শুভ বড়দিন: ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’

player
শুভ বড়দিন: ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’

যিশুর কথা মানলে নিজেদের মধ্যে কেন, মানবকুলের কারো সঙ্গেই বিরোধ থাকার কথা নয়। আসলে ধর্মের বিভাজন রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সম্পদ আহরণ, রক্ষণ ও ভোগকে কেন্দ্র করে রাজনীতি অবর্তিত হয়। সুতরাং, ধর্ম যখন রাজনীতির অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে, তখন বিরোধ তো দেখা দেবেই।

মাঝে মধ্যে রাজধানীর উপকণ্ঠে সাভার ব্যাপটিস্ট-মণ্ডলীর উপাসনায় যোগ দেই। শহর থেকে দূরে উপশহরের পরিবেশ আর ওই মণ্ডলীর খ্রিস্টভক্তদের সান্নিধ্য আমাকে উপাসনায় যোগ দিতে অনুপ্রেরণা জোগায়। প্রতি বড়দিনে সেখানে বড়দিনের উপাসনার পর প্রীতিভোজের আয়োজন হয়। সেকারণে সবাই হাতে সময় নিয়ে উপাসনায় যোগ দিতে আসে।

পালক সেই সুযোগে উপাসনায় যোগ দিতে আসা অনেককে বড়দিন সম্পর্কে তাদের নিজস্ব উপলব্ধির কথা সবার উদ্দেশে বলার জন্য আহ্বান জানান। যাতে তারা একে অন্যের অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে পারে। সবার বক্তব্য শেষ হলে পালক বড়দিনের ওপর তার প্রচারমূলক বক্তৃতা দেন।

উপাসনা অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় সবাই তা পছন্দ করে বলে মনে হয়। কোনো তাত্ত্বিক বক্তব্য না রেখে বড়দিন সম্পর্কে নিজের অনুভূতির কথা বলতে পালক অংশগ্রহণকারীদের অনুরোধ করেন। তবে পালকের কথা না রেখে এই উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করে প্রায় সবাই যিশুর জন্ম ও পৃথিবীতে তার আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করে। একপর্যায়ে পালক কোন দিন অবগাহন নিয়েছেন তা নয় বরং ব্যক্তিজীবনে যিশু যেদিন ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থিত হন, সেদিনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে আহবান জানান।

বিষয়টি স্পষ্ট করতে তিনি একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। এক ব্যক্তি কোথাও বের হলে সঙ্গে একটি বাইবেল রাখতেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন- বাইবেল তাকে পুরোনো অভ্যাস অনুযায়ী পাপের পথে পা না বাড়াতে প্রেরণা দেয় এবং পাপ থেকে রক্ষা করে। যাহোক, ব্যক্তিজীবনে কোন দিন বা কোন ক্ষণে যিশু আমার জীবনে প্রবেশ করলেন, সেটিই বড় ভাবনা।

আমরা জানি, সাধু পৌল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের পথে যাওয়ার সময় যিশুর দর্শন লাভ করেন এবং এটি তার জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী একটি ঘটনা। সেদিন এবং সেই মুহূর্ত থেকে যিশুর অনুসারীদের নিপীড়ন করার পরিবর্তে তিনি তাদের রক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন এবং জীবনবাজি রেখে রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে খ্রিস্টধর্ম প্রচারে অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

ভারতবর্ষে সাধু সুন্দর সিংয়ের কথা বলা যেতে পারে। তিনি পাঞ্জাবের লুধিয়ানার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি শিখতে তার মা তাকে লুধিয়ানার একটি ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করান। অধ্যয়নকালে ১৪ বছর বয়সে তার মাতৃবিয়োগ হয়।

এতে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। রাগে তিনি তার স্কুলের বন্ধুদের সামনে বাইবেলের একটি-একটি পাতা ছিঁড়ে আগুনে পোড়ান। মায়ের মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি তার ধর্মের (শিখ ধর্ম) ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকেন এবং তিনি যদি তাকে দর্শন না দেন- তবে তিনি (সুন্দর সিং) রাতের বেলা চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবেন।

ওই রাতে তিনি যিশুর দর্শন লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে সিমলার ব্যাপটিস্ট চার্চে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে অবগাহন নেন এবং ভারতবর্ষে খ্রিস্টধর্মপ্রচারে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। সাধু পৌল প্রথম জীবনে প্রকৃত অর্থেই একজন মৌলবাদী মানুষ ছিলেন।

ইহুদি ধর্মের মর্যাদারক্ষায় তিনি সন্ত্রাসের পথ বেছে নেন এবং যিশুর অনুসারীদেরকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে তাদের উপর অত্যাচার-নিপীড়ন চালান। অপরদিকে সাধু সুন্দর সিং ঈশ্বর-দর্শনে জীবনবাজি রাখেন।

অন্তরের তীব্র দহন বা তাড়নার কারণে তারা জীবনের একটি সন্ধিক্ষণে গিয়ে উপস্থিত হন এবং সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ান। একথা স্মরণ করেই হয়ত জ্ঞানী সলোমন বলেন- ‘‘তাই তোমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে বাহিরে আসিয়াছি, সযত্নে তোমার মুখ দেখিতে আসিয়াছি, তোমাকে পাইয়াছি” (হিতোপদেশ ৭:১৫ পদ।)

সাধারণ মানুষ সত্য অনুসন্ধানে প্রাণপণ চেষ্টা করে না। তাই সত্যকে সবাই সেভাবে অনুভব করে না বা জানতে পারে না। পারস্যের কবি ও দার্শনিক জালালউদ্দিন রুমির একটি উক্তি এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেন-

“I looked into my heart and there is He.”

সবার দৃষ্টি অতদূর পৌঁছায় না। সে কথা মনে করে কবিগুরু বলেন-

‘‘হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে,/ দেখতে আমি পাইনি। বাহির পানে চোখ মেলেছি,/ আমার হৃদয় পানে চাইনি।”

যিশু সবার হৃদয়ে থাকলেও, তাকে দেখার মতো দৃষ্টি অনেকেরই নেই।

জন্মের পর জীবনের প্রথম ৬ বছর আমরা hypnotic trench-এর মধ্যে থাকি। এ সময় পরিবারসহ অন্য যাদের সাহচর্যে বেড়ে উঠি, তাদের কাছ থেকে যা শিখি; সেগুলো আমাদের অবচেতন মনে গেঁথে যায় এবং জীবনের পরবর্তী সময়ে রাডার হিসেবে কাজ করে। সেকারণে দায়ূদ হিতোপদেশ ২২:৬ পদে বলেছেন- ‘‘বালককে তাহার গন্তব্য পথানুরূপ শিক্ষা দাও, সে প্রাচীন হইলেও তাহা ছাড়িবে না।”

শৈশব থেকে যে ধর্মবিশ্বাস নিয়ে আমরা বেড়ে উঠি, সেটি স্থায়ী হয় এবং একে আশ্রয় করে জীবনযাপন করি। এটি আমাদের ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রধান অংশ হয়ে ওঠে। ফলে আমরা জীবনভর এই পরিচয়রক্ষায় যত্নবান হই। ধর্মবিশ্বাসকে সমুন্নত রাখতে লেখাপড়া করি এবং যেসব বিষয় আমাদের ধর্মবিশ্বাস মজবুত করে, সেগুলো মনে রাখি। এর ওপর ব্যাখ্যা প্রদান করি।

আমাদের ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে যেসব চিন্তা বা মতবাদ সংগতিপূর্ণ নয়, সেগুলো সযত্নে পরিহার করি। ফলে মুক্তচিন্তা ও যুক্তির নিরীখে আমরা কখনও ধর্মকে দেখি না। ধর্ম আমাদের বিশ্বাসের অংশ হিসেবেই থেকে যায়। ধর্মকে নিজের মতো ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার ক্ষমতা লাভ করি না।

আমাদের চেতনা বা বোধের সঙ্গে নতুন কোনো মাত্রা যুক্ত হয় না। ফলে ধর্মশিক্ষাকে নিজেদের জীবননির্মাণ বা সমাজ পরিবর্তনের কাজে লাগাতে পারি না। সেকারণে নিজেদের উপলব্ধি বা অভিজ্ঞতা থেকে যিশু সম্পর্কে কিছু বলতে বলা হলে আমাদের চিন্তার মধ্যে একটি ঝাঁকুনি অনুভব করি।

ধর্মবিশ্বাস অনেকটা আবেগকেন্দ্রিক। সুতরাং নিজধর্ম সম্পর্কে কেউ নেতিবাচক কিছু বললে আমরা ক্ষেপে যাই। আবেগতাড়িত হয়ে ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতা সম্পর্কে আমরা অনেক জ্ঞানগম্ভীর বক্তৃতা-বিবৃতি দিলেও, ব্যক্তিজীবনে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। রোগ-শোকে আমরা যিশুর কাছে প্রার্থনা করি এবং বিপদ কেটে গেলে যিশুকে ধন্যবাদ দিই।

খ্রিস্টানদের প্রধান দুটি দল ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট। তারা নিজেদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে তা নয়। ফ্রান্সে ১৫৭২-এর ২৪ আগস্ট সাধু বর্থেলময় দিবসে এমন একটি ঘটনার সূত্রপাত হয়।

রাজা নবম চার্লস তার মা Catherine de Medici-এর প্ররোচনায় তার প্রজাদের Huguenots সম্প্রদায়ের প্রোটেস্ট্যান্টদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলেন। ফলে রাজ্যব্যাপী দাঙ্গা বাধে। এই দাঙ্গায় ৭০ হাজার প্রোটেস্ট্যান্ট নিহত হয়।

ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপের কাছে এই বার্তা পৌঁছালে তিনি উল্লসিত হন এবং হত্যায় অংশগ্রহণকারী তার অনুসারীদের অভিনন্দিত করেন। ইতিহাসে ধর্মকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী ঘটনার এমন অনেক উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। খ্রিস্ট যদি সব চার্চ বা মণ্ডলীর মস্তক হবেন, তবে নিজেদের মধ্যে এমন দলাদলি আর বৈরিতা কেন?

