শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা

শেখ হাসিনা: বঞ্চিত মানুষের ঠিকানা

শেখ হাসিনার কাছে আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশা হলো- শহর হবে গ্রাম। দুর্নীতিমুক্ত হবে বাংলাদেশ। অব্যাহত থাকবে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান। বেকারত্ব ঘুচবে। সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে। রাজনীতি থাকবে প্রকৃত দেশপ্রেমিক মানুষের হাতে। আধুনিক চিন্তা ও সিদ্ধান্তে দেশের গণতন্ত্রের ভিত আরও মজবুত হবে। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে সামনের দিনগুলোতে আর কোনো প্রশ্ন উঠবে না।

দেশের কোনো এলাকায় যদি সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস, হত্যা-নির্যাতনসহ যেকোনো বড় রকমের সহিংস ঘটনা বা প্রকৃতিক দুর্যোগের খবরটি দ্রুত গণমাধ্যমে আসে। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনীতি হয়ে বার্তাটি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কান পর্যন্ত পৌঁছাতেও সময় লাগে না। সামাজিক যেকোনো বড় রকমের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালীরা দ্বিধা- বিভক্ত হয়। প্রশাসনও শক্তিশালী পক্ষে অনেক সময় অবস্থান নেয়।

সাধারণ মানুষের বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী যদি প্রকৃত খবরটি পান তাহলে পরে এর একটা সুষ্ঠু বিহিত হবেই। ন্যায়বিচার পাবেন নির্যাতিত মানুষ। আইনের মুখোমুখি হবে অপরাধীরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে মানুষ আশায় বুক বেঁধে বসে থাকে শেখ হাসিনা পাশে আছেন। সবাই সরকারের সহযোগিতা পাবেন। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো তাদের জন্য কঠিন কিছু হবে না। সারের সংকট হলে কৃষকরা আশায় থাকেন শেখ হাসিনা জানলে ফসল নষ্ট হবে না। যেকোনো মূল্যে তিনি কৃষি উপকরণের জোগান দেবেন। সমস্যার সমাধান করবেন। জাতির পিতার কন্যা বলে কথা নয়, শেখ হাসিনার প্রতি এখনও অনেকের এমন বিশ্বাস বা আস্থা এমনই। এরকম আস্থার জায়গাটি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত অর্জন। যা মানুষের অন্তর থেকেই তৈরি হয়েছে।

দুই.

ঘটনা প্রবাহের দেশ বাংলাদেশ। এখানে সংকটের শেষ নেই। রাত পোহালেই নতুন সমস্যার জন্ম হয়। এগুলো সমাধান হতে না হতেই পুরোনোগুলো ছাপিয়ে নতুন অনেক কিছু সামনে চলে আসে। তাই এদেশের গণমাধ্যম নিয়মিত সুখবর নিয়ে প্রকাশিত হয় না। অথচ বিশ্বের অনেক দেশ আছে সেখানের গণমাধ্যমে খারাপ খবর লেখার কিছু নেই। সব ভালো, তাই আরও ভালো খবর নিয়ে প্রতিদিন পাঠকের কাছে সংবাদ পরিবেশন করা হয়।

আমাদের দেশে মন্দের ভিড়ে যেমন ভালো খবরগুলো দেয়ার সুযোগ থাকে না, অনেক দেশে ভালো খবরগুলোই মূল খবর। দুএকটি মন্দ ঘটনা ঘটলে সেগুলো সাধারণ ভেবে গণমাধ্যমগুলো অনেক সময় প্রকাশে এড়িয়ে চলে। আবার দুএকটি মন্দ ঘটনা সমাজ, রাষ্ট্র তথা গোটা রাজনীতিকে ভাবিয়ে তোলে। যা সামাধানে সব পক্ষ থেকেই দ্রুত তৎপর হতে দেখা যায়।

পক্ষান্তরে আমাদের দেশে কী দেখা যায়, বছর ধরে সামাজিক, রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করে। পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। খাদ্যসংকট দেখা দেয়। নানা সংকটের মুখে সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে ওঠে আসে। বার বার প্রাকৃতিক দুর্যোগের থাবায় নিঃস্ব হয় মানুষ। অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা-সামাজিক অপরাধ, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ-অর্থনৈতিক সংকট, বিনিয়োগ সমস্যা-গ্যাং কালচার, দখল-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, শ্রমবাজারে ধসসহ বহুমাত্রিক সমস্যা মাথায় নিয়ে সরকারকে পথ চলতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও।

এসব সমস্যা তো একদিনে তৈরি হয়নি। অনেক আগে থেকেই ছিল। সময়ের কারণে কোনটি বাড়ে, কোনটি কমে। এতসব সমস্যা নিয়ে পথ চলতে গেলে ভালো খবরগুলো গণমাধ্যমে সামনে আসবে না এটাই স্বাভাবিক। চলমান নানা সমস্যা মোকাবিলা করে আওয়ামী লীগ সরকারের পথচলার প্রায় ১৩ বছরের মাথায় করোনা মহামারির ধাক্কা। এতকিছুর পরেও কিন্তু বৈশ্বিক উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। সবকিছু সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার কারণেই। কারণ মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী তিনি। থেমে যাওয়াতে বিশ্বাস করেন না।

তার ৭৫তম জন্মদিন চলে গেল গত ২৮ তারিখে। এ সময়ে দল বা সরকারপ্রধান হিসেবে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার প্রবল মানসিক শক্তি দেশের মানুষকে এগিয়ে চলার সাহস ও শাক্তি জোগায়। এর ধারাবাহিকতা তাকেই ধরে রাখতে হবে। কারণ তার চোখ দিয়ে দেখা স্বপ্নে বিভোর ১৬ কোটি মানুষ। অর্থাৎ এগিয়ে চলার বাংলাদেশে তার সঙ্গে স্বপ্নের সারথি গোটা জাতি।

তিন.

শেখ হাসিনার কাছে আগামী প্রজন্মের প্রত্যাশা হলো- শহর হবে গ্রাম। দুর্নীতিমুক্ত হবে বাংলাদেশ। অব্যাহত থাকবে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান। বেকারত্ব ঘুচবে। সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে। রাজনীতি থাকবে প্রকৃত দেশপ্রেমিক মানুষের হাতে। আধুনিক চিন্তা ও সিদ্ধান্তে দেশের গণতন্ত্রের ভিত আরও মজবুত হবে। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে সামনের দিনগুলোতে আর কোনো প্রশ্ন উঠবে না। সামনের দিনগুলোতে সকলের প্রত্যাশা দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। মজবুত হবে দেশের অর্থনৈতিক ভিত। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা নিয়ে শত বছরের করা ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন শুরু হবে। যানজটমুক্ত হবে রাজধানী।

গ্রামে গ্রামে পৌঁছাবে সব রকমের নাগরিকসুবিধা। রাষ্ট্রের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় তরুণরা হবে উদ্যোক্তা। সবখানে সমান কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে শহরমুখী কমবে মানুষের স্রোত। নৌ ও রেলপথ হবে আরও গতিশীল। উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকার কোনো অবস্থাতেই আপস করবে না। ’৭২-এর সংবিধানে ফিরবে রাষ্ট্র। শেখ হাসিনার উপস্থিতিতেই ২০৪১ সালের বদলের যাওয়া বাংলাদেশ উপভোগ করবে গোটা জাতি। সর্বোপরী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানমনষ্ক জাতি গড়ে তোলার বাঁশিওয়ালা কিন্তু তিনিই।

চার.

১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আর ওই বছরেরই ১৭ মে দীর্ঘ ৬ বছর প্রবাসজীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে দীর্ঘ ২১ বছর পর সরকার গঠন করে এবং সে বছরের ২৩ জুন প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২০১৮ সালে চতুর্থবারের মতো জয়লাভ করেন তিনি। বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন তিনি ১৯৮১ সাল থেকে দেখতে শুরু করেন। তার দেখা স্বপ্ন বিফলে যায়নি। অনেক স্বপ্ন সফল হয়েছে। তাই দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে শেখ হাসিনার ভালো কাজগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনার কিছু নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন জমে থাকা যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়েছেন তিনি। এজন্য তার প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে হয়ত কিছু ভুল বোঝাবুঝি আছে। তবে তার প্রতি প্রত্যাশার জায়গাটুকু কখনই নষ্ট হবে না। বিশ্বাস আছে তিনি পারবেন। আশা করি সামনের দিনগুলোতে তার কর্ম ও সিদ্ধান্তে সবার শতভাগ আস্থা ফিরবে। শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষের আস্থার ঠিকানা হয়ে থাকুন যুগ যুগ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়
বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের যত্ন নিতে হবে
আলোকময় শেখ হাসিনা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

সাম্প্রদায়িকতার কাছে বাংলাদেশ হারবে না

সাম্প্রদায়িকতার কাছে বাংলাদেশ হারবে না

ইসলাম কিছুতেই মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট সমর্থন করে না। এটা ভয়ংকর শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির মতো পাপ। একজন ভালো মুসলমান কিছুতেই ভিন্নধর্মের নিরপরাধ মানুষের ওপর আঘাত করবে না। একজনের অপরাধে আরেকজনকে শাস্তি দেবে না। কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির শাস্তি আমরা সবাই চাই। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় পীরগঞ্জে আগুন, নোয়াখালীতে লুটাপাট হবে কেন?

