নূর হোসেনের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই আছে

নূর হোসেনের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই আছে

খালি গা আর জিন্সের প্যান্ট পরিহিতি কোমরে শার্ট জড়িয়ে নূর হোসেন ছুটছিলেন মিছিলের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। সবার চোখ আটকে যাচ্ছিল তার বুকে ও পিঠে। শরীরে জড়ানো এক প্রতিবাদী পোস্টার, যে পোস্টার অন্য যেকোনো প্রতিবাদী পোস্টারের থেকে আলাদা। মুখের প্রতিবাদী স্লোগানের চেয়েও নূর হোসেনের শরীরে লেখা ওই ছয় শব্দের ১৭ অক্ষরের লেখাটুকু স্বৈরাচারী সরকারের বুকে শেল হয়ে বিঁধেছিল শতগুণ বেগে। এমন জীবন্ত প্রতিবাদী পোস্টারকে সহ্য করা সহজ ছিল না স্বৈরাচারের পাহারাদারদের।

ক্ষমতা জবরদখলকারী সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের বিরদ্ধে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছিল। ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল হাইজ্যাক না করলে এরশাদকে হটানোর জন্য বিরোধী দলগুলোকে রাজপথে নামতে হতো না। কিন্তু এরশাদ ছিলেন ‘বিশ্ব বেহায়া’। তাই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য গণ-আন্দোলনের বিকল্প ছিল না।

বিরোধী দলগুলো যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলে সরকার সাতদিনের জন্য সভা-সমাবেশ, মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকরা যাতে ঢাকা আসতে না পারে তার জন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ করা হয়েছিল। এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ৮ দল, ৭ দল এবং ৫-দলীয় জোটের সমর্থকরা সারা দেশ থেকে ঢাকায় এসে জড়ো হয়েছিল অবরোধ কর্মসূচি সফল করতে। ‘এক দফা এক দাবি, এরশাদ তুই কবে যাবি?’- স্লোগানে মুখর হয়ে উঠেছিল ঢাকার রাজপথ। সেদিনের কর্মসূচি ছিল মূলত সচিবালয়কে ঘিরে। সচিবালয়কে মনে করা হয় সরকারের হৃদপিণ্ড। সচিবালয়কে অবরুদ্ধ করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলাই ছিল আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য।

ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী সরকার মানুষের প্রতিবাদের বিষয়টিকে বিবেচনায় না নিয়ে জনতাকে দমন করার জন্য রাস্তায় নামিয়েছিল পুলিশ এবং বিডিআরের সশস্ত্র সদস্যদের। কিন্তু মৃত্যুভয়ের পরোয়া না করে হাজারো প্রতিবাদী মানুষ স্লোগান-মুখরিত হয়ে সচিবালয় ঘিরে ফেলেছিল। মানুষের জমায়েত ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এবং বিক্ষুব্ধ মানুষ অশান্ত হয়ে ওঠায় আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যরা বিনা উসকানিতে নিরীহ মানুষদের ওপর হামলা চালায়। শুধু লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ছুড়ে সমাবেশ বা মিছিল ছত্রভঙ্গ করা নয়, টার্গেট করে গুলি ছোড়া হয়েছিল। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন অন্তত দুজন। এদের একজনের নাম নূর হোসেন এবং অন্যজনের নাম সৈয়দ আমিনুল হুদা টিটো। নূর হোসেনের মৃত্যু সবার মনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল এবং এরশাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও ঘৃণা তৈরি করে।

নূর হোসেন ছিলেন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এক যুবক। দরিদ্র অটোচালক পিতার ৬ সন্তানের একজন নূর হোসেন অষ্টম শ্রেণির পর আর লেখাপড়া করতে পারেননি। তবে তারমধ্যে জাগরূক ছিল তীব্র দেশপ্রেম। দেশকে ভালোবাসার কারণেই নূর হোসেন জড়িয়েছিলেন রাজনীতিতে। হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ছিল তার সহজাত স্বভাব।

যুবলীগের একজন সক্রিয় কর্মী হয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে মিছিল-মিটিংয়ে ছিল তার সরব উপস্থিতি। ১০ নভেম্বরের অবরোধ কর্মসূচিতেও তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অভিনব পথ বেছে নিয়েছিলেন। গায়ের জামা খুলে উদোম বুকে ও পিঠে সাদা রঙে লিখিয়ে নিয়েছিলেন অসাধারণ সেই স্লোগান-‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।’ এটা ছিল তখন গোটা দেশের মানুষের প্রাণের দাবি।

বুকে-পিঠে স্লোগান লিখে মিছিলে অংশ নেয়ার জন্য হাজারো জনতার ভিড়ে নূর হোসেন দ্রুত সবার দৃষ্টি কেড়েছিলেন। খালি গা আর জিন্সের প্যান্ট পরিহিতি কোমরে শার্ট জড়িয়ে নূর হোসেন ছুটছিলেন মিছিলের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। সবার চোখ আটকে যাচ্ছিল তার বুকে ও পিঠে।

শরীরে জড়ানো এক প্রতিবাদী পোস্টার, যে পোস্টার অন্য যেকোনো প্রতিবাদী পোস্টারের থেকে আলাদা। মুখের প্রতিবাদী স্লোগানের চেয়েও নূর হোসেনের শরীরে লেখা ওই ছয় শব্দের ১৭ অক্ষরের লেখাটুকু স্বৈরাচারী সরকারের বুকে শেল হয়ে বিঁধেছিল শতগুণ বেগে। এমন জীবন্ত প্রতিবাদী পোস্টারকে সহ্য করা সহজ ছিল না স্বৈরাচারের পাহারাদারদের।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গাড়িতে চড়ে জনতার মধ্য দিয়ে চলার সময় তারও চোখ গিয়েছিল নূর হোসেনের গায়ে ওই লেখা স্লোগানের দিকে। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠেছিল তার অন্তরাত্মা। নূর হোসেনকে কাছে ডেকে তাকে সতর্ক করেছিলেন। ‘ওরা টোকাই কেন’ বইতে শেখ হাসিনা লিখেছেন-

“মনে পড়ে আমি তাকে বলেছিলাম, জামাটা গায়ে দাও, একি সর্বনাশ করছ, ওরা যে তোমাকে গুলি করে মারবে।’ নূর হোসেন মাথাটা এগিয়ে দিল আমার কাছে। বলল, ‘জান দিয়া দিমু আপা, আপনে শুধু মাথায় হাত বুলাইয়্যা দেন।’ শেখ হাসিনা লিখেছেন, ‘আমার হাত ধরে বেশ কিছুক্ষণ নূর হোসেন গাড়ির পাশে হাঁটল। তারপর কখন যেন জনতার স্রোতে হারিয়ে গেল।”

কিছুক্ষণ পরেই গুলির শব্দ। মিছিলটি জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। গুলি এসে লেগেছিল নূর হোসেনের বুকে। গুলির আঘাতে তার দেহ থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত রাজপথ রঞ্জিত করে। মরণযন্ত্রণায় কাতর নূর হোসেনকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে পুলিশ টেনে-হিঁচড়ে রিকশা থেকে নামিয়ে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়।

তারপর তার আত্মীয়-স্বজনকে না জানিয়ে অতি গোপনে তাকে কবর দেওয়া হয় জুরাইন কবরস্থানে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর নূর হোসেনের পরিবার তার কবরের সন্ধান পেয়েছিলেন গোরখোদকের সহায়তায়। তার বুকে-পিঠে স্লোগান লেখা না থাকলে হয়তো তা সম্ভব হতো না। ১০ নভেম্বরের আরেক শহীদ আমিনুল হুদা টিটো কিন্তু অজ্ঞাত লাশ হয়েই আছেন।

নূর হোসেনের আত্মদান বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে এবং শহীদের তালিকায় উজ্জ্বল হয়েই আছে। দেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানসহ অনেকেই তাকে নিয়ে কবিতা ছাড়াও উদ্দীপনামূলক লেখা লিখেছেন। শামসুর রাহমান তার ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছেন, ‘ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সীসা, নূর হোসেনের বুক নয়, বাংলাদেশের হৃদয় ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে।’

নূর হোসেন, টিটো, তাজুল ,সেলিম-দেলোয়ারসহ অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটেছে। কিন্তু গণতন্ত্র কি মুক্তি পেয়েছে? না। এরশাদ পতনের পর দেশে ৬টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্ত ভিত্তি পায়নি। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত বা সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া ছাড়া গণতন্ত্রের আর কোনো চিহ্ন দেশশাসনে কিংবা রাজনৈতিক দল পরিচালনায় দেখা যায় না। বিএনপি-জাময়াতকে গণতন্ত্রের মিত্র মনে করেন না অনেকেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন দাবিদার হলেও দেশ এখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় চলছে বললে গণতন্ত্রকেই লজ্জায় ফেলা হয়।

প্রতিবছর এখনও নূর হোসেন দিবস পালন করা হয়, তার সাহসিকতার প্রশংসা করা হয়। কিন্তু পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না হলে, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে, মানুষ নির্ভয়ে অবাধে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে না পারলে নূর হোসেনকে স্মরণ করা প্রকৃতপক্ষে একটি তামাশা ছাড়া আর কিছু হয় না।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে
চৌত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি
গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি: কাদের
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়
শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

শেয়ার করুন

মন্তব্য

শিক্ষার্থীদের দাবি মানতে বাধা কোথায়?

শিক্ষার্থীদের দাবি মানতে বাধা কোথায়?

বিশ্বের অনেক দেশে এখনও শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া প্রচলিত আছে। হাফ ভাড়ার এই দাবিটি যৌক্তিক হলেও কেন শিক্ষার্থীদের এখনও পড়ার টেবিল ছেড়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হচ্ছে সেটাই প্রশ্ন। পাকিস্তান আমলের দাবি নিয়ে এদেশে এখনও মাঠে আন্দোলন করতে হচ্ছে এটি লজ্জাজনক নয়? ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক ১১ দফার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের বাসভাড়া অর্ধেক করার দাবি ছিল।

ঢাকায় শিক্ষার্থীরা অর্ধেক ভাড়া দেবে আর ঢাকার বাইরে কী হবে সেটি এখনও ফয়সালা হয়নি। তেলের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে বাসমালিকরা বাসভাড়া বাড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারি অজুহাত ছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া। জানা যায়, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবার কমেছে। কিন্তু আমাদের দেশে বাসভাড়া বলি আর বাসা ভাড়া- কোনোটির দাম একবার বাড়লে তা আর কমতে দেখা যায় না।

তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমার পরেও এখনও সমন্বয় করা হয়নি। কিন্তু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিকই সমন্বয়ের নামে রাতারাতি বাড়ানো হয়েছে। যে অজুহাতে বাস মালিকরা বাসভাড়া বাড়িয়েছে ধারণা করা যায়, এখন যদি সরকার তেলের দাম কমায়ও, বাসভাড়া আর কমবে না। আসলে এদেশের জনগণকেই সব অনিয়মের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হয়।

বাসভাড়া ইস্যুকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা এখনও সড়কে অবস্থান করছে। তাদের দাবি হাফ পাস। বাসমালিক কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি মেনেও নিয়েছে। কিন্তু শুধু ঢাকার জন্য। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক প্রশ্ন ঢাকার বাইরে কেন নয়?

