ইনডেমনিটি ঘৃণিত ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায়

ইনডেমনিটি ঘৃণিত ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায়

দায়মুক্তি পাওয়া খুনিরা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। জিয়া থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের পরিবর্তে করেছে পুরস্কৃত, করেছে ক্ষমতার অংশীদার। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

১৯৭৫ সালের এদিনে অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির পদ দখলকারী খুনি মোশতাক আহমেদ অধ্যাদেশ আকারে ইনডেমনিটি জারি করে। এটি ১৯৭৫ সালের অধ্যাদেশ নং ৫০ নামে অভিহিত ছিল।

ইনডেমনিটি শব্দের অর্থ ‘শাস্তি এড়াইবার ব্যবস্থা’। অর্থাৎ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ হলো সে অধ্যাদেশ, যার মাধ্যমে শাস্তি এড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারবর্গকে হত্যার পেছনে যারা জড়িত ছিল, তাদেরকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। পরে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জিয়াউর রহমানের আমলে সংসদে এই কালো আইনটিকে অনুমোদন দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনের শাসনের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। আইন করে বলা হলো হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম কালো আইন আগে ও পরে আর কখনও ছিল না। এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের ছুতা দিয়ে ২১ বছর বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার বিচার করা হয়নি।

এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে খুনি মোশতাকের স্বাক্ষর থাকলেও অনেকেই মনে করে অধ্যাদেশটি জারির পেছনে মূল ক্রীড়নক ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৯ দিনের মাথায় সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে হটিয়ে নতুন সেনাপ্রধান বনে যাওয়া জিয়াউর রহমান। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর এবং তার পর সেসময়ের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএইচ রহমানের স্বাক্ষর আছে।

অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ। প্রথম অংশে বলা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

দ্বিতীয় অংশে বলা আছে-

“রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলো।”

অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসেবে আবিভূর্ত হয়। সেসময় বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭-এর ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ এবং ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’ এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেয়ায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পায়।

একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেয়া না হলে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু সে ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যাতে এ ব্যাপারে কিছু না করতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিল এবং এই সময় একটি প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে গেল যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তিত হবে না। এ দোহাই দিয়ে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচএম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেনি।

এদিকে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকাকালে অর্থাৎ ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর অঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। যেহেতু মোশতাক সরকার ছিল সেনাসমর্থিত, জিয়াউর রহমান ছিল সেনাপ্রধান সেহেতু ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী জিয়াউর রহমানের নির্দেশ কিংবা সম্মতি ছাড়া নামেমাত্র রাষ্ট্রপতি মোশতাকের পক্ষে কোনোভাবেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি দিতে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা সম্ভব হতো না।

একারণে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির দায় জিয়াউর রহমান এড়িয়ে যেতে পারে না। আর বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা বিবিসিতে সাক্ষাৎকার দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জেনারেল জিয়াউর রহমানও যে জড়িত ছিল, তা স্পষ্ট করেই বলেছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞদের মতে, খুনি মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেয়া না হলে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের পরই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত।

দায়মুক্তি পাওয়া খুনিরা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। জিয়া থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের পরিবর্তে করেছে পুরস্কৃত, করেছে ক্ষমতার অংশীদার। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

হত্যার বিচার চাওয়ার পথ সাংবিধানিকভাবে রুদ্ধ করে দিয়ে জিয়া বাংলাদেশকে মানবাধিকার ও সভ্যতাবিরোধী অমানবিক, অসভ্য, জংলি রাষ্ট্রে পরিণত করে। তিনি খুনিদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেই থেমে থাকেননি; দূতাবাসে চাকরির যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিশেষ ব্যবস্থায় খুনিদের চীন, আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, কুয়েত, আবুধাবি, মিসর, কানাডা ও সেনেগালের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করে।

জিয়াউর রহমানের পর বিচারপতি সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলেও কেউ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেনি। বরং জিয়া খুনিদের দূতাবাসে যে চাকরি দিয়েছিল, এরশাদ ও খালেদা জিয়া তাদের পদোন্নতি দিয়ে বাঙালি জাতির কলঙ্কের দায়কে ভারী ও দীর্ঘায়িত করে। দায়মুক্তি ও দূতাবাসে চাকরি-পদোন্নতি পেয়ে খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত।

এরশাদ খুনিদের রাজনৈতিক দল গঠন ও সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দেয়, আর খালেদা জিয়া ৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুনি শাহরিয়ার রশিদকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে।

দীর্ঘ আন্দোলন আর সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমেই জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ উন্মুক্ত করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল-সংক্রান্ত আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আমিন উল্লাহর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করেন। তাদের রিপোর্টেই প্রকাশ পায় এই কুখ্যাত আইনটি বাতিলের জন্য সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই।

কমিটির ওই রিপোর্ট আইন কমিশনের মতামতের জন্য পাঠানো হলে সাবেক প্রধান বিচারপতি এফকেএম মুনীরের নেতৃত্বাধীন এই কমিশনও তা সমর্থন করে। এরপর সেসময়ের আইন প্রতিমন্ত্রী (পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী) প্রয়াত অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিল বাতিলের জন্য ‘দি ইনডেমনিটি রিপিল অ্যাক্ট-১৯৯৬’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সংসদে পাস হয় মানবতা ও সভ্যতাবিরোধী কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বিল। ঘোচানো হয় ২১ বছরের জাতীয় কলঙ্ক, খুলে যায় বঙ্গবন্ধুহত্যার বিচারের পথ।

এভাবেই সুদীর্ঘ ২১ বছর পর শুরু হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া। ১৯৯৮-এর ৮ নভেম্বর মামলার যাবতীয় কার্যক্রম শেষে ১৫ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আসামি পক্ষের ১৫ আসামি উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পায়। উক্ত আপিলে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং ৩ জনকে খালাস প্রদান করা হয়। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে এ মামলার কার্যক্রম ফের স্থবির হয়ে পড়ে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আবার এ বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০০৯ সালে লিভ-টু-আপিলের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আপিল শেষে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে আদালত। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি খুনিদের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সম্প্রতি আরও একজন দণ্ডিতকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জাতি কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হয়েছে, অবসান হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গ্লানি।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি
২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন
দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

শেয়ার করুন

মন্তব্য

শুভ জন্মদিন শহীদ শেখ রাসেল

শুভ জন্মদিন শহীদ শেখ রাসেল

প্রত্যক্ষদর্শী বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী এএফএম মহিতুল ইসলামের ভাষ্যমতে, ১১ বছরের শিশু রাসেল প্রতিদিনের মতো সেদিনও ঘুমিয়েছিল। আকস্মিক গুলির শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমভাঙা চোখে সে আতঙ্কিত হয়ে চমকে ওঠে। অবস্থা বুঝে বেগম মুজিব আদরের দুলাল রাসেলকে রক্ষায় বাড়ির কাজের লোকজনসহ পেছনের দরজা দিয়ে চলে যেতে বলেন। পেছনের ফটক দিয়ে বাইরে যাওয়ার সময় ঘাতকরা তাকে আটক করে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল। ১৮ অক্টোবর তার জন্মদিন। প্রতিবছর দিবসটি আলোচনা সভা, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনাড়ম্বরভাবে পালিত হতো। সরকার সিন্ধান্ত নিয়েছে এখন থেকে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শেখ রাসেল দিবস’ হিসেবে দিবসটি পালিত হবে। যার মূল উদ্দেশ্য হবে- শেখ রাসেলের আদর্শ, চিন্তাচেতনাকে শিশু-কিশোর তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া।

শেখ রাসেল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ছোট সন্তান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদরের ছোট ভাই। রাজনীতির তীর্থস্থান ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ১৯৬৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘ সাত বছর পর বঙ্গবন্ধু পরিবারে নতুন অতিথি আসার কারণে সবার মধ্যেই ছিল অন্যরকম আনন্দ উচ্ছ্বাস।

রাসেল নামকরণেরও আছে সুন্দর একটি ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা দুজনই সময় পেলে বই পড়তেন, ছিলেন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী, দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত। বার্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের বিশ্বনেতা। বিশ্ব শান্তির জন্য গঠন করেছিলেন ‘কমিটি অব হান্ড্রেড’। শেখ রাসেলের জন্মের দুবছর আগে ১৯৬২ সালে কিউবাকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন দ্বারপ্রান্তে তখন শান্তির পতাকা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেল। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা আগেই সিন্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন যে তাদের যদি পুত্র সন্তান হয় তাহলে শান্তির দূত বার্ট্রান্ড রাসেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে নাম রাখবেন রাসেল।

রাসেল যখন খুব ছোট তখন পিতা বঙ্গবন্ধু ছয় দফা পেশ করার কারণে দীর্ঘমেয়াদে কারাবরণ করেন। বঙ্গবন্ধু ‘কারাগারের রোজনামচা’য় শেখ রাসেলকে নিয়ে লিখেছেন-

“৮ ফেব্রুয়ারী ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বাড়ি চলো। কী উত্তর ওকে দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ওতো বুঝে না আমি কারাবন্দী। ওকে বললাম, তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়! কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটাকে, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে। দুঃখ আমারও লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা।”

শেখ রাসেলের বড় বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছোট ভাইয়ের সব স্মৃতিকে এক করে বই লিখেছেন ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’। বইটিতে শেখ রাসেলের জন্মগ্রহণ থেকে শুরু করে ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হওয়া পর্যন্ত জীবনের খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন। বইটি থেকে শেখ রাসেলের অনেক গুণাবলির তথ্য জানতে পারি।

শেখ রাসেল অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন। পরিবারের রাজনৈতিক আলোচনা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। ছোট্ট রাসেল একদিন মাকে জিজ্ঞেস করে, মা আব্বার কাছে যাবে না? মা কোনো উত্তর দেয় না। দিবে কী করে তখন যে পিতা বঙ্গবন্ধুকে ছয়মাস ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা আটক করে রেখেছিল। কেউ কোনো খবরই জানত না তিনি কোথায় কীভাবে আছেন? ছেলেকে শুধু বুকে টেনে নিয়ে আদর করলেন মা।

