অদম্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের অর্থনীতি

অদম্য অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের অর্থনীতি

আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য সংস্থাটির পূর্বাভাস ৭.৯ শতাংশ। রপ্তানি ও ভোগে ধারাবাহিকতা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার অব্যাহত থাকা ও দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়া নির্ভর করবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং ব্যবসায়ীদের সাহায্য করে অর্থনীতির ক্ষতি মোকাবিলার ওপর।

বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক আশাব্যঞ্জক মাইলফলক ছুঁয়েছে। নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। সরকার বেশকিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়ছে। পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ প্রায় শেষের দিকে। সর্বশেষ স্প্যানটি বসানো হয় গত ডিসেম্বরে। আগামী বছরের মাঝামাঝি সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে।

এতে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সব নাগরিককে বিস্তৃত টেলিযোগাযোগ সেবা (সরাসরি ঘরে ঘরে টিভি, রেডিও, টেলিমেডিসিন, শিক্ষা ও ইন্টারনেট ব্যবহার), রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, মাতারবাড়ি প্রকল্প দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করতে অবদান রাখছে।

গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ প্রকল্প, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, তিন ডজনেরও বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি গ্রাম নির্মাণ করা হচ্ছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। গ্রামগুলো সব ধরনের নাগরিক সুবিধা দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে। আজ দেশ এমন একটি অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে মাথা উঁচু করে বিশ্বের কাছে দেশের পরিচয় দেয়া যায়।

সরকার ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, এমডিজি এবং প্রথম পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৩ লাখ ২০ হাজার ৭২টি পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছে। মুজিব জন্মশতবর্ষে সরকার বছরের উপহার হিসেবে ৬৬ হাজার ১৮৯টি পরিবারকে একটি করে বাড়ি উপহার দিয়েছে।

জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরি করা হয়েছে। ৩ কোটির বেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি-উপবৃত্তি, ৬ লাখ মানুষকে বিভিন্ন ভাতা, ৫০ লাখ পরিবারকে ১০ লাখ টাকার চাল, কৃষি খাতে কৃষকদের ভর্তুকি প্রদান করে। কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালে সরকার ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ এবং মাছ-মাংস, ডিম ও শাকসবজিতেও স্বয়ংসম্পূর্ণ। অভ্যন্তরীণ জলসীমায় মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আজ ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

জাতিসংঘ ২০১৮ সালে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে একটি উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের ঘোষণা দেয়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে একটি উন্নয়শীল দেশে পরিণত করার জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, ২০৩০-এর মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। দ্বিতীয় পরিপ্রেক্ষিতে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ সালে বাংলাদেশে এমন কেউ থাকবে না, যাকে অত্যন্ত দরিদ্র বলা যাবে।

মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এই তিনটি সূচক উন্নয়নশীল দেশগুলোর যোগ্যতা নির্ধারণ করে। এই তিন সূচকে বাংলাদেশ প্রায় কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জন করেছে। কোভিড-১৯-এর মধ্যেও বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫৫৪ এর অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সারা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে।

নারী শিক্ষা-ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। নারীরা এখন সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকসহ সব স্তরে অবদান রাখছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গ্রামাঞ্চলের নারীও পিছিয়ে নেই। এগিয়ে চলেছেন পুরুষের সঙ্গে সমানতালে। এতে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

আজকের তরুণরাই আগামীর কর্ণধার। তরুণ প্রজন্মকে মানবসম্পদে পরিণত করতে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, প্রকৌশল, কলা ও গণিত (স্টিম) শিক্ষা ব্যাপকভাবে চালু করা হচ্ছে। সমসাময়িক বিশ্বে ক্যারিয়ারভিত্তিক শিক্ষা অপরিহার্য। রাষ্ট্রকে অবশ্যই তরুণদের জ্ঞান-দক্ষতা, অভিজ্ঞতা-আকাঙ্ক্ষা এবং মতামতের যথাযথ মূল্য দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী দেশের জন্য অর্জনের জন্য চারটি মাইলফলক নির্ধারণ করেছেন। প্রথমটি ২০২১-এ ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প, ২০৩০-এ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন, ২০৪১-এ উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং চতুর্থটি ২১০০-এর ডেল্টা প্ল্যান। সব নাগরিককে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত (এসডিজি-১ দারিদ্র্য অবসান এবং এসডিজি-২, জিরো হাঙ্গার অর্জন) করতে একটি উন্নত বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে হবে এবং বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনাকে সমুন্নত রাখতে হবে। বাংলাদেশের সম্পদ সীমিত। ভূমির তুলনায় জনসংখ্যা বেশি। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল।

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিশ্বের বেশির ভাগ অর্থনীতি গত বছরে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখেছে। এর মানে এই দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের বছরের তুলনায় কম। এমনকি প্রতিবেশী ভারতের মতো উচ্চ-বৃদ্ধির দেশগুলোতেও জিডিপির আকার প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ এই ধারার অন্যতম ব্যতিক্রম ছিল। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু আগের বছরের তুলনায় আকারে সংকুচিত হয়নি। ২০১৯-২০ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি পিছিয়ে যায়নি।

আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য সংস্থাটির পূর্বাভাস ৭.৯ শতাংশ। রপ্তানি ও ভোগে ধারাবাহিকতা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার অব্যাহত থাকা ও দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়া নির্ভর করবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং ব্যবসায়ীদের সাহায্য করে অর্থনীতির ক্ষতি মোকাবিলার ওপর।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সম্প্রতি জন্ম-মৃত্যু, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ ২০২০-এর ‘ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রকাশ করেছে। দেখা যায় বাংলাদেশের গড় আয়ু এখন ৭২.৮ বছর। ত্রিশ বছর আগে-১৯৯০ সালে গড় আয়ু ছিল মাত্র ৫৬ বছর। পাকিস্তানি দুঃশাসনের কারণে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের গড় আয়ু গত ৩০ বছরে ১৫ বছর বেড়েছে।

ভারতের গড় আয়ু বাংলাদেশের তুলনায় কম। ২০২০ সালে এটি ৬৮.৩ বছর ছিল। বাংলাদেশে গত বছর পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে ৩১ শিশু মারা যায়। ১৯৯০ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪৪। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ভর্তি হারেও অনেক উন্নতি হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের বয়স বিবেচনায় এখন ৬৩ শতাংশ শিশু স্কুলে যায়।

বিশ্বব্যাংকের মতে, ১৯৯০-এ বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৩২০ মার্কিন ডলার। ২০২০ সালে এটি ২ হাজার ১৩৯ ডলারে দাড়িয়েছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি বা জিডিপির আকার ছিল মাত্র ৩২ বিলিয়ন ডলার। ২০২০-এ জিডিপি ৩২৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত এক দশকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিশ্ব অর্থনীতির গতিশীলতার ওপর এর সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক আউটলুকে বলেছে যে, বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি এ বছরও ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে।

দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৭২ শতাংশ। সর্বশেষ প্রকাশিত পারিবারিক আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী-২০১৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এর ভিত্তিতে ২০১৯ সালে আনুমানিক দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ। গত বছর কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি হয়।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ অনুসারে, এর অনেকটাই এখন উদ্ধার করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলেছে, কোভিড-১৯-এর কারণে বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে, কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি উল্টে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। সঠিক নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে বেরিয়ে গেলে, বর্তমান শুল্ক এবং কোটামুক্ত সুবিধা শুধু ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইইউ বাজারে পাওয়া যাবে। এ কারণে আগামী পাঁচ বছরের প্রস্তুতি বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতিবিদরা এসডিজি, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও টেকসই ট্রানজিটের জন্য পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে শক্তিশালী ট্রানজিট কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পরামর্শ দিচ্ছেন। আগামীতে অগ্রগতির জন্য স্থানীয় বাজার ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অবকাঠামোর উন্নয়ন, দুর্নীতি হ্রাস, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে বিশেষ মনোযোগ দেয়ার সুপারিশ করা হয়।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

আরও পড়ুন:
রিজওয়ানকে ছাড়াই অনুশীলনে পাকিস্তান
ফিল্ডিং নিয়ে কাজ করার সময় নেই ফিল্ডিং কোচের
পাকিস্তান সিরিজে নেই তামিম; নাও খেলতে পারেন মুশফিক
ডমিঙ্গোর জন্য বিকল্প ভাবছে বিসিবি
ফিল্ডিং কোচকে বিদায় জানাচ্ছে বিসিবি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ নয়

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা
গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ নয়

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাধারণ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার দিকে লক্ষ করি, তাহলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে সেটি হলো, এই সহিংসতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতার পরিমাণ অন্য নির্বাচনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এবারের সহিংসতা মূলত হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমি। কারণ এখান থেকেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। একটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অনন্য। গণতন্ত্রে কেন্দ্রীয় সরকার নীতি প্রণয়ন করবে এবং স্থানীয় সরকার সেই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করবে- এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু জনগণের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, সেহেতু বিভিন্ন ধরনের সেবা ও পণ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

আমরা জানি, বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ ধারায় কেন্দ্রীয় সরকারের নিচে স্থানীয়পর্যায়ে বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সরকারের স্তর প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই স্তরগুলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার বিধান রয়েছে। গ্রামীণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে নিচের স্তর ইউনিয়ন পরিষদ প্রায় ২০০ বছরের অধিক সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্য স্তরগুলোর তুলনায় নিজেদের এখতিয়ারের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও এই প্রতিষ্ঠানের বাজেটনির্ভরতা রয়েছে সরকারের ওপর।

স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক দলভিত্তিক নির্বাচন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনুশীলন করা হয়। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই প্রক্রিয়া চলমান। এই অনুশীলনের বিষয়টির কথা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় সরকারে রাজনৈতিক দলভিত্তিক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে। দলভিত্তিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ-উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়।

অন্যদিকে, এসব স্তরের সদস্য ও কাউন্সিলররা সরাসরি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করলেও রাজনৈতিক দলগুলো চেষ্টা করে প্রতিটি নির্বাচনে স্থানীয়পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক দলীয় নমিনেশনের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের। দলীয় মনোনয়ন দেয়ার সময় স্থানীয় নেতা ও সংসদ সদস্য নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে এমন অনেক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য কেন্দ্রে সুপারিশ করেন, যাদের দলের সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগ নেই।

