পরার্থেই আনন্দ: এবারের ঈদে হোক মূলকথা

পরার্থেই আনন্দ: এবারের ঈদে হোক মূলকথা

মহামারির সময় ঈদ এলো। ঈদ যে রূপে আমরা দেখেছি এর আগে, আজকের ঈদ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে এসেছে। এখন অনেকের ঘরে খাবার নেই। চাকরি হারাচ্ছেন কেউ কেউ। এসবের মধ্যে ঈদ কখনও আনন্দের হতে পারে না। তবুও এই ঈদকে আমরা সার্থক করতে পারি।

প্রাচীনকাল থেকেই প্রত্যেক জাতির মানুষের মধ্যে বিশেষ দিনকে উপলক্ষ করে উৎসবের রেওয়াজ রয়েছে। বিশ্ব মুসলিমের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ। আর ঈদুল আজহা মূলত ত্যাগের উৎসব। ঈদ মানেই আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে স্বজন আর বন্ধুদের মিলনমেলা, হৈ-হুল্লোড়, ঘুরে বেড়ানো। ঈদ মানে কোলাকুলি, করমর্দন। ঈদ মানে প্রতিবেশীদের নিয়ে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা দেয়া। নাড়ির টানে গ্রামে গিয়ে মা-বাবা, ভাই-বোনদের সঙ্গে একত্র হওয়া। নতুন জামাকাপড় পরা। কিন্তু এবারও সেই অনাবিল আনন্দের আবহ নেই। খুশির জোয়ারও নেই। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাপন।

কোভিড-১৯ বিশ্বে মানব শরীরে হানা দেয় ২০১৯-এ। আমাদের দেশে এলো আজ প্রায় বছর দেড়েক ছুঁই ছুঁই। এরই মধ্যে তিনটি ঈদ পার করেছি আমরা। এবারের ঈদটাও ঠিক আগের মতোই এসেছে আমাদের জীবনে। শুধু মানবিকতা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আমাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় নেয়া লকডাউন গরিব-দুঃখী মানুষদের অসহায় করে তুলেছে। শুধু তারাই নয় করোনা ভাইরসের কারণে আরোপিত বিধিনিষেধের ফলে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে কর্মহীন হয়েছেন অনেকে। অসহায় মানুষের প্রতি পারস্পরিক সমবেদনা, সহমর্মিতা ও সহানুভূতি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে রমজান মাসের রোজার ভূমিকা অপরিসীম। সমাজে ধনী-গরিব, দুঃখী-অসহায়, অনাথ-এতিম বিভিন্ন ধরনের মানুষ বসবাস করেন।

এ বৈষম্য দূর করতে ধনী লোকেরা অতি সহজেই সমাজের অসহায় গরিব-দুঃখী, এতিম-মিসকিন ও নিরন্ন মানুষের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের জন্য ঈদ সামগ্রীর ব্যবস্থা করতে পারেন এবং তাদের দান-খয়রাত, কোরবানির মাংস বিলি, সাদকা প্রদানসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পারেন। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এবারের ঈদে খাদ্য-চিকিৎসা তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিয়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি এগিয়ে আসা দরকার। এই রমজানে যারা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন সে সব মানুষের পাশে দেশীয় সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের জন্য খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে পাশে দাঁড়াতে হবে। আর এসব সংগঠনের মাধ্যমে এমন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করতে হবে।

পবিত্র ঈদুল আজহায় যেসব মুসলিম পরিবারের ওপর কোরবানি ফরজ তারা তাদের সাধ্যমতো কোরবানি করে থাকে। তবে এবারের ঈদে শাটডাউন থাকার ফলে দিনমজুররা ঠিকঠাক মতো কাজ করতে পারেনি৷ তাদের পাশে দাঁড়ানোও বিত্তবানদের একটি দায়িত্ব। বিত্তশালীরা যদি এমন দুঃসময়ে দুঃখীদের পাশে দাঁড়ায় তাহলে সবাই মিলে এবারের ঈদ উল আজহা আনন্দে কাটানো যাবে৷ এবারের ঈদ উল আজহা উদযাপনের আনন্দের চেয়ে আতঙ্কই যেন বেশি। কারণ করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা আবারও বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। আক্রান্তের হার কমানোর জন্য কঠোর শাটডাউন জারি ও টিকা প্রদানের কাজকর্ম চলমান থাকলেও ঈদ উপলক্ষে কিছুদিনের জন্য শিথিল করা হয়েছে বিধিনিষেধ। ঈদের এই কয়েকদিনে আক্রান্তের হার আরও বৃদ্ধি পাবে কি না এমন আশঙ্কা ভেতরে থেকেই যাচ্ছে। কারণ স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দে মেতে উঠতে সবাই হবে ঘরমুখী। একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করা, কোরবানির মাংস সকলকে ভাগ করে দেয়া, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, এগুলো ছাড়া বার বার বিবর্ণ ঈদ উদযাপন করা যেন আসলেই অনেক কষ্টদায়ক। তাই আমরা সকলেই হয়তো চাইব প্রতিবারের মতো স্বাভাবিকভাবে আনন্দের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদ উদযাপন করতে হবে, যাতে আক্রান্তের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে না যায় কিংবা করোনার কারণে প্রিয় মানুষকে হারিয়ে বিবর্ণ ঈদ যেন উদযাপন করতে না হয়।

