ঢাকাদূষণ আর নয়

ঢাকাদূষণ আর নয়

রাজধানী শহরকে দূষণমুক্ত রাখতে উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। দিন-মাস ছাপিয়ে বছর গেলেও সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি। বাতাসে বিভিন্ন গ্যাস ও ধূলিকণার পাশাপাশি ভেসে বেড়ায় অতি ক্ষুদ্র বিভিন্ন ক্ষতিকারক বস্তুকণা, যা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা সম্ভব নয়। পিএম ২ দশমিক ৫ নামের এসব বস্তুকণা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে আটকে থাকে এবং গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

বায়ুদূষণজনিত ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি সামলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করা মাত্রই পুনরায় বন্ধের খবরটি উদ্বেগজনক। চলতি মাসের ১৭ তারিখ এক সরকারি ঘোষণায় নির্দেশনাটি দেয়া হয়। অনুমান করা যায়, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হলে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়!

খবরটি দিল্লির হলেও, একই কারণে বাংলাদেশের রাজধানী নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশ্বের যে কটি শহর ভয়াবহ দূষণের তালিকায় রয়েছে, এরমধ্যে মেগাসিটি ঢাকা অন্যতম।

দিল্লিতে মোট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ১১টি। সরকারের নতুন নির্দেশনায় বায়ুদূষণ রোধে এগুলোর মধ্যে মাত্র ৫টি চালু রাখতে বলা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো- ১৭ লাখ নিবন্ধিত যানবাহন আর প্রায় দুই কোটি মানুষের ঢাকা শহরে এখন কতগুলো উন্নয়ন প্রকল্প চলছে? এর সঠিক পরিসংখ্যান দেয়া সম্ভব নয়। তবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, রেল লাইন সম্প্রসারণ প্রকল্প, ফুটপাত নির্মাণ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সয়েল টেস্টসহ বিআরটিএ প্রকল্পের সরাসরি দূষণের প্রভাব নগরীতে পড়ছে। এর বাইরে সিটি করপোরেশন, বিটিসিএল, ওয়াসাসহ বিভিন্ন সেবাসংস্থার মাটি খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেনেজ ও ফুটপাত নির্মাণ-প্রকল্পের কাজ চলমান।

ইটভাটা, ধূলিকণা, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, ইট-বালুবাহিত ট্রাকের অবাধ চলাচল, ময়লা-আবর্জনার পোড়া গন্ধসহ বায়ুদূষণের জন্য অন্য যেসব কারণ রয়েছে সেগুলোও ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। অথচ শীত মৌসুমে দূষণরোধে নগরীতে চলমান কোনো উন্নয়ন-প্রকল্পের কাজই বন্ধ নেই।

ঢাকার আকাশ রাতদিন ধুলায় কুয়াশাচ্ছন্ন! ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, সামনের দিনগুলোতে এই শহরের পরিণতি দিল্লির মতো হবে না তো?

এই রাজধানী শহরকে দূষণমুক্ত রাখতে উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। দিন-মাস ছাপিয়ে বছর গেলেও সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি। বাতাসে বিভিন্ন গ্যাস ও ধূলিকণার পাশাপাশি ভেসে বেড়ায় অতি ক্ষুদ্র বিভিন্ন ক্ষতিকারক বস্তুকণা, যা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা সম্ভব নয়।

পিএম ২ দশমিক ৫ নামের এসব বস্তুকণা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে আটকে থাকে এবং গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। কোনো এলাকার বাতাসের পিএম ২ দশমিক ৫-এর পরিমাণ পরিমাপের একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মান হলো এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) বা একিউ সূচক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুর গুণাগুণ-বিষয়ক নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো এলাকার বাতাসের একিউআই যদি ০ থেকে ৫০ থাকে, সেক্ষেত্রে সেখানকার বাতাস ভালো।

সূচক যদি ৫১ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকে, তাহলে বাতাসের মান সন্তোষজনক। আর যদি ১০১ থেকে ২০০ থাকে তাহলে তাকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ এবং ২০০ এর উপরে থাকলে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে ডব্লিউএইচওর নির্দেশনায়।

দিল্লিতে একিউ সূচক অনুযায়ী বেশিরভাগ এলাকার বাতাসে পিএম ২ দশমিক ৫-এর পরিমাণ ৪০০-এর উপরে। এ থেকেই বোঝা যায়, কোন প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। যানবাহন ও কলকারখানা থেকে নিঃসৃত ধোঁয়া, ধুলো ও আবহাওয়াগত কারণে নয়াদিল্লি ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর রাজধানীর স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিশেষ করে শীতকালে দিল্লির বাতাসে দূষণের মাত্রা থাকে সবচেয়ে বেশি। কারণ, সেসময় প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে কৃষকদের খড়-বিচালি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া কুয়াশাচ্ছন্ন রাজধানীর বাতাসকে ভারী করে তোলে।

প্রশ্ন হলো- বিশ্বে বায়ুদূষণের তালিকায় প্রথমদিকে থাকা রাজধানী ঢাকার প্রকৃত অবস্থা আসলে কী? শীত মৌসুমে অন্যান্য শহরের মতো ঢাকাতেও দূষণ বাড়ে, এটি খালি চোখে দেখলেও সহজে বোঝা যায়। কিন্তু এই দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু ভয়াবহ?

১৮ নভেম্বর সকালের দিকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান ছিল চতুর্থ। বিশ্বের বায়ু-মান প্রতিবেদনে (একিউআই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে ১৮৯ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশকে খুব অস্বাস্থ্যকর অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে।

তখন পাকিস্তানের লাহোর, ভারতের দিল্লি ও চীনের উহান যথাক্রমে ৪২৫, ৩১০ এবং ১৯১ স্কোর নিয়ে প্রথম তিনটি স্থান দখল করে ছিল। যদিও তিন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ভালো। তবে অনেক সময় দৈনিক দূষণের তালিকায় ঢাকা প্রথম স্থানে চলে যায়।

একিউআই মান ২০১ থেকে ৩০০ হলে, স্বাস্থ্য-সতর্কতাসহ তা জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে নগরবাসী। এ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ রোগীদের বাড়ির ভেতরে এবং অন্যদের বাড়ির বাইরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। এই বিবেচনায় ঢাকার দূষণের মাত্রা কিন্তু সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ঠিক কাছাকাছি অবস্থান করছে। তাই আগেভাগে সতর্ক হওয়া দরকার।

এমনিতেই বায়ুদূষণের কারণে নগরে থাকা মানুষ নানারকম স্বাস্থ্য-ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছে বিভিন্ন বয়সের মানুষ। হচ্ছে জটিল রোগ। তাই সরকারের দূষণরোধে দ্রুত মনোযোগ দেয়া দরকার। একে শুধু ঢাকার সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না।

সত্যিকার অর্থেই দেখতে হবে জাতীয় সমস্যা হিসেবে। কারণ এই নগরে থাকা প্রায় দুই কোটি মানুষ সারা দেশ থেকে এসেছে। বিশাল এই জনগোষ্ঠী যদি দূষণের ছোবলের মধ্যে পড়ে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব কতগুলো পরিবারে ছড়াবে তা অনুভব করা উচিত।

বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিয়তার দিকে যাবে। থমকে দাঁড়াবে বিশাল অঙ্কের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। ঢাকা যদি বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়? তাহলে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে যাবে তা সহজে অনুমান করা যায়।

গত বছর ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ ঠেকাতে রাজধানীর প্রবেশমুখ গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, পূর্বাচল, কেরানীগঞ্জ ও টঙ্গীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পানি ছিটাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।

পাশাপাশি রাস্তার পাশে ছোটখাটো গাছে জমে থাকা ধুলা-ময়লা যাতে পরিষ্কার হয় সেজন্য রাস্তার ওপর থেকে পানি ছিটাতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দেয়া হয়। আর ছিটানোর ক্ষেত্রে পানির ঘাটতি দেখা দিলে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও নির্দেশ দেয়া হয়। গত বছরের ১৩ জানুয়ারি রাজধানী ও আশপাশের বায়ুদূষণরোধে ৯ দফা নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে। সেগুলো হলো-

১. ঢাকা শহরে মাটি-বালি, বর্জ্য পরিবহন করা ট্রাক ও অন্যান্য গাড়িতে মালামাল ঢেকে রাখা

২. নির্মাণাধীন এলাকায় মাটি-বালি, সিমেন্ট-পাথর, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা

৩. সিটি করপোরেশন রাস্তায় পানি ছিটাবে

৪. রাস্তা-কালভার্ট, কার্পেটিং-খোঁড়াখুঁড়িকাজে টেন্ডারের শর্ত পালন নিশ্চিত করা

৫. কালো ধোঁয়া নিঃসরণ করা গাড়ি জব্দ করা

৬. সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে গাড়ি চলাচল সময়সীমা নির্ধারণ ও উত্তীর্ণ সময়সীমার পরে গাড়ি চলাচল বন্ধ করা

৭. অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ করা

৮. পরিবেশ লাইসেন্স ব্যতীত চলমান সব টায়ার ফ্যাক্টরি বন্ধ করা

৯. মার্কেট, দোকানে প্রতিদিনের বর্জ্য ব্যাগে ভরে রাখা এবং অপসারণ নিশ্চিত করা।

এই নির্দেশনাগুলো কতটুকু মানা হচ্ছে? তা দেখভালের কি কেউ নেই? বড় বিষয় হলো- গত বছরের তুলনায় এবার নগরীর দূষণের মাত্রা কমেছে কি না? যদি কমে থাকে তবে আরও কমাতে হবে। যদি না কমে তাহলে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া কি জরুরি নয়? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকার অবস্থা যে পর্যায়ে আছে এ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। কারণ যাদের এ নিয়ে ভাববার কথা তারা দিব্যি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে!

চোখের সামনে এই শহরে অপরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার ভবন উঠে গেল! দুই কোটি মানুষের স্রোতে ভেসে গেল নগরী, ইচ্ছেমতো গাড়ি রেজিস্ট্রেশন দেয়া হলো, ফুটপাতও দখলে চলে গেল। শহরে পর্যাপ্ত রাস্তা ও জলাশয় নেই। বসবাসের মানদণ্ডে সবদিক থেকে পিছিয়ে।

অথচ কারো কোনো চিন্তা নেই। প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। সবকিছু বিবেচনায় বায়ুদূষণ রোধে কারো ভাবনা না থাকাই যেন স্বাভাবিক। বড় বিষয় হলো- সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বায়ুদূষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকা উচিত ছিল। অথচ আদালত এ বিষয়ে এগিয়ে এলেও দূষণ ঠেকাতে কাজ করানো সম্ভব হচ্ছে না!

আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বে দূষিত শত শহরেরর মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ চারটি শহরের নাম। রাজধানীতে শীত মৌসুমে ময়লা পোড়ার কারণে দূষণের মাত্রা আরও বাড়ে। কিন্তু সেটিও কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নতুন নিয়ম অনুযায়ী সন্ধ্যার পর পরই রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করায় নিঃসন্দেহে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। অথচ এই সিদ্ধান্তটি অন্তত রাত ১১টার পর যদি কার্যকর করা যেত।

গবেষণায় ঢাকার রাস্তার ধুলায় সর্বোচ্চ মাত্রায় সিসা, ক্যাডমিয়াম, দস্তা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, আর্সেনিক, ম্যাঙ্গানিজ ও কপারের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মাটিতে যে মাত্রায় ক্যাডমিয়াম থাকার কথা, ধুলায় তার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। আর নিকেল ও সিসার মাত্রা দ্বিগুণের বেশি।

ঢাকার রাস্তার ধুলার মধ্যেও নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এসব ভারী ধাতুকণার আকার এতটাই সূক্ষ্ম যে তা মানুষের চুলের চেয়ে ২৫ থেকে ১০০ গুণের বেশি ছোট। ফলে খুব সহজেই এসব সূক্ষ্ম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা ত্বকের সংস্পর্শে আসছে; শ্বাসপ্রশ্বাস, খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে শরীরের ভেতর প্রবেশ করছে।

যেসব কারণে দিল্লি ভয়াবহ বায়ুদূষণের কবলে এর প্রায় সবকটিই কমবেশি রাজধানী ঢাকায় রয়েছে। তাই মহাবিপর্যয় আসার আগেই সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। দিল্লি যে আগাম বার্তাটি দিল, তা সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। ইট-পাথরের এই নগরীতে সবুজ বিপ্লব ছড়িয়ে দেয়াই সবচেয়ে জরুরি।

যত বেশি সম্ভব জলাশয় সৃষ্টির দিকে নজর দেয়াও সময়ের দাবি। বাড়াতে হবে সড়কের পরিধি। এরসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে নগরের উপর বাড়তি মানুষ ও যানবাহনের চাপ কমানো জরুরি।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে বায়ুদূষণরোধে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে কাজ করতে হবে। দূষণের বিষয়টি মাথায় নিয়ে সব সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেয়ার বিকল্প নেই। সামনের খারাপ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা যদি কার্যকর করা যায়, তবেই মেগাসিটিকে যেমন বাঁচানো সম্ভব; তেমনি নগরবাসীকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেয়া যাবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ‘লকডাউন’
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে লকডাউনের পরিকল্পনা
বায়ুদূষণে নাকাল দিল্লি, সরকারের উদাসীনতায় ক্ষিপ্ত প্রধান বিচারপতি
দীপাবলির বাজির ধোঁয়ায় ঢাকা দিল্লি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

রাজস্ব প্রশাসন ও করজাল সম্প্রসারণে করণীয়

রাজস্ব প্রশাসন ও করজাল সম্প্রসারণে করণীয়

করের আওতা সম্প্রসারণ করে, করহার সুষম করে, প্রয়োজনীয় অটোমেশন সম্পন্ন করে মোট দেশজ উৎপাদনে করের অনুপাত বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য থাকলেও উদ্দেশ্য অর্জনে বিলম্ব হচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০২১ সালের মধ্যে কর জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার স্বপ্ন এখনও অধরা থেকে গেল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও ২০৪১ সালের মধ্যে এ অনুপাত ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে। এনবিআর পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করলে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে উদ্বুদ্ধকরণ ও নৈতিক দায়িত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের দায়িত্ব মূলত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপরই ন্যস্ত। এ সংস্থার অধীন কর, মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) ও কাস্টমস কমিশনারেটগুলো বার্ষিক বাজেটে এদের ওপরে ন্যস্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে রাজস্ব আহরণে সচেষ্ট থাকে। বাজেট প্রণয়নের সময় এনবিআর প্রয়োজনে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে আইন পরিবর্তন বা সংশোধন এবং প্রশাসনিক আদেশ ও প্রজ্ঞাপন জারি করে সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণের চেষ্টা করে। এসব সংশোধন ও পরিবর্তনে কর হ্রাস-বৃদ্ধি ছাড়াও নীতি সহায়তা থাকে, যার ফলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটে, ফলে স্বাভাবিকভাবে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ে। মূলত রাজস্ব প্রবৃদ্ধিনির্ভর করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা, আমদানি-রপ্তানি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সরকারি রাজস্ব ও প্রকল্প বরাদ্দের সুষ্ঠু ব্যয় এবং সর্বোপরি রাজস্ব সংগ্রহে নিয়োজিত কর্মচারীদের পেশাদারত্বের ওপর।

কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটি রাজস্বের এ তিনটি শ্রেণিকে সাধারণত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিগত সরকারগুলো বার্ষিক বাজেট ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়নে চেষ্টা করে। সরকার, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং ভোক্তা জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ক্রমান্বয়ে কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ফলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ভোগ চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা বছর শেষে জিডিপির আকার ও শতকরা প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। তাই দেখা যায়, ১৯৭২-৭৩ সালের ৮ বিলিয়ন ডলার জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১ সালে ৪০৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।

সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে দেশের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ সম্পদের অবদান বাড়তে থাকে এবং বৈদেশিক ঋণের নির্ভরতা কমতে থাকে। বিগত প্রায় ৩০ বছর ধরে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে ৭-২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও দেশের কর জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারেনি, বরং বিগত দু’বছর কর জিডিপির অনুপাত ৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে আমাদের করের পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিম্নতম। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের হিসাব মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালের কর জিডিপির অনুপাত সবচেয়ে বেশি- প্রায় ১৯ শতাংশ।

ভারতের কর জিডিপির অনুপাত ১২ শতাংশ, ভুটানের ১৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১.৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১ শতাংশ। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় অনুপাত প্রায় ১৮ শতাংশ। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কর জিডিপির অনুপাত ৩৫-৪০ শতাংশ। বিগত বছরগুলোতে বাজেট প্রণয়নের সময় কর জিডিপির অনুপাত ১০-১১ শতাংশ অনুমান করলেও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় আমাদের দেশের এ অনুপাত নিম্নমুখী হয়েছে।

আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষের অনীহা আগে যা ছিল, এখনও তেমন আছে। অনভ্যাস, অনিচ্ছা, শঙ্কা, আইন অমান্যের প্রবণতা, দেশপ্রেমের অভাব প্রভৃতি কারণে সামর্থ্য থাকলেও দেশের মানুষ কর প্রদান করতে চায় না। বছরে প্রচুর টাকা মানুষ বাজে খরচ কিংবা অপেক্ষাকৃত অল্প প্রয়োজনে খরচ করে। এর কিছু অংশ কর দিলেও নৈতিক দায়িত্ব পালন করা হয়। শুধু ব্যক্তিশ্রেণি নয়, ব্যবসায়ীদের মধ্যেও কর ফাঁকির প্রবণতা বিদ্যমান।

আমাদের দেশের ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা জনসংখ্যার অনুপাতে মাত্র ১ শতাংশের মতো। গত বেশ কবছর ধরে আয়কর মেলা এবং নানা বিজ্ঞাপনমূলক প্রচারণা সত্বেও আয়কর রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা ২৪-২৫ লাখের উপরে তোলা যায়নি।

উৎসে কর, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদির কর বিবেচনায় প্রায় ১ কোটি লোক কোনো না কোনোভাবে কর দেয় বলে ধরা যায়। জমি ক্রয়, নানাক্ষেত্রে আয়কর রেয়াত, ব্যাংক এবং অন্যবিধ সেবাদাতার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ ই-টিআইএন নম্বর নিয়ে থাকে। বর্তমানে দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ। বাস্তবে এর ৩৫ শতাংশ মাত্র রিটার্ন জমা দেয়। আবার রিটার্ন জমাদানকারীদের একটা বড় অংশ ০ (শূন্য) কর দেয়।

অনুরূপভাবে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সকলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর দেয় না। ব্যবসার আকার ও ধরনভেদে যেখানে ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে কর দেয়। করের আওতা সম্প্রসারণ এনবিআরের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করহার কমানো হয়েছে ব্যক্তিশ্রেণি ও কর্পোরেট উভয় ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট করহার বেশি বলে আমাদের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছে।

সেজন্য গত চার বছরে করপোরেট করহার সাড়ে ৭ শতাংশ কমানো হয়েছে। বর্তমানে এ হার ৩০ শতাংশ, তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে সাড়ে ২২ শতাংশ। নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এ হার ২৫ শতাংশ। তবে সিগারেট ও তামাকজাত দ্রব্য এবং মোবাইল কোম্পানির করপোরেট করহার সবচেয়ে বেশি- ৪৫ শতাংশ। সরকার এই দুই উৎস থেকে যেমন কর পায় বেশি তেমনি এসব কোম্পানির কর প্রদানে মোটামুটি স্বচ্ছতা রয়েছে। ব্যাংক খাতের করহারও তেমন কমানো হয়নি। তিনটি খাত উচ্চ করহার মেনে নিয়েছে।

ব্যবসা সহজীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ডিজিটালাইজেশন ও আইসিটি সেবা সম্প্রসারণ প্রভৃতি কারণে কর রেয়াত, নিম্ন করহার, কর অব্যাহতি প্রভৃতির প্রচলন রয়েছে। আবার কোনো কোনো বিশেষ দ্রব্য ও সেবায়ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর হ্রাসকৃত হারে নেয়ার নজির রয়েছে। এসব কারণে এনবিআর এর রাজস্ব আহরণ কম হয়। তাই রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য এনবিআরকে নানা ফন্দি-ফিকির বের করতে হয়।

গত প্রায় দুই দশক যাবৎ উৎসে অগ্রিম কর, কর্তন কর আহরণের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। আয়করের প্রায় ৮০ শতাংশের অধিক উৎসে কর থেকে আদায় হয়। এছাড়া ব্যক্তি কিংবা ব্যবসায়ী উভয় শ্রেণিতেই করজাল তেমন সম্প্রসারণ হয় না বিধায় চালু করদাতাদের কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় কর বা বাড়তি কর আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এতে হয়রানির অভিযোগও পাওয়া যায়।

কর প্রদানে মিথ্যা ঘোষণা অনেক দিন ধরে আমাদের দেশে চলে আসছে। ‍প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় করের ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অনেক ব্যবসায়ী তাদের বিক্রয় ও লাভের পরিমাণ কম দেখায়। আবার আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণায় এবং ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শুধু তাই নয়, বিদেশে অর্থপাচারের একটা বড় অংশ যায় আমদানি-রপ্তানি দ্রব্যমূল্যের ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। ব্যবসাভিত্তিক অর্থপাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং কেইস ধরা পড়লে উচ্চহারে করারোপ ও জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কাস্টমস আইন ও কর আইন সংশোধন ও যুগোপযোগী করার জন্য ৬-৭ বছর যাবৎ কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কাস্টমস আইন জাতীয় সংসদ থেকে ৩ বার ফেরত এসেছে। বর্তমানে কাস্টমস আইন, আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগের ভেটিংয়ের জন্য পরীক্ষাধীন রয়েছে। নতুন কর আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। উভয় আইন বলবৎ হলে ব্যবসা, কর সংগ্রহ ও রাজস্ব প্রশাসনে সুশাসন ফিরে আসতে পারে।

রাজস্ব প্রশাসন অটোমেশনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা গত শতাব্দীর নব্বই দশকেই শুরু হয়। কাস্টমস অফিসে এসাইকুডা সিস্টেম চালু করে স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়ন শুরু হয় ১৯৯৩-৯৪ সালে। বর্তমানে এ সিস্টেম আপগ্রেড করে এসাইকুডা++ সিস্টেম চালু হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সকল কিছু যেমন- শিপিং ডকুমেন্ট, ইনভয়েস, দ্রব্যের পরিমাণ ইত্যাদি অনলাইনে আসার কথা থাকলেও কাস্টমস অফিস এখনও আমদানিকারকদের যাবতীয় মূল কাগজপত্র দাখিল করতে বলে।

নানা জটিলতা ও জালিয়াতির সম্ভাবনায় অনলাইন ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে ডিজিটাল কর ব্যবস্থা প্রণয়নের চেষ্টাও দীর্ঘদিনের। তবে অনলাইনে টিআইএন সংগ্রহ বা কর নিবন্ধন চালু হয় ২০১৩ সালে, অনলাইন পেমেন্ট চালু হয়েছে ২০১২, অনলাইন রিটার্ন দাখিল কার্যক্রম ২০১৬ সালে। তবে ই-টিআইএন সংগ্রহ ছাড়া অন্য দুটি ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়নি; ফলে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নও হয়নি।

