ইলা মিত্র, নাচোলের তেভাগা আন্দোলন ও একজন বৃন্দাবন সাহার বয়ান

ইলা মিত্র, নাচোলের তেভাগা আন্দোলন ও
একজন বৃন্দাবন সাহার বয়ান

তিন আঁটিতে মজুরি পোষাত না বলেই অনেক আগে থেকেই নাচোলের কৃষকদের মধ্যে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করলেও তা প্রশমিত হতে পারেনি নেতৃত্বের কারণে। অর্থাৎ তাদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো কেউ ছিল না। পরে কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক সংগঠন সেখানে গেলে কৃষকরা নতুন আশা নিয়ে বুক বাঁধে এবং সংগ্রাম কমিটির হয়ে আওয়াজ তোলে, সাত আঁটি জিন দেয়ার। নাচোলের তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন বৃন্দাবন সাহা।

তেভাগা আন্দোলনের কিংবদন্তি নেত্রী বিপ্লবী ইলা মিত্রের মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৩ অক্টোবর। ১৯ বছর আগে অর্থাৎ ২০০২ সালের এদিনে কলকাতায় ইলা মিত্র পরলোকগমন করেন।

শুরুর দিকে এই বিপ্লবী নারীর মৃত্যুবার্ষিকীর কোনো আয়োজন নাচোলে হয়েছে কি না জানা নেই। তবে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ধারাবিহকভাবে ‘আলোচনা সভা ও কাঙালি ভোজ’-এর আয়োজন করে আসছে রানী ইলা মিত্র সংসদ। বিশেষ করে সংসদের সভাপতি শ্রী বিধান সিং এ আয়োজনে তৎপর ও উদ্যোক্তা।

জানা গেছে, প্রথমবার তিনি নিজের গরু বেচেই মৃত্যুবার্ষিকীর আয়োজন করেছিলেন। তাদের আয়োজনে সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের উপস্থিতি থাকে বেশি। অতিথি বা আলোচক হিসেবে অনেকেই যোগ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, রানী ইলা মিত্র সংসদটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নেজামপুরে অবস্থিত।

নাচোলের তেভাগা আন্দোলন তথা ইলা মিত্র নিয়ে অনেক লেখা আছে দেশ-বিদেশে। এ বিষয়ে নতুন প্রজন্ম কতটুকু জানে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। জাতীয় রাজনীতিতেও অনেকটা বিস্মৃত তেভাগা আন্দোলন ও ইলা মিত্র। এর আগে তেভাগা কী, সেটা বলে নেয়া দরকার। ‘তেভাগা’ কিংবা ‘সাত আড়ি জিন’ দুটোই সমার্থক। তেভাগা বাংলার প্রতিটি মানুষ বুঝত। আর সাত আড়ি জিন ছিল আঞ্চলিক শব্দ। নিয়মটা ছিল- বিশ আঁটি ধান কাটা-মাড়াই ও ঝাড়াই করে জোতদারের গোলায় তুলে দিতে হবে। বিনিময়ে কৃষক মজুরি হিসেবে পাবে তিন আঁটি ধান। এটাই ছিল জিন কাটা।

এই তিন আঁটিতে মজুরি পোষাত না বলেই অনেক আগে থেকেই নাচোলের কৃষকদের মধ্যে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করলেও তা প্রশমিত হতে পারেনি নেতৃত্বের কারণে। অর্থাৎ তাদেরকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো কেউ ছিল না। পরে কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক সংগঠন সেখানে গেলে কৃষকরা নতুন আশা নিয়ে বুক বাঁধে এবং সংগ্রাম কমিটির হয়ে আওয়াজ তোলে, সাত আঁটি জিন দেয়ার।

নাচোলের তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন বৃন্দাবন সাহা। তার নাম অনেক জায়গায় উল্লেখ থাকলেও তাকে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়নি; হয়তোবা তার সম্পর্কে সেভাবে তথ্য প্রকাশ পায়নি বলে। গতবছর দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকার দুটি সংখ্যায় বৃন্দাবন সাহার নিজের ধারাবাহিক লেখা প্রকাশ হয়। দুই পর্বের লেখার প্রথম পর্বে রয়েছে নাচোলের তেভাগা আন্দোলন; ইলা মিত্র ও তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত বর্ণনা। দ্বিতীয় পর্বে তার জেলজীবন।

বৃন্দাবন সাহার লেখা পড়ে নাচোলের তেভাগা আন্দোলন সম্পর্কে নতুন কিছু তথ্য জানা যায়। সেসব তথ্য গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হয়েছে। নওগাঁর রানীনগরের বাসিন্দা ছিলেন বৃন্দাবন সাহা। পেশায় শিক্ষক, কমিউনিস্ট এ মানুষটি নাচোলের তেভাগা আন্দোলনে ছিলেন নেতৃত্ব পর্যায়ের একজন। ইলা মিত্রের সঙ্গে রহনপুর স্টেশনে তিনিও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। দীর্ঘ কারাভোগের পর ১৯৬০ সালে ভারতে চলে যান তিনি। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরে স্থায়ী হয়েছিলেন এবং আমৃত্যু দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র নেতা ও সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বৃন্দাবন সাহা ১৯৯৫ সালের ৮ মার্চ মারা যান।

বৃন্দাবন সাহা, ইলা মিত্র ছাড়াও নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকজন নেতা হলেন- ইলা মিত্রের স্বামী রমেন মিত্র, অনিমেষ লাহিড়ী, চিত্ত চ্যাটার্জি, শিবু প্রামাণিক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুরের আজাহার শেখ। যাকে রমেন মিত্রই পার্টিতে নিয়ে এসেছিলেন।

১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে নাটোর থানার কোরামুদি পাড়ায় রাজশাহী জেলা কমিটির মিটিংয়ে মজুর শ্রেণির পার্টি হিসেবে আজাহার শেখকে সেক্রেটারি নির্বাচিত করা হয়। উল্লেখ্য, রমেন মিত্রের বাড়ি ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে।

নাচোলের চণ্ডিপুর গ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতলা মাঝি ছিলেন তেভাগা আন্দোলনের স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তিনিই একমাত্র কমিউনিস্ট সদস্য ছিলেন বলে জানা যায়। আর এদের সবার নেতা ছিলেন বৃন্দাবন সাহা।

চণ্ডিপুর গ্রামে সুকচাঁদ কর্মকারের বাড়িটিই ছিল পার্টির কেন্দ্রীয় অফিস এবং তেভাগা আন্দোলন পরিচালনার জন্য সেই সময় স্থানীয়ভাবে একটি সংগ্রাম কমিটিও গঠন করা হয়।

স্থানীয়দের মধ্যে তেভাগা আন্দোলনে সক্রিয় হিসেবে যাদের নাম পাওয়া যায়, তারা হলেন- রতু, খতু, জসিমুদ্দিন, সুকচাঁদ কর্মকার, হীরা সিং, উপেন সিং, সূর্য মাঝি, সুখু মাঝি, চুনু মাঝি, মংলি মাঝি, চূড়কা হেমরম, হরেক সিং, হাড়মা মাঝি, তারা মাঝি, লুৎরে মাঝি, বুধরাই মাঝিসহ আরও অনেকে। তবে আলাদা করে আরেকটি নামের কথা উল্লেখ করতে হয়, তিনি হলেন সুকচাঁদ কর্মকারের বোন মোক্ষদা কর্মকারিণী। কিছুটা লেখাপড়া জানতেন। নারী বাহিনী নিয়ে সবসময় মিছিলের অগ্রভাগে ইলা মিত্রের সঙ্গেই থাকতেন তিনি।

আন্দোলনের তোড়ে স্থানীয় কয়েকজন ভূস্বামী তেভাগা মেনে নেন এবং কৃষকদের পাওনা বুঝিয়ে দেন। সেই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের লিখিত দেন- “আমি স্বেচ্ছায় তেভাগা মেনে নিলাম এবং বর্গাদারদের ন্যায্য পাওনা দিয়ে দিলাম।”

বৃন্দাবন সাহার লেখা পড়ে অনেক বিষয়ই স্পষ্ট হয়। এও স্পষ্ট যে, নাচোলের চণ্ডিপুরে পুলিশ মেরে ফেলাটা তার উৎসাহেই হয়েছে। তাছাড়া অন্য কারোরই, বিশেষ করে সেখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কেউই এটা চাননি। মাতলা মাঝি তো সরাসরি বৃন্দাবন সাহাকে কৈফিয়ত তলবের সুরেই বলেছেন- “তোরা কি করলি? কেন ওদের মেরে ফেললি?” যদিও এ প্রশ্নের জবাব দেবার মতো কোনো ভাষা ছিল না বৃন্দাবন সাহার কাছে।

সম্ভবত ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি গরুর গাড়িতে চড়ে নাচোল থানার দারোগা তিনজন সেপাইকে নিয়ে ঘাসুড়া গ্রামে গিয়ে হাজির হন। গাড়োয়ানের নাম ছিল লালু। চারজন পুলিশ সদস্যের দুজনকে মেরে ফেলে এবং দুজনকে মাটিতে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হয়; ওই দিনই সূর্যাস্তের আগে।

ওই দিনই স্থানীয় সুকচাঁদের জামাই সুষ্ঠিকে নিয়ে রমেন মিত্র কলকাতা রওনা হন পার্টিকে রিপোর্ট দিতে। তেভাগা আন্দোলনের আরও দুজন নেতা আজাহার শেখ ও অনিমেষ লাহিড়ী ওই দিনই রাতের অন্ধকারে গোপন আশ্রয়ের জন্য রামচন্দ্রপুর চলে যান। কিন্তু চণ্ডিপুর গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তি এই দুজনকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়।

এতদিন তথ্য-উপাত্তে চণ্ডিপুর গ্রামে পুলিশ-কনস্টেবল যাওয়ার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বৃন্দাবন সাহার লেখায় জানা যায়, ওই দিন আরও দুজন লোক সেখানে গিয়েছিলেন। এদের একজন ফুড ইন্সপেক্টর, আরেকজন পিয়ন। তাদেরও পাকড়াও করা হয়েছিল এবং তাদেরকেও খতম করার কথা ভাবা হলে শেষ পর্যন্ত তাদের একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। কিন্তু রাতে পাহারাদার ঘুমিয়ে যাওয়ায় তারা পালাতে সক্ষম হন।

পরদিন ৬ জানুয়ারি পুলিশ ফৌজরা চণ্ডিপুরের আশপাশের কয়েকটি গ্রামে ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াও চালিয়েছিল। এরপর নিপীড়িত স্থানীয়রা প্রাণভয়ে এলাকা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন ভারতের উদ্দেশ্যে। অনেকে ধরাও পড়েছিলেন পুলিশের হাতে।

