কোরবানির ঈদ ও করোনা নিয়ে ভাবনা

কোরবানির ঈদ ও করোনা নিয়ে ভাবনা

জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ ধ্বংসের কারণে পৃথিবীতে নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি আসতেই থাকবে- এদের সঙ্গে মানিয়ে চলাই হবে আমাদের কাজ। নিতে হবে চলমান এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থা। করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি খুব খারাপ বার্তা দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে। লকডাউনের শিথিলতা নির্ভর করে করোনা সংক্রমণের হারের ওপর। সংক্রমণ যতক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে নিম্নমুখী না করা যাবে ততক্ষণ শিথিল করা যাবে না । আর এই প্রক্রিয়াটা হতে হবে ধাপে ধাপে।

লকডাউন শিথিল করায় ঢাকা শহরের সড়কে চিরচেনা যানজট। ফুটপাথ, অলিগলি থেকে অভিজাত শপিংমল ও পাঁচতারকা হোটেল- সর্বত্রই মানুষের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে গত কদিনে। ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতেও উপচে পড়া ভিড়ও দেখা গেছে। গ্রামমুখী গাড়ির চাপে মহাসড়কে ছিল তীব্র যানজট। কোথাও সামাজিক দূরত্ব মানা হয়নি। স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে মাস্কও পরছেন না অধিকাংশ মানুষ। বিপরীতে দেশে করোনা শনাক্তের হার বাড়ছে। প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তালিকা।

ডেল্টা ভাইরাস ১১১ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন সংক্রমণ এবং মৃত্যু বেড়ে চলেছে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভারতসহ অনেক দেশে। জাপানে চলছে করোনার তৃতীয় ঢেউ, অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে ২৩ জুলাইয়ের বিশ্ব অলিম্পিক। করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে অনেকটা ভেঙে পড়েছে গোটা বিশ্বের চিকিৎসা ব্যবস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ‘বিশ্বে করোনার ডেল্টা স্ট্রেন ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে ।’ ভারতে করোনার তৃতীয় ঢেউ আগস্ট মাসেই শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের (আইসিএমআর) সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ ও বিভাগীয়প্রধান সমীরণ পান্ডা এই আশঙ্কা জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, এখনই সতর্ক না হলে তৃতীয় ঢেউ মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। দৈনিক লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন।

ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (ইউসিডিসি) বলেছে, উষ্ণতার কারণে ইউরোপে আগস্ট মাসের শেষে ডেল্টা ভাইরাস ৯০ শতাংশ মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার ইউরোপ-প্রধান বলেছেন, মানুষ যদি সামজিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আবারও অবাধে চলাচল করে তাহলে এই অঞ্চলে করোনার আরেকটি ঢেউ আঘাত হানবে ।

তৃতীয় ঢেউয়ের প্রধানত তিনটি কারন- ১. ডেল্টা ধরনের বিস্তার ২. সামাজিক গতিশীলতা বৃদ্ধি ৩. প্রমাণিত সুরক্ষা স্বাস্থ্যবিধির বাস্তবায়নের দুর্বলতা।

টিকা নিয়ে বাংলাদেশ স্বস্তিকর অবস্থানে আছে। দুই মাসের কম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন উৎস থেকে বাংলাদেশ প্রায় ২ কোটি ডোজ টিকা পাবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গণটিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে নিতে আপাতত টিকার সংকটে পড়তে হবে না।

৫০ লাখ টিকার ২০ লাখ চীনের সিনোফার্মের তৈরি। আর ৩০ লাখ টিকার বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্সের মাধ্যমে দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যা মডার্নার তৈরি।

আশা করা হচ্ছে, কোভ্যাক্সের মাধ্যমে এই ৩০ লাখসহ মোট ১ কোটি ২৯ লাখ টিকা পাওয়া যাবে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে। চীন এ দফায় ২০ লাখ ছাড়াও আগামী আগস্টে আরও ৪০ থেকে ৫০ লাখ টিকা পাঠাবে। রাশিয়া থেকে পাওয়া যেতে পারে ১০ লাখ টিকা। সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে টিকার সংস্থান হতে পারে অন্তত ২ কোটি ডোজ।