যিশু বলেন-

‘‘তোমরা শুনিয়াছ এবং উক্ত হইয়াছিল যে, ‘তোমরা প্রতিবেশীকে প্রেম করিবে এবং তোমার শত্রুকে দ্বেষ করিবে’, কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, তোমরা আপন আপন শত্রুদিগকে প্রেম করিও এবং যাহারা তোমাদিগকে তাড়না করে, তাহাদের জন্য প্রার্থনা করিও।” (মথি ৫:৪৩-৪৪ পদ)

এর সঙ্গে আরও একটি মাত্রা যোগ করে তিনি বলেন-

‘‘যে তোমার এক গালে চড় মারে, তাহার দিকে অন্য গালও পাতিয়া দিও।” (লূক ৬:২৯ পদ)

যিশুর কথা মানলে নিজেদের মধ্যে কেন, মানবকুলের কারো সঙ্গেই বিরোধ থাকার কথা নয়। আসলে ধর্মের বিভাজন রাজনীতিকে কেন্দ্র করে সম্পদ আহরণ, রক্ষণ ও ভোগকে কেন্দ্র করে রাজনীতি অবর্তিত হয়। সুতরাং, ধর্ম যখন রাজনীতির অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে, তখন বিরোধ তো দেখা দেবেই।

জীবনে উন্নতি করতে হলে প্রয়োজন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা অর্জন। যাকে EI (Emotional Intelligence) বলে। নিজের আবেগকে সংযত রেখে Social Aptitude বা সামাজিক দক্ষতা অর্জন হচ্ছে জীবনে সাফল্য লাভের প্রধান শর্ত।

অনেক মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি সেটি করতে না পারায় কর্মজীবনে সাফল্যলাভে ব্যর্থ হয়। যিশুর ভালোবাসা হিসেবে মানুষের সঙ্গে সামাজিক বন্ধন তৈরিতে, পরস্পরকে গেঁথে তুলতে আমাদের সক্ষমতা প্রদান করে। এছাড়া সমাজে বিবাদ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে তা antidote হিসেবেও কাজ করে।

যিশু বলেন-

‘‘তোমরা যদি আমাতে থাক এবং আমার বাক্য যদি তোমাদের মধ্যে থাকে তবে তোমাদের যাহা ইচ্ছা হয় করিও, তোমাদের জন্য তাহা করা যাইবে।”

তার কথা অনুযায়ী তাকে আশ্রয় করে জীবনযাপন করলে, আমরা জীবনের উপচয় লাভ করি। যিশুর শিক্ষা অনুযায়ী সম্পদ অর্জনের পিছনে আমাদের লক্ষ্য থাকবে নিরন্ন-হতদরিদ্রের সেবা করা, তাদের মানবিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা। তা না করে আমরা যদি স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের সুখের জন্য চেষ্টা করি আর দরিদ্র ও পীড়িতদের নিজেদের অর্থবিত্তের অংশীদার না করি তবে আমরা লক্ষ্যচ্যুত হব এবং যিশু আমাদের জীবন থেকে তিরোহিত হবেন।

এটি সত্য যে, অন্যকে আমাদের অর্জিত সম্পদের অংশীদার করতে গেলে, নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অনিবার্যভাবে বিরোধ তৈরি হবে। এটি চিত্তের দৃঢ়তা এবং আদর্শ দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধের বিষয় চিন্তা করে যিশু বলেন-

‘‘তোমাদের কি মনে হয় যে, আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে এসেছি? না, তাহা নয়।... এখন থেকে এক বাড়ির পাঁচজন ভাগ হয়ে যাবে। তিনজন দুজনের বিরুদ্ধে, দুজন তিনজনের বিরুদ্ধে।” (লূক ১২:৫১-৫২ পদ)

অন্যের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করলেই যিশুখ্রিস্ট আমাদের জীবনে স্থায়ী হন। অন্যথায় জীবনের কোনো এক ক্ষণে চিন্তাচেতনার মধ্যে ধরা দিলেও তিনি আমাদের জীবনে স্থায়ী হন না। অনেকে তাদের জীবনে যে যিশুর আবির্ভাবের কথা বলেন, তা প্রকৃত বা ভ্রান্তিমূলক কি না তা বলা কঠিন।

একজন Buddhist Monk-এর কথা অনুযায়ী- “Buddha considered that the faith of people gained from seeing miracles usually led them from the path of wisdom rather towards it.” অর্থাৎ, বুদ্ধের মতে কোনো দৈব ঘটনার মধ্য দিয়ে যে বিশ্বাস তৈরি হয়, তা আমাদের প্রজ্ঞা অর্জনের দিকে না নিয়ে বরং তা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যিশু আমাদের চেতনায় ধরা দিলেও তার দিনক্ষণ বলা সহজ মনে হয় না। আমাদের চেতনা ও কাজের মধ্যে যিশু অল্প-অল্প করে প্রকাশ পান এবং ক্রমান্বয়ে আমাদের জীবনে স্থায়ী হন।

অনেকে যিশুকে পেয়েছেন বলে ঘোষণা দিলেও তাদের চরিত্র ও জীবন দেখলে এর মধ্যে যিশুকে খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক তথাকথিত খ্রিস্টভক্তের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাৎ আর অনৈতিক কাজের অভিযোগ শোনা যায়। কথায় বলে, God has given us salvation, but we don't have the character to retain it. সুতরাং, যিশু কবে কোন তারিখে আমার জীবনে প্রকাশ পেলেন, সেটি বড় কথা নয়, বরং তাকে লাভ করার জন্য যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন, তার কতটুকু অর্জনে সক্ষম হলাম সেটিই বড় কথা।

লেখক: গবেষক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
কল্যাণের বাণী নিয়ে মোংলায় বড়দিন উদযাপন
করোনায় চলে গেলেন সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন
‘আমরা যেন দ্বীন দরিদ্রকে আপন করে নিই’
‘পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসুক’
শান্তি প্রার্থনায় বড়দিন উদযাপন শুরু

শেয়ার করুন

মন্তব্য

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

একপর্যায়ে করা হয় সশস্ত্র পন্থায় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার অভিযোগে মামলা। কিন্তু তিনি নির্ভীক। তাকে ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। কোথায় তাকে নেয়া হয়েছে, সেটা কেউ জানতে পারেনি, এমনকি পরিবারের সদস্যরাও। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ছয় মাস পর জুনে পরিবারের সদস্যরা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়েরের কথা জানতে পারে।

তিনি কারাগারে গেলেন শেখ মুজিবুর রহমান হিসেবে, মুক্ত হলেন বঙ্গবন্ধু হিসেবে নন্দিত হয়ে- হ্যাঁ, এভাবেই বলা যায়। ১৯৬৬ সালের ৮ মে গভীর রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাসা থেকে। তিনি দুপুর থেকে নারায়ণগঞ্জে ছিলেন ৬ দফার সমর্থনে আয়োজিত এক জনসভায় ভাষণ প্রদানের জন্য। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের এক সভার আয়োজন হয়েছিল।

উপস্থিত বেশিরভাগ নেতা পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন দলের। শেখ মুজিবুর রহমান কয়েকদিন আগে বন্দি হয়েছিলেন। তবে জামিনে মুক্তি পান। তার কাছে বন্দিজীবন নতুন নয়। বার বার তাকে আটক করা হয়। তিনি যেন বিরোধী নেতাদের সভায় যোগদানের জন্য লাহোর যান, সেটা পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা চেয়েছেন। তারা জানতেন যে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হলে আওয়ামী লীগকে দরকার, শেখ মুজিবুর রহমানকে দরকার। জনগণ তাকে মানে।

শেখ মুজিবুর রহমান লাহোর গেলেন, পকেটে তার স্বায়ত্তশাসনের ৬ দফা কর্মসূচি।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার সময় থেকে তিনি স্বায়ত্তশাসনের দাবি বার বার সামনে এনেছেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি বন্দি। তাকে আটক করা হয়েছিল ২৬ মাস আগে ১৯৫০ সালের প্রথম দিনে। বন্দি হওয়ার আগে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সংগঠিত করার জন্য লাহোর এবং অন্যান্য নগরীতে। ফেরার পরেই বন্দি।

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারির লাহোর যাত্রা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে ৬ দফার কারণে। এর আগেও তিনি এবং আরও অনেক নেতা স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেছেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২১ দফার ১৯ নম্বর দফা ছিল স্বায়ত্তশাসন। তবে এতে কেন্দ্রের হাতে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও অর্থ রাখার কথা ছিল।

৬ দফায় বলা হয় অর্থ থাকবে প্রদেশের হাতে। শুল্ক-কর ধার্য করবে প্রদেশ এবং আদায়ও করবে তারাই। কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার জন্য তা থেকে একটি অংশ দেয়া হবে। পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য থাকবে দুটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মিলিশিয়া বাহিনী গঠিত হবে এবং তা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে। নৌবাহিনীর সদর দপ্তর নিয়ে আসতে হবে পূর্ব পাকিস্তানে।

পশ্চিম পাকিস্তানের যেসব নেতা লাহোরে সভা ডেকেছিলেন, তাদের ইচ্ছে ছিল একটি এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হবে- সর্বজনীন ভোটাধিকার। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের এজেন্ডাও থাকতে হবে আন্দোলনের কর্মসূচিতে। আর এই স্বায়ত্তশাসন হতে হবে ৬ দফার ভিত্তিতে।

পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় কোনো নেতাই কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা খর্ব করার এ কর্মসূচি গ্রহণ করতে রাজি হলেন না। কেউ কেউ তো বলেই দিলেন- এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র পরিণত হবে শিথিল ফেডারেশনে। পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানকে শেখ মুজিবুর রহমান লাহোর যাত্রার আগে ঢাকায় তার বাসায় ৬ দফা দেখিয়ে বলেছিলেন- ‘শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক নেই। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নেই। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আইয়ুব খানকে বিব্রত না করার নীতি নিয়ে চলছেন। এখন আপনিই পূর্ব পাকিস্তানের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা। লাহোরের সভায় আপনিই স্বায়ত্তশাসনের এই দাবি উপস্থাপন করলে ভালো হবে।’

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং এইচএম এরশাদের আমলে মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম (বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর বোনের ছেলে) আমাকে বলেছেন, ‘আতাউর রহমান খানকে ৬ দফা উত্থাপনের অনুরোধ করা হলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন- এটা করা হলে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। আমি এটা করব না। আপনিও করবেন না।’

লাহোরে বিরোধী নেতাদের বৈঠকে ৬ দফা নিয়ে আলোচনা করতে অন্য নেতারা রাজি না হওয়ায় শেখ মুজিবুর রহমান বৈঠক বর্জন করেন। পরের কয়েকটি দিন তিনি লাহোরে সংবাদকর্মী এবং আইনজীবীদের কাছে এ কর্মসূচি তুলে ধরেন। আইয়ুব খান এবং তার মন্ত্রীরা এ কর্মসূচির মর্মার্থ উপলব্ধি করতে মুহূর্ত দেরি করেননি। তাকে গ্রেপ্তার করা হবে, এমন শোনা যেতে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন, ঢাকায় গেলে গ্রেপ্তার করা হবে।

শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় ফেরেন ১১ ফেব্রুয়ারি। বিমানবন্দরেই সংবাদকর্মীরা দলে দলে হাজির হন। পর দিন ৬ দফা নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য ব্যাপক প্রচার পায়। তিনি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক আহ্বান করেন। কেউ কেউ বলেন, আগে কেন কমিটিতে এ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়নি? কেউবা বলেন, এ তো পাকিস্তান ভাঙার কর্মসূচি। শেরে বাংলা ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য লাহোর গিয়েছিলেন। আর আপনি সেই নগরীতেই এমন প্রস্তাব উত্থাপন করলেন, যা বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তান থাকবে না।

মার্চে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ৬ দফা অনুমোদন পায়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি এ কর্মসূচি মানতে সম্মত হননি। কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান বের হয়ে পড়েন জেলা ও মহকুমা সফরে।

সর্বত্র বিপুল সাড়া। পাশাপাশি চলে গ্রেপ্তার অভিযান। কয়েকটি জেলায় তাকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পান। মুক্ত হয়েই আবার জনসভা। কিন্তু ৮ মে (১৯৬৬) নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়া মাঠে জনসভার পর রাতে যে গ্রেপ্তার হলেন, মুক্তি পেলেন প্রায় তিন বছর পর ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তাকে মুক্ত করার জন্য ছাত্র-জনতা রাজপথে নামে। ১১ দফা কর্মসূচি প্রণীত হয়, যাতে ৬ দফা পুরোপুরি স্থান পায়। আরেকটি দাবি ছিল সব রাজবন্দির মুক্তি। হরতাল-অবরোধ-ঘেরাওয়ে উত্তাল ছিল সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তান।

৮ মে গভীর রাতে গ্রেপ্তারের পর তিনি বন্দি থাকেন বিনাবিচারে। পুরোনো মামলায় জেলও হয়। একপর্যায়ে করা হয় সশস্ত্র পন্থায় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার অভিযোগে মামলা। কিন্তু তিনি নির্ভীক। তাকে ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।

কোথায় তাকে নেয়া হয়েছে, সেটা কেউ জানতে পারেনি, এমনকি পরিবারের সদস্যরাও। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ছয় মাস পর জুনে পরিবারের সদস্যরা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়েরের কথা জানতে পারে। ফজিলাতুন নেছা মুজিব ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে তাকে দেখতে পান। শুরু করেন মামলা মোকাবিলার নতুন পর্যায়ের সংগ্রাম। পাশাপাশি গড়ে তোলেন আন্দোলন। এর পরিণতিতেই ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ বন্দি মুক্তি পান। একইসঙ্গে পাকিস্তানের কারাগারে আটক সব রাজবন্দি মুক্তিলাভ করেন।

২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রজনতার বিশাল সমাবেশে তাকে বরণ করে নেয়া হয় ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে। তিনি অঙ্গীকার করেন- ‘বাঙালির মুক্তি আনবই। এ জন্য আবার যদি কারাগারে যেতে হয়, এমনকি জীবন দিতে হয় আমি প্রস্তুত।’ তিনি কথা রেখেছেন।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক-কলাম লেখক, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
কল্যাণের বাণী নিয়ে মোংলায় বড়দিন উদযাপন
করোনায় চলে গেলেন সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন
‘আমরা যেন দ্বীন দরিদ্রকে আপন করে নিই’
‘পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসুক’
শান্তি প্রার্থনায় বড়দিন উদযাপন শুরু

শেয়ার করুন

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্যেই আগরতলা মামলা

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্যেই আগরতলা মামলা

১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারির প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ আইন-আদালত ভঙ্গ করে সেনানিবাসে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে হত্যার উদ্দেশ্যেই কারাগার থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। একারণেই এই গ্রেপ্তার, মামলা এবং নিরুদ্দেশে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাবলি ইতিহাসের এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার গুরত্ব বহন করে।

আজ ১৮ জানুয়ারি। ১৯৬৮ সালের এই দিনের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্স আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার দেখিয়ে ঢাকা সেনানিবাসের উদ্দেশ্যে নেয়া হয় এবং সেখানেই তিনি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র কথা জানতে পারেন। ২২ জানুয়ারি ১৯৬৯-এ মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত সেখানেই তিনি বন্দি ছিলেন। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৪৭ উত্তরকাল থেকে সূচিত রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে বিভিন্ন মামলায় তাকে কারারুদ্ধ করা হয়।

সেসব মামলাকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সরকারের রোষানলের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। দেশের আইন-আদালতে মামলার বিরুদ্ধে লড়াই করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জামিনে মুক্তি নেন, কারাগারে বন্দি থেকেও মুক্ত হন। পাকিস্তানের শুরু থেকে শেখ মুজিবুর রহমান যেহেতু শাসকগোষ্ঠীর সব অনাচারের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন, নিয়েছিলেন উদ্যোগী ভূমিকা।

তাই পাকিস্তান সরকার তাকে সবসময়ই ‘বড় হুমকি’ হিসেবে মনে করত। এসব কারণে তার বিরুদ্ধে ১৯৪৮ ও ৪৯ সাল থেকে একের পর এক মামলা রুজু করা হতে থাকে। তিনি এসব মামলার বিরুদ্ধে আইন ও আদালতে লড়াই করে কখনও জামিন পেয়েছিলেন, আবার কখনও রুজু করা নতুন মামলায় কারাগারে আটক থেকেছেন। অবশেষে মুক্ত হয়ে আবার তিনি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যতদিন তিনি এই আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন ততদিন তিনি পাকিস্তান সরকারের রোষানল থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি, মামলা তার পিছু ছাড়েনি।

সেকারণে আদালতে সবসময় তার বিরুদ্ধে কোনো না কোনো মামলা থাকতই । তিনি সেসব মামলায় লড়াই করেই রাজনীতিতে টিকে ছিলেন। মামলাকে বঙ্গবন্ধু কখনও ভয় করার বিষয় মনে করেননি। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা প্রদানের পর তাকে একের পর এক মামলায় নতুন করে জড়ানো হতে থাকে। ৯ মের প্রথম প্রহরে তাকে আবার বন্দি করে জেলে রুদ্ধ করা হয়। জেলে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে পুরাতন এবং নতুন মোট ১২টি মামলা একের পর এক চলছিল।

মূলত, ৬ দফার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্যই পাকিস্তানের সামরিক সরকার আইয়ুব খান শেখ মুজিবের ওপর এসব মামলায় তাকে কারারুদ্ধ করে রাখছিল। কিন্তু আইয়ুব সরকার যখন মামলার ভয় দেখিয়ে কিংবা সংখ্যা বাড়িয়েও শেখ মুজিব ও তার অনুসারীদের ৬ দফার আন্দোলন থেকে বিরত রাখতে পারছিল না কিংবা সেই আন্দোলনকে দুর্বলও করতে পারছিল না তখন প্রথমে আওয়ামী লীগের মধ্যে ফাটল ধরানোর জন্য পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) নামের একটি জোট গঠন করে। জোটের ৮ দফা দাবিনামাও প্রণয়ন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল ৬ দফার আন্দোলনকে বিভক্ত করা এবং আওয়ামী লীগকে দুইভাগে ভাগ করা। ১৯৬৭ সালে পিডিএম সেই চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তখনই আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে সাধারণ সরকারবিরোধী কোনো মামলা নয় বরং রাষ্ট্রবিরোধী মামলা রুজু করে তাকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে প্রমাণিত করে হত্যা করার নতুন ষড়যন্ত্র আটতে থাকে। নতুন এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি গোপন রাখা হয়।

১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে এক নম্বর আসামি করে অপর ৩৪ বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে একটি রাষ্ট্রোদ্রোহী মামলা গোপনে করে। ৬ জানুয়ারি রাওয়ালপিন্ডি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে ২৮ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা প্রদান করে। এই মামলাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৭ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১২টার পর অর্থাৎ ১৮ জানুয়ারি রাত ১টায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে গোপনে কাউকে না জানিয়ে ঢাকা সেনানিবাসের উদ্দেশে যাত্রা করা হয়। কোনো সাধারণ মামলায় কোনো আসামিকে এভাবে গ্রেপ্তার করা হয় না, নিরুদ্দেশেও নেয়া হয় না। কিন্তু ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারির প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ আইন-আদালত ভঙ্গ করে সেনানিবাসে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে হত্যার উদ্দেশ্যেই কারাগার থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। একারণেই এই গ্রেপ্তার, মামলা এবং নিরুদ্দেশে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাবলি ইতিহাসের এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার গুরত্ব বহন করে।

কী ঘটেছিল সেই রাতে কিংবা তার আগে যা অনেকেরই জানা ছিল না, এমনকি বন্দি শেখ মুজিবও জানতেন না। সেসম্পর্কে জানার একমাত্র উৎস হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থটি। এই গ্রন্থেই তিনি দিয়েছেন এর লোমহর্ষক বিবরণ। আমরা সেই সময়ের ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ বইয়ের ২৫২ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে ২৬৬ পর্যন্ত সবিস্তারে জানতে পারব। আমরা শুধু ১৭ জানুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৮ তারিখের প্রথম প্রহরে কী ঘটেছিল তার কিছু দিক সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরছি। গ্রন্থের লেখক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব লিখেছেন-

“১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি রাত্রে যথারীতি খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ি। দেওয়ানি ওয়ার্ডে আমি থাকতাম। দেশরক্ষা আইনে বন্দি আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমিন এডভোকেট আমার কামরায় থাকতেন। ১৭ মাস একাকী থাকার পর তাকে আমার কাছে দেওয়া হয়। একজন সাথী পেয়ে কিছুটা আনন্দও হয়েছিল। হঠাৎ ১৭ই জানুয়ারি রাত্র ১২টার সময় আমার মাথার কাছে জানালা দিয়ে কে বা কারা আমাকে ডাকছিলেন। ঘুম থেকে উঠে দেখি নিরাপত্তা বিভাগের ডেপুটি জেলার তোজাম্মেল সাহেব দাঁড়াইয়া আছেন।

