শিশুদের নীল বেদনা পৃথিবীর এক গাঢ় দুঃখ

শিশুদের নীল বেদনা পৃথিবীর এক গাঢ় দুঃখ

শিশুদের সামনে অগ্নিমূর্তি দেখানোর কোনো নৈতিক অধিকার বাবা-মা রাখেন না। মালিকানার দিক থেকে বাবা-মা শিশুদের একান্ত নিজেদের সন্তান হিসেবে বিবেচনা করেন, যা পরিপূর্ণ সত্য নয়। প্রতিটি শিশু প্রকৃতির হাজারও রসায়নের সমষ্টি। শিশুদের মালিকানা বলে যদি কিছু থাকে তবে সেটা প্রকৃতি। বাবা-মা শিশুদের কেয়ারগিভার মাত্র।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো ও বাংলাদেশি নাগরিক শরীফ ইমরানের বিয়ে বিচ্ছেদোত্তর সন্তানদের অভিভাবকত্ব নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো সন্তানদের অভিভাবকত্ব দাবি করে এদেশের হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন। সন্তান ফিরে পেতে মা জাপান থেকে বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন।

হাইকোর্ট আগামী ৩১ আগস্ট ২০২১ পর্যন্ত তেজগাঁওয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে উন্নত পরিবেশে তাদের সন্তানদের রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। নাকানো এরিকো ও শরীফ ইমরানের সন্তান জেসমিন মালিকা (১১), লাইলা লিনা (১০) বর্তমানে তেজগাঁওয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রয়েছে এ নিবন্ধ লেখা পর‌্যন্ত।

জাপানে জন্ম নেয়া ও বেড়ে ওঠা শিশু দুটি আজ এক বিশেষ পরিস্থিতির শিকার। তারা বাবা-মার সঙ্গে সীমিত পরিসরে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছে। গণমাধ্যম থেকে আরও জানা গেছে, এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে শিশুদের খাপ খাওয়াতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। শিশুদের এ অবস্থা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের জন্য পীড়াদায়ক।

পৃথিবীর সব শিশুর রয়েছে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার। এটি বাড়তি কোনো চাওয়া বা করুণার বিষয় নয়। একটি মৌলিক বিষয়। শিশুদের মর্যাদাপূর্ণ ও শঙ্কাহীনভাবে বেড়ে ওঠায় বাবা-মার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কোনো বিশেষ পরিস্থিতির শিকার হয়ে শিশুরা শাস্তি ভোগ করতে পারে না। শিশুদের বিস্ফোরোণ-উন্মুখ পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয়া কোনো সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে না। শিশুর কুসুমরাঙা মুহূর্ত বেদনার নীল রঙে ঢেকে দেয়া যায় না। মনে রাখতে হবে, শিশুদের নীল বেদনা পৃথিবীর এক গাঢ় দুঃখ।

বাস্তবতা হলো পরিবারে শিশুদের অনেক সময় বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। নাকানো এরিকো ও শরীফ ইমরানের সন্তানদ্বয় জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনার অবস্থা বাংলাদেশে অনেক শিশুর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাজুয্যময়। এখানে ঘরভাঙা দুঃখবোধ নিয়ে অনেক শিশু বেড়ে ওঠে। সারা পৃথিবীর শিশুদের কষ্টগুলো প্রায়ই একরকম। পৃথিবীর কোনো প্রান্তে একটি শিশু সংকটগ্রস্ত মানে সব শিশুরই কষ্ট।

ঘরভাঙাকেন্দ্রিক দুঃখবোধ শিশুদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। তাদের এ অভিঘাত বয়ে বেড়াতে হয় জীবনজুড়ে। কোনো সংসারই হুট করে ভাঙে না। সংসার ভাঙার পূর্ব মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে সংঘাতময়। সংসার ভাঙার আগে তৈরি হয় মতবিরোধ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সহিংসতা, যা নীরবে শিশুদের সহ্য করতে হয়। মানসিক বিষণ্নতা তাদের পেয়ে বসে। আশ্রয় করে অজানা আশঙ্কা।

নিজগৃহে সংঘাত পৃথিবীর ভয়াবহতম কষ্ট। পারিবারিক এ সংঘাতের দর্শক কেবল শিশুরা। বিশেষত নগরজীবনে। নগরজীবনে পরিবারিক সংকটে শিশুরা যুদ্ধের মধ্যে পড়ে। কারণ, তাদের পালিয়ে বাঁচার কোনো জায়গা নেই। নেই পরিবেশ বদলের সুযোগ। কেবল শার্সি দিয়ে পাশের বাড়ির আরেকটি দেয়াল দেখা ছাড়া বাড়তি কোনো সুযোগ নেই।

নগরজীবনে পারিবারিক কলহে পাশে নেই কোনো খোলা জায়গা বা প্রিয়জন। কেউ এসে একটু ভারী গলায় বলে না তোমরা ‘থামো’। নগরজীবনে নেই কোনো সম্পর্কসঙ্গ। এখানে জীবন ও ব্যক্তি একা। ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে বিস্ফোরণ উন্মুখ পরিস্থিতি তৈরি হয়। শিশুরা ক্ষণে ক্ষণে আগুনের তাপ অনুভব করে। অনেক সময় তারা এ তাপে পড়ে যেতে বাধ্য হয়।

গ্রামীণ পটভূমিতে বাবা-মার মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত তৈরি হলে অনেক সময় চাচি-ফুফু-দাদীরা শিশুদের টেনে নিয়ে যায়। দুপুর বেলায় গোসল করিয়ে দুটো ভাত খাইয়ে ঘুমিয়ে দেয়। বিরোধ মিটাতে দূতিয়ালি করে। বিকেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শিশুদের বাড়িতে দিয়ে যায়।

সামান্য সংখ্যক শিশু জীবনীশক্তি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। বাবা-মার বিরোধে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করে। ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। বাবা-মা বুঝতে দেয় না কাকে সে বেশি ভালোবাসে। বিরোধ থামলে একবার বাবার কাছে আরেকবার মায়ের কাছে ছুটে যায়। বাবা-মার মধ্যে সম্পর্কের গুরুত্ব বা অনুভব জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করে। জীবনের শুরুতে তাদের এ অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক তৎপরতা শিখতে হয়। তবে এ সংখ্যা বেশি নয়। তুলনামূলক বিচারে, আমাদের শিশুদের বেঁচে থাকা বা জীবনীশক্তি অনেক উন্নত।

বাবা-মার বিরোধে শিশুরা দিশেহারা হয়ে পড়ে। আর তা পড়াটাই স্বাভাবিক। এ রকম পরিস্থিতিতে শিশুরা দোটানা পরিস্থিতির ভেতর পড়ে। তারা ভেঙে যায়, বিভক্ত হতে থাকে। এটি তাদের কাঙ্ক্ষিত কোনো বিভক্তি নয়। শিশুরা মূলত বন্ধন চায় বিভক্তি নয়।

শিশু যখন কোনো কারণে আজ সহিংস হয়ে উঠছে তখন নিজেকে শান্ত করার কোনো স্মৃতি খুঁজে পাচ্ছে না। যেমন, আমার কোনো কারণে আব্বার ওপর অভিমান হলে ভাবতাম কয়েকদিন পরই তো আব্বা কাকনহাটের মেলায় নিয়ে যাবে। মুহূর্তেই মহিষের গাড়ি, মহিষের পায়ের ধুপধাপ শব্দ, টোপরের ভেতর খড়ের গন্ধ, সার্কাসের জাদুকর, মেলার বড় বড় মিষ্টি, টমটম আর বাঁশির শব্দ ভেসে উঠত। অভিমান মুহূর্তেই পানি হয়ে যেত। সহিংস পরিবারগুলো শিশুদের অভিমান প্রশমনে ভালো কোনো স্মৃতি গড়ে উঠছে না। এ কারণে তারা অল্পতেই সহিংস হয়ে ওঠে।

স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ শুরু হলে প্রথমে যে বিষয়টি লোপ পায় তা হলো ‘রেসিও’ মানে অনুপাত জ্ঞান। ইংরেজি রেসিও শব্দের সঙ্গে ‘র‌্যাশানাল’ শব্দের সম্পর্ক রয়েছে যার অর্থ যৌক্তিক আচরণ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তিক্ততা তৈরি হলে অনেক সময় যৌক্তিক আচরণ লোপ পায়। সহিংসতা হয়ে ওঠে প্রধান মুখ্য বিষয়। কার পাল্লা ভারী সেই হিসাব এখানে নয়। পরিবারগুলো হয়ে ওঠে পাগলাগারদের মতো। এক ধরনের বদ্ধতার মধ্যে পড়ে যায় শিশুরা।

এ বদ্ধতা অনেক সময় শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে মনোবৈকল্য তৈরি করে। পশ্চিমা এক মনস্তত্ত্ববিদ শিক্ষার্থীদের ওপর বিদ্যালয়ে বাজানো ঘণ্টার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি দেখান ঘণ্টার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে শিশুদের ধারাবাহিক মনোযোগের ওপর। ঘণ্টানির্ভর মনোযোগের যে স্থিতি শিশু মনোজগতে পোক্ত করে দেয়া হয় তার প্রভাব সারাজীবন বহন করে চলে। শিশুরা বাকি জীবন ঘণ্টানির্ভর মনোযোগ নিয়ে কাটায়।

মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা বলেছেন, শিশুদের মন হলো কাদামাটির মতো। তাদের যেভাবে আকার দেয়া যাবে সেই আকারে তারা গড়ে উঠবে। শিশুদের মনোজগত গঠনে পরিবার একটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান। বাবা-মার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরির ব্যাপারে বাবা-মার কর্তৃত্ব অস্বীকার করা যায় না।

শিশুদের সামনে অগ্নিমূর্তি দেখানোর কোনো নৈতিক অধিকার বাবা-মা রাখেন না। মালিকানার দিক থেকে বাবা-মা শিশুদের একান্ত নিজেদের সন্তান হিসেবে বিবেচনা করেন, যা পরিপূর্ণ সত্য নয়। প্রতিটি শিশু প্রকৃতির হাজারও রসায়নের সমষ্টি। শিশুদের মালিকানা বলে যদি কিছু থাকে তবে সেটা প্রকৃতি। বাবা-মা শিশুদের কেয়ারগিভার মাত্র। জাপানি প্রখ্যাত লেখক মুরাকামি হারুকি বলেছেন- “মানুষ চূড়ান্ত বিবেচনায় কিছুই না কেবল বাহকমাত্র- নিজেকে পাস করে দেয় জিনের মাধ্যমে। ঘোড়দৌড়ের মতো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে।”

ভেঙে যাওয়া সংসারের শিশুদের জন্য তৈরি হয় স্নেহবঞ্চনার দীর্ঘ পঙ্কিলপথ। তাদের জীবনের পরের অংশের সব কিছুই হয়ে পড়ে অর্ধেক। এ ধরুন ঈদের আনন্দ, জন্মদিন, বাইরে ঘুরে বেড়ানো, নতুন বই পড়ার বা বাসার রান্নার নতুন সাধ, জ্যোৎস্না বা শীতের পিঠা। অথবা মা-বাবার স্নেহের পরশ। কখনও হয়ত মায়ের কাছ থেকে ভালোবাসা কখনওবা বাবার কাছ থেকে। কিন্তু কিছুতেই তা শতভাগ হয় না। এর মধ্যে শিশুদের উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। অপরিণত বয়সে তাকে জটিল পরিস্থিতি সামলাতে হয়। শিশুর এ বঞ্চনা পৃথিবীর কোনোকিছু দিয়ে পূরণযোগ্য নয়।

যারা কোনো অপরাধ না করেও নির্মম শাস্তি ভোগ করে, যাদের বেঁচে থাকতে হয়, এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে হয় এমন সব শিশুদের জন্য থাকছে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। প্রতিটি শিশুর আবাস হোক স্বর্গতুল্য। জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাও আগামী পৃথিবীর মা।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।

আরও পড়ুন:
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সত্যকেই ধারণ করে
হীনম্মন্যতায় উন্নয়ন থেমে থাকে না
অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও টিকা গ্রহণের বয়স
বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

