রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী

রোহিঙ্গাকথন ও মানবতার জননী

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র বিশ্বের শরণার্থী, সেই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য যে মানবিকতা দেখিয়েছেন তা বিশ্ববাসীর কাছে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। আজ বিশ্বদরবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার মা’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। নেদারল্যান্ডসের নামকরা ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন সাময়িকী তাদের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল ‘শেখ হাসিনা : মাদার অব হিউম্যানিটি’। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে লাখ লাখ নির্যাতিত মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। তখন এক সেনা কর্মকর্তা তার অধীনস্থ জওয়ানদের নির্দেশ দিয়েছিলেন এভাবে- ‘যা দেখবে, যা শুনবে, সব লক্ষ্য করেই গুলি চালাবে।’ আরেক কর্মকর্তার নির্দেশ ছিল এমন- ‘ছেলে-বুড়ো যাকে দেখবে, তাকেই হত্যা করবে।’ সেনাসদস্যরা যে ওই সব নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন, এর প্রমাণ বিশ্ব দেখেছিল পরের কয়েক মাসে। হতাহতের সংখ্যা জানা যায়নি, হয়ত কোনো দিন জানা যাবেও না; কিন্তু ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করার ঘোষণা দিয়েছিল রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পরের বছর ২০১৮ সালে রোহিঙ্গারা ‘২০১৭ সালের ২৫ আগস্টকে সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় এই সংক্রান্ত কিছু লিফলেট, ফেস্টুন ও ব্যানার নিয়ে প্রচারণা করা হচ্ছে ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশন (রোহিঙ্গা মুক্তকরণ মোর্চা) নামের একটি সংগঠন।

ঘোষণাপত্রে উল্লেখ হয়েছে, ৮০ দশকে মিয়ানমারের উত্তর প্রদেশ রাখাইনে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা নাগরিকদের নাগরিকত্ব বাতিল করে নিপীড়ন চালিয়ে আসছে মিয়ানমার সরকার। নানা অজুহাতে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাতে রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন শুরু হয়। এরপর থেকে দিনের পর দিন হত্যা, ধর্ষণ ও আগুনে পুড়িয়ে মারাসহ গণহত্যা শুরু করে। এই গণহত্যাকে বিশ্বের অগ্রগণ্য পণ্ডিত অধ্যাপক অমর্ত্য সেন ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মরত এবং অর্থনীতিতে নোবেল জয়ী জেসমন্ডু টুটু মিয়ানমারের রাখাইনে সংঘটিত ঘটনাকে গণহত্যা (জেনোসাইড) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এ কারণে আমরা তাদের (রোহিঙ্গারা) সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গণহত্যা দিবস হিসেবে সম্পূর্ণরূপে স্বীকৃতি প্রদান করার কথা জানানো হয়। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র বিশ্বের শরণার্থী, সেই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য যে মানবিকতা দেখিয়েছেন তা বিশ্ববাসীর কাছে একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। আজ বিশ্বদরবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার মা’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন।

নেদারল্যান্ডসের নামকরা ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন সাময়িকী তাদের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছিল ‘শেখ হাসিনা : মাদার অব হিউম্যানিটি’। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে লাখ লাখ নির্যাতিত মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন।

রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার মানবিক সাহায্য সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত করাসহ তাদেরকে প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনসহ স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে পাঁচ দফা এবং ৭৪তম অধিবেশনে চার দফা প্রস্তাব রাখেন।

সম্প্রতি এক লাখের অধিক রোহিঙ্গার জন্য ভাসানচরে তৈরি করা হয়েছে সবচেয়ে বড় আধুনিক অস্থায়ীভিত্তিতে আবাসন ব্যবস্থা। নানা কারণেই সারা বিশ্বে দিন দিন বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। নিজ বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালানো জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এসব বাস্তুচ্যুতরা বিভিন্ন ক্যাম্পে আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এখনও যুদ্ধ-বিগ্রহ, সীমান্ত নীতি, গৃহযুদ্ধ ও জাতিগত বৈষম্যের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। আর এসব সহিংসতার শিকার হয়ে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। আধুনিক এই বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ বিষয় হলো- বিপুলসংখ্যক একটি জনগোষ্ঠী নিজ ঘর-বাড়ি, দেশ ছেড়ে অন্য কোনো দেশে বাস্তুচ্যুত জীবনযাপন করছে। আর এই বাস্তুচ্যুতরাই সবচেয়ে বেশি সংকটে ভুগছে। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে রাজনৈতিক-সামরিক, জাতিগত ও মতাদর্শের নানা সংকট মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে জাতিগত পরিচয় এবং বেঁচে থাকার অধিকার।

ইউনাইটেড নেশনস হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর)-এর মতে, বর্তমানে প্রায় ৮ কোটি মানুষ নিজ ঘর-বাড়ি ছেড়েছে, এমনকি দেশ ছেড়েছে। বাস্তুচ্যুত পরিচয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। এসব বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকাংশই বয়স ১৮ বছরের নিচে। এখনও ১ কোটি মানুষের কোনো পরিচয়ই নেই। কোনো দেশই এদের নাগরিক অধিকার ও স্বীকৃতি দিচ্ছে না। তারা যেন এই পৃথিবী নামক গ্রহের কেউ নয়।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কেননা এই সকল শরণার্থীদের মানবাধিকার রক্ষা করা না গেলে প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে। পৃথিবীর অন্যতম অত্যাচারিত এবং নিপীড়িত একটি জাতিসত্তার নাম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধন কোনো নতুন বিষয় নয়। বিগত চার দশকের বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাদের পরিকল্পিত আক্রমণ বিশ্ববাসীর অজানা নয়। ১৯৭৮ সাল প্রথম মিয়ানমার থেকে সে দেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে এবং আশ্রয় নেয়। তবে সে সময় বিষয়টি সাময়িক মনে করা হলেও এখন তা স্থায়ী সমস্যা হিসেবে বিরাট আকার ধারণ করেছে।

সর্বশেষ ২০১৬-এর অক্টোবর ও ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে আবার নতুন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণের উদ্দেশ্যে অনুপ্রবেশ করে। বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়া, কুতুপালং ও টেকনাফ উপজেলাসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। এ সকল রোহিঙ্গা স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান করছে দীর্ঘ ৪ দশক ধরে। এমনকি সারা দেশে রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গবেষণায় এসেছে। বিভিন্ন সময় মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতার কারণে এখনও রোহিঙ্গারা আসছে এদেশে।

যদিও বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারীর দেশ নয়, তা সত্ত্বেও বিশ্বের অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত এসব মানুষের পাশে সবসময় আছে। যার অন্যতম উদাহরণ আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ সরকার অব্যাহত রেখেছে তার মানবিক সাহায্য সহায়তা আর প্রত্যাবাসনের জন্য। গত ১৮ জুন ২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমার বিষয়ক গৃহীত রেজুলেশনে দেশটির গণতান্ত্রিক সমস্যা, জরুরি অবস্থা, রাজনৈতিক বন্দি, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও আসিয়ানের কেন্দ্রীয় ভূমিকার প্রতি নজর দেয়া হলেও প্রায় চার বছর ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকট এবং তাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি সমাধানের জন্য কোনো আলোচনা করা হয়নি। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায় থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে এমন উদাসীনতা প্রশ্নের উদ্রেক তৈরি করে বটে।

প্রায় চার বছর আগে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক বাহিনী এবং তাদের দোসরদের জেনোসাইড ও বর্বরতার শিকার হয়ে প্রায় ১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। তবে, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং তাদের দোসরদের এ ধরনের বর্বরতা প্রথম নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদেরকে তাদের আবাস থেকে উচ্ছেদের নানা প্রচেষ্টা চলমান ছিল। মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করলেও মাত্র ১৪ বছরের মাথায় ১৯৬২ সালে সামরিক শাসকের কবলে চলে যায়।

১৯৬২ সালের পর মিয়ানমার মাঝে মাঝে গণতন্ত্রের পথে হাঁটলেও, সেটি ছিল শুভংকরের ফাঁকি! সরকার এবং সংসদে কর্তব্যরত সেনাসদস্যের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা ছিল। সরকার পরিচালনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সুবিধা-সংবলিত বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দেয়া ছিল। ২০১১ সালের পর থেকে ২০১৫ পর্যন্ত মিয়ানমারের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ফলে ২০১৫-তে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিজয় লাভ করে। তবে, সেনাবাহিনী সাংবিধানিকভাবে সংরক্ষিত সংসদের ২৫ শতাংশ আসন নিজেদের জন্য বরাদ্দ রাখে এবং ক্ষমতার বিরাট অংশ ধরে রাখে। এই অর্থে, ১৯৬২ সালের পরে মিয়ানমার কখনও পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি।

সর্বশেষ, ২০২০ সালে ৮ নভেম্বরের অনুষ্ঠিত মিয়ানমারের নির্বাচনে (অনেক বিশেষজ্ঞ এটাকে মিয়ানমারের মুক্ত নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করেন) সুচির রাজনৈতিক দল এনএলডি সংসদের ৪৭৬টি আসনের মধ্যে ৩৯৬টি আসনে জয়ী হয়।

অপরদিকে, সেনাসমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি কেবল ৩৩টি আসনে জয় লাভ করে। এ সামরিক বাহিনীসমর্থিত দলের ভরাডুবির পর দেশটির সামরিক বাহিনী নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলে এবং ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইয়ের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সুচি, রাষ্ট্রপতি উইন মিন্ট এবং সুচির রাজনৈতিক দল এনএলডির অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

১৯৬২ সালের প্রথম সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসার পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সেনাবাহিনীর রোষানলে পড়ে। এর চরম বহিঃপ্রকাশ প্রথম দেখা যায় ১৯৭৮ সালে ‘অপারেশন নাগামিন (Operation Dragon King)’ এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের অবৈধ অভিবাসী আখ্যা দিয়ে হত্যা-ধর্ষণ, অমানুষিক নির্যাতনের নামে অমানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত করে জান্তা সরকার।

১৯৮২ সালে বার্মা নাগরিকত্ব আইনে (Burma Citizenship Law 1982) ১৩৫টি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে নাগরিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলেও বাদ দেয়া হয় ‘রোহিঙ্গা’ জনগোষ্ঠীকে। ‘রোহিঙ্গা’ জনগোষ্ঠীকে ভিনদেশি বিশেষত বাঙালি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মিয়ানমারের সরকারের এ ধরনের ন্যক্কারজনক পদক্ষেপের ফলে রোহিঙ্গারা হয়ে যায় রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী। সবশেষ, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনী লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যা, শিশু ও নারী নির্যাতন, বেদম প্রহার, ঘর, বাড়ি স্থাপনা পুড়িয়ে দেয়াসহ বিভিন্ন ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। রাখাইন রাজ্যের সংকটের সময়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও গত প্রায় চার বছরে একজন রোহিঙ্গাও তাদের দেশে ফেরত যেতে পারেননি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর ১৯ দফা-সংবলিত একটা সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়।

