ঐতিহ্যচর্চা ও সংরক্ষণে সংকট

ঐতিহ্যচর্চা ও সংরক্ষণে সংকট

দুর্বল ইতিহাসচর্চার দেশে কেউ ইতিহাস নামীয় গ্রন্থ লিখে সুপরিচিত হওয়ার কারণে এসবের মান বিচার না করে ইতিহাস সংকলক ‘ইতিহাসবিদ’ হয়ে যান। আধুনিক যুগের ইতিহাস গবেষক প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস রক্ষকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। রাজনৈতিক ইতিহাসের গবেষক শিল্প ইতিহাসের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। এসব কারণে ঐতিহ্য সংরক্ষণে নানা ধরনের সংকট দেখা দেয়।

বেশ কবছর আগের কথা। কানাডাপ্রবাসী আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন- অদ্ভুত আমাদের দেশ! গিয়েছিলাম জাদুঘরে। কটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীর ছবি তুলে নিয়ে যাব। কানাডায় আমার স্কুলের শিক্ষার্থীদের দেখাব। কিন্তু জাদুঘর গ্যালারির দায়িত্বে যারা ছিল, জানিয়ে দিল ছবি তোলা মানা। আমি জানতে চাইলাম কেন? কোনো উত্তর নেই। শুধু বিধিবদ্ধ নিয়মের কথা বললেন।

আমি হাসতে হাসতে ক্ষুব্ধ বন্ধুকে বললাম, দেশকে অদ্ভুত বলে লাভ নেই। দেশ ঠিকই আছে। কিন্তু এদেশে রয়েছে কিছু সংখ্যক অদ্ভুত মানুষ ও নীতিনির্ধারক। সঠিক কারণ ব্যাখ্যা না করতে পারলেও গৎবাঁধা নিয়মের দোহাই দিয়ে বিধি আরোপ করে। আমিও জাদুঘরে গিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর পাইনি। এই অলিখিত নিয়ম চালু আছে দেশের অনেক প্রত্নস্থলেও।

জাদুঘরগুলোতে গেলে প্রত্নবস্তুর ছবি তুলতে বাধা দেয়া হয় কেন! এখন স্যাটেলাইটের যুগ। মহাকাশ ফটোগ্রাফি হচ্ছে। ঘরে বসে পৃথিবীর তাবৎ ছবি চলে আসছে। নেট থেকে নামানো যাচ্ছে হাজারও ছবি। আর জাদুঘরে গেলে বলছে ছবি তোলা নিষেধ।

প্রায় দুযুগ আগে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গিয়েছিলাম ময়নামতিতে। তখনও স্মার্ট ফোন আসেনি। সাধারণ মোবাইল ফোন। ময়নামতি সেনানিবাসের ভেতর কটি প্রত্নক্ষেত্র আছে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগেই অনুমতি নিয়েছিলাম। সেনানিবাসে ঢোকার গেইটে বলা হলো সবার মোবাইল, ক্যামেরা ইত্যাদি জমা দিতে হবে। ছবি তোলা নিষেধ। আমরা একটু হতাশ হলাম। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ওদের রিপোর্ট লিখতে হবে। এই সফর ছিল ওদের মাঠকর্মের অংশ। ছবি বেশ জরুরি।

আমরা বোঝাতে ব্যর্থ হলাম। আমাদের সঙ্গে দুজন সৈন্য দেয়া হলো পাহারায়। ত্রিরত্নমুড়া ও ভোজবিহারের কাছে এসে বুঝলাম না ছবি তোলায় নিষেধাজ্ঞা কেন! বিচ্ছিন্ন এলাকায় প্রত্নক্ষেত্র। এমন নয় যে, সেনাবাহিনীর স্পর্শকাতর কোনো কিছুর ছবি তুলে ফেলা হতে পারে। তাছাড়া সঙ্গে তো পাহারাদার আছেই। যাহোক, শুধু চর্মচক্ষে দেখেই ফিরতে হলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার পর একদিন কজন ছাত্র এলো। হাতে ভোজবিহার ও ত্রিরত্নমুড়ার ছবি। একজন ঠিকই সবার চোখ এড়িয়ে ছবি তুলেছে। আমি যদিও নিয়ম ভাঙার জন্য বকাঝকা করলাম। পরে ভাবলাম ওদের কীইবা করার ছিল! এই ছবি তো ওদের রিপোর্টের জরুরি অনুষঙ্গ। এমন ভাবনাও এলো যে, এতসব নিয়মের মধ্যে থেকেও দেখছি ইচ্ছা করলে দিব্বি ছবি তোলা সম্ভব। তাহলে এত রাখঢাক কেন?

আমি ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘরে গিয়ে অবাক! জাদুঘরের ভেতর ছবি তোলায় কোথাও কোনো বিধিনিষেধ দেখলাম না। প্যারিসের বিশ্বখ্যাত ল্যুভ মিউজিয়ামে শত শত ছবি তুলেছি। কেউ বাধা দেয়নি। ইতালির দুয়েকটি মিউজিয়ামে কোনো কোনো গ্যালারিতে শুধু ফ্লাশ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছে। কারণ ফ্লাশের আলোতে স্পর্শকাতর প্রত্নবস্তুর ক্ষতি হতে পারে।

১৯৯১-৯২ সালে গবেষণার প্রয়োজনে কলকাতাস্থ জাতীয় লাইব্রেরি ব্যবহার করেছিলাম। সেখানে দরকারি অনেক দুষ্প্রাপ্য বই আছে। আমার প্রয়োজন গোটা বই। লাইব্রেরিতে রিকুইজিশন দিয়ে ফটোকপি করা যায়। কিন্তু গোটা বই নয়। হয়ত কপিরাইট আইনে বাধা আছে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে তেমন অনেক বই নেটে পাওয়া যাচ্ছে এখন। ডাউনলোড করে প্রিন্ট করা যাচ্ছে ঘরে বসেই। জানি না এখনও ভারতীয় ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে আগের বিধিনিষেধ রয়ে গেছে কি না। তবে আমাদের জাদুঘরে প্রত্নবস্তুর ছবি তোলায় রয়েই গেছে।

পর্তুগালের লিসবনের এভোরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে দুটো মূল্যবান পাণ্ডুলিপি। আঠারো শতকে (১৭৪৩ সালে) বাংলাদেশে আসা পর্তুগিজ পাদ্রি ফ্রান্সিসকো দ্য সিলভা পর্তুগিজ ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ লিখেছিলেন। আর লেখা হয়েছিল বাংলা ভাষার কিছু শব্দার্থের বই। আমরা সাধারণভাবে জানি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আগে উনিশ শতকের শুরুতে স্যার উইলিয়াম কেরি প্রথম বাংলা ব্যাকরণ লিখেছিলেন। আমি অস্পষ্টভাবে এই পর্তুগিজ পাদ্রির ব্যাকরণ পাণ্ডুলিপির কথা জেনেছিলাম।

২০১৬ সালের মেতে দেখলাম, লিসবনে বাংলাদেশ দূতাবাসের এম্বেসেডর নির্ধারিত ফি দিয়ে এই পাণ্ডুলিপির সফট কপি সংগ্রহ করেছেন। কটি কপি প্রিন্ট করেছেন। আমাকে জানিয়েছেন দেশে ফিরে বাংলা একাডেমিকে এক কপি দেবেন। যদি অনুবাদ করে প্রকাশ করা যায়। অর্থাৎ এই মূল্যবান পাণ্ডুলিপির সফট কপি সংগ্রহ করা ওসব দেশে কঠিন কিছু নয়। যত নিয়মের গ্যাঁড়াকল আমাদের দেশে। এসব কারণে সাধারণ জ্ঞান অন্বেষী কৌতূহলী মানুষের ঐতিহ্য অনুসন্ধান করা অনেক ক্ষেত্রেই সংকটের কারণ হয়ে গেছে।

একটি বিষয় খুব হতাশার সঙ্গে দেখে আসছি। আমাদের অনেক শিক্ষিতজনের মধ্যে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চায় বেশ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক সময় ইতিহাসকে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করতেও ব্যর্থ হই। তাই ইতিহাস নামীয় বই হলেই একে ইতিহাস গ্রন্থ বলি। মূল্য বিচার করি না। ইতিহাসের সময় ও শাখা সম্পর্কে সতর্ক থাকি না। ফলে যথাযোগ্য বিশেষজ্ঞ যথাযথ জায়গায় দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। অপাত্রে গুরুদায়িত্ব থাকায় ঐতিহ্যচর্চা ও গবেষণা বাধাগ্রস্ত হয়।

দুর্বল ইতিহাসচর্চার দেশে কেউ ইতিহাস নামীয় গ্রন্থ লিখে সুপরিচিত হওয়ার কারণে এসবের মান বিচার না করে ইতিহাস সংকলক ‘ইতিহাসবিদ’ হয়ে যান। আধুনিক যুগের ইতিহাস গবেষক প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস রক্ষকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। রাজনৈতিক ইতিহাসের গবেষক শিল্প ইতিহাসের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। এসব কারণে ঐতিহ্য সংরক্ষণে নানা ধরনের সংকট দেখা দেয়।

গত শতকের নব্বইয়ের দশকে আমি শরিয়তপুর জেলা সদরের পাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্রের সন্ধান পাই। একটি বাড়িতে অর্ধভঙ্গ অবস্থায় চারটি মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে মনসামন্দির ও দুর্গামন্দির মধ্যযুগের নির্মাণশৈলীর বিশেষ ধারায় দোচালা আকৃতির ছাদবিশিষ্ট। লাল ইট বেরিয়ে আছে। ছাদের নিচের অংশে চমৎকার কারুকাজ। কোথাও মোজাইকের কাজ রয়েছে। এই মন্দিরগুলোর একটু পেছনে দ্বিতল কালীমন্দির। উপরের তলার অনেকটাই ধসে গেছে। এগুলো পরিত্যক্ত মন্দির ছিল।

বাড়িটি মনসাবাড়ি নামে পরিচিত। এই বাড়ি-সংলগ্ন আরেকটি অংশে ধ্বংসপ্রায় বিশাল ইমারত রয়েছে। দোতলাটি ভেঙে গেছে। একতলার অনেকটা অংশ এখনও টিকে আছে। এই অংশটি ময়ুরভট্টের বাড়ি নামে পরিচিত। এটি সে যুগে একটি বড় সংস্কৃত টোল ছিল বলে এক ধরনের সিদ্ধান্তে আসা গেছে।

আমি দেড় বছর গবেষণা করে এই বাড়ি দুটোর ইতিহাস তৈরি করেছিলাম। স্পষ্ট হয়- এই ইট কাঠের আড়ালে ষোলো বা সতেরো শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে। পরে তা গবেষণা জার্নাল ও গ্রন্থে প্রকাশ করেছি। আমি সেসময় সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দৃষ্টিতে এনেছিলাম। কিন্তু সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়নি।

অথচ দেখলাম পর্তুগালের পর্যটন নগরী এভোরাকে কত যত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। মধ্যযুগে রোমান ও মুসলিম আধিপত্য এখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল। রোমানরা দেয়ালঘেরা যে নগরী গড়ে তুলেছিল তা একেবারে অবিকল রেখে দিয়েছে পর্তুগিজরা। আর আমি কয়েক বছর আগে শরিয়তপুরে গিয়ে দারুণ হোঁচট খেলাম।

মনসাবাড়ির হিন্দু সেবায়েতদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন কিছু অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিল। আর তা দিয়ে প্রত্ন-আইন না মেনে পুরো প্লাস্টার করে মন্দিরটির ঐতিহ্যিক রূপ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঐতিহ্য সচেতন ও প্রত্ন-আইন সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকলে জেলা প্রশাসক সংস্কারের আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন। এর কবছর আগে বিলাস খান মসজিদ নামে শরিয়তপুরের একটি ছোট মোগল মসজিদকে গুড়িয়ে দিয়ে জেলা পরিষদের অর্থায়নে আধুনিক মসজিদ বানানো হয়।

স্থানীয়পর্যায়ে প্রশাসন ক্ষমতাবান। দেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা নানা ঐতিহ্যিক উপাদান সবার আগে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দৃষ্টিগোচর হবে। এতে করে প্রাথমিকভাবে রক্ষা হবে তাদের হাতেই। তারাই দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও গবেষকদের। কিন্তু নিজেরাই যদি সচেতন না থাকেন তবে ঐতিহ্য রক্ষা করা কঠিন। এ কারণে আমি বহু আগে থেকে বলে আসছি পিএটিসিতে তরুণ কর্মকর্তাদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের সময় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে একটি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) পক্ষ থেকে পিএটিসির রেক্টর মহোদয়কে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোনো কোনো কমিটিতে বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ আমার রয়েছে। আমার মনে পড়ে এক দেড় বছর আগে এক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই অনুরোধ পিএটিসি প্রশাসনকে করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। আমার জানা মতে, পিএটিসি কর্তৃপক্ষ গত দুবছর হয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিষয়ে ক্লাসের ব্যবস্থা রেখেছে।

