৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র

player
৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র

বঙ্গবন্ধুর সরকারই অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণ শুরু করেছিল। তবে তার দুঃখজনক মৃত্যুর পর দেশে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পায়। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, পেশাজীবী প্রমুখের মধ্যপ্রাচ্যসহ বহির্বিশ্বে চাকরির সুযোগ অবারিত হয়। জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দেশ সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা থেকে বেরিয়ে পুঁজিবাদী অবাধ অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়।

উনিশ শ সত্তরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের স্বৈরাচারী সামরিক সরকার আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে। বাঙালির আন্দোলন, মিছিল ও প্রতিরোধ সংগ্রামে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে সারা পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল থাকে।

৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রায় দশ লাখ লোকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধু পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে বর্বর সেনাবাহিনী পৃথিবীর ইতিহাসে নৃশংসতম গণহত্যা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে।

সেনাবাহিনী ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে হানা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করার আগে ১২টা ৩০ মিনিটে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হলেও তার সহযোগী আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যথা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ বাংলাদেশের ছাত্র, যুবক ও আপামর জনতাকে সঙ্গে নিয়ে দেশের মুক্তি-সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল।

অবশেষে ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সংগ্রামের পর ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হয়। মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে সাড়ে ৯ মাস বন্দি জীবন কাটিয়ে বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২-এ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে আগমন করেন। ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে দেখা যাক এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ কত দূর এগিয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন, তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি বলতে কিছুই ছিল না। রাস্তাঘাট, রেললাইন, সেতু, কালভার্ট, বন্দর প্রভৃতি বিধ্বস্ত। ব্যাংকগুলো টাকাশূন্য।

তদুপরি দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাবারের ব্যবস্থা, প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন, পশ্চিম পাকিস্তানে আটকেপড়া বাংলাদেশি সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন, দেশের সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন পুনর্গঠন, অফিস-আদালত স্থাপন ও সচল করা এবং তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ফেরত পাঠানো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংক পুনর্গঠন, ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করা ইত্যাদি কাজ করতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে।

এ ছাড়া জাতীয় সংসদ সচল করা এবং গণপরিষদ প্রতিষ্ঠা করে সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব অর্পণ, দেশ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, ১০ মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান প্রণয়ন প্রভৃতি গুরুদায়িত্ব পালন করে বঙ্গবন্ধুর সরকার। নানা ধরনের অর্থনৈতিক সংকট, অনিয়ম-দুর্নীতি মোকাবিলা করে দেশকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের রূপরেখাও তিনি প্রণয়ন করেছিলেন।

এ রূপরেখার প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৭৩ সালে প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। এ পরিকল্পনায় তিনি কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি জোর দেন। কৃষির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ শিল্প উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়া হয়। কিছু অসৎ ব্যক্তি ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে ১৯৭৪ সালে দেশের কোনো কোনো স্থানে সাময়িক দুর্ভিক্ষ দেখা দিলেও অল্প সময়ের মধ্যে এটি মোকাবিলা করে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করতে পেরেছিলেন। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে জিডিপির আকার ছিল ৮ বিলিয়ন ডলার। স্বাধীনতা অর্জনের সময়ে দেশের মাথাপিছু আয় যেখানে ছিল ৯৪ ডলারের মতো, সেখানে ১৯৭৫ সালে মাথাপিছু আয় প্রায় তিন গুণ বেড়ে ২৭৩ ডলারে দাঁড়ায়।

বঙ্গবন্ধুর সরকারই অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণ শুরু করেছিল। তবে তার দুঃখজনক মৃত্যুর পর দেশে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পায়। গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, পেশাজীবী প্রমুখের মধ্যপ্রাচ্যসহ বহির্বিশ্বে চাকরির সুযোগ অবারিত হয়।

জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দেশ সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা থেকে বেরিয়ে পুঁজিবাদী অবাধ অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়। কারও কারও মতে, ১৯৭১ সালের আগের পাকিস্তানি ভাবধারায় তিনি দেশ পরিচালনা শুরু করেন। আশির দশকে শহর ও গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নতি হতে থাকে। এলজিইডি সৃষ্টি হলে সড়ক বিভাগের পাশাপাশি এ বিভাগ গ্রামাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট নির্মাণেও ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ১৯৭৯ সালে বিদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু হয়। তৈরি পোশাকশিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারকল্পে আশির দশকের প্রথম দিকে সরকার দুটো নীতি প্রবর্তন করে।

একটি ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণ প্রদান এবং অন্যটি হলো রপ্তানির জন্য প্রস্তুতকৃত পোশাকের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস স্থাপন ও শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ ডিউটি ড্র ব্যাক। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিপ্লব ঘটে। ক্রমান্বয়ে রপ্তানিতে তৈরি পোশাকশিল্পের অবদান ৮৫ শতাংশে পৌঁছে। পোশাকশিল্পে নারীদের কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ শ্রমিকদের বিদেশে কর্মসংস্থানের ফলে গ্রামে অর্থপ্রবাহ ও ভোগ-চাহিদা বৃদ্ধি পায়।

কৃষিতে সার ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এবং বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে শস্য উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। উচ্চফলনশীল শস্যের আবাদ হওয়ার কারণে বর্তমানে খাদ্য উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। ১৯৭২ সালে দেশে ধান উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন, ২০২০ সালে তা বেড়ে ৩ কোটি ৮২ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। ধান, গম ও ভুট্টা মিলিয়ে ২০২০ সালে খাদ্য উৎপাদন ছিল ৪ কোটি ৫৩ লাখ টন।

ধান উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, তরিতরকারি উৎপাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ এবং আম উৎপাদনে বাংলাদেশ অষ্টম স্থানে রয়েছে। তৈরি পোশাক উৎপাদনে চীন ও ভিয়েতনামের পরই বাংলাদেশের স্থান।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতাসীন হয়। পরবর্তীকালে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পরপর আরও দুবার নির্বাচনে জয়লাভ করে চতুর্থ মেয়াদে (টানা তৃতীয় মেয়াদে) শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার শাসনামলে বিগত ১৩ বছরেই অর্থনীতি ও সামাজিক সূচকের নানা ক্ষেত্রে আগের তুলনায় প্রভূত উন্নতি হয়েছে।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনা ‘দিনবদলের রূপকল্প-২০২১’ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যে রূপকল্পে উল্লেখ ছিল বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার অঙ্গীকার। ২০১৮ সালেই বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত’ দেশের ক্যাটাগরি থেকে ‘উন্নয়নশীল’ দেশের ক্যাটাগরিতে উন্নীত হয়েছে।

২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিগত ১৩ বছরের গড় অর্জন, এর আগের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হয়েছে। ২০০১-২০০৬ সালে যেখানে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, সেখানে ২০০৯-২০২১ সালে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ২৫ শতাংশে উন্নীত হয়। মাথাপিছু আয় ২০২১ সালে এসে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৫৪ ডলার। ১৯৭৫ থেকে এ পর্যন্ত মাথাপিছু আয়ের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তার ৭৩ শতাংশই ঘটেছে গত ১২ বছরে। আইএমএফের হিসাবমতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে।

অবশ্য ২০১৫ সালেই আমাদের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯৭২-৭৩ সালে যেখানে জিডিপির আকার ছিল ৮ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২১ সালে মোট জিডিপি ৪০৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মোট জনসংখ্যার ৮২ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল, ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার কমে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। চরম দারিদ্র্যের হার ২০০৫ সালের ২৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০১৯ সালে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছে।

সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে দেশের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগের ফলে তৈরি পোশাক, খাদ্য-পানীয়-তামাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, ভোজ্যতেল, রাবার ও প্লাস্টিক পণ্য, ইলেকট্রনিকস, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং দ্রব্যাদি, বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল প্রভৃতির উৎপাদন বেড়েছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো ও রপ্তানি উভয়ই সম্ভব হচ্ছে।

দেশে ২০১৯ সালে জিডিপিতে শিল্পের অবদান প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের প্রসারের ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। শুধু শিল্পে নয়, পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটন প্রভৃতি সেবা খাত এবং অবকাঠামো উন্নয়ন, হাউজিং, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, আইসিটি প্রভৃতি খাতের ব্যাপক বিস্তৃতি ও কর্মসংস্থান লক্ষ্য করা যায়।

সরকারি খাতে বর্ধিত বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকার বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করে। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশে বৈদেশিক সহায়তা ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নে কোনো সমস্যাই হয় না। এ ছাড়া বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগেও আশাব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া যায়। ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলার। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করা হবে।

তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরুর আগে বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে ছিল মূলত পাট, পাটজাত দ্রব্য, চা ও চামড়া। গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু হলে ক্রমান্বয়ে রপ্তানিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি হতে থাকে। ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ৭৫ দশমিক ২ কোটি ডলার।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৪২ বিলিয়ন (৪,২০০ কোটি) ডলার। করোনাকালীন ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩৩ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল, তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৪৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। প্রায় দুই দশক ধরে রপ্তানি আয়ের ৮০-৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।

করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও পাট ও পাটজাত দ্রব্য এবং ওষুধ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। উৎপাদনের পরিবেশ ও পণ্যের মান এবং ছাড়পত্র নিশ্চিত হলে চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ ও কৃষিভিত্তিকি খাদ্যপণ্য (মাছ, সবজি ও ফলমূল) রপ্তানিতেও বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতাগ্রহণের পরই বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বেসরকারি উৎপাদকদের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে সরাসরি বিদ্যুৎ ক্রয়ের সুবিধার্থে সরকার বিশেষ আইন প্রণয়ন করে, যাতে ভবিষ্যতে সরকারের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। উদ্যোক্তাদের উৎপাদনের শুরু থেকে ১৫ বছরের কর মওকুফ করা হয়। এ ছাড়া কারখানা, প্ল্যান্ট স্থাপন ও যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ইত্যাদি আমদানিতে শুল্ক মওকুফ করা হয়।

সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হয়। সরকারি-বেসরকারি উৎপাদনের সমন্বয়ে দেশ এখন বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। ২০০৪-০৫ সালে যেখানে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট, যেখানে ২০২০ সালে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার মেগাওয়াট।

বর্তমানে দেশে ৯৯ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎসুবিধা ভোগ করে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য রামপাল, পায়রা, বাঁশখালী, মহেশখালী ও মাতারবাড়ীতে আরও ৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। রাশিয়া থেকে কমবেশি ১২ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তায় রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে। এতে দুটি ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে অন্তত একটি ইউনিট থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন সম্ভব হবে।

বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন। রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট, উড়াল সেতু, রেলপথ, স্কুল-কলেজ, গ্রোথ সেন্টার, হাট-বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন কমপ্লেক্স, সাইক্লোন শেল্টার প্রভৃতি নির্মাণ করে শহর ও গ্রামীণ জনগণের নাগরিক সুবিধা উন্নত করে জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য আনা হয়েছে।

পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের কাজ শুরু করার পর আরও ১০-১২টি মেগা প্রকল্প দেশি-বিদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে। এদের মধ্যে কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল, ঢাকায় দুটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রামপাল ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প,পায়রা সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রামের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

২০২২-২৩ সাল নাগাদ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প সমাপ্ত হবে। শুধু পদ্মা সেতু চালু হলেই দেশের মোট জিডিপিতে ১ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। সুতরাং আরও কয়েকটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পর দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে।

‘রূপকল্প ২০২১’-এর একটি অঙ্গীকার ছিল ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে আইসিটি জ্ঞানসম্পন্ন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার। বর্তমান সরকারের বিগত ১৩ বছরের প্রচেষ্টা ও কর্মপরিকল্পনায় দেশে তথ্য ও যোগযোগ প্রযুক্তির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, রেলওয়ে, বিমান প্রভৃতি স্থানে কম্পিউটারাইজড অনলাইন সেবা চালু হয়েছে।

আইসিটি রপ্তানি ২০১৮ সালেই ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ৩৯টি হাইটেক পার্কের মধ্যে ইতিমধ্যে নির্মিত ৯টিতে ১৬৬টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেছে। করোনা মহামারির সময়ও অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে মুঠোফোনের সংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটি।

বঙ্গবন্ধু-১ সাটেলাইট উৎক্ষেপণ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর ফলে দেশব্যাপী ইন্টারনেট সেবা প্রদান ও টেলিভিশন চ্যালেনগুলোর সম্প্রচার সহজ হয়েছে।

ডিজিটালাইজেশনের পাশাপাশি তৃণমূল জনগণের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নীরব বিপ্লবও গত এক যুগের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে মাইক্রোক্রেডিট, সাধারণ ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং গ্রামাঞ্চলেও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করেছে এবং জনগণের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলাকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এ কঠিন সত্যটি মাথায় রেখে সরকার ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২০২১’ নামে একটি শতবর্ষের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। ক্লাইমেট ভালনারেবল গ্রুপের সভাপতি হিসেবে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ফোরামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নানাবিধ পরামর্শ ও উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে।

