লক্ষ্য হোক আফ্রিকা

লক্ষ্য হোক আফ্রিকা

সিঙ্গাপুরের মতো এশিয়ার সব থেকে ধনী দেশ চায়নাও আফ্রিকার অনেক দেশে তাদের বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাড়িয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। চায়না তাদের বেশি বিনিয়োগ করছে রাস্তা, ব্রিজ এবং পোর্ট তৈরিতে। তবে তারা কৃষিতেও বিনিয়োগ করছে। ২০১৯-এর হিসাব অনুযায়ী দেখা যায়, চায়না বিদেশে কৃষিতে যে বিনিয়োগ করে, ওই মোট বিনিয়োগের ১২% তারা আফ্রিকার দেশগুলোতে করছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি আফ্রিকার সুদান ও দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করেছেন। এই অতিমারিকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আফ্রিকার এই দুটি দেশ সফর নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তিনি যে আফ্রিকার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন, এ দেশের পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য বা সর্বোপরি অর্থনীতির জন্য তা একটা ভালো দৃষ্টিভঙ্গি। আফ্রিকার প্রতি বাংলাদেশের আরও আগ্রহী হওয়া উচিত, এ কথা নানান স্টাডি ফোরামে দীর্ঘদিন থেকে বলা হচ্ছে। সব থেকে আশ্চর্য লাগে, বাংলাদেশ ও আফ্রিকার মানুষের গায়ের রং, আচার-আচরণ বা পারিবারিক, সামাজিক কাঠামো ও রীতিনীতি একই রকম। তার পরেও বাংলাদেশে ইউরোপীয় যতগুলো দেশের দূতাবাস আছে, আফ্রিকার ততগুলো নেই; বা ওইভাবে অন্য যোগাযোগও বাড়ানো হচ্ছে না আফ্রিকার সঙ্গে।

অথচ অন্যান্য এশীয় দেশ ইতোমধ্যে অনেক যোগাযোগ বাড়িয়েছে আফ্রিকার সঙ্গে। যেমন এ সপ্তাহেই এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশ সিঙ্গাপুর আফ্রিকায় তাদের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য আরও বাড়ানোর জন্য চুক্তি করেছে। সিঙ্গাপুর আফ্রিকা মহাদেশের ৫৪টি দেশের মধ্যে ৫০টিতে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য করছে। এ দেশটি মূলত আফ্রিকার দেশগুলোতে কৃষি, সাধারণ শিল্প, কৃষি-শিল্প ও ব্যবসা, সাধারণ ব্যবসায় এবং তেল ও গ্যাসে বিনিয়োগ করছে।

সিঙ্গাপুরের মতো এশিয়ার সব থেকে ধনী দেশ চায়নাও আফ্রিকার অনেক দেশে তাদের বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাড়িয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। চায়না তাদের বেশি বিনিয়োগ করছে রাস্তা, ব্রিজ এবং পোর্ট তৈরিতে। তবে তারা কৃষিতেও বিনিয়োগ করছে। ২০১৯-এর হিসাব অনুযায়ী দেখা যায়, চায়না বিদেশে কৃষিতে যে বিনিয়োগ করে, ওই মোট বিনিয়োগের ১২% তারা আফ্রিকার দেশগুলোতে করছে।

চায়না ও সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য হলো চায়নার অধিকাংশ বিনিয়োগ সরকারি, অপরদিকে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ সবই প্রাইভেট সেক্টরের। প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগ হওয়াতে ওই বিনিয়োগ অনেক বেশি নিরাপদ বলে মনে করছে আফ্রিকার অনেক বিজনেস অ্যানালিস্টরা।

কারণ, চায়নার বিনিয়োগ নিয়ে ইতোমধ্যে জমি গ্রাস করা ও ঋণের ফাঁদে ফেলার অভিযোগসংক্রান্ত বেশ কিছু রিপোর্ট বিভিন্ন মিডিয়া প্রকাশ করেছে। যদিও জন হফকিনস ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, রিপোর্টগুলো চায়নার আগ্রাসন সম্পর্কে বেশ বাড়িয়ে বলেছে। রিপোর্টগুলো যেখানে ৬ লাখ একর জমি গ্রাসের কথা বলছে, এটা ২ লাখ একরের কিছু বেশি হবে। অপরদিকে কেনিয়াকে যে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে চায়না, তা শোধ করতে পারছে না দেশটি। আর এ সুযোগে কেনিয়ার রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতিতে আরও প্রভাব বাড়িয়েছে চায়না। তারা সেখানে কৃষির থেকে এখন এনার্জি ও ট্রান্সপোর্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে বেশি নজর দিয়েছে। সেখানে নিজস্ব কমার্শিয়াল ব্যাংক স্থাপন করে চায়নিজ ফার্মগুলোকে ঋণ দিচ্ছে।

চায়নার এই রাস্তা, পোর্ট ব্রিজের অবকাঠামো গড়ে তোলাকে দুভাবে দেখা হচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছে, এর ফলে আফ্রিকার বাণিজ্য বাড়বে। সমগ্র আফ্রিকার ৭০ ভাগ মানুষ যেখানে কৃষিকাজ করে, তাদের কৃষিপণ্য সরবরাহে এই রাস্তা ও পোর্ট সহায়তা করবে। তাতে কৃষিপণ্যের জন্য অনেক বেশি সুবিধা হবে। তবে আফ্রিকার বাণিজ্য ও ভবিষ্যৎ গবেষণার অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করছে, এই অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্য শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। চায়না এ কাজ তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই করছে।

এশীয় দেশ সিঙ্গাপুরের মতো ভারতও আফ্রিকাতে তাদের নানা ব্যবসার সঙ্গে কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। সেগুলো করছে তাদের প্রাইভেট কোম্পানিগুলো। ভারতের সঙ্গে আফ্রিকার অনেক দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অতীত থেকেই চলমান। কিছু শুরু হয়েছে ব্রিটিশ-ভারত আমল থেকে আর কিছু তারও আগে থেকে। যে কারণে আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে অনেক ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেখানে বাস করছে।

২০১০ সালের একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, ভারতের ৮০টি কোম্পানি আফ্রিকায়। পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়া, কেনিয়া, মাদাগাস্কার, সেনেগাল ও মোজাম্বিকে কৃষিতে ১.৫ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ অর্থনৈতিক পলিসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, আফ্রিকার কৃষিতে ভারতের বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আরও অনেক বেড়েছে।

তারা আফ্রিকায় অনেক জমিও কিনেছে। মূলত আফ্রিকায় ৮০৭ মিলিয়ন হেক্টর চাষযোগ্য জমির তিন মিলিয়ন হেক্টরের মতো এখন চাষাবাদ হচ্ছে। ভারত তাই কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ ছাড়াও সেখানকার কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। আর এ কারণে ভারত সরকার আফ্রিকায় ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্টের আওতায় তাদের দেশের বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগ করতে সহায়তা করছে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের হিসাবমতে, ২০৩০-এর মধ্যে আফ্রিকায় যে খাদ্য উৎপাদন হবে তার মূল্য দাঁড়াবে এক ট্রিলিয়ন ডলার। যা ২০৫০ সালের মধ্যে হওয়ার কথা সেই লক্ষ্যে আফ্রিকার দেশগুলো ২০৩০-এর মধ্যে পৌঁছানোর পথে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক মনে করে, আফ্রিকার কৃষি উৎপাদন ও কৃষি-শিল্পে ছোট আকারে বিনিয়োগ যথেষ্ট লাভজনক। যার ফলে আফ্রিকা তাদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে আগামী ২০৬৩-তে পৌঁছে যাবে। আর এ লক্ষ্যে কাজ করার জন্য আফ্রিকার অনেক দেশে ভারতসহ অনান্য দেশ তিন দেশীয় পার্টনারশিপে কাজ করছে। তারা ইউরোপ ও আমেরিকার ফান্ড প্রোগ্রামগুলো থেকে সহজশর্তে ঋণ নিচ্ছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্প্রতি এই আফ্রিকার দুটি দেশ সফরের পরে তাই স্বাভাবিকই এ বিষয়টা সামনে আসে, বাংলাদেশ কেন আফ্রিকার কৃষিতে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের অন্যান্য সুযোগ নেবে না? কারণ এটা তো সত্য, পরবর্তী পৃথিবীর অর্থনীতির বড় অংশ যেমন এশিয়ার হাতে থাকবে, তেমনি আফ্রিকাও এই শতকের মধ্যভাগে গিয়ে অর্থনীতির একটি বড় অঞ্চল হবে। কারণ ইতোমধ্যে পৃথিবীর যে বারোটি দেশের প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়ছে, তার ভেতর ছয়টি আফ্রিকান দেশ; এই সংখ্যা দ্রুত বাড়বে।

ইথিওপিয়া ইতোমধ্যে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টসে এগিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। আফ্রিকার অন্যান্য দেশও দ্রুত এগোবে- কারণ সেখানে বিদ্যুৎ ও শ্রম সস্তা। তাই বাংলাদেশকে আফ্রিকার দিকে মনোযোগ দেয়া এখন একটি অনিবার্য বিষয়। যেমন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে সুদান ঘুরে এলেন, সুদান বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য বিশেষ করে গানিব্যাগ রপ্তানির একটি অন্যতম গন্তব্য। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী খোঁজ নিলে জানতে পারবেন, বাংলাদেশের পাট রপ্তানির সঙ্গে এমন কিছু স্বার্থান্বেষী গ্রুপ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যার ফলে সুদানের বাজারে যে পরিমাণ পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করা সম্ভব, তা হয় না।

অপরদিকে বাংলাদেশকেও এখন মনোযোগ দিতে হবে আফ্রিকার কৃষি উৎপাদন ও কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগের দিকে। আর এ কাজে অবশ্যই বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর ও ভারতের পথেই হাঁটতে হবে। বাংলাদেশের বেসরকারি কোম্পানিগুলো যাতে সেখানে ডাইরেক্ট বিনিয়োগ ও ত্রিপক্ষীয় বিনিয়োগ করতে পারে, তার সুযোগ বাংলাদেশ সরকারকে করে দিতে হবে। কৃষিতে বাংলাদেশ অনেক ভালো করবে আফ্রিকায় বিনিয়োগ করলে। কারণ, আফ্রিকার প্রতিটি কৃষিপণ্যের ওপর এখন গবেষণা করা দরকার। যাতে তার প্রতিটি কৃষিপণ্যের ফলন বাড়ে। কৃষিতে গবেষণায় বাংলাদেশের জ্ঞান অনেক সমৃদ্ধ। এটাকে সেখানে কাজে লাগনো যাবে। এই জ্ঞান শুধু মূল খাবারগুলোর ভেতর সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যান্য কৃষিপণ্যে কাজে লাগালে সেগুলো রপ্তানির পাশাপাশি একটা অংশ বাংলাদেশেও আনা সম্ভব হবে।

যার ফলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার যে মূল খাদ্যের পাশাপাশি অন্য খাদ্য দরকার, তা পূরণে সহায়ক হবে। কিন্তু এ কাজে বাংলাদেশের মোটেই উচিত হবে না সরকারি বিনিয়োগে যাওয়া। কারণ, চায়না সরকারি বিনিয়োগে গিয়ে যেভাবে লাভ করতে পারে, বাংলাদেশের পক্ষে তা সম্ভব নয়। চায়নার সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতিপরায়ণ অন্য দেশে। তারা নিজের দেশের স্বার্থে অন্য দেশের প্রশাসনকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে। অপরদিকে বাংলাদেশের প্রশাসনের দুর্নীতির চরিত্র হলো, প্রশাসনের লোকজন ব্যক্তিগত স্বার্থে দুর্নীতি করে।

কৃষির পাশাপাশি বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতাসহ সব ধরনের জ্ঞান রয়েছে টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পে। ভারত, চায়না ও ভিয়েতনামের থেকে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত অনেক বেশি। এ সেক্টরগুলো ভালো করবে আফ্রিকাতে। তাদেরও ধৈর্যসহকারে আফ্রিকাকে পরবর্তী উৎপাদন স্থান হিসেবে নিতে হবে। সরকার নিঃসন্দেহে তাদের সহায়তা করবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বিশ্বব্যাংক ধোয়া তুলসী পাতা নয়

