মহালয়া ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র

মহালয়া ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র

যে ভাঙা-ভাঙা স্বরের কারণে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠ হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র, সেটি নাকি হয়েছে অসুখের কারণে। ছেলেবেলায় ডিপথেরিয়া হয়েছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণের। চিকিৎসকরা সে যাত্রায় তাকে প্রাণে বাঁচাতে পারলেও বদলে যায় কণ্ঠস্বর। এই ‘নষ্ট’ হওয়া স্বরই তাকে এনে দিয়েছে অমরত্ব।

তখন আশ্বিনেই শীত পড়ে যেত। আর সকালগুলো ছিল কুয়াশাময়। এমন শীত শীত ভোরে ঘুম আরও গাঢ় হয়ে আসে।

তবু আরামের ঘুম ভেঙে বাবার ডাকে বিছানা থেকে উঠে আসতে হতো। এরপর ঢুলুঢুলু চোখ আর চরম বিরক্তি নিয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে বসে থাকা রেডিওর সামনে। এই সাতসকালে পরিবারের সবাই রেডিও ঘিরে বসা। নারীদের মুষ্টিবদ্ধ হাতে ফুল আর বেলপাতা।

রেডিওর নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এক জায়গায় গিয়ে থামতেন বাবা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই স্টেশন থেকে ভেসে আসত একটি দরাজ কণ্ঠ।

প্রতি মহালয়ার ভোরেই এই ছিল রুটিন, ভোরে উঠে রেডিওতে সেই কণ্ঠ শোনা।

এই কণ্ঠে ভর করেই আমাদের শৈশবে দেবী দুর্গা আসতেন। পূজার ঢাকে কাঠি পড়ত। শুরু হতো ক্ষণগণনা।

মহালয়া মানেই ছিল সেই সম্মোহনী কণ্ঠে ভেসে আসা-

“আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জির;

ধরণির বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা;

প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা।

আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবন।

তাই আনন্দিতা শ্যামলীমাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন।

আজ চিৎ-শক্তিরূপিণী বিশ্বজননীর শারদ-স্মৃতিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা।”

পরে, অনেক বড় হয়ে জানা গেছে দরাজ কণ্ঠের সেই লোকটি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। রেডিওর একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই যিনি হয়ে উঠেছেন অনেকটা মহালয়ারই সমার্থক।

মহালয়া ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র

বাণী কুমারের রচনায় ও পঙ্কজ মল্লিকের সুরে আকাশবাণী রেডিওর এই অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। ১৯৩২ সালে দুর্গাপূজার ষষ্ঠীর ভোরে প্রথমবার প্রচারিত হয় বেতারের এই কালজয়ী অনুষ্ঠান।

তখন নাকি বেতারে রেকর্ডিং করার সুযোগ ছিল না। সব অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। যারা মহিষাসুরমর্দিনীতে অংশ নিতেন তারা আগের রাতেই রেডিও অফিসে চলে আসতেন। রাতভর চলত মহড়া। আর ভোরে অনুষ্ঠান শুরুর আগে স্নান করে গরদের ধুতি আর পাঞ্জাবি পরে চণ্ডিপাঠে বসতেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ।

যার চণ্ডীপাঠ ভক্তিরসে ভাসিয়ে দেয় আবালবৃদ্ধবণিতাকে, পুণ্যকর্ম ভেবে মহালয়ার ভোরে যার কণ্ঠ শুনতেন সকলে, তিনি কিন্তু সেই অর্থে তেমন ধার্মিক ছিলেন না। বাবার ধর্মচর্চা সম্পর্কে বীরেন্দ্রকষ্ণের মেয়ে সুজাতা দেবীর মন্তব্য- ‘বাবাকে কখনও ঠাকুরকে একটা ধূপও দিতে দেখিনি।’

যে ভাঙা-ভাঙা স্বরের কারণে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠ হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র, সেটি নাকি হয়েছে অসুখের কারণে। ছেলেবেলায় ডিপথেরিয়া হয়েছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণের। চিকিৎসকরা সে যাত্রায় তাকে প্রাণে বাঁচাতে পারলেও বদলে যায় কণ্ঠস্বর। এই ‘নষ্ট’ হওয়া স্বরই তাকে এনে দিয়েছে অমরত্ব।

প্রথম জীবনে ভাঙা স্বরের কারণে রেডিওর অডিশনে অকৃতকার্য হন বীরেন্দ্র। আবার এই কণ্ঠস্বরের কারণেই কিছুদিন পর রেডিওতে ডাক পড়ে তার। একটা রাক্ষস চরিত্রের জন্য এমন একটা কণ্ঠস্বরই খুঁজছিলেন পরিচালক। রাক্ষসরূপে রেডিওতে প্রবেশ করা এই লোকটি পরবর্তী সময়ে ঢুকে পড়েন বাঙালির, বিশেষত বাঙালি হিন্দুদের মনোজগতেও।

মহালয়া ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র

১৯৭৬ সালে একটি হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে যায় কলকাতায়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ তখন বৃদ্ধ। উত্তমকুমার তখন মহাতারকা। আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানটি নতুনভাবে রেকর্ডের। ‘দুর্গা দুর্গতিহারিণী’ নামের সেই অনুষ্ঠানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের বদলে মহানায়ক উত্তমকুমারের কণ্ঠ ব্যবহার করা হয়। ৭৬-এর মহালয়ার ভোরে আকাশবাণী থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের বদলে ভেসে আসে উত্তমকুমারের কণ্ঠ।

জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা উত্তমকুমারের কারণে এই অনুষ্ঠান আরও জনপ্রিয়তা ও ভিন্নমাত্রা পাবে বলে আশা করেছিল রেডিও কর্তৃপক্ষ, কিন্তু অনুষ্ঠান প্রচারের পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। প্রিয় কণ্ঠ শুনতে না পেরে খেপে গেল কলকাতার মানুষ। ক্ষোভে মানুষজন রাস্তায় নেমে আসে। ব্যাপক বিক্ষোভ হয় কলকাতা শহরে। ভাঙচুর করা হয় আকাশবাণীর কার্যালয়।

মানুষের ক্ষোভের মুখে সে বছরই ষষ্ঠীর দিন আবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণর মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচার করতে বাধ্য হয় রেডিও কর্তৃপক্ষ।

এই কাহিনি নিয়ে ‘মহালয়া’ নামে একটি সিনেমা নির্মাণ করেন পশ্চিমবঙ্গের পরিচালক সৌমিক সেন। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় প্রযোজিত ছবিটি ২০১৯ সালে মুক্তি পায়। এতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শুভাশীষ মুখোপাধ্যায় আর উত্তমকুমারের ভূমিকায় ছিলেন যীশু সেনগুপ্ত।

মহালয়া ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র
‘মহালয়া’ সিনেমার পোস্টার

তাকে সরিয়ে উত্তমকুমারকে দিয়ে এই অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ বলেছিলেন: ‘হাজার হোক, আমি তো অমর নই। একদিন না-একদিন ওদের তো কাজে নামতেই হবে।’

বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কথায় বিনয় প্রকাশ পেলেও তার নাতি সায়ন ভদ্র পরবর্তীকালে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘দাদু সেদিন আঘাত পেয়েছিলেন আকাশবাণী কর্তৃপক্ষের ব্যবহারে।’

একবার বাংলাদেশে এসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেখেন, এখানকার মুসলমান শ্রোতারাও তার মহিষাসুরমর্দিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এতে বিস্মিত বীরেন্দ্র বলেন, ‘আমি কায়েতের ছেলে হয়ে মাতৃবন্দনার সুযোগ পেয়েছি। আর ওই অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজান খুশী মহম্মদ, আলী, মুন্সী এরা। এর থেকে সম্প্রীতির পূজার্চনা আর কী হতে পারে!’

জীবৎকালেই অমরত্ব পেয়েছিলেন। তবু শেষ জীবনটা তার কেটেছে দারিদ্র্য আর জরায়। ১৯৯১ সালের ৪ নভেম্বর ৮৬ বছর বয়সে মারা যান এই কণ্ঠের জাদুকর।

তবে জাদুকরী কণ্ঠের কারণে এখনও তিনি থেকে গেছেন বাঙালির স্মৃতিতে। রেডিওর যুগ ফুরিয়েছে। তবু ইউটিউবের কল্যাণে এখনও মহালয়ায় বেজে ওঠে তার কণ্ঠ।

আরও পড়ুন:
রিমান্ড মানে যেন হয় ভয়-ভীতির কিছু নয়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ: বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনই মুক্তির হাতিয়ার
ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এখানে পড়তে আসেননি!
মোসাদের নৃশংসতা, বিজ্ঞানী ফাখরিজাদেহর পরিণতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনা
বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখতে পারে সমন্বিত উদ্যোগ

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখতে পারে সমন্বিত উদ্যোগ

বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বৈষম্যমূলক সমাজের জন্য হয়নি। বাঙালি জাতি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি। একদিকে ধর্মীয় বৈষম্য, অপরদিকে জাতিগত বৈষম্য। বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধানের ৪টি মৌলিক কাঠামোর অংশ। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা উভয়ই। এটি সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো হওয়ায় সরকার ধর্ম বিবেচনা না করে সাধারণভাবে দেশের সব মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে ধর্ম প্রত্যেকের নিজস্ব বিষয়।

রাষ্ট্র একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর মানবাধিকারকে সম্মান করবে এবং তাদের মানবাধিকার ভোগে হস্তক্ষেপ করবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করবে। সবশেষে রাষ্ট্রকে সর্বদা একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মানবাধিকার ভোগ করার ইতিবাচক উপায়গুলো পূরণের চেষ্টা করতে হবে।

১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির অনুচ্ছেদ ২৭, অনুশীলনীটিকে পালন করার কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে।

সাধারণভাবে একটি রাষ্ট্র ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ‘সংখ্যালঘু’দের বিবেচনায় না নিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দায়বদ্ধ। কিন্তু ‘সংখ্যালঘু’দের ধর্মীয় অধিকার এবং অসহিষ্ণুতাপূর্ণ অবস্থা থেকে রাষ্ট্রই বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করবে। বিশেষ সুরক্ষার আলোচনাটি বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) এবং ২৯(৩) উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্র বা সরকার ‘সংখ্যালঘু’দের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রকে উৎসাহিত করবে।

বাংলাদেশের বর্তমান দৃশ্যপট সত্যিই ভিন্ন। কুমিল্লার একটি ঘটনার পর গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলছে। কিছু ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসবের সময় তাদের ওপর নির্যাতন, ভাঙচুর এবং সংঘষের্র ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় মানুষ নিহত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা কোনোটাই বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন করে না। এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গুজব ছড়িয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা উসকে দেয়ার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়। এদেশের মুসলিম-হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অর্জন করেছে। এভাবেই স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়।

যারা দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, যারা নিজধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান করে, তারা এধরনের হিংস্র গোঁড়ামির উন্মাদনাকে সমর্থন করতে পারে না। কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলার পর গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী এবং রংপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় কীভাবে উগ্রপন্থিরা ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’দের বাড়িতে হামলা করেছে তা সবার জানা। ধর্মের নামে এ ধরনের সন্ত্রাসকে কোনোভাবেই বাড়তে দেয়া যাবে না। এধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস প্রতিরোধে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মী, মানবহিতৈষী ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী এবং প্রগতিশীল শক্তিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যথাযথভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।

