পরিবহন ভাড়া, শীতের সবজি ও করোনার ওষুধ

পরিবহন ভাড়া, শীতের সবজি ও করোনার ওষুধ

সবচেয়ে বড় বিষয় যেটা, তাহলো যে বাসগুলো চলছে তা সিএনজি-চালিত। তাহলে জ্বালনি তেলের দাম বাড়লে পরিহনের ভাড়া বাড়বে কেন? অন্য দিকে শুভংকরের ফাঁকি হচ্ছে- ধরা গেল বর্ধিত ভাড়া ২৭ ভাগ। যে যাত্রী মোহাম্মদপুর থেকে বনানী গেল তার থেকে ২৭ পার্সেন্ট। আবার ওই সিটে যে ক্ষিলক্ষেত এল, তার থেকেও ২৭ পার্সেন্ট, ওখান থেকে যে আব্দুল্লাহপুর গেল, তার থেকেও ২৭ পার্সেন্ট। তাহলে ভাড়া কত বাড়ল আর নেয়া হলো কত?

সম্প্রতি পূর্বঘোষণা ছাড়াই গণপরিবহনে ধর্মঘট ডেকে যে দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছিল মালিক-শ্রমিকরা মিলে, তার অবসান হলেও বলির শিকার হলো সেই যাত্রীরাই। চাপের মুখে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। যে হারে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, তার কঠোর সমালোচনা করেছেন নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ, বিশিষ্টজন, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও যাত্রী অধিকার রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা করলেও ‘যাহা বাযান্ন তাহাই তেপ্পান্ন’!

এই একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কারো কিছু বলার নেই। বরাবরের মতো যাত্রীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবারও পরিবহন মালিকদের অন্যায্য চাপ মেনে নেয়া হয়েছে। জনগণের কাঁধে বাড়তি ভাড়ার বোঝা চাপিয়ে বাস ও লঞ্চের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছেন মালিকরা। দূরপাল্লার রুটের বাসে ২৭ শতাংশ এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলরত বাসে ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়েছে সরকার।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে মিনিবাসের ভাড়া ৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ও বাসের ভাড়া ৭ টাকার স্থলে ১০ টাকা করা হয়েছে। অপরদিকে লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ৩৫ শতাংশ। নতুন ভাড়া নির্ধারণে তেলের দাম ছাড়াও এ খাতে বিনিয়োগ, ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, বিভিন্ন ধরনের চার্জ, শ্রমিক বেতনসহ অন্যান্য ব্যয়ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গত সোমবার থেকেই বাড়তি এই ভাড়া গুনতে হচ্ছে সড়ক ও নৌপথের যাত্রীদের। ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে কৌশলে ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছে মালিকরা। এই অযৌক্তিক পদ্ধতিতে ভাড়া বাড়ানো কতটা অমানবিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সরকারের কিছু কর্মকর্তার হঠকারিতায় ডিজেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে জনগণকে এই দুর্ভোগের কবলে পড়তে হয়েছে। গত ৩ নভেম্বর রাতে ডিজেলের দাম একলাফে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা লিটার করেছে সরকার। এর ফলে ভাড়া বৃদ্ধির দাবিতে গত শুক্রবার ভোর থেকে সারা দেশে বাস চলাচল বন্ধ রাখেন মালিকরা। এর পর তিনদিন ধরে পথে পথে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে অগণিত মানুষকে। এর সঙ্গে লঞ্চ ধর্মঘট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি হয় শোচনীয়। ডিজেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ার জেরে দূরপাল্লা ও নগর পরিবহনের বাস ভাড়া গড়ে ২৭ শতাংশ বেড়েছে।

গত রোববার সারাদিন বৈঠক শেষে ভাড়া বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্তের পর মহাদুর্ভোগের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে বাস চলাচল শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে টানা তিনদিনের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পান যাত্রীরা। এটা হলো একটি জরুরি বিষয়। এর চেয়ে বড় বিষয় আর কী হতে পারে। এই ঘটনার পরের জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে লাগাতার ধর্মঘট ডেকে মানুষকে গণপরিবহনে বর্ধিত ভাড়া আদায় নিয়ে চলছে নৈরাজ্য।

এ নিয়ে দূরপাল্লা কিংবা দুই মহানগরীতে চলা পরিবহনে মানা হচ্ছে না সরকারি নির্দেশনা। ডিজেলে চলে- এই অজুহাতে সিএনজিচালিত বাসেও আদায় করা হয় বর্ধিত ভাড়া। এ কারণে কন্ডাক্টর ও যাত্রীদের মধ্যে হয়েছে বাদানুবাদও। এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। হঠাৎ করেই যাতায়াতে অনেকটা বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে তাদের। নিত্যপণ্যের চড়া দামের কারণে কষ্টে থাকা মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে দেখা দিয়েছে পরিবহন খরচ।

পরিবহন এমনি একটা বিষয় যারা এক পয়সার ভাড়া বাড়লে সব ধরনের পণ্যের ভাড়া বাড়ে। এই মুহূর্তে এ কাজটি হলো ‘মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা’য়ের মতো। এখানে সবচেয়ে বড় বিষয় যেটা, তাহলো যে বাসগুলো চলছে তা সিএনজি-চালিত। তাহলে জ্বালনি তেলের দাম বাড়লে পরিহনের ভাড়া বাড়বে কেন?

অন্যদিকে শুভংকরের ফাঁকি হচ্ছে- ধরা গেল বর্ধিত ভাড়া ২৭ ভাগ। যে যাত্রী মোহাম্মদপুর থেকে বনানী গেল তার থেকে ২৭ পার্সেন্ট। আবার ওই সিটে যে ক্ষিলক্ষেত এল, তার থেকেও ২৭ পার্সেন্ট, ওখান থেকে যে আব্দুল্লাহপুর গেল, তার থেকেও ২৭ পার্সেন্ট। তাহলে ভাড়া কত বাড়ল আর নেয়া হলো কত? এ গেল একটা কথা, এর পরেই আসা যাক বাস্তবতার গল্পে। মোহাম্মদপুর থেকে ক্ষিলক্ষেতের ভাড়া ছিল ৪০ টাকা। এখন সেখানে হয়েছে ৬০ টাকা। এহারে ভাড়া বাড়েনি। কিন্তু আদায় করা হচ্ছে। এটা কোনো শোনা গল্প নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা। এটা নিয়ে টানাহেঁচড়া করলে ৫ টাকা ফেরত দেয়া হয়। সড়কে কোনো নিয়মিত মোবাইল কোর্ট দেখা যাচ্ছে না। দেখার কেউ নেই।

বরং পরিবহন ধর্মঘট থেকে ভাড়া নির্ধারণী বৈঠকে দেখা গেল সরকারসমর্থিত কিছু নেতার দাপট। মন্ত্রী এমপি না থাকলেও যে তারা ক্ষমতাধর এটা তারা দেখাল। সেখানে সরকারের ভূমিকা গৌণ। অথচ এই জিম্মি নাটক ঠেকাতে সরকার ১০০ বিআরটিসি বাস ছাড়লে পরিবহন নেতাদের এই অপরাজনীতি থাকে না। সরকার সেখানে ঠুঁটোজগন্নাথ হয়ে বসে আছে।

শীত পড়েছে গ্রামগঞ্জে। শীতের সবজি উঠছে। ক্ষেতের টমেটো বিক্রি করছে ১০ টাকা, বেগুন, করোলা পাঁচ টাকা, কফি ৭/১০ টাকা। আর রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আসতে আসতে দাম বাড়তে থাকে। রাজধানীবাসীর হাতে এলে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। তাহলে দাম কৃষক পেল না। পেলটা কে।

এ খেলা আজকের নয়। প্রতি বছরের। বগুড়ার খামারের চিত্র এটা। ট্রাক মালিকদের ভাষ্য হলো- ট্রাক ভাড়ার সঙ্গে মোড়ে মোড়ে টাকা দিতে হয়। কাদের দিতে হয় কেন দিতে হয়। সবাই জানেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশের ভূমিকা সবার জানা তারপরও অব্যবস্থা চলছে। পরিবহন শ্রমিকের যে কষ্ট তা কে বুঝবে? পরিবহণ শ্রমিক এখানে সাক্ষী গোপাল। একদিন গাড়ি না চালালে যে অভুক্ত থাকে। বাসে প্রতিদিন মার খায় সে। আর ক্ষির খেয়ে যায় দুধের মাছি। সড়কে যে নৈরাজ্য চলছে সেটা বন্ধ করতে যে শিরদাঁড়া লাগে তা কি সরকারের নেই? আছে।

সরকার পারে না এমন কিছু নেই। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? অথচ ভোটের সংখ্যায় নেতাকর্মী, পুলিশ না ওই জনগণ সবকিছু। একটি জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যদি শ্রমিকদের দাপটে সরকারকে জনগণের ওপর দায় ফেলে দিতে হয়, তাহলে আমাদের বলার কিছু থাকে না। পরিবহনে অনৈতিক ভাড়া বৃদ্ধি তার প্রভাবে পণ্য মূল্য বাড়ছে। এই নৈরাজ্য কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের উচিত ঘুরে দাঁড়িয়ে এই নৈরাজ্য ঠেকানো। সরকার কি তা পারবে?

২.

গত বছর মার্চের প্রথম সপ্তাহে শনাক্ত হলো করোনা। তারপরে মৃত্যু যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়াল। ঢাকার স্বাভাবিক পরিস্থিতি বদলে গেল। মানুষ নিরুপায় হয়ে গেল। লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, স্যানিটাইজার, মাস্ক কত নতুন সব শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলাম আমরা। উন্নত দেশগুলোতে মৃত্যুর পরিণতি দেখে সন্ত্রস্ত হলো মানুষ। কোন ওষুধে এর থেকে মুক্তি মিলবে তাও জানে না কেউ। ধীরে ধীরে ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হলো দেশে দেশে। আমাদের দেশে সে ভ্যাক্সিন আসতে শুরু করল।

মানুষ আশায় বুক বাঁধল এর মধ্যে আমরা হারালাম অসংখ্য গুণী মানুষকে। হারালাম আত্মীয়স্বজনকে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা থেমে থাকেনি। তারা ভ্যাক্সিনের পর এবারে বাজারে এনেছে ট্যাবলেট আকারে করোনার ওষুধ। এখন পাশের দোকানেই পাওয়া যাবে করোনার ওষুধ। করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় মুখে খাওয়ার ক্যাপসুল ‘মলনুপিরাভির’ জরুরি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এতদিন করোনার চিকিৎসায় টিকা ছাড়া কোনো সুনির্দিষ্ট ওষুধ ছিল না। গত ৪ নভেম্বর মলনুপিরাভির নামের নতুন ওষুধের অনুমোদন দেয় যুক্তরাজ্য সরকার।