বিশ্বব্যাংক ধোয়া তুলসী পাতা নয়

কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করেই, ঋণের টাকা ছাড় না করেই মোড়লের মতো এই সংস্থার মাতব্বরি শুরু করে দেয়ার ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি কবছর আগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি; চুক্তিও করেছিল সরকারের সঙ্গে। কিন্তু অর্থ ছাড় না দিয়েই, প্রকল্পের কাজ শুরু না হতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে কাল্পনিক অভিযোগ করে বসে সংস্থাটি। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি- বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার। বিষয়টি কানাডার আদালত অবধি গড়ায়। দেড় বছর ধরে চলা দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেবে না বলে নিজস্ব অর্থে সেতুটি নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্নীতি মানে শুধু টাকা এ হাত-ও হাত করা নয়। দুর্নীতির মানে ক্ষমতার অপব্যবহার। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তথ্য এ দিক-ও দিক করে কোনো রিপোর্ট বা প্রতিবেদন বিশ্বববাসীর কাছে তুলে ধরা কোন ধরনের দুর্নীতি- তা আমার জানা নেই। আর সেই প্রতিবেদনের কারণে যদি কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতাচ্যুত হন বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন- তাহলে সেটা দুর্নীতির মধ্যে পড়বে কি না, সে বিষয়েও আমার কোনো ধারণা নেই।

কিন্তু, এই কাজটি যদি বিশ্ব আর্থিক খাতের মোড়ল সংস্থা বিশ্বব্যাংক করে থাকে তাহলে কিন্তু আমার কথা আছে। যে সংস্থাটি উঠতে-বসতে বাংলাদেশসহ তামাম দুনিয়ার মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবক দেয়, আর্থিকসহ নানা খাতের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা কথা বলে; তাদের কথামতো না চললে বা কাজ না করলে কোনো দেশকে ঋণ দেয় না। নানা শর্ত মেনে কোনো প্রকল্পে ঋণ দিলেও একটু এদিক-সেদিক হলেই সেই টাকা আবার ফেরত নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলে দেয়া হয় সেই দেশের সরকারকে; অনিশ্চিত হয়ে পড়ে প্রকল্পটির ভবিষৎ। উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হন সেই দেশ বা প্রকল্প এলাকার জনগণ।

শুধু কি তাই, কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করেই, ঋণের টাকা ছাড় না করেই মোড়লের মতো এই সংস্থার মাতব্বরি শুরু করে দেয়ার ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি কবছর আগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি; চুক্তিও করেছিল সরকারের সঙ্গে। কিন্তু অর্থ ছাড় না দিয়েই, প্রকল্পের কাজ শুরু না হতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে কাল্পনিক অভিযোগ করে বসে সংস্থাটি। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি- বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার। বিষয়টি কানাডার আদালত অবধি গড়ায়। দেড় বছর ধরে চলা দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেবে না বলে নিজস্ব অর্থে সেতুটি নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাকিটা ইতিহাস; সবারই জানা…!

এই তো আর কমাস! তারপরই স্বপ্নপূরণ। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে বাস চলবে; চলবে ট্রেন। উন্নয়নের আরেক মহাসড়কে উঠবে বাংলাদেশ। জিডিপিতে যোগ হবে এক থেকে দেড় শতাংশ। দুই অঙ্কের (১০ শতাংশ) জিডিপিতে অগ্রসর হওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে।

এরই মধ্যে থলের বিড়াল বের হতে শুরু করেছে। যে সংস্থার এত বড় কথা; কত মাতব্বরি- সেই বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধেই এখন গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আর সেই অভিযোগটি হচ্ছে, চিলির সমাজতান্ত্রিক সরকারের বদনাম করতে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ বা ‘ব্যবসা করার সূচক-বিষয়ক প্রতিবেদন’ তৈরি করেছিল বিশ্বব্যাংক।

ব্যবসা করার পরিবেশ কোথায় সবচেয়ে অনুকূল, এর নিরিখে ২০০৬ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বের ১৯০ দেশের একটি তুলনামূলক তালিকা ও রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে বিশ্বব্যাংক। এ রিপোর্টকে ভিত্তি করেই বহু বিদেশি বিনিয়োগকারী কোন দেশে বিনিয়োগ করবে বা কোন দেশ থেকে সরে আসবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয়। গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রতিবেদন তৈরিতেই নানা অনিয়মের কথা স্বীকার করে এই রিপোর্ট আর না করার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

গত বছরের আগস্টে প্রথম অনিয়মের বিষয়টি টের পায় সংস্থাটি। এ কারণে ওই বছরের অক্টোবরে ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ প্রকাশ করা হবে না বলে জানায় তারা। এ ছাড়া পাঁচটি প্রকাশিত রিপোর্টের তথ্যও ফরেনসিক অডিটরকে দিয়ে পরীক্ষা করানোর কথা বলা হয় সেসময়।

গত বৃহস্পতিবার এক আকস্মিক ঘোষণায় সংস্থাটি জানায়, ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ আর দেয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তর থেকে এই ঘোষণা দেয়া হয়। এ বিষয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতিও দেয় সংস্থাটি।

প্রতিবছর বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশগুলোর ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট তৈরি করে। ব্যবসা শুরু, বিদ্যুৎ-সংযোগ, সম্পত্তি নিবন্ধন, কর ব্যবস্থাসহ কয়েকটি নির্দেশক বা মানদণ্ডের প্রতিটির ওপর ১০০ নম্বরের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর গড় করে চূড়ান্ত স্কোর নির্ণয় করা হয়। স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোর অবস্থানের তালিকা করা হয়।

২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস সূচকে চিলির অবস্থান ছিল ৩৪তম। ২০১৭ সালে এসে সেই চিলি পিছিয়ে চলে যায় ৫৫তম অবস্থানে। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি চিলির তখনকার রাষ্ট্রপতি মিশেল বাশলে। ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এর জেরে বিশ্বব্যাংকের এ সূচক তৈরির অনিয়ম প্রথম ধরা পড়ে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে চিলি ৩৪তম অবস্থানে ছিল। ২০১৭ সালে তা পিছিয়ে ৫৫তম অবস্থানে নেমেছে। এরপর চিলির রাষ্ট্রপতি ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। চিলির কর্মকর্তারা বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা করে বলেন, সংস্থাটি দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির ক্ষেত্রে তাদের বার্ষিক ‘ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিযোগিতামূলক র‍্যাঙ্কিংয়ে অন্যায় আচরণ করেছে।

২০১৪ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট হন মিশেল বাশলে। এরপরে তার শাসনামলের পরবর্তী তিন বছরই ডুয়িং বিজনেস সূচকে চিলির অধঃপতন হয়। ২০১৫ সালে ৪১, ২০১৬ সালে ৪৮ ও ২০১৭ সালে ৫৫তম হয় চিলির অবস্থান।

চিলির প্রেসিডেন্টের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনায় নেয়া হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের সেসময়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার অসংগতির কথা জানান। তার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের একজন সাবেক পরিচালক এমনভাবে জালিয়াতি করে ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ সূচক নির্ণয়ের পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন, যাতে চিলির ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়।

পল রোমার প্রতিবেদনের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের জন্য চিলির কাছে ক্ষমা চান। তিনি স্বীকার করেন বাশলের অধীন ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এই র‌্যাঙ্কিং রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত। তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ফলে প্রতিবেদনে চিলির অবনমন হতে পারে।

সেসময় এ বিষয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বক্তব্য দেন পল রোমার। তিনি বলেন- ‘আমি চিলি এবং অন্য যেকোনো দেশে যেখানে আমরা ভুল ধারণা দিয়েছি, তাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাই। আমার দায় রয়েছে। কারণ, আমরা বিষয়গুলো যথেষ্ট পরিষ্কার করিনি। বিশ্বব্যাংক অতীতের রিপোর্টগুলো সংশোধন করার পদ্ধতি শুরু করছে এবং পদ্ধতি পরিবর্তন না করে র‍্যাঙ্কিং কেমন হবে, তা পুনরায় প্রকাশ করবে।’

রোমার বলেন, সংশোধনগুলো চিলির জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, তাদের অবস্থান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্থিতিশীল ছিল। বিশ্বব্যাংকের কর্মীদের রাজনৈতিক প্রেরণার কারণে বিষয়টি কলঙ্কিত হয়েছে। কারণ, বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কাভারেজ পায়। এমন মন্তব্য করায় পল রোমারকে পদত্যাগ করতে হয়।

প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন করা সেই সাবেক পরিচালক ছিলেন অগাস্টো লোপেজ-ক্লারোস। চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক লোপেজ-ক্লারোস সে সময় বিশ্বব্যাংকের দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়ে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় তার ওই কাজের জন্য প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।

২০১৮ সালে মার্চে দায়িত্ব থেকে সরে যান মিশেল বাশলে। সমাজতান্ত্রিক দল থেকে ক্ষমতা চলে যায় কনজারভেটিভ দলের কাছে। দায়িত্ব পান প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা।

পল রোমারের ক্ষমা চাওয়ার পর ওই সময় এক টুইটে মিশেল বাশলে লেখেন, ‘বিশ্বব্যাংকের প্রতিযোগিতামূলক র‌্যাঙ্কিং তৈরিতে যা ঘটেছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে র‌্যাঙ্কিং পরিচালনা করে, তা নির্ভরযোগ্য হওয়া উচিত। কারণ, তারা বিনিয়োগ ও দেশগুলোর উন্নয়নে প্রভাব ফেলে।’ তিনি আরও বলেন, তার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাংকের কাছে সম্পূর্ণ তদন্তের অনুরোধ জানাবে।

গত বছরের আগস্টে বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অসংগতি থাকতে পারে, কিন্তু তা এখনও চিহ্নিত হয়নি। তাই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তন এবং অসংগতির কারণে যেসব দেশ অধিক প্রভাবিত হয়েছে, সেসব দেশের সঠিক তথ্য পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আর এ কারণে গত বছরের অক্টোবরে ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স তৈরি স্থগিত করে তারা।

আর এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়ে এই রিপোর্ট আর না করার কথা জানিয়েছে সারাবিশ্বে ‘দাদাগিরি’ ফলিয়ে আসা বিশ্বব্যাংক। তাহলে, কী দাঁড়াল বিশ্বব্যাংকও ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ নয়! তাদের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বিশ্বব্যাংকেও দুর্নীতি হয়!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক ছাত্রনেতা।

শেয়ার করুন

অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার

অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেশ-বিদেশে বসে একাত্তরের চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীরা এবং তাদের রাজনৈতিক- দোসর- সহযোগীরা এমন সব মিথ্যাচার করছে, এমন বিকৃত তথ্য দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা দেখে- শুনে বিস্মিত হতে হয়। এমনকি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টাও চালাচ্ছে তারা। অনলাইন পত্রিকার নামে অনেকে অসৎ উদ্দেশ্যে যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো খুলে বসেছে অনলাইন পোর্টাল।

একসময়ের দারিদ্র্যে জর জর টানাপোড়নের বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়নের মহাসড়কে তার মূলে শক্তি জুগিয়েছে ডিজিটাইজেশন। যদি যোগাযোগ প্রযুক্তির এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটত তাহলে অনেক কিছুই বিলম্বিত হতো। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়েছিল যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার অন্যতম ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। প্রযুক্তির সেই অভাবিত উন্নয়ন বাংলাদেশকে সব ক্ষেত্রে গতিশীলতা দিয়েছে।

এক কথায় ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগসহ উন্নয়নের সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন গতি সঞ্চার করেছে। ব্যাংকিং এবং বিপণন ক্ষেত্রে এই গতিশীলতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কার্ডেই অধিকাংশ লেনদেন কেনাকাটা। কথায় বলে, আলোর পিঠেই অন্ধকার। এ উক্তি চিরসত্য।

এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের পর মানুষের হাতে হাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোনসেট। তার মানে পৃথিবীর তাবৎ তথ্যভাণ্ডার আর লেনদেন কয়েকটি অ্যাপসের বদৌলতে এখন এন্ড্রয়েড ফোনে। এমনকি টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রের সব কিছুই এখন মোবাইল ফোনে! এককথায় তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে প্রযুক্তি!