সমুদ্র বিজয়ের মাধ্যমে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৮ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যার ফলে সমৃদ্ধ ব্লু ইকোনমির সুফলপ্রাপ্তির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে ৬৮ বছরের অমীমাংসিত স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১১১টি ছিটমহলের ১৭ হাজার ৮৫১ একর জায়গা বাংলাদেশের সীমানায় যুক্ত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু অনুসৃত ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’- বৈদেশিক নীতি অনুসরণে সরকার সব বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো উন্নত শক্তিশালী রাষ্ট্র বা অর্থনৈতিক জোটের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখা ও ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার নীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ও বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাদের শান্তিপূর্ণভাবে নিজদেশে প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোর সঙ্গে সর্বতোভাবে যোগাযোগ রেখে কাজ করে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে অনেক দূর এগিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সব রকমের চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ সন্তোষজনক। সরকারের সচিব, করপোরেট গ্রুপের চেয়ারম্যান বা পরিচালক পদে নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। স্কুল-কলেজে উপবৃত্তি প্রদান করার ফলে নারী শিক্ষার যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ শতাংশ শিক্ষক নারীদের মধ্য থেকে নেয়ার বিধান করা হয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্পে ৬০ শতাংশ শ্রমিক নারী হওয়ায় গ্রামীণ নারীদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত হয়েছে। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বর্তমানে ৩৬ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, মন্ত্রী এমপি পদে এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়ও নারীদের নির্বাচনের ফলে রাজনীতির ক্ষেত্রেও নারীদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে। এসব কারণে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে এক অনন্য স্থানে রয়েছে। জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সে ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম এবং নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সপ্তম।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার একটি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে নানা সামাজিক সূচকে যেমন গড় আয়ু, শিক্ষার হার, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার কমানো, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির শতকরা হার, টীকাকরণ প্রভৃতিতে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে ভালো করেছে। বিগত ৫০ বছরে আরও কয়েকটি সূচকে বাংলাদেশের অর্জন তুলনা করা যেতে পারে।

যেমন ১৯৭২ সালে যেখানে গড় আয়ু ছিল ৪৬ দশমিক ৫ বছর, সেখানে বর্তমানে গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৮ বছর, ১৯৭২-৭৩ সালে যেখানে রাজস্ব আয় ছিল ১৬৬ কোটি টাকা, সেখানে ২০২০-২১ সালে রাজস্ব আয় হয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা; অর্থাৎ রাজস্ব বেড়েছে ১ হাজার ৫৬৬ গুণ। ১৯৭২-৭৩ সালে বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ অর্থসালে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটিতে; অর্থাৎ বাজেটের আকার বেড়েছে ৭৬৮ গুণ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী, আত্মপ্রত্যয়ী এবং সাহসী নেতৃত্বের ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিস্ময়, উন্নয়নের রোল মডেল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে শূন্য হাতে, ধ্বংসস্তূপ থেকে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে তারই কন্যা শেখ হাসিনার চেষ্টায় ও নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বানায়, স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে দেশকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত করে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখায়।

বাংলাদেশ এখন দ্রুত উন্নয়নশীল প্রথম পাঁচটি দেশের একটি। আর্থসামাজিক খাতে বাংলাদেশের বিস্ময়কর উত্থান ও অগ্রযাত্রা এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত। প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘দি ইকোনমিস্ট’-এর ২০২০ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান নবম।

ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ’ তাদের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবল-২০২১’-এ ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও সার্বিক অগ্রগতি এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের ২৫টি বড় অর্থনীতির একটি হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। উন্নয়ন গবেষকরা আজকের বাংলাদেশকে ‘উন্নয়নের রোল মডেল, ‘এমার্জিং টাইগার’, দক্ষিণ এশিয়ার ‘তেজি ষাঁড়’ প্রভৃতি অভিধায় ভূষিত করছেন।

স্বাধীনতা-উত্তর ৫০ বছরে বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও কিছু সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ আমাদের অগ্রগতিকে ব্যাহত করে কিংবা গতি দুর্বল করে দেয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমাজের উচ্চবিত্ত শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং সুবিধাভোগী উচ্চ মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর হাতে অধিকাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ফলে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি উন্নয়নের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়। আয়বৈষম্য কমানোর জন্য অধিক কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে নিয়মিত মজুরি বৃদ্ধির ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ এবং একশ্রেণির লোকের নীতিবিবর্জিত নষ্ট রাজনীতি আমাদের অগ্রগতিকে ব্যাহত করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’সহ ওপরে বর্ণিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও নাগরিকদের দেশপ্রেম নিয়ে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ গড়ার লক্ষ্যে আমরা সফল হব এবং রূপকল্প ২০৪১ অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত, সমৃ্দ্ধ দেশ হিসেবে পরিগণিত হবে।

লেখক: বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, জার্মানি। সাবেক সিনিয়র সচিব এবং সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

আরও পড়ুন:
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংকটে মানুষ: আবুল বারকাত
অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন শুরু শুক্রবার
সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রতিজ্ঞা  
ধ্বংসস্তূপ থেকে রোল মডেল
উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

শেয়ার করুন

মন্তব্য

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আন্দোলন যতক্ষণ পর্যন্ত স্লোগান, মিছিল, উত্তপ্ত বক্তৃতা এবং দেশাত্মবোধক গানের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে সেটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কিন্তু সেটি যদি শেষপর্যায়ে চলে যায়, যখন ছাত্রছাত্রীরা আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেটি খুবই বিপজ্জনক। তাদের প্রচণ্ড ক্রোধ এবং ক্ষোভ তখন একটা গভীর দুঃখবোধ এবং অভিমানে পাল্টে যায়। হঠাৎ করে তারা টের পায় তারা আসলে একা, তাদের পাশে কেউ নেই।

এখন রাত দুইটা বাজে। একটু আগে টেলিফোন বেজে উঠেছে। গভীর রাতে টেলিফোন বেজে উঠলে বুকটা ধক করে ওঠে, তাই টেলিফোনটা ধরেছি। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ফোন করেছে। পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানি সেখানে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করছে। মোটামুটি নিরীহ আন্দোলন একটা বিপজ্জনক আন্দোলনে মোড় নিয়েছে। ছাত্রটি ফোনে আমাকে জানাল অনশন করা কয়েকজন ছাত্রকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, একজনের অবস্থা খুবই খারাপ, ডাক্তার বলেছে কিছু না খেলে ‘কোমায়’ চলে যেতে পারে। ফোন রেখে দেয়ার আগে ভাঙা গলায় বলেছে, ‘স্যার কিছু একটা করেন’।

আমি তখন থেকে চুপচাপ বসে আছি, আমি কী করব? আমার কি কিছু করার আছে?

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি অনেকবার অনেক ধরনের আন্দোলন হতে দেখেছি, কাজেই আমি একটি আন্দোলনের ধাপগুলো জানি। প্রথম ধাপে যখন হলের মেয়েরা তাদের দাবি- দাওয়া নিয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে গিয়েছে সেটি সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। আমি খুব ভালো করে জানি একটুখানি আন্তরিকতা দিয়ে ছাত্র্রছাত্রীদের কঠিন দাবি-দাওয়াকে শান্ত করে দেয়া যায়। কেউ একজন তাদের ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামায়, তারা শুধু এটুকু নিশ্চয়তা চায়।

সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন যদি একটুখানি জনপ্রিয়তা পায় তখন সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সেখানে ঢুকে পড়ে, সেটাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেটাকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করে। সাধারণ ছাত্র্রছাত্রীরা যদি সতর্ক না থাকে তখন নেতৃত্ব তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আন্দোলন যদি থেমে না যায় তখন সরকারি ছাত্রদের সংগঠন (এখানে ছাত্রলীগ) তাদের ওপর হামলা করে। প্রায় সবসময়ই সেটা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তাদের শলাপরামর্শে। তারপরও যদি আন্দোলন চলতে থাকে তখন কর্তৃপক্ষকে পুলিশ ডাকতে হয়, পুলিশ এসে পিটানোর দায়িত্ব নেয়।

এই আন্দোলনে আমি এর প্রত্যেকটি ধাপ ঘটতে দেখেছি। প্রচলিত প্রক্রিয়ার বাইরে যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে পুলিশের অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা। যতবড় পুলিশ বাহিনীই হোক তারা ছাত্রছাত্রীদের গায়ে হাত তোলার আগে একশবার চিন্তা করে। এখানে সেটা হয়নি, শটগান দিয়ে গুলি পর্যন্ত করা হয়েছে, বিষয়টি আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। পুলিশের চৌদ্দ পুরুষের সৌভাগ্য যে সেই গুলিতে কেউ মারা যায়নি। বোঝাই যাচ্ছে সিলেটের পুলিশ বাহিনীর তেজ এখনও কমেনি, তারা দুইশ থেকে তিনশ ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে রেখেছে। যখন প্রয়োজন হবে কোনো একজনের নাম ঢুকিয়ে তাকে শায়েস্তা করা যাবে!

হয়রানি কতপ্রকার ও কী কী শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম বয়সি ছাত্রছাত্রীরা সেটা এবারে টের পাবে। তবে একটি ব্যাপার আমি এখনও বুঝতে পারছি না। পুলিশের এই অবিশ্বাস্য আক্রমণটি ঘটার কারণ হচ্ছে ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়কে তালাবদ্ধ বিল্ডিং থেকে উদ্ধার করা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের জন্য একটা বিল্ডিংয়ে তালাবদ্ধ হয়ে আটকে পড়া এমন কোনো বড় ঘটনা নয়। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল কিংবা সিন্ডিকেট মিটিং চলার সময় দাবি আদায়ের জন্য বাইরে থেকে তালা মেরে বিশ্ববিদালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের আটকে রাখার ঘটনা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়েই একাধিকবার ঘটেছে। তারা তখন গল্প-গুজব করে সময় কাটিয়েছেন, সোফায় শুয়ে রাত কাটিয়েছেন, গোপনে কিছু খাবার আনিয়ে ভাগাভাগি করে খেয়ে হাসি তামাশা করেছেন কিন্তু পুলিশ ডাকিয়ে ছাত্রদের গায়ে হাত তুলে মুক্ত হওয়ার জন্য কখনও ব্যস্ত হননি।

এবার ভাইস চ্যান্সেলরকে উদ্ধার করার জন্যে ছাত্রছাত্র্রীর ওপর একটি অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা করা হলো, এর চাইতে বড় অমানবিক কাজ কী হতে পারে আমি জানি না। স্বাভাবিক নিয়মেই আন্দোলনটি এখন ভাইস চ্যান্সেলরের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে। তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটা এমন কিছু বিচিত্র দাবি নয়, আমরা প্রায়ই নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের পদত্যাগ দাবি শুনে আসছি।

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে ছাত্রছাত্রীদের ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এবারেও সেই চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়নি। এটিও নতুন একটি ঘটনা— তারা এখন কোথায় থাকে, কী খায় আমি জানি না।

আন্দোলন যতক্ষণ পর্যন্ত স্লোগান, মিছিল, উত্তপ্ত বক্তৃতা এবং দেশাত্মবোধক গানের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে সেটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কিন্তু সেটি যদি শেষপর্যায়ে চলে যায়, যখন ছাত্রছাত্রীরা আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেটি খুবই বিপজ্জনক। তাদের প্রচণ্ড ক্রোধ, এবং ক্ষোভ তখন একটা গভীর দুঃখবোধ এবং অভিমানে পাল্টে যায়।

হঠাৎ করে তারা টের পায় তারা আসলে একা, তাদের পাশে কেউ নেই। ‘আমরণ’ কথাটি থেকে ভয়ংকর কোনো কথা আমি জানি না, বড় মানুষেরা সেটাকে কৌশলী একটা শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেন, কিন্তু এই বয়সি ছাত্রছাত্র্রীরা তাদের তীব্র আবেগের কারণে শব্দটাকে আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর নামকরণ করা নিয়ে একবার বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল তখন আমাদের ছাত্রছাত্রীরা শহীদমিনারে অনশন করে বিশ্ববিদ্যালয়টি খোলার ব্যবস্থা করেছিল।

অভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের দুর্বল শরীরে যখন খিঁচুনি হতে থাকে সেই দৃশ্য সহ্য করার মতো নয়। (পরে তারা আমাকে তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছে, দিনরাত তারা বোধ-শক্তিহীনভাবে পড়ে আছে, অন্য কোনো অনুভূতি নেই, শুধু এক প্লেট খাবারের স্বপ্ন দেখছে! আমি তাদের সেই কষ্টের কথাগুলো কখনও ভুলতে পারি না।) যে কারণেই হোক, আমার এককালীন ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীরা আবার সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বিষয়টি চিন্তা করে আমি খুবই অশান্তি অনুভব করছি।

২.

