দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: দুই দলের প্রস্তুতির হাওয়া

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: 
দুই দলের প্রস্তুতির হাওয়া

বিএনপির সামনে বেশ কিছু জটিল সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ এবং অসুস্থ। সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি জামিনে বাসায় আছেন। দ্বিতীয়ত, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও বিচারিক আইনে দণ্ডিত। তিনিও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বিএনপি মূলত এই দুজনের নির্দেশনা ও ভাবমূর্তিতে পরিচালিত হয়। তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিযুক্ত।

বৈশ্বিক করোনা সংক্রমণের ঢেউ দেশে এখনও পুরোপুরি কমেনি। সবেমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে ব্যবসা- বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শিল্প-কলকারখানা, যানবাহন, পর্যটনসহ সব কিছু খুলে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দেড় বছরে করোনার দুটি ঢেউ দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসনসহ সবক্ষেত্রে বড় ধরনের আঘাত সৃষ্টি করেছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেশ সময়ের প্রয়োজন। শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম বজায় রাখা দরকার। সবকিছুই নির্ভর করবে করোনার নতুন কোনো ঢেউ আবার যেন হানা না দেয় তার ওপর। সেটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। দুনিয়ার অভিজ্ঞতা এখনও সুখকর নয়। অনেক দেশেই করোনার চতুর্থ ঢেউ এবং নতুন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব ঘটতে দেখা যাচ্ছে। সেকারণেই আমাদের দেশে কতদিন বর্তমান সহনীয় অবস্থাটি দেখতে পাব তা নিশ্চিত করে বলে যায় না।

এমনই এক অনিশ্চিত অবস্থায় দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের হাওয়া দুই বড় দলের দিক থেকে বয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এই হাওয়া বইয়ে দেয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে ২০২৩ সালের শেষ সপ্তাহে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। সেই হিসাবে বাকি রয়েছে দুই বছর তিন মাসের মতো সময়। করোনার সংক্রমণ যদি বর্তমান ধারায় কমে আসতে থাকে তাহলে রাজনৈতিক সভা সমাবেশ বা কর্মকাণ্ড হয়ত স্বাভাবিক গতিতে দলগুলো পরিচালিত করতে মাঠে নামবে। কিন্তু সেই নামাটি যদি আবার নতুন কোনো কোভিড ভ্যারিয়েন্টের রূপান্তর ঘটায় তাহলে পরিস্থিতি কী হবে বলা মুশকিল।

এই বছরের শুরুতে ভারতে বেশ কিছু রাজ্যসভা নির্বাচনের পর ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ ভারতকে কতটা নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল সেটি সবারই স্মরণে থাকার কথা। আমরাও সেই ঢেউয়ে অনেকটাই ভেসে বেড়াচ্ছি। সুতরাং নির্বাচনি হাওয়া বইয়ে দেয়ার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা ২০২২-২৩ সালে কতটা সুখের হবে, জনগণ তাতে কতটা স্বাছন্দ্যে অংশ নেবে সেটি তখনকার পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে। বেশিরভাগ মানুষই করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে কমবেশি অবগত। একইসঙ্গে দেড় বছরে অনেক মানুষ করোনার কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্বজনদের হারিয়েছে, এখনও অনেকে কোভিড-উত্তর শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত।

ফলে সামনের দিনগুলো আগের মতো মানুষকে রাজনৈতিক মাঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নামতে খুব বেশি উদ্বুদ্ধ করবে এমনটা আশা করা মনে হয় প্রশ্নের মধ্যেই থাকবে। তাছাড়া জীবন-জীবিকার সংগ্রাম বিপুলসংখ্যক মানুষের সামনে এখন গুরত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার যে সুযোগটি যার যার সামনে রয়েছে তারা সেটাকেই প্রাধান্য দেবেন- এটাই স্বাভাবিক। দেশে গত একযুগে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে।

সামাজিকভাবেও মানুষের একটি নতুন অবস্থান তৈরি হয়েছে। করোনার অভিঘাতে পড়েও মানুষ দেড় বছর নিজেদেরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ধরে রাখার বেশ কিছু অবলম্বন খুঁজে নিতে পেরেছে। সুতরাং সামনের দিনগুলোতে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি বেশিরভাগ মানুষই সৃষ্টি হওয়ার পক্ষে যেতে চাইবে না। তাছাড়া আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা মানুষকে নতুন কিছু উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মানুষ যখন দেখছে ক্ষমতার পরিবর্তন সেখানে অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকারে খারাপের দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের মানুষজন আসবাবপত্র পানির দামে বিক্রি করতে চাইলেও গ্রাহক খুঁজে পাচ্ছে না, খাদ্যসংকট চরম আকার ধারণ করতে যাচ্ছে।

নারীরা রাস্তায় তাদের অধিকারের জন্য মিছিল করছে, ক্ষমতাসীনরা নারীদেরকে শিক্ষা, চাকরি ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত করার সব বেআইনি কর্মকাণ্ড চালিয়ে দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সর্বত্র এক ধরনের পর্যবেক্ষণ দেশের রাজনীতির উত্থান পতনে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে যুক্ত হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই কেউ বিরাজমান স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ুক, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য বাংলাদেশে তৈরি হোক সেটি খুব বেশি সমর্থন পাবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ২০১৩-১৫ সালের নৈরাজ্যকর অভিজ্ঞতা এখনও দেশে অনেকের স্মরণে আছে। সেকারণে বাংলাদেশে আগামী ২ বছর রাজনীতিতে সংঘাত সংঘর্ষের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে কাবুলের মতো নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ন্যূনতম সুযোগ সৃষ্টিতে বেশিরভাগ মানুষই অংশ নেবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সভা গণভবনে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর। এতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ৫৩ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। তারা দলের নিজ নিজ এলাকার পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন। এতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিস্থিতি, নেতৃবৃন্দের কার্যক্রম, কোথাও কোথাও দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা হয়।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অনেক স্থানেই নেতাকর্মীদের জনসংযোগ ও সম্পৃক্ততার অভাব সম্পর্কে নেতৃবৃন্দ দলের সভাপতিকে অবহিত করেন। দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় থাকার কারণে অনেক জায়গায় নেতাকর্মীদের মধ্যে চাওয়া পাওয়া ও দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করছে। তারপরও করোনার এই সংকটময়কালে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী সাধারণ মানুষকে নানাভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করেছেন। অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণও করছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা শেষে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি দলের অভ্যন্তরে যারা কোন্দল ও সংঘাতে লিপ্ত আছেন তাদেরকে হুঁশিয়ার করে দেন এবং দলের জন্য যারা অবদান রাখছেন তাদেরকে দলের কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন।

আগামী নির্বাচন উপলক্ষে তিনি দলের প্রস্তুতি গ্রহণের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন উপকমিটিকে পরবর্তী নির্বাচনি ইশতেহারে যে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হবে সেসব বিষয়ে আপডেট করার নির্দেশ দেন। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ শিক্ষা, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কীভাবে বাংলাদেশকে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে কাজ করবে সে সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা ইশতেহারে থাকার কথা তিনি জানান।

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এই সভার পর জাতীয়তাবাদী দল ( বিএনপি) নড়েচড়ে ওঠে। প্রথমে দলটি জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত মহিলা দলের এক সভায় বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কথা উল্লেখ করেন। ওই সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অনুষ্ঠিত হতে না দেয়ার কথাও উল্লেখ করেন। এরপরেই গত মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে বিএনপি এক জরুরি সভা আহ্বান করে।

২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারির পর এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বর্তমানে তিনি কারাদণ্ডে থাকায় দলের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারছেন না। এই অবস্থায় লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও কারাদণ্ডে দণ্ডিত। সেকারণে লন্ডন থেকে তিনি অনলাইনে বিএনপির গুলশানস্থ চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন, যা গণমাধ্যমে আইনগতভাবে প্রকাশিত হওয়ার বিধান না থাকায় প্রদর্শিত হয়নি। মঙ্গলবারের সভায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যগণ অংশ্রগ্রহণ করেন, বুধবার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম ও যুগ্ম সম্পাদক এবং বৃহস্পতিবার দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বসেছেন। সভায় অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দের মধ্য থেকে অনেকেই আগামীদিনের আন্দোলন সংগ্রাম ও নির্বাচনের ব্যাপারে বক্তব্য প্রদান করেন। নেতৃবৃন্দ নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না মর্মে অভিমত প্রকাশ করেন। একারণেই তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় চালু করার দাবিতে আন্দোলন করার ওপর জোর দেন। সেক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ কিংবা যুগপৎভাবে আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য দলকে প্রস্তুত করার কথা জানান।

এছাড়া আগামী সপ্তাহে বিএনপির সমমনা পেশাজীবীদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের একটি সম্ভাবনার কথা গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। সভার কার্যক্রম যেহেতু রুদ্ধদ্বার ছিল তাই ভেতরের সব কথা বাইরে জানা যায়নি। বোঝা গেছে বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গুরত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সেজন্য দলটি বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নয় বরং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন সংগঠিত করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে। সেক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনো মূল্যে ত্যাগ স্বীকার করার আন্দোলন দাঁড় করাতে সবাইকে সংগঠিত করার কাজে নামতে ব্যাপক সাংগঠনিক সফর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হয়ত শিগগিরই বিএনপি নেতৃবৃন্দ সেভাবে মাঠে নামবে।

