তিন নভেম্বর ও খালেদ মোশাররফের দুর্বলতা

তিন নভেম্বর ও খালেদ মোশাররফের দুর্বলতা

খালেদের সমন্বয়হীন অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুনি চক্র আরকেটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছিল। ৩ নভেম্বর রাতেই কারাগারে নিষ্ঠুর হত্যার শিকার হন জাতীয় চারনেতা। যতদূর জানা যায় মোশতাক ও খুনি মেজর চক্রের যোগসাজসেই নিহত হন মুক্তিযুদ্ধের চার মূল সংগঠক। খালেদ মোশাররফ ওই সময় জাতীয় চারনেতার বিষয়ে কিছুই ভাবেননি। তিনি সচেতন হলে অথবা চাইলে হয়তো ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।

নভেম্বর, ১৯৭৫। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধোঁয়াশাপূর্ণ একটি অধ্যায়। এই সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভাজনের যে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল তা আজ এক বিশাল মহিরুহ হয়ে দেশের রাজনীতিতে দণ্ডায়মান। তাই এই সময় নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে, পরস্পর বিরোধী কথার যুদ্ধ বা আক্রমণ চলতে পারে কিন্তু এই অস্থির সময়কে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকেই বাংলাদেশ নামক নবীন রাষ্ট্রটি প্রবেশ করে অদ্ভুত এক গোলকধাঁধায়। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক, নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া কিন্তু দেশ চলছিল খুনি মেজরদের নির্দেশে। দৃশ্যত, তখন দেশ ছিল বিশৃঙ্খল, বিভক্ত, দিশাহীন। আর ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল দুটি। বঙ্গভবন ও সেনানিবাস। ১৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সব ক্ষমতা ছিল খুনি চক্রের হাতেই। ফারুক-রশীদ চক্র জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে খুন করে অনেককেই ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।

ফলে তারা ছিলেন খুনিদের প্রতি অনুরক্ত, নিস্ক্রিয়, প্রতিক্রিয়াহীন। অপরদিকে খুনিচক্রের হঠকারিতাকে নিজের স্বার্থে মেনে নিলেও তাদের ঔদ্ধত্য, আস্ফালন নিয়ে সেনাবাহিনীর অনেকেই বিরক্ত ও শঙ্কিত ছিলেন। এই নিয়ে তৈরি হয় ধোঁয়াশা। যা ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে নিয়ে যায় আরেক রক্তাক্ত নাটকের শেষ অঙ্কে। যে বিয়োগান্তক নাটকের আলোচিত চরিত্র খালেদ মোশাররফ।

খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম। একজন দুর্দান্ত মুক্তিযোদ্ধা। গেরিলা যোদ্ধাদের গুরু। যার হাতে ত্রিপুরার মেলাঘরে বৃহত্তর ঢাকার হাজার হাজার অগ্রসর তরুণ গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। খালেদ নিজেও রণাঙ্গনে মারাত্মক আহত হন বিজয়ের আগে। পরে চিকিৎসা শেষে তিনি ফিরেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে। ছিলেন খুবই সম্মানিত ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন সেনা কর্মকর্তা।

১৯৭৫ সালে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মেশাররফ ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সিজিএস। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। আর সেনাবাহিনীতে তার আস্থাভাজন ছিলেন ঢাকার ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিল। সে সময় ৪৬ ব্রিগেড ছিল একটি শক্তিশালী স্বতন্ত্র কমান্ড। ১৯৭৫ সালের খুনি চক্র অর্থাৎ ফারুক-রশীদরা সারাসরি শাফায়াতের কমান্ডে ছিল। কিন্তু ১৫ আগস্টের কালরাতে তারা কমান্ডকে ব্রেক করে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে।

এতে সেনাবাহিনীতে শাফায়াতের যোগ্যতা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন ওঠে। এদিকে খুনিদের ঔদ্ধত্য আর সেনানিবাসে না ফিরে আসায় ধীরে ধীরে সেনানিবাসের উচ্চপর্যায়ে অন্য ধরনের, পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের অক্টোবরে সবাই অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায় খুব দ্রুত কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু তা কী আর কার মাধ্যমে এটা ঘটবে সেটা নিয়ে ছিল জল্পনা-কল্পনা, সংশয়।

ডেট লাইন: তিন নভেম্বর ১৯৭৫

পারস্পরিক সন্দেহ-সংশয় আর শঙ্কার ওই সময়ে পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটান খালেদ মোশাররফ ও শাফায়াত জামিল। শাফায়াতের দাবি অনুযায়ী খুনিদের সেনা চেইন অব কমান্ডে আনতে খালেদ ও শাফায়াত একমত হন। পরিবর্তন বা পাল্টা অভ্যুত্থানের দিন ঠিক করা হয় ৩ নভেম্বর ১৯৭৫।

শাফায়াত জামিল তার ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ (১৯৯৮) গ্রন্থে এই অভ্যুত্থান সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী- “পরিকল্পনামতো রাত তিনটায় বঙ্গভবনে মোতায়েন প্রথম বেঙ্গলের কোম্পানি দুটো ক্যান্টনমেন্টে চলে এলো। আমার স্টাফ অফিসারবৃন্দ- মেজর নাসির, মেজর ইকবাল, মেজর মাহমুদ এবং এম.পি. অফিসার মেজর আমিন অভ্যুত্থান শুরুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেনাপ্রধান জিয়াকে ১৫ আগস্টের খুনি বিদ্রোহকারীদের কবল থেকে বিচ্ছন্ন করে রাখার জন্য ক্যাপ্টেন হাফিজউল্লাহর নেতৃত্বে প্রথম বেঙ্গলের এক প্লাটুন সেনা পাঠানো হলো তাঁকে নিরাপত্তামূলক হেফাজতে রাখতে। মেজর নাসির ও মেজর আমিনকে পাঠালাম ট্যাঙ্ক বাহিনী হেড কোয়ার্টারে।” (পৃষ্ঠা; ১৩২-১৩৩)

এখানে উল্লেখ্য যে, শাফায়াত জামিল জিয়াউর রহমানকে সরাসরি বন্দি না বলে ‘নিরাপত্তামূলক হেফাজত’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যদিও সেই সময়ের অনেক সেনা কর্মকর্তা বিভিন্ন বই আর নিবন্ধে জিয়াকে বন্দি করার বিষয়টি উল্লেখ করে থাকেন। শাফায়াতের মতে, এই অভ্যুত্থানে প্রাথমিক সফলতার মূল ছিল বিমান বাহিনী।

কাক ডাকা ভোরে বিমানবাহিনীর পাইলটরা সেদিন বঙ্গভবনের ওপর ফাইটার প্লেন ও হেলিকপ্টার উড়িয়েছিলেন। যাতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়েই মোশতাক ও খুনি চক্র ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হয়। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারীরা এক সময় বিনা প্রতিরোধেই আত্মসমর্পণ করে। তাদের পরাভূত করতে একটি গুলিও খরচ করতে হয়নি। টেলিফোন যুদ্ধেই পরাজয় মেনে তারা বিদেশে চলে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে।

তিন নভেম্বরের অভ্যুত্থানে প্রাথমিক সফলতা আসলেও পরবর্তী সময়ে দ্রুত উল্টে যায়। অতি অল্প সময়ের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে সে সময় বেশ প্রতাপশালী জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের উইং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা। যারাই মূলত নতুন করে পট পরিবর্তনের সূচনা করে। তাদের মূল নেতৃত্বে ছিলেন রণাঙ্গনের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) আবু তাহের।

তাহের ও জাসদের প্রতিক্রিয়া ছাড়াও ওই সময়ে খালেদ মোশাররফের ব্যর্থতার বেশ কয়েকটি কারণ ছিল। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অকল্পনীয় বিলম্ব, অদূরদর্শিতা আর নমনীয়তা তাকে সফল হতে দেয়নি। এছাড়া সেনাবাহিনীতে বেশ জনিপ্রয় জিয়াকে বন্দি করে নিজে সেনাপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত হওয়াকেও অনেকেই খালেদের পতনের কারণ বলে মনে করে থাকেন। এছাড়া সক্রিয় ছিল রশীদ-ফারুকের অনুগত সেনারা। যারা খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত ছিল।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর ফারুক-রশীদের অনুগত সেনারাই জেলখানায় জাতীয় চারনেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাই বলা যায়, খালেদ মোশাররফকে বহুমুখী প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। যা সম্মিলিতভাবে তার অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে দেয়। যার শেষ পর্যায়ে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয় খালেদ ও তার সহযোগী হুদা-হায়দারকে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব

অভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর পরিস্থিতির পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে খালেদ অনেক সময় নেন। বঙ্গভবনে দিনরাত চলে দেন দরবার। দরকষাকষি। সামরিক ইতিহাসে কোনো অভ্যুত্থানকারী কখনও সিদ্ধান্ত নিতে এত সময় নেননি। খালেদ অভ্যুত্থান করলেন আবার নানা বিষয়ে দেন-দরবার মোশতাকের সঙ্গে!

বিষয়টি স্ববিরোধী। যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তার সঙ্গেই আলোচনা! এদিকে এই আলোচনার মধ্যে খুনি চক্র নিরপদ বিদেশ গমনের নিশ্চয়তা চায়। একপর্যায়ে তা তারা আদায়ও করে! আর এতে প্রশ্ন আসে খালেদের এই অভ্যুত্থানের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে। এ বিষয়ে একটা মূল্যায়ন পাওয়া যায় কবি নির্মলেন্দু গুণের বিশ্লেষণে। তিনি তার ‘রক্তাক্ত নভেম্বর ১৯৭৫’ গ্রন্থে লিখেছেন-

“আমার মনে প্রশ্ন জাগে, তবে কি সামরিক বাহিনীতে চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার সীমিত লক্ষ্যকে সামনে রেখেই খালেদ মোশাররফ এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন? দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপটু একজন দুর্বল চিত্তের জেনারেল হিসেবে খালেদ যখন চিহ্নিত হতে চলেছেন, তখন আমাদের কানে আসে শাফায়েত জামিলের নাম। আমরা শুনতে পাই শাফায়েত জামিল বঙ্গভবনে গিয়ে খুনি মোশতাককে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন। তখন জেনারেল ওসমানী সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে মোশতাককে রক্ষা করেন- এমন কথা শোনা যাচ্ছিলো।”(পৃষ্ঠা:২৩) কবি নির্মলেন্দু গুণের এই বিশ্লেষণ অনেক প্রাসঙ্গিক। শুধু তিনিই নন, অন্যান্য সামরিক বিশ্লেষকও মনে করেন খালেদ সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় নিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে অযথা সময় নষ্ট করেছেন। যা তার অভ্যুত্থানকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে।

ভারতপন্থি খালেদ?

খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানবিরোধী বেশ কয়েকটি পক্ষ ছিল। জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, ফারুক-রশীদের অনুগত সেনা, জেনারেল জিয়ার অনুগত সেনা কর্মকর্তা ও অফিসার এবং খন্দকার মোশতাকের সমর্থকরা। সংগঠিত এই শত্রুরা খালেদ ভারতপন্থি, এই অভ্যুত্থান ভারতপন্থিদের কাজ বলে গুজব ছড়ায়। এ কাজে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার প্রচারণা ছিল সবচেয়ে বেশি। তারা বিভিন্ন সেনানিবাসে এ নিয়ে লিফলেটও ছড়ায়। যা ওই সময় বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়। আর রেডিও টিভিতে কোনো ঘোষণা না থাকায় জনসাধারণও ছিলেন বিভ্রান্তিতে।

এছাড়া ৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য এক শোক র‌্যালিতে খালেদ মোশাররফের মা ও ভাই যোগ দেয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ওই সভার ছবি প্রকাশিত হয়েছিল ‘বাংলাদেশ টাইমস্’ সংবাদপত্রে। এতে খালেদের বিরুদ্ধে ভারতপন্থিতার যে গুজব তা সত্যি বলেই ধরে নেয় জনসধারণ থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর একটি অংশ। যদিও ১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রাম থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে কখনই খালেদ ভারতপন্থি বলে বিবেচিত হন- এমন কোনো কাজ করেননি। বরং সেই সময় গেরিলা রিক্রুট থেকে নানা ইস্যুতে খালেদ ভারতবিরোধী বলেই পরিচিত ছিলেন।

তবে অভ্যুত্থান পরবর্তী কিছু অদূরদর্শী পদক্ষেপ আর বিরূপ পরিবেশের কারণে খালেদ মোশাররফকে ভারতের চর হিসেবে চিত্রিত করা হয়। যা সত্য ছিল না। এ বিষয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেন পিএসসি (অব.) তার ‘বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-৮১’ বইতে লিখেছেন-

