বিশ্বব্যাংক ধোয়া তুলসী পাতা নয়

বিশ্বব্যাংক ধোয়া তুলসী পাতা নয়

কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করেই, ঋণের টাকা ছাড় না করেই মোড়লের মতো এই সংস্থার মাতব্বরি শুরু করে দেয়ার ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি কবছর আগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি; চুক্তিও করেছিল সরকারের সঙ্গে। কিন্তু অর্থ ছাড় না দিয়েই, প্রকল্পের কাজ শুরু না হতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে কাল্পনিক অভিযোগ করে বসে সংস্থাটি। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি- বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার। বিষয়টি কানাডার আদালত অবধি গড়ায়। দেড় বছর ধরে চলা দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেবে না বলে নিজস্ব অর্থে সেতুটি নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্নীতি মানে শুধু টাকা এ হাত-ও হাত করা নয়। দুর্নীতির মানে ক্ষমতার অপব্যবহার। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তথ্য এ দিক-ও দিক করে কোনো রিপোর্ট বা প্রতিবেদন বিশ্বববাসীর কাছে তুলে ধরা কোন ধরনের দুর্নীতি- তা আমার জানা নেই। আর সেই প্রতিবেদনের কারণে যদি কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতাচ্যুত হন বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন- তাহলে সেটা দুর্নীতির মধ্যে পড়বে কি না, সে বিষয়েও আমার কোনো ধারণা নেই।

কিন্তু, এই কাজটি যদি বিশ্ব আর্থিক খাতের মোড়ল সংস্থা বিশ্বব্যাংক করে থাকে তাহলে কিন্তু আমার কথা আছে। যে সংস্থাটি উঠতে-বসতে বাংলাদেশসহ তামাম দুনিয়ার মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবক দেয়, আর্থিকসহ নানা খাতের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলে; তাদের কথামতো না চললে বা কাজ না করলে কোনো দেশকে ঋণ দেয় না। নানা শর্ত মেনে কোনো প্রকল্পে ঋণ দিলেও একটু এদিক-সেদিক হলেই সেই টাকা আবার ফেরত নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলে দেয়া হয় সেই দেশের সরকারকে; অনিশ্চিত হয়ে পড়ে প্রকল্পটির ভবিষৎ। উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হন সেই দেশ বা প্রকল্প এলাকার জনগণ।

শুধু কি তাই, কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করেই, ঋণের টাকা ছাড় না করেই মোড়লের মতো এই সংস্থার মাতব্বরি শুরু করে দেয়ার ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি কবছর আগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি; চুক্তিও করেছিল সরকারের সঙ্গে। কিন্তু অর্থ ছাড় না দিয়েই, প্রকল্পের কাজ শুরু না হতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে কাল্পনিক অভিযোগ করে বসে সংস্থাটি। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি- বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার। বিষয়টি কানাডার আদালত অবধি গড়ায়। দেড় বছর ধরে চলা দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেবে না বলে নিজস্ব অর্থে সেতুটি নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাকিটা ইতিহাস; সবারই জানা…!

এই তো আর কমাস! তারপরই স্বপ্নপূরণ। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে বাস চলবে; চলবে ট্রেন। উন্নয়নের আরেক মহাসড়কে উঠবে বাংলাদেশ। জিডিপিতে যোগ হবে এক থেকে দেড় শতাংশ। দুই অঙ্কের (১০ শতাংশ) জিডিপিতে অগ্রসর হওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে।

এরই মধ্যে থলের বিড়াল বের হতে শুরু করেছে। যে সংস্থার এত বড় কথা; কত মাতব্বরি- সেই বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধেই এখন গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আর সেই অভিযোগটি হচ্ছে, চিলির সমাজতান্ত্রিক সরকারের বদনাম করতে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ বা ‘ব্যবসা করার সূচক-বিষয়ক প্রতিবেদন’ তৈরি করেছিল বিশ্বব্যাংক।

ব্যবসা করার পরিবেশ কোথায় সবচেয়ে অনুকূল, এর নিরিখে ২০০৬ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বের ১৯০ দেশের একটি তুলনামূলক তালিকা ও রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে বিশ্বব্যাংক। এ রিপোর্টকে ভিত্তি করেই বহু বিদেশি বিনিয়োগকারী কোন দেশে বিনিয়োগ করবে বা কোন দেশ থেকে সরে আসবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয়। গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রতিবেদন তৈরিতেই নানা অনিয়মের কথা স্বীকার করে এই রিপোর্ট আর না করার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

গত বছরের আগস্টে প্রথম অনিয়মের বিষয়টি টের পায় সংস্থাটি। এ কারণে ওই বছরের অক্টোবরে ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ প্রকাশ করা হবে না বলে জানায় তারা। এ ছাড়া পাঁচটি প্রকাশিত রিপোর্টের তথ্যও ফরেনসিক অডিটরকে দিয়ে পরীক্ষা করানোর কথা বলা হয় সেসময়।

গত বৃহস্পতিবার এক আকস্মিক ঘোষণায় সংস্থাটি জানায়, ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ আর দেয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তর থেকে এই ঘোষণা দেয়া হয়। এ বিষয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতিও দেয় সংস্থাটি।

প্রতিবছর বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশগুলোর ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট তৈরি করে। ব্যবসা শুরু, বিদ্যুৎ-সংযোগ, সম্পত্তি নিবন্ধন, কর ব্যবস্থাসহ কয়েকটি নির্দেশক বা মানদণ্ডের প্রতিটির ওপর ১০০ নম্বরের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর গড় করে চূড়ান্ত স্কোর নির্ণয় করা হয়। স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোর অবস্থানের তালিকা করা হয়।

২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস সূচকে চিলির অবস্থান ছিল ৩৪তম। ২০১৭ সালে এসে সেই চিলি পিছিয়ে চলে যায় ৫৫তম অবস্থানে। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি চিলির তখনকার রাষ্ট্রপতি মিশেল বাশলে। ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এর জেরে বিশ্বব্যাংকের এ সূচক তৈরির অনিয়ম প্রথম ধরা পড়ে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে চিলি ৩৪তম অবস্থানে ছিল। ২০১৭ সালে তা পিছিয়ে ৫৫তম অবস্থানে নেমেছে। এরপর চিলির রাষ্ট্রপতি ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। চিলির কর্মকর্তারা বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা করে বলেন, সংস্থাটি দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির ক্ষেত্রে তাদের বার্ষিক ‘ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিযোগিতামূলক র‍্যাঙ্কিংয়ে অন্যায় আচরণ করেছে।

২০১৪ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট হন মিশেল বাশলে। এরপরে তার শাসনামলের পরবর্তী তিন বছরই ডুয়িং বিজনেস সূচকে চিলির অধঃপতন হয়। ২০১৫ সালে ৪১, ২০১৬ সালে ৪৮ ও ২০১৭ সালে ৫৫তম হয় চিলির অবস্থান।

চিলির প্রেসিডেন্টের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনায় নেয়া হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের সেসময়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার অসংগতির কথা জানান। তার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের একজন সাবেক পরিচালক এমনভাবে জালিয়াতি করে ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ সূচক নির্ণয়ের পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন, যাতে চিলির ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়।

পল রোমার প্রতিবেদনের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের জন্য চিলির কাছে ক্ষমা চান। তিনি স্বীকার করেন বাশলের অধীন ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এই র‌্যাঙ্কিং রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত। তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ফলে প্রতিবেদনে চিলির অবনমন হতে পারে।

সেসময় এ বিষয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বক্তব্য দেন পল রোমার। তিনি বলেন- ‘আমি চিলি এবং অন্য যেকোনো দেশে যেখানে আমরা ভুল ধারণা দিয়েছি, তাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাই। আমার দায় রয়েছে। কারণ, আমরা বিষয়গুলো যথেষ্ট পরিষ্কার করিনি। বিশ্বব্যাংক অতীতের রিপোর্টগুলো সংশোধন করার পদ্ধতি শুরু করছে এবং পদ্ধতি পরিবর্তন না করে র‍্যাঙ্কিং কেমন হবে, তা পুনরায় প্রকাশ করবে।’

রোমার বলেন, সংশোধনগুলো চিলির জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, তাদের অবস্থান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্থিতিশীল ছিল। বিশ্বব্যাংকের কর্মীদের রাজনৈতিক প্রেরণার কারণে বিষয়টি কলঙ্কিত হয়েছে। কারণ, বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কাভারেজ পায়। এমন মন্তব্য করায় পল রোমারকে পদত্যাগ করতে হয়।

প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন করা সেই সাবেক পরিচালক ছিলেন অগাস্টো লোপেজ-ক্লারোস। চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক লোপেজ-ক্লারোস সে সময় বিশ্বব্যাংকের দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়ে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় তার ওই কাজের জন্য প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।

২০১৮ সালে মার্চে দায়িত্ব থেকে সরে যান মিশেল বাশলে। সমাজতান্ত্রিক দল থেকে ক্ষমতা চলে যায় কনজারভেটিভ দলের কাছে। দায়িত্ব পান প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা।

পল রোমারের ক্ষমা চাওয়ার পর ওই সময় এক টুইটে মিশেল বাশলে লেখেন, ‘বিশ্বব্যাংকের প্রতিযোগিতামূলক র‌্যাঙ্কিং তৈরিতে যা ঘটেছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে র‌্যাঙ্কিং পরিচালনা করে, তা নির্ভরযোগ্য হওয়া উচিত। কারণ, তারা বিনিয়োগ ও দেশগুলোর উন্নয়নে প্রভাব ফেলে।’ তিনি আরও বলেন, তার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাংকের কাছে সম্পূর্ণ তদন্তের অনুরোধ জানাবে।

গত বছরের আগস্টে বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অসংগতি থাকতে পারে, কিন্তু তা এখনও চিহ্নিত হয়নি। তাই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তন এবং অসংগতির কারণে যেসব দেশ অধিক প্রভাবিত হয়েছে, সেসব দেশের সঠিক তথ্য পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আর এ কারণে গত বছরের অক্টোবরে ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স তৈরি স্থগিত করে তারা।

আর এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়ে এই রিপোর্ট আর না করার কথা জানিয়েছে সারাবিশ্বে ‘দাদাগিরি’ ফলিয়ে আসা বিশ্বব্যাংক। তাহলে, কী দাঁড়াল বিশ্বব্যাংকও ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ নয়! তাদের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বিশ্বব্যাংকেও দুর্নীতি হয়!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার
বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া
ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা
বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু
চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

শেয়ার করুন

মন্তব্য

শিশুদের জন্য নিরাপদ হোক পৃথিবী

শিশুদের জন্য নিরাপদ হোক পৃথিবী

শেখ রাসেল ছিল বন্ধুবৎসল, গরিবদের জন্য ছিল তার দরদ, মমতা। জাতির পিতার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়াতে যখন সে যেত তখন গ্রামের ছেলেদের জন্য সে জামা নিয়ে যেত। তাদের উপহার দিত। আজ শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে দেশ একজন মানবদরদি মানুষ পেত।

১৯৬৪ সাল। সময়টা ছিল লড়াই আর যুদ্ধের উত্তেজনায় মুখর। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে চলেছে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ওই সময় পাকিস্তানজুড়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোল। একদিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান, অপরদিকে সম্মিলিত বিরোধীদলের প্রার্থী কায়দে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহ। অনিশ্চয়তা আর অন্ধকারের মাঝেও এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে। যিনি এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটিয়ে বাঙালি জাতিকে এনে দেবেন মুক্তির স্বাদ বাঙালির সেই অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘর আলো করে জন্ম নিল এক শিশু।

১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িতে শেখ রাসেলের জন্ম। রাসেলের যেদিন জন্ম হয় বঙ্গবন্ধু সেদিন ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণের জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। জন্মের সময় বাবা কাছে না থাকলেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পিতা-পুত্রের চিরপ্রস্থান ঘটেছিল একসঙ্গেই।

ছোট ছেলের রাসেল নামটি রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার প্রিয় লেখক ছিলেন পৃথিবী বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক সাহিত্যে নোবেল পুস্কারপ্রাপ্ত বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি কেবল একজন দার্শনিকই ছিলেন না। বিজ্ঞানীও ছিলেন। ছিলেন পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের একজন বড় মাপের বিশ্বনেতা। পৃথিবীটাকে মানুষের বসবাসের জন্য সুন্দর ও শান্তিময় করার লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন নিরলস। বার্ট্রান্ড রাসেলের নামের সঙ্গে মিলিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের নাম রাখলেন রাসেল। শেখ রাসেল। এই নামটিকে ঘিরে নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর মহৎ কোনো স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা ছিল। কত আশা ছিল তার ছেলে বড় হয়ে জগৎখ্যাত হয়ে উঠবে একদিন। কত সাধই না মানুষের অপূর্ণ থেকে যায়!

