ডিজিটাল জমানায় পেশাদারত্বের বর্ষপূর্তি

ডিজিটাল জমানায় পেশাদারত্বের বর্ষপূর্তি

এক সময় গণমাধ্যমকে পৌরবিজ্ঞানীরা আদর করে বলতেন ফোর্থ স্টেট বা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এখনও আমরা বলছি। কিন্তু আজকের বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণমাধ্যমের আয়নায় রাষ্ট্র তার চেহারা দেখতে চায় কি না সেটা সব দেশের প্রেক্ষাপটেই একটি বড় প্রশ্ন। এমনকি গণমাধ্যমের দর্পণে সেই ‘গণ’ নিজেদেরও দেখতে পায় কি না সে প্রশ্নও অবান্তর নয় কোনো কোনো প্রেক্ষাপটে।

রাষ্ট্র ও সমাজ ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। সমাজের বহুমাত্রিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ‘গণমাধ্যম’ ধারণাটিরও পরিবর্তন হচ্ছে। শত বছর আগের গণমাধ্যমের ধারণা ও আজকের গণমাধ্যমের ধারণার সঙ্গে অনেক ফারাক। এমনকি দুই দশক আগের গণমাধ্যমের সঙ্গেও সাম্প্রতিক গণমাধ্যমের তুলনা চলে না।

এখন নয়া জমানা। এ জমানায় অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। এখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের, রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে পরিবর্তন এসেছে। সব কিছুই চেনা চেনা লাগে, তবু অচেনা। রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। গণমাধ্যমও একটি প্রতিষ্ঠান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের সম্পর্কের মাঝেও পরিবর্তন এসেছে। অতীতে একটি রাষ্ট্র গণমাধ্যমকে বন্ধু মনে না করলেও শত্রু মনে করত না। তারা একে অপরের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।

রাষ্ট্রকে নিছক একটি রাজনৈতিক ধারণা থেকে আজকের স্বাধীন-সার্বভৌম ও আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের যে ভ্রমণগাথা গণমাধ্যম সেখানে বাতিঘরের মতো কাজ করেছে। পথ দেখিয়েছে, সতর্ক করেছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের সেই সম্পর্কও অনেকটাই বদলে গেছে। বিশ্বজুড়েই আজ মুক্ত গণমাধ্যমের অন্যতম চ্যালেঞ্জটির নামও ‘রাষ্ট্র বনাম গণমাধ্যম’।

গণমাধ্যমের মূল চ্যালেঞ্জ রাষ্ট্র নয়। যদি চ্যালেঞ্জ হতো তবে কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই গণমাধ্যম দাঁড়াতে পারত না। বাংলাদেশে আজ গণমাধ্যমের শুধু বিকাশই হয়নি, বিস্ফোরণ ঘটেছে। তাই গণমাধ্যমের মূল চ্যালেঞ্জ আজকের বিশ্ব বাস্তবতা যার নাম ডিজিটাল বাস্তবতা। ডিজিটাল বিশ্বে সব গণমাধ্যমই একই দৌড়ে শামিল এবং সে দৌড় শুরুও হয় সময়ের একই রেখায়। কে কার আগে সংবাদকে গ্রাহক বা পাঠকের কাছে কতটা চটকদার করে উপস্থাপন করতে পারে সেই দৌড় শুরু হয় ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই। সময় এখন আগের চেয়ে দ্রুত বহমান। আগে একটি ঘটনা ঘটার পরের দিন গ্রাহকের কাছে পাঠানোই ছিল বড় কৃতিত্ব, দুই-তিন দিন বা সপ্তাহ খানেক না হলেই হলো।

সাংবাদিকের হাত ধরে পত্রিকামারফত একটি সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছাত। সাংবাদিক ছাড়া সংবাদ চলতে-ফিরতে পারত না। সংবাদ ছিল স্থবির একটি ঘটনামাত্র। কিন্তু ডিজিটাল বিশ্বে সবাই আজ সাংবাদিক। ডিজিটাল যুগে নাগরিকের হ্যান্ডহেলের মাধ্যমে মুহূর্তেই একটি সংবাদ পৌঁছে যায় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। সিটিজেন জার্নালিজমের যুগে সংবাদ ঢাকায় আসার জন্য সাংবাদিকের অপেক্ষায় থাকে না।

ডিজিটাল ডিভাইস ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সবাই আজ সক্রিয় সাংবাদিক। সংবাদ পেতে পাঠককে আজ আর হকারের জন্য সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। ঘটনা ঘটার পর কোনো অনলাইনের কত মিনিট আগে কোন অনলাইন পাঠককে জানাতে পারল সেটাই বড় কথা। ডিজিটাল বাস্তবতা মানে এখন ঘটনা এখনই প্রচার-প্রসার, লাইভ-লাইক-কমেন্ট-রিঅ্যাক্ট-ভাইরাল-ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমাদের দেশে এই ডিজিটাল প্রতিযোগিতার সূচনা হয় দুই দশক আগে। ২০০০ সালের গোড়ার দিকেই দেশে আজকের যে প্রচলিত অনলাইন পোর্টাল তার সূচনা হয়। তবে এদেশে গণমাধ্যমের অনলাইনে উত্তরণের কাজটি কিন্তু করেছিল কাগজের ওই পত্রিকাগুলোই। তারাই প্রথমে নিজেদের অনলাইন ভার্সন চালু করেছে। এরপর দেশে শুরু হয় পুরোপুরি অনলাইন-ভিত্তিক মিডিয়া যাকে আমরা বলি অনলাইন গণমাধ্যম।

পাশাপাশি কাগজের ওই পত্রিকাগুলোও তাদের অনলাইন ভার্সন চালু করে। কাগজের পত্রিকাগুলোর গ্রাহক থাকুক বা না থাকুক সবারই একটি অনলাইন ভার্সন আছে। গণমাধ্যমের আত্মপরিচয়ের জায়গার নামই তাদের অনলাইন ঠিকানা। ডিজিটাল প্লাটফর্মেই সবাই সবার অস্তিত্বের জানান দেয়। বিস্তীর্ণ সাইবার স্পেসে নিজের একখণ্ড জমিই (ডোমেইন) যেন সব গণমাধ্যমের মাথাগোঁজার ঠাঁই।

এক সময় গণমাধ্যমকে পৌরবিজ্ঞানীরা আদর করে বলতেন ফোর্থ স্টেট বা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এখনও আমরা বলছি। কিন্তু আজকের বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণমাধ্যমের আয়নায় রাষ্ট্র তার চেহারা দেখতে চায় কি না সেটা সব দেশের প্রেক্ষাপটেই একটি বড় প্রশ্ন। এমনকি গণমাধ্যমের দর্পণে সেই ‘গণ’ নিজেদেরও দেখতে পায় কি না সে প্রশ্নও অবান্তর নয় কোনো কোনো প্রেক্ষাপটে। এসব প্রশ্ন ওঠার পেছনে বহু কারণ থাকলেও মূল কারণ হয়তো ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’। টিকতে হলে এখানে অনেক কিছুর সঙ্গে ফিট করতে হবে, হিটও বাড়াতে হবে।

ডিজিটাল মাধ্যম গণমাধ্যমের জন্ম যেমন সহজ করে দিয়েছে, ঠিক একইভাবে কঠিন করে দিয়েছে তার সারভাইভাল। এখানে প্রসব বেদনা ছাড়াই জন্মের সুখ অনুভব করা যায় সত্য, কিন্তু তার বেঁচে থাকার লড়াইটা আগের চেয়ে আরও কঠিন। তদুপরি মান-ইজ্জত ও চরিত্র নিয়ে (মানোত্তীর্ণ হয়ে) বেঁচে থাকা আরও কঠিন।

এরকম একটি পরিস্থতিতে যা প্রথমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় তা হচ্ছে- বিশ্বাস ও আস্থা। সোজা কথায় গণমাধ্যম তার নিজস্ব সারভাইভালের জন্য অনেক সময়ই রাষ্ট্রের আস্থা ও জনগণের বিশ্বাস দুই-ই হারায়। একজনের কাছে আস্থাভাজন হতে গেলে আরেকজনের বিশ্বাস হারাতে হয়। এক কথায় এটাই অনলাইন গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত এবং এ লড়াইয়ে সে একেবারেই একা, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক।

দেশে আজ অসংখ্য অনলাইন গণমাধ্যম রয়েছে। এর মধ্যে ‘এই আছি এই নেই’ মার্কা নিউজপোর্টালও কম নয়। কে কার আগে নিউজ ব্রেক করবে সে প্রতিযোগিতাতো রয়েছেই। কয়েক হাজার টাকায় ওয়েব সাইট কিনে কাট-কপি-পেস্টের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অতিদ্রুতই পাঠকসমাজে ঝড় তোলা যায়।

এ রকম ঝড় তোলা অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ঘূর্ণিঝড়ে পেশাদার গণমাধ্যমগুলো আজ বিপর্যস্ত। ডিজিটাল যুগে শুধু খবর নয়, প্রয়োজন ঝড় তোলা খবর-সেনসেশন। সেই সেনসেশনের সাপ্লাই দিতে গিয়ে গণমাধ্যম নিজেই নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। এ যুদ্ধে পেশাদারত্ব, সততা-নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা- কিছু আদর্শিক শব্দমালামাত্র। আর গণমাধ্যমের ’মান’ বিষয়টিওতো আপেক্ষিক। কার মান কে ঠিক করবে?

