শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান

শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান

ছাত্র-অভ্যুত্থানের তৃতীয় দিনের মধ্যে সরকার শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট স্থগিত এবং একই সঙ্গে ১৯৬৩ সালের স্নাতক পরীক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করার ঘোষণা দেয়। এ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বলা যায়, আইয়ুব খানের মতো তথাকথিত লৌহ মানবও ছাত্র-আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন স্থগিত করতে বাধ্য হন।

১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। পঞ্চাশের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন এবং ষাটের দশকের শেষনাগাদ জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মধ্যে সমন্বয়ক হিসেবে ১৯৬২’র ছাত্র-আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ এ দিবস।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণকারী বাঙালি রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জা প্রথমবারের মতো সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন এবং সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। সামরিক শাসন জারির ২০ দিনের মাথায় মির্জার দেখানো পথেই তাকে উৎখাত করে ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন আইয়ুব খান।

পূর্ব বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে হলে এখানকার শিক্ষা সংস্কৃতিকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এটা আইয়ুব খান খুব ভালো জানতেন। আর তাই ক্ষমতা দখলের দুই মাসের মাথায় ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন শিক্ষাসচিব ড. এস এম শরীফকে প্রধান করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট শিক্ষা-কমিশন গঠন করেন যা ‘শরীফ কমিশন’ নামে পরিচিত।

১৯৫৯ সালের আগস্ট মাসে কমিশন সরকারের কাছে রিপোর্ট হস্তান্তর করে। কমিশনের রিপোর্টে ষষ্ঠ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক, উর্দুকে সর্বজনীন ভাষায় রূপান্তর, উর্দু ও বাংলা ভাষার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে পাকিস্তানের জন্য একটি অভিন্ন বর্ণমালার সুপারিশ এবং অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাকে অবান্তর বলে ঘোষণা করা হয়। কমিশনের সুপারিশে- ১. প্রতিটি স্কুলে ৬০ শতাংশ ব্যয় সংগৃহীত হবে ছাত্রদের বেতন থেকে বাকি ২০ শতাংশ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নির্বাহ করবে। ২. পাস ও অনার্সকোর্সের সময়গত পার্থক্য বিলোপ করা হয়।

কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারি করার প্রস্তাব করে।

রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেলেও বাংলা ভাষাকে সাম্প্রদায়িকীকরণের লক্ষ্যে বিকৃতি চলতে থাকে। কবি নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘চল্ চল্ চল্’-এর ‘নব নবীনের গাহিয়া গান, সজীব করিব মহাশ্মশান’ চরণের সংশোধন করে, লেখা হয় ‘সজীব করিব গোরস্থান’। জনপ্রিয় ছড়া, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/ সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।’ পরিবর্তন করে করা হয়- ‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি/ সারাদিন আমি যেন নেক হয়ে চলি।’

১৯৫৯ সালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগঠনগুলোর একুশের সম্মিলিত অনুষ্ঠানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতির ভাষণে এসব বিকৃতিসহ অন্যান্য তথাকথিত সংস্কার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করেন যে, এসব তারা মেনে নেবেন না।

১৯৬১ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ দীর্ঘদিন পর আবার চাঙা হয়ে ওঠে। সামরিক শাসনের ফলে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দাবিকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলে। ১৯৬১ সালের গোড়ার দিকে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনকে কেন্দ্র করে ছাত্র-আন্দোলনের পরোক্ষ প্রস্তুতি চলতে থাকে। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ অন্যদের সঙ্গে নিয়ে ১৯৬১ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপন ও রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠান পালন করে।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বরেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ও ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মণি সিংহ ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য খোকা রায়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনায় আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ৬১’র ডিসেম্বরে পরবর্তী ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের লক্ষ্যে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মোহাম্মদ ফরহাদের উদ্যোগে ইস্কাটনের একটি বাড়িতে এক গোপন সভায় ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শিক্ষার দাবিকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হতে শুরু করে। ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকাল বন্ধ ঘোষণার প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ মিছিল করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ খুললে ১৫ মার্চ থেকে অব্যাহতভাবে ধর্মঘট চলতে থাকে।

ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ডাকসু, বিভিন্ন হল ও কলেজ ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সাধারণ ছাত্রদের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৫ আগস্ট দেশব্যাপী ধর্মঘট এবং ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়।

১০ সেপ্টেম্বর সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে প্রতিবাদস্বরূপ ১৭ সেপ্টেম্বর হরতালের ডাক দেয়া হয়। ওইদিন সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার সমাবেশ শেষে কার্জন হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেয় ব্যবসায়ী, কর্মচারী, রিকশা শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার সংগঠন। জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছে- এমন সংবাদ পেয়ে মিছিল নবাবপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে।

হাইকোর্টের সামনে পুলিশি বাধায় মিছিলকারীরা আবদুল গনি রোডে অগ্রসর হয়। পুলিশ মিছিলের পেছন থেকে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে। নবকুমার স্কুলের ছাত্র বাবুল, বাস কন্ডাক্টর গোলাম মোস্তফা ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গুলিবিদ্ধ গৃহকর্মী ওয়াজিউল্লাহ পরদিন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। যশোর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে পুলিশের নির্যাতনে বহু ছাত্র আহত ও গ্রেপ্তার হন। টঙ্গীতে গুলিতে নিহত হন শ্রমিক সুন্দর আলী।

তিনদিন পূর্ব বাংলায় ব্যাপক ছাত্র-অভ্যুত্থান ঘটে। ছাত্র-অভ্যুত্থানের তৃতীয় দিনের মধ্যে সরকার শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট স্থগিত এবং একই সঙ্গে ১৯৬৩ সালের স্নাতক পরীক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করার ঘোষণা দেয়। এ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বলা যায়, আইয়ুব খানের মতো তথাকথিত লৌহ মানবও ছাত্র-আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন স্থগিত করতে বাধ্য হন।

এর পর থেকে প্রতিবছর একটি সর্বজনীন, গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক একধারার শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে ছাত্র-আন্দোলন ও শহিদদের আত্মদান তথা শিক্ষার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বরকে ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের এই অর্জনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে ৬ দফা, ’৬৯-এর ১১ দফার ভিত্তিতে গণ-অভ্যুত্থান ও আইয়ুব খানের পতন, ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে বাঙালি রাজনীতিকদের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়।

১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লাখ শহিদ আর ২ লাখ নারী ও শিশু নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে হিসাব মিলাতে বসলে বলতে হয় শিক্ষাক্ষেত্রে এখনও আমরা খুব একটা অগ্রসর হতে পারিনি।

শিক্ষানীতি প্রণয়নকালে প্রথম শিক্ষা কমিশন-প্রধান ড. কুদরাত-ই-খুদা বলেছিলেন- “শিক্ষা ব্যবস্থা একটি জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা রূপায়ণের ও ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার। কাজেই দেশের কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তসহ সব শ্রেণির জনগণের জীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনের উপলব্ধি জাগানো, নানাবিধ সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জন এবং তাদের বাঞ্ছিত নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ সৃষ্টির প্রেরণা সঞ্চারই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব ও লক্ষ্য। এই লক্ষ্য আমাদের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসমূহের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। শিক্ষার মূলনীতির সঙ্গে এই সাংবিধানিক নীতিমালার যোগ সাধন করে বাংলাদেশের শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলি নির্ধারণ করা যায়।”

সংবিধানে স্বীকৃত শিক্ষার অধিকার আমরা আজও পাইনি। ধনীক শ্রেণির কাছে শিক্ষা কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়েছে। সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের বিষয়টি স্বীকৃত হলেও শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে বাংলাচর্চা সীমিত হয়ে পড়েছে। তিন বছরের ডিগ্রি, চার বছরের অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বদলে বাণিজ্য শাখায় শিক্ষার্থী বাড়ছে।

বিগত বছরগুলোতে পাসের হার বৃদ্ধিতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের বর্ধিত চাহিদা থেকে বেড়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ-এমবিএ কিংবা প্রযুক্তিগত কোর্স পড়ানোতেই সীমাবদ্ধ। এভাবে মৌলিক বিদ্যাচর্চা ব্যাহত হওয়ায় দেশে উচ্চতর গবেষণার সংখ্যা ও মান কমেছে।

রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চেহারা বদলানো হয়েছে। হেফাজতের ১৩ দফা অনুযায়ী পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করে শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে। গুণগত কোনো পরিবর্তন ব্যতিরেকেই মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাপ্ত ডিগ্রিকে দেয়া হয়েছে সাধারণ শিক্ষার সমমান। মাদ্রাসা বাড়ানো ও উন্নয়নের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ বাড়ছে। সেভাবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল খোলার জন্য সরকারি বরাদ্দ বাড়ছে না।

ছাত্র সংগঠনের নাম আগেরটা থাকলেও তারা ক্ষমতাসীন দলের লাঠিয়ালবাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চ, যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ, বর্ধিত বেতন-ফি কমানো, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি শিক্ষায় ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করে করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণেরা।

