রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন সময়ের দাবি

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানবতাবাদী নেতা ছিলেন। সারা বিশ্বে তার পরিচিতি ছিল শোষিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে। তার কন্যা শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায়। চার বছর অতিবাহিত হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সারা বিশ্বের দৃষ্টি এখনও বাংলাদেশ তথা শেখ হাসিনার দিকে। শেখ হাসিনা এখানে মধ্যমণি। তিনি আজ বিশ্বে শান্তিকামী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে মর্যাদাবান।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চতুর্থ বর্ষপূর্তি আজ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে চার বছর আগের এইদিনে তাদের ওপর নৃশংস হত্যা-ধর্ষণ, হামলা চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে শুরু হওয়া ওই সেনা অভিযানের পরের পাঁচ মাসে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। অবশ্য এর আগে থেকেই বিভিন্ন সময়ে আরও প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করত। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু করে সর্বশেষ আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে।

মানবিকতার চরমতম বিপর্যয়ের দৃষ্টান্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। কয়েক যুগ ধরে তারা স্বভূমির সামরিক জান্তার নির্মম শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসছে। পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে এই মানবিক বিপর্যয় বাংলাদেশের জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যথিত করেছে এই মানবিক বিপর্যয়। তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন, নানা সময় ছুটে গেছেন আশ্রয় শিবিরে। নিজে দেখেছেন এই অমানবিক অপরাধের চিহ্ন। কথা শুনেছেন নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের। দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই, তবে তাদের অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করা হবে না।

তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, শরণার্থীদের পাশে তিনি আছেন। দেশে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি তাদের পাশে থাকবেন। একথা সত্য যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে দীর্ঘ সময় আশ্রয় দেয়া আমাদের মতো দরিদ্র দেশের জন্য সত্যিই অসম্ভব। সীমিত সাধ্যের মধ্যেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শরণার্থীদের আশ্বস্ত করছেন। তাদের থাকা, খাওয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। এই চাপ বাংলাদেশের জন্য সত্যিই চ্যলেঞ্জ। শেখ হাসিনা মানবিক হৃদয় দিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চলছেন।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি মানবিক মনোভাবের পরিচয় দেয়ায় বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিশ্বে একটি আলোচিত নাম। পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজের অবস্থান আগেই তৈরি করেছেন। এখন মানবিকতায়ও। বর্বর নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয়-সেবা দিয়ে বিশ্বে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্রিটিশ মিডিয়া চ্যানেল ফোর সে সময় তাকে আখ্যায়িত করেছে ‘মানবতার মা’ হিসেবে। তিনি সর্বহারা রোহিঙ্গাদের পরম মমতায়, মাতৃস্নেহে যেভাবে আঁকড়ে ধরেছেন সেই দৃশ্য বিশ্ববাসীকে কাঁদিয়েছে, ভাবিয়েছে।

আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানবতাবাদী নেতা ছিলেন। সারা বিশ্বে তার পরিচিতি ছিল শোষিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে। তার কন্যা শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায়। চার বছর অতিবাহিত হলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সারা বিশ্বের দৃষ্টি এখনও বাংলাদেশ তথা শেখ হাসিনার দিকে। শেখ হাসিনা এখানে মধ্যমণি। তিনি আজ বিশ্বে শান্তিকামী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে মর্যাদাবান।

মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও শুরু থেকেই বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো।

২০১৭ সালের নভেম্বরেই মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চুক্তি সই করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া এখনও সম্ভব হয়নি। শিগগিরই প্রত্যাবাসন শুরু হবে এমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনাও শুরু হয়নি। অথচ মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের মূল হোতা জেনারেল মিন অং লায়েং এখন দেশটির সেনাশাসক ও স্বঘোষিত প্রধানমন্ত্রী। তার পক্ষ থেকেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কোনো বার্তা বা আভাস নেই।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গতি আনতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের আগ্রহে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় যুক্ত হয় চীন। বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় আলোচনাও একাধিকবার হয়েছে। সেখানেও আশার বাণী শোনা যায় না। বরং প্রত্যাবাসনের আলোচনার চেয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নেই তাদের মনোযোগ বেশি। যদিও চীনের সরাসরি মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সময়সীমা ঠিক করেছিল। এ জন্য কক্সবাজারের শিবিরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন চীনের কর্মকর্তারা। সে মোতাবেক তালিকাও করা হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের নাগরিকত্বসহ রোহিঙ্গাদের পক্ষে দেয়া শর্তগুলো পূরণ না হওয়ায় শেষমুহূর্তে। এর আগে ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রথম তারিখ ঠিক করেছিল বাংলাদেশ ও মিয়ানমার, সেটিও ব্যর্থ হয়।

আজ এটা স্পষ্ট যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের শুরুর বাস্তব সম্ভাবনা এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে জোর দেয়া ছাড়া সামনে কোনো বিকল্প নেই। বিশ্লেষকরা মনে করেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাংলাদেশের প্রতি যতটা যৌক্তিক ও সহানুভূতিশীল আচরণ করা উচিত, সেটি তারা করছে না। উলটো বাংলাদেশকে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের নানা পরামর্শ দিচ্ছে। এমনকি এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরে বাংলাদেশের উদ্যোগকে ভালো চোখে দেখেনি কিছু সংস্থা। তাই বলা যায়, লম্বা সময়ের জন্য রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে থেকে যাবে। এখন রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি বিশ্বের সামনে কূটনৈতিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। প্রত্যাবাসনের জন্য এককভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে জাতিসংঘসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষকে সঙ্গে নিতে আরও সক্রিয় হওয়া দরকার।

বাস্তবে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’- এই নীতি ধারণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের যে কজন নেতাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গুরুত্ব দেয় শেখ হাসিনা তাদের অন্যতম। শুধু রোহিঙ্গা প্রসঙ্গই নয়, এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার অনন্য ভূমিকা রেখে আসছেন। ১৯ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি বাহিনীর সঙ্গে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পাহাড়ে পাহাড়ি-বাঙালির নিরাপদ আবাস গড়ে তোলেন তিনি। এই চুক্তি পাহাড়ে সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসান ঘটায়। এর আগে দীর্ঘদিন এই অঞ্চলের মানুষ নিজদেশে পরবাসীর মতো জীবন যাপনে বাধ্য ছিল। শেখ হাসিনা প্রায় ৬৮ বছর পর ছিটমহলবাসীর বন্দি জীবনের অবসান ঘাটিয়ে নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেন।

১৯৪৭ সালের পর ২০১৬ সালে এসে স্বাধীন দেশের নাগরিকত্ব পায় ১৬২টি ছিটমহলের হাজার হাজার মানুষ। শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে এই মানবতার মেলবন্ধন রচিত হয়। আমাদের বিশ্বাস, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানও শেখ হাসিনার হাত ধরে বেরিয়ে আসবে। কারণ, শেখ হাসিনার হাতেই বাংলাদেশ নিরাপদ। যদিও এই মুহূর্তে আফগানিস্তান তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর আঞ্চলিক ও ভূরাজনীতিতে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি সেভাবে আলোচনায় থাকবে না। কারণ, বিশ্ব মনোযোগ এখন আফগানিস্তানের দিকে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা ইস্যু বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে বাংলাদেশকে। এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও আলোচনা দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আমরা চাই, রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসন হোক- তাদের স্বদেশ ভূমিতে।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
ওয়ান ইলেভেন ও আগস্টের ছাত্র-আন্দোলন
রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?

শেয়ার করুন

মন্তব্য

আশার রৌদ্র ছড়াও তুমিই এদেশে প্রতিটি ভোরে

আশার রৌদ্র ছড়াও তুমিই
এদেশে প্রতিটি ভোরে

শেখ হাসিনা যে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ এবং সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার এবং প্রগতির বাতিঘর হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। আর সে কারণেই দেশের শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক-শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীসহ সমাজের প্রগতিশীল পেশাজীবী যেমন, তেমনই সমাজের সচেতন মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসায় অভিষিক্ত হয়েছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। গ্রেনেড হামলা ব্যর্থ হওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল অন্ধকারের অনুসারীরা।

আজ প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন। নানা আয়োজনে দেশ-বিদেশে তার অনুরাগীরা উদযাপন করছেন দিনটি। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনসমূহ ব্যাপক আয়োজনে প্রিয় নেত্রীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগদান উপলক্ষে এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। সংগত কারণেই ঢাকায় তার অফিস কিংবা গণভবনে শুভেচ্ছা জানাতে কেউ যাবেন না, তারা শুভেচ্ছা জানাবেন ফেসবুকসহ নানা সামাজিক নেটওয়ার্কে।

এর বাইরে এমন বহু মানুষ আছেন, যারা আওয়ামী লীগের কোনো পর্যায়ের নেতাও নন, কর্মীও নন, অথচ শেখ হাসিনার জন্য শুভ কামনা জানাচ্ছেন, দোয়া করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তারা পরিচিতও নন কিন্তু তারা ভালোবাসেন তাকে। তার সুখে-দুঃখে উদ্বেলিত হন এসব মানুষ। এদেরকেই আমরা বলি জনসাধারণ। এই জনসাধারণের ভালোবাসাতেই বঙ্গবন্ধু মহান নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই দুঃখিনী বাংলার দুঃখমোচনের জন্য।

সেই বিপুলসংখ্যক সাধারণেরই একজন হিসেবে বলছি : শুভ জন্মদিন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা! আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু হোক। বার বার ফিরে আসুক জন্মতিথির এই সোনালি সকাল।

সোনালি সকাল আর শেখ হাসিনার জন্মদিন প্রায় সমার্থক। কারণ এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন এক আশ্চর্য অধ্যায় তিনি রচনা করেছেন, যা অন্ধকারে নিমজ্জিত একটি দেশের মানুষের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে সোনালি সূর্যোদয় দেখার আনন্দের সঙ্গে তুল্য।

দীর্ঘ অন্ধকার কথাটা এ কারণে বলা- ৩০ লাখ শহিদের রক্তফসল এই বাংলাদেশ ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর ভয়ংকর অন্ধকারের দিকেই যাত্রা করেছিল! অথচ এই অন্ধকার একাত্তরেই মুছে গিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তা আবার ফিরে আসে।

যে অন্ধকার তাড়াতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সারা জীবন সংগ্রাম করতে হয়েছে, চরম ত্যাগ স্বীকার করে এই জাতিকে ২৩ বছরের ঔপনিবেশিকতার গ্লানি থেকে স্বাধীনতার সোনালি সূর্যের মুখোমুখি করেছিলেন ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মার্চে এবং ১৬ ডিসেম্বর জাতি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের পতাকা উঁচু করে ধরেছিল পৃথিবীর বুকে।

কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে নিমগ্ন স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্র বাংলাদেশকে তার কক্ষচ্যুত করে নিয়ে যেতে থাকে সামরিক শাসন, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাসের ভয়ংকর অন্ধকার পথে!