টিকে ও টপকে থাকার প্রতিযোগিতায় নিজের খরচ মিটিয়ে টিকে থাকাটাই বড় কথা। মান নিয়ে টিকে থাকার জন্য পেশাদারত্বের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতা তথা গণমাধ্যমের নীতি-নৈতিকতা ও খরচের সম্পর্ক রয়েছে। সে সম্পর্কে কোনো রকম চিড় ধরলেই গণমাধ্যমে নিজের মান হারিয়ে ফেলে, কর্তৃপক্ষের আস্থা ও জনগণের ভালোবাসা সবই হারায়। এতে করে গণমাধ্যমের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই প্রান্তিক পাঠক মানে জনগণ মানে রাষ্ট্র।

এত সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও থেমে নেই গণমাধ্যমের জন্ম, বিবর্তন ও বিকাশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন আশা ও উদ্যোম নিয়ে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয় নতুন গণমাধ্যমের পথচলা। এদের মধ্যে অনেকেই হয়তো গা ভাসিয়ে দিচ্ছে গড্ডলিকায়, সময়ের সহজ স্রোতে। কিন্তু কেউ কেউ থাকবে যারা শত প্রতিকূলতার মাঝেও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার শক্তি সঞ্চয় করে পথচলা শুরু করবে।

শক্তি যদি হয় পেশাদারত্ব, তবে এ পথচলা কঠিন হলেও উপভোগ্যও কম নয়। পেশাদারত্বের মাঝেই অনলাইন গণমাধ্যম নিজেকে আবিষ্কার করবে নতুন রূপে ও আঙ্গিকে। নিজেকে নিজে চ্যালেঞ্জ করার মাঝেই রয়েছে অনলাইন গণমাধ্যমের চলার শক্তি। বাইরে ঝড়, আছে অন্ধকার, বজ্রপাত। কিন্তু বিজলির আলোওতো আছে। প্রয়োজন প্রশান্ত হৃদয় ও দৃঢ় পদক্ষেপ।

নিউজবাংলা গত এক বছর ধরে সে কাজটিই যেন করে যাচ্ছে। প্রশান্ত হৃদয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে নিজের মতো করে। গড্ডলিকার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। নিজেকে নিজেই সে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। অব্যাহত থাকুক এ প্রয়াস। শুভ জন্মবার্ষিকীতে নিউজবাংলার লড়াকুদের জন্য শুভ কামনা।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনা: জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী
শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়

শেয়ার করুন

মন্তব্য

অর্থনীতির চাকায় গতিশীল বাংলাদেশ

অর্থনীতির চাকায় গতিশীল বাংলাদেশ

দারিদ্র্য দূর করায় তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতির স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৩ সালে ‘সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ পায়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৫০-এর মধ্যে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এছাড়া, দ্য গোল্ডম্যান স্যাচ পূর্বাভাস দিয়েছে, ব্রিকসের পর যে ১১টি দেশ (এন ১১) আগামীর পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ তার একটি।

বাংলাদেশ বর্তমানে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির দেশ। অর্থনীতির গতিময়তায় দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন সারাবিশ্বে তার পরিচিতি। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরকে ২০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তামূলক ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। একটি দরিদ্র সাহায্যপ্রার্থী দেশ থেকে আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশ হওয়ার পথে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। ১৯৭১-এ পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের সময় বাংলাদেশ ছিল ‘আপাত সম্ভাবনাহীন’ পৃথিবীর দরিদ্রতম একটি দেশ, যাকে হেনরি কিসিঞ্জার ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের একটি সমৃদ্ধ দেশ। যাদের আছে রপ্তানিনির্ভর এক বিশাল অর্থনীতি। একযুগ ধরে যার প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ । ২০২০-এ কোভিড-১৯ এর কারণে প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এলেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলছে-

২০২১-এ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৮ এবং ২০২২ সালে এটা দাঁড়াবে ৭ দশমিক ২ শতাংশে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২২২৭ মার্কিন ডলার, যা প্রতিবেশী ভারত (১৯৪৭ ডলার) এবং পাকিস্তানের (১৫৪৩ ডলার) চেয়ে ঢের বেশি। এদিকে স্বাস্থ্য, গড় আয়ু, জন্মহার এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা নির্দেশকগুলোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির এই চিত্তাকর্ষক সাফল্য ভারত ও এর বাইরের সংবাদ মাধ্যমে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারী শিল্পোন্নতসহ অনেক দেশের অর্থনীতিতে যেখানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য সত্যি একটি উদযাপনের ব্যাপার।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে ভারতকে টপকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক আউটুলক: আ লং অ্যান্ড ডিফিকাল্ট অ্যাসেন্ট’ শিরোনামের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী-

বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ১ হাজার ৮৮৮ ডলার। অথচ পাঁচ বছর আগেও ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ছিল বাংলাদেশের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছেন- ‘যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতি ভালো করছে, এমন সংবাদ সুখকর’।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা ৩ মেয়াদের সরকার ও জনগণের দূরদর্শী পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ ও কঠোর পরিশ্রম বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের সাফল্য এনে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং বন্ধুপ্রতিম দেশ বলেই গণ্য করে। প্রতিবেশী এই দেশসহ অন্যান্য ক্ষমতাধর দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশ আস্থাশীল। দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই দেশগুলোকে অংশীদার হিসেবে মনে করে।

এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের এই উত্থানের কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি বুঝতে হলে পেছন ফিরে তাকাতে হবে। এর আগে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে দশকের পর দশক পশ্চিম পাকিস্তানের নিপীড়ন, নির্যাতন, বৈষম্যমূলক আচরণ ও অন্যায়-অবিচারের শিকার হয় পূর্ব পাকিস্তান। যার ফল ছিল পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা । ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ছিল মাত্র ৪৫০ টাকা (বর্তমানের হিসাবে ৫.৩০ ডলার)। জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল। শিক্ষিতের হার ছিল মাত্র ১৭। ১৯৪৯-৫০ এবং ১৯৬৯-৭০ অর্থবছর পর্যন্ত মাথাপিছু গড় আয় ০.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারত। কিন্তু, পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় কমে ০.৩ শতাংশে নেমে যায়।

এদেশে মাথাপিছু দুধ, স্নেহ, তেল, মাছ ও অন্যান্য প্রোটিন গ্রহণের হার ছিল অনেক কম। ১৯৭২-এর মার্চে, পিসি ভেরমা ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলি জার্নালে লিখেছিলেন-

“গত ২৪ বছরে, বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের অংশ ছিল, তখন এর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সররকারের নীতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল পশ্চাদমুখী।”

তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচক ছিল ভয়ানক কম। এছাড়া পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বৈশ্বিক বাণিজ্য, সহায়তা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যনীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর। একাত্তরের যুদ্ধ এই সংকটকে আরও ঘণীভূত করে। জাতিসংঘের হিসাবে, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সংস্কারে দরকার ছিল অন্তত ৯৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ওই সময় বাস্তবিকভাবে কাজটি ছিল সত্যিই দুঃসাধ্য। এমনকি তখন অনেকেই বাংলাদেশকে স্থিতিশীল দেশ হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের সেসময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৪-এ ঢাকা সফরে আসেন। তখন তিনি বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। আর রাষ্ট্রদূত ইউ অ্যালিক্স জনসন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে বলেন ‘আন্তর্জাতিক ঝুলি’। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার দূরদৃষ্টি ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে এ ধরনের পূর্বাভাসকে ছাপিয়ে যেতে সক্ষম হন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯-এর ৪ অক্টোবর দ্য প্রিন্ট-এ এক নিবন্ধে বলেছিলেন-

“স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া ছাড়াও, সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদনে আমরা এখন চতুর্থ স্থানে, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, আমে চতুর্থ, শাকসবজি উৎপাদনে পঞ্চম ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ স্থানে রয়েছি।”

বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন অব্যাহত আছে। দেশটি ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের স্বীকৃতি পায়। এছাড়া ২০২৪-এর মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া শর্ত ২০১৮ সালে পূরণ করে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ দেশগুলোর একটি।

এগুলো সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্জন। এ অগ্রগতির পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি, পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব। একইসঙ্গে লাখো কৃষক, কারখানা শ্রমিক, পোশাক শ্রমিক ও দেশের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে।