“ভারতের সাথে যোগসাজোস থাকার ধারণা অমূলক। খালেদ মোশাররফ, শাফায়েত জামিল ও অন্যান্যরা যে ধরনের দেশ প্রেমিক ও যুদ্ধে তাদের যে অবদান রয়েছে সেখানে তাদের সম্পর্কে এ ধরনের ধারণা (ভারতের চর) পোষণ করা অত্যন্ত Unjustified. হয়ত কিছু কাকতালীয় ঘটনা সে সময় ঘটতে পারে।” (পৃষ্ঠা: ১০০-১০১)

এই ঘটনার বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, খালেদ ভারতপন্থি ছিলেন না। তবে পারিপার্শ্বিক নানা ঘটনা ও ষড়যন্ত্র তাকে ভারতপন্থি হিসেবে চিত্রিত করেছিল। যা তার অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পেছনে জোরালোভাবে কাজ করে।

গণমাধ্যম থেকে দূরে থাকা

খালেদ ও শাফায়াত ঠিক কী করতে যাচ্ছেন তা নিয়ে জাতির সামনে কিছুই পরিষ্কার করেননি। গণমাধ্যম ছিল একেবারেই নীরব। যদি গত শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে যতগুলো ক্যু বা পাল্টা ক্যু হয়েছে তাতে মূল অস্ত্র ছিল গণমাধ্যম, বিশেষ করে বেতার। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওই সময় খালেদ রেডিও ব্যবহার করেননি। ওই সংকট মুহূর্তে জাতিকে অন্ধকারে রাখার বিষয়ে লে. কর্নেল (অব.) এমএ হামিদ পিএসপি’র একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও না বলা কিছু কথা’ (২০০৩) গ্রন্থে লিখেছেন-

“সকাল থেকেই সারাদেশে আবার বিভ্রান্তি। রেডিও বাংলাদেশ ধরতে গিয়েই বিপত্তি। কোন শব্দ নেই। রেডিও বন্ধ। সবাই ধরে নিল আবার ক্ষমতার হাতবদল হয়ে গেছে। যদিও মোশতাক তখনও প্রেসিডেন্ট। শাফায়েত জামিল সাভারে অবস্থিত রেডিও ট্রান্সমিটারের একটি অংশ খুলে নেওয়ায় রেডিও ব্রডকাস্টিং সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। দেশের মানুষ আর একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়ল।”(পৃষ্ঠা ৭৮) এ বিষয়ে লেখকের সঙ্গে কথা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত আলী খানের সঙ্গে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান-

“বেতারে ঘোষণা বা বেতারে তখন (৩ নভেম্বরের পর) ঠিক সম্প্রচার হচ্ছিল সে বিষয়ে আমার ভালো ধারণা নেই। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ১৫ আগস্ট রেডিওকে যেভাবে ব্যবহার করা হয় ৩ নভেম্বর খালেদ বেতারকে সেভাবে কোনো কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে তেমনটা আমার মনে হয় না। আমার ধারণা খালেদের পক্ষের লোকেরা বেতারকে সেভাবে ব্যবহার করেননি। কারণ যদি করা হত তাহলে সে বিষয়টি আমার জানা থাকতো।”(সাক্ষাৎকার ড. সাখাওয়াত আলী খান: ২০১৯)।

একটি অভ্যুত্থানের সাফল্য নির্ভর করে সুর্নিদিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা সম্পর্কে যথাযথ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতার মাধ্যমে। যে লক্ষ্যে খালেদ মোশাররফ গণমাধ্যমের ব্যবহার করেননি। যা তার অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করতে সহযোগিতা করে। শত্রু বা প্রতিপক্ষ সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য না নেয়া

খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান ছিল রক্তপাতহীন। খালেদ কোনো রক্তপাত চাননি এ কথা সত্য। কিন্তু খালেদ মোশাররফ তার শত্রু সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। তার কাছে ছিল না যথাযথ গোয়েন্দা তথ্য। জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে খালেদ ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

এছাড়া জিয়াউর রহমানের অনুসারী ও ফারুক-রশীদ চক্রের অনুগত সেনাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে খালেদ কোনো পদক্ষেপ নেননি। খালেদ সরল মনে সবাইকে বিশ্বাস করে নিজ লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এই পথে চলতে গিয়ে তাতে যে তার নিজের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে তা তিনি খেয়ালই করেননি। খালেদের এই শত্রুরা ছিলেন সংগঠিত, অনেক নিষ্ঠুর। যুদ্ধ বা অভ্যুত্থান প্রেক্ষাপটে শত্রুদের সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকা বা ইতিবাচক ধারণা পোষণা করা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ওই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার কিছু কারণ তুলে ধরেছেন সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি ‘বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-৮১’ গ্রন্থে লিখেছেন- “সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও খালেদ মোশাররফ ও তার সঙ্গীদের সাথে সাধারণ সৈনিকদের কোন যোগাযোগ না থাকায় সৈনিকদের সাথে দূরত্ব বাড়তে থাকায় নানা ধরনের সংস্থা শিকড় গাড়তে সক্ষম হয়। জনপ্রিয়তার দিক থেকে খালেদ মোশাররফের চাইতে জিয়াউর রহমান এগিয়ে ছিলেন। ...খালেদ মোশররফ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন ঠিকই কিন্তু অভ্যুত্থানের কোথাও কোন সমন্বয় তিনি করতে পারেননি। এ কয়েকটা দিনে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও কোন কাজে লাগাননি। সেজন্য তিনি ভেতর বা বাইরের কোন খবর সময়মতো তিনি পাননি। রংপুর থেকে ৭২ ব্রিগেডের ইউগুলোকে ঢাকায় আনার কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।” (পৃষ্ঠা ১১৫-১১৬)

খালেদের সমন্বয়হীন অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুনি চক্র আরকেটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছিল। ৩ নভেম্বর রাতেই কারাগারে নিষ্ঠুর হত্যার শিকার হন জাতীয় চারনেতা। যতদূর জানা যায় মোশতাক ও খুনি মেজর চক্রের যোগসাজসেই নিহত হন মুক্তিযুদ্ধের চার মূল সংগঠক। খালেদ মোশাররফ ওই সময় জাতীয় চারনেতার বিষয়ে কিছুই ভাবেননি। তিনি সচেতন হলে অথবা চাইলে হয়তো ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের নায়ক হয়েও তিনি এই বর্বর এই হত্যাকাণ্ডের খবর জেনেছিলেন অনেক পরে। ততক্ষণে খুনিরা বিশেষ বিমানে দেশ ছেড়েছে। ৩ নভেম্বর জেল হত্যার জন্য দায়ী কে বা কারা তা উচ্চ আদালতের রায়ে অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে। জাতি প্রকৃত সত্য জানতে পেরেছে। কিন্তু তিন নভেম্বর শুরু হওয়া অভ্যুত্থানের হয়তো আরও অনেক সমীকরণ আছে। যা এখনও অজানা।

যেমন অজানা তিন নভেম্বর অভ্যুত্থান প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সকালে তিন বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ-হুদা-হায়দারের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি। কাদের হাতে নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল এই তিন জনকে? লেখকের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় খালেদ মোশাররফের কন্যা সাবেক সংসদ সদস্য মেহজাবিন খালেদ জানিয়েছিলেন, তাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী তার বাবার খুনিদের দুজন এখনও বেঁচে আছেন। এই হত্যকাণ্ডের রহস্য উন্মেচনে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলেছিলেন। যদিও এর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি এখনও চোখে পড়ে না।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
খালেদার বায়োপসি রিপোর্ট বিশ্লেষণে বসছে মেডিক্যাল বোর্ড
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে প্রশ্ন মোশাররফের
ভালো আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল
১৯ বছর পর হচ্ছে মডেল তিন্নি হত্যার রায়
আইসিইউ থেকে কেবিনে খালেদা জিয়া

শেয়ার করুন

মন্তব্য

নাকাল নগরবাসী

নাকাল নগরবাসী

কারো কোনো বিষয়ে দাবি থাকলে তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দাবি নিয়ে কথা বলা যায়। প্রয়োজনে শীর্ষ কর্তৃপক্ষের কাছেও যাওয়া যেতে পারে। গণমাধ্যম তো প্রস্তুতই রয়েছে, এসব দাবি-দাওয়ার কথা প্রচার করতে সরকারের দৃষ্টি তাতে সহজেই আকৃষ্ট করা যায়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো এখন সুলভ হয়ে গেছে। এসবকে বাদ দিয়ে আমরা এখন ৫০-৬০ বছর আগের ব্যবহৃত পদ্ধতি রাস্তা অবরোধ করে, ধর্মঘটের নামে দাবি আদায় করার জন্য যা করছি তা জনদুর্ভোগকে চরমপর্যায়ে নিতেই কেবল সাহায্য করছে।

ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে জনজীবন অনেকটাই স্থবির হয়ে আসছে দিন দিন। ছোট শহরগুলোতেও অবস্থা প্রায় একই রকম হতে যাচ্ছে। এমনিতেই শহরগুলোর ওপর কর্মজীবী মানুষের চাপ ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নাগরিক-সুবিধা নিয়ে যেকোনো শহরে বসবাস করা অকল্পনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের ঘনত্ব এত বেশি যে রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটা যায় না।

রাস্তা ও ফুটপাতও প্রয়োজনের তুলনায় নেই বললেই চলে। বড় ছোট সব শহরের ফুটপাতের প্রায় সবটাই হকার মার্কেটে পরিণত হয়ে আছে। সেগুলোতে কেনাবেচাও চলছে রাতদিন। পথচারীদের এসব ভাসমান হকার মার্কেট অতিক্রম করে চলতে হয় অতিশয় ধীর গতিতে। ঢাকা শহরে এটি এখন এক অভিনব দৃশ্য। রাস্তায় বাস, ট্রাক, ছোট যানবাহন ও রিকশা গাদাগাদি করে চলছে। কোনোটারই গতি দিনের বেলা স্বাভাবিক নয়।

সুতরাং যানজট শুধু জেব্রা ক্রসিং, চৌরাস্তা বা ট্রাফিক সিগন্যালের সম্মুখে ঘটে তা নয়, সাধারণ সড়কেও স্বাভাবিকের চাইতে বেশিসংখ্যক যানবাহন হওয়ার কারণে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়। কোনো একটি ছোট পরিবহন আকস্মিকভাবে থেমে গেলে কিংবা খারাপ হলে তো কথাই নেই। ট্রাফিক পুলিশ কবে সেই বিকল গাড়ি সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করবে তার ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া প্রায় সব কটি বড় শহরেই কিছু জায়গা দিয়ে অতিক্রম করতে যানজটের ধকল সহ্য করতেই হবে, সময় অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে এমনটিও ধরে নিতে হবে।

রাজধানী ঢাকা শহরে গত এক দশকে ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার যথেষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সড়কে স্বাভাবিক গতি নিয়ে পরিবহন চলার ব্যবস্থা খুব বেশি স্বস্তি দিতে পারেনি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে নানা ধরনের পরিবহনের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। রাস্তার সম্প্রসারণ তো সেভাবে করা সম্ভব নয়, একইভাবে নতুন নতুন রাস্তায় তৈরি করাও বড় শহরগুলোতে অসম্ভব ব্যপার। সেকারণে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো এখন চলাচলের জন্য খুবই ধীরগতির, যানজট ও ফুটপাতবিহীন চলাচলের অনিরাপদ শহরে পরিণত হয়েছে। সময়মতো কোথাও পৌঁছানো কষ্টের এবং জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানুষকে তাই হাতে বেশ কিছু সময় রেখেই ঘর থেকে বের হতে হয়। এতে মানুষের সময়ের অপচয় যেমন বেড়ে চলছে একইভাবে শ্রমঘণ্টা, কর্মক্ষমতা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিবেশ হ্রাস পাচ্ছে। মানুষের ধৈর্য, সহনশীলতা, মনোবৃত্তি ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়েই চলছে। অথচ উন্নত জীবনযাপনের জন্য মানুষ আসছে শহরে। শহরগুলোতে মানুষের ঢল যেন বেড়েই চলছে। কিন্তু সেই শহরে এ তো মানুষের বসবাস, যাতায়াত, নিত্যদিনের প্রয়োজনীয়তা পূরণ ইত্যাদি এখন আর স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার মধ্যে নেই। বড় শহরগুলো অনেক আগেই নাগরিক জীবনের ধারণা হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি অভিজাত এলাকাগুলোতেও এখন ঘিঞ্জি অবস্থা।

এমনই এক দুঃসহ বাস্তবতা আমাদের বেশিরভাগ নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে দৃশ্যমান। এর অলৌকিক কোনো সমাধান কেউ আশা করতে পারে না। স্বাভাবিক সমাধানের উপায়ও বের করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক, ব্যবসা বাণিজ্যিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ধরনের সেবার অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বড় শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়া।