এ ছাড়া ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি ও যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসহ (এফডিএ) বিশ্বের অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থায় মলনুপিরাভিরের অনুমোদন পর্যালোচনাধীন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মার্ক, শার্প অ্যান্ড ডোম (এমএসডি) ও রিজব্যাক বায়োথেরাপিউটিকসের যৌথ গবেষণায় ওষুধটি তৈরি হয়। এটি ক্যাপসুল আকারে মুখে খেতে হয়। ওষুধটি ব্যবহারে করোনা আক্রান্ত হলেও খুব কমসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে বলে গবেষণায় জানা গেছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে করোনার এই বড়ি অনুমোদন পেল দেশে। আশা করা হচ্ছে, ওষুধটি মৃত্যু ঠেকাতে ও হাসপাতালে ভর্তি অর্ধেক কমাবে। তবে ওষুধটি ব্যবহারে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। করোনা আক্রান্ত রোগীকে এই ক্যাপসুলটি দিনে ৮টি করে মোট ৫ দিন খেতে হবে জানিয়ে এর প্রতিটির দাম কত পড়বে তা-ও বলে দিয়েছেন ডিজি। তিনি বলেছেন, ২০০ মিলিগ্রামের প্রতিটির ক্যাপসুলের দাম ৫০ টাকা করে পড়বে। সরবরাহ বাড়লে দাম কমতে পারে। ১৮ বছরের বেশি যেকোনো ব্যক্তি এটি সেবন করতে পারবেন। মলনুপিরাভির করোনা চিকিৎসার জন্য তৈরি মুখে খাওয়ার প্রথম ওষুধ।

এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য যেমন আনন্দের সংবাদ তেমন দেশের জন্যও। করোনা চিকিৎসায় দেশ আরও অনেক দূর এগিয়ে গেল এটা নিঃসন্দেহে অভিনন্দনযোগ্য। আমরা চাই এর যথাযথ প্রয়োগ হোক এবং দেশের ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীদের সিণ্ডিকেটও বিশাল। তারা এর নাগাল পেলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটাবে। ভেজালকারী গোষ্ঠী যাতে এর নাগাল না পায় এর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নজর রাখতে হবে।

লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ
বাড়তি ভাড়া না দিতে বাসমালিকের অনুরোধ
লাল স্টিকারে ডিজেল, সবুজে চেনা যাবে সিএনজিচালিত গাড়ি  

শেয়ার করুন

মন্তব্য

রাজপথে শিক্ষার্থী: সমাধান সহজ  

রাজপথে শিক্ষার্থী: সমাধান সহজ  

বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন একজন ছাত্রের খরচ বেড়ে গিয়েছে ৩০/৪০ টাকা। একদিকে খরচের চাপ অপরদিকে অযৌক্তিক তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি তাদেরকে প্রতিবাদী করে তুলেছে। তারা চাইছে পরিবহনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করার অধিকার। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। ’৬৯ সালের ১১ দফাতেও পরিবহনে কনসেশনের দাবি ছিল। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া চালু হয়। আর এখন তো শিক্ষার্থীরা খবর পাচ্ছে যে, ভারত-নেপাল, শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাস, টিকেট, কনসেশনের ব্যবস্থা আছে।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছে গণপরিবহনে বিশেষত বাসে তাদের হাফ ভাড়া কার্যকরের জন্য। দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এখন স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনেও নাভিশ্বাস, কারণ দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে এমন কোনো জিনিস নেই যা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে না। মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় চাল-চিনি, আটা-তেলসহ খাদ্যপণ্য তো আছেই- রান্নার গ্যাস-বিদ্যুৎ, পানি সব কিছুর দাম বাড়াতে তেমন কোনো অজুহাত এখন প্রয়োজন হয় না।

ব্যবসায়ীদের আবদার এবং সরকারের অনুমোদন একটা যুগলবন্দির মতো পরিবেশ তৈরি করেছে। পরস্পর পরস্পরকে সহায়তা করে সরকার ও ব্যবসায়ীদের এই যৌথ সংগীতের মূর্ছনায় সাধারণ মানুষের মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম। এর সঙ্গে আছে ক্ষমতাসীন দলের উচ্চপর্যায়ের নেতা-মন্ত্রীদের উপদেশ ও অপমানসূচক কথা। বিদেশিরা চাল-গম কম খায়, আমরা ভাত বেশি খাই তাই খাদ্যঘাটতি।

অতএব ভাত কম খাওয়ার পরামর্শ দেয়ার সহজ পথ বেছে নিয়েছেন তারা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যায় মুনাফার ব্যাপারে নীরবতা ভীষণ অর্থ বহন করে। এর পর আবার বলা হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলে সব তেল ভারতে পাচার হয়ে যাবে কিন্তু সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্ব যাদের তাদের সতর্ক না করে শাস্তি দিলেন সাধারণ মানুষকে। কৃষকরা কম দামে তেল পেলে তা কৃষি উৎপাদনে সহায়ক হতো কি না সে বিষয় কি আলোচনার অপেক্ষা রাখে?

কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বোরো মৌসুমে কৃষিতে ৭৫০ কোটি টাকার বেশি বাড়তি খরচ করতে হবে ধানচাষিকে। দেশের ১৬ লাখ সেচ পাম্পের ৭০ শতাংশের বেশি চলে ডিজেল দিয়ে। এতে প্রতি বিঘায় সেচ খরচ বাড়বে ৩০০ টাকার বেশি। আমন ধান কাটা শেষ। বোরো মৌসুম শুরু হবে। এই বোরো মৌসুমে দেশের ধানের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদন হয়। ফলে সরকার তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব কৃষকের খেতে আর জনগণের পাতে সরাসরি পড়বে।

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাড়িয়ে দেয়া হলো পরিবহনের ভাড়া। সরকার তেলের দাম বাড়াল ২৩ শতাংশ। পরিবহনের ব্যয়ের ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল একমাত্র উপাদান নয়। বাস বা ট্রাকের দাম, পরিচালনা খরচ, ড্রাইভার হেলপারের বেতন, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, অবচয়, অদৃশ্য খরচ (বিআরটিএর ঘুষ, পুলিশ খরচ, চাঁদা ইত্যাদি), কত সিট খালি থাকে ইত্যাদিসহ ১৬ ধরনের বিষয় যুক্ত করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়ে থাকে বলে জানা যায়। সাধারণত মোট খরচের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হয়ে থাকে জ্বালানি তেলবাবদ।

এক হিসাবে দেখানো হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাসের ভাড়া ৬ থেকে ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। কিন্তু ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২৭ শতাংশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরে প্রতি কিলোমিটারে ৪৫ পয়সা বাড়িয়ে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২ টাকা ৫ পয়সা। কিন্তু ভাড়া তো আগেও বেশি নেয়া হতো এখন তা আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

যেমন প্রেস ক্লাব থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত দূরত্ব ৪ কিলোমিটারের বেশি নয়। বর্ধিত ভাড়া অনুযায়ী এই ভাড়া হওয়ার কথা ৮ টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু আগে নেয়া হতো ১০ টাকা এখন তা নেয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। সাধারণ মানুষ বাসে প্রতিদিন ঝগড়া করছেন বাড়তি ভাড়া নিয়ে। বাসের কন্ডাকটর বলছেন মালিক প্রতি ট্রিপে তার জমা বাড়িয়েছেন ১৫০০ টাকা। বেশি ভাড়া আদায় না করলে তারা এটা দেবেন কোথা থেকে? ঝগড়া কখনও রূপ নিচ্ছে মারামারিতে। যাত্রী আর পরিবহন শ্রমিক মারামারি করছেন, মুনাফা যাচ্ছে পরিবহন মালিকের পকেটে।

শিক্ষার্থীরা তুলনামুলকভাবে সংগঠিত। কলেজের সামনে থেকে বাসে ওঠে, কলেজের সামনে নেমে যায়। ফলে তারা শক্তি দেখাতে পারে। বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিন একজন ছাত্রের খরচ বেড়ে গিয়েছে ৩০/৪০ টাকা। একদিকে খরচের চাপ অপরদিকে অযৌক্তিক তেলের দাম ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি তাদেরকে প্রতিবাদী করে তুলেছে।

তারা চাইছে পরিবহনে অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করার অধিকার। এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি। ’৬৯ সালের ১১ দফাতেও পরিবহনে কনসেশনের দাবি ছিল। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাফ ভাড়া চালু হয়।

আর এখন তো শিক্ষার্থীরা খবর পাচ্ছে যে, ভারত-নেপাল, শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানসহ অনেক দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পাস, টিকেট, কনসেশনের ব্যবস্থা আছে। ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলের উন্নয়ন দেখছে যে ছাত্র, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হিসাব পত্রিকায় পড়ছে, দুরন্ত গতিতে দেশ এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শুনছে নেতাদের কাছ থেকে তাহলে শিক্ষার্থীদের, যাদের ওপর নির্ভর করবে দেশের অগ্রযাত্রা তাদের জন্য রাষ্ট্র ভর্তুকি দেবে না কেন? এই ভর্তুকির টাকা তো আসবে জনগণের কাছ থেকে।

জনগণের টাকা তাদের সন্তানদের জন্য ব্যয় করা হবে না কেন? কেন তাদের সন্তানরা পরিবহন মালিকদের মুনাফার শিকারে পরিণত হবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ডের সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব নেয়া হবে না কেন, যাতে পরিবহন মালিকরা তাদের কাছে হাফ ভাড়া নেন। একজন ছাত্র গড়ে কতবার বাসে ওঠে, তার কাছে হাফ ভাড়া নিলে কত টাকা কম আয় হবে, এর কত অংশ সরকার দেবে, কত অংশ মালিক বহন করবে এ নিয়ে একটা সমীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া কি খুব কঠিন বিষয়?

ছাত্র এবং পরিবহন শ্রমিক মুখোমুখি বিরোধে জড়ালে যে আর্থিক ক্ষতি ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হয় তার তুলনায় কি হাফ ভাড়া অনেক কম নয়? সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পরিবহন কার্ড পেতে পারে, রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিবহন বরাদ্দ দিতে পারে কি না, ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকার শিক্ষা বাজেটে আর কত টাকা বরাদ্দ বাড়ালে পরিবহনে সাবসিডি দেয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করা এখন জরুরি।

প্রতিদিন সংঘাত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের, কখনও কখনও আক্রান্ত হচ্ছে পরিবহন শ্রমিকরা। ভাড়া বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকরা যুক্ত না থাকলেও ভাড়া আদায়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে শ্রমিকরা যুক্ত বলে ছাত্র এবং যাত্রীদের ক্ষোভের প্রধান টার্গেট হয়ে পড়ে পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে প্রতিদিন কিছু না কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। শিক্ষার্থীরা যেমন হাফ ভাড়ায় যাতায়াত করতে চায়, তেমনি ঝগড়া ও সংঘাত থেকে পরিবহন শ্রমিকরাও পরিত্রাণ চায়। এই প্রসঙ্গে কিছু বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে-

১. সরকার সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিসি পরিচালিত বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া নেয়া হবে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কীভাবে তা জানা থাকলে আমাদের জন্য ভালো হতো। তা না হলে বিআরটিসির বাসে হাফ ভাড়া অন্য বাসগুলোতে কেন নয়- বলে উত্তেজনা আরও বাড়বে।

২. হাফ ভাড়া শিক্ষার্থীরা দেবে বাকি টাকা পূরণ করা হবে কীভাবে এবং কোন তহবিল থেকে?

৩. সারা দেশে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসার ক্ষেত্রে বাস ব্যবহার করে কতজন শিক্ষার্থী? হাফ ভাড়া নিলে ভর্তুকি কত টাকা দিতে হবে?

৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা কীভাবে কনসেশন প্রদান করে তা জানা দরকার।

৫. শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন কার্ড চালু করা দরকার যা প্রতিষ্ঠান প্রদান করবে। তাহলে যাত্রী কোন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র তা নিশ্চিত সম্ভব হবে।

৬. এ বছর শিক্ষাবাজেট ৭১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মিলে মোট বাজেট দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। প্রতিবছর শিক্ষাবাজেট থেকে বেশ কিছু টাকা ফেরত যায়। ফেরত যাওয়া এই টাকাটা পরিবহন ভর্তুকি হিসেবে দেয়া যেতে পারে।

৭. যে সমস্ত পরিবহন শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া কার্যকর করবে, তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৮. দেশের ছাত্রসমাজের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। তাদের শিক্ষা সহায়ক কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিবহনে সাবসিডি দেয়া এবং একটি যুক্তিসংগত নিয়ম-বিধি প্রণয়ন করা হলে তা ছাত্র এবং পরিবহন শ্রমিক উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক।

৯. দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে নগর পরিবহন আছে আবার এই দুই শহরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছাত্রসংখ্যা বেশি। বাকি সারা দেশে সাধারণত স্বল্প দূরত্বে শিক্ষার্থীরা বাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা করে। এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিবহন সহায়তার জন্য বাজেটে থোক বরাদ্দ করা যেতে পারে।

১০. বিভিন্ন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরিবহন ফি নেয়া হয়। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন ও ফি বেশি। উভয়ক্ষেত্রেই যারা গণপরিবহনে যাতায়াত করে তাদের কাছ থেকে নেয়া পরিবহন ফি এবং সরকারপ্রদত্ত বরাদ্দ দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

১১. সরকার, পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও ছাত্র প্রতিনিধি সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। তাহলে যেকোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন:
যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ
বাড়তি ভাড়া না দিতে বাসমালিকের অনুরোধ
লাল স্টিকারে ডিজেল, সবুজে চেনা যাবে সিএনজিচালিত গাড়ি  

শেয়ার করুন

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তিনি যে অভিযোগগুলো করেছেন তা কি ভিত্তিহীন? ১৫ আগস্টের দায়ভার থেকে কি জিয়া পুরোপুরি মুক্ত? জিয়াউর রহমান কি ১৫ আগস্টের খুনিদের পুরস্কৃত করেননি? ১৫ আগস্টে নিজের ভুয়া জন্মদিন পালন করে তিনি কি সমঝোতার পথ রুদ্ধ করে দেননি? ২১ আগস্টের খুনিদের তিনি বিচার না করে মদদ দেননি? প্রধানমন্ত্রীর এ অভিযোগগুলোর কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়।

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের সিসিইউতে রয়েছেন। বিএনপির দাবি তাকে সুস্থ করে তুলতে হলে এ মুহূর্তে বিদেশে নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চপর্যায় থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তাকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়া সম্ভব নয়।

খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, উচ্চরক্তচাপ, কিডনি, ফুসফুস, চোখের সমস্যাসহ নানা রোগে ভুগছেন। তার হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে দুবার। চোখেও অপারেশন হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন কোভিডে। কোভিড-পরবর্তী জটিলতায় তার ফুসফুস, লিভার, হার্ট ও কিডনির অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে বলে জানা যায়। এমতাবস্থায় তিনি ২০১৮ সাল থেকে কারাভোগ করছেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে বিএনপির দাবি, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তার বিরুদ্ধে সব মামলাই মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক। তবে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ বিএনপি করতেই পারে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলার সুযোগ নেই। আদালতে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এবং তিনি সাজাপ্রাপ্ত।

খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঁচবার আবেদন করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা প্রসঙ্গে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা তিনি ইতোমধ্যেই ব্যবহার করেছেন। আমার হাতে যেটুকু পাওয়ার, সেটুকু আমি দেখিয়েছি। এখানে আমার কিছু করার নাই। আমার যেটা করার, আমি করেছি। এটা এখন আইনের ব্যাপার। খালেদা জিয়াকে যে কারাগার থেকে বাসায় থাকতে দিয়েছি, চিকিৎসা করতে দিয়েছি, এটাই কি বেশি নয়?’

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে বিএনপিপন্থিরা নাখোশ হয়েছেন। তা হতেই পারেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সবগুলো কথাই সঠিক বলেছেন। তিনি তার হাতে যে ক্ষমতা আছে সেটা প্রয়োগ করেছেন। মানবিকতা দেখিয়ে তিনি খালেদা জিয়াকে বুয়াসহ জেল ও বর্তমানে সাজা স্থগিত রেখে বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন। এগুলো তিনি মানবিকতা দেখিয়েই করেছেন।

কিন্তু খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তিনি যে অভিযোগগুলো করেছেন তা কি ভিত্তিহীন? ১৫ আগস্টের দায়ভার থেকে কি জিয়া পুরোপুরি মুক্ত? জিয়াউর রহমান কি ১৫ আগস্টের খুনিদের পুরস্কৃত করেননি? ১৫ আগস্টে নিজের ভুয়া জন্মদিন পালন করে তিনি কি সমঝোতার পথ ‍রুদ্ধ করে দেননি?

২১ আগস্টের খুনিদের তিনি বিচার না করে মদদ দেননি? প্রধানমন্ত্রীর এ অভিযোগগুলোর কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়। তবে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা প্রশ্নে বিএনপি এখন যথেষ্ট নমনীয়। তারা পাল্টা যুক্তির পথে না গিয়ে বিদেশে চিকিৎসার বিষয়টিকে মানবিকতার সঙ্গে দেখার দাবিই করে আসছেন। সেই সঙ্গে হয়তো কিছু আইনি ও রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন।

খালেদা জিয়ার জীবনমৃত্যুর প্রশ্নটিকেই তারা বড় করে দেখছেন। খালেদা জিয়া একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ও যথেষ্ট অসুস্থ। এছাড়া তিনি তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও একজন বীরোত্তমের স্ত্রী। বিএনপি এ কথাগুলোই বার বার বলছে। কিন্তু একজন ভিকটিম বা সংক্ষু্ব্ধ ব্যক্তির কাছে তিনি শুধুই একজন হুকুমের আসামি ও বর্তমানে দণ্ডিত কয়েদি।

বিএনপি খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিকে রাজনৈতিকভাবেই আদায় করতে চায় বলেই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি গত ১২ বছরে কোনো দাবিই আদায় করতে পারেনি। খালেদা জিয়ার বিচারের বিষয়টিকেও তারা প্রথমে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি।

পরে আইনগতভাবে মোকাবিলা করতে চেয়েছিল, সেখানেও ব্যর্থ হয়েছে। শেষমেশ তাকে কারাগারেই যেতে হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দাবি আদায়ের শক্তি ও কৌশল কোনোটিই বিএনপি দেখাতে পারেনি। এখনও তারা একটি আইনগত বিষয়কে আইনি প্রক্রিয়ায় সুরাহা করার চেষ্টা না করে রাজনৈতিক ইস্যু বানাতে চায়।

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিই এ মুহূর্তে তাদের একমাত্র রাজনৈতিক পুঁজি। নেত্রীর অসুস্থতাকে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের হাতিয়ার বানানো বা তার বিদেশে চিকিৎসার দাবির আড়ালে দলকে রাজপথমুখী করা মূলত এক ধরনের রাজনৈতিক দেউলিয়ার বহিঃপ্রকাশ।

দাবি আদায়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকতেই পারে। কিন্তু এ বিষয়টি সুরাহা করতে হলে আইনগতভাবেই করতে হবে। কারণ, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা বা মুক্তির বিষয়টি অনেক আগেই আইনের আওতাধীন একটি বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কাজেই, এ বিষয়টি আইনগতভাবেই সমাধান করতে হবে। আওয়ামী লীগও যদি খালেদা জিয়াকে মু্ক্তি দিতে চায় বা বিদেশে চিকিৎসা দিতে চায় তাকেও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তা করতে হবে।

বিএনপি নেত্রী গত এক দশক ধরেই শোচনীয় অবস্থার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় ও নিয়মের কারণে বাসা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। বিচার শেষে তিনি কারাভোগ করেছেন। বর্তমানে সাজা স্থগিত আছে। সাজাভোগের এ মধ্যবর্তী অবস্থায় আওয়ামী লীগ তার প্রতি আরও মানবিকতা দেখাবে কি না সেটি একান্তই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যাপার। তবে সেই মানবিকতা দেখালেও তা আইনানুযায়ীই হতে হবে। আইনে এখনও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখানোর সুযোগ আছে।

মানবিক কারণ বিবেচনা করেই অনেক সময় আসামিকে জামিন প্রদান করা হয় ও তার সাজা স্থগিত করা হয়। বিচারকালীন জামিন প্রদান করা আদালতের কাজ। আদালত মানবিক বিবেচনায় জামিন দিতে পারেন। সাজা হয়ে গেলে সরকার মানবিক বিবেচনায় সাজা স্থগিত করতে পারে।

এটাই ফৌজদারি আইনের বিধান। এছাড়া রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টিও রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমার এ বিষয়টিও পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের অংশ। রাষ্ট্রপতি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে যেকোনো আসামিকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। বিএনপি দাবি করতেই পারে যে, এ দেশে খুনের আসামিকেও রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করেছেন। সেখানে তিনবারের নির্বাচিত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা করতে বাধা কোথায়?

এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি পরিষ্কার। তিনি ইতোমধ্যে মানবিকতা দেখিয়েছেন। মানবিক কারণেই তিনি এখন বাসায় আছেন। তার সাজা স্থগিত আছে। মানবিক কারণেই তার দেখভাল করার জন্য একজন কাজের বুয়াকেও সঙ্গে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এসবই সত্য। বিএনপির দাবি, সেই মানবিকতাকে আরও প্রসারিত করে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো!

আইনমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদিও ফৌজদারি কার্যবিধি ভিন্ন কথা বলে। বর্তমানে তার সাজা স্থগিত রয়েছে। তবে কিছু শর্ত রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম শর্ত হচ্ছে, তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। (ফৌজদারি কার্যবিধির সিআরপিসি) ৪০১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইলে সরকার যে কোনো সময় বিনা শর্তে বা দণ্ডিত যাহা মানিয়া নেয় সেইরূপ শর্তে যে দণ্ডে সে দণ্ডিত হইয়াছে, সেই দণ্ডের কার্যকরীকরণ স্থগিত রাখিতে বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করিতে পারিবেন।’

কাজেই সরকার চাইলে শর্ত তুলে নিয়ে সাজা স্থগিত করতে পারে। এমনকি সাজা মওকুফও করতে পারে। সিআরপিসি’র ৪০১ (৬)-এর অধীনে তাকে কয়েকটি শর্ত দিয়ে সাজা স্থগিত করা হয়েছে। ৪০১(৬) ধারা বলছে, ‘সরকার সাধারণ বিধিমালা বা বিশেষ আদেশ দ্বারা দণ্ড স্থগিত রাখা এবং আবেদনপত্র স্থগিত রাখা এবং আবেদনপত্র দাখিল ও বিবেচনার শর্ত সম্বন্ধে নির্দেশ দিতে পারিবেন।’

কাজেই ৪০১(৬) ধারা প্রয়োগ করে যে নির্বাহী আদেশে শর্ত দিয়ে সাজা স্থগিত করা হয়েছে, সেই একই ধারা প্রয়োগ করে আরেকটি নির্বাহী আদেশে জারি করে উক্ত শর্তটি তুলে দিলেই তার বিদেশে যাওয়ায় আর কোনো বাধা থাকে না। বিএনপি সেই দাবিটিই করছে। অর্থাৎ নির্বাহী আদেশটি আরেকবার পরিবর্তন করে জারি করাই যথেষ্ট। তবে, এক্ষেত্রে ৪০১(২) ধারা অনুযায়ী আসামির তরফ থেকে আবেদন করতে হবে।

এছাড়াও সরকার চাইরে The Probation of offenders Ordinance ১৯৬০ ও The Probation of offenders Rules ১৯৭৫ অনুযায়ীও যেকোনো সময় যেকোনো সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দিতে পারে।

সরকার থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার কথা আগেও বলেছে। কিন্তু বিএনপি সে পথে যায়নি। তারা কৌশলগত কারণেই সে পথে যায়নি। কারণ, ক্ষমা চাইতে হলে দোষ স্বীকার করতে হবে, মানে সব অভিযোগ স্বীকার করে নিতে হবে। তবে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমা করার অধিকারটি সার্বভৌম নয়।

কারণ, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি কেবল প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া সব ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। কাজেই ক্ষমা করার অধিকারটিও প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিনি চাইলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমাও মিলতে পারে। কিন্তু বিএনপি সে পথে যাবে কি না সেটাই প্রশ্ন।

দুই নেত্রীর মধ্যে আজকে বিভেদের দেয়াল থাকলেও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সদ্ভাব ও সহমর্মিতার কথাও আমরা ভুলে যাইনি। এক/এগারোকালে শেখ হাসিনা বন্দি হলে খালেদা জিয়া তার মুক্তির দাবি করেছিলেন। পরে খালেদা জিয়াও অন্তরীণ হলে দুই নেত্রী পাশাপাশি থেকেছেন। তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে।

শেখ হাসিনা তাকে রান্না করা খাবারও পাঠিয়েছেন। শেখ হাসিনার মুখেই আমরা একথা শুনেছি। এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দুই নেত্রীর সেই হাস্যোজ্জ্বল মুখ এদেশের জনগণের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এক মুহূর্ত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দুই নেত্রীর নিজস্ব একটি জায়গা আছে। সেখানে তারা অনন্য।

অতীতে তাদের দুইজনকেই রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। তাদের বিকল্প তারা নিজেরাই। এই দুই দল ও নেত্রীর মধ্যে শত বিভেদ থাকলেও তাদের একটু পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ও এদেশের মানুষকে যার পর নাই আশান্বিত করে।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে মানবিকতা দাবি করছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ও ক্ষোভ তার ঊর্ধ্বে উঠে আরও মানবিকতা দেখাবেন কি না সেটি একান্ত তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে এ ব্যাপারে তাকে দায়ী করা কোনোভাবেই সংগত হবে না। বিশেষ করে ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ গুরুতর।

বঙ্গবন্ধুকন্যা, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দুবারের বিরোধীদলীয় নেত্রী, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, মাদার অব হিউম্যানিটি ও একজন নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, দুবারের বিরোধী দলের নেত্রী, বিরোত্তমের স্ত্রী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী ও একজন মরণাপন্ন বয়োবৃদ্ধ নারী খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেন অথবা না দেন-দুটোই আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ
বাড়তি ভাড়া না দিতে বাসমালিকের অনুরোধ
লাল স্টিকারে ডিজেল, সবুজে চেনা যাবে সিএনজিচালিত গাড়ি  

শেয়ার করুন

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও বিএনপির মামাবাড়ির আবদার  

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও
বিএনপির মামাবাড়ির আবদার  

খালেদা জিয়া যে মামলায় দণ্ড ভোগ করছেন সেটা তো আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। তারপরও বিএনপি অভিযোগ করে আসছে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে সরকার তাদের নেত্রীকে কারাদণ্ড দিয়েছে। মামলার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এতিমের টাকা আত্মাসাতের কারণে দুদক ২০০৮ সালের ৪ জুলাই এ মামলাটি করে। এ মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার পুত্র তারেক রহমানও আসামি ছিলেন।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে দেশবাসী ধোঁয়াশার মধ্যে আছে। কখনও মুত্যুগুজব, কখনও বলা হচ্ছে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে, আবার কখনও শোনা যাচ্ছে তিনি মোটামুটি সুস্থ আছেন। এ প্রসঙ্গে ঈশপের একটি গল্প মনে পড়ে গেল। যদিও গল্পটি প্রায় সবাই জানে। এক মিথ্যাবাদী রাখাল বালক প্রতিদিন বাঘ আসছে, বাঘ আসছে বলে গ্রামবাসীকে মিথ্যে ভয় দেখাত। সত্যিই একদিন যখন বাঘ এল, সেদিন কিন্তু তার কথাকে আর কেউ বিশ্বাস করে এগিয়ে যায়নি। পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়েছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে।

বেগম জিয়া জেলে যাওয়ার পর থেকেই বিএনপির নেতারা বলে আসছে- তিনি মারাত্মক অসুস্থ, জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, সরকার চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছে এসব অবান্তর গল্প শুনতে শুনতে জনগণ এখন ক্লান্ত। এখন তাদের কোন কথা সত্য আর কোনটি মিথ্যা সাধারণ মানুষ যথেষ্ট সন্দিহান।

খালেদা জিয়া যখন জেলে ছিলেন তখন বিএনপি থেকে দাবি করা হতো তাকে বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু তিনি মুক্তি পাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে চিকিৎসা নিচ্ছেন এভারকেয়ার হাসপাতালে (সাবেক অ্যাপোলো) আবার যখন নিজেরদের পছন্দমতো হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে তখন আবার নতুন উছিলা তুলেছে, খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিএনপি যে রাজনীতি করছে সেটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তাদের নেত্রীর সুচিকিৎসার থেকে বেশি মনোযোগ রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করে সরকারকে বিব্রত করা। বিএনপির নেতারা সচেতনভাবে জানেন একজন দণ্ডিত আসামির বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ নেই। তারপরও তারা এই বিষয়টি নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করতে চাইছে।

খালেদা জিয়া যে মামলায় দণ্ড ভোগ করছেন সেটা তো আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। তারপরও বিএনপি অভিযোগ করে আসছে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে সরকার তাদের নেত্রীকে কারাদণ্ড দিয়েছে। মামলার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এতিমের টাকা আত্মাসাতের কারণে দুদক ২০০৮ সালের ৪ জুলাই এ মামলাটি করে। এ মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার পুত্র তারেক রহমানও আসামি ছিলেন।

পিতা মারা গেলে পুত্র এতিম হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তারেক জিয়া নিঃসন্দেহে এতিম হন। কিন্তু মা যখন প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান তখন কি আর ছেলেটা এতিম থাকে? ১৯৯১ সালে সৌদি আরব বাংলাদেশের এতিমদের সহায়তার জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে’ সাড়ে ৪ কোটি টাকা দান করে। পরবর্তী সময়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল নামে ভুয়া দুটি ট্রাস্ট গঠন করে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সমুদয় অর্থ আত্মসাৎ করে খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমান।

জিয়া অরফানেজ মামলায় এতিমের টাকা আত্মসাতের কারণে বিচারিক আদালত খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। তবে হাইকোর্টে সাজা বাতিল চেয়ে আবেদন করলে উল্টো সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে দেন। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায়ও খালেদা জিয়াকে আরও ৭ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।

খালেদা জিয়া কতটুকু অসুস্থ সে বিষয়ে সার্টিফিকেট দেবে চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকরা। গণমাধ্যমসূত্রে জানা যাচ্ছে, এভারকেয়ার হাসপাতালে বিশজনের চিকিৎসক প্যানেল বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। কিন্তু চিকিৎসকরা তার অসুস্থতা বিষয়ে মুখে কলুপ এঁটেছেন। প্রতিদিন বিএনপি নেতারা বলে যাচ্ছেন, খালেদা জিয়া জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছেন। যে কথাটা বলার কথা চিকিৎসকদের, কিন্তু সেটি বলে যাচ্ছে ফখরুল সাহেবরা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা এবিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব। বিএনপি নেত্রী কেমন আছেন সেটা জানার অধিকার জনগণের আছে। কিন্তু জনগণ তো দূরের কথা বিএনপির নেতাকর্মীরাই ধোঁয়াশার মধ্যে আছে, আদৌ তাদের নেত্রীর কী অবস্থা। বিএনপি নেত্রী এখন মুক্তভাবে জীবনযাপন করছেন। পরিবার ও দলের কিছু নেতা চিকিৎসা-সংশ্লিষ্টতায় জড়িত। তারা ছাড়া সবাইকে অসুস্থতার বিষয়টি নিয়ে অন্ধকার রাখা হচ্ছে। এখানেই রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির আভাস পাওয়া যায়।

খালেদা জিয়া এবারই প্রথম হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, এমনটি নয়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর ৬ অক্টোবর অসুস্থবোধ করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেয়া হয়। সেসময় এক মাসেরও বেশি হাসপাতালে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আবার অসুস্থবোধ করলে ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল পুনরায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মুক্তির আগপর্যন্ত সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার মহানুভবতার কারণে করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার আগে ২৫ মাস কারাভোগের পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়া। এরপর আরও তিনদফা সাজা স্থগিতের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তার মুক্তির ক্ষেত্রে শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না এবং দেশের পছন্দমতো যেকোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন।

বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার অজুহাতে মাঠ গরম করার দিকে বেশি তৎপর হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে আদৌ আন্তরিক মনে হচ্ছে না। খালেদা জিয়ার বিদেশ যেতে বাধা থাকলেও বিদেশ থেকে ডাক্তার আনার ক্ষেত্রে তো কোনো বাধা নেই। কিন্তু সেদিকে বিএনপির কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

বিএনপি যদি প্রকৃতপক্ষেই খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার কথা ভাবত তাহলে তারা আন্দোলনের নামে জলঘোলা না করে চিকিৎসার দিকে আরও বেশি নজর দিত। কথায় কথায় আন্দোলনের হুমকি, সরকার পতনের কথা বলত না। সরকারের কাছে দেনদরবারের পাশাপাশি আইনগতভাবে প্যারোলে মুক্তির জন্য চেষ্টা করতে দেখতে পারত।

মির্জা ফখরুল বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে নাকি স্লো পয়জনিং করা হচ্ছে। বেগম জিয়া ২১ মাস ধরে মুক্ত আছেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকেন। আর আশপাশে ঘোরাঘুরি করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। আর ব্যক্তিগত পছন্দের চিকিৎসকরাই তাকে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।

তাহলে স্লো পয়জনিং যদি কেউ করে থাকেন তাহলে আপনজনদের মধ্যেই তো কেউ করেছেন। এখানে তো সরকারের করার কোনো সুযোগই নেই। আবার তিনি এ-ও বলছেন, খালেদা জিয়ার রোগনির্ণয়ের প্রযুক্তি দেশে নেই। এসব উদ্ভট কথা বলে তিনি জনগণের কাছে সার্কাসের জোকারে পরিণত হয়েছেন।