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যাওয়ার আগে উপমহাদেশকে দুই ভাগ করে দিয়ে যায়। ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গঠিত হয় ভারত। আর দ্বিজাতিত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত হয় ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান। বর্তমান বাংলাদেশ তখন ছিল পাকিস্তানের অংশ- পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক ব্যবধান ছিল ১১০০ মাইল, আর মানসিক দূরত্ব ছিল অলঙ্ঘনীয়। পাকিস্তান গঠনের পর পরই এ অঞ্চলের মানুষ বুঝে যায়, এটি তাদের দেশ নয়। ধর্ম কখনও একটি রাষ্ট্রের ঐক্যের সূত্র হতে পারে না, হয়নিও। ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রাম শেষে নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন। স্বাধীনতার পর সংবিধানেও ঠাঁই হয় সেই মূল চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতার।

আবহমানকাল ধরেই এ অঞ্চলের সব ধর্মের মানুষ মিলে-মিশে থাকছে। এটাই বাংলাদেশের মূল চেতনা, মানুষের মূল শক্তি। কিন্তু ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ আবার পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। গর্তে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের পরাজিত শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সামরিক শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ধর্মকেই বেছে নেয় ঢাল হিসেবে। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। আর এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে রাষ্ট্রের মূল চেতনায় আঘাত হানেন।

সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, কোনো বিদ্বেষ নেই। তারা মিলে মিশেই থাকছেন আবহমানকাল ধরে। কিন্তু কখনও কুচক্রী মহলের উসকানিতে, কখনও রাজনৈতিক কারণে, কখনও সম্পত্তির লোভে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতনের শিকার হয়। আর কোণঠাসা হতে হতে একসময় তাদের কেউ কেউ দেশ ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন।

’৪৭ সালে দেশে ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায় ছিল ৩৩ ভাগ, এখন সেটা নেমে এসেছে ৮ ভাগে। এই পরিসংখ্যানটি আমরা যারা ধর্মীয় সংখ্যাগুরু তাদের জন্য লজ্জার, গ্লানির। একজন মানুষ কখনোই স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েন না, শেকড় কেউ ছাড়তে চান না। পিঠ যখন একদম দেয়ালে ঠেকে যায়, তখনই মনের কষ্ট চাপা দিয়ে দেশ ছেড়ে উদ্বাস্তু হয় মানুষ। সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কমে যাওয়া মানে সংখ্যাগুরু হিসেবে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারিনি, তাদের সত্যিকারের বন্ধু হতে পারিনি, তাদের মনে নিরাপত্তাবোধ দিতে পারিনি। এমনিতে সাধারণভাবে বাংলাদেশে খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি সবই হয়। কিন্তু একজন মানুষ যখন ধর্ম পরিচয়ের জন্য নির্যাতনের শিকার হবে সে অপরাধটা সবচেয়ে বড়।

আমরা আসলেই পারিনি ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দিতে। তারা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে। উৎসব মানে আনন্দ, বাধভাঙা উচ্ছ্বাস। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে উৎসব করতে হয় ভয়ে ভয়ে, তাদের উৎসব যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। শারদীয় দুর্গোৎসব যেন প্রতিমা ভাঙার মৌসুম। দিনের পর দিন চলে আসছে এই অবস্থা। তবে এবার কুমিল্লা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্নস্থানে যা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

কুমিল্লায় পবিত্র কোরআন অবমাননার ঘটনায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের হৃদয়ে আঘাত করেছে। তারা দায়ীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। কিন্তু বিক্ষোভ করা আর মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এক নয়। যারা হামলা করেছে তারা বিছুতেই ধর্মপ্রাণ মুসলমান হতে পারে না। ইসলাম কিছুতেই মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট সমর্থন করে না। এটা ভয়ংকর শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির মতো পাপ। একজন ভালো মুসলমান কিছুতেই ভিন্নধর্মের নিরপরাধ মানুষের ওপর আঘাত করবে না। একজনের অপরাধে আরেকজনকে শাস্তি দেবে না। কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির শাস্তি আমরা সবাই চাই। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় পীরগঞ্জে আগুন, নোয়াখালীতে লুটাপাট হবে কেন?

এ ধরনের ঘটনায় চেনা বাংলাদেশ মুহূর্তেই অচেনা হয়ে যায়। পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, দোষারোপ চলতে থাকে। কিন্তু এসব কিছু নয়, প্রয়োজন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ। আশার কথা হলো, বাংলাদেশ তার আপন শক্তিতে জেগে উঠেছে। গোটা বাংলাদেশ এখন প্রতিবাদে উত্তাল। প্রতিদিনই এখন দেশের কোথাও না কোথাও বিক্ষোভ, শান্তির পদযাত্রা, সমাবেশ, মানববন্ধন হচ্ছে। কুমিল্লার ঘটনার পর থেকে দেশের বিভিন্নস্থানে মন্দির বা হিন্দুদের বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছে মুসলমান যুবকরা। এমনকি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের রক্ষা করতে গিয়ে আহত হয়েছেন মুসলমানদের অনেকে।

কুমিল্লার ঘটনা অচেনা হয়ে ওঠা বাংলাদেশ আবার ফিরছে চেনা রূপে। আমি সবসময় যেটা প্রত্যাশা করি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের প্রতিবাদে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানরা বেশি মাঠে নামবে। এবার তাই হচ্ছে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষই সামনের কাতারে। সাধারণত এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দ্রুত ছড়ায় গুজবের পাখায় ভর করে। আর ধর্মের নামে কিছু অমানুষ এই গুজব ছড়ায়। এখন আবার ফেসবুক আসায় গুজবটা সহজে ছড়ানো যায়।

বেদনাদায়ক হলো- ইসলামের লেবাসধারী কিছু কাঠমোল্লা ধর্মের আসল চেতনাকে পাশ কাটিয়ে ঘৃণা ছড়ায়, বিদ্বেষ ছড়ায়; তাতে সহিংসতা আরও বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিছু ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে কুমিল্লার ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছে। আর তাতে হাওয়া দিয়েছে কিছু লেবাসধারী মোল্লা। তবে আশার কথা হলো, ইসলামকে যারা অন্তরে ধারণ করেন, তেমন মওলানারা এবার সোচ্চার। তারা কথা বলছেন, মসজিদের খুতবায় ইসলামের আসল চেতনাটা তুলে ধরছেন, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঠেকাতে এর চেয়ে ভালো উপায় আর নেই।

একজন ইসলামি চিন্তাবিদ যখন ইসলামের আলোকে বুঝিয়ে দেবেন মন্দিরে হামলা করাটা পাপ, হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করাটা ভয়ংকর অন্যায়; তখন সাধারণ মানুষ সেটা সবচেয়ে ভালো করে বুঝবে, তারা কারো উসকানিতে পা দেবে না। ইসলাম তো নয়ই কোনো ধর্মই ভিন্নধর্মের মানুষের ওপর হামলাকে সমর্থন করে না। আপনি যখন ভিন্নধর্মের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দিলেন, মনে রাখবেন, অন্য কেউও আপনার ধর্মকে আঘাত করার সুযোগ খুঁজবে। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ইসলাম ধর্মের অবমাননা, বাংলাদেশের মূল চেতনার ওপর আঘাত।

কুমিল্লা এবং এরপর দেশজুড়ে তাণ্ডবে যতটা হতাশ হয়েছিলাম, দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে তার অনেকটাই কেটে গেছে। আবার আমরা আশাবাদী হচ্ছি। বাংলাদেশ হারবে না, সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেই। সত্যের জয়, মানবতার জয় অবশ্যম্ভাবী।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়
বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের যত্ন নিতে হবে
আলোকময় শেখ হাসিনা

শেয়ার করুন

‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি’

‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি’

পাকিস্তান আমলে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক হাজারো মুসলমান এর বিরুদ্ধে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল করে। দাঙ্গা থামাতে জীবন দিয়েছে এমন নজিরও আছে। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত আত্মত্যাগে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা আছে। তবু একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু কোটি কোটি অসাম্প্রদায়িক মুসলমান বন্ধু রীতিমতো চুপ।

বিজয়া দশমী চলে গেছে। বড্ড বিবর্ণ, ম্লান, এক রক্তঝরা দুর্গোৎসব পার করলাম। আমি সকালে পত্রিকাগুলো হাতে পেয়ে লিখতে বসছি। আগেই লেখা উচিত ছিল, কিন্তু পারিনি। এ লেখার তৈরির আগের দিন পাবনাতে ঢাকার পত্রিকাগুলো আসেনি। সংবাদপত্রবাহী গাড়ি সরকারি অগ্রাধিকার তালিকায় প্রথমদিকে। পুলিশের কর্তব্য ছিল যে করেই হোক, যানযটের তোয়াক্কা না করে এই গাড়িগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দেয়া। পুলিশ সে দায়িত্ব পালন করেনি।

কী লিখব আর কীভাবে লিখব? কেমন উপসংহার টানব বুঝে ওঠতে পারছি না। মনে যা আসে, ঘটনা যেভাবে দেখেছি তাই স্পষ্টভাষায় লিখব।

বিদ্রোহী কবির ভাষায়-‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি- তাই যাহা আসে কই মুখে।’ পরিস্থিতিটা এমনই যা ভাষায় প্রকাশ করতে কষ্ট হয়। এই কষ্ট তো হওয়ার কথা ছিল না। ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো। কিন্তু জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তীব্র ও আপসহীন লড়াইয়ের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে আনা হয়। ভাষাসংগ্রামীদের আত্মদানও ঘটেছে। তবু কেউ পিছু হটেনি। কী লিখেছে জাতীয় ও বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রগুলো?

দেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকাটির প্রতিবেদন দিয়েই শুরু করি। ‘আবারও ধর্মীয় উস্কানী, সাম্প্রদায়িক হামলা, নিহত ৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে দুর্গাপূজার আগে দেশে বেশ কটি জায়গায় পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে। এধরনের ঘটনায় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে সংঘর্ষে ৪ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপে বিচ্ছিন্নভাবে আরও একাধিক ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি পুলিশ, র‌্যাব ছাড়াও দেশের ২২ জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে হাজীগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত, গত বুধবার ১৩ অক্টোবর মহাষ্টমীর দিন কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে প্রতিমার পায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়া গেছে এমন খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে উসকানি দেয়া হয়েছে। এরপর কুমিল্লার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এ নিয়ে সেখানে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও গুলি ছোড়ে।

‘কুমিল্লায় হামলার ঘটনায় সন্দেহজনক কজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আরও কজনকে চিহ্নিত করেছে। তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে শিগগিরই সক্ষম হবে বলে মনে করছি।’ বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

হাজীপুরে (চাঁদপুর) গত বুধবার (১৩ অক্টোবর) রাত নটার দিকে চাাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বাজারে লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখড়া মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসময় পুলিশের সঙ্গে মিছিলকারীদের সংঘর্ষের সময় গোলাগুলিতে ৪ জন নিহত হয়। আহত হয় পুলিশসহ ৩০ জন। পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার রাত এগারোটার পর থেকে হাজীগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার পূজামণ্ডপ ও হিন্দু বসতিতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। মোতায়েন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।

সাম্প্রদায়িক অপশক্তি উলিপুরের পরিবেশ বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এমন ঘটনা ঘটল।

কুমিল্লার ঘটনার জের হিসেবে সিলেটের জকিগঞ্জের কালীগঞ্জে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ৩০০-৪০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।

পাবনা জেলার বেড়াতেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার নিশ্চয়ই এখানেই শেষ নয়- এটি শুরুও নয়। দশকের পর দশক ধরে এ জাতীয় কিংবা এর থেকেও ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটছে কিন্তু বিচার নেই, মামলা নেই, মামলা হলেও চার্জশিট নেই। জামিনও পেতে লাগে মাত্র ৩ থেকে ৭ দিন। তারপর ফাইনাল রিপোর্ট।

তাহলে উপায়? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার বলেছেন, কুমিল্লার সাম্প্রদায়িক ঘটনায় কাউকে ছাড় নয়। একথা সত্য হোক। কিন্তু অভিজ্ঞতা করুণ। আরও বহু জায়গায় কুমিল্লার মতো ঘটনা ঘটেছে। সেসবসহ যেগুলো ঘটবে সেগুলো এবং অতীতে যেগুলো ঘটেছে সেগুলোর কী হয়েছে?

এ কথা সবারই জানার কথা, পাকিস্তান আমলে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক হাজারো মুসলমান এর বিরুদ্ধে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল করে। দাঙ্গা থামাতে জীবন দিয়েছে এমন নজিরও আছে। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত আত্মত্যাগে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছে।

সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা আছে। তবু একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু কোটি কোটি অসাম্প্রদায়িক মুসলমান বন্ধু রীতিমতো চুপ। রাজপথে মাঝেমধ্যে ‘সংখ্যালঘু’দের কিছু সংগঠনকে মিছিল করতে দেখা যায়। এরা অনেকেই সরকারের কাছ থেকে সুবিধাভোগী। লোক দেখানো হলেও তবু তারা মাঝেমধ্যে মাঠে বা রাস্তায় নামে। এর কোনো প্রতিক্রিয়া বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে আদৌ হয় না। আবার যে আইনি ব্যবস্থার কথা সরকার ও আমরা বলে থাকি, তারা যেন মনে রাখে আইন দ্বারা সব হয় না। আইনি পথে মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতাও হয়নি।

লেখক: রাজনীতিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়
বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের যত্ন নিতে হবে
আলোকময় শেখ হাসিনা

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িকতার অন্ধত্ব নয় মানবিকবোধসম্পন্ন হতে হবে

সাম্প্রদায়িকতার অন্ধত্ব নয় মানবিকবোধসম্পন্ন হতে হবে

এরা শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারীই যদি হবে তবে ২০১৪-এর নির্বাচন ঠেকানোর সন্ত্রাসী আয়োজনের সময় শিবিরের আস্তানায় পেট্রোলবোমা, গানপাউডার আর ককটেল পাওয়া যাবে কেন? কেন সিতাকুণ্ডের পাহাড়ে শিবির মানুষ হত্যার জন্য, সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলবে? কেন সেখানে ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ পাওয়া যাবে? ধর্মের নাম ভাঙিয়ে চলা এসব লোভী মানুষ ধর্ম ও সভ্যতার শত্রু।

সচেতন আর বিবেকবান মানুষেরা আতঙ্কিত ও বিস্মিত এই জন্য যে, একুশ শতকের এ অগ্রগতির যুগে বাংলাদেশের মতো একটি দেশে কীভাবে একদল মানুষ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াতে মাঠে নেমেছে। এদেশের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল ক্যানভাসের কথা এসব অন্ধকার জীবের জানা নেই। ১৩ শতক থেকে ১৮ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এদেশে বহিরাগত মুসলিম- সুলতান ও মোগলরা শাসন করেছে। সুফি-সাধকরা ধর্মপ্রচার করেছে মানবতার বাণী ছড়িয়ে।

ইসলামের শান্তির বাণী ও মানবিক আচরণ আকৃষ্ট করে ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকদের অত্যাচারে বিপন্ন সাধারণ হিন্দুকে। সুফির কাছে এসে তারা বেঁচে থাকার আশ্বাস পেতে চেয়েছে। অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পৃষ্ঠপোষকতা পেত মুসলমান শাসকদের কাছ থেকে। মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বন্ধুর মতো পাশাপাশি বাস করত। একে অন্যের প্রয়োজনে ছুটে আসত।

এখনও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধি নেই। হঠাৎ সাম্প্রদায়িক হিংসা উসকে দেয়া দেখে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে সব অপকাণ্ডের সূত্র হচ্ছে নষ্ট রাজনীতি। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে সমাজকে বিপন্ন করে তুলছে সুবিধাবাদী কিছু মানুষ।

গণতান্ত্রিক পথচলার পরিক্রমা নষ্ট করে ফেলেছে বিভিন্ন পক্ষের রাজনীতিকরা। সরল পথে কেউ হাঁটতে পারছে না। নিয়মতান্ত্রিক পথে গণতান্ত্রিক ধারা বজায় থাকলে রাজনীতিতে এত হতাশা নেমে আসত না। তাই সরল পথ না পেয়ে মোক্ষ লাভের জন্য অন্ধকার পথ খুঁজতে হচ্ছে সব পক্ষকে।

এমন বাস্তবতায় নৈরাজ্য দানা বাধবেই। এসবের মধ্যে আবার এ আধুনিক সময়ে নানা নামে ধর্মীয় মৌলবাদীদের বিকাশ ও বিস্তার ঘটছে। পাকিস্তান আমলেও ধর্ম নিয়ে এমন ফিতনা-ফ্যাশাদ ছিল না। গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় গজিয়ে ওঠা অসংখ্য মাদ্রাসায় তৈরি করা হচ্ছে মৌলবাদীদের তালেবে এলেম। দায়িত্বশীল মাদ্রাসার প্রকৃত ইসলামচর্চাকারী আলেম ও শিক্ষার্থীরা এদের দাপটে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।

ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় এদের বিভ্রান্ত করে অন্যায়ের পথে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর এসবের ভেতর থেকে একে একে ঘটে যাচ্ছে রামুর বৌদ্ধদের ওপর আঘাত হানা, নাসিরনগরে হিন্দুদের জীবন ও সম্পদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া, কুমিল্লার পূজামণ্ডপে সাম্প্রদায়িকতার কূটচালে নাটক সাজানো।

জঙ্গি দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কৃতিত্ব এসব ঘটনায় অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। গোয়েন্দাদের দুর্বলতা এখন আর লুকোছাপা নেই। কুমিল্লার ঘটনার আগে কোনো পক্ষ আঁচ করতে পারেনি- তা না হয় মানা যায় কিন্তু এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া যে হতে পারে তা না ভাববার কারণ কী? রংপুরের জেলেপল্লিতে এতবড় তাণ্ডব ঘটে গেল অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই আঁচ করতে পারল না! ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ভাঙা রেকর্ড বাজতে থাকে। খুঁজে বের করবে, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে... ইত্যাদি।

ধর্মীয় মৌলবাদীরা ও রাষ্ট্রক্ষমতা প্রত্যাশী রাজনীতিকরা অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে যুগ যুগ ধরে সরল মানুষদের ধর্মান্ধ জঙ্গি বানাতে চেষ্টা করেছে। এই সরল মানুষদের মুক্তবুদ্ধি আর চেতনার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। একচোখা গণ্ডারের মতো অন্ধ বানিয়ে ছেড়েছে মানবতা ও সভ্যতার বক্ষ বিদীর্ণ করতে।

ব্যক্তিগত লাভের ফসল ঘরে তুলতে নিজধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। খ্রিস্ট-সনাতন, ইসলামসহ অন্যসব ধর্মের নামাবরণে এ ধারার ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের অশুভ অবস্থান দেখা গিয়েছে, যাচ্ছেও। বিশ্বজুড়ে এসময় ইসলামের নাম ভাঙানো জঙ্গিবাদ শান্তিবাদী মানবিক ধর্ম ইসলামকে ভুলভাবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করছে।

আমাদের দেশে লেবাস ও বর্ণিত আদর্শে জামায়েতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবির ইসলামের নাম নিয়েই রাজনীতি করে। এখন যদিও নিজ অপকর্মে এই দল দুর্বল হয়ে গেছে। এরা কি কম আসুরিক কাজ করেছে? এই দলের নেতাকর্মীরা নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য চরম ইসলামবিরোধী কাজ করে যাচ্ছিল অবলীলায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা নিজেদের আদর্শিক কারণে পাকিস্তানপন্থি হতেই পারে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান না-ও নিতে পারে। তাই বলে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হয়ে গণহত্যায় অংশ নেবে? ধর্ষণের সহযোগী হবে? নিরীহ-নিপরাধ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে? ইসলামের দৃষ্টিতে তো এসব আচরণ ঘোরতর পাপের কাজ। ইসলামী ছাত্র শিবির যখন প্রতিপক্ষ ছাত্রবন্ধুকে হত্যা করে, পায়ের রগ কেটে দেয় এর কি কোনো অনুমোদন পাবে ইসলামে? কবছর আগেও আন্দোলনের নামে বিএনপির বন্ধু হয়ে যেভাবে নিরীহ সাধারণ মানুষকে পেট্রোল বোমায় পোড়াচ্ছিল এর অনুমোদন কোথায় ইসলাম ধর্মে?