অতি তুচ্ছ ঘটনায় বার বার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় দেশের ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের মানুষ। গত ১৭ মার্চ যখন দেশব্যাপী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল, সেদিন সকালে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে ঘটে যায় ন্যক্কারজনক ঘটনা। একটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া নিয়ে একযোগে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় ওই গ্রামের ৮৮টি হিন্দু বাড়ি ও পাঁচটি মন্দিরে। তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি স্থানীয় কজন মুক্তিযোদ্ধাও।

আওয়ামী লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যুদ্ধ করার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই আওয়ামী লীগের একযুগের বেশি শাসনামলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বার বার নৃশংস হামলা হচ্ছে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর নৃশংস হামলা চলে। মামলা হলেও দুর্বৃত্তরা শাস্তি পায়নি। সবাই এখন জামিনে মুক্ত।

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হয়েছে আরও ভয়াবহ হামলা। এ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধরা এখনও সুবিচার পায়নি। আসামিরাও এখন আর কারাগারে নেই। একইভাবে দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নাটোর, রাজশাহীর চারঘাট, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও পিরোজপুরে ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে যেকোনো ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতনের ঘটনার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও রাজনীতি হয়, কিন্তু কোনো শাস্তি হয় না। ফলে থামছে না নির্যাতনের ঘটনা।

অভিযোগ আছে নেপথ্যে ক্ষমতাশালীরা জড়িত থাকায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যায় না। প্রতিটি হামলার পেছনেই অপশক্তি কাজ করেছে। ধর্মীয় ইস্যুকে ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া দণ্ডবিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বিভিন্ন সময় ধর্ম অবমাননার যেসব অভিযোগ শোনা যায়, সেসবের বিচারের কথাও তেমন শোনা যায় না।

এসব ঘটনায় দ্রুত ন্যায়বিচারের উদাহরণ সৃষ্টি করা না গেলে মানুষ ক্রমেই বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারাতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারকে এ বিষয়ে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বৈষম্যমূলক সমাজের জন্য হয়নি। বাঙালি জাতি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি। একদিকে ধর্মীয় বৈষম্য, অপরদিকে জাতিগত বৈষম্য। বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়।

এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য এদেশের মানুষ লড়াই করেছে, যুদ্ধ করেছে, যে রাষ্ট্রটির জন্ম হলে সব নাগরিকের জন্য সাম্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর নির্যাতন আর হয়রানির ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা সেই পুরোনো অপকৌশলেরই আশ্রয় নেয়। আক্রমণকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় থানা-পুলিশে যেতেও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ভয় পায়। একসময় ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর হামলার পর গণমাধ্যমের খবরকে অতিরঞ্জিত বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হতো। আওয়ামী লীগ আমলে তা হয়নি। সরকার রামু ও নাসিরনগরে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ও মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছে। সুনামগঞ্জে ত্রাণ সামগ্রীসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। দোষীদের কঠিন শাস্তির আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো- প্রায় সব ঘটনায়ই অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা এখনও সম্ভব হয়নি।

অনেক ঘটনা আছে যেগুলো সরকার, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও তৎপর থাকলে, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই এসব ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। আর এসমস্ত ঘটনায় যদি অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা যেত তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। দৃষ্কৃতিকারীরা এসব অপকর্ম করতে ভয় পেত।

সমাজের সব মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং একটি সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ‘সংখ্যালঘু’ মানুষের জন্য এখন দরকার তাদের মনে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন ও সরকারকে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় আরও কাজ করতে হবে এবং নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।

বর্তমান সরকারের পক্ষে বলা হয়- বাংলাদেশ ধর্মীয় বহুত্ববাদ বিকাশ ও ‘সংখ্যালঘু’দের অধিকার রক্ষায় সবাই সচেষ্ট। যেকোনো সহিংসতা ও বিভেদ মোকাবিলায় সরকার সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে স্লোগান এনেছেন- ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এ স্লোগানের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দেশের সাধারণ মানুষকে সব ধর্মের প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আমাদের দায়িত্ব হলো, গণতান্ত্রিকভাবে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচারের ও মানবাধিকারের লড়াইটিকে এগিয়ে নেয়া। তাই প্রশাসন ও সরকারকে ‘সংখ্যালঘু’দের নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি রক্ষায় আরও কাজ করতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো বিএনএনআরসি।

আরও পড়ুন:
রিমান্ড মানে যেন হয় ভয়-ভীতির কিছু নয়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ: বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনই মুক্তির হাতিয়ার
ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এখানে পড়তে আসেননি!
মোসাদের নৃশংসতা, বিজ্ঞানী ফাখরিজাদেহর পরিণতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনা
বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি

শেয়ার করুন

আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারব তো?

আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারব তো?

সংবিধানে উল্লিখিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মর্যাদা মানে সংখ্যালঘিষ্ঠের মর্যাদাহানি নয়। ইসলাম কখনও সংখ্যালঘিষ্ঠের অমর্যাদা করেনি। সংবিধানও সে কথা বলে না। ইসলামের বিশ্ববিজয়ের মূল কারণই ছিল ‘সংখ্যালঘু’ বা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি এর মর্যাদাবোধ। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি বলেছেন- “কোনো মুসলিম যদি অমুসলিম নাগরিকের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করে, তার কোনো অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে, তার কোনো জিনিস বা সহায়-সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেয়; তবে কেয়ামতের দিন আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় আমি তাদের বিপক্ষে অবস্থান করব (দাউদ শরিফ)।

ধর্ম অবমাননার রেশ ধরে অন্য ধর্মের উৎসব পণ্ড করে দেয়া বাংলাদেশে নজিরবিহীন। শুধু উৎসব পণ্ড করে দেয়ার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি, এ উন্মাদনা সহিংসতায় রূপ নেয়। মন্দির, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব চালিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়। ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু সম্প্রদায়ের হয়তো ঘরবাড়ি পুড়েছে, কিন্তু এতে প্রকৃত মুসলমানদের হৃদয়ে কি একটুও আঁচ লাগেনি? ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের ভিটেমাটিতে হয়ত সহসাই আবার ঘরবাড়ি তৈরি হবে, কিন্তু সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের হৃদয়ের এ রক্তক্ষরণ সহসাই বন্ধ হবে কি? স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে কি এই ঘটনা একটি চিরস্থায়ী কালো অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে না?

যুগ যুগ ধরে এদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা যে এখানে ঘটেনি তা নয়। তবে সবসময় পারস্পরিক সম্প্রীতি যে বজায় ছিল এটাই সত্যি। কোনো অঘটন ঘটে থাকলেও মানুষ এর প্রতিবাদ করেছে, ‘সংখ্যালঘু’দের পাশে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় অথবা জাতীয়ভাবে কোনো সম্প্রদায় একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়নি। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় এবারের চিত্র যেন অনেকটাই ভিন্নরকম, অচেনা। এর মধ্য দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আমাদের চিরচেনা ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’র দাবি।

এতদিন যে ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন হয়েছে তার একটি বড় কারণ ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার যে সাধারণ মানুষকেও হতে হয়, সে কথা অজানা নয়। পরাজিত দল, দলের নেতা ও ভোটারদের এলাকাছাড়া করা, মামলা-হামলা করে দৌড়ের ওপর রাখা নতুন কিছু নয়। এ বিবেচনায় ‘সংখ্যালঘু’দের ওপরও নির্যাতন করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হয়েছে। ২০০১-এর সহিংসতা সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।

এবারের ঘটনা ধর্মীয় সহিংসতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এর পেছনে কোনো পক্ষের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি আছে কি না তা এখনও জানা যায়নি। তবে, রাজনৈতিক মোটিভ এর পেছনে না থাকলেও যে এর রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা হবে, এর লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে। দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল এ ঘটনার জন্য পরস্পরকে দুষছে। অতীতেও তাই হয়েছে। ফলে আসল অপরাধী ও মাস্টারমাইন্ডরা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এদেশের মানুষ যতটা না ধর্মপরায়ণ এর চেয়ে বেশি ধর্মের ব্যাপারে স্পর্শকাতর। এই অতি স্পর্শকাতর অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা তুলতে চায় অনেক পক্ষ। ধর্মের অপব্যবহার রাজনীতি থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও সমাজেও বিস্তার লাভ করেছে। নাসিরনগর, শাল্লা ও রামুতে আমরা ধর্মের অপব্যবহারই দেখেছি। যা কুমিল্লা ও রংপুরে এবার দেখা গেল।

একটি ধর্ম অবমাননার দায়ে আরেকটি ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়া হলো এবার। এ দেশের সংবিধান বলছে-

“প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।” (প্রথম ভাগ, ধারা ২ক) এই বাক্যে দুটি কথা আছে। প্রথমত, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং দ্বিতীয়ত, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মপালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপের প্রবেশদ্বারে একটি মূর্তির পায়ের ওপর পবিত্র কোরআন রাখা হয়েছে। এই অভিযোগে ইকবাল নামক একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে। কে প্রকৃত অপরাধী, কে পেছনের কারিগর, কী তার বা তাদের মোটিভ এসব বিষয়ে এখনই শেষ কথা বলার সময় আসেনি। আদৌ এর শেষটা দেখা যাবে কি না তাও জানা নেই। কিন্তু এর আগেই শেষ দৃশ্যের অবতারণা করা হয়ে গেছে। একটি সম্প্রদায়ের অধিকারকে চরমভাবে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।

প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের অবমাননা হয়েছে। এক্ষেত্রে যে বা যারা অবমাননা করেছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা প্রজাতন্ত্রের কাজ। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্মের অবমাননা হলে সে ধর্মের অনুসারীরা অন্য ধর্মের অনুসারীদের আক্রমণ করবে, এটা প্রজাতন্ত্রের কোন আইনে আছে?

কোথাও ইসলামের অবমাননা হলে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব ওই অবমাননাকারীদের বিচার করা। কিন্তু সে দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়ার এখতিয়ার সহিংসতাকারীদের কে দিল? কুমিল্লায় ইসলামের অবমাননা করা হয়েছে। কাজেই অবমাননাকারী ও ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর হামলাকারীদের ফৌজদারি আইনে সোপর্দ করে তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সংবিধানের একই অনুচ্ছেদ আরও বলছে- “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হলেও, রাষ্ট্র হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবে।” একটি ধর্মের অবমাননা হলে সেই অবমাননা ঠেকানো বা অবমাননাকারীদের বিচার করা রাষ্ট্রের কাজ যা আগেই বলেছি। কিন্তু অবমাননার অজুহাতে অন্য ধর্ম পালনের সমমর্যাদা ও সমঅধিকার লঙ্ঘন করা হবে কেন? কুমিল্লা, রংপুরসহ অন্যান্য আরও জায়গায় পূজামণ্ডপে হামলা করে হিন্দুদের ধর্ম পালনের সমঅধিকার লঙ্ঘন করা হলো কেন? কাজেই যারা কাজটি করেছে তারা দুক্ষেত্রেই সংবিধান লঙ্ঘনকারী। কিন্তু এরচেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, হামলাকারীরা রাষ্ট্রকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। কাজেই রাষ্ট্রকে কঠোরভাবে এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে হবে।

সংবিধানে উল্লিখিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মর্যাদা মানে সংখ্যালঘিষ্ঠের মর্যাদাহানি নয়। ইসলাম কখনও সংখ্যালঘিষ্ঠের অমর্যাদা করেনি। সংবিধানও সে কথা বলে না। ইসলামের বিশ্ববিজয়ের মূল কারণই ছিল ‘সংখ্যালঘু’ বা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি এর মর্যাদাবোধ। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি বলেছেন-

“কোনো মুসলিম যদি অমুসলিম নাগরিকের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করে, তার কোনো অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে, তার কোনো জিনিস বা সহায়-সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেয়; তবে কেয়ামতের দিন আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় আমি তাদের বিপক্ষে অবস্থান করব (দাউদ শরিফ)। কাজেই কুমিল্লায় কোরআন অবমাননার দায় কোনোরকম বিচার ছাড়া পুরো হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো মহা অন্যায়। বরং ইসলামের নাম নিয়ে এধরনের কাজ করাই বেশি ইসলামের অবমাননা।

ইসলাম বিচার ছাড়া কারো ওপর দোষ চাপায় না। একজনের অপরাধের জন্য আরেকজনকে বা পুরো সম্প্রদায়কে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের বাড়িঘরে লুটপাট করে আগুন লাগিয়ে দিতে বলে না। তাই বলা যায়, হামলাকারীরা সুস্পষ্টভাবে নবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ইসলামি শরীয়ত মতেও তারা অপরাধী। একজনের অপরাধের দায়ে অন্য ধর্মের মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া, পূজামণ্ডপ গুড়িয়ে দেয়া তো পরের কথা, মহান আল্লাহ অন্য ধর্মের দেব-দেবিদের গালি দিতেও নিষেধ করেছেন (সুরা আনআম, ১০৮)। হামলাকারীরা আদতে কার অবমাননা করেছে? এরাই কি ইসলামের অবমাননা করেনি?