ইউরোপে নানা দেশে দেখেছি ছোটখাট ঐতিহ্যিক নিদর্শনও কত যত্নে কত মমতায় সংরক্ষণ করে। ২০১৬ সালের ২৯ এপ্রিল পর্তুগালের এভোরা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করেছিল। সিদ্ধান্ত ছিল নানা বিষয়ে আমার সঙ্গে কথপোকথন হবে। সেখানে আয়োজকরা আমার কাছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইউরোপীয়দের আগমন প্রসঙ্গে জানতে চান। সংগত কারণেই তাদের বিশেষ লক্ষ্য ছিল এককালে বাংলাদেশে পর্তুগিজ অবস্থান সম্পর্কে জানা। বাংলাদেশে পর্তুগিজ ঐতিহ্য সংরক্ষণের দুর্বলতার বিষয়ে তাদের হতাশা ছিল।

আমি চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপে একসময় পর্তুগিজ অবস্থান ও ঢাকার আশপাশে দুয়েকটি পর্তুগিজ গির্জার সন্ধান মাত্র দিতে পেরেছি। পর্তুগিজ অধ্যাপকরা ঠিকই বলেছেন, ভারতের গোয়ায় সেদেশের সরকার যেভাবে পর্তুগিজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেছে এর সামান্যও যদি আমরা করতে পারতাম তাহলে ইতিহাস অনেকটা সমৃদ্ধ হতো।

বর্তমান যন্ত্রযুগে এমন হতাশা থেকে বেরিয়ে আসা যে খুব কঠিন আমার মনে হয় না। প্রয়োজন শুধু সরকারিপর্যায়ে প্রয়োজনীয় ও লাগসই নীতি নির্ধারণ এবং যথাযোগ্য গবেষকদের মেধা ব্যবহার করা।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
শেখ রেহানার জন্মদিন: ‘দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো’
শুভ জন্মদিন ‘ছোট আপা’
সাধারণ তবুও অসাধারণ শেখ রেহানা
অসাধারণ নারীর সাধারণ জন্মদিন: সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা
শেখ রেহানা: নীরবে যিনি পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করেন

শেয়ার করুন

মন্তব্য

‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে’

‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে’

বেরিয়ে আসছে ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ব্যবসায়িক প্রতারণার ভয়াবহ নজির। সুদ খাওয়া হারাম তাই সুদ নয়, মুনাফার অংশ দেয়া হবে এবং পরিমাণে তা সাধারণ ব্যাংকের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু মুনাফা পাবে তাই নয়, বেহেস্তে যাওয়াও সম্ভব হবে এখানে টাকা বিনিয়োগ করলে। এই কথা বলে বিশ্বাস করানোর জন্য ওয়াজ এবং ধর্মীয় সভায় পরিচিত মাওলানাদের নিয়ে গিয়েছে তারা। তাতে কেউ কেউ তাদের জমি বিক্রি করে, পেনশনের টাকা থেকে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে।

সহজে প্রচুর টাকার মালিক হওয়ার ফাঁদে পড়ে হাঁসফাঁস করছে অনেক মানুষ। এখন টাকা ফেরত পেতে মিছিল প্রতিবাদ করছে। পুলিশের লাঠিপেটা খাচ্ছে। এসব দেখে মনে হয় সেই বিখ্যাত গানের কথা! আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠে সেই অবিস্মরণীয় গান- ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে।’ সেই গানের এক জায়গায় আছে, ‘ফান্দ পাতাইছে ফান্দুয়া রে পুঁটি মাছ দিয়া।’ পুঁটি মাছ খাওয়ার লোভে বগার জীবনটাই চলে গেল।

ফাঁদে আঁটকে পড়া বগাকে দেখে বগি কাঁদছে। এটা তো শুধু গান নয় এ যেন জীবন থেকে পাওয়া জ্ঞান। এদেশের মানুষের ফাঁদে পড়ার বেদনাময় অভিজ্ঞতা হয়েছে যে কতবার। কিন্তু শিক্ষা পরিপূর্ণ হচ্ছে না বা চমকে প্রভাবিত হচ্ছে দ্রুত, তাই একের পর এক ফাঁদে ধরা পড়ছে বার বার।

পত্রিকার পাতা ভর্তি হয়ে আছে এরকম নানা প্রতারণার গল্পে। প্রতারণার ফাঁদে ফতুর হয়ে যাচ্ছে ভাগ্য ফেরানো বা সস্তায় জিনিস পাওয়ার প্রত্যাশায় টাকা বিনিয়োগ করা মানুষ। এমএলএম ও ই-কমার্সের নামে ৪০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে রিপোর্ট হয়েছে পত্রিকায়।

এদের মধ্যে ডেসটিনি ও যুবক নিয়েছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা, ইউনিপেটুইউ ৬ হাজার কোটি টাকা, এহসান গ্রুপ ১৭ হাজার কোটি, ই-অরেঞ্জ ১ হাজার ১০০ কোটি ও আইসিএল ৩ হাজার কোটি টাকা জনগণের কাছ থেকে নিয়েছে বলে প্রকাশিত। এসব ঘটনায় অতীতে অনেক মামলা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিক গ্রেপ্তার হয়েছে কিন্তু টাকা ফিরে পায়নি গ্রাহক। দ্রুত লাভের আশায় টাকা দিয়ে লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকা ফিরে না পেয়ে লাখ লাখ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই পথে বসেছে। আর বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে কিছু মানুষের।

প্রতারিত হওয়ার কত পথ যে খোলা আছে দেশবাসীর জন্য, তা হিসাব করে বলা মুশকিল। গণমানুষের সবচেয়ে নির্ভর করার জায়গা বা শেষ আশ্রয় হলো রাজনীতি। রাজনীতির মাধ্যমেই তো নির্ধারিত হয় একটা রাষ্ট্র বা সমাজ চলবে কীভাবে। রাজনীতিবিদদের আহবানে মানুষ সাড়া দেয়, সংগ্রামে নামে, জীবন দেয় একটা নতুন সম্ভাবনা বা সৃষ্টির আশায়। কিন্তু যখন সেই রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় তখন হতাশার সীমা থাকে না।

যদিও রাজনীতিতে প্রতারিত হলে তার ফল সুদূরপ্রসারী কিন্তু সাময়িক বা তাৎক্ষণিক প্রভাব সাধারণভাবে বোঝা যায় না। আবার যখন বুঝতে পারা যায় তখন করার তেমন কিছু থাকে না। তখন সেই আপ্তবাক্য বলতে থাকেন সবাই, রাজনীতি মানেই ঠকানো ভদ্র ভাষায় যাকে বলা হয় কৌশল। এই কৌশল চলছে অর্থনীতিতে সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ এবং হারিয়ে ফেলছে মানুষের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস। প্রতারকরা তা বুঝতে পারে ভালোভাবেই। তাই নতুন কৌশলে নতুন ফাঁদ পাতে।

হুন্ডি কাজলের কথা মানুষ প্রায় ভুলেই গেছে। হাজার হাজার মানুষকে সর্বস্বান্ত করে প্রচার মাধ্যমে আলোড়ন তোলা সেই কাজলের কী হয়েছে? মানুষ কি তার টাকা ফেরত পেয়েছে? কিংবা নিকট অতীতে যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপেটুইউ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান যে হাজার হাজার কোটি টাকা মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল, প্রায় দুই দশক তো পার হয়ে গেল, টাকা কি উদ্ধার হলো?

এসব প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কীর্তি ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যরা যখন ভুলেই গিয়েছে, তখন দেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন ধরনের প্রতারণা শুরু হয়। ই-কমার্স, অনলাইন মার্কেটিং ইত্যাদি ডিজিটাল ভাষা আর ভার্চুয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন কায়দায় প্রতারণার ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত।

কিছুদিন ধরে ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ, আবেদন-নিবেদনের ফলে একের পর এক আলামত উদ্‌ঘাটিত হতে শুরু করেছে। পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত সেসব খবরের কিছু যেমন : ‘ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মালিকপক্ষ প্রতারণামূলকভাবে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।’ ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অন্তত ৫৮৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ধামাকা শপিং নামের একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।’ দীর্ঘদিনের প্রতারণার পুঞ্জীভূত প্রকাশ ঘটছে প্রতিদিন।

রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়েই নির্দিষ্ট পণ্য কিনলে ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত অস্বাভাবিক ‘ক্যাশব্যাক’ অফার দিয়ে ব্যবসা করছিল ডিজিটাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি। বিজ্ঞাপন দিয়েছে সর্বত্র। আড়ালে থাকেনি ব্যবসা কিন্তু আড়ালে রেখেছিল তার ব্যবসাকৌশল।

অবিশ্বাস্য অফার, সস্তায় জিনিস কিনে লাভবান হওয়ার লোভে আকৃষ্ট হয়ে কত গ্রাহক যে পঙ্গপালের মতো ছুটেছে আর তাদের কী পরিমাণ টাকা আটকে ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটি, তার কোনো সঠিক হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। এ প্রতারণা ব্যবসায় নতুনমাত্রা যুক্ত হয়েছে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে। শরিয়াহভিত্তিক সুদমুক্ত বিনিয়োগের কথা বলে এহসান গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১০ হাজার ধর্মপ্রাণ গ্রাহকের কাছ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন মূল হোতা।

বেরিয়ে আসছে ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ব্যবসায়িক প্রতারণার ভয়াবহ নজির। সুদ খাওয়া হারাম তাই সুদ নয়, মুনাফার অংশ দেয়া হবে এবং পরিমাণে তা সাধারণ ব্যাংকের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু মুনাফা পাবে তাই নয়, বেহেস্তে যাওয়াও সম্ভব হবে এখানে টাকা বিনিয়োগ করলে। এই কথা বলে বিশ্বাস করানোর জন্য ওয়াজ এবং ধর্মীয় সভায় পরিচিত মাওলানাদের নিয়ে গিয়েছে তারা। তাতে কেউ কেউ তাদের জমি বিক্রি করে, পেনশনের টাকা থেকে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে।

একটি দুটি নয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ১৪টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জনগণের অর্থ আত্মসাতের পর বিদেশে পাচারের অভিযোগ পেয়েছে।

দুই লাখ টাকা জমা রাখলে মাসে ১৬ কিংবা ১৮ হাজার টাকা মুনাফা দেয়ার অবিশ্বাস্য এসব অফার কীভাবে দেয়া হয়, একটু মাথা খাটালেই সেটা ধরে ফেলা যায়। দুই তিন মাস ১৫০–২০০ শতাংশ হারে মুনাফা দিয়ে পুরো টাকাটাই গায়েব করে দিলে টাকা দিতে সমস্যা কী? আর সদস্য বা গ্রাহকদের ওপর নতুন সদস্য জোগাড়ের ভার থাকলে নতুন সদস্যদের জমা করা টাকা থেকেই পুরোনোদের ‘কমিশন’ অথবা ‘উচ্চহারে’ মুনাফা দেয়া সম্ভব। খুব হিসেব করে চালাতেন তারা ব্যবসা।

নতুন সদস্যের আগমন বন্ধ হয়ে গেলে, অর্থাৎ ক্যাশ ফ্লো থেমে গেলেই সবকিছু গুটিয়ে উধাও হয়ে যান উদ্যোক্তারা। যেন ভোজবাজির মতো হাওয়া হয়ে যায়। পড়ে থাকে প্রতারিত গ্রাহক, যারা নিজের সম্বল বা ঋণ করে লাভের আশায় লোভের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন।

একই ব্যাপার ঘটেছে অবিশ্বাস্য ছাড়ে পণ্য বিক্রির জন্য আগাম নেয়া টাকার ক্ষেত্রেও। নতুন গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুরোনোদের উচ্চহারের ক্যাশব্যাক এবং অস্বাভাবিক মূল্যছাড় দেয়া হয়। সুবিধা পেয়ে তারা আবার ব্যাপক প্রচার করে ফলে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবরা আগ্রহী হয়ে ওঠে।

এভাবেই চলে প্রতারণার নতুন বিস্তার। কিন্তু যদি নতুন গ্রাহকের সংখ্যা না বাড়ে কিংবা পণ্য উৎপাদক বাকি দিতে রাজি না হয়, তাহলে তো ঘোষিত দামে পণ্যটা আর দেয়া সম্ভব হয় না। এরকম ঘটনা ঘটেছে ইভ্যালি কিংবা ই-অরেঞ্জের বেলায়। সাধারণ অর্থনীতি যারা বোঝেন তারা তো জানেন যে, এ ধরনের প্রকল্প একসময় ধসে পড়তে বাধ্য। কারণ, এসব কোম্পানির প্রতিনিধির সংখ্যা যত বাড়তে থাকবে, বাজার তো তত বড় হবে না। ফলে কে আর কাকে গ্রাহক বানাবে?