এরা শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারীই যদি হবে তবে ২০১৪-এর নির্বাচন ঠেকানোর সন্ত্রাসী আয়োজনের সময় শিবিরের আস্তানায় পেট্রোলবোমা, গানপাউডার আর ককটেল পাওয়া যাবে কেন? কেন সিতাকুণ্ডের পাহাড়ে শিবির মানুষ হত্যার জন্য, সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলবে? কেন সেখানে ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্রের মজুদ পাওয়া যাবে? ধর্মের নাম ভাঙিয়ে চলা এসব লোভী মানুষ ধর্ম ও সভ্যতার শত্রু। এসব বিচারে ইসলামী স্টেটস নামধারী জঙ্গি থেকে শুরু করে জামায়েতে ইসলামী এবং ইসলাম নামধারী নানা জঙ্গি ভাবাদর্শের দল সবাই একসূত্রে গাঁথা।

ইন্টারনেটের কল্যাণে পাঠক নিশ্চয়ই বেশ কবছর আগে বর্বর জঙ্গিদের মসুল জাদুঘরে রাখা এশেরীয় সভ্যতার মহামূল্যবান নিদর্শনগুলো নির্দয়ভাবে হাতুড়ি চালিয়ে ভেঙে ফেলতে দেখেছিলেন! চোখে দেখেও বিশ্বাস হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল হাতুড়ির প্রতিটি ঘা বুকের একটি করে পাঁজর ভেঙে ফেলছে। সেই মধ্যযুগে আব্বাসীয় শাসনপর্বে বাগদাদ ছিল ইসলামি সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি।

এখানে আক্রমণ করেছিল মঙ্গোলীয় বর্বর নেতা হালাকু খান। পুড়িয়ে দিয়েছিল বাগদাদের জাদুঘর আর লাইব্রেরি। এখনও ঘৃণাভরে সে বর্বরতার কথা স্মরণ করে পৃথিবীর সংস্কৃতিসচেতন মানুষ। এই আধুনিক যুগে এসেও ইসলামি রাজ্য গড়ার কথা বলে ইসলামের উদারতা ও গরিমাকে কলঙ্কিত করে বিশ্ববাসীর কাছে সংকীর্ণভাবে উপস্থাপন করছে কিছু ধর্মান্ধ মানুষ। এজন্যই বুঝি বলে ধার্মিক মানুষ সবসময় মানবিকতার পক্ষে আর মানবতা ও ধর্মের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ধর্মান্ধ মানুষ। কারণ অন্ধ রেখে ধর্মের নাম ভাঙিয়ে এদের দিয়ে যেকোনো অপকর্ম করানো যায়।

২০০১-এর কথা কি আমরা ভুলতে পেরেছি? আফগানিস্তানের তালেবান নেতা মোল্লা ওমরের ফরমান মতো বামিয়ান উপত্যকায় অনিন্দ্য সুন্দর বৌদ্ধ ভাস্কর্য গুড়িয়ে দিয়েছিল মূর্খ, উন্মাদ তালেবান জঙ্গিরা। ২০০৮-এর কথা; হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বরাবর মূল সড়কের সড়কদ্বীপে লালন ভাস্কর্য তৈরি করা হয়। সে ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে মৌলবাদীরা। এদেশের মৌলবাদী ইসলামি নেতারা কতটা গভীরভাবে নিজধর্মকে বোঝে জানি না, তবে তারা যে অসংখ্য ধার্মিক মুসলমানকে ধর্মান্ধ বানিয়ে ইসলামের কমনীয় রূপে কালিমা লেপন করছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

গভীরভাবে ইসলাম ও ইতিহাস না বুঝতে পারায় সম্ভবত অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী লালনকে এ যুগের মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষরা চিনতে পারল না। যে মরমি সাধক লালন আল্লাহর সঙ্গে নিজের হৃদয় এক করে দিতে চেয়েছিলেন, তাকে প্রতীক হিসেবে ধারণ করে আমরা প্রতিদিন শুদ্ধ হতে পারতাম। এর বদলে কিছু অশিক্ষিত, অসংস্কৃত, অমার্জিত মানুষ বোকা ছাত্রদের উসকে দিয়ে লালন ভাস্কর্যকে পায়ের তলায় পিষে ফেলতে চাইল। এদের কাছে কি মূর্তি আর ভাস্কর্যের পার্থক্য স্পষ্ট নয়?

নিরাকার আল্লাহর প্রতিরূপ যাতে কেউ না দেয় সে অর্থে মূর্তি গড়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য আছে ইসলামে। ভাস্কর্য তো সৌন্দর্যের প্রতিরূপ, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতিরূপ। এর প্রতি হিংসা প্রকাশ করতে পারে একমাত্র অন্ধকারের জীবরা।

এশেরীয় সভ্যতার নিদর্শনসমূহের ভেতর একটি বড় অহংকার শিল্প সৌকর্যে পূর্ণ ভাস্কর্য। প্রায় ৩ হাজার বছর আগের নাম না জানা শিল্পীরা কতটা নৈপুণ্যে গড়ে তুলেছিল এসব শিল্প। তা দেখে শিল্প ইতিহাসের মূল্যায়ন করবে এযুগের মানুষ। অথচ একমুহূর্তে জঙ্গির তকমা আঁটা কিছু অন্ধ উন্মাদ এই মহামূল্যবান প্রত্নঐতিহ্য নির্দয়ভাবে গুড়িয়ে দিল।

ইরাকের নিমরুদ শহরের এসব ভাস্কর্য গুড়িয়ে দেয়ার পর আরেকটি প্রাচীন শহর হাত্রার স্থাপত্যসমূহ ভেঙে ফেলে জঙ্গিরা। বুঝলাম এরা ভাস্কর্যকে পূজ্য মূর্তি বিবেচনায় ভেঙেছে। যেমন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙতে চেয়েছিল। আসলে অন্ধকারের জীবরা আলোকে সবসময় ভয় পায়। এদের কাণ্ড দেখে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আর্যদের কথা মনে পড়ল।

তাদের গ্রন্থ বেদের ভাষ্য থেকে জানা যায়, গ্রামীণ-সংস্কৃতির ধারক আর্যরা ভারতে ঢুকে সিন্ধু সভ্যতার দুর্গ নগরী দেখতে পায়। নগরীকে ভীতিকর মনে করে। তাই তাদের দেবতা ইন্দ্র ‘পুর’ অর্থাৎ নগর ধ্বংস করে দেয়। একারণে আর্যরা গর্ব করে দেবতা ইন্দ্রকে বলেছে ‘পুরন্দর’। অর্থাৎ পুর ধ্বংসকারী দেবতা।

দেখা যাচ্ছে মেসোপটেমিয়া থেকে বাংলাদেশ সর্বত্রই ধর্মান্ধরা তাদের ছড়ানো উন্মাদনায় শুধু সভ্যতার শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত হয়নি, এরা নিজধর্মেরও শত্রু। নিজেদের ক্ষমতার লোভ এবং ধর্মকে ভুল ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করে কলঙ্কিত করছে ধর্মের ঔজ্জ্বল্য। একারণে সুস্থ চিন্তার সব মানুষকেই প্রতিহত করতে এগিয়ে আসতে হবে।

আসলে আমরা মনে করি হিংসাকে বন্ধ করতে হিংসা ছড়ানো নয়। মানবিকতার আহবানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। যারা আজ কুমিল্লা, নোয়াখালী ও রংপুরে নিরীহ হিন্দুদের ওপর আঘাত হেনেছে, তাদের সম্পদ ধ্বংস করেছে, তারা যাতে মানবিকতার আহবানে সুন্দরের দিকে ফিরে তাকায় তেমন পরিবেশ রচনা করতে হবে। মতলববাজ গুরুরা এসব তরুণের কাঁচা মাথা চিবানোর আগেই সমাজের সচেতন মানুষকে সুন্দর ও যুক্তির পথ রচনা করতে হবে। একটি মানুষ মানবিকবোধসম্পন্ন হলে তাকে অন্ধকারের পথে নেয়া সহজ হবে না।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়
বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের যত্ন নিতে হবে
আলোকময় শেখ হাসিনা

শেয়ার করুন

ধর্মমুখী রাজনীতি ও ‘সংখ্যালঘু’র যাতনা

ধর্মমুখী রাজনীতি ও ‘সংখ্যালঘু’র যাতনা

ধর্মমুখী রাজনীতির দিকে অতিরিক্ত ঝোঁক, নীতি-নৈতিকতা আদর্শ-মূল্যবোধহীন স্বার্থপর জীবনযাপন, সুবিধাবাদিতাকে তালিম দেয়া, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা-অভাব, শোষণ আমাদের মনমানসিকতাকে ভীষণ রকম সংকীর্ণ বানিয়ে ফেলেছে। আমরা এখন নিজেদের ব্যর্থতার জন্য কেবলই অন্যকে দায়ী করি। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো এই দায়ী করাটা হয়তো ঠিক; কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা ঠিক নয়।

বাংলা অ্যাকাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের পরিমার্জিত সংস্করণের ৯৮১ পৃষ্ঠায় ‘মালাউন’ শব্দের তিনটি অর্থ দেয়া আছে। ১. লানতপ্রাপ্ত; অভিশপ্ত; বিতাড়িত; কাফের। ২. শয়তান। ৩. মুসলমান কর্তৃক ভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের লোককে দেয়া গালিবিশেষ। অভিধানের ১০৫৪ পৃষ্ঠায় লানত শব্দেরও তিনটা অর্থ দেয়া আছে। ১. অভিশাপ। ২. অপমান; লাঞ্ছনা; ভর্ৎসনা। ৩. শাস্তি।

মনে হচ্ছে মালাউন শব্দের অর্থের পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার চলছে বাংলাদেশে। এখানকার হিন্দুরা প্রতিদিনই বুঝতে পারছে বাংলাদেশে হিন্দু হয়ে জন্ম নেয়াটা অভিশাপের শামিল, প্রতিদিনই তাদের কোনো না কোনোভাবে অপমানিত হতে হয়। নির্যাতিত হতে হয়। ভীত হতে হয়। বিপন্ন হতে হয়। অপরাধ না করলেও শাস্তি পেতে হয়– ‘মালাউন’ হওয়ার চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে?

গত কদিন ধরে পাইকারি হারে চলছে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলা, আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট। এসব ঘটনার কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। তেমন প্রতিবাদ-প্রতিরোধও নেই। সংখ্যালঘুদের জন্য বাংলাদেশ ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। সংখ্যাগুরুর অহমিকায় অনেককেই বলতে শুনছি: ওরা বাপের দেশ হিন্দুস্তানে যায় না কেন? ওরা কোরআন অবমাননার দুঃসাহস দেখায় কেন? ওদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হচ্ছে না কেন?

