ডেল্টার আক্রমণ

ডেল্টার আক্রমণ

কোভিড-১৯-এর প্রথম রূপ থেকে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ নিজেকে খুব ভালোভাবে রক্ষা করতে পেরেছিল। যার ভেতর সব থেকে এগিয়ে ছিল ভিয়েতনাম; এর পরে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড। কিন্তু এই দেশগুলোও এখন ডেল্টার আক্রমণে ভুগছে। এর মূল কারণ হিসেবে সব দেশ চিহ্নিত করেছে ডেল্টার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা।

কোভিড-১৯ বা সার্স-২ ভাইরাসের পরিবর্তিত রূপ B.1.617.2। এই পরিবর্তিত রূপকে কোভিড-১৯-এর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট হিসেবেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। ভাইরাসের চরিত্রই হলো বারবার নিজের রূপ পরিবর্তন করা। এ মুহূর্তে সবাই জানেন, ২০১৯ সালে চায়নার উহান প্রদেশে করোনাভাইরাস আক্রমণ করার পরে এ পর্যন্ত ওই ভাইরাসটি তিনটি রূপ পরিবর্তন করেছে। ব্রিটেনে ধরা পড়ে কোভিড-১৯-এর পরিবর্তিত রূপ আলফা, আফ্রিকায় বিটা এবং ব্যাপক আকারে ডেল্টা ধরা পড়ে ইন্ডিয়ায়। ইন্ডিয়ায় এই ডেল্টা ভাইরাস সরকারি হিসাবে চার লাখের মতো মানুষের প্রাণ নিয়েছে। আর এ মুহূর্তে পৃথিবীর ১০৪টি দেশে এই ভাইরাসের আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। যার ভেতর এশিয়ায় এখন সব থেকে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে ব্রিটেনে। বাংলাদেশেও চলছে এই ডেল্টার ছোবল।

কোভিড-১৯-এর প্রথম রূপ থেকে এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ নিজেকে খুব ভালোভাবে রক্ষা করতে পেরেছিল। যার ভেতর সব থেকে এগিয়ে ছিল ভিয়েতনাম; এর পরে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড। কিন্তু এই দেশগুলোও এখন ডেল্টার আক্রমণে ভুগছে। এর মূল কারণ হিসেবে সব দেশ চিহ্নিত করেছে ডেল্টার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা। ইতোমধ্যে সবাই জানেন, করোনার প্রথম রূপের থেকে ডেল্টা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ গুণ বেশি দ্রুত ছড়ায় বা মানুষকে আক্রান্ত করে। যেমন কম্বোডিয়া চিহ্নিত করছে, তাদের একটি ঘটনা থেকেই এই ডেল্টা এখন গোটা দেশকে আক্রান্ত করতে যাচ্ছে। তাদের একজন পাইলট করোনার আইসোলেশনের জন্য নির্দিষ্ট হোটেলে না গিয়ে অন্য একটি হোটেলে ছিলেন। এবং তার শরীরে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট করোনাভাইরাস ছিল। ওই পাইলটের থেকে হোটেলের কর্মচারী হয়ে এখন এটা কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। আর একবার কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়লে তখন করোনার আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা খুবই কষ্টসাধ্য। যেমন ব্রিটেন ৪৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষকে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ এবং বয়স্ক নাগরিকদের ৮৬ শতাংশকে টিকা দেয়ার পরেও ডেল্টার আক্রমণকে ঠেকাতে পারছে না। তাদের আক্রান্তের সংখ্যা আবার ৫০ হাজারের ওপরে চলে গেছে। থাইল্যান্ডের একজন অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, তার দেশে গত বছর যেভাবে আক্রান্তের উৎস চিহ্নিত করে আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল, এবার আর তা সহজে সম্ভব নয়। অথচ এই থাইল্যান্ডেও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়েছে মিয়ানমারের শ্রমিকরা একটি মাছবাজারে যাওয়ার ফলে।

