শিশুদের জন্য নিরাপদ হোক পৃথিবী

শিশুদের জন্য নিরাপদ হোক পৃথিবী

শেখ রাসেল ছিল বন্ধুবৎসল, গরিবদের জন্য ছিল তার দরদ, মমতা। জাতির পিতার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়াতে যখন সে যেত তখন গ্রামের ছেলেদের জন্য সে জামা নিয়ে যেত। তাদের উপহার দিত। আজ শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে দেশ একজন মানবদরদি মানুষ পেত।

১৯৬৪ সাল। সময়টা ছিল লড়াই আর যুদ্ধের উত্তেজনায় মুখর। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে চলেছে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ওই সময় পাকিস্তানজুড়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোল। একদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, অপরদিকে সম্মিলিত বিরোধীদলের প্রার্থী কায়দে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহ। অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারের মাঝেও এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে। যিনি এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটিয়ে বাঙালি জাতিকে এনে দেবেন মুক্তির স্বাদ বাঙালির সেই অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘর আলো করে জন্ম নিল এক শিশু।

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িতে শেখ রাসেলের জন্ম। রাসেলের যেদিন জন্ম হয় বঙ্গবন্ধু সেদিন ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণের জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। জন্মের সময় বাবা কাছে না থাকলেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পিতা-পুত্রের চিরপ্রস্থান ঘটেছিল একসঙ্গেই।

ছোট ছেলের রাসেল নামটি রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার প্রিয় লেখক ছিলেন পৃথিবী বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক সাহিত্যে নোবেল পুস্কারপ্রাপ্ত বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি কেবল একজন দার্শনিকই ছিলেন না। বিজ্ঞানীও ছিলেন। ছিলেন পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের একজন বড় মাপের বিশ্বনেতা। পৃথিবীটাকে মানুষের বসবাসের জন্য সুন্দর ও শান্তিময় করার লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন নিরলস। বার্ট্রান্ড রাসেলের নামের সঙ্গে মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের নাম রাখলেন রাসেল। শেখ রাসেল। এই নামটিকে ঘিরে নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর মহৎ কোনো স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা ছিল। কত আশা ছিল তার ছেলে বড় হয়ে জগৎখ্যাত হয়ে উঠবে একদিন। কত সাধই না মানুষের অপূর্ণ থেকে যায়!

শিশু রাসেলের ভুবন ছিল তার পিতা-মাতা— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব; বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালকে ঘিরে। তাদের সবার ভালোবাসার ধন ছিলেন ছোট্ট রাসেল। রাসেলের জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে বাবা মুজিবকে ছাড়া। কারণ, বাবা মুজিব রাজনৈতিক বন্দি হয়ে কারাগারে ছিলেন দিনের পর দিন। শেখ রাসেল বেশ কবারই কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে তার প্রথম কারাগার দেখা ১৯৬৬ সালের ৮ মে, পিতার গ্রেপ্তারের পর।

কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার বাবাকে রেখে আসতে চাইত না। এ কারণে তার মন খারাপ থাকত। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় ১৯৬৬ সালের ১৫ জুনের দিনলিপিতে রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না- যে পযর্ন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করছে। জেল গেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকেছিল। আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরেই ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি। যাবার সময় হলে ওকে ফাঁকি দিতে হয়।”

শিশু রাসেল ছিল অভিমানী। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন ‘কারগারের রোজনামচা‘য়। ১৯৬৭ সালের ১৪-১৫ এপ্রিল অন্যান্য প্রসঙ্গ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু রাসেলকে নিয়ে লিখেছেন-

“জেল গেটে যখন উপস্থিত হলাম ছোট ছেলেটা আজ আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে আশ্চর্যই হলাম। আমি যখন রুমের ভিতর যেয়ে ওকে কোলে করলাম আমার গলা ধরে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করল। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কি?’ ওর মা বলল,“বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে।” রাসেল ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকতে লাগল। যেই আমি জবাব দেই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার উপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়। এখন আর বিদায়ের সময় আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।”

শিশু রাসেলকেও কাটাতে হয় বন্দিজীবন। অত্যন্ত কষ্টকর ছিল তার দিনগুলো। তার বন্দিত্ব সম্পর্কে বোন শেখ হাসিনা ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ নিবন্ধে লিখেছেন-

“ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবন-যাপন শুরু করে। ঠিকমতো খাবার-দাবার নেই। কোন খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো। বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোন খবর আমরা জানি না। কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানি না। প্রথমদিকে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। তার ওপর আদরের কামাল ভাইকে পাচ্ছে না, সেটাও ওর জন্য কষ্টকর। ” (ইতিহাসের মহানায়ক: পৃষ্ঠা ২১)।

ছোট থেকে বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে দেখতে দেখতে বড় হওয়া রাসেল অজান্তেই চাপা স্বভাবের হয়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে বিষয়ে বক্তৃতায় বলেন-

‘খুব চাপা স্বভাবের ছিল। সহজে নিজের কিছু বলতো না। তার চোখে যখন পানি, চোখে পানি কেন জানতে চাইলে বলতো, চোখে যেন কী পড়েছে। ওইটুকু ছোট বাচ্চা, নিজের মনের ব্যথাটা পর্যন্ত কীভাবে লুকিয়ে রাখতে হয় শিখেছিল।’

শেখ রাসেল ছিল বন্ধুবৎসল, গরিবদের জন্য ছিল তার দরদ, মমতা। জাতির পিতার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়াতে যখন সে যেত তখন গ্রামের ছেলেদের জন্য সে জামা নিয়ে যেত। তাদের উপহার দিত। আজ শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে দেশ একজন মানবদরদি মানুষ পেত।

শেখ রাসেলের এই ছোট্ট জীবন আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয়। প্রথমত, আমাদের শিশুরা যদি শেখ রাসেলকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে তার মতো বেড়ে ওঠে, তাহলে আমরা আদর্শ শিশু পাব। যাদের হাত ধরে বিনির্মিত হবে আগামীদিনের চেতনার নাগরিক। শিশুদের তাই, শেখ রাসেলের ছোট্ট জীবনটা জানাতে হবে। যাতে শিশুরা অনাবিল সুন্দরের সৌন্দর্যে বেড়ে ওঠে, হাসতে পারে, খেলতে পারে, দুষ্টুমি করতে পারে, বন্ধুত্ব করতে পারে, গরিব মানুষকে ভালোবাসতে পারে। এভাবে যদি প্রতিটি শিশু বেড়ে ওঠে তাহলে এই শিশুরা বড় হয়ে আলোকিত মানুষ হতে পারে। একারণেই শেখ রাসেলের জীবন আমাদের জানাটা অত্যন্ত জরুরি।

শেখ রাসেল নিজেকে কীভাবে গড়ে তুলত তা বলার উপায় নেই। তবে পারিবারিক ঐতিহ্য, আদর্শের উত্তরাধিকার তার চরিত্র গঠনে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, তাতে সন্দেহ নেই। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় অন্তত এই দেশ, দেশের মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ থাকত তার অন্তর ও চেতনাজুড়ে। পরিণত হয়ে উঠত দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য। তার আগ্রহের বিষয়গুলো আয়ত্ত করে সেখানে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারত। সেটিই স্বাভাবিক ছিল তার জন্য।

আজ রাসেল থাকলে একজন মেধাবী মানুষ বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার সংগ্রামে থাকত প্রথম সারিতে। দুর্ভাগ্য এই যে, জীবনের পথ, ইতিহাসের গতিধারা সব সময় স্বাভাবিক সূত্র ধরে এগোয় না। অনভিপ্রেত বহু ঘটনা এসে সেই যাত্রাপথ বিপৎসংকুল করে তোলে, বাঁক ঘুরিয়ে দেয়, ভিন্নখাতে নিয়ে যায়। তখন আবার সঠিক পথে ফিরতে প্রয়োজন হয় কঠিন সংগ্রামের।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে এমনি এক ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করা হয়েছিল এই দেশকে। এরই নির্মম শিকার হয়েছিল শিশু শেখ রাসেল। ফলে তার জন্মদিনটি আনন্দ নয়, বরং বেদনাই বয়ে আনে বিবেকবান মানুষের কাছে।

শেখ রাসেলের সেই বেদনাঘন জন্মদিন আজ। আমরা শেখ রাসেলের পাশাপাশি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের শহীদদের স্মৃতিও এই দিনে স্মরণ করি। একাত্তরের পরাজিত ঘাতক বাহিনী দেশ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে দিতে এ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। আর আইন করে সেই আত্মস্বীকৃত খুনিদের দায়মুক্তি দেয়া হয়। আশার কথা হলো- বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল করে খুনিদের বিচারের আওতায় এনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করেন।

শেখ রাসেলের জন্মদিন ১৮ অক্টোবর। এ বছর থেকে ‘জাতীয় দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে আগামী বছরগুলোতে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ শেখ রাসেল দিবস পালনের প্রস্তাব এবং যৌক্তিকতা মন্ত্রিসভায় পেশ করে। ২৩ আগস্ট ২০২১, মন্ত্রিসভার বৈঠকে শেখ রাসেল দিবস ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালনের বিষয়ে অনুমোদন দেয়া হয়। এর জন্য আমরা আইসিটি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

শিশু শেখ রাসেলের অকালপ্রয়াণের শোক-দুঃখ কোনো দিন শেষ হবার নয়। শেখ রাসেলের জন্মদিনে আমাদের কামনা শুধু আমাদের দেশ নয়, সারা পৃথিবীই শিশুদের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠুক। হানাহানির অবসান হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক চিরকাঙ্ক্ষিত শান্তি।

লেখক: সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়

আরও পড়ুন:
অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক
অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে
‘অন্তর মম বিকশিত করো’
নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা
মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

শেয়ার করুন

মন্তব্য

পার্বত্য শান্তি চুক্তির দুই যুগে অর্জন ও বাস্তবতা

পার্বত্য শান্তি চুক্তির দুই যুগে অর্জন ও বাস্তবতা

সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ নিরসন কিংবা অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করার মাধ্যমে কখনও শান্তি স্থাপিত হতে পারে না এই সত্যটি উপলব্ধির ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকারসমূহের ধারণার সঙ্গে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল, সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং মানবাধিকারে বিশ্বাসী সংগঠন ও জনগণের মত এবং পথের ভিন্নতা ছিল।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর খাগড়াছড়িতে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও সাংসদ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ৭২ দফার একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এটি ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি নামে অভিহিত।

সেই সময় বিশ্ব গণমাধ্যম এই চুক্তি স্বাক্ষরকে ব্যাপকভাবে প্রাধান্য পায়। বিভিন্ন সরকার এবং মানবাধিকার সংস্থা এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার জন্য সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতিপ্রধান সন্তু লারমাকে অভিনন্দনও জানায়। এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে দুই দশকের বেশি সময় চলে আসা বিরোধ, সংঘাত ও সংঘর্ষ নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়। পাহাড়ে নিরীহ, নিরপরাধ পাহাড়ি ও বাঙালি বহু মানুষের প্রাণ ঝরে।

একসময় ৯৬-পূর্ববর্তী সরকারগুলো সামরিক বাহিনী নিয়োগ করে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা করে আসছিল তা মোটেও গ্রহণযোগ্য ও সফল হয়নি। পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস ও চাষবাসের জায়গায় সমতল ভূমি থেকে নিয়ে আসা সেটেলারদের বসিয়ে দেয়ার ফলে যে বিরোধ সৃষ্টি হয় তাতে ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ এবং নিরাপত্তাহীনতার যথেষ্ট কারণ সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় এবং সেটেলারদের মধ্যে সম্পত্তির দখলসহ নানা কারণে বিরোধে রক্তপাত ঘটতে থাকে। এর ফলে স্থানীয় পাহাড়ি নৃ-জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মরক্ষার্থে সংগঠন গড়ে ওঠে যা পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র সংঘাত, রক্তপাত ও প্রণহানিতে রূপ নেয়। জনসংহতি সমিতি দীর্ঘদিন গভীর অরণ্যে স্থানীয় পাহাড়ি তরুণদের নিয়ে সশস্ত্র পন্থায় তাদের অধিকার বাস্তবায়নে লড়াই করতে থাকে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠী দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্টের জন্য এ ধরনের সংগঠনকে উৎসাহিত করতে থাকে। এটি বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপদ তৈরি করতে যাচ্ছিল। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ নিরসন কিংবা অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করার মাধ্যমে কখনও শান্তি স্থাপিত হতে পারে না এই সত্যটি উপলব্ধির ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকারসমূহের ধারণার সঙ্গে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল, সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং মানবাধিকারে বিশ্বাসী সংগঠন ও জনগণের মত এবং পথের ভিন্নতা ছিল।