শেয়ার করুন

মন্তব্য

শেখ হাসিনার শান্তির উদ্যোগ

শেখ হাসিনার শান্তির উদ্যোগ

শান্তি প্রতিষ্ঠায় পিস হুইলের যে আটটি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু সে বিষয়গুলোকেই তার ভাষণের প্রতিপাদ্য হিসেবে নিয়েছেন। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের থিমটাও তার ভাষণের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছিলেন ও শান্তির ললিত বাণী শুনিয়েছিলেন, তার পথ ধরে তার কন্যাও আজ বর্তমান বিশ্ব উপযোগী শান্তির ললিত বাণী শোনাচ্ছেন। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।

দুনিয়াজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানির কমতি নেই। আজ এক দেশে তো কাল আরেক দেশে অস্ত্রবাজি চলছেই। শোষকগোষ্ঠীর নানামুখী স্বার্থের কারণে থেমে নেই এই যুদ্ধবাজি।

শান্তিনিকতেন বসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত ১৯৩৭ সালে লিখেছিলেন-

‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস,

শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস-

বিদায় নেবার আগে তাই

ডাক দিয়ে যাই

দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে

প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে॥

(প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)

দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয়। পৃথিবীর মানুষ শান্তি চায়। কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে শান্তিপ্রিয় মানুষের কণ্ঠস্বরের চেয়ে গোলাগুলি আর বোমাবাজির ডেসিবেল (শব্দের তীব্রতার পরিমাপক) বেশি। শান্তির জন্য শান্তিপ্রিয় মানুষের উদ্যোগ বেশিরভাগ সময়েই মাঠে মারা যায়। তবু দুনিয়ার মহান মানুষেরা শান্তির জন্য ছুটে বেড়ান। এই উদ্যোগ থেকেই বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘ পর্যন্ত যুদ্ধবিহীন বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮২ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দিবসটিকে ‘শান্তির আদর্শকে শক্তিশালী করার জন্য নিবেদিত’ দিন বলে ঘোষণা করে। এদিনটিতে অস্ত্র সরিয়ে রেখে বিশ্বজুড়ে সম্প্রীতির প্রতি যুদ্ধবাজদের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়। ২০০২ সাল থেকে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় মঙ্গলবারের পরিবর্তে প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস’ হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়।

শান্তির জন্য জাতিসংঘের এই দিবস ঘোষণার আগেই নতুন দেশ হিসেবে জন্মের শুরু থেকেই বাংলাদেশ শান্তির পিছনে ছুটে বেড়িয়েছে। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব সময় শান্তির অন্বেষণে ছুটেছেন। যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই শান্তির ললিত বাণী প্রচার করেছেন।

১৯৭৩ সালের ২৩ মে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি শান্তি পদক পরিয়ে দিয়ে বিশ্ব শান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশচন্দ্র বলেছিলেন- “শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।”

বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন- “লাখো শহীদের রক্তে সিক্ত স্বাধীন বাংলার পবিত্র মাটিতে প্রথম এশীয় শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য আগত শান্তির সেনানীদের জানাই স্বাগতম। উপনিবেশবাদী শাসন আর শোষণের নগ্ন হামলাকে প্রতিরোধ করে ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছি আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শান্তি আর স্বাধীনতা একাকার হয়ে মিশে গেছে। আমরা মর্মে মর্মে অনুধাবন করি বিশ্বশান্তি তথা আঞ্চলিক শান্তির অপরিহার্যতা।...

... আমি নিজে ১৯৫২ সালে পিকিং-এ অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলীয় শান্তি সম্মেলনের একজন প্রতিনিধি ছিলাম। বিশ্ব শান্তি পরিষদের ১৯৫৬ সালের স্টকহোম সম্মেলনেও আমি যোগ দিয়েছিলাম। একই সাথে এটাও আমি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই, বিশ্বশান্তি আমার জীবনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনো স্থানেই থাকুক না কেন, তাঁদের সাথে আমি রয়েছি। আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।”... (সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫৯-৬৬০, বাংলা একাডেমি, সম্পাদক: মোনায়েম সরকার।)

জাতিসংঘ শান্তির জন্য একটি দিন ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছিল ১৯৮১ সালে। তারপর ১৯৮২ সাল থেকে দিবসটি পালিত হতে শুরু করল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো এই জাতিসংঘেই অনেক আগেই শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলা ভাষায় দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘....বাংলাদেশ প্রথম হইতেই শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান ও সকলের প্রতি বন্ধুত্ব- এই নীতিমালার উপর ভিত্তি করিয়া জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করিয়াছে। কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশই কষ্টলব্ধ জাতীয় স্বাধীনতার ফল ভোগ করিতে আমাদেরকে সক্ষম করিয়া তুলিবে এবং সক্ষম করিয়া তুলিবে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা ও বেকারের বিরুদ্ধে লড়াই করিবার জন্য আমাদের সকল শক্তি ও সম্পদকে সমাবেশ ও কেন্দ্রীভূত করিতে। এই ধারণা হইতে জন্ম নিয়াছে শান্তির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি। এই জন্য সমঝোতার অগ্রগতি, উত্তেজনা প্রশমণ, অস্ত্র সীমিতকরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান নীতির সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা-বিশ্বের যেকোনো অংশে যেকোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হউক না কেন, আমরা তাহাকে স্বাগত জানাই। এই নীতির প্রতি অবিচল থাকিয়া আমরা ভারত মহাসাগরীয় এলাকা সম্পর্কে শান্তি এলাকার ধারণা, যাহা এই পরিষদ অনুমোদন করিয়াছে, তাহাকে সমর্থন করি।

আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে শান্তি, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ এলাকায় পরিণত করার প্রতিও সমর্থন জানাই।

আমরা বিশ্বাস করি যে, সমবেত উন্নয়নশীল দেশসমূহ শান্তির স্বার্থকে দৃঢ় সমর্থন করে। জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগুরু জনগণের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা তাঁহারা প্রকাশ করিয়াছেন।

মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শান্তি অত্যন্ত জরুরি এবং তাহা সমগ্র বিশ্বের নর-নারীর গভীর আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটাইবে। এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত শান্তিই দীর্ঘস্থায়ী হইতে পারে।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অঙ্গীকার প্রমাণের জন্য উপমহাদেশে আপস মীমাংসার পদ্ধতিকে আমরা জোরদার করিয়াছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের অভ্যুদয় বস্তুতপক্ষে এই উপমহাদেশে শান্তি কাঠামো এবং স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অবদান সৃষ্টি করিবে। ইহা ছাড়া আমাদের জনগণের মঙ্গলের স্বার্থেই অতীতের সংঘর্ষ ও বিরোধিতার পরিবর্তে মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।”...

(সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৮৬-৬৮৭, বাংলা একাডেমি, সম্পাদক: মোনায়েম সরকার।)

কেবল যুদ্ধ বিরতিতেই যে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না, এটা এখন সর্বজনস্বীকৃত। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অনেকগুলো উপাদান নিশ্চিত করতে হয়।

জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয় ‘পাথওয়ে টু পিস’ (সংক্ষেপে পিটিপি) নামে পিস ম্যাসেঞ্জার অর্গানাইজেশন বা শান্তির দূতিয়ালি সংগঠন। এই সংগঠনের গবেষকরা ২৫ বছরের নিরন্তর গবেষণা করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আটটি বিষয় নির্দিষ্ট করেছেন। তাদের মতে, এই আটটি বিষয়ের সঙ্গে যদি পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের সংযোগ ঘটানো যায় ও মানানো যায়, তাহলে দুনিয়াও শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠবে। যদিও দুনিয়ায় নানা জাতের, নানা চিন্তার, নানা ধর্মের, নানা পরিচয়ের, নানা বয়সের, নানা বর্ণের ও নানান লিঙ্গের মানুষ, তবু এই আটটি বিষয় প্রত্যেক সম্প্রদায় বা সোসাইটির জন্য সমান প্রযোজ্য। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘পিস হুইল’ বা শান্তির চাকা।

শান্তির চাকার আটটি বিষয় হচ্ছে- ১. সরকার, আইন, নিরাপত্তা, ২. শিক্ষা, মিডিয়া, ৩. অর্থনীতি,ব্যবসা ৪. স্বাস্থ্য সম্পর্ক ৫. বিজ্ঞান প্রযুক্তি ৬. ধর্ম, আত্মিক শিক্ষা, ৭. পরিবেশ, বাসস্থান এবং ৮. সংস্কৃতি।

প্রতিবছর আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবসের একটি থিম ঠিক করা হয়। ২০২১ সালে আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবসের থিম ঠিক করা হয়েছে- রিকভারিং বেটার ফর অ্যান একুয়াটেবল অ্যান্ড সাসটেইনেবল ওয়ার্ল্ড বা ন্যায়সংগত ও টেকসই পৃথিবীর জন্য আরও উত্তম পুনরুদ্ধার।

কোভিড-১৯ মহামারির ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে পৃথিবী। কীভাবে পৃথিবীর মানুষ আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে, সে চেষ্টা আমাদের সবার মধ্যে। আমরা সবাই মিলে সৃজনশীলতা দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করব। একটি সহনশীল পৃথিবী পুনর্নির্মাণ করব। যে পৃথিবী হবে আরও সাম্য, থাকবে ন্যায়বিচার, হবে ন্যায়নিষ্ঠ, শুদ্ধ, টেকসই এবং স্বাস্থ্যসম্মত।

এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত হিসাবে পৃথিবীর প্রায় ৬৭ কোটি মানুষ টিকা নিয়েছেন বা নেয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। কিন্তু পৃথিবীর এক শয়েরও বেশি দেশে তখন অবধি এক ডোজ টিকাও পৌঁছেনি। ওই সব টিকাহীন দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যের শিকার। তাদের কারণে পৃথিবীর সব মানুষই কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ করোনা একটি ভয়ংকর সংক্রামক রোগ। যেকোনো বৈষম্য শান্তি বিঘ্নিত করে। আর সেটাই উপলব্ধি করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য বাংলার প্রধানমন্ত্রী এখন জাতিসংঘের সদরদপ্তর নিউইয়র্কে। করোনা ভাইরাসের টিকার মেধাস্বত্ব উঠিয়ে এর ন্যায্যতাভিত্তিক বণ্টনের বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি জোর দেবেন বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা সমস্যা, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু, একীভূত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশ্ব শান্তি, নিরাপদ অভিবাসন, ফিলিস্তিন ও জোর করে বাস্তুচ্যুত করা মিয়ানমারের নাগরিকদের সংকট ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত বিষয়গুলোও তার ভাষণে গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় পিস হুইলের যে আটটি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু সে বিষয়গুলোকেই তার ভাষণের প্রতিপাদ্য হিসেবে নিয়েছেন। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের থিমটাও তার ভাষণের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছিলেন ও শান্তির ললিত বাণী শুনিয়েছিলেন, তার পথ ধরে তার কন্যাও আজ বর্তমান বিশ্ব উপযোগী শান্তির ললিত বাণী শোনাচ্ছেন। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। আশা করা যায়, শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার এই ভূমিকা ‘ব্যর্থ পরিহাস’ হবে না। এবারের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রতিপাদ্য বিষয়ও হচ্ছে ‘আশা।’ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল হবে- সে আশাও তো আমরা করতেই পারি।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সত্যকেই ধারণ করে
হীনম্মন্যতায় উন্নয়ন থেমে থাকে না
অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও টিকা গ্রহণের বয়স
বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

শেয়ার করুন

কাতারের অর্থ ও মধ্যস্থতায় ধরাশায়ী আরববিশ্ব

কাতারের অর্থ ও মধ্যস্থতায় ধরাশায়ী আরববিশ্ব

ইরান ও তুরস্কের উত্তেজনা প্রশমনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে। এসব অসহ্য লাগছে প্রতিবেশী সৌদি ও তার মিত্রদের। কারণ সৌদির অবস্থান তেহরান ও আঙ্কারার বিরুদ্ধে। কিন্তু উপায় নেই সৌদি জোটের। ট্রাম্প প্রশাসন যতটা মাথায় তুলেছিল সৌদি জোটকে, বাইডেন প্রশাসন তার বিপরীত। ইরান-তুরস্কের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসন ফিরলে বেকায়দায় পড়বে সৌদি। তাই কমাস আগে তুরস্কের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খাদ্যসহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে রিয়াদ। ইরান ইস্যুতে থাকছে নমনীয়।