দেশে করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় টিকা নিতেও মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। সর্বশেষ টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন ১ কোটি ৫ লাখের বেশি মানুষ। সরকার এখন ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষকে টিকার জন্য নিবন্ধন করার সুযোগ দিচ্ছে। তবে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী সব মানুষকে টিকা নিবন্ধনের সুযোগ দেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। সরকার নতুন বাজেটে টিকার জন্য ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে বিনামূল্যে টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রতিমাসে ২৫ লাখ মানুষকে টিকার আওতায় আনা হবে।

কোভ্যাক্স বাংলাদেশকে ৬ কোটি ৮০ লাখ টিকা প্রদানে প্রতিশ্রুতবদ্ধ। ইতোমধ্যে কোভ্যাক্সের চালান আসতে শুরু করেছে। চীনের সিনোফার্মের সঙ্গে দেড় কোটি টিকা কেনার চুক্তি হয়েছে যা এ মাস থেকে প্রতিমাসে ৫০ লাখ ডোজ করে আসতে শুরু করেছে। এ ছাড়া রাশিয়ার স্পুটনিক ভি টিকা আনার চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে। জনসন অ্যান্ড জনসনের ৭ কোটি ডোজ কেনার প্রক্রিয়া চলছে। চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চলছে বাংলাদেশে টিকা প্রস্তুত করা যায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঈদুল আজহা উপলক্ষে ১ কোটির বেশি পরিবারকে খাদ্যসহায়তা দিচ্ছেন। করোনাকালে অসহায়, গরিব-দুস্থ, খেটে খাওয়া ও কর্মহীন মানুষকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে খাদ্য ও নগদ অর্থসহ মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বে এক অনন্য নজির।

মুসলমানদের পবিত্র ইদুল আজহায় স্বাভাবিকভাবেই ত্যাগের মহিমা পূরণ করতে পশু কোরবানি দিচ্ছে। ঈদ-উদযাপন এদেশের মানুষ পিতামাতা-পরিজনদের সঙ্গে উৎসবমুখর পরিবেশে করতে অভ্যস্ত। কিন্তু করোনা সংক্রমণ এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । ঈদ উদযাপনে আমদের এবার বাস্তব পরিকল্পনা নিতে হবে কীভাবে প্রিয়জনদের করোনা থেকে নিরাপদ রেখে পালন করা যায়। উৎসব করতে গিয়ে প্রিয়জনদের যেন আমরা মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দেই। কোরবানির ঈদ হাজার বছর ধরে আমাদের ত্যাগের মহিমা শিখিয়েছে । সে ত্যাগ এবার আমদের মানুষকে বাঁচানোর জন্য ব্যবহার করতে হবে ।

আমদের লক্ষ্য হবে, আমরা ঈদ উদযাপনও করব আবার সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজেকে এবং প্রিয়জনকে নিরাপদ রাখব। সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি এবং মৃত্যুর যে দীর্ঘ মিছিল চলছে তাতে আমদের কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। পবিত্র ঈদ পালনে ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং ইসলামিক ফাউন্ডেসনকে তাদের গোটা দেশের ইমামদের দিয়ে পুরো পরিস্থিতির দায়িত্ব নিতে হবে, নেতৃত্ব দিতে হবে এবং পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সকল বিবেচনায় তাদের বাস্তব ধর্মীয় নির্দেশনা দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারিভাবে অনলাইনে পশু কেনাকাটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। করোনা পরস্থিতি বিবেচনায় সৌদি সরকার পবিত্র হজ নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য হয়েছে। ঈদকে ঘিরে যেন আবার অবাধ যাতায়াত এবং স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করে নতুন করে সংক্রমণ বাড়িয়ে না দেই। অবাধ যাতায়াত এবং স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করলে সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়- এটা প্রমাণিত।

এমন মহামারি পৃথিবীতে আর আসেনি যেখানে ২২২ দেশ-অঞ্চল আক্রান্ত হয়েছে। এখন শিশু-বৃদ্ধ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে আক্রান্ত হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামের পর গ্রাম। গবেষণায় নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে- যার বেশির ভাগ হতাশাব্যঞ্জক। অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে করোনার গতিবিধি এবং মানুষের ভবিষ্যৎ।