এমনকি অন্য দল থেকে আসা অনেক প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ায় দলের যোগ্য, ত্যাগী ও নিবেদিত প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে এলাকার সক্রিয় নেতাকর্মীরা দলীয় মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং অপেক্ষাকৃত জনপ্রিয় বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেয়। আর এ কারণেই স্থানীয়ভাবে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তির কারণে পরস্পরের বিরুদ্ধে আক্রমণের চেষ্টা করে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে সহিংস ঘটনা। চলতি বছরে শুধু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরেই প্রায় ২০০ সংঘাতের ঘটনায় ৪৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। আহত হয়েছেন অসংখ্য। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনেরও নানা অভিযোগ উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোট কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, নির্বাচন ঘিরে এ সংঘাত, বিশৃঙ্খলা ও হতাহতের দায় ইসি, সরকার ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে। কারণ আইন ও বিধিমালায় নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া আছে। পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসব ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এতে সংঘাত বেড়েই চলেছে। এছাড়া নির্বাচনি মাঠে দলীয়ভাবে বিএনপি না থাকায় অধিকাংশ স্থানেই রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। তারা নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগ তাদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারছে না।

তৃতীয় ধাপের ১০০৭ ইউপিতে ভোট হবে ২৮ নভেম্বর। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য নির্বাচন কমিশন কী ব্যবস্থা নিয়েছেন? এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসব সহিংস ঘটনারোধে তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে? যেভাবেই হোক, পুলিশকে দ্রুত ঘটনার তদন্ত করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিট দিতে হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে পুলিশকে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সাধারণ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার দিকে লক্ষ করি, তাহলে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে সেটি হলো- এই সহিংসতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতার পরিমাণ অন্য নির্বাচনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।

এবারের সহিংসতা মূলত হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে। কারণ বিএনপি এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। যেহেতু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপি প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে দেশব্যাপী বিএনপি এতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, তাদের পক্ষে নির্বাচনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জেতা কঠিন।

ফলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় মানুষ মারা যাচ্ছে, যেটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং দেশের সামগ্রিক নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং নির্বাচন হবে প্রশ্নবিদ্ধ। ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্থানীয়পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীরা চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছেন। এভাবে দুই ধাপের ইউপি নির্বাচনে বিএনপির শতাধিক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা যারা পাচ্ছেন তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। অধিকাংশ ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না পেয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েও কোথাও কোথাও ভোটে জিতে যাচ্ছেন।

এ পরিস্থিতিতে তৃণমূলপর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ সম্পর্কে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। তাই দেশব্যাপী চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণে সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বিব্রত। আর এ কারণেই আইন সংশোধনের ৫ বছরের মাথায় আবার আগের মতো প্রতীক ছাড়া ইউপি নির্বাচনের কথা ভাবছে সরকার।

রাজনীতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা হিসাব-নিকাশ, কৌশল ও মূল্যায়ন থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার যে নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা নিয়ে কোনো পক্ষেরই পরিষ্কার অবস্থান নেই। এ ব্যর্থতার দায় নির্বাচন কমিশনের।

ইউপি নির্বাচন নিয়ে যে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করার উপায় হচ্ছে সামনের নির্বাচনগুলো অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত করা। নির্বাচন কমিশনকেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও সহিংসতার পথ পরিহার করে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। এসব ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি যত গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় তৎপরতা। নির্বাচনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে দলমত নির্বিশেষে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে হবে এবং আইন প্রয়োগকারীদের অবশ্যই নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করতে হবে।

নির্বাচনকে অবাধ-সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশন সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে আইনগত কোনো বাধা নেই। কিন্তু শুরু থেকেই তাদের কাজকর্মে একধরনের ঢিলেঢালা ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করছে।

নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলের মধ্যে উত্তেজনাও তত বাড়বে। তাই আগামীতে নির্বাচন কমিশনকে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে আরও সক্রিয় ও সজাগ হতে হবে। যেকোনো মূল্যে নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন নিয়ে আর কোনো মৃত্যু আমাদের কাম্য নয়।

অতীতেও স্থানীয়পর্যায়ের নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সেসব তথ্য বিবেচনায় রেখে এবারও যাতে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে কোনো ধরনের সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটে সে জন্য কর্তৃপক্ষের করণীয় নিয়ে নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই নানা মহল থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করা হয়েছিল। দুঃখজনক হলো, তারপরও ইউপি নির্বাচনে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন প্রতিটিতেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই। আগামীতে অনুষ্ঠেয় তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচন এবং স্থানীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠিতব্য অন্যান্য নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণা ও ভোটগ্রহণ যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারে, সেদিকে নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ নজর দিতে হবে। লেভেল প্লেইং ফিল্ড প্রস্তুতসহ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। প্রার্থী, নেতাকর্মী ও সমর্থকদেরও নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলতে হবে।

নির্বাচনের সব অংশীজন উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচয় না দিলে এককভাবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করা বেশ কঠিন। কাজেই উন্নত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আগামীতে সব নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফলভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন, এটাই দেশবাসী কামনা করে।

লেখক: গবেষক, কলাম লেখক। সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি

আরও পড়ুন:
রিজওয়ানকে ছাড়াই অনুশীলনে পাকিস্তান
ফিল্ডিং নিয়ে কাজ করার সময় নেই ফিল্ডিং কোচের
পাকিস্তান সিরিজে নেই তামিম; নাও খেলতে পারেন মুশফিক
ডমিঙ্গোর জন্য বিকল্প ভাবছে বিসিবি
ফিল্ডিং কোচকে বিদায় জানাচ্ছে বিসিবি

শেয়ার করুন

ফিলিস্তিনের জন্য ভালোবাসা

ফিলিস্তিনের জন্য ভালোবাসা

অনেক আগে থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ১৯৭২-এর ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে তৃতীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইসরায়েল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের সমর্থনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল টিম ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন ইয়াসির আরাফাত।

পৃথিবীর ইতিহাসে ইংরেজদের বেইমানির অগণিত উদাহরণ আছে। তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও দুঃখজনক উদাহরণ হচ্ছে ফিলিস্তিন। ইংরেজরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) সময় ফিলিস্তিনি আরবদের কথা দিয়েছিল- তোমরা যদি তুর্কিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে লড়াই না করো, তবে তোমাদের (সেলফ ডিটারমিনেশন) স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র দেব। ওদিকে আরবদের অগোচরে ইহুদিদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যদি তোমরা জার্মানিকে অর্থসাহায্য বন্ধ করে সে অর্থ ইংরেজকে দাও, তবে যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনে তোমাদের ‘ন্যাশনাল হোম’ নির্মাণ করতে দেয়া হবে।

ইংরেজদের এই দুমুখো নীতি প্রকাশ পেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে। এই যুদ্ধের আগে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ছিল তুরস্কের উসমানিয়া সাম্রাজ্যের অধীন। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রে তুরস্কের মুসলিম খেলাফত ভেঙে যায় এবং একটি গুলিও খরচ না করে ইরাক, সিনাই উপত্যকা, ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম দখল করে নেয় ব্রিটিশ বাহিনী। ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্ডান ও লেবানন চলে যায় ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের দখলে। ১৯১৭-এর ২ নভেম্বর সে সময়ের ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর একটি চিঠিতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন, যেটা বেলফোর ঘোষণা নামে পরিচিত।

ইউরোপের নানা দেশে ইহুদিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। তবে এই বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হতেই দলে দলে ইহুদি আসতে শুরু করল ফিলিস্তিনে। ওদিকে বেইমান ইংরেজ ক্ষমতালিপ্সু ও আরেক বেইমান জাতি ইহুদিদের ইউরোপে রাষ্ট্র তৈরির পক্ষে কখনও সমর্থন দেয়নি। বরং ঝামেলাবাজ ইহুদিদের ঠেলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে।

রোমান সময় থেকে ইহুদিদের ছোট্ট একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী সেখানে বাস করত। তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ায় বিপুলসংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে পাড়ি জমায় ফিলিস্তিনে। ব্রিটিশদের সহায়তায় ১৯১৮ সালের মধ্যে ইহুদিদের সংখ্যা হয়ে যায় ২০ হাজার। যা ১৯২৩ সালে দাঁড়ায় ৩৫ হাজার এবং ১৯৩১ সালে ১ লাখ ৮০ হাজারে।

এর মধ্যেই ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ১৯১৮ সালে তৈরি হয় গুপ্ত ইহুদি বাহিনী ‘হাগানাহ’। এই বাহিনী প্রথম দিকে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইহুদিবাদীদের সহায়তা করত। পরবর্তী সময়ে তারা সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত হয়। শুধু ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ও ক্ষেত-খামার দখল করেই তারা ক্ষান্ত থাকেনি, জোর করে বিতাড়িতও করত। বাজার ও রাস্তাঘাটে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করা ছিল তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ।

ইউরোপে ইহুদিদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও হিটলারের কঠোরতায় ১৯৪৮ সালেই ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা হয়ে যায় ৬ লাখ। টনক নড়ে আরবদের। ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ফিলিস্তিনি আরবরা বিদ্রোহ শুরু করে। ব্রিটিশ সৈন্যরা ভয়ংকর দমন-পীড়নের মাধ্যমে সে বিদ্রোহ দমন করে কঠোরভাবে। বিবিসির খবরে প্রকাশ, এ সময় ৩২ হাজার ইহুদি ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিয়ে রণকুশলী হয়ে ওঠে।

ইহুদিরা সেই রণকৌশল প্রথমে প্রয়োগ করে আরবদের বিরুদ্ধে। এরপর ইহুদি রাষ্ট্র তৈরিতে চাপ সৃষ্টি করার জন্য ব্রিটিশ সৈন্যদের ওপর। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। হিটলারের কবল থেকে বেঁচে যাওয়া এক লাখ ইহুদিকে অতিদ্রুত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে জায়গা দেয়ার জন্য চাপাচাপি করতে থাকেন। যদিও ব্রিটেন বুঝে গিয়েছিল এত ইহুদিকে তাদের উপনিবেশ ফিলিস্তিনে নিয়ে গেলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। অর্থাৎ ইংরেজ তখন গৃহস্থকে ঘর পাহারা দেয়ার কথা বলে চোরকে চুরি করার অনুমতি দিল।

জাহাজ বোঝাই করে পঙ্গপালের মতো হাজার হাজার ইহুদি এসে আস্তানা গাড়তে থাকে ফিলিস্তিনে। ধীরে ধীরে দখলদার ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। এবার জাতিসংঘের মাথায় কাঁঠাল ভাঙতে শুরু করে ইংরেজরা। ১৯৪৭-এর নভেম্বরে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে দুটি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। একটি ইহুদিদের, অন্যটি আরবদের জন্য। এই আরব কিন্তু শুধু মুসলিম নয়। এখানে মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিষ্টানসহ অন্য ধর্মের অনুসারীও ছিল।

এটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিতকরণসংক্রান্ত ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব ছিল। এ প্রস্তাব অনুসারে ফিলিস্তিনের ৪৫ শতাংশ জমি ফিলিস্তিনি এবং ৫৫ শতাংশ জমি ইহুদিদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। অথচ তখন অবধি জোরজবরদস্তি ও সন্ত্রাসী কায়দায় দখল করার পরও ইহুদিরা ছিল মাত্র ১০ শতাংশ জমির মালিক। স্বাভাবিকভাবে এই চক্রান্তকে মেনে নেয়নি ফিলিস্তিন ও অন্যান্য আরব দেশ। জাতিসংঘে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে ভোট দেয়ার জন্য দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে চাপ দিতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এই সুযোগে আরবদের মাঝে বিষফোড়া ইহুদি ঢুকিয়ে ফিলিস্তিন থেকে ইংরেজরা সটকে পড়ে ১৯৪৮-এর ১৪ মে। সেদিনই পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গঠিত হয় ইসরায়েল রাষ্ট্র।

পৃথিবী অবাক হয়ে দেখল, কার জমিতে কারা রাষ্ট্র গঠন করেছে! সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তোড়ে ভেসে গেল সব নীতিনৈতিকতা। যদিও আরব দেশগুলো এটা মোটেই মেনে নিতে পারেনি। সে কারণে রাষ্ট্র ঘোষিত হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে মিসর, ইরাক, লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়া সম্মিলিতভাবে ইসরায়েল আক্রমণ করে।

তীব্র লড়াইয়ে ইসরায়েলের পরাজয় তখন ছিল সময়ের ব্যাপার। ইহুদিদের অস্ত্রের মজুতও ফুরিয়ে যায়। আর কিছুটা এগোলেই মিসরীয় বাহিনী তেল আবিব কবজা করে ফেলতে পারত। কিন্তু তখনই ইসরায়েলের সৃষ্টিদাতার মতো ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় জাতিসংঘ। ইহুদি ও আরব দেশগুলোকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয় সংস্থাটি।

১৯৭১-এর ১১ ডিসেম্বর পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা গণহত্যাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী জাতিসংঘের সদর দপ্তরে যুদ্ধবিরতির জন্য জরুরি বার্তা পাঠান। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত যুদ্ধবিরতির এ প্রস্তাব মেনে নিতে জোরালো দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র পর্যন্ত বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব মেনে নেয়া ভারত-পাকিস্তান উভয়ের জন্যই অত্যাবশ্যক। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সে ফাঁদে পা দেয়নি মুক্তিযুদ্ধের সম্মিলিত বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনী। আর সে ফাঁদে পা না দেয়ার সুফল হিসেবে ফাঁদ পাতার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় ‘বাংলাদেশ’।

তবে ২৩ বছর আগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই যুদ্ধবিরতির ফাঁদে পা দেয় আরব বাহিনী। যুদ্ধবিরতির সুযোগে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্রের চালান এসে পৌঁছায় ইসরায়েলে। ফাঁদটা কাজে লাগিয়ে আরবদের ওপর নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইহুদিরা। আরবদের হটিয়ে নতুন কিছু জায়গাও কবজা করে নেয়। আরব দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না থাকার কারণেই নতুন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে মাথা তোলার সুযোগ পায় ইহুদিরা।

পরের জায়গা পরের জমিতে ঘর বানিয়ে থাকলেও উদ্বাস্তু ইহুদিরা কখনোই সে ঘরের মালিক ছিল না। ওদিকে নিজেদের জায়গাজমি-ঘর ও ঠিকানা হারিয়ে আসল মালিক ফিলিস্তিনিরা এখন উদ্বাস্তু হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দুনিয়ার নানা দেশে। একসময় ইহুদিরা যে রকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।

সময় গড়ানোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইহুদি-ফিলিস্তিন সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠেছে। পরজমি দখলকারী ইহুদিদের নৃশংসতার শিকার হচ্ছে অসংখ্য ফিলিস্তিনি নাগরিক। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালে আরও তিনবার আরব-ইহুদি যুদ্ধ হয় এবং প্রতিটা যুদ্ধই আরবদের জন্য আরও দুর্ভোগ বয়ে এনেছে। আরও অপ্রতিরোধ্য ও সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠেছে ইসরায়েল। নিরীহ আরবদের করুণ আর্তনাদ আর হাহাকারে গুমোট হয়েছে ইহুদি অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলো।

গায়ের জোরে টিকে আছে ইসরায়েল। আর তাদের এই গায়ের জোরের ইন্ধন জুগিয়েছে বিশ্বের দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মার্কিন-ইংরেজ। গত শতাব্দীর ষাটের দশকেই পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে গায়ের জোর বাড়িয়েছে ইসরায়েল। অস্ত্র ও অর্থের জোর এতটাই হয়েছে যে, ইসরায়েল এখন দুনিয়াকেই গোনায় ধরে না। যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটাচ্ছে যখন তখন। ইচ্ছেমতো নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতার পরীক্ষা চালাচ্ছে নিরীহ ফিলিস্তিনি জনগণকে গিনিপিগ বানিয়ে। কৃত্রিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কত আরবের রক্ত যে ঝরিয়েছে, সে হিসেব নেই। যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই মার খাচ্ছে জায়গাজমি ও ঘরের বৈধ মালিক ফিলিস্তিনিরা।

১৯৭৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৯ নভেম্বরকে ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রদর্শন হিসেবে ‘আর্ন্তজাতিক ফিলিস্তিন সংহতি দিবস’ হিসেবে গ্রহণ করে। এর ১০ বছর পরে ১৯৮৭ সালের ২৯ নভেম্বর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘ইউনাইটেড নেশনস পার্টিশন প্ল্যান ফর প্যালেস্টাইন’ প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। এরপর থেকে এ দিনটি ‘আন্তর্জাতিক ফিলিস্তিনি সংহতি দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবহিকতায় ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনকে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়া হয়। আর ২০১৫-এর ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা স্থান পায়।

সংহতি দিবসে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকোর আশা ফিলিস্তিনি জনগণ যেন শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং স্বাধীনতাকে প্রকাশ করার সুযোগ পায়। দেশের নারী ও শিশুসহ সব মানুষ যেন সব ধরনের ঘৃণা, হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত হয়ে স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারে। নিরাপদে ও শান্তিতে থাকতে পারে।

যদিও জাতিসংঘের ঘোষণার অনেক আগে থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ১৯৭২-এর ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে তৃতীয় দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইসরায়েল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে। ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ফিলিস্তিনের সমর্থনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল টিম ও ত্রাণ পাঠিয়েছিল। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন ইয়াসির আরাফাত।

বাংলাদেশ সব সময়ই দখলদার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশ কখনোই ফিলিস্তিনিদের ওপর ইজরায়েলের নির্মমতা ও দখলদারত্বকে সমর্থন দেয় না। এমনকি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে এখন অবধি স্বীকৃতিও দেয়নি। কারণ বাংলাদেশ কখনোই সাম্রাজ্যবাদে বিশ্বাস করে না।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার।

আরও পড়ুন:
রিজওয়ানকে ছাড়াই অনুশীলনে পাকিস্তান
ফিল্ডিং নিয়ে কাজ করার সময় নেই ফিল্ডিং কোচের
পাকিস্তান সিরিজে নেই তামিম; নাও খেলতে পারেন মুশফিক
ডমিঙ্গোর জন্য বিকল্প ভাবছে বিসিবি
ফিল্ডিং কোচকে বিদায় জানাচ্ছে বিসিবি

শেয়ার করুন

রাজপথে শিক্ষার্থী: সমাধান সহজ  

রাজপথে শিক্ষার্থী: সমাধান সহজ  

বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন একজন ছাত্রের খরচ বেড়ে গিয়েছে ৩০/৪০ টাকা। একদিকে খরচের চাপ অপরদিকে অযৌক্তিক তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি তাদেরকে প্রতিবাদী করে তুলেছে। তারা চাইছে পরিবহনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করার অধিকার। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। ’৬৯ সালের ১১ দফাতেও পরিবহনে কনসেশনের দাবি ছিল। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া চালু হয়। আর এখন তো শিক্ষার্থীরা খবর পাচ্ছে যে, ভারত-নেপাল, শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাস, টিকেট, কনসেশনের ব্যবস্থা আছে।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছে গণপরিবহনে বিশেষত বাসে তাদের হাফ ভাড়া কার্যকরের জন্য। দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এখন স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনেও নাভিশ্বাস, কারণ দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে এমন কোনো জিনিস নেই যা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে না। মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় চাল-চিনি, আটা-তেলসহ খাদ্যপণ্য তো আছেই- রান্নার গ্যাস-বিদ্যুৎ, পানি সব কিছুর দাম বাড়াতে তেমন কোনো অজুহাত এখন প্রয়োজন হয় না।

ব্যবসায়ীদের আবদার এবং সরকারের অনুমোদন একটা যুগলবন্দির মতো পরিবেশ তৈরি করেছে। পরস্পর পরস্পরকে সহায়তা করে সরকার ও ব্যবসায়ীদের এই যৌথ সংগীতের মূর্ছনায় সাধারণ মানুষের মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম। এর সঙ্গে আছে ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-মন্ত্রীদের উপদেশ ও অপমানসূচক কথা। বিদেশিরা চাল-গম কম খায়, আমরা ভাত বেশি খাই তাই খাদ্যঘাটতি।

অতএব ভাত কম খাওয়ার পরামর্শ দেয়ার সহজ পথ বেছে নিয়েছেন তারা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যায় মুনাফার ব্যাপারে নীরবতা ভীষণ অর্থ বহন করে। এর পর আবার বলা হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলে সব তেল ভারতে পাচার হয়ে যাবে কিন্তু সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্ব যাদের তাদের সতর্ক না করে শাস্তি দিলেন সাধারণ মানুষকে। কৃষকরা কম দামে তেল পেলে তা কৃষি উৎপাদনে সহায়ক হতো কি না সে বিষয় কি আলোচনার অপেক্ষা রাখে?

কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বোরো মৌসুমে কৃষিতে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি বাড়তি খরচ করতে হবে ধানচাষিকে। দেশের ১৬ লাখ সেচ পাম্পের ৭০ শতাংশের বেশি চলে ডিজেল দিয়ে। এতে প্রতি বিঘায় সেচ খরচ বাড়বে ৩০০ টাকার বেশি। আমন ধান কাটা শেষ। বোরো মৌসুম শুরু হবে। এই বোরো মৌসুমে দেশের ধানের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদন হয়। ফলে সরকার তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব কৃষকের খেতে আর জনগণের পাতে সরাসরি পড়বে।

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাড়িয়ে দেয়া হলো পরিবহনের ভাড়া। সরকার তেলের দাম বাড়াল ২৩ শতাংশ। পরিবহনের ব্যয়ের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল একমাত্র উপাদান নয়। বাস বা ট্রাকের দাম, পরিচালনা খরচ, ড্রাইভার হেলপারের বেতন, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, অবচয়, অদৃশ্য খরচ (বিআরটিএর ঘুষ, পুলিশ খরচ, চাঁদা ইত্যাদি), কত সিট খালি থাকে ইত্যাদিসহ ১৬ ধরনের বিষয় যুক্ত করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়ে থাকে বলে জানা যায়। সাধারণত মোট খরচের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হয়ে থাকে জ্বালানি তেলবাবদ।

এক হিসাবে দেখানো হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাসের ভাড়া ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। কিন্তু ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২৭ শতাংশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরে প্রতি কিলোমিটারে ৪৫ পয়সা বাড়িয়ে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৫ পয়সা। কিন্তু ভাড়া তো আগেও বেশি নেয়া হতো এখন তা আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

যেমন প্রেস ক্লাব থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত দূরত্ব ৪ কিলোমিটারের বেশি নয়। বর্ধিত ভাড়া অনুযায়ী এই ভাড়া হওয়ার কথা ৮ টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু আগে নেয়া হতো ১০ টাকা এখন তা নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। সাধারণ মানুষ বাসে প্রতিদিন ঝগড়া করছেন বাড়তি ভাড়া নিয়ে। বাসের কন্ডাকটর বলছেন মালিক প্রতি ট্রিপে তার জমা বাড়িয়েছেন ১৫০০ টাকা। বেশি ভাড়া আদায় না করলে তারা এটা দেবেন কোথা থেকে? ঝগড়া কখনও রূপ নিচ্ছে মারামারিতে। যাত্রী আর পরিবহন শ্রমিক মারামারি করছেন, মুনাফা যাচ্ছে পরিবহন মালিকের পকেটে।

শিক্ষার্থীরা তুলনামুলকভাবে সংগঠিত। কলেজের সামনে থেকে বাসে ওঠে, কলেজের সামনে নেমে যায়। ফলে তারা শক্তি দেখাতে পারে। বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন একজন ছাত্রের খরচ বেড়ে গিয়েছে ৩০/৪০ টাকা। একদিকে খরচের চাপ অপরদিকে অযৌক্তিক তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি তাদেরকে প্রতিবাদী করে তুলেছে।

তারা চাইছে পরিবহনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করার অধিকার। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। ’৬৯ সালের ১১ দফাতেও পরিবহনে কনসেশনের দাবি ছিল। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া চালু হয়।

আর এখন তো শিক্ষার্থীরা খবর পাচ্ছে যে, ভারত-নেপাল, শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাস, টিকেট, কনসেশনের ব্যবস্থা আছে। ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলের উন্নয়ন দেখছে যে ছাত্র, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হিসাব পত্রিকায় পড়ছে, দুরন্ত গতিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শুনছে নেতাদের কাছ থেকে তাহলে শিক্ষার্থীদের, যাদের ওপর নির্ভর করবে দেশের অগ্রযাত্রা তাদের জন্য রাষ্ট্র ভর্তুকি দেবে না কেন? এই ভর্তুকির টাকা তো আসবে জনগণের কাছ থেকে।

জনগণের টাকা তাদের সন্তানদের জন্য ব্যয় করা হবে না কেন? কেন তাদের সন্তানরা পরিবহন মালিকদের মুনাফার শিকারে পরিণত হবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ডের সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব নেয়া হবে না কেন, যাতে পরিবহন মালিকরা তাদের কাছে হাফ ভাড়া নেন। একজন ছাত্র গড়ে কতবার বাসে ওঠে, তার কাছে হাফ ভাড়া নিলে কত টাকা কম আয় হবে, এর কত অংশ সরকার দেবে, কত অংশ মালিক বহন করবে এ নিয়ে একটা সমীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া কি খুব কঠিন বিষয়?

ছাত্র এবং পরিবহন শ্রমিক মুখোমুখি বিরোধে জড়ালে যে আর্থিক ক্ষতি ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয় তার তুলনায় কি হাফ ভাড়া অনেক কম নয়? সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিবহন কার্ড পেতে পারে, রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিবহন বরাদ্দ দিতে পারে কি না, ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকার শিক্ষা বাজেটে আর কত টাকা বরাদ্দ বাড়ালে পরিবহনে সাবসিডি দেয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করা এখন জরুরি।

প্রতিদিন সংঘাত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের, কখনও কখনও আক্রান্ত হচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা। ভাড়া বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকরা যুক্ত না থাকলেও ভাড়া আদায়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে শ্রমিকরা যুক্ত বলে ছাত্র এবং যাত্রীদের ক্ষোভের প্রধান টার্গেট হয়ে পড়ে পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে প্রতিদিন কিছু না কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। শিক্ষার্থীরা যেমন হাফ ভাড়ায় যাতায়াত করতে চায়, তেমনি ঝগড়া ও সংঘাত থেকে পরিবহন শ্রমিকরাও পরিত্রাণ চায়। এই প্রসঙ্গে কিছু বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে-

১. সরকার সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিসি পরিচালিত বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া নেয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কীভাবে তা জানা থাকলে আমাদের জন্য ভালো হতো। তা না হলে বিআরটিসির বাসে হাফ ভাড়া অন্য বাসগুলোতে কেন নয়- বলে উত্তেজনা আরও বাড়বে।

২. হাফ ভাড়া শিক্ষার্থীরা দেবে বাকি টাকা পূরণ করা হবে কীভাবে এবং কোন তহবিল থেকে?

৩. সারা দেশে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসার ক্ষেত্রে বাস ব্যবহার করে কতজন শিক্ষার্থী? হাফ ভাড়া নিলে ভর্তুকি কত টাকা দিতে হবে?

৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা কীভাবে কনসেশন প্রদান করে তা জানা দরকার।

৫. শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন কার্ড চালু করা দরকার যা প্রতিষ্ঠান প্রদান করবে। তাহলে যাত্রী কোন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র তা নিশ্চিত সম্ভব হবে।

৬. এ বছর শিক্ষাবাজেট ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মিলে মোট বাজেট দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। প্রতিবছর শিক্ষাবাজেট থেকে বেশ কিছু টাকা ফেরত যায়। ফেরত যাওয়া এই টাকাটা পরিবহন ভর্তুকি হিসেবে দেয়া যেতে পারে।

৭. যে সমস্ত পরিবহন শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া কার্যকর করবে, তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৮. দেশের ছাত্রসমাজের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। তাদের শিক্ষা সহায়ক কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিবহনে সাবসিডি দেয়া এবং একটি যুক্তিসংগত নিয়ম-বিধি প্রণয়ন করা হলে তা ছাত্র এবং পরিবহন শ্রমিক উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক।

৯. দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে নগর পরিবহন আছে আবার এই দুই শহরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছাত্রসংখ্যা বেশি। বাকি সারা দেশে সাধারণত স্বল্প দূরত্বে শিক্ষার্থীরা বাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করে। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিবহন সহায়তার জন্য বাজেটে থোক বরাদ্দ করা যেতে পারে।

১০. বিভিন্ন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরিবহন ফি নেয়া হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন ও ফি বেশি। উভয়ক্ষেত্রেই যারা গণপরিবহনে যাতায়াত করে তাদের কাছ থেকে নেয়া পরিবহন ফি এবং সরকারপ্রদত্ত বরাদ্দ দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

১১. সরকার, পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও ছাত্র প্রতিনিধি সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। তাহলে যেকোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন:
রিজওয়ানকে ছাড়াই অনুশীলনে পাকিস্তান
ফিল্ডিং নিয়ে কাজ করার সময় নেই ফিল্ডিং কোচের
পাকিস্তান সিরিজে নেই তামিম; নাও খেলতে পারেন মুশফিক
ডমিঙ্গোর জন্য বিকল্প ভাবছে বিসিবি
ফিল্ডিং কোচকে বিদায় জানাচ্ছে বিসিবি

শেয়ার করুন

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তিনি যে অভিযোগগুলো করেছেন তা কি ভিত্তিহীন? ১৫ আগস্টের দায়ভার থেকে কি জিয়া পুরোপুরি মুক্ত? জিয়াউর রহমান কি ১৫ আগস্টের খুনিদের পুরস্কৃত করেননি? ১৫ আগস্টে নিজের ভুয়া জন্মদিন পালন করে তিনি কি সমঝোতার পথ রুদ্ধ করে দেননি? ২১ আগস্টের খুনিদের তিনি বিচার না করে মদদ দেননি? প্রধানমন্ত্রীর এ অভিযোগগুলোর কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়।

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের সিসিইউতে রয়েছেন। বিএনপির দাবি তাকে সুস্থ করে তুলতে হলে এ মুহূর্তে বিদেশে নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চপর্যায় থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তাকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়া সম্ভব নয়।

খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, উচ্চরক্তচাপ, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা রোগে ভুগছেন। তার হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে দুবার। চোখেও অপারেশন হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন কোভিডে। কোভিড-পরবর্তী জটিলতায় তার ফুসফুস, লিভার, হার্ট ও কিডনির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে বলে জানা যায়। এমতাবস্থায় তিনি ২০১৮ সাল থেকে কারাভোগ করছেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে বিএনপির দাবি, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তার বিরুদ্ধে সব মামলাই মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক। তবে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ বিএনপি করতেই পারে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলার সুযোগ নেই। আদালতে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং তিনি সাজাপ্রাপ্ত।

খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঁচবার আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা প্রসঙ্গে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা তিনি ইতোমধ্যেই ব্যবহার করেছেন। আমার হাতে যেটুকু পাওয়ার, সেটুকু আমি দেখিয়েছি। এখানে আমার কিছু করার নাই। আমার যেটা করার, আমি করেছি। এটা এখন আইনের ব্যাপার। খালেদা জিয়াকে যে কারাগার থেকে বাসায় থাকতে দিয়েছি, চিকিৎসা করতে দিয়েছি, এটাই কি বেশি নয়?’