ইন্দোনেশিয়া তাদের দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়ানোর উৎস খুঁজে পায়নি। ইন্দোনেশিয়ায় এখন প্রতিদিনই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। ৭ জুলাই তাদের দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৪ হাজার ৩৯৭, সেটা ৮ জুলাই বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ৩৯১ জনে। এবং ৮ জুলাই সে দেশে এক দিনে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। ৮ জুলাই অবধি ইন্দোনেশিয়ায় ২৪ লাখ ১৭ হাজার ৭৮৮ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ৬৩ হাজার ৭৬০ জন। সরকারি হিসাবের এই আক্রান্ত মৃতের বেশি অংশ ডেল্টা আক্রমণ করার পরে হচ্ছে। আর এই দ্রুত বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া চিহ্নিত করেছে গত রমজানের ঈদের সময় শহর থেকে মানুষের গ্রামের বাড়ি যাওয়াকে। অবশ্য মে মাসের প্রথমে সে দেশের সরকার মানুষের চলাচলের ওপর নিষেধজ্ঞা দিয়েছিল। কিন্তু মানুষ তা মানেনি। প্রায় ১৫ লাখ মানুষ তাদের পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। এবং তাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, ওই ঈদে বাড়ি যাওয়া ও আসার পাঁচ থেকে সাত সপ্তাহ পরে সেখানে এখন করোনা সংক্রমণ সর্বোচ্চের দিকে যাচ্ছে। এবং এটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা তারা বুঝতে পারছে না। তবে সরকার মনে করছে, শুধু আরো কঠোর সামাজিক দূরত্ব ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে লাভ হবে না। মানুষকে দ্রুত ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মনে করে, দ্রুত ভ্যাকসিনের আওতায় আনা ছাড়া কোনোমতেই মানুষকে রক্ষা করা যাবে না। কারণ, ইতোমধ্যে সারা পৃথিবীতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১৮ কোটি ৫৪ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৩ এবং মারা গেছে ৪০ লাখ ৮ হাজার ৮৮৪ জন মানুষ। কিন্তু প্রকৃত অর্থে দেশকে ভ্যাকসিনের আওতায় সব থেকে বেশি আনতে পেরেছে একমাত্র আমেরিকা। চায়না অবশ্য তাদের দেশকে অনেকখানি মাস্কমুক্তও করে ফেলেছে। কিন্তু তারা কীভাবে এ কাজ করেছে, তার কোনো সঠিক ছবি ও তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তারপরেও ৮ তারিখে চায়নায় ২৩ জন কোভিড আক্রান্ত হয়েছে, যা ৭ তারিখে ছিল ১৭ জন। অনেকেই মনে করছে, চায়নার এ লক্ষণ আবার করোনা ফিরে আসার একটি ইঙ্গিত। যেমন জাপানের টোকিওতে এখন পঞ্চম ওয়েভ চলছে। যে কারণে টোকিও শহরের সব অলিম্পিক গেমস দর্শকশূন্য মাঠে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। আবার যে ইন্ডিয়া এক ভয়াবহ সেকেন্ড ওয়েভ থেকে কেবল একটু স্বস্তির দিকে যাচ্ছে, সেখানেও অনেক বিশেষজ্ঞ ইতোমধ্যে বলেছেন , খুব শীঘ্র তৃতীয় ওয়েভ আসবে। ঠিক তেমনিভাবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, চায়নার উহানে চায়না যেভাবে কঠোর লকডাউন দিয়ে সফল হয়েছিল, অন্য শহর বা প্রদেশ আক্রান্ত হলে তাদের পক্ষে তেমনটি সম্ভব হবে না। কারণ, উহান ছিল ছোট শহর। তারা ওই শহরকে কঠোর লকডাউনে নিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু বড় শহর ও গ্রামে যদি দ্বিতীয় ওয়েভ যায়, তাহলে উহানের মতো তারা সফল হতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। যেমন ব্রিটেন এত কঠোর লকডাউনের পরেও পারছে না। তারা দ্বিতীয় ওয়েভ চলে গেছে মনে করে ১৯ জুলাই থেকে যে বিধিনিষেধ শিথিল করতে যাচ্ছিল, সেখান থেকে সরে এসেছে।

