× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য

মতামত
Whether Murad Hasan has the post of MP or not
hear-news
player
print-icon

মুরাদ হাসানের এমপি পদ থাকা না থাকা

মুরাদ-হাসানের-এমপি-পদ-থাকা-না-থাকা
যার বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, একজন চিত্রনায়িকার শরীর নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য এমনকি তাকে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত— তিনি কী করে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে বহাল থাকেন? সংসদের বাকি ৩৪৯ সদস্য কি তার সঙ্গে সংসদের চেয়ারে বসতে বিব্রতবোধ করবেন না? এরকম নোংরা মানসিকতা ও বিশ্রী ভাষার লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে কি তার নারী সহকর্মীরা কথা বলতে পারবেন?

একটি ইউটিউব চ্যানেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার মেয়েকে নিয়ে নোংরা মন্তব্য এবং দুই বছর আগে চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহির সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনায় গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ডা. মুরাদ হাসান তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না? প্রশ্নটি একেবারে অবান্তর নয়। আমরা একটু দেখতে চাই সংবিধান কী বলছে?

মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সুপারিশ করা হবে। অর্থাৎ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে তার পরিণতি কী?

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বেশ কিছু কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হতে পারে। যেমন: কোনো উপযুক্ত আদালত যদি তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেন; তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর যদি দায় থেকে অব্যাহতি লাভ না করেন; তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন; তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন; তিনি যদি প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন; সংসদের অনুমতি ছাড়া তিনি যদি একটানা নব্বই বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন এবং সংবিধানের বহুল আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে তিনি যদি তার দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দেন।

দেখা যাচ্ছে, উপরোক্ত একটি কারণও মুরাদ হাসানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সংবিধান বলছে, দল থেকে পদত্যাগ করলে তার সংসদ সদস্য পদ যাবে। কিন্তু যদি তাকে বহিষ্কার করা হয়, তাহলে বিধান কী— সেটি স্পষ্ট নয়।

দল থেকে বহিষ্কার হলে সংসদ সদস্য পদ যাবে কি না, এই প্রশ্ন আগেও উঠেছে। স্মরণ করা যেতে পারে, একটি হত্যামামলার আসামি হওয়ার পরে টাঙ্গাইলের বিতর্কিত সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানাকে জেলা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

যদিও আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র বলছে, দলের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় সংসদের। ওই সময়ে তিনি দীর্ঘদিন কারাভোগও করেন। তবে তার সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়নি।

দল ও জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার কারণে বিএনপি থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান জাহিদকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুজনকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং স্পিকারের কাছে তাদের আসন শূন্য ঘোষণার আবেদন করা হয়। কিন্তু এই কারণে তাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি।

তারও আগে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর সপ্তম সংসদে বিএনপির নির্বাচিত দুজন সংসদ সদস্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারে যোগ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাদের সদস্যপদ বাতিলের বিষয় আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কিন্তু কোনো ফলাফল আসার আগেই ওই সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। নবম সংসদের শেষদিকে জাতীয় পার্টি থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এইচএম গোলাম রেজাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত সংসদে তার সদস্যপদ স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে বহাল ছিল। এর আগে অষ্টম সংসদের (২০০১-২০০৬) শেষদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি থেকে রাজশাহী-৪ আসনের সাংসদ আবু হেনাকে বহিষ্কার করা হয়।

সেক্ষেত্রেও তার সদস্যপদ বহাল ছিল। দুটি ক্ষেত্রেই সংসদের ব্যাখ্যা ছিল, দল তাদের বহিষ্কার করেছে। কিন্তু তারা দল থেকে পদত্যাগ করেননি। যে কারণে তাদের সদস্যপদ বহাল ছিল। দশম সংসদে সরকারদলীয় সাংসদ আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দল থেকে পদত্যাগ করেন। এ কারণে তিনি সংসদ সদস্যপদ হারান।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে অনেক সময়ই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলেও এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দলের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। যাতে করে সংসদের ফ্লোর ক্রসিং এড়ানো যায়। অর্থাৎ যিনি যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি যেন সেই দলেই থাকে। এই আলোকে কেউ যদি দল থেকে বহিষ্কৃত হন, তাহলেও তার সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত।

অর্থাৎ দল থেকে পদত্যাগ করলে যদি সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়, তাহলে বহিষ্কৃত হলেও তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু সংবিধানে বিষয়টি স্পষ্ট নয়, ফলে দল থেকে বহিষ্কারের পরও অনেকের সংসদ সদস্যপদ টিকে গেছে। তবে আওয়ামী লীগ যদি সত্যিই তার সংসদ সদস্যপদও বাতিল চায়, সেক্ষেত্রে তাকে দল থেকে বহিষ্কার না করে প্রতিমন্ত্রীর মতো দল থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে তার সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাবে এবং স্পিকার তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করবেন।

সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ বলছে, কোনো সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না, সে সম্পর্কে বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে এবং এক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। সুতরাং, এমপি মুরাদের প্রতিমন্ত্রিত্ব যাওয়ার পরে যদি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তখন তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি না তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচনে কমিশনে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এটা ঠিক, আইন ও সংবিধানের চেয়ে নৈতিকতা অনেক বড় বিষয়। আইনত তার সদস্যপদ থাকবে কি থাকবে না সেটি বিতর্কের বিষয় এবং সময়ই বলে দেবে।

একজন সংসদ সদস্য যখন প্রকাশ্যে গালাগালি, অশ্লীল ও অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলেন এবং সেটি নিয়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়, তখন তার সংসদ সদস্যের মতো একটি সাংবিধানিক পদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। যে অভিযোগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন, সেই একই অভিযোগে, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে (শাস্তি না হলেও) তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করা উচিত। অথবা তার নিজেরই উচিত সংসদ সদস্যপদ ছেড়ে দেয়া।

মুশকিল হলো, আমাদের জনপ্রতিনিধিদের অভিধানে পদত্যাগ বলে কোনো শব্দ নেই। বরং কারো মন্ত্রণালয় বা এখতিয়ারের ভেতরে ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা বা অনিয়ম হলেও তার দায় নিয়ে কেউ পদত্যাগ করতে চান না। উপরন্তু সেসব ঘটনাকে ‘বিরোধীদের ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন। আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কোনো এক প্রসঙ্গে সংসদে আলোচনায় রসিকতা করে বলেছিলেন: ‘মাননীয় স্পিকার, আমরা দুটি জিনিস ছাড়া আর কিছু ত্যাগ করতে চাই না...।’

সুতরাং যার বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, একজন চিত্রনায়িকার শরীর নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য এমনকি তাকে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত— তিনি কী করে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে বহাল থাকেন? সংসদের বাকি ৩৪৯ সদস্য কি তার সঙ্গে সংসদের চেয়ারে বসতে বিব্রতবোধ করবেন না? এরকম নোংরা মানসিকতা ও বিশ্রী ভাষার লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে কি তার নারী সহকর্মীরা কথা বলতে পারবেন?

ডা. মুরাদ হাসানের বিষয়টিকে শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে বিবেচনারও সুযোগ নেই। কারণ তিনি একজন জনপ্রতিনিধি; ক্ষমতাসীন দলের এমপি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি যা বলেছেন, যা করেছেন তার দায় তার দল ও সংসদ এড়াতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
মুরাদের সংসদ সদস্য পদ চ্যালেঞ্জ করে রিট
অশালীন বক্তব্য: মুরাদের ১৭ ভিডিও সরিয়েছে ফেসবুক-গুগল
মুরাদের গ্রেপ্তার চায় ছাত্র অধিকার পরিষদ
মুরাদের জন্য কেঁদে ভাইরাল যুবলীগ নেতা
মুরাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
Happy Birthday Humane and brave Muntasir Mamun

জন্মদিনের শুভেচ্ছা: মানবিক ও সাহসী মুনতাসীর মামুন

জন্মদিনের শুভেচ্ছা: মানবিক ও সাহসী মুনতাসীর মামুন
মুনতাসীর মামুনের বক্তৃতায় একটা বিষয় সুম্পষ্ট করে বলেন যে, ১৯৬৮ সাল থেকে রাস্তায় আছেন তাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিপক্ষে যেকোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করার অধিকার তার আছে। অপর পক্ষে যিনিই থাকুন না কেন। এমনকি নিজের চাচা ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তার অনেক কাজের সমালোচনা করে পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। আপন চাচার বিরুদ্ধে পত্রিকায় লিখে প্রতিবাদ করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে পড়াকালীন ড. মুনতাসীর মামুন আমাদের দ্বিতীয়বর্ষে ইডরোপের ইতিহাস পড়াতেন। ক্লাসে রেনেসাঁ পড়ানোর সময় বলেছিলেন ইতিহাস পড়তে হলে ধর্মকে সব কিছুর ওপরে রাখতে হবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে ইতিহাসকে মিলিয়ে নিলে ইতিহাস বুঝতে সমস্যা হবে। তখন বিষয়টি বুঝতে পারিনি। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে বিষয়টি অনুধাবন করেছি। ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের তত্ত্বাবধানে ‘যুদ্ধাপরাধ বিচার আন্দোলন (১৯৭১-২০১২)’ নিয়ে গবেষণা কাজ করতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধী বিচারের আন্দোলনে সাহসী মুনতাসীর মামুনের অবদান সম্পর্কে জানতে পারি। তিনি এই আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য যেমন অবিরাম লিখেছেন, তেমনি মাঠের আন্দোলনে থেকেছেন সক্রিয়। আমার মতো অনেক তরুণকে মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবির লেখনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

মুনতাসীর মামুন বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন। ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে মুনতাসীর মামুনের লেখালেখি বিষয়ে ১২টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও মুনতাসীর মামুনের লেখালেখি ও অন্য অনেক বিষয় বাকি রয়ে গেছে। আমার মনে হয়েছে শুধু লেখালেখি নয়, আন্দোলন ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা মুনতাসীর মামুনের আজকের মুনতাসীর মামুন হয়ে ওঠার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি লেখালেখির জন্য বিএনপি জোট সরকারের সময়ে ২০০২ সালে কারাবরণ করেন।

