রাজস্ব প্রশাসন ও করজাল সম্প্রসারণে করণীয়

player
রাজস্ব প্রশাসন ও করজাল সম্প্রসারণে করণীয়

করের আওতা সম্প্রসারণ করে, করহার সুষম করে, প্রয়োজনীয় অটোমেশন সম্পন্ন করে মোট দেশজ উৎপাদনে করের অনুপাত বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য থাকলেও উদ্দেশ্য অর্জনে বিলম্ব হচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০২১ সালের মধ্যে কর জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার স্বপ্ন এখনও অধরা থেকে গেল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও ২০৪১ সালের মধ্যে এ অনুপাত ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে। এনবিআর পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করলে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে উদ্বুদ্ধকরণ ও নৈতিক দায়িত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের দায়িত্ব মূলত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপরই ন্যস্ত। এ সংস্থার অধীন কর, মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) ও কাস্টমস কমিশনারেটগুলো বার্ষিক বাজেটে এদের ওপরে ন্যস্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে রাজস্ব আহরণে সচেষ্ট থাকে। বাজেট প্রণয়নের সময় এনবিআর প্রয়োজনে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে আইন পরিবর্তন বা সংশোধন এবং প্রশাসনিক আদেশ ও প্রজ্ঞাপন জারি করে সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণের চেষ্টা করে। এসব সংশোধন ও পরিবর্তনে কর হ্রাস-বৃদ্ধি ছাড়াও নীতি সহায়তা থাকে, যার ফলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটে, ফলে স্বাভাবিকভাবে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ে। মূলত রাজস্ব প্রবৃদ্ধিনির্ভর করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা, আমদানি-রপ্তানি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সরকারি রাজস্ব ও প্রকল্প বরাদ্দের সুষ্ঠু ব্যয় এবং সর্বোপরি রাজস্ব সংগ্রহে নিয়োজিত কর্মচারীদের পেশাদারত্বের ওপর।

কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটি রাজস্বের এ তিনটি শ্রেণিকে সাধারণত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিগত সরকারগুলো বার্ষিক বাজেট ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়নে চেষ্টা করে। সরকার, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং ভোক্তা জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ক্রমান্বয়ে কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ফলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ভোগ চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা বছর শেষে জিডিপির আকার ও শতকরা প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। তাই দেখা যায়, ১৯৭২-৭৩ সালের ৮ বিলিয়ন ডলার জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১ সালে ৪০৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।

সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে দেশের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ সম্পদের অবদান বাড়তে থাকে এবং বৈদেশিক ঋণের নির্ভরতা কমতে থাকে। বিগত প্রায় ৩০ বছর ধরে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে ৭-২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও দেশের কর জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারেনি, বরং বিগত দু’বছর কর জিডিপির অনুপাত ৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে আমাদের করের পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিম্নতম। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের হিসাব মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালের কর জিডিপির অনুপাত সবচেয়ে বেশি- প্রায় ১৯ শতাংশ।

ভারতের কর জিডিপির অনুপাত ১২ শতাংশ, ভুটানের ১৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১.৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১ শতাংশ। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় অনুপাত প্রায় ১৮ শতাংশ। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কর জিডিপির অনুপাত ৩৫-৪০ শতাংশ। বিগত বছরগুলোতে বাজেট প্রণয়নের সময় কর জিডিপির অনুপাত ১০-১১ শতাংশ অনুমান করলেও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় আমাদের দেশের এ অনুপাত নিম্নমুখী হয়েছে।

আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষের অনীহা আগে যা ছিল, এখনও তেমন আছে। অনভ্যাস, অনিচ্ছা, শঙ্কা, আইন অমান্যের প্রবণতা, দেশপ্রেমের অভাব প্রভৃতি কারণে সামর্থ্য থাকলেও দেশের মানুষ কর প্রদান করতে চায় না। বছরে প্রচুর টাকা মানুষ বাজে খরচ কিংবা অপেক্ষাকৃত অল্প প্রয়োজনে খরচ করে। এর কিছু অংশ কর দিলেও নৈতিক দায়িত্ব পালন করা হয়। শুধু ব্যক্তিশ্রেণি নয়, ব্যবসায়ীদের মধ্যেও কর ফাঁকির প্রবণতা বিদ্যমান।

আমাদের দেশের ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা জনসংখ্যার অনুপাতে মাত্র ১ শতাংশের মতো। গত বেশ কবছর ধরে আয়কর মেলা এবং নানা বিজ্ঞাপনমূলক প্রচারণা সত্বেও আয়কর রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা ২৪-২৫ লাখের উপরে তোলা যায়নি।

উৎসে কর, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদির কর বিবেচনায় প্রায় ১ কোটি লোক কোনো না কোনোভাবে কর দেয় বলে ধরা যায়। জমি ক্রয়, নানাক্ষেত্রে আয়কর রেয়াত, ব্যাংক এবং অন্যবিধ সেবাদাতার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ ই-টিআইএন নম্বর নিয়ে থাকে। বর্তমানে দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ। বাস্তবে এর ৩৫ শতাংশ মাত্র রিটার্ন জমা দেয়। আবার রিটার্ন জমাদানকারীদের একটা বড় অংশ ০ (শূন্য) কর দেয়।

অনুরূপভাবে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সকলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর দেয় না। ব্যবসার আকার ও ধরনভেদে যেখানে ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে কর দেয়। করের আওতা সম্প্রসারণ এনবিআরের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করহার কমানো হয়েছে ব্যক্তিশ্রেণি ও কর্পোরেট উভয় ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট করহার বেশি বলে আমাদের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছে।

সেজন্য গত চার বছরে করপোরেট করহার সাড়ে ৭ শতাংশ কমানো হয়েছে। বর্তমানে এ হার ৩০ শতাংশ, তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে সাড়ে ২২ শতাংশ। নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এ হার ২৫ শতাংশ। তবে সিগারেট ও তামাকজাত দ্রব্য এবং মোবাইল কোম্পানির করপোরেট করহার সবচেয়ে বেশি- ৪৫ শতাংশ। সরকার এই দুই উৎস থেকে যেমন কর পায় বেশি তেমনি এসব কোম্পানির কর প্রদানে মোটামুটি স্বচ্ছতা রয়েছে। ব্যাংক খাতের করহারও তেমন কমানো হয়নি। তিনটি খাত উচ্চ করহার মেনে নিয়েছে।

ব্যবসা সহজীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ডিজিটালাইজেশন ও আইসিটি সেবা সম্প্রসারণ প্রভৃতি কারণে কর রেয়াত, নিম্ন করহার, কর অব্যাহতি প্রভৃতির প্রচলন রয়েছে। আবার কোনো কোনো বিশেষ দ্রব্য ও সেবায়ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর হ্রাসকৃত হারে নেয়ার নজির রয়েছে। এসব কারণে এনবিআর এর রাজস্ব আহরণ কম হয়। তাই রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য এনবিআরকে নানা ফন্দি-ফিকির বের করতে হয়।

গত প্রায় দুই দশক যাবৎ উৎসে অগ্রিম কর, কর্তন কর আহরণের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। আয়করের প্রায় ৮০ শতাংশের অধিক উৎসে কর থেকে আদায় হয়। এছাড়া ব্যক্তি কিংবা ব্যবসায়ী উভয় শ্রেণিতেই করজাল তেমন সম্প্রসারণ হয় না বিধায় চালু করদাতাদের কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় কর বা বাড়তি কর আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এতে হয়রানির অভিযোগও পাওয়া যায়।

কর প্রদানে মিথ্যা ঘোষণা অনেক দিন ধরে আমাদের দেশে চলে আসছে। ‍প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় করের ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অনেক ব্যবসায়ী তাদের বিক্রয় ও লাভের পরিমাণ কম দেখায়। আবার আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণায় এবং ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শুধু তাই নয়, বিদেশে অর্থপাচারের একটা বড় অংশ যায় আমদানি-রপ্তানি দ্রব্যমূল্যের ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। ব্যবসাভিত্তিক অর্থপাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং কেইস ধরা পড়লে উচ্চহারে করারোপ ও জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কাস্টমস আইন ও কর আইন সংশোধন ও যুগোপযোগী করার জন্য ৬-৭ বছর যাবৎ কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কাস্টমস আইন জাতীয় সংসদ থেকে ৩ বার ফেরত এসেছে। বর্তমানে কাস্টমস আইন, আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগের ভেটিংয়ের জন্য পরীক্ষাধীন রয়েছে। নতুন কর আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। উভয় আইন বলবৎ হলে ব্যবসা, কর সংগ্রহ ও রাজস্ব প্রশাসনে সুশাসন ফিরে আসতে পারে।

রাজস্ব প্রশাসন অটোমেশনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা গত শতাব্দীর নব্বই দশকেই শুরু হয়। কাস্টমস অফিসে এসাইকুডা সিস্টেম চালু করে স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়ন শুরু হয় ১৯৯৩-৯৪ সালে। বর্তমানে এ সিস্টেম আপগ্রেড করে এসাইকুডা++ সিস্টেম চালু হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সকল কিছু যেমন- শিপিং ডকুমেন্ট, ইনভয়েস, দ্রব্যের পরিমাণ ইত্যাদি অনলাইনে আসার কথা থাকলেও কাস্টমস অফিস এখনও আমদানিকারকদের যাবতীয় মূল কাগজপত্র দাখিল করতে বলে।

নানা জটিলতা ও জালিয়াতির সম্ভাবনায় অনলাইন ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে ডিজিটাল কর ব্যবস্থা প্রণয়নের চেষ্টাও দীর্ঘদিনের। তবে অনলাইনে টিআইএন সংগ্রহ বা কর নিবন্ধন চালু হয় ২০১৩ সালে, অনলাইন পেমেন্ট চালু হয়েছে ২০১২, অনলাইন রিটার্ন দাখিল কার্যক্রম ২০১৬ সালে। তবে ই-টিআইএন সংগ্রহ ছাড়া অন্য দুটি ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়নি; ফলে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নও হয়নি।

১৯৯১ সালে প্রণীত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন ২০১২ সালে সংশোধিত হওয়ার কথা থাকলেও এটি সংশোধিত আকারে জারি হয় ২০১৯ সালে। এনবিআরের প্রত্যাশা ছিল, এ আইন জারির ফলে ভ্যাট আহরণে স্বচ্ছতা ও গতি আসবে এবং করের সংগ্রহ বাড়বে। কিন্তু এ আইনের বিভিন্ন ধারায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতপার্থ্যক্যের কারণে ব্যবসা সহজীকরণ, উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদান এবং একই সঙ্গে রাজস্ব বৃদ্ধির কথা বিবেচনায় রেখে গত ২টি বাজেটে এ আইনে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়।

দ্রব্য ক্রয়ের সঙ্গে সাধারণ মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্যাট প্রদান করলেও অনেক ব্যবসায়ী আদায়কৃত ভ্যাট সরকারকে প্রদান করে না। অসৎ ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ফাঁকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিসের অসৎ কর্মচারীরাও যুক্ত থাকে। সেজন্য ভ্যাট আদায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় আনার স্বার্থে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু গত ২ বছরে মাত্র ৩৫০০ ইএফডি মেশিন স্থাপন সম্ভব হয়েছে। দেশের অন্তত ৭ থেকে ১০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ মেশিন সচল থাকলে বর্তমানে আদায় করা ভ্যাটের তিন-চার গুণ ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হতো বলে অনেকের ধারণা।