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল এবং জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলনরত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার নিরসনের দাবি করে আসছিল। কিন্তু সামরিক সরকার ও নির্বাচিত বিএনপি সরকার পার্বত্য অঞ্চলে রক্ত ঝরার অশান্ত পরিস্থিতির সমাধানে আন্দোলনরত জনসংহতির সঙ্গে কোনো আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে উপনীত হতে চায়নি।

লোকদেখানো কিছু উদ্যোগ ছাড়া তেমন কোনো কার্যকর ও আন্তরিক প্রচেষ্টা গৃহীত হয়নি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় মানুষের অবাধ যাতায়াত কিংবা বসবাস প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল। আমাদের রাষ্ট্রের বিরাট একটি অংশে এ ধরনের অশান্ত পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন ও অগ্রগতিকেই শুধু বাধাগ্রস্ত করেনি, পাহাড়ে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং জাতিগত পশ্চাদপদতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগও সুদূর পরাহত হতে থাকে।

বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে তার অন্যতম মূলমন্ত্র ছিল বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ৬ দফা, যেখানে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও জাতিগত অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের মৌলিক অবস্থান স্পষ্ট ছিল। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জাতিগত ও ভাষা-সাংস্কৃতিক অধিকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। এখানে বিরোধের কোনো সুযোগ নেই। অথচ সরকারগুলো সেই বিরোধকে জিইয়ে রাখার জন্যই সংঘাত, সংঘর্ষ ও রক্তপাতকে সমর্থন করে যাচ্ছিল। আন্দোলনরত জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ করছিল। এর ফলে বাংলাদেশ দেশ ও বিদেশে জাতিগত বিরোধ ও সংঘাত সম্পর্কে ব্যাপকভাবে ভাবমূর্তির সংকটে পড়ে।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা নির্বাচনে বিজয়লাভ করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানে সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহকে প্রধান করে জনসংহতির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা, সমস্যার কারণসমূহ চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের উপায় নির্ধারণের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশেষে ৭২ দফার একটি দাবিনামায় সমস্যার সমাধানে উভয়পক্ষ শান্তি চুক্তি সম্পাদনে সম্মত হয়। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর খাগড়াছড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার এবং জনসংহতি সমিতির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

বিএনপি, জামায়াতসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল শান্তি চুক্তির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। তারা এই শান্তি চুক্তিকে দেশভাগের চুক্তি হিসেবে অভিহিত করে। এমনকি ফেনী জেলা থেকে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম অঞ্চল বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বলে অপপ্রচার ও অভিযোগ করা হয়।

ঢাকা থেকে রোডমার্চ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে গাড়িবহর নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করা হয়। পার্বত্য শান্তি চুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে বাঙালি এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে উপস্থাপন করা হতে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের বসবাস কিংবা যাতায়তের কোনো অধিকার থাকবে না- এমনও প্রচার করা হয়। এ ধরনের অপপ্রচারে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছেন, অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে বিষয়টিকে দেখেছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির প্রতি একশ্রেণির মানুষের লোলুপ দৃষ্টি আগে থেকেই ছিল। তারা সেখানে নানা ধরনের এনজিও, ব্যক্তিগত রিসোর্ট, ভূমিদখল, কেনাকাটা এবং ব্যবসায়িক নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিবেচনায় রেখেছিল। এদের অনেকে শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করলেও শান্তি চুক্তি হওয়ার পর তারাই সেসব সুযোগ-সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে থাকে।

পাহাড়ি বাঙালি বিরোধ উসকে দিয়ে এরা পাহাড়ের বিভিন্ন ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীকে আবার ভয় ও আতঙ্কে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার প্রকৃত সুফল স্থানীয় দরিদ্র ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীর অধিবাসীরা এখনও ভোগ করার পুরোপুরি সুযোগ পায়নি।

এখনও বেশ কটি সংগঠনে বিভক্ত হয়ে পাহাড়ের আদি জনগোষ্ঠী নানা সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। এটি মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়। প্রয়োজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক, ভাষা-সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটিয়ে অনগ্রসর মানুষগুলোকে বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় যুক্ত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশাল অঞ্চলের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, একইসঙ্গে ভূমি নিয়ে যে দ্বন্দ্ব ও বৈষম্য এখনও বিরাজ করছে তা দূর করা।

বাঙালি এবং ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ ও দূরত্ব নয়, বরং পারস্পরিক সম্প্রীতি, আস্থা ও প্রতিবেশীসুলভ আচরণের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সবারই সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তাহলেই শান্তি চুক্তি শুধু পাহাড়েই নয়, গোটা দেশে মানুষের মনে শান্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিদেরই উদার হতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকার শান্তি চুক্তি ও সংবিধানের যথাযথ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক
অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে
‘অন্তর মম বিকশিত করো’
নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা
মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

শেয়ার করুন

সুষ্ঠু ভোটের অনিবার্যতা

সুষ্ঠু ভোটের অনিবার্যতা

গণতন্ত্রের জন্য আমরা ভারতবর্ষ ভেঙেছি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু গণতন্ত্র অধরাই রয়ে গেছে। গণতন্ত্র বলতে আমরা গোষ্ঠীতন্ত্র ও দলতন্ত্রকেই প্রাধান্য দিয়ে চলেছি।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অনেক বছর আগে লিখেছিলেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে/বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’... তিনি কথাগুলো বলেছিলেন ভারতবর্ষের, আরও নির্দিষ্ট করে বললে বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারকে ইঙ্গিত করে। তিনি যে বাঙালি মুসলমানদের মনোজগতে আঘাত দিয়ে তাদের চৈতন্যোদয় ঘটাতে চেয়েছিলেন, সেই বাঙালি মুসলমান এখনও জেদ ও ফতোয়াবাজিতে ব্যস্ত।
নজরুলের সময় ধর্মীয় ফতোয়া জোরদার ছিল, এখন ধর্মীয় ফতোয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক ফতোয়া যোগ হয়েছে। কথায় কথায় প্রতিপক্ষকে গালমন্দ না করলে, বিদেশের দালাল না বানাতে পারলে নেতানেত্রীদের পেটের ভাত হজম হয় না। এটাই এখন আমাদের দেশে ‘গণতন্ত্র’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হ্যাঁ, গণতন্ত্রের জন্য আমরা ভারতবর্ষ ভেঙেছি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু গণতন্ত্র অধরাই রয়ে গেছে। গণতন্ত্র বলতে আমরা গোষ্ঠীতন্ত্র ও দলতন্ত্রকেই প্রাধান্য দিয়ে চলেছি। আমাদের নেতানেত্রীরা জর্জ ডব্লিউ বুশের সেই আলোচিত উক্তিকেই অনুসরণ করে চলেছেন, ‘যে আমার সঙ্গে নেই, সে আমার বিরুদ্ধে।’

এই বৈরিতা ও ‘শত্রুতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশে শেষ হয়েছে তৃতীয় দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। এতে যেন ‘শাপে বর’ হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের জন্য। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য ক্ষমতাসীন দলের সবাই যেন মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

যারা দলের মনোনয়ন বাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তারা স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে নির্বাচনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এতে করে সংঘাত-সংঘর্ষ বেড়েছে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নির্বাচনি সহিংসতায় তিন দফা নির্বাচনে ৩৫ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে।

রাজনীতির ফাঁকা মাঠে ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে দলের মধ্যে শৃঙ্খলার অভাবই প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে। আওয়ামী লীগের উচিত এই ধরনের উপদলীয় সংঘর্ষ বন্ধের সমাধান খুঁজে বের করা।

এ ক্ষেত্রে প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া আরও গণতান্ত্রিকভাবে করতে হবে। একইসঙ্গে নির্বাচনি সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করতে হবে। কেবল কয়েকজন প্রার্থীকে বহিষ্কার করলেই হবে না।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও উন্নত ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে যখন বিভিন্ন দেশ নিত্যনতুন উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন আমাদের দেশে ‘একদলীয়’ নির্বাচনেও সনাতন কায়দায় হানাহানি-খুনোখুনি হচ্ছে। মানুষের রক্ত ঝরছে। এমনিতেই আমাদের দেশের নির্বাচনে নানা কারসাজি হয়।

জয়ী হওয়ার জন্য ক্ষমতাসীনরা নানা উপায় অবলম্বন করে। কেবল শক্ত প্রতিপক্ষই কিছুটা হলেও প্রতিরোধ গড়তে পারে। তা না হলে সব নদী সাগরে মিলে যাওয়ার মতো সব ভোট ক্ষতাসীনদের বাক্সে গিয়ে জমা হয়। এমন এক সর্বনাশা ব্যবস্থা থেকে সরে আসার পথ-পদ্ধতি খুঁজে পাওয়া কিংবা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অঙ্গীকার লক্ষ করা যায় না।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএমের মাধ্যমে ভোটদানের প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। ইভিএমকে কীভাবে আরও বেশি কার্যকর ও উন্নত করা যায়౼ দেশে দেশে চলছে সেই পরীক্ষা। আমাদের দেশেও জাতীয় সংসদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কিছু নির্বাচিত সংসদীয় আসন ও কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু তা জনপ্রিয়তা পায়নি। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোও এ ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেনি। বরং অনেক দল জোরেশোরে এর বিরোধিতা করেছে।

এটা ঠিক, ভোটযন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রয়োজন গণতন্ত্রের স্বার্থেই। কিন্তু তার চাইতে এতটুকু কম দরকারি নয় যন্ত্রের উপরে জনগণের আস্থা, বিশ্বাস। ভোটপ্রক্রিয়া নিয়ে নাগরিক-সংশয় গণতন্ত্রে অভিপ্রেত নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো আর ইভিএম যন্ত্রগুলোর পেট কেটে তার অ্যানাটমি বোঝার সুযোগ পাবেন না। তাদের নির্ভর করতে হবে বিশেষজ্ঞদের মতামতের উপরেই। আমাদের দেশে তেমন বিশ্বাসী বিশেষজ্ঞরও অভাব রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে যারা আঙুল তুলেছেন এই বোবা ভোটযন্ত্রের সততা আর বিশ্বাসযোগ্যতায়, তাদের মধ্যে রয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতা, এমনকি আছেন দস্তুর মতো আইটি বিশেষজ্ঞও।

দোষ অবশ্য যন্ত্রের নয়, যন্ত্র যারা চালায়, যাদের কথায় চালায়, তাদের। কিন্তু তাদের মনোভাব বদল করবে কে? তবে কি হানাহানি মারামারি, খুনোখুনি, ‘মানি না, মানব না’-র পাশাপাশি কাগজের ব্যালটে ষোলো কোটি ভোটারের ভোটপ্রক্রিয়া চলতে থাকবে? আর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের সঙ্গে ইভিএমে ভোটগ্রহণও কেবল প্রশ্ন হয়েই থাকবে?