পৃথিবীর দেশে দেশে বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। সরকারপ্রধান নিহত হয়েছেন। কোনো কোনো দেশে জিন্নাহ-গান্ধীর মতো জাতির পিতারাও নিহত হয়েছেন, কিন্তু তাতে কোনো রাষ্ট্রের চরিত্র হনন হয়নি, স্বাধীনতার মূল চেতনা থেকেও কোনো দেশ বিচ্যুত হয়ে যায়নি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কারণে বাংলাদেশ আমূল পাল্টে গেছে! যে পাকিস্তানি সামরিক শাসন আর ধর্মান্ধতা থেকে বেরিয়ে এসেছিল বাংলাদেশ একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে, সেই পথ উল্টো করে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী এবং খুনিচক্রের সহযোগীরা। সামরিক শাসকেরা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে ক্ষমতা দখল করেই তুষ্ট ছিল না, তারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানি অন্ধকারেই নিমজ্জিত করতে থাকে।

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার গৌরবের অধিকারী আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব সংকটেও পড়ে যায়- এরকম একটা সময়েই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে দেশে ফিরিয়ে আনে এবং শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতির মতো গুরু দায়িত্ব অর্পণ করে এবং তা সর্বসম্মতভাবেই।

১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বজনহারা শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফেরার পর থেকে বাংলাদেশে শুরু হয় তার মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনার সাধনা। স্বজনহারানো শোক ভুলেছেন তিনি দেশবাসীর ভালোবাসা পেয়ে। তবু দেশের কাণ্ডারি হওয়ার সেই পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বরং ছিল ভয়াবহ কণ্টকিত।

তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন যে কত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, তা ওই সময়ের বিদেশি পত্র-পত্রিকার খবরের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায়।

১৯৮১ সালের ৩১ মে লন্ডনের ‘সানডে টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় বলা হয়- ‘বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ফলে দেশে রাজনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য দেখা দেয়। ছয়বছর ভারতে নির্বাসিত জীবন যাপনের পর তিনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ ও জিয়া শাসনের বিরোধিতা করার জন্য দেশে ফিরে এসেছেন।’

১ জুনের ‘দি গার্ডিয়ান’ ও ‘মর্নিং স্টার’ পত্রিকায় বলা হয় ‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন জিয়ার পক্ষে গুরুতর উদ্বেগজনক ছিল’।

একই তারিখের ‘দি টাইমস’-এ বলা হয়- ‘সংসদের ক্ষমতা হ্রাস করে জিয়াউর রহমান কর্তৃক অধিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ফলে আওয়ামী লীগের প্রতি জনসমর্থন ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের ফলে উক্ত জনসমর্থন আরও পুঞ্জিভূত হয়। ‘ফিনান্সিয়াল টাইমস’ ও সাপ্তাহিক ‘ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকায়ও অনুরূপ মন্তব্য করা হয়। (সূত্র: শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন/ সুভাষ সিংহ রায় , পৃষ্ঠা ৯৭)

এসব তথ্য থেকেই বোঝা যায় শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং নেতৃত্ব কী বিপুল প্রভাব সৃষ্টি করেছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে!

জেনারেল জিয়াকে আকস্মিকভাবে সেনা-অভ্যুত্থানে নিহত হলে তার গড়া রাজনৈতিক দল বিএনপি সবচেয়ে অতিষ্ঠ ছিল শেখ হাসিনা-আতঙ্কে। তাকে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-মুসলিম লীগের মতোই বিএনপিও ভয় পেত। কারণ বিএনপি জানত মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব-দানকারী বঙ্গবন্ধুর গড়া দল আওয়ামী লীগ ও তার কন্যা শেখ হাসিনার চেয়ে বড় শত্রু তাদের আর নেই। তাই আওয়ামী লীগ এবং তার প্রধান চালিকাশক্তি শেখ হাসিনা শুরু থেকেই তাদের চোখের বালিতে পরিণত হয়েছিলেন। যে কারণে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধানকে হত্যার চেষ্টা করা না হলেও ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কম করে হলেও শেখ হাসিনাকে অন্তত ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়!

সবচেয়ে ভয়ংকর চেষ্টাটি ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি সমাবেশে শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের একসঙ্গে গ্রেনেড ছুড়ে নির্মূল করে দেয়ার। সিনিয়র নেতা আইভি রহমানসহ অনেকে নিহত হলেও সৌভাগ্য ক্রমেই বেঁচে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা।

সুতরাং শেখ হাসিনা যে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ এবং সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার এবং প্রগতির বাতিঘর হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। আর সে কারণেই দেশের শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক-শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীসহ সমাজের প্রগতিশীল পেশাজীবী যেমন, তেমনই সমাজের সচেতন মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসায় অভিষিক্ত হয়েছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। গ্রেনেড হামলা ব্যর্থ হওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল অন্ধকারের অনুসারীরা।

২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও তাই রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিনকেই একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বসিয়ে আবার ক্ষমতায় যাবার জন্য চারদলীয় জোট সৃষ্টি করে রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতি! যার ফসল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির সামরিক বাহিনীর সমর্থিত মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকার। সে সরকারও অবৈধ পথে ক্ষমতায় থেকে যেতে চেয়েছিল। তাদেরও টার্গেট ছিল শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরানো।

চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তার আগে এই সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারই তাকে দেশে ফিরতে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু সকল বাধা তুচ্ছ করে সাহসী নেত্রী শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের সংগ্রামে শামিল হয়েছেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয়ী হলে ২০০৯ সালে পুনরায় রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। সে পথেও বাধা কম ছিল না, এখন তা আরও তীব্রতর। কিন্তু প্রাণের মায়া ত্যাগ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত একযুগের বাংলাদেশের দিকে তাকালে বোঝা যায় কী বিস্ময়কর পরিবর্তনই না তিনি ঘটিয়েছেন দেশে! দেশকে ডিজিটাইজেশন করে অর্থনৈতিক এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে নতুন যুগের সূচনা করেছেন, কেউ তা কল্পনাও করতে পারেনি আগে।

নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার বিস্ময়করভাবে কমিয়ে আনা, সামাজিক নিরাপত্তা-বেষ্টনী সৃষ্টি করে দারিদ্র্য বিমোচনে গতি সঞ্চারসহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এমন সব কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন, যা মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়িয়ে, জীবনমান উন্নত করে বাংলাদেশকে নতুন যুগে প্রবেশ করিয়েছে।

তাই মাত্র একযুগের ব্যবধানে দারিদ্র্যপীড়িত দেশ আজ উন্নয়নশীল মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে! বাংলাদেশ আজ বিশ্ববাসীর কাছে উন্নয়নের রোল মডেল।

এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার দেশপ্রেম, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা আর লক্ষ্যে অবিচল পথচলায়। তার সুযোগ্য নেতৃত্বই বাংলাদেশ আজ বিশ্বসমাজে এত বড় সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশের যে অগ্রগতি, তা দেখে কবিতার ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে:

দেশপ্রেমী তুমি জনকের মতো, তুমি যে তুলনাহীন

সত্যে-সাহসে অবিচল তুমি, আশাবাদী চিরদিন।

আশার রৌদ্র ছড়াও তুমিই এদেশে প্রতিটি ভোরে

বাংলার নীল আকাশে তাইতো শান্তি-পায়রা ওড়ে।

জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রীর একটি সামান্য রেখাচিত্রই অঙ্কন করা গেল মাত্র। প্রথম একুশে সংকলনের সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রর সম্পাদক প্রখ্যাত কবি হাসান হাফিজুর রহমান বহুবছর আগে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন- ‘আপনিইতো বাংলাদেশ’।

এত বছর আগে কেন এমন মন্তব্য করেছিলেন তার মতো বিশাল ব্যক্তিত্ব, আজ আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি যখন তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবে রূপায়িত করতে চলেছেন।

শুভ জন্মদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জয়তু শেখ হাসিনা!

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
ওয়ান ইলেভেন ও আগস্টের ছাত্র-আন্দোলন
রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনা: বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও রাজনীতির উত্তরাধিকার

শেখ হাসিনা: বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও রাজনীতির উত্তরাধিকার

বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব আদর্শের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোতে প্রবাহিত করা। তাই ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল ঘাতকদের চারণভূমি এবং পাকিস্তানি ভাবাদর্শের রাষ্ট্রের পুনরুজ্জীবনের পথকে সুগম করার এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বজায় রাখা। সেই রাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উত্তরাধিকার ফিরে আসা ছিল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ১৫ আগস্ট দেশে না থাকার কারণে হত্যার শিকার হননি। তবে তারা দেশে ফিরতে পারেননি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত।

লেখার শুরুতেই জানাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে ৭৫তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ক্রমেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য আরও অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন। তাই তার শতায়ু কামনা মন থেকে আপনা আপনি চলে আসছে। তিনি প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে শুধু নয়, পিতার মতো বিশ্বের সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনিও একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠ হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। নিজদেশে তিনি ফিরেছেন শূন্য হাতে। তাকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বাধা প্রদান করা হচ্ছিল।

জীবনের প্রতি আগে থেকেই হুমকি আসতে থাকে। যারা তার বিপক্ষে এভাবে অবস্থান নিয়েছিল তারা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পিতা বঙ্গবন্ধু, মাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবসহ পরিবারের অন্য তিন ভাই, দুই ভাইয়ের নববিবাহিতা স্ত্রী, চাচা, নিকট আত্মীয়, শেখ মণি ও আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে।

সেই দিন যদি শেখ হাসিনা দেশে থাকতেন তাহলে তাকেও ঘাতকরা রেহাই দিত না। কারণ ওই হত্যাকাণ্ডটি ছিল বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও রাজনীতির উত্তরাধিকারকে সবংশে নির্মূল করা, বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুজিব আদর্শের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোতে প্রবাহিত করা। তাই ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল ঘাতকদের চারণভূমি এবং পাকিস্তানি ভাবাদর্শের রাষ্ট্রের পুনরুজ্জীবনের পথকে সুগম করার এক স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বজায় রাখা। সেই রাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উত্তরাধিকার ফিরে আসা ছিল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ১৫ আগস্ট দেশে না থাকার কারণে হত্যার শিকার হননি। তবে তারা দেশে ফিরতে পারেননি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাকে দলের সভাপতি পদে নির্বাচিত করার মাধ্যমে দলকে পুনরুজ্জীবনের এক গুরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সিদ্ধান্তটি দলের জন্যই শুধু নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। কারণ সাধারণ মানুষ ৭৫-৮১ পর্যন্ত সময়ে দেখেছে দেশ কীভাবে সান্ধ্য আইনে চলে, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা হয়, মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতিকে কীভাবে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং রাজনীতির খুনি, ঘাতক, সুবিধাবাদী, ৭১-এর পরাজিত শক্তি এবং পাকিস্তানের ভাবাদর্শের রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনা হয়।