রাসেল আবার মাকে জিজ্ঞাসা করল, মা আব্বার নাকি ফাঁসি হবে? ফাঁসি কি? মা বললেন, তোমাকে একথা কে বলেছে বাবা। রাসেল উত্তর দিয়ে বলে সেদিন কাকা, দুলাভাই আর কামাল ভাই বলেছিল আমি শুনেছি মা। এমনই রাজনৈতিক সচেতন ছিলেন রাসেল। কারাগারে বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেলে জয়বাংলা স্লোগান দিত। এমনকি হরতালের দিনে বাসার সামনের লনে দাঁড়িয়ে হরতালের সমর্থনে হরতাল হরতাল বলে স্লোগান দিত।

আতিথেয়তা বঙ্গবন্ধু পরিবারের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। ঠিক সে গুণটিও ছিল ছোট্ট রাসেলের। গ্রামে গেলে দরিদ্র শিশু বন্ধুদের জন্য উপহার সামগ্রী ঢাকা থেকে নিয়ে যেতেন। শিশু বন্ধুদের প্রতি তার অপরিসীম দরদ ছিল। সবসময়ই তাদের কিছু না কিছু দিত।

রাসেল চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন। পড়তেন ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরী স্কুলে। বাসায় গৃহশিক্ষক ছিলেন গীতালি দাশগুপ্তা। শিক্ষিকাকেই শুনতে হতো রাসেলের কথা, নইলে সে মনোযোগী হতো না। শিক্ষিকাও আদর করে তাকে ম্যানেজ করেই শিক্ষাদান করেছেন। গৃহশিক্ষিকা গীতালি দাশগুপ্তা ছাত্র শেখ রাসেল সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে বলেন-

“শেখ রাসেলকে যেটা শিখিয়েছি, সে তা কোনো দিন ভোলেনি। শেখ রাসেল একবার বলে, আমি আর অঙ্ক করব না। আমি প্রশ্ন করলে বলে, আমার ইচ্ছে করে না। এরপর আমি চিন্তা করলাম, কীভাবে শেখানো যায়। বললাম যে, তুমি স্কুলে চকলেট নিয়ে যাও? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, একা একা খাও, তাই না? রাসেল বলল, নাহ, একা খাই না, বন্ধুদের দিয়ে খাই। তখন বললাম, এই যে তুমি দুইটা অঙ্ক রেখে দিলে, তারা কষ্ট পাবে না?

‘রাসেল বলল, কেন কষ্ট পাবে? ওরা কি কথা বলতে পারে? খুব অবাক ও। আমি বললাম, এই যে আমাদের বাংলাদেশ আছে, তেমনই একটা অঙ্কের দেশ আছে। তারা নিজেরা নিজেরা কথা বলতে পারে। কষ্ট পেয়ে যাবে। এরপর রাসেল টপ টপ করে দুটো অঙ্ক করে বলে, এখন তো আর ওরা রাগ করবে না। এখন তো আর অঙ্কের দুঃখ নেই।”

১৯৭৫ সালের ভয়াবহ ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নেয় ছোট্ট রাসেলকে। তাকে বাবা, মা, দুই ভাইসহ পরিবার প্রতিটি লাশ দেখিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী এএফএম মহিতুল ইসলামের ভাষ্যমতে, ১১ বছরের শিশু রাসেল প্রতিদিনের মতো সেদিনও ঘুমিয়েছিল। আকস্মিক গুলির শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমভাঙা চোখে সে আতঙ্কিত হয়ে চমকে ওঠে। অবস্থা বুঝে বেগম মুজিব আদরের দুলাল রাসেলকে রক্ষায় বাড়ির কাজের লোকজনসহ পেছনের দরজা দিয়ে চলে যেতে বলেন।

পেছনের ফটক দিয়ে বাইরে যাওয়ার সময় ঘাতকরা তাকে আটক করে। এ সময় বাড়ির ভেতরে মুহুর্মুহু বুলেটের শব্দ, বীভৎসতা আর আর্তচিৎকার শুনে অবুঝ শিশু রাসেল কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘাতকদের বলেছিল, ‘আমি মায়ের কাছে যাব।’ পরে মায়ের লাশ দেখার পর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জোর মিনতি করে বলেছিল, ‘আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দাও।’ ছোট্ট নিষ্পাপ শিশুর আকুতিও নরপশুদের মন গলাতে পারেনি। ঘাতকরা ভেবেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কোনো উত্তরাধিকার রাখলে ভবিষ্যতে তাদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মাত্র ১০ বছর ৯ মাস ২৭ দিন বয়সে এই প্রতিভাবান শিশুর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

শিশু-কিশোর তরুণদের কাছে শেখ রাসেল একটি ভালোবাসার নাম, একটি আদর্শের নাম। শেখ রাসেলের জীবনের প্রতিটি গল্প এদেশের শিশু-কিশোর, তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে শেখ রাসেল বাংলাদেশের কোটি কোটি শিশু-কিশোর, তরুণদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। শহীদ শেখ রাসেলের মৃত্যু নেই, তিনি ইতিহাসের মহাশিশু হিসেবে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। শুভ জন্মদিন, শহীদ শেখ রাসেল!

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি
২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন
দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

শেয়ার করুন

সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই রাসেল

সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই রাসেল

১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই। সেদিন খুব মন খারাপ হয়েছিল রাসেলের। হাসুপা আর আপু (শেখ রেহানা) চলে গেছেন জার্মানিতে। সঙ্গে নিয়ে গেছেন ওর খেলার সঙ্গী হাসুপার ছেলে জয়কে। হাসুপার সঙ্গে রাসেলও যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মা ওকে যেতে দেননি। কী করে দেবেন! ওর যে তখন জন্ডিস হয়েছিল। তারপর এলো ভয়ংকর এক কালো রাত।

হেমন্ত কেবল শুরু হয়েছে। রাত নামলেই ছাতিমের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। এখানে ওখানে। এমনকি একটু বাতাস পেয়ে ঘরের ভিতরও ঢুকে পড়ে কখনও কখনও। রাত যত বাড়তে থাকে, ছাতিমের তীব্র সুবাস ততই ছড়ায়। ছাতিমের সুবাস ছড়ানো তেমনি এক হেমন্তের ভোর রাতে জন্ম হলো ওর। সময় তখন ভোর সাড়ে তিনটা। আর তারিখটা ছিল ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বড় বোন শেখ হাসিনার ঘরটা ছিল ওর জন্মঘর। জন্মের পর বড় বোন হাসুপা এসে নিজের ওড়না দিয়ে ওর ভেজা মাথা পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। ৩২ নম্বর বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। ওর নাম?

ওর বাবা শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা। বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক, লেখক ও গণিতবিদ বার্ট্রান্ড রাসেলের ভীষণ ভক্ত। বাবা ও মা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব তাদের সবচেয়ে ছোট সন্তানের নাম রাখলেন শেখ রাসেল। তবে স্কুলের খাতায় ওর নাম ছিল রিসাল উদ্দিন। (সূত্র: রাসেল আমাদের ভালোবাসা- শেখ রেহানা)

বাবাকে ভীষণ ভালোবাসত রাসেল। কিন্তু বাবাকে যে বেশিক্ষণ কাছে পেত না। বাবার কত্ত কাজ! বেশিরভাগ সময়ই বাবা থাকতেন জেলে। তবে রাসেলের ভীষণ প্রিয় ছিল হাসুপা। মানে শেখ হাসিনা। হাসুপার চুলের বেণি ধরে খেলত। হাসুপার হাত ধরেই হাঁটা শিখেছিল।

রাসেলের চার বছর বয়সে বাবা শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেছিলেন। তাতেই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। তারা জেলে পুরেছিল বাবাকে। ওর মুখের হাসিও মুছে গিয়েছিল। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে কেবল বাবাকে খুঁজত ও। মাঝে মাঝে জেলে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করে আসত।

এর মাঝে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হলো বাবার বিরুদ্ধে। বাবার সঙ্গে এবার দেখা করাও বন্ধ। অবশেষে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পেলেন বাবা। মুক্তির পর বাবাকে আর চোখের আড়াল হতেই দিতে চাইত না ও। খেলার ফাঁকে ফাঁকে কিছুক্ষণ পর পরই বাবাকে দেখে আসত।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করল আওয়ামী লীগ। বাড়িতে মানুষের ভিড়, আত্মীয়-স্বজনদের ঘন ঘন আনাগোনা। বাড়িতে খেলাধুলা করা তো পরের কথা, লেখাপড়া করারও সুযোগ নেই। এমনকি ঘরের ভিতর নিরিবিলি ঘুমানোও যেত না।

একদিন বাবা শেখ মুজিবুর রহমান বাড়ি থেকে বের হলেন না। ঘরে বসে মিটিং করলেন নেতাদের সঙ্গে। অনেক রাতে দোতলায় উঠে এলেন। আত্মীয়-স্বজনরাও চলে গেছেন। সব সময় উপর তলাটা নিরিবিলি রাখার চেষ্টা করতেন মা। যাতে বাবা নিরিবিলিতে ভাত খেতে পারেন, ঘুমাতে পারেন। সেদিন অনেকদিন পর বাবাকে কাছে পেল রাসেল। বাবার পাশে বসে রাসেল আবদার জানাল, ‘মা আমি ভাত খাবো।’

মা বললেন, ‘তুমি তো খেয়েছ বাবা।’

রাসেল জেদ ধরল, ‘আমি আব্বার সঙ্গে খাবো।’

তারপর ওকে কোলে তুলে নিলেন বাবা। বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই তুমি আমার সঙ্গে খাবে।’

তারপর বাবার কোলে বসে বাবার হাতে ভাত খেল রাসেল। ওর মনটাও জুড়াল।

খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে সবার সঙ্গে গল্প জুড়ে দিলেন শেখ মুজিব। সবার লেখাপড়ার খবর নিলেন। হঠাৎ রাসেল প্রশ্ন করল, ‘আব্বা, আমরা নাকি রাওয়ালপিন্ডি চলে যাবো? তুমি নাকি প্রেসিডেন্ট হবে। নিচে সবাই বলে।’

রাসেলের মুখে এমন কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন শেখ মুজিব। বাকিরাও না হেসে থাকতে পারলেন না।

সবাইকে হাসতে দেখে বোকার মতো সবার মুখের দিকে তাকাল রাসেল। ভুল কিছু কি বলে ফেলেছে ও? নইলে সবাই ওর কথা শুনে অমন করে হাসছে কেন? তারপর সেটা আড়াল করার জন্য চট করে বলল, ‘আমি কিন্তু এই বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবো না। মা তুমিও কিন্তু যাবে না।’

কথাটা শুনে ওকে বুকে টেনে নিলেন বাবা। ওর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘ঠিক বলেছ রাসেল। এই বাড়ি কেন- এই দেশ ছেড়ে আমরা কোথাও যাব না। এই বাংলার মাটি তো আমাদের জন্মভূমি- মাতৃভূমি। পৃথিবীর যেখানেই থাকি না কেন, আমার এই বাড়ি, আমার এই দেশে আমি ফিরে আসবই। আমি মরে গেলেও আমার লাশটা ঠিক আসবে। এখানেই আমার শান্তি এখানেই আমার সুখ। সেই যে গানটা আছে- সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।...’