বিগত কবছর দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৩২-৩৩ শতাংশ আসে প্রত্যক্ষ কর থেকে, ৩৮-৩৯ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে আর বাকি রাজস্ব আদায় হয় কাস্টমস শুল্ক হিসেবে। ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীশ্রেণির করজাল সম্প্রসারণ করে ২০২০-২১ সালের মধ্যে কর রাজস্ব ৫১ শতাংশে উন্নীত করার একটি পরিকল্পনা এনবিআরের ছিল। কিন্তু এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

সমুদ্র ও স্থলবন্দর দিয়ে আগত আমদানি ও বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত রপ্তানির স্বচ্ছতা, ঘোষণা ফাঁকি ইত্যাদি রোধকল্পে বন্দর কাস্টমস অফিসে উন্নতমানের বৃহদাকার স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের একটি পরিকল্পনা প্রায় দুবছর আগে নেয়া হলেও এখনও ক্রয়কাজে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

করজাল ‍বৃদ্ধি, কর সংগ্রহের গতি আনা, সব জেলা ও উপজেলায় রাজস্ব অফিস স্থাপন এবং কর জরিপ পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ব্যাপক বৃদ্ধি পেলেও ২০১১ সালের পর রাজস্ব প্রশাসনে আর কোনো সংস্কার হয়নি। জনবল ও অফিস সংখ্যা বৃদ্ধি তথা প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য কয়েক বছর আগে প্রস্তাব প্রণীত হলেও এ প্রস্তাব সরকারের অনুমোদনের জন্য এখনও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বিলম্বিত হচ্ছে।

করের আওতা সম্প্রসারণ করে, করহার সুষম করে, প্রয়োজনীয় অটোমেশন সম্পন্ন করে মোট দেশজ উৎপাদনে করের অনুপাত বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য থাকলেও উদ্দেশ্য অর্জনে বিলম্ব হচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০২১ সালের মধ্যে কর জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার স্বপ্ন এখনও অধরা থেকে গেল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও ২০৪১ সালের মধ্যে এ অনুপাত ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে। এনবিআর পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করলে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে উদ্বুদ্ধকরণ ও নৈতিক দায়িত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে নিচের সুপারিশগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক:

১. কর প্রদানে জনগণের ‘ভয় ও দ্বিধা’দূর করে সক্ষম করদাতা ও ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে কর প্রদানে আগ্রহী করে তুলতে হবে। সেজন্য কর কর্মকর্তাদের সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। কর অফিসে ‘হয়রানি’দূর করতে হবে।

২. রিটার্ন দাখিল ফর্ম ও জমাদান প্রক্রিয়াটি যথাসম্ভব সহজ করতে হবে। কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন সহজ, গ্রহণযোগ্য ও বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৩. কর আইন এমনভাবে যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে ব্যবসা সহজ ও কর আদায় বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন ও বিধির স্পষ্টতা থাকলে আইন অমান্য করা কিংবা হয়রানির সুযোগ থাকবে না।

৪. রাজস্ব প্রশাসনে দক্ষতা আনয়নের জন্য দেশ-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের নীতি নৈতিকতার প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। এনবিআরের অধীন কর এবং ভ্যাট ও কাস্টমস ক্যাডারের সম্প্রসারণ এবং কর ও শুল্ক অফিস সম্প্রসারণ করে উপজেলাপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা প্রয়োজন। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে রাজস্ব উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

৫. বন্দরের শুল্ক অফিসের আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং পর্যাপ্ত স্ক্যানার স্থাপন করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সবরকম ফাঁকি ও অনিয়ম বন্ধ করে স্বচ্ছতা আনতে হবে। অনুরূপভাবে মূল্য সংযোজন আদায়ে শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য হোটেল-রেস্তোরাঁ, দোকান-পাট, সুপার মার্কেট, শপিংমল প্রভৃতি বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে ইএফডি মেশিন স্থাপন করতে হবে।

৬. সর্বোপরি কম্পিউটারাইজেশন, ডিজিটালাইজেশন, আধুনিকায়ন, অটোমেশন যা-ই বলি না কেন এতে এনবিআর কর্মকর্তাদের শতভাগ সম্পৃক্ততা ও অংশীদারত্ব থাকতে হবে। এ ধরনের যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পর যাতে কর্মকর্তারা প্রক্রিয়াটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে পারে সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিতে ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিভাগীয় কর্মকর্তারা কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অটোমেশনে স্থায়িত্ব আনা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সিনিয়র কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের বিশেষ মনোযোগী ও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায় থেকে উন্নয়নশীল মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। জিডিপির আকার বেড়েছে, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, দেশে অন্তত চার কোটি লোক কর প্রদানে সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদেরকে করের আওতায় আনার উপায় উদ্ভাবন করতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাতে বিশ্বে সর্বনিম্ন স্থান থেকে বেরিয়ে এসে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে সরকারকে আরও পারদর্শিতা দেখাতে হবে।

লেখক: বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, জার্মানি। সাবেক সিনিয়র সচিব ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর।

আরও পড়ুন:
আয়কর রিটার্ন জমার সময় বাড়ল এক মাস
করের টাকা যেন অপব্যবহার না হয়: আইনমন্ত্রী
আয়কর দেন না বেশির ভাগ মানুষ
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার আগ্রহ বাড়ছে
রিটার্ন জমায় মেলার সুবিধা কর অঞ্চলে

শেয়ার করুন

মন্তব্য

তৈমূর কি এখন ট্রাইব্যুনালে যাবেন?

তৈমূর কি এখন ট্রাইব্যুনালে যাবেন?

প্রশ্ন হলো, তৈমূর আলম খন্দকার কি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন বা সেটি প্রমাণের কি কোনো পদ্ধতি আছে? যদি থাকে তাহলে তিনি কি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন? প্রশ্নটা জরুরি, কারণ নারায়ণগঞ্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিটির নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইভিএমকে ‘জালিয়াতির বাক্স’ বলে মন্তব্য করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী জিতবেন না বা হেরে যাবেন—এমনটি কি আপনি ভেবেছিলেন?

এই সিটির প্রথম মেয়র আইভী। ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন ঘোষিত হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনেই তিনি পরাজিত করেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানকে। ওই নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তৈমূর আলম খন্দকার—এবার যিনি আইভীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদও হারিয়েছেন তৈমূর আলম, যাকে ২০১১ সালের নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তে (ভোটের আগের রাতে) মাঠ থেকে সরে যেতে হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালের নির্বাচনে আইভীর বিরুদ্ধে বিএনপির টিকিট পান সাখাওয়াত হোসেন খান। অর্থাৎ তৈমূর আলম খন্দকার মনোনয়ন পাননি।

সুতরাং বলা যায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের সঙ্গে তৈমূর আলম খন্দকারের পলিটিক্যাল ট্র্যাজেডির একটা সম্পর্ক আছে। তৈমূর আলমের এই ট্র্যাজেডির বিপরীতে সেলিনা হায়াৎ আইভীর মেয়র পদে এবার হ্যাটট্রিক জয়।

এবার নারায়ণগঞ্জ সিটিতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় নির্বাচনে আইভী পেয়েছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭টি ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৈমূর আলম পেয়েছেন ৯২ হাজার ১৬৬টি ভোট। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধান ৬৬ হাজার ৯৩১।

প্রশ্ন হলো, এবার আইভীর পরাজয়ের কি কোনো আশঙ্কা ছিল?

চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহীদের কাছে নৌকা মার্কার প্রার্থীদের নাস্তানাবুদ হওয়া; রাজনীতিতে আইভীর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী (যদিও তারা একই দলের) এবং যার সমর্থনও আইভীর জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে, সেই শামীম ওসমানের নেপথ্য ভূমিকাও কি আইভীর হেরে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা তৈরি করেছিল?

স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার যদি বিএনপির মনোনয়ন বা সমর্থন পেতেন, অর্থাৎ বিএনপি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনে অংশ নিত, তাহলে সারা দেশে ইউপি নির্বাচনের ক্ষমতাসীন দলের অসংখ্য প্রার্থীর পরাজিত হওয়ার ধারাবাহিকতায় নারায়গঞ্জ সিটি নির্বাচনেও কি নৌকার প্রার্থী হেরে যেতেন? হয়তো না।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আর সিটি করপোরেশন নির্বাচন এক নয়। যেসব ইউপিতে নৌকা হেরে গেছে, সেখানে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী। অর্থাৎ নৌকার বিরুদ্ধে নৌকা। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ। বিএনপি মাঠে নেই, অথচ আওয়ামী লীগ হেরে যাচ্ছে তাদের নিজেদের লোকদের কাছেই। এটা দলের গৃহদাহ।

ইউপি নির্বাচন হয় অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। রাষ্ট্রের একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের এই নির্বাচনে দল ও মার্কার বাইরে অনেক হিসাব-নিকাশ কাজ করে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে সেই হিসাব-নিকাশ ছিল না। এখানে আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আওয়ামী লীগের কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন না। তৈমূর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী। মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি তাকে মনোনয়ন বা সমর্থন দেয়নি। উল্টো দল থেকে বহিষ্কার করেছে। ব্যক্তি আইভীরও একটা ভোটব্যাংক আছে।

কোনো একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে নানা কাজের কারণে জনগণের বিরাট অংশ ক্ষুব্ধ হয় বলে তাদের প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়— এটি রাজনীতির সরল সমীকরণ। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এটি খাটে না। যেসব ক্ষেত্রে খাটে না— নারায়ণগঞ্জ সিটিতে আইভী তার অন্যতম। সুতরাং কোনো সমীকরণই সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রতিকূলে ছিল না। কিন্তু তার পরও সেখানে মূল ফ্যাক্টর হয়েছিলেন শামীম ওসমান, যিনি শুরুতে আইভীর পক্ষে না দাঁড়ালেও দলের চাপে অথবা সিদ্ধান্তে মন থেকে না হলেও মুখে আইভীর পক্ষে কথা বলেছেন।

দলীয় কারণেই আইভীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়ার অবস্থা শামীম ওসমানের ছিল না। আবার গোপনেও তিনি আইভীর বিরুদ্ধে কাজ করলে যে খুব বেশি সফল হতেন, সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সুতরাং নারায়ণগঞ্জ সিটিতে আইভী যে হ্যাটট্রিক জয় পাবেন, তা মোটামুটি ধারণা করাই যাচ্ছিল।

তবে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর প্রার্থীরা যে ধরনের মন্তব্য করেন বা নিজের পরাজয়কে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন, তৈমূর আলম খন্দকারও তার ব্যতিক্রম নন। ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন তিনি। ব্যালট পেপারে ভোট হলেও তিনি হয়তো গণনায় কারচুপির অভিযোগ আনতেন।

আমাদের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে এখনও পরাজয় মেনে নিয়ে বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানানোর বিষয়টি সেভাবে চালু হয়নি। কালেভদ্রে দু-একটি ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরাজিত প্রার্থী মূলত বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কারচুপি, অনিয়মসহ নানা অভিযোগ করেন। কিন্তু যিনি অভিযোগ করেন, তার দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগটি যে সত্য সেটি প্রমাণ করা। না হলে ওই অভিযোগটির ‍গুরুত্ব থাকে না। প্রশ্ন হলো, তৈমূর আলম খন্দকার কি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন বা সেটি প্রমাণের কি কোনো পদ্ধতি আছে? যদি থাকে তাহলে তিনি কি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন?