বিএনপির সামনে বেশ কিছু জটিল সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ এবং অসুস্থ। সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি জামিনে বাসায় আছেন। দ্বিতীয়ত, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও বিচারিক আইনে দণ্ডিত। তিনিও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বিএনপি মূলত এই দুজনের নির্দেশনা ও ভাবমূর্তিতে পরিচালিত হয়।

তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিযুক্ত। দলের অভ্যন্তরে কোন্দল এবং নিষ্ক্রিয়তা দীর্ঘদিন থেকে বিরাজ করছে। এছাড়া ২০০১-০৬ সালের জোট সরকারের কর্মকাণ্ডে দেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির ভাবমূর্তির চরম সংকট এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সবচাইতে অপব্যবহারটি ২০০৬ সালে জোট সরকারের হাতেই ঘটেছিল। সেকারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রতি সমর্থন জোরালো করার ভিত্তি বিএনপির খুব বেশি জোরালো হবে না। এছাড়া জামায়াত ও স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দলটির আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা সম্পর্ক বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি, জঙ্গিবাদী এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থানকেই উৎসাহিত করবে এটি নিশ্চিত হওয়ায় রাজনীতি সচেতন মহল, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রতি আগের মতো আস্থা রাখার পর্যায়ে নেই।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে মাঝারি পর্যায় পর্যন্ত অনেকের কর্মকাণ্ডে সমাজে ক্ষোভ এবং সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা বর্তমান দেশীয় এবং বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে যেভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার সঙ্গে পাল্লা দেয়ার নেতৃত্ব বিএনপি বা অন্য কোনো দলে দেখা যাচ্ছে না। সেকারণে সুশাসন, নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে যে অসন্তুষ্টি রয়েছে তা এককভাবেই যেমন আওয়ামী লীগের ওপর দায় চাপিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, তেমনি বিরোধী দল যতক্ষণ পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের ধারায় ফিরে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্যাগুলো একক কোনো দল বা জোটের পক্ষে সমাধান করাও সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করা না গেলে সুশাসন, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের বিকাশ নিশ্চিত হওয়া নয়।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক

আরও পড়ুন:
শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

শেয়ার করুন

মন্তব্য

রেজা-নুরের নতুন ‘দল’ কী করবে?

রেজা-নুরের নতুন ‘দল’ কী করবে?

বিরাট কর্মী বাহিনী এবং জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও রাজপথে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি যা পারেনি বা পারছে না— রেজা ও নুরের দলের পক্ষে তা আরও কঠিন। কারণ জনসমর্থন গড়ে তোলাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাছাড়া এই দলের প্রধান হিসেবে যিনি আছেন, সেই রেজা কিবরিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরীক্ষিত কোনো নেতা নন।

‘দল’ শব্দটি উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখার কারণ হলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর এবং গণফোরোম থেকে বেরিয়ে যাওয়া নেতা রেজা কিবরিয়ার নেতৃত্বে নতুন যে দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, সেটির নাম দেয়া হয়েছে ‘গণ-অধিকার পরিষদ।’ কোনো রাজনৈতিক দলের নাম ‘পরিষদ’ হয় কি না—সেটি একটি প্রশ্ন। সম্ভবত এই ‘পরিষদ’ শব্দটি এসেছে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে গড়ে ওঠা ‘ছাত্র অধিকার পরিষদ’ থেকে। যে সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন ভিপি নুর। নতুন এই দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানের মঞ্চেও ছাত্র অধিকার পরিষদের একাধিক নেতাকে দেখা গেছে। সুতরাং এই দলকে ছাত্র অধিকার পরিষদের রাজনৈতিক সংস্করণ বলা যায় কি না—সে প্রশ্ন তোলাও অযৌক্তিক নয়।

নুর যে রাজনৈতিক দল গঠন করবেন, সেই আলোচনাটি অনেক দিন ধরেই ছিল। তবে এতদিন আলোচনাটি ছিল নুর ও সাকিকে নিয়ে। অর্থাৎ গণসংহগতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি এবং নুরুল হক নুর মিলে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন করবেন—এই আলোচনাটি গত ডিসেম্বরেও ছিল। কিন্তু সেখান থেকে সাকি হয়তো সরে গেছেন এবং নুরের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলেন রেজা কিবরিয়া। অবশ্য নুরের সঙ্গে রেজা নাকি রেজার সঙ্গে নুর— তাও আপাতত পরিষ্কার নয়।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে আলোচনায় আসা রেজা কিবরিয়া গণফোরাম থেকে সরে যাওয়া বা তাকে সরিয়ে দেয়ার পরে তিনি যে আওয়ামীবিরোধী কোনো ফোরামে যুক্ত হবেন— সেটিও শোনা যাচ্ছিল। সরাসরি আওয়ামী লীগ বা বিএনপিতে যোগ না দিয়ে ভিপি নুরের সঙ্গে তিনি যে নতুন দল গঠন করলেন— সেটির ভবিষ্যৎ কী, তা অনেক কিছুর উপরে নির্ভর করছে। কারণ দল হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে গেলে তাকে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হতে হয়— যা খুব সহজ নয়।

একসময় আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যকে নিবন্ধন দেয়া হলেও পরে তা বাতিল করা হয়। জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলনও নিবন্ধন পায়নি। সুতরাং যে নুর বিভিন্ন সময়ে সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থতি তৈরি করেছেন; ডাকসুর ভিপি হওয়ার পরেও যিনি ক্ষমতামসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন— তার দল খুব সহজে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেয়ে যাবে, তা হয়তো নয়।

রেজা ও নুরের নতুন দলের স্লোগান ‘জনতার অধিকার আমাদের অঙ্গীকার।’ স্লোগান হিসেবে এটি খারাপ নয়। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জনগণই রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক হলেও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্নে জনগণের সবচেয়ে বেশি অধিকার থাকে যে নির্বাচনে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই ভোটাধিকারই সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘিত হয়েছে। সুতরাং নতুন এই দল যদি জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনতে কাজ করে বা করতে চায়— সেটি সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু কী করে তারা জনগণের অধিকার নিশ্চিত করবে?

রাজপথে আন্দোলন করে নাকি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে? প্রসঙ্গত, দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী— যিনি সরাসরি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও নানা ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করেন। তার মানে রেজা ও নুরের এই দলটি যে আওয়ামীবিরোধী জোটের সঙ্গেই ভবিষ্যতে যুক্ত হবে— সেটি ধারণা করা যায়। দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, নুর-রেজার এই নতুন দল ক্ষমতায় যেতে পারে বলেও তার ধারণা।

রাজনীতিতে নানা কারণে জোট হয়। তার মধ্যে প্রধান কারণ নির্বাচন। যেমন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও আটটি দল মিলে গঠন করেছিল ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’। সেই জোটে জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলনও ছিল। কিন্তু এবার রেজা ও নুর মিলে যে নতুন দল গঠন করলেন, তারা আওয়ামী লীগের মতো বিশাল দলের বিপরীতে ভোটের রাজনীতিতে কতটুকু সুবিধা করতে পারবেন, তা এখনই বলা মুশকিল।

এটা ঠিক, এই দলটি নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেলেও একক দল হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে খুব বেশি জনসমর্থন পাবে না। সেক্ষেত্রে তারা হয়তো রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সঙ্গে জোট করবে। সেই জোটও নির্বাচনে কতটা আসন পাবে, তার পুরোটাই নির্ভর করবে নির্বাচনটি কোন সরকারের অধীনে এবং কোন প্রক্রিয়ায় হবে।

গত দুটি নির্বাচনের মতো হলে বিএনপি এবং তার শরিকরা মিলে যে গোটা দশের বেশি আসন পাবে না, সেটি একাদশ জাতীয় নির্বাচনেই টের পাওয়া গেছে। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে নতুন দল আত্মপ্রকাশের দিনই রেজা কিবরিয়া জাতিসংঘের অধীনে নির্বাচন করার দাবি জানিয়েছেন। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে জাতিসংঘের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান যে মোটেও সম্মানজনক নয়, সেটি নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবেন না।

আবার বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে (যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার) নির্বাচনেরও সুযোগ নেই। উপরন্তু একটি সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে যেরকম নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত থাকতে হয়, সেটিও তারা কতটা থাকতে পেরেছেন এবং পারবেন— তাও প্রশ্নাতীত নয়। ফলে কে কোন দল গঠন করলেন, দলটি নিবন্ধন পেল কি পেল না, তারা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে নাকি বড় কোনো দলের সঙ্গে জোট গঠন করবে— সেই আলোচনার কোনো অর্থই হয় না যদি নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে যেসব প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেগুলোর সুরাহা করা না যায়।

কথা হচ্ছে, রেজা ও নুর যে দলটি গঠন করলেন, তাদের উদ্দেশ্য কি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া নাকি নির্বাচনি ব্যবস্থা ঠিক করতে আন্দোলন গড়ে তোলা? এরকম একটি দল কি কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে? ছাত্র অধিকার পরিষদের আদলে দলটির নামের সঙ্গে ‘পরিষদ’ শব্দটি যুক্ত রাখা হয়েছে কি কোটাবিরোধী আন্দোলনের মতো শিক্ষার্থীদের নিয়ে নির্বাচনি ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার আন্দোলন গড়ে তোলার টার্গেট থেকে? সেটি কি আদৌ সম্ভব হবে?