এরপর এলো মুক্তিযুদ্ধ। বাবাকে তো ওরা বন্দি করে নিয়ে গেল পশ্চিম পাকিস্তানে। আর পরিবারের বাকিদের বন্দি করে রাখল একটা একতলা বাসায়। বড়দের সঙ্গে ছোট্ট রাসেলেরও বন্দিজীবন শুরু হয়েছিল। ঠিকমতো খাবার নেই, খেলনা নেই। বই নেই।

কী যে কষ্টের ছিল সে দিনগুলো! কিন্তু ওর কাছে সেগুলো কোনো কষ্টই ছিল না। তখনও ওর আসল কষ্ট ছিল বাবার জন্য। ওর চোখের কোণে সব সময় পানি আটকে থাকত। কেউ জানতে চাইলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। বলত, ‘চোখে ময়লা’। ততদিনে মনের কষ্ট লুকোনো শিখে গিয়েছিল রাসেল।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু রাসেলদের মুক্তি হলো ১৭ ডিসেম্বর সকালে। কিছুদিনের মধ্যে রণাঙ্গণ থেকে বাড়িতে ফিরে এলেন বড়ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামাল। ভাইদের পেয়ে রাসেল খুব আনন্দিত। তবে ওর চোখদুটো বলছিল অন্য কথা। চোখ দুটো তখনও ব্যথায় ভরা। বাবা যে এখনও আসেননি! কোথায় বাবা?

বাবা এলেন আরও কিছুদিন পর- ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বড়দের সঙ্গে ছোট্ট রাসেলও বাবাকে আনতে এয়ারপোর্ট গিয়েছিল। তারপর বাবাকে নিয়ে যখন বাসায় ফিরল, তখন ওর আনন্দ দেখে কে? একটু সময়ের জন্যও বাবাকে কাছছাড়া করতে চাইত না। যেন বাবাকেই পাহারা দিয়ে রাখত ছোট্ট রাসেল। যাতে আর কেউ ওর কাছ থেকে বাবাকে ছিনিয়ে নিতে না পারে। ছায়ার মতো বাবাকে অনুসরণ করত। দেশ-বিদেশে- সবখানে।

১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই। সেদিন খুব মন খারাপ হয়েছিল রাসেলের। হাসুপা আর আপু (শেখ রেহানা) চলে গেছেন জার্মানিতে। সঙ্গে নিয়ে গেছেন ওর খেলার সঙ্গী হাসুপার ছেলে জয়কে। হাসুপার সঙ্গে রাসেলও যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মা ওকে যেতে দেননি। কী করে দেবেন! ওর যে তখন জন্ডিস হয়েছিল। তারপর এলো ভয়ংকর এক কালো রাত।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ঘাতকদের নির্মম বুলেটে ততক্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন ওর বাবা, মা-দুই ভাই, দুই ভাবি আর চাচা। এই ঘাতকদের কাছেই সেদিন করুণ মিনতি করেছিল ছোট্ট রাসেল-আমি মায়ের কাছে যাব।

নিষ্পাপ রাসেলের করুণ মিনতিতে সেদিন ঘাতকদের হৃদয় এতুটুক আর্দ্র হয়নি। কারণ ওরা সেদিন কোনো শিশুর মিনতি শুনতে আসেনি। তবে রাসেলকে সেদিন ঘাতকরা মায়ের কাছেই পাঠিয়েছিল। কিন্তু বড় নির্মমভাবে!

রাসেলের সেদিনের মিনতি, করুণ আর্তনাদ ছুঁয়েছিল কবিহৃদয়ও। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন-

‘রাসেল, অবোধ শিশু, তোর জন্যে

আমিও কেঁদেছি

খোকা, তোর মরহুম পিতার নামে যারা

একদিন তুলেছিল আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি

তারাই দুদিন বাদে থুথু দেয়, আগুন ছড়ায়

বয়স্করা এমনি উন্মাদ!

তুই তো গল্পের বই, খেলনা নিয়ে

সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন বয়সেতে ছিলি

তবু পৃথিবী আজ এমন পিশাচী হলো

শিশু রক্তপানে গ্লানি নেই?

সর্বনাশী, আমার ধিক্কার নে!

যত নামহীন শিশু যেখানেই ঝরে যায়

আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই।’

আজ তোমার জন্মদিনে কবির সঙ্গে আমরাও উচ্চারণ করি- সভ্যতার নামে ক্ষমা চাই রাসেল। তুমি কি আমাদের ক্ষমা করবে?

সহায়ক

রাসেল আমাদের ভালোবাসা- শেখ রেহানা

আমাদের ছোট রাসেল সোনা- শেখ হাসিনা

‘শিশু রক্ত’ -সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি
২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন
দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

শেয়ার করুন

শিশুদের জন্য নিরাপদ হোক পৃথিবী

শিশুদের জন্য নিরাপদ হোক পৃথিবী

শেখ রাসেল ছিল বন্ধুবৎসল, গরিবদের জন্য ছিল তার দরদ, মমতা। জাতির পিতার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়াতে যখন সে যেত তখন গ্রামের ছেলেদের জন্য সে জামা নিয়ে যেত। তাদের উপহার দিত। আজ শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে দেশ একজন মানবদরদি মানুষ পেত।

১৯৬৪ সাল। সময়টা ছিল লড়াই আর যুদ্ধের উত্তেজনায় মুখর। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে চলেছে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ওই সময় পাকিস্তানজুড়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোল। একদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, অপরদিকে সম্মিলিত বিরোধীদলের প্রার্থী কায়দে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহ। অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারের মাঝেও এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে। যিনি এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটিয়ে বাঙালি জাতিকে এনে দেবেন মুক্তির স্বাদ বাঙালির সেই অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘর আলো করে জন্ম নিল এক শিশু।

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িতে শেখ রাসেলের জন্ম। রাসেলের যেদিন জন্ম হয় বঙ্গবন্ধু সেদিন ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণের জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। জন্মের সময় বাবা কাছে না থাকলেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পিতা-পুত্রের চিরপ্রস্থান ঘটেছিল একসঙ্গেই।

ছোট ছেলের রাসেল নামটি রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার প্রিয় লেখক ছিলেন পৃথিবী বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক সাহিত্যে নোবেল পুস্কারপ্রাপ্ত বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি কেবল একজন দার্শনিকই ছিলেন না। বিজ্ঞানীও ছিলেন। ছিলেন পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের একজন বড় মাপের বিশ্বনেতা। পৃথিবীটাকে মানুষের বসবাসের জন্য সুন্দর ও শান্তিময় করার লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন নিরলস। বার্ট্রান্ড রাসেলের নামের সঙ্গে মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের নাম রাখলেন রাসেল। শেখ রাসেল। এই নামটিকে ঘিরে নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর মহৎ কোনো স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা ছিল। কত আশা ছিল তার ছেলে বড় হয়ে জগৎখ্যাত হয়ে উঠবে একদিন। কত সাধই না মানুষের অপূর্ণ থেকে যায়!

শিশু রাসেলের ভুবন ছিল তার পিতা-মাতা— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব; বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালকে ঘিরে। তাদের সবার ভালোবাসার ধন ছিলেন ছোট্ট রাসেল। রাসেলের জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে বাবা মুজিবকে ছাড়া। কারণ, বাবা মুজিব রাজনৈতিক বন্দি হয়ে কারাগারে ছিলেন দিনের পর দিন। শেখ রাসেল বেশ কবারই কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে তার প্রথম কারাগার দেখা ১৯৬৬ সালের ৮ মে, পিতার গ্রেপ্তারের পর।

কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার বাবাকে রেখে আসতে চাইত না। এ কারণে তার মন খারাপ থাকত। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় ১৯৬৬ সালের ১৫ জুনের দিনলিপিতে রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না- যে পযর্ন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করছে। জেল গেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকেছিল। আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরেই ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি। যাবার সময় হলে ওকে ফাঁকি দিতে হয়।”

শিশু রাসেল ছিল অভিমানী। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন ‘কারগারের রোজনামচা‘য়। ১৯৬৭ সালের ১৪-১৫ এপ্রিল অন্যান্য প্রসঙ্গ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু রাসেলকে নিয়ে লিখেছেন-

“জেল গেটে যখন উপস্থিত হলাম ছোট ছেলেটা আজ আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে আশ্চর্যই হলাম। আমি যখন রুমের ভিতর যেয়ে ওকে কোলে করলাম আমার গলা ধরে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করল। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কি?’ ওর মা বলল,“বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে।” রাসেল ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকতে লাগল। যেই আমি জবাব দেই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার উপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়। এখন আর বিদায়ের সময় আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।”

শিশু রাসেলকেও কাটাতে হয় বন্দিজীবন। অত্যন্ত কষ্টকর ছিল তার দিনগুলো। তার বন্দিত্ব সম্পর্কে বোন শেখ হাসিনা ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ নিবন্ধে লিখেছেন-

“ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবন-যাপন শুরু করে। ঠিকমতো খাবার-দাবার নেই। কোন খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো। বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোন খবর আমরা জানি না। কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানি না। প্রথমদিকে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। তার ওপর আদরের কামাল ভাইকে পাচ্ছে না, সেটাও ওর জন্য কষ্টকর। ” (ইতিহাসের মহানায়ক: পৃষ্ঠা ২১)।