প্রশ্নটা জরুরি, কারণ নারায়ণগঞ্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিটির নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইভিএমকে ‘জালিয়াতির বাক্স’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে তাকে পরাজিত করেছে; ফলে তার এই অভিযোগটি হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।

ইভিএম নিয়ে অতীতেও অনেক প্রার্থীর তরফে অভিযোগ এসেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এই মেশিনে হবে। সুতরাং কোনো একটি মেশিন যদি সব প্রার্থীর আস্থা অর্জন করতে না পারে এবং প্রার্থীদের মধ্যে যদি এই ধারণা থেকেই যায় যে ইভিএমে কারচুপি করা যায়, তাহলে ভোট যত শান্তিপূর্ণই হোক না কেন, আখেরে এটি গ্রহণযোগ্য হবে না। আর ভোট যত শান্তিপূর্ণ হোক, ভোটার উপস্থিতি যতই হোক কিংবা ভোট যত অংশগ্রহণমূলক এবং উৎসবমুখরই হোক না কেন, যে মেশিনে মানুষ ভোট দেবে, সেই মেশিনটি যদি সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে সেই ভোটও বিশ্বাসযোগ্য হয় না।

সুতরাং নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে, ইভিএম নিয়ে সর্বসাধারণের মনে এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কোনো ধরনের কারচুপির সুযোগ নেই এবং এখানে প্রকৃতই জনরায়ের প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু ইভিএম চালুর পর থেকে এ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের বিরাট অংশের মনে যে প্রশ্ন, যে সংশয়, তা দূর করতে নির্বাচন কমিশন ‍খুব বেশি পদক্ষেপ নিয়েছে বা নির্বাচনের বেশ কয়েক দিন আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারদের মধ্যে এই মেশিনটি নিয়ে খুব বেশি প্রচার করেছে এবং হাতে-কলমে এর ব্যবহার শিখেয়েছে, তা বলা যাবে না।

সর্বোপরি কথা হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পরাজয়ের তেমন কোনো কারণ ছিল না। নৌকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ মার্কার প্রার্থীও ছিলেন না। কিন্তু তার পরও পরাজিত প্রার্থী যদি সত্যিই এটি মনে করেন যে ইভিএম হচ্ছে ‘ভোট চুরির বাক্স’, তাহলে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে তার এই বক্তব্যের জবাব দেয়া। আর তৈমুর আলমেরও উচিত হবে তার অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে জানানো। না হলে তার এই অভিযোগটিকে নিতান্তই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর এবং পরাজিত প্রার্থীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বিবেচনা করা হবে, আখেরে যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য নেই।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
আয়কর রিটার্ন জমার সময় বাড়ল এক মাস
করের টাকা যেন অপব্যবহার না হয়: আইনমন্ত্রী
আয়কর দেন না বেশির ভাগ মানুষ
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার আগ্রহ বাড়ছে
রিটার্ন জমায় মেলার সুবিধা কর অঞ্চলে

শেয়ার করুন

মায়ের পরিচয়ে পরিচিতি কেন নয়

মায়ের পরিচয়ে পরিচিতি কেন নয়

একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য অবশ্যই তার মা-বাবার পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। তবে যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, দুজনের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না, একজনের পরিচয়েই বেড়ে উঠতে হবে; তাহলে অবশ্যই যেন সেটা মা হন। মা অথবা বাবা এটা হতে পারে। তবে বিষয়টি শেষ পর্যন্ত একজনে এসে ঠেকলে সেটা অবশ্যই মা। এমনকি সিঙ্গেল মা-ও তো হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বাবার পরিচয় নয়, মায়ের পরিচয়টাই মুখ্য।

এ কথা অনেকেই জানেযে, সন্তান প্রসবের সময় নারীদের অবর্ণনীয় কষ্ট পোহাতে হয়। বলা হয়, প্রসববেদনা অন্য সব শারীরিক কষ্টের চেয়েও বেশি। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখার পর নারী অবলীলায় সব কষ্ট ভুলে যান। আজীবন আগলে রাখেন সেই সন্তানকে। একজন মা তার সন্তানের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকার করেন। মুরগি খুব নিরীহ একটা প্রাণী। কিন্তু মুরগির বাচ্চাকে ধরতে গিয়ে দেখবেন মুরগি কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

নিরীহ একজন নারীও সন্তানের ভালোর জন্য, সন্তানকে আগলে রাখার জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। একাত্তর সালে অনেকেই শহীদ হয়েছেন। শহীদজায়াদের সংগ্রামের অনেক গল্প আমরা জানি। স্বামীর অবর্তমানে তারা সংসার সামলেছেন, সন্তানদের মানুষ করেছেন। শহীদজায়াদের সংগ্রামের ইতিহাস অনেকটাই সিনেমার মতো থ্রিলিং।

এবার মূল কথায় আসা যাক। সন্তানের মায়ের পরিচয় নিশ্চিত হলেও বাবার পরিচয় সবসময় নিশ্চিত না-ও হতে পারে। সন্দেহ হলে ডিএনএ টেস্ট করতে হয়। কিন্তু মায়ের পরিচয়ের জন্য কোনো পরীক্ষার দরকার নেই। অথচ বাস্তবে ঘটে উলটো ঘটনা। সন্তান বেড়ে ওঠে বাবার পরিচয়ে। দুই দশক আগে এই বাংলাদেশেই সন্তানের পরিচয়ে শুধু বাবার নাম লেখা হতো। শেখ হাসিনা প্রথম দফায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে সন্তানের পরিচয়ে বাবার পাশাপাশি মায়ের নামও যুক্ত করেন। কিন্তু মায়ের পরিচয় যেন যথেষ্ট নয়। বাবার পরিচয় ছাড়া মা যেন অসম্পূর্ণ।

এই আলোচনাটি সামনে এনেছেন এক জয়িতা নারী মরিয়ম খাতুন। বাংলাদেশে সাধারণত স্বামী পরিত্যক্তা নারীরা বাবার বাড়িতে গিয়ে বাবা বা ভাইয়ের গলগ্রহ হয়ে গ্লানির জীবনযাপন করেন। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর মরিয়মও নাটোরের বাবার বাড়িতে ভাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন। কিন্তু মরিয়ম আর সবার মতো আশ্রিতা হয়ে থাকতে চাননি। কন্যা মিথিলা খাতুনকে নিয়ে মরিয়ম শুরু করেন জীবনযুদ্ধ। আরও অনেকের অনুপ্রেরণা হয়ে মরিয়ম জিতে নেন জয়িতা পুরস্কার। সবকিছু চলছিল ঠিকঠাকমতোই, বাবা ছাড়া মায়ের লড়াইয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল মিথিলা। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে স্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে জানা গেল, বাবার পরিচয়ের প্রমাণ ছাড়া ভর্তি হওয়া যাবে না। যে বাবা সন্তানকে ছেড়ে দিয়েছে, সন্তানের কোনো দায়িত্ব পালন করে না; সেই বাবাই এখন তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল! মরিয়মের সাবেক স্বামী, মিথিলার বাবা শাহ আলম চাকরি করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। মা-মেয়ে নাটোর থেকে ছুটে এলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তাদের চাওয়া সামান্য- মিথিলার বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের একটি ফটোকপি, যা ছাড়া সামনে এগোতে পারবে না মিথিলা, লড়াই থেমে যাবে মরিয়মের। কিন্তু শাহ আলম জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি তো দিলেনই না, উল্টো মা-মেয়েকে অপমান করে তাড়িয়ে দেন। আর কোনো উপায় না পেয়ে মরিয়ম বেগম তার মেয়ে মিথিলাকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অনশনে বসেছেন।

বিষয়টি নিয়ে যেভাবে লেখালেখি এবং আলোচনা হচ্ছে; তাতে মিথিলা হয়তো তার বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি পেয়ে গেছে বা যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে বাবা সন্তানের দায়িত্ব নেয় না, সে বাবার পরিচয়টা সন্তানের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হবে কেন? কোনো মানুষের জন্মের দায় তার নয়। সে কোন সংসারে জন্ম নেবে, সেটা বেছে নেয়ার অধিকার তার নেই। সব পিতা-মাতারই দায়িত্ব সন্তানকে বড় করে তোলা। সন্তানের প্রতি মা-বাবার অন্ধ অপত্য স্নেহই আসলে সভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে। মা-বাবার সাহায্য, ভালোবাসা ছাড়া কোনো শিশুর পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। তবু শাহ আলমের মতো কিছু পিতা নামের অযোগ্য ব্যক্তি আছে, যারা সন্তানের দায়িত্ব পালন করে না। আবার মরিয়মের মতো অনেক লড়াকু নারী আছেন, যারা সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করে দেন। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য অবশ্যই তার মা-বাবার পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি পরিস্থিতি এমন হয় যে, দুজনের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে না, একজনের পরিচয়েই বেড়ে উঠতে হবে; তাহলে অবশ্যই যেন সেটা মা হন। মা অথবা বাবা এটা হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি শেষ পর্যন্ত একজনে এসে ঠেকলে সেটা অবশ্যই মা। এমনকি সিঙ্গেল মাও তো হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বাবার পরিচয় নয়, মায়ের পরিচয়টাই মুখ্য।

আমাদের দেশে অনেক অদ্ভুত আইন আছে। যেমন কদিন আগে ভূমি না থাকায় পুলিশে চাকরি না পাওয়ার বিষয় নিয়ে অনেক হই চই হয়েছে। আলোচিতরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে চাকরি পেয়েছে, ভূমি পেয়েছেন। কিন্তু ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া দুয়েকজনের চাকরি দেয়ার চেয়ে ভূমি না থাকলে সরকারি চাকরি পাবে না, এ আইনটি বদলানো দরকার। বাংলাদেশের মানুষ কি না সেটাই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত।

ভূমিহীনদের চাকরি না হওয়ার মতোই মান্ধাতা আমলের চিন্তা বাবার পরিচয় ছাড়া সন্তানের ভর্তি হতে না পারার বিষয়টি। একজন মানুষকে বিবেচনা করা হবে তার মেধা, তার যোগ্যতা দিয়ে; বাবা বা মা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। পরিচয় যদি লাগেই, তবে সেটা হোক মায়ের পরিচয়। মরিয়ম তবু জয়িতা নারী বলে, দাবি আদায়ে অনশনে বসতে পেরেছেন। কিন্তু কত নারী এভাবে পুরুষদের লাঞ্ছনা, অবমাননার শিকার হচ্ছেন; আমরা তার কোনো খবরই রাখি না। মরিয়ম বেগম যে সাহস দেখিয়েছেন, তা যেন আমাদের চোখ খুলে দেয়।

লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
আয়কর রিটার্ন জমার সময় বাড়ল এক মাস
করের টাকা যেন অপব্যবহার না হয়: আইনমন্ত্রী
আয়কর দেন না বেশির ভাগ মানুষ
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার আগ্রহ বাড়ছে
রিটার্ন জমায় মেলার সুবিধা কর অঞ্চলে

শেয়ার করুন

করোনা ও হত্যাবাণিজ্যের কড়চা

করোনা ও হত্যাবাণিজ্যের কড়চা

গত বছর যেভাবে লকডাউন দিয়ে সুফল অর্জিত হয়েছিল এখন সেটা প্রায় অসম্ভব। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে, দরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবন সচল রাখতে হলে এককথায় সাধারণ মানুষের খেয়েপরে বাঁচার পথ খোলা রাখতে চাইলে, গরিবের কথা মাথায় থাকলে লকডাউনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। লকডাউনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের পক্ষে বহন সম্ভব নয়।