যোগাযোগ ও উন্নয়ন অর্থনীতির বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে প্রযুক্তি। ওই যে বলেছি আলোর উল্টোপিঠে অন্ধকার সেই অন্ধকারে এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছ। সম্ভাবনা তখনই সংকটে পরিণত হয়, যখন শুরু হয় তার অপব্যবহার। ইতিবাচক উদ্ভাবনকে নেতিবাচক কাজে ব্যবহার করলে যে কী ভয়াবহ সর্বনাশ বয়ে আনতে পারে, তার প্রমাণ তো এটম বোমা!

আমাদের অনেকেরই জানা বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন এটমকে ভেঙে যে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানো যায়, এই সত্য! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি শঙ্কিত হয়েছিলেন এই ভেবে, যদি হিটলার তথা জার্মানি এই শক্তির সন্ধান পেয়ে যায় তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে!

তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে তার এই আশঙ্কার কথাই জানিয়েছিলেন। কিন্তু রুজভেল্ট সেই আণবিক শক্তি আবিষ্কারের সম্ভাবনাকে বোমায় পরিণত করে নিজেই ব্যবহার করিয়েছিলেন জাপানের বিরুদ্ধে। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা-নাগাসাকি শহর দুটি ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছিল এটম বোমা। আইনস্টাইন যা কখনও ভাবতেই পারেননি মানব সভ্যতাবিনাশী এত বড় সর্বনাশা কাজে ব্যবহৃত হবে তার উদ্ভাবন!

প্রযুক্তির শক্তিতেই বাংলাদেশ আজ বহুমাত্রিক উন্নয়নে অগ্রযাত্রায় মুখরিত। কিন্তু সেই প্রযুক্তির অপব্যবহার নানামুখী বিপর্যয়ও ডেকে আনছে। তথ্যপ্রযুক্তির ফসল সোশ্যাল মিডিয়া। সেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত আজ নানা রকম সেবার আওতায় চলে এসেছে।

দেশের ইউনিয়নগুলো আজ সেই সেবা দিয়ে যাচ্ছে ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র থেকে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ফরম পূরণ, পাসপোর্টের আবেদন, চাকরির আবেদনসহ বহু ধরনের সেবা আজ ঘরে বসেই পাচ্ছে মানুষ। নগদ লেন-দেনের বিকল্প ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে ই-প্লাটফরম। মার্কেটিংসহ নানা বিপণন ব্যবস্থায় নগদ লেনদেনের বিকল্প এখন কার্ড। ঘরে বসেই মিলছে সব পণ্য।

অথচ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেশ-বিদেশে বসে একাত্তরের চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীরা এবং তাদের রাজনৈতিক- দোসর- সহযোগীরা এমন সব মিথ্যাচার করছে, এমন বিকৃত তথ্য দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা দেখে- শুনে বিস্মিত হতে হয়। এমনকি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টাও চালাচ্ছে তারা। অনলাইন পত্রিকার নামে অনেকে অসৎ উদ্দেশ্যে যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো খুলে বসেছে অনলাইন পোর্টাল। সম্প্রতি যার লাগাম টেনে ধরার প্রয়াস পাচ্ছে সরকার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর যা খুশি তা অপপ্রচারের সুযোগ কখনও এক কথা হতে পারে না।

যাহোক ই-কমার্স প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ই-কমার্স-এর আওতায় বড় বড় কয়েকটি পণ্য বিপণন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে দেশে, যেখানে বিপুল পরিমাণ পণ্য কেনাবেচা হয় প্রতিদিন। ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছিল অনলাইনমার্কেট। অনলাইন ব্যবহার করে ইতোমধ্যে ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ ধামাকা, আলেশা মার্ট ইত্যাদি মেগাশপ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। প্রযুক্তির এই সুবিধাকে এদের কেউ কেউ অপব্যবহার করে বিশাল সম্ভাবনাময় এই আধুনিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করল। প্রতারিত করল অসংখ্য গ্রাহককে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে প্রযুক্তির ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটি দিকেই আলো আর অন্ধকারের মতো বিপরীত বাস্তবতা। প্রয়োজন শুধু অপপ্রয়োগ রোধ করতে যথাযথ নজরদারি নিশ্চিত করা। সেটা করা না গেলে যে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে তা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। বিশেষ করে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রতারণার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর মানুষের বিশ্বাস ধসে পড়েছে অনলাইন শপিংয়ে কেনাকাটা বিষয়ে। অথচ গত দেড় বছর ধরে করোনাকালের বাস্তবতায় জনসাধারণ বিপুলভাবে ঝুঁকছিল ই-শপিংয়ে। করোনা সংক্রমণের ভয়ে মানুষ ঘরে বসেই এই কেনাকাটার সুযোগ গ্রহণ করছিল সানন্দে। সংগত কারণেই দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছিল ই-শপিং।

গ্রাহকের দোরগোড়ায় পণ্য পৌঁছে দেয়ার এই প্লাটফরম জনপ্রিয়তা পাবে সেটাই স্বাভাবিক। পেয়েছিলও। কিন্তু গ্রাহকদের সঙ্গে একের পর এক প্রতারণার তথ্য ফাঁস হতে থাকলে এসব অনলাইন মেগা শপের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় চলে আসে এবং বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হয়। একটি সম্ভাবনাময় বিকাশমান বিপণন খাতে নেমে আসে বিশাল ধস! বিশেষ করে গত সপ্তাহে প্রতারিত গ্রাহকদের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাবের হাতে ই-ভ্যালি চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দম্পতি রাসেল ও নাসরিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর ই-শপিং ব্যবসার সম্ভাবনার ওপর চরম আঘাত নেমে আসে! মানুষের যেটুকু বিশ্বাস অবশিষ্ট ছিল, তাও নিঃশেষ হয়ে গেল।

গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে তাদের স্বামী-স্ত্রীর প্রতারণার বিশাল ফাঁদ। তারা অগ্রিম টাকা নিয়েও অসংখ্য গ্রাহককেই পণ্য বুঝিয়ে দেননি। তাদের দেনার দায় সহস্রাধিক কোটি টাকা। অথচ তাদের ব্যাংক হিসাবে আছে মাত্র লাখ টাকা! তাহলে এত টাকা কোথায় গেল?

এ প্রশ্নের উত্তর এখনও জানা যায়নি। র‌্যাব তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এখন। ইতোমধ্যে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা ভয়ংকর। তারা সচেতনভাবেই গ্রাহকদের প্রতারিত করে আসছিল।

ই-ভ্যালির এমডি এবং চেয়ারম্যান পরিকল্পনা করেছিলেন কোম্পানির দেউলিয়া ঘোষণা করে গ্রাহকদের দায় থেকে মুক্তি পেতে। তাদের আরেক পরিকল্পনা ছিল গ্রাহকসংখ্যা আরও বাড়িয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ই-ভ্যালি হস্তান্তর!

এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তাদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে হাজার হাজার প্রতারিত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা কী হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। ইভ্যালির মতো যেসব অনলাইন শপিং প্রতিষ্ঠান এই ধরনের লুটপাট করেছে তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব কী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের, নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের, নাকি কনজিউমার স্বার্থ যারা দেখার কথা তাদের? কার কী ভূমিকা তাও এখন খতিয়ে দেখা দরকার। এত বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যেমন খুশি তেমন চলতে দেয়া যায় কি? দিনের পর দিন তারা জনগণের অর্থ লুটপাট করে যাবে আর তা কেউ দেখবে না, তা কি হতে পারে? তার দেখভালের দায়িত্ব কি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরও বর্তায় না?

আইনের আশ্রয় নিয়ে এদের কাছ থেকে গ্রাহকদের অর্থ আদায় করা যে সম্ভব নয় তা এখন স্পষ্ট। ই-ভ্যালি বন্ধ করে দিয়ে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না। সরকার প্রশাসক বসিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে যদি পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে হয়তো একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকতে পারে। কারণ আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা মোটেও সুথকর নয়। পিকে হালদারের অর্থ প্রতিষ্ঠানের অরিয়ান্টাল ব্যাংক গ্রাহকরা এখনও অর্থ ফিরে পায়নি, বহু বছর আগে জনগণকে প্রতারণার দায়ে যুবক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু যুবকের প্রতারিত গ্রাহকরা তাদের অর্থ ফিরে পায়নি। এরকম বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করে সাধারণ মানুষকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।

ই-ভ্যালির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যদি মাত্র ত্রিশ লাখ টাকা থাকে তাহলে বাকি হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে কোথাও সরানো হয়েছে, না কি বিদেশে পাচার হয়েছে, তার সন্ধান পেতেই হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যমন্ত্রণালয় কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিত ভূমিকা নিতে হবে- যাতে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার উপায় উদ্ভাবন করা যায়।

এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, ই-কমার্সের সুস্পষ্ট পরিচালনাবিধি বা গাইডলাইন থাকা সত্ত্বেও তা মানেনি ই-ভ্যালি কর্তৃপক্ষ! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের জন্য যে ধরনের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ থাকার কথা, তা কতটা কার্যকর ছিল? এ ব্যাপারে তাদের যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকা দরকার ছিল তার কতটুকু তাদের ছিল? এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে।

এরই মধ্যে ধামাকাকে ২০০ কোটি টাকা ফেরত দিতে পাঁচদিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে ধামাকায় পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ। ১৮ সেপ্টেম্বর শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে এই আল্টিমেটাম দেন তারা। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ধামাকা শপিং ডটকম সেলার অ্যাসোসিয়েশন তাদের বকেয়া পাবে কি না তাও এক অনিশ্চিত প্রশ্ন। এ-তো গেল সেলার বা মার্চেন্টদের কথা, এর বাইরেও রয়েছে গ্রাহকদের পাওনা যারা টাকা দিয়ে পণ্য পাননি। ই-ভ্যালি ধামাকার মতো অন্যান্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকেও নজরদারির আওতায় আনা উচিত।

প্রতারণার ক্ষেত্রে আমাদের গণমাধ্যম এবং গ্রাহকদেরও সতর্ক থাকা দরকার ছিল। গণমাধ্যম যেভাবে তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে তাতে কোনো বাছবিচার ছিল বলে মনে হয় না। একটি প্রতিষ্ঠানকে টাকা পেলেই বিজ্ঞাপিত করা যায় না, তার সাত-পাঁচ ভেবে দেখতে হয়। আমাদের যে সমস্ত বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী তারকা ব্যক্তিরা ই-ভ্যালির হয়ে উচ্ছ্বসিত ভাষায় বিজ্ঞাপন প্রচার করেছেন, তাদেরও বিবেচনা থাকা উচিত ছিল বলে মনে করি।

ই-ভ্যালির ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সচেতনতার অভাব মারাত্মকভাবে চোখে পড়েছে। দুই লাখ টাকার একটি পণ্য কী করে আশি হাজার টাকায় দেবে, তা ভেবে দেখলে কেউ এ পথে আসার কথা ছিল না। লোভের মোহে পড়েই কেউ ভেবে দেখেননি।

যাহোক, হাজার হাজার গ্রাহকের স্বার্থ দেখার দায়িত্ব সরকারকে গ্রহণ করতেই হবে। ভোক্তা অধিকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। ই-কমার্স একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাত। কিছু দুষ্টচক্রের কারণে এই বিশাল সম্ভাবনাময় খাত ধ্বংস হয়ে যাক, এটা আমাদের কারো কাম্য হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীনসহ বিশ্বের বহু দেশ বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মাধ্যমে সফলভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছে, আমাজান, আলিবাবার মতো প্রতিষ্ঠান এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ।