জিজ্ঞাসা করলাম, এত রাত্রে কি জন্য এসেছেন? তিনি বললেন, দরজা খুলে ভিতরে এসে বলব। ডিউটি জমাদার দরজা খুলে দিলে তিনি ভিতরে এসে বললেন, আপনার মুক্তির আদেশ দিয়েছে সরকার। এখনই আপনাকে মুক্ত করে দিতে হবে। মোমিন সাহেবও উঠে পড়েছেন। আমি বললাম, হতেই পারে না। ব্যাপার কি বলুন। তিনি বললেন, সত্যই বলছি আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে- এখনই, কাপড় চোপড় নিয়ে চলুন। আমি আবার তাকে প্রশ্ন করলাম, আমার যে অনেকগুলো মামলা আছে তার জামানত নেওয়া হয় নাই। চট্টগ্রাম থেকে কাস্টডি ওয়ারেন্ট রয়েছে, আর যশোর, সিলেট, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, পাবনা থেকে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট রয়েছে। ছাড়বেন কি করে? এটাতো বেআইনি হবে। তিনি বললেন, সরকারের হুকুমে এগুলি থাকলেও ছাড়তে পারি। আমি তাকে হুকুমনামা দেখাতে বললাম। তিনি জেল গেটে ফিরে গেলেন হুকুমনামা আনতে।

আমি মোমিন সাহেবকে বললাম, মনে হয় কিছু একটা ষড়যন্ত্র আছে এর মধ্যে। হতে পারে এরা আমাকে এ জেল থেকে অন্য জেলে পাঠাবে। অন্য কিছু একটাও হতে পারে, কিছুদিন থেকে আমার কানে আসছিল আমাকে ‘ষড়যন্ত্র’ মামলায় জড়াইবার জন্য কোনো কোনো মহল থেকে চেষ্টা করা হতেছিলো। ডিসেম্বর মাস থেকে অনেক সামরিক, সিএসপি ও সাধারণ নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছে দেশরক্ষা আইনে- রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা উপলক্ষ্যে, সত্য মিথ্যা খোদাই জানে!” (পৃ-২৫২ )

এখানে স্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু তখনও জানতে পারেননি তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কী করতে যাচ্ছিল। তিনি সেই রাতে জেল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থামতো রুম ত্যাগ করে জেলখানার গেটে আসার পর দেখতে পান-

“এলাহি কাণ্ড! সামরিক বাহিনীর লোকজন যথারীতি সামরিক পোষাকে সজ্জিত হয়ে দাঁড়াইয়া আছেন আমাকে ‘অভ্যর্থনা’ করার জন্য।” বঙ্গবন্ধু জেলারের কক্ষে বসা ছিলেন। সেখানেই একজন সামরিক বাহিনীর বড় কর্মকর্তা এসে তাকে জানালেন, “শেখ সাহেব আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো।” বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চাইলেন। সাদা পোশাক পরিহিত একজন কর্মকর্তা পড়লেন, “আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্স আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হলো।” এরপর বঙ্গবন্ধু বললেন। ‘চলুন’। তাকে নিয়ে বসানো হলো তাদের গাড়িতে। কিন্তু কোথায় নেয়া হচ্ছে। সেই সম্পর্কে কিছুই জানানো হলো না।

তিনি দেখলেন তিন জাতীয় নেতার কবরের পাশ দিয়ে গাড়িটি শাহবাগ হোটেল পার হয়ে এয়ারপোর্টের দিকে চলছে। তারপর তেজগাঁও বিমানবন্দর অতিক্রম করে তেজগাঁও সেনানিবাসে প্রবেশের পর বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন যে তাকে সেনানিবাসেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাকে নেয়া হলো একটি সামরিক অফিসার মেসে। সেখানে ডাক্তারি পরীক্ষা শেষে একটি কক্ষে নেয়া হলো। কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সামরিক কর্মকর্তা চলে যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু ঘুমিয়ে পড়েন। সেই রাতেই শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রুজু করা নতুন আরেক মামলার অধ্যায়।

ইতিহাসে এটিকে আমরা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ বলে জানি। তবে মামলাটির পুরো নাম হচ্ছে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’। এ মামলায় জড়িত করা হয়েছিল বেশ কজন বাঙালি আমলা, সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদকে। ভূতপূর্ব নৌবাহিনীর কর্মচারী কামালউদ্দিনকে ব্যাপকভাবে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন সেই স্বীকারোক্তি লিখিয়ে নিয়েছিল। বেশ কজন সিএসপি ও বাঙালি অফিসারকে এর সঙ্গে যুক্ত করা হলো। বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।

আসামির তালিকায় তিনি ছিলেন প্রধান। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধুর এক কারা জীবন থেকে আরেক কারা জীবনে স্থানান্তর এবং শুরু হয়। এটি ছিল নির্ঘাত তাকে হত্যা করার এক পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা। ১৮ তারিখ বঙ্গবন্ধু সেনানিবাসের সেই কঠোর বন্দি ও বিচারের জীবনে প্রবেশ করেছিলেন। পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করতেই এখানে এনেছিল। কিন্তু ষড়যন্ত্রের সেই প্রহসন একপর্যায়ে এসে বুমেরাং হয়ে গেল। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী গণ-অভ্যুত্থানে গদিচ্যুত হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে ফিরে এলেন তার প্রিয় জনগণের কাছে।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
কল্যাণের বাণী নিয়ে মোংলায় বড়দিন উদযাপন
করোনায় চলে গেলেন সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন
‘আমরা যেন দ্বীন দরিদ্রকে আপন করে নিই’
‘পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসুক’
শান্তি প্রার্থনায় বড়দিন উদযাপন শুরু

শেয়ার করুন

তৈমূর কি এখন ট্রাইব্যুনালে যাবেন?

তৈমূর কি এখন ট্রাইব্যুনালে যাবেন?

প্রশ্ন হলো, তৈমূর আলম খন্দকার কি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন বা সেটি প্রমাণের কি কোনো পদ্ধতি আছে? যদি থাকে তাহলে তিনি কি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন? প্রশ্নটা জরুরি, কারণ নারায়ণগঞ্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিটির নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইভিএমকে ‘জালিয়াতির বাক্স’ বলে মন্তব্য করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী জিতবেন না বা হেরে যাবেন—এমনটি কি আপনি ভেবেছিলেন?

এই সিটির প্রথম মেয়র আইভী। ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন ঘোষিত হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনেই তিনি পরাজিত করেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানকে। ওই নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তৈমূর আলম খন্দকার—এবার যিনি আইভীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদও হারিয়েছেন তৈমূর আলম, যাকে ২০১১ সালের নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তে (ভোটের আগের রাতে) মাঠ থেকে সরে যেতে হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালের নির্বাচনে আইভীর বিরুদ্ধে বিএনপির টিকিট পান সাখাওয়াত হোসেন খান। অর্থাৎ তৈমূর আলম খন্দকার মনোনয়ন পাননি।

সুতরাং বলা যায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের সঙ্গে তৈমূর আলম খন্দকারের পলিটিক্যাল ট্র্যাজেডির একটা সম্পর্ক আছে। তৈমূর আলমের এই ট্র্যাজেডির বিপরীতে সেলিনা হায়াৎ আইভীর মেয়র পদে এবার হ্যাটট্রিক জয়।

এবার নারায়ণগঞ্জ সিটিতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় নির্বাচনে আইভী পেয়েছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭টি ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৈমূর আলম পেয়েছেন ৯২ হাজার ১৬৬টি ভোট। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধান ৬৬ হাজার ৯৩১।

প্রশ্ন হলো, এবার আইভীর পরাজয়ের কি কোনো আশঙ্কা ছিল?

চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহীদের কাছে নৌকা মার্কার প্রার্থীদের নাস্তানাবুদ হওয়া; রাজনীতিতে আইভীর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী (যদিও তারা একই দলের) এবং যার সমর্থনও আইভীর জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে, সেই শামীম ওসমানের নেপথ্য ভূমিকাও কি আইভীর হেরে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা তৈরি করেছিল?

স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার যদি বিএনপির মনোনয়ন বা সমর্থন পেতেন, অর্থাৎ বিএনপি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনে অংশ নিত, তাহলে সারা দেশে ইউপি নির্বাচনের ক্ষমতাসীন দলের অসংখ্য প্রার্থীর পরাজিত হওয়ার ধারাবাহিকতায় নারায়গঞ্জ সিটি নির্বাচনেও কি নৌকার প্রার্থী হেরে যেতেন? হয়তো না।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আর সিটি করপোরেশন নির্বাচন এক নয়। যেসব ইউপিতে নৌকা হেরে গেছে, সেখানে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী। অর্থাৎ নৌকার বিরুদ্ধে নৌকা। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ। বিএনপি মাঠে নেই, অথচ আওয়ামী লীগ হেরে যাচ্ছে তাদের নিজেদের লোকদের কাছেই। এটা দলের গৃহদাহ।

ইউপি নির্বাচন হয় অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। রাষ্ট্রের একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের এই নির্বাচনে দল ও মার্কার বাইরে অনেক হিসাব-নিকাশ কাজ করে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে সেই হিসাব-নিকাশ ছিল না। এখানে আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আওয়ামী লীগের কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন না। তৈমূর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী। মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি তাকে মনোনয়ন বা সমর্থন দেয়নি। উল্টো দল থেকে বহিষ্কার করেছে। ব্যক্তি আইভীরও একটা ভোটব্যাংক আছে।

কোনো একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে নানা কাজের কারণে জনগণের বিরাট অংশ ক্ষুব্ধ হয় বলে তাদের প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়— এটি রাজনীতির সরল সমীকরণ। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এটি খাটে না। যেসব ক্ষেত্রে খাটে না— নারায়ণগঞ্জ সিটিতে আইভী তার অন্যতম। সুতরাং কোনো সমীকরণই সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রতিকূলে ছিল না। কিন্তু তার পরও সেখানে মূল ফ্যাক্টর হয়েছিলেন শামীম ওসমান, যিনি শুরুতে আইভীর পক্ষে না দাঁড়ালেও দলের চাপে অথবা সিদ্ধান্তে মন থেকে না হলেও মুখে আইভীর পক্ষে কথা বলেছেন।

দলীয় কারণেই আইভীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়ার অবস্থা শামীম ওসমানের ছিল না। আবার গোপনেও তিনি আইভীর বিরুদ্ধে কাজ করলে যে খুব বেশি সফল হতেন, সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সুতরাং নারায়ণগঞ্জ সিটিতে আইভী যে হ্যাটট্রিক জয় পাবেন, তা মোটামুটি ধারণা করাই যাচ্ছিল।

তবে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর প্রার্থীরা যে ধরনের মন্তব্য করেন বা নিজের পরাজয়কে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন, তৈমূর আলম খন্দকারও তার ব্যতিক্রম নন। ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন তিনি। ব্যালট পেপারে ভোট হলেও তিনি হয়তো গণনায় কারচুপির অভিযোগ আনতেন।

আমাদের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে এখনও পরাজয় মেনে নিয়ে বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানানোর বিষয়টি সেভাবে চালু হয়নি। কালেভদ্রে দু-একটি ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরাজিত প্রার্থী মূলত বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কারচুপি, অনিয়মসহ নানা অভিযোগ করেন। কিন্তু যিনি অভিযোগ করেন, তার দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগটি যে সত্য সেটি প্রমাণ করা। না হলে ওই অভিযোগটির ‍গুরুত্ব থাকে না। প্রশ্ন হলো, তৈমূর আলম খন্দকার কি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন বা সেটি প্রমাণের কি কোনো পদ্ধতি আছে? যদি থাকে তাহলে তিনি কি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন?