কেন এসব প্রতিষ্ঠান মানুষের কাছ থেকে টাকা নিতে পারে? মানুষ না হয় লোভে পড়ে ভুল করছে, রাষ্ট্রের কি কোনো দায় নেই? দিনের পর দিন এই অর্থনৈতিক প্রতারণা চলছে কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি থাকবে না কেন? অবিশ্বাস্য অফারের বিজ্ঞাপন পত্রিকার পাতায় ছাপা হচ্ছে, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ এদের পক্ষে কথা বলছেন, এসব দেখে সাধারণ মানুষ তো প্রভাবিত হতেই পারেন। প্রতারণার কবল থেকে মানুষকে বাঁচাতে রাষ্ট্র তার দায় পালন করবে কি?

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
শেখ রেহানার জন্মদিন: ‘দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো’
শুভ জন্মদিন ‘ছোট আপা’
সাধারণ তবুও অসাধারণ শেখ রেহানা
অসাধারণ নারীর সাধারণ জন্মদিন: সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা
শেখ রেহানা: নীরবে যিনি পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করেন

শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি পুরস্কারপ্রাপ্তি: অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি পুরস্কারপ্রাপ্তি: অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

বিশ্বে বাংলাদেশের অর্জন ও সুনাম ক্ষুণ্ন করে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশে একটি মহল ক্রমাগত ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। এ রকম বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করে সফলভাবে দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া বিশ্বে আর কোনো নেতার নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোভিড-১৯ মহামারি থেকে জীবন বাঁচাতে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছেন। মার্কিন প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেছে। এর অনুসরণ করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসা করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে এবং করোনা পরিচালনা ও টিকা কার্যক্রমের জন্য তার ভূয়সী প্রশংসা করে এবং এই খাতে ৯৪০ মিলিয়ন আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়।

টানা এক যুগেরও বেশি সময় দেশসেবার সুযোগ পেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। তার স্বীকৃতি জাতিসংঘের এই এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন অনেক স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন। এর আগে কমনওয়েলথভুক্ত দেশের সরকারপ্রধানদের মধ্যে অন্যতম সফল এবং অনুকরণীয় তিনজন নারী সরকারপ্রধানের একজন নির্বাচিত হন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) দারিদ্র্য দূরীকরণ, পৃথিবীর সুরক্ষা এবং সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বজনীন আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সঠিক পথে অগ্রসরের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে নবম বার্ষিক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে (ভার্চুয়াল) এই পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্জনের জন্য এসডিএসএনসহ কয়েকটি সংস্থা প্রধানমন্ত্রীকে পুরস্কৃত করেছে। তারা বাংলাদেশের অবস্থা বিশ্লেষণ করেছে এবং মূল্যায়ন করে দেখেছে- বাংলাদেশ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করছে। এ পুরস্কার বাংলাদেশের জনগণকে উৎসর্গ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন কৌশলবিদ অধ্যাপক জেফ্রি ডি স্যাকসের নেতৃত্বে জাতিসংঘ মহাসচিবের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১২ সালে এসডিএসএন প্রতিষ্ঠা করা হয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য বাস্তবভিত্তিক সমাধান জোরদারে বিশ্বের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানোই এ প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক শেখ হাসিনাকে ‘জুয়েল ইন দি ক্রাউন অব দি ডে’ হিসেবে তুলে ধরেন এবং বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনাভাইরাস চলাকালেও এসডিজি প্রচারণা কার্যক্রম চালাতে তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

এ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এ পুরস্কার হচ্ছে এসডিজি’র লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে জোরালো দায়িত্ব পালনের একটি প্রমাণপত্র। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের (ইউএনজিএ) ফাঁকে কয়েকটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।

এ অনুষ্ঠানে স্যাকস বলেন, এ পুরস্কার হচ্ছে এসডিজির লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে জোরালো দায়িত্ব পালনের একটি প্রমাণপত্র। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ রেখে যাওয়ার জন্য একটি ‘সার্বিক বৈশ্বিক’ উদ্যোগের মাধ্যমে এই গ্রহের জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আশু সাহসী ও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নিউইয়র্কে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা-বিষয়ক নেতৃবৃন্দের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এ আহ্বান জানান। বৈঠকে এ ব্যাপারে তিনি ছয়টি সুপারিশ পেশ করেছেন।

শেখ হাসিনা তার প্রস্তাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে প্যারিস চুক্তির কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু তহবিল আদায়ের ওপরও জোর দেন। এ তহবিলের ৫০ শতাংশ বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতার জন্য ব্যবহার করা হবে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নতুন আর্থিক প্রক্রিয়া এবং সবুজ প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লোকসান এবং ক্ষয়ক্ষতির সমস্যা আর সেই সঙ্গে বৃহৎ আকারের জনসংখ্যার স্থানচ্যুতি মোকাবিলার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, মহামারি ও দুর্যোগের দ্বৈত বিপদ মোকাবিলায় বিশেষ করে জলবায়ু-সৃষ্ট দুর্যোগের বর্ধিত পৌনঃপুনিকতা আক্রান্ত সিভিএফ দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রয়োজন। শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে তাদের অভিযোজন ও প্রশমন প্রচেষ্টায় সহায়তা করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনে সবচেয়ে কম অবদান রাখে, কিন্তু তারাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক আইপিসিসি রিপোর্টের উল্লেখ করে বলেন, এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। কেননা বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে গেলে তারা স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তার সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক পথিকৃৎ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সম্প্রতি ইউএনএফসিসিসি’তে বাংলাদেশ একটি উচ্চাভিলাষী ও হালনাগাদ এনডিসি জমা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার সবুজ প্রবৃদ্ধি, স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ গ্রহণ করেছে। তিনি এটা স্পষ্ট করেন যে, সরকার জলবায়ু ঝুঁকি থেকে জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা এবং তা থেকে জলবায়ু সমৃদ্ধির পথে যাত্রা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) এবং ভি২০-এর চেয়ার হিসেবে তার সরকারের মূল লক্ষ্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ঢাকাস্থ জিসিএ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সর্বোত্তম অনুশীলন এবং অভিযোজন জ্ঞান শেয়ার করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি উল্লেখ করেন যে, “স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত এবং ধর্মনিরপেক্ষ এক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করব। তিনি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে বলেন, কারণ কোভিড-১৯ মহামারি সত্ত্বেও আমাদের জিডিপি ৫.২৪% উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। যখন অনেক উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশ কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নেতিবাচক অবস্থার সঙ্গে লড়াই করছে”। তিনি বলেন, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং দেশের রেমিট্যান্স-প্রবাহ, কৃষি উৎপাদন এবং রপ্তানিতে পরিবর্তন এসেছে।

কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে এর মোকাবিলায় দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার গতি বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়। উন্নততর কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৪,০০০ নতুন চিকিৎসক, ৫,০৫৪ জন নার্স, ১,২০০ হেলথ টেকনোলজিস্ট ১,৬৫০ হেলথ টেকনিশিয়ান, ১৫০ কার্ডিওগ্রাফার এবং এক হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেয়া হয়।

কোভিড-১৯ সংক্রমণের তথ্য এবং পরিষেবা সরবরাহ করতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে হটলাইনে ৪,২১৮ চিকিৎসক যুক্ত করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৪৮ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করা হয় এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নেতৃত্বে একটি ১৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়। প্রায় ১১০০ আইসিইউ বেড ছাড়াও প্রায় ১২০০০ সাধারণ বেডসহ দেশে কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ করা হয়। ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতাল, যা কোভিড-১৯ সহযোগিতা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রস আধনাম গ্যাবরিয়াস কভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা করা এবং একই সঙ্গে অর্থনীতিকে সচল রাখা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, যদিও কোভিড-১৯ অভিযোজন এবং অর্থনৈতিক বিকাশকে টেকসই করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

এমনকি সারা বিশ্ব আজ দেড় বছরের অধিক সময় ধরে করোনা অতিমারিতে বিপর্যস্ত হয়ে আছে। এই মহামারি সামাল দিতে গিয়ে বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত সব দেশের সরকারপ্রধানেরই দিশাহারা অবস্থা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথেষ্ট সফলতার সঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারি সামলে চলেছেন। বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞই এই করোনা মহামারি ম্যানেজ করার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আমাদের দেশকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে থাকেন।

এই প্রশংসনীয় কাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমসাময়িক অন্য যেকোনো বিশ্বনেতার চেয়ে অনন্য এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং তিনি বিশ্বের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের অন্যতম প্রধান নেতা। এমনকি কোভিড-১৯ চলাকালেও পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল প্রকল্প এবং অন্যান্য মেগা প্রকল্পগুলো কার্যকরভবাবে এগিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও মনোবল ও বিচক্ষণতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ কোভিড-১৯ সংকট কাটিয়ে উঠে এবং অদম্য উন্নয়নে আরও এগিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী জনগণকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তিনি জনগণের টিকার ব্যবস্থা করবেন ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ পর্যন্ত প্রথম ডোজ পেয়েছেন ৩ কোটি ৮৫ লাখ মানুষ এবং ১ম ও ২য় উভয় ডোজ সম্পন্ন করেছেন ১ কোটি ৫৪ লাখ মানুষ। ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালে শেখ হাসিনা তার সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনায় দেশের মানুষের জন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

উন্নত অনেক দেশ যখন টিকা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি, তখন প্রধানমন্ত্রীর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এই ভ্যাকসিন বাংলাদেশে আসে; এটি একটি অকল্পনীয় সাফল্য। বাংলাদেশ সরকার কোভিড-১৯ প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করছে এবং এ পর্যন্ত কোভিড-১৯ ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে। একই সঙ্গে, অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নতিসহ এমন সব যুগান্তকারী অর্জন সাধিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। জাতিসংঘের এই পুরস্কারটি এমন একটি সময় প্রদান করা হলো, যা সময়ের এবং বিরূপ বিশ্বপরিস্থিতির বিবেচনায় এই পুরস্কার অতীতের যেকোনো সময়ের পুরস্কার ও স্বীকৃতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। একটু বাড়তি আনন্দ যোগ হতে পারে এ জন্য যে, জাতীয়ভাবে মুজিব শতবর্ষ পলনকালে এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার জন্মমাসে (২৮ সেপ্টেম্বর জন্মদিন) এ পুরস্কার পাওয়া গেল।

বাংলাদেশের অভূতপূর্ব আর্থসামাজিক উন্নতিতে ইতোমধ্যে অনেকের গাত্রদাহ শুরু হয়েছে এবং দেশ-বিদেশে বসে যারা প্রিয় মাতৃভূমির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের লিপ্ত রয়েছে তাদের জন্য উপযুক্ত জবাব হিসেবে দেখা যেতে পারে।

বিশ্বে বাংলাদেশের অর্জন ও সুনাম ক্ষুণ্ন করে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশে একটি মহল ক্রমাগত ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। এ রকম বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করে সফলভাবে দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া বিশ্বে আর কোনো নেতার নেই। প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা এবং সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে সফল নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের জাতিসংঘ এসডিজি অপ্রগতি পুরস্কার আরেক অসাধারণ এক স্বীকৃতি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

আরও পড়ুন:
শেখ রেহানার জন্মদিন: ‘দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো’
শুভ জন্মদিন ‘ছোট আপা’
সাধারণ তবুও অসাধারণ শেখ রেহানা
অসাধারণ নারীর সাধারণ জন্মদিন: সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা
শেখ রেহানা: নীরবে যিনি পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করেন

শেয়ার করুন

ইভ্যালিকাণ্ড: গুরু পাপে লঘু দণ্ড যেন না হয়

ইভ্যালিকাণ্ড: গুরু পাপে লঘু দণ্ড যেন না হয়

ই-ভ্যালিকাণ্ডে রাসেল দম্পতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর গ্রাহকদের মূল ভাবনা তারা টাকা ফেরত পাবেন তো? যদি টাকা ফেরত না পান তবে সেটা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক, আর প্রতারক ব্যবসায়ীরা ভাববে, গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিলে ফেরত না দিলেও চলে। হয়তো ক’দিন জেলের ভাত খেতে হবে। ক’দিন জেল খেটেও যদি শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়া যায়, মন্দ কী?

