বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

বঙ্গবন্ধু: রাজনীতির বরপুত্র, বাঙালির অহংকার

তারণ্যের মননে লক্ষ মুজিবকে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং মুজিব আদর্শে আগামী প্রজন্ম বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করতে পারবে- সে প্রত্যাশা আমরা সবাই করতে পারি।

আজ বাঙালির শোকের মাস আগস্টের শেষদিন। একটি মাস কেটে গেল শোক আর স্মরণে। এ মাসে বেশি মনে পড়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতিসত্তার প্রাণপুরুষ, বাঙালি জাতির অহংকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক।

কবিতার আবেগ ছাড়িয়ে যাওয়া মুজিব, “যতদিন রবে পদ্মা-যমুনা, গৌরী-মেঘনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান”। কবিতাও যেন তাকে সীমার বাইরে অসীমতা দিয়েছে। মুজিব সংগ্রামী চেতনা, অনিরুদ্ধ অভিযাত্রার পথিক। তাই বাঙালির স্বপ্ন জয়ের উন্মুক্ত ঠিকানা, স্বাধীনতা, প্রিয় স্বাধীনতা। মুজিব যে, স্বাধীনতার অদম্য- অনিরুদ্ধ সামগ্রিতা, অসীমতা, বাস্তবতা। সেই ’৬৯-এর গগনবিদারী স্লোগান, ‘জেলের তালা ভেঙেছি/ শেখ মুজিবকে এনেছি’। ‘আমার ভাই, তোমার ভাই/ মুজিব ভাই, মুজিব ভাই’।

’৭১-এর মুক্তি সংগ্রামে শেখ মুজিবই শিখিয়েছেন পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে কীভাবে দেশকে স্বাধীন করতে হয় এবং লড়াই-সংগ্রাম করেই বাঁচতে হয়। অথবা ‘তোমার আমার ঠিকানা/পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’। ‘তোমার দেশ-আমার দেশ/ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’।

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি- যে বাঙালি মনন বাংলার পলিমাটির মতো, তীরভাঙা নদীর পাড়ের মতো, বহতা নদীর মতো চলমান, বৈশাখি ঝড়ের মতো- তিনি আর কেউ নন, আমাদের প্রাণের নেতা, জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা, বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে ভাষা-সংস্কৃতির দৃঢ়তা আর ভালোবাসার রাখিবন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন- তিনি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সীমাহীন সাহসিকতা আর অদম্য চেতনা বোধের রসায়নে তারই সুযোগ্য তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উচ্চতার স্বপ্নসিঁড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন- তার মেধা-ঘামে-শ্রমের বিনিময়ে।

তারণ্যের মননে লক্ষ মুজিবকে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং মুজিব আদর্শে আগামী প্রজন্ম বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করতে পারবে- সে প্রত্যাশা আমরা সবাই করতে পারি। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে রেডিও-টেলিভিশনে টকশো, মুক্ত আলোচনা মঞ্চে কিংবা পত্র-পত্রিকায় এবং বিভিন্ন নিবন্ধে ‘অশ্রুসিক্ত বাঙালি’ ১৫ আগস্টের শোক দিবস উদযাপন মঞ্চে কিংবা কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি দেশের বাইরে ভারতের রাজধানী আগরতলায় ‘বই মেলা’ মঞ্চে দাঁড়িয়ে আজও আমি শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করি। ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের লক্ষ জনতার মাঝে বিশ্বনন্দিত ভাষণ আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়-

‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

মহাকাব্যের মহানায়ক, রাজনীতির রাজপুত্র, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে অনন্তকাল ধরে আমরা গেয়ে যাব সেই গান, “মুজিব বাইয়া যাওরে... অকূলও দরিয়ার মাঝে তুমি মুজিব ভাই ওরে..... মুজিব, বাইয়া যাওরে।”

লেখক: শিক্ষানুরাগী, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এখনও তমসা!
বন্যায় শঙ্কা নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি
‘বৈষম্য বাড়ছে’ বলে দিলেই কি দায় শেষ?
জিয়ার মাজার: ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসছে 
শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চাই

শেয়ার করুন

মন্তব্য

২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় তখন কেবল তিনি একটু একটু করে ঠাঁই নিতে শুরু করেছেন। তিনি তখন রাষ্ট্রপ্রধান তো পরের কথা, মন্ত্রীও ছিলেন না। ছিলেন না দাপুটে জাঁদরেল কেউকেটা। কিন্তু বাংলা ছিল তাঁর হৃদয়জুড়ে। আর সে কারণেই যখন তিনি বাংলাদেশের শীর্ষনেতা হলেন, বাঙালির জাতির পিতা হয়ে যোগ দিলেন জাতিসংঘের অধিবেশনে, তখনও তার হৃদয়জুড়ে ছিল কেবল বাংলা। বাংলা ভাষাকে তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিশ্বদরবারে।

১৯৪৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের কৃষ্ণনগরে এক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ওই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানের পরদিন নৌকায় করে আশুগঞ্জ রওনা দিয়েছিলেন তারা। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“... নদীতে বসে আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তাঁর নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে।... তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।” আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)

বঙ্গবন্ধু এমন মানুষ, যিনি কথা রাখেন। বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দেয়ার কথা রেখেছিলেন। তেমনি আব্বাসউদ্দিনকে দেয়া কথাও রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলা ভাষাকে উপস্থাপন করেছিলেন গর্বিত মস্তকে। আজ সেই ঐতিহাসিক দিন।

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাই এখন পর্যন্ত দুনিয়ার একমাত্র ভাষা, যে ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে প্রাণও দিয়েছে বাঙালি। এটা বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্ব। কিন্তু এই গর্বের স্তম্ভটাকে যে আরও উঁচুতে তুলে ধরার বেলায় আর বাঙালিদের পাওয়া যায় না। রক্তের বিনিময়ে বাঙালি ভাষা ও দেশ অর্জন করেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেই তৃপ্তির ঢেকুরও তুলেছে।

বিশ্বদরবারে বাঙালিদের অনেক অর্জন আছে। রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাময় নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিও। এ যাবৎ তিন বাঙালি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিকে অমর্ত্য সেন এবং ২০০৬ সালে শান্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রথম নোবেল বিজয়ী বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার আনার জন্য সুইডেনে যাননি।

পরের দুই বাঙালি নোবেল পুরস্কার আনার জন্য সুইডেন গিয়েছিলেন এবং বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার গ্রহণ করার সময় বক্তৃতাও করেছেন। এই দুই বাঙালি যে ‘নোবেল স্পিচ’ দিয়েছিলেন, তাতে তাদের পরিচয়টা কোথায়? তারা কোন ভাষার মানুষ? তাদের বক্তৃতার ভাষায় তাদের আত্মপরিচয় ছিল না। অমর্ত্য সেন পুরো বক্তৃতাটাই করেছেন ইংরেজিতে। আর মুহাম্মদ ইউনূস তার নোবেল বক্তৃতার ৩৫ মিনিটের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট মানে নব্বই সেকেন্ডের জন্য বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বাংলা ভাষাকে ‘দয়া’ করেছিলেন!

যদিও ইদানিং ‘মডিফাই বাঙালি’রা তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করান, নিজেরা ইংরেজিতে কথা বলেন। যেন ইংরেজিতে কথা বলাটাই ‘স্ট্যাটাস’ রক্ষা করার একমাত্র উপায়। নিজেকে জাহির করার জন্যও তারা অনর্গল ইংরেজিতে বকরবকর করতে থাকেন।

প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ইংরেজি ‘টক’ করে তারা কাকে হেয় করেন? তাদের জাতিভাই আরেক বাঙালিকে? নাকি নিজের ভাষাকে? আসলে তারা নিজেকেই হেয় করেন। নিজের জাতিভাইকে হেয় করা মানে তো নিজেকেই হেয় করা। আর নিজের ভাষাকে হেয় করা মানে... সবসময় সবটা বুঝিয়ে বলা লাগে না।

যাহোক। দুনিয়ায় সম্ভবত একমাত্র জাতি আমরাই, যারা মাতৃভাষায় কথা বলতে গেলে হীনম্মন্যতায় ভুগি। নিজেদের কখনও ‘রাজা’ ভাবতে পারি না। সবসময় অদৃশ্য একটা দাসত্বের শিকল পরে থাকি। সেটা ভাষারই হোক বা সংস্কৃতিরই হোক। নিজেকে ‘রাজা’ ভাবতে পারে কজন? বিশেষ করে জাতিসংঘের মতো দুনিয়ার সর্ববৃহৎ আর্ন্তজাতিক সংগঠনের আর্ন্তজাতিক অনুষ্ঠানে ‘রাজা’ হিসেবেই বাঙালি জাতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বাংলাকে দিয়েছেন অপরিসীম মর্যাদা। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি। এর মধ্যে বাংলা নেই। সেদিন সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন ইংরেজিতে বক্তৃতা করার জন্য। বঙ্গবন্ধু বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘মাননীয় সভাপতি, আমি আমার মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’

বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে অধিবেশনের সভাপতি তাকে বাংলায় বক্তব্য দেয়ার অনুমতি দেন। অথচ অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বাংলায় বঙ্গবন্ধুর দেয়া এই ভাষণের মাত্র আটদিন আগে ১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ১৩৬তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের অর্ন্তভুক্ত হয় বাংলাদেশ। তার ওপর ইংরেজিতে ভাষণ দেয়ার জন্য তার ওপর চাপও ছিল। কিন্তু তিনি যে বাঙালি জাতির পিতা। তিনি কোনো চাপের কাছে কখনও মাথা নোয়াননি। ভাষার বেলায় আপস করবেন কেন?