দারিদ্র্য দূর করায় তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতির স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৩ সালে ‘সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ পায়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৫০-এর মধ্যে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এছাড়া, দ্য গোল্ডম্যান স্যাচ পূর্বাভাস দিয়েছে, ব্রিকসের পর যে ১১টি দেশ (এন ১১) আগামীর পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ তার একটি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সামরিক সক্ষমতাও বৃদ্ধিতেও সহায়তা করছে। চীন-রাশিয়ার মতো পুরনো উৎস বাদ দিয়ে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী কিছু বড়সড় কেনাকাটা করতে যাচ্ছে। তারা ইতোমধ্যে তুরস্ক থেকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের সামরিক যান কিনেছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আমেরিকান এফ-১৬ অথবা ইউরো ফাইটার টাইফুন কেনার চিন্তা করছে।

এদিকে ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক হাব হয়ে ওঠছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর ফলে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনীতির উন্নতি হবে। এতে বদলে যাবে দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ২০১৮ সালে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস আইন প্রণীত হয়েছে, ফলে বিনিয়োগকারীরা একই পয়েন্ট থেকে সব ধরনের সেবা পাবে।

বাংলাদেশের জিডিপি ২০০৯ সালে ছিল ১০২ বিলিয়ন ডলার যা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩০২ বিলিয়ন ডলার। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও বেড়েছে। ২০০৯ সালে যা ছিল ৭০০ মিলিয়ন ডলার; ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬১৩ মিলিয়ন ডলার।

শেখ হাসিনার সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশের উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ঠ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ণ করেছে। এর মধ্যে ছিল ২০২১ সালে মধ্য-আয়ের দেশের স্বীকৃতি লাভ, যা ইতোমধ্যেই অর্জিত। ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়া, ২০৭১-এর মধ্যে যাদুকরী দেশে রূপান্তর এবং ২১০০ সালের মধ্যে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

অনেকেই মনে করে, শেখ হাসিনার শাসনামলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রধান উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে। বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শক্তি হলো, ১৭ কোটি জনগণ। যাদের ৬০ ভাগের বেশি তরুণ। কর্মশক্তিতে পরিপূর্ণ এই তরুণেরা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বিপুল ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়েছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশ এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্র নীতি— ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ অনুযায়ী এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। আয়তনে ছোট ও সীমিত সম্পদ নিয়ে ৫০ বছরের মাথায় অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করেছে। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যাওয়ার সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) নামে এই জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামেও নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইউনিসেফ নির্বাহী বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব এখন বাংলাদেশের। একইসঙ্গে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ও জাতিসংঘ প্রকল্পসেবাগুলোর কার্যালয়ের (ইউএনওপিএস) নির্বাহী বোর্ডের সহ-সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বের সমুদ্র সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে থাকে ও সঠিক ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সিবেড অথরিটি। বর্তমানে সিবেড অথরিটি কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক জোটের নেতৃত্বেও পিছিয়ে নেই দেশটি। বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল, টেকনিকাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (বিমসটেক) নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ। বিমসটেকের সদর দপ্তর এখন ঢাকায়। এছাড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক জোট সার্ক বাংলাদেশের উদ্যোগেই গঠিত হয়। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ভূমিকা কম নয়। দেশটি এখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী।

এছাড়া বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর চাপ উপেক্ষা করে পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে সই করেছে বাংলাদেশ। ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বের অন্যতম মুসলিম দেশ হিসেবে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

৫০ বছরে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গেও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করছে। ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশটি বর্তমানে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনা: জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী
শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়

শেয়ার করুন

জামায়াত-হেফাজত নিষিদ্ধ কি কঠিন?

জামায়াত-হেফাজত নিষিদ্ধ কি কঠিন?

গণ-আদালত ছিল নেহায়েত জনগণের আদালত এবং সাংবিধানিকভাবে গঠিত না হওয়ায় তখন সরকার ওই অভিযোগ আমলে নেয়নি। কিন্তু সবখানেই জনগণ বরাবর সোচ্চার গোলাম আযমের ফাঁসির দাবিতে আওয়াজ তোলে। যাহোক আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল অবশেষে গঠিত হয়। মওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ বেশ কজন নেতৃস্থানীয় জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে আনা সরকারি অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিজামীসহ বেশ কজনের ফাঁসির আদেশ ও তা কার্যকর করা হয়। এখন কতগুলো যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতার ফাঁসির আদেশ উচ্চতর আদালতে বিচারাধীন আছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দিতে গিয়ে বিচারকরা বেশ কবার ‘জামায়াতে ইসলামী একটি সন্ত্রাসী দল’ বলে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো সন্ত্রাসী দলের বৈধভাবে সমাজে কাজ করার অধিকার নেই। ইতোমধ্যে কয়েকটি সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আদালতে প্রমাণিত সন্ত্রাসী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী আজও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়নি। দিব্যি দেশ-বিদেশের সহায়তা ও আনুকূল্যে প্রকাশ্যে সংগঠন হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে বিষয়টি শঙ্কা ও হতাশার।

এ ব্যাপারে অনেক লেখালেখি-আলোচনা হলেও বিগত প্রায় ৪ দশকেও দলটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়নি। তাদের বাংলাদেশে রাজনীতি করতে না দেয়া ও গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামীসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ফাঁসির দাবি তুলেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সেই প্রায় ৩০ বছর আগে।

কোনো নেতা-নেত্রী তার আগে এমন দাবি সাহসের সঙ্গে উত্থাপন করে দেশব্যাপী কাজ করেননি। জাহানারা ইমাম এ দাবিতে দেশের বিশিষ্টজনদের নিয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো বৃহত্তম ময়দানে গণ-আদালত বসিয়ে গোলাম আযমের বিচারের আয়োজন করেন। স্বাধীনতাবিরোধীদের তীব্র বিরোধিতার মুখেও লক্ষাধিক মানুষ ওই গণ-আদালত পর্যবেক্ষণে যোগ দেয়।

বিশাল মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন বিচারকরা। উপস্থিত থাকেন প্রখ্যাত আইনজীবীরা। একে একে সাক্ষীরা এসে সাক্ষ্য প্রদান করে। বিচারকরা সাক্ষ্য ও জেরার ভিত্তিতে এ মর্মে রায় দেয় যে, গোলাম আযম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতা করে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ দালিলিক ও মৌখিক সাক্ষ্যে সন্দেহাতীতভাবে সত্য প্রমাণিত হওয়ায়; সর্বসম্মতিক্রমে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে ফাঁসির রজ্জুতে ঝোলানো উচিত।

যেহেতু ওই গণ-আদালত ছিল নেহায়েত জনগণের আদালত এবং সাংবিধানিকভাবে গঠিত না হওয়ায় তখন সরকার ওই অভিযোগ আমলে নেয়নি। কিন্তু সবখানেই জনগণ বরাবর সোচ্চার গোলাম আযমের ফাঁসির দাবিতে আওয়াজ তোলে। যাহোক আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল অবশেষে গঠিত হয়।

মওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ বেশ কজন নেতৃস্থানীয় জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে আনা সরকারি অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিজামীসহ বেশ কজনের ফাঁসির আদেশ ও তা কার্যকর করা হয়। এখন কতগুলো যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতার ফাঁসির আদেশ উচ্চতর আদালতে বিচারাধীন আছে। আগামী বছরের মাঝামাঝি এই আপিলগুলোর শুনানি, রায় ও কার্যকর করা হবে বলে আশা করা যায়। তবে তা সন্দেহাতীত নয়। সন্দেহাতীত নয় কথাটি আসলে বেসুরো।

আমাদের সবারই মনে আছে, কবছর আগের শাহবাগের গণজাগরণের কথা। ঢাকার তরুণসমাজ রুখে দাঁড়ায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিলম্বের প্রতিবাদে। উল্লেখ্য, তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলেও নানা কারণে রায় প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছিল। প্রতিবাদী তরুণ-তরুণীরা, যারা দিনরাত শাহবাগ ময়দানে লক্ষাধিক সংখ্যায় জমায়েত হয়- সম্মিলিত কণ্ঠে যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত ফাঁসির আদেশ এবং তা কার্যকরের দাবি তোলে।

এখানেই এ আন্দোলনের শেষ নয়। যতদিন পর্যন্ত তাদের ওই বিপ্লবী দাবি মেনে নেয়া কার্যকর না হয়- ততদিন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অবস্থান করে। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের আয়োজিত কর্মসূচি ছিল না। তবে ব্যক্তিগতভাবে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা ওই সমাবেশে উপস্থিত হয়ে তাদের সংহতি জানায়।

অপরদিকে হেফাজতে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দল নয় বলে, তাদের নেতারা এসব কথা প্রচার করলেও; তারা শাহবাগের তরুণ সমাজের ওই অরাজনৈতিক সমাবেশকে বিতর্কিত করতে ধর্মের আশ্রয় নেয়। এতেও ওই তরুণ-তরুণীরা ভয় পেয়ে থেমে যায়নি বরং সবাই মিলে সন্ত্রাসীদের শাহবাগ এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।

পরে সংশ্লিষ্ট মহল তাদের ছাত্র সংগঠন, যারা স্বেচ্ছায় ওই সমাবেশে শরিক থেকে আন্দোলনটিকে বেগবান করে তুলতে সহায়তা করে, তারা নিজেদেরকে নীরবে ওই আন্দোলন থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এর পরেও বাকি যারা ছিল তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে অপেক্ষাকৃত কম শক্তি নিয়েই।