করোনা পরিস্থিতির আবারও অবনতি ঘটল। বিশেষ করে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে। বহির্বিশ্বে তো বটেই বাংলাদেশেরও পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। মাঝখানে জনমনে একটা স্বস্তি এসেছিল সংক্রমণহার এবং মৃত্যুহার কমে যাওয়ার ফলে। মাত্র মাস-দুইতিন আগেও যেখানে আক্রান্তের গড় হার ছিল প্রতিদিন শতকরা ১৩-১৪ জন, সেখানে আমরা তা নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম শতকরা ১-২ জনে। কিন্তু করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট আসার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত এবং মৃত্যুহার দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত দৈনিক আক্রান্তের হার শতকরা ১৫-১৬ জনে পৌঁছেছে। আক্রান্তের পাশাপাশি বাড়ছে মৃত্যুহারও। এই অবস্থা নিঃসন্দেহে শঙ্কাজনক।

গত বছর যেভাবে লকডাউন দিয়ে সুফল অর্জিত হয়েছিল এখন সেটা প্রায় অসম্ভব। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে, দরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবন সচল রাখতে হলে এককথায় সাধারণ মানুষের খেয়েপরে বাঁচার পথ খোলা রাখতে চাইলে, গরিবের কথা মাথায় থাকলে লকডাউনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। লকডাউনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় বাংলাদেশের পক্ষে বহন সম্ভব নয়।

তাহলে বিকল্প কী? এই ভাবনা অনেকেই ভাবছেন। সরকারের তরফ থেকে টিকা কর্মসূচি আরও জোরদার করতে হবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনও স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। মানানোর মতো ব্যাপক জনমত গঠন করার বিকল্প নেই।

চিকিৎসক-সাংবাদিক তথা গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি প্রবীণদেরও বুস্টার ডোজের আওতায় আনার সরকারি প্রয়াস জারি আছে। কিন্তু প্রথম ডোজইতো এখনও দেয়া যায়নি বিপুলসংখ্যক মানুষকে। প্রথমবার যারা পেয়েছেন তাদের অনেকে এখনও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি। টিকা নেননি অথবা পাননি এমন নাগরিকের সংখ্যাও অসংখ্য!

আরও ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার জন্য গত সপ্তাহে উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কার্যকর করা যায়নি। সরকারের তরফে বলা হয়েছিল অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের জন্য। কিন্তু গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট মালিক-চালক কর্তৃপক্ষ সরকারের প্রস্তাব কার্যকর করেনি। গণমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদনে পাওয়া প্রামাণ্য বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, অনেক বাসচালক-হেলপার এবং সুপারভাইজারও টিকা গ্রহণ করেননি অথবা পাননি! তাহলে উপায়? কেন জনগণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসব টেকনিক্যাল পেশার লোকজনকে টিকার আওতায় বাধ্যতামূলকভাবে আনা গেল না! এ যে শুধু বাসচালকদের ক্ষেত্রে সত্য, তা নয়। লঞ্চ স্টিমারসহ অন্য গণ- পরিবহনের চিত্রও প্রায় অভিন্ন।

টিকার কথা আসতেই মনে পড়ল আন্তর্জাতিক বাজারের মহাপরাক্রমশালী টিকা ব্যবসায়ীদের কথাও। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি স্ট্যাটাসের কথা বলি। স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ডক্টর তমাল রায়চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক। রীতিমতো পিলে চমকানো তথ্য। চীনের উহান প্রদেশ থেকে করোনার আবির্ভাব কিংবা উৎপাদন এবং এই নিষ্ঠুরতম অমানবিক বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিশ্বমোড়লদের ভয়াবহ সব কর্মকাণ্ডের তথ্য। সত্য-মিথ্যা যাচাই করবেন গবেষকরা। কিন্তু যেসব যুক্তি ওই দীর্ঘ স্ট্যাটাসে উল্লেখ করা হয়েছে এবং যেসব রেফারেন্স দেয়া হয়েছে, তা একেবারে ঝেড়ে ফেলে দেয়াও যায় না। যাকগে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাদের মতো সীমিত সম্পদের দেশ এবং দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে এ মুহূর্তেই জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

বিশেষ করে টিকা কার্যক্রম জোরদার করে যত দ্রুত সম্ভব দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা। এ ক্ষেত্রে কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর ভরসা করলে হবে না। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সমন্বিত ক্র্যাশ প্রোগ্রামও নিতে হবে। গণপরিবহনসহ জনসমাগমস্থলে যাতে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করা যায়, তাহলেও অন্তত কিছুটা শঙ্কা কমতে পারে। গার্মেন্টস, ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ কাজ করছে, তাদের সবাইকে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিষ্ঠান মালিকদেরকে দিয়েই করাতে হবে। এর বিকল্প আর কিছু নেই। যত সহজে লিখলাম তত সহজ নয় কাজটি। কিন্তু দুঃসাধ্যও নয়। অধিকাংশ কারখানায় বেশিরভাগ শ্রমিক স্বাস্থ্যবিধি না মেনে নির্বিকার কাজ করে যাচ্ছে।

এর বাইরে হাটবাজার, গণপরিবহন, জনসমাগম হয় এমন স্থান; স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংক্রমণের আশঙ্কা আছে এমন স্থানসমূহে ব্যাপক মনিটরিং করতে হবে। তা শুধু স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠার জন্যই। প্রয়োজনে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি অমান্যকারীদের দরকারে শাস্তির আওতায় এনে হলেও এটা বাস্তবায়ন করা জরুরি।

আরেকটি শঙ্কার কথা বলে রাখা ভালো, তা হচ্ছে দেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে, এমনকি কোনো কোনো জেলা শহরেও করোনার প্রকোপকালে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু বিশেষায়িত হাসপাতাল সক্রিয় ছিল। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বিস্তৃত ছিল। টেস্ট-কিটসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি তারা সংরক্ষণ করেছিল।

আইসিইউর সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু গত মাস দুই-তিনেক করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকেই অনেক হাসপাতালকে হাত-পা গুটিয়ে নিতে দেখা গেছে। এখন যদি অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে, সে ক্ষেত্রে মৃত্যুর মিছিল হয়ে যাবে যথার্থ চিকিৎসা সংকটেই। অতীত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইসিইউসহ উন্নত চিকিৎসার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।

ডক্টর তমাল রায়চৌধুরীর দীর্ঘ লেখাটি পড়ে মনে হয়েছে করোনা যেন মানবসৃষ্ট এবং অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করা একটি বাণিজ্যিক আইটেম। নৃশংসতম গণহত্যার পথ ধরেই যেন চলেছে সেই বাণিজ্য!

২০০৮ খ্রিস্টাব্দে লেখা একটি বইয়ের নাম ‘করোনা ক্রাইসিস’। বইটির লেখক রবিন রুইট। তিনি এই বইটিতেই আগাম লকডাউন পেন্ডামিকের কথা লিখে গেছেন! লন্ডনে অনুষ্ঠিত ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ৩০তম অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও দেখানো হয় পেন্ডামিকের ওপর অনুষ্ঠান! যেখানে নার্সেরা মাস্ক পরা অবস্থায় শুশ্রূষা করছেন আক্রান্ত রোগীর! শুধু তাই নয়, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে সাংবাদিক হ্যারি ভক্স তার প্রতিবেদনে লিখেছেন: “এক ভয়ংকর রাসায়নিক যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, যা হয়তো পৃথিবী ধ্বংসের শুরু!”

এছাড়া ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ৬শ ডাক্তারের তৈরি করা মেডিক্যাল বোর্ড একটি সংগঠন তৈরি করে, সংগঠনটির নাম ‘ডক্টরস ফর ট্রুথ’। তারা এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার জানিয়ে দেন “covid-19 নামের এক ভয়াবহ ভাইরাস-পরিমণ্ডল তৈরির জন্য ভয়ংকর স্ক্যামের ভাবনা ভাবা হচ্ছে (২০১৫ খ্রিস্টাব্দে covid-19 নাম!) যার মূলে আসলে ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল বাজার দখলের নোংরা খেলা এবং প্রতিষেধকের নতুন বাজার তৈরির উন্মত্ত খেলা, এটাই হতে চলেছে নিকৃষ্টতম গ্লোবাল ক্রাইম।”

যুক্তরাষ্ট্রে এই তৎপরতার ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয় প্যানডেমিক নামে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে রিচার্ড রথশিল্ড নামের এক বিজ্ঞানী কোভিড টেস্টিং কিটের একটি পেটেন্ট নিয়ে রাখেন! গোপন চুক্তি হয় বিশ্বের এক নম্বর ধনকুবের বিল গেটসের সঙ্গে!

২০১৭ ও ২০১৮ সালে ১০ কোটি টেস্ট কিট উৎপাদন করা হয় এবং তা সংরক্ষণ করেন বিল গেটস! করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়া বা ডক্টর তমালের ভাষায় ছড়িয়ে দেয়ার তিন বছর আগেই Covid-19-এর রূপরেখা তৈরি হয়ে গিয়েছিল! শুধু তাই নয়, কোন দেশে কত রপ্তানি করা হবে তার ভাগবাটোয়ারাও তৈরি হয়েছিল, সে তথ্য বিল গেটস এবং তার সংগঠন WITS (world integrated trade solution) থেকে পাওয়া গেছে!

২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এই তথ্য সোশ্যাল-মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যেতেই পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর ‘কোভিড-১৯ টেস্ট কিট’-এর নাম বদলে ‘মেডিক্যাল টেস্ট কিট’ করা হয় এবং তা বুলেটিন আকারে প্রকাশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে ডক্টর তমাল রায়চৌধুরী উল্লেখ করেছেন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের একটি ঘটনা। যখন করোনার নামগন্ধও ছিল না। এই ঘটনার দুই বছর আগেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও চীনে কোটি কোটি ‘কোভিড নাইনটিন টেস্ট কিট’ সরবরাহ করে! ভয়ংকর হলেও সত্য বিশ্বব্যাংক বলেছে : “covid-19 এমন এক পরিকল্পনা যার ব্যাপ্তি ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত এবং তখন থেকেই শুরু হয়ে যাবে পুরোপুরি ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এবং অটোমেশন যুগের সেটাই শুরু।

২০১৭ সালে বিল গেটসের পক্ষ থেকে অ্যান্থনি ফৌসি এক বিজ্ঞান আলোচনা অনুষ্ঠানে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অদ্ভুত ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন: “ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৯ সালে এক বিস্ময়কর জৈব মহামারির সম্মুখিন হবেন যার উত্তর আমরা তৈরি করে রেখেছি।”

কীভাবে তিনি দুই বছর আগেই এমন নিশ্চিত করে বলতে পারলেন করোনা তথা জৈব মহামারির কথা! ২০১৮ সালে বিল গেটস বলেছিলেন: “অ্যা গ্লোবাল প্যানডেমিক ইজ অন ইটস ওয়ে, দ্যাট থার্টি মিলিয়ন পিপল... ইট উইল কনটিনিউ টিল নেক্সট ডিকেড।”

আরও বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে এর এক বছর পর ২০১৯ সালের অক্টোবরে বিশ্বের এক নম্বর ভ্যাকসিন ডিলার বিল গেটস নিউইয়র্কে দুই দিনের এক বিজনেস মিটিং ডাকলেন। তার দ্বিতীয় দিনের দিনের এজেন্ডা ছিল ‘করোনা ভাইরাস প্যানডেমিক এক্সারসাইজ’! এই বিজনেস মিটিংয়ের শিরোনাম ছিল Event 2013. মার্কেটিয়ারদের উদ্দেশে তিনি বললেন : “উই নিউ টু প্রিপেয়ার ফর দ্যাট ইভেন্ট।”

কী ভয়ংকর উক্তি! করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া বিষয়টাকে একটা ইভেন্ট বললেন তিনি! পৃথিবীর সেরা জৈব-বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় উহানে তখন জৈব মারণাস্ত্র তৈরি প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। বিল গেটস অনুমতি দিলেই কেবল ছড়িয়ে দেয়া।

ডক্টর তমাল রায়চৌধুরী লিখেছেন: ভ্যাকসিন মানেই বাজার। একচেটিয়া বাজার। ৬শ কোটি টাকার মালিক বিল গেটসের এর পরের অবদান ডিজিটাল ভ্যাকসিন আইডি, যা হবে আপনার-আমার পরিচয়পত্র! এই আইডি যন্ত্র একটা এক্স-রে মেশিনের মতো, শরীরের স্পর্শমাত্র সে বলে দেবে আপনি ভ্যাকসিনেটেড কি-না। এই টেকনোলজির নাম W02020-0606061.

