নারীর পাশে পুরুষকেই দাঁড়াতে হবে

নারীর পাশে পুরুষকেই দাঁড়াতে হবে

মহামারি করোনায় সারা বিশ্বের মানুষ যখন শুধু বেঁচে থাকা নিয়ে আতঙ্কিত, এই পরিস্থিতিতেও চলছে নারীর ওপর নির্যাতন। সারা বিশ্বে পারিবারিক সহিংসতা অনেক বেড়ে গেছে এবং চরম অনিরাপত্তায় ভুগছেন নারীরা।

সম্প্রতি রাজধানীর পুরান ঢাকার কলতাবাজারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী চলতি পথে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাসায় ফেরার পথে এক ব্যক্তি ওই শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে হেনস্তা ও যৌন হয়রানি করেন। মেয়েটি চিৎকার করলে হেনস্তাকারী ব্যক্তিটি পালিয়ে যান। তবে ওই শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, আশপাশে অনেক লোকজন ছিল কিন্তু কেউ তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। এমন ঘটনা একজন নারীর জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের এবং কষ্টের।

বেশির ভাগ নারী সরল বিশ্বাসে একজন পুরুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বা তার সান্নিধ্য পেতে ভালোবাসে। তবে অনেকেই তার পছন্দের পুরুষ উপযুক্ত কি না, সে বিচারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এমন নির্বুদ্ধিতার কারণে তাকে ঠকতে হয়। শুধু হেনস্তা বা শারীরিক নির্যাতন নয়, হতে হয় ধর্ষণের শিকার। এমনকি কখনও কখনও জীবন নিয়েও তারা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এরই মধ্যে খবরে প্রকাশ পেয়েছে ফতুল্লায় প্রেমিকের সঙ্গে ঘুরতে বের হয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক গার্মেন্টস কর্মী। ধর্ষণের শিকার গার্মেন্টস কর্মীর সঙ্গে চার মাস আগে এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে গত এক মাস তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারা প্রায় সময় বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে বের হতেন।

অন্য দিনের মতো সেদিনও ঘুরতে গিয়ে একপর্যায়ে গভীর রাতে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে চলাচলের রাস্তার পাশে তরুণীকে ধর্ষণ করে। এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটছে। তবে রাস্তাঘাট বা যানবাহনে হেনস্তা বা যৌন হয়রানির শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদের উদাহরণ নেই বললেই চলে।

বছর দশ কি বারো আগে একবার ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখনও বিব্রতবোধ করি। রাজধানীর ফার্মগেটে বাসের জানালা দিয়ে গলার চেইন ছিনিয়ে নিল। তার নখের আঁচড়ে গলা থেকে সামান্য রক্ত বের হলো। সঙ্গে আমার শিশুকন্যা। ভয়ে চিৎকার করে উঠল। বাস ড্রাইভার-হেলপার বা যাত্রী কেউ কোনো শব্দও করেনি। নির্বাক দৃষ্টিতে আমাদের অসহায় মা-মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখল। শুধু আতঙ্কিত মেয়েটা অনেক দিন ঘুমের মধ্যে আমাকে জড়িয়ে ধরত।

শুধু ছিনতাই নয়, বাংলাদেশের সড়ক, ফুটপাত কিংবা জনসমাগম স্থানগুলোতে দৈনন্দিন প্রয়োজনে চলাফেরার সময় কতজন নারী যৌন হেনস্তার শিকার হন তার হিসাব নেই। যানবাহন কিংবা রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় এ ধরনের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার খবর প্রায়ই শোনা যায়।

আশির দশকে মফস্বলের একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনও শিউরে উঠি। তখন কলেজে পড়ি। তখন সেকেন্ড ইয়ারের শিক্ষার্থী। দুপুরে ক্লাস শেষ করে বাসায় ফেরার পথে আমার এক বান্ধবীকে পথরোধ করে অন্য এলাকার কিছু বখাটে ছেলে। জোর করে রিকশা থেকে নামিয়ে তাদের গাড়িতে নিয়ে যাবে। সে রিকশার হুড শক্ত করে ধরে চিৎকার করতে থাকে। পাড়ার পুরুষ-মহিলারা হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলে বখাটেরা পালিয়ে যায়। আকস্মিক অনাকাঙ্ক্ষিত সে ঘটনায় আমার বান্ধবী ট্রমায় ভোগে দীর্ঘদিন।

নারীদের এমন অসহায় মুহূর্তে এগিয়ে আসা মানুষের কথা কমই শোনা যায়। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও এখনও অনেকে মনে করে নারী-বিষয়ক যেকোনো আলোচনা অশ্লীল, বিতর্কিত।

চলতি বছরের শুরুর দিকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক পরিচালিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না-কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর হেনস্তাকারীদের অধিকাংশই মধ্যবয়সী বা বয়স্ক পুরুষ।

আবার আরেক বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইডের এক জরিপ বলছে, তাদের জরিপে অংশ নেয়া নারীদের ৮৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা জনসমাগমস্থলে অশালীন মন্তব্য শুনেছেন এবং পুরুষেরা যৌন হয়রানি করার সুযোগ খুঁজেছিলেন। অর্ধেকের বেশি নারী গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

এ ছাড়াও কয়েক বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায় যে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ৭৬ শতাংশ ছাত্রীই কোনো না-কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ হার সবচেয়ে বেশি: ৮৭ শতাংশ।

চলন্ত বাসে নারী লাঞ্ছনা বা ধর্ষণের ঘটনাও কম ঘটেনি। ধর্ষণের পর কিছু নারীকে হত্যাও করা হয়েছে। চলন্ত বাসে ধর্ষণে শিক্ষার্থী থেকে গার্মেন্টস কর্মীও বাদ পড়েনি।

মহামারি করোনায় সারা বিশ্বের মানুষ যখন শুধু বেঁচে থাকা নিয়ে আতঙ্কিত, এই পরিস্থিতিতেও চলছে নারীর ওপর নির্যাতন। সারা বিশ্বে পারিবারিক সহিংসতা অনেক বেড়ে গেছে এবং চরম অনিরাপত্তায় ভুগছে নারীরা।

মানুষ ঘরবন্দি হয়েছে, অনেকে বেকার হয়ে পড়েছে, উদ্যোক্তাদের বাজার মন্দ আর এসব কারণে পুরুষের যেমন মেজাজ খিটখিটে হয়েছে নারীরাও নানা ঝক্কি পোহাতে বিরক্তবোধ করছেন। এ পরিস্থিতিতে ঘরে ঘরে নানা অশান্তির খবর পাওয়া যাচ্ছে।

করোনা পরিস্থিতি নারীর জীবনকে ভিন্নমাত্রায় প্রভাবিত করছে। বাড়িভাড়া পরিশোধ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া, দীর্ঘ সময় ঘরে থাকায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিবাহবিচ্ছেদ, আত্মহত্যা, নারী সেবিকাকে দমন করার জন্য সাত দিন পরিত্যক্ত পুকুরে থাকতে বাধ্য করা, এসব অমানবিক অনেক খবর শোনা যাচ্ছে।

মহামারির এই দুঃসময়ে বাসগৃহ একজন নারী বা শিশুর কাছে সবচেয়ে নিরাপদ হওয়ার কথা। কিন্তু এই সময়ে সামাজিক দূরত্বকে পুঁজি করে নারীর ওপর অত্যাচারের হার বাড়িয়ে দিয়েছে কিছু পুরুষ। মানবিক বিপর্যয়-শিশু-বৃদ্ধ, কিশোর-কিশোরীসহ যেকোনো মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। মহামারিকালেও অসংখ্য পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আর কবে এই দেশের নির্যাতনকারী পুরুষরা সত্যিকারের মানবিক মানুষ হয়ে উঠবে?

স্বাভাবিক সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। আর ৯০ শতাংশ নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। নারী-পুরুষ সম্পর্ক ও সমতার ক্ষেত্রে কোভিড-১৯-এর প্রভাব সম্প্রতি ব্র্যাকের একটি জরিপে (এপ্রিল ২০২০) উঠে আসে- করোনা পরিস্থিতিতে শিশুসহ পরিবারের সকল সদস্যই বেশিরভাগ সময় বাসায় থাকে। এই সময়ে আগের তুলনায় গৃহস্থালি কাজের চাপ এবং কর্মঘণ্টা বেড়েছে বলে অভিমত দেন ৯০ শতাংশ নারী। কর্মজীবী নারীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে কাজের মানুষের সাহায্য নিতে পারছে না। একদিকে অফিসের কাজ আবার ঘরে ফিরে সংসার সামলাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জরিপে আরও উঠে আসে, বাংলাদেশের নারীদের জীবনে নির্যাতনের কথা। এর হার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে করোনাকালে বেড়েছে ৩২ শতাংশ।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবনাচরণ। বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে খাদ্যাভ্যাসে বা স্বাস্থ্য সচেতনতায়। করোনা সমস্যা মানব জাতিকে আজ মানবিক মূল্যবোধের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। যে কাঠগড়ায় ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-জাতি সব একাকার। মানবিক হওয়ার সময় এসেছে, আর উপলব্ধি করতে হবে অর্থবিত্ত নয়, সুস্বাস্থ্যই সম্পদ।

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
নিরাপদ ঢাকা সৃষ্টিতে করণীয় 
নদী যেন না হয় খাল
রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলেই মঙ্গল
গ্রামভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা জরুরি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

উদ্দীপ্ত যৌবনের দূত শেখ কামাল

উদ্দীপ্ত যৌবনের দূত শেখ কামাল

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তার লাশ মানুষকে দেখতে না দেয়া, বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ঘৃণা করতে শেখানোর যে অপচেষ্টা, শেখ কামালও অপচেষ্টার শিকার। যে লোক পয়সার অভাবে হেঁটে বাসায় ফিরতেন, তিনি করবেন ব্যাংক ডাকাতি? ইতিহাসকে কখনও চেপে রাখা যায় না। খুনিরা প্রথমে খুন করে, তারপর সেই খুনকে জায়েজ করার জন্যে খুন হওয়া ব্যক্তির নামে অপপ্রচার চালায়। শেখ কামালের ব্যাপারেও সেটি ঘটেছে।

রাষ্ট্রপ্রধানের সন্তান হলেও তার মধ্যে ছিল না অহংকার, ছিল না বিলাসিতা। তাই বন্ধু, সতীর্থ ও সহপাঠীদের চোখে বঙ্গবন্ধুতনয় শেখ কামাল হয়ে উঠেছিলেন স্বপ্নবান ও আদর্শ তারুণ্যের এক উজ্জ্বল প্রতিকৃতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল। ১৯৪৯ সালের আগস্টের এই দিনে তার জন্ম। বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ৭২ বছর। উত্তরাধিকার সূত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নানা মানবিক ও নেতৃত্ব গুণাবলি পেয়েছিলেন শেখ কামাল। এর সঙ্গে শাণিত হয়েছিল সংস্কৃতিবোধ ও ক্রীড়া-দর্শন। সংযুক্ত হয়েছিল দেশ ও মানুষের প্রতি অনুপম দরদ এবং দায়িত্ববোধ। খেলার মাঠ থেকে নাটকের মঞ্চ, সংগীতের ভুবন থেকে রাজনীতির ময়দান সর্বত্র ছিল তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। ছিলেন বন্ধু ও সতীর্থদের মধ্যমণি।

শেখ কামাল একাধারে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, রাজনীতিবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সমাজচিন্তক। তার স্ত্রী সুলতানা কামালও বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ ছিলেন। বিবাহিত জীবনে প্রবেশের এক মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট গোটা পরিবারের সঙ্গে তাকেও শাহাদাতবরণ করতে হয় বাংলাদেশবিরোধী নর্দমার কীটদের হাতে। মানুষ হিসেবে শেখ কামাল ছিলেন অলরাউন্ডার। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে, কিংবা রাজনীতির মাঠে তার প্রয়োজনীয়তা যখন অনিবার্য, ঠিক তখনই রাজনীতির মাঠে। যুদ্ধের ময়দানে বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের পাশাপাশি তাকে পাওয়া গেছে খেলার মাঠে, গানের আসরে, নাটকের মঞ্চে, সেতারের সুরে, বন্ধুদের আড্ডায় ও ছাত্ররাজনীতির স্লোগানে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জাতির পিতাকে আটক করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর মা-মাটি-মাতৃভূমির সম্ভ্রম রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানীর এডিসি হিসেবে দেশকে স্বাধীন করতে তিনি রাখেন বীরত্বব্যঞ্জক ভূমিকা।

