দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ

দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ

১৯৭৯ সালে সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ২৬ সেপ্টেম্বরের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ৫০ অতিরিক্ত সংযোজনী হিসেবে ৬ এপ্রিল পাস করা হয়। এদের বিচার সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। যারা ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সকল অপরাধ, অপকর্মের সুবিধাভোগী তারা তাদের স্বার্থে খন্দকার মোশতাকের অবৈধ অধ্যাদেশকে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান ও চরিত্রকেই কলঙ্কিত করেছিল। এই কলঙ্ক যারা বহন ও ধারণ করেছে তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাতা হতে পারে না। তারা এর বিরোধী শক্তি। রাজনীতির এই পাঠ যারা বোঝেন না কিংবা গুলিয়ে ফেলেন তারাও ঘাতকদেরই অনুসারী।

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অবৈধ সরকারপ্রধান খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যারা বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জন নিরপরাধকে রাতের আঁধারে গুলি করে হত্যা করেছিল তাদেরকে বিচারের আওতা থেকে মুক্ত রাখার জন্য দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশটি দুটি অংশে বিভক্ত।

দুই অংশের এই অধ্যাদেশের প্রথম অংশে লেখা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থি যা-ই কিছু ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

দ্বিতীয় অংশে বলা হয়-

“রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হল। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের এবং নিকট আত্মীয়স্বজনদের যারা হত্যা করেছিল তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র যাত্রা শুরু করছিল সেটিকে মৌলিক আদর্শ থেকে সম্পূর্ণরূপে উল্টোপথে পরিচালিত করা। এজন্য তারা সামরিক বাহিনীর ট্যাঙ্ক, বন্দুক, গোলাবারুদ ব্যবহার করে। যারা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের সবাই ছিল সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কর্মকর্তা এবং অধস্তন সেনাসদস্য। এদের একটি অংশ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত ছিল, অন্য অংশটি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিল।

সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ বেশিরভাগ কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ডের গোপন কোনো ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সামান্যতম অবহিত ছিল না। তবে ধারণা করা হচ্ছে- সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা উচ্চাভিলাষী কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা গোটা ষড়যন্ত্রের পূর্বাপর প্রস্তুতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। নতুবা ট্যাঙ্কের মতো সাঁজোয়া বাহিনী সেনানিবাসের বাইরে এভাবে আগে থেকে বের হওয়ার কোনো সামরিক বিধানমতে থাকার ন্যূনতম কারণ ছিল না। তাছাড়া সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কিছু কর্মকর্তার ইচ্ছাতেই সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে কেউ কেউ বা কিছু জুনিয়র কর্মকর্তা সামরিক অস্ত্রের নির্বিচার ব্যবহার করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। যারা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল তারা সবাই অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ঘাতক চরিত্রের অধিকারী ছিল।

সে কারণে হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু, শেখ মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাত পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য এবং বাড়িতে থাকা অন্য সবাই তারা ভয়ানক আক্রোশ নিয়ে হত্যা করে। অন্য দুটি পরিবারেও আক্রোশের মাত্রা প্রায় একই রকম ছিল। দুচারজন শিশু সৌভাগ্যক্রমে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিল। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বাইরে আরও অনেকেই ছিল যারা বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের প্রহরা বসিয়েছিল। তাদের হাতেই নিহত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দিন আহমেদ বা কর্নেল জামিল নামে পরিচিত মিলিটারি সেক্রেটারি।

এছাড়া সাভারে ১১জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকেও নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা বেতার ভবন দখল এবং গণভবনে ১৫ তারিখ থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। কোনো ধরনের আইন, বিধিবিধান, সামরিক-বেসামরিক সৌজন্যতাবোধ তারা তাদের কর্ম ও আচরণে দেখায়নি। এমনকি সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে দ্বিধা করেনি। তাদের আচরণে অনেকেই ক্ষুব্ধ হলেও প্রাণভয়ে কেউ মাথা তুলতে পারেননি। রাষ্ট্রের কোথায় কে কী করবেন, কাকে বসানো হবে, কাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে সবকিছু তারা খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে একের পর এক বাস্তবায়ন করতে থাকে। খন্দকার মোশতাক অসংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে বসার পেছনে ছিল এসব হত্যাকারী ও ঘাতকদের পূর্বপরিকল্পনা। সংবিধান অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব আপনাআপনি উপরাষ্ট্রপতি তথা সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতি অর্পিত হওয়ার কথা। খন্দকার মোশতাক কোনো আইনেই রাষ্ট্রপতি পদে বসার কারণ ছিল না।

তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের অধীন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। সুতরাং তার রাষ্ট্রপতি পদ ছিল দখল করা, কোনোভাবেই সাংবিধানিকভাবে বৈধ পন্থায় নয়। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে থাকেন যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হওয়ার মানেই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। এটি দুর্জনের কুযুক্তি। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুহত্যার পর সরকার গঠনের কোনো সুযোগ পায়নি। খন্দকার মোশতাক আওয়ামী লীগ করলেও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যেহেতু তার ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্তি ছিল তাই মোশতাক ছিলেন একজন ষড়যন্ত্রকারী, ঘাতক ও ক্ষমতালোভী ব্যক্তি যিনি বঙ্গবন্ধু কিংবা আওয়ামী লীগের আদর্শের ধারক ছিলেন না।

তিনি যে একজন বিশ্বাসঘাতক, ষড়যন্ত্রকারী এবং ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তি ছিলেন সেটি ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন না যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতায় বসার জন্য আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ইচ্ছার কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়েছিল। সেই সুযোগ তখন কারো ছিল না।

সাংবিধানিকভাবে উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহণের পথ যারা রুদ্ধ করেছিল তারা প্রমাণ দিয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশ পরিচালিত হবে তাদের ইচ্ছায়, সংবিধান বা জনপ্রতিনিধিদের কোনো দায়দায়িত্ব রাখার সুযোগ দেয়া হয়নি। সুতরাং ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল বঙ্গবন্ধুর বৈধ সরকারকে সম্পূর্ণরূপে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা নিজেদের ইচ্ছেমতো দখল করা। সেকারণেই ঘাতকরা ১৫ আগস্টের রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে তাদের নরঘাতকদের চরিত্র সম্পূর্ণরূপে উন্মোচন করে সবাইকে হত্যা করেছিল। তারা কাউকেই জীবিত থাকতে দেয়নি- যারা রাষ্ট্র-রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেন।

শুধু তাই নয়, ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামানসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নেতৃবৃন্দকে প্রথমে গৃহবন্দি করে রাখে, পরে জেলখানায় বিনা অপরাধে আটকে রাখে। তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজনের ওপর শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরকারপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তার অধীনে সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। যারা তাতে সম্মতি দেননি তাদের জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এখন অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে বঙ্গবন্ধুর লাশ ৩২ নম্বরে থাকা অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের কিছু নেতা বিকাল ৪টায় মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথ গ্রহণ করেন। যারা বিষয়টিকে এত সহজভাবে উপস্থাপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন তারাও ১৫ আগস্টের ঘাতকদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের সমর্থক, মানসিকভাবে ক্ষমতা-রোগাক্রান্ত, রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পশ্চাৎ গমনেরই অনুসারী।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিল তারা রাষ্ট্রবিরোধী, মানবতাবিরোধী এবং রাষ্ট্রের সকল প্রকার প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসকারীও ছিল। এদের অপকর্মের কোনো তুলনা হয় না। কোনো স্বাভাবিক সমাজে এমন অপরাধীর বসবাস হতে পারে না। রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী হচ্ছে সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানসহ এত সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ মানুষকেই শুধু হত্যা করেনি, রাষ্ট্রক্ষমতা শুধু দখল করেনি, সংবিধানই শুধু লঙ্ঘন করেনি, সেনাবাহিনীকেও তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিক্ষেপ করে।

১৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যেসব বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছিল। তার ফলে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চেইন অব কমান্ড নষ্ট হয়ে যায়। অসংখ্য সেনা কর্মকর্তা চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে গিয়ে আত্মাহুতি দেন, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটে। গোটা সেনাবাহিনী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য মর্যাদায় ফিরে আসতে অনেক সময় নিয়েছিল। এর ফলে সেনাবাহিনী হারিয়ে ছিল অসংখ্য মেধাবী চৌকষ দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাকে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্র রাজনৈতিক হঠকারী মতাদর্শের বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়।

সেনাবাহিনীর জন্য এটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন একটি পর্ব। যা পার হতে সেনাবাহিনীকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, সময়ও নিয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। রাজনৈতিক ময়দানে সুবিধাবাদী, ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি ভাবাদর্শের রাজনীতির উত্থান ঘটে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানে এবং বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থায়। অথচ এমন এক কলঙ্কজনক এবং ইতিহাসের নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের অপরাধকে দায়মুক্তি দেয়ার জন্য খন্দকার মোশতাক ২৬ সেপ্টেম্বর এই অধ্যাদেশ জারি করে যা ছিল অবৈধ, সংবিধানবিরোধী এবং মানবতাবিরোধীও।

সেকারণেই খন্দকার মোশতাক এই অপরাধীদের দ্বারা ২ নভেম্বর দিবাগত রাত তথা ৩ নভেম্বর জেলখানার অভ্যন্তরে ৪ জাতীয় নেতাকে হত্যা করার জন্য জেলের ভেতরে বেয়নেট এবং অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়। এরপরে ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড, অবৈধ ক্ষমতা দখল, সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড বিনষ্ট এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এতসব অপরাধ সংগঠনের অপরাধীদের বিনাবিচারে দেশ থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রীয়ভাবে করে দেয়া হয়। তাদেরকে বিমানে সপরিবারে ব্যাংককে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন এক অপরাধ সংগঠনের ঘটনা যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সেই সময়কার ক্ষমতা দখলকারী এবং পরবর্তী সময়ে যারা এই অপরাধের উত্তরাধিকারী হন তাদের জন্য। এদেরকে শুধু খন্দকার মোশতাকই নয় সামরিক শাসক জিয়া, সাত্তার, এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া এবং চারদলীয় জোট সরকার বিদেশে দূতাবাসে চাকরি প্রদান, দেশে তাদের শাসনামলে অবাধে আসা-যাওয়া করার সুযোগ দেয়া, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করারও ঘটনা ঘটেছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা এই সরকারগুলো নেয়নি। অধিকন্তু ১৯৭৯ সালে সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ২৬ সেপ্টেম্বরের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ৫০ অতিরিক্ত সংযোজনী হিসেবে ৬ এপ্রিল পাস করা হয়। এদের বিচার সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