যন্ত্র তৈরি। এখন শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। বাইরে যেখানেই ঢুকবেন এই যন্ত্রের পরীক্ষার ভেতর দিয়ে ঢুকতে হবে, এই মারণ খেলার ফাঁদে পড়ে ভ্যাকসিন নিতেই হবে।

এই নির্মম বাস্তবতার বিশ্লেষণ আর নানা জিজ্ঞাসা এখন ভাসছে বাতাসে। এই চরম বৈষম্য আর অসমতার পৃথিবীতে আমরা ভেবেও এর কোনো কূলকিনারা করতে পারব না। আমাদের প্রয়োজন এখন শুধু আত্মরক্ষার পথ উদ্ভাবন আর সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজে বাঁচা এবং সমাজকে বাঁচানো।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
আয়কর রিটার্ন জমার সময় বাড়ল এক মাস
করের টাকা যেন অপব্যবহার না হয়: আইনমন্ত্রী
আয়কর দেন না বেশির ভাগ মানুষ
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার আগ্রহ বাড়ছে
রিটার্ন জমায় মেলার সুবিধা কর অঞ্চলে

শেয়ার করুন

সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়ে ওঠার কথা

সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়ে ওঠার কথা

সুন্দরবন এখন জলদস্যুদের কাছ থেকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত। এটি কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সফল কার্যক্রম এবং জলদস্যুদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রণোদনার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও ব্যবসা নিয়ে প্রথমবারের মতো করা পিএইচডি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঘ চোরাকারবারীরা এখনও সুন্দরবনে রয়ে গেছে।

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য যার বেশিরভাগ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ এই বিশ্ব ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে, তাদের বেশিরভাগই জেলে, মধু এবং কাঠ সংগ্রাহক। উপকূলীয় জনগণকে তাদের জীবিকার জন্য ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। তার পাশাপাশি জলদস্যুদের ভয় তাদেরকে সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখত।

২০১৬ সালে ১২টির মতো জলদস্যু বাহিনী তৎপর ছিল যারা সুন্দরবনকে নিয়ন্ত্রণ করত। এই অঞ্চলে সক্রিয় জলদস্যু চক্রের কারণে আশেপাশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা সব সময় আতঙ্কে থাকত। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন। ওই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সামনে জুম ভিডিওর মাধ্যমে ৩ হাজার ৩২১টি অস্ত্র ও অস্ত্রভাণ্ডারসহ ৬টি গ্রুপের অন্তত ৫৮ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের আগে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং কীভাবে সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়— এর প্রেক্ষাপট ও উত্তর খোঁজা আবশ্যক।

সুন্দরবনে জলদস্যুরা সুন্দরবনের রাজা হিসাবে বিবেচিত হতো। জলদস্যুতা, ডাকাতি এবং চোরাশিকারি বেড়ে বাংলাদেশের ফুসফুসের জন্য ক্যানসারে রূপান্তরিত হয়। স্থানীয়, জেলে এবং ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ ছিল বর্ণনাতীত। জলদস্যু ও ডাকাতদের অপরাধমূলক কার্যকলাপে উপকূলীয় মানুষ, বিশেষ করে জেলে, কাঠ ও মধু সংগ্রহকারীদের প্রাত্যহিক জীবন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতো।

জলদস্যুদের মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত হয়েছে অনেক জেলে, মৌয়াল এবং কাঠুরিয়া; অনেক নিরীহকে হারাতে হয়েছে প্রাণ। অপহরণ এড়াতে এলাকার জেলেদের জলদস্যুদের থেকে ‘জেল থেকে মুক্ত হও’ কার্ড নিতে হতো। স্থানীয়রা অভিযোগ ছিল, জলদস্যুদের কাছে মুক্তিপণের একটি নির্দিষ্ট হার ছিল— একজন মানুষের জন্য ২০ হাজার থেকে ১ লাখ এবং একটি ট্রলারের জন্য ৫ হাজার থেকে ১০হাজার টাকা। অপরাধীরা অপহরণ এবং লুটপাটের মাধ্যমে ২শ কোটিরও বেশি ‘বার্ষিক ব্যবসা’ তৈরি করেছিল। এছাড়াও, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটন খাত মূলত জলদস্যুদের কারণেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ক্রমাগত অভিযান এবং তদারকির মাধ্যমে সরকার সুন্দরবনে জলদস্যুদের দমন করতে সক্ষম হয়েছে। নদীর দানবদের প্রতি কঠোরতা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার গ্যারান্টি জলদস্যুতা নিবৃত করতে সক্ষম হয়।

সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিজিবি এবং বন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে ২০১২ সালে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ৩০ মে মাস্টার বাহিনী নামে কুখ্যাত জলদস্যু দলটি প্রথম আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু বড় ভাই বাহিনী, আইয়ুব বাহিনী, রেজা বাহিনী, শাহিনুর বাহিনী এবং অন্যান্য দল সুন্দরবনে লুকিয়ে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল।

সময়ে সময়ে তাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। এই এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জলদস্যুদের সঙ্গে লড়াইয়ে র‌্যাবের কমপক্ষে ২৮ সদস্য নিহত হয়েছে। তবে তারা ২শ ৪৬টি সফল অভিযান চালিয়েছে এবং ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন চক্রের ৫শ ৮৬ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এমনকি জলদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের ওপর ভিত্তি করে ‘অপারেশন সুন্দরবন’ নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

শুধু দমনের প্রচেষ্টায় অভিযান চালিয়ে জলদস্যুদের ম্যানগ্রোভ বন থেকে নির্মূল করা ছিল অসম্ভব। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের পুনর্বাসন এবং তাদের পরিবারকে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য ‘সুন্দরবনের হাসি’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করা হয় যা মূলত জলদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ৩১ মে, ২০১৬ থেকে ০১ নভেম্বর, ২০১৮ পর্যন্ত ৪শ ৬২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে সুন্দরবনের ৩২টি ডাকাত দলের ৩শ ২৮ সদস্য। প্রত্যেক জলদস্যু তাদের নতুন জীবন শুরু করার জন্য ১ লাখ করে টাকা পায়। এছাড়াও, সেলাই, কম্পিউটার, ড্রাইভিং, বুটিকসহ নানা বিষয়ে তাদের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

উল্লেখ্য, সুন্দরবন পুনর্বাসন প্রকল্প এতটাই সফল হয়েছে যে, এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার ৪৩ ডাকাত ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আত্মসমর্পণ করে।

সুন্দরবন এখন জলদস্যুদের কাছ থেকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত। এটি কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সফল কার্যক্রম এবং জলদস্যুদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রণোদনার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও ব্যবসা নিয়ে প্রথমবারের মতো করা পিএইচডি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঘ চোরাকারবারীরা এখনও সুন্দরবনে রয়ে গেছে। ২০১৪ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪শ ৪০ যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১শ ১৪ তে নেমে এসেছে যেটি সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বাঘ শিকারের সিন্ডিকেট ভাঙতে আরও কঠোর এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক।

সুন্দরবনে জলদস্যুতা এখন একটি স্মরণীয় অতীত, যা আমরা আর দেখতে চাই না। আশা করা হচ্ছে যে, সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্প আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে সহায়তা করবে। এছাড়া সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত রাখতে প্রকল্পের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই।

লেখক: গবেষক, প্রবন্ধকার ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
আয়কর রিটার্ন জমার সময় বাড়ল এক মাস
করের টাকা যেন অপব্যবহার না হয়: আইনমন্ত্রী
আয়কর দেন না বেশির ভাগ মানুষ
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার আগ্রহ বাড়ছে
রিটার্ন জমায় মেলার সুবিধা কর অঞ্চলে

শেয়ার করুন

মানবাধিকার ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী

মানবাধিকার ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী

বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিবন্ধী মানুষ। শুধু সমাজ বা রাষ্ট্র থেকেই নয়, এমনকি পরিবার থেকেও প্রায়শই বঞ্চনা আর নেতিবাচক আচরণের শিকার হন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিবন্ধীদের রয়েছে নানা বঞ্চনা আর বৈষম্যের অভিজ্ঞতা। বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নিজের অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধীরা নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সমতা বলতে বোঝায় মৌলিকভাবে ‘আমরা সবাই এক’, আমাদের নানা ধরনের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের সবার জীবনের মূল্য একই। শুধু মানব সন্তান হিসেবে জন্ম নেয়ার কারণেই মানবাধিকারের সব মানুষের রয়েছে সমান দাবি এবং অধিকার। মানব বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা মানুষের এ অধিকারকে স্বতন্ত্র করে তোলে কিন্তু তা কখনই ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না। সমতার মূলনীতিসমূহ চর্চা করতে গেলে বা করার সময় ব্যক্তিসহ গোটা সমাজকে প্রতিবন্ধিতাসহ সব ধরনের মানববৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।

সমতার মূলনীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি পন্থা অবলম্বন করা হয়। প্রথমেই যেটি নিয়ে আলোচনা করা হবে সেটিকে বলা হয় ‘আনুষ্ঠানিক সমতা’ এবং এটি সাধারণত ঘটে থাকে যখন কোনো আইন বা নীতিমালায় আহ্বান করা হয় যে, নানা স্তরের জনগণকে সমতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার জন্য বা কাউকে যেন বৈষম্য না করা। কিন্তু শুধু এর দ্বারা প্রতিবন্ধী বা যেকোনো জনগোষ্ঠীর জন্য সত্যিকারের সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এটি যথেষ্টও নয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি ও সমাজ দ্বারা সৃষ্ট কৃত্রিম বাধাসমূহের সম্মুখীন হয়, সেগুলো বিবেচনা ও মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দরকার হতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে সম-সুযোগ দিতে হলে, কাঠামোগত-তথ্যগত, যোগাযোগের ক্ষেত্রে এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত যেসব বাধার সম্মুখীন হয়, সেগুলো নির্মূল করতে হবে। সমতা প্রতিষ্ঠায় আরেকটি যে পন্থা অবলম্বন করা হয়, সেটিকে প্রায় ক্ষেত্রেই বলা হয় ‘সুযোগের সমতা’। এ পন্থা স্বীকৃতি দেয় যে, মানুষ তার নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে কিছু বিষয় ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়।