এর আগে নাচোলের তেভাগা আন্দোলন সম্পর্কে পুলিশ হত্যার পর ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়ন সম্পর্কে লেখা হলেও নির্যাতনে কেউ মারা গিয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে তথ্য চোখে পড়েনি। বৃন্দাবন সাহার লেখায় সেটা চোখে পড়েছে। ১৯৫০ সালের ৬ জানুয়ারি পুলিশ ফৌজরা স্থানীয় জামলা মাঝিকে বন্দুকের বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলে। নাচোলের তেভাগা আন্দোলনে এই শহিদের নাম পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে নবাবগঞ্জ থানায় পুলিশের অকথ্য নির্যাতনে আরেকজন মৃত্যুবরণ করেছিলেন, তিনি হলেন নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের একনিষ্ঠকর্মী হরেক সিং।

রহনপুর স্টেশনে ইলা মিত্রের ধরা পড়া নিয়ে দুটো মতবাদ প্রচলিত ছিল। একটি হলো- পথ ভুল করে ইলা মিত্র রহনপুর স্টেশনে পৌঁছান। অন্যটি হলো- তিনি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীর বেশ ধরে গিয়েছিলেন। কেউ বলেন যে, টিকেট কাউন্টারে ইংরেজি বলায় ধরা পড়েছিলেন; আবার কেউবা বলেন যে, হাতে ঘড়ি থাকার কারণে তিনি ধরা পড়েন।

বৃন্দাবন সাহার লেখা পড়ে জানা গেল, ইলা মিত্র রামচন্দ্রপুরের দিকে যেতে রাজি ছিলেন না। তিনি রহনপুর স্টেশন হয়ে কলকাতা যেতে চেয়েছিলেন। যদিও তার মতের সঙ্গে একমত ছিলেন না বৃন্দাবন সাহা। তিনি রামচন্দ্রপুরের দিকেই যেতে চেয়েছিলেন গ্রেপ্তার এড়াতে; কিন্তু ইলা মিত্রের কারণেই রহনপুর স্টেশনে গিয়ে কলকাতার ট্রেন ধরার বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন। তিনি চাইলেই ইলা মিত্রকে একা ফেলে পালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু একজন নেত্রীকে ফেলে রেখে পার্টির কাছে গিয়ে তিনি কী কৈফিয়ত দিতেন? এ কারণেই পারেননি।

পরে দুজনেই ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি রহনপুর রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এরপর তাদেরকে নাচোল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর নবাবগঞ্জে। থানায় থাকাকালে তাদের ওপর চরম নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়। বিশেষ করে ইলা মিত্রের ওপর চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন ।

নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গে ইলা মিত্র জড়িয়েছিলেন ১৯৪৬-৪৭ সালের দিকে; এটাও প্রচলিত। তবে বৃন্দাবন সাহা তার লেখা শুরু করছেন ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নাটোরের মিটিং থেকে। পরের বছরই ৭ জানুয়ারি ইলা মিত্র ও তিনি পুলিশের হাতে রহনপুর স্টেশনে ধরা পড়েন।

তার তথ্যানুযায়ী, নাচোলের তেভাগা আন্দোলনের বিস্ফোরণটা ঘটেছিল অল্প কয়েকদিনের মধ্যে। বড়জোর ২৫-৩০ দিনের মধ্যেই। তার লেখায় রমেন মিত্র ও ইলা মিত্র নাচোলে আগে থেকেই কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন- এ সম্পর্কিত কোনো তথ্যও নেই। এটা কী কারণে, তা বোধগম্য নয়।

এটা সত্য যে, তেভাগা আন্দোলনের দুটি পর্যায়। একটি পর্যায় হচ্ছে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট অর্থাৎ ভারত ভাগ হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত। আর পরের পর্যায়টি হচ্ছে এই বঙ্গের অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশে। এটা অনস্বীকার্য যে, ভারত ভাগ হওয়ার পর তেভাগা আন্দোলনের গতিতে ভাটা পড়ে দুই বঙ্গেই- ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ও আমাদের এ পূর্ববঙ্গে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান)।

বেশিরভাগ বইপুস্তক এবং লেখায় তেভাগা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়টি কমই উঠে এসেছে; অর্থাৎ নাচোলে তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত হওয়া নিয়ে। ঠিক কী কারণে নাচোলের তেভাগা আন্দোলনটি রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া ভার।

লেখক: সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
আগামী নির্বাচন এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ
জিয়ার মরণোত্তর বিচার যৌক্তিক যেসব কারণে
বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ : কন্যাশিশুর গুরুত্বহীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত
১৯৭৭ সালের অক্টোবর-হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটিত হোক
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ : মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সার্বিক উন্নয়নও জড়িত

শেয়ার করুন

মন্তব্য

সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তি জয়ী হয়নি কখনও

সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তি জয়ী হয়নি কখনও

মৌলবাদী অংশটি এতদিন সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিল। কিন্তু এখন এদের ওপর ভর করেছে বিএনপি-জামায়াত, হেফাজত। একপক্ষ চায় এদেশে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েম করতে, অন্যপক্ষ চায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। উভয়পক্ষের ষড়যন্ত্রের বলি এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। নির্বাচন-পরবর্তী সংহিসতা কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এমনকি যেকোনো ইস্যু তৈরিতে ভিকটিম হচ্ছে ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’রা।

রামু থেকে কুমিল্লা হয়ে নোয়াখালী, রংপুর একই চিত্রনাট্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে মিথ্যা গুজব রটিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর পরিকল্পিত হামলা। তবে কুমিল্লা শহরের নানুয়া দীঘির পাড়ের মন্দিরের ঘটনাটি যে ছিল সুপরিকল্পিত গভীর ষড়ডন্ত্র সেটি ইকবাল হোসেনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছে।

কুমিল্লার নানুয়া দীঘির পাড়ের মন্দিরে হনুমান মূর্তির ওপর কোরআন শরিফ রেখে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে সেই ঘটনাটিকে ফেইসবুকে লাইভ করে ভাইরাল করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই শত শত দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁটা নিয়ে মন্দিরে হামলা করে এবং নারী, পুরুষ, শিশু যাকেই যেখানে পেয়েছে তাকেই সেখানে আহত করেছে। এই একই অভিযোগে শুধু কুমিল্লাই নয়, আরও অন্ততপক্ষে পনেরোটি জেলায় দুর্গা মূর্তি কিংবা মন্দিরে হামলা চালানো হয়েছে।

এটা কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে না যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক নিজেদের দুর্গোৎসবকে বানচাল করতে এমন কাজ করবে? ঘটনার পরবর্তী কার্যক্রমও প্রমাণ করে মৌলবাদী গোষ্ঠী সম্প্রীতির দুর্গোৎসবকে বানচাল ও দেশকে অস্থিতিশীল করতেই এমন কাজ করেছে। কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে সারা দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ফলে তাদের প্রচেষ্টা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুরসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়নি।

মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোত্র ইত্যাদি দিয়ে বিবেচনা করে দেখা-ই সাম্প্রদায়িকতা। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে একশ্রেণির সুবিধাবাদী লোকজন রাজনৈনিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে।

ধর্মের নাম ব্যবহার করে এই উপমহাদেশে হানাহানি, রক্তপাত, হত্যার ঘটনা তো নতুন নয়। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের দাঙ্গা থামাতে বঙ্গবন্ধু রাস্তায় নেমে বলেছিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি রুখে দাঁড়িয়েছিল।

ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি-ধর্ম, বর্ণ একসঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে। সেদিনও মৌলবাদীরা ইসলামের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ মৌলবাদীদের প্রত্যাখ্যান করে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পবিত্র সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতির একটি ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্থান দিয়ে ১৯৭২ সালে গণপরিষদের ভাষণে বলেছিলেন- ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চলতে পারে না।’ বঙ্গবন্ধু সরকার তখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও তাদের কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করে।

১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছে, অপরদিকে আরেক কদম এগিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করে ধর্মনিরপেক্ষতার কফিনে শেষ পেরেকটি ঢুকিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ যেহেতু ধর্মভীরু সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ দুই দশক স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বীজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিয়েছে যার কুফল ভোগ করছে আজকের বাংলাদেশ।

নব্বইয়ের দশক থেকেই একদল মৌলবাদীরা সম্প্রীতি বিনষ্টের নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে। তারা কখনও রাষ্ট্রীয় মদদে আবার কখনও রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে।

ভারতে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর বর্বরতা চালানো হয়। ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হামলা করা হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রায় একমাস ধরে একটানা সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছে৷
২০০১ সালের নির্বাচনের পর হত্যা, লুটপাট, গণধর্ষণ, ধর্মান্তরিত করা, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ এহেন এমন কোনো কাজ নেই, যা বিএনপি-জামায়াত করেনি। নির্যাতিত ও ভুক্তভোগীরা থানায় বা আদালতে অভিযোগ পর্যন্ত করতে পারেননি। কেউ অভিযোগ করতে পারলেও রাজনৈতিক কারণে তদন্ত হয়নি। বিএনপি-জামায়াত আমলের পুরো পাঁচ বছর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার একটা রেওয়াজে পরিণত হয়৷

মৌলবাদী অংশটি এতদিন সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিল। কিন্তু এখন এদের ওপর ভর করেছে বিএনপি-জামায়াত, হেফাজত। একপক্ষ চায় এদেশে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েম করতে, অন্যপক্ষ চায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। উভয়পক্ষের ষড়যন্ত্রের বলি এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। নির্বাচন-পরবর্তী সংহিসতা কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এমনকি যেকোনো ইস্যু তৈরিতে ভিকটিম হচ্ছে ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’রা।

এতকিছুর পরও আমাদের আশা ও ভরসার জায়গা দুইটি। এক. বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দুই. এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমিল্লার ঘটনার পর অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন-

‘যেখানে যেখানে যারাই এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের খুঁজে বের করা হবে। যথাযথ শাস্তি তাদের দিতে হবে। এমন শাস্তি দিতে হবে ভবিষ্যতে যেন আর কেউ সাহস না পায়।’

এদেশের জনগণের বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতি শতভাগ বিশ্বাস আছে। তিনি অনেক অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন। তিনি এই মৌলবাদী ধর্মান্ধগোষ্ঠীকে অবশ্যই পরাজিত করবেন। দ্বিতীয়টি হলো এদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী কখনও সাম্প্রদায়িকতাকে মেনে নেয়নি। সেজন্যই এতকিছুর পরও সাম্প্রদায়িকতা কখনও এদেশে বিজয়ী হতে পারেনি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন- ‘যারা এ বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা করতে চায়, তাদের সম্পর্কে সাবধান হয়ে যাও। আওয়ামী লীগের কর্মীরা, তোমরা কোনো দিন সাম্প্রদায়িকতাকে পছন্দ করো নাই। তোমরা জীবনভর তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছ। তোমাদের জীবন থাকতে যেন বাংলার মাটিতে আর কেউ সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন না করতে পারে।’

এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী শুধু ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’দেরই শত্রু নয়। এরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের শত্রু, দেশরত্ন শেখ হাসিনার উন্নয়নের শত্রু, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার শত্রু, সর্বোপরি মানবতার শত্রু। অনতিবিলম্বে সরকারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মনে রাখতে হবে এই দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ ১৬ কোটি বাঙালির দেশ।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

আরও পড়ুন:
আগামী নির্বাচন এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ
জিয়ার মরণোত্তর বিচার যৌক্তিক যেসব কারণে
বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ : কন্যাশিশুর গুরুত্বহীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত
১৯৭৭ সালের অক্টোবর-হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটিত হোক
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ : মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সার্বিক উন্নয়নও জড়িত

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বলি কেন হবে একটি গোষ্ঠী?