এই দলিলের ৩ নং অনুচ্ছেদে নাগরিকত্বের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। ১৪ নং অনুচ্ছেদে জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় সংযুক্তের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। এছাড়া ১৮ নং অনুচ্ছেদে কফি আনান কমিশনের সুপারিশের মাধ্যমে রাখাইন রাজ্যে সমস্যার সমাধান করা হবে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দলিলটি রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে অন্যতম মাইলফলক হলেও মিয়ানমার সরকার বরাবরই ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী’ শব্দকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে। তবে, এ চুক্তির আলোকে ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট মিয়ানমার বাংলাদেশ থেকে প্রথমপর্যায়ে সাত ভাগে বিভক্ত করে ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গাকে নিজেদের দেশে ফেরত নেয়ার কথা বললেও তা বাস্তবে হয়নি। ২০১৯ সালে গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে আরোপিত মামলা- Application of the Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide (The Gambia v. Myanmar) করা হয়।

২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি ওই মামলার শুনানি শেষে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলা না হলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যে, মিয়ানমারের অধিবাসী তা স্পষ্ট। বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে বার বার মিয়ানমার সরকারকে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন’ বিষয়ে বলা হলেও গত চার বছরে একজনও রোহিঙ্গা তাদের দেশে ফেরত যায়নি। ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের’ বিষয়টি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অং সান সুচির শাসনামলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি। বরং নানা সময়ে অং সান সুচির বৈপরীত্য আচরণ এ সংকটকে আরও ঘণীভূত করে তুলেছিল।

২০২১ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে মিয়ানমারের পট পরিবর্তন হওয়ায় ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে’র বিষয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি রোহিঙ্গাবিরোধী কট্টর গোষ্ঠী ও তাদের অনুসারীদের নানামুখী পদক্ষেপের বিষয়টি রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশেষত চীন, ভারত এবং জাপানের নীরবতা এ সংকটকে বেগবান করে তুলেছে। ১৯৮২ সালের বার্মার নাগরিকত্ব আইন, মিয়ানমারের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং চীন-ভারতের মতো রাষ্ট্রের শক্তিশালী ভূমিকা না রাখা রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২১ সালের ৩১ মে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার, ইউএনএইচসিআরের দুইজন কর্মকর্তার ভাসানচরের সফরের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দেননি। এ বছরেরই ১৬ জুন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক ক্রিস্টিন এস বার্গনারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠককালে প্রত্যাবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘ স্পষ্ট একটি রোডম্যাপ তৈরির বিষয়টি নজরে আনা হয়। কিন্তু, তা সত্ত্বেও মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমার বিষয়ক গৃহীত রেজুলেশনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া সত্যিই হতাশাজনক।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন’-এর বিষয়ে প্রচেষ্টা চলমান থাকলেও জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর), চীন, ভারতের মতো রাষ্ট্রের ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন’-এর বিষয়ে নীরবতা, ১৯৮২ সালের বার্মার নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের কোনো উদ্যোগ না নেয়া, মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের বিষয়াদির আলোকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের বিষয়কে জটিল করে তুলছে।

আশা করা যায়, শেখ হাসিনার কূটনৈতিক সাফল্যে এই রোহিঙ্গা প্রতাবর্তনও শুরু হবে। এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর প্রতিও অনুরোধ থাকবে, বৈশ্বিক এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে থাকুন। জয় হোক মানবতার জননী শেখ হাসিনার।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। পরিচালক, এফবিসিসিআই

আরও পড়ুন:
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?
বঙ্গবন্ধু, যে নাম অমোচনীয়
শোকের মাসে প্রত্যাশা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

অভিশপ্ত ইনডেমনিটি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

অভিশপ্ত ইনডেমনিটি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি

পৃথিবীর ইতিহাসে ঘৃণ্যতম নরহত্যায় যে টিক্কার কাছে হিটলার পর্যন্ত লজ্জা পাবে, সেই টিক্কার ঘৃণা থেকেও রেহাই পায়নি বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কাছে টিক্কাও নস্যি। আর তার চেয়ে নস্যি যারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় ও পুরস্কৃত করে।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তারপর বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটতে থাকে একের পর এক ন্যক্কারজনক ঘটনা। এতই ন্যক্কারজনক যে, জাতি হিসেবে দুনিয়ার কাছে বাঙালি হয়ে যায় ‘মীরজাফর’। যদিও সত্যিকার মীরজাফরদের সংখ্যা অতি নগণ্য। তবুও পুরো জাতির গায়ে মীরজাফরি কাদা লেগে যায়। সে মীরজাফরি কাদা সরাতে হয় জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার সরকারকে।

সপরিবারে জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ‘স্বঘোষিত’ রাষ্ট্রপতি হয় নব্য মীরজাফর খন্দকার মোশতাক আহমদ। তার এ ক্ষমতা দখলের পেছনে ছিল সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তার সমর্থন। খন্দকার মোশতাকের রাজনীতির হাতেখড়ি হয় বঙ্গবন্ধুর হাতে। বঙ্গবন্ধুই তাকে বিপদে-আপদে আগলে রাখেন বটবৃক্ষের মতো। তার চাওয়া কোনোকিছু যথাসম্ভব অপূর্ণ রাখেননি বঙ্গবন্ধু। এমনকি একসময় যখন খন্দকার মোশতাকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রায় ধ্বংসের মুখে, তখনও তাকে টেনে তোলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাত্র ৯ দিনের মাথায় ১৯৭৫-এর ২৪ আগস্ট সেনাবাহিনীর প্রধান করা হয় জিয়াউর রহমানকে। তারপর জাতির পিতাকে হত্যার একমাস দশদিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর মানব সভ্যতা ও ইতিহাসের কলঙ্কতম আইন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ শিরোনামের ওই দায়মুক্তি অধ্যাদেশটিতে ছিল খন্দকার মোশতাক আহমদ ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এএইচ রহমানের স্বাক্ষর। অধ্যাদেশটির দুভাগের প্রথম অংশে বলা হয়-

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থি যা-ই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

দ্বিতীয় অংশে ছিল-

রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

এই বিশ্বাসঘাতক খুনি বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। তার সে যোগ্যতাই ছিল না। কাজ হাসিলের পর তাকে ক্ষমতার চেয়ার থেকে ছুড়ে ফেলে দেয় এ দেশের পাকিস্তানপ্রেমীরা। পর্দার আড়ালে থাকা আসল পাকিস্তানপ্রেমীদের মুখোশ খুলতে শুরু করে ধীরে।

সামরিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের পর ১৯৭৬-এর ১৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭-এর ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সায়েমকে কৌশলে হটিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতা দখল করে এতদিন পর্দার আড়ালে থাকা বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কারিগর।

রাষ্ট্রপতি হয়ে একটুও দেরি করল না জিয়াউর রহমান। ক্ষমতার জোরে খন্দকার মোশতাকের ওই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করল। কারণটা খুবই সহজ। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া যদি আটকানো না যায়, তাহলে তো মূল কারিগরের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে জাতির কাছে, বিশ্বের কাছে।

শুধু আইন করেই ক্ষান্ত হয়নি জিয়া। বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নেয়াটাকেও ‘পাপ’ পর্যায়ে নিয়ে যায় সে। আর এজন্য একের পর এক গুজব ছড়ায়, সত্য কোনো ঘটনার সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে প্রপাগান্ডা চালায়। গুজবপ্রিয় জাতি সেসব প্রপাগান্ডায় এতটাই হেলে পড়ে যে, ওসব যে মিথ্যা, গুজব, প্রপাগান্ডা এটা বুঝতেই জাতির সময় লাগে ২১ বছর।

যাহোক, ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদের দু-তৃতীয়াংশ আধিপত্য দখল করে জিয়া সরকার এবং ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংবিধানের ৫ম সংশোধনী পাস করানো হয়। সংশোধনীতে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দায়মুক্তি অধ্যাদেশসহ ৪ বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে বৈধতা দেয়া হয়। আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’। এ সংশোধনীতে বলা হয়-

“১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ, ও অন্যান্য আইন, উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কৃত কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ, অথবা প্রণীত, কৃত বা গৃহীত বলিয়া বিবেচিত আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তৎসম্পর্কে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো কারণেই কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।”

এ সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের পাকাপোক্তভাবে দায়মুক্ত করা। কিন্তু ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের কারণে ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর অঘোষিত রাষ্ট্রপতি মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। ফলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধা ছিল না।

সে পথ আটকাতেই জিয়া সরকার জাতীয় সংসদকে কলঙ্কিত করে ৫ম সংশোধনী আনে। তখন তারা এটাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করেছিল আইনের মাধ্যমে এবং তাদের ধারণা ছিল সংসদের দু-তৃতীয়াংশ সমর্থন ছাড়া এ আইন যেহেতু পরিবর্তন করা যাবে না এবং সংসদে দু-তৃতীয়াংশের সমর্থন পাওয়া সহজ কথাও নয়- কাজেই বাংলাদেশে জাতির পিতা হত্যার বিচার করা সহজ হবে না।

এখানেই থেমে থাকেনি খুনিচক্র। এমনিতেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান সংসদের মাধ্যমে খুন করেও রেহাই পেল খুনিরা। আর বোনাস হিসেবে পেল অপ্রত্যাশিত উপহার। যা পাওয়ার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম চীনের প্রথম সচিব, লে. কর্নেল আজিজ পাশা আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব, মেজর একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব, মেজর বজলুল হুদা পাকিস্তানের দ্বিতীয় সচিব, মেজর শাহরিয়ার রশিদ ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব, মেজর রাশেদ চৌধুরী সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব, মেজর নূর চৌধুরী ইরানে দ্বিতীয় সচিব, মেজর শরিফুল হোসেন কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব, কর্নেল কিসমত হাশেম আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব, লে. নাজমুল হোসেন কানাডায় তৃতীয় সচিব এবং লে. আবদুল মাজেদকে সেনেগালে তৃতীয় সচিব বানিয়ে পুরস্কৃত করা হলো খুনিদের।

এর মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে আরও কলঙ্কিত করে বাঙালি জাতির ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হলো। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করে বাংলাদেশে শুরু করা হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

দেখা যায় যে, পাকিস্তানপ্রীতির কারণে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট পরবর্তী সরকারগুলো বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আইনের মাধ্যমে রক্ষা করে, এটি খোদ পাকিস্তানের কসাই টিক্কা খানের অভিমত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে বাঙালিদের হত্যা করে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয় টিক্কা খান। পরে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর হয় টিক্কা। তার সঙ্গে দেখা করেন এক মুজিবভক্ত ও বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা মুসা সাদিক। এক সাক্ষাৎকারে মুসা সাদিককে টিক্কা জানায়-

