শ্রদ্ধাঞ্জলি: বিচারপতি কেএম সোবহান

player
শ্রদ্ধাঞ্জলি: বিচারপতি কেএম সোবহান

বিচারপতি সোবহান খুবই সাহসী মানুষ ছিলেন। তিনি মৌলবাদ, ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে বলনে-কথনে ও লিখনে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ও নিজামীর নেতৃত্বাধীন ধর্মান্ধ জোট সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এ সময় ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ওই অত্যাচার-নির্যাতন ও খুন-খারাবির বিরুদ্ধে দুই দিনব্যাপী সম্মেলন হয়। তখন ওই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার জন্য কেউ সাহস করে এগিয়ে আসেনি। পরে বিচারপতি সোবহান সেখানে শুধু সভাপতিত্বই করেননি, কঠোর ভাষায় জোট সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবাদও করেছিলেন।

৩১ ডিসেম্বর দেশ ও জাতির আলোকিত সন্তান বিচারপতি কে এম সোবহানের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার প্রতি মনেপ্রাণে শ্রদ্ধাশীল, বাঙালি জাতির চরম দুঃসময়ে স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তবুদ্ধি-গণতন্ত্র ও জাতির পিতার কথা বলার জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সিনিয়র বিচারপতি কাজী মাহবুবুস সোবহান রাজপথে নেমে এসেছিলেন। আবেগপ্রবণ এই বাংলার মানুষ সেই দুঃসময়ের কথা কখনও ভুলতে পারবে বলে মনে হয় না।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের সদস্যসহ হত্যার পর রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী স্বাধীনতাবিরোধী খুনিচক্র ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখের অধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশকে ‘মিনি পাকিস্তানে’ পরিণত করে। জাতির পিতার হত্যা-ষড়যন্ত্রের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত দেশের প্রথম স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে (১৯৭৫-১৯৮১) সে সময়ের বাংলাদেশ ও পরাজিত পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না।

যেই বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না, তাকেই তার সৃষ্ট বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করেন জেনারেল জিয়া। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ বিরোধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী এবং রাজাকার সর্দার মওলানা মান্নান, আবদুল আলীমসহ স্বাধীনতাবিরোধী আরও অনেককে স্পিকার, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা বানান জিয়াউর রহমান। জাতির পিতা হত্যার ৭৯ দিনের মাথায় স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর রাষ্ট্রের প্রায় সব পর্যায়ের বড় বড় পদে স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানের দালালদের ক্ষমতায় বসানো হয়।

জিয়া, এরশাদ ও খালেদার ২৫ বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের নাম-ঠিকানা পর্যন্ত মুছে ফেলার আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছিল। স্বাধীনতা-উত্তরকালে দেশ ও জাতির সেই অন্ধকার সময়ে আলোর মশাল নিয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হন আরও কিছু বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবীসহ বিচারপতি কে এম সোহবান।

সামরিক স্বৈরশাসকরা দুঃশাসনের প্রতিবাদকারী, সাহসী ও দেশপ্রেমিক মানুষদের একেবারেই পছন্দ করল না। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের মধ্যে অনেকেই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী শাসকদের কুকর্ম সমর্থন করেছেন এবং ক্ষমতার অংশীদার হয়ে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। তবে ব্যতিক্রম ছিল। ভয়ভীতির মুখেও যারা অবৈধদের পক্ষ নেননি। সেসব কীর্তিমান বিচারপতিদের মধ্যে অন্যতম হলন বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন, বিচারপতি কে এম সোবহান, বিচারপতি খায়রুল হকসহ আরও দু-চারজন।

জিয়া-এরশাদচক্র বিচারপতি সোবহানের দেশপ্রেম ও স্বাধীনচেতা মন-মানসিকতার কথা জানত। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি থাকাকালে জেনারেল জিয়া ১৯৮০ সালে বিচারপতি সোবহানকে বিচার বিভাগ থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রদূত বানিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন। আর স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ ১৯৮২ সালের ১ জুন তাকে দেশে ডেকে এনে দুই সপ্তাহের মধ্যে আপিল বিভাগ থেকে অপসারণ করেন।

চাকরির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৮২ সাল থেকেই রাজপথ-মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশে উপস্থিত হয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতা হত্যার তদন্ত ও বিচার দাবি করতে শুরু করেন। জাহানারা ইমাম, আবদুর রাজ্জাক, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুনসহ আরও অনেকের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিচারপতি সোবহান একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন।

জিয়া ও খুনিচক্রের বানানো পূর্ব পাকিস্তানেই ১৯৮১-এর ১৭ মে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। স্বদেশে ফিরে শেখ হাসিনা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও পিতা হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেন।

ওই সময়ে বিচারপতি সোবহানসহ কতিপয় বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিরা বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতিবাদী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাজপথে থেকে আন্দোলন করতে থাকেন। বঙ্গবন্ধু এবং তার কন্যার প্রতি শ্রদ্ধাশীল বিচারপতি সোবহান জাতির পিতার কোনো বিরূপ সমালোচনা সহ্য করতে পারতেন না।

তিনি সব সময় বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। এই দেশ-জাতি ও জনগণের জন্য বঙ্গবন্ধু এত বেশি অবদান রেখেছেন, এত বেশি কষ্ট ভোগ ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন যে এর তুলনায় জাতির পিতার দু-একটা ছোটখাটো ভুল যদি হয়েও থাকে, তা তেমন কিছু নয়।

খুবই সাহসী মানুষ ছিলেন বিচারপতি সোবহান। তিনি মৌলবাদ, ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে বলনে-কথনে ও লিখনে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ও নিজামীর নেতৃত্বাধীন ধর্মান্ধ জোট সরকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়।

এ সময় ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ওই অত্যাচার-নির্যাতন ও খুন-খারাবির বিরুদ্ধে দুই দিনব্যাপী সম্মেলন হয়। তখন ওই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার জন্য কেউ সাহস করে এগিয়ে আসেনি। পরে বিচারপতি সোবহান সেখানে শুধু সভাপতিত্বই করেননি, কঠোর ভাষায় জোট সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিবাদও করেছিলেন।

বৃদ্ধ বয়সেও কর্মচঞ্চল মানুষ ছিলেন বিচারপতি সোবহান। শুধু ঢাকা নয়, বঙ্গবন্ধু-মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীনতা বিষয়ে আর ধর্মান্ধ অপশক্তির বিরুদ্ধে রাজধানীর বাইরেও অনেক সভা-সেমিনারে তিনি যোগদান করেছেন।

মুক্তবুদ্ধির চর্চা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সামরিক স্বৈরশাসন ও সামাজিক অনাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশে নিরীহ আহমদিয়া সম্প্রদায়ের ওপর জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মৌলবাদী দোসরদের ধারাবাহিক হামলা-নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন।

হামলাকারীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-সমাবেশ ও রাজপথের মিছিলে তিনি সামনের সারিতে থেকেছেন। যেকোনো অপরাধের প্রতিবাদ করতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যখন-তখন ছুটে গেছেন। অসহায়-নিরপরাধ ও আক্রান্ত মানুষের ভরসা আর সাহসের প্রতীক ছিলেন এই মানবতাবাদী পুরুষ। ২০০৭-এর ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে অসুস্থ বিচারপতি সোবহান জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বঙ্গবন্ধু ভবনে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুকন্যার জন্মদিনে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে সাব-জেলের গেটেও ছুটে গেছেন তিনি।

আরেকবার ক’বছর আগে ঢাকায় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের সময় রাস্তায় ঢলে পড়েন। ধরাধরি করে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে গিয়ে জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর পাশের লোকদের বললেন- ‘খবরদার, আমার বাসার কাউকে জানাবেন না। তাহলে মিছিলে আসা আমার বন্ধ হয়ে যাবে।’ হাসপাতাল থেকে বাসায় গিয়ে আবার প্রতিবাদ সভা ও মিছিলে হাজির হয়েছেন। মাঝেমধ্যে খোঁজখবর নেয়ার জন্য বাসায় ফোন করলে তার সহধর্মিণী কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বলতেন- ‘আপনাদের স্যার কারও কথা শুনেন না। অসুস্থতা ওনার কাছে কোনো বিষয় নয়। সভা-সমাবেশের ডাক আসলে তিনি কাউকে কিছু না বলে ঘর থেকে বের হয়ে যান।’

এভাবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ক্লান্তিহীনভাবে সব অন্যায়-অত্যাচার ও অবিচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আর মানবতার সপক্ষে তিনি কাজ করে গেছেন। তিনি বাংলাদেশ-রাশিয়া মৈত্রী সমিতির সভাপতি থাকাকালে এ দেশের বহু ছেলেমেয়ে রাশিয়ার বৃত্তিতে সে দেশে পড়েছে। তিনি ছিলেন সমগ্র জাতির একজন অভিভাবক। তার মৃত্যু দেশ ও জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। দেশের ক্রান্তিকালে যখন তার প্রয়োজন ছিল বেশি, ঠিক তখনই আট বছর আগে ২০০৭-এর ৩১ ডিসেম্বর তিনি সবাইকে ছেড়ে গেছেন।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি
২২ প্রধান বিচারপতি: চারজন হন রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়কের প্রধান
নতুন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী
অবসরে সাক্ষাৎকার দেব না: প্রধান বিচারপতি
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বিদায়ী সাক্ষাৎ

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বাণিজ্য মেলা, করোনা ও লেখাপড়া

বাণিজ্য মেলা, করোনা ও লেখাপড়া

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, করোনায় সবচেয়ে বেশি ভিকটিম হয়েছে শিক্ষা খাত। যখনই বিধিনিষেধ বা লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, শুরুতেই কোপ পড়েছে পড়ালেখায়। বলা হচ্ছে, অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষার মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া হচ্ছে।

ইউরোপের দেশ আয়ারল্যান্ডে যেদিন (২২ জানুয়ারি) থেকে করোনার অধিকাংশ বিধিনিষেধ প্রত্যাহার শুরু হলো, তার ঠিক আগের দিনই করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেইসঙ্গে দেয়া হয় ১১টি বিধিনিষেধ। অথচ গত সপ্তাহেও আয়ারল্যান্ড ছিল ইউরোপে সর্বোচ্চ করোনা আক্রান্তের দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়।

শুধু আয়ারল্যান্ড নয়, পুরো ইউরোপ শুরু থেকেই করোনায় নাস্তানাবুদ হয়েছে। তারা যখন বিধিনিষেধ শিথিল এবং কোথাও কোথাও পুরোপুরি প্রত্যাহারের পথে হাঁটছে, তখন বাংলাদেশকে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করতে হচ্ছে। ফের লকডাউনের শঙ্কা না থাকলেও পরিস্থিতি যে খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে, সে কথা খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যেও স্পষ্ট। উপরন্তু দেশে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় নানারকম কন্ট্রাডিকশন বা সাংঘর্ষিক অবস্থাও পরিস্থিতিকে জটিলতর করে তুলছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী যেদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধের ঘোষণা দিলেন, সেদিনই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা চলবে। বাণিজ্য মেলার পরিচালক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) জানিয়েছে, মেলা বন্ধের বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এখনও নতুন নির্দেশনা আসেনি। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে তদারকি বাড়ানো হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছে। মাস্ক না পরা ও স্বাস্থ্যবিধি ভাঙলে জরিমানাও করা হচ্ছে।

এর পরদিনই, অর্থাৎ শনিবার চলমান পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় রাজধানীর নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের ডিগ্রির শিক্ষার্থীরা। সকাল ৯টার পর থেকে তারা রাস্তায় অবস্থান নেয়। ওইদিনই তারা শেষ পরীক্ষাটি দিতে কেন্দ্রে এসেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে জানতে পারে, পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। যেহেতু এটি শেষ পরীক্ষা, সুতরাং করোনা বেড়ে যাওয়ার দোহাই দিয়ে এটি স্থগিত রাখার কোনো মানে নেই। কারণ একবার স্থগিত হয়ে গেলে এটি আবার কবে নেয়া হবে, তা কেউ বলতে পারে না। উপরন্তু ওই একটি পরীক্ষার জন্যই এই শিক্ষার্থীদের ফলাফল পেতে বিলম্ব হবে।