যারা ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সকল অপরাধ, অপকর্মের সুবিধাভোগী তারা তাদের স্বার্থে খন্দকার মোশতাকের অবৈধ অধ্যাদেশকে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান ও চরিত্রকেই কলঙ্কিত করেছিল। এই কলঙ্ক যারা বহন ও ধারণ করেছে তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাতা হতে পারে না। তারা এর বিরোধী শক্তি। রাজনীতির এই পাঠ যারা বোঝেন না কিংবা গুলিয়ে ফেলেন তারাও ঘাতকদেরই অনুসারী।

সংবিধানে এমন মানবতাবিরোধী আইন আমাদেরকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বহন করতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের মাধ্যমে সংবিধানে থাকা মানবতাবিরোধী কালো আইনটি রহিত করার উদ্যোগ নেয়। বিএনপি জামায়াতসহ কয়েকটি দল এর বিরোধিতা করে, সংসদে অনুপস্থিত থাকে। ১২ নভেম্বর সংসদে আইন পাসের দিন তারা হরতাল ডাকে।

তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ৫ম সংশোধনীর কালো আইনটি রহিত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ এবং এর সংবিধান মুক্তি পায় অপরাধী ও দায়মুক্তির আইন থেকে। এরপরে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলার বিচার শুরু হয়। উচ্চ আদালতের রায়ে কয়েকজনের সাজা কার্যকর করা হয়। কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশে পালিয়ে আছে। ইতিহাসে এরা মানবতাবিরোধী অপরাধী, এদের সহযোগীরা রাজনীতিতেও ১৫ আগস্টের হত্যাকারী এবং তাদের অনুসারী হিসেবে চিরকালের জন্য চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক।

আরও পড়ুন:
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব
জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ
বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

শেয়ার করুন

মন্তব্য

আলোকিত হোক মানবাত্মা

আলোকিত হোক মানবাত্মা

দেশে সরকারি দল আছে, বিরোধী দল আছে, আছে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার সচেতন নাগরিক। সবকিছু থাকার পরও কেন আমরা ‘সংখ্যালঘু’দের নিরাপত্তা দিতে পারলাম না?

আসন্ন শীতে নদী-পুকুর, খাল-বিলের পানি শুকিয়ে মাছের আকাল পড়লে আহার জুটবে কী করে, মহামারিতে মুদি দোকানটিও চলে না ঠিকমতো, তাই সারাবছর দু'মুঠো অন্ন জোগাতে দিন-রাত নিরন্তর শ্রম দিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছে না, গেল দুর্গোৎসবে স্ত্রী-সন্তানকে একখানা নতুন কাপড় কিনে দেয়ার সামর্থ্য নিয়ে কয়েকবার ভাবতে হয় যে মানুষগুলোর। কুমিল্লায় কোন মণ্ডপে কী হলো তা নিয়ে তাদের ভাবার সুযোগ কোথায়? অথচ মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার দায়ে রংপুরের পীরগঞ্জের নিরন্ন হতদরিদ্র জেলে পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করে দেয়া হলো।
নোয়াখালীতে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত যতন সাহার চার বছরের শিশুসন্তান আদিত্য সাহা কাঁদছে আর বলছে, ‘বাবা ফিরে এলে ভাত খাব। বাবা ফিরে না আসা পর্যন্ত কিছু খাব না।’ সে জানে না বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। এমন কত দীর্ঘশ্বাস আর বহন করবে বাংলাদেশ?
দেশে সরকারি দল আছে, বিরোধী দল আছে, আছে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার সচেতন নাগরিক। সবকিছু থাকার পরও কেন আমরা ‘সংখ্যালঘু’দের নিরাপত্তা দিতে পারলাম না?
বর্তমান সরকারের মতো ক্ষমতাধর সরকার অতীতে আসেনি, ভবিষ্যতেও হয়তো আসবে না। প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সরকারের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব থাকার পরও দুর্বৃত্তদের হাত থেকে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা যায়নি।
যে অন্যায় এক বা একাধিক মুসলিম করেছে, সে অন্যায়ের দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষগুলোকে সর্বস্বান্ত করে দেয়া হলো। তাদের অপরাধ তারা মুসলিম নয়, অন্য ধর্মের। যেকোনো ধর্মের কেউ অন্যায় করে থাকলে সেই ব্যক্তিই দায়ী, তাকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হোক।

ব্যক্তির অন্যায় অপকর্মের দায় দলগতভাবে, সম্প্রদায়গতভাবে অন্যের ঘাড়ে পড়বে কেন? কিন্তু পড়েছে। নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষের ওপর হামলা করা হয়েছে। রামুর ক্ষেত্রে, নাসিরনগরের ক্ষেত্রে, সুনামগঞ্জের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।

১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে ১৩.৫ শতাংশ হিন্দু থাকলেও কমতে কমতে ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারিতে তা দাঁড়িয়েছে ৮.৫ শতাংশে। এই যে নিজভূমির মায়া ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে হিন্দুরা, এমনি এমনি ঘটছে না। তাদের যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। বৃহৎ রাজনৈতিক কারণ যেমন আছে, জায়গা জমি দখলের মতো স্থানীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারণও রয়েছে।
‘সংখ্যালঘু’ মানুষ এতটা সাহসী হয়ে ওঠেনি ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলিমের দেশে তারা উসকানিমূলক কোনো কাজ করবে। অনেক আগে থেকেই এর বিপদ তারা জানেন।
চিত্রনাট্যের কাহিনি একই, শুধু মঞ্চায়নের আঙ্গিক ভিন্ন। ঘটনা সেই ধর্মের অবমাননা। ধর্মভিত্তিক কোনো বিষয়কে পুঁজি করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে, ভাইরাল করে, মাইকে ঘোষণা দিয়ে অথবা মুখে মুখে গুজব রটিয়ে উত্তেজনা তৈরি করা, তারপর সংঘবদ্ধ হয়ে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হামলা। লক্ষ্য একই- অন্যধর্মের মানুষ, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়।
২০১২ সালে ফেসবুককেন্দ্রিক পোস্টকে কেন্দ্র করে রামুতে বৌদ্ধমন্দির জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে এদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার যে নতুন ধরন শুরু হয়েছিল, তা আর থেমে থাকেনি।
২০১৭ সালেও রংপুরের গঙ্গাচড়ায় এক হিন্দু যুবকের বিরুদ্ধে ছড়ানো গুজব ভাইরাল করে একটি চক্র। সে সময় এলাকায় মাইকিং করে হামলা হয়েছিল হিন্দুদের বাড়িঘরে।
এ বছরের ১৬ মার্চ হেফাজতের বিতর্কিত নেতা মামুনুল হককেন্দ্রিক পোস্টের জেরে গ্রেপ্তার হন সুনামগঞ্জের ঝুমন দাশ। তিনি লিখেছিলেন যে, মামুনুল হকের মূল উদ্দেশ্য দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। এই পোস্টকে আপত্তিকর ও ইসলামের সমালোচনা উল্লেখ করে নোয়াগাঁও গ্রামে কয়েক হাজার লোক লাঠিসোঁটাসহ মিছিল করে সংখ্যালঘুদের প্রায় ৯০টি বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায়।
এবারেও কুমিল্লার কোরআন শরিফ-সংক্রান্ত ঘটনার জেরে চাঁদপুর নোয়াখালীসহ একাধিক স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলায় ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। জ্বালিয়ে দেয়া হয় রংপুরের পীরগঞ্জে এক জেলেপল্লি।
ধর্ম ভূ-খণ্ডগত মৌলিক দূরত্ব ঘোচাতে পারে না, তা ১৯৪৭-এর অব্যবহিত পরেই বুঝতে পেরেছে এই উপমহাদেশের মানুষ। জিন্নাহ-নেহেরুর দ্বিজাতিতত্ত্ব এই অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপনে শুধু প্রতিঘাতই তৈরি করেছে। ধর্মের ভিত্তিতে এদেশ ভাগ হয়নি, স্বাধীন হয়েছে ভাষা আর নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যকে ঘিরে। সেই স্বাতন্ত্র্য ছিল বাঙালিত্ব। ঔপনিবেশিক আমল থেকে আমরা নিগৃহীত হতে হতে একটা পর্যায়ে বুঝতে পারলাম একক কোনো স্বাতন্ত্র্যের ভেতরই নিহিত রয়েছে আমাদের মুক্তি। তাই বায়ান্নোর হাত ধরে একাত্তরে এসে সেই মুক্তি নিশ্চিত হয়েছে।

একাত্তরে ধর্ম-বর্ণ, মত নির্বিশেষে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির সংগ্রামে। সেই মুক্তির ব্রত শুধু ভূ-খণ্ডের স্বাধীনতার নিমিত্তে ছিল না; ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মার মুক্তি, মতপ্রকাশের মুক্তি, জীবনাচরণের মুক্তি। তাই বাহাত্তরের সংবিধান রচিত হয়েছিল একাত্তরের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করেই। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই চার মূলনীতিকে ব্রত হিসেবে নিয়েই দেশ পরিচালনায় অগ্রগামী হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকার।
পঁচাত্তরের কলঙ্কজনক পটপরিবর্তনের পর পরই দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসতে থাকল। চতুর সরকারগুলো একদিকে সংবিধানকে কাঁটাছেঁড়া করতে করতে ক্ষতবিক্ষত করেছে, অপরদিকে বিভিন্ন কৌশলে মানুষের চিন্তাধারায় মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যার মূল উপজীব্যই ছিল ধর্ম। বৈধ-অবৈধ যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান অস্ত্র বানিয়ে ফেলল ধর্মকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের সমর্থন লাভের আশায় সংবিধানের মৌলিক নীতির পরিবর্তন এনে ধর্মকে সংবিধানে যুক্ত করে পুরো দেশকেই বিপন্ন করে ফেলল। কুটিল রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য চতুর রাজনীতিবিদরা এমন একটি লোভনীয় বিষয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ফেলেছে এবং না বুঝেই সেই ফাঁদে পা দিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। যতদিন এমনসব মানুষ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক থাকবে, ততদিন অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কাঠামোর ভাবনা বিকশিত হবে না।
ধর্মনিরপেক্ষতার অপ ও ভুল ব্যাখ্যাকেই আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে এদেশের বেশিরভাগই মানুষ, এর ভুল ব্যাখ্যা দখল করে আছে মানুষের মনোজগৎ। তার ওপর ভিত্তি করেই বিরামহীন ঘটে চলেছে ন্যক্কারজনক সব ঘটনা। ধর্মহীনতা নয়, বরং প্রতিটি মানুষ সম্মানের সঙ্গে নিজ নিজ ধর্মাচারণ করবে, ধর্ম পালন করবে- এটাই ধর্মনিরপেক্ষতা।

আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক মনোভাব দিন দিন বাড়ছে। এখন প্রকাশ্যে ভিন্নধর্মের মানুষদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করা হয়। নানাভাবে তাদের অপমান, অপদস্থ, বিদ্রূপ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কুৎসাও রটনা করা হয়। ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকেই এদেশের সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে ঘটছে।
গত ৫০ বছরের ইতিহাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, হোক সে ধর্মীয় কিংবা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের- ক্রমাগত হয়রানি হুমকি নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়ে আসছে।
শিক্ষা রুচি ও সংস্কৃতির বাস্তব অভিব্যক্তি ঘটে মানুষের আচরণে। এই আচরণ মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক কল্যাণকর সহাবস্থান তৈরিতে সহায়তা করে। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনাই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের উন্নতির সোপান। উন্নত রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাব একেবারেই গৌণ। ধর্ম যদি রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, তাহলে সেই রাষ্ট্র আর সুসভ্য থাকে না।

উন্নত সাংস্কৃতিক বিকাশে, আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে এসবের আদৌ কোনো ভূমিকা নেই। বরং এসব বিতর্ক পেছনে ফেলে শিক্ষা-স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর মতো বিষয়গুলো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। চলমান মহামারিকে বধ করেছে যে বিজ্ঞানীরা, নমস্য সেজন। মসজিদ মন্দির গীর্জা প্যাগোডা যার যার অন্তরে থাকুক, অন্ধকার ভেদ করে আলোকিত হোক মানবাত্মা, গভীর মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হোক পৃথিবীর সব মানুষ।

লেখক: শিক্ষক-প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব
জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ
বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বঙ্গবন্ধু

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বঙ্গবন্ধু

১৯৪৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স ছিল ছাব্বিশ বছর। তখন তিনি জাতির পিতা তো পরের কথা, বঙ্গবন্ধুও হননি। ছাব্বিশ বছরের এক তরুণ রাজনৈতিককর্মী। কিন্তু মানুষের প্রতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার জন্য জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নিয়েছিলেন তিনি। আজ তার হাতে তৈরি দল রাষ্ট্রক্ষমতায়। তার আদর্শে উজ্জীবিত লাখ লাখ তরুণ দেশের আনাচে কানাচে। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কারা নষ্ট করছে এটা সবাই জানে। কেন নষ্ট করছে সেটাও কারো অজানা নয়। সেদিকে না গিয়ে বরং তরুণরা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তুলে ধরতে পারে না?

চলতি সপ্তাহের গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে সত্তরটিরও বেশি। অনেকে ভেবেছিলেন পুজো শেষে হয়ত আর এটা থাকবে না। কিন্তু হায়! পুজো তো ছিল একটা ছুতো। নইলে প্রতিমা বিসর্জনের পর কিংবা পুজোর পরদিন পীরগঞ্জের আগুন ও হামলা হলো কেন? তাহলে প্রশ্ন, বাংলাদেশে কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে?

এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে পৌনে এক শতাব্দি আগে ঘটা দাঙ্গার ঘটনা সম্পর্কে জানা যাক। ১৯৪৬ সালের ২৯ জুলাই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিলে ১৬ আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষণা করলেন মুহম্মদ আলী জিন্নাহ। কিন্তু কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা বিবৃতি দিতে লাগলেন, এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধে।

দিনটি সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য ডাক পড়ল শেখ মুজিব ও তখনকার তরুণ কর্মীদের। নির্দেশ এল- মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে বোঝাতে হবে যে, এই সংগ্রাম হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করলেন। এতে আরও খেপে গেল কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা। তারা হিন্দু সম্প্রদায়কে বোঝাল এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধেই। ১৬ আগস্ট সকাল থেকেই মুসলমানদের উপর হামলা শুরু করল হিন্দুরা।

মুজিব নিজে মহল্লায় মহল্লায় মাইকিং করে বুঝিয়েছেন, আজকের এই কর্মবিরতি হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়। তবু হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদরা হিন্দুদের খেপিয়ে তুলেছে। দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে।

দেখতে দেখতে পুরো কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ল দাঙ্গা। হিন্দুপ্রধান এলাকায় মুসলমানদের উপর হামলা চালাল হিন্দুরা। আর মুসলিমপ্রধান এলাকায় হিন্দুদের উপর হামলা চালাল মুসলিমরা। একটাবারের জন্যও হিন্দুরা মুসলিমপ্রধান এলাকার হিন্দুদের কথা ভাবল না। আর দাঙ্গাবাজ মুসলিমরা ভাবল না হিন্দুপ্রধান এলাকার মুসলিমদের কথা। অজানা আক্রোশে ধর্মের দোহাই দিয়ে একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুসলিমপ্রধান এলাকা থেকে কিছু হিন্দু পরিবারকে অনেক কষ্টে হিন্দুপ্রধান এলাকায় পাঠাতে পারলেন মুজিব। বেকার হোস্টেলের আশপাশে কিছু হিন্দু পরিবার ছিল, তাদের রক্ষা করলেন সুরেন ব্যানার্জি রোডে পাঠিয়ে দিয়ে। হিন্দুপ্রধান এলাকা থেকেও কিছু মুসলিমকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন।

কলকাতা শহরে এখানে ওখানে লাশ পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গেছে। মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে!

রিফিউজিদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে। দোতলায় মেয়েরা, নিচে পুরুষরা। উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে কয়েক জায়গায় আক্রান্ত হয়েছেন মুজিব। আঘাত পাওয়া মানুষে হাসপাতালগুলো ভরা। ওদিকে হোস্টেলগুলোতে চাল, আটা ফুরিয়ে গেছে। লুট হওয়ার ভয়ে কেউ কেউ দোকান খুলল না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করলেন মুজিব। শহীদ সাহেব বললেন, ‘নবাবজাদা নসরুল্লাহকে ভার দিয়েছি, তার সাথে দেখা কর।’

কর্মীদের নিয়ে তার কাছে ছুটলেন মুজিব। নসরুল্লাহ মুজিবদের নিয়ে গেলেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। বললেন, ‘এখানে চাল রাখা আছে। নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কর। আমাদের কাছে গাড়ি নেই। প্রায় সব গাড়ি মিলিটারিরা নিয়ে গেছে। তবে দেরি করলে পরে গাড়ির ব্যবস্থা করা যাবে।’

দেরি করার সুযোগ নেই। এখনই চাল নিয়ে না গেলে ছাত্রদের অনাহারে থাকতে হবে। শেষপর্যন্ত ঠেলাগাড়ি জোগাড় করে ফেললেন মুজিব। ঠেলাগাড়িতে চাল বোঝাই করা হলো। ওদিকে গাড়ি ঠেলার লোক নেই। শেখ মুজিব হাত লাগালেন ঠেলাগাড়িতে। তার সঙ্গে নূরুদ্দিন ও নূরুল হুদাও যোগ দিলেন।

তিনজন মিলে কোনো রকমে চাল বোঝাই ঠেলাগাড়ি ঠেলে বেকার হোস্টেল ও ইলিয়ট হোস্টেলে চাল পৌঁছে দিলেন। কারমাইকেল হোস্টেলেও চাল পৌঁছাতে হবে। ওখানে কী করে পৌঁছাবেন? একে তো অনেক দূর, তার ওপর ওখানে যেতে হলে হিন্দু মহল্লা পার হয়ে যেতে হবে। ঠেলাগাড়িতে করে ওখানে চাল পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব।

অনেক চেষ্টা করে একটা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি জোগাড় করে আনলেন নূরুদ্দিন। ওই গাড়িতে করে কারমাইকেল হোস্টেলে চাল পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন মুজিব।

এই দাঙ্গায় মুজিব দেখেছেন, অনেক হিন্দু মুসলমানদের রক্ষা করতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন। জীবনও হারিয়েছেন। আবার অনেক মুসলমান হিন্দু পাড়াপড়শিকে রক্ষা করতে গিয়েও জীবন দিয়েছেন। মুসলিম লীগ অফিসে অনেক হিন্দু ফোন করে জানিয়েছিলেন, তাদের বাড়িতে মুসলমানদের আশ্রয় দিয়েছেন। শিগগির এদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন। নইলে আশ্রয়দাতা হিন্দুরাও মরবে, আশ্রিত মুসলমানরাও মরবে।

ওদিকে আরেকদল লোককে দেখেছেন মুজিব। এরা দাঙ্গাহাঙ্গামার ধার ধারেনি। এরা শুধু দোকান ভেঙেছে। লুটপাট করেছে। এদেরই একজনকে বাধা দিতে গিয়ে বিপদেই পড়েছিলেন। তারা তাকে আক্রমণ করে বসেছিল।

দাঙ্গা নিয়ন্ত্রেণে আনতে কারফিউ জারি হয়। পার্ক সার্কাস ও বালিগঞ্জের মাঝে একটা মুসলমান বস্তি আছে। প্রত্যেক রাতেই সেখানে হিন্দুরা আক্রমণ করে। তাদের পাহারা দেয়ার ভার পড়েছে মুজিব এবং সিলেটের মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর ওপর।

কলকাতায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যেতে লাগলেন মুজিব। রাতদিন রিফিউজি সেন্টারে কাজ করতে লাগলেন কর্মীদের নিয়ে। কিছুদিনের মধ্যে দাঙ্গা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়। মুসলমানরা চলে যায় মুসলমান মহল্লায়। আর হিন্দুরা হিন্দু মহল্লায়।

ওদিকে কলকাতার দাঙ্গা বন্ধ হতে না হতেই নোয়াখালীতে দাঙ্গা শুরু হয়। ঢাকায় তখনও দাঙ্গা লেগে ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হলো বিহারে। বিহারের বিভিন্ন জেলায় পরিকল্পনা করে মুসলমানদের উপর আক্রমণ হয়েছিল। অনেক মানুষ মারা যায়। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। দাঙ্গা শুরু হওয়ার তিন দিন পরেই শেখ মুজিব রওনা হলেন পাটনায়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাটনায় মুসলিম লীগ নেতাদের খবর পাঠালেন, যেকোনো ধরনের সাহায্য প্রয়োজন হলে বেঙ্গল সরকার দিতে রাজি আছে। বিহার সরকারকেও এটা জানিয়ে রেখেছিলেন।