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বলি কেন হবে একটি গোষ্ঠী?

এই যে সময়ে সময়ে আমরা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিহীন হয়ে পড়ি এরইবা কী সমাধান! আমাদের মধ্যে কোন প্রক্রিয়ায় যুক্তি-বুদ্ধির উন্মোচন ঘটানো যায়। কোন প্রক্রিয়ায় আমাদের ধর্মের মাননা বা অবমাননা বোঝানো যায়!

কুমিল্লায় মন্দিরে হামলার ঘটনার জেরে সব মিলিয়ে এই পর্যন্ত মোট আটজন নিহত হলেন। এর মধ্যে থিয়েটারকর্মী অধরা প্রিয়া’র বাবা দীলিপ দাস আছেন। দিলীপ দাস (৭৫) গত ১৩ অক্টোবর থেকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি ছিলেন। বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কুমিল্লা শহরে নানুয়া দীঘির পাড়ে একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কুরআন অবমাননার কথিত অভিযোগে গত ১৩ অক্টোবর ওই শহরে আটটি মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়।

ওই ঘটনার জের ধরে পরে চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও রংপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায়ও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়। নোয়াখালীতে হামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের দুজন মারা যান।

এছাড়া চাঁদপুরে মন্দিরে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে নিহত হন পাঁচজন।

এসব ঘটনায় সারা দেশে মোট ৭২টি মামলা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ৪৫০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

আমরা জানতে পারলাম ঘটনার কূলকিনারা করা গেছে। ঘটনার মূল কালপ্রিট ইকবাল ধরা পড়েছে। ১২ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত লাগল ইকবাল রহস্য উদঘাটনে।

এখন কথা হচ্ছে ইকবাল না হয় ধরা পড়ল। ঘটনার রহস্য না হয় উদ্ঘাটন হলো সিসিটিভির ক্যামেরা ফুটেজ দেখে। কিন্তু এর মধ্যে যেসসব জেলায় হামলা হয়ে গেল, ঘরবাড়ি, উপাসনালয়-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি অবলা প্রাণিকুলও যে হামলায় রক্ষা পেল না তার কী হবে?

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এতগুলো সিসি ক্যামেরা ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও কেন ঘটনার রহস্য উন্মোচনে এত দেরি! আর সেইসঙ্গে প্রশ্ন জাগে যিনি পবিত্র কুরআন শরিফ হনুমানের নিকট রেখে গদা নিয়ে গেলেন, ধর্ম অবমাননায় তার অবস্থান কোথায়? তবে কি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে দেরি হয়েছে, নাকি নানুয়া দিঘীর পাড় এলাকায় যে এতগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে তা জানতে এতো দেরি হয়েছে, নাকি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সত্য উদঘাটনে দেরি হয়েছে? আসল কারণ কোনটি, নাকি সবগুলোই?

আর এদিকে যে এত সম্পদ ও প্রাণহানী, তার দায় দায়িত্ব এখন কে নেবে? সেকি শুধুই ইকবাল, ‘তৌহিদি জনতা’ প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ-সরকার-রাষ্ট্র নাকি অন্য কেউ?

ব্রিটিশ আমলে হিন্দু-মুসলিম ভাগ করে যে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’র বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল তা কি এই ভারতীয় উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর মানসপট হতে মুছে গিয়েছে! নাকি পরানের গহীন ভেতর থেকে তা থেমে থেমে জ্বলে ওঠে? যেই জ্বলনে দ্বগ্ধ হয় সব কিছু!

স্পষ্টতই আমরা দেখতে পাই, এই একবিংশ শতাব্দিতে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার সময়ে এসেও ওপারে ভারত আর এপারে বাংলাদেশে নিয়মিত বিরতিতে কতিপয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধিয়ে ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া খেতে চায়?

আমাদের এই ভূখণ্ডে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো স্বপ্ন দেখেছিলেন অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের। ৭২’র সংবিধানেও রয়েছে যার সুস্পষ্ট ছাপ। তবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীতে এসেও আমাদের দেশে এখনও কেন সংঘটিত হচ্ছে পায়ে পা বাধিয়ে সংখ্যালঘুর উপর সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস!

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়। যা কার্যকর হয় ওই বছরেরই ১৬ ডিসেম্বর থেকে৷ সেই সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতি ছিল– ১. জাতীয়তাবাদ, ২. গণতন্ত্র, ৩. সমাজতন্ত্র এবং ৪. ধর্মনিরপেক্ষতা৷ সুতরাং সংবিধানের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা৷

১৯৮৮ সালে স্বৈরাচার এইচএম এরশাদ গণ-আন্দোলন মোকাবিলা করতে না পেরে রাজনৈতিক হীনউদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে বাংলাদেশের সংবিধানের খোলনলচেই পাল্টে দিতে অপচেষ্টা করে। তার শাসনামলে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷

অথচ ডান-বাম রাজনৈতিক দলগুলো তখন ঠিকই বুঝতে রাষ্ট্রের তো ধর্ম হয় না। ধর্মতো মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস। অপ্রয়োজনীয় এই সংশোধনী যাবতীয় অনৈসলামিক কাজে পটু এরশাদের স্রেফ ধাপ্পাবাজি। আর তাই সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করার প্রতিবাদে তখনকার আন্দোলনরত ৮ দল, ৭ দল ও ৫ দলসহ সব নেতৃবৃন্দই কঠোর হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছিলেন।

পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১-এর মাধ্যমে ৭২-এর ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলেও, রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বহালই রাখা হলো।

অতএব, বলা যায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধানে স্থান দিয়ে সংবিধানের মূল নীতিরই একধরনের রদবদল করা হয়েছে৷

কাজেই আজ এই প্রশ্ন তোলা জরুরি গত তিন দশকে কি এমন জরুরি পরিবর্তন ঘটল যে আজ ইচ্ছা করে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো ইকবাল গং কী এক সর্বনেশে খেলায় মেতে উঠছে!

ইকবাল তো দৃশ্যমান মানবতাবিরোধী শত্রু। কিন্তু এই ইকবালের পশ্চাতে রয়েছে কোন স্বার্থান্বেষী মহল? এক ইকবালের অপকর্মকে জায়েজ করার জন্য অন্য সবাই যে উঠে পড়ে লাগল এর কী বিহিত হবে?

এই যে সময়ে সময়ে আমরা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিহীন হয়ে পড়ি এরইবা কী সমাধান! আমাদের মধ্যে কোন প্রক্রিয়ায় যুক্তি-বুদ্ধির উন্মোচন ঘটানো যায়। কোন প্রক্রিয়ায় আমাদের ধর্মের মাননা বা অবমাননা বোঝানো যায়!

প্রতিটা ধর্ম এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ রক্ষার জন্য তো স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই রয়েছেন। আর সাধারণভাবে প্রতিটা ধর্মেই তো মানবতা তথা মানুষকে ভালোবাসার কথাই বলা হয়েছে। তবে কেন মানুষকে বিযুক্ত করে আমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে যাবতীয় অধর্মের কাজ করার জন্য মত্ত হয়ে উঠছি?

ভবিষ্যতের সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সময়ে এই প্রশ্নসমূহের উত্তর খোঁজা আর সমাধানে পৌঁছা খুবই জরুরি।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
আগামী নির্বাচন এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ
জিয়ার মরণোত্তর বিচার যৌক্তিক যেসব কারণে
বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ : কন্যাশিশুর গুরুত্বহীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত
১৯৭৭ সালের অক্টোবর-হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটিত হোক
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ : মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সার্বিক উন্নয়নও জড়িত

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখতে পারে সমন্বিত উদ্যোগ

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখতে পারে সমন্বিত উদ্যোগ

বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বৈষম্যমূলক সমাজের জন্য হয়নি। বাঙালি জাতি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি। একদিকে ধর্মীয় বৈষম্য, অপরদিকে জাতিগত বৈষম্য। বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধানের ৪টি মৌলিক কাঠামোর অংশ। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা উভয়ই। এটি সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো হওয়ায় সরকার ধর্ম বিবেচনা না করে সাধারণভাবে দেশের সব মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে ধর্ম প্রত্যেকের নিজস্ব বিষয়।

রাষ্ট্র একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর মানবাধিকারকে সম্মান করবে এবং তাদের মানবাধিকার ভোগে হস্তক্ষেপ করবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করবে। সবশেষে রাষ্ট্রকে সর্বদা একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মানবাধিকার ভোগ করার ইতিবাচক উপায়গুলো পূরণের চেষ্টা করতে হবে।

১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির অনুচ্ছেদ ২৭, অনুশীলনীটিকে পালন করার কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে।

সাধারণভাবে একটি রাষ্ট্র ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ‘সংখ্যালঘু’দের বিবেচনায় না নিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দায়বদ্ধ। কিন্তু ‘সংখ্যালঘু’দের ধর্মীয় অধিকার এবং অসহিষ্ণুতাপূর্ণ অবস্থা থেকে রাষ্ট্রই বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করবে। বিশেষ সুরক্ষার আলোচনাটি বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) এবং ২৯(৩) উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্র বা সরকার ‘সংখ্যালঘু’দের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রকে উৎসাহিত করবে।

বাংলাদেশের বর্তমান দৃশ্যপট সত্যিই ভিন্ন। কুমিল্লার একটি ঘটনার পর গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলছে। কিছু ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসবের সময় তাদের ওপর নির্যাতন, ভাঙচুর এবং সংঘষের্র ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় মানুষ নিহত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা কোনোটাই বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন করে না। এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গুজব ছড়িয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা উসকে দেয়ার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়। এদেশের মুসলিম-হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অর্জন করেছে। এভাবেই স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়।