ছোট থেকে বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে দেখতে দেখতে বড় হওয়া রাসেল অজান্তেই চাপা স্বভাবের হয়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে বিষয়ে বক্তৃতায় বলেন-

‘খুব চাপা স্বভাবের ছিল। সহজে নিজের কিছু বলতো না। তার চোখে যখন পানি, চোখে পানি কেন জানতে চাইলে বলতো, চোখে যেন কী পড়েছে। ওইটুকু ছোট বাচ্চা, নিজের মনের ব্যথাটা পর্যন্ত কীভাবে লুকিয়ে রাখতে হয় শিখেছিল।’

শেখ রাসেল ছিল বন্ধুবৎসল, গরিবদের জন্য ছিল তার দরদ, মমতা। জাতির পিতার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়াতে যখন সে যেত তখন গ্রামের ছেলেদের জন্য সে জামা নিয়ে যেত। তাদের উপহার দিত। আজ শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে দেশ একজন মানবদরদি মানুষ পেত।

শেখ রাসেলের এই ছোট্ট জীবন আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয়। প্রথমত, আমাদের শিশুরা যদি শেখ রাসেলকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে তার মতো বেড়ে ওঠে, তাহলে আমরা আদর্শ শিশু পাব। যাদের হাত ধরে বিনির্মিত হবে আগামীদিনের চেতনার নাগরিক। শিশুদের তাই, শেখ রাসেলের ছোট্ট জীবনটা জানাতে হবে। যাতে শিশুরা অনাবিল সুন্দরের সৌন্দর্যে বেড়ে ওঠে, হাসতে পারে, খেলতে পারে, দুষ্টুমি করতে পারে, বন্ধুত্ব করতে পারে, গরিব মানুষকে ভালোবাসতে পারে। এভাবে যদি প্রতিটি শিশু বেড়ে ওঠে তাহলে এই শিশুরা বড় হয়ে আলোকিত মানুষ হতে পারে। একারণেই শেখ রাসেলের জীবন আমাদের জানাটা অত্যন্ত জরুরি।

শেখ রাসেল নিজেকে কীভাবে গড়ে তুলত তা বলার উপায় নেই। তবে পারিবারিক ঐতিহ্য, আদর্শের উত্তরাধিকার তার চরিত্র গঠনে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, তাতে সন্দেহ নেই। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় অন্তত এই দেশ, দেশের মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ থাকত তার অন্তর ও চেতনাজুড়ে। পরিণত হয়ে উঠত দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য। তার আগ্রহের বিষয়গুলো আয়ত্ত করে সেখানে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারত। সেটিই স্বাভাবিক ছিল তার জন্য।

আজ রাসেল থাকলে একজন মেধাবী মানুষ বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার সংগ্রামে থাকত প্রথম সারিতে। দুর্ভাগ্য এই যে, জীবনের পথ, ইতিহাসের গতিধারা সব সময় স্বাভাবিক সূত্র ধরে এগোয় না। অনভিপ্রেত বহু ঘটনা এসে সেই যাত্রাপথ বিপৎসংকুল করে তোলে, বাঁক ঘুরিয়ে দেয়, ভিন্নখাতে নিয়ে যায়। তখন আবার সঠিক পথে ফিরতে প্রয়োজন হয় কঠিন সংগ্রামের।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে এমনি এক ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করা হয়েছিল এই দেশকে। এরই নির্মম শিকার হয়েছিল শিশু শেখ রাসেল। ফলে তার জন্মদিনটি আনন্দ নয়, বরং বেদনাই বয়ে আনে বিবেকবান মানুষের কাছে।

শেখ রাসেলের সেই বেদনাঘন জন্মদিন আজ। আমরা শেখ রাসেলের পাশাপাশি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের শহীদদের স্মৃতিও এই দিনে স্মরণ করি। একাত্তরের পরাজিত ঘাতক বাহিনী দেশ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে দিতে এ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। আর আইন করে সেই আত্মস্বীকৃত খুনিদের দায়মুক্তি দেয়া হয়। আশার কথা হলো- বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল করে খুনিদের বিচারের আওতায় এনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করেন।

শেখ রাসেলের জন্মদিন ১৮ অক্টোবর। এ বছর থেকে ‘জাতীয় দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে আগামী বছরগুলোতে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ শেখ রাসেল দিবস পালনের প্রস্তাব এবং যৌক্তিকতা মন্ত্রিসভায় পেশ করে। ২৩ আগস্ট ২০২১, মন্ত্রিসভার বৈঠকে শেখ রাসেল দিবস ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালনের বিষয়ে অনুমোদন দেয়া হয়। এর জন্য আমরা আইসিটি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

শিশু শেখ রাসেলের অকালপ্রয়াণের শোক-দুঃখ কোনো দিন শেষ হবার নয়। শেখ রাসেলের জন্মদিনে আমাদের কামনা শুধু আমাদের দেশ নয়, সারা পৃথিবীই শিশুদের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠুক। হানাহানির অবসান হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক চিরকাঙ্ক্ষিত শান্তি।

লেখক: সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়

আরও পড়ুন:
খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি
২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন
দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

শেয়ার করুন

অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক

অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক

অজয় দাকে অনেক ব্যাপারেই আমার মনে পড়বে। ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নিপীড়নের ঘটনা দেশে ঘটতে থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এসবের বিরুদ্ধে আমৃত্যু প্রতিবাদী সোচ্চার কন্ঠ ছিলেন।

এবার বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় তাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপন করতে পারেনি। কুমিল্লা শহরের একটি পূজামণ্ডবে হনুমানের কোলে কে বা কারা একটি কোরআন রেখে যায়। কোনো হিন্দু এটা করতে পারে না। কারণ পূজা অনুষ্ঠানে অন্য ধর্মের গ্রন্থ রাখা পূজার পবিত্রতার সঙ্গেই যায় না। আবার কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমানও তার পবিত্র গ্রন্থ পূজামণ্ডবে রাখতে পারেন না। এাটও তার বিশ্বাসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। তাহলে কে রাখল পূজামণ্ডপে কোরআন?

মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়ে যারা দেশে দাঙ্গাফ্যাশাদ বাধিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায় তাদের মাথা থেকেই এই নষ্ট ও দুষ্ট বুদ্ধি বের হয়েছে। কোরআনের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করার গুজব ছড়িয়ে দেশের কয়েকটি স্থানে পূজাস্থলে আক্রমণ হয়েছে, প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে এবং হিন্দুদের কিছু বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা, ভাঙচুর হয়েছে। দুএক জায়গায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

বিভিন্ন জায়গা থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার খবর শুনে আমার একজন মানুষের কথা খুব মনে হয়েছে। তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ফোন করতেন এবং কিছু একটা করার জন্য ছটফট করতেন। তিনি অজয় রায়, বাংলাদেশের প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন অগ্রণী যোদ্ধা। মানুষে মানুষে সাম্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তার জীবন নিবেদিত ছিল। আজ ১৭ অক্টোবর অজয় রায়ের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালে তার প্রয়াণ হয়।

অজয় রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭৩ সালের দিকে। কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হয়ে তার নিজের জেলা ময়মনসিংহ থেকে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ঢাকা আসার পর। তবে তার সম্পর্কে জানি আরও আগে থেকে।

আমি যেহেতু স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম এবং রাজনৈতিক বইপুস্তিকা পড়ার অভ্যাস ছিল, সেহেতু অজয় বায়ের ‘বাংলা ও বাঙালী’ পড়া হয়েছিল। তাছাড়া কারাগারে ও আত্মগোপনে থাকা কমিউনিস্ট নেতাদের বিষয়ে জানার আগ্রহ থেকেও আমি অজয় রায় সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে ছিলাম তার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের আগেই।

তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন, জেলে বসে পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেছেন, তার বাবাও ছিলেন বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, চার ভাষায় পণ্ডিত– এসব তথ্য জেনে একদিকে যেমন তাকে নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে, অপরদিকে তেমনি কমিউনিস্ট হওয়ার ঝোঁকও প্রবল হয়েছে। কমিউনিস্টরা সব অসাধারণ মানুষ, তারা একদিকে ধীমান, অপরদিকে আত্মত্যাগী– এগুলোই আমাকে আকৃষ্ট করেছিল সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ তত্ত্বকথা তার পরের বিষয়। রাজনীতি-অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি সব বিষয়ে অজয় রায়ের জ্ঞানের কথাও তার সঙ্গে পরিচয়ের আগেই জানা।

অজয় দাকে বাইরে থেকে দেখে একটু গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ বলে মনে হলেও বাস্তবে তিনি তা ছিলেন না। তার মতো অমায়িক মানুষ খুব বেশি দেখিনি। তার সঙ্গে সহজেই মেশা যেত, কথা বলা যেত, তর্কাতর্কিও করা যেত। তার সঙ্গে আমার বয়সের অনেক ব্যবধান সত্ত্বেও তিনি আমার সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণই করতেন। আমার ধারণা অন্যদের সঙ্গেও তাই। কারণ এটাই ছিল অজয় দার বৈশিষ্ট্য।

অজয় দার মধ্যে পাণ্ডিত্য জাহিরের কোনো ভাব ছিল না। অন্যের মত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, নিজের মত চাপিয়ে দিতেন না। পার্টির কোনো সিদ্ধান্ত আমার মনঃপূত না হলে অজয় দার কাছে গিয়ে তর্ক জুড়ে দিতাম। তার সঙ্গে অনায়াসে তর্ক করা যেত। যুক্তি পাল্টাযুক্তির লড়াই শেষ করতেন অজয় দা এভাবে : কমরেড, আপনার কথায়ও যুক্তি আছে। কিন্তু এখন পার্টির সিদ্ধান্ত তো মানতেই হইবো। আমাকেও রণে ভঙ্গ দিতে হতো। পার্টির সিদ্ধান্ত বলে কথা! তার কোনো নড়চড় হওয়ার সুযোগ নেই।

অজয় দা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। অর্থনীতি ও শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক বিশিষ্টজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। কমিউনিস্ট কিংবা কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন নন এমন কারো কারো সঙ্গেও অজয় দার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