১৯৯১ সালে প্রণীত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন ২০১২ সালে সংশোধিত হওয়ার কথা থাকলেও এটি সংশোধিত আকারে জারি হয় ২০১৯ সালে। এনবিআরের প্রত্যাশা ছিল, এ আইন জারির ফলে ভ্যাট আহরণে স্বচ্ছতা ও গতি আসবে এবং করের সংগ্রহ বাড়বে। কিন্তু এ আইনের বিভিন্ন ধারায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতপার্থ্যক্যের কারণে ব্যবসা সহজীকরণ, উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদান এবং একই সঙ্গে রাজস্ব বৃদ্ধির কথা বিবেচনায় রেখে গত ২টি বাজেটে এ আইনে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়।

দ্রব্য ক্রয়ের সঙ্গে সাধারণ মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্যাট প্রদান করলেও অনেক ব্যবসায়ী আদায়কৃত ভ্যাট সরকারকে প্রদান করে না। অসৎ ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ফাঁকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিসের অসৎ কর্মচারীরাও যুক্ত থাকে। সেজন্য ভ্যাট আদায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় আনার স্বার্থে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু গত ২ বছরে মাত্র ৩৫০০ ইএফডি মেশিন স্থাপন সম্ভব হয়েছে। দেশের অন্তত ৭ থেকে ১০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ মেশিন সচল থাকলে বর্তমানে আদায় করা ভ্যাটের তিন-চার গুণ ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হতো বলে অনেকের ধারণা।

বিগত কবছর দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৩২-৩৩ শতাংশ আসে প্রত্যক্ষ কর থেকে, ৩৮-৩৯ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে আর বাকি রাজস্ব আদায় হয় কাস্টমস শুল্ক হিসেবে। ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীশ্রেণির করজাল সম্প্রসারণ করে ২০২০-২১ সালের মধ্যে কর রাজস্ব ৫১ শতাংশে উন্নীত করার একটি পরিকল্পনা এনবিআরের ছিল। কিন্তু এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

সমুদ্র ও স্থলবন্দর দিয়ে আগত আমদানি ও বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত রপ্তানির স্বচ্ছতা, ঘোষণা ফাঁকি ইত্যাদি রোধকল্পে বন্দর কাস্টমস অফিসে উন্নতমানের বৃহদাকার স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের একটি পরিকল্পনা প্রায় দুবছর আগে নেয়া হলেও এখনও ক্রয়কাজে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

করজাল ‍বৃদ্ধি, কর সংগ্রহের গতি আনা, সব জেলা ও উপজেলায় রাজস্ব অফিস স্থাপন এবং কর জরিপ পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ব্যাপক বৃদ্ধি পেলেও ২০১১ সালের পর রাজস্ব প্রশাসনে আর কোনো সংস্কার হয়নি। জনবল ও অফিস সংখ্যা বৃদ্ধি তথা প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য কয়েক বছর আগে প্রস্তাব প্রণীত হলেও এ প্রস্তাব সরকারের অনুমোদনের জন্য এখনও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বিলম্বিত হচ্ছে।

করের আওতা সম্প্রসারণ করে, করহার সুষম করে, প্রয়োজনীয় অটোমেশন সম্পন্ন করে মোট দেশজ উৎপাদনে করের অনুপাত বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য থাকলেও উদ্দেশ্য অর্জনে বিলম্ব হচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০২১ সালের মধ্যে কর জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার স্বপ্ন এখনও অধরা থেকে গেল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও ২০৪১ সালের মধ্যে এ অনুপাত ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে। এনবিআর পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করলে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে উদ্বুদ্ধকরণ ও নৈতিক দায়িত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে নিচের সুপারিশগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক:

১. কর প্রদানে জনগণের ‘ভয় ও দ্বিধা’দূর করে সক্ষম করদাতা ও ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে কর প্রদানে আগ্রহী করে তুলতে হবে। সেজন্য কর কর্মকর্তাদের সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। কর অফিসে ‘হয়রানি’দূর করতে হবে।

২. রিটার্ন দাখিল ফর্ম ও জমাদান প্রক্রিয়াটি যথাসম্ভব সহজ করতে হবে। কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন সহজ, গ্রহণযোগ্য ও বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৩. কর আইন এমনভাবে যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে ব্যবসা সহজ ও কর আদায় বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন ও বিধির স্পষ্টতা থাকলে আইন অমান্য করা কিংবা হয়রানির সুযোগ থাকবে না।

৪. রাজস্ব প্রশাসনে দক্ষতা আনয়নের জন্য দেশ-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের নীতি নৈতিকতার প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। এনবিআরের অধীন কর এবং ভ্যাট ও কাস্টমস ক্যাডারের সম্প্রসারণ এবং কর ও শুল্ক অফিস সম্প্রসারণ করে উপজেলাপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা প্রয়োজন। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে রাজস্ব উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

৫. বন্দরের শুল্ক অফিসের আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং পর্যাপ্ত স্ক্যানার স্থাপন করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সবরকম ফাঁকি ও অনিয়ম বন্ধ করে স্বচ্ছতা আনতে হবে। অনুরূপভাবে মূল্য সংযোজন আদায়ে শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য হোটেল-রেস্তোরাঁ, দোকান-পাট, সুপার মার্কেট, শপিংমল প্রভৃতি বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে ইএফডি মেশিন স্থাপন করতে হবে।

৬. সর্বোপরি কম্পিউটারাইজেশন, ডিজিটালাইজেশন, আধুনিকায়ন, অটোমেশন যা-ই বলি না কেন এতে এনবিআর কর্মকর্তাদের শতভাগ সম্পৃক্ততা ও অংশীদারত্ব থাকতে হবে। এ ধরনের যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পর যাতে কর্মকর্তারা প্রক্রিয়াটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে পারে সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিতে ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিভাগীয় কর্মকর্তারা কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অটোমেশনে স্থায়িত্ব আনা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সিনিয়র কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের বিশেষ মনোযোগী ও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায় থেকে উন্নয়নশীল মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। জিডিপির আকার বেড়েছে, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, দেশে অন্তত চার কোটি লোক কর প্রদানে সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদেরকে করের আওতায় আনার উপায় উদ্ভাবন করতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাতে বিশ্বে সর্বনিম্ন স্থান থেকে বেরিয়ে এসে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে সরকারকে আরও পারদর্শিতা দেখাতে হবে।

লেখক: বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, জার্মানি। সাবেক সিনিয়র সচিব ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর।

আরও পড়ুন:
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ‘লকডাউন’
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে লকডাউনের পরিকল্পনা
বায়ুদূষণে নাকাল দিল্লি, সরকারের উদাসীনতায় ক্ষিপ্ত প্রধান বিচারপতি
দীপাবলির বাজির ধোঁয়ায় ঢাকা দিল্লি

শেয়ার করুন

বানর ও হাতি নিধন বন্ধ হোক

বানর ও হাতি নিধন বন্ধ হোক

হাতি তার শারীরিক শক্তি ও আকার নিয়ে যত সহনশীল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিজপরিসরে বসবাস করে আসছে তা অতুলনীয় ব্যাপার। হাতি তার শ্রেষ্ঠত্বে কখনও উন্মাদ হয়নি। নিজেকে সংযত করে অন্যদের সঙ্গে সখ্য ও ভারসাম্য বজায় রেখে প্রাণিরাজ্যে বাস করে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া হাতি লোকালয়ে আসেনি, তার দরকার হয়নি। মানুষ সে পরিস্থিতি আজ তৈরি করেছে। তাকে লোকালয়ে আসতে বাধ্য করছে।

‘‘আমাদের ঘরে ঘরে প্রতিনিয়ত চলছে হত্যাকাণ্ড। আমরা মশা মারি, মাছি মারি, পিঁপড়ে মারি, ছারপোকা মারি আর মারি তোলাপোকা-ক্বচিৎ ইঁদুরও। আর খাদ্য হিসেবে পশুপাখি ও সবজি হিসেবে এবং ফল হিসেবে উদ্ভিদও মারি। কাজে হত্যা দিয়ে হনন দিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জাগ্রত মুহূর্তগুলো কাটে’’-আহমদ শরীফ-এর ডায়রি; ভাব-বুদ্বুদ; জাগৃতি প্রকাশনী (২য় সংস্করণ; ২০১৫)।

তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্ধৃত করে আরও বলছেন- হত্যা অরণ্যের মাঝে/হত্যা লোকালয়ে/হত্যা বিহঙ্গের নীড়ে/কীটের গহ্বরে/অগাধ সাগরে জলে/নির্মল আকাশে/হত্যা জীবিকার তরে/হত্যা খেলাচ্ছলে/হত্যা অকারণে/হত্যা অনিচ্ছার ফলে।

আহমদ শরীফ-এর আরও আহবান- হত্যা এড়ানোর যুগান্তর আসন্ন, হত্যা কমানোর প্রয়াস আমাদের মানবিক দায়িত্ব।

সম্প্রতি হাতি হত্যাকাণ্ড বেড়ে চলেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০০৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বছরে তিন থেকে চারটি করে হাতি হত্যার শিকার হতো। ২০২০ সালে ১২টি হাতি হত্যা করা হয়। এ বছর ইতোমধ্যে হাতিহত্যার সংখ্যা ৩৩-এ দাঁড়িয়েছে । বন দখলকারী একটি চক্র ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে হাতি হত্যা করাচ্ছে, শেরপুর, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে একই কায়দায় হাতি হত্যা করা হচ্ছে। বিষয়টি আদালতের নজরেও আনা হয়েছে।

হাতিহত্যার জন্য ভাড়াটে খুনিদের কাজে লাগানো হচ্ছে এবং নেপথ্যে কাজ করছে বনভূমি দখল। দখলের মনোবাসনা আজ এতটাই তিব্র যে, অভয়ারণ্য-জল, জঙ্গল-তরঙ্গ সবকিছু করয়াত্ত করার হিংস্র বাসনা পেয়ে বসেছে আমাদের। জনমনোভঙ্গি হলো- প্রকৃতিতে কেবল মানুষ থাকবে আর কেউ না। একেই বলে একীকরণ প্রক্রিয়া। অর্থাৎ একক অবস্থান। মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশে বাস করার যোগ্যতা হারাচ্ছে।

প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্ব সে মুখে মুখে আলোচনা করে, সভা-সেমিনার করে, জাতীয় ও আন্তজার্তিক ফোরামে নানা নীতি-কাঠামো বানায় কিন্তু দিনশেষে এগুলো কাজে লাগছে না। প্রাণী অধিকার আজ কাগজ ও ক্যাবিনেটে-বন্দি। একটা কাগজ উৎপাদন করে তা বন্দি করতে পারাতেই পৌরুষত্ব। দিনে দিনে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্ব মূল্যহীন হয়ে উঠছে। হৃদয়হীন কংক্রিট দিয়ে সবুজ অরণ্য ও তার অনুষঙ্গ বধের অপতৎপরতা চলছে সবখানে। বাংলাদেশ হলো আজ অনেকগুলো নিষ্ফলা দলিলের সমষ্টি।

মানুষের প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে জানাশোনার পরিধি যত বাড়ছে, অনুভূতির ব্যাপ্তি তত ছোট হচ্ছে। প্রকৃতিতে বিরূপ এক বন্যতা জেঁকে বসেছে। মানুষের মনুষ্যত্বের চেয়ে তার প্রাণিত্ব বড় হয়ে উঠছে। মানুষের প্রথম পরিচয় প্রাণী; প্রাণী হিসেবে মানুষ কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ, মদ-মাৎসর্যে চালিত হয় আর মানুষ হিসেবে সে কৃপা-করুণা, দয়া-দাক্ষিণ্য সংযমে, সহিষ্ণুতায় বিবেকানুগত্য ও ন্যায্যতা-ক্ষমা, ধৈর্য-অধ্যবসায়, আদর্শনিষ্ঠায় অসামান্য হয়ে ওঠে (পূর্বোক্ত)।