করোনা মহামারিতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পরিচালনা কমিটি এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য ৬৩টি নির্দেশনা পালন করার শর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম যথাযথভাবে শুরু করতে হলে এই খাতে সরকারের আরও মনোযোগ ও বিনিয়োগ দরকার। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসার আহ্বান নয় বরং শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও অর্থনৈতিকভাবে কী ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করছে তা বিবেচনায় নিয়ে সমাধানও জরুরি।

করোনাকালে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরার মাধ্যমে সব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নিশ্চিত হোক এবারের শিক্ষা দিবসে এই হোক আমাদের সবার চাওয়া।

তথ্যসুত্র:

১. ড. মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৪।

২. আবুল কাশেম, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন: প্রকৃতি ও পরিধি, ইতিহাস সমিতি পত্রিকা, সংখ্যা ২৩-২৪, ১৪০২-১৪০৪।

৩. বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক
জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

আন্ডারওয়ার্ল্ড ও নারী

আন্ডারওয়ার্ল্ড ও নারী

মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিম হাজি মস্তানকে হত্যা করে অপরাধ জগতের মুকুটহীন সম্রাট বনে যায়। একাধিক নায়িকার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন আছে। ‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি’ খ্যাত মন্দাকিনীর সঙ্গে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়। বলিউডে যারা পা রাখে তারা এসব বিষয়ে অবহিত হয়েই আসে। মমতা কুলকার্নি ড্রাগ মাফিয়া বিক্রম গোস্বামীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। হরর মুভি ‘ভিরানা’ খ্যাত নায়িকা জেসমিন ধুন্না দাউদ ইব্রাহিমের থাবা থেকে বাঁচতে সিনেমা জগৎ থেকেই অন্তর্হিত হন।

পাশ্চাত্য সমাজে নারীদেহের সূচিতার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক নয়। মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রে এবং মুসলিম সমাজে অবশ্য নারীদেহের শুচিতা একটি বড় বিষয়। একজন পুরুষ অনায়াসেই বহু নারীর সঙ্গে মেলামেশা করতে পারে। এতে সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে মিলতে তার কোনো সমস্যা হয় না। অথচ নারীর সামান্য পদস্খলনও সমাজ সহ্য করে না। পৃথিবীর ইতিহাসে নারীর সৌন্দর্যের পরিপ্রেক্ষিতে কী কী ঘটেছে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে।

প্রাচীন ভারতীয় নগরবধূ আম্রপালি ছিলেন অসাধারণ সৌন্দর্য ও লাবণ্যে পরিপূর্ণ একজন নারী। বৈশালির রাজা মনুদেব আম্রপালির হবু স্বামী পুষ্পকুমারকে হত্যা করে এবং একটি সরকারি ঘোষণায় আম্রপালিকে বৈশালীর নগরবধূ হিসেবে ঘোষণা করে। এতে মনুদেবের রাজকোষ সমৃদ্ধ হয়।

ব্রিটেনের রাজা অষ্টম অ্যাডওয়ার্ড তার প্রেমিকা ওয়ালিস সিম্পসনের জন্য ১৯৩৭-এ সিংহাসন ত্যাগ করেন। মার্কিন পরিবারে জন্ম নেয়া ওয়ালিস সিম্পসন আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন এবং ফ্যাশন সচেতন নারী ছিলেন। ‘স্বর্ণকেশী বোম্বশেল’ খ্যাত মেরিলিন মনরোর ভুবনমোহিনী সৌন্দর্যে বিমোহিত ছিলেন জন এফ কেনেডি। রীতিমত প্রণয় ছিল তাদের মধ্যে। কথিত আছে প্রেসিডেন্ট কেনেডি মাফিয়াদের প্রতি খড়গহস্ত হয়েছিলেন বলে, পরিকল্পিতভাবে তারা মেরিলিন মনরোকে খুন করে। এই নায়িকার হলিউডে পদার্পণ ছিল নিতান্ত আকস্মিক! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধচলাকালে একটি কারখানায় কাজ করার সময় মেরিলিন মনরো একজন ফাস্ট মোশন পিকচার ইউনিটের আলোকচিত্রীর ক্যামেরায় ধরা পড়েন এবং একজন পিন-আপ মডেল হিসেবে মনোনীত হন।

বাংলা সিনেমার সর্বকালের ধ্রুপদী সৌন্দর্যের অধিকারী নায়িকা সুচিত্রা সেন বিয়ের পর আর্থিক টানাপোড়েনের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পেতে বাংলা সিনেমায় নাম লেখান। তিনি আজও বাঙালি নারী-পুরুষের অবচেতন মনে তার ব্যক্তিত্ব ও সৌন্দর্যের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন।

মাদক, অস্ত্র এবং নারী এক সূত্রে গাঁথা মালার মতো তিনটি শব্দ। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং মাফিয়াতন্ত্র। এসবের আমদানি হয় উন্নত বিশ্বের দেশগুলো থেকেই যখন তাদের গণতন্ত্র এবং জীবনযাত্রার মান বর্তমানের এই সুবেশী অবস্থায় ছিল না। পরে তা রপ্তানী হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রেখেই বলিউডের সিনেমা জগৎ যাত্রা শুরু করে।

মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিম হাজি মস্তানকে হত্যা করে অপরাধ জগতের মুকুটহীন সম্রাট বনে যায়। একাধিক নায়িকার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন আছে। ‘রাম তেরি গঙ্গা মইলি’ খ্যাত মন্দাকিনীর সঙ্গে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়। বলিউডে যারা পা রাখে তারা এসব বিষয়ে অবহিত হয়েই আসে। মমতা কুলকার্নি ড্রাগ মাফিয়া বিক্রম গোস্বামীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। হরর মুভি ‘ভিরানা’ খ্যাত নায়িকা জেসমিন ধুন্না দাউদ ইব্রাহিমের থাবা থেকে বাঁচতে সিনেমা জগৎ থেকেই অন্তর্হিত হন।

সম্প্রতি বলিউড বাদশা শাহরুখ খানের পুত্র আরিয়ানকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করেছে ভারতের নারকোটিকস কন্ট্রোল ব্যুরো। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আজিজ মোহাম্মদ ভাই বাংলাদেশের সিনেমা জগতকে নিয়ন্ত্রণ করত। বহুগামীতা তার দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিল। মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গেও রয়েছে তার সখ্যতা। পরবর্তীকালে আজিজ মোহাম্মদ ভাই সপরিবারে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং মাফিয়াতন্ত্রে মদ, অস্ত্র এবং নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সোনালী ত্রিভুজের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নেশাজাতীয় দ্রব্যের যে চাষাবাদ, বিশ্বমোড়লদের সদিচ্ছা থাকলে এতদিনে তা নির্মূল হয়ে যেত। অস্ত্রের বিষয়ে বলতেই হয়- উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের আয়ের প্রধান উৎস অস্ত্র বিক্রয়। অস্ত্র বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে তারা পরিকল্পিতভাবে পৃথিবীর নানা দেশে যুদ্ধ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে রাখে। আর আকর্ষণীয় নারীর উপস্থিতিতি মদ ও অস্ত্রের ব্যবসা সহজ করে তোলে।

বৈধ ও অবৈধ উপায়ে অর্থ এবং বিত্তের অধিকারী ব্যক্তিরা মদ ও নারীদেহের মধ্যে স্বর্গের সিঁড়ি খোঁজে। অসৎ উদ্দেশ্যে অনেকে উপঢৌকনও পাঠায়। সন্ত্রাসীরা মদ সেবন এবং অস্ত্র বেচাকেনার পাশাপাশি নারীসঙ্গও উপভোগ করে। এ আন্ডারওয়ার্ল্ডে যেসব নারী এবং পুরুষ একবার প্রবেশ করে তারা সাধারণত আর বের হতে পারে না।

অর্থ, খ্যাতি, বিদেশ ভ্রমণ এবং বিলাসী জীবনে এরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এত সহজ পথে আত্মপ্রতিষ্ঠার ওল্টো পৃষ্ঠায় কোন বিভীষিকা অপেক্ষা করে তা ভাবার প্রয়োজন মনে করে না। যদি গত দুবছরের দিনলিপির সন্ধান করি তাতেই অনেক আলোকিত অন্ধকার আমাদের চোখমুখ ঢেকে দেবে।

পাপিয়া, সাবরিনা, সাহেদ, সম্রাট, জিকে শামীম, পদ্রীপ, পিয়াসা, মৌ, হেলেনা, রাজ, কাদের এবং পরীমনি প্রমুখ ব্যক্তিরা এ সমাজেই বেড়ে ওঠেছেন। বিশাল ছাতার নিচে হৃষ্টপুষ্ট হয়েছেন। হয়ত কোথাও কোনো অংক মেলেনি অথবা ক্ষণিকের কোনো ভুলে তারা পা ফসকে পড়ে গেছেন। পরীমনিকে মাদক মামলায় বার বার রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। উচ্চ আদালত রিমান্ড বিষয়ে নিম্ন আদালতের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। নানা দোলাচলের মাঝে আদালত পরীমনিকে স্থায়ী জামিন দিয়েছে এবং তার মামলাটি বিচারিক আদালতে পাঠানো হয়েছে।

লেডি দাবাং পাপিয়া যে অনৈতিক কার্যকলাপ বেশ কিছুদিন ধরে ওয়েস্টিন হোটেলে চালাচ্ছিল তা কি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা জানতেন না? শোনা যায় সেখানে সমাজের সব শ্রেণী-পেশার ব্যক্তিদের আনাগোনা ছিল। দুর্ভাগ্য যে তাদের বিষয়ে আমরা কোনোদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানতে পারব না।

বিত্ত, ক্ষমতা এবং পদবীর লেবাস শরীরে মুড়িয়ে তারা সদর্পে এ সমাজেই অবস্থান করছে এবং যে এ বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করে সেই ফটো সাংবাদিককে নিখোঁজ থাকতে হয়েছে, যেতে হয়েছে কারাগারে। কথিত মডেল পিয়াসা এবং মৌ গ্রেপ্তারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়- এরা ‘রাতের রানী’ নামে পরিচিত। প্রশ্ন জাগে- ‘রাতের রাজা’রা এখনও কেন গ্রীন রুমেই রয়ে গেল?