বিহারে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় রিফিউজি ক্যাম্প খোলার ব্যবস্থা করলেন মুজিব। কিন্তু আহত ও উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ছিল ধারণারও বাইরে। এদের সহায়তা করার জন্য কলকাতা থেকে অনেক ডাক্তার ও কর্মী এসে হাজির। বিহার থেকে উদ্বাস্তুদের নিয়ে রাখা হলো পাটনা, পাটনা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, নিগাহ, কান্দুলিয়ায়। নিগাহ ও কান্দুলিয়ায় ক্যাম্প খোলা হয়েছিল। এর মধ্যে কান্দুলিয়া ক্যাম্পটি ছিল বিশাল। প্রায় দশ হাজার লোক ধরার জায়গা ছিল। মুজিব এই ক্যাম্পের নাম দিলেন ‘হিজরতগঞ্জ’।

উদ্বাস্তুদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তবে কর্মীদের জন্য আলাদা খাবারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মোহাজিরদের জন্য যা রান্না হতো, সেখান থেকেই কিছু খেয়ে নিতেন মুজিব। দোকানপাট কিছুই ছিল না। প্রতিদিনই শত শত লোক আসছে ক্যাম্পে। নতুন করে ময়রা ও মাধাইগয় ক্যাম্প খুলতে হলো। এ দু জায়গাতেই দশ হাজার উদ্বাস্তুর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। তবে উদ্বাস্তুদের একবেলার বেশি খাবার রান্না করা সম্ভব ছিল না। মুজিবসহ কর্মীরাও একবেলাই খাবার খেতেন।

উদ্বাস্তু ক্যাম্পের কর্মী ব্যবস্থাপনা সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছিলেন মুজিব। উদ্বাস্তুদের থেকেই সুপারিনটেনডেন্ট, অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট, রেশন ইনচার্জ, দারোয়ান ও অন্যান্য কর্মী নিয়োগ দেয়া হলো। খাবার রান্না করার সমস্যার কারণে রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করা হলো। প্রত্যেক পরিবারকে বিনা পয়সায় সাতদিনের চাল, জ্বালানি কাঠ, মরিচ, পিঁয়াজ দেয়া হতো। মাংস দেয়া হতো একদিন পর পর। মোহাজিররা এ বন্দোবস্তে খুশি হয়েছিল।

মুজিবের সঙ্গে যেসব কর্মী ছিলেন, খাবার ও ঘুমের অভাব এবং কাজের চাপে প্রায় সবাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনেক অসুস্থ কর্মীকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মুজিব। রয়ে গেলেন নিজে। টানা দেড়মাস অমানুষিক পরিশ্রমের কারণে তার শরীর ভেঙে গিয়েছিল। এসময় পূর্ব পরিচিতরা তাকে দেখে আশ্চর্য হন। তারপর অসুস্থ শরীর নিয়ে কলকাতায় হাজির হলেন মুজিব। বেকার হোস্টেলে ফিরে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। জ্বর মোটেই ছাড়ছিল না। এতটাই কাবু হয়ে গিয়েছিলেন যে, ট্রপিক্যাল স্কুল অব মেডিসিন হাসপাতালের ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডে পনেরো দিন চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।

১৯৪৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স ছিল ছাব্বিশ বছর। তখন তিনি জাতির পিতা তো পরের কথা, বঙ্গবন্ধুও হননি। ছাব্বিশ বছরের এক তরুণ রাজনৈতিককর্মী। কিন্তু মানুষের প্রতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার জন্য জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নিয়েছিলেন তিনি। আজ তার হাতে তৈরি দল রাষ্ট্রক্ষমতায়। তার আদর্শে উজ্জীবিত লাখ লাখ তরুণ দেশের আনাচে কানাচে। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কারা নষ্ট করছে এটা সবাই জানে। কেন নষ্ট করছে সেটাও কারো অজানা নয়। সেদিকে না গিয়ে বরং তরুণরা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তুলে ধরতে পারে না? সে সুযোগ তো তাদের রয়েছে।

বিশ্বাস করা যায়, তরুণরা সচেতন হলে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনাশকারীদের উপস্থিতভাবে প্রতিরোধ করলেই তবে দেশে আর এরকম ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশায় না থেকে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতাও তৈরি করতে পারে। তবেই তো মুজিব আদর্শের সৈনিক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যাবে। সে যোগ্যতা কি দেশের বর্তমান তরুণদের নেই?

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, আছে; এবং এই বিশ্বাসটাও আছে, এই ঘটনার কারণে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মোটেই বিনষ্ট হয়নি। এবং কোনোদিন হবেও না। জাতি-ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে আমরা সবাই বাঙালি। আমরা সবাই রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশের নাগরিক। গুটিকয়েক নষ্ট চরিত্রের মানুষের কারণে দেশের বিশাল জাতিগোষ্ঠীকে কোনোভাবেই বিচার করা ঠিক হবে না। কারণ দেশের বেশিরভাগ মানুষ নয়, প্রায় সবাই-ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করে। দুনিয়ার অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর দিকে তাকালে কিংবা তাদের ইতিহাস ঘাটলেও দেখা যাবে- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বাঙালির ধারেকাছেও কেউ নেই। বাঙালির এই গর্বের ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্বটা কি আমাদের সবার নয়?

সহায়ক গ্রন্থ: অসমাপ্ত আত্মজীবনী-শেখ মুজিবুর রহমান

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন:
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব
জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ
বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

শেয়ার করুন

জ্ঞানবৃক্ষ শীর্ণ হচ্ছে প্রযুক্তির অপব্যবহারে

জ্ঞানবৃক্ষ শীর্ণ হচ্ছে প্রযুক্তির অপব্যবহারে

ধর্মীয় বিষয়ে অনেকেই একইভাবে ভাইরাল করাতে বিবেকের চর্চা করেন না। অথচ ফেক আইডি খুলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখে আসছেন তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, কুৎসা ও অপপ্রচার রটনা করে যাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের যাচাই বাছাই না করে কেউ কেউ মিথ্যা অপপ্রচারে অংশ নিয়ে থাকে।

আমরা যখন স্কুলের ছাত্র ছিলাম তখন স্কুল বিতর্কে শিক্ষকরা ‘বিজ্ঞানের আশীর্বাদ ও অভিশাপ’ এই শিরোনামে দুটি ভাগে আমাদেরকে ভাগ করে দিতেন। যাদের ভাগ্যে অভিশাপের কথা বলার বিষয় পড়ত তারা বেশ বেকায়দায় পড়ত। বিতর্কে নিজেদেরকে বিজয়ী করার জন্য তারা যুদ্ধ বিগ্রহ, মারণাস্ত্র, রাস্তাঘাটে যানবাহনের দুর্ঘটনা ইত্যাদিতে মানুষের হতাহতের বিষয়গুলোকে বিজ্ঞানের অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করে বলার চেষ্টা করত। কিন্তু বুদ্ধিমান প্রতিপক্ষ যুক্তিতে বুঝিয়ে দিত যে, এতে বিজ্ঞানের দায় নেই, মানুষের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব, অজ্ঞতা ইত্যাদিই দায়ী। সুতরাং বিজ্ঞানের ওপর দায় না চাপিয়ে মানুষকেই অধিকতর বিজ্ঞান সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

বিজ্ঞানের উৎকর্ষের কারণেই গত কয়েক দশকে মানুষ বিজ্ঞানচর্চা করেই প্রযুক্তির বহুমুখী উদ্ভাবন ঘটিয়ে চলছে। একারণেই বলা হয়ে থাকে এখন প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি এখন মানুষের হাতে হাতে চলে এসেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার কে কীভাবে করবে সেটি তার জ্ঞান, সচেতনতা, চিন্তাভাবনা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে।

মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান সচেতনতা, চিন্তাভাবনা, জীবনবোধ, বিশ্বকে দেখা, নিজেকে অধিকতর উন্নত জীবনের অধিকারী করা ইত্যাদি নির্ভর করে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য- প্রযুক্তি ইত্যাদি থেকে অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি অন্যতম একটি গুরত্বপূর্ণ বাহন- যা অনেক কিছুকে সহজে মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে পেতে সাহায্য করে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞান মানুষকে উন্নত জীবনযাপন-আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, সুখশান্তি-মানবিক মূল্যবোধ ইত্যাদিতে জীবন গড়ার অপরিহার্য উপায় হিসেবে বিবেচিত।

বিজ্ঞানচিন্তা একদিকে মানুষকে উন্নত চিন্তার অধিকারী করে, অপরদিকে মানুষই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটিয়ে সবকিছুকে নিজেদের আয়ত্তে আনার সুযোগ সৃষ্টি করছে। তবে এক্ষেত্রে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যত উন্নতিই মানুষ লাভ করতে থাকুক না কেন, মানুষকে অতীত অর্জিত জ্ঞানভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে বর্তমান ও ভবিষ্যতের অজানা জ্ঞানবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, জীবনবোধ ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় অধিকতর উন্নত স্তরে যেতে হলে জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই তা অর্জন করতে হবে।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে অনেক কিছুই আমরা সাধারণ মানুষরাও ব্যবহার করছি। মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ওয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি এখন সহজলভ্য হয়ে গেছে। এগুলোর মাধ্যমে অনেক কিছু জানা, শেখা, বোঝা, উপলব্ধি করা এবং জীবনকে সহজতর করা খুবই স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। সমাজের বিপুলসংখ্যক মানুষ খুব বেশি লেখাপড়া না জেনেও এসব প্রযুক্তি অনায়াসে ব্যবহার করতে শিখেছে। যারা ব্যক্তিগত জীবনকে নানা কাজে ও উদ্ভাবনী শক্তিতে উদ্ভাসিত করতে চায় তারা এসব প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার মাধ্যমে অনেক কিছুই ঘরে বসে সাধন করতে পারে। বিশ্ব যেন এখন তার হাতের মুঠোয়। এই মানুষটি ইচ্ছে করলেই তথ্যপ্রযুক্তির ফেসবুক ব্যবহার করে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারে। এটি তার জন্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু বিপরীত চিত্রটিও ঘটছে অনেকের জীবনে যারা ফেসবুকে নিজেকে সারাদিন ডুবিয়ে রেখে শুধু নানা ধরনের অর্থহীন, জীবনের তাৎপর্যহীন বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখে ক্রমেই আসক্তিতে জড়িয়ে ফেলেছে।