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে বিএনপিপন্থিরা নাখোশ হয়েছেন। তা হতেই পারেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সবগুলো কথাই সঠিক বলেছেন। তিনি তার হাতে যে ক্ষমতা আছে সেটা প্রয়োগ করেছেন। মানবিকতা দেখিয়ে তিনি খালেদা জিয়াকে বুয়াসহ জেল ও বর্তমানে সাজা স্থগিত রেখে বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন। এগুলো তিনি মানবিকতা দেখিয়েই করেছেন।

কিন্তু খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তিনি যে অভিযোগগুলো করেছেন তা কি ভিত্তিহীন? ১৫ আগস্টের দায়ভার থেকে কি জিয়া পুরোপুরি মুক্ত? জিয়াউর রহমান কি ১৫ আগস্টের খুনিদের পুরস্কৃত করেননি? ১৫ আগস্টে নিজের ভুয়া জন্মদিন পালন করে তিনি কি সমঝোতার পথ ‍রুদ্ধ করে দেননি?

২১ আগস্টের খুনিদের তিনি বিচার না করে মদদ দেননি? প্রধানমন্ত্রীর এ অভিযোগগুলোর কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়। তবে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা প্রশ্নে বিএনপি এখন যথেষ্ট নমনীয়। তারা পাল্টা যুক্তির পথে না গিয়ে বিদেশে চিকিৎসার বিষয়টিকে মানবিকতার সঙ্গে দেখার দাবিই করে আসছেন। সেই সঙ্গে হয়তো কিছু আইনি ও রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন।

খালেদা জিয়ার জীবনমৃত্যুর প্রশ্নটিকেই তারা বড় করে দেখছেন। খালেদা জিয়া একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ও যথেষ্ট অসুস্থ। এছাড়া তিনি তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও একজন বীরোত্তমের স্ত্রী। বিএনপি এ কথাগুলোই বার বার বলছে। কিন্তু একজন ভিকটিম বা সংক্ষু্ব্ধ ব্যক্তির কাছে তিনি শুধুই একজন হুকুমের আসামি ও বর্তমানে দণ্ডিত কয়েদি।

বিএনপি খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিকে রাজনৈতিকভাবেই আদায় করতে চায় বলেই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি গত ১২ বছরে কোনো দাবিই আদায় করতে পারেনি। খালেদা জিয়ার বিচারের বিষয়টিকেও তারা প্রথমে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি।

পরে আইনগতভাবে মোকাবিলা করতে চেয়েছিল, সেখানেও ব্যর্থ হয়েছে। শেষমেশ তাকে কারাগারেই যেতে হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দাবি আদায়ের শক্তি ও কৌশল কোনোটিই বিএনপি দেখাতে পারেনি। এখনও তারা একটি আইনগত বিষয়কে আইনি প্রক্রিয়ায় সুরাহা করার চেষ্টা না করে রাজনৈতিক ইস্যু বানাতে চায়।

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিই এ মুহূর্তে তাদের একমাত্র রাজনৈতিক পুঁজি। নেত্রীর অসুস্থতাকে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের হাতিয়ার বানানো বা তার বিদেশে চিকিৎসার দাবির আড়ালে দলকে রাজপথমুখী করা মূলত এক ধরনের রাজনৈতিক দেউলিয়ার বহিঃপ্রকাশ।

দাবি আদায়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকতেই পারে। কিন্তু এ বিষয়টি সুরাহা করতে হলে আইনগতভাবেই করতে হবে। কারণ, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা বা মুক্তির বিষয়টি অনেক আগেই আইনের আওতাধীন একটি বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কাজেই, এ বিষয়টি আইনগতভাবেই সমাধান করতে হবে। আওয়ামী লীগও যদি খালেদা জিয়াকে মু্ক্তি দিতে চায় বা বিদেশে চিকিৎসা দিতে চায় তাকেও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তা করতে হবে।

বিএনপি নেত্রী গত এক দশক ধরেই শোচনীয় অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় ও নিয়মের কারণে বাসা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। বিচার শেষে তিনি কারাভোগ করেছেন। বর্তমানে সাজা স্থগিত আছে। সাজাভোগের এ মধ্যবর্তী অবস্থায় আওয়ামী লীগ তার প্রতি আরও মানবিকতা দেখাবে কি না সেটি একান্তই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যাপার। তবে সেই মানবিকতা দেখালেও তা আইনানুযায়ীই হতে হবে। আইনে এখনও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখানোর সুযোগ আছে।

মানবিক কারণ বিবেচনা করেই অনেক সময় আসামিকে জামিন প্রদান করা হয় ও তার সাজা স্থগিত করা হয়। বিচারকালীন জামিন প্রদান করা আদালতের কাজ। আদালত মানবিক বিবেচনায় জামিন দিতে পারেন। সাজা হয়ে গেলে সরকার মানবিক বিবেচনায় সাজা স্থগিত করতে পারে।

এটাই ফৌজদারি আইনের বিধান। এছাড়া রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টিও রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমার এ বিষয়টিও পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের অংশ। রাষ্ট্রপতি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে যেকোনো আসামিকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। বিএনপি দাবি করতেই পারে যে, এ দেশে খুনের আসামিকেও রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করেছেন। সেখানে তিনবারের নির্বাচিত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা করতে বাধা কোথায়?

এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি পরিষ্কার। তিনি ইতোমধ্যে মানবিকতা দেখিয়েছেন। মানবিক কারণেই তিনি এখন বাসায় আছেন। তার সাজা স্থগিত আছে। মানবিক কারণেই তার দেখভাল করার জন্য একজন কাজের বুয়াকেও সঙ্গে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এসবই সত্য। বিএনপির দাবি, সেই মানবিকতাকে আরও প্রসারিত করে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো!

আইনমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদিও ফৌজদারি কার্যবিধি ভিন্ন কথা বলে। বর্তমানে তার সাজা স্থগিত রয়েছে। তবে কিছু শর্ত রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম শর্ত হচ্ছে, তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। (ফৌজদারি কার্যবিধির সিআরপিসি) ৪০১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইলে সরকার যে কোনো সময় বিনা শর্তে বা দণ্ডিত যাহা মানিয়া নেয় সেইরূপ শর্তে যে দণ্ডে সে দণ্ডিত হইয়াছে, সেই দণ্ডের কার্যকরীকরণ স্থগিত রাখিতে বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করিতে পারিবেন।’

কাজেই সরকার চাইলে শর্ত তুলে নিয়ে সাজা স্থগিত করতে পারে। এমনকি সাজা মওকুফও করতে পারে। সিআরপিসি’র ৪০১ (৬)-এর অধীনে তাকে কয়েকটি শর্ত দিয়ে সাজা স্থগিত করা হয়েছে। ৪০১(৬) ধারা বলছে, ‘সরকার সাধারণ বিধিমালা বা বিশেষ আদেশ দ্বারা দণ্ড স্থগিত রাখা এবং আবেদনপত্র স্থগিত রাখা এবং আবেদনপত্র দাখিল ও বিবেচনার শর্ত সম্বন্ধে নির্দেশ দিতে পারিবেন।’

কাজেই ৪০১(৬) ধারা প্রয়োগ করে যে নির্বাহী আদেশে শর্ত দিয়ে সাজা স্থগিত করা হয়েছে, সেই একই ধারা প্রয়োগ করে আরেকটি নির্বাহী আদেশে জারি করে উক্ত শর্তটি তুলে দিলেই তার বিদেশে যাওয়ায় আর কোনো বাধা থাকে না। বিএনপি সেই দাবিটিই করছে। অর্থাৎ নির্বাহী আদেশটি আরেকবার পরিবর্তন করে জারি করাই যথেষ্ট। তবে, এক্ষেত্রে ৪০১(২) ধারা অনুযায়ী আসামির তরফ থেকে আবেদন করতে হবে।

এছাড়াও সরকার চাইরে The Probation of offenders Ordinance ১৯৬০ ও The Probation of offenders Rules ১৯৭৫ অনুযায়ীও যেকোনো সময় যেকোনো সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দিতে পারে।

সরকার থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার কথা আগেও বলেছে। কিন্তু বিএনপি সে পথে যায়নি। তারা কৌশলগত কারণেই সে পথে যায়নি। কারণ, ক্ষমা চাইতে হলে দোষ স্বীকার করতে হবে, মানে সব অভিযোগ স্বীকার করে নিতে হবে। তবে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার অধিকারটি সার্বভৌম নয়।

কারণ, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া সব ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। কাজেই ক্ষমা করার অধিকারটিও প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিনি চাইলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমাও মিলতে পারে। কিন্তু বিএনপি সে পথে যাবে কি না সেটাই প্রশ্ন।

দুই নেত্রীর মধ্যে আজকে বিভেদের দেয়াল থাকলেও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সদ্ভাব ও সহমর্মিতার কথাও আমরা ভুলে যাইনি। এক/এগারোকালে শেখ হাসিনা বন্দি হলে খালেদা জিয়া তার মুক্তির দাবি করেছিলেন। পরে খালেদা জিয়াও অন্তরীণ হলে দুই নেত্রী পাশাপাশি থেকেছেন। তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে।

শেখ হাসিনা তাকে রান্না করা খাবারও পাঠিয়েছেন। শেখ হাসিনার মুখেই আমরা একথা শুনেছি। এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দুই নেত্রীর সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখ এদেশের জনগণের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এক মুহূর্ত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দুই নেত্রীর নিজস্ব একটি জায়গা আছে। সেখানে তারা অনন্য।

অতীতে তাদের দুইজনকেই রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। তাদের বিকল্প তারা নিজেরাই। এই দুই দল ও নেত্রীর মধ্যে শত বিভেদ থাকলেও তাদের একটু পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ও এদেশের মানুষকে যার পর নাই আশান্বিত করে।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে মানবিকতা দাবি করছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ও ক্ষোভ তার ঊর্ধ্বে উঠে আরও মানবিকতা দেখাবেন কি না সেটি একান্ত তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে এ ব্যাপারে তাকে দায়ী করা কোনোভাবেই সংগত হবে না। বিশেষ করে ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ গুরুতর।

বঙ্গবন্ধুকন্যা, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দুবারের বিরোধীদলীয় নেত্রী, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, মাদার অব হিউম্যানিটি ও একজন নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দুবারের বিরোধী দলের নেত্রী, বিরোত্তমের স্ত্রী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী ও একজন মরণাপন্ন বয়োবৃদ্ধ নারী খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেন অথবা না দেন-দুটোই আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
রিজওয়ানকে ছাড়াই অনুশীলনে পাকিস্তান
ফিল্ডিং নিয়ে কাজ করার সময় নেই ফিল্ডিং কোচের
পাকিস্তান সিরিজে নেই তামিম; নাও খেলতে পারেন মুশফিক
ডমিঙ্গোর জন্য বিকল্প ভাবছে বিসিবি
ফিল্ডিং কোচকে বিদায় জানাচ্ছে বিসিবি