আমরা দলাদলি নিয়ে যখন ব্যস্ত, দেশের একজন প্রধান নেত্রীর জীবন-মৃত্যু নিয়ে নানাবিধ গুজব নিয়ে মত্ত তখন উন্নত বিশ্বে ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। একটা উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিটকয়েন এবং সার্বিকভাবে ক্রিপ্টোমুদ্রা নিয়ে বিপুল বিতর্ক দুনিয়াজুড়ে। সে পরিসরে না ঢুকেও নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, বিটকয়েনের চলমান ইতিবৃত্ত দুনিয়াকে দিয়েছে অন্য এক বলিষ্ঠ উত্তরাধিকার। তা হলো ‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’, যার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বিটকয়েনের বিজ্ঞান এবং নিরাপত্তার চক্রব্যূহ। ব্লকচেইন যেন লেজার বা খেরোর খাতা, যার তথ্যগুলো জমা রয়েছে গাদা গাদা ব্লকের মধ্যে।

একটা ব্লক তথ্যে পূর্ণ হয়ে গেলে, তা জুড়ে দেয়া হয় আগের ব্লকগুলোর সঙ্গে। শিকলের মতো, প্রায় অচ্ছেদ্য এক বন্ধনে। ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে জমা হওয়া তথ্যের প্রায় অলঙ্ঘনীয় নিরাপত্তার কারণেই এর বিপুল ব্যবহার শুরু হয়েছে জমি নিবন্ধনে, শেয়ার বাজারের কেনাবেচায়, ব্যাংকের বিবিধ কাজকর্মে, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে। ভোটপ্রক্রিয়াতেও।

ইতোমধ্যেই ভোটের কাজে ব্লকচেইনের ব্যবহার হয়েছে নানা দেশে। ২০২০-র আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্প-বাইডেনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের উত্তেজনার আবহে অনেকেই খেয়াল করেননি, সে দেশের উটাহ (Utah) রাজ্যের উটাহ কাউন্টিতে ভোট হয়েছিল ‘ভোটস’ নামের ভোটিং অ্যাপের সাহায্যে, ব্লকচেইন-ভিত্তিক প্রযুক্তির প্রয়োগে। এটা সম্ভব হয়েছে কারণ আমেরিকার বিভিন্ন অংশে ভোট হয় স্থানীয় নিয়মে। তার অনেক আগে, সেই ২০১৪-তেই, ডেনমার্কের রাজনৈতিক দল ‘লিবারাল অ্যালায়েন্স’ তাদের দলীয় নির্বাচনে ব্যবহার করেছে এই প্রযুক্তি। ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে প্রথম রাষ্ট্রীয় ভোট অবশ্য হয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনে, ২০১৮-তে। পরবর্তীকালে ব্লকচেইনের সাহায্যে ভোট নেয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে জাপানের সুকুবা শহরের ভোটে, ২০১৯-এ মস্কোর সিটি কাউন্সিলের ভোটে, ২০২০-এ রাশিয়ার সংবিধান সংশোধনের গণভোটে, এই সেপ্টেম্বরের রাশিয়ার পার্লামেন্টের নির্বাচনেও।

প্রাচীন গ্রিসে মাটির পাত্রের ভাঙা টুকরোকে ব্যবহার করা হতো ব্যালট হিসেবে। সেখান থেকে শুরু করে ইভিএম পর্যন্ত এসেই তো এই বিবর্তন থেমে যেতে পারে না। পরের ধাপে ব্লকচেইনের সার্বিক ব্যবহার তাই এক প্রকার নিশ্চিত। তবে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের আগে বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলোচনা-সমালোচনা, বাদানুবাদ হবেই।

রাশিয়া বা আমেরিকায় ব্লকচেইন প্রয়োগে কিছু দুর্বলতা দেখা গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে আরও উন্নত করতে চাইবেন এর প্রয়োগ-পদ্ধতি। আশা করা যায়, যথেষ্ট নিরাপদ হবে ভবিষ্যৎ ব্লকচেইন ভোটিং।

গণতন্ত্রে ভোটযন্ত্রের প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা যতটা দরকারি, তার চাইতে এতটুকু কম প্রয়োজনীয় নয় জনগণের মনে প্রত্যয় জাগানো যে, ভোট এবং তার গণনা নিরপেক্ষভাবেই হয়েছে। প্রযুক্তি যাচাই করে বিশ্বাসের আবহ বিস্তারের মূল দায়িত্ব অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের। অগণিত সাধারণ মানুষ তো প্রযুক্তি বোঝেন না। যে-সব বিশেষজ্ঞ ইভিএম-এর অ্যানাটমি বোঝেন, ব্লকচেইনের উন্নততর প্রযুক্তি হয়তো তাদেরও অনেকের আয়ত্তের বাইরে। তাতে অবশ্য বিশেষ সমস্যা নেই।

সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদরা ব্লকচেইন-ভোটিংকে সার্টিফিকেট দেবেন, প্রতিষ্ঠান একে ভরসাযোগ্য মনে করে তবেই এর প্রয়োগে উদ্যোগী হবে। প্রচারের মাধ্যমে জনগণের মনে এই যান্ত্রিক ভোটযন্ত্র সম্পর্কে প্রত্যয় জাগানোর চেষ্টাও হবে। তবু, ইভিএম বা ব্লক-চেইন পদ্ধতিতে ভোট হওয়ার পর কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা যে ভবিষ্যতে, বিশেষত ভোটে হারার পরে নতুন ভোটযন্ত্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না, তার গ্যারান্টি কে দেবে?

তাই ইভিএম হোক বা ব্লকচেইন-ভিত্তিক ভোটযন্ত্র, কিংবা ভবিষ্যতের অনাগত কোনো প্রযুক্তি, ভোটের ক্ষেত্রে কাগজের বিস্ময়কর ক্ষমতার বন্ধনের সঙ্গে ভোটযন্ত্রকে কুস্তি চালিয়ে যেতেই হবে। আমাদের লড়াইটা অবশ্য আরও অনেক পুরোনো, যা অন্তত ২০ বছর আগে শেষ হওয়ার কথা ছিল অর্থাৎ অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ভোটের আয়োজন নিশ্চিত করা। যা আপাত-অবাস্তব, অসম্ভব, অথচ অনিবার্য এক লড়াই।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক
অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে
‘অন্তর মম বিকশিত করো’
নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা
মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

শেয়ার করুন

জ্ঞানের বাতিঘর আপনি অনির্বাণ!

জ্ঞানের বাতিঘর আপনি অনির্বাণ!

আজীবন প্রগতিশীল আর মুক্তচিন্তার ধারক, অসাম্প্রদায়িক আদর্শের প্রবক্তা এই শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশকে সমার্থক বিবেচনা করেছেন সব সময়। ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম শতবর্ষ উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’র সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রেখে যাবার জন্য জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি অসামান্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।

মৃত্যু জীবনের এক অনিবার্য অধ্যায়। নশ্বর জীবন থেকে অবিনশ্বর জগতে আমাদের যেতেই হয়। অলঙ্ঘনীয় মৃত্যুর সত্য জেনেও মন কিছুতেই মেনে নিতে চায় না মৃত্যু। তবু চলে যেতে হয়, চলে যেতে দিতে হয়। এই নির্মম সত্য ভাবতে গেলে বিষণ্নতায় মন মেঘলা হয়ে যায়। মৃত্যু হচ্ছে চলমান জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতার আরেক নাম।

কিন্তু মানব জীবনের অনিবার্য এই নিয়তির মুখোমুখি হয়ে এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে যাবার পরেও কেউ কেউ মানুষের মনে বেঁচে থাকেন অনেক বছর, যদি তিনি হন চিরস্মরণীয় ব্যক্তি।

কথাগুলো মনে এলো জাতীয় অধ্যাপক, ভাষাসংগ্রামী ডক্টর রফিকুল ইসলামের প্রয়াণে। তিনি ব্যাক্তিগতভাবে আমার মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অগণিত শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক। কিন্তু দেশের কোটি কোটি মানুষের মনে এই জাতীয় অধ্যাপক পরম শ্রদ্ধার মানুষ। তিনি শিক্ষকদের শিক্ষক। তার চলে যাওয়া আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনসহ অগণিত সচেতন মানুষের মনে বিষাদের কালি ছড়িয়ে দিয়েছে।

বয়সের বিবেচনায় ৮৭ বছর মোটামুটি দীর্ঘায়ুই বলা যায়। তারপরও মনে হয় আহা যদি আরও কিছুদিন স্যার আমাদের মাঝে থাকতেন! এই আক্ষেপ এ কারণেই যে তিনি সাধারণ কোনো মানুষ নন। সৃজনে-মননে, পেশায় তিনি আমাদের জাতীয় জীবনের বাতিঘরতুল্য এক জ্ঞানতাপস। বাংলা ভাষা সাহিত্য ছিল তার জ্ঞানের মূল বিষয়। ভাষাতত্ত্ববিদ হিসেবে তার সুনাম দুই বাংলাতেই সমান বিস্তৃত।

ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে তার একাধিক বই রয়েছে। ‘ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধাবলী’ গ্রন্থটি পড়লে এ বিষয়ে তার জ্ঞানের গভীরতা এবং অধ্যয়নের বহুমাত্রিকতা যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন ভাষা এবং ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে। বাংলা ভাষা শুধু নয়, বিশ্বের অপরাপর ভাষাগোষ্ঠীর বিবর্তন এবং বাংলার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নির্ধারণে কৌতূহল ছিল তার অপরিসীম। গবেষক হিসেবে তিনি অসাধারণ নিষ্ঠাবান ছিলেন।

শিক্ষক হিসেবে অসামান্য স্মার্ট ছিলেন তিনি। কোনোদিন কাগজ দেখে পড়াননি। বাংলা ভাষার ক্রমবিবর্তনের বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর আন্তঃসম্পর্কের বিষয় ছিল তার নখদর্পণে। তার আরেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান নজরুল গবেষণা। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তিনি আজীবন গবেষণার বিষয় করে রেখেছিলেন। আমাদের ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা ঐতিহাসিক।

বায়ান্নো সালের মহান ভাষা আন্দোলনের বহু মূল্যবান আলোকচিত্র ধারণ করেছেন তার নিজের ক্যামেরায়, যা একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক দলিল বলে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে তার কাজ পথিকৃতের। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘বীরের এই রক্তস্রোত মাতার এ অশ্রুধারা’ এসব গ্রন্থ তারই স্বাক্ষর বহন করে। পরের বইটি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে লেখা। ডক্টর রফিকুল ইসলাম শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ওপরে প্রথম গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিষয়ে তার যে গবেষণামূলক রচনা ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে যেসব লেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পূর্বাপর ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল বিবেচিত হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছিলেন, শেরেবাংলা নগর ঢাকার কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে তার উপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। সেসব অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

বাংলা ভাষার ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষক হিসেবে তার যেমন ভূমিকা উজ্জ্বল, তেমনি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনা করেও তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে গেছেন। ঢাকা গবেষণায়ও রয়েছে স্মরণীয় ভূমিকা। তার লেখা ‘ঢাকার কথা’ ‘ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনার’ উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে।

এছাড়াও ‘বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ বছর’ এসব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে আকর গ্রন্থ। ‘বাংলা ব্যাকরণ সমীক্ষা’ আরেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন তিনি একসময়। একাডেমির ব্যাকরণ, অভিধানসহ ভাষাবিষয়ক প্রায় সব কাজে যুক্ত ছিলেন রফিকুল ইসলাম। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সভাপতি হিসেবে।

আরও বহুবিধ কারণে ডক্টর রফিকুল ইসলাম স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে জানার জন্য তার রচিত নজরুল-জীবনী একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। ‘নজরলজীবনী’ রচনার আগেও ‘কাজী নজরুল ইসলাম জীবন ও সাহিত্য’, ‘ছোটদের নজরুল’, ‘নজরুলনির্দেশিকা’,‘কাজী নজরুল ইসলামের গীতিসাহিত্য’ ইত্যাদি বিভিন্ন গ্রন্থে নজরুলকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন করেছেন রফিকুল ইসলাম। নজরুলের গানের সুর ও রাগের ওপরে তার পড়াশোনা ছিল অগাধ।

বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ একাধিক টিভি চ্যানেলে নজরুলগীতি নিয়ে বিশেষ সংগীতানুষ্ঠান গত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে গ্রন্থনা ও উপস্থাপনা করেছেন তিনি। যারা সেসব অনুষ্ঠান দেখেছেন তারা সম্যক উপলব্ধি করতে পারবেন নজরুলের সঙ্গীতের কত বড় নিষ্ঠাবান গবেষক তিনি। ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করেছেন তিনি নজরুলের গানের বাণী ও সুর।