সম্প্রতি যেসব নারীকে মাদক, অস্ত্র এবং অন্যান্য অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় এবং যাদের বিচার চলছে- তাদের পেছনে অদৃশ্য যে সুতোর টান আছে অর্থাৎ এই পুতুলদেরকে যারা নাচিয়েছে তাদের পরিচয় জানা এবং প্রকাশ করাটাও জরুরী। আসল হোতা এবং ভোক্তাদেরকে যদি শনাক্ত করা না হয় এবং তারা যদি আইনের ঊর্ধ্বাকাশে ওড়ে তবে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতেই থাকবে। নারীদের ‘স্কেপ গোট’ করে যারা বিত্ত এবং ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যাচ্ছে- তারা কি অপরাধী নয়? এটা অপরাধ দমনের পন্থা হতে পারে না। যেখানে আসল অপরাধীকে আড়াল করা হচ্ছে। অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার অপরাধমূলক রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এটিই স্বাভাবিক।

ঠগবাজি করে অগাধ সম্পদের মালিক হয়ে এরা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে কেউকেটা বনে যায়। এরা যে বৃত্ত সৃষ্টি করে, সে বৃত্ত ভেদ করা মাঝেমধ্যে সরকারের পক্ষেও সম্ভব হয় না। আর কে না জানে কর্তৃত্ববাদী শাসনে অন্যায্য উচ্চাভিলাসী একটি গোষ্ঠিকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এ প্রসঙ্গে ফরাসী উপন্যাসিক বালজাকের উক্তিটি মনে পড়ছে- “আইন হচ্ছে মাকড়শার জালের মতো, ছোট কিছু পড়লে আটকে যায়, বড় কিছু পড়লে ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়। আইন গরীবকে পিষে, আর ক্ষমতা আইনকে পিষে।”

যে কথাটি প্রায়ই শোনা যায়, ‘কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়’। বাস্তবতা এই যে, সব নাগরিকের ক্ষেত্রে উপরোক্ত উক্তির বাস্তবায়ন দূর আকাশের তারার মতই অধরা রয়ে গেছে।

লেখক: শিক্ষক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক
জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা

তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিয়ন্ত্রণে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা

বাংলাদেশে অনেক নিষিদ্ধ দ্রব্যের ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু আছে যাতে সেগুলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। মদ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কিন্তু এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেকারণে এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের জন্য বিক্রেতা-ক্রেতা উভয়ের ক্ষেত্রে লাইসেন্স আরোপ করে সরকার। তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার একদিনেই বন্ধ করা সম্ভব নয় কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে চুড়ান্তভাবে অবশ্যই সম্ভব।

গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোবাকো সার্ভে ২০১৭ অনুসারে- বাংলাদেশে ১৫ বছরের ঊর্দ্ধে ৩৫.৩% প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৪৬% পুরুষ এবং ২৫.২% নারী। বিভিন্ন জনসমাগম ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান না করেও পরোক্ষভাবে ধূমপানের শিকার হচ্ছে বহু মানুষ। এই হার কর্মক্ষেত্রে ৪২.৭%, রেস্তোরায় ৪৯.৭%, সরকারি কার্যালয়ে ২১.৬%, হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ১২.৭% এবং পাবলিক পরিবহনে ৪৪%।

বৈশ্বিকভাবে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০০৩-এর মে তে ৫৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ফ্রেমওর্য়াক কনভেনশন অন টোবাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) চুক্তি অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশ এ চুক্তির প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ এবং ২০০৪-এ চুক্তিটিকে অনুসমর্থন করে। এর ধারাবাহিকতায় সরকার এফসিটিসির আলোকে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এবং ২০১৫ সালে এ সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করে।

৩০ থেকে ৩১ জানুয়ারী, ২০১৬ ঢাকায় অনুষ্ঠিত Summit on Achieving the Sustainable Development Goals শীর্ষক South Asian Speakers Summit এর সমাপনী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪০-এর মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দেন। দেশের ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) এর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত লক্ষ্য-৩ অর্জনে আন্তর্জাতিক চুক্তি এফসিটিসির বাস্তবায়ন ও তামাকজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আছে।

মানীয় প্রধানমন্ত্রীর ২০৪০-এর মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা বাস্তবায়ন কী স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে? নিশ্চয়ই তা নয়। কোনো সিদ্ধান্তই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত হয় না। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং আরও কিছু অনুসিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

এর আলোকেই তামাক বিরোধী সংস্থাগুলোর চেষ্টা এবং সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যকর ভূমিকায় জানুয়ারী ২০২১-এ ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা’ প্রকাশিত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের সব দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) নির্দেশিকাটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২মার্চ ২০২১-এ (স্মারক নং:৪৬.০০.০০০০.০৮৫.০৬.০৪২.২০১৮-১১৮) স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

তামাকজাত দ্রব্য যত্রতত্র ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও বিক্রয় সীমিতকরণে ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকা’ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। নির্দেশিকাটি ঠিকভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে ২০৪০-এর মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নির্দেশিকার ৮ এর ৮.১-এ বলা হয়েছে-

‘তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়কেন্দ্র বা যেখানে তামাকজাত দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় হবে তার জন্য আবশ্যিকভাবে পৃথক ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করা এবং প্রতি বছর নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে আবেদনের মাধ্যমে উক্ত ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা।’ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর করার অর্থ শুধু বৈধতা প্রদান নয়। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশে অনেক নিষিদ্ধ দ্রব্যের ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু আছে যাতে সেগুলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। মদ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কিন্তু এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেকারণে এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের জন্য বিক্রেতা-ক্রেতা উভয়ের ক্ষেত্রে লাইসেন্স আরোপ করে সরকার। তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার একদিনেই বন্ধ করা সম্ভব নয় কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে চুড়ান্তভাবে অবশ্যই সম্ভব। যা বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে করে দেখিয়েছে। বাংলাদেশে সে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য এর ব্যবহার ও বিক্রি কমিয়ে আনতে হবে, আর সেজন্য অন্যতম পদক্ষেপ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা।

বর্তমান অবস্থায় তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। লাইসেন্সিং ব্যবস্থার উদ্যোগ এর বিক্রয়কে সীমিত করতে সাহায্য করবে। বিক্রয় সীমিত করা সম্ভব হলে ব্যবহারও কমে আসতে বাধ্য। লাইসেন্সিং এর বিষয়ে নির্দেশিকায় যেসব শর্তারোপ হয়েছে সেগুলোর প্রতিপালন যদি নিশ্চিত করা যায় তবে তামাকজাত দ্রব্যের (বিশেষ করে সিগারেট/বিড়ি) যত্রতত্র ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও বিক্রয় সীমিতকরণে সরাসরি প্রভাব পড়বে।

নির্দেশিকায় ৮-এর ৮.৪ এ বলা হয়েছে-

‘হোল্ডিং নাম্বার ব্যতীত কোনো প্রকার তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় কেন্দ্রকে লাইসেন্স প্রদান করা যাবে না। রাস্তার মোড়ে মোড়ে সিগারেট কোম্পানী কর্তৃক সরবরাহকৃত বক্স বসিয়ে, গলায় ঝুলিয়ে যারা সিগারেট বিক্রি করে সেটি আর করতে পারবে না। ফলে বিক্রয় কেন্দ্র সীমিত হয়ে আসবে, বিক্রি সীমিত হবে, সহজপ্রাপ্যতা বাধাগ্রস্থ হবে।’

নির্দেশিকায় ৮.৫-এ বলা হয়েছে-

‘সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য লাইসেন্স প্রদান করা যাবে না। তামাক কোম্পানীগুলোর অন্যতম টার্গেট থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে যাতে সিগারেট বিক্রি হয় সে ব্যবস্থা করা। তারা প্রধান ভোক্তা বানাতে চায় শিশু-কিশোর ও যুবকদের। কারণ তাদের একবার সিগারেট ধরিয়ে দিতে পারলে দীর্ঘমেয়াদী ভোক্তা তৈরি হয়ে যায়। গাইডলাইনের উল্লেখিত ধারা বাস্তবায়িত হলে তামাক কোম্পানীর এই অপতৎপরতাকে বাধাগ্রস্থ করা সম্ভব হবে।’