যারা দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, যারা নিজধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান করে, তারা এধরনের হিংস্র গোঁড়ামির উন্মাদনাকে সমর্থন করতে পারে না। কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলার পর গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী এবং রংপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় কীভাবে উগ্রপন্থিরা ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’দের বাড়িতে হামলা করেছে তা সবার জানা। ধর্মের নামে এ ধরনের সন্ত্রাসকে কোনোভাবেই বাড়তে দেয়া যাবে না। এধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস প্রতিরোধে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মী, মানবহিতৈষী ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী এবং প্রগতিশীল শক্তিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যথাযথভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।

অতি তুচ্ছ ঘটনায় বার বার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় দেশের ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের মানুষ। গত ১৭ মার্চ যখন দেশব্যাপী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল, সেদিন সকালে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে ঘটে যায় ন্যক্কারজনক ঘটনা। একটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া নিয়ে একযোগে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় ওই গ্রামের ৮৮টি হিন্দু বাড়ি ও পাঁচটি মন্দিরে। তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি স্থানীয় কজন মুক্তিযোদ্ধাও।

আওয়ামী লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যুদ্ধ করার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই আওয়ামী লীগের একযুগের বেশি শাসনামলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বার বার নৃশংস হামলা হচ্ছে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর নৃশংস হামলা চলে। মামলা হলেও দুর্বৃত্তরা শাস্তি পায়নি। সবাই এখন জামিনে মুক্ত।

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হয়েছে আরও ভয়াবহ হামলা। এ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধরা এখনও সুবিচার পায়নি। আসামিরাও এখন আর কারাগারে নেই। একইভাবে দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নাটোর, রাজশাহীর চারঘাট, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও পিরোজপুরে ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে যেকোনো ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতনের ঘটনার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও রাজনীতি হয়, কিন্তু কোনো শাস্তি হয় না। ফলে থামছে না নির্যাতনের ঘটনা।

অভিযোগ আছে নেপথ্যে ক্ষমতাশালীরা জড়িত থাকায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যায় না। প্রতিটি হামলার পেছনেই অপশক্তি কাজ করেছে। ধর্মীয় ইস্যুকে ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া দণ্ডবিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বিভিন্ন সময় ধর্ম অবমাননার যেসব অভিযোগ শোনা যায়, সেসবের বিচারের কথাও তেমন শোনা যায় না।

এসব ঘটনায় দ্রুত ন্যায়বিচারের উদাহরণ সৃষ্টি করা না গেলে মানুষ ক্রমেই বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারাতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারকে এ বিষয়ে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বৈষম্যমূলক সমাজের জন্য হয়নি। বাঙালি জাতি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি। একদিকে ধর্মীয় বৈষম্য, অপরদিকে জাতিগত বৈষম্য। বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়।

এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য এদেশের মানুষ লড়াই করেছে, যুদ্ধ করেছে, যে রাষ্ট্রটির জন্ম হলে সব নাগরিকের জন্য সাম্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর নির্যাতন আর হয়রানির ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা সেই পুরোনো অপকৌশলেরই আশ্রয় নেয়। আক্রমণকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় থানা-পুলিশে যেতেও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ভয় পায়। একসময় ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর হামলার পর গণমাধ্যমের খবরকে অতিরঞ্জিত বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হতো। আওয়ামী লীগ আমলে তা হয়নি। সরকার রামু ও নাসিরনগরে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ও মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছে। সুনামগঞ্জে ত্রাণ সামগ্রীসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। দোষীদের কঠিন শাস্তির আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো- প্রায় সব ঘটনায়ই অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা এখনও সম্ভব হয়নি।

অনেক ঘটনা আছে যেগুলো সরকার, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও তৎপর থাকলে, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই এসব ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। আর এসমস্ত ঘটনায় যদি অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা যেত তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। দৃষ্কৃতিকারীরা এসব অপকর্ম করতে ভয় পেত।

সমাজের সব মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং একটি সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ‘সংখ্যালঘু’ মানুষের জন্য এখন দরকার তাদের মনে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন ও সরকারকে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় আরও কাজ করতে হবে এবং নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।

বর্তমান সরকারের পক্ষে বলা হয়- বাংলাদেশ ধর্মীয় বহুত্ববাদ বিকাশ ও ‘সংখ্যালঘু’দের অধিকার রক্ষায় সবাই সচেষ্ট। যেকোনো সহিংসতা ও বিভেদ মোকাবিলায় সরকার সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে স্লোগান এনেছেন- ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এ স্লোগানের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দেশের সাধারণ মানুষকে সব ধর্মের প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আমাদের দায়িত্ব হলো, গণতান্ত্রিকভাবে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচারের ও মানবাধিকারের লড়াইটিকে এগিয়ে নেয়া। তাই প্রশাসন ও সরকারকে ‘সংখ্যালঘু’দের নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি রক্ষায় আরও কাজ করতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো বিএনএনআরসি।

আরও পড়ুন:
আগামী নির্বাচন এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ
জিয়ার মরণোত্তর বিচার যৌক্তিক যেসব কারণে
বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ : কন্যাশিশুর গুরুত্বহীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত
১৯৭৭ সালের অক্টোবর-হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটিত হোক
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ : মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সার্বিক উন্নয়নও জড়িত

শেয়ার করুন

আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারব তো?

আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারব তো?

সংবিধানে উল্লিখিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মর্যাদা মানে সংখ্যালঘিষ্ঠের মর্যাদাহানি নয়। ইসলাম কখনও সংখ্যালঘিষ্ঠের অমর্যাদা করেনি। সংবিধানও সে কথা বলে না। ইসলামের বিশ্ববিজয়ের মূল কারণই ছিল ‘সংখ্যালঘু’ বা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি এর মর্যাদাবোধ। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি বলেছেন- “কোনো মুসলিম যদি অমুসলিম নাগরিকের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করে, তার কোনো অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে, তার কোনো জিনিস বা সহায়-সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেয়; তবে কেয়ামতের দিন আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় আমি তাদের বিপক্ষে অবস্থান করব (দাউদ শরিফ)।

ধর্ম অবমাননার রেশ ধরে অন্য ধর্মের উৎসব পণ্ড করে দেয়া বাংলাদেশে নজিরবিহীন। শুধু উৎসব পণ্ড করে দেয়ার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি, এ উন্মাদনা সহিংসতায় রূপ নেয়। মন্দির, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব চালিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়। ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু সম্প্রদায়ের হয়তো ঘরবাড়ি পুড়েছে, কিন্তু এতে প্রকৃত মুসলমানদের হৃদয়ে কি একটুও আঁচ লাগেনি? ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের ভিটেমাটিতে হয়ত সহসাই আবার ঘরবাড়ি তৈরি হবে, কিন্তু সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের হৃদয়ের এ রক্তক্ষরণ সহসাই বন্ধ হবে কি? স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে কি এই ঘটনা একটি চিরস্থায়ী কালো অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে না?

যুগ যুগ ধরে এদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা যে এখানে ঘটেনি তা নয়। তবে সবসময় পারস্পরিক সম্প্রীতি যে বজায় ছিল এটাই সত্যি। কোনো অঘটন ঘটে থাকলেও মানুষ এর প্রতিবাদ করেছে, ‘সংখ্যালঘু’দের পাশে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় অথবা জাতীয়ভাবে কোনো সম্প্রদায় একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়নি। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় এবারের চিত্র যেন অনেকটাই ভিন্নরকম, অচেনা। এর মধ্য দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আমাদের চিরচেনা ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’র দাবি।

এতদিন যে ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন হয়েছে তার একটি বড় কারণ ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার যে সাধারণ মানুষকেও হতে হয়, সে কথা অজানা নয়। পরাজিত দল, দলের নেতা ও ভোটারদের এলাকাছাড়া করা, মামলা-হামলা করে দৌড়ের ওপর রাখা নতুন কিছু নয়। এ বিবেচনায় ‘সংখ্যালঘু’দের ওপরও নির্যাতন করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হয়েছে। ২০০১-এর সহিংসতা সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।

এবারের ঘটনা ধর্মীয় সহিংসতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এর পেছনে কোনো পক্ষের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি আছে কি না তা এখনও জানা যায়নি। তবে, রাজনৈতিক মোটিভ এর পেছনে না থাকলেও যে এর রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা হবে, এর লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে। দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল এ ঘটনার জন্য পরস্পরকে দুষছে। অতীতেও তাই হয়েছে। ফলে আসল অপরাধী ও মাস্টারমাইন্ডরা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এদেশের মানুষ যতটা না ধর্মপরায়ণ এর চেয়ে বেশি ধর্মের ব্যাপারে স্পর্শকাতর। এই অতি স্পর্শকাতর অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা তুলতে চায় অনেক পক্ষ। ধর্মের অপব্যবহার রাজনীতি থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও সমাজেও বিস্তার লাভ করেছে। নাসিরনগর, শাল্লা ও রামুতে আমরা ধর্মের অপব্যবহারই দেখেছি। যা কুমিল্লা ও রংপুরে এবার দেখা গেল।

একটি ধর্ম অবমাননার দায়ে আরেকটি ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়া হলো এবার। এ দেশের সংবিধান বলছে-

“প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।” (প্রথম ভাগ, ধারা ২ক) এই বাক্যে দুটি কথা আছে। প্রথমত, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং দ্বিতীয়ত, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মপালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপের প্রবেশদ্বারে একটি মূর্তির পায়ের ওপর পবিত্র কোরআন রাখা হয়েছে। এই অভিযোগে ইকবাল নামক একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে। কে প্রকৃত অপরাধী, কে পেছনের কারিগর, কী তার বা তাদের মোটিভ এসব বিষয়ে এখনই শেষ কথা বলার সময় আসেনি। আদৌ এর শেষটা দেখা যাবে কি না তাও জানা নেই। কিন্তু এর আগেই শেষ দৃশ্যের অবতারণা করা হয়ে গেছে। একটি সম্প্রদায়ের অধিকারকে চরমভাবে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।

প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের অবমাননা হয়েছে। এক্ষেত্রে যে বা যারা অবমাননা করেছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা প্রজাতন্ত্রের কাজ। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্মের অবমাননা হলে সে ধর্মের অনুসারীরা অন্য ধর্মের অনুসারীদের আক্রমণ করবে, এটা প্রজাতন্ত্রের কোন আইনে আছে?