দেশে ই-কমার্সের বিকাশ হয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজার হাজার তরুণের। ধীরে ধীরে এটি প্রসারিতও হচ্ছে। রাজধানীর পাশাপাশি মফস্বলেও এখন পৌঁছে গেছে অনলাইন সেবা ও ব্যবসা। কিন্তু কিছু ‘ফটকা’ ব্যবসায়ী এখানে ঢুকে পড়ায় পুরো ই-কমার্সই আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

ই-কমার্স শুধু একটি বাণিজ্য নয়, সেবাও। ডিজিটাল মাধ্যমে বেচাকেনা হয় মাত্র। পয়সা ও সময় খরচ করে বাজারে গিয়ে মুদি দোকানে দামাদামি না করে ওয়েবসাইট থেকে পণ্যের অর্ডার করেন ক্রেতারা। অর্ডারমতো বাড়িতে পৌঁছে যায় পণ্য। শুধু দেশের নয়, দেশের বাইরে থেকেও অনলাইনে পণ্য কিনতে পারি আমরা।

করোনাকালে গত প্রায় ১৮ মাসে ই-কমার্সের পরিধি আরও বেড়েছে। কোভিডকালে অনলাইন গ্রোসারির প্রসার হয়েছে। এসময়ে চালডালের মতো অনলাইন গ্রোসারির মাধ্যমে নিত্যপণ্য কেনা বেড়েছে বহুগুণ।

এ রকম একটি স্থিতিশীল, আস্থাশীল ও প্রসারমাণ বাজারে ঢুকে পড়েছে ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জের মতো কিছু ‘ফটকা’ ব্যবসায়ী। ক্রেতাদের লোভে ফেলে অস্বাভাবিক ডিসকাউন্টে পণ্য দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এরা। কিছু পণ্য ক্রেতাদের কাছে ডেলিভারি দিয়ে তারা বাজারে একটি পজিটিভ ইম্প্রেশন সৃষ্টি করতে চেয়েছে, তা পেরেছেও বটে। কিন্তু অধিকাংশ গ্রাহকই মাসের পর মাস অপেক্ষায় থেকেও তার পণ্যটি পাননি। ফেরত পাননি টাকাও।

কিছু পণ্য ডেলিভারি দেয়াটা আসলে তাদের কৌশলী ফাঁদ ছিল মাত্র। কারণ কেউ পণ্য পেয়েছে শুনে আরও অনেকেই নতুন করে পণ্য অর্ডার করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এ রকম অস্বাভাবিক মূ্ল্য ছাড়ে পণ্য বিক্রি সম্ভব না।

এভাবে ডিসকাউন্ট অফারের খপ্পরে পড়ে ক্রেতারা লাখ লাখ টাকার পণ্য অর্ডার করেছেন। শুধু তাই নয়, ইভ্যালি বলেছে, তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য দিতে না পারলে বাজারমূল্যের চেক ফেরত দেবে। ফলে অনেক ক্রেতাই পণ্য অথবা বাজারমূল্য-দুটোর জন্যই অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।

তার মানে ইভ্যালি এখানে শুধু পণ্যের ব্যবসাই করেনি, টাকাও তাদের একটি পণ্য। তারা টাকার বিনিময়ে টাকা বিক্রি করেছে। দেশের ইকমার্স নীতিমালা অনুযায়ী এ ব্যবসা করা যায় না। দেশের বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই ইভ্যালি এ ব্যবসা করেছে।

ই-ক্যাব (ইকমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিয়ে চিঠি চালাচালি করলেও ইভ্যালির বিরুদ্ধে শেষমেশ কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। ইভ্যালির মালিক দম্পতি গ্রেপ্তার হওয়ায় সবাই এখন এ নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু বিদ্যমান নীতিমালা (ডিজিটাল কমার্স পলিসি ২০১৮ ও ডিজিটাল কমার্স অপারেশন গাইডলাইন ২০২১) অনুযায়ীই তাদের বিরুদ্ধে আগেই ব্যবস্থা নেয়া যেত। কিন্তু তা হয়নি। তখন ব্যবস্থা নিলে গ্রাহকদের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা কোনো ডিজিটাল প্রতারকের পকেটে যেত না। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকাসহ আরও কয়েকটি ‘হায় হায় কোম্পানি’ দেশে সৃষ্টি হতো না। ইভ্যালিকাণ্ডে দেশের ইতিহাসে যোগ হলো আরেকটি বড় মানি স্কাম।

ইভ্যালিকাণ্ডে রাসেল দম্পতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর গ্রাহকদের মূল ভাবনা তারা টাকা ফেরত পাবেন তো? যদি টাকা ফেরত না পান তবে সেটা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক, আর প্রতারক ব্যবসায়ীরা ভাববে, গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিলে ফেরত না দিলেও চলে। হয়তো ক’দিন জেলের ভাত খেতে হবে। ক’দিন জেল খেটেও যদি শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়া যায়, মন্দ কী?

কাজেই, এখন গ্রাহকরা যাতে টাকা ফেরত পান, সে দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। কেউ প্রতারিত হয়ে টাকা খোয়ালে বিদ্যমান আইনেই এর প্রতিকার সম্ভব। কিন্তু সেটি সময়সাপেক্ষ।

গ্রাহকরা ইভ্যালির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করতে পারেন। থানায় অথবা আদালতে গিয়ে গ্রাহক এ মামলা করতে পারেন। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অভিযোগ প্রমাণিত হলে গ্রাহক তার পাওনা ফিরে পেতে পারেন। অভিযুক্ত রাসেল দম্পতির সম্পদ থেকেও আদালত গ্রাহকের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়ার আদেশ দিতে পারেন। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে অভিযুক্তের বা দণ্ডিতের সম্পদ নিজের হেফাজতে নিতে পারে বা বাজেয়াপ্ত করতে পারে।

এছাড়া গ্রাহক চাইলে দেওয়ানি মোকদ্দমাও করতে পারেন। টাকা আদায়ে এটিই (মানি মোকদ্দমা) সবচেয়ে প্রচলিত পন্থা। এটিও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া সন্দেহ নেই। বাদী মামলা করলে বিবাদীপক্ষ সব সময় চেষ্টা করেন মামলাকে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখতে। আর ক্ষুদ্র গ্রাহক সাধারণ দীর্ঘ মেয়াদে এ মামলা চালানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, হতাশ হয়ে যান।

এছাড়া কোনো কারণে চেক ডিজঅনার হলে চেক প্রদানকারীর বিরুদ্ধে হস্তারযোগ্য দলিল আইন ১৮৮১ (Negotiable Instrument Act)-এর অধীনেও মামলা করা যেতে পারে। ইভ্যালি যদি কোনো চেক দিয়ে থাকে ও তা ডিজঅনার হয় তবে ইভ্যালির বিরুদ্ধে এ মামলা করা যেতে পারে।

অতীতে আমরা দেখেছি যুবক, ইউনিপেটুইউ এবং ডেসটিনির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। গ্রাহকের কাছ থেকে এরা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ইভ্যালি ও ইউনিপেটুইউ-এর ব্যবসার ধরন প্রায় একই। ইভ্যালি ৪৫ দিনে ডিসকাউন্টেড মূল্যে পণ্য অথবা ব্যর্থতায় আনডিসকাউন্টেড বাজার মূল্য (টাকা) গ্রাহকদের ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ফলে গ্রাহকরা অবিশ্বাস্য কম মূল্যে পণ্য কিনতে অথবা কম টাকা খাটিয়ে অল্প সময়েই অধিক মুনাফা লাভের আশায় ইভ্যালির ফাঁদে পা দিয়েছে। আর ইউনিপেটুইউ ১০ মাসে বিনিয়োগের দ্বিগুণ টাকা গ্রাহককে ফেরত দেয়ার ফাঁদ পেতেছিল। অভিন্ন ফাঁদ। শুধু শিকারি আলাদা। আর ঘুঘু সেই পুরোনো গ্রাহক।

সে সময় ইউনিপেটুইউ’র চেয়ারম্যানসহ প্রতিষ্ঠানটির কজনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়। ওই মামলায় ইউনিপেটুইউর চেয়ারম্যানসহ ছয় কর্মকর্তার ১২ বছর করে কারাদণ্ড হয়। একইসঙ্গে জরিমানা করা হয় ২ হাজার ৭০২ কোটি টাকা।

ইভ্যালির বিরুদ্ধেও একই মামলা হতে পারে। কিন্তু ইউনিপেটুইউসহ অন্যান্য প্রতারক কোম্পানি ১৪ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেও এত কম টাকা জরিমানা দিলে অপরাধের তুলনায় শাস্তি হয় নগণ্য। গ্রাহকরাও টাকা ফেরত না পেয়ে হন ক্ষতিগ্রস্ত। তাই ফৌজদারি মামলার শাস্তি যেমন হতেই হবে, তেমনি নিশ্চিত করতে হবে গ্রাহকদের টাকা ফেরতের বিষয়টিও।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইভ্যালির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৪০৬, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায়। ৪০৬ ধারার মামলাটি হলো অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের। এর শাস্তি বড় জোর তিন বছর কারাদণ্ড বা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ড। আর ৪২০ ধারার শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা। ৪০৬ ধারার চেয়ে ৪২০ ধারায় শাস্তি বেশি ও অপরাধী একই সঙ্গে উভয়দণ্ডেই দণ্ডিত হতে পারে।

আর ৫০৬ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। কিন্তু ৫০৬ ধারার অপরাধ হচ্ছে অপরাধমূলক ভিতি প্রদর্শন। ইভ্যালিকাণ্ডে অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন প্রমাণ করা সহজ কিছু নয়, আর এটি কীভাবে প্রাসঙ্গিক তাও বোধগম্য নয়।

আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। রাসেল দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা চলমান। মামলার পরিণতি কী তা গ্রাহকরা জানেন না। গ্রাহকরা শুধু জানেন তারা টাকা দিয়েছেন, আর ইভ্যালি তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ইভ্যালির সব অ্যাকাউন্ট জব্দ করা প্রয়োজন।

গ্রাহকদের সঙ্গে ইভ্যালির সব লেনদেনের খতিয়ান বের করা কঠিন কিছু নয়। কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছাই যথষ্ট। গ্রাহকরা প্রমাণ দিয়ে টাকা ফেরত নেবে। ইভ্যালির জন্য এখন একজন প্রশাসকও (রিসিভার) নিয়োগ করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ইভ্যালির সব সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষেই ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরত দেয়া যেতে পারে।

এছাড়া দেশে ভোক্তাস্বার্থ আইন আছে। ইভ্যালি মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। পণ্যের কথা বলে পণ্যও দেয়নি, টাকাও ফেরত দেয়নি। তাই এ আইনেও ইভ্যালির বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। কিন্তু এখানেও ‘গুরু পাপে লঘু দণ্ড’।

এক বা দুই বছর কারাদণ্ড বা জরিমানা- অতঃপর খালাস। কিন্তু তাতে এত বড় অর্থ কেলেঙ্কারির শাস্তি হয় না। বিদ্যমান আইনানুযায়ী শাস্তি যা হওয়ার হোক, হোক জরিমানাও। কিন্তু আম গ্রাহকদের চাওয়া একটাই-ক্যাশব্যাক, যে অফার ইভ্যালিই দিয়েছিল। ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে ই-কমার্স সেক্টরে। ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরত দেয়ার মাধ্যমেই শুরু হোক এ কাজ।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
শেখ রেহানার জন্মদিন: ‘দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো’
শুভ জন্মদিন ‘ছোট আপা’
সাধারণ তবুও অসাধারণ শেখ রেহানা
অসাধারণ নারীর সাধারণ জন্মদিন: সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা
শেখ রেহানা: নীরবে যিনি পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করেন

শেয়ার করুন

বিএনপি যে কারণে দাঁড়াতে পারছে না

বিএনপি যে কারণে দাঁড়াতে পারছে না

২০০৬ সালের পর থেকে গত ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। আবার তারা কবে ক্ষমতায় ফিরতে পারবে, তা কেউ জানে না। তবে বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী দল। গণতান্ত্রিক পন্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়াই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বার বার আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে হেরে ক্ষমতা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে বিএনপি।

রাজনীতি আসলে কৌশলের খেলা। কখনও কখনও অপকৌশলেরও খেলা। রাজপথে আমরা যা দেখি, সেটা সেই কৌশল বা অপকৌশলের শেষ ধাপ। তার আগে পর্দার পেছনে চলে আসল খেলা। সেই খেলায় আওয়ামী লীগের কাছে বার বার হেরে যাচ্ছে বিএনপি। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি।

কৌশলের অংশ হিসেবে দুদলই সমমনাদের কাছে টানে, জোট বানায়, জোট ভাঙে। অপকৌশলের অংশ হিসেবে সমমনা নয়, এমন দলের সঙ্গেও জোট হয়। রাজনীতির এই মেরুকরণের কোনো স্থির সমীকরণ নেই। যেমন একসময় আওয়ামী লীগ-বিএনপি যুগপতভাবে জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে।