একজন ছাত্র সংগঠক হিসেবে তিনি কখনও নেতৃত্বের শীর্ষে আসতে চাননি। তিনিই ছাত্রলীগকে সংগঠিত করতেন, প্রেরণা জোগাতেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা, পরবর্তীকালে জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশ গঠনের কাজে নিজেকে সমর্পণ করেছেন, তখন পিতার কাজে সহায়তা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে কাজ শুরু করেছেন তিনি। তার হাতের ছোঁয়ায় নিমেষেই বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশের ফুটবল, ক্রিকেট, হকিসহ বিভিন্ন খেলাধুলা। আবাহনী ক্রীড়া চক্রের মতো একটি ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার হাতেই। ঢাকার শাহীন স্কুলে অধ্যয়নকালে শেখ কামাল ছিলেন স্কুলের প্রতিটা খেলার পরিচিত মুখ। নিখুঁত লাইন-লেন্থের একজন ফাস্ট বোলার হিসেবেও তার সুনাম ছিল। তিনি আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন দীর্ঘদিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর তিনি ছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বাস্কেটবল টিমের অধিনায়ক। শুধু খেলাধুলা নয়- সংগীত, বিতর্ক, অভিনয়, উপস্থিত বক্তৃতা থেকে শুরু করে কোথায় ছিলেন না শেখ কামাল? ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করে তিনি বাংলা গানের নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলেন।

ফিরোজ সাঁই, ফেরদৌস ওয়াহিদদের মতো জনপ্রিয় পপসংগীত শিল্পীরা এসেছেন এই সংগঠনের মধ্য দিয়েই। বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে পপসংগীতের সূচনা হয়েছিল শেখ কামালের হাত ধরে। পাকিস্তান সরকার যখন রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছিল, তখন শেখ কামাল বিভিন্ন প্রতিবাদী সভায় নিজে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে বাংলা ও বাঙালির প্রাণের রবীন্দ্রসংগীতকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। ছায়ানটের সেতারবাদনের ছাত্র হিসেবে সেতার বাজানোতেও তিনি তালিম নিয়েছিলেন। শেখ কামাল ছিলেন বাংলাদেশের নাট্য-আন্দোলনের এক তরতরে পুরোধা যুবক। তিনি ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ যখন ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক, তখন ‘নাট্যচক্র’ নামে একটি নাটকের সংগঠন গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই নাট্য সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন শেখ কামাল। এই নাট্য সংগঠনের অভিনয়শিল্পী হয়েই নাট্যজন ফেরদৌসী মজুমদারের সঙ্গে কলকাতায় মঞ্চ নাটকে অভিনয় করতে গিয়েছিলেন তিনি।

নাটক শেষে ফেরদৌসী মজুমদার ও শেখ কামালের অটোগ্রাফ নিতে সেদিন দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এই তরুণ মানুষটি থেমে থাকেননি। তিনি সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি নিয়ে পড়াশোনার দিকে আবার ঝুঁকে পড়েন এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন শেখ কামাল। ২৬ বছরের এক টগবগে তরুণ ছিলেন শেখ কামাল। তার এই ছোট জীবন পরিধিতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল উদীয়মান জ্বলজ্বলে তারা। তারুণ্যের প্রতীক। এই ২৬ বছরের জীবনে অনেক কিছু করেছেন তিনি। কিন্তু তাকে নিয়ে হায়েনাদের চক্রান্ত থেমে থাকেনি। তার নামে ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগ এনে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে যা পরবর্তীকালে টিকে থাকতে পারেনি। কারণ, ইতিহাস কখনও মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয় না। এ প্রসঙ্গে আমাদের দেশের বিখ্যাত অভিনেত্রী ডলি জহুর বলেছিলেন, আমি খুব কষ্ট পাই, অভিশাপ দেই, যখন দেখি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নিয়ে চিরকাল মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত, কাল্পনিক অভিযোগের কথা শুনি। অনেকে জানেন যে, এসব মিথ্যা ও বানোয়াট।

পাছে আওয়ামী লীগ সিল লেগে যায় এই জন্যে তারা এসব সত্যের বিষয়ে মুখ খোলেননি। আর এইসব ঘটনা বের করে আনার জন্যে মিডিয়ার ভূমিকাও দরকার। কারণ, এই মিথ্যাচারের মাধ্যম ও বাহন ছিল গণমাধ্যম ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ছোট বোনের বান্ধবীকে নিজের বোনের মতো করে গাইড করা, অনেক রাতে নাটকের রিহার্সাল শেষ হলে বাসায় পৌঁছে দেয়ার মতো দায়িত্ববোধ যে তরুণের আছে, তার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা কঠিন কিছু না।

প্রেসিডেন্টের ছেলে হয়ে যার মধ্যে ছিল না অহংকার। পকেটে টাকা না থাকলে যিনি হেঁটে বাড়ি ফিরতেন। তরুণ বয়সে একজন ছেলের একটি মেয়েকে ভালো লাগতেই পারে। তাইতো ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন একজন ক্রীড়াবিদকে। ঘাতকের আঘাতে তার প্রিয় সহধর্মিণীর মৃত্যু হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তার লাশ মানুষকে দেখতে না দেয়া, বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ঘৃণা করতে শেখানোর যে অপচেষ্টা, শেখ কামালও অপচেষ্টার শিকার। যে লোক পয়সার অভাবে হেঁটে বাসায় ফিরতেন, তিনি করবেন ব্যাংক ডাকাতি? ইতিহাসকে কখনও চেপে রাখা যায় না। খুনিরা প্রথমে খুন করে, তারপর সেই খুনকে জায়েজ করার জন্যে খুন হওয়া ব্যক্তির নামে অপপ্রচার চালায়। শেখ কামালের ব্যাপারেও সেটি ঘটেছে।

শেখ কামাল একজন দক্ষ, বিচক্ষণ সংগঠক ছিলেন তাইতো যুদ্ধের ময়দানে স্বাধীন বাংলার ফুটবল ম্যানেজার তানভীর মাঝার তান্নার সঙ্গে যুদ্ধে প্রায় আলাপ হলেই উনি বলতেন, ‘তান্না, আমরা কি ফিরে যেতে পারব না? দেখে নিস, স্বাধীন হলে খেলার ছবিটাই বদলে দিব আমি’। তিনি তার কথা রেখেছিলেন। ১৯৭৪ সালে আবাহনী যখন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আইএফএ শিল্ড ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে যায়, তখন আন্তর্জাতিক মাধ্যমেও তার মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে।

ভাইবোনদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বঙ্গমাতা বেগম মুজিব শেখ কামালকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জেলে দেখা করতে গিয়েছিলেন। এমনিতেই রাজনৈতিক কারণে পিতার সঙ্গে তার দেখা তেমন হতো না। তাইতো জেল গেটে শেখ হাসিনা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘বুবু তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা ডাকি?’ এমন একজন মানুষকে নিয়ে কত প্রোপাগান্ডাই না হয়েছে!

শেখ কামালের মিথ্যাচার নিয়ে যখন অনেকেই না জেনে কথা বলে, তখনই হাসি পায়। যে ব্যাংক ডাকাতির কথা বলা হয়, সেখানে দুষ্কৃতিকারীদের ধরতে পুলিশের সঙ্গে শেখ কামালের বন্ধু ও সিনিয়ররাও যোগ দেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ইকবাল হাসান টুকু। তার ড্রাইভার ছিলেন সেই টুকু। জাপার কাজী ফিরোজ রশিদ ছিলেন তার সিনিয়র, তিনিও ছিলেন সেই জিপে। ওই সময়ের ‘দৈনিক মর্নিং নিউজ’-এর সাংবাদিক প্রয়াত এবিএম মুসা পরদিন পত্রিকায় এর সত্যতা প্রকাশ করেন।

পৃথিবীতে ভালো মানুষকে ভালো কাজের জন্যে জীবন দিতে হয়। অনেক ধৈর্য ত্যাগ-তিতিক্ষা কষ্ট সহ্য করতে। বঙ্গবন্ধু পরিবার তার মধ্যে অন্যতম। এ দেশীয় দালাল ও বিদেশি শক্তি এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্রান্তে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন। আজ যদি শেখ কামাল বেঁচে থাকতেন কেমন হতেন তিনি? এই প্রশ্ন মনের মধ্যে খুব জাগে। ২০২০ সালের এ আধুনিক যুগে তিনি হতেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই তরুণ-সমাজকে আরও মানসিক-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করতেন। যে তরুণ তার জীবনের ২৬ বছরে এত কর্মোদ্দীপ্ত ছিলেন, বেঁচে থাকলে হয়ত আরও কিছু করে যেতে পারতেন দেশের জন্যে। দেশের তরুণদের জন্যে। শেখ কামাল একজন ইয়ুথ আইকন। আজও, এখনও... ।

খুনিরা হয়তো তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তার অবদানকে মুছে দিতে পারেনি। কারণ, হিরো’জ নেভার ডাই...। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের ছাত্ররাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন সূচিত হতো। ক্ষণজন্মা শেখ কামালের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন, তার আদর্শকে যদি আজকের তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া যেত, তরুণদের অন্তরে যদি গেঁথে দেয়া যেত; তাহলে তরুণদের মধ্যে যে গোষ্ঠীটি আজ পথভ্রষ্ট হয়েছে, বিপথে গেছে বা ভ্রান্ত পথে হাঁটছে, তারা সত্যিই দেশপ্রেমিক নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতো। আর দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে আজ কণ্টকাকীর্ণ যে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, শেখ কামাল বেঁচে থাকলে হয়তো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এতটা বন্ধুর পথ তাকে পাড়ি দিতে হতো না। মাত্র ২৬ বছরের ক্ষুদ্র জীবনে শেখ কামাল যেসব অসামান্য কর্ম দিয়ে প্রিয় এ মাতৃভূমিকে সাজিয়েছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মরণ রাখবে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ও আন্তরিকতায়। শেখ কামালের জন্মদিনে তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু! বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ,পরিচালক, এফবিসিসিআই

আরও পড়ুন:
নিরাপদ ঢাকা সৃষ্টিতে করণীয় 
নদী যেন না হয় খাল
রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলেই মঙ্গল
গ্রামভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা জরুরি

শেয়ার করুন

শেখ কামালকে নিয়ে জাতির জানার আছে অনেক কিছু 

শেখ কামালকে নিয়ে জাতির জানার আছে অনেক কিছু 

বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকলের নৈতিক অবস্থান এবং ক্ষমতার প্রতি মোহমুক্ত মনোভাব, এই পরিবারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মে এসেও পরিবারটি আজও উজ্জ্বল। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতাধর ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবারগুলো আস্তে আস্তে ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে। এর মূল কারণ তাদের উত্তরাধিকারীরা যোগ্যতার প্রশ্নে পূর্বসূরিদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।

বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর যোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল। শৈশবে তাকে নিয়ে কত যে মিথ্যাচার আর বিকৃত ইতিহাস শুনেছি। তারপর স্কুল জীবন থেকে তাকে জানতে শুরু করলাম। ঢাকা কলেজে এসে অনেক কিছু জানলাম এই ট্র্যাজেডি-নায়ক সম্পর্কে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষক আর সহকর্মীদের কাছ থেকে তার গল্প শুনতে শুনতে আরও গভীরভাবে আবিষ্কার করলাম এই মেধাবী, সাহসী, দেশপ্রেমিক, স্পষ্টবাদী সংগঠককে। যিনি ছিলেন একাধারে ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠক, নাট্যকর্মী ও নাট্যসংগঠক, শিল্পকলার সকল ক্ষেত্রে যার সুনিপুণ পারদর্শিতা ছিল, ছিলেন ছাত্র সংগঠক ও ছাত্রনেতা, ছিলেন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যিনি তরুণ ও যুব সমাজকে সৃজনশীল রাজনীতি, সাংগঠনিক কার্যক্রম আর ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছিলেন; ছিলেন বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর একজন কমিশনড অফিসার। জন্মের মাসেই ঘাতকের বুলেটে নিহত হয়েছিলেন এই বীর সেনানায়ক।

শহিদ শেখ কামাল ছিলেন পঁচাত্তর পরবর্তী আওয়ামী লীগবিরোধী অপপ্রচার আর ইতিহাস বিকৃতির সবচেয়ে বড় ভিকটিম। এই দেশপ্রেমিক মেধাবী বীরকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী ও তাদের সুবিধাভোগীরা কত রকম অপপ্রচারই না করেছে! এই অপপ্রচারগুলো তারা সুপরিকল্পিতভাবে চালিয়েছিল কখনও কখনও তাদের অবৈধ শাসন আর বাংলাদেশের আদর্শবিরোধী পরিচয়কে আড়াল করার জন্য, আবার কখনও কখনও বাংলাদেশবিরোধী ওই পরিচয়কেই বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