কুমিল্লার ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কে বা কারা মূর্তির পায়ের কাছে পবিত্র কোরআন রেখেছে তা খুঁজে বের করতেই হবে। এর উদ্দেশ্য যত নগণ্যই হোক, এরকম একটি ঘটনার পরণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে; তা তো দেশের মানুষ দেখেছে। তাই ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। সেই সঙ্গে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকদেরই সতর্ক থাকতে হবে। সবধরনের উসকানিদাতা ও অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিটি ধর্মের মানুষদেরই সাবধান হতে হবে। বুঝতে হবে এরা সব ধর্ম-বর্ণ, রাষ্ট্র সর্বোপরি মানবজাতির শত্রু।

‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন বিশ্বে নতুন নয়। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা সবখানেই আছে বর্ণবাদের কালো ইতিহাস। গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে খ্যাত ব্রিটেন অথবা আধুনিক গণতন্ত্র ও কথিত উদার রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, ‘সংখ্যালঘু’ নিষ্পেষণে কেউ কম যায় না। কিছুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের পুলিশ প্রকাশ্যে জর্জ ফ্লয়েড নামে এক কৃষ্ণাঙ্গের গলা হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেছে। মৃত্যু যন্ত্রণায় ফ্লয়েড বার বার বলছে-

“আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।” বুটের চাপে তার মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে এসেছে। এমনকি মৃত্যুর আগে ফ্লয়েড পানি খেতে চেয়েছিল। পানি পায়নি। তার মৃত্যুযন্ত্রণা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য পুলিশ সদস্যদেরও টলাতে পারেনি। এভাবে কাতরাতে কাতরাতে ফ্লয়েড মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পুরো বিশ্ব সে দৃশ্য দেখেছে। তবে এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাদা-কালো সবাই রাস্তায় নেমে আসে। সবার মুখে ছিল ফ্লয়েডেরই শেষ কথার প্রতিধ্বনি- ‘উই ক্যান্ট ব্রিথ’।

যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লয়েডের মৃত্যুই প্রথম নয়। আর ধর্ম, বিশেষ করে ইসলামোফোবিয়া যে ইউরোপ-আমেরিকার সবচেয়ে বড় মহামারি তা তো সবারই জানা। মুসলিমরা সেখানে ‘সংখ্যালঘু’। কালোরা সেখানে ‘সংখ্যালঘু’। তাই ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন স্থানভেদে রূপ বদলায় মাত্র। আসল চরিত্র একই। আমরা শুধু চাই আমাদের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রটি বহাল থাকুক। এটাই বাংলাদেশের ভিত্তি। সামাজিক সাম্যই রাষ্ট্রের অক্সিজেনের জোগান দেয়, ধর্মকে পানি দেয়। এমন একটি সমাজেই আমরা মুসলমান-হিন্দু, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই নিঃশ্বাস নিতে চাই। তা না হলে, সবারই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে।

লেখক: আইনজীবী, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
রিমান্ড মানে যেন হয় ভয়-ভীতির কিছু নয়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ: বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনই মুক্তির হাতিয়ার
ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এখানে পড়তে আসেননি!
মোসাদের নৃশংসতা, বিজ্ঞানী ফাখরিজাদেহর পরিণতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনা
বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি

শেয়ার করুন

প্রধান বিচারপতির উদ্বেগ ও সাম্প্রদায়িকতা বিনাশে করণীয়

প্রধান বিচারপতির উদ্বেগ ও
সাম্প্রদায়িকতা বিনাশে করণীয়

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপরে বিভিন্ন সময়ে হামলা এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, এ কথা সত্য, কিন্তু তা সবসময়ই ঘটিয়েছে ধর্মান্ধ একটি চিহ্নিত চক্র। যারা মোট জনসংখ্যার অত্যন্ত সংখ্যালঘু একটি অংশ। এরা পাকিস্তান আমলেও সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, এখনও করছে। অপরাধীরা সংখ্যায় যত কমই হোক তারাই কিন্তু বড় বড় বিপর্যয় ঘটায়। সুতরাং ধর্মের রাজনীতি করা এই সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকদের প্রতিরোধে সংঘবদ্ধ প্রয়াস জরুরি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মানুরাগী, তারা ধর্মান্ধ নয়। সংখ্যালঘু ধর্মান্ধরাই বিপদের কারণ।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।

রোববার একটি মামলার শুনানিতে নিজের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে তিনি এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সাম্প্রদায়িক হামলার মামলায় ভুয়া অভিযোগ বিবেচনায় আসামিদের ছেড়ে দিলে কী অবস্থা দাঁড়াবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেছেন- ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের আসামিদের জামিন দিলে সমাজে নেতিবাচক বার্তা যাবে।’

ফরিদপুরের সালথায় ইউএনও অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অভিযুক্ত আসামির জামিন শুনানিতে জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি উল্লিখিত মন্তব্য করেন।

দেশের প্রধান বিচারপতির মতো একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ চেয়ার থেকে যে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারকদের দায়িত্বনিষ্ঠার বিষয়টিও তার উক্তির মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়েছে। অতীতে অনেক মামলায় জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের জামিন পেতে দেখেছি আমরা। প্রধান বিচারপতির এই উদ্বিগ্ন অভিমতের মধ্য দিয়ে বিষয়-সংশ্লিষ্ট সবাই আরও অধিকতর সতর্ক হবেন, এমন প্রত্যাশাই করতে চাই।

বাংলাদেশ আজ এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। যেকোনো মূল্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দমন করতেই হবে। আর সেজন্য চাই বিচার ও শাসন বিভাগের সমন্বিত প্রয়াস। একই সঙ্গে চাই দেশের প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ প্রগতিপন্থিদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।

প্রধান বিচারপতির উদ্বেগ পর্যালোচনা করলে এসত্য বেরিয়ে আসে যে, অতীতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি কঠোরভাবে কার্যকর করা যায়নি। যদি যেত, তা হলে দেশে বর্তমানে যে অবাঞ্ছিত সাম্প্রদায়িকতার উগ্র পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা এড়ানো যেত।

কারণ, এ সত্য আমাদের সকলেরই জানা- বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপরে বিভিন্ন সময়ে হামলা এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, এ কথা সত্য, কিন্তু তা সবসময়ই ঘটিয়েছে ধর্মান্ধ একটি চিহ্নিত চক্র। যারা মোট জনসংখ্যার অত্যন্ত সংখ্যালঘু একটি অংশ।

এরা পাকিস্তান আমলেও সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, এখনও করছে। অপরাধীরা সংখ্যায় যত কমই হোক তারাই কিন্তু বড় বড় বিপর্যয় ঘটায়। সুতরাং ধর্মের রাজনীতি করা এই সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকদের প্রতিরোধে সংঘবদ্ধ প্রয়াস জরুরি। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মানুরাগী, তারা ধর্মান্ধ নয়। সংখ্যালঘু ধর্মান্ধরাই বিপদের কারণ।

১৯৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর পর্যবেক্ষণ করলেও ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দেয়া এই চক্রটির স্বরূপ উদঘাটন করা যায়। বঙ্গবন্ধুর জীবনব্যাপী সাধনায় মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা এই চক্রটিকে পরাজিত করেছিলাম। কিন্তু সেই পরাজয় চিরস্থায়ী করা গেল না।

তা ১৯৭৫ পর্যন্তই টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল রক্তার্জিত বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ফিরে যায় আবারও সেই পাকিস্তান আমলের ধর্মান্ধ রাজনীতি তথা সাম্প্রদায়িকতায়!

বাংলাদেশের গত ৪৫ বছরের রাজনৈতিক লড়াই সে কারণেই নিরন্তর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে এই সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার থেকেই প্রগতির আলোয় আলোকিত একটি রাষ্ট্র আমরা অর্জন করেও কুচক্রীমহলের চক্রান্তে ধরে রাখা গেল না! এর জন্য দায়ী কারা?

এ প্রশ্নের উত্তরও সচেতন মানুষমাত্রেরই জানা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা শুধু বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধুকেই সপরিবার হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছে মূলত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনকেও।

এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে অনিবার্যভাবে এসে যায় রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাধনা। পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সাতচল্লিশের আগস্টের পর থেকেই। অর্থনৈতিক শোষণ বঞ্চনার পাশাপাশি ধর্মের নামে অপরাজনীতিমুক্ত একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও তার স্বপ্ন ছিল। এর বহু দালিলিক প্রমাণও আছে।

বঙ্গবন্ধু তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন-

“জনগণকে ইসলাম ও মুসলমানের নামে স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালোবাসে কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি তারা করতে দিবে না।” (পৃষ্ঠা ২৫৮)

শুধু আত্মজীবনীতে নয়, জনসভায়, বক্তৃতা-বিবৃতিতেও তিনি সবসময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে কথা বলেছেন। অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমানের একটি বইয়ের নাম ‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম’। ওই গ্রন্থের ২১৯ পৃষ্ঠায় তিনি বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর দেয়া এক বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যেখানে বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন-

“এদেশে ইসলাম, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবই থাকবে এবং বাংলাদেশও থাকবে। হিন্দু ও বৌদ্ধদের ওপর গত এক দশক যে অত্যাচার হয়েছে তার অবসান হবে।”

বঙ্গবন্ধুর লিখিত এই এক দশক ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সাল।

সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু এনে দিয়েছিলেন কিন্তু সেই চেতনার বাংলাদেশ তো আমরা ধরে রাখতে পারলাম না!

স্বাধীনতার ৫০ বছরে তথা সুবর্ণজয়ন্তীর এই গৌরবময় ২০২১ সালে বসে পেছনে ফিরে তাকালে অনুতাপই জাগে- এই বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম!