শেয়ার করুন

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও বিএনপির মামাবাড়ির আবদার  

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও
বিএনপির মামাবাড়ির আবদার  

খালেদা জিয়া যে মামলায় দণ্ড ভোগ করছেন সেটা তো আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। তারপরও বিএনপি অভিযোগ করে আসছে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে সরকার তাদের নেত্রীকে কারাদণ্ড দিয়েছে। মামলার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এতিমের টাকা আত্মাসাতের কারণে দুদক ২০০৮ সালের ৪ জুলাই এ মামলাটি করে। এ মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার পুত্র তারেক রহমানও আসামি ছিলেন।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে দেশবাসী ধোঁয়াশার মধ্যে আছে। কখনও মুত্যুগুজব, কখনও বলা হচ্ছে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, আবার কখনও শোনা যাচ্ছে তিনি মোটামুটি সুস্থ আছেন। এ প্রসঙ্গে ঈশপের একটি গল্প মনে পড়ে গেল। যদিও গল্পটি প্রায় সবাই জানে। এক মিথ্যাবাদী রাখাল বালক প্রতিদিন বাঘ আসছে, বাঘ আসছে বলে গ্রামবাসীকে মিথ্যে ভয় দেখাত। সত্যিই একদিন যখন বাঘ এল, সেদিন কিন্তু তার কথাকে আর কেউ বিশ্বাস করে এগিয়ে যায়নি। পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়েছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে।

বেগম জিয়া জেলে যাওয়ার পর থেকেই বিএনপির নেতারা বলে আসছে- তিনি মারাত্মক অসুস্থ, জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, সরকার চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছে এসব অবান্তর গল্প শুনতে শুনতে জনগণ এখন ক্লান্ত। এখন তাদের কোন কথা সত্য আর কোনটি মিথ্যা সাধারণ মানুষ যথেষ্ট সন্দিহান।

খালেদা জিয়া যখন জেলে ছিলেন তখন বিএনপি থেকে দাবি করা হতো তাকে বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু তিনি মুক্তি পাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে চিকিৎসা নিচ্ছেন এভারকেয়ার হাসপাতালে (সাবেক অ্যাপোলো) আবার যখন নিজেরদের পছন্দমতো হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে তখন আবার নতুন উছিলা তুলেছে, খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিএনপি যে রাজনীতি করছে সেটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তাদের নেত্রীর সুচিকিৎসার থেকে বেশি মনোযোগ রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করে সরকারকে বিব্রত করা। বিএনপির নেতারা সচেতনভাবে জানেন একজন দণ্ডিত আসামির বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ নেই। তারপরও তারা এই বিষয়টি নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করতে চাইছে।

খালেদা জিয়া যে মামলায় দণ্ড ভোগ করছেন সেটা তো আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। তারপরও বিএনপি অভিযোগ করে আসছে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে সরকার তাদের নেত্রীকে কারাদণ্ড দিয়েছে। মামলার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এতিমের টাকা আত্মাসাতের কারণে দুদক ২০০৮ সালের ৪ জুলাই এ মামলাটি করে। এ মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার পুত্র তারেক রহমানও আসামি ছিলেন।

পিতা মারা গেলে পুত্র এতিম হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তারেক জিয়া নিঃসন্দেহে এতিম হন। কিন্তু মা যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান তখন কি আর ছেলেটা এতিম থাকে? ১৯৯১ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশের এতিমদের সহায়তার জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে’ সাড়ে ৪ কোটি টাকা দান করে। পরবর্তী সময়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল নামে ভুয়া দুটি ট্রাস্ট গঠন করে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সমুদয় অর্থ আত্মসাৎ করে খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমান।

জিয়া অরফানেজ মামলায় এতিমের টাকা আত্মসাতের কারণে বিচারিক আদালত খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। তবে হাইকোর্টে সাজা বাতিল চেয়ে আবেদন করলে উল্টো সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে দেন। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়ও খালেদা জিয়াকে আরও ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।

খালেদা জিয়া কতটুকু অসুস্থ সে বিষয়ে সার্টিফিকেট দেবে চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকরা। গণমাধ্যমসূত্রে জানা যাচ্ছে, এভারকেয়ার হাসপাতালে বিশজনের চিকিৎসক প্যানেল বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। কিন্তু চিকিৎসকরা তার অসুস্থতা বিষয়ে মুখে কলুপ এঁটেছেন। প্রতিদিন বিএনপি নেতারা বলে যাচ্ছেন, খালেদা জিয়া জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছেন। যে কথাটা বলার কথা চিকিৎসকদের, কিন্তু সেটি বলে যাচ্ছে ফখরুল সাহেবরা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা এবিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব। বিএনপি নেত্রী কেমন আছেন সেটা জানার অধিকার জনগণের আছে। কিন্তু জনগণ তো দূরের কথা বিএনপির নেতাকর্মীরাই ধোঁয়াশার মধ্যে আছে, আদৌ তাদের নেত্রীর কী অবস্থা। বিএনপি নেত্রী এখন মুক্তভাবে জীবনযাপন করছেন। পরিবার ও দলের কিছু নেতা চিকিৎসা-সংশ্লিষ্টতায় জড়িত। তারা ছাড়া সবাইকে অসুস্থতার বিষয়টি নিয়ে অন্ধকার রাখা হচ্ছে। এখানেই রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির আভাস পাওয়া যায়।

খালেদা জিয়া এবারই প্রথম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এমনটি নয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর ৬ অক্টোবর অসুস্থবোধ করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেয়া হয়। সেসময় এক মাসেরও বেশি হাসপাতালে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আবার অসুস্থবোধ করলে ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল পুনরায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মুক্তির আগপর্যন্ত সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মহানুভবতার কারণে করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার আগে ২৫ মাস কারাভোগের পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। এরপর আরও তিনদফা সাজা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তার মুক্তির ক্ষেত্রে শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না এবং দেশের পছন্দমতো যেকোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন।

বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার অজুহাতে মাঠ গরম করার দিকে বেশি তৎপর হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে আদৌ আন্তরিক মনে হচ্ছে না। খালেদা জিয়ার বিদেশ যেতে বাধা থাকলেও বিদেশ থেকে ডাক্তার আনার ক্ষেত্রে তো কোনো বাধা নেই। কিন্তু সেদিকে বিএনপির কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

বিএনপি যদি প্রকৃতপক্ষেই খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার কথা ভাবত তাহলে তারা আন্দোলনের নামে জলঘোলা না করে চিকিৎসার দিকে আরও বেশি নজর দিত। কথায় কথায় আন্দোলনের হুমকি, সরকার পতনের কথা বলত না। সরকারের কাছে দেনদরবারের পাশাপাশি আইনগতভাবে প্যারোলে মুক্তির জন্য চেষ্টা করতে দেখতে পারত।

মির্জা ফখরুল বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে নাকি স্লো পয়জনিং করা হচ্ছে। বেগম জিয়া ২১ মাস ধরে মুক্ত আছেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকেন। আর আশপাশে ঘোরাঘুরি করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। আর ব্যক্তিগত পছন্দের চিকিৎসকরাই তাকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।

তাহলে স্লো পয়জনিং যদি কেউ করে থাকেন তাহলে আপনজনদের মধ্যেই তো কেউ করেছেন। এখানে তো সরকারের করার কোনো সুযোগই নেই। আবার তিনি এ-ও বলছেন, খালেদা জিয়ার রোগনির্ণয়ের প্রযুক্তি দেশে নেই। এসব উদ্ভট কথা বলে তিনি জনগণের কাছে সার্কাসের জোকারে পরিণত হয়েছেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে বিদেশে চিকিৎসা দেয়ার উদাহরণ কি আছে? নেই, সেটা জেনেও বিএনপি খালেদা জিয়াকে পুঁজি করে আন্দোলনের ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে।

বিএনপি-জামায়াতপন্থি কিছু কথিত বুদ্ধিজীবী টেলিভিশনে গলা ফাটাচ্ছে সরকারের উচিত মানবিক কারণে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো। যারা মানবিক হওয়ার কথা বলেন, তারা কি কখনও নিজেরা আত্মোপলব্ধি করেছেন যে, শেখ হাসিনা কতটা মানবিক হলে খালেদা জিয়াকে নির্বাহী ক্ষমতার বলে সাজা স্থগিত করে মুক্তভাবে চলাফেরা সুযোগ করে দিয়েছেন। শুধু কি তাই? বেগম জিয়া যখন জেলে ছিলেন তখন তাকে দেখাশোনার জন্য ব্যক্তিগত গৃহপরিচারিকা ফাতেমাকে সঙ্গে থাকার সুযোগ করে দেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেই এমন উদারতা দেখাতে পারেন।

যেসব বুদ্ধিজীবী খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠাতে উঠে পড়ে লেগেছেন তারা কি নিশ্চয়তা দিতে পারবেন খালেদা জিয়া বিদেশে থেকে চিকিৎসা শেষে আবার দেশে ফিরে আসবেন? বেগম জিয়ার পুত্র তারেক রহমান যিনিও একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তিনি ১৪ বছর ধরে চিকিৎসার কথা বলে পালিয়ে আছেন।

বিএনপি নেতাদের তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, তিনি চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরবেন। তারেক রহমান এমন কী রোগে আক্রান্ত যে চৌদ্দ বছরে সুস্থ হতে পারেননি। এটা হলো রাজনৈতিক অসুস্থতা। খালেদা জিয়াও একবার দেশ ছাড়তে পারলে আর ফিরে আসবেন না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তখন মা-ছেলে মিলে দেশের বিরুদ্ধে আরও জোরালোভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করবে।

বিএনপি নেতারা মায়াকান্না করলেও যার জন্য খালেদা জিয়ার এই পরিণতি তার সেই সুপুত্র তারেক রহমান একবারও মাকে দেখতে আসার আগ্রহ দেখাননি। অনেকে যুক্তি দেখান তিনি গ্রেপ্তার আতঙ্কে আসতে পারছেন না।

তারেক রহমান বিএনপির অন্যতম ‘শীর্ষনেতা’, তিনি কেন গ্রেপ্তারকে ভয় পাবেন? নৈতিকভাবে দুর্বল বলেই কারাগারকে ভয় পায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝড়ের রাতে প্রবল স্রোতে সাঁতার কেটে দামোদর নদী পার হয়ে অসুস্থ মার কাছে পৌঁছেছিলেন। আর তারেক রহমান অসুস্থ মাকে রেখে আরাম আয়েশ করে বেড়াচ্ছেন! এতেই বোঝা যায় মায়ের প্রতি তিনি কতটা উদাসীন! তিনি মাকে নিয়ে রাজনীতি করবেন নাকি মায়ের ভালোবাসার টানে দেশে ফিরে আসবেন এখন সেটিই দেখার সময় এসেছে।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

[email protected]

আরও পড়ুন:
রিজওয়ানকে ছাড়াই অনুশীলনে পাকিস্তান
ফিল্ডিং নিয়ে কাজ করার সময় নেই ফিল্ডিং কোচের
পাকিস্তান সিরিজে নেই তামিম; নাও খেলতে পারেন মুশফিক
ডমিঙ্গোর জন্য বিকল্প ভাবছে বিসিবি
ফিল্ডিং কোচকে বিদায় জানাচ্ছে বিসিবি

শেয়ার করুন

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কেন বিদেশে হবে?