কারণ বিরাট কর্মী বাহিনী এবং জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও রাজপথে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি যা পারেনি বা পারছে না— রেজা ও নুরের দলের পক্ষে তা আরও কঠিন। কারণ জনসমর্থন গড়ে তোলাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাছাড়া এই দলের প্রধান হিসেবে যিনি আছেন, সেই রেজা কিবরিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরীক্ষিত কোনো নেতা নন।

আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া পড়াশোনা করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরামে যোগ দিয়ে আলোচনায় আসেন তিনি।বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে রেজা কিবরিয়া পৈতৃক এলাকা হবিগঞ্জের একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান।

রেজা কিবরিয়া মূলত ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরামে যোগ দেন ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর। তাকে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করা হয়। এর ৬ মাসের মাথায় ২০১৯ সালের ৫ মে গণফোরামের বিশেষ কাউন্সিলে মোস্তফা মহসিন মন্টুকে সরিয়ে রেজা কিবরিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। যদিও পরে রেজা কিবরিয়াসহ চারজনকে বহিষ্কার করে জাতীয় কাউন্সিলের ঘোষণা দেয় গণফোরামের একাংশ। সবশেষ গত ৭ ফেব্রুয়ারি রেজা কিবরিয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, তিনি গণফোরাম থেকে পদত্যাগ করেছন।

অপরদিকে নুরুল হক নুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি হওয়ার আগে থেকেই সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার মাধ্যমে। বলা চলে, এই নেতৃত্বই তাকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের ভিপি হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

ভিপি হওয়ার পর থেকেই তিনি একাধিক ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মীদের হাতে যেভাবে প্রতিনিয়ত মার খেয়েছেন— সেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল। তার মতো আর কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি থাকা অবস্থায় এরকম মার খেয়েছেন বা নাজেহাল হয়েছেন— এমন নজির নেই।

মজার ব্যাপার হলো, রেজা ও নুরের দল যেদিন আত্মপ্রকাশ করল, সেদিনই অর্থাৎ গত মঙ্গলবার রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা। তারা এই দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্র ও যুব অধিকার পরিষদকে ‘জঙ্গি, সাম্প্রদায়িক ও সন্ত্রাসী সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক হামলায় মদদ দেয়ার অভিযোগ তুলে রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরকে গ্রেপ্তারেরও দাবি জানান।

পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনও তিন বছরের বেশি সময় বাকি। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে।

বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সংসদ ভেঙে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বর্তমান সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। সুতরাং এর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি। ফলে এর পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে যেকোনো দিন নির্বাচন হতে হবে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তিন বছর আগেই রাজনীতির মাঠে নির্বাচনের হাওয়া এবং দেশের বড় দুই দলের নেতারাও নির্বাচন নিয়ে নানা কথা বলছেন। এরকম বাস্তবতায় রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুর যে নতুন দল গঠন করলেন এবং আত্মপ্রকাশের দিনই তাদের দল নিষিদ্ধ করা এবং তাদের গ্রেপ্তারের যে দাবি জানানো হয়েছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে এই দলটিকে নানারকম চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হবে— তাতে সন্দেহ নেই।

বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পেতে গিয়ে তাদের হয়তো উচ্চ আদালতেও যেতে হতে পারে। কিন্তু যে জনগণের অধিকার আদায়ের স্লোগান নিয়ে দলটি আত্মপ্রকাশ করল, সেই অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তারা আখেরে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে— সেটি নির্ভর করবে অনেকগুলো ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’র উপরে।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক।

আরও পড়ুন:
শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

শেয়ার করুন

অর্থনীতির চাকায় গতিশীল বাংলাদেশ

অর্থনীতির চাকায় গতিশীল বাংলাদেশ

দারিদ্র্য দূর করায় তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতির স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৩ সালে ‘সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ পায়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৫০-এর মধ্যে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এছাড়া, দ্য গোল্ডম্যান স্যাচ পূর্বাভাস দিয়েছে, ব্রিকসের পর যে ১১টি দেশ (এন ১১) আগামীর পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ তার একটি।

বাংলাদেশ বর্তমানে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির দেশ। অর্থনীতির গতিময়তায় দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে এখন সারাবিশ্বে তার পরিচিতি। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদেরকে ২০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তামূলক ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। একটি দরিদ্র সাহায্যপ্রার্থী দেশ থেকে আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশ হওয়ার পথে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। ১৯৭১-এ পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা অর্জনের সময় বাংলাদেশ ছিল ‘আপাত সম্ভাবনাহীন’ পৃথিবীর দরিদ্রতম একটি দেশ, যাকে হেনরি কিসিঞ্জার ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের একটি সমৃদ্ধ দেশ। যাদের আছে রপ্তানিনির্ভর এক বিশাল অর্থনীতি। একযুগ ধরে যার প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ । ২০২০-এ কোভিড-১৯ এর কারণে প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এলেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলছে-

২০২১-এ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৮ এবং ২০২২ সালে এটা দাঁড়াবে ৭ দশমিক ২ শতাংশে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২২২৭ মার্কিন ডলার, যা প্রতিবেশী ভারত (১৯৪৭ ডলার) এবং পাকিস্তানের (১৫৪৩ ডলার) চেয়ে ঢের বেশি। এদিকে স্বাস্থ্য, গড় আয়ু, জন্মহার এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা নির্দেশকগুলোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির এই চিত্তাকর্ষক সাফল্য ভারত ও এর বাইরের সংবাদ মাধ্যমে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারী শিল্পোন্নতসহ অনেক দেশের অর্থনীতিতে যেখানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য সত্যি একটি উদযাপনের ব্যাপার।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে ভারতকে টপকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক আউটুলক: আ লং অ্যান্ড ডিফিকাল্ট অ্যাসেন্ট’ শিরোনামের এই প্রতিবেদন অনুযায়ী-

বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ১ হাজার ৮৮৮ ডলার। অথচ পাঁচ বছর আগেও ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ছিল বাংলাদেশের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছেন- ‘যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতি ভালো করছে, এমন সংবাদ সুখকর’।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা ৩ মেয়াদের সরকার ও জনগণের দূরদর্শী পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ ও কঠোর পরিশ্রম বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের সাফল্য এনে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ভারতকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং বন্ধুপ্রতিম দেশ বলেই গণ্য করে। প্রতিবেশী এই দেশসহ অন্যান্য ক্ষমতাধর দেশগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশ আস্থাশীল। দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই দেশগুলোকে অংশীদার হিসেবে মনে করে।

এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের এই উত্থানের কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে। এটি বুঝতে হলে পেছন ফিরে তাকাতে হবে। এর আগে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে দশকের পর দশক পশ্চিম পাকিস্তানের নিপীড়ন, নির্যাতন, বৈষম্যমূলক আচরণ ও অন্যায়-অবিচারের শিকার হয় পূর্ব পাকিস্তান। যার ফল ছিল পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা । ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় ছিল মাত্র ৪৫০ টাকা (বর্তমানের হিসাবে ৫.৩০ ডলার)। জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল। শিক্ষিতের হার ছিল মাত্র ১৭। ১৯৪৯-৫০ এবং ১৯৬৯-৭০ অর্থবছর পর্যন্ত মাথাপিছু গড় আয় ০.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারত। কিন্তু, পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় কমে ০.৩ শতাংশে নেমে যায়।

এদেশে মাথাপিছু দুধ, স্নেহ, তেল, মাছ ও অন্যান্য প্রোটিন গ্রহণের হার ছিল অনেক কম। ১৯৭২-এর মার্চে, পিসি ভেরমা ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলি জার্নালে লিখেছিলেন-

“গত ২৪ বছরে, বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানের অংশ ছিল, তখন এর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সররকারের নীতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল পশ্চাদমুখী।”

তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচক ছিল ভয়ানক কম। এছাড়া পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বৈশ্বিক বাণিজ্য, সহায়তা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যনীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর। একাত্তরের যুদ্ধ এই সংকটকে আরও ঘণীভূত করে। জাতিসংঘের হিসাবে, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সংস্কারে দরকার ছিল অন্তত ৯৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ওই সময় বাস্তবিকভাবে কাজটি ছিল সত্যিই দুঃসাধ্য। এমনকি তখন অনেকেই বাংলাদেশকে স্থিতিশীল দেশ হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের সেসময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৪-এ ঢাকা সফরে আসেন। তখন তিনি বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। আর রাষ্ট্রদূত ইউ অ্যালিক্স জনসন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে বলেন ‘আন্তর্জাতিক ঝুলি’। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার দূরদৃষ্টি ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে এ ধরনের পূর্বাভাসকে ছাপিয়ে যেতে সক্ষম হন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯-এর ৪ অক্টোবর দ্য প্রিন্ট-এ এক নিবন্ধে বলেছিলেন-