অতঃপর একজন বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির আদেশের রায় হলে তখন তারা সে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়। বিজয় সূচিত হয় যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনের। তবে এখনও বেশকিছু ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীর আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত না হওয়ায় অনেকের মনে নানা আশঙ্কা বিরাজ করছে।

এই হলো জামায়াত-হেফাজতের অরাজনৈতিক (?) ভূমিকা- যা বাংলাদেশের মানুষকে আজও জীবনাশঙ্কায় ভোগাচ্ছে। হেফাজত ইদানীং অনেক এগিয়ে গেছে। সরকারের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করে পাঠ্যপুস্তক থেকে অসাম্প্রদায়িক লেখক-কবিদের লেখা তুলে নিয়ে সাম্প্রদায়িক লেখকদের লেখা অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষার্থীদরকে সাম্প্রদায়িক হয়ে গড়ে ওঠার ব্যবস্থা পাকাপাকি করেছে। এতে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে দেশটি ঘোর সাম্প্রদায়িক দেশে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে নির্মিত একটি স্থাপত্য, যা জাস্টিসিয়া নামে পরিচিত সেটিকে ভেঙে ফেলার দাবি তুললে সঙ্গে সঙ্গে তা অপসারণ করে সর্বোচ্চ আদালতটির পিছনের আঙিনায় স্থাপন করা হয়।

হেফাজতিদের দাবি অনুযায়ী মাদ্রাসাশিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরের ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রির সমতুল্য বলে স্বীকৃতি দিয়ে উচ্চশিক্ষাকেও সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবে নিয়ে যাওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারিভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সর্বোচ্চ আকারে গড়ার যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা করলে হেফাজত ওই ভাস্কর্য ভেঙে বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলে দেবে বলে হুঁশিয়ারি জানালে সরকার চুপিসারে কাউকে না জানিয়ে পরিকল্পনাটি বাতিল করে।

এই দুই অপশক্তি, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের আরও অনেক ভয়ংকর কাজের সঙ্গে সবাই পরিচিত। এরপরও এরা বৈধ সংগঠন হিসেবে সক্রিয়ভাবে চালু থাকছে। এদেরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা কি তবে এতই কঠিন?

লেখক: রাজনীতিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনা: জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী
শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মুখোশ খুলছে

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মুখোশ খুলছে

এবারের পুজোয় তাণ্ডব চালানোর একটি পরিকল্পনা হবার সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল বলেই মনে হয়- যা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জোরালো একটা আগাম প্রস্তুতি নেয়া যেত। যার ফলে এই সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে লজ্জায় পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা যেত।

অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ধর্মের লেবাসধারী চক্রান্তকারীরা সরকারের মুখে কালিমা লেপন করবে বা করেছে এমন তথ্যটি গোয়েন্দা বাহিনীর নজরে কেন থাকবে না- এ প্রশ্ন অনেকের। আমাদের দেশের চৌকষ গোয়েন্দা বাহিনী কত গোপন আস্তানা থেকে জঙ্গি নাশকতাকারীদের খুঁজে বের করে তাদের গ্রেপ্তার করেছে। কৃতিত্বপূর্ণ এই ধরনের ঘটনার সংখ্যাতো নেহায়েত কম নয়।

জঙ্গি দমনে তাদের দক্ষতা ২০১৬ সালের পর থেকে গৌরবোজ্জ্বল। কিন্তু দেখা যায়, যখনি কোনো ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ধর্মকে, পবিত্র গ্রন্থকে অবমাননা করে এর দায় হিন্দু-বৌদ্ধ, বা অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দিয়ে এটি প্রচারের মাধ্যমে একটি তাণ্ডব সৃষ্টি করে। তারপর হিন্দু বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বাড়িঘর লুট, ভাঙচুর, মন্দির ও প্রতিমা ভাঙার মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে! তখন তাণ্ডব লুটপাট-ভাঙচুর শেষ হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অকুস্থলে তাদের কাজ শুরু করে! এমনটা নিয়েও কম বিতর্কের সৃষ্টি হয়নি।

৪/৫ বছর আগে সংঘটিত নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবে হিন্দুদের জেলে পাড়ার তরুণ রসরাজের ওপর এই ইসলাম অবমাননার দায় চাপানোকে কেন্দ্র করে তাণ্ডব চালানোর সময়ে ওই সব হেফাজত-জামায়াতকর্মীদের গ্রেপ্তার না করার ফল হয় ভুক্তভোগী সমাজের অসহায় ক্ষমতাহীন তরুণদের অহেতুক অন্যায় মামলার মুখে পরা। রামুর উত্তম বড়ুয়া বা নাসিরনগরে রসরাজ বা সুনামগঞ্জে ঝুমন দাস- এরা এবং অনেক পরিচিত হিন্দু তরুণ-বয়স্কদের কাছে এই ভণ্ড অমানুষগুলো ইসলাম ধর্মকে নিয়ে দুষ্টবুদ্ধির খেলা করল, তাদের উপযুক্ত শাস্তি কেন হয় না? সে প্রশ্ন অনেকের।

আমাদের সমাজে কর্মহীন অলস মস্তিষ্কের ব্যক্তি-গোষ্ঠী যারা কিছু টাকার বিনিময়ে ইসলাম ধর্মের নবী, কোরআনকে নিয়ে অসৎ খেলায় মেতে উঠতে পারে তারা প্রকৃত ধর্ম বা কোরআনের বাণীর অনেক কিছুই জানে না। বিশ্বাস করে না এসব অসৎ অন্যায় কাজের কোনো পারলৌকিক পরিণাম আছে কি না, বা দেরিতে হলেও পুলিশের হাতে ইহলৌকিক শাস্তি নিয়েও ভাবে না!

জামায়াত-হেফাজতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা হিন্দুবিদ্বেষী এবং ভ্রান্তভাবে বিশ্বাস করে- ইসলামের একটি মূলনীতি- হিন্দুবিদ্বেষ! এদের এই বিদ্বেষনীতি তাদের পরিবারের সদস্যদের ছাড়িয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এর অনেক উদাহরণ আশপাশে দেখতে পেয়ে মন ভারাক্রান্ত হয়।

১৯৫৫ থেকে ’৬৪, তারপর ’৭১, ও ’৭৫-এর পর হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ মুসলিম প্রতিবেশীদের কাছ থেকে যথাযোগ্য সম্মান, সাহায্য-সমর্থন না পেয়ে বরং তাদের বসতভিটা ও জমি-সম্পদের ওপর মুসলিম প্রতিবেশীদের লোভের কারণে হত্যা-ধর্ষণের শিকার হয়ে দেশত্যাগ করেছে! আমাদের বাল্য-কৈশোরে প্রতি শ্রেণিতে অন্তত চল্লিশজনের মধ্যে দশজন হিন্দু-বৌদ্ধ শিক্ষার্থীদের বন্ধু হিসেবে পেতাম।

তাদের সঙ্গে একসঙ্গে পড়া-খেলা, নাচ-গান, নাটকাভিনয়, টিফিন খাওয়া, গার্হস্থ্যবিজ্ঞানের বিরিয়ানিসহ নানা রান্নার ক্লাস করে সে খাবার এক থালায় খাওয়া- কত কিছুতেই না জড়িয়ে ছিল আমাদের সবধর্মের মানুষের অন্তরঙ্গ জীবন। পুজো শুরু হলে অপেক্ষায় থাকতাম কবে দূরের পুজো মণ্ডপ থেকে ভেসে আসবে প্রিয় সেই হেমন্ত মুখার্জী, সন্ধ্যা মুখার্জী, লতা মুঙ্গেশকর, কিশোর কুমার, সতীনাথ, শ্যামল মিত্রদের গান।

ওই গানগুলো পুজোর সঙ্গে এতটা মিশে গিয়েছিল যে- এখনও ভাবি, কেন পুজো উদ্যোক্তারা পুজোর প্রথম দিন থেকে মাইকে গানগুলো বাজায় না? এখনও নিশ্চয় বাজাতে পারে। এ গানগুলো যদি বাজে তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়- এ গান মুসলমান তরুণ-বয়স্ক, এমনকি মোল্লা-মৌলবিদের মনকেও স্পর্শ করবে।

পুজোর মঞ্চে গান-নাচের অনুষ্ঠান হয়, এটি আনন্দদায়ক। কিন্তু পুজোর সকাল-দুপুরে মাইকে দূর থেকে ভেসে আসা গানের মন-সঞ্জীবনী ক্ষমতা আজও বড্ড মিস করি।

হিন্দু সম্প্রদায়ের বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব দেবী দুর্গার পুজোতে অন্তত কোনো হিন্দু যুবক-বয়স্ক, কারো দ্বারা হনুমানের কোলে কোরআন যেটি অন্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থ, সেটি রেখে নিজেদের পুজোর পবিত্রতা বিনষ্ট করতে পারে না। তাছাড়া, হিন্দুরাই খুব ভালো জানে কীভাবে তাদের কাউকে পরিকল্পিত অপবাদ দিয়ে বার বার হামলা-লুটপাট, মন্দির, দেবী প্রতিমা ভাঙচুর, মারপিট, ধর্ষণের শিকার তাদের হতে হয়েছে! সুতরাং এ কাজটি কোনো হিন্দু, আদিবাসী বা অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের দ্বারা করা সম্ভব নয়।

সম্ভব একমাত্র যারা ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, ’৭১- থেকে চেনা সেই ধর্ম-ব্যবসায়ী জামায়াত-হেফাজত এবং এদের নেপথ্যের সূত্রধর অর্থের দ্বারাই এ অপকর্মটি করেছে। জনগণ জানে এ ধরনের হীন কাজ, একটি ধর্ম সম্প্রদায়ের বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির দ্বারা সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারী সরকার!