এর ফলে গ্রাম থেকে প্রতিদিন মানুষ ছুটছে শহরে, ঢাকায় এটি যেন জনস্রোতের রূপ ধারণ করেছে। এতে ঢাকার জনজীবন নানা জটে নাকাল হয়ে পড়ছে। এটি অনেকটাই সহ্যের সীমা অতিক্রম করে বসে আছে। সুতরাং নতুন করে যে চাপ প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে তার অবস্থা কতটা করুণ রূপ ধারণ করছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

এমন এক নিত্যদিনের ভয়াবহ স্বাভাবিক চিত্রের ওপর যখন পরিবহনব্যবস্থায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে দেখা যায় তখন জনদুর্ভোগকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যাবে সেটিই আমরা বুঝতে অক্ষম। একবার পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা আকস্মিকভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় সবধরনের বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে যারা নিত্যদিন যাওয়া-আসা করেন তাদের সময়মতো পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। রাস্তায় বাস নেই তো দূরের যাত্রায় অন্য পরিবহনের ওপর ভর করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। গলাকাটা ভাড়ার এক মহোৎসব চলতে থাকে।

বাধ্য হয়ে অনেককেই পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে কিংবা বাড়ি ফিরতে হয়েছে। আবার ভাড়া নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের ইঁদুর-বিড়াল খেলা শুরু হয়েছে। মালিক-পরিবহন শ্রমিকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া হাঁকাতে থাকে, তা নিয়ে মোবাইল কোর্ট বসায় বিপুলসংখ্যক বাস রাস্তা থেকে উধাও হয়ে যায়। গণপরিবহণের সংকটে যাত্রীদের ভোগান্তি যেন ভাগ্যের লিখনের মতো আপনা-আপনি কপালে এসে পড়তে শুরু করে! সেটি এখনও কমবেশি চলছে।

নতুন করে দেখা গেল শিক্ষার্থীদের হাফ-পাস দেয়ার দাবিতে আন্দোলন। তাতেও বেশ কিছু রুটে গাড়ি চলাচল বলতে গেলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সেই রাস্তা অতিক্রমকারীদের জন্য তখন একমাত্র প্রকৃতিপ্রদত্ত দুই পা-ই ভরসা। সেভাবেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। এভাবে হঠাৎ করে গণপরিবহন যারা আটকে দিয়েছে কিংবা বন্ধ করে দিয়েছে তারা শুধু তাদের কথাটাই ভেবেছে, তাদের স্বার্থটাই দেখেছে!

গণপরিবহন বন্ধ করে দিলে যে বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতে নেমে আসে বড় ধরনের বিপর্যয়, দুর্ভোগ সেকথা তারা একবারও ভাবতে চায় না। আমরা সেভাবে তো ভাবতে বোধহয় অভ্যস্তও নই। কারো কোনো বিষয়ে দাবি থাকলে তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দাবি নিয়ে কথা বলা যায়। প্রয়োজনে শীর্ষ কর্তৃপক্ষের কাছেও যাওয়া যেতে পারে।

গণমাধ্যম তো প্রস্তুতই রয়েছে, এসব দাবি-দাওয়ার কথা প্রচার করতে সরকারের দৃষ্টি তাতে সহজেই আকৃষ্ট করা যায়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো এখন সুলভ হয়ে গেছে। এসবকে বাদ দিয়ে আমরা এখন ৫০-৬০ বছর আগের ব্যবহৃত পদ্ধতি রাস্তা অবরোধ করে, ধর্মঘটের নামে দাবি আদায় করার জন্য যা করছি তা জনদুর্ভোগকে চরমপর্যায়ে নিতেই কেবল সাহায্য করছে।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আদায়ের দাবিতে গোটা মিরপুরে রাস্তা অবরোধ করায় সমগ্র ঢাকা শহরই কয়েক ঘণ্টা অচল হয়ে পড়ে। এমন অচল অবস্থায় সামনে বা পেছনেও যাওয়া যায় না। লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ যেন রাস্তাতেই মানুষের হাপিত্যেশের মধ্যে আটকে ছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিদিন অমুক দলের মানববন্ধন, অমুক সংগঠনের প্রতিবাদ সভা লেগেই আছে।

ফলে ওই পথে সেই সময় পরিবহনের বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। অন্যপথে ঘুরে যাওয়াও সহজ কথা নয়। সমাবেশটি যদি হয় বড়সর তাহলে এর ধাক্কা লাগে গোটা শহরে। তখন যানজট নয়, সব পরিবহনই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তেমন পরিস্থিতিতে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় পরিবহনের ভেতর আটকে থাকে। যাদের এসি গাড়ি নেই তারা প্রখর রোদে ঘামতে থাকেন।

সমাবেশ কখন শেষ হবে তা সংগঠনের নেতাদের মর্জির ওপর নির্ভর করে। তারা গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা শোনাতে গিয়ে লাখ লাখ মানুষের পথচলার অধিকার যে হরণ করেন, কর্মস্থল কিংবা জরুরি কাজে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ান, সেটি তারা বুঝতে চান না। সেই প্রশ্ন এখন করাটাও বোধহয় তাদের ভাষায় গণতন্ত্রবিরোধী হয়ে পড়ে।

প্রায় প্রতিদিনই তো এ দল ও দলের আন্দোলন, সমাবেশ অবস্থান, ধর্মঘট ইত্যাদি শহরগুলোতে, এমনকি সড়ক, মহাসড়কে আকস্মিকভাবে ঘটতে দেখা যায়। সড়ক, মহাসড়কগুলো যেন জনসাধারণের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের সুযোগ দেয়ার প্রস্তুতি রেখেও দিতে পারছে না! আমাদের সমাজেরই আমরা কেউ না কেউ সড়ক-মহাসড়কে অবস্থান-অবরোধ, ধর্মঘট ইত্যাদি করতে পছন্দ করি।

আমরা শহরের কোনো মাঠ অথবা জনসমাবেশের জন্য নির্ধারিত ময়দানে গিয়ে প্রতিবাদ করাকে যথেষ্ট মনে করছি না। রাস্তাই আমাদের প্রতিবাদের উত্তম জায়গা বলে বিবেচিত হচ্ছে। সেই রাস্তা যদি সরু গলিও হয় তাহলে সেখানেই হবে আন্দোলন সংগ্রামের অবস্থান, ধর্মঘট! আমরা বহুকাল আগে থেকে শিখেছি ‘লড়াই হবে রাজপথে’, ‘রাজপথ রাজপথ ছাড়ি নাই ছাড়বো না’ ইত্যাদি স্লোগান। সেই রাজপথে যদি স্বল্পসংখ্যক প্রতিবাদীও দাঁড়ায় কিংবা বসে যায় তাহলেও হাজার হাজার মানুষকে বহনকারী গাড়ি থেমে যেতে বাধ্য হয়।

পরিবহনে যাত্রীদের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই। পরিবহনের মালিক-শ্রমিকরাও যেমন দেখে না, কলকারখানার শ্রমিকরাও সবসময় দেখে না, রাজনীতির নেতাকর্মীরাও দেখে না, অন্য যেকোনো দাবি আদায়কারীরাও দেখে না। আসলেই আমরা যে যার মতো করে নাগরিক জীবনটাকেই বোধহয় এখন এক অভিশপ্ত জীবনে পরিণত করে ফেলেছি। এখান থেকে বের হয়ে আসার কথা কজনইবা বিবেক ও যুক্তি দিয়ে উপলব্ধি করছে? যখন নাগরিক জীবন ততটা জমে ওঠেনি তখন হয়ত রাজপথে এত পরিবহন ছিল না, শহরেও এত মানুষ ছিল না। রাজপথে আন্দোলন মিছিল হলে গোটা শহরে বসবাসকারী মানুষের জীবনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলত না।

তখন অবশ্য সমাবেশ হতো পল্টন ময়দান কিংবা শহরের জনসভা স্থলগুলোতে কিংবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে । কিন্তু এখন নগরজীবন যখন কানায় কানায় পরিপূর্ণ তখন আমাদের প্রতিবাদের সবকিছুই যেন রাস্তাঘাটে এসে পড়েছে। এই রাস্তাগুলো গভীর রাতেও এক মিনিটের জন্য পরিবহনবিহীন থাকে না। জীবন জীবিকা মানুষের এখন এতই নগর এবং পরিবহনকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে যে, এক মুহূর্ত কোনোটি বন্ধ রাখা মানেই হচ্ছে জনদুর্ভোগে মানুষকে শুধু অতিষ্ঠ করাই নয়, জীবন জীবিকাকেও স্তব্ধ করে দেয়া। এই বাস্তবতার বোধটি আমাদের সহসাই কি জাগ্রত হবে?

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক

আরও পড়ুন:
খালেদার বায়োপসি রিপোর্ট বিশ্লেষণে বসছে মেডিক্যাল বোর্ড
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে প্রশ্ন মোশাররফের
ভালো আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল
১৯ বছর পর হচ্ছে মডেল তিন্নি হত্যার রায়
আইসিইউ থেকে কেবিনে খালেদা জিয়া

শেয়ার করুন

শিক্ষার্থীদের দাবি মানলে কী ক্ষতি?

শিক্ষার্থীদের দাবি মানলে কী ক্ষতি?

১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হাত ধরে আসে ১১ দফা দাবি। পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ঘোষিত এ ১১ দফা দাবির একটি ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া রাখা। সেটা কীভাবে বদলে গেল আমরা জানি না। সেটা ছাড়াও সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় আন্দোলনগুলোর একটি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবি। তখন ঢাকা অবরোধ করা শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির ভেতরে অন্যতম ছিল, ‘শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’ এটার কোনো সুরাহা হয়নি।

রাস্তার উপরের স্টলে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়া আমার পুরোনো অভ্যেস। এটা আমি যেখানেই যাই সেখানেই করে থাকি। গত বুধবার পত্রিকা দেখতে দেখতে এটা পত্রিকার ওপর আমার চোখ থেমে গেল। পত্রিকার ওপরের ছবিতে দেখা গেল একদল তরুণের রণপ্রস্তুতি। আমি মোহাম্মদপুর, ঢাকা কলেজের ওদিকে মঙ্গলবার দেখলাম ছাত্ররা রাস্তা আটকে যেভাবে আন্দোলন করে ওভাবেই আন্দোলন করছে।

আমি কজন ছাত্রের সঙ্গে কথাও বললাম। তারা বলেছে সব সময় সব কালে ছাত্রদের জন্য সব গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া নেয়। কিন্তু এবার ভাড়া বাড়ানোর পরে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বাসের হেলপার কন্ডাকটরদের দুর্ব্যবহার গাড়িতে দেখেছি। বিভিন্ন সময় কথাও বলেছি। বেগতিক হয়ে ছাত্ররা আন্দোলনে নেমেছে আর তাদের ঠেকাতে সরকার দলের ছাত্র সংগঠন আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে কথা না বলে তাদের পেটাতে মহড়া দিচ্ছে। খবরটি পড়ে খুব মনঃপীড়ায় আছি। কোনো ছাত্র আন্দোলনে নামলে আমি আমার ফেলে আসা জীবনটাকে ফিরে পাই। এরশাদবিরোধী আন্দোলন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল আন্দোলন, একাত্তরের ঘাতক-দালালবিরোধী আন্দোলন- কোনোটাই ভুলবার নয়। কিন্তু এবারে ছাত্রদের অপরাধ কী? অপরাধ তারা গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে রাস্তায় নেমেছে। গণপরিবহনে ছাত্রছাত্রীদের হাফ ভাড়ার বিষয়টি নতুন নয়। দেশে কোনো সময়ই ছিল না যে, ছাত্রছাত্রীরা বাসে-লঞ্চে হাফ ভাড়ায় চলেনি। অনেক সময় ছাত্রছাত্রীদের হাতে বইখাতা থাকলেও কন্ডাকটর ভাড়াই চাইত না। কিন্তু সম্প্রতি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

ছাত্রছাত্রীদের হাফ ভাড়ার বিষয়টিও তখন বাদ দেয়া হয়েছে। এর আগেও বাস মালিকদের এই পাঁয়তারা লক্ষ করা গেছে। ইতিপূর্বেও বিভিন্ন বাসে দেখা গেছে হাফ ভাড়া নেয়া হয় না বা হাফ ভাড়া চালু হয়নি লেখা। হাফ বা অর্ধেক ভাড়া নিয়ে আন্দোলনটা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ারও আগের। মানে ৫২ বছরের পুরোনো।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হাত ধরে আসে ১১ দফা দাবি। পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ঘোষিত এ ১১ দফা দাবির একটি ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া রাখা। সেটা কীভাবে বদলে গেল আমরা জানি না। সেটা ছাড়াও সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় আন্দোলনগুলোর একটি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবি। তখন ঢাকা অবরোধ করা শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির ভেতরে অন্যতম ছিল, ‘শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’ এটার কোনো সুরাহা হয়নি।

