বেওয়ারিশ কুকুরে সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি

বেওয়ারিশ কুকুরে সঠিক ব্যবস্থাপনা জরুরি

প্রাণিচিকিৎসকরাও বলেন যে, কুকুরকে বন্ধ্যাকরণ করা হলে তারা শান্ত হয়ে যায়। তবে এসব কিছুর বাইরে আরেকটি বিকল্প হতে পারে কুকুরের মাংস রপ্তানি। বিশ্বের অনেক দেশেই কুকুরের মাংসের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের যে কর্মীরা কাজ করেন, তারাও অনেক সময় রাস্তঘাটের এসব বেওয়ারিশ কুকুর ধরে রান্না করে খেয়ে ফেলেন বলে শোনা যায়। সুতরাং বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বেড়ে গেলে এর মাংস প্রসেস করে বিদেশে রপ্তানি করা যায় কি না—তার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যায়।

মানুষ অনেক সময় নিজের অপছন্দের লোক বা প্রতিপক্ষকে গালি দেয়ার জন্য ‘কুকুর’ শব্দটি ব্যবহার করলেও মানুষের সঙ্গে কুকুরের সম্পর্ক বেশ পুরোনো। বিশেষ করে অন্য হিংস্র প্রাণীদের তুলনায় সহজে পোষ মানা এবং বাড়িঘর ও এলাকার নিরাপত্তা এমনকি রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোয়েন্দাকাজে অংশ নেয়ার কারণে কুকুরের জনপ্রিয়তা বিশ্বময়। তাছাড়া শিশুরাও অহিংস বা খরগোশ-বেড়ালের মতো দেখতে এবং আচরণে তুলনামূলক শান্ত কুকুরদের পছন্দ করে। যে কারণে অনেকে বাসার ভেতরেই কুকুর পোষেন। কিন্তু তারপরও আমাদের দেশে এই প্রাণিটি মাঝেমধ্যেই সংবাদ শিরোনাম হয়; বিশেষ করে বেওয়ারিশ কুকুর।

কোনো এলাকায় হঠাৎ করে কুকুরদের উৎপাত বেড়ে গেলে স্থানীয় প্রশাসনও কুকুর নিধনের উদ্যোগ নেয়। ব্যক্তিপর্যায় থেকেই কুকুর মারাকে তখন আর অন্যায় বা অমানবিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কারণ বেওয়ারিশ কুকুরগুলো হঠাৎ করে হিংস্র হয়ে উঠলে বা কোনো কারণে খাদ্যসংকটে পড়ে উৎপাত শুরু করলে তাদের সঠিক ব্যবস্থাপনার চিন্তা না করে বিকল্প সমাধান হিসেবে তাদেরকে মেরে ফেলাকেই যুক্তিযুক্ত মনে করা হয়।

অথচ পৃথিবীর অনেক দেশেই কুকুরের মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার হিসেবে পরিচিত। সুতরাং, বেওয়ারিশ কুকুরগুলো কেন উৎপাত শুরু করে তার সঠিক কারণ অনুসন্ধান জরুরি। সেইসঙ্গে কুকুরের উৎপাত বেড়ে যাওয়া প্রতিরোধে এর বন্ধ্যাকরণ কিংবা কুকুরের সংখ্যা বেড়ে গেলে এর মাংস প্রসেস করে রপ্তানি করার চিন্তাটিও বিবেচনায় নেয়া যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমদিকে মানুষের শিকার কাজে সঙ্গ দেয়া, জিনিসপত্র দেখাশোনা, বিপদের পূর্বাভাস ও সংকেত দেয়া এবং খাদ্যের উৎস খোঁজার কাজে মানুষ কুকুরের সহযোগিতা নিত। ধীরে ধীরে এই কাজের সম্পর্ক বন্ধুত্বে রূপ নেয়।

২০১৬ সালে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কত দিন আগে কুকুরের সঙ্গে মানুষের সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল— এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে যুক্তরাজ্যের একদল বিজ্ঞানী জানতে পেরেছেন, আদি যুগের মানুষ বিশ্বের দুই অঞ্চলে প্রাণিটিকে পোষ মানিয়েছিল।

চতুষ্পদ জন্তুটির ক্রমবিকাশের ইতিহাস জানার লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা আধুনিক জিনতত্ত্ব প্রয়োগ করে দেখতে পান, ইউরোপ ও এশিয়া অঞ্চলে নেকড়েসদৃশ শিকারি কুকুরের দুটি পৃথক প্রজাতি মানুষের পোষ মেনেছিল অন্তত ১৫ হাজার বছর আগে। আর এটা ঘটে গরু-ছাগল জাতীয় পশুকে পোষ মানানোরও পাঁচ হাজার বছর আগে। জিনগত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কুকুরের একটি বংশলতিকা তৈরি করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ইউরেশিয়া অঞ্চলের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তে জীবজন্তু পোষ মানানোর অত্যন্ত প্রাচীন ইতিহাস থাকলেও মধ্যাঞ্চলে এমনটি ঘটেনি।