কাতারের রাজধানী দোহায় ২০২০-এর ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় মার্কিন সমর্থিত আফগান সরকারের সঙ্গে তালেবানের শান্তি বৈঠক। দিন পাঁচেক পর আবার বৈঠক হবে বলে ঘোষণা করেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কথা ছিল গুয়ানতানামো কারাগার থেকে ৬ জন তালেবান বন্দিকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে যোগ দেবেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সচিব। কিন্তু কূটনৈতিক দোহা ১৬ সেপ্টেম্বরের আলোচনা ফলপ্রসূ করতে বৈঠকে হাজির করায় স্বয়ং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল রিচার্ড পম্পেওকে। পরে সে বৈঠক চলে টানা ৪ দিন।

মার্কিনদের পক্ষে বৈঠকের কূটনৈতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আফগানবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ। আগে তিনি ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের অধীনস্থ জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। ২০০৪ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত আফগানিস্তান এবং ২০০৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ইরাকের রাষ্ট্রদূত থাকার পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন বারাক ওবামা প্রশাসনের সঙ্গেও।

খলিলজাদকে আফগান উদ্ধার ও তালেবানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের নায়ক বলা হলেও মার্কিন জনগণ বরাবরই তার ভূমিকা সন্দেহের চোখে দেখেছে। যদিও এসবের পেছনে কাতারের সূক্ষ্ম হাত রয়েছে বলে মনে করে অনেকে। সম্প্রতি নিজেকে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে তুলে ধরলেও একটা সময় কূটনৈতিক সংকটে টালমাটাল ছিল পৃথিবীর ছোট অথচ মাথাপিছু আয়ে এক নম্বর দেশ কাতার।

আকস্মিকভাবে ২০১৭ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ইয়েমেন ও আফ্রিকার মুসলিম দেশ মিসর জোটবদ্ধ হয়ে কাতারের সঙ্গে সকল ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। শুরু হয় বিশ্বজুড়ে হইচই। নৃত্যের সঙ্গে পা মিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ।

আকাশ ও নদীপথের সম্পর্ক বন্ধের পাশাপাশি ছিন্ন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক, বন্ধ করে মিডিয়া সম্প্রচার। কাতার পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যসংকটে। এই অবস্থায় দোহার দিকে হাত বাড়ায় তেহরান ও আঙ্কারা। পরে সবকিছু স্বাভাবিক হলেও ততদিনে বিশ্ব-কূটনৈতিক ময়দানে দক্ষ খেলোয়াড় হয়ে ওঠে ছাব্বিশ লাখ জনসংখ্যার দেশটি। দূতিয়ালিতে ভূমিকা রাখে মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোর শান্তিচুক্তিতে।

আফগানিস্তানের তালেবান ইস্যু এখনও তরতাজা। প্রথমে মার্কিনরা ওমানের মাসকটে বসার আহ্বান জানায় তালেবানদের। তালেবানরা ভাবল সেখানে তাদের অনুকূল পরিবেশ এবং নিরপেক্ষ অবস্থান নেই। এমন সময় আসে দোহায় বসার আহ্বান। সেই সমঝোতার ভিত্তিতেই আফগানিস্তান ছাড়ে মার্কিনরা।

শুধু তাই নয়, নিরপেক্ষ শান্তি স্থাপনকারী হিসেবে সুদান সংকট নিরসন, লেবানন এবং ইয়েমেনেও ত্রাতার ভূমিকায় ছিল কাতার। বছরের পর বছর এসব পক্ষের বৈঠক আয়োজনে বিপুল অর্থ ও সময় খরচ করছে দোহা দপ্তর। এরপরও সমঝোতার সপক্ষে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন আরব অঞ্চলে কনিষ্ঠতম শাসক এবং কাতারের নতুন আমির শেখ তামিম বিন হামাদ বিন খলিফা আল থানি।

বর্তমানে কাতার চাইছে আমেরিকা-ইরানের মধ্যকার পরমাণু চুক্তির বিষয় আলোচনার টেবিলে এনে সমঝোতায় পৌঁছাতে। এটি সম্ভব হলে, মধ্যপ্রাচ্য আসবে এক ছাতার নিচে, আর পশ্চিমা বিশ্বের মাস্তানি নেমে যাবে অর্ধেকে। কাতার এর আগে চাচ্ছে তুরস্ক, সৌদি এবং ইরানের কূটনৈতিক ঐক্য।

ইতিমধ্যে সে প্রচেষ্টা হাতে নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন কাতার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ালেও বাইডেন চাচ্ছে কমাতে। এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি তেহরান ও ওয়াশিংটন। তবুও বসে নেই কাতার পররাষ্ট্র দপ্তর।

দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে। এসব অসহ্য লাগছে প্রতিবেশী সৌদি ও তার মিত্রদের। কারণ সৌদির অবস্থান তেহরান ও আঙ্কারার বিরুদ্ধে। কিন্তু উপায় নেই সৌদি জোটের। ট্রাম্প প্রশাসন যতটা মাথায় তুলেছিল সৌদি জোটকে, বাইডেন প্রশাসন তার বিপরীত। ইরান-তুরস্কের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসন ফিরলে বেকায়দায় পড়বে সৌদি। তাই কমাস আগে তুরস্কের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খাদ্যসহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে রিয়াদ। ইরান ইস্যুতে থাকছে নমনীয়।

মধ্যপ্রাচ্যে আর্তুগ্রুলের সৈনিকরা উসমানীয়দের সোনালি সময় ফেরাতে চাইছে তুরস্ক। অপর দিকে ইরান অপ্রতিরোধ্য। চারপাশে মার্কিন চব্বিশটি ঘাঁটি থাকার পরও আধুনিক সব অস্ত্র বানানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে ধর্মগুরু খামেনির নির্দেশে। ইব্রাহিম রাইসি সরকার সৌদির সঙ্গে বসতে রাজি হলেও আগে চাচ্ছে মার্কিনদের সঙ্গে সমঝোতা। তেহরান জানে, মার্কিন-সৌদি সম্পর্ক বেশ পুরোনো। মার্কিনদের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করতে চায় রিয়াদ। সেই রিয়াদের সঙ্গে বসলে আধিপত্য ভাগাভাগি হয়ে যেতে পারে।

পারমাণবিক শক্তির অধিকারী ইরান তা চাইবে কেন? এদিকে ইরান-তুরস্কের সঙ্গে আগে থেকে সুসম্পর্ক রয়েছে আধুনিক অস্ত্র ও অর্থে প্রভাবশালী মস্কো ও বেইজিংয়ের। তাই কাতার চাচ্ছে সম্পর্ক এবং অর্থের জোরে সবার ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করতে।

৪৪১৬ বর্গমাইলের কাতারের অর্থনৈতিক অবস্থান গত বিশ বছর ধরে মাথাপিছু আয়ের হিসাবে শীর্ষে। বিশ্বের প্রায় ৪০টির অধিক দেশে উপসাগরীয় এই ক্ষুদ্র দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে ৩৩৫ বিলিয়ন ডলার। সভরেন ওয়েলথ ফান্ড ইনস্টিটিউটের হিসাবে কাতার বিশ্বের ১৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাজপরিবারের সদস্য শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবর আল থানি জার্মানির ডয়েচ ব্যাংকে বিনিয়োগ করেন ১.৮৫ বিলিয়ন ডলার। কাতার ২০১১ সালে কিনে নেয় স্পোর্ট ইনভেস্টমেন্টস প্যারিস সেইন্ট-জারমেই (পিএসজি) ফুটবল ক্লাব। যে দলে খেলেন গ্রহের সবচেয়ে দামি ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি এবং নেইমার, এমবাপ্পেরা। বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেন জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ নামক ফুটবল ক্লাবটিতেও। তাই দুদেশের মধ্যকার খেলায় জিতে যায় কাতার।

২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দাকালে বারক্লেইসও ক্রেডিট সুইস গ্রুপে বিনিয়োগ করে কয়েক বিলিয়ন ডলার। ২০১২ সালে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে ‘পারমিরা অ্যাডভাইজর্স’ নামের একটি কোম্পানির কাছ থেকে বিলাসবহুল ইতালীয় ফ্যাশন হাউস ভ্যালেন্তিনো ফ্যাশন গ্রুপ কিনে নেয়। এর ৩ বছর পর পশ্চিম ইউরোপের জনপ্রিয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এল কোর্ট ইংলেসের ১০ শতাংশ মালিকানা কেনে। যুক্তরাজ্যে কাতারের বিনিয়োগ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অধিকাংশ বিনিয়োগ বিলাসবহুল আবাসিক এলাকাগুলোতে। ২০১৫ সালে কাতারের একটি কোম্পানি লন্ডনের ক্যানারি ইর্ফ নামের একটি এলাকাও কিনে নেয়। এ ছাড়া লন্ডনে রয়েছে কাতারের অসংখ্য বিনিয়োগ।

রাশিয়ার তেল কোম্পানিতেও কাতারের বড় ধরনের বিনিয়োগ আছে। গত বছর জুলাইয়ে রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গ বিমানবন্দরের ২৪.৯ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে জায়ান্ট তেল কোম্পানি রোজনেক্টের সঙ্গে ১১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সম্পন্ন হয়। রাশিয়ান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডে দেয় ২ বিলিয়ন ডলার। কাতারের নজর যায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। ২০১৫ সালে নিউ ইয়র্কে অফিস খোলে দেশটি। ২০২০ সালে সে দেশের তেল খাতে ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। হলিউডের সিনেমাশিল্পেও রয়েছে দোহার বিনিয়োগ।

কাতারভিত্তিক বিইন মিডিয়া গ্রুপ গত বছর ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কোম্পানি মিরাম্যাক্স কিনে নেয়। ২০১৬ সালে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে কিউআইএ চতুর্থ বৃহৎ বিনিয়োগকারীর অবস্থানে ছিল। গত বছর এম্পায়ার স্টেট রিয়েলিটি ট্রাস্ট ইনকর্পোরেশনের ১০ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় কাতার। এ ছাড়া ৮.৬ বিলিয়ন ডলারের মিশ্র মালিকানা রয়েছে ব্রুকফিল্ড প্রোপার্টি পার্টনার্সের।

কাতারের নজর ফিরে এশিয়ার দিকে। হংকং, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের সঙ্গে কাতারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রসারিত হচ্ছে। আগামী ৬ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে অফিস বানাতে চাইছে বেইজিং ও নয়াদিল্লিতে। অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের দেশটি বৈশ্বিক রাজনীতিতেও ক্রমাগত ভূমিকা রাখছে। ইসরায়েলকে উৎখাত করতে ফিলিস্তিনের হামাসকে অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দেয় দেশটি।

সৌদি জোট যেসব দাবিতে কাতারকে একঘরে করার চেষ্টা করছে- তার একটি হলো হামাসকে অর্থসহায়তা বন্ধ করা। না হয় আরবদের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইসরায়েলের বন্ধুত্ব, সমস্যায় পড়বে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক। উত্তেজনা আরও চরম আকার ধারণ করে মিসরের ইসলামপন্থি দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেয়ায়। যে দলটির তালেবান ও আল-কায়েদা সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, সুসম্পর্ক ইরানের সঙ্গেও।

কাতারের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের, তিউনিসিয়ার আন্না হাদা মুভমেন্ট ও লিবিয়ার বিভিন্ন ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলকে এবং তুরস্কের একে পার্টিসহ বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি দলের দিকে সমর্থনের অভিযোগও আছে । তাদের এমন সমর্থনে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দেশগুলো পড়ছে হুমকির মুখে।

ইরানের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসন সমঝোতায় বসলে সুবিধা হবে কাতারেরও। কারণ ইরাক সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রে ইরানের ব্যাপক প্রভাব। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীরা থাকে তেহরানের ছত্রছায়ায়। লেবানন-সিরিয়ায়ও আছে তাদের শক্ত অবস্থান। তালেবান রাষ্ট্র আফগানিস্তান ইরানের অনুকরণে গঠন করছে সরকার। পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, তুরস্কের সঙ্গে ভাই ভাই সম্পর্ক। বৈশ্বিক এই বলয় ভাঙতে গেলে ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই আমেরিকার হাতে।

কাতার কূটনীতিবিদরা জানে এমন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে আমেরিকা এবং বাকি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বোঝাপড়ার যেকোনো উদ্যোগে তাদের পরিপূর্ণ সমর্থন থাকার বার্তাই দিচ্ছে। আর এটা বাস্তবায়িত হলে ভেঙে পড়বে সৌদি জোট। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে উঠবে আমেরিকার কৌশলগত মিত্র দেশ কাতার। তাছাড়া আমেরিকা-ইরান সমঝোতায় মধ্যস্থতা করতে পারলে এশিয়ায় বাড়বে কাতারের মান-মর্যাদা।

লেখক: কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সত্যকেই ধারণ করে
হীনম্মন্যতায় উন্নয়ন থেমে থাকে না
অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও টিকা গ্রহণের বয়স
বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

শেয়ার করুন

বিশ্বব্যাংক ধোয়া তুলসী পাতা নয়

বিশ্বব্যাংক ধোয়া তুলসী পাতা নয়

কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করেই, ঋণের টাকা ছাড় না করেই মোড়লের মতো এই সংস্থার মাতব্বরি শুরু করে দেয়ার ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি কবছর আগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি; চুক্তিও করেছিল সরকারের সঙ্গে। কিন্তু অর্থ ছাড় না দিয়েই, প্রকল্পের কাজ শুরু না হতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে কাল্পনিক অভিযোগ করে বসে সংস্থাটি। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি- বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার। বিষয়টি কানাডার আদালত অবধি গড়ায়। দেড় বছর ধরে চলা দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেবে না বলে নিজস্ব অর্থে সেতুটি নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্নীতি মানে শুধু টাকা এ হাত-ও হাত করা নয়। দুর্নীতির মানে ক্ষমতার অপব্যবহার। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তথ্য এ দিক-ও দিক করে কোনো রিপোর্ট বা প্রতিবেদন বিশ্বববাসীর কাছে তুলে ধরা কোন ধরনের দুর্নীতি- তা আমার জানা নেই। আর সেই প্রতিবেদনের কারণে যদি কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতাচ্যুত হন বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন- তাহলে সেটা দুর্নীতির মধ্যে পড়বে কি না, সে বিষয়েও আমার কোনো ধারণা নেই।

কিন্তু, এই কাজটি যদি বিশ্ব আর্থিক খাতের মোড়ল সংস্থা বিশ্বব্যাংক করে থাকে তাহলে কিন্তু আমার কথা আছে। যে সংস্থাটি উঠতে-বসতে বাংলাদেশসহ তামাম দুনিয়ার মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবক দেয়, আর্থিকসহ নানা খাতের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলে; তাদের কথামতো না চললে বা কাজ না করলে কোনো দেশকে ঋণ দেয় না। নানা শর্ত মেনে কোনো প্রকল্পে ঋণ দিলেও একটু এদিক-সেদিক হলেই সেই টাকা আবার ফেরত নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলে দেয়া হয় সেই দেশের সরকারকে; অনিশ্চিত হয়ে পড়ে প্রকল্পটির ভবিষৎ। উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হন সেই দেশ বা প্রকল্প এলাকার জনগণ।

শুধু কি তাই, কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করেই, ঋণের টাকা ছাড় না করেই মোড়লের মতো এই সংস্থার মাতব্বরি শুরু করে দেয়ার ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি কবছর আগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি; চুক্তিও করেছিল সরকারের সঙ্গে। কিন্তু অর্থ ছাড় না দিয়েই, প্রকল্পের কাজ শুরু না হতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে কাল্পনিক অভিযোগ করে বসে সংস্থাটি। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি- বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার। বিষয়টি কানাডার আদালত অবধি গড়ায়। দেড় বছর ধরে চলা দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেবে না বলে নিজস্ব অর্থে সেতুটি নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাকিটা ইতিহাস; সবারই জানা…!

এই তো আর কমাস! তারপরই স্বপ্নপূরণ। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে বাস চলবে; চলবে ট্রেন। উন্নয়নের আরেক মহাসড়কে উঠবে বাংলাদেশ। জিডিপিতে যোগ হবে এক থেকে দেড় শতাংশ। দুই অঙ্কের (১০ শতাংশ) জিডিপিতে অগ্রসর হওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে।

এরই মধ্যে থলের বিড়াল বের হতে শুরু করেছে। যে সংস্থার এত বড় কথা; কত মাতব্বরি- সেই বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধেই এখন গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আর সেই অভিযোগটি হচ্ছে, চিলির সমাজতান্ত্রিক সরকারের বদনাম করতে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ বা ‘ব্যবসা করার সূচক-বিষয়ক প্রতিবেদন’ তৈরি করেছিল বিশ্বব্যাংক।

ব্যবসা করার পরিবেশ কোথায় সবচেয়ে অনুকূল, এর নিরিখে ২০০৬ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বের ১৯০ দেশের একটি তুলনামূলক তালিকা ও রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে বিশ্বব্যাংক। এ রিপোর্টকে ভিত্তি করেই বহু বিদেশি বিনিয়োগকারী কোন দেশে বিনিয়োগ করবে বা কোন দেশ থেকে সরে আসবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয়। গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রতিবেদন তৈরিতেই নানা অনিয়মের কথা স্বীকার করে এই রিপোর্ট আর না করার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

গত বছরের আগস্টে প্রথম অনিয়মের বিষয়টি টের পায় সংস্থাটি। এ কারণে ওই বছরের অক্টোবরে ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ প্রকাশ করা হবে না বলে জানায় তারা। এ ছাড়া পাঁচটি প্রকাশিত রিপোর্টের তথ্যও ফরেনসিক অডিটরকে দিয়ে পরীক্ষা করানোর কথা বলা হয় সেসময়।

গত বৃহস্পতিবার এক আকস্মিক ঘোষণায় সংস্থাটি জানায়, ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ আর দেয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তর থেকে এই ঘোষণা দেয়া হয়। এ বিষয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতিও দেয় সংস্থাটি।

প্রতিবছর বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশগুলোর ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট তৈরি করে। ব্যবসা শুরু, বিদ্যুৎ-সংযোগ, সম্পত্তি নিবন্ধন, কর ব্যবস্থাসহ কয়েকটি নির্দেশক বা মানদণ্ডের প্রতিটির ওপর ১০০ নম্বরের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর গড় করে চূড়ান্ত স্কোর নির্ণয় করা হয়। স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোর অবস্থানের তালিকা করা হয়।

২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস সূচকে চিলির অবস্থান ছিল ৩৪তম। ২০১৭ সালে এসে সেই চিলি পিছিয়ে চলে যায় ৫৫তম অবস্থানে। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি চিলির তখনকার রাষ্ট্রপতি মিশেল বাশলে। ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এর জেরে বিশ্বব্যাংকের এ সূচক তৈরির অনিয়ম প্রথম ধরা পড়ে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে চিলি ৩৪তম অবস্থানে ছিল। ২০১৭ সালে তা পিছিয়ে ৫৫তম অবস্থানে নেমেছে। এরপর চিলির রাষ্ট্রপতি ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। চিলির কর্মকর্তারা বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা করে বলেন, সংস্থাটি দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির ক্ষেত্রে তাদের বার্ষিক ‘ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিযোগিতামূলক র‍্যাঙ্কিংয়ে অন্যায় আচরণ করেছে।

২০১৪ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট হন মিশেল বাশলে। এরপরে তার শাসনামলের পরবর্তী তিন বছরই ডুয়িং বিজনেস সূচকে চিলির অধঃপতন হয়। ২০১৫ সালে ৪১, ২০১৬ সালে ৪৮ ও ২০১৭ সালে ৫৫তম হয় চিলির অবস্থান।

চিলির প্রেসিডেন্টের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনায় নেয়া হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের সেসময়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার অসংগতির কথা জানান। তার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের একজন সাবেক পরিচালক এমনভাবে জালিয়াতি করে ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ সূচক নির্ণয়ের পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন, যাতে চিলির ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়।

পল রোমার প্রতিবেদনের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের জন্য চিলির কাছে ক্ষমা চান। তিনি স্বীকার করেন বাশলের অধীন ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এই র‌্যাঙ্কিং রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত। তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ফলে প্রতিবেদনে চিলির অবনমন হতে পারে।

সেসময় এ বিষয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বক্তব্য দেন পল রোমার। তিনি বলেন- ‘আমি চিলি এবং অন্য যেকোনো দেশে যেখানে আমরা ভুল ধারণা দিয়েছি, তাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাই। আমার দায় রয়েছে। কারণ, আমরা বিষয়গুলো যথেষ্ট পরিষ্কার করিনি। বিশ্বব্যাংক অতীতের রিপোর্টগুলো সংশোধন করার পদ্ধতি শুরু করছে এবং পদ্ধতি পরিবর্তন না করে র‍্যাঙ্কিং কেমন হবে, তা পুনরায় প্রকাশ করবে।’

রোমার বলেন, সংশোধনগুলো চিলির জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, তাদের অবস্থান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্থিতিশীল ছিল। বিশ্বব্যাংকের কর্মীদের রাজনৈতিক প্রেরণার কারণে বিষয়টি কলঙ্কিত হয়েছে। কারণ, বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কাভারেজ পায়। এমন মন্তব্য করায় পল রোমারকে পদত্যাগ করতে হয়।

প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন করা সেই সাবেক পরিচালক ছিলেন অগাস্টো লোপেজ-ক্লারোস। চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক লোপেজ-ক্লারোস সে সময় বিশ্বব্যাংকের দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়ে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় তার ওই কাজের জন্য প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।

২০১৮ সালে মার্চে দায়িত্ব থেকে সরে যান মিশেল বাশলে। সমাজতান্ত্রিক দল থেকে ক্ষমতা চলে যায় কনজারভেটিভ দলের কাছে। দায়িত্ব পান প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা।

পল রোমারের ক্ষমা চাওয়ার পর ওই সময় এক টুইটে মিশেল বাশলে লেখেন, ‘বিশ্বব্যাংকের প্রতিযোগিতামূলক র‌্যাঙ্কিং তৈরিতে যা ঘটেছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে র‌্যাঙ্কিং পরিচালনা করে, তা নির্ভরযোগ্য হওয়া উচিত। কারণ, তারা বিনিয়োগ ও দেশগুলোর উন্নয়নে প্রভাব ফেলে।’ তিনি আরও বলেন, তার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাংকের কাছে সম্পূর্ণ তদন্তের অনুরোধ জানাবে।

গত বছরের আগস্টে বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অসংগতি থাকতে পারে, কিন্তু তা এখনও চিহ্নিত হয়নি। তাই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তন এবং অসংগতির কারণে যেসব দেশ অধিক প্রভাবিত হয়েছে, সেসব দেশের সঠিক তথ্য পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আর এ কারণে গত বছরের অক্টোবরে ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স তৈরি স্থগিত করে তারা।

আর এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়ে এই রিপোর্ট আর না করার কথা জানিয়েছে সারাবিশ্বে ‘দাদাগিরি’ ফলিয়ে আসা বিশ্বব্যাংক। তাহলে, কী দাঁড়াল বিশ্বব্যাংকও ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ নয়! তাদের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বিশ্বব্যাংকেও দুর্নীতি হয়!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সত্যকেই ধারণ করে
হীনম্মন্যতায় উন্নয়ন থেমে থাকে না
অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও টিকা গ্রহণের বয়স
বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

শেয়ার করুন

অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার

অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেশ-বিদেশে বসে একাত্তরের চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীরা এবং তাদের রাজনৈতিক- দোসর- সহযোগীরা এমন সব মিথ্যাচার করছে, এমন বিকৃত তথ্য দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা দেখে- শুনে বিস্মিত হতে হয়। এমনকি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টাও চালাচ্ছে তারা। অনলাইন পত্রিকার নামে অনেকে অসৎ উদ্দেশ্যে যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো খুলে বসেছে অনলাইন পোর্টাল।

একসময়ের দারিদ্র্যে জর জর টানাপোড়নের বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়নের মহাসড়কে তার মূলে শক্তি জুগিয়েছে ডিজিটাইজেশন। যদি যোগাযোগ প্রযুক্তির এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটত তাহলে অনেক কিছুই বিলম্বিত হতো। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়েছিল যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার অন্যতম ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। প্রযুক্তির সেই অভাবিত উন্নয়ন বাংলাদেশকে সব ক্ষেত্রে গতিশীলতা দিয়েছে।

এক কথায় ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগসহ উন্নয়নের সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন গতি সঞ্চার করেছে। ব্যাংকিং এবং বিপণন ক্ষেত্রে এই গতিশীলতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কার্ডেই অধিকাংশ লেনদেন কেনাকাটা। কথায় বলে, আলোর পিঠেই অন্ধকার। এ উক্তি চিরসত্য।

এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের পর মানুষের হাতে হাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোনসেট। তার মানে পৃথিবীর তাবৎ তথ্যভাণ্ডার আর লেনদেন কয়েকটি অ্যাপসের বদৌলতে এখন এন্ড্রয়েড ফোনে। এমনকি টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রের সব কিছুই এখন মোবাইল ফোনে! এককথায় তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে প্রযুক্তি!

যোগাযোগ ও উন্নয়ন অর্থনীতির বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে প্রযুক্তি। ওই যে বলেছি আলোর উল্টোপিঠে অন্ধকার সেই অন্ধকারে এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছ। সম্ভাবনা তখনই সংকটে পরিণত হয়, যখন শুরু হয় তার অপব্যবহার। ইতিবাচক উদ্ভাবনকে নেতিবাচক কাজে ব্যবহার করলে যে কী ভয়াবহ সর্বনাশ বয়ে আনতে পারে, তার প্রমাণ তো এটম বোমা!

আমাদের অনেকেরই জানা বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন এটমকে ভেঙে যে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানো যায়, এই সত্য! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি শঙ্কিত হয়েছিলেন এই ভেবে, যদি হিটলার তথা জার্মানি এই শক্তির সন্ধান পেয়ে যায় তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে!

তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে তার এই আশঙ্কার কথাই জানিয়েছিলেন। কিন্তু রুজভেল্ট সেই আণবিক শক্তি আবিষ্কারের সম্ভাবনাকে বোমায় পরিণত করে নিজেই ব্যবহার করিয়েছিলেন জাপানের বিরুদ্ধে। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা-নাগাসাকি শহর দুটি ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছিল এটম বোমা। আইনস্টাইন যা কখনও ভাবতেই পারেননি মানব সভ্যতাবিনাশী এত বড় সর্বনাশা কাজে ব্যবহৃত হবে তার উদ্ভাবন!

প্রযুক্তির শক্তিতেই বাংলাদেশ আজ বহুমাত্রিক উন্নয়নে অগ্রযাত্রায় মুখরিত। কিন্তু সেই প্রযুক্তির অপব্যবহার নানামুখী বিপর্যয়ও ডেকে আনছে। তথ্যপ্রযুক্তির ফসল সোশ্যাল মিডিয়া। সেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত আজ নানা রকম সেবার আওতায় চলে এসেছে।

দেশের ইউনিয়নগুলো আজ সেই সেবা দিয়ে যাচ্ছে ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র থেকে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ফরম পূরণ, পাসপোর্টের আবেদন, চাকরির আবেদনসহ বহু ধরনের সেবা আজ ঘরে বসেই পাচ্ছে মানুষ। নগদ লেন-দেনের বিকল্প ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে ই-প্লাটফরম। মার্কেটিংসহ নানা বিপণন ব্যবস্থায় নগদ লেনদেনের বিকল্প এখন কার্ড। ঘরে বসেই মিলছে সব পণ্য।

অথচ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেশ-বিদেশে বসে একাত্তরের চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীরা এবং তাদের রাজনৈতিক- দোসর- সহযোগীরা এমন সব মিথ্যাচার করছে, এমন বিকৃত তথ্য দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা দেখে- শুনে বিস্মিত হতে হয়। এমনকি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টাও চালাচ্ছে তারা। অনলাইন পত্রিকার নামে অনেকে অসৎ উদ্দেশ্যে যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো খুলে বসেছে অনলাইন পোর্টাল। সম্প্রতি যার লাগাম টেনে ধরার প্রয়াস পাচ্ছে সরকার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর যা খুশি তা অপপ্রচারের সুযোগ কখনও এক কথা হতে পারে না।

যাহোক ই-কমার্স প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ই-কমার্স-এর আওতায় বড় বড় কয়েকটি পণ্য বিপণন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে দেশে, যেখানে বিপুল পরিমাণ পণ্য কেনাবেচা হয় প্রতিদিন। ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছিল অনলাইনমার্কেট। অনলাইন ব্যবহার করে ইতোমধ্যে ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ ধামাকা, আলেশা মার্ট ইত্যাদি মেগাশপ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। প্রযুক্তির এই সুবিধাকে এদের কেউ কেউ অপব্যবহার করে বিশাল সম্ভাবনাময় এই আধুনিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করল। প্রতারিত করল অসংখ্য গ্রাহককে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে প্রযুক্তির ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটি দিকেই আলো আর অন্ধকারের মতো বিপরীত বাস্তবতা। প্রয়োজন শুধু অপপ্রয়োগ রোধ করতে যথাযথ নজরদারি নিশ্চিত করা। সেটা করা না গেলে যে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে তা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। বিশেষ করে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রতারণার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর মানুষের বিশ্বাস ধসে পড়েছে অনলাইন শপিংয়ে কেনাকাটা বিষয়ে। অথচ গত দেড় বছর ধরে করোনাকালের বাস্তবতায় জনসাধারণ বিপুলভাবে ঝুঁকছিল ই-শপিংয়ে। করোনা সংক্রমণের ভয়ে মানুষ ঘরে বসেই এই কেনাকাটার সুযোগ গ্রহণ করছিল সানন্দে। সংগত কারণেই দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছিল ই-শপিং।

গ্রাহকের দোরগোড়ায় পণ্য পৌঁছে দেয়ার এই প্লাটফরম জনপ্রিয়তা পাবে সেটাই স্বাভাবিক। পেয়েছিলও। কিন্তু গ্রাহকদের সঙ্গে একের পর এক প্রতারণার তথ্য ফাঁস হতে থাকলে এসব অনলাইন মেগা শপের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় চলে আসে এবং বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হয়। একটি সম্ভাবনাময় বিকাশমান বিপণন খাতে নেমে আসে বিশাল ধস! বিশেষ করে গত সপ্তাহে প্রতারিত গ্রাহকদের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাবের হাতে ই-ভ্যালি চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দম্পতি রাসেল ও নাসরিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর ই-শপিং ব্যবসার সম্ভাবনার ওপর চরম আঘাত নেমে আসে! মানুষের যেটুকু বিশ্বাস অবশিষ্ট ছিল, তাও নিঃশেষ হয়ে গেল।

গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে তাদের স্বামী-স্ত্রীর প্রতারণার বিশাল ফাঁদ। তারা অগ্রিম টাকা নিয়েও অসংখ্য গ্রাহককেই পণ্য বুঝিয়ে দেননি। তাদের দেনার দায় সহস্রাধিক কোটি টাকা। অথচ তাদের ব্যাংক হিসাবে আছে মাত্র লাখ টাকা! তাহলে এত টাকা কোথায় গেল?

এ প্রশ্নের উত্তর এখনও জানা যায়নি। র‌্যাব তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এখন। ইতোমধ্যে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা ভয়ংকর। তারা সচেতনভাবেই গ্রাহকদের প্রতারিত করে আসছিল।

ই-ভ্যালির এমডি এবং চেয়ারম্যান পরিকল্পনা করেছিলেন কোম্পানির দেউলিয়া ঘোষণা করে গ্রাহকদের দায় থেকে মুক্তি পেতে। তাদের আরেক পরিকল্পনা ছিল গ্রাহকসংখ্যা আরও বাড়িয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ই-ভ্যালি হস্তান্তর!

এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তাদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে হাজার হাজার প্রতারিত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা কী হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। ইভ্যালির মতো যেসব অনলাইন শপিং প্রতিষ্ঠান এই ধরনের লুটপাট করেছে তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব কী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের, নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের, নাকি কনজিউমার স্বার্থ যারা দেখার কথা তাদের? কার কী ভূমিকা তাও এখন খতিয়ে দেখা দরকার। এত বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যেমন খুশি তেমন চলতে দেয়া যায় কি? দিনের পর দিন তারা জনগণের অর্থ লুটপাট করে যাবে আর তা কেউ দেখবে না, তা কি হতে পারে? তার দেখভালের দায়িত্ব কি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরও বর্তায় না?

আইনের আশ্রয় নিয়ে এদের কাছ থেকে গ্রাহকদের অর্থ আদায় করা যে সম্ভব নয় তা এখন স্পষ্ট। ই-ভ্যালি বন্ধ করে দিয়ে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না। সরকার প্রশাসক বসিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে যদি পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে হয়তো একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকতে পারে। কারণ আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা মোটেও সুথকর নয়। পিকে হালদারের অর্থ প্রতিষ্ঠানের অরিয়ান্টাল ব্যাংক গ্রাহকরা এখনও অর্থ ফিরে পায়নি, বহু বছর আগে জনগণকে প্রতারণার দায়ে যুবক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু যুবকের প্রতারিত গ্রাহকরা তাদের অর্থ ফিরে পায়নি। এরকম বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করে সাধারণ মানুষকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।

ই-ভ্যালির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যদি মাত্র ত্রিশ লাখ টাকা থাকে তাহলে বাকি হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে কোথাও সরানো হয়েছে, না কি বিদেশে পাচার হয়েছে, তার সন্ধান পেতেই হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যমন্ত্রণালয় কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিত ভূমিকা নিতে হবে- যাতে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার উপায় উদ্ভাবন করা যায়।

এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, ই-কমার্সের সুস্পষ্ট পরিচালনাবিধি বা গাইডলাইন থাকা সত্ত্বেও তা মানেনি ই-ভ্যালি কর্তৃপক্ষ! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের জন্য যে ধরনের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ থাকার কথা, তা কতটা কার্যকর ছিল? এ ব্যাপারে তাদের যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকা দরকার ছিল তার কতটুকু তাদের ছিল? এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে।

এরই মধ্যে ধামাকাকে ২০০ কোটি টাকা ফেরত দিতে পাঁচদিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে ধামাকায় পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ। ১৮ সেপ্টেম্বর শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে এই আল্টিমেটাম দেন তারা। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ধামাকা শপিং ডটকম সেলার অ্যাসোসিয়েশন তাদের বকেয়া পাবে কি না তাও এক অনিশ্চিত প্রশ্ন। এ-তো গেল সেলার বা মার্চেন্টদের কথা, এর বাইরেও রয়েছে গ্রাহকদের পাওনা যারা টাকা দিয়ে পণ্য পাননি। ই-ভ্যালি ধামাকার মতো অন্যান্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকেও নজরদারির আওতায় আনা উচিত।

প্রতারণার ক্ষেত্রে আমাদের গণমাধ্যম এবং গ্রাহকদেরও সতর্ক থাকা দরকার ছিল। গণমাধ্যম যেভাবে তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে তাতে কোনো বাছবিচার ছিল বলে মনে হয় না। একটি প্রতিষ্ঠানকে টাকা পেলেই বিজ্ঞাপিত করা যায় না, তার সাত-পাঁচ ভেবে দেখতে হয়। আমাদের যে সমস্ত বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী তারকা ব্যক্তিরা ই-ভ্যালির হয়ে উচ্ছ্বসিত ভাষায় বিজ্ঞাপন প্রচার করেছেন, তাদেরও বিবেচনা থাকা উচিত ছিল বলে মনে করি।