একইভাবে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হলে এর সুবিধা ভোগ করে বিএনপি-জামায়াত, হেফাজত। তাই এ অপকর্ম এই সুবিধাভোগী ধর্ম ব্যবসায়ী, নীতিহীন, দেশপ্রেমহীন, অপরাজনৈতিক জোটের দ্বারা সংঘটিত এতে কোনো সন্দেহ নেই।

সরকারকে একটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক-কৃষি, শিল্প-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটছে, কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষাক্রমে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ চেতনা গঠনে সেভাবে কাজ হয়নি যেটি পাঠ্য বিষয়ের পাশে সংস্কৃতিচর্চা, নাটক, যাত্রাপালায় খুব ভালোভাবে অনুশীলন করা দরকার।

এবারের পুজোয় তাণ্ডব চালানোর একটি পরিকল্পনা হবার সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল বলেই মনে হয়- যা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জোরালো একটা আগাম প্রস্তুতি নেয়া যেত। যার ফলে এই সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে লজ্জায় পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা যেত। একটা কথা বলি- কোনো শিশু কি মায়ের গর্ভে থেকে আল্লাহ বা ভগবানকে বলতে পারে যে- হে আল্লাহ- ভগবান! তুমি আমাকে মুসলমানের ঘরে জন্ম দিও বা হিন্দুর ঘরে জন্ম দিও? সুতরাং ধর্ম আসলে আমরা সবাই উত্তরাধিকারসূত্রে বাবা, মা’র কাছ থেকেই পাই।

এই স্বধর্মের প্রতি অতি প্রীতি বা ভিন্নধর্মের প্রতি বিদ্বেষের যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কিছু ধর্মান্ধ দুষ্ট ও অসৎ ব্যক্তি ধর্মকে রক্ষার পাহারাদার দাবি করে সমাজে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের উচিত এদের কঠিন দণ্ডের ব্যবস্থা করা, কারণ তারাই প্রকৃতপক্ষে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে চূড়ান্তভাবে অপমানিত করেছে, ভিন্ন ধর্মজীবীরা নয়। তারাই মুক্তিযুদ্ধপন্থি সরকারকে অসুবিধায় ফেলার জন্য বার বার হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত হেনে বিশ্বকে দেখায়- আওয়ামী লীগ সরকার সংখ্যালঘুকে রক্ষা করতে পারে না!

লেখক: শিক্ষাবিদ ও গবেষক

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনা: জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী
শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তি জয়ী হয়নি কখনও

সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তি জয়ী হয়নি কখনও

মৌলবাদী অংশটি এতদিন সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিল। কিন্তু এখন এদের ওপর ভর করেছে বিএনপি-জামায়াত, হেফাজত। একপক্ষ চায় এদেশে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েম করতে, অন্যপক্ষ চায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। উভয়পক্ষের ষড়যন্ত্রের বলি এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। নির্বাচন-পরবর্তী সংহিসতা কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এমনকি যেকোনো ইস্যু তৈরিতে ভিকটিম হচ্ছে ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’রা।

রামু থেকে কুমিল্লা হয়ে নোয়াখালী, রংপুর একই চিত্রনাট্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে মিথ্যা গুজব রটিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর পরিকল্পিত হামলা। তবে কুমিল্লা শহরের নানুয়া দীঘির পাড়ের মন্দিরের ঘটনাটি যে ছিল সুপরিকল্পিত গভীর ষড়ডন্ত্র সেটি ইকবাল হোসেনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছে।

কুমিল্লার নানুয়া দীঘির পাড়ের মন্দিরে হনুমান মূর্তির ওপর কোরআন শরিফ রেখে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে সেই ঘটনাটিকে ফেইসবুকে লাইভ করে ভাইরাল করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই শত শত দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁটা নিয়ে মন্দিরে হামলা করে এবং নারী, পুরুষ, শিশু যাকেই যেখানে পেয়েছে তাকেই সেখানে আহত করেছে। এই একই অভিযোগে শুধু কুমিল্লাই নয়, আরও অন্ততপক্ষে পনেরোটি জেলায় দুর্গা মূর্তি কিংবা মন্দিরে হামলা চালানো হয়েছে।

এটা কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে না যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক নিজেদের দুর্গোৎসবকে বানচাল করতে এমন কাজ করবে? ঘটনার পরবর্তী কার্যক্রমও প্রমাণ করে মৌলবাদী গোষ্ঠী সম্প্রীতির দুর্গোৎসবকে বানচাল ও দেশকে অস্থিতিশীল করতেই এমন কাজ করেছে। কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে সারা দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ফলে তাদের প্রচেষ্টা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুরসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়নি।

মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোত্র ইত্যাদি দিয়ে বিবেচনা করে দেখা-ই সাম্প্রদায়িকতা। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে একশ্রেণির সুবিধাবাদী লোকজন রাজনৈনিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে।

ধর্মের নাম ব্যবহার করে এই উপমহাদেশে হানাহানি, রক্তপাত, হত্যার ঘটনা তো নতুন নয়। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের দাঙ্গা থামাতে বঙ্গবন্ধু রাস্তায় নেমে বলেছিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি রুখে দাঁড়িয়েছিল।

ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি-ধর্ম, বর্ণ একসঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে। সেদিনও মৌলবাদীরা ইসলামের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ মৌলবাদীদের প্রত্যাখ্যান করে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পবিত্র সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতির একটি ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্থান দিয়ে ১৯৭২ সালে গণপরিষদের ভাষণে বলেছিলেন- ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চলতে পারে না।’ বঙ্গবন্ধু সরকার তখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও তাদের কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করে।

১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছে, অপরদিকে আরেক কদম এগিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করে ধর্মনিরপেক্ষতার কফিনে শেষ পেরেকটি ঢুকিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ যেহেতু ধর্মভীরু সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ দুই দশক স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বীজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিয়েছে যার কুফল ভোগ করছে আজকের বাংলাদেশ।

নব্বইয়ের দশক থেকেই একদল মৌলবাদীরা সম্প্রীতি বিনষ্টের নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে। তারা কখনও রাষ্ট্রীয় মদদে আবার কখনও রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে।

ভারতে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর বর্বরতা চালানো হয়। ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হামলা করা হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রায় একমাস ধরে একটানা সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছে৷
২০০১ সালের নির্বাচনের পর হত্যা, লুটপাট, গণধর্ষণ, ধর্মান্তরিত করা, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ এহেন এমন কোনো কাজ নেই, যা বিএনপি-জামায়াত করেনি। নির্যাতিত ও ভুক্তভোগীরা থানায় বা আদালতে অভিযোগ পর্যন্ত করতে পারেননি। কেউ অভিযোগ করতে পারলেও রাজনৈতিক কারণে তদন্ত হয়নি। বিএনপি-জামায়াত আমলের পুরো পাঁচ বছর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার একটা রেওয়াজে পরিণত হয়৷

মৌলবাদী অংশটি এতদিন সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিল। কিন্তু এখন এদের ওপর ভর করেছে বিএনপি-জামায়াত, হেফাজত। একপক্ষ চায় এদেশে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েম করতে, অন্যপক্ষ চায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। উভয়পক্ষের ষড়যন্ত্রের বলি এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। নির্বাচন-পরবর্তী সংহিসতা কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এমনকি যেকোনো ইস্যু তৈরিতে ভিকটিম হচ্ছে ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’রা।

এতকিছুর পরও আমাদের আশা ও ভরসার জায়গা দুইটি। এক. বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দুই. এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমিল্লার ঘটনার পর অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন-

‘যেখানে যেখানে যারাই এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের খুঁজে বের করা হবে। যথাযথ শাস্তি তাদের দিতে হবে। এমন শাস্তি দিতে হবে ভবিষ্যতে যেন আর কেউ সাহস না পায়।’

এদেশের জনগণের বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতি শতভাগ বিশ্বাস আছে। তিনি অনেক অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন। তিনি এই মৌলবাদী ধর্মান্ধগোষ্ঠীকে অবশ্যই পরাজিত করবেন। দ্বিতীয়টি হলো এদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী কখনও সাম্প্রদায়িকতাকে মেনে নেয়নি। সেজন্যই এতকিছুর পরও সাম্প্রদায়িকতা কখনও এদেশে বিজয়ী হতে পারেনি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন- ‘যারা এ বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা করতে চায়, তাদের সম্পর্কে সাবধান হয়ে যাও। আওয়ামী লীগের কর্মীরা, তোমরা কোনো দিন সাম্প্রদায়িকতাকে পছন্দ করো নাই। তোমরা জীবনভর তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছ। তোমাদের জীবন থাকতে যেন বাংলার মাটিতে আর কেউ সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন না করতে পারে।’

এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী শুধু ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’দেরই শত্রু নয়। এরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের শত্রু, দেশরত্ন শেখ হাসিনার উন্নয়নের শত্রু, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার শত্রু, সর্বোপরি মানবতার শত্রু। অনতিবিলম্বে সরকারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মনে রাখতে হবে এই দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ ১৬ কোটি বাঙালির দেশ।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনা: জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী
শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বলি কেন হবে একটি গোষ্ঠী?