নিজের জীবনের গুরত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রেখে ফেসবুকে এটা ওটা দেখা, নানা রকম মন্তব্য জুড়ে দিয়ে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করা। কিন্তু একবারও ভাবেন না এর শেষ অর্জন তার ব্যক্তিগত জীবনে কী বয়ে নিয়ে আসবে? অনেক কিশোর, তরুণ এবং যুবক দীর্ঘদিন ফেসবুকে দিনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটাতে গিয়ে একসময় তার ব্যক্তিজীবনের অর্জন, শেখা, গড়ে তোলা বিষয়াদির খাতা ফাঁকা হয়ে যায়। অথচ সে যদি এই প্রযুক্তিটিকেই নতুন তথ্য-উপাত্ত, জ্ঞানের আধার অনুসন্ধানে ব্যবহার করত তাহলে এই প্রযুক্তিটি তাকে অনেক বেশি মেধা, মনন ও চিন্তাশীলতায় সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখত। কিন্তু চিন্তাশীল মানুষ হয়ে ওঠার আগেই নতুন প্রযুক্তি হাতে নিয়ে কিশোর-তরুণ বা যুবকটি শেষপর্যন্ত প্রযুক্তির অভিশাপকে নিজের জীবনে যুক্ত করে ফেলে, আশীর্বাদ তার জন্য অধরাই থেকে যায়।

আমাদের দেশে এখন অসংখ্য শিশু-তরুণ বা যুবক এমনকি বয়স্ক ব্যক্তিও ফেসবুকে ছবি দেয়া, অন্যের লেখার ওপর স্থূল মন্তব্য করা, চটুল কথাবার্তা লিখে ফেসবুকে নিজেকে জাহির করা, বিজ্ঞান ও যুক্তির বিষয়কে না বুঝে যা খুশি তাই লিখে দেয়ার মধ্যে নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। অনেকেই কী লেখে, কেন লেখে তাও খুব একটা স্পষ্ট নয়। ভুল বানান, বাক্যের ত্রুটি, চিন্তার বিচ্যুতি একেবারেই হাস্যকর পর্যায়ে তাকে নিয়ে যায়। এটিও অনেকে বুঝতে পারে না। এর মূল কারণ হচ্ছে যারা ফেসবুকে না বুঝে শুনে মন্তব্য লিখছে তাদের আসলে পড়াশোনার গণ্ডি কতটা সীমিত তাও তারা জানে না।

ফেসবুকে অনেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যা খুশি তা লেখেন। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে খুবই উৎসাহী অনেককে দেখা যায়। রাজনীতি তারা কতটা পড়াশোনা করে বোঝেন, জানেন এবং লেখেন তাও তাদের মন্তব্য কিংবা লেখা পড়ে বুঝতে কষ্ট হয়। অনেকে আছেন কোনো কিছু যাচাই বাছাই না করেই লাইক ও কমেন্ট দিয়ে থাকেন। কে কোথা থেকে কী লিখল, লাইভে কী বলল, তার উদ্দেশ্য কী তা না জেনেই অনেকে হইহই রইরই করে ফেসবুকে ভাইরাল করিয়ে দেয়। এর ফলে সমাজের লাভ হবে না কি ক্ষতি হবে তার কোনো দায় দায়িত্ব তিনি বোধ করেন না। ধর্মীয় বিষয়ে অনেকেই একইভাবে ভাইরাল করাতে বিবেকের চর্চা করেন না। অথচ ফেক আইডি খুলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখে আসছেন তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, কুৎসা ও অপপ্রচার রটনা করে যাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের যাচাই বাছাই না করে কেউ কেউ মিথ্যা অপপ্রচারে অংশ নিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং আমাদের জাতীয় জীবনে যারা সীমাহীন কষ্ট ও দুর্ভোগ আমাদের জন্য বরণ করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও কেউ কেউ নানা অপপ্রচার, বানোয়াট কথাবার্তা লিখে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। দেশ ও বিদেশে বেশ কিছু গোষ্ঠী রয়েছে যারা ফেসবুকে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি-রাজনীতি, রাষ্ট্রের দর্শন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়ে অনেক মিথ্যাচার ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই একটি গোষ্ঠী সামাজিক এই মাধ্যমটিকে অপব্যবহার করছে। উঠতি অনেক তরুণ-তরুণী এসব অপপ্রচারের রহস্য ভেদ করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে পারছে না। তারা দারুণভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি শেষ পর্যন্ত তাদেরকে দিগভ্রান্তিতে ফেলে দিচ্ছে। অথচ এরা যদি ফেসবুকের এসব বানোয়াট যাচাই বাছাইহীন বিকৃত তথ্য-সংবলিত লেখালেখি না পড়ে, গুগল, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া ইত্যাদি সার্চ করে নিজের অনুসন্ধিৎসু মনকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করত তাহলে তারা নিজেরাই লাভবান হতে পারত।

ফেসবুকে তাদের চটুল, মনগড়া, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর, ভুল বানান ও বাক্যে ভরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লেখা ও মন্তব্যে সময় না কাটিয়ে যদি প্রযুক্তির আসল মাধ্যমগুলো ব্যবহার করত তাহলেও তাদের জানা ও শেখার সুযোগ অনেক বেড়ে যেত। বুঝতে হবে ফেসবুক ভালো মানুষরাও যেমন ব্যবহার করে, খারাপ-অসৎ, অযোগ্য এবং প্রতারক মানুষরাও তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ব্যবহার করে থাকে।

সেকারণে ফেসবুককে এখন অনেকেই সাবধানতার সঙ্গে ব্যবহার করে থাকেন। কারণ এই প্রযুক্তিটি অপব্যবহারকারীদের কারণে দেশে দেশে সবচাইতে সমালোচিত মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেক রাষ্ট্রই ফেসবুককে বেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নিয়েছে কারণ নিয়ন্ত্রণহীন ফেসবুকের মাধ্যমে সভ্যতা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। এটি বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোও উপলব্ধি করতে পেরেছে।

অনেক উন্নত দেশের নাগরিকরা এখন আর ফেসবুকের সামনে বসতে উৎসাহী নন, অনেকে ব্যবহার ছেড়েও দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে এ বছর ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ফেসবুক ব্যবহার করে অনেকেই ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে নানা অঘটন ঘটিয়েছে। তাতে মানুষের জীবন, সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নানা ঘটনা ঘটেছে। অথচ ফেসবুকে প্রচারিত সব প্রচারণাই মিথ্যে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে জানা যাচ্ছে। সুতরাং ফেসবুক ব্যবহারে আমাদেরকেও উন্নত দুনিয়ার মতো হিসেবি ও পরিণত বোধের পরিচয় দিতে হবে।

ফেসবুক যত বেশি মানুষই ব্যবহার করুক না কেন, নিজেকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত, জ্ঞানী-গুণী ও সৃষ্টিশীল মানুষ করার জন্য বই পড়ার কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। প্রাচীন যুগ থেকে মানুষ বই পড়েই চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, জ্ঞানী-গুণী হওয়ার শিক্ষা লাভ করেছে। এখনও উন্নত দুনিয়ায় মানুষ বই কিনছে, পড়ছে এবং লিখছে। করোনার এই অতিমারিকালে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে বইপড়ার অভ্যাস বেড়েছে এমন পাঠকের সংখ্যা গণমাধ্যমে সংবাদ হয়ে এসেছে। ঘরে বসে ওরা ফেসবুক নিয়ে সময় কাটায়নি বরং নিজের পছন্দের বই পড়ে জানার আগ্রহ বৃদ্ধি করেছে।

সাহিত্য না পড়ে কেউ কখনও ভাষাজ্ঞান, কল্পনাশক্তি, সমাজ সচেতনতা, মানব মনের নানা খুঁটিনাটি দিক সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারে না। ইতিহাস-সমাজ, দর্শন-অর্থনীতি, নৃ-বিজ্ঞান, জাতিতত্ত্ব-মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে মৌলিক বই না পড়ে কেউ কোনোদিন মানব সভ্যতার অর্জন, সমস্যা, সংকট ও উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞানের জটিল বই পড়ে মানুষ আজকের দুনিয়ার জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান দেয়ার চেষ্টা করছে। গবেষণা ও লেখালেখিতে উন্নত দুনিয়ার মানুষ আগের চাইতে বেশি মনোযোগী হচ্ছে। সেই তুলনায় আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি।

আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে এখন আগের মতো সাহিত্য-দর্শন, ইতিহাস-সংস্কৃতি, সমাজ ও বিজ্ঞানবিষয়ক বই পুস্তক নেই। বই পড়ার অভ্যাস এখন আগের তুলনায় আমাদের সমাজে দ্রুতই কমে যেতে দেখা যাচ্ছে। জ্ঞানবিজ্ঞানের বই খুব একটা বিকোচ্ছে না। অথচ চটুল, হালকা, স্থূল নানা মনোরঞ্জন-বিষয়ক বই-পুস্তক চলছে বলে প্রকাশকরা বলে থাকেন। ধর্মের মৌলিক গ্রন্থ না পড়ে হালকা বই পড়ার প্রবণতা মোটেও সুখকর নয়।

মৌলিক গ্রন্থ পড়া ছাড়া কেউ কখনও চিন্তার গভীরে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মৌলিক কিংবা মৌল বই পড়ার পরিবর্তে নোটবই, গাইডবই পড়ার ঝোঁক প্রবলভাবে বিরাজ করছে। এমনকি সব ধরনের সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য বাজারে নোটবই, গাইডবই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। বিসিএস পরীক্ষা দেয়ার আশায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশই গাইডবই সংগ্রহ বা খোঁজার চেষ্টা করে থাকে । তাদের মধ্যেও এখন মৌলিক বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের কর্নার যতটা সরগরম, মূল লাইব্রেরি ততটাই ছাত্রশূন্য হয়ে পড়েছে। বোঝাই যাচ্ছে আমাদের জাতীয় জীবনে মৌলিক বই পুস্তকের গুরত্ব অনেকটাই কমে গেছে। একুশের মেলায় প্রতিবছর কয়েক হাজার বই প্রকাশিত হয় বলে দাবি করা হয়। কিন্তু মৌলিক চিন্তাশীল, মননশীল বই প্রকাশের সংখ্যা হিসাবে নিলে কষ্ট পেতে হবে।