প্রায় তিন বছর আগে অবসর নিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার আগের মুহূর্তে আমি বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলরকে তিন পৃষ্ঠার একটি লম্বা চিঠি লিখে এসেছিলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে তাকে সেই চিঠিতে বেশ কয়েকটি উপদেশ দিয়েছিলাম। তিনি যদি আমার উপদেশগুলো শুনে সেভাবে কাজ করতেন তাহলে আজকে বিশ্ববিদ্যালয়টি এরকম বিপজ্জনক একটা জায়গায় পৌঁছাতো না।

তিনি আমার উপদেশগুলো সহজভাবে নেবেন আমি সেটা আশা করি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি করা শিক্ষকদের পুরস্কার হিসেবে ভাইস চ্যান্সেলর করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। যদিও অনেক দিক দিয়েই শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অনেক আধুনিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপক তাদের উন্নাসিকতার কারণে সেটা মেনে নেন না। কাজেই প্রান্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের আমার মতো একজন শিক্ষকের উপদেশ ভালো লাগার কথা নয়।

কিছুদিন আগে আমার উপর জঙ্গি হামলার বিচারের শুনানিতে সাক্ষী দেয়ার জন্যে আমাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। আমি একদিনের জন্য সিলেটে গিয়েছিলাম এবং বহুদিন পরে ক্যাম্পাসে পা দিয়েছিলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা রীতিমতো অপরাধ তাই সবাই দূরে দূরে থাকলেও ছাত্রছাত্রীরা মন খুলে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। আমি বেশ দুঃখের সঙ্গে আবিষ্কার করেছি আমার পরিচিত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রটি পাল্টে যাচ্ছে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া বিশেষ হয় না (এখানে শুধু পরীক্ষা হয়)।

কাজেই ভালো ছাত্রছাত্রীরা চেষ্টাচরিত্র করে নিজেরা যেটুকু পারে শিখে নেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈচিত্র্যময় পরিবেশে অন্য সবার সঙ্গে সময় কাটিয়ে তাদের এক ধরনের মানসিক গঠন হয়, সেটার মূল্য কম নয়। সেজন্য আমি যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, সবসময় তাদের সব রকম সংগঠন করে নানা ধরনের কাজকর্মে উৎসাহ দিয়ে এসেছি। ছাত্রছাত্রীরা জানাল এখন তাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও বাধা নিষেধ। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় আমাদের ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসের রাস্তায় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে দীর্ঘ আলপনা এঁকেছিল। ছাত্রছাত্রীরা জানাল এখন তারা রাস্তায় আলপনাও আঁকতে পারে না। তাদের দুঃখের কাহিনি শোনা ছাড়া আমার কিছু করার ছিল না। আমি শুধু তাদের ভেতরকার চাপা ক্ষোভটি অনুভব করেছি।

সেই ক্ষোভটি এখন বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।

৩.

কিছুদিন আগে লন্ডনের একটি ওয়েবিনারে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেটি ছিল বাংলাদেশের শিক্ষা-সংক্রান্ত একটি ওয়েবিনার। আমি বক্তব্য দেয়ার পর সঞ্চালক উইকিপিডিয়া থেকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভয়ংকর দুরাবস্থার বর্ণনা পড়ে শোনালেন, তারপর এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ‘আমি এই ব্যাপারটি খুব ভালো করে জানি এবং চাইলে সেটি সম্পর্কে বলতেও পারব। কিন্তু নীতিগতভাবে আমি দেশের বাইরের কোনো অনুষ্ঠানে দেশ সম্পর্কে খারাপ কিছু বলি না।

কাজেই আমি এটা নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আপনি যদি সত্যিই জানতে চান ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করলে বলতে পারি।’ সঞ্চালক বললেন, ‘তাহলে অন্তত এর সমাধান কী হতে পারে সেটা বলেন।’ আমি বললাম, ‘সমাধান খুব কঠিন নয়। যেহেতেু বাংলাদেশে ভাইস চ্যান্সেলররা হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তা-বিধাতা তাই রাজনীতি করা শিক্ষকদের নিয়োগ না দিয়ে খাঁটি শিক্ষাবিদদের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দিলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেহারা পাল্টে যাবে।’

সেই ওয়েবিনারে আমাদের শিক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। তিনি তার বক্তব্য দেয়ার সময় বললেন, একজন ভাইস চ্যান্সেলরকে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অনেক কাজ করতে হয় তাই শুধু শিক্ষাবিদ সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন না— তার ভেতর নেতৃত্ব দেয়ার গুণ থাকতে হয়। সেজন্য নেতৃত্ব দিতে পারেন সেরকম ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দিতে হয়।

বলা যেতে পারে আমি তখন প্রথমবার বুঝতে পেরেছি আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন সবসময় দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়। এটি আকস্মিক ঘটনা নয়, সেটি একটি সুচিন্তিত কিন্তু বিপজ্জনক এবং ভুল সিদ্ধান্ত! একজন শিক্ষক যদি শিক্ষাবিদ হন তাহলে তার ভেতর নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলি থাকবে না সেটি মোটেও সত্যি নয়। তাছাড়া এই দেশে দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষক সবসময় আদর্শের জন্য রাজনীতি করেন সেটিও সত্যি নয়। যিনি এক সময় ‘জিয়া চেয়ার’ স্থাপনের প্রস্তাবক, সাদা দলের রাজনীতি করেছেন তিনি সময়ের প্রয়োজনে নীল দলের রাজনীতি করে অবলীলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হতে পারেন। সেরকম উদাহরণ কি আমাদের সামনে নেই?

৪.

কাজেই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকেরা যদি আদর্শবাদী হতেন ভাইস চ্যান্সেলরদের স্বেচ্ছাচারী কিংবা একগুঁয়ে না হতে দিতেন, ভুল কিংবা অন্যায় করলে প্রতিবাদ করতেন তাহলেও একটা আশা ছিল। কিন্তু সেগুলো হয় না। ভাইস চ্যান্সেলর যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তা-বিধাতা তাই তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘জি হুজুর’ করার একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্দয় আক্রমণ শুরু করেছিল তখন একজন শিক্ষকও ছুটে গিয়ে পুলিশকে থামানোর চেষ্টা করেননি! ছাত্রছাত্রী এখন শিক্ষকদের শত্রুপক্ষ। আমাদের শিক্ষকেরা সব ধোয়া তুলসীপাতা এবং ছাত্র্রছাত্র্রীরা বেয়াদব এবং অশোভন আমি সেটা বিশ্বাস করি না।

শিক্ষক হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্মানবোধ থাকতে হবে, তাদের জন্য ভালোবাসা থাকতে হবে। সেটি এখন নেই। ভর্তিপরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয় সেটি সবাই জানে—সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সেটি চোখের পলকে দূর করে দেয়া যায়। বহুকাল আগে একবার তার উদ্যোগ নিয়ে সেই সময়কার শিক্ষামন্ত্রী সব ভাইস চ্যান্সেলরকে ডেকেছিলেন। আমি সেখানে প্রস্তাবটি ব্যাখ্যা করেছিলাম এবং তখন আবিষ্কার করেছিলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষকদের ভেতরে রয়েছে সর্বগ্রাসী লোভ! সেটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করতেও তারা সংকোচ অনুভব করেন না! সেই সভায় তারা এককথায় ছাত্রছাত্রীদের জীবনকে সহজ করার সেই উদ্যোগটিকে বাতিল করে দিয়েছিলেন!

এই মুহূর্তে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি খুবই জটিল অবস্থা। আমি একমাস দেশের বাইরে ছিলাম বলে পত্রপত্রিকার খবরের বাইরে কিছু জানি না। খবরের বাইরেও খবর থাকে এবং আজকাল সামাজিক নেটওয়ার্কে বিষ উগড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে, আমি সেগুলোও জানি না। যখন একটি নিরীহ আন্দোলন একটি বিপজ্জনক আন্দোলনে পালটে যাচ্ছে আমি তখন প্লেনে বসে আছি, দেশে এসে প্রায় হঠাৎ করে জানতে পেরেছি আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই।

একদিকে ছাত্রছাত্রী অন্যদিকে ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে সকল শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের দাবি খুবই চাঁছাছোলা। এটাকে মোলায়েম করার কোনো উপায় নেই। যেহেতু নির্দয় পুলিশি হামলা করার লজ্জাটুকু কেটে গেছে তাই যদি দ্বিতীয়বার সেটাকে প্রয়োগ করে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন বন্ধ না করা যায় এটার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের কোনো উপায় নেই।

সরকারের নিয়োগ দেয়া ভাইস চ্যান্সেলরকে প্রত্যাহার করা সরকারের জন্য খুবই অপমানজনক একটা ব্যাপার তাই সরকার কখনই সেটা করবে না। ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের সঙ্গে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক আছেন, শুধু তাই নয় দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভাইস চ্যান্সেলররাও আছেন, কাজেই তার নিজ থেকে পদত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না।

মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অনির্দিষ্ট কাল হাড়কাঁপানো শীতে অনশন করে খোলা রাস্তায় শুয়ে থাকতে হবে, কেউ তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আাসবে না। যে ছাত্রজীবনটি তাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় হতে পারত সেই সময়টি তাদের জন্যে অপমান আর অবহেলার সময় হয়ে যাচ্ছে, সেই জন্য আমি তাদের কাছে ক্ষমা চাই।

ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয় আমার এ লেখাটি পড়বেন কি না জানি না। যদি পড়েন তাকে বলব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শেষদিনটিতে আমি তাকে যে চিঠিটি লিখে এসেছিলাম সেটি যেন আরও একবার পড়েন, সম্ভব হলে তার আশেপাশে থাকা শিক্ষকদেরও পড়তে দেন। এখন যা ঘটছে সেটি যে একদিন ঘটবে, আমি সেটি তিন বছর আগে তাকে জানিয়ে রেখেছিলাম। তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি।

লেখক: শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন:
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংকটে মানুষ: আবুল বারকাত
অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন শুরু শুক্রবার
সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রতিজ্ঞা  
ধ্বংসস্তূপ থেকে রোল মডেল
উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

শেয়ার করুন

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিত্যপণ্যের মূল্য কমানো জরুরি

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিত্যপণ্যের
মূল্য কমানো জরুরি

সরকার শহরাঞ্চলে টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে কিছু পণ্য বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে বিক্রি করছে। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল হতদরিদ্র কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ খুব বেশি পাবে বলে মনে হয় না। এখানেও ডিলার-প্রশাসন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা কারসাজি রয়েছে। সরকার কেন ভ্রাম্যমাণ ট্রাক-দোকান দিয়ে এমন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা বজায় রাখছে তা বোধগম্য নয়।

করোনার অভিঘাত বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ও সমাজ জীবনে যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে তা থেকে কোনো দেশই মুক্ত নেই। ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা অক্সফাম বিশ্ব দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করছে। সম্প্রতি তাদের প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে যে, করোনার ভয়াবহ প্রকোপে বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে, পক্ষান্তরে পৃথিবীর শীর্ষ ১০ ধনীর সম্পদ দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতি ২৬ ঘণ্টায় একজন করে বিলিয়নার তৈরি হচ্ছে। ১৬০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

সমাজে লিঙ্গ বৈষম্য বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশেও মুক্ত নয়। বিপুল জনগোষ্ঠীর আয়-উপার্জন যেমন কমে গেছে, তেমনিভাবে প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের জীবনজীবিকাও দুই বছরের করোনা সংকটে বড় ধরনের অর্থনৈতিক টানাটানিতে পড়েছে। এ অবস্থায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী উৎপাদনের সক্ষমতা অনেকেরই হ্রাস পেয়েছে। আবার আমাদের সমাজেই মজুতদারি, নানা ধরনের সিন্ডিকেশন, ঘুষ-দুর্নীতির প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে একটি অংশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাজারে পণ্য সরবরাহের নানা কারসাজি, মধ্যস্বত্বভোগী এবং ক্ষমতার নানা ধরনের অপব্যবহারকারী গোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। এর ফলে বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর মূল্য। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রান্তিক থেকে মধ্যম আয়ের মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের ওপর। করোনার আগে যেখানে আমাদের দারিদ্র্যের হার ১৯ শতাংশে নেমে এসেছিল এখন তা বেড়ে ২৫ শতাংশের উপরে চলে গেছে। প্রান্তিক মানুষের আয় এবং ক্রমবর্ধমান বাজারমূল্যের যে দূরত্ব তৈরি করেছে তাতে নিম্ন আয়ের পরিবারের জীবনযাপনের ওপর বেশ চাপ পড়েছে।

চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার শহরাঞ্চলে টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে কিছু পণ্য বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে বিক্রি করছে। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল হতদরিদ্র কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ খুব বেশি পাবে বলে মনে হয় না। এখানেও ডিলার-প্রশাসন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা কারসাজি রয়েছে। সরকার কেন ভ্রাম্যমাণ ট্রাক-দোকান দিয়ে এমন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা বজায় রাখছে তা বোধগম্য নয়। প্রয়োজন ছিল বস্তি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের এলাকায় সুনির্দিষ্ট দোকানে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষদের সাপ্তাহিক, পাক্ষিক কিংবা মাসিক ভিত্তিতে ন্যায্যমূল্যে চাল-ডাল, তেল-লবণ, আটা-চিনি ক্রয়-বিক্রয়ের একটি বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা করা।

একইভাবে গ্রামাঞ্চলেও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো ন্যায্যমূল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী ক্রয় করার সুবিধা লাভের আওতায় আসার সুযোগ পেলে দেশীয় এবং বৈশ্বিক বর্তমান সংকটকালে জাতীয়ভাবে আমাদের দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ার গতি রোধ করা যেত। ২০ জানুয়ারি থেকে সরকার উপজেলাপর্যায়ে ১ হাজার ৭৬০ জন ডিলারের মাধ্যমে চাল-আটাসহ খাদ্যদ্রব্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে। এতে প্রতি কেজি চালের দাম ৩০ এবং আটার দাম ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এর সুবিধা দরিদ্র এবং স্বল্প আয়ের মানুষ কতটা নিতে পারবে সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধি কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। অথচ কৃষিমন্ত্রীর কথায় জানা গেছে যে, দেশে এই মুহূর্তে ২০ লাখ টন খাদ্যশস্য সরকারের গুদামে মজুদ আছে। এরপরেও বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী, চাতালের মালিক এবং খাদ্যপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মজুতদার ও ব্যবসায়ীরা কিছুতেই বাজারে স্বাভাবিক মূল্য বজায় রাখতে দিচ্ছে না। নানা অজুহাত তাদের রয়েছে। পরিবহন খরচ, চাঁদাবাজি ইত্যাদির অজুহাতে বাজারে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি স্বল্প ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে বাধ্য করেছে।

এমনকি কৃষক এই শীত মৌসুমে যেসব শাকসবজি উৎপাদন করছে সেগুলোর বাজারমূল্য শহরে কৃষকের উৎপাদনমূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। এখানেও পরিবহন খরচ এবং চাঁদাবাজির অজুহাত দেখিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী এবং ব্যবসায়ীরা বাজারকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। এর সুফল তারাই ভোগ করছে, উৎপাদনকারী এবং ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদনকারী কৃষক কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে বার বার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যাহত হতে বাধ্য।

এর প্রতিক্রিয়ায় বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। সরকার এ পর্যন্ত কৃষিজ পণ্য উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং বাজারে মূল্য স্বাভাবিক রাখার জন্য কোনো যৌক্তিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারেনি। সরকারের স্থানীয় কোনো প্রশাসনই এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। এটি না পারার প্রধান কারণ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাপনা পরিষদ এ পর্যন্ত গঠিত হয়নি। ফলে দেশের গোটা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে উৎপাদনকারী কৃষক এবং ক্রেতা ভোক্তারা কোনোভাবেই ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। উৎপাদনকারী এবং ভোক্তার মধ্যখানে যেসব গোষ্ঠী অবস্থান করছে তারাই এর সুফল ভোগ করছে। রাতারাতি এরাই অর্থবিত্ত ও প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

এরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। প্রশাসন, পরিবহন এবং সড়কপথে তদারককারী গোষ্ঠী চাঁদাবাজির নামে যা করছে তা তাদেরকেই পারস্পরিকভাবে লাভবান হতে সাহায্য করছে। অথচ এর দায় তারাই চাপিয়ে দিচ্ছে অন্যের ওপর এবং অন্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধির অজুহাত হিসেবে নিজেদের দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজিকে পণ্যের মূল্য বাড়ার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এ ধরনের একটি অনৈতিক কারসাজি বৃত্তাকারে আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য নিয়ে খেলা করছে। সরকার এই চক্রবৃত্তকে কখনই স্পর্শ করছে না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, বণিকতান্ত্রিক নানা গোষ্ঠী রাতারাতি ধনী হয়ে ওঠার মস্তবড় সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে কেউ হাত দিচ্ছে না।

বাংলাদেশে দ্রুত বিকাশমান বাজার অর্থনীতির মূলেই রয়েছে এমন লুম্পেন চরিত্রের নানা অসৃষ্টিশীল, দুর্নীতিপরায়ণ গোষ্ঠীর সংযুক্তি। এদের নাম বিভিন্ন দেশে মাফিয়া চক্র হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে এই চক্র এখন এতটাই প্রভাবশালী যে, সরকার এদের কাছে অসহায়, উৎপাদনকারী ও ভোক্তারা নিরুপায়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও সমাজ-অর্থনীতিতে যে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে তার কেন্দ্রবিন্দু গোটা লুটপাটকারী অর্থনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ। সরকার এখানে কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রবেশ করতে পারবে তা নিয়ে কেউই সন্দেহমুক্ত নয়।

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছিল সেটি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পরিবহন মালিক শ্রমিকগণ এক্ষেত্রে যেসব ওজর-আপত্তি, ছলচাতুরী ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে তা খোলা চোখেই দেখা গেছে। গ্যাসচালিত যানবাহনও ভাড়া বৃদ্ধি করে নিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের পরিবহন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এটি অনেকটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আরেকটি উদ্যোগের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

দেশের অন্যতম সরকারি তিতাস, বাখরাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির একটি প্রস্তাব এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে পৃথকভাবে জমা দিয়েছে। বাকি আরও তিনটি কোম্পানি এই সপ্তাহে অনুরূপ প্রস্তাব জমা দিতে যাচ্ছে। এতে জ্বালানি গ্যাসের মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় যেসব মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে তা দেখে যে কারো ভিমড়ি খেয়ে মরার অবস্থা হয়েছে।

যেসব ব্যক্তি এসব মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন তারা সম্ভবত কোনো ভিন্ন গ্রহে বসবাস করেন। হয় তাদের গ্যাস ব্যবহার করতে হয় না, নতুবা তাদের অর্থকড়ির কোনো দরকার পড়ে না! তাদের প্রস্তাবমতো এখন বাসাবাড়িতে যারা দুই চুলায় ৯৭৫ টাকা ব্যয় করছেন তাদেরকে ২ হাজার ১০০ টাকা দিতে এবং এক চুলায় ৯২৫ টাকার জায়গায় ২ হাজার টাকা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। শিল্পে প্রতি ঘনমিটারে গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা, শিল্প কারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ১৩ টাকা ২৫ পয়সার জায়গায় ৩০ টাকা, বিদ্যুৎ ও সারে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৬৬ পয়সা, হোটেল-রেস্টুরেন্টে ২৩ টাকা থেকে ৫০ টাকা, সিএনজিতে ৩৫ টাকা থেকে ৭৫-৭৬ টাকা এবং আবাসিক মিটারে ১২ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ২৭ টাকা ২৭ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। রেগুলেটরি বোর্ডই শেষ পর্যন্ত শুনানি শেষে মূল্য কোন খাতে কত বৃদ্ধি করবে সেটি জানা যাবে। কিন্তু গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির এমন প্রস্তাব হাঁকানোর খবর শুনে এখনই তো আমাদের কাঁপুনি লেগে যাওয়ার কথা।

গ্যাসের সহনীয় মূল্যবৃদ্ধি যেখানে এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে, সেখানে এমন অসহনীয় প্রস্তাব দেখে কোনো মন্তব্য মুখে আসার কথা নয়। বিষয়গুলো সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে এখনই গুরত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করোনার এমন অর্থনৈতিক সংকটকালে দেশের সকল মানুষকেই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিতে পারে। সেকারণে ব্যয় সংকোচন নীতি কার্যকর করা, গ্যাস নিয়ে যেসব অপচয় ও দুর্নীতি চলছে সেসবকে দৃঢ়ভাবে রোধ করার মাধ্যমে সরকার দেশের গ্যাস খাতকে জনবান্ধব করে তুলতে পারে। সেটিই হওয়া উচিত মূল্যবৃদ্ধির চাইতে স্থির রাখার যুক্তিসংগত উপায়।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংকটে মানুষ: আবুল বারকাত
অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন শুরু শুক্রবার
সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রতিজ্ঞা  
ধ্বংসস্তূপ থেকে রোল মডেল
উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

শেয়ার করুন

শাবিপ্রবির চলমান বাস্তবতা অনাকাঙ্ক্ষিত

শাবিপ্রবির চলমান বাস্তবতা অনাকাঙ্ক্ষিত

ছাত্র আর শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চরম সর্বনাশের পথে এগিয়ে চলেছে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ছিল: যে বিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যার চর্চা হয়। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ দাঁড়িয়েছে- যেখানে বিশ্ববিদ্যা লয়প্রাপ্ত হয়!

আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য মেনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী যৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়েই আন্দোলন শুরু করেছিল। এর মধ্যে প্রধান দাবি ছিল- নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের প্রতি বিরূপ আচরণ শুরু করে। বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদ লিজার বিরুদ্ধে আবাসিক ছাত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এতে আন্দোলনকারীরা অন্যান্য দাবির সঙ্গে তার পদত্যাগ দাবিও জুড়ে দেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের উপেক্ষা দেখাতে থাকে, এদিকে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ ততই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে প্রথমে ছাত্রলীগ, পরে পুলিশ দিয়ে আন্দোলনকারীদের দমন করার চেষ্টা করা হয়। শক্তি প্রয়োগ করেও কোনো রকম কূলকিনারা করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে শিক্ষার্থীরা চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়। তারা হল এবং বিশ্ববিদ্যালয় না ছাড়ার ঘোষণা দেয়। তারা ভিসি ও প্রক্টরের বাড়িতে তালা লগিয়ে দেয় এবং ভিসির পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থান গ্রহণ করে।

এর মধ্যে ছাত্রীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অত্যন্ত নেতিবাচক ও আপত্তিকর মন্তব্যসংবলিত একটি অডিও ভাইরাল হওয়ার পর পরিস্থিতি একেবারেই বদলে যায়। দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিশেষ করে ভিসির ভূমিকা নিয়ে সবাই সমালোচনামুখর হয়। সবার অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করে শুরুতেই যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হতো, তাদের কথা শুনত, তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নিত, তাহলে পরিস্থিতি বর্তমান অবস্থায় উপনীত হতো না।

এখন রাজনৈতিক নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও প্রতিবাদকারীদের শান্ত করতে পারেননি। করোনা মহামারির কারণে এমনিতেই আমাদের দেশে প্রায় দুই বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এখন করোনাভাইরাসের চরম সংক্রমণের লগ্নে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অপরিণামদর্শী আচরণের কারণে যদি শিক্ষা কার্যক্রম আবার বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এর দায় কে বহন করবে?

বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, দাবি-দাওয়াগুলো সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাজ। তা ছাড়া শিক্ষার্থীরা এমন কোনো কঠিন দাবি তোলেনি যা মানা যায় না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথম থেকেই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেছে। সবচেয়ে খারাপ কাজ করেছে ছাত্রলীগ এবং পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে শিক্ষার্থীদের শায়েস্তা করার পথ অবলম্বন করে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকেই দায় নিতে হবে।

ভিসি হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যক্তি। তিনি যদি তার শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে না পারেন, হলে এবং ক্লাসে ফিরিয়ে নিতে না পারেন, তাহলে বুঝতে হবে তার যোগ্যতা ও সক্ষমতায় ঘাটতি আছে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে গত দুই দশকে আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন, উপাচার্য আর পুলিশ একাকার হয়ে গেছে। সরকারি দলের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল-সন্ত্রাস, বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, ছাত্রী নিপীড়নসহ নানা অপকর্মের সূতিকাগার হয়ে উঠেছে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়।

অপকর্মকারীরা সব সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়ে যায়। এর বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী হয়ে উঠলেই নেমে আসে দমন-পীড়ন-নির্যাতন। তখন পুলিশ এসে অপকর্মকারীদের প্রটেকশন দেয় আর প্রতিবাদীদের ঠেঙিয়ে শায়েস্তা করার চেষ্টা করে। আর উপাচার্য হয়ে ওঠেন এসব কু-নাট্যের নাট্যকার! সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি এবং তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করবেন। এটাই তার দায়িত্ব। অথচ এখনকার অধিকাংশ উপাচার্য সেই কাজটি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর শিক্ষকরাও কম সরেস নয়। তারাও উপাচার্যকে নানাভাবে মদত জুগিয়ে যান। উপাচার্যের পাশাপাশি শিক্ষকদের ভূমিকাও পুনর্মূল্যায়ন করে দেখার সময় এসেছে।

সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, সমাজের অগ্রসর ও ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ’ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। সঠিক দিকনির্দেশনা দেবেন। হিংসায় উন্মত্ত, ক্ষমতার নেশায় বিভোর, স্বার্থোদ্ধারের চেষ্টায় যখন সমাজের বেশির ভাগ মানুষ ব্যাকুল, তখন ক্ষুদ্রতামুক্ত লোভ-মোহ-সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রুখে দাঁড়াবেন। সাধারণ মানুষকে পথ দেখাবেন।

দেশের অন্যত্র যা-ই ঘটুক, অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে কোনো অন্যায়, পক্ষপাত, নীতিগর্হিত কাজ তারা হতে দেবে না। এ জন্য প্রয়োজনে তারা বুকের রক্ত দেবে। প্রাণ উৎসর্গ করবে। যুগে যুগে আমাদের সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাই করেছে। ন্যায়ের জন্য, অধিকারের জন্য, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে কখনও তারা কুণ্ঠিত হননি।

এখন দিন বদলে গেছে। সমাজের সার্বিক অধঃপতন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও গ্রাস করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই এখন আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই লোভী, ধান্দাবাজ ও হিংস্র হয়ে উঠছেন। স্বার্থোদ্ধার, সুবিধা আদায় আর ধান্দাবাজিতে তারা অনেকে এখন অধম হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মানে নির্লোভ-নির্মোহ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার জ্ঞানতাপস– এই ধারণা এখন আমূল বদলে গেছে। আর দশজন সুবিধাবাদী নষ্ট মানুষের সঙ্গে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পার্থক্য করা কঠিনতম বিষয়ে পরিণত হয়েছে!

অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধানও তেমনভাবেই তৈরি করা হয়েছে। এই বিধি অনুযায়ী দলবাজির মহড়ায় পাস না করলে নিয়োগ-বদলি, প্রমোশন ইত্যাদি পাওয়া যায় না। এ ব্যবস্থায় শিক্ষকরা অসন্তুষ্ট বলেও মনে হয় না। তারা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে পদ-পদবি, সামান্য একটু সুযোগ-সুবিধা এবং প্রমোশনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান। এ জন্য তারা দলবাজিই শুধু নয়, ‘অশিক্ষিত’ ‘অর্ধশিক্ষিত’ রাজনৈতিক নেতাদের পা চাটতেও কুণ্ঠিত হন না। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা– অবশ্য সবাই নয়, তবে বেশির ভাগই দলবাজি নিয়ে মত্ত থাকেন, একটু সুযোগ-সুবিধা, পদ-পদবি, প্রমোশনের ধান্দায় সারাক্ষণ ব্যস্ত সময় কাটায়।

সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হচ্ছে, আত্মমর্যাদা-আত্মসম্মান, নীতিনৈতিকতা-আদর্শ ভুলে একশ্রেণির শিক্ষক অধ্যাপক-প্রক্টর, বিভাগের প্রধান, অনুষদের ডিন, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ইত্যাদি পদ বাগাতে রাজনৈতিক দলের প্রতি ‘লেজ নাড়তে’ থাকেন। তাদের অনেকে শাসক দলের ‘গৃহভৃত্য’ হতেও কোনো গ্লানি বা অনুশোচনা বোধ করে না। অধঃপতনের এ এক চূড়ান্ত অবস্থা! শিক্ষক রাজনীতির নামে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন এমন ‘বাঁদরের সার্কাসই’ চলছে।

এভাবে একটি দেশ, দেশের বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। এখানে শিক্ষকদের কোনো জবাবদিহি আছে কি? বছরে কটা ক্লাস নেন, কটা বই লেখেন, কটা আর্টিকেল পাবলিশ করেন, বিদেশি জার্নালে তাদের কটা লেখা প্রকাশিত হয়– এসব নিয়েই একজন শিক্ষকের পরিচয়। এসবের হিসাব কি কেউ নেয়? সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, প্রশাসন– কেউ কি এসবের খবর নেয়?

ছাত্র আর শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চরম সর্বনাশের পথে এগিয়ে চলেছে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ছিল: যে বিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যার চর্চা হয়। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ দাঁড়িয়েছে- যেখানে বিশ্ববিদ্যা লয়প্রাপ্ত হয়!

বেশ কয়েক বছর আগে একজন প্রবাসী গবেষক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুরবস্থা ঘোচানোর জন্য কিছু উপায় বাতলেছিলেন। এগুলো হচ্ছে:

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবেন অনির্বাচিত পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি কোনোক্রমে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবেন না; উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করবেন সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সমর্থক হবেন না; সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্য বদল হবেন না। কাজ করবেন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য; ডিন হবেন এক বছরের জন্য, একেকটা বিভাগ থেকে রোটেশনের মাধ্যমে। নির্বাচন হবে না; বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র তিন-চারজন শিক্ষক রোটেশনের মাধ্যমে বিভাগের সভাপতি হবেন। প্ল্যানিং কমিটিতে থাকবেন তারাই। বিভাগের সম্প্রসারণ দরকার আছে কি না, তারাই তা ঠিক করবেন; বিভাগের শিক্ষকসংখ্যা এমন হবে, যাতে প্রত্যেক শিক্ষক সপ্তাহে গড়ে সাত-আটটি লেকচার দিতে বাধ্য হন এবং সমানসংখ্যক টিউটরিয়াল ক্লাসও নেন; শিক্ষকেরা যাতে গবেষণা করার সুযোগ পান, তার জন্য প্রতি তিন বছর পরে এক বছর গবেষণা-ছুটি পেতে পারেন; চাকরির উন্নতির ক্ষেত্রে সত্যিকার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। খবরের কাগজে প্রকাশিত লেখা গবেষণামূলক বলে গণ্য হবে না; দ্বিতীয় পরীক্ষক অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হতে হবে।

নম্বরে দশের বেশি পার্থক্য থাকলে তৃতীয় পরীক্ষক উত্তরপত্র পরীক্ষা করবেন; ব্যাঙের ছাতার মতো যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে, তাদের সংখ্যা কমাতে হবে; মান যাচাই করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দিতে হবে; বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার খাতার দ্বিতীয় পরীক্ষক হবেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকেরা; বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের শাখা থাকতে পারবে না।

এমন আরও অনেক সুপারিশই করা যায়। কিন্তু আপাতত উল্লিখিত সুপারিশগুলো পালন করলে কিছুটা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আমাদের দেশে এসব সুপারিশ কে বিবেচনায় নেবে, কে-ইবা বাস্তবায়ন করবে?

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা-প্রবন্ধকার ও রম্য লেখক।

আরও পড়ুন:
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংকটে মানুষ: আবুল বারকাত
অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন শুরু শুক্রবার
সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রতিজ্ঞা  
ধ্বংসস্তূপ থেকে রোল মডেল
উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

শেয়ার করুন

চাষাভুষা বনাম বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক

চাষাভুষা বনাম বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক

তারা তাদের ক্রিয়া-কর্মের দ্বারা নিজেদের সমাজের বৃহত্তর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে সদা সতর্ক থাকেন। যে চাষাভুষা সমাজ তাদের খাওয়ায়, এক দু প্রজন্ম আগে যে খেতের আইলে প্রকৃতিক কাজ সারত, সানকিতে খাওয়া পরিবারগুলো থেকে আমরা আসছি তাদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে জানার মধ্যেই আমাদের মর্যাদাবোধ নিহিত!

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হীনন্মন্যতার দিকটা প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়েছে শাবিপ্রবির এক শিক্ষিকার ‘চাষাভুষা’র কথায়। আর গত কদিন আগে ঢাবির অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন স্যারের ‘আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক’ নামের ফেবু-পোস্ট পাঠে আমার মনে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের প্রেষণাই যেন হীনন্মন্যতার অবিনশ্বর এক বোধ।

‘আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক’। খেয়াল করুন, বাক্য হয়নি কিন্তু তাতে অহমিকার লেলিহান রূপে কিছু মাত্র আড়ালও তৈরি হয়নি!

সে যাহোক, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আমি একজন শিক্ষক’-এই পরিচয় কিছুতেই বিশেষ কিছু না, হতে পারে না, হওয়া উচিতও নয়। কোনো চাকরি, যার জন্য কেউ বেতন নেয়- সেটা চাকরিই মাত্র। কোনো শিক্ষক বা যে কাউকে বিশিষ্ট হয়ে ওঠার দরকার নেই। সম্মান মর্যাদা- এগুলো সব হীনন্মন্যতাজাত আকাঙ্ক্ষা।

আপনি বিশিষ্ট, আপনি সম্মানিত- এই কথার মানে হচ্ছে, আপনি আপনার সঙ্গীজনদের পিছনে ফেলছেন- এই পেছনে ফেলাটা আপনাকে যে তৃপ্তি দেয় সেটার একটা সার্বক্ষণিক স্বীকৃতি আপনি চাইছেন। মানুষকে পিছনে ফেলে বিশিষ্ট বা সম্মানিত বোধ করা অসুস্থতা, মানসিক বিকারগ্রস্ততা।

বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষকরা আর সব চাকরিজীবীদের মতোই চাকরিগত প্রাণী। কিন্তু তারা নানা মধুর মধুর বাজে কথা বলে, নানান ভাব ও ভং ধরে সমাজে বিশিষ্ট হতে চান। বিশেষ সম্মান পেতে চান। এর আর একটা অর্থ হচ্ছে, তারা তাদের ক্রিয়া-কর্মের দ্বারা নিজেদের সমাজের বৃহত্তর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে সদা সতর্ক থাকেন। যে চাষাভুষা সমাজ তাদের খাওয়ায়, এক দু প্রজন্ম আগে যে খেতের আইলে প্রকৃতিক কাজ সারত, সানকিতে খাওয়া পরিবারগুলো থেকে আমরা আসছি তাদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে জানার মধ্যেই আমাদের মর্যাদাবোধ নিহিত!

এ কারণেই শাবিপ্রবির অধ্যাপিকা নিজেকে ‘চাষাভুষা’ থেকে পৃথক করে শ্লাঘা বোধ করেন আর মামুন স্যাররা আশা করেন, বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক এমনতর ভাব অন্তরে লালন করবেন যেন তারে দেখলেই মানুষ বুঝতে পারেন, তিনি সামান্য কেউ নন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! কী ভয়ানক হিটলারি ভাবনা! প্রতি পলে পলে নিজেকে বিশেষ ও বিশ্লিষ্ট জানার বিকারগ্রস্ত আকাঙ্ক্ষা ভয় ধরিয়ে দেয়ার মতো!

মানুষের বিশেষ হওয়া, অন্যদের থেকে বেশি সম্মান পাওয়ার কোনো দরকার নেই। এই সম্মান, মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মানুষের মুক্তি যে নেই তা আজ প্রতিষ্ঠিত। মানুষের যদি কিছু হওয়ার থাকে তাহলে তা হচ্ছে, নিজেকে আর সবার সমান জানা, যেখানেই কাউকে বিশেষ, সম্মানিত করার আয়োজন চলে তাকে অস্বীকার করা, নিদেনপক্ষে এড়িয়ে যাওয়া, কারণ কাউকে সর্বক্ষণ সম্মান দেয়া, সদাসর্বদা বিশেষ জানা মানে তার চারপাশের আর সবাইকে সম্মান না দেয়া, অবিশেষ গণ্য করা। এটা কোনো জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের আরাধ্য হওয়ার কথা নয়।

রবি ঠাকুর থেকে ধার করে বলি, সকল অহংকারকে যদি চোখের জলে ডুবিয়ে না ফেলতে পারেন তাহলে আপনি কোনোদিনও আমজনতার কাতারভুক্ত হতে পারবেন না, মানে মানুষ থাকতে পারবেন না। নিজেকে গৌরবদান করার চেষ্টা নিজে যত করবেন তত বেশি নিজেকে আপনি অপমানই করবেন।

এসব শিক্ষিত-বাঙালি কেমন ভুলে যেতে পারে সেই অমিয় ঘোষণা-

“তারি পদরজ অঞ্জলি করি/ মাথায় লইব তুলি, সকলের সাথে পথে চলি/ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি।”

আপনি বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা ব্রহ্মাণ্ড বিদ্যালয়ের শিক্ষক হোন বা যা-ই হোন কেন আপনি একটা লিখিত-অলিখিত সামাজিক-রাষ্ট্রিক চুক্তির আওতায় চাকরি করেন। আপনার পাদ্রী হওয়ার দরকার নেই, আপনার রাজনীতিক বা সমাজের মাথা হওয়ার দায় নেই, আপনার দায় আছে যে কাজের জন্য আপনাকে বেতন দেয়া হয় সেই কাজটুকু ঠিকঠাক মতো করা। মাত্র দুইটা কাজ, শিক্ষার্থীদের চাহিদামতো পড়ানো, তাদের লেখাপড়ার পরিবেশ দেয়া। আর অন্যান্য কাজ করলে করবেন নিজের খায়েশে, না করলে কেউ দুষতে আসবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিশু-কিশোর পড়তে আসে না। তাদের অভিভাবক সাজার দরকার নেই। আপনাদের প্রিয় যে মর্যাদা, সম্মান ইত্যাদি তাদের সমান সমান দেয়ার চেষ্টা করেন, তাদের যা যা প্রাপ্য মিটিয়ে দেন। দেখবেন, চাকরিটা তৃপ্তি নিয়েই করতে পারছেন।