মনুষ্যত্বের পরিচয় ডিঙিয়ে যদি প্রাণিত্বের পরিচয় বড় হয়ে ওঠে অর্থাৎ লোভই যদি শাসনের সূচক হয় তাহলে তো বুঝতে হবে আমরা এক বড় চোরাবালিতে আটকে পড়েছি। কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরী সংস্কৃতির সংজ্ঞায় যর্থাথই বলেছেন- একজন সংস্কৃতিমান মানুষের পক্ষে অন্যায় নিষ্ঠুরতা দেখানোও সম্ভব নয়। অর্থাৎ যেখানে নিষ্ঠুরতা সেখানে অসভ্যতা বা বর্বরতা। শুভ্রতার বিপরীতে অশুভ্রের সাধনায় আমরা নিবিষ্ট হয়ে পড়েছি। স্বার্থ ও লোভের সাধনা আজ মূল প্রেরণা।

জনমনস্তত্ত্বে হিংস্রতার বসতবাড়ি, যেখানে কোনো সংবেদের উপলক্ষ নেই। অপরিশোধিত মানুষের ঘনবসতি আজ বাংলাদেশ। বিযুক্তি ও হননের তিব্র আকাঙ্ক্ষার লকলকে জিভ চারদিক। লোভের বাসনা এমন রোগ যা থাকলে আর কোনো অসুখ লাগে না। এ নীচুতা কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের পাবলিক সাইকিকে।

একটি প্রাণ যখন আরেকটি প্রাণ হনন করতে চায় তখন তার চেয়ে করুণ বিষয় আর কিছু হতে পারে না। হনন পূর্বপ্রস্তুতি মানুষের মনুষ্যত্বের পরিচয়টি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অমানুষ করে তোলে। অর্থাৎ যেকোনো হনন অপপ্রয়াস একটি সাংঘাতিক বন্যপ্রস্তুতি। এক প্রস্তুতিচর্চা আজ একক ও যৌথ, কূটকৌশলে। অর্থাৎ এ বিমানবীকরণ প্রচেষ্টা একক কোনো তৎপরতা নয়, ক্ষুদ্র দলীয় বা বড় স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর কালো অন্তর্জাল।

শুভ কাজের তুলনায় অশুভ কাজে বাঙালির পেশাদারী উৎকর্ষ আজ বেড়েছে অনেক গুণ। থাকছে অভিনব সব অপকৌশল। অপরাধ কৌশলে অভিনবত্ব ও সংযুক্তি বিস্ময় জাগায়। মানুষরূপী এসব কীটদের জঘন্য মানসিকতা পাঠের অযোগ্য।

হাতি তার শারীরিক শক্তি ও আকার নিয়ে যত সহনশীল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিজপরিসরে বসবাস করে আসছে তা অতুলনীয় ব্যাপার। হাতি তার শ্রেষ্ঠত্বে কখনও উন্মাদ হয়নি। নিজেকে সংযত করে অন্যদের সঙ্গে সখ্য ও ভারসাম্য বজায় রেখে প্রাণিরাজ্যে বাস করে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া হাতি লোকালয়ে আসেনি, তার দরকার হয়নি। মানুষ সে পরিস্থিতি আজ তৈরি করেছে। তাকে লোকালয়ে আসতে বাধ্য করছে।

হাতির শরীরের স্নিগ্ধতা ও সারল্য যে অনুভব করেনি তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কে আছে! আফ্রিকান এক প্রবাদে বলা হয়েছে, হাতি নিজদায়িত্বে তার শুঁড় বয়ে বেড়ায়। অর্থাৎ নিজদায়িত্ব সম্পর্কে হাতি খুব সচেতন এবং সে তা সুচারুভাবে প্রতিপালন করে। বলা হয়, পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে বড় কিন্তু ক্ষতিকর নয় এমন একটি প্রাণী হলো হাতি। হাতি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও দায়িত্বশীল প্রাণী।

বাঙালির কাছে স্বার্থ যখন মুখ্য তখন গুণবিচার মূল্যহীন। শক্তির বিবেচনায় বন দখলে সে হাতিকে মূল প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। হাতিকে সরাতে পারলে বন দখল তার সহজ হয়। কিন্তু বাস্তবতা হাতিকে স্মৃতিহীন বা ইতিহাস থেকে মিলিয়ে দেয়া খুব সহজ নয়। এরা সভ্যতার এক অপরিহার্য অংশীদার।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, হাতিহত্যার অনুকুলে সমাজে অনেক আগেই একটি প্রাধান্যশীল আখ্যান বা ডমিনেন্ট ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে যেমন- হাতি বাঁচলেও লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা। এ আখ্যানের মূল বিষয় হলো জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় হাতির মূল্য সমান। হাতির জীবন ও মৃত্যুকে অর্থমূল্য দিয়ে সমান করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্যালকুলেশনে মূল ফ্যালাসি বা ভ্রান্তি হলো হাতির জীবনের মূল্যটি উপেক্ষিত থেকেছে। কেবল অগ্রাধিকার পেয়েছে তার আকার বা শরীর।

মানুষের ন্যারেটিভের প্যান্টার্নগুলো এরকমেরই যা তার আধিপত্য, ক্ষমতা সর্বোপরি নিজের অবস্থানকে ধরে রাখতে সহায়তা করে। আমরা যদি হাতির দিক থেকে মানুষ নিয়ে আখ্যানগুলো শুনতে পেতাম তাহলে হয়ত ভিন্ন বাস্তবতা উৎপাদিত হতো। প্রাণীদেরও মনস্তত্ত রয়েছে।

ইজরাইলের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ইয়ুভেল নোয়াহ হারারি গরুর মানসিক অবস্থা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। একে তিনি বলছেন বোভাইন ম্যান্টালিটি। হাতির যে রয়েছে এক গভীর মনোকাঠামো তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

যুগপৎভাবে, গত অক্টোবর মাসে সংবাদমাধ্যমে কক্সবাজারের মহেশখালীতে প্রায় ৫০টি বানর হত্যা করার খবর প্রকাশিত হয়। বানরগুলো স্থানীয় এক কৃষকের ফাঁদ হিসেবে রাখা বিষাক্ত কলা খেয়েছিল। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, বড় মহেশখালীর পাহাড়–জঙ্গলে হাজারো বানরের বসবাস। বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় বানরগুলো খাদ্যসংকটে পড়ে। মাঝেমধ্যে বানর দল বেঁধে হানা দেয় স্থানীয় লোকজনের খেতে। বানরগুলোর এ আচরণকে তারা চিহ্নিত করেছে ‘উপদ্রব’ হিসেবে।

ক্রমশ বনভূমি কমে যাওয়া ও খাদ্যসংকটের কারণে বানরগুলো লোকালয় ও ফসলের খেতে ঢুকে পড়ছে। বনভূমিতে অবৈধ মালিকানা স্থাপন করে বানরগুলোর বসবাসের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। বন্যপ্রাণীদেরও যে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই।

বানরের ক্ষেত্রেও ভিকটম ব্ল্যামিং চলছে। সব দোষ বানরের। আমরা যেমনটি বলি বাঁদরামি করবে না। বানরের আচরণকেও আমরা লেবেলিং করেছি। তাদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে হত্যার পথ তৈরি করেছি। জীবন নাশ তো শেষ অস্ত্র কথা নয়। এর আগে কিছু বিকল্প ভাবা যেত?

প্রাণীদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদাসনীতা বা শৈথল্য বেদনাদায়ক। প্রাণী-পাখি-উদ্ভিদ সুরক্ষায় বন বিভাগের এখতিয়ার ও দায়িত্ব বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

এ থেকে উত্তরণে পরার্থবোধ বা অন্যের জন্য কল্যাণবোধের জাগৃতি জরুরি। প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। আমরা তা কেড়ে নিতে পারি না।

শেষান্তে আবারেও স্মরি আহমদ শরীফকে- পিঁপড়ে থেকে হাতি, তিমি অবধি সবার প্রাণের ও জীবনের মূল্য ও মমতা সমান- এ তত্ত্ব, তথ্য ও সত্য অনুভব ও উপলব্ধি করতে হবে। তা করতে হবে একটি বৈচিত্র্যময়, সহাবস্থান মূলত নিরাপদ প্রকৃতিবলয় গড়ে তোলার স্বার্থে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন:
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ‘লকডাউন’
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে লকডাউনের পরিকল্পনা
বায়ুদূষণে নাকাল দিল্লি, সরকারের উদাসীনতায় ক্ষিপ্ত প্রধান বিচারপতি
দীপাবলির বাজির ধোঁয়ায় ঢাকা দিল্লি

শেয়ার করুন

দায়িত্ব নাকি ক্ষমতা?

দায়িত্ব নাকি ক্ষমতা?

সাংবাদিক নির্যাতনের যে ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে, সরকারের তদন্তেও যা প্রমাণিত হয়; সেই অপরাধেরও কোনো শাস্তি হলো না! এরপর আমলা বা পুলিশ কর্মকর্তারা যদি নিজেদের সব আইনের ঊর্ধ্বে ভাবেন এবং আইন হাতে তুলে নিতে পরোয়া না করেন; তাহলে তাদের খুব একটা দোষ দেয়া যাবে না। শাস্তি না হলে অপরাধ প্রবণতা বাড়বেই শুধু।

আমাদের দেশে দায়িত্ব আর ক্ষমতার সংজ্ঞাটাই বোধহয় বদলে গেছে। এখানে দায়িত্বকেই ক্ষমতা মনে করা হয়। আর দায়িত্ব একবার পেলে তাকে ক্ষমতা মনে করে চলে ক্ষমতার দেদার অপব্যবহার। আর আমরা সাধারণ মানুষও এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কেউ কোনো দায়িত্ব পেলেই আমরা অনায়াসে বলি অমুক ক্ষমতায় গেছে। এটা রাজনৈতিক দল, রাজনীতিবিদদের জন্য যেমন সত্যি, তেমনি সরকারি কর্মচারীদের জন্যও সত্যি। এক্ষেত্রে আমলা বা পুলিশ সদস্যরা ব্যাপকভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। কারণ তাদের কাছে অনেক বড় দায়িত্ব দেয়া থাকে। সেই দায়িত্বকে ক্ষমতায় বদলে নিয়ে তারা সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রয়োগ করেন কখনও আইন মেনে, কখনও আইনের তোয়াক্কা না করেই।

একটি সভ্য, আইনের শাসনের সমাজ গড়তে আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীলতা আর দায়িত্বশীলদের দায়িত্বশীলতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। দায়িত্বশীলদের অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টো ঘটনা। কেউ বেআইনি কিছু করলেই, আমরা পরামর্শ দেই, আইন হাতে তুলে নেবেন না। কিন্তু পুলিশ কিছু করলে আমরা কখনও সেটা বলি না; যেন পুলিশের যা ইচ্ছা তাই করার স্বাধীনতা আছে।

বাংলাদেশের আইনে গায়ে হাত তোলার অধিকার কারোই নেই। ধরুন, আমি যদি রাস্তায় কোনো রিকশাওয়ালাকে পেটাই, পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে। কারণ আমি আইন হাতে তুলে নিয়েছি। কিন্তু পুলিশ যে প্রতিদিন রাস্তায় মানুষকে পেটায়, আমরা কিন্তু কিছুই মনে করি না।