বর্ধিত ভাড়া চালুর কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীরা দাবি জানাচ্ছে তাদের জন্য অর্ধেক ভাড়া চালুর। তার মানে ছাত্রছাত্রীদের হাফ ভাড়ার যে ৫২ বছরের রীতি সেটা ভাঙতে চাচ্ছে পরিবহন মালিকরা। যে কারণে গত রোববারও ঢাকার সায়েন্সল্যাব, ফার্মগেটে এ দাবিতে বাস ভাঙচুর হয়েছে। তবু নীরব সরকার।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ছাত্রদের এ আন্দোলন থামাতে যেখানে সরকারের একটি ঘোষণাই যথেষ্ট সেখানে আন্দোলন এত সময় নেয়, সেটা ভাবাই যায় না। দেশের গণপরিবহনে হাফ পাস বা অর্ধেক ভাড়াসহ পাঁচ দফা দাবি মেনে নিতে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি বাস্তবায়ন না হলে বৃহস্পতিবার থেকে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে বলেও জানিয়েছে ছাত্ররা। কিন্তু এ আন্দোলনে কী হবে তা কিন্তু আমরা আঁচ করতে পেয়েছি ইতোমধ্যে। এবারও হেলমেট বাহিনী না হোক অন্য কোনো বাহিনী নামবে।

গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর ধানমণ্ডির নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাবের সড়ক কর্মসূচি চলাকালে ৫০-৬০ তরুণ লাঠিসোঁটা নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। কিছুক্ষণ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলার পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাস্তা থেকে সরে যায়। সেখানে মিছিল থেকে আইডিয়াল কলেজের এক ছাত্রকে তুলে নেয়ার অভিযোগ মিলেছে। এর প্রায় ৫ ঘণ্টা পর ওই ছাত্র ছাড়া পায়। প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলাকারীরা কারা? শিক্ষার্থীদের দাবি, হামলাকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মী কেন এ আন্দোলনে হামলা করবে? ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ কত তা সরকারও জানে। কিন্তু তারপরও ছাত্রদের আন্দোলনের দাবি না মেনে ছাত্রলীগকে কেন নামানো হলো এটা প্রশ্ন আসে। এই আন্দোলন ইতোমধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। যে পদ্ধতিতে আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে তাতে আন্দোলন থামবে না, হয়ত আরও বড় হবে। গত কয়েকদিন ধরে চলা শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন ইতোমধ্যে ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। গণপরিবহনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়াসহ ৫ দফা দাবিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে।

ছাত্রদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে যে, ছাত্ররা বলেছে- আমরা সড়ক ছেড়ে দিয়েছি, সরকার ও বাস মালিকদের ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছি, তারা বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই সময়ের মধ্যে আমাদের দাবি বাস্তবায়ন করবে। এটা হলো আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের কথা।

যখন শামসুন্নাহার হল আন্দোলন হয়েছে, সেসময় বিএনপির ক্যাডাররা ক্যাডাররা যার পর নাই বিরক্ত করেছে আন্দোলনকারীদের। আমাকে একদিন এক ক্যাডার একটা পিস্তল দেখিয়ে রাজু ভাস্কর্য থেকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমাদের আন্দোলনরত ছাত্রদের সহমর্মিতা জানানো শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেছে। তাতে আন্দোলন থামেনি। আন্দোলন এভাবে থামানো যায় না। কিন্তু আন্দোলন থামাতে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, মানে পত্রিকায় যে পদক্ষেপের বর্ণনা শুনেছি তা রীতিমতো ভীতিকর।

আন্দোলনরত ছাত্রদের পেটানো হলে আন্দোলন থামে না। চলমান আন্দোলন থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিবৃত্ত করতে সরকারে উচিত তাদের দাবি মেনে নেয়া। কারণ আন্দোলনরত এই ছাত্রছাত্রীরা আমাদেরই সন্তান, ভাইবোন এটা ভুললে চলবে না। এখানে শক্তি প্রদর্শন মোটেও সমাধান আনবে না।

সরকারকে ভুললে চলবে না ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটা প্রজন্মের আন্দোলনকে সরকার সঠিকভাবে নিবৃত্ত করতে পারেনি। যার মধ্য দিয়ে ওই আন্দেলনকারীদের হেলমেট বাহিনীর ওপর ভালো ধারণা হয়নি। বরং ওই সময় বিরোধীরা অপপ্রচার করেছিল অনেকেই তা বিশ্বাস করেছিল। বিশ্বাসের সে সুযোগও তাদের করে দেয়া হয়েছিল। এবারেও কি সেই পথ ধরা হবে? সেটা তাহলে আরেকটি ভুল হবে।

সরকারে মধ্যে এমন সব ব্যক্তিত্ব আছেন যারা ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আজ তারা কথা বলছেন না কেন? ছাত্রছাত্রী কতজন প্রতিদিন গণপরিবহনে ওঠে? তাদের থেকে হাফ ভাড়া নিলে এমন কী ক্ষতি? সরকার হাফ ভাড়া নিয়ে মালিক সমিতির সঙ্গে বসে একটা ঘোষণা দিলে এ সমস্যা আর থাকবে বলে মনে হয় না। কিন্তু ইতোমধ্যে বিভিন্ন সড়ক আটকে দেয়ায় পথচারীদের দুর্ভোগ ছিল অবর্ণনীয়।

কদিন আগে বাস মালিক- শ্রমিক নেতাদের কারণে মানুষের দুর্ভোগের অন্ত ছিল না। মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে তখন কোনো লাঠিয়ালকে দেখা যায়নি, তাহলে এখন ছাত্রদের পেটানো হবে কেন? কেউ আন্দোলন করতে পারবে না? তার দাবির কথা বলতে পারবে না? সরকার মালিকদের কথায় ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হলেন। আর ছাত্রদের কথা শুনবেন না এটা হয় না। কী এমন বিশাল দাবি এটা! মেনে নিলে কী হবে? ক্ষমতায় গিয়ে আন্দোলন সংগ্রামকে এভাবে ভুলতে নেই। দমানোর চেষ্টা করতে হয় না। মেনে নেয়া যুক্তিযুক্ত।

লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
খালেদার বায়োপসি রিপোর্ট বিশ্লেষণে বসছে মেডিক্যাল বোর্ড
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে প্রশ্ন মোশাররফের
ভালো আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল
১৯ বছর পর হচ্ছে মডেল তিন্নি হত্যার রায়
আইসিইউ থেকে কেবিনে খালেদা জিয়া

শেয়ার করুন

জঙ্গিবাদকে মদদ দিয়েই যাচ্ছে পাকিস্তান

জঙ্গিবাদকে মদদ দিয়েই যাচ্ছে পাকিস্তান

চার দশক ধরে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদকে মদদ জুগিয়ে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি। শুধু মুম্বাই হামলাই নয়, আমেরিকায় ৯/১১ হামলার ষরযন্ত্রেরও আঁতুড়ঘর ধরা হয় পাকিস্তানকে। ২০০৫ সালে লন্ডন বিস্ফোরণে ৫৬ জনের মৃত্যু, ২০১৯ সালের লন্ডন ব্রিজে হামলা, ২০১৬ সালে উরিতে আক্রমণের ষড়যন্ত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে পাকিস্তানের মাটি।

মুম্বাই হামলার মূল হোতারা লাহোর হাইকোর্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে আবারও প্রমাণ হলো, পাকিস্তান জঙ্গিদের এখনও মদদ জুগিয়েই যাচ্ছে। আদালতে মুম্বাই হামলায় অভিযুক্ত ছয় জঙ্গির বিরুদ্ধে শক্ত কোনো তথ্য-প্রমাণ হাজির করেনি পাকিস্তানি কর্মকর্তারা। ফলে আলোচিত ওই হামলার মাস্টারমাইন্ড হাফিজ সইদের নিষিদ্ধ সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়ার শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে অর্থায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আর লাহোর হাইকোর্টও তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক মহলকে বোকা বানিয়ে পাকিস্তান আবারও জঙ্গিদের পক্ষেই অবস্থান নিল। এর ফলে স্পষ্ট হলো- সন্ত্রাস দমনে পাকিস্তান বা তাদের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের মনোভাব বিন্দুমাত্র বদলায়নি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় জঙ্গিরা গোটা দুনিয়াতেই জিহাদের নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান এখনও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর। আর ইসলামাবাদ তাদের এমন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সেটা বার বার গোটা দুনিয়াকে বুঝিয়ে দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইতে আইএসআইয়ের মদদপুষ্ট জঙ্গিরা এক ভয়াবহ হামলা চালায়। তাজমহল হোটেলের অতিথিরাই ছিলেন সেদিনের আক্রমণের মূল লক্ষ্য। জঙ্গি হামলায় ৬ আমেরিকানসহ ১৬টি দেশের মোট ১৬৬ জন নিহত হয়েছিল।

গুরুতর আহত হয়েছিল আরও অন্তত ৭টি দেশের নাগরিক। নিহত বা আহতদের একটা বড় অংশই ছিল পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষ। ইজরায়েল, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্সসহ আরও বেশকিছু দেশের একাধিক নাগরিক মুম্বাই হামলায় নিহত হয়। বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমা পর্যটকরা ওই হামলার অন্যতম টার্গেট ছিল।

গোটা দুনিয়ার সবাই জানে, হাফিজ সঈদের নেতৃত্বাধীন লস্কর-ই-তৈয়াবাই মুম্বাইয়ের হোটেল তাজে হামলা চালায়। পুরো হামলার মূল মাথা ছিল হাফিজ নিজে। সেই গড়ে তোলে লস্করের ‘ছায়া’ সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়া।

সেই জামাত-উদ-দাওয়ার শীর্ষ ৬ নেতাকে লাহোরের সন্ত্রাসবিরোধী একটি আদালত ২০২১-এর এপ্রিলে ৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। ট্রায়াল কোর্ট সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছিল তাদের। অভিযুক্তদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

সেই সাজাপ্রাপ্তরা হলো- অধ্যাপক মালিক জাফর ইকবাল, ইয়াহিয়া মুজাহিদ, নাসারুল্লাহ, সামিউল্লাহ এবং উমর বাহাদুর। এছাড়াও পঞ্জাব পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ডিপার্টমেন্টের একটি এফআইআরের ভিত্তিতে হাফিজ সইদের শ্যালক হাফিজ আবদুল রহমান মাক্কিকেও ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত।

লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মুহম্মদ আমির ভাট্টি ও বিচারপতি তারিক সেলিম শেখের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ ট্রায়াল কোর্টের রায় খারিজ করে দিয়েছেন। তথ্য প্রমাণের অভাবে উচ্চ আদালত ৬ কট্টর জঙ্গি নেতাকেই বেকসুর খালাস করে দিলেন।

আদালতের চাওয়ার চেয়েও ইমরান খানের সরকার জঙ্গিদের মুক্তি বেশি চাইছিল। তাই আদালতকে কোনো সাহায্যই করা হয়নি। এমনকি, ১৬৬ জনকে হত্যা করার মতো ভয়ংকর হামলার ষড়যন্ত্রীদের মাত্র ৯ বছরের সাজাটুকুও যাতে খাটতে না হয় সেই চেষ্টাতেই ব্যস্ত ছিল সেনাববাহিনীর হাতের পুতুল ইমরান সরকার।
ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, মামলাটাই এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে করে হাফিজ সইদ বা তার দলের অন্যরা বিন্দুমাত্র বিপদে না পড়ে। ২০০৮ সালের মুম্বই হামলায় লস্কর যুক্ত থাকার সমস্ত প্রমাণ পেয়েও বিশ্ববাসীর কাছে তা গোপন রাখার চেষ্টা করে পাকিস্তান। পুরো বিচার ব্যবস্থাটাকেই আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সামনে প্রহসনে পরিণত করেছে এই সন্ত্রাসবাদী দেশটি।
মুম্বাই হামলার পর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকায় পাকিস্তান ৭ জনকে ‘লোক দেখানো’ গ্রেপ্তার করে। কিন্তু হামলার অন্যতম হোতা জাকিউর রহমান লাখভীকে ২০১৫ সালেই জামিনে মুক্তি দেয়।

মুম্বাই হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ভারত সমস্ত রকম প্রমাণ পাকিস্তানের হাতে তুলে দিলেও শক্তভাবে এই সন্ত্রাসীদের দমনে কোনো তাগিদই দেখায়নি দেশটি। শুধু ভারতই নয়, জঙ্গিবাদের অর্থায়নকারীদের উপর নজর রাখা আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সও (এফএটিএফ) জঙ্গিদের অর্থায়নে পাকিস্তানের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে।

চার দশক ধরে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদকে মদদ জুগিয়ে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি। শুধু মুম্বfই হামলাই নয়, আমেরিকায় ৯/১১ হামলার ষরযন্ত্রেরও আঁতুড়ঘর ধরা হয় পাকিস্তানকে। ২০০৫ সালে লন্ডন বিস্ফোরণে ৫৬ জনের মৃত্যু, ২০১৯ সালের লন্ডন ব্রিজে হামলা, ২০১৬ সালে উরিতে আক্রমণের ষড়যন্ত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে পাকিস্তানের মাটি।
বহুকাল ধরে জিহাদের নামে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনকে মদদ জুগিয়ে চলেছে দেশটির সেনাবাহিনী। কিন্তু সবকিছু জেনেও পশ্চিমা দুনিয়া পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

বরং যুক্তরাষ্ট্র থেকে এত কিছুর পরেও পাকিস্তান ২০০২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্য পেয়েছে।
অথচ, ওসামা বিন লাদেন, খালিদ শেখ মোহাম্মদ, রামজি বিন আল-শিব, আবু জুবায়দাহ, আবু লাইথ আল লিবি এবং শেখ সাইদ মাসরির কট্টর জঙ্গিবাদীরা পাকিস্তানেই আশ্রয় নিয়েছিল।

সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের দ্বৈত চরিত্রের কথা গোটা দুনিয়াই জানে। ২০১০ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন জঙ্গিবাদে মদদের প্রশ্নে প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে সতর্কও করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভসেও সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পেশ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সন্ত্রাসের প্রশ্নে পাকিস্তানের ‘মিথ্যা ও প্রতারণা’র কড়া সমালোচনা করে এক সময়। তালেবান ও আল-কায়েদার সঙ্গে পাকিস্তানি যোগসাজসের বিষয়টি গোটা দুনিয়ার সামনেই উন্মুক্ত। তবু সন্ত্রাসী কার্যকলাপে মদদ জুগিয়ে চলেছে সেনা নিয়ন্ত্রিত ইমরান খান সরকার। পারভেজ মোশাররফের সময় থেকেই পাকিস্তানি সেনারা দেশের জন্য কাজ করার পরিবর্তে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণে বেশি ব্যস্ত।

আর তাদের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য সচেষ্ট ভূমিকা পালন করে চলেছে। প্রযুক্তিগতভাবে তালেবান ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠী চীন থেকেও ইদানিং সাহায্য পাচ্ছে।
মুম্বাই হামলার সঙ্গে যুক্তদেরই শুধু নয়, গত বছর ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের আদালত আল-কায়েদার অন্যতম নেতা ও সন্ত্রাসী আহমেদ ওমর সইদ শেখ ও তার তিন সহযোগীকে মুক্তি দিয়েছে। মার্কিন সাংবাদিক ডানিয়েল পার্ল হত্যার অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে।
মোদ্দাকথা, পাকিস্তান জঙ্গিবাদকে মদদ দেয়াকেই তাদের রাষ্ট্রীয় ধর্ম বলে মনে করে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যা-ই বলুক না কেন, সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গ দেয়া তারা কিছুতেই বন্ধ করবে না বলে দৃশ্যমান হচ্ছে। তাই ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র হাফিজ সেইদের মাথার দাম ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘোষণা করলেও পাকিস্তানে অবাধে ঘুরে বেড়াতে পেরেছিল এই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী। আর তাই পাকিস্তান আজও জঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘরই হয়ে রয়েছে। বিন্দুমাত্র সন্ত্রাস দমনে আগ্রহী নয়। মাঝেমধ্যে চাপে পড়ে বেসুরো গাইলেও আসলে জঙ্গিবাদই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রধর্ম।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
খালেদার বায়োপসি রিপোর্ট বিশ্লেষণে বসছে মেডিক্যাল বোর্ড
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে প্রশ্ন মোশাররফের
ভালো আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল
১৯ বছর পর হচ্ছে মডেল তিন্নি হত্যার রায়
আইসিইউ থেকে কেবিনে খালেদা জিয়া

শেয়ার করুন

ঢাকাদূষণ আর নয়

ঢাকাদূষণ আর নয়

রাজধানী শহরকে দূষণমুক্ত রাখতে উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। দিন-মাস ছাপিয়ে বছর গেলেও সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি। বাতাসে বিভিন্ন গ্যাস ও ধূলিকণার পাশাপাশি ভেসে বেড়ায় অতি ক্ষুদ্র বিভিন্ন ক্ষতিকারক বস্তুকণা, যা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা সম্ভব নয়। পিএম ২ দশমিক ৫ নামের এসব বস্তুকণা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে আটকে থাকে এবং গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

বায়ুদূষণজনিত ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি সামলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করা মাত্রই পুনরায় বন্ধের খবরটি উদ্বেগজনক। চলতি মাসের ১৭ তারিখ এক সরকারি ঘোষণায় নির্দেশনাটি দেয়া হয়। অনুমান করা যায়, পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হলে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়!

খবরটি দিল্লির হলেও, একই কারণে বাংলাদেশের রাজধানী নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশ্বের যে কটি শহর ভয়াবহ দূষণের তালিকায় রয়েছে, এরমধ্যে মেগাসিটি ঢাকা অন্যতম।

দিল্লিতে মোট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ১১টি। সরকারের নতুন নির্দেশনায় বায়ুদূষণ রোধে এগুলোর মধ্যে মাত্র ৫টি চালু রাখতে বলা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো- ১৭ লাখ নিবন্ধিত যানবাহন আর প্রায় দুই কোটি মানুষের ঢাকা শহরে এখন কতগুলো উন্নয়ন প্রকল্প চলছে? এর সঠিক পরিসংখ্যান দেয়া সম্ভব নয়। তবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, রেল লাইন সম্প্রসারণ প্রকল্প, ফুটপাত নির্মাণ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সয়েল টেস্টসহ বিআরটিএ প্রকল্পের সরাসরি দূষণের প্রভাব নগরীতে পড়ছে। এর বাইরে সিটি করপোরেশন, বিটিসিএল, ওয়াসাসহ বিভিন্ন সেবাসংস্থার মাটি খোঁড়াখুঁড়ি, ড্রেনেজ ও ফুটপাত নির্মাণ-প্রকল্পের কাজ চলমান।

ইটভাটা, ধূলিকণা, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, ইট-বালুবাহিত ট্রাকের অবাধ চলাচল, ময়লা-আবর্জনার পোড়া গন্ধসহ বায়ুদূষণের জন্য অন্য যেসব কারণ রয়েছে সেগুলোও ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। অথচ শীত মৌসুমে দূষণরোধে নগরীতে চলমান কোনো উন্নয়ন-প্রকল্পের কাজই বন্ধ নেই।

ঢাকার আকাশ রাতদিন ধুলায় কুয়াশাচ্ছন্ন! ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, সামনের দিনগুলোতে এই শহরের পরিণতি দিল্লির মতো হবে না তো?

এই রাজধানী শহরকে দূষণমুক্ত রাখতে উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে বেশকিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। দিন-মাস ছাপিয়ে বছর গেলেও সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি। বাতাসে বিভিন্ন গ্যাস ও ধূলিকণার পাশাপাশি ভেসে বেড়ায় অতি ক্ষুদ্র বিভিন্ন ক্ষতিকারক বস্তুকণা, যা অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া দেখা সম্ভব নয়।

পিএম ২ দশমিক ৫ নামের এসব বস্তুকণা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে আটকে থাকে এবং গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। কোনো এলাকার বাতাসের পিএম ২ দশমিক ৫-এর পরিমাণ পরিমাপের একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মান হলো এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) বা একিউ সূচক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুর গুণাগুণ-বিষয়ক নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো এলাকার বাতাসের একিউআই যদি ০ থেকে ৫০ থাকে, সেক্ষেত্রে সেখানকার বাতাস ভালো।

সূচক যদি ৫১ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকে, তাহলে বাতাসের মান সন্তোষজনক। আর যদি ১০১ থেকে ২০০ থাকে তাহলে তাকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ এবং ২০০ এর উপরে থাকলে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে ডব্লিউএইচওর নির্দেশনায়।

দিল্লিতে একিউ সূচক অনুযায়ী বেশিরভাগ এলাকার বাতাসে পিএম ২ দশমিক ৫-এর পরিমাণ ৪০০-এর উপরে। এ থেকেই বোঝা যায়, কোন প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। যানবাহন ও কলকারখানা থেকে নিঃসৃত ধোঁয়া, ধুলো ও আবহাওয়াগত কারণে নয়াদিল্লি ইতোমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর রাজধানীর স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিশেষ করে শীতকালে দিল্লির বাতাসে দূষণের মাত্রা থাকে সবচেয়ে বেশি। কারণ, সেসময় প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে কৃষকদের খড়-বিচালি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া কুয়াশাচ্ছন্ন রাজধানীর বাতাসকে ভারী করে তোলে।

প্রশ্ন হলো- বিশ্বে বায়ুদূষণের তালিকায় প্রথমদিকে থাকা রাজধানী ঢাকার প্রকৃত অবস্থা আসলে কী? শীত মৌসুমে অন্যান্য শহরের মতো ঢাকাতেও দূষণ বাড়ে, এটি খালি চোখে দেখলেও সহজে বোঝা যায়। কিন্তু এই দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু ভয়াবহ?

১৮ নভেম্বর সকালের দিকে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অবস্থান ছিল চতুর্থ। বিশ্বের বায়ু-মান প্রতিবেদনে (একিউআই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে ১৮৯ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশকে খুব অস্বাস্থ্যকর অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে।

তখন পাকিস্তানের লাহোর, ভারতের দিল্লি ও চীনের উহান যথাক্রমে ৪২৫, ৩১০ এবং ১৯১ স্কোর নিয়ে প্রথম তিনটি স্থান দখল করে ছিল। যদিও তিন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ভালো। তবে অনেক সময় দৈনিক দূষণের তালিকায় ঢাকা প্রথম স্থানে চলে যায়।

একিউআই মান ২০১ থেকে ৩০০ হলে, স্বাস্থ্য-সতর্কতাসহ তা জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে নগরবাসী। এ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ রোগীদের বাড়ির ভেতরে এবং অন্যদের বাড়ির বাইরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। এই বিবেচনায় ঢাকার দূষণের মাত্রা কিন্তু সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর ঠিক কাছাকাছি অবস্থান করছে। তাই আগেভাগে সতর্ক হওয়া দরকার।

এমনিতেই বায়ুদূষণের কারণে নগরে থাকা মানুষ নানারকম স্বাস্থ্য-ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগছে বিভিন্ন বয়সের মানুষ। হচ্ছে জটিল রোগ। তাই সরকারের দূষণরোধে দ্রুত মনোযোগ দেয়া দরকার। একে শুধু ঢাকার সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না।

সত্যিকার অর্থেই দেখতে হবে জাতীয় সমস্যা হিসেবে। কারণ এই নগরে থাকা প্রায় দুই কোটি মানুষ সারা দেশ থেকে এসেছে। বিশাল এই জনগোষ্ঠী যদি দূষণের ছোবলের মধ্যে পড়ে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব কতগুলো পরিবারে ছড়াবে তা অনুভব করা উচিত।

বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিয়তার দিকে যাবে। থমকে দাঁড়াবে বিশাল অঙ্কের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো। ঢাকা যদি বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়? তাহলে পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে যাবে তা সহজে অনুমান করা যায়।

গত বছর ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ ঠেকাতে রাজধানীর প্রবেশমুখ গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, পূর্বাচল, কেরানীগঞ্জ ও টঙ্গীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পানি ছিটাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।

পাশাপাশি রাস্তার পাশে ছোটখাটো গাছে জমে থাকা ধুলা-ময়লা যাতে পরিষ্কার হয় সেজন্য রাস্তার ওপর থেকে পানি ছিটাতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দেয়া হয়। আর ছিটানোর ক্ষেত্রে পানির ঘাটতি দেখা দিলে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককেও নির্দেশ দেয়া হয়। গত বছরের ১৩ জানুয়ারি রাজধানী ও আশপাশের বায়ুদূষণরোধে ৯ দফা নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে। সেগুলো হলো-

১. ঢাকা শহরে মাটি-বালি, বর্জ্য পরিবহন করা ট্রাক ও অন্যান্য গাড়িতে মালামাল ঢেকে রাখা

২. নির্মাণাধীন এলাকায় মাটি-বালি, সিমেন্ট-পাথর, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা

৩. সিটি করপোরেশন রাস্তায় পানি ছিটাবে

৪. রাস্তা-কালভার্ট, কার্পেটিং-খোঁড়াখুঁড়িকাজে টেন্ডারের শর্ত পালন নিশ্চিত করা

৫. কালো ধোঁয়া নিঃসরণ করা গাড়ি জব্দ করা

৬. সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে গাড়ি চলাচল সময়সীমা নির্ধারণ ও উত্তীর্ণ সময়সীমার পরে গাড়ি চলাচল বন্ধ করা

৭. অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধ করা

৮. পরিবেশ লাইসেন্স ব্যতীত চলমান সব টায়ার ফ্যাক্টরি বন্ধ করা

৯. মার্কেট, দোকানে প্রতিদিনের বর্জ্য ব্যাগে ভরে রাখা এবং অপসারণ নিশ্চিত করা।

এই নির্দেশনাগুলো কতটুকু মানা হচ্ছে? তা দেখভালের কি কেউ নেই? বড় বিষয় হলো- গত বছরের তুলনায় এবার নগরীর দূষণের মাত্রা কমেছে কি না? যদি কমে থাকে তবে আরও কমাতে হবে। যদি না কমে তাহলে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া কি জরুরি নয়? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকার অবস্থা যে পর্যায়ে আছে এ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। কারণ যাদের এ নিয়ে ভাববার কথা তারা দিব্যি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে!