“২৬ মার্চ (১৯৭১) আমি নিজে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে আমার ফ্ল্যাগ কারে করে তোমাদের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে তেজগাঁও এয়ারপোর্টে নিয়ে গিয়ে একজন জাতীয় নেতার মর্যাদায় সসম্মানে তাঁকে আমি করাচিগামী পিআইএ’র বিমানে তুলে দেই। তুলে দেবার সময় তাঁকে আমি সামরিক কায়দায় স্যালুট করে বলি: স্যার, আমাকে নিজগুণে মার্জনা করবেন, আমি একজন অনুগত গভর্নর হিসেবে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের হুকুম তামিল করেছি মাত্র। আমি আশা করি, সেখানে পৌঁছে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের সাথে আপনার সাক্ষাৎ হবে এবং আপনি আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারবেন।”

এরপর টিক্কা খান হ্যান্ডশেক করার জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার দিকে না তাকিয়ে সোজা বিমানে উঠে যান। পরে টিক্কা খানকে এদেশে গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন মুসা সাদিক। বার বার করা প্রশ্নে টিক্কা খান হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারপর বলে, “তোমার বড় বড় বুলি বন্ধ করো। তোমাদের জাতির জনককে তোমরা যে খুন করেছো, সেজন্য তোমাদের ঘৃণিত বাঙালি জাতি নিয়ে জাহান্নামে যাও। আমি তো তাঁকে ঢাকা বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানিয়ে জীবিত অবস্থায় পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। সেই পুণ্যের জন্য আর তোমার শিক্ষার জন্য, তুমি আমার জুতোজোড়া তোমার মাথার মুকুট বানিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে ধরে ঢাকার দিকে রওনা দাও এবং মহাসড়কের দুধারের সকল পথচারীর উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে বলতে যাও যে, জেনারেল টিক্কা খান একজন মহামানব, শেখ মুজিবকে যিনি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু বাঙালি জারজ সন্তানেরা এত বড় নরাধম যে, তারা শেখ মুজিবকে খুন করেছে।”

(১৫ই আগস্ট ট্র্যাজেডি ও বঙ্গভবনের অজানা অধ্যায়: মুসা সাদিক)

পৃথিবীর ইতিহাসে ঘৃণ্যতম নরহত্যায় যে টিক্কার কাছে হিটলার পর্যন্ত লজ্জা পাবে, সেই টিক্কার ঘৃণা থেকেও রেহাই পায়নি বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কাছে টিক্কাও নস্যি। আর তার চেয়ে নস্যি যারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় ও পুরস্কৃত করে।

যদিও শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬-এর ১২ নভেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল’ জাতীয় সংসদে পাস হয়। ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি বিলটিকে স্বাক্ষর করার পর এটি পরিপূর্ণ আইনে পরিণত হয়। আর এর পরই শুরু হয় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। জাতি হয় কলঙ্কমুক্ত। জাতির গা থেকে খসে পড়ে ‘মীরজাফরি কাদা’। কিন্তু ইতিহাসে ঘৃণ্যতম একটি অধ্যায় হিসেবেই রয়ে যাবে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?
বঙ্গবন্ধু, যে নাম অমোচনীয়
শোকের মাসে প্রত্যাশা

শেয়ার করুন

ইনডেমনিটি ঘৃণিত ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায়

ইনডেমনিটি ঘৃণিত ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায়

দায়মুক্তি পাওয়া খুনিরা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। জিয়া থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের পরিবর্তে করেছে পুরস্কৃত, করেছে ক্ষমতার অংশীদার। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

১৯৭৫ সালের এদিনে অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির পদ দখলকারী খুনি মোশতাক আহমেদ অধ্যাদেশ আকারে ইনডেমনিটি জারি করে। এটি ১৯৭৫ সালের অধ্যাদেশ নং ৫০ নামে অভিহিত ছিল।

ইনডেমনিটি শব্দের অর্থ ‘শাস্তি এড়াইবার ব্যবস্থা’। অর্থাৎ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ হলো সে অধ্যাদেশ, যার মাধ্যমে শাস্তি এড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারবর্গকে হত্যার পেছনে যারা জড়িত ছিল, তাদেরকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। পরে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জিয়াউর রহমানের আমলে সংসদে এই কালো আইনটিকে অনুমোদন দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনের শাসনের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। আইন করে বলা হলো হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম কালো আইন আগে ও পরে আর কখনও ছিল না। এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের ছুতা দিয়ে ২১ বছর বঙ্গবন্ধু হত্যামামলার বিচার করা হয়নি।

এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে খুনি মোশতাকের স্বাক্ষর থাকলেও অনেকেই মনে করে অধ্যাদেশটি জারির পেছনে মূল ক্রীড়নক ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৯ দিনের মাথায় সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে হটিয়ে নতুন সেনাপ্রধান বনে যাওয়া জিয়াউর রহমান। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর এবং তার পর সেসময়ের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএইচ রহমানের স্বাক্ষর আছে।

অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ। প্রথম অংশে বলা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

দ্বিতীয় অংশে বলা আছে-

“রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলো।”

অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসেবে আবিভূর্ত হয়। সেসময় বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭-এর ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ এবং ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’ এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেয়ায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পায়।

একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেয়া না হলে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারত। কিন্তু সে ব্যবস্থা নেয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যাতে এ ব্যাপারে কিছু না করতে পারে সে ব্যবস্থা করে দিল এবং এই সময় একটি প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে গেল যে, যেহেতু এটি সংবিধানের অংশ হয়ে গেছে এটি আর পরিবর্তিত হবে না। এ দোহাই দিয়ে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচএম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেনি।

এদিকে জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকাকালে অর্থাৎ ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর অঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। যেহেতু মোশতাক সরকার ছিল সেনাসমর্থিত, জিয়াউর রহমান ছিল সেনাপ্রধান সেহেতু ওই সময় রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী জিয়াউর রহমানের নির্দেশ কিংবা সম্মতি ছাড়া নামেমাত্র রাষ্ট্রপতি মোশতাকের পক্ষে কোনোভাবেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দায়মুক্তি দিতে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা সম্ভব হতো না।

একারণে এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির দায় জিয়াউর রহমান এড়িয়ে যেতে পারে না। আর বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা বিবিসিতে সাক্ষাৎকার দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জেনারেল জিয়াউর রহমানও যে জড়িত ছিল, তা স্পষ্ট করেই বলেছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞদের মতে, খুনি মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেয়া না হলে ১৯৭৯-এর ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের পরই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত।

দায়মুক্তি পাওয়া খুনিরা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত। জিয়া থেকে শুরু করে খালেদা জিয়া পর্যন্ত সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের পরিবর্তে করেছে পুরস্কৃত, করেছে ক্ষমতার অংশীদার। যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

হত্যার বিচার চাওয়ার পথ সাংবিধানিকভাবে রুদ্ধ করে দিয়ে জিয়া বাংলাদেশকে মানবাধিকার ও সভ্যতাবিরোধী অমানবিক, অসভ্য, জংলি রাষ্ট্রে পরিণত করে। তিনি খুনিদের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেই থেমে থাকেননি; দূতাবাসে চাকরির যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিশেষ ব্যবস্থায় খুনিদের চীন, আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, কুয়েত, আবুধাবি, মিসর, কানাডা ও সেনেগালের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করে।

জিয়াউর রহমানের পর বিচারপতি সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলেও কেউ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করেনি। বরং জিয়া খুনিদের দূতাবাসে যে চাকরি দিয়েছিল, এরশাদ ও খালেদা জিয়া তাদের পদোন্নতি দিয়ে বাঙালি জাতির কলঙ্কের দায়কে ভারী ও দীর্ঘায়িত করে। দায়মুক্তি ও দূতাবাসে চাকরি-পদোন্নতি পেয়ে খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াত।

এরশাদ খুনিদের রাজনৈতিক দল গঠন ও সংসদ সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দেয়, আর খালেদা জিয়া ৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুনি শাহরিয়ার রশিদকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে।

দীর্ঘ আন্দোলন আর সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমেই জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ উন্মুক্ত করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল-সংক্রান্ত আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আমিন উল্লাহর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করেন। তাদের রিপোর্টেই প্রকাশ পায় এই কুখ্যাত আইনটি বাতিলের জন্য সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই।

কমিটির ওই রিপোর্ট আইন কমিশনের মতামতের জন্য পাঠানো হলে সাবেক প্রধান বিচারপতি এফকেএম মুনীরের নেতৃত্বাধীন এই কমিশনও তা সমর্থন করে। এরপর সেসময়ের আইন প্রতিমন্ত্রী (পরবর্তী সময়ে মন্ত্রী) প্রয়াত অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিল বাতিলের জন্য ‘দি ইনডেমনিটি রিপিল অ্যাক্ট-১৯৯৬’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সংসদে পাস হয় মানবতা ও সভ্যতাবিরোধী কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বিল। ঘোচানো হয় ২১ বছরের জাতীয় কলঙ্ক, খুলে যায় বঙ্গবন্ধুহত্যার বিচারের পথ।

এভাবেই সুদীর্ঘ ২১ বছর পর শুরু হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া। ১৯৯৮-এর ৮ নভেম্বর মামলার যাবতীয় কার্যক্রম শেষে ১৫ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আসামি পক্ষের ১৫ আসামি উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পায়। উক্ত আপিলে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং ৩ জনকে খালাস প্রদান করা হয়। তবে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে এ মামলার কার্যক্রম ফের স্থবির হয়ে পড়ে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আবার এ বিচারকাজ চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০০৯ সালে লিভ-টু-আপিলের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আপিল শেষে ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে আদালত। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি খুনিদের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সম্প্রতি আরও একজন দণ্ডিতকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জাতি কিছুটা হলেও কলঙ্কমুক্ত হয়েছে, অবসান হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও গ্লানি।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?
বঙ্গবন্ধু, যে নাম অমোচনীয়
শোকের মাসে প্রত্যাশা

শেয়ার করুন

খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি

খুনিরা ইনডেমনিটি পায়নি

সংগত কারণই প্রশ্ন উঠছে- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িতদের বিচার হতে পারলে এ ভয়ংকর অপরাধে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিয়েছে এবং তাদের রক্ষার রক্ষার জন্য কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন প্রণয়ন করেছে তাদের কেন বিচারের আওতায় আনা হবে না?

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমানের খুনিরা দম্ভ করেই খুনের দায় স্বীকার করেছিল। এটাও বলেছিল- সাহস থাকলে কেউ বিচার করুক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ ও বিশ্বের অনেক সংবাদপত্রে সৈয়দ ফারুক রহমান ও আবদুর রশিদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের পেছনে তাদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে নেয়ার পাশাপাশি কাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা পেয়েছে সেটাও জানিয়ে দিয়েছে।

জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি এবং তার পরিবারের নারী-শিশুসহ সব সদস্যকে হত্যার পরও যে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না, তার আইনি নিশ্চয়তা মিলেছিল কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণকারী খন্দকার মোশতাক আহমদ খুনিদের বিচার করা যাবে না ২৬ সেপ্টেম্বর (১৯৭৫) ‘সামরিক আইনবলে’ পাওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করে এ অধ্যাদেশ জারি করেন। পরে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদকে কাজে লাগিয়ে তার অনুমোদন দেন।

১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ইসনমেনিটি আইন বাতিল করে। ফলে ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচারের আইনি বাধা দূর হয় এবং আদালত বিচারকাজ শুরু করতে পারে। সংগত কারণই প্রশ্ন উঠছে- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িতদের বিচার হতে পারলে এ ভয়ংকর অপরাধে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিয়েছে এবং তাদের রক্ষার রক্ষার জন্য কুখ্যাত ইনডেমনিটি আইন প্রণয়ন করেছে তাদের কেন বিচারের আওতায় আনা হবে না?

জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের কুখ্যাত সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের কাছ থেকে শিক্ষা-দীক্ষা নিয়েছেন, সন্দেহ নেই। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন এবং ২৯ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। এ জন্য কোনো নির্বাচনের প্রয়োজন পড়েনি, সামরিক আইনের ঘোষণাই যথেষ্ট ছিল।

আইয়ুব খান ১৯৬২ সালের ৮ জুন কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা জাতীয় পরিষদ সভায় সামরিক শাসন প্রত্যাহারের আগে গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্য সম্পাদন করেন- সামরিক শাসন জারির পর যত অধ্যাদেশ, বিধিবিধান ও নির্দেশ জারি করেছেন- সবকিছু সংবিধান ও আইনসম্মত হিসেবে অনুমোদনলাভ।

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান আইয়ুব খানের মতোই একটি কাজ করেছেন ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল। সে দিন জাতীয় পরিষদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বিল অনুমোদিত হয়। আমাদের জানা আছে, জিয়াউর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট সেনাবাহিনী পদে নিয়োগদান করেন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি খন্দকার মোশতাক আহমদ। জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান।

বঙ্গবন্ধুকে স্ত্রী, তিন পুত্র, দুই পুত্রবধূসহ নিষ্ঠুরভাবে বাসভবনে হত্যা করা হয়। তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাংলাদেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। একইদিনে আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ ফজলুল হক মণিসহ আরও কয়েকজনকে ঘাতকরা হত্যা করে। এসব খুনে অংশ নেয়া ব্যক্তিরা দম্ভ করে বলছিল- তারাই ‘শেখ মুজিবকে সবংশে হত্যা করেছে।’ খুনিরা এটাও বলত- জিয়াউর রহমান বরাবর তাদের সঙ্গেই মুজিবহত্যার চক্রান্তে জড়িত ছিলেন।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাষ্ট্র ক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। যদিও কাগজে-কলমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ছিলেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, কিন্তু ক্ষমতার দণ্ড ছিল জিয়াউর রহমানের হাতে। বঙ্গভবনের শেষ দিনগুলি গ্রন্থে লিখেছেন-

“১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি জিয়াউর রহমানের হাতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ ছেড়ে দেন। রাষ্ট্র্রপতির পদ ছেড়ে দেন কয়েক মাস পর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল।” [পৃষ্ঠা ৩৫]

তিনি লিখেছেন, জিয়াউর রহমান যে সেনাপ্রধান থাকা অবস্থাতেই এবং সামরিক আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদে বহাল থেকে প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনে অংশ নেবেন, সে ধারণা তিনি করতে পারেননি। [পৃষ্ঠা ৩৬]

কুটিল পথে সেনাবাহিনীপ্রধান চলেছেন, এটা বুঝতে পারেননি প্রধান বিচারপতি পদে থাকা আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, এটা ভাবা যায়!

ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার পথে জিয়াউর রহমান একের পর এক পদক্ষেপ নিতে থাকেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সামরিক আইন বলবৎ রয়েছে। আওয়ামী লীগের শত শত নেতা জেলে। জয় বাংলা উচ্চারণ করলেই জেল। বঙ্গবন্ধুর নাম এমনকি আভাসে-ইঙ্গিতেও বলা যাবে না। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল ১৫ আগস্ট থেকেই। সরকারবিরোধী মিছিল-সমাবেশ করার অধিকার ছিল না। এমন পরিবেশেই জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে ‘বিপুলভোটে নির্বাচিত’ হয়ে যান।

এর আগে তিনি আরেকটি কাজ করেন- সংবিধান সংশোধন। ত্রিশ লাখ নারী-পুরুষ-শিশুর আত্মদানে অর্জিত বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ যায়। সমাজতন্ত্র বর্জন করা হয়। একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা-ধর্ষণ-লুটপাটের প্রত্যক্ষ সহযোগী রাজাকার-আলবদর ও তাদের দল জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগকে রাজনীতি করার অধিকার দেয়া হয়। বাংলাদেশকে ফের ‘পাকিস্তান বানানোর’ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে তারা হয়ে ওঠে জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ সহযোগী।

১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রির জাতীয় সংসদে ‘সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী’ বিল ওঠে। এতে বলা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত প্রণীত সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ, ও অন্যান্য আইন এবং উক্ত মেয়াদের মধ্যে অনুরূপ কোন ফরমান দ্বারা এই সংবিধানে যে সকল সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন ও বিলোপসাধন করা হইয়াছে তাহা এবং অনুরূপ কোনো ফরমান, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ বা অন্য কোন আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত ক্ষমতাবলে অথবা অনুরূপ কোন ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে গিয়া বা অনুরূপ বিবেচনায় কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তপক্ষ কর্তৃক প্রণীত কোন আদেশ কিংবা প্রদত্ত কোন দণ্ডাদেশ কার্যকর বা পালন করিবার জন্য উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা, বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তৎসম্পর্কে কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোন কারণেই কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।”

১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড, খুনিদের বিচার না করার কুখ্যাত বিধান- ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি প্রদান, জিয়াউর রহমানের একক সিদ্ধান্তে সংবিধান সংশোধন, গণভোটের প্রহসন- সব বৈধতা পায়।

বঙ্গবন্ধুসহ নারী-শিশুদের খুনিদের বিচার করা যাবে না- ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এ বিধান জারি করেছিলেন খোন্দকার মোশতাক আহমদ। তখন জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীপ্রধান। ক্ষমতা হাতের নাগালে, রাষ্ট্রপতির পদটি কখন হাতে আসবে- এমন ছক কষছিলেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুনের রাষ্ট্রপতি ও ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর সব অপরাধ হালাল করা হয়ে গেছে ‘সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর’ মাধ্যমে।

খুনিদের কেউ যেন কখনও বিচার করতে না পারে, সে জন্য ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটির অনুমোদন প্রদান করা হয়। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে বিধান ছিল- খুনিদের দায়মুক্তি পেতে রাষ্ট্রপতি বা তার মনোনীত ব্যক্তির কাছ থেকে সার্টিফিকেট নিতে হবে। জিয়াউর রহমান কেবল খুনিদের দায়মুক্তি দিয়ে আইন প্রণয়ন করেননি, নানা দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব দিয়ে পুরস্কৃতও করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুহত্যার বিচারের দাবি যতবার এসেছে- জিয়াউর রহমান, এইচএম এরশাদ এবং খালেদা জিয়া একই কথা বলে গেছেন- সংবিধান সংশোধন করতে হবে, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে। কিন্তু ১৯৯৬ সালের নভেম্বরে এই কুখ্যাত আইন জাতীয় সংসদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাতেই পাস হয়। সে সময় সংসদে বিএনপির সদস্যরা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাবে সায় দেননি। কেনইবা দেবে? খুনিতে খুনিতে যে মিতালি!

২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের দণ্ড কার্যকর হওয়া শুরু হয়। তবে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া কয়েকজন এখনও পলাতক। এদের ফিরিয়ে আনার দাবি জোরদার হচ্ছে। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কাজ যখন হাতে নেন- স্পষ্ট বলেছিলেন- প্রচলিত ফৌজদারি আইনেই বিচারকাজ চলবে। সামরিক শাসনের আমলের মতো ধর-মার-কাট নীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন।

বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থমকে গিয়েছিল ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডে। ঘাতকদের বিচার যেন না হয়, সে জন্য আইন প্রণীত হয়েছিল। এ কলঙ্ক মুছে ফেলা সম্ভব হয়েছে। এখন সময়ের দাবি- হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যুক্তদেরও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। এমনকি এমন ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্তরা বেঁচে না থাকলেও তাদের চিহ্নিত করা উচিত। অপরাধ করে রেহাই মেলে না- এটাও স্বীকৃত হওয়া প্রয়োজন।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত

আরও পড়ুন:
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?
বঙ্গবন্ধু, যে নাম অমোচনীয়
শোকের মাসে প্রত্যাশা

শেয়ার করুন

২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন

২৬ সেপ্টেম্বর: ইতিহাসের সেই কালো দিন

পঞ্চম সংশোধনীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো জঘন্য কালাকানুন শুধু সংবিধানে অন্তর্ভুক্তই করেননি রাষ্ট্রপতি জিয়া, বঙ্গবন্ধু-হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের বিচারের পথ চিরতরে রুদ্ধ করায় সহযোগী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা ও চেতনাই বাঙালি জাতির জাগরণের মূলশক্তি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ই সংবিধান থেকে মুছে দিলেন সংবিধান সংশোধন করে! যে ‘জয়বাংলা’ রণধ্বনি দিয়ে বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, সেই জয়বাংলা মুছে দিয়ে মৃত পাকিস্তানের ‘জিন্দাবাদ’ ফিরিয়ে আনলেন সংশোধনীতে। বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রেডিও পাকিস্তানের স্টাইলে করলেন রেডিও বাংলাদেশ!

আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৭ মার্চ, ১০ জানুয়ারির মতো স্মরণীয় দিনগুলো যেমন ত্যাগ আর গৌরবের মহিমায় জ্বল জ্বল করছে, তেমনি গণহত্যার ২৫ মার্চ, ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট, ১৭ই আগস্ট, ২৬ সেপ্টেম্বর, ৯ জুলাইয়ের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কিছু কালো দিনও আছে। না চাইলেও আমরা ভুলে যেতে পারব না। তেমনই কলঙ্কিত একটি দিন ২৬ সেপ্টেম্বর। ১৯৭৫ সালের এই দিনে খন্দকার মোশতাক তার সেই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যা জেনারেল জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠনের পরে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই পার্লামেন্টে আইনে পরিণত করে পঞ্চম সংশোধনী হিসেবে সংবিধানে ভুক্ত করা হয়।

দেশি-বিদেশি চক্রান্ত বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল যে খুনিরা, তাদের যাতে কোনোদিন বিচারের মুখোমুখি হতে না হয়, সেই অশুভ উদ্দেশ্যেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্র যখন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে, তখন তা কেবল কোনো ব্যক্তি বা প্রশাসনযন্ত্রের জন্যেই নিন্দনীয় কাজ নয়, গোটা জাতির জন্যই তা কলঙ্ক আর চরম লজ্জার ঘটনা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে ঘাতকচক্রের গড়া পুতুল সরকারের রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ওই সালেরই ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করেছিল ইন্ডেমনিটি অধ্যাদেশ, শিরোনাম ছিল রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নম্বর ৫০। খন্দকার মোশতাকের পাশাপাশি তাতে স্বাক্ষর করেন সে সময়ের আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবও।

সেই অধ্যাদেশ এর আইনগত বৈধতা দেয় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রধান বেনিফিশিয়ারি জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিএনপি এই কলঙ্কিত অধ্যাদেশকে বিল হিসেবে পাস করিয়ে নেয়। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর পর সেদিন সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এই কালো আইনটি। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুহত্যা তো বটেই ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বর জেলে জাতীয় চার নেতা হত্যা পর্যন্ত বিচার থেকে অব্যাহতি পেয়ে যায়! দায় মুক্তির পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়েও খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যার অব্যবহিত পর পরই সেনাপ্রধান হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। মেজর জেনারেল থেকে হয়ে যান লেফটেন্যান্ট জেনারেল। সামরিকশাসন জারি থাকা অবস্থায়ই প্রেসিডেন্ট পদে থাকার বৈধতা নিয়েছিলেন হ্যাঁ-না ভোটের প্রহসন করে। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে সারা দেশে ভোটকেন্দ্র বসিয়ে সেই হ্যাঁ-না গণভোটের নাটক হয়েছিল।

সামরিক পোশাকেই জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন এবং ১৯৭৯ সালে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিজয় নিয়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আনার পূর্বাপর সব ঘটনাই আজ ইতিহাসের অংশ। সেই সংসদেই সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী এনে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালে সামরিকশাসন তুলে নেয়া পর্যন্ত জিয়া-মোশতাক গংদের সমস্ত কার্যক্রমকেই বৈধতা দেয়া হয়।

সংগত কারণেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি সৃষ্টিকারী কালো দিন ৯ জুলাই অনাগত কাল ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি কলঙ্কিত তারিখ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

একই সঙ্গে বিএনপি এবং এর দোসরদের ললাটেও এই কলঙ্কের দাগ অমোচনীয় হয়েই থাকবে। ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে এই যে, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না। যদি করত, তাহলে খন্দকার মোশতাক বাংলার ইতিহাসের আরেক মীরজাফর হিসেবে ধিকৃত হয়ে বিদায় নেবার পরও ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের পক্ষে কারো দাঁড়াবার কথা ছিল না।

মীরজাফরের মতো মোশতাকওতো মাত্র কদিনের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন খুনিদের ক্রীড়নক হিসেবে। গলাধাক্কা দিয়ে তাকে বিদায়ের পর বিচারপতি সায়েমকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করেন জেনারেল জিয়া। তাকে নামমাত্র রাষ্ট্রপতি বানিয়ে জিয়া নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে রাজনীতিতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাত্র।

প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, খন্দকার মোশতাকের মতো গণধিকৃত, সেই একই বেঈমানি তিনিও কি করেননি? রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হবে জেনেও তিনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বরং ‘গো এহেড’ বলে ফারুক-রশীদের সমর্থন দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যায়! বিস্ময়কর হলেও সত্য একজন উপপ্রধান সেনাবাহিনী প্রধান হয়েও তিনি এমন নৃশংস ভূমিকাই পালন করেছিলেন!

জিয়াউর রহমান যে ক্ষমতার কী তীব্র পিপাসু, সেটা স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু থেকেই টের পাওয়া গিয়েছিল। কালুরঘাটে স্থাপিত বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের জন্য ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যাওয়ার পরে তিনি যে কাণ্ড করেছিলেন, তাও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ।

চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান ঘোষণা দেয়ার পরও সবাই ভাবলেন যে, একজন বাঙালি সেনাকর্মকর্তাকে দিয়ে ঘোষণাটি দেয়ানো গেলে সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সেনারা মুক্তিযুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ হবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা না করে সরাসরি নিজেকে রাষ্ট্রপতি বলে সে ঘোষণা পাঠ করেছিলেন জিয়া! সঙ্গে সঙ্গে বিরূপ প্রতিক্রিয়া! আবার পাঠ করলেন তিনি এবং এবার বললেন, “অন বিহাফ অব আওয়ার ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান...।”

সুতরাং সেই জিয়ার স্বরূপ উন্মোচন যে একদিন হবে সে তো ছিল অনিবার্য সত্য এবং সময়ের ব্যাপার মাত্র। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে জিয়া কেন যাবেন? তার অন্তরে যে পাকিস্তান! বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমানের গভীর পাকিস্তানপ্রীতি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল!

পঞ্চম সংশোধনীতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো জঘন্য কালাকানুন শুধু সংবিধানে অন্তর্ভুক্তই করেননি রাষ্ট্রপতি জিয়া, বঙ্গবন্ধু-হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের বিচারের পথ চিরতরে রুদ্ধ করায় সহযোগী ভূমিকা পালনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের মূল প্রেরণা ও চেতনাই বাঙালি জাতির জাগরণের মূলশক্তি ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ই সংবিধান থেকে মুছে দিলেন সংবিধান সংশোধন করে!

যে ‘জয়বাংলা’ রণধ্বনি দিয়ে বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, সেই জয়বাংলা মুছে দিয়ে মৃত পাকিস্তানের ‘জিন্দাবাদ’ ফিরিয়ে আনলেন সংশোধনীতে। বাংলাদেশ বেতারের নাম বদলে রেডিও পাকিস্তানের স্টাইলে করলেন রেডিও বাংলাদেশ!

জ্ঞাতসারে বলতে হবে এ কারণে যে, কর্নেল ফারুক-রশিদ, ডালিমদের ১৫ আগস্টের পরিকল্পনা জিয়াউর রহমান জেনেছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার ৪ মাস ১৯ দিন আগে! ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কর্নেল ফারুক ও রশিদ গং প্রথমে ঢাকা থেকে ব্যাংককে চলে গিয়েছিলেন। সেনাপ্রধান জিয়া তাদেরকে দ্রুত বিশেষ ব্যবস্থায় দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন। সেখানেই ব্রিটিশ সাংবাদিক ম্যাসকারাহ্যানসকে টেলিভিশনের জন্য যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, রশিদ, ফারুকরা তাতে উল্লেখ করেছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা।দুজনই বলেছেন ২০ মার্চ সন্ধ্যায়

আমরা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাই। আমাদের পরিকল্পনা শুনে তিনি বললেন, সিনিয়র অফিসার হিসেবে আমি তোমাদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকতে পারি না। তোমরা ইয়াং অফিসাররা করতে চাইলে এগিয়ে যাও। শেষ বাক্যটা ছিল, ‘গো এহেড।’

ফারুক ও রশিদের সেই সাক্ষাৎকার আগ্রহী পাঠক ইচ্ছে করলে ইউটিউবে সার্চ দিয়ে এখনও শুনতে পারেন।

যাহোক, পৃথিবীর ইতিহাসের এই কলঙ্কিত আইন, বিচারহীনতার এই বিধানটি বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে সংবিধানে সংশোধনী এনে সংবিধানকে কলঙ্কমুক্ত করেন কালো আইনটি বাতিলের মাধ্যমে।

দুঃখের বিষয়, এই একুশটি বছর দেশ যারা পরিচালনা করেছেন তাদের কারো বিবেক দংশিত হয়নি এই কালো আইনটি দেখে! বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, জেনারেল এরশাদ এবং বেগম খালেদা জিয়ার সরকার এই একুশ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতাকে হত্যা করা হলো- তার হত্যাকারীদের বিচারের কোনো ব্যবস্থাই নেয়া যাবে না!

এমন কালো আইন সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলে তা জাতি হিসেবে তাদের কোন আদিম বর্বর যুগে ঠেলে দেয়? এ প্রশ্ন কি তাদের কারো মনেই জাগেনি? নিশ্চিত করেই বলা যায়, জাগেনি। কারণ, যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা সকলেই পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ যারা রুদ্ধ করে রেখেছিলেন তারা দেশের যে সর্বনাশ করে গেছেন, তা কোনোদিন মোচন হবার নয়। ১৫ আগস্ট কোনো সরকারপ্রধানকেই হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষাকেও। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে না কোনো অর্থনৈতিক বৈষম্য আর ধর্মীয় সহিংসতা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের রাষ্ট্রে থাকবে না ধর্মের নামে রাজনীতি আর শোষণ-বঞ্চনার মতো পাকিস্তানি অভিশাপ। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক পরিচালক (বার্তা), বিটিভি।

আরও পড়ুন:
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?
বঙ্গবন্ধু, যে নাম অমোচনীয়
শোকের মাসে প্রত্যাশা

শেয়ার করুন

দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ

দায়মুক্তির অধ্যাদেশ: মানবতাবিরোধী অপরাধ

১৯৭৯ সালে সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ২৬ সেপ্টেম্বরের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ৫০ অতিরিক্ত সংযোজনী হিসেবে ৬ এপ্রিল পাস করা হয়। এদের বিচার সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। যারা ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সকল অপরাধ, অপকর্মের সুবিধাভোগী তারা তাদের স্বার্থে খন্দকার মোশতাকের অবৈধ অধ্যাদেশকে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান ও চরিত্রকেই কলঙ্কিত করেছিল। এই কলঙ্ক যারা বহন ও ধারণ করেছে তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাতা হতে পারে না। তারা এর বিরোধী শক্তি। রাজনীতির এই পাঠ যারা বোঝেন না কিংবা গুলিয়ে ফেলেন তারাও ঘাতকদেরই অনুসারী।

১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অবৈধ সরকারপ্রধান খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যারা বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জন নিরপরাধকে রাতের আঁধারে গুলি করে হত্যা করেছিল তাদেরকে বিচারের আওতা থেকে মুক্ত রাখার জন্য দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশটি দুটি অংশে বিভক্ত।

দুই অংশের এই অধ্যাদেশের প্রথম অংশে লেখা হয়-

“১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থি যা-ই কিছু ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

দ্বিতীয় অংশে বলা হয়-

“রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হল। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।”

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের এবং নিকট আত্মীয়স্বজনদের যারা হত্যা করেছিল তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র যাত্রা শুরু করছিল সেটিকে মৌলিক আদর্শ থেকে সম্পূর্ণরূপে উল্টোপথে পরিচালিত করা। এজন্য তারা সামরিক বাহিনীর ট্যাঙ্ক, বন্দুক, গোলাবারুদ ব্যবহার করে। যারা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের সবাই ছিল সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কর্মকর্তা এবং অধস্তন সেনাসদস্য। এদের একটি অংশ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সামরিক বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত ছিল, অন্য অংশটি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিল।

সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ বেশিরভাগ কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ডের গোপন কোনো ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সামান্যতম অবহিত ছিল না। তবে ধারণা করা হচ্ছে- সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা উচ্চাভিলাষী কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা গোটা ষড়যন্ত্রের পূর্বাপর প্রস্তুতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। নতুবা ট্যাঙ্কের মতো সাঁজোয়া বাহিনী সেনানিবাসের বাইরে এভাবে আগে থেকে বের হওয়ার কোনো সামরিক বিধানমতে থাকার ন্যূনতম কারণ ছিল না। তাছাড়া সামরিক বাহিনীর জুনিয়র কিছু কর্মকর্তার ইচ্ছাতেই সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে কেউ কেউ বা কিছু জুনিয়র কর্মকর্তা সামরিক অস্ত্রের নির্বিচার ব্যবহার করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। যারা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল তারা সবাই অত্যন্ত দুর্ধর্ষ ঘাতক চরিত্রের অধিকারী ছিল।