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে বিদেশে চিকিৎসা দেয়ার উদাহরণ কি আছে? নেই, সেটা জেনেও বিএনপি খালেদা জিয়াকে পুঁজি করে আন্দোলনের ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে।

বিএনপি-জামায়াতপন্থি কিছু কথিত বুদ্ধিজীবী টেলিভিশনে গলা ফাটাচ্ছে সরকারের উচিত মানবিক কারণে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো। যারা মানবিক হওয়ার কথা বলেন, তারা কি কখনও নিজেরা আত্মোপলব্ধি করেছেন যে, শেখ হাসিনা কতটা মানবিক হলে খালেদা জিয়াকে নির্বাহী ক্ষমতার বলে সাজা স্থগিত করে মুক্তভাবে চলাফেরা সুযোগ করে দিয়েছেন। শুধু কি তাই? বেগম জিয়া যখন জেলে ছিলেন তখন তাকে দেখাশোনার জন্য ব্যক্তিগত গৃহপরিচারিকা ফাতেমাকে সঙ্গে থাকার সুযোগ করে দেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেই এমন উদারতা দেখাতে পারেন।

যেসব বুদ্ধিজীবী খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠাতে উঠে পড়ে লেগেছেন তারা কি নিশ্চয়তা দিতে পারবেন খালেদা জিয়া বিদেশে থেকে চিকিৎসা শেষে আবার দেশে ফিরে আসবেন? বেগম জিয়ার পুত্র তারেক রহমান যিনিও একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তিনি ১৪ বছর ধরে চিকিৎসার কথা বলে পালিয়ে আছেন।

বিএনপি নেতাদের তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন করলে বলেন, তিনি চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরবেন। তারেক রহমান এমন কী রোগে আক্রান্ত যে চৌদ্দ বছরে সুস্থ হতে পারেননি। এটা হলো রাজনৈতিক অসুস্থতা। খালেদা জিয়াও একবার দেশ ছাড়তে পারলে আর ফিরে আসবেন না, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তখন মা-ছেলে মিলে দেশের বিরুদ্ধে আরও জোরালোভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করবে।

বিএনপি নেতারা মায়াকান্না করলেও যার জন্য খালেদা জিয়ার এই পরিণতি তার সেই সুপুত্র তারেক রহমান একবারও মাকে দেখতে আসার আগ্রহ দেখাননি। অনেকে যুক্তি দেখান তিনি গ্রেপ্তার আতঙ্কে আসতে পারছেন না।

তারেক রহমান বিএনপির অন্যতম ‘শীর্ষনেতা’, তিনি কেন গ্রেপ্তারকে ভয় পাবেন? নৈতিকভাবে দুর্বল বলেই কারাগারকে ভয় পায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ঝড়ের রাতে প্রবল স্রোতে সাঁতার কেটে দামোদর নদী পার হয়ে অসুস্থ মার কাছে পৌঁছেছিলেন। আর তারেক রহমান অসুস্থ মাকে রেখে আরাম আয়েশ করে বেড়াচ্ছেন! এতেই বোঝা যায় মায়ের প্রতি তিনি কতটা উদাসীন! তিনি মাকে নিয়ে রাজনীতি করবেন নাকি মায়ের ভালোবাসার টানে দেশে ফিরে আসবেন এখন সেটিই দেখার সময় এসেছে।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

[email protected]

আরও পড়ুন:
যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ
বাড়তি ভাড়া না দিতে বাসমালিকের অনুরোধ
লাল স্টিকারে ডিজেল, সবুজে চেনা যাবে সিএনজিচালিত গাড়ি  

শেয়ার করুন

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কেন বিদেশে হবে?

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কেন বিদেশে হবে?

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সাংবিধানিকভাবেই তার ক্ষমতা এতই যে, তিনি শুধু প্রাকৃতিক বিষয়গুলোর বাইরে সব করতে পারেন। সুতরাং তিনি চাইলেই বিএনপির দাবি অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়া সম্ভব। কিন্তু তিনি কেন চাইবেন? যিনি বিশ্বাস করেন এবং আদালত যেখানে রায়ও দিয়েছেন যে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তাকে (তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা) হত্যার জন্য যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, সেটি তখনকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নির্দেশেই হয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, ‘বেগম জিয়া জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।’ তার সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান ২০ নভেম্বর ফেসবুকে লিখেছেন, খালেদা জিয়া তার পুরানো জটিল রোগগুলো ছাড়াও ডিকমপেন্স্যাটেড লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়েছেন।

শরীর থেকে রক্ত যেতে যেতে তার হিমোগ্লোবিন একেবারে কমে গেলে এবং রক্তবমি হতে থাকলে তাকে এবার হাসপাতালে নেয়া হয়। মারুফ কামাল খানের অভিযোগ: বেগম জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ এবং হার্ট, কিডনি ও চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি নিয়মিত চিকিৎসাধীন ও চিকিৎসকদের তদারকিতে ছিলেন। তাকে জেলে নেয়ার পর সব বন্ধ হয়ে যায়। উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হতে থাকে, তার অবস্থারও গুরুতর অবনতি ঘটে।

এ অবস্থায় কয়েকটি বিষয় ও প্রশ্ন সামনে আসছে।

১. বিএনপির দাবি ‘সুচিকিৎসার’ জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে যেতে দেয়া হোক।

২. দণ্ডবিধির ৪০১ ধারা প্রয়োগ করে খালেদা জিয়ার শাস্তি মওকুফ করা হোক। এই ধারায় বলা হয়েছে, সরকার যেকোনো সময় বিনাশর্তে বা দণ্ডিত ব্যক্তি যা মেনে নেয় সেরূপ শর্তে যে দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে, সেই দণ্ডের কার্যকরীকরণ স্থগিত রাখতে বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করতে পারবেন। তার মানে হলো- আদালত কোনো নাগরিককে কোনো অপরাধের জন্য দণ্ড দিলেও সরকার তার নির্বাহী ক্ষমতাবলে ওই দণ্ড মওকুফ বা স্থগিত করতে পারবেন। এটি সরকারের একটি বিরাট ক্ষমতা।

৩. খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে হলে অপরাধ স্বীকার করতে হবে। প্রশ্ন হলো- খালেদা জিয়া কেন তার ‘আপসহীন নেত্রী’র বিশেষণের সঙ্গে ‘আপস’ করে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইবেন এবং কেন নিজের অপরাধ স্বীকার করবেন?

৪. বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সাংবিধানিকভাবেই তার ক্ষমতা এতই যে, তিনি শুধু প্রাকৃতিক বিষয়গুলোর বাইরে সব করতে পারেন। সুতরাং তিনি চাইলেই বিএনপির দাবি অনুযায়ী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়া সম্ভব। কিন্তু তিনি কেন চাইবেন?

যিনি বিশ্বাস করেন এবং আদালত যেখানে রায়ও দিয়েছেন যে, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তাকে (তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা) হত্যার জন্য যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়েছিল, সেটি তখনকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের নির্দেশেই হয়েছে। সুতরাং যে দল তাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড মারল, সেই দলের শীর্ষ নেতার দাবি মেনে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর মতো মহানুভবতা তিনি কেন দেখাবেন? আমাদের দেশের প্রতিহিংসার রাজনীতিতে এই ধরনের মহানুভবতা বা পরমতসহিষ্ণুতা কবে ছিল?

৫. মির্জা ফখরুলের ভাষ্য জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণের সবশেষ পরিণতি হিসেবে যদি দেশের মাটিতেই খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়, তাহলে কী পরিস্থিতি তৈরি হবে এবং তার মৃত্যুর দায় সরকারের উপরে এসে পড়বে কি না?

৬. এখানে খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলে তার দল কি সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করে দেবে? সেই ক্ষমতা তাদের আছে বা জনগণ তাদের সেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে?

এসব প্রশ্নের নির্মোহ এবং পক্ষপাতমুক্ত উত্তর দেয়া যে কারো পক্ষেই কঠিন। তবে যে বিষয়টি এখন সামনে আনা দরকার তা হলো- খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য কেন বিদেশে নিতে হবে? দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের উপরে তার বা তার পরিবার ও দলের কেন আস্থা নেই? দেশে কি তার রোগের চিকিৎসা নেই? যদি না থাকে তাহলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পঞ্চাশ বছরে চিকিৎসাব্যবস্থার কী উন্নতিটা হলো?

কেন স্বাধীনতার ৫০ বছরেও দেশে এমন একটি চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা গেল না, যেখানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয়া যায় এবং সেই চিকিৎসার উপরে তার পরিবার ও দলের পূর্ণ আস্থা রয়েছে? কেন দেশের এমপি-মন্ত্রী এমনকি মহামান্য রাষ্ট্রপতিকেও চিকিৎসা, এমনকি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যও সিঙ্গাপুর যেতে হয়? কেন সামান্য একটু জটিল রোগ কিংবা দুর্ঘটনায় হাড়গোড় একটু বেশি ভাঙলেই তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠাতে হয়? কেন মেডিক্যাল কলেজগুলো থেকেও অসংখ্য রোগীকে ঢাকায় পাঠানো হয়? তাহলে এইসব মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা শহরের হাসপাতালগুলো রেখে লাভ কী?

খালেদা জিয়াকে বিদেশেই কেন নিতে হবে?

মারুফ কামাল খান লিখেছেন, খালেদা জিয়া তার পুরানো জটিল রোগগুলো ছাড়াও ডিকমপেন্স্যাটেড লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়েছেন। এর দুটি মাত্র চিকিৎসা। স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন থেরাপি এবং তাতেও কাজ না হলে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করা। এর কোনোটিই বাংলাদেশে সম্ভব নয় এবং করার সুযোগ নেই। তার দাবি, বর্তমানে খালেদা জিয়ার যে অবস্থা তাতে দেশে চিকিৎসার সুযোগ নেই বললেই চলে।

সরকারের তরফে বলা হচ্ছিলো, বিএনপি বা খালেদা জিয়ার পরিবার চাইলে তার চিকিৎসায় বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে বিএনপি নেতা তৈমুর আলম খন্দকার গত ২৬ নভেম্বর রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে বলেছেন, বিদেশ থেকে চিকিৎসক এনেও লাভ নেই। কারণ পরীক্ষার ল্যাব, যন্ত্রপাতি, হাসপাতাল সবই বাংলাদেশের— যার উপরে মানুষের আস্থা নেই। অতএব তাকে বিদেশেই নিতে হবে।

মুদ্রার অন্যপিঠ হলো- করোনার দুই বছরে দেশের মানুষ বিদেশে চিকিৎসা করাতে যায়নি বা যেতে পারেনি। এই সময়ের মধ্যে কি কেউ এমন কোনো অসুস্থ হননি যাতে করে তাকে বিদেশে নেয়ার প্রয়োজন ছিল? নাকি প্রয়োজন হলেও বাধ্য হয়ে তারা অপেক্ষা করেছেন?