ছাত্রাবস্থায় অধ্যাপক মামুন আমাদের বলেছিলেন সামাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এমন হয়েছে যে, এখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি বা সেনাবাহিনী প্রধান হতে পারবেন না, বা হতে দেয়া হবে না। তখন মাত্র দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তাই এত কিছু বুঝতে পারিনি। পরবর্তীকালে অবশ্য মুনতাসীর মামুনদের লেখালেখি ও দাবির ফলেই বঙ্গবন্ধুকন্যার সময়ে একজন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এই উদ্যোগটি সত্যিই প্রশংসনীয়।

এরপর ছাত্রজীবন শেষে এম ফিল করার সময়ে স্যারের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয়। তখন একদিন খুলনায় গিয়েছি একটি কাজে। আমাদের এক সহপাঠী আমাকে জড়িয়ে ধরে কুশলাদি জানার পর মামুন স্যার কেমন আছেন জানতে চাইল। আমি একটু আশ্চর্য হলাম। সবাই যেখানে স্যারকে ভয় পায় সেখানে সে স্যারের খবর নিচ্ছে! কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই বলল যে, মামুন স্যারের ট্রাস্টের টাকায় পড়ালেখা করে আজ সে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার। মুনতাসীর মামুন স্যার যে বিভাগের দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের নিজের ট্রাস্টের টাকায় পড়াতেন তা ছাত্রাবস্থায় জানতেই পারিনি। স্যারকে যখন বিষয়টি জিজ্ঞেস করলাম তখন তিনি বললেন, আমি কি মানুষকে জানানোর জন্য এসব করি যে তোমাদের বলব।

অন্য আরেকদিন স্যারের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় মুক্তিযুদ্ধ কোষের কাজ করছি এই সময়ে একজন মহিলা সঙ্গে একটি মেয়েকে নিয়ে স্যারের বাসায় ঢুকলেন। স্যারকে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করছেন। স্যার বললেন, সব ঠিক আছে ‘বিজনেস টক’ করো, বিষয় কী বলো। মহিলা মেয়ের পরীক্ষার ফিস জমা দিতে হবে বলে জানালেন। স্যার সঙ্গে সঙ্গে টাকা দিয়ে দিলেন। আমি তাকিয়ে আছি দেখে মহিলা জানালেন যে, তার এই মেয়েটিকে স্যার পড়াচ্ছেন। পরে জানতে পারলাম এই মহিলা শিক্ষকদের কোয়ার্টারের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। মুনতাসীর মামুন-ফাতেমা ট্রাস্টের মাধ্যমে মুনতাসীর মামুন গরিব ছাত্রছাত্রীদের পড়াতেন যা পরবর্তীকালে কাজের সুবাদে জানতে পেরেছিল। এ তো গেল মানবিক দিকের কিছু।

এখন আমার দেখা সাহসী মুনতাসীর মামুন সম্পর্কে কিছু কথা বলব। স্যারের সঙ্গে কাজ ও এম ফিল করার সুবাদে বেশি সময় থাকা হতো তার সঙ্গে। এই সুযোগে নির্মূল কমিটির বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে যেতাম। মামুন স্যার যখন বক্তৃতা করতে মঞ্চে ওঠেন, তখন দর্শক সারিতে একটু নড়াচড়া শুরু হয়ে যায়। কেন এমন হয় বুঝতে কিছু সময় লেগেছিল। মামুন স্যার বক্তৃতায় এমন কিছু কথা বলবেন যে, তা অনেকের বলার সাহস নেই বা বলতে চান না। কিন্তু কোনো অন্যায় হলে সেটার প্রতিবাদ তিনি দৃঢ়কণ্ঠে করবেন এটা সবাই জানত তাই আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে থাকতেন। তিনি সব সময় দর্শক-শ্রোতার মন বুঝে বক্তৃতা করেন বলে মনে হয়েছে। কারণ কখনই অযথা বক্তৃতা দীর্ঘ করেন না। যা প্রয়োজন তাই বলে শেষ করেন।

মুনতাসীর মামুনের বক্তৃতায় একটা বিষয় সুম্পষ্ট করে বলেন যে, ১৯৬৮ সাল থেকে রাস্তায় আছেন তাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিপক্ষে যেকোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করার অধিকার তার আছে। অপর পক্ষে যিনিই থাকুন না কেন। এমনকি নিজের চাচা ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তার অনেক কাজের সমালোচনা করে পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। আপন চাচার বিরুদ্ধে পত্রিকায় লিখে প্রতিবাদ করা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি সামরিক সরকার, জোট সরকার বা বর্তমান সরকারের যেসব সিদ্ধান্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে গিয়েছে বলে মনে করেছেন তখনই দৃঢ়ভাবে পত্রিকায় লিখে বা বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন।

অনেকের মতো তিনি শুধু এসি রুমে বসে বক্তৃতা করে বা ক্লাস নিয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি, বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে রাজপথে থেকে দাবি আদায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার এই সাহস ও আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা আমাদের মতো অনেক তরুণকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে উজ্জীবিত করেছে। তার পরিবার মানস গঠনে সহায়তা করলেও পরিবারের পরিচয়ে তিনি পরিচিত হননি।

পরিবারকে পিছনে রেখে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান করে নিয়েছেন। পিতৃব্য ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের স্নেহ পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু নিজের কর্মগুণে তাদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছিলেন। যদিও একটি লেখায় মুনতাসীর মামুনের আন্দোলন ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে অবদান তুলে ধরা সম্ভব নয়। তারপরও এই লেখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে মানবিক ও সাহসী মুনতাসীর মামুনের ভূমিকা কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র।

৭২তম জন্মদিনে আপনাকে অনেক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা স্যার! জাতিকে আপনার আরও অনেক কিছু দেয়ার আছে। আপনার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

লেখক: গবেষক-প্রবন্ধকার। সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
মহাকালজয়ী মহানায়কের জন্মদিন
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শিক্ষাসামগ্রী বিতরণের কর্মসূচি
ক্ষতিপূরণ বাদে মুনতাসির মামুনের বিরুদ্ধে মামলা চলবে
প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে উপহার বিতরণ
৭১টি লাল গোলাপে মোদিকে হাসিনার শুভেচ্ছা

মন্তব্য

মতামত
Let the Padma bridge be named after the river

পদ্মা সেতু নদীর নামেই হোক

পদ্মা সেতু নদীর নামেই হোক
শেখ হাসিনা এখনও দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যতদিন বেঁচে থাকবেন মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন, এটা তার প্রত্যয়। তার সামনে আরও অনেক সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে মানুষের জন্য আরও বৃহত্তর কল্যাণের পথ প্রশস্ত করার। তার কাছে মানুষের প্রত্যাশার ইতি ঘটেনি। তাই তাকে তার মতো চলতে দেয়াই ভালো। তার নামে পদ্মা সেতুর নামকরণ করার প্রস্তাব তাকে সমালোচনার মুখে ঠেলে দেয়ারই নামান্তর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের নামে পদ্মা সেতুর নাম চান না। এমনকি শেখ রেহানা চান না বলেও জানা গেছে।

আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষায়। জুনের শেষ সপ্তাহে উদ্বোধন করা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নামে পদ্মা সেতুর নামকরণ চান না। এটা তিনি আগেও বলেছেন। এটা তার বড় ও উদার মনের পরিচয় বহন করে। তারপরও একশ্রেণির মানুষ পদ্মা সেতুর নাম শেখ হাসিনার নামে রাখার আবদার করে চলেছেন। বলা হচ্ছে, সর্বস্তরের মানুষ শেখ হাসিনার নামে পদ্মা সেতুর নাম চাচ্ছে। এটা কোনোভাবেই ঠিক নয়। অমর শিল্পী মান্না দে’র গাওয়া সে গানটিই হোক পাথেয় “হৃদয়ে লেখ নাম সে নাম রয়ে যাবে”। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নাম এদেশের মানুষের হৃদয়ে লেখা আছে এবং থাকবে। যতদিন বাঙালি থাকবে, বাংলা ভাষা থাকবে এবং তা থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

এটা কেউ অস্বীকার করবে না এবং সবাই জানেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপেই এই পদ্মা সেতু স্বপ্ন থেকে আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু নিশ্চয়ই শেখ হাসিনার সাহসের ফসল। তারপরও এই সেতুর নাম পদ্মা সেতু রাখাই যুক্তিযুক্ত। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিই তো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও সাহসের ফসল। বঙ্গবন্ধু যেমন আছেন আমাদের রক্ত পতাকায়। বাংলাদেশের পতাকায় আমরা সব সময় বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। বাংলাদেশের প্রতিটি পথে-প্রান্তরে, বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে আমরা বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পাই, যেমনটা বাংলাদেশের সব পথ আজ মিশেছে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়ায়। যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিনই বাংলার মানুষ দেখতে পাবে বঙ্গবন্ধুকে।

বাংলাদেশের এই যে অদম্য যাত্রা তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান। সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এক সময় চাঙা হয়ে ওঠেন; নতুন করে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে ওঠেন। তখন শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই নেতা-কর্মীরা কাউন্সিলের মাধ্যমে তাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করে।

স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্রের হাতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কালো অন্ধকার গ্রাস করেছিল, সেই অন্ধকার তাড়াতে প্রথম আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন তিনি। সে মশাল, প্রাথমিক সংকট- সীমাবদ্ধতার পর দিকে দিকে আলোকিত করতে থাকে, শুরু হয় রাহু মুক্তির পালা।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক কল্যাণ, বিকাশ এবং মুক্তির লক্ষ্যে অগ্রণী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের জন্য তার বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার সততা, নিষ্ঠা, যুক্তিবাদী মানসিকতা, দৃঢ় মনোবল, প্রজ্ঞা এবং অসাধারণ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্ব অঙ্গনে এক ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে । পিতার মতোই তিনি বিশ্ববিখ্যাত নেতা হিসেবে পরিচিত।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাহসী কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরামহীনভাবে নিরন্তর জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার অদম্য শক্তি, সাহস, মনোবল এবং দঢ় নেতৃত্বে ‘বিশ্ব অবাক তাকিয়ে রয়’। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৯তম এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ২৩তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ একটি ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে এবং ২০৪১ সালে একটি ‘উন্নত দেশ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে তার বড় প্রমাণ হলেঅ গত কয়েক বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বর্তমান মাথাপিছু আয় ২,৮২৪। অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষদেশগুলোর মধ্যে একটি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪টি মাইলফলক দিয়েছেন প্রথমটি হলো- ডিজিটাল বাংলাদেশ যা ইতোমধ্যে একটি পর্যায়ে এসেছে, দ্বিতীয়টি, ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট (এসডিজি) অর্জন করা, তৃতীয়টি, ২০৪১ সালে একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার এবং চতুর্থটি, ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন।