৮.৬ ধারা অনুযায়ী, জনসংখ্যার ঘনত্বের বিবেচনায় একটি এলাকায় লাইসেন্স ইস্যু করা হবে। এর মাধ্যমে বিক্রয় কেন্দ্র সীমিত হয়ে যাবে। বিক্রিও সীমিত হয়ে আসবে। সহজলভ্যতা অনেক হ্রাস পাবে।

লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকরের মাধ্যমে একটি শহরে মোট কয়টি দোকানে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় হচ্ছে তার ডাটাবেজ তৈরি হয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করা সহজ হয়ে যাবে।

সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স এবং পাশাপশি তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ের জন্য পৃথক লাইসেন্সিং ফি কার্যকর করার ফলে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে বিক্রেতা নিরুৎসাহিত হবে। অর্জিত ফি’র অর্থ দ্বারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তামাক নিয়ন্ত্রণ অন্যান্য কার্যক্রম বাস্তবায়নে অর্থায়ন করতে পারবে।

তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের অনেক রাজ্য এবং নেপালেও অনেক আগে চালু হয়েছে। বর্তমানে ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, ফ্রান্স, ইতালী, স্পেন, অষ্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর আছে। এর কার্যকারিতার প্রভাব ইতোমধ্যে এসব দেশে দেখা যাচ্ছে।

BMJ জার্নালে প্রকাশিত তথ্যানুসারে-

লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কারণে ফিনল্যান্ডে পয়েন্ট অব সেলের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে ২৮%, ক্যালির্ফোনিয়া কাউন্টিতে ৩১% এবং হাঙ্গেরিতে ৮৩%। অস্ট্রেলিয়াতে লাইসেন্স ফি ১৩ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০০ ডলার করায় খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা এক ধাক্কায় কমে গেছে ২৩.৭%। যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোয় ৮% এবং ফিলাডেলফিয়ায় ৯.৮% হ্রাস পেয়েছে।

তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রি সীমিতকরণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা প্রভাব তৈরি করায় তামাক কোম্পানিগুলো বৈশ্বিকভাবে মরিয়া হয়ে নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। যাতে নতুন করে কোনো দেশে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা কার্যকর না হতে পারে এবং যেসব দেশে কার্যকর হয়েছে সেখানে যাতে এটি কার্যকর না থাকতে পারে। ইউরোপের নরওয়ে ও স্কটল্যান্ডে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করলেও কোম্পানীর কূটকৌশলে সেটি অকার্যকর হয়ে যায়।

বাংলাদেশেও তামাক কোম্পানী ইতোমধ্যে বিভিন্ন কূটকৌশল গ্রহণ করেছে। নীতিনির্ধারক মহলকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তারা অনুধাবন করেছে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হলে বিক্রি সীমিত হয়ে আসতে বাধ্য। কারণ দেশের বেশ কিছু পৌরসভায় লাইসেন্সিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং বিক্রি সীমিতকরণে যা ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে। খুলনা বিভাগের সিটি কর্পোরেশনসহ ৯ টি জেলাসদর পৌরসভায় অসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এইড ফাউন্ডেশনের তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের সহায়তায় তামাক বিক্রেতাদের ডাটাবেজ তৈরি হয়েছে। এই তালিকা অনুসারে সংশ্লিষ্ট জেলার টাস্কফোর্স কমিটি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করার জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। এটি সম্ভব হচ্ছে লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কারণে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতি আহ্বান, দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা- ‘২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের জন্য তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয়ে লাইসেন্স ব্যবস্থাকে জোরদার করে তামাক কোম্পানীর কূটকৌশল প্রতিহত করতে হবে।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী

আরও পড়ুন:
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক
জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

যে লজ্জা চিরকালের

যে লজ্জা চিরকালের

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকেরা বাংলাদেশকে ছায়া পাকিস্তান বানানোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে শিশু রাসেলকেও নির্মমভাবে হত্যা করে। শেখ রাসেল বারবার মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিলেন। আকুতি করেছিলেন, আমি মায়ের কাছে যাব বলে। তার কান্নায় পাথর হয়ত গলে যায়। কিন্তু ঘাতকের নিষ্ঠুর মন গলেনি।

এত যে বিষাদ চারধারে! উত্তুরে হাওয়া যেন হাহাকার করছে। অথচ দিনটি তো এমন হবার কথা ছিল না। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গতকাল যে দেবশিশুর আগমন হয়েছিল তার জন্মোৎবের আলোকচ্ছটা মেঘে মেঘে ভেসে বেড়াবার কথা ছিল। কথা ছিল তেতুলিয়া হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিয়ে যাওয়ার। কীভাবে এই দিনটিকে বরণ করি আমরা?

জাতি হিসেবে আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ইতিহাসের কলংকজনক হত্যাকাণ্ডের শিকার সেই দেবশিশুর হত্যাকারী আমরা নিজেরাই। ১৯৬৪-এর ১৮ অক্টোবর দিনটি চিরদিনের জন্য বিষাদ ভরা হয়ে থাকবে। দেবশিশুর ৫৭ তম জন্মদিন গেল গতকাল। কিন্তু কোথাও কোনো আলো নেই। সেসময় কতইবা বয়স ছিল তার? অথচ ঘাতকের বুক একটি বারের জন্যেও কাঁপল না।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকেরা বাংলাদেশকে ছায়া পাকিস্তান বানানোর স্বপ্নে বিভোর হয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে শিশু রাসেলকেও নির্মমভাবে হত্যা করে। শেখ রাসেল বারবার মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিলেন। আকুতি করেছিলেন, আমি মায়ের কাছে যাব বলে। তার কান্নায় পাথর হয়তো গলে যায়। কিন্তু ঘাতকের নিষ্ঠুর মন গলেনি। তাদেরই একজন ‘মায়ের কাছে চল’ বলে দোতলায় নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করে। টেনে হিঁচড়ে উপরে নেয়ার সময় রাসেল ভয় পেয়ে বলেছিলেন, আমাকে হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন। চিরতরে হারিয়ে যায় হাসু আপার কলিজার টুকরা। মা ফজিলাতুন নেসা মুজিবের নাড়ি ছেঁড়া ধন।

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা দুজনেই ছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত। তার নামেই রেখেছিলেন ছোট্ট রাসেলের নাম। রাসেলের জন্মের সময় বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন। যেকারণে শিশু রাসেল বাবাকে ভালোভাবে চিনতেন না।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সামনের যে রাস্তায় রাসেল সাইকেলে ঘুরে বেড়াতেন সে রাস্তায় হেঁটে যেতে যেতে আমি বহুবার রাসেলের কথা ভেবেছি। রাস্তাটাকে বহু লোকের সমাগমেও আমার কাছে নিঃসঙ্গ লাগে। রাস্তার দুপাশের গাছগুলো নিশ্চয়ই কাল সারাদিন অপেক্ষা করেছিল রাসেলের জন্য।

ছোট রাসেল ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাড়ার আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই তিনি স্কুলে যেতেন। ছোট ছেলেটি যেন বাবা, মা আর বড় ভাই-বোনদের অনুসরণ করছে। কলাভবন থেকে বাসায় ফেরার পথে রাসেলের স্কুলের সামনে মাঝেমধ্যে দাঁড়াই। মনে মনে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। কীভাবে সম্ভব একটি শিশুর শৈশব লুন্ঠন করা?

রাসেলের ৫৪ তম জন্মদিনেও যেন বয়স বাড়ে না। তার বয়স ১০ বছরে আটকে গেছে। একটি শৈশব লুণ্ঠনের কী শাস্তি হতে পারে? আমি ভেবে পাই না। আমি পরিমাপ করতে পারি না, সেই শাস্তির ওজন! আমি কোনো দাঁড়িপাল্লায় মাপতে পারি না ঘাতকের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আমার চোখের বিচ্ছুরিত ঘৃণাকে।

ক্ষমতালোভী ঘাতকেরা চাপা দিতে চেয়েছিল যে আলোকরশ্মি তাতে তারা সক্ষম হয়নি। ১৯৯৬ সালে বহুবছর অমাবস্যায় ঢাকা চাঁদ আবার কিরণ ফিরে পায় শেখ হাসিনার নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে।

১৯৯৬ সালে আমি ৪র্থ শ্রেণিতে পড়তাম। আমাদের ঘরের দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর বিশাল একটা ছবি ছিল। আমার বাবার মুখে ইতিহাস শুনতে শুনতে আমার বড় হওয়া। বাবার মুখে শুনেছি ১৫ আগস্টের ভয়াবহ রাতের কাহিনী। বাবাই বলেছেন শেখ রাসেলকে নির্মম ভাবে হত্যা করার কাহিনী। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছি। ১০ বছরের সেই শান্তা মনে মনে রাসেলকে বাড়িয়ে দিয়েছিল বন্ধুর হাত। মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ভেবেছে, মায়ের কাছে রাসেলকে যেতে না দেয়ার বেদনা। খেলতে গিয়ে পরে গিয়ে হাত কেটে যাওয়ার পর ভেবেছে, যখন ঘাতকের বুলেট রাসেলের বুকটাকে ভেদ করে বেরিয়ে গেছে তখন কতখানি বেদনার কুকড়ে গেছে দেব শিশুর মুখটা…!