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বলি কেন হবে একটি গোষ্ঠী?

এই যে সময়ে সময়ে আমরা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিহীন হয়ে পড়ি এরইবা কী সমাধান! আমাদের মধ্যে কোন প্রক্রিয়ায় যুক্তি-বুদ্ধির উন্মোচন ঘটানো যায়। কোন প্রক্রিয়ায় আমাদের ধর্মের মাননা বা অবমাননা বোঝানো যায়!

কুমিল্লায় মন্দিরে হামলার ঘটনার জেরে সব মিলিয়ে এই পর্যন্ত মোট আটজন নিহত হলেন। এর মধ্যে থিয়েটারকর্মী অধরা প্রিয়া’র বাবা দীলিপ দাস আছেন। দিলীপ দাস (৭৫) গত ১৩ অক্টোবর থেকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি ছিলেন। বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কুমিল্লা শহরে নানুয়া দীঘির পাড়ে একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কুরআন অবমাননার কথিত অভিযোগে গত ১৩ অক্টোবর ওই শহরে আটটি মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়।

ওই ঘটনার জের ধরে পরে চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও রংপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায়ও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়। নোয়াখালীতে হামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের দুজন মারা যান।

এছাড়া চাঁদপুরে মন্দিরে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে নিহত হন পাঁচজন।

এসব ঘটনায় সারা দেশে মোট ৭২টি মামলা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ৪৫০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

আমরা জানতে পারলাম ঘটনার কূলকিনারা করা গেছে। ঘটনার মূল কালপ্রিট ইকবাল ধরা পড়েছে। ১২ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত লাগল ইকবাল রহস্য উদঘাটনে।

এখন কথা হচ্ছে ইকবাল না হয় ধরা পড়ল। ঘটনার রহস্য না হয় উদ্ঘাটন হলো সিসিটিভির ক্যামেরা ফুটেজ দেখে। কিন্তু এর মধ্যে যেসসব জেলায় হামলা হয়ে গেল, ঘরবাড়ি, উপাসনালয়-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি অবলা প্রাণিকুলও যে হামলায় রক্ষা পেল না তার কী হবে?

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এতগুলো সিসি ক্যামেরা ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও কেন ঘটনার রহস্য উন্মোচনে এত দেরি! আর সেইসঙ্গে প্রশ্ন জাগে যিনি পবিত্র কুরআন শরিফ হনুমানের নিকট রেখে গদা নিয়ে গেলেন, ধর্ম অবমাননায় তার অবস্থান কোথায়? তবে কি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে দেরি হয়েছে, নাকি নানুয়া দিঘীর পাড় এলাকায় যে এতগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে তা জানতে এতো দেরি হয়েছে, নাকি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সত্য উদঘাটনে দেরি হয়েছে? আসল কারণ কোনটি, নাকি সবগুলোই?

আর এদিকে যে এত সম্পদ ও প্রাণহানী, তার দায় দায়িত্ব এখন কে নেবে? সেকি শুধুই ইকবাল, ‘তৌহিদি জনতা’ প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ-সরকার-রাষ্ট্র নাকি অন্য কেউ?

ব্রিটিশ আমলে হিন্দু-মুসলিম ভাগ করে যে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’র বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল তা কি এই ভারতীয় উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর মানসপট হতে মুছে গিয়েছে! নাকি পরানের গহীন ভেতর থেকে তা থেমে থেমে জ্বলে ওঠে? যেই জ্বলনে দ্বগ্ধ হয় সব কিছু!

স্পষ্টতই আমরা দেখতে পাই, এই একবিংশ শতাব্দিতে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার সময়ে এসেও ওপারে ভারত আর এপারে বাংলাদেশে নিয়মিত বিরতিতে কতিপয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধিয়ে ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া খেতে চায়?

আমাদের এই ভূখণ্ডে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো স্বপ্ন দেখেছিলেন অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের। ৭২’র সংবিধানেও রয়েছে যার সুস্পষ্ট ছাপ। তবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীতে এসেও আমাদের দেশে এখনও কেন সংঘটিত হচ্ছে পায়ে পা বাধিয়ে সংখ্যালঘুর উপর সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস!

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়। যা কার্যকর হয় ওই বছরেরই ১৬ ডিসেম্বর থেকে৷ সেই সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতি ছিল– ১. জাতীয়তাবাদ, ২. গণতন্ত্র, ৩. সমাজতন্ত্র এবং ৪. ধর্মনিরপেক্ষতা৷ সুতরাং সংবিধানের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা৷

১৯৮৮ সালে স্বৈরাচার এইচএম এরশাদ গণ-আন্দোলন মোকাবিলা করতে না পেরে রাজনৈতিক হীনউদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে বাংলাদেশের সংবিধানের খোলনলচেই পাল্টে দিতে অপচেষ্টা করে। তার শাসনামলে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷

অথচ ডান-বাম রাজনৈতিক দলগুলো তখন ঠিকই বুঝতে রাষ্ট্রের তো ধর্ম হয় না। ধর্মতো মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস। অপ্রয়োজনীয় এই সংশোধনী যাবতীয় অনৈসলামিক কাজে পটু এরশাদের স্রেফ ধাপ্পাবাজি। আর তাই সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করার প্রতিবাদে তখনকার আন্দোলনরত ৮ দল, ৭ দল ও ৫ দলসহ সব নেতৃবৃন্দই কঠোর হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছিলেন।

পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১-এর মাধ্যমে ৭২-এর ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলেও, রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বহালই রাখা হলো।

অতএব, বলা যায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধানে স্থান দিয়ে সংবিধানের মূল নীতিরই একধরনের রদবদল করা হয়েছে৷

কাজেই আজ এই প্রশ্ন তোলা জরুরি গত তিন দশকে কি এমন জরুরি পরিবর্তন ঘটল যে আজ ইচ্ছা করে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো ইকবাল গং কী এক সর্বনেশে খেলায় মেতে উঠছে!

ইকবাল তো দৃশ্যমান মানবতাবিরোধী শত্রু। কিন্তু এই ইকবালের পশ্চাতে রয়েছে কোন স্বার্থান্বেষী মহল? এক ইকবালের অপকর্মকে জায়েজ করার জন্য অন্য সবাই যে উঠে পড়ে লাগল এর কী বিহিত হবে?

এই যে সময়ে সময়ে আমরা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিহীন হয়ে পড়ি এরইবা কী সমাধান! আমাদের মধ্যে কোন প্রক্রিয়ায় যুক্তি-বুদ্ধির উন্মোচন ঘটানো যায়। কোন প্রক্রিয়ায় আমাদের ধর্মের মাননা বা অবমাননা বোঝানো যায়!

প্রতিটা ধর্ম এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ রক্ষার জন্য তো স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই রয়েছেন। আর সাধারণভাবে প্রতিটা ধর্মেই তো মানবতা তথা মানুষকে ভালোবাসার কথাই বলা হয়েছে। তবে কেন মানুষকে বিযুক্ত করে আমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে যাবতীয় অধর্মের কাজ করার জন্য মত্ত হয়ে উঠছি?