সে আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত জাতীয় পার্টি পরে কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। একসময় হেফাজতে ইসলাম সরকার উৎখাতের স্বপ্নে ঢাকা দখল করতে এসেছিল। সেই হেফাজত এখন চলে সরকারের ইশারায়। আরেকটু পেছনে গেলে দেখা যাবে, জাসদের জন্মই হয়েছিল আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে। সেই জাসদের বড় একটি অংশ এখন আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী। তাই রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা বন্ধু বলে কিছু নেই। প্রয়োজনই বন্ধু ঠিক করে দেয়।

১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরতে ২১ বছর লেগেছিল। ২০০৬ সালের পর থেকে গত ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। আবার তারা কবে ক্ষমতায় ফিরতে পারবে, তা কেউ জানে না। তবে বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী দল। গণতান্ত্রিক পন্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়াই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বার বার আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে হেরে ক্ষমতা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে বিএনপি।

এরশাদ পতনের পর অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোয় দেখা গেছে আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভোট পাওয়ার হার ৩০-৩৫ শতাংশের মধ্যে। এই ভারসাম্য থেকে ক্ষমতায় যেতে বিএনপি কখনও জামায়াতকে কাছে, আওয়ামী লীগ টানে জাতীয় পার্টিকে।

কারণ আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে এই দুই দলেরই বলার মতো কিছু ভোট আছে, যা ক্ষমতার পাল্লা হেলিয়ে দিতে পারে। কিন্তু গত ১৫ বছরে বিশেষ করে গত ১২ বছরে ভোটের এই হিসাব যাচাই করার কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। বিএনপির ভোটব্যাংক কি অটুট আছে, নাকি কমেছে? সেটা জানার কোনো উপায় নেই।

বাংলাদেশের মতো দেশে সাধারণভাবে একটি সরকার ক্ষমতায় থাকলে, যত ভালো কাজই করুক, মানুষ তাদের বদলাতে চায়। সেখানে আওয়ামী লীগ টানা তিন দফায় ক্ষমতায় আছে। সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের ওপর বিরক্ত হলে তার সুবিধা পাবে বিএনপি। কিন্তু সেই সুবিধাটা পাওয়ার রাস্তাটাই খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি।

শুরুতে যেমন বলেছি, রাজনীতি আসলে কৌশল বা অপকৌশলের খেলা। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়- এই কৌশলে অনড় থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। সে নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপির ধারণা ছিল, নির্বাচনে না গিয়ে তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবে বা নির্বাচন ঠেকাতে পারবে কিংবা নির্বাচনের পর আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বাধ্য করতে পারবে। কিন্তু বিএনপি কোনোটাই পারেনি।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপিও আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে একটি নির্বাচন করেছিল। কিন্তু টিকতে পারেনি। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপিকে বাধ্য করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে যেটা পেরেছিল, বিএনপি ২০১৪ সালে সেটা পারেনি। তারপর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, এই দাবিতে অনড় থাকলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই তারা অংশ নেয়। কিন্তু ততদিনে আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠটি এমনভাবে দখল করে নেয়, বিএনপির আর তাতে ঢোকারই সুযোগ ছিল না।

২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করেছিল, আর ড. কামাল, জাফরুল্লাহ চৌধুরীদের পরামর্শে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভুল করেছে। দুটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালেচনা আছে। কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দায় ছাড়া আওয়ামী লীগের ঘাড়ে বিএনপি আর কিছুই দিতে পারেনি। দুটি নির্বাচন দিয়েই আওয়ামী লীগ টানা দেশশাসন করছে। বিএনপি নির্বাচনের মাঠে তো ঢুকতেই পারেনি, রাজপথেও প্রতিরোধ গড়তে পারেনি।

আওয়ামী লীগের মতো একটি পুরোনো ও গণতান্ত্রিক দলের জন্য ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন দুটি অবশ্যই বড় ধাক্কা। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই কৌশল শিখেছে বিএনপির কাছ থেকেই। জিয়াউর রহমান হ্যাঁ-না ভোট, ১৯৭৯ সালের নির্বাচন আর খালেদা জিয়ার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও একই দোষে দুষ্ট। এরশাদ আমলে ’৮৬ আর ’৮৮ সালের দুটি নির্বাচনও নির্বাচনি ব্যবস্থার কলঙ্ক হয়ে আছে। আসলে যে যখন সুযোগ পেয়েছে, সে তখন নির্বাচন নিয়ে অপকৌশলের খেলা খেলেছে। নির্বাচন নয়, আসলে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে কৌশল-অপকৌশলের খেলায়।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। আড়াই বছর আগেই নির্বাচনের প্রস্তুতির নির্দেশে অনেকেই আগাম নির্বাচনের গন্ধ পেয়েছেন।

যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তবে শেখ হাসিনার নির্বাচনি বলের পেছনে এখন ছুটছে রাজনীতি। অনেকদিন পর চাঞ্চল্য বিএনপি শিবিরেও। নিজেদের রাজনীতি ও কৌশল ঠিক করতে ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। বৈঠক এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের আলোচনায় উঠে এসেছে, পুরোনো কৌশলে ফিরে যাওয়ার দাবি।

বেশিরভাগ নেতাই বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে একদফার আন্দোলনের পক্ষে মত দিয়েছেন। গত দুটি নির্বাচনে না গিয়ে এবং গিয়ে বিএনপি যা শিখেছে, তাতে এর বাইরে অন্য কোনো কৌশলের কোনো সুযোগই নেই। নির্বাচন আগে হোক আর আড়াই বছর পরে হোক, বর্তমান সরকারের অধীনে তাতে অংশ নেয়া মানেই বিএনপির আরেকটি ভরাডুবি, এটা সবাই বোঝে। কিন্তু বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করল, আর আওয়ামী লীগ সেটা মেনে নিল, ব্যাপারটি অত সরলও নয়।

তাছাড়া টানা তিন দফায় ক্ষমতায় থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপির হাতে ক্ষমতা দিয়ে প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার মতো বোকাও আওয়ামী লীগ নয়। তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে চাইবে। তাই বিএনপির সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিটিই যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিএনপি তাদের এই যৌক্তিক দাবিটি আদায় করবে কীভাবে? সবাই নিশ্চয়ই বলবেন, আন্দোলন করে। কিন্তু আন্দোলন করে দাবি আদায়ের সক্ষমতা কি আছে বিএনপির?

গত একযুগে বিএনপি আন্দোলনের নানা চেষ্টা করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কঠোর হাতে সেসব দমন করেছে। একাধিকবার আন্দোলনের চেষ্টায় দলের শক্তিক্ষয় হয়েছে, নেতাকর্মীদের মামলার সংখ্যা বেড়েছে। আর পরিস্থিতি এখন আরও অবনতি হয়েছে।

দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ড মাথায় নিয়ে সরকারের অনুকম্পায় অন্তরীণ জীবনযাপন করছেন। তার যা বয়স এবং শরীরের যে অবস্থা, তাতে তিনি আর দলের নেতৃত্ব দেবেন বা আন্দোলনে নামবেন; তেমন বাস্তবতা নেই। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও দণ্ড মাথায় নিয়ে পালিয়ে আছেন। তাই এ অবস্থায় নেতৃত্ব শূন্যতাই বিএনপির সবচেয়ে বড় সংকট।

তাছাড়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মাঠে থাকা দলটি এখন কেন মাঠে নামতে পারছে না, সেটাও বিশ্লেষণ করা দরকার। বৃহত্তর আন্দোলনে নামার আগে বিএনপির নিজেদের সক্ষমতা যাচাই এবং আত্মসমালোচনা জরুরি।

এটা ঠিক, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন, বর্তমান সময়ের ন্যূনতম রাজনৈতিক দাবি। বিএনপির লক্ষ্যটাও পরিষ্কার- সুষ্ঠু নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথটা বড়ই বন্ধুর। সেই বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর সামর্থ্য বিএনপির আছে কি না, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
শেখ রেহানার জন্মদিন: ‘দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো’
শুভ জন্মদিন ‘ছোট আপা’
সাধারণ তবুও অসাধারণ শেখ রেহানা
অসাধারণ নারীর সাধারণ জন্মদিন: সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা
শেখ রেহানা: নীরবে যিনি পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করেন

শেয়ার করুন

ঈশ্বরদীর ট্রেন হামলা: শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার রায় কার্যকর হোক

ঈশ্বরদীর ট্রেন হামলা: শেখ হাসিনাকে
হত্যাচেষ্টার রায় কার্যকর হোক

আজ ২৩ সেপ্টেম্বর। ২৭ বছর আগে ১৯৯৪ সালের এদিনে পাবনার ঈশ্বরদীতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনের কামরায় অতর্কিত হামলা করে ক্ষমতাসীন সরকারে মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীরা। সেদিন তিনি সাংগঠনিক সফরে খুলনা থেকে রাজশাহীতে ট্রেনে যাচ্ছিলেন। পথে ঈশ্বরদী স্টেশনে তার নির্ধারিত পথসভা ছিল। তাকে বহনকারী ট্রেনটি পাকশী স্টেশনে পৌঁছার পর পরই ট্রেনে ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলা চালানো হয়।

সাহস তাকে পরাভূত হওয়ার সব শক্তিমত্তাকে পর্যুদস্ত করে দেয়। সাহসের বরাভয় কাঁধে তিনি এগিয়ে চলছেন। কোনো বাধা-বিপত্তি তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না, পারেনিও। আদর্শ ও লক্ষ্যে অবিচল নিষ্ঠা, কর্মকুশলতা, দক্ষতা, যোগ্যতা তাকে ধরে রাখে বাংলার অন্তরের গভীর অন্তরে, মানুষের জেগে ওঠার, বেড়ে ওঠার অনন্তর আবেগে। আলোকের ঝরনাধারায় দেশ ও দেশবাসীকে রাঙিয়ে দিতে কুণ্ঠাহীন তিনি। তেজস্বী মনোভাব তাকে দমিয়ে রাখার ক্ষেত্রকে করে সংকুচিত। সবুজ-শ্যামলে মোড়া বাংলাদেশকে পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় উন্নীত করতে নিরন্তর নিবেদিত তিনি।

একাত্তরের পরাজিত শক্তি এখনও ওঁত পেতে আছে প্রতিশোধে। পঁচাত্তরের ঘাতক বাহিনী, যারা হত্যা করেছে পিতা-মাতা-ভাইসহ স্বজনদের, তারা চায় তার বিনাশ। তাকে নির্জন করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী পাকিস্তানি ধারায় ফিরে যেতে চায়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর দেশটাকে তারা পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে তিনি ফিরিয়ে এনেছেন স্বাধীনতার স্বপ্নবাহী পথে। সেই পথ মসৃণ নয়। অনেক চড়াই-উতরাই। সেসব পথ মাড়িয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। তিনি শেখ হাসিনা।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যা সম্পূর্ণ হয়নি, সেটাই বার বার করার চেষ্টা করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীচক্র। সেই ’৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকেই ঘাতকের নিশানায় বঙ্গবন্ধুকন্যা। নানা সময়ে নানাস্থানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। কখনও সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, কখনও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের অনুসারী, কখনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী গোষ্ঠীর ইন্ধন ও সহযোগিতায়। আর প্রতিটি ঘটনার পর রাজনৈতিক যোগসূত্র মিলে যায় ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বেনিফিশিয়ারি দলগুলোর কার্যক্রমের সঙ্গে।

কোনো কোনো হত্যাচেষ্টায় আওয়ামীবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ‘শত্রুর শত্রু, আমার মিত্র’ এই আদর্শে ঘাতকদের পক্ষ নিয়েছিল। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ পর্যন্ত ২১ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টায় তাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড-বোমা ও গুলির হামলা হয়েছে। প্রতিটি হামলায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাই ছিলেন হত্যাকারীদের মূল টার্গেট। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বার বার বুলেট-বোমা তাড়া করে বেড়ায় তাকে? কেন বার বার হত্যাকারীদের মূল লক্ষ্য শেখ হাসিনা?

