মহামারি মোকাবিলায় দরকার সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ

মহামারি মোকাবিলায় দরকার সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ

করোনা কি তবে ধনীক শ্রেণির আর সামর্থ্যবানেরই রোগ! অর্থাৎ করোনা মোকাবিলা করতে পারবে একমাত্র ঘরওয়ালা, বাড়িওয়ালা, বাসায় খাদ্য মজুদ করতে পারা, মাস্ক আর সাবান, স্যানিটাইজার কেনা তথা ধনীক শ্রেণির জনগোষ্ঠীই কেবল করোনা মোকাবিলা করতে পারবে!

করোনা না করোনার ভূত কোনটি বেশি শক্তিশালী! এটিই এই মুহূর্তের সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমরা একদিকে দেখতে পাচ্ছি করোনার বিস্তার। জেলায় জেলায় অক্সিজেন থেকে শুরু করে চিকিৎসা উপকরণের অভাবসহ নানাবিধ সংকট, আর অন্যদিকে সেই বিষয়ে যথাযথ মনোযোগ না দিয়ে জনগণকে ঘরে আটকে রাখতে নানা ধরনের বিধিনিষেধ।

চলছে শাটডাউন। শাটডাউন শুরু হওয়ার আগে আমরা দেখলাম ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। আর মিডিয়াতে তার সংবাদ।

আচ্ছা এই যে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই দলে দলে শহর ছাড়ে, কেন ছাড়ে? এই ছাড়াছাড়ি কি এমন যে, মানুষ নিরাপদ আশ্রয় হতে অনিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছতে চায় না, বরং এমন যে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়েই শেষ বিচারে পৌঁছতে চায়!

কোন আশার টানে কেন মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে আসে আর কেনই বা আবার সেই শহর ছাড়ে! এই বিষয়ক কী কী পরিসংখ্যান আছে আমাদের দেশে? এখন কি দেশে কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে? তবে দলে দলে মানুষ কেন শহর ছাড়ছে?

এই যে করোনার বিস্তার রোধের একমাত্র সমাধান হচ্ছে ঘরে থাকা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, মাস্ক পড়া আর ঘন ঘন হাত ধোয়া। তবে মানুষ কেন ঘরের বাইরে বের হচ্ছে?

মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে ঘরের বাইরে বের হওয়া অ্যাডভেঞ্চার হলেও বেশির ভাগ মানুষই কিন্তু জীবন ও জীবিকার টানেই ঘরের বাইরে বের হয়। তাকে কাজ করে উপার্জন করতে হয়। কয়জন আছে আর সেই সৌভাগ্যবান যারা ঘরে খাবার দাবার মজুদ করে লকডাউন উপভোগ করতে পারে?

আর সেই ঘরই বা কয়জনের আছে যেখানে সামাজিক দূরত্ব তথা শারীরিক দূরত্ব মেনে সবাই নিরাপদে ঘরে থাকতে পারে। বরং কারো কারো কাছে তো ঘরের বাইরে ঘরের উঠান কিংবা শহরাঞ্চল হলে ঘরের সামনে রাস্তা আরো বেশি ফাঁকা বা নিরাপদ মনে হয়।

আর মাস্ক পড়া, প্রতিদিন সেই মাস্ক ধোয়া আর ঘন ঘন হাত ধোয়া- সেই পানীয় জলের ব্যবস্থা কয়জনের আছে? কিংবা স্যানিটাইজার কেনার কথা বাদই দিলাম ঘন ঘন হাত ধোয়ার সাবান কেনার সামর্থ্যই বা কয়জনার আছে?

করোনা কি তবে ধনীক শ্রেণির আর সামর্থ্যবানেরই রোগ! অর্থাৎ করোনা মোকাবিলা করতে পারবে একমাত্র ঘরওয়ালা, বাড়িওয়ালা, বাসায় খাদ্য মজুদ করতে পারা, মাস্ক আর সাবান, স্যানিটাইজার কেনা তথা ধনীক শ্রেণির জনগোষ্ঠীই কেবল করোনা মোকাবিলা করতে পারবে!

করোনা উপসর্গে মারা যাচ্ছে মানুষ। কিন্তু করোনার কারণে আরো যে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার শিকার খাদ্যর অভাবে, চাকরির অভাবে, চিকিৎসার অভাবে, দুঃশ্চিন্তা আর অসহায়ত্বের শিকার হয়ে মারা যাচ্ছে আরও কতজন? তার খবর কি আছে আমাদের কাছে?