সরকার যখন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ঢাকায় নজরুল ইন্সটিটিউট গড়ে তোলেন, সে সময়ও তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষক। নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের প্রধান হিসেবে যেমন, ট্রাস্টি হিসেবে তেমনই এই প্রতিষ্ঠানকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে উজ্জ্বল অবদান রেখে গেছেন জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।

পঞ্চাশের দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মেধাবী শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম ইমেরিটাস অধ্যাপক হয়েছেন, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন, জাতীয় অধ্যাপক হয়েছেন, কিন্তু তারপরও তিনি আজীবন ছাত্র হয়েই থেকেছেন। অর্থাৎ পড়াশোনা থেকে নিজেকে কখনো দূরে সরিয়ে রাখেননি। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরের পরেও ইউল্যাব ইউনিভার্সিটি এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে যেমন উপাচার্য হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন শিক্ষাবিস্তারে।

তার এই সাহিত্যনিষ্ঠা আর জ্ঞান পিপাসার একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ‘হাজার বছরের বাংলা সাহিত্য’ বইটি। এটি একটি সম্পাদিত সংকলন গ্রন্থ! সহস্রাধিক পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে ডক্টর রফিকুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের ক্রমবিকাশের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন। চার্জার কবি ভুসুকুপা থেকে এযুগের তরুণতম কবি পর্যন্ত, যাদের তিনি সাহিত্যের ইতিহাসের অংশ মনে করেছেন, সংকলিত করেছেন এই বিশাল আকৃতির গ্রন্থে।

এটি মাত্র ১০/১২বছর আগের কাজ তার। পঁচাত্তর অতিক্রান্ত একজন পণ্ডিত গবেষক শিক্ষাবিদ কতটা সচেতন হলে এ ধরনের একটি গবেষণামূলক কাজ সম্পন্ন করতে পারেন, সহজেই অনুমান করা যায়।

২০১৯ সালে এক কাজে স্যারের বাসায় যাওয়ার পর কথায় কথায় তিনি এই বইটির কথা বললেন, জানতে চাইলেন এটি আমার সংগ্রহে আছে কি না। বললাম স্যার এই বইটির দেখেছি নজরুল ইনস্টিটিউটে একজনের কাছে, আমার কাছে নেই। সঙ্গে সঙ্গে সেলফ থেকে বের করে বইটি দিতে দিতে বললেন, এখানে তোমার বৃক্ষমঙ্গলের একটি কবিতা আমি নিয়েছি। আমি মুগ্ধ বিষয়ে কৃতজ্ঞতা জানালাম।

রফিকুল ইসলামের গবেষণায় বাংলাদেশের সাহিত্যের ঐতিহ্য সমানভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। যে কারণে নজরুল যুগের কবি আব্দুল কাদিরের কবিতা এবং তার কবিজীবন গুরুত্ব পেয়েছে তার গবেষণায়। আব্দুল কাদির শিরোনামের ওই বইটি এ প্রজন্মের অনেকে হয়তো পড়েননি, অনেকেই দেখেনওনি। আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল আব্দুল কাদির, ‘আবুল মনসুর আহমেদ রচনাবলী’ সম্পাদনাও তারই কৃতিত্ব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ‘নজরুল অধ্যাপক’ রফিকুল ইসলাম ‘নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের’ও প্রথম পরিচালক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন উৎসব চলছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কিছুর জীবন্ত সাক্ষ্য এককালের ছাত্র ও শিক্ষক রফিকুল ইসলাম সে সময় চলে গেলেন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর শতবর্ষের ইতিহাস রচিত হচ্ছে। পথিকৃৎ কিন্তু রয়ে গেলেন রফিকুল ইসলাম। ২০০৩ সালে তিনিই প্রথম রচনা করেছিলেন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৮০ বছরের ইতিহাস’।

বাংলা ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি এবং নজরুল চর্চা ও গবেষণার এই মহিরুহ পণ্ডিত তার কাজের জন্য সব স্বীকৃতিই জীবদ্দশায় অর্জন করেছেন। স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, নজরুল একাডেমি পুরস্কারসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এই ২০২১ সালেই মাতৃভাষার সংরক্ষণ পুনরুজ্জীবন বিকাশচর্চা ও প্রচার প্রসারের সার্বিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এ বছরই এই পুরস্কারটি প্রবর্তন করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার তিনি নিয়ে গেলেন সেটি হচ্ছে অগণিত ছাত্রছাত্রীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা।

ছাত্র হিসেবে ক্লাস এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসে যেমন তাকে ঘনিষ্ঠভাবে জানবার সুযোগ হয়েছে, তেমনি দীর্ঘকাল দৈনিক পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে একজন লেখক এবং সাহিত্য সম্পাদকের সম্পর্কের দিক থেকেও রফিক স্যারকে দীর্ঘদিন গভীরভাবে দেখবার এবং জানবার সুযোগ হয়েছে। বাংলা আঞ্চলিক ভাষা কীভাবে বিবর্তিত হতে হতে অঞ্চলভেদে কত রূপ পেয়েছে তার স্বরূপসন্ধান তিনি দিয়েছিলেন আমাদের।

আজীবন তারুণ্যের সাধক ছিলেন তিনি। বয়স হয়েছিল এ কথা ঠিক কিন্তু বার্ধক্যকে কখনও মেনে নেননি তিনি। বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি নামসর্বস্ব সভাপতি থাকেননি। প্রত্যক্ষভাবে কাজ করবার মানসিকতা তার সব সময় অটুট ছিল। যে কারণে একাডেমির প্রতিটি সভায় তিনি উপস্থিত থাকতেন।

আজীবন প্রগতিশীল আর মুক্তচিন্তার ধারক, অসাম্প্রদায়িক আদর্শের প্রবক্তা এই শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশকে সমার্থক বিবেচনা করেছেন সব সময়। ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম শতবর্ষ উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’র সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রেখে যাবার জন্য জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি অসামান্য ভূমিকা পালন করে চলেছে।

কমিটির প্রধান নির্বাহী বা সদস্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী (কবি কামাল চৌধুরী) আর ডক্টর রফিকুল ইসলাম পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে এই গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন, বয়স তার কাজের জন্য কখনো বাধা হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে তার যে তারুণ্য দেখেছি সেই তারুণ্য তিনি বহাল রেখেছিলেন অশীতিপর পর্যায়েও। শরীর দুর্বল হয়ে হয়েছিল একথা ঠিক, কিন্তু কর্মস্পৃহা আর মনের জোরে তিনি সক্রিয় থেকেছেন হাসপাতালের আইসিইউতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত।

সুতরাং এমন উদ্যমী মানুষের মৃত্যু হয় না, জীবনব্যাপী অবদান এর মধ্যে তারা বেঁচে থাকেন কোটি কোটি মানুষের অন্তরে। রফিক স্যার বেঁচে থাকবেন তার বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞে এবং চির তারুণ্যের প্রেরণা হয়ে।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক, (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক
অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে
‘অন্তর মম বিকশিত করো’
নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা
মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

শেয়ার করুন

শিকড় সন্ধানী গবেষক রফিকুল ইসলাম

শিকড় সন্ধানী গবেষক রফিকুল ইসলাম

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে জেলখানায় বন্দি করে রাখা হয়। কিছুদিন জেলও খেটেছেন। তবে ওয়াশিংটন ডিসিতে তার কিছু বন্ধু ছিল। সেই বন্ধুরা এক সিনেটরের মাধ্যমে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে চাপ দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্ত করার জন্য। সেই চাপে অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে তিনিও মুক্তি পান। যদিও মুক্তির পর মুনাফেক ভুট্টোই আবার শিক্ষকদের খুঁজে বের করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মন্ত্রীদের বাড়ি ঘেরাও করলেন। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজ তখন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবন। সচিবালয়ের পাশাপাশি সেটাও ঘেরাও করলেন ছাত্ররা। সেটাই ছিল প্রথম সচিবালয় ঘেরাও।

সে ঘেরাওয়ে পিকেটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নাইমুদ্দিন আহমেদ, শওকত আলী, আজীজ আহমেদসহ অনেক ছাত্রনেতা। আন্দোলনে ছাত্রদের উপর লাঠিচার্জ করল ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ল পাকিস্তানি পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হলো অসংখ্য ছাত্রকে। পরিবারের সঙ্গে তখন রমনায় ফজলুল হক হলের উল্টো দিকে রেলওয়ে কলোনির বাসায় থাকতেন রফিকুল ইসলাম। তিনি তখন সেন্টগ্রেগরি স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র।

অপার কৌতূহল নিয়ে দূর থেকে প্রত্যক্ষ করলেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন; বঙ্গবন্ধুকে জীবনে প্রথম দেখলেন। ছাত্ররা মাটিতে শুয়ে সচিবালয়ের প্রবেশপথ আটকে দিয়েছিলেন। শেখ মুজিবকেও মাটিতে শুয়ে পড়তে দেখেছিলেন। আর দেখলেন একজন আহতকে (শওকত) রিকশায় করে মেডিক্যালে নিয়ে যাচ্ছেন শেখ মুজিব। ওটা ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথমপর্যায়।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের চূড়ান্তপর্যায় ছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। রফিকুল ইসলাম তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্রদের মিছিলে অংশ নিলেন তিনি। তার হাতে একটা ভয়েগল্যান্ডার ক্যামেরা। ক্যামেরায় ছবি তোলার শখ তার ছোটবেলা থেকেই। ১৯৪৩ সালে তার ছিল একটি ‘কোডাক’ ব্র্যান্ডের ‘সিক্স টুয়েন্টি বক্স’ ক্যামেরা। সে ক্যামেরা দিয়ে রমনার সৌন্দর্য ধরে রাখতেন ছবি তুলে তুলে। তখন এক রোল ফিল্মে আটটা সাদা-কালো ছবি উঠত। আর সে ছবি ডেভেলপ ও প্রিন্ট করতে চলে যেতেন নবাবপুর রোডের ‘ডস’ স্টুডিওতে।

ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশবিভাগ হলো ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক উৎসব হয়েছিল কার্জন হলের সামনের মাঠে। সে অনুষ্ঠানের ছবি তুললেন নিজের ক্যামেরায়। কিন্তু ছবিগুলো ভালো হয়নি। ১৯৪৮ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলনের মাস, মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে বোন ফাতেমা জিন্নাহসহ ঢাকায় এলেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

রমনার ঘোড়দৌড় মাঠের জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন জিন্নাহ। তার বক্স ক্যামেরায় সেদিনকার জনসভার ছবিও তুলেছিলেন রফিকুল ইসলাম। কিন্তু সে ছবিও ভালো হয়নি। তারপর ১৯৪৯ সালে এক বিলাতফেরত ভাইয়ের কাছ থেকে উপহার পেলেন জার্মানির তৈরি ক্যামেরা ‘ভয়েগল্যান্ডার’ ব্র্যান্ডের ফোর পয়েন্ট ফাইভ ল্যান্সরিফ্লেক্ট ক্যামেরা। যদিও ক্যামেরাটি ‘রোলি ফ্ল্যাস্ক’ বা ‘রোলি কড’-এর মতো অটোমেটিক ছিল না; অ্যাপারচার, ডিসটেন্স ও টাইমিং ঠিক করতে হতো হাতে। তবু এ ক্যামেরা দিয়ে জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, কলিম শরাফী, কামেলা শরাফীর মতো ব্যক্তিত্বের চমৎকার ছবি তুলেছিলেন।

আর তুলেছিলেন একটি জাতির উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ছবি। তার সবচেয়ে আলোচিত ছবি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলা ভবন প্রাঙ্গণে ছাত্রছাত্রীদের ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে রফিকুল ইসলাম বলেছেন-