প্রশ্নটা জরুরি, কারণ নারায়ণগঞ্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিটির নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইভিএমকে ‘জালিয়াতির বাক্স’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে তাকে পরাজিত করেছে; ফলে তার এই অভিযোগটি হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।

ইভিএম নিয়ে অতীতেও অনেক প্রার্থীর তরফে অভিযোগ এসেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এই মেশিনে হবে। সুতরাং কোনো একটি মেশিন যদি সব প্রার্থীর আস্থা অর্জন করতে না পারে এবং প্রার্থীদের মধ্যে যদি এই ধারণা থেকেই যায় যে ইভিএমে কারচুপি করা যায়, তাহলে ভোট যত শান্তিপূর্ণই হোক না কেন, আখেরে এটি গ্রহণযোগ্য হবে না। আর ভোট যত শান্তিপূর্ণ হোক, ভোটার উপস্থিতি যতই হোক কিংবা ভোট যত অংশগ্রহণমূলক এবং উৎসবমুখরই হোক না কেন, যে মেশিনে মানুষ ভোট দেবে, সেই মেশিনটি যদি সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে সেই ভোটও বিশ্বাসযোগ্য হয় না।

সুতরাং নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে, ইভিএম নিয়ে সর্বসাধারণের মনে এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কোনো ধরনের কারচুপির সুযোগ নেই এবং এখানে প্রকৃতই জনরায়ের প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু ইভিএম চালুর পর থেকে এ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের বিরাট অংশের মনে যে প্রশ্ন, যে সংশয়, তা দূর করতে নির্বাচন কমিশন ‍খুব বেশি পদক্ষেপ নিয়েছে বা নির্বাচনের বেশ কয়েক দিন আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারদের মধ্যে এই মেশিনটি নিয়ে খুব বেশি প্রচার করেছে এবং হাতে-কলমে এর ব্যবহার শিখেয়েছে, তা বলা যাবে না।

সর্বোপরি কথা হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পরাজয়ের তেমন কোনো কারণ ছিল না। নৌকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ মার্কার প্রার্থীও ছিলেন না। কিন্তু তার পরও পরাজিত প্রার্থী যদি সত্যিই এটি মনে করেন যে ইভিএম হচ্ছে ‘ভোট চুরির বাক্স’, তাহলে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে তার এই বক্তব্যের জবাব দেয়া। আর তৈমুর আলমেরও উচিত হবে তার অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে জানানো। না হলে তার এই অভিযোগটিকে নিতান্তই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর এবং পরাজিত প্রার্থীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বিবেচনা করা হবে, আখেরে যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য নেই।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কল্যাণের বাণী নিয়ে মোংলায় বড়দিন উদযাপন
করোনায় চলে গেলেন সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন
‘আমরা যেন দ্বীন দরিদ্রকে আপন করে নিই’
‘পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসুক’
শান্তি প্রার্থনায় বড়দিন উদযাপন শুরু

শেয়ার করুন

মায়ের পরিচয়ে পরিচিতি কেন নয়

মায়ের পরিচয়ে পরিচিতি কেন নয়

একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য অবশ্যই তার মা-বাবার পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। তবে যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, দুজনের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না, একজনের পরিচয়েই বেড়ে উঠতে হবে; তাহলে অবশ্যই যেন সেটা মা হন। মা অথবা বাবা এটা হতে পারে। তবে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত একজনে এসে ঠেকলে সেটা অবশ্যই মা। এমনকি সিঙ্গেল মা-ও তো হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বাবার পরিচয় নয়, মায়ের পরিচয়টাই মুখ্য।

এ কথা অনেকেই জানেযে, সন্তান প্রসবের সময় নারীদের অবর্ণনীয় কষ্ট পোহাতে হয়। বলা হয়, প্রসববেদনা অন্য সব শারীরিক কষ্টের চেয়েও বেশি। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখার পর নারী অবলীলায় সব কষ্ট ভুলে যান। আজীবন আগলে রাখেন সেই সন্তানকে। একজন মা তার সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকার করেন। মুরগি খুব নিরীহ একটা প্রাণী। কিন্তু মুরগির বাচ্চাকে ধরতে গিয়ে দেখবেন মুরগি কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

নিরীহ একজন নারীও সন্তানের ভালোর জন্য, সন্তানকে আগলে রাখার জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। একাত্তর সালে অনেকেই শহীদ হয়েছেন। শহীদজায়াদের সংগ্রামের অনেক গল্প আমরা জানি। স্বামীর অবর্তমানে তারা সংসার সামলেছেন, সন্তানদের মানুষ করেছেন। শহীদজায়াদের সংগ্রামের ইতিহাস অনেকটাই সিনেমার মতো থ্রিলিং।

এবার মূল কথায় আসা যাক। সন্তানের মায়ের পরিচয় নিশ্চিত হলেও বাবার পরিচয় সবসময় নিশ্চিত না-ও হতে পারে। সন্দেহ হলে ডিএনএ টেস্ট করতে হয়। কিন্তু মায়ের পরিচয়ের জন্য কোনো পরীক্ষার দরকার নেই। অথচ বাস্তবে ঘটে উলটো ঘটনা। সন্তান বেড়ে ওঠে বাবার পরিচয়ে। দুই দশক আগে এই বাংলাদেশেই সন্তানের পরিচয়ে শুধু বাবার নাম লেখা হতো। শেখ হাসিনা প্রথম দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে সন্তানের পরিচয়ে বাবার পাশাপাশি মায়ের নামও যুক্ত করেন। কিন্তু মায়ের পরিচয় যেন যথেষ্ট নয়। বাবার পরিচয় ছাড়া মা যেন অসম্পূর্ণ।

এই আলোচনাটি সামনে এনেছেন এক জয়িতা নারী মরিয়ম খাতুন। বাংলাদেশে সাধারণত স্বামী পরিত্যক্তা নারীরা বাবার বাড়িতে গিয়ে বাবা বা ভাইয়ের গলগ্রহ হয়ে গ্লানির জীবনযাপন করেন। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর মরিয়মও নাটোরের বাবার বাড়িতে ভাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন। কিন্তু মরিয়ম আর সবার মতো আশ্রিতা হয়ে থাকতে চাননি। কন্যা মিথিলা খাতুনকে নিয়ে মরিয়ম শুরু করেন জীবনযুদ্ধ। আরও অনেকের অনুপ্রেরণা হয়ে মরিয়ম জিতে নেন জয়িতা পুরস্কার। সবকিছু চলছিল ঠিকঠাকমতোই, বাবা ছাড়া মায়ের লড়াইয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল মিথিলা। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে স্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে জানা গেল, বাবার পরিচয়ের প্রমাণ ছাড়া ভর্তি হওয়া যাবে না। যে বাবা সন্তানকে ছেড়ে দিয়েছে, সন্তানের কোনো দায়িত্ব পালন করে না; সেই বাবাই এখন তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল! মরিয়মের সাবেক স্বামী, মিথিলার বাবা শাহ আলম চাকরি করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। মা-মেয়ে নাটোর থেকে ছুটে এলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তাদের চাওয়া সামান্য- মিথিলার বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের একটি ফটোকপি, যা ছাড়া সামনে এগোতে পারবে না মিথিলা, লড়াই থেমে যাবে মরিয়মের। কিন্তু শাহ আলম জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি তো দিলেনই না, উল্টো মা-মেয়েকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। আর কোনো উপায় না পেয়ে মরিয়ম বেগম তার মেয়ে মিথিলাকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অনশনে বসেছেন।

বিষয়টি নিয়ে যেভাবে লেখালেখি এবং আলোচনা হচ্ছে; তাতে মিথিলা হয়তো তার বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি পেয়ে গেছে বা যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে বাবা সন্তানের দায়িত্ব নেয় না, সে বাবার পরিচয়টা সন্তানের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হবে কেন? কোনো মানুষের জন্মের দায় তার নয়। সে কোন সংসারে জন্ম নেবে, সেটা বেছে নেয়ার অধিকার তার নেই। সব পিতা-মাতারই দায়িত্ব সন্তানকে বড় করে তোলা। সন্তানের প্রতি মা-বাবার অন্ধ অপত্য স্নেহই আসলে সভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে। মা-বাবার সাহায্য, ভালোবাসা ছাড়া কোনো শিশুর পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। তবু শাহ আলমের মতো কিছু পিতা নামের অযোগ্য ব্যক্তি আছে, যারা সন্তানের দায়িত্ব পালন করে না। আবার মরিয়মের মতো অনেক লড়াকু নারী আছেন, যারা সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করে দেন। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য অবশ্যই তার মা-বাবার পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, দুজনের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না, একজনের পরিচয়েই বেড়ে উঠতে হবে; তাহলে অবশ্যই যেন সেটা মা হন। মা অথবা বাবা এটা হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি শেষ পর্যন্ত একজনে এসে ঠেকলে সেটা অবশ্যই মা। এমনকি সিঙ্গেল মাও তো হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বাবার পরিচয় নয়, মায়ের পরিচয়টাই মুখ্য।

আমাদের দেশে অনেক অদ্ভুত আইন আছে। যেমন কদিন আগে ভূমি না থাকায় পুলিশে চাকরি না পাওয়ার বিষয় নিয়ে অনেক হই চই হয়েছে। আলোচিতরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে চাকরি পেয়েছে, ভূমি পেয়েছেন। কিন্তু ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া দুয়েকজনের চাকরি দেয়ার চেয়ে ভূমি না থাকলে সরকারি চাকরি পাবে না, এ আইনটি বদলানো দরকার। বাংলাদেশের মানুষ কি না সেটাই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত।