কোথাও ইসলামের অবমাননা হলে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব ওই অবমাননাকারীদের বিচার করা। কিন্তু সে দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়ার এখতিয়ার সহিংসতাকারীদের কে দিল? কুমিল্লায় ইসলামের অবমাননা করা হয়েছে। কাজেই অবমাননাকারী ও ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর হামলাকারীদের ফৌজদারি আইনে সোপর্দ করে তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সংবিধানের একই অনুচ্ছেদ আরও বলছে- “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হলেও, রাষ্ট্র হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবে।” একটি ধর্মের অবমাননা হলে সেই অবমাননা ঠেকানো বা অবমাননাকারীদের বিচার করা রাষ্ট্রের কাজ যা আগেই বলেছি। কিন্তু অবমাননার অজুহাতে অন্য ধর্ম পালনের সমমর্যাদা ও সমঅধিকার লঙ্ঘন করা হবে কেন? কুমিল্লা, রংপুরসহ অন্যান্য আরও জায়গায় পূজামণ্ডপে হামলা করে হিন্দুদের ধর্ম পালনের সমঅধিকার লঙ্ঘন করা হলো কেন? কাজেই যারা কাজটি করেছে তারা দুক্ষেত্রেই সংবিধান লঙ্ঘনকারী। কিন্তু এরচেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, হামলাকারীরা রাষ্ট্রকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। কাজেই রাষ্ট্রকে কঠোরভাবে এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে হবে।

সংবিধানে উল্লিখিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মর্যাদা মানে সংখ্যালঘিষ্ঠের মর্যাদাহানি নয়। ইসলাম কখনও সংখ্যালঘিষ্ঠের অমর্যাদা করেনি। সংবিধানও সে কথা বলে না। ইসলামের বিশ্ববিজয়ের মূল কারণই ছিল ‘সংখ্যালঘু’ বা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি এর মর্যাদাবোধ। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি বলেছেন-

“কোনো মুসলিম যদি অমুসলিম নাগরিকের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করে, তার কোনো অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে, তার কোনো জিনিস বা সহায়-সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেয়; তবে কেয়ামতের দিন আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় আমি তাদের বিপক্ষে অবস্থান করব (দাউদ শরিফ)। কাজেই কুমিল্লায় কোরআন অবমাননার দায় কোনোরকম বিচার ছাড়া পুরো হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো মহা অন্যায়। বরং ইসলামের নাম নিয়ে এধরনের কাজ করাই বেশি ইসলামের অবমাননা।

ইসলাম বিচার ছাড়া কারো ওপর দোষ চাপায় না। একজনের অপরাধের জন্য আরেকজনকে বা পুরো সম্প্রদায়কে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের বাড়িঘরে লুটপাট করে আগুন লাগিয়ে দিতে বলে না। তাই বলা যায়, হামলাকারীরা সুস্পষ্টভাবে নবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ইসলামি শরীয়ত মতেও তারা অপরাধী। একজনের অপরাধের দায়ে অন্য ধর্মের মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া, পূজামণ্ডপ গুড়িয়ে দেয়া তো পরের কথা, মহান আল্লাহ অন্য ধর্মের দেব-দেবিদের গালি দিতেও নিষেধ করেছেন (সুরা আনআম, ১০৮)। হামলাকারীরা আদতে কার অবমাননা করেছে? এরাই কি ইসলামের অবমাননা করেনি?

কুমিল্লার ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কে বা কারা মূর্তির পায়ের কাছে পবিত্র কোরআন রেখেছে তা খুঁজে বের করতেই হবে। এর উদ্দেশ্য যত নগণ্যই হোক, এরকম একটি ঘটনার পরণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে; তা তো দেশের মানুষ দেখেছে। তাই ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। সেই সঙ্গে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকদেরই সতর্ক থাকতে হবে। সবধরনের উসকানিদাতা ও অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিটি ধর্মের মানুষদেরই সাবধান হতে হবে। বুঝতে হবে এরা সব ধর্ম-বর্ণ, রাষ্ট্র সর্বোপরি মানবজাতির শত্রু।

‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন বিশ্বে নতুন নয়। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা সবখানেই আছে বর্ণবাদের কালো ইতিহাস। গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে খ্যাত ব্রিটেন অথবা আধুনিক গণতন্ত্র ও কথিত উদার রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, ‘সংখ্যালঘু’ নিষ্পেষণে কেউ কম যায় না। কিছুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের পুলিশ প্রকাশ্যে জর্জ ফ্লয়েড নামে এক কৃষ্ণাঙ্গের গলা হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেছে। মৃত্যু যন্ত্রণায় ফ্লয়েড বার বার বলছে-

“আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।” বুটের চাপে তার মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে এসেছে। এমনকি মৃত্যুর আগে ফ্লয়েড পানি খেতে চেয়েছিল। পানি পায়নি। তার মৃত্যুযন্ত্রণা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য পুলিশ সদস্যদেরও টলাতে পারেনি। এভাবে কাতরাতে কাতরাতে ফ্লয়েড মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পুরো বিশ্ব সে দৃশ্য দেখেছে। তবে এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাদা-কালো সবাই রাস্তায় নেমে আসে। সবার মুখে ছিল ফ্লয়েডেরই শেষ কথার প্রতিধ্বনি- ‘উই ক্যান্ট ব্রিথ’।

যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লয়েডের মৃত্যুই প্রথম নয়। আর ধর্ম, বিশেষ করে ইসলামোফোবিয়া যে ইউরোপ-আমেরিকার সবচেয়ে বড় মহামারি তা তো সবারই জানা। মুসলিমরা সেখানে ‘সংখ্যালঘু’। কালোরা সেখানে ‘সংখ্যালঘু’। তাই ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন স্থানভেদে রূপ বদলায় মাত্র। আসল চরিত্র একই। আমরা শুধু চাই আমাদের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রটি বহাল থাকুক। এটাই বাংলাদেশের ভিত্তি। সামাজিক সাম্যই রাষ্ট্রের অক্সিজেনের জোগান দেয়, ধর্মকে পানি দেয়। এমন একটি সমাজেই আমরা মুসলমান-হিন্দু, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই নিঃশ্বাস নিতে চাই। তা না হলে, সবারই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে।

লেখক: আইনজীবী, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
আগামী নির্বাচন এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ
জিয়ার মরণোত্তর বিচার যৌক্তিক যেসব কারণে
বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ : কন্যাশিশুর গুরুত্বহীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত
১৯৭৭ সালের অক্টোবর-হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটিত হোক
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ : মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সার্বিক উন্নয়নও জড়িত

শেয়ার করুন

প্রধান বিচারপতির উদ্বেগ ও সাম্প্রদায়িকতা বিনাশে করণীয়

প্রধান বিচারপতির উদ্বেগ ও
সাম্প্রদায়িকতা বিনাশে করণীয়

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপরে বিভিন্ন সময়ে হামলা এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, এ কথা সত্য, কিন্তু তা সবসময়ই ঘটিয়েছে ধর্মান্ধ একটি চিহ্নিত চক্র। যারা মোট জনসংখ্যার অত্যন্ত সংখ্যালঘু একটি অংশ। এরা পাকিস্তান আমলেও সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, এখনও করছে। অপরাধীরা সংখ্যায় যত কমই হোক তারাই কিন্তু বড় বড় বিপর্যয় ঘটায়। সুতরাং ধর্মের রাজনীতি করা এই সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকদের প্রতিরোধে সংঘবদ্ধ প্রয়াস জরুরি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মানুরাগী, তারা ধর্মান্ধ নয়। সংখ্যালঘু ধর্মান্ধরাই বিপদের কারণ।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।

রোববার একটি মামলার শুনানিতে নিজের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে তিনি এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সাম্প্রদায়িক হামলার মামলায় ভুয়া অভিযোগ বিবেচনায় আসামিদের ছেড়ে দিলে কী অবস্থা দাঁড়াবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেছেন- ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের আসামিদের জামিন দিলে সমাজে নেতিবাচক বার্তা যাবে।’

ফরিদপুরের সালথায় ইউএনও অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অভিযুক্ত আসামির জামিন শুনানিতে জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি উল্লিখিত মন্তব্য করেন।

দেশের প্রধান বিচারপতির মতো একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ চেয়ার থেকে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারকদের দায়িত্বনিষ্ঠার বিষয়টিও তার উক্তির মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়েছে। অতীতে অনেক মামলায় জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের জামিন পেতে দেখেছি আমরা। প্রধান বিচারপতির এই উদ্বিগ্ন অভিমতের মধ্য দিয়ে বিষয়-সংশ্লিষ্ট সবাই আরও অধিকতর সতর্ক হবেন, এমন প্রত্যাশাই করতে চাই।

বাংলাদেশ আজ এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। যেকোনো মূল্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দমন করতেই হবে। আর সেজন্য চাই বিচার ও শাসন বিভাগের সমন্বিত প্রয়াস। একই সঙ্গে চাই দেশের প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ প্রগতিপন্থিদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।

প্রধান বিচারপতির উদ্বেগ পর্যালোচনা করলে এসত্য বেরিয়ে আসে যে, অতীতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি কঠোরভাবে কার্যকর করা যায়নি। যদি যেত, তা হলে দেশে বর্তমানে যে অবাঞ্ছিত সাম্প্রদায়িকতার উগ্র পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা এড়ানো যেত।

কারণ, এ সত্য আমাদের সকলেরই জানা- বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপরে বিভিন্ন সময়ে হামলা এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, এ কথা সত্য, কিন্তু তা সবসময়ই ঘটিয়েছে ধর্মান্ধ একটি চিহ্নিত চক্র। যারা মোট জনসংখ্যার অত্যন্ত সংখ্যালঘু একটি অংশ।

এরা পাকিস্তান আমলেও সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, এখনও করছে। অপরাধীরা সংখ্যায় যত কমই হোক তারাই কিন্তু বড় বড় বিপর্যয় ঘটায়। সুতরাং ধর্মের রাজনীতি করা এই সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকদের প্রতিরোধে সংঘবদ্ধ প্রয়াস জরুরি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মানুরাগী, তারা ধর্মান্ধ নয়। সংখ্যালঘু ধর্মান্ধরাই বিপদের কারণ।

১৯৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর পর্যবেক্ষণ করলেও ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দেয়া এই চক্রটির স্বরূপ উদঘাটন করা যায়। বঙ্গবন্ধুর জীবনব্যাপী সাধনায় মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা এই চক্রটিকে পরাজিত করেছিলাম। কিন্তু সেই পরাজয় চিরস্থায়ী করা গেল না।

তা ১৯৭৫ পর্যন্তই টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল রক্তার্জিত বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ফিরে যায় আবারও সেই পাকিস্তান আমলের ধর্মান্ধ রাজনীতি তথা সাম্প্রদায়িকতায়!