গত একযুগে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তার একটিও প্রমাণিত হয়নি। কখনও আইডি হ্যাক করে, কখনও ভুয়া আইডি থেকে, কখনও কেবল কোনো একজন হিন্দুকে ট্যাগ করা ফেসবুক-পোস্টকে কেন্দ্র করে হিন্দুদের ওপর পাইকারি হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। সরকার আজ পর্যন্ত এসব ঘটনার কূলকিনারা বের করতে পারেনি। সরকারের সামর্থ্য নেই, না ইচ্ছে নেই- সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

মনগড়া সব অভিযোগের ভিত্তিতে হাজার হাজার মানুষ হিন্দু গ্রামগুলোতে আক্রমণ করছে। যখনই হিন্দুবাড়িতে আক্রমণের দরকার হয়, তখনই একশ্রেণির মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে যায়। থানা-পুলিশ-আইন কোনো কিছুই এই আক্রমণ ঠেকাতে পারে না। এ ব্যাপারে সামাজিক প্রতিরোধ বলতে এখন আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।

সম্প্রতি ফেসবুকে আমার এক বন্ধু গভীর হতাশা ব্যক্ত করে লিখেছেন- ‘‘জ্বর এসেছে? ধরছে মাথা? ভাঙতে কিছু ইচ্ছে করে?/গাল দিয়েছে? জমেছে রাগ? পেটের ভেতর কেমন করে?/আরে বোকা! বলবে কে কী? দাও না আগুন হিন্দুর ঘরে!’’

বর্তমানে পরিস্থিতি যেন এমনটাই দাঁড়িয়েছে। এদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একগাদা ‘অপযুক্তি’ শোনা যায়। এমনকি ‘শিক্ষিত-সচেতন’রা পর্যন্ত মনে করেন– এ দেশে হিন্দুরা ‘খুব ভালো’ আছে, সংখ্যালঘু ইস্যুটা বিশেষ উদ্দেশ্যে সামনে আনা হয়, এদেশের হিন্দুদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই, এদের দেহ থাকে বাংলাদেশে, কিন্তু মন ভারতে, এরা বাংলাদেশের সম্পদ ভারতে পাচার করে!

পাশাপাশি এটাও ভাবেন এবং বলেন যে– ভারতে মুসলমানরা যতটা খারাপ অবস্থায় আছে, সে তুলনায় বাংলাদেশে হিন্দুরা ‘রাজার হালে’ আছে, এরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, বাড়াবাড়ি করে, এদের পিটিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেয়া উচিত!

বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, এই কথাগুলো যারা বলেন এবং বিশ্বাস করেন তারা অন্য কোনো যুক্তি-প্রমাণ-তথ্যের ধার ধারেন না। এই দেশে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা আপাতত একটা বিরাট জাঁতাকলের মধ্যে আছে। নিয়মিত পিষ্ট হলেও করার কিছু তো নেই-ই, বলারও কিছু নেই। কারণ বললে তা কেউ কানে তোলে না। উল্টো এমন সব কথা বলে যে, তাতে বোবা-কালা হয়ে বেঁচে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয়।

১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িকতা, হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির পরিবর্তে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণ রাজনীতিচর্চা প্রাধান্য পেয়েছে। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও চর্চার জায়গা থেকে ক্রমশ রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে থাবা প্রসারিত করেছে। এখন ধর্মকে রাজনীতির বাহন বানিয়ে রাষ্ট্রীয় আচারে পরিণত করার দাবি পর্যন্ত উচ্চারিত হচ্ছে। আমরা এখন আর ‘মানুষ’ পরিচয় দিতে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। কে ‘কতটা’ হিন্দু বা মুসলমান– সেটাই আমরা মূখ্য করে তুলছি।

এদেশের এক শ্রেণির মানুষ হিন্দুদের কোনো কিছুই মেনে নিতে পারছে না। এমনকি তাদের উপস্থিতিও অনেকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই তো আমরা দেখছি প্রায়ই সংঘবদ্ধ মানুষের তীব্র ক্ষোভ হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিতে উৎসাহ জোগাচ্ছে।

আমরা মুখে যতই প্রেম, মানবিকতা, ঔদার্য, মহত্ত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি কপচাই না কেন, বাস্তবে কিন্তু ততটা মহৎ, উদার, মানবিক হতে পারি না। সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ, ঘৃণা আমাদের চেতনাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আচ্ছন্ন করে রাখে। আমাদের মধ্যে প্রেম-মানবিকতা অবশ্যই আছে; কিন্তু ঘৃণা-বিদ্বেষ-হিংস্রতা আছে তার চেয়ে বেশি। আমাদের মধ্যে জাতিগত, সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি যতটুকু আছে, অধিক পরিমাণে আছে ভিন্ন জাতি, অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি বিদ্বেষ।

আসলে ধর্মমুখী রাজনীতির দিকে অতিরিক্ত ঝোঁক, নীতি-নৈতিকতা আদর্শ-মূল্যবোধহীন স্বার্থপর জীবনযাপন, সুবিধাবাদিতাকে তালিম দেয়া, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা-অভাব, শোষণ আমাদের মনমানসিকতাকে ভীষণ রকম সংকীর্ণ বানিয়ে ফেলেছে। আমরা এখন নিজেদের ব্যর্থতার জন্য কেবলই অন্যকে দায়ী করি। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো এই দায়ী করাটা হয়তো ঠিক; কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা ঠিক নয়।

তারপরও আমরা সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা ও বিদ্বেষের কারণে অন্য ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল, সম্প্রদায় ও জাতির প্রতি আমাদের যাবতীয় ঘৃণা ও অভিসম্পাত ঠিকই জমা রাখি। সময়-সুযোগমতো তার বহিঃপ্রকাশও ঘটাই। এটা আমাদের সামগ্রিক অধঃপতন ও ব্যর্থতা।

আজকে শিক্ষিত ও সচেতনদের এ জন্য অবশ্যই নিজেদের ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে দেখতে হবে। নিজেদের ব্যর্থতা আমাদের স্বীকার করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যর্থতা আছে, আছে সামাজিক ব্যর্থতাও। যারা ধর্মপ্রাণ, তারা সকলকে বোঝাতে পারেননি যে, অন্য ধর্মাবলম্বীকে আঘাত করা ধর্মীয় নির্দেশের পরিপন্থি। যারা ইহজাগতিক, যারা নিত্য মানবতা, শুভাশুভ, ন্যায়-অন্যায়ের কথা বলেন, তারাও সমাজে যথোচিত প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হননি।

ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করেন, তারা বরং ভেদবুদ্ধির মন্ত্র দিয়ে যাচ্ছেন মানুষের কানে। একাত্তরের ঐক্য কোথায় গেল? দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে অতি অল্পসময়ে রাজনৈতিক নেতারা মানুষকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তেমন নেতৃত্ব আজ কোথায়? আর কতকাল হিন্দুদের ‘মালাউন’ হিসেবে দেখা হবে? সাম্প্রদায়িক পশুত্বকে আর কতকাল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে লালন-পালন করা হবে?

লেখক: প্রবন্ধকার, সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়
বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের যত্ন নিতে হবে
আলোকময় শেখ হাসিনা

শেয়ার করুন

অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা: জেগে ওঠো বাংলাদেশ

অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা: জেগে ওঠো বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগের মতো এত বড় রাজনৈতিক দল, গত একযুগ ধরে যে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায়, সেই দলের তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কর্মী কেন নিজ এলাকা নিরাপদ রাখতে, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করতে দৃষ্টিগ্রাহ্য ভূমিকা রাখতে পারবে না? এটা সত্যিই ভাবনার বিষয়।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে প্রযুক্তির বিকাশ তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার যে নতুন যুগের সূচনা করেছে তার ইতোবাচক অর্জনের পরিমাণ বিপুল। যোগাযোগ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে ডিজিটাইজেশন। ১৭ কোটি মানুষের এই ভূখণ্ডে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাতেই এখন এন্ড্রয়েড সেলফোন। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সবক্ষেত্রেই ইন্টারনেট প্রযুক্তি অসাধারণ ইতোবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে। ব্যাংকে না গিয়ে ঘরে বসেই আর্থিক লেনদেন কেনাকাটা সবকিছু সম্ভব হচ্ছে শুধু ইন্টারনেট প্রযুক্তি-সুবিধার কারণে। কিন্তু এত বিশাল অর্জনের মধ্যেও ফুলের আড়ালে থাকা কাঁটার মতো ইন্টারনেট প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের জাতীয় জীবনে বড় বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

বিশেষ করে অর্থ কেলেঙ্কারি এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অপপ্রচার ছড়িয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা পর্যন্ত বাঁধিয়ে দেয়া হচ্ছে দেশজুড়ে। শুধু তাই নয়, সরকারের বিরুদ্ধে নানামুখী উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে বানোয়াট ভিজুয়াল চিত্র তৈরি করে দেশের ভেতর থেকে এবং বাইরে বসে চালানো হচ্ছে ভয়াবহ অপপ্রচার। এ ধরনের অপপ্রচার যে কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষকে উস্কে দিয়ে দাঙ্গা পরিস্থিতির সৃষ্টি।

গত ১৪ অক্টোবর দুর্গাপূজার মহানবমীর দিন কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে হামলার মধ্য দিয়ে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, অনেকেই ভেবেছিলেন তার সমাপ্তি হয়তো সেখানেই ঘটবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় ‘পবিত্র কোরআন অবমাননা’র প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে যে ভয়ংকর একতরফা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, তা দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের কাম্য ছিল না।

যারা দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন, নিজের ধর্মের মতো অন্যের ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল, তারা আর যা-ই হোক এই ধরনের সহিংস ধর্মান্ধতার উন্মাদনা সমর্থন করতে পারেন না।

ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনার পরবর্তী কয়েকদিন চট্টগ্রাম, লক্ষীপুর-নোয়াখালী এবং রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে যেভাবে উগ্রবাদীরা হামলা চালিয়েছে, তা চরম দুঃখজনক বললেও সবটুকু বলা হয় না।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের নামে এমন সন্ত্রাস এভাবে চলতে দেয়া যায় না। এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখে দেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের যে প্রস্তুতি এবং প্রতিরোধ থাকা দরকার ছিল, তা যথাযথভাবে ছিল কি না সে প্রশ্নও ইতোমধ্যেই উঠেছে।