এমন কোনো ঘটনা কি ঘটেছে যে, কোনো একজনকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে পারায় তার মৃত্যু হয়েছে? এরকম ঘটনা যদি ঘটে থাকে তাহলে তার সংখ্যা কত— সেটি কি কোনোদিন জানা যাবে? আর যদি এরকম ঘটনা না ঘটে থাকে, অর্থাৎ বিদেশে না গিয়েও যদি রোগ ভালো করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে কি চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য-পরীক্ষার জন্য মানুষের বিদেশমুখিতা কমবে? ক্ষমতাবান ও পয়সাওয়ালারা কি চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য-পরীক্ষার জন্য আগের চেয়ে কম বিদেশে যাবেন বা এখন থেকে চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য-পরীক্ষা দেশেই করবেন?

ধরা যাক সরকার কোনোভাবেই খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে দিল না এবং দেশেই তার মৃত্যু হলো। তারপর কী হবে? বিএনপি সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দেবে এবং সাধারণ মানুষ সেই ডাকে সাড়া দিয়ে রাস্তায় নেমে যাবে? কেন নামবে? তার স্বার্থ কী?

আওয়ামী লীগের পতনের পরে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সাধারণ মানুষের লাভ কী? তাছাড়া সরকার পতনের আন্দোলনের জন্য কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দল যেরকম সংগঠিত ও শক্তিশালী থাকা দরকার, বিএনপির সেটি আছে? গত কয়েক বছরে বিএনপি কোনো আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ
বাড়তি ভাড়া না দিতে বাসমালিকের অনুরোধ
লাল স্টিকারে ডিজেল, সবুজে চেনা যাবে সিএনজিচালিত গাড়ি  

শেয়ার করুন

শহীদ ডা. মিলন ও গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্ন

শহীদ ডা. মিলন ও গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্ন

১৯৯০ সালে চিকিৎসকদের প্রাণের দাবি ২৩ দফা বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন চলছিল। এ দাবিতে চিকিৎসকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ছিল না। গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার, বাজেট, মেডিক্যাল শিক্ষা সংস্কারসহ বিভিন্ন জরুরি বিষয় ছিল ওই আন্দোলনের দাবি। ডা. মিলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এদেশের চিকিৎসকসমাজ জনগণের কাছে মর্যাদার আসন পেয়েছে।

ডা. শামসুল আলম খান মিলন ১৯৯০-এর ২৭ নভেম্বর আনুমানিক বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বায়োক্যামিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক। পাশাপাশি সেসময়ের বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ ) যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও প্রকৃচি-এর (প্রকৌশলী-কৃষিবিদ–চিকিৎসক) কেন্দ্রীয় নেতা।

২৭ নভেম্বর ১৯৯০, দিনটি ছিল বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ও চিকিৎসকদের ২৩ দফা বাস্তবায়ন আন্দোলনের কর্মসূচি সারা দেশের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি এবং সেসময়ের পিজি হাসপাতালের বটতলায় সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় চিকিৎসক সমাবেশ। পাশাপাশি দেশব্যাপী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের কর্মসূচি। ছাত্র সংগঠনগুলো সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল। দেশ তখন চূড়ান্ত কর্মসূচির অপেক্ষায়।

ডা. মিলন সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে সেসময়ের পিজি হাসপাতালের দিকে রওনা হন। পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে আরেক রিকশায় থাকা বিএমএর সেসময়ের মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সঙ্গে দেখা হয়। মিলন নিজের রিকশা ছেড়ে ওই রিকশায় ওঠেন।

আর রিকশার প্যাডেলে চাপ পড়তেই ডা. মিলন পেছন থেকে গুলিবিদ্ধ হন এবং ওখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে প্রিয় চিকিৎসক নেতা ডা. মিলন চিরতরে হারিয়ে যান। থ্রি নট থ্রির একটি বুলেট তার ফুসফস ও হৃদপিণ্ড ভেদ করে গিয়েছিল।

মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে। গর্জে ওঠে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথ। সর্বত্র জনগণের কণ্ঠ- ‘মিলন ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না’। আন্দোলন এমন এক ঝড়ের গতি পায়, যে ঝড়ে কোনো রাজন্য বা স্বৈরাচার কখনও টিকে থাকতে পারে না।

ডা. মিলন হত্যার প্রতিবাদে পুনরুজ্জীবিত হয়ে দেশের চিকিৎসক-সমাজ, মেডিক্যাল-ছাত্র রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং এরশাদ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। চারদিক থেকে চিকিৎসক ও ছাত্রজনতা বিশাল মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জনতার এক মহাসমুদ্র তৈরি করে।

পোস্ট মর্টেম এবং বহির্বিভাগের সামনে অনুষ্ঠিত জানাজা শেষে মিলনের শেষশয্যা রচিত হয় তারই প্রিয় শিক্ষাঙ্গন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেদিনের সব আয়োজনের দায়িত্ব বর্তেছিল আমার ওপর।

মিলনের মৃত্যুসনদটিও আমাকে লিখতে হয়েছিল। তাকে কবরে শায়িত করার সঙ্গে সঙ্গে খবর পেলাম এরশাদ সরকার ইতোমধ্যে কারফিউ জারি করেছে। জরুরি আইন ঘোষিত হয়েছে। এটি ছিল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার শেষ অস্ত্র।

জনগণ ঘৃণাভরে সেই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করল। সে রাতেই কারফিউ ও জরুরি আইন অমান্য করে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে ঢাকার রাজপথসহ সারা দেশে। ২৮ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সব মেডিক্যাল শিক্ষক ও সরকারি চিকিৎসক পদত্যাগ করে এরশাদ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানায়।

এই পদত্যাগ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলে। আমরা ২৮ নভেম্বর সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সভাকক্ষে কন্ট্রোলরুম স্থাপন করি। সেখান থেকেই বিএমএর কর্মসূচি সারা দেশে পরিচালিত হয়।

৪ ডিসেম্বর রাতে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় এবং সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচারী দুঃশাসনের পতন ঘটে। রাতে ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট ভরে যায় আনন্দমিছিলে। আমরাও ঢাকা মেডিক্যাল থেকে মিলনের সহকর্মী হিসেবে আনন্দ-বেদনার মধ্য দিয়ে যোগ দেই সে মিছিলে।

ডা. মিলন, নূর হোসেন, জেহাদসহ আরও অসংখ্য শহীদের রক্তে এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে আরেকটি ঐতিহাসিক সংযোজন ‘গণ-অভ্যূত্থান ৯০’। যা দেশবাসীর কাছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক নতুন আশার সঞ্চার করে।

১৯৮৩ সালে ডাক্তার হওয়ার পর থেকে মিলন চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের সব আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। প্রতিটি আন্দোলনে তাকে সরকারের রোষানলে পড়তে হয়। এমনকি চাকরিচ্যুত পর্যন্ত হতে হয়েছে। যদিও চিকিৎসক-পেশাজীবীদের চাপের মুখে সরকার প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে।

মিলন তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এদেশের চিকিৎসক, পেশাজীবী ও রাজনীতিবিদদের হৃদয়ে মযার্দার আসন অর্জন করেছিল। মিলনের সঙ্গে আমার ৮৩ সাল থেকে বন্ধুত্ব হলেও, ওর জীবনের শেষ দুটি বছর একরকম অহর্নিশি আমরা একসঙ্গে থাকতাম।

অমায়িক ব্যক্তিত্বের মানুষ মিলনের সঙ্গে ঢামেক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। আমি জয়ী হওয়ার পর ওকে কোষাধ্যক্ষ পদের প্রস্তাব দিলে প্রত্যাখ্যান করেনি। দিনরাত একসঙ্গে বিএমএ, শিক্ষক সমিতি ও পেশাজীবী আন্দোলনে কাজ করেছি।

সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। আন্দোলন সংঘটিত করার জন্য সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। এমনকি হুলিয়া মাথায় নিয়ে রাতে হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে দুজনে একসঙ্গে ঘুমিয়েছি। মিলন প্রগতিশীল রাজনীতির কর্মী ছিল এবং স্বপ্ন দেখত দেশে গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নের।

১৯৯০ সালে চিকিৎসকদের প্রাণের দাবি ২৩ দফা বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন চলছিল। এ দাবিতে চিকিৎসকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ছিল না। গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার, বাজেট, মেডিক্যাল শিক্ষা সংস্কারসহ বিভিন্ন জরুরি বিষয় ছিল ওই আন্দোলনের দাবি।

ডা. মিলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এদেশের চিকিৎসকসমাজ জনগণের কাছে মর্যাদার আসন পেয়েছে। যে কারণে বিএমএর সেসময়ের সভাপতি ডা. এমএ মাজেদকে র্সবদলীয় রাজনতৈকি সিদ্ধান্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকাররে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব প্রদান করেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এদেশের চিকিৎসকদের একমাত্র জাতীয় সংগঠন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও মেডিক্যাল শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। দেশের চিকিৎসকসমাজ নানা রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত।

এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএমএ ও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতেই পারে, কিন্তু মিলনের আত্মত্যাগের সাক্ষী বিএমএতে দলমত নির্বিশেষে গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসকদের উন্নয়ন ও অধিকারের স্বার্থে সব চিকিৎসকদের ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।

উন্নত বিশ্বে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীতিনির্ধারনে মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা অপরিসীম। কখনও আবার প্রধান। ডা. মিলনসহ লাখো শহীদের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’কেও সেই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা দরকার।

শহীদ ডা. মিলনের ৩১ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, এদেশের চিকিৎসক সমাজের চিকিৎসাক্ষেত্রে ভেদাভেদ ভুলে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ মেধা, শক্তি ও সুযোগ ব্যয় করবে- এটিই প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত।

শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি, ডা. আলীম ও ডা. মিলনসহ বহু চিকিৎসক দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন। জাতির কাছে চিকিৎসকদের একটি র্মযাদার আসনে বসিয়ে গেছেন।

এ দেশের চিকিৎসকদের দায়িত্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব সীমাবদ্ধতা পাস কাটিয়ে, সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসার জন্য আন্তরকিতার সঙ্গে শক্তভাবে পাশে দাঁড়ানো। তবেই স্থায়ী হবে চিকিৎসকদের র্মযাদা। শান্তি পাবে শহিদের আত্মা।

এজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার। স্বাস্থ্যখাতে যে বাস্তবতা বিরাজ করছে তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এই বাস্তবতাকে গণবান্ধব করতে কিছু সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই-

১. স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ। একটি স্বাস্থ্য কমিশন গঠনরে মাধ্যমে অবকাঠামো এবং র্কমচারীদের দায়িত্ব পুনর্গঠন করতে হবে। যেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত থাকবে। প্রতিটি কাজের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং ফলো-আপ থাকা

২. শেখ হাসিনা সরকার প্রণীত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০০০-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন

৩. জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরকিল্পনা

৪. জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট। প্রয়োজনীয় বাজেটে (জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ১০%) বরাদ্দ এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা

৫. স্বাস্থ্যখাতে কঠোরভাবে দুর্নীতি দমন

৬. নিয়োগ ও বদলি নীতিমালা। অর্থাৎ চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার প্ল্যানিংসহ একটি গ্রহণযোগ্য বদলি-পদোন্নতির কার্যকর নীতিমালা থাকা যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত হবে