ই-ভ্যালির ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সচেতনতার অভাব মারাত্মকভাবে চোখে পড়েছে। দুই লাখ টাকার একটি পণ্য কী করে আশি হাজার টাকায় দেবে, তা ভেবে দেখলে কেউ এ পথে আসার কথা ছিল না। লোভের মোহে পড়েই কেউ ভেবে দেখেননি।

যাহোক, হাজার হাজার গ্রাহকের স্বার্থ দেখার দায়িত্ব সরকারকে গ্রহণ করতেই হবে। ভোক্তা অধিকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। ই-কমার্স একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাত। কিছু দুষ্টচক্রের কারণে এই বিশাল সম্ভাবনাময় খাত ধ্বংস হয়ে যাক, এটা আমাদের কারো কাম্য হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীনসহ বিশ্বের বহু দেশ বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মাধ্যমে সফলভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছে, আমাজান, আলিবাবার মতো প্রতিষ্ঠান এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ।

আমরা আশা করতে চাই, দেশের সম্ভাবনাময় এই বাণিজ্যিক খাতকে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসবেন। হাজার হাজার গ্রাহকের ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস আবার ফিরিয়ে আনবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কবি। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সত্যকেই ধারণ করে
হীনম্মন্যতায় উন্নয়ন থেমে থাকে না
অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও টিকা গ্রহণের বয়স
বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

শেয়ার করুন

বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া

বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া

বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেটা শুধু বাংলাদেশই নয়, বিদেশি আদালতের রায়েও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কানাডার ফেডারেল আদালতে (সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন-২০১৭, এফসি ৯৪) বলা হয়েছে যে, বিএনপি প্রকৃতপক্ষে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারা হচ্ছে এমন একটি দল যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে সশস্ত্র সংগ্রাম বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জন্ম রাজনীতির কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়নি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। শাসকদের শোষণ, অত্যাচার, বঞ্চনার প্রতিবাদে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ থেকেই একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। আর বিএনপি দলটির জন্ম হয়েছে এক অরাজনৈতিক ব্যক্তির ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে। সুমহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী, আওয়ামী লীগবিরোধী কট্টরপন্থি, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদীদের নিয়ে একটি প্ল্যাটফরম হলো বিএনপি। রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠনের পর পাকিস্তানের দি হেরাল্ড পত্রিকায় বলা হয়, ‘বিএনপির জন্ম ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার নীল নকশার ফলশ্রুতি।... এই দলের জন্য যে দর্শন নির্ধারণ করা হয় তা হলো: আওয়ামী লীগের দুর্বল স্থানে আঘাত করা এবং জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব জাগ্রত করা।... নিন্দিত আওয়ামী লীগার, চরম বামপন্থী ও মুসলিম লীগারদের নিয়ে দলের জনবল বাড়ানো।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রধান বেনিফিশিয়ারি হলো জিয়াউর রহমান। খন্দকার মোশতাককে সামনে রেখে জিয়াউর রহমানই যে অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন তা আজ প্রমাণিত সত্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি ছিলেন উপসেনাপ্রধান, অচিরেই ক্ষমতা দখল করে হয়ে যান সেনাপ্রধান। মার্শাল ল চালু করে রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করে বিচারের নামে রাজনীতিবিদদের বন্দি ও ভিন্নমতের শত শত মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারকে হত্যা করে ক্ষমতাকে করেন পাকাপোক্ত। একপর্যায়ে অস্ত্রের জোরে বিচারপতি সায়েমকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ দখল করে নেন। জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ সালের ৩০ মে ‘হ্যাঁ না’ ভোট ছিল গণতন্ত্রকে হত্যা করার প্রথম পদক্ষেপ। নিজের পক্ষে প্রদত্ত ভোটের ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার নজির গণতন্ত্রের নামে তামাশা। ভোটারবিহীন গণতন্ত্রের তিনিই প্রবর্তক।

জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথমে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে সমন্বয়ক করে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ বা ‘জাগদল’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করা হয়। কিন্তু জাগদল রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের মধ্যে তেমন প্রভাব ফেলতে না পারায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান নিজেকে প্রধান করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে। তখন জিয়া সেনাবাহিনীপ্রধান ছিলেন, রাজনৈতিক দল গঠন করে হয়ে গেলেন রাজনীতিবিদ। দেশের রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান আবার একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। কী তুগলকি কাণ্ডকারখানা!

বিএনপি প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছরের পরিক্রমায় জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান দলের নেতৃত্ব দিয়েছে। তিনজনের মেয়াদ আলাদা হলেও দল পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের নীতি ও আদর্শ এক, অভিন্ন।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে বাংলাদেশের মূল চরিত্রটাকেই ধ্বংস করে দেয়। আঘাত হানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে দালাল আইন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার শুরু করেছিলেন। কিন্তু জিয়া ক্ষমতার নাটাই হাতে নিয়েই দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১১ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেয়, যাদের মধ্যে ৭৫২ ছিল সাজাপ্রাপ্ত আসামি।

মুক্তিযুদ্ধের পর জামায়াতের রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের আড়ালে জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে তাদেরকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়। জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পাওয়ার ফলে বেড়ে যায় সাম্প্রদায়িকতা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডটি ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত ঘটনা। অথচ জিয়াউর রহমান হত্যাকারীদেরকে পুরস্কৃত করে বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়েছেন এবং বিচারের পথ চিরতরে বন্ধ করতে জারি করেন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ।

জিয়াউর রহমানের দেখানো পথেই যাত্রা শুরু করে খালেদা জিয়া। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত দিবসে খালেদা জিয়া ভুয়া জন্মদিন পালন শুরু করে। বাঙালি জাতি যখন বিনম্র শ্রদ্ধায় শোক পালন করে তখন বিএনপি খালেদা জিয়ার ভুয়া জন্মদিনের কেক কেটে উৎসব করে। যা একজন বাঙালি ও বাংলাদেশি হিসেবে কেউ এমন ঘৃণ্য কাজ করতে পারে না।

খালেদা জিয়া তার প্রয়াত স্বামী জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জনগণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি এক ভোটারবিহীন নির্বাচন আয়োজন করেন। কোনো দল ওই সাজানো নির্বাচনে অংশ না নিলেও, কুমিল্লা-৬ আসন থেকে বঙ্গবন্ধুর খুনি ও ফ্রিডম পার্টির নেতা আবদুর রশিদকে জিতিয়ে এনে সংসদকে করেন অপবিত্র। যদিও সে সরকারের মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন। জনগণের চাপে সেদিনের সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

বিএনপি ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ’৭১-এর নরঘাতক নিজামী-মুজাহিদকে মন্ত্রী করে লাল সবুজের পতাকাকে করেছে কলঙ্কিত। ২০০২ সালে তারেক রহমান দলের সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই মূলত বিএনপিতে তারেক যুগের সুচনা হয়। তিনি হাওয়া ভবন তৈরি করে ক্ষমতার একটি আলাদা বলয় সৃষ্টি করেন। তারেক গংদের হাতে চলতে থাকে দল ও সরকার। খালেদা জিয়া দলের নামস্বর্বস্ব প্রধান থাকলেও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ থাকে তারেক রহমানের হাতে।

সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহারে বিপর্যস্ত হয় বাংলাদেশের চেহারা। রাষ্ট্রীয় মদতে দুর্নীতি, লুটপাট, কমিশন বাণিজ্য, অবাধে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে। তারেক জিয়া ও বিএনপি সরকারের অপকর্ম আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। সেসময় দুর্নীতিতে বাংলাদেশ টানা পাঁচবার হয়েছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তারেক রহমান এমন কোনো অপরাধ নেই যা তিনি করেননি। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চাঞ্চল্যকরভাবে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান। তারেক রহমানের নির্দেশে ও লুৎফুজ্জামান বাবরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকে অস্থিতিশীল করতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীগোষ্ঠী উলফাকে সরবরাহ করার জন্য আনা হয়েছিল।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ পুরো আওয়ামী লীগ দলটিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তারেক রহমানের পরিকল্পনায় সম্পূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে গ্রেনেড হামলা করা হয়। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও বহু মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় মদতে দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় তো রীতিমতো তালেবানি শাসন চালু হয়েছিল। জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ- জেএমবি এবং হরকাতুল জিহাদ ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলা করে তাদের অস্তিত্বের জানান দেয়।

ক্ষমতার বাইরে থেকেও বিএনপি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বের হয়ে আসেনি। ২০১৩-১৪ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ বন্ধ করার দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মিলে সারা দেশে একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে বানচাল ও ২০১৫ সালে সরকারের বর্ষপূর্তিতে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কাজ করে বিএনপি-জামায়াত। বিএনপির আন্দোলন মানেই গাড়ি পোড়ানো, পেট্রল বোমা ছোড়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সহিংস ও প্রাণঘাতী হামলা ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা।

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও তাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটকে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে বিএনপি। আর এসব কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপি আজ দেশের মানুষের সমর্থন হারিয়ে ডুবন্ত জাহাজে পরিণত হয়েছে।

বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেটা শুধু বাংলাদেশই নয়, বিদেশি আদালতের রায়েও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কানাডার ফেডারেল আদালতে (সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন-২০১৭, এফসি ৯৪) বলা হয়েছে যে, বিএনপি প্রকৃতপক্ষে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারা হচ্ছে এমন একটি দল যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে সশস্ত্র সংগ্রাম বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়। হাতবোমা, পিস্তল ও অস্ত্র ব্যবহার করে নেতৃস্থানীয় এবং জনগণের ওপর হামলা চালায়। এমনকি অগ্নিসংযোগেরর মতোও ঘটনা ঘটায় দলটি।

তারপরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক জনসমর্থন আছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এটি বিএনপির কোনো নীতি-আদর্শ, নৈতিকতার জন্য হয়েছে- তেমনটি নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিরাই মূলত কারণে অকারণে বিএনপির সমর্থক। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যারা বিরোধিতা করেছিল, সেই গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে বিএনপি।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য বিএনপি নামক দলটি দীর্ঘ সময় এদেশের ক্ষমতায় ছিল, এখনও বিরোধী শক্তি হিসেবে আছে। বিএনপি ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বার বার করেছে বাধাগ্রস্ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে করেছে ভূলুণ্ঠিত। বিএনপি দলটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি বিষফোড়া। বাংলাদেশকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে দ্রুত এই বিষফোড়াকে এড়িয়ে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সত্যকেই ধারণ করে
হীনম্মন্যতায় উন্নয়ন থেমে থাকে না
অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও টিকা গ্রহণের বয়স
বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

শেয়ার করুন

ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা

ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা

ফ্ল্যাটে বসবাস করতে যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তা হলো- রাজনৈতিক জ্ঞান, দেনদরবারের ক্ষমতা এবং যোগাযোগ দক্ষতা। ফ্ল্যাট হয়ে উঠছে একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষুদ্র সংস্করণ। একটি দেশের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বুঝতে ফ্ল্যাটবাড়ি গবেষণার একক হয়ে উঠছে।

ফ্ল্যাট হলো সদরঘাট, যেখানে সম্পর্ক খেলা করে কিন্তু জমাট বাঁধে না। একইভাবে ফ্ল্যাট হলো বহু রুচি, সংস্কৃতি এবং দৃষ্টিভঙ্গির মিলনস্থল, যা আবাস হিসেবে নগর জীবনে অপরিহার্য হয়েছে। ফ্ল্যাট গণতন্ত্রচর্চা, ক্ষমতা-কাঠামো, পরিচয় নির্মাণ, সম্পর্কের মেরুকরণ এবং ভাব দেখানোর এক নতুন ক্ষেত্র। অধিকাংশ ফ্ল্যাটবাড়ি মূলত কখনও জ্বলন্ত কখনওবা সুপ্ত অগ্নিগিরিসদৃশ। নাগরিক জীবনপাঠের এক খোলা জানালা।