আজ ২৩ সেপ্টেম্বর। ২৭ বছর আগে ১৯৯৪ সালের এদিনে পাবনার ঈশ্বরদীতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনের কামরায় অতর্কিত হামলা করে ক্ষমতাসীন সরকারে মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীরা।

সেদিন তিনি সাংগঠনিক সফরে খুলনা থেকে রাজশাহীতে ট্রেনে যাচ্ছিলেন। পথে ঈশ্বরদী স্টেশনে তার নির্ধারিত পথসভা ছিল। তাকে বহনকারী ট্রেনটি পাকশী স্টেশনে পৌঁছার পর পরই ট্রেনে ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলা চালানো হয়। ট্রেনটি ঈশ্বরদী পৌঁছানোর পরও একইভাবে বোমা ও গুলিবর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় ঈশ্বরদী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন।

মামলাটি চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে শেষ করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার। মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করা হলেও আদালত তা গ্রহণ না করে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালের ৩ এপ্রিল ৫২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। পরে মামলায় ধারাবাহিকভাবে ৩৮ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়।

১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে ২১ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। দেশের বাইরেও তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে। এসব হামলায় ৬৬ জন দলীয় নেতাকর্মী নিহত হন। আহত কয়েক হাজার। চিরতরে পঙ্গু ও শারীরিক সক্ষমতা হারিয়েছেন শতাধিক নেতাকর্মী। যাদের প্রাণহানি ঘটেছে সেই পরিবারগুলো এখনও বিচার পায়নি।

উল্লেখ করার মতো, এরশাদ আমলে দুবার, ১৯৯১ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে চারবার, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে চারবার, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকার আমলে চারবার (২১ আগস্টসহ), সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে একবার ও আওয়ামী লীগের বর্তমান আমলে চারবার হত্যাচেষ্টার প্রকাশ্য ঘটনাগুলো উল্লেখ করার মতো। শুধু ঢাকাতেই শেখ হাসিনার ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয় সাতবার। প্রতিটি ঘটনায় মামলা হলেও বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে কয়েকটির। ২৩ সেপ্টেম্বরের হামলা এর একটি।

বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম আদালত ভবনের পাশে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২৪ দলীয় নেতাকর্মীকে হত্যা করে। তাদের মধ্যে ১০ জন মারা যান নেত্রীকে ‘মানববর্ম’ তৈরি করে রক্ষা করতে গিয়ে। এ ঘটনায় ৫ পুলিশের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয়ের সামনে তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। তখন মারা যান যুবলীগকর্মী নূর হোসেন। ’৮৯ সালের ১১ আগস্ট ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে হামলা করে ফ্রিডম পার্টি। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে।

১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে ফ্রিডম পার্টির কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে একটি সন্ত্রাসী দল। এই মামলার রায় হয়েছে। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচন চলাকালে রাজধানীর গ্রিন রোডে গাড়ি থেকে নামতে ২০/২৫ জন সন্ত্রাসী গুলি ও বোমা হামলা চালায়। এরা সবাই বিএনপির কর্মী। ১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ধানমন্ডির রাসেল স্কোয়ারে জনসভায় শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ১৯৯৬ সালের ৪ মার্চ টঙ্গীর বিশ্ব এজতেমার আখেরি মোনাজাত থেকে ফেরার পথে রবীন্দ্র সরণির মোড়ে সন্ত্রাসীরা শেখ হাসিনার গাড়িতে হামলা চালায়।

১৯৯৬ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে বক্তৃতা দেয়ার সময় মাইক্রোবাস থেকে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করে একদল সন্ত্রাসী। ১৯৯৯ সালের ২৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের গেটে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে বোমা ফাটায় সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনায় ৬ জন গ্রেপ্তার হয়।

একই সালের ১১ জুলাই ভুয়া ই-মেইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পুত্র-কন্যাসহ ৩১ জনকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান সরকারি কলেজের পাশ থেকে ৭৬ কেজি এবং ২৩ জুলাই হেলিপ্যাডের কাছে ৪০ কেজির দুটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করেন সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা। ২২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে এক জনসভায় বক্তব্য রাখার কথা ছিল।

২০০১ সালের ৩০ মে খুলনার রূপসা সেতুর কাজ উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ঘাতকচক্র সেখানে শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখে। বিস্ফোরণের আগেই বোমাটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় গোয়েন্দা পুলিশ। ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সিলেটে নির্বাচনি জনসভায় শেখ হাসিনাকে হুজিবি বোমা পেতে হত্যার পরিকল্পনা করে। সভাস্থলের ৫০০ গজ দূরে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরিত হয়ে জঙ্গিদের দুজন নিহত হলে চক্রান্ত ভেস্তে যায়।

২০০২ সালের ৪ মার্চ নওগাঁয় শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা হয়। ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট শেখ হাসিনা সাতক্ষীরার কলারোয়ায় গেলে তার গাড়িবহরের ওপর গুলি ও বোমা হামলার ঘটনা ঘটে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দলের মিছিল-পূর্ব সমাবেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা।

শেখ হাসিনা সেদিন অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও মারা যান আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী। রক্তাক্ত ২১ আগস্টের এমন লোমহর্ষক ঘটনার উদ্দেশ্য আজ আর কারো অজানা নয়। আহতদের অনেককেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। অনেকেই ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। আলোচিত এ মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে।

২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র হামলা করে হুজি, জেএমবি, জামায়াত ও বিএনপি মিলে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে।

জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাব-জেলে তাকে স্লো-পয়জনিংয়ের মাধ্যমে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। ২০১৫ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভায় যাওয়ার পথে কারওয়ান বাজারে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জেএমবি। ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন। এছাড়াও বেশ কয়েকটি ষড়যন্ত্র হয়েছে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টায়, কিন্তু ঘাতকরা সফল হয়নি।

ফিরে দেখা ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪

হামলার পরদিন (২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪, শনিবার) বিভিন্ন পত্রিকায় এ ঘটনা নিয়ে নানা শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জাতীয় একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়- “গতকাল শুক্রবার ঈশ্বরদীতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনে গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলা চালানো হয়েছে। ট্রেনযোগে গণসংযোগ কর্মসূচি পালনের একপর্যায়ে খুলনা থেকে ঈশ্বরদী পৌঁছালে এ ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে ঈশ্বরদী স্টেশনে ট্রেনটি প্রবেশের সময় কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষিত হয় একটি বগিকে লক্ষ্য করে। ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে কড়া পুলিশবেষ্টনীর মধ্যে উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষের উদ্দেশে শেখ হাসিনার বক্তৃতাকালে বোমা বিস্ফোরিত হয়। গতকাল শেখ হাসিনা সকাল ৯টা ১০ মিনিটে খুলনা থেকে রওয়ানা হন। ১১টি স্টেশনে সমাবেশ-জনসভায় বক্তৃতা শেষে ঈশ্বরদী এসে পৌঁছালে তিনি হামলার শিকার হন। ঈশ্বরদী স্টেশনে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিবেদক। তারা জানায়, সরকারি দলের সমর্থিত মস্তান বাহিনী এ হামলা চালিয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে বিএনপি সমর্থকরা ঈশ্বরদী স্টেশনে আওয়ামী লীগকে সমাবেশ করতে বাধা দেয়। দিনব্যাপী ব্যাপক বোমা হামলায় ভীত ঈশ্বরদী স্টেশনের লোকজন অভিযোগ করে, পৌর চেয়ারম্যানের সমর্থনপুষ্ট মাস্তানরা এ হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে। বোমা হামলা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ঈশ্বরদীতে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে।’

স্টেশনে উপস্থিত আওয়ামী লীগকর্মীদের অভিযোগের তির একজন প্রতিমন্ত্রীর দিকে। তার নির্দেশে এ হামলা চালানো হয়েছে। সন্ধ্যায় রেলস্টেশনে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন ছিল। সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগের মঞ্চও পুড়িয়ে দিয়েছে। ৬টা ৪৫ মিনিটে শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষে ট্রেনটি ঈশ্বরদী স্টেশন ছাড়লে ট্রেনটি লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা ছাড়া হয়। শেখ হাসিনার নির্ধারিত সভাকে কেন্দ্র করে শহরে এবং সভামঞ্চের কাছাকাছি ব্যাপক বোমা হামলা ও সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। জনসভায় গোলযোগের সময় মাথায় বোমার আঘাতে গুরুতর আহত হন যুবলীগকর্মী স্বপন।’

উল্লেখ্য, ২১ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদীতে বিএনপি ও ছাত্রদলের এক বিক্ষোভ মিছিল ঈশ্বরদী শহর প্রদক্ষিণ করে আওয়ামী লীগের সভামঞ্চের কাছে দুপুর ১২টার দিকে উপস্থিত হয় এবং মঞ্চ ভাঙচুর করে। মঞ্চ নির্মাণে যুক্ত কর্মীদের ওপর হামলা করা হয়। এ সময় ১৫ জন আহত হয়। মঞ্চের কাছে বিক্ষোভকারীদের বোমাবাজির কারণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুর রহমান শরীফের বাসভবনে সমবেত হন। এ সময় গোটা শহরে বোমাবাজি চলতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের হাজারখানেক কর্মী মিছিল করে ঈশ্বরদী থানা অতিক্রম করার সময় তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় পুলিশ এক রাউন্ড গুলি, এক রাউন্ড রাবার বুলেট এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। আওয়ামী লীগের মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে নেতৃবৃন্দ পুলিশের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে মঞ্চের কাছাকাছি উপস্থিত হন।”

ঘটনায় সরকারের প্রেসনোট

১৯৯৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সরকারের দায়সারা একটি প্রেসনোট ছাপা হয়। এতে শেখ হাসিনার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। ওই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেসনোটে বলা হয়েছিল, গতকাল বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তাকে বহনকারী ট্রেনটিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে বলে যে অভিযোগ করেছেন, তার প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সরকার জানাতে চায় যে, প্রাথমিক রিপোর্টে বিরোধীদলীয় নেত্রীর এ অভিযোগের কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিরোধীদলীয় নেত্রী স্টেশনে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা পূর্বে পরস্পরবিরোধী কতিপয় রাজনৈতিক দলের উচ্ছৃঙ্খল সমর্থকরা উল্লিখিত স্টেশন দুটির আশপাশে ধাওয়া-পালটা ধাওয়ায় লিপ্ত হয় এবং পটকা বিস্ফোরণ ঘটায়।

শুধু সরকারি প্রেসনোটই নয়, সেসময় ওই অঞ্চলের বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটল বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপর ঈশ্বরদী ও নাটোরে গুলিবর্ষণের কথিত অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য, বানোয়াট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন- ‘জাতীয় রাজনীতিতে চমক সৃষ্টির বা অতীত ঐতিহ্য আওয়ামী লীগের রয়েছে সাংবাদিক সন্মেলনের বক্তব্যে সেটাই প্রকাশ পেয়েছে।’ তার এই ভাষ্য প্রেসনোটের ভাষাকে হার মানায়। সেই মন্ত্রী আজ প্রয়াত। কিন্তু তাকে ওই হত্যাচেষ্টার অন্যতম ‘ভিলেন’ হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত করেছে।

আশার কথা, ২০২১ সালের ৩ জুলাই এই হামলার মামলার রায়ে নয়জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। একই মামলায় ২৫ জনকে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ১৩ জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড হয়েছে। আলোচিত এ মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নয়জন আসামির প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া ২৫ জনের প্রত্যেককে তিন লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুবছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। আর ১৩ জনের প্রত্যেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। হত্যাচেষ্টার বেশকয়েকটি মামলায় অপরাধীদের সাজা দিয়েছে আদালত। কিছু মামলার রায় কার্যকর নিয়ে রয়েছে এখনও আইনি প্রক্রিয়া চলমান। ২৩ সেপ্টেম্বরের মামলায় আসামিদের সাজা কার্যকর করা সময়ের দাবি।

বাঙালির আশার বাতিঘর শেখ হাসিনা। তিনি তার জীবনকে বাংলার মেহনতি দুঃখী মানষের কল্যাণে উৎসর্গ করে এগিয়ে যাচ্ছেন বিশ্ব মানবতার দিকে দুর্বার গতিতে। গণমানুষের কল্যাণই তার রাজনীতির মূল দর্শন। ১৯৭৫ সালের শুরুতেই প্রশ্ন ছিল কেন শেখ হাসিনা টার্গেট।

১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর ১৯৮১ সালের শুরুতে দলের দায়িত্ব নিয়ে দলকে তিনি শুধু চারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ই আনেননি; বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে যেমনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি উদার, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি এখন তিনি। বাঙালির জাতীয় বোধ জাগ্রত রাখার কারিগর শেখ হাসিনা। যার হাতে বাঙালি রাষ্ট্র ও বাঙালির সংস্কৃতি নিরাপদ। জঙ্গিবাদকে নির্মূল ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই। আর এ কারণেই তার নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য বার বার তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে ঘাতকচক্র।

আদর্শিক বিরোধের কারণে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানকে নির্মূল করার এমন পাশবিক ঘটনা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। শেখ হাসিনা বার বার বুলেট ও গ্রেনেডের মুখ থেকে বেঁচে ফেরা এক বহ্নিশিখা। তিনি মানবতার জননী। বিশ্বের এক রোল মডেল। তাকে হত্যার জন্য কম প্রচেষ্টা চালানো হয়নি। এখনও তৎপর ঘাতককুল। কিন্তু জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত তিনি অপ্রতিরোধ্য অদম্য বাংলাদেশ গড়ে তুলছেন। কোনো ভয় তাকে কাবু করতে পারে না। জাতিকে তিনি অভয়মাঝে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্রমান্বয়ে। জয় হোক অভয়ের।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
শেখ রেহানার জন্মদিন: ‘দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো’
শুভ জন্মদিন ‘ছোট আপা’
সাধারণ তবুও অসাধারণ শেখ রেহানা
অসাধারণ নারীর সাধারণ জন্মদিন: সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা
শেখ রেহানা: নীরবে যিনি পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করেন