৩০ লাখ শহিদের আত্মত্যাগের প্রতি এর চাইতে বিশ্বাসঘাতকতা আর কী হতে পারে! বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কত সব কুৎসা, অপপ্রচার রটিয়ে মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশকে তার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাষ্ট্রচেতনা থেকে সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ করার এক নীলনকশা ও গভীর ষড়যন্ত্র স্বাধীনতার পর থেকে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা অপশক্তি বাংলাদেশে সংগঠিত করে আসছিল। ফলে মানুষ বঙ্গবন্ধুকে ভোলেনি। যদিও রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলকারীরা বঙ্গবন্ধুর নামটিও মুছে ফেলার সব শক্তি প্রয়োগ করে যাচ্ছিল। এটি ছিল তাদের এক দীর্ঘ পরিকল্পনা। তারা নিশ্চিত ছিল বাংলাদেশ আর কোনোদিন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে ফিরবে না।

সেই পথ তারা ১৯৭৫ থেকে হত্যা ও রাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে তৈরি করে যাচ্ছিল। স্বদম্ভে তারা উচ্চারণ করেছিল বাংলাদেশের মাটিতে আর কোনোদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি চলবে না, রাষ্ট্রক্ষমতায়ও আর কোনোদিন কেউ আওয়ামী লীগকে দেখবে না। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রাজনীতিতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা তেমনটি স্বদম্ভে উচ্চারণ করত। বিদেশে অবস্থানরত শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে দেশে ফিরে আসার পদে পদে ছিল হত্যার হুমকি, বাধা-বিপত্তি। সহজেই অনুমেয় ছিল বাংলাদেশকে তারা কোথায় নিয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশ মনে হয় কেবল তখন স্বাধীনতাবিরোধীদের জন্যই নিরাপদ ছিল। যারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের হত্যা করা হলো, তাদের অনুসারীদের জেলে নিক্ষেপ করা হলো, রাজনীতি তাদের জন্য জটিল করে দেয়া হলো। এমন বাস্তবতায় শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা, রাজনীতিকে আবার মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে নেয়ার কাজটি ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

১৯৮১ সালের ১৭ মে ঢাকায় অবতরণ করার পর বোঝা গেল বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পাওয়ার যে স্বপ্ন দেখছিল সেটির বহিঃপ্রকাশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছিল। তিনি শত প্রতিকূলতার মধ্যে এসে দাঁড়ালেন। ঢাকায় তার থাকার ছিল না একটি ঘর। যদিও ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি একসময় ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির সবচাইতে আলোচিত এবং উদারভাবে আশ্রয় নেয়ার স্থল।

এই বাড়িটি শেখ হাসিনার পৈতৃক বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও তাকে সেখানে উঠতে দেয়া হয়নি। সেখান থেকেই তার রাজনীতিতে হাঁটিহাঁটিপা চলা। তিনি কোনোদিন ভাবেননি তাকে রাজনীতিতে আসতে হবে। বঙ্গবন্ধুও তাকে রাজনীতির উত্তরাধিকার হিসেবে আগে থেকে নির্ধারণ করে রাখেননি। যদিও তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির কঠিন সংগ্রামী জীবন ও দর্শনের ভেতর দিয়েই বড় হয়েই উঠছিলেন।

১৯৪৭ সালে আজকের এই দিনে টুঙ্গিপাড়ায় যখন তিনি জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার পিতা যুবনেতা শেখ মুজিব ঢাকায় নতুন আন্দোলন সংগ্রামে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। এর আগে পাকিস্তানের জন্য মুজিব ঢাকায় ফিরে এসেই বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ব বাংলার জনগণের মুক্তি সম্ভব নয়। সেকারণে তিনি ঢাকার রাজনীতিতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই অতি পরিচিত এবং অপরিহার্য হয়ে উঠছিলেন। তার তখন টুঙ্গিপাড়ায় যখন তখন যাওয়ার সময় ছিল না। ঢাকায়ও তার কোনো থাকার নিবাস ছিল না। রাজনীতির কারণে তাকে কারাগারে যেতে হয়। ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২ বছর ১ মাস ২৭ দিন তিনি ছিলেন ঢাকা ও ফরিদপুরের কারাগারে।

সুতরাং এহেনও মুজিবের কন্যা, শিশু সন্তানরা তাকে কাছে পাবেন, একসঙ্গে থাকবেন এমনটি তো আশা করা যায় না। তার পরও টুঙ্গিপাড়ায় মুজিবের কন্যা, প্রথম পুত্র কামাল মা ও দাদা-দাদির আদরেই বড় হচ্ছিলেন। পিতাকে তারা দেখেছেন খুবই কম। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর অসুস্থ পিতাকে কিছুদিন টুঙ্গিপাড়ায় দেখতে পান। কিন্তু সেটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। আবার তিনি ঢাকায় চলে এলেন। রাজনীতির উত্তাল ঢেউ সৃষ্টিতে মুজিব ছাড়া যেন চলছিল না। ১৯৫২-৫৩ সালে সেই ঢেউই শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। এর পরই কেবল তাদের ঢাকায় আসা। ১৯৫৪ সালে ঢাকার টিকাটুলিতে ভাড়া বাসায় তারা উঠলেন।

যদিও তিনি টুঙ্গিপাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করেছিলেন। তবে ঢাকায় আসার কারণে ভর্তি হলেন নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে। এরপর রাজনীতির উত্থান-পতন এই প্রদেশে যতবার ঘটছিল, ততবার মুজিব পরিবারের ওপর দিয়েই ঝড়টি যেন বার বার বয়ে যাচ্ছিল। বেগম মুজিব সন্তানদের আগলে রাখার জন্য সকল শক্তি নিয়োগ করেন। সন্তানদের লেখাপড়া, স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা যাতে নির্বিঘ্ন থাকে সেই দায়িত্ব তিনি পালন করেন।

১৯৬১ সালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি তৈরি হলে এখানেই মুজিব পরিবার স্থির হওয়ার সুযোগ পায়। শেখ হাসিনা তখন আজিমপুর গার্লস হাইস্কুলে চলে আসেন। ১৯৬৫ সালে এখান থেকে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন বকশীবাজারের ইন্টারমিডিয়েট গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজে।১৯৬৭ সালে তিনি আইএ পাস করেন। কলেজে ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ৬ দফার আন্দোলনে তখন তিনি জড়িয়ে পড়েন। পিতা বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি লাভের জন্য তিনি ভর্তি হন। ওই বছরটিতে পিতার ইচ্ছাতে ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শেখ হাসিনা পিতা ও স্বামীর সংসারে সদস্য হয়েও সেই উত্তাল দিনগুলোতে স্বামীর সঙ্গে রাজনীতির মাঠে নিজেকে যুক্ত রাখেন তবে বঙ্গবন্ধু মুক্ত হওয়ার পর স্বাধীনতার সংগ্রাম যখন মুক্তিযুদ্ধে এগিয়ে গেল তখন বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পাকিস্তানের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। বেগম মুজিবসহ পরিবারের সদস্যদের ধানমন্ডির একটি বাসায় বন্দি করে রাখা হয়। এখানেই যুদ্ধ চলাকালে সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্ম হয়।

যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পর শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির অনুসারী ও পর্যবেক্ষক ছিলেন। কিন্তু তিনি কিংবা বঙ্গবন্ধু কেউই স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের জীবন এতটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে সেটি কল্পনা করতে পারেননি। সে অনিশ্চয়তার পথ কত নির্দয়, নিষ্ঠুর, রক্তাক্ত এবং প্রতিশোধে পূর্ণ সেটি ১৫ আগস্ট থেকে এখন অবধি বদলায়নি। এমন এক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির হাল ধরলেন, নিজেকে সমর্পিত করে দিলেন পিতার মতোই। আর সেই কারণেই ৭৫-এর পর ঘুরে যাওয়া বাংলাদেশটিকে আবার ফিরিয়ে আনা শুরু করলেন অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারায়।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে ক্ষমতায় ফিরে এসে তিনি ঘাতকদের সকল দম্ভ, ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ করে দিলেন। আওয়ামী লীগ দেশকে যা দিতে পারে তা আগের কোনো সরকারই দেয়নি বা দিতে পারেনি সেটি প্রথম মেয়াদেই প্রমাণ করে দিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিকভাবে একটি মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে আসলেন, এর গতিপথও যেন ফিরে পেল আপন ঠিকানা। এরপর ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তিনি প্রমাণ করলেন যে, তিনি বঙ্গবন্ধুর উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ করার কারিগর। সেই লক্ষ্যেই তিনি গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তন, কৃষির উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিপ্লবাত্মক ঘটনা সংগঠিত করা, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া, দারিদ্র্য বিমোচন করা, আশ্রয়হীনদের আশ্রয় দেয়া।

শিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আনা। যোগাযোগ, তথ্য-প্রযুক্তি, কূটনীতি, ব্যবসাবাণিজ্য, আন্ত রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ইত্যাদি; আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রনীতিক ব্যবস্থায় তিনি যুগান্তকারী পরিবর্তন একের পর এক ঘটাতে থাকেন।

এখানেই তিনি অন্য সরকারগুলোর চাইতে নিজেকে আলাদা, দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারক এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উন্নত মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার একজন ভিশনারি-মিশনারি রাজনীতিক রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে দেশ এবং বিদেশে প্রমাণ করেছেন। বাংলাদেশে এখনও অনেক অর্জনের বাকি, সেই অর্জনও সম্ভব হতে পারে কেবল তার কিংবা তার মতো নিঃস্বার্থভাবে সমর্থনকারী রাজনীতিবিদের মাধ্যমে যিনি বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও আদর্শের ফলগুধারা বহন করেন।

শেখ হাসিনার জন্মদিনে তাই কোটি কোটি মানুষের প্রার্থনা হবে বাংলাদেশ যেন আর কোনোদিন ঘাতকদের রাজনীতিতে ফিরে না যায়, মুক্তিযুদ্ধের শক্তিশালী অসমাপ্ত পথচলা। তাহলেই বাংলাদেশ ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতি সফল হতে দেখবে।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক।

আরও পড়ুন:
ওয়ান ইলেভেন ও আগস্টের ছাত্র-আন্দোলন
রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?