সে কারণে হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু, শেখ মণি এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাত পরিবারের সদস্যদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য এবং বাড়িতে থাকা অন্য সবাই তারা ভয়ানক আক্রোশ নিয়ে হত্যা করে। অন্য দুটি পরিবারেও আক্রোশের মাত্রা প্রায় একই রকম ছিল। দুচারজন শিশু সৌভাগ্যক্রমে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিল। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বাইরে আরও অনেকেই ছিল যারা বিভিন্ন জায়গায় নানা ধরনের প্রহরা বসিয়েছিল। তাদের হাতেই নিহত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাহায্যার্থে এগিয়ে আসা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দিন আহমেদ বা কর্নেল জামিল নামে পরিচিত মিলিটারি সেক্রেটারি।

এছাড়া সাভারে ১১জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যকেও নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা বেতার ভবন দখল এবং গণভবনে ১৫ তারিখ থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। কোনো ধরনের আইন, বিধিবিধান, সামরিক-বেসামরিক সৌজন্যতাবোধ তারা তাদের কর্ম ও আচরণে দেখায়নি। এমনকি সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে দ্বিধা করেনি। তাদের আচরণে অনেকেই ক্ষুব্ধ হলেও প্রাণভয়ে কেউ মাথা তুলতে পারেননি। রাষ্ট্রের কোথায় কে কী করবেন, কাকে বসানো হবে, কাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে সবকিছু তারা খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে একের পর এক বাস্তবায়ন করতে থাকে। খন্দকার মোশতাক অসংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে বসার পেছনে ছিল এসব হত্যাকারী ও ঘাতকদের পূর্বপরিকল্পনা। সংবিধান অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব আপনাআপনি উপরাষ্ট্রপতি তথা সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রতি অর্পিত হওয়ার কথা। খন্দকার মোশতাক কোনো আইনেই রাষ্ট্রপতি পদে বসার কারণ ছিল না।

তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকারের অধীন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। সুতরাং তার রাষ্ট্রপতি পদ ছিল দখল করা, কোনোভাবেই সাংবিধানিকভাবে বৈধ পন্থায় নয়। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে থাকেন যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হওয়ার মানেই হচ্ছে আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। এটি দুর্জনের কুযুক্তি। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুহত্যার পর সরকার গঠনের কোনো সুযোগ পায়নি। খন্দকার মোশতাক আওয়ামী লীগ করলেও ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যেহেতু তার ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্তি ছিল তাই মোশতাক ছিলেন একজন ষড়যন্ত্রকারী, ঘাতক ও ক্ষমতালোভী ব্যক্তি যিনি বঙ্গবন্ধু কিংবা আওয়ামী লীগের আদর্শের ধারক ছিলেন না।

তিনি যে একজন বিশ্বাসঘাতক, ষড়যন্ত্রকারী এবং ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তি ছিলেন সেটি ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ছিলেন না যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতায় বসার জন্য আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ইচ্ছার কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়েছিল। সেই সুযোগ তখন কারো ছিল না।

সাংবিধানিকভাবে উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহণের পথ যারা রুদ্ধ করেছিল তারা প্রমাণ দিয়েছিল যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দেশ পরিচালিত হবে তাদের ইচ্ছায়, সংবিধান বা জনপ্রতিনিধিদের কোনো দায়দায়িত্ব রাখার সুযোগ দেয়া হয়নি। সুতরাং ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল বঙ্গবন্ধুর বৈধ সরকারকে সম্পূর্ণরূপে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা নিজেদের ইচ্ছেমতো দখল করা। সেকারণেই ঘাতকরা ১৫ আগস্টের রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে তাদের নরঘাতকদের চরিত্র সম্পূর্ণরূপে উন্মোচন করে সবাইকে হত্যা করেছিল। তারা কাউকেই জীবিত থাকতে দেয়নি- যারা রাষ্ট্র-রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেন।

শুধু তাই নয়, ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তথা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামানসহ গুরুত্বপূর্ণ সব নেতৃবৃন্দকে প্রথমে গৃহবন্দি করে রাখে, পরে জেলখানায় বিনা অপরাধে আটকে রাখে। তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজনের ওপর শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হয়। খন্দকার মোশতাককে সরকারপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তার অধীনে সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়। যারা তাতে সম্মতি দেননি তাদের জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এখন অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে বঙ্গবন্ধুর লাশ ৩২ নম্বরে থাকা অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের কিছু নেতা বিকাল ৪টায় মোশতাকের মন্ত্রিসভায় শপথ গ্রহণ করেন। যারা বিষয়টিকে এত সহজভাবে উপস্থাপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন তারাও ১৫ আগস্টের ঘাতকদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের সমর্থক, মানসিকভাবে ক্ষমতা-রোগাক্রান্ত, রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পশ্চাৎ গমনেরই অনুসারী।

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিল তারা রাষ্ট্রবিরোধী, মানবতাবিরোধী এবং রাষ্ট্রের সকল প্রকার প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসকারীও ছিল। এদের অপকর্মের কোনো তুলনা হয় না। কোনো স্বাভাবিক সমাজে এমন অপরাধীর বসবাস হতে পারে না। রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী হচ্ছে সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানসহ এত সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ মানুষকেই শুধু হত্যা করেনি, রাষ্ট্রক্ষমতা শুধু দখল করেনি, সংবিধানই শুধু লঙ্ঘন করেনি, সেনাবাহিনীকেও তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে নিক্ষেপ করে।

১৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে যেসব বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছিল। তার ফলে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে চেইন অব কমান্ড নষ্ট হয়ে যায়। অসংখ্য সেনা কর্মকর্তা চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে গিয়ে আত্মাহুতি দেন, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটে। গোটা সেনাবাহিনী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য মর্যাদায় ফিরে আসতে অনেক সময় নিয়েছিল। এর ফলে সেনাবাহিনী হারিয়ে ছিল অসংখ্য মেধাবী চৌকষ দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাকে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্র রাজনৈতিক হঠকারী মতাদর্শের বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়।

সেনাবাহিনীর জন্য এটি ছিল অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন একটি পর্ব। যা পার হতে সেনাবাহিনীকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, সময়ও নিয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। রাজনৈতিক ময়দানে সুবিধাবাদী, ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি ভাবাদর্শের রাজনীতির উত্থান ঘটে। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানে এবং বৃহত্তর সমাজ ব্যবস্থায়। অথচ এমন এক কলঙ্কজনক এবং ইতিহাসের নির্মম নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের অপরাধকে দায়মুক্তি দেয়ার জন্য খন্দকার মোশতাক ২৬ সেপ্টেম্বর এই অধ্যাদেশ জারি করে যা ছিল অবৈধ, সংবিধানবিরোধী এবং মানবতাবিরোধীও।

সেকারণেই খন্দকার মোশতাক এই অপরাধীদের দ্বারা ২ নভেম্বর দিবাগত রাত তথা ৩ নভেম্বর জেলখানার অভ্যন্তরে ৪ জাতীয় নেতাকে হত্যা করার জন্য জেলের ভেতরে বেয়নেট এবং অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করার অনুমতি দেয়। এরপরে ১৫ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড, অবৈধ ক্ষমতা দখল, সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড বিনষ্ট এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এতসব অপরাধ সংগঠনের অপরাধীদের বিনাবিচারে দেশ থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রীয়ভাবে করে দেয়া হয়। তাদেরকে বিমানে সপরিবারে ব্যাংককে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।

পৃথিবীর ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন এক অপরাধ সংগঠনের ঘটনা যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সেই সময়কার ক্ষমতা দখলকারী এবং পরবর্তী সময়ে যারা এই অপরাধের উত্তরাধিকারী হন তাদের জন্য। এদেরকে শুধু খন্দকার মোশতাকই নয় সামরিক শাসক জিয়া, সাত্তার, এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়া এবং চারদলীয় জোট সরকার বিদেশে দূতাবাসে চাকরি প্রদান, দেশে তাদের শাসনামলে অবাধে আসা-যাওয়া করার সুযোগ দেয়া, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করারও ঘটনা ঘটেছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা এই সরকারগুলো নেয়নি। অধিকন্তু ১৯৭৯ সালে সংসদে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ২৬ সেপ্টেম্বরের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ ৫০ অতিরিক্ত সংযোজনী হিসেবে ৬ এপ্রিল পাস করা হয়। এদের বিচার সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

যারা ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সকল অপরাধ, অপকর্মের সুবিধাভোগী তারা তাদের স্বার্থে খন্দকার মোশতাকের অবৈধ অধ্যাদেশকে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান ও চরিত্রকেই কলঙ্কিত করেছিল। এই কলঙ্ক যারা বহন ও ধারণ করেছে তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্মাতা হতে পারে না। তারা এর বিরোধী শক্তি। রাজনীতির এই পাঠ যারা বোঝেন না কিংবা গুলিয়ে ফেলেন তারাও ঘাতকদেরই অনুসারী।

সংবিধানে এমন মানবতাবিরোধী আইন আমাদেরকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বহন করতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের মাধ্যমে সংবিধানে থাকা মানবতাবিরোধী কালো আইনটি রহিত করার উদ্যোগ নেয়। বিএনপি জামায়াতসহ কয়েকটি দল এর বিরোধিতা করে, সংসদে অনুপস্থিত থাকে। ১২ নভেম্বর সংসদে আইন পাসের দিন তারা হরতাল ডাকে।

তারপরও সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ৫ম সংশোধনীর কালো আইনটি রহিত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ এবং এর সংবিধান মুক্তি পায় অপরাধী ও দায়মুক্তির আইন থেকে। এরপরে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলার বিচার শুরু হয়। উচ্চ আদালতের রায়ে কয়েকজনের সাজা কার্যকর করা হয়। কয়েকজন দণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশে পালিয়ে আছে। ইতিহাসে এরা মানবতাবিরোধী অপরাধী, এদের সহযোগীরা রাজনীতিতেও ১৫ আগস্টের হত্যাকারী এবং তাদের অনুসারী হিসেবে চিরকালের জন্য চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক।

আরও পড়ুন:
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?
বঙ্গবন্ধু, যে নাম অমোচনীয়
শোকের মাসে প্রত্যাশা

শেয়ার করুন

কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ

কলঙ্কিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ

জিয়া এবং মোশতাক উভয়েই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কুশীলব ছিল সে যুক্তির পক্ষে যেসব প্রমাণ রয়েছে তার অন্যতম প্রমাণ এই অধ্যাদেশ বা আইন। জিয়া-মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার অংশীদার না হলে কেন তারা বন্দুকধারী খুনিদের বিচারের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের পুরস্কৃত করেছিল, কেনইবা তাদের উঁচু কূটনৈতিক পদে চাকরি দিয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাব নিশ্চয় খুনি জিয়া এবং খুনি মোশতাকের পক্ষে যারা কথা বলার চেষ্টা করে, তাদের কাছে নেই।