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কেন বিদেশে হবে?

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সাংবিধানিকভাবেই তার ক্ষমতা এতই যে, তিনি শুধু প্রাকৃতিক বিষয়গুলোর বাইরে সব করতে পারেন। সুতরাং তিনি চাইলেই বিএনপির দাবি অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়া সম্ভব। কিন্তু তিনি কেন চাইবেন? যিনি বিশ্বাস করেন এবং আদালত যেখানে রায়ও দিয়েছেন যে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তাকে (তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা) হত্যার জন্য যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, সেটি তখনকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নির্দেশেই হয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, ‘বেগম জিয়া জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।’ তার সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান ২০ নভেম্বর ফেসবুকে লিখেছেন, খালেদা জিয়া তার পুরানো জটিল রোগগুলো ছাড়াও ডিকমপেন্স্যাটেড লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়েছেন।

শরীর থেকে রক্ত যেতে যেতে তার হিমোগ্লোবিন একেবারে কমে গেলে এবং রক্তবমি হতে থাকলে তাকে এবার হাসপাতালে নেয়া হয়। মারুফ কামাল খানের অভিযোগ: বেগম জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ এবং হার্ট, কিডনি ও চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি নিয়মিত চিকিৎসাধীন ও চিকিৎসকদের তদারকিতে ছিলেন। তাকে জেলে নেয়ার পর সব বন্ধ হয়ে যায়। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হতে থাকে, তার অবস্থারও গুরুতর অবনতি ঘটে।

এ অবস্থায় কয়েকটি বিষয় ও প্রশ্ন সামনে আসছে।

১. বিএনপির দাবি ‘সুচিকিৎসার’ জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে যেতে দেয়া হোক।

২. দণ্ডবিধির ৪০১ ধারা প্রয়োগ করে খালেদা জিয়ার শাস্তি মওকুফ করা হোক। এই ধারায় বলা হয়েছে, সরকার যেকোনো সময় বিনাশর্তে বা দণ্ডিত ব্যক্তি যা মেনে নেয় সেরূপ শর্তে যে দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে, সেই দণ্ডের কার্যকরীকরণ স্থগিত রাখতে বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করতে পারবেন। তার মানে হলো- আদালত কোনো নাগরিককে কোনো অপরাধের জন্য দণ্ড দিলেও সরকার তার নির্বাহী ক্ষমতাবলে ওই দণ্ড মওকুফ বা স্থগিত করতে পারবেন। এটি সরকারের একটি বিরাট ক্ষমতা।

৩. খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে হলে অপরাধ স্বীকার করতে হবে। প্রশ্ন হলো- খালেদা জিয়া কেন তার ‘আপসহীন নেত্রী’র বিশেষণের সঙ্গে ‘আপস’ করে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন এবং কেন নিজের অপরাধ স্বীকার করবেন?

৪. বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সাংবিধানিকভাবেই তার ক্ষমতা এতই যে, তিনি শুধু প্রাকৃতিক বিষয়গুলোর বাইরে সব করতে পারেন। সুতরাং তিনি চাইলেই বিএনপির দাবি অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়া সম্ভব। কিন্তু তিনি কেন চাইবেন?

যিনি বিশ্বাস করেন এবং আদালত যেখানে রায়ও দিয়েছেন যে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তাকে (তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা) হত্যার জন্য যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, সেটি তখনকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নির্দেশেই হয়েছে। সুতরাং যে দল তাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড মারল, সেই দলের শীর্ষ নেতার দাবি মেনে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর মতো মহানুভবতা তিনি কেন দেখাবেন? আমাদের দেশের প্রতিহিংসার রাজনীতিতে এই ধরনের মহানুভবতা বা পরমতসহিষ্ণুতা কবে ছিল?

৫. মির্জা ফখরুলের ভাষ্য জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণের সবশেষ পরিণতি হিসেবে যদি দেশের মাটিতেই খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়, তাহলে কী পরিস্থিতি তৈরি হবে এবং তার মৃত্যুর দায় সরকারের উপরে এসে পড়বে কি না?

৬. এখানে খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলে তার দল কি সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করে দেবে? সেই ক্ষমতা তাদের আছে বা জনগণ তাদের সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে?

এসব প্রশ্নের নির্মোহ এবং পক্ষপাতমুক্ত উত্তর দেয়া যে কারো পক্ষেই কঠিন। তবে যে বিষয়টি এখন সামনে আনা দরকার তা হলো- খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য কেন বিদেশে নিতে হবে? দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের উপরে তার বা তার পরিবার ও দলের কেন আস্থা নেই? দেশে কি তার রোগের চিকিৎসা নেই? যদি না থাকে তাহলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পঞ্চাশ বছরে চিকিৎসাব্যবস্থার কী উন্নতিটা হলো?

কেন স্বাধীনতার ৫০ বছরেও দেশে এমন একটি চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা গেল না, যেখানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয়া যায় এবং সেই চিকিৎসার উপরে তার পরিবার ও দলের পূর্ণ আস্থা রয়েছে? কেন দেশের এমপি-মন্ত্রী এমনকি মহামান্য রাষ্ট্রপতিকেও চিকিৎসা, এমনকি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যও সিঙ্গাপুর যেতে হয়? কেন সামান্য একটু জটিল রোগ কিংবা দুর্ঘটনায় হাড়গোড় একটু বেশি ভাঙলেই তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠাতে হয়? কেন মেডিক্যাল কলেজগুলো থেকেও অসংখ্য রোগীকে ঢাকায় পাঠানো হয়? তাহলে এইসব মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা শহরের হাসপাতালগুলো রেখে লাভ কী?

খালেদা জিয়াকে বিদেশেই কেন নিতে হবে?

মারুফ কামাল খান লিখেছেন, খালেদা জিয়া তার পুরানো জটিল রোগগুলো ছাড়াও ডিকমপেন্স্যাটেড লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর দুটি মাত্র চিকিৎসা। স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন থেরাপি এবং তাতেও কাজ না হলে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা। এর কোনোটিই বাংলাদেশে সম্ভব নয় এবং করার সুযোগ নেই। তার দাবি, বর্তমানে খালেদা জিয়ার যে অবস্থা তাতে দেশে চিকিৎসার সুযোগ নেই বললেই চলে।

সরকারের তরফে বলা হচ্ছিলো, বিএনপি বা খালেদা জিয়ার পরিবার চাইলে তার চিকিৎসায় বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকার গত ২৬ নভেম্বর রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে বলেছেন, বিদেশ থেকে চিকিৎসক এনেও লাভ নেই। কারণ পরীক্ষার ল্যাব, যন্ত্রপাতি, হাসপাতাল সবই বাংলাদেশের— যার উপরে মানুষের আস্থা নেই। অতএব তাকে বিদেশেই নিতে হবে।

মুদ্রার অন্যপিঠ হলো- করোনার দুই বছরে দেশের মানুষ বিদেশে চিকিৎসা করাতে যায়নি বা যেতে পারেনি। এই সময়ের মধ্যে কি কেউ এমন কোনো অসুস্থ হননি যাতে করে তাকে বিদেশে নেয়ার প্রয়োজন ছিল? নাকি প্রয়োজন হলেও বাধ্য হয়ে তারা অপেক্ষা করেছেন?

এমন কোনো ঘটনা কি ঘটেছে যে, কোনো একজনকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে পারায় তার মৃত্যু হয়েছে? এরকম ঘটনা যদি ঘটে থাকে তাহলে তার সংখ্যা কত— সেটি কি কোনোদিন জানা যাবে? আর যদি এরকম ঘটনা না ঘটে থাকে, অর্থাৎ বিদেশে না গিয়েও যদি রোগ ভালো করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে কি চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য-পরীক্ষার জন্য মানুষের বিদেশমুখিতা কমবে? ক্ষমতাবান ও পয়সাওয়ালারা কি চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য-পরীক্ষার জন্য আগের চেয়ে কম বিদেশে যাবেন বা এখন থেকে চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য-পরীক্ষা দেশেই করবেন?

ধরা যাক সরকার কোনোভাবেই খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে দিল না এবং দেশেই তার মৃত্যু হলো। তারপর কী হবে? বিএনপি সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দেবে এবং সাধারণ মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে রাস্তায় নেমে যাবে? কেন নামবে? তার স্বার্থ কী?