আমরা ভাবি পুলিশ তো আইনের লোক। কিন্তু আইনের লোক বলেই আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার তারও নেই। কেউ যদি বেআইনি কিছু করে পুলিশের দায়িত্ব হলো তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া, তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা, অভিযুক্তের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে আদালত। অপরাধ বিবেচনা করা শাস্তি নির্ধারণ করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় পেটানোর কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু আমাদের দেশে বিচারপ্রক্রিয়ায় বাইরে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে অহরহ। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের অনুমতি নিয়েই রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের কৌশলেই তথ্য আদায় করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের শিশুও জানে, রিমান্ড মানেই পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা। কোনো একটি সিনেমায় দেখেছিলাম, এক সন্ত্রাসী পুলিশকে হুমকি দিচ্ছে, তোমার গুলির হিসাব দিতে হবে। আমার গুলির কিন্তু কোনো হিসাব লাগবে না। পুলিশের হাতে যেহেতু আইন আছে, অস্ত্র আছে, গুলি আছে। তাই তাদের কাছে সর্বোচ্চ সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহি প্রত্যাশিত। কিন্তু পুলিশের আইনের, ক্ষমতার, অস্ত্রের, গুলির অপব্যবহার হয় সবচেয়ে বেশি। সন্দেহভাজন আসামিকে ধরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে যাওয়ার নামে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়।

আমরা বলি বটে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কিন্তু এটা স্রেফ ঠাণ্ডা মাথায় খুন, যে খুনের কোনো বিচার হয় না। আমার বিবেচনায় সন্ত্রাসীর খুন আর পুলিশের খুনে কোনো পার্থক্য নেই; দুটিই সমান অপরাধ। বরং পুলিশের হাতে যেহেতু অস্ত্র আছে, তাই তার কাছে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রত্যাশিত, যা নেই বললেই চলে।

পুলিশ হোক আর আমলা হোক আর সাধারণ মানুষ হোক; শেষ পর্যন্ত সবাই মানুষ। তাই তারা ভুল করতে পারে, বেআইনি কাজ করতে পারে। সেটা যাতে কেউ না করে, সে জন্যই আইন। কেউ অপরাধ করলে তাকে সাজা দিতে হবে। সাজার ভয়ে কেউ অপরাধ করবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের অপরাধ শাস্তিযোগ্য হলেও আমলা বা পুলিশের ক্ষেত্রে যেন তার কোনো বালাই নেই। কোনো ঘটনায় গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক হৈ চৈ হলে, তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়া হলেও শেষ বিচারে তা আইওয়াশই।

গত বছরের ১৩ মার্চ মধ্যরাতে বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং সাজানো মাদক মামলায় সাজা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। কুড়িগ্রামের তখনকার জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের নির্দেশেই রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর নাজিম উদ্দিন এবং দুই সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলাম এই অভিযানে অংশ নেয়।

আরিফুল ইসলামের মূল অপরাধ ছিল, তিনি জেলা প্রশাসকের নানা অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি করেছিলেন। কিন্তু কাগজে-কলমে দেখানো হয় তার কাছ থেকে আধা বোতল, মদ আর ১৫০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছিল। মধ্যরাতে সাংবাদিককে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও মাদক মামলায় সাজা দেয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনসহ অভিযুক্ত চারজনকেই প্রত্যাহার করা হয়।

সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কারণ দর্শাতে বলা হয়। ব্যক্তিগত শুনানিও হয়। তদন্ত বোর্ড তার অপরাধের প্রমাণ পায় এবং তার বিরুদ্ধে গুরুদণ্ডের সুপারিশ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে দেয়া হয়, দুই বছর ইনক্রিমেন্ট স্থগিত রাখার অতি লঘুদণ্ড। কিন্তু সেই সান্ত্বনার লঘুদদণ্ডটিও শেষপর্যন্ত টিকল না। সুলতানা পারভিন রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করলে সেই অতি লঘুদণ্ড থেকেও মার্জনা পান তিনি। সুলতানা পারভীনকে সকল দায় থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

সাংবাদিক নির্যাতনের যে ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে, সরকারের তদন্তেও যা প্রমাণিত হয়; সেই অপরাধেরও কোনো শাস্তি হলো না! এরপর আমলা বা পুলিশ কর্মকর্তারা যদি নিজেদের সব আইনের ঊর্ধ্বে ভাবেন এবং আইন হাতে তুলে নিতে পরোয়া না করেন; তাহলে তাদের খুব একটা দোষ দেয়া যাবে না।

শাস্তি না হলে অপরাধ প্রবণতা বাড়বেই শুধু। অথচ বার বার বলছি, যাদের হাতে আইন আছে, ক্ষমতা আছে, অস্ত্র আছে; তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা, দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি প্রত্যাশিত। এটা না থাকলে আইনের শাসনের আকাঙ্ক্ষা করা আর সুন্দরবনের গহীনে বসে কান্নাকাটি করা সমান কথা।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ‘লকডাউন’
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে লকডাউনের পরিকল্পনা
বায়ুদূষণে নাকাল দিল্লি, সরকারের উদাসীনতায় ক্ষিপ্ত প্রধান বিচারপতি
দীপাবলির বাজির ধোঁয়ায় ঢাকা দিল্লি

শেয়ার করুন

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, তবু বিস্মরণ

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, তবু বিস্মরণ

সেনাবাহিনী পরিচালিত সব সংস্থা যদি লাভজনক হয়, তাহলে একই সরকারের অসামরিক সংস্থাগুলো কেন লাভজনক হবে না? প্রশ্নটি অনেকের মাথায় আসে। দেশে যে বিপুল পরিমাণ যাত্রী, তাতে বিআরটিসি অলাভজনক তো হওয়ার কথা নয়। সরকারের কোটি কোটি টাকার বাস নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, মেরামত হয় না। কেবল নতুন কেনার দিকে ঝোঁক!

ডিসেম্বর কড়া নাড়ছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫০ বছর বা সুবর্ণজয়ন্তীর বছর ২০২১ এখন অস্তাচলে। দিন যায় কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু অবিস্মরনীয় ঘটনা থেকে যায়। সেসব কেউ ভোলে, কেউ মনে রাখে। যারা ভোলে না তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে। অনেকের দুর্ভাগ্য এই যে, তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে না। আর করে না বলেই মারাত্মক ভুলের ফাঁদে পড়তে হয়।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর গৌরবময় ২০২১ সাল চলে যাবে কিন্তু রেশ থেকে যাবে। ২০২২ সালেও মনে পড়বে করোনা মহামারির তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড সময়ের কথা। এই দুর্যোগ ছাড়াও মনে পড়বে রাজনৈতিক অবক্ষয়জনিত দুর্ভোগের নানা স্মৃতি।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে পেছনে তাকালে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মতো একটি আনন্দমুখর স্থানীয় নির্বাচন কীভাবে সহিংসতায় আক্রান্ত হয়েছে ২০২১ সালে। সেই অবাঞ্ছিত বাস্তবতা নিয়েই শুরু হবে ২০২২ সাল। পর নতুন বছর। কিন্তু জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তৃতীয় ধাপের যে ইউপি নির্বাচন, সেখানে কি থাকবে না এমন দুঃখজনক সহিংসতার ঘটনা? এই গ্যারান্টি তো নেই।

সড়ক পরিবহনের সৃষ্ট অনিয়মের কারণে সারা বছর যে কত প্রাণ ঝরে গেছে সেসব দুঃখজনক অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে যেতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু যাওয়া যাবে না। যারা পরিবহন সেক্টর সুশৃঙ্খল করতে পারত, তারা সক্রিয় হবে না। যদি সরিষাতেই ভূত থাকে তাহলে সেই সরিষা দিয়ে ভূত তাড়ানো যায় না। সবকিছুতেই প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ লাগে! বাংলাদেশে এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার! গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড হচ্ছে। বহু বছরের চলে আসা এই নিয়ম এখন মেনে নিতে রাজি নয় পরিবহন মালিক-শ্রমিকপক্ষ। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এক সাবেক মন্ত্রী, যিনি পরিবহন সেক্টরেরও শীর্ষপর্যায়ের নেতা, বললেন- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা বলবেন, তাই মেনে নেব আমরা।

শিক্ষার্থীরা সমস্ত গণপরিবহনে হাফ ভাড়ায় চলাচল করবে, এটা তো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দাবি ছিল না। কিছুদিন আগেও এ নিয়ম চালু ছিল। আজ থেকে ৪০-৪৫ বছর আগেও শিক্ষার্থীরা যানবাহনের ভাড়া দিয়েছে অর্ধেক। তাদের দাবি পূরণের যৌক্তিকতা সরকারও স্বীকার করছে। আলোচনায় বসেছে। হতাশার কথা এই যে, নিষ্ফল সে আলোচনা।

পরিবহন মালিকরা হাফ ভাড়ার দাবি মেনে নিচ্ছে না অথবা পারছে না। সরকার বিআরটিসি বাসের অর্ধেক ভাড়ায় শিক্ষার্থীদের চলাচলের ঘোষণা দিয়েছে। বিআরটিসির সীমিত বাসে তা কতটা কার্যকর করা সম্ভব? সমস্যা থেকেই যাবে। বিআরটিসি বাসের আশায় রাস্তায় অপেক্ষা করে সময়মতো ক্লাস করা সম্ভব হবে না।

বিআরটিসি হতে পারত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন। কিন্তু শুধু অব্যবস্থাপনার কারণেই বছরের পর বছর ধরে খুঁড়িয়ে চলছে এই সরকারি সংস্থাটি। বিপুল ঘাটতি টেনে সরকার এই সংস্থাটিকে আজও কেন টিকিয়ে রেখেছে তাও এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। সেনাবাহিনী পরিচালিত সব সংস্থা যদি লাভজনক হয়, তাহলে একই সরকারের অসামরিক সংস্থাগুলো কেন লাভজনক হবে না? প্রশ্নটি অনেকের মাথায় আসে। দেশে যে বিপুল পরিমাণ যাত্রী, তাতে বিআরটিসি অলাভজনক তো হওয়ার কথা নয়। সরকারের কোটি কোটি টাকার বাস নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, মেরামত হয় না। কেবল নতুন কেনার দিকে ঝোঁক!

অথচ পরিবহন খাতে বেসরকারি বাসমালিকরা একটি বাস থেকে দশটি বাসের মালিক হয়েছে ১০ বছরের ভেতর, এমন দৃষ্টান্ত একাধিক। টিসিবি আর বিআরটিসি হতে পারত দরিদ্র জনগণের সবচেয়ে বড় সহায়ক প্ল্যাটফর্ম। বাজারের আগুনের তাপ থেকে স্বল্প আয়ের মানুষকে বাঁচাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত এই দুটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে তা হয়নি।

কথায় বলে বোঝার উপর শাকের আঁটি। সম্প্রতি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বহু সংকট সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থীরা এখন যে রাজপথে, তারও কারণ ওই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। একটি খাতকে সহায়তা করতে গিয়ে শত খাতকে বিপর্যস্ত করার কোনো মানে হয় না।

প্রসঙ্গক্রমে স্মরণ করা যেতে পারে, গত ১২ বছর ধরে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায়। দেশের অনেক সেক্টরে অভূতপূর্ব উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে এই সরকারের হাত দিয়ে। কিন্তু সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার উপায় এখনই উদ্ভাবন করতে হবে। ২০২৩-এর ডিসেম্বরে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। এর আগেই দেশে একটা অরাজক অবস্থা সৃষ্টির আলামত ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।

আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে সারা দেশের নানা স্তরে সুবিধাবাদী লোক এই দলে ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতার ব্যক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ না পেলে এই অনুপ্রবেশ ছিল অসম্ভব। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশ ও দলকে বড় করে দেখলেই এটি হতো না। দলে এমন লোকরাই ঢুকেছে- যারা বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ঘোরতর বিরোধী। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই তাদের অস্তিত্বে গাঁথা!

ক্যাসিনো কাণ্ডে ধরপাকড়কে কেন্দ্র করে কেঁচো খুঁড়তে বহু বিষধর সাপও বেরিয়ে আসে। যারা আওয়ামী লীগের সম্পদ নয়, কলঙ্ক। তাদেরই দায় বহন করতে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এবং বাংলাদেশকে উন্নয়নে আধুনিকতায় শাণিত করা দল আওয়ামী লীগকে!