তার সরলতা, জ্ঞান-বুদ্ধি অন্যদের সহজেই আকর্ষণ করত। কমিউনিস্ট পার্টি যে একটি বিশেষ কালপর্বে দেশের রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাববলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল তার পেছনে অজয় দা’র মতো মানুষদের ব্যক্তিগত ভূমিকা একেবারে গৌণ নয় বলেই আমি মনে করি।

অজয় দা পার্টির সাপ্তাহিক মুখপাত্র ‘একতা’র সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। আমি একতায় কাজ করতাম। সেই সুবাদেও তার সঙ্গে আমার কাজের সম্পর্ক ছিল। তিনি একতায় লিখতেন। তার লেখা সংগ্রহের জন্য ওয়ারীর বাসায় যেতে হতো। কখনও কখনও আমাকে বসিয়ে রেখেই লেখা শেষ করতেন। তাতে আমি একটুও বিরক্ত হতাম না। বরং দেরি হোক মনে মনে সেটাই চাইতাম, জয়ন্তী বৌদির সুস্বাদু চা-নাশতা পাওয়ার লোভে।

একতা সম্পাদক মতিউর রহমানের বাসাও ছিল ওয়ারীর লারমিনি স্ট্রিটে। মতি ভাইয়ের বাসায় প্রায় প্রতি সকালেই যেতে হতো। সুযোগ পেলে কখনও কখনও অজয় দা’র বাসায় ঢুঁ মেরে আসতাম। অজয় দার সঙ্গে কতদিন কত বিষয়ে কত কথা হয়েছে তার সব কিছু এখন মনেও নেই। যদি দিনপঞ্জি লেখার অভ্যাস থাকত তাহলে অজয় দাকে নিয়ে আমার লেখা আরও তথ্যপূর্ণ হতো।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় সোভিয়েত বিপর্যয়ের পর সিপিবির মধ্যেও আদর্শিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। অজয় দাকে যেহেতু পার্টির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে দেখা হতো, সেহেতু আদর্শিক দ্বন্দ্বে তার অবস্থান কোনদিকে সেটা জানার আগ্রহ নিয়ে অজয় দার সঙ্গে আলোচনায় বসে বিস্মিত হলাম সংস্কারের পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থান দেখে! আমার ধারণা ছিল তার মতো একজন পুরোনো কমিউনিস্ট তার এতদিনের লালিত বিশ্বাস থেকে নড়বেন না। কারো কারো কাছে মার্কসবাদ যতটা না দর্শন, তারচেয়ে বেশি বিশ্বাস। আরও নির্দিষ্ট করে বললে অন্ধ বিশ্বাস! আমার মনে হয়েছিল, অজয় দা তার এতদিনের বিশ্বাস আঁকড়ে থাকবেন।

মার্কসবাদী দর্শনকে অভ্রান্ত মনে করে কমিউনিস্ট পার্টি রক্ষায় জানপ্রাণ দিয়ে নামবেন। বাস্তবে তিনি বিপরীতটাই করলেন। আমাকে বললেন, শুধু তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশে আর বাম আন্দোলন এগিয়ে নেয়া যাবে না। সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টান্ত দিয়ে, অসংখ্য কমিউনিস্টের আত্মত্যাগ, সংগ্রামের উদাহরণ দিয়েও যেখানে আমরা মানুষের ব্যাপক সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়েছি, সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর মার্কসবাদী তত্ত্বের সঠিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় এখন নতুন ভাবনার বিকল্প নেই।

এই নতুন ভাবনার অংশ হিসেবেই দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে গেল। এই ভাঙনে অজয় দা পক্ষ নিলেন সংস্কারবাদীদের। তিনি ছিলেন নেতা, কাজেই বলা যায় তিনি পার্টি ভাঙনে আরও অনেককে নিয়ে নেতৃত্ব দিলেন। এরপর আমৃত্যু অজয় রায়ের কেটেছে এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। কাজের ক্ষেত্র খুঁজেছেন, সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। কতটুকু সফল হয়েছেন সে বিচার এখনই নয়।

তিনি ছিলেন চিন্তাশীল প্রগতিকামী সদাসক্রিয় মানুষ। মানবকল্যাণ, মানবমুক্তির যে স্বপ্ন নিয়ে কৈশোরকালেই নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন রাজনীতিতে সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা থেকে কখনই বিরত থাকেননি। নানা ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন অজয় দা। শেষ পর্যন্ত থিতু হয়েছিলেন সামাজিক আন্দোলন নামের একটি সংগঠনে। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী একটি জাতীয় মঞ্চ গড়ে তুলতেও তিনি ভূমিকা পালন করেছিলেন।

অজয় দা যে উদ্যোগই নিয়েছেন তাতে শামিল হওয়ার জন্য আমাকে ডাকতেন। তার ডাকে সাড়া না দিতে পেরে খারাপ লেগেছে। কিন্তু আমার মনে হতো, এভাবে হবে না। আবার কীভাবে হবে সে সম্পর্কে আমার নিজের কোনো স্পষ্ট ধারণাও নেই। তাছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগে জড়িত না হওয়ার ব্যাপারে আমি দৃঢ়মত। অজয় দার বয়স হয়েছিল।

যখন তার অবসর কাটানোর কথা তখন তিনি নানা ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য সভা ডাকছেন, মানববন্ধন করছেন। রক্তে তার মিশেছিল অন্যায় অনাচার অসাম্যের বিরোধিতা করা। চোখের সামনে এসব ঘটতে দেখলে তিনি কি নিশ্চুপ থাকতে পারেন? পুরোনো বন্ধুদের তিনি পাশে চাইতেন। খুব সাড়া পেতেন না। কিন্তু তিনি হতোদ্যম হতেন না। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’… অজয় দা যেন শেষ জীবনে এই নীতি নিয়েই অগ্রসর হয়েছেন।

অজয় দা পার্টি ত্যাগের পর যদি আর কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগে না জড়িয়ে লেখালেখিতে অধিক মনোযোগী হতেন, তাহলে সেটাই বেশি ভালো হতো বলে আমি অন্তত মনে করি। অজয় দা বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি বই অনেকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। সময় দিয়ে তিনি যদি লেখালেখি চালিয়ে যেতেন তাহলে আমরা আরও কিছু মননশীল বই পেতে পারতাম। শেষদিকে রোগশয্যায় শুয়েও তিনি একটি বই লিখে গেছেন। রাজনীতি নয়– বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চাই ছিল অজয় রায়ের উপযুক্ত ক্ষেত্র।

অজয় রায়– ‘কমরেড’ তকমা নাম থেকে মুছতে পারেননি। আবার অন্য পরিচয়ও তার ওপর বেশি আলো ফেলতে পারেনি। তবে এই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্যই ছিল তার জীবন উৎসর্গীকৃত। অসাম্প্রদায়িক-বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক একটি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি বিরামহীন শ্রম দিয়েছেন। কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা নয়- নিজে দেশ ও সমাজকে কী দিতে পারছেন সেটাই ছিল তার জীবনসাধনা।

অজয় রায় আমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। রেখে গেছেন কর্মনিষ্ঠার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। যারা সমাজ প্রগতিতে বিশ্বাস করেন, যারা অসাম্প্রদায়িক দেশের জন্য সংগ্রাম করছেন তাদের কাছে যদি অজয় রায় প্রাসঙ্গিক বিবেচিত হন তাহলে তার জীবনসাধনা বিফল বলে মনে হবে না। অজয় দাকে অনেক ব্যাপারেই আমার মনে পড়বে। ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নিপীড়নের ঘটনা দেশে ঘটতে থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এসবের বিরুদ্ধে আমৃত্যু প্রতিবাদী সোচ্চার কন্ঠ ছিলেন।

পরিণত বয়সেই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। ১৯২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর– এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অজয় রায় এ দেশের রাজনীতি-সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানবকল্যাণে বড় অবদান রেখেছেন। প্রগতির পথ রচনায় তার অবদানের কথা আমাদের মনে করতেই হবে।

অজয় দার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা!

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন:
খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি
২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন
দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

শেয়ার করুন

অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে

অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে

বাংলাদেশ বহুকাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে সারা দুনিয়ায় প্রশংসিত। এ ধরনের হামলা দেশের হাজার হাজার পূজামণ্ডপের মধ্যে একটি মাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু তারপরও আমাদের জন্য এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, এক চরম লজ্জার। দেশের একটি গ্রামের অখ্যাত এক পূজামণ্ডপে এই ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা উগ্র সাম্প্রদায়িক এবং এর পেছনে মৌলবাদী রাজনীতি সক্রিয়।

পশ্চিমবঙ্গের এক বন্ধু ১৪ অক্টোবর রাতে মেসেঞ্জারে একটি লাইভ অনুষ্ঠান ফরোয়ার্ড করেছিলেন, যেখানে এক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে হামলা প্রসঙ্গে ধারাভাষ্য দিয়ে এই অবাঞ্চিত ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। হামলার ভিডিও চিত্রটি তিনি পুরোপুরি দেখাননি, আংশিক দেখিয়ে বার বার বলছিলেন, এ দৃশ্য আমরা দেখাতে চাই না, বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে, যা আমরা কখনও চাই না। ভদ্রলোক বাংলাদেশের একটি অঞ্চল বিশেষের মৌলবাদীদের দ্বারা সংঘটিত এই হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেননি। মনে হয়েছে যেন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের একটি রাষ্ট্র। যদিও প্রকৃত বাস্তবতা তা নয়।

বাংলাদেশ বহুকাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে সারা দুনিয়ায় প্রশংসিত। এ ধরনের হামলা দেশের হাজার হাজার পূজামণ্ডপের মধ্যে একটি মাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু তারপরও আমাদের জন্য এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, এক চরম লজ্জার। দেশের একটি গ্রামের অখ্যাত এক পূজামণ্ডপে এই ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা উগ্র সাম্প্রদায়িক এবং এর পেছনে মৌলবাদী রাজনীতি সক্রিয়। সরকারের তরফ থেকে সর্বাত্মক নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টির পরেও দেশের পাড়াগাঁর একটি পূজামণ্ডপে এই ঘটনা সমস্ত গৌরবকে ম্লান করে দিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর তথা দেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে যে উগ্র প্রতিবাদ মিছিল বেরিয়েছিল, তাও কারো কাঙ্ক্ষিত ছিল না।

ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দেশে যারা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পূজামণ্ডপে প্রতিমার পায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চেয়েছিল, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক নষ্ট করার অপচেষ্টা করেছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চয়ই তাদের স্বরূপ উন্মোচিত হবে। কিন্তু তার আগে আমরা লজ্জিত হলাম আমাদের অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ওপর কিছু ধর্মান্ধ লোকের এই বর্বর আচরণের কারণে। আমাদের রাষ্ট্রীয় গৌরব ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

এই বর্বরোচিত ঘটনার পর সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। টেলিভিশনের টকশোগুলোতে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে ওই বিচ্ছিন্ন ঘটনাই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানসহ সবাই দোষীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা এই অপকর্ম করেছে তাদের এমন শাস্তি দেয়া হবে- যেন ভবিষ্যতে আর কোনোদিন কেউ এ ধরনের দুঃসাহস দেখাতে না পারে। দেশের শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে আমরাও চাই এ ধরনের বর্বরতা চিরতরে বন্ধ হোক।

এই ঘটনার আগে পর্যন্ত আমরা সারা দেশের হাজার হাজার পূজামণ্ডপের যে শান্তি শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ দেখেছি, তাতে সংগত কারণেই সবাই আশা করেছিল, নিরাপত্তার জন্য এবার কোথাও কোনো হুমকি নেই। কিন্তু কুমিল্লা জেলার একটি গ্রামে এই ঘটনা সেই সুন্দর আয়োজন এবং প্রস্তুতিকে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করলই।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার উৎসবে মুখর ছিল নেপাল, ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশসহ গোটা উপমহাদেশ। টেলিভিশন, সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও বাংলাদেশে ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল প্রতিমা তৈরি থেকে মহানবমী পর্যন্ত সমস্ত আয়োজন। বিজয়া দশমীর সমাপনী অনুষ্ঠানের একদিন আগে এই ঘটনা হিন্দু সম্প্রদায়কে যেমন, তেমনই বাংলাদেশের কিছু ধর্মান্ধ লোক ছাড়া বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকেই ব্যথিত করেছে। আমরা আশা করছি এ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের কোথাও কারো মনে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হবে না।

জনসংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিকরা কম হলেও সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রশাসনে তাদের গুরুত্ব ও অবদান মোটেও কম নয়। গ্রাম-প্রশাসন থেকে উপজেলা, জেলা পার হয়ে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয় পর্যন্ত সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে অনেকেই মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত আছেন এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন।

আমরা আশা করতে চাই, কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলায় জড়িত অপরাধীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই দেশের ললাটে লেপ্টে দেয়া এই কলঙ্কের কালি মোচন সম্ভব।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপের ঘটনার ফলোআপ যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে, তখন একই সঙ্গে দেখছি বাড়তি ব্যয়ে বেসামাল মানুষের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরছে দেশের পত্রপত্রিকা আর টেলিভিশনসহ অনলাইন পোর্টালগুলো। চাল-ডাল, পেঁয়াজ-তেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত একমাসে যেভাবে হু হু করে বেড়েছে, তা এককথায় অপ্রত্যাশিত। বাজার নিয়ন্ত্রক অসাধু ব্যবসায়ীদেরই এক একটি সিন্ডিকেট মানুষকে জিম্মি করে প্রতিবছরই এভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

২৫ টাকার পেঁয়াজ যখন ৮৫ টাকা কেজি হয়, তখন বুঝতে অসুবিধা থাকে না, কীভাবে ১৫ দিনের ব্যবধানে এমন উল্লম্ফন ঘটতে পারে দামের ক্ষেত্রে। চাল বলুন আর পিঁয়াজ বলুন, কোন পণ্যের ঘাটতি নেই দেশে। ধানচালের উৎপাদন যে এত বিপুল পরিমাণ, তারপরও চালের দাম কমে না, বরং বেড়েই চলেছে। কেন বাড়ছে তার কারণ সরকারও জানে এবং সাধারণ মানুষও অনুমান করতে পারে। চালের মজুত তো বেশি থাকার কথা সরকারের গুদামে, কিন্তু সরকারের গুদামের চেয়ে বেশি থাকে চালকল মালিকদের গোডাউনে। পেঁয়াজ-চিনি, তেল-আলুসহ প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রেই অসাধু মুনাফাখোর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে আছে বহু বছর ধরে।

এই সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের মন্ত্রণালয়ের যে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে, তারা কি তাদের যথাসময়ের যথা কাজটি করেন? যে সময় অসাধু ব্যবসায়ী চক্র নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে চলে, তখন কি সরকারের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবি বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে এই পণ্যটি ছাড়ে? যদি ছাড়তে পারত তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীচক্র সাধারণ মানুষকে এইভাবে জিম্মি করতে পারত না।

ভেবে পাই না কোন যুক্তিতে প্রতিবছর আগস্ট-সেপ্টেম্বর আসা মাত্র মানে বর্ষা মৌসুম এলেই পেঁয়াজের দামে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যায়? এ প্রশ্নের সদুত্তর কারো কাছ থেকেই পাওয়া যায় না।

গত ১১ অক্টোবর রাতে একাত্তর টিভির টকশোত ফারজানা রুপা পেঁয়াজের বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট সকলকে উপস্থিত করেছিলেন তার অনুষ্ঠানে। পেঁয়াজের বড় ব্যবসায়ী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার তদারক করেন- এমন একজন অতিরিক্ত সচিবসহ দুজন সাংবাদিক অনুষ্ঠানে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করলেন, কিন্তু কিছুতেই সমাধানে পৌঁছানো গেল না!

পেঁয়াজের ব্যবসায়ীকে বার বার একই প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভারতে বৃষ্টি হলে কিংবা রপ্তানি বন্ধ হলে বাংলাদেশের বাজারে দাম বাড়ে, কথা ঠিক, কিন্তু সেই বাড়ার জন্য ভারত থেকে আমদানির যে সময় লাগে, কমপক্ষে সেই ১০দিন তো পুরো বাজারে মূল্য স্থিতিশীল থাকার কথা। পুরোনো পেঁয়াজ কেন বাড়তি দামে তাহলে বিক্রি হবে? এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি ওই নেতা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও কেন বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজটি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে করতে পারেন না? তারও সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিশেষ করে তেল আর চিনির কথাটাই বলি। দেশের বাজারে ক্রমাগত তেল আর চিনির দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে ওই সব পণ্যের মিল মালিকরা বলছেন বিশ্ববাজারের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়েই এই অবস্থা। কিন্তু আসল ব্যাপার বিশ্ব বাজারের নামে নিজেদের বাড়তি লাভের পরিস্থিতি তৈরি করা।

২০দিন আগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভোগ্য পণ্যের মূল্যের এতটা ঊর্ধ্বগতি অযৌক্তিক। গত সেপ্টেম্বরেই দাম বাড়ানো হয়েছে তেল এবং চিনির। আবারও মিল মালিকরা প্রস্তাব করেছেন বিশ্ববাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির অজুহাতে কেজিপ্রতি দাম চার থেকে ছয় টাকা বাড়াতে। আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করলে নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা যায় না। কারণ, টানা বৃদ্ধির পরে এখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম প্রতি টন ১৩১৪ ডলার। একমাস আগে ছিল ১০৪৫ ডলার। প্রতিটনে কমেছে ৩১ ডলার বা ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। কিন্তু আমাদের দেশে তাহলে সয়াবিনের দাম বাড়বে কেন? এই প্রশ্নের সদুত্তর মিলছে না! গত মাসে দেশে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে!

টিসিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত একবছরে দেশে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৫২ শতাংশ আর চিনির দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে তেল আর চিনির দাম যে পরিমাণ বেড়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে বেড়েছে অনেক বেশি। তারপরও তিনদিন আগে তেল-চিনি পিঁয়াজের শুল্ক কোনো কোনো ক্ষেত্রে তুলে দিয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিয়ে দিয়েছে সরকার।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয় করতে গিয়ে ট্যারিফ কমিশন দফায় দফায় অযৌক্তিক দাবিও মেনে নিয়েছে ব্যবসায়ীদের। আইনে রয়েছে বলে সরকারকে বার বার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়, যা লোকদেখানো, বলছেন বাজার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা।

এই যে চাল-ডাল, তেল-চিনি, আটা-পেঁয়াজের দাম বেড়ে চলেছে, তাতে মনে হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যেন কিছুই করার নেই! দেশের ১০টি জেলার মানুষ এখন বন্যাকবলিত। চরম দুর্ভোগে আছে তারা। মূল্যস্ফীতি তাদের মড়ার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। সরকার লাগামহীন মূল্যস্ফীতির সুযোগ না দিয়ে সময়মতো পর্যাপ্ত আমদানি করলে এবং তা সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে বাজারে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিলে এতটা লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এত উন্নয়ন করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে চলেছেন, অর্থনৈতিকভাবে দেশকে দৃষ্টান্তমূলক সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন, বিশ্ববাসীর কাছে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, অথচ সেই অর্জন নষ্ট করে দেবার মতো সীমিত আয়ের মানুষের চরম দুর্ভোগের কারণ এমন অযৌক্তিক মূল্যস্ফীতিও কি মেনে নেয়া যায়? সীমিত আয়ের বিপুলসংখ্যক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ বাজারের আগুনে পুড়ছেন এখন। যেকোনো মূল্যেই হোক এ আগুন নিভাতেই হবে।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক, উপদেষ্টা সম্পাদক দৈনিক দেশের কণ্ঠ।

আরও পড়ুন:
খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি
২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন
দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

শেয়ার করুন

‘অন্তর মম বিকশিত করো’

‘অন্তর মম বিকশিত করো’

কিছু মানুষের খোলসের ভেতর এখন দানবের অবয়ব। আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশটা ভয়াবহ দানবে ছেয়ে গেছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা মানুষকে কতটা রুচিহীন-দায়িত্বহীন-সংস্কৃতিহীন ও বোধহীন করেছে; চারপাশে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। মনুষ্যত্বের জায়গাটা বড়ই নড়বড়ে হয়ে গেছে, ভয়াবহ অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে মানুষের মনোজগতে।