দেশের কোনো কোনো এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও তাদের ওপর হামলার যেসব দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি আর কোথাও হবে না, এই মুহূর্তে এটাই নিশ্চিত করা জরুরি। এই হামলার ঘটনায় তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে সারা দেশে।

শাহবাগে সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্র-যুবা তরুণ শ্রেশি। দেশের লেখক-সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী-শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকসহ সব মহলের সোচ্চার কণ্ঠস্বর ইতোমধ্যেই আমরা শুনতে পেয়েছি। এ অবস্থায় যা করণীয় তা হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীসমূহের সর্বাত্মক সর্তকতা এবং রাজনৈতিক দলের বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সারা দেশে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের।

আওয়ামী লীগের মতো এত বড় রাজনৈতিক দল, গত একযুগ ধরে যে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায়, সেই দলের তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কর্মী কেন নিজ এলাকা নিরাপদ রাখতে, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করতে দৃষ্টিগ্রাহ্য ভূমিকা রাখতে পারবে না? এটা সত্যিই ভাবনার বিষয়।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যখন ভেতরে-বাইরে ইতিবাচক বহু অর্জনে গৌরবান্বিত, তখন দেশের মাথা হেঁট করে দেয়ার মতো এমন জঘন্য সাম্প্রদায়িক হামলা কীভাবে মেনে নেয়া যায়? কারণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতো আমাদের জাতীয় জীবনের গৌরব। সেই মহান গৌরবের ঐতিহ্য দেশের অহংকার। যেকোনো মূল্যে হোক, সেই গৌরবময় অহংকার রক্ষা করতেই হবে।

প্রতিমার পায়ের কাছে কীভাবে পবিত্র কোরআন শরিফ এলো! এই অপ্রত্যাশিত রহস্যের জট খুলতেই হবে। বাংলাদেশে হিন্দু সমাজের কোনো লোক এমন আত্মঘাতী কাজ করতে পারে বলে বিশ্বাস করা যায় না। আমরা সে বিশ্বাস করতেও পারি না। যে বা যারাই এই ভয়ংকর কাজ করে থাকুক, ফেসবুকে যারাই উগ্রতা ছড়িয়ে থাকুক, নিশ্চয়ই তদন্তে সবকিছু বেরিয়ে আসবে। দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট হবে কারা কীভাবে কাদের ইন্ধনে এমন দুঃসাহসিক অপতৎপরতা চালিয়েছিল?

ইতোমধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষমা চেয়েছেন এই ঘটনায় প্রাণহানির জন্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, দোষীদের এমন কঠোর শাস্তি দেয়া হবে, যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের দুঃসাহস দেখাতে না পারে। প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর মনের কথাটাই বলেছেন।

এ প্রসঙ্গে স্মরণ রাখতে হবে- দেশে একটা অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির জন্য নানাদিক থেকে নানামুখী তৎপরতা গত কয়েক মাস ধরে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক ঘোলা পানিতে সুবিধার মাছ শিকার করতে দেশ-বিদেশে অনেকেই বহুদিন ধরে তৎপর। এমনকি আন্তর্জাতিক চক্রান্তও এর পেছনে থাকার আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ঘটনা যেভাবেই ঘটুক, আর যারাই ঘটিয়ে থাকুক, নিশ্চয়ই এর হদিশ মিলবে। তবে তার জন্য প্রয়োজন হবে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের যে আন্তরিক সদিচ্ছা সেই সদিচ্ছা বাস্তবায়নকারীদের নিষ্ঠা এবং সৎ প্রচেষ্টা। শান্তিপ্রিয় দেশবাসীর প্রত্যাশা সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত ভেঙে দিতে সরকার সম্ভাব্য সর্বাত্মক কঠোরতার পরিচয় দেবে।

দেশে আজ যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে এই আস্থার বোধ জাগিয়ে তুলতেই হবে যে, এদেশে তারা অসহায় নন। বাংলাদেশ তাদেরও মাতৃভূমি।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারাও পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, প্রাণ দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ভারতের সরকার ও জনগণ আমাদের পরম বন্ধুর ভূমিকায় ছিল। বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সব সময় তা মনে রাখে।

ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশে কাউকে ছোট করেও দেখা হয় না। অন্তত রাষ্ট্রীয় জীবনে কোথাও এর কোনো চিহ্ন নেই। রাষ্ট্রের সব কর্মধারায় তা দৃশ্যমান। চাকরিতে, জনপ্রতিনিধিত্বে সর্বস্তরে- ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সচিবালয় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত আছে হিন্দু সম্প্রদায়ের শত শত নাগরিক। এমন বৈষম্যহীন সমাজে তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজাকে অবলম্বন করে এমন দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়ার মতো ষড়যন্ত্র হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করি না।

পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ যদি কারো বিরুদ্ধে ওঠে, তা হলে তার প্রতিবাদ অবশ্যই করা হবে, কিন্তু তা কেন হবে এরকম সহিংস? ইসলামে তো সহিংসতার কোনো স্থান নেই! ‘লাকুম দ্বী নুকুম ওয়ালইয়াদ্বীন (যার যার ধর্ম তার তার) যে শান্তির ধর্ম ইসলামের শিক্ষা, সেই ধর্মে আস্থাশীল মানুষ ধর্ম নিয়ে সহিংসতায় মেতে উঠবে, এমন সুযোগই তো নেই। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন, কেউ হীন স্বার্থান্ধ সুবিধাবাদীদের ফাঁদে পা দেবেন না। ইসলামের আদর্শ এবং সৌন্দর্য নষ্ট হতে দেবেন না।

গত ১৮ অক্টোবর শহীদ শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে ‘শেখ রাসেল স্বর্ণপদক’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন: ‘একটা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশকে গড়তে চাই। উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই। সোনার বাংলাদেশ গড়তে চাই। যে দেশে কোনো অন্যায় থাকবে না। অবিচার থাকবে না। মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচবে; সেটাই আমি চাই।’

দেশ-বিদেশে এ কথা আজ কে না জানেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নয়। এখানে শত শত বছর ধরে মুসলমান-হিন্দু বৌদ্ধ- খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। পাকিস্তানি শাসনামলে রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মান্ধ পাকিস্তানি শাসকরা, আরও স্পষ্ট করে বললে সামরিক শাসকরা এখানে বহুবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধানোর অপচেষ্টা করেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ তা সমর্থন না করায় ব্যর্থ হয়েছে তাদের সেই সব অপচেষ্টা।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত চিরতরে ভেঙে দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিল। বঙ্গবন্ধু নিজে নামাজ পড়তেন, এককথায় ধর্মানুরাগী ছিলেন। কিন্তু ধর্মের নামে যারা রাজনীতি করে, যারা ধর্মের অপব্যবহার করে, তাদের ধর্মান্ধতাকে তিনি কোনোদিন সমর্থন করেননি।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়- দুঃশাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের সংগ্রাম। তার ডাকেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ করেছিল বাংলার মানুষ। তাই ৩০ লাখ শহীদের রক্তফসল এই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান থাকতে পারে না।

১৯৭৫ সালে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বাংলাদেশকে অনেক দূরে সরে নিয়েছিল শাসকচক্র। ধর্মানুরাগের স্থলে স্থান করে নিয়েছিল ধর্মান্ধতা। ধর্মের নামে রাজনীতি উন্মুক্ত করে দেয়ার ফলে আবারও পাকিস্তানি রাজনৈতিক দর্শনে দগ্ধ হতে থাকে বাংলাদেশ।

সেই পরিস্থিতি থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি প্রায় ২৫ বছর আগে। আজ বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এশিয়ার এক উদীয়মান শক্তি। দরিদ্র দেশের গ্লানিমুক্ত হয়ে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মর্যাদায় অভিষিক্ত। পৃথিবী আজ বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

এরকম গৌরবময় অবস্থায় আমাদের হাজার বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে যাক, এটা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। সব রাজনৈতিক দল, সব ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে আজ এই আবেদন, আসুন রাজনৈতিক হীনস্বার্থ পরিত্যাগ করে দেশের মর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে আমরা সর্বাত্মক ত্যাগ স্বীকার করি।

বাংলাদেশকে আর অসম্মানিত না করি। যদি দেশকে অপমানিত করি তাহলে লাখ লাখ শহীদের আত্মা আমাদেরকে অভিশাপ দেবে, যা আমাদের কারো কাম্য হতে পারে না।

সবশেষে বলতে চাই, দেশের প্রতিটি অঞ্চলে আওয়ামী লীগসহ সব অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে সম্মিলিত শান্তি সমাবেশের আয়োজন করুন। সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তায় নিজ নিজ এলাকায় প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলুন। তা না হলে মৌলবাদী চক্র বাংলাদেশকে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলে তখন আর কিছুই করার থাকবে না। এই পরিস্থিতি যেকোনো মূল্যে সামাল দিতেই হবে।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। উপদেষ্টা সম্পাদক দৈনিক দেশের কণ্ঠ।

আরও পড়ুন:
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়
বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের যত্ন নিতে হবে
আলোকময় শেখ হাসিনা

শেয়ার করুন

আন্ডারওয়ার্ল্ড ও নারী

আন্ডারওয়ার্ল্ড ও নারী

মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিম হাজি মস্তানকে হত্যা করে অপরাধ জগতের মুকুটহীন সম্রাট বনে যায়। একাধিক নায়িকার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন আছে। ‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি’ খ্যাত মন্দাকিনীর সঙ্গে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়। বলিউডে যারা পা রাখে তারা এসব বিষয়ে অবহিত হয়েই আসে। মমতা কুলকার্নি ড্রাগ মাফিয়া বিক্রম গোস্বামীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। হরর মুভি ‘ভিরানা’ খ্যাত নায়িকা জেসমিন ধুন্না দাউদ ইব্রাহিমের থাবা থেকে বাঁচতে সিনেমা জগৎ থেকেই অন্তর্হিত হন।