শেয়ার করুন

সংশপ্তকের জন্য জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

সংশপ্তকের জন্য জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

৮০-র দশকে তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিশ্বসভায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল খুবই দুর্বল। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অনেকটা নতজানু হয়ে থাকতে হতো আমাদের। মাত্র ৭০ মিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে আমাদের তদানীন্তন অর্থমন্ত্রীদের প্যারিস কনসোর্টিয়ামের বৈঠকে দুর্বল চিত্তে হাজির হতে হতো। আজ আমাদের দেশ অন্যদের ২০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে।

‘হাসিনা: আ ডটারস টেল’। মধ্যবিত্ত গার্হস্থ্য আবহে হাসি আনন্দে ভরা পরিবারে বেড়ে ওঠা এক নারীর অকস্মাৎ সব স্বজন হারিয়ে সর্বহারা হয়ে যাওয়া, সেই অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানো এবং অবশেষে দিগন্তবিস্তারী মহিমায় ১৭ কোটি মানুষের ত্রাতা হিসেবে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণার গল্প নিয়ে এই ছবি।

পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর আপন দেহভস্ম থেকে গ্রিক পুরাণের ফিনিক্স পাখির পুনরুত্থান, এই গল্প যেন সেই পৌরাণিক আখ্যানের বাস্তব প্রকাশ। যেন এক জাদুবাস্তবতানির্ভর পরাবাস্তব গল্প। এই ছবির সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় দিক হলো- এখানে একেবারে হারিয়ে যাওয়ার মতো পর্যায় থেকে স্বমহিমায় যার ফিরে আসার গল্প বলা হয়েছে, তিনি নিজেই সেই গল্পের মূল কথক। তিনি হলেন বাংলার ‘ফিনিক্স পাখি’, বিশ্বনন্দিত রাজনীতিক আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ ২৮ সেপ্টেম্বর সেই মহীয়সী নারী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিন। এই ঐতিহাসিক উচ্ছ্বাসের মুহূর্তে লেখাটি শুরু করেছি। ‘হাসিনা: আ ডটারস টেল’ ছবিতে আত্মকথনের একপর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা বলেন, ১৯৮১ সালের ৯ এপ্রিল তারা দুই বোন দিল্লির নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগায় গিয়েছিলেন। সেখানে একজন খাদেম অনেক পুরোনো একটা খাতা এনে তাদের সামনে মেলে ধরলেন। সেই খাতায় বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর। তারিখ ৯ এপ্রিল, ১৯৪৬।

ওই প্রামাণ্যচিত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- “দেখলাম তারিখটা ৯ এপ্রিল। ১৯৪৬ সালে আব্বা ওখানে গিয়েছিলেন। আর আমি গেলাম ৮১ সালের ৯ এপ্রিল। ৪৬ সাল, আমার জন্মের আগে উনি গিয়েছেন। আর আমি পাচ্ছি ৮১ সালের একই তারিখ। তখন আমার মনে একটা সাহস এল। মনে হলো আমাকে যেতে হবে। মানুষের জন্য কিছু করতে হবে। বোধ হয় এই বার্তাটাই আমি পাচ্ছি।”

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ছিলেন। নিয়তি নির্ধারিত সেই অনুপস্থিতি সেদিন তাদের গণহত্যা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। বিদেশে বসে জানলেন, তিনি আক্ষরিক অর্থে এতিম হয়ে গেছেন।

ব্রাসেলস থেকে প্রথমে জার্মানিতে এবং পরে ভারতে এসেছিলেন। দিল্লিতে থাকার সময় খুনিরা তাকে হত্যার চেষ্টা করছিল। আত্মরক্ষার্থে তখন দিল্লিতে দুই বোনকে নাম-পরিচয় পর্যন্ত গোপন করতে হয়েছিল। কিন্তু দেশে ফেরার ইচ্ছা তাকে তাড়া করে ফিরছিল। তিনি জানতেন, দেশে ফেরার পর তার পায়ে পায়ে বিপদ থাকবে, কিন্তু সেই বিপদকে সরিয়ে দেশবাসীকে স্বৈরাচারমুক্ত করতেই হবে। ফলে পরের মাসেই, অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশের মাটিতে পা রাখেন তিনি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা যেন বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঘটনারই এক পুনর্মঞ্চায়ন। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে বঙ্গবন্ধুকে যখন সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিলেন, যুদ্ধে সব শেষ হয়ে যাওয়া দেশে ফিরে তিনি কী করবেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন- “আমার দেশের মাটি আছে, আমার জনগণ আছে। আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াব”। মানুষ এবং মাটিই যে তার শক্তির উৎস ছিল, দেশবাসী সেটি জানতেন, সেদিন তিনি তা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বঙ্গবন্ধুকেই ধারণ ও বহন করে চলেছেন, যত দিন যাচ্ছে, তত তা স্পষ্ট হচ্ছে।

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা যখন দেশের মাটিতে পা রেখেছেন, সে মুহূর্তে ঘাতকেরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসন দখল করে আছে। ‘জয় বাংলা’, ‘বঙ্গবন্ধু’—এ শব্দগুলো তখন নিষিদ্ধ পঙক্তিমালা। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে জাতিকে কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছেন। দীর্ঘ যাত্রায় নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে, কারাভোগ করে, একাধিকবার গৃহবন্দি হয়ে, হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে গিয়ে তিনি চারবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড গড়েছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় চার দশক ধরে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে যাওয়া এই মহীয়সী ১৯৪৭ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মেছিলেন। মধুমতি নদী, বাঘিয়ার বিল আর বর্নির বাঁওড়ের জলকল্লোলস্নাত পরিবেশে শৈশব কেটেছে তার। মাটি আর মৃত্তিকাসংলগ্ন মানুষের মধ্যে বেড়ে ওঠা। সেই কোমল মাটির মতো মানুষটিকে জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনে কখনও কখনও কঠোর হতে হয়েছে। কোমলে-কঠোরে মিলে এক অনন্য চরিত্রে আজ তিনি জাতির স্বপ্ন ও আশার ধ্রুব নক্ষত্র।

বলা হয়ে থাকে, জওহরলাল নেহরু ছিলেন একজন ভিশনারি, আর তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন মিশনারি। বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে একই কথা বলা যায়।

বঙ্গবন্ধুর স্মরণশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। প্রচলিত আছে, তিনি কারো নাম শুনলে সচরাচর সেই নাম ভুলতেন না। দেশের কোথায় কী হচ্ছে, তা বঙ্গবন্ধুর নখদর্পণে ছিল। সব খোঁজখবর তিনি রাখতেন। এই গুণগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে স্পষ্ট।

আমার মনে পড়ছে, ঢাকায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অল্প কয়েক দিন আগে আমি তখন র‌্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে একটা কাজে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে কথা প্রসঙ্গে ঢাকায় ক্যাসিনো থাকার কথা বললেন। অতঃপর জিজ্ঞেস করেন, ‘তাহলে তুমি কী করছ? তুমি এগুলো দেখছ না কেন?’ আমি বেশ অবাক হলাম। তার নলেজের বাইরে যে কিছুই নেই, সেটা আরও একবার উপলব্ধি করলাম।

আমি বললাম, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ব্রিটিশ আমলে প্রণীত জুয়া আইনটি খুব দুর্বল। তা ছাড়া, প্রয়োগের বিষয়টা জেলার অধিক্ষেত্রে দেখেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আর মেট্রোপলিটন এলাকায় এ বিষয়টি দেখেন পুলিশ কমিশনার। মানে জুয়া আইন বাস্তবায়নে সরাসরি র‌্যাবের তেমন কিছু করার নেই।’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘আমি যদি তোমাকে নির্দেশ দিই?’ আমি বললাম, ‘আপনি নির্দেশ দিলে তো আমি অবশ্যই করতে পারি—ইন নো টাইম’। পরে আমি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে র‌্যাবকে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিই। এর ফলে যা হলো- সেটি এই অঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনন্য উদাহরণ এবং বাকিটা ইতিহাস।

এর কিছুদিন পরে র‌্যাবের ‘রেইজিং ডে’ ছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন। ওই সময় সুন্দরবনে জলদস্যু দমন অভিযানের কারণে আমরা জানতে পারি, বঙ্গোপসাগরে ছোট ছোট অনেকগুলো দ্বীপ জাগতে শুরু করেছে। তখন আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গোপসাগরে নতুন কিছু দ্বীপ ভেসে উঠছে। আমরা আমাদের কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য কি এ রকম একটা দ্বীপ নিতে পারি, যেখানে বিদেশি পর্যটক ও দেশের মানুষের জন্য কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করা যেতে পারে’। তিনি তার মোবাইল ফোন খুললেন।

মুহূর্তের মধ্যেই তিনি মোবাইলের স্ক্রিন আমার সামনে ধরে জেগে ওঠা দ্বীপগুলোর নাম ধরে বলতে লাগলেন, ‘এই দেখো, এটা এই আইল্যান্ড, ওটা হলো ওই আইল্যান্ড।’ দ্বীপগুলোর কোনটাতে কোন ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন, সেটাও তিনি বলে দিচ্ছিলেন। দেখলাম, তিনি ওই দ্বীপগুলো সম্পর্কে আগাগোড়া পরিচ্ছন্ন ধারণা নিয়ে বসে আছেন। আমি হতভম্ব ও হতবাক! দেশকে এগিয়ে নিতে হলে, আগে দেশকে ভালোভাবে জানতে হবে—এই সত্যটা তার কাছ থেকে আমি সবচেয়ে বেশি জেনেছি। তার অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ফলে উত্তরবঙ্গের দুর্ভিক্ষের শব্দকোষ থেকে আজ ‘মঙ্গা’ নামের শব্দটি চিরস্থায়ীভাবে বিলুপ্ত হয়েছে।

আমি পুলিশের মহাপরিদর্শক হওয়ার পর যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘দেখো, পুলিশকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হলে প্রশিক্ষণকে প্রাধান্য দিতেই হবে। তোমাদের মধ্যে র‌্যাংকের পরিবর্তন হলেই মাঝে মাঝে প্রশিক্ষণ হয়। এটা কিন্তু ঠিক না। বছরব্যাপীই কিন্তু তোমাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলমান থাকতে হবে। সকল অফিসারসহ প্রতিটি সদস্যকে প্রতিবছরই প্রশিক্ষণে থাকতে হবে, সে যে র‌্যাংকেরই হোক না কেন।’

আমার আবারও চমকানোর পালা। দেখলাম, পুলিশ বাহিনীর অতি খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সম্পর্কেও তিনি বিশেষজ্ঞের মতো বলে যাচ্ছেন। প্রশিক্ষণ ছাড়া যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী এগোতে পারে না, সেটি তিনি কতটা উপলব্ধি করেন!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেই পরামর্শের ধারাবাহিকতায় আমরা এ বছর ৫ সেপ্টেম্বর সকল র‌্যাংকের অফিসারসহ সব সদস্যের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছি। পুলিশ বাহিনী গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এটি একটি বিরল ঘটনা যে, সকল র‌্যাংকের সবার জন্য প্রতিবছর নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেয়ার যাত্রা শুরু হলো। এইভাবে রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি—প্রতিটি ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঈর্ষণীয় প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে আসছেন।