আদিতে রাষ্ট্র ছিল না। রাষ্ট্রের আগেই সম্প্রদায় ছিল, সমাজ ছিল। রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে অনেক অনেক পরে। সমাজে সম্প্রদায়সমূহের সুশৃঙ্খল বিন্যাসের নিমিত্তেই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মঙ্গলের জন্য সাধারণ ইচ্ছার ফল হিসেবে সামাজিক চুক্তির বাস্তব রূপই রাষ্ট্র।
একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের একত্রিত মঙ্গলার্থে কাজ করতে রাষ্ট্রগুলো আর ইচ্ছুক নয়। এখন দেশে দেশে অতিমাত্রায় আগ্রাসী, উগ্র ও জাতীয়তাবাদী সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তারা বিভিন্ন বিভাজনে বিভাজন করছে রাষ্ট্রের মানুষদের। এসব কর্তৃত্ববাদী সরকারের কারণে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ, সম্প্রদায়, গোত্রের মানুষ অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে মানুষে মানুষে বিভেদ-প্রভেদ, সংঘাত। মানুষ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে, তৈরি হচ্ছে আস্থাহীনতা। মানুষ ভাবতে শুরু করেছে যেকোনো মেরুকরণের কারণে সে হতে পারে নির্যাতিত, নিপীড়িত, বাস্তুহীন, এমনকি রাষ্ট্রহীন।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সারা পৃথিবীতে যুগে যুগে সংখ্যালঘুরা নিগৃহীত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, উপেক্ষিত। তা সে জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু যা-ই হোক না কেন । জিন্নাহ-নেহেরুর ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের কুফল সরাসরি ভোগ করছে মানুষই।
শুধু ধর্মের কারণে দুটি ভূখণ্ড যে এক থাকতে পারে না, সেটাও একাত্তরে ফায়সালা হয়ে গেছে। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, এদেশের মাটি-পানি, বায়ুতে বেড়ে ওঠা মানুষেরা কখনোই আলাদা সত্তা নয়। তারা একই হৃদয়ের অভিন্ন মানুষ। যুগে যুগে রাজনীতি এবং অর্থনীতির নোংরা খেলায় পর্যুদস্ত হয়েছে জীবন, জীবনের বোধ, মর্যাদা।

সুজলা-সুফলা শ্যামল বাংলার সবুজে আচ্ছাদিত এই দেশটিতে গত শতাব্দীর শেষের দিকেও দেখেছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চমৎকার সহাবস্থান। ধর্ম-বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে একজন আরেকজনের পরম বন্ধু, আত্মার আত্মীয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে একত্রিত হওয়া, ঈদে পুজোয় অন্য ধর্মের বন্ধুদের বাড়িতে নেমন্তন্ন খাওয়া, মণ্ডপে মণ্ডপে পুজো দেখতে যাওয়ার চমৎকার রেওয়াজ ছিল। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে, উগ্র হতে দেখিনি। ভারতের বাবরি মসজিদ ইস্যুতেও অনেকটাই সুস্থির ছিল আমাদের এই ভূখণ্ড। সেটিও ছিল রাজনৈতিক চক্রান্ত।
চোখের সামনেই পাল্টে গেল দেশটা। ক্রমান্বয়ে স্বার্থ হাসিলের সবচেয়ে বড় পুঁজি হয়ে দাঁড়াল ধর্মীয় অনুভূতি। বিবেকহীন হতে হতে উন্মত্ততা বাসা বাঁধল মগজে। মানুষকে কুপোকাৎ, ঘায়েল করার পুরোনো মোক্ষম অস্ত্র ধর্মীয় অনুভূতিকেই বার বার কাজে লাগায় স্বার্থান্বেষীরা। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। মাঝখান থেকে ঝোঁকের মাথায় বুঝে উঠতে না পারা অকারণ কিছু প্রাণ গেল।
কিছু মানুষের খোলসের ভেতর এখন দানবের অবয়ব। আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশটা ভয়াবহ দানবে ছেয়ে গেছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা মানুষকে কতটা রুচিহীন-দায়িত্বহীন-সংস্কৃতিহীন ও বোধহীন করেছে; চারপাশে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। মনুষ্যত্বের জায়গাটা বড়ই নড়বড়ে হয়ে গেছে, ভয়াবহ অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে মানুষের মনোজগতে।
এক অন্ধকার সময়ে, অন্ধকার পৃথিবীতে আলো খুঁজে ফিরছি আমরা যারা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু কোথাও আলো নেই। চারদিকে শুধু বিষাদাচ্ছন্ন অন্ধকার।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদযাপনের সময়ে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নিয়ে সাম্প্রদায়িক ঘটনাটি একেবারেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। কারণ যাদের ধর্মীয় উৎসব চলছে; তারা নিজের ধর্মকে রক্ষা করতে, ধর্মের পবিত্রতা অটুট রাখতে, উৎসব উদযাপন ক্ষুণ্ন করতে এ কাজটি করবে না, নিশ্চিত করেই বলা যায়। খুব স্বল্প বুদ্ধির মানুষও বুঝতে পারবে, এটি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল অথবা অন্য যেকোনো কারণে হলেও অবশ্যই ধর্মীয় কারণে নয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমান বা হিন্দুদের দ্বারা কাজটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
কোনো বিশেষ পরিস্থিতির প্রথম শিকার সংখ্যালঘু মানুষ। বাড়িঘরে আগুন দিয়ে, খেতের ফসল পুড়িয়ে, শারীরিক নির্যাতন করে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিয়ে, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটিয়ে বিভীষিকা তৈরি করে তাদের দেশছাড়া করার চক্রান্ত করা হয়। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থকেন্দ্রিক এই কাজটা সুকৌশলে করার জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা অথবা সংবেদনশীল সময়ের অপেক্ষা করে সুযোগ সন্ধানীরা। এক্ষেত্রে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিবেচ্য নয়, আদিবাসী বা রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীও এর শিকার হয়।

ধনী-দরিদ্র‍, মুসলিম-অমুসলিম, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুতে, ‘উঁচু-নিচু’ বংশ, স্থানীয়-বহিরাগত, পুরুষ-নারীতে এবং এমন আরও অসংখ্য কারণে সাম্প্রদায়িকতা হয়। সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বেশিরভাগ মানুষের ভেতরই সাম্প্রদায়িকতা স্পষ্টভাবে বা সুপ্তাবস্থায় বিরাজমান থাকে।
এ কারণেই এই দেশে হিন্দু নির্যাতন হয়, ভারতে মুসলিম নির্যাতন হয়, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন হয়, চায়নায় উইঘুর জনগোষ্ঠী নির্যাতন হয়, ইউরোপ-আমেরিকায় কালো নির্যাতন হয়। যদিও সবখানে ভিন্ন মাত্রা বা কৌশল যোগ করা হয়।
বিশ্বায়নের কালে প্রতিনিয়ত আমরা একদেশ থেকে আরেক দেশে ছোটাছুটি করি। তাই কেউ একদেশে সংখ্যাগুরু হলেও অন্যদেশে সে সংখ্যালঘু। বাংলাদেশে মুসলিম হিসেবে কেউ সংখ্যাগুরু হলেও ভারত বা আমেরিকায় কিংবা শ্রীলঙ্কায় সে সংখ্যাল। বাংলাদেশে বাঙালি হিসেবে কেউ সংখ্যাগুরু হলেও ইউরোপে সে সংখ্যালঘু।
রামুর বৌদ্ধ মন্দির ভাঙা, গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লিতে আগুন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রসরাজ নামের নিরীহ ছেলেকে ফাঁসিয়ে দিয়ে বাড়ি ও মন্দিরে আগুন দেয়ার ঘটনাগুলো ঘুরেফিরে দেখতে হচ্ছে। মসজিদ- মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, প্রতিমা ভাঙার ঘটনাও বার বার দেখতে হচ্ছে। মৌলবাদী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে আর একটা প্রাণেরও বিনাশ দেখতে চাই না।
আমরা শুধু মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রিস্টান হতে চাই না। আমাদের আদি এবং অকৃত্রিম পরিচয় বাঙালি। আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, লোকাচার-ঐতিহ্য সবই বাঙালিত্বকে ঘিরে। এই জীবনবোধই আমাদের শেখায় ভিন্ন ধর্ম, জাতি, ভাষার মানুষের প্রতি সহনশীলতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্রও ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। ’৭২ সালের সংবিধানেও রাষ্ট্রীয় চারনীতির একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। তবুও অস্থিরতার এই সময়ে প্রতিমা ভাঙচুর, ভূমি দখলসহ বেশকিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটেই চলেছে। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার নজিরও কম। যে কারণে সংখ্যালঘুরা সবসময় নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। তাদের মনে অনিরাপদবোধ ও পলায়নপর মনোভাব কাজ করে, সেগুলো দূর করার জন্য সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনলে, আস্থার ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে সংখ্যালঘুরা আর নিজেদের সংখ্যালঘু মনে করবে না।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল ক্ষেত্র আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ। ছোট ভূখণ্ডের বড় জনসংখ্যার এই দেশে সবাই নিরাপদে থাকুক, স্বস্তিতে থাকুক, শান্তিতে থাকুক। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বন্ধন আরও গভীর হোক। ভালো থাকার জন্য, নিরাপদে থাকার জন্য, বিশ্বাসের জন্য এ বন্ধন খুবই জরুরি।
এই দেশ, এই মাটি সবার। এই ভূমিতে জন্ম নেয়া প্রতিটি মানুষই এ দেশের নাগরিক। কেউ এখানে সংখ্যালঘু নয়। এখানে সবার সমানাধিকার রয়েছে। নিশ্চিতভাবে যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে।
মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হলে, ভালোবাসতে হলে সভ্যতার আলোয় নিজেকে আলোকিত করতে হবে। সংস্কৃতিগতভাবে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার মাঝেই নিহিত আছে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ক্ষয়ের উপায়। ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’…
লেখক: প্রাবন্ধিক-শিক্ষক

আরও পড়ুন:
খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি
২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন
দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