কী কী কারণে মানুষের কাছে কুকুরের জনপ্রিয়তা, তার একটি তালিকা করেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। তাদের তালিকায় রয়েছে নিরাপত্তা, কুকুরের শিশুসুলভ আচরণ, মালিকের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা ও আনুগত্য, ভালো সঙ্গী, বোঝার ক্ষমতা তথা মানুষের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনে পারদর্শী, অর্থাৎ মানুষের ভাষা দ্রুত বুঝতে পারা এবং সর্বোপরী আনন্দ-বিনোদন। অর্থাৎ অনেকে নিছকই শখে, আনন্দের উপলক্ষ তৈরির জন্যও কুকুর পোষেন। বিশেষ করে ছোট আকারের নাদুসনুদুস কুকুর কোনো বাসার ভেতরে থাকলে এবং ঠিকমতো কুকুরের যত্নআত্তি করা গেলে পাখি ও বেড়ালের মতোই কুকুরও নিরাপদ বিনোদনসঙ্গী হতে পারে।

আবার কুকুরের প্রভুভক্তি নিয়ে অনেক সিনেমাও হয়েছে। অর্থাৎ কুকুর যে শুধু হিংস্র হয়ে গেলে মানুষকে বিপদাপন্ন করে ফেলে তা-ই নয়, বরং বিপদগ্রস্ত মানুষকে বাঁচাতেও এগিয়ে আসে—তার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। সুতরাং অন্য প্রাণীদের সঙ্গে সহজেই কুকুরকে আলাদা করা যায় এবং যে প্রাণীটির সঙ্গে মানুষের সুসম্পর্কের বয়স পাঁচ হাজার বছরের— সেই প্রাণিটিকে সমূলে নিধন করার আগে চিন্তা করা দরকার, একটি শহরে বা এলাকায় কুকুর না থাকলে ওই কমিউনিটির মানুষের কতটা উপকার হবে? কারণ শুধু মানুষের বন্ধুই নয়, বরং সে পরিবেশেরও বন্ধু। পরিচ্ছনতাকর্মীরা এলাকার রাস্তাঘাট ও ড্রেন পরিষ্কার করেন সত্যি। কিন্তু ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে কুকুরের ভূমিকাও অস্বীকার করা যাবে না। ম্যানহোলে লুকিয়ে থাকা ইঁদুর-ছোঁচারা প্রকাশ্যে আসতে ভয় পায় কুকুরের কারণে।

অথচ তাদের বংশবিস্তার কুকুরের চেয়েও দ্রুত। আবার রাস্তাঘাটে কুকুরের চলাচল থাকলে অনেক সময় চোর-ডাকাতের মতো অপরাধীরাও তটস্থ থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, প্রকৃতি শুধু মানুষকে বাঁচার অধিকার দেয় না। বরং মানুষকে যেহেতু অন্য প্রাণীদের ওপর কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে এবং যে কারণে মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির সেরা জীব—ফলে অন্য সকল জীবের অধিকার রক্ষা করাও মানুষের দায়িত্ব। মানুষের চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে বা নিরাপত্তার সংকট হচ্ছে বলেই গণহারে কুকুর নিধন করার ক্ষমতা মানুষের থাকলেও এটি নৈতিকতার বিচারে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং রাস্তায় চলাচলকারী কুকুরগুলো কেন হিংস্র হয়ে উঠছে, কেন তারা উপদ্রব সৃষ্টি করছে, এর পেছনে তাদের খাদ্যসংকট কতটা দায়ী এবং সেই সংকট কেন তৈরি হলো—তাও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, করোনার কারণে দীর্ঘ সময় লকডাউন তথা সবকিছু বন্ধ থাকলে এমনকি হোটেল রেস্টুরেন্টও বন্ধ থাকলে তখন বেওয়ারিশ কুকুকদের উৎপাত বাড়ে। কারণ সাধারণত এই কুকুরদের খাদ্যে-সংস্থান হয় এসব হোটেল-রেস্টুরেন্টের উচ্ছিষ্ট খাবারের মাধ্যমেই। এখানে আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই যে, প্রতিদিন হোটেল রেস্টুরেন্টে যে বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় হয়, নষ্ট হয়, সেগুলো যদি এই বেওয়ারিশ কুকুররা না খেত, তাহলে এসব খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হতো এবং সেখানেই পচে দুর্গন্ধ ছড়াত। সুতরাং, উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে কুকুর যে আমাদের পরিবেশকেও বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করছে—তাও ভুলে যাওয়া উচিত হবে না।

তারপরও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী এই বেওয়ারিশ কুকুরগুলো নিয়ে নাগরিকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বিশেষ করে কোনো এলাকায় হঠাৎ করে এর উৎপাত বেড়ে গেলে। স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছরের শেষদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার প্রায় ৩০ হাজার কুকুর স্থানান্তরের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা কর্মসূচি পালিত হয়। একটি পক্ষ যেমন বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের পক্ষে মানববন্ধন করে, তেমনি বিপক্ষেও মানববন্ধন করে প্রাণিপ্রেমী ও পরিবেশবাদী কয়েকটি সংগঠন।