এই দেশের শিক্ষার্থীরা অবিবেচক নয়। আইন-বিধি-প্রথার বাইরে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা কোনোদিনও কিছু চায় না, চায়নি। যদি তাদের সঙ্গে নেমে দাঁড়াতে না পারেন তাহলে চুপ থাকা ভালো। দায়িত্বে থেকেও যদি তাদের প্রাপ্য মিটাতে না পারেন দায়িত্ব ছেড়ে দেন। কেউ আপনাদের পায়ে ধরে চাকরি দেয় না, চাকরি তো চাকরিই। সেবক হন। নইলে পথ দেখেন। কথায় কথায় উদোম সম্মান মর্যাদা চাইবেন না। এই চাওয়া বিকারগ্রস্ততা।

শিক্ষার্থী হিসেবে আমি সারাক্ষণ এই কথা আওড়াই, শিক্ষকদের সামনে মাথা নিচু করার কিছু নেই। মাথা নিচু করে কিছুই শেখা যায় না। কাউকে বড় জানা শিক্ষাগ্রহণের প্রধান অন্তরায়। সমানে সমানে লেনদেনই শিক্ষা। চোখে চোখ রেখে নিজের বস্তুগত-অবস্তুগত চাওয়া আদায় করতে পারাই শিক্ষার মূলমন্ত্র। লড়াই-সংগ্রাম জারি রাখার নামই শিক্ষা।

জয় হোক শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের!

লেখক: অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংকটে মানুষ: আবুল বারকাত
অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন শুরু শুক্রবার
সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রতিজ্ঞা  
ধ্বংসস্তূপ থেকে রোল মডেল
উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

শেয়ার করুন

‘রানা’র চিরবিদায়!

‘রানা’র চিরবিদায়!

শুধু মাসুদ রানা নয়, কাজী আনোয়ার হোসেন তার সেবা প্রকাশনী দিয়ে আমাদের আরও অনেক উপকার করেছেন। প্রথমত পেপারব্যাক হওয়ায় সস্তায় বই পাওয়া যেত। বাংলাদেশের বাকি প্রকাশনা শিল্পের পুরোটাই ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। কিন্তু সেবা প্রকাশনীর বই প্রকাশিত হয় বছরজুড়ে। সেবা প্রকাশনীর বই পাওয়া যেত রেলস্টেশনে, বাসস্টেশনে, এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানেও।

সন্ধ্যায় হঠাৎ নিউজরুমে সাড়া পড়ে গেল- কাজী আনোয়ার হোসেন মারা গেছেন। রুটিন যা যা কাজ তাই করলাম। খবরটি কনফার্ম করে ব্রেকিং দেয়া হলো। কোন হাসপাতালে মারা গেছেন, সেটা নিশ্চিত করে একজন রিপোর্টার পাঠালাম সেখানে, আরেকজন বসে গেলেন তার জীবনী বানাতে। সবই হলো যন্ত্রের মতো। কিন্তু বুঝিনি, একজন অদেখা মানুষের মৃত্যু এতটা আচ্ছন্ন করে ফেলবে। আসলে শুধু আমাকে নয়, কাজী আনোয়ার হোসেন যুগ যুগ ধরে আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছেন। এখন ফেসবুক প্রজন্ম হয়তো বুঝতেও পারবে না, কাজী আনোয়ার হোসেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন আমাদের কাছে।

কাজী আনোয়ার হোসেনের অনেক পরিচয়। সেটি নিয়ে বিস্তারিত লেখা যাবে। তবে এটিএন নিউজের ব্রেকিং নিউজে লেখা হলো- ‘মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন আর নেই।’ সব পরিচয় ছাপিয়ে মাসুদ রানার স্রষ্টাই তার মূল পরিচয়। মাসুদ রানার লেখক কে, এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। শেখ আব্দুল হাকিম মাসুদ রানা সিরিজের অনেকগুলো বইয়ের লেখক হিসেবে আদালতের স্বীকৃতি পেয়েছেন। শুধু শেখ আব্দুল হাকিম নন, আমরা জানি আরও অনেকেই মাসুদ রানা লিখেছেন।

১৯৬৬ সালে প্রকাশিত মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম দুটি বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ আর ‘ভারতনাট্যম’ এবং পরে প্রকাশিত ‘পিশাচ দ্বীপ’ ছাড়া এই সিরিজের প্রায় ৪৫০ বইয়ের বাকি সবই বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে লেখা। কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেও কখনও একে মৌলিক লেখা বলে দাবি করেননি। কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে প্রকাশিত হলেও এর অনেক বই-ই তার লেখা নয়, তবুও কাজী আনোয়ার হোসেনই মাসুদ রানার স্রষ্টা।

কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর খবরে বছর পাঁচেক আগের একটি স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ২০১৬ সালে মাসুদ রানার ৫০ বছরপূর্তি নিয়ে লেখালেখি হচ্ছিল। অফিসে বসে আমি আর মুন্নী (মুন্নী সাহা) মাসুদ রানা নিয়ে কথা বলছিলাম। স্মৃতির পুকুরে তোলপাড়। হঠাৎ মুন্নী বলল, চল মাসুদ রানার সঙ্গে দেখা করে আসি। মাসুদ রানার নাম শুনেই রক্তে শিহরণ লাগল, ভর করল রাজ্যের নস্টালজিয়া। আসলে মাসুদ রানা নয়, মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনের খোঁজে বের হতে চায় মুন্নী। আমি বললাম, আমি যতদূর জানি কাজী আনোয়ার হোসেন খুব প্রচারবিমুখ ও ঘরকুনো মানুষ। সাধারণত তিনি কারো সঙ্গে দেখা করেন না, বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে তো নয়ই। মাসুদ রানার মতোই তার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনও নিজেকে রহস্যময়তার চাদরে আড়াল করে রাখেন। ইনফ্যাক্ট আমরা তো তার বাসাও চিনি না।

আমি বললাম, দাঁড়া, আমি একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার চেষ্টা করি। ফোন করলাম, কাজী আনোয়ার হোসেনের চাচাতো ভাই সারগাম সম্পাদক কাজী রওনাক হোসেনকে। তিনিও বললেন, বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে গিয়ে কোনো লাভ নেই। তিনি আশ্বাস দিলেন, আমাদের জন্য শিগগিরই একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু মুন্নী নাছোড়বান্দা, সে যাবেই। তাই বাধ্য হয়ে গুগল সার্চ দিয়ে সেবা প্রকাশনীর ঠিকানা বের করলাম, ২৪/৪ সেগুনবাগিচা। এটুকু ভরসা করে রওয়ানা দিলাম।

একদম শুরুর দিকে ঢাকায় আমার আস্তানা ছিল ৭৬ সেগুনবাগিচা, সাপ্তাহিক প্রিয় প্রজন্মের অফিস। তখন ছায়া ঢাকা, পাখি ঢাকা না হলেও নিরিবিলি সেগুনবাগিচার পুরোটাই চিনতাম। বাইরে থেকে সেবা প্রকাশনীর অফিসও দেখেছি। কিন্তু গত ২৫ বছরে সেগুনবাগিচা এতটাই বদলে গেছে, এখন গেলে সবকিছুই অচেনা মনে হয়। বাগানবাড়ির মতো বিশাল সব বাড়ির জায়গা নিয়েছে উঁচু ভবনগুলো। ২৪/৪ সম্বল করে সেগুনবাগিচায় চক্কর দিতে থাকলাম। ২৪ পাই, কিন্তু ২৪/৪ পাই না। শেষ পর্যন্ত মুন্নীকে গাড়িতে বসিয়ে নেমে জিজ্ঞাসা করে করে বের করলাম ২৪/৪ সেগুনবাগিচা। দেখলাম একটা চোখে না পড়ার মতো ছোট সাইনবোর্ডও আছে, ‘কাজী আনোয়ার হোসেন, ২৪/৪ সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০’। কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়ি আর নেই।

তার জায়গা নিয়েছে সুউচ্চ ভবন। গেটের কাছে গিয়ে মুন্নীকে বললাম, এবার আমার কাজ শেষ, তোর মাস্তানি শুরু। দেখ চেহারা বেচে কিছু করতে পারিস কি না। কাজ হলো। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজন মুন্নীকে চিনল। খাতিরও করল। কিন্তু ‘স্যার’-এর অনুমতি ছাড়া তো আর ওপরে যাওয়া যাবে না। আমাদের সামনেই ফোন করলেন। ও প্রান্তের কিছু কথা আমরা আবছা আবছা শুনলামও। টেলিফোনের ওপাশে কাজী আনোয়ার হোসেন, সেবা প্রকাশনীর আরও অনেক নিয়মিত পাঠকের মতো আমার কাছে তিনি কাজীদা, এক ধরনের থ্রিল অনুভব করলাম। কিন্তু এত কাছে তবু কত দূর। অনুমতি মিলল না। বললেন, অসুস্থ। বুঝলাম, অজুহাত। আমাদের পীড়াপীড়িতে নিরাপত্তাকর্মীরা আবার ফোন করলেন।

বললেন, আমরা কোনো সাক্ষাৎকার নিতে আসিনি, সঙ্গে ক্যামেরাও নেই। জাস্ট দেখা করতে এসেছি। বাসায়ও ঢুকব না। বাইরে থেকে দেখা করে চলে যাব। কিন্তু লাভ হলো না। অনুমতি মিলল না। নিরাপত্তাকর্মীরা কথায় কথায় বললেন, আগের বছর স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনের মৃত্যু এবং মেয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার পর উনি অনেকটাই নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। কারো সঙ্গেই দেখা করেন না। অবশ্য দেখা উনি আগেও করতেন না। ওনার নেমপ্লেট পেছনে রেখে একটা সেলফি তুলে দুই বন্ধু ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলাম। দুধের স্বাদ ঘোলা পানিতে মেটানোর অপচেষ্টা।

মাসুদ রানাকে নিয়ে প্রায় পঞ্চাশের দুই বন্ধুর এই আদিখ্যেতা দেখে এই প্রজন্মের কেউ কেউ অবাক হতে পারেন। কিন্তু তারা বুঝতেই পারবে না, আমাদের প্রজন্মের কাছে মাসুদ রানা কতটা! শুনলাম মাসুদ রানা এখনও প্রকাশিত হয়। তবে আমি অন্তত ৩০ বছর ধরে মাসুদ রানা পড়ি না। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত প্রায় সব মাসুদ রানাই পড়া ছিল। মাসুদ রানা ছিল নেশার মতো, তীব্র নেশা। পড়ার টেবিলে বইয়ের নিচে লুকিয়ে, এমনকি ক্লাসরুমে লুকিয়েও মাসুদ রানা পড়েছি। একবার হাতে নিলে শেষ না করে ওঠা যেত না। সামনে যত কাজই থাকুক। এমনকি পরীক্ষার আগের রাতে লুকিয়ে মাসুদ রানা পড়ার মতো ‘অপরাধ’ও করেছি। আসলে আমরা বেড়েই উঠেছি মাসুদ রানার সঙ্গে, মাসুদ রানার সময়ে। মাসুদ রানা আমাদের সমান বয়সী।

মাসুদ রানার বয়স যখন ৫০, আমার তখন ৪৭। তবে মাসুদ রানার বয়স বাড়ে না, আমরাই খালি বুড়িয়ে যাই। আমি ভাগ্যবান যে আমার ছেলেবেলা মোবাইল, ফেসবুকে অপচয় হয়নি। আনন্দময় শৈশবের রহমস্যময়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল মাসুদ রানা। প্রতিটি বইয়ের ভূমিকাতেই মাসুদ রানার পরিচিতি লেখা থাকত ‘বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টালিজেন্সের এক দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই গোপন মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ দেশান্তরে।... কোমলে কঠোরে মেশানো নিষ্ঠুর, সুন্দর এক অন্তর। একা। টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।’ কিন্তু আমরা জড়িয়ে যাই অচ্ছেদ্য এক বাঁধনে। আমাদের ছেলেবেলা কুয়াশা, ব্যোমকেশ, ফেলুদা, দস্যু বনহুরময়। তবে সত্যি বলতে কি মাসুদ রানার মতো আর কেউ এমন বাঁধনে জড়ায়নি।