আমরা আশা করতে চাই, দেশের সম্ভাবনাময় এই বাণিজ্যিক খাতকে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসবেন। হাজার হাজার গ্রাহকের ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস আবার ফিরিয়ে আনবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কবি। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

শেয়ার করুন

বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া

বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া

বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেটা শুধু বাংলাদেশই নয়, বিদেশি আদালতের রায়েও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কানাডার ফেডারেল আদালতে (সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন-২০১৭, এফসি ৯৪) বলা হয়েছে যে, বিএনপি প্রকৃতপক্ষে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারা হচ্ছে এমন একটি দল যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে সশস্ত্র সংগ্রাম বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জন্ম রাজনীতির কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়নি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। শাসকদের শোষণ, অত্যাচার, বঞ্চনার প্রতিবাদে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ থেকেই একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। আর বিএনপি দলটির জন্ম হয়েছে এক অরাজনৈতিক ব্যক্তির ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে। সুমহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী, আওয়ামী লীগবিরোধী কট্টরপন্থি, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদীদের নিয়ে একটি প্ল্যাটফরম হলো বিএনপি। রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠনের পর পাকিস্তানের দি হেরাল্ড পত্রিকায় বলা হয়, ‘বিএনপির জন্ম ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার নীল নকশার ফলশ্রুতি।... এই দলের জন্য যে দর্শন নির্ধারণ করা হয় তা হলো: আওয়ামী লীগের দুর্বল স্থানে আঘাত করা এবং জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব জাগ্রত করা।... নিন্দিত আওয়ামী লীগার, চরম বামপন্থী ও মুসলিম লীগারদের নিয়ে দলের জনবল বাড়ানো।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রধান বেনিফিশিয়ারি হলো জিয়াউর রহমান। খন্দকার মোশতাককে সামনে রেখে জিয়াউর রহমানই যে অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন তা আজ প্রমাণিত সত্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি ছিলেন উপসেনাপ্রধান, অচিরেই ক্ষমতা দখল করে হয়ে যান সেনাপ্রধান। মার্শাল ল চালু করে রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করে বিচারের নামে রাজনীতিবিদদের বন্দি ও ভিন্নমতের শত শত মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারকে হত্যা করে ক্ষমতাকে করেন পাকাপোক্ত। একপর্যায়ে অস্ত্রের জোরে বিচারপতি সায়েমকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ দখল করে নেন। জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ সালের ৩০ মে ‘হ্যাঁ না’ ভোট ছিল গণতন্ত্রকে হত্যা করার প্রথম পদক্ষেপ। নিজের পক্ষে প্রদত্ত ভোটের ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার নজির গণতন্ত্রের নামে তামাশা। ভোটারবিহীন গণতন্ত্রের তিনিই প্রবর্তক।

জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথমে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে সমন্বয়ক করে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ বা ‘জাগদল’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করা হয়। কিন্তু জাগদল রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের মধ্যে তেমন প্রভাব ফেলতে না পারায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান নিজেকে প্রধান করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে। তখন জিয়া সেনাবাহিনীপ্রধান ছিলেন, রাজনৈতিক দল গঠন করে হয়ে গেলেন রাজনীতিবিদ। দেশের রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান আবার একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। কী তুগলকি কাণ্ডকারখানা!

বিএনপি প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছরের পরিক্রমায় জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান দলের নেতৃত্ব দিয়েছে। তিনজনের মেয়াদ আলাদা হলেও দল পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের নীতি ও আদর্শ এক, অভিন্ন।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে বাংলাদেশের মূল চরিত্রটাকেই ধ্বংস করে দেয়। আঘাত হানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে দালাল আইন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার শুরু করেছিলেন। কিন্তু জিয়া ক্ষমতার নাটাই হাতে নিয়েই দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১১ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেয়, যাদের মধ্যে ৭৫২ ছিল সাজাপ্রাপ্ত আসামি।

মুক্তিযুদ্ধের পর জামায়াতের রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের আড়ালে জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে তাদেরকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়। জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পাওয়ার ফলে বেড়ে যায় সাম্প্রদায়িকতা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডটি ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত ঘটনা। অথচ জিয়াউর রহমান হত্যাকারীদেরকে পুরস্কৃত করে বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়েছেন এবং বিচারের পথ চিরতরে বন্ধ করতে জারি করেন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ।

জিয়াউর রহমানের দেখানো পথেই যাত্রা শুরু করে খালেদা জিয়া। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত দিবসে খালেদা জিয়া ভুয়া জন্মদিন পালন শুরু করে। বাঙালি জাতি যখন বিনম্র শ্রদ্ধায় শোক পালন করে তখন বিএনপি খালেদা জিয়ার ভুয়া জন্মদিনের কেক কেটে উৎসব করে। যা একজন বাঙালি ও বাংলাদেশি হিসেবে কেউ এমন ঘৃণ্য কাজ করতে পারে না।

খালেদা জিয়া তার প্রয়াত স্বামী জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জনগণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি এক ভোটারবিহীন নির্বাচন আয়োজন করেন। কোনো দল ওই সাজানো নির্বাচনে অংশ না নিলেও, কুমিল্লা-৬ আসন থেকে বঙ্গবন্ধুর খুনি ও ফ্রিডম পার্টির নেতা আবদুর রশিদকে জিতিয়ে এনে সংসদকে করেন অপবিত্র। যদিও সে সরকারের মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন। জনগণের চাপে সেদিনের সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

বিএনপি ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ’৭১-এর নরঘাতক নিজামী-মুজাহিদকে মন্ত্রী করে লাল সবুজের পতাকাকে করেছে কলঙ্কিত। ২০০২ সালে তারেক রহমান দলের সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই মূলত বিএনপিতে তারেক যুগের সুচনা হয়। তিনি হাওয়া ভবন তৈরি করে ক্ষমতার একটি আলাদা বলয় সৃষ্টি করেন। তারেক গংদের হাতে চলতে থাকে দল ও সরকার। খালেদা জিয়া দলের নামস্বর্বস্ব প্রধান থাকলেও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ থাকে তারেক রহমানের হাতে।

সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহারে বিপর্যস্ত হয় বাংলাদেশের চেহারা। রাষ্ট্রীয় মদতে দুর্নীতি, লুটপাট, কমিশন বাণিজ্য, অবাধে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে। তারেক জিয়া ও বিএনপি সরকারের অপকর্ম আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। সেসময় দুর্নীতিতে বাংলাদেশ টানা পাঁচবার হয়েছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তারেক রহমান এমন কোনো অপরাধ নেই যা তিনি করেননি। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চাঞ্চল্যকরভাবে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান। তারেক রহমানের নির্দেশে ও লুৎফুজ্জামান বাবরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকে অস্থিতিশীল করতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীগোষ্ঠী উলফাকে সরবরাহ করার জন্য আনা হয়েছিল।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ পুরো আওয়ামী লীগ দলটিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তারেক রহমানের পরিকল্পনায় সম্পূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে গ্রেনেড হামলা করা হয়। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও বহু মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় মদতে দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় তো রীতিমতো তালেবানি শাসন চালু হয়েছিল। জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ- জেএমবি এবং হরকাতুল জিহাদ ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলা করে তাদের অস্তিত্বের জানান দেয়।

ক্ষমতার বাইরে থেকেও বিএনপি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বের হয়ে আসেনি। ২০১৩-১৪ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ বন্ধ করার দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মিলে সারা দেশে একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে বানচাল ও ২০১৫ সালে সরকারের বর্ষপূর্তিতে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কাজ করে বিএনপি-জামায়াত। বিএনপির আন্দোলন মানেই গাড়ি পোড়ানো, পেট্রল বোমা ছোড়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সহিংস ও প্রাণঘাতী হামলা ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা।

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও তাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটকে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে বিএনপি। আর এসব কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপি আজ দেশের মানুষের সমর্থন হারিয়ে ডুবন্ত জাহাজে পরিণত হয়েছে।

বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেটা শুধু বাংলাদেশই নয়, বিদেশি আদালতের রায়েও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কানাডার ফেডারেল আদালতে (সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন-২০১৭, এফসি ৯৪) বলা হয়েছে যে, বিএনপি প্রকৃতপক্ষে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারা হচ্ছে এমন একটি দল যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে সশস্ত্র সংগ্রাম বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়। হাতবোমা, পিস্তল ও অস্ত্র ব্যবহার করে নেতৃস্থানীয় এবং জনগণের ওপর হামলা চালায়। এমনকি অগ্নিসংযোগেরর মতোও ঘটনা ঘটায় দলটি।

তারপরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক জনসমর্থন আছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এটি বিএনপির কোনো নীতি-আদর্শ, নৈতিকতার জন্য হয়েছে- তেমনটি নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিরাই মূলত কারণে অকারণে বিএনপির সমর্থক। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যারা বিরোধিতা করেছিল, সেই গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে বিএনপি।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য বিএনপি নামক দলটি দীর্ঘ সময় এদেশের ক্ষমতায় ছিল, এখনও বিরোধী শক্তি হিসেবে আছে। বিএনপি ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বার বার করেছে বাধাগ্রস্ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে করেছে ভূলুণ্ঠিত। বিএনপি দলটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি বিষফোড়া। বাংলাদেশকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে দ্রুত এই বিষফোড়াকে এড়িয়ে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

শেয়ার করুন

ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা

ফ্ল্যাট সংস্কৃতি: সবাই মিলে একা

ফ্ল্যাটে বসবাস করতে যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তা হলো- রাজনৈতিক জ্ঞান, দেনদরবারের ক্ষমতা এবং যোগাযোগ দক্ষতা। ফ্ল্যাট হয়ে উঠছে একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষুদ্র সংস্করণ। একটি দেশের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বুঝতে ফ্ল্যাটবাড়ি গবেষণার একক হয়ে উঠছে।

ফ্ল্যাট হলো সদরঘাট, যেখানে সম্পর্ক খেলা করে কিন্তু জমাট বাঁধে না। একইভাবে ফ্ল্যাট হলো বহু রুচি, সংস্কৃতি এবং দৃষ্টিভঙ্গির মিলনস্থল, যা আবাস হিসেবে নগর জীবনে অপরিহার্য হয়েছে। ফ্ল্যাট গণতন্ত্রচর্চা, ক্ষমতা-কাঠামো, পরিচয় নির্মাণ, সম্পর্কের মেরুকরণ এবং ভাব দেখানোর এক নতুন ক্ষেত্র। অধিকাংশ ফ্ল্যাটবাড়ি মূলত কখনও জ্বলন্ত কখনওবা সুপ্ত অগ্নিগিরিসদৃশ। নাগরিক জীবনপাঠের এক খোলা জানালা।

ফ্ল্যাটের প্রকৌশল কাঠামো যতই সুউচ্চ বা বহিরাঙ্গের নির্মাণশৈলী বাহারি হোক না কেন এর ভেতরাঙ্গটা বড়ই লঘু উচ্চতা এবং শতধাভাগে বিভক্ত। এ বিভক্তির পেছনে রয়েছে মূলত ভাবস্বীকৃতি বা আধিপত্য বিস্তারের পরাস্ত মনোবাসনা।

ফ্ল্যাটে তিন ধরনের মানুষ বাস করে। ভূমির মালিক, যারা ডেভেলপারকে ভূমি দেয় এবং এর বিনিময়ে টাকা ও নির্দিষ্ট সংখ্যক ফ্ল্যাট পায়। ভূমি মালিকেরা নিজেদের পাওয়া ফ্ল্যাটে বাস করে অথবা ভাড়া দেয়। ফ্ল্যাটের আরেক ধরনের মালিকানা রয়েছে যারা ক্রয়সূত্রে ফ্ল্যাটের মালিক হয়। আরেকটি অংশ আছে যারা ভাড়া থাকে।