আমরা তো আগে মাঝে মধ্যে নেতাদের কাছ শুনতাম, করোনার চেয়ে আমরাই বেশি শক্তিশালী। এখন কোথায় সেইসব ফাঁকাবুলি। আমাদের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ে, নানা ধরনের ভাতা চালু হয়। কিন্তু সেসবের উপকারভোগী কারা হয় আর কারা হয় শিকার?

করোনা মোকাবিলায় জেলায় জেলায় আর পাড়ায় পাড়ায় লকডাউন-শাটডাউনের পরিবর্তে একে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে মেনে নিয়ে আমরা কি পারতাম না, দল-মত নির্বিশেষে শ্রেণি-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয়ভাবে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করতে। এবং জাতীয়ভাবে সেই পরিকল্পনাকে স্থানীয়ভাবে বিস্তৃত করতে?

করোনা সংক্রমণকালীন এই দীর্ঘ সময়ে প্রথম থেকে উদ্যোগ নিলে স্থানীয়ভাবে প্রতি পাড়া-মহল্লায় একটি করে করোনা প্রতিরোধ টিম গঠন করা যেত। যেই টিম সেই এলাকায় বসবাসরত অধিবাসীদের কথা চিন্তা করে স্থানীয়ভাবে করোনা মোকাবিলায় উদ্যোগ নিতে পারত। কার ঘরে খাবার নেই, কার কোথায় চাকরি, কে কোন পেশায় জড়িত, কার জন্য অবশ্য মান্য কী নিয়ম হতে পারে, কার ঘরে বয়স্ক মানুষ আছে, কার ঘরে করোনার উপসর্গযুক্ত রোগী আছে, কার কী ধরনের চিকিৎসা দরকার হতে পারে, কার ঘরে বাইরে থেকে লোক আসছে? স্থানীয়ভাবে গঠিত কমিটির পক্ষেই একমাত্র সম্ভব এসব বিষয় যথাযথভাবে তদারকি করা।

এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন আর সামগ্রিকভাবে তদারকি করবে জেলা প্রশাসন। তবেই না সম্ভব ফাঁকা আওয়াজের বদলে করোনা মোকাবিলায় প্রকৃত উদ্যোগ গ্রহণ!

আমরা জানি, আমাদের দেশে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বার্তা না আসলে কখনওই এরকম উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সময়ের দাবি এখন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল আর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মিলে দেশের সমস্ত শক্তিগুলোকে একত্রিত করে কাজ করার। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে সাংগঠনিক কাঠামো ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা। সামগ্রিক একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে অগ্রসর হওয়া।

আর এজন্য দরকার জাতীয়ভাবে একটি আহ্বান। যেমন ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ঘোষিত হয়েছিল, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- তেমনি এক উদাত্ত আহ্বান। করোনা মোকাবিলায় সেই রাষ্ট্রনায়কোচিত ঘোষণা আসবে কবে?

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি দেড় কোটি মানুষ
৩০০ ক্ষুধার্তকে খাদ্য বিতরণ পুলিশের
রোগীর চাপ বাড়ছে করোনা হাসপাতালে
কোকা-কোলা, ফলের রসে ভুয়া করোনা পজিটিভ
ভারতে করোনা প্রতিরোধী বিশ্বের প্রথম প্লাজমিড ডিএনএ টিকা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বিএনপি যে কারণে দাঁড়াতে পারছে না

বিএনপি যে কারণে দাঁড়াতে পারছে না

২০০৬ সালের পর থেকে গত ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। আবার তারা কবে ক্ষমতায় ফিরতে পারবে, তা কেউ জানে না। তবে বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী দল। গণতান্ত্রিক পন্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়াই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বার বার আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে হেরে ক্ষমতা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে বিএনপি।

রাজনীতি আসলে কৌশলের খেলা। কখনও কখনও অপকৌশলেরও খেলা। রাজপথে আমরা যা দেখি, সেটা সেই কৌশল বা অপকৌশলের শেষ ধাপ। তার আগে পর্দার পেছনে চলে আসল খেলা। সেই খেলায় আওয়ামী লীগের কাছে বার বার হেরে যাচ্ছে বিএনপি। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি।

কৌশলের অংশ হিসেবে দুদলই সমমনাদের কাছে টানে, জোট বানায়, জোট ভাঙে। অপকৌশলের অংশ হিসেবে সমমনা নয়, এমন দলের সঙ্গেও জোট হয়। রাজনীতির এই মেরুকরণের কোনো স্থির সমীকরণ নেই। যেমন একসময় আওয়ামী লীগ-বিএনপি যুগপতভাবে জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে।