৮০-র দশকে তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিশ্বসভায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল খুবই দুর্বল। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অনেকটা নতজানু হয়ে থাকতে হতো আমাদের। মাত্র ৭০ মিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে আমাদের তদানীন্তন অর্থমন্ত্রীদের প্যারিস কনসোর্টিয়ামের বৈঠকে দুর্বল চিত্তে হাজির হতে হতো। আজ আমাদের দেশ অন্যদের ২০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশ আজ যে উচ্চতায় উঠে এসেছে, তার পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী ও সাহসী ভূমিকা প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।

আজ পৃথিবীর সর্বত্র শেখ হাসিনাকে নিয়ে আলোচনা হয়। ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদর দপ্তরে তাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ উপাধিতে ভূষিত করে। নারী ও কন্যাশিশুদের শিক্ষা প্রসারে স্বীকৃতি স্মারক ‘শান্তি বৃক্ষ’ দেয়ার সময় তার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ইউনেসকোর প্রধান। তাকে ‘সাহসী নারী’ অভিহিত করে জাতিসংঘের এ সংস্থাটির প্রধান বলেছেন-

“নারী ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চের জোরালো এক কণ্ঠ।” গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সল্যুশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘এসডিজি অগ্রগতি পুরস্কার’-এ ভূষিত করেছে। পুরস্কার প্রদানকালে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এসডিএসএন-এর প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন কৌশলবিদ প্রফেসর জেফরি স্যাকস শেখ হাসিনাকে উন্নয়নশীল দেশের অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে ‘জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন অব দি ডে’ হিসেবে তুলে ধরেন, যা প্রতিটি বাংলাদেশি বাঙালির জন্য অত্যন্ত গর্বের।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহাকাব্যিক অর্জন ও সাফল্যগাথা কোনো ছোট একটি প্রবন্ধে কিংবা পুস্তকে তুলে আনা অসম্ভব আস্পর্ধা। ১৯৯৬-২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে পার্বত্য চুক্তি ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি তার সরকারের অন্যতম সাফল্য হিসেবে এখনও বিবেচিত হয়ে আসছে। দীর্ঘকাল ছিটমহলের বাসিন্দারা নাগরিকত্বহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করে আসছিলেন। তিন বিঘা করিডরে সন্ধ্যা নামার আগেই সেখানে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হতো। স্বাধীনভাবে মানুষ নিজের ঘরে ঢুকতে পারত না। ভারতের সঙ্গে ছিটমহল-বিনিময় চুক্তি করে, ছিটমহলগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করে সেই কষ্টের, সেই যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়েছেন শেখ হাসিনা।

বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত ও মধ্যম আয়ের আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য পূরণে কাজ করে যাচ্ছে। এর বাইরে তার নেতৃত্বে ‘ডেলটা প্ল্যান’ নামের একটি এক শ’ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে। সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা অভাবনীয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র উড়িয়ে দিয়ে তার বজ্রকঠিন মনোবলের কারণেই আজ পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ নিয়েছে। মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো মহাপ্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তিনি যোগাযোগব্যবস্থায় এক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনি সাধারণ মানুষের অন্তরের কতটা গভীরে যেতে পেরেছেন, তার প্রমাণ গফরগাঁওয়ের রিকশাচালক হাসমত আলী। হতদরিদ্র হাসমত আলী নিজের সব সঞ্চয় দিয়ে জমি কিনে তা শেখ হাসিনার নামে লিখে দিয়েছিলেন। অথচ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কোনো দিন দেখাই হয়নি।
এই রকম দেশের অগণিত হাসমত আলীর দোয়ার বরকতেই কমপক্ষে ১৯ বার হত্যাচেষ্টার হাত থেকে বেঁচে প্রধানমন্ত্রী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। ৭৫তম জন্মদিনের এই শুভ মুহূর্তে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে প্রাণঢালা অভিনন্দন। তার জন্য শুভকামনা— শতায়ু হোন সংশপ্তক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

লেখক: ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন:
ওয়ান ইলেভেন ও আগস্টের ছাত্র-আন্দোলন
রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?

শেয়ার করুন

বাংলাদেশ কি আফগানিস্তান হবে?

বাংলাদেশ কি আফগানিস্তান হবে?

আফগানিস্তান কি ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ও প্রযুক্তিতে উন্নত কোন দেশ? তা-ও নয়। তাহলে বাংলাদেশকে কেন আফগানিস্তান বানাতে হবে? কারা বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানাতে চায়? তারা কি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে ধারণ করে? কী মূল্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটি তারা জানে? প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশ বছর পর বাংলাদেশ আর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক বিকাশের কোন পর্যায়ে আছে সেসম্পর্কে কি তারা ওয়াকিবহাল? নিশ্চয়ই বাংলাদেশ আফগানিস্তানের চেয়ে শতগুণ উন্নত ও সন্তোষজনক জায়গা।

মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর নজিরবিহীন ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তালেবান বাহিনী আফগানিস্তান দখল করে নেয়ায় বিশ্ব হতবাক! এদের এত হিম্মত! ৩ থেকে ৪ লাখ আফগান সরকারি বাহিনী প্রতিরোধ করতে পারেনি ৮০ থেকে ৯০ হাজার তালেবানকে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আফগান বাহিনী তাদের প্রতিরোধের চেষ্টাও করেনি! লক্ষ্য ও গন্তব্য ঠিক না থাকলে, আদর্শিক শক্তিতে তাকত না থাকলে সংখ্যার আধিক্য, অস্ত্র-শস্ত্র ও বিদেশি সমর্থন দিয়ে যে যুদ্ধ করা যায় না, সেটি তালেবানরা প্রমাণ করে দিল। তালেবান বাহিনী আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর সারা বিশ্বে নানা ধরনের আতংক ও উৎকন্ঠা শোনা গেছে। যা এখনও চলমান- দৃশ্যমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রাষ্ট্রনেতাদের বক্তব্যে।

তালেবানদের নৃশংসতা ও সম্ভাব্য প্রতিহিংসার আতংকে হাজারো মানুষকে বিমানে করে কাবুল ত্যাগ করতে দেখা যায়। হুড়োহুড়ি করে বিমানে উঠতে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় কজন হতভাগ্য মানুষের। তালেবান সদস্যদের স্টাইলই অন্যরকম। মাথায় আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী শেরওয়ানী বা পাগড়ি, পরনে পাজামা ও পাঞ্জাবী এবং হাতে স্বংয়ক্রিয় রাইফেল, গ্রেনেড বা রকেট। বিবিসি, সিএনএন, ও আল-জাজিরার কল্যাণে একদম লাইভ মহড়া ও ফাঁকা গুলি ছোড়ার দৃশ্য দেখা যায়।

ভয়ে লোকজন বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। স্থল সীমান্ত দিয়ে লাখো মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চলে গেছে। আফগানিস্তানের সাধারণ লোকজন উৎকন্ঠার মধ্যে আছে। সবচেয়ে আতংকে নারীরা। পড়াশুনা ও চাকরি-বাকরির জন্য ঘরের বাইরে যেতে পারবে কি না, আপাদমস্তক বোরখাবন্দি হয়ে তাদের চলাফেরা করতে হবে কি না- সেটি নিয়ে শুধু আফগানিস্তানের নারীই নয়, জাতিসংঘ, বিশ্বসম্প্রদায় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও উৎকন্ঠিত। নতুন সরকার গঠন করার পর নারী মন্ত্রণালয় বন্ধ করে দিলেও, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পুনরায় গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে তালেবান সরকার।

আফগানিস্তানের তালেবানি উত্থান সারা বিশ্বে কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে? গুরুত্ব পাওয়ার কারণ এর বৈশ্বিক, আঞ্চলিক, ও রাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাব। কেননা, তালেবানি উত্থানে আল-কায়েদা, আল-শাবাব ও আইএস-এর মত জিহাদী সংগঠনের যোদ্ধারাই শুধু উজ্জীবিত হয়নি, নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছে নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, পাকিস্তানের তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি), ভারতের কাশ্মিরভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বা ও জইশ-ই-মুহম্মদ। তালেবানদের বীরত্ব অনেক মুসলিম দেশের সিভিল ও জঙ্গী সংগঠন যারা কট্টরপন্থী ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়েছে।

আফগানিস্তানের বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদের জন্যও চীন, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, তুরস্ক, কাতার, ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে আছে নানা হিসাব-নিকাষ। একদিকে এ বিপুল পরিমাণ সম্পদ অন্যদিকে নতুন দেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করে গড়ে তোলা এবং বিশ্বব্যাপী ও আঞ্চলিক পর্যায়ের নানা জঙ্গিসংগঠনের ওপর তালেবানদের প্রভাব ও যোগাযেগের ফলে সারা বিশ্ব আফগানিস্তানের ক্ষমতার পালা বদলকে এতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। মার্কিনিদের হটিয়ে আফগানিস্তানে তালেবানদের নিরংকুশ নিয়ন্ত্রণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটি নিয়েও হচ্ছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ।

দশক ২ আগে আমরা শ্লোগান শুনেছি– ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান।’ আফগানিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কোন সরাসরি যোগাযোগ, বিরোধ বা মিতালির ঘটনা আমাদের জীবদ্দশায় দেখিনি, যেমনটি দেখেছি ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। দূর অতীতে আফগানিস্তানের শাসকরা বাংলা শাসন করেছিল এইটুকু শুধু ইতিহাসে পড়েছি। এর পরের কাহিনি হচ্ছে, আশির দশকে আফগানিস্তানের মুজাহিদদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে জিহাদিরা গিয়েছিল। এরপর আরও কটি দল তালেবানদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য গেছে বলে গণমাধ্যমের খবরে দেখেছি।

তবে, ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’- শ্লোগানটির মধ্যে ভাবনার খোরাক যেমন আছে, তেমনি আছে অনেক প্রশ্ন। যেমন- বাংলা কেন আফগান হবে? আফগানিস্তান কি খুব সম্পৎশালী, গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র? যেখানে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের মানুষ সাগ্রহে অপেক্ষা করবে? বাংলাদেশের মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ইউরোপের কোন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চায় ওসব দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে।

তাছাড়া আফগানিস্তান কি ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ও প্রযুক্তিতে উন্নত কোন দেশ? তা-ও নয়। তাহলে বাংলাদেশকে কেন আফগানিস্তান বানাতে হবে? কারা বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানাতে চায়? তারা কি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে ধারণ করে? কী মূল্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটি তারা জানে? প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশ বছর পর বাংলাদেশ আর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক বিকাশের কোন পর্যায়ে আছে সেসম্পর্কে কি তারা ওয়াকিবহাল?