আমাদের সমাজে এখন মননশীল, চিন্তাশীল মৌলিক গ্রন্থ পড়ার পাঠকের সংখ্যা কমে গেছে। এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। এখনই গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় সবধরনের মৌলিক বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা ও গুরত্বকে স্থান দিতে হবে। তাহলেই ফেসবুকের হালকা চটুল লেখা, স্কুল-কলেজের গাইডবই, নোটবই থেকে আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্ত করে আনা সম্ভব হবে।

লেখক: অধ্যাপক, গবেষক।

আরও পড়ুন:
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব
জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ
বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

শেয়ার করুন

ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই

ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই

ইসলামে যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেয়াই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে মন্দির ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর কোনোভাবে ধর্মসম্মত হতে পারে না। মহানবী (সা.) আরও বলেছেন- “কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব।” (আবু দাউদ)

কুমিল্লার পূজামণ্ডপে যে ব্যক্তি কোরআন শরিফ রাখে, তাকে শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মাধ্যমে মন্দিরে কোরআন শরিফ রাখার যে গল্পটি প্রচারিত হয়- সেটি এবং এর পরবর্তী ঘটনাগুলো নিয়ে মোটামুটি সব পক্ষই এ উপসংহারে পৌঁছেছে যে, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সুকৌশলে কাজটি ঘটানো হয়। পূজা ছিল উপলক্ষ মাত্র। কিন্তু যে আগুন ১৩ অক্টোবর ফেসবুকের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সে আগুনই অন্তত ১৬ জেলায় হিন্দুদের বাড়ি ও প্রতিমা ভাঙচুরের ইন্ধন দিয়ে পুড়িয়ে গেছে রংপুরের পীরগঞ্জের হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনটি গ্রামও।

এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে এবার অনেক জায়গায় পূজার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা যায়নি, প্রতিমা বিসর্জনও হয়নি অনেক জায়গায়। মূলত, কুমিল্লার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পাঁচদিনের উৎসবের তাল কেটে যায় তৃতীয় দিনেই।

মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া একটি দেশে- যে দেশটিকে এর স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও সব মানুষের দেশ হিসেবে গড়ে তোলেন, সেখানে এমন ঘটনা শুধু দুঃখজনকই নয়, দেশের মূল চেতনা আর নীতিরও পরিপন্থি। তবে একটু দেরিতে হলেও সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন কঠোর বার্তা। কিন্তু তাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, হৃদয় থেকে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে; তার কতটুকু উপশম হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মুক্তিযুদ্ধের পর এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় নতুন দেশে সমধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের তুলনায় তাদের ত্যাগও বেশি। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় পরও আমাদের সামনে এখন একটি প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আসলে তাদেরকে এখনও এদেশের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে পারছি কি না?

পরিসংখ্যান বলছে, পাকিস্তান আমল তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেও অধিকাংশ সময় ‘সংখ্যালঘু’দের কাটাতে হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। রাজনৈতিক সহিংসতার সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়কে বার বার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে আসছে। অথচ এসব সাম্প্রদায়িক কাজ মহানবীর (সা.) এর নির্দেশনা ও ইসলামি শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সুরা আনআমের ১০৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-

“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব দেবদেবীর পূজা-উপাসনা করে, তোমরা তাদের গালি দিও না। যাতে করে তারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দিয়ে না বসে।”

ইসলামে যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেয়াই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে মন্দির ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর কোনোভাবে ধর্মসম্মত হতে পারে না। মহানবী (সা.) আরও বলেছেন-

“কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব।” (আবু দাউদ)

মূলত পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর থেকে তারা কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে। এরপর সামরিক বা বেসামরিক লেবাসে জিয়া, এরশাদসহ যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে, তারা শুধু যে সংবিধানকে ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে আবদ্ধ করেছিলেন তা নয়, মাইনরিটি ক্লিনজিং প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত করে গেছেন।

১৯৯০ ও ১৯৯২-এ এরশাদ ও বিএনপি আমলে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা লাগিয়ে সংখ্যালঘুদের বহু ঘরবাড়ি ও মন্দির ভাঙা হয়েছে। ২০০১-এর নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে তাণ্ডব চালায়, স্বাধীনতার পর এটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ নির্যাতন। তখন পূর্ণিমা আর সীমাদের কান্নায় বাতাস ভারী হলেও অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। গণহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, জোর করে বিয়ে, ধর্মান্তরিত করা, চাঁদা আদায় ও সম্পত্তি দখল কোনোকিছুই যেন বাদ ছিল না সে সময়।

দেশে প্রায় দেড় কোটি লোক আছে হিন্দু সম্প্রদায়ের। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেসব দেশের জনসংখ্যাই এর চেয়ে কম। এই বিরাট জনগোষ্ঠীর মেজরিটিই এখন জবরদস্তি ও পীড়নের শিকার। আগে আড়ালে-আবডালে বলা হলেও এখন মুখের সামনেই তাদের বলা হয় ‘মালাউন’। এটা পরিষ্কার যে, একাত্তরের পরাজিত শক্তি ‘সংখ্যালঘু’ হ্রাসকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে একটি গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের সংকট তৈরি করতে চায়। কারণ, এরা ভাবছে, যদি ‘সংখ্যালঘু’দের তাড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করাও সহজতর হবে।

প্রথম আলোর ২০১২-এর ২২ সেপ্টেম্বরের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়- দেশের জনসংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে না। ২০০১ ও ২০১১ সালের আদমশুমারির জেলাভিত্তিক তথ্য পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, ১৫টি জেলায় হিন্দু জনসংখ্যা কমে গেছে। জনসংখ্যাবিদদের মতে, এটি ‘মিসিং’ পপুলেশন বা ‘হারিয়ে যাওয়া মানুষ’। এরা কেন হারিয়ে গেল? কেন নীরবে দেশত্যাগ করার কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে অবিশ্বাস্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ল তা নিয়ে কেউ কি ভেবেছে? একটা উদাহরণে কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে।

এক পরিসংখ্যান জানাচ্ছে- বরিশাল বিভাগের কোনো জেলাতেই হিন্দুদের সংখ্যা বাড়েনি। বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী এবং বরগুনা; এই ছটি জেলায় ২০০১-এর আদমশুমারিতে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৮ লাখ ১৬ হাজার ৫১ জন। ২০১১-এর শুমারিতে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৯ জন। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও কুষ্টিয়া; এ ৫ জেলায় হিন্দুদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। উল্লেখ্য, ২০০১-এ বরিশাল ও খুলনা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

গত কবছর ধরে আমরা দেখছি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিতাড়ন ও উচ্ছেদে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী একযোগে কাজ করে। ২০১২ সালে রামুতে ট্রাকে করে লোক এসে বৌদ্ধমন্দিরে হামলা করে। নাসিরনগরে কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলা করা হয় তা সবার জানা। আর সুনামগঞ্জের শাল্লায় তো মাইকিং করে লোক জড়ো করা হয়েছে। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাগুলো করা হচ্ছে।

আরেকটি ব্যাপার হলো, যত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাই ঘটুক; পুলিশ আসে ঘটনার পরে। কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে হামলা ও লুটপাটের পর পুলিশ এসেছে, একই অবস্থা রামুতেও হয়েছিল। আর পীরগঞ্জে আমরা দেখলাম, পুলিশ নিরাপত্তা দিতে গেল এক জায়গায়, কিন্তু অগ্নিসংযোগ হলো অন্য জায়গায়।

আমরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দাবি করছি। অথচ কদিন ধরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে সন্ত্রাসী হামলা হলো, তাদের মন্দির ও পূজামণ্ডপে ভাঙচুর করা হলো- বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হলো- সেসব ঘটনা সংখ্যাগুরুদের মনে কি খুব একটা দাগ কেটেছে? উল্টো রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা যেসব কথা বলছে, তাতে আক্রান্তের ওপর তাদের সহানুভূতি প্রকাশের চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের চেষ্টাই বেশি দেখা গেছে।

এ কারণে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন- ‘রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আমাদের আস্থা নেই।’ কিন্তু এই অনাস্থা কি একদিনে তৈরি হয়েছে? ক্রমাগত আক্রান্ত হতে হতে তাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।

কোনো দেশের ‘সংখ্যালঘু’ নিরাপদ থাকবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মনমানসিকতার ওপর। বাংলাদেশের ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের মানুষ মাটি কামড়ে এদেশেই থাকতে চায়। তাদের তাড়িয়ে বা তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করে বাংলাদেশ কি লাভবান হতে পারবে? বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো হোক সেটা আমরা কেউই চাই না।

দেশটিতে একদিকে যেমন সংখ্যালঘু নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া সফলতার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে, একইভাবে সংখ্যাগুরুরাও নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে। সেখানে শিয়ারা সুন্নিদের মারছে, সুন্নিরা শিয়াদের। আর সবাই মিলে হত্যা করছে মানবতাকে। বাংলাদেশেও যাতে সে পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়, সেজন্য এখনই আমাদের সজাগ হওয়া উচিত।

পাশাপাশি ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়কে সুরক্ষায় নারী নির্যাতন দমন আইনের মতো একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। বর্তমানে যে আইনগুলো আছে, সেসব দিয়ে এ সমস্যা মোকাবিলা করা যাবে না। এ আইন প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত সন্ত্রাস দমন আইন, দ্রুত বিচার আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের প্রয়োগ ঘটানো যেতে পারে। ‘সংখ্যালঘু’দের পাশে দাঁড়ানো উচিত ‘সংখ্যালঘু’দের স্বার্থে নয়, সংখ্যাগুরুদের স্বার্থেও। কারণ, বহুত্ববাদের ধারণা থেকে রাষ্ট্র একবার সরে এলে সেটি ফিরিয়ে আনা শুধু কঠিনই হবে না বলা যায় অসম্ভব হয়ে যাবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব
জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ
বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক শক্তি রুখতে কালক্ষেপণ নয়

সাম্প্রদায়িক শক্তি রুখতে কালক্ষেপণ নয়

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কী করছিলেন জানি না। তারা যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বুকে নয়, মুখে বলে তাহলে কিছু বলার আছে। যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলেন। আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মুখ বুজে পড়ে থাকেন, তাহলে আপত্তি আছে। তার মানে বুঝতে হবে চেতনায় মরিচা ধরেছে।