সে আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত জাতীয় পার্টি পরে কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। একসময় হেফাজতে ইসলাম সরকার উৎখাতের স্বপ্নে ঢাকা দখল করতে এসেছিল। সেই হেফাজত এখন চলে সরকারের ইশারায়। আরেকটু পেছনে গেলে দেখা যাবে, জাসদের জন্মই হয়েছিল আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে। সেই জাসদের বড় একটি অংশ এখন আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী। তাই রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা বন্ধু বলে কিছু নেই। প্রয়োজনই বন্ধু ঠিক করে দেয়।

১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরতে ২১ বছর লেগেছিল। ২০০৬ সালের পর থেকে গত ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। আবার তারা কবে ক্ষমতায় ফিরতে পারবে, তা কেউ জানে না। তবে বিএনপি একটি ক্ষমতামুখী দল। গণতান্ত্রিক পন্থায়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়াই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বার বার আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে হেরে ক্ষমতা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে বিএনপি।

এরশাদ পতনের পর অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোয় দেখা গেছে আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভোট পাওয়ার হার ৩০-৩৫ শতাংশের মধ্যে। এই ভারসাম্য থেকে ক্ষমতায় যেতে বিএনপি কখনও জামায়াতকে কাছে, আওয়ামী লীগ টানে জাতীয় পার্টিকে।

কারণ আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে এই দুই দলেরই বলার মতো কিছু ভোট আছে, যা ক্ষমতার পাল্লা হেলিয়ে দিতে পারে। কিন্তু গত ১৫ বছরে বিশেষ করে গত ১২ বছরে ভোটের এই হিসাব যাচাই করার কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। বিএনপির ভোটব্যাংক কি অটুট আছে, নাকি কমেছে? সেটা জানার কোনো উপায় নেই।

বাংলাদেশের মতো দেশে সাধারণভাবে একটি সরকার ক্ষমতায় থাকলে, যত ভালো কাজই করুক, মানুষ তাদের বদলাতে চায়। সেখানে আওয়ামী লীগ টানা তিন দফায় ক্ষমতায় আছে। সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের ওপর বিরক্ত হলে তার সুবিধা পাবে বিএনপি। কিন্তু সেই সুবিধাটা পাওয়ার রাস্তাটাই খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি।

শুরুতে যেমন বলেছি, রাজনীতি আসলে কৌশল বা অপকৌশলের খেলা। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়- এই কৌশলে অনড় থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। সে নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপির ধারণা ছিল, নির্বাচনে না গিয়ে তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবে বা নির্বাচন ঠেকাতে পারবে কিংবা নির্বাচনের পর আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বাধ্য করতে পারবে। কিন্তু বিএনপি কোনোটাই পারেনি।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপিও আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে একটি নির্বাচন করেছিল। কিন্তু টিকতে পারেনি। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপিকে বাধ্য করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে যেটা পেরেছিল, বিএনপি ২০১৪ সালে সেটা পারেনি। তারপর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, এই দাবিতে অনড় থাকলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই তারা অংশ নেয়। কিন্তু ততদিনে আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠটি এমনভাবে দখল করে নেয়, বিএনপির আর তাতে ঢোকারই সুযোগ ছিল না।

২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করেছিল, আর ড. কামাল, জাফরুল্লাহ চৌধুরীদের পরামর্শে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ভুল করেছে। দুটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালেচনা আছে। কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দায় ছাড়া আওয়ামী লীগের ঘাড়ে বিএনপি আর কিছুই দিতে পারেনি। দুটি নির্বাচন দিয়েই আওয়ামী লীগ টানা দেশশাসন করছে। বিএনপি নির্বাচনের মাঠে তো ঢুকতেই পারেনি, রাজপথেও প্রতিরোধ গড়তে পারেনি।

আওয়ামী লীগের মতো একটি পুরোনো ও গণতান্ত্রিক দলের জন্য ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন দুটি অবশ্যই বড় ধাক্কা। কিন্তু আওয়ামী লীগ এই কৌশল শিখেছে বিএনপির কাছ থেকেই। জিয়াউর রহমান হ্যাঁ-না ভোট, ১৯৭৯ সালের নির্বাচন আর খালেদা জিয়ার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও একই দোষে দুষ্ট। এরশাদ আমলে ’৮৬ আর ’৮৮ সালের দুটি নির্বাচনও নির্বাচনি ব্যবস্থার কলঙ্ক হয়ে আছে। আসলে যে যখন সুযোগ পেয়েছে, সে তখন নির্বাচন নিয়ে অপকৌশলের খেলা খেলেছে। নির্বাচন নয়, আসলে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে কৌশল-অপকৌশলের খেলায়।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। আড়াই বছর আগেই নির্বাচনের প্রস্তুতির নির্দেশে অনেকেই আগাম নির্বাচনের গন্ধ পেয়েছেন।

যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তবে শেখ হাসিনার নির্বাচনি বলের পেছনে এখন ছুটছে রাজনীতি। অনেকদিন পর চাঞ্চল্য বিএনপি শিবিরেও। নিজেদের রাজনীতি ও কৌশল ঠিক করতে ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। বৈঠক এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের আলোচনায় উঠে এসেছে, পুরোনো কৌশলে ফিরে যাওয়ার দাবি।

বেশিরভাগ নেতাই বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে একদফার আন্দোলনের পক্ষে মত দিয়েছেন। গত দুটি নির্বাচনে না গিয়ে এবং গিয়ে বিএনপি যা শিখেছে, তাতে এর বাইরে অন্য কোনো কৌশলের কোনো সুযোগই নেই। নির্বাচন আগে হোক আর আড়াই বছর পরে হোক, বর্তমান সরকারের অধীনে তাতে অংশ নেয়া মানেই বিএনপির আরেকটি ভরাডুবি, এটা সবাই বোঝে। কিন্তু বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করল, আর আওয়ামী লীগ সেটা মেনে নিল, ব্যাপারটি অত সরলও নয়।

তাছাড়া টানা তিন দফায় ক্ষমতায় থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপির হাতে ক্ষমতা দিয়ে প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার মতো বোকাও আওয়ামী লীগ নয়। তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে চাইবে। তাই বিএনপির সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিটিই যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিএনপি তাদের এই যৌক্তিক দাবিটি আদায় করবে কীভাবে? সবাই নিশ্চয়ই বলবেন, আন্দোলন করে। কিন্তু আন্দোলন করে দাবি আদায়ের সক্ষমতা কি আছে বিএনপির?

গত একযুগে বিএনপি আন্দোলনের নানা চেষ্টা করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কঠোর হাতে সেসব দমন করেছে। একাধিকবার আন্দোলনের চেষ্টায় দলের শক্তিক্ষয় হয়েছে, নেতাকর্মীদের মামলার সংখ্যা বেড়েছে। আর পরিস্থিতি এখন আরও অবনতি হয়েছে।

দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ড মাথায় নিয়ে সরকারের অনুকম্পায় অন্তরীণ জীবনযাপন করছেন। তার যা বয়স এবং শরীরের যে অবস্থা, তাতে তিনি আর দলের নেতৃত্ব দেবেন বা আন্দোলনে নামবেন; তেমন বাস্তবতা নেই। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও দণ্ড মাথায় নিয়ে পালিয়ে আছেন। তাই এ অবস্থায় নেতৃত্ব শূন্যতাই বিএনপির সবচেয়ে বড় সংকট।

তাছাড়া এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মাঠে থাকা দলটি এখন কেন মাঠে নামতে পারছে না, সেটাও বিশ্লেষণ করা দরকার। বৃহত্তর আন্দোলনে নামার আগে বিএনপির নিজেদের সক্ষমতা যাচাই এবং আত্মসমালোচনা জরুরি।

এটা ঠিক, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন, বর্তমান সময়ের ন্যূনতম রাজনৈতিক দাবি। বিএনপির লক্ষ্যটাও পরিষ্কার- সুষ্ঠু নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথটা বড়ই বন্ধুর। সেই বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর সামর্থ্য বিএনপির আছে কি না, সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি দেড় কোটি মানুষ
৩০০ ক্ষুধার্তকে খাদ্য বিতরণ পুলিশের
রোগীর চাপ বাড়ছে করোনা হাসপাতালে
কোকা-কোলা, ফলের রসে ভুয়া করোনা পজিটিভ
ভারতে করোনা প্রতিরোধী বিশ্বের প্রথম প্লাজমিড ডিএনএ টিকা

শেয়ার করুন

ঈশ্বরদীর ট্রেন হামলা: শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার রায় কার্যকর হোক