শেয়ার করুন

‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’

‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’

শরতের শান্ত শ্যামল রৌদ্রছায়ার সঙ্গে ধানের খেতে ঢেউ খেলে যায় আবহমান বাংলার কৃষকের প্রাণ। কারণ কৃষিভিত্তিক এ দেশে শরৎই আগাম বারতা নিয়ে আসে সুদিনের সুদৃঢ় নিশ্চয়তার, বেঁচে থাকার অনিঃশেষ আশ্বাস জানিয়ে দেয়, নবান্ন সমাগত।

আষাঢ়-শ্রাবণের অঝোর বর্ষণ শেষে মেঘাচ্ছন্ন সকাল ধীরে ধীরে উজ্জ্বল, পরিপাটি হতে থাকে। পাতার ফাঁক গলে সোনালি সূর্যের কিরণ মৃত্তিকার বুকে অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে আসে শ্বেতশুভ্র শরৎ।
এবারেও শরৎ এসেছে চুপিচুপি, ঠিক গেল বছরের মতো। শ্রাবণের রেশ এখনও কাটেনি। থেমে থেমে বৃষ্টি, বর্ষাকেই মনে করিয়ে দেয় প্রবলভাবে৷ মহামারি না কি জলবায়ুর পরিবর্তন; কোন কারণে ঋতু বৈচিত্র্যের এ অঞ্চলের ঋতুরা ভিন্ন আচরণ করছে বোঝা যাচ্ছে না। অথচ শুভ্রাকাশে সাদা মেঘের সঙ্গে হালকা মৃদুমন্দ হাওয়া মিলেমিশে তৈরি হওয়া চমৎকার মনমোহন আবেশই বলে দিত শরৎ এসেছে।
ঋতু বৈচিত্র‍্যের সেই প্রকৃতি কেমন যেন পাল্টে গেছে। বছরের অল্প কিছু সময় বাদ দিলে বাকি সময়টা তীব্র গরমের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মাঝেমধ্যে বৃষ্টিও হয়। সেই বৃষ্টিতে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে ভ্যাপসা গরমে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের জাঁতাকলে পড়ে শরৎ তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে অনেকখানি, বিন্যাসে এসেছে পরিবর্তন। তাই তো শরতের এই দ্বিতীয় পক্ষেও বলতে হচ্ছে 'আবার শ্রাবণ হয়ে এলে ফিরে, মেঘ-আঁচলে নিলে ঘিরে'।
শরৎ ঠিক তেমনই এক ঋতু যা শীত-গ্রীষ্মের মেলবন্ধন তৈরি করে। শরতের শেষদিকে শীতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে সবাই। বর্ষার অনুজ্জ্বল দিনের পর শরতের হালকা সাদা মেঘের মতো আমাদের মনও যেন হালকা হতে থাকে। শরতের দিনগুলোকে তাই স্বপ্নের মতোই মনে হয়। মনের গহীনে ছড়িয়ে থাকা নানা রকমের স্বপ্ন কুড়িয়ে আমরা ভবিষ্যতের মালা গাঁথি।

শরতের আকাশ-বাতাস, নদী-ফুল, প্রকৃতি; সবকিছুই শান্ত স্নিগ্ধ মায়াময়। বিলের শাপলা, নদীতীরের কাশফুল, উঠোনের শিউলি সবই কোমল, স্নেহমাখা। যখন বিলের মন্থর বাতাসে দোল খায় শাপলা ফুলেরা, যখন টুপটাপ ঝরে পড়ে শিউলি ফুল, যখন ঢেউহীন শান্ত নদীর দুকূল ছাপিয়ে দৃশ্যমান হয় কাশবনের রুপালি নান্দনিক দৃশ্য, তখনই মনোজগতে অনুভূত হয়- শরৎ এসেছে।
শরতের স্নিগ্ধতাকে মোহময় করে তোলে এ মৌসুমের বিচিত্র ফুলেরা। নদী কিংবা জলাশয়ের ধারে ফোটে কাশ, ঘরের আঙিনায় শিউলি বা শেফালি, খাল-বিল, পুকুর-ডোবায় থাকে অসংখ্য জলজ ফুল। শেষরাতে মৃদু কুয়াশায় ঢেকে থাকা মায়াবী ফুলেরা যেন আরও রূপসী হয়ে ওঠে।

শিশিরভেজা শিউলি, বাতাসে মৃদু দোল খাওয়া কাশবনের মঞ্জরি, পদ্ম-শাপলা-শালুকে আচ্ছন্ন জলাভূমি শরতের চিরকালীন রূপ। সত্যিই বিচিত্র রূপ নিয়ে শরৎ আমাদের চেতনায় ধরা দেয়। মেঘ, আকাশ আর কাশফুলের ছায়া পড়ে নদীর নীলজলে। এমন মনোলোভা দৃশ্য শরৎ ছাড়া অন্যকোনো ঋতুতে দেখা পাওয়া ভার।
প্রকৃতির এক শুদ্ধ রূপ শরৎ। শরতের প্রকৃতি বর্ষার অবগুণ্ঠন ভেদ করে শুভ্রতার আচ্ছাদনে আবিষ্ট হয়ে অনন্য সাধারণ হয়ে ওঠে। জলহারা শুভ্র মেঘের দল নীল নির্জন নির্মল আকাশে উদ্দাম ভেসে বেড়ায়। সেই সঙ্গে কাশফুলের মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া প্রকৃতিতে শুধুই মুগ্ধতা ছড়ায়। তখনই স্নিগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে স্মৃতিতে দোলা দেয়, চঞ্চল চপলতায় নিমগ্ন হতে মন চায়।

সোনা ঝরা সকাল, নির্লিপ্ত দুপুর, রুপালি বিকেল কিংবা শান্ত নির্মেঘ সন্ধ্যার পর ভরা পূর্ণিমায় উদ্ভাসিত আলোয় স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে চরাচর। অলৌকিক সৌন্দর্যে মোহময় মায়ায় প্রবল ঘোর তৈরি হয়। কবিগুরুর বন্দনাতেও সেই মুগ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। এই শরতেই প্রিয়তমাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন- “তোমায় দেখেছি শারদ প্রাতে, তোমায় দেখেছি মাধবী রাতে।”
কামিনী শেফালী টগর ছাতিম কাশফুল আর গগনশিরীষের শৈল্পিক শুভ্রতার সঙ্গে দিনভর মায়াময় আলোছায়ার খেলা আর রাতের স্নিগ্ধ মোহময় জ্যোৎস্না গায়ে মেখে রোজকার জীবনের কঠিন বাস্তবতায় হতাশা আর কষ্টের মাঝেও শুভ্রতার পরশে সজীব হয়ে ওঠে প্রাণ। বিমগ্ন হৃদয় আত্মহারা হয়ে দুঃখকে সাথি করেই এগিয়ে যেতে চায়- “দুঃখকে আজ কঠিন বলে,/ জড়িয়ে ধরতে বুকের তলে,/ উধাও হয়ে হৃদয় ছুটেছে,/ প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে।”

নদীর তীরে, বনের ধারে, মেঠোপথে, গ্রামের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, এমনকি শহরের কোলাহলেও একটুখানি জলমগ্ন স্থানে অপরূপ শোভা ছড়িয়ে বিকশিত হয় কাশফুল । বিলে-ঝিলে শাপলা-শালুক, পদ্মরা মেলে ধরে তাদের মোহময় মাধুর্য। এমন নিরুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুলকিত করেনি তেমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শরতের শান্ত স্নিগ্ধ রূপ মনে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়- “শরৎ-আলোর আঁচল টুটে,/ কিসের ঝলক নেচে উঠে,/ ঝড় এনেছ এলোচুলে,/ তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে।” শরৎকে কি ভোলা যায়?

নির্জন মাঠে নিঃশব্দে বেড়ে ওঠা সবুজ ধানের নয়নাভিরাম দৃশ্য, শুধু কৃষকের হৃদয় মন জুড়ায় না, প্রতিটি প্রাণ উন্মনা হয়, চোখে সোনালি স্বপ্ন খেলা করে, খুশির ঝিলিক বয়ে যায়।

শরতের শান্ত শ্যামল রৌদ্রছায়ার সঙ্গে ধানের খেতে ঢেউ খেলে যায় আবহমান বাংলার কৃষকের প্রাণ। কারণ কৃষিভিত্তিক এ দেশে শরৎই আগাম বারতা নিয়ে আসে সুদিনের সুদৃঢ় নিশ্চয়তার, বেঁচে থাকার অনিঃশেষ আশ্বাস জানিয়ে দেয়, নবান্ন সমাগত।

নিস্তরঙ্গ জীবনে বাংলার ঋতুরা বৈচিত্র্য আর ভালোবাসার পসরা নিয়ে আসে প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দিতে। সুখ-দুঃখের একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর জীবনে একটুখানি অনুরক্তি আসক্তি দোলা দেয়, আশা জাগায়।

স্নিগ্ধ শান্ত শুভ্র শরৎও হৃদয়কে আর্দ্র করে, অবসাদ দূর করে জাগতিক জীবনে এনে দেয় অপার্থিব মোহনীয় কাব্যময়তা। বেঁচে থাকাটা অর্থপূর্ণ মনে হয়। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব বাদ দিয়ে বিচিত্রতর উপলব্ধি নিয়ে সামনের পানে এগোতে ইচ্ছে করে-“আমার রাত পোহালো শারদ প্রাতে। বাঁশি, তোমায় দিয়ে যাব কাহার হাতে।”

হৃদয়ের গোপন গভীর থেকে আত্মতুষ্টির রিনিঝিনি দ্যোতনা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র অস্ত্বিত্বে, নতুন করে বাঁচার অনুভূতি জাগে- জীবন সত্যিই আনন্দময়।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক।

আরও পড়ুন:
শেখ রেহানার জন্মদিন: ‘দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো’
শুভ জন্মদিন ‘ছোট আপা’
সাধারণ তবুও অসাধারণ শেখ রেহানা
অসাধারণ নারীর সাধারণ জন্মদিন: সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা
শেখ রেহানা: নীরবে যিনি পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করেন

শেয়ার করুন

চলমান শিক্ষাভাবনা

চলমান শিক্ষাভাবনা

একটি জাতির সংস্কৃতি তার ভাষার বাহনে চড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা হারিয়ে ফেললে প্রজন্ম সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফলে যেকোনো অশুভ শক্তি আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করতে পারবে সহজে। পাকিস্তানি শাসকচক্র এ সত্য ১৯৪৭ সালেই বুঝেছিল। তাই বাংলা ভাষার ওপরই প্রথম আঘাত করে। আমাদের পূর্বসূরিরা আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে আত্মপরিচয়কে সমুন্নত রাখতে পেরেছিল। কিন্তু চৈতন্য-বিচ্ছিন্ন আমরা নানাভাবে একে লালন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

সম্প্রতি স্কুলশিক্ষায় নতুন কারিক্যুলাম-ভাবনা উপস্থাপন করেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। এ রূপকল্প ২০২৩ থেকে কার্যকর করার কথা রয়েছে। প্রাথমিক দৃষ্টিতে রূপকল্পটি উৎসাহব্যঞ্জক। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসবে বলে আমরা মনে করি। তবে কিছু ক্ষেত্রে পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কারের অবকাশ রয়েছে। আশা করব দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মন্ত্রণালয় সেসব বিষয় বিবেচনা করবে। এখানে বড় প্রশ্ন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি নিয়ে আমরা কতটা সক্রিয় হতে পারছি এবং সে বিষয়টির ওপর কতটা দৃষ্টি দেয়া হচ্ছে।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভাষা প্রশ্নে নড়েচড়ে ওঠি। বাংলা ভাষার মর্যাদা নিয়ে কথা বলি। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে পৃথিবীর তাবৎ ভাষার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিয়ে আমাদের দায়দায়িত্বের কথাও বলি।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে মুখর-মুখরা জ্ঞানীজন টকশো মুখরিত করে। চমৎকার শব্দমালায় বক্তৃতার মঞ্চ আমোদিত হয়। পত্রিকার পাতায় নানা শিরোনামে প্রকাশিত হয় নিবন্ধ। আসলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিনগুলোর গুরুত্ব এখানেই যে, অন্তত সেই বিশেষ দিন যে চৈতন্য ধারণ করে আছে, সারা বছর তা পাথরচাপা থাকলেও বছরের বিশেষ সময়ে দৃশ্যমান হয়। এতেও যদি নতুন করে দেশের কিছুসংখ্যক মানুষ এবং নীতিনির্ধারকগণ প্রাণিত হতে পারে- তাহলেইবা মন্দ কী!