এই অপপ্রচারের আরেকটি কারণ ছিল শেখ কামালের মেধাবী নেতৃত্বের বহুমাত্রিকতা, যা তাকে ইতিহাসে একটা উচ্চতর স্থানে নিয়ে যাবে- খুনি চক্র ও তাদের সুবিধাভোগীদের এই রকম একটি ভয়। তাদের ভয় ছিল এদেশের তরুণ প্রজন্ম এরকম একজন বহুমাত্রিক গুণাবলিসম্পন্ন দেশপ্রেমিক চৌকস তরুণ নেতার অস্তিত্ব ইতিহাসে খুঁজে পেলে তারা আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি ঝুঁকে যেতে পারে। তাই তারা অপপ্রচার চালিয়েছিল। এই খুনি চক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা নেতৃত্ব আর ইতিহাসকে অনেক ভয় পায়। সেই ভয় থেকেই তারা প্রথমে জাতির পিতাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারণ তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ তার মূল আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যাবে। এদেশকে অন্য কোনো দিকে ধাবিত করা যাবে না।

এই চক্রটি বুঝতে পেরেছিল, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন একটি জাতি জন্মলাভ করে, অপরদিকে তারই নেতৃত্বে এই জনপদে স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শ ধারণকারী একটি শক্তির উন্মেষ ঘটে। ওই আদর্শবাদী শক্তি তথা বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যেই সেদিন ওই পিশাচরা জাতির পিতাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

তাদের পরিকল্পনায় পিতাকে হত্যার পরই তাদের স্বস্তির কারণ ছিল না। তাই বঙ্গমাতাসহ শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু রাসেলসহ দেশে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবাইকে হত্যা করল। খুনিরা জানত, বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতিটি সদস্যের এ জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে পরিবারের কেউ যাতে নেতৃত্ব নিতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই দেশে অবস্থানরত পরিবারের সবাইকে তারা হত্যা করেছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা ও কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ওই সময়ে বিদেশে ছিলেন। তাই খুনি চক্র তাদেরকে হত্যা করতে পারেনি।

বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের অসাধারণ নেতৃত্বের ক্ষমতা ও বহুমুখী গুণাবলির কারণে তার মৃত্যুর পরও খুনিচক্র তাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিল। সে কারণেই এই চক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা বহু বছর এই প্রতিভাবান নেতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও মিথ্যাচার করেছিল। তারা চরম মিথ্যাচার করল যে, শেখ কামাল নাকি তার বন্ধুদের নিয়ে ব্যাংক ডাকাতি করেছিল। এই জঘন্য মিথ্যাচার তারা পনেরোই আগস্টের পর থেকে করে আসছিল। এটি তাদের একটি পরিকল্পিত মিথ্যাচার। ব্যাংক ডাকাতি করে থাকলে ওই টাকা সুইস ব্যাংকে থাকার কথা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো সদস্যের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দেশ-বিদেশে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা যেসব মিথ্যাচার করেছিল, তার প্রত্যেকটিই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে এই গোষ্ঠীটিই সেনাবাহিনীকে নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালিয়েছিল। তারা অপপ্রচার চালিয়েছিল, আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিবার সেনাবাহিনী বিরোধী– সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। অশুভ শক্তির এই অপপ্রচার বহুদিন চলেছে। অথচ মানুষ আস্তে আস্তে জানতে পেরেছে, এই সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুর হাতে তৈরি বাহিনী। তারা জানতে পেরেছে, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ দুই পুত্র সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন আর শিশু পুত্র রাসেল দুই ভাইকে অনুসরণ করে সৈনিক হতে চেয়েছিল। শিশু রাসেলের সেই স্বপ্নের কথা জাতির পিতা খুশি মনেই সাংবাদিকদের বলেছেন।

শেখ কামাল জাতির পিতা এবং রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সন্তান হলেও সব সময়ই ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থাকতে পছন্দ করতেন। তিনি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাজকর্মে যুক্ত থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। ক্ষমতার প্রতি তার কোনো মোহই ছিল না।

সেনাবাহিনীর লোভনীয় পদ ছেড়ে তিনি রাজনীতিতে থাকতে চেয়েছিলেন। আবার, রাজনীতিতে ফিরে এসেও কোনো পদ গ্রহণ না করে একজন কর্মী ও সংগঠক হিসেবেই সেখানে মনোনিবেশ করেছিলেন। তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে চাইতেন না। তার মতো চৌকস ও অসাধারণ প্রতিভাবান তরুণ নেতৃত্ব সমসাময়িক কালে বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক পরিবারে ছিল না ।

সত্তরের দশকের শুরুতে যখন সারা বিশ্বেই তরুণ প্রজন্ম ড্রাগ আর মাদকের দিকে ঝুঁকছিল, তখন শেখ কামাল তারুণ্য ও যুব সমাজকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা আর রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত করার মাধ্যমে তাদেরকে দেশ গড়ার পথে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্র ও সমাজের এমন কোনো জনকল্যাণমুলক কাজ নেই, যেখানে শেখ কামালের হাতের ছোঁয়া ছিল না।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকলের নৈতিক অবস্থান এবং ক্ষমতার প্রতি মোহমুক্ত মনোভাব, এই পরিবারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মে এসেও পরিবারটি আজও উজ্জ্বল। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতাধর ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবারগুলো আস্তে আস্তে ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে। এর মূল কারণ তাদের উত্তরাধিকারীরা যোগ্যতার প্রশ্নে পূর্বসূরিদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।

উপমহাদেশের গান্ধী পরিবার, ভুট্টো পরিবার অনেকটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আর বঙ্গবন্ধুর পরিবার দিনে দিনে আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আজ পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর ও সফল রাষ্ট্রনায়ক। বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় প্রজন্ম আজ শুধু বাংলাদেশেই অবদান রাখছেন না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করছেন। দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, দৌহিত্রী সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আজ বিশ্বে অটিজম বিষয়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আরেক দৌহিত্রী টিউলিপ সিদ্দীক তরুণ বয়সেই দুবার ব্রিটিশ এমপি নির্বাচিত।

আরেক দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি বাংলাদেশের উন্নয়নে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। সাধারণত বিশ্বের ক্ষমতাধর ও কিংবদন্তি রাজনীতিবিদদের পরিবারে তাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলোতে ক্ষমতার প্রকাশটা বেশি থাকে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম। এই পরিবারের নতুন প্রজন্ম ক্ষমতাধারণ ও প্রকাশের পরিবর্তে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মকৌশল দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই আগ্রহী।

আজ শহিদ শেখ কামাল বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকমের হতে পারত। বড় বোন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়তা করতে পারতেন। তিনি বেঁচে থাকলে ক্রীড়া আর সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ অনেক আগেই অনন্য উচ্চতায় চলে যেত। রাজনীতিতে সৃজনশীলতার প্রবক্তা শেখ কামাল বেঁচে থাকলে রাজনীতি এতদিনে আরও বেশি সৃজনশীল ও মেধাভিত্তিক হতো। স্বাধীনতার পর অর্থাৎ সত্তর দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, বিশেষভাবে, রাজনীতিতে তরুণ ও যুব সমাজের ইতিবাচক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এই অসাধারণ মেধাবী সংগঠক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

শেখ কামালকে নিয়ে জাতীয়ভাবে অনেক বেশি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তার বহুমাত্রিক প্রতিভা, নানামুখী জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং রাষ্ট্র ও সমাজ দর্শন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একাধিক ডিসিপ্লিনে গবেষণাকর্ম হতে পারে। এই কাজটি শুরু করার আজ সময় এসেছে। ঘাতক চক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা শেখ কামালকে হত্যার পরও জঘন্য অপপ্রচার চালিয়েছিল তার বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ও কিংবদন্তিসম নেতৃত্বকে ইতিহাস থেকে আড়াল করার জন্য।

ইতিহাসে প্রতিটি মানুষের একটি সত্ত্বা থাকে। মানুষটি জাগতিকভাবে মৃত হলেও ইতিহাসে সেই সত্ত্বা সবসময় জীবিত থাকে। শহিদ শেখ কামালের সেই জাগ্রত সত্ত্বাকে আড়াল করার জন্যই তারা এত বছর এই মিথ্যাচার ও অপপ্রচার করে আসছিল। এই মহান তরুণ নেতাকে নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে তার সঠিক চিত্র নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের সময় এসেছে।

এই কিংবদন্তিতুল্য নেতার আজ জন্মদিন। শুভ জন্মদিন ক্যাপ্টেন শেখ কামাল! আমরা আপনাকে অনেক অনেক ভালোবাসি। আপনি আমাদের কাছে স্বপ্নের নায়কের মতো। আপনি বাঙালির হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন।

লেখক: তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

আরও পড়ুন:
নিরাপদ ঢাকা সৃষ্টিতে করণীয় 
নদী যেন না হয় খাল
রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলেই মঙ্গল
গ্রামভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা জরুরি

শেয়ার করুন

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যগণ কখনোই কোনো খেদোক্তি প্রকাশ করেননি। বরং পরিবারের সদস্যরা সে-সব সগৌরবে মেনে নিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অংশে পরিণত হয়েছেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, দেশ স্বাধীনের পর কুচক্রী মহল শেখ কামালের বিরুদ্ধে মিথ্যা-বানোয়াট অপপ্রচার চালাবার চেষ্টা করেছিল। যা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বাস্তবে টেকেনি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। আজ তার ৭৩তম শুভ জন্মদিন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে শেখ কামাল দ্বিতীয় ছিলেন। তিনি শাহীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী ও সংগঠক হিসেবে ৬ ও ১১ দফা আন্দোলন এবং ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে শেখ কামাল সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে ’৬৯-এর অগ্নিঝরা গণ-আন্দোলনের স্মৃতি। যে আন্দোলনে শেখ কামালের প্রতিদিনের উপস্থিতি ছিল সবার জন্য তুমুল উৎসাহব্যঞ্জক। এই আন্দোলনে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সংগঠিত করে মিছিলসহ বটতলায় সমবেত হতেন। আমার পরম স্নেহভাজন ছিলেন শেখ কামাল।

মনে পড়ে, ’৬৯-এ পাকিস্তান সামরিক জান্তা সরকার ধর্মীয় উগ্রতার পরিচয় দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে। শেখ কামাল তখন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের সংগঠিত করেন এবং রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি খ্যাতিমান শিল্পী জাহিদুর রহিমকে দিয়ে বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানে গাওয়ানোর উদ্যোগ নেন। বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতার সন্তান তিনি, জন্ম থেকেই তার ধমনীতে নেতৃত্বগুণ আর বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনা। সংস্কৃতিবান শেখ কামালের প্রতিবাদের ভাষা ছিল রবীন্দ্র সংগীত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে যখন যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই বিশ্বকবির গান গেয়ে অহিংস প্রতিবাদের অসাধারণ উদাহরণ রেখেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে হাতিয়ার তুলে নিয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি ছিলেন শেখ কামাল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে সংগঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার আশাবাদ ছিল, দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রের ছবিটাই পাল্টে দেবেন এবং দেশকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করবেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দেশ পুনর্গঠনে নিজের অসামান্য মেধা ও অক্লান্ত কর্মক্ষমতা নিয়ে জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে ঝাঁপিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। সেখান থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে শেখ কামালের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছায়ানট থেকে সেতার শিক্ষার তালিম নেন। পড়াশোনা, সংগীতচর্চা, অভিনয়, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা থেকে শুরু করে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবার চেষ্টায় সদা-সর্বদা নিয়োজিত ছিলেন শেখ কামাল। অধ্যয়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তার পদচারণায় ছিল মুখর। স্বাধীনতার পর শেখ কামাল তার বন্ধুদের সহযোগে প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যদল ‘ঢাকা থিয়েটার’ এবং আধুনিক সংগীত সংগঠন ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে তিনি ছিলেন সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠক এবং অভিনেতা। আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি দেশের ক্রীড়াজগতে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ‘স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী’র প্রতিষ্ঠাও তাকে অমরত্ব দান করেছে। প্রকৃতপক্ষে শেখ কামাল ছিলেন একজন ক্রীড়া ও সংস্কৃতিমনা সুকুমার মনেবৃত্তির মানুষ। তিনি কখনও ব্যবসায়িক কার্যকলাপে জড়িত হননি, অনর্থক ছোটেননি অর্থের পেছনে।