বাংলাদেশের গত ৪৫ বছরের রাজনৈতিক লড়াই সে কারণেই নিরন্তর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে এই সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার থেকেই প্রগতির আলোয় আলোকিত একটি রাষ্ট্র আমরা অর্জন করেও কুচক্রীমহলের চক্রান্তে ধরে রাখা গেল না! এর জন্য দায়ী কারা?

এ প্রশ্নের উত্তরও সচেতন মানুষমাত্রেরই জানা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা শুধু বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধুকেই সপরিবার হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছে মূলত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনকেও।

এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে যায় রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাধনা। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সাতচল্লিশের আগস্টের পর থেকেই। অর্থনৈতিক শোষণ বঞ্চনার পাশাপাশি ধর্মের নামে অপরাজনীতিমুক্ত একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও তার স্বপ্ন ছিল। এর বহু দালিলিক প্রমাণও আছে।

বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন-

“জনগণকে ইসলাম ও মুসলমানের নামে স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালোবাসে কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি তারা করতে দিবে না।” (পৃষ্ঠা ২৫৮)

শুধু আত্মজীবনীতে নয়, জনসভায়, বক্তৃতা-বিবৃতিতেও তিনি সবসময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে কথা বলেছেন। অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমানের একটি বইয়ের নাম ‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম’। ওই গ্রন্থের ২১৯ পৃষ্ঠায় তিনি বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর দেয়া এক বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যেখানে বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-

“এদেশে ইসলাম, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবই থাকবে এবং বাংলাদেশও থাকবে। হিন্দু ও বৌদ্ধদের ওপর গত এক দশক যে অত্যাচার হয়েছে তার অবসান হবে।”

বঙ্গবন্ধুর লিখিত এই এক দশক ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সাল।

সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু এনে দিয়েছিলেন কিন্তু সেই চেতনার বাংলাদেশ তো আমরা ধরে রাখতে পারলাম না!

স্বাধীনতার ৫০ বছরে তথা সুবর্ণজয়ন্তীর এই গৌরবময় ২০২১ সালে বসে পেছনে ফিরে তাকালে অনুতাপই জাগে- এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম!

পঁচাত্তরের পর থেকে বাংলাদেশে দিনে দিনে সাম্প্রদায়িকতা চরম রূপ লাভ করেছে। জেনারেল জিয়ার সরকার থেকে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার আমল পর্যন্ত দুই দফা সামরিক শাসন আর নিষিদ্ধ জামায়াতসহ ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে সহযোগিতা দিয়ে বিকশিত হবার সুযোগ-সুবিধাই দেয়া হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশকে ধ্বংসের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারই বিষফল আজ ভোগ করছে বাংলাদেশ।

কুমিল্লার পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার চক্রান্তের স্বরূপ উদঘাটিত হতে চলেছে। কোরআন শরিফ রেখেছিল যে ইকবাল, তাকে গ্রেপ্তার করার পর আদালত তাকে রিমান্ডে দিয়েছে। কারা ইকবালকে দিয়ে এ কাজ করিয়েছে, তাদেরও চিহ্নিত করা হচ্ছে।

গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁও কলেজে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িত সবাই চিহ্নিত হয়েছে। তারা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। কেন এই ঘটনা ঘটিয়েছে তার সবকিছু আপনাদের জানাতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।’

এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, অন্য ধর্মের নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে সরকার। সাম্প্রতিক হামলায় জড়িতদের বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করার কথাও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ইতোমধ্যেই কঠোর বার্তা দিয়েছেন সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত উপড়ে ফেলার জন্য। তিনি দেশ-বিদেশে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় চালানো ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচারের পরিস্থিতিও তুলে ধরেছেন।

এদিকে চট্টগ্রামে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা রোববার সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ করেছেন। নিঃসন্দেহে এর সবকিছুই আমাদের মনে আশা জাগায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যেটা তা হলো আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দল ছাড়া সব প্রগতিশীল শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায় থেকে জনসাধারণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনমত গঠন- কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ের সংস্কৃতি- কর্মীদেরকেও এ কাজে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা জরুরি। বাংলাদেশ যে সত্যিকার অর্থেই অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, সেই সত্য চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই।

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে যারা দেশে সাম্প্রদায়িকতার আগুন ছড়িয়ে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম ক্ষমতাসীন দলকে দেশ-বিদেশে সক্রিয়ভাবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হয়।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক, উপদেষ্টা সম্পাদক দৈনিক দেশের কণ্ঠ। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
আগামী নির্বাচন এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ
জিয়ার মরণোত্তর বিচার যৌক্তিক যেসব কারণে
বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ : কন্যাশিশুর গুরুত্বহীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত
১৯৭৭ সালের অক্টোবর-হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটিত হোক
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ : মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সার্বিক উন্নয়নও জড়িত

শেয়ার করুন

জন্মদিনে স্মরণ: বব কেইন ব্যাটম্যানে অমর

জন্মদিনে স্মরণ: বব কেইন ব্যাটম্যানে অমর

তখন পর্যন্ত বিশ্বের যেকোনো দেশে কমিকস-বিষয়ক বই সমান জনপ্রিয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, প্রযুক্তির অসুস্থতা, ড্রাগ, দারিদ্র্য ইত্যাদি বিষয়ে তিনি বিপুল বিদ্রূপাত্মক কার্টুন এঁকেছেন। নিজের সৃষ্টি ‘ব্যাটম্যান’ চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বব কেইন বলেছিলেন- বিশ্বের তাবৎ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যাটম্যানের নিয়ন্তর যুদ্ধ। অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়ানোই তার একমাত্র কাজ।

সৃষ্টির ভেতর দিয়ে যে জগৎ নির্মাণ করা হয়েছে, সৃজনশীলতার নিরিখে সময়ের পথ পাড়ি দিয়ে আজও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে তার কীর্তি। কীর্তিমান মানুষ বৈকি। বিশ্বসংসারকে দেখেছেন ভিন্নতার অবয়বে। এঁকেছেন কার্টুনের পর কার্টুন। তিনি বব কেইন। বিশ্বনন্দিত কার্টুনিস্ট। যিনি আজও তার অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘ব্যাটম্যান’-এর জন্য সববয়সির কাছে জনপ্রিয় হয়ে আছেন। অসংখ্য কমিকস কার্টুন এবং এনিমেশন ফিল্মের (কার্টুন) জন্য বিখ্যাত বব কেইন ছিলেন চিরতরুণ, সতেজ যুবা যেন। বয়স তার সৃষ্টিকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়নি।

জীবনের শেষদিনেও এঁকেছেন কার্টুন। বব কেইন বিশ্বাস করতেন কার্টুনের মধ্যে অনেক কিছু ফুটে বেরোয়। শুধু কার্টুনিস্টদের মনের কথাই নয়, যুগের প্রভাব, সম্প্রদায়গত মনস্তত্ত্ব, পারিপার্শ্বিকতার অসংগতিও ফুটে ওঠে। কার্টুন যদিও শিল্পসাহিত্যের মতো চিরকালীন সত্যের বাহক নয়। কিন্তু দীর্ঘকালের হতেই পারে। কার্টুনের আবার রকমফের আছে। একটিমাত্র বিষয় নিয়ে যেমন একটি কার্টুন তৈরি হয়, সংবাদপত্রে যা প্রায়শই ছাপা হয় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে আবার টানা গল্প দিয়ে কার্টুন আঁকা হয়।

কাগজের পাতায় কার্টুন এক নির্বাক দর্শকের এমন কাছের মানুষ হয়ে ওঠার উদাহরণ আর কোথাও মেলে না। কার্টুনে আসে হাজার মুখের মিছিল। মুখম্লানে কার্টুনের মুখ। ক্যারিকেচার করা মুখ, অথচ তাদের মাধ্যমে যেন ফুটে ওঠে প্রকৃত সত্তার আভাস। লুকিয়ে রাখা চেহারা, যা আমাদের মনে থাকে সন্দেহের রূপে, দেখলে হাসি পায়, কিন্তু ভয় করে না যে, ব্যাপারটা বোধ হয় হাসির নয়। আবার কখনও মনে হয় ঠিক বিপরীত। অর্থাৎ যাকে ভাবা হয়েছিল এরকম ওরকম সেরকম। সে আসলে হয়তো শুধুই একটা মজার মানুষ। কিংবা একটা হাস্যকর জীবন।

কিংবা সে সত্যি সত্যিই একটা চলন্ত কার্টুন। ঠিক মানুষ নয় আসলে। প্রত্যেক মানুষের আকৃতির পিছনে লুকানো থাকে এক অমানবিক চেহারা। কার্টুনিস্ট সেটাকে খুঁজে বের করেন। এক্ষেত্রে একটি বিশেষ দৃষ্টি থাকতে হয়। কার্টুন থেকে ক্রমশ কমিকসের আবির্ভাব। কল্প কাহিনি, গোয়েন্দা কাহিনি আর সায়েন্স ফিকশন ও এই কমিকসের বিষয়বস্তু। এর সম্প্রদায়ের সংখ্যাও বিশ্বজুড়ে কম নয়। কার্টুনিস্ট বব কেইন জন্মেছিলেন ১০৬ বছর আগে ১৯১৫ সালের ২৪ অক্টোবর নিউইয়র্ক শহরের প্রসিদ্ধ কান পরিবারে।

পরে পারিবারিক পদবি পরিবর্তন করে বব কেইন নাম ধারণ করেন। ছবি আঁকার আগ্রহ শৈশবেই জাগে। পেনসিল, রংতুলি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন। কুকুর, বিড়াল, টিকটিকি, ইঁদুর সবই আঁকতেন। পারিবারিকভাবেও এ কাজে উৎসাহ পেয়েছেন। এক সময় পোট্রেট আঁকাও শুরু করেন। আর ঠিক এ সময় তার আকাঙ্ক্ষার স্রোতে জোয়ার বইয়ে দেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। বদলে যায় তার চিত্রকর্ম সৃষ্টির পথ। লা ভিঞ্চির কাজ তাকে প্রবলভাবেই বুঝি নাড়া দিয়েছিল।

এক সাক্ষাৎকারে পরবর্তীকালে বব কেইন বলেছেনও, “বারো কি তেরো বছর বয়সে অটোমোবাইল ইঞ্জিনের ডিজাইন-সম্পর্কিত একটি গ্রন্থ কীভাবে যেন হাতে আসে। এর পর পরই দ্য ভিঞ্চির একটি গ্রন্থ আসে হাতে। যাতে আঁকা ছিল একটি ফ্লাই মেশিনের ডিজাইন। মেশিনের পাখা ছিল অনেকটা আমার সৃষ্টি ব্যাটম্যানের মতো। তখন থেকেই মূলত ব্যাটম্যানের মতো একটা কিছু সৃষ্টি প্রেরণা আমার ভেতর কাজ করতে থাকে।”