বিশ্বের ঘৃণ্যতম কালো কানুনগুলোর অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশের খুনি মোশতাক ও জিয়া প্রণীত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বা আইন। আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সভ্য সমাজের অভ্যুদয়ের পর কোনো দেশে এ ধরনের কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। আর রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার ব্যাপারেতো নয়ই।

পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের অনেকেই ছিলেন মানবিক গুণাগুণের অধিকারী আর তাই মানবতাবিরোধীরাই তাদের হত্যা করেছে।

খ্রিস্ট জন্মের আগে জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করেছিল তারই অতি আপনজন ব্রুটাস। রোমান কর্তৃপক্ষের প্রিয়জন হওয়া সত্ত্বেও তার বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ব্রুটাস পালিয়ে যাওয়ায় এবং পরে আত্মহত্যা করায় তার বিচার করা যায়নি। গত দুই শতকে যেসব রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে তার মধ্যে ছিলেন মার্কিন মানবতাবাদী প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন যিনি কৃষ্ণাঙ্গ কৃতদাসদের মুক্ত করার জন্য গৃহযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, আর সে কারণেই তাকে হত্যা করেছিল জন উইলকিস বুথ নামের এক অভিনেতা। ১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল তার সঙ্গে ষড়যন্ত্রে ছিল ৮ জন।

হত্যার পর পরই বুথ পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়ায় তাকে খোঁজার জন্য শুরু হয় দেশব্যাপী অভিযান, ঘোষণা করা হয় তাকে খুঁজে পেতে ১ লাখ ডলার পুরস্কার। তাকে খুঁজে পেলেও সে আত্মহত্যা করার কারণে তারও বিচার সম্ভব হয়নি, তবে তার সঙ্গে যে ৮ জন ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল তাদের বিচার হয় এবং এক মহিলাসহ ৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় লিংকন হত্যা বিচারের জন্য গঠিত মিলিটারি কমিশন।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারতের অহিংসবাদের নায়ক মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করে হিংসার চরম দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল নাথুরাম গডসে নামের এক হিংসাবাদী। গান্ধীজি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বলেছিলেন তার হত্যাকারীকে ক্ষমা করতে। কিন্তু আইনের কঠোর হাত নাথুকে ক্ষমা করেনি, দিয়েছিল মৃত্যুদণ্ড।

পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জন কেনেডি হত্যারও বিচার হয়েছিল, বিচার হয়েছিল ইন্দিরা, রাজিব হত্যার। তাদের সবার হত্যার পরও সাংবিধানিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়নি, সাংবিধানিক নিয়মেই তাদের উত্তরসূরিদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম হয়েছে বাংলাদেশে যেখানে সব খুনি এবং ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের হাত থেকে রক্ষা করার অপপ্রয়াস হিসেবে বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম কুশীলব খুনি মোশতাক প্রথমে ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর খুনিদের রক্ষা করার জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বাংলাদেশকে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে এ ধরনের কালো আইনপ্রণেতা দেশের তালিকাভুক্ত করে।

মোশতাক বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি, পারেনি তার উত্তরসূরি বিচারপতি সায়েমও। বঙ্গবন্ধু হত্যার আসল খলনায়ক খুনি জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে, যে কিনা ঘটনার আগে ছিল ক্ষমতার আড়ালে। জিয়া ক্ষমতায় যেয়েও অধ্যাদেশটি বাতিল করেনি বরং এক কদম এগিয়ে সব বন্দুকধারী খুনিদের বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে পদোন্নতিসহ লোভনীয় কূটনৈতিক পদে পদায়ন করে। জিয়ার কাজ সেখানেই শেষ হয়নি, সে ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনি মর্যাদা দিয়ে পঞ্চম সংশোধনী আইন প্রণয়ন করে।

তথাকথিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ যে শুধু বন্দুকধারী খুনিদের জন্য রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছিল, তা নয় এতে সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত সব ষড়যন্ত্রকারীদেরও। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যারাই বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে বা কোনো ট্রাইব্যুনালে দেওয়ানি বা ফৌজদারি কোনো ধরনের মামলা হবে না, কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গমূলক মামলা কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষের কাছে করা যাবে না, কোনো সামরিক আদালতে বা কোর্ট মার্শালে বিচার হবে না, কোনো বিভাগীয় বিচার হবে না, কোনো দেওয়ানি মামলাও হবে না।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল সেই দিনের ঘটনাবলির জন্য যারা পরিকল্পনা করেছিল, ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, প্রস্তুতিপর্বে অংশীদার ছিল অথবা কার্যকর করিয়েছিল তাদের সবার জন্যই এই অধ্যাদেশ প্রযোজ্য হবে। অধ্যাদেশের দ্বিতীয় পর্বে খুনিদের নাম উল্লেখ করা হয়। অধ্যাদেশের ভাষা থেকে এটি পরিষ্কার যে, শুধু বন্দুকধারী খুনিরাই নয়, এই অধ্যাদেশ দ্বারা রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে সব ষড়যন্ত্রকারী, নীলনকশাকারী, পরিকল্পনাকারী এবং সেগুলো বাস্তবায়নে যাদের ভূমিকা ছিল। এ ধরনের আইন করে বাংলাদেশকে প্রবেশ করানো হয়েছিল বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারক দেশে আর এ কারণে খুনি এবং ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার ২১ বছর বিলম্বিত হয়।

জিয়া এবং মোশতাক উভয়েই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কুশীলব ছিল সে যুক্তির পক্ষে যেসব প্রমাণ রয়েছে তার অন্যতম প্রমাণ এই অধ্যাদেশ বা আইন। জিয়া-মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার অংশীদার না হলে কেন তারা বন্দুকধারী খুনিদের বিচারের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের পুরস্কৃত করেছিল, কেনইবা তাদের উঁচু কূটনৈতিক পদে চাকরি দিয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাব নিশ্চয় খুনি জিয়া এবং খুনি মোশতাকের পক্ষে যারা কথা বলার চেষ্টা করে, তাদের কাছে নেই। জিয়া তথাকথিত রাষ্ট্রপতি পদটি জবরদখল করার পর ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি আরও পাকাপোক্ত করার জন্য সেটিকে আইনে রূপান্তরিত করেছিল। জিয়া তার পঞ্চম সংশোধনী আইনের মাধ্যমে (যে আইনকে পরবর্তীকালে সুপ্রিমকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন) এই কালো আইনকে সংবিধানের অংশে পরিণত করার অপচেষ্টা করেছিল, যা ধোপে টেকেনি।

পরবর্তীতেকালে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেশকে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল তার অন্যতমটি ছিল ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু এবং জেল হত্যার বিচারের পথ খুলে দেয়া, সেই উদ্দেশ্যেই আওয়ামী লীগ সরকারের সে সময়ের আইনমন্ত্রী, প্রয়াত অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিলের জন্য বিল উত্থাপন করলে তা ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়, বাতিল হয়ে যায় কলঙ্কিত ইনডেমনিটি আইন। আইনটি বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দুজন খুনি হাইকোর্টে রিট করলে মহামান্য হাইকোর্ট ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন এই মর্মে রায় দেন যে, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বা আইন কখনও বৈধ ছিল না, যার অর্থ এই যে, এগুলো শুরু থেকেই অচল, অপ্রয়োগযোগ্য ছিল।

উল্লেখযোগ্য যে আইনটি বাতিল করে সংসদে আইন পাস হওয়ার কয়েকদিন আগেই লালবাগ থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যার এজাহার দায়ের করা হয়েছিল। এটিও উল্লেখযোগ্য যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের দিনই ধানমন্ডি থানায় এজাহার দায়ের করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু থানা পুলিশ এই বলে মামলা ফিরিয়ে দিয়েছিল যে “আপনারাও বাঁচেন, আমাদেরও বাঁচতে দেন। এই মামলা করলে আমাদের সকলের কল্লা যাবে।”

অধ্যাদেশ বা আইনটি রহিত করার পরে বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং জেল হত্যামামলা চালানো সম্ভব হয়, দেশ বেঁচে যায় বিচারহীনতার কলঙ্কময় অধ্যায় থেকে। এরপর বন্দুকধারী খুনিদের বিচার হয়েছিল বটে কিন্তু পেছনের খলনায়কদের অর্থাৎ যারা পরিকল্পনায়, নীলনকশা প্রণয়ন, ষড়যন্ত্র এবং ষড়যন্ত্র কার্যকর করার ব্যাপারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিল তাদের মৃত্যুজনিত কারণে বিচার হলো না। আরও কয়েকজন রয়ে গেছে আইনের আওতার বাইরে এবং তাই আজকের গণদাবি এসব কুশীলবদেরও মুখোশ উন্মোচন করার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী কমিশন।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।

আরও পড়ুন:
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?
বঙ্গবন্ধু, যে নাম অমোচনীয়
শোকের মাসে প্রত্যাশা

শেয়ার করুন

২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

২৫ সেপ্টেম্বর: জাতিসংঘে বাংলা ও বাঙালির গৌরব

বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় তখন কেবল তিনি একটু একটু করে ঠাঁই নিতে শুরু করেছেন। তিনি তখন রাষ্ট্রপ্রধান তো পরের কথা, মন্ত্রীও ছিলেন না। ছিলেন না দাপুটে জাঁদরেল কেউকেটা। কিন্তু বাংলা ছিল তাঁর হৃদয়জুড়ে। আর সে কারণেই যখন তিনি বাংলাদেশের শীর্ষনেতা হলেন, বাঙালির জাতির পিতা হয়ে যোগ দিলেন জাতিসংঘের অধিবেশনে, তখনও তার হৃদয়জুড়ে ছিল কেবল বাংলা। বাংলা ভাষাকে তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিশ্বদরবারে।

১৯৪৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের কৃষ্ণনগরে এক অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ওই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানের পরদিন নৌকায় করে আশুগঞ্জ রওনা দিয়েছিলেন তারা। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“... নদীতে বসে আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তাঁর নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে।... তিনি আমাকে বলেছিলেন, “মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।” আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)

বঙ্গবন্ধু এমন মানুষ, যিনি কথা রাখেন। বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দেয়ার কথা রেখেছিলেন। তেমনি আব্বাসউদ্দিনকে দেয়া কথাও রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলা ভাষাকে উপস্থাপন করেছিলেন গর্বিত মস্তকে। আজ সেই ঐতিহাসিক দিন।

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাই এখন পর্যন্ত দুনিয়ার একমাত্র ভাষা, যে ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে প্রাণও দিয়েছে বাঙালি। এটা বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্ব। কিন্তু এই গর্বের স্তম্ভটাকে যে আরও উঁচুতে তুলে ধরার বেলায় আর বাঙালিদের পাওয়া যায় না। রক্তের বিনিময়ে বাঙালি ভাষা ও দেশ অর্জন করেছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেই তৃপ্তির ঢেকুরও তুলেছে।

বিশ্বদরবারে বাঙালিদের অনেক অর্জন আছে। রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাময় নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তিও। এ যাবৎ তিন বাঙালি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিকে অমর্ত্য সেন এবং ২০০৬ সালে শান্তিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রথম নোবেল বিজয়ী বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার আনার জন্য সুইডেনে যাননি।

পরের দুই বাঙালি নোবেল পুরস্কার আনার জন্য সুইডেন গিয়েছিলেন এবং বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার গ্রহণ করার সময় বক্তৃতাও করেছেন। এই দুই বাঙালি যে ‘নোবেল স্পিচ’ দিয়েছিলেন, তাতে তাদের পরিচয়টা কোথায়? তারা কোন ভাষার মানুষ? তাদের বক্তৃতার ভাষায় তাদের আত্মপরিচয় ছিল না। অমর্ত্য সেন পুরো বক্তৃতাটাই করেছেন ইংরেজিতে। আর মুহাম্মদ ইউনূস তার নোবেল বক্তৃতার ৩৫ মিনিটের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট মানে নব্বই সেকেন্ডের জন্য বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বাংলা ভাষাকে ‘দয়া’ করেছিলেন!