হয়ত অনেকে বলতে পারেন, তিনি তো বাঙালির একছত্র নেতা। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। বাঙালি হৃদয়েও তার নিরঙ্কুশ সমর্থন। তিনি বাংলায় ভাষণ দেয়ার দুঃসাহস দেখাতেই পারেন। এ আর এমন কী! তাহলে একটু পিছনের দিকে যাওয়া যাক। যাওয়া যাক আরও বাইশ বছর আগে।

১৯৫২ সালে চীনের রাজধানী পিকিঙে (বর্তমানে বেইজিং) শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই শান্তি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাঁইত্রিশ দেশের তিনশ আটাত্তর প্রতিনিধি। স্বাভাবিকভাবে শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানের প্রতিনিধি ছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু জানিয়েছেন-

“... পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও অনেকেই বক্তৃতা করলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান সাহেব ইংরেজি করে দিলেন। ইংরেজি থেকে চীনা, রুশ ও স্পেনিশ ভাষায় প্রতিনিধিরা শুনবেন। কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করেছেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে জানে না এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ায় অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পর মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছ, আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।”

‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইতে বঙ্গবন্ধু বিষয়টাকে আরেকটু খোলাসা করেছেন।

“... আমি বক্তৃতা করলাম বাংলা ভাষায়, আর ভারত থেকে বক্তৃতা করলেন মনোজ বসু বাংলা ভাষায়।

বাংলা আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় বক্তৃতা করাই উচিত। কারণ পূর্ব বাংলার ভাষা-আন্দোলনের কথা দুনিয়ার সকল দেশের লোকই কিছু কিছু জানে। মানিক ভাই, আতাউর রহমান খান ও ইলিয়াস বক্তৃতাটা ঠিক করে দিয়েছিল। দুনিয়ার সকল দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি।

... অনেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, ভারত থেকে একজন বাংলায় বক্তৃতা করলেন, আর পাকিস্তান থেকেও একজন বক্তৃতা করলেন, ব্যাপার কী! আমি বললাম, বাংলাদেশ ভাগ হয়ে একভাগ ভারত আর একভাগ পাকিস্তানে পড়েছে। বাংলা ভাষা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা এ অনেকেই জানে। ঠাকুর দুনিয়ায় ‘ট্যাগোর’ নামে পরিচিত। যথেষ্ট সম্মান দুনিয়ার লোক তাঁকে করে। আমি বললাম, পাকিস্তানের শতকরা ৫৫ জন লোক এই ভাষায় কথা বলে। এবং দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাষার অন্যতম ভাষা বাংলা। আমি দেখেছি ম্যাডাম সান ইয়াৎ-সেন খুব ভালো ইংরেজি জানেন, কিন্তু তিনি বক্তৃতা করলেন চীনা ভাষায়। একটা ইংরেজি অক্ষরও তিনি ব্যবহার করেন নাই।

চীনে অনেক লোকের সাথে আমার আলাপ হয়েছে, অনেকেই ইংরেজি জানেন, কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলবেন না। দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলবেন। আমরা নানকিং বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যাই। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ইংরেজি জানেন, কিন্তু আমাদের অভ্যর্থনা করলেন চীনা ভাষায়। দোভাষী আমাদের বুঝাইয়া দিলো। দেখলাম তিনি মাঝে মাঝে এবং আস্তে আস্তে তাকে ঠিক করে দিচ্ছেন যেখানে ইংরেজি ভুল হচ্ছে। একেই বলে জাতীয়তাবোধ। একেই বলে দেশের ও মাতৃভাষার উপরে দরদ।”

(সূত্র: আমার দেখা নয়াচীন- শেখ মুজিবুর রহমান। পৃষ্ঠা ৪৩-৪৪)

মাতৃভাষার প্রতি বঙ্গবন্ধুর দরদের কথা কে না জানে! বাংলাকে মাতৃভাষা করার আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন সেই ১৯৪৮ সালেই। জেলও খেটেছিলেন। তখন তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। তারপর ১৯৫২ সালে যখন চীনের শান্তি সম্মেলনে গিয়ে বাংলায় বক্তৃতা করলেন, তখনও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রভাব এত বিশাল ছিল না। বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় তখন কেবল তিনি একটু একটু করে ঠাঁই নিতে শুরু করেছেন। তিনি তখন রাষ্ট্রপ্রধান তো পরের কথা, মন্ত্রীও ছিলেন না। ছিলেন না দাপুটে জাঁদরেল কেউকেটা। কিন্তু বাংলা ছিল তাঁর হৃদয়জুড়ে। আর সে কারণেই যখন তিনি বাংলাদেশের শীর্ষনেতা হলেন, বাঙালির জাতির পিতা হয়ে যোগ দিলেন জাতিসংঘের অধিবেশনে, তখনও তার হৃদয়জুড়ে ছিল কেবল বাংলা।

বাংলা ভাষাকে তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিশ্বদরবারে। এ যোগ্যতা সত্যিকারের ‘রাজা’র পক্ষেই সম্ভব। নইলে তার পরে বাংলাদেশের আরও অনেক শীর্ষনেতাও তো জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন। তারা তো কেউ বাংলায় ভাষণ দেননি! নিজভাষা নিয়ে ওইসব রাষ্ট্রনায়করা নিজেরাই যখন হীনম্মন্যতায় ভুগছিলেন, কিংবা তাদের কাছে মাতৃভাষার চেয়ে ইংরেজি ভাষা প্রাধান্য পেয়েছিল, সেই তারা জাতিকে যে কেমন নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটা এই বাংলাভাষা বিমুখতা থেকেই বোঝা যায়।

১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলা ভাষার যে গৌরব প্রতিষ্ঠা করেন, সে গৌরব অব্যাহত রেখে চলেছেন তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বরাবরের মতো বিগত কয়েকবছর ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাতেই ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন। মাতৃভাষার এমন অধিকার প্রতিষ্ঠা করায় বাঙালি হিসেবে তাদের প্রতি আজীবনের কৃতজ্ঞতা।

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় দেয়া ভাষণের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে যুক্তরাজ্যের নিউইয়র্ক রাজ্যে প্রতিবছর ২৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বাংলাদেশি ইমিগ্রান্ট ডে’ বা ‘বাংলাদেশি অভিবাসী দিবস’ হিসেবে। ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্টেট সিনেট অধিবেশনে বিলটি পাস হয় ও স্টেট ক্যালেন্ডারে দিবসটি অর্ন্তভুক্ত করা হয়।

তথ্যসূত্র:

অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান

আমার দেখা নয়াচীন- শেখ মুজিবুর রহমান

dhakatribune.com/bangladesh/2021/09/17/bangladeshi-immigrant-day-to-be-observed-in-new-york-on-september-25

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এখনও তমসা!
বন্যায় শঙ্কা নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি
‘বৈষম্য বাড়ছে’ বলে দিলেই কি দায় শেষ?
জিয়ার মাজার: ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসছে 
শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চাই

শেয়ার করুন

জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা

জাতিসংঘে বাংলাদেশ: বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সে ভাষণের ঐতিহাসিক তাৎপর্য আলোচনার আগে আরও একটি তথ্য অনিবার্যভাবে আসে, তা-হলো তার সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও জাতিসংঘে বাংলাদেশকে গৌরবময় ভূমিকায় উপস্থাপন। তার ধারাবাহিক নেতৃত্ব বাংলাদেশকে যে বহির্বিশ্বে উন্নত থেকে উন্নততর মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করছে, জাতিসংঘের নানামাত্রিক সম্মাননা ও স্বীকৃতিতে সে বাস্তবতাই দেদীপ্যমান করে তুলেছে।

বছর ঘুরে এই দিনটি (২৫ সেপ্টেম্বর) এলেই স্মৃতিতে জেগে ওঠে এদেশের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। জাতিসংঘে ভাষণ দিচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সে ভাষণ মাতৃভাষা বাংলায়। রবীন্দ্রনাথের নোবেল বিজয়ের ৬১ বছর পর বাংলা ভাষা আরেকবার সম্মানিত হলো বিশ্ব সামাজে এবং তা বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মধ্য দিয়ে।

সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দেশের পুনর্গঠন আর বিশ্ব সমাজে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধু দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পর পর দুবছর পাকিস্তানের বিরোধিতা এবং চীনের ভেটোর কারণে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।

অবশেষে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী কূটনৈতিক চেষ্টায় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। এর ঠিক এক সপ্তাহ পরে জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। নানা কারণে সে ভাষণ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের উদার মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, অপরদিকে মানব সভ্যতার কল্যাণে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বান।

বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর দুঃখ-দুর্দশা মোচনের জন্য জাতিসংঘকে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য বঙ্গবন্ধুর আহবান সারা পৃথিবীতে প্রশংসিত হয়েছিল। সেসঙ্গে প্রকাশ পেয়েছিল বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর টিকে থাকার সংগ্রামে শক্তি, সাহস ও আত্মপ্রত্যয়ের দৃঢ় চেতনা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সে ভাষণের ঐতিহাসিক তাৎপর্য আলোচনার আগে আরও একটি তথ্য অনিবার্যভাবে আসে, তা-হলো তার সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও জাতিসংঘে বাংলাদেশকে গৌরবময় ভূমিকায় উপস্থাপন। তার ধারাবাহিক নেতৃত্ব বাংলাদেশকে যে বহির্বিশ্বে উন্নত থেকে উন্নততর মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করছে, জাতিসংঘের নানামাত্রিক সম্মাননা ও স্বীকৃতিতে সে বাস্তবতাই দেদীপ্যমান করে তুলেছে। গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদে পিতার মতোই প্রিয় মাতৃভাষা বাংলায় সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী।

মহামারির এ সময়ে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব মানুষের টিকাপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ভূমিকা গ্রহণ, বিশ্বের জলবায়ু বিপর্যয় রোধে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের আহ্বানসহ গুরুত্বপূর্ণ কটি দফা তিনি উপস্থাপন করেছেন। এজন্য দেশ-বিদেশে ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা দীর্ঘ ৪৭ বছরের ব্যবধানে জাতিসংঘে বাংলাদেশ আজ এক মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে মহিমান্বিত। যে বিশ্ববাস্তবতায় ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে ভাষণ দেন, সেসময়ের অনেক বিবর্তন ঘটেছে কিন্তু এত বছর পরেও তার সে ভাষণের তাৎপর্য এতটুকু ম্লান হয়নি।

তিনি নামিবিয়াসহ স্বাধীনতা সংগ্রামে নিয়োজিত বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে তার অবস্থান তুলে ধরেন স্পষ্ট ভাষায়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য নিরসন, বর্ণবাদ, দারিদ্র্য, বেকারত্ব নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, আবহাওয়া ও জলবায়ু বিপর্যয় রোধে সম্মিলিত প্রয়াস এর ওপর গুরুত্বারোপ করে যে বক্তৃতা করেছিলেন, এর আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি। কারণ এই সমস্যাগুলো ৪৭ বছর পরও বৈষম্যপীড়িত পৃথিবীতে রয়ে গেছে।

বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের তাৎপর্য যেমন শাশ্বত, তেমন বাংলা ভাষায় প্রথম জাতিসংঘে বক্তৃতা করার ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা ও জন্মভূমির প্রতি তার যে তীব্র অনুরাগ এর কোনো তুলনা নেই। সত্য বটে রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, কিন্তু নোবেল ভাষণ দিয়েছিলেন ইংরেজিতে। পরবর্তীকালে যে দুজন বাঙালি নোবেল পুরস্কার পায় তাদের একজন ড. অমর্ত্য সেন, আরেকজন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তারা কেউ নোবেল ভাষণ মাতৃভাষা বাংলায় দেয়নি। বক্তৃতা করে ইংরেজিতে। শুধু বঙ্গবন্ধুই ব্যতিক্রম।