ভবিষ্যতের সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সময়ে এই প্রশ্নসমূহের উত্তর খোঁজা আর সমাধানে পৌঁছা খুবই জরুরি।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনা: জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী
শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখতে পারে সমন্বিত উদ্যোগ

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখতে পারে সমন্বিত উদ্যোগ

বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বৈষম্যমূলক সমাজের জন্য হয়নি। বাঙালি জাতি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি। একদিকে ধর্মীয় বৈষম্য, অপরদিকে জাতিগত বৈষম্য। বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধানের ৪টি মৌলিক কাঠামোর অংশ। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা উভয়ই। এটি সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো হওয়ায় সরকার ধর্ম বিবেচনা না করে সাধারণভাবে দেশের সব মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে ধর্ম প্রত্যেকের নিজস্ব বিষয়।

রাষ্ট্র একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর মানবাধিকারকে সম্মান করবে এবং তাদের মানবাধিকার ভোগে হস্তক্ষেপ করবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করবে। সবশেষে রাষ্ট্রকে সর্বদা একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মানবাধিকার ভোগ করার ইতিবাচক উপায়গুলো পূরণের চেষ্টা করতে হবে।

১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির অনুচ্ছেদ ২৭, অনুশীলনীটিকে পালন করার কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে।

সাধারণভাবে একটি রাষ্ট্র ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ‘সংখ্যালঘু’দের বিবেচনায় না নিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দায়বদ্ধ। কিন্তু ‘সংখ্যালঘু’দের ধর্মীয় অধিকার এবং অসহিষ্ণুতাপূর্ণ অবস্থা থেকে রাষ্ট্রই বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করবে। বিশেষ সুরক্ষার আলোচনাটি বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) এবং ২৯(৩) উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্র বা সরকার ‘সংখ্যালঘু’দের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রকে উৎসাহিত করবে।

বাংলাদেশের বর্তমান দৃশ্যপট সত্যিই ভিন্ন। কুমিল্লার একটি ঘটনার পর গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলছে। কিছু ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসবের সময় তাদের ওপর নির্যাতন, ভাঙচুর এবং সংঘষের্র ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় মানুষ নিহত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা কোনোটাই বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন করে না। এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গুজব ছড়িয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা উসকে দেয়ার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়। এদেশের মুসলিম-হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অর্জন করেছে। এভাবেই স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়।

যারা দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, যারা নিজধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান করে, তারা এধরনের হিংস্র গোঁড়ামির উন্মাদনাকে সমর্থন করতে পারে না। কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলার পর গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী এবং রংপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় কীভাবে উগ্রপন্থিরা ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’দের বাড়িতে হামলা করেছে তা সবার জানা। ধর্মের নামে এ ধরনের সন্ত্রাসকে কোনোভাবেই বাড়তে দেয়া যাবে না। এধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস প্রতিরোধে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মী, মানবহিতৈষী ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী এবং প্রগতিশীল শক্তিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যথাযথভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।

অতি তুচ্ছ ঘটনায় বার বার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় দেশের ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের মানুষ। গত ১৭ মার্চ যখন দেশব্যাপী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল, সেদিন সকালে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে ঘটে যায় ন্যক্কারজনক ঘটনা। একটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া নিয়ে একযোগে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় ওই গ্রামের ৮৮টি হিন্দু বাড়ি ও পাঁচটি মন্দিরে। তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি স্থানীয় কজন মুক্তিযোদ্ধাও।

আওয়ামী লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যুদ্ধ করার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই আওয়ামী লীগের একযুগের বেশি শাসনামলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বার বার নৃশংস হামলা হচ্ছে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর নৃশংস হামলা চলে। মামলা হলেও দুর্বৃত্তরা শাস্তি পায়নি। সবাই এখন জামিনে মুক্ত।

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হয়েছে আরও ভয়াবহ হামলা। এ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধরা এখনও সুবিচার পায়নি। আসামিরাও এখন আর কারাগারে নেই। একইভাবে দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নাটোর, রাজশাহীর চারঘাট, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও পিরোজপুরে ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে যেকোনো ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতনের ঘটনার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও রাজনীতি হয়, কিন্তু কোনো শাস্তি হয় না। ফলে থামছে না নির্যাতনের ঘটনা।

অভিযোগ আছে নেপথ্যে ক্ষমতাশালীরা জড়িত থাকায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যায় না। প্রতিটি হামলার পেছনেই অপশক্তি কাজ করেছে। ধর্মীয় ইস্যুকে ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া দণ্ডবিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বিভিন্ন সময় ধর্ম অবমাননার যেসব অভিযোগ শোনা যায়, সেসবের বিচারের কথাও তেমন শোনা যায় না।

এসব ঘটনায় দ্রুত ন্যায়বিচারের উদাহরণ সৃষ্টি করা না গেলে মানুষ ক্রমেই বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারাতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারকে এ বিষয়ে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বৈষম্যমূলক সমাজের জন্য হয়নি। বাঙালি জাতি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি। একদিকে ধর্মীয় বৈষম্য, অপরদিকে জাতিগত বৈষম্য। বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়।

এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য এদেশের মানুষ লড়াই করেছে, যুদ্ধ করেছে, যে রাষ্ট্রটির জন্ম হলে সব নাগরিকের জন্য সাম্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর নির্যাতন আর হয়রানির ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা সেই পুরোনো অপকৌশলেরই আশ্রয় নেয়। আক্রমণকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় থানা-পুলিশে যেতেও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ভয় পায়। একসময় ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর হামলার পর গণমাধ্যমের খবরকে অতিরঞ্জিত বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হতো। আওয়ামী লীগ আমলে তা হয়নি। সরকার রামু ও নাসিরনগরে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ও মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছে। সুনামগঞ্জে ত্রাণ সামগ্রীসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। দোষীদের কঠিন শাস্তির আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো- প্রায় সব ঘটনায়ই অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা এখনও সম্ভব হয়নি।

অনেক ঘটনা আছে যেগুলো সরকার, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও তৎপর থাকলে, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই এসব ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। আর এসমস্ত ঘটনায় যদি অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা যেত তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। দৃষ্কৃতিকারীরা এসব অপকর্ম করতে ভয় পেত।

সমাজের সব মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং একটি সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ‘সংখ্যালঘু’ মানুষের জন্য এখন দরকার তাদের মনে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন ও সরকারকে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় আরও কাজ করতে হবে এবং নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।

বর্তমান সরকারের পক্ষে বলা হয়- বাংলাদেশ ধর্মীয় বহুত্ববাদ বিকাশ ও ‘সংখ্যালঘু’দের অধিকার রক্ষায় সবাই সচেষ্ট। যেকোনো সহিংসতা ও বিভেদ মোকাবিলায় সরকার সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে স্লোগান এনেছেন- ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এ স্লোগানের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দেশের সাধারণ মানুষকে সব ধর্মের প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আমাদের দায়িত্ব হলো, গণতান্ত্রিকভাবে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচারের ও মানবাধিকারের লড়াইটিকে এগিয়ে নেয়া। তাই প্রশাসন ও সরকারকে ‘সংখ্যালঘু’দের নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি রক্ষায় আরও কাজ করতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো বিএনএনআরসি।

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনা: জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী
শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়

শেয়ার করুন

আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারব তো?

আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারব তো?

সংবিধানে উল্লিখিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মর্যাদা মানে সংখ্যালঘিষ্ঠের মর্যাদাহানি নয়। ইসলাম কখনও সংখ্যালঘিষ্ঠের অমর্যাদা করেনি। সংবিধানও সে কথা বলে না। ইসলামের বিশ্ববিজয়ের মূল কারণই ছিল ‘সংখ্যালঘু’ বা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি এর মর্যাদাবোধ। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি বলেছেন- “কোনো মুসলিম যদি অমুসলিম নাগরিকের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করে, তার কোনো অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে, তার কোনো জিনিস বা সহায়-সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেয়; তবে কেয়ামতের দিন আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় আমি তাদের বিপক্ষে অবস্থান করব (দাউদ শরিফ)।

ধর্ম অবমাননার রেশ ধরে অন্য ধর্মের উৎসব পণ্ড করে দেয়া বাংলাদেশে নজিরবিহীন। শুধু উৎসব পণ্ড করে দেয়ার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকেনি, এ উন্মাদনা সহিংসতায় রূপ নেয়। মন্দির, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব চালিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়। ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু সম্প্রদায়ের হয়তো ঘরবাড়ি পুড়েছে, কিন্তু এতে প্রকৃত মুসলমানদের হৃদয়ে কি একটুও আঁচ লাগেনি? ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের ভিটেমাটিতে হয়ত সহসাই আবার ঘরবাড়ি তৈরি হবে, কিন্তু সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের হৃদয়ের এ রক্তক্ষরণ সহসাই বন্ধ হবে কি? স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে কি এই ঘটনা একটি চিরস্থায়ী কালো অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে না?