যদিও ইদানিং ‘মডিফাই বাঙালি’রা তাদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করান, নিজেরা ইংরেজিতে কথা বলেন। যেন ইংরেজিতে কথা বলাটাই ‘স্ট্যাটাস’ রক্ষা করার একমাত্র উপায়। নিজেকে জাহির করার জন্যও তারা অনর্গল ইংরেজিতে বকরবকর করতে থাকেন।

প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ইংরেজি ‘টক’ করে তারা কাকে হেয় করেন? তাদের জাতিভাই আরেক বাঙালিকে? নাকি নিজের ভাষাকে? আসলে তারা নিজেকেই হেয় করেন। নিজের জাতিভাইকে হেয় করা মানে তো নিজেকেই হেয় করা। আর নিজের ভাষাকে হেয় করা মানে... সবসময় সবটা বুঝিয়ে বলা লাগে না।

যাহোক। দুনিয়ায় সম্ভবত একমাত্র জাতি আমরাই, যারা মাতৃভাষায় কথা বলতে গেলে হীনম্মন্যতায় ভুগি। নিজেদের কখনও ‘রাজা’ ভাবতে পারি না। সবসময় অদৃশ্য একটা দাসত্বের শিকল পরে থাকি। সেটা ভাষারই হোক বা সংস্কৃতিরই হোক। নিজেকে ‘রাজা’ ভাবতে পারে কজন? বিশেষ করে জাতিসংঘের মতো দুনিয়ার সর্ববৃহৎ আর্ন্তজাতিক সংগঠনের আর্ন্তজাতিক অনুষ্ঠানে ‘রাজা’ হিসেবেই বাঙালি জাতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বাংলাকে দিয়েছেন অপরিসীম মর্যাদা। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি। এর মধ্যে বাংলা নেই। সেদিন সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলেন ইংরেজিতে বক্তৃতা করার জন্য। বঙ্গবন্ধু বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘মাননীয় সভাপতি, আমি আমার মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’

বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে অধিবেশনের সভাপতি তাকে বাংলায় বক্তব্য দেয়ার অনুমতি দেন। অথচ অবাক করা বিষয় হচ্ছে, বাংলায় বঙ্গবন্ধুর দেয়া এই ভাষণের মাত্র আটদিন আগে ১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ১৩৬তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের অর্ন্তভুক্ত হয় বাংলাদেশ। তার ওপর ইংরেজিতে ভাষণ দেয়ার জন্য তার ওপর চাপও ছিল। কিন্তু তিনি যে বাঙালি জাতির পিতা। তিনি কোনো চাপের কাছে কখনও মাথা নোয়াননি। ভাষার বেলায় আপস করবেন কেন?

হয়ত অনেকে বলতে পারেন, তিনি তো বাঙালির একছত্র নেতা। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী। বাঙালি হৃদয়েও তার নিরঙ্কুশ সমর্থন। তিনি বাংলায় ভাষণ দেয়ার দুঃসাহস দেখাতেই পারেন। এ আর এমন কী! তাহলে একটু পিছনের দিকে যাওয়া যাক। যাওয়া যাক আরও বাইশ বছর আগে।

১৯৫২ সালে চীনের রাজধানী পিকিঙে (বর্তমানে বেইজিং) শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেই শান্তি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সাঁইত্রিশ দেশের তিনশ আটাত্তর প্রতিনিধি। স্বাভাবিকভাবে শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানের প্রতিনিধি ছিলেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু জানিয়েছেন-

“... পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও অনেকেই বক্তৃতা করলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান সাহেব ইংরেজি করে দিলেন। ইংরেজি থেকে চীনা, রুশ ও স্পেনিশ ভাষায় প্রতিনিধিরা শুনবেন। কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করেছেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে জানে না এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ায় অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পর মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছ, আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।”

‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইতে বঙ্গবন্ধু বিষয়টাকে আরেকটু খোলাসা করেছেন।

“... আমি বক্তৃতা করলাম বাংলা ভাষায়, আর ভারত থেকে বক্তৃতা করলেন মনোজ বসু বাংলা ভাষায়।

বাংলা আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষায় বক্তৃতা করাই উচিত। কারণ পূর্ব বাংলার ভাষা-আন্দোলনের কথা দুনিয়ার সকল দেশের লোকই কিছু কিছু জানে। মানিক ভাই, আতাউর রহমান খান ও ইলিয়াস বক্তৃতাটা ঠিক করে দিয়েছিল। দুনিয়ার সকল দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি।

... অনেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, ভারত থেকে একজন বাংলায় বক্তৃতা করলেন, আর পাকিস্তান থেকেও একজন বক্তৃতা করলেন, ব্যাপার কী! আমি বললাম, বাংলাদেশ ভাগ হয়ে একভাগ ভারত আর একভাগ পাকিস্তানে পড়েছে। বাংলা ভাষা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা এ অনেকেই জানে। ঠাকুর দুনিয়ায় ‘ট্যাগোর’ নামে পরিচিত। যথেষ্ট সম্মান দুনিয়ার লোক তাঁকে করে। আমি বললাম, পাকিস্তানের শতকরা ৫৫ জন লোক এই ভাষায় কথা বলে। এবং দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাষার অন্যতম ভাষা বাংলা। আমি দেখেছি ম্যাডাম সান ইয়াৎ-সেন খুব ভালো ইংরেজি জানেন, কিন্তু তিনি বক্তৃতা করলেন চীনা ভাষায়। একটা ইংরেজি অক্ষরও তিনি ব্যবহার করেন নাই।

চীনে অনেক লোকের সাথে আমার আলাপ হয়েছে, অনেকেই ইংরেজি জানেন, কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলবেন না। দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলবেন। আমরা নানকিং বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যাই। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ইংরেজি জানেন, কিন্তু আমাদের অভ্যর্থনা করলেন চীনা ভাষায়। দোভাষী আমাদের বুঝাইয়া দিলো। দেখলাম তিনি মাঝে মাঝে এবং আস্তে আস্তে তাকে ঠিক করে দিচ্ছেন যেখানে ইংরেজি ভুল হচ্ছে। একেই বলে জাতীয়তাবোধ। একেই বলে দেশের ও মাতৃভাষার উপরে দরদ।”

(সূত্র: আমার দেখা নয়াচীন- শেখ মুজিবুর রহমান। পৃষ্ঠা ৪৩-৪৪)

মাতৃভাষার প্রতি বঙ্গবন্ধুর দরদের কথা কে না জানে! বাংলাকে মাতৃভাষা করার আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন সেই ১৯৪৮ সালেই। জেলও খেটেছিলেন। তখন তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। তারপর ১৯৫২ সালে যখন চীনের শান্তি সম্মেলনে গিয়ে বাংলায় বক্তৃতা করলেন, তখনও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রভাব এত বিশাল ছিল না। বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় তখন কেবল তিনি একটু একটু করে ঠাঁই নিতে শুরু করেছেন। তিনি তখন রাষ্ট্রপ্রধান তো পরের কথা, মন্ত্রীও ছিলেন না। ছিলেন না দাপুটে জাঁদরেল কেউকেটা। কিন্তু বাংলা ছিল তাঁর হৃদয়জুড়ে। আর সে কারণেই যখন তিনি বাংলাদেশের শীর্ষনেতা হলেন, বাঙালির জাতির পিতা হয়ে যোগ দিলেন জাতিসংঘের অধিবেশনে, তখনও তার হৃদয়জুড়ে ছিল কেবল বাংলা।

বাংলা ভাষাকে তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিশ্বদরবারে। এ যোগ্যতা সত্যিকারের ‘রাজা’র পক্ষেই সম্ভব। নইলে তার পরে বাংলাদেশের আরও অনেক শীর্ষনেতাও তো জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছেন। তারা তো কেউ বাংলায় ভাষণ দেননি! নিজভাষা নিয়ে ওইসব রাষ্ট্রনায়করা নিজেরাই যখন হীনম্মন্যতায় ভুগছিলেন, কিংবা তাদের কাছে মাতৃভাষার চেয়ে ইংরেজি ভাষা প্রাধান্য পেয়েছিল, সেই তারা জাতিকে যে কেমন নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটা এই বাংলাভাষা বিমুখতা থেকেই বোঝা যায়।

১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলা ভাষার যে গৌরব প্রতিষ্ঠা করেন, সে গৌরব অব্যাহত রেখে চলেছেন তারই সুযোগ্য উত্তরসূরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বরাবরের মতো বিগত কয়েকবছর ধরে জাতিসংঘের বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাতেই ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন। মাতৃভাষার এমন অধিকার প্রতিষ্ঠা করায় বাঙালি হিসেবে তাদের প্রতি আজীবনের কৃতজ্ঞতা।

জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় দেয়া ভাষণের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে যুক্তরাজ্যের নিউইয়র্ক রাজ্যে প্রতিবছর ২৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বাংলাদেশি ইমিগ্রান্ট ডে’ বা ‘বাংলাদেশি অভিবাসী দিবস’ হিসেবে। ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্টেট সিনেট অধিবেশনে বিলটি পাস হয় ও স্টেট ক্যালেন্ডারে দিবসটি অর্ন্তভুক্ত করা হয়।

তথ্যসূত্র:

অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান

আমার দেখা নয়াচীন- শেখ মুজিবুর রহমান

dhakatribune.com/bangladesh/2021/09/17/bangladeshi-immigrant-day-to-be-observed-in-new-york-on-september-25

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
বরিশালে ‘শান্তি’ ও পরীমনির জামিন
ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হোক
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অশুভ ছায়া সরবে কবে?
বঙ্গবন্ধু, যে নাম অমোচনীয়
শোকের মাসে প্রত্যাশা

শেয়ার করুন