এমন পরিস্থিতি আমাদের সর্বাত্মক, সম্মিলিত এবং সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। জীবন বাঁচাতে আমাদের ত্যাগ-কষ্ট স্বীকার এবং ধৈর্যধারণ করতে হবে।

আমরা এই পরিস্থতিতে যে লক্ষ্য অর্জন করতে চাই- ১. করোনা সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ২. মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় অভ্যস্ত করা ৩. প্রতিটি মানুষের মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ ধ্বংসের কারণে পৃথিবীতে নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি আসতেই থাকবে- এদের সঙ্গে মানিয়ে চলাই হবে আমাদের কাজ। নিতে হবে চলমান এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থা। করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি খুব খারাপ বার্তা দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হতে পারে। লকডাউনের শিথিলতা নির্ভর করে করোনা সংক্রমণের হারের ওপর। সংক্রমণ যতক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে নিম্নমুখী না করা যাবে ততক্ষণ শিথিল করা যাবে না । আর এই প্রক্রিয়াটা হতে হবে ধাপে ধাপে।

এহেন পরিস্থিতিতে নিজেকে, নিজের পরিবারকে, দেশকে করোনা ভাইরাসের ভয়ংকর থাবা থেকে মুক্ত রাখতে হলে যা করতে হবে-

১. সর্বত্র স্বাস্থ্যবিধি মানার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে।

২) যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে অনুমতিসাপেক্ষে জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি যেতে হলে অবশ্যই স্বাস্থবিধি মানতে হবে। এজন্য ভেঙে ভেঙে যাওয়ার চাইতে দুরপাল্লার গাড়ি বেশি স্বাস্থ্যবিধিবান্ধব।

৩. ধর্ম মন্ত্রণালয় এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন গোটা বাংলাদেশে ইমাম-আলেমদের সমন্বয়ে ঈদের যাবতীয় রীতিনীতি নির্দিষ্ট নির্দেশনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করবেন। তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের সহযোগিতা নেবেন।

৪. নিজেকে এবং নিজের প্রিয়জনদের নিরাপদ রাখতে আমরা যেন অনলাইনে পশু কেনাকাটার সুযোগটি ব্যবহার করি।

৫. বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে সামাজিক নেতৃত্বে পশু কোরবানি এবং মাংস বণ্টনের এক চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। এই সামাজিক নেতৃবৃন্দকে দায়িত্ব দিলে তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে ঘরে সুষ্ঠুভাবে মাংস পৌঁছে দেবেন ।

৬. করোনা পরীক্ষার হার বাড়াতে হবে; মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পজিটিভ হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে সে ছড়াতে না পারে।

৭. হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে হবে: ভর্তিযোগ্য রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে নতুন সংকট সৃষ্টি হবে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে হবে, প্রয়োজনে ফিল্ড হাসপাতালের প্রস্তুতি থাকতে হবে।

৮. জনসম্পৃক্তি: করোনা প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

৯. সরকারের পাশাপাশি বিত্তবান মানুষদের দরিদ্র মানুষের পাশে অর্থ এবং খাদ্য সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়াতে হবে।

১০. সাধারণ মানুষকে নিরন্তর সাহস জোগাতে হবে, উদ্বুদ্ধ করতে হবে, করোনা নিয়ন্ত্রণে উৎসাহ দিতে হবে, সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

করোনা যুদ্ধ পৃথিবীর জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। সকল সংকটে অবশেষে মানুষেরই জয় হয়েছে। করোনা যুদ্ধেও আমরা বিজয়ী হবো কিন্তু আমাদের সচেনতার ওপর নির্ভর করবে আমরা কতটা ক্ষয়ক্ষতি মেনে নেব যা অনেকটাই আমাদের হাতে। সাধারণ জনগণের সহযোগিতাই করোনা নিয়ন্ত্রণে আমদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক: চিকিৎসক, সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
চামড়া শিল্পে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আলো
সমাজের মাংস!
ঈদ-উৎসব: তবুও শেকড়ের স্বাদ
করোনাভীতি ও আবহমানকালের বাঙালির ঈদ
আজীবন বয়ে বেড়াব তার স্মৃতি

শেয়ার করুন

মন্তব্য