পঁচাত্তরের পর থেকে বাংলাদেশে দিনে দিনে সাম্প্রদায়িকতা চরম রূপ লাভ করেছে। জেনারেল জিয়ার সরকার থেকে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার আমল পর্যন্ত দুই দফা সামরিক শাসন আর নিষিদ্ধ জামায়াতসহ ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে সহযোগিতা দিয়ে বিকশিত হবার সুযোগ-সুবিধাই দেয়া হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশকে ধ্বংসের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারই বিষফল আজ ভোগ করছে বাংলাদেশ।

কুমিল্লার পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার চক্রান্তের স্বরূপ উদঘাটিত হতে চলেছে। কোরআন শরিফ রেখেছিল যে ইকবাল, তাকে গ্রেপ্তার করার পর আদালত তাকে রিমান্ডে দিয়েছে। কারা ইকবালকে দিয়ে এ কাজ করিয়েছে, তাদেরও চিহ্নিত করা হচ্ছে।

গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁও কলেজে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ‘সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িত সবাই চিহ্নিত হয়েছে। তারা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। কেন এই ঘটনা ঘটিয়েছে তার সবকিছু আপনাদের জানাতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।’

এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, অন্য ধর্মের নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়নের কথা ভাবছে সরকার। সাম্প্রতিক হামলায় জড়িতদের বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করার কথাও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ইতোমধ্যেই কঠোর বার্তা দিয়েছেন সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত উপড়ে ফেলার জন্য। তিনি দেশ-বিদেশে বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় চালানো ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচারের পরিস্থিতিও তুলে ধরেছেন।

এদিকে চট্টগ্রামে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা রোববার সাম্প্রদায়িক হামলার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ করেছেন। নিঃসন্দেহে এর সবকিছুই আমাদের মনে আশা জাগায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যেটা তা হলো আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দল ছাড়া সব প্রগতিশীল শক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায় থেকে জনসাধারণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জনমত গঠন- কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ের সংস্কৃতি- কর্মীদেরকেও এ কাজে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা জরুরি। বাংলাদেশ যে সত্যিকার অর্থেই অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, সেই সত্য চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই।

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে যারা দেশে সাম্প্রদায়িকতার আগুন ছড়িয়ে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম ক্ষমতাসীন দলকে দেশ-বিদেশে সক্রিয়ভাবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হয়।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক, উপদেষ্টা সম্পাদক দৈনিক দেশের কণ্ঠ। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
রিমান্ড মানে যেন হয় ভয়-ভীতির কিছু নয়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ: বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনই মুক্তির হাতিয়ার
ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এখানে পড়তে আসেননি!
মোসাদের নৃশংসতা, বিজ্ঞানী ফাখরিজাদেহর পরিণতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনা
বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি

শেয়ার করুন

জন্মদিনে স্মরণ: বব কেইন ব্যাটম্যানে অমর

জন্মদিনে স্মরণ: বব কেইন ব্যাটম্যানে অমর

তখন পর্যন্ত বিশ্বের যেকোনো দেশে কমিকস-বিষয়ক বই সমান জনপ্রিয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, প্রযুক্তির অসুস্থতা, ড্রাগ, দারিদ্র্য ইত্যাদি বিষয়ে তিনি বিপুল বিদ্রূপাত্মক কার্টুন এঁকেছেন। নিজের সৃষ্টি ‘ব্যাটম্যান’ চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বব কেইন বলেছিলেন- বিশ্বের তাবৎ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যাটম্যানের নিয়ন্তর যুদ্ধ। অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়ানোই তার একমাত্র কাজ।

সৃষ্টির ভেতর দিয়ে যে জগৎ নির্মাণ করা হয়েছে, সৃজনশীলতার নিরিখে সময়ের পথ পাড়ি দিয়ে আজও অবিস্মরণীয় হয়ে আছে তার কীর্তি। কীর্তিমান মানুষ বৈকি। বিশ্বসংসারকে দেখেছেন ভিন্নতার অবয়বে। এঁকেছেন কার্টুনের পর কার্টুন। তিনি বব কেইন। বিশ্বনন্দিত কার্টুনিস্ট। যিনি আজও তার অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘ব্যাটম্যান’-এর জন্য সববয়সির কাছে জনপ্রিয় হয়ে আছেন। অসংখ্য কমিকস কার্টুন এবং এনিমেশন ফিল্মের (কার্টুন) জন্য বিখ্যাত বব কেইন ছিলেন চিরতরুণ, সতেজ যুবা যেন। বয়স তার সৃষ্টিকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়নি।

জীবনের শেষদিনেও এঁকেছেন কার্টুন। বব কেইন বিশ্বাস করতেন কার্টুনের মধ্যে অনেক কিছু ফুটে বেরোয়। শুধু কার্টুনিস্টদের মনের কথাই নয়, যুগের প্রভাব, সম্প্রদায়গত মনস্তত্ত্ব, পারিপার্শ্বিকতার অসংগতিও ফুটে ওঠে। কার্টুন যদিও শিল্পসাহিত্যের মতো চিরকালীন সত্যের বাহক নয়। কিন্তু দীর্ঘকালের হতেই পারে। কার্টুনের আবার রকমফের আছে। একটিমাত্র বিষয় নিয়ে যেমন একটি কার্টুন তৈরি হয়, সংবাদপত্রে যা প্রায়শই ছাপা হয় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে আবার টানা গল্প দিয়ে কার্টুন আঁকা হয়।

কাগজের পাতায় কার্টুন এক নির্বাক দর্শকের এমন কাছের মানুষ হয়ে ওঠার উদাহরণ আর কোথাও মেলে না। কার্টুনে আসে হাজার মুখের মিছিল। মুখম্লানে কার্টুনের মুখ। ক্যারিকেচার করা মুখ, অথচ তাদের মাধ্যমে যেন ফুটে ওঠে প্রকৃত সত্তার আভাস। লুকিয়ে রাখা চেহারা, যা আমাদের মনে থাকে সন্দেহের রূপে, দেখলে হাসি পায়, কিন্তু ভয় করে না যে, ব্যাপারটা বোধ হয় হাসির নয়। আবার কখনও মনে হয় ঠিক বিপরীত। অর্থাৎ যাকে ভাবা হয়েছিল এরকম ওরকম সেরকম। সে আসলে হয়তো শুধুই একটা মজার মানুষ। কিংবা একটা হাস্যকর জীবন।

কিংবা সে সত্যি সত্যিই একটা চলন্ত কার্টুন। ঠিক মানুষ নয় আসলে। প্রত্যেক মানুষের আকৃতির পিছনে লুকানো থাকে এক অমানবিক চেহারা। কার্টুনিস্ট সেটাকে খুঁজে বের করেন। এক্ষেত্রে একটি বিশেষ দৃষ্টি থাকতে হয়। কার্টুন থেকে ক্রমশ কমিকসের আবির্ভাব। কল্প কাহিনি, গোয়েন্দা কাহিনি আর সায়েন্স ফিকশন ও এই কমিকসের বিষয়বস্তু। এর সম্প্রদায়ের সংখ্যাও বিশ্বজুড়ে কম নয়। কার্টুনিস্ট বব কেইন জন্মেছিলেন ১০৬ বছর আগে ১৯১৫ সালের ২৪ অক্টোবর নিউইয়র্ক শহরের প্রসিদ্ধ কান পরিবারে।

পরে পারিবারিক পদবি পরিবর্তন করে বব কেইন নাম ধারণ করেন। ছবি আঁকার আগ্রহ শৈশবেই জাগে। পেনসিল, রংতুলি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন। কুকুর, বিড়াল, টিকটিকি, ইঁদুর সবই আঁকতেন। পারিবারিকভাবেও এ কাজে উৎসাহ পেয়েছেন। এক সময় পোট্রেট আঁকাও শুরু করেন। আর ঠিক এ সময় তার আকাঙ্ক্ষার স্রোতে জোয়ার বইয়ে দেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। বদলে যায় তার চিত্রকর্ম সৃষ্টির পথ। লা ভিঞ্চির কাজ তাকে প্রবলভাবেই বুঝি নাড়া দিয়েছিল।

এক সাক্ষাৎকারে পরবর্তীকালে বব কেইন বলেছেনও, “বারো কি তেরো বছর বয়সে অটোমোবাইল ইঞ্জিনের ডিজাইন-সম্পর্কিত একটি গ্রন্থ কীভাবে যেন হাতে আসে। এর পর পরই দ্য ভিঞ্চির একটি গ্রন্থ আসে হাতে। যাতে আঁকা ছিল একটি ফ্লাই মেশিনের ডিজাইন। মেশিনের পাখা ছিল অনেকটা আমার সৃষ্টি ব্যাটম্যানের মতো। তখন থেকেই মূলত ব্যাটম্যানের মতো একটা কিছু সৃষ্টি প্রেরণা আমার ভেতর কাজ করতে থাকে।”

১৯৩০ সালে বয়স যখন পনেরো, কার্টুন-কমিকস আঁকার কাজ শুরু করেন বব কেইন। কার্টুন তখনও সারাবিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কার্টুনের পদচারণা তখন সংবাদপত্র তথা প্রকাশনা জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কার্টুনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। দুই হাজার বছরেরও আগে রোমে খোদাই শিল্পীরা কাঠ বা পাথর খোদাই করে ছোট ছোট ছবি আঁকত। কাঠখণ্ডের এসব চিত্র বেচা-কেনাও হতো।

আধুনিক কার্টুন-কমিকসের প্রতিষ্ঠাতা সুইজারল্যান্ডের রুডলফ টপার নিজের আঁকা কার্টুনচিত্র দিয়ে শতপৃষ্ঠার ‘দি অ্যাডভেঞ্চার অব অবাদিয়াহ ওল্ডবাক’ নামে অ্যালবাম প্রকাশ করেন। ১৮৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংশোধিত আকারে প্রথম কমিকস বই হিসেবে ছাপা হয়। অবশ্য পেশাদার কমিকস আঁকিয়ে হিসেবে সে সময় খুব নাম ডাক হয় জার্মানীর উইলিয়াম বাস্কের। ১৮৯৩ সালে নিউইয়র্ক টাইমস ও মর্নিং জার্নাল পত্রিকা দুটিতে কমিকস ছাপা শুরু হয়। ক্রমশ তা পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। সংবাদপত্রের কারণে কমিকসের বিকাশ ঘটে দ্রুত গতিতেই।

একটি জনপ্রিয় ডিটেকটিভ কমিকস, যাকে ডিসি কমিকসও বলা হতো, তা আঁকার মধ্যে দিয়ে বব কেইন পেশাগতভাবে কার্টুন জগতে প্রবেশ করেন। কার্টুন ঢঙের চিত্রকর্মের পাশাপাশি অল্প কথার হাস্যরসাত্মক ডায়লগ দিয়ে গোয়েন্দা গল্প টেনে নিয়ে যাবার আইডিয়া বিশ্বে তখন একেবারেই আনকোরা। সংবাদপত্রের প্রচারণার সুবাদে বব কেইনের কমিকস গ্রন্থ বিক্রির হার বেড়ে গেল। এরই প্রেরণায় বব আরও বেশক’টি কমিকস বই প্রকাশ করেন। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলো ছেলেবুড়োদের মুখে মুখে ফিরত। সে সময় গণমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার না ঘটায় বব কেইনের চেহারা পাঠকের কাছে ছিল অপরিচিত।