ঈশ্বরদীর ট্রেন হামলা: শেখ হাসিনাকে
হত্যাচেষ্টার রায় কার্যকর হোক

আজ ২৩ সেপ্টেম্বর। ২৭ বছর আগে ১৯৯৪ সালের এদিনে পাবনার ঈশ্বরদীতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনের কামরায় অতর্কিত হামলা করে ক্ষমতাসীন সরকারে মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীরা। সেদিন তিনি সাংগঠনিক সফরে খুলনা থেকে রাজশাহীতে ট্রেনে যাচ্ছিলেন। পথে ঈশ্বরদী স্টেশনে তার নির্ধারিত পথসভা ছিল। তাকে বহনকারী ট্রেনটি পাকশী স্টেশনে পৌঁছার পর পরই ট্রেনে ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলা চালানো হয়।

সাহস তাকে পরাভূত হওয়ার সব শক্তিমত্তাকে পর্যুদস্ত করে দেয়। সাহসের বরাভয় কাঁধে তিনি এগিয়ে চলছেন। কোনো বাধা-বিপত্তি তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না, পারেনিও। আদর্শ ও লক্ষ্যে অবিচল নিষ্ঠা, কর্মকুশলতা, দক্ষতা, যোগ্যতা তাকে ধরে রাখে বাংলার অন্তরের গভীর অন্তরে, মানুষের জেগে ওঠার, বেড়ে ওঠার অনন্তর আবেগে। আলোকের ঝরনাধারায় দেশ ও দেশবাসীকে রাঙিয়ে দিতে কুণ্ঠাহীন তিনি। তেজস্বী মনোভাব তাকে দমিয়ে রাখার ক্ষেত্রকে করে সংকুচিত। সবুজ-শ্যামলে মোড়া বাংলাদেশকে পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় উন্নীত করতে নিরন্তর নিবেদিত তিনি।

একাত্তরের পরাজিত শক্তি এখনও ওঁত পেতে আছে প্রতিশোধে। পঁচাত্তরের ঘাতক বাহিনী, যারা হত্যা করেছে পিতা-মাতা-ভাইসহ স্বজনদের, তারা চায় তার বিনাশ। তাকে নির্জন করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী পাকিস্তানি ধারায় ফিরে যেতে চায়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর দেশটাকে তারা পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে তিনি ফিরিয়ে এনেছেন স্বাধীনতার স্বপ্নবাহী পথে। সেই পথ মসৃণ নয়। অনেক চড়াই-উতরাই। সেসব পথ মাড়িয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। তিনি শেখ হাসিনা।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যা সম্পূর্ণ হয়নি, সেটাই বার বার করার চেষ্টা করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীচক্র। সেই ’৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকেই ঘাতকের নিশানায় বঙ্গবন্ধুকন্যা। নানা সময়ে নানাস্থানে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। কখনও সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, কখনও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের অনুসারী, কখনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী গোষ্ঠীর ইন্ধন ও সহযোগিতায়। আর প্রতিটি ঘটনার পর রাজনৈতিক যোগসূত্র মিলে যায় ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বেনিফিশিয়ারি দলগুলোর কার্যক্রমের সঙ্গে।

কোনো কোনো হত্যাচেষ্টায় আওয়ামীবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ‘শত্রুর শত্রু, আমার মিত্র’ এই আদর্শে ঘাতকদের পক্ষ নিয়েছিল। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ পর্যন্ত ২১ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টায় তাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড-বোমা ও গুলির হামলা হয়েছে। প্রতিটি হামলায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাই ছিলেন হত্যাকারীদের মূল টার্গেট। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বার বার বুলেট-বোমা তাড়া করে বেড়ায় তাকে? কেন বার বার হত্যাকারীদের মূল লক্ষ্য শেখ হাসিনা?

আজ ২৩ সেপ্টেম্বর। ২৭ বছর আগে ১৯৯৪ সালের এদিনে পাবনার ঈশ্বরদীতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনের কামরায় অতর্কিত হামলা করে ক্ষমতাসীন সরকারে মদতপুষ্ট সন্ত্রাসীরা।

সেদিন তিনি সাংগঠনিক সফরে খুলনা থেকে রাজশাহীতে ট্রেনে যাচ্ছিলেন। পথে ঈশ্বরদী স্টেশনে তার নির্ধারিত পথসভা ছিল। তাকে বহনকারী ট্রেনটি পাকশী স্টেশনে পৌঁছার পর পরই ট্রেনে ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলা চালানো হয়। ট্রেনটি ঈশ্বরদী পৌঁছানোর পরও একইভাবে বোমা ও গুলিবর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় ঈশ্বরদী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন।

মামলাটি চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে শেষ করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার। মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করা হলেও আদালত তা গ্রহণ না করে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালের ৩ এপ্রিল ৫২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে সিআইডি। পরে মামলায় ধারাবাহিকভাবে ৩৮ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়।

