জীবনকে ভালোবাসতে হবে

জীবনকে ভালোবাসতে হবে

মানবিকতার বিকাশ ছাড়া আত্মহত্যার প্রবণতা কমানো সম্ভব নয়। আত্মহত্যাকে ‘না’ বলতে হবে। জীবনকে ভালোবাসতে হবে। মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর বুকে আমাদের আগমন কেবল একবার। সেই এক জনমকে ব্যর্থতা দিয়ে নয়, সফলতা দিয়ে পূর্ণ করে তুলতে হবে। যতক্ষণ নিজের আত্মবিশ্বাস প্রখর আছে, ততক্ষণ তিনি দুর্বল নন। জীবনটাই যুদ্ধক্ষেত্র। হারলেন কি জিতলেন, তা মুখ্য নয়। যোদ্ধা হয়ে বেঁচে থাকাটাই সাফল্য।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আকুল হয়ে বলেছিলেন, “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।” অথচ সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে অনেকেই স্বেচ্ছায় ওপারে চলে যেতে যান। যাকে আমরা বলি আত্মহত্যা বা আত্মহনন। স্বভাবতই মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার প্রবণতাটাই বেশি৷ তবে তার মনে যখনই ‘নেই, হবে না’ এমন আক্ষেপগুলো ভেসে ওঠে তখনই বেছে নেয় এই নির্মম পথ। যা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য আমাদের সমাজে কখনই কাম্য নয়। কেননা এটি কখনই সমাধান হতে পারে না। এ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে এসে যে সফল হওয়া যায় তা উপলব্ধি করতে হবে। শুরু করতে হবে নতুন জীবন।

পত্রপত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে আর পাঁচটি সামাজিক সমস্যার মতো আত্মহত্যার খবরও। দীর্ঘদিনের ডিপ্রেশনকে বয়ে নিতে নিতে মানুষ ক্লান্ত হলেই এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয় বলে বলেন বিশেষজ্ঞরা৷ অনেক কারণেই আত্মহত্যার এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তার মধ্যে প্রেমঘটিত ও পারিবারিক সমস্যাই নেপথ্যে কাজ করছে বেশি৷

বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘কাজের মাঝে জাগাই আশা’ (ক্রিয়েটিং হোপ থ্রু অ্যাকশন)।

মানুষ নানা কারণে আত্মহত্যা করতে পারে। এর মধ্যে ডিপ্রেশন, ব্যক্তিত্বের সমস্যা, গুরুতর মানসিক রোগ বা স্বল্পতর মানসিক রোগ। তাছাড়া মাদকাসক্তি, এনজাইটি, অপরাধ বোধ, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অশিক্ষা, দারিদ্র্য, দাম্পত্য কলহ, প্রেমকলহ, অভাব-অনটন, দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগা, যৌন নির্যাতন, মা-বাবার ওপর অভিমান, পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট, প্রেমে ব্যর্থ ও প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে আত্মহত্যা করে থাকেন। আবার কারো ক্ষেত্রে কারণ থাকে অজানা। করোনাকালে হতাশা আর অভাব কেড়ে নিয়েছে অনেকের প্রাণ। পিছিয়ে নেই বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কিংবা তরুণ প্রজন্মও। এ সময়টাতে না বুঝেই ভুল করে বসছে অনেকে।

গত ১৭ মাসে প্রায় দুইশ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই ৪০। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা ও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য হারে এটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিছু দিন আগেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার চেষ্টার সংবাদ পাওয়া গেছে।সব কিছু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই একটা জায়গাতে এসেই আমরা হেরে যাই। আর তা হলো অভিমান, আবেগ ও জ্ঞান-বুদ্ধিহীন বিচারক্ষমতা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে আট লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এর অর্থ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। এছাড়া আরও অনেক মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে। সারা বিশ্বে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে তার ৭৫ শতাংশ বা তিন-চতুর্থাংশই হয়ে থাকে নিম্ন বা মধ্য আয়ভুক্ত দেশগুলোতে। এই তালিকাতেই বাংলাদেশের স্থান দশ নম্বরে।

আত্মহত্যা কোনো সহজ কাজ নয়। সুস্থ মানুষের পক্ষে কখনও এই পথ বেছে নেয়া সম্ভব নয়। আত্মহত্যার প্রবণতা এক ধরনের মানসিক সমস্যা। আর এ সমস্যা তৈরি হয় প্রচণ্ড ক্রোধ, আবেগ ও অপ্রাপ্তি থেকে। একজন মানুষ যখন মনে করে যে তিনি বেঁচে থাকার সমস্ত উপকরণ হারিয়ে ফেলেছেন এবং তার চলে যাওয়ায় পৃথিবীর কিছু যায় আসে না, তখনই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এটা তার অভিমান।

সেই অভিমান যে ভুলও হতে পারে, তা বিচার করার মতো মানসিক ক্ষমতা তার থাকে না। আবার অনেকেই জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলো থেকে মুক্তির পথ খুঁজে না পেয়ে, পারিবারিক সহায়তার অভাবে, একাই নিজের জীবনের সমাপ্তি টানতে এই পথ বেছে নেন। কেউ কেউ তার ভুল কোনো পদক্ষেপের মাশুল হিসেবে আত্মহত্যা করেন।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব সুইসাইড প্রিভেনশনের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে বছরে সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি ১ হাজার মৃত্যুর মধ্যে ১৩ জনই আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। আবার প্রতি ১০০টি আত্মহত্যা ঘটানো মানুষের মধ্যে ৫৮ জনের বয়সই ৫০ বছরের নিচে। যাদের বিষণ্ণতা রোগ রয়েছে, অন্যদের চেয়ে তারা ২০ গুণ বেশি আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। যা বেড়েই চলেছে। বিষয়টি মোটেও ইতিবাচক নয়।

আত্মহত্যার সঙ্গে মানসিক অসুস্থতার যোগাযোগ, বিশেষ করে অবসাদ ও মদ্যপানের সংযোগ রয়েছে বলে এ তথ্য এখন প্রতিষ্ঠিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দেখাচ্ছে বহু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে থাকে সংকটকালে এবং ব্যক্তিবিশেষে কোনো ধরনের কঠিন চাপ নিতে না পারলে।

তরুণদের সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের করোনাকালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আত্মহত্যা করেছে। এদিকে দেশে চলমান মহামারির মধ্যে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ৫ হাজার ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেই সময় ১১ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছেন বলে তথ্য দিয়েছে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ।

আত্মহত্যার প্ররোচনা থেকেও এর সংখ্যা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে পদ্ধতি হিসেবে দেখা যাচ্ছে প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে কীটনাশক পান করছেন আত্মহত্যাকারীরা। কীটনাশক পানে আত্মহনন ঘটছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর গ্রামীণ কৃষি এলাকায়। এ ছাড়া গলায় ফাঁস দেয়া ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার আত্মহননের একটি পদ্ধতি।

পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই আত্মহত্যা করতে নিষেধ করা হয়েছে। মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআন শরিফে বলা হয়েছে, আত্মহত্যা মহাপাপ! এ বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু এবং যে কেউ জুলুম করে, অন্যায়ভাবে ওটা (আত্মহত্যা) করবে, অবশ্য আমি তাকে অগ্নিদগ্ধ করব, আল্লাহর পক্ষে তা সহজসাধ্য।” (সুরা নিসা ২৯-৩০)।

আত্মহত্যা কোনো অবস্থাতেই কাম্য হতে পারে না। আত্মহত্যার মাধ্যমে একটি জীবনই শুধু নষ্ট হয় না, একটি পরিবার ও আত্মহত্যাকারীর আপনজন বন্ধু-বান্ধবদের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, আত্মহত্যাকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই আত্মহত্যার আগে নিজেদের ইচ্ছা সম্পর্কে অন্যের কাছে কমবেশি তথ্য দেয়। সেসব তথ্যকে নজরে রেখে, পরিবার বা বন্ধু-বান্ধব সবাই যদি সতর্ক থাকে এবং সময়মতো যথাযথ ব্যবস্থা নেয়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

প্রয়োজনে ডাক্তার বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এর পাশাপাশি, প্রতিটা সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, একে অপরের প্রতি সদয় মনোভাব থাকতে হবে। সমস্যা হতেই পারে। দুঃখ-কষ্ট নিয়েই জীবন। সেটাকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

মানুষের মধ্যে এই আত্মহত্যার প্ররোচনা বন্ধ করাও জরুরি। ভাঙতে হবে মৌনতা। মানুষ যখন একেবারে নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করে তখনই মনে করে তার জীবন শেষ। তবে এখানেই হেরে গেলে চলবে না। জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে হবে। আত্মহত্যা মানেই জীবন শেষ, আর এই শেষ যে জীবনের যবনিকা নয়, সেটি সব ধর্মেই স্পষ্ট করে বলা আছে। আত্মহত্যার দাঁড়প্রান্ত থেকে ফিরে এসে জীবনে সফলতার সোপানে পৌঁছেছেন এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। তাই মনে রাখতে হবে কোনো কিছুতেই ভেঙে পড়লে চলবে না। ঘুরে দাঁড়াতে হবে।

সরকারিভাবে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। মানসিকভাবে উৎপীড়িত মানুষের জন্য জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে শহর ও গ্রামে যদি ক্রাইসিস ইন্টারভেনশন সেন্টার খোলা হয়, পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও সাইকোলোজিস্ট এবং সোশ্যাল ওয়ার্কার রাখা হয়, তাহলে অনেকাংশেই সঠিক সময়ে ভিক্টিম-নির্ণয় ও তাদের রোগনিরাময় করতে সুবিধা হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে হবে। প্রতিটি স্কুল-কলেজে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং এবং প্রচারণার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সবার সচেতন হওয়া দরকার। অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের হতে হবে। সামাজিক সচেতনতা ও মানবিকতার বিকাশ ছাড়া আত্মহত্যার প্রবণতা কমানো সম্ভব নয়।