প্রকাশনা জগতে বব কেইনের অবস্থান তখন শীর্ষে। কার্টুন নিয়ে ব্যাপক চিন্তাভাবনা, গবেষণা শুরু করেন। চলচ্চিত্রের কার্টুনের প্রয়াস ঘটানোর চিন্তা তার অনেক দিনেরই। সীমাবদ্ধ প্রাযুক্তিক কলাকৌশলের কারণে বিষয়টা তখন বেশ কঠিন এবং ব্যয়বহুল ছিল। কারণ প্রতিটি চরিত্রের বা সাবজেক্টের প্রতিটি ‘মুভমেন্ট’ এঁকে এঁকে তা ফ্রেমবদ্ধ করে চলচ্চিত্রে রূপান্তর ঘটিয়ে কার্টুন ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলেন বব কেইন।

প্রতিটি চরিত্রের অসংখ্য মুভমেন্ট আঁকার কাজ শুরু করেন। এভাবে দীর্ঘদিন সময় ব্যয় করে, অনেকটা সন্দিহান থেকেই বব কেইন ১৯০৯ সালে ‘ব্যাটম্যান’-এর কাজ শেষ করেন। কাল্পনিক চরিত্র ব্যাটম্যানের লেখক ছিলেন বিল কিঙ্গার। গোয়েন্দা ব্যাটম্যানের নতুন জন্ম হলো বব কেইনের হাতে। আর তখনি কমিকস হয়ে ওঠে সত্যিকারের কমিকস।

বব কেইন সিরিজের পর সিরিজ তৈরি করতে থাকেন ব্যাটম্যান-এর। শৈশবে নিজের চোখের সামনে ডাকাতদের হাতে বাবা-মায়ের খুন হতে দেখেছে ব্যাট। বড় হয়েছে এক এতিমখানায়। তারপর লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে একের পর এক প্রতিশোধ নিতে থাকে দুর্বৃত্তদের উপর। এরকম টান টান উত্তেজনায় ভরপুর ছিল ‘ব্যাটম্যান’-এর প্রতিটি সিরিজ। ফলে শিশু-কিশোরদের কাছে ব্যাটম্যান হয়ে ওঠে রহস্য রোমাঞ্চের এক স্বপ্নের নায়ক।

এই সফলতার ফলও পুরোপুরিভাবে আসতে থাকে বব কেইনের ভাগ্যে। ক্রমে কার্টুন তথা এনিমেশন ফিল্মজগতে এক ‘প্রবাদ পুরুষ’ ইমেজ প্রতিষ্ঠিত হয় তার। ব্যাটম্যানের হাত ধরেই ১৯৪০ সালে মুভি সিরিয়াল, ১৯৬০ সালে টিভি সিরিয়াল এবং ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বড় বড় বাজেটের ফিল্ম সিরিজ সম্পন্ন করার কৃতিত্ব দেখান বব কেইন। ১৯৯০ সালে নির্মাণ করেন এনিমেশন সিরিজ ‘ডার্ক নাইট’।

‘ব্যাটম্যান’-এর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার পর নব্বই দশকে এসে বব কেইনের আরও বেশ কিছু আধুনিক সংস্করণ নিয়ে আসে সমকালের শিশু-কিশোরদের সামনে। ১৯৯২ সালে ব্যাটম্যান রিটার্ন, ১৯৯৬ সালে ব্যাটম্যান ফরএভার, ১৯৯৭ সালে ব্যাটম্যান অ্যান্ড রবিন ইত্যাদি।

“খেলনা, কার্টুন, স্টিকার, টিভি, মুভি কোথায় নেই বব কেইন? সর্বত্রই ব্যাটম্যানের ছড়াছড়ি। আর এই ব্যাটম্যানের পাশাপাশি যুগ যুগ যিনি টিকে থাকবেন তিনিই বব কেইন”- মন্তব্য করেছিলেন বব কেইনের বিভিন্ন ডিসি কমিকস প্রকাশক এবং কমিকস-বিষয়ক ঐতিহাসিক মার্ক এভানি। যার দৃষ্টিতে বব কেইন একজন ‘কাজ পাগলা মানুষ’। বিশ্বজুড়ে কমিকস বইকে প্রকাশনার বিষয় হিসেবে নিয়ে আসা এবং এর বাণিজ্যিক বিস্তারে কৃতিত্বের দাবিদারও বব কেইন।

তখন পর্যন্ত বিশ্বের যেকোনো দেশে কমিকস-বিষয়ক বই সমান জনপ্রিয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, প্রযুক্তির অসুস্থতা, ড্রাগ, দারিদ্র্য ইত্যাদি বিষয়ে তিনি বিপুল বিদ্রূপাত্মক কার্টুন এঁকেছেন। নিজের সৃষ্টি ‘ব্যাটম্যান’ চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বব কেইন বলেছিলেন- বিশ্বের তাবৎ অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যাটম্যানের নিয়ন্তর যুদ্ধ। অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়ানোই তার একমাত্র কাজ।” বব কেইনের জীবনের লক্ষ্যই ছিল নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। সে কাজ সৃষ্টিশীলও সৃজনশীল কাজ। জীবনে চরম প্রতিষ্ঠা চলে আসার পরও এবং প্রচুর বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হয়েও বব কেইন সার্বক্ষণিক মগ্ন থাকতেন কাজে।

স্ত্রী ছিলেন অভিনেত্রী। সানডার্স কেইন তাকে নিয়মিত উৎসাহ জোগাতেন। এছাড়া নিজের কন্যা, নাতি এবং এক বোন ছায়ার মতো পাশে পাশে থাকতেন। ৮৩ বছর বয়সে ১৯৯৮ সালের তিন নভেম্বর লস এঞ্জেলসে নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর অল্প ক’দিন আগেও প্রচুর ফ্যানমেইল ‘রিসিভ’ করেছেন। মৃত্যুর পর তার বাড়িটি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। সবই ছিল শিশু-কিশোরদের ভক্তি ও শ্রদ্ধার্ঘ্য। মৃত্যুর পর তার বাড়িটি কার্টুন-কমিকস জাদুঘর করে তোলা হয়েছে।

বব কেইন দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোরদের মাতিয়ে রেখেছেন। এই বাংলাদেশে ব্যাটম্যান এখনও জনপ্রিয়। তবে এই সৃষ্টির স্রষ্টা আড়ালেই থেকে গেছেন। তবে তার কর্ম আরও অনেক যুগ ধরে শিশু-কিশোরদের কাছে আদরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: কবি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও মহাপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

আরও পড়ুন:
রিমান্ড মানে যেন হয় ভয়-ভীতির কিছু নয়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ: বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনই মুক্তির হাতিয়ার
ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এখানে পড়তে আসেননি!
মোসাদের নৃশংসতা, বিজ্ঞানী ফাখরিজাদেহর পরিণতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনা
বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি

শেয়ার করুন

রাজনীতি-অপরাজনীতি ও তারুণ্য

রাজনীতি-অপরাজনীতি ও তারুণ্য

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের জিঘাংসু প্রজন্ম বাংলার মাটিতে এখনও বেঁচে আছে। এ জাতির উপর তাদের ৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তারা এখনও তৎপর রয়েছে। একটি জাতিকে ধ্বংস করার মোক্ষম অস্ত্র হলো সে জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকবোধকে বিনষ্ট করে দেয়া। সে অপচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দালালগোষ্ঠীর হীন উদ্দেশ্য ছিল বাস্তবায়নের জন্য বাঙালিকে জ্ঞানবিমুখ ও সংস্কৃতিবিমুখ করা একান্ত জরুরি।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো দেশ নেই যে দেশের স্বাধীনতার শত্রুরা বেঁচে আছে; পৃথিবীর কোনো দেশে এমন কোনো রাজনৈতিক দল নেই যারা তাদের জন্মভূমির স্বাধীনতার শত্রুদের তল্পিবাহক হিসেবে গড়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম মানবাধিকারের চূড়ান্ত নিদর্শন স্থাপনকারী একটি দেশ। এদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি শুধু বেঁচে আছে তাই নয়, তারা দিব্যি সক্রিয়ভাবে ক্ষমতাচর্চার রাজনীতি করে আসছে। তারা নানা ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে অবৈধভাবে একাধিকবার এদেশের ক্ষমতা দখল করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে পাকিস্তানিকরণ করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহিদের রক্তেরাঙা বর্ণমালায় প্রণীত সংবিধানকে ক্ষতবিক্ষত করার মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক চরিত্রকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

যার চূড়ান্ত প্রতিফলন হিসেবে লাল সবুজের পতাকাকে বদলে দেয়ার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান এবং বীর বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে পাকিস্তানের ‘জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে অপসারণ করা পাকিস্তানি ভাবধারায় নেয়ার অপতৎপরতা চালিয়েছে জামায়াত-শিবির ও জিয়া কর্তৃক ক্যান্টনমেন্ট-সৃষ্ট দুর্নীতি, লুটতরাজ ও খুনি সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর জনবিচ্ছিন্ন দল বিএনপি। বাংলাদেশবিরোধী এই গোষ্ঠীগুলো সংঘবদ্ধভাবে তাদের হীন অপচেষ্টা এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পাকিস্তানি দালাল বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠী কোনোভাবে রাজপথে যৌক্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে সম্প্রতি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক ফ্যাশাদ লাগিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। দ্রুত অগ্রসরমান বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয়ার হীন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন ও বাঙালির হাজার বছরের সম্প্রীতির সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করার জন্যেই কুমিল্লায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে পবিত্র কোরআন রেখেছিল স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরের ক্যাডারেরা। বিশদ তদন্তে সিসি ফুটেজ দেখে তা এখন প্রমাণিত হয়েছে।

আমরা দেখলাম বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনা না করেই, বিবেকবুদ্ধি দিয়ে চিন্তা না করেই উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দোষারোপ করে তাদের পূজামণ্ডপ ভাঙচুর এবং তাদের বসতবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জবরদখল, চুরি, লুটপাট করার মাধ্যমে তাদের তথাকথিত ঈমানের নগ্ন পরিচয় দিয়েছে। আদতে তারা কি ঈমানের পরিচয় দিতে পারল! এই যে তারা নিরপরাধ মানুষকে আক্রান্ত করল, অসহায় মানুষের ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল, ধর্মকে পুঁজি করে লুটপাট এবং চুরির মতো জঘন্য কর্মকাণ্ড করল; এতে কি তাদের পাপ হয়নি?

ইসলামের নাম ভাঙিয়ে নামধারী মুসলমান কোরআনকে অপমান করল এর জন্য তারা কি বিচারের মুখোমুখি হবে না? তাদের কি আল্লাহর আদালতে বিচার হবে না?