গণমাধ্যমে এসেছে, অর্ধেক ভাড়া দিতে চাওয়ায় এক বাস হেলপার নাকি একজন ছাত্রীকে ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে! এই ঘটনার কয়েকটি অর্ন্তনিহিত বিষয় রয়েছে। নারীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই ঘটনায়। সেই সঙ্গে গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নটিও এর সঙ্গে জড়িত। সর্বোপরি গণপরিবহনে বিরাজমান নৈরাজ্যের বিষয়টি তো রয়েছেই।

দিল্লিতে বাসে ধর্ষণকাণ্ডে (১৬ ডিসেম্বর ২০১৩) দিল্লির জনগণ রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু এর কিছুদিন আগেই (৬ ডিসেম্বর ২০১৩) আমাদের টাঙ্গাইলেও একই ঘটনা ঘটে। দিল্লির জনগণ রাস্তায় নামলেও ঢাকায় কেউ ওভাবে প্রতিবাদ করেনি। গণমাধ্যমে কিছু লেখালেখি হয়েছে কেবল। নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিটিই এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, নারী ধর্ষণকে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তা না হলে একজন ছাত্রী বা নারী হাফ ভাড়া দিতে চাইলে তাকে ধর্ষণ করার হুমকি কীভাবে দেয়া যায়? আর চোখের সামনে সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয় যাত্রীসাধারণ; যারা এই সমাজেরই মানুষ।

এদেশে গণপরিবহনে নারী এখনও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বাসে ওঠা থেকে শুরু করে বাস থেকে না নামা পর্যন্ত নারী-যাত্রীকে তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। বাসে অন্য যাত্রী না থাকলে তো কথাই নেই। স্বল্প সংখ্যক যাত্রী থাকলেও একই কথা। কারণ, বাকিরা তো সব পুরুষ যাত্রী। এমন ভীতিকর গণপরিবহন নারীর কাম্য নয়।

মানুষ শুধু মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা ঘটলে একটু প্রতিবাদ করবে। গণমাধ্যমে সংবাদ হলেও পারে না হলেও পারে- এ অবস্থা আর কতদিন! দেশে নারীদেরও পথ চলতে হয়, কাজেই সবার আগে নারীসহ সবার জন্য নিরাপদ সড়ক চাই, এরপর অন্য কথা।

অনেক সময় নারীরা বাসে ওঠার সময় পুরুষ হেলপার ওঠাতে সাহায্য করার নামে তাদের গায়ে হাত দেয়। অবস্থা এমন যে, হেলপারকে পুরুষ যাত্রীর গায়ে হাত দিতে দেখা না গেলেও; নারী যাত্রীদের পিঠে হাত দিয়ে বাসে ওঠাতেই হবে। নারী-যাত্রীরা যাতে বাস থেকে ওঠার সময় পড়ে না যায় সে জন্যই তারা পিঠে হাত দিয়ে বাসে ওঠানো- এটাই তাদের অজুহাত। কিন্তু এই অজুহাতে নারীর গায়ে হাত দিয়ে বাসে ওঠানো শ্লীলতাহানীরই নামান্তর। এসব বন্ধ করা জরুরি।

দিনের পর চোখের সামনে এসব হচ্ছে। আর চলন্ত বাস থেকে নামা ও চলন্ত অবস্থাতেই যাত্রী ওঠানো এদেশে যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। শুধু নামার সময় হেলপারদের বলতে শোনা যায়- বাম পা আগে দেন। বাসস্টপে বাস ঠিকভাবে থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর বালাই নেই। বলা যায়, ঢাকায় যেন কোনো বাসস্টপ নেই অথবা পুরো ঢাকা শহরই একটি বাসস্টপ। যেখানে সেখানে যাত্রী নামানো-ওঠানো নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে রাস্তায় আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতাও রয়েছে। সুশৃঙ্খলভাবে বাস চলাচল নিশ্চিত করা না গেলে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

রাজধানীতে বাসের প্রতিযোগিতায় প্রাণ-হারানোর ঘটনা নতুন নয়। এ নিয়ে আগেও অনেক হাঙ্গামা হয়েছে। গত সোমবার (২৯ নভেম্বর) আবারও এক শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। রামপুরায় অনাবিল পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় নিহত মাঈনুদ্দীন ইসলাম নামের ওই শিক্ষার্থী বাসায় ফিরছিলেন।

এই প্রতিযোগিতায় যে শুধু যাত্রী বা পথচারীরাই নিহত হয় তা নয়, বাসের হেলপারও নিহত হয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি উত্তরা থেকে পোস্তগোলাগামী রাইদা পরিবহনের দুটি বাসের প্রতিযোগিতায় এক হেলপার নিহত হয়। আগে গিয়ে যাত্রী ওঠানোর জন্যই এমন প্রতিযোগিতা।

ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর আপাতদৃষ্টিতে কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। যে যেভাবে পারছে গাড়ি চালাচ্ছে। সড়কের অন্তত তিনভাগের একভাগ বাজারের দখলে। কুড়িল থেকে শুরু করে মালিবাগ-গুলিস্তান পর্যন্ত অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সড়কের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে রাখা হয়। মূলত, সড়কের এক লেন দিয়েই গাড়ি চলাচল করে। অন্য লেনে যাত্রী ওঠানো ও নামানো হয়; ওই একই লেনে রিকশাও চলে। ওদিকে প্রথম লেনটি বাজারের দখলে, যেখানে আবার যাত্রীরা বাসের জন্য অপেক্ষা করে। কমবেশি সব সড়কে একই অবস্থা। এই অনিয়মের মাঝেই যতটুকু নিয়ম করে চলা যায় যাত্রীরা চলাচল করছে।

বাসভাড়া বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের জন্য হাফ ভাড়ার দাবি করলেও এক সময় এদেশের গণপরিবহনে তারা হাফ ভাড়াই দিত। পরিচয়পত্র দেখে হাফ ভাড়া কার্যকর হতো। মালিকপক্ষের কারসাজিতে বাসে সিটিং সার্ভিস চালু হয়। এর মাধ্যমে হাফ ভাড়া দেয়ার প্রথাও বাতিল হয়ে যায়। বিশ্বের অনেক দেশে এখনও শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া প্রচলিত আছে।

হাফ ভাড়ার এই দাবিটি যৌক্তিক হলেও কেন শিক্ষার্থীদের এখনও পড়ার টেবিল ছেড়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হচ্ছে সেটাই প্রশ্ন। পাকিস্তান আমলের দাবি নিয়ে এদেশে এখনও মাঠে আন্দোলন করতে হচ্ছে এটি লজ্জাজনক নয়? ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক ১১ দফার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের বাসভাড়া অর্ধেক করার দাবি ছিল। দফা ১-এর (ঢ) উপদফায় বলা ছিল- “ট্রেনে, স্টিমারে ও লঞ্চে ছাত্রদের ‘আইডেন্টিটি কার্ড’ দেখাইয়া শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ‘কন্সেসনে’ টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। মাসিক টিকিটেও ‘কন্সেসন’ দিতে হইবে। পশ্চিম পাকিস্তানের মত বাসে ১০ পয়সা ভাড়ায় শহরের যেকোনো স্থানে যাতায়াতের ব্যবস্থা করিতে হইবে। দূরবর্তী অঞ্চলে বাস যাতায়াতেও শতকরা ৫০ ভাগ ‘কন্সেসন’ দিতে হইবে। ছাত্রীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাসের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সরকারি ও আধাসরকারি উদ্যোগে আয়োজিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্রদের শতকরা ৫০ ভাগ ‘কন্সেসন’ দিতে হইবে।”

প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকার বাইরে শিক্ষার্থীরা হাফ ভাড়া কেন দেবে না? এ কেমন বৈষম্য? ঢাকার বাইরে বাস ভাড়া কি কম? নাকি সেখানকার শিক্ষার্থীরা অনেক টাকার মালিক? কাজেই, ঢাকার বাইরেও হাফ ভাড়া মেনে নেয়া যুক্তিযুক্ত। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও যেন শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে গড়িমসি করা না হয়।

ওই ১১ দফার মধ্যে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য। তা হচ্ছে- দূরবর্তী অঞ্চলেও বাসে যাতায়াতের জন্য শতকরা ৫০ ভাগ ‘কন্সেসন’ চাওয়া হয়। ঔপনিবেশিক পাকিস্তান আমলে এদেশের শিক্ষার্থীরা যে দাবি করতে পেরেছিল, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসেও সেটি দাবি করার সাহসও পাচ্ছে না। তাই তারা কেবল ঢাকায় বা ঢাকার বাইরে যাতে হাফ ভাড়ার ‍সুযোগ দেয়া হয় সে দাবিই করে যাচ্ছে।

আমাদের ছেলে-মেয়েরা ঢাকা না ঢাকার বাইরে তা নিয়েই দিনের পর দিন রাস্তায় বসে আছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের বাহাসও করতে হচ্ছে।

কাজেই, ছাত্রদের ন্যায়সংগত দাবি পূরণে সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন। হাফ ভাড়ার বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তা কার্যকর করাও জরুরি। সেই সঙ্গে শৃঙ্খলা আনতে হবে গণপরিবহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনায়।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে
চৌত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি
গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি: কাদের
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়
শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

শেয়ার করুন

রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের পাঁচ দশক

রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের পাঁচ দশক

চীনের পক্ষ থেকে ১৯৭১-এ জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে বলা হচ্ছিল- ভারত পূর্ব পাকিস্তানকে নিজের দখলে নিতে চায়। বাস্তবে এমনটি ঘটেনি। কারণ বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা চেয়েছে এবং ভারত এ আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। কেন ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, এ বিষয়ে ইন্দিরা গান্ধী ৬ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট বলেছিলেন- `বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের পেছনে জনগণের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই স্বাধীনতার পেছনে সে দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন আমরা দেখি।'

বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান এবং এই ভূখণ্ডে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করার চূড়ান্ত অভিযানে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত প্রকাশকালে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সে সময়ের ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। তা হলো- ‘আমরা কোনো দেশের ভূখণ্ড দখলে নিতে চাই না’।

মার্কিন গবেষক-লেখক গ্যারি জে ব্যস ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন-

‘ভারতের স্বীকৃতির গুরুত্ব কেবল ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ কিংবা মুক্ত ভূখণ্ডে বিশৃঙ্খলারোধ অথবা আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার মধ্যে সীমিত করে দেখলে চলে না। মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে যৌথ কমান্ড গঠন করে বাংলাদেশ ভূখণ্ড পাকিস্তানি হানাদারের কবল থেকে মুক্ত করার অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার বলা হয়- এই স্বীকৃতির মাধ্যমে একটি বার্তা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে; আমরা ভারতের ভূখণ্ডের সঙ্গে নতুন কোনো ভূখণ্ড যুক্ত করতে চাই না কিংবা কোনো ভূখণ্ড দখলও করতে চাই না।’ (দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম, পৃষ্ঠা ২৮২)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। যুদ্ধ অবসানের ৭৬ বছর পরও জার্মানি ও জাপানে আমেরিকান সৈন্য রয়ে গেছে। ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশে ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে মুক্তিদাতা হিসেবে প্রবেশ করেছিল, বিজয়ী শক্তি হিসেবে নয়। দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র মিলিতভাবে গঠন করেছিল যৌথ বাহিনী।

এ কারণেই ১৯৭২-এর ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের এক সপ্তাহ আগেই সব ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশের মাটি ত্যাগ করে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ ও এশিয়ায় এটা করেনি বা করতে চায়নি। কারণ- 'In Germany and in Japan, the Americans who came into their countries did not arrive as liberators but as conquerors'.

চীনের পক্ষ থেকে ১৯৭১-এ জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে বলা হচ্ছিল- ভারত পূর্ব পাকিস্তানকে নিজের দখলে নিতে চায়। বাস্তবে এমনটি ঘটেনি। কারণ বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা চেয়েছে এবং ভারত এ আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। কেন ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, এ বিষয়ে ইন্দিরা গান্ধী ৬ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট বলেছিলেন- ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের পেছনে জনগণের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই স্বাধীনতার পেছনে সে দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন আমরা দেখি।’

দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্ণ হওয়ার দিন ৬ ডিসেম্বর। অনেকেই বলেন, রক্তের বন্ধন দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সৈন্য প্রাণ দিয়েছে। অনেকে আহত হয়েছে। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের ভূখণ্ডেও ভারতীয় সৈন্যদের লড়াই করতে হয়েছে। এর কারণও ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি ভারতের সমর্থন।

২৫ মার্চ গণহত্যা অভিযান শুরুর পর ভারত সরকার ও জনগণ যদি বাংলাদেশের পাশে না দাঁড়াত, তা হলে আরও কত বাঙালিকে প্রাণ দিতে হতো, ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়। পাকিস্তানি শাসকরা মানুষের জীবন-সম্পদ কোনোকিছু বিবেচনা করেনি। এই বর্বরগুলো কসাই হিসেবে পরিচিত টিক্কা খানকে কেবল গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেই নিয়োগ দেয়নি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর পদেও বসিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১-এর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়ে সচেষ্ট হয়। কিন্তু প্রথম স্বীকৃতি আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে- ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর। ভারত ও ভুটান কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

ততদিনে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের বেশির ভাগ মুক্ত। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল শপথ নিয়েছিল। কিন্তু ভারত ও ভুটান ছাড়া কোনো দেশই ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আগে স্বীকৃতি দেয়নি। রাশিয়া স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে, ব্রিটেন ফেব্রুয়ারি এবং যুক্তরাষ্ট্র এপ্রিলে। চীন ও সৌদি আরবের স্বীকৃতি মিলেছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটার পর।

অনেকেই তর্কে মাতেন- ভারত না ভুটান কে আগে স্বীকৃতি দিয়েছিল? মনে রাখতে হবে, ভারত তখনও বড় শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়েছিল সর্বশক্তি দিয়ে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটি উদ্বাস্তু মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি অস্ত্র-সহায়তা করেছিল। রণাঙ্গনে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সৈন্য হতাহত হয়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য ইন্দিরা গান্ধী ও অন্য নেতারা বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। তাদের স্বীকৃতির ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদার হয়েছে।

ভারত বিবেচনায় নিয়েছিল- বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি বাস্তব সত্ত্বা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রায় সমগ্র ভূখণ্ডে। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে জনগণ বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন জানিয়েছিল। এটাও ভারতের বিচেনায় ছিল যে, বাংলাদেশি নেতৃত্ব পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল। ২৫ মার্চ ভয়ঙ্কর গণহত্যা শুরুর দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকার গঠিত হয় এবং তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীতও ছিল পূর্বনির্ধারিত।

বাংলাদেশের সংগ্রাম ছিল গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে তাৎক্ষণিক তা সশস্ত্র সংগ্রামে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণ ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা’ করতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই লাখো তরুণ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয় এবং প্রশিক্ষণ শেষে সশস্ত্র যোদ্ধা হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সরকার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ বেতার কেন্দ্র- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে, যার শিল্পী-কলাকুশলী সবাই ছিল বাংলাদেশের নাগরিক।

বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে পারে। কলকাতা, দিল্লি ও লন্ডনে বাংলাদেশের কূটনীতিকরা বিশ্বজনমত পক্ষে আনায় কার্যকর ভূমিকা রাখেন। এমনকি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনেও বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল উপস্থিত হয়ে প্রচার চালায়।

রণাঙ্গনে সর্বোচ্চ মাত্রায় সক্রিয় থেকেও বাংলাদেশ সরকার মুক্ত ভূখণ্ডে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখায় সক্রিয় ছিল। এ সময় পরিকল্পনা সেল গঠিত হয়, যার সদস্যরা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছিলেন।

আমরা জানি- For any state to enjoy the rights, duties and obligations of international law and to be a member of the international community, recognition of the entity as a state is very important. Only after recognition of the entity as a state, it becomes acknowledged by other states who are a member of the International Community.

ভারত যখন বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পদান করে, তার কদিনের মধ্যে সে সময়ের বিশ্বের প্রবল ক্ষমতাধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে পারমাণবিক অস্ত্রসহ সপ্তম নৌবহর প্রেরণ করে। এ নৌবহর চট্টগ্রামের কাছে চলে এসেছিল- যাদের বোমারু বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানের পাল্লায় ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ড। চীনও পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১-এর আগস্টে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে যে মৈত্রী চুক্তি হয়, তার শর্ত অনুসারে এক দেশ তৃতীয় কোনো দেশের সামরিক আক্রমণের শিকার হলে পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর কিংবা চীনা সৈন্য সামরিক অভিযান চালালে সে সময়ের বড় শক্তি রাশিয়ার সমর্থন ভারত পেত। বাংলাদেশকে পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত করার অভিযানে ভারত-রাশিয়া চুক্তির সুফল বাংলাদেশ ভোগ করেছে।

প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেক সমস্যা থাকে। চীনের সঙ্গে দেশটির প্রায় সব প্রতিবেশীর স্থল বা সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মেক্সিকোর বিরোধ আছে। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের বিরোধ আছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধ করেছে। সৌদি আরব-ইয়েমেন বিরোধে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যেও বিরোধের ইস্যু রয়েছে। কিন্তু পাঁচ দশকের কূটনৈতিক সম্পর্কে ইতিহাসে দুটি দেশ অনেক সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে।

সীমান্ত কিংবা সমুদ্রসীমা নিয়ে জট কেটেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। চীন থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদনি করে। এর পরই রয়েছে ভারত। কিন্তু চীনে বাংলাদেশ যত পণ্য রপ্তানি করে, এর চেয়ে বেশি করে ভারতে। পদ্মা সেতু চালু হলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়বে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকেন্দ্রিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে। একসময় কেবল উন্নত দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ বিনিয়োগপ্রত্যাশী ছিল। এখন ভারতীয় বিনিয়োগও সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীরাও ভারতকে পুঁজি খাটানোর জন্য বিবেচনা করছে। বাংলাদেশ ও ভারত একাত্তরের চেতনার পথ ধরে চলতে থাকলে বন্ধন জোরদার হবে, সন্দেহ নেই। এ পথে বাধা এলে সেটা অপসারণের পথও ওই একাত্তরের চেতনা।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, কলাম লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে
চৌত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি
গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি: কাদের
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়
শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

শেয়ার করুন

গণতন্ত্র উন্মুক্ত হওয়ার দিন

গণতন্ত্র উন্মুক্ত হওয়ার দিন

মধ্যদুপুরে কোনো মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে বলতেন, গতকাল রাতে স্বপ্ন দেখেছেন এই মসজিদে তিনি নামাজ পড়বেন। জেনারেল এরশাদের এই ভণ্ডামি খুব বেশি দিন এ দেশের মানুষের কাছে চাপা থাকেনি। কেননা যে মসজিদে এরশাদ নামাজ পড়বেন বলে আগের রাতে স্বপ্নে দেখতেন, সেই মসজিদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সাত দিন আগে থেকেই তৎপর থাকতেন। এতে ওই এলাকার মানুষ সহজেই বুঝতে পারতেন এরশাদ কিছুদিনের মধ্যেই এই মসজিদে নামাজ পড়ার স্বপ্ন দেখবেন! ধর্ম নিয়ে এমন মিথ্যাচার ও ভণ্ডামি ইতিহাসে বিরল।

সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৯০-এর ৬ ডিসেম্বর গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। দিনটিকে আওয়ামী লীগ ‘গণতন্ত্র মুক্তি দিবস’, বিএনপি ‘গণতন্ত্র দিবস’ ও এরশাদের জাতীয় পার্টি ‘সংবিধান সংরক্ষণ দিবস’ হিসেবে পালন করে। এ ছাড়া অনেক রাজনৈতিক দল এই দিনটিকে ‘স্বৈরাচার পতন দিবস’ হিসেবেও পালন করে থাকে।