ভূমিহীনদের চাকরি না হওয়ার মতোই মান্ধাতা আমলের চিন্তা বাবার পরিচয় ছাড়া সন্তানের ভর্তি হতে না পারার বিষয়টি। একজন মানুষকে বিবেচনা করা হবে তার মেধা, তার যোগ্যতা দিয়ে; বাবা বা মা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। পরিচয় যদি লাগেই, তবে সেটা হোক মায়ের পরিচয়। মরিয়ম তবু জয়িতা নারী বলে, দাবি আদায়ে অনশনে বসতে পেরেছেন। কিন্তু কত নারী এভাবে পুরুষদের লাঞ্ছনা, অবমাননার শিকার হচ্ছেন; আমরা তার কোনো খবরই রাখি না। মরিয়ম বেগম যে সাহস দেখিয়েছেন, তা যেন আমাদের চোখ খুলে দেয়।

লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কল্যাণের বাণী নিয়ে মোংলায় বড়দিন উদযাপন
করোনায় চলে গেলেন সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন
‘আমরা যেন দ্বীন দরিদ্রকে আপন করে নিই’
‘পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসুক’
শান্তি প্রার্থনায় বড়দিন উদযাপন শুরু

শেয়ার করুন

করোনা ও হত্যাবাণিজ্যের কড়চা

করোনা ও হত্যাবাণিজ্যের কড়চা

গত বছর যেভাবে লকডাউন দিয়ে সুফল অর্জিত হয়েছিল এখন সেটা প্রায় অসম্ভব। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে, দরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবন সচল রাখতে হলে এককথায় সাধারণ মানুষের খেয়েপরে বাঁচার পথ খোলা রাখতে চাইলে, গরিবের কথা মাথায় থাকলে লকডাউনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। লকডাউনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের পক্ষে বহন সম্ভব নয়।

করোনা পরিস্থিতির আবারও অবনতি ঘটল। বিশেষ করে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে। বহির্বিশ্বে তো বটেই বাংলাদেশেরও পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। মাঝখানে জনমনে একটা স্বস্তি এসেছিল সংক্রমণহার এবং মৃত্যুহার কমে যাওয়ার ফলে। মাত্র মাস-দুইতিন আগেও যেখানে আক্রান্তের গড় হার ছিল প্রতিদিন শতকরা ১৩-১৪ জন, সেখানে আমরা তা নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম শতকরা ১-২ জনে। কিন্তু করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট আসার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত এবং মৃত্যুহার দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত দৈনিক আক্রান্তের হার শতকরা ১৫-১৬ জনে পৌঁছেছে। আক্রান্তের পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যুহারও। এই অবস্থা নিঃসন্দেহে শঙ্কাজনক।

গত বছর যেভাবে লকডাউন দিয়ে সুফল অর্জিত হয়েছিল এখন সেটা প্রায় অসম্ভব। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে, দরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবন সচল রাখতে হলে এককথায় সাধারণ মানুষের খেয়েপরে বাঁচার পথ খোলা রাখতে চাইলে, গরিবের কথা মাথায় থাকলে লকডাউনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। লকডাউনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের পক্ষে বহন সম্ভব নয়।

তাহলে বিকল্প কী? এই ভাবনা অনেকেই ভাবছেন। সরকারের তরফ থেকে টিকা কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনও স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। মানানোর মতো ব্যাপক জনমত গঠন করার বিকল্প নেই।

চিকিৎসক-সাংবাদিক তথা গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি প্রবীণদেরও বুস্টার ডোজের আওতায় আনার সরকারি প্রয়াস জারি আছে। কিন্তু প্রথম ডোজইতো এখনও দেয়া যায়নি বিপুলসংখ্যক মানুষকে। প্রথমবার যারা পেয়েছেন তাদের অনেকে এখনও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি। টিকা নেননি অথবা পাননি এমন নাগরিকের সংখ্যাও অসংখ্য!

আরও ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার জন্য গত সপ্তাহে উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কার্যকর করা যায়নি। সরকারের তরফে বলা হয়েছিল অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের জন্য। কিন্তু গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট মালিক-চালক কর্তৃপক্ষ সরকারের প্রস্তাব কার্যকর করেনি। গণমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদনে পাওয়া প্রামাণ্য বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, অনেক বাসচালক-হেলপার এবং সুপারভাইজারও টিকা গ্রহণ করেননি অথবা পাননি! তাহলে উপায়? কেন জনগণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব টেকনিক্যাল পেশার লোকজনকে টিকার আওতায় বাধ্যতামূলকভাবে আনা গেল না! এ যে শুধু বাসচালকদের ক্ষেত্রে সত্য, তা নয়। লঞ্চ স্টিমারসহ অন্য গণ- পরিবহনের চিত্রও প্রায় অভিন্ন।

টিকার কথা আসতেই মনে পড়ল আন্তর্জাতিক বাজারের মহাপরাক্রমশালী টিকা ব্যবসায়ীদের কথাও। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি স্ট্যাটাসের কথা বলি। স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ডক্টর তমাল রায়চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক। রীতিমতো পিলে চমকানো তথ্য। চীনের উহান প্রদেশ থেকে করোনার আবির্ভাব কিংবা উৎপাদন এবং এই নিষ্ঠুরতম অমানবিক বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিশ্বমোড়লদের ভয়াবহ সব কর্মকাণ্ডের তথ্য। সত্য-মিথ্যা যাচাই করবেন গবেষকরা। কিন্তু যেসব যুক্তি ওই দীর্ঘ স্ট্যাটাসে উল্লেখ করা হয়েছে এবং যেসব রেফারেন্স দেয়া হয়েছে, তা একেবারে ঝেড়ে ফেলে দেয়াও যায় না। যাকগে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাদের মতো সীমিত সম্পদের দেশ এবং দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে এ মুহূর্তেই জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

বিশেষ করে টিকা কার্যক্রম জোরদার করে যত দ্রুত সম্ভব দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর ভরসা করলে হবে না। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সমন্বিত ক্র্যাশ প্রোগ্রামও নিতে হবে। গণপরিবহনসহ জনসমাগমস্থলে যাতে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করা যায়, তাহলেও অন্তত কিছুটা শঙ্কা কমতে পারে। গার্মেন্টস, ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ কাজ করছে, তাদের সবাইকে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিষ্ঠান মালিকদেরকে দিয়েই করাতে হবে। এর বিকল্প আর কিছু নেই। যত সহজে লিখলাম তত সহজ নয় কাজটি। কিন্তু দুঃসাধ্যও নয়। অধিকাংশ কারখানায় বেশিরভাগ শ্রমিক স্বাস্থ্যবিধি না মেনে নির্বিকার কাজ করে যাচ্ছে।

এর বাইরে হাটবাজার, গণপরিবহন, জনসমাগম হয় এমন স্থান; স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংক্রমণের আশঙ্কা আছে এমন স্থানসমূহে ব্যাপক মনিটরিং করতে হবে। তা শুধু স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠার জন্যই। প্রয়োজনে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি অমান্যকারীদের দরকারে শাস্তির আওতায় এনে হলেও এটা বাস্তবায়ন করা জরুরি।

আরেকটি শঙ্কার কথা বলে রাখা ভালো, তা হচ্ছে দেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে, এমনকি কোনো কোনো জেলা শহরেও করোনার প্রকোপকালে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল সক্রিয় ছিল। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিস্তৃত ছিল। টেস্ট-কিটসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি তারা সংরক্ষণ করেছিল।

আইসিইউর সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু গত মাস দুই-তিনেক করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকেই অনেক হাসপাতালকে হাত-পা গুটিয়ে নিতে দেখা গেছে। এখন যদি অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে, সে ক্ষেত্রে মৃত্যুর মিছিল হয়ে যাবে যথার্থ চিকিৎসা সংকটেই। অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইসিইউসহ উন্নত চিকিৎসার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।

ডক্টর তমাল রায়চৌধুরীর দীর্ঘ লেখাটি পড়ে মনে হয়েছে করোনা যেন মানবসৃষ্ট এবং অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করা একটি বাণিজ্যিক আইটেম। নৃশংসতম গণহত্যার পথ ধরেই যেন চলেছে সেই বাণিজ্য!

২০০৮ খ্রিস্টাব্দে লেখা একটি বইয়ের নাম ‘করোনা ক্রাইসিস’। বইটির লেখক রবিন রুইট। তিনি এই বইটিতেই আগাম লকডাউন পেন্ডামিকের কথা লিখে গেছেন! লন্ডনে অনুষ্ঠিত ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ৩০তম অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও দেখানো হয় পেন্ডামিকের ওপর অনুষ্ঠান! যেখানে নার্সেরা মাস্ক পরা অবস্থায় শুশ্রূষা করছেন আক্রান্ত রোগীর! শুধু তাই নয়, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে সাংবাদিক হ্যারি ভক্স তার প্রতিবেদনে লিখেছেন: “এক ভয়ংকর রাসায়নিক যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, যা হয়তো পৃথিবী ধ্বংসের শুরু!”

এছাড়া ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ৬শ ডাক্তারের তৈরি করা মেডিক্যাল বোর্ড একটি সংগঠন তৈরি করে, সংগঠনটির নাম ‘ডক্টরস ফর ট্রুথ’। তারা এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার জানিয়ে দেন “covid-19 নামের এক ভয়াবহ ভাইরাস-পরিমণ্ডল তৈরির জন্য ভয়ংকর স্ক্যামের ভাবনা ভাবা হচ্ছে (২০১৫ খ্রিস্টাব্দে covid-19 নাম!) যার মূলে আসলে ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল বাজার দখলের নোংরা খেলা এবং প্রতিষেধকের নতুন বাজার তৈরির উন্মত্ত খেলা, এটাই হতে চলেছে নিকৃষ্টতম গ্লোবাল ক্রাইম।”

যুক্তরাষ্ট্রে এই তৎপরতার ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয় প্যানডেমিক নামে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে রিচার্ড রথশিল্ড নামের এক বিজ্ঞানী কোভিড টেস্টিং কিটের একটি পেটেন্ট নিয়ে রাখেন! গোপন চুক্তি হয় বিশ্বের এক নম্বর ধনকুবের বিল গেটসের সঙ্গে!