সাহিত্যমূল্যে হয়তো মাসুদ রানা অনুল্লেখযোগ্যই থেকে যাবে। সাহিত্য ইতিহাসে মাসুদ রানা হয়তো পরিশিষ্ট। কিন্তু বোদ্ধারাই মূল্য বা ইতিহাস নিয়ে থাকুক। আমার তাতে আগ্রহ নেই। আমি জানি মাসুদ রানা আমার, আমাদের জন্য কতটা। কেউ কেউ আমার গদ্যের প্রশংসা করেন। করলে আমি সেই প্রশংসার পুরোটাই কাজী আনোয়ার হোসেনকে উৎসর্গ করি। ’৯৩ সালে আমি যখন বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করি, তখন স্পোর্টসে কাজ করতেন শামসুল ইসলাম কবির।

এখন তিনি কানাডাপ্রবাসী। তো কবির এসে একদিন আমার কাছে দুঃখ করে বললেন, ভাই, বড় বিপদে আছি। আযম ভাই (শহীদুল আযম) তো সারাক্ষণ বকাবকি করেন। আমার লেখা ভালো না। কী করি বলেন তো। আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম, আপনি মাসুদ রানা আর হুমায়ুন আহমেদ পড়েন। পড়তে ভালো লাগবে এবং আমি নিশ্চিত আপনার লেখারও অনেক উন্নতি হবে। শামসুল ইসলাম কবির ফল পেয়েছিলেন হাতে হাতে। কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি তিনি।

ঢাকায় আমার প্রথম কর্মক্ষেত্র সাপ্তাহিক বিচিন্তা, প্রথম বস মিনার মাহমুদ। তিনি মাসুদ রানায় প্রভাবিত ছিলেন দারুণভাবে। নিজেকে তিনি দাবি করতেন রাহাত খান। আর আমাদের সবাইকে বলতেন মাসুদ রানা। তিনি আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট দিতেন মাসুদ রানা স্টাইলে। মিনার মাহমুদ অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করতেন।

শুধু মিনার মাহমুদ নন; আমরা, আমাদের প্রজন্ম মাসুদ রানায় কতটা প্রভাবিত; কাগজে-কলমে কখনই তার পুরোটা ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাবে না। হয়তো আমরা পুরোটা জানিও না; চেতনে-অবচেতনে মাসুদ রানা আমাদের কতটা জুড়ে আছে। লেখার কথা তো আগেই বলেছি। ছোট ছোট বাক্যে মাসুদ রানার ঝরঝরে গদ্য টেনে নেয় যে কাউকে। মাসুদ রানা পড়তে পড়তে একটা সহজবোধ্য স্মার্ট গদ্য পাঠকের মননে ছাপ ফেলে যায়। কাহিনির মতো গদ্যের ছিল যেন টানটান উত্তেজনা।

মাসুদ রানাকে আমি বলি- আই ওপেনার। আমাদের জন্য পড়ার আনন্দের সিংহ দরজাটা খুলে দিয়েছিল মাসুদ রানা। মাসুদ রানা পড়তে পড়তেই ছেলেবেলায় ‘আউট বই’ পড়ার নেশাটা চেপেছিল, সেটা আর কাটেনি। আকাঙ্ক্ষা করি কখনও না কাটুক। বয়স হলে নিশ্চয়ই অনেক অসুখ-বিসুখ হবে, হচ্ছেও। কামনা করি যেন কখনও চোখের অসুখ না হয়। কারণ পড়ার আনন্দটাকে আমি বেঁচে থাকার আনন্দের সমার্থক ভাবি।

আমার ছেলেবেলা কেটেছে গ্রামে, একদম অজপাড়াগায়। হারিকেন বা কুপির আলোয় লুকিয়ে লুকিয়ে মাসুদ রানা পড়তে পড়তে আমরা ঘুড়ে বেড়াতাম বিশ্বজুড়ে। আহা, কী যে আনন্দময়, রোমাঞ্চকর শৈশব! এমনিতে আমি খুব আনস্মার্ট। এখনও আমার প্রিয় পোশাক লুঙ্গি। আমার স্ত্রী মুক্তি আর ছেলে প্রসূন আমাকে প্রায়শই ‘গেরাইম্যা’ বলে ঠাট্টা করে। আমি অবশ্য একে গালি হিসেবে নয়, প্রশংসা হিসেবেই নেই। তবুও অজপাড়াগা থেকে উঠে এসে যে শহরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছি, তার অনেকটা অবদানই মাসুদ রানার। তার হার না মানা মানসিকতা, শেষ পর্যন্ত লেগে থাকার চিন্তা আমাদের লড়াইয়ে রসদ জুগিয়েছে।

মাসুদ রানার আরেকটা বড় অবদান, পাঠকের মনে অনায়াসে দেশপ্রেমের বীজ বুনে দেয়া। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টালিজেন্সের স্পাই মাসুদ রানা বিশ্বসেরা। এখন অনেক কিছুতেই বাংলাদেশ সেরাদের কাতারে। কিন্তু ৪০/৪৫ বছর আগে বাংলাদেশ এমন ছিল না। দারিদ্র্য, সাইক্লোন, বৈদেশিক সাহায্য- এসবই ছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। হীনন্মন্যতার সেই সময়ে মাসুদ রানা আমাদের বুকের ছাতি ফুলিয়ে দিত।

শুধু মাসুদ রানা নয়, কাজী আনোয়ার হোসেন তার সেবা প্রকাশনী দিয়ে আমাদের আরও অনেক উপকার করেছেন। প্রথমত পেপারব্যাক হওয়ায় সস্তায় বই পাওয়া যেত। বাংলাদেশের বাকি প্রকাশনা শিল্পের পুরোটাই ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। কিন্তু সেবা প্রকাশনীর বই প্রকাশিত হয় বছরজুড়ে।

সেবা প্রকাশনীর বই পাওয়া যেত রেলস্টেশনে, বাসস্টেশনে, এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানেও। কিশোর পত্রিকা বা তিন গোয়েন্দা শিশু-কিশোরদের পাঠে আগ্রহী করেছে। এছাড়া ক্ল্যাসিক আর ওয়েস্টার্ন পড়েও অনেক সময় কাজে লাগিয়েছি। আহা আমার খুব আফসোস, এখন যদি ইন্টারনেট, ফেসবুক না থাকত; যদি আমাদের সন্তানেরা আমাদের মতোই বই পড়ার পেছনে অনেক সময় দিত! তারা যদি জানত, কত আনন্দময় সে জগৎ।

আমাদের সবার জীবন আনন্দময় করে কাজী আনোয়ার হোসেন যাপন করছেন নিঃসঙ্গ জীবন। তবুও তিনি ছিলেন, এটা একটা ভরসা ছিল। তার বিদায়ে অবসান ঘটল একটি যুগের।

লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংকটে মানুষ: আবুল বারকাত
অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন শুরু শুক্রবার
সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রতিজ্ঞা  
ধ্বংসস্তূপ থেকে রোল মডেল
উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

শেয়ার করুন

নির্বাচনব্যবস্থা যেন আস্থার সংকট সৃষ্টি না করে

নির্বাচনব্যবস্থা যেন আস্থার সংকট সৃষ্টি না করে

গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত হলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এ নির্বাচন পরিচালনা করে মূলত মাঠপ্রশাসন। আরপিও ১৯৭২-এ সংসদ সদস্যদের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাকে নিয়োগ দেয়া হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও কমিশন কর্তৃক জেলা প্রশাসককে রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রদান একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিধিত্ব আদেশে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে রিটার্নিং অফিসার মাঠপর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার নিয়োগ দেন।

এ আদেশে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে একজন রিটার্নিং অফিসার তার কর্তৃত্বাধীন এলাকায় সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার স্বার্থে প্রয়োজনীয় যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। নির্বাচন কমিশন কোনো শর্তারোপসাপেক্ষে সহকারী রিটার্নিং অফিসার রিটার্নিং অফিসারের নিয়ন্ত্রণে থেকে রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা ভোগ ও কার্যাবলি সম্পন্ন করেন। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসিসহ পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ডিসি, ইউএনও, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসি- এসব কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ তাদের পদোন্নতি, বদলিসহ তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকায় ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে নির্বাচনে তাদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা অনেকটা সহজ হয়। বিগত দিনে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত যেকোনো সংসদ নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনে ক্ষমতাসীন দলগুলোর প্রভাব বিস্তারের চিত্র দেখা গেছে। নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার জন্য রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের ব্যাপারে শুধু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা না দিয়ে মাঠপর্যায়ে যেকোনো ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনী আবশ্যক।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে ৪৫ বছর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন হয়েছে নির্দলীয়ভাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৪-১৮ মেয়াদে স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ সংশোধিত আইন-২০১৫, উপজেলা পরিষদ সংশোধিত আইন-২০১৫, পৌরসভা সংশোধিত আইন-২০১৫ এবং সিটি করপোরেশন সংশোধিত আইন-২০১৫-এর মাধ্যমে কেবল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য ঘোষণা করা হয়।

এ নিয়ম এখনও বলবৎ রয়েছে। এতে শুধু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যই লোপ পায়নি, বরং সমাজে, বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে হাজার বছরের সামাজিক বন্ধনে ফাটল ধরেছে। দলীয় আনুগত্যের কারণে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সদ্ভাব নষ্ট হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন রাজনীতিকীকরণ, নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতা এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্য ও তোষণ নীতি ইত্যাদির কারণে বিগত সময়ের স্থানীয় ও সংসদ নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সিভিল সোসাইটির সদস্যদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। ২০১১ সালের ১০ মে বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় ঘোষণা করলে বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করা হয়।

নির্বাচনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রধান বিরোধী দলের সীমাবদ্ধতা, সুশীল সমাজের সদিচ্ছা সর্বোপরি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার নিরিখে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে আমাদেরকে একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকলেও বর্তমান জাতীয় সংসদ তথা সংসদীয় সরকার পদ্ধতির মধ্যেই আমরা মনে করি, একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব।

রাজনীতি-সৎ ও যোগ্য প্রার্থী, দুর্নীতি-সন্ত্রাস, কালো টাকার প্রভাব ইত্যাদি বিষয় আজ আলোচনায় উঠে এসেছে দেখে প্রধানমন্ত্রী কিন্তু অখুশি নন। যে কথাটা আজ পঞ্চাশ বছর পর সবাই উপলব্ধি করলেন সে কথাটা কিন্তু জীবদ্দশায় জাতির পিতা উপলব্ধি করেছিলেন। আর সে কারণেই সাময়িকভাবে একটা পরিবর্তনও এনেছিলেন। কিন্তু তখন তা কেউই দূরদর্শিতার অভাবে বুঝতে পারেনি। অথবা হতে পারে স্বাধীনতাকে অর্থহীন করার জন্য কোনো ঝড়যন্ত্র এর পেছনে ছিল, তাই তা করতে দেয়নি। নির্বাচনে যাতে কালো টাকা ও সন্ত্রাসীরা প্রভাব ফেলতে না পারে তার জন্যই নির্বাচনপদ্ধতিতে একটা পরিবর্তন আনা হয়।

তাহলো, প্রার্থী যারা হবেন তাদের পোস্টার সরকার করে দেবে। নির্বাচনের সব খরচ জাতীয় সরকার বহন করবে। প্রার্থী শুধু বাড়ি বাড়ি যেতে পারবে। সভা-সমাবেশ একসঙ্গে করতে পারবে। একই মঞ্চে দাঁড়াবে এর জন্য সরকার ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু যাবতীয় খরচ বহন করবে সরকার। নিরপেক্ষভাবে এভাবে দুটো উপনির্বাচন হয়েছিল। কিশোরগঞ্জে উপনির্বাচনে একজন স্কুল শিক্ষক জয়ী হন। উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাই হেরে যান। ক্ষমতায় ছিলেন বলে তিনি ভাইকে জেতাতে কারচুপি করেননি খাটাননি ক্ষমতার প্রভাবও।

বর্তমান সমাজে আদর্শে বিশ্বাসী রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর এ কারণে সুবিধাবাদী, তোষামোদী, খোষামোদীদের প্রাধান্য বাড়ছে। ত্যাগ নয়, ভোগের মানসিকতা নিয়ে রাজনীতিতে অবতরণ করেই জনগণকে শোষণ করা হচ্ছে। সে কারণেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ধনী থেকে আরও ধনী হয়েছে, সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। যদি আদর্শবাদী রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় থাকতে পারত তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত অনেক আগেই মজবুত হতো।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা যদি না ঘটত, বঙ্গবন্ধু যদি আর পাঁচটা বছর হাতে সময় পেতেন তাহলেই বাংলাদেশ পৃথিবীর জন্য উন্নয়নের রোল মডেল হতো অনেক আগেই। অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকেই এ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

নির্বাচনব্যবস্থা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়নি। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের। বিগত সময়ে ভোটারদের ভোট দিতে না পারাসহ নানা অনিয়মের কারণে মানুষ ভোট প্রদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। জাতীয় নির্বাচন, উপনির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে খুব স্বল্পসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। তাই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে ন্যূনতম ভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা দরকার হয়ে পড়েছে।