এরশাদ কী ছিলেন, কত বড় স্বৈরাচারী ছিলেন; আশির দশকে এরশাদের শাসন যারা দেখেনি, তারা কল্পনাও করতে পারবে না। অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ যথার্থই বলেছেন- ‘‘আশির দশকের শুরু থেকেই ভালো করে ঘুম হচ্ছিল না বাঙালির, দুঃস্বপ্নের মধ্যেই কাটছিল দিন রাত; বিরাশির চব্বিশে মার্চের ভোরে দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠে বাঙালি পড়ে আরেক দুঃস্বপ্নে…সেই শুরু হয় বাংলাদেশের কালরাত্রি; ওই কালরাত্রির নাম এরশাদ, বাঙলার ইতিহাসের ঘৃণ্যতম নামগুলোর একটি; আর বাঙালি জীবনের প্রায় একটি দশক, আট বছর আট মাস তের দিন কেটে যায় কালরাত্রির গ্রাসে। যা কিছু অশুভ তার সব নিয়ে সে আসে; আশির দশকে বাংলাদেশে চরম অশুভ মানুষের মুখোশ পরে দেখা দিয়েছিল তার নাম এরশাদ। বাঙলায় বলতে পারি অশুভ বা কালরাত্রি। তার কাছে কোন কিছু পবিত্র ছিল না, তাই সব কিছু সে অপবিত্র করে গেছে; তার নৈতিকতা ছিল না, তাই সে বাঙলার সব কিছুকে অনৈতিকতায় আক্রান্ত করে গেছে; কোন সুস্থতা ছিল না, তাই সে সবকিছুকে অসুস্থ করে গেছে। দিনের পর দিন সে বাঙলাকে অন্ধ থেকে অন্ধতর করে তুলেছে, বছরের পর বছর সে বাঙলাকে করে তুলেছে অপবিত্র।” (হুমায়ুন আজাদ, নরকে অনন্ত ঋতু, পৃষ্ঠা ৯৭)।

এই লোকটি দেশের রাজনীতিকে নষ্ট করেছেন। সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করেছেন। ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে নষ্ট করেছেন। ধর্মকে নষ্ট করেছেন। দেশের নির্বাচন-ব্যবস্থাকে নষ্ট করেছেন। নষ্ট করেছেন প্রশাসন ও ছাত্র-যুবাদেরকেও। পুরো দেশকেই দূষিত করে গেছেন। যার ফল এখনও ভোগ করতে হচ্ছে।

এরশাদ ১৯৮২-এর ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলেন। নিজেকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে সামরিক শাসন জারি করেন তিনি, স্থগিত করেন সংবিধান। ১৯৮৩ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন।

মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলসহ ৩ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা মিছিল বের করে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের বিশাল মিছিলটি সচিবালয়ে যাওয়ার পথে হাইকোর্টের সামনে পৌঁছালে এরশাদের পুলিশ বাহিনী বেপরোয়া গুলি চালায়। এতে মৃত্যুবরণ করেন জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ নাম না জানা আরও অনেকে। কালো পিচ ঢালা রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। সেই শুরু, এর পরের ইতিহাস কেবলই এরশাদের খুনে রাজপথ রঞ্জিত হওয়ার ইতিহাস। পরদিন অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোজাম্মেল পুলিশের গুলিতে নিহত হন।

পরের বছর ১৯৮৪-এর ২৮ ফেব্রুয়ারি এরশাদের রাষ্ট্রীয় পেটোয়া বাহিনী ছাত্রমিছিলে ট্রাক উঠিয়ে দিয়ে হত্যা করে ইব্রাহিম হোসেন সেলিম এবং কাজী দেলোয়ার হোসেনকে। এর পর ধারাবাহিকভাবে গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরশাদের পুলিশ এবং সন্ত্রাসী বাহিনী নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে দেশের নিরীহ ছাত্র-জনতাকে।

১৯৮৪-এর ১ মার্চ দেশব্যাপী আহূত শিল্প-ধর্মঘট ও হরতালের সমর্থনে আগের দিন মধ্যরাতে আদমজী জুট মিল এলাকায় কমরেড তাজুলের নেতৃত্বে শ্রমিকরা প্রচার মিছিল বের করলে স্বৈরশাসক এরশাদের সশস্ত্র অনুচরেরা মধ্যরাতে মিছিলে হামলা চালিয়ে মাথা থেঁতলে নির্মমভাবে হত্যা করে তাজুলকে।

একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল চলাকালে নিজ নির্বাচনি এলাকা গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জের মাটিতে রাজপথে মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার সময় পুলিশের সহযোগিতায় এরশাদের লেলিয়ে দেয়া পেটোয়া বাহিনী দেশপ্রেমিক রাজনীতিক মোহাম্মদ ময়েজউদ্দিনকে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এদিন সারা দেশে পুলিশের গুলিতে আরও অন্তত ছয়জন নিহত হন। একই বছরের ২৪ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গায় ফজলুর রহমান নামে একজন নিহত হন। ২২ ডিসেম্বর রাজশাহীতে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় হলের বাবুর্চি আশরাফ, ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ ও পত্রিকার হকার আব্দুল আজিজ।

১৯৮৫-এর ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিলে নিহত হন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া। ৩১ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরে বিডিআরের গুলিতে ছাত্র স্বপন ও রমিজ নিহত হন।

১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাঁচজন, ১৪ মে হরতালে আটজন, ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনে ১১ জন, ১০ নভেম্বর হরতাল চলাকালে ঢাকার কাঁটাবন এলাকায় সাহাদত নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়।

১৯৮৭-এর ২২ জুলাই জেলা পরিষদ বিল প্রতিরোধ ও স্কপের হরতালে তিনজন, ২৪ অক্টোবর শ্রমিকনেতা শামসুল আলম, ২৬ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের লক্ষ্মীপুরে কৃষক জয়নাল ও ১ নভেম্বর কৃষকনেতা হাফিজুর রহমান মোল্লা নিহত হন।

একই বছর ১০ নভেম্বর ‘সচিবালয় ঘেরাও’ কর্মসূচি চলাকালে রাজধানীর জিরো পয়েন্ট এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন যুবলীগ নেতা নূর হোসেন। যুবলীগের আরেক নেতা নূরুল হুদা বাবুল ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের খেতমজুর নেতা আমিনুল হুদা টিটোও সেদিন শহীদ হন।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে মিছিলে গুলিবর্ষণে খেতমজুর নেতা রমেশ বৈদ্য, হোটেল কর্মচারী জি কে চৌধুরী, ছাত্র মহিউদ্দিন শামীম, বদরুল, শেখ মোহাম্মদ, সাজ্জাদ হোসেন, মোহাম্মদ হোসেন ও আলবার্ট গোমেজ, আবদুল মান্নান, কাশেম, ডি কে দাস, কুদ্দুস, পংকজ বৈদ্য, চান মিঞা, হাসান, সমর দত্ত, পলাশ, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন এবং সাহাদাত হোসেনসহ অন্তত ২২ জন নিহত হন। ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় হামলায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়।

এরপর আসে ১৯৯০ সাল, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতির বছর। এ বছর ১০ অক্টোবর সচিবালয়ে অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের গুলিতে ছাত্র জেহাদ ও মনোয়ার, হকার জাকির ও ভিক্ষুক দুলাল নিহত হন। ১৩ অক্টোবর পুলিশের গুলিতে নিহত হন পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র মনিরুজ্জামান ও সাধন চন্দ্র শীল। ২৭ অক্টোবর হরতাল চলাকালে ঢাকার বাইরে দুজন, ১৪ নভেম্বর আদমজীতে ১১ জন, ২৬ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিকশাচালক নিমাই, ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্বদ্যিলয়ের টিএসসি চত্বরে ডা. শামসুল আলম মিলন, ২৮ নভেম্বর মালিবাগ রেলপথ অবরোধে দুজন, ৩০ নভেম্বর রামপুরায় বিডিআরের গুলিতে একজন, ১ ডিসেম্বর মিরপুরে ছাত্র জাফর, ইটভাঙা শ্রমিক আব্দুল খালেক ও একজন মহিলা গার্মেন্টসকর্মীসহ সাতজন।

২৭ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ময়মনসিংহে দুজন, রাজশাহীতে দুজন, ধানমন্ডিতে একজন ও জিগাতলায় একজন নিহত হন। ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ও চাঁদপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন দুজন। এভাবে দীর্ঘ ৯ বছর অসংখ্য মানুষের খুনের রক্তে রক্তাক্ত এরশাদ অবশেষে ১৯৯০-এর ৬ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

স্বৈরশাসক এরশাদ শুধু ঠান্ডা মাথার খুনিই ছিলেন না, তিনি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিরও বারোটা বাজিয়েছেন। ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে কাছে টানতে তিনি ১৯৮৮ সালের ৭ জুন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেন। মধ্যদুপুরে কোনো মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে বলতেন, গতকাল রাতে স্বপ্ন দেখেছেন এই মসজিদে তিনি নামাজ পড়বেন।

জেনারেল এরশাদের এই ভণ্ডামি খুব বেশি দিন এ দেশের মানুষের কাছে চাপা থাকেনি। কেননা যে মসজিদে এরশাদ নামাজ পড়বেন বলে আগের রাতে স্বপ্নে দেখতেন, সেই মসজিদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সাত দিন আগে থেকেই তৎপর থাকতেন। এতে ওই এলাকার মানুষ সহজেই বুঝতে পারতেন এরশাদ কিছুদিনের মধ্যেই এই মসজিদে নামাজ পড়ার স্বপ্ন দেখবেন! ধর্ম নিয়ে এমন মিথ্যাচার ও ভণ্ডামি ইতিহাসে বিরল।

তার মৃত্যুর পর অনেকেই এরশাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্যান্য শাসনামলের সঙ্গে তুলনা টেনে এরশাদের দুষ্কর্ম ও অপরাধকে লঘু করে দেখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু একজন খুনিকে কি আরেকজনের খুন দিয়ে বিচার করা যায়? আরেকজন খারাপের তুলনা টেনে খারাপকে ভালো বলা যায়?