শেয়ার করুন

নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা

নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা

সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আর নির্বাচন করার সুযোগ নেই। কাজেই দলীয় সরকারের অধীনেই আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ খুঁজতে হবে। যোগ্য, দক্ষ ও সাহসী কমিশন হলে দলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নির্বাচনের চেষ্টা অন্তত করতে পারে।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ। নতুন কমিশন গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনপ্রক্রিয়ার জন্য আমাদের দেশে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। তাই কথা উঠেছে একটি আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও।

কমিশন গঠনের জন্য সংবিধানে মোটা দাগে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা গাইডলাইন দেয়া আছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের সংবিধানেই এরকম কিছু নীতিমালার কথাই বলা থাকে। এর ভিত্তিতেই গঠিত হয় নির্বাচন কমিশন।

দেশের সংবিধানে আছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন হবে। রাষ্ট্রপতি এই পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ করবেন এ উদ্দ্যেশ্যে প্রণীত একটি আইনের মাধ্যমে। কিন্তু আজ অবধি আমরা ওই আইনটি হাতে পাইনি।

বাস্তবতা হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্য এরকম একটি আইন করা কঠিনই বটে। তড়িঘড়ি করে যাচাই-বাছাই ছাড়া আইন প্রণয়ন করা যেতেই পারে, কিন্তু তাতে আইনের উদ্দেশ্য সফল হয় না। উল্টো আইন নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। তবে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনেরও যে কোনো বিকল্প নেই সে বিষয়টিও আমাদের ভাবতে হবে।

বর্তমান কমিশনের মতোই যদি একটি কমিশন গঠন করা হয়, তবে সেই কমিশনের ওপর সব দলের আস্থা থাকবে কি না সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে পারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে নবগঠিত এই নির্বাচন কমিশনের অধীনেই। কাজেই এই কমিশনের ওপর আস্থার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সার্চ কমিটি গঠন করে সে কমিটির সুপারিশ করা ব্যক্তিদের নিয়েই কমিশন গঠন করতে চায়। এর মাধ্যমে সরকার মূলত নিরপেক্ষভাবে কমিশন গঠনের একটি বার্তা দিতে চায়। সন্দেহ নেই এটি একটি শুভ উদ্যোগ।

কারণ, বর্তমান সংবিধানের অধীনে এরকম কোনো সার্চ কমিটি গঠনের সুযোগ নেই। তবে সার্চ কমিটি গঠন যে সংবিধানের লঙ্ঘন সেটিও নয়। আসলে এ বিষয়ে সংবিধানে কিছু বলা নেই। আইন প্রণয়ন হলে সেখানে হয়তো কমিশনারদের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকত। যদিও ভারতে প্রণীত আইনে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কিছু বলা নেই।

বর্তমান কমিশনও সার্চ কমিটির বাছাইকৃতদের নিয়েই গঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি সব দলের কাছ থেকেই তাদের প্রস্তাবিত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নাম চেয়েছেন। বর্তমান কমিশনে বিএনপির মনোনীত একজন কমিশনারও আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শুধু একজন নির্বাচন কমিশনার, অথবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার অথবা এমনকি শুধু নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষেই কি একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব? অন্তত আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়? নিরপেক্ষতার বিষয়টি তো শুধু নির্বাচন কমিশনের একার বিষয় নয়। আর কমিশনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে এর দক্ষতা, যোগ্যতা ও সাহসিকতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

এ মুহূর্তে সার্চ কমিটি ছাড়া অন্যকোনো বিকল্প আছে কি? যাচাই-বাছাই করে একটি কার্যকর আইন প্রণয়নের সময়ও হাতে নেই। আইনমন্ত্রী যদিও বলছেন কোভিড সিচুয়েশনের জন্য আইন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেছেন,কোভিড সিচুয়েশন ইমপ্রুভ করলে পুরো সংসদে আমরা সাড়ে তিনশ’ সদস্য বসতে পারব, বসে এই রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতে পারব।’

কিন্তু আইন করার জন্য সংসদে তিনশ’ সদস্যের উপস্থিতি লাগে না। আইন পাসের জন্য সর্বনিম্ন সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট। মূল বিষয়টি হচ্ছে একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করার মতো সময় হাতে নেই। এ আলোচনাটা আরও আগেই ‍শুরু হতে পারত।

রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করে গেজেট নোটিফিকেশন জারি করেন। সংবিধান অনুযায়ী ‘নোটিফিকেশন’ ও আইনের মর্যাদাসম্পন্ন (১৫২ অনুচ্ছেদ)। কিন্তু তারপরও সার্চ কমিটি গঠন করা আইনের বিকল্প নয়। হলে অন্যান্য দেশও সার্চ কমিটি গঠন করেই কমিশন গঠন করত। কেউ আর আইন প্রণয়ন করত না। এর বিপরীতেও বলা যায়, আইন প্রণয়ন করলেই কি একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা যায়, বা নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব?

ভারত ১৯৯১ সালে আইন করেছে। ১৯৯১-এর আগে কি তারা নিরপেক্ষ নির্বাচন করেনি? এখনও পৃথিবীর অনেক দেশেই নির্বাচন কমিশনের কোনো আইন নেই, তারা কি নিরপেক্ষ নির্বাচন করছে না? কাজেই শুধু আইন প্রণয়ন করেই নিরপেক্ষ, যোগ্য ও দক্ষ কমিশন গঠন করা যায় না, যায় না নিরপেক্ষ নির্বাচন করাও। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সব দলের সদিচ্ছা বিশেষ করে সরকারের সদিচ্ছা জরুরি। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

রাষ্ট্র চালায় নির্বাহী বিভাগ। নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছা অনুযায়ীই রাষ্ট্রের সব কাজ পরিচালিত হয়। এটাই আমাদের সংবিধানের বিধান। সংবিধান অনুযায়ী দেশে সংসদীয় শাসন বিদ্যমান। রাষ্ট্রপতির এখানে কার্যত তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা।

প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব পালনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন। কাজেই যে সার্চ কমিটি গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তাও তিনি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে গিয়ে করতে পারবেন না। কমিশনার নিয়োগতো পরের কথা। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি ছাড়া সার্চ কমিটির সদস্যদের ঠিক করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই। এটাই সংবিধানের বিধান।

সার্চ কমিটিতে কারা থাকবেন সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ তারা চাইলে যে কাউকেই (গ্রহণযোগ্য) সুপারিশ করতে পারেন। সে সুপারিশ মানা না মানা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিষয়। তবে সার্চ কমিটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতেই পারে। আর রাষ্ট্রপতিও যৌক্তিক কারণেই কমিটির বাছাইকৃত ব্যক্তিদের থেকে কমিশনার নিয়োগ দেবেন। ফলে, অনেক সীমাবদ্ধতা থাকলেও সার্চ কমিটি নিরপেক্ষভাবে কাজ করলে একটি গ্রহনযোগ্য সুপারিশ এলেও আসতে পারে।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১২ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭ জনই ছিলেন বিচারপতি। বিচারপতি ও পঞ্চম প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধীনে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন থেকেই দেশে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের শুরু।

যদিও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিতর্কটি এখানে আরও আগের। ৯০-এর আগের নির্বাচন বিতর্ক যতটা না নির্বাচনকেন্দ্রিক তারচেয়েও বেশি ছিল শাসনতান্ত্রিক। কারণ, তখন দেশে গণতন্ত্রেরই উত্তরণ ঘটেনি। নির্বাচন বিতর্কতো আরও পরের কথা। ’৯০-এর পরে বিচারপতি এ. কে. এম সাদেক, মোহাম্মদ আবু হেনা, এম এ সাঈদ-এর অধীনে আমরা কয়েকটি সুষ্ঠু নির্বাচন পেয়েছি। এ নির্বাচনগুলো ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। বিচারপতি এম এ আজিজ থেকে আবার শুরু হয় নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক। এর পর শামসুল হুদা কমিশনের অধীনে আমরা ২০০৮-এর নির্বাচন পেয়েছি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হওয়ার পর গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে আমরা পেয়েছি রকিবুদ্দিন ও নুরুল হুদা কমিশন। এই দুই কমিশনের অধীনে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পর পর দুইটি নির্বাচন হয়েছে। এ দুটি নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই নতুন কমিশন গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। কমিশন ও সরকারের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। অতীতের সুষ্ঠু নির্বাচনের ইতিহাস সে কথাই জানান দেয়।

সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আর নির্বাচন করার সুযোগ নেই। কাজেই দলীয় সরকারের অধীনেই আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ খুঁজতে হবে। যোগ্য, দক্ষ ও সাহসী কমিশন হলে দলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নির্বাচনের চেষ্টা অন্তত করতে পারে।

বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ১৯৭০-এর নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগকে পছন্দ না করলেও আইনের বাইরে গিয়ে কোনো ভূমিকা রাখেননি। ফলে স্বাধীন নির্বাচনের পথ ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি।

সার্চ কমিটি হোক। সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনও হোক। সেটি সরকারের নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ার ও ইচ্ছার বিষয়। তবে রাষ্ট্রের আইন বিভাগ একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করার কাজটিও যুগপৎ করে যেতে পারে। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও ১১৮ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সেই আইনটি আমরা পাইনি। এটি সংবিধানের প্রতিও এক ধরনের অবজ্ঞা। এক এগারোকালীন শামসুল হুদা কমিশন নির্বাচন কমিশন আইনটি করার উদ্যোগ নিয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু সে আইনটি আজ অবধি আর আলোর মুখ দেখেনি। আইন থাকলে সরকারের দায়ভারও কমে। আইনানুযায়ী কমিশন গঠন হবে ও আইনানুযায়ী কমিশন কাজ করবে। তাদের যোগ্যতা, অযোগ্যতা ও কর্মপরিধি সবই আইনানুযায়ী চলবে।

কমিশনের ক্ষমতা ও জবাবদিহিও বাড়বে। তবে কমিশন যেভাবেই গঠিত হোক না কেন তাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হচ্ছে সংবিধানের ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদ-যার মাধ্যমে তারা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন এবং কেবল সংবিধান ও আইনের অধীন হবেন।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি
২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন
দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

শেয়ার করুন