নিশ্চয়ই বাংলাদেশ আফগানিস্তানের চেয়ে শতগুণ উন্নত ও সন্তোষজনক জায়গা। তাহলে ‘বাংলাকে আফগান’ বানানোর শ্লোগানটি যেমন অর্বাচীন, ধারণাটি আরও পশ্চাদপদ।

বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ তা হয়নি বরং আরও ‘বেশি বাংলাদেশ’ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের আফগানিস্তান হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। যদিও বাংলাদেশে রক্ষণশীল ভাবধারার গোঁড়া ধার্মিকদের সংখ্যা আশংকাজনক হারে বেড়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প-সাহিত্য ও গণমাধ্যমগুলোতে মুক্তজ্ঞান চর্চা কমেছে। মুক্ত জ্ঞানচর্চার কথা আমি একটু জোর দিয়ে বলতে চাই কেননা এর বেশি চর্চা যেমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে দেয় আবার মুক্ত জ্ঞানচর্চা কমে গেলে একটি রাষ্ট্রের অস্থিতিশীল হবার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যাহোক বাংলাদেশের বিদ্যমান সমস্যা, সম্ভাবনা, ঘাটতি ও অর্জনকে বিবেচনায় রেখে বলা যায়, নানা কারণে বাংলাদেশের আফগানিস্তান হওয়ার সম্ভাবনা শুধু শূন্য নয়, জোড়া শূন্য।

প্রথমত, বিভিন্ন সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের বহুত্ববাদী রাজনীতি বলা চলে। কেননা, বাংলাদেশের রাজনীতিতে মধ্যপন্থী, বামপন্থী, ডানপন্থী, আলট্রা ডান, আলট্রা বাম- সবই আছে। যদিও মানুষ এ পর্যন্ত মধ্যপন্থী দলগুলোর ওপরই ভরসা রেখেছে।

বাংলাদেশের মানুষ সশস্ত্র বামপন্থাকে যেমন পছন্দ করেনি, তেমনি সশস্ত্র ডানপন্থা বা জঙ্গীবাদকেও পছন্দ করেনি। যেকোনো পরিস্থিতিতে এটিকে আমার বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির বটম লাইন, বর্ডার লাইন বা চূড়ান্ত সীমারেখা বলে মনে হয়। বাংলাদেশে যারাই রাজনীতি করুক না কেন, যারাই রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিরোধী দলে থাকুক না কেন, এই বাস্তবতা তাদের মাথায় রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও পহেলা বৈশাখখে যে বিপুল পরিমাণ মানুষের ঢল নামে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সাধারণ বাংলাদেশি বাঙালি। উত্তাল তরঙ্গের মত বহমান এই মানুষের সম্মিলন আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শেকড়ের কথা, আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য ও উৎসবের কথা।

এটি সত্য যে, বৃটিশ আমলে ‘ডিভাইড এ্যান্ড রুল’ পলিসির মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়কে বিভাজন করা হয়। এরপরে হিন্দু সংরক্ষণশীলদের কারণে হোক অথবা জিন্নাহর ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কারণে অথবা উভয় কারণের সম্মিলিত ফলাফল হিসেবে হোক, ভারতীয় উপমহাদেশ ধর্মের ভিত্তিতে দু’টি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয় এবং হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় লাখো মানুষ খুন হয়।

আবার এটিও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ছিল বৃটিশ শাসকদের সঙ্গে ‘নেগোশিয়েসন’ বা দর-কষাকষির ফল কিন্তু বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধ করে যে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে, তার চরিত্র ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে নারী শিক্ষা যতটা এগিয়েছে এবং নারী ক্ষমতায়ন যতটা হয়েছে, সে বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন হবে বলে মনে হয়। এ কারণে ‘নারী অধিকার’ পরিপন্থী কোন শক্তির রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসাটা দুঃসাধ্য। মোদ্দা কথা হচ্ছে, এমন কিছু সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় আছে, যে বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে কোন শক্তি বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে না। ক্ষমতায় আসা তো দূর কল্পনা।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
ওয়ান ইলেভেন ও আগস্টের ছাত্র-আন্দোলন
রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?

শেয়ার করুন

ভুতুড়ে গণমাধ্যম

ভুতুড়ে গণমাধ্যম

গণমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে কিছু ধান্দাবাজও তৈরি হয়েছে। কেউ গণমাধ্যমকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে, কেউ ব্যবসায়িক স্বার্থে। আবার অনেকে আছে নিজেই মালিক, সম্পাদক ও রিপোর্টার।

সোশ্যাল মিডিয়ার দৌরাত্ম্যে এখন কোনটা সংবাদ বা অপসংবাদ, কোনটা তথ্য বা গুজব— তা অনেক সময় ঠাওর করা যায় না। অনেক কথিত অনলাইন পোর্টাল ও আইপি টিভি সংবাদের ভাষা আর কনটেন্ট দেখে মনে হতে পারে, সাংবাদিকতা বুঝি অশিক্ষিত লোকের পেশায় পরিণত হয়েছে। অথচ হওয়ার কথা উল্টো। যে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ বলে স্বীকার করা হয়, সে গণমাধ্যম কাদের হাতে চলে যাচ্ছে, কারা সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় আসছে এবং তারা কী করছে— তা নিয়ে প্রশ্নের অন্ত নেই।

এমন বাস্তবতায় গত ১৪ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়- ১০টি দৈনিক পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে। দীর্ঘদিন প্রকাশনা বন্ধ থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহ্‌মুদ জানান, যেসব পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয় না, সেগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হবে। তিনি বলেন, ২১০টি পত্রিকা, যেগুলো সচরাচর ছাপা হয় না বা চোরাগুপ্তা ছাপে— এগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আরও বলেন, “এই পত্রিকাগুলো মাঝেমধ্যে কোথা থেকে ছাপা হয় কেউ জানে না। এগুলো থাকার দরকার নেই। গণমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে কিছু ধান্দাবাজও তৈরি হয়েছে। কেউ গণমাধ্যমকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে, কেউ ব্যাবসায়িক স্বার্থে। আবার অনেকে আছে নিজেই মালিক, সম্পাদক ও রিপোর্টার।”

এর কয়েক দিন আগে ১৪ সেপ্টেম্বর আরেকটি অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জানান, দেশে প্রায় ৪০০টি পত্রিকা অনিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তিনি এগুলোকে ‘ভূতুড়ে পত্রিকা’ বলেও মন্তব্য করেন।

তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমতের সুযোগ নেই, বরং একমত হয়ে বলা যায়, ভূতুড়ে (অনেক সময় যেগুলোকে আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকাও বলা হয়) পত্রিকা বন্ধের এ উদ্যোগ আরও আগেই নেয়া উচিত ছিল। গণমাধ্যমের পেশাদারি বজায় রাখার স্বার্থেই তথ্যমন্ত্রীর ভাষায় এসব ‘ধান্দাবাজের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

ইন্টারনেট তথা ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির লোক আইপি টিভিতে লোাক নিয়োগের নামে যে ধরনের বাণিজ্য করছে এবং এসব টিভিতে সংবাদ প্রচারের নামে যেসব কর্মকাণ্ড করছে, তা দেশবাসীর অজানা নয়।

১৯ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি জানায়, ৫৯টি অবৈধ ও অনিবন্ধিত আইপি টিভি বন্ধ করা হয়েছে। টেলিভিশনে প্রচারিত কনটেন্ট ইন্টারনেট প্রটোকল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সম্প্রচার করার প্রক্রিয়া হলো আইপিটিভি। বিটিআরসি শুধু লাইসেন্সধারী আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইপিভিত্তিক ডাটা সার্ভিসের (স্ট্রিমিং সেবা, আইপিটিভি, ভিডিও অন ডিমান্ড) অনুমোদন দেয়।

নিয়ম অনুযায়ী বিটিআরসির কাছ থেকে আইপিটিভি সেবার অনুমোদনপ্রাপ্ত আইএসপি অপারেটররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্য মন্ত্রণালয় অনুমোদিত স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার শুধু তাদের গ্রাহকদেরই দেখাতে পারবে। তবে প্রতিটি চ্যানেলকে প্রোগ্রাম বা কন্টেন্ট প্রচারে প্রয়োজনীয় চুক্তি, অনুমোদন বা ছাড়পত্র প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু বিটিআরসি বলছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে ডোমেইন কিনে বা ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে জনগণকে আইপি টিভি প্রদর্শন করছে, যার কোনো অনুমোদন নেই। অনুমোদন ছাড়া সম্প্রচার অনৈতিক এবং টেলিযোগাযোগ আইনের লঙ্ঘন।

স্মরণ করা যেতে পারে, ১৪ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ যেদিন ১০টি পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিলের খবর আসে, সেদিনই অননুমোদিত ও অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো সাত দিনের মধ্যে বন্ধ করতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। বিটিআরসির চেয়ারম্যান ও প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের প্রতি এ নির্দেশ দেয়া হয়। অননুমোদিত ও অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর কার্যক্রম বন্ধ চেয়ে করা সম্পূরক এক আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

নির্দেশনা বাস্তবায়ন বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ২৮ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য করা হয়। শুধু তা-ই নয়, সংবাদপত্র, সংবাদ এজেন্সি এবং সাংবাদিকদের জন্য নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নে নিষ্ক্রিয়তা কেন বেআইনি হবে না এবং নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়নে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তাও জানতে রুল জারি করেন উচ্চ আদালত। এর পরদিনই সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহ্‌মুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‌'দেশে এত বেশি অনলাইনের প্রয়োজন নেই। থাকা সমীচীনও নয়।' নিউজ পোর্টালের পাশাপাশি ইউটিউব চ্যানেল ও আইপি টিভিও রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনার কথা জানান তিনি।

অনেকে তথ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলে, অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ ভালো, কিন্তু নিবন্ধনের নামে যেন নিয়ন্ত্রণ করা না হয়। অনেকে মনে করে, নিবন্ধন না নিয়েও কেউ যদি ‘অনিবন্ধিত মিডিয়া’ হিসেবে থাকতে চায়, সে সুযোগ দেয়া উচিত। বিশেষ করে এসব অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল যদি সাংবাদিকতার নামে অন্যায় ও অন্যায্য কিছু না করে, তাহলে তাদের প্রকাশিত হতে দেয়া সংবাদমাধ্যম ও বাক্‌স্বাধীনতার অংশ বলেও মনে করে তারা।