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কসাই ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খানসহ কায়েমি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কোনো কূলকিনারা না পেয়ে কোনো রাজনৈতিক সমাধান করতে না পেরে ধর্মের বিষবাষ্প ছড়িয়ে এদেশের নিরস্ত্র গণমানুষের উপর গণহত্যা এবং লুটপাট চালানো শুরু করল। এমনকি তারা গণমানুষকে নগ্ন করে গণতল্লাশি চালিয়েছে যারা হিন্দু তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মা-বোনদের ধরে নিয়ে তাদের যৌন লালসা চরিতার্থ করে গণহত্যা চালিয়েছে।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের ‘পাকিস্তানি জেনারেলদের মন’ বইটিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দালালদের এই জঘন্য কর্মকাণ্ডের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। আজকের সমাজে এসে ধর্মের নামে বিশৃঙ্খলা, লুটপাট, হানাহানি কেন হচ্ছে? এর দায়ভার রাষ্ট্রযন্ত্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে- যখন এদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বীর মুক্তিযোদ্ধারা যখন পাকিস্তানি বাহিনীকে চারদিক থেকে পাকড়াও করে ফেলছিল তখন বাঙালি জাতির চিরশত্রু গাদ্দার জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রসংঘ (যার বর্তমান নাম ছাত্রশিবির) দ্বারা গঠিত পাকিস্তানি দালাল রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচারের অংশ হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ভারতের চর হিসেবে অপবাদ দেয়ার চেষ্টা করত, তাদের ষড়যন্ত্রমূলক অপচেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

পাকিস্তানের পা-চাটা গোলাম এই বর্বর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি ইসলাম রক্ষার নামে ১৯৭১ সালে লাখ লাখ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করে ও লক্ষাধিক মা বোনকে গণধর্ষণ করে হত্যা করে। কিন্তু সেসময় বাংলার ভূমি সন্তানেরা হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বীর বাঙালি মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমে কাপুরুষ পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করেছিল।

পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার লাল সবুজ পতাকা। এই যে আজকের শিক্ষিত সমাজেও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পের উদ্গীরণ ঘটছে তার পেছনেও রয়েছে বাংলা ও বাঙালির শত্রুদের দীর্ঘদিনের সুচতুর পরিকল্পনা। সুদীর্ঘকাল ধরে এদেশের মানুষকে সাংস্কৃতিকভাবে দেউলিয়া করে দেয়ার এক ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দালালগোষ্ঠী।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের জিঘাংসু প্রজন্ম বাংলার মাটিতে এখনও বেঁচে আছে। এ জাতির উপর তাদের ৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তারা এখনও তৎপর রয়েছে। একটি জাতিকে ধ্বংস করার মোক্ষম অস্ত্র হলো সে জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকবোধকে বিনষ্ট করে দেয়া।

সে অপচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দালালগোষ্ঠীর হীন উদ্দেশ্য ছিল বাস্তবায়নের জন্য বাঙালিকে জ্ঞানবিমুখ ও সংস্কৃতিবিমুখ করা একান্ত জরুরি। এরই অংশ হিসেবে অসাম্প্রদায়িক বাঙালিকে সাংস্কৃতিকভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্যে খুনি জিয়া, খালেদা-নিজামীর বিএনপি জামায়াত গংয়ের সুকৌশলী চক্রান্ত আজ বর্ণনা করব। যাদের বয়স ৩০ এবং যারা প্রকৃত অর্থেই শিক্ষিত, যাদের মন এবং মনন আলোকিত তারা বিষয়টি বোধ করি ধরতে পারবেন। বিএনপি জামায়াত খুনিচক্র বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে যে প্রক্রিয়ায় নির্মূল করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো-

১. শিক্ষিত প্রজন্মকে সিনেমা হল-বিমুখ করার লক্ষ্যে বাংলা চলচ্চিত্রে ভয়াবহ রকমের অশ্লিলতা ও কাটপিসের (নগ্ন চিত্র প্রদর্শন) প্রবর্তন করা হয়

২. সিনেমা হলে ও বৈশাখী মেলায় বোমা হামলা

৩. উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কর্মসূচিতে বোমা হামলা

৪. প্রগতিশীল শিল্পী-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা।

৫. জঙ্গিগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় মদদ প্রদান করা

৬. তারেক জিয়া ও বাবরের পরিকল্পিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় খালেদা-নিজামী সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা।

৭) খালেদা-নিজামী সরকার কর্তৃক জেএমবি, বাংলা ভাইয়ের মতো জঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান।

এছাড়াও, অসংখ্য অগণিত রাষ্ট্রীয় অপরাজনৈতিক কুকর্ম সম্পাদনের মধ্য দিয়ে বাংলাকে সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করার চক্রান্তে মেতে উঠেছিল পাকিস্তানি দালাল বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠী।

আজকের দিনে নতুন প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে, একটি সুখীসমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের শপথ নিয়ে বাংলার মাটি থেকে পাকিস্তানের দালালগোষ্ঠী বিএনপি-জামায়াতের বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অমোঘ নির্দেশনা অনুসরণ করে পথচলায় সর্বাগ্রে গুরুত্বারোপ করতে হবে, জাতির পিতা এ জাতিকে যেসব কালোত্তীর্ণ নির্দেশ প্রদান করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-

১. ‘সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। হিন্দু তার ধর্মকর্ম করবে। বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না।

২. সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই মাটি ও মানুষকে কেন্দ্র করে গণমানুষের সুখ, শান্তি ও স্বপ্ন এবং আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠবে বাংলার নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতি।

৩. যদি আমরা বিভক্ত হয়ে যাই এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও মতাদর্শের অনৈক্যের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে আত্মঘাতী সংঘাতে মেতে উঠি, তাহলে যারা এদেশের মানুষের ভালো চান না ও এখানকার সম্পদের ওপর ভাগ বসাতে চান তাদেরই সুবিধা হবে এবং বাংলাদেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত, ভাগ্যাহত ও দুঃখী মানুষের মুক্তির দিনটি পিছিয়ে যাবে।

৪. পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না।

এদেশের জন্মলগ্ন থেকে আদর্শিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দেউলিয়া রাজনৈতিকগোষ্ঠী বিএনপি-জামায়াত এ মাটিকে গুজব ষড়যন্ত্রের অপরাজনীতির মাধ্যমে রক্তাক্ত করেছে, ক্রমাগত ছিন্নভিন্ন করে চলেছে তাই তরুণ প্রজন্মকে সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রেখে পথচলতে হবে। আমরা যেন অপশক্তির হীনউদ্দেশ্যে পাতা ফাঁদে যেন না পড়ি। আমাদের চিন্তাভাবনা ও শিক্ষা যেন মাতৃভূমির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়ে না যায়।

আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রামের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন “যখন একজন মানুষ বিবেচনা করে যে, নিজজাতি এবং স্বদেশের প্রতি সে তার দায়িত্ব পালন করেছে, তখন সে শান্তিতে মৃত্যুবরণ করতে পারে।”

সবশেষে মহান স্বাধীনতার স্থপতি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করছি- ‘একবার একান্ত আলাপচারিতায় যুবলীগের কয়েকজন কর্মীকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমি মারা গেলে আমার কবরে একটা টিনের চোঙা রেখে দিস। লোকে জানবে এই একটা লোক একটা টিনের চোঙা হাতে নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিল এবং সারাজীবন সেই টিনের চোঙায় বাঙালি বাঙালি বলে চিৎকার করতে করতেই মারা গেল।’

লেখক: ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
রিমান্ড মানে যেন হয় ভয়-ভীতির কিছু নয়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ: বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনই মুক্তির হাতিয়ার
ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এখানে পড়তে আসেননি!
মোসাদের নৃশংসতা, বিজ্ঞানী ফাখরিজাদেহর পরিণতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনা
বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি

শেয়ার করুন

ছোট সংখ্যার ভয়

ছোট সংখ্যার ভয়

শ্রেষ্ঠত্বের অনুভব ব্যক্তিকে সহিংস করে তোলে, তাকে করে তোলে একরৈখিক। একরৈখিকতা এক ধরনের প্রতিবন্ধিতা। কারণ, যুক্তির বিপরীতে যিনি বিশ্বাসের ঘরে বসত গাড়েন তিনি মূলত পার্থিব ও অপার্থিব পুরস্কারের সাধনা করেন। এ লোভ তাকে হীন করে। এ হীনতা বা নীচুতা খুব নিম্নস্তরের বিষয় সেটি বোঝার বুদ্ধিবৃক্তিক সক্ষমতা তার থাকে না। সুকৌশলে সেই শক্তিটা লোপ করে দেয়া হয়। কড়া বিশ্বাসের রসায়নে মস্তিষ্ক প্রক্ষলিত করা হয়। এ ধরনের মস্তিষ্ক প্রক্ষালনের বিষয় হিরক রাজার দেশে সত্যজিৎ রায় দেখিয়েছেন।

অর্জুন আপ্পাদুরাই গ্লোবাল স্টাডিজের বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত। পড়ান নিউইয়ার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। আপ্পাদুরাইয়ের Fear of Small Numbers অর্থাৎ ছোট সংখ্যার ভয় শিরোনামে একটি অসাধারণ বই রয়েছে। খুব ধারালো বই, পরিচ্ছন্ন চিন্তার স্মারক। ছোট সংখ্যা কীভাবে আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায় তাই এ বইয়ের অন্যতম উপজীব্য।

আপ্পাদুরাইয়ের বিশ্লেষণ দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়ার মতো। তিনি খুব সহজ করে বলেছেন- মানুষ মূলত ছোট সংখ্যা দেখে ভয় পায়। ছোট সংখ্যা বড়দের ভয়ের অন্যতম কারণ। বড় সংখ্যা কেবল বড় সংখ্যা দেখে ভয় পায় না, ছোটদের দেখেও ভয় পায়।

মনে রাখতে হবে কেউ ভয় না পেলে অন্যকে ভয় দেখায় না। ভয়ের সংস্কৃতির ভেতর রয়েছে আরেকটি ভয়ের দীর্ঘ ছায়া। ভয় প্রর্দশন ও ভয়-সংস্কৃতির পেছনে কাজ করে বিশেষ রাজনীতি।

এ রাজনীতি হলো একক হওয়ার রাজনীতি। হয় মুসলিম, না হয় হিন্দু না হয় বৌদ্ধ। অন্যদের নিশ্চিহ্ন করে এক বিশ্বাস, এক দৃষ্টিভঙ্গি, এক ধর্ম ও সংস্কার প্রতিষ্ঠা বা সুপ্রিমেসি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ঘৃণ্য তৎপরতা।

নিজের ধর্ম, নিজের বর্ণ, নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস, নিজ কমিউনিটি, নিজপেশা এবং নিজদেশ শ্রেষ্ঠ আর বাকিগুলো অপাঙক্তেয় বা অগ্রহণযোগ্য এমন বিশ্বাসের চেয়ে অশ্লীল মনোভঙ্গি আর কিছু হতে পারে না।

শ্রেষ্ঠত্বের অনুভব ব্যক্তিকে সহিংস করে তোলে, তাকে করে তোলে একরৈখিক। একরৈখিকতা এক ধরনের প্রতিবন্ধিতা। কারণ, যুক্তির বিপরীতে যিনি বিশ্বাসের ঘরে বসত গাড়েন তিনি মূলত পার্থিব ও অপার্থিব পুরস্কারের সাধনা করেন। এ লোভ তাকে হীন করে।

এ হীনতা বা নীচুতা খুব নিম্নস্তরের বিষয় সেটি বোঝার বুদ্ধিবৃক্তিক সক্ষমতা তার থাকে না। সুকৌশলে সেই শক্তিটা লোপ করে দেয়া হয়। কড়া বিশ্বাসের রসায়নে মস্তিষ্ক প্রক্ষলিত করা হয়। এ ধরনের মস্তিষ্ক প্রক্ষালনের বিষয় হিরক রাজার দেশে সত্যজিৎ রায় দেখিয়েছেন।

আজ দেশজুড়ে শ্রেষ্ঠ বিশ্বাসের বীজ বোনা হচ্ছে। যে বীজ বোনা হবে তার তো চারা গজাবে। এটাই স্বাভাবিক। সহাবস্থানের জন্য দরকার বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গি। কী দিয়ে তৈরি হবে দৃষ্টিভঙ্গি। কার মধ্যে রয়েছে সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের মহৌষধ।

শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি সমন্বয়ে গড়ে ওঠা গ্রহণোন্মুক্ত এক সংকর সংস্কৃতির মধ্যে। কিন্তু সেই পথ তো আজ মসৃণ নয়। নানাভাবে তা সংকুচিত। প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষার সর্বস্তরে নেই বৈচিত্র্যের কোনো সুগন্ধিচন্দন।

কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের ভাষায়- আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে গল্পের দানবের মতো। এর ভেতরের খোলসটা এতো বড় যে মুখ দিয়ে ঢুকে সারা পেট ঘুরে আসলে কোথাও স্পর্শ হবে না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও ঠিক এমনই- শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পার হয়ে যাবে কিন্তু শিক্ষা কী সেই বিষয়টি স্পর্শ করবে না। শিক্ষালয়গুলো হয়ে উঠছে বৈচিত্র্য নির্মাণের পরিবর্তে বিশ্বাস উৎপাদনের কারখানা। কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় গোটা সামাজিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে বিশ্বাসের পক্ষে।

যেকোনো বিশ্বাসের মূল সমীবদ্ধতা হলো এর ভেতর অন্য বিশ্বাস বাস করতে পারে না, বা শ্রদ্ধান্বিত হতে পারে না। বিশ্বাস মানেই একক ব্যাপার। আবার বিশ্বাস মানেই বিভক্তি। বিশ্বাসের একটি বিশেষ দিক হলো- পিওর বিশ্বাস বলে কিছু নেই। ব্যক্তি একটি বিশ্বাসের সাধারণ স্কিমে বিশ্বাস করে আবার তার মধ্যে অনেক ধরনের ছোট ছোট ভিন্ন ধরনের বিশ্বাস ও সংস্কার থাকে।

বিশ্বাস মানেই যে এক নিরাপদ শীতল ছায়া তা নয়। যেমন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য শেষ কথা নয়। কে কার গ্রুপের অনুসারী পরবর্তী পর্যায়ে তা মুখ্য ওঠে। একক ধর্মীয় বিশ্বাস শেষ কথা নয়। এরপর প্রশ্ন আসে কে কোন তরিকা বা মাযহাবের। বিশ্বাসের ভেতর রয়েছে বিযুক্তির গাঢ় রসদ যা মূলত নিশ্চিহ্নকরণ প্রক্রিয়ার মূল জ্বালানি। বিশ্বাস মানেই বদ্ধতা।

বিশ্বাস অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শনবাদ উৎসাহিত করে। আর এজন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণ ও শ্রীবৃদ্ধিতে তথাকথিত বিশ্বাসীদের বিশেষ তৎপরতা লক্ষ্ করা যায়। প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সেমিনারে দুঃখ করে বলেছিলেন- যেখানকার প্রেসক্লাবের শ্রী যত সুন্দর সেখানকার সাংবাদিকতার মান তত নিম্ন।

জনগণ আদর্শিক অর্থে যথেষ্ট ধার্মিক না হলেও ধর্মকে কেন্দ্র করে দেখানোর ব্যাপারে সে খুব তৎপর। ধর্মের আচারসর্বস্ব ব্যাপারকে সে বেশ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সংস্কৃতি অধ্যয়নের পণ্ডিত জেমস ডাব্লিউ ক্যারে তার Communication as Culture-বইতে যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রবণতার ব্যাখ্যা করেছেন। একে তিনি বলেছেন- যোগাযোগের ট্রান্সমিশন অ্যান্ড রিচুয়ালভিউ। জনগণ আজ ধর্মের স্পিরিচুয়াল দিকের চেয়ে আচারসর্বস্ব দিকের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে উঠছে, যা তাকে সহিংস হতে প্রণোদনাও জোগাচ্ছে।

বিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে যুক্তি। যুক্তি হলো বহুমাত্রিক ব্যাপার। যুক্তি মানেই সংযুক্তি। গ্রহণোন্মুক্ত এক মনোভঙ্গি। বিশ্বাসের বিপরীতে যুক্তিনির্ভর আধুনিক জনমানস আমরা গড়তে পারিনি। সমালোচনাত্মক মনোভঙ্গিসম্পূর্ণ জনসমাজ নেই। বাংলাদেশ বিশ্বাসের ঘনগ্রাম।

বাঙালির সংস্কৃতিতে সব মত ও পথের যে সম্মিলনশক্তি ছিল তা লোকজগায়ক, চিন্তক ও সাধকেরা লালন ও ধারণ করতেন তা ক্ষীণ হতে হতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সবাই মিলে এক বিশ্বাস ও এক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। যার মূল প্রেরণা কেবল সংখ্যাধিক্যেরা থাকবে, ছোট সংখ্যা নয়।

মোট জনসংখ্যার ৫-১০ ভাগ ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ভিন্ন ধর্মের। এ সংখ্যা নিয়ে আজ বড় সংখ্যার ভয়ের শেষ নেই। অনেকে এ সংখ্যাটিকে মানচিত্র থেকে তুলে দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা বানাতে চায়। অর্থাৎ একশ হতে চান। ছোট সংখ্যা বড়র মধ্যে নানারকম অস্বস্তি তৈরি করে। এর পেছনে রয়েছে বড় সংখ্যার অসম্পূর্ণতার অনুভব। অর্থাৎ সংখ্যাধ্যিকের ধর্ম, বিশ্বাস এবং ভাষা এবং মূল্যবোধই কেবল বেঁচে থাকবে।

অন্যদের উপস্থিতি তা যত নগণ্য হোক থাকবে না। বড় সংখ্যারা এভাবে ছোটদের দ্বারা তাড়িত হচ্ছে। বড় সংখ্যাই মূলত ভীত হয়ে পড়ছে। ছোট সংখ্যার উপস্থিতি তাকে অস্থির করে তুলছে। এ বড়করণ সংস্কৃতির আরেক নাম প্রান্তিকীকরণ। অর্থাৎ ঠেলতে ঠেলতে একেবারে কোণায় চেপে ধরা। যেখানে সহনশীল শাসন থাকে না কর্তৃত্ববাদী বা লোকরঞ্জনবাদী কাঠামো বিদ্যমান, সেখানে এ ধারা প্রবল হবে এটাই বাস্তবতা।

এমন কর্তৃত্ববাদী কাঠামোয় যেসব প্রতিষ্ঠান ছোটদের গিলে ফেলার অপচর্চাকে মদদ দেয় রাষ্ট্র তার মধ্যে অন্যতম। রাষ্ট্রীয় মেশিনারিজ ব্যবহার করে স্বার্থবাদী কায়েমি গোষ্ঠী কখনও সজোরে কখনওবা নীরবে ছোটদের খেয়ে ফেলার চেষ্টা করে।

Laurent Gayer & Chirstophe Jaffrelot-এর যৌথ সম্পাদনায় Muslims in Indian Cities: Trajectories of Marginalisation বইয়ে শুরুর অধ্যায়ে জাস্টিস রানজিনদার সাচারের একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন যার বাংলা অর্থ হলো- “একটি রাষ্ট্র কতটুকু সভ্য তা যাচাইয়ের অন্যতম মাপকাঠি হলো সেই রাষ্ট্র ক্ষুদ্রজাতি সত্তাকে কতটুকু বিশ্বাস ও আস্থার সঙ্গে নিতে পারে।”

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং জাস্টিস রানজিনদার সাচারের নেতৃত্বে ভারতের মুসলিমদের প্রান্তিকীকরণ চিত্র বোঝার জন্য একটি কমিশন গঠন করেন। ভারতীয় মুসলিমদের প্রান্তিকীকরণের যে চিত্র কমিশন উন্মোচন করেছে তা কেবল বেদনাদায়ক নয়; নির্মমও বটে।

ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে একটি সম্প্রদায়কে ঠেলতে ঠেলতে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায় সাচার কমিশন তা নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরেছে। সালমান খুরশিদের At Home in India: The Muslim Saga বইতেও একইধরনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে একইচিত্র লক্ষ করা যায়। কেবল হিন্দু সম্প্রদায় নয়, সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের প্রান্তিকীকরণে তৈরি হয়েছে অনন্য নজির।

গত বছর দুয়েক আগে রাঙ্গামাটিতে এক প্রশিক্ষণে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। একজন আদিবাসী নারী প্রশিক্ষণের একপর্যায়ে বললেন, তারা যথেষ্ট সুন্দর নয়। গণমাধ্যমে তারা যে মডেল দেখছেন তাতে তাদের নিজেদের আর সুন্দর মনে হচ্ছে না। ‘আমি যথেষ্ট সুন্দর নেই’ এমন বোধ জাগিয়ে তুলে পরিচয়ের ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি করা হচ্ছে যা মূলত সমরূপী সমাজ নির্মাণ প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করবে।

যেখানে কোনো বৈচিত্র্য থাকবে না। দোকানে সাজানো পণ্যসমাহার দেখে বনরূপা বাজারকে রাজশাহীর সাহেব বাজার মনে হয়েছে। পণ্য কেবল পণ্য নয় মূল্যবোধের প্রতিনিধি। জনপরিসরে বড় সংখ্যার অপ্রয়োজনীয় বৃহৎ উপস্থিতিও চোখে পড়ে, সচরাচর পড়ল। বৃহৎ অথচ অপ্রয়োজনীয় বড়দের এ উপস্থিতি ছোটদের মনে ভয় জাগায়। একলাকরণ প্রক্রিয়াকে গতিশীল করে।

সমকালীন রাজনীতির ইতিহাস হলো ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রান্তিকীকরণের ইতিহাস। চার্লস ডারউইন সেই বিখ্যাত উক্তি, Survival of the Fittest অর্থাৎ যোগ্যরাই টিকে থাকবে মানে সংখ্যাধিক্য, শক্তি ও ক্ষমতা টিকে থাকবে; মানে ছোট সংখ্যা, শক্তি ও ক্ষমতাহীনরা টিকে থাকবে না?