“স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া ছাড়াও, সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদনে আমরা এখন চতুর্থ স্থানে, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, আমে চতুর্থ, শাকসবজি উৎপাদনে পঞ্চম ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে চতুর্থ স্থানে রয়েছি।”

বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন অব্যাহত আছে। দেশটি ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের স্বীকৃতি পায়। এছাড়া ২০২৪-এর মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া শর্ত ২০১৮ সালে পূরণ করে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ দেশগুলোর একটি।

এগুলো সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্জন। এ অগ্রগতির পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি, পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব। একইসঙ্গে লাখো কৃষক, কারখানা শ্রমিক, পোশাক শ্রমিক ও দেশের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে।

দারিদ্র্য দূর করায় তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতির স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৩ সালে ‘সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ পায়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পিডব্লিউসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০৫০-এর মধ্যে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। এছাড়া, দ্য গোল্ডম্যান স্যাচ পূর্বাভাস দিয়েছে, ব্রিকসের পর যে ১১টি দেশ (এন ১১) আগামীর পৃথিবীর অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ তার একটি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সামরিক সক্ষমতাও বৃদ্ধিতেও সহায়তা করছে। চীন-রাশিয়ার মতো পুরনো উৎস বাদ দিয়ে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী কিছু বড়সড় কেনাকাটা করতে যাচ্ছে। তারা ইতোমধ্যে তুরস্ক থেকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের সামরিক যান কিনেছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আমেরিকান এফ-১৬ অথবা ইউরো ফাইটার টাইফুন কেনার চিন্তা করছে।

এদিকে ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক হাব হয়ে ওঠছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর ফলে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনীতির উন্নতি হবে। এতে বদলে যাবে দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থা। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ২০১৮ সালে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস আইন প্রণীত হয়েছে, ফলে বিনিয়োগকারীরা একই পয়েন্ট থেকে সব ধরনের সেবা পাবে।

বাংলাদেশের জিডিপি ২০০৯ সালে ছিল ১০২ বিলিয়ন ডলার যা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩০২ বিলিয়ন ডলার। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও বেড়েছে। ২০০৯ সালে যা ছিল ৭০০ মিলিয়ন ডলার; ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬১৩ মিলিয়ন ডলার।

শেখ হাসিনার সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশের উন্নয়নের জন্য সুনির্দিষ্ঠ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ণ করেছে। এর মধ্যে ছিল ২০২১ সালে মধ্য-আয়ের দেশের স্বীকৃতি লাভ, যা ইতোমধ্যেই অর্জিত। ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়া, ২০৭১-এর মধ্যে যাদুকরী দেশে রূপান্তর এবং ২১০০ সালের মধ্যে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন।

অনেকেই মনে করে, শেখ হাসিনার শাসনামলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রধান উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে। বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শক্তি হলো, ১৭ কোটি জনগণ। যাদের ৬০ ভাগের বেশি তরুণ। কর্মশক্তিতে পরিপূর্ণ এই তরুণেরা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বিপুল ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়েছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশ এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্র নীতি— ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ অনুযায়ী এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। আয়তনে ছোট ও সীমিত সম্পদ নিয়ে ৫০ বছরের মাথায় অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করেছে। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যাওয়ার সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) নামে এই জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামেও নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইউনিসেফ নির্বাহী বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব এখন বাংলাদেশের। একইসঙ্গে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) ও জাতিসংঘ প্রকল্পসেবাগুলোর কার্যালয়ের (ইউএনওপিএস) নির্বাহী বোর্ডের সহ-সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বের সমুদ্র সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে থাকে ও সঠিক ব্যবহার সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সিবেড অথরিটি। বর্তমানে সিবেড অথরিটি কাউন্সিলের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক জোটের নেতৃত্বেও পিছিয়ে নেই দেশটি। বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল, টেকনিকাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (বিমসটেক) নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ। বিমসটেকের সদর দপ্তর এখন ঢাকায়। এছাড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক জোট সার্ক বাংলাদেশের উদ্যোগেই গঠিত হয়। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ভূমিকা কম নয়। দেশটি এখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী।

এছাড়া বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর চাপ উপেক্ষা করে পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে সই করেছে বাংলাদেশ। ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা-ওআইসিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশ্বের অন্যতম মুসলিম দেশ হিসেবে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

৫০ বছরে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গেও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা করছে। ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশটি বর্তমানে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

শেয়ার করুন

জামায়াত-হেফাজত নিষিদ্ধ কি কঠিন?

জামায়াত-হেফাজত নিষিদ্ধ কি কঠিন?

গণ-আদালত ছিল নেহায়েত জনগণের আদালত এবং সাংবিধানিকভাবে গঠিত না হওয়ায় তখন সরকার ওই অভিযোগ আমলে নেয়নি। কিন্তু সবখানেই জনগণ বরাবর সোচ্চার গোলাম আযমের ফাঁসির দাবিতে আওয়াজ তোলে। যাহোক আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল অবশেষে গঠিত হয়। মওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ বেশ কজন নেতৃস্থানীয় জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে আনা সরকারি অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিজামীসহ বেশ কজনের ফাঁসির আদেশ ও তা কার্যকর করা হয়। এখন কতগুলো যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতার ফাঁসির আদেশ উচ্চতর আদালতে বিচারাধীন আছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দিতে গিয়ে বিচারকরা বেশ কবার ‘জামায়াতে ইসলামী একটি সন্ত্রাসী দল’ বলে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো সন্ত্রাসী দলের বৈধভাবে সমাজে কাজ করার অধিকার নেই। ইতোমধ্যে কয়েকটি সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আদালতে প্রমাণিত সন্ত্রাসী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী আজও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়নি। দিব্যি দেশ-বিদেশের সহায়তা ও আনুকূল্যে প্রকাশ্যে সংগঠন হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। নিঃসন্দেহে বিষয়টি শঙ্কা ও হতাশার।

এ ব্যাপারে অনেক লেখালেখি-আলোচনা হলেও বিগত প্রায় ৪ দশকেও দলটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়নি। তাদের বাংলাদেশে রাজনীতি করতে না দেয়া ও গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামীসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ফাঁসির দাবি তুলেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সেই প্রায় ৩০ বছর আগে।

কোনো নেতা-নেত্রী তার আগে এমন দাবি সাহসের সঙ্গে উত্থাপন করে দেশব্যাপী কাজ করেননি। জাহানারা ইমাম এ দাবিতে দেশের বিশিষ্টজনদের নিয়ে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো বৃহত্তম ময়দানে গণ-আদালত বসিয়ে গোলাম আযমের বিচারের আয়োজন করেন। স্বাধীনতাবিরোধীদের তীব্র বিরোধিতার মুখেও লক্ষাধিক মানুষ ওই গণ-আদালত পর্যবেক্ষণে যোগ দেয়।

বিশাল মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন বিচারকরা। উপস্থিত থাকেন প্রখ্যাত আইনজীবীরা। একে একে সাক্ষীরা এসে সাক্ষ্য প্রদান করে। বিচারকরা সাক্ষ্য ও জেরার ভিত্তিতে এ মর্মে রায় দেয় যে, গোলাম আযম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতা করে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ দালিলিক ও মৌখিক সাক্ষ্যে সন্দেহাতীতভাবে সত্য প্রমাণিত হওয়ায়; সর্বসম্মতিক্রমে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে ফাঁসির রজ্জুতে ঝোলানো উচিত।

যেহেতু ওই গণ-আদালত ছিল নেহায়েত জনগণের আদালত এবং সাংবিধানিকভাবে গঠিত না হওয়ায় তখন সরকার ওই অভিযোগ আমলে নেয়নি। কিন্তু সবখানেই জনগণ বরাবর সোচ্চার গোলাম আযমের ফাঁসির দাবিতে আওয়াজ তোলে। যাহোক আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল অবশেষে গঠিত হয়।

মওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ বেশ কজন নেতৃস্থানীয় জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে আনা সরকারি অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিজামীসহ বেশ কজনের ফাঁসির আদেশ ও তা কার্যকর করা হয়। এখন কতগুলো যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতার ফাঁসির আদেশ উচ্চতর আদালতে বিচারাধীন আছে। আগামী বছরের মাঝামাঝি এই আপিলগুলোর শুনানি, রায় ও কার্যকর করা হবে বলে আশা করা যায়। তবে তা সন্দেহাতীত নয়। সন্দেহাতীত নয় কথাটি আসলে বেসুরো।