যারা অনিবন্ধিত পোর্টাল বন্ধের বিপক্ষে, তাদের মত হলো- মূলধারার গণমাধ্যম হিসেবে পরিচিত অনেক সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল ও টেলিভিশন সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা পরিপন্থি কাজ করে। কিন্তু এসব যুক্তিতে অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল ও আইপি টিভি চলতে দেয়া যায় কি না— সেটি বিরাট তর্ক। কারণ শুধু বাংলাদেশ নয়, উন্নত বিশ্বের সাংবাদিকতা নিয়েও সেসব দেশের জনগণের অসন্তুষ্টি আছে।

গণমাধ্যম যে কারণে গণমাধ্যম, তা অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোও সে গণমাধ্যমকে উপেক্ষা করে। করপোরেট পুঁজির স্বার্থরক্ষা, রাজনৈতিক ভয়ভীতি এবং নানাবিধ রাষ্ট্রীয় ও সেলফ-সেন্সরশিপের কারণেও গণমাধ্যম অনেক সময় গণবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে কারণে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার বাইরে গিয়ে যে কেউ নিজের খেয়াল-খুশি মতো একটি অনলাইন পোর্টাল খুলে বা আইপি টিভি চালু করে সেটিকে গণমাধ্যম বলে দাবি করলে সেখানে অপসাংবাদিকতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে এ ক্ষেত্রে একটা ‘নিয়ন্ত্রণ’ থাকা বাঞ্ছনীয়।

অস্বীকার করার উপায় নেই, হাতে গোনা কিছু অনলাইন সংবাদ পোর্টাল বাদ দিলে বাকিদের অধিকাংশই কপি-পেস্ট করে। এদের একটি অংশ উদ্ভট সব শিরোনাম দিয়ে ভুয়া ও হাস্যকর সংবাদ প্রকাশ করে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। এসব কথিত গণমাধ্যমের কারণে প্রশ্নের মুখে পড়ছে মূলধারার গণমাধ্যম।

যার সাংবাদিক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা নেই, সেসব লোক যখন সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়, তখন প্রকৃত সাংবাদিকরা লজ্জিত হন। সাধারণ মানুষ তখন এসব ভুয়া ও ভুঁইফোঁড় সাংবাদিকের সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদের গুলিয়ে ফেলে। সম্প্রতি পুরো গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের যে অনাস্থা-অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে বড় কারণ এসব ভূতুড়ে গণমাধ্যমের দৌরাত্ম্য।

অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে, কারা সাংবাদিকতা পেশায় আসছেন এবং এত মানুষ কেন সাংবাদিক হতে চান? তা ছাড়া রাজধানী থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম তো বটেই, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যারা সাংবাদিকতা করেন, তাদের ন্যূনতম যোগ্যতা থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেকে এ ইস্যুতে দ্বিমতও পোষণ করেছে।

অযোগ্যরা কথিত পত্রিকা বা আইপি টিভির আইডি কার্ড সংগ্রহ করে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ঘুরে বেড়াবে তা মানা যায় না। প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক থাকাকালে প্রখ্যাত সাংবাদিক শাহ আলমগীর একাধিকবার বলেন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের যেকোনো সাংবাদিকের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হওয়া উচিত ডিগ্রি পাস। এ বিষয়ে একটি নীতিমালা করার ওপর তিনি জোর দেন। তার মৃত্যুর পরে এ নিয়ে আর তেমন কোনো কথাবার্তা শোনা যায় না।

২০১৫-এর ১৫ নভেম্বর সেই সময়ের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু জাতীয় সংসদে বলেন, সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রচলিত আইন বা নীতিমালায় সাংবাদিকতার ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণের কোনো মানদণ্ড নেই। তবে অনেক সাংবাদিক আছেন, যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ও পেশার প্রতি দায়বদ্ধ। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইন ১৯৭৪ সংশোধন করে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

গত বছর ১১ ফেব্রুয়ারি যশোরে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাংবাদিকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস হওয়া উচিত। দেশের সাংবাদিকদের ডাটাবেজ তৈরি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ডাটাবেজের আওতায় আনতে পারলে অপসাংবাদিকতা বন্ধ হবে।

উল্লেখ্য, অনেক দিন ধরে শোনা যাচ্ছে, সাংবাদিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় দুটি আইন হচ্ছে। এর একটি জাতীয় সম্প্রচার আইন আরেকটি গণমাধ্যমকর্মী সুরক্ষা আইন। বলা হচ্ছে, এ দুটি আইন পাস হলে হুটহাট করে কাউকে চাকরিচ্যুত করা সম্ভব হবে না। কিন্তু আইন দুটি পাস হচ্ছে না।

সুতরাং অপসাংবাদিকতা বন্ধে ভূতুড়ে পত্রিকা, অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল ও আইপি টিভি বন্ধের উদ্যোগ যেমন সাধুবাদযোগ্য, তেমনি প্রকৃত সাংবাদিকের স্বার্থ সুরক্ষা এবং দেশের গণমাধ্যমে পরিপূর্ণ পেশাদারত্ব গড়ে তুলতে সম্প্রচার আইন এবং গণমাধ্যমকর্মী সুরক্ষা আইন দ্রুত পাস করার পাশাপাশি আইন দুটির খুঁটিনাটি স্পষ্টীকরণের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিধিমালা করাও জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
ওয়ান ইলেভেন ও আগস্টের ছাত্র-আন্দোলন
রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?

শেয়ার করুন

অভিশপ্ত ইনডেমনিটি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

অভিশপ্ত ইনডেমনিটি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

পৃথিবীর ইতিহাসে ঘৃণ্যতম নরহত্যায় যে টিক্কার কাছে হিটলার পর্যন্ত লজ্জা পাবে, সেই টিক্কার ঘৃণা থেকেও রেহাই পায়নি বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কাছে টিক্কাও নস্যি। আর তার চেয়ে নস্যি যারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় ও পুরস্কৃত করে।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তারপর বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটতে থাকে একের পর এক ন্যক্কারজনক ঘটনা। এতই ন্যক্কারজনক যে, জাতি হিসেবে দুনিয়ার কাছে বাঙালি হয়ে যায় ‘মীরজাফর’। যদিও সত্যিকার মীরজাফরদের সংখ্যা অতি নগণ্য। তবুও পুরো জাতির গায়ে মীরজাফরি কাদা লেগে যায়। সে মীরজাফরি কাদা সরাতে হয় জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার সরকারকে।

সপরিবারে জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ‘স্বঘোষিত’ রাষ্ট্রপতি হয় নব্য মীরজাফর খন্দকার মোশতাক আহমদ। তার এ ক্ষমতা দখলের পেছনে ছিল সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তার সমর্থন। খন্দকার মোশতাকের রাজনীতির হাতেখড়ি হয় বঙ্গবন্ধুর হাতে। বঙ্গবন্ধুই তাকে বিপদে-আপদে আগলে রাখেন বটবৃক্ষের মতো। তার চাওয়া কোনোকিছু যথাসম্ভব অপূর্ণ রাখেননি বঙ্গবন্ধু। এমনকি একসময় যখন খন্দকার মোশতাকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রায় ধ্বংসের মুখে, তখনও তাকে টেনে তোলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাত্র ৯ দিনের মাথায় ১৯৭৫-এর ২৪ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রধান করা হয় জিয়াউর রহমানকে। তারপর জাতির পিতাকে হত্যার একমাস দশদিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর মানব সভ্যতা ও ইতিহাসের কলঙ্কতম আইন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ শিরোনামের ওই দায়মুক্তি অধ্যাদেশটিতে ছিল খন্দকার মোশতাক আহমদ ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এএইচ রহমানের স্বাক্ষর। অধ্যাদেশটির দুভাগের প্রথম অংশে বলা হয়-

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থি যা-ই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

দ্বিতীয় অংশে ছিল-

রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

এই বিশ্বাসঘাতক খুনি বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। তার সে যোগ্যতাই ছিল না। কাজ হাসিলের পর তাকে ক্ষমতার চেয়ার থেকে ছুড়ে ফেলে দেয় এ দেশের পাকিস্তানপ্রেমীরা। পর্দার আড়ালে থাকা আসল পাকিস্তানপ্রেমীদের মুখোশ খুলতে শুরু করে ধীরে।

সামরিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের পর ১৯৭৬-এর ১৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭-এর ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সায়েমকে কৌশলে হটিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা দখল করে এতদিন পর্দার আড়ালে থাকা বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কারিগর।

রাষ্ট্রপতি হয়ে একটুও দেরি করল না জিয়াউর রহমান। ক্ষমতার জোরে খন্দকার মোশতাকের ওই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করল। কারণটা খুবই সহজ। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া যদি আটকানো না যায়, তাহলে তো মূল কারিগরের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে জাতির কাছে, বিশ্বের কাছে।

শুধু আইন করেই ক্ষান্ত হয়নি জিয়া। বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নেয়াটাকেও ‘পাপ’ পর্যায়ে নিয়ে যায় সে। আর এজন্য একের পর এক গুজব ছড়ায়, সত্য কোনো ঘটনার সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে প্রপাগান্ডা চালায়। গুজবপ্রিয় জাতি সেসব প্রপাগান্ডায় এতটাই হেলে পড়ে যে, ওসব যে মিথ্যা, গুজব, প্রপাগান্ডা এটা বুঝতেই জাতির সময় লাগে ২১ বছর।

যাহোক, ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদের দু-তৃতীয়াংশ আধিপত্য দখল করে জিয়া সরকার এবং ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংবিধানের ৫ম সংশোধনী পাস করানো হয়। সংশোধনীতে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দায়মুক্তি অধ্যাদেশসহ ৪ বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে বৈধতা দেয়া হয়। আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’। এ সংশোধনীতে বলা হয়-

“১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ, ও অন্যান্য আইন, উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কৃত কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ, অথবা প্রণীত, কৃত বা গৃহীত বলিয়া বিবেচিত আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তৎসম্পর্কে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো কারণেই কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।”

এ সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের পাকাপোক্তভাবে দায়মুক্ত করা। কিন্তু ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের কারণে ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর অঘোষিত রাষ্ট্রপতি মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। ফলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধা ছিল না।

সে পথ আটকাতেই জিয়া সরকার জাতীয় সংসদকে কলঙ্কিত করে ৫ম সংশোধনী আনে। তখন তারা এটাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করেছিল আইনের মাধ্যমে এবং তাদের ধারণা ছিল সংসদের দু-তৃতীয়াংশ সমর্থন ছাড়া এ আইন যেহেতু পরিবর্তন করা যাবে না এবং সংসদে দু-তৃতীয়াংশের সমর্থন পাওয়া সহজ কথাও নয়- কাজেই বাংলাদেশে জাতির পিতা হত্যার বিচার করা সহজ হবে না।