“১৪৪ ধারা ভঙ্গের ছবি তোলার জন্য আমাকে কলাভবনের ছাদে উঠতে হবে। কিন্তু সমস্যা ছিল এই যে ছাদে ওঠার কোনো সিঁড়ি ছিল না, ছিল একটা ছোট ফোকর। ওই ফোকর দিয়ে আমার বন্ধুরা আমাকে ছাদে তুলে দিল। আমি সেখান থেকে আমতলার সভার এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন দলের লম্বা লাইনের ছবি তুলতে লাগলাম।”

(সূত্র: ভাষা আন্দোলনের ছবি তোলা: রফিকুল ইসলাম-প্রথম আলো ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪)

এছাড়া বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিল, ১৯৫৩ সালে ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের পিছনে অবস্থিত ঢাকা কলেজের পুরোনো ক্যাম্পাসে ইডেন কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রীদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রভাতফেরি, কলাভবনের উপর কালো পতাকা উত্তোলন, আজিমপুর গোরস্থানে শহীদ আবুল বরকতের কবরের পাশে মুর্শিদাবাদ থেকে আসা বরকতের মা, ঢাকার নয়াপল্টনে বসবাসকারী বরকতের বোন ও দুলাভাই, ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল শামসুজ্জামান চৌধুরী, উর্দু প্রফেসর আহসান আহমদ আশক ও ইডেন কলেজের প্রিন্সিপাল মিসেস ফজিলতুন্নেসা জোহা কর্তৃক ছাত্রছাত্রীদের বাধা দেয়ার ছবিসহ অনেক ছবি তুলেছিলেন। যে ছবিগুলো এখন বাঙালি জাতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।

শুধু ছবি তুলেই ক্ষান্ত ছিলেন না রফিকুল ইসলাম। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি আন্দোলনের সঙ্গেও সরাসরি জড়িয়ে পড়লেন। ১৯৫১ সালে ‘জবানবন্দী’ নামে মুনির চৌধুরীর একটি নাটকও মঞ্চস্থ করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমি করার দাবি জানানোদের মধ্যেও একজন ছিলেন তিনি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হলে তাদের দাবি অনুযায়ী বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা পায়।

জাতি হিসেবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অনেকগুলো কঠিন ও সংগ্রামময় অধ্যায় পেরিয়ে এসেছে বাঙালি। এর মধ্যে উল্লেযোগ্য ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর নির্বাচন, ছেষট্টির স্বাধিকার, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ। জাতির এসব প্রত্যেকটা গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যময় অধ্যায়ের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন রফিকুল ইসলাম। আর ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে প্রত্যেকটা অধ্যায়ে রয়েছে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৪৩ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রায় ছয়দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই কেটেছে তার দিনগুলো।

রফিকুল ইসলামের জন্ম ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার কলাকান্দা গ্রামের পাটওয়ারি বাড়িতে। তার বাবা মো. জুলফিকার আলী ছিলেন রেলওয়ে কর্মকর্তা ও ডাক্তার। মা জান্নাতুন নেছা। শৈশবের কিছুটা সময় গ্রামে থাকলেও, ঢাকায় ছিলেন স্থায়ী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়াশোনার পর, ভাষাতত্ত্বে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন ও গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়, মিশিগান-অ্যান আরবর বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন ১৯৫৮ সাল থেকে। পাশাপাশি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে গবেষণাও করতে থাকেন। নজরুলকে নিয়ে গবেষণা করার পিছনে ছিল তার শিক্ষক প্রফেসর মো. আব্দুল হাইয়ের অনুপ্রেরণা। মো. আব্দুল হাই তাকে বলেছিলেন, “নজরুলের উপর কোনো একাডেমিক কাজ হয়নি, তুমি নজরুলের জীবন ও কবিতার উপর কাজ শুরু করো।”

এরপর তিনি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন। কথা বলেন কবিপত্নী প্রমিলা দেবীর সঙ্গে।

রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশে প্রথম নজরুল গবেষক। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম নজরুল অধ্যাপক ও নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের প্রথম পরিচালক।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে জেলখানায় বন্দি করে রাখা হয়। কিছুদিন জেলও খেটেছেন। তবে ওয়াশিংটন ডিসিতে তার কিছু বন্ধু ছিল। সেই বন্ধুরা এক সিনেটরের মাধ্যমে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে চাপ দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মুক্ত করার জন্য।

সেই চাপে অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে তিনিও মুক্তি পান। যদিও মুক্তির পর মুনাফেক ভুট্টোই আবার শিক্ষকদের খুঁজে বের করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল। খবর শুনে বেশিরভাগ শিক্ষক পালিয়ে গিয়েছিলেন। পালাতে না পেরে হত্যার শিকার হয়েছিলেন ড. খায়ের। রফিকুল ইসলামের সামনেই হত্যার শিকার হলেন আরও অনেকে। তিনি ছিলেন সেসব গণহত্যার সাক্ষী।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশ পুনর্গঠন কাজে তার ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক অংশগ্রহণ। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছর’ নামে একটি বই লিখেছেন তিনি। সেটার সংশোধিত ও বর্ধিত সংস্করণ ‘শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ বইতে ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরেছেন।

এ ছাড়াও তার উল্লেখযোগ্য অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘নজরুল নির্দেশিকা’, ‘ভাষাতত্ত্ব’, ‘নজরুল জীবনী’, ‘বীরের এই রক্তস্রোতে মাতার এ অশ্রুধারা’, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম’, ‘ঢাকার কথা’, ‘ভাষা আন্দোলন ও শহীদ মিনার’, ‘কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও কবিতা’, ‘কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সাহিত্য’, ‘কাজী নজরুল ইসলামের গীতি সাহিত্য’, ‘শহীদ মিনার’, ‘আবদুল কাদির’, ‘বাংলা ভাষা আন্দোলন’, ‘বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ’, ‘ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধাবলী’, ‘অমর একুশে ও শহীদ মিনার’, ‘কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সৃষ্টি’, ‘কিশোর কবি নজরুল’ ইত্যাদি।

২০১৮ সালের ১৯ জুন তিনি জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত হন। অর্জন করেছেন স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়ার সময় বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিক্ষক ছিলেন রফিকুল ইসলাম। কর্মজীবনে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। ছিলেন কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের সভাপতি এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি। এছাড়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন রফিকুল ইসলাম। তার মতে, ‘‘আমাদের ’৫২, ’৬২র শিক্ষা, ’৬৬র স্বাধিকার, ’৬৯ গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০ নির্বাচন, ’৭১ অসহযোগ ও মুক্তিযুদ্ধ, এই যে এত ধারাবাহিকতা এত দ্রুত ঘটনাগুলো ঘটে গেছে এবং ক্রমশ এটা উত্তরোত্তর এত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। সমস্ত দেশ এমনভাবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সম্পৃক্ত হয়েছে এবং ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে পাকিস্তানি সশস্ত্র গণহত্যা শুরু করার পর সমস্ত দেশ যেভাবে একাত্ম হয়েছে- বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে কোথাও এ ধরনের ঘটনা নেই। আমরা হাজার বছর ধরে বহিরাগতদের দ্বারা শাসিত হয়েছি, শোষিত হয়েছি, নির্যাতিত হয়েছি, জাতিগত নিপীড়নের শিকার হয়েছি এবং দরিদ্র থেকে দরিদ্রতম হয়েছি এবং বিদেশি ভাষা দ্বারাও আমরা শাসিত হয়েছি। কিন্তু আমরা ফিরে দাঁড়িয়েছি ’৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে। তারপর আর আমরা পিছনে তাকাই নাই।”

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলাকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য তার ছিল নিরলস প্রচেষ্টা। এ বিষয়ে তার কিছু অভিমতও আছে। “যেসব কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যম ইংরেজি, তাদের জন্য তো বাংলা ভাষাটা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এখানে চার লেভেলে পরীক্ষা হয়। এ লেভেলে ১০০ মার্ক বাংলা আছে। যেখানে নাই, সরকারের উচিত ব্রিটিশ কাউন্সিলকে বলা যে, তোমরা হয় এ লেভেলে ১০০ মার্ক বাংলা ঢোকাও- আগে কিন্তু এটা ছিল- ক্লাস নাইনে বাংলাদেশে আমরা এলাউ করবো না। সবচেয়ে ক্ষতিকর কাজ হচ্ছে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সিরিয়ালে যে ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে এগুলো প্রমিত বাংলাও নয়, কোনো অঞ্চলের উপভাষাও নয়। চট্টগ্রামের না, ঢাকার না, সিলেটের না- কোনো অঞ্চলের নয়। এটা একটা জগাখিচুড়ি করে বাংলা ভাষাটাকে বিকৃতির চরমে নিয়ে গেছে। আমাদের বাংলা ভাষা এমন একটা সুন্দর ভাষা এবং একটা পরিমার্জিত ভাষা, সেটা অমার্জিত অশ্লীল ভাষায় রূপান্তর করার একটা চক্রান্ত ওই পাকিস্তান আমলে একবার হয়েছিল। এখন আবার হচ্ছে।”

(সূত্র: ভাষা আন্দোলনের সময় নিয়ে রফিকুল ইসলামের সাক্ষাৎকার-বেবী মওদুদ। বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটকম-২১ ফেব্রুয়ারি ২০১১)

বাংলাভাষার অন্যতম পুরোধা গবেষক, অন্যতম লেখক রফিকুল ইসলাম ৮৭ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন গতকাল ৩০ নভেম্বর। দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি তার প্রয়াণে শোকবার্তা জানিয়েছেন। তার প্রয়াণ বাংলা ভাষার গবেষণায় অপূর্ণতা রয়ে গেল। তবে তিনি বাঙালির জন্য রেখে গিয়েছেন তার অসংখ্য গবেষণাকর্ম, সাহিত্যকর্ম, আলোকচিত্রকর্ম।

আর এসব কর্মই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে বাঙালি হৃদেয়ে। শিকড় হয়ে রইলেন। আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি যেমন বলেছিলেন- “কলাভবনের সামনের বটগাছটা দেখেছেন? এটা আসল গাছটা নয়, জানেন? মুক্তিযুদ্ধের পর সিনেটর কেনেডি এসেছিলেন। তাকে দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কেটে ফেলা আসল গাছটির একটি অংশ লাগানো হয়। তবে এভাবে কি চাইলেই একটা গাছ কেটে ফেলা যায়? শিকড় তো রয়েই যায়।”

সহায়ক:

চাঁদপুরের চাঁদমুখ: সম্পাদনা আশিক বিন রহিম

Prof. Rafiqul Islam: A Witness to the Language Movement and the Liberation of Bangladesh-The Daily Star- Feb 17, 2018

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক
অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে
‘অন্তর মম বিকশিত করো’
নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা
মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

শেয়ার করুন

চিরভাস্বর সাংবাদিক চিশতী

চিরভাস্বর সাংবাদিক চিশতী

সাংবাদিক চিশতীর পুরো নাম চিশতী শাহ হেলালুর রহমান। তিনি ১৯৭১ সালে দৈনিক আজাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ছিলেন। থাকতেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ২১২ নম্বর কক্ষে। শুধু সাংবাদিকতা নয়, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই তরুণ একজন দক্ষ সংগঠকও ছিলেন। জহুরুল হক হলের ছাত্র সংসদের পাঠাগার সম্পাদকের দায়িত্বটিও ছিল তার।

একাত্তরের ২৬ মার্চ সকালে একজন পাকিস্তানি মেজর খুব কাছ থেকে পর পর তিনটি গুলি করে সাংবাদিক চিশতীর বুক বরাবর। প্রথম গুলিটি লাগার সঙ্গে সঙ্গে ‘জয় বাংলা’ বলে চিৎকার করেন চিশতী। সে শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বাংলার জমিনে ছিটকে পড়ে চিশতীর দেহটি। পাকিস্তানিদের বর্বর নিধনযজ্ঞে শুধু চিশতী নয়, তার মতো আরও হাজারো মানুষের তাজা-উষ্ণ রক্তের বিনিময়ে শুরু হয়েছিল ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক যাত্রা। যে কাব্যের শেষ অঙ্কে লালসবুজের পতাকা আর রক্তের দামে কেনা একটি মানচিত্র পায় সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি।