আমার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি করতেন। বাবার মুখে শুনেছি ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণ অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ আর শেখ মুজিবের কথা। আমার বাবার নেতা শেখ মুজিব কবে কোনদিন আমার নেতা মুজিব হয়ে ওঠেন আমি জানি না। খুব গর্ব হয় আমার বাবাকে নিয়ে। মাঝেমধ্যে ভাবি যদি শেখ রাসেল বেঁচে থাকতেন, তিনিও নিশ্চয়ই তার বাবা শেখ মুজিবকে নিয়ে আমার মত গর্ব করতেন। কেন জানি না মাঝেমধ্যে নিজেকে খুব অপরাধী লাগে। রাসেল কি কোনোদিন ক্ষমা করবেন আমাদের?

লেখক: চেয়ারপার্সন, কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক
জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

আদরের শেখ রাসেল

আদরের শেখ রাসেল

বঙ্গবন্ধু তার প্রিয় দার্শনিক ও নোবেল বিজয়ী বার্ট্রান্ড রাসেলের নামানুসারে পরিবারের নতুন সদস্যের নাম রাখেন রাসেল। এই নামকরণে মা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শৈশব থেকেই দুরন্ত প্রাণবন্ত রাসেল ছিলেন পরিবারের সবার অতি আদরের। কিন্তু মাত্র দেড় বছর বয়স থেকেই প্রিয় পিতার সঙ্গে তার সাক্ষাতের একমাত্র স্থান হয়ে ওঠে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট।

হাসুপার আদরের রাসেল ছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান। কিন্তু মাত্র ১১ বছর বয়সেই ঘাতকের বুলেটে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। কুঁড়িতেই শেষ হয়ে যায় একটি ফুল। আচ্ছা, আজ বেঁচে থাকলে দেখতে কেমন হতেন তিনি? ৫৭ পেরিয়ে ৫৮ বছরে পা দিতেন। পুরোদস্তুর মধ্যবয়স্ক এক পুরুষের দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হতেন। সেই গোঁফওয়ালা ভরাট কণ্ঠের রাশভারী চেহারা নাকি আরেকটু ভিন্ন কোনো অবয়ব?

তা যাই হোক, আদল দেখলে নিশ্চিত বোঝা যেত- এ আর কেউ নন, জাতির পিতারই এক প্রতিচ্ছবি। হয়তো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে থাকত। কারণ, দেশ পরিচালনা ও রাজনীতির সৎ রক্ত যে তার শরীরে। আবার পিতার প্রিয় বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো পৃথিবীখ্যাত দার্শনিক ও বিজ্ঞানীও হতেন হয়ত। কিংবা নিজের ইচ্ছা ছিল আর্মি অফিসার হওয়ার, তাহলে জাঁদরেল সেনাবাহিনীর জেনারেলেই হতেন নিশ্চিত। এটা হয়তো আমার স্বপ্ন, আক্ষেপের কথা। অনেকটা সে কালজয়ী গানের মতো-

‘যদি রাত পোহালেই শোনা যেত, বঙ্গবন্ধু মরে নাই’…।

সময়টা ছিল ১৯৬৪ সাল। দেশজুড়ে তখন ক্রমে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। বঙ্গবন্ধু ব্যস্ত থাকতেন মুক্তিকামী জাতিকে চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করতে। সেসময়ের রাজনৈতিক নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করতে ছুটে চলছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

অপরদিকে বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের তত্ত্বাবধানে, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কেও চলছিল বাড়ি নির্মাণের কাজ। এমন এক কর্মমুখর সময়ে সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন সদ্য ভূমিষ্ট এক শিশু।

আদরের রাসেলের জন্মের কথা স্মরণ করে তার বড় বোন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করেন-

“রাসেল যেদিন জন্ম নিয়েছে, সেদিনের কথাটা এখনো আমার মনে পড়ে। একটা ছোট্ট শিশু আসবে, আমাদের পরিবারে, আমি কামাল-জামাল, রেহানা- আমরা সবাই খুব উৎসাহিত এবং বেশ উত্তেজিত ছিলাম, কখন সেই শিশুটির কান্না আমরা শুনবো, কখন তার আওয়াজটা পাবো, কখন তাকে কোলে তুলে নেবো। আর সেই ক্ষণটা যখন এলো, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের সময় ছিল। ছোট্ট শিশুটি আমাদের সবার চোখের মণি ছিল।”

শৈশবে বাবাকে কাছে না পাওয়ায় ছোট্ট শিশু রাসেলের বেদনার কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন-

“কী দুর্ভাগ্য তার, ৬৪ সালের অক্টোবরের ১৮ তারিখ তার জন্ম। এরপর ’৬৬ সালে আবার বাবা যখন ৬ দফা দাবি দিলেন- তিনি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ’৬৬ সালের মে মাসে তিনি (বঙ্গবন্ধু) বন্দি হয়ে গেলেন। ছোট্ট রাসেল কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবা কারাগারে। যখন সে একটু বড় হলো, তখন কারাগার থেকে বাবাকে কীভাবে নিয়ে আসবে, সে জন্য বাড়ি চল, বাড়ি চল বলে কান্নাকাটি করতো।”

বড় দুই বোন শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং দুই ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালের স্নেহে আদরে শুরু হয় রাসেলের জীবনের পথ চলা।

বঙ্গবন্ধু তার প্রিয় দার্শনিক ও নোবেল বিজয়ী বার্ট্রান্ড রাসেলের নামানুসারে পরিবারের নতুন সদস্যের নাম রাখেন রাসেল। এই নামকরণে মা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শৈশব থেকেই দুরন্ত প্রাণবন্ত রাসেল ছিলেন পরিবারের সবার অতি আদরের। কিন্তু মাত্র দেড় বছর বয়স থেকেই প্রিয় পিতার সঙ্গে তার সাক্ষাতের একমাত্র স্থান হয়ে ওঠে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। তবে ৭ বছর বয়সে ১৯৭১ সালে তিনি নিজেই বন্দি হয়ে যান।

রাসেলের জন্মের পর থেকেই বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে জেলবাস করতেন। তাই রাসেলের ভাগ্যে তার বাবার সান্নিধ্য খুব কমই হয়েছে। রাসেলের সব থেকে প্রিয় সঙ্গী ছিল তার হাসুপা। রাসেলকে নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’র ২৭ মে এবং ২৮ মে ১৯৬৭ সালের স্মৃতিচারণায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“রাসেল আমাকে পড়ে শোনাল, আড়াই বৎসরের ছেলে আমাকে বলছে ৬ দফা মানতে হবে, সংগ্রাম, সংগ্রাম, চলবে চলবে(…) ভাঙা ভাঙা করে বলে কি মিষ্টি শোনায়! জিজ্ঞাসা করলাম, ও শিখল কোথা থেকে। রেণু বলল, বাসায় সভা হয়েছে তখন কর্মীরা বলেছিল, তাই শিখেছে।” কারাগারের রোজনামচায় শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন-

“৮ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বাড়ি চলো। কী উত্তর ওকে আমি দেব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কী বুঝতে চায়! কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলে-মেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখেনি। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।”

‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ বইয়ে কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা লিখেছেন-

“আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করত। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাব। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত।”

বড় হয়ে আর্মি অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন শেখ রাসেল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাসেলের এই ইচ্ছা মনে দানা বাঁধতে শুরু করে। এ থেকেই বড় দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর তাদের কাছ থেকে খুব আগ্রহ নিয়ে যুদ্ধের গল্প শুনতেন।

‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু শেখ রাসেল সম্পর্কে আরও লিখেছেন- “রাসেল একবার আমার কোলে, একবার তার মার কোলে, একবার টেবিলের উপরে উঠে বসে। আবার মাঝে মাঝে আপন মনেই এদিক ওদিক হাঁটাচলা করে। বড় দুষ্ট হয়েছে, রেহানাকে খুব মারে। রেহানা বলল, ‘আব্বা দেখেন আমার মুখখানা কি করেছে রাসেল মেরে।’ আমি ওকে বললাম, ‘তুমি রেহানাকে মার?’ রাসেল বলল, ‘হ্যাঁ মারি।’ বললাম, ‘না আব্বা আর মেরো না।’ উত্তর দিল, ‘মারবো।’ কথা একটাও মুখে রাখে না।”

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে মাত্র ১১ বছর বয়সের প্রাণবন্ত শিশু রাসেলের প্রাণ কেড়ে নেয় ঘাতকের বুলেট। আগস্টের আগে প্রিয় হাসুপার সঙ্গে জার্মানি যাবার কথা ছিল। কিন্তু জন্ডিসে আক্রান্ত হবার কারণে যেতে পারেননি। সেদিন যদি তিনি জার্মানি যেতে পারতেন তাহলে হয়ত তাকে ঘাতকের বুলেট ভূপাতিত করতে পারত না।

ছোট্ট শিশুটি যে প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতম শিকার হয়েছিল, তা এখনও বিশ্বমানবতাকে বিচলিত করে। জন্মদিনে শেখ রাসেলকে স্মরণ করি গভীর আবেগ ও ভালোবাসায়।

লেখক: সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক
জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

জন্মদিনের শ্রদ্ধা: উদয়ের আগে হারানো নক্ষত্র

জন্মদিনের শ্রদ্ধা:
উদয়ের আগে হারানো নক্ষত্র

রাসেল মানুষকে খুব ভালোবাসতে পারতেন। আমরা একজন হৃদয়বান মানুষকে হারিয়েছি। যে শিশুর চোখে ছিল তারার আলো, ছিল অপার সম্ভাবনা, উদয়ের আগেই আমরা সেই নক্ষত্রকে হারিয়েছি। বাংলার পথেপ্রান্তরে কত ইতিহাস ছড়ানো। ক্ষমতার অলি-গলিতে কত যে ষড়যন্ত্র কত যে রক্তাক্ত ঘটনা!

মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ৭ বছর। পিতার জন্য কাতরতা ছিল। পিতা পাকিস্তানের কারাগারে কিন্তু তার জেদ ছিল পিতার কাছে যাবে। স্বাধীন দেশে পিতা প্রধানমন্ত্রী, ব্যস্ততার শেষ নেই। এর মধ্যে রাসেল তার চিরসঙ্গী সাইকেলটি নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। এই সাইকেল ছিল পরিবারের অন্য সদস্যদের মতোই প্রিয়। যেটি এখনও তার স্মৃতির নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। পিতার একান্ত সান্নিধ্যে তার সময় কাটত কখনও কখনও। যদিও সেই মহান পিতাকে দেখার সুযোগ তার জীবনে খুবই কম ছিল।

শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করেন-

“টুঙ্গিপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে রাসেলের খেলাধুলার অনেক সাথি ছিল। বাড়ি গেলে গ্রামের ছোট অনেক বাচ্চা জড়ো করত। তাদের জন্য ডামি বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল। সেই বন্দুক হাতে তাদের প্যারেড করাত। প্রত্যেকের জন্য খাবার কিনে নিয়ে যেত। রাসেলের খুদে বাহিনীর জন্য জামা-কাপড় ঢাকা থেকেই কিনে নিয়ে যাওয়া হতো। মাছ ধরা খুব পছন্দ করত। কিন্তু মাছ ধরে আবার ছেড়ে দিত। রাসেল একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠে। মা ও আব্বার দেওয়া নাম রাসেল। স্কুলে নাম ছিল শেখ রিসাল উদ্দীন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বারট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন। রাসেলের বই পড়ে তিনি তার ছায়াসঙ্গী প্রিয়তমা স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন নেছা রেণুকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন। এই দার্শনিকের কথা শুনে শুনে বঙ্গমাতা এতটাই বারট্রান্ড রাসেলের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে তার নাম অনুসারে নিজের ছোট ছেলে জন্মের পর তার নাম রাখলেন রাসেল।”

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা রেণুর কনিষ্ঠ সন্তান। মুজিববর্ষে ২০২১ সালে শেখ রাসেলের ৫৭তম জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয়ভাবে। ১৯৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করা শেখ রাসেল বঙ্গবন্ধু পরিবারকে আবেগে-আহ্লাদে মাতিয়ে রাখতেন সবসময়। রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে উঠছিলেন তিনি। তবে তার বেড়ে ওঠার প্রথম অংশে ছিল রাজনৈতিক সংকটের কাল।

জন্ম থেকেই অনেক আলোকচিত্র সংরক্ষিত আছে শেখ রাসেলের। শেখ হাসিনার কোলে চড়ে এক কি দেড় বছরের রাসেল। মিষ্টি হাসিতে চেয়ে থাকা, পিতার কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা রাসেল; তার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়া অথবা খাবার টেবিলে বাবার ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকা।

১৯৭৫-এ শেখ কামাল ও সুলতানা কামালের বৌভাতের দিন বঙ্গবন্ধু ও সুলতানা কামালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কৌতূহলী বালক রাসেল। বঙ্গবন্ধুর কোলে কিংবা অন্য দুই ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালসহ পিতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা। আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের যে ছবি আছে সেখানেও রাসেল বঙ্গবন্ধুর কোলঘেঁষে দাঁড়িয়ে। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান হিসেবে পিতার স্নেহে ধন্য ছিলেন রাসেল; আলোকচিত্রগুলো সে সাক্ষ্য বহন করে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৬৪ সালের পর জেলের বাইরে থাকা পুরো সময়টাই রাসেলের সঙ্গে নিবিড় মমতায় জড়িয়েছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার পর জাপান সফরে তিনি এই ছোটপুত্রকে সঙ্গী করেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত রাসেলই ছিলেন তার আনন্দের সঙ্গী।

রাসেলের জন্মবার্ষিকীতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রকৃত ইতিহাস জানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস শেখাতে পারলে রাসেলের হত্যাকারীদের বিপক্ষে মূল্যবোধ সৃষ্টি করা যাবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন-

“১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিল ছোট্ট রাসেলকে। বয়স তার মাত্র ১০ বছর ১১ মাস। মা-বাবা, দুই ভাই, দুই ভাবি, চাচা সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে ঘাতকরা সবার শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল রাসেলকে। ওই ছোট্ট বুকটা তখন কষ্টে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মায়ের রক্তাক্ত লাশ দেখে আকুল আবেদন জানায়, ‘আমার হাসুপার কাছে পাঠিয়ে দিন।’ এত মৃতদেহ দেখে যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসেখেলে বড় হয়েছিল কী কষ্টই না ও পেয়েছিল। কিন্তু ঘাতকের পাষাণহৃদয় সে আকুতি শোনেনি। তারা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে শিশু শেখ রাসেলকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। কেন আমার রাসেলকে এত কষ্ট দিয়ে কেড়ে নিল ঘাতকরা?” এর উত্তর কে দেবে?

৩০ জুলাই ১৯৭৫, শেখ হাসিনা জার্মানিতে স্বামীর কর্মস্থলে চলে যান। রাসেল খুব মন খারাপ করে থাকতেন সেসময়। অসুস্থ থাকার কারণে শেখ হাসিনা রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেননি।

রাসেল মানুষকে খুব ভালোবাসতে পারতেন। আমরা একজন হৃদয়বান মানুষকে হারিয়েছি। যে শিশুর চোখে ছিল তারার আলো, ছিল অপার সম্ভাবনা, উদয়ের আগেই আমরা সেই নক্ষত্রকে হারিয়েছি। বাংলার পথেপ্রান্তরে কত ইতিহাস ছড়ানো। ক্ষমতার অলি-গলিতে কত যে ষড়যন্ত্র কত যে রক্তাক্ত ঘটনা!

যে জাতি বিশ্বে বীরের জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল, সে জাতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিশ্বজুড়ে মানুষ হিসেবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা হারায়। বিদেশিরা মনে করত, যে বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যেকোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে, সাহসী বাঙালি নিজেদেরকে একটি কাপুরুষ, আত্মঘাতী ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়। যে মানুষ তার সারা জীবনকে সঁপেছেন দেশের জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য, সে মানুষটাকে তো হত্যা করেছেই, তার পরিবারকেও ছাড় দেয়নি ঘাতকরা।

বঙ্গবন্ধুহত্যা মামলার বাদী পিএ মুহিতুল ইসলামের বর্ণনায়-

“ঘাতকদের অভিযানের শেষ শিকার ছিল শিশু রাসেল। সবাইকে হত্যার পর তাকে নিচে নিয়ে আসা হয়। এ সময় রাসেল আমাকে জড়িয়ে ধরে জানতে চায়, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে? এর কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ঘাতক আমাকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে রাসেলকে পুলিশ বক্সের ভেতরে আটকায়। এরপর দুই ঘাতক রাসেলকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে দোতলায় নিয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শুনতে পাই।”

আমরা একজন স্বর্ণসন্তানকে হারিয়েছি। আর যেন কোনো শিশুর ভাগ্যে এমন ঘটনা না ঘটে সেটাই আমাদের কাম্য। সেজন্য প্রত্যেক শিশুর জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর অবদান, শেখ রাসেলের অনুভূতি ও শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ডগুলো ছড়িয়ে দিতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

আরও পড়ুন:
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক
জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

শেখ রাসেল অবিকশিত সম্ভাবনা

শেখ রাসেল অবিকশিত সম্ভাবনা

আসলে শেখ রাসেলের মাঝে বঙ্গবন্ধুর সব গুণেরই পূর্বাভাস ছিল। রাসেলের জ্বলজ্বলে সুতীক্ষ্ণ চোখ দুটোই বলে দেয় ওই শিশুর মাঝে ছিল ভিন্ন কিছু, আজ বেঁচে থাকলে যে ভিন্নতা বাঙালি জাতি সম্যক অনুধাবন করতে পারত। শিশু বয়সেই লক্ষ করা গেছে বঙ্গবন্ধুর মতোই ছিল তার উদার হৃদয়, ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তার মধ্যে ছিল অসাধারণ জ্ঞানবাসনা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠপুত্র শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিন আজ। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট ভাই। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডির বিখ্যাত ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িটি আলোকিত করে জন্ম নেন শেখ রাসেল। সময়টা ছিল লড়াই আর যুদ্ধের উত্তেজনায় মুখর। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে চলেছে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ওই সময় পাকিস্তানজুড়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোল। বঙ্গবন্ধু সেদিন ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণের জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন।

সেইদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক লেখায় উল্লেখ করেছেন-

“রাসেলের জন্মের আগ মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা চাচা বাসায়। বড়ো ফুপু ও মেজো ফুপু মার সাথে। একজন ডাক্তার ও নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে। আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেজো ফুপু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুপু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড়ো ফুপু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালোচুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়োসড়ো হয়েছিল রাসেল।”

রাসেল নামকরণেরও একটি ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। বাবা শেখ মুজিব ছিলেন খুব পড়ুয়া। বঙ্গবন্ধু মাঝেমধ্যে বেগম মুজিবকে ব্যাখ্যা করে শোনাতেন বার্ট্রান্ড রাসেলের দার্শনিকতা। স্বামীর কাছে এসব শুনে রাসেলের ভক্ত হয়ে ওঠেন বেগম মুজিবও। তাই তাদের ছোটো সন্তানের জন্মের পর নাম রাখেন রাসেল।

বার্ট্রান্ড রাসেল শুধু একজন দার্শনিকই ছিলেন না। ছিলেন বিজ্ঞানীও। ছিলেন পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের একজন বড়ো মাপের বিশ্বনেতা। তিনি বিশ্বকে মানুষের বসবাসের জন্য সুন্দর ও শান্তিময় করার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে গেছেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও ছিলেন বিশ্ব মানবতার উজ্জ্বল দ্যুতি, নিপীড়িত মানুষের বন্ধু, মুক্তিকামী মানুষের নেতা। সেই চেতনায় থেকেই বার্ট্রান্ড রাসেলের নামানুসারে তার সন্তানের নাম রাখা হয় রাসেল।

শিশু রাসেলের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে বাবাকে ছাড়াই। বাবা রাজনৈতিক বন্দি হয়ে প্রায়ই কারাগারে থাকতেন। বাবাকে দেখতে না পেয়ে মা ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে ‘আব্বা’ বলে সম্বোধন করতেন রাসেল। এই কষ্ট কেবল ছোট্ট রাসেলই অনুভব করতেন না, বাবা শেখ মুজিবও করতেন- যা স্পষ্টত ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর লেখায়। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনের পর থেকেই রাজবন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই বাবাকে রেখে আসবেন না। এই দৃশ্য বঙ্গবন্ধুর খুব খারাপ লাগত। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বাড়ি চলো। কী উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো। ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা।”

‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ বইয়ের ২১ পৃষ্ঠায় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার বিষয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন-

“আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করত। ওকে বোঝানো হয়েছিল যে, আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাব। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকত।”

রাসেলের কোমলমতি মনের উদাহরণ আনতে গিয়ে এই বইয়েই আরেকটি ঘটনারও উল্লেখ করে শেখ হাসিনা লিখেছেন-

“মা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। রাসেলকে কোলে নিয়ে নিচে যেতেন এবং নিজের হাতে খাবার দিতেন কবুতরদের। হাঁটতে শেখার পর থেকেই রাসেল কবুতরের পেছনে ছুটতো, নিজ হাতে ওদের খাবার দিত। আমাদের গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল। কবুতরের মাংস সবাই খেত।... রাসেলকে কবুতরের মাংস দেওয়া হলে খেত না। ওকে ওই মাংস খাওয়াতে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি। ওর মুখের কাছে নিয়ে গেছি, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ওই বয়সে ও কী করে বুঝতে পারতো যে, ওকে পালিত কবুতরের মাংস দেওয়া হয়েছে!”

বঙ্গবন্ধু রাসেলকে খুব ভালোবাসতেন। সারাদিন কর্মব্যস্ততার পরও বাসায় ফিরে প্রথমেই খুঁজতেন রাসেলকে। রাসেল, রাসেল বলে ভরাট কণ্ঠে ডাকতেন। রাসেলও বাবাকে কাছে পাওয়ার জন্য, বাবার কোলে চড়ার জন্য অপেক্ষায় থাকত সব সময়। বাবার ডাক শোনার সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে ছুটে আসত বাবার কাছে। বাবাকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরতেন, কিংবা উঠে পড়ত কোলে। বঙ্গবন্ধু তাকে কোলে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন পরম আদরে।

বাবার চশমাটাকে দারুণ লাগত তার, তাই সেটা বাবার চোখ থেকে খুলে নিজের চোখে লাগিয়ে নিতে বেশ মজা লাগত ওর। গল্প শুনতে খুবই ভালোবাসত ছোট্ট শেখ রাসেল। বাবা অবসরে থাকলেই গল্প শোনানোর জন্য আবদার জুড়ে দিত। বঙ্গবন্ধুও সময় পেলে বেশ আগ্রহ নিয়ে গল্প শোনাতেন।

রাসেলের বেড়ে ওঠার স্মৃতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন-

“রাসেলের সবকিছুতেই যেন ছিল ব্যতিক্রম। ও যে অত্যন্ত মেধাবী তার প্রমাণ অনেকভাবেই আমরা পেয়েছি। আমাকে হাসুপা বলে ডাকতো। কামাল ও জামালকে ভাই বলতো আর রেহানাকে আপু। কামাল ও জামালের নাম কখনও বলতো না। আমরা নাম বলা শেখাতে অনেক চেষ্টা করতাম। কিন্তু ও মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলতো ভাই। দিনের পর দিন আমরা যখন চেষ্টা করে যাচ্ছি, একদিন ও হঠাৎ করে বলেই ফেলল, ‘কামমাল’, ‘জামমাল’।”

ভীষণ দুরন্ত ছিলেন রাসেল। তার দুরন্তপনার সঙ্গী ছিল বাইসাইকেল। সাইকেলে করে স্কুলে যেতেন, পাড়ার আর দশজন সাধারণ ছেলের মতো। সাংবাদিক এবিএম মূসা স্মৃতিকথায় শেখ রাসেল সম্পর্কে লিখেছেন-

“কদিন বিকেল পাঁচটার দিকে শাঁ করে ৩১ নম্বরের অপ্রশস্ত রাস্তা থেকে ৩২ নম্বরে ঢুকেই আমার সামনে একেবারে পপাতধরণিতল। গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল সদ্য শৈশবোত্তীর্ণ ছেলেটি।...অতঃপর সাইকেলে উঠে লেকপাড়ে উধাও হলো শৈশবের শেষ প্রান্তের ছোট্ট ছেলেটি।... বিকেলে লেকের পূর্বপাড়ে এমনি করে চক্কর মারত। মধ্যবর্তী ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পূর্বপ্রান্তের সাদা একটি দালান পর্যন্ত সাইকেলারোহীর দৌড়ানোর সীমানা।... এদিকে ৩২ নম্বরের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন স্নেহময়ী মা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন দুষ্টু ছেলেটির সাইকেল-পরিক্রমা যেন সীমাবদ্ধ থাকে।”

আসলে শেখ রাসেলের মাঝে বঙ্গবন্ধুর সব গুণেরই পূর্বাভাস ছিল। রাসেলের জ্বলজ্বলে সুতীক্ষ্ণ চোখ দুটোই বলে দেয় ওই শিশুর মাঝে ছিল ভিন্ন কিছু, আজ বেঁচে থাকলে যে ভিন্নতা বাঙালি জাতি সম্যক অনুধাবন করতে পারত। শিশু বয়সেই লক্ষ করা গেছে বঙ্গবন্ধুর মতোই ছিল তার উদার হৃদয়, ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তার মধ্যে ছিল অসাধারণ জ্ঞানবাসনা। বঙ্গবন্ধু তাকে নিয়ে সভা-সমিতিতে যেতেন, জাপান ভ্রমণের সময় তাকে সফরসঙ্গী করেছিলেন।

শেখ রাসেল বেঁচে থাকলে আজ ৫৮ বছরে পা রাখতেন। ঘাতকচক্র তা হতে দেয়নি। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রিতে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সবাইকেই হত্যা করেছে। সেদিন হত্যা করেছে এগারো বছরের শিশু রাসেলকেও।

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে শিশু শেখ রাসেলের প্রাণ কেড়ে নেয় ঘাতকদের বুলেট। তিনি হতে পারতেন বার্ট্রান্ড রাসেলের মতোই স্বমহিমায় উজ্জ্বল, বিশ্বমানবতার প্রতীক। কিন্তু নিষ্ঠুর ঘাতকরা রাসেলের জীবনকেই কেড়ে নেয়নি, ধ্বংস করেছে তার সব অবিকশিত সম্ভাবনাও। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক
জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

