সাম্প্রদায়িকতার অন্ধত্ব নয় মানবিকবোধসম্পন্ন হতে হবে

সাম্প্রদায়িকতার অন্ধত্ব নয় মানবিকবোধসম্পন্ন হতে হবে

এরা শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারীই যদি হবে তবে ২০১৪-এর নির্বাচন ঠেকানোর সন্ত্রাসী আয়োজনের সময় শিবিরের আস্তানায় পেট্রোলবোমা, গানপাউডার আর ককটেল পাওয়া যাবে কেন? কেন সিতাকুণ্ডের পাহাড়ে শিবির মানুষ হত্যার জন্য, সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলবে? কেন সেখানে ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ পাওয়া যাবে? ধর্মের নাম ভাঙিয়ে চলা এসব লোভী মানুষ ধর্ম ও সভ্যতার শত্রু।

সচেতন আর বিবেকবান মানুষেরা আতঙ্কিত ও বিস্মিত এই জন্য যে, একুশ শতকের এ অগ্রগতির যুগে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে কীভাবে একদল মানুষ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াতে মাঠে নেমেছে। এদেশের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল ক্যানভাসের কথা এসব অন্ধকার জীবের জানা নেই। ১৩ শতক থেকে ১৮ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এদেশে বহিরাগত মুসলিম- সুলতান ও মোগলরা শাসন করেছে। সুফি-সাধকরা ধর্মপ্রচার করেছে মানবতার বাণী ছড়িয়ে।

ইসলামের শান্তির বাণী ও মানবিক আচরণ আকৃষ্ট করে ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকদের অত্যাচারে বিপন্ন সাধারণ হিন্দুকে। সুফির কাছে এসে তারা বেঁচে থাকার আশ্বাস পেতে চেয়েছে। অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পৃষ্ঠপোষকতা পেত মুসলমান শাসকদের কাছ থেকে। মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বন্ধুর মতো পাশাপাশি বাস করত। একে অন্যের প্রয়োজনে ছুটে আসত।

এখনও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধি নেই। হঠাৎ সাম্প্রদায়িক হিংসা উসকে দেয়া দেখে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে সব অপকাণ্ডের সূত্র হচ্ছে নষ্ট রাজনীতি। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে সমাজকে বিপন্ন করে তুলছে সুবিধাবাদী কিছু মানুষ।

গণতান্ত্রিক পথচলার পরিক্রমা নষ্ট করে ফেলেছে বিভিন্ন পক্ষের রাজনীতিকরা। সরল পথে কেউ হাঁটতে পারছে না। নিয়মতান্ত্রিক পথে গণতান্ত্রিক ধারা বজায় থাকলে রাজনীতিতে এত হতাশা নেমে আসত না। তাই সরল পথ না পেয়ে মোক্ষ লাভের জন্য অন্ধকার পথ খুঁজতে হচ্ছে সব পক্ষকে।

এমন বাস্তবতায় নৈরাজ্য দানা বাধবেই। এসবের মধ্যে আবার এ আধুনিক সময়ে নানা নামে ধর্মীয় মৌলবাদীদের বিকাশ ও বিস্তার ঘটছে। পাকিস্তান আমলেও ধর্ম নিয়ে এমন ফিতনা-ফ্যাশাদ ছিল না। গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় গজিয়ে ওঠা অসংখ্য মাদ্রাসায় তৈরি করা হচ্ছে মৌলবাদীদের তালেবে এলেম। দায়িত্বশীল মাদ্রাসার প্রকৃত ইসলামচর্চাকারী আলেম ও শিক্ষার্থীরা এদের দাপটে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।

ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় এদের বিভ্রান্ত করে অন্যায়ের পথে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর এসবের ভেতর থেকে একে একে ঘটে যাচ্ছে রামুর বৌদ্ধদের ওপর আঘাত হানা, নাসিরনগরে হিন্দুদের জীবন ও সম্পদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া, কুমিল্লার পূজামণ্ডপে সাম্প্রদায়িকতার কূটচালে নাটক সাজানো।

জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কৃতিত্ব এসব ঘটনায় অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। গোয়েন্দাদের দুর্বলতা এখন আর লুকোছাপা নেই। কুমিল্লার ঘটনার আগে কোনো পক্ষ আঁচ করতে পারেনি- তা না হয় মানা যায় কিন্তু এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া যে হতে পারে তা না ভাববার কারণ কী? রংপুরের জেলেপল্লিতে এতবড় তাণ্ডব ঘটে গেল অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই আঁচ করতে পারল না! ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ভাঙা রেকর্ড বাজতে থাকে। খুঁজে বের করবে, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে... ইত্যাদি।

ধর্মীয় মৌলবাদীরা ও রাষ্ট্রক্ষমতা প্রত্যাশী রাজনীতিকরা অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে যুগ যুগ ধরে সরল মানুষদের ধর্মান্ধ জঙ্গি বানাতে চেষ্টা করেছে। এই সরল মানুষদের মুক্তবুদ্ধি আর চেতনার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। একচোখা গণ্ডারের মতো অন্ধ বানিয়ে ছেড়েছে মানবতা ও সভ্যতার বক্ষ বিদীর্ণ করতে।

ব্যক্তিগত লাভের ফসল ঘরে তুলতে নিজধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। খ্রিস্ট-সনাতন, ইসলামসহ অন্যসব ধর্মের নামাবরণে এ ধারার ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের অশুভ অবস্থান দেখা গিয়েছে, যাচ্ছেও। বিশ্বজুড়ে এসময় ইসলামের নাম ভাঙানো জঙ্গিবাদ শান্তিবাদী মানবিক ধর্ম ইসলামকে ভুলভাবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করছে।

আমাদের দেশে লেবাস ও বর্ণিত আদর্শে জামায়েতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির ইসলামের নাম নিয়েই রাজনীতি করে। এখন যদিও নিজ অপকর্মে এই দল দুর্বল হয়ে গেছে। এরা কি কম আসুরিক কাজ করেছে? এই দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য চরম ইসলামবিরোধী কাজ করে যাচ্ছিল অবলীলায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা নিজেদের আদর্শিক কারণে পাকিস্তানপন্থি হতেই পারে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান না-ও নিতে পারে। তাই বলে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হয়ে গণহত্যায় অংশ নেবে? ধর্ষণের সহযোগী হবে? নিরীহ-নিপরাধ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে? ইসলামের দৃষ্টিতে তো এসব আচরণ ঘোরতর পাপের কাজ। ইসলামী ছাত্র শিবির যখন প্রতিপক্ষ ছাত্রবন্ধুকে হত্যা করে, পায়ের রগ কেটে দেয় এর কি কোনো অনুমোদন পাবে ইসলামে? কবছর আগেও আন্দোলনের নামে বিএনপির বন্ধু হয়ে যেভাবে নিরীহ সাধারণ মানুষকে পেট্রোল বোমায় পোড়াচ্ছিল এর অনুমোদন কোথায় ইসলাম ধর্মে?

এরা শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারীই যদি হবে তবে ২০১৪-এর নির্বাচন ঠেকানোর সন্ত্রাসী আয়োজনের সময় শিবিরের আস্তানায় পেট্রোলবোমা, গানপাউডার আর ককটেল পাওয়া যাবে কেন? কেন সিতাকুণ্ডের পাহাড়ে শিবির মানুষ হত্যার জন্য, সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলবে? কেন সেখানে ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ পাওয়া যাবে? ধর্মের নাম ভাঙিয়ে চলা এসব লোভী মানুষ ধর্ম ও সভ্যতার শত্রু। এসব বিচারে ইসলামী স্টেটস নামধারী জঙ্গি থেকে শুরু করে জামায়েতে ইসলামী এবং ইসলাম নামধারী নানা জঙ্গি ভাবাদর্শের দল সবাই একসূত্রে গাঁথা।

ইন্টারনেটের কল্যাণে পাঠক নিশ্চয়ই বেশ কবছর আগে বর্বর জঙ্গিদের মসুল জাদুঘরে রাখা এশেরীয় সভ্যতার মহামূল্যবান নিদর্শনগুলো নির্দয়ভাবে হাতুড়ি চালিয়ে ভেঙে ফেলতে দেখেছিলেন! চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল হাতুড়ির প্রতিটি ঘা বুকের একটি করে পাঁজর ভেঙে ফেলছে। সেই মধ্যযুগে আব্বাসীয় শাসনপর্বে বাগদাদ ছিল ইসলামি সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি।

এখানে আক্রমণ করেছিল মঙ্গোলীয় বর্বর নেতা হালাকু খান। পুড়িয়ে দিয়েছিল বাগদাদের জাদুঘর আর লাইব্রেরি। এখনও ঘৃণাভরে সে বর্বরতার কথা স্মরণ করে পৃথিবীর সংস্কৃতিসচেতন মানুষ। এই আধুনিক যুগে এসেও ইসলামি রাজ্য গড়ার কথা বলে ইসলামের উদারতা ও গরিমাকে কলঙ্কিত করে বিশ্ববাসীর কাছে সংকীর্ণভাবে উপস্থাপন করছে কিছু ধর্মান্ধ মানুষ। এজন্যই বুঝি বলে ধার্মিক মানুষ সবসময় মানবিকতার পক্ষে আর মানবতা ও ধর্মের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ধর্মান্ধ মানুষ। কারণ অন্ধ রেখে ধর্মের নাম ভাঙিয়ে এদের দিয়ে যেকোনো অপকর্ম করানো যায়।

২০০১-এর কথা কি আমরা ভুলতে পেরেছি? আফগানিস্তানের তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের ফরমান মতো বামিয়ান উপত্যকায় অনিন্দ্য সুন্দর বৌদ্ধ ভাস্কর্য গুড়িয়ে দিয়েছিল মূর্খ, উন্মাদ তালেবান জঙ্গিরা। ২০০৮-এর কথা; হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বরাবর মূল সড়কের সড়কদ্বীপে লালন ভাস্কর্য তৈরি করা হয়। সে ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে মৌলবাদীরা। এদেশের মৌলবাদী ইসলামি নেতারা কতটা গভীরভাবে নিজধর্মকে বোঝে জানি না, তবে তারা যে অসংখ্য ধার্মিক মুসলমানকে ধর্মান্ধ বানিয়ে ইসলামের কমনীয় রূপে কালিমা লেপন করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

গভীরভাবে ইসলাম ও ইতিহাস না বুঝতে পারায় সম্ভবত অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী লালনকে এ যুগের মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষরা চিনতে পারল না। যে মরমি সাধক লালন আল্লাহর সঙ্গে নিজের হৃদয় এক করে দিতে চেয়েছিলেন, তাকে প্রতীক হিসেবে ধারণ করে আমরা প্রতিদিন শুদ্ধ হতে পারতাম। এর বদলে কিছু অশিক্ষিত, অসংস্কৃত, অমার্জিত মানুষ বোকা ছাত্রদের উসকে দিয়ে লালন ভাস্কর্যকে পায়ের তলায় পিষে ফেলতে চাইল। এদের কাছে কি মূর্তি আর ভাস্কর্যের পার্থক্য স্পষ্ট নয়?

নিরাকার আল্লাহর প্রতিরূপ যাতে কেউ না দেয় সে অর্থে মূর্তি গড়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য আছে ইসলামে। ভাস্কর্য তো সৌন্দর্যের প্রতিরূপ, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতিরূপ। এর প্রতি হিংসা প্রকাশ করতে পারে একমাত্র অন্ধকারের জীবরা।

এশেরীয় সভ্যতার নিদর্শনসমূহের ভেতর একটি বড় অহংকার শিল্প সৌকর্যে পূর্ণ ভাস্কর্য। প্রায় ৩ হাজার বছর আগের নাম না জানা শিল্পীরা কতটা নৈপুণ্যে গড়ে তুলেছিল এসব শিল্প। তা দেখে শিল্প ইতিহাসের মূল্যায়ন করবে এযুগের মানুষ। অথচ একমুহূর্তে জঙ্গির তকমা আঁটা কিছু অন্ধ উন্মাদ এই মহামূল্যবান প্রত্নঐতিহ্য নির্দয়ভাবে গুড়িয়ে দিল।

ইরাকের নিমরুদ শহরের এসব ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেয়ার পর আরেকটি প্রাচীন শহর হাত্রার স্থাপত্যসমূহ ভেঙে ফেলে জঙ্গিরা। বুঝলাম এরা ভাস্কর্যকে পূজ্য মূর্তি বিবেচনায় ভেঙেছে। যেমন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙতে চেয়েছিল। আসলে অন্ধকারের জীবরা আলোকে সবসময় ভয় পায়। এদের কাণ্ড দেখে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আর্যদের কথা মনে পড়ল।

তাদের গ্রন্থ বেদের ভাষ্য থেকে জানা যায়, গ্রামীণ-সংস্কৃতির ধারক আর্যরা ভারতে ঢুকে সিন্ধু সভ্যতার দুর্গ নগরী দেখতে পায়। নগরীকে ভীতিকর মনে করে। তাই তাদের দেবতা ইন্দ্র ‘পুর’ অর্থাৎ নগর ধ্বংস করে দেয়। একারণে আর্যরা গর্ব করে দেবতা ইন্দ্রকে বলেছে ‘পুরন্দর’। অর্থাৎ পুর ধ্বংসকারী দেবতা।

দেখা যাচ্ছে মেসোপটেমিয়া থেকে বাংলাদেশ সর্বত্রই ধর্মান্ধরা তাদের ছড়ানো উন্মাদনায় শুধু সভ্যতার শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত হয়নি, এরা নিজধর্মেরও শত্রু। নিজেদের ক্ষমতার লোভ এবং ধর্মকে ভুল ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করে কলঙ্কিত করছে ধর্মের ঔজ্জ্বল্য। একারণে সুস্থ চিন্তার সব মানুষকেই প্রতিহত করতে এগিয়ে আসতে হবে।

আসলে আমরা মনে করি হিংসাকে বন্ধ করতে হিংসা ছড়ানো নয়। মানবিকতার আহবানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যারা আজ কুমিল্লা, নোয়াখালী ও রংপুরে নিরীহ হিন্দুদের ওপর আঘাত হেনেছে, তাদের সম্পদ ধ্বংস করেছে, তারা যাতে মানবিকতার আহবানে সুন্দরের দিকে ফিরে তাকায় তেমন পরিবেশ রচনা করতে হবে। মতলববাজ গুরুরা এসব তরুণের কাঁচা মাথা চিবানোর আগেই সমাজের সচেতন মানুষকে সুন্দর ও যুক্তির পথ রচনা করতে হবে। একটি মানুষ মানবিকবোধসম্পন্ন হলে তাকে অন্ধকারের পথে নেয়া সহজ হবে না।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

এ স্বপ্ন অলীক নয়

এ স্বপ্ন অলীক নয়

প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আমাদের না আছে বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না আছে পারিবারিক-সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভালো পরিবেশ। মেধা বিকশিত করার জন্যও নেই ভালো কারিগর। মানুষ গড়ার এই কারিগর শিক্ষকরা নানা দলে-উপদলে বিভক্ত, কুটিল রাজনীতিতে লিপ্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফোর্বসের ‘থার্টি আন্ডার থার্টি’-তে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের বাসিমা ইসলাম। গেল বুধবার এ তালিকা প্রকাশ করেছে সাময়িকীটি। ফোর্বস প্রতিবছর ২০টি ক্যাটাগরিতে ৩০ জন করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করে, যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে।

এ ক্যাটাগরিগুলোর একটি বিজ্ঞান, যেখানে স্থান পাওয়া বাসিমা বোস্টনের ওয়েস্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কম্পিউটার ও তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে যোগ দিতে যাচ্ছেন। তার ছোট একটি প্রোফাইলও প্রকাশ করেছে ফোর্বস। এতে লেখা রয়েছে, তিনি ব্যাটারি ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারযোগ্য ডিভাইস ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ (আইওটি) তৈরিতে কাজ করছেন।

এক সাক্ষাৎকারে বাসিমা বলেছেন, তার উদ্ভাবিত ডিভাইসটি বিশ্বব্যাপী ইলেক্ট্রনিক্স জগতে পরিবর্তন আনবে। পৃথিবীতে দৈনিক প্রায় ৮৭ লাখ ডিভাইসে ব্যাটারি পরিবর্তন হয়। এই বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি তৈরি ও রিসাইক্লিংয়ে ব্যাপক খরচের পাশাপাশি পরিবেশে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। যার সমাধান হতে পারে আইওটি।

এটি ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চিকিৎসা ও কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। বাসিমার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন আইওটি ডিভাইস তৈরি করা। দেশের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বুয়েট থেকে পড়াশোনা করা বাসিমা ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে সদ্যই নিয়োগ পেয়েছেন ৩৭ বছর বয়সি ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরাগ আগরওয়াল। ২০০৫ সালে মুম্বাই আইআইটি থেকে ব‍্যাচেলর শেষ করে, সে বছরই আমেরিকার স্ট‍্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে যান পিএইচডি করতে। ২০১১ সালে টুইটারে যোগ দেয়ার আগে তিনি এটি অ্যান্ড টি ল্যাব, ইয়াহু এবং মাইক্রোসফটে কাজ করেন। ২০১৭ সালে টুইটারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) পদেও বসানো হয় তাকে।

ভারতীয়দের মধ্যে আরও আছেন মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সত্য নাদেলা, গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই, অ্যাডোবির সিইও শান্তনু নারায়ণ এবং মাস্টারকার্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান অজয়পাল সিং বাঙ্গা।
সারা বিশ্বে আমাদের বাসিমার মতো হাতেগোনা দুয়েকজন থাকলেও ভারতের সংখ্যাটা অনেক বড় এবং তারা ততধিক বড় পদে মাথা উঁচু করে কাজ করছেন সম্মান, সম্ভ্রম আর বিনয়ের সঙ্গে।

বিশ্বায়নের কালে ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী, এগিয়েও যাচ্ছে। আর এগিয়ে যাওয়ার এ সময়ে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ছেলেমেয়েরা মেধা দিয়ে, নিজের যোগ্যতা দিয়ে, শ্রম দিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে পৃথিবীর শীর্ষস্থানগুলোতে। সেইসঙ্গে আর্থিক দিকটিও পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পরাগ আগরওয়ালের আনুষঙ্গিক সুবিধার বাইরের বার্ষিক ১০ লাখ ডলার বেতন, শুধুই তার কাজের স্বীকৃতি।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে চাহিদার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে। প্রযুক্তি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বাড়ছে, সেটাই স্বাভাবিক। নিত্যনতুন ডিভাইস, ইলেকট্রনিক পণ্য, দামি বা ফ্যাশনেবল পোশাক, বাড়ি, গাড়ি, দামি ফার্নিচার, আরও কতকিছুই এখন আমাদের চাহিদার তালিকায়।

নিজের জীবন নিয়ে উচ্চাশা দোষের কিছু নয়। প্রতিটি মানুষের আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন থাকে। মেধা আর কঠোর শ্রম দিয়ে সে স্বপ্ন পূরণের সফলতার আনন্দময় গল্পও থাকে, ঠিক বাসিমা ইসলাম, পরাগ আগরওয়াল, সুন্দর পিচাই, সত্য নাদেলাদের মতো।

বিষয়টি হলো কষ্টসাধ্য, দুর্গম পথে হাঁটতে আমাদের বড়ই অনীহা। আমরা তড়তড় করে উপরে ওঠার জন্য খুঁজে বেড়াচ্ছি সহজতর পথ। খ্যাতি-মোহ, অর্থ-বিত্ত সবকিছু নিমিষেই হাতের মুঠোয় পেতে মরিয়া। ছেলেমেয়েদের বেশিরভাগই শ্রম-মেধা দিয়ে সময়ক্ষেপণ করে প্রতিষ্ঠা পাওয়াকে সময়ের অপচয় মনে করে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আমাদের না আছে বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না আছে পারিবারিক-সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভালো পরিবেশ। মেধা বিকশিত করার জন্যও নেই ভালো কারিগর। মানুষ গড়ার এই কারিগর শিক্ষকরা নানা দলে-উপদলে বিভক্ত, কুটিল রাজনীতিতে লিপ্ত। রাজনৈতিক পদ-পদবি পাওয়াকেই শিক্ষকতার সর্বোচ্চ প্রাপ্তি মনে করেন।

নিজের ঘর থেকে যে নৈতিক শিক্ষার শুরু, সেখানেও সমস্যা। পিতামাতা অভিভাবকেরা নিজেরাই গোলক ধাঁধায় ভোগেন। কেবলই অর্থনৈতিক নিশ্চয়তাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যোগ্য মানুষ করে গড়ে তোলার পরিবর্তে বেশি অর্থ উপার্জন করার ভাবনাটাকেই প্রাধান্য দেন। তাই সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালনা করাটা তাদের জন্যও সহজ হয় না।

আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। আমাদের দেশে যেখানে সেখানে দেখা যাওয়া বিপুলসংখ্যক মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হচ্ছে ততধিক মানহীন শিক্ষার্থী। পরবর্তী সময়ে যারা বেকার হিসেবে দুঃসহ জীবন শুরু করে। এই বেকারত্বের বাঁধন ছিন্ন করা বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। যে স্বচ্ছলতার সুখস্বপ্ন নিয়ে তারা পড়তে এসেছিল, পড়া শেষ করে কিছুদিনের ভেতরই তাদের মোহভঙ্গ হয়, আশাহত হয়। অথচ সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে কৌশল অবলম্বন করে বিপুলসংখ্যক ছেলেমেয়েকে বেকারত্বের গ্লানি থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অধিক মাত্রায় জোর দিয়ে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট তৈরি করা গেলে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্ব অনেকটাই কমে আসবে নিশ্চিত। ভারত যে মহাকাশ গবেষণা, পরমাণু শক্তি গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক‍েমিক‍্যাল অ্যান্ড বায়োকেমিক‍্যাল গবেষণা অনেক ক্ষেত্রে অভাবনীয় সফলতা দেখাচ্ছে, তার মূলে হলো তাদের উচ্চমানের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখান থেকে শিক্ষা নিয়েই ছেলেমেয়েরা সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত করতে পারছে। যতই দিন যেতে থাকবে ভারত এর সুফল ভোগ করতে থাকবে পূর্ণমাত্রায়।

ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে কেউ বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ে, কেউ দেশেই গড়ে। অনেকেই সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠে, তৈরি হয় বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠান।

দেশে আর্থিক সমস্যা আছে, থাকবে। ভারতেরও আছে। এখনও ভারতে বিপুলসংখ্যক মানুষ একবেলা মাত্র খেতে পায়, চিকিৎসার অভাবে মারা যায় অসংখ্য মানুষ, আকাশের নিচে রাত কাটায়, স্যানিটেশন নেই, আরও আরও অনেক কিছু নেই। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় ছাড় দেয়নি ভারত। তুখোড় ছাত্রদের শানিত করবার সব ধরনের ব্যবস্থা করে রেখেছে।

তাই উন্নতমানের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানবিক গুণ যোগ করে যদি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যায়, তবে তা হবে জ্ঞানের ভাণ্ডার, অর্থেরও ভাণ্ডার। তাহলে আমরা লোভ লালসাহীন, উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন মানবিক এক দেশ দেখব, যেখানে অর্থনীতির সুষম বণ্টন হবে, দুর্নীতির মাত্রা আর দারিদ্র্য কমে যাবে। মানসম্পন্ন আধুনিক সভ্যতার সোপান রচিত হবে।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

সড়কে নৈরাজ্য ঠেকানোর দায়িত্ব কার

সড়কে নৈরাজ্য ঠেকানোর দায়িত্ব কার

নানা ঘটনায়, নানা অজুহাতে পরিবহন মালিকরা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা নেন। সম্প্রতি খোদ জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্য যিনি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত, তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান সরকারের আমলে তারা বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকা প্রণোদনা পেয়েছেন। যে রাষ্ট্রে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা সরকারি প্রণোদনা পান, সেই পরিবহন মালিকরা কী করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নিতে অস্বীকার করেন— তা বোধগম্য নয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা বাসে যে হাফ ভাড়া দেয়, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।

সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, অভিনেতা এমনকি পুলিশের গাড়ি আটকে দিয়ে কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করছে যারা, তাদের বয়স ২০-এর বেশি নয়। অর্থাৎ অধিকাংশই কিশোর-তরুণ। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। এই দৃশ্যগুলো প্রথম দেখা গিয়েছিল ২০১৮ সালের আগস্টে। তার সোয়া তিন বছর পরে আবারও সেই একই দৃশ্যের অবতারণা।

স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরে শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছে রাস্তায়। তারা সড়ক অবরোধ করে, সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়ে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদ করছে। বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার দাবি করছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ এবং সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় তাদের সহপাঠী নিহতের বিচার দাবি করছে। শুধু তাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তারা একটি পুলিশ ভ্যান আটকে পুলিশের সঙ্গে তর্ক করছে, কারণ ওই গাড়ির লাইসেন্স নেই। একজন পুলিশ কর্মকর্তা তখন তাদের বলছেন, এই গাড়িটির বিরুদ্ধেও মামলা দেয়া হবে।

দৃশ্যগুলো সিনেমায় হলে আরও ভালো হতো। বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত নয়। এই দৃশ্যগুলোর ভেতরে রোমান্টিসিজম আছে। উত্তেজনা আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার উপাদান আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রশ্নও আছে যে, আমরা আমাদের সন্তানদের ঠিক এভাবে রাস্তায় দেখতে চাই কি না?

যদি উত্তর হয় ‘না’, তাহলে পাল্টা প্রশ্ন আসবে, কেন সড়কের নৈরাজ্য ঠেকাতে তাদের রাস্তায় নামতে হলো? সড়কে নৈরাজ্য ঠেকানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠানের, তারা কী করছে? তারা কি নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বলেই এখন এই তরুণদের ক্লাস বাদ দিয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হচ্ছে? এই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটির অবতারণা হলো কাদের ব্যর্থতার কারণে?

২০১৮ সালের কিছু দৃশ্য মনে করা যেতে পারে, পুলিশ প্রটোকলে মন্ত্রীর গাড়ি। সাদা গাড়ির ভেতরে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা থামিয়ে দিল। তারা জানতে পারল খোদ মন্ত্রীর গাড়ির চালকেরই লাইসেন্স নেই, অথবা লাইসেন্স সঙ্গে নেই। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে মন্ত্রী মহোদয় সাদা গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। পেছনে থাকা কালো রঙের আরেকটি গাড়িতে উঠে রওনা হলেন।

একইরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন দেশের ছাত্র-আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, উনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক তোফায়েল আহমেদ। তার গাড়িটি উল্টো পথে যাচ্ছিলে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আটকে দেয়। যদিও তোফায়েল আহমেদ গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের বলেছিলেন, তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্যই উল্টো পথে এসেছেন।

ওই বছরও পুলিশ তাদের নিজের বাহিনীর গাড়ির বিরুদ্ধেই মামলা দিয়েছিল। ছাত্ররা তখন সরকারের অন্য আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এমনকি গণমাধ্যমের গাড়ি আটকে দেয় এবং গাড়ির ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স না থাকলে সেই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিতে বাধ্য করে। কিছু গাড়ি ভাঙচুরও করা হয়। ওই বছর তারা রাস্তায় নেমেছিল সড়কে তাদের দুই সহপাঠীর নির্মম মৃত্যুর প্রতিবাদ জানাতে।

সেই প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওই প্রতিবাদের তিন বছর পরে তাদেরকে আবার কেন একই দাবিতে রাস্তায় নামতে হলো? ২০১৮ সালে তারা প্ল্যাকার্ডে লিখেছিলো: ‘রাষ্ট্রের মেরামত চলছে; সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ কিন্তু রাষ্ট্রের মেরামত যে ঠিকমতো হয়নি, তার প্রমাণ হলো একইরকমের প্ল্যাকার্ড নিয়ে সেই কিশোর-তরুণরা আবারও রাস্তায়।

এবারের ঘটনার পেছনে শুধু সড়কে সহপাঠীর নিহত হওয়ার ঘটনাই নয়, বরং গহণপরিহনে হাফ ভাড়ার দাবিটিও যুক্ত হয়েছে। লিটারে তেল ও ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে বাস ও লঞ্চে ভাড়া বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া না নেয়ার সিদ্ধান্ত জানার পরেই এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসে সমাজের নানা স্তর থেকে। তার মধ্যেই ঢাকা দক্ষিণ সিটির একটি ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ যায় একজন শিক্ষার্থীর— যা এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া না নেয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে গণপরিবহন, বিশেষ করে বাসের মালিকরা দাবি করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই গরিব। পরিবহন ব্যবসায়ীরা গরিব— এই কথার ভেতরে যতটা না বাস্তবতা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে রসিকতা। ফলে সেই রসিকতার উৎস সন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক। এরইমধ্যে একজন পরিবহন মালিকের ব্যাপারে তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, তিনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন একটা বাস দিয়ে। এখন তার বাসের সংখ্যা আড়াইশ। আড়াই শ বাসের মালিকও এই দেশে গরিব!

এসব রসিকতাও অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। যেমন, এক লিটার তেলে একটি বাস কত দূর যায়? একটি বাসে কতজন যাত্রী থাকেন এবং এক লিটার তেলের দাম যদি আগের চেয়ে ১৫ টাকা বেশি হয় তাহলে প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ১৫ টাকার কত শতাংশ বাড়তি হিসাবে সর্বোচ্চ কত টাকা বাড়তি আদায় করা সংগত? এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যাবে না। উপরন্তু, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোয় যেসব বাস চলে, তার সবগুলো তো তেল বা ডিজেলে চলে না। সিএনজিতে চলে যেসব বাস, তারাও কেন বাড়তি ভাড়া নেবে? আর শিক্ষার্থীরা তাদের আইডি কার্ড দেখিয়ে তো বছরের পর বছর ধরে হাফ ভাড়া দিয়েই আসছিলেন, তাহলে নতুন করে তাদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া না নেয়ার সিদ্ধান্তটি কেন হলো?

নানা ঘটনায়, নানা অজুহাতে পরিবহন মালিকরা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা নেন। সম্প্রতি খোদ জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্য যিনি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত, তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান সরকারের আমলে তারা বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকা প্রণোদনা পেয়েছেন। যে রাষ্ট্রে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা সরকারি প্রণোদনা পান, সেই পরিবহন মালিকরা কী করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নিতে অস্বীকার করেন— তা বোধগম্য নয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা বাসে যে হাফ ভাড়া দেয়, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।

বস্তুত, আমাদের গণপরিবহন ও গণপরিবহন ব্যবস্থা সারা বছরই গণমাধ্যমের শিরোনামে থাকে। এত বেশি নৈরাজ্য রাষ্ট্রের আর কোনো সেক্টরে সম্ভবত হয় না। প্রতিদ্বন্দ্বী বাসের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো এবং বাসের ভেতরে থাকা সব যাত্রীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা; ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ; রাস্তার মাঝখানে কোনো নারী উঠতে চাইলে তাকে না নেয়া; নারী বা বৃদ্ধকে নামানোর জন্য গাড়ি পুরোপুরি না থামানো; ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা; লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অমানবিক লোকদের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং তুলে দেয়া; বাসের ভেতরে একা কোনো নারী থাকলে তাকে ধর্ষণ বা গণধর্ষণ করাসহ পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগের অন্ত নেই।

বছরের পর বছর ধরে চলছে এসব নৈরাজ্য— যা বন্ধের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। তারা তাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করছে? করছে না যে, তার প্রমাণ ২০১৮ সালের বিক্ষোভের সোয়া তিন বছর পরে একই দাবিতে আবারও রাজপথে শিক্ষার্থীরা— যে কাজটি তাদের করার কথা নয়। রাস্তায় পুলিশের গাড়ি থামিয়ে ছাত্ররা গাড়ির কাগজ ও লাইসেন্স পরীক্ষা করবে, এটি শোভন নয়। এই অশোভন কাজটি করার জন্য কেন তাদের রাস্তায় নামতে হলো, সেই জবাব রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

প্রশ্ন হলো, শিশু-কিশোররা কি রাষ্ট্রকে তার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কেউই তার কাজটা সঠিকভাবে করছে না? যে পুলিশ গাড়ির ফিটনেস আর ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করবে, তাদেরই লাইসেন্স নেই। যে গণমাধ্যম সমাজের অসংগতি তুলে ধরবে, তাদের গাড়িই নিয়ম মেনে চলে না। যে মন্ত্রীরা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ করেন, তারাই উল্টো পথে চলেন। তাদের চালকেরই লাইসেন্স নেই! জনগণের পয়সায় পরিচালিত খোদ সিটি করপোরেশনের গাড়ি চালায় ভাড়াটিয়া লোকজন এবং এখানে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়ম, যে অনিয়মের বলি হচ্ছে সাধার মানুষ।

ফলে শিক্ষার্থীরা বলছে, তারা জাস্টিস চায়। তারা লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের গাড়ির চালকের বিরুদ্ধেও মামলা দিতে বাধ্য করে। এই দৃশ্য ২০১৮ সালের আগে স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ দেখেনি। এ এক অদ্ভুত বাস্তবতা; ভুক্তভোগীদের জন্য এ এক করুণ অভিজ্ঞতা। যারা বছরের পর বছর মনে করে আসছিলেন তারা সব নিয়ম কানুন আর আইনের ঊর্ধ্বে, তাদেরকেও রাস্তায় নাজেহাল হতে হয় তাদের সন্তান এমনকি নাতিতুল্যদের কাছে। এই দৃশ্য তো কাঙ্ক্ষিত নয়।

প্রশ্ন হলো, সড়কে নৈরাজ্য কেন থামে না? এর পেছনে অনেকগুলো কারণ ও ফ্যাক্টর রয়েছে। একটি বড় কারণ পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা খুবই প্রভাবশালী এবং তাদেরকে ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়। ক্ষমতায় যেতে এবং ক্ষমতায় থাকতে নানাভাবেই তাদের কাজে লাগানো হয়। সুতরাং রাষ্ট্র যাদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া কঠিন।

তাছাড়া দেশের রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদেরও অনেকে পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের বিরাট ভোটব্যাংক রয়েছে। উপরন্তু গণপরিবহগুলোর পরিচালনার পদ্ধতিটিই এমন যে, এখানে চালকরা প্রতিদ্বন্দ্বী বাসের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবেই।

আরেকটি বড় সমস্যা, দেশে যে পরিমাণ গণপরিবহন, সেই পরিমাণ দক্ষ চালক নেই বা তৈরি হয় না। ফলে মালিকরা তাদের ব্যবসার স্বার্থে সব সময়ই পরিবহন শ্রমিকদের তোয়াজ করে চলে। মালিকরা একটু কঠোর হলেই তারা চাকরি ছেড়ে দেয়। ফলে ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কায় মালিকরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের অন্যায় মেনে নেয়।

আবার অনেক সময় মালিকের ‍অতিলোভ, শ্রমিকদের ঠকানো ইত্যাদি কারণেও চালক ও হেলপাররা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমস্যাটা নানামুখী। এসব সমীকরণ যতদিন থাকবে, ততদিন গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধের জন্য রাস্তায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ, মাঝেমধ্যে গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, টেলিভিশনে টকশোতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা কিংবা পত্রিকার পাতায় বড় নিবন্ধ ছাপা হবে ঠিকই— সড়ক-মহাসড়কে জীবনের অপচয় রোধ করা তো অনিশ্চিতই থেকে যায়।

কোটি কোটি টাকা খরচ করে ফ্লাইওভার বানানো হয়, বিদেশ থেকে ঝকঝকে গাড়ি আনা হয়; কিন্তু সেই ফ্লাইওভার, সেই সড়ক কিংবা সেসব সেতুতে যারা গাড়ি চালাবেন, অর্থাৎ যাদের হাতে স্টিয়ারিং, তারা কতটা দক্ষ, যোগ্য, তারা কোন প্রক্রিয়ায় স্টিয়ারিং ধরলেন এবং সর্বোপরি তারা কতটা মানবিক— সেই প্রশ্নগুলোই সবচেয়ে বেশি জরুরি। দক্ষ ও মানবিক চালক তৈরিতে রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব পালনের কথা; যে ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের জন্য যেরকম দুর্নীতিমুক্ত একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা— তা কি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও গড়ে তোলা গেছে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন

জন্মদিনে শেখ মনিকে ঘিরে ভাবনা

জন্মদিনে শেখ মনিকে ঘিরে ভাবনা

১৪ আগস্ট ১৯৭৫ ছিল বৃহস্পতিবার। নতুন ব্যবস্থায় দেশের প্রতি মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করে ৬৪ জেলায় একজন করে বাকশালের সম্পাদক এবং একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। বেইলি রোডের একটি বাড়িতে ৬৪ জেলার সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের শেষ দিন ছিল ১৪ আগস্ট। ওইদিন মূল বক্তা ছিলেন শেখ মনি। বাকশালের নীতি-আদর্শ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে মনি প্রায় দেড় ঘণ্টার এক অনবদ্য ও জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেন। বক্তৃতা শেষে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফরহাদ মন্তব্য করেন- “আমার জীবনে এমন চমৎকার বক্তৃতা আর শুনিনি।”

যুবনেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির ৮৩ তম জন্মদিন ৪ ডিসেম্বর। তার মতো বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী যুবনেতা তার সমসাময়িকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া ভার। তার ছিল আকাশচুম্বী গ্রহণযোগ্যতা। তার ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে হওয়ার পাশাপাশি শেখ ফজলুল হক মনির মধ্যে এমন কিছু মানবীয় গুণ ছিল, যা সচরাচর দেখা যায় না। শেখ মনি ১৯৭০-এর নির্বাচন কর্মসূচির অন্যতম প্রণেতা ছিলেন। তখন তার বয়স ত্রিশের কোঠায়। তিনি আইয়ুব খানের পান্ডা গভর্নর মোনেম খানের কাছ থেকে সনদ নিতে অস্বীকার করেন। যে কারণে তার এমএ ডিগ্রি পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়।

১৫ আগস্ট যদি শেখ ফজলুল হক মনিকে হত্যা করা না হতো, তাহলে হয়ত বাংলাদেশের রাজনীতি অন্য খাতে প্রবাহিত হতো। ধারণা করা যায়, এ জন্যই খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেখ ফজলুল হক মনিকেও হত্যা করে। দেশ-বিদেশের খুনিরা একথা নিশ্চিতভাবেই জানত যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করতে হলে মুজিবের সঙ্গে মনিকেও হত্যা করতে হবে।

রাজনীতির ময়দানে শেখ ফজলুল হক মনি ছিলেন অলরাউন্ডার। তার এতসব গুণ ছিল, যা এক কলামে লিখে শেষ করা যাবে না। তিনি ছিলেন সাহসী-তেজস্বী, দক্ষ সংগঠক, সুবক্তা, লেখক ও অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। ভাগ্নে বলে নয়, বঙ্গবন্ধুর মতো বিশ্বমানের নেতাকে মনি অতি অল্প বয়সেই জয় করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুজিব বাহিনীর ৪ জনের অন্যতম শীর্ষ অধিনায়ক ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির হাত দিয়েই গড়ে ওঠে যুবলীগ। যে দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান শেখ মনির বড় ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ। আর ছোট ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও স্বাধিকার আন্দোলনের নক্ষত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের সৃজনশীল যুবনেতা ও মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স তথা মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান কমান্ডার শেখ ফজলুল হক মনি ১৯৩৯-এর ৪ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়ায় শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তার বাবা শেখ নূরুল হক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি। মা শেখ আছিয়া বেগম বঙ্গবন্ধুর বড় বোন। ছাত্রজীবন থেকেই শেখ মনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ষাটের দশকে সামরিক-শাসনবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে তিনি সাহসী নেতৃত্ব দেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।

১৯৬২ সালে হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ৬ মাস কারাভোগ করেন। ১৯৬৪-এর এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সরকারের গণবিরোধী শিক্ষানীতির প্রতিবাদে সমাবর্তন বর্জন আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও ১৯৬৫ সালে তিনি পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন এবং দেড় বছর কারাভোগ করেন। তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ও কৃতিত্ব ছিল- ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬ দফার পক্ষে হরতাল সফল করে তোলা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২-এর ১১ নভেম্বর যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গড়ে তুলেছিলেন ‘বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ’। তিনি সংগঠনটির দায়িত্ব দেন শেখ ফজলুল হক মনিকে। কংগ্রেসে শেখ মনিই যুবলীগের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

শেখ ফজলুল হক মনি তেজগাঁও আঞ্চলিক শ্রমিক লীগের সভাপতি হয়ে শ্রমিকদেরও সংগঠিত করেন। শেখ মুজিবসহ অন্য নেতাদের গ্রেপ্তার ও পূর্ব বাংলায় নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ আহূত হরতালে শেখ মনি, আবদুর রাজ্জাক, নূরে আলম সিদ্দিকীসহ ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।

সব দলমতের লোক নিয়ে গঠিত হয়েছিল মুক্তিবাহিনী। আর পাশাপাশি গঠন করা হয় মুজিব বাহিনী (বিএলএফ বা বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট)। মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শে বিশ্বাসী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে বেছে বেছে মুজিব বাহিনী নামে রাজনৈতিক গেরিলা বাহিনীটি গঠন করা হয়। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মুজিব বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন জেনারেল উবান।

আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ছাত্রলীগের প্রথম সারির নেতা ফকীর আবদুর রাজ্জাক শুরু থেকেই মনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ থাকার পাশাপাশি যুবলীগ ও বাংলার বাণী প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ফকীর আবদুর রজ্জাকের লেখা ‘শেখ ফজলুল হক মনি- অনন্য রাজনীতির প্রতিকৃতি’ নামের ৬৪ পৃষ্ঠার একটি নাতিদীর্ঘ গ্রন্থ ২০১০ সালে আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধকালে মনি মুজিব বাহিনী যেমন গড়ে তুলেছিলেন, একই সঙ্গে কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক বাংলার বাণী বের করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজেও লেখালেখি করেছেন। ফকীর রাজ্জাকের গ্রন্থে উঠে এসেছে একাত্তরে ভারত সরকার এবং সেদেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও ৩২ বছরের শেখ ফজলুল হক মনিকে সেই একাত্তরেই বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে সম্মান দিয়েছেন।

যুদ্ধের শেষদিকে অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে শেখ মনি মেঘালয় থেকে একটি বিশেষ বিমানে দিল্লি যান। বিশেষ প্রটোকল দিয়ে তাকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বসা ছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে শেখ মনি দেখা করে প্রয়োজনীয় কথা বলে বের হয়ে এসে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। জানা যায়, সেদিন শেখ মনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বেশ জোরালো ভাষায় বলেছিলেন- “বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি করার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি সবকিছুর উপরে রাখতে হবে।” দুদেশের মধ্যে ২৫ বছরের মৈত্রীচুক্তি হবে- এ কথা শুনেই তিনি সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন শেখ ফজলুল হক মনি। দেশ মুক্ত হওয়ার ২ মাস ৫ দিনের মাথায় শেখ মনির সম্পাদনায় ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ দৈনিক বাংলার বাণী প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যাটি বঙ্গবন্ধুকে দেয়ার সময় দুই নেতার (মামা-ভাগ্নে) ছবিটি এখনো স্মৃতি হয়েই রয়েছে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মাত্র দুই মাসে একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করা এককথায় দুরূহ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ১১ মাসের কম সময়ের মধ্যে ১৯৭২-এর ১১ নভেম্বর শেখ মনি আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে যুবলীগ গঠনের কনভেনশনে শেখ ফজলুল হক মনি সভাপতিত্ব করেন। এতে সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার যুবকর্মী সেদিন সেখানে এসেছিল। আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় শেখ মনিকে। দুদিন পরেই ১১ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। কিছুদিনের মধ্যে প্রথমে ২১ ও পরে ৩৫ সদস্যের কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করা হয়।

যুবলীগ গঠনের কনভেনশনে দেড় ঘণ্টার এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে শেখ মনি নতুন দেশের অর্থনীতি-কৃষিনীতি ও শিল্পনীতি বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো সমাজতান্ত্রিক দেশের অনুকরণে তিনি যুবলীগের সম্মেলনকে কংগ্রেস, সভাপতির পরিবর্তে চেয়ারম্যান ও সহসভাপতির পরিবর্তে প্রেসিডিয়াম নামকরণ করেন। কথা ছিল মনি কমিটি গঠন করে বঙ্গবন্ধুকে দেখাবেন। ফকীর রাজ্জাক তার গ্রন্থে লিখেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই কার্যকরী কমিটির একটি খসড়া তালিকা তৈরি করে ঘনিষ্ঠ কজনকে দেখান।

১৯৭৩ সালেই শেখ মনি দৈনিক ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও দৈনিক সংবাদের আহমেদুল কবিরের সঙ্গে যৌথভাবে জার্মান থেকে গজ অফসেট প্রিন্টিং মেশিন আমদানি করে ৮১ মতিঝিল থেকে নতুনভাবে বাংলার বাণী পত্রিকা ছাপার ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৩ সালে শেখ মনি বের করেন চলচ্চিত্র বিষয়ক সাপ্তাহিক ‘সিনেমা’। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে শেখ মনি সাপ্তাহিক (পরে দৈনিক) পিপলস- এর বার্তা সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৪ সালে বের করেন ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস।

বাকশাল গঠনের কয়েক মাস আগে হঠাৎ একদিন পত্রিকায় বিবৃতি দেন। বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১৫ সদস্যবিশিষ্ট সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির চেয়ারম্যান হন বঙ্গবন্ধু এবং এর ৩ জন সেক্রেটারি ছিলেন- জিল্লুর রহমান, শেখ মনি ও আবদুর রাজ্জাক। জাতীয় কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় যুবলীগ ও জাতীয় ছাত্রলীগ- এই চারটি অঙ্গ সংগঠন গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু আসলে গণতান্ত্রিক পন্থায় সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন।

একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, শেখ ফজলুল হক মনি যুবলীগের চেয়ারম্যান ছাড়া আর কোনো পদে ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার কী পরিমাণ প্রভাব ছিল এমন একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে- বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া বাকশাল ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন না। তিনি একথা বঙ্গবন্ধুর কাছে জানানোর জন্য বাকশাল প্রতিষ্ঠার আগের রাত ২৪ জানুয়ারি ৩২ নম্বরে যান। বাসায় গিয়ে দেখেন সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বৈঠক করছেন।

ড. ওয়াজেদ তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিখেছেন- “বৈঠকখানার বাইরে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। এর পরেও তারা যাচ্ছেন না লক্ষ্য করে আমি স্থির করলাম যে, রাতে খাবারের পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করবো। ঐ সময় বঙ্গবন্ধু দুই নেতাকে নিয়ে কিছু সময়ের জন্য বাসার বাইরে যান। রাত ১০টার দিকে বাসায় ফেরেন। এগারোটার দিকে হাসিনা ও আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খেতে বসি।সে সময় বঙ্গবন্ধু কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে খাবার শেষ করে অতিদ্রুত তার শয়নকক্ষে চলে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে ঢুকেই ছিটকিনি লাগিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষের দরজা ছিটকিনি লাগিয়ে বন্ধ করে, বিশেষ করে আমার শাশুড়িকে শয়নকক্ষের বাইরে রেখে শেখ মনিকে ইতিপূর্বে কখনো তার (বঙ্গবন্ধুর) সঙ্গে আলাপ করতে দেখিনি। রাত প্রায় পৌনে একটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। কিন্তু ততক্ষণেও শেখ মনির বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ শেষ হলো না। অতঃপর আমরা বাসায় চলে যাই রাত ১টার দিকে।” (পৃ. ২১৫)

১৪ আগস্ট ১৯৭৫ ছিল বৃহস্পতিবার। নতুন ব্যবস্থায় দেশের প্রতি মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করে ৬৪ জেলায় একজন করে বাকশালের সম্পাদক এবং একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। বেইলি রোডের একটি বাড়িতে ৬৪ জেলার সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের শেষ দিন ছিল ১৪ আগস্ট। ওইদিন মূল বক্তা ছিলেন শেখ মনি। বাকশালের নীতি-আদর্শ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে মনি প্রায় দেড় ঘণ্টার এক অনবদ্য ও জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেন। বক্তৃতা শেষে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফরহাদ মন্তব্য করেন- “আমার জীবনে এমন চমৎকার বক্তৃতা আর শুনিনি।”

বক্তৃতার পর সৈয়দ আহমদ একজন যুবককে যুবলীগ নেতা ফকীর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে বলেন- “এ ছেলেটি আমার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছে এবং এখন পুলিশে গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করে।” আগন্তুক ছেলেটি একান্তে গিয়ে সৈয়দ আহমদ ও ফকীর রাজ্জাক প্রমুখকে জানায়, চাকরিসূত্রে সে সেনাসদর এলাকায় দায়িত্ব পালন করে। ছেলেটি বলল- “পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশে যে কোনো সময় বড় ধরনের খারাপ কিছু ঘটে যাবে। এমনকি আজ রাতেই সরকারের পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। সাবেক ও সদ্য চাকরিচ্যুত ও চাকরিরত বেশকিছু সেনা কর্মকর্তা সেনানিবাসে গোপনে শলাপরামর্শ করছে। ওদের হাবভাব ভালো নয়। কানাঘুষা চলছে। দেশে বড় একটা কিছু হয়ে যাবে।”

বক্তৃতা শেষে শেখ মনি তার গাড়ির কাছে গেলেন; সৈয়দ আহমদ, সুলতান শরীফ, শফিকুল আজিজ মুকুল ও ফকীর রাজ্জাক বললেন, জরুরি কথা আছে। শেখ মনি তাদেরকে গাড়িতে উঠতে বলেন। মনির গাড়িতে ওঠেন সৈয়দ আহমদ। বাকিরা সুলতান শরীফের গাড়িতে ওঠে। রাত সাড়ে ৯টায় তারা গেলেন ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে এসে মনি জানান- “মামাকে সব কিছু জানিয়েছি, তিনি এখনই খোঁজ নিবেন।” তারা চলে এলেন মনির ধানমণ্ডির ১৩ নম্বর সড়কের ভাড়া বাড়িতে।

এই মহান নেতার জীবন প্রদীপ মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিভে গেল। ১৫ আগস্ট জাতির পিতার সঙ্গে যদি শেখ মনি নিহত না হতেন, তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। মুজিব হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী জিয়া-এরশাদরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করতে পারত না। আজ ব্যথিত হৃদয়ে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মনি ভাইকে!

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।

শেয়ার করুন

সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হোক

সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হোক

শুধু হিজড়া ইস্যুতেই নয়, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০১৯-এর আইনগত সহায়তা দিবসের অনুষ্ঠানে ’পুত্র’ বা ’কন্যা’র পরিবর্তে আইনে শুধু ‘সন্তান’ শব্দটি ব্যবহার করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাতে করে সন্তানের লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে ভাবার দরকার হবে না। এরকম মানবিক ও নিরপেক্ষ চিন্তা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নাম ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

দেশের হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী বাবার সম্পত্তিতে অধিকার পেতে পারেন, এরকম একটি কথা আমরা কখনও কল্পনাও করতে পারিনি, অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটাই বলেছেন এবং করে দেখাতে চেয়েছেন। বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পত্তি আইন মুসলিম অনুযায়ী চলে। এদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী কখনও বাবা-মায়ের সম্পত্তি পাওয়ার কথা স্বপ্নেও দেখেনি। সবসময়, সবক্ষেত্রেই তারা অধিকারবঞ্চিত। পরিবার-সমাজ, রাষ্ট্র কোথাও তাদের স্থান ছিল না। বাবা-মা মারা গেলে, তাদের শূন্যহাতে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়। এবার প্রধানমন্ত্রীর নেয়া এই উদ্যোগ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমন একটি আইন প্রণয়নের কথা সরকার ভাবছে, যাতে হিজড়াদের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ হিজড়া রয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে তারা ভোটাধিকারও পেয়েছে তৃতীয়লিঙ্গ হিসেবে।

শুধু হিজড়া ইস্যুতেই নয়, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০১৯-এর আইনগত সহায়তা দিবসের অনুষ্ঠানে ’পুত্র’ বা ’কন্যা’র পরিবর্তে আইনে শুধু ‘সন্তান’ শব্দটি ব্যবহার করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাতে করে সন্তানের লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে ভাবার দরকার হবে না। এরকম মানবিক ও নিরপেক্ষ চিন্তা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নাম ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

এ প্রসঙ্গে মনে হলো স্বনামখ্যাত আইনজীবী এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর কথা। আবদুল মতিন খসরুর সঙ্গে আমার দু’একবার কথা হয়েছিল, একটি দৈনিকে কাজ করার সময়। সেসময়ে আমি তার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম উত্তরাধিকার আইন নিয়ে এবং সেজন্যই ওনার কথা মনে হলো। দৈনিকটিতে ওই সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- মুসলিম উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করে কেন ছেলে-মেয়ের মধ্যে সমানভাবে সম্পত্তি ভাগ করে দেয়ার বিধান কায়েম করেন না? আপনাদের সরকার তো আইনে অনেক ধরনের প্রগতিশীল পরিবর্তন এনেছে?

তিনি আমার কথা উত্তরে বলেছিলেন- নানা কারণে আমাদের হাতপা বাঁধা। তাই চাইলেও সরকার এরকম ইতিবাচক একটি পরিবর্তন আনতে পারবে না। আমার নিজের এক ছেলে, এক মেয়ে। আমি মনেপ্রাণে চাই দুজনকে সমানভাগে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে যেতে। আমি বাবা হিসেবে দুজনকে সমান ভালোবাসি। কিন্তু আমারও হাতপা বাঁধা। পারছি কই উত্তরাধিকার আইনে কোনো পরিবর্তন আনতে?” তিনি এ কথাগুলো বলেছিলেন সাক্ষাৎকারের বাইরে, অফ দ্যা রেকর্ড-এ।

নারী ও শিশু নির্যাতন আইন-২০০০ এবং সংশোধন-২০০৩ আইনটি মতিন খসরু সাহেবের তত্ত্বাবধানে হয়েছিল। তিনি নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ আইভি রহমানের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং নারীর অধিকার আদায়ে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। হয়তোবা আরও বেশ কিছু সময় আইনমন্ত্রী থাকার সুযোগ পেলে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন নিয়ে আরও কিছু করে যেতে পারতেন।

আওয়ামী লীগ সরকার যখন ১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল, তখন নারী উন্নয়ন নীতি-১৯৯৭-এর ৭.২ অনুচ্ছেদে বাবার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকারের কথা বলা হয়। ইচ্ছে করলেই হয়তো সরকার একটি আইন পাস করতে পারত বা নীতি গ্রহণ করতে পারত। কিন্তু না, তারা তখন সেটা করতে পারেনি। বোঝা যায় নব নির্বাচিত সরকার হয়তো এত বড় ঝুঁকি নিতে চায়নি।

আর এর ফলে আমাদের পেতে হলো বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়কার নারী উন্নয়ন নীতির দ্বিতীয় খসড়া ২০০৪ সালে। তৎকালীন সরকার উত্তরাধিকার আইনে ও ভূমির উপর অধিকারের অংশটি কেটে দিয়েছিল। আমরা তৃতীয় খসড়াটি পেয়েছিলাম ২০০৮ সালে। সে যাক, অনেক জল ঘোলা হয়েছে এই নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে। এমনকি কেয়ারটেকার সরকার পর্যন্ত আলেমদের নিয়ে কমিটি করেছিলেন নীতিটি যাচাই-বাছাই করার জন্য। ফলে একদিন নীতিটি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সবসময়ই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নারী উন্নয়ন নীতিতে সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার নিয়ে নীরবতা প্রদর্শন করেছে। (সূত্র: দি ডেইলি স্টার, নিবন্ধ: প্রফেসর ড. কাবেরি গায়েন)

মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলো উত্তরাধিকার আইনে যখন সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলে আসছে। মুসলিম পরিবারে যে বাবামায়ের শুধু কন্যা সন্তান রয়েছে, তারা জানেন নিজের আত্মজাকে নিজের সম্পত্তিটুকু দিয়ে যেতে কতটা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। হয় তাদের জীবদ্দশায় হেবা করে দিয়ে যেতে হয় বা উইল করে দিতে বাধ্য হন।

যদিও এই পদ্ধতি বাবামায়ের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাও মানুষ এই পদ্ধতির দিকেই হাঁটছেন, নয়তো কন্যা সন্তান কখনই আইনত বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির শতভাগের মালিক হতে পারবে না। তার বাবার ভাইয়ের ছেলে সন্তানরা এর থেকে ভাগ পাবেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে আমরা সবসময় বলছি, দুই সন্তানই যথেষ্ট। সেখানে কারো যদি দুটিই কন্যা সন্তান হয়, তখন সেই পরিবার কী করবে? কাজেই সবকিছুই বাস্তবতার নিরিখে ভাবতে হবে।

কোনো মাবাবাই তাদের সন্তানদের মধ্যে ফারাক করেন না বা করতে চান না। কোনো বাবা কি তার মেয়ে সন্তানকে কম ভালোবাসেন, নাকি কম যত্ন করেন? আইনে আছে বলে তারা বাধ্য হন এভাবে ভাগ করে দিতে। আজকাল মেয়েরাও বাবামায়ের প্রতি অনেক দায়িত্ব পালন করেন। অনেকে পুরো দায়িত্বই পালন করেন।

আমার জানামতে, উদাহরণ দিই। হাসনা, সে কাজ করে হংকংয়ে গৃহ সহযোগী হিসেবে। যখন থেকে মেয়েটি কাজ করতে শুরু করেছে, তখন থেকেই ওর বেতনের সব টাকা দিয়ে বাবামায়ের সংসার টানত। গত চার বছর যাবৎ হংকংয়ে কাজ করে ভাইবোনদের পড়াশোনা, বাবামায়ের চিকিৎসা, ভিটায় পাকা বাড়ি তোলার কাজ, সব করেছে। সেক্ষেত্রে এই মেয়ে কি বাবার সম্পত্তিতে সমান ভাগ দাবি করতে পারে না? কিংবা বাবার কি ইচ্ছা করতে পারে না যে, তিনি তার এই মেয়েকে নিজের সম্পত্তিতে সমান ভাগ দেবেন?

এরকম অনেক কন্যা সন্তানই আছেন, যারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাবামা, ভাইবোনের পাশে থাকেন। আমার এক বন্ধুকে এমনও দেখেছি যে ছেলে সন্তান নেই বলে বিছানায় শায়িত বাবাকে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নিজের কাছে রেখে দেখাশোনা করেছে। এই বাবার সম্পত্তিতে আর কার অধিকার থাকা উচিত? আর কেউতো এসে ওনাকে দেখা শোনা করেনি, কোনো খরচও করেনি তার চিকিৎসার জন্য। এরকম শত শত উদাহরণ আছে আমাদের সমাজে, আমাদের দেশে।

সেজন্যই প্রধানমন্ত্রী বার বার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সংরক্ষণের কথা বলেছেন। তিনি এ-ও বলেছেন পিতার অর্জিত সম্পত্তির অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে যেন শরিয়া আইনের অপব্যবহার করা না হয়। বিচারপতিদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন যে, হ্যাঁ আমরা শরীয়া আইন মেনে চলব, সেই সঙ্গে এমন কোনো উপায় বের করতে হবে, যেন ইসলামি আইনের নাম ব্যবহার করে নারীকে কেউ স্বামী ও পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে না পারে। যদিও ইসলাম নারীকে সম্পত্তিতে অধিকার দিয়েছে কিন্তু সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেক ক্ষেত্রেই ভাইরা বোনকে বঞ্চিত করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমরাও কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাইছি যে, আমরা কাউকে শরিয়া আইন পরিবর্তন করতে বলছি না। কিন্তু সম্পত্তি আইন ধরে এই বিষয়টির নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তিনি নিজেই অনেক ইসলামি চিন্তাবিদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তারা অনেকেই বিষয়টিতে তাদের সম্মতি জানিয়েছেন।

এবার প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন, এর চাইতে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ্বের ইতিহাসে সেই দেশ, যে দেশে বার বার নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। কোনো দিক থেকে কোনো বাধা আসেনি। ‘আদর্শ মসজিদ’ও উদ্বোধন করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। যারা ‘ধর্ম গেল’ বলে শঙ্কিত থাকেন, তাদের বুঝতে হবে সময়ের আবর্তে অনেক ধর্মীয় মতবাদ ও আইনি নিয়ম-কানুন পরিবর্তন করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে এই দেশেই ইসলামি দলগুলো বহুবার নারী নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, শপথ নিয়েছে। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া ১৯৩৭ সালের মুসলিম পারসোনাল আইন (শরিয়া আইন) পাকিস্তান আমলে এসে পরিবর্তন করা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে। যেমন, দাদা বা নানার সস্পত্তিতে, নাবালক সন্তানের সম্পত্তি পাওয়ার অধিকার কার্যকর হয়েছে, এখন চাইলেই কোনো মুসলিম একসঙ্গে চারটি বিয়ে করতে পারে না। তাকে নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

হিল্লা বিয়েও অনেক কঠিন করা হয়েছে এবং সর্বোপরি মুসলিম নারী তার স্বামীকে কারণ উল্লেখ করে এবং চার বছর নিরুদ্দেশ থাকলে তালাক দিতে পারেন। অনেকে ফতোয়া দিয়েছেন যে ছবি তোলা হারাম, সেটাও উঠে গেছে কাজের প্রয়োজনে। হজে যেতে চাইলে ছবি তুলতেই হবে। এসব নানা ধরনের উদাহরণ দেয়া যাবে।