পাশ্চাত্য সমাজে নারীদেহের সূচিতার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক নয়। মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রে এবং মুসলিম সমাজে অবশ্য নারীদেহের শুচিতা একটি বড় বিষয়। একজন পুরুষ অনায়াসেই বহু নারীর সঙ্গে মেলামেশা করতে পারে। এতে সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে মিলতে তার কোনো সমস্যা হয় না। অথচ নারীর সামান্য পদস্খলনও সমাজ সহ্য করে না। পৃথিবীর ইতিহাসে নারীর সৌন্দর্যের পরিপ্রেক্ষিতে কী কী ঘটেছে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে।

প্রাচীন ভারতীয় নগরবধূ আম্রপালি ছিলেন অসাধারণ সৌন্দর্য ও লাবণ্যে পরিপূর্ণ একজন নারী। বৈশালির রাজা মনুদেব আম্রপালির হবু স্বামী পুষ্পকুমারকে হত্যা করে এবং একটি সরকারি ঘোষণায় আম্রপালিকে বৈশালীর নগরবধূ হিসেবে ঘোষণা করে। এতে মনুদেবের রাজকোষ সমৃদ্ধ হয়।

ব্রিটেনের রাজা অষ্টম অ্যাডওয়ার্ড তার প্রেমিকা ওয়ালিস সিম্পসনের জন্য ১৯৩৭-এ সিংহাসন ত্যাগ করেন। মার্কিন পরিবারে জন্ম নেয়া ওয়ালিস সিম্পসন আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন এবং ফ্যাশন সচেতন নারী ছিলেন। ‘স্বর্ণকেশী বোম্বশেল’ খ্যাত মেরিলিন মনরোর ভুবনমোহিনী সৌন্দর্যে বিমোহিত ছিলেন জন এফ কেনেডি। রীতিমত প্রণয় ছিল তাদের মধ্যে। কথিত আছে প্রেসিডেন্ট কেনেডি মাফিয়াদের প্রতি খড়গহস্ত হয়েছিলেন বলে, পরিকল্পিতভাবে তারা মেরিলিন মনরোকে খুন করে। এই নায়িকার হলিউডে পদার্পণ ছিল নিতান্ত আকস্মিক! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধচলাকালে একটি কারখানায় কাজ করার সময় মেরিলিন মনরো একজন ফাস্ট মোশন পিকচার ইউনিটের আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় ধরা পড়েন এবং একজন পিন-আপ মডেল হিসেবে মনোনীত হন।

বাংলা সিনেমার সর্বকালের ধ্রুপদী সৌন্দর্যের অধিকারী নায়িকা সুচিত্রা সেন বিয়ের পর আর্থিক টানাপোড়েনের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে বাংলা সিনেমায় নাম লেখান। তিনি আজও বাঙালি নারী-পুরুষের অবচেতন মনে তার ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্যের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন।

মাদক, অস্ত্র এবং নারী এক সূত্রে গাঁথা মালার মতো তিনটি শব্দ। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং মাফিয়াতন্ত্র। এসবের আমদানি হয় উন্নত বিশ্বের দেশগুলো থেকেই যখন তাদের গণতন্ত্র এবং জীবনযাত্রার মান বর্তমানের এই সুবেশী অবস্থায় ছিল না। পরে তা রপ্তানী হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রেখেই বলিউডের সিনেমা জগৎ যাত্রা শুরু করে।

মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিম হাজি মস্তানকে হত্যা করে অপরাধ জগতের মুকুটহীন সম্রাট বনে যায়। একাধিক নায়িকার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন আছে। ‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি’ খ্যাত মন্দাকিনীর সঙ্গে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়। বলিউডে যারা পা রাখে তারা এসব বিষয়ে অবহিত হয়েই আসে। মমতা কুলকার্নি ড্রাগ মাফিয়া বিক্রম গোস্বামীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। হরর মুভি ‘ভিরানা’ খ্যাত নায়িকা জেসমিন ধুন্না দাউদ ইব্রাহিমের থাবা থেকে বাঁচতে সিনেমা জগৎ থেকেই অন্তর্হিত হন।

সম্প্রতি বলিউড বাদশা শাহরুখ খানের পুত্র আরিয়ানকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করেছে ভারতের নারকোটিকস কন্ট্রোল ব্যুরো। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আজিজ মোহাম্মদ ভাই বাংলাদেশের সিনেমা জগতকে নিয়ন্ত্রণ করত। বহুগামীতা তার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিল। মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গেও রয়েছে তার সখ্যতা। পরবর্তীকালে আজিজ মোহাম্মদ ভাই সপরিবারে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং মাফিয়াতন্ত্রে মদ, অস্ত্র এবং নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সোনালী ত্রিভুজের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নেশাজাতীয় দ্রব্যের যে চাষাবাদ, বিশ্বমোড়লদের সদিচ্ছা থাকলে এতদিনে তা নির্মূল হয়ে যেত। অস্ত্রের বিষয়ে বলতেই হয়- উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের আয়ের প্রধান উৎস অস্ত্র বিক্রয়। অস্ত্র বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে তারা পরিকল্পিতভাবে পৃথিবীর নানা দেশে যুদ্ধ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে রাখে। আর আকর্ষণীয় নারীর উপস্থিতিতি মদ ও অস্ত্রের ব্যবসা সহজ করে তোলে।

বৈধ ও অবৈধ উপায়ে অর্থ এবং বিত্তের অধিকারী ব্যক্তিরা মদ ও নারীদেহের মধ্যে স্বর্গের সিঁড়ি খোঁজে। অসৎ উদ্দেশ্যে অনেকে উপঢৌকনও পাঠায়। সন্ত্রাসীরা মদ সেবন এবং অস্ত্র বেচাকেনার পাশাপাশি নারীসঙ্গও উপভোগ করে। এ আন্ডারওয়ার্ল্ডে যেসব নারী এবং পুরুষ একবার প্রবেশ করে তারা সাধারণত আর বের হতে পারে না।

অর্থ, খ্যাতি, বিদেশ ভ্রমণ এবং বিলাসী জীবনে এরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এত সহজ পথে আত্মপ্রতিষ্ঠার ওল্টো পৃষ্ঠায় কোন বিভীষিকা অপেক্ষা করে তা ভাবার প্রয়োজন মনে করে না। যদি গত দুবছরের দিনলিপির সন্ধান করি তাতেই অনেক আলোকিত অন্ধকার আমাদের চোখমুখ ঢেকে দেবে।

পাপিয়া, সাবরিনা, সাহেদ, সম্রাট, জিকে শামীম, পদ্রীপ, পিয়াসা, মৌ, হেলেনা, রাজ, কাদের এবং পরীমনি প্রমুখ ব্যক্তিরা এ সমাজেই বেড়ে ওঠেছেন। বিশাল ছাতার নিচে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছেন। হয়ত কোথাও কোনো অংক মেলেনি অথবা ক্ষণিকের কোনো ভুলে তারা পা ফসকে পড়ে গেছেন। পরীমনিকে মাদক মামলায় বার বার রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। উচ্চ আদালত রিমান্ড বিষয়ে নিম্ন আদালতের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। নানা দোলাচলের মাঝে আদালত পরীমনিকে স্থায়ী জামিন দিয়েছে এবং তার মামলাটি বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়েছে।

লেডি দাবাং পাপিয়া যে অনৈতিক কার্যকলাপ বেশ কিছুদিন ধরে ওয়েস্টিন হোটেলে চালাচ্ছিল তা কি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা জানতেন না? শোনা যায় সেখানে সমাজের সব শ্রেণী-পেশার ব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল। দুর্ভাগ্য যে তাদের বিষয়ে আমরা কোনোদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানতে পারব না।

বিত্ত, ক্ষমতা এবং পদবীর লেবাস শরীরে মুড়িয়ে তারা সদর্পে এ সমাজেই অবস্থান করছে এবং যে এ বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করে সেই ফটো সাংবাদিককে নিখোঁজ থাকতে হয়েছে, যেতে হয়েছে কারাগারে। কথিত মডেল পিয়াসা এবং মৌ গ্রেপ্তারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়- এরা ‘রাতের রানী’ নামে পরিচিত। প্রশ্ন জাগে- ‘রাতের রাজা’রা এখনও কেন গ্রীন রুমেই রয়ে গেল?

সম্প্রতি যেসব নারীকে মাদক, অস্ত্র এবং অন্যান্য অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় এবং যাদের বিচার চলছে- তাদের পেছনে অদৃশ্য যে সুতোর টান আছে অর্থাৎ এই পুতুলদেরকে যারা নাচিয়েছে তাদের পরিচয় জানা এবং প্রকাশ করাটাও জরুরী। আসল হোতা এবং ভোক্তাদেরকে যদি শনাক্ত করা না হয় এবং তারা যদি আইনের ঊর্ধ্বাকাশে ওড়ে তবে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতেই থাকবে। নারীদের ‘স্কেপ গোট’ করে যারা বিত্ত এবং ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যাচ্ছে- তারা কি অপরাধী নয়? এটা অপরাধ দমনের পন্থা হতে পারে না। যেখানে আসল অপরাধীকে আড়াল করা হচ্ছে। অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার অপরাধমূলক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এটিই স্বাভাবিক।

ঠগবাজি করে অগাধ সম্পদের মালিক হয়ে এরা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে কেউকেটা বনে যায়। এরা যে বৃত্ত সৃষ্টি করে, সে বৃত্ত ভেদ করা মাঝেমধ্যে সরকারের পক্ষেও সম্ভব হয় না। আর কে না জানে কর্তৃত্ববাদী শাসনে অন্যায্য উচ্চাভিলাসী একটি গোষ্ঠিকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এ প্রসঙ্গে ফরাসী উপন্যাসিক বালজাকের উক্তিটি মনে পড়ছে- “আইন হচ্ছে মাকড়শার জালের মতো, ছোট কিছু পড়লে আটকে যায়, বড় কিছু পড়লে ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। আইন গরীবকে পিষে, আর ক্ষমতা আইনকে পিষে।”