বঙ্গবন্ধুকে প্রথমে অনুরোধ করা হয় ইংরেজিতে বক্তৃতা করার জন্য- ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ বঙ্গবন্ধু সবিনয়ে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন-‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’

বক্তৃতার শুরুতেই বললেন-

“মাননীয় সভাপতি, আজ এই মহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এইজন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাতকোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাহারা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্যে আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত রহিয়াছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তুলিবার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের এই অঙ্গীকারের সহিত শহীদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবেন।”

ওই বক্তৃতায় প্রয়োজনীয় কোনো দিক তিনি বাদ রাখেননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও মুক্তির সংগ্রামে যেসব দেশ সমর্থন দেয়, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“যাহাদের ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ বিশ্ব-সমাজে স্থান লাভ করিয়াছে, এই সুযোগে আমি তাহাদেরকে অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সমর্থনকারী সকল দেশ ও জনগণের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ছিল শান্তির জন্য সংগ্রাম, জাতিসংঘ গত ২৫ বছর ধরে এই শান্তির জন্য সংগ্রাম করিয়া যাইতেছে।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি ওই বক্তৃতায় জনগণের অধিকার কেড়ে নেয়ার ক্ষেত্রে দেশে দেশে সেনাবাহিনী ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানান এবং বাংলাদেশসহ চারটি দেশ আলজেরিয়া, গিনিবিসাউ এবং ভিয়েতনামের নাম উল্লেখ করে বললেন- “এই দেশগুলি অপশক্তির বিরুদ্ধে বিরাট বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।”

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে ফিলিস্তিন, জাম্বিয়া, নামিবিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গেও একাত্মতা ঘোষণা করেন। বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত, দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তার ভাষণে।

ওই সময় বন্যায় বিপর্যস্ত হয়েছিল বাংলাদেশ। দুর্গত মানুষের সহায়তার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু একটি অসামান্য কথা বলেন। তার বক্তব্য ছিল আমাদের মতো জাতিসমূহ- যাদের অভ্যুদয় সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে, তাদের অদম্য মানবীয় শক্তি রয়েছে।

তিনি বলেন- “আমাদের কষ্ট করতে হতে পারে কিন্তু আমাদের ধ্বংস নাই।”

দুরূহ বাধা অতিক্রমের অদম্য শক্তির প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল দৃঢ় বিশ্বাস। বিশ্বের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি দেখে বিহ্বল হয়ে পড়েন তিনি। জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের জন্য।

এর আগের বছর আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ দেশগুলোর সম্মেলনেও দরিদ্র ও লড়াকু দেশগুলোর মানুষের সে অদম্য শক্তির কথা তিনি বলেন। বলেন দ্বিধা-বিভক্ত পৃথিবীর বৈষম্যের কথাও। শোষক ও শোষিতে বিভক্ত পৃথিবীতে তিনি নিজেকে সুস্পষ্টভাবে শোষিতের পক্ষে ঘোষণা করেছিলেন এবং সে কারণে প্রচলিত পথ ছেড়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে যাচ্ছিলেন।

১৯৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বরের ভাষণই জাতিসংঘে তার প্রথম এবং শেষ ভাষণ। পরের বছর সেপ্টেম্বর আসার আগেই তিনি সপরিবারে নিহত হন।

কিন্তু দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ, আঞ্চলিক অখণ্ডতা আর সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার অনন্য ভাষ্যকার হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আমাদের সঙ্গে বিশ্ববাসীকেও অনুপ্রাণিত করবে যুগ যুগ ধরে। বিশ্বসমাজও আজ তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।

২০১৯ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের উদ্যোগে ১৫ আগস্ট জাতিসংঘ ভবনে বঙ্গবন্ধুর স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও অংশগ্রহণ করে। অত্যাচারিত, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামকে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদাহরণস্বরূপ বলে মন্তব্য করে এবং বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ব মানবের মুক্তির দূত হিসেবে বিশ্ববন্ধু বা ‘ফ্রেন্ডস অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ বিশেষণে ভূষিত করে।

আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা তার দেখানো পথে বিশ্বনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ১৯৯৬ থেকে (২০০১-২০০৮ সাল ছাড়া) বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তিনি সব সময় জাতির পিতার মতোই বাংলায় ভাষণ দেন। বাংলা ভাষা ও বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে গভীর ভালোবাসা সে প্রতিধ্বনিই যেন শুনি তার সুযোগ্য কন্যার কণ্ঠে।

জাতিসংঘে নানাক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ সম্মান এবং মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। দারিদ্র্য মোচনের ক্ষেত্রে দ্রুত গতিতে অগ্রসর বাংলাদেশ। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুহার কমিয়ে রয়েছে নেতৃত্বের আসনে। বিশ্ব পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যে নেতৃত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন, তাতে তিনি বিশ্বনেতার সম্মান অর্জন করেন, এজন্য তাকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ’ সম্মাননায় ভূষিত করে জাতিসংঘ।

এবারসহ ১৭ বার জাতিসংঘে ভাষণ দেন তিনি। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ, দারিদ্র্য বিমোচন, পরিবেশ বিপর্যয় রোধ, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা নেতৃত্বস্থানীয়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুর সমাধান, বিশ্বব্যাপী শরণার্থী মানুষের দুঃখ দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে তা মোচনের জন্য অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এ বছর জাতিসংঘ তাকে ‘ক্রাউন জুয়েল’ বা মুকুটমণি অভিধায় ভূষিত করে। বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন।

বিশ্বের গোলযোগপূর্ণ দেশগুলোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ যে অসামান্য ভূমিকা পালন করছে, সে শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যেমন গৌরবের, দেশের জন্য তেমনি অসামান্য অর্জন।

১৯৭৪ থেকে ২০২১ সাল- এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে যেতে যেভাবে ধাপে ধাপে গৌরবের সোপান অতিক্রম করছে, তাতে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের গর্বিত হওয়ার কথা।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এখনও তমসা!
বন্যায় শঙ্কা নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি
‘বৈষম্য বাড়ছে’ বলে দিলেই কি দায় শেষ?
জিয়ার মাজার: ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসছে 
শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চাই

শেয়ার করুন

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষণ: ভাষার বিশ্বকরণ

জাতিসংঘের সেক্রেটারিয়েট থেকে ইংরেজিতে ভাষণ দেয়ার কথা বলা হলে বঙ্গবন্ধু আগেই জানিয়ে দেন, তিনি বাংলায় ভাষণ দেবেন। মাতৃভাষার প্রতি দরদ ও মমত্ববোধ থেকে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামে সমর্থনকারী দেশ ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ছিল শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মিলিত সংগ্রাম।”

আজ ২৫ সেপ্টেম্বর, বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন। ১৯৭৪ সালে এ দিনে আমাদের মহান নেতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বপ্রথম বাংলায় ভাষণ দেন। আর এ ভাষণের মাধ্যমে তিনি আমাদের সত্ত্বা ও আত্মমর্যাদাকে বিকশিত করেছিলেন বিশ্বদরবারে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাভাষা পেয়েছিল এক নতুন রূপ।

তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। এর আগে মাতৃভাষায় এমন তেজোদীপ্ত ভাষণ কখনও কেউ দিতে পারেনি। এটিই ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ দরবারে জাতির পিতার প্রথম ও শেষ ভাষণ।

এ নিয়ে তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছেন-

“আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম।… কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না?… পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ায় অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য।” নিজের কর্তব্যবোধ সম্পর্কে সদাজাগ্রত বঙ্গবন্ধু মাতৃভাষায় বক্তৃতা দেয়ার সিদ্ধান্তটি আগেই নিয়েছিলেন।

বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের বয়ানে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর বাংলা বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করার গুরু দায়িত্বটি অর্পিত হয়েছিল ফারুক চৌধুরীর (প্রয়াত) ওপর। তিনি ছিলেন লন্ডনে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার। ছুটিতে দেশে এসেছেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, ‘ফারুক, তোমার ছুটি নাই। তোমাকে এখানে কাজ করতে হবে।’ কাজগুলো হচ্ছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর আসন্ন বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে প্রতিনিধি দল নিয়ে বার্মায় গমন। বার্মা থেকে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু ফারুক চৌধুরীকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তোমার লন্ডন যাওয়া চলবে না। তুমি আমার সঙ্গে নিউইয়র্ক যাবে এবং জাতিসংঘে আমি বাংলায় যে বক্তৃতাটি করব, তাৎক্ষণিকভাবে তুমি সেই বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করবে।’

একথা শুনে ফারুক চৌধুরী একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তখন পরিস্থিতি সহজ করতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রিহার্সাল দাও। বক্তৃতা ভাষান্তরের সময় ভাববে যেন তুমিই প্রধানমন্ত্রী। তবে পরে কিন্তু তা ভুলে যেও।’

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এটি ছিল বঙ্গবন্ধুর বড় সাফল্য। বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ও সদস্যপদ অর্জনে জাতির পিতার নিরলস কূটনৈতিক চেষ্টা ও সাফল্যগাথা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এর মাত্র ৮ দিন পর ২৫ সেপ্টেম্বর তৈরি হয় আরও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বাংলায় যে যুগান্তকারী ভাষণটি দেন সেটি ছিল বিশ্বের বঞ্চিত, নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত মানুষের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বশান্তির জন্য বলিষ্ঠ উচ্চারণ।

জাতিসংঘের সেক্রেটারিয়েট থেকে ইংরেজিতে ভাষণ দেয়ার কথা বলা হলে বঙ্গবন্ধু আগেই জানিয়ে দেন, তিনি বাংলায় ভাষণ দেবেন। মাতৃভাষার প্রতি দরদ ও মমত্ববোধ থেকে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও মুক্তি সংগ্রামে সমর্থনকারী দেশ ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ছিল শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মিলিত সংগ্রাম।”

তিনি জাতিসংঘের আদর্শ, শান্তি ও ন্যায়বিচারের বাণীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বাংলার লাখও শহিদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণপূর্বক বিশ্বশান্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। জাতির পিতা তার ভাষণে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষের লড়াই ও ত্যাগের উদাহরণ টেনে বলেন, অন্যায় এখনও চলছে এবং বর্ণবাদও পূর্ণমাত্রায় বিলুপ্ত হয়নি। জনগণের ন্যায়সংগত অধিকার ও বর্ণবাদের অবসান ঘটাতে নতুন বিশ্বব্যবস্থার আহ্বান জানান তিনি। ফিলিস্তিন, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামের কথাও বলেন।

বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে একদিকে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন, অপরদিকে ক্ষুধায় আক্রান্ত দেশগুলোর জন্য জরুরি সহায়তার কথাও বলেছেন। তিনি অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে প্রতিটি মানুষের জন্য সুখী ও শ্রদ্ধাশীল জীবন নিশ্চয়তার তাগিদ দেন। অনাহার, দারিদ্র্য ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধভাবে ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান। যে ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বের সমস্ত সম্পদ ও প্রযুক্তিজ্ঞানের যথাযথ বণ্টনের মাধ্যমে একটি জাতির কল্যাণের দ্বার উন্মুক্ত হবে, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি সুখী ও সম্মানজনক জীবনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা পাবে। তিনি বলেছেন, “আমি জীবনকে ভালোবাসি তবে আমি মানুষের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করতে ভয় পাই না।”

সেই ঐতিহাসিক ক্ষণের স্মৃতি থেকে একাধিক বিশিষ্টজনের লেখায় জানা যায়, জাতিসংঘ অধিবেশনে সচরাচর সবাই উপস্থিত থাকে না। অনেক চেয়ার খালি পড়ে থাকে। কিন্তু ওইদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সময় অধিবেশন কক্ষ ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। গ্যালারিগুলোতেও ছিল অভিন্ন চিত্র। কারণ শেখ মুজিবুর রহমান তখন কেবল একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী নন। বরং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া একটি নতুন দেশের স্থপতি। সারাবিশ্বে আলোচিত তিনি। তাই সবাই এই নেতাকে দেখার জন্য, বক্তৃতা শোনার জন্য অধিবেশনে যোগ দিয়েছিল।

নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৪টায় তাকে বক্তৃতার জন্য আহ্বান জানানো হয়। এ সময় সাধারণসভার সভাপতি আলজিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) আব্দুল আজিজ ব্যুতফলিকা নিজ আসন থেকে উঠে এসে বঙ্গবন্ধুকে মঞ্চে তুলে নেন। বক্তৃতা মঞ্চে দাঁড়ান গলাবন্ধ কোট, কালো ফ্রেমের চশমা, আর ব্যাকব্রাশ করা চুলের বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘদেহী, স্মার্ট, সুদর্শন আর আভিজাত্যপূর্ণ এক সৌম্য ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিবকে দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারেনি নানা দেশের প্রতিনিধিরা।

নাতিদীর্ঘ ভাষণের সূচনায় বঙ্গবন্ধু বলেন “আজ এই মহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সঙ্গে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।”

মাতৃভাষায় বঙ্গবন্ধু মুজিবের এই ঐতিহাসিক বক্তৃতার পর অধিবেশনে সমাগত পাঁচটি মহাদেশের প্রতিনিধি এবং সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুল পঠিত জাতিসংঘের ‘ডেলিগেট বুলেটিন’ বঙ্গবন্ধুকে ‘কিংবদন্তির নায়ক মুজিব’ বলে আখ্যায়িত করে। বুলেটিনটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কদের প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া পত্রস্থ করা হয়। বুলেটিনের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়- “এ যাবৎ আমরা কিংবদন্তির নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের নাম শুনেছি। এখন আমরা তাকে কাজের মধ্যে দেখতে পাব।” জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্পর্কে বলা হয়- “বক্তৃতায় ধ্বনিত হয়েছে মুজিবের মহৎকণ্ঠ।”

বাংলার এই নেতার মহান বীরত্ব দেখে বিশ্ব নেতারা হয়েছিলেন বিস্মিত! শোষিত মানুষের পক্ষে উচ্চারিত ভাষণে সাম্রাজ্যবাদের ভিত কেঁপে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত, শোষিত। আর আমি শোষিতের পক্ষে।

এর আগে বিশ্ব পরিসরে মাতৃভাষা বাংলাকে এমন করে কেউ পরিচয় করিয়ে দেয়নি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তার মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে প্রথম বাংলা ভাষা পরিচিতি পেয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাঙ্গনের কোথাও তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেননি।

১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পুরস্কার পাওয়া দ্বিতীয় বাঙালি তিনি। তিনিও তার বক্তব্যটি রেখেছিলেন ইংরেজিতে। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ড. মুহম্মদ ইউনূস চাইলে তার বক্তব্যের পুরোটি বাংলায় দিতে পারতেন। তাতে বাংলা ভাষা বিশ্বজনের কাছে আরও পরিচিত ও সম্মানিত হতে পারত। তিনি তার ৩৫ মিনিটের ভাষণের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট বাংলা বলেছেন।

জাতির পিতার পর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে চেতনায় ধারণ করে লালন করেছেন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিতে পেরেছেন সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে। এবারও তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন বাংলায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। এরপর শেখ হাসিনা যতবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এসেছেন, ততবার বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি দেয়ার দাবি করেছেন। ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ ইউনেসকো স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিশ্বব্যাপী ৩৫ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। তবে বাংলা ভাষা বলতে বিশ্ব বাংলাদেশকেই বোঝে। মাতৃভাষা বিবেচনায় বাংলা এখন চতুর্থ। সংখ্যার দিক দিয়ে সপ্তম।

ইউনেসকো ২০১০ সালে বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরেলা ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ানো হয়।

এদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তার সম্মানে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের উত্তর লনের বাগানে একটি বেঞ্চ উৎসর্গের পাশাপাশি একটি বৃক্ষরোপণ করার অনুমতি দিয়েছে জাতিসংঘ। আর এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত সোমবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী এই বৃক্ষ রোপণ করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই বৃক্ষ শতবর্ষ পরেও টিকে থাকবে। শান্তির বার্তাই বয়ে বেড়াবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা সবসময় শান্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। দরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই ছিল তার এই সংগ্রাম। ওই বৃক্ষটির কাছে বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে একটি বেঞ্চ উন্মুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। বেঞ্চটিতে বঙ্গবন্ধুর বাণী রয়েছে। গত শুক্রবার তিনি বাংলায় ভাষণ দিয়ে আবারও জাতির পিতার কথা জাতিসহ বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিলেন।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এখনও তমসা!
বন্যায় শঙ্কা নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি
‘বৈষম্য বাড়ছে’ বলে দিলেই কি দায় শেষ?
জিয়ার মাজার: ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসছে 
শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চাই

শেয়ার করুন

বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ: আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস

ফারুক চৌধুরীর লেখা ‘স্মরণে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সফরের আগে পররাষ্ট্র সচিব একদিন বলেন, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রণয়নে সেসময়ের তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর খুবই আগ্রহ দেখান। ঠাকুর এর আগে ইত্তেফাকের রিপোর্টার ছিলেন। তিনি মনে করতেন, বাংলা ভাষায় তার খুব দখল রয়েছে। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু বাংলাতেই ভাষণ দেবেন, এটি জানার পর তাহের ঠাকুর বাংলায় ভাষণের একটি খসড়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করেন। পরে জানা যায়, তাহের ঠাকুরের ওই ভাষণ বঙ্গবন্ধুর পছন্দ হয়নি।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন। ওই শতাব্দীর শুরুতে ১৯১৩ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্বে পরিচয় করান। ৬ দশক পর বাঙালি জাতির মুক্তির নায়ক শেখ মুজিব জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষাকে আবারও বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন।

এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর (১৯৭৪) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশকে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে। তখন চীন ভেটো দেয়া থেকে বিরত থাকে। ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ আনন্দ উল্লাস করে।

২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু ঢাকা ত্যাগ করেন। ওই সময় জাতিসংঘে ৬টি ভাষায় বক্তৃতা দেয়ার রেওয়াজ ছিল। এ ৬টির মধ্যে বাংলা ভাষা ছিল না। আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাভাষী এই নেতার বক্তৃতা শুনে উপস্থিত সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানগণ মুগ্ধ হন।

ভাষণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত বিশ্বনেতারা নিজ আসন থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে করমর্দন ও আলিঙ্গন করেন। বাংলা ভাষা আসলে সেদিন থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্যাদা লাভ করে।

সৈয়দ আনোয়ারুল করিম জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রথম স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন। ওই সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন ফখরুদ্দীন আহমদ। জাতিসংঘে দেয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণটির একটি খসড়া তৈরি করে পররাষ্ট্র সচিব ফখরুদ্দীন আহমদ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেসময়ের পদস্থ কর্মকর্তা ফারুক আহমদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ভাষণ পাঠ শেষে প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে বলেন, “ভালোই তো তোমাদের ফরেন সার্ভিসের বক্তৃতা। কিন্তু তোমরা যে আসল কথাই লেখনি। দেশে বন্যা হয়ে গেল। দুর্ভিক্ষ হতে যাচ্ছে, সেই কথাটিই তো আমি জাতিসংঘে বলবার চাই। বাংলাদেশের সমস্যার কথা বিশ্ববাসী আমার মুখ থেকেই শুনুক। তোমাদের সংশয় কেন?”