বর্ণ, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা এবং সামাজিক অবস্থান। শুধু এ বিষয়গুলো অথবা এর সঙ্গে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিগত এবং অন্যান্য বাধা যোগ হয়ে নিজেদের মতো করে জীবন যাপন করা এবং সমাজে অবদান রাখা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে হলে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন হয়, যা কিনা ‘আনুষ্ঠানিক সমতা’-র বাইরে, এবং তা বিশেষভাবে প্রতিবন্ধী মানুষদেরও একই সুযোগপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে। সেগুলো হতে পারে- পরিবহন ব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে এমন চর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা এবং প্রতিবন্ধিতার ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তৃতীয় যে পন্থা অবলম্বন হিসেবে যেটি উল্লেখ করা হয়, সেটি হলো- ‘প্রকৃত বা কার্যত সমতা’।

এ পন্থার মূল বক্তব্য হলো- ‘শুধু সুযোগের সমতা নয় ফলাফল বা পরিণতির সমতাও নিশ্চিত করা’। মানুষের সমতা নিশ্চিত করার জন্য ‘সব মানুষ সমান’ শুধু এ বাক্যটি যথেষ্ট নয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে, প্রকৃত বা কার্যত সমতা মনে করে, ব্যক্তি সমাজে কতটুকু অবদান রাখতে পারল বা তার রাখার সামর্থ্য কতখানি রয়েছে তা নির্বিচারে সবারই রয়েছে মানবাধিকারসমূহে সমান ও সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করার অধিকার। যদিও ‘সুযোগের সমতা’ পন্থার সঠিক প্রয়োগই যথেষ্ট, বেশিরভাগ প্রতিবন্ধী মানুষ যাতে তাদের মতো করে মানবাধিকার উপভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য, কিন্তু ‘প্রকৃত সমতা’ পন্থার ওপর বাড়তি অঙ্গীকার প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

বলা যেতে পারে যে, কাজ বা চাকরিতে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যাতে বৈষম্যের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করলেই প্রতিবন্ধীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে না, যদি না একই সঙ্গে কাজ বা চাকরি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এ কারণে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রকৃত সমতা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে প্রতিবন্ধীর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা চাকরির বাজারে অন্য সবার মতো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

বৈষম্যকরণ-এর মূল অর্থই হলো ‘ভেদাভেদ করা, অবজ্ঞা করা, অবহেলা করা, নিম্নশ্রেণির ভাবা, অবমাননাকর আচরণ করা’ এবং এর ভাব বা লয় সম্পূর্ণ নেতিবাচক। আচরণ বর্ণনার ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহারকালে সেটি আরও নেতিবাচক রূপ নেয়। যখন কোথাও উল্লেখ করা হয় কাউকে ‘বৈষম্য’ করা হয়েছে, তখন এর অর্থই হলো- ব্যক্তিটির সঙ্গে শুধু ভিন্ন আচরণই না অন্যায্য আচরণও করা হয়েছে।

এ ধরনের অন্যায্য আচরণ করা হতে পারে সুস্পষ্টভাবে, যেমন- এমন একটি আইন পাস হলো, যেটি খুব উন্মুক্তভাবে প্রতিবন্ধী মানুষকে বৈষম্য করে অথবা এটি হতে পারে খুবই অস্পষ্টভাবে। যেমন- আইনটি হয়তো নিরপেক্ষ, কিন্তু এর প্রয়োগ হয় প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিকূলে। এ ধরনের অস্পষ্ট বৈষম্য ক্ষতিকর হতে পারে কারণ, জনগণ মনে করতে পারে যে, সুস্পষ্ট বৈষম্য না থাকার অর্থই হলো সেটি ন্যায্য, এর প্রভাব ক্ষতিকর হলেও।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এর দ্বারা যে ক্ষতি হতে পারে তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে বিষয়গুলোকে আখ্যায়িত করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনগুলোতে নির্দিষ্ট কোনো কিছু, প্রতিবন্ধিতা, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, জাতিসত্তা ইত্যাদি অথবা অন্য যেকোনো কিছুর ভিত্তিতে কাউকে বৈষম্য করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ কারণেই বৈষম্যহীনতার মূলনীতি হলো- কোনো ধরনের বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত না হওয়ার অঙ্গিকার এবং অস্পষ্ট ও পরোক্ষ বৈষম্যের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। রাষ্ট্রকেও নিশ্চিত করতে হবে সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে থাকবে তার অবস্থান, সেটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের বৈষম্য হলেও।

বৈষম্যহীনতার সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর দিক হচ্ছে যে, রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বিশেষ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করে, কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজনও হয়। এর কারণ হলো- বৈষম্যহীনতা ও সমতার মূল নীতিসমূহ একে অপরের সঙ্গে ক্রিয়াশীল। প্রতিবন্ধীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি যে বৈষম্য করা হয়েছে, যা তাদেরকে অন্য সবার মতো সম্পূর্ণ সমতা উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হতে বাধ্য করেছে।

এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে রাষ্ট্র কিছু পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা বিশ্বের নানা দেশে ও প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়। নানা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী কর্মীদের অবদানকে মূল্যায়ন ও আরও বেশি প্রতিবন্ধীকর্মী নিয়োগ দেয়ার জন্য উৎসাহিত করতে প্রচেষ্টা নিলে হয়তো নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কিছু বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদে সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ‘স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন সেবা প্রাপ্তির অধিকার’কে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির এ অধিকার লঙ্ঘিত হলে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকেও সে বঞ্চিত হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অধিকার বিষয়ে বলা হয়েছে। সর্বজনীন মানবাধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিপূরক ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে আলাদাভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারসনদ প্রণীত হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিবন্ধী মানুষ। শুধু সমাজ বা রাষ্ট্র থেকেই নয়, এমনকি পরিবার থেকেও প্রায়শই বঞ্চনা আর নেতিবাচক আচরণের শিকার হন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিবন্ধীদের রয়েছে নানা বঞ্চনা আর বৈষম্যের অভিজ্ঞতা। বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নিজের অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধীরা নানাভাবে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। দুনিয়াব্যাপী প্রতিবন্ধিতা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন জাতিসংঘ প্রতিবন্ধীর অধিকার সনদ বা সিআরপিডি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে মানব বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের চিরন্তন মর্যাদার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এখানে প্রতিবন্ধীদেরকে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে সমাজকে সবার জন্য উপযোগী করার মাধ্যমে সব সামাজিক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। দুনিয়াব্যাপী প্রতিবন্ধিতা আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন এই সনদের এক গর্বিত ও অগ্রণী অংশীদার বাংলাদেশ। বর্তমান সরকার অত্যন্ত প্রতিবন্ধীবান্ধব এবং প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করছে। প্রতিবন্ধীরা সমাজের সব ক্ষেত্রে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারছে। তবু সমাজের সবাইকে প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে আরও কাজ করতে হবে এবং তাদের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

আরও পড়ুন:
আয়কর রিটার্ন জমার সময় বাড়ল এক মাস
করের টাকা যেন অপব্যবহার না হয়: আইনমন্ত্রী
আয়কর দেন না বেশির ভাগ মানুষ
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার আগ্রহ বাড়ছে
রিটার্ন জমায় মেলার সুবিধা কর অঞ্চলে

শেয়ার করুন

কৌশলটার পরিবর্তন চাই

কৌশলটার পরিবর্তন চাই

গত ২১ মাসে করোনার দুটি ঢেউ বুঝিয়ে দিয়েছে ‌যে, যুদ্ধের কৌশলেও পরিবর্তন চাই। কেবল গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাফেরাসহ কিছু খাপছাড়া বিধিনিষেধ দিয়ে তৃতীয় প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। সুস্থ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে।

করোনার ঢেউ সহসা বন্ধ হচ্ছে না। একটার পর একটা আসছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কিন্তু করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের হাত ধরে গত ৩ জানুয়ারি থেকে দেশে দৈনিক শনাক্তের হার বাড়তে থাকে। করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রায় পাঁচ মাস পর ১১ দফা নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।

১১ দফার মধ্যে অন্যতম হলো- ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরা এবং রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে টিকার সনদ দেখানো। সেইসঙ্গে উন্মুক্ত স্থানে সব ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সমাবেশ পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বলা হয়। সরকারিভাবে বলা হয়েছে এসব বিধিনিষেধের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—মহামারি থেকে সুরক্ষার জন্য জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা। করোনার সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানো ঠেকাতে মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিত করা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য গণপরিবহনে সক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহন। প্রাত্যহিক জীবনে হাত ধোয়া এবং স্যানিটাইজ করার অভ্যাস চালু রাখা।

সরকারঘোষিত ১১ দফা নির্দেশনা করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও এগুলো আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে সংশয়।সরকারি ঘোষণা ও বাস্তবতার মধ্যেই রয়েছে অনেক স্ববিরোধিতা। বাণিজ্য মেলা চলছে, পিঠা উৎসব চলছে, রাজনৈতিক সমাবেশ চলছে, নির্বাচন চলছে— এটা স্পষ্টতই ১১ দফার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাণিজ্য মেলাকে আরও সফল করার জন্য, আরও জনসমাগম বাড়ানোর জন্য আয়োজন হচ্ছে, প্রচারণা হচ্ছে। কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা চলবে- বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্য মেলা কি খোলা রাখা সম্ভব? আর স্বাস্থ্যবিধি কেউ মানছে কি না, সেটাইবা নিশ্চিত করবে কে?

টিকার সনদ দেখিয়ে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার বিষয়ে সরকার যে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে সেটাও অবাস্তব এক প্রস্তাব। মানুষ কি টিকার সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরবে? আর এ ব্যাপারে তদারকিইবা কে করবে?

১১ দফা প্রস্তাব শেষ বিচারে কাগুজে ঘোষণা ছাড়া কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হয় না। কারণ এই ১১ দফা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কে বাস্তবায়ন করবে, কে তদারকি করবে— তার কোনো নির্দেশনা নেই। এমন ঘোষণা বা বিধিনিষেধ অতীতেও দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি। তদারকির ব্যবস্থা না থাকলে সে নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয় না। তা ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হলে একটা সমন্বিত, সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। জনমানুষের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। কিন্তু তেমন কিছু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না।

সরকার যা বলছে, যা করছে, তা যেন কেবলই করার জন্য করা। তা না হলে গণপরিবহনে সক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের মতো অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে কেন? আর ঘোষণা দেয়ার পর আবার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরেইবা আসবে কেন? দোকান-পাট, অফিস-আদালতসহ মানুষের রুটি-রুজির জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু খোলা রেখে শুধু গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত কোন যুক্তিতে গ্রহণ করা হয়েছিল? এমনিতেই আমাদের দেশে গণপরিবহনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম।

সেখানে যদি অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচলের নিয়ম করা হয়, তাহলে মানুষ গন্তব্যে পৌঁছবে কীভাবে? বড়লোকদের নিজস্ব পরিবহন আছে। তাদের জন্য ওয়ার্ক ফ্রম হোমসহ নানা সুবিধা আছে। এমনকি সপ্তাহের প্রতিদিন তাদের বাইরে বের না হলেও চলে। কিন্তু দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সেই সুযোগ নেই। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাদের বাড়ির বাইরে বা কর্মস্থলে যেতেই হবে। এসব মানুষের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়টি কি সরকারের বিবেচনার বাইরেই থেকে যাবে?