ঘরবন্দি এবারের ঈদও যেহেতু গতবারের মতো পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হবে তাই আমাদের সকলের উচিত পরিবার-পরিজনদের এই মহামারি থেকে সুরক্ষিত রাখতে সকল স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে চলতে সাহায্য করা। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আমরা বাড়ির বাইরে যাব না। অসহায় এবং দুস্থ প্রতিবেশীদের সাহায্য করার মাধ্যমে আমরা তাদের পাশে দাঁড়াব এবং তাদের সুরক্ষিত রাখতে সচেষ্ট থাকব। আমাদের সচেতনতাই পারবে পরবর্তী ঈদের আমেজ আমাদের ফিরিয়ে দিতে। আমাদের এই ঈদে বর্জন করতে হবে আমাদের সাময়িক আনন্দ, গ্রহণ করে নিতে হবে করোনা দূরীকরণের শপথ।

এই ঈদ যেন শেষ ঈদ হয় করোনার প্রকোপের হাত থেকে এই বিশ্বাসের সঙ্গে আমাদের গতবারের ঈদের মতো এবারেও ঈদ পালনে রাখতে হবে সীমাবদ্ধতা। ত্যাগের মাঝেই যে প্রকৃত সুখ নিহিত থাকে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মুসলিম ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসবের একটি ঈদ উল আজহা। এই উৎসবকে ঈদুজ্জোহা বা ত্যাগের উৎসবও বলা হয়। কারণ ঈদ উল আজহা আসলে মুসলমানরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মহান আল্লাহর নামে পশু কোরবানি করে৷ আর এই পশু কোরবানির মাধ্যমে নিজের ভিতরের অহংকারকে ত্যাগ করে নিজেকে মহান আল্লাহর দরবারে স্থাপন করে। তাছাড়া এই ঈদের কোরবানিকৃত পশুর কিছু অংশ আত্মীয়স্বজন এবং গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হয় যার ফলে দরিদ্রদের প্রতি ধনীরা দায়িত্ব পালনের একটি সুযোগ পায় এবং একই সঙ্গে আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এভাবেই সকল ভেদাভেদ ভুলে মিলিত হই ঐক্যের বন্ধনে, উপভোগ্য হয়ে ওঠে ঈদ আনন্দ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সংকট সামনে আরও আসবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি থাকতে হবে ভিন্ন ধরনের। দুর্যোগে কিংবা মহামারির ঝুঁকিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিয়ে আগাম ভাবনার সময় এসেছে। এই মহামারির সময় ঈদ এলো। ঈদ যে রূপে আমরা দেখেছি এর আগে, আজকের ঈদ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে এসেছে। এখন অনেকের ঘরে খাবার নেই। চাকরি হারাচ্ছেন কেউ কেউ। এসবের মধ্যে ঈদ কখনও আনন্দের হতে পারে না। তবুও এই ঈদকে আমরা সার্থক করতে পারি। সেটি কীভাবে? এই দুর্যোগে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারি, ভালোবাসা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে। সেটা হতে পারে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। হতে পারে ব্যক্তি-উদ্যোগে। করোনাকালের এই ঈদে আমাদের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে নিতে পারি। আর যদি আমাদের আশপাশে থাকা মানুষদের পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলেই দেখব ঈদটা এই মলিন সময়ে কিছুটা হলেও উজ্জ্বল হবে।

এই ঈদে মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে তাদের জন্য কিছু করার উদ্দেশ্য নিয়ে যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। মানবধর্মের কাছে যে ধর্মীয় রীতিনীতিও সামান্য, তা সবাইকে প্রমাণ করে দিতে হবে। এই ঈদে সোশ্যাল ডিস্টেন্স মেনে করোনাবিধ্বস্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়ার আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। অসহায় প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের বাসায় খাদ্যসামগ্রী তথা বাজার আছে কি না খোঁজ নেয়া কর্তব্য। রাস্তায় পড়ে থাকা ছিন্নমূল, কর্মহীন, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান। বিয়ে-জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বহু দামি উপহার বা নগদ অর্থ নিয়ে যান, কোনো অসুস্থ অসহায় রোগী বা সংকটে পড়া প্রতিবেশী ও স্বজনের কাছে সাধ্যমতো প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দিতে পারেন। অর্থ-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, চেয়ার-পদবি, ক্ষমতা যা কিছু সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন, তা যদি প্রয়োজনের সময় কাজে না লাগে, তবে তা অসার, মূল্যহীন!

সব ভেদাভেদ ভুলে মিলিত হই ঐক্যের বন্ধনে, উপভোগ্য হয়ে উঠুক ঈদ-আনন্দ।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
কোরবানির ঈদ ও করোনা নিয়ে ভাবনা
চামড়া শিল্পে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আলো
সমাজের মাংস!
ঈদ-উৎসব: তবুও শেকড়ের স্বাদ
করোনাভীতি ও আবহমানকালের বাঙালির ঈদ

শেয়ার করুন

মন্তব্য