আমাদের সবারই মনে আছে, কবছর আগের শাহবাগের গণজাগরণের কথা। ঢাকার তরুণসমাজ রুখে দাঁড়ায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিলম্বের প্রতিবাদে। উল্লেখ্য, তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলেও নানা কারণে রায় প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছিল। প্রতিবাদী তরুণ-তরুণীরা, যারা দিনরাত শাহবাগ ময়দানে লক্ষাধিক সংখ্যায় জমায়েত হয়- সম্মিলিত কণ্ঠে যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত ফাঁসির আদেশ এবং তা কার্যকরের দাবি তোলে।

এখানেই এ আন্দোলনের শেষ নয়। যতদিন পর্যন্ত তাদের ওই বিপ্লবী দাবি মেনে নেয়া কার্যকর না হয়- ততদিন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অবস্থান করে। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের আয়োজিত কর্মসূচি ছিল না। তবে ব্যক্তিগতভাবে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা ওই সমাবেশে উপস্থিত হয়ে তাদের সংহতি জানায়।

অপরদিকে হেফাজতে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দল নয় বলে, তাদের নেতারা এসব কথা প্রচার করলেও; তারা শাহবাগের তরুণ সমাজের ওই অরাজনৈতিক সমাবেশকে বিতর্কিত করতে ধর্মের আশ্রয় নেয়। এতেও ওই তরুণ-তরুণীরা ভয় পেয়ে থেমে যায়নি বরং সবাই মিলে সন্ত্রাসীদের শাহবাগ এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।

পরে সংশ্লিষ্ট মহল তাদের ছাত্র সংগঠন, যারা স্বেচ্ছায় ওই সমাবেশে শরিক থেকে আন্দোলনটিকে বেগবান করে তুলতে সহায়তা করে, তারা নিজেদেরকে নীরবে ওই আন্দোলন থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এর পরেও বাকি যারা ছিল তারা আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে অপেক্ষাকৃত কম শক্তি নিয়েই।

অতঃপর একজন বিচারাধীন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির আদেশের রায় হলে তখন তারা সে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়। বিজয় সূচিত হয় যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনের। তবে এখনও বেশকিছু ফাঁসির আদেশপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীর আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত না হওয়ায় অনেকের মনে নানা আশঙ্কা বিরাজ করছে।

এই হলো জামায়াত-হেফাজতের অরাজনৈতিক (?) ভূমিকা- যা বাংলাদেশের মানুষকে আজও জীবনাশঙ্কায় ভোগাচ্ছে। হেফাজত ইদানীং অনেক এগিয়ে গেছে। সরকারের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করে পাঠ্যপুস্তক থেকে অসাম্প্রদায়িক লেখক-কবিদের লেখা তুলে নিয়ে সাম্প্রদায়িক লেখকদের লেখা অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষার্থীদরকে সাম্প্রদায়িক হয়ে গড়ে ওঠার ব্যবস্থা পাকাপাকি করেছে। এতে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে দেশটি ঘোর সাম্প্রদায়িক দেশে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে নির্মিত একটি স্থাপত্য, যা জাস্টিসিয়া নামে পরিচিত সেটিকে ভেঙে ফেলার দাবি তুললে সঙ্গে সঙ্গে তা অপসারণ করে সর্বোচ্চ আদালতটির পিছনের আঙিনায় স্থাপন করা হয়।

হেফাজতিদের দাবি অনুযায়ী মাদ্রাসাশিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরের ডিগ্রিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রির সমতুল্য বলে স্বীকৃতি দিয়ে উচ্চশিক্ষাকেও সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবে নিয়ে যাওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারিভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য সর্বোচ্চ আকারে গড়ার যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা করলে হেফাজত ওই ভাস্কর্য ভেঙে বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলে দেবে বলে হুঁশিয়ারি জানালে সরকার চুপিসারে কাউকে না জানিয়ে পরিকল্পনাটি বাতিল করে।

এই দুই অপশক্তি, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের আরও অনেক ভয়ংকর কাজের সঙ্গে সবাই পরিচিত। এরপরও এরা বৈধ সংগঠন হিসেবে সক্রিয়ভাবে চালু থাকছে। এদেরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা কি তবে এতই কঠিন?

লেখক: রাজনীতিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মুখোশ খুলছে

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মুখোশ খুলছে

এবারের পুজোয় তাণ্ডব চালানোর একটি পরিকল্পনা হবার সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল বলেই মনে হয়- যা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জোরালো একটা আগাম প্রস্তুতি নেয়া যেত। যার ফলে এই সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে লজ্জায় পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা যেত।

অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ধর্মের লেবাসধারী চক্রান্তকারীরা সরকারের মুখে কালিমা লেপন করবে বা করেছে এমন তথ্যটি গোয়েন্দা বাহিনীর নজরে কেন থাকবে না- এ প্রশ্ন অনেকের। আমাদের দেশের চৌকষ গোয়েন্দা বাহিনী কত গোপন আস্তানা থেকে জঙ্গি নাশকতাকারীদের খুঁজে বের করে তাদের গ্রেপ্তার করেছে। কৃতিত্বপূর্ণ এই ধরনের ঘটনার সংখ্যাতো নেহায়েত কম নয়।

জঙ্গি দমনে তাদের দক্ষতা ২০১৬ সালের পর থেকে গৌরবোজ্জ্বল। কিন্তু দেখা যায়, যখনি কোনো ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ধর্মকে, পবিত্র গ্রন্থকে অবমাননা করে এর দায় হিন্দু-বৌদ্ধ, বা অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দিয়ে এটি প্রচারের মাধ্যমে একটি তাণ্ডব সৃষ্টি করে। তারপর হিন্দু বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বাড়িঘর লুট, ভাঙচুর, মন্দির ও প্রতিমা ভাঙার মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে! তখন তাণ্ডব লুটপাট-ভাঙচুর শেষ হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অকুস্থলে তাদের কাজ শুরু করে! এমনটা নিয়েও কম বিতর্কের সৃষ্টি হয়নি।

৪/৫ বছর আগে সংঘটিত নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবে হিন্দুদের জেলে পাড়ার তরুণ রসরাজের ওপর এই ইসলাম অবমাননার দায় চাপানোকে কেন্দ্র করে তাণ্ডব চালানোর সময়ে ওই সব হেফাজত-জামায়াতকর্মীদের গ্রেপ্তার না করার ফল হয় ভুক্তভোগী সমাজের অসহায় ক্ষমতাহীন তরুণদের অহেতুক অন্যায় মামলার মুখে পরা। রামুর উত্তম বড়ুয়া বা নাসিরনগরে রসরাজ বা সুনামগঞ্জে ঝুমন দাস- এরা এবং অনেক পরিচিত হিন্দু তরুণ-বয়স্কদের কাছে এই ভণ্ড অমানুষগুলো ইসলাম ধর্মকে নিয়ে দুষ্টবুদ্ধির খেলা করল, তাদের উপযুক্ত শাস্তি কেন হয় না? সে প্রশ্ন অনেকের।

আমাদের সমাজে কর্মহীন অলস মস্তিষ্কের ব্যক্তি-গোষ্ঠী যারা কিছু টাকার বিনিময়ে ইসলাম ধর্মের নবী, কোরআনকে নিয়ে অসৎ খেলায় মেতে উঠতে পারে তারা প্রকৃত ধর্ম বা কোরআনের বাণীর অনেক কিছুই জানে না। বিশ্বাস করে না এসব অসৎ অন্যায় কাজের কোনো পারলৌকিক পরিণাম আছে কি না, বা দেরিতে হলেও পুলিশের হাতে ইহলৌকিক শাস্তি নিয়েও ভাবে না!

জামায়াত-হেফাজতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা হিন্দুবিদ্বেষী এবং ভ্রান্তভাবে বিশ্বাস করে- ইসলামের একটি মূলনীতি- হিন্দুবিদ্বেষ! এদের এই বিদ্বেষনীতি তাদের পরিবারের সদস্যদের ছাড়িয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এর অনেক উদাহরণ আশপাশে দেখতে পেয়ে মন ভারাক্রান্ত হয়।

১৯৫৫ থেকে ’৬৪, তারপর ’৭১, ও ’৭৫-এর পর হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ মুসলিম প্রতিবেশীদের কাছ থেকে যথাযোগ্য সম্মান, সাহায্য-সমর্থন না পেয়ে বরং তাদের বসতভিটা ও জমি-সম্পদের ওপর মুসলিম প্রতিবেশীদের লোভের কারণে হত্যা-ধর্ষণের শিকার হয়ে দেশত্যাগ করেছে! আমাদের বাল্য-কৈশোরে প্রতি শ্রেণিতে অন্তত চল্লিশজনের মধ্যে দশজন হিন্দু-বৌদ্ধ শিক্ষার্থীদের বন্ধু হিসেবে পেতাম।

তাদের সঙ্গে একসঙ্গে পড়া-খেলা, নাচ-গান, নাটকাভিনয়, টিফিন খাওয়া, গার্হস্থ্যবিজ্ঞানের বিরিয়ানিসহ নানা রান্নার ক্লাস করে সে খাবার এক থালায় খাওয়া- কত কিছুতেই না জড়িয়ে ছিল আমাদের সবধর্মের মানুষের অন্তরঙ্গ জীবন। পুজো শুরু হলে অপেক্ষায় থাকতাম কবে দূরের পুজো মণ্ডপ থেকে ভেসে আসবে প্রিয় সেই হেমন্ত মুখার্জী, সন্ধ্যা মুখার্জী, লতা মুঙ্গেশকর, কিশোর কুমার, সতীনাথ, শ্যামল মিত্রদের গান।