ফ্ল্যাটের প্রকৌশল কাঠামো যতই সুউচ্চ বা বহিরাঙ্গের নির্মাণশৈলী বাহারি হোক না কেন এর ভেতরাঙ্গটা বড়ই লঘু উচ্চতা এবং শতধাভাগে বিভক্ত। এ বিভক্তির পেছনে রয়েছে মূলত ভাবস্বীকৃতি বা আধিপত্য বিস্তারের পরাস্ত মনোবাসনা।

ফ্ল্যাটে তিন ধরনের মানুষ বাস করে। ভূমির মালিক, যারা ডেভেলপারকে ভূমি দেয় এবং এর বিনিময়ে টাকা ও নির্দিষ্ট সংখ্যক ফ্ল্যাট পায়। ভূমি মালিকেরা নিজেদের পাওয়া ফ্ল্যাটে বাস করে অথবা ভাড়া দেয়। ফ্ল্যাটের আরেক ধরনের মালিকানা রয়েছে যারা ক্রয়সূত্রে ফ্ল্যাটের মালিক হয়। আরেকটি অংশ আছে যারা ভাড়া থাকে।

ডেভেলপার ফ্ল্যাট ডেভেলপড এবং বিক্রি শেষে ফ্ল্যাট মালিকদের অংশগ্রহণে গড়ে তোলা ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে হস্তান্তর করে। এর আগে ফ্ল্যাট পরিচালনা-সংক্রান্ত গঠনতন্ত্র তৈরি করে। অ্যাসোসিয়েশনের কাছে ফ্ল্যাট পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণের মধ্য দিয়ে ডেভেলপার বিদায় হয়। এটি স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস।

সবসময় যে এ প্রাকটিস অনুসৃত হয় এমন নয়। অনেকসময় ডেভেলপার সুচারুভাবে এ কাজগুলো করতে পারে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগে ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজের মান ও চুক্তি মোতাবেক প্রয়োজনীয় উপকরণাদি সরবরাহ করতে গাফিলতি, দীর্ঘসূত্রতা বা অপারগতার কারণে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের সঙ্গে নানারকম দ্বন্দ্বমুখর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে ফ্ল্যাট মালিকরা নিজের ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার আগে অন্য ফ্ল্যাট মালিকদের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। তারা ফ্ল্যাটের সাধারণ স্বার্থের ব্যাপারে জোটবদ্ধ হয়। ডেভেলপারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

শুরুর দিকে ফ্ল্যাট মালিকরা পরস্পর কিছুটা অচেনা বা অজানা হলেও সাধারণ স্বার্থের ব্যাপারে তাদের জোট বাঁধতে বেশি বেগ পেতে হয় না। ফ্ল্যাট ক্রেতারা চুক্তি মোতাবেক প্রাপ্য বুঝে নিতে সতর্ক থাকে। অন্যদিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্রেতার সঙ্গে ডেভেলপারের ফ্ল্যাট ক্রয়-সম্পর্কিত চুক্তি স্বাক্ষরের পর তা বাস্তবায়নে গড়িমসি দেখা যায়।

চুক্তির শর্ত মোতাবেক ফ্ল্যাট ক্রেতারা অনেকসময় নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে পারে না। যারা এক কিস্তিতে রেডি ফ্ল্যাট কিনে তাদের বিষয়টি ভিন্ন। অর্থাৎ, ফ্ল্যাট ক্রয়ের আগে ডেভেলপারের সঙ্গে ক্রেতার যে আনন্দদায়ক সম্পর্ক তৈরি হয় এর আয়ুষ্কাল হয় অল্প।

আগেই বলা হয়েছে, ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের একটি গঠনতন্ত্র থাকে। ফ্ল্যাট পরিচালনার সার্বিক দিক এখানে লেখা থাকে। এ গঠনতন্ত্র হলো ফ্ল্যাট সংস্কৃতির নির্ধারক। ফ্ল্যাটের মালিকরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ গঠনতন্ত্র ও চলনকাঠামো নির্ধারণ করে।

গ্রামীণ সমাজকাঠামোর একটি কম্প্যাক্ট বিন্যাস হলো ফ্ল্যাট কাঠামো। সমস্যা হলো- গ্রামীণ সমাজে একটি পরম্পরা থাকে, সেখানে নানা মাত্রিক আর্থসামাজিক বন্ধন কাজ করে। গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর এ সম্পর্কটি হলো অরগানিক আর ফ্ল্যাট হলো মেকানিক্যাল সর্ম্পকের সূচক। সমাজ চলে অলিখিত চুক্তিতে আর ফ্ল্যাট পরিচালিত হয় লিখিত সমঝোতার ভিত্তিতে।

ফ্ল্যাট যেহেতু বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমি থেকে আসা মানুষের মিলনস্থল সুতরাং তা শৃঙ্খলায় আনতে এ ধরনের সমঝোতামূলক নীতিমালার বিকল্প নেই। অ্যাসোসিয়েশন নেতৃত্ব নির্বাচনের ব্যাপারে চলে একটি জটিল ফ্ল্যাট-রাজনীতি। অধিকাংশ ফ্ল্যাট সদস্যের মধ্যে ফ্ল্যাট পরিচালনার নেতৃত্ব প্রদানের বেশ আগ্রহ দেখা যায়।

বাঙালির নেতৃত্ব প্রদানের যে সুপ্তবাসনা কতটা প্রবল তা ফ্ল্যাটগুলোর সভায় অংশগ্রহণ না করলে বোঝা বেশ কঠিন। সাধারণ পাঁচ বা সাত সদস্য নিয়ে কমিটি গঠিত হয়। একজন সভাপতি, একজন সাধারণ সম্পাদক ও একজন কোষাধ্যক্ষসহ দু-চারজন সদস্য নিয়ে কমিটিগুলো গঠিত হয়। সদস্যদের সম্মতি এবং ভিন্নমতের ভিত্তিতে কমিটি গঠিত হয়।

মজার ব্যাপার হলো, কমিটি গঠনের পরদিন থেকে অন্য সদস্যরা কমিটির কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। বাঙালির প্রতিষ্ঠানবিরোধী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ সহজেই লক্ষ করা যায়। তারা সম্মিলিতভাবে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর চেষ্টা করে এবং প্রতিষ্ঠানটি দাঁড়িয়ে গেলে তা সম্মিলিতভাবেই ভাঙতে উঠেপড়ে লেগে পড়ে।

অর্থাৎ, ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক মনোকাঠামো নিয়ে ব্যক্তি যখন ফ্ল্যাটের মতো গড়ে ওঠা আধুনিক আবাসন ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে, তখন ব্যক্তিকে যূথবদ্ধভাবে বাস করার জন্য যে মনোভঙ্গি দরকার এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হয়।

অপরদিকে, কমিটির সদস্যরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্রুত গণতান্ত্রিক আচরণ পরিহার করে একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে ফ্ল্যাট পরিচালনা করতে থাকে। ফলে দ্রুত তিক্ততা বাড়ে। নানা দল বা উপদল তৈরি হয়। তিক্ততা বহুমাত্রিকতা লাভ করে।

ফ্ল্যাটে বসবাস করতে যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তা হলো- রাজনৈতিক জ্ঞান, দেনদরবারের ক্ষমতা এবং যোগাযোগ দক্ষতা। ফ্ল্যাট হয়ে উঠছে একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষুদ্র সংস্করণ। একটি দেশের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বুঝতে ফ্ল্যাটবাড়ি গবেষণার একক হয়ে উঠছে।

ফ্ল্যাট অ্যাসোসিয়েশন সভাগুলো খুব চমৎকার একটি প্যাটার্ন। বিশেষত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রসায়ন, কৌশল ও স্বার্থ বোঝার জন্য। ফ্ল্যাটে সাধারণত দুধরনের সভা হয়। কমিটির সদস্য নিজেরা বসে জরুরি বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। আবার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সব সদস্যের অংশগ্রহণে বিশেষ বা সাধারণ সভা আহবান করা হয়।

সাধারণ সভায় সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি থাকলেও সবসময় তা যথাযথভাবে অনুসৃত হয় না। সাধারণত যেকোনো সদস্য কথা বলার সময় বিষয়ভিত্তিক কথা বলার চেয়ে তার অবস্থান, ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব বোঝানোর চেষ্টা করে। অনেক সময় বক্তার বক্তব্যের সারবত্তা খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়। এ সভাগুলো মোটেও উপভোগ্য হয় না, হয় খুব বিরক্তি ও ক্লান্তিকর। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ১৫-২০ জন ফ্ল্যাট সদস্য দু থেকে আড়াই ঘণ্টা আলোচনা করে সিকিউরিটি গার্ডের বেতন বাড়িয়েছেন দুই শ’ টাকা, যা ব্যয়সাশ্রয়ী নয়। অথবা কমন স্পেসে রাতে লাইট জ্বলবে কি জ্বলবে না বা কমন স্পেসের ক্লিনারের পারফরমেন্স নিয়ে দেড়-দু ঘণ্টা আলোচনা শেষ হয়েছে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই।

সভার সভাপতি বা সম্পাদকের থাকে না সভা পরিচালনার বিশেষ কোনো দক্ষতা। অন্যকে কথা বলতে দেয়ার চেয়ে তারাই বেশি বলেন। বাঙালি যখন কোনো সভায় বসে তখন সে যে কত কৌশলী হতে পারে তা এ ধরনের সভাতে না বসলে বোঝা মুশকিল। সদস্যরা সভায় বসে চোখাচোখি করে, ম্যাড়ম্যাড়ে স্বরে- অস্পষ্ট ভাষায় এবং দিক-নির্দেশনাহীনভাবে কথা বলে। খুব হিসাব-নিকাশমূলক এক মনোভঙ্গি নিয়ে সদস্যরা সভায় অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ, কাঠামোবদ্ধ আলোচনায় বাঙালি খুব অসংগঠিত, ও উদভ্রান্ত তা সহজেই বোঝা যায়।

যারা নেতৃত্বে থাকে তারা একে বানিয়ে ফেলে স্বৈরাচারের ক্ষুদ্র পার্লামেন্ট। ফ্ল্যাট ওনার্সদের মধ্যে মধুচন্দ্রিমা পার হলেই সৃষ্টি হয় সম্পর্কের নানা জটিলতা। কে কত বড় চাকরি করে, কে কত বড় ব্যবসায়ী, কার গাড়ি কী ব্র্যান্ডের এবং তা নতুন না পুরাতন; কার ফ্ল্যাট নিচে আর কারটা ওপরে, কার সাইজ কত বড়, ছেলেমেয়েরা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে ইত্যাদি।

এছাড়াও বছরে কে কতবার ফ্যামিলি নিয়ে দেশের বাইরে যায়, সপ্তাহে কবার দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করে এবং পোশাক-আশাক, আত্মীয়-স্বজনের প্রভাব প্রতিপত্তি হয়ে ওঠে পরিচয়ের আলাদা সূচক। এগুলোর সাদৃশ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয় ছোট ছোট ক্লিক বা উপদল। দ্রুতই ফ্ল্যাটের মধ্যে আপার ক্লাস, মিডল ক্লাস ও লোয়ার ক্লাস তৈরি হয়। একবার তা তৈরি হলে তা হয়ে ওঠে এক অভেদ্য প্রাচীর। ফ্ল্যাট সংস্কৃতির মূল প্রবণতা হলো সবাই মিলে একা।

ফ্ল্যাটের তথাকথিত আপার ক্লাস বা মিডল ক্লাসের সঙ্গে লোয়ার ক্লাসের মতবিরোধ হলে তা খুব অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে ফ্ল্যাটে বসবাস করতে প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা। এ দক্ষতা না থাকলে পথ হয় কণ্টকাকীর্ণ।

ফ্ল্যাটের দুটো গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হলো নিরাপত্তাপ্রহরী ও কাজের সহায়ককর্মী। নিরাপত্তাপ্রহরীদের বেঁচে থাকার কৌশল আলাদাভাবে দেখার আগ্রহ তৈরি করে। যারা পেশাদার নিরাপত্তাপ্রহরী নয়, তারা কেবল শরীর নিয়ে এ মহানগরে আসে এ কাজের জন্য। ফ্ল্যাট সদস্যদের মনস্তত্ত্ব, আচার-আচরণ, ফ্ল্যাটের ক্ষমতা-কাঠামো বুঝেশুনে ও ভারসাম্য বজায় রেখে তাদের চলতে হয়।