গতকাল ২০ অক্টোবর ছিল লক্ষ্মীপূজা, ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী, প্রবারণা পূর্ণিমা; একদিনেই। এই একদিনে তিনটি ধর্মীয় উৎসব পালন এদেশেই সম্ভব। কেননা, তিন ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে এদেশে সহাবস্থান করছে। এর চেয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর কী হতে পারে! আমরা সবাই একসঙ্গে মিলে উৎসব পালন করছি। তবে এবার বড় বেদনাহত হয়ে আমরা দুর্গোৎসব পালন করেছি। দেশের ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত।

আমরা বীরের জাতি। বাঙালি জাতি কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ভয় পায় না। কুমিল্লার নানুয়ার দীঘির পাড়ে পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রাখা নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, আমি হতবাক হয়েছি। আমি ভয় পেয়েছি। আমার ভয়টা অন্য জায়গায়। আবার না জানি কার বাড়ি-ঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে! কোন মায়ের বুক খালি হবে। মায়ের আর্তচিৎকারে জন্মভূমি কেঁপে উঠবে। এখন ভয় নিত্যদিনের সঙ্গী হয়েছে।

পত্রিকায় দেখলাম, মানুষ সবকিছু হরিয়ে কপালে হাত দিয়ে বসে আছে। রংপুরের পীরগঞ্জে চারদিকে পোড়া গন্ধ। মাটি পুড়ে লাল হয়ে গেছে। কিন্তু পোড়েনি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হৃদয়। বাচ্চারা ভাতের অভাবে তাকিয়ে আছে। কিন্তু মন গলেনি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর। বরং সাম্প্রদায়িক শক্তির বীভৎস রূপ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। হিন্দুদের মণ্ডপ, বাড়ি-ঘর, নারী ও লুটপাট এখন তাদের টার্গেট।

এরাই জামায়াত-বিএনপি আমলে মা-মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। মায়ের সামনে মেয়েকে অপমান করেছে। সুখের সংসারে আগুন জ্বালিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে অনেক পরিবারকে। কিন্তু কান্না শোনার যেন কেউ নেই।

গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লার নানুয়ার দীঘির পাড়ে পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগে এনে হামলার ঘটনাকে ধিক্কার জানানোরও ভাষা নেই। শুধু হামলা নয়, ভাঙচুর, খুন, লুটপাটসহ এমন কোনো ঘটনা নেই, যা ঘটেনি। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন কী করছিলেন? সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। এই সংস্থাগুলো কী করছিল?

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কী করছিলেন জানি না। তারা যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বুকে নয়, মুখে বলে তাহলে কিছু বলার আছে। কিন্তু যদি অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলেন। আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় মুখ বুজে পড়ে থাকেন, তাহলে আপত্তি আছে। তার মানে বুঝতে হবে চেতনায় মরিচা ধরেছে। এতো গেল কুমিল্লার ঘটনা। কিন্তু পরে নোয়াখালীর ঘটনাকে আরও বেশি নাড়া দিয়েছে। অন্তত সরকার ও প্রশাসনের সজাগ থাকলে এমন পরিস্থিতি হতো না। এখানে সরকারের গাফলতি রয়েছে। রয়েছে প্রশাসনের উদাসীনতা।

নোয়াখালী মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম ঘাঁটি। অনেক বড় মানুষের জন্ম। তাদের সন্তানরা আজকে স্থানীয় প্রতিনিধি সেখানে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল সেটা বোধগম্য নয়। যেখানে ত্যাগী আওয়ামী লীগের নেতারা রয়েছেন। তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষাকে কেন্দ্র করে আজ সেখানে আওয়ামী লীগ বিভক্ত। আপনারা বিভক্ত হন, আর অবিভক্ত থাকেন, সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা, আপনারা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাস করেন। তাহলে নোয়াখালীতে এমন দুঃখজনক ফটনা ঘটে কীভাবে?

রংপুরের পীরগঞ্জ। জানা মতে, শান্তিপ্রিয় এলাকা। এলাকায় জেলেপল্লিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। গোয়ালের পশু পর্যন্ত রেহাই পায়নি। মানুষের গোলার ধান, ঘরের টিনসহ সব কিছু পুড়ে ছাই হয়েছে। আর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তালি দিয়েছে। প্রশাসন ঘটনা শেষ হওয়ার পর সেখানে যাচ্ছে। প্রশাসনকে জানানোর পরেও তারা ঘটনার অনেক পর সেখানে উপস্থিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাহলে কি প্রশাসনের মধ্যেও গলদ আছে?

গত ১৩ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। কিন্তু এই ১৩ বছরেও প্রশাসন অসাম্প্রদায়িক কি না প্রশ্নসাপেক্ষ। সেখানে অজ্ঞাত অসংখ্য মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এতদিনে হিন্দুদের ওপর যতগুলো হামলা হয়েছে, তার কটির বিচার মানুষ দেখতে পেয়েছে? হয়নি বললেই চলে।

মামলা হয়। গ্রেপ্তার হয়। কদিন পর জামিনে বেরিয়ে আসে। কিন্তু ভুক্তভোগী বা ক্ষতিগ্রস্তরা বিচার পায় না। এবারও মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে। কদিন পর হয়তো ছেড়ে দেয়া হবে। বিচার হবে কি না সেট আরও দূরের বিষয়। কারণ সরকারের ইচ্ছে থাকলেও প্রশাসনসহ বিচারকাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি জায়গায় সাম্প্রদায়িক শক্তি রয়েছে। যেখান থেকে সরকার চাইলেও বের হয়ে আসতে পারছে না কেন সেটা উদঘাটন জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তাই এদেশের মানুষের তার প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা অনেক বেশি। এই বিশ্বাস ও আস্থা যেন উবে না যায়। এদেশের ‘সংখ্যালঘু’রা সব সরকারের আমলেই মার খায়। কিন্তু শেখ হাসিনার আমলে মার খাবে, এটা ভাবতে অবাক লাগে।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার পার্শ্ববর্তী এলাকা আগৈলঝাড়া, গৌরনদী। সেখানে হিন্দুদের বাড়িতে হামলা করা হয়েছিল। মায়ের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। মন্দিরে হামলা ভাঙচুর করা হয়। কিন্তু তার কতটুকু বিচার হয়েছে আজও জানি না। সেটা ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমল। বিএনপির সঙ্গে ছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। ফলে জনগণ আশার আলো একটু বেশি দেখতে চাইবে, এটিই স্বভাবিক। কিন্তু সেই ‘গুড়ে যদি বালি’ পড়ে, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে!

যুগে যুগে ‘সংখ্যালঘু’রা মার খাবে, এটা হতে পারে না। অপরাধীদের এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব
জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ
বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িকতার কাছে বাংলাদেশ হারবে না

সাম্প্রদায়িকতার কাছে বাংলাদেশ হারবে না

ইসলাম কিছুতেই মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট সমর্থন করে না। এটা ভয়ংকর শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির মতো পাপ। একজন ভালো মুসলমান কিছুতেই ভিন্নধর্মের নিরপরাধ মানুষের ওপর আঘাত করবে না। একজনের অপরাধে আরেকজনকে শাস্তি দেবে না। কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির শাস্তি আমরা সবাই চাই। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় পীরগঞ্জে আগুন, নোয়াখালীতে লুটাপাট হবে কেন?

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যাওয়ার আগে উপমহাদেশকে দুই ভাগ করে দিয়ে যায়। ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গঠিত হয় ভারত। আর দ্বিজাতিত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত হয় ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান। বর্তমান বাংলাদেশ তখন ছিল পাকিস্তানের অংশ- পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ভৌগোলিক ব্যবধান ছিল ১১০০ মাইল, আর মানসিক দূরত্ব ছিল অলঙ্ঘনীয়। পাকিস্তান গঠনের পর পরই এ অঞ্চলের মানুষ বুঝে যায়, এটি তাদের দেশ নয়। ধর্ম কখনও একটি রাষ্ট্রের ঐক্যের সূত্র হতে পারে না, হয়নিও। ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রাম শেষে নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠন। স্বাধীনতার পর সংবিধানেও ঠাঁই হয় সেই মূল চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতার।

আবহমানকাল ধরেই এ অঞ্চলের সব ধর্মের মানুষ মিলে-মিশে থাকছে। এটাই বাংলাদেশের মূল চেতনা, মানুষের মূল শক্তি। কিন্তু ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশ আবার পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। গর্তে লুকিয়ে থাকা একাত্তরের পরাজিত শক্তি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সামরিক শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ধর্মকেই বেছে নেয় ঢাল হিসেবে। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। আর এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে রাষ্ট্রের মূল চেতনায় আঘাত হানেন।

সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, কোনো বিদ্বেষ নেই। তারা মিলে মিশেই থাকছেন আবহমানকাল ধরে। কিন্তু কখনও কুচক্রী মহলের উসকানিতে, কখনও রাজনৈতিক কারণে, কখনও সম্পত্তির লোভে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতনের শিকার হয়। আর কোণঠাসা হতে হতে একসময় তাদের কেউ কেউ দেশ ছাড়তেও বাধ্য হয়েছেন।

’৪৭ সালে দেশে ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায় ছিল ৩৩ ভাগ, এখন সেটা নেমে এসেছে ৮ ভাগে। এই পরিসংখ্যানটি আমরা যারা ধর্মীয় সংখ্যাগুরু তাদের জন্য লজ্জার, গ্লানির। একজন মানুষ কখনোই স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েন না, শেকড় কেউ ছাড়তে চান না। পিঠ যখন একদম দেয়ালে ঠেকে যায়, তখনই মনের কষ্ট চাপা দিয়ে দেশ ছেড়ে উদ্বাস্তু হয় মানুষ। সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কমে যাওয়া মানে সংখ্যাগুরু হিসেবে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াতে পারিনি, তাদের সত্যিকারের বন্ধু হতে পারিনি, তাদের মনে নিরাপত্তাবোধ দিতে পারিনি। এমনিতে সাধারণভাবে বাংলাদেশে খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি সবই হয়। কিন্তু একজন মানুষ যখন ধর্ম পরিচয়ের জন্য নির্যাতনের শিকার হবে সে অপরাধটা সবচেয়ে বড়।

আমরা আসলেই পারিনি ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দিতে। তারা সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে। উৎসব মানে আনন্দ, বাধভাঙা উচ্ছ্বাস। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে উৎসব করতে হয় ভয়ে ভয়ে, তাদের উৎসব যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। শারদীয় দুর্গোৎসব যেন প্রতিমা ভাঙার মৌসুম। দিনের পর দিন চলে আসছে এই অবস্থা। তবে এবার কুমিল্লা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্নস্থানে যা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে কলঙ্ক হয়ে থাকবে।

কুমিল্লায় পবিত্র কোরআন অবমাননার ঘটনায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের হৃদয়ে আঘাত করেছে। তারা দায়ীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। কিন্তু বিক্ষোভ করা আর মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এক নয়। যারা হামলা করেছে তারা বিছুতেই ধর্মপ্রাণ মুসলমান হতে পারে না। ইসলাম কিছুতেই মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট সমর্থন করে না। এটা ভয়ংকর শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির মতো পাপ। একজন ভালো মুসলমান কিছুতেই ভিন্নধর্মের নিরপরাধ মানুষের ওপর আঘাত করবে না। একজনের অপরাধে আরেকজনকে শাস্তি দেবে না। কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তির শাস্তি আমরা সবাই চাই। কিন্তু কুমিল্লার ঘটনায় পীরগঞ্জে আগুন, নোয়াখালীতে লুটাপাট হবে কেন?