১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে ২১ বার হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। দেশের বাইরেও তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে। এসব হামলায় ৬৬ জন দলীয় নেতাকর্মী নিহত হন। আহত কয়েক হাজার। চিরতরে পঙ্গু ও শারীরিক সক্ষমতা হারিয়েছেন শতাধিক নেতাকর্মী। যাদের প্রাণহানি ঘটেছে সেই পরিবারগুলো এখনও বিচার পায়নি।

উল্লেখ করার মতো, এরশাদ আমলে দুবার, ১৯৯১ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে চারবার, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে চারবার, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকার আমলে চারবার (২১ আগস্টসহ), সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে একবার ও আওয়ামী লীগের বর্তমান আমলে চারবার হত্যাচেষ্টার প্রকাশ্য ঘটনাগুলো উল্লেখ করার মতো। শুধু ঢাকাতেই শেখ হাসিনার ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয় সাতবার। প্রতিটি ঘটনায় মামলা হলেও বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে কয়েকটির। ২৩ সেপ্টেম্বরের হামলা এর একটি।

বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম আদালত ভবনের পাশে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ২৪ দলীয় নেতাকর্মীকে হত্যা করে। তাদের মধ্যে ১০ জন মারা যান নেত্রীকে ‘মানববর্ম’ তৈরি করে রক্ষা করতে গিয়ে। এ ঘটনায় ৫ পুলিশের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত।

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর সচিবালয়ের সামনে তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। তখন মারা যান যুবলীগকর্মী নূর হোসেন। ’৮৯ সালের ১১ আগস্ট ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে হামলা করে ফ্রিডম পার্টি। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে।

১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে ফ্রিডম পার্টির কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে একটি সন্ত্রাসী দল। এই মামলার রায় হয়েছে। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচন চলাকালে রাজধানীর গ্রিন রোডে গাড়ি থেকে নামতে ২০/২৫ জন সন্ত্রাসী গুলি ও বোমা হামলা চালায়। এরা সবাই বিএনপির কর্মী। ১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ধানমন্ডির রাসেল স্কোয়ারে জনসভায় শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ১৯৯৬ সালের ৪ মার্চ টঙ্গীর বিশ্ব এজতেমার আখেরি মোনাজাত থেকে ফেরার পথে রবীন্দ্র সরণির মোড়ে সন্ত্রাসীরা শেখ হাসিনার গাড়িতে হামলা চালায়।

১৯৯৬ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে বক্তৃতা দেয়ার সময় মাইক্রোবাস থেকে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করে একদল সন্ত্রাসী। ১৯৯৯ সালের ২৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের গেটে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে বোমা ফাটায় সন্ত্রাসীরা। এই ঘটনায় ৬ জন গ্রেপ্তার হয়।

একই সালের ১১ জুলাই ভুয়া ই-মেইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পুত্র-কন্যাসহ ৩১ জনকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান সরকারি কলেজের পাশ থেকে ৭৬ কেজি এবং ২৩ জুলাই হেলিপ্যাডের কাছে ৪০ কেজির দুটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করেন সেনাবাহিনীর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা। ২২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে এক জনসভায় বক্তব্য রাখার কথা ছিল।

২০০১ সালের ৩০ মে খুলনার রূপসা সেতুর কাজ উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ঘাতকচক্র সেখানে শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখে। বিস্ফোরণের আগেই বোমাটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় গোয়েন্দা পুলিশ। ২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সিলেটে নির্বাচনি জনসভায় শেখ হাসিনাকে হুজিবি বোমা পেতে হত্যার পরিকল্পনা করে। সভাস্থলের ৫০০ গজ দূরে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরিত হয়ে জঙ্গিদের দুজন নিহত হলে চক্রান্ত ভেস্তে যায়।

২০০২ সালের ৪ মার্চ নওগাঁয় শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা হয়। ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট শেখ হাসিনা সাতক্ষীরার কলারোয়ায় গেলে তার গাড়িবহরের ওপর গুলি ও বোমা হামলার ঘটনা ঘটে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দলের মিছিল-পূর্ব সমাবেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা।

শেখ হাসিনা সেদিন অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও মারা যান আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী। রক্তাক্ত ২১ আগস্টের এমন লোমহর্ষক ঘটনার উদ্দেশ্য আজ আর কারো অজানা নয়। আহতদের অনেককেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। অনেকেই ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। আলোচিত এ মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে।