৭. মেডিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন

৮. ল্যাবরেটরি সার্ভিস নীতিমালা হালনাগাদ ও জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ ও সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যৌক্তিক মূল্যনির্ধারণ

৯. বিএমডিসিকে র্কাযকর ও শক্তিশালী করে তোলা

১০. বেসরকারি কলেজ-হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনা

১১. চিকিৎসক ও সব হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

১২. স্বাস্থ্য প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ

১৩. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন

১৪. মেডিক্যাল ইনফরমশেন সিস্টেম (এমআইএস) গঠন

১৫. অভ্যর্থনা ও তথ্যকেন্দ্র তৈরি

শেখ হাসিনা সরকার-প্রণীত সর্বজনগৃহীত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০০০-এর ওপর ভিত্তি করে সংস্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যনীতি গড়ে উঠবে এটাই বিশ্বাস।

লেখক: চিকিৎসক ও অধ্যাপক। সাবেক উপাচার্য, বিএসএমএমইউ।

আরও পড়ুন:
যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ
বাড়তি ভাড়া না দিতে বাসমালিকের অনুরোধ
লাল স্টিকারে ডিজেল, সবুজে চেনা যাবে সিএনজিচালিত গাড়ি  

শেয়ার করুন

মিলনের রক্ত ও বিশ্বাসঘাতকতার উল্লাসধ্বনি

মিলনের রক্ত ও বিশ্বাসঘাতকতার উল্লাসধ্বনি

জনশ্রুতি হিসেবে ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ধরা হয় তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ক্যাডার ও তার দলকে। সেই ক্যাডার ছাত্রদলের রাজনীতি করত। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কয়েকমাস আগে গ্রেপ্তার হয়। নভেম্বরে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ছাত্রদলের কর্মীরা মিষ্টি-মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেয়। শুধু তাই নয়, সেই ক্যাডারকে সন্তান হিসেবে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন এরশাদপত্নী। বিপুল পরিমাণ উপহারও দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন ভণ্ডুল করার জন্য তাকে কাজে লাগানো হয়।

১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পুরো দেশ তোলপাড়। দেশব্যাপী চলছিল রাজপথ-রেলপথ অবরোধ। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) একটি জরুরি সভা হবে। সে সভায় যোগ দেয়ার জন্য আজিমপুরের বাসা থেকে সকাল দশটার দিকে রিকশায় করে যাচ্ছিলেন অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্মমহাসচিব ডা. শামসুল আলম খান মিলন। টিএসসি’র মোড়ে আসতেই ডা. মিলনকে ডাক দিলেন আরেক রিকশায় থাকা বিএমএ মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। ডা. জালাল বললেন, মিলন আমার রিকশায় চলে এস, একসাথে যাই।

রিকশা ছেড়ে দিয়ে ডা. জালালের রিকশায় চড়ে বসলেন ডা. মিলন। কিন্তু কে জানত, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওৎ পেতে ছিল আততায়ীরা! রিকশা কিছুদূর এগোতেই হঠাৎ ডা. মিলন বললেন, জালাল ভাই, দেখেন তো আমার কী হয়েছে?

ডা. মিলনের দিকে তাকিয়ে তাজ্জব হয়ে গেলেন ডা. জালাল। গুলির শব্দ তিনি পেয়েছেন, কিন্তু সেটা যে তার রিকশার সহযাত্রী ও সহকর্মীকে বিদ্ধ করেছে, টের পাননি। টের পেলেন রক্তে ভেসে যাওয়া মিলনের গুলিবিদ্ধ শরীরের দিকে তাকিয়ে।

সময় নষ্ট না করে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো মিলনকে। কিন্তু তাঁকে প্রাণে বাঁচানো যায়নি। এগারোটার আগেই সহকর্মীদের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে শহীদ হলেন মিলন। আর ভাগ্যের জোরে প্রাণে বেঁচে গেলেন ডা. জালাল।

কিন্তু কেন এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো? কেন ডাক্তার মিলনকে টার্গেট করা হলো? কারণ একটাই- ডা. মিলনকে হত্যার মধ্য দিয়ে এক ঢিলে অনেকগুলো পাখি মারার অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল তখনকার স্বৈরাচার এরশাদ।

ডা. মিলনের জন্ম ১৯৫৭ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায়। ১৯৮৩ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত হন। ১৯৮৮ সালে বায়োকেমিস্ট্রিতে এমফিল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন।

ডা. মিলন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের চিন্তাধারায় সিক্ত মানুষ। তাকে নিয়ে নানা জায়গায় স্মৃতিচারণ করেছেন তার মা সেলিনা আক্তার। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পারার আক্ষেপ ছিল ডা. মিলনের। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতার ডাক দিলেন, যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার নির্দেশ দিলেন, ডা. মিলনও সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। পাড়ার অনেকের সঙ্গে কাঠের বন্দুক নিয়ে প্যারেড করতেন মিলন।

ছাত্র থাকা অবস্থাতেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৮২ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন মিলন।

স্বৈরাচারবিরোধিতার কারণে তাকে রংপুরের রৌমারীতে বদলি করা হয়েছিল। সরকারের তরফ থেকেও তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল বেশ কয়েকবার। অনেকবার তাকে সরকারি দলে যোগ দেয়ার লোভ দেখানো হয়। ডা. মিলন ঘৃণার সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর তাকে চাকরি থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল একবার। তবু দমানো যায়নি ডা. মিলনকে।

তিনি ছিলেন এরশাদের স্বাস্থ্যনীতির কঠোর সমালোচক। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর স্বৈরাচারবিরোধী বিক্ষোভে নাজির উদ্দিন জেহাদ নামের এক ছাত্র পুলিশের গুলিতে মারা যান। পুলিশ জেহাদের লাশ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এসময় ডা. মিলনের নেতৃত্বে ছাত্র ও চিকিৎসকরা তাদের প্রতিহত করে। আর সেদিনই ডা. মিলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় গঠিত হয় সম্মিলিত সর্বদলীয় ছাত্রজোট। তার অসম্ভব সাংগঠনিক ক্ষমতা ও দক্ষতায় ঘাবড়ে যায় স্বৈরাচার ও তার দোসরেরা। ডা. মিলন তাদের টার্গেটে পরিণত হন। আর তারই করুণ পরিণতি ঘটে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর।

স্বৈরাচার এরশাদ চেয়েছিল ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের দোষ ছাত্রদের উপর চাপিয়ে দেবে। এই সুযোগে আন্দোলনকারী ছাত্রদের উপর দমন-পীড়ন চালাবে। সে কারণে স্বরাষ্ট্র সচিবকে ডেকে কারফিউ জারির ইচ্ছাও পোষণ করেছিল এরশাদ। কিন্তু এরশাদের পরিকল্পনার সঙ্গে পরবর্তী ঘটনাগুলো একেবারেই মিলল না। বরং ডা. মিলনের মৃত্যুতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে উঠল।

কর্মবিরতির ঘোষণা দিলেন ডাক্তাররা। গণপদত্যাগ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘নিউজ উইক’ মন্তব্য করল- ‘ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ড বিদ্যুস্পর্শের মতো দাবানল তৈরি করেছিল। এর ফলে অনির্বাচিত সামরিক সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার কুখ্যাত স্বাস্থ্যনীতি বাতিলের ঘোষণা দেয়।’

ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত? শুধুই কি স্বৈরাচারী এরশাদ? নাকি পর্দার আড়ালে আরও কিছু রয়ে গেছে?

১৯৯০ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত মাসিক ‘গণসংস্কৃতি’ পত্রিকায় ডা. মিলনের একটি লেখার অংশ বিশেষ থেকে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। ডা. মিলন লিখেছিলেন- ‘‘সরকার মূল সমস্যা সমূহের সমাধানের পথে না গিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থার জন্য চিকিৎসকদেরও দায়ী করেছেন। অথচ সরকার ২৮ পয়সা বরাদ্দ করে জনগণের কাছে কোন স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করতে চান তা বলছেন না।

সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ও শক্তিশালীভাবে গড়ে তুললে জনগণ কখনও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী হতো না। তাই আজ প্রথম প্রয়োজন সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। অথচ সে পথে না গিয়ে সরকার স্বাস্থ্য বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নিচ্ছে। এর ফলে গরিব জনগণ আজ যতটুকু চিকিৎসা পাচ্ছে, তা থেকেও বঞ্চিত হবে। তাই আজ প্রথম প্রয়োজন একটি জনগণের সরকার, যারা জনগণের স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাধান্য দেবে।”

তার মানে ডা. মিলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে সরকারীকরণের মাধ্যমে দেশের আপামর জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করা। সামরিকশাসনের সময় অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে জনকল্যানমূলক কাজে ব্যয় বাড়ানোর যে চাপ, চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সে আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন।

জনমুখী জাতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা আন্দোলনের অগ্রবর্তী সৈনিক ছিলেন মিলন। মোদ্দাকথা, বেসরকারীকরণের মাধ্যমে চিকিৎসার নামে ব্যবসার ঘোর বিরোধী ছিলেন মিলন। আর সেটা পুঁজিপতি স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের স্বার্থে চরম আঘাত করেছে নিশ্চয়ই। যা তার জীবনের জন্য হয়ে উঠল মারাত্মক হুমকি।

এর প্রমাণ মেলে ডা. মিলন শহীদ হওয়ার পর পরবর্তী কর্মকাণ্ডে।

ডা. মিলন নিহত হওয়ার দিন সন্ধ্যায় রমনা থানায় (তখন শাহবাগ থানা হয়নি) একটি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশি তদন্ত ঘুরতে থাকে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এ হাত থেকে সে হাতে। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি আদালত চার্জ গঠন করেন। ৩১ জনকে সাক্ষী করে চার্জশিট দেয়া হয়। কিন্তু আদালত ১৪ জন সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করেন। জনশ্রুতি হিসেবে ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ধরা হয় তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ক্যাডার ও তার দলকে। সেই ক্যাডার ছাত্রদলের রাজনীতি করত।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কয়েকমাস আগে গ্রেপ্তার হয়। নভেম্বরে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ছাত্রদলের কর্মীরা মিষ্টি-মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেয়। শুধু তাই নয়, সেই ক্যাডারকে সন্তান হিসেবে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন এরশাদপত্নী। বিপুল পরিমাণ উপহারও দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন ভণ্ডুল করার জন্য তাকে কাজে লাগানো হয়। সেটা সে সময়কার ছাত্রনেতারাও বুঝতে পেরেছিলেন। এবং তার প্রমাণও মিলল অনেক বছর পরে।

১৯৯৬ সালে সেই ক্যাডার এরশাদ গঠিত জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে বরিশাল থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিল। এরপর মডেল তিন্নি হত্যা মামলায় ফেঁসে এখন অবধি পলাতক।

১৯৯২ সালে ডা. মিলনের মায়ের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে মিলন হত্যা মামলার পুনঃতদন্ত ও পুনর্বিচারের আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু এখন অবধি তার কোনো ফলাফল জানা যায়নি।