বাংলাদেশের সেকেন্ড ওয়েভ প্রথম ওয়েভ থেকে ইতোমধ্যে অনেক বেশি বড় আকারে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের সেকেন্ড ওয়েভের এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের উৎস চিহ্নিত না হলেও বলা যায়, এটা সীমান্ত এলাকা দিয়ে এসেছে। কারণ, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে আমাদের সাড়ে চার হাজার কিলোমিটারের ওপর সীমান্ত। তাই তাদের ওখানে যখন ডেল্টা ভয়াবহ রূপে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন সেখান থেকে যে এখানে আসবে এ ছিল অনিবার্য। অন্যদিকে আফ্রিকার বিটা ভ্যারিয়েন্ট কীভাবে এ দেশে প্রবেশ করল, তার উৎস চিহ্নিত হয়নি। আর ডেল্টার উৎসের মতো মোটা দাগে বলাও যায় না। তবে বাংলাদেশের সরকারও ইন্দোনেশিয়ার মতো রমজানের ঈদে মানুষের বাড়িতে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষও তা শোনেনি। আর তাই দেখা গেল ইন্দোনেশিয়ার মতো বাংলাদেশেও ওই ঈদের পাঁচ থেকে সাত সপ্তাহ পর থেকে সংক্রমণ উধ্র্ব গতি নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার এখন ভয় সামনের কোরবানির ঈদ। আর ইন্দোনেশিয়ার থেকেও অনেক ব্যাপক আকারে এই ঈদ বাংলাদেশে পালিত হয়। তাই এবার মানুষ কী করবে তা তাদের ওপর নির্ভর করছে। কারণ, প্রতিবারই দেখা যাচ্ছে সরকারি নির্দেশ মানুষ মানছে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশসহ গোটা দরিদ্র বিশ্বই টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। আর এটা সত্য, টিকা উৎপাদন যদি শুধু কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দরিদ্র বিশ্বের মানুষকে টিকার আওতায় আনতে অনেক সময় লাগবে। তা ছাড়া ইতোমধ্যে অক্সফোর্ড এবং ফাইজার বলছে, ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ওপর তাদের টিকা কার্যকর হতে গেলে বুস্টার ডোজ অর্থাৎ তৃতীয় ডোজ নিতে হবে। তার অর্থ পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে তিন ডোজ করে টিকা দিতে হবে। যার অর্থ বাংলাদেশের মানুষকেও তিন ডোজ করে টিকা দিতে হবে। এই টিকা কোনোমতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভ্যাক্সের মাধ্যমে দরিদ্র বিশ্বকে আগামী পাঁচ বছরেও দিতে পারবে না। তাই এখন বিশ্বের প্রতিটি দরিদ্র দেশের ওষুধ কোম্পানি ও সরকারকে টিকা উৎপাদনের দিকেই এগোতে হবে। যা বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শুরু করেছে। এখন টিকা আবিষ্কারক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের টিকা উৎপাদনের অনুমতি, মেধাস্বত্ব ও প্রযুক্তি এসব দেশকে সহজে হস্তান্তর করতে হবে। তাহলে হয়তো আগামী বছরের মধ্যে দরিদ্র দেশগুলো তাদের দেশের মানুষকে অন্তত এক ডোজ টিকার আওতায় আনতে পারবে। আর এ মুহূর্তের টিকা উৎপাদনকারী দেশগুলো হয়তো আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে তাদের দেশের মানুষকে সম্পূর্ণরূপে না হলেও এক ডোজ টিকার আওতায় আনতে পারবে।

বাস্তবে করোনার এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের আক্রমণ নিয়ে আক্রান্ত ১০৪ দেশ শুধু নয়, সব দেশই উদ্বিগ্ন। আর যদি তৃতীয় ঢেউ আসে, তাহলে পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা কত হবে এবং দেশে দেশে অর্থনীতি কোন কঠিন খাতে গিয়ে পড়বে, তা এ মুহূর্তে কেউই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। এ কারণে এ মুহূর্তে প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ববান এবং নিজ নিজ দেশের সরকারের নির্দেশনাগুলো মানা একান্তই জরুরি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য