ওই গানগুলো পুজোর সঙ্গে এতটা মিশে গিয়েছিল যে- এখনও ভাবি, কেন পুজো উদ্যোক্তারা পুজোর প্রথম দিন থেকে মাইকে গানগুলো বাজায় না? এখনও নিশ্চয় বাজাতে পারে। এ গানগুলো যদি বাজে তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়- এ গান মুসলমান তরুণ-বয়স্ক, এমনকি মোল্লা-মৌলবিদের মনকেও স্পর্শ করবে।

পুজোর মঞ্চে গান-নাচের অনুষ্ঠান হয়, এটি আনন্দদায়ক। কিন্তু পুজোর সকাল-দুপুরে মাইকে দূর থেকে ভেসে আসা গানের মন-সঞ্জীবনী ক্ষমতা আজও বড্ড মিস করি।

হিন্দু সম্প্রদায়ের বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব দেবী দুর্গার পুজোতে অন্তত কোনো হিন্দু যুবক-বয়স্ক, কারো দ্বারা হনুমানের কোলে কোরআন যেটি অন্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থ, সেটি রেখে নিজেদের পুজোর পবিত্রতা বিনষ্ট করতে পারে না। তাছাড়া, হিন্দুরাই খুব ভালো জানে কীভাবে তাদের কাউকে পরিকল্পিত অপবাদ দিয়ে বার বার হামলা-লুটপাট, মন্দির, দেবী প্রতিমা ভাঙচুর, মারপিট, ধর্ষণের শিকার তাদের হতে হয়েছে! সুতরাং এ কাজটি কোনো হিন্দু, আদিবাসী বা অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের দ্বারা করা সম্ভব নয়।

সম্ভব একমাত্র যারা ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, ’৭১- থেকে চেনা সেই ধর্ম-ব্যবসায়ী জামায়াত-হেফাজত এবং এদের নেপথ্যের সূত্রধর অর্থের দ্বারাই এ অপকর্মটি করেছে। জনগণ জানে এ ধরনের হীন কাজ, একটি ধর্ম সম্প্রদায়ের বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির দ্বারা সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাধারী সরকার!

একইভাবে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হলে এর সুবিধা ভোগ করে বিএনপি-জামায়াত, হেফাজত। তাই এ অপকর্ম এই সুবিধাভোগী ধর্ম ব্যবসায়ী, নীতিহীন, দেশপ্রেমহীন, অপরাজনৈতিক জোটের দ্বারা সংঘটিত এতে কোনো সন্দেহ নেই।

সরকারকে একটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক-কৃষি, শিল্প-যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটছে, কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষাক্রমে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ চেতনা গঠনে সেভাবে কাজ হয়নি যেটি পাঠ্য বিষয়ের পাশে সংস্কৃতিচর্চা, নাটক, যাত্রাপালায় খুব ভালোভাবে অনুশীলন করা দরকার।

এবারের পুজোয় তাণ্ডব চালানোর একটি পরিকল্পনা হবার সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল বলেই মনে হয়- যা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জোরালো একটা আগাম প্রস্তুতি নেয়া যেত। যার ফলে এই সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে লজ্জায় পড়ার হাত থেকে রক্ষা করা যেত। একটা কথা বলি- কোনো শিশু কি মায়ের গর্ভে থেকে আল্লাহ বা ভগবানকে বলতে পারে যে- হে আল্লাহ- ভগবান! তুমি আমাকে মুসলমানের ঘরে জন্ম দিও বা হিন্দুর ঘরে জন্ম দিও? সুতরাং ধর্ম আসলে আমরা সবাই উত্তরাধিকারসূত্রে বাবা, মা’র কাছ থেকেই পাই।

এই স্বধর্মের প্রতি অতি প্রীতি বা ভিন্নধর্মের প্রতি বিদ্বেষের যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কিছু ধর্মান্ধ দুষ্ট ও অসৎ ব্যক্তি ধর্মকে রক্ষার পাহারাদার দাবি করে সমাজে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের উচিত এদের কঠিন দণ্ডের ব্যবস্থা করা, কারণ তারাই প্রকৃতপক্ষে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে চূড়ান্তভাবে অপমানিত করেছে, ভিন্ন ধর্মজীবীরা নয়। তারাই মুক্তিযুদ্ধপন্থি সরকারকে অসুবিধায় ফেলার জন্য বার বার হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত হেনে বিশ্বকে দেখায়- আওয়ামী লীগ সরকার সংখ্যালঘুকে রক্ষা করতে পারে না!

লেখক: শিক্ষাবিদ ও গবেষক

আরও পড়ুন:
শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তি জয়ী হয়নি কখনও

সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তি জয়ী হয়নি কখনও

মৌলবাদী অংশটি এতদিন সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিল। কিন্তু এখন এদের ওপর ভর করেছে বিএনপি-জামায়াত, হেফাজত। একপক্ষ চায় এদেশে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েম করতে, অন্যপক্ষ চায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। উভয়পক্ষের ষড়যন্ত্রের বলি এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। নির্বাচন-পরবর্তী সংহিসতা কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এমনকি যেকোনো ইস্যু তৈরিতে ভিকটিম হচ্ছে ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’রা।

রামু থেকে কুমিল্লা হয়ে নোয়াখালী, রংপুর একই চিত্রনাট্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে মিথ্যা গুজব রটিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর পরিকল্পিত হামলা। তবে কুমিল্লা শহরের নানুয়া দীঘির পাড়ের মন্দিরের ঘটনাটি যে ছিল সুপরিকল্পিত গভীর ষড়ডন্ত্র সেটি ইকবাল হোসেনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছে।

কুমিল্লার নানুয়া দীঘির পাড়ের মন্দিরে হনুমান মূর্তির ওপর কোরআন শরিফ রেখে ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে সেই ঘটনাটিকে ফেইসবুকে লাইভ করে ভাইরাল করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই শত শত দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁটা নিয়ে মন্দিরে হামলা করে এবং নারী, পুরুষ, শিশু যাকেই যেখানে পেয়েছে তাকেই সেখানে আহত করেছে। এই একই অভিযোগে শুধু কুমিল্লাই নয়, আরও অন্ততপক্ষে পনেরোটি জেলায় দুর্গা মূর্তি কিংবা মন্দিরে হামলা চালানো হয়েছে।

এটা কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে না যে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক নিজেদের দুর্গোৎসবকে বানচাল করতে এমন কাজ করবে? ঘটনার পরবর্তী কার্যক্রমও প্রমাণ করে মৌলবাদী গোষ্ঠী সম্প্রীতির দুর্গোৎসবকে বানচাল ও দেশকে অস্থিতিশীল করতেই এমন কাজ করেছে। কুমিল্লার ঘটনাকে পুঁজি করে সারা দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ফলে তাদের প্রচেষ্টা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুরসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়নি।

মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে ধর্ম-বর্ণ, জাতি-গোত্র ইত্যাদি দিয়ে বিবেচনা করে দেখা-ই সাম্প্রদায়িকতা। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে একশ্রেণির সুবিধাবাদী লোকজন রাজনৈনিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে।

ধর্মের নাম ব্যবহার করে এই উপমহাদেশে হানাহানি, রক্তপাত, হত্যার ঘটনা তো নতুন নয়। ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের দাঙ্গা থামাতে বঙ্গবন্ধু রাস্তায় নেমে বলেছিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি রুখে দাঁড়িয়েছিল।

ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি-ধর্ম, বর্ণ একসঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে। সেদিনও মৌলবাদীরা ইসলামের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ মৌলবাদীদের প্রত্যাখ্যান করে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পবিত্র সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতির একটি ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্থান দিয়ে ১৯৭২ সালে গণপরিষদের ভাষণে বলেছিলেন- ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চলতে পারে না।’ বঙ্গবন্ধু সরকার তখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও তাদের কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করে।

১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জিয়াউর রহমান ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছে, অপরদিকে আরেক কদম এগিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইসলাম ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করে ধর্মনিরপেক্ষতার কফিনে শেষ পেরেকটি ঢুকিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ যেহেতু ধর্মভীরু সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ দুই দশক স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বীজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিয়েছে যার কুফল ভোগ করছে আজকের বাংলাদেশ।

নব্বইয়ের দশক থেকেই একদল মৌলবাদীরা সম্প্রীতি বিনষ্টের নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে। তারা কখনও রাষ্ট্রীয় মদদে আবার কখনও রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে।