সমকালীন বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডওকিন বলছেন, পরার্থবোধ এ জগৎ-সংসার টিকিয়ে রেখেছে, মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে পারস্পরিক সহযোগিতা প্রযোজন, প্রয়োজন সহাবস্থানের যূথবদ্ধ চেতনা। ‘লাইফ অব পাই’ মুভির শেষ উক্তি ডোন্ট লুজ হোপ অর্থাৎ আশা হারাবেন না। ছোট সংখ্যা কারো অনুগ্রহে নয়, বেঁচে থাকবে তাদের সৌন্দর্য ও জীবনীশক্তি নিয়ে। আর তা না হলে পৃথিবীর যে মৌলিক চরিত্র বৈচিত্র্য তা তো পড়বে গভীর সংকটে।

ছোট ও বড় সংখ্যার সহাবস্থানের জন্য মানবিক, জনকল্যাণমূলক ও কার্যকর রাষ্ট্রের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
রিমান্ড মানে যেন হয় ভয়-ভীতির কিছু নয়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ: বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনই মুক্তির হাতিয়ার
ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এখানে পড়তে আসেননি!
মোসাদের নৃশংসতা, বিজ্ঞানী ফাখরিজাদেহর পরিণতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনা
বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি

শেয়ার করুন

ইকবাল যেন না হন জজ মিয়া

ইকবাল যেন না হন জজ মিয়া

ইকবাল যদি আসলেই অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি যে কেবল মাঠের অ্যাসাইনমেন্টই বাস্তবায়ন করেছেন এবং তার পেছনে যে বিরাট শক্তি রয়েছে— তাতে সন্দেহ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও সাংবাদিকদের বলেছেন, কাজটি পরিকল্পনামাফিক করা হয়েছে। দুই থেকে তিনবার যাওয়া– আসার মধ্যে তিনি এই কর্মটি শেষ করেছেন। কাজেই এটি নির্দেশিত হয়ে কিংবা কারো প্ররোচনা ছাড়া এটি করেছেন বলে তারা এখনও মনে করেন না।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তার সমাবেশে যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়, সেই মামলার তদন্ত ভিন্নখাতে নিতে ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে ধরে আনা হয় জজ মিয়া নামে এক যুবককে। তাকে ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে একটি সাজানো জবানবন্দি আদায় করে সিআইডি। ২০০৫ সালের ২৬ জুন আদালতে দেয়া ওই কথিত স্বীকারোক্তিতে জজ মিয়া বলেছিলেন, তিনি আগে কখনও গ্রেনেড দেখেননি; গ্রেনেড ও বোমার মধ্যে পার্থক্য তিনি জানেন না।

পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় ভাইদের নির্দেশে তিনি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নিয়েছেন। ওই বড় ভাইয়েরা হচ্ছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ, মুকুল প্রমুখ। তবে এই জবানবন্দির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে। পরের বছর ২০০৬ সালের আগস্টে আসল ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার ছোট বোন খোরশেদা বেগম। তিনি জানান, জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর থেকে সিআইডি তার পরিবারকে মাসে মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে এই মামলার তদন্তের উদ্যোগ নেয়। তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন এ-সংক্রান্ত মামলা দুটির অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। অব্যাহতি দেয়া হয় জজ মিয়াকে।

রাষ্ট্র কীভাবে একটি বড় ঘটনাকে ভিন্নখাতে নিতে এবং আসল ঘটনা আড়াল করতে জনগণের করের পয়সায় পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীকে ব্যবহার করে— একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় এই জজ মিয়া নাটক তার একটি বড় কেস স্টাডি। এটি ওই সময়ে এত বেশি আলোচিত হয় যে, এখনও বিভিন্ন মামলার রেফারেন্স হিসেবে জজ মিয়া শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে নারকীয় তাণ্ডবের পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফে জানানো হচ্ছে যে, যে লোক পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রেখে এসেছিলেন, তার নাম ইকবাল। এরইমধ্যে তাকে গ্রেপ্তারের খবরও জানানো হয়েছে। যদিও ইকবালের পরিবার বলছে, ইকবাল ভবঘুরে, মানসিকভাবেও পুরোপুরি সুস্থ নন। কেউ কেউ বলছেন, ইকবাল ভবঘুরে হলেও আগে বিএনপি-জামায়াতের মিছিলে তাকে দেখা গেছে। তবে যে দাবিটি সবচেয়ে বেশি সামনে আসছে তা হলো, ইকবাল যেন বলির পাঁঠা বা আরেকজন জজ মিয়া না হন।

যেন এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেকে এবং এই ঘটনার পেছনে যদি দেশি-বিদেশি চক্রান্ত থেকে থাকে; যদি বড় কোনো গোষ্ঠী বা দল এমনকি কোনো রাষ্ট্রও জড়িত থাকে— সেই সত্যটা যেন বেরিয়ে আসে। যেন পুরো ঘটনাটি ইকবালকেন্দ্রিক না হয়। কারণ আপাতদৃষ্টিতে ইকবাল সম্পর্কে যতটুকু জানা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, তিনি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে এই কাজটি করেনননি। বরং নগদ কিছু টাকার বিনিময়ে হয়তো তাকে দিয়ে একটি মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে পূজামণ্ডপে রাখা হয়েছে।

সিসি ক্যামেরার যে ছবি এরইমধ্যে গণমাধ্যমে দেখা গেছে, সেটি যদি সত্যি হয় এবং ইকবাল নামে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনিই যদি পূজামণ্ডপে কোরআন রেখে আসেন—তাহলে তার কাছ থেকে জানতে হবে তিনি কার নির্দেশে বা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়েছিলেন? এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, যাকে ধরা হয়েছে তিনি প্রকৃতই অপরাধী কি না; মূল অপরাধীদের ধরতে না পারা বা তাদের আড়াল করতে ইকবালকে সামনে আনা হচ্ছে কি না; জিজ্ঞাসাবাদে ইকবাল সঠিক তথ্য দেবেন কি না; যদি তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ না হন, তাহলে তার দেয়া তথ্য কতটুকু আমলযোগ্য হবে ইত্যাদি নিয়েও সংশয় রয়েছে।

কুমিল্লার এই ঘটনার পর থেকেই বলা হচ্ছিল যে, ওই পূজামণ্ডপের সিসি ক্যামেরা ছিল না। কিন্তু ঘটনার কয়েক দিন পরে জানা গেল যে, মন্দিরের আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে অপরাধীকে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু শুরু থেকেই এই ভিডিও ফুটেজের সত্যতা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। সংশয় প্রকাশ করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ এমনও লিখেছেন যে, মন্দির থেকে যখন লোকটি বের হয়ে আসছেন, তখন তিনি সাবলিল ভঙ্গিতে আসছেন এবং তার হাতে সাদা উজ্জ্বল একটা বইয়ের মতন। কিন্তু মণ্ডপ থেকে যে কোরআন শরিফ উদ্ধার করা হয়েছে, সেটির কাভার ছিলো সবুজ। আবার হনুমানের গদা নিয়ে হাঁটার সময় মনে হয়নি তিনি গোপন কোনো কাজ করছেন। এরকম আরও অনেক প্রশ্ন আছে এই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে।

এখন কথা হচ্ছে, মানুষ কেন এই ফুটেজ নিয়ে সন্দেহ করছে বা এরকম ঘটনায় জনগণের একটি বিরাট অংশ কেন সংশয় প্রকাশ করে? করে এই কারণে যে, যখনই কোথাও বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটে, সেখানে অনেক সময়ই গণমাধ্যম সঠিক সময়ে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জনগণকে দিতে ব্যর্থ হয়; অনেক সময় গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় নানা বাহিনীর তরফে চাপ প্রয়োগ করা হয় আবার গণমাধ্যম নিজেও নানারকম সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করে তথ্য গোপন করে বা চেপে যায়। তখন সংগত কারণেই সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ও অপতথ্য ডালপালা মেলে। ফলে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফে কোনো ফলোআপ দেয়া হয় বা অপরাধী সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়া হয়, তখন অনেক মানুষই সেগুলো সন্দেহের চোখে দেখে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ব্যাপারে মানুষের আস্থার সংকটও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। বছরের পর বছর ধরেও অনেক আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার কূলকিনারা না হওয়ায় এই সংকট আরও বেড়ে যায়। যেমন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি বা কুমিল্লায় কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পরে হত্যার ঘটনা।

অনেক ঘটনা বা মামলাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার; রাজনীতি ও ভোটের মাঠে বিরোধীপক্ষ দমনের জন্য গ্রাউন্ড বা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা; একপক্ষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা খেয়ে অন্যপক্ষের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিয়ে দেয়া; বিচারিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপসহ নানা কারণে দেশের পুরো সিস্টেম নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট রয়েছে। যে কারণে ইকবাল নামে একজন যুবককে কুমিল্লার ঘটনায় সামনে নিয়ে আসা হলো, সেই লোকটি প্রকৃত প্রস্তাবে অপরাধী হলেও সমাজের বিরাট অংশ এটিকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করল। এটি খুবই বিপজ্জনক।

রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার তথা সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার একটি বড় শর্ত হলো- সেই বিচারব্যবস্থায় জনগণের পূর্ণ আস্থা থাকতে হবে। সেই রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস ও ভরসা থাকতে হবে। তারা যে প্রতিবেদন দেবে, সংবাদ সম্মেলনে যে তথ্য দেবে, মানুষের কাছে সেটি বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। কিন্তু এই বিশ্বাস ও আস্থা একদিনে তৈরি হয় না। এই বিশ্বাস ও আস্থা একদিনে নষ্ট হয়নি। জজ মিয়ার মতো নাটক এই দেশে হয়েছে বলেই এখন কুমিল্লার পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখে আসার অভিযোগে গ্রেপ্তার ইকবালের প্রসঙ্গেও অনেকে সেই একই শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

মোদ্দা কথা, ইকবাল যদি আসলেই অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি যে কেবল মাঠের অ্যাসাইনমেন্টই বাস্তবায়ন করেছেন এবং তার পেছনে যে বিরাট শক্তি রয়েছে— তাতে সন্দেহ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও সাংবাদিকদের বলেছেন, কাজটি পরিকল্পনামাফিক করা হয়েছে। দুই থেকে তিনবার যাওয়া– আসার মধ্যে তিনি এই কর্মটি শেষ করেছেন। কাজেই এটি নির্দেশিত হয়ে কিংবা কারো প্ররোচনা ছাড়া এটি করেছেন বলে তারা এখনও মনে করেন না।

বাস্তবতা হলো, যারাই এই ঘটনার পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন, তারা জানতেই যে এটি বড় ইস্যু হবে এবং এটা নিয়ে একটা বড় ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় সংকট সৃষ্টি করা হবে। হয়তো সেই সামাজিক ও ধর্মীয় সংকটকে পুঁজি কের কেউ কেউ তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও করে থাকতে পারেন। কিন্তু আসলেই কী ঘটেছিল, সেটি নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে বের করে আনার জন্য রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও গোয়েন্দা বাহিনীসহ পুরো সিস্টেমকে যেরকম দক্ষ, যোগ্য, পক্ষপাতমুক্ত হওয়া দরকার—সেখানেই বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নানারকম ষড়যন্ত্র থাকলেও সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করছে সাধারণ মানুষেরই বিরাট অংশ। যারা মিছিল নিয়ে মন্দিরে ভাঙচুর চালিয়েছে বা যারা রংপুরে জেলেপল্লিতে আগুন দিয়েছে, তাদের সবাই রাজনৈতিক কর্মী নন। এখানে অনেক সাধারণ মানুষও আছেন— যারা কথিত ধর্মীয় অনুভূতি থেকেই এই সহিংসতায় অংশ নিয়েছেন। মানুষ হিসেবে আমাদের অসহিষ্ণুতার পারদ যে দিন দিন উপরে উঠছে; পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভিন্নমত-ভিন্ন আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীলতা যে দিন দিন কমছে, এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক অরাজনৈতিক নানা গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করবে; সরকারের বিরোধীপক্ষ সরকারকে বিপদে ফেলতে বা বিব্রত করতেই চাইবে। কিন্তু তাদের সেই চাওয়াটা সাধারণ মানুষই বাস্তবায়ন করে দিচ্ছে। সুতরাং একজন ইকবালকে ধরে তো কোনো লাভ নেই কিংবা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে ধরেও খুব বেশি লাভ হবে না— যদি সমাজের মানুষের মধ্যে যে কট্টরপন্থার বীজ ক্রমশ বাড়ছে— সেটি উপড়ে ফেলা না যায়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
রিমান্ড মানে যেন হয় ভয়-ভীতির কিছু নয়
বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ: বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শনই মুক্তির হাতিয়ার
ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এখানে পড়তে আসেননি!
মোসাদের নৃশংসতা, বিজ্ঞানী ফাখরিজাদেহর পরিণতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনা
বাল্যবিবাহ রোধ করা জরুরি

শেয়ার করুন