ইয়াহিয়া-টিক্কা খান যেমন ১৯৭১-এ ঠান্ডা মাথায় ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছিল, এরশাদও ক্ষমতায় থাকার জন্য ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ঠান্ডা মাথায় হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষকে খুন করেছেন। এমন একজন নৃশংস খুনিকে যদি আমরা ক্ষমা করে দিই, তাহলে আইয়ুব-ইয়াহিয়া এবং টিক্কা খানদেরও ক্ষমা করে দিতে হয়। এরশাদের অন্য সব অপকর্মের কথা বাদ দিলেও, নিরীহ মানুষ হত্যার কথা ভোলা অসম্ভব।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে
চৌত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি
গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি: কাদের
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়
শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

শেয়ার করুন

উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

উন্নয়নে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ

সামগ্রিক এই সম্ভাবনাকে আমলে নেয়া জরুরি। খেয়াল রাখা দরকার, প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। চলমান করোনা মহামারিতে শ্রমবাজারের এই চিত্র নিশ্চয়ই আরও জটিল হয়েছে। সুতরাং ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক নীতির দিকে এগিয়ে যাওয়াই বড় সমাধান বলা যেতে পারে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কদিন আগেই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের সুপারিশ এসেছে। এমন একটা সময় খবরটা এসেছে যখন বাংলাদেশের বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তি হতে আর অল্প কদিন বাকি।

বাংলাদেশ যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেল, সেখানে দেশের জনগণ ও সরকারের নীতির ভূমিকা আছে। তবে বিশেষ বিবেচনায় বলা যেতে পারে, এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত; বিশেষ করে উদ্যোক্তারা সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ– হোক সে প্রযুক্তি হস্তান্তর বা গাঁটের পয়সা খরচ করে নতুন কোনো পণ্য বা সেবা তৈরির চেষ্টা। স্বল্পোন্নত বা এলডিসি থেকে উন্নয়নশীলের কাতারে আসার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাইলে অনেক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে।

সাম্প্রতিক দেশের এই অগ্রযাত্রায় একসময়ের বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর অর্থনীতি এখন উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এগিয়ে চলা এই অর্থনীতিকে এখন বিনিয়োগবান্ধব নীতিতে ধাবিত করে পৌঁছাতে হবে উন্নত দেশের তালিকায়।

বিনিয়োগবান্ধব নীতির পথে হাঁটতে অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিধি বিস্তৃত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সময়োপযোগী নীতিমালা অবলম্বন করা দরকার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই-এর পরিমাণ ছিল খুবই কম। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বিভিন্ন সময় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রচলিত আইন ও নীতির কিছু পরিবর্তন এবং পরিমার্জন করা হয়েছে। এর সঙ্গে স্বল্প মজুরি, কাঁচামালের সহজলভ্যতা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ফলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।

তারপরেও কিন্তু বেশ কিছু বাধা রয়েছে। সেগুলো অপসারণ করা সময়ের দাবি। কারণ একটাই, বাংলাদেশ এখন আর কোটারি অর্থনীতির মধ্যে নেই যে কোটার কারণে উন্নত দেশগুলো এ দেশ থেকে তাদের সব পণ্য ও সেবা কিনবে। বরং প্রতিযোগিতা করে বাজারের সেরা সেবা নিশ্চিত করেই এগিয়ে যাওয়া জরুরি।

যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের পাশাপাশি চীন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি ও কানাডার মতো অনেক দেশ এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। সরকারও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এর মধ্যে প্রণোদনা ও উৎসাহমূলক সুবিধার ব্যবস্থাও থাকছে। যদিও অতিমাত্রায় আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এখানে অন্যতম বাধা। এ ছাড়া দলিলপত্র প্রক্রিয়াকরণে দীর্ঘসূত্রতা, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় স্থিরমনস্কতার অভাব ও অহেতুক বিলম্ব সমস্যা সৃষ্টি করছে।

এর বাইরে আমদানি-সংক্রান্ত শুল্ক নীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ কার্যকারিতা অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই বিষয়গুলোতে দৃষ্টি না দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকে কেবল আহবান করলেই কাজ হবে না। বিনিয়োগের চলার পথ করতে হবে মসৃণ। তাহলে সেটি স্রোতের মতো প্রবাহিত হয়ে অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার পথকে প্রসারিত করবে।

জাতিসংঘের কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের বিশ্ব বিনিয়োগের প্রতিবেদন অনুসারে- ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এফডিআই-এর পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। পরের বছর সেটি চলে আসে ৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু কাছাকাছি অর্থনীতির দেশগুলোতে এর পরিমাণ অনেকটাই এগিয়ে। সমস্যাগুলোকে আড়াল না করে যদি স্বীকার করে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হয়, তাহলেই বিনিয়োগ তখন আমাদেরকে খুঁজে নেবে এমন আশা করা যায়। তখন আর এখনকার মতো বিনিয়োগ খুঁজতে হবে না। এসব কারণেই সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাসহ অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বিনিয়োগের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই কারণে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশা অনুযায়ী মিলছে না। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজ করার সূচকে বারবার পিছিয়ে পড়াও ভোগাচ্ছে। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অবকাঠামো সঠিক ব্যবহার করতে না পারা, শ্রমিকের যথাযথ দক্ষতার ঘাটতি, সামগ্রিক দুর্নীতি, ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সম্পত্তি নিবন্ধনে জটিলতা ও ঋণপ্রাপ্তির চ্যালেঞ্জসহ নানা কারণে ব্যবসা শুরু করতেই অনেক সময় লেগে যায়। এসব ব্যাপারও দেশীয় উদ্যোক্তাদের যেমন অনাগ্রহী করে, একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কৃষি হতে পারে বড় একটি ক্ষেত্র। জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান আগের চেয়ে কমেছে। কিন্তু এখনও সেটি অনেক। ২০১৯-২০ অর্থবছরেও জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান ছিল ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। যদিও শিল্প খাতের অবদান এখানে অনেক বেশি। কিন্তু কৃষি খাতটি এত বিস্তৃত ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব এত বিশাল যে, শুধু কৃষি খাতের আধুনিকায়ন করে গোটা দেশকে বদলে ফেলা সম্ভব।

কৃষির ক্ষেত্রেও শিল্পের যোগ আছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলেও অনেক মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষি ও মৎস্য খাতের সঙ্গে শিল্পের সংযোগ ঘটাতে পারলে সবার জন্য ‍সুষম খাবারের নিশ্চয়তা অর্জন করা যাবে।

এ ছাড়া প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ তো আছেই। যা বিনিয়োগে অনেক বড় ক্ষেত্র। কারণ অগ্রগতির চাকা অনেকাংশে প্রযুক্তিই দ্রুততর করে দিতে পারে। ‍প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আসে নতুন জ্ঞান, নতুন শিক্ষা। সেগুলো ধাপে ধাপে সঞ্চারিত হয় স্থানীয়দের মধ্যে। যেখান থেকে দাঁড়িয়ে যায় নতুন সম্ভাবনা এবং সৃষ্টি হয় হাজার-লাখো কর্মসংস্থান।

সামগ্রিক এই সম্ভাবনাকে আমলে নেয়া জরুরি। খেয়াল রাখা দরকার, প্রতি বছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। চলমান করোনা মহামারিতে শ্রমবাজারের এই চিত্র নিশ্চয়ই আরও জটিল হয়েছে। সুতরাং ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক নীতির দিকে এগিয়ে যাওয়াই বড় সমাধান বলা যেতে পারে।

বিদেশি বিনিয়োগ টানার অসংখ্য ক্ষেত্র বাংলাদেশে রয়েছে। প্রয়োজন শুধু যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করা। আবার বিদেশি বিনিয়োগ টানতে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তার একটি হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা; যেখানে বাংলাদেশ বেশ উন্নতি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও আছে বাংলাদেশের পক্ষে। বাকি থাকে কেবল পারিপার্শ্বিক উন্নয়ন। সেটির দায় সবার। সবাই মিলে কাজ করলে দেশীয় উদ্যোগ ও বিদেশি বিনিয়োগ মিলে ২০৪১-এর আগেই বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের কাতারে যেতে পারবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: কলাম লেখক ও নির্বাহী পরিচালক, ডাক বিভাগের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’।

আরও পড়ুন:
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে
চৌত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি
গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি: কাদের
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়
শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সূচনা লগ্ন ও অনুচ্চারিত কিছু কথা

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সূচনা লগ্ন ও
অনুচ্চারিত কিছু কথা

পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) সীমান্ত রেখায় ভারতীয় ভূখণ্ডে ভারত স্বাভাবিক কারণেই সৈন্য ও সমরাস্ত্র সমাবেশ করেছিল। সম্ভবত ভারতের দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর উদ্দেশ্যে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তান আচমকা বিমান হামলা করে। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় পাকিস্তান বিমান হামলা করে। পাকিস্তানের মিরেজ-৩ বিমানগুলো পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে। এতে রানওয়ের কিছুটা ক্ষতি সাধিত হয়। এরপর বিমান হামলায় পাঞ্জাবের অমৃতসরের রানওয়েরও ক্ষতিসাধিত হয় তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা মেরামত করা সম্ভব হয়।

মুক্তিযুদ্ধের একটি নিষ্পত্তিমূলক পরিণতি অর্থাৎ চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্র ১৯৭১-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্তরালে রাজনৈতিক কারণ কিছুটা ভূমিকা রাখলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত সহানূভূতি ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নির্যাতিত নিপীড়িত বাঙালির প্রতি।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে তিনি মূল্য দিয়েছিলেন। ফলে প্রায় এককোটি শরণার্থীর ভার তিনি অবলীলায় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি পাশে পেয়েছিলেন সমমনা রাজনৈতিক সহকর্মী ও সামাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেককে। কিছু বিরুদ্ধ চিন্তার রাজনৈতিক ঘরানার মানুষের প্রতিরোধের মুখোমুখি হলেও নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়েই ইন্দিরা গান্ধী তার লক্ষ্যে এগিয়েছিলেন।

ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ও অস্ত্র সহায়তা করে গেরিলা যোদ্ধাদের এগিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধারা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে নভেম্বরের মধ্যে কোণঠাসা করে ফেলেছিল পকিস্তানি বাহিনীকে। কিন্তু এ সত্যটিও মানতে হবে পাকিস্তানি বাহিনীর মতো একটি প্রশিক্ষিত বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে হলে সম্মুখযুদ্ধের বিকল্প ছিল না। ট্যাঙ্ক-কামান, মর্টারসহ ভারী অস্ত্র ও বিমান বাহিনীর সমর্থন ছাড়া এই যুদ্ধের নিষ্পত্তি এতটা অল্প সময়ে সম্ভব ছিল না।

এই সত্য মেনে একাত্তরের শেষদিকে এসে মুক্তিপ্রত্যাশী বাঙালির চাওয়া ছিল ভারতীয় বাহিনী সরাসরি আমাদের পাশে থেকে সাহায্য করুক। বিষয়টি নিয়ে সেসময়ের স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গভীরভাবে ভেবেছে। যুদ্ধে ভারত সরাসরি অংশ নিলে এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে এসব নিয়েও ভাবতে হয়েছে।