ভারতে বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর বর্বরতা চালানো হয়। ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরী মন্দিরে হামলা করা হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রায় একমাস ধরে একটানা সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছে৷
২০০১ সালের নির্বাচনের পর হত্যা, লুটপাট, গণধর্ষণ, ধর্মান্তরিত করা, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ এহেন এমন কোনো কাজ নেই, যা বিএনপি-জামায়াত করেনি। নির্যাতিত ও ভুক্তভোগীরা থানায় বা আদালতে অভিযোগ পর্যন্ত করতে পারেননি। কেউ অভিযোগ করতে পারলেও রাজনৈতিক কারণে তদন্ত হয়নি। বিএনপি-জামায়াত আমলের পুরো পাঁচ বছর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার একটা রেওয়াজে পরিণত হয়৷

মৌলবাদী অংশটি এতদিন সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছিল। কিন্তু এখন এদের ওপর ভর করেছে বিএনপি-জামায়াত, হেফাজত। একপক্ষ চায় এদেশে তালেবানি রাষ্ট্র কায়েম করতে, অন্যপক্ষ চায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। উভয়পক্ষের ষড়যন্ত্রের বলি এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। নির্বাচন-পরবর্তী সংহিসতা কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এমনকি যেকোনো ইস্যু তৈরিতে ভিকটিম হচ্ছে ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’রা।

এতকিছুর পরও আমাদের আশা ও ভরসার জায়গা দুইটি। এক. বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দুই. এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুমিল্লার ঘটনার পর অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন-

‘যেখানে যেখানে যারাই এ ধরনের ঘটনা ঘটাবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের খুঁজে বের করা হবে। যথাযথ শাস্তি তাদের দিতে হবে। এমন শাস্তি দিতে হবে ভবিষ্যতে যেন আর কেউ সাহস না পায়।’

এদেশের জনগণের বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতি শতভাগ বিশ্বাস আছে। তিনি অনেক অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন। তিনি এই মৌলবাদী ধর্মান্ধগোষ্ঠীকে অবশ্যই পরাজিত করবেন। দ্বিতীয়টি হলো এদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী কখনও সাম্প্রদায়িকতাকে মেনে নেয়নি। সেজন্যই এতকিছুর পরও সাম্প্রদায়িকতা কখনও এদেশে বিজয়ী হতে পারেনি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন- ‘যারা এ বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা করতে চায়, তাদের সম্পর্কে সাবধান হয়ে যাও। আওয়ামী লীগের কর্মীরা, তোমরা কোনো দিন সাম্প্রদায়িকতাকে পছন্দ করো নাই। তোমরা জীবনভর তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছ। তোমাদের জীবন থাকতে যেন বাংলার মাটিতে আর কেউ সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন না করতে পারে।’

এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী শুধু ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’দেরই শত্রু নয়। এরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের শত্রু, দেশরত্ন শেখ হাসিনার উন্নয়নের শত্রু, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার শত্রু, সর্বোপরি মানবতার শত্রু। অনতিবিলম্বে সরকারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মনে রাখতে হবে এই দেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ ১৬ কোটি বাঙালির দেশ।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

আরও পড়ুন:
শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বলি কেন হবে একটি গোষ্ঠী?

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বলি কেন হবে একটি গোষ্ঠী?

এই যে সময়ে সময়ে আমরা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিহীন হয়ে পড়ি এরইবা কী সমাধান! আমাদের মধ্যে কোন প্রক্রিয়ায় যুক্তি-বুদ্ধির উন্মোচন ঘটানো যায়। কোন প্রক্রিয়ায় আমাদের ধর্মের মাননা বা অবমাননা বোঝানো যায়!

কুমিল্লায় মন্দিরে হামলার ঘটনার জেরে সব মিলিয়ে এই পর্যন্ত মোট আটজন নিহত হলেন। এর মধ্যে থিয়েটারকর্মী অধরা প্রিয়া’র বাবা দীলিপ দাস আছেন। দিলীপ দাস (৭৫) গত ১৩ অক্টোবর থেকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি ছিলেন। বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কুমিল্লা শহরে নানুয়া দীঘির পাড়ে একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কুরআন অবমাননার কথিত অভিযোগে গত ১৩ অক্টোবর ওই শহরে আটটি মন্দির ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়।

ওই ঘটনার জের ধরে পরে চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও রংপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলায়ও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়। নোয়াখালীতে হামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের দুজন মারা যান।

এছাড়া চাঁদপুরে মন্দিরে হামলাকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে নিহত হন পাঁচজন।

এসব ঘটনায় সারা দেশে মোট ৭২টি মামলা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ৪৫০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

আমরা জানতে পারলাম ঘটনার কূলকিনারা করা গেছে। ঘটনার মূল কালপ্রিট ইকবাল ধরা পড়েছে। ১২ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত লাগল ইকবাল রহস্য উদঘাটনে।

এখন কথা হচ্ছে ইকবাল না হয় ধরা পড়ল। ঘটনার রহস্য না হয় উদ্ঘাটন হলো সিসিটিভির ক্যামেরা ফুটেজ দেখে। কিন্তু এর মধ্যে যেসসব জেলায় হামলা হয়ে গেল, ঘরবাড়ি, উপাসনালয়-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি অবলা প্রাণিকুলও যে হামলায় রক্ষা পেল না তার কী হবে?

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এতগুলো সিসি ক্যামেরা ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও কেন ঘটনার রহস্য উন্মোচনে এত দেরি! আর সেইসঙ্গে প্রশ্ন জাগে যিনি পবিত্র কুরআন শরিফ হনুমানের নিকট রেখে গদা নিয়ে গেলেন, ধর্ম অবমাননায় তার অবস্থান কোথায়? তবে কি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে দেরি হয়েছে, নাকি নানুয়া দিঘীর পাড় এলাকায় যে এতগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে তা জানতে এতো দেরি হয়েছে, নাকি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সত্য উদঘাটনে দেরি হয়েছে? আসল কারণ কোনটি, নাকি সবগুলোই?

আর এদিকে যে এত সম্পদ ও প্রাণহানী, তার দায় দায়িত্ব এখন কে নেবে? সেকি শুধুই ইকবাল, ‘তৌহিদি জনতা’ প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ-সরকার-রাষ্ট্র নাকি অন্য কেউ?

ব্রিটিশ আমলে হিন্দু-মুসলিম ভাগ করে যে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’র বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল তা কি এই ভারতীয় উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর মানসপট হতে মুছে গিয়েছে! নাকি পরানের গহীন ভেতর থেকে তা থেমে থেমে জ্বলে ওঠে? যেই জ্বলনে দ্বগ্ধ হয় সব কিছু!

স্পষ্টতই আমরা দেখতে পাই, এই একবিংশ শতাব্দিতে জ্ঞান-বিজ্ঞান আর তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার সময়ে এসেও ওপারে ভারত আর এপারে বাংলাদেশে নিয়মিত বিরতিতে কতিপয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বাধিয়ে ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া খেতে চায়?

আমাদের এই ভূখণ্ডে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো স্বপ্ন দেখেছিলেন অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের। ৭২’র সংবিধানেও রয়েছে যার সুস্পষ্ট ছাপ। তবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীতে এসেও আমাদের দেশে এখনও কেন সংঘটিত হচ্ছে পায়ে পা বাধিয়ে সংখ্যালঘুর উপর সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস!

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয়। যা কার্যকর হয় ওই বছরেরই ১৬ ডিসেম্বর থেকে৷ সেই সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতি ছিল– ১. জাতীয়তাবাদ, ২. গণতন্ত্র, ৩. সমাজতন্ত্র এবং ৪. ধর্মনিরপেক্ষতা৷ সুতরাং সংবিধানের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা৷

১৯৮৮ সালে স্বৈরাচার এইচএম এরশাদ গণ-আন্দোলন মোকাবিলা করতে না পেরে রাজনৈতিক হীনউদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে বাংলাদেশের সংবিধানের খোলনলচেই পাল্টে দিতে অপচেষ্টা করে। তার শাসনামলে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়৷

অথচ ডান-বাম রাজনৈতিক দলগুলো তখন ঠিকই বুঝতে রাষ্ট্রের তো ধর্ম হয় না। ধর্মতো মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস। অপ্রয়োজনীয় এই সংশোধনী যাবতীয় অনৈসলামিক কাজে পটু এরশাদের স্রেফ ধাপ্পাবাজি। আর তাই সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম যুক্ত করার প্রতিবাদে তখনকার আন্দোলনরত ৮ দল, ৭ দল ও ৫ দলসহ সব নেতৃবৃন্দই কঠোর হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছিলেন।

পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১-এর মাধ্যমে ৭২-এর ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলেও, রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বহালই রাখা হলো।

অতএব, বলা যায় রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধানে স্থান দিয়ে সংবিধানের মূল নীতিরই একধরনের রদবদল করা হয়েছে৷

কাজেই আজ এই প্রশ্ন তোলা জরুরি গত তিন দশকে কি এমন জরুরি পরিবর্তন ঘটল যে আজ ইচ্ছা করে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো ইকবাল গং কী এক সর্বনেশে খেলায় মেতে উঠছে!