শুধু এ একটি ঘটনাই নয়, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, করোনায় সবচেয়ে বেশি ভিকটিম হয়েছে শিক্ষা খাত। যখনই বিধিনিষেধ বা লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, শুরুতেই কোপ পড়েছে পড়ালেখায়। বলা হচ্ছে, অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষার মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া হচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, ফিজিক্যাল ক্লাস-পরীক্ষা আর অনলাইন ক্লাস-পরীক্ষার মধ্যে যে ব্যবধান আকাশ-পাতাল, সেটি শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা জানেন। শিক্ষকরা তো বটেই। অনলাইন ক্লাস মূলত ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো’। এর একটি বড় কারণ, অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই অনলাইন ক্লাস করার মতো উন্নত ডিভাইস এবং নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট কানেকশন নেই। অনেকে ক্লাস শুরু করে ভিডিও অফ করে রাখেন। কেউ কেউ অডিও-ভিডিও দুটিই অফ করে অন্য কাজ করেন। সব মিলিয়ে অনলাইন ক্লাস হচ্ছে পড়াশোনা ফাঁকি দেয়ার একটি বিরাট হাতিয়ার।

তাহলে করণীয় কী ছিল? বলা হচ্ছে ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।’ অর্থাৎ একেবারে ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ার চেয়ে অনলাইন বেটার। কিন্তু আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও সংস্কৃতি এখানে বিরাট অন্তরায়। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিক্ষকদের চেষ্টা নিশ্চয়ই প্রশংসনীয়। কিন্তু এই বিকল্প উপায়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা আসলে কতটা হয়েছে, হচ্ছে বা হবে— তা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে সংশয়ের অন্ত নেই। দুর্ভাগ্য, যখনই শারীরিকভাবে উপস্থিতিতে ক্লাস চালু শুরু হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছিল, তখনই নতুন করে চোখ রাঙাতে শুরু করে করোনাভাইরাস। ফলে সরকারকে নতুন করে আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিতে হয়।

এখানে অবশ্য কিছু কন্ট্রাডিকশন বা সাংঘর্ষিক অবস্থাও দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হলেও বাণিজ্যমেলা ঠিকই চলছে—যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় এবং অনেকেই যে এরকম ভিড়ের মধ্যে গিয়েও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে মাস্কও পরছেন না— এমন ছবিও গণমাধ্যমে আসছে। তার মানে কি বাণিজ্যমেলায় করোনার শঙ্কা কম?

অনেকে মনে করেন, মেলা যেহেতু খোলা জায়গায় হচ্ছে, ফলে এখানে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কম। যদি তাই হয়, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কী প্রয়োজন ছিল? যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বড় মাঠ বা খোলা জায়গা আছে, সেখানেও বেঞ্চ পেতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস-পরীক্ষা নেয়া সম্ভব। কিন্তু এই বিকল্প ভাবনাটি আমাদের নীতি-নির্ধারকদের মগজে আসতে চায় না। কারণ তারা সম্ভবত মাথাব্যথা হলে মাথাটি কেটে ফেলার পক্ষে।

ফিজিক্যাল ক্লাস-পরীক্ষা চালুর জন্য অনেক বিকল্প প্রস্তাবও এসেছিল। যেমন একসঙ্গে ক্লাসের সব শিক্ষার্থীকে হাজির না করে দুই বা তিনটি শিফটে, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস চালু করা। সব ক্লাসের নির্ধারিত ক্লাসের সংখ্যা কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে যে, পড়ালেখা ছাড়া সবই স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। রাস্তায় বা বাজারে গেলে মানুষের ভিড় এবং মাস্কবিহীন মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই যে, বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব একটি অতিমারির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

যদি তাই হয়, তাহলে বিধিনিষেধেরইবা দরকার কী? মানুষ যদি মনে করে এই পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে; জ্বর-সর্দি-কাশি হলেও যদি তারা যদি মনে করে যে, এই পরিস্থিতি নিয়েও তারা স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাবে; সেটিও বরং বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক কম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের জন্য ভালো। কারণ দিনের পর দিন আর্থিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকলে তার পরিণাম করোনার চেয়েও খারাপ হবে।

কিন্তু এই পরিস্থিতিতে জাতির জন্য সঠিক দিকনির্দেশনার যে ঘাটতি রয়েছে তা শুরু থেকেই দৃশ্যমান। যেমন একবার বলা হলো- হোটেল রেস্টুরেন্টে খেতে হলে সঙ্গে টিকাকার্ড থাকতে হবে। প্রশ্ন হলো, এই কার্ড কে পরীক্ষা করবে? রেস্টুরেন্টের মালিক? তার কী দায় পড়েছে! কার্ড দেখে কাস্টমার প্রবেশ করালে তার ব্যবসা লাটে উঠবে। তাহলে কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী? দেশে কি এত পুলিশ আছে যে সারা দেশের হোটেল রেস্টুরেন্টে গিয়ে তারা কাস্টমারদের কার্ড পরীক্ষা করবে? এরপরে বলা হলো- সামাজিক অনুষ্ঠানও চলবে, তবে একশ লোকের বেশি নয়। প্রশ্ন হলো- সেখানে একশ লোক আছে নাকি একশ দশজন, সেটি কে গুণে দেখবে?

তারও চেয়ে বড় প্রশ্ন, যদি বাণিজ্যমেলা চলতে পারে, যদি সর্বোচ্চ একশ লোক নিয়ে সামাজিক অনুষ্ঠান হতে পারে, যদি প্রতিটি বাস ও লঞ্চে এখনও গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন করা হতে পারে, তাহলে শুধু স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা হবে কেন? করোনার ঝুঁকি শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে?

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং শত শত ইউনিয়ন পরিষদেও ভোট হয়ে গেল যেখানে একসঙ্গে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছে। সেখানে করোনা ছড়ায়নি? বার বারই কেন পড়ালেখাই ভিকটিম হবে? বাঙালির প্রাণের মেলা, অমর একুশে বইমেলাও নির্ধারিত সময় অর্থাৎ পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে না। এটি নাকি ১৫ তারিখ শুরু হবে। প্রশ্ন হলো ১৫ তারিখের মধ্যে দেশ থেকে করোনা উধাও হয়ে যাবে? বার বার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বইমেলার মতো মননশীল আয়োজনের মধ্যেই কেন বিধিনিষেধ? যে ‍যুক্তিতে বাণিজ্যমেলা চলছে, সেই যুক্তিতে বইমেলা কেন পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করা যাবে না? কাদের মাথা থেকে এসব চিন্তা বের হয়?

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি
২২ প্রধান বিচারপতি: চারজন হন রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়কের প্রধান
নতুন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী
অবসরে সাক্ষাৎকার দেব না: প্রধান বিচারপতি
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বিদায়ী সাক্ষাৎ

শেয়ার করুন

‘জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েরা’: প্রতিষ্ঠিত ও বিকল্প ডিসকোর্স

‘জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েরা’:
প্রতিষ্ঠিত ও বিকল্প ডিসকোর্স

জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের গায়ে চাপিয়ে দেয়া হয় নেতিবাচক লেবেল বা পরিচয়; এই পরিচয় উপেক্ষা করে জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। যে পরিচয় আমলে নেয় না, অনুধাবন করে না- জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের অধিকার আদায়ের ইতিহাস, বুক চিতিয়ে যৌক্তিক ইস্যুতে যূথবদ্ধ হওয়ার ইতিহাস।

‘জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের কেউ বিয়ে করতে চায় না’ এমন একটি বক্তব্য দিয়ে সম্প্রতি আলোচনায় এসেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ভিসি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নারী শিক্ষার্থীদের তথা নারীর প্রতি অত্যন্ত অবমাননাকর এই বক্তব্যটির কারণে অনেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন, ট্রল করছেন, ভিসির পদত্যাগ চাইছেন; কিন্তু মোদ্দা কথা হলো- জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের নিয়ে শাবি ভিসিই প্রথম এই মন্তব্য করলেন বিষয়টি তা নয়।

জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রী অথচ এই মন্তব্যটি শোনেননি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে। আমিও শুনেছি এবং ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব ও বিড়ম্বনা দুই-ই নানাভাবে মোকাবিলা করেছি। এই তো সেদিনও পিএইচডিধারী একজন বললেন, ‘মেয়েকে জাবিতে দিলাম না। লোকজন যা সব বলে তোমাদের জাবিকে নিয়ে! শেষমেশ প্রাইভেটে দিলাম।’

কেউ কারো ছেলে বা মেয়েকে জাবিতে পড়াবেন, নাকি মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটিতে পড়াবেন- সেটা একান্তই তার পারিবারিক সিদ্ধান্ত, কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নানান কথা প্রচলিত আছে এবং সে কারণে সেখানে মেয়েকে পড়তে পাঠালেন না- এমন মন্তব্য নিঃসন্দেহে অবমাননাকর এবং তা চুপচাপ শুনে যাওয়া অসম্ভব।

কথায় কথা বাড়ে, শেষতক তিনি প্রশ্ন ছুড়লেন, ‘কই অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তো কথা হয় না। তোমাদের জাহাঙ্গীরনগরকে নিয়েই কেন এত কথা হয়?’

একভাবে আমি একটি প্রশ্ন আবার একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত একটি ডিসকোর্সের মুখোমুখি হলাম। শাবি ভিসিও আমাদেরকে সেই ডিসকোর্সের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলেন আরেকবার।

জাহাঙ্গীরনগরের নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রচলিত এই ডিসকোর্সটি বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই আসে একটি সময়ের কথা।

অনেকেরই হয়তো জানা আছে যে, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে জাবিতে তৎকালীন সরকারি দলের আশীর্বাদপুষ্ট কিছু ছাত্রনেতার ‘ধর্ষণের সেঞ্চুরি’ উদযাপনের কথা। এই খবর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন এমন মানুষজনের মধ্যে বিস্তৃত হওয়ার পর উৎকণ্ঠিতরা মনে করতে থাকলেন জাহাঙ্গীরনগরে মেয়েরা নিরাপদ নন। সেখানে মেয়েরা গেলেই ধর্ষণের শিকার হন অথবা যারা আছেন তারা সবাই ইতোমধ্যে ধর্ষণের মুখোমুখি হয়েছেন।

উৎকণ্ঠিতদের কেউ কেউ ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। তারা জাহাঙ্গীরনগরকে মন ও মগজ থেকে আলাদা করে ফেলতে চাইলেন। মেয়েদেরকে সেখানে পড়তে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, কিছু পরিবার পুত্রবধূ হিসেবেও জাবির মেয়েদেরকে নামঞ্জুর করলেন। কথিত আছে যে, সেসময় পত্রপত্রিকায় পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করে দেয়া হতো, ‘জাহাঙ্গীরনগরের মেয়ে ব্যতিত।’

‘জাহাঙ্গীরনগরের মেয়ে ব্যতিত’ পাত্রী খোঁজা বা জাহাঙ্গীরনগরে মেয়েদেরকে পড়তে না পাঠানোর মানে জাহাঙ্গীরনগর বাদ, কালো তালিকাভুক্ত বা অচ্ছুৎ।

খেয়াল করলে দেখা যাবে এই এক্সক্লুশন ধারণার মূলে রয়েছে ‘সতীত্ব’র ধারণা। জাহাঙ্গীরনগরের মেয়ে এবং তাদের ‘সতীত্ব’ প্রশ্নবোধক। দুই কারণে: এক. তারা ধর্ষিত হয়ে থাকতে পারেন, দুই. তারা রাতবিরাতে চলাচল করেন। স্বাধীনভবে ঘোরাঘুরি করার কারণে তাদের স্বভাব চরিত্র ‘ঠিক নয়’। কেননা রাতবিরাতে ‘ভালো মেয়েরা’ ঘোরাঘুরি করেন না জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েরা করেন, সুতরাং তারা খারাপ।

এর ফলে জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের সামাজিকভাবে বয়কটের ডিসকোর্স তৈরি হয়। এখানে লক্ষণীয়, জাহাঙ্গীরনগরে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক বয়কটের ডিসকোর্স শাস্তির আওতায় নিয়ে এসেছে নারীকেই। কারণ লোকের চাই অক্ষত যোনি। ধর্ষণ যদিও বলপ্রয়োগের ঘটনা, তবু মেয়েরাই এর শাস্তি পাবেন এবং তারা বিয়ের বাজারে ‘অযোগ্য’ ঘোষিত হবেন?