যে কথাটি প্রায়ই শোনা যায়, ‘কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়’। বাস্তবতা এই যে, সব নাগরিকের ক্ষেত্রে উপরোক্ত উক্তির বাস্তবায়ন দূর আকাশের তারার মতই অধরা রয়ে গেছে।

লেখক: শিক্ষক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়
বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের যত্ন নিতে হবে
আলোকময় শেখ হাসিনা

শেয়ার করুন

তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা

তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা

বাংলাদেশে অনেক নিষিদ্ধ দ্রব্যের ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু আছে যাতে সেগুলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। মদ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কিন্তু এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেকারণে এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের জন্য বিক্রেতা-ক্রেতা উভয়ের ক্ষেত্রে লাইসেন্স আরোপ করে সরকার। তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার একদিনেই বন্ধ করা সম্ভব নয় কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে চুড়ান্তভাবে অবশ্যই সম্ভব।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোবাকো সার্ভে ২০১৭ অনুসারে- বাংলাদেশে ১৫ বছরের ঊর্দ্ধে ৩৫.৩% প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৪৬% পুরুষ এবং ২৫.২% নারী। বিভিন্ন জনসমাগম ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান না করেও পরোক্ষভাবে ধূমপানের শিকার হচ্ছে বহু মানুষ। এই হার কর্মক্ষেত্রে ৪২.৭%, রেস্তোরায় ৪৯.৭%, সরকারি কার্যালয়ে ২১.৬%, হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ১২.৭% এবং পাবলিক পরিবহনে ৪৪%।

বৈশ্বিকভাবে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০০৩-এর মে তে ৫৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ফ্রেমওর্য়াক কনভেনশন অন টোবাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) চুক্তি অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশ এ চুক্তির প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ এবং ২০০৪-এ চুক্তিটিকে অনুসমর্থন করে। এর ধারাবাহিকতায় সরকার এফসিটিসির আলোকে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এবং ২০১৫ সালে এ সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করে।

৩০ থেকে ৩১ জানুয়ারী, ২০১৬ ঢাকায় অনুষ্ঠিত Summit on Achieving the Sustainable Development Goals শীর্ষক South Asian Speakers Summit এর সমাপনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪০-এর মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দেন। দেশের ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) এর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লক্ষ্য-৩ অর্জনে আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসির বাস্তবায়ন ও তামাকজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আছে।

মানীয় প্রধানমন্ত্রীর ২০৪০-এর মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা বাস্তবায়ন কী স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে? নিশ্চয়ই তা নয়। কোনো সিদ্ধান্তই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত হয় না। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং আরও কিছু অনুসিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

এর আলোকেই তামাক বিরোধী সংস্থাগুলোর চেষ্টা এবং সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যকর ভূমিকায় জানুয়ারী ২০২১-এ ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা’ প্রকাশিত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের সব দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) নির্দেশিকাটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২মার্চ ২০২১-এ (স্মারক নং:৪৬.০০.০০০০.০৮৫.০৬.০৪২.২০১৮-১১৮) স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

তামাকজাত দ্রব্য যত্রতত্র ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও বিক্রয় সীমিতকরণে ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা’ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। নির্দেশিকাটি ঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে ২০৪০-এর মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকার ৮ এর ৮.১-এ বলা হয়েছে-

‘তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়কেন্দ্র বা যেখানে তামাকজাত দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় হবে তার জন্য আবশ্যিকভাবে পৃথক ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করা এবং প্রতি বছর নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে আবেদনের মাধ্যমে উক্ত ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা।’ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর করার অর্থ শুধু বৈধতা প্রদান নয়। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশে অনেক নিষিদ্ধ দ্রব্যের ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু আছে যাতে সেগুলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। মদ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কিন্তু এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেকারণে এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের জন্য বিক্রেতা-ক্রেতা উভয়ের ক্ষেত্রে লাইসেন্স আরোপ করে সরকার। তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার একদিনেই বন্ধ করা সম্ভব নয় কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে চুড়ান্তভাবে অবশ্যই সম্ভব। যা বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে করে দেখিয়েছে। বাংলাদেশে সে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য এর ব্যবহার ও বিক্রি কমিয়ে আনতে হবে, আর সেজন্য অন্যতম পদক্ষেপ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা।

বর্তমান অবস্থায় তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। লাইসেন্সিং ব্যবস্থার উদ্যোগ এর বিক্রয়কে সীমিত করতে সাহায্য করবে। বিক্রয় সীমিত করা সম্ভব হলে ব্যবহারও কমে আসতে বাধ্য। লাইসেন্সিং এর বিষয়ে নির্দেশিকায় যেসব শর্তারোপ হয়েছে সেগুলোর প্রতিপালন যদি নিশ্চিত করা যায় তবে তামাকজাত দ্রব্যের (বিশেষ করে সিগারেট/বিড়ি) যত্রতত্র ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও বিক্রয় সীমিতকরণে সরাসরি প্রভাব পড়বে।

নির্দেশিকায় ৮-এর ৮.৪ এ বলা হয়েছে-

‘হোল্ডিং নাম্বার ব্যতীত কোনো প্রকার তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় কেন্দ্রকে লাইসেন্স প্রদান করা যাবে না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে সিগারেট কোম্পানী কর্তৃক সরবরাহকৃত বক্স বসিয়ে, গলায় ঝুলিয়ে যারা সিগারেট বিক্রি করে সেটি আর করতে পারবে না। ফলে বিক্রয় কেন্দ্র সীমিত হয়ে আসবে, বিক্রি সীমিত হবে, সহজপ্রাপ্যতা বাধাগ্রস্থ হবে।’

নির্দেশিকায় ৮.৫-এ বলা হয়েছে-

‘সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য লাইসেন্স প্রদান করা যাবে না। তামাক কোম্পানীগুলোর অন্যতম টার্গেট থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে যাতে সিগারেট বিক্রি হয় সে ব্যবস্থা করা। তারা প্রধান ভোক্তা বানাতে চায় শিশু-কিশোর ও যুবকদের। কারণ তাদের একবার সিগারেট ধরিয়ে দিতে পারলে দীর্ঘমেয়াদী ভোক্তা তৈরি হয়ে যায়। গাইডলাইনের উল্লেখিত ধারা বাস্তবায়িত হলে তামাক কোম্পানীর এই অপতৎপরতাকে বাধাগ্রস্থ করা সম্ভব হবে।’

৮.৬ ধারা অনুযায়ী, জনসংখ্যার ঘনত্বের বিবেচনায় একটি এলাকায় লাইসেন্স ইস্যু করা হবে। এর মাধ্যমে বিক্রয় কেন্দ্র সীমিত হয়ে যাবে। বিক্রিও সীমিত হয়ে আসবে। সহজলভ্যতা অনেক হ্রাস পাবে।

লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকরের মাধ্যমে একটি শহরে মোট কয়টি দোকানে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় হচ্ছে তার ডাটাবেজ তৈরি হয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করা সহজ হয়ে যাবে।

সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স এবং পাশাপশি তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য পৃথক লাইসেন্সিং ফি কার্যকর করার ফলে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে বিক্রেতা নিরুৎসাহিত হবে। অর্জিত ফি’র অর্থ দ্বারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তামাক নিয়ন্ত্রণ অন্যান্য কার্যক্রম বাস্তবায়নে অর্থায়ন করতে পারবে।

তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের অনেক রাজ্য এবং নেপালেও অনেক আগে চালু হয়েছে। বর্তমানে ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, ফ্রান্স, ইতালী, স্পেন, অষ্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর আছে। এর কার্যকারিতার প্রভাব ইতোমধ্যে এসব দেশে দেখা যাচ্ছে।

BMJ জার্নালে প্রকাশিত তথ্যানুসারে-

লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কারণে ফিনল্যান্ডে পয়েন্ট অব সেলের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ২৮%, ক্যালির্ফোনিয়া কাউন্টিতে ৩১% এবং হাঙ্গেরিতে ৮৩%। অস্ট্রেলিয়াতে লাইসেন্স ফি ১৩ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০০ ডলার করায় খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা এক ধাক্কায় কমে গেছে ২৩.৭%। যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোয় ৮% এবং ফিলাডেলফিয়ায় ৯.৮% হ্রাস পেয়েছে।

তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রি সীমিতকরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা প্রভাব তৈরি করায় তামাক কোম্পানিগুলো বৈশ্বিকভাবে মরিয়া হয়ে নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। যাতে নতুন করে কোনো দেশে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর না হতে পারে এবং যেসব দেশে কার্যকর হয়েছে সেখানে যাতে এটি কার্যকর না থাকতে পারে। ইউরোপের নরওয়ে ও স্কটল্যান্ডে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করলেও কোম্পানীর কূটকৌশলে সেটি অকার্যকর হয়ে যায়।

বাংলাদেশেও তামাক কোম্পানী ইতোমধ্যে বিভিন্ন কূটকৌশল গ্রহণ করেছে। নীতিনির্ধারক মহলকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তারা অনুধাবন করেছে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হলে বিক্রি সীমিত হয়ে আসতে বাধ্য। কারণ দেশের বেশ কিছু পৌরসভায় লাইসেন্সিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং বিক্রি সীমিতকরণে যা ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে। খুলনা বিভাগের সিটি কর্পোরেশনসহ ৯ টি জেলাসদর পৌরসভায় অসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এইড ফাউন্ডেশনের তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের সহায়তায় তামাক বিক্রেতাদের ডাটাবেজ তৈরি হয়েছে। এই তালিকা অনুসারে সংশ্লিষ্ট জেলার টাস্কফোর্স কমিটি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করার জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। এটি সম্ভব হচ্ছে লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কারণে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতি আহ্বান, দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা- ‘২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের জন্য তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে লাইসেন্স ব্যবস্থাকে জোরদার করে তামাক কোম্পানীর কূটকৌশল প্রতিহত করতে হবে।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী

আরও পড়ুন:
মশকনিধনে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ
পিঠেতে খাবার তবু তা যাবে না ছোঁয়া
শেখ হাসিনা: যার কাছে প্রত্যাশা বেড়ে যায়
বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: হৃদয় দিয়ে হৃদয়ের যত্ন নিতে হবে
আলোকময় শেখ হাসিনা

শেয়ার করুন