সাংবাদিক চিশতীর পুরো নাম চিশতী শাহ হেলালুর রহমান। তিনি ১৯৭১ সালে দৈনিক আজাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ছিলেন। থাকতেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ২১২ নম্বর কক্ষে। শুধু সাংবাদিকতা নয়, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই তরুণ একজন দক্ষ সংগঠকও ছিলেন।

জহুরুল হক হলের ছাত্র সংসদের পাঠাগার সম্পাদকের দায়িত্বটিও ছিল তার। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির সহসভাপতি ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন চিশতী শাহ হেলালুর রহমান।

হলের হাজারো ছাত্রের মধ্যে চিশতীকে সহজেই চেনা যেত তার আলাদা বৈশিষ্ট্যের জন্য। তিনি বঙ্গবন্ধুর মতোই সাদা কাপড়ের পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন। তিনিও মোটা ফ্রেম এবং খুব ভারী কাচের লেন্সের চশমা পরতেন চিশতী, ছিলেন গ্লুকোমার রোগী। চুলের মাঝখান দিয়ে সিঁথি কাটতেন বলে সহজেই চিশতীকে আলাদা করে চেনা যেত। সবসময় হাসি লেগেই থাকত তার মুখে।

আগাগোড়া রাজনীতি-সচেতন চিশতী ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১১ দফা আদায়ের এক মিছিলে ‘আইয়ুব-মোনেম ভাই ভাই, এক রশিতে ফাঁসি চাই’- উচ্চকণ্ঠে এই স্লোগান দিতে দিতে বর্বর পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন তিনি। রাইফেলের বাটের আঘাতে থেঁতলে যায় তার এক পা।

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতেও প্রতিবাদ সমাবেশে সবসময় সামনের সারিতে ছিলেন চিশতী। যার বর্ণনা পাওয়া যায় তার বন্ধু মফিজুল ইসলামের বর্ণনাতে। মফিজুল ‘আমার বন্ধু’ শিরোনামের এক লেখাতে মার্চের উত্তাল দিন, তথা চিশতীর জীবনের শেষ দিককার বর্ণনা তুলে ধরেছেন বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘স্মৃতি: ১৯৭১’ সংকলনে। মফিজুল ইসলাম লিখেছেন-

“চিশতী এদেশের মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির একটি সংগ্রামী কণ্ঠ। পয়লা মার্চ দুপুরের দিকে ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণের পর পরই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান দিতে দিতে এক বিশাল ছাত্র জনতাকে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় চিশতী। মনে হলো, যেন হাজার বছরের জমে থাকা আগুন একসঙ্গে জ্বলে উঠল ওর কণ্ঠ। ... স্লোগানের ঐ কণ্ঠে কী যে এক বিদ্রোহী চেতনা বুকের মধ্যে জেগে উঠতো, তা বুঝানো যাবে না।” (পৃষ্ঠা ৪১৭, প্রথম খণ্ড, স্মৃতি: ১৯৭১)

শুধু তাই নয়, ৫ মার্চ সেসময়ের ইকবাল হলে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলে সালাম জানান চিশতী। শপথ নেন স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার। এর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের টানা অসহযোগ কর্মসূচি আর দুর্বার আন্দোলনের মধ্যে বাঙালি জাতির জীবনে আসে ২৫ মার্চ কালরাত। যে রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অন্যতম টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ করে জহুরুল হক হল (সেসময়ের ইকবাল হল)।

কারণ, এ হল ছিল আন্দোলনের দুর্গ; এছাড়া আন্দোলনের সামনের সারির ছাত্র-নেতারা এই হলেই থাকতেন। এখান থেকেই ঘোষিত হতো বিভিন্ন কর্মসূচি, আসত গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত। ইতিহাসের বর্বর ওই রাতে হলটির উপর প্রবল আক্রোশে গোলাবর্ষণ করে পাকিস্তানি সেনারা।

যা থেকে বাঁচতে চিশতী তার হল আর মিলনায়তনের মধ্যকার শেডের উপর লাফিয়ে পড়েন এবং সারারাত ওখানেই অবস্থান করেন। দিনের আলো ফোটার পর সেখান থেকে মাথা উঁচু করতেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান চিশতী। এরপর তাকে নেয়া হয় পুকুরের পাশে একজন পাকিস্তানি মেজরের সামনে। সেখানেই চিশতীকে হত্যা করা হয়।

সাংবাদিক চিশতীকে হত্যার বর্ণনায় তার বন্ধু মফিজুল ইসলাম আরও লিখেছেন-

“দৈনিক আজাদের বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করল চিশতী। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। হলের পেছন দিক থেকে ডাইনিং হলের দিকে যেতে যে সরু রাস্তাটা- তারই পাশে ড্রেনের কাছে গাছটির নিচে দাঁড় করিয়ে পর পর তিনটি গুলি করা হয় চিশতীকে।” (পৃষ্ঠা ৪১৮, প্রথম খণ্ড, স্মৃতি: ১৯৭১)

২৭ মার্চ জহুরুল হক হলের মাঠে লাশের সারির মধ্যে চিশতীকে খুঁজে পেয়েছিলেন কবি নিমর্লেন্দু গুণ। হাজারো লাশের মিছিলে একজন চিশতীর স্মৃতি রক্ষায় এই কবি লেখেন-

“জহুর হলের মাঠে শুয়ে আছে একদল সারিবদ্ধ যুবা,

যন্ত্রণাবিকৃত মুখ তবু দেশমাতৃকার গর্বে অমলিন।”

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক
অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে
‘অন্তর মম বিকশিত করো’
নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা
মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

শেয়ার করুন

রাজস্ব প্রশাসন ও করজাল সম্প্রসারণে করণীয়

রাজস্ব প্রশাসন ও করজাল সম্প্রসারণে করণীয়

করের আওতা সম্প্রসারণ করে, করহার সুষম করে, প্রয়োজনীয় অটোমেশন সম্পন্ন করে মোট দেশজ উৎপাদনে করের অনুপাত বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য থাকলেও উদ্দেশ্য অর্জনে বিলম্ব হচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০২১ সালের মধ্যে কর জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার স্বপ্ন এখনও অধরা থেকে গেল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও ২০৪১ সালের মধ্যে এ অনুপাত ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে। এনবিআর পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করলে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে উদ্বুদ্ধকরণ ও নৈতিক দায়িত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের দায়িত্ব মূলত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপরই ন্যস্ত। এ সংস্থার অধীন কর, মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) ও কাস্টমস কমিশনারেটগুলো বার্ষিক বাজেটে এদের ওপরে ন্যস্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে রাজস্ব আহরণে সচেষ্ট থাকে। বাজেট প্রণয়নের সময় এনবিআর প্রয়োজনে জাতীয় সংসদের মাধ্যমে আইন পরিবর্তন বা সংশোধন এবং প্রশাসনিক আদেশ ও প্রজ্ঞাপন জারি করে সর্বোচ্চ রাজস্ব আহরণের চেষ্টা করে। এসব সংশোধন ও পরিবর্তনে কর হ্রাস-বৃদ্ধি ছাড়াও নীতি সহায়তা থাকে, যার ফলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটে, ফলে স্বাভাবিকভাবে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ে। মূলত রাজস্ব প্রবৃদ্ধিনির্ভর করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা, আমদানি-রপ্তানি, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সরকারি রাজস্ব ও প্রকল্প বরাদ্দের সুষ্ঠু ব্যয় এবং সর্বোপরি রাজস্ব সংগ্রহে নিয়োজিত কর্মচারীদের পেশাদারত্বের ওপর।

কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটি রাজস্বের এ তিনটি শ্রেণিকে সাধারণত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিগত সরকারগুলো বার্ষিক বাজেট ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়নে চেষ্টা করে। সরকার, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং ভোক্তা জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ক্রমান্বয়ে কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। ফলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ভোগ চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা বছর শেষে জিডিপির আকার ও শতকরা প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। তাই দেখা যায়, ১৯৭২-৭৩ সালের ৮ বিলিয়ন ডলার জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১ সালে ৪০৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।

সময়ের ব্যাপ্ত পরিসরে দেশের রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ সম্পদের অবদান বাড়তে থাকে এবং বৈদেশিক ঋণের নির্ভরতা কমতে থাকে। বিগত প্রায় ৩০ বছর ধরে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে ৭-২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও দেশের কর জিডিপির অনুপাত ১০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারেনি, বরং বিগত দু’বছর কর জিডিপির অনুপাত ৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে আমাদের করের পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিম্নতম। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের হিসাব মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালের কর জিডিপির অনুপাত সবচেয়ে বেশি- প্রায় ১৯ শতাংশ।

ভারতের কর জিডিপির অনুপাত ১২ শতাংশ, ভুটানের ১৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১.৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১ শতাংশ। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় অনুপাত প্রায় ১৮ শতাংশ। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কর জিডিপির অনুপাত ৩৫-৪০ শতাংশ। বিগত বছরগুলোতে বাজেট প্রণয়নের সময় কর জিডিপির অনুপাত ১০-১১ শতাংশ অনুমান করলেও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় আমাদের দেশের এ অনুপাত নিম্নমুখী হয়েছে।

আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মানুষের অনীহা আগে যা ছিল, এখনও তেমন আছে। অনভ্যাস, অনিচ্ছা, শঙ্কা, আইন অমান্যের প্রবণতা, দেশপ্রেমের অভাব প্রভৃতি কারণে সামর্থ্য থাকলেও দেশের মানুষ কর প্রদান করতে চায় না। বছরে প্রচুর টাকা মানুষ বাজে খরচ কিংবা অপেক্ষাকৃত অল্প প্রয়োজনে খরচ করে। এর কিছু অংশ কর দিলেও নৈতিক দায়িত্ব পালন করা হয়। শুধু ব্যক্তিশ্রেণি নয়, ব্যবসায়ীদের মধ্যেও কর ফাঁকির প্রবণতা বিদ্যমান।

আমাদের দেশের ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা জনসংখ্যার অনুপাতে মাত্র ১ শতাংশের মতো। গত বেশ কবছর ধরে আয়কর মেলা এবং নানা বিজ্ঞাপনমূলক প্রচারণা সত্বেও আয়কর রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা ২৪-২৫ লাখের উপরে তোলা যায়নি।

উৎসে কর, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদির কর বিবেচনায় প্রায় ১ কোটি লোক কোনো না কোনোভাবে কর দেয় বলে ধরা যায়। জমি ক্রয়, নানাক্ষেত্রে আয়কর রেয়াত, ব্যাংক এবং অন্যবিধ সেবাদাতার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষ ই-টিআইএন নম্বর নিয়ে থাকে। বর্তমানে দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ। বাস্তবে এর ৩৫ শতাংশ মাত্র রিটার্ন জমা দেয়। আবার রিটার্ন জমাদানকারীদের একটা বড় অংশ ০ (শূন্য) কর দেয়।

অনুরূপভাবে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সকলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর দেয় না। ব্যবসার আকার ও ধরনভেদে যেখানে ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয় না, সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে কর দেয়। করের আওতা সম্প্রসারণ এনবিআরের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করহার কমানো হয়েছে ব্যক্তিশ্রেণি ও কর্পোরেট উভয় ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট করহার বেশি বলে আমাদের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছে।

সেজন্য গত চার বছরে করপোরেট করহার সাড়ে ৭ শতাংশ কমানো হয়েছে। বর্তমানে এ হার ৩০ শতাংশ, তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে সাড়ে ২২ শতাংশ। নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এ হার ২৫ শতাংশ। তবে সিগারেট ও তামাকজাত দ্রব্য এবং মোবাইল কোম্পানির করপোরেট করহার সবচেয়ে বেশি- ৪৫ শতাংশ। সরকার এই দুই উৎস থেকে যেমন কর পায় বেশি তেমনি এসব কোম্পানির কর প্রদানে মোটামুটি স্বচ্ছতা রয়েছে। ব্যাংক খাতের করহারও তেমন কমানো হয়নি। তিনটি খাত উচ্চ করহার মেনে নিয়েছে।