বাংলাদেশি অভিভাবকদের কন্যাসন্তান লালনপালনের একটা বড় উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে ‘সুকন্যা’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং ‘সুপাত্রস্থ’ করা। শাবি ভিসিসহ উৎকণ্ঠিত অভিভাবককুল এই ধারারই অংশ। প্রায় সবাই চান তাদের কন্যাকে ‘সু’ করে গড়ে তুলতে এবং সেজন্য চান সব ধরনের ‘কলঙ্ক’ থেকে মুক্ত রাখতে।

এ জন্য তারা চেষ্টার কমতি রাখেন না। বাংলাদেশে ‘সুকন্যা’ গড়ে তোলার জন্য একজন মেয়েকে ‘সুশীল’ বা ‘উত্তম’ কিছু গুণাবলি আয়ত্ত করার দিকে শৈশব থেকেই শিক্ষা দেয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘সতীত্ব’ ধারণাকে মনেপ্রাণে ধারণ করা এবং ‘সতীত্ব’ রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া; স্বামী, সংসার এবং সন্তান এই তিনের আবর্তে নিজের চাহিদা ও ইচ্ছাকে তৈরি করা; এবং প্রয়োজনে পরিবার ও সমাজের চাহিদা পূরণে নিজের ইচ্ছা ও চাহিদাকে বিসর্জন দেয়া।

পারিবারিক ও সামাজিক এই গাইডলাইনের সঙ্গে জড়িত থাকে পারিবারিক ও সামাজিক মানসম্মান। কেননা ধরে নেয়া হয়, ‘ভালো পরিবারের’ মেয়েরা কখনও নির্ধারিত গাইড লাইনের বাইরে যান না।

অথচ জাবির মানিক ও তার গং-কে জাবির ছাত্রীছাত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করেছেন। আমাদের সময়ে আমরা অসংখ্য সাধারণ ছাত্রী ধর্ষক আনিসবিরোধী আন্দোলন করেছি। ক্লাস, পরীক্ষা উপেক্ষা করে মাঠে-ময়দানে মিছিল করেছি।

শুধু মানিক বা আনিসবিরোধী আন্দোলনই নয়, শিক্ষার্থীদের অধিকার ও দাবি আদায়ের যেকোনো যৌক্তিক ইস্যুতে জাবির শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারতেন। মুক্ত ক্যাম্পাসে সবার পদচারণা নিশ্চিত করার কথা ভাবতে পারতেন। ফলে দ্বিতীয় সান্ধ্য আইনবিরোধী আন্দোলন করেছি আমরা।

হুমায়ুন আজাদ যেদিন ঘাতকের আক্রমণের শিকার হন সেদিন প্রীতিলতা হল থেকে আমরা ছাত্রীরা প্রথম মিছিল নিয়ে সব ছাত্রী হল প্রদক্ষিণ করে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরাই প্রথম সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়নের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। এমনকি তৎকালীন ভিসির বিরুদ্ধেও তারা অবস্থান নিয়েছিলেন।

জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে ছাত্রীদের এই যে অন্য একটি পরিচয়, প্রতিবাদী চেতনা বা মানসিকতাকে ঘিরে অলটারনেটিভ বা বিকল্প ডিসকোর্সের খোঁজ উৎকণ্ঠিত জনতা রাখেনি। জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের অন্যায় মোকাবিলা করার সাহসের প্রশংসা তারা করেনি। শুধু জাহাঙ্গীরনগরকেন্দ্রিক নয়, আরও সব সামাজিক-রাষ্ট্রীয় অন্যায়ে জাহাঙ্গীরনগরের ছাত্রীছাত্রদের বলিষ্ঠ অবস্থান এই জনতা দেখতে পায়নি, হৃদয়ঙ্গমও করেনি।

কারণ, তারা জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের এই চেহারাকে আদতে বুঝতেই পারেনি। তাদের দেখার যে চোখ তা কেবল মেয়েদের নির্যাতিত, নিপীড়িত হিসেবে দেখেই অভ্যস্ত। মেয়েদের চোখে চোখ রেখে কথা বলা বা মেরুদণ্ড সোজা করে চলার এই ইতিহাস বুঝতে গেলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা দরকার তা তাদের অনুপস্থিত। তারা কেবল জানে, মেয়েরা ‘নষ্ট’ হয়, ‘সতীত্ব’ হারায়। যেন মেয়েরা কেবল একটি যোনি!

রাজা যায় রাজা আসে, রানিরাও আসে যায়। জাহাঙ্গীরনগরের মাটি থেকে মানিক বিতাড়িত হয়, আনিস বিতাড়িত হয়, তবু জাবির মেয়েদের ‘চরিত্র’ মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

নারীর পরিচয়কে কোনো একটি নেতিবাচক লেবেলিং করা মূলত হীনতর পুরুষতান্ত্রিক প্রচেষ্টা। পতিতা, অসতী, নষ্টা- পরিচয়ও সেই নেতিবাচকতার অংশ। আজকের সমাজ, রাষ্ট্র, তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ভিসি সেই হিসেবে আর কতদূর ভাববেন?

সময় বদলেছে, অথচ জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের গায়ে এখনও চাপিয়ে দেয়া হয় সেই নেতিবাচক লেবেল বা পরিচয়; এই পরিচয় উপেক্ষা করে জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। যে পরিচয় আমলে নেয় না, অনুধাবন করে না- জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েদের অধিকার আদায়ের ইতিহাস, বুক চিতিয়ে যৌক্তিক ইস্যুতে যূথবদ্ধ হওয়ার ইতিহাস।

এক ও একমাত্র ‘সতীত্ব’র ধারণাকে কেন্দ্র করে জাহাঙ্গীরনগরের নারী শিক্ষার্থীদের আলাদা করে দেখতে চাওয়ার যে এক্সক্লুশনারি ডিসকোর্স, সামাজিক বয়কটের দৃষ্টিভঙ্গি জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েরা সেই অবস্থানকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন, কেননা জাহাঙ্গীরনগরের মেয়েরা জানেন কীভাবে আবর্জনা পায়ে দলে যৌথতার পথকে মসৃণ করে তুলতে হয়। আমি সেই যূথবদ্ধ মেয়েদের একজন, এ জন্য আমি গর্বিত।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক

আরও পড়ুন:
শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি
২২ প্রধান বিচারপতি: চারজন হন রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়কের প্রধান
নতুন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী
অবসরে সাক্ষাৎকার দেব না: প্রধান বিচারপতি
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বিদায়ী সাক্ষাৎ

শেয়ার করুন

সেবার সঙ্গে মিতালি ও কাজীদার সান্নিধ্য

সেবার সঙ্গে মিতালি ও কাজীদার সান্নিধ্য

মানুষের জীবন আলো-আঁধারিতে ভরা। কাজীদা’র মধ্যে আঁধার বলে কিছু ছিল কি না, জানি না। সেটা তো দেখিনি কখনও। তবে যে আলোটুকু দেখেছি, তা ছিল পুরোটাই মাধুর্যে ভরা। প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। তার কথাবার্তা-চালচলনে ছিল অনুকরণীয় পরিমিতি বোধ।

তখন টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে পড়ি। অষ্টম শ্রেণিতে জাহাঙ্গীর নামের এক জ্যেঠা সহপাঠী পেলাম। জ্যেঠা বলছি এ কারণে যে, জাহাঙ্গীর আমার এক ক্লাস ওপরে ছিল। পরীক্ষা দেয়নি বা পাস করেনি- এমন কোনো কারণে অষ্টম শ্রেণিতেই থেকে যায়। ওরে-ব্বাস, বিরাট এক কবি! কী সব লেখে, এক বর্ণও বুঝতে পারি না। স্থানীয় পত্রিকায় আবার ছাপাও হয়। মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে গেল, ভবিষ্যতে একজন রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের মতো কবি পেতে যাচ্ছি। আর কিছু না হলেও জীবনানন্দ তো বটেই। প্রচুর বই পড়ত সে। আর আমাকে বিস্তর জ্ঞান দিত। ওস্তাদ কিসিমের পোংটা।

ওই সময় ‘দস্যু বনহুর’ গোগ্রাসে গিলতাম। সিরিজের পরবর্তী বইয়ের জন্য একটা বইয়ের দোকানে দুই-চার টাকা আগাম পর্যন্ত দিয়ে আসতাম। ভাবলাম, জাহাঙ্গীর ওস্তাদ যত বই-ই পড়ুক, নিশ্চয়ই দস্যু বনহুরের খবর জানে না। একদিন টিফিন পিরিয়ডে বেশ গর্বভরে দস্যু বনহুরের গপ্পো ঝাড়তে গেলাম, জাহাঙ্গীর ঠোঁট বাঁকিয়ে অবলীলায় বলল, ‘ও, দস্যু বনহুর! এইটা তো ফোর-ফাইভের পোলাপান পড়ে! আমি পড়ি মাসুদ রানা! একবার পড়লে বুঝবি।’
দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় থ্রিলার সিরিজ মাসুদ রানার সঙ্গে আমার পরিচয় এভাবেই। সিরিজের খ্যাতিমান লেখক কাজী আনোয়ার সম্পর্কে জানাও শুরু এখান থেকে। তবে জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে মাসুদ রানা নিতে পারিনি। পাছে গায়েব করে দিই, এই ভয়ে দেয়নি। তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল ওর।

‘বাংলাঘর’ নামে একটা ঘর ছিল আমাদের। সেখানে বড় মামার বড় ছেলে থাকতেন। ছাত্ররাজনীতি করতেন। অনেক রাতে ফিরতেন তিনি। সকাল ১০টা-১১টা পর্যন্ত ঘুমাতেন। সকালে একদিন গিয়ে দেখি যে টেবিলের ওপর একটা অন্যরকম বই। মলাটে লেখা- মাসুদ রানা। লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন। বুকের রক্ত ছলকে উঠল- আরে, এ তো সেই গুপ্তধন! কিন্তু বইটা হাতে নিতে গিয়ে জমে যাই।

লেখা আছে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। তখনও ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ কথার মানেটা পুরোপুরি বুঝি না। কেবল বুঝি যে এটা এক ভয়ংকর বয়স, যার ধারেকাছে ছোটদের থাকতে নেই। কিন্তু মাসুদ রানার দুর্নিবার টান এড়াতে পারি না। কখন যে বইটা তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করেছি, টেরই পাইনি। তারপর মামাতো ভাই খুক্ করে একটু কাশি দিতেই বই ফেলে ভোঁ দৌড়! কিন্তু ততক্ষণে যতটুকু মজার মজে গিয়েছি। মনের ভেতর প্রবল আলোড়ন- এই বই পড়তেই হবে। না পড়ে শান্তি নেই।