সাঁটলিপিকার রোজারিওকে ডেকে আনা হলো। অদূরে সোফা দেখিয়ে ফারুক চৌধুরীকে বঙ্গবন্ধু বললেন, “ওখানে বসে আসন্ন খাদ্যাভাব সম্বন্ধে একটি লাইন তুমি আমার বক্তৃতায় জুড়ে দাও।”

পরবর্তী সময়ে ফারুক চৌধুরীর লেখা ‘স্মরণে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সফরের আগে পররাষ্ট্র সচিব একদিন বলেন, জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রণয়নে সেসময়ের তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর খুবই আগ্রহ দেখান। ঠাকুর এর আগে ইত্তেফাকের রিপোর্টার ছিলেন। তিনি মনে করতেন, বাংলা ভাষায় তার খুব দখল রয়েছে। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু বাংলাতেই ভাষণ দেবেন, এটি জানার পর তাহের ঠাকুর বাংলায় ভাষণের একটি খসড়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করেন। পরে জানা যায়, তাহের ঠাকুরের ওই ভাষণ বঙ্গবন্ধুর পছন্দ হয়নি।

১৯৭৪ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় দেয়া সেই ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভাষণের ইংরেজি অনুবাদটি পাঠ করেছিলেন ফারুক চৌধুরী।বঙ্গবন্ধু তার জীবনে সবসময় যা করেছেন, তা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন।

এই যে বিশ্ব ফোরামে বঙ্গবন্ধু একদিকে বাংলা ভাষণ দিচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে তা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ফারুক চৌধুরী। আর এ জন্য নিউইয়র্কে বঙ্গবন্ধু যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন, তার কামরার রুদ্ধ কক্ষে প্রধানমন্ত্রী আর ফারুক চৌধুরীর মধ্যে বক্তৃতা পাঠের রিহার্সাল হয়েছিল অন্তত তিনবার।

এমনভাবে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের আর একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ফারুক চৌধুরী। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। দিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণের খসড়াটিও লিখে দেন ফারুক চৌধুরী। ৯ জানুয়ারি দিল্লির অশোক হোটেলে লেখা সেই ছোট্ট বক্তৃতার স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে-

“এই তাঁর জয়যাত্রা অন্ধকার থেকে আলোয়, বন্দিত্ব থেকে স্বাধীনতায়, নিরাশা থেকে আশায়। ন’মাসের ব্যবধানে দেশে ফিরছেন তিনি। সেই সময়টুকুতেই আমার জনগণ শতাব্দী অতিক্রম করেছে, তিনি ফিরছেন বিজয়কে শান্তি, প্রগতি আর উন্নতির পথে চালিত করতে। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এই সান্ত্বনায় যে অবশেষে অসত্যের ওপর সত্যের, উন্মাদনার ওপর প্রকৃতিস্থতার, কাপুরুষতার ওপর শৌর্যের, অবিচারের ওপর ন্যায়বিচারের, অমঙ্গলের ওপর মঙ্গলের হয়েছে জয়।” পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদকে বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু বলেন- “ওতো আমার মনের কথাই লিখেছে।”

অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বাঙালির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তান শেখ মুজিব ১৯৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে পিনপতন নীরবতার মধ্যে তার স্বভাবসুলভ সাবলীল ভাষায় দৃপ্তকণ্ঠে প্রথমেই বলেন-

“আজ এই মহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সঙ্গে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির অংশীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে- আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আমাদের এই অঙ্গীকারের সহিত শহীদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবেন। ইহা বিশেষ আনন্দের ব্যাপার যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সক্রিয় যোদ্ধা সভাপতি থাকাকালেই বাংলাদেশকে এই পরিষদের অন্তর্ভুক্ত করিয়া নেয়া হইয়াছে।”

আগামীদিনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“...আজিকার দিনে বিশ্বের জাতিসমূহ কোন পথ বাছিয়া নিবে তাহা লইয়া সংকটে পড়িয়াছে। এই পথ বাছিয়া নেওয়ার বিবেচনার ওপর নির্ভর করিবে আমরা সামগ্রিক ধ্বংস, ভীতি এবং আণবিক যুদ্ধের হুমকি নিয়া এবং ক্ষুধা, বেকার ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে মানবিক দুর্গতিকে বিপুলভাবে বাড়াইয়া তুলিয়া আগাইয়া যাইব অথবা আমরা এমন এক বিশ্ব গড়িয়া তোলার পথে আগাইয়া যাইব যে বিশ্বে মানুষের সৃজনশীলতা এবং আমাদের বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতি আনবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের রূপায়ণ সম্ভব করিয়া তুলিবে এবং যে কারিগরি বিদ্যা ও সম্পদের পারস্পরিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে সুন্দর জীবন গড়িয়া তোলার অবস্থা সৃষ্টি করিবে। যে অর্থনৈতিক উত্তেজনা সম্প্রতি সমগ্র বিশ্বকে নাড়া দিয়াছে তাহা একটি ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিয়া জরুরিভাবে মোকাবিলা করিতে হইবে।”

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে স্বাধীনতাযুদ্ধকালে ধ্বংসলীলার কথা উল্লেখ করে বলেন- “সাম্প্রতিক বন্যা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।”

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অঙ্গীকার প্রমাণের জন্য উপমহাদেশে আপোষ মীমাংসার পদ্ধতিকে আমরা জোরদার করেছি।”

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের জন্য যেসব পদক্ষেপ ও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেসব কথাও তিনি উল্লেখ করেন। বলেন- “আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের অভ্যুদয় বস্তুতপক্ষে এই উপমহাদেশে শান্তির কাঠামো এবং স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অবদান রাখবে।”

পরিশেষে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“জনাব সভাপতি, মানুষের অজয় শক্তির প্রতি বিশ্বাস, মানুষের অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতা এবং অজেয়কে জয় করার শক্তির প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাস রেখে আমি আমার বক্তৃতা শেষ করিতেছি। আমরা দুঃখ ভোগ করিতে পারি, কিন্তু মরিব না। টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে জনগণের দৃঢ়তাই চরম শক্তি। আমাদের স্বনির্ভরতা।”

প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণদানকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ন্যায়সংগত কথা বলতে কাউকে পরোয়া করেননি। এমনকি সেসময় কয়েক সপ্তাহ আগে দেয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হেনরি কিসিঞ্জারের একটি বক্রোক্তিরও জবাব দেন খোদ সেদেশে বসেই।

ড. কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘Bangladesh is an international basket case।’ ওই সফরে ওয়াশিংটনে বসেই কিসিঞ্জারের বাজে বক্তব্যের জবাব দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এক সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘কেউ কেউ বাংলাদেশকে ‘international basket case’ বলে উপহাস করেন। কিন্তু বাংলাদেশ basket case নয়। দুশ বছর ধরে বাংলাদেশের সম্পদ লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশের সম্পদেই শ্রীবৃদ্ধি করা হয়েছে লন্ডন, ডান্ডি, মাঞ্চেস্টার, করাচী, ইসলামাবাদের। ... আজো আমাদের অফুরন্ত সম্পদ রয়েছে। একদিন আমরা দেখাবো বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।”

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়ে বঙ্গবন্ধু এক যুগান্তকারী ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন। সেই ভাষণ দেয়ার ৪৭তম বার্ষিকীতে ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এখনও তমসা!
বন্যায় শঙ্কা নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি
‘বৈষম্য বাড়ছে’ বলে দিলেই কি দায় শেষ?
জিয়ার মাজার: ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসছে 
শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চাই

শেয়ার করুন

বিশ্বসভায় বঙ্গবন্ধু, বাংলা-বাংলাদেশ

বিশ্বসভায় বঙ্গবন্ধু, বাংলা-বাংলাদেশ

বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে বাংলায় কাব্য রচনা করে নোবেল পুরস্কার জিতে বাঙালি জাতিকে বিশ্বে পরিচিত করালেন আর বঙ্গবন্ধু তা বিশ্বসভায় প্রতিষ্ঠা করলেন। বাঙালিকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং গৌরবের দিক থেকে সামনের কাতারে।

২১ ফেব্রুয়ারি, ৭ মার্চ ও ২৬ মার্চের মতোই ২৫ সেপ্টেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে আরেকটি অনন্য দিন। বুক চিতিয়ে গর্ব করার দিন। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিজে ভাষার অধিকারের জন্য লড়াই করেছেন, করেছেন কারাভোগ। ভাষার লড়াইয়ে যে অকাতরে প্রাণবিসর্জন দিয়েছিলেন বরকত, সালাম, রফিক, শফিক, জব্বারসহ আরও বঙ্গসন্তান, এই ২৫ সেপ্টেম্বরে সেই বাংলা ভাষা বঙ্গবন্ধু বিশ্বসভায় প্রতিষ্ঠা করেন।

বঙ্গবন্ধু কতভাবেই না আমাদের সম্মানিত করলেন, কতভাবেই না মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন। প্রতিদানে আমরা দিলাম কী? পরিবারের অন্য সদস্যসহ হত্যা। নির্মমতা। অকৃতজ্ঞ বাঙালি এভাবে আমাদের ছোট করল। এই অপমানের প্রতিশোধ জাতির পিতার কন্যার নেতৃত্বে আমরা নিয়েছি। এটাই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।

বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে বাংলায় কাব্য রচনা করে নোবেল পুরস্কার জিতে বাঙালি জাতিকে বিশ্বে পরিচিত করালেন আর বঙ্গবন্ধু তা বিশ্বসভায় প্রতিষ্ঠা করলেন। বাঙালিকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং গৌরবের দিক থেকে সামনের কাতারে।

বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি দেয়ার কথা ছিল বিজয়ের পর পর ১৯৭২-৭৩ সালে। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে কিছু শক্তি বাংলাদেশের জাতিসংঘে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বলে ১৯৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বরের আগে ভাষণটি দিতে পারেননি। কিন্তু বাঙালির মহাকালের ইতিহাসের মহানায়ককে যে ঠেকানো যায় না বিশ্ব বুঝল একটু দেরিতে।

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে বিশ্বশান্তি সমৃদ্ধি ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে যাপিত জীবনের কথা বারবার এসেছে। বঙ্গবন্ধু বলেছেন-

“স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সাথে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, আমাদের এই অঙ্গীকারের সাথে শহীদানের বিদেহী আত্মাও মিলিত হইবে।”

“বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম হইতেছে সার্বিক অর্থে শান্তি এবং ন্যায়ের সংগ্রাম আর সেই জন্যই জন্মলগ্ন হইতেই বাংলাদেশ বিশ্বের নিপীড়িত জনতার পার্শ্বে দাঁড়াইয়া আসিতেছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পরে এই ২৫ বৎসরের অভিজ্ঞতা হইতে দেখা যায় যে, এইসব নীতিমালার বাস্তবায়নে অব্যাহতভাবে কি তীব্র সংগ্রাম চালাইয়া যাইতে হইতেছে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার লক্ষ লক্ষ বীর যোদ্ধার চরম আত্মদানের মাধ্যমে শুধুমাত্র জাতিসংঘ সনদ স্বীকৃত আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার পুনরুদ্ধার সম্ভব।”

“আগ্রাসনের মাধ্যমে বে আইনিভাবে ভূখণ্ড দখল, জনগণের অধিকার হরণের জন্য সেনাবাহিনী ব্যবহার এবং জাতিগত বৈষম্য ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এখনো অব্যাহত রহিয়াছে। আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ এবং গিনিবিসাউ এই সংগ্রামে বিরাট বিজয় অর্জন করিয়াছে।”