ব্যবসা সহজীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ডিজিটালাইজেশন ও আইসিটি সেবা সম্প্রসারণ প্রভৃতি কারণে কর রেয়াত, নিম্ন করহার, কর অব্যাহতি প্রভৃতির প্রচলন রয়েছে। আবার কোনো কোনো বিশেষ দ্রব্য ও সেবায়ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর হ্রাসকৃত হারে নেয়ার নজির রয়েছে। এসব কারণে এনবিআর এর রাজস্ব আহরণ কম হয়। তাই রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য এনবিআরকে নানা ফন্দি-ফিকির বের করতে হয়।

গত প্রায় দুই দশক যাবৎ উৎসে অগ্রিম কর, কর্তন কর আহরণের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। আয়করের প্রায় ৮০ শতাংশের অধিক উৎসে কর থেকে আদায় হয়। এছাড়া ব্যক্তি কিংবা ব্যবসায়ী উভয় শ্রেণিতেই করজাল তেমন সম্প্রসারণ হয় না বিধায় চালু করদাতাদের কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় কর বা বাড়তি কর আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এতে হয়রানির অভিযোগও পাওয়া যায়।

কর প্রদানে মিথ্যা ঘোষণা অনেক দিন ধরে আমাদের দেশে চলে আসছে। ‍প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় করের ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অনেক ব্যবসায়ী তাদের বিক্রয় ও লাভের পরিমাণ কম দেখায়। আবার আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে মিথ্যা ঘোষণায় এবং ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। শুধু তাই নয়, বিদেশে অর্থপাচারের একটা বড় অংশ যায় আমদানি-রপ্তানি দ্রব্যমূল্যের ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। ব্যবসাভিত্তিক অর্থপাচার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং কেইস ধরা পড়লে উচ্চহারে করারোপ ও জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

কাস্টমস আইন ও কর আইন সংশোধন ও যুগোপযোগী করার জন্য ৬-৭ বছর যাবৎ কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কাস্টমস আইন জাতীয় সংসদ থেকে ৩ বার ফেরত এসেছে। বর্তমানে কাস্টমস আইন, আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগের ভেটিংয়ের জন্য পরীক্ষাধীন রয়েছে। নতুন কর আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। উভয় আইন বলবৎ হলে ব্যবসা, কর সংগ্রহ ও রাজস্ব প্রশাসনে সুশাসন ফিরে আসতে পারে।

রাজস্ব প্রশাসন অটোমেশনের আওতায় আনার প্রচেষ্টা গত শতাব্দীর নব্বই দশকেই শুরু হয়। কাস্টমস অফিসে এসাইকুডা সিস্টেম চালু করে স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়ন শুরু হয় ১৯৯৩-৯৪ সালে। বর্তমানে এ সিস্টেম আপগ্রেড করে এসাইকুডা++ সিস্টেম চালু হয়েছে। এ ব্যবস্থায় সকল কিছু যেমন- শিপিং ডকুমেন্ট, ইনভয়েস, দ্রব্যের পরিমাণ ইত্যাদি অনলাইনে আসার কথা থাকলেও কাস্টমস অফিস এখনও আমদানিকারকদের যাবতীয় মূল কাগজপত্র দাখিল করতে বলে।

নানা জটিলতা ও জালিয়াতির সম্ভাবনায় অনলাইন ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে ডিজিটাল কর ব্যবস্থা প্রণয়নের চেষ্টাও দীর্ঘদিনের। তবে অনলাইনে টিআইএন সংগ্রহ বা কর নিবন্ধন চালু হয় ২০১৩ সালে, অনলাইন পেমেন্ট চালু হয়েছে ২০১২, অনলাইন রিটার্ন দাখিল কার্যক্রম ২০১৬ সালে। তবে ই-টিআইএন সংগ্রহ ছাড়া অন্য দুটি ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়নি; ফলে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নও হয়নি।

১৯৯১ সালে প্রণীত মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন ২০১২ সালে সংশোধিত হওয়ার কথা থাকলেও এটি সংশোধিত আকারে জারি হয় ২০১৯ সালে। এনবিআরের প্রত্যাশা ছিল, এ আইন জারির ফলে ভ্যাট আহরণে স্বচ্ছতা ও গতি আসবে এবং করের সংগ্রহ বাড়বে। কিন্তু এ আইনের বিভিন্ন ধারায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতপার্থ্যক্যের কারণে ব্যবসা সহজীকরণ, উদ্যোক্তাদের উৎসাহ প্রদান এবং একই সঙ্গে রাজস্ব বৃদ্ধির কথা বিবেচনায় রেখে গত ২টি বাজেটে এ আইনে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়।

দ্রব্য ক্রয়ের সঙ্গে সাধারণ মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্যাট প্রদান করলেও অনেক ব্যবসায়ী আদায়কৃত ভ্যাট সরকারকে প্রদান করে না। অসৎ ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ফাঁকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিসের অসৎ কর্মচারীরাও যুক্ত থাকে। সেজন্য ভ্যাট আদায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় আনার স্বার্থে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইলেক্ট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বসানোর সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু গত ২ বছরে মাত্র ৩৫০০ ইএফডি মেশিন স্থাপন সম্ভব হয়েছে। দেশের অন্তত ৭ থেকে ১০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ মেশিন সচল থাকলে বর্তমানে আদায় করা ভ্যাটের তিন-চার গুণ ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হতো বলে অনেকের ধারণা।

বিগত কবছর দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৩২-৩৩ শতাংশ আসে প্রত্যক্ষ কর থেকে, ৩৮-৩৯ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে আর বাকি রাজস্ব আদায় হয় কাস্টমস শুল্ক হিসেবে। ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীশ্রেণির করজাল সম্প্রসারণ করে ২০২০-২১ সালের মধ্যে কর রাজস্ব ৫১ শতাংশে উন্নীত করার একটি পরিকল্পনা এনবিআরের ছিল। কিন্তু এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

সমুদ্র ও স্থলবন্দর দিয়ে আগত আমদানি ও বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত রপ্তানির স্বচ্ছতা, ঘোষণা ফাঁকি ইত্যাদি রোধকল্পে বন্দর কাস্টমস অফিসে উন্নতমানের বৃহদাকার স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের একটি পরিকল্পনা প্রায় দুবছর আগে নেয়া হলেও এখনও ক্রয়কাজে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

করজাল ‍বৃদ্ধি, কর সংগ্রহের গতি আনা, সব জেলা ও উপজেলায় রাজস্ব অফিস স্থাপন এবং কর জরিপ পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ব্যাপক বৃদ্ধি পেলেও ২০১১ সালের পর রাজস্ব প্রশাসনে আর কোনো সংস্কার হয়নি। জনবল ও অফিস সংখ্যা বৃদ্ধি তথা প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য কয়েক বছর আগে প্রস্তাব প্রণীত হলেও এ প্রস্তাব সরকারের অনুমোদনের জন্য এখনও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বিলম্বিত হচ্ছে।

করের আওতা সম্প্রসারণ করে, করহার সুষম করে, প্রয়োজনীয় অটোমেশন সম্পন্ন করে মোট দেশজ উৎপাদনে করের অনুপাত বৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য থাকলেও উদ্দেশ্য অর্জনে বিলম্ব হচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০২১ সালের মধ্যে কর জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার স্বপ্ন এখনও অধরা থেকে গেল। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও ২০৪১ সালের মধ্যে এ অনুপাত ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে। এনবিআর পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করলে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সঠিকভাবে উদ্বুদ্ধকরণ ও নৈতিক দায়িত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে নিচের সুপারিশগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক:

১. কর প্রদানে জনগণের ‘ভয় ও দ্বিধা’দূর করে সক্ষম করদাতা ও ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে কর প্রদানে আগ্রহী করে তুলতে হবে। সেজন্য কর কর্মকর্তাদের সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। কর অফিসে ‘হয়রানি’দূর করতে হবে।

২. রিটার্ন দাখিল ফর্ম ও জমাদান প্রক্রিয়াটি যথাসম্ভব সহজ করতে হবে। কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন সহজ, গ্রহণযোগ্য ও বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৩. কর আইন এমনভাবে যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে ব্যবসা সহজ ও কর আদায় বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইন ও বিধির স্পষ্টতা থাকলে আইন অমান্য করা কিংবা হয়রানির সুযোগ থাকবে না।

৪. রাজস্ব প্রশাসনে দক্ষতা আনয়নের জন্য দেশ-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের নীতি নৈতিকতার প্রশিক্ষণও প্রয়োজন। এনবিআরের অধীন কর এবং ভ্যাট ও কাস্টমস ক্যাডারের সম্প্রসারণ এবং কর ও শুল্ক অফিস সম্প্রসারণ করে উপজেলাপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা প্রয়োজন। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে রাজস্ব উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

৫. বন্দরের শুল্ক অফিসের আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং পর্যাপ্ত স্ক্যানার স্থাপন করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সবরকম ফাঁকি ও অনিয়ম বন্ধ করে স্বচ্ছতা আনতে হবে। অনুরূপভাবে মূল্য সংযোজন আদায়ে শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য হোটেল-রেস্তোরাঁ, দোকান-পাট, সুপার মার্কেট, শপিংমল প্রভৃতি বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে ইএফডি মেশিন স্থাপন করতে হবে।

৬. সর্বোপরি কম্পিউটারাইজেশন, ডিজিটালাইজেশন, আধুনিকায়ন, অটোমেশন যা-ই বলি না কেন এতে এনবিআর কর্মকর্তাদের শতভাগ সম্পৃক্ততা ও অংশীদারত্ব থাকতে হবে। এ ধরনের যে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পর যাতে কর্মকর্তারা প্রক্রিয়াটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে পারে সে ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিতে ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিভাগীয় কর্মকর্তারা কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অটোমেশনে স্থায়িত্ব আনা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সিনিয়র কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের বিশেষ মনোযোগী ও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায় থেকে উন্নয়নশীল মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। জিডিপির আকার বেড়েছে, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, দেশে অন্তত চার কোটি লোক কর প্রদানে সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদেরকে করের আওতায় আনার উপায় উদ্ভাবন করতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাতে বিশ্বে সর্বনিম্ন স্থান থেকে বেরিয়ে এসে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে সরকারকে আরও পারদর্শিতা দেখাতে হবে।

লেখক: বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, জার্মানি। সাবেক সিনিয়র সচিব ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর।

আরও পড়ুন:
অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক
অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে
‘অন্তর মম বিকশিত করো’
নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা
মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

শেয়ার করুন

বানর ও হাতি নিধন বন্ধ হোক

বানর ও হাতি নিধন বন্ধ হোক

হাতি তার শারীরিক শক্তি ও আকার নিয়ে যত সহনশীল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিজপরিসরে বসবাস করে আসছে তা অতুলনীয় ব্যাপার। হাতি তার শ্রেষ্ঠত্বে কখনও উন্মাদ হয়নি। নিজেকে সংযত করে অন্যদের সঙ্গে সখ্য ও ভারসাম্য বজায় রেখে প্রাণিরাজ্যে বাস করে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া হাতি লোকালয়ে আসেনি, তার দরকার হয়নি। মানুষ সে পরিস্থিতি আজ তৈরি করেছে। তাকে লোকালয়ে আসতে বাধ্য করছে।

‘‘আমাদের ঘরে ঘরে প্রতিনিয়ত চলছে হত্যাকাণ্ড। আমরা মশা মারি, মাছি মারি, পিঁপড়ে মারি, ছারপোকা মারি আর মারি তোলাপোকা-ক্বচিৎ ইঁদুরও। আর খাদ্য হিসেবে পশুপাখি ও সবজি হিসেবে এবং ফল হিসেবে উদ্ভিদও মারি। কাজে হত্যা দিয়ে হনন দিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জাগ্রত মুহূর্তগুলো কাটে’’-আহমদ শরীফ-এর ডায়রি; ভাব-বুদ্বুদ; জাগৃতি প্রকাশনী (২য় সংস্করণ; ২০১৫)।

তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্ধৃত করে আরও বলছেন- হত্যা অরণ্যের মাঝে/হত্যা লোকালয়ে/হত্যা বিহঙ্গের নীড়ে/কীটের গহ্বরে/অগাধ সাগরে জলে/নির্মল আকাশে/হত্যা জীবিকার তরে/হত্যা খেলাচ্ছলে/হত্যা অকারণে/হত্যা অনিচ্ছার ফলে।

আহমদ শরীফ-এর আরও আহবান- হত্যা এড়ানোর যুগান্তর আসন্ন, হত্যা কমানোর প্রয়াস আমাদের মানবিক দায়িত্ব।

সম্প্রতি হাতি হত্যাকাণ্ড বেড়ে চলেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০০৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বছরে তিন থেকে চারটি করে হাতি হত্যার শিকার হতো। ২০২০ সালে ১২টি হাতি হত্যা করা হয়। এ বছর ইতোমধ্যে হাতিহত্যার সংখ্যা ৩৩-এ দাঁড়িয়েছে । বন দখলকারী একটি চক্র ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে হাতি হত্যা করাচ্ছে, শেরপুর, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে একই কায়দায় হাতি হত্যা করা হচ্ছে। বিষয়টি আদালতের নজরেও আনা হয়েছে।

হাতিহত্যার জন্য ভাড়াটে খুনিদের কাজে লাগানো হচ্ছে এবং নেপথ্যে কাজ করছে বনভূমি দখল। দখলের মনোবাসনা আজ এতটাই তিব্র যে, অভয়ারণ্য-জল, জঙ্গল-তরঙ্গ সবকিছু করয়াত্ত করার হিংস্র বাসনা পেয়ে বসেছে আমাদের। জনমনোভঙ্গি হলো- প্রকৃতিতে কেবল মানুষ থাকবে আর কেউ না। একেই বলে একীকরণ প্রক্রিয়া। অর্থাৎ একক অবস্থান। মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশে বাস করার যোগ্যতা হারাচ্ছে।

প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্ব সে মুখে মুখে আলোচনা করে, সভা-সেমিনার করে, জাতীয় ও আন্তজার্তিক ফোরামে নানা নীতি-কাঠামো বানায় কিন্তু দিনশেষে এগুলো কাজে লাগছে না। প্রাণী অধিকার আজ কাগজ ও ক্যাবিনেটে-বন্দি। একটা কাগজ উৎপাদন করে তা বন্দি করতে পারাতেই পৌরুষত্ব। দিনে দিনে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্ব মূল্যহীন হয়ে উঠছে। হৃদয়হীন কংক্রিট দিয়ে সবুজ অরণ্য ও তার অনুষঙ্গ বধের অপতৎপরতা চলছে সবখানে। বাংলাদেশ হলো আজ অনেকগুলো নিষ্ফলা দলিলের সমষ্টি।

মানুষের প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে জানাশোনার পরিধি যত বাড়ছে, অনুভূতির ব্যাপ্তি তত ছোট হচ্ছে। প্রকৃতিতে বিরূপ এক বন্যতা জেঁকে বসেছে। মানুষের মনুষ্যত্বের চেয়ে তার প্রাণিত্ব বড় হয়ে উঠছে। মানুষের প্রথম পরিচয় প্রাণী; প্রাণী হিসেবে মানুষ কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ, মদ-মাৎসর্যে চালিত হয় আর মানুষ হিসেবে সে কৃপা-করুণা, দয়া-দাক্ষিণ্য সংযমে, সহিষ্ণুতায় বিবেকানুগত্য ও ন্যায্যতা-ক্ষমা, ধৈর্য-অধ্যবসায়, আদর্শনিষ্ঠায় অসামান্য হয়ে ওঠে (পূর্বোক্ত)।

মনুষ্যত্বের পরিচয় ডিঙিয়ে যদি প্রাণিত্বের পরিচয় বড় হয়ে ওঠে অর্থাৎ লোভই যদি শাসনের সূচক হয় তাহলে তো বুঝতে হবে আমরা এক বড় চোরাবালিতে আটকে পড়েছি। কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরী সংস্কৃতির সংজ্ঞায় যর্থাথই বলেছেন- একজন সংস্কৃতিমান মানুষের পক্ষে অন্যায় নিষ্ঠুরতা দেখানোও সম্ভব নয়। অর্থাৎ যেখানে নিষ্ঠুরতা সেখানে অসভ্যতা বা বর্বরতা। শুভ্রতার বিপরীতে অশুভ্রের সাধনায় আমরা নিবিষ্ট হয়ে পড়েছি। স্বার্থ ও লোভের সাধনা আজ মূল প্রেরণা।

জনমনস্তত্ত্বে হিংস্রতার বসতবাড়ি, যেখানে কোনো সংবেদের উপলক্ষ নেই। অপরিশোধিত মানুষের ঘনবসতি আজ বাংলাদেশ। বিযুক্তি ও হননের তিব্র আকাঙ্ক্ষার লকলকে জিভ চারদিক। লোভের বাসনা এমন রোগ যা থাকলে আর কোনো অসুখ লাগে না। এ নীচুতা কুরে কুরে খাচ্ছে আমাদের পাবলিক সাইকিকে।

একটি প্রাণ যখন আরেকটি প্রাণ হনন করতে চায় তখন তার চেয়ে করুণ বিষয় আর কিছু হতে পারে না। হনন পূর্বপ্রস্তুতি মানুষের মনুষ্যত্বের পরিচয়টি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অমানুষ করে তোলে। অর্থাৎ যেকোনো হনন অপপ্রয়াস একটি সাংঘাতিক বন্যপ্রস্তুতি। এক প্রস্তুতিচর্চা আজ একক ও যৌথ, কূটকৌশলে। অর্থাৎ এ বিমানবীকরণ প্রচেষ্টা একক কোনো তৎপরতা নয়, ক্ষুদ্র দলীয় বা বড় স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর কালো অন্তর্জাল।

শুভ কাজের তুলনায় অশুভ কাজে বাঙালির পেশাদারী উৎকর্ষ আজ বেড়েছে অনেক গুণ। থাকছে অভিনব সব অপকৌশল। অপরাধ কৌশলে অভিনবত্ব ও সংযুক্তি বিস্ময় জাগায়। মানুষরূপী এসব কীটদের জঘন্য মানসিকতা পাঠের অযোগ্য।

হাতি তার শারীরিক শক্তি ও আকার নিয়ে যত সহনশীল ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিজপরিসরে বসবাস করে আসছে তা অতুলনীয় ব্যাপার। হাতি তার শ্রেষ্ঠত্বে কখনও উন্মাদ হয়নি। নিজেকে সংযত করে অন্যদের সঙ্গে সখ্য ও ভারসাম্য বজায় রেখে প্রাণিরাজ্যে বাস করে আসছে হাজার হাজার বছর ধরে। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া হাতি লোকালয়ে আসেনি, তার দরকার হয়নি। মানুষ সে পরিস্থিতি আজ তৈরি করেছে। তাকে লোকালয়ে আসতে বাধ্য করছে।

হাতির শরীরের স্নিগ্ধতা ও সারল্য যে অনুভব করেনি তার চেয়ে দুর্ভাগা আর কে আছে! আফ্রিকান এক প্রবাদে বলা হয়েছে, হাতি নিজদায়িত্বে তার শুঁড় বয়ে বেড়ায়। অর্থাৎ নিজদায়িত্ব সম্পর্কে হাতি খুব সচেতন এবং সে তা সুচারুভাবে প্রতিপালন করে। বলা হয়, পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে বড় কিন্তু ক্ষতিকর নয় এমন একটি প্রাণী হলো হাতি। হাতি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও দায়িত্বশীল প্রাণী।

বাঙালির কাছে স্বার্থ যখন মুখ্য তখন গুণবিচার মূল্যহীন। শক্তির বিবেচনায় বন দখলে সে হাতিকে মূল প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। হাতিকে সরাতে পারলে বন দখল তার সহজ হয়। কিন্তু বাস্তবতা হাতিকে স্মৃতিহীন বা ইতিহাস থেকে মিলিয়ে দেয়া খুব সহজ নয়। এরা সভ্যতার এক অপরিহার্য অংশীদার।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, হাতিহত্যার অনুকুলে সমাজে অনেক আগেই একটি প্রাধান্যশীল আখ্যান বা ডমিনেন্ট ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে যেমন- হাতি বাঁচলেও লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা। এ আখ্যানের মূল বিষয় হলো জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় হাতির মূল্য সমান। হাতির জীবন ও মৃত্যুকে অর্থমূল্য দিয়ে সমান করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্যালকুলেশনে মূল ফ্যালাসি বা ভ্রান্তি হলো হাতির জীবনের মূল্যটি উপেক্ষিত থেকেছে। কেবল অগ্রাধিকার পেয়েছে তার আকার বা শরীর।

মানুষের ন্যারেটিভের প্যান্টার্নগুলো এরকমেরই যা তার আধিপত্য, ক্ষমতা সর্বোপরি নিজের অবস্থানকে ধরে রাখতে সহায়তা করে। আমরা যদি হাতির দিক থেকে মানুষ নিয়ে আখ্যানগুলো শুনতে পেতাম তাহলে হয়ত ভিন্ন বাস্তবতা উৎপাদিত হতো। প্রাণীদেরও মনস্তত্ত রয়েছে।

ইজরাইলের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ইয়ুভেল নোয়াহ হারারি গরুর মানসিক অবস্থা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। একে তিনি বলছেন বোভাইন ম্যান্টালিটি। হাতির যে রয়েছে এক গভীর মনোকাঠামো তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

যুগপৎভাবে, গত অক্টোবর মাসে সংবাদমাধ্যমে কক্সবাজারের মহেশখালীতে প্রায় ৫০টি বানর হত্যা করার খবর প্রকাশিত হয়। বানরগুলো স্থানীয় এক কৃষকের ফাঁদ হিসেবে রাখা বিষাক্ত কলা খেয়েছিল। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, বড় মহেশখালীর পাহাড়–জঙ্গলে হাজারো বানরের বসবাস। বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় বানরগুলো খাদ্যসংকটে পড়ে। মাঝেমধ্যে বানর দল বেঁধে হানা দেয় স্থানীয় লোকজনের খেতে। বানরগুলোর এ আচরণকে তারা চিহ্নিত করেছে ‘উপদ্রব’ হিসেবে।

ক্রমশ বনভূমি কমে যাওয়া ও খাদ্যসংকটের কারণে বানরগুলো লোকালয় ও ফসলের খেতে ঢুকে পড়ছে। বনভূমিতে অবৈধ মালিকানা স্থাপন করে বানরগুলোর বসবাসের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। বন্যপ্রাণীদেরও যে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই।

বানরের ক্ষেত্রেও ভিকটম ব্ল্যামিং চলছে। সব দোষ বানরের। আমরা যেমনটি বলি বাঁদরামি করবে না। বানরের আচরণকেও আমরা লেবেলিং করেছি। তাদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে হত্যার পথ তৈরি করেছি। জীবন নাশ তো শেষ অস্ত্র কথা নয়। এর আগে কিছু বিকল্প ভাবা যেত?

প্রাণীদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদাসনীতা বা শৈথল্য বেদনাদায়ক। প্রাণী-পাখি-উদ্ভিদ সুরক্ষায় বন বিভাগের এখতিয়ার ও দায়িত্ব বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

এ থেকে উত্তরণে পরার্থবোধ বা অন্যের জন্য কল্যাণবোধের জাগৃতি জরুরি। প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। আমরা তা কেড়ে নিতে পারি না।

শেষান্তে আবারেও স্মরি আহমদ শরীফকে- পিঁপড়ে থেকে হাতি, তিমি অবধি সবার প্রাণের ও জীবনের মূল্য ও মমতা সমান- এ তত্ত্ব, তথ্য ও সত্য অনুভব ও উপলব্ধি করতে হবে। তা করতে হবে একটি বৈচিত্র্যময়, সহাবস্থান মূলত নিরাপদ প্রকৃতিবলয় গড়ে তোলার স্বার্থে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন:
অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক
অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে
‘অন্তর মম বিকশিত করো’
নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা
মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

শেয়ার করুন