কোনো কারণে এ বিচ্যুতি হলে চাকরি খোয়াতে হয়। সাধারণ অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষকে খুশি করে তারা চলে। নিরাপত্তাপ্রহরীরা ফ্ল্যাটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হালচাল বেশ ভালোই বোঝে। সম্ভাব্য সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গেও তারা সখ্য বজায় রাখে।

নিরাপত্তাপ্রহরীদের সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হয়। স্বল্প বেতনে নিজেদের চলতে হয়, পরিবারের কাছে মাস শেষে টাকা পাঠাতে হয় এবং ফ্ল্যাটের সদস্যদের মন জুগিয়ে চলতে হয়। ফ্ল্যাটের মালিকরা ভাবসাবে তো একেকটি সাম্রাজ্যের অধিপতি। এসব রাজাদের খুশি রাখা সহজ কাজ নয়, যা সাফল্যের সঙ্গে গ্রাম থেকে আসা এক নিরীহ নিরাপত্তাপ্রহরী করে চলে।

কাজের সহায়ক নারীকর্মীরাও আরেক অনুঘটক। ফ্ল্যাটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের রয়েছে কখনও নিকটবর্তী ও কখনও দূরবর্তী সংযোগ। একটা ফ্ল্যাটবাড়ির একাধিক ফ্ল্যাটে যখন কোনো নারী সহায়ক কাজ করে তখন সে নিজের অবস্থান পোক্ত করার জন্য এক ফ্ল্যাটের তথ্য আরেক ফ্ল্যাটে শেয়ার করে। এসব নারীকর্মী কনফ্লিক্ট কানেক্টর হিসেবে কাজ করে।

ফ্ল্যাট বাড়িতে সবসময় একধরনের মানসিক চাপে থাকে ভাড়াটিয়ারা। ফ্ল্যাট মালিকরা তাদের প্রতি রাখে তীর্ষক নজর। অনেকসময় তাদের ছোটখাটো বিষয়েও ফ্ল্যাট মালিকরা যৌক্তিক আচরণ করে না। ভাড়াটিয়াদের বাস করতে হয় এক উপেক্ষিত সংস্কৃতির মধ্যে অথচ তারা ভাড়া দিয়েই ফ্ল্যাটে বাস করে।

আধুনিক নগরজীবনে ফ্ল্যাট সংস্কৃতি হয়ে উঠছে ভঙ্গুর সামাজিক সম্পর্কের এক মিলনস্থল। সামাজিক প্রেক্ষাপটে যূথবদ্ধভাবে বাসের অভ্যাসের ঐতিহ্য থাকলেও ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে সৌহার্দ্য, সংহতি, স্বস্তি ও মর্যাদা নিয়ে বাস করার মসৃণপথ এখনও নির্মিত হয়নি- হয়ত হবে কোনো একদিন।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সত্যকেই ধারণ করে
হীনম্মন্যতায় উন্নয়ন থেমে থাকে না
অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও টিকা গ্রহণের বয়স
বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

শেয়ার করুন

বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু

বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু

ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশে হচ্ছে না, আরও বহু দেশেই হচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বর হওয়া সরকারের ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতা বা অপরাধ হলো তার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল, তা না করা। গত বছরই বিভিন্ন সংস্থা থেকে এডিস মশা বৃদ্ধির ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আসলে দেশের মানুষের জীবন ও দুর্ভোগ নিয়ে দায়িত্ববোধ বা জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি এ রকম হতো না। এ ব্যাপারে সরকার ও সিটি করপোরেশনকে গা-ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামতে হবে।

করোনাভাইরাসের আতঙ্কের মধ্যেই দেশজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। দেশে গত মাসের প্রথম ১৫ দিনের চেয়ে চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। আগস্ট মাসের প্রথম ১৫ দিনে ডেঙ্গু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৪৯ জন। আর চলতি সেপ্টেম্বর মাসে একই সময়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৪৭৫ জন।

ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা৷ ইতোমধ্যে ৪০টিরও বেশি জেলায় ছড়িয়েছে এর সংক্রমণ। ডেঙ্গু চিকিৎসা নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তিত হয়ে উঠেছে নগরবাসী। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন স্বজনেরা। প্রচণ্ড জ্বর, বমি, গা ব্যথা এবং কারো কারো ক্ষেত্রে হাতে-পায়ে ফুসকুড়ি কিংবা র‌্যাশ ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর জন্য প্রায় প্রতিদিনই রক্তের খোঁজে ছুটছেন স্বজনরা। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে কীভাবে দূরে থাকা যায়, কী করে সহজে প্রতিকার পেতে পারেন আক্রান্তরা— এ নিয়ে অনেকেই চিন্তিত ও দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।

ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়। স্বাধীনতার আগে থেকে এই রোগের সংক্রমণ ছিল। তবে ২০০০ সাল থেকে মূলত সরকারিভাবে রোগটিকে আমলে নেয়া হয়। দুই দশক ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, রোগী ব্যবস্থাপনা ও এডিস মশা নির্মূলকরণে কাজ করছে সরকার। কিন্তু তাতে কোনো ফল মিলছে না। প্রতিবছরই ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফিরে আসছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা মোটেও সন্তোষজনক নয়।

প্রথম থেকেই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বলা হচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। রোগীর সংখ্যা, মৃতের সংখ্যা কমিয়ে বলা সরকারের অন্যতম তৎপরতা। এর বাইরে মাঝে মাঝে মূল সড়কে ফগার মেশিন নিয়ে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের মহড়া ছাড়া তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।

করোনা নিয়ে অধিক ব্যস্ত থাকায় এ বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এর ফলে এখন ডেঙ্গু করোনার চেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অথচ হাসপাতালগুলোতে ঠিকমতো চিকিৎসা মিলছে না। এর দায়ভাগ সরকারেরও আছে।

সরকার সঠিক সময়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্রমাগত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলছে। যে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়, সেটাও কার্যকর করতে পারে না। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছে। ঢাকা শহরে এখন চরম মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রাজধানী ও এর আশপাশের ছয়টি হাসপাতালকে ডেডিকেটেড ঘোষণা করা হয় গত ২৩ আগস্ট। এই হাসপাতালগুলো হচ্ছে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, টঙ্গীর শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল, কমলাপুর রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল, ২০ শয্যার আমিনবাজার সরকারি হাসপাতাল, মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল ও কামরাঙ্গীরচর ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। শেষ খবর পাওয়া পর‌্যন্ত কিন্তু এই হাসপাতালগুলো এখনও ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এসব হাসপাতালে শুরু হয়নি ডেঙ্গুর চিকিৎসা। তা ছাড়া রয়েছে জনবলেরও সংকট। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ রোগীরা।

প্রস্তুতি না থাকার পাশাপাশি যেসব হাসপাতালকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে, এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচার চোখে পড়ছে না। ফলে এসব হাসপাতাল সম্পর্কে জানেন না অনেকে। তা ছাড়া এসব হাসপাতালে চিকিৎসার অনেক প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও নেই। গুরুতর অসুস্থদের এসব হাসপাতালে চিকিৎসার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে এবার ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ব্লাড প্রেশার কমছে, পেট ও বুকে পানি চলে আসছে, শকে চলে যাচ্ছে, রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এবার মশাবাহিত এই ভাইরাস সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থতার হারও বেড়েছে। আগে যেখানে শকে যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ শতাংশের মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রে জটিলতা হতো, এবার সেই হার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

অথচ এ বছরই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার ও সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি সবচেয়ে কম। যদিও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ওষুধ ছিটানো এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মতো নানা পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছে। কিন্তু সেসবের কার্যকারিতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মশা মারার ওষুধ আনা এবং বিতরণ নিয়ে নানা রকম সমালোচনাও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, মশার ওষুধ ছিটানো হয় কেবল প্রধান সড়কের আশপাশে। কিন্তু বিভিন্ন গলি, দুই বাসার ফাঁক-ফোঁকর, আরও নানা ধরনের দুর্গম স্থানে যেখানে ওষুধ ছিটানোর দায়িত্বে থাকা কর্মীরা সহজে পৌঁছতে পারেন না, সেখানে নিরাপদে এডিস মশা বংশ বৃদ্ধি করতে থাকে।

সিটি করপোরেশন সঠিক সময়ে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় ও উপযুক্ত কীটনাশক ব্যবহার না করায় ঢাকায় ভয়াবহ আকারে ডেঙ্গু বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন অ্যাডাল্ট মশা মারা। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কোনো হাত নেই। এই কাজটি অবশ্যই সিটি করপোরেশনকেই করতে হবে। কিন্তু তারা সেই কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছে না।

সিটি করপোরেশন যে ফগিং করে সেটি ত্রুটিপূর্ণ। তাছাড়া তাদের লোকবল ও কর্মীদের দক্ষতা নিয়েও সন্দেহ আছে। তাদের অধিকাংশ কাজ ত্রুটিপূর্ণ। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। দেশের যারা স্বীকৃত কীটতত্ত্ববিদ আছেন, তাদের পরামর্শও শোনা হয় না।

সরকারের দিক থেকে পরিকল্পিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। কারণ এডিস মশা তাৎক্ষণিককভাবে নির্মূলকরণের ব্যাপার নয়। সারা বছর ধরে এডিসের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি কোনো গ্রহণ করতে দেখা যায় না।

কীটনাশক প্রয়োগ এবং ডেঙ্গু ঠেকাতে নাগরিকদের যুক্ত করার ক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগ নেই। বিশেষ করে স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করে পাড়ায় পাড়ায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা কমিটি গঠনের কাজটি একেবারেই করা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কাউন্সিলরদেরও কাজে লাগানো হচ্ছে না।

এই কাজে রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরও ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্ষমতাসীন দল এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। রাজনৈতিক দলের কর্মীরা কেবল চাঁদাবাজি করবে, ক্ষমতার দাপট দেখাবে, দলের নেতানেত্রীদের নামে স্লোগান দেবে, দেশের মানুষের কল্যাণের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলবে, আর বাস্তবে আত্মকেন্দ্রিক একটা মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে, তা হয় না। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার প্রয়োজন।বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের। ঢাকা শহরের প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় আওয়ামী লীগের কমিটি আছে।

এই কমিটিকে এলাকার পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যুক্ত করা যেতে পারে। যারা নিজি এলাকায় এডিস মশার বংশ ধ্বংস করার জন্য সপ্তাহে অন্তত একদিন হলেও অভিযান পরিচালনা করবেন। কোনো এলাকায় কোনো ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেলে সেই এলাকায় কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থেকে ডেঙ্গু মশার প্রজননস্থল খুঁজে বের করে সেটা ধ্বংস করার অভিযানে নেতৃত্ব দেবেন। কেবল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীর উপর নির্ভর করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এর জন্য স্থানীয় নাগরিকদের যুক্ত করতে হবে। তাদের ভূমিকা জোরদার করতে হবে।

ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশে হচ্ছে না, আরও বহু দেশেই হচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বর হওয়া সরকারের ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতা বা অপরাধ হলো তার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল, তা না করা। গত বছরই বিভিন্ন সংস্থা থেকে এডিস মশা বৃদ্ধির ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আসলে দেশের মানুষের জীবন ও দুর্ভোগ নিয়ে দায়িত্ববোধ বা জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি এ রকম হতো না। এ ব্যাপারে সরকার ও সিটি করপোরেশনকে গা-ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, অন্য জীব দিয়ে এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশক হিসেবে লার্ভি সাইড ও অ্যাডাল্টি সাইডের প্রয়োগ এবং জনগণকে এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ౼ এই চারটি পদ্ধতি সারাবছর ধরে বাস্তবায়ন করতে হবে। সিটি করপোরেশন সারা বছর কাজ করলেও এই চারটি বিষয়কে একত্রিত করে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার কাজটি করে না। এ ব্যপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও অঙ্গীকার প্রয়োজন।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন:
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস সত্যকেই ধারণ করে
হীনম্মন্যতায় উন্নয়ন থেমে থাকে না
অভূতপূর্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ও টিকা গ্রহণের বয়স
বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

শেয়ার করুন