ইকবাল তো দৃশ্যমান মানবতাবিরোধী শত্রু। কিন্তু এই ইকবালের পশ্চাতে রয়েছে কোন স্বার্থান্বেষী মহল? এক ইকবালের অপকর্মকে জায়েজ করার জন্য অন্য সবাই যে উঠে পড়ে লাগল এর কী বিহিত হবে?

এই যে সময়ে সময়ে আমরা স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিহীন হয়ে পড়ি এরইবা কী সমাধান! আমাদের মধ্যে কোন প্রক্রিয়ায় যুক্তি-বুদ্ধির উন্মোচন ঘটানো যায়। কোন প্রক্রিয়ায় আমাদের ধর্মের মাননা বা অবমাননা বোঝানো যায়!

প্রতিটা ধর্ম এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থ রক্ষার জন্য তো স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই রয়েছেন। আর সাধারণভাবে প্রতিটা ধর্মেই তো মানবতা তথা মানুষকে ভালোবাসার কথাই বলা হয়েছে। তবে কেন মানুষকে বিযুক্ত করে আমরা ধর্মের দোহাই দিয়ে যাবতীয় অধর্মের কাজ করার জন্য মত্ত হয়ে উঠছি?

ভবিষ্যতের সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বর্তমান সময়ে এই প্রশ্নসমূহের উত্তর খোঁজা আর সমাধানে পৌঁছা খুবই জরুরি।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখতে পারে সমন্বিত উদ্যোগ

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রুখতে পারে সমন্বিত উদ্যোগ

বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বৈষম্যমূলক সমাজের জন্য হয়নি। বাঙালি জাতি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি। একদিকে ধর্মীয় বৈষম্য, অপরদিকে জাতিগত বৈষম্য। বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধানের ৪টি মৌলিক কাঠামোর অংশ। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা উভয়ই। এটি সংবিধানের একটি মৌলিক কাঠামো হওয়ায় সরকার ধর্ম বিবেচনা না করে সাধারণভাবে দেশের সব মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে ধর্ম প্রত্যেকের নিজস্ব বিষয়।

রাষ্ট্র একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর মানবাধিকারকে সম্মান করবে এবং তাদের মানবাধিকার ভোগে হস্তক্ষেপ করবে না। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে রক্ষা করবে। সবশেষে রাষ্ট্রকে সর্বদা একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মানবাধিকার ভোগ করার ইতিবাচক উপায়গুলো পূরণের চেষ্টা করতে হবে।

১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির অনুচ্ছেদ ২৭, অনুশীলনীটিকে পালন করার কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে।

সাধারণভাবে একটি রাষ্ট্র ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা ‘সংখ্যালঘু’দের বিবেচনায় না নিয়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য দায়বদ্ধ। কিন্তু ‘সংখ্যালঘু’দের ধর্মীয় অধিকার এবং অসহিষ্ণুতাপূর্ণ অবস্থা থেকে রাষ্ট্রই বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করবে। বিশেষ সুরক্ষার আলোচনাটি বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) এবং ২৯(৩) উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্র বা সরকার ‘সংখ্যালঘু’দের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রকে উৎসাহিত করবে।

বাংলাদেশের বর্তমান দৃশ্যপট সত্যিই ভিন্ন। কুমিল্লার একটি ঘটনার পর গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা চলছে। কিছু ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসবের সময় তাদের ওপর নির্যাতন, ভাঙচুর এবং সংঘষের্র ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় মানুষ নিহত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা কোনোটাই বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন করে না। এটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

গুজব ছড়িয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা উসকে দেয়ার কারণে পরিস্থিতির অবনতি হয়। এদেশের মুসলিম-হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অর্জন করেছে। এভাবেই স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়।

যারা দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, যারা নিজধর্মের পাশাপাশি অন্য ধর্মকেও সম্মান করে, তারা এধরনের হিংস্র গোঁড়ামির উন্মাদনাকে সমর্থন করতে পারে না। কুমিল্লার পূজামণ্ডপে হামলার পর গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী এবং রংপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় কীভাবে উগ্রপন্থিরা ধর্মীয় ‘সংখ্যালঘু’দের বাড়িতে হামলা করেছে তা সবার জানা। ধর্মের নামে এ ধরনের সন্ত্রাসকে কোনোভাবেই বাড়তে দেয়া যাবে না। এধরনের সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস প্রতিরোধে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, সমাজকর্মী, মানবহিতৈষী ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী এবং প্রগতিশীল শক্তিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে যথাযথভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।

অতি তুচ্ছ ঘটনায় বার বার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয় দেশের ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের মানুষ। গত ১৭ মার্চ যখন দেশব্যাপী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল, সেদিন সকালে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে ঘটে যায় ন্যক্কারজনক ঘটনা। একটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া নিয়ে একযোগে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় ওই গ্রামের ৮৮টি হিন্দু বাড়ি ও পাঁচটি মন্দিরে। তাদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি স্থানীয় কজন মুক্তিযোদ্ধাও।

আওয়ামী লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যুদ্ধ করার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই আওয়ামী লীগের একযুগের বেশি শাসনামলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বার বার নৃশংস হামলা হচ্ছে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর নৃশংস হামলা চলে। মামলা হলেও দুর্বৃত্তরা শাস্তি পায়নি। সবাই এখন জামিনে মুক্ত।

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর হয়েছে আরও ভয়াবহ হামলা। এ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধরা এখনও সুবিচার পায়নি। আসামিরাও এখন আর কারাগারে নেই। একইভাবে দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নাটোর, রাজশাহীর চারঘাট, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা ও পিরোজপুরে ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে যেকোনো ‘সংখ্যালঘু’ নির্যাতনের ঘটনার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও রাজনীতি হয়, কিন্তু কোনো শাস্তি হয় না। ফলে থামছে না নির্যাতনের ঘটনা।

অভিযোগ আছে নেপথ্যে ক্ষমতাশালীরা জড়িত থাকায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যায় না। প্রতিটি হামলার পেছনেই অপশক্তি কাজ করেছে। ধর্মীয় ইস্যুকে ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া দণ্ডবিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের বিভিন্ন ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বিভিন্ন সময় ধর্ম অবমাননার যেসব অভিযোগ শোনা যায়, সেসবের বিচারের কথাও তেমন শোনা যায় না।

এসব ঘটনায় দ্রুত ন্যায়বিচারের উদাহরণ সৃষ্টি করা না গেলে মানুষ ক্রমেই বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারাতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারকে এ বিষয়ে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ কোনো বৈষম্যমূলক সমাজের জন্য হয়নি। বাঙালি জাতি দ্বিজাতিতত্ত্বের বিস্তারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি। একদিকে ধর্মীয় বৈষম্য, অপরদিকে জাতিগত বৈষম্য। বৈষম্য থেকে মুক্তি এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়।

এমন একটি রাষ্ট্রের জন্য এদেশের মানুষ লড়াই করেছে, যুদ্ধ করেছে, যে রাষ্ট্রটির জন্ম হলে সব নাগরিকের জন্য সাম্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মর্যাদা সুনিশ্চিত হবে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর নির্যাতন আর হয়রানির ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা সেই পুরোনো অপকৌশলেরই আশ্রয় নেয়। আক্রমণকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় থানা-পুলিশে যেতেও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ভয় পায়। একসময় ‘সংখ্যালঘু’দের ওপর হামলার পর গণমাধ্যমের খবরকে অতিরঞ্জিত বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হতো। আওয়ামী লীগ আমলে তা হয়নি। সরকার রামু ও নাসিরনগরে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি ও মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছে। সুনামগঞ্জে ত্রাণ সামগ্রীসহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে। দোষীদের কঠিন শাস্তির আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো- প্রায় সব ঘটনায়ই অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা এখনও সম্ভব হয়নি।

অনেক ঘটনা আছে যেগুলো সরকার, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও তৎপর থাকলে, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই এসব ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। আর এসমস্ত ঘটনায় যদি অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা যেত তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। দৃষ্কৃতিকারীরা এসব অপকর্ম করতে ভয় পেত।

সমাজের সব মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং একটি সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ‘সংখ্যালঘু’ মানুষের জন্য এখন দরকার তাদের মনে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন ও সরকারকে সব নাগরিকের নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় আরও কাজ করতে হবে এবং নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।

বর্তমান সরকারের পক্ষে বলা হয়- বাংলাদেশ ধর্মীয় বহুত্ববাদ বিকাশ ও ‘সংখ্যালঘু’দের অধিকার রক্ষায় সবাই সচেষ্ট। যেকোনো সহিংসতা ও বিভেদ মোকাবিলায় সরকার সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসাম্প্রদায়িক ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে স্লোগান এনেছেন- ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এ স্লোগানের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দেশের সাধারণ মানুষকে সব ধর্মের প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আমাদের দায়িত্ব হলো, গণতান্ত্রিকভাবে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচারের ও মানবাধিকারের লড়াইটিকে এগিয়ে নেয়া। তাই প্রশাসন ও সরকারকে ‘সংখ্যালঘু’দের নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি রক্ষায় আরও কাজ করতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো বিএনএনআরসি।

আরও পড়ুন:
শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

শেয়ার করুন