একুশ আমাদের অহঙ্কার হলেও একুশের মূল চেতনা থেকে আমরা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছি। এটি আমাদের সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষা সংকটের বড় দিক। এ সংকট তৈরি হচ্ছে প্রধানত সংস্কৃতিবোধ ও ইতিহাস চেতনা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে। যেখানে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চা জরুরি সেখানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন শিক্ষার ধারায় ইতিহাস পাঠকে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে।

ভাষা-আন্দোলনের পর প্রায় সত্তর বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যতটুকু বিকাশ ঘটার কথা ছিল তার সিকিভাগও হয়নি। কিছু ক্ষেত্র আবার অপূর্ণ স্বাজাত্যবোধের কারণে ভূতের পায়ে হেঁটে পিছিয়েও গেছে। এমন কথাও চলে আসছে যে, বিশ্বায়নের যুগে বাংলা ভাষাচর্চা অত জরুরি কেন? এখন বিশ্ব-সংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসাব- বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে পড়ে থাকা কেন? ফলে একই দেশে তিন-চার ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা অসম প্রতিযোগিতায় এগোচ্ছে। এই জগাখিচুড়ির মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি।

স্পষ্টতই চারটি শিক্ষাধারা এখন প্রচলিত। মূলধারার বাংলা মাধ্যম স্কুল এবং এর ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, আলিয়া-ধারার মাদ্রাসা এবং কওমি মাদ্রাসা। আগে বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর পাঠক্রম ও পরিচর্যাতে বাংলাচর্চায় ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের সচেতনতা যতটা ছিল, এখন আর তেমনটি নেই। এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলে এ প্লাস বা স্বর্ণখচিত এ প্লাস পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকগণ শুদ্ধ বানান ও ভাষায় বাংলাচর্চার দিকে মনোযোগ দেয়ার সময় পাচ্ছে না।

তাই দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন ভুল বানান আর দুর্বল বাক্যগঠনে উত্তরপত্র লেখে তখন বোঝা যায় সংকটটি কোথায়। আমার মতো ষাটোর্ধ্ব অনেকেই স্মরণ করতে পারবে শুদ্ধ বানান আর বাক্যে বাংলা-ইংরেজি লেখাটা স্কুলই শিখিয়ে দিত। এখন এসবের ধার ধারে না কেউ।

এক পৃষ্ঠা ইংরেজি লেখায় একটি শব্দের বানানে ‘ই’-এর বদলে ‘এ’ হয়ে গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়। এমন আকাটমূর্খ ছাত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন শিক্ষক-অভিভাবক। অপরদিকে বাংলা বানান পাঁচটা ভুল করলেও অর্ধেকটা চোখে পড়ে শিক্ষকের। বাংলা বানানে ভুল আর বাক্য গঠনে সাধু-চলিত মিশে গেলেও তা গর্হিত অপরাধ নয় জেনে শিক্ষার্থী অবিচল থাকে। এ কারণে বর্তমানে শিক্ষকতায় আসা (স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত) তরুণ শিক্ষকদের একটি বড় অংশের বাংলা ভাষা আর বানানের দুর্বলতা তাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পল্লবিত হচ্ছে।

অপরদিকে বিশ্বায়নের অপূর্ণ ব্যাখ্যায় আর চারপাশের ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার দাপটে মূলধারার বাংলা মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীরা এক ধরনের হতাশা ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে না ঘরকা না ঘাটকা দশায় পৌঁছেছে।

ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে দ্রুত। দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি শেখার তেমন অবকাশ নেই এদের পাঠক্রমে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন এ প্রজন্মের অনেকে। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, এ ধারার শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠক্রম বিন্যাসের দুর্বলতার কারণে যতটা ভালো ইংরেজি বলতে পারছে তত ভালো দখল দেখাতে পারছে না ইংরেজি ভাষা ও গ্রামারে। বিশেষ করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এদের মধ্যে দেশাত্মবোধ তৈরি হওয়াটা খুব কঠিন।

আলিয়া-ধারার মাদ্রাসাশিক্ষা বাংলা মাধ্যমের সঙ্গে অনেকটাই সম্পর্কিত। তাই বাংলা মাধ্যম শিক্ষার অনুরূপ সংকট এই অঞ্চলেও রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সংকটে আছে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ কওমি মাদ্রাসায় পড়ে। আরবি, ফারসি ও উর্দু কওমি মাদ্রাসার শিক্ষামাধ্যম। বাংলা ও ইংরেজির সঙ্গে এদের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। দেশ, জাতি ও জাতীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অনেকের ধারণাই খুব অস্পষ্ট। এরা নিজেদের এবং দেশ ও সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে।

একটি জাতির সংস্কৃতি তার ভাষার বাহনে চড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা হারিয়ে ফেললে প্রজন্ম সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফলে যেকোনো অশুভ শক্তি আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করতে পারবে সহজে। পাকিস্তানি শাসকচক্র এ সত্য ১৯৪৭ সালেই বুঝেছিল। তাই বাংলা ভাষার ওপরই প্রথম আঘাত করে। আমাদের পূর্বসূরিরা আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে আত্মপরিচয়কে সমুন্নত রাখতে পেরেছিল। কিন্তু চৈতন্য-বিচ্ছিন্ন আমরা নানাভাবে একে লালন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

এক ধরনের উগ্র আধুনিকতা ও অপূর্ণ বৈশ্বিক ভাবনা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজার অর্থনীতির বিকৃত ধারণা থেকে আমরা বাঙালি সংস্কৃতির বিকলাঙ্গ অবয়ব উপস্থাপন করছি। আমাদের চারপাশে অর্থবিত্তে আভিজাত্য খোঁজা অনেক পরিবারকেই পাওয়া যাবে যাদের বাংলা ভালো বলতে না পারা বা লিখতে না পারার মধ্যে এক ধরনের অহমিকার ছোঁয়া থাকে।

আমার শিক্ষক প্রয়াত খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিক ক্লাসে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি গল্প বলেছিলেন। ভাষা প্রশ্ন সামনে এলে এ গল্পটি নতুন করে মনে পড়ে আমার। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে স্যার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ছিলেন। সে সময়ে তাদের বাসায় এক বিহারি ভিক্ষুক আসত। ভিক্ষা চাইত তার ভাষা উর্দুতে। মুক্তিযুদ্ধের পর একদিন স্যারের দরজায় সেই বৃদ্ধ ভিখারি। যথারীতি উর্দুতেই ভিক্ষা চাচ্ছে। আমার মুক্তিযোদ্ধা স্যারের কাছে এবার বিসদৃশ লাগল। তিনি বললেন, বাংলায় ভিক্ষা না চাইলে তিনি ভিক্ষা দেবেন না। এবার অসহায় হয়ে পড়ল ভিক্ষুক। উপসংহার টানলেন স্যার। বললেন, ও বেচারা হয়ত ঢাকায় কাটিয়ে দিয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় সময়। কিন্তু জীবনযাত্রার কোনো পর্যায়েই তার বাংলা শেখার দায় পড়েনি। ভাঙা-আধাভাঙা উর্দুতে তাকে সাহায্য করেই আমরা গৌরব বোধ করেছি। অর্থাৎ আমরা আমাদের আত্মমর্যাদাবোধকেই যেন খুঁজে পাইনি।

সামাজিক জীব হিসেবে বসবাস করতে হয় বলে নিজের নেয়া শপথ নিজেকেই ভাঙতে হয়। বাঙালি পরিবারের বিয়ে ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে ইংরেজি ভাষায় দাওয়াতপত্র পেলে তেমন অনুষ্ঠানে যাব না বলে এক সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত সামাজিকতার দায়ে সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারিনি। এই প্রবণতা ইদানীং অনেক বেড়েছে। ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমলা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারও ইংরেজিতে দাওয়াতপত্র লিখে আত্মপ্রসাদ লাভ করে। আমাদের সমাজবাস্তবতায় বিয়ের অনুষ্ঠানে শিক্ষিত-স্বল্পশিক্ষিত নানা স্তরের মানুষকে দাওয়াত দিতে হয়।

এক সময় দেখতাম ডাকঘরে অশিক্ষিত মানুষের চিঠি লিখে দেয়ার জন্য পয়সার বিনিময়ে লেখক থাকত। এখন বোধহয় বিয়ের দাওয়াতপত্র পড়ে দেয়ার জন্য আরেকটি পেশা সৃষ্টি হতে পারে। বেশ কবছর আগের কথা। তখন সরদার ফজলুল করিম স্যার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন ক্লাস নিতে। স্যারকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, এক বাঙালি আরেক বাঙালিকে তার সামাজিক অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে দাওয়াত করে কেন? মৃদু হেসে স্যার বলেছিলেন, এটি এক ধরনের শ্রেণিচরিত্র। অর্থবিত্ত বা অবস্থানে সে যে একটু উঁচুতে তা প্রকাশের একটি সুযোগ খোঁজে এখানে। এ ধারার সবাই এই শ্রেণিভুক্ত হতে চায়।

প্রজন্মকে স্বাজাত্যবোধ থেকে দূরে সরাতে আমাদের টিভি চ্যানেল আর বেসরকারি রেডিও কম কসরত করছে না। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তৈরি অনেক অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ‘প্রিয় দর্শক’-এর বদলে ‘হাই ভিউয়ার্স’ বলে হাত-পা ছুড়ে মাঝেমধ্যে অদ্ভুত উচ্চারণে ইংরেজি শব্দ বলে খাওয়ার অযোগ্য এক খিচুড়ি বানাতে থাকে। এসব অনুষ্ঠানের প্রভাবও কম নয়। ক্যাম্পাস বা পথঘাটে তরুণ-তরুণীর শব্দচয়ন ও অঙ্গভঙ্গি দেখলে এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

বাংলা একাডেমি একটি প্রমিত বাংলা বানানরীতি প্রণয়ন করেছে। আবার জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তাদের বই লেখার জন্য একটি বানানরীতি ধরিয়ে দেয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে লিখতে গিয়ে আরেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আমার প্রমিত বানানরীতির কোনো কোনো বানান সংশোধন করা হয়। জানতে চাইলে বলা হয়, এটি এই পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালা। এসব অসংগতি দেখলে বোঝা যায় একুশের চেতনা আমাদের চৈতন্যোদয় ঘটাতে পারেনি এখনও। এই চেতনা অন্য ভাষাকে বৈরী জ্ঞান করা নয়- নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্মান দেয়া।

আত্মগৌরববোধ ছাড়া প্রজন্ম দেশপ্রেমিক হতে পারে না। নিজদেশ নিয়ে বড় স্বপ্ন বুনতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের শূন্যতা রয়েছে। আমরা প্রজন্মকে ঐতিহ্যসচেতন করে তুলতে পারছি না। তাই আত্মমর্যাদার জায়গাটি খুব স্পষ্ট নয় প্রজন্মের সামনে।

আরও লক্ষ করব, প্রস্তাবিত শিক্ষা-সংক্রান্ত নীতিতে বৃত্তিমূলক ও নিত্য ব্যবহারিক বিষয় যতটা গুরুত্ব পেয়েছে জ্ঞানভিত্তিক মানবিক বিষয় চর্চার অবকাশ ততটা নয়। স্কুল শিক্ষার্থী দেশপ্রেমের প্রথম পাঠ পাবে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কারিক্যুলামের ভেতর থেকে।

পৃথিবীর কোনো দেশেরই সভ্য ও মেধাবী নীতিনির্ধারকরা চায় না তাদের শিক্ষার্থীরা রোবটের মতো বেড়ে উঠুক। মানবিক গুণসম্পন্ন প্রজন্ম পেতে হলে তাকে মানবিক বিষয়গুলো চর্চা করাতে হবে। আগে বিবেচনা করতে হবে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রস্তাবিত ১০টি বইয়ের মধ্যে আলাদা বই না হয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা ধরনের বই সমাজ পাঠের অন্তর্ভুক্ত হবে, না সমাজ পাঠ থেকে বের করে ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়কে পূর্ণ পাঠের ব্যবস্থা করা হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চলের সব দেশপ্রেমিক মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে বাস্তবতার নিরিখে জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির নীতি প্রণয়ন করে তবে নতুন প্রজন্মের মনে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলা সম্ভব হবে। দেশাত্মবোধহীন জাতি কি দেশের সার্বিক উন্নয়নের দায়িত্ব নিতে পারে?

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
শেখ রেহানার জন্মদিন: ‘দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো’
শুভ জন্মদিন ‘ছোট আপা’
সাধারণ তবুও অসাধারণ শেখ রেহানা
অসাধারণ নারীর সাধারণ জন্মদিন: সশ্রদ্ধ শুভেচ্ছা
শেখ রেহানা: নীরবে যিনি পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করেন

শেয়ার করুন