গত চার দশকে তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য লড়াই করেছেন। সংগ্রামের এই গতিপথ ছিল প্রতিকূল। শেখ হাসিনা, যিনি অলৌকিকভাবে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় বেঁচে গিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত উনয়ন প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ৩৯টি হাই-টেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মিত হচ্ছে।

কৃষি-শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, আধুনিক প্রযুক্তি সবকিছুর অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে নতুন পরিকল্পনা, চিন্তাভাবনা করতে হবে। বাংলাদেশকে আমূল বদলে যাচ্ছে টেকসই উন্নয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এদেশ। দুর্বল, অনুন্নত, নড়বড়ে অবস্থা থেকে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। প্রচলিত অবকাঠামোর আধুনিক রূপান্তর সম্ভাবনার নতুন দিক উন্মোচন করছে প্রতিদিন। যেসব খাত কিংবা ব্যবসা আগে অবহেলিত অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে চলছিল সেগুলোতে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। অমিত সম্ভাবনার হাতছানি এদেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত, আগ্রহী করে তুলছে। অবহেলা-অযত্নে লালিত সেই সম্ভাবনাময় খাতগুলো ক্রমেই জেগে উঠছে।

সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ, দপ্তর, মন্ত্রণালয়গুলো সময়ে সময়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। ফলে সম্ভাবনার নতুন খাতের বিকাশ ঘটে চলেছে। সম্ভানাময় নতুন খাতগুলো বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনে, অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় বেশ শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের মানুষ কোনোভাবেই অক্ষম-দুর্বল, মেধাহীন নয়। তারা অনেক পরিশ্রম করতে পারে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষ যারা এর আগে বেকারত্ব, দারিদ্র্য, আর অসহায়ত্বের বেড়াজালে নিজেদের বন্দি করে রেখেছিল, তারা এখন নিজের মেধা-বুদ্ধিমত্তা, শক্তি-সাহস, পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে সম্ভাবনার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নিজেই নিজের ভাগ্য নতুনভাবে গড়ে তুলছেন। এভাবে সবার সম্মিলিত উদ্যোগে পাল্টে যাচ্ছে বিভিন্ন এলাকা, জনপদের চিত্র। সম্ভাবনার উজ্জ্বল চমক দ্যুতি ছড়াচ্ছে দেশজুড়ে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জন অবিশ্বাস্য রকমের। বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ বর্তমানে ৪১তম স্থানে উঠে এসেছে।

এই পদ্মা সেতু যাতে না হতে পারে তার জন্য অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করেছেন। বিশ্ব ব্যাংক তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে গোটা জাতিকে হতাশায় ফেলে দেয়। কিন্তু সমগ্র জাতিকে অবাক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করবেন। তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই আমাদের বঙ্গবন্ধুকন্যা। বাংলাদেশে যখন সংকট তীব্র হয়, যখন সবকিছু আবর্তিত হয় অনিশ্চয়তায়, বাংলার আকাশে কালো মেঘ জমে থাকে, তখন শেখ হাসিনাই আমাদের শেষ ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়ান। একজন ব্যক্তি অদম্য সংকল্প এবং কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে ভয়ের কালো মেঘকে সরিয়ে দেন, দেশের মানুষ আশার আলো দেখে। যখনই মনে হয় যে সবকিছু শেষ হয়ে আসছে, তখন আমরা খারাপ সময়টির মুখোমুখি হই, তবে একজন ত্রাণকর্তাই দক্ষতার সঙ্গে দুঃস্বপ্নটি সরিয়ে ফেলেন তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী।

অতিভক্তি ভালো নয়। শেখ হাসিনাকে যারা ভালোবাসেন তারা কেন একটি স্থাপনার নামের মধ্যে তাকে সীমিত করতে চান। শেখ হাসিনা এখনও দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যতদিন বেঁচে থাকবেন মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন, এটা তার প্রত্যয়। তার সামনে আরও অনেক সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে মানুষের জন্য আরও বৃহত্তর কল্যাণের পথ প্রশস্ত করার। তার কাছে মানুষের প্রত্যাশার ইতি ঘটেনি। তাই তাকে তার মতো চলতে দেয়াই ভালো। তার নামে পদ্মা সেতুর নামকরণ করার প্রস্তাব তাকে সমালোচনার মুখে ঠেলে দেয়ারই নামান্তর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের নামে পদ্মা সেতুর নাম চান না। এমনকি শেখ রেহানা চান না বলেও জানা গেছে।

গণতন্ত্রকে সুসংগঠিত করতে বাংলার পথ-প্রান্তর চষে বেড়িয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। গত ৫০ বছরে সবচেয়ে সৎ রাজনীতিকের নাম শেখ হাসিনা। তিনি না ফিরলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হতো না। জয় বাংলা জাতীয় স্লোগান হয়েছে। নয়তো অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়া সম্ভব হতো না। তিনি না থাকলে নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু হতো না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে পাথর বিছানো পথ, তাই সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেই সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে বাংলাদেশকে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষের সবচেয়ে বড় উপহার পদ্মা সেতু। এটি শুধু পদ্মা পারাপারের সেতুই নয়, এটি বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাস এমন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করেছে যে, আমরা যেকোনো অসাধ্য সাধন করতে পারি। আর এই আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছেন আমাদের সময়ের সাহসী প্রধানমন্ত্রী। পিতা দিয়েছেন দেশের স্বাধীনতা আর কন্যা দিলেন সমৃদ্ধি, ঘর-বারান্দা চলাচলের পথ সাজিয়ে দিচ্ছেন। গ্রাম যাচ্ছে নাগরিক জীবনে।

তিনি সাহসিকতার সঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা করছেন এখনও, এখন এটি বিশ্বের সেরা উদাহরণ এবং বিশ্ব নেতারা বিশ্বব্যাপী সংকট পরিচালনার জন্য তার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে তার সাহসকে আরও অদম্য করে তুলেছে। নামকরণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জোর দবরদস্তি করা ঠিক হবে না পদ্মা সেতু নদীর নামেই থাকুক।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আরও পড়ুন:
নাম পদ্মা সেতুই
পদ্মা সেতু খুলছে ২৫ জুন
পদ্মা সেতু উদ্বোধন জুনের শেষ সপ্তাহে
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের অর্থ খালেদার মৃত্যু কামনা নয়: কাদের
আমার বিষয়ে করা মন্তব্য তথ্যভিত্তিক নয়: মাহফুজ আনাম

মন্তব্য

মতামত
Julio Curie Medal Bangabandhus first international recognition

জুলিও কুরি পদক: বঙ্গবন্ধুর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

জুলিও কুরি পদক: বঙ্গবন্ধুর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
বিশ্বের শান্তির জন্য সর্বোচ্চ পদক হলো ‘জুলিও কুরি’ পদক। বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিরাই এ পুরস্কার পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ছাড়াও এ বিরল সম্মান অর্জন করেছেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, চিলির সালভেদর আলেন্দে, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, ভিয়েতনামের হো চি মিন, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, কবি ও রাজনীতিবিদ পাবলো নেরুদা, মার্টিন লুথার কিং।

স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ছিল সংগ্রামের। তিনি ছাত্র অবস্থায়ই রাজনীতি-সচেতন ছিলেন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে এসে জড়িয়ে পড়েছিলেন সক্রিয় রাজনীতিতে। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের একজন অতি উৎসাহী কর্মী ছিলেন, কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শাসকগোষ্ঠীর বাঙালিবিরোধী তথা গণবিরোধী ভূমিকার কারণে অবস্থান পরিবর্তন করতে দেরি করেননি। তিনি ছিলেন ন্যায়ের পক্ষে, জুলুমের বিরুদ্ধে। তার জীবন নিবেদিত ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নানামুখী তৎপরতায়। নিজের জীবনের সুখ-শান্তি হেলায় উপেক্ষা করেছেন। বাংলার মানুষের দুঃখ মোচনের লড়াইয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে ছিলেন বলেই তিনি ১৯৬৯ সালেই হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। তার দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। জনরায়ে তারই হওয়ার কথা পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রথম প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর নেতা ইয়াহিয়া খান বাঙালির হাতে শাসনক্ষমতা অর্পণ না করে চাপিয়ে দেয় এক বর্বর যুদ্ধ।

গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামী নেতা শেখ মুজিবকে বাধ্য হয়েই যুদ্ধের মোকাবিলায় ডাক দিতে হয় জনযুদ্ধের, স্বাধীনতা যুদ্ধের। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অকৃত্রিম বন্ধুর মতো বাংলাদেশের মুক্তিপাগল মানুষের পক্ষে দাঁড়ান। বাংলাদেশ পায় সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কারাগারে বন্দি থেকেও হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা। তার নামেই চলে ৯ মাসের অসম সাহসী যুদ্ধ এবং তার প্রেরণাতেই ঘটে যুদ্ধজয়। বন্দি মুজিব বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কাড়েন। তার সাহস, মনোবল এবং মানুষের প্রতি তার দরদের কথা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বেই।

নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির টানাপড়েনে কোন দিকে যাবে তা নিয়ে যখন অনেকের মনেই সংশয় ছিল, তখন বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে তার রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে, তিনি সমাজতন্ত্রের পক্ষে, তিনি বিশ্ব শান্তির পক্ষে। ‘কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ ছিল বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু যারা যুদ্ধবাজ, যারা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে পছন্দ করে, তাদের ব্যাপারে কোনো নমনীয়তা ছিল না বঙ্গবন্ধুর।

শান্তি আন্দোলনের প্রতি শেখ মুজিব আগ্রহী ছিলেন বরাবরই। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন কারাগারে। মুক্তি পান ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ওই বছরই অক্টোবরে চীনে অনুষ্ঠিত হয় ‘পিস কনফারেন্স অফ দ্য এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিওনস’। বঙ্গবন্ধু ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন আরও কয়েকজনের সঙ্গে। ৩৭টি দেশ থেকে আগত শান্তি আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে তার কথা বলা বা মতবিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল। তার সফর অভিজ্ঞতার কথা ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন।

১৯৫৬ সালের ৫-৯ এপ্রিল স্টকহোমে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘বিশ্ব শান্তি আমার জীবনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনো স্থানেই হোক না কেন, তাঁদের সঙ্গে আমি রয়েছি। আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।’

বঙ্গবন্ধুর সরকারের দৃঢ় অবস্থান ছিল কোনো সামরিক জোটে যোগ না দেয়া। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘আমরা সর্বপ্রকার অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবর্তে দুনিয়ার সকল শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে বিশ্বাসী বলেই বিশ্বের সব দেশ ও জাতির বন্ধুত্ব কামনা করি। সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এই নীতিতে আমরা আস্থাশীল। তাই সামরিক জোটগুলোর বাইরে থেকে সক্রিয় নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি আমরা অনুসরণ করে চলেছি।’

১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোয় বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্সিয়াল কমিটির সভায় বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলন এবং বিশ্ব শান্তির সপক্ষে বঙ্গবন্ধুর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক প্রদানের জন্য শান্তি পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। বিশ্বের ১৪০ দেশের শান্তি পরিষদের ২০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

জুলিও কুরি হচ্ছে বিশ্ব শান্তি পরিষদের একটি সম্মানজনক পদক। ফরাসি পদার্থ বিজ্ঞানী জঁ ফ্রেডরিক জুলিও কুরি ১৯৫৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার স্ত্রীর নাম ইরেন কুরি। তারা দুজনেই নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী। ইরিনার মা-বাবাও নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী দম্পতি পিয়েরে কুরি ও মাদাম কুরি। পরে বিশ্ব শান্তি পরিষদ তাদের শান্তি পদকের নাম ১৯৫৯ সাল থেকে রাখে ‘জুলিও কুরি’।

বিশ্বের শান্তির জন্য সর্বোচ্চ পদক হলো ‘জুলিও কুরি’ পদক। বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিরাই এ পুরস্কার পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ছাড়াও এ বিরল সম্মান অর্জন করেছেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, চিলির সালভেদর আলেন্দে, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, ভিয়েতনামের হো চি মিন, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, কবি ও রাজনীতিবিদ পাবলো নেরুদা, মার্টিন লুথার কিং।

১৯৭৩ সালের ২৩ মে ঢাকায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রতিনিধিরা যোগদান করেন। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিশ্ব শান্তি পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশ্ব শান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশ চন্দ্র বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি পদক প্রদান করেন এবং বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।’ সেদিন থেকেই বাঙালি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিব।

অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এ সম্মান কোনো ব্যক্তিবিশেষের জন্য নয়। এ সম্মান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মদানকারী শহীদদের, স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানীদের। জুলিও কুরি শান্তি পদক সমগ্র বাঙালি জাতির।’

বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের উত্থান আর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ষড়যন্ত্রের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধিতা করে বিশ্ব পরাশক্তির একাংশের যে অমানবিক অবস্থান, তার পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বৃহৎ শক্তিবর্গ, বিশেষভাবে আগ্রাসীনীতির অনুসারী কতিপয় মহাশক্তির অস্ত্রসজ্জা, তথা অস্ত্র প্রতিযোগিতার ফলে আজ এক সংকটজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তার প্রতিক্রিয়া নিজেই দেখেছেন। সে সময় তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দুস্থ ও অনাহারীদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে গেছেন। সেই অভিজ্ঞতা তার আছে। তাই তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই, অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয়িত অর্থ দুনিয়ার দুঃখী মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যয় করা হোক। তাহলে পৃথিবী থেকে দারিদ্র্যের অভিশাপ মুছে ফেলার কাজ অনেক সহজসাধ্য হবে।’ এটি তার প্রত্যাশাই শুধু নয়, নিজের ক্ষুদ্র সামর্থ্যে এগিয়ে আসাও। তাই স্বাধীনতার পর তিনি প্রথমে জোর দিয়েছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ওপর।

বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে। তিনি এটাও বলেছিলেন, প্রয়োজনে আলেন্দের পরিণতি বরণ করব, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করব না।

বঙ্গবন্ধু তার কথা রেখেছেন। তিনি জীবন দিয়েছেন কিন্তু আপসের পথে হাঁটেননি। বঙ্গবন্ধু শরীরী উপস্থিতি আমাদের সঙ্গে নেই। কিন্তু তার আদর্শ আছে। যদিও এখন বিশ্বব্যাপী রাজনীতির ধরন এবং প্রেক্ষাপট অনেক বদলেছে। শোষিতের পক্ষের বিশ্বশক্তি দুর্বল। যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযেগিতা চলছে। শান্তির ললিত বাণী পরিহাসের মতো শোনায়। তার পরও বলতে ইচ্ছে হয়, হাল ছেড়ো না বন্ধু...

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তির দিনে তার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
‘মুজিব’ ট্রেলার নিয়ে বিতর্কের ঝড়
জাতির পিতার সমাধিতে গৌতম ঘোষের শ্রদ্ধা
‘কলকাতায় বঙ্গবন্ধু’ তথ্যচিত্র বানাচ্ছেন গৌতম ঘোষ
সন্‌জীদার হাতে ‘পদ্মশ্রী’
‘পল্লীবন্ধু’ পদক পেয়ে এরশাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ জাফরুল্লাহ

মন্তব্য

মতামত
The Julio Curie Medal takes the country to unique heights

জুলিও কুরি পদক দেশকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়

জুলিও কুরি পদক দেশকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়
১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই পদকপ্রাপ্ত ৪৮তম রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে ১৪০টি দেশের ২০০ প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধুকে এই বিরল সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিলে ১৯৭৩-এর ২৩ মে ২৩তম এশীয় শান্তি সম্মেলনের এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে সেই পদক পরিয়ে দিয়েছিলেন সংস্থার সে সময়ের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র। অনুষ্ঠানে রমেশ চন্দ্র বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার মহানায়ক নন, তিনি সারা বিশ্বের, বিধায় বিশ্ববন্ধু।’

২৩ মে যে আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, সে কথাটি আজ অনেকেরই স্মৃতির অন্তরালে চলে গেছে। অথচ ১৯৭৩ সালের সেই দিনটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পেয়েছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মাননা পদক। পঞ্চাশের দশকে শান্তির জন্য নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক জোলিও এবং তার স্ত্রী ইরেন কুরির নাম অনুসারে ১৯৫৯ সালে বিশ্ব শান্তি পরিষদ তাদের শান্তির জন্য প্রদেয় পদকের নামকরণ করেন এই বিজ্ঞানী দম্পতির নামে, ১৯৫৮ সালে ফ্রেডেরিক জোলিওর প্রয়াণের পর। উভয়ে যৌথভাবে নোবেল বিজয়ী এই দম্পতি শুধু বিজ্ঞান চর্চাই অবদান রাখেননি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে গোটা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেন। ফ্রেডেরিকের একান্ত প্রচেষ্টায় গঠিত এই বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রথম সভাপতি তিনি নিজেই ছিলেন।

এই দম্পতি নোবেলপ্রাপ্তির সঙ্গে যে অর্থ পেয়েছিলেন, তা দিয়েই বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের পদক প্রদান শুরু হয় ১৯৫০ সাল থেকে, যা ১৯৫৮ সালে ফ্রেডেরিকের মৃত্যুর পরও চলতে থাকে। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যেসব মহান ব্যক্তির হাতে এ পদক দেয়া হয় তাদের মধ্যে ছিলেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ভিয়েতনাম মুক্তির নায়ক হো চি মিন, চিলির সালভাদর আয়েন্দে, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত প্রমুখ। এরা সবাই সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছিলেন।

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই পদকপ্রাপ্ত ৪৮তম রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে ১৪০টি দেশের ২০০ প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধুকে এই বিরল সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিলে ১৯৭৩-এর ২৩ মে ২৩তম এশীয় শান্তি সম্মেলনের এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে সেই পদক পরিয়ে দিয়েছিলেন সংস্থার সে সময়ের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র। অনুষ্ঠানে রমেশ চন্দ্র বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার মহানায়ক নন, তিনি সারা বিশ্বের, বিধায় বিশ্ববন্ধু।’ এভাবেই একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানেই বঙ্গবন্ধু বিশ্ববন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের পর এই পদককে দ্বিতীয় শীর্ষ আন্তর্জাতিক পদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর সেই বিরল সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন আমাদের জাতির পিতা, ঠিক আমাদের স্বাধীনতার পর পরই, যা জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থানকে অনেক গৌরবময় করে তুলেছিল।

বঙ্গবন্ধুকে এ পদক প্রদানের জন্য শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার নেতৃত্বের কথাই বিবেচনায় নেয়া হয়নি, বিশ্ব সভাগুলোয় গোটা মানবজাতির জন্য তার ভাষণ এবং অবদানের কথাও বিবেচনায় আনা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে, ১৯৭৩-এ জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে এবং কমনওয়েলথ সম্মেলনে তার ভাষণগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেছিল শান্তি পরিষদ।

এসব আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত, যথা শাসক এবং শোষিতের মধ্যে, আর তিনি শোষিতের পক্ষে। বঙ্গবন্ধুর সেই মন্তব্য তাকে এক বিশেষ গুরুত্ববাহী দার্শনিকের পর্যায়ভুক্ত করে দিয়েছিল। তিনি শুধু কথার মধ্যেই তার প্রচেষ্টা সীমিত রাখেননি, তার নীতির প্রতিফলন ঘটিয়ে ছিলেন মুক্তিকামী ফিলিস্তিনি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোর জনগণকে সমর্থন প্রদান করে। আগে ভিয়েতনাম যুদ্ধেও তিনি সে দেশের যুদ্ধরত জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

১৯৪৫ সালে ভারত বিভাগের আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের সময়, যাতে বঙ্গভূমিতে কমবেশি ১০ লাখ লোক অনাহারে মৃত্যুবরণ করে, তখন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবের ভূমিকা ছিল অসাধারণ, যা বহু রাজনৈতিক নেতাও করতে পারেননি। সিভিল সাপ্লাই-মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন ভারতের অন্যান্য এলাকা থেকে খাদ্য আনতে। তিনি নিজ উদ্যোগে অনেক লঙ্গরখানা খুলে বহু বুভুক্ষু মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে পেরেছিলেন। নিজের লেখাপড়াকে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেছেন দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত মানুষের পক্ষে।

সোহরাওয়ার্দী সে সময়ের তরুণ শেখ মুজিবের ভূমিকা দেখে অবাক হয়েছিলেন। একই ধরনের বলিষ্ঠতা নিয়ে তিনি ১৯৪৫-এ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সে সময়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের নামে যে হত্যাযজ্ঞের উদ্ভব হয়েছিল, তা প্রতিরোধ করতে; তখনও তিনি লেখাপড়া বাদ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সাম্প্রদায়িক দস্যুদের প্রতিহত করার লক্ষ্যে। তিনি এমনকি বাংলাভূমির বাইরেও বিচরণ করেছেন দাঙ্গা বন্ধের উদ্দেশ্যে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর বহুদিন সোহরাওয়ার্দী পশ্চিম বাংলায়ই থেকে গিয়েছিলেন, জিন্না-লিয়াকত আলি-নাজিমুদ্দিন গংয়ের ষড়যন্ত্রের ভিকটিম হয়ে। তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবও বহু সময় পাকিস্তান আসেননি। একসময় তিনি সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে পাকিস্তান যাওয়ার পরামর্শ দিলে সোহরাওয়ার্দী সাহেব তার অনিচ্ছা প্রকাশ করে বরং তরুণ নেতা শেখ মুজিবকে বলেছিলেন পূর্ব বাংলায় চলে গিয়ে সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধে ভূমিকা রাখতে। বলেছিলেন, হিন্দুরা যেন পূর্ব বাংলা ছেড়ে ভারতে পাড়ি না জমায় সেদিকে খেয়াল রাখতে।

ভারত বিভাগের পর তিনি অন্তত দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা ভাষণ দিয়েছিলেন। এর একটি ছিল ১৯৫২ সালে চীনে অনুষ্ঠিত ‘পিস কনফারেন্স অফ দ্য এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিওনাল’ আর অন্যটি ছিল ১৯৫৬ সালের এপ্রিলে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি পরিষদের সম্মেলন। স্টকহোম সম্মেলনে সবার দৃষ্টি কেড়ে এই তরুণ নেতা বলেছিলে- ‘বিশ্ব শান্তি আমার জীবনের মূল নীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত এবং স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনো স্থানেই হোক না কেন, তাদের সঙ্গে আমি রয়েছি, আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।’

তখন সবার মুখেই একটি বাক্য প্রতিধ্বনিত হয়েছে, তা ছিল এই যে লর্ড বার্ট্রান্ড রাসেলের পর এ ধরনের ভাষণ আর কেউ দেননি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি আমলের সিয়াটো-চুক্তি বর্জন করে জোট নিরপেক্ষ নীতির পথ ধরেছিলেন। বিশ্ব তখন একদিকে ন্যাটো, সিয়াটো, সেন্টো নামক তিনটি মার্কিন প্রভাবিত শিবির এবং অপরদিকে ওয়ারস নামক সোভিয়েত ব্লকের চুক্তিতে বিভক্ত ছিল। এদের কাজ ছিল বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রসহ আরও অধিক সমরাস্ত্র উৎপাদন করে বিশ্বে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।

বঙ্গবন্ধু সমরাস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করে, পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার থামিয়ে বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদনে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে, শান্তিকামী মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। যে কারণে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সে সময়ের বিশ্বকাঁপানো নেতৃবৃন্দ, যথা ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ইন্দিরা গান্ধী, নায়ারেয়ার, মার্শাল টিটো, বুমেদিন, ইয়াসির আরাফাত প্রমুখের চোখের মধ্যমণিতে পরিণত হয়েছিলেন। নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির জন্য তার দাবি সবার কানে পৌঁছেছিল।

যে ব্যক্তি বিশ্ব মানবতার বিজয়ের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, জোলিও কুরি পুরস্কার তার অবশ্যই প্রাপ্য ছিল। বেঁচে থাকলে তিনি নোবেলও পেতে পারতেন, অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বিরোধিতা করত।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।

আরও পড়ুন:
গৌতম ঘোষের ক্যামেরায় কথা বলবেন শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করবে সশস্ত্র বাহিনী
এ দিন বিশ্ববাসীর সামনে প্রথম পিতা হত্যার বিচারের দাবি তোলেন শেখ রেহানা
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ইইডির প্রধান প্রকৌশলীর শ্রদ্ধা
সব ইউপিতে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপনের নির্দেশ

মন্তব্য

মতামত
Fundamental rights must ensure medical care

মৌলিক অধিকার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে

মৌলিক অধিকার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে
বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সমুদ্র চুরির খতিয়ান তো নানা সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে আসছে। মানুষ এসব খবর পায় ও ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু এ সংবাদটি পায় না যে, এসব দুর্নীতিবাজ বিচারের আওতায় এলো কি না। বরং এ তথ্য ভেসে আসে চিহ্নিত অনেক দুর্নীতিবাজ পুরস্কৃত হয় এবং নতুনভাবে দুর্নীতি করার মওকা খুঁজে নেয়। এভাবে দুর্নীতিবাজ বড় নেতা বা আমলা ফুলে ফেঁপে বেলুন হয়ে এক সুন্দর সকালে কানাডা, সুইজারল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাবে।

স্বাধীনতা-উত্তর বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন জরুরি ছিল। তাই উন্নয়নের অনেক বেশি প্রত্যাশা অনেকেই করেনি। ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশে বিএনপি, আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি দীর্ঘ সময় ধরে শাসন ক্ষমতায় ছিল। এসময়ে একটি পরিবর্তন প্রত্যাশিত ছিল। বড় বড় বিলাসি বেসরকারি হাসপাতাল আর ডায়গনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স দিয়েছে ঠিকই কিন্তু সরকারি হাসপাতালের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন আর বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যয়ের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের সমন্বয়ের কথা কোনো সরকার পক্ষই ভাবেনি।

রাজনীতি অঞ্চলের ক্ষমতাশালী মানুষ, সরকার পরিচালক ও ধনীক শ্রেণি সামান্য অসুখেও ছুটে যান থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে। এরা নিজেরাই যেখানে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আস্থাশীল না হয়ে দেশান্তরী হন তা হলে আসল সংকটটি অনুধাবন করবেন কেমন করে! চিকিৎসা ক্ষেত্রে উন্নতিইবা হবে কীভাবে! হয়তো ভাবেন আমরা নিরাপদে থাকি পচনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষ মরুক বা বাঁচুক তা দেখার দায় কি আমাদের!

গণশক্তি এবং জনমন তুষ্টি বিষয়টি আমলে না এনে রাজনৈতিক পান্ডাদের পেশি শক্তির ওপর নির্ভরতা যেদিন থেকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশেষ জায়গা করে নিল সেদিন থেকে রাষ্ট্রের সব জায়গায় প্রশাসনের সকল রন্ধ্রে দুর্নীতির নিশ্চিন্ত আশ্রয় হলো।

দুর্নীতিবাজরা রাজনৈতিক সরকারকে নিজেদের উপর নির্ভরশীল করে তোলে। ক্ষমতাপ্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের ক্ষমতায় পৌঁছার সিঁড়ি হিসেবে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। তাই হাজার অন্যায় করলেও এদের সাতখুন মাফ হয়ে যায়। একারণে স্বাস্থ্য খাত থেকে শুরু করে দেশের সব খাতেই দুর্নীতিবাজরা সব অন্তঃসারশূন্য করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষমতাবান নেতা ও সব ধরনের প্রশাসনে দুর্নীতির ভাইরাস করোনার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় করোনাকালে এসে আমাদের অত্যন্ত আতঙ্কের সঙ্গে দুর্নীতি-আক্রান্ত স্বাস্থ্য খাতের দুর্দশা দেখতে হয়েছে।

এখন করোনার প্রকোপ কমে গেলেও দুর্নীতির ভাইরাস আরও শক্তিমান হয়েছে। দুর্ভাগ্য এই যে, স্বাস্থ্য খাতের নানাবিধ দুর্নীতির খবর বহুদিন ধরে গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পরও সরকারি দল ও সরকার এর তেমন কোনো প্রতিবিধানের চেষ্টা করেনি। তাই স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব জায়গায়ই দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্যে তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোর জন্য বড় বড় বাজেট বরাদ্দ হয়েছে আর এর উল্লেখযোগ্য অংশই অন্ধকার ড্রেন দিয়ে দুর্নীতিবাজদের পঙ্কে জমা হয়েছে। তাই করোনাকালের সংকটে এসে একে একে খসে পড়ছিল ঝুলির কালো বিড়ালগুলো।

একটু পেছনে ফিরে তাকাই। করোনার মতো এত ভয়াবহ মাহামারির মোকাবিলার জন্য অভিজ্ঞতা এবং প্রস্তুতি আমাদের থাকার কথা ছিল না। এই বাস্তবতা অবশ্যই বুঝতে হবে। তবে করোনা আঘাত না হানলে আমরা বুঝতে পারতাম না দুর্নীতিবাজরা কতটা ঘুণপোকার মত কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফাঁপা করে ফেলেছে। ভেন্টিলেশন থেকে শুরু করে হাসপাতালের চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের সংকট যে এত প্রকট হবে কে বুঝেছিল! ইউরোপ-আমেরিকায় কভিড হানা দেয়ার পর সতর্ক হওয়ার জন্য বেশ কিছুটা সময় আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু কোনো প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। দুর্নীতিবাজদের বিবেক কখনও কাজ করে না।

দেশপ্রেমের তো প্রশ্নই নেই। তাই হয়তো অপেক্ষা করেছে সংকট কখন আঘাত হানে। তখন তড়িঘড়ি অবস্থা সামাল দেয়ার জন্য নিজেদের দুর্নীতির হাত প্রসারিত করার মওকা পাওয়া যাবে। কার্যকারণ সূত্রে এই কল্পনা অনেকটা যেন মিলে গিয়েছিল। এদেশের ক্ষমতাবান রাজনীতিকরা মুখে যা-ই বলুন না কেন দেশ বা জনগণ নয় দল সুরক্ষাটাই প্রধান বিবেচনা করেন। ছোট দেশ; সবাই সবাইকে চেনে। চোখের সামনের ঘটনাগুলো আড়াল করা যায় না। দেশের মানুষের শ্রমের টাকার রাজস্ব থেকে সরকার উন্নয়নের কাজ করে। কিন্তু অসহায় মানুষ দেখে অভ্যস্ত সব সরকারের আমলেই স্থানীয়পর্যায় থেকে জাতীয়পর্যায় পর্যন্ত দলীয় পান্ডারা ঠিকাদারি থেকে শুরু করে সব ধরনের লাইসেন্স পেয়ে যায়।

তাই উপজেলা-জেলায় বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ যার যার সময় দলীয় অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য ঠিকাদারির ‘ঠ’ অভিজ্ঞতা যাদের নেই তারা ঠিকাদারির লাইসেন্স পেয়ে যায়। বিশেষ উপায়ে তারা টেন্ডারে জিতে কার্যাদেশও পায়। প্রায় সময় এসব কাজ বিক্রি করে দেয় সাব কন্ট্রাক্টটারদের কাছে। এভাবে কাজ শুরু হওয়ার আগে কমপক্ষে তিন জায়গায় বানরের পিঠা ভাগ হয়। ‘অফিস খরচে’ যায় একভাগ, মূল ঠিকাদার একভাগ রেখে সাব কন্ট্রাক্টকে দেয়। তিনি আবার তার ভাগ রেখে বাকি টাকায় কাজ সম্পন্ন করে।

ধরি এভাবে একটি রাস্তা মেরামতের কাজ শুরু করে। সেই কাজের মান কতটা রক্ষা পায় তা সহজেই অনুমেয়। তাই রাস্তার মাথা সংস্কার করে লেজের দিকে আসতে আসতে মাথা ভেঙে যায়। অর্থাৎ জনগণের টাকা দুর্নীতিবাজদের পকেট ভরতেই শেষ হয়ে যায়। জনকল্যাণ হোক বা না হোক দলকল্যাণ তো হয়! করোনাকালেও তাই ঘটেছিল। আমরা কি ভুলে গেছি ডাক্তার ও চিকিৎসাকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় মাস্ক কেনার কার্যাদেশ প্রায় প্রতিযোগিতাহীনভাবে পেয়ে যায় সরকারি দলের নেতার প্রতিষ্ঠান। আর সরবরাহ করে ফেলে নকল মাস্ক। বিপুল টাকার ভাগবাটোয়ারা কতদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল তা প্রমাণ করার ক্ষমতা জনগণের নেই।

তবু ভালো শেষপর্যন্ত সংকট আড়াল না করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনা মোকাবিলায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রী কঠোর নজরদারি করেছেন। এতে সংকট মোকাবিলায় অনেকটা সাফল্য এসেছে।

বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সমুদ্র চুরির খতিয়ান তো নানা সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে আসছে। মানুষ এসব খবর পায় ও ক্ষুব্ধ হয়। কিন্তু এ সংবাদটি পায় না যে, এসব দুর্নীতিবাজ বিচারের আওতায় এলো কি না। বরং এ তথ্য ভেসে আসে চিহ্নিত অনেক দুর্নীতিবাজ পুরস্কৃত হয় এবং নতুনভাবে দুর্নীতি করার মওকা খুঁজে নেয়। এভাবে দুর্নীতিবাজ বড় নেতা বা আমলা ফুলে ফেঁপে বেলুন হয়ে এক সুন্দর সকালে কানাডা, সুইজারল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাবে।

সরকারের ঘরে দুর্নীতিবাজদের বসতি থাকলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সরকার দৃঢ় নয় বলে করোনা সংকটেও বেসরকারি হাসপাতালগুলাকে জনকল্যাণে এগিয়ে আসতে বাধ্য করতে পারেনি। বাধ্য করাতে হলে সততার শক্তির প্রয়োজন হয়। এর প্রমাণতো আমরা করোনাকালে বেশ কয়েকটি নামি বেসরকারি হাসপাতালের উদ্যোগের নমুনা দেখতে পেয়েছি।

নানা অপকর্ম করা রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রতারক সাহেদ ধরা পড়লেও সেসময় একে আমার কাছে বড় কোনো ঘটনা মনে হয়নি। বরঞ্চ বড় ঘটনা ৬০-এর বেশি মামলা আর একাধিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে র‌্যাবের ভাষায় ভয়ংকর এই প্রতারক ঘুরে বেড়াতে পেরেছিল কেমন করে! গোয়েন্দারা কি চোখে ঠুলি পরেছিল? রাজনৈতিক নেতা আর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা বুকে বুক মেলাতে থাকল। হাস্যোজ্জ্বল ছবি তুলল। অথচ এমন একজন চিহ্নিত অপরাধীকে চিনতেই পারল না! তাহলে প্রশাসন আর দেশ চলছে কেমন করে! আর সরকার ও সরকারি দলের কথাই বলি। সাহেদকে আটকের জন্য যত কৃতিত্বের কথাই বলেন জনক্ষোভ তৈরির আগে সে চেষ্টা কি করেছেন? তিনি আওয়ামী লীগে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা বলে বেড়িয়েছেন তখনতো তা প্রতিবাদের বদলে উপভোগই করেছেন। ধরা পড়ার পর এই প্রতারককে না চিনতে চাইলে মানুষ কি দায়মুক্তি দেবে!

মানুষ এর একটি সরল অর্থই বুঝবে, তা হচ্ছে সবার কাছেই সম্ভবত এই প্রতারক কামধেনু ছিল। না হলে এত মামলার অভিযুক্তকে ব্যাংকগুলো কোটি কোটি টাকা ঋণ দেয় কেমন করে! একাধিক চেক জালিয়াতি করে অথচ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তার টিকিও ছোঁয় না। সহাস্যে এর সঙ্গে ছবি তোলেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা। করোনার মহাদুর্যোগে দেশে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল থাকার পরও সনদ তামাদি হয়ে যাওয়া এই প্রতারকের হাসপাতালের সঙ্গেই কোটি টাকার চুক্তি করতে হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।

বিনাপয়সায় চিকিৎসা করানোর কথা বলে একদিকে সরকারের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়েছিল আবার রোগীর স্বজনদের পকেট ফতুর করে দিচ্ছিল। অথচ এসব তথ্য জানতে বড় দেরি হয়ে যায় সরকারি কর্তৃপক্ষের। যখন পারিপার্শ্বিকতার কারণে হজম করা কঠিন হয়ে পড়ে তখন মাঠে নামতে বাধ্য হন সবাই।

সাহেদ কাণ্ডের পরও কি নানা চেহারায় দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে না? আমাদের বরাবর মনে হয় রাজনৈতিক লাভালাভ আর প্রভাব থেকে আমাদের আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে এবং দুদককে মুক্ত করে দিতে পারলে এসব অনাচার থেকে আমরা অনেকটা মুক্তি পাব। একই সঙ্গে করোনার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। দেশবাসী চিকিৎসা পাওয়ার মৌলিক অধিকার হারাচ্ছে। আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার কারণেই উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত সামর্থ্য বিবেচনায় চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন দেশে ছোটেন। ঈশ্বর না করুন কভিডের মতো সংকটে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে এবং একই সঙ্গে সেসব দেশে মরণ ভাইরাস আঘাত হানলে চিকিৎসার জন্য তো নিজ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করতে হবে।

নাগরিকের চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর তো করোনাকালে প্রমাণ করছে তারা কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ পেতে রেখেছে। ওখানে কিছু ফেললেই নর্দমায় চলে যাবে। তাই প্রথমত এই অঞ্চল রাজনীতি প্রভাবমুক্ত করতে হবে। ঝুড়ির তলা মেরামত করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের ছায়ামুক্ত করে নতুনভাবে সব সাজাতে হবে। আমি বিশ্বাস করি এদেশের চিকিৎসকগণ অকর্মণ্য, অদক্ষ আর অমেধাবী নন। মুক্ত পরিবেশে সুযোগ পেলে তাদের অনেকেই বিশ্বমানের চিকিৎসার কাঠামো গড়ে তুলতে পারবেন। সকলের চাওয়া হবে চিকিৎসার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত থাকুক মানুষের।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল: ১৮ মাসের কাজে ৩ বছর পার
কোভিড হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশয়
আল্ট্রাসাউন্ডে ‘যমজ সন্তান’, প্রসব একটির
লাখো চোখের আলোর ভরসা ‘পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল’
করোনা শনাক্ত বাড়লেও হাসপাতাল ঠাসা ‘ঠান্ডাজনিত রোগীতে’

মন্তব্য

মতামত
Strong political columns stopped

শক্তিশালী রাজনৈতিক কলাম থেমে গেল

শক্তিশালী রাজনৈতিক কলাম থেমে গেল
মান্না দের গাওয়া বিখ্যাত গান ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’… গানটি বহুল শ্রুত হিসেবে গিনিচ রেকর্ডে স্থান পেয়েছে। সেই বিবেচনায় গাফ্ফার চৌধুরী রচিত অমর একুশের গান সেখানে সবার আগে স্থান পাওয়ার কথা। এব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

কালজয়ী অমর একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের রচয়িতা, সাংবাদিক-সাহিত্যিক ও কিংবদন্তি কলাম লেখক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী চলে গেলেন। গত বৃহস্পতিবার লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

এই গুণী মানুষের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ আমি কখনই আমি পাইনি। সরাসরি কখনও দেখা বা কথা বলারও সুযোগ হয়নি। কিছু ভার্চুয়াল মিটিং বিশেষ করে সম্প্রীতি বাংলাদেশের জুম মিটিংয়ে কয়েকদিন কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কলাম পাঠের মধ্য দিয়ে। আমি আমার সেই ছাত্রজীবন থেকে গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলাম পড়ে আসছি। তার শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমেই তিনি আপন হয়ে গিয়েছিলেন।

রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তিনি যে মানের কলাম লিখেছেন তা খুব সচরাচর দেখা যায় না। এমনকি উন্নত বিশ্বের নামকরা সব সংবাদমাধ্যমেও সেই মানের কলাম খুব একটা চোখে পড়ে না।

গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলাম মানেই তথ্যের সমাহার। এককথায় তিনি ছিলেন তথ্যভাণ্ডার। তথ্য শুধু স্মৃতিতে ধরে রাখাই বড় কথা নয়, সেই তথ্য প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যবহার করার মধ্যেই আছে মুনশিয়ানা। আর এই ব্যাপারে গাফ্‌ফার চৌধুরী ছিলেন যারপরনাই পারদর্শী। আমি যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছি তার কলাম পাঠ করে। অনেকেই ভাবেন গাফ্‌ফার চৌধুরী যেহেতু ভারত উপমহাদেশের রাজনীতির উত্থানপতনের প্রত্যক্ষদর্শী তাই সেই রাজনীতি ও ইতিহাসের অনেক তথ্য তিনি জানবেন এটাই স্বাভাবিক।

বিষয়টি আসলে তা নয়। সমগ্র বিশ্বের রাজনীতি এবং ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ ছিল তার নখদর্পণে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এমনকি আফ্রিকার অনেক রাজনৈতিক উত্থানপতন এবং ইতিহাসের নানান ঘটনা ছিল তার দখলে এবং সেসব তথ্য তিনি খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই বিভিন্ন লেখায় ব্যবহার করে পাঠককে সমৃদ্ধ করেছেন।

লেখা অনেকেই লেখেন, কিন্তু অপ্রিয় সত্য কথা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে খুব কম মানুষই বলতে পারেন। গাফ্‌ফার চৌধুরী ছিলেন সেরকম একজন ব্যক্তি যিনি উচিত কথা বলতে কোনোরকম দ্বিধা করেননি। তিনি আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন অথচ সবচেয়ে বেশি আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেছেন। বরং বলা যায় গাফ্‌ফার চৌধুরীর প্রয়াণে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করার আর কেউ থাকল না।

আওয়ামী লীগের বিরোধিতা বা বদনাম করা আর সমালোচনা করা এক বিষয় নয়। প্রকৃত সমালোচনা বলতে যা বোঝায় সেই সমালোচনাই গাফ্‌ফার চৌধুরী করেছেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। তিনি তার অসংখ্য লেখায় বিএনপির প্রচণ্ড সমালোচনা করেছেন কিন্তু তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছেন যে বিএনপির মতো একটি বড় দল তাদের রাজনৈতিক আদর্শের পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল হিসেবে পরিচালিত হোক এবং সে ব্যাপারে তিনি অনেক মূল্যবান পরামর্শ তার লেখনীতে তুলে ধরেছেন।

কলম চালানোর ক্ষেত্রে এই গুণী লেখক কখনই কোথাও নতিস্বীকার করেননি বা কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলেননি। একবার একটি লেখা নিয়ে তারই এক বন্ধু এবং আমলা এনাম আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং চলতে থাকে এই দুইজনের মধ্যে পালটাপালটি কলাম লেখা। এই কলাম যুদ্ধের একপর্যায়ে এনাম আহমেদ চৌধুরী সরে গেলে সেই পালটাপালটি কলাম লেখার অবসান ঘটে।

সেই কলামযুদ্ধে সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের প্রকাশ ঘটেছিল কারণ উভয়ই স্ব স্ব অবস্থান থেকে বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন কিন্তু তাদের দুজনের বন্ধুত্বের সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরেনি। এখানেই গাফ্‌ফার চৌধুরীর মতো লেখকের বিশেষত্ব। আমরা পাঠাকরা অবশ্য সেই কলামযুদ্ধ থেকে জানতে পেরেছিলাম অনেক কিছু।

গাফ্‌ফার চৌধুরী লেখক এবং সাংবাদিক হিসেবে পদচারণা ছিল সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক কলাম লেখক হিসেবে। প্রতিসপ্তাহে ঢাকার একাধিক পত্রিকায় কলাম লিখেছেন নিয়মিত। অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ে যখন কেউ কলম ধরতেই সাহস পায়নি, তখন তিনি সব ভয়ভীতি এবং সমালোচনার তোয়াক্কা না করে কলম চালিয়েছেন সাহসী কলমযোদ্ধার মতোই।

গাফ্‌ফার চৌধুরী প্রথম লেখার পর অন্যরা তখন সেই বিষয়ে লেখার সাহস দেখিয়েছেন। গাফ্‌ফার চৌধুরীর এরকম তীক্ষ্ণ কলামের বাইরে যে বিষয়টি দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে জনপ্রিয় করে রেখেছে তা হচ্ছে তারই লেখা একুশের অমর কালজয়ী গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি”। একটি মাত্র গান লিখে যে একজন গীতিকার এত জনপ্রিয় হতে পারেন তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে গাফ্‌ফার চৌধুরী ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে।

একবার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এসে বলেছিলেন যে এই গান এত জনপ্রিয় হবে তেমনটা ভেবে তিনি এটা লিখেননি। ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত দৃশ্য দেখা সম্পূর্ণ আবেগতাড়িত হয়েই কবিতাটা রচনা করেছিলেন যা পরবর্তীকালে আলতাফ মাহমুদের সুরে গানে রূপ নেয় এবং অমর একুশের প্রভাতফেরির গান হিসেবে গ্রহণ করায় এই কালজয়ী গানটি আন্তর্জাতিকভাবেও জনপ্রিয় হয়।

গাফ্‌ফার চৌধুরী তার লেখনীর মাধ্যমে বাঙালি জাতির জন্য যা দিয়ে গেছেন তার মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ থাকবে এবং যতদিন অসাম্প্রদায়িক আদর্শ টিকে থাকবে ততদিনই তিনি আমাদের মাঝে থাকবেন। তারপরও তার অবদান এবং লেখাগুলো সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিতে হবে। তার লেখা তো নিছক লেখা নয়, এসব লেখা হচ্ছে আদর্শের বাণী বিতরণ।

প্রতিটা লেখায় অনেক কিছু শেখার আছে। এসব লেখা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠ করার প্রয়োজনীয়তা আছে। সে কারণেই গাফ্‌ফার চৌধুরীর সমস্ত লেখা সন্নিবেশিত করে সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করে তা সবার জন্য পাঠের সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিতে হবে।

আর তার রচিত অমর একুশের গান যাতে গ্রিনিচ রেকর্ড বুকে স্থান পায় সেই উদ্যোগও নিতে হবে যদি সেখানে স্থান না পেয়ে থাকে। আমি যতটুকু জানি মান্না দের গাওয়া বিখ্যাত গান ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’… গানটি বহুল শ্রুত হিসেবে গিনিচ রেকর্ডে স্থান পেয়েছে। সেই বিবেচনায় গাফ্‌ফার চৌধুরী রচিত অমর একুশের গান সেখানে সবার আগে স্থান পাওয়ার কথা। এব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। একথা ঠিক যে অনেকেই গাফ্‌ফার চৌধুরীর স্মৃতি ধরে রাখার উদ্দেশ্যে নানান পদক্ষেপ নিবেন এবং অনেক স্মৃতি সংগঠনও গড়ে উঠবে। এগুলো হতেই পারে। তার মতো কিংবদন্তি কলাম লেখকের লেখা একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ এবং প্রচারের ব্যবস্থা না করলে তথ্যের বিকৃতি হতে পারে।

লেখক: ব্যাংকার, কলাম লেখক। টরনটো, কানাডা-প্রবাসী।

[email protected]

আরও পড়ুন:
গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ দেশে আসছে সোমবার
দেশে আনা হচ্ছে গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ
‘বাঙালির হৃদয়ে চির অম্লান গাফ্‌ফার চৌধুরী’
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর প্রয়াণ
ভারত আপনাদের রক্ষা করতে পারবে না, সরকারকে জাফরুল্লাহ

মন্তব্য

মতামত
The futility of national government theory

জাতীয় সরকারতত্ত্বের অসারতা  

জাতীয় সরকারতত্ত্বের অসারতা  
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতীয় সরকারের ঘাড়ে যেসব দায়িত্ব ন্যস্ত করতে চাচ্ছেন তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা, সময় কোনোটিই তাদের হবে না। দুইবছর দেশের সংবিধান কোথায় যাবে? ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কি বিষয়গুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন? যদি পারতেন তাহলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা এবং বিষয়টি যথাযথ পরিবীক্ষণের চেয়ে বেশি কিছু ভাবাটাই অবান্তর।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গত কয়েক বছর রাজনীতি, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ সক্রিয় ও আলোচিত এক ব্যক্তিত্ব। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এই পরিচয়ে তাকে অনেকে শ্রদ্ধা করেন। তিনি নিজেকে একজন ভাসানী অনুসারী দাবি করলেও তার সমর্থন ও দুর্বলতা ডান-বাম, উগ্র ডান, উগ্র বামসহ সব পন্থার ব্যক্তিদের প্রতি বাছ-বিচারহীনভাবে রয়েছে- এটি গোপনীয় নয়। তিনি সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের প্রতি যেমন আনুগত্য প্রকাশ করেন আবার বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে তিনি শ্রদ্ধা করেন বলে দাবি করেন। সামরিক শাসক এরশাদের সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা তিনি নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেন। উগ্র সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক দল সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদারকে তিনি জাতীয় নেতার মর্যাদায় বসান। ১৯৭৬ সালে ভাসানীর নেতৃত্বে ভারতবিরোধী জিগির তোলার লক্ষ্যে আয়োজিত ফারাক্কা লং মার্চকে এবারও পুনর্জীবন ঘটিয়ে নিজেই উগ্র ডান, উগ্র বামদের নিয়ে রাজশাহীতে লং মার্চ করে এসেছেন। সেখানেও তিনি ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে নিজেকে আলোচনায় রেখেছেন। তার রাজনৈতিক দর্শন মূলতই অতি ডান, অতি বামদের মাঝামাঝি অবস্থানে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বাঙালি মধ্যবিত্তের তথাকথিত শিক্ষিতজনের রাজনীতি খুব বেশি একটা দেশপ্রেম ও আদর্শভিত্তিক নয় এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য। এদের রাজনৈতিক জ্ঞান খুবই সংকীর্ণ কিন্তু প্রকাশভঙ্গি উচ্চমার্গীয়। দেশ ও জাতির জন্য এদের দরদ ভালোবাসা দেখে অনেকেই বিভ্রান্ত হন। কিন্তু কালের স্রোতে এদের হারিয়ে যাওয়ার নজির এ দেশেই অনেক আছে। দেশ ও জাতি এদের থেকে শেষ পর্যন্ত কিছুই পায় না। এরা নিজেরা যেমন সফল হয় না, তেমনি দেশ ও জাতিকেও নানা বিভ্রান্তি ও দিকভ্রান্তির চোরাবালিতে আটকে রাখার বেশি কিছু অবদান রাখতে পারেনি। কারণ এদের তত্ত্বজ্ঞান অনেকটাই বায়বীয়, বাস্তবজ্ঞান একেবারেই শূন্য। ফলে এদের কাছ থেকে দেশ ও জাতি খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দিকদর্শন পায় না। আমাদের জাতির দুর্ভাগ্য এখানেই।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অনেক ভালো কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু মনের অজান্তে থাকা তার অনেক কথাই তিনি লুকাতে পারেন না। মুখ ফসকে বের হয়ে আসে। সেখানেই তার দ্বিচারিতার স্বরূপটি ধরা পড়ে যায়। তিনি নিজেকে যতই প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং দেশপ্রেমিক বলে মনে করেন; কিন্তু উগ্র ডান, বাম, হঠকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মিশেল দিয়ে কেউ কখনও দেশ ও জাতিকে উদারবাদী ধারায় অগ্রসর করার কথা ভাবতে পারেন না। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রবীণ নাগরিক হিসেবে যখন বক্তব্য দেন তখন অনেকেই তার প্রতি সম্মান রেখে কথা বলেন । কিন্তু তিনি সেই সম্মানের অনেক কিছুই তার বক্তব্যের নির্মোহ বিশ্লেষণে থাকার মতো অবস্থানে না থাকলেও কেউ বিষয়গুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি বা ঘাটাঘাটি করে না। এখানেই তার বিশেষ সুবিধাটি। তবে তিনি যেসব স্ববিরোধী বক্তব্য ও আচরণ করেন সেটি বোধিচিত্তের মানুষদের না বোঝার কোনো কারণ নেই।

সম্প্রতি তিনি জাতীয় সরকারের একটি তত্ত্ব গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছেন। তার এই বক্তব্যের ক্ষেত্রে কে বা কারা সহযোগিতা করেন তা আমাদের জানা নেই। তবে তার বিবৃতির মিশেল চরিত্র দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তিনি হয় জনগণের দৃষ্টিকে তার মতো করে কিংবা অন্য কারো সুদূরপ্রসারী চিন্তাকে নিয়ে মানুষকে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার পরিকল্পনা থেকে এসব তত্ত্ব হাজির করেন। তবে কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এক-দুইদিন এ নিয়ে কিছু আলোচনা- সমালোচনার পর নানা বৈপরীত্য, অসংগতি এবং চিন্তার বালখিল্যপনার কারণে সেটি আপনা থেকে উবে যেতে থাকে।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী যেভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন সেটি যে এত সহজ সরল নয়, তা তিনি কতটা জানেন বা বোঝেন জানি না। কিন্তু যে বিষয়ে তিনি এমন একটি প্রস্তাব হাজির করেছেন সেটি কোনো পক্ষই চিন্তার খোরাকের মধ্যে বিবেচনা করেছেন এমনটিও দেখা যায়নি। তবে নেপথ্যে থেকে যদি কেউ তাকে দিয়ে কাজটি করিয়ে থাকেন তারা হয়তো এখন বাজার যাচাই করছেন! ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেশে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব, কার্যকারিতা, সরকার কাঠামো ইত্যাদি উল্লেখ করেছেন।

দুবছরের জন্য দেশে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি যেসব বক্তব্য হাজির করেছেন তা এমন: “জাতীয় সরকারের প্রথম তিন মাসের মধ্যে নতুন করে নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচনি আইনের কিছু ধারার সংস্কার, গণভোট এবং ‘না’ ভোটের প্রচলন, প্রশ্নবিদ্ধ সংসদকে লক্ষ ভোটারের স্বাক্ষরে প্রত্যাহার ব্যবস্থা, জনস্বার্থ সম্পর্কিত বিভাগে ন্যায়পাল নিয়োগ, প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ এবং ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি পুরোপুরি কার্যকর করে, ওষুধ, শৈল্য চিকিৎসা ও রোগনিরীক্ষার দর সরকার স্থির করে দেবে। পর্যাপ্ত লাভ দিয়েও ওষুধের সর্বোচ্চ বিক্রিমূল্য অর্ধেকে নেমে আসবে। অপ্রয়োজনীয় ও প্রতারণামূলক ওষুধ বাতিল হবে। সব ওষুধ কোম্পানিসমূহকে একাধিক কাঁচামাল উৎপাদনে প্রণোদনা দেয়া হবে।” তার প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করেছেন, “মানহানির মামলা করতে হলে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে ন্যূনতম ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা কোর্ট ফি দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির শহরে ফৌজদারি মামলা করতে হবে। একই মামলা বিভিন্ন জেলার একাধিক আদালতে করা যাবে না।” প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, “পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সব রাজনৈতিক কর্মী ও আলেমদের জামিন নিশ্চিত করে এক বছরের মধ্যে তাদের বিচার শেষ করে রায় কার্যকর করা হবে।” প্রস্তাবে তিনি বাংলাদেশকে ১৫/১৭টি প্রদেশ বা স্টেটে বিভক্ত করার কথাও বলেছেন।

এক্ষেত্রেও তার প্রস্তাব, “প্রত্যেক প্রদেশে/স্টেটে ৬-৭ জন বিচারপতি সমন্বিত হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা এবং সুপ্রিম কোর্টে একটি সার্বক্ষণিক সাংবিধানিক বেঞ্চ সৃষ্টিসহ সুপ্রিম কোর্টে ৬টি স্থায়ী বেঞ্চ থাকবে-(১) ফৌজদারি, (২) দেওয়ানী, (৩) নির্বাচন ও মৌলিক অধিকার, (৪) কোম্পানি বিরোধ ও আয়কর সংক্রান্ত, (৫) সকল প্রকার দুর্নীতি বিষয়, (৬) যৌন নিপীড়ন ও নারীদের অধিকার ।” তিনি এই প্রস্তাবনায় ‘সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন, দুই কোটি মানুষের সাপ্তাহিক রেশনিং চালু করা, মাসিক ১০০ টাকায় তিন বাল্‌বের বিদ্যুৎ-সুবিধা এবং মাসিক ২০০ টাকার প্রিমিয়ামে ওষুধসহ সকল প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিচর্যা, দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ, অভিযুক্তদের নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা, ইভিএম পদ্ধতি বাতিল, ভোটার তালিকা সংশোধন, দলের নিবন্ধন সহজীকরণ, দলীয় প্রতীকে ইউপি ও উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেয়া, পেশাজীবী, বয়োজ্যেষ্ঠ অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের নিয়ে জাতীয় ও প্রাদেশিক সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, বাজেট প্রদান, বাজেটে শুল্কমুক্ত আমদানি, এনজিওদের মাধ্যমে কৃষিতে ৫ শতাংশ সুদে বিনিয়োগ, কারাগার, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর হাসপাতালগুলো বিকল্প চিকিৎসাসেবা দ্বারা পরিচালিত, বিদেশফেরতদের বিমানবন্দরে ভিআইপি-সুবিধা, মৃতদেহ বিনা অর্থে দেশে আনা, প্রবাসীদের ৫০ লাখ টাকার জীবনবীমা-সুবিধা প্রদান, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ছয় মাস পর ক্ষমতা হস্তান্তর করা’ ইত্যাদি তার জাতীয় সরকারের রূপকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জাতীয় সরকার গঠন করার জন্য তিনি ৩১ ব্যক্তির নাম তাদের বিনা অনুমতিতেই প্রকাশ করেছেন। এদের কেউ কেউ আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তারা আদৌ এ ধরনের সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা দেশে অনুভব করেন কি না সেটিই মস্তবড় প্রশ্ন।তাছাড়া এখানে বিভিন্ন ঘরানার কিছু ব্যক্তিকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দেয়ারও প্রস্তাব তিনি করেছেন। মন্ত্রণালয়ের নামও তিনি প্রস্তাব করেছেন। সমস্ত বিষয়টি তার একান্ত কাল্পনিক, একান্ত ব্যক্তিগত নাকি কারো কারো চিন্তাপ্রসূত প্রস্তাবনা সেটি একটি ভিন্ন প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো তিনি দেবেন না। কিন্তু যে প্রস্তাবনা তিনি গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য প্রেরণ করেছেন সেটি পড়ে কোনো সচেতন মানুষ ভাবতে পারবেন না যে, এটি ইউটোপিয়া ছাড়া বাস্তবে কোনো চিন্তা করার যোগ্যতা রাখে।

দেশে সংবিধান আছে। এটিকে স্থগিত করার অধিকার কারো নেই। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা জনপ্রতিনিধিদের ছাড়া এক মুহূর্তের জন্য পরিচালিত হওয়ার কথা ভাবতে পারে না। সে ধরনের চিন্তার পরিণতি আমাদের রাষ্ট্রের জন্য অতীতে (১৯৭৫, ৮১-৮২, ৯০, ৯১, ৯৬, ২০০১, ২০০৬-২০০৮) যে বিপর্যয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রে নেমে এসেছিল সেটি কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারেন না। রাষ্ট্রক্ষমতায় নির্বাচিত প্রতিনিধি ব্যতীত কেউ বসতে পারেন- সেই সুযোগ করে দেয়ার পরিণতি অনেক দেশের জন্যই বিপর্যয় ডেকে নিয়ে এসেছে।

সুতরাং জাতীয় সরকারের কথা শুনতে যত আবেগময় মনে হবে, কিন্তু বাস্তবে এর ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে জাতিকে রক্ষা করা খুবই কঠিন কাজ। বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় জাতীয় বিপর্যয় চলছে তারপরও কেউই সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলের বাইরে গিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের কথা কল্পনাও করছেন না। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতীয় সরকারের ঘাড়ে যেসব দায়িত্ব ন্যস্ত করতে চাচ্ছেন তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা, সময় কোনোটিই তাদের হবে না।

দুইবছর দেশের সংবিধান কোথায় যাবে? ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কি বিষয়গুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন? যদি পারতেন তাহলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা এবং বিষয়টি যথাযথ পরিবীক্ষণের চেয়ে বেশি কিছু ভাবাটাই অবান্তর। যা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা একমাত্র জনপ্রতিনিধিরাই রাখেন তাদের বাদ দিয়ে অনির্বাচিত বহু মত, বহু পথ, বহু চিন্তা ও ভাবাদর্শের মানুষদের সমন্বিত করে ভাববার কথা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ভাবেন কীভাবে? রাষ্ট্র, সরকার এবং সংবিধান নিয়ে হেলাফেলা করা যায় না, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কবে এই উপলব্ধিতে ফিরে আসবেন?

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক

আরও পড়ুন:
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ভর্তির আবেদন শুরু ২২ মে
নিজেদের স্বার্থেই এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হবে: পরিকল্পনামন্ত্রী
এসডিজি বাস্তবায়নে চাই সমন্বিত প্রচেষ্টা: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী
ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ফল প্রকাশ
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে চাকরি

মন্তব্য

p
উপরে