আওয়ামী লীগের পতনের পরে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সাধারণ মানুষের লাভ কী? তাছাড়া সরকার পতনের আন্দোলনের জন্য কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দল যেরকম সংগঠিত ও শক্তিশালী থাকা দরকার, বিএনপির সেটি আছে? গত কয়েক বছরে বিএনপি কোনো আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
রিজওয়ানকে ছাড়াই অনুশীলনে পাকিস্তান
ফিল্ডিং নিয়ে কাজ করার সময় নেই ফিল্ডিং কোচের
পাকিস্তান সিরিজে নেই তামিম; নাও খেলতে পারেন মুশফিক
ডমিঙ্গোর জন্য বিকল্প ভাবছে বিসিবি
ফিল্ডিং কোচকে বিদায় জানাচ্ছে বিসিবি

শেয়ার করুন

শহীদ ডা. মিলন ও গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্ন

শহীদ ডা. মিলন ও গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্ন

১৯৯০ সালে চিকিৎসকদের প্রাণের দাবি ২৩ দফা বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন চলছিল। এ দাবিতে চিকিৎসকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ছিল না। গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার, বাজেট, মেডিক্যাল শিক্ষা সংস্কারসহ বিভিন্ন জরুরি বিষয় ছিল ওই আন্দোলনের দাবি। ডা. মিলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এদেশের চিকিৎসকসমাজ জনগণের কাছে মর্যাদার আসন পেয়েছে।

ডা. শামসুল আলম খান মিলন ১৯৯০-এর ২৭ নভেম্বর আনুমানিক বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বায়োক্যামিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক। পাশাপাশি সেসময়ের বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ ) যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও প্রকৃচি-এর (প্রকৌশলী-কৃষিবিদ–চিকিৎসক) কেন্দ্রীয় নেতা।

২৭ নভেম্বর ১৯৯০, দিনটি ছিল বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ও চিকিৎসকদের ২৩ দফা বাস্তবায়ন আন্দোলনের কর্মসূচি সারা দেশের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি এবং সেসময়ের পিজি হাসপাতালের বটতলায় সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় চিকিৎসক সমাবেশ। পাশাপাশি দেশব্যাপী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের কর্মসূচি। ছাত্র সংগঠনগুলো সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল। দেশ তখন চূড়ান্ত কর্মসূচির অপেক্ষায়।

ডা. মিলন সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে সেসময়ের পিজি হাসপাতালের দিকে রওনা হন। পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে আরেক রিকশায় থাকা বিএমএর সেসময়ের মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সঙ্গে দেখা হয়। মিলন নিজের রিকশা ছেড়ে ওই রিকশায় ওঠেন।

আর রিকশার প্যাডেলে চাপ পড়তেই ডা. মিলন পেছন থেকে গুলিবিদ্ধ হন এবং ওখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে প্রিয় চিকিৎসক নেতা ডা. মিলন চিরতরে হারিয়ে যান। থ্রি নট থ্রির একটি বুলেট তার ফুসফস ও হৃদপিণ্ড ভেদ করে গিয়েছিল।

মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে। গর্জে ওঠে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথ। সর্বত্র জনগণের কণ্ঠ- ‘মিলন ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না’। আন্দোলন এমন এক ঝড়ের গতি পায়, যে ঝড়ে কোনো রাজন্য বা স্বৈরাচার কখনও টিকে থাকতে পারে না।

ডা. মিলন হত্যার প্রতিবাদে পুনরুজ্জীবিত হয়ে দেশের চিকিৎসক-সমাজ, মেডিক্যাল-ছাত্র রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং এরশাদ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। চারদিক থেকে চিকিৎসক ও ছাত্রজনতা বিশাল মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জনতার এক মহাসমুদ্র তৈরি করে।

পোস্ট মর্টেম এবং বহির্বিভাগের সামনে অনুষ্ঠিত জানাজা শেষে মিলনের শেষশয্যা রচিত হয় তারই প্রিয় শিক্ষাঙ্গন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেদিনের সব আয়োজনের দায়িত্ব বর্তেছিল আমার ওপর।

মিলনের মৃত্যুসনদটিও আমাকে লিখতে হয়েছিল। তাকে কবরে শায়িত করার সঙ্গে সঙ্গে খবর পেলাম এরশাদ সরকার ইতোমধ্যে কারফিউ জারি করেছে। জরুরি আইন ঘোষিত হয়েছে। এটি ছিল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার শেষ অস্ত্র।

জনগণ ঘৃণাভরে সেই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করল। সে রাতেই কারফিউ ও জরুরি আইন অমান্য করে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে ঢাকার রাজপথসহ সারা দেশে। ২৮ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সব মেডিক্যাল শিক্ষক ও সরকারি চিকিৎসক পদত্যাগ করে এরশাদ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানায়।

এই পদত্যাগ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলে। আমরা ২৮ নভেম্বর সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সভাকক্ষে কন্ট্রোলরুম স্থাপন করি। সেখান থেকেই বিএমএর কর্মসূচি সারা দেশে পরিচালিত হয়।

৪ ডিসেম্বর রাতে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় এবং সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচারী দুঃশাসনের পতন ঘটে। রাতে ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট ভরে যায় আনন্দমিছিলে। আমরাও ঢাকা মেডিক্যাল থেকে মিলনের সহকর্মী হিসেবে আনন্দ-বেদনার মধ্য দিয়ে যোগ দেই সে মিছিলে।

ডা. মিলন, নূর হোসেন, জেহাদসহ আরও অসংখ্য শহীদের রক্তে এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে আরেকটি ঐতিহাসিক সংযোজন ‘গণ-অভ্যূত্থান ৯০’। যা দেশবাসীর কাছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক নতুন আশার সঞ্চার করে।

১৯৮৩ সালে ডাক্তার হওয়ার পর থেকে মিলন চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের সব আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। প্রতিটি আন্দোলনে তাকে সরকারের রোষানলে পড়তে হয়। এমনকি চাকরিচ্যুত পর্যন্ত হতে হয়েছে। যদিও চিকিৎসক-পেশাজীবীদের চাপের মুখে সরকার প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে।

মিলন তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এদেশের চিকিৎসক, পেশাজীবী ও রাজনীতিবিদদের হৃদয়ে মযার্দার আসন অর্জন করেছিল। মিলনের সঙ্গে আমার ৮৩ সাল থেকে বন্ধুত্ব হলেও, ওর জীবনের শেষ দুটি বছর একরকম অহর্নিশি আমরা একসঙ্গে থাকতাম।

অমায়িক ব্যক্তিত্বের মানুষ মিলনের সঙ্গে ঢামেক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। আমি জয়ী হওয়ার পর ওকে কোষাধ্যক্ষ পদের প্রস্তাব দিলে প্রত্যাখ্যান করেনি। দিনরাত একসঙ্গে বিএমএ, শিক্ষক সমিতি ও পেশাজীবী আন্দোলনে কাজ করেছি।

সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। আন্দোলন সংঘটিত করার জন্য সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। এমনকি হুলিয়া মাথায় নিয়ে রাতে হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে দুজনে একসঙ্গে ঘুমিয়েছি। মিলন প্রগতিশীল রাজনীতির কর্মী ছিল এবং স্বপ্ন দেখত দেশে গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নের।

১৯৯০ সালে চিকিৎসকদের প্রাণের দাবি ২৩ দফা বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন চলছিল। এ দাবিতে চিকিৎসকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ছিল না। গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার, বাজেট, মেডিক্যাল শিক্ষা সংস্কারসহ বিভিন্ন জরুরি বিষয় ছিল ওই আন্দোলনের দাবি।

ডা. মিলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এদেশের চিকিৎসকসমাজ জনগণের কাছে মর্যাদার আসন পেয়েছে। যে কারণে বিএমএর সেসময়ের সভাপতি ডা. এমএ মাজেদকে র্সবদলীয় রাজনতৈকি সিদ্ধান্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকাররে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব প্রদান করেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এদেশের চিকিৎসকদের একমাত্র জাতীয় সংগঠন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও মেডিক্যাল শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। দেশের চিকিৎসকসমাজ নানা রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত।

এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএমএ ও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতেই পারে, কিন্তু মিলনের আত্মত্যাগের সাক্ষী বিএমএতে দলমত নির্বিশেষে গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসকদের উন্নয়ন ও অধিকারের স্বার্থে সব চিকিৎসকদের ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।

উন্নত বিশ্বে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীতিনির্ধারনে মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা অপরিসীম। কখনও আবার প্রধান। ডা. মিলনসহ লাখো শহীদের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’কেও সেই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা দরকার।

শহীদ ডা. মিলনের ৩১ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, এদেশের চিকিৎসক সমাজের চিকিৎসাক্ষেত্রে ভেদাভেদ ভুলে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ মেধা, শক্তি ও সুযোগ ব্যয় করবে- এটিই প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত।

শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি, ডা. আলীম ও ডা. মিলনসহ বহু চিকিৎসক দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন। জাতির কাছে চিকিৎসকদের একটি র্মযাদার আসনে বসিয়ে গেছেন।

এ দেশের চিকিৎসকদের দায়িত্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব সীমাবদ্ধতা পাস কাটিয়ে, সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসার জন্য আন্তরকিতার সঙ্গে শক্তভাবে পাশে দাঁড়ানো। তবেই স্থায়ী হবে চিকিৎসকদের র্মযাদা। শান্তি পাবে শহিদের আত্মা।

এজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার। স্বাস্থ্যখাতে যে বাস্তবতা বিরাজ করছে তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এই বাস্তবতাকে গণবান্ধব করতে কিছু সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই-

১. স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ। একটি স্বাস্থ্য কমিশন গঠনরে মাধ্যমে অবকাঠামো এবং র্কমচারীদের দায়িত্ব পুনর্গঠন করতে হবে। যেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত থাকবে। প্রতিটি কাজের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং ফলো-আপ থাকা

২. শেখ হাসিনা সরকার প্রণীত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০০০-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন

৩. জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরকিল্পনা

৪. জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট। প্রয়োজনীয় বাজেটে (জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ১০%) বরাদ্দ এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা

৫. স্বাস্থ্যখাতে কঠোরভাবে দুর্নীতি দমন

৬. নিয়োগ ও বদলি নীতিমালা। অর্থাৎ চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার প্ল্যানিংসহ একটি গ্রহণযোগ্য বদলি-পদোন্নতির কার্যকর নীতিমালা থাকা যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত হবে

৭. মেডিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন

৮. ল্যাবরেটরি সার্ভিস নীতিমালা হালনাগাদ ও জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ ও সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যৌক্তিক মূল্যনির্ধারণ

৯. বিএমডিসিকে র্কাযকর ও শক্তিশালী করে তোলা

১০. বেসরকারি কলেজ-হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনা

১১. চিকিৎসক ও সব হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

১২. স্বাস্থ্য প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ

১৩. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন

১৪. মেডিক্যাল ইনফরমশেন সিস্টেম (এমআইএস) গঠন

১৫. অভ্যর্থনা ও তথ্যকেন্দ্র তৈরি

শেখ হাসিনা সরকার-প্রণীত সর্বজনগৃহীত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০০০-এর ওপর ভিত্তি করে সংস্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যনীতি গড়ে উঠবে এটাই বিশ্বাস।

লেখক: চিকিৎসক ও অধ্যাপক। সাবেক উপাচার্য, বিএসএমএমইউ।

আরও পড়ুন:
রিজওয়ানকে ছাড়াই অনুশীলনে পাকিস্তান
ফিল্ডিং নিয়ে কাজ করার সময় নেই ফিল্ডিং কোচের
পাকিস্তান সিরিজে নেই তামিম; নাও খেলতে পারেন মুশফিক
ডমিঙ্গোর জন্য বিকল্প ভাবছে বিসিবি
ফিল্ডিং কোচকে বিদায় জানাচ্ছে বিসিবি

শেয়ার করুন