জাহাঙ্গীরের মাধ্যমেই মাসুদ রানা পাওয়ার উপায় জুটল। এক বইয়ের দোকানে আগাম টাকা দিলে ঢাকা থেকে এনে দেয়। টাকা দিয়ে প্রবল উত্তেজনা নিয়ে দিন গোনা- কখন আসে মাসুদ রানা! দোকানি আজ যাব কাল যাব করে অপেক্ষায় রাখেন। তিনি তো আর শুধু একটা-দুটো বইয়ের জন্য যাবেন না। একসঙ্গে নানা ধরনের বই আনবেন। তারপর একদিন বাসে করে আসত মাসুদ রানা। দোকানি বইটাকে পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে এমনভাবে হাতে তুলে দিতেন, যেন নিষিদ্ধ কোনো মাদক তুলে দেয়া হচ্ছে! তখন মাসুদ রানার কাভারে এমন কিছু থাকত, যা বালক বা কিশোরের হাতে মানাত না।
তো, এভাবে শুরু হলো মাসুদ রাানার প্রতি আকর্ষণ ও নেশা। পরে একটা লাইব্রেরি যখন নিয়মিত সেবার বই আনতে শুরু করল, এই প্রকাশনীর অন্যান্য বইয়ের প্রতিও আকৃষ্ট হলাম। বিশেষ করে জুলভার্নের বইয়ের অনুবাদগুলো। এক কথায় অসাধারণ! একপর্যায়ে দেখা গেল, শুধু সেবার বই-ই পড়ছি, আর কিছু পড়ি না। দুনিয়া সম্পর্কে জানা, দেখা ও বোঝার মতো অনেক কিছু রয়েছে সেবার বইগুলোতে। এটাই হচ্ছে এসব বইয়ের মূল কারিশমা। আরও রয়েছে ভাষার ব্যবহার, শব্দ চয়ন ও প্রয়োগ এবং নির্ভুল বানান শেখার বিষয়।

সেবার বই পড়তে পড়তেই একটা সময় রহস্য-রোমাঞ্চ নিয়ে লেখার অদম্য ইচ্ছা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আরও বড় হয়ে কাটা-ছেঁড়া করতে করতে একটা রোমাঞ্চ-উপন্যাস লিখেও ফেলি। নাম দিই ‘অদৃশ্য ফাঁদ’। পাণ্ডুলিপি কাজীদা বরাবর পাঠিয়ে দিন গুনতে থাকি- কী আসে জবাব। কিন্তু দিনের পর দিন পেরিয়ে যায়, কোনো উত্তর আসে না। নানা ভাবনা দোল খায় মাথায়।

তিনি যে ব্যস্ত মানুষ, এসব ছাতামাথা স্ক্রিপ্ট দেখার সময় আছে কি তাঁর? এরপরও সফট রিমাইন্ডার দিয়ে চিঠি লিখি। মাস তিনেক পর এক দুপুরে সেবা প্রকাশনীর সিল মারা একটি হলুদ খাম এল। সেটা খুলে চোখের পলক পড়ে না। কাজীদার নিজস্ব প্যাডে স্বহস্তে লেখা চিঠি। ওতে ‘জনাব শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া’ বলে সম্বোধন করা। লেখা হয়েছে, আমার কাহিনিটি কাঁচা, ভাষায় ভুল, বানানে ভুল; তবে আমাকে দিয়ে হবে, কারণ লেখার ভঙ্গি ভালো।
এই চিঠি আমাকে জাদু করল। লেখায় লেগে রইলাম। হাল ছাড়লাম না। ধৈর্য ধরে সারাতে লাগলাম লেখার ত্রুটিগুলো। তারপর একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে রহস্য পত্রিকায় আমার একটি ভৌতিক গল্প ছাপা হলো। শিগগিরই সেবার ছোটদের মাসিক সাময়িকী কিশোর পত্রিকায় একটি বড় গল্প উপন্যাস আকারে গেল। তারপর আমাকে আর পায় কে? দুহাতে লিখে চললাম সেবার দুই পত্রিকায়। দুটোতে আমার গল্প, উপন্যাস, ফিচার ছাপা হতেই থাকল। রহস্য পত্রিকার দুই সহকারী সম্পাদক সেবার শীর্ষস্থানীয় লেখক শেখ আবদুল হাকিম ও রকিব হাসানের সঙ্গে পরিচয় হলো। ঘনিষ্ঠতা হলো।

হৃদ্য গড়ে উঠল কাজীদার বড় ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন টিংকুর সঙ্গে। ছুটির দিন বাদে রোজ সন্ধ্যায় রহস্য পত্রিকার অফিস হতো। সেখানে চুটিয়ে আড্ডা জমাতেন সেবার লেখকেরা। সে আড্ডায় প্রায়ই যোগ দিতাম। বেশির ভাগ দিন হাকিম ভাই চা আনাতেন। চা খেতে খেতে খেতে নানা বিষয়ে গল্প হতো। সেসব মধুর স্মৃতি কখনও ভোলার নয়। ওই সময় রহস্য পত্রিকা ও কিশোর পত্রিকায় স্বনামে-বেনামে আমার অনেক লেখা ছাপা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে কিশোর পত্রিকায় আমার সাক্ষাৎকারও ছাপা হয়। আসজাদুল কিবরিয়া নিয়েছিলেন সেই সাক্ষাৎকার।
সেবার অঙ্গ প্রতিষ্ঠান প্রজাপতি প্রকাশন থেকে আমার প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। রহস্য পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি গল্পের সংকলন ছিল সেটি। নাম ‘তান্ত্রিকের মূর্তি’। এর কিছুদিন পরই প্রজাপতি থেকে ‘অশুভ শক্তি’ নামে আমার একটি সায়েন্স ফিকশন প্রকাশিত হয়। তখনও কাজীদার সঙ্গে আমার পরিচয় বা সাক্ষাৎ হয়নি।
একদিন রহস্য পত্রিকার সান্ধ্য আড্ডায় লোকজন কম। একপর্যায়ে দেখা গেল হাকিম ভাই, মহিউদ্দিন ভাই আর আমি আছি। এ সময় ক্যাজুয়াল পোশাকে সৌম্যকান্তি এক ব্যক্তি এলেন। দেখেই বুঝলাম তিনি কে। হাকিম ভাইয়ের সঙ্গে রহস্য পত্রিকা কিছু বিষয় নিয়ে দু-চার মিনিট কথা বলে বেরিয়ে গেলেন। তার পিছু পিছু হাকিম ভাইও গেলেন। শিগগিরই ফিরে এলেন দুজন। কাজীদা তার হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘দেখেন কী কাণ্ড! সেবা থেকে আপনার দুটো বই বেরিয়েছে, অথচ আপনাকে আমি চিনি না!’
বুঝলাম হাকিম ভাই আমার কথা বলেছেন তাঁকে। কাজীদার সঙ্গে সেটাই প্রথম সাক্ষাৎ। তিনি বসলেন না। হাসিমুখে খানিকক্ষণ কথা বলে চলে গেলেন। এর পর আরও বেশ কয়েকবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে তার সঙ্গে। কিশোর তারকালোকে কাজ করার সময় তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি। সেবা থেকে আমার একটা রোমান্টিক উপন্যাস বের হয়। নাম ‘তোমার আকাশ নীলে’। ওই সময় বড় ধরনের লেখার বিষয়ে সূক্ষ্ম কিছু কলাকৌশল শিখতে পারি তার কাছে। এভাবে আরও বহু দিন সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলাম।
তারপর সময়ের বিবর্তনে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে সেবায় যাতায়াত কমে গেছে। তাই বলে সেবার সঙ্গে কখনও মনোবিচ্ছেদ ঘটেনি। সেবার সেই মধুর সান্ধ্য আড্ডা এখনও আছে কি না, জানি না। হয়তো আছে। মান্না দের সেই ‘কফি হাউসের আড্ডা’র মতো হয়তো নতুন নতুন মুখ এসে জুটেছে। অনেক দিন যাওয়া হয় না। তাই জানি না কিছু।

আমাদের প্রবাদপুরুষ কাজীদা চলে যাওয়ায় বেদনার্ত হয়েছি, তবে অবাক হইনি। তিনি যেকোনো দিন চলে যাবেন, এমন একটা মানসিক প্রস্তুতি ছিল। বয়স তো আর কম হয়নি। তবে তিনি এই অধমের স্মৃতিপটে থাকবেন আজীবন। মানুষের জীবন আলো-আঁধারিতে ভরা। কাজীদা’র মধ্যে আঁধার বলে কিছু ছিল কি না, জানি না। সেটা তো দেখিনি কখনও। তবে যে আলোটুকু দেখেছি, তা ছিল পুরোটাই মাধুর্যে ভরা। প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। তার কথাবার্তা-চালচলনে ছিল অনুকরণীয় পরিমিতি বোধ। কথা বলতে বলতে কখনও ভরাট কণ্ঠে গেয়ে উঠতেন। আবার স্বচ্ছন্দে ফিরে আসতেন মূল প্রসঙ্গে। কথা মেপে বললেও তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। এমন মানুষ সত্যিই বিরল।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি
২২ প্রধান বিচারপতি: চারজন হন রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়কের প্রধান
নতুন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী
অবসরে সাক্ষাৎকার দেব না: প্রধান বিচারপতি
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বিদায়ী সাক্ষাৎ

শেয়ার করুন

সরকারের পেছনের সরকার

সরকারের পেছনের সরকার

সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার ভিত শক্ত না হলে সব আয়োজন চোরাবালিতে ডুবে যেতে পারে। প্রায় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ না থাকার মতো অবস্থায় থেকেও সরকার পরিচালকরা কেন যে নিজদলের সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে শক্ত হতে পারছে না তা এক বিস্ময়। এরাই সরকারের পেছনে আরেকটি সরকার গড়ে তুলেছে যেন। আর এই অদৃশ্য সরকার যেন ক্রমে দৃশ্যমান সরকারের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে পড়ছে। এদের কারণে প্রধানমন্ত্রীর সব সৎ উদ্যোগ নড়বড়ে হয়ে না পড়ে এই আশঙ্কা এখন সচেতন মানুষের।

বিরোধী দল আর দলসমূহ অনেক বছর ধরেই কোণঠাসা অবস্থায় আছে। যদিও বিএনপি সম্প্রতি সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু এতে দলের ভাঙা অবস্থাকে সহসা মেরামত করতে পারবে বলে তেমন মনে হয় না। প্রথমত, সরকারে থাকার সময় যেসব নেতানেত্রী দুর্নীতিসহ নানা ধরনের দুর্বলতায় প্রশ্নবিদ্ধ ছিলেন তাদের অনেকেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলকে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ও জনসংকটের কোনো ইস্যু নয় দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করার চেষ্টা করছে।

সুতরাং তৃণমূল পর্যন্ত এভাবে শক্তিশালী গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা কঠিন। এসব বিচারে মনে হয় না অদূর ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী দলসমূহ সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে। আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে নিজেকে অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে। শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের সোপান পার হচ্ছে একে একে। কিন্তু এ কথা মানতে হয়, কখনও কোনো দেশে কিছু ক্ষেত্রে উন্নয়নের সূচক ঊর্ধ্বমুখী হলেও সে উন্নয়ন টেকসই হবে তা হলফ করে কেউ বলতে পারে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার ভিত শক্ত না হলে সব আয়োজন চোরাবালিতে ডুবে যেতে পারে। প্রায় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ না থাকার মতো অবস্থায় থেকেও সরকার পরিচালকরা কেন যে নিজদলের সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে শক্ত হতে পারছে না তা এক বিস্ময়।

এরাই সরকারের পেছনে আরেকটি সরকার গড়ে তুলেছে যেন। আর এই অদৃশ্য সরকার যেন ক্রমে দৃশ্যমান সরকারের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে পড়ছে। এদের কারণে প্রধানমন্ত্রীর সব সৎ উদ্যোগ নড়বড়ে হয়ে না পড়ে এই আশঙ্কা এখন সচেতন মানুষের। এমন এক হযবরল অবস্থা যে আজ দায়িত্বশীলরা জনকল্যাণমুখী একটি সিদ্ধান্ত জানান তো কালই সুবিধাভোগীদের রক্তচক্ষু দেখে সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়া থমকে দাঁড়ায়। এসবের কারণে ক্রমে মানুষের চোখে আদালত দুর্বল হয়ে পড়ছে। সরকারের ঘোষিত নীতির প্রতি আস্থা রাখা যাচ্ছে না।