সম্প্রতি গাজীপুর এবং রাজশাহীর কাটাখালির বহিষ্কৃত দুই মেয়রের দুটি অডিও আলোচনা শুনে চমকে ওঠেছি। কী ভয়ংকর সে আলোচনা! সেখানে ৩০ লাখ শহীদের মৃত্যুর জন্য সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী বলা হচ্ছে! বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাস্কর্য স্থাপনকে মৌলবাদী জঙ্গিদের ভাষায় তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে!

জীবন দিয়ে হলেও সেই ভাস্কর্য স্থাপন ঠেকানো হবে; এমন জঙ্গিবাদী উক্তি করতে পারে যে বা যারা, তাদেরকে দলে আনতে কারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে? আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উচিত তাদেরকে খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনা। আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত না হলে ২০২১ সাল মোটেও সুখকর হবে না।

২০০১ সালে শাহ এমএস কিবরিয়ার নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটির এক সভায় মতামত জানতে চাওয়া হলে বলেছিলাম, গ্রামগঞ্জে জামায়াত-বিএনপিকর্মীরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। মসজিদে মসজিদে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, জনগণকে বিভ্রান্ত করছে; তৃণমূলপর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় করে এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা না নিলে বিপর্যয় এড়ানো যাবে না।

অনেকেই সেদিন বিরক্ত হয়েছিল। নির্বাচনে দেখা গেছে লতিফুর রহমানের মতো পক্ষপাতদুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে অপপ্রচার আওয়ামী লীগকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। শুধু তাই নয়, সহিংসতার তাণ্ডবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছিলেন।

ইউপি নির্বাচনে এই বছর যে মাত্রায় সহিংসতা হলো এমন কোনো নজির অতীতে নেই। এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। অবশ্য এ কাজেও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকেই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তিনি হস্তক্ষেপ না করলে কিছুই হবে না।

মনে রাখতে হবে, দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তত সুস্থির নয়। ঘোলা পানিতে মাছ শিকার কিংবা ঘর পোড়ার মধ্যে আলুপোড়া দেয়ার মতো লোকের অভাব নেই। দেশ-বিদেশে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। তাকে বিদেশ নিয়ে চিকিৎসা করানোর দাবিতে বিএনপি এবং তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য মিত্র দেশ-বিদেশে জোট বাঁধছে।

দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসা হোক, তিনি সুস্থ হয়ে উঠুন এটা দলনিরপেক্ষ মানুষও চায়। কিন্তু তার চিকিৎসা নিয়ে যেন রাজনৈতিক ফায়দা লোটার সুযোগ করে দেয়া না হয়। তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকার সর্বাত্মক আন্তরিকতার পরিচয় দেবে, এ আশা করাই যায়।

প্রবল প্রতাপশালী জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে কঠোর হাতে দেশ শাসন করেছেন ৯ বছর। কল্পনাও করেননি তাকে কারাগারে যেতে হবে কোনোদিন! নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে এরশাদের পতনের পর ৩ জোটের রূপরেখা অনুযায়ী নির্বাচন হলো। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবে এটা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অলৌকিকভাবেই যেন জিতে যায় বিএনপি।

সরকার গঠনের পর এরশাদ গেলেন কারাগারে। নয়টি বছর মামলার পীড়নে জর্জরিত হলেন। দণ্ডিতও হলেন দু-একটি মামলায়। তখন কি বেগম জিয়া কল্পনাও করেছেন কোনোদিন তিনিও বিচারের মুখোমুখি হয়ে দণ্ডিত হবেন?

২০০৬ সালে যখন তার প্রবল প্রতাপ, লাখো শহীদের রক্তেভেজা জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছেন একাত্তরের ঘাতকদের গাড়িতে; তখন তো কল্পনাও করতে পারেননি যাকে চক্ষুশূল মনে করেন, তার কাছেই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার জন্য তার অনুকম্পা চাইতে হবে।

সম্প্রতি গণভবনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত ক্ষোভে-দুঃখে বিএনপি এবং বেগম জিয়ার তার প্রতি নৃশংস মানসিকতা আর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রতি অন্ধ পক্ষপাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ২০০৭ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যবর্তী ঘটনাগুলো এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কালো অধ্যায়। কাদের উদগ্র ক্ষমতালিপ্সায় কীভাবে ওয়ান ইলেভেন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তাও ইতিহাসে লেখা আছে।

অতএব, স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগকেও আজ জোয়ারভাটার এই দেশের অস্থিরচিত্ত মানুষের মন বুঝে সতর্ক পা ফেলতে হবে। প্রকাশ্য অথবা গোপনে শুদ্ধি অভিযান দলের ভেতরে চালাতে হবে। এভাবে এই সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা), বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ‘লকডাউন’
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে লকডাউনের পরিকল্পনা
বায়ুদূষণে নাকাল দিল্লি, সরকারের উদাসীনতায় ক্ষিপ্ত প্রধান বিচারপতি
দীপাবলির বাজির ধোঁয়ায় ঢাকা দিল্লি

শেয়ার করুন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ নয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা
গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ নয়

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাধারণ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার দিকে লক্ষ করি, তাহলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে সেটি হলো, এই সহিংসতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতার পরিমাণ অন্য নির্বাচনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এবারের সহিংসতা মূলত হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমি। কারণ এখান থেকেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। একটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অনন্য। গণতন্ত্রে কেন্দ্রীয় সরকার নীতি প্রণয়ন করবে এবং স্থানীয় সরকার সেই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করবে- এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু জনগণের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, সেহেতু বিভিন্ন ধরনের সেবা ও পণ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

আমরা জানি, বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ ধারায় কেন্দ্রীয় সরকারের নিচে স্থানীয়পর্যায়ে বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সরকারের স্তর প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই স্তরগুলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার বিধান রয়েছে। গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে নিচের স্তর ইউনিয়ন পরিষদ প্রায় ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্য স্তরগুলোর তুলনায় নিজেদের এখতিয়ারের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও এই প্রতিষ্ঠানের বাজেটনির্ভরতা রয়েছে সরকারের ওপর।

স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক দলভিত্তিক নির্বাচন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনুশীলন করা হয়। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই প্রক্রিয়া চলমান। এই অনুশীলনের বিষয়টির কথা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক দলভিত্তিক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে। দলভিত্তিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ-উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়।

অন্যদিকে, এসব স্তরের সদস্য ও কাউন্সিলররা সরাসরি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করলেও রাজনৈতিক দলগুলো চেষ্টা করে প্রতিটি নির্বাচনে স্থানীয়পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক দলীয় নমিনেশনের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের। দলীয় মনোনয়ন দেয়ার সময় স্থানীয় নেতা ও সংসদ সদস্য নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে এমন অনেক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য কেন্দ্রে সুপারিশ করেন, যাদের দলের সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগ নেই।

এমনকি অন্য দল থেকে আসা অনেক প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ায় দলের যোগ্য, ত্যাগী ও নিবেদিত প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে এলাকার সক্রিয় নেতাকর্মীরা দলীয় মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং অপেক্ষাকৃত জনপ্রিয় বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেয়। আর এ কারণেই স্থানীয়ভাবে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তির কারণে পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণের চেষ্টা করে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে সহিংস ঘটনা। চলতি বছরে শুধু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরেই প্রায় ২০০ সংঘাতের ঘটনায় ৪৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন অসংখ্য। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনেরও নানা অভিযোগ উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, নির্বাচন ঘিরে এ সংঘাত, বিশৃঙ্খলা ও হতাহতের দায় ইসি, সরকার ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে। কারণ আইন ও বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া আছে। পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এতে সংঘাত বেড়েই চলেছে। এছাড়া নির্বাচনি মাঠে দলীয়ভাবে বিএনপি না থাকায় অধিকাংশ স্থানেই রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। তারা নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগ তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারছে না।

তৃতীয় ধাপের ১০০৭ ইউপিতে ভোট হবে ২৮ নভেম্বর। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য নির্বাচন কমিশন কী ব্যবস্থা নিয়েছেন? এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসব সহিংস ঘটনারোধে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে? যেভাবেই হোক, পুলিশকে দ্রুত ঘটনার তদন্ত করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিট দিতে হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে পুলিশকে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাধারণ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার দিকে লক্ষ করি, তাহলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে সেটি হলো- এই সহিংসতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতার পরিমাণ অন্য নির্বাচনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

এবারের সহিংসতা মূলত হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে। কারণ বিএনপি এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। যেহেতু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপি প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে দেশব্যাপী বিএনপি এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, তাদের পক্ষে নির্বাচনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতা কঠিন।

ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় মানুষ মারা যাচ্ছে, যেটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং দেশের সামগ্রিক নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং নির্বাচন হবে প্রশ্নবিদ্ধ। ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্থানীয়পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীরা চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছেন। এভাবে দুই ধাপের ইউপি নির্বাচনে বিএনপির শতাধিক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা যারা পাচ্ছেন তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। অধিকাংশ ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না পেয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েও কোথাও কোথাও ভোটে জিতে যাচ্ছেন।

এ পরিস্থিতিতে তৃণমূলপর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ সম্পর্কে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। তাই দেশব্যাপী চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বিব্রত। আর এ কারণেই আইন সংশোধনের ৫ বছরের মাথায় আবার আগের মতো প্রতীক ছাড়া ইউপি নির্বাচনের কথা ভাবছে সরকার।

রাজনীতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা হিসাব-নিকাশ, কৌশল ও মূল্যায়ন থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার যে নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা নিয়ে কোনো পক্ষেরই পরিষ্কার অবস্থান নেই। এ ব্যর্থতার দায় নির্বাচন কমিশনের।

ইউপি নির্বাচন নিয়ে যে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করার উপায় হচ্ছে সামনের নির্বাচনগুলো অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত করা। নির্বাচন কমিশনকেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও সহিংসতার পথ পরিহার করে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। এসব ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় তৎপরতা। নির্বাচনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে দলমত নির্বিশেষে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারীদের অবশ্যই নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করতে হবে।

নির্বাচনকে অবাধ-সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশন সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে আইনগত কোনো বাধা নেই। কিন্তু শুরু থেকেই তাদের কাজকর্মে একধরনের ঢিলেঢালা ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করছে।

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলের মধ্যে উত্তেজনাও তত বাড়বে। তাই আগামীতে নির্বাচন কমিশনকে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে আরও সক্রিয় ও সজাগ হতে হবে। যেকোনো মূল্যে নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন নিয়ে আর কোনো মৃত্যু আমাদের কাম্য নয়।

অতীতেও স্থানীয়পর্যায়ের নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সেসব তথ্য বিবেচনায় রেখে এবারও যাতে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে কোনো ধরনের সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটে সে জন্য কর্তৃপক্ষের করণীয় নিয়ে নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই নানা মহল থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করা হয়েছিল। দুঃখজনক হলো, তারপরও ইউপি নির্বাচনে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন প্রতিটিতেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। আগামীতে অনুষ্ঠেয় তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন এবং স্থানীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠিতব্য অন্যান্য নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণা ও ভোটগ্রহণ যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারে, সেদিকে নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ নজর দিতে হবে। লেভেল প্লেইং ফিল্ড প্রস্তুতসহ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। প্রার্থী, নেতাকর্মী ও সমর্থকদেরও নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলতে হবে।

নির্বাচনের সব অংশীজন উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচয় না দিলে এককভাবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা বেশ কঠিন। কাজেই উন্নত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আগামীতে সব নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফলভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন, এটাই দেশবাসী কামনা করে।

লেখক: গবেষক, কলাম লেখক। সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি

আরও পড়ুন:
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ‘লকডাউন’
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে লকডাউনের পরিকল্পনা
বায়ুদূষণে নাকাল দিল্লি, সরকারের উদাসীনতায় ক্ষিপ্ত প্রধান বিচারপতি
দীপাবলির বাজির ধোঁয়ায় ঢাকা দিল্লি