২০১৭ ও ২০১৮ সালে ১০ কোটি টেস্ট কিট উৎপাদন করা হয় এবং তা সংরক্ষণ করেন বিল গেটস! করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়া বা ডক্টর তমালের ভাষায় ছড়িয়ে দেয়ার তিন বছর আগেই Covid-19-এর রূপরেখা তৈরি হয়ে গিয়েছিল! শুধু তাই নয়, কোন দেশে কত রপ্তানি করা হবে তার ভাগবাটোয়ারাও তৈরি হয়েছিল, সে তথ্য বিল গেটস এবং তার সংগঠন WITS (world integrated trade solution) থেকে পাওয়া গেছে!

২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এই তথ্য সোশ্যাল-মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যেতেই পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর ‘কোভিড-১৯ টেস্ট কিট’-এর নাম বদলে ‘মেডিক্যাল টেস্ট কিট’ করা হয় এবং তা বুলেটিন আকারে প্রকাশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে ডক্টর তমাল রায়চৌধুরী উল্লেখ করেছেন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের একটি ঘটনা। যখন করোনার নামগন্ধও ছিল না। এই ঘটনার দুই বছর আগেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও চীনে কোটি কোটি ‘কোভিড নাইনটিন টেস্ট কিট’ সরবরাহ করে! ভয়ংকর হলেও সত্য বিশ্বব্যাংক বলেছে : “covid-19 এমন এক পরিকল্পনা যার ব্যাপ্তি ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত এবং তখন থেকেই শুরু হয়ে যাবে পুরোপুরি ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এবং অটোমেশন যুগের সেটাই শুরু।

২০১৭ সালে বিল গেটসের পক্ষ থেকে অ্যান্থনি ফৌসি এক বিজ্ঞান আলোচনা অনুষ্ঠানে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অদ্ভুত ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৯ সালে এক বিস্ময়কর জৈব মহামারির সম্মুখিন হবেন যার উত্তর আমরা তৈরি করে রেখেছি।”

কীভাবে তিনি দুই বছর আগেই এমন নিশ্চিত করে বলতে পারলেন করোনা তথা জৈব মহামারির কথা! ২০১৮ সালে বিল গেটস বলেছিলেন: “অ্যা গ্লোবাল প্যানডেমিক ইজ অন ইটস ওয়ে, দ্যাট থার্টি মিলিয়ন পিপল... ইট উইল কনটিনিউ টিল নেক্সট ডিকেড।”

আরও বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে এর এক বছর পর ২০১৯ সালের অক্টোবরে বিশ্বের এক নম্বর ভ্যাকসিন ডিলার বিল গেটস নিউইয়র্কে দুই দিনের এক বিজনেস মিটিং ডাকলেন। তার দ্বিতীয় দিনের দিনের এজেন্ডা ছিল ‘করোনা ভাইরাস প্যানডেমিক এক্সারসাইজ’! এই বিজনেস মিটিংয়ের শিরোনাম ছিল Event 2013. মার্কেটিয়ারদের উদ্দেশে তিনি বললেন : “উই নিউ টু প্রিপেয়ার ফর দ্যাট ইভেন্ট।”

কী ভয়ংকর উক্তি! করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া বিষয়টাকে একটা ইভেন্ট বললেন তিনি! পৃথিবীর সেরা জৈব-বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় উহানে তখন জৈব মারণাস্ত্র তৈরি প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। বিল গেটস অনুমতি দিলেই কেবল ছড়িয়ে দেয়া।

ডক্টর তমাল রায়চৌধুরী লিখেছেন: ভ্যাকসিন মানেই বাজার। একচেটিয়া বাজার। ৬শ কোটি টাকার মালিক বিল গেটসের এর পরের অবদান ডিজিটাল ভ্যাকসিন আইডি, যা হবে আপনার-আমার পরিচয়পত্র! এই আইডি যন্ত্র একটা এক্স-রে মেশিনের মতো, শরীরের স্পর্শমাত্র সে বলে দেবে আপনি ভ্যাকসিনেটেড কি-না। এই টেকনোলজির নাম W02020-0606061.

যন্ত্র তৈরি। এখন শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। বাইরে যেখানেই ঢুকবেন এই যন্ত্রের পরীক্ষার ভেতর দিয়ে ঢুকতে হবে, এই মারণ খেলার ফাঁদে পড়ে ভ্যাকসিন নিতেই হবে।

এই নির্মম বাস্তবতার বিশ্লেষণ আর নানা জিজ্ঞাসা এখন ভাসছে বাতাসে। এই চরম বৈষম্য আর অসমতার পৃথিবীতে আমরা ভেবেও এর কোনো কূলকিনারা করতে পারব না। আমাদের প্রয়োজন এখন শুধু আত্মরক্ষার পথ উদ্ভাবন আর সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজে বাঁচা এবং সমাজকে বাঁচানো।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
কল্যাণের বাণী নিয়ে মোংলায় বড়দিন উদযাপন
করোনায় চলে গেলেন সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন
‘আমরা যেন দ্বীন দরিদ্রকে আপন করে নিই’
‘পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসুক’
শান্তি প্রার্থনায় বড়দিন উদযাপন শুরু

শেয়ার করুন

সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়ে ওঠার কথা

সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়ে ওঠার কথা

সুন্দরবন এখন জলদস্যুদের কাছ থেকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত। এটি কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সফল কার্যক্রম এবং জলদস্যুদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রণোদনার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও ব্যবসা নিয়ে প্রথমবারের মতো করা পিএইচডি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঘ চোরাকারবারীরা এখনও সুন্দরবনে রয়ে গেছে।

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য যার বেশিরভাগ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ এই বিশ্ব ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে, তাদের বেশিরভাগই জেলে, মধু এবং কাঠ সংগ্রাহক। উপকূলীয় জনগণকে তাদের জীবিকার জন্য ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। তার পাশাপাশি জলদস্যুদের ভয় তাদেরকে সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখত।

২০১৬ সালে ১২টির মতো জলদস্যু বাহিনী তৎপর ছিল যারা সুন্দরবনকে নিয়ন্ত্রণ করত। এই অঞ্চলে সক্রিয় জলদস্যু চক্রের কারণে আশেপাশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা সব সময় আতঙ্কে থাকত। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন। ওই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সামনে জুম ভিডিওর মাধ্যমে ৩ হাজার ৩২১টি অস্ত্র ও অস্ত্রভাণ্ডারসহ ৬টি গ্রুপের অন্তত ৫৮ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের আগে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং কীভাবে সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়— এর প্রেক্ষাপট ও উত্তর খোঁজা আবশ্যক।

সুন্দরবনে জলদস্যুরা সুন্দরবনের রাজা হিসাবে বিবেচিত হতো। জলদস্যুতা, ডাকাতি এবং চোরাশিকারি বেড়ে বাংলাদেশের ফুসফুসের জন্য ক্যানসারে রূপান্তরিত হয়। স্থানীয়, জেলে এবং ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ ছিল বর্ণনাতীত। জলদস্যু ও ডাকাতদের অপরাধমূলক কার্যকলাপে উপকূলীয় মানুষ, বিশেষ করে জেলে, কাঠ ও মধু সংগ্রহকারীদের প্রাত্যহিক জীবন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতো।

জলদস্যুদের মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত হয়েছে অনেক জেলে, মৌয়াল এবং কাঠুরিয়া; অনেক নিরীহকে হারাতে হয়েছে প্রাণ। অপহরণ এড়াতে এলাকার জেলেদের জলদস্যুদের থেকে ‘জেল থেকে মুক্ত হও’ কার্ড নিতে হতো। স্থানীয়রা অভিযোগ ছিল, জলদস্যুদের কাছে মুক্তিপণের একটি নির্দিষ্ট হার ছিল— একজন মানুষের জন্য ২০ হাজার থেকে ১ লাখ এবং একটি ট্রলারের জন্য ৫ হাজার থেকে ১০হাজার টাকা। অপরাধীরা অপহরণ এবং লুটপাটের মাধ্যমে ২শ কোটিরও বেশি ‘বার্ষিক ব্যবসা’ তৈরি করেছিল। এছাড়াও, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটন খাত মূলত জলদস্যুদের কারণেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ক্রমাগত অভিযান এবং তদারকির মাধ্যমে সরকার সুন্দরবনে জলদস্যুদের দমন করতে সক্ষম হয়েছে। নদীর দানবদের প্রতি কঠোরতা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার গ্যারান্টি জলদস্যুতা নিবৃত করতে সক্ষম হয়।

সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিজিবি এবং বন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে ২০১২ সালে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ৩০ মে মাস্টার বাহিনী নামে কুখ্যাত জলদস্যু দলটি প্রথম আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু বড় ভাই বাহিনী, আইয়ুব বাহিনী, রেজা বাহিনী, শাহিনুর বাহিনী এবং অন্যান্য দল সুন্দরবনে লুকিয়ে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল।

সময়ে সময়ে তাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। এই এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জলদস্যুদের সঙ্গে লড়াইয়ে র‌্যাবের কমপক্ষে ২৮ সদস্য নিহত হয়েছে। তবে তারা ২শ ৪৬টি সফল অভিযান চালিয়েছে এবং ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন চক্রের ৫শ ৮৬ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এমনকি জলদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের ওপর ভিত্তি করে ‘অপারেশন সুন্দরবন’ নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

শুধু দমনের প্রচেষ্টায় অভিযান চালিয়ে জলদস্যুদের ম্যানগ্রোভ বন থেকে নির্মূল করা ছিল অসম্ভব। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের পুনর্বাসন এবং তাদের পরিবারকে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য ‘সুন্দরবনের হাসি’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করা হয় যা মূলত জলদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ৩১ মে, ২০১৬ থেকে ০১ নভেম্বর, ২০১৮ পর্যন্ত ৪শ ৬২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে সুন্দরবনের ৩২টি ডাকাত দলের ৩শ ২৮ সদস্য। প্রত্যেক জলদস্যু তাদের নতুন জীবন শুরু করার জন্য ১ লাখ করে টাকা পায়। এছাড়াও, সেলাই, কম্পিউটার, ড্রাইভিং, বুটিকসহ নানা বিষয়ে তাদের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

উল্লেখ্য, সুন্দরবন পুনর্বাসন প্রকল্প এতটাই সফল হয়েছে যে, এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার ৪৩ ডাকাত ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আত্মসমর্পণ করে।

সুন্দরবন এখন জলদস্যুদের কাছ থেকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত। এটি কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সফল কার্যক্রম এবং জলদস্যুদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রণোদনার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও ব্যবসা নিয়ে প্রথমবারের মতো করা পিএইচডি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঘ চোরাকারবারীরা এখনও সুন্দরবনে রয়ে গেছে। ২০১৪ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪শ ৪০ যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১শ ১৪ তে নেমে এসেছে যেটি সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বাঘ শিকারের সিন্ডিকেট ভাঙতে আরও কঠোর এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক।