ডেভেলপার ফ্ল্যাট ডেভেলপড এবং বিক্রি শেষে ফ্ল্যাট মালিকদের অংশগ্রহণে গড়ে তোলা ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে হস্তান্তর করে। এর আগে ফ্ল্যাট পরিচালনা-সংক্রান্ত গঠনতন্ত্র তৈরি করে। অ্যাসোসিয়েশনের কাছে ফ্ল্যাট পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অর্পণের মধ্য দিয়ে ডেভেলপার বিদায় হয়। এটি স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস।

সবসময় যে এ প্রাকটিস অনুসৃত হয় এমন নয়। অনেকসময় ডেভেলপার সুচারুভাবে এ কাজগুলো করতে পারে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের আগে ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজের মান ও চুক্তি মোতাবেক প্রয়োজনীয় উপকরণাদি সরবরাহ করতে গাফিলতি, দীর্ঘসূত্রতা বা অপারগতার কারণে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের সঙ্গে নানারকম দ্বন্দ্বমুখর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে ফ্ল্যাট মালিকরা নিজের ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার আগে অন্য ফ্ল্যাট মালিকদের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। তারা ফ্ল্যাটের সাধারণ স্বার্থের ব্যাপারে জোটবদ্ধ হয়। ডেভেলপারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

শুরুর দিকে ফ্ল্যাট মালিকরা পরস্পর কিছুটা অচেনা বা অজানা হলেও সাধারণ স্বার্থের ব্যাপারে তাদের জোট বাঁধতে বেশি বেগ পেতে হয় না। ফ্ল্যাট ক্রেতারা চুক্তি মোতাবেক প্রাপ্য বুঝে নিতে সতর্ক থাকে। অন্যদিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্রেতার সঙ্গে ডেভেলপারের ফ্ল্যাট ক্রয়-সম্পর্কিত চুক্তি স্বাক্ষরের পর তা বাস্তবায়নে গড়িমসি দেখা যায়।

চুক্তির শর্ত মোতাবেক ফ্ল্যাট ক্রেতারা অনেকসময় নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে পারে না। যারা এক কিস্তিতে রেডি ফ্ল্যাট কিনে তাদের বিষয়টি ভিন্ন। অর্থাৎ, ফ্ল্যাট ক্রয়ের আগে ডেভেলপারের সঙ্গে ক্রেতার যে আনন্দদায়ক সম্পর্ক তৈরি হয় এর আয়ুষ্কাল হয় অল্প।

আগেই বলা হয়েছে, ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের একটি গঠনতন্ত্র থাকে। ফ্ল্যাট পরিচালনার সার্বিক দিক এখানে লেখা থাকে। এ গঠনতন্ত্র হলো ফ্ল্যাট সংস্কৃতির নির্ধারক। ফ্ল্যাটের মালিকরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ গঠনতন্ত্র ও চলনকাঠামো নির্ধারণ করে।

গ্রামীণ সমাজকাঠামোর একটি কম্প্যাক্ট বিন্যাস হলো ফ্ল্যাট কাঠামো। সমস্যা হলো- গ্রামীণ সমাজে একটি পরম্পরা থাকে, সেখানে নানা মাত্রিক আর্থসামাজিক বন্ধন কাজ করে। গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর এ সম্পর্কটি হলো অরগানিক আর ফ্ল্যাট হলো মেকানিক্যাল সর্ম্পকের সূচক। সমাজ চলে অলিখিত চুক্তিতে আর ফ্ল্যাট পরিচালিত হয় লিখিত সমঝোতার ভিত্তিতে।

ফ্ল্যাট যেহেতু বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমি থেকে আসা মানুষের মিলনস্থল সুতরাং তা শৃঙ্খলায় আনতে এ ধরনের সমঝোতামূলক নীতিমালার বিকল্প নেই। অ্যাসোসিয়েশন নেতৃত্ব নির্বাচনের ব্যাপারে চলে একটি জটিল ফ্ল্যাট-রাজনীতি। অধিকাংশ ফ্ল্যাট সদস্যের মধ্যে ফ্ল্যাট পরিচালনার নেতৃত্ব প্রদানের বেশ আগ্রহ দেখা যায়।

বাঙালির নেতৃত্ব প্রদানের যে সুপ্তবাসনা কতটা প্রবল তা ফ্ল্যাটগুলোর সভায় অংশগ্রহণ না করলে বোঝা বেশ কঠিন। সাধারণ পাঁচ বা সাত সদস্য নিয়ে কমিটি গঠিত হয়। একজন সভাপতি, একজন সাধারণ সম্পাদক ও একজন কোষাধ্যক্ষসহ দু-চারজন সদস্য নিয়ে কমিটিগুলো গঠিত হয়। সদস্যদের সম্মতি এবং ভিন্নমতের ভিত্তিতে কমিটি গঠিত হয়।

মজার ব্যাপার হলো, কমিটি গঠনের পরদিন থেকে অন্য সদস্যরা কমিটির কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করতে থাকে। বাঙালির প্রতিষ্ঠানবিরোধী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ সহজেই লক্ষ করা যায়। তারা সম্মিলিতভাবে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর চেষ্টা করে এবং প্রতিষ্ঠানটি দাঁড়িয়ে গেলে তা সম্মিলিতভাবেই ভাঙতে উঠেপড়ে লেগে পড়ে।

অর্থাৎ, ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক মনোকাঠামো নিয়ে ব্যক্তি যখন ফ্ল্যাটের মতো গড়ে ওঠা আধুনিক আবাসন ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে, তখন ব্যক্তিকে যূথবদ্ধভাবে বাস করার জন্য যে মনোভঙ্গি দরকার এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হয়।

অপরদিকে, কমিটির সদস্যরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্রুত গণতান্ত্রিক আচরণ পরিহার করে একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে ফ্ল্যাট পরিচালনা করতে থাকে। ফলে দ্রুত তিক্ততা বাড়ে। নানা দল বা উপদল তৈরি হয়। তিক্ততা বহুমাত্রিকতা লাভ করে।

ফ্ল্যাটে বসবাস করতে যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তা হলো- রাজনৈতিক জ্ঞান, দেনদরবারের ক্ষমতা এবং যোগাযোগ দক্ষতা। ফ্ল্যাট হয়ে উঠছে একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ক্ষুদ্র সংস্করণ। একটি দেশের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বুঝতে ফ্ল্যাটবাড়ি গবেষণার একক হয়ে উঠছে।

ফ্ল্যাট অ্যাসোসিয়েশন সভাগুলো খুব চমৎকার একটি প্যাটার্ন। বিশেষত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রসায়ন, কৌশল ও স্বার্থ বোঝার জন্য। ফ্ল্যাটে সাধারণত দুধরনের সভা হয়। কমিটির সদস্য নিজেরা বসে জরুরি বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। আবার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সব সদস্যের অংশগ্রহণে বিশেষ বা সাধারণ সভা আহবান করা হয়।

সাধারণ সভায় সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি থাকলেও সবসময় তা যথাযথভাবে অনুসৃত হয় না। সাধারণত যেকোনো সদস্য কথা বলার সময় বিষয়ভিত্তিক কথা বলার চেয়ে তার অবস্থান, ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব বোঝানোর চেষ্টা করে। অনেক সময় বক্তার বক্তব্যের সারবত্তা খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়। এ সভাগুলো মোটেও উপভোগ্য হয় না, হয় খুব বিরক্তি ও ক্লান্তিকর। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ১৫-২০ জন ফ্ল্যাট সদস্য দু থেকে আড়াই ঘণ্টা আলোচনা করে সিকিউরিটি গার্ডের বেতন বাড়িয়েছেন দুই শ’ টাকা, যা ব্যয়সাশ্রয়ী নয়। অথবা কমন স্পেসে রাতে লাইট জ্বলবে কি জ্বলবে না বা কমন স্পেসের ক্লিনারের পারফরমেন্স নিয়ে দেড়-দু ঘণ্টা আলোচনা শেষ হয়েছে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই।

সভার সভাপতি বা সম্পাদকের থাকে না সভা পরিচালনার বিশেষ কোনো দক্ষতা। অন্যকে কথা বলতে দেয়ার চেয়ে তারাই বেশি বলেন। বাঙালি যখন কোনো সভায় বসে তখন সে যে কত কৌশলী হতে পারে তা এ ধরনের সভাতে না বসলে বোঝা মুশকিল। সদস্যরা সভায় বসে চোখাচোখি করে, ম্যাড়ম্যাড়ে স্বরে- অস্পষ্ট ভাষায় এবং দিক-নির্দেশনাহীনভাবে কথা বলে। খুব হিসাব-নিকাশমূলক এক মনোভঙ্গি নিয়ে সদস্যরা সভায় অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ, কাঠামোবদ্ধ আলোচনায় বাঙালি খুব অসংগঠিত, ও উদভ্রান্ত তা সহজেই বোঝা যায়।

যারা নেতৃত্বে থাকে তারা একে বানিয়ে ফেলে স্বৈরাচারের ক্ষুদ্র পার্লামেন্ট। ফ্ল্যাট ওনার্সদের মধ্যে মধুচন্দ্রিমা পার হলেই সৃষ্টি হয় সম্পর্কের নানা জটিলতা। কে কত বড় চাকরি করে, কে কত বড় ব্যবসায়ী, কার গাড়ি কী ব্র্যান্ডের এবং তা নতুন না পুরাতন; কার ফ্ল্যাট নিচে আর কারটা ওপরে, কার সাইজ কত বড়, ছেলেমেয়েরা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে ইত্যাদি।

এছাড়াও বছরে কে কতবার ফ্যামিলি নিয়ে দেশের বাইরে যায়, সপ্তাহে কবার দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করে এবং পোশাক-আশাক, আত্মীয়-স্বজনের প্রভাব প্রতিপত্তি হয়ে ওঠে পরিচয়ের আলাদা সূচক। এগুলোর সাদৃশ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয় ছোট ছোট ক্লিক বা উপদল। দ্রুতই ফ্ল্যাটের মধ্যে আপার ক্লাস, মিডল ক্লাস ও লোয়ার ক্লাস তৈরি হয়। একবার তা তৈরি হলে তা হয়ে ওঠে এক অভেদ্য প্রাচীর। ফ্ল্যাট সংস্কৃতির মূল প্রবণতা হলো সবাই মিলে একা।

ফ্ল্যাটের তথাকথিত আপার ক্লাস বা মিডল ক্লাসের সঙ্গে লোয়ার ক্লাসের মতবিরোধ হলে তা খুব অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে ফ্ল্যাটে বসবাস করতে প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা। এ দক্ষতা না থাকলে পথ হয় কণ্টকাকীর্ণ।

ফ্ল্যাটের দুটো গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হলো নিরাপত্তাপ্রহরী ও কাজের সহায়ককর্মী। নিরাপত্তাপ্রহরীদের বেঁচে থাকার কৌশল আলাদাভাবে দেখার আগ্রহ তৈরি করে। যারা পেশাদার নিরাপত্তাপ্রহরী নয়, তারা কেবল শরীর নিয়ে এ মহানগরে আসে এ কাজের জন্য। ফ্ল্যাট সদস্যদের মনস্তত্ত্ব, আচার-আচরণ, ফ্ল্যাটের ক্ষমতা-কাঠামো বুঝেশুনে ও ভারসাম্য বজায় রেখে তাদের চলতে হয়।

কোনো কারণে এ বিচ্যুতি হলে চাকরি খোয়াতে হয়। সাধারণ অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষকে খুশি করে তারা চলে। নিরাপত্তাপ্রহরীরা ফ্ল্যাটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হালচাল বেশ ভালোই বোঝে। সম্ভাব্য সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গেও তারা সখ্য বজায় রাখে।

নিরাপত্তাপ্রহরীদের সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হয়। স্বল্প বেতনে নিজেদের চলতে হয়, পরিবারের কাছে মাস শেষে টাকা পাঠাতে হয় এবং ফ্ল্যাটের সদস্যদের মন জুগিয়ে চলতে হয়। ফ্ল্যাটের মালিকরা ভাবসাবে তো একেকটি সাম্রাজ্যের অধিপতি। এসব রাজাদের খুশি রাখা সহজ কাজ নয়, যা সাফল্যের সঙ্গে গ্রাম থেকে আসা এক নিরীহ নিরাপত্তাপ্রহরী করে চলে।

কাজের সহায়ক নারীকর্মীরাও আরেক অনুঘটক। ফ্ল্যাটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের রয়েছে কখনও নিকটবর্তী ও কখনও দূরবর্তী সংযোগ। একটা ফ্ল্যাটবাড়ির একাধিক ফ্ল্যাটে যখন কোনো নারী সহায়ক কাজ করে তখন সে নিজের অবস্থান পোক্ত করার জন্য এক ফ্ল্যাটের তথ্য আরেক ফ্ল্যাটে শেয়ার করে। এসব নারীকর্মী কনফ্লিক্ট কানেক্টর হিসেবে কাজ করে।

ফ্ল্যাট বাড়িতে সবসময় একধরনের মানসিক চাপে থাকে ভাড়াটিয়ারা। ফ্ল্যাট মালিকরা তাদের প্রতি রাখে তীর্ষক নজর। অনেকসময় তাদের ছোটখাটো বিষয়েও ফ্ল্যাট মালিকরা যৌক্তিক আচরণ করে না। ভাড়াটিয়াদের বাস করতে হয় এক উপেক্ষিত সংস্কৃতির মধ্যে অথচ তারা ভাড়া দিয়েই ফ্ল্যাটে বাস করে।

আধুনিক নগরজীবনে ফ্ল্যাট সংস্কৃতি হয়ে উঠছে ভঙ্গুর সামাজিক সম্পর্কের এক মিলনস্থল। সামাজিক প্রেক্ষাপটে যূথবদ্ধভাবে বাসের অভ্যাসের ঐতিহ্য থাকলেও ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে সৌহার্দ্য, সংহতি, স্বস্তি ও মর্যাদা নিয়ে বাস করার মসৃণপথ এখনও নির্মিত হয়নি- হয়ত হবে কোনো একদিন।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন

বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু

বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু

ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশে হচ্ছে না, আরও বহু দেশেই হচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বর হওয়া সরকারের ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতা বা অপরাধ হলো তার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল, তা না করা। গত বছরই বিভিন্ন সংস্থা থেকে এডিস মশা বৃদ্ধির ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আসলে দেশের মানুষের জীবন ও দুর্ভোগ নিয়ে দায়িত্ববোধ বা জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি এ রকম হতো না। এ ব্যাপারে সরকার ও সিটি করপোরেশনকে গা-ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামতে হবে।

করোনাভাইরাসের আতঙ্কের মধ্যেই দেশজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। দেশে গত মাসের প্রথম ১৫ দিনের চেয়ে চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। আগস্ট মাসের প্রথম ১৫ দিনে ডেঙ্গু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৪৯ জন। আর চলতি সেপ্টেম্বর মাসে একই সময়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৪৭৫ জন।

ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা৷ ইতোমধ্যে ৪০টিরও বেশি জেলায় ছড়িয়েছে এর সংক্রমণ। ডেঙ্গু চিকিৎসা নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তিত হয়ে উঠেছে নগরবাসী। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন স্বজনেরা। প্রচণ্ড জ্বর, বমি, গা ব্যথা এবং কারো কারো ক্ষেত্রে হাতে-পায়ে ফুসকুড়ি কিংবা র‌্যাশ ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর জন্য প্রায় প্রতিদিনই রক্তের খোঁজে ছুটছেন স্বজনরা। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে কীভাবে দূরে থাকা যায়, কী করে সহজে প্রতিকার পেতে পারেন আক্রান্তরা— এ নিয়ে অনেকেই চিন্তিত ও দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।

ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়। স্বাধীনতার আগে থেকে এই রোগের সংক্রমণ ছিল। তবে ২০০০ সাল থেকে মূলত সরকারিভাবে রোগটিকে আমলে নেয়া হয়। দুই দশক ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, রোগী ব্যবস্থাপনা ও এডিস মশা নির্মূলকরণে কাজ করছে সরকার। কিন্তু তাতে কোনো ফল মিলছে না। প্রতিবছরই ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফিরে আসছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা মোটেও সন্তোষজনক নয়।

প্রথম থেকেই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বলা হচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। রোগীর সংখ্যা, মৃতের সংখ্যা কমিয়ে বলা সরকারের অন্যতম তৎপরতা। এর বাইরে মাঝে মাঝে মূল সড়কে ফগার মেশিন নিয়ে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের মহড়া ছাড়া তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।

করোনা নিয়ে অধিক ব্যস্ত থাকায় এ বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এর ফলে এখন ডেঙ্গু করোনার চেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অথচ হাসপাতালগুলোতে ঠিকমতো চিকিৎসা মিলছে না। এর দায়ভাগ সরকারেরও আছে।

সরকার সঠিক সময়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্রমাগত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলছে। যে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়, সেটাও কার্যকর করতে পারে না। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছে। ঢাকা শহরে এখন চরম মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রাজধানী ও এর আশপাশের ছয়টি হাসপাতালকে ডেডিকেটেড ঘোষণা করা হয় গত ২৩ আগস্ট। এই হাসপাতালগুলো হচ্ছে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, টঙ্গীর শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল, কমলাপুর রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল, ২০ শয্যার আমিনবাজার সরকারি হাসপাতাল, মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল ও কামরাঙ্গীরচর ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। শেষ খবর পাওয়া পর‌্যন্ত কিন্তু এই হাসপাতালগুলো এখনও ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এসব হাসপাতালে শুরু হয়নি ডেঙ্গুর চিকিৎসা। তা ছাড়া রয়েছে জনবলেরও সংকট। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ রোগীরা।

প্রস্তুতি না থাকার পাশাপাশি যেসব হাসপাতালকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে, এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচার চোখে পড়ছে না। ফলে এসব হাসপাতাল সম্পর্কে জানেন না অনেকে। তা ছাড়া এসব হাসপাতালে চিকিৎসার অনেক প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও নেই। গুরুতর অসুস্থদের এসব হাসপাতালে চিকিৎসার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে এবার ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ব্লাড প্রেশার কমছে, পেট ও বুকে পানি চলে আসছে, শকে চলে যাচ্ছে, রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এবার মশাবাহিত এই ভাইরাস সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থতার হারও বেড়েছে। আগে যেখানে শকে যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ শতাংশের মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রে জটিলতা হতো, এবার সেই হার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

অথচ এ বছরই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার ও সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি সবচেয়ে কম। যদিও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ওষুধ ছিটানো এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মতো নানা পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছে। কিন্তু সেসবের কার্যকারিতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মশা মারার ওষুধ আনা এবং বিতরণ নিয়ে নানা রকম সমালোচনাও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, মশার ওষুধ ছিটানো হয় কেবল প্রধান সড়কের আশপাশে। কিন্তু বিভিন্ন গলি, দুই বাসার ফাঁক-ফোঁকর, আরও নানা ধরনের দুর্গম স্থানে যেখানে ওষুধ ছিটানোর দায়িত্বে থাকা কর্মীরা সহজে পৌঁছতে পারেন না, সেখানে নিরাপদে এডিস মশা বংশ বৃদ্ধি করতে থাকে।

সিটি করপোরেশন সঠিক সময়ে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় ও উপযুক্ত কীটনাশক ব্যবহার না করায় ঢাকায় ভয়াবহ আকারে ডেঙ্গু বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন অ্যাডাল্ট মশা মারা। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কোনো হাত নেই। এই কাজটি অবশ্যই সিটি করপোরেশনকেই করতে হবে। কিন্তু তারা সেই কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছে না।

সিটি করপোরেশন যে ফগিং করে সেটি ত্রুটিপূর্ণ। তাছাড়া তাদের লোকবল ও কর্মীদের দক্ষতা নিয়েও সন্দেহ আছে। তাদের অধিকাংশ কাজ ত্রুটিপূর্ণ। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। দেশের যারা স্বীকৃত কীটতত্ত্ববিদ আছেন, তাদের পরামর্শও শোনা হয় না।

সরকারের দিক থেকে পরিকল্পিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। কারণ এডিস মশা তাৎক্ষণিককভাবে নির্মূলকরণের ব্যাপার নয়। সারা বছর ধরে এডিসের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি কোনো গ্রহণ করতে দেখা যায় না।

কীটনাশক প্রয়োগ এবং ডেঙ্গু ঠেকাতে নাগরিকদের যুক্ত করার ক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগ নেই। বিশেষ করে স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করে পাড়ায় পাড়ায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা কমিটি গঠনের কাজটি একেবারেই করা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কাউন্সিলরদেরও কাজে লাগানো হচ্ছে না।

এই কাজে রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরও ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্ষমতাসীন দল এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। রাজনৈতিক দলের কর্মীরা কেবল চাঁদাবাজি করবে, ক্ষমতার দাপট দেখাবে, দলের নেতানেত্রীদের নামে স্লোগান দেবে, দেশের মানুষের কল্যাণের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলবে, আর বাস্তবে আত্মকেন্দ্রিক একটা মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে, তা হয় না। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার প্রয়োজন।বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের। ঢাকা শহরের প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় আওয়ামী লীগের কমিটি আছে।

এই কমিটিকে এলাকার পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যুক্ত করা যেতে পারে। যারা নিজি এলাকায় এডিস মশার বংশ ধ্বংস করার জন্য সপ্তাহে অন্তত একদিন হলেও অভিযান পরিচালনা করবেন। কোনো এলাকায় কোনো ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেলে সেই এলাকায় কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থেকে ডেঙ্গু মশার প্রজননস্থল খুঁজে বের করে সেটা ধ্বংস করার অভিযানে নেতৃত্ব দেবেন। কেবল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীর উপর নির্ভর করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এর জন্য স্থানীয় নাগরিকদের যুক্ত করতে হবে। তাদের ভূমিকা জোরদার করতে হবে।

ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশে হচ্ছে না, আরও বহু দেশেই হচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বর হওয়া সরকারের ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতা বা অপরাধ হলো তার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল, তা না করা। গত বছরই বিভিন্ন সংস্থা থেকে এডিস মশা বৃদ্ধির ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আসলে দেশের মানুষের জীবন ও দুর্ভোগ নিয়ে দায়িত্ববোধ বা জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি এ রকম হতো না। এ ব্যাপারে সরকার ও সিটি করপোরেশনকে গা-ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, অন্য জীব দিয়ে এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশক হিসেবে লার্ভি সাইড ও অ্যাডাল্টি সাইডের প্রয়োগ এবং জনগণকে এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ౼ এই চারটি পদ্ধতি সারাবছর ধরে বাস্তবায়ন করতে হবে। সিটি করপোরেশন সারা বছর কাজ করলেও এই চারটি বিষয়কে একত্রিত করে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার কাজটি করে না। এ ব্যপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও অঙ্গীকার প্রয়োজন।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও প্রবন্ধকার

শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

চট্টগ্রামে আরও হাসপাতাল দরকার। এবং হাসপাতাল নির্মাণ করতে চাইলে জায়গা অনেক আছে। কিন্তু সিআরবির সবুজ কিংবা বসতি ধ্বংস করে হাসপাতাল কেন? টাকা থাকলে হাসপাতাল অনেক বানানো যাবে, কিন্তু টাকা থাকলেই দ্বিতীয় সিআরবি পাহাড় কি বানানো যাবে? ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামান্য ক্ষতি কবিতাটি নীতি নির্ধারকদের অনেকেই পড়েছেন। মাঘ মাসের শীত খুব তীব্র কিন্তু শীতের হাত থেকে বাঁচতে দরিদ্র মানুষের কুটিরে আগুন জ্বালিয়ে আগুন পোহানো অন্যায় এবং অমানবিক।

বন্দর নগর, শিল্প নগর, বাণিজ্য নগর হিসেবে চট্টগ্রামকে যেমন সবাই জানে তেমনি জানে পাহাড়, বন, নদী, সমুদ্রের সমন্বয়ে এ এক সুন্দর নগর। বাণিজ্যের আকর্ষণে যেমন মানুষ এসেছে তেমনি সৌন্দর্য দেখতে আসা মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সেই চট্টগ্রাম মহানগরে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব আন্দোলন। বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের মধ্যে ১৮ মার্চ ২০২০ এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটা হলো হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের। এ খবর প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্নভাবে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এর বিরোধিতা করে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে এবং দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

নাগরিকরা একটি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের বিরোধিতা করছেন। শুনতে কি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? নিজের এলাকায় হাসপাতাল কে না চায়? আর এই করোনা দুর্যোগে মানুষ হাড়ে হাড়ে বুঝেছে হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা আর দেখেছে চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা। তাহলে চট্টগ্রামের মানুষের কী হলো? তারা হাসপাতালের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন কেন? একটি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ আসনবিশিষ্ট মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মানুষ কেন প্রতিবাদ করছেন?

এই প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা আন্দোলন করছেন তারা হাসপাতাল চান না এই অপবাদ দেয়া কিংবা এককথায় এই আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কারণটা একটু গভীরে গিয়ে খুঁজতে হবে। যারা আন্দোলন করছেন তারা সবাই চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। চট্টগ্রামের যেকোনো নাগরিক সমস্যায় তারা শুধু বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন না, তারা জনসাধারণের পক্ষে পথে নামেন। এবারও তেমনি এক অভিন্ন দাবিতে তারা আন্দোলনে নেমেছেন। প্রাণ-প্রকৃতিকে বাণিজ্যিক থাবা থেকে রক্ষা করতে তারা আন্দোলনে নেমেছেন, প্রতিদিন পালিত হচ্ছে নানা ধরনের কর্মসূচি। মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন, প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ হচ্ছে।

সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) রক্ষার এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছে যখন প্রকাশ পেয়েছে যে, বাণিজ্যিক হাসপাতাল তৈরির নামে চট্টগ্রামের সিআরবি পাহাড়কে পছন্দ করেছে ইউনাইটেড গ্রুপ আর সরকার তাদের জন্য রেলওয়ের জায়গা বরাদ্দ দিচ্ছে। পিপিপি বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে তৈরি হবে বাণিজ্যিক হাসপাতাল। এই হাসপাতালে সাধারণ মানুষের সেবা নয়, ধনী মানুষের চিকিৎসা হবে।

চট্টগ্রামের জনসংখ্যার বিবেচনায় আরও হাসপাতাল দরকার। এটা কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে– জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে সরকারি হাসপাতাল স্থাপন করা হবে না কেন? হাসপাতালের জন্য সিআরবি পাহাড়-সংলগ্ন এলাকা বেছে নেয়া হলো কেন? বেসরকারি ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক হাসপাতালে সাধারণ জনগণ কি চিকিৎসাসেবা পাবে? একদল চিকিৎসা ব্যবসায়ী আর চিকিৎসাবিলাসীদের জন্য কি চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র আর সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে?

সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ ও হতবাক মানুষের প্রশ্ন, ব্যবসার হাত থেকে কি কিছুই রক্ষা পাবে না? নদী-বন, পাহাড়-সমুদ্র সবই বাণিজ্য আর লুণ্ঠনের থাবায় ক্ষত বিক্ষত। এবার নজর পড়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আধার, সৌন্দর্য আর ফুসফুসের মতো স্থান সিআরবির পাহাড়ের ওপর। চট্টগ্রামের কেন্দ্রস্থলে রেলওয়ে স্টেশন, স্টেডিয়াম, লাভ লেইন, টাইগার পাস, বাটালি হিলের মধ্যখানে এক দারুণ সুন্দর জায়গা এই সিআরবি পাহাড়। একে চট্টগ্রাম মহানগরের শ্বাসকেন্দ্র বললে অত্যুক্তি হয় না মোটেই।

১৮৭২ সালে তৈরি করা বন্দর নগরীর প্রাচীনতম ভবন, ১৮৯৯ সালে তৈরি বাষ্পীয় রেল ইঞ্জিনের মডেল, পাহাড়ের শীর্ষে হাতির বাংলোর পাশে দাঁড়িয়ে একনজরে পুরো চট্টগ্রাম শহর দেখা, সকালে হাঁটা, বিকেলে ঘুরে বেড়ানো, পয়লা বৈশাখসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্থান, শত বছরের পুরোনো বিশাল গাছগুলো দেখে বিস্মিত বা মুগ্ধ হওয়া সব মিলে এই পাহাড় চট্টগ্রামবাসীর প্রশান্তি ও ভালোবাসার স্থান। এক অর্থে একে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সাংস্কৃতিক বলয়। চট্টগ্রামে কেউ নতুন এলে তাকে নিয়ে সিআরবি পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া এক অবধারিত বিষয় চট্টগ্রামবাসীর কাছে।

শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, সিআরবি এলাকা জড়িয়ে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন আর স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে। এর পাশেই আছে হাসপাতাল কলোনি যা আব্দুর রব কলোনি নামে পরিচিত সেখানে আছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রবসহ ১০ জন শহিদের কবর। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে বলতে মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জনকে বিসর্জন দেয়ার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বর্তমান সরকার।

এখন অতীতের স্মৃতি রক্ষার চাইতে ভবিষ্যতের ব্যবসা তাদের কাছে অনেক লোভনীয় বিষয়। তাই সংবিধানের ধারাকে উপেক্ষা করতেও তারা দ্বিধা করছে না। সংবিধানের ১৮ ক ধারা অনুসারে রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নয়ন করবে। প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা বিধান করবে। সংবিধানের এই ধারা অনুযায়ী সিআরবিতে কোন ধরনের স্থাপনা সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

জনগণের অসন্তোষ ও আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য এখন নতুন কৌশল অবলম্বন শুরু হয়েছে। বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নামে ইউনাইটেড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা প্রচার শুরু করেছে তারা। আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করতে আবেগের ব্যবহার করার এ এক পুরোনো কৌশল। প্রথমত, হাসপাতাল হবে, দ্বিতীয়ত, বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নাম এই দুই বিষয়কে সামনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে কোনো কোনো পক্ষ থেকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বীরকন্যা প্রীতিলতার নামে ছাত্রী হলের নামকরণের দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তখনও আন্দোলনকে ভিন্নখাতে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যে এরকম তৎপরতা চালানো হয়। কিন্তু তখন সেটা ছিল ছাত্রী হলের নামকরণ নিয়ে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি। কিন্তু এখন চিকিৎসা ব্যবসায়ীর মুনাফা অর্জনের কাজে আবেগের ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আন্দোলনকে বিভক্ত ও দুর্বল করার জন্যও বিভিন্নমুখী তৎপরতা শুরু হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরবাসীর প্রশ্ন, রাষ্ট্রের সম্পদ, দেশের ঐতিহ্য, সাধারণ মানুষের শ্বাস নেবার জায়গা সব কিছু কি গৌণ হয়ে যাবে মুনাফা শিকারিদের কৌশলের কাছে?

বন-পাহাড়, নদী-সাগর মিলে চট্টগ্রাম প্রকৃতির এক অপূর্ব সুন্দর স্থান। কিন্তু রেল, বন্দরসহ পাহাড়ের জায়গা লুণ্ঠন, দখল ও দূষণে অবস্থা এখন যা দাঁড়িয়েছে কিছুদিন পর বলতে হবে একসময় খুব সুন্দর জায়গা ছিল। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় চাক্তাই খালের মরণ দশার কারণে জলাবদ্ধতা, পাহাড় কেটে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সৌন্দর্য নষ্ট করার ফলে চট্টগ্রাম এখন যানজট ও জলজটের শহরে পরিণত হয়েছে।

সুন্দর কিছু গড়ে ওঠে প্রকৃতি আর মানুষের শ্রমে। আর তাকে ভোগদখল করতে চায়, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ বানাতে চায় সুবিধাভোগীরা। এ কাজে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে তারা সিদ্ধহস্ত। অতীতের ধারাবাহিকতায় সিআরবি পাহাড় এখন তাদের সর্বশেষ টার্গেট। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে পাঁচতারা হোটেলের মতো হাসপাতাল হবে, সুদৃশ্য ভবনের মেডিক্যাল কলেজ হবে।

সেখানে চিকিৎসা নেবেন এবং ছেলেমেয়েদেরকে পড়াবেন যাদের অঢেল টাকা আছে। যদিও তাদের টাকা আসবে জনগণকে শোষণ করে বা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেই। আর পরিবেশ ধ্বংস ও সম্পদ লুণ্ঠনের দায় ভোগ করবে জনগণ। অভিজ্ঞতা বলে প্রতিবাদ না করে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলে জনগণের সম্পত্তি পাহাড় ধনশালী আর ক্ষমতাশালীদের কুক্ষিগত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না।

চট্টগ্রামে আরও হাসপাতাল দরকার। এবং হাসপাতাল নির্মাণ করতে চাইলে জায়গা অনেক আছে। কিন্তু সিআরবির সবুজ কিংবা বসতি ধ্বংস করে হাসপাতাল কেন? টাকা থাকলে হাসপাতাল অনেক বানানো যাবে, কিন্তু টাকা থাকলেই দ্বিতীয় সিআরবি পাহাড় কি বানানো যাবে? ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামান্য ক্ষতি কবিতাটি নীতি নির্ধারকদের অনেকেই পড়েছেন। মাঘ মাসের শীত খুব তীব্র কিন্তু শীতের হাত থেকে বাঁচতে দরিদ্র মানুষের কুটিরে আগুন জ্বালিয়ে আগুন পোহানো অন্যায় এবং অমানবিক। তাই রানীকে শাস্তি পেতে হয়েছিল। ছোটবেলায় পড়া এই কবিতার মর্মার্থ কি আমরা উপলব্ধি করতে শিখব না, নাকি পাঠ্যপুস্তকের এই কবিতা শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য পড়া হিসেবে বিবেচিত হবে?

একদল মানুষের মুনাফা অর্জন, প্রজেক্ট দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, কিছু মানুষের চিকিৎসা বিলাসিতার জন্য সাধারণ মানুষের সম্পদ কেড়ে নেয়া হবে? একবার কি ভাববেন না, সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য জায়গা কোথায়? ছেলেমেয়েরা মুক্ত পরিবেশে ছোটাছুটি করবে এমন খোলা জায়গা কোথায়? ৬০ লাখ অধিবাসীর চট্টগ্রাম মহানগরে বুক ভরে শ্বাস নেয়ার জায়গা দিন দিন কমে আসছে।

যারা নগরটিকে নিজেদের প্রিয় আবাসভূমি মনে করেন তারা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেন, আগে চট্টগ্রাম ছিল এক সবুজে ঘেরা শহর। সেই সবুজ যেন দিন দিন বিতাড়িত হচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে। সুন্দর পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ কেউ তৈরি করেনি। প্রাকৃতিক নিয়মে তা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ প্রকৃতিকে সাজিয়ে রাখবে না কি সংহার করবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। যোগাযোগের সুব্যবস্থা আর খোলামেলা পরিবেশে হাসপাতাল চিকিৎসা ব্যবসায়ীদের জন্য লোভনীয় কিন্তু তাদের লোভ ও লাভের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাধারণের সম্পত্তি কেড়ে নেয়া অন্যায় ও অমানবিক, এই বোধ কি জাগবে না?

সিআরবি রক্ষার আন্দোলনে চট্টগ্রামে যারা পথে নেমেছেন যারা তারা তাদের কর্তব্যের কথা সুস্পষ্টভাবেই বলছেন। তারা হাসপাতালের বিরুদ্ধে নন, তারা প্রকৃতি-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষা করতে চান। তারা সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজ সবই চান কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংসের বিনিময়ে নয়। যখন থেকে আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে তখন থেকেই প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক দেশের জনগণ। এ কথা আমদের সংবিধানেও উল্লেখ আছে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রাকৃতিক সম্পদকে সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু যদি মুনাফা শিকারিদের হাতে সম্পদ ও ঐতিহ্য তুলে দেয়া হয় তখন সেই অপচেষ্টা রুখে না দাঁড়ালে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ তৈরি হবে কীভাবে? ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায় থেকেই সিআরবি পাহাড় ও তার সৌন্দর্যকে রক্ষা করতে হবে। এই আন্দোলন শক্তিশালী না হলে যেখানেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেখানেই বাণিজ্যের থাবা পড়বে। তা বান্দরবনের ম্রো জনগোষ্ঠীর পাহাড় কিংবা সিআরবি পাহাড় যা-ই হোক না কেন!

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

শেয়ার করুন

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: দুই দলের প্রস্তুতির হাওয়া

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: 
দুই দলের প্রস্তুতির হাওয়া

বিএনপির সামনে বেশ কিছু জটিল সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ এবং অসুস্থ। সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি জামিনে বাসায় আছেন। দ্বিতীয়ত, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও বিচারিক আইনে দণ্ডিত। তিনিও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বিএনপি মূলত এই দুজনের নির্দেশনা ও ভাবমূর্তিতে পরিচালিত হয়। তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিযুক্ত।

বৈশ্বিক করোনা সংক্রমণের ঢেউ দেশে এখনও পুরোপুরি কমেনি। সবেমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে ব্যবসা- বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শিল্প-কলকারখানা, যানবাহন, পর্যটনসহ সব কিছু খুলে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দেড় বছরে করোনার দুটি ঢেউ দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসনসহ সবক্ষেত্রে বড় ধরনের আঘাত সৃষ্টি করেছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেশ সময়ের প্রয়োজন। শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম বজায় রাখা দরকার। সবকিছুই নির্ভর করবে করোনার নতুন কোনো ঢেউ আবার যেন হানা না দেয় তার ওপর। সেটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। দুনিয়ার অভিজ্ঞতা এখনও সুখকর নয়। অনেক দেশেই করোনার চতুর্থ ঢেউ এবং নতুন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব ঘটতে দেখা যাচ্ছে। সেকারণেই আমাদের দেশে কতদিন বর্তমান সহনীয় অবস্থাটি দেখতে পাব তা নিশ্চিত করে বলে যায় না।

এমনই এক অনিশ্চিত অবস্থায় দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের হাওয়া দুই বড় দলের দিক থেকে বয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এই হাওয়া বইয়ে দেয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে ২০২৩ সালের শেষ সপ্তাহে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। সেই হিসাবে বাকি রয়েছে দুই বছর তিন মাসের মতো সময়। করোনার সংক্রমণ যদি বর্তমান ধারায় কমে আসতে থাকে তাহলে রাজনৈতিক সভা সমাবেশ বা কর্মকাণ্ড হয়ত স্বাভাবিক গতিতে দলগুলো পরিচালিত করতে মাঠে নামবে। কিন্তু সেই নামাটি যদি আবার নতুন কোনো কোভিড ভ্যারিয়েন্টের রূপান্তর ঘটায় তাহলে পরিস্থিতি কী হবে বলা মুশকিল।

এই বছরের শুরুতে ভারতে বেশ কিছু রাজ্যসভা নির্বাচনের পর ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ ভারতকে কতটা নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল সেটি সবারই স্মরণে থাকার কথা। আমরাও সেই ঢেউয়ে অনেকটাই ভেসে বেড়াচ্ছি। সুতরাং নির্বাচনি হাওয়া বইয়ে দেয়ার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা ২০২২-২৩ সালে কতটা সুখের হবে, জনগণ তাতে কতটা স্বাছন্দ্যে অংশ নেবে সেটি তখনকার পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে। বেশিরভাগ মানুষই করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে কমবেশি অবগত। একইসঙ্গে দেড় বছরে অনেক মানুষ করোনার কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্বজনদের হারিয়েছে, এখনও অনেকে কোভিড-উত্তর শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত।

ফলে সামনের দিনগুলো আগের মতো মানুষকে রাজনৈতিক মাঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নামতে খুব বেশি উদ্বুদ্ধ করবে এমনটা আশা করা মনে হয় প্রশ্নের মধ্যেই থাকবে। তাছাড়া জীবন-জীবিকার সংগ্রাম বিপুলসংখ্যক মানুষের সামনে এখন গুরত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার যে সুযোগটি যার যার সামনে রয়েছে তারা সেটাকেই প্রাধান্য দেবেন- এটাই স্বাভাবিক। দেশে গত একযুগে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে।

সামাজিকভাবেও মানুষের একটি নতুন অবস্থান তৈরি হয়েছে। করোনার অভিঘাতে পড়েও মানুষ দেড় বছর নিজেদেরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ধরে রাখার বেশ কিছু অবলম্বন খুঁজে নিতে পেরেছে। সুতরাং সামনের দিনগুলোতে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি বেশিরভাগ মানুষই সৃষ্টি হওয়ার পক্ষে যেতে চাইবে না। তাছাড়া আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা মানুষকে নতুন কিছু উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মানুষ যখন দেখছে ক্ষমতার পরিবর্তন সেখানে অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকারে খারাপের দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের মানুষজন আসবাবপত্র পানির দামে বিক্রি করতে চাইলেও গ্রাহক খুঁজে পাচ্ছে না, খাদ্যসংকট চরম আকার ধারণ করতে যাচ্ছে।

নারীরা রাস্তায় তাদের অধিকারের জন্য মিছিল করছে, ক্ষমতাসীনরা নারীদেরকে শিক্ষা, চাকরি ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত করার সব বেআইনি কর্মকাণ্ড চালিয়ে দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সর্বত্র এক ধরনের পর্যবেক্ষণ দেশের রাজনীতির উত্থান পতনে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে যুক্ত হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই কেউ বিরাজমান স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ুক, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য বাংলাদেশে তৈরি হোক সেটি খুব বেশি সমর্থন পাবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ২০১৩-১৫ সালের নৈরাজ্যকর অভিজ্ঞতা এখনও দেশে অনেকের স্মরণে আছে। সেকারণে বাংলাদেশে আগামী ২ বছর রাজনীতিতে সংঘাত সংঘর্ষের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে কাবুলের মতো নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ন্যূনতম সুযোগ সৃষ্টিতে বেশিরভাগ মানুষই অংশ নেবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সভা গণভবনে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর। এতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ৫৩ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। তারা দলের নিজ নিজ এলাকার পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন। এতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিস্থিতি, নেতৃবৃন্দের কার্যক্রম, কোথাও কোথাও দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা হয়।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অনেক স্থানেই নেতাকর্মীদের জনসংযোগ ও সম্পৃক্ততার অভাব সম্পর্কে নেতৃবৃন্দ দলের সভাপতিকে অবহিত করেন। দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় থাকার কারণে অনেক জায়গায় নেতাকর্মীদের মধ্যে চাওয়া পাওয়া ও দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করছে। তারপরও করোনার এই সংকটময়কালে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী সাধারণ মানুষকে নানাভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করেছেন। অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণও করছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা শেষে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি দলের অভ্যন্তরে যারা কোন্দল ও সংঘাতে লিপ্ত আছেন তাদেরকে হুঁশিয়ার করে দেন এবং দলের জন্য যারা অবদান রাখছেন তাদেরকে দলের কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন।

আগামী নির্বাচন উপলক্ষে তিনি দলের প্রস্তুতি গ্রহণের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন উপকমিটিকে পরবর্তী নির্বাচনি ইশতেহারে যে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হবে সেসব বিষয়ে আপডেট করার নির্দেশ দেন। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ শিক্ষা, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কীভাবে বাংলাদেশকে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে কাজ করবে সে সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা ইশতেহারে থাকার কথা তিনি জানান।

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এই সভার পর জাতীয়তাবাদী দল ( বিএনপি) নড়েচড়ে ওঠে। প্রথমে দলটি জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত মহিলা দলের এক সভায় বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কথা উল্লেখ করেন। ওই সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অনুষ্ঠিত হতে না দেয়ার কথাও উল্লেখ করেন। এরপরেই গত মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে বিএনপি এক জরুরি সভা আহ্বান করে।

২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারির পর এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বর্তমানে তিনি কারাদণ্ডে থাকায় দলের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারছেন না। এই অবস্থায় লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও কারাদণ্ডে দণ্ডিত। সেকারণে লন্ডন থেকে তিনি অনলাইনে বিএনপির গুলশানস্থ চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন, যা গণমাধ্যমে আইনগতভাবে প্রকাশিত হওয়ার বিধান না থাকায় প্রদর্শিত হয়নি। মঙ্গলবারের সভায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যগণ অংশ্রগ্রহণ করেন, বুধবার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম ও যুগ্ম সম্পাদক এবং বৃহস্পতিবার দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বসেছেন। সভায় অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দের মধ্য থেকে অনেকেই আগামীদিনের আন্দোলন সংগ্রাম ও নির্বাচনের ব্যাপারে বক্তব্য প্রদান করেন। নেতৃবৃন্দ নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না মর্মে অভিমত প্রকাশ করেন। একারণেই তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় চালু করার দাবিতে আন্দোলন করার ওপর জোর দেন। সেক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ কিংবা যুগপৎভাবে আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য দলকে প্রস্তুত করার কথা জানান।

এছাড়া আগামী সপ্তাহে বিএনপির সমমনা পেশাজীবীদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের একটি সম্ভাবনার কথা গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। সভার কার্যক্রম যেহেতু রুদ্ধদ্বার ছিল তাই ভেতরের সব কথা বাইরে জানা যায়নি। বোঝা গেছে বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গুরত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সেজন্য দলটি বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নয় বরং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন সংগঠিত করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে। সেক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনো মূল্যে ত্যাগ স্বীকার করার আন্দোলন দাঁড় করাতে সবাইকে সংগঠিত করার কাজে নামতে ব্যাপক সাংগঠনিক সফর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হয়ত শিগগিরই বিএনপি নেতৃবৃন্দ সেভাবে মাঠে নামবে।

বিএনপির সামনে বেশ কিছু জটিল সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ এবং অসুস্থ। সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি জামিনে বাসায় আছেন। দ্বিতীয়ত, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও বিচারিক আইনে দণ্ডিত। তিনিও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বিএনপি মূলত এই দুজনের নির্দেশনা ও ভাবমূর্তিতে পরিচালিত হয়।

তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিযুক্ত। দলের অভ্যন্তরে কোন্দল এবং নিষ্ক্রিয়তা দীর্ঘদিন থেকে বিরাজ করছে। এছাড়া ২০০১-০৬ সালের জোট সরকারের কর্মকাণ্ডে দেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির ভাবমূর্তির চরম সংকট এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সবচাইতে অপব্যবহারটি ২০০৬ সালে জোট সরকারের হাতেই ঘটেছিল। সেকারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রতি সমর্থন জোরালো করার ভিত্তি বিএনপির খুব বেশি জোরালো হবে না। এছাড়া জামায়াত ও স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দলটির আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা সম্পর্ক বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি, জঙ্গিবাদী এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থানকেই উৎসাহিত করবে এটি নিশ্চিত হওয়ায় রাজনীতি সচেতন মহল, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রতি আগের মতো আস্থা রাখার পর্যায়ে নেই।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে মাঝারি পর্যায় পর্যন্ত অনেকের কর্মকাণ্ডে সমাজে ক্ষোভ এবং সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা বর্তমান দেশীয় এবং বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে যেভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার সঙ্গে পাল্লা দেয়ার নেতৃত্ব বিএনপি বা অন্য কোনো দলে দেখা যাচ্ছে না। সেকারণে সুশাসন, নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে যে অসন্তুষ্টি রয়েছে তা এককভাবেই যেমন আওয়ামী লীগের ওপর দায় চাপিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, তেমনি বিরোধী দল যতক্ষণ পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের ধারায় ফিরে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্যাগুলো একক কোনো দল বা জোটের পক্ষে সমাধান করাও সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করা না গেলে সুশাসন, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের বিকাশ নিশ্চিত হওয়া নয়।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক

শেয়ার করুন