কতবার আদালত নদী দখলমুক্ত করার পক্ষে রায় দিলেন কিন্তু কার্যকর করা সম্ভব হয় না। ঢাকা থেকে সাভারের পথে যেতে চোখ পড়ে প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে হয়েছে ফদিপুর-গোপালগঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত একটি নদীর নামে বিশাল টাউন। পত্রিকায় দেখেছি আদালতের রায় হয়েছিল এটি অবৈধ দখল। দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ। অর্থাৎ পুনরায় জলাধার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু মহাসড়ক দিয়ে চলতে গিয়ে দেখি আদালতের রায়ের অসহায় দশা। জলাধার ফিরিয়ে দেয়া তো দূরের কথা- প্রতিদিন নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে সেখানে। নিশ্চয়ই সরকারের চেয়ে বড় সরকার সেখানে ছড়ি ঘোরাচ্ছে।

পাঠক, নিশ্চয় মনে করতে পারবেন একবার কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে সরকারের একজন যুগ্মসচিব-ভিআইপির জন্য বিলম্ব করতে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা আহত কিশোর মারা যায়। এ নিয়ে দেশজুড়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরপর আদালত বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত জানান। পর্যবেক্ষণে বলা হয় দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউ ভিআইপি নন। বাকি সবাই রাষ্ট্রের কর্মচারী মাত্র। গণমাধ্যমে আদালতের এই বক্তব্য প্রচারের পর আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। ভিআইপি-বিড়ম্বনা থেকে বাঁচা যাবে ভেবে স্বস্তি পাওয়ার বদলে শঙ্কিত হয়েছিলাম।

শঙ্কা এই জন্য যে আদালত যদি আবারও জনগণের কাছে দুর্বল হয়ে যায়! ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছিলাম ‘হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না’ কথাটি। এখন তো মনে হয় এ ছিল সত্যযুগের কথা। আদালতের রায় নিয়ে কটাক্ষ করলে আদালত অবমাননার দায়ে এখনও সাধারণ মানুষকে কাঠগড়ায় ঠিকই দাঁড়াতে হয় আর রাজনৈতিক শক্তি আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করলে এমনকি আদালত প্রাঙ্গণে মিছিল করলেও আদালত অবমাননা হয় না। ধরে নিচ্ছি এসবের পেছনে হয়তো আইনের ফাঁক আছে। কিন্তু সেসব তো সাধারণ মানুষ জানবে না। এর ব্যাখ্যাও কখনও দেয়া হয় না। তাই আদালতের সম্মান নিয়ে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হতেই পারে।

আদালতের দেয়া ভিআইপির সংজ্ঞা নিয়ে আমার শঙ্কার কারণটি এখন বলি। এতকালের সুবিধাভোগী ভিআইপিরা শেষ পর্যন্ত আদালতের এমন ব্যাখ্যা মেনে নেবেন কি না এ নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। না মানলে আবার তো আদালত সাধারণ মানুষের চোখে দুর্বল হয়ে যাবে। গত সপ্তাহে আমার পরিচিত পুরান সংজ্ঞার একজন ভিআইপি আমলা একান্তে আমাকে জানিয়েছিলেন, আদালতের এই ব্যাখ্যা টিকানো সম্ভব নয়। কারণ তিনি জানেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এখন কাদের ভিআইপি নিরাপত্তা আর মর্যাদা দেবে তা নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়েছে। একজন আদালত-সংশ্লিষ্ট ভিআইপি মাওয়া ঘাট পার হবেন। অন্যসময় তিনি বা তারা ভিআইপি প্রটোকল পেয়ে আসছেন। এখন তা থেকে বঞ্চিত হতে চান না। আর আমলা ভিআইপিরা তো অনেক বেশি শক্তিমান। তারা সাধারণত নিজেদের জন্য সুবিধা বাড়াতে চান। খর্ব করার তো প্রশ্নই ওঠে না।

দুর্বল গণতন্ত্রের দেশে ভোটের রাজনীতিতে প্রশাসনের আমলাদের অন্ধকার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। সরকারপক্ষীয় রাজনীতিকদের এই দুর্বলতা আমলারা জানে। তাই প্রতি নির্বাচনের আগে নিজেদের নানা সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে নেন। যাঁরা জ্ঞান বিতরণ করে এসব আমলা ভিআইপিদের সফল শিক্ষার্থী হিসেবে তৈরি করে দেন তেমন প্রবীণ অধ্যাপক ছাড়াও আন্তর্জাকিতভাবে খ্যাতিমান বিজ্ঞানী-গবেষক, ডাক্তার কারো কোনো মূল্য নেই। ভিআইপির সংজ্ঞায় তারা যুক্ত হন না। দলীয় সরকার টিকে থাকতে চায় আমলা আর নিজদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে। এরা সবাই গড়ে তোলেন সরকারের পেছনের সরকার। এভাবে অন্য পেশাজীবী ও সাধারণ অ-ভিআইপি নাগরিকরা অনেকটা যেন অস্পৃশ্য হয়ে পড়েন।

আমার আশঙ্কাই ঠিক হয়েছিল। এরপর একদিন আগে কাগজে দেখেছিলাম আদালতের ভিআইপি সংজ্ঞা নীরবে বাতিল করে দিয়ে আগের নির্ধারিত সবাই ভিআইপি সম্মান ফিরে পেয়েছেন। এ সত্যটি আমাদের মানতেই হবে সুবিধা ভোগকারী গোষ্ঠী যত যুক্তিই থাকুক সুবিধা হারাতে চাইবে না।

সরকারের ভেতরের সরকার এভাবেই শক্তিশালী হয়ে পড়ে দৃশ্যমান সরকারের চেয়েও। একই কারণে ঋণ খেলাপিদের ঋণের মাত্রাই কেবল বাড়ে। আর শাস্তির বদলে এরা সহাস্য বদনে সরকারের ডানে বামে অবস্থান নেয়। অ-ভিআইপিরা ঘর-সংসার ফেলে বিদেশে ঘাম ঝরিয়ে দেশের জন্য টাকা পাঠায় আর সম্মানিত ভিআইপিদের অনেকে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে। এদের বিরুদ্ধে সরকারের কিচ্ছুটি করার নেই। সরকারের ভেতরের সরকার শক্তিশালী বলে ঘুষ-দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে আমাদের মুক্তি নেই।

গণতান্ত্রিক দেশের সরকার ও সরকারি দল বরাবরই একটি বেকায়দা অবস্থায় থাকে। যেহেতু মানুষের যাবতীয় নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকে সরকারের ওপর এবং জনগণের অধিকার রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণকারী যাবতীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত থাকে সরকারযন্ত্রের হাতে। তাই সামগ্রিক সাফল্যের গৌরব ও ব্যর্থতার দায় তাদেরই বহন করতে হয়। এ দেশের স্বার্থবাদী বিরোধী রাজনীতিকরা বরাবরই সরকারকে দুর্বল করার জন্য নৈরাজ্য উসকে দিতে ভূমিকা রাখে। ফলে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকেও গ্রহণ করতে হয় নানা রাজনৈতিক কৌশল।

এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য ভূমিকা রাখতে পারে সরকারি দল। সরকারি দলের ইতিবাচক ভূমিকার জন্যই গণবিচ্ছিন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে সরকার, প্রাজ্ঞ রাজনীতিকদের পরামর্শে সরকারযন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্বলতাগুলো অপসৃত হতে পারে। সরকারি দলের রাজনীতিকদের সতর্ক দৃষ্টি ও মনিটরিংয়ের কারণে সতর্ক হয়ে যেতে পারে দুর্নীতিপরায়ণ আমলাতন্ত্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসী তৎপরতায় সরকারযন্ত্র যখন সমালোচিত হতে থাকে তখন সরকারি দলের কর্মীদেরই ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা এই সমস্ত নৈরাজ্য প্রতিহত করে সরকারকে কালিমার হাত থেকে বাঁচাতে।

এসব চরম বাস্তব যুক্তি হলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে সব যেন স্বপ্নবিলাস। বরাবরই আমাদের দেশে সরকারি দলের ভূমিকা ছিল এবং আছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, ছাত্রদল, ছাত্রলীগ বা এরশাদবাহিনী যে যখন ক্ষমতায় থেকেছে নিজ সরকারকে জনপ্রিয় করায় কোনো ভূমিকা রাখেনি। বরং যাবতীয় অন্যায়ের চালিকাশক্তি, প্রেরণা প্রদানকারী হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছে। তাই সরকারের পেছনের এই সরকার অর্থাৎ সরকারি দলের অনেকেই যখন সরকারি শক্তিকে পুঁজি করে অনাচারে লিপ্ত থাকে তখন সরকারযন্ত্রের যাবতীয় বক্তব্য ফাঁকা বুলি হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে যায়।

সন্ত্রাস আর দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ সমাজের মানুষ। প্রতিদিন সাধারণ নাগরিকের সম্পদ লুণ্ঠিত হচ্ছে। সামান্য উপলক্ষে খুন হয়ে যাচ্ছে মানুষ। অসহায় মানুষ বুঝতে শিখেছে, এর মধ্য দিয়েই তাদের বেঁচেবর্তে থাকতে হবে। সরকারযন্ত্র এ ক্ষেত্রে নিরুপায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের পরিচয় সরকারি দল ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে আছে। ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজদের দাবি পূরণে বাধ্য হয়। কারণ তারা জানে, ওদের টিকিও ছোঁবে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই বাহিনীর সেই ক্ষমতাইবা কোথায়! কারণ চাঁদাবাজদের ‘গডফাদার’ সরকারি দলের নেতার ধমক সইতে হয় তাদের। বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা থেকে কর্মী হতে পারাও এখন সংশ্লিষ্টরা সৌভাগ্যের প্রতীক বিবেচনা করে।

কারণ অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যেকোনো নির্মাণকাজে একটি বখরা নেতাকর্মীদের হাতে আসতেই হবে। বিষয়টি এত প্রথাসিদ্ধ হয়ে গেছে যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তারা চাঁদাবাজদের বখরা দিতে হবে বিবেচনায় একটি বর্ধিত হার ধরে দেন ঠিকাদারদের। এ সমস্ত তস্করবৃত্তি সরকারি দলের ঊর্ধ্বতন স্তরের অগোচরে হয়- এ বিশ্বাস একমাত্র স্বপ্নলোকের বাসিন্দারাই করতে পারে। কারণ এরা মনে করেন পেশিশক্তি ছাড়া তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

আবার এই পেশি শক্তিকে টিকে থাকতে হলে এদের হাতে অস্ত্র ও অর্থের জোগান দিতে হবে। আর এভাবেই অর্থ সংগ্রহ করার অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছে তারা। এমনও শোনা যায়, চাঁদাবাজির অর্থের ভাগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত চলে যায়। এসব অভিযোগ বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় তখনই যখন দেখা যায় সরকারি সংগঠন বা অঙ্গ সংগঠনের নামে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি হচ্ছে এবং তা পত্রিকায় বিস্তারিত প্রকাশিত হচ্ছে অথচ দল নীরবে হজম করে নিচ্ছে অভিযোগ। সরকারি দল বা অঙ্গ সংগঠনের সাইনবোর্ড থাকছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের টিকি ছোঁয়ারও চেষ্টা করছে না।

এরা সবাই সরকারের পেছনের সরকার। মাঝে মাঝে মনে হয় এরাই নিয়ন্ত্রণ করছে সরকারকে। প্রধানমন্ত্রীর যতই সদিচ্ছা থাকুক সরকারের পেছনের সরকারকে শক্তিশালী রেখে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় টেকসই উন্নয়ন।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি
২২ প্রধান বিচারপতি: চারজন হন রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়কের প্রধান
নতুন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী
অবসরে সাক্ষাৎকার দেব না: প্রধান বিচারপতি
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বিদায়ী সাক্ষাৎ