চোখের সামনে এই শহরে অপরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার ভবন উঠে গেল! দুই কোটি মানুষের স্রোতে ভেসে গেল নগরী, ইচ্ছেমতো গাড়ি রেজিস্ট্রেশন দেয়া হলো, ফুটপাতও দখলে চলে গেল। শহরে পর্যাপ্ত রাস্তা ও জলাশয় নেই। বসবাসের মানদণ্ডে সবদিক থেকে পিছিয়ে।

অথচ কারো কোনো চিন্তা নেই। প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। সবকিছু বিবেচনায় বায়ুদূষণ রোধে কারো ভাবনা না থাকাই যেন স্বাভাবিক। বড় বিষয় হলো- সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বায়ুদূষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকা উচিত ছিল। অথচ আদালত এ বিষয়ে এগিয়ে এলেও দূষণ ঠেকাতে কাজ করানো সম্ভব হচ্ছে না!

আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বে দূষিত শত শহরেরর মধ্যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ চারটি শহরের নাম। রাজধানীতে শীত মৌসুমে ময়লা পোড়ার কারণে দূষণের মাত্রা আরও বাড়ে। কিন্তু সেটিও কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

দুই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নতুন নিয়ম অনুযায়ী সন্ধ্যার পর পরই রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করায় নিঃসন্দেহে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। অথচ এই সিদ্ধান্তটি অন্তত রাত ১১টার পর যদি কার্যকর করা যেত।

গবেষণায় ঢাকার রাস্তার ধুলায় সর্বোচ্চ মাত্রায় সিসা, ক্যাডমিয়াম, দস্তা, ক্রোমিয়াম, নিকেল, আর্সেনিক, ম্যাঙ্গানিজ ও কপারের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মাটিতে যে মাত্রায় ক্যাডমিয়াম থাকার কথা, ধুলায় তার চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। আর নিকেল ও সিসার মাত্রা দ্বিগুণের বেশি।

ঢাকার রাস্তার ধুলার মধ্যেও নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এসব ভারী ধাতুকণার আকার এতটাই সূক্ষ্ম যে তা মানুষের চুলের চেয়ে ২৫ থেকে ১০০ গুণের বেশি ছোট। ফলে খুব সহজেই এসব সূক্ষ্ম ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুকণা ত্বকের সংস্পর্শে আসছে; শ্বাসপ্রশ্বাস, খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে শরীরের ভেতর প্রবেশ করছে।

যেসব কারণে দিল্লি ভয়াবহ বায়ুদূষণের কবলে এর প্রায় সবকটিই কমবেশি রাজধানী ঢাকায় রয়েছে। তাই মহাবিপর্যয় আসার আগেই সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। দিল্লি যে আগাম বার্তাটি দিল, তা সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। ইট-পাথরের এই নগরীতে সবুজ বিপ্লব ছড়িয়ে দেয়াই সবচেয়ে জরুরি।

যত বেশি সম্ভব জলাশয় সৃষ্টির দিকে নজর দেয়াও সময়ের দাবি। বাড়াতে হবে সড়কের পরিধি। এরসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে নগরের উপর বাড়তি মানুষ ও যানবাহনের চাপ কমানো জরুরি।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে বায়ুদূষণরোধে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে কাজ করতে হবে। দূষণের বিষয়টি মাথায় নিয়ে সব সেবা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেয়ার বিকল্প নেই। সামনের খারাপ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা যদি কার্যকর করা যায়, তবেই মেগাসিটিকে যেমন বাঁচানো সম্ভব; তেমনি নগরবাসীকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেয়া যাবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
খালেদার বায়োপসি রিপোর্ট বিশ্লেষণে বসছে মেডিক্যাল বোর্ড
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে প্রশ্ন মোশাররফের
ভালো আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল
১৯ বছর পর হচ্ছে মডেল তিন্নি হত্যার রায়
আইসিইউ থেকে কেবিনে খালেদা জিয়া

শেয়ার করুন

বিশ্ব নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের ভাবনা: উন্নয়নের সুফল পেতে নারী নির্যাতন রুখতে হবে

বিশ্ব নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের ভাবনা: উন্নয়নের সুফল পেতে নারী নির্যাতন রুখতে হবে

বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষ আজ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠছেন। বস্তুত, আমাদের সবারই উচিত নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং অন্যদেরকেও উৎসাহিত করা। নারী নির্যাতনমুক্ত সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে নিজে নির্যাতন করা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি আমাদের আশপাশে ঘটে যাওয়া যেকোনো নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে হবে, প্রতিরোধ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। কারণ নারী নির্যাতনকে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বেশি দায়ী আমাদের নীরবতা।

২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। এদিন থেকে শুরু হয়ে ১০ ডিসেম্বর, বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত ১৬ দিনব্যাপী পালিত হয় নারী ও মেয়ে শিশুর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযান পক্ষ। ১৯৯১ সালে উইমেন গ্লোবাল লিডারশিপ ইনস্টিটিউট প্রথম এই পক্ষ উদযাপন শুরু হয়। এই বছর উদযাপিত হচ্ছে প্রতিরোধ পক্ষের ৩০তম বার্ষিকী।

প্রচারাভিযানের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিশ্বের ১৮৭টি দেশের ৬ হাজারের বেশি সংস্থা এই পক্ষ পালন করার মাধ্যমে ৩শ মিলিয়ন মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছে।

২০২১ সালে আন্তর্জাতিকভাবে এই পক্ষের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘Orange the world: End violence against women now!’

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জাতীয়ভাবে এই প্রচারাভিযান পক্ষ পালিত হয়। আমাদের দেশে জাতীয়ভাবে এই বছরে স্লোগান নির্ধারিত হয়েছে- ‘নারী নির্যাতন বন্ধ করি, কমলা রঙের বিশ্ব গড়ি’। এখানে কমলা রংকে সহিংসতামুক্ত নারী ও মেয়ে শিশুর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠার প্রতিকী রূপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী নাগরিক সমাজের গৃহীত নানাধরনের উদ্যোগের মাধ্যেমে ২০৩০ সালের মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি প্রচারাভিযান শুরু হয় ২০০৮ সালে।

জাতিসংঘের এই প্রচারাভিযান একটি বহুপক্ষীয় উদ্যোগ যা নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও তা দূর করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে, অ্যাডভোকেসি প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে এবং আলোচনার মাধ্যমে যথাযোগ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সমাধানে পৌঁছার একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া নির্দেশ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জন নারী তার নিকটতম সঙ্গী বা অন্য কেউ কিংবা উভয়ের দ্বারা নিজের জীবদ্দশায় অন্তত একবার শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন।

এই পরিসংখ্যান থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে দেশে দেশে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণীত হলেও নির্যাতনের সংখ্যায় খুব একটা হেরফের হয়নি। যদিও এই সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব কোভিড-১৯ মহামারির আগের।

কোভিডকালীন অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় জীবনযাত্রার অনিশ্চয়তা এবং লকডাউনকালীন গৃহবন্দিত্বের সময় বিবেচনায় নিলে এই সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যেকোনো সংকটজনক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয় নারী ও শিশুরা।

এবার যদি আমাদের দেশের দিকে ফিরে তাকাই তাহলে আমরা দেখতে পাই করোনাকালে নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি নিপীড়ন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত বছর করোনা সংক্রমণকালীন এই নির্যাতনের হার হয় ঊর্ধ্বমুখী।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে লকডাউনে নারী ও পুরুষকে দীর্ঘ একটা সময় একই ছাদের নিচে থাকতে হয়েছে। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা বাড়ার পরিবর্তে বরং কমেছে। অর্থনৈতিক দুর্দশায় যৌতুকের দাবিতে কিংবা কলহের জেরেও নির্যাতনের সংখ্যা বেড়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, করোনাকালে ২০২০ সালে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৬ শ ৮৭ জন নারী। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাব অনুযায়ী ২০২০ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ২শ ১৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণ ২ শ ২৩টি।

আসকের চলতি বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৫শ ২ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এই পাঁচ মাসে ৫ শ ৩৩ শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে।

নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য সরকারি উদ্যোগে গঠিত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত যৌন হয়রানির শিকার হয়ে ৮হাজার ৪ শ ১৫ নারী ও শিশু সেবা গ্রহণ করেছে।

পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় ধর্ষণ বহুগুণে বেড়ে গেছে। বিচারহীনতা, রাজনৈতিক প্রশ্রয়, ধর্ষণের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, ভিকটিম ব্লেইমিং (ভুক্তভোগীকেই উল্টো দোষারোপ করা) যৌন সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অনেকেই মনে করে থাকন।

গত এক দশকের হিসাব করলে নারীকে সমাজের মূলস্রোতে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে নারী ও শিশু নির্যাতন রোধকল্পে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১, জাতীয় শিশুনীতি-২০১১, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০, শিশুদের ওপর নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে শিশু আইন-২০১৩, নারী ও শিশুসহ মানব পাচার রোধে একটি সমন্বিত আইন ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন-২০০৯ ইত্যাদি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নারী ও শিশু পাচার রোধে ‘জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ এবং ‘এসিড মামলা মনিটরিং সেল’ গঠন করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ইউপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।

দেশের ৮টি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ৪০টি জেলা সদর হাসপাতাল এবং ২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করা হচ্ছে। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের সপ্তাহে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা সহায়তা করার জন্য সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে টোল ফ্রি ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টার (১০৯) চালু করা হয়েছে।

এ সব উদ্যোগ গ্রহণের পরও নারী নির্যাতন আমাদের দেশের প্রতিদিনকার ঘটনা। শুধু বাইরেই নয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, শতকরা ৮০ ভাগ নারী তার নিজঘরেই পারিবারিক নির্যাতনের শিকার।

নারী নির্যাতন যে কতটা ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে তা প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই আমাদের চোখের সামনে ধরা দেয়। সারা দেশেই নারী নির্যাতন নানারূপে ও মাত্রায় সংঘটিত হচ্ছে এবং এর ফলে আমাদের দেশের সার্বিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। ধর্ষণ, হত্যা, অ্যাসিড নিক্ষেপ, যৌতুকের কারণে নির্যাতন, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি বহুমাত্রিক সহিংসতা নারীর জীবনের নিত্যসঙ্গী।

প্রতিটি নির্যাতনেরও রয়েছে বিভিন্ন রূপ ও মাত্রা। সাইবার ক্রাইম বা মোবাইল, ইন্টারনেট, ফটোশপ ইত্যাদি প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারী ও কিশোরীদের হয়রানি ও নির্যাতনও থেমে নেই। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের পাশাপাশি এ কারণে হত্যা ও আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়ছে।

বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে প্রতিদিন কতজন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, এর সঠিক পরিসংখ্যান আসলেই দুর্লভ, কেননা সব ঘটনার মামলা হয় না, অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে এসব চেপে যান। নির্যাতন যে পরিমাণ ঘটে তার চেয়ে অনেক কম সংখ্যকের খবরই প্রকাশিত হয় কিংবা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নজরে আসে।

বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষ আজ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠছেন। বস্তুত, আমাদের সবারই উচিত নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং অন্যদেরকেও উৎসাহিত করা। নারী নির্যাতনমুক্ত সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে নিজে নির্যাতন করা থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি আমাদের আশপাশে ঘটে যাওয়া যেকোনো নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে হবে, প্রতিরোধ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। কারণ নারী নির্যাতনকে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বেশি দায়ী আমাদের নীরবতা।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা না থাকায় কিংবা সচেতনতার অভাবে জনসাধারণ সেসব আইন ও নীতিমালার সুফল ভোগ করতে পারেন না। এ বিষয়ে আমরা আমাদের গণমাধ্যমের আরও জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশা করি।

এর পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যথাযথ তৎপরতার অভাবে কিংবা আইনের ফাঁক-ফোকরের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এর ফলে একদিকে যেমন অন্য অপরাধীরা উৎসাহিত হয়, অন্যদিকে নির্যাতিত নারীরাও আইনের আশ্রয় নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিছু নির্যাতনের ক্ষেত্রে আইনের অভাবও নারী নির্যাতনের জন্য দায়ী।

নারী নির্যাতন বন্ধে সিডও সনদ ও বেইজিং প্ল্যাটফরম ফর অ্যাকশন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কিছু আন্তর্জাতিক দলিল প্রণীত হয়েছে, কিন্তু তা যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে নারী নির্যাতন হ্রাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়নি। তাই এসব নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

বিশেষ করে নারী নির্যাতন বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ ও সম্পদ বরাদ্দ, অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা, এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা যথাযথ প্রয়োগের ব্যাপারে সরকারের বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
খালেদার বায়োপসি রিপোর্ট বিশ্লেষণে বসছে মেডিক্যাল বোর্ড
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে প্রশ্ন মোশাররফের
ভালো আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল
১৯ বছর পর হচ্ছে মডেল তিন্নি হত্যার রায়
আইসিইউ থেকে কেবিনে খালেদা জিয়া

শেয়ার করুন

বিশ্ব নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের ভাবনা: নারী, প্রতিবাদ কর শিরদাঁড়া সোজা করে

বিশ্ব নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের ভাবনা: নারী, প্রতিবাদ কর শিরদাঁড়া সোজা করে

নারীর আত্মমর্যাদা এবং সম্মান বাড়াতে নিজেদেরই আওয়াজ তুলতে হবে। নিজেকে শিক্ষায়, স্বাতন্ত্র্যে নিজের মতো করে পরিপূর্ণ মানুষ হতে হবে। বাড়াতে হবে দক্ষতা, নিশ্চিত করতে হবে অর্থনৈতিক অবস্থান। নিজেকে নিজের যোগ্য করে তুলতে হবে। সেটা সম্ভব হলেই কেবল নারী আর নারী থাকবে না, মানুষ হবে।

পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, বিকশিত হচ্ছে সভ্যতা, প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে সামাজিক কাঠামোয়। পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে সবখানে। কিন্তু নারীর মর্যাদার ক্ষেত্রে তার গুণগত কোনো প্রভাব পড়েনি। উন্নতি ঘটেনি মানসিক এবং সামাজিক অবস্থার, পরিবর্তন ঘটেনি অবস্থানেরও।

নারীর প্রতি অবমাননা, অসম্মান, নির্যাতন সেকালেও ছিল, একালেও আছে। এ যেন অলিখিত এক অধ্যাদেশ। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান থাকলেও নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা কোনো অংশেই কমেনি, বরং বেড়েছে।
এখনও পৃথিবীতে প্রতি তিনজন নারীর একজন জীবনে কোনো না কোনো সময়ে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়; তিনজনের দুজন স্বামী বা বন্ধু কিংবা পরিবারের সদস্যদের দ্বারা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়।

সারা পৃথিবীতে মাত্র ৮৯টি দেশ নারী নির্যাতনের তথ্য জাতীয়ভাবে সংগ্রহ করে থাকে। ১১৯টি দেশে নারী নির্যাতনবিরোধী আইন আছে, ১২৫টি দেশে যৌন সহিংসতাবিরোধী আইন আছে এবং মাত্র ২৫টি দেশে বিবাহভুক্ত ধর্ষণবিরোধী আইন আছে।

এ তো গেল সারা পৃথিবীর হিসাব। এবার চোখ ফেরাই নিজের দেশে। আমাদের নারীদের ৮৭ শতাংশ পারিবারিক সহিংসতার (Domestic violence) শিকার হয়। তাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত মার খায় ৭৭ শতাংশ, যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। আবার এক-তৃতীয়াংশ স্বামী কর্তৃক ধর্ষণের শিকারও হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় পর্যায়ের জরিপ ‘Violence Against Women Survey’ তে উঠে এসেছে এসব ভয়ংকর তথ্য। বিবিএস এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রথাগত সব ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে গৃহেই সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে নারী। স্বামী এবং অন্যান্য আপনজনদের কাছেই অনেক বেশি সহিংসতার শিকার হয় এবং নির্যাতনের ঝুঁকির ভেতর থাকে।

স্বামীর অনুমতি না নিয়ে বাইরে যাওয়া, বাচ্চাদের প্রতি যত্নশীল না হওয়া, স্বামীর সঙ্গে তর্ক করা, যৌন সম্পর্ক করতে অস্বীকৃতি জানানো, খাবার পুড়িয়ে ফেলার মতো অতি তুচ্ছ যেকোনো অন্তত একটি কারণে পুরুষের কাছে মার খায় নারী।
বিবিএসের জরিপে আরও উঠে এসেছে, ৮০ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো সময়ে সহিংসতার শিকার হয়েছে, কখনও গোপনে, কখনও প্রকাশ্যে। জরিপে অন্তত ৭ শতাংশ নারী জানিয়েছে, নির্যাতনের কারণে তারা আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছে।
জীবনের বাঁকে বাঁকে বহুমাত্রিক বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত নারী, নির্মম বাস্তবতার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতে হতে স্বকীয়তাই ভুলতে বসে। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি নারীর আর মানুষ হওয়া হয় না।

জন্মেই নারীর ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় নিশ্চিতভাবেই। এখনও ভূমিষ্ট হওয়ার পর সন্তানটি কন্যা হলে পরিবারের সদস্যদের মুখ কালো হয়ে যায়, মন অন্ধকার হয়ে আসে। যেন কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার দায় শুধুই নারীটির।

আবার এই যে সংরক্ষিত অধিকার নিয়ে কন্যা সন্তানটি পৃথিবীর মুখ দেখল, মৃত্যু অবধি তার আর পরিবর্তন ঘটল না। পিতার সম্পত্তিতে সে ভাইয়ের সমান হলো না, স্বামীর সংসারেও সে অপাঙক্তেয়ই থেকে গেল।

সাফল্যের চূড়ায় বসে থাকা অল্প কয়েকজন নারী গোটা সমাজের প্রতিভূ নয়। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানসিক অবস্থানের সূচকই নারীর বাস্তবতা। আর গোটা কয় নারীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার পেছনের কাহিনিটাও কম কষ্টসাধ্য নয়।

সেখানেও রয়েছে সহিংসতার ভিন্ন রকমের মাত্রা। নারীদের শিক্ষিত এবং সচেতন হওয়ার আনুপাতিক হার বাড়ার কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে নারীকে শৃঙ্খলিত করার ধরন ও প্রকৃতিও।
নারী মাত্রই জানে প্রতিনিয়ত কতটা অবহেলা, অসম্মান আর আত্মগ্লানির ভেতর দিয়ে যেতে হয় ।

কত নারী বুক সমান হতাশা, দীর্ঘশ্বাস, অবহেলা, আক্ষেপ নিয়ে নির্ঘুম রাত পার করে, সে হিসাবটা শুধু নারীরাই জানে। যে দেশ, সমাজ, পরিবার আজও মেয়েদের মানুষ ভাবতেই শেখেনি, ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্যায়ন করতে জানে না, সেখানে মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাববার সময় কই! এত মানুষের ভিড়ে একাকিত্ব আর তীব্র দহনে নারীদের দীর্ঘশ্বাস শুধু চার দেয়ালের ভেতরেই ঘুরপাক খায়।

আমরা যে পঙ্কিল সমাজে বাস করি, তাতে যূথবদ্ধভাবে নারীকে অবদমন করা হয় ব্যক্তিগত-দলগত, গোষ্ঠীগত, সমাজগতভাবে। তাই নারীদের অন্ধকার থেকে আলোতে বেরিয়ে আসাও সহজ হয় না।

বিংশ শতকের এ সময়েও নারীর অধিকার আর মর্যাদা অন্য কোথাও শেকলে বাঁধা। সেই বাঁধনের দৃঢ়তা বা শিথিলতার ওপর নির্ভর করে তার মান মর্যাদা আকাঙ্ক্ষা সম্ভ্রম প্রায় সবকিছুই। কন্যা জায়া জননীর প্রতিচ্ছায়া দিয়ে যতই মহিমান্বিত করা হোক না কেন, পশ্চাৎপদ প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন এ সমাজে নারীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাকে পদে পদে শৃঙ্খল পরানো হয়, পেরোতে হয় নানামুখী অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা। পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদ তাকে অর্থনৈতিকভাবে অকর্মণ্যতার দিকে ঠেলে দেয় প্রতিনিয়ত।

সামষ্টিক বিচারে গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতে নারীর স্পষ্ট অবদান থাকলেও স্বীকৃতি নেই । অথচ সভ্যতার ক্রম বিকাশের ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই রোবটিক্স যুগ পর্যন্ত সমাজের বিবর্তন-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় নারীর সর্বজনীন উপস্থিতিই প্রমাণ করে তার বৈচিত্র্যময় বহুমুখিতা।

তাই নারীর আত্মমর্যাদা এবং সম্মান বাড়াতে নিজেদেরই আওয়াজ তুলতে হবে। নিজেকে শিক্ষায়, স্বাতন্ত্র্যে নিজের মতো করে পরিপূর্ণ মানুষ হতে হবে। বাড়াতে হবে দক্ষতা, নিশ্চিত করতে হবে অর্থনৈতিক অবস্থান। নিজেকে নিজের যোগ্য করে তুলতে হবে। সেটা সম্ভব হলেই কেবল নারী আর নারী থাকবে না, মানুষ হবে। উপভোগ করতে পারবে নিজের জীবন, স্বাধীনতা।

সবকিছুর আগে সংস্কৃতিগতভাবে নারীকে সমৃদ্ধ হতে হবে। কারণ সংস্কৃতি যেকোনো মানুষকে পরিশীলিত করে, ঋদ্ধ করে। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। আমাদের সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষের ভয়ংকর প্রভেদের মূল কারণ সমাজে বিদ্যমান অপসংস্কৃতি, অশিক্ষা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় অনুভূতি।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পুরুষকে দিয়েছে সর্বময় ক্ষমতা অন্যদিকে নারীকে করে রেখেছে গৃহমুখী। কিন্তু বিশ্বের উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই সংস্কৃতির পরিবর্তন খুবই জরুরি। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর ইতিবাচক ভূমিকা ও প্রগতিশীল ভাবমূর্তির মাধ্যমে নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথকে সুগম করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, সচেতনতা-সুযোগ, নিরাপত্তা-শিক্ষা এবং সর্বোপরি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তবেই নারী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
তীব্র ঘাত প্রতিঘাত উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের মাধ্যমে একদিন নারী তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেই। তখনই সভ্যতার আলো জ্বলবে। নতুন সূর্য উঠবে।

সে আলোয় নারী পুরুষ নয়, মানুষ হিসেবেই আলোকিত হবে। সেদিন নারীরা শৃঙ্খলমুক্ত বাসযোগ্য একটা সমাজ পাবে। পূরণ হবে নিজের মতো করে বাঁচবার সাধ, অসীম আকাশে মেঘ হয়ে উড়বার সাধ, নিজেকে নিজের মতো করে পাওয়ার সাধ।
এর আগে বুঝতে হবে- পুরুষশাসিত সমাজ কিছু সস্তা অজুহাতে শৃঙ্খল পরিয়েছে নারীকে, নিজের স্বার্থে। সে অধিকার বঞ্চিত, উপেক্ষিত, অবহেলিত।
আজ ২৫ নভেম্বর। আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর লাতিন আমেরিকার ডমিনিকান রিপাবলিকের স্বৈরাচারী শাসক রাফায়েল ক্রজিলোর বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন চলাকালে শাসকচক্র প্যাট্রিয়া, মারিয়া তেরেসা ও মিনার্ভা মিরাকেল নামের ৩ বোনকে হত্যা করে। এই হত্যার প্রতিবাদে ১৯৮১ সালে লাতিন আমেরিকার এক নারী সম্মেলনে ২৫ নভেম্বরকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে দিবসটি স্বীকৃতি পায়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২৫ নভেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়।

এর দুই বছর আগে ১৯৯৭ সাল থেকেই অবশ্য আমাদের দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। তবে দিবস এলে সভা-সমাবেশ, সেমিনার, ওয়েবিনারে চমৎকৃত হওয়ার মতো অনেক আলোচনা থাকলেও নারীর ভাগ্যের সুষম সুরাহা হয় না।
সংস্কারের পলেস্তারা খসাতে হবে নারীকেই। শিরদাঁড়া সোজা করে তাকাতে হবে সামনের পানে। তাহলেই হয়তো নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস তার প্রয়োজনীয়তা হারাবে।

লেখক: শিক্ষক-প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
খালেদার বায়োপসি রিপোর্ট বিশ্লেষণে বসছে মেডিক্যাল বোর্ড
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে প্রশ্ন মোশাররফের
ভালো আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল
১৯ বছর পর হচ্ছে মডেল তিন্নি হত্যার রায়
আইসিইউ থেকে কেবিনে খালেদা জিয়া

শেয়ার করুন

খেলাপ্রীতি নাকি পাকিস্তানপ্রীতি

খেলাপ্রীতি নাকি পাকিস্তানপ্রীতি

যারা বলে খেলার মাঠের বিষয় নিয়ে রাজনীতির ইস্যু বানানো ঠিক নয়। তারা জানে কি, ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার খবর শুনে ঢাকা স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, গ্যালারিতে বাঙালি দর্শকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল।

খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে মেশাতে চান না অনেকেই। এই অনেকের সংখ্যা আসলে কত তা বলা কঠিন। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ ক্রীড়ামোদী এবং এই ক্রীড়ামোদীদের কত শতাংশ মানুষ খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশাতে চান না, তার কোনো পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই। তবে এটা অনুমান করা যায় যে, দেশে ক্রীড়ামোদীর সংখ্যার চেয়ে পাকিস্তানভক্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না!