শাহীন স্কুলের ছাত্র থাকাকালে স্কুলের প্রতিটি খেলায় তিনি ছিলেন অপরিহার্য। এর মধ্যে ক্রিকেট ছিল তার প্রিয়। সেময়ের অন্যতম উদীয়মান পেসার ছিলেন তিনি। ‘আজাদ বয়েজ ক্লাব’ তখন কামালদের মতো উঠতি প্রতিভাদের আশ্রয়স্থল। এখানেই শেখ কামাল প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন দীর্ঘদিন। দেশ স্বাধীনের পর ’৭২-এ ‘আবাহনী সমাজকল্যাণ সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থার নামে সংগঠিত করেন ফুটবল দল ‘ইকবাল স্পোর্টিং’, আর ক্রিকেট, হকির দল ‘ইস্পাহানী স্পোর্টিং’। পরে এসব দলের সমবায়ে নবোদ্যমে যাত্রা শুরু করে ‘আবাহনী ক্রীড়া চক্র’।

ফুটবল, ক্রিকেট, হকি এই খেলাগুলোতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল কামালের। তার স্বপ্ন ছিল একদিন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশ হবে অপরাজেয় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রীড়াশক্তি। সত্যিই সে বেঁচে থাকলে সেটা সম্ভব ছিল। স্বপ্ন তার দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছিল বহুদূর অবধি। ফুটবলের উন্নতির জন্য ’৭৩-এ আবাহনীতে বিদেশি কোচ বিল হার্টকে নিযুক্ত করেন। যোগ্যতা, দক্ষতা আর দেশপ্রেমের অসামান্য স্ফূরণে শেখ কামাল অল্প দিনেই বদলে দিয়েছিলেন সদ্য স্বাধীন একটা দেশের ক্রীড়াক্ষেত্র। শুধু ক্রীড়াই নয়, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সব শাখাতেই ছিল তার মুন্সিয়ানা ও অসামান্য সংগঠকের ভূমিকা।

শেখ কামালের নবপরিণীতা বধূ সুলতানা খুকু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। দেশজোড়া খ্যাতি ছিল তার। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার পরিচিতি ছিল এক প্রতিভাবান অ্যাথলেট হিসেবে। নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন। ’৭৫-এর ১৪ জুলাই যেদিন গণভবনে শেখ কামাল ও শেখ জামাল দুই ভাইয়ের বিয়ে হয় সেদিন আমি সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারিনি। কেননা ওই বছরের ১১ জুলাই আমার বড় ভাই পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) মৃত্যুবরণ করেন। আমি তখন ভোলায়।

বিয়ের দিন ভোলার পুলিশ স্টেশনে ফোন করে বঙ্গবন্ধু আমার খবর নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘জামাল-কামালের বিয়ের আসরে সবাই আছে। শুধু তুই নাই।’ কত বড় মহান নেতা যে আমার মতো ক্ষুদ্রকর্মীর কথাও সেদিন তিনি ভোলেননি। বিয়ের অল্প কিছুদিন পর ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫-এ সেনাবাহিনীর কিছু বিশ্বাসঘাতক উচ্ছৃঙ্খল সেনাসদস্যের হাতে পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও নববিবাহিতা দুই বধূ, দুই ভাই শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নির্মম মৃত্যুকে বরণ করতে হয়।

জাতির পিতা জীবনের যৌবনের বারোটি বছর কারান্তরালে কাটিয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে শত-দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থেকেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যগণ কখনোই কোনো খেদোক্তি প্রকাশ করেননি। বরং পরিবারের সদস্যরা সে-সব সগৌরবে মেনে নিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অংশে পরিণত হয়েছেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, দেশ স্বাধীনের পর কুচক্রী মহল শেখ কামালের বিরুদ্ধে মিথ্যা-বানোয়াট অপপ্রচার চালাবার চেষ্টা করেছিল। যা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বাস্তবে টেকেনি।

শেখ কামালের আচার-আচরণ কেমন ছিল সে-সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবুল ফজল রচিত ‘শেখ মুজিব: তাকে যেমন দেখেছি’ গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি। নাতিদীর্ঘ এই গ্রন্থটির ৪৭-৪৮ এই দুই পৃষ্ঠাজুড়ে আছে একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা। লেখাটির শিরোনাম ‘শেখ কামাল: স্মৃতিচারণ’।

তিনি লিখেছেন, “১৭ই মার্চ শেখ সাহেবের জন্মদিন। স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগ প্রতি বছর এ দিনটি পালন করে থাকে। ১৯৭৪-এর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য ঢাকার ছাত্রলীগ আমাকে অনুরোধ জানায়। আমি রাজি হলাম, তবে দিনে দিনে ফিরে আসতে চাই এ শর্তে। তারা সেভাবে বিমানের টিকেট পাঠিয়ে দিয়েছিল।

১৭ তারিখ ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে আমি চিন্তা করতে লাগলাম, ওরা আমাকে নিতে আসবে কিনা, এলেও আমি চিনতে পারবো কিনা। ওদের কারো সঙ্গে তো আমার দেখা নেই। ...একধারে দেখলাম একটা ছিপছিপে গোঁফওয়ালা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ লম্বা বলে সহজে চোখে পড়ে। ছেলেটাকে আমি চিনতে পারলাম না। লাউঞ্জের প্রবেশপথে ছেলেটি এগিয়ে এসে বলে: ‘আপনাকে নিতে এসেছি।’ বলেই আমার হাত থেকে ব্যাগটি আমার আপত্তি অগ্রাহ্য করে নিজের হাতে নিয়ে নিল। নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম: তুমি ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এসেছ? ‘জ্বী হ্যাঁ।’ নম্র কণ্ঠে জবাব দিলো ছেলেটি।

ওর পেছনে পেছনে হেঁটে এসে একটা গাড়িতে উঠে বসলাম। ড্রাইভারের সিটে গিয়ে বসলো ও নিজে এবং শুরু করলো ড্রাইভ করতে। তার আগে ও জেনে নিয়েছে আমি কোথায় উঠবো। গাড়িতে তৃতীয় ব্যক্তি নেই। কিছুদূর যাওয়ার পর আমার মনে হঠাৎ কৌতূহল হলো, জিজ্ঞাসা করলাম: তুমি কি করো? বললে: ‘অনার্স পরীক্ষা দিয়েছি সোশিয়োলজিতে।’ ঢাকা থেকে? ‘জ্বী হ্যাঁ।’ শেখ সাহেবের সঙ্গে ছেলেটির দৈহিক সাদৃশ্য আমার মনে ধীরে ধীরে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছিল। জিজ্ঞাসা করলাম: তোমার নাম। ‘শেখ কামাল।’ ও তুমি আমাদের শেখ সাহেবের ছেলে।”

এই ছিলেন শেখ কামাল। জাতির পিতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে কোনো অহমিকাবোধ ছিল না। তিনি ছিলেন বিনয়ী ও মার্জিত। দাম্ভিকতা ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ। পরোপকারী, বন্ধুবৎসল ও মার্জিত শেখ কামালের বিনম্র আচরণে মুগ্ধ হতো সবাই।

পরিশেষে, কামালের শৈশবের একটি স্মৃতি উদ্ধৃত করছি। যে স্মৃতিকথাটি পাঠ করলে দু’চোখ পানিতে ভরে আসে, অশ্রু সংবরণ দুঃসাধ্য হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ শিরোনামের লেখায় এই স্মৃতি উল্লেখ করেছেন।

“১৯৪৯ সালে আমার আব্বা গ্রেফতার হন। আমি তখন খুবই ছোট্ট আর আমার ভাই কামাল কেবল জন্মগ্রহণ করেছে। আব্বা ওকে দেখারও সুযোগ পাননি। একটানা ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দি ছিলেন। সে সময় আমাদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে আমার মা দাদা-দাদির কাছেই থাকতেন। একবার একটা মামলা উপলক্ষে আব্বাকে গোপালগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়। কামাল তখন অল্প কথা বলা শিখেছে। কিন্তু আব্বাকে ও কখনও দেখেনি, চেনেও না। আমি যখন বার বার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি আব্বা-আব্বা বলে ডাকছি ও শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। গোপালগঞ্জ থানায় একটা বড় পুকুর আছে, যার পাশে বড় খোলা মাঠ। ওই মাঠে আমরা দুই ভাইবোন খেলা করতাম ও ফড়িং ধরার জন্য ছুটে বেড়াতাম। আর মাঝে মাঝেই আব্বার কাছে ছুটে আসতাম। অনেক ফুল, পাতা কুড়িয়ে এনে থানার বারান্দায় কামালকে নিয়ে খেলতে বসেছি। ও হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ কামালের সেই কথা আজ যখন মনে পড়ে আমি তখন চোখের পানি রাখতে পারি না।”

ঘাতকের বুলেট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। ঘাতকেরা চেয়েছিল বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করতে। তারা জানত জাতির পিতার সন্তানেরা মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারক-বাহক। সেজন্য তারা শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল কাউকেই রেহাই দেয়নি। সেদিন জাতির পিতার দুই কন্যা বিদেশে থাকায় ঘাতকের বুলেট তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের পর ’৮১তে আমরা দলীয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার হাতে শহিদের রক্তে ভেজা দলীয় পতাকা তুলে দেই। সেই পতাকা যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে হাতে তুলে নিয়ে জাতির পিতার আদর্শ সমুন্নত রেখে তিনি আজ দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন করার যে স্বপ্ন শেখ কামাল দেখতেন সেই অসমাপ্ত কাজটিও তারই পৃষ্ঠপোষকতায় সাফল্যের সঙ্গে করে চলেছেন।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

আরও পড়ুন:
নিরাপদ ঢাকা সৃষ্টিতে করণীয় 
নদী যেন না হয় খাল
রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলেই মঙ্গল
গ্রামভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা জরুরি

শেয়ার করুন

আফগানিস্তানে তালেবানের শক্তির উৎস পাকিস্তান 

আফগানিস্তানে তালেবানের শক্তির উৎস পাকিস্তান 

আফগানিস্তানের সঙ্গে মিলে সারা বিশ্বে যারা এখন জঙ্গিগোষ্ঠীর সবচেয়ে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বিবেচিত। আর এই দেশ দুটিই বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ ‘রপ্তানি’ করে বেড়ায়। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠনগুলোর অধিকাংশই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকেন্দ্রিক। এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আফগানযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মার্কিন জেনারেল অস্টিন মিলার ১২ জুলাই দায়িত্বভার ত্যাগ করেছেন। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আফগান মিশনের যবনিকাপাত ঘটল। অপরদিকে, মার্কিন বাহিনীর বাগরাম ঘাঁটি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পরই তালেবানরা আফগান সরকারি বাহিনী কিংবা অন্যান্য গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা কব্জা করতে শুরু করেছে। ফলে প্রতিদিনই কোনো না কোনো জেলা তালেবানের কব্জায় চলে যাওয়ার খবর আসছে। দেশটিতে তালেবান তৎপরতা এতটাই বেড়েছে যে, ধারণা করা হচ্ছে, জঙ্গিগোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক অংশের দখল নিয়েছে। এরই মধ্যে ইরান-আফগান, আফগান-পাকিস্তান, আফগান-চীন সীমান্ত ক্রসিং ও বাণিজ্যিক রুটও তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে গোষ্ঠীটি। জাতিসংঘ বলছে, তারা যেসব জেলা দখল করেছে, সেগুলো দেশটির বিভিন্ন প্রাদেশিক রাজধানীর চারপাশে অবস্থিত। অর্থাৎ, আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হলেই প্রাদেশিক রাজধানীগুলো দখল করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে তালেবান।

অনেক ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রতিরোধের চেষ্টা ছাড়াই আফগান সেনাবাহিনী তালেবানের হাতে আত্মসমর্পণ করছে। তালেবানরা মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সেনাদের আক্রমণ না করলেও আফগান সরকারি বাহিনী এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যে পরিণত করেছে। অপরদিকে, প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির অনুগত সেনারা অনেক জায়গায় আত্মসমর্পণ করছে এবং অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাজিকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। এসব কারণে একদিকে যেমন গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে দেশটি, তেমনই আশপাশের বহু দেশে এর আঁচ লাগার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। হুমকিতে পড়েছে পুরো দক্ষিণ এশিয়া।