‘মিলনের মুখ’ কবিতায় শামসুর রাহমান লিখেছেন-

“গুলিবিদ্ধ শহর করছে অশ্রুপাত অবিরত,

কেননা মিলন নেই। দিন দুপুরেই নরকের

শিকারী কুকুর তার বুকে বসিয়েছে দাঁত, বড়

নিঝুম স্থাপত্য আজ মিলনের প্রতিবাদী মুখ।”…

“…অকস্মাৎ আকাশে কে যেন দিল ঢেলে কালো কালি,

দুপুর সন্ধ্যায় সাজ প’রে বিধবার মতো চোখ

মেলে চেয়ে থাকে আর আঁচলে সংগ্রামী স্মৃতি জ্বলে,

মিলনের মুখে বৃষ্টি নয়, বাংলার অশ্রু ঝরে।

(কাব্যগ্রন্থ: খণ্ডিত গৌরব)

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি দেশে গড়ে উঠেছে, অনেকের মতো ডা. মিলনও সে সংস্কৃতির শিকার। শুধু তাই নয়, খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতার সংস্কৃতিতে নতুন করে হাওয়া লাগাল ১৯৯০ পরবর্তী রাজনৈতিক দল বিএনপি। তিন জোটের রূপরেখায় অঙ্গীকারনামা ছিল যে, স্বৈরাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কাউকে দলে ভেড়ানো হবে না।

গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন এম কে আনোয়ার। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের করা কালো তালিকায় কিছু ব্যবসায়ী ও আমলার সঙ্গে এম কে আনোয়ারের নামও ছিল। কালো তালিকায় নাম থাকার কারণে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হতে চেয়েও মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি শিবিরে আস্তানা গাড়েন আনোয়ার। মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য হন এবং দুবার খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রী ছিলেন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যও হয়েছিলেন এই কালো তালিকাভুক্ত দাপুটে আমলা।

মূলত ডা. মিলনের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শুরু সেখান থেকেই।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন:
যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ
বাড়তি ভাড়া না দিতে বাসমালিকের অনুরোধ
লাল স্টিকারে ডিজেল, সবুজে চেনা যাবে সিএনজিচালিত গাড়ি  

শেয়ার করুন

তারেক জিয়ার নতুন কৌশল গুজবসন্ত্রাস

তারেক জিয়ার নতুন কৌশল গুজবসন্ত্রাস

গুজব সিন্ডিকেটে রয়েছে সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ও চাকরিচ্যুত কজন সেনাকর্মকর্তা, বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত বিদেশে আত্মগোপনকারী ভুঁইফোঁড় সাংবাদিক, রাজাকারের সন্তান ও শিবির ক্যাডার। এ সিন্ডিকেট প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পরিবার-সরকার, বিচার বিভাগ-দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও পুলিশবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে; তখনই দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার মানসে বিদেশে বসে ক্রমাগত চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতাবিরোধী একটি চক্র। এরা প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মাধ্যমে দেশকে অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অশুভ প্রয়াস নিয়ে বিশাল অর্থব্যয়ে কিছু সাইবার সন্ত্রাসী ভাড়া করে গড়ে তুলেছে গুজব সিন্ডিকেট।

তাদের এ গুজব সিন্ডিকেটে রয়েছে সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ও চাকরিচ্যুত কজন সেনাকর্মকর্তা, বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত বিদেশে আত্মগোপনকারী ভুঁইফোঁড় সাংবাদিক, রাজাকারের সন্তান ও শিবির ক্যাডার। এ সিন্ডিকেট প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পরিবার-সরকার, বিচার বিভাগ-দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও পুলিশবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।

রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য, ভুয়া ছবি দিয়ে অডিও-ভিডিও তৈরি করে ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারেক জিয়ার এ গুজব সিন্ডিকেট শুরুর দিকে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেশকে সাময়িক অস্থিতিশীল করতে পারলেও দেশপ্রেমিক জনগণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা উপলব্ধি করতে পেরেছে।

এবার আসা যাক তারেক জিয়া গুজবকে হাতিয়ার হিসেবে কেন ব্যবহার করছে এবং কীভাবে করছে?

জার্মানির নাৎসি নেতা এডলফ হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলস বিশ্বাস করতেন, ‘একটা মিথ্যা দশবার প্রচার করলে তা সত্যে পরিণত হয়।’ ২য় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে এ তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে তারা অনেক গুজব ছড়িয়েছিল এবং সফলতাও পায়। তারেক রহমান ও তার সংঘবদ্ধ চক্র বিদেশে বসে এই তত্ত্বের আলোকেই গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

ইতিহাসভিত্তিক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনীতিতে গুজব বরাবর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, কলুষিত রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে উন্নয়ন ও অগ্রগতির কারণে যাতে ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারার ক্ষতি করা যায়- এ ধরনের মানসিকতা থেকে গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধে মানুষ সম্পৃক্ত হয়। এর ফলে যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে, এটি তারা কখনও চিন্তা করে না।

রবার্ট এইচ নাপ তার ‘এ সাইকোলজি অব রিউমার’ বইয়ে লিখেছেন, গুজবের তিনটি মৌলিক দিক আছে। প্রথমটি হলো মানুষের মুখ। গুজব এক মুখ থেকে আরেক মুখে প্রচারিত হয়ে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সময় ও মানুষ- এ দুটি উপাদানের কারণে তা বিকৃতও হয় বিভিন্নভাবে। দ্বিতীয় দিকটি হলো- গুজবের জ্ঞান দেয়া। এর দুটো দিক থাকতে পারে। একটি হলো ইতিবাচক আরেকটি হলো নেতিবাচক। তৃতীয় দিকটি হলো মানুষের মন গুজব দ্বারা প্রভাবিত হতে চায় ও গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

জনপ্রত্যাশা থেকে ছিটকে পড়ে গুজব সন্ত্রাসে ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলছে বিএনপি। মাঠের আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে এখন গুজব ছড়িয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে বিএনপি নিয়ন্ত্রিত এ গুজব সিন্ডিকেট। এই সংঘবদ্ধ চক্রটির ছড়ানো কিছু গুজবের নমুনা:

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ‘পুলিশের গুলিতে আহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবুবকর চিকিৎসারত অবস্থায় মারা গেছে!’ এই গুজব ছড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছিল এ চক্রটি।

‘হলে বিদ্যুৎ বন্ধ করে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা হচ্ছে!’ এই গুজবটিও ছড়ানো হয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়। কিন্তু প্রত্যেক হলেই বিদ্যুৎ ছিল। সবাই ভেবেছিল আমার হলে হয়তো বিদ্যুৎ আছে, অন্য সব হলে বিদ্যুৎ বন্ধ করে হামলা হচ্ছে।

২০১৮ সালের এপ্রিলে বিএনপির নেতাকর্মীদের শত শত শেয়ারের মাধ্যমে ‘তারেক জিয়াকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবার আমন্ত্রণ’ শীর্ষক গুজবটি ছড়িয়ে দেয়া হয়; যা পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রতীয়মান হয়।

সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে নিয়ে এমন কিছু গুজব ছড়ানো হয়েছিল, যা তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের অবাক করে দিয়েছে। দেশের বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকাকে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছে নকল করে। যার কোনোটাই আসল কাগজ ছিল না। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউকে থেকে পরিচালিত ৭৮টি ফেসবুক আইডির মাধ্যমে তারা এই গুজব ছড়ায়।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংস আন্দোলনে পরিণত করে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির পেছনে তখন কলকাঠি নেড়েছিল এই গুজব সিন্ডিকেট। বর্তমানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ‘পরিবহনে হাফ ভাড়া চাই’ শীর্ষক যৌক্তিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংস করে তুলতে ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে গুজব সিন্ডিকেট।

‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে।’ এই গুজবটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছিল এ চক্রটি। এই গুজবকে কেন্দ্র করে ছেলেধরা সন্দেহে দেশজুড়ে গণপিটুনিতে প্রাণ হারায় অন্তত ২০ জন।

২০১২ সালের শেষদিকে ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননা করে ছবি সংযুক্ত করে গুজব ছড়ানোর কুশীলব ছিল এই গুজব সিন্ডিকেট। যার ফলে সামপ্রদায়িক শক্তি রামু উপজেলার ১২ বৌদ্ধ মন্দির ও ৩০টি বাড়িতে আগুন দেয়।

জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ঢাকার পল্লবীতে শাহীন উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার একটি পুরোনো ভিডিওকে ফেনীর যতন কুমার সাহার হত্যার ভিডিও বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল এ চক্রটি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় দেশব্যাপী দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উন্নয়নে দেশ এখন ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির এই সহজলভ্যতাকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করছে বিএনপি-জামায়াতের মতো স্বার্থান্বেষী মহল।

তারেক জিয়া নিয়ন্ত্রিত গুজব সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্রপ্রসূত বিভিন্ন মিথ্যাচারকে ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশীয় ভুঁইফোঁড় ‘পণ্ডিতেরা’। যদিও সাধারণ মানুষ এসব অশুভ শক্তিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। এরপরও সরকারকে ঘায়েল করার অপকৌশল হিসেবে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপশক্তি এখন সাইবারযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা শুধু গুজব ছড়িয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য উসকানি দিচ্ছে মৌলবাদী প্রেতাত্মাদের।

তাদের এ গুজব সন্ত্রাস রুখতে গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারের যোগাযোগের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার চৌকস সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গুজব ছড়ানোর কুশীলবদের ইতোমধ্যেই শনাক্ত করতে পেরেছে সরকার। গুজব ছড়িয়ে দিয়ে যাতে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে না পারে এ ব্যাপারে সবসময় তৎপর আমাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল সদস্য।

অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও মিথ্যা তথ্য প্রচার রোধে মানুষকে সচেতন করে তোলার জন্য ‘আসল চিনি’ নামে একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। গুজব সন্ত্রাসীদের রুখতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে নিজে সচেতন থাকতে হবে এবং আশপাশের সকলকে সচেতন রাখতে হবে।

সবাইকে মনে রাখতে হবে- গুজব একটি সামাজিক অপরাধ, যা একটি দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্টের অন্যতম কারণ। গুজব সৃষ্টি ও গুজব ছড়ানো দুটোই অপরাধ। তাই একজন সুনাগরিক হিসেবে আমাদের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ( ফেইসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব) কোনো কিছু শেয়ার করার আগে ঘটনার সত্যতা ও প্রকৃত উৎস সম্পর্কে অবগত হয়ে শেয়ার করা উচিত। কেননা, আমাদের শেয়ার করা একটি ভুল তথ্য আমাদের বন্ধু ও অনুসারীদের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগে আমাদের বিবেকবোধকে কাজে লাগিয়ে কর্মের মাধ্যমে ‘হুজুগে বাঙালি’ তকমা থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: ছাত্রনেতা

আরও পড়ুন:
যাবেন মগবাজার, ভাড়া দেবেন মতিঝিলের
জরিমানা দিয়েই আবার বেশি ভাড়া আদায়
বাড়তি ভাড়া রোধে ব্যর্থ পুরোনো পথেই হাঁটছে বিআরটিএ
বাড়তি ভাড়া না দিতে বাসমালিকের অনুরোধ
লাল স্টিকারে ডিজেল, সবুজে চেনা যাবে সিএনজিচালিত গাড়ি  

শেয়ার করুন