শেয়ার করুন

ফিলিস্তিনের জন্য ভালোবাসা

ফিলিস্তিনের জন্য ভালোবাসা

অনেক আগে থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ১৯৭২-এর ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে তৃতীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইসরায়েল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের সমর্থনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল টিম ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন ইয়াসির আরাফাত।

পৃথিবীর ইতিহাসে ইংরেজদের বেইমানির অগণিত উদাহরণ আছে। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও দুঃখজনক উদাহরণ হচ্ছে ফিলিস্তিন। ইংরেজরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) সময় ফিলিস্তিনি আরবদের কথা দিয়েছিল- তোমরা যদি তুর্কিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে লড়াই না করো, তবে তোমাদের (সেলফ ডিটারমিনেশন) স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র দেব। ওদিকে আরবদের অগোচরে ইহুদিদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যদি তোমরা জার্মানিকে অর্থসাহায্য বন্ধ করে সে অর্থ ইংরেজকে দাও, তবে যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনে তোমাদের ‘ন্যাশনাল হোম’ নির্মাণ করতে দেয়া হবে।

ইংরেজদের এই দুমুখো নীতি প্রকাশ পেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে। এই যুদ্ধের আগে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ছিল তুরস্কের উসমানিয়া সাম্রাজ্যের অধীন। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রে তুরস্কের মুসলিম খেলাফত ভেঙে যায় এবং একটি গুলিও খরচ না করে ইরাক, সিনাই উপত্যকা, ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম দখল করে নেয় ব্রিটিশ বাহিনী। ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্ডান ও লেবানন চলে যায় ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের দখলে। ১৯১৭-এর ২ নভেম্বর সে সময়ের ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর একটি চিঠিতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন, যেটা বেলফোর ঘোষণা নামে পরিচিত।

ইউরোপের নানা দেশে ইহুদিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। তবে এই বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হতেই দলে দলে ইহুদি আসতে শুরু করল ফিলিস্তিনে। ওদিকে বেইমান ইংরেজ ক্ষমতালিপ্সু ও আরেক বেইমান জাতি ইহুদিদের ইউরোপে রাষ্ট্র তৈরির পক্ষে কখনও সমর্থন দেয়নি। বরং ঝামেলাবাজ ইহুদিদের ঠেলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে।

রোমান সময় থেকে ইহুদিদের ছোট্ট একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী সেখানে বাস করত। তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ায় বিপুলসংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে পাড়ি জমায় ফিলিস্তিনে। ব্রিটিশদের সহায়তায় ১৯১৮ সালের মধ্যে ইহুদিদের সংখ্যা হয়ে যায় ২০ হাজার। যা ১৯২৩ সালে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার এবং ১৯৩১ সালে ১ লাখ ৮০ হাজারে।

এর মধ্যেই ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ১৯১৮ সালে তৈরি হয় গুপ্ত ইহুদি বাহিনী ‘হাগানাহ’। এই বাহিনী প্রথম দিকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইহুদিবাদীদের সহায়তা করত। পরবর্তী সময়ে তারা সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হয়। শুধু ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও ক্ষেত-খামার দখল করেই তারা ক্ষান্ত থাকেনি, জোর করে বিতাড়িতও করত। বাজার ও রাস্তাঘাটে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা ছিল তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।

ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও হিটলারের কঠোরতায় ১৯৪৮ সালেই ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা হয়ে যায় ৬ লাখ। টনক নড়ে আরবদের। ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ফিলিস্তিনি আরবরা বিদ্রোহ শুরু করে। ব্রিটিশ সৈন্যরা ভয়ংকর দমন-পীড়নের মাধ্যমে সে বিদ্রোহ দমন করে কঠোরভাবে। বিবিসির খবরে প্রকাশ, এ সময় ৩২ হাজার ইহুদি ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিয়ে রণকুশলী হয়ে ওঠে।

ইহুদিরা সেই রণকৌশল প্রথমে প্রয়োগ করে আরবদের বিরুদ্ধে। এরপর ইহুদি রাষ্ট্র তৈরিতে চাপ সৃষ্টি করার জন্য ব্রিটিশ সৈন্যদের ওপর। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। হিটলারের কবল থেকে বেঁচে যাওয়া এক লাখ ইহুদিকে অতিদ্রুত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জায়গা দেয়ার জন্য চাপাচাপি করতে থাকেন। যদিও ব্রিটেন বুঝে গিয়েছিল এত ইহুদিকে তাদের উপনিবেশ ফিলিস্তিনে নিয়ে গেলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। অর্থাৎ ইংরেজ তখন গৃহস্থকে ঘর পাহারা দেয়ার কথা বলে চোরকে চুরি করার অনুমতি দিল।

জাহাজ বোঝাই করে পঙ্গপালের মতো হাজার হাজার ইহুদি এসে আস্তানা গাড়তে থাকে ফিলিস্তিনে। ধীরে ধীরে দখলদার ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। এবার জাতিসংঘের মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে শুরু করে ইংরেজরা। ১৯৪৭-এর নভেম্বরে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। একটি ইহুদিদের, অন্যটি আরবদের জন্য। এই আরব কিন্তু শুধু মুসলিম নয়। এখানে মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্মের অনুসারীও ছিল।

এটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিতকরণসংক্রান্ত ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব ছিল। এ প্রস্তাব অনুসারে ফিলিস্তিনের ৪৫ শতাংশ জমি ফিলিস্তিনি এবং ৫৫ শতাংশ জমি ইহুদিদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। অথচ তখন অবধি জোরজবরদস্তি ও সন্ত্রাসী কায়দায় দখল করার পরও ইহুদিরা ছিল মাত্র ১০ শতাংশ জমির মালিক। স্বাভাবিকভাবে এই চক্রান্তকে মেনে নেয়নি ফিলিস্তিন ও অন্যান্য আরব দেশ। জাতিসংঘে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে চাপ দিতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এই সুযোগে আরবদের মাঝে বিষফোড়া ইহুদি ঢুকিয়ে ফিলিস্তিন থেকে ইংরেজরা সটকে পড়ে ১৯৪৮-এর ১৪ মে। সেদিনই পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গঠিত হয় ইসরায়েল রাষ্ট্র।

পৃথিবী অবাক হয়ে দেখল, কার জমিতে কারা রাষ্ট্র গঠন করেছে! সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তোড়ে ভেসে গেল সব নীতিনৈতিকতা। যদিও আরব দেশগুলো এটা মোটেই মেনে নিতে পারেনি। সে কারণে রাষ্ট্র ঘোষিত হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে মিসর, ইরাক, লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়া সম্মিলিতভাবে ইসরায়েল আক্রমণ করে।

তীব্র লড়াইয়ে ইসরায়েলের পরাজয় তখন ছিল সময়ের ব্যাপার। ইহুদিদের অস্ত্রের মজুতও ফুরিয়ে যায়। আর কিছুটা এগোলেই মিসরীয় বাহিনী তেল আবিব কবজা করে ফেলতে পারত। কিন্তু তখনই ইসরায়েলের সৃষ্টিদাতার মতো ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় জাতিসংঘ। ইহুদি ও আরব দেশগুলোকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি।

১৯৭১-এর ১১ ডিসেম্বর পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা গণহত্যাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যুদ্ধবিরতির জন্য জরুরি বার্তা পাঠান। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত যুদ্ধবিরতির এ প্রস্তাব মেনে নিতে জোরালো দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র পর্যন্ত বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব মেনে নেয়া ভারত-পাকিস্তান উভয়ের জন্যই অত্যাবশ্যক। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সে ফাঁদে পা দেয়নি মুক্তিযুদ্ধের সম্মিলিত বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনী। আর সে ফাঁদে পা না দেয়ার সুফল হিসেবে ফাঁদ পাতার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় ‘বাংলাদেশ’।

তবে ২৩ বছর আগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই যুদ্ধবিরতির ফাঁদে পা দেয় আরব বাহিনী। যুদ্ধবিরতির সুযোগে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্রের চালান এসে পৌঁছায় ইসরায়েলে। ফাঁদটা কাজে লাগিয়ে আরবদের ওপর নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইহুদিরা। আরবদের হটিয়ে নতুন কিছু জায়গাও কবজা করে নেয়। আরব দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না থাকার কারণেই নতুন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে মাথা তোলার সুযোগ পায় ইহুদিরা।

পরের জায়গা পরের জমিতে ঘর বানিয়ে থাকলেও উদ্বাস্তু ইহুদিরা কখনোই সে ঘরের মালিক ছিল না। ওদিকে নিজেদের জায়গাজমি-ঘর ও ঠিকানা হারিয়ে আসল মালিক ফিলিস্তিনিরা এখন উদ্বাস্তু হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দুনিয়ার নানা দেশে। একসময় ইহুদিরা যে রকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।

সময় গড়ানোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইহুদি-ফিলিস্তিন সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠেছে। পরজমি দখলকারী ইহুদিদের নৃশংসতার শিকার হচ্ছে অসংখ্য ফিলিস্তিনি নাগরিক। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে আরও তিনবার আরব-ইহুদি যুদ্ধ হয় এবং প্রতিটা যুদ্ধই আরবদের জন্য আরও দুর্ভোগ বয়ে এনেছে। আরও অপ্রতিরোধ্য ও সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠেছে ইসরায়েল। নিরীহ আরবদের করুণ আর্তনাদ আর হাহাকারে গুমোট হয়েছে ইহুদি অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলো।

গায়ের জোরে টিকে আছে ইসরায়েল। আর তাদের এই গায়ের জোরের ইন্ধন জুগিয়েছে বিশ্বের দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মার্কিন-ইংরেজ। গত শতাব্দীর ষাটের দশকেই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে গায়ের জোর বাড়িয়েছে ইসরায়েল। অস্ত্র ও অর্থের জোর এতটাই হয়েছে যে, ইসরায়েল এখন দুনিয়াকেই গোনায় ধরে না। যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটাচ্ছে যখন তখন। ইচ্ছেমতো নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতার পরীক্ষা চালাচ্ছে নিরীহ ফিলিস্তিনি জনগণকে গিনিপিগ বানিয়ে। কৃত্রিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কত আরবের রক্ত যে ঝরিয়েছে, সে হিসেব নেই। যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই মার খাচ্ছে জায়গাজমি ও ঘরের বৈধ মালিক ফিলিস্তিনিরা।

১৯৭৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৯ নভেম্বরকে ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রদর্শন হিসেবে ‘আর্ন্তজাতিক ফিলিস্তিন সংহতি দিবস’ হিসেবে গ্রহণ করে। এর ১০ বছর পরে ১৯৮৭ সালের ২৯ নভেম্বর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘ইউনাইটেড নেশনস পার্টিশন প্ল্যান ফর প্যালেস্টাইন’ প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। এরপর থেকে এ দিনটি ‘আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবহিকতায় ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়। আর ২০১৫-এর ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা স্থান পায়।

সংহতি দিবসে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকোর আশা ফিলিস্তিনি জনগণ যেন শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং স্বাধীনতাকে প্রকাশ করার সুযোগ পায়। দেশের নারী ও শিশুসহ সব মানুষ যেন সব ধরনের ঘৃণা, হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত হয়ে স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারে। নিরাপদে ও শান্তিতে থাকতে পারে।

যদিও জাতিসংঘের ঘোষণার অনেক আগে থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ১৯৭২-এর ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে তৃতীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইসরায়েল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের সমর্থনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল টিম ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন ইয়াসির আরাফাত।