১৯৩০ সালে বয়স যখন পনেরো, কার্টুন-কমিকস আঁকার কাজ শুরু করেন বব কেইন। কার্টুন তখনও সারাবিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কার্টুনের পদচারণা তখন সংবাদপত্র তথা প্রকাশনা জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কার্টুনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। দুই হাজার বছরেরও আগে রোমে খোদাই শিল্পীরা কাঠ বা পাথর খোদাই করে ছোট ছোট ছবি আঁকত। কাঠখণ্ডের এসব চিত্র বেচা-কেনাও হতো।

আধুনিক কার্টুন-কমিকসের প্রতিষ্ঠাতা সুইজারল্যান্ডের রুডলফ টপার নিজের আঁকা কার্টুনচিত্র দিয়ে শতপৃষ্ঠার ‘দি অ্যাডভেঞ্চার অব অবাদিয়াহ ওল্ডবাক’ নামে অ্যালবাম প্রকাশ করেন। ১৮৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংশোধিত আকারে প্রথম কমিকস বই হিসেবে ছাপা হয়। অবশ্য পেশাদার কমিকস আঁকিয়ে হিসেবে সে সময় খুব নাম ডাক হয় জার্মানীর উইলিয়াম বাস্কের। ১৮৯৩ সালে নিউইয়র্ক টাইমস ও মর্নিং জার্নাল পত্রিকা দুটিতে কমিকস ছাপা শুরু হয়। ক্রমশ তা পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। সংবাদপত্রের কারণে কমিকসের বিকাশ ঘটে দ্রুত গতিতেই।

একটি জনপ্রিয় ডিটেকটিভ কমিকস, যাকে ডিসি কমিকসও বলা হতো, তা আঁকার মধ্যে দিয়ে বব কেইন পেশাগতভাবে কার্টুন জগতে প্রবেশ করেন। কার্টুন ঢঙের চিত্রকর্মের পাশাপাশি অল্প কথার হাস্যরসাত্মক ডায়লগ দিয়ে গোয়েন্দা গল্প টেনে নিয়ে যাবার আইডিয়া বিশ্বে তখন একেবারেই আনকোরা। সংবাদপত্রের প্রচারণার সুবাদে বব কেইনের কমিকস গ্রন্থ বিক্রির হার বেড়ে গেল। এরই প্রেরণায় বব আরও বেশক’টি কমিকস বই প্রকাশ করেন। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো ছেলেবুড়োদের মুখে মুখে ফিরত। সে সময় গণমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার না ঘটায় বব কেইনের চেহারা পাঠকের কাছে ছিল অপরিচিত।

প্রকাশনা জগতে বব কেইনের অবস্থান তখন শীর্ষে। কার্টুন নিয়ে ব্যাপক চিন্তাভাবনা, গবেষণা শুরু করেন। চলচ্চিত্রের কার্টুনের প্রয়াস ঘটানোর চিন্তা তার অনেক দিনেরই। সীমাবদ্ধ প্রাযুক্তিক কলাকৌশলের কারণে বিষয়টা তখন বেশ কঠিন এবং ব্যয়বহুল ছিল। কারণ প্রতিটি চরিত্রের বা সাবজেক্টের প্রতিটি ‘মুভমেন্ট’ এঁকে এঁকে তা ফ্রেমবদ্ধ করে চলচ্চিত্রে রূপান্তর ঘটিয়ে কার্টুন ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন বব কেইন।

প্রতিটি চরিত্রের অসংখ্য মুভমেন্ট আঁকার কাজ শুরু করেন। এভাবে দীর্ঘদিন সময় ব্যয় করে, অনেকটা সন্দিহান থেকেই বব কেইন ১৯০৯ সালে ‘ব্যাটম্যান’-এর কাজ শেষ করেন। কাল্পনিক চরিত্র ব্যাটম্যানের লেখক ছিলেন বিল কিঙ্গার। গোয়েন্দা ব্যাটম্যানের নতুন জন্ম হলো বব কেইনের হাতে। আর তখনি কমিকস হয়ে ওঠে সত্যিকারের কমিকস।

বব কেইন সিরিজের পর সিরিজ তৈরি করতে থাকেন ব্যাটম্যান-এর। শৈশবে নিজের চোখের সামনে ডাকাতদের হাতে বাবা-মায়ের খুন হতে দেখেছে ব্যাট। বড় হয়েছে এক এতিমখানায়। তারপর লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে একের পর এক প্রতিশোধ নিতে থাকে দুর্বৃত্তদের উপর। এরকম টান টান উত্তেজনায় ভরপুর ছিল ‘ব্যাটম্যান’-এর প্রতিটি সিরিজ। ফলে শিশু-কিশোরদের কাছে ব্যাটম্যান হয়ে ওঠে রহস্য রোমাঞ্চের এক স্বপ্নের নায়ক।

এই সফলতার ফলও পুরোপুরিভাবে আসতে থাকে বব কেইনের ভাগ্যে। ক্রমে কার্টুন তথা এনিমেশন ফিল্মজগতে এক ‘প্রবাদ পুরুষ’ ইমেজ প্রতিষ্ঠিত হয় তার। ব্যাটম্যানের হাত ধরেই ১৯৪০ সালে মুভি সিরিয়াল, ১৯৬০ সালে টিভি সিরিয়াল এবং ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বড় বড় বাজেটের ফিল্ম সিরিজ সম্পন্ন করার কৃতিত্ব দেখান বব কেইন। ১৯৯০ সালে নির্মাণ করেন এনিমেশন সিরিজ ‘ডার্ক নাইট’।

‘ব্যাটম্যান’-এর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার পর নব্বই দশকে এসে বব কেইনের আরও বেশ কিছু আধুনিক সংস্করণ নিয়ে আসে সমকালের শিশু-কিশোরদের সামনে। ১৯৯২ সালে ব্যাটম্যান রিটার্ন, ১৯৯৬ সালে ব্যাটম্যান ফরএভার, ১৯৯৭ সালে ব্যাটম্যান অ্যান্ড রবিন ইত্যাদি।

“খেলনা, কার্টুন, স্টিকার, টিভি, মুভি কোথায় নেই বব কেইন? সর্বত্রই ব্যাটম্যানের ছড়াছড়ি। আর এই ব্যাটম্যানের পাশাপাশি যুগ যুগ যিনি টিকে থাকবেন তিনিই বব কেইন”- মন্তব্য করেছিলেন বব কেইনের বিভিন্ন ডিসি কমিকস প্রকাশক এবং কমিকস-বিষয়ক ঐতিহাসিক মার্ক এভানি। যার দৃষ্টিতে বব কেইন একজন ‘কাজ পাগলা মানুষ’। বিশ্বজুড়ে কমিকস বইকে প্রকাশনার বিষয় হিসেবে নিয়ে আসা এবং এর বাণিজ্যিক বিস্তারে কৃতিত্বের দাবিদারও বব কেইন।

তখন পর্যন্ত বিশ্বের যেকোনো দেশে কমিকস-বিষয়ক বই সমান জনপ্রিয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, প্রযুক্তির অসুস্থতা, ড্রাগ, দারিদ্র্য ইত্যাদি বিষয়ে তিনি বিপুল বিদ্রূপাত্মক কার্টুন এঁকেছেন। নিজের সৃষ্টি ‘ব্যাটম্যান’ চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বব কেইন বলেছিলেন- বিশ্বের তাবৎ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যাটম্যানের নিয়ন্তর যুদ্ধ। অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়ানোই তার একমাত্র কাজ।” বব কেইনের জীবনের লক্ষ্যই ছিল নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। সে কাজ সৃষ্টিশীলও সৃজনশীল কাজ। জীবনে চরম প্রতিষ্ঠা চলে আসার পরও এবং প্রচুর বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হয়েও বব কেইন সার্বক্ষণিক মগ্ন থাকতেন কাজে।

স্ত্রী ছিলেন অভিনেত্রী। সানডার্স কেইন তাকে নিয়মিত উৎসাহ জোগাতেন। এছাড়া নিজের কন্যা, নাতি এবং এক বোন ছায়ার মতো পাশে পাশে থাকতেন। ৮৩ বছর বয়সে ১৯৯৮ সালের তিন নভেম্বর লস এঞ্জেলসে নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর অল্প ক’দিন আগেও প্রচুর ফ্যানমেইল ‘রিসিভ’ করেছেন। মৃত্যুর পর তার বাড়িটি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। সবই ছিল শিশু-কিশোরদের ভক্তি ও শ্রদ্ধার্ঘ্য। মৃত্যুর পর তার বাড়িটি কার্টুন-কমিকস জাদুঘর করে তোলা হয়েছে।

বব কেইন দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোরদের মাতিয়ে রেখেছেন। এই বাংলাদেশে ব্যাটম্যান এখনও জনপ্রিয়। তবে এই সৃষ্টির স্রষ্টা আড়ালেই থেকে গেছেন। তবে তার কর্ম আরও অনেক যুগ ধরে শিশু-কিশোরদের কাছে আদরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: কবি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও মহাপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

আরও পড়ুন:
আগামী নির্বাচন এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ
জিয়ার মরণোত্তর বিচার যৌক্তিক যেসব কারণে
বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ : কন্যাশিশুর গুরুত্বহীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত
১৯৭৭ সালের অক্টোবর-হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটিত হোক
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ : মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সার্বিক উন্নয়নও জড়িত

শেয়ার করুন

রাজনীতি-অপরাজনীতি ও তারুণ্য

রাজনীতি-অপরাজনীতি ও তারুণ্য

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের জিঘাংসু প্রজন্ম বাংলার মাটিতে এখনও বেঁচে আছে। এ জাতির উপর তাদের ৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তারা এখনও তৎপর রয়েছে। একটি জাতিকে ধ্বংস করার মোক্ষম অস্ত্র হলো সে জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকবোধকে বিনষ্ট করে দেয়া। সে অপচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দালালগোষ্ঠীর হীন উদ্দেশ্য ছিল বাস্তবায়নের জন্য বাঙালিকে জ্ঞানবিমুখ ও সংস্কৃতিবিমুখ করা একান্ত জরুরি।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো দেশ নেই যে দেশের স্বাধীনতার শত্রুরা বেঁচে আছে; পৃথিবীর কোনো দেশে এমন কোনো রাজনৈতিক দল নেই যারা তাদের জন্মভূমির স্বাধীনতার শত্রুদের তল্পিবাহক হিসেবে গড়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম মানবাধিকারের চূড়ান্ত নিদর্শন স্থাপনকারী একটি দেশ। এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি শুধু বেঁচে আছে তাই নয়, তারা দিব্যি সক্রিয়ভাবে ক্ষমতাচর্চার রাজনীতি করে আসছে। তারা নানা ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে অবৈধভাবে একাধিকবার এদেশের ক্ষমতা দখল করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে পাকিস্তানিকরণ করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহিদের রক্তেরাঙা বর্ণমালায় প্রণীত সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করার মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক চরিত্রকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