এমন একটি বাস্তবতায় ২৬ অক্টোবর থেকে ছাব্বিশ দিন ইন্দিরা গান্ধী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপ সফর করেন। এসময়ে তিনি বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে, বাস্তব কারণেই পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ অনেকেই এতদিন আশা করেছিলেন পাকিস্তান একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে। কিন্তু ক্রমে সে আশা ফিকে হয়ে যাচ্ছিল। অবস্থা যে পর্যায়ে চলে গিয়েছে তাতে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে তার সঙ্গে কোনো আপস করতে হলে সেনা-শাসকদের ক্ষমতা ত্যাগ করে আসতে হবে। কিন্তু সে পথে হাঁটবে না ইয়াহিয়া খানের প্রশাসন।

কিন্তু ভারতের মতো একটি বিদেশি রাষ্ট্রের সৈন্যরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করায় ভূমিকা রাখলে এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সে আশঙ্কাও করছিলেন অনেকে। কিন্তু এই আশঙ্কা থেকে সকলকে মুক্ত করেছিলেন দুইপক্ষের নেতৃবৃন্দ। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বাক্ষরিত একটি দলিল তৈরি করা হয়েছিল। তাতে ছিল বেশ কয়েকটি শর্ত।

একটি শর্তে ছিল ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর যারা ভারতে প্রবেশ করেছে স্বাধীন দেশে শুধু তারাই ফেরত আসবে। অন্য আরেক শর্তে ছিল বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে না এবং বাংলাদেশ সরকার যতদিন চাইবে শুধু ততদিনই ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে থাকতে পারবে। বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর চাপ ভারতের মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছিল।

ফলে ভারতও চাইছিল বাংলাদেশ সংকটের দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। যা হয়তো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। এ প্রসঙ্গে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর ৫ ডিসেম্বর অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর লেখা লন্ডন সানডে টাইমসে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ থেকে যৌক্তিক বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অথচ বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো নীরবতার ভূমিকা পালন করছে। মাসকারেনহাস লিখেছেন-

“সত্যি কথা হলো, ভারত অনিচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের আর কোনো বিকল্প নেই। আটমাস ধরে বিশ্বের কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হতে হয়েছে। যে ১১ মিলিয়ন পূর্ব পাকিস্তানি শরণার্থী সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয় নিয়েছে তাদের ভরণপোষণ ও খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করার জন্য ভারত আর্থিক সাহায্য চেয়েছে। এছাড়া শরণার্থীরা যাতে পূর্ব পাকিস্তানে নিরাপদ আশ্রয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে পারে সে লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থার ব্যবস্থা গ্রহণের আশা ভারতের ছিল।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন যে, ‘কোনো অবস্থাতেই শরণার্থীদের ভারতে স্থায়ীভাবে থাকতে দেয়া হবে না।’ ইন্দিরা গান্ধীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সফর আশানুরূপ ফল দেয়নি। আগামী মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ ১২ মাসে উদ্বাস্তুদের ভরণপোষণে খরচ হবে ৩৯০ মিলিয়ন পাউন্ড। এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ সাহায্যের আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে তা মাত্র ১০৩ মিলিয়ন পাউন্ড। এর মধ্যে ভারত হাতে পেয়েছে মাত্র ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড।

পাকিস্তানের প্রতি রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের ভারতীয় অনুরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল হতাশাব্যঞ্জক। নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, ভারত আপসের দিকে না গিয়ে বরং যুদ্ধের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। একজন ভারতীয় মুখপাত্রের মতে, “আমরা সাহায্য প্রার্থনা করে যা পেয়েছি তা শুধু ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা ধরনের উপদেশ।” ...

পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা ভারতের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। জিনিসপত্রের মূল্য অনবরত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে বেকারের সংখ্যা। ছয় মাস আগে দিল্লিতে রাস্তার পাশে মাদ্রাজি দুটি দোসা ও দুটি ইডলি এবং দুকাপ চা কফি তিন টাকায় (২৫ পেনি) পাওয়া যেত, এখন তা সাড়ে আট টাকা।...উদ্বাস্তুদের সাহায্যার্থে যে ট্যাক্স বসানো হয়েছে তা এখন সবাইকে আক্রান্ত করছে। কারণ প্রতিটি ভারতীয়কে একটি চিঠি লেখার জন্য ৫ পয়সা করে উদ্বাস্তু কর দিতে হয়।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধে যত টাকা খরচ হয়েছিল বর্তমানে শরণার্থীদের জন্য ভারতের তার চেয়ে বেশি খরচ করতে হচ্ছে। সুতরাং উদ্বাস্তুদের আর্থিক সাহায্য করার বদলে যুদ্ধ করাই শ্রেয়।...

কয়েকজন ব্যক্তি যেমন সম্পাদক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তাসহ দিল্লিতে যার সঙ্গেই আলাপ করি, তারা সবাই একবাক্যেই বলেন, ২৪ বছর ধরে ভারত-পাকিস্তানের বোঝা টানছে। এখন চিরতরে সব সমস্যা সমাধানের সময় এসেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সমস্যা, এবং ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য প্রদানে ব্যর্থতা ও জাতিসংঘের অকার্যকারিতা ভারতকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”

এর মধ্যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে ভারতের অভ্যন্তরে সরকারের উপর চাপ ছিল। মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি নানা সংগঠন থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নটি উঠে আসে। বিশেষ করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, বুদ্ধিজীবীদের নানা সংগঠন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষক সমিতি এবং রাজ্য বিধানসভাগুলোও স্বীকৃতির পক্ষে দাবি উত্থাপন করে।

বাংলাদেশকে অর্থাৎ মুক্তিবাহিনীকে সরাসরি সাহায্যের জন্য এই স্বীকৃতিরও প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধাবস্থা তৈরি না হলে বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য প্রবেশ করা বৈধতা পাবে না। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এসব প্রশ্ন সামনে চলে আসে। কিন্তু শেষপর্যন্ত যুদ্ধ ঘোষণার প্রথম প্রত্যক্ষ কারণ ঘটিয়ে দিল পাকিস্তান।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এর আগেও দুবার সংঘটিত হয়েছিল। তবে এই তৃতীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটটিই ছিল আলাদা। পাকিস্তান বাঙালির স্বায়ত্বশাসনের দাবির প্রতি সম্মান দেখায়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গণহত্যা চালিয়ে পাকিস্তানি শাসক বাঙালির ওপর মুক্তিযুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। মে-র মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তাদের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলতে থাকে।

এর মধ্যে আগস্টে ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ২০ বছরব্যাপী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুসারে প্রত্যেক দেশ অপর দেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পারস্পরিক সহযোগিতার করার অঙ্গীকার করে। পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) সীমান্ত রেখায় ভারতীয় ভূখণ্ডে ভারত স্বাভাবিক কারণেই সৈন্য ও সমরাস্ত্র সমাবেশ করেছিল। সম্ভবত ভারতের দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর উদ্দেশ্যে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তান আচমকা বিমান হামলা করে।

বিকেল সাড়ে পাঁচটায় পাকিস্তান বিমান হামলা করে। পাকিস্তানের মিরেজ-৩ বিমানগুলো পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে। এতে রানওয়ের কিছুটা ক্ষতি সাধিত হয়। এরপর বিমান হামলায় পাঞ্জাবের অমৃতসরের রানওয়েরও ক্ষতিসাধিত হয় তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা মেরামত করা সম্ভব হয়। এ সময়ই ভারত সিদ্ধান্ত নেয় ওই রাতেই তারা পাকিস্তানে বিমান আক্রমণ করবে।

সামান্য বিরতির পরে পাকিস্তানের দুটি বি-৫৭ বিমান বোমা ফেলে হরিয়ানার আম্বালাতে। এই হামলায় সামান্যই ক্ষতি হয়েছিল। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজস্থানের উত্তারলাই এবং পাঞ্জাবের হালওয়ারা বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তানি বোমা বর্ষণে। এছাড়াও পাকিস্তানি বোমারু বিমান হামলা করে কাশ্মিরের উধামপুরে, জয়সালমির ও জোধপুরে। এভাবে প্রায় ১২টি বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তানি বিমান হামলা পরিচালিত হয়। নিক্ষিপ্ত বোমার সংখ্যা ছিল ১৮৩টি।

ওই রাতেই ইন্দিরা গান্ধি ভারতীয় রেডিওতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেখানে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরদিন ভারতীয় বিমান বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আগে থেকেই যুদ্ধকৌশল নির্ধারিত ছিল ভারতের।

ভারতীয় বিমান বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানের নানা বিমানঘাঁটি ছাড়াও একযোগে বিমান হামলা চালিয়ে বোমাবর্ষণে ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর অকেজো করে দেয়। লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিংয়ের ওপর পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণের প্রধান দায়িত্ব ছিল। তিনি ৮, ২৩ এবং ৫৭ ডিভিশন নিয়ে আক্রমণ পরিকল্পনা করেন। ভারতের পশ্চিম সীমান্তেও যুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে।

ঢাকায় ভারতীয় বিমান হামলায় রানওয়ে পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। ফলে এখানেই পাকিস্তানি বাহিনীর পতনের সুর স্পষ্ট হয়ে বাজতে থাকে। ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ তীব্র হতে থাকে। ভারতের নানা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় মিত্র বাহিনী প্রবেশ করতে থাকে। মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর তীব্র আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। বিজয়ের ক্ষণগণনা করতে থাকে সাধারণ মানুষ।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে
চৌত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি
গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি: কাদের
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়
শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

শেয়ার করুন

এ স্বপ্ন অলীক নয়

এ স্বপ্ন অলীক নয়

প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আমাদের না আছে বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না আছে পারিবারিক-সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভালো পরিবেশ। মেধা বিকশিত করার জন্যও নেই ভালো কারিগর। মানুষ গড়ার এই কারিগর শিক্ষকরা নানা দলে-উপদলে বিভক্ত, কুটিল রাজনীতিতে লিপ্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফোর্বসের ‘থার্টি আন্ডার থার্টি’-তে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের বাসিমা ইসলাম। গেল বুধবার এ তালিকা প্রকাশ করেছে সাময়িকীটি। ফোর্বস প্রতিবছর ২০টি ক্যাটাগরিতে ৩০ জন করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করে, যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে।

এ ক্যাটাগরিগুলোর একটি বিজ্ঞান, যেখানে স্থান পাওয়া বাসিমা বোস্টনের ওয়েস্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কম্পিউটার ও তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে যোগ দিতে যাচ্ছেন। তার ছোট একটি প্রোফাইলও প্রকাশ করেছে ফোর্বস। এতে লেখা রয়েছে, তিনি ব্যাটারি ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারযোগ্য ডিভাইস ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ (আইওটি) তৈরিতে কাজ করছেন।