“চূড়ান্ত বিজয়ে ইতিহাস যে জনগণ ও ন্যায়ের পক্ষেই যায়, এইসব বিজয় এই কথাই প্রমাণ করিয়াছে। কিন্তু বিশ্বের বহু অংশে এখনো অবিচার ও নিপীড়ন চলিতেছে। অবৈধ দখলকৃত ভূখণ্ড পুরাপুরি মুক্ত করার জন্য আমাদের আরব ভাইদের সংগ্রাম অব্যাহত রহিয়াছে এবং প্যালেস্টাইনি জনগণের বৈধ জাতীয় অধিকার এখনো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয় নাই। উপনিবেশ বিলোপ প্রক্রিয়ার যদিও অগ্রগতি হইয়াছে, কিন্তু এই প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছায় নাই, বিশেষ করিয়া আফ্রিকার ক্ষেত্রে এই সত্যটি স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। এই অঞ্চলের জিম্বাবুয়ে (দক্ষিণ রোডেশিয়া) এবং নামিবিয়ার জনগণ জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য দৃঢ়তার সাথে লড়াই করিয়া যাইতেছে। বর্ণবৈষম্যবাদ, যাহাকে মানবতার বিরোধী বলিয়া বার বার আখ্যায়িত করা হইয়াছে, তাহা এখানে আমাদের বিবেককে দংশন করা অব্যাহত রাখিয়াছে।”

মূলত এই ভাষণের পরই বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণ আরেকজন বিপ্লবী নেতাকে তাদের মাঝে পেয়ে গেলেন। অবশ্য ওই সময়টাতে ভারতের মহীয়সী রাষ্ট্রনেতা শ্রীমতি ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী, যুগোস্লাভিয়ার জোসেফ ব্রোজ টিটু, আল-জিরিয়ার হুয়ারী বুমেদিন, কিউবার ফিদেল কাস্ট্রো, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত, চিলির ড. আলেন্দে প্রমুখ বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ তৃতীয় বিশ্বকে জোটবদ্ধ করে বিশ্বের তাবৎ মুক্তিকামী মানুষের শত্রু সাম্রাজ্যবাদ বর্ণবৈসম্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে তুলেছিলেন।

বাংলাদেশের জাতি-রাষ্ট্র পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওই সময়টাতে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন তথা তৃতীয় বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের নেতা হয়ে উঠলেন। তার আগের বছর আলজিরিয়ায় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ রাষ্ট্রনেতাদের আসরেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন সবার নেতা। সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর উচ্চারণ ছিল:

“বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত- শোষক আর শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে।”

বঙ্গবন্ধুর এই অকুতোভয় উচ্চারণ সেদিনের শোষিত বঞ্চিত মানুষের বুকে সাহস জুগিয়েছিল। অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সাহস জুগিয়েছিল। দেশে দেশে সেনাবাহিনী কিংবা ধর্ম ও বর্ণবৈষম্যবাদ ব্যবহার করে যারা বিশ্বের মোড়লিপনা চালাচ্ছিল তারাও শঙ্কিত হয়ে উঠল। দেশে দেশে মুক্তিকামী মানুষের বিজয়ের রথ চলতে শুরু করল।

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক, যিনি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ কিন্তু প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই। সিদ্ধান্তটি তিনি আগেই নিয়েছিলেন।

ভাষণে তার বিশ্বচিন্তা ও বৈশ্বিক নেতৃত্বগুল ফুটে ওঠার প্রমাণ মেলে এখানে-

“বিশ্ব খ্যাদ্য সংস্থার বিবেচনায় শুধু বাঁচিয়া থাকার জন্য যে সর্বনিম্ন সামগ্রীর প্রয়োজন, তাহার চাইতেও কম ভোগ করিয়াছে যেসব মানুষ, তাহারা আজ অনাহারের মুখে পতিত হইয়াছে। দরিদ্র দেশগুলির ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার। শিল্পোন্নত দেশগুলির রপ্তানি পণ্য, খাদ্যসামগ্রীর ক্রমবর্ধমান মূল্যের দরুন তাহা আজ ক্রমশ তাহাদের নাগালের বাহিরে চলিয়া যাইতেছে। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের জন্য তাহাদের প্রচেষ্টাও প্রয়োজনীয় উৎপাদনের সহায়ক সামগ্রীর ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি ও দুষ্প্রাপ্যতার ফলে প্রচণ্ডভাবে বিঘ্নিত হইতেছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির ফলে ইতিমধ্যেই দারিদ্র্য ও ব্যাপক বেকারির নিষ্পেষণে পতিত দেশগুলি তাহাদের পাঁচ হইতে ছয় শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধির হার সংবলিত পরিমিত উন্নয়ন পরিকল্পনা ছাঁটাই করার ভয়ানক আশঙ্কার হুমকিতে পতিত হইয়াছে। এই মুদ্রাস্ফীতির ফলে কেবলমাত্র উন্নয়ন প্রকল্পের খরচই বহুগুণ বাড়িয়া যায় নাই, উপরন্তু তাহাদের নিজস্ব সম্পদ কাজে লাগাইবার জন্য তাহাদের সামর্থ্যও প্রতিকূলভাবে কমিয়া গিয়াছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিশ্বের জাতিসমূহ ঐক্যবদ্ধভাবে কার্যক্রম গ্রহণ করিতে না পারিলে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আরও চরমে উঠিবে, ইতিহাসে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়। মানুষের সেই দুঃখ-দুর্দশার আর কোনো পূর্ববর্তী নজির পাওয়া যাইবে না। ইহার পাশাপাশি অবশ্য থাকিবে গুটিকয়েক লোকের অপ্রত্যাশিত সুখ-সমৃদ্ধি। শুধুমাত্র মানবিক সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়িয়া তোলা এবং পারস্পরিক স্বনির্ভরতার স্বীকৃতি এই পরিস্থিতির যুক্তিযুক্ত সমাধান আনিতে পারে এবং এই মহাবিপর্যয় পরিহার করিবার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক।

একটি যথার্থ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়িয়া তোলার পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘকে এর আগে কোথাও এই ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করিতে হয় নাই। এই ধরনের ব্যবস্থায় শুধুমাত্র নিজ নিজ প্রাকৃতিক সম্পদের উপর প্রত্যেক রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকারকে নিশ্চিত করাই নয়, ইহাতে একটি স্থায়ী এবং যথার্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বিশ্বের দেশগুলির সাধারণ স্বার্থের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক কাঠামো প্রণয়নেরও ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। এই মুহূর্তে আমরা প্রত্যেক মানুষের জন্য মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক ঘোষণায় স্বীকৃত মুক্তভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সুবিধা ভোগের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক দায়িত্বের কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে পুনরুল্লেখ করিতেছি। আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুযায়ী, প্রত্যেকটি মানুষের স্বাস্থ্য এবং পরিবারের কল্যাণের জন্য পর্যাপ্ত জীবনযাত্রার ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে হইবে। আমরা এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন যে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট শুধুমাত্র শান্তি এবং আন্তর্জাতিক সমঝোতার পরিবেশেই সমাধান করা সম্ভব।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বর্তমান অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করার জরুরি ব্যবস্থা নিতে হইবে। ইহাতে শুধুমাত্র এই ধরনের পরিবেশই সৃষ্টি হইবে না, ইহাতে অস্ত্রসজ্জার জন্য যে বিপুল সম্পদ অপচয় হইতেছে, তাহাও মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত করা যাইবে। বাংলাদেশ প্রথম হইতেই শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান ও সকলের প্রতি বন্ধুত্ব— এই নীতিমালার উপর ভিত্তি করিয়া জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করিয়াছে। কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশই কষ্টলব্ধ জাতীয় স্বাধীনতার ফল ভোগ করিতে আমাদেরকে সক্ষম করিয়া তুলিবে এবং সক্ষম করিয়া তুলিবে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা ও বেকারির বিরুদ্ধে লড়াই করিবার জন্য আমাদের সকল শক্তি ও সম্পদকে সমাবেশ ও কেন্দ্রীভূত করিতে। এই ধারণা হইতে জন্ম নিয়াছে শান্তির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি। এই জন্য সমঝোতার অগ্রগতি, উত্তেজনা প্রশমন, অস্ত্র সীমিতকরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান নীতির সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা— বিশ্বের যেকোনো অংশে যে কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হউক না কেন, আমরা তাহাকে স্বাগত জানাই। এই নীতির প্রতি অবিচল থাকিয়া আমরা ভারত মহাসাগরীয় এলাকা সম্পর্কে শান্তি এলাকার ধারণা, যাহা এই পরিষদ অনুমোদন করিয়াছে, তাহাকে সমর্থন করি।”

সম্প্রতি নিউইয়র্ক স্টেটের রাজধানী আলবেনিতে অনুষ্ঠিত সিনেট অধিবেশনে ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ বিলটি উত্থাপিত হলে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করা হয় এবং তারিখটিকে স্টেট ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

নিউইর্য়ক স্টেট সিনেটের ওয়েবসাইটে দেয়া রেজ্যুলেশনে এই সংবাদ দিয়ে উল্লেখ করা হয় যে, যেহেতু ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন সেজন্য এই দিনটি নিউইর্য়কের বাংলাদেশি অভিবাসীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের এইদিনে মহাকালের ইতিহাসের মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি।

লেখক: সংসদ সদস্য, চাঁদপুর-৪

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এখনও তমসা!
বন্যায় শঙ্কা নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি
‘বৈষম্য বাড়ছে’ বলে দিলেই কি দায় শেষ?
জিয়ার মাজার: ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসছে 
শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চাই

শেয়ার করুন

‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে’

‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে’

বেরিয়ে আসছে ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ব্যবসায়িক প্রতারণার ভয়াবহ নজির। সুদ খাওয়া হারাম তাই সুদ নয়, মুনাফার অংশ দেয়া হবে এবং পরিমাণে তা সাধারণ ব্যাংকের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু মুনাফা পাবে তাই নয়, বেহেস্তে যাওয়াও সম্ভব হবে এখানে টাকা বিনিয়োগ করলে। এই কথা বলে বিশ্বাস করানোর জন্য ওয়াজ এবং ধর্মীয় সভায় পরিচিত মাওলানাদের নিয়ে গিয়েছে তারা। তাতে কেউ কেউ তাদের জমি বিক্রি করে, পেনশনের টাকা থেকে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে।

সহজে প্রচুর টাকার মালিক হওয়ার ফাঁদে পড়ে হাঁসফাঁস করছে অনেক মানুষ। এখন টাকা ফেরত পেতে মিছিল প্রতিবাদ করছে। পুলিশের লাঠিপেটা খাচ্ছে। এসব দেখে মনে হয় সেই বিখ্যাত গানের কথা! আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠে সেই অবিস্মরণীয় গান- ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে।’ সেই গানের এক জায়গায় আছে, ‘ফান্দ পাতাইছে ফান্দুয়া রে পুঁটি মাছ দিয়া।’ পুঁটি মাছ খাওয়ার লোভে বগার জীবনটাই চলে গেল।