গত প্রায় ২১ মাসের মহামারি জীবনে লকডাউনের মতো কঠোর বিধিনিষেধ সাধারণ মানুষের জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। টিকাকরণও এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়নি। দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন। দুই ডোজ করে টিকা পেয়েছেন প্রায় ৩২ শতাংশ মানুষ। যদিও টিকাকরণ মানেই করোনা থেকে রেহাই পাওয়া নয়। টিকাকরণের পরেও যে কোভিড ছড়িয়েছে, তার সাক্ষী বহু দেশ। ইজরায়েলে চার ডোজ় টিকার পরেও সংক্রমণ বেড়েছে পনেরো গুণ! জার্মানিতে তৃতীয় ঢেউ পেরিয়ে কোভিডের চতুর্থ প্রবাহে জানুয়ারিতে প্রতিদিন আক্রান্ত প্রায় এক লাখ মানুষ। আমেরিকায় দিনে দশ লাখ। প্রতিবেশী ভারত, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডেও করোনা সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

করোনা ভাইরাসের ক্রমাগত মিউটেশন চলছে, আসছে একের পর এক স্ট্রেন। কোনটা অধিক সংক্রামক, কোনটা বেশি প্রাণঘাতী, এসব তথ্য অনেকটাই অজানা। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রধান অস্ত্র মনে করা হয় মাস্ককে। ভালো মানের মাস্ক ব্যবহার, স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পরা ও খোলা, নিয়মিত মাস্ক পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনসমাগম হয়- এমন স্থানে গেলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশে এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে মাস্ক ব্যবহারে উৎসাহী করা যায়নি। শহরে অল্প কিছু মানুষ ছাড়া কেউই মাস্ক ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।

এটা অবশ্য শুধু বাংলাদেশের চিত্র নয়, কোভিড-আক্রান্ত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই মাস্ক পরতে নারাজ নাগরিক নীতিনির্ধারকদের বিরাট চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এমনকি, স্বজনের মৃত্যু দেখেও কোভিড বিধি পালন করতে অনেকে অনাগ্রহী। চ্যালেঞ্জটা এখানেই। জীবনযাপনকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজটি অত্যন্ত কঠিন। যদি আমরা বাধ্য হতাম, মাস্ক ব্যবহার করতাম তাহলে ভিন্ন রকম প্রেক্ষিত তৈরি হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তা হয়নি।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়েই অবশ্য একই ক্লান্তি এবং অনীহা। সেক্ষেত্রে ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। মানুষ কেন এত ক্ষত ও ক্ষতি নিজচোখে দেখেও কোভিড-বিধি মানতে নারাজ? এ এক আশ্চর্য প্রবণতা! গবেষকরা বলছেন, করোনা ঠেকাতে সবাইকেই মাস্ক পরতে হবে। দেখতে হবে যাতে বন্ধ ঘরে অনেক মানুষ এক সঙ্গে না থাকেন ইত্যাদি। আর এ সব আমরা কর্তব্য হিসেবে জানি। কিন্তু তা পালন করার ধর্মটা মানছি না।

আসলে করোনাসংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সতর্কতা ও সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। যাবতীয় উদ্যোগ ও পরিকল্পনা সরকারের তরফে শুরু হলেই ভালো, কিন্তু নাগরিক সমাজেরও কিছু দায়িত্ব আছে। প্রয়োজনে সরকারের কাছে দাবিও পেশ করতে হবে নাগরিকদেরই। নিয়ম মেনে চলার ব্যাপারে সব নাগরিককেই সমানভাবে তৎপর হতে হবে।

গত ২১ মাসে করোনার দুটি ঢেউ বুঝিয়ে দিয়েছে ‌যে, যুদ্ধের কৌশলেও পরিবর্তন চাই। কেবল গণপরিবহনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাফেরাসহ কিছু খাপছাড়া বিধিনিষেধ দিয়ে তৃতীয় প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। সুস্থ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে। স্বাস্থ্যকর্মী বলতে শুধু ডাক্তার, নার্স, বা হাসপাতালের অন্য কর্মী নন, গ্রামের স্বাস্থ্যকর্মী এবং সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার স্বাস্থ্যকর্মীরাও।

এই স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর কেবল কাজ চাপালেই হবে না, তাদের অভিজ্ঞতা, পরামর্শও শুনতে হবে। কারণ কোথায়, কীভাবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, কারা রয়ে যাচ্ছেন টিকার বাইরে, তা তাদের মতো কেউ জানে না। এসব স্বাস্থ্যকর্মী ও সর্বস্তরের সরকারি কর্মীদের এখন শুধু কোভিড সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রশিক্ষণ দেয়াই যথেষ্ট নয়। কর্মক্ষেত্রে এবং পরিবার-প্রতিবেশে কোভিড পজিটিভ মানুষ থাকবেন, কী করে স্বাভাবিক জীবন-জীবিকার সব কর্তব্য পালন করা যায়, সে বিষয়েও তাদের অবহিত করা চাই।

কারণ কোভিড সহজে যাবে না। বার বার মিউটেশন মানেই নতুন নতুন স্ট্রেন, সংক্রমণের ঢেউ বার বার। আগে থাকতে যুদ্ধের রূপরেখা ঠিক করা থাকলে পালে বাঘ পড়লে খাঁচাবন্দি করতে সময় লাগে কম। তাই প্রয়োজন নানা প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট কোভিড-বিধি। স্কুলে একজন শিক্ষার্থী আক্রান্ত হলেই কি গোটা স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে?

একজন কর্মী আক্রান্ত হলেই স্তব্ধ হবে গোটা দপ্তর? এতদিনে বোঝা গিয়েছে যে, স্কুল বন্ধ রাখলে শিশুরা নিরাপদ, এই ধারণাও একটা সময়সীমার পরে আর কাজ করে না। গত দুবছরে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে ছাত্রছাত্রীদের। লেখাপড়া তো বটেই, স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। ঘরে থেকে শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে।

সংক্রমণ সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়, এর একটা উদাহরণ তো চোখের সামনেই রয়েছে— হাসপাতাল। অসংখ্য ডাক্তার আক্রান্ত হচ্ছেন, তা সত্ত্বেও চিকিৎসা পরিষেবা চালু থাকছে। নানা কৌশল বের করা হচ্ছে। এখন যেমন স্বাস্থ্য দপ্তর ব্যবস্থা করেছে যে, মেডিসিন, স্ত্রীরোগ, সার্জারি ও অন্য ক্লিনিক্যাল বিভাগে সব ডাক্তার একসঙ্গে রোগী না দেখে, ভাগ করে রোগী দেখবেন।

অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের অভাব কমাতে ননক্লিনিক্যাল বিষয়ের ডাক্তাররাও এগিয়ে আসবেন। জুনিয়রদের পাশাপাশি সিনিয়ররাও আর একটু দায়িত্ব নিন। কোভিড ও ননকোভিড ইমার্জেন্সি শুধু নয়, ফিভার ক্লিনিকে, সাধারণ আউটডোরে এই চিকিৎসকদের কাজে লাগানো হোক। প্যারামেডিক্যাল কর্মীরা টিকা দিতে, কোভিড টেস্ট করতে, চিকিৎসাতে ডাক্তারদের সাহায্য করতে পারেন অনেকটাই। টিকাকরণের দায়িত্ব নিন জনস্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞরাও।

করোনার অব্যাহত ঢেউ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা, সুচিন্তিত উদ্যোগ। এই ঢেউটা পার করে দিতে পারলেই কোভিড-পর্ব সামাল দেয়া যাবে, এই মনোভাব নিয়ে যদি কাজ করে সরকার বা নাগরিকসমাজ, তা হলে বুঝতে হবে, মহামারি থেকে আমরা আসলে কিছুই শিখিনি।

লেখক: প্রবন্ধকার-সাবেক ছাত্রনেতা, রম্য লেখক।

আরও পড়ুন:
আয়কর রিটার্ন জমার সময় বাড়ল এক মাস
করের টাকা যেন অপব্যবহার না হয়: আইনমন্ত্রী
আয়কর দেন না বেশির ভাগ মানুষ
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার আগ্রহ বাড়ছে
রিটার্ন জমায় মেলার সুবিধা কর অঞ্চলে

শেয়ার করুন

নাসিক নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ

নাসিক নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ

ভোটের দিন সকাল পর্যন্ত এমনকি ভোট প্রদান শেষ না হওয়া পর্যন্তও চলে ভোটের হিসাব-নিকাশ। রাজনীতিকদের হিসাব-নিকাশ আর জনগণের হিসাব-নিকাশ যার পক্ষে যায়, শেষ হাসি তিনিই হাসেন। নাসিক নির্বাচনে শেষ হাসি কে হাসবেন সেটা শুধু নাসিকবাসী নয়, পুরো দেশবাসীই দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। বিজয়ী যিনিই হোন না কেন, মূল বিজয়টি যেন গণতন্ত্রেরই হয়।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ভোট নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ততই বাড়ছে। নাসিক নির্বাচনে পাওয়া যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী। ২০১১ সালে শেখ হাসিনা তাকে মনোনয়ন দেননি। দিয়েছিলেন শামীম ওসমানকে। সেবার স্বতন্ত্র প্রার্থী আইভী ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৮০ হাজার। আর শামীম ওসমান পেয়েছিলেন ৮০ হাজার। সরকারদলীয় প্রার্থীর চেয়ে ১ লাখ ভোট বেশি পেয়েছিলেন আইভী। আইভী ২০১১ সালে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাই, পরবর্তী সময়ে নেত্রীও তাকে কাছে টেনে নিয়েছেন। নিয়েছেন তার প্রমাণ পরবর্তী নির্বাচনে আইভীর হাতেই নৌকা তুলে দেয়া।

২০১১ সালে নাসিক নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তৈমূর আলম খন্দকার। কিন্তু ভোটের আগের রাতে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। তখন তৈমূরের কিছু ভোট আইভীর বাক্সে পড়ায় শামীমের চেয়ে তিনি এখানেও এগিয়ে যান। এছাড়া আওয়ামী লীগের শামীমবিরোধী ভোট ও সাধারণ ভোটও আইভীর বাক্সে পড়ায় তিনি সহজেই জয়ী হন।

২০১৬ সালে শামীম প্রার্থী ছিলেন না। আওয়ামী লীগের পুরো ভোটই আইভীর পাওয়ার কথা। নারায়ণগঞ্জে ভোটের রাজনীতিতে দুটি ধারা বিদ্যমান। একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন শামীম ওসমান। আরেকটি অংশের নেতৃত্বে আছেন সেলিনা হায়াৎ আইভী।

২০১৬-তে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন শাখাওয়াত হোসেন। তিনি বিজয়ী হতে পারেননি কিন্তু শেষপর্যন্ত নির্বাচনে ছিলেন। ভোট পেয়েছিলেন ৯৬ হাজার। আর আইভী পেয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার। তখন শামীম নির্বাচনে না থাকায় তার ভোট বিভক্ত হয়ে কিছু গিয়েছে আইভীর বাক্সে আর বাকি শাখাওয়াতের বাক্সে।

সম্প্রতি শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে আইভীকে সমর্থন করার কথা বলেছেন। কিন্তু সংবাদ সম্মেলন করা মানে শামীমের সব আইভী পাওয়া নয়। একই দলের দুই নেতা কখনই একজন আরেকজনকে একনিষ্ঠ সমর্থন করেন না। যদি তাই হতো তবে শামীমকে ম্যানেজ করার জন্য কেন্দ্র থেকে নানককে পাঠাতে হতো না।

একটি বড় দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে ইউপি নির্বাচনেও আমরা দলীয় প্রার্থী ও নেতাদের মধ্যে ভোটের মাঠে টানাপোড়েন দেখি। এই টানাপোড়েনের মধ্যে সাধারণত বিরোধীপক্ষই সুবিধা নেয়।