এক সাক্ষাৎকারে বাসিমা বলেছেন, তার উদ্ভাবিত ডিভাইসটি বিশ্বব্যাপী ইলেক্ট্রনিক্স জগতে পরিবর্তন আনবে। পৃথিবীতে দৈনিক প্রায় ৮৭ লাখ ডিভাইসে ব্যাটারি পরিবর্তন হয়। এই বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি তৈরি ও রিসাইক্লিংয়ে ব্যাপক খরচের পাশাপাশি পরিবেশে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। যার সমাধান হতে পারে আইওটি।

এটি ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চিকিৎসা ও কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। বাসিমার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন আইওটি ডিভাইস তৈরি করা। দেশের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বুয়েট থেকে পড়াশোনা করা বাসিমা ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে সদ্যই নিয়োগ পেয়েছেন ৩৭ বছর বয়সি ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরাগ আগরওয়াল। ২০০৫ সালে মুম্বাই আইআইটি থেকে ব‍্যাচেলর শেষ করে, সে বছরই আমেরিকার স্ট‍্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে যান পিএইচডি করতে। ২০১১ সালে টুইটারে যোগ দেয়ার আগে তিনি এটি অ্যান্ড টি ল্যাব, ইয়াহু এবং মাইক্রোসফটে কাজ করেন। ২০১৭ সালে টুইটারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) পদেও বসানো হয় তাকে।

ভারতীয়দের মধ্যে আরও আছেন মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সত্য নাদেলা, গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই, অ্যাডোবির সিইও শান্তনু নারায়ণ এবং মাস্টারকার্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান অজয়পাল সিং বাঙ্গা।
সারা বিশ্বে আমাদের বাসিমার মতো হাতেগোনা দুয়েকজন থাকলেও ভারতের সংখ্যাটা অনেক বড় এবং তারা ততধিক বড় পদে মাথা উঁচু করে কাজ করছেন সম্মান, সম্ভ্রম আর বিনয়ের সঙ্গে।

বিশ্বায়নের কালে ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী, এগিয়েও যাচ্ছে। আর এগিয়ে যাওয়ার এ সময়ে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ছেলেমেয়েরা মেধা দিয়ে, নিজের যোগ্যতা দিয়ে, শ্রম দিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে পৃথিবীর শীর্ষস্থানগুলোতে। সেইসঙ্গে আর্থিক দিকটিও পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পরাগ আগরওয়ালের আনুষঙ্গিক সুবিধার বাইরের বার্ষিক ১০ লাখ ডলার বেতন, শুধুই তার কাজের স্বীকৃতি।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে চাহিদার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে। প্রযুক্তি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বাড়ছে, সেটাই স্বাভাবিক। নিত্যনতুন ডিভাইস, ইলেকট্রনিক পণ্য, দামি বা ফ্যাশনেবল পোশাক, বাড়ি, গাড়ি, দামি ফার্নিচার, আরও কতকিছুই এখন আমাদের চাহিদার তালিকায়।

নিজের জীবন নিয়ে উচ্চাশা দোষের কিছু নয়। প্রতিটি মানুষের আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন থাকে। মেধা আর কঠোর শ্রম দিয়ে সে স্বপ্ন পূরণের সফলতার আনন্দময় গল্পও থাকে, ঠিক বাসিমা ইসলাম, পরাগ আগরওয়াল, সুন্দর পিচাই, সত্য নাদেলাদের মতো।

বিষয়টি হলো কষ্টসাধ্য, দুর্গম পথে হাঁটতে আমাদের বড়ই অনীহা। আমরা তড়তড় করে উপরে ওঠার জন্য খুঁজে বেড়াচ্ছি সহজতর পথ। খ্যাতি-মোহ, অর্থ-বিত্ত সবকিছু নিমিষেই হাতের মুঠোয় পেতে মরিয়া। ছেলেমেয়েদের বেশিরভাগই শ্রম-মেধা দিয়ে সময়ক্ষেপণ করে প্রতিষ্ঠা পাওয়াকে সময়ের অপচয় মনে করে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আমাদের না আছে বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না আছে পারিবারিক-সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভালো পরিবেশ। মেধা বিকশিত করার জন্যও নেই ভালো কারিগর। মানুষ গড়ার এই কারিগর শিক্ষকরা নানা দলে-উপদলে বিভক্ত, কুটিল রাজনীতিতে লিপ্ত। রাজনৈতিক পদ-পদবি পাওয়াকেই শিক্ষকতার সর্বোচ্চ প্রাপ্তি মনে করেন।

নিজের ঘর থেকে যে নৈতিক শিক্ষার শুরু, সেখানেও সমস্যা। পিতামাতা অভিভাবকেরা নিজেরাই গোলক ধাঁধায় ভোগেন। কেবলই অর্থনৈতিক নিশ্চয়তাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যোগ্য মানুষ করে গড়ে তোলার পরিবর্তে বেশি অর্থ উপার্জন করার ভাবনাটাকেই প্রাধান্য দেন। তাই সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালনা করাটা তাদের জন্যও সহজ হয় না।

আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। আমাদের দেশে যেখানে সেখানে দেখা যাওয়া বিপুলসংখ্যক মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হচ্ছে ততধিক মানহীন শিক্ষার্থী। পরবর্তী সময়ে যারা বেকার হিসেবে দুঃসহ জীবন শুরু করে। এই বেকারত্বের বাঁধন ছিন্ন করা বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। যে স্বচ্ছলতার সুখস্বপ্ন নিয়ে তারা পড়তে এসেছিল, পড়া শেষ করে কিছুদিনের ভেতরই তাদের মোহভঙ্গ হয়, আশাহত হয়। অথচ সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে কৌশল অবলম্বন করে বিপুলসংখ্যক ছেলেমেয়েকে বেকারত্বের গ্লানি থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অধিক মাত্রায় জোর দিয়ে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট তৈরি করা গেলে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্ব অনেকটাই কমে আসবে নিশ্চিত। ভারত যে মহাকাশ গবেষণা, পরমাণু শক্তি গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক‍েমিক‍্যাল অ্যান্ড বায়োকেমিক‍্যাল গবেষণা অনেক ক্ষেত্রে অভাবনীয় সফলতা দেখাচ্ছে, তার মূলে হলো তাদের উচ্চমানের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখান থেকে শিক্ষা নিয়েই ছেলেমেয়েরা সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত করতে পারছে। যতই দিন যেতে থাকবে ভারত এর সুফল ভোগ করতে থাকবে পূর্ণমাত্রায়।

ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে কেউ বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ে, কেউ দেশেই গড়ে। অনেকেই সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠে, তৈরি হয় বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠান।

দেশে আর্থিক সমস্যা আছে, থাকবে। ভারতেরও আছে। এখনও ভারতে বিপুলসংখ্যক মানুষ একবেলা মাত্র খেতে পায়, চিকিৎসার অভাবে মারা যায় অসংখ্য মানুষ, আকাশের নিচে রাত কাটায়, স্যানিটেশন নেই, আরও আরও অনেক কিছু নেই। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় ছাড় দেয়নি ভারত। তুখোড় ছাত্রদের শানিত করবার সব ধরনের ব্যবস্থা করে রেখেছে।

তাই উন্নতমানের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানবিক গুণ যোগ করে যদি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যায়, তবে তা হবে জ্ঞানের ভাণ্ডার, অর্থেরও ভাণ্ডার। তাহলে আমরা লোভ লালসাহীন, উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন মানবিক এক দেশ দেখব, যেখানে অর্থনীতির সুষম বণ্টন হবে, দুর্নীতির মাত্রা আর দারিদ্র্য কমে যাবে। মানসম্পন্ন আধুনিক সভ্যতার সোপান রচিত হবে।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে
চৌত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি
গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি: কাদের
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়
শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

শেয়ার করুন

সড়কে নৈরাজ্য ঠেকানোর দায়িত্ব কার

সড়কে নৈরাজ্য ঠেকানোর দায়িত্ব কার

নানা ঘটনায়, নানা অজুহাতে পরিবহন মালিকরা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা নেন। সম্প্রতি খোদ জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্য যিনি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত, তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান সরকারের আমলে তারা বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকা প্রণোদনা পেয়েছেন। যে রাষ্ট্রে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা সরকারি প্রণোদনা পান, সেই পরিবহন মালিকরা কী করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নিতে অস্বীকার করেন— তা বোধগম্য নয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা বাসে যে হাফ ভাড়া দেয়, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।

সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, অভিনেতা এমনকি পুলিশের গাড়ি আটকে দিয়ে কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করছে যারা, তাদের বয়স ২০-এর বেশি নয়। অর্থাৎ অধিকাংশই কিশোর-তরুণ। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। এই দৃশ্যগুলো প্রথম দেখা গিয়েছিল ২০১৮ সালের আগস্টে। তার সোয়া তিন বছর পরে আবারও সেই একই দৃশ্যের অবতারণা।

স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরে শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছে রাস্তায়। তারা সড়ক অবরোধ করে, সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়ে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদ করছে। বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার দাবি করছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ এবং সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় তাদের সহপাঠী নিহতের বিচার দাবি করছে। শুধু তাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তারা একটি পুলিশ ভ্যান আটকে পুলিশের সঙ্গে তর্ক করছে, কারণ ওই গাড়ির লাইসেন্স নেই। একজন পুলিশ কর্মকর্তা তখন তাদের বলছেন, এই গাড়িটির বিরুদ্ধেও মামলা দেয়া হবে।

দৃশ্যগুলো সিনেমায় হলে আরও ভালো হতো। বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত নয়। এই দৃশ্যগুলোর ভেতরে রোমান্টিসিজম আছে। উত্তেজনা আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার উপাদান আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রশ্নও আছে যে, আমরা আমাদের সন্তানদের ঠিক এভাবে রাস্তায় দেখতে চাই কি না?

যদি উত্তর হয় ‘না’, তাহলে পাল্টা প্রশ্ন আসবে, কেন সড়কের নৈরাজ্য ঠেকাতে তাদের রাস্তায় নামতে হলো? সড়কে নৈরাজ্য ঠেকানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠানের, তারা কী করছে? তারা কি নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বলেই এখন এই তরুণদের ক্লাস বাদ দিয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হচ্ছে? এই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটির অবতারণা হলো কাদের ব্যর্থতার কারণে?