বাংলাদেশ সব সময়ই দখলদার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশ কখনোই ফিলিস্তিনিদের ওপর ইজরায়েলের নির্মমতা ও দখলদারত্বকে সমর্থন দেয় না। এমনকি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে এখন অবধি স্বীকৃতিও দেয়নি। কারণ বাংলাদেশ কখনোই সাম্রাজ্যবাদে বিশ্বাস করে না।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার।

আরও পড়ুন:
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ‘লকডাউন’
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে লকডাউনের পরিকল্পনা
বায়ুদূষণে নাকাল দিল্লি, সরকারের উদাসীনতায় ক্ষিপ্ত প্রধান বিচারপতি
দীপাবলির বাজির ধোঁয়ায় ঢাকা দিল্লি

শেয়ার করুন

রাজপথে শিক্ষার্থী: সমাধান সহজ  

রাজপথে শিক্ষার্থী: সমাধান সহজ  

বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন একজন ছাত্রের খরচ বেড়ে গিয়েছে ৩০/৪০ টাকা। একদিকে খরচের চাপ অপরদিকে অযৌক্তিক তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি তাদেরকে প্রতিবাদী করে তুলেছে। তারা চাইছে পরিবহনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করার অধিকার। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। ’৬৯ সালের ১১ দফাতেও পরিবহনে কনসেশনের দাবি ছিল। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া চালু হয়। আর এখন তো শিক্ষার্থীরা খবর পাচ্ছে যে, ভারত-নেপাল, শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাস, টিকেট, কনসেশনের ব্যবস্থা আছে।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছে গণপরিবহনে বিশেষত বাসে তাদের হাফ ভাড়া কার্যকরের জন্য। দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এখন স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনেও নাভিশ্বাস, কারণ দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে এমন কোনো জিনিস নেই যা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে না। মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় চাল-চিনি, আটা-তেলসহ খাদ্যপণ্য তো আছেই- রান্নার গ্যাস-বিদ্যুৎ, পানি সব কিছুর দাম বাড়াতে তেমন কোনো অজুহাত এখন প্রয়োজন হয় না।

ব্যবসায়ীদের আবদার এবং সরকারের অনুমোদন একটা যুগলবন্দির মতো পরিবেশ তৈরি করেছে। পরস্পর পরস্পরকে সহায়তা করে সরকার ও ব্যবসায়ীদের এই যৌথ সংগীতের মূর্ছনায় সাধারণ মানুষের মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম। এর সঙ্গে আছে ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-মন্ত্রীদের উপদেশ ও অপমানসূচক কথা। বিদেশিরা চাল-গম কম খায়, আমরা ভাত বেশি খাই তাই খাদ্যঘাটতি।

অতএব ভাত কম খাওয়ার পরামর্শ দেয়ার সহজ পথ বেছে নিয়েছেন তারা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যায় মুনাফার ব্যাপারে নীরবতা ভীষণ অর্থ বহন করে। এর পর আবার বলা হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলে সব তেল ভারতে পাচার হয়ে যাবে কিন্তু সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্ব যাদের তাদের সতর্ক না করে শাস্তি দিলেন সাধারণ মানুষকে। কৃষকরা কম দামে তেল পেলে তা কৃষি উৎপাদনে সহায়ক হতো কি না সে বিষয় কি আলোচনার অপেক্ষা রাখে?

কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বোরো মৌসুমে কৃষিতে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি বাড়তি খরচ করতে হবে ধানচাষিকে। দেশের ১৬ লাখ সেচ পাম্পের ৭০ শতাংশের বেশি চলে ডিজেল দিয়ে। এতে প্রতি বিঘায় সেচ খরচ বাড়বে ৩০০ টাকার বেশি। আমন ধান কাটা শেষ। বোরো মৌসুম শুরু হবে। এই বোরো মৌসুমে দেশের ধানের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদন হয়। ফলে সরকার তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব কৃষকের খেতে আর জনগণের পাতে সরাসরি পড়বে।

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাড়িয়ে দেয়া হলো পরিবহনের ভাড়া। সরকার তেলের দাম বাড়াল ২৩ শতাংশ। পরিবহনের ব্যয়ের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল একমাত্র উপাদান নয়। বাস বা ট্রাকের দাম, পরিচালনা খরচ, ড্রাইভার হেলপারের বেতন, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, অবচয়, অদৃশ্য খরচ (বিআরটিএর ঘুষ, পুলিশ খরচ, চাঁদা ইত্যাদি), কত সিট খালি থাকে ইত্যাদিসহ ১৬ ধরনের বিষয় যুক্ত করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়ে থাকে বলে জানা যায়। সাধারণত মোট খরচের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হয়ে থাকে জ্বালানি তেলবাবদ।

এক হিসাবে দেখানো হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাসের ভাড়া ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। কিন্তু ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২৭ শতাংশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরে প্রতি কিলোমিটারে ৪৫ পয়সা বাড়িয়ে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৫ পয়সা। কিন্তু ভাড়া তো আগেও বেশি নেয়া হতো এখন তা আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

যেমন প্রেস ক্লাব থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত দূরত্ব ৪ কিলোমিটারের বেশি নয়। বর্ধিত ভাড়া অনুযায়ী এই ভাড়া হওয়ার কথা ৮ টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু আগে নেয়া হতো ১০ টাকা এখন তা নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। সাধারণ মানুষ বাসে প্রতিদিন ঝগড়া করছেন বাড়তি ভাড়া নিয়ে। বাসের কন্ডাকটর বলছেন মালিক প্রতি ট্রিপে তার জমা বাড়িয়েছেন ১৫০০ টাকা। বেশি ভাড়া আদায় না করলে তারা এটা দেবেন কোথা থেকে? ঝগড়া কখনও রূপ নিচ্ছে মারামারিতে। যাত্রী আর পরিবহন শ্রমিক মারামারি করছেন, মুনাফা যাচ্ছে পরিবহন মালিকের পকেটে।

শিক্ষার্থীরা তুলনামুলকভাবে সংগঠিত। কলেজের সামনে থেকে বাসে ওঠে, কলেজের সামনে নেমে যায়। ফলে তারা শক্তি দেখাতে পারে। বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন একজন ছাত্রের খরচ বেড়ে গিয়েছে ৩০/৪০ টাকা। একদিকে খরচের চাপ অপরদিকে অযৌক্তিক তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি তাদেরকে প্রতিবাদী করে তুলেছে।

তারা চাইছে পরিবহনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করার অধিকার। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। ’৬৯ সালের ১১ দফাতেও পরিবহনে কনসেশনের দাবি ছিল। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া চালু হয়।

আর এখন তো শিক্ষার্থীরা খবর পাচ্ছে যে, ভারত-নেপাল, শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাস, টিকেট, কনসেশনের ব্যবস্থা আছে। ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলের উন্নয়ন দেখছে যে ছাত্র, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হিসাব পত্রিকায় পড়ছে, দুরন্ত গতিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শুনছে নেতাদের কাছ থেকে তাহলে শিক্ষার্থীদের, যাদের ওপর নির্ভর করবে দেশের অগ্রযাত্রা তাদের জন্য রাষ্ট্র ভর্তুকি দেবে না কেন? এই ভর্তুকির টাকা তো আসবে জনগণের কাছ থেকে।

জনগণের টাকা তাদের সন্তানদের জন্য ব্যয় করা হবে না কেন? কেন তাদের সন্তানরা পরিবহন মালিকদের মুনাফার শিকারে পরিণত হবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ডের সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব নেয়া হবে না কেন, যাতে পরিবহন মালিকরা তাদের কাছে হাফ ভাড়া নেন। একজন ছাত্র গড়ে কতবার বাসে ওঠে, তার কাছে হাফ ভাড়া নিলে কত টাকা কম আয় হবে, এর কত অংশ সরকার দেবে, কত অংশ মালিক বহন করবে এ নিয়ে একটা সমীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া কি খুব কঠিন বিষয়?

ছাত্র এবং পরিবহন শ্রমিক মুখোমুখি বিরোধে জড়ালে যে আর্থিক ক্ষতি ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয় তার তুলনায় কি হাফ ভাড়া অনেক কম নয়? সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিবহন কার্ড পেতে পারে, রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিবহন বরাদ্দ দিতে পারে কি না, ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকার শিক্ষা বাজেটে আর কত টাকা বরাদ্দ বাড়ালে পরিবহনে সাবসিডি দেয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করা এখন জরুরি।

প্রতিদিন সংঘাত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের, কখনও কখনও আক্রান্ত হচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা। ভাড়া বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকরা যুক্ত না থাকলেও ভাড়া আদায়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে শ্রমিকরা যুক্ত বলে ছাত্র এবং যাত্রীদের ক্ষোভের প্রধান টার্গেট হয়ে পড়ে পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে প্রতিদিন কিছু না কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। শিক্ষার্থীরা যেমন হাফ ভাড়ায় যাতায়াত করতে চায়, তেমনি ঝগড়া ও সংঘাত থেকে পরিবহন শ্রমিকরাও পরিত্রাণ চায়। এই প্রসঙ্গে কিছু বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে-

১. সরকার সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিসি পরিচালিত বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া নেয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কীভাবে তা জানা থাকলে আমাদের জন্য ভালো হতো। তা না হলে বিআরটিসির বাসে হাফ ভাড়া অন্য বাসগুলোতে কেন নয়- বলে উত্তেজনা আরও বাড়বে।

২. হাফ ভাড়া শিক্ষার্থীরা দেবে বাকি টাকা পূরণ করা হবে কীভাবে এবং কোন তহবিল থেকে?

৩. সারা দেশে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসার ক্ষেত্রে বাস ব্যবহার করে কতজন শিক্ষার্থী? হাফ ভাড়া নিলে ভর্তুকি কত টাকা দিতে হবে?

৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা কীভাবে কনসেশন প্রদান করে তা জানা দরকার।

৫. শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন কার্ড চালু করা দরকার যা প্রতিষ্ঠান প্রদান করবে। তাহলে যাত্রী কোন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র তা নিশ্চিত সম্ভব হবে।

৬. এ বছর শিক্ষাবাজেট ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মিলে মোট বাজেট দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। প্রতিবছর শিক্ষাবাজেট থেকে বেশ কিছু টাকা ফেরত যায়। ফেরত যাওয়া এই টাকাটা পরিবহন ভর্তুকি হিসেবে দেয়া যেতে পারে।

৭. যে সমস্ত পরিবহন শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া কার্যকর করবে, তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৮. দেশের ছাত্রসমাজের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। তাদের শিক্ষা সহায়ক কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিবহনে সাবসিডি দেয়া এবং একটি যুক্তিসংগত নিয়ম-বিধি প্রণয়ন করা হলে তা ছাত্র এবং পরিবহন শ্রমিক উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক।

৯. দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে নগর পরিবহন আছে আবার এই দুই শহরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছাত্রসংখ্যা বেশি। বাকি সারা দেশে সাধারণত স্বল্প দূরত্বে শিক্ষার্থীরা বাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করে। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিবহন সহায়তার জন্য বাজেটে থোক বরাদ্দ করা যেতে পারে।

১০. বিভিন্ন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরিবহন ফি নেয়া হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন ও ফি বেশি। উভয়ক্ষেত্রেই যারা গণপরিবহনে যাতায়াত করে তাদের কাছ থেকে নেয়া পরিবহন ফি এবং সরকারপ্রদত্ত বরাদ্দ দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

১১. সরকার, পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও ছাত্র প্রতিনিধি সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। তাহলে যেকোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন:
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
দূষণ নিয়ন্ত্রণে দিল্লিতে ‘লকডাউন’
বায়ুদূষণ: দিল্লিতে লকডাউনের পরিকল্পনা
বায়ুদূষণে নাকাল দিল্লি, সরকারের উদাসীনতায় ক্ষিপ্ত প্রধান বিচারপতি
দীপাবলির বাজির ধোঁয়ায় ঢাকা দিল্লি

শেয়ার করুন