শেয়ার করুন

হারিছ চৌধুরীর রহস্যময়তা ও কিছু প্রশ্ন

হারিছ চৌধুরীর রহস্যময়তা ও কিছু প্রশ্ন

নিখোঁজের ৯ বছর পর বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে নিয়ে মন্তব্য করে দলের বিরাগভাজন হয়েছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। তিনি ইলিয়াস আলীর ‘গুমের’ পেছনে দলের ভেতরে থাকা কজন নেতাকে দায়ী করেন।

চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে দোর্দণ্ড প্রতাপশালীদের একজন ছিলেন আবদুল হারিছ চৌধুরী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও খালেদা জিয়া তাকে তার বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হন। তিনি এতটাই ক্ষমতাধর ছিলেন যে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজ বাড়িতে ডাকঘর, স্কুল, পুলিশ ক্যাম্প ও ব্যাংকের শাখা বসিয়েছিলেন। সেখানে গড়ে তুলেছিলেন ব্যক্তিগত মিনি চিড়িয়াখানা। আয়ের বৈধ কোনো উৎস না থাকলেও রাতারাতি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যান হারিছ চৌধুরী। তার কানাইঘাটের বাড়িকে বলা হতো সিলেটের ‘হাওয়া ভবন’।

১/১১-এর পট পরিবর্তনের পর দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযান শুরু হলে আত্মগোপনে চলে যান হারিছ চৌধুরী। আড়ালে চলে গেলেও গণমাধ্যমে একের পর এক তার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। সম্প্রতি জানা গেল তিনি তিন মাস আগে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর সংবাদটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও হারিছ চৌধুরীর কন্যা ও লন্ডন বিএনপির শীর্ষনেতারা খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। প্রমাণ হলো- ইন্টারপোলের রেড নোটিশে থাকা কেউ চাইলে আত্মগোপনে থাকতে পারে। তিনি কবে, কীভাবে দেশ ছাড়লেন, কোথায় ছিলেন, কী করেছেন, কবে ও কীভাবে দেশে এলেন- এমন অনেক প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু এ রহস্যকে ছাড়িয়ে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে- বিএনপির গুম দাবি করা ব্যক্তিদের সন্ধানও কি একদিন এভাবে পাওয়া যাবে?

২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। দুমাস পর ১১ মে মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে ‘উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা’ করার সময় তাকে আটক করে শিলং পুলিশ। তার নামে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা হয়। বলা হয়েছিল, গোয়েন্দা পরিচয়ে তাকে তার উত্তরার বাসা থেকে তুলে একটি প্রাইভেট কারে শিলং নেয়া হয়েছে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিয়ে ছেড়ে দেয়ার দাবি হাস্যকর ও অবাস্তব একটি বিষয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হারিছ চৌধুরী ছিলেন আলোচিত-সমালোচিত এক ব্যক্তি। বিএনপির শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও তখনকার পাওয়ার হাউস হিসেবে পরিচিত ‘হাওয়া ভবন’- উভয় স্থানেই অবাধ বিচরণ ছিল তার। এছাড়া মোসাদ্দেক আলী ফালুর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় যৌথ ব্যবসা রয়েছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়।

হারিছের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও শাহএএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা রয়েছে। এছাড়া দুদকের দুর্নীতি মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার যথাক্রমে তিন ও সাতবছরের জেল ও দশ লাখ টাকা জরিমানা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত। ২০১৮ সালে ইন্টারপোলে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ ইস্যু হয়। কিন্তু তিনি সফলভাবেই গা ঢাকা দিয়ে থাকতে সক্ষম হন।

জানা যায়, ২০০৭ সালে ২৯ জানুয়ারি সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতের করিমগঞ্জে পাড়ি জমান হারিছ চৌধুরী। সেখান থেকে পাকিস্তান হয়ে ইরানে তার ভাই আবদুল মুকিত চৌধুরীর কাছে যান। ইরানে থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা নেন বলেও গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়।

এর আগে যুদ্ধাপরাধী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ভারত হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া বিদেশে এসাইলামের জন্য পিনাকী ভট্টাচার্য নামের এক ইউটিউবার নাটক করে মিয়ানমার হয়ে ফ্রান্সে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। তাই ধারণা করা অস্বাভাবিক নয় যে, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে চোরাচালানে জড়িত কোনো সিন্ডিকেট হয়তো তাদেরকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করে।

খবরে জানা যায়, নিখোঁজের ৯ বছর পর বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে নিয়ে মন্তব্য করে দলের বিরাগভাজন হয়েছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। তিনি ইলিয়াস আলীর ‘গুমের’ পেছনে দলের ভেতরে থাকা কজন নেতাকে দায়ী করেন।

গুম অবশ্যই নিন্দনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত একটি বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতেও যে গুম নাটক হতে পারে তার নজির রয়েছে। ছাত্র অধিকার পরিষদ‌ নেতা তারেককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সংগঠনের নেতাকর্মীরাই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে লুকিয়ে থাকার তথ্য ফাঁস করে। বিএনপির পক্ষ থেকে গত ১২ বছরে প্রায় ছয়শ নেতাকর্মীকে গুম করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। কিন্তু তথ্য পাওয়া যায় ৮৭ জনের।

এদের মধ্যে কতজন ব্যক্তিগত কোন্দলের শিকার, কতজন স্বেচ্ছায় গা ঢাকা দিয়ে আছে- কে জানে! যেমন: একজন কাপড় বিক্রেতাকে কোনো রাজনৈতিক দল কেন প্রতিপক্ষ করবে- এর বিশ্বাসযোগ্য জবাব খুঁজে পাইনি। ব্যক্তিগত কোন্দলকে রাজনৈতিক মেরুকরণ করে পরোক্ষভাবে বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে কি না তাও বিবেচনার দাবি রাখে। তবে যেহেতু গুম ইস্যুতে সরকারকে টার্গেট করে প্রচারণা চলে আসছে, তাই সরকারের উচিত এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জনগণকে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরা।

লেখক: রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি
২২ প্রধান বিচারপতি: চারজন হন রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়কের প্রধান
নতুন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী
অবসরে সাক্ষাৎকার দেব না: প্রধান বিচারপতি
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বিদায়ী সাক্ষাৎ

শেয়ার করুন

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আন্দোলন যতক্ষণ পর্যন্ত স্লোগান, মিছিল, উত্তপ্ত বক্তৃতা এবং দেশাত্মবোধক গানের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে সেটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কিন্তু সেটি যদি শেষপর্যায়ে চলে যায়, যখন ছাত্রছাত্রীরা আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেটি খুবই বিপজ্জনক। তাদের প্রচণ্ড ক্রোধ এবং ক্ষোভ তখন একটা গভীর দুঃখবোধ এবং অভিমানে পাল্টে যায়। হঠাৎ করে তারা টের পায় তারা আসলে একা, তাদের পাশে কেউ নেই।

এখন রাত দুইটা বাজে। একটু আগে টেলিফোন বেজে উঠেছে। গভীর রাতে টেলিফোন বেজে উঠলে বুকটা ধক করে ওঠে, তাই টেলিফোনটা ধরেছি। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ফোন করেছে। পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানি সেখানে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করছে। মোটামুটি নিরীহ আন্দোলন একটা বিপজ্জনক আন্দোলনে মোড় নিয়েছে। ছাত্রটি ফোনে আমাকে জানাল অনশন করা কয়েকজন ছাত্রকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, একজনের অবস্থা খুবই খারাপ, ডাক্তার বলেছে কিছু না খেলে ‘কোমায়’ চলে যেতে পারে। ফোন রেখে দেয়ার আগে ভাঙা গলায় বলেছে, ‘স্যার কিছু একটা করেন’।

আমি তখন থেকে চুপচাপ বসে আছি, আমি কী করব? আমার কি কিছু করার আছে?

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি অনেকবার অনেক ধরনের আন্দোলন হতে দেখেছি, কাজেই আমি একটি আন্দোলনের ধাপগুলো জানি। প্রথম ধাপে যখন হলের মেয়েরা তাদের দাবি- দাওয়া নিয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে গিয়েছে সেটি সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। আমি খুব ভালো করে জানি একটুখানি আন্তরিকতা দিয়ে ছাত্র্রছাত্রীদের কঠিন দাবি-দাওয়াকে শান্ত করে দেয়া যায়। কেউ একজন তাদের ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামায়, তারা শুধু এটুকু নিশ্চয়তা চায়।

সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন যদি একটুখানি জনপ্রিয়তা পায় তখন সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সেখানে ঢুকে পড়ে, সেটাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেটাকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করে। সাধারণ ছাত্র্রছাত্রীরা যদি সতর্ক না থাকে তখন নেতৃত্ব তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আন্দোলন যদি থেমে না যায় তখন সরকারি ছাত্রদের সংগঠন (এখানে ছাত্রলীগ) তাদের ওপর হামলা করে। প্রায় সবসময়ই সেটা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তাদের শলাপরামর্শে। তারপরও যদি আন্দোলন চলতে থাকে তখন কর্তৃপক্ষকে পুলিশ ডাকতে হয়, পুলিশ এসে পিটানোর দায়িত্ব নেয়।

এই আন্দোলনে আমি এর প্রত্যেকটি ধাপ ঘটতে দেখেছি। প্রচলিত প্রক্রিয়ার বাইরে যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে পুলিশের অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা। যতবড় পুলিশ বাহিনীই হোক তারা ছাত্রছাত্রীদের গায়ে হাত তোলার আগে একশবার চিন্তা করে। এখানে সেটা হয়নি, শটগান দিয়ে গুলি পর্যন্ত করা হয়েছে, বিষয়টি আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। পুলিশের চৌদ্দ পুরুষের সৌভাগ্য যে সেই গুলিতে কেউ মারা যায়নি। বোঝাই যাচ্ছে সিলেটের পুলিশ বাহিনীর তেজ এখনও কমেনি, তারা দুইশ থেকে তিনশ ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে রেখেছে। যখন প্রয়োজন হবে কোনো একজনের নাম ঢুকিয়ে তাকে শায়েস্তা করা যাবে!