২০১৮ সালের কিছু দৃশ্য মনে করা যেতে পারে, পুলিশ প্রটোকলে মন্ত্রীর গাড়ি। সাদা গাড়ির ভেতরে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা থামিয়ে দিল। তারা জানতে পারল খোদ মন্ত্রীর গাড়ির চালকেরই লাইসেন্স নেই, অথবা লাইসেন্স সঙ্গে নেই। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে মন্ত্রী মহোদয় সাদা গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। পেছনে থাকা কালো রঙের আরেকটি গাড়িতে উঠে রওনা হলেন।

একইরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন দেশের ছাত্র-আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, উনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক তোফায়েল আহমেদ। তার গাড়িটি উল্টো পথে যাচ্ছিলে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আটকে দেয়। যদিও তোফায়েল আহমেদ গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের বলেছিলেন, তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্যই উল্টো পথে এসেছেন।

ওই বছরও পুলিশ তাদের নিজের বাহিনীর গাড়ির বিরুদ্ধেই মামলা দিয়েছিল। ছাত্ররা তখন সরকারের অন্য আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এমনকি গণমাধ্যমের গাড়ি আটকে দেয় এবং গাড়ির ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স না থাকলে সেই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিতে বাধ্য করে। কিছু গাড়ি ভাঙচুরও করা হয়। ওই বছর তারা রাস্তায় নেমেছিল সড়কে তাদের দুই সহপাঠীর নির্মম মৃত্যুর প্রতিবাদ জানাতে।

সেই প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওই প্রতিবাদের তিন বছর পরে তাদেরকে আবার কেন একই দাবিতে রাস্তায় নামতে হলো? ২০১৮ সালে তারা প্ল্যাকার্ডে লিখেছিলো: ‘রাষ্ট্রের মেরামত চলছে; সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ কিন্তু রাষ্ট্রের মেরামত যে ঠিকমতো হয়নি, তার প্রমাণ হলো একইরকমের প্ল্যাকার্ড নিয়ে সেই কিশোর-তরুণরা আবারও রাস্তায়।

এবারের ঘটনার পেছনে শুধু সড়কে সহপাঠীর নিহত হওয়ার ঘটনাই নয়, বরং গহণপরিহনে হাফ ভাড়ার দাবিটিও যুক্ত হয়েছে। লিটারে তেল ও ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে বাস ও লঞ্চে ভাড়া বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া না নেয়ার সিদ্ধান্ত জানার পরেই এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসে সমাজের নানা স্তর থেকে। তার মধ্যেই ঢাকা দক্ষিণ সিটির একটি ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ যায় একজন শিক্ষার্থীর— যা এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া না নেয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে গণপরিবহন, বিশেষ করে বাসের মালিকরা দাবি করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই গরিব। পরিবহন ব্যবসায়ীরা গরিব— এই কথার ভেতরে যতটা না বাস্তবতা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে রসিকতা। ফলে সেই রসিকতার উৎস সন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক। এরইমধ্যে একজন পরিবহন মালিকের ব্যাপারে তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, তিনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন একটা বাস দিয়ে। এখন তার বাসের সংখ্যা আড়াইশ। আড়াই শ বাসের মালিকও এই দেশে গরিব!

এসব রসিকতাও অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। যেমন, এক লিটার তেলে একটি বাস কত দূর যায়? একটি বাসে কতজন যাত্রী থাকেন এবং এক লিটার তেলের দাম যদি আগের চেয়ে ১৫ টাকা বেশি হয় তাহলে প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ১৫ টাকার কত শতাংশ বাড়তি হিসাবে সর্বোচ্চ কত টাকা বাড়তি আদায় করা সংগত? এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যাবে না। উপরন্তু, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোয় যেসব বাস চলে, তার সবগুলো তো তেল বা ডিজেলে চলে না। সিএনজিতে চলে যেসব বাস, তারাও কেন বাড়তি ভাড়া নেবে? আর শিক্ষার্থীরা তাদের আইডি কার্ড দেখিয়ে তো বছরের পর বছর ধরে হাফ ভাড়া দিয়েই আসছিলেন, তাহলে নতুন করে তাদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া না নেয়ার সিদ্ধান্তটি কেন হলো?

নানা ঘটনায়, নানা অজুহাতে পরিবহন মালিকরা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা নেন। সম্প্রতি খোদ জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্য যিনি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত, তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান সরকারের আমলে তারা বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকা প্রণোদনা পেয়েছেন। যে রাষ্ট্রে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা সরকারি প্রণোদনা পান, সেই পরিবহন মালিকরা কী করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নিতে অস্বীকার করেন— তা বোধগম্য নয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা বাসে যে হাফ ভাড়া দেয়, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।

বস্তুত, আমাদের গণপরিবহন ও গণপরিবহন ব্যবস্থা সারা বছরই গণমাধ্যমের শিরোনামে থাকে। এত বেশি নৈরাজ্য রাষ্ট্রের আর কোনো সেক্টরে সম্ভবত হয় না। প্রতিদ্বন্দ্বী বাসের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো এবং বাসের ভেতরে থাকা সব যাত্রীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা; ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ; রাস্তার মাঝখানে কোনো নারী উঠতে চাইলে তাকে না নেয়া; নারী বা বৃদ্ধকে নামানোর জন্য গাড়ি পুরোপুরি না থামানো; ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা; লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অমানবিক লোকদের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং তুলে দেয়া; বাসের ভেতরে একা কোনো নারী থাকলে তাকে ধর্ষণ বা গণধর্ষণ করাসহ পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগের অন্ত নেই।

বছরের পর বছর ধরে চলছে এসব নৈরাজ্য— যা বন্ধের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। তারা তাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করছে? করছে না যে, তার প্রমাণ ২০১৮ সালের বিক্ষোভের সোয়া তিন বছর পরে একই দাবিতে আবারও রাজপথে শিক্ষার্থীরা— যে কাজটি তাদের করার কথা নয়। রাস্তায় পুলিশের গাড়ি থামিয়ে ছাত্ররা গাড়ির কাগজ ও লাইসেন্স পরীক্ষা করবে, এটি শোভন নয়। এই অশোভন কাজটি করার জন্য কেন তাদের রাস্তায় নামতে হলো, সেই জবাব রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

প্রশ্ন হলো, শিশু-কিশোররা কি রাষ্ট্রকে তার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কেউই তার কাজটা সঠিকভাবে করছে না? যে পুলিশ গাড়ির ফিটনেস আর ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করবে, তাদেরই লাইসেন্স নেই। যে গণমাধ্যম সমাজের অসংগতি তুলে ধরবে, তাদের গাড়িই নিয়ম মেনে চলে না। যে মন্ত্রীরা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ করেন, তারাই উল্টো পথে চলেন। তাদের চালকেরই লাইসেন্স নেই! জনগণের পয়সায় পরিচালিত খোদ সিটি করপোরেশনের গাড়ি চালায় ভাড়াটিয়া লোকজন এবং এখানে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়ম, যে অনিয়মের বলি হচ্ছে সাধার মানুষ।

ফলে শিক্ষার্থীরা বলছে, তারা জাস্টিস চায়। তারা লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের গাড়ির চালকের বিরুদ্ধেও মামলা দিতে বাধ্য করে। এই দৃশ্য ২০১৮ সালের আগে স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ দেখেনি। এ এক অদ্ভুত বাস্তবতা; ভুক্তভোগীদের জন্য এ এক করুণ অভিজ্ঞতা। যারা বছরের পর বছর মনে করে আসছিলেন তারা সব নিয়ম কানুন আর আইনের ঊর্ধ্বে, তাদেরকেও রাস্তায় নাজেহাল হতে হয় তাদের সন্তান এমনকি নাতিতুল্যদের কাছে। এই দৃশ্য তো কাঙ্ক্ষিত নয়।

প্রশ্ন হলো, সড়কে নৈরাজ্য কেন থামে না? এর পেছনে অনেকগুলো কারণ ও ফ্যাক্টর রয়েছে। একটি বড় কারণ পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা খুবই প্রভাবশালী এবং তাদেরকে ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়। ক্ষমতায় যেতে এবং ক্ষমতায় থাকতে নানাভাবেই তাদের কাজে লাগানো হয়। সুতরাং রাষ্ট্র যাদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া কঠিন।

তাছাড়া দেশের রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদেরও অনেকে পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের বিরাট ভোটব্যাংক রয়েছে। উপরন্তু গণপরিবহগুলোর পরিচালনার পদ্ধতিটিই এমন যে, এখানে চালকরা প্রতিদ্বন্দ্বী বাসের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবেই।

আরেকটি বড় সমস্যা, দেশে যে পরিমাণ গণপরিবহন, সেই পরিমাণ দক্ষ চালক নেই বা তৈরি হয় না। ফলে মালিকরা তাদের ব্যবসার স্বার্থে সব সময়ই পরিবহন শ্রমিকদের তোয়াজ করে চলে। মালিকরা একটু কঠোর হলেই তারা চাকরি ছেড়ে দেয়। ফলে ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কায় মালিকরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের অন্যায় মেনে নেয়।

আবার অনেক সময় মালিকের ‍অতিলোভ, শ্রমিকদের ঠকানো ইত্যাদি কারণেও চালক ও হেলপাররা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমস্যাটা নানামুখী। এসব সমীকরণ যতদিন থাকবে, ততদিন গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধের জন্য রাস্তায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ, মাঝেমধ্যে গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, টেলিভিশনে টকশোতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা কিংবা পত্রিকার পাতায় বড় নিবন্ধ ছাপা হবে ঠিকই— সড়ক-মহাসড়কে জীবনের অপচয় রোধ করা তো অনিশ্চিতই থেকে যায়।

কোটি কোটি টাকা খরচ করে ফ্লাইওভার বানানো হয়, বিদেশ থেকে ঝকঝকে গাড়ি আনা হয়; কিন্তু সেই ফ্লাইওভার, সেই সড়ক কিংবা সেসব সেতুতে যারা গাড়ি চালাবেন, অর্থাৎ যাদের হাতে স্টিয়ারিং, তারা কতটা দক্ষ, যোগ্য, তারা কোন প্রক্রিয়ায় স্টিয়ারিং ধরলেন এবং সর্বোপরি তারা কতটা মানবিক— সেই প্রশ্নগুলোই সবচেয়ে বেশি জরুরি। দক্ষ ও মানবিক চালক তৈরিতে রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব পালনের কথা; যে ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের জন্য যেরকম দুর্নীতিমুক্ত একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা— তা কি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও গড়ে তোলা গেছে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে
চৌত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি
গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি: কাদের
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়
শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ

শেয়ার করুন