এ ধরনের ঘটনায় চেনা বাংলাদেশ মুহূর্তেই অচেনা হয়ে যায়। পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, দোষারোপ চলতে থাকে। কিন্তু এসব কিছু নয়, প্রয়োজন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ। আশার কথা হলো, বাংলাদেশ তার আপন শক্তিতে জেগে উঠেছে। গোটা বাংলাদেশ এখন প্রতিবাদে উত্তাল। প্রতিদিনই এখন দেশের কোথাও না কোথাও বিক্ষোভ, শান্তির পদযাত্রা, সমাবেশ, মানববন্ধন হচ্ছে। কুমিল্লার ঘটনার পর থেকে দেশের বিভিন্নস্থানে মন্দির বা হিন্দুদের বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছে মুসলমান যুবকরা। এমনকি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের রক্ষা করতে গিয়ে আহত হয়েছেন মুসলমানদের অনেকে।

কুমিল্লার ঘটনা অচেনা হয়ে ওঠা বাংলাদেশ আবার ফিরছে চেনা রূপে। আমি সবসময় যেটা প্রত্যাশা করি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের প্রতিবাদে হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানরা বেশি মাঠে নামবে। এবার তাই হচ্ছে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষই সামনের কাতারে। সাধারণত এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দ্রুত ছড়ায় গুজবের পাখায় ভর করে। আর ধর্মের নামে কিছু অমানুষ এই গুজব ছড়ায়। এখন আবার ফেসবুক আসায় গুজবটা সহজে ছড়ানো যায়।

বেদনাদায়ক হলো- ইসলামের লেবাসধারী কিছু কাঠমোল্লা ধর্মের আসল চেতনাকে পাশ কাটিয়ে ঘৃণা ছড়ায়, বিদ্বেষ ছড়ায়; তাতে সহিংসতা আরও বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিছু ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে কুমিল্লার ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছে। আর তাতে হাওয়া দিয়েছে কিছু লেবাসধারী মোল্লা। তবে আশার কথা হলো, ইসলামকে যারা অন্তরে ধারণ করেন, তেমন মওলানারা এবার সোচ্চার। তারা কথা বলছেন, মসজিদের খুতবায় ইসলামের আসল চেতনাটা তুলে ধরছেন, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঠেকাতে এর চেয়ে ভালো উপায় আর নেই।

একজন ইসলামি চিন্তাবিদ যখন ইসলামের আলোকে বুঝিয়ে দেবেন মন্দিরে হামলা করাটা পাপ, হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা করাটা ভয়ংকর অন্যায়; তখন সাধারণ মানুষ সেটা সবচেয়ে ভালো করে বুঝবে, তারা কারো উসকানিতে পা দেবে না। ইসলাম তো নয়ই কোনো ধর্মই ভিন্নধর্মের মানুষের ওপর হামলাকে সমর্থন করে না। আপনি যখন ভিন্নধর্মের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দিলেন, মনে রাখবেন, অন্য কেউও আপনার ধর্মকে আঘাত করার সুযোগ খুঁজবে। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ইসলাম ধর্মের অবমাননা, বাংলাদেশের মূল চেতনার ওপর আঘাত।

কুমিল্লা এবং এরপর দেশজুড়ে তাণ্ডবে যতটা হতাশ হয়েছিলাম, দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে তার অনেকটাই কেটে গেছে। আবার আমরা আশাবাদী হচ্ছি। বাংলাদেশ হারবে না, সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেই। সত্যের জয়, মানবতার জয় অবশ্যম্ভাবী।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব
জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ
বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

শেয়ার করুন

‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি’

‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি’

পাকিস্তান আমলে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক হাজারো মুসলমান এর বিরুদ্ধে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল করে। দাঙ্গা থামাতে জীবন দিয়েছে এমন নজিরও আছে। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত আত্মত্যাগে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা আছে। তবু একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু কোটি কোটি অসাম্প্রদায়িক মুসলমান বন্ধু রীতিমতো চুপ।

বিজয়া দশমী চলে গেছে। বড্ড বিবর্ণ, ম্লান, এক রক্তঝরা দুর্গোৎসব পার করলাম। আমি সকালে পত্রিকাগুলো হাতে পেয়ে লিখতে বসছি। আগেই লেখা উচিত ছিল, কিন্তু পারিনি। এ লেখার তৈরির আগের দিন পাবনাতে ঢাকার পত্রিকাগুলো আসেনি। সংবাদপত্রবাহী গাড়ি সরকারি অগ্রাধিকার তালিকায় প্রথমদিকে। পুলিশের কর্তব্য ছিল যে করেই হোক, যানযটের তোয়াক্কা না করে এই গাড়িগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দেয়া। পুলিশ সে দায়িত্ব পালন করেনি।

কী লিখব আর কীভাবে লিখব? কেমন উপসংহার টানব বুঝে ওঠতে পারছি না। মনে যা আসে, ঘটনা যেভাবে দেখেছি তাই স্পষ্টভাষায় লিখব।

বিদ্রোহী কবির ভাষায়-‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি- তাই যাহা আসে কই মুখে।’ পরিস্থিতিটা এমনই যা ভাষায় প্রকাশ করতে কষ্ট হয়। এই কষ্ট তো হওয়ার কথা ছিল না। ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো। কিন্তু জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তীব্র ও আপসহীন লড়াইয়ের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে আনা হয়। ভাষাসংগ্রামীদের আত্মদানও ঘটেছে। তবু কেউ পিছু হটেনি। কী লিখেছে জাতীয় ও বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রগুলো?

দেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকাটির প্রতিবেদন দিয়েই শুরু করি। ‘আবারও ধর্মীয় উস্কানী, সাম্প্রদায়িক হামলা, নিহত ৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে দুর্গাপূজার আগে দেশে বেশ কটি জায়গায় পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে। এধরনের ঘটনায় চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে সংঘর্ষে ৪ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পূজামণ্ডপে বিচ্ছিন্নভাবে আরও একাধিক ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়তি পুলিশ, র‌্যাব ছাড়াও দেশের ২২ জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে হাজীগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত, গত বুধবার ১৩ অক্টোবর মহাষ্টমীর দিন কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে প্রতিমার পায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শরিফ পাওয়া গেছে এমন খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে উসকানি দেয়া হয়েছে। এরপর কুমিল্লার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। এ নিয়ে সেখানে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও গুলি ছোড়ে।

‘কুমিল্লায় হামলার ঘটনায় সন্দেহজনক কজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আরও কজনকে চিহ্নিত করেছে। তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে শিগগিরই সক্ষম হবে বলে মনে করছি।’ বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

হাজীপুরে (চাঁদপুর) গত বুধবার (১৩ অক্টোবর) রাত নটার দিকে চাাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বাজারে লক্ষ্মীনারায়ণ জিউর আখড়া মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসময় পুলিশের সঙ্গে মিছিলকারীদের সংঘর্ষের সময় গোলাগুলিতে ৪ জন নিহত হয়। আহত হয় পুলিশসহ ৩০ জন। পরিস্থিতি সামাল দিতে বুধবার রাত এগারোটার পর থেকে হাজীগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার পূজামণ্ডপ ও হিন্দু বসতিতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। মোতায়েন করা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য।

সাম্প্রদায়িক অপশক্তি উলিপুরের পরিবেশ বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এমন ঘটনা ঘটল।

কুমিল্লার ঘটনার জের হিসেবে সিলেটের জকিগঞ্জের কালীগঞ্জে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ৩০০-৪০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।

পাবনা জেলার বেড়াতেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার নিশ্চয়ই এখানেই শেষ নয়- এটি শুরুও নয়। দশকের পর দশক ধরে এ জাতীয় কিংবা এর থেকেও ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটছে কিন্তু বিচার নেই, মামলা নেই, মামলা হলেও চার্জশিট নেই। জামিনও পেতে লাগে মাত্র ৩ থেকে ৭ দিন। তারপর ফাইনাল রিপোর্ট।

তাহলে উপায়? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার বলেছেন, কুমিল্লার সাম্প্রদায়িক ঘটনায় কাউকে ছাড় নয়। একথা সত্য হোক। কিন্তু অভিজ্ঞতা করুণ। আরও বহু জায়গায় কুমিল্লার মতো ঘটনা ঘটেছে। সেসবসহ যেগুলো ঘটবে সেগুলো এবং অতীতে যেগুলো ঘটেছে সেগুলোর কী হয়েছে?

এ কথা সবারই জানার কথা, পাকিস্তান আমলে এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক হাজারো মুসলমান এর বিরুদ্ধে বিশাল প্রতিবাদ মিছিল করে। দাঙ্গা থামাতে জীবন দিয়েছে এমন নজিরও আছে। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত আত্মত্যাগে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছে।

সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা আছে। তবু একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু কোটি কোটি অসাম্প্রদায়িক মুসলমান বন্ধু রীতিমতো চুপ। রাজপথে মাঝেমধ্যে ‘সংখ্যালঘু’দের কিছু সংগঠনকে মিছিল করতে দেখা যায়। এরা অনেকেই সরকারের কাছ থেকে সুবিধাভোগী। লোক দেখানো হলেও তবু তারা মাঝেমধ্যে মাঠে বা রাস্তায় নামে। এর কোনো প্রতিক্রিয়া বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে আদৌ হয় না। আবার যে আইনি ব্যবস্থার কথা সরকার ও আমরা বলে থাকি, তারা যেন মনে রাখে আইন দ্বারা সব হয় না। আইনি পথে মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতাও হয়নি।

লেখক: রাজনীতিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ
২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব
জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ
বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

শেয়ার করুন