এরইমধ্যে কিছুদিন আগে প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আফগানিস্তানের চলমান সংঘাতে তালেবানকে সহযোগিতা করার অভিযোগ তুলেছেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা অনুযায়ী, তালেবানের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য গত মাসেই পাকিস্তান এবং অন্যান্য জায়গা থেকে আফগানিস্তানে ১০ হাজারের বেশি মানুষ এসেছে। প্রেসিডেন্টের পর সম্প্রতি আফগানিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হামদুল্লাহ মুহিবও একই অভিযোগ এনেছেন। তিনি তালেবানকে আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা দেয়ার জন্য পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেছেন। হামদুল্লাহ মুহিবের দাবি, ইসলামাবাদের প্রত্যক্ষ মদদে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান থেকে প্রায় ১৫ হাজার জঙ্গি আফগানিস্তানে অনুপ্রবেশ করেছে এবং আরও ১০ হাজার সশস্ত্র জঙ্গিকে আফগানিস্তানে পাঠানোর তোড়জোড় চলছে বলে তারা খবর পেয়েছেন।

এসবের পাশাপাশি, আফগানিস্তানের বর্তমান অস্থিরতার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করছে আফগান সংবাদমাধ্যম ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের একাংশ৷ তাদের মতে, পাকিস্তানের প্রচ্ছন্ন তালেবান সমর্থন মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আবহে অস্থিরতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে৷ যদিও পাকিস্তানের ওপর করা এই অভিযোগ নতুন কিছু নয়৷ দেশটির সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে সবসময়। তাছাড়া আফগানিস্তানের তালেবান ও তাদের মিত্র হাক্কানি নেটওয়ার্ককে পাকিস্তানে ‘নিভৃত আবাস’ গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে ইসলামাবাদ।

আফগান রাজনীতিক আবদুল সাত্তার হুসেইনি সম্প্রতি একটি টিভি শোতে বলেছেন, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, আমরা পাকিস্তানের হাতে আক্রান্ত। আমরা শুধু তালেবানের বিরুদ্ধে লড়ছি না, আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে এই মেকি যুদ্ধেও জড়িত৷ সাত্তার হুসেইনির মন্তব্যের কারণ হচ্ছে, পাকিস্তান থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও অস্ত্রের জোরেই তালেবানরা দ্রুত শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং এখনও তালেবান জঙ্গিদের শক্তির প্রধান উৎস এই দেশটি।

সরকারি নীতি যা-ই হোক, তালেবানদের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র যোগাযোগ বরাবরই ছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার হামলার পর আল-কায়দাপ্রধান ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেয় আফগানিস্তানের তৎকালীন শাসক তালেবান সরকার। সেই বিন লাদেনকে ধরার জন্য আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী আক্রমণ শুরু করলেও বহু বছর পর বিন লাদেনকে পাওয়া গিয়েছিল পাকিস্তানে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভেতরের একটি অংশ জঙ্গিদের হয়ে কাজ করছে বলেই সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের জোর বিশ্বাস। বিশেষ করে বিন লাদেন পাকিস্তানের একটি সামরিক আবাসিক এলাকাতে বছরের পর বছর নিরাপদে বসবাস করার পর সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে।

অপরদিকে, তালেবানদেরও অবাধ যাতায়াত রয়েছে পাকিস্তানে। মোল্লা ওমরের তালেবান সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতা হারালেও বছরের পর বছর দখলে রেখেছে আফগানিস্তানের একটা বিস্তৃত এলাকা। তাছাড়া ধারণা করা হয়, আল-কায়েদার কিছু সদস্য এখন পর্যন্ত আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে লুকিয়ে আছে। পশ্চিমা বাহিনী প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই এসব জঙ্গি বাহিনীর সদস্যরা তৎপর হয়ে উঠতে পারে।

হিসাব বলছে, ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে যে সরকারই আসুক না কেন পাকিস্তান চায় তালেবান যেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়। কারণ, তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। ৯০-এর দশকে আফগান গৃহযুদ্ধে তালেবানকে সমর্থন দিয়েছে পাকিস্তান। ১৯৯৬ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর যে মাত্র তিনটি দেশ তাদের বৈধ সরকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের একটি ছিল পাকিস্তান। তাছাড়া, তালেবানের নেতারা পাকিস্তানের আশ্রয় পেয়েছে সবসময়। এমনকি গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের যে শান্তিচুক্তি সম্ভব হয়, তার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল পাকিস্তানের। যুক্তরাষ্ট্র সেটা একবাক্যে স্বীকারও করেছে।

তাছাড়া আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয় কাশ্মিরেও একটি প্রভাব ফেলতে পারে। সশস্ত্র কর্মকাণ্ড বেড়ে যেতে পারে সেখানে। এর কারণ হচ্ছে, ভারত আশরাফ ঘানির নেতৃত্বাধীন বর্তমান আফগান সরকারের শক্তিশালী সমর্থক। তদুপরি, দেশটি তালেবানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেনি। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে সোভিয়েতের পরাজয়ের পর পরই জম্মু-কাশ্মীরে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মুজাহিদীনদের যেভাবে কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছিল, ঠিক একইভাবে এখন তালেবান জঙ্গিদেরও ব্যবহার করতে পারে।

গতবছর কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবানদের সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাতে চীনও ভূমিকা রাখে নেপথ্যে থেকে। তারা কাবুল সরকার, তালেবান আর পাকিস্তানকে এক মঞ্চে নিয়ে আসে। এর কিছুদিন পর গত বছরের ২৬ আগস্ট পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি আফগানিস্তানে নিয়োজিত চীনের বিশেষ দূত লিউ জিয়ানকে আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ করতে সাহায্য করার জন্য ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে তালেবানদের রাজনৈতিক শাখার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের বৈঠক হয়েছে কীভাবে তালেবান এবং আফগান সরকার একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারে তার রূপরেখা নিয়ে।

তাছাড়া আফগানিস্তানের এই নব পর্যায় আরেকটি কোয়াডেরও জন্ম দিচ্ছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের জোটবদ্ধতার মতো আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে নতুন সেই কোয়াডের শরিক চীন, রাশিয়া, ইরান ও পাকিস্তান।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সখ্য রাশিয়া ও ইরানকে অনেকাংশে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে নতুন এই কোয়াড জোটকে চীন ও পাকিস্তান পরবর্তীকালে ভারতবিরোধিতায় ব্যবহার করতে পারে। কারণ, চীন নিশ্চিতভাবেই চাইবে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের পাল্টা দান হিসেবে নতুন এই কোয়াডকে সক্রিয় করে তুলতে। আর তাতে চাপ বাড়বে ভারতের। কেননা, এখানে চীনের দোসর হিসেবে পাকিস্তানও রয়েছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে মিলে সারা বিশ্বে যারা এখন জঙ্গিগোষ্ঠীর সবচেয়ে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বিবেচিত। আর এই দেশ দুটিই বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ ‘রপ্তানি’ করে বেড়ায়।

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠনগুলোর অধিকাংশই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকেন্দ্রিক। এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাপী জঙ্গি অর্থায়ন তদারকি করার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স- যার দায়িত্ব হচ্ছে, কারা জঙ্গিদের অর্থায়ন করছে তা নির্ধারণ করা এবং সেসব দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

তারা ইতোমধ্যে জঙ্গিদের অর্থ সাহায্য করার কারণে পাকিস্তানকে ধূসর তালিকাভুক্ত করেছে। পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ গণমাধ্যমে প্রকাশেই বলেছিলেন যে, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পদ। তারা রাজনৈতিক দল ও সেনাবাহিনীর নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন পায়। নিজেদের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সাম্প্রদায়িক তালেবান গোষ্ঠীকেও কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তান এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অসহিষ্ণু করে তোলে কি না আগামীদিনে এ প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
নিরাপদ ঢাকা সৃষ্টিতে করণীয় 
নদী যেন না হয় খাল
রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলেই মঙ্গল
গ্রামভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা জরুরি

শেয়ার করুন

সামনে দেখা যাচ্ছে, পেছনে কী

সামনে দেখা যাচ্ছে, পেছনে কী

দুই শ টাকা পকেটমার হওয়ার পর পকেটমার ধরা পড়লে তার হাড়-মাংস এক করে দেবার মতো মারধোর করার লোকের অভাব হয় না। আবার ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, দুর্নীতি করে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে এরকম লোককে সালাম দেবার মানুষের অভাব হয় না। দুক্ষেত্রেই হাত খুব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কোথাও মারতে আর কোথাও বা সালাম দিতে। পার্থক্য হয়ে যায় টাকার পরিমাণের কারণে।

সময়টা এখন এমনই। কয়েকদিন আগেই যিনি হেঁটে কিংবা রিকশায় চলাচল করতেন তাকে বিশাল ঝকঝকে গাড়ি থেকে নামতে দেখলে পরিচিতজনেরা এখন আর অবাক হন না। অথবা মেসে থাকা মানুষটাকে অভিজাত এলাকায় বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনতে দেখেও তাক লেগে যায় না কারো। অনেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কপাল! কেউ আবার অতটা কপালের ওপর নির্ভর করেন না, তারা বলেন, বেশ করিৎকর্মা ও বুদ্ধিমান। কয়েক বছরে কী রকম উন্নতি করেছে দেখেছেন? কপাল বলুক আর করিৎকর্মা বলে স্বীকৃতি দিক, যা-ই করুক না কেন এই দ্রুত সম্পদশালী হয়ে ওঠার কারণ সবাই জানে। কিন্তু বলতে চায় না। কেউ বলে না ভয়ে, আর কেউ বলে না কারণ, তার মনেও গোপন বাসনা। সেও এরকম হয়ে উঠতে চায়।

কিছু সহজ প্রশ্ন কখনও মাথা ঘুরিয়ে দেয়। উত্তর দেয়ার পরিবর্তে চিন্তা করতে হয় পরবর্তী প্রশ্নটা কী হতে পারে। যেমন, কত টাকায় এক কোটি টাকা হয়? কতদিন লাগে এক কোটি টাকা জমাতে। সম্রাট আকবরের প্রশ্নে বীরবল যে পদ্ধতিতে উত্তর দিয়েছিলেন সেই পদ্ধতি অবলম্বন করে বললে উত্তর দাঁড়াবে, যদি মাসে এক লাখ টাকা করে জমায় তাহলে ব্যাংকের লাভসহ কমপক্ষে ৮৪ মাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো কতজন মানুষ সংসার খরচের পর মাসে এক লাখ টাকা জমাতে পারেন?

তাহলে ৩৫/ ৪০ বছর বয়সে একজন নারী বা পুরুষ কীভাবে কয়েক কোটি টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স, কয়েক কোটি টাকার বাড়ি এবং কোটি টাকার গাড়ির মালিক হয়ে যেতে পারেন? সবচেয়ে সঠিক উত্তরটা হবে, অসৎ পথে উপার্জন করে অর্থাৎ দুর্নীতি করে। দুর্নীতি কি সবাই করতে পারে? সহজ উত্তর হবে, না। কারণ, দুর্নীতি করতে ক্ষমতা লাগে। দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতা আর ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি তাই যুগলবন্দি। দুজনে দুজনার।

দেশের মানুষের জীবনে কত সমস্যা! আর কত ঘটনাই না ঘটে চলেছে প্রতিদিন। কিছু ঘটনা নিয়মিতভাবে দীর্ঘদিন ধরেই ঘটে চলছে, কিছু ঘটনা হঠাৎ করে ঘটছে। কোনো কোনো ঘটনায় শুধু চমকে ওঠা নয় আঁতকে উঠছে মানুষ। কী হচ্ছে এবং কী ঘটছে দেশে। যারা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হচ্ছেন। গ্রেপ্তারদের আত্মবিশ্বাসভরা হাসিমুখ দেখে এই প্রশ্ন ওঠা একেবারেই অস্বাভাবিক নয় যে, তাদের হাত লম্বা এবং শিকড় গভীর ছিল। দীর্ঘদিন পরে বেচারা কোনো কারণে ধরা পড়েছেন কিন্তু যারা ধরা পড়েননি তাদের সংখ্যা এবং শক্তিও হয়তো যে কম নয়, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

কয়েকদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে কয়েকটি নাম। রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন সদ্য আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্যপদ হারানো ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর। তার বাসায় অভিযান শেষে র‍্যাব জানিয়েছে, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ, বিয়ার, বিদেশি মুদ্রা, চাকু, মোবাইল সেট, ক্যাসিনো সরঞ্জাম, এটিএম কার্ড ও হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে।

র‍্যাবের তদন্তে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানায় রাজধানীতে ১৫টি ফ্ল্যাটের খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে পাঁচটি ফ্ল্যাট, গুলশান ৩৬ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িতে পাঁচটি ফ্ল্যাট, গুলশান ২ নম্বরের ৮৬ নম্বর সড়কের ৭/বি নম্বর বাড়িতে আট হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, গুলশান এভিনিউ ও নিকেতনে দুটি ফ্ল্যাট, মিরপুর ১১ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট এবং কাজীপাড়ায় একটি ফ্ল্যাট।

র‍্যাবের তদন্তে আরও জানা যাচ্ছে, হেলেনা পাঁচটি গার্মেন্টের মালিক। এগুলো হলো মিরপুর ১১ নম্বরের নিউ কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট, নারায়ণগঞ্জের জয় অটো গার্মেন্টস, জেসি এমব্রয়ডারি, প্যাক কনসার্ন (যৌথ মালিকানা) ও হুমায়ারা স্টিকার। এছাড়া সাতটি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে হেলেনার সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে। সেগুলো হলো জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন, আর্চারি ফেডারেশন ক্লাব, নোটারি ডোনেশনস, টেনিস ফেডারেশন, ইনারহিল ক্লাব, জন্টা ইন্টারন্যাশনাল লেডিস ক্লাব ও ক্যারম ফেডারেশন।

এখানেই শেষ নয়, র‍্যাব কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, হেলেনা মোট ১২টি ক্লাবের সদস্য। সেগুলো হলো গুলশান ক্লাব, গুলশান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব, ঢাকা বোর্ড ক্লাব, গুলশান সোসাইটি ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গুলশান জগার সোসাইটি, ফিল্ম ক্লাব, গুলশান হেলথ ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, ঢাকা রাইফেলস ক্লাব ও ওয়ার্ল্ড ট্রাভেলার্স ক্লাব। আবার র‍্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে কখনও ছয়টি গাড়ি, কখনও আটটি গাড়ির মালিকানার কথা বলেছেন হেলেনা।

আবার পিয়াসা ও মৌ নামে আরও দুই নারীকে আটক করা হয়েছে, যারা নাকি বেশ পরিচিত মডেল বা অভিনেত্রী। আটকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে গিয়ে ডিবি কর্মকর্তা বলেন, তারা দুজন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে অনেক ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ছিল। সেসব ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তাদের বাসায় অভিযান চালানো হয়। দুজনের বাসায় বিদেশি মদ, ইয়াবা ও সিসা পাওয়া গেছে। মৌয়ের বাড়িতে মদের বারও ছিল।

ডিবির কর্মকর্তা আরও বলেছেন, আটক দুই মডেল হচ্ছেন রাতের রানি। তারা দিনের বেলায় ঘুমান এবং রাতে এসব কর্মকাণ্ড করেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পার্টির নামে বাসায় ডেকে এনে তাদের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ধারণ করে রাখতেন। পরে তারা সেসব ভিডিও ও ছবি পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিতেন।

আর একটি ঘটনাও নিশ্চয়ই আড়াল হয়ে যাবে না। গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে একসময়ের চিত্রনায়িকা একাকে আটক করেছে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে শনিবার (৩১ জুলাই) বিকালে তাকে রাজধানীর উলনের বাসা থেকে আটক করা হয়। থানার ওসি জানিয়েছেন, একার বাসা থেকে পাঁচ পিস ইয়াবা, ৫০ গ্রাম গাঁজা ও মদ উদ্ধার করা হয়েছে।
এর কয়েকদিন আগে একটি নামকরা স্কুলের অধ্যক্ষের একটি টেলিফোন কথোপকথন প্রচার মাধ্যমে এসেছে। কীভাবে এসব প্রচার মাধ্যমে আসে সেটা একটা প্রশ্ন। এটা কতটা অশ্লীল, অসৌজন্যমূলক, পদের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ তা আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তিনি যা বলেছেন তাতে এই ক্ষমতার ভিত্তি কোথায় তার কিছুটা উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো চিন্তা করি না। কারণ, আমি নিজেই শক্তিশালী। আমি যে দলের প্রেসিডেন্ট ছিলাম সেই দলটা এখন সরকারে। যতদিন এই দলটা আছে ততদিন আমার পাওয়ার আছে। আমি কিন্তু ... বাচ্চাদের লেংটা করে রাস্তার মধ্যে পিটাইতে পারব।’

একটা বিষয় লক্ষ করার মতো যে, কোনো অপকর্ম করে কেউ ধরা পড়লেই দেখা যায় তিনি ক্ষমতাসীন দলের কোনো না কোনো পদে আছেন বা ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। ছবি তাদের একটা প্রমাণপত্রের মতো। বাসার ড্রইং রুমে বড় করে বাঁধাই করে রাখা, নিজের সঙ্গে রাখা, পোস্টার ছাপিয়ে লাগানো, রাস্তায় বড় করে বিলবোর্ড লাগানো এসব হলো ক্ষমতা দেখানোর আরেক কৌশল।
ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা সর্বত্র। কোনো কাজ পেতে, টেন্ডার পেতে, সুবিধা পেতে গিয়ে কত বড় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এটা এখন অন্যতম যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা টিভি বিজ্ঞাপন আছে না! যেখানে ধমকের সুরে একজন বলছেন , ‘তুমি জানো আমি কে? এটা ভদ্র ভাষায় বলা হয়েছে। কিন্তু, তুই আমারে চিনস? এই সংস্কৃতি চলছে সর্বত্র। দাপট দেখিয়ে প্রতিষ্ঠা পাবার মানসিকতার পেছনে মূল কারণ অবৈধ সুবিধা। সেটা সংসদ সদস্য মনোনয়ন থেকে শিক্ষক নিয়োগ, ব্যবসা থেকে বদলি, স্কুলে বাচ্চা ভর্তি করা থেকে মসজিদ কমিটির সভাপতি পর্যন্ত সর্বত্র টাকার প্রভাব।

দুই শ টাকা পকেটমার হওয়ার পর পকেটমার ধরা পড়লে তার হাড়-মাংস এক করে দেবার মতো মারধোর করার লোকের অভাব হয় না। আবার ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, দুর্নীতি করে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে এরকম লোককে সালাম দেবার মানুষের অভাব হয় না। দুক্ষেত্রেই হাত খুব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কোথাও মারতে আর কোথাও বা সালাম দিতে। পার্থক্য হয়ে যায় টাকার পরিমাণের কারণে।

প্রথমে ভিকারুন্নিসা স্কুলের অধ্যক্ষ, তারপর একে একে হেলেনা জাহাঙ্গীর, মডেল পিয়াসা, মৌ, চিত্রনায়িকা একা, চিকিৎসক ডা. ঈশিতা। ঘটনা প্রবাহ প্রায় একই রকম, তাদের ব্যবহারও প্রায় একই ধরনের। বড় বড় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, গালাগাল করা, দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া। কারো বাসায় দেয়ালে শোভা পায় বন্যপ্রাণীর চামড়া। কারো বাসায় ড্রাগস মেলে, আবার কারো বাসায় মদ। কেউবা ভুয়া ডিগ্রি দেখিয়ে করে প্রতারণা। অর্থাৎ এরা সবাই সমাজের জন্য ক্ষতিকর, ক্ষমতাধর, ভয়ংকর মানুষ। অনেকদিন বহাল তবিয়তে ছিলেন। ভোগ করেছেন প্রচুর, অনেকের জীবনে দুর্ভোগ এনেছেন। ধরা পড়ার পর ভুক্তভোগীদের অনেকেই মুখ খুলেছেন, কেউ কেউ মুখ খোলার কথা ভাবছেন আর কেউ হয়তো কখনই মুখ খুলবেন না, তাদেরও কিছু বেরিয়ে যাওয়ার ভয়ে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ তৎপরতা চালিয়ে এদেরকে ধরেছে, প্রেস কনফারেন্স করে তাদের অপরাধের বর্ণনা দিয়েছে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক প্রচার মাধ্যমে তার রসালো প্রচার হচ্ছে। এরা নারী হওয়ার কারণে মানুষ সম্ভবত তার একঘেয়ে জীবনে কিছুটা বিনোদন পাচ্ছেন। কিন্তু যে প্রশ্ন তারা উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না তা হলো, মাঝে মাঝে এসব ঘটছে কেন? এসব নারীর যে পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক তারা কারা?

এদের প্রায় সবার বাড়ি থেকেই মাদক উদ্ধার হচ্ছে কেন? বর্তমানের আলোড়ন হেলেনা বা অধুনা বিস্মৃত পাপিয়া কিংবা আরও যত নাম শুনছি বা দেখছি তারাই কি সব? এসব কি দুর্নীতির বিশাল আইসবার্গের ওপরের সামান্য অংশ? এদের পিছনে, পাশে এবং সামনে যারা ছিলেন তারা কি বহাল তবিয়তে থাকবেন? এরা ক্ষমতাসীনদের ব্যবহার করেন, নিজেরা ব্যবহৃত হন, মানুষকে কষ্ট দেন এটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মানুষের রুচির মানটা যে নেমে যাচ্ছে এবং মানুষ এসব মুখরোচক খবর নিয়েই ব্যস্ত থাকছে সেটাও কিন্তু কম কষ্টের নয়।

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
নিরাপদ ঢাকা সৃষ্টিতে করণীয় 
নদী যেন না হয় খাল
রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলেই মঙ্গল
গ্রামভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা জরুরি

শেয়ার করুন

পাকিস্তানের কাশ্মীর বধ, নাকি উগ্রবাদের জন্ম

পাকিস্তানের কাশ্মীর বধ, 
নাকি উগ্রবাদের জন্ম

সম্প্রতি ইমরান খান বলেছেন, ‘তালিবানরা জঙ্গি নয়, সাধারণ নাগরিক’। তার এই মন্তব্যের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু চীন আফগানিস্তানে তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ইস্যু নিয়ে জঙ্গিদের শান্ত রাখতে দেশটি তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এই তালেবান গোষ্ঠী জঙ্গিদের কারণে পাকিস্তানেও বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু তারপরও ইমরান খান তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এর মূল কারণ চীন।

জম্মু ও কাশ্মীরের বিষয়টি কিছুতেই ভুলতে পারছে না পাকিস্তান। বিগত ৭৩ বছর ধরে কাশ্মীর ইস্যুতে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো এবং উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কাশ্মীরে লেলিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। কিছু ক্ষেত্রে জম্মু-কাশ্মীরে জীবিত উদ্ধার হওয়া জঙ্গিরা তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাকিস্তানের নামও নিয়েছে। কিন্তু তারপরও কাশ্মীরে যেকোনো অস্থিরতার জন্য ভারতকে দায়ী করে আসছে দেশটি।

স্বাধীন কাশ্মীর রাষ্ট্রে যুদ্ধবহর নিয়ে হামলা চালিয়ে প্রথম এই অঞ্চলের স্বাধীনতা হরণ করে পাকিস্তান। এরপর তারা তাদের দখল করা কাশ্মীর অঞ্চলের নাম দেয় ‘আজাদ কাশ্মীর’ অর্থাৎ স্বাধীন কাশ্মীর। কিন্তু পাকিস্তানের দখল করা সেই আজাদ কাশ্মীরের মানুষ আজ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছে। তাদের ন্যূনতম অধিকার আদায়ের জন্য রক্ত ঝরাচ্ছে। গত একমাসে আজাদ কাশ্মীরে বিভিন্ন আন্দোলনে তিনজনের বেশি তরুণের নিহতের খবর পাওয়া গেছে। কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী নয়, বরং পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চালিয়েছে এই হত্যাকাণ্ড। এই অঞ্চলের মানুষের ন্যূনতম অধিকার এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি পাকিস্তান।

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সংবিধানে বিশেষ ধারা ‘৩৭০’ বিলোপ করা হয়। এরপর থেকে এই অঞ্চলের উন্নয়নে মনোযোগ দেয় ভারত। কিন্তু এই ৫ আগস্টকে ঘিরে অপপ্রচারের বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে দেয়া বিশেষ মর্যাদা বাতিলের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে ওই দিনকে ‘নিপীড়ন দিবস’ হিসেবে পালন করার জন্যে জনমত গঠনে বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানের বিদেশি মিশনগুলোতে এক বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে তারা। আধুনিক ডিজিটাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে বলা হয়েছে সেখানে। দিনটি সফলভাবে পালন করতে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন রেড ফর কাশ্মীর’ নামে একটি সংগঠনও গড়ে তোলা হয়েছে। রেড ফর কাশ্মীর-এর পেছনে মূলত কাজ করছে ‘স্ট্যান্ড উইথ কাশ্মীর’ নামে একটি সংগঠন।

১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে পাকিস্তান হামলা চালানোর আগে এই ইস্যুতে ভুয়া তথ্য প্রচারের জন্য সংগঠনটি গড়ে তোলা হয়। এই সংগঠন উগ্র ওয়াহাবি মতবাদ প্রচারে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ থেকে ব্যাপক অর্থ সহায়তা পেয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কথিত নিপীড়ন দিবস পালনের জন্য বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয় মিশনগুলোর সামনে মোমবাতি প্রজ্বলন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে সেসব প্রচার করে ভাইরাল করার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। এ জন্যে একাধিক টুইটার অ্যাকাউন্ট, ফেসবুক পেজ ও একটি নতুন ই-মেইলও খুলেছে সংগঠনটি। ৫ আগস্টে ভারতবিরোধী ওই প্রচারের জন্যে ইংরেজি এবং রোমান ভাষায় অন্তত ২০টি স্লোগান পাকিস্তানি বিদেশি মিশনে পাঠিয়েছে সংস্থাগুলো। এরমধ্যে রয়েছে ‘যম-ই-ইস্তেহসাল’, সংগ্রামী কাশ্মীরীদের সঙ্গে একাত্মতা দেখানোর দিন', 'কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের সঙ্গে ও ‘কাশ্মীর হচ্ছে পাকিস্তানের ঘাড়ের শিরা’-এমন বেশ কিছু স্লোগান।

লন্ডনে ৫ আগস্টের কর্মসূচি সফল করতে কূটনৈতিক লাগেজে করে পাকিস্তানি বিদেশি মিশনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের চিরকুট, পোস্টার, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

গত ২৬ জুলাই পাকিস্তানের স্থানীয় নির্বাচনের পর দিন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের নীলম উপত্যকার শারদা এলাকায় ‘পয়েন্ট-জিরো’ রেঞ্জে আধাসামরিক বাহিনীর গুলিতে এক যুবক নিহত হয়। এ সময় পুলিশ জওয়ানসহ ২৫ জনেরও বেশি আহত হয়। এর আগে গত ২১ জুন টরেন্টো থেকে বাবার শেষকৃত্যে যোগ দিতে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে এসে হত্যার শিকার হন গোলাম আব্বাস নামে এক যুবক। তিনি ভারতীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (জম্মু ও কাশ্মীর)-এ মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে আন্ত-বিশ্বাস ও সম্প্রীতি প্রচারে কাজ করতেন।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য গত জুন মাসে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে অর্থ জোগানের ওপর নজরদারি চালানো সংগঠন ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) আবারও দেশটিকে ধূসর তালিকাতে রেখেছে।

গত ২৫ জুন প্যারিসে অবস্থিত সংস্থাটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রসংঘের ঘোষিত জঙ্গি হাফিজ সইদ, মাসুদ আজহারের মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে পাকিস্তানকে ধূসর তালিকাতেই রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

২০১৮ সালের জুনে সন্ত্রাসে আর্থিক মদদ দেয়া ও আর্থিক দুর্নীতি রোধে যে ২৭টি শর্ত পাকিস্তানকে পূরণ করতে বলা হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তইবার কুখ্যাত জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যা পাকিস্তান পূরণ করতে পারেনি।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক খবরগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানের কূটনীতিকরা শুধু সমাজবিরোধী কাজের সঙ্গেই লিপ্ত নন বরং তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ও সন্ত্রাসবাদী মনোভাবও প্রবল।

২০১৫ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তান হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব ফারিনা আশরাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়। একই বছর ঢাকায় জাল নোট ব্যবহারের দায়ে আটক করা হয় পাকিস্তান হাইকমিশনের সহকারী ভিসা কর্মকর্তা মাজহার খানকে। এছাড়া কলম্বোর পাকিস্তান হাইকমিশনের ভাইস চ্যান্সেলর আমির জুবায়ের সিদ্দিকী সন্দেহভাজন জঙ্গি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। পরে ২০২০ সালে নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের দুই কূটনীতিককে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়া ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

২০০১ সালে নেপালের কাঠমন্ডুতে পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রথম সচিব মোহাম্মদ আরশাদ সিমাকে ১৬ কেজি আরডিএক্সসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ২০১৪ সালে কলম্বোতে পাক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা কর্নেল শাহরিয়ার বাটকে হাইকমিশনের কার্যক্রমে নিয়মিত নজর রাখার অভিযোগে তাকে ওই দেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পর্যালোচনা করলে আরও দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানের দূতাবাসগুলোকে যেসব কূটনীতিকরা নিযুক্ত রয়েছেন তাদের বেশিরভাগই এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত।

২০১৮ সালের মে থেকে ওয়াশিংটনের কিছু জায়গায় পাকিস্তানি কূটনীতিকদের আনাগোনা বন্ধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে পাকিস্তানের বর্তমান প্রতিনিধি মুনির আকরামের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন তার স্ত্রী। ২০১৪ দেশটির আরও দুই কূটনীতিকের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে যুক্তরাজ্যে। এদিকে গত বছরের মে মাসে মানবপাচারের অভিযোগে জিম্বাবুয়ের হারারেতে গ্রেপ্তার হন পাকিস্তানি কূটনীতিক ওয়াকাস আহমেদ।

সম্প্রতি ইমরান খান বলেছেন, ‘তালিবানরা জঙ্গি নয়, সাধারণ নাগরিক’। তার এই মন্তব্যের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু চীন আফগানিস্তানে তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ইস্যু নিয়ে জঙ্গিদের শান্ত রাখতে দেশটি তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এই তালেবান গোষ্ঠী জঙ্গিদের কারণে পাকিস্তানেও বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু তারপরও ইমরান খান তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এর মূল কারণ চীন।

পাকিস্তানের করিডর ব্যবহার করে তালেবানরা যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তাতে পাকিস্তানের সরকার এবং ইসলামি মৌলবাদী শক্তিগুলোর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। এমনকি তালেবানদের উগ্রবাদী আচরণকে সমর্থন জুগিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে যাচ্ছে পাকিস্তানের বিভিন্ন মৌলবাদী গোষ্ঠী। আফগানিস্তানকে তালেবানদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ২০০১ ও সমসাময়িক সময়ে যেভাবে এশিয়া অঞ্চলে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসের রাজনীতির চর্চা করা হয়েছে তা আবারও পুনঃস্থাপন করতে চাচ্ছে পাকিস্তান, চীন ও তালেবান গোষ্ঠী।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরে স্বাধীনতা ও ন্যায্য অধিকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বেলুচিস্তান, সিন্ধু এবং পাকিস্তানের দখল করা কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। আর এই দাবিকে প্রতিহত করতে সামরিক বাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী এবং জঙ্গিদের ব্যবহার করছে পাকিস্তান। নিজদেশে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারা দেশটি আলোচনা করছে ভারতের কাশ্মীর নিয়ে!

গত দুবছরে কাশ্মীরের মানুষ পেয়েছেন নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। পর্যটন ও হর্টিকালচার (বাগান পালন) নির্ভর উন্নয়নে মিলছে সহযোগিতা। কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াতে এ দুটি ক্ষেত্রকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত সরকার। আপেল, আখরোট, চেরি, নাশপাতি এবং ফুল চাষে সরকারি সহায়তায় স্থানীয়রা তাদের রোজগার তিন চার গুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি হিমঘর নির্মাণ প্রক্রিয়াকরণ, উড়োজাহাজে ফসল দেশের অন্যত্র পরিবহনের সুবিধাও পাচ্ছে চাষীরা। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বাজার পেতেও সুবিধা হচ্ছে তাদের।

তৃণমূল স্তরে মানুষের চাহিদা মেটাতে জেলা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তহবিল সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মানুষের কল্যাণে প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছেন। কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের দ্রুত রেল যোগাযোগ স্থাপনে সরকার ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে। কোভিড মোকাবিলায় জম্মু ও শ্রীনগরে গড়ে উঠেছে দুটি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল। কেন্দ্রশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে দুটি অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স বা এইমস-এর মতো হাসপাতাল, ৭টি মেডিক্যাল কলেজ, একটি ক্যানসার হাসপাতাল, একটি হাড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং একটি শিশু হাসপাতাল হচ্ছে। স্মার্ট সিটি প্রকল্পে নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ ছাড়াও মেট্রো রেল চালানোরও পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তির উন্নয়নে গড়ে উঠছে আইটি হাব। গত সাত দশকের তুলনায় মাত্র দুবছরেই ব্যাপক উন্নয়নের স্বাদ পাচ্ছে কাশ্মীর।

জম্মু ও কাশ্মীরে উন্নয়নের পাশাপাশি দীর্ঘ বঞ্চনারও অবসান ঘটেছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৩৭০ ধারা বিলোপ করে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের নাগরিকদের মতো সমান অধিকার ভোগ করছে সেখানকার মানুষ। নয় শতাধিক আইনি সুবিধা দেশের বাকি অংশের মতোই কাশ্মীরের মানুষও এখন ভোগ করছেন। তফশিলভুক্ত জাতি ও উপজাতি, অন্যান্য পিছিয়ে পরা সম্প্রদায়ের মানুষ, শিশু, সংখ্যালঘু, বনবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন পাচ্ছেন সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষার অধিকার জম্মু ও কাশ্মীরেও প্রতিষ্ঠিত। কাশ্মীরি নারীরা ভিন রাজ্যের বাসিন্দাদের বিয়ে করলে তাদের স্বামী বা সন্তানরাও উপত্যকার স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা মানুষগুলোকে ৩৭০ ধারা বিলোপের পর মিলেছে নাগরিকত্ব।

৩৭০ ধারা বিলোপের পর ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরের মানসিক দূরত্ব আরও কমেছে। কাশ্মীরি বা মুসলিমদের কাছেও বড় হয়ে উঠেছে ভারতীয় পরিচিতি। তারা সব ক্ষেত্রে এখন নিজেদের অধিকার অর্জন করেছে। স্বাধীন নাগরিক হিসেবে সেখানে ভোটাধিকার থেকে শুরু করে সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে কতটা স্বাধীনতা উপভোগ করছে ‘আজাদ কাশ্মীর’-এর সাধারণ মানুষ?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
নিরাপদ ঢাকা সৃষ্টিতে করণীয় 
নদী যেন না হয় খাল
রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলেই মঙ্গল
গ্রামভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা জরুরি

শেয়ার করুন

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাঙালি জাতির ক্রান্তিলগ্নে প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে জান্তার হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিচারপতি চৌধুরী কাজ করার তরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। এই সিদ্ধান্ত তার পরিবারের সদস্যবর্গ এবং তার নিজের জীবনের জন্যও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তখনও তিনি জানতেন না বাঙালি জাতির মুক্তির কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু কোথায়।

২ আগস্ট বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি রাজনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে রাতারাতি তিনি জাতীয় বীরে পরিণত হন। নিরীহ, নির্বিবাদী, নিরহংকারী, সজ্জন পণ্ডিত মানুষটি একাত্তরে মাতৃভূমির মুক্তির যুদ্ধে অমিত বিক্রম আপসহীন যোদ্ধায় পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। তাকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা যাবে না।

এই ইতিহাস সৃষ্টির অনেকখানি ভার তিনি নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। কেউ তাকে উদ্বুদ্ধ করেনি। শুধুমাত্র দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে, কর্তব্যবোধে পরিচালিত হয়ে পাকিস্তানের নৃশংস বর্বরতায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন।

১৯৮৭ সালের ২ আগস্ট তিনি লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। ৫ আগস্ট তার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছে। তার তিরোধানে বিশ্ববরেণ্য বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রনায়ক ও রাষ্ট্রপ্রধান, জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব পেরেজ দ্য কুয়েলার, রাণী এলিজাবেথ, তার প্রিন্স ফিলিপ প্রমুখ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শোকবার্তা পাঠান।

স্বৈরাচার এরশাদ তখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। বিচাপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর মরদেহ ঢাকায় আসার পর রাষ্ট্রপতি এরশাদ মরহুমের বাসায় গিয়েছিলেন। স্বৈরশাসক এরশাদকে জীবনে ওই একবারই কাছ থেকে দেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত এরশাদ মরহুমের জানাজায় অংশ নেন এবং বিমানবন্দরে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। হিথরো এয়ারপোর্টে স্বয়ং রানীর গার্ড রেজিমেন্ট একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মরদেহের প্রতি যেমন গার্ড অব অনার দেয়া হয়, তেমনিভাবে তার কফিন বিমানে তুলে দিয়েছে।

ক্ষমতার প্রতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কোনো মোহ ছিল না। ড. কামাল হোসেন লিখেছেন, ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে স্বদেশে আসার পর ১১ তারিখ বিচারপতি চৌধুরীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাসভবনে তাকে দেখা করতে বলা হলো। বিচারপতি চৌধুরী ও ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামকে নিয়ে ড. কামাল সেখানে গিয়ে দেখেন বঙ্গবন্ধুও উপস্থিত আছেন। তাজউদ্দীন সাহেব তাদেরকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘আমরা পার্লামেন্টারি কাঠামোতে আসতে চাই, তোমরা এ ব্যাপারে সাংবিধানিক উপদেশ দাও।’

সেই বাসভবনে তাঁদের রচিত প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ অর্ডার, ১৯৭২-এ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐদিনই স্বাক্ষর দিলেন।

স্বাক্ষর দেবার পরই বঙ্গবন্ধু ড. কামালকে এক কোনে ডেকে নিয়ে জাস্টিস চৌধুরী সম্পর্কে বললেন, প্রেসিডেন্ট তো উনিই হতে পারেন। বিচারপতি চৌধুরী এই প্রস্তাবের জন্য তৈরি ছিলেন না। তাকে বলা হলে তিনি নম্র স্বরে বললেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু আমাকে প্রেসিডেন্ট হতে হবে আমি কখনও তা ভাবিনি।’

কিন্তু তিনি আপত্তি করতে পারলেন না। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে তিনি খুবই শ্রদ্ধা করতেন। এখনও ভাবি, প্রেসিডেন্ট পদ তিনি চাননি। অবস্থার চাপেই তাকে প্রেসিডেন্ট হতে হয়েছিল।

২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তান সামরিক জান্তা নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ঐ রাতে শুধু ঢাকা শহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ অজস্র নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়। ২৬ মার্চ সকালে বিবিসির খবরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ডের ভাসা ভাসা খবর প্রচারিত হয়। বিবিসির খবর শুনে বিচলিত বিচারপতি চৌধুরী মানবাধিকার কমিশনের সভায় উপস্থিত হয়ে ঢাকায় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত বিবিসির খবরের কথা জানান। ঢাকায় গণহত্যার খবর শুনে বিচারপতি চৌধুরী ২৭ মার্চ শনিবার পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেন।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিশ্ব জনমত গঠনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী লন্ডনে সদরদপ্তর স্থাপন করে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে সমগ্র বিশ্ব ছুটে বেড়িয়ে সম্পন্ন করেছেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও তাদের দোসরদের প্রাণনাশের হুমকির মুখে অবিচলিত, শান্ত এই কর্মবীর সাহসের সাথে মাতৃভূমির মুক্তির লক্ষ্যে বিরামহীনভাবে কাজ করে গেছেন।

একাত্তরে যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বের শক্তিশালী কিছু দেশ পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের আপস-মীমাংসার চেষ্টা চালায়। দেশ ও জাতির ওই সংকটের সময় বিচারপতি চৌধুরীর অবিস্মরণীয় উক্তি ছিল, ‘লন্ডনের রাস্তায় আমার শবদেহ পড়ে থাকবে, তবু পাকিস্তানের সাথে আপস করে দেশে ফিরব না।’

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বর্বর সামরিক জান্তা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সশস্ত্র যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। জেনেভায় অবস্থানরত বিচারপতি চৌধুরী এবারও দেশ ও জাতির জন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করেননি। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি দস্যুদের দ্বারা বাঙালি হত্যাযজ্ঞের খবর পরের দিন সকালে বিবিসির সংবাদে তিনি অবহিত হন। কিছুক্ষণের মধ্যে মানবাধিকার কমিশনের সভায় উপস্থিত হয়ে বিচারপতি চৌধুরী বাংলার মানুষের হত্যার কথা জানান। জেনেভা থেকে অতি দ্রুত লন্ডন ফিরে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ঢাকা থেকে প্রেরিত টেলেক্স পড়ে কালরাতের খবরাখবর তিনি জানতে পারেন। ক্ষোভে, দুঃখে, যন্ত্রণায়, অপমানে বিচারপতি চৌধুরী ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান ইয়ান সাদারল্যান্ডকে বললেন, ‘এই মুহূর্ত থেকে পাকিস্তান সরকারের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক রইল না। আমি দেশ থেকে দেশান্তরে যাব আর পাকিস্তানি সৈন্যদের নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার কথা বিশ্ববাসীকে জানাব।’

বাঙালি জাতির ঐ ক্রান্তিলগ্নে এভাবে প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে জান্তার হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিচারপতি চৌধুরী কাজ করার তরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দেন।

এই সিদ্ধান্ত তার পরিবারের সদস্যবর্গ এবং তার নিজের জীবনের জন্যও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তখনও তিনি জানতেন না বাঙালি জাতির মুক্তির কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু কোথায়। বাংলাদেশ সরকার তখনও গঠিত হয়নি। প্রথম সারির নেতারা নিহত, গ্রেপ্তার নাকি আত্মগোপনে, কিছুই তার জানা ছিল না। জাতির ঐ সংকটময় মুহূর্তে বিচারপতি চৌধুরীর দেশের পক্ষে কাজ করার ওই সরব ঘোষণা শুধু ঐতিহাসিক বললেই দায়িত্ব শেষ হবে না, এটা ছিল পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। শুধুমাত্র এই একটি সিদ্ধান্তের জন্য বাঙালি জাতির ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র এক দিন পর ২৭ মার্চ শনিবার ছুটির দিনে খোদ লন্ডন শহরে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী একজন বীরের মতো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আবু সাঈদ চৌধুরীর ওই বীরোচিত ঘোষণা শুধু লন্ডন বা আমেরিকায় অবস্থানরত বাঙালিদের নয়, বাংলাদেশের জনগণসহ সমগ্র বিশ্বে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাঙালি সন্তানদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে।

ঐতিহাসিকরা একদিন লিখবেন, ‘২৬ মার্চের পর পর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুর অবস্থান, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সারা বাংলায় গণহত্যা, আওয়ামী শীর্ষ নেতাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে দেশ-বিদেশের মানুষ যখন কিছুই জানতে পারছিল না, তখন একজন বাঙালি শিক্ষাবিদ আবু সাঈদ পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণার পর ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড হিউমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এরপর তিনি কমনওয়েলথ সচিবালয় সাধারণ সম্পাদক আর্নল্ড স্মিথের সাথে দেখা করে ঢাকায় গণহত্যা বন্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য চেষ্টা করতে অনুরোধ জানান।’

১০ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড হিউমের সাথে আবু সাঈদ চৌধুরীর সাক্ষাৎ হয়। লর্ড হিউম তাকে দেখেই বলেন, ‘পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। চিন্তার কারণ নেই।’

বিচারপতি চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচানোর জন্য চেষ্টার অনুরোধ জানান। হিউম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট খবর আছে। শেখ মুজিব ভালোই আছেন।’

ঐদিনই ১০ এপ্রিল ৪টার সময় বিচারপতি চৌধুরী বিবিসিতে যান। মি. পিটারগিল তার একক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি পাকিস্তানিদের গণহত্যাসহ পাকিস্তানের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বিস্তারিত বলেন। বিবিসির দুজন সাংবাদিক সিরাজুর রহমান এবং শ্যামল লোধ বিচারপতি চৌধুরীর বক্তব্য নেন এবং প্রচার করেন। বিবিসি তখন সকাল-বিকাল বাংলাদেশের খবর বিশেষভাবে প্রচার করত। এভাবে বিচারপতি চৌধুরী ২৫ মার্চের পর থেকে লন্ডনে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে চাঙ্গা করে তোলেন।

এভাবে মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতার অবস্থান না জেনে এবং যুদ্ধকালীন সরকার গঠিত হওয়ার আগেই লন্ডনে মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে কাজ শুরু করে দিয়ে বিচারপতি চৌধুরী দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বাংলার মানুষকে উজ্জীবিত করেন। যুক্তরাজ্যে নানা দলমতে বিভক্ত বাঙালিদের তিনি ঐক্যবদ্ধ করেন। মূলত তিনি ছিলেন বহির্বিশ্বে বাঙালিদের ঐক্যের প্রতীক। ইউরোপ ও আমেরিকার বাঙালি সমাজকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার মন্ত্রে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেন। ২৩ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার বিচারপতি চৌধুরীকে বিদেশে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করে।

বিচারপতি চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। ১৯৮৫ সালে বাংলাবার্তা সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতম আঘাতের ফলে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

৭১-এর বঙ্গবন্ধু কোনো ব্যক্তি নন, বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, তার নামেই স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে। কোনো ব্যক্তির নাম যখন প্রেরণার উৎস হয়, তখন তিনি ইতিহাসে স্থায়ী মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হন।... বঙ্গবন্ধু আমাদের মধ্যে স্বাদেশিকতা, স্বাজাত্যবোধ জাগিয়েছেন, সর্বোপরি এনে দিয়েছেন স্বাধীনতা।’

আবু সাঈদ চৌধুরী আজীবন গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ পূজারী ছিলেন। আশির দশকে জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা জোরের সাথে বলেছেন। স্বৈরশাসকরা ঐ সময় বঙ্গবন্ধুর অবদান শুধু অস্বীকারই করেনি, বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার জন্য যা যা দরকার তার সবই করে। নানা ব্যস্ততার মধ্যেও বহু সভা-সমিতিতে প্রধান অতিথি, প্রধান বক্তা, সভাপতি, সম্বর্ধিত ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন ভূমিকায় যোগ দিয়ে বিচারপতি চৌধুরী তার সুললিত ভাষায় বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল অবদানের কথা জাতির সামনে তুলে ধরেন। স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যেভাবে তিনি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা, গণতন্ত্রের কথা বলেছেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

আবু সাঈদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদকীয়তে লেখে: ‘হয়তো তাঁর অপেক্ষা অনেক পণ্ডিত লোককে ভবিষ্যতে আমরা পাইব, হয়তো অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি বিজ্ঞ আইনজ্ঞ কিংবা দূরদর্শী রাজনীতিকেরও আবির্ভাব ঘটবে, এদেশে। কিন্তু একই সঙ্গে এতগুলো উজ্জ্বল গুণের অধিকারী এবং চরিত্রবান, ব্যক্তিত্বমণ্ডিত, সজ্জন, নির্লোভ আর একজন আবু সাঈদ চৌধুরীর জন্য আমাদের কতকাল অপেক্ষা করতে হবে কে জানে।’ (সোমবার, ১৭ শ্রাবণ ১৩৯৪)।

দৈনিক সংবাদ (১৮ শ্রাবণ ১৩৯৪) সম্পাদকীয়তে লেখা হয়: ‘আবু সাঈদ চৌধুরীর কর্মজীবন পর্যালোচনা করে তাকে সার্থকভাবেই দার্শনিক-রাজনীতিক হিসেবে অভিহিত করা চলে।’

দৈনিক বাংলা লেখে:, ‘বিচারপতি চৌধুরী তার কর্মে আর কৃতিত্বের মাধ্যমে অমরত্বে উপনীত হয়েছেন।’

একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এম সাদিক নামে লেখেন: ‘বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপ্নময় বরেণ্য মনীষী আবু সাঈদ চৌধুরীর তিরোধান নক্ষত্রের পতনের মতো। কিন্তু তিনি জেগে রবেন প্রতিটি বাঙালির চোখের তারায়।’ (স্মৃতিসত্তায় আবু সাঈদ চৌধুরী, পৃ. ৩৮)।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একজন নায়ক জাতীয় বীর আবু সাঈদ চৌধুরীর মৃত্যু নেই। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল তিনি অমর হয়ে থাকবেন। মৃত্যুদিবসে স্যারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক

আরও পড়ুন:
নিরাপদ ঢাকা সৃষ্টিতে করণীয় 
নদী যেন না হয় খাল
রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলেই মঙ্গল
গ্রামভিত্তিক পর্যটন শিল্প উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
প্রবাসী নারীকর্মীদের নিরাপত্তা জরুরি

শেয়ার করুন