২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র হামলা করে হুজি, জেএমবি, জামায়াত ও বিএনপি মিলে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে।

জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাব-জেলে তাকে স্লো-পয়জনিংয়ের মাধ্যমে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। ২০১৫ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভায় যাওয়ার পথে কারওয়ান বাজারে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় জেএমবি। ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন। এছাড়াও বেশ কয়েকটি ষড়যন্ত্র হয়েছে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টায়, কিন্তু ঘাতকরা সফল হয়নি।

ফিরে দেখা ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪

হামলার পরদিন (২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪, শনিবার) বিভিন্ন পত্রিকায় এ ঘটনা নিয়ে নানা শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জাতীয় একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়- “গতকাল শুক্রবার ঈশ্বরদীতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনে গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলা চালানো হয়েছে। ট্রেনযোগে গণসংযোগ কর্মসূচি পালনের একপর্যায়ে খুলনা থেকে ঈশ্বরদী পৌঁছালে এ ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে ঈশ্বরদী স্টেশনে ট্রেনটি প্রবেশের সময় কয়েক রাউন্ড গুলি বর্ষিত হয় একটি বগিকে লক্ষ্য করে। ঈশ্বরদী রেলস্টেশনে কড়া পুলিশবেষ্টনীর মধ্যে উপস্থিত কয়েক হাজার মানুষের উদ্দেশে শেখ হাসিনার বক্তৃতাকালে বোমা বিস্ফোরিত হয়। গতকাল শেখ হাসিনা সকাল ৯টা ১০ মিনিটে খুলনা থেকে রওয়ানা হন। ১১টি স্টেশনে সমাবেশ-জনসভায় বক্তৃতা শেষে ঈশ্বরদী এসে পৌঁছালে তিনি হামলার শিকার হন। ঈশ্বরদী স্টেশনে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিবেদক। তারা জানায়, সরকারি দলের সমর্থিত মস্তান বাহিনী এ হামলা চালিয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে বিএনপি সমর্থকরা ঈশ্বরদী স্টেশনে আওয়ামী লীগকে সমাবেশ করতে বাধা দেয়। দিনব্যাপী ব্যাপক বোমা হামলায় ভীত ঈশ্বরদী স্টেশনের লোকজন অভিযোগ করে, পৌর চেয়ারম্যানের সমর্থনপুষ্ট মাস্তানরা এ হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে। বোমা হামলা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ঈশ্বরদীতে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে।’

স্টেশনে উপস্থিত আওয়ামী লীগকর্মীদের অভিযোগের তির একজন প্রতিমন্ত্রীর দিকে। তার নির্দেশে এ হামলা চালানো হয়েছে। সন্ধ্যায় রেলস্টেশনে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন ছিল। সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগের মঞ্চও পুড়িয়ে দিয়েছে। ৬টা ৪৫ মিনিটে শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষে ট্রেনটি ঈশ্বরদী স্টেশন ছাড়লে ট্রেনটি লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা ছাড়া হয়। শেখ হাসিনার নির্ধারিত সভাকে কেন্দ্র করে শহরে এবং সভামঞ্চের কাছাকাছি ব্যাপক বোমা হামলা ও সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। জনসভায় গোলযোগের সময় মাথায় বোমার আঘাতে গুরুতর আহত হন যুবলীগকর্মী স্বপন।’

উল্লেখ্য, ২১ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদীতে বিএনপি ও ছাত্রদলের এক বিক্ষোভ মিছিল ঈশ্বরদী শহর প্রদক্ষিণ করে আওয়ামী লীগের সভামঞ্চের কাছে দুপুর ১২টার দিকে উপস্থিত হয় এবং মঞ্চ ভাঙচুর করে। মঞ্চ নির্মাণে যুক্ত কর্মীদের ওপর হামলা করা হয়। এ সময় ১৫ জন আহত হয়। মঞ্চের কাছে বিক্ষোভকারীদের বোমাবাজির কারণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুর রহমান শরীফের বাসভবনে সমবেত হন। এ সময় গোটা শহরে বোমাবাজি চলতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের হাজারখানেক কর্মী মিছিল করে ঈশ্বরদী থানা অতিক্রম করার সময় তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় পুলিশ এক রাউন্ড গুলি, এক রাউন্ড রাবার বুলেট এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। আওয়ামী লীগের মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে নেতৃবৃন্দ পুলিশের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে মঞ্চের কাছাকাছি উপস্থিত হন।”