হয়রানি কতপ্রকার ও কী কী শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম বয়সি ছাত্রছাত্রীরা সেটা এবারে টের পাবে। তবে একটি ব্যাপার আমি এখনও বুঝতে পারছি না। পুলিশের এই অবিশ্বাস্য আক্রমণটি ঘটার কারণ হচ্ছে ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়কে তালাবদ্ধ বিল্ডিং থেকে উদ্ধার করা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের জন্য একটা বিল্ডিংয়ে তালাবদ্ধ হয়ে আটকে পড়া এমন কোনো বড় ঘটনা নয়। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল কিংবা সিন্ডিকেট মিটিং চলার সময় দাবি আদায়ের জন্য বাইরে থেকে তালা মেরে বিশ্ববিদালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের আটকে রাখার ঘটনা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়েই একাধিকবার ঘটেছে। তারা তখন গল্প-গুজব করে সময় কাটিয়েছেন, সোফায় শুয়ে রাত কাটিয়েছেন, গোপনে কিছু খাবার আনিয়ে ভাগাভাগি করে খেয়ে হাসি তামাশা করেছেন কিন্তু পুলিশ ডাকিয়ে ছাত্রদের গায়ে হাত তুলে মুক্ত হওয়ার জন্য কখনও ব্যস্ত হননি।

এবার ভাইস চ্যান্সেলরকে উদ্ধার করার জন্যে ছাত্রছাত্র্রীর ওপর একটি অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা করা হলো, এর চাইতে বড় অমানবিক কাজ কী হতে পারে আমি জানি না। স্বাভাবিক নিয়মেই আন্দোলনটি এখন ভাইস চ্যান্সেলরের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে। তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটা এমন কিছু বিচিত্র দাবি নয়, আমরা প্রায়ই নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের পদত্যাগ দাবি শুনে আসছি।

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে ছাত্রছাত্রীদের ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এবারেও সেই চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়নি। এটিও নতুন একটি ঘটনা— তারা এখন কোথায় থাকে, কী খায় আমি জানি না।

আন্দোলন যতক্ষণ পর্যন্ত স্লোগান, মিছিল, উত্তপ্ত বক্তৃতা এবং দেশাত্মবোধক গানের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে সেটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কিন্তু সেটি যদি শেষপর্যায়ে চলে যায়, যখন ছাত্রছাত্রীরা আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেটি খুবই বিপজ্জনক। তাদের প্রচণ্ড ক্রোধ, এবং ক্ষোভ তখন একটা গভীর দুঃখবোধ এবং অভিমানে পাল্টে যায়।

হঠাৎ করে তারা টের পায় তারা আসলে একা, তাদের পাশে কেউ নেই। ‘আমরণ’ কথাটি থেকে ভয়ংকর কোনো কথা আমি জানি না, বড় মানুষেরা সেটাকে কৌশলী একটা শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেন, কিন্তু এই বয়সি ছাত্রছাত্র্রীরা তাদের তীব্র আবেগের কারণে শব্দটাকে আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর নামকরণ করা নিয়ে একবার বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল তখন আমাদের ছাত্রছাত্রীরা শহীদমিনারে অনশন করে বিশ্ববিদ্যালয়টি খোলার ব্যবস্থা করেছিল।

অভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের দুর্বল শরীরে যখন খিঁচুনি হতে থাকে সেই দৃশ্য সহ্য করার মতো নয়। (পরে তারা আমাকে তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছে, দিনরাত তারা বোধ-শক্তিহীনভাবে পড়ে আছে, অন্য কোনো অনুভূতি নেই, শুধু এক প্লেট খাবারের স্বপ্ন দেখছে! আমি তাদের সেই কষ্টের কথাগুলো কখনও ভুলতে পারি না।) যে কারণেই হোক, আমার এককালীন ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীরা আবার সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বিষয়টি চিন্তা করে আমি খুবই অশান্তি অনুভব করছি।

২.

প্রায় তিন বছর আগে অবসর নিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার আগের মুহূর্তে আমি বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলরকে তিন পৃষ্ঠার একটি লম্বা চিঠি লিখে এসেছিলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে তাকে সেই চিঠিতে বেশ কয়েকটি উপদেশ দিয়েছিলাম। তিনি যদি আমার উপদেশগুলো শুনে সেভাবে কাজ করতেন তাহলে আজকে বিশ্ববিদ্যালয়টি এরকম বিপজ্জনক একটা জায়গায় পৌঁছাতো না।

তিনি আমার উপদেশগুলো সহজভাবে নেবেন আমি সেটা আশা করি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি করা শিক্ষকদের পুরস্কার হিসেবে ভাইস চ্যান্সেলর করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। যদিও অনেক দিক দিয়েই শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অনেক আধুনিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপক তাদের উন্নাসিকতার কারণে সেটা মেনে নেন না। কাজেই প্রান্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের আমার মতো একজন শিক্ষকের উপদেশ ভালো লাগার কথা নয়।

কিছুদিন আগে আমার উপর জঙ্গি হামলার বিচারের শুনানিতে সাক্ষী দেয়ার জন্যে আমাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। আমি একদিনের জন্য সিলেটে গিয়েছিলাম এবং বহুদিন পরে ক্যাম্পাসে পা দিয়েছিলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা রীতিমতো অপরাধ তাই সবাই দূরে দূরে থাকলেও ছাত্রছাত্রীরা মন খুলে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। আমি বেশ দুঃখের সঙ্গে আবিষ্কার করেছি আমার পরিচিত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রটি পাল্টে যাচ্ছে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া বিশেষ হয় না (এখানে শুধু পরীক্ষা হয়)।

কাজেই ভালো ছাত্রছাত্রীরা চেষ্টাচরিত্র করে নিজেরা যেটুকু পারে শিখে নেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈচিত্র্যময় পরিবেশে অন্য সবার সঙ্গে সময় কাটিয়ে তাদের এক ধরনের মানসিক গঠন হয়, সেটার মূল্য কম নয়। সেজন্য আমি যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, সবসময় তাদের সব রকম সংগঠন করে নানা ধরনের কাজকর্মে উৎসাহ দিয়ে এসেছি। ছাত্রছাত্রীরা জানাল এখন তাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও বাধা নিষেধ। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় আমাদের ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসের রাস্তায় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে দীর্ঘ আলপনা এঁকেছিল। ছাত্রছাত্রীরা জানাল এখন তারা রাস্তায় আলপনাও আঁকতে পারে না। তাদের দুঃখের কাহিনি শোনা ছাড়া আমার কিছু করার ছিল না। আমি শুধু তাদের ভেতরকার চাপা ক্ষোভটি অনুভব করেছি।

সেই ক্ষোভটি এখন বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।

৩.

কিছুদিন আগে লন্ডনের একটি ওয়েবিনারে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেটি ছিল বাংলাদেশের শিক্ষা-সংক্রান্ত একটি ওয়েবিনার। আমি বক্তব্য দেয়ার পর সঞ্চালক উইকিপিডিয়া থেকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভয়ংকর দুরাবস্থার বর্ণনা পড়ে শোনালেন, তারপর এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ‘আমি এই ব্যাপারটি খুব ভালো করে জানি এবং চাইলে সেটি সম্পর্কে বলতেও পারব। কিন্তু নীতিগতভাবে আমি দেশের বাইরের কোনো অনুষ্ঠানে দেশ সম্পর্কে খারাপ কিছু বলি না।

কাজেই আমি এটা নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আপনি যদি সত্যিই জানতে চান ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করলে বলতে পারি।’ সঞ্চালক বললেন, ‘তাহলে অন্তত এর সমাধান কী হতে পারে সেটা বলেন।’ আমি বললাম, ‘সমাধান খুব কঠিন নয়। যেহেতেু বাংলাদেশে ভাইস চ্যান্সেলররা হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তা-বিধাতা তাই রাজনীতি করা শিক্ষকদের নিয়োগ না দিয়ে খাঁটি শিক্ষাবিদদের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দিলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেহারা পাল্টে যাবে।’

সেই ওয়েবিনারে আমাদের শিক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। তিনি তার বক্তব্য দেয়ার সময় বললেন, একজন ভাইস চ্যান্সেলরকে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অনেক কাজ করতে হয় তাই শুধু শিক্ষাবিদ সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন না— তার ভেতর নেতৃত্ব দেয়ার গুণ থাকতে হয়। সেজন্য নেতৃত্ব দিতে পারেন সেরকম ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দিতে হয়।

বলা যেতে পারে আমি তখন প্রথমবার বুঝতে পেরেছি আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন সবসময় দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়। এটি আকস্মিক ঘটনা নয়, সেটি একটি সুচিন্তিত কিন্তু বিপজ্জনক এবং ভুল সিদ্ধান্ত! একজন শিক্ষক যদি শিক্ষাবিদ হন তাহলে তার ভেতর নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলি থাকবে না সেটি মোটেও সত্যি নয়। তাছাড়া এই দেশে দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষক সবসময় আদর্শের জন্য রাজনীতি করেন সেটিও সত্যি নয়। যিনি এক সময় ‘জিয়া চেয়ার’ স্থাপনের প্রস্তাবক, সাদা দলের রাজনীতি করেছেন তিনি সময়ের প্রয়োজনে নীল দলের রাজনীতি করে অবলীলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হতে পারেন। সেরকম উদাহরণ কি আমাদের সামনে নেই?

৪.

কাজেই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকেরা যদি আদর্শবাদী হতেন ভাইস চ্যান্সেলরদের স্বেচ্ছাচারী কিংবা একগুঁয়ে না হতে দিতেন, ভুল কিংবা অন্যায় করলে প্রতিবাদ করতেন তাহলেও একটা আশা ছিল। কিন্তু সেগুলো হয় না। ভাইস চ্যান্সেলর যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তা-বিধাতা তাই তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘জি হুজুর’ করার একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্দয় আক্রমণ শুরু করেছিল তখন একজন শিক্ষকও ছুটে গিয়ে পুলিশকে থামানোর চেষ্টা করেননি! ছাত্রছাত্রী এখন শিক্ষকদের শত্রুপক্ষ। আমাদের শিক্ষকেরা সব ধোয়া তুলসীপাতা এবং ছাত্র্রছাত্র্রীরা বেয়াদব এবং অশোভন আমি সেটা বিশ্বাস করি না।

শিক্ষক হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্মানবোধ থাকতে হবে, তাদের জন্য ভালোবাসা থাকতে হবে। সেটি এখন নেই। ভর্তিপরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয় সেটি সবাই জানে—সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সেটি চোখের পলকে দূর করে দেয়া যায়। বহুকাল আগে একবার তার উদ্যোগ নিয়ে সেই সময়কার শিক্ষামন্ত্রী সব ভাইস চ্যান্সেলরকে ডেকেছিলেন। আমি সেখানে প্রস্তাবটি ব্যাখ্যা করেছিলাম এবং তখন আবিষ্কার করেছিলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষকদের ভেতরে রয়েছে সর্বগ্রাসী লোভ! সেটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করতেও তারা সংকোচ অনুভব করেন না! সেই সভায় তারা এককথায় ছাত্রছাত্রীদের জীবনকে সহজ করার সেই উদ্যোগটিকে বাতিল করে দিয়েছিলেন!

এই মুহূর্তে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি খুবই জটিল অবস্থা। আমি একমাস দেশের বাইরে ছিলাম বলে পত্রপত্রিকার খবরের বাইরে কিছু জানি না। খবরের বাইরেও খবর থাকে এবং আজকাল সামাজিক নেটওয়ার্কে বিষ উগড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে, আমি সেগুলোও জানি না। যখন একটি নিরীহ আন্দোলন একটি বিপজ্জনক আন্দোলনে পালটে যাচ্ছে আমি তখন প্লেনে বসে আছি, দেশে এসে প্রায় হঠাৎ করে জানতে পেরেছি আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই।

একদিকে ছাত্রছাত্রী অন্যদিকে ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে সকল শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের দাবি খুবই চাঁছাছোলা। এটাকে মোলায়েম করার কোনো উপায় নেই। যেহেতু নির্দয় পুলিশি হামলা করার লজ্জাটুকু কেটে গেছে তাই যদি দ্বিতীয়বার সেটাকে প্রয়োগ করে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন বন্ধ না করা যায় এটার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের কোনো উপায় নেই।

সরকারের নিয়োগ দেয়া ভাইস চ্যান্সেলরকে প্রত্যাহার করা সরকারের জন্য খুবই অপমানজনক একটা ব্যাপার তাই সরকার কখনই সেটা করবে না। ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের সঙ্গে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক আছেন, শুধু তাই নয় দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভাইস চ্যান্সেলররাও আছেন, কাজেই তার নিজ থেকে পদত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না।

মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অনির্দিষ্ট কাল হাড়কাঁপানো শীতে অনশন করে খোলা রাস্তায় শুয়ে থাকতে হবে, কেউ তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আাসবে না। যে ছাত্রজীবনটি তাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় হতে পারত সেই সময়টি তাদের জন্যে অপমান আর অবহেলার সময় হয়ে যাচ্ছে, সেই জন্য আমি তাদের কাছে ক্ষমা চাই।

ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয় আমার এ লেখাটি পড়বেন কি না জানি না। যদি পড়েন তাকে বলব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শেষদিনটিতে আমি তাকে যে চিঠিটি লিখে এসেছিলাম সেটি যেন আরও একবার পড়েন, সম্ভব হলে তার আশেপাশে থাকা শিক্ষকদেরও পড়তে দেন। এখন যা ঘটছে সেটি যে একদিন ঘটবে, আমি সেটি তিন বছর আগে তাকে জানিয়ে রেখেছিলাম। তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি।

লেখক: শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন:
শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি
২২ প্রধান বিচারপতি: চারজন হন রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়কের প্রধান
নতুন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী
অবসরে সাক্ষাৎকার দেব না: প্রধান বিচারপতি
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বিদায়ী সাক্ষাৎ

শেয়ার করুন

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিত্যপণ্যের মূল্য কমানো জরুরি

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিত্যপণ্যের
মূল্য কমানো জরুরি

সরকার শহরাঞ্চলে টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে কিছু পণ্য বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে বিক্রি করছে। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল হতদরিদ্র কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ খুব বেশি পাবে বলে মনে হয় না। এখানেও ডিলার-প্রশাসন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা কারসাজি রয়েছে। সরকার কেন ভ্রাম্যমাণ ট্রাক-দোকান দিয়ে এমন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা বজায় রাখছে তা বোধগম্য নয়।

করোনার অভিঘাত বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ও সমাজ জীবনে যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে তা থেকে কোনো দেশই মুক্ত নেই। ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা অক্সফাম বিশ্ব দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করছে। সম্প্রতি তাদের প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে যে, করোনার ভয়াবহ প্রকোপে বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে, পক্ষান্তরে পৃথিবীর শীর্ষ ১০ ধনীর সম্পদ দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতি ২৬ ঘণ্টায় একজন করে বিলিয়নার তৈরি হচ্ছে। ১৬০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

সমাজে লিঙ্গ বৈষম্য বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশেও মুক্ত নয়। বিপুল জনগোষ্ঠীর আয়-উপার্জন যেমন কমে গেছে, তেমনিভাবে প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের জীবনজীবিকাও দুই বছরের করোনা সংকটে বড় ধরনের অর্থনৈতিক টানাটানিতে পড়েছে। এ অবস্থায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী উৎপাদনের সক্ষমতা অনেকেরই হ্রাস পেয়েছে। আবার আমাদের সমাজেই মজুতদারি, নানা ধরনের সিন্ডিকেশন, ঘুষ-দুর্নীতির প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে একটি অংশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাজারে পণ্য সরবরাহের নানা কারসাজি, মধ্যস্বত্বভোগী এবং ক্ষমতার নানা ধরনের অপব্যবহারকারী গোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। এর ফলে বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর মূল্য। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রান্তিক থেকে মধ্যম আয়ের মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের ওপর। করোনার আগে যেখানে আমাদের দারিদ্র্যের হার ১৯ শতাংশে নেমে এসেছিল এখন তা বেড়ে ২৫ শতাংশের উপরে চলে গেছে। প্রান্তিক মানুষের আয় এবং ক্রমবর্ধমান বাজারমূল্যের যে দূরত্ব তৈরি করেছে তাতে নিম্ন আয়ের পরিবারের জীবনযাপনের ওপর বেশ চাপ পড়েছে।

চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার শহরাঞ্চলে টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে কিছু পণ্য বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে বিক্রি করছে। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল হতদরিদ্র কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ খুব বেশি পাবে বলে মনে হয় না। এখানেও ডিলার-প্রশাসন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা কারসাজি রয়েছে। সরকার কেন ভ্রাম্যমাণ ট্রাক-দোকান দিয়ে এমন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা বজায় রাখছে তা বোধগম্য নয়। প্রয়োজন ছিল বস্তি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের এলাকায় সুনির্দিষ্ট দোকানে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষদের সাপ্তাহিক, পাক্ষিক কিংবা মাসিক ভিত্তিতে ন্যায্যমূল্যে চাল-ডাল, তেল-লবণ, আটা-চিনি ক্রয়-বিক্রয়ের একটি বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা করা।

একইভাবে গ্রামাঞ্চলেও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো ন্যায্যমূল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী ক্রয় করার সুবিধা লাভের আওতায় আসার সুযোগ পেলে দেশীয় এবং বৈশ্বিক বর্তমান সংকটকালে জাতীয়ভাবে আমাদের দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ার গতি রোধ করা যেত। ২০ জানুয়ারি থেকে সরকার উপজেলাপর্যায়ে ১ হাজার ৭৬০ জন ডিলারের মাধ্যমে চাল-আটাসহ খাদ্যদ্রব্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে। এতে প্রতি কেজি চালের দাম ৩০ এবং আটার দাম ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এর সুবিধা দরিদ্র এবং স্বল্প আয়ের মানুষ কতটা নিতে পারবে সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধি কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। অথচ কৃষিমন্ত্রীর কথায় জানা গেছে যে, দেশে এই মুহূর্তে ২০ লাখ টন খাদ্যশস্য সরকারের গুদামে মজুদ আছে। এরপরেও বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী, চাতালের মালিক এবং খাদ্যপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মজুতদার ও ব্যবসায়ীরা কিছুতেই বাজারে স্বাভাবিক মূল্য বজায় রাখতে দিচ্ছে না। নানা অজুহাত তাদের রয়েছে। পরিবহন খরচ, চাঁদাবাজি ইত্যাদির অজুহাতে বাজারে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি স্বল্প ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে বাধ্য করেছে।

এমনকি কৃষক এই শীত মৌসুমে যেসব শাকসবজি উৎপাদন করছে সেগুলোর বাজারমূল্য শহরে কৃষকের উৎপাদনমূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। এখানেও পরিবহন খরচ এবং চাঁদাবাজির অজুহাত দেখিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী এবং ব্যবসায়ীরা বাজারকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। এর সুফল তারাই ভোগ করছে, উৎপাদনকারী এবং ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদনকারী কৃষক কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে বার বার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যাহত হতে বাধ্য।

এর প্রতিক্রিয়ায় বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। সরকার এ পর্যন্ত কৃষিজ পণ্য উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং বাজারে মূল্য স্বাভাবিক রাখার জন্য কোনো যৌক্তিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারেনি। সরকারের স্থানীয় কোনো প্রশাসনই এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। এটি না পারার প্রধান কারণ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাপনা পরিষদ এ পর্যন্ত গঠিত হয়নি। ফলে দেশের গোটা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে উৎপাদনকারী কৃষক এবং ক্রেতা ভোক্তারা কোনোভাবেই ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। উৎপাদনকারী এবং ভোক্তার মধ্যখানে যেসব গোষ্ঠী অবস্থান করছে তারাই এর সুফল ভোগ করছে। রাতারাতি এরাই অর্থবিত্ত ও প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

এরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। প্রশাসন, পরিবহন এবং সড়কপথে তদারককারী গোষ্ঠী চাঁদাবাজির নামে যা করছে তা তাদেরকেই পারস্পরিকভাবে লাভবান হতে সাহায্য করছে। অথচ এর দায় তারাই চাপিয়ে দিচ্ছে অন্যের ওপর এবং অন্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধির অজুহাত হিসেবে নিজেদের দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজিকে পণ্যের মূল্য বাড়ার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এ ধরনের একটি অনৈতিক কারসাজি বৃত্তাকারে আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য নিয়ে খেলা করছে। সরকার এই চক্রবৃত্তকে কখনই স্পর্শ করছে না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, বণিকতান্ত্রিক নানা গোষ্ঠী রাতারাতি ধনী হয়ে ওঠার মস্তবড় সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে কেউ হাত দিচ্ছে না।

বাংলাদেশে দ্রুত বিকাশমান বাজার অর্থনীতির মূলেই রয়েছে এমন লুম্পেন চরিত্রের নানা অসৃষ্টিশীল, দুর্নীতিপরায়ণ গোষ্ঠীর সংযুক্তি। এদের নাম বিভিন্ন দেশে মাফিয়া চক্র হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে এই চক্র এখন এতটাই প্রভাবশালী যে, সরকার এদের কাছে অসহায়, উৎপাদনকারী ও ভোক্তারা নিরুপায়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও সমাজ-অর্থনীতিতে যে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে তার কেন্দ্রবিন্দু গোটা লুটপাটকারী অর্থনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ। সরকার এখানে কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রবেশ করতে পারবে তা নিয়ে কেউই সন্দেহমুক্ত নয়।

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছিল সেটি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পরিবহন মালিক শ্রমিকগণ এক্ষেত্রে যেসব ওজর-আপত্তি, ছলচাতুরী ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে তা খোলা চোখেই দেখা গেছে। গ্যাসচালিত যানবাহনও ভাড়া বৃদ্ধি করে নিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের পরিবহন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এটি অনেকটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আরেকটি উদ্যোগের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

দেশের অন্যতম সরকারি তিতাস, বাখরাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির একটি প্রস্তাব এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে পৃথকভাবে জমা দিয়েছে। বাকি আরও তিনটি কোম্পানি এই সপ্তাহে অনুরূপ প্রস্তাব জমা দিতে যাচ্ছে। এতে জ্বালানি গ্যাসের মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় যেসব মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে তা দেখে যে কারো ভিমড়ি খেয়ে মরার অবস্থা হয়েছে।

যেসব ব্যক্তি এসব মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন তারা সম্ভবত কোনো ভিন্ন গ্রহে বসবাস করেন। হয় তাদের গ্যাস ব্যবহার করতে হয় না, নতুবা তাদের অর্থকড়ির কোনো দরকার পড়ে না! তাদের প্রস্তাবমতো এখন বাসাবাড়িতে যারা দুই চুলায় ৯৭৫ টাকা ব্যয় করছেন তাদেরকে ২ হাজার ১০০ টাকা দিতে এবং এক চুলায় ৯২৫ টাকার জায়গায় ২ হাজার টাকা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। শিল্পে প্রতি ঘনমিটারে গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা, শিল্প কারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ১৩ টাকা ২৫ পয়সার জায়গায় ৩০ টাকা, বিদ্যুৎ ও সারে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৬৬ পয়সা, হোটেল-রেস্টুরেন্টে ২৩ টাকা থেকে ৫০ টাকা, সিএনজিতে ৩৫ টাকা থেকে ৭৫-৭৬ টাকা এবং আবাসিক মিটারে ১২ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ২৭ টাকা ২৭ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। রেগুলেটরি বোর্ডই শেষ পর্যন্ত শুনানি শেষে মূল্য কোন খাতে কত বৃদ্ধি করবে সেটি জানা যাবে। কিন্তু গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির এমন প্রস্তাব হাঁকানোর খবর শুনে এখনই তো আমাদের কাঁপুনি লেগে যাওয়ার কথা।

গ্যাসের সহনীয় মূল্যবৃদ্ধি যেখানে এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে, সেখানে এমন অসহনীয় প্রস্তাব দেখে কোনো মন্তব্য মুখে আসার কথা নয়। বিষয়গুলো সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে এখনই গুরত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করোনার এমন অর্থনৈতিক সংকটকালে দেশের সকল মানুষকেই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিতে পারে। সেকারণে ব্যয় সংকোচন নীতি কার্যকর করা, গ্যাস নিয়ে যেসব অপচয় ও দুর্নীতি চলছে সেসবকে দৃঢ়ভাবে রোধ করার মাধ্যমে সরকার দেশের গ্যাস খাতকে জনবান্ধব করে তুলতে পারে। সেটিই হওয়া উচিত মূল্যবৃদ্ধির চাইতে স্থির রাখার যুক্তিসংগত উপায়।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
শপথ নিলেন প্রধান বিচারপতি
২২ প্রধান বিচারপতি: চারজন হন রাষ্ট্রপতি, তত্ত্বাবধায়কের প্রধান
নতুন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী
অবসরে সাক্ষাৎকার দেব না: প্রধান বিচারপতি
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বিদায়ী সাক্ষাৎ

শেয়ার করুন