সম্প্রতি মিরপুর স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ-পাকিস্তান টি টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়ে পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে উল্লাস করেছে, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়েছে এবং একজন তো পাকিস্তান ভাঙার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাও বলেছেন।

এরা বয়সে তরুণ। এদের মধ্যে এমন পাকিস্তানপ্রেম কীভাবে উথলে উঠল, সে প্রশ্ন উঠছে। এটাও বলা হচ্ছে যে, গত ১২ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পতাকাবাহী দল। তাহলে তারা ক্ষমতায় থাকতে দেশে তরুণদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রতি মহব্বত বাড়ছে কেন এবং কী কারণে?

বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রযোজন। কেউ কেউ বলছেন যে, খেলার মাঠে রাজনীতি ঢোকানো উচিত নয়। কে কোন দলকে সমর্থন করবে, কোন খেলোয়াড়ের ফ্যান কে হবে– এটা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। এটা যার যার ব্যক্তিগত রুচি ও পছন্দের ব্যাপার।

বাংলাদেশের একজন তরুণ বা যেকোনো বয়সের মানুষ যেকোনো দেশের ক্রিকেট বা ফুটবল টিমের সমর্থক হতে পারেন। কেউ যদি ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড-ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা-শ্রীলঙ্কা বা জিম্বাবুয়ের সমর্থক হতে পারেন, তাহলে আরেকজন কেন পাকিস্তানের সমর্থক হতে পারবেন না?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো- অন্য কোনো দেশ বাংলাদেশে গণহত্যা চালায়নি। পাকিস্তান চালিয়েছে। পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। দুই লাখের বেশি বাঙালি নারী পাকিস্তানি সেনাসদস্য এবং তাদের দেশীয় দোসরদের দ্বারা চরম পাশবিকতার শিকার হয়েছেন। পাকিস্তানিরা তখন ‘মুসলমান ভাই ভাই’ নীতি অনুসরণ করেনি।

ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে সব বাঙালিকে শত্রু ভেবেছে এবং শত্রুনিধনে চরম নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নিয়েছে। পাকিস্তান যদি একাত্তরে জয়লাভ করত তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। পাকিস্তানকে পরাজিত করেই বাঙালিরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কাজেই অন্য দেশের সমর্থক হওয়া আর পাকিস্তানের সমর্থক হওয়া এক কথা নয়। আমাদের হারতে দেখলে (শুধু খেলার মাঠে নয়) যারা খুশি হয়, তাদের জন্য যারা অন্তরে দরদ পোষে তাদের দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রশ্ন জাগাটা অযৌক্তিক নয়।

কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, যারা মিরপুরে পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে মাঠে উল্লাসে মেতেছে, তারা আসলে পাকিস্তানি, আটকেপড়া বিহারি, যাদের আমাদের দেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি। এটা যে ঠিক নয়, বাংলাদেশের বেশ কিছু তরুণ যে পাকিস্তানি দলের জার্সি গায়ে পরে এবং পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে মাঠে গিয়েছে, তার প্রমাণ আছে।

শেষদিন এমন এক তরুণের গা থেকে পাকিস্তানি জার্সি জোর করে খোলার দৃশ্য সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে এবং দৈনিক পত্রিকায়ও বিষয়টি খবর হয়েছে। যদি খেলাটি বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মধ্যে না হয়ে অন্য দুই দেশের মধ্যে হতো তাহলে ওই দুই দেশের সমর্থকেরা ওই দেশের পতাকা হাতে নিয়ে গেলেও না হয় মেনে নেয়া যেত। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে খেলার সময় যদি কোনো বাংলাদেশি বাঙালি অন্য দেশের পতাকা বহন করে তাহলে বিষয়টি শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

যদি বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে খেলা হলে বাংলাদেশের কেউ ভারতের পতাকা নিয়ে মাঠে গেলেও কি তার নিন্দা-সমালোচনা করা হবে? নাকি পাকিস্তানি পতাকাতেই সব রাগ-গোস্বা-ক্ষোভ? যারা এমন কূটতর্ক করতে চান, তাদের জন্যও বলার কথা একটাই– বাংলাদেশের নাগরিকদের আনুগত্য শুধু বাংলাদেশের প্রতিই থাকবে। বিষয়টি দেশপ্রেমের সঙ্গে জড়িত, ভারতপ্রীতি বা পাকিস্তানবিদ্বেষের সঙ্গে যুক্ত নয়।

যারা বলে খেলার মাঠের বিষয় নিয়ে রাজনীতির ইস্যু বানানো ঠিক নয়। তারা জানে কি, ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার খবর শুনে ঢাকা স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, গ্যালারিতে বাঙালি দর্শকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল।

রাজনীতি সবাই করেন না। কিন্তু সবার জীবনই রাজনৈতিক ঘটনার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। খেলাধুলাও যে রাজনীতি, রাজনৈতিক পরিবেশের বাইরে নয়, একাধিক ঘটনা দিয়ে তা প্রমাণ করা যায়।

কানাডাপ্রবাসী সাংবাদিক শওগত আলী সাগর তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন: “ঢাকার খেলার মাঠে পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করছে বাংলাদেশিরাই”- এই দৃশ্যটি অসহনীয়। কিন্তু যারা পাকিস্তানি পতাকা নিয়ে মাঠে গেছে- তাদের আমি শুরুতেই গালি দেব না।

তার আগে তাদের মানসপটটা বোঝার চেষ্টা করব। বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যকার খেলায় বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানকে সমর্থন এবং সেদেশের পতাকা নিয়ে উল্লাস করার পেছনে তাদের কী ভাবনা কাজ করেছে- সেটা বোঝার চেষ্টা করা দরকার।

ইতোমধ্যে কোনো মিডিয়া তাদের এই প্রশ্নটা করেছে কি না জানি না। কিন্তু করাটা দরকার ছিল। তারা কেন এটা করছে- কেবল সেটা জানার জন্যই নয়, আমাদের এতে কোনো দায় আছে কি না, সেটা বোঝার জন্যও আমি এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পক্ষে। খেলার মাঠে পাকিস্তানকে সমর্থন করা বা পাকিস্তানের পক্ষে উল্লাস করা নতুন কোনো ঘটনা নয়। অনেক দিন ধরেই এগুলো চলে আসছে। এখন সেটা সংখ্যায় বেড়েছে।

‘খেলার সঙ্গে রাজনীতি মিশাবেন না’- এমন আপ্তবাক্য আর ‘এরা সব পাকিস্তানের জারজ সন্তান’- এমন গালি দিয়েই আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করেছি। এর বাইরে আর কিছু ভাববার দরকার আছে বলে কখনও মনে করিনি।

খেলার সঙ্গে কেন রাজনীতি জড়িয়ে যায়, কেবল রাজনীতিই নয়, সংস্কৃতি, দেশপ্রেম জড়িয়ে যায়- সেগুলো বোঝার সক্ষমতা না থাকলে, অন্যকে বোঝানোর সক্ষমতা না থাকলে, আমরা অন্যকে কী দিয়ে প্রভাবিত করব! ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছি, কিংবা পাকিস্তানিদের নৃশংসতা’ অন্যদের কেন স্পর্শ করা উচিত- এই বোধটা এই মানুষগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব ছিল কি না- সেটাও ভাববার চেষ্টার মধ্যে রাখা জরুরি’।

এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। যারা শাসনক্ষমতায় আছেন, তাদের এগুলো নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে। দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে, নানা ধরনের দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো গড়ে উঠছে, মানুষের গড় আয় ও আয়ু বাড়ছে। আমরা তো এগিয়ে যাওয়ার জন্যই মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, রক্তনদী সাঁতরে আমরা বিজয়ী হয়েছি। এখন স্বাধীনতার ৫০ বছরে অনেক দূর আমরা এগিয়েছি। বড় বড় অর্জন অবশ্যই আমাদের আছে।

আবার এই সময়ে কিছু ক্ষেত্রে আমাদের পিছু হটার ঘটনাও আছে। আমরা একটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। ধর্মীয় পরিচয়কে বড় করে দেখে আমরা মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চাইনি। অথচ আজ আমরা ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে পারছি না।

পাকিস্তানিরা মুসলমান, আমরাও মুসলমান তাই তাদের জয়ে আমাদের কেউ কেউ উল্লসিত হয়– একাত্তরের রক্তস্মৃতি ভুলে গিয়ে। এটাকে যারা ছোট বিষয় মনে করেন তারা আসলে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলিয়ে দিতে চান। মানুষকে তার শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে পারলে পরাজিত করা সহজ হয়। আমরা কি সে পথেই হাঁটছি না?

আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছি তখন পাকিস্তানি পতাকা উড়িয়ে, পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের চার-ছক্কায় উল্লাস করে ফের একাত্তরের মতোই রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ করেছে যারা তারা আসলে একাত্তরের রাজাকারসন্তান! নাকি অন্য পরিবার থেকে আসা? শুধু রাজাকার বা রাজাকারসন্তান বলে গাল দিলেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? কেউ কেউ বলছেন, বিষয়টি নিছকই পতাকাবিধি লঙ্ঘন নয়।

এটি পঞ্চাশ বছরের গভীর ষড়যন্ত্র। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, জাতীয় চারনেতা হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতার বহিঃপ্রকাশ। এদের দ্রুত চিহ্নিত করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে বিচারের দাবি জানিয়েছেন কেউ কেউ। এক্ষেত্রে আইন, স্বরাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে যৌথ উদ্যোগ নেয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বিষয়টি দেখে আইনিব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

মন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা আবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব। এটা দুর্ভাগ্যজনক, যদি কেউ করে থাকে। একটা টিমকে যে কেউ সাপোর্ট করতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে খেলার দিন অন্য টিমকে সাপোর্ট করা, একটা দেশপ্রেমিক নাগরিকের জন্য শোভনীয় নয়।

নিঃসন্দেহে কারো কাছেই এটি শোভনীয় মনে হবে না। রক্তে কেনা স্বাধীন দেশের নাগরিক নিজদেশের খেলায় একাত্তরের পরাজিত শক্তির পতাকা বহন করে উল্লাস করবে, এটি কখনও ভাবা যায়! অকল্পনীয়। এটি বিবেকের প্রশ্ন। আমরা এখন বিষয়টি নিয়ে ভাবব। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে করণীয় ঠিক করব এবং ব্যবস্থা নেব।’

করণীয় ঠিক করে ব্যবস্থা নিতে বেশি দেরি করলে বিপদও বাড়বে- এটা মনে রাখতে হবে সরকারের নীতিনির্ধারকদের। শত্রুর সঙ্গে গলাগলি করা আর মিত্র চিনতে ভুল করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
খালেদার বায়োপসি রিপোর্ট বিশ্লেষণে বসছে মেডিক্যাল বোর্ড
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে প্রশ্ন মোশাররফের
ভালো আছেন খালেদা জিয়া: ফখরুল
১৯ বছর পর হচ্ছে মডেল তিন্নি হত্যার রায়
আইসিইউ থেকে কেবিনে খালেদা জিয়া

শেয়ার করুন