সুন্দরবনে জলদস্যুতা এখন একটি স্মরণীয় অতীত, যা আমরা আর দেখতে চাই না। আশা করা হচ্ছে যে, সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্প আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে সহায়তা করবে। এছাড়া সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত রাখতে প্রকল্পের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই।

লেখক: গবেষক, প্রবন্ধকার ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কল্যাণের বাণী নিয়ে মোংলায় বড়দিন উদযাপন
করোনায় চলে গেলেন সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন
‘আমরা যেন দ্বীন দরিদ্রকে আপন করে নিই’
‘পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসুক’
শান্তি প্রার্থনায় বড়দিন উদযাপন শুরু

শেয়ার করুন

মানবাধিকার ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী

মানবাধিকার ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী

বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিবন্ধী মানুষ। শুধু সমাজ বা রাষ্ট্র থেকেই নয়, এমনকি পরিবার থেকেও প্রায়শই বঞ্চনা আর নেতিবাচক আচরণের শিকার হন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিবন্ধীদের রয়েছে নানা বঞ্চনা আর বৈষম্যের অভিজ্ঞতা। বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নিজের অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধীরা নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সমতা বলতে বোঝায় মৌলিকভাবে ‘আমরা সবাই এক’, আমাদের নানা ধরনের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের সবার জীবনের মূল্য একই। শুধু মানব সন্তান হিসেবে জন্ম নেয়ার কারণেই মানবাধিকারের সব মানুষের রয়েছে সমান দাবি এবং অধিকার। মানব বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা মানুষের এ অধিকারকে স্বতন্ত্র করে তোলে কিন্তু তা কখনই ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না। সমতার মূলনীতিসমূহ চর্চা করতে গেলে বা করার সময় ব্যক্তিসহ গোটা সমাজকে প্রতিবন্ধিতাসহ সব ধরনের মানববৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।

সমতার মূলনীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি পন্থা অবলম্বন করা হয়। প্রথমেই যেটি নিয়ে আলোচনা করা হবে সেটিকে বলা হয় ‘আনুষ্ঠানিক সমতা’ এবং এটি সাধারণত ঘটে থাকে যখন কোনো আইন বা নীতিমালায় আহ্বান করা হয় যে, নানা স্তরের জনগণকে সমতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার জন্য বা কাউকে যেন বৈষম্য না করা। কিন্তু শুধু এর দ্বারা প্রতিবন্ধী বা যেকোনো জনগোষ্ঠীর জন্য সত্যিকারের সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এটি যথেষ্টও নয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি ও সমাজ দ্বারা সৃষ্ট কৃত্রিম বাধাসমূহের সম্মুখীন হয়, সেগুলো বিবেচনা ও মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দরকার হতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে সম-সুযোগ দিতে হলে, কাঠামোগত-তথ্যগত, যোগাযোগের ক্ষেত্রে এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত যেসব বাধার সম্মুখীন হয়, সেগুলো নির্মূল করতে হবে। সমতা প্রতিষ্ঠায় আরেকটি যে পন্থা অবলম্বন করা হয়, সেটিকে প্রায় ক্ষেত্রেই বলা হয় ‘সুযোগের সমতা’। এ পন্থা স্বীকৃতি দেয় যে, মানুষ তার নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে কিছু বিষয় ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়।

বর্ণ, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা এবং সামাজিক অবস্থান। শুধু এ বিষয়গুলো অথবা এর সঙ্গে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিগত এবং অন্যান্য বাধা যোগ হয়ে নিজেদের মতো করে জীবন যাপন করা এবং সমাজে অবদান রাখা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে হলে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন হয়, যা কিনা ‘আনুষ্ঠানিক সমতা’-র বাইরে, এবং তা বিশেষভাবে প্রতিবন্ধী মানুষদেরও একই সুযোগপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে। সেগুলো হতে পারে- পরিবহন ব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে এমন চর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং প্রতিবন্ধিতার ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তৃতীয় যে পন্থা অবলম্বন হিসেবে যেটি উল্লেখ করা হয়, সেটি হলো- ‘প্রকৃত বা কার্যত সমতা’।

এ পন্থার মূল বক্তব্য হলো- ‘শুধু সুযোগের সমতা নয় ফলাফল বা পরিণতির সমতাও নিশ্চিত করা’। মানুষের সমতা নিশ্চিত করার জন্য ‘সব মানুষ সমান’ শুধু এ বাক্যটি যথেষ্ট নয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, প্রকৃত বা কার্যত সমতা মনে করে, ব্যক্তি সমাজে কতটুকু অবদান রাখতে পারল বা তার রাখার সামর্থ্য কতখানি রয়েছে তা নির্বিচারে সবারই রয়েছে মানবাধিকারসমূহে সমান ও সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করার অধিকার। যদিও ‘সুযোগের সমতা’ পন্থার সঠিক প্রয়োগই যথেষ্ট, বেশিরভাগ প্রতিবন্ধী মানুষ যাতে তাদের মতো করে মানবাধিকার উপভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য, কিন্তু ‘প্রকৃত সমতা’ পন্থার ওপর বাড়তি অঙ্গীকার প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

বলা যেতে পারে যে, কাজ বা চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যাতে বৈষম্যের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করলেই প্রতিবন্ধীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে না, যদি না একই সঙ্গে কাজ বা চাকরি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এ কারণে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রকৃত সমতা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে প্রতিবন্ধীর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা চাকরির বাজারে অন্য সবার মতো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

বৈষম্যকরণ-এর মূল অর্থই হলো ‘ভেদাভেদ করা, অবজ্ঞা করা, অবহেলা করা, নিম্নশ্রেণির ভাবা, অবমাননাকর আচরণ করা’ এবং এর ভাব বা লয় সম্পূর্ণ নেতিবাচক। আচরণ বর্ণনার ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহারকালে সেটি আরও নেতিবাচক রূপ নেয়। যখন কোথাও উল্লেখ করা হয় কাউকে ‘বৈষম্য’ করা হয়েছে, তখন এর অর্থই হলো- ব্যক্তিটির সঙ্গে শুধু ভিন্ন আচরণই না অন্যায্য আচরণও করা হয়েছে।

এ ধরনের অন্যায্য আচরণ করা হতে পারে সুস্পষ্টভাবে, যেমন- এমন একটি আইন পাস হলো, যেটি খুব উন্মুক্তভাবে প্রতিবন্ধী মানুষকে বৈষম্য করে অথবা এটি হতে পারে খুবই অস্পষ্টভাবে। যেমন- আইনটি হয়তো নিরপেক্ষ, কিন্তু এর প্রয়োগ হয় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিকূলে। এ ধরনের অস্পষ্ট বৈষম্য ক্ষতিকর হতে পারে কারণ, জনগণ মনে করতে পারে যে, সুস্পষ্ট বৈষম্য না থাকার অর্থই হলো সেটি ন্যায্য, এর প্রভাব ক্ষতিকর হলেও।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এর দ্বারা যে ক্ষতি হতে পারে তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে বিষয়গুলোকে আখ্যায়িত করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনগুলোতে নির্দিষ্ট কোনো কিছু, প্রতিবন্ধিতা, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, জাতিসত্তা ইত্যাদি অথবা অন্য যেকোনো কিছুর ভিত্তিতে কাউকে বৈষম্য করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ কারণেই বৈষম্যহীনতার মূলনীতি হলো- কোনো ধরনের বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত না হওয়ার অঙ্গিকার এবং অস্পষ্ট ও পরোক্ষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। রাষ্ট্রকেও নিশ্চিত করতে হবে সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে থাকবে তার অবস্থান, সেটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের বৈষম্য হলেও।

বৈষম্যহীনতার সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর দিক হচ্ছে যে, রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করে, কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজনও হয়। এর কারণ হলো- বৈষম্যহীনতা ও সমতার মূল নীতিসমূহ একে অপরের সঙ্গে ক্রিয়াশীল। প্রতিবন্ধীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি যে বৈষম্য করা হয়েছে, যা তাদেরকে অন্য সবার মতো সম্পূর্ণ সমতা উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হতে বাধ্য করেছে।

এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে রাষ্ট্র কিছু পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা বিশ্বের নানা দেশে ও প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়। নানা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী কর্মীদের অবদানকে মূল্যায়ন ও আরও বেশি প্রতিবন্ধীকর্মী নিয়োগ দেয়ার জন্য উৎসাহিত করতে প্রচেষ্টা নিলে হয়তো নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কিছু বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ‘স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন সেবা প্রাপ্তির অধিকার’কে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির এ অধিকার লঙ্ঘিত হলে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকেও সে বঞ্চিত হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অধিকার বিষয়ে বলা হয়েছে। সর্বজনীন মানবাধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিপূরক ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে আলাদাভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারসনদ প্রণীত হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিবন্ধী মানুষ। শুধু সমাজ বা রাষ্ট্র থেকেই নয়, এমনকি পরিবার থেকেও প্রায়শই বঞ্চনা আর নেতিবাচক আচরণের শিকার হন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিবন্ধীদের রয়েছে নানা বঞ্চনা আর বৈষম্যের অভিজ্ঞতা। বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নিজের অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধীরা নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। দুনিয়াব্যাপী প্রতিবন্ধিতা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন জাতিসংঘ প্রতিবন্ধীর অধিকার সনদ বা সিআরপিডি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে মানব বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের চিরন্তন মর্যাদার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এখানে প্রতিবন্ধীদেরকে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে সমাজকে সবার জন্য উপযোগী করার মাধ্যমে সব সামাজিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। দুনিয়াব্যাপী প্রতিবন্ধিতা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন এই সনদের এক গর্বিত ও অগ্রণী অংশীদার বাংলাদেশ। বর্তমান সরকার অত্যন্ত প্রতিবন্ধীবান্ধব এবং প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। প্রতিবন্ধীরা সমাজের সব ক্ষেত্রে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারছে। তবু সমাজের সবাইকে প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে আরও কাজ করতে হবে এবং তাদের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

আরও পড়ুন:
কল্যাণের বাণী নিয়ে মোংলায় বড়দিন উদযাপন
করোনায় চলে গেলেন সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন
‘আমরা যেন দ্বীন দরিদ্রকে আপন করে নিই’
‘পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসুক’
শান্তি প্রার্থনায় বড়দিন উদযাপন শুরু

শেয়ার করুন