ফাঁদে আঁটকে পড়া বগাকে দেখে বগি কাঁদছে। এটা তো শুধু গান নয় এ যেন জীবন থেকে পাওয়া জ্ঞান। এদেশের মানুষের ফাঁদে পড়ার বেদনাময় অভিজ্ঞতা হয়েছে যে কতবার। কিন্তু শিক্ষা পরিপূর্ণ হচ্ছে না বা চমকে প্রভাবিত হচ্ছে দ্রুত, তাই একের পর এক ফাঁদে ধরা পড়ছে বার বার।

পত্রিকার পাতা ভর্তি হয়ে আছে এরকম নানা প্রতারণার গল্পে। প্রতারণার ফাঁদে ফতুর হয়ে যাচ্ছে ভাগ্য ফেরানো বা সস্তায় জিনিস পাওয়ার প্রত্যাশায় টাকা বিনিয়োগ করা মানুষ। এমএলএম ও ই-কমার্সের নামে ৪০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে রিপোর্ট হয়েছে পত্রিকায়।

এদের মধ্যে ডেসটিনি ও যুবক নিয়েছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা, ইউনিপেটুইউ ৬ হাজার কোটি টাকা, এহসান গ্রুপ ১৭ হাজার কোটি, ই-অরেঞ্জ ১ হাজার ১০০ কোটি ও আইসিএল ৩ হাজার কোটি টাকা জনগণের কাছ থেকে নিয়েছে বলে প্রকাশিত। এসব ঘটনায় অতীতে অনেক মামলা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মালিক গ্রেপ্তার হয়েছে কিন্তু টাকা ফিরে পায়নি গ্রাহক। দ্রুত লাভের আশায় টাকা দিয়ে লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকা ফিরে না পেয়ে লাখ লাখ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই পথে বসেছে। আর বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে কিছু মানুষের।

প্রতারিত হওয়ার কত পথ যে খোলা আছে দেশবাসীর জন্য, তা হিসাব করে বলা মুশকিল। গণমানুষের সবচেয়ে নির্ভর করার জায়গা বা শেষ আশ্রয় হলো রাজনীতি। রাজনীতির মাধ্যমেই তো নির্ধারিত হয় একটা রাষ্ট্র বা সমাজ চলবে কীভাবে। রাজনীতিবিদদের আহবানে মানুষ সাড়া দেয়, সংগ্রামে নামে, জীবন দেয় একটা নতুন সম্ভাবনা বা সৃষ্টির আশায়। কিন্তু যখন সেই রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয় তখন হতাশার সীমা থাকে না।

যদিও রাজনীতিতে প্রতারিত হলে তার ফল সুদূরপ্রসারী কিন্তু সাময়িক বা তাৎক্ষণিক প্রভাব সাধারণভাবে বোঝা যায় না। আবার যখন বুঝতে পারা যায় তখন করার তেমন কিছু থাকে না। তখন সেই আপ্তবাক্য বলতে থাকেন সবাই, রাজনীতি মানেই ঠকানো ভদ্র ভাষায় যাকে বলা হয় কৌশল। এই কৌশল চলছে অর্থনীতিতে সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ এবং হারিয়ে ফেলছে মানুষের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস। প্রতারকরা তা বুঝতে পারে ভালোভাবেই। তাই নতুন কৌশলে নতুন ফাঁদ পাতে।

হুন্ডি কাজলের কথা মানুষ প্রায় ভুলেই গেছে। হাজার হাজার মানুষকে সর্বস্বান্ত করে প্রচার মাধ্যমে আলোড়ন তোলা সেই কাজলের কী হয়েছে? মানুষ কি তার টাকা ফেরত পেয়েছে? কিংবা নিকট অতীতে যুবক, ডেসটিনি, ইউনিপেটুইউ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান যে হাজার হাজার কোটি টাকা মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছিল, প্রায় দুই দশক তো পার হয়ে গেল, টাকা কি উদ্ধার হলো?

এসব প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় কীর্তি ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যরা যখন ভুলেই গিয়েছে, তখন দেশে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন ধরনের প্রতারণা শুরু হয়। ই-কমার্স, অনলাইন মার্কেটিং ইত্যাদি ডিজিটাল ভাষা আর ভার্চুয়াল পদ্ধতি ব্যবহার করে নতুন কায়দায় প্রতারণার ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত।

কিছুদিন ধরে ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ, আবেদন-নিবেদনের ফলে একের পর এক আলামত উদ্‌ঘাটিত হতে শুরু করেছে। পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত সেসব খবরের কিছু যেমন : ‘ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মালিকপক্ষ প্রতারণামূলকভাবে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।’ ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অন্তত ৫৮৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ধামাকা শপিং নামের একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।’ দীর্ঘদিনের প্রতারণার পুঞ্জীভূত প্রকাশ ঘটছে প্রতিদিন।

রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়েই নির্দিষ্ট পণ্য কিনলে ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত অস্বাভাবিক ‘ক্যাশব্যাক’ অফার দিয়ে ব্যবসা করছিল ডিজিটাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি। বিজ্ঞাপন দিয়েছে সর্বত্র। আড়ালে থাকেনি ব্যবসা কিন্তু আড়ালে রেখেছিল তার ব্যবসাকৌশল।

অবিশ্বাস্য অফার, সস্তায় জিনিস কিনে লাভবান হওয়ার লোভে আকৃষ্ট হয়ে কত গ্রাহক যে পঙ্গপালের মতো ছুটেছে আর তাদের কী পরিমাণ টাকা আটকে ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটি, তার কোনো সঠিক হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। এ প্রতারণা ব্যবসায় নতুনমাত্রা যুক্ত হয়েছে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে। শরিয়াহভিত্তিক সুদমুক্ত বিনিয়োগের কথা বলে এহসান গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১০ হাজার ধর্মপ্রাণ গ্রাহকের কাছ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন মূল হোতা।

বেরিয়ে আসছে ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে ব্যবসায়িক প্রতারণার ভয়াবহ নজির। সুদ খাওয়া হারাম তাই সুদ নয়, মুনাফার অংশ দেয়া হবে এবং পরিমাণে তা সাধারণ ব্যাংকের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু মুনাফা পাবে তাই নয়, বেহেস্তে যাওয়াও সম্ভব হবে এখানে টাকা বিনিয়োগ করলে। এই কথা বলে বিশ্বাস করানোর জন্য ওয়াজ এবং ধর্মীয় সভায় পরিচিত মাওলানাদের নিয়ে গিয়েছে তারা। তাতে কেউ কেউ তাদের জমি বিক্রি করে, পেনশনের টাকা থেকে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে।

একটি দুটি নয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ১৪টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জনগণের অর্থ আত্মসাতের পর বিদেশে পাচারের অভিযোগ পেয়েছে।

দুই লাখ টাকা জমা রাখলে মাসে ১৬ কিংবা ১৮ হাজার টাকা মুনাফা দেয়ার অবিশ্বাস্য এসব অফার কীভাবে দেয়া হয়, একটু মাথা খাটালেই সেটা ধরে ফেলা যায়। দুই তিন মাস ১৫০–২০০ শতাংশ হারে মুনাফা দিয়ে পুরো টাকাটাই গায়েব করে দিলে টাকা দিতে সমস্যা কী? আর সদস্য বা গ্রাহকদের ওপর নতুন সদস্য জোগাড়ের ভার থাকলে নতুন সদস্যদের জমা করা টাকা থেকেই পুরোনোদের ‘কমিশন’ অথবা ‘উচ্চহারে’ মুনাফা দেয়া সম্ভব। খুব হিসেব করে চালাতেন তারা ব্যবসা।

নতুন সদস্যের আগমন বন্ধ হয়ে গেলে, অর্থাৎ ক্যাশ ফ্লো থেমে গেলেই সবকিছু গুটিয়ে উধাও হয়ে যান উদ্যোক্তারা। যেন ভোজবাজির মতো হাওয়া হয়ে যায়। পড়ে থাকে প্রতারিত গ্রাহক, যারা নিজের সম্বল বা ঋণ করে লাভের আশায় লোভের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন।

একই ব্যাপার ঘটেছে অবিশ্বাস্য ছাড়ে পণ্য বিক্রির জন্য আগাম নেয়া টাকার ক্ষেত্রেও। নতুন গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুরোনোদের উচ্চহারের ক্যাশব্যাক এবং অস্বাভাবিক মূল্যছাড় দেয়া হয়। সুবিধা পেয়ে তারা আবার ব্যাপক প্রচার করে ফলে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবরা আগ্রহী হয়ে ওঠে।

এভাবেই চলে প্রতারণার নতুন বিস্তার। কিন্তু যদি নতুন গ্রাহকের সংখ্যা না বাড়ে কিংবা পণ্য উৎপাদক বাকি দিতে রাজি না হয়, তাহলে তো ঘোষিত দামে পণ্যটা আর দেয়া সম্ভব হয় না। এরকম ঘটনা ঘটেছে ইভ্যালি কিংবা ই-অরেঞ্জের বেলায়। সাধারণ অর্থনীতি যারা বোঝেন তারা তো জানেন যে, এ ধরনের প্রকল্প একসময় ধসে পড়তে বাধ্য। কারণ, এসব কোম্পানির প্রতিনিধির সংখ্যা যত বাড়তে থাকবে, বাজার তো তত বড় হবে না। ফলে কে আর কাকে গ্রাহক বানাবে?

কেন এসব প্রতিষ্ঠান মানুষের কাছ থেকে টাকা নিতে পারে? মানুষ না হয় লোভে পড়ে ভুল করছে, রাষ্ট্রের কি কোনো দায় নেই? দিনের পর দিন এই অর্থনৈতিক প্রতারণা চলছে কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারি থাকবে না কেন? অবিশ্বাস্য অফারের বিজ্ঞাপন পত্রিকার পাতায় ছাপা হচ্ছে, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ এদের পক্ষে কথা বলছেন, এসব দেখে সাধারণ মানুষ তো প্রভাবিত হতেই পারেন। প্রতারণার কবল থেকে মানুষকে বাঁচাতে রাষ্ট্র তার দায় পালন করবে কি?