শিশু রাসেলের ভুবন ছিল তার পিতা-মাতা— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব; বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালকে ঘিরে। তাদের সবার ভালোবাসার ধন ছিলেন ছোট্ট রাসেল। রাসেলের জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে বাবা মুজিবকে ছাড়া। কারণ, বাবা মুজিব রাজনৈতিক বন্দি হয়ে কারাগারে ছিলেন দিনের পর দিন। শেখ রাসেল বেশ কবারই কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে তার প্রথম কারাগার দেখা ১৯৬৬ সালের ৮ মে, পিতার গ্রেপ্তারের পর।

কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার বাবাকে রেখে আসতে চাইত না। এ কারণে তার মন খারাপ থাকত। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় ১৯৬৬ সালের ১৫ জুনের দিনলিপিতে রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না- যে পযর্ন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করছে। জেল গেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকেছিল। আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরেই ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি। যাবার সময় হলে ওকে ফাঁকি দিতে হয়।”

শিশু রাসেল ছিল অভিমানী। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন ‘কারগারের রোজনামচা‘য়। ১৯৬৭ সালের ১৪-১৫ এপ্রিল অন্যান্য প্রসঙ্গ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু রাসেলকে নিয়ে লিখেছেন-

“জেল গেটে যখন উপস্থিত হলাম ছোট ছেলেটা আজ আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে আশ্চর্যই হলাম। আমি যখন রুমের ভিতর যেয়ে ওকে কোলে করলাম আমার গলা ধরে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করল। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কি?’ ওর মা বলল,“বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে।” রাসেল ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকতে লাগল। যেই আমি জবাব দেই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার উপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়। এখন আর বিদায়ের সময় আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।”

শিশু রাসেলকেও কাটাতে হয় বন্দিজীবন। অত্যন্ত কষ্টকর ছিল তার দিনগুলো। তার বন্দিত্ব সম্পর্কে বোন শেখ হাসিনা ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ নিবন্ধে লিখেছেন-

“ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবন-যাপন শুরু করে। ঠিকমতো খাবার-দাবার নেই। কোন খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো। বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোন খবর আমরা জানি না। কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানি না। প্রথমদিকে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। তার ওপর আদরের কামাল ভাইকে পাচ্ছে না, সেটাও ওর জন্য কষ্টকর। ” (ইতিহাসের মহানায়ক: পৃষ্ঠা ২১)।

ছোট থেকে বাবা শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে দেখতে দেখতে বড় হওয়া রাসেল অজান্তেই চাপা স্বভাবের হয়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে বিষয়ে বক্তৃতায় বলেন-

‘খুব চাপা স্বভাবের ছিল। সহজে নিজের কিছু বলতো না। তার চোখে যখন পানি, চোখে পানি কেন জানতে চাইলে বলতো, চোখে যেন কী পড়েছে। ওইটুকু ছোট বাচ্চা, নিজের মনের ব্যথাটা পর্যন্ত কীভাবে লুকিয়ে রাখতে হয় শিখেছিল।’

শেখ রাসেল ছিল বন্ধুবৎসল, গরিবদের জন্য ছিল তার দরদ, মমতা। জাতির পিতার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়াতে যখন সে যেত তখন গ্রামের ছেলেদের জন্য সে জামা নিয়ে যেত। তাদের উপহার দিত। আজ শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে দেশ একজন মানবদরদি মানুষ পেত।

শেখ রাসেলের এই ছোট্ট জীবন আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয়। প্রথমত, আমাদের শিশুরা যদি শেখ রাসেলকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করে তার মতো বেড়ে ওঠে, তাহলে আমরা আদর্শ শিশু পাব। যাদের হাত ধরে বিনির্মিত হবে আগামীদিনের চেতনার নাগরিক। শিশুদের তাই, শেখ রাসেলের ছোট্ট জীবনটা জানাতে হবে। যাতে শিশুরা অনাবিল সুন্দরের সৌন্দর্যে বেড়ে ওঠে, হাসতে পারে, খেলতে পারে, দুষ্টুমি করতে পারে, বন্ধুত্ব করতে পারে, গরিব মানুষকে ভালোবাসতে পারে। এভাবে যদি প্রতিটি শিশু বেড়ে ওঠে তাহলে এই শিশুরা বড় হয়ে আলোকিত মানুষ হতে পারে। একারণেই শেখ রাসেলের জীবন আমাদের জানাটা অত্যন্ত জরুরি।

শেখ রাসেল নিজেকে কীভাবে গড়ে তুলত তা বলার উপায় নেই। তবে পারিবারিক ঐতিহ্য, আদর্শের উত্তরাধিকার তার চরিত্র গঠনে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, তাতে সন্দেহ নেই। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় অন্তত এই দেশ, দেশের মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ থাকত তার অন্তর ও চেতনাজুড়ে। পরিণত হয়ে উঠত দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য। তার আগ্রহের বিষয়গুলো আয়ত্ত করে সেখানে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারত। সেটিই স্বাভাবিক ছিল তার জন্য।

আজ রাসেল থাকলে একজন মেধাবী মানুষ বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার সংগ্রামে থাকত প্রথম সারিতে। দুর্ভাগ্য এই যে, জীবনের পথ, ইতিহাসের গতিধারা সব সময় স্বাভাবিক সূত্র ধরে এগোয় না। অনভিপ্রেত বহু ঘটনা এসে সেই যাত্রাপথ বিপৎসংকুল করে তোলে, বাঁক ঘুরিয়ে দেয়, ভিন্নখাতে নিয়ে যায়। তখন আবার সঠিক পথে ফিরতে প্রয়োজন হয় কঠিন সংগ্রামের।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে এমনি এক ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করা হয়েছিল এই দেশকে। এরই নির্মম শিকার হয়েছিল শিশু শেখ রাসেল। ফলে তার জন্মদিনটি আনন্দ নয়, বরং বেদনাই বয়ে আনে বিবেকবান মানুষের কাছে।

শেখ রাসেলের সেই বেদনাঘন জন্মদিন আজ। আমরা শেখ রাসেলের পাশাপাশি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের শহীদদের স্মৃতিও এই দিনে স্মরণ করি। একাত্তরের পরাজিত ঘাতক বাহিনী দেশ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে দিতে এ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। আর আইন করে সেই আত্মস্বীকৃত খুনিদের দায়মুক্তি দেয়া হয়। আশার কথা হলো- বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল করে খুনিদের বিচারের আওতায় এনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করেন।

শেখ রাসেলের জন্মদিন ১৮ অক্টোবর। এ বছর থেকে ‘জাতীয় দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে আগামী বছরগুলোতে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ শেখ রাসেল দিবস পালনের প্রস্তাব এবং যৌক্তিকতা মন্ত্রিসভায় পেশ করে। ২৩ আগস্ট ২০২১, মন্ত্রিসভার বৈঠকে শেখ রাসেল দিবস ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালনের বিষয়ে অনুমোদন দেয়া হয়। এর জন্য আমরা আইসিটি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

শিশু শেখ রাসেলের অকালপ্রয়াণের শোক-দুঃখ কোনো দিন শেষ হবার নয়। শেখ রাসেলের জন্মদিনে আমাদের কামনা শুধু আমাদের দেশ নয়, সারা পৃথিবীই শিশুদের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠুক। হানাহানির অবসান হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক চিরকাঙ্ক্ষিত শান্তি।

লেখক: সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়

আরও পড়ুন:
অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার
বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া
ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা
বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু
চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

শেয়ার করুন

অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক

অজয় রায়: সাম্য ও সম্প্রীতির সাধক

অজয় দাকে অনেক ব্যাপারেই আমার মনে পড়বে। ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নিপীড়নের ঘটনা দেশে ঘটতে থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এসবের বিরুদ্ধে আমৃত্যু প্রতিবাদী সোচ্চার কন্ঠ ছিলেন।

এবার বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় তাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপন করতে পারেনি। কুমিল্লা শহরের একটি পূজামণ্ডবে হনুমানের কোলে কে বা কারা একটি কোরআন রেখে যায়। কোনো হিন্দু এটা করতে পারে না। কারণ পূজা অনুষ্ঠানে অন্য ধর্মের গ্রন্থ রাখা পূজার পবিত্রতার সঙ্গেই যায় না। আবার কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমানও তার পবিত্র গ্রন্থ পূজামণ্ডবে রাখতে পারেন না। এাটও তার বিশ্বাসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। তাহলে কে রাখল পূজামণ্ডপে কোরআন?

মানুষের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়ে যারা দেশে দাঙ্গাফ্যাশাদ বাধিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায় তাদের মাথা থেকেই এই নষ্ট ও দুষ্ট বুদ্ধি বের হয়েছে। কোরআনের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করার গুজব ছড়িয়ে দেশের কয়েকটি স্থানে পূজাস্থলে আক্রমণ হয়েছে, প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে এবং হিন্দুদের কিছু বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও হামলা, ভাঙচুর হয়েছে। দুএক জায়গায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

বিভিন্ন জায়গা থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার খবর শুনে আমার একজন মানুষের কথা খুব মনে হয়েছে। তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ফোন করতেন এবং কিছু একটা করার জন্য ছটফট করতেন। তিনি অজয় রায়, বাংলাদেশের প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন অগ্রণী যোদ্ধা। মানুষে মানুষে সাম্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তার জীবন নিবেদিত ছিল। আজ ১৭ অক্টোবর অজয় রায়ের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালে তার প্রয়াণ হয়।

অজয় রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৭৩ সালের দিকে। কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হয়ে তার নিজের জেলা ময়মনসিংহ থেকে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ঢাকা আসার পর। তবে তার সম্পর্কে জানি আরও আগে থেকে।

আমি যেহেতু স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম এবং রাজনৈতিক বইপুস্তিকা পড়ার অভ্যাস ছিল, সেহেতু অজয় বায়ের ‘বাংলা ও বাঙালী’ পড়া হয়েছিল। তাছাড়া কারাগারে ও আত্মগোপনে থাকা কমিউনিস্ট নেতাদের বিষয়ে জানার আগ্রহ থেকেও আমি অজয় রায় সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে ছিলাম তার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের আগেই।

তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন, জেলে বসে পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেছেন, তার বাবাও ছিলেন বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, চার ভাষায় পণ্ডিত– এসব তথ্য জেনে একদিকে যেমন তাকে নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে, অপরদিকে তেমনি কমিউনিস্ট হওয়ার ঝোঁকও প্রবল হয়েছে। কমিউনিস্টরা সব অসাধারণ মানুষ, তারা একদিকে ধীমান, অপরদিকে আত্মত্যাগী– এগুলোই আমাকে আকৃষ্ট করেছিল সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ তত্ত্বকথা তার পরের বিষয়। রাজনীতি-অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি সব বিষয়ে অজয় রায়ের জ্ঞানের কথাও তার সঙ্গে পরিচয়ের আগেই জানা।

অজয় দাকে বাইরে থেকে দেখে একটু গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ বলে মনে হলেও বাস্তবে তিনি তা ছিলেন না। তার মতো অমায়িক মানুষ খুব বেশি দেখিনি। তার সঙ্গে সহজেই মেশা যেত, কথা বলা যেত, তর্কাতর্কিও করা যেত। তার সঙ্গে আমার বয়সের অনেক ব্যবধান সত্ত্বেও তিনি আমার সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণই করতেন। আমার ধারণা অন্যদের সঙ্গেও তাই। কারণ এটাই ছিল অজয় দার বৈশিষ্ট্য।

অজয় দার মধ্যে পাণ্ডিত্য জাহিরের কোনো ভাব ছিল না। অন্যের মত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, নিজের মত চাপিয়ে দিতেন না। পার্টির কোনো সিদ্ধান্ত আমার মনঃপূত না হলে অজয় দার কাছে গিয়ে তর্ক জুড়ে দিতাম। তার সঙ্গে অনায়াসে তর্ক করা যেত। যুক্তি পাল্টাযুক্তির লড়াই শেষ করতেন অজয় দা এভাবে : কমরেড, আপনার কথায়ও যুক্তি আছে। কিন্তু এখন পার্টির সিদ্ধান্ত তো মানতেই হইবো। আমাকেও রণে ভঙ্গ দিতে হতো। পার্টির সিদ্ধান্ত বলে কথা! তার কোনো নড়চড় হওয়ার সুযোগ নেই।

অজয় দা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। অর্থনীতি ও শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক বিশিষ্টজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। কমিউনিস্ট কিংবা কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন নন এমন কারো কারো সঙ্গেও অজয় দার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

তার সরলতা, জ্ঞান-বুদ্ধি অন্যদের সহজেই আকর্ষণ করত। কমিউনিস্ট পার্টি যে একটি বিশেষ কালপর্বে দেশের রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাববলয় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল তার পেছনে অজয় দা’র মতো মানুষদের ব্যক্তিগত ভূমিকা একেবারে গৌণ নয় বলেই আমি মনে করি।

অজয় দা পার্টির সাপ্তাহিক মুখপাত্র ‘একতা’র সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। আমি একতায় কাজ করতাম। সেই সুবাদেও তার সঙ্গে আমার কাজের সম্পর্ক ছিল। তিনি একতায় লিখতেন। তার লেখা সংগ্রহের জন্য ওয়ারীর বাসায় যেতে হতো। কখনও কখনও আমাকে বসিয়ে রেখেই লেখা শেষ করতেন। তাতে আমি একটুও বিরক্ত হতাম না। বরং দেরি হোক মনে মনে সেটাই চাইতাম, জয়ন্তী বৌদির সুস্বাদু চা-নাশতা পাওয়ার লোভে।

একতা সম্পাদক মতিউর রহমানের বাসাও ছিল ওয়ারীর লারমিনি স্ট্রিটে। মতি ভাইয়ের বাসায় প্রায় প্রতি সকালেই যেতে হতো। সুযোগ পেলে কখনও কখনও অজয় দা’র বাসায় ঢুঁ মেরে আসতাম। অজয় দার সঙ্গে কতদিন কত বিষয়ে কত কথা হয়েছে তার সব কিছু এখন মনেও নেই। যদি দিনপঞ্জি লেখার অভ্যাস থাকত তাহলে অজয় দাকে নিয়ে আমার লেখা আরও তথ্যপূর্ণ হতো।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় সোভিয়েত বিপর্যয়ের পর সিপিবির মধ্যেও আদর্শিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। অজয় দাকে যেহেতু পার্টির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে দেখা হতো, সেহেতু আদর্শিক দ্বন্দ্বে তার অবস্থান কোনদিকে সেটা জানার আগ্রহ নিয়ে অজয় দার সঙ্গে আলোচনায় বসে বিস্মিত হলাম সংস্কারের পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থান দেখে! আমার ধারণা ছিল তার মতো একজন পুরোনো কমিউনিস্ট তার এতদিনের লালিত বিশ্বাস থেকে নড়বেন না। কারো কারো কাছে মার্কসবাদ যতটা না দর্শন, তারচেয়ে বেশি বিশ্বাস। আরও নির্দিষ্ট করে বললে অন্ধ বিশ্বাস! আমার মনে হয়েছিল, অজয় দা তার এতদিনের বিশ্বাস আঁকড়ে থাকবেন।

মার্কসবাদী দর্শনকে অভ্রান্ত মনে করে কমিউনিস্ট পার্টি রক্ষায় জানপ্রাণ দিয়ে নামবেন। বাস্তবে তিনি বিপরীতটাই করলেন। আমাকে বললেন, শুধু তত্ত্বের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশে আর বাম আন্দোলন এগিয়ে নেয়া যাবে না। সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টান্ত দিয়ে, অসংখ্য কমিউনিস্টের আত্মত্যাগ, সংগ্রামের উদাহরণ দিয়েও যেখানে আমরা মানুষের ব্যাপক সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়েছি, সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর মার্কসবাদী তত্ত্বের সঠিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় এখন নতুন ভাবনার বিকল্প নেই।

এই নতুন ভাবনার অংশ হিসেবেই দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে গেল। এই ভাঙনে অজয় দা পক্ষ নিলেন সংস্কারবাদীদের। তিনি ছিলেন নেতা, কাজেই বলা যায় তিনি পার্টি ভাঙনে আরও অনেককে নিয়ে নেতৃত্ব দিলেন। এরপর আমৃত্যু অজয় রায়ের কেটেছে এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। কাজের ক্ষেত্র খুঁজেছেন, সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। কতটুকু সফল হয়েছেন সে বিচার এখনই নয়।

তিনি ছিলেন চিন্তাশীল প্রগতিকামী সদাসক্রিয় মানুষ। মানবকল্যাণ, মানবমুক্তির যে স্বপ্ন নিয়ে কৈশোরকালেই নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন রাজনীতিতে সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা থেকে কখনই বিরত থাকেননি। নানা ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন অজয় দা। শেষ পর্যন্ত থিতু হয়েছিলেন সামাজিক আন্দোলন নামের একটি সংগঠনে। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদবিরোধী একটি জাতীয় মঞ্চ গড়ে তুলতেও তিনি ভূমিকা পালন করেছিলেন।

অজয় দা যে উদ্যোগই নিয়েছেন তাতে শামিল হওয়ার জন্য আমাকে ডাকতেন। তার ডাকে সাড়া না দিতে পেরে খারাপ লেগেছে। কিন্তু আমার মনে হতো, এভাবে হবে না। আবার কীভাবে হবে সে সম্পর্কে আমার নিজের কোনো স্পষ্ট ধারণাও নেই। তাছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগে জড়িত না হওয়ার ব্যাপারে আমি দৃঢ়মত। অজয় দার বয়স হয়েছিল।

যখন তার অবসর কাটানোর কথা তখন তিনি নানা ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য সভা ডাকছেন, মানববন্ধন করছেন। রক্তে তার মিশেছিল অন্যায় অনাচার অসাম্যের বিরোধিতা করা। চোখের সামনে এসব ঘটতে দেখলে তিনি কি নিশ্চুপ থাকতে পারেন? পুরোনো বন্ধুদের তিনি পাশে চাইতেন। খুব সাড়া পেতেন না। কিন্তু তিনি হতোদ্যম হতেন না। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’… অজয় দা যেন শেষ জীবনে এই নীতি নিয়েই অগ্রসর হয়েছেন।

অজয় দা পার্টি ত্যাগের পর যদি আর কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগে না জড়িয়ে লেখালেখিতে অধিক মনোযোগী হতেন, তাহলে সেটাই বেশি ভালো হতো বলে আমি অন্তত মনে করি। অজয় দা বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি বই অনেকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। সময় দিয়ে তিনি যদি লেখালেখি চালিয়ে যেতেন তাহলে আমরা আরও কিছু মননশীল বই পেতে পারতাম। শেষদিকে রোগশয্যায় শুয়েও তিনি একটি বই লিখে গেছেন। রাজনীতি নয়– বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চাই ছিল অজয় রায়ের উপযুক্ত ক্ষেত্র।

অজয় রায়– ‘কমরেড’ তকমা নাম থেকে মুছতে পারেননি। আবার অন্য পরিচয়ও তার ওপর বেশি আলো ফেলতে পারেনি। তবে এই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্যই ছিল তার জীবন উৎসর্গীকৃত। অসাম্প্রদায়িক-বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক একটি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি বিরামহীন শ্রম দিয়েছেন। কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা নয়- নিজে দেশ ও সমাজকে কী দিতে পারছেন সেটাই ছিল তার জীবনসাধনা।

অজয় রায় আমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। রেখে গেছেন কর্মনিষ্ঠার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। যারা সমাজ প্রগতিতে বিশ্বাস করেন, যারা অসাম্প্রদায়িক দেশের জন্য সংগ্রাম করছেন তাদের কাছে যদি অজয় রায় প্রাসঙ্গিক বিবেচিত হন তাহলে তার জীবনসাধনা বিফল বলে মনে হবে না। অজয় দাকে অনেক ব্যাপারেই আমার মনে পড়বে। ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নিপীড়নের ঘটনা দেশে ঘটতে থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তিনি এসবের বিরুদ্ধে আমৃত্যু প্রতিবাদী সোচ্চার কন্ঠ ছিলেন।

পরিণত বয়সেই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। ১৯২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর– এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অজয় রায় এ দেশের রাজনীতি-সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানবকল্যাণে বড় অবদান রেখেছেন। প্রগতির পথ রচনায় তার অবদানের কথা আমাদের মনে করতেই হবে।

অজয় দার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা!

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন:
অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার
বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া
ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা
বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু
চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

শেয়ার করুন

অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে

অগ্রযাত্রার এসব পথের কাঁটা দূর করতে হবে

বাংলাদেশ বহুকাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে সারা দুনিয়ায় প্রশংসিত। এ ধরনের হামলা দেশের হাজার হাজার পূজামণ্ডপের মধ্যে একটি মাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু তারপরও আমাদের জন্য এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, এক চরম লজ্জার। দেশের একটি গ্রামের অখ্যাত এক পূজামণ্ডপে এই ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা উগ্র সাম্প্রদায়িক এবং এর পেছনে মৌলবাদী রাজনীতি সক্রিয়।

পশ্চিমবঙ্গের এক বন্ধু ১৪ অক্টোবর রাতে মেসেঞ্জারে একটি লাইভ অনুষ্ঠান ফরোয়ার্ড করেছিলেন, যেখানে এক ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে হামলা প্রসঙ্গে ধারাভাষ্য দিয়ে এই অবাঞ্চিত ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। হামলার ভিডিও চিত্রটি তিনি পুরোপুরি দেখাননি, আংশিক দেখিয়ে বার বার বলছিলেন, এ দৃশ্য আমরা দেখাতে চাই না, বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে, যা আমরা কখনও চাই না। ভদ্রলোক বাংলাদেশের একটি অঞ্চল বিশেষের মৌলবাদীদের দ্বারা সংঘটিত এই হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেননি। মনে হয়েছে যেন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের একটি রাষ্ট্র। যদিও প্রকৃত বাস্তবতা তা নয়।

বাংলাদেশ বহুকাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে সারা দুনিয়ায় প্রশংসিত। এ ধরনের হামলা দেশের হাজার হাজার পূজামণ্ডপের মধ্যে একটি মাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু তারপরও আমাদের জন্য এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, এক চরম লজ্জার। দেশের একটি গ্রামের অখ্যাত এক পূজামণ্ডপে এই ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা উগ্র সাম্প্রদায়িক এবং এর পেছনে মৌলবাদী রাজনীতি সক্রিয়। সরকারের তরফ থেকে সর্বাত্মক নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টির পরেও দেশের পাড়াগাঁর একটি পূজামণ্ডপে এই ঘটনা সমস্ত গৌরবকে ম্লান করে দিয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর তথা দেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে যে উগ্র প্রতিবাদ মিছিল বেরিয়েছিল, তাও কারো কাঙ্ক্ষিত ছিল না।

ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দেশে যারা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পূজামণ্ডপে প্রতিমার পায়ের কাছে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চেয়েছিল, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক নষ্ট করার অপচেষ্টা করেছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চয়ই তাদের স্বরূপ উন্মোচিত হবে। কিন্তু তার আগে আমরা লজ্জিত হলাম আমাদের অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ওপর কিছু ধর্মান্ধ লোকের এই বর্বর আচরণের কারণে। আমাদের রাষ্ট্রীয় গৌরব ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

এই বর্বরোচিত ঘটনার পর সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। টেলিভিশনের টকশোগুলোতে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে ওই বিচ্ছিন্ন ঘটনাই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানসহ সবাই দোষীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা এই অপকর্ম করেছে তাদের এমন শাস্তি দেয়া হবে- যেন ভবিষ্যতে আর কোনোদিন কেউ এ ধরনের দুঃসাহস দেখাতে না পারে। দেশের শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে আমরাও চাই এ ধরনের বর্বরতা চিরতরে বন্ধ হোক।

এই ঘটনার আগে পর্যন্ত আমরা সারা দেশের হাজার হাজার পূজামণ্ডপের যে শান্তি শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ দেখেছি, তাতে সংগত কারণেই সবাই আশা করেছিল, নিরাপত্তার জন্য এবার কোথাও কোনো হুমকি নেই। কিন্তু কুমিল্লা জেলার একটি গ্রামে এই ঘটনা সেই সুন্দর আয়োজন এবং প্রস্তুতিকে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করলই।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার উৎসবে মুখর ছিল নেপাল, ভারত, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশসহ গোটা উপমহাদেশ। টেলিভিশন, সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও বাংলাদেশে ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল প্রতিমা তৈরি থেকে মহানবমী পর্যন্ত সমস্ত আয়োজন। বিজয়া দশমীর সমাপনী অনুষ্ঠানের একদিন আগে এই ঘটনা হিন্দু সম্প্রদায়কে যেমন, তেমনই বাংলাদেশের কিছু ধর্মান্ধ লোক ছাড়া বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকেই ব্যথিত করেছে। আমরা আশা করছি এ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের কোথাও কারো মনে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হবে না।

জনসংখ্যার হিসাবে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিকরা কম হলেও সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রশাসনে তাদের গুরুত্ব ও অবদান মোটেও কম নয়। গ্রাম-প্রশাসন থেকে উপজেলা, জেলা পার হয়ে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয় পর্যন্ত সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে অনেকেই মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত আছেন এবং দেশের সার্বিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন।

আমরা আশা করতে চাই, কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলায় জড়িত অপরাধীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই দেশের ললাটে লেপ্টে দেয়া এই কলঙ্কের কালি মোচন সম্ভব।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপের ঘটনার ফলোআপ যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে, তখন একই সঙ্গে দেখছি বাড়তি ব্যয়ে বেসামাল মানুষের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরছে দেশের পত্রপত্রিকা আর টেলিভিশনসহ অনলাইন পোর্টালগুলো। চাল-ডাল, পেঁয়াজ-তেল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত একমাসে যেভাবে হু হু করে বেড়েছে, তা এককথায় অপ্রত্যাশিত। বাজার নিয়ন্ত্রক অসাধু ব্যবসায়ীদেরই এক একটি সিন্ডিকেট মানুষকে জিম্মি করে প্রতিবছরই এভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

২৫ টাকার পেঁয়াজ যখন ৮৫ টাকা কেজি হয়, তখন বুঝতে অসুবিধা থাকে না, কীভাবে ১৫ দিনের ব্যবধানে এমন উল্লম্ফন ঘটতে পারে দামের ক্ষেত্রে। চাল বলুন আর পিঁয়াজ বলুন, কোন পণ্যের ঘাটতি নেই দেশে। ধানচালের উৎপাদন যে এত বিপুল পরিমাণ, তারপরও চালের দাম কমে না, বরং বেড়েই চলেছে। কেন বাড়ছে তার কারণ সরকারও জানে এবং সাধারণ মানুষও অনুমান করতে পারে। চালের মজুত তো বেশি থাকার কথা সরকারের গুদামে, কিন্তু সরকারের গুদামের চেয়ে বেশি থাকে চালকল মালিকদের গোডাউনে। পেঁয়াজ-চিনি, তেল-আলুসহ প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রেই অসাধু মুনাফাখোর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে আছে বহু বছর ধরে।

এই সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের মন্ত্রণালয়ের যে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে, তারা কি তাদের যথাসময়ের যথা কাজটি করেন? যে সময় অসাধু ব্যবসায়ী চক্র নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে চলে, তখন কি সরকারের ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবি বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে এই পণ্যটি ছাড়ে? যদি ছাড়তে পারত তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীচক্র সাধারণ মানুষকে এইভাবে জিম্মি করতে পারত না।

ভেবে পাই না কোন যুক্তিতে প্রতিবছর আগস্ট-সেপ্টেম্বর আসা মাত্র মানে বর্ষা মৌসুম এলেই পেঁয়াজের দামে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যায়? এ প্রশ্নের সদুত্তর কারো কাছ থেকেই পাওয়া যায় না।

গত ১১ অক্টোবর রাতে একাত্তর টিভির টকশোত ফারজানা রুপা পেঁয়াজের বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট সকলকে উপস্থিত করেছিলেন তার অনুষ্ঠানে। পেঁয়াজের বড় ব্যবসায়ী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার তদারক করেন- এমন একজন অতিরিক্ত সচিবসহ দুজন সাংবাদিক অনুষ্ঠানে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করলেন, কিন্তু কিছুতেই সমাধানে পৌঁছানো গেল না!

পেঁয়াজের ব্যবসায়ীকে বার বার একই প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভারতে বৃষ্টি হলে কিংবা রপ্তানি বন্ধ হলে বাংলাদেশের বাজারে দাম বাড়ে, কথা ঠিক, কিন্তু সেই বাড়ার জন্য ভারত থেকে আমদানির যে সময় লাগে, কমপক্ষে সেই ১০দিন তো পুরো বাজারে মূল্য স্থিতিশীল থাকার কথা। পুরোনো পেঁয়াজ কেন বাড়তি দামে তাহলে বিক্রি হবে? এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি ওই নেতা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও কেন বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজটি পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে করতে পারেন না? তারও সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিশেষ করে তেল আর চিনির কথাটাই বলি। দেশের বাজারে ক্রমাগত তেল আর চিনির দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে ওই সব পণ্যের মিল মালিকরা বলছেন বিশ্ববাজারের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়েই এই অবস্থা। কিন্তু আসল ব্যাপার বিশ্ব বাজারের নামে নিজেদের বাড়তি লাভের পরিস্থিতি তৈরি করা।

২০দিন আগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভোগ্য পণ্যের মূল্যের এতটা ঊর্ধ্বগতি অযৌক্তিক। গত সেপ্টেম্বরেই দাম বাড়ানো হয়েছে তেল এবং চিনির। আবারও মিল মালিকরা প্রস্তাব করেছেন বিশ্ববাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির অজুহাতে কেজিপ্রতি দাম চার থেকে ছয় টাকা বাড়াতে। আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করলে নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা যায় না। কারণ, টানা বৃদ্ধির পরে এখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম প্রতি টন ১৩১৪ ডলার। একমাস আগে ছিল ১০৪৫ ডলার। প্রতিটনে কমেছে ৩১ ডলার বা ২ দশমিক ৩০ শতাংশ। কিন্তু আমাদের দেশে তাহলে সয়াবিনের দাম বাড়বে কেন? এই প্রশ্নের সদুত্তর মিলছে না! গত মাসে দেশে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে!

টিসিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত একবছরে দেশে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৫২ শতাংশ আর চিনির দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে তেল আর চিনির দাম যে পরিমাণ বেড়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে বেড়েছে অনেক বেশি। তারপরও তিনদিন আগে তেল-চিনি পিঁয়াজের শুল্ক কোনো কোনো ক্ষেত্রে তুলে দিয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিয়ে দিয়েছে সরকার।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয় করতে গিয়ে ট্যারিফ কমিশন দফায় দফায় অযৌক্তিক দাবিও মেনে নিয়েছে ব্যবসায়ীদের। আইনে রয়েছে বলে সরকারকে বার বার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়, যা লোকদেখানো, বলছেন বাজার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা।

এই যে চাল-ডাল, তেল-চিনি, আটা-পেঁয়াজের দাম বেড়ে চলেছে, তাতে মনে হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যেন কিছুই করার নেই! দেশের ১০টি জেলার মানুষ এখন বন্যাকবলিত। চরম দুর্ভোগে আছে তারা। মূল্যস্ফীতি তাদের মড়ার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। সরকার লাগামহীন মূল্যস্ফীতির সুযোগ না দিয়ে সময়মতো পর্যাপ্ত আমদানি করলে এবং তা সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে বাজারে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিলে এতটা লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এত উন্নয়ন করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে চলেছেন, অর্থনৈতিকভাবে দেশকে দৃষ্টান্তমূলক সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন, বিশ্ববাসীর কাছে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, অথচ সেই অর্জন নষ্ট করে দেবার মতো সীমিত আয়ের মানুষের চরম দুর্ভোগের কারণ এমন অযৌক্তিক মূল্যস্ফীতিও কি মেনে নেয়া যায়? সীমিত আয়ের বিপুলসংখ্যক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ বাজারের আগুনে পুড়ছেন এখন। যেকোনো মূল্যেই হোক এ আগুন নিভাতেই হবে।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক, উপদেষ্টা সম্পাদক দৈনিক দেশের কণ্ঠ।

আরও পড়ুন:
অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার
বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া
ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা
বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু
চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

শেয়ার করুন

‘অন্তর মম বিকশিত করো’

‘অন্তর মম বিকশিত করো’

কিছু মানুষের খোলসের ভেতর এখন দানবের অবয়ব। আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশটা ভয়াবহ দানবে ছেয়ে গেছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা মানুষকে কতটা রুচিহীন-দায়িত্বহীন-সংস্কৃতিহীন ও বোধহীন করেছে; চারপাশে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। মনুষ্যত্বের জায়গাটা বড়ই নড়বড়ে হয়ে গেছে, ভয়াবহ অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে মানুষের মনোজগতে।

আদিতে রাষ্ট্র ছিল না। রাষ্ট্রের আগেই সম্প্রদায় ছিল, সমাজ ছিল। রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে অনেক অনেক পরে। সমাজে সম্প্রদায়সমূহের সুশৃঙ্খল বিন্যাসের নিমিত্তেই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তাই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মঙ্গলের জন্য সাধারণ ইচ্ছার ফল হিসেবে সামাজিক চুক্তির বাস্তব রূপই রাষ্ট্র।
একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের একত্রিত মঙ্গলার্থে কাজ করতে রাষ্ট্রগুলো আর ইচ্ছুক নয়। এখন দেশে দেশে অতিমাত্রায় আগ্রাসী, উগ্র ও জাতীয়তাবাদী সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তারা বিভিন্ন বিভাজনে বিভাজন করছে রাষ্ট্রের মানুষদের। এসব কর্তৃত্ববাদী সরকারের কারণে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ, সম্প্রদায়, গোত্রের মানুষ অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে মানুষে মানুষে বিভেদ-প্রভেদ, সংঘাত। মানুষ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে, তৈরি হচ্ছে আস্থাহীনতা। মানুষ ভাবতে শুরু করেছে যেকোনো মেরুকরণের কারণে সে হতে পারে নির্যাতিত, নিপীড়িত, বাস্তুহীন, এমনকি রাষ্ট্রহীন।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সারা পৃথিবীতে যুগে যুগে সংখ্যালঘুরা নিগৃহীত, নির্যাতিত, নিপীড়িত, উপেক্ষিত। তা সে জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু যা-ই হোক না কেন । জিন্নাহ-নেহেরুর ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের কুফল সরাসরি ভোগ করছে মানুষই।
শুধু ধর্মের কারণে দুটি ভূখণ্ড যে এক থাকতে পারে না, সেটাও একাত্তরে ফায়সালা হয়ে গেছে। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, এদেশের মাটি-পানি, বায়ুতে বেড়ে ওঠা মানুষেরা কখনোই আলাদা সত্তা নয়। তারা একই হৃদয়ের অভিন্ন মানুষ। যুগে যুগে রাজনীতি এবং অর্থনীতির নোংরা খেলায় পর্যুদস্ত হয়েছে জীবন, জীবনের বোধ, মর্যাদা।

সুজলা-সুফলা শ্যামল বাংলার সবুজে আচ্ছাদিত এই দেশটিতে গত শতাব্দীর শেষের দিকেও দেখেছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চমৎকার সহাবস্থান। ধর্ম-বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে একজন আরেকজনের পরম বন্ধু, আত্মার আত্মীয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে একত্রিত হওয়া, ঈদে পুজোয় অন্য ধর্মের বন্ধুদের বাড়িতে নেমন্তন্ন খাওয়া, মণ্ডপে মণ্ডপে পুজো দেখতে যাওয়ার চমৎকার রেওয়াজ ছিল। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে, উগ্র হতে দেখিনি। ভারতের বাবরি মসজিদ ইস্যুতেও অনেকটাই সুস্থির ছিল আমাদের এই ভূখণ্ড। সেটিও ছিল রাজনৈতিক চক্রান্ত।
চোখের সামনেই পাল্টে গেল দেশটা। ক্রমান্বয়ে স্বার্থ হাসিলের সবচেয়ে বড় পুঁজি হয়ে দাঁড়াল ধর্মীয় অনুভূতি। বিবেকহীন হতে হতে উন্মত্ততা বাসা বাঁধল মগজে। মানুষকে কুপোকাৎ, ঘায়েল করার পুরোনো মোক্ষম অস্ত্র ধর্মীয় অনুভূতিকেই বার বার কাজে লাগায় স্বার্থান্বেষীরা। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। মাঝখান থেকে ঝোঁকের মাথায় বুঝে উঠতে না পারা অকারণ কিছু প্রাণ গেল।
কিছু মানুষের খোলসের ভেতর এখন দানবের অবয়ব। আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশটা ভয়াবহ দানবে ছেয়ে গেছে। অশিক্ষা-কুশিক্ষা মানুষকে কতটা রুচিহীন-দায়িত্বহীন-সংস্কৃতিহীন ও বোধহীন করেছে; চারপাশে চোখ বোলালেই বোঝা যায়। মনুষ্যত্বের জায়গাটা বড়ই নড়বড়ে হয়ে গেছে, ভয়াবহ অবক্ষয় বাসা বেঁধেছে মানুষের মনোজগতে।
এক অন্ধকার সময়ে, অন্ধকার পৃথিবীতে আলো খুঁজে ফিরছি আমরা যারা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু কোথাও আলো নেই। চারদিকে শুধু বিষাদাচ্ছন্ন অন্ধকার।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদযাপনের সময়ে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নিয়ে সাম্প্রদায়িক ঘটনাটি একেবারেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। কারণ যাদের ধর্মীয় উৎসব চলছে; তারা নিজের ধর্মকে রক্ষা করতে, ধর্মের পবিত্রতা অটুট রাখতে, উৎসব উদযাপন ক্ষুণ্ন করতে এ কাজটি করবে না, নিশ্চিত করেই বলা যায়। খুব স্বল্প বুদ্ধির মানুষও বুঝতে পারবে, এটি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল অথবা অন্য যেকোনো কারণে হলেও অবশ্যই ধর্মীয় কারণে নয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমান বা হিন্দুদের দ্বারা কাজটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
কোনো বিশেষ পরিস্থিতির প্রথম শিকার সংখ্যালঘু মানুষ। বাড়িঘরে আগুন দিয়ে, খেতের ফসল পুড়িয়ে, শারীরিক নির্যাতন করে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দিয়ে, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটিয়ে বিভীষিকা তৈরি করে তাদের দেশছাড়া করার চক্রান্ত করা হয়। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থকেন্দ্রিক এই কাজটা সুকৌশলে করার জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা অথবা সংবেদনশীল সময়ের অপেক্ষা করে সুযোগ সন্ধানীরা। এক্ষেত্রে শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিবেচ্য নয়, আদিবাসী বা রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীও এর শিকার হয়।

ধনী-দরিদ্র‍, মুসলিম-অমুসলিম, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুতে, ‘উঁচু-নিচু’ বংশ, স্থানীয়-বহিরাগত, পুরুষ-নারীতে এবং এমন আরও অসংখ্য কারণে সাম্প্রদায়িকতা হয়। সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বেশিরভাগ মানুষের ভেতরই সাম্প্রদায়িকতা স্পষ্টভাবে বা সুপ্তাবস্থায় বিরাজমান থাকে।
এ কারণেই এই দেশে হিন্দু নির্যাতন হয়, ভারতে মুসলিম নির্যাতন হয়, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন হয়, চায়নায় উইঘুর জনগোষ্ঠী নির্যাতন হয়, ইউরোপ-আমেরিকায় কালো নির্যাতন হয়। যদিও সবখানে ভিন্ন মাত্রা বা কৌশল যোগ করা হয়।
বিশ্বায়নের কালে প্রতিনিয়ত আমরা একদেশ থেকে আরেক দেশে ছোটাছুটি করি। তাই কেউ একদেশে সংখ্যাগুরু হলেও অন্যদেশে সে সংখ্যালঘু। বাংলাদেশে মুসলিম হিসেবে কেউ সংখ্যাগুরু হলেও ভারত বা আমেরিকায় কিংবা শ্রীলঙ্কায় সে সংখ্যাল। বাংলাদেশে বাঙালি হিসেবে কেউ সংখ্যাগুরু হলেও ইউরোপে সে সংখ্যালঘু।
রামুর বৌদ্ধ মন্দির ভাঙা, গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লিতে আগুন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রসরাজ নামের নিরীহ ছেলেকে ফাঁসিয়ে দিয়ে বাড়ি ও মন্দিরে আগুন দেয়ার ঘটনাগুলো ঘুরেফিরে দেখতে হচ্ছে। মসজিদ- মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা, প্রতিমা ভাঙার ঘটনাও বার বার দেখতে হচ্ছে। মৌলবাদী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে আর একটা প্রাণেরও বিনাশ দেখতে চাই না।
আমরা শুধু মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রিস্টান হতে চাই না। আমাদের আদি এবং অকৃত্রিম পরিচয় বাঙালি। আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, লোকাচার-ঐতিহ্য সবই বাঙালিত্বকে ঘিরে। এই জীবনবোধই আমাদের শেখায় ভিন্ন ধর্ম, জাতি, ভাষার মানুষের প্রতি সহনশীলতা, সহমর্মিতা, ভালোবাসা।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্রও ছিল অসাম্প্রদায়িকতা। ’৭২ সালের সংবিধানেও রাষ্ট্রীয় চারনীতির একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। তবুও অস্থিরতার এই সময়ে প্রতিমা ভাঙচুর, ভূমি দখলসহ বেশকিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটেই চলেছে। এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার নজিরও কম। যে কারণে সংখ্যালঘুরা সবসময় নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। তাদের মনে অনিরাপদবোধ ও পলায়নপর মনোভাব কাজ করে, সেগুলো দূর করার জন্য সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনলে, আস্থার ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে সংখ্যালঘুরা আর নিজেদের সংখ্যালঘু মনে করবে না।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল ক্ষেত্র আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ। ছোট ভূখণ্ডের বড় জনসংখ্যার এই দেশে সবাই নিরাপদে থাকুক, স্বস্তিতে থাকুক, শান্তিতে থাকুক। মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বন্ধন আরও গভীর হোক। ভালো থাকার জন্য, নিরাপদে থাকার জন্য, বিশ্বাসের জন্য এ বন্ধন খুবই জরুরি।
এই দেশ, এই মাটি সবার। এই ভূমিতে জন্ম নেয়া প্রতিটি মানুষই এ দেশের নাগরিক। কেউ এখানে সংখ্যালঘু নয়। এখানে সবার সমানাধিকার রয়েছে। নিশ্চিতভাবে যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে।
মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হলে, ভালোবাসতে হলে সভ্যতার আলোয় নিজেকে আলোকিত করতে হবে। সংস্কৃতিগতভাবে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার মাঝেই নিহিত আছে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ক্ষয়ের উপায়। ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’…
লেখক: প্রাবন্ধিক-শিক্ষক

আরও পড়ুন:
অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার
বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া
ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা
বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু
চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

শেয়ার করুন

নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা

নির্বাচন কমিশন গঠন: সার্চ কমিটি ও আইনের প্রাসঙ্গিকতা

সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আর নির্বাচন করার সুযোগ নেই। কাজেই দলীয় সরকারের অধীনেই আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ খুঁজতে হবে। যোগ্য, দক্ষ ও সাহসী কমিশন হলে দলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নির্বাচনের চেষ্টা অন্তত করতে পারে।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ। নতুন কমিশন গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনপ্রক্রিয়ার জন্য আমাদের দেশে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। তাই কথা উঠেছে একটি আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও।

কমিশন গঠনের জন্য সংবিধানে মোটা দাগে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা গাইডলাইন দেয়া আছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের সংবিধানেই এরকম কিছু নীতিমালার কথাই বলা থাকে। এর ভিত্তিতেই গঠিত হয় নির্বাচন কমিশন।

দেশের সংবিধানে আছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন হবে। রাষ্ট্রপতি এই পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ করবেন এ উদ্দ্যেশ্যে প্রণীত একটি আইনের মাধ্যমে। কিন্তু আজ অবধি আমরা ওই আইনটি হাতে পাইনি।

বাস্তবতা হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্য এরকম একটি আইন করা কঠিনই বটে। তড়িঘড়ি করে যাচাই-বাছাই ছাড়া আইন প্রণয়ন করা যেতেই পারে, কিন্তু তাতে আইনের উদ্দেশ্য সফল হয় না। উল্টো আইন নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। তবে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনেরও যে কোনো বিকল্প নেই সে বিষয়টিও আমাদের ভাবতে হবে।

বর্তমান কমিশনের মতোই যদি একটি কমিশন গঠন করা হয়, তবে সেই কমিশনের ওপর সব দলের আস্থা থাকবে কি না সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখতে পারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্বশর্ত। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে নবগঠিত এই নির্বাচন কমিশনের অধীনেই। কাজেই এই কমিশনের ওপর আস্থার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার সার্চ কমিটি গঠন করে সে কমিটির সুপারিশ করা ব্যক্তিদের নিয়েই কমিশন গঠন করতে চায়। এর মাধ্যমে সরকার মূলত নিরপেক্ষভাবে কমিশন গঠনের একটি বার্তা দিতে চায়। সন্দেহ নেই এটি একটি শুভ উদ্যোগ।

কারণ, বর্তমান সংবিধানের অধীনে এরকম কোনো সার্চ কমিটি গঠনের সুযোগ নেই। তবে সার্চ কমিটি গঠন যে সংবিধানের লঙ্ঘন সেটিও নয়। আসলে এ বিষয়ে সংবিধানে কিছু বলা নেই। আইন প্রণয়ন হলে সেখানে হয়তো কমিশনারদের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকত। যদিও ভারতে প্রণীত আইনে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে কিছু বলা নেই।

বর্তমান কমিশনও সার্চ কমিটির বাছাইকৃতদের নিয়েই গঠিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি সব দলের কাছ থেকেই তাদের প্রস্তাবিত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নাম চেয়েছেন। বর্তমান কমিশনে বিএনপির মনোনীত একজন কমিশনারও আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শুধু একজন নির্বাচন কমিশনার, অথবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার অথবা এমনকি শুধু নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষেই কি একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব? অন্তত আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়? নিরপেক্ষতার বিষয়টি তো শুধু নির্বাচন কমিশনের একার বিষয় নয়। আর কমিশনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে এর দক্ষতা, যোগ্যতা ও সাহসিকতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

এ মুহূর্তে সার্চ কমিটি ছাড়া অন্যকোনো বিকল্প আছে কি? যাচাই-বাছাই করে একটি কার্যকর আইন প্রণয়নের সময়ও হাতে নেই। আইনমন্ত্রী যদিও বলছেন কোভিড সিচুয়েশনের জন্য আইন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেছেন,কোভিড সিচুয়েশন ইমপ্রুভ করলে পুরো সংসদে আমরা সাড়ে তিনশ’ সদস্য বসতে পারব, বসে এই রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতে পারব।’

কিন্তু আইন করার জন্য সংসদে তিনশ’ সদস্যের উপস্থিতি লাগে না। আইন পাসের জন্য সর্বনিম্ন সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট। মূল বিষয়টি হচ্ছে একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করার মতো সময় হাতে নেই। এ আলোচনাটা আরও আগেই ‍শুরু হতে পারত।

রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করে গেজেট নোটিফিকেশন জারি করেন। সংবিধান অনুযায়ী ‘নোটিফিকেশন’ ও আইনের মর্যাদাসম্পন্ন (১৫২ অনুচ্ছেদ)। কিন্তু তারপরও সার্চ কমিটি গঠন করা আইনের বিকল্প নয়। হলে অন্যান্য দেশও সার্চ কমিটি গঠন করেই কমিশন গঠন করত। কেউ আর আইন প্রণয়ন করত না। এর বিপরীতেও বলা যায়, আইন প্রণয়ন করলেই কি একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা যায়, বা নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব?

ভারত ১৯৯১ সালে আইন করেছে। ১৯৯১-এর আগে কি তারা নিরপেক্ষ নির্বাচন করেনি? এখনও পৃথিবীর অনেক দেশেই নির্বাচন কমিশনের কোনো আইন নেই, তারা কি নিরপেক্ষ নির্বাচন করছে না? কাজেই শুধু আইন প্রণয়ন করেই নিরপেক্ষ, যোগ্য ও দক্ষ কমিশন গঠন করা যায় না, যায় না নিরপেক্ষ নির্বাচন করাও। নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সব দলের সদিচ্ছা বিশেষ করে সরকারের সদিচ্ছা জরুরি। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

রাষ্ট্র চালায় নির্বাহী বিভাগ। নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছা অনুযায়ীই রাষ্ট্রের সব কাজ পরিচালিত হয়। এটাই আমাদের সংবিধানের বিধান। সংবিধান অনুযায়ী দেশে সংসদীয় শাসন বিদ্যমান। রাষ্ট্রপতির এখানে কার্যত তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা।

প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব পালনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন। কাজেই যে সার্চ কমিটি গঠনের কথা বলা হচ্ছে, তাও তিনি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে গিয়ে করতে পারবেন না। কমিশনার নিয়োগতো পরের কথা। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি ছাড়া সার্চ কমিটির সদস্যদের ঠিক করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই। এটাই সংবিধানের বিধান।

সার্চ কমিটিতে কারা থাকবেন সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ তারা চাইলে যে কাউকেই (গ্রহণযোগ্য) সুপারিশ করতে পারেন। সে সুপারিশ মানা না মানা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিষয়। তবে সার্চ কমিটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতেই পারে। আর রাষ্ট্রপতিও যৌক্তিক কারণেই কমিটির বাছাইকৃত ব্যক্তিদের থেকে কমিশনার নিয়োগ দেবেন। ফলে, অনেক সীমাবদ্ধতা থাকলেও সার্চ কমিটি নিরপেক্ষভাবে কাজ করলে একটি গ্রহনযোগ্য সুপারিশ এলেও আসতে পারে।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১২ জন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭ জনই ছিলেন বিচারপতি। বিচারপতি ও পঞ্চম প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধীনে ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন থেকেই দেশে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের শুরু।

যদিও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিতর্কটি এখানে আরও আগের। ৯০-এর আগের নির্বাচন বিতর্ক যতটা না নির্বাচনকেন্দ্রিক তারচেয়েও বেশি ছিল শাসনতান্ত্রিক। কারণ, তখন দেশে গণতন্ত্রেরই উত্তরণ ঘটেনি। নির্বাচন বিতর্কতো আরও পরের কথা। ’৯০-এর পরে বিচারপতি এ. কে. এম সাদেক, মোহাম্মদ আবু হেনা, এম এ সাঈদ-এর অধীনে আমরা কয়েকটি সুষ্ঠু নির্বাচন পেয়েছি। এ নির্বাচনগুলো ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। বিচারপতি এম এ আজিজ থেকে আবার শুরু হয় নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক। এর পর শামসুল হুদা কমিশনের অধীনে আমরা ২০০৮-এর নির্বাচন পেয়েছি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হওয়ার পর গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে আমরা পেয়েছি রকিবুদ্দিন ও নুরুল হুদা কমিশন। এই দুই কমিশনের অধীনে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পর পর দুইটি নির্বাচন হয়েছে। এ দুটি নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই নতুন কমিশন গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। কমিশন ও সরকারের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। অতীতের সুষ্ঠু নির্বাচনের ইতিহাস সে কথাই জানান দেয়।

সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আর নির্বাচন করার সুযোগ নেই। কাজেই দলীয় সরকারের অধীনেই আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ খুঁজতে হবে। যোগ্য, দক্ষ ও সাহসী কমিশন হলে দলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নির্বাচনের চেষ্টা অন্তত করতে পারে।

বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ১৯৭০-এর নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগকে পছন্দ না করলেও আইনের বাইরে গিয়ে কোনো ভূমিকা রাখেননি। ফলে স্বাধীন নির্বাচনের পথ ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি।

সার্চ কমিটি হোক। সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনও হোক। সেটি সরকারের নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ার ও ইচ্ছার বিষয়। তবে রাষ্ট্রের আইন বিভাগ একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করার কাজটিও যুগপৎ করে যেতে পারে। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও ১১৮ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সেই আইনটি আমরা পাইনি। এটি সংবিধানের প্রতিও এক ধরনের অবজ্ঞা। এক এগারোকালীন শামসুল হুদা কমিশন নির্বাচন কমিশন আইনটি করার উদ্যোগ নিয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্তু সে আইনটি আজ অবধি আর আলোর মুখ দেখেনি। আইন থাকলে সরকারের দায়ভারও কমে। আইনানুযায়ী কমিশন গঠন হবে ও আইনানুযায়ী কমিশন কাজ করবে। তাদের যোগ্যতা, অযোগ্যতা ও কর্মপরিধি সবই আইনানুযায়ী চলবে।

কমিশনের ক্ষমতা ও জবাবদিহিও বাড়বে। তবে কমিশন যেভাবেই গঠিত হোক না কেন তাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হচ্ছে সংবিধানের ১১৮ (৪) অনুচ্ছেদ-যার মাধ্যমে তারা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন এবং কেবল সংবিধান ও আইনের অধীন হবেন।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার
বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া
ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা
বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু
চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

শেয়ার করুন

মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

মন্দিরে কোরআন ও অনুভূতির করাত

গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৪-১৯১০) যখন পবিত্র কোরআন শরিফের বাংলা অনুবাদ করলেন, তখন কেউ কি কোরআনের অবমাননা হয়েছে বলে অভিযোগে করেছিলেন? কেউ কি তখন এই প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, একজন হিন্দু কেন কোরআন শরিফের অনুবাদ করবেন? কেউ কি তখন বলেছিলেন যে, যেহেতু একজন হিন্দু কোরআনের অনুবাদ করেছেন, অতএব কোনো মুসলমানের এই অনুবাদ পড়া উচিত নয়?

হিন্দুদের উপাসনালয় মন্দিরে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরিফ থাকার কথা নয়। একইভাবে মুসলমানদের প্রার্থনালয় মসজিদেও হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ গীতার প্রয়োজন হয় না। কারণ দুই ধর্মের প্রার্থনার পদ্ধতি ভিন্ন। সুতরাং কুমিল্লার একটি মন্দিরে কোরআন শরিফ অবমাননা করা হয়েছে বলে যে গুজব অথবা খবরের ভিত্তিতে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেল, সেখানে খতিয়ে দেখা দরকার, কে বা কারা মন্দিরে কোরআন রেখে এসেছেন। সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো লোক মন্দিরে কোরআন রেখে আসবেন আর এটাকে ইস্যু করে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হবে— সাধারণ মানুষ এতটা অবিবেচক নয়।

হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো লোক অবমাননার উদ্দেশ্যে ওই মন্দিরে কোরআন নিয়ে গেছেন— এটা ভাবার যেমন কোনো কারণ নেই, তেমনি কোনো সাধারণ মুসলমানও হিন্দুদের ওপর দোষ চাপিয়ে মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর জন্য সেখানে কোরআন রেখে আসবেন— সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ। প্রশ্ন হলো- আসলেই মন্দিরে কোরআন ছিল কি না? থাকলে কে বা কারা কী উদ্দেশ্যে সেখানে কোরআন রেখে এসেছেন? আর কেউ যদি সৎ বা অসৎ যেকোনো উদ্দেশ্যেই মন্দিরে কোরআন রেখে আসেন, তাতে কোরানের অবমাননা হয় কি না?

গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৪-১৯১০) যখন পবিত্র কোরআন শরিফের বাংলা অনুবাদ করলেন, তখন কেউ কি কোরআনের অবমাননা হয়েছে বলে অভিযোগে করেছিলেন? কেউ কি তখন এই প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, একজন হিন্দু কেন কোরআন শরিফের অনুবাদ করবেন? কেউ কি তখন বলেছিলেন যে, যেহেতু একজন হিন্দু কোরআনের অনুবাদ করেছেন, অতএব কোনো মুসলমানের এই অনুবাদ পড়া উচিত নয়?

কোরআন শরিফ শুধু মুসলমানদের জন্য অবতীর্ণ হয়নি। সুতরাং কোনো মন্দিরের পুরোহিত বা পূজারি যদি মনে করেন যে, আন্তধর্মীয় সম্পর্ক বোঝানোর জন্য তারা মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে কিছু উদ্ধৃতি ব্যবহার করবেন, সেজন্য কেউ যদি কোরআন শরিফ মন্দিরে নিয়ে যান, যদি এখানে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে সেটি কী করে অবমাননা হয়?

কোনো মসজিদের ইমাম যদি মনে করেন যে, তিনি হিন্দুদের কোনো দর্শন সম্পর্কে জানা বা বোঝার জন্য গীতা পড়বেন, এমনকি জুমার খুতবায়ও তিনি যদি মনে করেন যে, এটা থেকে রেফারেন্স দেবেন—তাতে কি গীতার অবমাননা হবে এবং এজন্য মসজিদে হামলা চালানো হবে? সব ধর্মের মূল বাণীই তো হচ্ছে মানুষকে মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করা, ভালোবাসা। সুতরাং ধর্মগ্রন্থের অবমাননা হয়েছে— এই যুক্তিতে মানুষ কী করে ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা চালায়? ধর্মীয় অনুভূতি এত ঠুনকো কেন?

কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা এবং এরপর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অনেককে গ্রেপ্তারের পরে যে প্রশ্নটি বার বার সামনে আসছে তা হলো- ধর্মীয় অনুভূতির সংজ্ঞা বা মানদণ্ড কী? অর্থাৎ কোন বক্তব্যে বা কী কথায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে?

মানুষের যদি বাকস্বাধীনতা থাকে; সংবিধান যদি নাগরিকের বাকস্বাধীনতা স্বীকার করে নেয়— তাহলে সেই নাগরিকরা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কেন প্রকাশ্যে, উপাসনালয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা ও বিতর্ক করতে পারবে না? আন্তধর্মীয় বিতর্কও হতে পারে। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই বিতর্ক প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতি বছরগুলোয় অবস্থা এমন হয়েছে যে, ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে কথা বললেই সেখানে অবমাননার গন্ধ খোঁজা হয়। এর ফলে অ্যাকাডেমিক আলোচনা বা বিতর্তের স্পেসও সংকুচিত হচ্ছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, লালমনিরহাটের পাটগ্রামে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা এবং তারপরে তাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। এটি কোনো ধর্ম সমর্থন করে? যারা এই কাজ করেছেন, তারা যে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এই কাজ করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই ইসলাম ধর্মের মহানবী মোহাম্মদ (সা.) সারা জীবনই সহনশীলতা ও ভিন্নমত প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। যে মক্কা থেকে তিনি কার্যত বিতাড়িত হয়েছেন— সেই মক্কা বিজয়ের পরে তিনি শত্রুদের প্রতিও যে মানবিক আচরণ করেছেন— সেটিই প্রকৃত ইসলাম।

অথচ কোরআন অবমাননা হয়েছে বলে একজন লোককে পিটিয়ে মারা হলো; মরদেহ পুড়িয়ে দেয়া হলো। মন্দিরে হামলা হলো। হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণ করা হলো। এর নাম ইসলাম নয়। বরং একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার পরে যে পুড়িয়ে দেয়া হলো, এটি স্পষ্টতই ইসলামের অবমাননা। কোনো মন্দিরে হামলা বা প্রতিমা ভাঙচুরই ইসলামের অবমাননা।

প্রশ্ন হলো, হাজার হাজার মানুষ এই যে ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের অবমাননা হয়েছে গুজবে একটি জায়গায় জড়ো হলেন এবং একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার পরে পুড়িয়ে দিলেন; এই যে কিছু লোক জড়ো হয়ে কুমিল্লার মন্দিরে হামলা চালালেন, এর পেছনে কোন মন্ত্রটি কাজ করে? মানুষ কেন ‘ধর্মের অবমাননা’ হয়েছে শুনলেই উত্তেজিত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে এবং হত্যার মতো জঘন্য কাজে শামিল হয়? ধর্মীয় শিক্ষার কোথাও কি তাহলে একটা বড় ধরনের গলদ রয়ে গেছে? ধর্মের উদ্দেশ্যই যেখানে মানুষকে আরও বেশি মানবিক ও সহনশীল করা, সেখানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ শুনলেই মানুষ কেন হিংস্র হয়ে ওঠে?

বাস্তবতা হলো- অধিকাংশ মানুষই ব্যক্তিজীবনে ধর্মের অনুশাসনগুলো ঠিকমতো পালন না করলেও নিজধর্মের কোনো বিষয়ে ভিন্নমত শুনলেই তাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। যে মানুষটি নিজে অন্যায় করে, ঘুষ খায়, মানুষ ঠকায়, মিথ্যা বলে— অথচ কেউ যখন কোনো ধর্মীয় নেতা বা ধর্মের কোনো বিষয় নিয়ে সমালোচনা করে, তার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পড়ে। অনুভূতিতে আঘাতের মামলা করে।

মুরতাদ ঘোষণা করে ফাঁসির দাবি জানায়। অথচ ব্যক্তিজীবনে সে নিজেই ধর্মকর্মের ধারেকাছে নেই। এখানে ধর্মীয় অনুভূতি কোনো বিষয় নয়। এখানে বিষয়ের আড়ালে অন্য বিষয় রয়েছে। সেই বিষয়ের অনুসন্ধান জরুরি।

একটি বড় কারণ আমাদের ভোটের রাজনীতি। কেননা বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে এই ধর্ম বরাবরই অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। প্রধান দলগুলোও ধর্মকে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যেহেতু এই দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান এবং এর মধ্যে অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের চর্চা না করলেও এবং সারা জীবন মিথ্যা ও দুর্নীতির উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকলেও নিজের ধর্ম বা ধর্মীয় গ্রন্থের কথিত অবমাননার খবর পেলেই লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে; ফলে রাজনীতিবিদরাও জানেন মানুষের এই হুজুগকে ভোটের মাঠেও কাজে লাগানো সম্ভব। যে কারণে আমাদের শীর্ষ রাজনীতিবিদরাও নিজেদেরকে যতটা ‘মানুষ’ তার চেয়ে বেশি ধার্মিক হিসেবে প্রমাণে ব্যস্ত থাকেন। সাধারণ নেতাকর্মীরাও তাদের দলের শীর্ষ নেতাদের কে কত বড় ধার্মিক; ধর্মীয় বিষয়ে তাদের কার কী অবদান; কে কতগুলো উপাসনালয় বানিয়েছেন— সেই তথ্য গর্বভরে প্রচার করা হয়।

অথচ শীর্ষ রাজনীতিবিদদের উচিত, ধর্ম নিয়ে যতটা সম্ভব কম কথা বলা। কিন্তু তারা কম কথা বলেন না। কারণ ধর্ম তাদের কাছে ব্যক্তিগত চর্চার বিষয় নয়। তারা জানেন, ধর্ম এই দেশে বিরাট রাজনৈতিক অস্ত্র— যে অস্ত্র ভোটের বৈতরণি পার হতে সহায়তা করে। অতএব কুমিল্লার ঘটনার পেছনে যে সাধারণ মুসলমান বা হিন্দুর প্ররোচনা নেই, বরং এটি যে কোনো অসৎ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক গেমের অংশ— তা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়। তবে এই রাজনীতি খুঁজতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে রাজনীতি না করে; যাতে প্রকৃত অপরাধীরাই ধরা পড়ে— সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার
বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া
ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা
বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু
চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

শেয়ার করুন

অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের অপরিহার্যতা

অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের অপরিহার্যতা

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি আধুনিক চরিত্র দানের বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন । তিনি ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রটি পরিচালিত হবে, রাষ্ট্রের আধুনিক রূপটি সমাজসহ সর্বত্র ধীরে ধীরে দৃশ্যমান- এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। রাষ্ট্রের সংবিধানের গণতন্ত্র , সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ দর্শন হিসেবে গৃহীত হয়।

পৃথিবীতে এই সময়ে রাষ্ট্রের সংখ্যা ২০২টি। এর মধ্যে ১৯৫টি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র। বাকি রাষ্ট্রগুলোর কোনোটি এখনও পরিপূর্ণভাবে সার্বভৌমত্ব লাভ করেনি, আবার কোনো কোনোটি এতই ছোটো যে, এখনও অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি।

জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আন্তর্জাতিক বেশ কিছু আইন নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলো সেসব আইন ও নিয়ম-কানুনে অনুস্বাক্ষরও করেছে। ফলে রাষ্ট্রগুলো জাতিসংঘের বিভিন্ন কাজে যেমন অংশগ্রহণ করে থাকে, সুযোগ-সুবিধা লাভেও প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

এটি মোটা দাগে বর্তমান বিশ্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি চিত্র। তবে যেটি ভুলে গেলে চলবে না তা হচ্ছে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র ১৯৫ বা মোট ২০২টি রাষ্ট্রের সবকটি এক চরিত্রের নয়। তাদের মধ্যে আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও আদর্শগত ভিন্নতা রয়েছে। পরস্পর বিরোধী মতাদর্শের রাষ্ট্রও জাতিসংঘের গুরত্বপূর্ণ সংস্থায় অংশগ্রহণ করে থাকে। পৃথিবীর নানা ইস্যুতে এসব রাষ্ট্রের মধ্যে ভিন্নতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পরস্পর বিরোধী অবস্থান গ্রহণের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে।

এরপরও বড়, ছোটো ও শক্তিশালী বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক, আন্তরাষ্ট্রীয়, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা ধরনের যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। যদিও কোনো কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে বাহ্যিক সম্পর্ক থাকলেও ভেতরে অনাস্থা ও সন্দেহের দূরত্ব যোজন যোজন বলে মনে হয়। আবার কোনো কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক রাষ্ট্রই কোনো ধরনের কূটনৈতিক বা যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা না করেই অবস্থান করছে। এসব জটিলতাকে মেনে নিয়েও বলতে হবে আমরা এখন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার যুগে বসবাস করছি। যখন তখন কেউ কাউকে ইচ্ছে করলেই দখল করে নিতে পারে না কিংবা কলোনি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। প্রত্যেক রাষ্ট্রকে অন্যের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেই চলতে হয়। এর ফলে রাষ্ট্রের নাগরিক এবং জাতিসমূহ অন্তত স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার এক ধরনের নিশ্চয়তা ভোগ করে থাকে।

অথচ ২০০-৩০০ বছর আগেও পৃথিবীর চিত্র এমন ছিল না। অল্প কয়েকটি শক্তিশালী রাষ্ট্র পৃথিবীর মহাদেশগুলোকে দখলের মাধ্যমে নিজেদের কলোনি তথা উপনিবেশ স্থাপন করে রেখেছিল। সেটিও প্রায় ২০০-৩০০ বছরের ইতিহাস। অধিকৃত এসব উপনিবেশ স্বাধীন কোনো রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ওই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষজন এঁটে উঠতে পারেনি। তাই তাদেরকে হারাতে হয়েছিল নিজেদের স্বাধীনতা। তাদেরও ছিল না কোনো স্বাধীন সার্বভৌম শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা। অনেক জায়গায় রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল। রাজারা নিজেদেরকে খুব পরাক্রমশালী ভাবতেন। কিন্তু জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

জনগণও কর দেয়া ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো নিয়ম কানুন সুযোগ সুবিধা ভোগ করার পর্যায়ে ছিল না। এরও আগে কিছু স্বৈরতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল। এগুলোর কোনোটিই জনকল্যাণকামী হয়ে ওঠেনি। আরেকটু পেছনের দিকের ইতিহাসে গেলে যে সভ্যতার কথা আমরা গৌরবের সঙ্গে উল্লেখ করি (গ্রিক, রোমান, চীনা, মেসোপটেমীয়া, পারস্য, মিশরীয়, মায়ান, আজটেক, ইনকা, হরোপ্পা-মহেঞ্জোদারো ইত্যাদি) সেগুলোও ছিল চরিত্রগতভাবে স্বৈরতান্ত্রিক এবং অস্থায়ী। একসময় নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠেছিল। সেগুলো ছিল আয়তনে খুবই ছোট। এসব নগররাষ্ট্রের বাইরে অসংখ্য মানুষ বসবাস করত। রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তথাপিও কোনো কোনো নগর রাষ্ট্র তাদেরকে দখলের মাধ্যমে দাসে পরিণত করে। হরণ করে তাদের স্বাধীন প্রাকৃতিক জীবন। সুতরাং রাষ্ট্রের উত্থানের যুগটি আজ থেকে ৫ থেকে ৬ হাজার বছর আগে শুরু হলেও এর সঙ্গে মানুষের সহজাত কোনো স্বাভাবিক সুসম্পর্ক শুরুতেই ছিল না।

রাষ্ট্র ছিল একটি ছোট সম্পদশালী শক্তির নিয়ন্ত্রাধীন ব্যবস্থা। তাদের ছিল সামরিক ক্ষমতা। রাজশক্তি ও সামরিক শক্তিকে ব্যবহারের মাধ্যমে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে, বসবাসকারী মানুষকে দাসে পরিণত করেছে। এসব দাসতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দাসদের নাগরিক হিসেবে কোনো অধিকার দেয়নি। রাষ্ট্র তখন নাগরিকের অধিকার স্বীকার করার বোধে ছিল না। সেকারণেই আমরা প্রাচীন এবং মধ্যযুগের কোনো নগররাষ্ট্র সভ্যতা, সাম্রাজ্য, রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশাল আয়তনের রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যকে খুব দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে দেখিনি। এসব রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক কোনো কালেই নিবিড় থাকেনি, রাষ্ট্রও জনগণকে আপন করে নেয়নি।

সেকারণে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে সেনা সদস্যদের নিয়ে, জনগণ যুদ্ধের দৃশ্য তাকিয়ে দেখেছে। কিন্তু এই যুদ্ধের পরিণতি কী তা তাদের জানা ছিল না। রাজার পরাজয়ে যে তাদের জীবনে পরাধীনতা নেমে আসবে সেটি বুঝতে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যেমন- পলাশীর আম্রকাননে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজ লর্ড ক্লাইভের বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ করেছে তখন গ্রামের কৃষক যুদ্ধ দেখেছে। কিন্তু বুঝতে পারেনি যে এর মাধ্যমেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা পরাক্রমশালী ইংরেজদের হাতে ২০০ বছরের জন্য চলে যাবে।

জনগণের এই বিষয়টি না বোঝার কারণটি ছিল ভারতবর্ষে তখন যে ধরনের মোগল সাম্রাজ্য ছিল সেটি ভারতীয় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি, ভারতীয় অভিন্ন রাষ্ট্রব্যবস্থার নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেনি। সেই ধারণা এই তথাকথিত রাষ্ট্রের ছিল না। সেকারণেই এই রাষ্ট্রগুলোকে আধুনিক কোনো রাষ্ট্রের নতুন মর্যাদায় ভূষিত করা যায় না।

আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠা শুরু করে ইউরোপে রেনেসাঁ তথা নবজাগরণ, শিল্পবিপ্লব, ১৮ শতকের আলোকিত যুগ এবং সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত ফরাসি বিপ্লব-উত্তর যুগ থেকে। দার্শনিকরা মানুষকে রেনেসাঁর যুগ থেকে নতুন মর্যাদায় দেখার শিক্ষা দিতে থাকে। তারা রাজা ও প্রজায় নয়, বরং নাগরিকতার ধারণায় মানুষকে চিন্তা করার নতুন শিক্ষায় শিক্ষিত হতে উজ্জীবিত করেন।

গোটা শিক্ষাব্যবস্থা তখন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। আলোকিত মানুষ সমাজে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকে। মানুষে মানুষে সাম্য এবং মৈত্রীর গুরত্ব উপলব্ধিতে আসতে থাকে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সঙ্গে মানুষেরও মৌলিক অধিকারের ধারণা গুরত্ব পেতে থাকে। সামাজিক-রাজনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক নানা সংগঠন ও আন্দোলন ক্রমেই দানা বাঁধতে থাকে। ১৯ শতকে ইউরোপীয় সমাজ ব্যবস্থায় এসব আন্দোলন ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাতে সৃষ্টি হয় আধুনিক জাতি- রাষ্ট্রের।

রাষ্ট্রে এক বা একাধিক জাতি নাগরিক পরিচয়ে সকল সুযোগ-সুবিধা লাভ করার অধিকার সংরক্ষণ করবে। এখান থেকেই বলা চলে আধুনিক রাষ্ট্রচরিত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়। ২০ শতকে এই যাত্রায় শামিল হয় পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের জাতিসমূহ। বিশেষত, ১৯৪৫ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষে উপনিবেশবাদের পতন ঘটতে থাকে, অভ্যুদয় ঘটে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের। সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের তালিকায় আমরা ১৯৪৭ সালে যুক্ত হয়েও স্বাধীনতা ভোগ করতে পারিনি। ফলে আমাদেরকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করে স্বাধীনতা লাভ করতে হয়েছে।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি আধুনিক চরিত্র দানের বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন । তিনি ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রটি পরিচালিত হবে, রাষ্ট্রের আধুনিক রূপটি সমাজসহ সর্বত্র ধীরে ধীরে দৃশ্যমান- এটিই স্বাভাবিক নিয়ম। রাষ্ট্রের সংবিধানের গণতন্ত্র , সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ দর্শন হিসেবে গৃহীত হয়।

গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা মৌলিকভাবে একই দর্শন। গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্র সকল নাগরিকের রাজনৈতিক-ধর্মীয়, অর্থনৈতিক-শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ সব অধিকার প্রদান করাই হচ্ছে মূল লক্ষ্য। কোনো বিশেষ জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্ম সম্প্রদায়ের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার অধিকার আধুনিক রাষ্ট্রের থাকে না। আধুনিক রাষ্ট্র হয় সবার। গণতন্ত্রের শিক্ষা এটিই ।

সুতরাং গণতন্ত্র চরিত্রগত ভাবে জাতি, সম্প্রদায় ও ধর্মনিরপেক্ষ। সুতরাং আমাদের শাসনতন্ত্রের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা আলাদাভাবে উল্লিখিত হলেও এর দর্শনগত ভিত্তি এক ও অভিন্ন। সমাজতন্ত্রকে দেখা হয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্ত রাখার দর্শন থেকে। সমাজের যাতে ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য আকাশ-পাতাল না হয় সেজন্যই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ধারণা সংবিধানে গৃহীত হয়েছিল। এটি গণতন্ত্রের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ।

জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম একটি চেতনা। এই চেতনায় রাষ্ট্রের সব নাগরিক উজ্জীবিত হবে, নিজ নিজ ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত অধিকার রক্ষার সুযোগ লাভ করবেন। এটিই হচ্ছে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের অন্যতম দর্শন। কোনো জাতিগোষ্ঠীই রাষ্ট্রে পিছিয়ে থাকবে না কিংবা কোনো জাতিগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব করবে না- এটি জাতীয়তাবাদের মূল চেতনা।

জাতীয়তাবাদ একটি আধুনিক উদারবাদী দর্শন যা রাষ্ট্রের সব নাগরিককে জাতিগত পরিচয়ে নয়, নাগরিক পরিচয়ে বসবাস করার অধিকার সংরক্ষণ করবে। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে নতুন সংবিধানে বর্ণিত আদর্শে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেছিল। কিন্তু এর চর্চা যথাযথভাবে না ঘটলে সমাজে যেসব সমস্যা ও সংকট তৈরি হয় তাতে রাষ্ট্রের চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নাগরিকরা শোষণ, বঞ্চনা ও অধিকারহারা হয়।

সেকারণে বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান দায়িত্ব সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠান এবং সব জাতিধর্ম পরিচয়ে নাগরিক সমাজের। কোনো বিশেষ জাতি বা সম্প্রদায় এক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় ঘটালে রাষ্ট্র ও সমাজে অস্থিরতা, জনজীবনে নিরাপত্তাহীনতা এবং মানুষে মানুষে আস্থা ও বিশ্বাসের অভাব ঘটবে। এতে রাষ্ট্রই শুধু নয়। প্রতিটি নাগরিকই শেষ বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা আজ শেষ হচ্ছে। আশা করা গিয়েছিল এই উৎসবটি কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি ছাড়াই নির্বিঘ্নে পালিত হবে। তারপরও দুঃখজনক কিছু দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। মহল বিশেষ দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার চাইতে নষ্ট করার ক্ষেত্রে গোপন তৎপরতায় লিপ্ত হতে থাকে। এবারও মনে হচ্ছে কোথাও কোথাও সেসব অশুভ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অপতৎপরতা ছিল। এটি না ঘটলেই আমাদের রাষ্ট্র-সমাজের মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেত। সবাইকে মনে রাখতে হবে- ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র আমাদের সবার।

লেখক: অধ্যাপক, গবেষক

আরও পড়ুন:
অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার
বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া
ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা
বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু
চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

শেয়ার করুন