যুগ যুগ ধরে এদেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা যে এখানে ঘটেনি তা নয়। তবে সবসময় পারস্পরিক সম্প্রীতি যে বজায় ছিল এটাই সত্যি। কোনো অঘটন ঘটে থাকলেও মানুষ এর প্রতিবাদ করেছে, ‘সংখ্যালঘু’দের পাশে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় অথবা জাতীয়ভাবে কোনো সম্প্রদায় একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়নি। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় এবারের চিত্র যেন অনেকটাই ভিন্নরকম, অচেনা। এর মধ্য দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আমাদের চিরচেনা ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’র দাবি।

এতদিন যে ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন হয়েছে তার একটি বড় কারণ ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার যে সাধারণ মানুষকেও হতে হয়, সে কথা অজানা নয়। পরাজিত দল, দলের নেতা ও ভোটারদের এলাকাছাড়া করা, মামলা-হামলা করে দৌড়ের ওপর রাখা নতুন কিছু নয়। এ বিবেচনায় ‘সংখ্যালঘু’দের ওপরও নির্যাতন করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হয়েছে। ২০০১-এর সহিংসতা সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।

এবারের ঘটনা ধর্মীয় সহিংসতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এর পেছনে কোনো পক্ষের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি আছে কি না তা এখনও জানা যায়নি। তবে, রাজনৈতিক মোটিভ এর পেছনে না থাকলেও যে এর রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা হবে, এর লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে। দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দল এ ঘটনার জন্য পরস্পরকে দুষছে। অতীতেও তাই হয়েছে। ফলে আসল অপরাধী ও মাস্টারমাইন্ডরা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এদেশের মানুষ যতটা না ধর্মপরায়ণ এর চেয়ে বেশি ধর্মের ব্যাপারে স্পর্শকাতর। এই অতি স্পর্শকাতর অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা তুলতে চায় অনেক পক্ষ। ধর্মের অপব্যবহার রাজনীতি থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও সমাজেও বিস্তার লাভ করেছে। নাসিরনগর, শাল্লা ও রামুতে আমরা ধর্মের অপব্যবহারই দেখেছি। যা কুমিল্লা ও রংপুরে এবার দেখা গেল।

একটি ধর্ম অবমাননার দায়ে আরেকটি ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্ম পালনের সাংবিধানিক অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়া হলো এবার। এ দেশের সংবিধান বলছে-

“প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।” (প্রথম ভাগ, ধারা ২ক) এই বাক্যে দুটি কথা আছে। প্রথমত, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এবং দ্বিতীয়ত, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মপালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপের প্রবেশদ্বারে একটি মূর্তির পায়ের ওপর পবিত্র কোরআন রাখা হয়েছে। এই অভিযোগে ইকবাল নামক একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে। কে প্রকৃত অপরাধী, কে পেছনের কারিগর, কী তার বা তাদের মোটিভ এসব বিষয়ে এখনই শেষ কথা বলার সময় আসেনি। আদৌ এর শেষটা দেখা যাবে কি না তাও জানা নেই। কিন্তু এর আগেই শেষ দৃশ্যের অবতারণা করা হয়ে গেছে। একটি সম্প্রদায়ের অধিকারকে চরমভাবে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।

প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের অবমাননা হয়েছে। এক্ষেত্রে যে বা যারা অবমাননা করেছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা প্রজাতন্ত্রের কাজ। প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্মের অবমাননা হলে সে ধর্মের অনুসারীরা অন্য ধর্মের অনুসারীদের আক্রমণ করবে, এটা প্রজাতন্ত্রের কোন আইনে আছে?

কোথাও ইসলামের অবমাননা হলে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব ওই অবমাননাকারীদের বিচার করা। কিন্তু সে দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়ার এখতিয়ার সহিংসতাকারীদের কে দিল? কুমিল্লায় ইসলামের অবমাননা করা হয়েছে। কাজেই অবমাননাকারী ও ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর হামলাকারীদের ফৌজদারি আইনে সোপর্দ করে তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সংবিধানের একই অনুচ্ছেদ আরও বলছে- “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হলেও, রাষ্ট্র হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবে।” একটি ধর্মের অবমাননা হলে সেই অবমাননা ঠেকানো বা অবমাননাকারীদের বিচার করা রাষ্ট্রের কাজ যা আগেই বলেছি। কিন্তু অবমাননার অজুহাতে অন্য ধর্ম পালনের সমমর্যাদা ও সমঅধিকার লঙ্ঘন করা হবে কেন? কুমিল্লা, রংপুরসহ অন্যান্য আরও জায়গায় পূজামণ্ডপে হামলা করে হিন্দুদের ধর্ম পালনের সমঅধিকার লঙ্ঘন করা হলো কেন? কাজেই যারা কাজটি করেছে তারা দুক্ষেত্রেই সংবিধান লঙ্ঘনকারী। কিন্তু এরচেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, হামলাকারীরা রাষ্ট্রকেই চ্যালেঞ্জ করেছে। কাজেই রাষ্ট্রকে কঠোরভাবে এই চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে হবে।

সংবিধানে উল্লিখিত সংখ্যাগরিষ্ঠের মর্যাদা মানে সংখ্যালঘিষ্ঠের মর্যাদাহানি নয়। ইসলাম কখনও সংখ্যালঘিষ্ঠের অমর্যাদা করেনি। সংবিধানও সে কথা বলে না। ইসলামের বিশ্ববিজয়ের মূল কারণই ছিল ‘সংখ্যালঘু’ বা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি এর মর্যাদাবোধ। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি বলেছেন-

“কোনো মুসলিম যদি অমুসলিম নাগরিকের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করে, তার কোনো অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে, তার কোনো জিনিস বা সহায়-সম্পদ জোরপূর্বক কেড়ে নেয়; তবে কেয়ামতের দিন আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় আমি তাদের বিপক্ষে অবস্থান করব (দাউদ শরিফ)। কাজেই কুমিল্লায় কোরআন অবমাননার দায় কোনোরকম বিচার ছাড়া পুরো হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো মহা অন্যায়। বরং ইসলামের নাম নিয়ে এধরনের কাজ করাই বেশি ইসলামের অবমাননা।

ইসলাম বিচার ছাড়া কারো ওপর দোষ চাপায় না। একজনের অপরাধের জন্য আরেকজনকে বা পুরো সম্প্রদায়কে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের বাড়িঘরে লুটপাট করে আগুন লাগিয়ে দিতে বলে না। তাই বলা যায়, হামলাকারীরা সুস্পষ্টভাবে নবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ইসলামি শরীয়ত মতেও তারা অপরাধী। একজনের অপরাধের দায়ে অন্য ধর্মের মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া, পূজামণ্ডপ গুড়িয়ে দেয়া তো পরের কথা, মহান আল্লাহ অন্য ধর্মের দেব-দেবিদের গালি দিতেও নিষেধ করেছেন (সুরা আনআম, ১০৮)। হামলাকারীরা আদতে কার অবমাননা করেছে? এরাই কি ইসলামের অবমাননা করেনি?

কুমিল্লার ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কে বা কারা মূর্তির পায়ের কাছে পবিত্র কোরআন রেখেছে তা খুঁজে বের করতেই হবে। এর উদ্দেশ্য যত নগণ্যই হোক, এরকম একটি ঘটনার পরণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে; তা তো দেশের মানুষ দেখেছে। তাই ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। সেই সঙ্গে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকদেরই সতর্ক থাকতে হবে। সবধরনের উসকানিদাতা ও অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিটি ধর্মের মানুষদেরই সাবধান হতে হবে। বুঝতে হবে এরা সব ধর্ম-বর্ণ, রাষ্ট্র সর্বোপরি মানবজাতির শত্রু।

‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন বিশ্বে নতুন নয়। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা সবখানেই আছে বর্ণবাদের কালো ইতিহাস। গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে খ্যাত ব্রিটেন অথবা আধুনিক গণতন্ত্র ও কথিত উদার রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, ‘সংখ্যালঘু’ নিষ্পেষণে কেউ কম যায় না। কিছুদিন আগেও যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের পুলিশ প্রকাশ্যে জর্জ ফ্লয়েড নামে এক কৃষ্ণাঙ্গের গলা হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেছে। মৃত্যু যন্ত্রণায় ফ্লয়েড বার বার বলছে-

“আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।” বুটের চাপে তার মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে এসেছে। এমনকি মৃত্যুর আগে ফ্লয়েড পানি খেতে চেয়েছিল। পানি পায়নি। তার মৃত্যুযন্ত্রণা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য পুলিশ সদস্যদেরও টলাতে পারেনি। এভাবে কাতরাতে কাতরাতে ফ্লয়েড মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পুরো বিশ্ব সে দৃশ্য দেখেছে। তবে এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাদা-কালো সবাই রাস্তায় নেমে আসে। সবার মুখে ছিল ফ্লয়েডেরই শেষ কথার প্রতিধ্বনি- ‘উই ক্যান্ট ব্রিথ’।

যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লয়েডের মৃত্যুই প্রথম নয়। আর ধর্ম, বিশেষ করে ইসলামোফোবিয়া যে ইউরোপ-আমেরিকার সবচেয়ে বড় মহামারি তা তো সবারই জানা। মুসলিমরা সেখানে ‘সংখ্যালঘু’। কালোরা সেখানে ‘সংখ্যালঘু’। তাই ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতন স্থানভেদে রূপ বদলায় মাত্র। আসল চরিত্র একই। আমরা শুধু চাই আমাদের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রটি বহাল থাকুক। এটাই বাংলাদেশের ভিত্তি। সামাজিক সাম্যই রাষ্ট্রের অক্সিজেনের জোগান দেয়, ধর্মকে পানি দেয়। এমন একটি সমাজেই আমরা মুসলমান-হিন্দু, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই নিঃশ্বাস নিতে চাই। তা না হলে, সবারই নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে।

লেখক: আইনজীবী, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনা: জননেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রী
শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়

শেয়ার করুন