কুকুর নিধনের পক্ষে থাকা লোকজনের দাবি, ঢাকা দক্ষিণে বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। বিভিন্ন অলিগলি অনেক সময় ২০-৩০টি কুকুর দল করে নেয়, যা ওইসব গলিতে চলাচলকারী মানুষের জন্য অত্যন্ত ভীতিকর। বিশেষ করে রাতে। তাছাড়া যেখানে সেখানে বেওয়ারিশ কুকুরের ঘোরাঘুরির কারণে অনেক সময় দ্রুতগতির মোটর সাইকেল বা গাড়িও দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে।

এইসব যুক্তি মেনে নিয়েই কুকুর নিধনের বিপক্ষে থাকা মানুষজনের দাবি, ঢাকা দক্ষিণের বেওয়ারিশ কুকুরগুলো রাজধানীর অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা হলে তাতে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ওইসব এলাকায় নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হবে। আর মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুকুর মেরে ফেলাও উচিত নয়।

২০১৯ সালের প্রাণিকল্যাণ আইন বলছে, মালিকানাবিহীন বা বেওয়ারিশ হলেও কোনো প্রাণীনিধন বা স্থানান্তর করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তাছাড়া ২০১৪ সালে একটি সংগঠনের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুকুরনিধনে আদালতেরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ অবস্থায় বিকল্প হিসেবে সামনে আসে কুকুর বন্ধ্যাকরণের বিষয়টি। কিন্তু গণমাধ্যমের খবর বলছে, বরাদ্দ না থাকায় রাজধানীতে কুকুর বন্ধ্যাকরণ প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে। দক্ষিণ সিটির ভেটেরিনারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কুকুর বন্ধ্যাকরণের একটি প্রকল্পর মাধ্যমে ২০১৭-এর মার্চ থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বিরতি দিয়ে এই কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু এই প্রকল্পের মাধ্যমে কতগুলো কুকুরকে বন্ধ্যাকরণ করা হয়েছে, কী পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে— এ বিষয়ে কোনো তথ্য ভেটেরিনারি বিভাগের কাছে নেই। তার মানে কুকুর বন্ধ্যাকরণের কাজ যখন বন্ধ এবং এক এলাকার কুকুরকে অন্য এলাকায় স্থানান্তর বা মেরে ফেলাও যেহেতু আইনত দণ্ডনীয়—তখন এর বিকল্প কী? বিকল্প হচ্ছে কুকুরের সঠিক ব্যবস্থাপনা।

বেওয়ারিশ বা মালিকানাবিহীন কুকুরও যে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশের সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রাখে, সে কথা আগেই বলা হয়েছে। সুতরাং মানুষ ও পরিবেশের স্বার্থে কুকুর যেমন লাগবে, তেমনি কুকুরের উৎপাত যাতে বেড়ে না যায় বা খাদ্যসংকটে কুকুর যাতে হিংস্র হয়ে মানুষকে আক্রমণ না করে, সেজন্য সিটি করপোরেশনেরও দায় আছে।

মানুষ ও পরিবেশের বন্ধু এই প্রাণিটির বেঁচে থাকা নিশ্চিতে সিটি করেপারেশনের তরফে নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের জন্য খাদ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া যায়। বিশেষ করে করোনার মতো পরিস্থিতিতে যখন লকডাউন হয়, অর্থাৎ যখন হোটেল রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকে। কেননা হোটেল রেস্টুরেন্ট খোলা থাকলে তথা কুকুর মানুষের উচ্ছিষ্ট খাবার পেলে হিংস্র হয় না। অর্থাৎ যেকোনোভাবেই হোক এই বেওয়ারিশ কুকুরদের খাবার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বন্ধ্যাকরণ প্রকল্পটি পুনরায় চালু করা যেতে পারে। কারণ প্রাণিচিকিৎসকরাও বলেন যে, কুকুরকে বন্ধ্যাকরণ করা হলে তারা শান্ত হয়ে যায়। তবে এসব কিছুর বাইরে আরেকটি বিকল্প হতে পারে কুকুরের মাংস রপ্তানি। বিশ্বের অনেক দেশেই কুকুরের মাংসের প্রচুর চাহিদা রয়েছে।বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীনের যে কর্মীরা কাজ করেন, তারাও অনেক সময় রাস্তঘাটের এসব বেওয়ারিশ কুকুর ধরে রান্না করে খেয়ে ফেলেন বলে শোনা যায়। সুতরাং বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বেড়ে গেলে এর মাংস প্রসেস করে বিদেশে রপ্তানি করা যায় কি না—তার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যায়। তবে সেখানে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, এই সুযোগে আবার কুকুরের মাংস আমাদের দেশের মাংসের বাজার কিংবা হোটেল রেস্টুরেন্টের হেঁশেলে চলে না যায়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
অমিত শাহর জন্য উপহার!
শিক্ষা-ঐতিহ্যচর্চা আমাদের উজ্জীবিত করবে
নারীর পাশে পুরুষকেই দাঁড়াতে হবে
নিরাপদ ঢাকা সৃষ্টিতে করণীয় 
নদী যেন না হয় খাল

শেয়ার করুন

মন্তব্য