আত্মহত্যাকে ‘না’ বলতে হবে। জীবনকে ভালোবাসতে হবে। মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর বুকে আমাদের আগমন কেবল একবার। সেই এক জনমকে ব্যর্থতা দিয়ে নয়, সফলতা দিয়ে পূর্ণ করে তুলতে হবে। যতক্ষণ নিজের আত্মবিশ্বাস প্রখর আছে, ততক্ষণ তিনি দুর্বল নন। জীবনটাই যুদ্ধক্ষেত্র। হারলেন কি জিতলেন, তা মুখ্য নয়। যোদ্ধা হয়ে বেঁচে থাকাটাই সাফল্য। সার্থকতা এখানেই।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’
আফগানিস্তানের গন্তব্য কোথায়?
কে কাকে ‘স্যার’ বলবে?
সেবক ও মানবিক শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু ভবন যেন বাংলাদেশের হৃদয়

শেয়ার করুন

মন্তব্য

ভূতুড়ে গণমাধ্যম

ভূতুড়ে গণমাধ্যম

গণমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে কিছু ধান্দাবাজও তৈরি হয়েছে। কেউ গণমাধ্যমকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে, কেউ ব্যাবসায়িক স্বার্থে। আবার অনেকে আছে নিজেই মালিক, সম্পাদক ও রিপোর্টার।

সোশ্যাল মিডিয়ার দৌরাত্ম্যে এখন কোনটা সংবাদ বা অপসংবাদ, কোনটা তথ্য বা গুজব— তা অনেক সময় ঠাওর করা যায় না। অনেক কথিত অনলাইন পোর্টাল ও আইপি টিভি সংবাদের ভাষা আর কনটেন্ট দেখে মনে হতে পারে, সাংবাদিকতা বুঝি অশিক্ষিত লোকের পেশায় পরিণত হয়েছে। অথচ হওয়ার কথা উল্টো। যে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ বলে স্বীকার করা হয়, সে গণমাধ্যম কাদের হাতে চলে যাচ্ছে, কারা সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় আসছে এবং তারা কী করছে— তা নিয়ে প্রশ্নের অন্ত নেই।

এমন বাস্তবতায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়- ১০টি দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে। দীর্ঘদিন প্রকাশনা বন্ধ থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহ্‌মুদ জানান, যেসব পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয় না, সেগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হবে। তিনি বলেন, ২১০টি পত্রিকা, যেগুলো সচরাচর ছাপা হয় না বা চোরাগুপ্তা ছাপে— এগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আরও বলেন, “এই পত্রিকাগুলো মাঝেমধ্যে কোথা থেকে ছাপা হয় কেউ জানে না। এগুলো থাকার দরকার নেই। গণমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে কিছু ধান্দাবাজও তৈরি হয়েছে। কেউ গণমাধ্যমকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে, কেউ ব্যাবসায়িক স্বার্থে। আবার অনেকে আছে নিজেই মালিক, সম্পাদক ও রিপোর্টার।”

এর কয়েক দিন আগে ১৪ সেপ্টেম্বর আরেকটি অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জানান, দেশে প্রায় ৪০০টি পত্রিকা অনিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তিনি এগুলোকে ‘ভূতুড়ে পত্রিকা’ বলেও মন্তব্য করেন।

তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ নেই, বরং একমত হয়ে বলা যায়, ভূতুড়ে (অনেক সময় যেগুলোকে আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকাও বলা হয়) পত্রিকা বন্ধের এ উদ্যোগ আরও আগেই নেয়া উচিত ছিল। গণমাধ্যমের পেশাদারি বজায় রাখার স্বার্থেই তথ্যমন্ত্রীর ভাষায় এসব ‘ধান্দাবাজের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

ইন্টারনেট তথা ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির লোক আইপি টিভিতে লোাক নিয়োগের নামে যে ধরনের বাণিজ্য করছে এবং এসব টিভিতে সংবাদ প্রচারের নামে যেসব কর্মকাণ্ড করছে, তা দেশবাসীর অজানা নয়।

১৯ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি জানায়, ৫৯টি অবৈধ ও অনিবন্ধিত আইপি টিভি বন্ধ করা হয়েছে। টেলিভিশনে প্রচারিত কনটেন্ট ইন্টারনেট প্রটোকল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সম্প্রচার করার প্রক্রিয়া হলো আইপিটিভি। বিটিআরসি শুধু লাইসেন্সধারী আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইপিভিত্তিক ডাটা সার্ভিসের (স্ট্রিমিং সেবা, আইপিটিভি, ভিডিও অন ডিমান্ড) অনুমোদন দেয়।

নিয়ম অনুযায়ী বিটিআরসির কাছ থেকে আইপিটিভি সেবার অনুমোদনপ্রাপ্ত আইএসপি অপারেটররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদিত স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার শুধু তাদের গ্রাহকদেরই দেখাতে পারবে। তবে প্রতিটি চ্যানেলকে প্রোগ্রাম বা কন্টেন্ট প্রচারে প্রয়োজনীয় চুক্তি, অনুমোদন বা ছাড়পত্র প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু বিটিআরসি বলছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে ডোমেইন কিনে বা ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে জনগণকে আইপি টিভি প্রদর্শন করছে, যার কোনো অনুমোদন নেই। অনুমোদন ছাড়া সম্প্রচার অনৈতিক এবং টেলিযোগাযোগ আইনের লঙ্ঘন।

স্মরণ করা যেতে পারে, ১৪ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ যেদিন ১০টি পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিলের খবর আসে, সেদিনই অননুমোদিত ও অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো সাত দিনের মধ্যে বন্ধ করতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। বিটিআরসির চেয়ারম্যান ও প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের প্রতি এ নির্দেশ দেয়া হয়। অননুমোদিত ও অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর কার্যক্রম বন্ধ চেয়ে করা সম্পূরক এক আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

নির্দেশনা বাস্তবায়ন বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য করা হয়। শুধু তা-ই নয়, সংবাদপত্র, সংবাদ এজেন্সি এবং সাংবাদিকদের জন্য নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নে নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি হবে না এবং নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তাও জানতে রুল জারি করেন উচ্চ আদালত। এর পরদিনই সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহ্‌মুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‌'দেশে এত বেশি অনলাইনের প্রয়োজন নেই। থাকা সমীচীনও নয়।' নিউজ পোর্টালের পাশাপাশি ইউটিউব চ্যানেল ও আইপি টিভিও রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনার কথা জানান তিনি।

অনেকে তথ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলে, অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ ভালো, কিন্তু নিবন্ধনের নামে যেন নিয়ন্ত্রণ করা না হয়। অনেকে মনে করে, নিবন্ধন না নিয়েও কেউ যদি ‘অনিবন্ধিত মিডিয়া’ হিসেবে থাকতে চায়, সে সুযোগ দেয়া উচিত। বিশেষ করে এসব অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল যদি সাংবাদিকতার নামে অন্যায় ও অন্যায্য কিছু না করে, তাহলে তাদের প্রকাশিত হতে দেয়া সংবাদমাধ্যম ও বাক্‌স্বাধীনতার অংশ বলেও মনে করে তারা।

যারা অনিবন্ধিত পোর্টাল বন্ধের বিপক্ষে, তাদের মত হলো- মূলধারার গণমাধ্যম হিসেবে পরিচিত অনেক সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল ও টেলিভিশন সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা পরিপন্থি কাজ করে। কিন্তু এসব যুক্তিতে অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল ও আইপি টিভি চলতে দেয়া যায় কি না— সেটি বিরাট তর্ক। কারণ শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত বিশ্বের সাংবাদিকতা নিয়েও সেসব দেশের জনগণের অসন্তুষ্টি আছে।

গণমাধ্যম যে কারণে গণমাধ্যম, তা অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোও সে গণমাধ্যমকে উপেক্ষা করে। করপোরেট পুঁজির স্বার্থরক্ষা, রাজনৈতিক ভয়ভীতি এবং নানাবিধ রাষ্ট্রীয় ও সেলফ-সেন্সরশিপের কারণেও গণমাধ্যম অনেক সময় গণবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে কারণে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার বাইরে গিয়ে যে কেউ নিজের খেয়াল-খুশি মতো একটি অনলাইন পোর্টাল খুলে বা আইপি টিভি চালু করে সেটিকে গণমাধ্যম বলে দাবি করলে সেখানে অপসাংবাদিকতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে এ ক্ষেত্রে একটা ‘নিয়ন্ত্রণ’ থাকা বাঞ্ছনীয়।

অস্বীকার করার উপায় নেই, হাতে গোনা কিছু অনলাইন সংবাদ পোর্টাল বাদ দিলে বাকিদের অধিকাংশই কপি-পেস্ট করে। এদের একটি অংশ উদ্ভট সব শিরোনাম দিয়ে ভুয়া ও হাস্যকর সংবাদ প্রকাশ করে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। এসব কথিত গণমাধ্যমের কারণে প্রশ্নের মুখে পড়ছে মূলধারার গণমাধ্যম।

যার সাংবাদিক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা নেই, সেসব লোক যখন সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়, তখন প্রকৃত সাংবাদিকরা লজ্জিত হন। সাধারণ মানুষ তখন এসব ভুয়া ও ভুঁইফোঁড় সাংবাদিকের সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের গুলিয়ে ফেলে। সম্প্রতি পুরো গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের যে অনাস্থা-অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে বড় কারণ এসব ভূতুড়ে গণমাধ্যমের দৌরাত্ম্য।

অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে, কারা সাংবাদিকতা পেশায় আসছেন এবং এত মানুষ কেন সাংবাদিক হতে চান? তা ছাড়া রাজধানী থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম তো বটেই, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যারা সাংবাদিকতা করেন, তাদের ন্যূনতম যোগ্যতা থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেকে এ ইস্যুতে দ্বিমতও পোষণ করেছে।

অযোগ্যরা কথিত পত্রিকা বা আইপি টিভির আইডি কার্ড সংগ্রহ করে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ঘুরে বেড়াবে তা মানা যায় না। প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক থাকাকালে প্রখ্যাত সাংবাদিক শাহ আলমগীর একাধিকবার বলেন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের যেকোনো সাংবাদিকের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হওয়া উচিত ডিগ্রি পাস। এ বিষয়ে একটি নীতিমালা করার ওপর তিনি জোর দেন। তার মৃত্যুর পরে এ নিয়ে আর তেমন কোনো কথাবার্তা শোনা যায় না।

২০১৫-এর ১৫ নভেম্বর সেই সময়ের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু জাতীয় সংসদে বলেন, সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রচলিত আইন বা নীতিমালায় সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণের কোনো মানদণ্ড নেই। তবে অনেক সাংবাদিক আছেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ও পেশার প্রতি দায়বদ্ধ। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন ১৯৭৪ সংশোধন করে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

গত বছর ১১ ফেব্রুয়ারি যশোরে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস হওয়া উচিত। দেশের সাংবাদিকদের ডাটাবেজ তৈরি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ডাটাবেজের আওতায় আনতে পারলে অপসাংবাদিকতা বন্ধ হবে।

উল্লেখ্য, অনেক দিন ধরে শোনা যাচ্ছে, সাংবাদিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় দুটি আইন হচ্ছে। এর একটি জাতীয় সম্প্রচার আইন আরেকটি গণমাধ্যমকর্মী সুরক্ষা আইন। বলা হচ্ছে, এ দুটি আইন পাস হলে হুটহাট করে কাউকে চাকরিচ্যুত করা সম্ভব হবে না। কিন্তু আইন দুটি পাস হচ্ছে না।

সুতরাং অপসাংবাদিকতা বন্ধে ভূতুড়ে পত্রিকা, অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল ও আইপি টিভি বন্ধের উদ্যোগ যেমন সাধুবাদযোগ্য, তেমনি প্রকৃত সাংবাদিকের স্বার্থ সুরক্ষা এবং দেশের গণমাধ্যমে পরিপূর্ণ পেশাদারত্ব গড়ে তুলতে সম্প্রচার আইন এবং গণমাধ্যমকর্মী সুরক্ষা আইন দ্রুত পাস করার পাশাপাশি আইন দুটির খুঁটিনাটি স্পষ্টীকরণের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিধিমালা করাও জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’
আফগানিস্তানের গন্তব্য কোথায়?
কে কাকে ‘স্যার’ বলবে?
সেবক ও মানবিক শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু ভবন যেন বাংলাদেশের হৃদয়

শেয়ার করুন

অভিশপ্ত ইনডেমনিটি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

অভিশপ্ত ইনডেমনিটি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

পৃথিবীর ইতিহাসে ঘৃণ্যতম নরহত্যায় যে টিক্কার কাছে হিটলার পর্যন্ত লজ্জা পাবে, সেই টিক্কার ঘৃণা থেকেও রেহাই পায়নি বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কাছে টিক্কাও নস্যি। আর তার চেয়ে নস্যি যারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় ও পুরস্কৃত করে।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তারপর বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটতে থাকে একের পর এক ন্যক্কারজনক ঘটনা। এতই ন্যক্কারজনক যে, জাতি হিসেবে দুনিয়ার কাছে বাঙালি হয়ে যায় ‘মীরজাফর’। যদিও সত্যিকার মীরজাফরদের সংখ্যা অতি নগণ্য। তবুও পুরো জাতির গায়ে মীরজাফরি কাদা লেগে যায়। সে মীরজাফরি কাদা সরাতে হয় জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার সরকারকে।

সপরিবারে জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ‘স্বঘোষিত’ রাষ্ট্রপতি হয় নব্য মীরজাফর খন্দকার মোশতাক আহমদ। তার এ ক্ষমতা দখলের পেছনে ছিল সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তার সমর্থন। খন্দকার মোশতাকের রাজনীতির হাতেখড়ি হয় বঙ্গবন্ধুর হাতে। বঙ্গবন্ধুই তাকে বিপদে-আপদে আগলে রাখেন বটবৃক্ষের মতো। তার চাওয়া কোনোকিছু যথাসম্ভব অপূর্ণ রাখেননি বঙ্গবন্ধু। এমনকি একসময় যখন খন্দকার মোশতাকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রায় ধ্বংসের মুখে, তখনও তাকে টেনে তোলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাত্র ৯ দিনের মাথায় ১৯৭৫-এর ২৪ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রধান করা হয় জিয়াউর রহমানকে। তারপর জাতির পিতাকে হত্যার একমাস দশদিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর মানব সভ্যতা ও ইতিহাসের কলঙ্কতম আইন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ শিরোনামের ওই দায়মুক্তি অধ্যাদেশটিতে ছিল খন্দকার মোশতাক আহমদ ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এএইচ রহমানের স্বাক্ষর। অধ্যাদেশটির দুভাগের প্রথম অংশে বলা হয়-

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থি যা-ই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

দ্বিতীয় অংশে ছিল-

রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

এই বিশ্বাসঘাতক খুনি বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। তার সে যোগ্যতাই ছিল না। কাজ হাসিলের পর তাকে ক্ষমতার চেয়ার থেকে ছুড়ে ফেলে দেয় এ দেশের পাকিস্তানপ্রেমীরা। পর্দার আড়ালে থাকা আসল পাকিস্তানপ্রেমীদের মুখোশ খুলতে শুরু করে ধীরে।

সামরিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের পর ১৯৭৬-এর ১৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭-এর ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সায়েমকে কৌশলে হটিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা দখল করে এতদিন পর্দার আড়ালে থাকা বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কারিগর।

রাষ্ট্রপতি হয়ে একটুও দেরি করল না জিয়াউর রহমান। ক্ষমতার জোরে খন্দকার মোশতাকের ওই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করল। কারণটা খুবই সহজ। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া যদি আটকানো না যায়, তাহলে তো মূল কারিগরের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে জাতির কাছে, বিশ্বের কাছে।

শুধু আইন করেই ক্ষান্ত হয়নি জিয়া। বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নেয়াটাকেও ‘পাপ’ পর্যায়ে নিয়ে যায় সে। আর এজন্য একের পর এক গুজব ছড়ায়, সত্য কোনো ঘটনার সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে প্রপাগান্ডা চালায়। গুজবপ্রিয় জাতি সেসব প্রপাগান্ডায় এতটাই হেলে পড়ে যে, ওসব যে মিথ্যা, গুজব, প্রপাগান্ডা এটা বুঝতেই জাতির সময় লাগে ২১ বছর।

যাহোক, ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদের দু-তৃতীয়াংশ আধিপত্য দখল করে জিয়া সরকার এবং ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংবিধানের ৫ম সংশোধনী পাস করানো হয়। সংশোধনীতে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দায়মুক্তি অধ্যাদেশসহ ৪ বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে বৈধতা দেয়া হয়। আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’। এ সংশোধনীতে বলা হয়-

“১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ, ও অন্যান্য আইন, উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কৃত কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ, অথবা প্রণীত, কৃত বা গৃহীত বলিয়া বিবেচিত আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তৎসম্পর্কে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো কারণেই কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।”

এ সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের পাকাপোক্তভাবে দায়মুক্ত করা। কিন্তু ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের কারণে ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর অঘোষিত রাষ্ট্রপতি মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। ফলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধা ছিল না।

সে পথ আটকাতেই জিয়া সরকার জাতীয় সংসদকে কলঙ্কিত করে ৫ম সংশোধনী আনে। তখন তারা এটাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করেছিল আইনের মাধ্যমে এবং তাদের ধারণা ছিল সংসদের দু-তৃতীয়াংশ সমর্থন ছাড়া এ আইন যেহেতু পরিবর্তন করা যাবে না এবং সংসদে দু-তৃতীয়াংশের সমর্থন পাওয়া সহজ কথাও নয়- কাজেই বাংলাদেশে জাতির পিতা হত্যার বিচার করা সহজ হবে না।

এখানেই থেমে থাকেনি খুনিচক্র। এমনিতেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান সংসদের মাধ্যমে খুন করেও রেহাই পেল খুনিরা। আর বোনাস হিসেবে পেল অপ্রত্যাশিত উপহার। যা পাওয়ার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম চীনের প্রথম সচিব, লে. কর্নেল আজিজ পাশা আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব, মেজর একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব, মেজর বজলুল হুদা পাকিস্তানের দ্বিতীয় সচিব, মেজর শাহরিয়ার রশিদ ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব, মেজর রাশেদ চৌধুরী সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব, মেজর নূর চৌধুরী ইরানে দ্বিতীয় সচিব, মেজর শরিফুল হোসেন কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব, কর্নেল কিসমত হাশেম আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব, লে. নাজমুল হোসেন কানাডায় তৃতীয় সচিব এবং লে. আবদুল মাজেদকে সেনেগালে তৃতীয় সচিব বানিয়ে পুরস্কৃত করা হলো খুনিদের।

এর মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে আরও কলঙ্কিত করে বাঙালি জাতির ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হলো। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করে বাংলাদেশে শুরু করা হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

দেখা যায় যে, পাকিস্তানপ্রীতির কারণে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পরবর্তী সরকারগুলো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আইনের মাধ্যমে রক্ষা করে, এটি খোদ পাকিস্তানের কসাই টিক্কা খানের অভিমত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে বাঙালিদের হত্যা করে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয় টিক্কা খান। পরে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর হয় টিক্কা। তার সঙ্গে দেখা করেন এক মুজিবভক্ত ও বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা মুসা সাদিক। এক সাক্ষাৎকারে মুসা সাদিককে টিক্কা জানায়-

“২৬ মার্চ (১৯৭১) আমি নিজে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে আমার ফ্ল্যাগ কারে করে তোমাদের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে তেজগাঁও এয়ারপোর্টে নিয়ে গিয়ে একজন জাতীয় নেতার মর্যাদায় সসম্মানে তাঁকে আমি করাচিগামী পিআইএ’র বিমানে তুলে দেই। তুলে দেবার সময় তাঁকে আমি সামরিক কায়দায় স্যালুট করে বলি: স্যার, আমাকে নিজগুণে মার্জনা করবেন, আমি একজন অনুগত গভর্নর হিসেবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের হুকুম তামিল করেছি মাত্র। আমি আশা করি, সেখানে পৌঁছে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সাথে আপনার সাক্ষাৎ হবে এবং আপনি আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারবেন।”

এরপর টিক্কা খান হ্যান্ডশেক করার জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার দিকে না তাকিয়ে সোজা বিমানে উঠে যান। পরে টিক্কা খানকে এদেশে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন মুসা সাদিক। বার বার করা প্রশ্নে টিক্কা খান হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারপর বলে, “তোমার বড় বড় বুলি বন্ধ করো। তোমাদের জাতির জনককে তোমরা যে খুন করেছো, সেজন্য তোমাদের ঘৃণিত বাঙালি জাতি নিয়ে জাহান্নামে যাও। আমি তো তাঁকে ঢাকা বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানিয়ে জীবিত অবস্থায় পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। সেই পুণ্যের জন্য আর তোমার শিক্ষার জন্য, তুমি আমার জুতোজোড়া তোমার মাথার মুকুট বানিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে ধরে ঢাকার দিকে রওনা দাও এবং মহাসড়কের দুধারের সকল পথচারীর উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে বলতে যাও যে, জেনারেল টিক্কা খান একজন মহামানব, শেখ মুজিবকে যিনি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু বাঙালি জারজ সন্তানেরা এত বড় নরাধম যে, তারা শেখ মুজিবকে খুন করেছে।”

(১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডি ও বঙ্গভবনের অজানা অধ্যায়: মুসা সাদিক)

পৃথিবীর ইতিহাসে ঘৃণ্যতম নরহত্যায় যে টিক্কার কাছে হিটলার পর্যন্ত লজ্জা পাবে, সেই টিক্কার ঘৃণা থেকেও রেহাই পায়নি বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কাছে টিক্কাও নস্যি। আর তার চেয়ে নস্যি যারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় ও পুরস্কৃত করে।

যদিও শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬-এর ১২ নভেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল’ জাতীয় সংসদে পাস হয়। ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি বিলটিকে স্বাক্ষর করার পর এটি পরিপূর্ণ আইনে পরিণত হয়। আর এর পরই শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। জাতি হয় কলঙ্কমুক্ত। জাতির গা থেকে খসে পড়ে ‘মীরজাফরি কাদা’। কিন্তু ইতিহাসে ঘৃণ্যতম একটি অধ্যায় হিসেবেই রয়ে যাবে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’
আফগানিস্তানের গন্তব্য কোথায়?
কে কাকে ‘স্যার’ বলবে?
সেবক ও মানবিক শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু ভবন যেন বাংলাদেশের হৃদয়

শেয়ার করুন

ইনডেমনিটি ঘৃণিত ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায়

ইনডেমনিটি ঘৃণিত ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায়

দায়মুক্তি পাওয়া খুনিরা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। জিয়া থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের পরিবর্তে করেছে পুরস্কৃত, করেছে ক্ষমতার অংশীদার। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

১৯৭৫ সালের এদিনে অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির পদ দখলকারী খুনি মোশতাক আহমেদ অধ্যাদেশ আকারে ইনডেমনিটি জারি করে। এটি ১৯৭৫ সালের অধ্যাদেশ নং ৫০ নামে অভিহিত ছিল।

ইনডেমনিটি শব্দের অর্থ ‘শাস্তি এড়াইবার ব্যবস্থা’। অর্থাৎ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ হলো সে অধ্যাদেশ, যার মাধ্যমে শাস্তি এড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারবর্গকে হত্যার পেছনে যারা জড়িত ছিল, তাদেরকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। পরে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জিয়াউর রহমানের আমলে সংসদে এই কালো আইনটিকে অনুমোদন দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনের শাসনের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। আইন করে বলা হলো হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম কালো আইন আগে ও পরে আর কখনও ছিল না। এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের ছুতা দিয়ে ২১ বছর বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার বিচার করা হয়নি।

এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে খুনি মোশতাকের স্বাক্ষর থাকলেও অনেকেই মনে করে অধ্যাদেশটি জারির পেছনে মূল ক্রীড়নক ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৯ দিনের মাথায় সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে হটিয়ে নতুন সেনাপ্রধান বনে যাওয়া জিয়াউর রহমান। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর এবং তার পর সেসময়ের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএইচ রহমানের স্বাক্ষর আছে।

অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ। প্রথম অংশে বলা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

দ্বিতীয় অংশে বলা আছে-

“রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলো।”

অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসেবে আবিভূর্ত হয়। সেসময় বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭-এর ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ এবং ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’ এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেয়ায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পায়।

একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেয়া না হলে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু সে ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যাতে এ ব্যাপারে কিছু না করতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিল এবং এই সময় একটি প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে গেল যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তিত হবে না। এ দোহাই দিয়ে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচএম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেনি।

এদিকে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকাকালে অর্থাৎ ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর অঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। যেহেতু মোশতাক সরকার ছিল সেনাসমর্থিত, জিয়াউর রহমান ছিল সেনাপ্রধান সেহেতু ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী জিয়াউর রহমানের নির্দেশ কিংবা সম্মতি ছাড়া নামেমাত্র রাষ্ট্রপতি মোশতাকের পক্ষে কোনোভাবেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি দিতে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা সম্ভব হতো না।

একারণে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির দায় জিয়াউর রহমান এড়িয়ে যেতে পারে না। আর বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা বিবিসিতে সাক্ষাৎকার দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জেনারেল জিয়াউর রহমানও যে জড়িত ছিল, তা স্পষ্ট করেই বলেছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞদের মতে, খুনি মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেয়া না হলে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের পরই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত।

দায়মুক্তি পাওয়া খুনিরা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। জিয়া থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের পরিবর্তে করেছে পুরস্কৃত, করেছে ক্ষমতার অংশীদার। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

হত্যার বিচার চাওয়ার পথ সাংবিধানিকভাবে রুদ্ধ করে দিয়ে জিয়া বাংলাদেশকে মানবাধিকার ও সভ্যতাবিরোধী অমানবিক, অসভ্য, জংলি রাষ্ট্রে পরিণত করে। তিনি খুনিদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেই থেমে থাকেননি; দূতাবাসে চাকরির যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিশেষ ব্যবস্থায় খুনিদের চীন, আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, কুয়েত, আবুধাবি, মিসর, কানাডা ও সেনেগালের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করে।

জিয়াউর রহমানের পর বিচারপতি সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলেও কেউ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেনি। বরং জিয়া খুনিদের দূতাবাসে যে চাকরি দিয়েছিল, এরশাদ ও খালেদা জিয়া তাদের পদোন্নতি দিয়ে বাঙালি জাতির কলঙ্কের দায়কে ভারী ও দীর্ঘায়িত করে। দায়মুক্তি ও দূতাবাসে চাকরি-পদোন্নতি পেয়ে খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত।

এরশাদ খুনিদের রাজনৈতিক দল গঠন ও সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দেয়, আর খালেদা জিয়া ৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুনি শাহরিয়ার রশিদকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে।

দীর্ঘ আন্দোলন আর সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমেই জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ উন্মুক্ত করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল-সংক্রান্ত আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আমিন উল্লাহর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করেন। তাদের রিপোর্টেই প্রকাশ পায় এই কুখ্যাত আইনটি বাতিলের জন্য সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই।

কমিটির ওই রিপোর্ট আইন কমিশনের মতামতের জন্য পাঠানো হলে সাবেক প্রধান বিচারপতি এফকেএম মুনীরের নেতৃত্বাধীন এই কমিশনও তা সমর্থন করে। এরপর সেসময়ের আইন প্রতিমন্ত্রী (পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী) প্রয়াত অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিল বাতিলের জন্য ‘দি ইনডেমনিটি রিপিল অ্যাক্ট-১৯৯৬’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সংসদে পাস হয় মানবতা ও সভ্যতাবিরোধী কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বিল। ঘোচানো হয় ২১ বছরের জাতীয় কলঙ্ক, খুলে যায় বঙ্গবন্ধুহত্যার বিচারের পথ।

এভাবেই সুদীর্ঘ ২১ বছর পর শুরু হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া। ১৯৯৮-এর ৮ নভেম্বর মামলার যাবতীয় কার্যক্রম শেষে ১৫ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আসামি পক্ষের ১৫ আসামি উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পায়। উক্ত আপিলে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং ৩ জনকে খালাস প্রদান করা হয়। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে এ মামলার কার্যক্রম ফের স্থবির হয়ে পড়ে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আবার এ বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০০৯ সালে লিভ-টু-আপিলের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আপিল শেষে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে আদালত। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি খুনিদের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সম্প্রতি আরও একজন দণ্ডিতকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জাতি কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হয়েছে, অবসান হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গ্লানি।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’
আফগানিস্তানের গন্তব্য কোথায়?
কে কাকে ‘স্যার’ বলবে?
সেবক ও মানবিক শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু ভবন যেন বাংলাদেশের হৃদয়

শেয়ার করুন

খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি

খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি

সংগত কারণই প্রশ্ন উঠছে- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িতদের বিচার হতে পারলে এ ভয়ংকর অপরাধে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিয়েছে এবং তাদের রক্ষার রক্ষার জন্য কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন প্রণয়ন করেছে তাদের কেন বিচারের আওতায় আনা হবে না?

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমানের খুনিরা দম্ভ করেই খুনের দায় স্বীকার করেছিল। এটাও বলেছিল- সাহস থাকলে কেউ বিচার করুক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ ও বিশ্বের অনেক সংবাদপত্রে সৈয়দ ফারুক রহমান ও আবদুর রশিদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের পেছনে তাদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে নেয়ার পাশাপাশি কাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা পেয়েছে সেটাও জানিয়ে দিয়েছে।

জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি এবং তার পরিবারের নারী-শিশুসহ সব সদস্যকে হত্যার পরও যে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না, তার আইনি নিশ্চয়তা মিলেছিল কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণকারী খন্দকার মোশতাক আহমদ খুনিদের বিচার করা যাবে না ২৬ সেপ্টেম্বর (১৯৭৫) ‘সামরিক আইনবলে’ পাওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করে এ অধ্যাদেশ জারি করেন। পরে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদকে কাজে লাগিয়ে তার অনুমোদন দেন।

১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ইসনমেনিটি আইন বাতিল করে। ফলে ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচারের আইনি বাধা দূর হয় এবং আদালত বিচারকাজ শুরু করতে পারে। সংগত কারণই প্রশ্ন উঠছে- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িতদের বিচার হতে পারলে এ ভয়ংকর অপরাধে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিয়েছে এবং তাদের রক্ষার রক্ষার জন্য কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন প্রণয়ন করেছে তাদের কেন বিচারের আওতায় আনা হবে না?

জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের কুখ্যাত সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের কাছ থেকে শিক্ষা-দীক্ষা নিয়েছেন, সন্দেহ নেই। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন এবং ২৯ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। এ জন্য কোনো নির্বাচনের প্রয়োজন পড়েনি, সামরিক আইনের ঘোষণাই যথেষ্ট ছিল।

আইয়ুব খান ১৯৬২ সালের ৮ জুন কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা জাতীয় পরিষদ সভায় সামরিক শাসন প্রত্যাহারের আগে গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্য সম্পাদন করেন- সামরিক শাসন জারির পর যত অধ্যাদেশ, বিধিবিধান ও নির্দেশ জারি করেছেন- সবকিছু সংবিধান ও আইনসম্মত হিসেবে অনুমোদনলাভ।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান আইয়ুব খানের মতোই একটি কাজ করেছেন ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল। সে দিন জাতীয় পরিষদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বিল অনুমোদিত হয়। আমাদের জানা আছে, জিয়াউর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট সেনাবাহিনী পদে নিয়োগদান করেন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদ। জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান।

বঙ্গবন্ধুকে স্ত্রী, তিন পুত্র, দুই পুত্রবধূসহ নিষ্ঠুরভাবে বাসভবনে হত্যা করা হয়। তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাংলাদেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। একইদিনে আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ ফজলুল হক মণিসহ আরও কয়েকজনকে ঘাতকরা হত্যা করে। এসব খুনে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা দম্ভ করে বলছিল- তারাই ‘শেখ মুজিবকে সবংশে হত্যা করেছে।’ খুনিরা এটাও বলত- জিয়াউর রহমান বরাবর তাদের সঙ্গেই মুজিবহত্যার চক্রান্তে জড়িত ছিলেন।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাষ্ট্র ক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। যদিও কাগজে-কলমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, কিন্তু ক্ষমতার দণ্ড ছিল জিয়াউর রহমানের হাতে। বঙ্গভবনের শেষ দিনগুলি গ্রন্থে লিখেছেন-

“১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি জিয়াউর রহমানের হাতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ ছেড়ে দেন। রাষ্ট্র্রপতির পদ ছেড়ে দেন কয়েক মাস পর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল।” [পৃষ্ঠা ৩৫]

তিনি লিখেছেন, জিয়াউর রহমান যে সেনাপ্রধান থাকা অবস্থাতেই এবং সামরিক আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদে বহাল থেকে প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনে অংশ নেবেন, সে ধারণা তিনি করতে পারেননি। [পৃষ্ঠা ৩৬]

কুটিল পথে সেনাবাহিনীপ্রধান চলেছেন, এটা বুঝতে পারেননি প্রধান বিচারপতি পদে থাকা আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, এটা ভাবা যায়!

ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার পথে জিয়াউর রহমান একের পর এক পদক্ষেপ নিতে থাকেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সামরিক আইন বলবৎ রয়েছে। আওয়ামী লীগের শত শত নেতা জেলে। জয় বাংলা উচ্চারণ করলেই জেল। বঙ্গবন্ধুর নাম এমনকি আভাসে-ইঙ্গিতেও বলা যাবে না। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল ১৫ আগস্ট থেকেই। সরকারবিরোধী মিছিল-সমাবেশ করার অধিকার ছিল না। এমন পরিবেশেই জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে ‘বিপুলভোটে নির্বাচিত’ হয়ে যান।

এর আগে তিনি আরেকটি কাজ করেন- সংবিধান সংশোধন। ত্রিশ লাখ নারী-পুরুষ-শিশুর আত্মদানে অর্জিত বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ যায়। সমাজতন্ত্র বর্জন করা হয়। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা-ধর্ষণ-লুটপাটের প্রত্যক্ষ সহযোগী রাজাকার-আলবদর ও তাদের দল জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগকে রাজনীতি করার অধিকার দেয়া হয়। বাংলাদেশকে ফের ‘পাকিস্তান বানানোর’ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে তারা হয়ে ওঠে জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ সহযোগী।

১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রির জাতীয় সংসদে ‘সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী’ বিল ওঠে। এতে বলা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত প্রণীত সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ, ও অন্যান্য আইন এবং উক্ত মেয়াদের মধ্যে অনুরূপ কোন ফরমান দ্বারা এই সংবিধানে যে সকল সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন ও বিলোপসাধন করা হইয়াছে তাহা এবং অনুরূপ কোনো ফরমান, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ বা অন্য কোন আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত ক্ষমতাবলে অথবা অনুরূপ কোন ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে গিয়া বা অনুরূপ বিবেচনায় কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তপক্ষ কর্তৃক প্রণীত কোন আদেশ কিংবা প্রদত্ত কোন দণ্ডাদেশ কার্যকর বা পালন করিবার জন্য উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা, বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তৎসম্পর্কে কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোন কারণেই কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।”

১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড, খুনিদের বিচার না করার কুখ্যাত বিধান- ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি প্রদান, জিয়াউর রহমানের একক সিদ্ধান্তে সংবিধান সংশোধন, গণভোটের প্রহসন- সব বৈধতা পায়।

বঙ্গবন্ধুসহ নারী-শিশুদের খুনিদের বিচার করা যাবে না- ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এ বিধান জারি করেছিলেন খোন্দকার মোশতাক আহমদ। তখন জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীপ্রধান। ক্ষমতা হাতের নাগালে, রাষ্ট্রপতির পদটি কখন হাতে আসবে- এমন ছক কষছিলেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুনের রাষ্ট্রপতি ও ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর সব অপরাধ হালাল করা হয়ে গেছে ‘সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর’ মাধ্যমে।

খুনিদের কেউ যেন কখনও বিচার করতে না পারে, সে জন্য ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটির অনুমোদন প্রদান করা হয়। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে বিধান ছিল- খুনিদের দায়মুক্তি পেতে রাষ্ট্রপতি বা তার মনোনীত ব্যক্তির কাছ থেকে সার্টিফিকেট নিতে হবে। জিয়াউর রহমান কেবল খুনিদের দায়মুক্তি দিয়ে আইন প্রণয়ন করেননি, নানা দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব দিয়ে পুরস্কৃতও করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুহত্যার বিচারের দাবি যতবার এসেছে- জিয়াউর রহমান, এইচএম এরশাদ এবং খালেদা জিয়া একই কথা বলে গেছেন- সংবিধান সংশোধন করতে হবে, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে। কিন্তু ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে এই কুখ্যাত আইন জাতীয় সংসদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাতেই পাস হয়। সে সময় সংসদে বিএনপির সদস্যরা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাবে সায় দেননি। কেনইবা দেবে? খুনিতে খুনিতে যে মিতালি!

২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের দণ্ড কার্যকর হওয়া শুরু হয়। তবে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া কয়েকজন এখনও পলাতক। এদের ফিরিয়ে আনার দাবি জোরদার হচ্ছে। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কাজ যখন হাতে নেন- স্পষ্ট বলেছিলেন- প্রচলিত ফৌজদারি আইনেই বিচারকাজ চলবে। সামরিক শাসনের আমলের মতো ধর-মার-কাট নীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন।

বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থমকে গিয়েছিল ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে। ঘাতকদের বিচার যেন না হয়, সে জন্য আইন প্রণীত হয়েছিল। এ কলঙ্ক মুছে ফেলা সম্ভব হয়েছে। এখন সময়ের দাবি- হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যুক্তদেরও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। এমনকি এমন ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্তরা বেঁচে না থাকলেও তাদের চিহ্নিত করা উচিত। অপরাধ করে রেহাই মেলে না- এটাও স্বীকৃত হওয়া প্রয়োজন।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত

আরও পড়ুন:
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’
আফগানিস্তানের গন্তব্য কোথায়?
কে কাকে ‘স্যার’ বলবে?
সেবক ও মানবিক শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু ভবন যেন বাংলাদেশের হৃদয়

শেয়ার করুন

২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন

২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন

পঞ্চম সংশোধনীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো জঘন্য কালাকানুন শুধু সংবিধানে অন্তর্ভুক্তই করেননি রাষ্ট্রপতি জিয়া, বঙ্গবন্ধু-হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের বিচারের পথ চিরতরে রুদ্ধ করায় সহযোগী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা ও চেতনাই বাঙালি জাতির জাগরণের মূলশক্তি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ই সংবিধান থেকে মুছে দিলেন সংবিধান সংশোধন করে! যে ‘জয়বাংলা’ রণধ্বনি দিয়ে বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, সেই জয়বাংলা মুছে দিয়ে মৃত পাকিস্তানের ‘জিন্দাবাদ’ ফিরিয়ে আনলেন সংশোধনীতে। বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রেডিও পাকিস্তানের স্টাইলে করলেন রেডিও বাংলাদেশ!

আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৭ মার্চ, ১০ জানুয়ারির মতো স্মরণীয় দিনগুলো যেমন ত্যাগ আর গৌরবের মহিমায় জ্বল জ্বল করছে, তেমনি গণহত্যার ২৫ মার্চ, ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট, ১৭ই আগস্ট, ২৬ সেপ্টেম্বর, ৯ জুলাইয়ের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কিছু কালো দিনও আছে। না চাইলেও আমরা ভুলে যেতে পারব না। তেমনই কলঙ্কিত একটি দিন ২৬ সেপ্টেম্বর। ১৯৭৫ সালের এই দিনে খন্দকার মোশতাক তার সেই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যা জেনারেল জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠনের পরে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই পার্লামেন্টে আইনে পরিণত করে পঞ্চম সংশোধনী হিসেবে সংবিধানে ভুক্ত করা হয়।

দেশি-বিদেশি চক্রান্ত বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল যে খুনিরা, তাদের যাতে কোনোদিন বিচারের মুখোমুখি হতে না হয়, সেই অশুভ উদ্দেশ্যেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্র যখন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে, তখন তা কেবল কোনো ব্যক্তি বা প্রশাসনযন্ত্রের জন্যেই নিন্দনীয় কাজ নয়, গোটা জাতির জন্যই তা কলঙ্ক আর চরম লজ্জার ঘটনা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে ঘাতকচক্রের গড়া পুতুল সরকারের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ওই সালেরই ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করেছিল ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ, শিরোনাম ছিল রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নম্বর ৫০। খন্দকার মোশতাকের পাশাপাশি তাতে স্বাক্ষর করেন সে সময়ের আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবও।

সেই অধ্যাদেশ এর আইনগত বৈধতা দেয় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রধান বেনিফিশিয়ারি জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিএনপি এই কলঙ্কিত অধ্যাদেশকে বিল হিসেবে পাস করিয়ে নেয়। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর পর সেদিন সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এই কালো আইনটি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুহত্যা তো বটেই ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর জেলে জাতীয় চার নেতা হত্যা পর্যন্ত বিচার থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়! দায় মুক্তির পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়েও খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যার অব্যবহিত পর পরই সেনাপ্রধান হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। মেজর জেনারেল থেকে হয়ে যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল। সামরিকশাসন জারি থাকা অবস্থায়ই প্রেসিডেন্ট পদে থাকার বৈধতা নিয়েছিলেন হ্যাঁ-না ভোটের প্রহসন করে। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে সারা দেশে ভোটকেন্দ্র বসিয়ে সেই হ্যাঁ-না গণভোটের নাটক হয়েছিল।

সামরিক পোশাকেই জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন এবং ১৯৭৯ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিজয় নিয়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আনার পূর্বাপর সব ঘটনাই আজ ইতিহাসের অংশ। সেই সংসদেই সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী এনে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালে সামরিকশাসন তুলে নেয়া পর্যন্ত জিয়া-মোশতাক গংদের সমস্ত কার্যক্রমকেই বৈধতা দেয়া হয়।

সংগত কারণেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি সৃষ্টিকারী কালো দিন ৯ জুলাই অনাগত কাল ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কলঙ্কিত তারিখ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

একই সঙ্গে বিএনপি এবং এর দোসরদের ললাটেও এই কলঙ্কের দাগ অমোচনীয় হয়েই থাকবে। ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে এই যে, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। যদি করত, তাহলে খন্দকার মোশতাক বাংলার ইতিহাসের আরেক মীরজাফর হিসেবে ধিকৃত হয়ে বিদায় নেবার পরও ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের পক্ষে কারো দাঁড়াবার কথা ছিল না।

মীরজাফরের মতো মোশতাকওতো মাত্র কদিনের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন খুনিদের ক্রীড়নক হিসেবে। গলাধাক্কা দিয়ে তাকে বিদায়ের পর বিচারপতি সায়েমকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করেন জেনারেল জিয়া। তাকে নামমাত্র রাষ্ট্রপতি বানিয়ে জিয়া নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে রাজনীতিতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাত্র।

প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, খন্দকার মোশতাকের মতো গণধিকৃত, সেই একই বেঈমানি তিনিও কি করেননি? রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হবে জেনেও তিনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বরং ‘গো এহেড’ বলে ফারুক-রশীদের সমর্থন দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যায়! বিস্ময়কর হলেও সত্য একজন উপপ্রধান সেনাবাহিনী প্রধান হয়েও তিনি এমন নৃশংস ভূমিকাই পালন করেছিলেন!

জিয়াউর রহমান যে ক্ষমতার কী তীব্র পিপাসু, সেটা স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু থেকেই টের পাওয়া গিয়েছিল। কালুরঘাটে স্থাপিত বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের জন্য ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যাওয়ার পরে তিনি যে কাণ্ড করেছিলেন, তাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।

চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান ঘোষণা দেয়ার পরও সবাই ভাবলেন যে, একজন বাঙালি সেনাকর্মকর্তাকে দিয়ে ঘোষণাটি দেয়ানো গেলে সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সেনারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ হবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা না করে সরাসরি নিজেকে রাষ্ট্রপতি বলে সে ঘোষণা পাঠ করেছিলেন জিয়া! সঙ্গে সঙ্গে বিরূপ প্রতিক্রিয়া! আবার পাঠ করলেন তিনি এবং এবার বললেন, “অন বিহাফ অব আওয়ার ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান...।”

সুতরাং সেই জিয়ার স্বরূপ উন্মোচন যে একদিন হবে সে তো ছিল অনিবার্য সত্য এবং সময়ের ব্যাপার মাত্র। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে জিয়া কেন যাবেন? তার অন্তরে যে পাকিস্তান! বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমানের গভীর পাকিস্তানপ্রীতি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল!

পঞ্চম সংশোধনীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো জঘন্য কালাকানুন শুধু সংবিধানে অন্তর্ভুক্তই করেননি রাষ্ট্রপতি জিয়া, বঙ্গবন্ধু-হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের বিচারের পথ চিরতরে রুদ্ধ করায় সহযোগী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা ও চেতনাই বাঙালি জাতির জাগরণের মূলশক্তি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ই সংবিধান থেকে মুছে দিলেন সংবিধান সংশোধন করে!

যে ‘জয়বাংলা’ রণধ্বনি দিয়ে বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, সেই জয়বাংলা মুছে দিয়ে মৃত পাকিস্তানের ‘জিন্দাবাদ’ ফিরিয়ে আনলেন সংশোধনীতে। বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রেডিও পাকিস্তানের স্টাইলে করলেন রেডিও বাংলাদেশ!

জ্ঞাতসারে বলতে হবে এ কারণে যে, কর্নেল ফারুক-রশিদ, ডালিমদের ১৫ আগস্টের পরিকল্পনা জিয়াউর রহমান জেনেছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার ৪ মাস ১৯ দিন আগে! ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কর্নেল ফারুক ও রশিদ গং প্রথমে ঢাকা থেকে ব্যাংককে চলে গিয়েছিলেন। সেনাপ্রধান জিয়া তাদেরকে দ্রুত বিশেষ ব্যবস্থায় দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন। সেখানেই ব্রিটিশ সাংবাদিক ম্যাসকারাহ্যানসকে টেলিভিশনের জন্য যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, রশিদ, ফারুকরা তাতে উল্লেখ করেছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা।দুজনই বলেছেন ২০ মার্চ সন্ধ্যায়

আমরা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাই। আমাদের পরিকল্পনা শুনে তিনি বললেন, সিনিয়র অফিসার হিসেবে আমি তোমাদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে পারি না। তোমরা ইয়াং অফিসাররা করতে চাইলে এগিয়ে যাও। শেষ বাক্যটা ছিল, ‘গো এহেড।’

ফারুক ও রশিদের সেই সাক্ষাৎকার আগ্রহী পাঠক ইচ্ছে করলে ইউটিউবে সার্চ দিয়ে এখনও শুনতে পারেন।

যাহোক, পৃথিবীর ইতিহাসের এই কলঙ্কিত আইন, বিচারহীনতার এই বিধানটি বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে সংবিধানে সংশোধনী এনে সংবিধানকে কলঙ্কমুক্ত করেন কালো আইনটি বাতিলের মাধ্যমে।

দুঃখের বিষয়, এই একুশটি বছর দেশ যারা পরিচালনা করেছেন তাদের কারো বিবেক দংশিত হয়নি এই কালো আইনটি দেখে! বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকার এই একুশ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতাকে হত্যা করা হলো- তার হত্যাকারীদের বিচারের কোনো ব্যবস্থাই নেয়া যাবে না!

এমন কালো আইন সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলে তা জাতি হিসেবে তাদের কোন আদিম বর্বর যুগে ঠেলে দেয়? এ প্রশ্ন কি তাদের কারো মনেই জাগেনি? নিশ্চিত করেই বলা যায়, জাগেনি। কারণ, যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা সকলেই পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ যারা রুদ্ধ করে রেখেছিলেন তারা দেশের যে সর্বনাশ করে গেছেন, তা কোনোদিন মোচন হবার নয়। ১৫ আগস্ট কোনো সরকারপ্রধানকেই হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষাকেও। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে না কোনো অর্থনৈতিক বৈষম্য আর ধর্মীয় সহিংসতা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের রাষ্ট্রে থাকবে না ধর্মের নামে রাজনীতি আর শোষণ-বঞ্চনার মতো পাকিস্তানি অভিশাপ। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক পরিচালক (বার্তা), বিটিভি।

আরও পড়ুন:
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’
আফগানিস্তানের গন্তব্য কোথায়?
কে কাকে ‘স্যার’ বলবে?
সেবক ও মানবিক শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু ভবন যেন বাংলাদেশের হৃদয়

শেয়ার করুন

দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ

দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ

১৯৭৯ সালে সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ২৬ সেপ্টেম্বরের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ৫০ অতিরিক্ত সংযোজনী হিসেবে ৬ এপ্রিল পাস করা হয়। এদের বিচার সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। যারা ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সকল অপরাধ, অপকর্মের সুবিধাভোগী তারা তাদের স্বার্থে খন্দকার মোশতাকের অবৈধ অধ্যাদেশকে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান ও চরিত্রকেই কলঙ্কিত করেছিল। এই কলঙ্ক যারা বহন ও ধারণ করেছে তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাতা হতে পারে না। তারা এর বিরোধী শক্তি। রাজনীতির এই পাঠ যারা বোঝেন না কিংবা গুলিয়ে ফেলেন তারাও ঘাতকদেরই অনুসারী।

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অবৈধ সরকারপ্রধান খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যারা বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জন নিরপরাধকে রাতের আঁধারে গুলি করে হত্যা করেছিল তাদেরকে বিচারের আওতা থেকে মুক্ত রাখার জন্য দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশটি দুটি অংশে বিভক্ত।

দুই অংশের এই অধ্যাদেশের প্রথম অংশে লেখা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থি যা-ই কিছু ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

দ্বিতীয় অংশে বলা হয়-

“রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হল। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের এবং নিকট আত্মীয়স্বজনদের যারা হত্যা করেছিল তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র যাত্রা শুরু করছিল সেটিকে মৌলিক আদর্শ থেকে সম্পূর্ণরূপে উল্টোপথে পরিচালিত করা। এজন্য তারা সামরিক বাহিনীর ট্যাঙ্ক, বন্দুক, গোলাবারুদ ব্যবহার করে। যারা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের সবাই ছিল সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কর্মকর্তা এবং অধস্তন সেনাসদস্য। এদের একটি অংশ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত ছিল, অন্য অংশটি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিল।

সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ বেশিরভাগ কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ডের গোপন কোনো ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সামান্যতম অবহিত ছিল না। তবে ধারণা করা হচ্ছে- সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা উচ্চাভিলাষী কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা গোটা ষড়যন্ত্রের পূর্বাপর প্রস্তুতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। নতুবা ট্যাঙ্কের মতো সাঁজোয়া বাহিনী সেনানিবাসের বাইরে এভাবে আগে থেকে বের হওয়ার কোনো সামরিক বিধানমতে থাকার ন্যূনতম কারণ ছিল না। তাছাড়া সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কিছু কর্মকর্তার ইচ্ছাতেই সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে কেউ কেউ বা কিছু জুনিয়র কর্মকর্তা সামরিক অস্ত্রের নির্বিচার ব্যবহার করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। যারা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল তারা সবাই অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ঘাতক চরিত্রের অধিকারী ছিল।

সে কারণে হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু, শেখ মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাত পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য এবং বাড়িতে থাকা অন্য সবাই তারা ভয়ানক আক্রোশ নিয়ে হত্যা করে। অন্য দুটি পরিবারেও আক্রোশের মাত্রা প্রায় একই রকম ছিল। দুচারজন শিশু সৌভাগ্যক্রমে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিল। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বাইরে আরও অনেকেই ছিল যারা বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের প্রহরা বসিয়েছিল। তাদের হাতেই নিহত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দিন আহমেদ বা কর্নেল জামিল নামে পরিচিত মিলিটারি সেক্রেটারি।

এছাড়া সাভারে ১১জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকেও নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা বেতার ভবন দখল এবং গণভবনে ১৫ তারিখ থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। কোনো ধরনের আইন, বিধিবিধান, সামরিক-বেসামরিক সৌজন্যতাবোধ তারা তাদের কর্ম ও আচরণে দেখায়নি। এমনকি সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে দ্বিধা করেনি। তাদের আচরণে অনেকেই ক্ষুব্ধ হলেও প্রাণভয়ে কেউ মাথা তুলতে পারেননি। রাষ্ট্রের কোথায় কে কী করবেন, কাকে বসানো হবে, কাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে সবকিছু তারা খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে একের পর এক বাস্তবায়ন করতে থাকে। খন্দকার মোশতাক অসংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে বসার পেছনে ছিল এসব হত্যাকারী ও ঘাতকদের পূর্বপরিকল্পনা। সংবিধান অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব আপনাআপনি উপরাষ্ট্রপতি তথা সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতি অর্পিত হওয়ার কথা। খন্দকার মোশতাক কোনো আইনেই রাষ্ট্রপতি পদে বসার কারণ ছিল না।

তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের অধীন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। সুতরাং তার রাষ্ট্রপতি পদ ছিল দখল করা, কোনোভাবেই সাংবিধানিকভাবে বৈধ পন্থায় নয়। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে থাকেন যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হওয়ার মানেই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। এটি দুর্জনের কুযুক্তি। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুহত্যার পর সরকার গঠনের কোনো সুযোগ পায়নি। খন্দকার মোশতাক আওয়ামী লীগ করলেও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যেহেতু তার ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্তি ছিল তাই মোশতাক ছিলেন একজন ষড়যন্ত্রকারী, ঘাতক ও ক্ষমতালোভী ব্যক্তি যিনি বঙ্গবন্ধু কিংবা আওয়ামী লীগের আদর্শের ধারক ছিলেন না।

তিনি যে একজন বিশ্বাসঘাতক, ষড়যন্ত্রকারী এবং ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তি ছিলেন সেটি ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন না যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতায় বসার জন্য আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ইচ্ছার কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়েছিল। সেই সুযোগ তখন কারো ছিল না।

সাংবিধানিকভাবে উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহণের পথ যারা রুদ্ধ করেছিল তারা প্রমাণ দিয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশ পরিচালিত হবে তাদের ইচ্ছায়, সংবিধান বা জনপ্রতিনিধিদের কোনো দায়দায়িত্ব রাখার সুযোগ দেয়া হয়নি। সুতরাং ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল বঙ্গবন্ধুর বৈধ সরকারকে সম্পূর্ণরূপে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা নিজেদের ইচ্ছেমতো দখল করা। সেকারণেই ঘাতকরা ১৫ আগস্টের রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে তাদের নরঘাতকদের চরিত্র সম্পূর্ণরূপে উন্মোচন করে সবাইকে হত্যা করেছিল। তারা কাউকেই জীবিত থাকতে দেয়নি- যারা রাষ্ট্র-রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেন।

শুধু তাই নয়, ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামানসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নেতৃবৃন্দকে প্রথমে গৃহবন্দি করে রাখে, পরে জেলখানায় বিনা অপরাধে আটকে রাখে। তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজনের ওপর শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরকারপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তার অধীনে সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। যারা তাতে সম্মতি দেননি তাদের জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এখন অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে বঙ্গবন্ধুর লাশ ৩২ নম্বরে থাকা অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের কিছু নেতা বিকাল ৪টায় মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথ গ্রহণ করেন। যারা বিষয়টিকে এত সহজভাবে উপস্থাপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন তারাও ১৫ আগস্টের ঘাতকদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের সমর্থক, মানসিকভাবে ক্ষমতা-রোগাক্রান্ত, রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পশ্চাৎ গমনেরই অনুসারী।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিল তারা রাষ্ট্রবিরোধী, মানবতাবিরোধী এবং রাষ্ট্রের সকল প্রকার প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসকারীও ছিল। এদের অপকর্মের কোনো তুলনা হয় না। কোনো স্বাভাবিক সমাজে এমন অপরাধীর বসবাস হতে পারে না। রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী হচ্ছে সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানসহ এত সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ মানুষকেই শুধু হত্যা করেনি, রাষ্ট্রক্ষমতা শুধু দখল করেনি, সংবিধানই শুধু লঙ্ঘন করেনি, সেনাবাহিনীকেও তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিক্ষেপ করে।

১৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যেসব বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছিল। তার ফলে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চেইন অব কমান্ড নষ্ট হয়ে যায়। অসংখ্য সেনা কর্মকর্তা চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে গিয়ে আত্মাহুতি দেন, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটে। গোটা সেনাবাহিনী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য মর্যাদায় ফিরে আসতে অনেক সময় নিয়েছিল। এর ফলে সেনাবাহিনী হারিয়ে ছিল অসংখ্য মেধাবী চৌকষ দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাকে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্র রাজনৈতিক হঠকারী মতাদর্শের বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়।

সেনাবাহিনীর জন্য এটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন একটি পর্ব। যা পার হতে সেনাবাহিনীকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, সময়ও নিয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। রাজনৈতিক ময়দানে সুবিধাবাদী, ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি ভাবাদর্শের রাজনীতির উত্থান ঘটে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানে এবং বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থায়। অথচ এমন এক কলঙ্কজনক এবং ইতিহাসের নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের অপরাধকে দায়মুক্তি দেয়ার জন্য খন্দকার মোশতাক ২৬ সেপ্টেম্বর এই অধ্যাদেশ জারি করে যা ছিল অবৈধ, সংবিধানবিরোধী এবং মানবতাবিরোধীও।

সেকারণেই খন্দকার মোশতাক এই অপরাধীদের দ্বারা ২ নভেম্বর দিবাগত রাত তথা ৩ নভেম্বর জেলখানার অভ্যন্তরে ৪ জাতীয় নেতাকে হত্যা করার জন্য জেলের ভেতরে বেয়নেট এবং অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়। এরপরে ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড, অবৈধ ক্ষমতা দখল, সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড বিনষ্ট এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এতসব অপরাধ সংগঠনের অপরাধীদের বিনাবিচারে দেশ থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রীয়ভাবে করে দেয়া হয়। তাদেরকে বিমানে সপরিবারে ব্যাংককে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন এক অপরাধ সংগঠনের ঘটনা যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সেই সময়কার ক্ষমতা দখলকারী এবং পরবর্তী সময়ে যারা এই অপরাধের উত্তরাধিকারী হন তাদের জন্য। এদেরকে শুধু খন্দকার মোশতাকই নয় সামরিক শাসক জিয়া, সাত্তার, এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া এবং চারদলীয় জোট সরকার বিদেশে দূতাবাসে চাকরি প্রদান, দেশে তাদের শাসনামলে অবাধে আসা-যাওয়া করার সুযোগ দেয়া, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করারও ঘটনা ঘটেছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা এই সরকারগুলো নেয়নি। অধিকন্তু ১৯৭৯ সালে সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ২৬ সেপ্টেম্বরের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ৫০ অতিরিক্ত সংযোজনী হিসেবে ৬ এপ্রিল পাস করা হয়। এদের বিচার সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

যারা ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সকল অপরাধ, অপকর্মের সুবিধাভোগী তারা তাদের স্বার্থে খন্দকার মোশতাকের অবৈধ অধ্যাদেশকে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান ও চরিত্রকেই কলঙ্কিত করেছিল। এই কলঙ্ক যারা বহন ও ধারণ করেছে তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাতা হতে পারে না। তারা এর বিরোধী শক্তি। রাজনীতির এই পাঠ যারা বোঝেন না কিংবা গুলিয়ে ফেলেন তারাও ঘাতকদেরই অনুসারী।

সংবিধানে এমন মানবতাবিরোধী আইন আমাদেরকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বহন করতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের মাধ্যমে সংবিধানে থাকা মানবতাবিরোধী কালো আইনটি রহিত করার উদ্যোগ নেয়। বিএনপি জামায়াতসহ কয়েকটি দল এর বিরোধিতা করে, সংসদে অনুপস্থিত থাকে। ১২ নভেম্বর সংসদে আইন পাসের দিন তারা হরতাল ডাকে।

তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ৫ম সংশোধনীর কালো আইনটি রহিত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ এবং এর সংবিধান মুক্তি পায় অপরাধী ও দায়মুক্তির আইন থেকে। এরপরে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলার বিচার শুরু হয়। উচ্চ আদালতের রায়ে কয়েকজনের সাজা কার্যকর করা হয়। কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশে পালিয়ে আছে। ইতিহাসে এরা মানবতাবিরোধী অপরাধী, এদের সহযোগীরা রাজনীতিতেও ১৫ আগস্টের হত্যাকারী এবং তাদের অনুসারী হিসেবে চিরকালের জন্য চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক।

আরও পড়ুন:
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’
আফগানিস্তানের গন্তব্য কোথায়?
কে কাকে ‘স্যার’ বলবে?
সেবক ও মানবিক শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু ভবন যেন বাংলাদেশের হৃদয়

শেয়ার করুন

কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ

কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ

জিয়া এবং মোশতাক উভয়েই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কুশীলব ছিল সে যুক্তির পক্ষে যেসব প্রমাণ রয়েছে তার অন্যতম প্রমাণ এই অধ্যাদেশ বা আইন। জিয়া-মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার অংশীদার না হলে কেন তারা বন্দুকধারী খুনিদের বিচারের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের পুরস্কৃত করেছিল, কেনইবা তাদের উঁচু কূটনৈতিক পদে চাকরি দিয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাব নিশ্চয় খুনি জিয়া এবং খুনি মোশতাকের পক্ষে যারা কথা বলার চেষ্টা করে, তাদের কাছে নেই।

বিশ্বের ঘৃণ্যতম কালো কানুনগুলোর অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশের খুনি মোশতাক ও জিয়া প্রণীত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বা আইন। আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সভ্য সমাজের অভ্যুদয়ের পর কোনো দেশে এ ধরনের কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। আর রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার ব্যাপারেতো নয়ই।

পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের অনেকেই ছিলেন মানবিক গুণাগুণের অধিকারী আর তাই মানবতাবিরোধীরাই তাদের হত্যা করেছে।

খ্রিস্ট জন্মের আগে জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করেছিল তারই অতি আপনজন ব্রুটাস। রোমান কর্তৃপক্ষের প্রিয়জন হওয়া সত্ত্বেও তার বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ব্রুটাস পালিয়ে যাওয়ায় এবং পরে আত্মহত্যা করায় তার বিচার করা যায়নি। গত দুই শতকে যেসব রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে তার মধ্যে ছিলেন মার্কিন মানবতাবাদী প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন যিনি কৃষ্ণাঙ্গ কৃতদাসদের মুক্ত করার জন্য গৃহযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আর সে কারণেই তাকে হত্যা করেছিল জন উইলকিস বুথ নামের এক অভিনেতা। ১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল তার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে ছিল ৮ জন।

হত্যার পর পরই বুথ পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়ায় তাকে খোঁজার জন্য শুরু হয় দেশব্যাপী অভিযান, ঘোষণা করা হয় তাকে খুঁজে পেতে ১ লাখ ডলার পুরস্কার। তাকে খুঁজে পেলেও সে আত্মহত্যা করার কারণে তারও বিচার সম্ভব হয়নি, তবে তার সঙ্গে যে ৮ জন ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল তাদের বিচার হয় এবং এক মহিলাসহ ৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় লিংকন হত্যা বিচারের জন্য গঠিত মিলিটারি কমিশন।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারতের অহিংসবাদের নায়ক মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করে হিংসার চরম দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল নাথুরাম গডসে নামের এক হিংসাবাদী। গান্ধীজি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বলেছিলেন তার হত্যাকারীকে ক্ষমা করতে। কিন্তু আইনের কঠোর হাত নাথুকে ক্ষমা করেনি, দিয়েছিল মৃত্যুদণ্ড।

পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জন কেনেডি হত্যারও বিচার হয়েছিল, বিচার হয়েছিল ইন্দিরা, রাজিব হত্যার। তাদের সবার হত্যার পরও সাংবিধানিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়নি, সাংবিধানিক নিয়মেই তাদের উত্তরসূরিদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম হয়েছে বাংলাদেশে যেখানে সব খুনি এবং ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের হাত থেকে রক্ষা করার অপপ্রয়াস হিসেবে বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম কুশীলব খুনি মোশতাক প্রথমে ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর খুনিদের রক্ষা করার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বাংলাদেশকে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে এ ধরনের কালো আইনপ্রণেতা দেশের তালিকাভুক্ত করে।

মোশতাক বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি, পারেনি তার উত্তরসূরি বিচারপতি সায়েমও। বঙ্গবন্ধু হত্যার আসল খলনায়ক খুনি জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে, যে কিনা ঘটনার আগে ছিল ক্ষমতার আড়ালে। জিয়া ক্ষমতায় যেয়েও অধ্যাদেশটি বাতিল করেনি বরং এক কদম এগিয়ে সব বন্দুকধারী খুনিদের বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে পদোন্নতিসহ লোভনীয় কূটনৈতিক পদে পদায়ন করে। জিয়ার কাজ সেখানেই শেষ হয়নি, সে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনি মর্যাদা দিয়ে পঞ্চম সংশোধনী আইন প্রণয়ন করে।

তথাকথিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ যে শুধু বন্দুকধারী খুনিদের জন্য রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছিল, তা নয় এতে সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত সব ষড়যন্ত্রকারীদেরও। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যারাই বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে বা কোনো ট্রাইব্যুনালে দেওয়ানি বা ফৌজদারি কোনো ধরনের মামলা হবে না, কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গমূলক মামলা কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের কাছে করা যাবে না, কোনো সামরিক আদালতে বা কোর্ট মার্শালে বিচার হবে না, কোনো বিভাগীয় বিচার হবে না, কোনো দেওয়ানি মামলাও হবে না।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল সেই দিনের ঘটনাবলির জন্য যারা পরিকল্পনা করেছিল, ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, প্রস্তুতিপর্বে অংশীদার ছিল অথবা কার্যকর করিয়েছিল তাদের সবার জন্যই এই অধ্যাদেশ প্রযোজ্য হবে। অধ্যাদেশের দ্বিতীয় পর্বে খুনিদের নাম উল্লেখ করা হয়। অধ্যাদেশের ভাষা থেকে এটি পরিষ্কার যে, শুধু বন্দুকধারী খুনিরাই নয়, এই অধ্যাদেশ দ্বারা রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে সব ষড়যন্ত্রকারী, নীলনকশাকারী, পরিকল্পনাকারী এবং সেগুলো বাস্তবায়নে যাদের ভূমিকা ছিল। এ ধরনের আইন করে বাংলাদেশকে প্রবেশ করানো হয়েছিল বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারক দেশে আর এ কারণে খুনি এবং ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার ২১ বছর বিলম্বিত হয়।

জিয়া এবং মোশতাক উভয়েই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কুশীলব ছিল সে যুক্তির পক্ষে যেসব প্রমাণ রয়েছে তার অন্যতম প্রমাণ এই অধ্যাদেশ বা আইন। জিয়া-মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার অংশীদার না হলে কেন তারা বন্দুকধারী খুনিদের বিচারের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের পুরস্কৃত করেছিল, কেনইবা তাদের উঁচু কূটনৈতিক পদে চাকরি দিয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাব নিশ্চয় খুনি জিয়া এবং খুনি মোশতাকের পক্ষে যারা কথা বলার চেষ্টা করে, তাদের কাছে নেই। জিয়া তথাকথিত রাষ্ট্রপতি পদটি জবরদখল করার পর ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি আরও পাকাপোক্ত করার জন্য সেটিকে আইনে রূপান্তরিত করেছিল। জিয়া তার পঞ্চম সংশোধনী আইনের মাধ্যমে (যে আইনকে পরবর্তীকালে সুপ্রিমকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন) এই কালো আইনকে সংবিধানের অংশে পরিণত করার অপচেষ্টা করেছিল, যা ধোপে টেকেনি।

পরবর্তীতেকালে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল তার অন্যতমটি ছিল ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু এবং জেল হত্যার বিচারের পথ খুলে দেয়া, সেই উদ্দেশ্যেই আওয়ামী লীগ সরকারের সে সময়ের আইনমন্ত্রী, প্রয়াত অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিলের জন্য বিল উত্থাপন করলে তা ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়, বাতিল হয়ে যায় কলঙ্কিত ইনডেমনিটি আইন। আইনটি বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দুজন খুনি হাইকোর্টে রিট করলে মহামান্য হাইকোর্ট ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন এই মর্মে রায় দেন যে, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বা আইন কখনও বৈধ ছিল না, যার অর্থ এই যে, এগুলো শুরু থেকেই অচল, অপ্রয়োগযোগ্য ছিল।

উল্লেখযোগ্য যে আইনটি বাতিল করে সংসদে আইন পাস হওয়ার কয়েকদিন আগেই লালবাগ থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যার এজাহার দায়ের করা হয়েছিল। এটিও উল্লেখযোগ্য যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের দিনই ধানমন্ডি থানায় এজাহার দায়ের করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু থানা পুলিশ এই বলে মামলা ফিরিয়ে দিয়েছিল যে “আপনারাও বাঁচেন, আমাদেরও বাঁচতে দেন। এই মামলা করলে আমাদের সকলের কল্লা যাবে।”

অধ্যাদেশ বা আইনটি রহিত করার পরে বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং জেল হত্যামামলা চালানো সম্ভব হয়, দেশ বেঁচে যায় বিচারহীনতার কলঙ্কময় অধ্যায় থেকে। এরপর বন্দুকধারী খুনিদের বিচার হয়েছিল বটে কিন্তু পেছনের খলনায়কদের অর্থাৎ যারা পরিকল্পনায়, নীলনকশা প্রণয়ন, ষড়যন্ত্র এবং ষড়যন্ত্র কার্যকর করার ব্যাপারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিল তাদের মৃত্যুজনিত কারণে বিচার হলো না। আরও কয়েকজন রয়ে গেছে আইনের আওতার বাইরে এবং তাই আজকের গণদাবি এসব কুশীলবদেরও মুখোশ উন্মোচন করার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী কমিশন।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।

আরও পড়ুন:
‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’
আফগানিস্তানের গন্তব্য কোথায়?
কে কাকে ‘স্যার’ বলবে?
সেবক ও মানবিক শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু ভবন যেন বাংলাদেশের হৃদয়

শেয়ার করুন