কুঁড়িতেই ঝরে যাওয়া মুকুল

কুঁড়িতেই ঝরে যাওয়া মুকুল

বঙ্গবন্ধু চাইতেন তার সন্তান মুক্তমনা ও প্রগতিশীল চিন্তাচেতনায় মানুষ হয়ে উঠুক। ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন তার প্রিয় দার্শনিক। তাই আদরের সন্তানের নামকরণও করেন প্রিয় দার্শনিকের নামে। বঙ্গবন্ধু চাইতেন বার্ট্রান্ড রাসেলের উদার, মানবতাবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক চেতনায় প্রভাবিত হোক শেখ রাসেল।

শেখ রাসেল, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোটভাই, যিনি ছিলেন বোনের নয়নের মণি। সেই নয়নের মণিকে পঁচাত্তরের কালরাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতাসহ পরিবারের সদস্যদের এ হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ঘটনা। আজ বেঁচে থাকলে ৫৮ বছরে পা দিতেন শেখ রাসেল। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! নিষ্পাপ শিশুটিও রক্ষা পায়নি ঘাতকদের হাত থেকে। বেঁচে থাকলে হয়ত তিনিও বাবার সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন, হতে পারতেন সেই অগ্রযাত্রার আরেক সৈনিক।

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শেখ রাসেল যখন শহীদ হন, তখন তার বয়স ছিল প্রায় ১১ বছর। ১৯৬৪ সালের এই দিনে ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে তার জন্ম। ‘আমাদের ছোট্ট রাসেল সোনা’ বইয়ে শেখ হাসিনা লিখেছেন-

“রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা চাচা বাসায়। বড় ফুফু ও মেজো ফুফু মার সাথে। একজন ডাক্তার ও নার্সও এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে। আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়। মেজো ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল।”

বঙ্গবন্ধু চাইতেন তার সন্তান মুক্তমনা ও প্রগতিশীল চিন্তাচেতনায় মানুষ হয়ে উঠুক। ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ছিলেন তার প্রিয় দার্শনিক। তাই আদরের সন্তানের নামকরণও করেন প্রিয় দার্শনিকের নামে। বঙ্গবন্ধু চাইতেন বার্ট্রান্ড রাসেলের উদার, মানবতাবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক চেতনায় প্রভাবিত হোক শেখ রাসেল।

রাসেলের জন্মের বছরই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হয়। তিনি হাল ধরেন আওয়ামী লীগের। ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল আওয়ামী লীগ গড়ে তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

১৯৬৪ সালে আবার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ভোটের ২ সপ্তাহ আগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। ফলে জন্মের পরের শৈশবে সেভাবে বাবাকে কাছে পাননি শেখ রাসেল।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারাগারে বন্দি বাবাকে দেখতে গেলে তাকে রেখে ফিরে আসতে চাইতেন না। ফিরলেও মন খারাপ করে থাকতেন। এ নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে ১৯৬৬-এর ১৫ জুনের দিনলিপিতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না- যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করছে। জেল গেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকছিল। আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম।

একটু পরেই ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি। যাবার সময় হলে ওকে ফাঁকি দিতে হয়।”

বাবা কাছে নেই। শিশু রাসেলের খেলার সঙ্গী প্রিয় সাইকেল আর কবুতর। পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্যটি অন্যান্য ভাই-বোনদের কনীনিকা। হাসি-আনন্দে সময় কাটালেও কী যেন একটা বিষাদের ছায়া বিরাজ করত ছোট্ট রাসেলের মনে, এটা হয়ত পিতাকে কাছে না পাওয়ার ব্যাকুলতা। এভাবেই একাকি বড় হয়ে উঠছিলেন তিনি।

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন। তখন রাসেলের বয়স ৪ বছর। ওই সময়টাতে শিশু রাসেল প্রথম পিতাকে তার কাছে পেলেন। পিতার সঙ্গেই দিনরাত কাটে তার। জেলখানার দিনগুলোর বিষয়ে বঙ্গবন্ধু ছোট ছেলে রাসেলকে নিয়ে লিখেছেন-

‘‘জেল গেটে যখন উপস্থিত হলাম ছোট ছেলেটা আজ আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে আশ্চর্যই হলাম। আমি যখন রুমের ভিতর যেয়ে ওকে কোলে করলাম আমার গলা ধরে ‘আব্বা’, ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’, ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করল। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কি?’ ওর মা বলল, ‘বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে।’ রাসেল ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকতে লাগল। যেই আমি জবাব দেই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার উপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়। এখন আর বিদায়ের সময় আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।’’

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে বিরাজ করছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা। এর মাঝে একাত্তরের ২৫ মার্চের কাল রাতে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানের কারাগারে।

মুক্তিযুদ্ধের ওই উত্তাল দিনগুলোতে মা ও বোনদের সঙ্গে শেখ রাসেলও বন্দি হয়েছিলেন ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে। বড় দুই ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামাল দেশমাতৃকার ডাকে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। রাসেল মা ও দুই বোনের সঙ্গে ঘরের ভিতর বন্দিজীবন কাটাতে থাকেন।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জন করার দিনও বন্দি ছিলেন তারা। বাইরে চলছে বিজয় উৎসব। ঘরের ভেতর থেকেই সেই উল্লাস শুনেছেন রাসেল। ১৭ ডিসেম্বর তারা বন্দিমুক্ত হলে রাসেল ‘জয় বাংলা’ বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।

বঙ্গবন্ধু তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। যিনি স্বাধীনতার ডাক দিলেন, নেতৃত্ব দিলেন সেই মহান নেতাকে ছাড়া বিজয় অর্জন যেন পূর্ণতা পাচ্ছিল না। বৈশ্বিক চাপে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। সেখান থেকে যান লন্ডনে, এরপর দিল্লি হয়ে ঢাকায় ফেরেন রাজনীতির মহানায়ক। পিতা দেশে ফিরলে শিশু রাসেলের মনে যেন আনন্দের বন্যা বইছে। বিস্ময়ভরা দুচোখে দেখেছেন।

বাবা দায়িত্ব নিলেন দেশ গড়ার। শিশু রাসেলও সবসময় বাবার সান্নিধ্য পেতে চাইতেন। যতক্ষণ বাবা আশপাশে থাকতেন, ততক্ষণ তার কাছাকাছিই থাকতে চাইতেন তিনি।

১৯৭৫ সাল। বঙ্গবন্ধু একটা ধ্বংসস্তূপ থেকে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেন। ব্যস্ততার ওই সময়গুলোতেও পিতার সঙ্গে সঙ্গে থাকতেন রাসেল। তখন তিনি ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র।

বেবী মওদুদ তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবার’ শীর্ষক গ্রন্থে লিখেছেন-

“রাসেল চঞ্চল প্রকৃতির হলেও কখনো কখনো হঠাৎ সে শান্ত হয়ে নির্জনে প্রিয়সঙ্গী সাইকেল নিয়ে খেলা করতে পছন্দ করত। তার আরো প্রিয় সঙ্গী ছিল ভাগ্নে জয়। তার সঙ্গে খুনসুটিও করত, আবার জয় না হলে তার চকোলেট খাওয়া হত না, খেলা করা হত না। আনন্দকে ভাগ করে নেয়ার উদারতায় রাসেল তার ক্লাসের বন্ধুদের খুব প্রিয় ছিল।”

আর পাঁচটি দিনের মতোই রাতের খাবার খেয়ে মায়ের হাতের মমতার স্পর্শে ঘুমাতে যান। ঘুমে আচ্ছন্ন রাসেল। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় গুলির শব্দে। মা তাকে পেছনের দরজা দিয়ে কাজের লোকজনের সঙ্গে নিচে পাঠিয়ে দেন। চোখে তখনও ঘুম ঘুম ভাব, গুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

ঘাতকরা তার হাত ধরে, অস্ত্র তাক করে রেখেছে। রাসেল কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘আমি মায়ের কাছে যাব। আমি মায়ের কাছে যাব।’

ঘাতকেরা তার হাত ধরে বিভিন্ন কক্ষে নিয়ে গিয়ে বড়ভাই শেখ কামাল, চাচা শেখ আবু নাসের, স্নেহময় পিতা শেখ মুজিব, মমতাময়ী মা, ভাই শেখ জামাল, সদ্যপরিণীতা ভাবী সুলতানা ও রোজী– সবার রক্তাক্ত দেহ দেখাল। স্বজন হারানোর কষ্ট ছোট্ট রাসেলের হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন রাসেল। আর বলছিলেন- ‘আমাকে আমার হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন!’

রাসেলের কান্নাজড়িত হৃদয়ের সে আকুতি শোনেনি ঘাতকেরা। তারা শিশু রাসেলকে হত্যা করেছে। কাঁদতে কাঁদতে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে ছোট্ট শিশু রাসেল।

কিন্তু শিশু রাসেল হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করে দেয় খুনি মুশতাক ও তার দোসররা। কালো আইন করে বিচারের পথ বন্ধ করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই খুনিদের বিচারের ব্যবস্থা করেন। খুনিদের রক্ষা করার কালো আইন বাতিল করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করেন। এতে নিশ্চয়ই রাসেলের আত্মা শান্তি পাবে।

লেখক: উপাচার্য, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে
আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক
জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন