গণমাধ্যমবান্ধব বঙ্গবন্ধু

গণমাধ্যমবান্ধব বঙ্গবন্ধু

তফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের গভীর হৃদয়ের সম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অনুরোধে সোহরাওয়ার্দী প্রথমে তাকে দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং তাকে পত্রিকাটির প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন। ১৯৬৬ সালে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন, তখন দৈনিক ইত্তেফাক তার পক্ষে জনমত গড়ে তুলে পাকিস্তানি জেনারেলের ক্ষমতা ভেঙে দিতে সহায়তা করে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭ সাল থেকেই ছিলেন বাঙালি জাতির প্রধান আকর্ষণ। বাঙালি জাতির মুক্তির ইতিহাস তাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে ধীরে ধীরে বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা ও স্থপতি হয়ে উঠেছেন তাতে যোগাযোগ কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে দেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

১৯৪২ সালে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করার পর, যখন তরুণ শেখ মুজিব কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যান, তখন তিনি সরাসরি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে জাতীয় পরিসরে রাজনীতি করা। সুতরাং, তিনি অবিভক্ত বাংলার কিংবদন্তী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলেন। তরুণ নেতা হিসেবে শেখ মুজিব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

এই সময় থেকে সংবাদপত্র অফিসে তার যাতায়াত শুরু হয়। কলকাতায় দৈনিক আজাদের কার্যালয়ে, সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন সময় পেলেই। বঙ্গবন্ধু তখন থেকেই মিডিয়ার বন্ধু ছিলেন। সাংবাদিক এবং সংবাদপত্র অফিসের অবস্থান ছিল তার হৃদয়ে। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের সব আন্দোলন-সংগ্রামে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অবিস্মরণীয় ছিল। মহান নেতা স্বাধীনতার সময় সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে আখ্যা দিয়েছিলেন সংগ্রামের প্রতিভূ হিসেবে।

ভাষা আন্দোলনে গণমাধ্যমের অবদান, ছয় দফা দাবি বাংলাদেশের জনগণের বেঁচে থাকার দাবি হিসেবে উপস্থাপনে গণমাধ্যমের অসামান্য অবদান।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবন থেকেই মিডিয়াতে অনেক বন্ধু ছিলেন। সাংবাদিক এবং সংবাদপত্র অফিসের অবস্থান ছিল তার হৃদয়ের কাছাকাছি। সাংবাদিকদের মধ্যেও তার অনেক বন্ধু ছিল। তার অমর সৃষ্টি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মিডিয়া। এর প্রতি তার গভীর আগ্রহ ও বিশ্বাস পরবর্তীকালে বড় রকমের সহায়ক হয়।

বাংলাদেশের সব আন্দোলন-সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল অসীম। এই মহান নেতা মুক্তিযুদ্ধের সময় সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে ‘গণমাধ্যম’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, শুধু সংবাদমাধ্যম নয়। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। গণমাধ্যমের গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলার সময় বঙ্গবন্ধু তার স্মৃতিতে উল্লেখ করেন যে,“আমার বাবা বাড়িতে সংবাদপত্র রাখতেন; আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী এবং সওগাত।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১০) তারপর তিনি পূর্ব বাংলার গণমাধ্যমের রাজনীতি এবং ইতিহাস সম্পর্কে কথা বলেন। তৎকালীন জনগণের কল্যাণে এই ধারার নেতৃবৃন্দ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ।

তরুণ মুজিব কলকাতায় তার জীবনে মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাই তাকে প্রায়ই মুসলিম লীগের প্রেস রিলিজ দিতে পত্রিকার অফিসে যেতে হতো। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন যে, মওলানা আকরম খাঁ সম্পাদিত দৈনিক আজাদ মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে সমর্থন করে। সুতরাং, ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আর্থিক সহায়তায় তারা দৈনিক ইত্তেহাদ প্রকাশ করেন।

এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন আবুল মনসুর আহমেদ। ম্যাগাজিনটি ওই সময় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে আধুনিক ম্যাগাজিন হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন রূপে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজেই অক্লান্ত পরিশ্রম করে পত্রিকাটি বাজারজাত করেন। তিনি পত্রিকার ব্যবস্থাপনায় একজন দায়িত্বশীল পরামর্শকও ছিলেন।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পরেও, কাগজটি কলকাতায় প্রকাশিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সংবাদপত্রের ঢাকা অফিসে কাজ করেন এবং পূর্ববঙ্গে এজেন্ট নিয়োগ করে এর ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকার কলকাতা থেকে প্রকাশিত হওয়ায় পূর্ব বাংলায় এই পত্রিকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার মুখপাত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়। মওলানা ভাসানী সম্পাদক ছিলেন, ইয়ার মোহাম্মদ খান প্রকাশক ছিলেন তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) পত্রিকা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পত্রিকার অর্থায়ন করতেন। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে শেখ মুজিবও সমধুর সম্পর্ক থাকায় এই পত্রিকার বিক্রির ব্যবস্থা করেছিলেন।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের আগে ইত্তেফাক সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তর হয়ে যায় এবং তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) সম্পাদক হন।

১৯৫৫ সালে পূর্ব বাংলায় ধারা ৯২ (ক) চালু করা হয়েছিল, রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করা এবং তাদের কার্যালয় বন্ধ করা। দৈনিক ইত্তেফাকও তখন বন্ধ ছিল। কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তফাজ্জল হোসেন বলেছিলেন যে, তিনি আর কোনো কাগজপত্র বের করবেন না। চাকরি নিয়ে করাচি যাচ্ছেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাকে অনুরোধ করেছিলেন- তুমি যাবে না। তুমি চলে গেলে কেউ ইত্তেফাক চালাতে পারবে না। তফাজ্জল হোসেন পরের দিন তাকে বার্তা পাঠান যে, তিনি করাচিতে যাচ্ছেন না।

তফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের গভীর হৃদয়ের সম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অনুরোধে সোহরাওয়ার্দী প্রথমে তাকে দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং তাকে পত্রিকাটির প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন। ১৯৬৬ সালে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন, তখন দৈনিক ইত্তেফাক তার পক্ষে জনমত গড়ে তুলে পাকিস্তানি জেনারেলের ক্ষমতা ভেঙে দিতে সহায়তা করে।

১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের সময় এ দেশের সংবাদপত্রগুলো সাহসী ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়য়ন্ত্র মামলার আদালত রিপোর্টিং, যা দেশদ্রোহিতার অভিযোগে শুরু হয়েছিল, দৈনিক পত্রিকায় তা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। একদিকে ছাত্র গণ-আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবি, অপরদিকে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিদিন মিছিল-সমাবেশ শুরু হয়। জেনারেল আইয়ুব সব দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন।

সেই সময়, সংবাদপত্রগুলো, তাদের সংবাদ, কলাম এবং সম্পাদকীয়তে, পাকিস্তানের শাসকশ্রেণির শোষণ, নির্যাতন এবং বৈষম্যের সঠিক চিত্র তুলে ধরেছিল। পরবর্তীকালে ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের সময় দৈনিকগুলোও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। তারা শেখ মুজিবের সব সিদ্ধান্ত, নির্দেশনা, বিবৃতি, এবং বক্তৃতা প্রথম পৃষ্ঠায় ছবিসহ ছেপেছে। বলা হয়ে থাকে যে, সংবাদপত্র জনগণকে অনুপ্রাণিত ও জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবের রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে বাঙালি জাতির প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। সমগ্র জাতি এক হয়ে গেল। শেখ মুজিব দৈনিক পত্রিকায় অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন, তার নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য ছিল।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর, পর্যন্ত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্দেশে সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের খবর এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের খবর পাওয়ার জন্য তারা আবার আগের মতো সাহসী ভূমিকা পালন করে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে সংবাদপত্রগুলো ‘ঐ আসে মহামানব’ বলে বর্ণনা করে।

স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ শাসন করেন। সেই স্বল্প সময়ে তিনি ৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করেন।

বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম সাংবাদিকদের বাকস্বাধীনতা রক্ষা করেন। গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি মিডিয়ার জন্য কাজ করেছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের জাতীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থাও করেছিলেন। এক কথায়, বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রাজনীতির কবি হলেন সেই চূড়ান্ত মুক্তি যার চেতনা অসীমভাবে প্রত্যাশার ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছে।

লেখক: প্রান্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি

আরও পড়ুন:
যানজট রোধে বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবনা জরুরি
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা ও করণীয়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র ও জিয়ার সম্পৃক্ততা 
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও একজন মানবিক শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: দুই দলের প্রস্তুতির হাওয়া

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: 
দুই দলের প্রস্তুতির হাওয়া

বিএনপির সামনে বেশ কিছু জটিল সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ এবং অসুস্থ। সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি জামিনে বাসায় আছেন। দ্বিতীয়ত, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও বিচারিক আইনে দণ্ডিত। তিনিও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বিএনপি মূলত এই দুজনের নির্দেশনা ও ভাবমূর্তিতে পরিচালিত হয়। তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিযুক্ত।

বৈশ্বিক করোনা সংক্রমণের ঢেউ দেশে এখনও পুরোপুরি কমেনি। সবেমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে ব্যবসা- বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শিল্প-কলকারখানা, যানবাহন, পর্যটনসহ সব কিছু খুলে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দেড় বছরে করোনার দুটি ঢেউ দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসনসহ সবক্ষেত্রে বড় ধরনের আঘাত সৃষ্টি করেছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেশ সময়ের প্রয়োজন। শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম বজায় রাখা দরকার। সবকিছুই নির্ভর করবে করোনার নতুন কোনো ঢেউ আবার যেন হানা না দেয় তার ওপর। সেটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। দুনিয়ার অভিজ্ঞতা এখনও সুখকর নয়। অনেক দেশেই করোনার চতুর্থ ঢেউ এবং নতুন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব ঘটতে দেখা যাচ্ছে। সেকারণেই আমাদের দেশে কতদিন বর্তমান সহনীয় অবস্থাটি দেখতে পাব তা নিশ্চিত করে বলে যায় না।

এমনই এক অনিশ্চিত অবস্থায় দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের হাওয়া দুই বড় দলের দিক থেকে বয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এই হাওয়া বইয়ে দেয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে ২০২৩ সালের শেষ সপ্তাহে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। সেই হিসাবে বাকি রয়েছে দুই বছর তিন মাসের মতো সময়। করোনার সংক্রমণ যদি বর্তমান ধারায় কমে আসতে থাকে তাহলে রাজনৈতিক সভা সমাবেশ বা কর্মকাণ্ড হয়ত স্বাভাবিক গতিতে দলগুলো পরিচালিত করতে মাঠে নামবে। কিন্তু সেই নামাটি যদি আবার নতুন কোনো কোভিড ভ্যারিয়েন্টের রূপান্তর ঘটায় তাহলে পরিস্থিতি কী হবে বলা মুশকিল।

এই বছরের শুরুতে ভারতে বেশ কিছু রাজ্যসভা নির্বাচনের পর ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ ভারতকে কতটা নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল সেটি সবারই স্মরণে থাকার কথা। আমরাও সেই ঢেউয়ে অনেকটাই ভেসে বেড়াচ্ছি। সুতরাং নির্বাচনি হাওয়া বইয়ে দেয়ার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা ২০২২-২৩ সালে কতটা সুখের হবে, জনগণ তাতে কতটা স্বাছন্দ্যে অংশ নেবে সেটি তখনকার পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে। বেশিরভাগ মানুষই করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে কমবেশি অবগত। একইসঙ্গে দেড় বছরে অনেক মানুষ করোনার কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্বজনদের হারিয়েছে, এখনও অনেকে কোভিড-উত্তর শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত।

ফলে সামনের দিনগুলো আগের মতো মানুষকে রাজনৈতিক মাঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নামতে খুব বেশি উদ্বুদ্ধ করবে এমনটা আশা করা মনে হয় প্রশ্নের মধ্যেই থাকবে। তাছাড়া জীবন-জীবিকার সংগ্রাম বিপুলসংখ্যক মানুষের সামনে এখন গুরত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার যে সুযোগটি যার যার সামনে রয়েছে তারা সেটাকেই প্রাধান্য দেবেন- এটাই স্বাভাবিক। দেশে গত একযুগে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে।

সামাজিকভাবেও মানুষের একটি নতুন অবস্থান তৈরি হয়েছে। করোনার অভিঘাতে পড়েও মানুষ দেড় বছর নিজেদেরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ধরে রাখার বেশ কিছু অবলম্বন খুঁজে নিতে পেরেছে। সুতরাং সামনের দিনগুলোতে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি বেশিরভাগ মানুষই সৃষ্টি হওয়ার পক্ষে যেতে চাইবে না। তাছাড়া আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা মানুষকে নতুন কিছু উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মানুষ যখন দেখছে ক্ষমতার পরিবর্তন সেখানে অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকারে খারাপের দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের মানুষজন আসবাবপত্র পানির দামে বিক্রি করতে চাইলেও গ্রাহক খুঁজে পাচ্ছে না, খাদ্যসংকট চরম আকার ধারণ করতে যাচ্ছে।

নারীরা রাস্তায় তাদের অধিকারের জন্য মিছিল করছে, ক্ষমতাসীনরা নারীদেরকে শিক্ষা, চাকরি ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত করার সব বেআইনি কর্মকাণ্ড চালিয়ে দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সর্বত্র এক ধরনের পর্যবেক্ষণ দেশের রাজনীতির উত্থান পতনে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে যুক্ত হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই কেউ বিরাজমান স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ুক, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য বাংলাদেশে তৈরি হোক সেটি খুব বেশি সমর্থন পাবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ২০১৩-১৫ সালের নৈরাজ্যকর অভিজ্ঞতা এখনও দেশে অনেকের স্মরণে আছে। সেকারণে বাংলাদেশে আগামী ২ বছর রাজনীতিতে সংঘাত সংঘর্ষের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে কাবুলের মতো নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ন্যূনতম সুযোগ সৃষ্টিতে বেশিরভাগ মানুষই অংশ নেবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সভা গণভবনে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর। এতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ৫৩ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। তারা দলের নিজ নিজ এলাকার পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন। এতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিস্থিতি, নেতৃবৃন্দের কার্যক্রম, কোথাও কোথাও দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা হয়।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অনেক স্থানেই নেতাকর্মীদের জনসংযোগ ও সম্পৃক্ততার অভাব সম্পর্কে নেতৃবৃন্দ দলের সভাপতিকে অবহিত করেন। দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় থাকার কারণে অনেক জায়গায় নেতাকর্মীদের মধ্যে চাওয়া পাওয়া ও দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করছে। তারপরও করোনার এই সংকটময়কালে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী সাধারণ মানুষকে নানাভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করেছেন। অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণও করছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা শেষে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি দলের অভ্যন্তরে যারা কোন্দল ও সংঘাতে লিপ্ত আছেন তাদেরকে হুঁশিয়ার করে দেন এবং দলের জন্য যারা অবদান রাখছেন তাদেরকে দলের কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন।

আগামী নির্বাচন উপলক্ষে তিনি দলের প্রস্তুতি গ্রহণের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন উপকমিটিকে পরবর্তী নির্বাচনি ইশতেহারে যে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হবে সেসব বিষয়ে আপডেট করার নির্দেশ দেন। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ শিক্ষা, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কীভাবে বাংলাদেশকে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে কাজ করবে সে সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা ইশতেহারে থাকার কথা তিনি জানান।

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এই সভার পর জাতীয়তাবাদী দল ( বিএনপি) নড়েচড়ে ওঠে। প্রথমে দলটি জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত মহিলা দলের এক সভায় বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কথা উল্লেখ করেন। ওই সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অনুষ্ঠিত হতে না দেয়ার কথাও উল্লেখ করেন। এরপরেই গত মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে বিএনপি এক জরুরি সভা আহ্বান করে।

২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারির পর এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বর্তমানে তিনি কারাদণ্ডে থাকায় দলের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারছেন না। এই অবস্থায় লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও কারাদণ্ডে দণ্ডিত। সেকারণে লন্ডন থেকে তিনি অনলাইনে বিএনপির গুলশানস্থ চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন, যা গণমাধ্যমে আইনগতভাবে প্রকাশিত হওয়ার বিধান না থাকায় প্রদর্শিত হয়নি। মঙ্গলবারের সভায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যগণ অংশ্রগ্রহণ করেন, বুধবার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম ও যুগ্ম সম্পাদক এবং বৃহস্পতিবার দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বসেছেন। সভায় অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দের মধ্য থেকে অনেকেই আগামীদিনের আন্দোলন সংগ্রাম ও নির্বাচনের ব্যাপারে বক্তব্য প্রদান করেন। নেতৃবৃন্দ নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না মর্মে অভিমত প্রকাশ করেন। একারণেই তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় চালু করার দাবিতে আন্দোলন করার ওপর জোর দেন। সেক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ কিংবা যুগপৎভাবে আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য দলকে প্রস্তুত করার কথা জানান।

এছাড়া আগামী সপ্তাহে বিএনপির সমমনা পেশাজীবীদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের একটি সম্ভাবনার কথা গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। সভার কার্যক্রম যেহেতু রুদ্ধদ্বার ছিল তাই ভেতরের সব কথা বাইরে জানা যায়নি। বোঝা গেছে বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গুরত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সেজন্য দলটি বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নয় বরং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন সংগঠিত করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে। সেক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনো মূল্যে ত্যাগ স্বীকার করার আন্দোলন দাঁড় করাতে সবাইকে সংগঠিত করার কাজে নামতে ব্যাপক সাংগঠনিক সফর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হয়ত শিগগিরই বিএনপি নেতৃবৃন্দ সেভাবে মাঠে নামবে।

বিএনপির সামনে বেশ কিছু জটিল সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ এবং অসুস্থ। সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি জামিনে বাসায় আছেন। দ্বিতীয়ত, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও বিচারিক আইনে দণ্ডিত। তিনিও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বিএনপি মূলত এই দুজনের নির্দেশনা ও ভাবমূর্তিতে পরিচালিত হয়।

তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিযুক্ত। দলের অভ্যন্তরে কোন্দল এবং নিষ্ক্রিয়তা দীর্ঘদিন থেকে বিরাজ করছে। এছাড়া ২০০১-০৬ সালের জোট সরকারের কর্মকাণ্ডে দেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির ভাবমূর্তির চরম সংকট এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সবচাইতে অপব্যবহারটি ২০০৬ সালে জোট সরকারের হাতেই ঘটেছিল। সেকারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রতি সমর্থন জোরালো করার ভিত্তি বিএনপির খুব বেশি জোরালো হবে না। এছাড়া জামায়াত ও স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দলটির আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা সম্পর্ক বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি, জঙ্গিবাদী এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থানকেই উৎসাহিত করবে এটি নিশ্চিত হওয়ায় রাজনীতি সচেতন মহল, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রতি আগের মতো আস্থা রাখার পর্যায়ে নেই।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে মাঝারি পর্যায় পর্যন্ত অনেকের কর্মকাণ্ডে সমাজে ক্ষোভ এবং সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা বর্তমান দেশীয় এবং বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে যেভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার সঙ্গে পাল্লা দেয়ার নেতৃত্ব বিএনপি বা অন্য কোনো দলে দেখা যাচ্ছে না। সেকারণে সুশাসন, নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে যে অসন্তুষ্টি রয়েছে তা এককভাবেই যেমন আওয়ামী লীগের ওপর দায় চাপিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, তেমনি বিরোধী দল যতক্ষণ পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের ধারায় ফিরে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্যাগুলো একক কোনো দল বা জোটের পক্ষে সমাধান করাও সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করা না গেলে সুশাসন, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের বিকাশ নিশ্চিত হওয়া নয়।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক

আরও পড়ুন:
যানজট রোধে বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবনা জরুরি
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা ও করণীয়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র ও জিয়ার সম্পৃক্ততা 
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও একজন মানবিক শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

শেয়ার করুন

শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান

শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান

ছাত্র-অভ্যুত্থানের তৃতীয় দিনের মধ্যে সরকার শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট স্থগিত এবং একই সঙ্গে ১৯৬৩ সালের স্নাতক পরীক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করার ঘোষণা দেয়। এ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বলা যায়, আইয়ুব খানের মতো তথাকথিত লৌহ মানবও ছাত্র-আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন স্থগিত করতে বাধ্য হন।

১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। পঞ্চাশের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন এবং ষাটের দশকের শেষনাগাদ জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মধ্যে সমন্বয়ক হিসেবে ১৯৬২’র ছাত্র-আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ এ দিবস।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণকারী বাঙালি রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জা প্রথমবারের মতো সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন এবং সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। সামরিক শাসন জারির ২০ দিনের মাথায় মির্জার দেখানো পথেই তাকে উৎখাত করে ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন আইয়ুব খান।

পূর্ব বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে হলে এখানকার শিক্ষা সংস্কৃতিকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এটা আইয়ুব খান খুব ভালো জানতেন। আর তাই ক্ষমতা দখলের দুই মাসের মাথায় ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন শিক্ষাসচিব ড. এস এম শরীফকে প্রধান করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট শিক্ষা-কমিশন গঠন করেন যা ‘শরীফ কমিশন’ নামে পরিচিত।

১৯৫৯ সালের আগস্ট মাসে কমিশন সরকারের কাছে রিপোর্ট হস্তান্তর করে। কমিশনের রিপোর্টে ষষ্ঠ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক, উর্দুকে সর্বজনীন ভাষায় রূপান্তর, উর্দু ও বাংলা ভাষার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে পাকিস্তানের জন্য একটি অভিন্ন বর্ণমালার সুপারিশ এবং অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাকে অবান্তর বলে ঘোষণা করা হয়। কমিশনের সুপারিশে- ১. প্রতিটি স্কুলে ৬০ শতাংশ ব্যয় সংগৃহীত হবে ছাত্রদের বেতন থেকে বাকি ২০ শতাংশ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নির্বাহ করবে। ২. পাস ও অনার্সকোর্সের সময়গত পার্থক্য বিলোপ করা হয়।

কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারি করার প্রস্তাব করে।

রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেলেও বাংলা ভাষাকে সাম্প্রদায়িকীকরণের লক্ষ্যে বিকৃতি চলতে থাকে। কবি নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘চল্ চল্ চল্’-এর ‘নব নবীনের গাহিয়া গান, সজীব করিব মহাশ্মশান’ চরণের সংশোধন করে, লেখা হয় ‘সজীব করিব গোরস্থান’। জনপ্রিয় ছড়া, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/ সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।’ পরিবর্তন করে করা হয়- ‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি/ সারাদিন আমি যেন নেক হয়ে চলি।’

১৯৫৯ সালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগঠনগুলোর একুশের সম্মিলিত অনুষ্ঠানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতির ভাষণে এসব বিকৃতিসহ অন্যান্য তথাকথিত সংস্কার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করেন যে, এসব তারা মেনে নেবেন না।

১৯৬১ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ দীর্ঘদিন পর আবার চাঙা হয়ে ওঠে। সামরিক শাসনের ফলে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দাবিকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলে। ১৯৬১ সালের গোড়ার দিকে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনকে কেন্দ্র করে ছাত্র-আন্দোলনের পরোক্ষ প্রস্তুতি চলতে থাকে। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ অন্যদের সঙ্গে নিয়ে ১৯৬১ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপন ও রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠান পালন করে।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বরেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ও ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মণি সিংহ ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য খোকা রায়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনায় আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ৬১’র ডিসেম্বরে পরবর্তী ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের লক্ষ্যে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মোহাম্মদ ফরহাদের উদ্যোগে ইস্কাটনের একটি বাড়িতে এক গোপন সভায় ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শিক্ষার দাবিকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হতে শুরু করে। ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকাল বন্ধ ঘোষণার প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ মিছিল করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ খুললে ১৫ মার্চ থেকে অব্যাহতভাবে ধর্মঘট চলতে থাকে।

ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ডাকসু, বিভিন্ন হল ও কলেজ ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সাধারণ ছাত্রদের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৫ আগস্ট দেশব্যাপী ধর্মঘট এবং ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়।

১০ সেপ্টেম্বর সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে প্রতিবাদস্বরূপ ১৭ সেপ্টেম্বর হরতালের ডাক দেয়া হয়। ওইদিন সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার সমাবেশ শেষে কার্জন হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেয় ব্যবসায়ী, কর্মচারী, রিকশা শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার সংগঠন। জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছে- এমন সংবাদ পেয়ে মিছিল নবাবপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে।

হাইকোর্টের সামনে পুলিশি বাধায় মিছিলকারীরা আবদুল গনি রোডে অগ্রসর হয়। পুলিশ মিছিলের পেছন থেকে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে। নবকুমার স্কুলের ছাত্র বাবুল, বাস কন্ডাক্টর গোলাম মোস্তফা ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গুলিবিদ্ধ গৃহকর্মী ওয়াজিউল্লাহ পরদিন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। যশোর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে পুলিশের নির্যাতনে বহু ছাত্র আহত ও গ্রেপ্তার হন। টঙ্গীতে গুলিতে নিহত হন শ্রমিক সুন্দর আলী।

তিনদিন পূর্ব বাংলায় ব্যাপক ছাত্র-অভ্যুত্থান ঘটে। ছাত্র-অভ্যুত্থানের তৃতীয় দিনের মধ্যে সরকার শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট স্থগিত এবং একই সঙ্গে ১৯৬৩ সালের স্নাতক পরীক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করার ঘোষণা দেয়। এ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বলা যায়, আইয়ুব খানের মতো তথাকথিত লৌহ মানবও ছাত্র-আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন স্থগিত করতে বাধ্য হন।

এর পর থেকে প্রতিবছর একটি সর্বজনীন, গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক একধারার শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে ছাত্র-আন্দোলন ও শহিদদের আত্মদান তথা শিক্ষার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বরকে ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের এই অর্জনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে ৬ দফা, ’৬৯-এর ১১ দফার ভিত্তিতে গণ-অভ্যুত্থান ও আইয়ুব খানের পতন, ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে বাঙালি রাজনীতিকদের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়।

১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লাখ শহিদ আর ২ লাখ নারী ও শিশু নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে হিসাব মিলাতে বসলে বলতে হয় শিক্ষাক্ষেত্রে এখনও আমরা খুব একটা অগ্রসর হতে পারিনি।

শিক্ষানীতি প্রণয়নকালে প্রথম শিক্ষা কমিশন-প্রধান ড. কুদরাত-ই-খুদা বলেছিলেন- “শিক্ষা ব্যবস্থা একটি জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা রূপায়ণের ও ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার। কাজেই দেশের কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তসহ সব শ্রেণির জনগণের জীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনের উপলব্ধি জাগানো, নানাবিধ সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জন এবং তাদের বাঞ্ছিত নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ সৃষ্টির প্রেরণা সঞ্চারই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব ও লক্ষ্য। এই লক্ষ্য আমাদের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসমূহের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। শিক্ষার মূলনীতির সঙ্গে এই সাংবিধানিক নীতিমালার যোগ সাধন করে বাংলাদেশের শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলি নির্ধারণ করা যায়।”

সংবিধানে স্বীকৃত শিক্ষার অধিকার আমরা আজও পাইনি। ধনীক শ্রেণির কাছে শিক্ষা কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়েছে। সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের বিষয়টি স্বীকৃত হলেও শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে বাংলাচর্চা সীমিত হয়ে পড়েছে। তিন বছরের ডিগ্রি, চার বছরের অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বদলে বাণিজ্য শাখায় শিক্ষার্থী বাড়ছে।

বিগত বছরগুলোতে পাসের হার বৃদ্ধিতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের বর্ধিত চাহিদা থেকে বেড়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ-এমবিএ কিংবা প্রযুক্তিগত কোর্স পড়ানোতেই সীমাবদ্ধ। এভাবে মৌলিক বিদ্যাচর্চা ব্যাহত হওয়ায় দেশে উচ্চতর গবেষণার সংখ্যা ও মান কমেছে।

রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চেহারা বদলানো হয়েছে। হেফাজতের ১৩ দফা অনুযায়ী পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করে শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে। গুণগত কোনো পরিবর্তন ব্যতিরেকেই মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাপ্ত ডিগ্রিকে দেয়া হয়েছে সাধারণ শিক্ষার সমমান। মাদ্রাসা বাড়ানো ও উন্নয়নের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ বাড়ছে। সেভাবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল খোলার জন্য সরকারি বরাদ্দ বাড়ছে না।

ছাত্র সংগঠনের নাম আগেরটা থাকলেও তারা ক্ষমতাসীন দলের লাঠিয়ালবাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চ, যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ, বর্ধিত বেতন-ফি কমানো, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি শিক্ষায় ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করে করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণেরা।

করোনা মহামারিতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পরিচালনা কমিটি এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য ৬৩টি নির্দেশনা পালন করার শর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম যথাযথভাবে শুরু করতে হলে এই খাতে সরকারের আরও মনোযোগ ও বিনিয়োগ দরকার। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসার আহ্বান নয় বরং শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও অর্থনৈতিকভাবে কী ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করছে তা বিবেচনায় নিয়ে সমাধানও জরুরি।

করোনাকালে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরার মাধ্যমে সব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নিশ্চিত হোক এবারের শিক্ষা দিবসে এই হোক আমাদের সবার চাওয়া।

তথ্যসুত্র:

১. ড. মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৪।

২. আবুল কাশেম, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন: প্রকৃতি ও পরিধি, ইতিহাস সমিতি পত্রিকা, সংখ্যা ২৩-২৪, ১৪০২-১৪০৪।

৩. বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
যানজট রোধে বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবনা জরুরি
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা ও করণীয়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র ও জিয়ার সম্পৃক্ততা 
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও একজন মানবিক শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

শেয়ার করুন

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। গণহত্যা শুরুর মাত্র ১ দিন পর ২৭ মার্চ শনিবার ইন্দিরা গান্ধী গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা করেন। এর ৩ দিন পর ৩১ মার্চ ভারতের লোকসভা বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানায়। ৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠককালে বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন ইন্দিরা গান্ধী। গণহত্যার পর তখনও কেউ জানে না বঙ্গবন্ধু কোথায়। তিনি জীবিত নাকি পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করেছে।

চলতি বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে বাংলাদেশ। একই সময়ে উদযাপিত হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। বাঙালি জাতির সবচেয়ে কঠিন সময় অর্থাৎ স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে যেসব দেশ, পত্রপত্রিকা, সাংবাদিক ও স্বনামধন্য ব্যক্তি সহযোগিতা করেছে তাদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা করা জরুরি।

যে দেশের সহযোগিতা ছাড়া ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের জয় ছিল প্রায় অসম্ভব, সে দেশটি হচ্ছে প্রতিবেশী ভারত। ভারতের জনগণ, সেসময়ের সরকার ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমাদের স্বাধীনতার জন্য যে অবদান রেখেছেন তার কোনো তুলনা হয় না।

পাকিস্তান সামরিক জান্তার গণহত্যার মুখে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকার ভারতে থেকেই কার্যক্রম চালিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভারত শুধু আশ্রয় দেয়নি, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রও দিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেসময় ভারতে অবস্থানকালে সে দেশের জনগণের সহযোগিতা ও সহমর্মিতার কথা শ্রদ্ধাভরে, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। ভারতের দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী নেহরুকন্যা ইন্দিরা গান্ধী বাঙালিদের তার দেশে আশ্রয় ও আহার দিয়েছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য এবং শত্রুর হাতে বন্দি বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষার জন্য বিশ্বের বহু রাষ্ট্র সফর করেছেন।

বাংলাদেশকে সমর্থনের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেসময়ের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেদেশ সফরকালে ইন্দিরা গান্ধীকে অসম্মান করে এবং হতচ্ছাড়া মেয়েলোক হিসেবে উল্লেখ করে বলে, ‘তাকে আমি দেখে নেব।’ তাছাড়া ক্রুদ্ধ নিক্সন মিসেস গান্ধীকে ‘বিচ’ (কুত্তি) ও বাস্টার্ড (বেজন্মা) বলেও গালি দেয়।

ইন্দিরা জানতেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঠেকিয়ে রাখতে নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি যা যা দরকার, তা-ই করবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীনকে মোকাবিলা করার জন্যই ১৯৭১-এর আগস্টে অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ২৫ বছরের মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করে ইন্দিরার ভারত। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

গণহত্যা শুরুর মাত্র ১ দিন পর ২৭ মার্চ শনিবার ইন্দিরা গান্ধী গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা করেন। এর ৩ দিন পর ৩১ মার্চ ভারতের লোকসভা বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানায়। ৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠককালে বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন ইন্দিরা গান্ধী। গণহত্যার পর তখনও কেউ জানে না বঙ্গবন্ধু কোথায়। তিনি জীবিত নাকি পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করেছে।

বাংলাদেশ সরকার তখনও গঠিত হয়নি। ঠিক ওই সময়ে বাংলাদেশে গণহত্যার নিন্দা ও স্বাধীনতার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধী অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

তিনি নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে- পাকিস্তান সামরিক চক্রের বাংলাদেশে গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা করেন ২৭ মার্চ। ৩১ মার্চ লোকসভায় গৃহীত সর্বসম্মত প্রস্তাবে প্রতিবেশী বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়ে বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম বৈধ ও ন্যায্য। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে উদ্বেগ ও সমবেদনা প্রকাশ করে প্রস্তাবে বলা হয়- “১৯৭০-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পূর্ব বাংলার জনগণ যে নির্ভুল রায় দিয়েছে, সেই গণরায়কে সম্মান দেয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান সামরিক সরকার ট্যাঙ্ক, মেশিনগান, বন্দুক, বেয়নেট, ভারী সমরাস্ত্র ও বিমানবহর ইত্যাদি দিয়ে বর্বরোচিত আক্রমণ দ্বারা সে দেশের জনগণকে দমন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ সভা পূর্ব বাংলায় জনগণের ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সংহতি ঘোষণা করছে। পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর সকল প্রকার শক্তি প্রয়োগ ও নির্বিচারে গণহত্যা বন্ধের দাবি জানাচ্ছে এ সভা এবং গভীর প্রত্যয় ব্যক্ত করছে যে, পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুক্তির এ ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান জয়যুক্ত হবে।”

৪ এপ্রিল (মতান্তরে ৩ এপ্রিল) ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগের দিন দিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এক ঊর্ধ্বতন পরামর্শদাতা তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলোচনাকালে জানতে চান, আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে কোনো সরকার গঠন করেছে কি না। মিসেস গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সূচনাতে তাজউদ্দীন আহমদ জানান, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ শুরুর আগে ২৫/২৬ মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে একটি সরকার গঠন করা হয়।

শেখ মুজিবকেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি এবং মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সব প্রবীণ নেতাই (পরে ‘হাইকমান্ড’ নামে পরিচিত) ওই মন্ত্রিসভার সদস্য। তখন অনেক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়া সত্ত্বেও দিল্লিতে সমবেত দলীয় প্রতিনিধিদের পরামর্শে তাজউদ্দীন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপিত করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, তাজউদ্দীন আহমদের এই উপস্থিত সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অসামান্য শক্তি সঞ্চারিত হয়। সদ্য গঠিত বাংলাদেশ সরকারের আবেদন অনুসারে স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র ৮/৯ দিনের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সকল প্রকার সহযোগিতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। ফলে স্বাধীনতা ঘোষণার শুরুতেই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠে।

কারো প্রশ্ন থাকতে পারে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এত কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেন কেন? উত্তরে ৩টি কারণের কথা বলা যেতে পারে:

প্রথমত, ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দুদেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক ছিল। ১৯৬৫ সালে দুদেশের স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের কথা কারো অজানা নয়। তাছাড়া পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতি গোড়া থেকেই ভারতের সহানুভূতিশীল মনোভাব ছিল।

দ্বিতীয় কারণ ছিল, আদর্শগত। ভারতের কংগ্রেস ও বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তৃতীয় কারণটি একেবারেই মানবিক। পূর্ব বাংলায় নিরীহ জনগণকে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্বিচার হত্যায় সমগ্র দুনিয়ার মানুষ আলোড়িত হয়েছিল।

তাছাড়া ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি ভারতের মানবিক সহানুভূতি ও সমবেদনায় সাড়া পড়েছিল সবচেয়ে বেশি। এমন অবস্থায় ভারত সরকার ও সেদেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করার রাজনৈতিক ও মানবিক উভয় কারণই সমানভাবে ছিল।

১০ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। সেদিন রাতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক দীর্ঘ ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপটসহ বিস্তারিত বর্ণনা করেন। ভারতের শিলিগুড়ির এক অজ্ঞাত বেতার কেন্দ্র থেকে এ ভাষণ প্রচারিত হয়।

পরে ভাষণটি আকাশবাণীর নিয়মিত কেন্দ্রসমূহ থেকে পুনঃপ্রচারিত হয়। ১৭ এপ্রিল ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বৈদ্যনাথতলার নতুন নামকরণ করেন মুজিবনগর।

জুলাইয়ের শেষদিকে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটল, ভারতের জন্য যা ছিল উদ্বেগজনক। পাকিস্তানের সামরিক সরকারের সহযোগিতায় খুব গোপনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. হেনরি কিসিঞ্জার চীন সফরে যায়। এই সফরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এবং কিসিঞ্জারের দূতিয়ালিতে আমেরিকার সঙ্গে চীনের বরফশীতল সম্পর্কের অবসান ঘটে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যস্থতায় পাকিস্তান বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির প্রিয়পাত্রে পরিণত হলো।

ভারতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে নতুন শক্তিতে বলীয়ান পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ২ আগস্ট ঘোষণা করল- রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে কারাগারে আটক শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার খুব শিগগিরই শুরু হবে। ভারতের সরকার ও সে দেশের জনগণ জেনারেল ইয়াহিয়ার ন্যক্কারজনক ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। দিল্লি, কলকাতা, বোম্বেসহ ভারতের বড় বড় শহরে শেখ মুজিবের বিচারের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সুস্পষ্ট ভাষায় বিশ্ববাসীসহ পাকিস্তানকে জানিয়ে দিলেন, শেখ মুজিবের বিচারের আয়োজন করা হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। পাকিস্তানকে মুজিবের বিচারপ্রহসন বন্ধে চাপ দেয়ার জন্য ইন্দিরা বিশ্বের বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি লিখলেন।

৪ আগস্ট লোকসভায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা শেখ মুজিবের জীবন রক্ষার জন্য যেকোনো উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানায়। তবে যেরকম নাটকীয়ভাবে চীন-মার্কিন সম্পর্ক নতুনভাবে শুরু হয়, এর চেয়ে আরও অধিক নাটকীয়তার মধ্যে দিল্লিতে ৯ আগস্ট ভারত-রাশিয়া মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ সিং ও সফররত রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদ্রে গ্রোমিকো ২৫ বছর মেয়াদি ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দুই দেশের একটি যদি তৃতীয় কোনো রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন অপর দেশ তার মিত্রের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। সোভিয়েত আক্রান্ত হলে ভারত এবং ভারত আক্রান্ত হলে সোভিয়েত সব রকমের সাহায্য করতে পারবে।

আখেরে এ চুক্তির ফল ভোগ করেছে বাংলাদেশ। ভারত-সোভিয়েত মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে একাত্তরে ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করতে পারত কি না প্রশ্ন থাকে। ডিসেম্বরে বিজয়ের চূড়ান্ত ক্ষণে সপ্তম নৌবহরের মাধ্যমে আমেরিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। ওই বিপদের সময় ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টি এবং পাকিস্তান সরকারের অত্যাচারে ভারতে আসা বাংলাদেশের এক কোটি মানুষের চাপে পিষ্ট ভারতে সেসময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী নভেম্বরের দিকে বিশ্বের শক্তিশালী কিছু দেশ সফর করেন। অবশেষে পাকিস্তানই ‘সুযোগ’ করে দেয় ভারতকে। ৩ ডিসেম্বর আকস্মিক ভারত আক্রমণ করে বসে পাকিস্তান। পাল্টা আক্রমণে বাধ্য হয় ভারত সরকার। এ সময় বাংলাদেশ এবং ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যৌথ বাহিনী গঠিত হয়।

মুক্তিবাহিনীর গেরিলা হামলায় পাকিস্তানি সৈন্যরা বিভিন্ন স্থানে পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুক্তিবাহিনী নব উদ্যমে আক্রমণ শুরু করলে পাকিস্তানি সেনারা বেসামাল হয়ে পড়ে। অবশেষে পর্যুদস্ত পাকিস্তানি বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

আমাদের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা স্বীকার করতেই হবে। সে দেশের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সার্বিক সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ আরও জটিল হতো।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৪ হাজার ভারতীয় সেনাসদস্য জীবন দান করে। পৃথিবীর সব দেশের আগে ভারতই সর্বপ্রথম (৬ ডিসেম্বর) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। বাঙালি জাতি প্রতিবেশী ভারত, সে দেশের জনগণ ও মহীয়সী ইন্দিরা গান্ধীকে চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
যানজট রোধে বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবনা জরুরি
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা ও করণীয়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র ও জিয়ার সম্পৃক্ততা 
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও একজন মানবিক শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

শেয়ার করুন

স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে

স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে

সংবিধান সরকারি কর্মচারীদের রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। রাষ্ট্রের সেবকের চেয়ে বড় কোনো পদবি আর কী হতে পারে! সরকারি ডাক্তাররাও তাই। অন্য সবাই এই পদ ও দায়িত্বের অবমূল্যায়ন করলেও ডাক্তারদের মতো মানবিক পেশায় নিয়োজিতদের কাছে মানবসেবাই বড় কথা।

মহামারি করোনা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশে করোনা আঘাত হেনেছে ১৮ মাসের বেশি। করোনা আঘাত হানার প্রথমদিকে দেশের সব অফিস-আদালত, কল-কারখানার সঙ্গে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বন্ধ হয়ে যায় দেশের হাসপাতালগুলোও। এমনকি প্রাইভেট হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোও বন্ধ ছিল কিছুদিন।

রোগীর স্বজনরা রোগীকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছেন। কখনও ইমারজেন্সি খালি নেই, কখনও আইসিইউ খালি নেই- এসব অজুহাতে হাসপাতালগুলো রোগী ফিরিয়ে দিয়েছে। মানুষের জন্য সে সময়টা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। তবে করোনাকালে অনেক ঝুঁকি নিয়ে হলেও চিকিৎসকরাই এগিয়ে এসেছেন মানুষের পাশে। হাসপাতালগুলোও খুলেছে চিকিৎসার দ্বার।

আমাদের দুঃস্বপ্ন কি কেটে গেছে? অবস্থার কি ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে? আসলে, করোনাকালে দেশের চিকিৎসাসেবার আসল চিত্রই ফুটে উঠেছে। গত দেড় বছরে আমাকে বহুবার একাধিক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। একবছর আগে আমার শ্বশুর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে নিকটস্থ এভার কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাই। ইমারজেন্সির বাইরে থেকেই অক্সিমিটার দিয়ে তার অক্সিজেন পরীক্ষা করে বলা হলো- আইসিইউ খালি নেই। পরে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মাস খানেক আগে গিয়েছি ঢাকা মেডিক্যালে। ইমারজেন্সি বিভাগ থেকে শুরু করে হাসপাতালের ভেতরের করিডোরেও রোগীদের রাখা হয়েছে। সিট খালি নেই। সব সরকারি হাসপাতালেই মোটামুটি একই চিত্র।

মানুষের এই দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক হাসপাতাল রমরমা ব্যবসা করছে। হাসপাতালে নেয়ার আগে আমাদেরকে ভাবতে হয় গলাকাটা বিলের কথা। জরুরি বিভাগে নেয়ার আগেও সাত-পাঁচ ভেবে পা ফেলতে হয়। এভাবে চিকিৎসার পেছনে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।

আমাদের ক্রমবর্ধমান চিকিৎসাব্যয় ও ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। সরকারি হাসপাতালের সরকারি ফি না বাড়লেও ওষুধপথ্য ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এছাড়া ভেজাল ওষুধে দেশ সয়লাব। করোনা ও ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ভেজাল ওষুধও পাওয়া যায় মহল্লার দোকানে। নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়ক লাগিয়ে ওষুধ এখন তৈরি হচ্ছে দেশেই। ঢাকার মিটফোর্ড বা অন্যান্য এলাকা থেকে অনলাইনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হোম ডেলিভারি দেয়া হচ্ছে এসব ওষুধ। দেশে আসল ওষুধ শিল্পের বিকাশ হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু নকল ওষুধ তৈরি, সরবরাহ ও বিপণনেও অসাধু ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে নেই।

দেশে নানা ক্ষেত্রে উন্নয়ন হচ্ছে এতে সন্দেহ নেই। অন্যান্য সেক্টরের মতো চিকিৎসা ক্ষেত্রেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন স্থাপনাও নির্মাণ হচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যালের নতুন ভবন ও বার্ন ইউনিট সবার নজর কাড়ে। অন্যান্য হাসপাতালেও হয়তো শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। কাজেই, বিদ্যমান হাসপাতালগুর শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

সংবিধান বলছে, রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে [১৫(ক)], জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র তার প্রাথমিক কর্তব্য বলে গণ্য করবে [১৮(১)] । কিন্তু হাসপাতাল যদি রোগী ফিরিয়ে দেয়, ভেজাল ওষুধ খেয়ে যদি রোগীর ক্ষতি হয় তবে রাষ্ট্র কীভাবে তার কর্তব্য পালন করবে? জানি, রাষ্ট্রের পক্ষে এতকিছু করা সম্ভব নয়।

রাষ্ট্র হাসপাতাল তৈরি করে দিতে পারে, সেই হাসপাতাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করে দিতে পারে, ওষুধ তৈরি ও বিপণনের নীতিমালা প্রণয়ন করে দিতে পারে। কিন্তু সেই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যদি তাদের দায়িত্বে ও হিসাবের খাতায় নয়-ছয় করে তবে রাষ্ট্র বা সরকার তা কীভাবে তদারকি করবে? আমাদের হয়েছে, ‘সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’ অবস্থা। সে ওষুধেওতো ভেজাল। কুইনাইন জ্বর সারাবে, কুইনাইন সারাবে কে? সরকারকে হাসপাতালও তৈরি করতে হয়, জ্বর সারাতে হয় আবার কুইনাইনও সারাতে হয়। কাজেই সরকার বা রাষ্ট্রের এখন দাঁড়িপাল্লায় ব্যাং মাপার মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। একটা ঠিক করে তো আর দুইটা বিগড়ে যায়।

দেশে অনেক হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ হলেও সেগুলো এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ না বলেই মনে হয়। ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোর সরকারি হাসপাতাল থেকেও রোগী পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকা মেডিক্যালে। এমনকি বরিশাল, ফরিদপুর, রাজশাহী, রংপুর মেডিক্যাল থেকেও রোগীকে ঢাকা মেডিক্যালে রেফার করা হয়। পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ-সেবা পর্যন্ত পাওয়া যায় না ওইসব হাসপাতালগুলোতে। কাজেই দেশের সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করা হোক, স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হোক। শুধু প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল করা নয়।

এদিকে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। হাসপাতালে একবার ভর্তি হলে এর খরচ কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল। সাধ্যের মধ্যে না থাকায় চিকিৎসার মাঝপথেই অনেক রোগীকে স্বজনরা অন্য হাসপাতাল অথবা বাড়িতে নিয়ে যায়। প্রাইভেট হাসপাতালের চিকিৎসাব্যয় নিয়ে কথা বলার কেউ নেই।

দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বহুবার কোর্ট-কাচারি পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি হাসপাতাল থেকে রোগী ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়টি নতুন করে হাইকোর্টের নজরে আনে বাংলাদেশে লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। হাইকোর্ট দেশের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একজন রোগীকে জরুরিসেবা দেয়া যেকোনো হাসপাতালের মৌলিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু এটা যে সব সম্ভবের দেশ!

এই সম্ভবের (জরুরি চিকিৎসাসেবা না দেয়া) বিরুদ্ধে ব্লাস্ট রিট করলে হাইকোর্ট গত রোববার সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। আদেশে আরও বলা হয়- ‘কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে যখনই হাসপাতাল বা ক্লিনিক অথবা চিকিৎসকের কাছে আনা হয়, ওই অসুস্থ ব্যক্তির তাৎক্ষণিক জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অসম্মতি জ্ঞাপন করতে পারবে না।

ব্লাস্টের ওই রিটের রুলে আদালত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের নতুন লাইসেন্স ইস্যু করার সময় ও লাইসেন্স নবায়ন করার সময় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থাকতে হবে শর্ত যুক্ত করে দিতে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকের কাছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রুলের জবাবের ওপর ভিত্তি করে আদালত তার পরবর্তী আদেশ দেবেন। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থাকা হাসপাতাল বা ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার জন্য বাধ্যতামূলক করাই যুক্তিসংগত।

এছাড়া আদালত দেশের স্বাস্থ্যসেবার সার্বিক চিত্রও প্রতিবেদন আকারে জানতে চেয়েছে। আমরা আদালতের চূড়ান্ত আদেশ ও এর বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারি প্রতিবেদন ও বাস্তবতা সব সময় এক হয় না। প্রতিবেদন তৈরি করা হয় ডাটাবেজের ওপর ভিত্তি করে আর চিকিৎসা দেয়া একটি মানবিক ও ম্যানুয়াল কাজ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনেক সুযোগ-সুবিধাই আছে, কিন্তু সেগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে। দক্ষ জনবলের অভাবে অনেক দামি মেশিনই অকেজো হয়ে পড়ে আছে অথবা ইচ্ছা করেই সেগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে না। গণমাধ্যমে এ খবর আমরা দেখতে পাই।

ফলে রোগী বাধ্য হয়েই বিভিন্ন টেস্টের জন্য প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে যায়। এর সঙ্গে হাসপাতাল প্রশাসনের কোনো যোগসাজস আছে কি না নাকি বিষয়টি নিতান্তই অবহেলাজনিত তা খতিয়ে দেখা দরকার। উচ্চমূল্যে মেশিন প্রকিউর করে কেন তা আজীবন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ফেলে রাখা হয় তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে।

স্বাস্থ্য নিয়ে গত দেড় বছরে সংসদ ও সংসদের বাইরে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। ১৫ সেপ্টেম্বরও সংসদে Medical Collegues (Governing Bodies) (Repeal) Bill 2021 বাছাই কমিটিতে পাঠানো ও বিলটির ওপর সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়।

আলোচনায় সংসদ সদস্য বলেন-‘আমরা এখন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতাল এবং বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারিনি। যারা আজকে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত তারাই আজকে বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবসা করছে।’ কাজেই, সরকারি হাসপাতালের নাম, পদবি ব্যবহার করে বেসরকারি হাসপাতালেই বেশি সেবা দেয়া একটি ব্যাধি। ডাক্তারদের এই ব্যাধি দূর করতে হবে।

প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ করার মতো অবস্থা বাংলাদেশের এখনও হয়নি। তাতে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাবলিক প্রাকটিস (সরকারি হাসপাতালের সেবা) ও প্রাইভেট প্রাকটিসের মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি ডাক্তারদেরই করতে হবে।

সংবিধান সরকারি কর্মচারীদের রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। রাষ্ট্রের সেবকের চেয়ে বড় কোনো পদবি আর কী হতে পারে! সরকারি ডাক্তাররাও তাই। অন্য সবাই এই পদ ও দায়িত্বের অবমূল্যায়ন করলেও ডাক্তারদের মতো মানবিক পেশায় নিয়োজিতদের কাছে মানবসেবাই বড় কথা। তারা সেটি করছেনও।

আসলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আমাদের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা চাই। সমস্যা হলে তা নিয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবনা সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিত পারে না। আমাদের স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম দেখার কেউ নেই, কথা বলার কেউ নেই। পৃথিবীর অনেক দেশেই স্বাস্থ্যসেবা রেগুলেটরি কমিশন আছে। আমাদের দেশেও একটি স্বাস্থ্যসেবা রেগুলেটরি কমিশন হতে পারে। যদিও আমাদের দেশে অনেক কমিশনই আছে। কমিশনের কার্যকারিতাই মূল কথা।

গত বুধবার সংসদে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সমালোচনা আমাকে শক্তিশালী করে। তা করুক। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যসেবাও যদি শক্তিশালী হয় তবে সেটিই কাম্য।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
যানজট রোধে বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবনা জরুরি
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা ও করণীয়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র ও জিয়ার সম্পৃক্ততা 
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও একজন মানবিক শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

শেয়ার করুন

আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো

আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো

যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারা বলছিল বাংলাদেশ টিকবে না। পাকিস্তানের কিছু লোক মনে করত- অচিরেই বাংলাদেশের নেতারা তাদের হাতে পায়ে ধরে মাফ চাইবে, বলবে- ভুল হয়েছে হুজুর। আবার আমাদের পাকিস্তানে নিয়ে নেন। সেই বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে! অর্থনীতি ও সামাজিক সব সূচকে বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে। পাকিস্তানের সহযোগীরা এসব কেমন করে সহ্য করবে? কিন্তু সরাসরি স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এখন আর সম্ভব না। তাই একটু ঘুরিয়ে অগ্রসর হতে চেয়েছিল- নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হবে না। এ জন্য তারা হরতাল ডেকেছিল।

বিদ্যালয় খুলে দেয়া হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা ভাগ ভাগ করে ক্লাসে যোগ দিয়েছে। করোনাকালের অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলতে শুরু করেছে, এমন বিশ্বাস ক্রমে বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও হয়ত খুলে যাবে।

রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হবে, এমন কথা বলছে কেউ কেউ। করোনার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো তেমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেনি। গত মার্চে ধর্মীয় চরমপন্থি কয়েকটি দল মাঠে নেমেছিল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব ভণ্ডুল করার জন্য। তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে ইস্যু করেছিল।

বলেছিল- বিজেপির এই নেতা গুজরাটে মুসলিম হত্যার জন্য দায়ী। তাকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হবে না। এর কিছুদিন আগে এই মহলটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল। নরেন্দ্র মোদি মুসলিমবিদ্বেষী, এ বক্তব্যের পেছনে সত্যতা থাকতেই পারে। কিন্তু তার বাংলাদেশ সফর ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল সর্বশক্তি দিয়ে। তারা এক কোটি নাগরিককে আশ্রয় দেয়। লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি জান্তা যাতে প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দিতে না পারে সে জন্য ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের সর্বত্র প্রচার চালান।

সে সময় জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ প্রভৃতি দল ছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষে। তারা আলবদর, রাজাকার বাহিনী গঠন করে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে গণহত্যায় অংশ নেয়। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হোক, সেটা তারা চায়নি। কিন্তু তারা সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারা বলছিল বাংলাদেশ টিকবে না। পাকিস্তানের কিছু লোক মনে করত- অচিরেই বাংলাদেশের নেতারা তাদের হাতে পায়ে ধরে মাফ চাইবে, বলবে- ভুল হয়েছে হুজুর। আবার আমাদের পাকিস্তানে নিয়ে নেন। সেই বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে! অর্থনীতি ও সামাজিক সব সূচকে বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে।

পাকিস্তানের সহযোগীরা এসব কেমন করে সহ্য করবে? কিন্তু সরাসরি স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এখন আর সম্ভব না। তাই একটু ঘুরিয়ে অগ্রসর হতে চেয়েছিল- নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হবে না। এ জন্য তারা হরতাল ডেকেছিল। কটি জেলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায় তারা। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট- মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা। তবে তারা ব্যর্থ হয়। জনগণ তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেনি। করোনাকালে এসব শক্তি মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। অর্থনীতির চাকা সচল হোক, এটা চায়নি। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে বলেছে। এর কারণ শিক্ষার ঘাটতি পূরণ নয়। তারা মতলব গোপন করেনি। বলেছে- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায়, সরকারবিরোধী তৎপরতা জোরদার করা যায়। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। ছাত্রছাত্রীরা পড়তে চায়।

সব বাধা জয় করতে চায়। একটি ছবিতে দেখেছি বন্যাকবলিত এলাকায় একটি শিশু কলাগাছের ভেলা চালাচ্ছে বাঁশের লগি দিয়ে, ভেলায় বসা চারটি শিশু। পাঁচজনের মুখেই মাস্ক। করোনাকালের বাস্তবতা। স্কুল ইউনিফর্ম পরেছে সবাই। লগি হাতে ছেলেটির কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। ভেলায় বসা চারজনই ছাত্রী, বই হাতে। করোনার প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর স্কুল খুলেছে, সেখানেই চলেছে তারা প্রকৃতির প্রচণ্ড বাধা উপেক্ষা করে। এ ছবিটি ফেসবুকে ঘুরছে, হয়ত কোনো পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছে।

আরেকটি ছবি দেখেছি ফেসবুকে- যেখানে কলা গাছের ভেলা নয়, কাঠের নৌকায় চলেছে কয়েকজন। মাঝি ও যাত্রী সবাই মেয়ে- একজন লগি হাতে, অন্যরা বসা। চলেছে স্কুলে- তাদের মুখাবয়বে দৃঢ় সংকল্প- কোনো বাধা মানব না।

২০১৮ সালে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকার একটি সংবাদপত্রে- দুই কিশোরী স্কুলের অবসরের সময় ছুটে গেছে পাশেই তাদের বাড়িতে- একজনের মা রোদে ধান শোকাচ্ছে। দুই ছাত্রী স্কুল থেকে ছুটে এসে তাকে ২০-২৫ মিনিট সাহায্য করে ফের ছুটল স্কুলে- অফ পিরিয়ড সময় যে শেষ!

আমার কেবলই মনে হয়েছে- বেগম রোকেয়া যদি এ দৃশ্য দেখতেন! তিনি নারী শিক্ষার প্রসার চেয়েছেন। জানতেন, এ পথ সহজ নয়। মেয়েরা বাধা পাবে পরিবার থেকে, সমাজ থেকে। তার সময়টি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ। তারা নারী শিক্ষায় প্রকাশ্যে বাধা দিত না। কিন্তু নারী-পুরুষ, কেবল সীমিত সংখ্যক শিখবে- এটা চেয়েছে। এখন ধর্মের নামে নারীশিক্ষা বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চলছে। বেগম রোকেয়ার জন্য কাজ করা কি আরও কঠিন হতো?

কয়েক বছর আগে সংবাদপত্রে একটি ছবি ছিল লালমনিরহাট এলাকার। বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান পায়রাবন্দের কাছেই ওই এলাকা। বন্যার পানিতে স্কুলে যাওয়ার পথের মাটির সড়কের একটি অংশ তলিয়ে গিয়েছিল। একদল ছাত্রী স্কুল ইউনিফর্ম পরা, সেই পানি ভেঙেই চলেছে ক্লাসে। হাতে বই তাদের। এরা কেউ বেগম রোকেয়াকে দেখেনি। কিন্তু তার আদর্শ অনুসরণ করছে। যে স্থানীয় সাংবাদিক ছবিটি পাঠিয়েছিলেন, তার ভাষ্য ছিল ভিন্ন- সড়কটি সময়মতো সংস্কার করা হয়নি বলে বন্যার সময় অশেষ কষ্ট করে ছাত্রীদের স্কুলে আসতে হয়। এ ভাষ্য সঠিক। কিন্তু আমি দেখেছি ছাত্রীদের চোখে-মুখে অদম্য মনোভাব- কেউ আমাদের রুখতে পারবে না। সুলতানার স্বপ্ন এরা বাস্তবে রূপ দেবেই।

মহীয়সী নারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন চেয়েছিলেন- প্রতিটি নারী যেন এগিয়ে যায়। কেবল পড়াশোনা নয়, রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সব ক্ষেত্র যেন তাদের দৃপ্ত পদচারণায় মুখরিত হয়। এমনকি তিনি দেশ প্রতিরক্ষার কাজেও নারীদের দেখতে চেয়েছেন সামনের সারিতে।

তার জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত- ১৮৮০ থেকে ১৯৩২, মাত্র ৫২ বছর। এ সময়ের বড় অংশ কেটে গেছে জীবন সংগ্রামে। কত বাধা মোকাবিলা করেছেন তিনি- পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র- বাধার প্রাচীর গড়ে তুলতে কতজনের উৎসাহের যেন শেষ নেই। কিন্তু তিনি থামতে জানতেন না। শত কাজের মধ্যেও লিখে গেছেন, সাহিত্যসাধনায় মগ্ন থেকেছেন। তার রচনা কেবল বাংলাভাষার পাঠকদের জন্য নয়, বিশ্বসাহিত্যেরও অমূল্য সম্পদ।

বাংলাদেশে এখনও এমন শক্তি রয়েছে, যারা নারী শিক্ষা চায় না। কল-কারখানায়, কৃষিতে, গণমাধ্যমে, সরকারি অফিসে নারী কাজ করুক, নিজের অধিকার বুঝে নিক- সেটা চায় না। প্রকাশ্যেই হুমকি দেয়া হয়েছে- নারীকে থাকতে হবে ঘরে। আফগানিস্তানে তালেবান শাসকরা যেমন বলছে- নারীর কাজ কেবল সন্তান উৎপাদন, তাকে প্রকাশ্যে আসা চলবে না।

এর প্রতিবাদ অবশ্য আফগানিস্তানেই আমরা দেখছি। আবার নারীকে ব্যবহার করেই নারী অধিকার খর্ব করার ঘটনা ঘটেছে আফগানিস্তানে। কয়েকদিন আগে ‘অবগুণ্ঠনবতী’ একদল নারীকে তালেবান শাসকরা রাজপথে নামিয়ে দিয়েছিল, যারা বলছে সোচ্চার কণ্ঠে- নারীদের আমরা রাজপথে দেখতে চাই না। তারা দাবি জানাতে পারবে না। তাদের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চলবে না। অফিসেও তারা যেতে পারবে না। তারা সাংবাদিকতা করতে পারবে না। টেলিভিশনে মুখ দেখাতে পারবে না। নারীকে ব্যবহার করে নারী স্বাধীনতা হরণের দাওয়াই! বাংলাদেশেও এমনটি ঘটতে দেখছি আমরা।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে ২০০৯ সালের শুরু থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নারী শিক্ষার ওপর বাড়ি গুরুত্বারোপ করেছেন। বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে (মাদ্রাসাসহ) প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের অর্ধেক ছাত্রী। তারা পরীক্ষায় ভালো করছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অনেকেই কলেজে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠে পা রাখছে।

এটাও লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশে এখন শিল্প-কারখানায় যে শ্রমশক্তি, তার বেশিরভাগ নারী। তাদের কারণে রপ্তানি খাত সচল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তেজি। কৃষিতেও সফল। কে তাদের অগ্রযাত্রায় বাধার প্রাচীর তৈরি করে সফল হবে?

করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে, এমন উদ্বেগজনক খবর দেখেছি। বাল্যবিবাহের ঘটনাও এসেছে সংবাদপত্রে। এ সব নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। কিন্তু রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যে উজ্জ্বল আলোকশিখা ধরে আছেন, তা পথ দেখাচ্ছে নারীর অগ্রযাত্রায়, কে তাদের রুখবে? সংবাদপত্রে ও সামাজিক গণমাধ্যমে যে সব ছবি ভাইরাল, আমাদের ভরসাস্থল তো আছেই!

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
যানজট রোধে বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবনা জরুরি
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা ও করণীয়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র ও জিয়ার সম্পৃক্ততা 
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও একজন মানবিক শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

শেয়ার করুন

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হোক

নারী যেমন ঘর-সন্তান সামলায়, রান্নাবান্না, সাজগোজ এবং স্বামীসেবা করে। এই নারীই আবার শ্রমজীবী হয়ে ইট ভাঙে, অফিসে ছোটে। তাদের প্রতি অন্যায়-অবিচার, অনধিকার, অস্বীকার, প্রতিটি কাজে দোষারোপ করার মতো কাজগুলো আমরা ছোট করেই দেখছি। এছাড়া স্ত্রী নির্যাতনের বিষয়টিকে আমাদের সমাজ স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই ধরে নেয়।

নারী- মা, বোন, অর্ধাঙ্গিনী আরও অনেক পরিচয় বহনকারী এ মানুষগুলো আমাদের সমাজের নানা ক্ষেত্রে নিপীড়িত, অবহেলিত। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে নারীর এগিয়ে যাওয়া, গতিশীলতা, অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা ও দৃশ্যমান ভূমিকা থাকার পরও নারী নির্যাতন কমছে না বরং নির্যাতনের ধরন বদলাচ্ছে।

জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি দিনে দিনে মানবসমাজে নতুন অপরাধের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। যার অন্যতম উদাহরণ ‘নারীর প্রতি সহিংসতা’ বা নারী নির্যাতন। বর্তমানে ধর্ষণ ও পারিবারিক নির্যাতন ভয়ংকর অবস্থায় পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা ইদানীং ব্যাপক আকারে বেড়েছে। এ নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এর কোনো প্রতিকার হবে না।

সমাজে নারীদের প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিকভাবে অপদস্ত হতে হচ্ছে। প্রাচীন আমলের বিভিন্ন সামাজিকপ্রথা, কুসংস্কার এমনকি লোকলজ্জার ভয় কাটিয়ে নারী এখন পুরুষের পাশাপাশি পথ চলতে শুরু করেছে। কিন্তু এসময়ে এসেও পথেঘাটে, বাস-ট্রেনে এমনকি বাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলেও নারীরা ব্যাপকহারে নির্যাতিত হচ্ছে।

যৌতুক, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, ধর্ষণ, হত্যাকসহ এমন নারী সহিংসতার ঘটনা নিত্যদিনের। নারীরা রাজনৈতিক সহিংসতারও শিকার হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পারিবারেই তারা সহিংসতার মুখোমুখি হয়। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা যেন স্বাভাবিক ঘটনা।

নারীর ওপর পুরুষের অবিরাম ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে সম্প্রতি এই নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে চলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো স্থান থেকে ধর্ষণের খবর পাওয়া যায়। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই পাওয়া যায় একাধিক ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের খবর। পৃথিবীব্যাপী এসব সহিংসতার শিকার হয়ে প্রতি বছর অসংখ্য নারীর মৃত্যু হচ্ছে।

নারী যেমন ঘর-সন্তান সামলায়, রান্নাবান্না, সাজগোজ এবং স্বামীসেবা করে। এই নারীই আবার শ্রমজীবী হয়ে ইট ভাঙে, অফিসে ছোটে। তাদের প্রতি অন্যায়-অবিচার, অনধিকার, অস্বীকার, প্রতিটি কাজে দোষারোপ করার মতো কাজগুলো আমরা ছোট করেই দেখছি।

এছাড়া স্ত্রী নির্যাতনের বিষয়টিকে আমাদের সমাজ স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই ধরে নেয়। এসব ঘটনার পাশাপাশি আবার যৌতুকপ্রথাকে প্রতিষ্ঠিত করছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। যা নির্যাতনের মাত্রা আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে নারীর অবস্থার যে পরিবর্তন হচ্ছে না- এর দায় নারীরও কিছু রয়েছে। এখন ঘরে ঘরে অশান্তি, আত্মহত্যা, ডিভোর্স যেন লেগেই আছে। নারী সমাজকে এই হীন পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় সোচ্চার নারীবাদীরা। প্রণিত হয়েছে নানা আইনও। তবু নারীর দুর্দশা থেকে মুক্তি মিলছে না।

করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা যেন বেড়েছে আগের থেকে বেশি। সমাজ-রাষ্ট্র তো নয়ই, পরিবারও নির্যাতনের শিকার নারীর পাশে দাঁড়ায় না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইন প্রয়োগ করা হয় না। এ সংস্কৃতি অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্টরা করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত হওয়ায় নারী নির্যাতনের বিষয়ে মনোযোগ হারাচ্ছে।

করোনাকাকালে যৌন সহিংসতা, পারিবারিক কলহ, শারীরিক নির্যাতন, হত্যা, যৌতুকের জন্য অত্যাচার, বিকৃত যৌনতার মতো নির্যাতনগুলো ভিন্নরূপে আবির্ভূত হয়।

নারী নির্যাতনের সংখ্যা, ধরন যে দিন দিন বেড়ে চলছে পরিসংখ্যান ঘাটলে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেয়া তথ্যমতে, শুধু ২০২০ সালে দেশে ১৩৪৬ কন্যাশিশু ও নারী ধর্ষণের ঘটনাসহ মোট ৩৪৪০টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। পরিষদটির লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৩টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ২০২০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের এই তালিকা তৈরি করা হয়। এর মধ্যে ১০৭৪টি ধর্ষণ, ২৩৬টি গণধর্ষণ ও ৩৩টি ধর্ষণের পর হত্যা ও ৩টি ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যাসহ মোট ১৩৪৬ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এছাড়া ২০০ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা, শ্লীলতাহানির শিকার ৪৩ সহ ৭৪ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। অ্যাসিড দগ্ধের শিকার ২৫ জন। এর মধ্যে অ্যাসিডে দগ্ধের কারণে মৃত্যু ৪টি।

তাছাড়া অগ্নিদগ্ধের শিকার ২৯ জন, যার মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু ঘটে। অপরদিকে উত্ত্যক্তের শিকার হয় ৫৯ জন। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে মোট ১২৫টি। পাচারের শিকার ১০১, এর মধ্যে পতিতালয়ে বিক্রি হয়েছে ৪ জন।

বিভিন্ন কারণে ৪৬৮ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়। এছাড়াও ৩৫ জন শিকার হয় হত্যাচেষ্টার। যৌতুকের কারণে নির্যাতিত ১১৭ জন, যার মধ্যে ৫২ জন হত্যার শিকার। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ১৫৯ জন। তাছাড়াও বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার ১৬৪ জন। ২৫২ জন নারী ও কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়।

বাল্যবিবাহ-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে ১১৭টি। পাশাপাশি সাইবার ক্রাইম অপরাধের শিকার হয় ৪৩ জন নারী। এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে নারীদের প্রতি নৃশংসতার চিহ্ন।

এই অসহায়, নির্যাতিত নারী ও শিশুদেরকে সমাজে অসতী বা খারাপ গণ্য করে ধিক্কার দিচ্ছে সমাজপতিরা। অপরদিকে ধর্ষণ বা নির্যাতনকারীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রেম প্রত্যাখ্যান, কু-প্রস্তাবে রাজি না হওয়া, স্বামীকে পরবর্তী বিয়েতে অনুমতি না দেয়ায় নৃশংসভাবে হত্যা করাসহ অনেক নারী বিনা অপরাধে শারীরিক ও মানসিক শাস্তি ভোগ করে।

নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘‘আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।’’ বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন- ‘‘সাম্যের গান গাই, আমার চক্ষে পুরুষ রমণী কোন ভেদাভেদ নাই।’’ ‘‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। বিশ্বে যা কিছু এল পাপ-তাপ, বেদনা অশ্রুবারি, অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।’’

অনেকক্ষেত্রে নারীরা সমাজে পশ্চাৎপদ এবং পুরুষের তুলনায় নিম্নস্তরের এ বিষয়ে বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারায় তাদের মন আচ্ছন্ন থাকে। তবে এ কথাও সত্য যে, বিভিন্নভাবে তাদেরকে পিছিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলে। এজন্য শুধু পুরুষ নয়, পুরুষতান্ত্রিকতায় আক্রান্ত নারীরাও দায়ী। যুগ যুগ ধরে নারীদের মনে যে ধারণা সৃষ্টি হয়, তা হলো- সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজ নারীদের জন্য নয়। এখনও এ ধারণা বদ্ধমূল রাখার চেষ্টা চলে যে, নারীরা ঘরের বাইরে গেলে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন নষ্ট হয়।

মেয়েদের প্রতি এ ধারণাকে কিছু প্রচার মাধ্যম যেমন- নাটক, চলচ্চিত্র, গল্প, উপন্যাস আরও দৃঢ়মূল করে।

আমাদের সমাজে নারীদের একসময় বোঝা হিসেবে গণ্য করা হতো। এমনকি নারী বেচাকেনার মতো ঘটনাও ঘটে। আর সেই পন্থারই আধুনিকায়ন করে পতিতালয়ের সৃষ্টি।

নারীদের ওপর সহিংসতার আরেকটি কারণ হলো- সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় সহিংসতার শিকার অনেক নারী চাইলেও আইনের আশ্রয় নিতে পারে না বরং পরিবার ও সন্তানের কথা ভেবে সহ্য করতে বাধ্য হয়।

বছরের পর বছর নারীর প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ নিয়ে আন্দোলন করেও এর সমাধান মিলছে না। অতীতে মানুষের মধ্যে এত সচেতনতা ছিল না। তখন নারী নির্যাতন যে একটা অপরাধ সেটা হয়ত অনেকে জানত না। এখন সময় পাল্টাচ্ছে। শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়েছে মানুষ। সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে সব ক্ষেত্রে। কিন্তু নারী নির্যাতনের মতো একটি মারাত্মক স্পর্শকাতর বিষয়ে তেমন সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি।

নারী সহিংসতা রোধে আছে আইন, বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি। কিন্তু এগুলোর তেমন কোনো বাস্তবায়ন নেই। এসব আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষও সচেতন নয়। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তাই প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। সহিংসতা রোধে প্রচলিত আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি নারীদেরও সোচ্চার হতে হবে। কথা বলতে হবে নিজ অধিকার আদায়ে।

এ সমস্যা মোকাবিলায় নারীর ক্ষমতায়নের ওপর জোর দেয়া দরকার। উন্নত আইনব্যবস্থা, সামাজিক রীতিনীতি বদল ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির দিক থেকে পুরুষেরও এগিয়ে আসা দরকার। নারী নির্যাতন প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ সমাবেশই নয় বরং ব্যক্তি, সমাজ ও সরকারের মূল দায়িত্বটা পালন করা জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
যানজট রোধে বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবনা জরুরি
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা ও করণীয়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র ও জিয়ার সম্পৃক্ততা 
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও একজন মানবিক শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

শেয়ার করুন

জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

জঙ্গি-তালেবান: শঙ্কা নয়, সতর্কতা জরুরি

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে। সুবিধাটা হলো ইদানীং জঙ্গিবাদের সমর্থক উগ্রবাদীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এটা তাদের ঢাল হতে পারে। আর জঙ্গি তৎপরতা চালাতে খুব বেশি অর্থ বা লোক লাগে না। ৭০টা হুরের লোভ দেখিয়ে ব্রেইন ওয়াশ করে হাতে বোমা দিয়ে ছেড়ে দিলেই হলো। এমনকি একজন আত্মঘাতী জঙ্গিও অনেক ভয়ংকর হতে পারে। জঙ্গিবাদে লোন উলফ, স্লিপার সেলের ধারণাও প্রচলিত।

তালেবানরা কাবুল দখলের একমাস পূর্তি হলো। এই একমাসে স্থিতিশীলতা তো আসেইনি, বরং গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। আফগানিস্তান এগিয়ে যাচ্ছে গভীর অন্ধকারের দিকে। প্রথম তিন সপ্তাহ আফগানিস্তান চলেছে কোনো সরকার ছাড়াই। দখলের তিন সপ্তাহ পর ‘অন্তর্বর্তীকালীন’ নামে যে সরকার গঠিত হয়েছে তা অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়েছে। ২০ বছর আগের আর পরের তালেবান সরকার এক হবে না, শুরুর দিকে এমন কথা বলা হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তার কোনো প্রতিফলন নেই।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কালো তালিকায় থাকা কট্টর তালেবানরাই ক্ষমতায় এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো নারী সদস্য তো নেই-ই, নেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারের প্রতিফলনও। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ঘোষণা থাকলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পায়নি তালেবান সরকার। যেমন আশঙ্কা করা হয়েছিল, পাকিস্তানের আইএসআই আফগান সরকারের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকের যুদ্ধে আফগানরা স্বর্গে ছিল তেমন নয়, আবার মার্কিন বাহিনীর বিদায়ে আফগানিস্তান স্বাধীন হয়ে গেছে তেমনও নয়। আফগানিস্তান আসলে ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে ঝাঁপ দিয়েছে। কট্টর তালেবানরা অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করলেও আফগানদের ভাগ্য বদলায়নি। বরং তাদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আফগানিস্তানে

ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। শিগগিরই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কোনো যৌক্তিক সমাধান না হলে দেশটির ৯৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা তাদের সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য আফগানরা আক্ষরিক অর্থেই ঘটিবাটি বিক্রি করছে। কিন্তু সেই ঘটিবাটি কেনারও লোক নেই। আর ঘটিবাটি শেষ হলে তারপর তারা কী খাবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। দারিদ্র্য আর দুর্ভিক্ষের নিষ্ঠুর থাবা যেভাবে ধেয়ে আসছে, তাতে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত সবাই। দুবেলা খাওয়ার জন্য রুটি চাই, ভাত চাই; ধর্মের বুলিতে হতভাগা আফগানদের পেট ভরবে না। আর আফগানদের তালেবান ভীতিও আর আগের মতো নেই।

তালেবানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ তো হয়েছেই, চলছে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধও। বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়েও আফগান নারীরা তাদের অধিকারের কথা বলছেন। দাবির মুখে তালেবানরা কিছুটা ছাড়ও দিয়েছে, তবে নারী অধিকার, মানবাধিকার, খাদ্য, নিরাপত্তা, চিকিৎসাই তাদের প্রধান দাবি। ঘরে চুলা না জ্বললে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তালেবানরা আফগানদের ঘরে আটকে রাখতে পারবে না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আফগানরা রাস্তায় নামলে তালেবানদের আফগান শাসনের স্বপ্ন ভেস্তে যেতে পারে।

এসবই আফগানিস্তানের ভেতরের সমস্যা। কিন্তু তালেবানশাসিত আফগানিস্তানই বিশ্বের জন্য একটা বড় বিষফোঁড়া। ২০ বছর আগের তালেবান শাসনের ভয়ংকর শাসনের স্মৃতি এখনও ভুলে যায়নি বিশ্ব। তালেবানরা বলছে, এবার তারা আফগানিস্তানের ভূমি জঙ্গিদের ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু আরও অনেক আশ্বাসের মতো এটাতেও আস্থা রাখা যাচ্ছে না। আফগানিস্তান হলো জঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘর আর তালেবানরাই এখন বিশ্ব জঙ্গিবাদের অঘোষিত নেতা। প্রকাশ্যে না হলেও তালেবানরা গোপনে জঙ্গিবাদকে মদদ দেবে না, এমনটা বিশ্বাস করার লোক কম। আর জঙ্গিবাদ হলো ধর্মীয় আদর্শের মোড়কে সন্ত্রাস। তাই বিশ্বের কোনো এক

প্রান্তে জঙ্গিবাদের উত্থান সব জঙ্গিদের অনুপ্রাণিত করে। আশির দশকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের আমদানি হয়েছিল আফগানিস্তান থেকেই। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আফগানিস্তান যাওয়া জঙ্গিরা দেশে ফিরে স্লোগান ধরেছিল- ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান।’ তাদের সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কিন্তু স্বপ্ন তারা বিসর্জনও দেয়নি। অনেকদিন ধরেই তারা নানা ফর্মে, নানা ভাগে বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানানোর চেষ্টা করছে। জঙ্গিরা নানাভাবে তাদের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা তাদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিল। আর ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ তার সামর্থ্যের শীর্ষ বিন্দু ছুঁয়েছিল। একই সঙ্গে সেই হামলাতেই তারা রোপণ করেছিল তাদের ধ্বংসের বীজ। হলি আর্টজানের পর সরকার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থেই জিরো টলারেন্স নিয়ে মাঠে নামে।

সরকারের সাঁড়াশি অভিযানে তছনছ হয়ে যায় বাংলাদেশের জঙ্গি নেটওয়ার্ক। জঙ্গি নেতাদের অনেকেই ধরা পড়ে, মারা যায় বা পালিয়ে যায়। আর নেতৃত্বহীন জঙ্গিরা ঢুকে পড়ে গর্তে। গর্তে ঢুকলেও তারা মরে যায়নি, আদর্শ বদলায়নি। শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তালেবানদের কাবুল দখলের বাংলাদেশের জঙ্গি মহলে দারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার পর তালেবানরা যখন একের পর এক আফগান শহর দখল করছিল, তখন থেকেই বাংলাদেশে উগ্রবাদীদের মধ্যে উল্লাসের ঢেউ লেগেছিল। কাবুল দখলের পর সে উল্লাস আর গোপন থাকেনি। অনেকে বাংলাদেশেও আফগান পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন প্রকাশ্যে। তালেবানদের আফগান দখলকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই তালেবানপন্থি উগ্রবাদীদের সরব উপস্থিতি। তবে তালেবানদের আফগানিস্তান দখলের প্রভাব বাংলাদেশে স্রেফ উগ্রবাদীদের উল্লাসে সীমাবদ্ধ নেই, অনুপ্রাণিত করছে জঙ্গিবাদকেও। এমনটা যে হতে পারে, সে আশঙ্কা আগেই করা হচ্ছিল।

ঢাকার পুলিশ কমিশনারও এ আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। গর্তে লুকিয়ে থাকা বাংলাদেশের জঙ্গিদের কেউ কেউ আফগানিস্তান যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, কেউ হয়তো গিয়েছেন, কেউ পথে আটক হয়েছেন। বাংলাদেশের জঙ্গিরা হয়তো এখনও সরাসরি তালেবানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। তবে তালেবানদের উত্থানই তাদের গা ঝাড়া দিয়ে গর্ত থেকে বেরোনোর জন্য যথেষ্ট। এরইমধ্যে জঙ্গিদের নানারকম মুভমেন্টের খবর মিলছে।

এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে আটক হয়েছেন বেশ কয়েকজন জঙ্গি। বড় কোনো অপারেশনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে জঙ্গিরা ব্যাংক, এনজিও বা স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ময়মনসিংহ থেকে আটক চার জঙ্গির কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাই নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। সদা সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে। সুবিধাটা হলো ইদানীং জঙ্গিবাদের সমর্থক উগ্রবাদীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। এটা তাদের ঢাল হতে পারে। আর জঙ্গি তৎপরতা চালাতে খুব বেশি অর্থ বা লোক লাগে না। ৭০টা হুরের লোভ দেখিয়ে ব্রেইন ওয়াশ করে হাতে বোমা দিয়ে ছেড়ে দিলেই হলো। এমনকি একজন আত্মঘাতী জঙ্গিও অনেক ভয়ংকর হতে পারে। জঙ্গিবাদে লোন উলফ, স্লিপার সেলের ধারণাও প্রচলিত।

তবে বাংলাদেশে জঙ্গিদের সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রবাদীদের কিছু উল্লাস চোখে পড়লেও সাধারণভাবে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ জঙ্গি বা উগ্রবাদকে পছন্দ করে না। তাই সমাজে তারা কখনোই ঠাঁই পায়নি, পাবেও না। এটা একটা বড় অসুবিধা।

আরেকটা অসুবিধা হলো নেতৃত্বহীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতা। সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো সরকার। একসময় বাংলাদেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের আনুকূল্যে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার বরাবরই জঙ্গিদের ব্যাপারে কঠোর। বিশেষ করে হলি আর্টিজানের পর থেকে একদম জিরো টলারেন্স। তালেবানদের আফগান দখলের পর থেকে সরকার আবার সতর্ক অবস্থানে। এরইমধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযানে মাথাচাড়া দিতে চাওয়া জঙ্গিরা ধরা পড়েছে। তার মানে গর্ত থেকে মাথা বের করলেই ধরা পড়তে হবে। তবে জঙ্গিদের গর্তে রেখেও নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। এদের শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে। তাই চাই, সরকারের জঙ্গিবিরোধী সর্বাত্মক অভিযান ও সমন্বিত চেষ্টা।

তালেবানের আফগান দখলের পর একটু মাথাব্যথা হলেও শঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই। তবে সতর্ক থাকতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
যানজট রোধে বিকল্প উপায় নিয়ে ভাবনা জরুরি
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা ও করণীয়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ষড়যন্ত্র ও জিয়ার সম্পৃক্ততা 
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও একজন মানবিক শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

শেয়ার করুন