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এখনও তমসা!
বন্যায় শঙ্কা নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি
‘বৈষম্য বাড়ছে’ বলে দিলেই কি দায় শেষ?
জিয়ার মাজার: ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসছে 
শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চাই

শেয়ার করুন

প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি পুরস্কারপ্রাপ্তি: অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি পুরস্কারপ্রাপ্তি: অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

বিশ্বে বাংলাদেশের অর্জন ও সুনাম ক্ষুণ্ন করে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশে একটি মহল ক্রমাগত ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। এ রকম বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করে সফলভাবে দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া বিশ্বে আর কোনো নেতার নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোভিড-১৯ মহামারি থেকে জীবন বাঁচাতে মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছেন। মার্কিন প্রভাবশালী ফোর্বস ম্যাগাজিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেছে। এর অনুসরণ করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসা করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে এবং করোনা পরিচালনা ও টিকা কার্যক্রমের জন্য তার ভূয়সী প্রশংসা করে এবং এই খাতে ৯৪০ মিলিয়ন আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়।

টানা এক যুগেরও বেশি সময় দেশসেবার সুযোগ পেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। তার স্বীকৃতি জাতিসংঘের এই এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন অনেক স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন। এর আগে কমনওয়েলথভুক্ত দেশের সরকারপ্রধানদের মধ্যে অন্যতম সফল এবং অনুকরণীয় তিনজন নারী সরকারপ্রধানের একজন নির্বাচিত হন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) দারিদ্র্য দূরীকরণ, পৃথিবীর সুরক্ষা এবং সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বজনীন আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সঠিক পথে অগ্রসরের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে নবম বার্ষিক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে (ভার্চুয়াল) এই পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্জনের জন্য এসডিএসএনসহ কয়েকটি সংস্থা প্রধানমন্ত্রীকে পুরস্কৃত করেছে। তারা বাংলাদেশের অবস্থা বিশ্লেষণ করেছে এবং মূল্যায়ন করে দেখেছে- বাংলাদেশ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করছে। এ পুরস্কার বাংলাদেশের জনগণকে উৎসর্গ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন কৌশলবিদ অধ্যাপক জেফ্রি ডি স্যাকসের নেতৃত্বে জাতিসংঘ মহাসচিবের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১২ সালে এসডিএসএন প্রতিষ্ঠা করা হয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য বাস্তবভিত্তিক সমাধান জোরদারে বিশ্বের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানোই এ প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক শেখ হাসিনাকে ‘জুয়েল ইন দি ক্রাউন অব দি ডে’ হিসেবে তুলে ধরেন এবং বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনাভাইরাস চলাকালেও এসডিজি প্রচারণা কার্যক্রম চালাতে তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

এ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এ পুরস্কার হচ্ছে এসডিজি’র লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে জোরালো দায়িত্ব পালনের একটি প্রমাণপত্র। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের (ইউএনজিএ) ফাঁকে কয়েকটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।

এ অনুষ্ঠানে স্যাকস বলেন, এ পুরস্কার হচ্ছে এসডিজির লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে জোরালো দায়িত্ব পালনের একটি প্রমাণপত্র। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ রেখে যাওয়ার জন্য একটি ‘সার্বিক বৈশ্বিক’ উদ্যোগের মাধ্যমে এই গ্রহের জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আশু সাহসী ও জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নিউইয়র্কে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা-বিষয়ক নেতৃবৃন্দের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এ আহ্বান জানান। বৈঠকে এ ব্যাপারে তিনি ছয়টি সুপারিশ পেশ করেছেন।

শেখ হাসিনা তার প্রস্তাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে প্যারিস চুক্তির কঠোর প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু তহবিল আদায়ের ওপরও জোর দেন। এ তহবিলের ৫০ শতাংশ বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতার জন্য ব্যবহার করা হবে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নতুন আর্থিক প্রক্রিয়া এবং সবুজ প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লোকসান এবং ক্ষয়ক্ষতির সমস্যা আর সেই সঙ্গে বৃহৎ আকারের জনসংখ্যার স্থানচ্যুতি মোকাবিলার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, মহামারি ও দুর্যোগের দ্বৈত বিপদ মোকাবিলায় বিশেষ করে জলবায়ু-সৃষ্ট দুর্যোগের বর্ধিত পৌনঃপুনিকতা আক্রান্ত সিভিএফ দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রয়োজন। শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে তাদের অভিযোজন ও প্রশমন প্রচেষ্টায় সহায়তা করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো বৈশ্বিক গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনে সবচেয়ে কম অবদান রাখে, কিন্তু তারাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক আইপিসিসি রিপোর্টের উল্লেখ করে বলেন, এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। কেননা বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে গেলে তারা স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তার সরকারের ভূমিকা সম্পর্কে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক পথিকৃৎ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সম্প্রতি ইউএনএফসিসিসি’তে বাংলাদেশ একটি উচ্চাভিলাষী ও হালনাগাদ এনডিসি জমা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার সবুজ প্রবৃদ্ধি, স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ গ্রহণ করেছে। তিনি এটা স্পষ্ট করেন যে, সরকার জলবায়ু ঝুঁকি থেকে জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা এবং তা থেকে জলবায়ু সমৃদ্ধির পথে যাত্রা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (সিভিএফ) এবং ভি২০-এর চেয়ার হিসেবে তার সরকারের মূল লক্ষ্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ঢাকাস্থ জিসিএ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সর্বোত্তম অনুশীলন এবং অভিযোজন জ্ঞান শেয়ার করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি উল্লেখ করেন যে, “স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত এবং ধর্মনিরপেক্ষ এক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করব। তিনি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে বলেন, কারণ কোভিড-১৯ মহামারি সত্ত্বেও আমাদের জিডিপি ৫.২৪% উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। যখন অনেক উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশ কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নেতিবাচক অবস্থার সঙ্গে লড়াই করছে”। তিনি বলেন, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৪৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং দেশের রেমিট্যান্স-প্রবাহ, কৃষি উৎপাদন এবং রপ্তানিতে পরিবর্তন এসেছে।

কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে এর মোকাবিলায় দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার গতি বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগে একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়। উন্নততর কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৪,০০০ নতুন চিকিৎসক, ৫,০৫৪ জন নার্স, ১,২০০ হেলথ টেকনোলজিস্ট ১,৬৫০ হেলথ টেকনিশিয়ান, ১৫০ কার্ডিওগ্রাফার এবং এক হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেয়া হয়।

কোভিড-১৯ সংক্রমণের তথ্য এবং পরিষেবা সরবরাহ করতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে হটলাইনে ৪,২১৮ চিকিৎসক যুক্ত করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৪৮ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠন করা হয় এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের নেতৃত্বে একটি ১৮ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়। প্রায় ১১০০ আইসিইউ বেড ছাড়াও প্রায় ১২০০০ সাধারণ বেডসহ দেশে কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ করা হয়। ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতাল, যা কোভিড-১৯ সহযোগিতা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রস আধনাম গ্যাবরিয়াস কভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা করা এবং একই সঙ্গে অর্থনীতিকে সচল রাখা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, যদিও কোভিড-১৯ অভিযোজন এবং অর্থনৈতিক বিকাশকে টেকসই করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

এমনকি সারা বিশ্ব আজ দেড় বছরের অধিক সময় ধরে করোনা অতিমারিতে বিপর্যস্ত হয়ে আছে। এই মহামারি সামাল দিতে গিয়ে বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত সব দেশের সরকারপ্রধানেরই দিশাহারা অবস্থা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথেষ্ট সফলতার সঙ্গে কোভিড-১৯ মহামারি সামলে চলেছেন। বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞই এই করোনা মহামারি ম্যানেজ করার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আমাদের দেশকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে থাকেন।

এই প্রশংসনীয় কাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমসাময়িক অন্য যেকোনো বিশ্বনেতার চেয়ে অনন্য এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং তিনি বিশ্বের ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের অন্যতম প্রধান নেতা। এমনকি কোভিড-১৯ চলাকালেও পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল প্রকল্প এবং অন্যান্য মেগা প্রকল্পগুলো কার্যকরভবাবে এগিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও মনোবল ও বিচক্ষণতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ কোভিড-১৯ সংকট কাটিয়ে উঠে এবং অদম্য উন্নয়নে আরও এগিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী জনগণকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তিনি জনগণের টিকার ব্যবস্থা করবেন ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ পর্যন্ত প্রথম ডোজ পেয়েছেন ৩ কোটি ৮৫ লাখ মানুষ এবং ১ম ও ২য় উভয় ডোজ সম্পন্ন করেছেন ১ কোটি ৫৪ লাখ মানুষ। ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালে শেখ হাসিনা তার সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনায় দেশের মানুষের জন্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

উন্নত অনেক দেশ যখন টিকা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি, তখন প্রধানমন্ত্রীর অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এই ভ্যাকসিন বাংলাদেশে আসে; এটি একটি অকল্পনীয় সাফল্য। বাংলাদেশ সরকার কোভিড-১৯ প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করছে এবং এ পর্যন্ত কোভিড-১৯ ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে। একই সঙ্গে, অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নতিসহ এমন সব যুগান্তকারী অর্জন সাধিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। জাতিসংঘের এই পুরস্কারটি এমন একটি সময় প্রদান করা হলো, যা সময়ের এবং বিরূপ বিশ্বপরিস্থিতির বিবেচনায় এই পুরস্কার অতীতের যেকোনো সময়ের পুরস্কার ও স্বীকৃতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। একটু বাড়তি আনন্দ যোগ হতে পারে এ জন্য যে, জাতীয়ভাবে মুজিব শতবর্ষ পলনকালে এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার জন্মমাসে (২৮ সেপ্টেম্বর জন্মদিন) এ পুরস্কার পাওয়া গেল।

বাংলাদেশের অভূতপূর্ব আর্থসামাজিক উন্নতিতে ইতোমধ্যে অনেকের গাত্রদাহ শুরু হয়েছে এবং দেশ-বিদেশে বসে যারা প্রিয় মাতৃভূমির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের লিপ্ত রয়েছে তাদের জন্য উপযুক্ত জবাব হিসেবে দেখা যেতে পারে।

বিশ্বে বাংলাদেশের অর্জন ও সুনাম ক্ষুণ্ন করে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশে একটি মহল ক্রমাগত ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। এ রকম বৈরী পরিবেশ মোকাবিলা করে সফলভাবে দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া বিশ্বে আর কোনো নেতার নেই। প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতা এবং সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে সফল নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের জাতিসংঘ এসডিজি অপ্রগতি পুরস্কার আরেক অসাধারণ এক স্বীকৃতি।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় এখনও তমসা!
বন্যায় শঙ্কা নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি
‘বৈষম্য বাড়ছে’ বলে দিলেই কি দায় শেষ?
জিয়ার মাজার: ইতিহাসের সত্য বেরিয়ে আসছে 
শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চাই

শেয়ার করুন