যার চূড়ান্ত প্রতিফলন হিসেবে লাল সবুজের পতাকাকে বদলে দেয়ার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান এবং বীর বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে পাকিস্তানের ‘জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে অপসারণ করা পাকিস্তানি ভাবধারায় নেয়ার অপতৎপরতা চালিয়েছে জামায়াত-শিবির ও জিয়া কর্তৃক ক্যান্টনমেন্ট-সৃষ্ট দুর্নীতি, লুটতরাজ ও খুনি সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর জনবিচ্ছিন্ন দল বিএনপি। বাংলাদেশবিরোধী এই গোষ্ঠীগুলো সংঘবদ্ধভাবে তাদের হীন অপচেষ্টা এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পাকিস্তানি দালাল বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠী কোনোভাবে রাজপথে যৌক্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে সম্প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক ফ্যাশাদ লাগিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। দ্রুত অগ্রসরমান বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয়ার হীন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন ও বাঙালির হাজার বছরের সম্প্রীতির সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করার জন্যেই কুমিল্লায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে পবিত্র কোরআন রেখেছিল স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরের ক্যাডারেরা। বিশদ তদন্তে সিসি ফুটেজ দেখে তা এখন প্রমাণিত হয়েছে।

আমরা দেখলাম বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনা না করেই, বিবেকবুদ্ধি দিয়ে চিন্তা না করেই উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দোষারোপ করে তাদের পূজামণ্ডপ ভাঙচুর এবং তাদের বসতবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জবরদখল, চুরি, লুটপাট করার মাধ্যমে তাদের তথাকথিত ঈমানের নগ্ন পরিচয় দিয়েছে। আদতে তারা কি ঈমানের পরিচয় দিতে পারল! এই যে তারা নিরপরাধ মানুষকে আক্রান্ত করল, অসহায় মানুষের ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল, ধর্মকে পুঁজি করে লুটপাট এবং চুরির মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড করল; এতে কি তাদের পাপ হয়নি?

ইসলামের নাম ভাঙিয়ে নামধারী মুসলমান কোরআনকে অপমান করল এর জন্য তারা কি বিচারের মুখোমুখি হবে না? তাদের কি আল্লাহর আদালতে বিচার হবে না?

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কসাই ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খানসহ কায়েমি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কোনো কূলকিনারা না পেয়ে কোনো রাজনৈতিক সমাধান করতে না পেরে ধর্মের বিষবাষ্প ছড়িয়ে এদেশের নিরস্ত্র গণমানুষের উপর গণহত্যা এবং লুটপাট চালানো শুরু করল। এমনকি তারা গণমানুষকে নগ্ন করে গণতল্লাশি চালিয়েছে যারা হিন্দু তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মা-বোনদের ধরে নিয়ে তাদের যৌন লালসা চরিতার্থ করে গণহত্যা চালিয়েছে।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের ‘পাকিস্তানি জেনারেলদের মন’ বইটিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দালালদের এই জঘন্য কর্মকাণ্ডের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। আজকের সমাজে এসে ধর্মের নামে বিশৃঙ্খলা, লুটপাট, হানাহানি কেন হচ্ছে? এর দায়ভার রাষ্ট্রযন্ত্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে- যখন এদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বীর মুক্তিযোদ্ধারা যখন পাকিস্তানি বাহিনীকে চারদিক থেকে পাকড়াও করে ফেলছিল তখন বাঙালি জাতির চিরশত্রু গাদ্দার জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রসংঘ (যার বর্তমান নাম ছাত্রশিবির) দ্বারা গঠিত পাকিস্তানি দালাল রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচারের অংশ হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ভারতের চর হিসেবে অপবাদ দেয়ার চেষ্টা করত, তাদের ষড়যন্ত্রমূলক অপচেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

পাকিস্তানের পা-চাটা গোলাম এই বর্বর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি ইসলাম রক্ষার নামে ১৯৭১ সালে লাখ লাখ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে ও লক্ষাধিক মা বোনকে গণধর্ষণ করে হত্যা করে। কিন্তু সেসময় বাংলার ভূমি সন্তানেরা হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বীর বাঙালি মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমে কাপুরুষ পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করেছিল।

পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার লাল সবুজ পতাকা। এই যে আজকের শিক্ষিত সমাজেও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের উদ্গীরণ ঘটছে তার পেছনেও রয়েছে বাংলা ও বাঙালির শত্রুদের দীর্ঘদিনের সুচতুর পরিকল্পনা। সুদীর্ঘকাল ধরে এদেশের মানুষকে সাংস্কৃতিকভাবে দেউলিয়া করে দেয়ার এক ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দালালগোষ্ঠী।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের জিঘাংসু প্রজন্ম বাংলার মাটিতে এখনও বেঁচে আছে। এ জাতির উপর তাদের ৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তারা এখনও তৎপর রয়েছে। একটি জাতিকে ধ্বংস করার মোক্ষম অস্ত্র হলো সে জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকবোধকে বিনষ্ট করে দেয়া।

সে অপচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দালালগোষ্ঠীর হীন উদ্দেশ্য ছিল বাস্তবায়নের জন্য বাঙালিকে জ্ঞানবিমুখ ও সংস্কৃতিবিমুখ করা একান্ত জরুরি। এরই অংশ হিসেবে অসাম্প্রদায়িক বাঙালিকে সাংস্কৃতিকভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্যে খুনি জিয়া, খালেদা-নিজামীর বিএনপি জামায়াত গংয়ের সুকৌশলী চক্রান্ত আজ বর্ণনা করব। যাদের বয়স ৩০ এবং যারা প্রকৃত অর্থেই শিক্ষিত, যাদের মন এবং মনন আলোকিত তারা বিষয়টি বোধ করি ধরতে পারবেন। বিএনপি জামায়াত খুনিচক্র বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে যে প্রক্রিয়ায় নির্মূল করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো-

১. শিক্ষিত প্রজন্মকে সিনেমা হল-বিমুখ করার লক্ষ্যে বাংলা চলচ্চিত্রে ভয়াবহ রকমের অশ্লিলতা ও কাটপিসের (নগ্ন চিত্র প্রদর্শন) প্রবর্তন করা হয়

২. সিনেমা হলে ও বৈশাখী মেলায় বোমা হামলা

৩. উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কর্মসূচিতে বোমা হামলা

৪. প্রগতিশীল শিল্পী-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা।

৫. জঙ্গিগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় মদদ প্রদান করা

৬. তারেক জিয়া ও বাবরের পরিকল্পিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় খালেদা-নিজামী সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা।

৭) খালেদা-নিজামী সরকার কর্তৃক জেএমবি, বাংলা ভাইয়ের মতো জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান।

এছাড়াও, অসংখ্য অগণিত রাষ্ট্রীয় অপরাজনৈতিক কুকর্ম সম্পাদনের মধ্য দিয়ে বাংলাকে সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করার চক্রান্তে মেতে উঠেছিল পাকিস্তানি দালাল বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠী।

আজকের দিনে নতুন প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, একটি সুখীসমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের শপথ নিয়ে বাংলার মাটি থেকে পাকিস্তানের দালালগোষ্ঠী বিএনপি-জামায়াতের বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অমোঘ নির্দেশনা অনুসরণ করে পথচলায় সর্বাগ্রে গুরুত্বারোপ করতে হবে, জাতির পিতা এ জাতিকে যেসব কালোত্তীর্ণ নির্দেশ প্রদান করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-

১. ‘সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। হিন্দু তার ধর্মকর্ম করবে। বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না।

২. সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই মাটি ও মানুষকে কেন্দ্র করে গণমানুষের সুখ, শান্তি ও স্বপ্ন এবং আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠবে বাংলার নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতি।

৩. যদি আমরা বিভক্ত হয়ে যাই এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও মতাদর্শের অনৈক্যের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে আত্মঘাতী সংঘাতে মেতে উঠি, তাহলে যারা এদেশের মানুষের ভালো চান না ও এখানকার সম্পদের ওপর ভাগ বসাতে চান তাদেরই সুবিধা হবে এবং বাংলাদেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত, ভাগ্যাহত ও দুঃখী মানুষের মুক্তির দিনটি পিছিয়ে যাবে।

৪. পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না।

এদেশের জন্মলগ্ন থেকে আদর্শিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দেউলিয়া রাজনৈতিকগোষ্ঠী বিএনপি-জামায়াত এ মাটিকে গুজব ষড়যন্ত্রের অপরাজনীতির মাধ্যমে রক্তাক্ত করেছে, ক্রমাগত ছিন্নভিন্ন করে চলেছে তাই তরুণ প্রজন্মকে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রেখে পথচলতে হবে। আমরা যেন অপশক্তির হীনউদ্দেশ্যে পাতা ফাঁদে যেন না পড়ি। আমাদের চিন্তাভাবনা ও শিক্ষা যেন মাতৃভূমির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়ে না যায়।

আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রামের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন “যখন একজন মানুষ বিবেচনা করে যে, নিজজাতি এবং স্বদেশের প্রতি সে তার দায়িত্ব পালন করেছে, তখন সে শান্তিতে মৃত্যুবরণ করতে পারে।”

সবশেষে মহান স্বাধীনতার স্থপতি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করছি- ‘একবার একান্ত আলাপচারিতায় যুবলীগের কয়েকজন কর্মীকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমি মারা গেলে আমার কবরে একটা টিনের চোঙা রেখে দিস। লোকে জানবে এই একটা লোক একটা টিনের চোঙা হাতে নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিল এবং সারাজীবন সেই টিনের চোঙায় বাঙালি বাঙালি বলে চিৎকার করতে করতেই মারা গেল।’

লেখক: ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
আগামী নির্বাচন এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ
জিয়ার মরণোত্তর বিচার যৌক্তিক যেসব কারণে
বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস আজ : কন্যাশিশুর গুরুত্বহীনতা অনাকাঙ্ক্ষিত
১৯৭৭ সালের অক্টোবর-হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটিত হোক
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ : মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির সঙ্গে সার্বিক উন্নয়নও জড়িত

শেয়ার করুন