আমরা চাই এদেশের মেয়েরা বাবার সম্পত্তির ভাগ ছেলেদের সমান পাক। বাবার অর্জিত সম্পত্তি ছেলে সন্তান না থাকলেও মেয়ে ও স্ত্রীর মধ্যে পুরোটা ভাগ হবে। এটাই এই সময়ে ন্যায্য। আমরা জানি ‘ইসলাম মানে ইনসাফ’। এই সত্যটি মানতেই হবে। শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, একটি ইউনিফর্ম আইন হওয়া দরকার, সব ধর্মের মানুষের জন্য। বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশেই সিভিল ল আছে, আবার শরিয়া আইনও আছে। যে পরিবার, যেভাবে সুবিধা পাবেন, তারা সেভাবেই সম্পত্তি ভাগ করবেন।

প্রধানমন্ত্রী, আপনি বাংলাদেশের নারীদের সবক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে দিয়েছেন, কাজেই এই কাজটুকু আপনার হাত দিয়েই হবে বলে আমরা আশাবাদী।

লেখক: সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, কলাম লেখক।

শেয়ার করুন

ঢাকা সিটি করপোরেশন: নগরবাসী স্বস্তিতে নেই

ঢাকা সিটি করপোরেশন: নগরবাসী স্বস্তিতে নেই

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা শহরের নানা সমস্যার কথা বিবেচনা করে হয়তো দুটি সিটি করপোরেশনে ঢাকা মহানগরীকে বিভক্ত করে দেন। তখন এর বিরোধিতা করা হয়েছে সব মহল থেকে। তারপরও তিনি অনড় ছিলেন তার সিদ্ধান্তে। এখন মনে হয় ঢাকাকে দুটি কেন চারটি সিটি করপোরেশনে বিভক্ত করলেও বোধহয় এর নাগরিকদের জীবনে স্তূপীকৃত সমস্যার সমাধান সহজে হবার নয়। অবশ্য ২-৪ জন মেয়রই সব সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, এমনটি ভাবলেও হবে না। সমস্যা সৃষ্টির জন্য নগরবাসীও দায় এড়াতে পারবে না। আবার জনসেবার নামে যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হন, তারাও যে সমানভাবে দক্ষ ও আন্তরিক সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে।

ঢাকার দুই মেয়র প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছুটে বেড়াচ্ছেন। কোথাও আবর্জনা নিয়ে একজনকে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে, অন্যজনকে হয়তো দখল করা খালের জমি উদ্ধারে তৎপরতা চালাতে দেখা যাচ্ছে। আবার পরদিনই হয়তো দেখা যাচ্ছে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের বিক্ষোভ প্রশমিত করতে, আন্ডারপাস করার প্রতিশ্রুতি দিতে।

ঢাকার মেয়ররা কখন ঘুমান, কখন অফিসে বসেন, কখন ছোটাছুটি করেন, কখন নতুন কোনো সমস্যার সমাধানে ছুটে যান তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে গণমাধ্যমে তাদের সারাক্ষণই এখানে-সেখানে ছুটে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে। ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশনের দুই মেয়রই দেখেশুনে মনে হচ্ছে ‘দৌড়ের ওপর’ আছেন। প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাসের এই মহানগরীতে দুটি সিটি করপোরেশন করা হয়েছে, আগে ছিল একটি। মেয়র ছিলেন একজন কিন্তু কোনো ডেপুটি মেয়র ছিল না। এখনও নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা শহরের নানা সমস্যার কথা বিবেচনা করে হয়তো দুটি সিটি করপোরেশনে ঢাকা মহানগরীকে বিভক্ত করে দেন। তখন এর বিরোধিতা করা হয়েছে সব মহল থেকে। তারপরও তিনি অনড় ছিলেন তার সিদ্ধান্তে। এখন মনে হয় ঢাকাকে দুটি কেন চারটি সিটি করপোরেশনে বিভক্ত করলেও বোধহয় এর নাগরিকদের জীবনে স্তূপীকৃত সমস্যার সমাধান সহজে হবার নয়। অবশ্য ২-৪ জন মেয়রই সব সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, এমনটি ভাবলেও হবে না। সমস্যা সৃষ্টির জন্য নগরবাসীও দায় এড়াতে পারবে না। আবার জনসেবার নামে যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হন, তারাও যে সমানভাবে দক্ষ ও আন্তরিক সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে।

তাছাড়া রাজধানী ঢাকা শহরে সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়ত চলছেই। সেসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমন্বিতভাবে হচ্ছে না বলে দীর্ঘদিন থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। ওয়াসা রাস্তা কাটছে তো, ডেসকো রাস্তা ভরছে। আবার স্যুয়ারেজ নিয়ে সিটি করপোরেশন হাত দিচ্ছে তো নতুন মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ রেল স্থাপনের উদ্যোগ নিতে আসছে। এভাবে নানা প্রতিষ্ঠানের নানা কাজ। বিষয়টি এমন- কোনটা থামাই, কোনটা রাখি, কোনটা বাদ দেই? সবই দরকার। তাই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ভরাভরি অবিরত চলছেই, ধুলাবালি উড়ছে, রাস্তা বন্ধ হচ্ছে, পথচারীদের চলাচল স্বাভাবিক থাকছে না। বৃষ্টি এলে সর্বত্রই কাদামাটি ও পানি থই থই করছে। মুহূর্তের বৃষ্টিতে সব কিছুই জলাবদ্ধতায় ডুবে যাচ্ছে। বর্ষাকালে ঢাকা শহরের অনেক অঞ্চলই ডুবে থাকে। গণপরিবহন স্বাভাবিক গতিতে চলছে না। জনদুর্ভোগ লেগেই আছে। এর জন্য দায় গিয়ে পড়ে কেষ্ট বেটা নগরপিতা তথা মেয়রের ওপর।

নগরপিতা তখন পিতা নয়, নানাজনের নানা গালিতে কুপোকাত হয়ে পড়েন। ঢাকা শহরের নগরপিতাদের এমন চিত্রায়িত হওয়ার করুণ অবস্থা দেখে অনেক সময় মায়া লাগলেও মুখ খুলে ভাব প্রকাশ করা যাবে না! এখন অনেকেই সাবেক মেয়র আনিসুল হকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু তিনি যখন জীবিত ছিলেন, একইভাবে ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের সমস্যার সমাধানে ছোটাছুটি করছিলেন, তখন রাস্তায় কিংবা পরিবহনে বসে তাকেও প্রচুর গালি উপহার দিতে নগরবাসী কার্পণ্য করেনি। এখনাকার দুই মেয়রও সেই ‘পুরস্কার’ লাভে প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন না, এটি আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। তবুও তাদের কাজ তাদের করতেই হবে। নগরবাসী গালমন্দ করলে খুব বেশি গায়ে মাখানো যাবে না। কেননা নগরবাসীও তো স্বস্তিতে নেই।

ছোট এই মহানগরীতে এত মানুষ, এত সমস্যা। ঘর থেকে বের হলেই কোনো না কোনো ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ঘরে ফিরেও শান্তি খুব বেশি নেই। মশার পাল দিনের বেলাতেও মানুষ দেখে ছুটে আসে কামড়াতে। সন্ধ্যা হলে মশার উৎপাত ঠেকাতে কয়েলের ধোঁয়া জ্বালিয়েও সফল হওয়া যাচ্ছে না। হাতে ব্যাট নিয়ে তাই সবাই মশা মারতে ব্যস্ত থাকছে। এই মুহূর্তে কিউলেক্স মশা ঢাকাবাসীর রাতের ঘুম কেড়ে নিতে শুরু করেছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন মশানিধনের ওষুধ ছিটাচ্ছে কি ছিটাচ্ছে না তাও বোঝা যাচ্ছে না। কিছুতেই মশার উপদ্রব কমানো যাচ্ছে না।

ঢাকার বর্জ্য নিয়ে মানুষ অনেক বছর থেকে সমস্যায় জর্জরিত। বাসাবাড়ি থেকে প্রতিদিন বর্জ্য বাইরে ফেলা হচ্ছে। অনেক সময় যারা ফেলছেন তারা পথচারীদের যাতায়াতের রাস্তার কথা বিবেচনা করেন না। রাস্তার ওপর বাসাবাড়ির এসব বর্জ্য পদার্থ যে যার মতো করে ছুড়ে ফেলে রেখে চলে যায়। এতে মশামাছি এবং নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়ে থাকে। সে কথা জানার পরও অনেকেই বর্জ্য ফেলতে দ্বিধা করেন না।

সিটি করপোরেশনের ময়লা সংগ্রহকারীরা সময়মতো না এলে রাস্তায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও দুর্গন্ধ এতই বেশি ছড়িয়ে পড়ে যে, এলাকায় হাঁটা কিংবা বসবাস বেশ কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়। অভিজাত এলাকাগুলো কিছুটা নিয়ম-শৃঙ্খলায় থাকলেও পুরাতন ঢাকা কিংবা আশপাশের অনেক এলাকায় বাসাবাড়ির বর্জ্য পদার্থ নিয়ে ছোট ছোট ময়লা আবর্জনার ভাগাড় কদিন অবস্থান করতে দেখা যায়। সিটি করপোরেশন একদিকে নিচ্ছে তো অন্যদিকে ভাগাড় তৈরি হচ্ছে।

একটি সুখবর নগরবাসীর সঙ্গে ভাগাভাগি করা যায়, আগামী দেড় বছর পর ঢাকার এসব আবাসিক ময়লা-আবর্জনা জাতির মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রতিদিন তিন হাজার টন বর্জ্য থেকে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে যাচ্ছে। গত ১ ডিসেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আমিনবাজার এলাকায় চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিএমইসি) ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।

স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়নমন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলাম , বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত চায়নার রাষ্ট্রদূত লি জিমিং চুক্তি স্বাক্ষরকালে উপস্থিত ছিলেন। ইনসিনারেশন পদ্ধতি বা বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিভিন্ন দেশে আগে থেকেই হয়ে আসছে।

এখন ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশন উল্লিখিত মন্ত্রণালয়গুলোর সহযোগিতা নিয়ে প্ল্যান্টটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহযোগিতা প্রদান করবে। এর ফলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরশনের আবাসিক বর্জ্য পদার্থ দ্রুত অপসারণের তাগিদ থেকে সিটি করপোরেশন আবর্জনা সরিয়ে নেবে। এর মাধ্যমে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধিবাসীদের জীবনে বর্জ্য পদার্থের দুর্গন্ধ, মশা, মাছি ও রোগ-জীবাণু ছড়ানো থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মন্ত্রী অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের সবকটি সিটি করপোরেশনেও এ ধরনের প্ল্যান্ট তৈরির মাধ্যমে আবর্জনামুক্ত হওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগার পরিকল্পনায় রয়েছে। শিগগিরই সেগুলো বাস্তবায়ন করার কাজে সরকার হাত দেবে। তবে এর জন্য সময়ের যথেষ্ট দরকার হয়, প্রচুর বিনিয়োগও করতে হয়। কিন্তু এর উপকার অনেক বেশি।

একদিকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, অন্যদিকে ময়লা-আবর্জনার অস্বস্তি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বদলে দেয়া যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশে এটি ঘটবে এমনটি এখন আর দূরের নয়, বরং অনেক কাছেরই স্বপ্ন। ঢাকা সিটি করপোরেশনে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার কথা অনেক আগে থেকে উচ্চারিত হলেও নানা জনের নানা স্বার্থে অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর নির্মাণ কিছুতেই যেন নিয়ম মেনে চলছে না। আবাসিক এলাকায় বড় ইমারত তৈরি হচ্ছে তাতে প্রতিবেশীদের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। ভাবা হচ্ছে না শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের কথা।

রাতদিন নির্মাণযন্ত্রের আওয়াজ মানুষের স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে। ধুলাবালিতে বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠছে। এমনিতেই ঢাকার বায়ু দূষিত হয়ে পড়েছে। ঢাকা কিছুতেই যেন মানুষের নিরাপদ স্বাস্থ্যের বসবাসের জায়গা থাকতে পারছে না। ঢাকায় আবাসিক অনাবাসিক এলাকায় নানা কেমিক্যালের গুদাম যেখানে-সেখানে বেড়ে উঠেছে। সেগুলোতে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে, বড় দুর্ঘটনায় অনেক প্রাণেরও সংহার ঘটেছে। তারপরও নবনির্মিত ভবনগুলো আবাসিক কোড মেনে নির্মিত হচ্ছে না। ঢাকা শহরে ভূমিদখল, চাঁদাবাজি, মানুষের জায়গা দখল নিয়ে নানা অভিযোগ আছে।

আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী যথাযথভাবে ভূমিকা পালন করছে না। প্রভাবশালী নানা মহল নানা জায়গায় হস্তক্ষেপ করছে। সিটি করপোরেশনে হোল্ডিং ট্যাক্সসহ নানা ধরনের কর যেভাবে আদায় হচ্ছে, সেভাবে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না। মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব লেগেই আছে। বেসরকারি হাসপাতাল এখন আবাসিক এলাকার ভেতরে প্রবেশ করেছে। এটি কতটা বিজ্ঞানসম্মত সেটি ভেবে দেখার বিষয়। অদূর ভবিষ্যতে পরিকল্পিত উপশহর বলে খ্যাত পূর্বাচলে আবাসিক, অনাবাসিক ভবন তৈরি হতে যাচ্ছে সেগুলো যেন উন্নত ভবন কোড মেনে নির্মিত হয়।

সেখানে যেন কমিউনিটি স্কুল-কলেজ, লাইব্রেরি-খেলার মাঠ, পার্ক, স্বাস্থ্য চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা, বিনোদনের ব্যবস্থা যথাযথভাবে থাকে সেই ব্যবস্থা রাজউক ও উত্তর সিটি করপোরেশন সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করে, সেটি সময়ের দাবি। ঢাকাকে সবধরনের অপরাধমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকেও নিতে হবে। তাহলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে চিন্তা থেকে মহানগর ঢাকায় দুটি সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন সেটি সুফল দেবে।

ঢাকার দুই মেয়র সক্রিয় আছেন এটি স্বস্তির বিষয়। তবে পর্বতসম সমস্যার নিচে তারা চাপা পড়ে হারিয়ে যাবেন সেটি কারোরই কাম্য নয়। দুই সিটি করপোরেশনই ধীরে ধীরে সফল হবে, নাগরিক জীবনেও ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরে আসবে এটিই সবার প্রত্যাশা।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

শেয়ার করুন

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী ঘিরে ভাবনা ও প্রত্যাশা

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী ঘিরে ভাবনা ও প্রত্যাশা

সরকারি টাকার সুদ ৯ টাকা। আর এনজিওর ২৫ টাকা। তারপর কৃষক টমেটো বেচে ১ টাকা কেজি। আর বাজারে আমরা পাই ৬০/৭০ টাকা দামে। মাঝের টাকা খেয়ে যায় কালো ঘোড়ায়। কৃষকের টাকায় দেশ চলে সেই কৃষক ঋণ পায় না। যদি পায় ঠিকমতো সময় দিতে না পারলে তার কোমড়ে ২৫ হাজার টাকার জন্য দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়। কিন্তু যে লোক রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে পরিশোধ করে না, তার বেলায় কোনো কথা নেই।

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ বা উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ, মধ্য আয়ের দেশ কথাগুলো শুনলে বেশ আপ্লুত হই। আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে মানে কী? প্রাণজুড়ানো শব্দাবলি। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে– এসব শব্দ শুনলে বুকের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় দক্ষিণা বাতাস। যেন ঝাপটা মেরে যায়। আমাদের দেশ কত উন্নত হচ্ছে।

গোপালগঞ্জ শহর, বরিশালের আগৈলঝাড়া বা মাদারীপুরের রাজৈর না নেমে কোটালীপাড়ার লোকজন কেথাও যেতে পারত না। তাতে সবখানেই ৭/৮ ঘণ্টা সময় লাগত। আামি যখন সরকারি বঙ্গবন্ধু কলজে পড়তাম আমার বড়সড় ছুটি না হলে বাড়ি যেতাম না। এত দূর আর বাহন একমাত্র নৌকা। সেই এলাকা এখন চেনা যায় না। বাস, গাড়ি চলছে। খুলনা-বরিশাল রোড ফোর লেনের সড়কে ৮ ঘণ্টা এখন ২০ মিনিট হয়ে গেছে। আমাদের এলাকায় গরিব লোক খুঁজে পাওয়া কষ্টকর।

বিজয়ের ৫০ বছরে আমাদের অর্জন তাহলে কম নয়। উন্নয়নের পেছনেও কিছু কথা থাকে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর দশটা দেশের মতো নয়। বাঙালির স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষা অনেক পুরোনো। টংক, তেভাগা, নানকার, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ কোনো কিছুই স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে আলাদা ছিল না।

মানুষ একের পর এক যত সংগ্রাম করে যাচ্ছিল ততই একটা ধারণায় এসে উপনীত হচ্ছিল যে, কোনো সংগ্রাম বৃথা যায় না। সংগ্রামের এই ধারাবাহিকতায় ৫২, ৬২, ৬৯-এর পথ পেরিয়ে একদিন আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। অজস্র মানুষের আত্মত্যাগ, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আর দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালি উপনীত হয় জীবনের চূড়ান্ত সংগ্রামে।

এই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের পেছনে ছিল বহুবিধ ঘটনা, বিরূপ পরিস্থিতি, অসম আর্থিক বণ্টন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বঞ্চনাসহ গুরুতর বিষয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমাবনতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাঙালিদের উপর অপারেশন চালানোর মধ্য দিয়ে তারা প্রতিবাদমুখর বাঙালিকে চিরতরে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক ওই পরিকল্পনা দিয়ে নারকীয় গণহত্যা চালালেও স্তব্ধ করা যায়নি।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। দেশকে হানাদারমুক্ত করতে মরণপণ লড়াইয়ে অংশ নেয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিককর্মী, ছাত্র-শ্রমিক, কৃষক-পেশাজীবী নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ ও গণহত্যা মোকাবিলার জন্য গড়ে তোলে প্রতিরোধ। নয় মাস আতঙ্কিত প্রহর অতিক্রম করে আসে বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করার বেশি দিন পার না হতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এদেশে ঘাপটি মেরে থাকা পরাজিত শত্রুরা।

১৯৭১ সালে সংঘটিত একটি গণবিপ্লবকে ১৯৭৫ সালের একটি প্রতিবিপ্লব দিয়ে শেষ করে দেয়া হয়। হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষকে তার পরিবার-পরিজনসহ। রক্তাক্ত করা হয় সংবিধানকে। বিকৃত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে। ঘাতকদের উম্মত্ত মঞ্চে পরিণত হয় দেশ। আর একাত্তরের যেসব মহানায়কেরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন তারা হয়ে যায় অপাঙক্তেয়।

মানবেতর জীবন যাপন করে বেঁচে থাকে সব বীর যোদ্ধা। বেহাত হওয়া বীরত্বগাথা ঢাকা পড়ে যায়। বিক্ষত করা হয় সংবিধানকে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ হয়ে ওঠে দলীয় ক্যাডারদের আড্ডাখানা। মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যেসব বীরযোদ্ধা জীবনকে তুচ্ছ করে দেশমাতৃকাকে হায়েনার হাত থেকে রক্ষা করতে মরণপণ সংগ্রাম করেছিল তারা মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকে। বিশেষ দিবসে এদের ডাকা হলেও এ বীরদের প্রশ্নে রাষ্ট্র, সরকারের যে ধরনের ভূমিকা রাখার কথা ছিল তা কোনো সরকার করেনি।

তালিকার পর তালিকা হয়েছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা লজ্জায় আনতচিত্তে তালিকায় নাম ওঠাতেও বিরূপ ছিলেন। বিনাযুদ্ধে যারা দেশের একমুঠো মাটিও ছাড়তে চায়নি। যারা ১০ খানা টিন দুই মণ গম বা একটা প্লটের জন্য যুদ্ধ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে মনে পড়ে সেই মুখগুলোর কথা?

যেসব গেরিলার যুদ্ধের বর্ণনা শরীরকে শিহরিত করে তারা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই ভাবতে অবাক হতে হয়। যেসব আগুনমুখাদের যুদ্ধের বর্ণনা শুনলে গর্বে বুক ভরে ওঠ তারা তালিকায় নেই।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার কিংবদন্তিতুল্য যোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞের নাম মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় নেই। যে লোকদের নাম আছে তা ভাবলে অবাক হতে হয়। কিন্তু বৃহত্তর ফরিদপুর-বরিশালের বড় যুদ্ধগুলোতে নেতৃত্বদানকারী কমলেশ বেদজ্ঞের নাম তালিকায় নেই। আমার স্কুলে যাওয়ার পথটার কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়ি থেকে কাঁচা একটা ছোট রাস্তা এসে থমকে দাঁড়িয়েছে খালপাড়ে। এটাকে আমরা বড় খাল বলতাম। এর পাশে একসময় একটা বটগাছ ছিল। আমাদের অনেক স্মৃতিবহ বটগাছটাকে ঘিরে অনেক ইতিহাস ছিল। বটগাছের ছায়ায় শীত-গ্রীষ্মে ছোট খাটো আড্ডা লেগেই থাকত। এই গাছের সঙ্গেই একটা পুল ছিল।

কখনও ভাঙা, কখনও আধভাঙা অবস্থায় থাকত এটি। এরপরই বাজারের শুরু। ডানপাশটাতে দোকানের ভিটি ছিল। দোকান ছিল না। পুরোনোর ইটের গাঁথুনির উপর ভিটি। মালিক ব্যবসায়ীরা ছিল। তারা ভারতে চলে গেছে। ওখান থেকে একটু এগোলেই আমাদের এলাকার মহাজন কাদের মিয়ার দোকান, পেছনে নারিকেল গাছ। সেখানে দাঁড়ালে যে বাড়িটা দেখা যায় ওখানে মোজাফফর ঘরামীর সুপারিবাগান ফলদবৃক্ষে ভরা বন-বনানী চোখে পড়ার মতো। ওই বাড়িটি ছিল কমলেশ বেদজ্ঞের।

তিনি কোটালীপাড়া হেমায়েত বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। সিকির বাজারের যুদ্ধে কয়েকবার কমলেশ বেদজ্ঞসহ মুক্তিসেনারা ওই বটগাছের তলায় আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধ করেছে বলে শুনেছি। কমলেশ মুক্তিযুদ্ধ করেনি, বিষ্ণপদ কর্মকার করেনি, রামপ্রসাদ ভট্টাচার্য করেনি! কোটালীপাড়ার মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাড়ির কোনো অবদান ছিল না! আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত ছিলো না! ঘটনাগুলো এখন এমনটাই দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেনের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা চালু করলে এমনসব মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন সেটা কল্পনার বাইরে। এবারে নতুন তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লিপিবদ্ধ করতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। সেখানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকা বিতর্কিত হয়েছে। বিএনপির সময় মুক্তিযোদ্ধাদের যে সংখ্যা ছিল তা বেড়েছে কয়েকগুণ। এতে কি সম্মান বাড়ল?

ভাতা পাওয়ার জন্য যারা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লেখায় তারা কোন মাপের মানুষ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু লোভীদের দশ বছর পরে কী হবে সেটা ভাবনার ব্যাপার। এ চিত্র সারা দেশের। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটা করা হোক। যেটা দলিল হয়ে থাকবে হাজার বছর ধরে।

দুই.

‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।’ যাদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই প্রাপ্তি সেই রক্তকে কতটুকু সম্মান জানাচ্ছি বা জানিয়েছি, সেটাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। দেশের অর্থনীতির মূল বুনিয়াদ যাদের হাতে তারা কৃষক। তারা কৃষি ব্যাংকে গেলে ২৫ হাজার টাকা ঋণ পায় না। এ ঋণ পেতে দালারকে ৩ হাজার দিতে হয়। গণমাধ্যমে সম্প্রতি এমন খবর প্রকাশ হয়েছে। আবার টাকা দিয়েও কেউ ঋণ পায় না। তারা দাদন নেয় এনজিওর কাছ থেকে। নেত্রকোনায় এই দাদনপ্রাবল্য বেশি। সরকারি টাকার সুদ ৯ টাকা।

আর এনজিওর ২৫ টাকা। তারপর কৃষক টমেটো বেচে ১ টাকা কেজি। আর বাজারে আমরা পাই ৬০/৭০ টাকা দামে। মাঝের টাকা খেয়ে যায় কালো ঘোড়ায়। কৃষকের টাকায় দেশ চলে সেই কৃষক ঋণ পায় না। যদি পায় ঠিকমতো সময় দিতে না পারলে তার কোমড়ে ২৫ হাজার টাকার জন্য দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়। কিন্তু যে লোক রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে পরিশোধ করে না, তার বেলায় কোনো কথা নেই।

যে কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ আর প্রবাসীদের র‌্যামিট্যান্সে অর্থনীতির বুনিয়াদ গড়া হয় সেই টাকা চলে যায় ঋণ খেলাপির হাতে। আর কৃষক থাকে না খেয়ে। দেশের ঋণখেলাপি আর অর্থপাচারের যে মচ্ছব চলছে- তা ভয়াবহ। সম্প্রতি জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচেভেলের প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা৷ এই অর্থ বাংলাদেশের দুটি বাজেটের সমান৷ স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশগুলোর মধ্যে অর্থপাচার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বাংলাদেশ থেকেই৷

গত ২ মে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) অর্থপাচারের যে তথ্য প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা৷ বলা হয়েছে, আমদানি-রপ্তানিতে আন্ডার ভয়েস এবং ওভার ভয়েসের মাধ্যমেই প্রধাণত এই অর্থ পাচার করা হয়৷ এবারের প্রতিবেদনে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে৷ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৮ শত ৬৮

কোটি টাকা। কিছু মানুষের অবিবেচক কার্যক্রম, দেশপ্রেমের অভাব, স্বার্থপরতা, দেশের সার্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সরকার এসব টাকা ফেরত এনে দেশের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করা সম্ভব। তবে তার আগে খেলাপিঋণ আদায় জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, খেলাপি ঋণের সিংহভাগই অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। জনতা ব্যাংকের ১৩ হাজার ৮ শত ৩৭ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপিঋণের ১৪ শতাংশ, সোনালী ব্যাংকের ১০ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা যা মোট খেলাপিঋণের ১০ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ৭ হাজার ৮ শত ৭২ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপিঋণের ৮ শতাংশ, বেসিক ব্যাংকের ৭ হাজার ৬ শত ১৯ কোটি টাকা যা মোট খেলাপিঋণের ৭.৫০ শতাংশ এবং বেসরকারি এবি ব্যাংকের ৫ হাজার ৩ শত ৩৩ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপিঋণের ৫ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ ৪৪ হাজার ১৬ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপিঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ।

বিশেষায়িত তিন ব্যাংকের খেলাপির পরিমাণ ৩ হাজার ৬ শত ৯৯ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ ৫০ হাজার ১ শত ৫৫ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো- ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া। ব্যাংক খাতে মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্যের কারণে খেলাপিঋণ চিত্র স্ম্ফীত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি এ অবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে। কাউকে নতুন করে খেলাপি বলা যাচ্ছে না।

ঋণ আদায়ের জন্য কোনো জোড়ালো তাগাদা বা কঠিন আইনি ব্যবস্থাও নেয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে কোনোই সংশয় নেই যে, মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক দুষ্টচক্রের দাপট ও আধিপত্যের কারণে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি খেলাপিঋণের প্রসার ঘটায়। মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেয়ার পর তা খেলাপিতে পরিণত করার প্রবণতা শুরুতেই যদি ব্যাংকগুলো রোধ করতে পারত কিংবা এখনও পারে, তাহলে ঝুঁকি এড়ানোর পথ থাকত। এ জন্য জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পাচারকারী, ঋণ খেলাপিদের টাকা আদায় যেমন জরুরি তেমনি এদের আইনের আওতার আনা উচিত। তাদের দেশের সার্বিক উন্নয়ন আমাদের পাশের যেকোনো দেশকে ছাড়িয়ে যাবে। বিজয়ের এই মাসে আমাদের অঙ্গীকার হোক অর্থ পাচারকারী, ঘুষখোর, মুনাফালোভী ও খেলাপিঋণ করে যারা দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা। মুক্তিযুদ্ধে মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিল তার বাস্তবায়ন খুব জরুরি।

লেখক: গবেষক, প্রবন্ধকার ও সাংবাদিক।

শেয়ার করুন

এলডিসি থেকে উত্তরণ ও পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

এলডিসি থেকে উত্তরণ ও পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

উন্নয়নশীল দেশের চ্যালেঞ্জ উত্তরণে দক্ষ মানবসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য তরুণ সমাজকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের উদ্যোগের কারণেই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রচলিত পণ্য রপ্তানিতে সাময়িক সমস্যা হলেও বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহে বড় ধরনের ক্ষতির প্রভাব সামাল দেয়া যাবে।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সুপারিশ জাতিসংঘের অনুমোদন পেয়েছে। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ হিসেবে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ৩টি মানদণ্ডই পূরণ করেছে। ১৭ নভেম্বর ২০২১ তারিখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম বৈঠকের ৪০তম প্ল্যানারি সভায় এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হয়। এটি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প ২০২১-এর বাস্তবায়ন। আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

অনেকেই এই অর্জনকে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার এক মহান মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। অনেকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণে তার কন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব সাফল্য বলেও উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যে দেশ জাতিসংঘ নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ড পূরণের মাধ্যমে এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের এ অর্জন বিশ্বদরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং আরও অধিকতর উন্নয়নের যাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে।

সুপারিশ অনুমোদনের বিষয়ে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল ও লাওসের ক্ষেত্রেও একই সুপারিশ করা হয়েছে। এই তিন দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর প্রস্তুতির সময় পাবে। সাধারণত প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সময় দেয়া হয়। করোনার কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই বাড়তি সময় দেয়া হলো। বাংলাদেশ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি)’ ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় দ্বিতীয়বারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের মানদণ্ড পূরণের মাধ্যমে উত্তরণের সুপারিশ লাভ করেছিল।

সিডিপি একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরব্যাপী প্রস্তুতিকাল প্রদানের সুপারিশ করেছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ ইতোমধ্যে সিডিপির সুপারিশ অনুমোদন করেছে। পাঁচ বছর প্রস্তুতিকাল শেষে বাংলাদেশের উত্তরণ ২০২৬ সালের ২৩ নভেম্বর কার্যকর হওয়ার কথা।

বাংলাদেশই একমাত্র দেশ হিসেবে জাতিসংঘ নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ড পূরণের মাধ্যমে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। প্রস্তুতিকালের সময়ে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্ত সব সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকবে। তাছাড়া বর্তমান নিয়মে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের পর আরও তিন বছর অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত কোটা-সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

উত্তরণপরবর্তী সময়ে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসমূহ অব্যাহত রাখাসহ মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিকৌশল ও পদক্ষেপ প্রণয়ন করছে। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যেসব দেশ তুলনামূলক দুর্বল, সেসব দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৯৭১ সালে প্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা করা হয়। বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে পাঁচ বছর পর এলডিসি থেকে বের হয়ে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কাতারে চলে যাবে বাংলাদেশ। সাধারণত সিডিপির চূড়ান্ত সুপারিশের তিন বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু করোনার প্রভাব মোকাবিলা করে প্রস্তুতি নিতে বাড়তি দুই বছর সময় দেয়া হয়েছে। সিডিপির সঙ্গে গত ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে বাংলাদেশও বাড়তি দুই বছর সময় চেয়েছিল।

এলডিসি থেকে কোন কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে থাকে সিডিপি। এ জন্য প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এই তিন সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কি না, সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। যেকোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার দ্বিগুণ করতে হয়।

অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ পয়েন্ট বা এর নিচে থাকতে হবে। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ বা এর বেশি পয়েন্ট পেতে হবে। মাথাপিছু আয় সূচকে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার থাকতে হবে। মাথাপিছু আয় হিসাবটি জাতিসংঘ করেছে অ্যাটলাস পদ্ধতিতে। সেখানে মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করে তিন বছরের গড় হিসাব করা হয়। বাংলাদেশ এ তিন মানদণ্ডই পূরণ করেছে। বর্তমানে ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশ আছে। এ পর্যন্ত মালদ্বীপ, বাতসোয়ানা, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, সামোয়া ও কেইপ ভার্দে-এই পাঁচ দেশ এলডিসি থেকে বের হয়েছে।

উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ এর অনেক চ্যালেঞ্জও আছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য আগামী কয়েক বছর খুব গুরুত্বপূর্ণ। করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিবেশ-পরিস্থিতি অর্থনৈতিক অগ্রগতির অনুকূল নয়। এ বৈরী পরিবেশের মধ্য দিয়েই আমাদের আগামী বছরগুলোতে অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে যেতে হবে।

বিশ্বদরবারে বিভিন্ন দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্ত হবে। এছাড়া ভাবমূর্তি উন্নয়নের ফলে বৈদেশিক ঋণ পাওয়াও সুবিধাজনক হবে। যেসব দেশ এখন পর্যন্ত স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের প্রায় প্রতিটির ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে।

সাধারণত উন্নয়নশীল দেশের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আস্থা পান। তাই উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার ফলে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি পাবে ও নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাপক শিল্পায়ন হবে বলে আশা করা যায়। অনেক দেশের সঙ্গে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যের দরজাও উন্মুক্ত হবে।

উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠলে সহজশর্তে ঋণ পাওয়া এবং বিভিন্ন রপ্তানি-সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। পাশাপাশি ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্বের আন্তর্জাতিক আইনকানুনের অব্যাহতিও থাকবে না, যদিও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও বেশি সময় পাবে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে, তা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।

বিশ্ববাজারে বিপণন ও বিনিয়োগ আকর্ষণ এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে। তবে মূল সমস্যা হলো, একমাত্র ভুটান ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এফটিএ বা পিটিএ নেই। আমাদের উন্নত দেশগুলো ছাড়াও ভারত ও চীনের মতো বড় উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে এফটিএ বা পিটিএ করতে হবে। দেশের বাণিজ্যে স্থানীয় শিল্পের জন্য সুরক্ষা কমানো না হলে অন্য দেশ পিটিএ বা এফটিএতে আগ্রহী হবে না।

বৈদেশিক অনুদান ও কম সুদের ঋণ কমে আসবে। এতে বৈদেশিক ঋণের ব্যয় বেড়ে যাবে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক কমে গেছে। তাই বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তির বিষয়ে বাংলাদেশের শঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই। কিন্তু সহজশর্তে বৈদেশিক ঋণ না পাওয়ায় বৈদেশিক অনুদাননির্ভর এনজিওগুলোর অর্থ-সংকট দেখা দিতে পারে।

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা বিদেশি ফেলোশিপ, স্কলারশিপ, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক জার্নালে নিবন্ধ ছাপানোর প্রকাশনা ফি প্রদানের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়সহ নানা সুবিধা পেয়ে থাকে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর বিদেশে উচ্চশিক্ষা-প্রত্যাশীরা প্রাথমিকপর্যায়ে কিছুটা বাধার সম্মুখীন হতে পারে। ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে প্রাপ্ত শুল্ক-সুবিধাও হারাতে হবে, যা দেশের ওষুধ রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এলডিসি থেকে উত্তরণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য গঠিত ফান্ড থেকেও বাংলাদেশ কোনো সহায়তা পাবে না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জিএসপি প্লাস পাওয়ার জন্য আমাদের চেষ্টা করতে হবে। যদি জিএসপি প্লাস পাওয়া কঠিন হয় বা পাওয়া না যায়, তাহলে এর বিকল্প কিছু পেতে হবে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে যে ধরনের সুরক্ষাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্যাপাসিটি থাকা দরকার, তা আমাদের নেই।

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির এই প্রক্রিয়া শুরুর পাশাপাশি দেশের ভেতরেও প্রতিযোগিতা বাড়াতে অভ্যন্তরীণ অনেক কাজ করতে হবে। পরিবহন-বন্দর, আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন করার মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানিতে ব্যয় কমানো প্রয়োজন। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সক্ষমতা আরও বাড়াতে এবং মূল্য সহনীয়পর্যায়ে রাখতে হবে। ব্যাংকিংসহ পুরো আর্থিক খাতে সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কমাতে হবে খেলাপি ঋণ।

উন্নয়নশীল দেশের চ্যালেঞ্জ উত্তরণে দক্ষ মানবসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য তরুণ সমাজকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের উদ্যোগের কারণেই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রচলিত পণ্য রপ্তানিতে সাময়িক সমস্যা হলেও বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহে বড় ধরনের ক্ষতির প্রভাব সামাল দেয়া যাবে। যেহেতু বাংলাদেশ বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে’ অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তাই এ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব।

এলডিসি থেকে বের হওয়ার অনেক সুবিধাও রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হবে। উন্নয়নের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের কদর বাড়বে ও উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা মর্যাদা পাব। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবে।

দেশের ক্রেডিট রেটিং বাড়বে। বাংলাদেশের বড় ধরনের ব্র্যান্ডিং হবে। এখানকার অর্থনীতি উদীয়মান এবং এখানে বড় বাজার সৃষ্টি হচ্ছে এমন বার্তা বিশ্ববাসী পাবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের অন্যতম শর্ত হলো, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া। বাংলাদেশ এ শর্ত পূরণ করতে পেরেছে মানে অর্থনীতিতে তুলনামূলক কম ঝুঁকি রয়েছে। এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের উপলব্ধিতে বিনিয়োগের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

শেয়ার করুন