২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুগান্তরে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, ওই বছরের ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে সংসদ সদস্যদের নির্বাচনে আসনভিত্তিক রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। কমিশন থেকে সে অনুযায়ী আরপিওতে সংশোধনী আনার প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করার সিদ্ধান্ত হয়। পরে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি।

জেলাভিত্তিক নিয়োজিত রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় মিডিয়া ক্যুর নজির দেশে রয়েছে। তাই আসনভিত্তিক রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে। আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য নির্বাচন, অর্থাৎ যে রাজনৈতিক দল নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, সে দল জাতীয় সংসদে তত শতাংশ সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠাবে- ফর্মুলাটি বিবেচনার দাবি রাখে। মোটকথা, গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচনপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই সব দলের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এ বিষয়ে সরকার, বিরোধী দল আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হলেই নির্বাচনপদ্ধতি সংস্কার করা সম্ভব। আর নির্বাচনপদ্ধতির সংস্কারেই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

নির্বাচনব্যবস্থাকে অবাধ, সুষ্ঠু ও কার্যকর করা না হলে দেশ ও জাতির কল্যাণ হবে না। অধিকন্তু প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনব্যবস্থা সরকার, রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক ও আস্থার সংকট তৈরি করবে। নির্বাচনব্যবস্থায় ত্রুটি, বিচ্যুতি ও তার কাঠামোগত দিক সংস্কারপূর্বক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতিকে গৌরাবান্বিত ও মহিমান্বিত করে তোলা জরুরি।

লেখক: গবেষক-কলাম লেখক। সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি।

আরও পড়ুন:
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংকটে মানুষ: আবুল বারকাত
অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন শুরু শুক্রবার
সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রতিজ্ঞা  
ধ্বংসস্তূপ থেকে রোল মডেল
উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

শেয়ার করুন

শাবির আন্দোলন ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক 

শাবির আন্দোলন ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক 

কিছু শিক্ষক পুলিশদের এনেছে আসলে শিক্ষার্থীদের দমন করতে ও পিটাতে। এর চেয়ে লজ্জাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে? পিতা তার সন্তানদের পিটানোর জন্য ভূমিকা নিয়ে এখন চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন! যোগ্য অভিভাবক বটে!

২০০২ সালের ঘটনা। আমরা হঠাৎ করেই জানতে পারলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আনোয়ার উল্লাহ শামসুন্নাহার হলে পুলিশ ঢুকিয়ে ছাত্রীদের পিটিয়েছে। সঙ্গে ছাত্রদলের নেত্রীদেরও ভূমিকা ছিল। বেশ কয়েকজন ছাত্রীকে রমনা থানায় গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। গণ-আন্দোলনের যে ঘটনাগুলো এখনও আমাকে নাড়া দেয় তাহলো- আমরা মিছিল করার প্রস্তুতি নিতে নিতে দেখলাম প্রবল বৃষ্টির মধ্যে আমাদের দেশের বরেণ্য একদল শিক্ষকরা বেরিয়ে এসেছিলেন মৌন মিছিল নিয়ে। তৎকালীন সরকারসমর্থিত ভিসি পুলিশ দিয়েও যখন আন্দোলন দমাতে পারছিলেন না তখন বিডিআর মোতায়েন করে।

আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশের হামলা যেমন ছিল তেমনি ছিল ছাত্রদল ক্যাডারদের হামলা। মধুর ক্যান্টিনের পাশে একদিন তারা সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা চালায় ন্যক্কারজনকভাবে। ওইদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে ছাত্রদলের ক্যাডাররা লাঞ্ছিত করে আনোয়ার ও মেজবাহ কামাল স্যারকে। তারা ছাত্র-ছাত্রীদের ক্যাডারদের পেটানো থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। একজন উপাচার্য শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কী না করতে পারে তা নিজে দেখেছি। সন্তানের মতো ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা চালাতে তারা কোনো দ্বিধা করে না। এমনকি তার সহকর্মীদের ওপরও। তাহলে শিক্ষকতার মহত্ত্ব কোথায় গেল?

একজন উপাচার্যের কত বড় সম্মানিত পদ! সেখানে বসে শিরদাঁড়া এত বাঁকা করে দলদাসবৃত্তি কেন? কী কারণে আমরা ভাবনার কূলকিনারা পাই না। একজন ভিসি ছাত্রলীগের কথায় চাকরি দেবেন, সাধারণ শিক্ষকরা তার প্রতিবাদ করলে, তাদের সঙ্গে ছাত্ররা দুর্বব্যবহার করলে, উপাচার্যের কিছু যায় আসে না। একজন উপাচার্য বলবেন তিনি পদ ছাড়তে রাজি যদি তাকে একটা যুব সংগঠনের চেয়ারম্যান করা হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে একটি সংগঠনের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক যায় চাঁদা ভাগাভাগি করতে। এমন ব্যক্তিত্ববোধের জায়গা কজন হয়? হঠাৎ করে হয় না। এমন দুর্বৃত্তকে শিক্ষকরা সুযোগ দেয় বলেই এসব ঘটনা ঘটে। এতসব কথা লেখার কারণ শুধু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ছবি দেখে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক আজ আমাকে ফোনে জানিয়েছেন এর পেছনে স্যারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান। সরকার দলের ঠিকাদাররা চায় লুটপাট করতে সেটা স্যার দেন না বলে এসব আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বাইরে থেকে তারা উসকে দিচ্ছে- সেই শিক্ষকের কথামতো, স্যারকে অবরুদ্ধ করা আন্দোলনকারীদের উচিত হয়েছে? আমি বললাম এটা তারা তাদের স্যারকে মেরে ফেলার জন্য করেনি।

এটা একটা প্রতীকী প্রতিবাদ। কিন্তু সেজন্য এই পরিমাণ শিক্ষার্থীকে আহত করে উদ্ধার করা কোন ধরনের মানসিকতা, এটা বললে তিনি বলেন, পত্রিকাগুলো এই মারই দেখে। দুর্নীতি দেখে না। আমি এতসব বুঝি না দুর্নীতির বিরুদ্ধে। আর প্রয়াত হুমায়ুন আাজাদ স্যার ছাত্রী হলে হামলার প্রতিবাদে নিজে রমনা হাজত খানায় গিয়ে মালা দিয়েছিলেন। তার গলায় তখন একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল আমার ছাত্রীদের পবিত্র পদভারে মুখরিত এই ক্যাম্পাস। (নিবন্ধকারের স্মৃতি থেকে)।

আমার মনে আছে হলের দ্যৈতিক সংযোগ, জলের লাইন কেটে দেয়া হলে আমরা ফ্লোরিং করে ছিলাম সৈয়দ আনোয়ার হোসেন স্যারের বাসায়। স্যার ও ম্যাডামের সেই যত্নের কথা ভোলার নয়। আবুল কাশেম ফজলুল হক স্যারের বাসাও ছিল থাকার জন্য উন্মুক্ত। আন্দোলনে ছাত্র-ছাত্রী মার খাচ্ছে- তখন শিক্ষকরা দেখছে ভিসি স্যারের সততার বিরোধিতা। যেসব ঠিকাদার এসব করে তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ভিসিদের। নতুবা একজন শিক্ষকের কাছে এসব দাবি করে কীভাবে আমাদের চিন্তায় আসে না।

সবকিছুর পরেও যে সত্যি তাহলো- শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অচল। বহুদিন করোনার কারণে বন্ধ থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয় খুললেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীরা কথা বলার পরই প্রশাসন ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি-দাওয়ার প্রতি কর্ণপাত না করায় পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। বহুদিনের সঞ্চিত ক্ষোভ আজকের ঘটনার জন্ম দিয়েছে বলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গণমাধ্যমে এই আন্দোলনের কারণ হিসেবে প্রকাশ হয়েছে যে, হলের যাবতীয় অব্যবস্থাপনা দূর করে সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত এবং ছাত্রীবান্ধব ও দায়িত্বশীল প্রাধ্যক্ষ কমিটি নিয়োগের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাত থেকে আন্দোলন শুরু করে হলের কয়েকশ ছাত্রী। গত শনিবার সন্ধ্যায় ছাত্রীদের কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর পরিস্থিতি পুরোপুরি ঘোলাটে হয়ে যায়, বহুদিনের সঞ্চিত ক্ষোভ সংগ্রামে রূপ নেয়।

গত রোববার দিনভর আন্দোলনে উত্তাল ছিল শাবি। এর মধ্যে ওইদিন বিকালে ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে অবরুদ্ধ করে শিক্ষার্থীরা। তাকে উদ্ধারে অ্যাকশনে যায় পুলিশ। এসময় তাদের রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জে অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত হয়। তখন ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী, পুলিশ সদস্যরাও আহত হয়। ফলে ঘটনা দাঁড়িয়েছে এই যে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) হল প্রভোস্টের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশের দফায় দফায় আক্রমণ ও সংঘর্ষের প্রতিবাদে এবার উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।

গত সোমবার (১৭ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের গোলচত্বরে আন্দোলন শুরু করে। এর আগে রোববার গভীর রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা শাবিপ্রবির ফটকে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীদের এখন একমাত্র দাবি বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগ। এদিকে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় আট সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য জহির বিন আলম এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বলেছেন, গত রোববারের ঘটনা কীভাবে ঘটল, এতে কারা দোষী- সেটা আমরা খুঁজে বের করব। বিশ্ববিদ্যালয় শান্ত ছিল, হঠাৎ কেন এমন অশান্ত হলো তাও বের করা হবে। তবে শিক্ষার্থীদের কথা স্পষ্ট- সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশে পুলিশের হামলা কেন তার জবাব দিতে হবে এবং ক্যাম্পাস পরিচালনায় ব্যর্থ হলে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদত্যাগ করতে হবে। একইসঙ্গে মুক্তমঞ্চের সমাবেশ থেকে উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করায় ক্যাম্পাস আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। স্লোগানে স্লোগানে ক্যাম্পাস এখন উত্তপ্ত। পাশপাশি উপাচার্যের বাসা, অফিসসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনসমূহে তালা ও ক্যাম্পাসে যাতে আর পুলিশ ঢুকতে না পারে সেজন্য প্রধান ফটকে ব্যারিকেড তৈরি করেছে শিক্ষার্থীরা। মূলত আন্দোলনকারীদের পর ন্যক্কারজনক হামলার পরে শাবি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা এই নির্দেশ মানেনি। বরং এই ঘোষণা আসায় পালটা উত্তাপ ছড়ায়। আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশ ডেকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা নজিরবিহীন এবং এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বিশেষ করে উপাচার্য কুশীলবের ভূমিকা পালন করেছেন।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছে, ‘এই উপাচার্যের দায়িত্বে থাকাকালে কোনো শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসে নিরাপদ বোধ করছে না। তার পদত্যাগ চাই।’ তারা বলেছে, ‘ক্যাম্পাসে মোতায়েন অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করতে হবে।’ এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবন, কন্ট্রোলার ভবন, অ্যাকাডেমিক ভবনসহ আরও কয়েকটি ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয় তারা। বিকালে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। গত সোমবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রোববার ক্যাম্পাসে সংঘটিত দুঃখজনক ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় বিশ্ববিদ্যালয় যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

এ উদ্যোগটি ভালো কিন্তু প্রশ্ন হলো কিছু শিক্ষক পুলিশদের এনেছে আসলে শিক্ষার্থীদের দমন করতে ও পিটাতে। এর চেয়ে লজ্জাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে? পিতা তার সন্তানদের পিটানোর জন্য ভূমিকা নিয়ে এখন চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন! যোগ্য অভিভাবক বটে!

এ কথা অবশ্যই বলা যায়, ছাত্রদের দাবি-দাওয়ার প্রতি শুরু থেকে কর্ণপাত করলে আজ বিশ্ববিদ্যালয় এভাবে ফুঁসে উঠত না। প্রশাসনের সব ধরনের অসহযোগিতা আজ এ পরিস্থিতির তৈরি করেছে। তবে অভিজ্ঞতা বলে, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। যেসব সংকট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে শেষ করা যায় সেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ডেকে আন্দোলনকারীদের মারধর করে থামানোর চেষ্টা করা দুঃখজনক। পুলিশ দিয়ে ছাত্র পিটানোর এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে উদ্ভূত সংকটের সমাধান না করলে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেটা কারো কাঙ্ক্ষিত নয়।

লেখক: গবেষক-প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংকটে মানুষ: আবুল বারকাত
অর্থনীতি সমিতির সম্মেলন শুরু শুক্রবার
সুবর্ণজয়ন্তীতে উন্নত পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রতিজ্ঞা  
ধ্বংসস্তূপ থেকে রোল মডেল
উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

শেয়ার করুন