এখানেই থেমে থাকেনি খুনিচক্র। এমনিতেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান সংসদের মাধ্যমে খুন করেও রেহাই পেল খুনিরা। আর বোনাস হিসেবে পেল অপ্রত্যাশিত উপহার। যা পাওয়ার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম চীনের প্রথম সচিব, লে. কর্নেল আজিজ পাশা আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব, মেজর একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব, মেজর বজলুল হুদা পাকিস্তানের দ্বিতীয় সচিব, মেজর শাহরিয়ার রশিদ ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব, মেজর রাশেদ চৌধুরী সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব, মেজর নূর চৌধুরী ইরানে দ্বিতীয় সচিব, মেজর শরিফুল হোসেন কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব, কর্নেল কিসমত হাশেম আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব, লে. নাজমুল হোসেন কানাডায় তৃতীয় সচিব এবং লে. আবদুল মাজেদকে সেনেগালে তৃতীয় সচিব বানিয়ে পুরস্কৃত করা হলো খুনিদের।

এর মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে আরও কলঙ্কিত করে বাঙালি জাতির ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হলো। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করে বাংলাদেশে শুরু করা হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

দেখা যায় যে, পাকিস্তানপ্রীতির কারণে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পরবর্তী সরকারগুলো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আইনের মাধ্যমে রক্ষা করে, এটি খোদ পাকিস্তানের কসাই টিক্কা খানের অভিমত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে বাঙালিদের হত্যা করে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয় টিক্কা খান। পরে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর হয় টিক্কা। তার সঙ্গে দেখা করেন এক মুজিবভক্ত ও বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা মুসা সাদিক। এক সাক্ষাৎকারে মুসা সাদিককে টিক্কা জানায়-

“২৬ মার্চ (১৯৭১) আমি নিজে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে আমার ফ্ল্যাগ কারে করে তোমাদের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে তেজগাঁও এয়ারপোর্টে নিয়ে গিয়ে একজন জাতীয় নেতার মর্যাদায় সসম্মানে তাঁকে আমি করাচিগামী পিআইএ’র বিমানে তুলে দেই। তুলে দেবার সময় তাঁকে আমি সামরিক কায়দায় স্যালুট করে বলি: স্যার, আমাকে নিজগুণে মার্জনা করবেন, আমি একজন অনুগত গভর্নর হিসেবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের হুকুম তামিল করেছি মাত্র। আমি আশা করি, সেখানে পৌঁছে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সাথে আপনার সাক্ষাৎ হবে এবং আপনি আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারবেন।”

এরপর টিক্কা খান হ্যান্ডশেক করার জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার দিকে না তাকিয়ে সোজা বিমানে উঠে যান। পরে টিক্কা খানকে এদেশে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন মুসা সাদিক। বার বার করা প্রশ্নে টিক্কা খান হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারপর বলে, “তোমার বড় বড় বুলি বন্ধ করো। তোমাদের জাতির জনককে তোমরা যে খুন করেছো, সেজন্য তোমাদের ঘৃণিত বাঙালি জাতি নিয়ে জাহান্নামে যাও। আমি তো তাঁকে ঢাকা বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানিয়ে জীবিত অবস্থায় পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। সেই পুণ্যের জন্য আর তোমার শিক্ষার জন্য, তুমি আমার জুতোজোড়া তোমার মাথার মুকুট বানিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে ধরে ঢাকার দিকে রওনা দাও এবং মহাসড়কের দুধারের সকল পথচারীর উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে বলতে যাও যে, জেনারেল টিক্কা খান একজন মহামানব, শেখ মুজিবকে যিনি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু বাঙালি জারজ সন্তানেরা এত বড় নরাধম যে, তারা শেখ মুজিবকে খুন করেছে।”

(১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডি ও বঙ্গভবনের অজানা অধ্যায়: মুসা সাদিক)

পৃথিবীর ইতিহাসে ঘৃণ্যতম নরহত্যায় যে টিক্কার কাছে হিটলার পর্যন্ত লজ্জা পাবে, সেই টিক্কার ঘৃণা থেকেও রেহাই পায়নি বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কাছে টিক্কাও নস্যি। আর তার চেয়ে নস্যি যারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় ও পুরস্কৃত করে।

যদিও শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬-এর ১২ নভেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল’ জাতীয় সংসদে পাস হয়। ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি বিলটিকে স্বাক্ষর করার পর এটি পরিপূর্ণ আইনে পরিণত হয়। আর এর পরই শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। জাতি হয় কলঙ্কমুক্ত। জাতির গা থেকে খসে পড়ে ‘মীরজাফরি কাদা’। কিন্তু ইতিহাসে ঘৃণ্যতম একটি অধ্যায় হিসেবেই রয়ে যাবে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
ওয়ান ইলেভেন ও আগস্টের ছাত্র-আন্দোলন
রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?

শেয়ার করুন

ইনডেমনিটি ঘৃণিত ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায়

ইনডেমনিটি ঘৃণিত ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায়

দায়মুক্তি পাওয়া খুনিরা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। জিয়া থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের পরিবর্তে করেছে পুরস্কৃত, করেছে ক্ষমতার অংশীদার। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

১৯৭৫ সালের এদিনে অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির পদ দখলকারী খুনি মোশতাক আহমেদ অধ্যাদেশ আকারে ইনডেমনিটি জারি করে। এটি ১৯৭৫ সালের অধ্যাদেশ নং ৫০ নামে অভিহিত ছিল।

ইনডেমনিটি শব্দের অর্থ ‘শাস্তি এড়াইবার ব্যবস্থা’। অর্থাৎ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ হলো সে অধ্যাদেশ, যার মাধ্যমে শাস্তি এড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারবর্গকে হত্যার পেছনে যারা জড়িত ছিল, তাদেরকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। পরে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জিয়াউর রহমানের আমলে সংসদে এই কালো আইনটিকে অনুমোদন দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনের শাসনের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। আইন করে বলা হলো হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম কালো আইন আগে ও পরে আর কখনও ছিল না। এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের ছুতা দিয়ে ২১ বছর বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার বিচার করা হয়নি।

এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে খুনি মোশতাকের স্বাক্ষর থাকলেও অনেকেই মনে করে অধ্যাদেশটি জারির পেছনে মূল ক্রীড়নক ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৯ দিনের মাথায় সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে হটিয়ে নতুন সেনাপ্রধান বনে যাওয়া জিয়াউর রহমান। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর এবং তার পর সেসময়ের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএইচ রহমানের স্বাক্ষর আছে।

অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ। প্রথম অংশে বলা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

দ্বিতীয় অংশে বলা আছে-

“রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলো।”

অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসেবে আবিভূর্ত হয়। সেসময় বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭-এর ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ এবং ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’ এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেয়ায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পায়।

একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেয়া না হলে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু সে ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যাতে এ ব্যাপারে কিছু না করতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিল এবং এই সময় একটি প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে গেল যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তিত হবে না। এ দোহাই দিয়ে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচএম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেনি।

এদিকে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকাকালে অর্থাৎ ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর অঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। যেহেতু মোশতাক সরকার ছিল সেনাসমর্থিত, জিয়াউর রহমান ছিল সেনাপ্রধান সেহেতু ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী জিয়াউর রহমানের নির্দেশ কিংবা সম্মতি ছাড়া নামেমাত্র রাষ্ট্রপতি মোশতাকের পক্ষে কোনোভাবেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি দিতে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা সম্ভব হতো না।

একারণে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির দায় জিয়াউর রহমান এড়িয়ে যেতে পারে না। আর বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা বিবিসিতে সাক্ষাৎকার দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জেনারেল জিয়াউর রহমানও যে জড়িত ছিল, তা স্পষ্ট করেই বলেছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞদের মতে, খুনি মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেয়া না হলে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের পরই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত।

দায়মুক্তি পাওয়া খুনিরা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। জিয়া থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের পরিবর্তে করেছে পুরস্কৃত, করেছে ক্ষমতার অংশীদার। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

হত্যার বিচার চাওয়ার পথ সাংবিধানিকভাবে রুদ্ধ করে দিয়ে জিয়া বাংলাদেশকে মানবাধিকার ও সভ্যতাবিরোধী অমানবিক, অসভ্য, জংলি রাষ্ট্রে পরিণত করে। তিনি খুনিদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেই থেমে থাকেননি; দূতাবাসে চাকরির যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিশেষ ব্যবস্থায় খুনিদের চীন, আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, কুয়েত, আবুধাবি, মিসর, কানাডা ও সেনেগালের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করে।

জিয়াউর রহমানের পর বিচারপতি সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলেও কেউ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেনি। বরং জিয়া খুনিদের দূতাবাসে যে চাকরি দিয়েছিল, এরশাদ ও খালেদা জিয়া তাদের পদোন্নতি দিয়ে বাঙালি জাতির কলঙ্কের দায়কে ভারী ও দীর্ঘায়িত করে। দায়মুক্তি ও দূতাবাসে চাকরি-পদোন্নতি পেয়ে খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত।

এরশাদ খুনিদের রাজনৈতিক দল গঠন ও সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দেয়, আর খালেদা জিয়া ৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুনি শাহরিয়ার রশিদকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে।

দীর্ঘ আন্দোলন আর সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমেই জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ উন্মুক্ত করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল-সংক্রান্ত আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আমিন উল্লাহর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করেন। তাদের রিপোর্টেই প্রকাশ পায় এই কুখ্যাত আইনটি বাতিলের জন্য সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই।

কমিটির ওই রিপোর্ট আইন কমিশনের মতামতের জন্য পাঠানো হলে সাবেক প্রধান বিচারপতি এফকেএম মুনীরের নেতৃত্বাধীন এই কমিশনও তা সমর্থন করে। এরপর সেসময়ের আইন প্রতিমন্ত্রী (পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী) প্রয়াত অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিল বাতিলের জন্য ‘দি ইনডেমনিটি রিপিল অ্যাক্ট-১৯৯৬’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সংসদে পাস হয় মানবতা ও সভ্যতাবিরোধী কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বিল। ঘোচানো হয় ২১ বছরের জাতীয় কলঙ্ক, খুলে যায় বঙ্গবন্ধুহত্যার বিচারের পথ।

এভাবেই সুদীর্ঘ ২১ বছর পর শুরু হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া। ১৯৯৮-এর ৮ নভেম্বর মামলার যাবতীয় কার্যক্রম শেষে ১৫ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আসামি পক্ষের ১৫ আসামি উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পায়। উক্ত আপিলে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং ৩ জনকে খালাস প্রদান করা হয়। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে এ মামলার কার্যক্রম ফের স্থবির হয়ে পড়ে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আবার এ বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০০৯ সালে লিভ-টু-আপিলের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আপিল শেষে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে আদালত। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি খুনিদের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সম্প্রতি আরও একজন দণ্ডিতকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জাতি কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হয়েছে, অবসান হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গ্লানি।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
ওয়ান ইলেভেন ও আগস্টের ছাত্র-আন্দোলন
রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?

শেয়ার করুন