এবারের ইউপি নির্বাচন তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইউপি নির্বাচনে মনোনীতদের বিদ্রোহী প্রার্থীরা সেভাবে সমর্থন না দেয়ায় আওয়ামীবিরোধী প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশি জয়ী হয়েছে। ইউপিতে আওয়ামী লীগ কৌশলগত কারণেই এবার বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, এবারের নির্বাচনে ২০১৬ সালেরই পুনরাবৃত্তি হওয়ার কথা। কারণ, ২০১৬ সালে শামীম ওসমান প্রার্থী ছিলেন না। এবারও তিনি নেই। বিএনপি সেবার মাঠে ছিল, এবারও আছে। বিএনপির শাখাওয়াতের চেয়ে তৈমূর হয়তো আরও জনপ্রিয়। তবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তৈমূর শাখাওয়াতের চেয়ে বেশি ভোট (৯৬ হাজারের চেয়ে বেশি) পাবেন কি না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

শামীম প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে যদিও নেতাকর্মীদের আইভীর পক্ষে কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তবে গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তার নেতাকর্মীদের সেভাবে আইভীর পক্ষে মাঠে দেখা যায়নি। শামীমের সংবাদ সম্মেলনের পরে আইভী যদিও শামীমের সমালোচনায় অতটা সরব নন, কিন্তু তারপরও তিনি অভিযোগ করেছেন যে, নেতাকর্মীরা সেভাবে মাঠে নেই।

২০১৬ সালে শামীমের ভোট তার প্রার্থিতার অনুপস্থিতিতে বিভক্ত হয়েছে, সেটাই স্বাভাবিক। এবারও যদি সে রকম হয় সেক্ষেত্রেও আইভীর পাল্লাই ভারী হওয়ার কথা। ২০১৬ সালেও তাই হয়েছিল। জনপ্রিয়তার কারণে তৈমূর শাখাওয়াতের চেয়ে বেশি ভোট পেলে ভোটের ব্যবধান কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু তাতে জয়-পরাজয়ের ফলাফল ভিন্ন হওয়ার কথা নয়। কারণ, ২০১১ ও ২০১৬ সালে উভয় নির্বাচনেই আইভী ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। তাই হাতির জোয়ার হলেও তাতে নৌকার গতি কিছু কমার কথা নয়।

শামীম ওসমান সংবাদ সম্মেলন করে নৌকাকে সমর্থনের কথা বললেও তার সমর্থকরা সেভাবে মাঠে নেই যা আগেই বলা হয়েছে। উপরন্তু আইভী অভিযোগ করেছেন যে, ‘আমাকে পরাজিত করার জন্য অনেক পক্ষ এক হয়ে গেছে। পক্ষগুলো ঘরের হতে পারে, বাইরেরও হতে পারে। সবাই মিলেমিশে চেষ্টা করছে কীভাবে আমাকে পরাজিত করা যায়।’ তার অভিযোগের তির মূলত শামীমের দিকে। অভিযোগ সত্য-মিথ্যা প্রমাণসাপেক্ষ। তবে, তাকে পরাজিত করতে হলে সব পক্ষেরই এক হতে হবে বলেই মনে হয়।

সব পক্ষ মানে মূলত শামীম ও তৈমূর। কিন্তু শামীম আইভীকে হারাতে চাইলেও যে তার সব ভোট নৌকার বিপক্ষে (আইভীর বিপক্ষে) যাবে বিষয়টি সেরকম নয়। কারণ, শামীমের সব নৌকাসমর্থক হাতিকে ভোট দিতে যাবে না। তারা হয়তো নৌকায় বা আইভীকে ভোটদানে বিরত থাকতে পারে। কিন্তু তারা সবাই হাতিকে ভোট দিতে যাবে না। সেক্ষেত্রে আইভীর ভোট কিছু কমলেও হাতির ভোট বাড়বে না।

আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ সমর্থকরা যা-ই হোক না কেন নৌকার গলুইতেই আশ্রয় নেবে, তাও হাতির পিঠে চড়বেন না। একইভাবে ধানের শীষের একনিষ্ঠ সমর্থকরা হাতির পিঠে না উঠলেও নৌকায় চড়বে না। তবে নৌকা ও ধানের শীষের একনিষ্ঠ সমর্থকদের বাইরেও অনেক ভোটার আছেন যাদেরকে আমরা বলি ফ্লোটিং ভোটার। যেকোনো নির্বাচনের ফলাফলে এই ফ্লোটিং ভোটারই বড় ফ্যাক্টর। নাসিক নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হবে না।

ফ্লোটিং ভোটারের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন ভোটার। জয়-পরাজয়ে এদেরও রয়েছে বড় ভূমিকা। এছাড়া নারী ভোটাররা হয়তো আইভীকেই বেছে নেবে। নতুন ভোটাররা রাজনীতিবিমুখ তবে রাজনীতিতে অজ্ঞ নয়। তারা সবকিছু বুঝেশুনেই ভোট দেবে।

একটি নির্বাচনে ভোটাররা অনেক কিছু বিবেচনা করে ভোট দেয়। কেউ কেউ প্রার্থীর যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিবেচনা করে আবার কেউবা বিবেচনা করে প্রতীক। এছাড়া ব্যক্তি-ইমেজও বিবেচ্য।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরেও নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টিও একটি ফ্যাক্টর। সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ ও সেই সঙ্গে ওসমান পরিবারের সদস্য ও শামীম ওসমানের বড় ভাই। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শুধু শামীম ওসমানই গুরুত্বপূর্ণ নন, ওসমান পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ওসমান পরিবার ও চুনকা পরিবার দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।

নাসিম, সেলিম ও শামীম ওসমানের দাদা এম ওসমান আলী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আর তাদের বাবা একেএম শামসুজ্জোহা বাংলাদেশের প্রথম সংসদের সদস্য। শামীম ওসমান নিজে ১৯৯৬ সাল থেকে সংসদ সদস্য। আর আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকা স্বাধীনতার পর থেকে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়্যারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে আইভী তারই উত্তরাধিকার। কাজেই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দুই পরিবারই গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে তৈমূর আলম খন্দকারের রাজনীতি শুরু আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকার হাত ধরে। আইভী তৈমূরকে চাচা বলেই সম্মোধন করেন।

কাজেই নাসিকের লড়াইটা প্রকাশ্যে যদিও চাচা-ভাতিজির লড়াই। কিন্তু পর্দার অন্তরালে চলমান ভাই-বোনের (শামীম আইভীকে বোন বলেই সম্মোধন করেন) লড়াইয়ের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করে চাচা-ভাতিজির লড়াইয়ের ফলাফল। তাই এ লড়াইয়ে ওসমান পরিবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

দলীয় কারণে শামীম ওসমান প্রত্যক্ষভাবে আইভীর বিপক্ষে যেতে না পারলেও সেলিম ওসমানের সে সমস্যা নেই। আর জাতীয় পার্টি (জাপা) যদিও জোটবদ্ধভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিন্তু সেটা কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে। মাঠের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির কাছাকাছি অবস্থান করে। সে হিসেবে ওসমান পরিবারের সমর্থনের একটি অংশ তৈমূরের পক্ষেই যাওয়ার কথা।

সেলিম তৈমূরের পক্ষে না গেলেও জাপার সমর্থন যে নৌকায় যাবে না তা মাঠের প্রচারণায়ও স্পষ্ট। জাপার মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা তৈমূরের সঙ্গেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সেলিম ওসমান প্রকাশ্যভাবে তৈমূরকে সমর্থন না দিলেও তার নীরব সমর্থন রয়েছে। সেটাও যদি না হয়, অন্তত সেলিমের প্রকাশ্য সমর্থন যে আইভীর জন্য নেই, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেলিম প্রকাশ্যভাবে আইভীর বিরোধিতা করবেন বলে মনে হয় না।

জোটের রাজনীতির কারণেই তিনি আওয়ামী লীগের কাছেও দায়বদ্ধ। এছাড়া আগামী নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির প্রশ্নেও সেলিম ওসমান জোটের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগের পছন্দকে অবজ্ঞা করবেন না। প্রশ্ন আসতে পারে, আগামী নির্বাচনে জাপা যে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই জোট করবে সেটিতো নিশ্চিত না। ঠিক একই কারণে তিনি বিএনপির তৈমূরেরও বিরোধিতা করবেন না, জোট বিএনপির সঙ্গেও হতে পারে।

মূল কথা, ওসমান পরিববার কৌশলগত কারণেই আইভীর প্রকাশ্য বিরোধিতা করছে না। অথবা বলা যায়, অন্তরালে আইভীর বিরোধিতা করলেও প্রকাশ্যে নৌকারই সমর্থন করছেন। কৌশল হিসেবে এটি মন্দ নয়। কারণ, হারলে আইভী হারবেন, জিতলে নৌকা জিতবে-শামীম ওসমান এ কৌশলেই এগোচ্ছেন। সে কারণেই তার মাঠকর্মীরা ‘আইভী আইভী’ না করে ‘নৌকা নৌকা’ করছে।

এ নির্বাচনে আইভীকে ডুবিয়ে কি নৌকা ভাসিয়ে রাখা যাবে? বাহ্যিক দৃষ্টিতে আইভীর ভরাডুবিতে শামীমের লাভ হলেও নৌকা ডুবিয়ে শেষমেষ তার ভেসে থাকাও কঠিন হতে পারে। শামীম ওসমান অন্তত সেটা চাইবেন না। আর দুই ভাই দুই দলের হলেও তাদের পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত মজবুত। হাতিকে জেতাতে বা আইভীকে হারাতে সেলিম ওসমানও ভাইকে ডোবাবেন না। নৌকা ভাসলে ভাসবে সবাই। সে কারণেই দুভাই আইভীকেই নীরব সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।

দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা পরপর দুবার আইভীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। এবার তিনি শুধু মনোনয়নই দেননি আইভীর জন্য নানককে পাঠিয়ে নারায়ণগঞ্জে আইভী বিরোধিতার অবসান চেয়েছেন। সবাইকে বিরোধিতা পরিহার করে আইভীর জন্যই কাজ করতে বলেছেন। শেখ হাসিনা নানককে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘আমার আইভীর কী খবর?’ কাজেই আইভীর ভালো খবরের জন্য স্থানীয় সব নেতাকর্মীকেই যে কাজ করতে হবে শেখ হাসিনা সে বার্তাটি পরিষ্কার করেই বলেছেন। শামীম ওসমান বা স্থানীয় নেতাকর্মীরা নিশ্চয় শেখ হাসিনার আইভীর ভালো খবরের জন্যই কাজ করবে।

সব কথার শেষ কথা- রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। ভোটের দিন সকাল পর্যন্ত এমনকি ভোট প্রদান শেষ না হওয়া পর্যন্তও চলে ভোটের হিসাব-নিকাশ। রাজনীতিকদের হিসাব-নিকাশ আর জনগণের হিসাব-নিকাশ যার পক্ষে যায়, শেষ হাসি তিনিই হাসেন। নাসিক নির্বাচনে শেষ হাসি কে হাসবেন সেটা শুধু নাসিকবাসী নয়, পুরো দেশবাসীই দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। বিজয়ী যিনিই হোন না কেন, মূল বিজয়টি যেন গণতন্ত্রেরই হয়। সেটি সম্ভব শুধু একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
আয়কর রিটার্ন জমার সময় বাড়ল এক মাস
করের টাকা যেন অপব্যবহার না হয়: আইনমন্ত্রী
আয়কর দেন না বেশির ভাগ মানুষ
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার আগ্রহ বাড়ছে
রিটার্ন জমায় মেলার সুবিধা কর অঞ্চলে

শেয়ার করুন