ঘটনায় সরকারের প্রেসনোট

১৯৯৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সরকারের দায়সারা একটি প্রেসনোট ছাপা হয়। এতে শেখ হাসিনার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। ওই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেসনোটে বলা হয়েছিল, গতকাল বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তাকে বহনকারী ট্রেনটিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছে বলে যে অভিযোগ করেছেন, তার প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সরকার জানাতে চায় যে, প্রাথমিক রিপোর্টে বিরোধীদলীয় নেত্রীর এ অভিযোগের কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিরোধীদলীয় নেত্রী স্টেশনে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা পূর্বে পরস্পরবিরোধী কতিপয় রাজনৈতিক দলের উচ্ছৃঙ্খল সমর্থকরা উল্লিখিত স্টেশন দুটির আশপাশে ধাওয়া-পালটা ধাওয়ায় লিপ্ত হয় এবং পটকা বিস্ফোরণ ঘটায়।

শুধু সরকারি প্রেসনোটই নয়, সেসময় ওই অঞ্চলের বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটল বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপর ঈশ্বরদী ও নাটোরে গুলিবর্ষণের কথিত অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য, বানোয়াট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন- ‘জাতীয় রাজনীতিতে চমক সৃষ্টির বা অতীত ঐতিহ্য আওয়ামী লীগের রয়েছে সাংবাদিক সন্মেলনের বক্তব্যে সেটাই প্রকাশ পেয়েছে।’ তার এই ভাষ্য প্রেসনোটের ভাষাকে হার মানায়। সেই মন্ত্রী আজ প্রয়াত। কিন্তু তাকে ওই হত্যাচেষ্টার অন্যতম ‘ভিলেন’ হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত করেছে।

আশার কথা, ২০২১ সালের ৩ জুলাই এই হামলার মামলার রায়ে নয়জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। একই মামলায় ২৫ জনকে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ১৩ জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড হয়েছে। আলোচিত এ মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নয়জন আসামির প্রত্যেককে পাঁচ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।

যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া ২৫ জনের প্রত্যেককে তিন লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুবছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। আর ১৩ জনের প্রত্যেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। হত্যাচেষ্টার বেশকয়েকটি মামলায় অপরাধীদের সাজা দিয়েছে আদালত। কিছু মামলার রায় কার্যকর নিয়ে রয়েছে এখনও আইনি প্রক্রিয়া চলমান। ২৩ সেপ্টেম্বরের মামলায় আসামিদের সাজা কার্যকর করা সময়ের দাবি।

বাঙালির আশার বাতিঘর শেখ হাসিনা। তিনি তার জীবনকে বাংলার মেহনতি দুঃখী মানষের কল্যাণে উৎসর্গ করে এগিয়ে যাচ্ছেন বিশ্ব মানবতার দিকে দুর্বার গতিতে। গণমানুষের কল্যাণই তার রাজনীতির মূল দর্শন। ১৯৭৫ সালের শুরুতেই প্রশ্ন ছিল কেন শেখ হাসিনা টার্গেট।

১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর ১৯৮১ সালের শুরুতে দলের দায়িত্ব নিয়ে দলকে তিনি শুধু চারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ই আনেননি; বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে যেমনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি উদার, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি এখন তিনি। বাঙালির জাতীয় বোধ জাগ্রত রাখার কারিগর শেখ হাসিনা। যার হাতে বাঙালি রাষ্ট্র ও বাঙালির সংস্কৃতি নিরাপদ। জঙ্গিবাদকে নির্মূল ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই। আর এ কারণেই তার নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য বার বার তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে ঘাতকচক্র।

আদর্শিক বিরোধের কারণে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানকে নির্মূল করার এমন পাশবিক ঘটনা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। শেখ হাসিনা বার বার বুলেট ও গ্রেনেডের মুখ থেকে বেঁচে ফেরা এক বহ্নিশিখা। তিনি মানবতার জননী। বিশ্বের এক রোল মডেল। তাকে হত্যার জন্য কম প্রচেষ্টা চালানো হয়নি। এখনও তৎপর ঘাতককুল। কিন্তু জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত তিনি অপ্রতিরোধ্য অদম্য বাংলাদেশ গড়ে তুলছেন। কোনো ভয় তাকে কাবু করতে পারে না। জাতিকে তিনি অভয়মাঝে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্রমান্বয়ে। জয় হোক অভয়ের।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি দেড় কোটি মানুষ
৩০০ ক্ষুধার্তকে খাদ্য বিতরণ পুলিশের
রোগীর চাপ বাড়ছে করোনা হাসপাতালে
কোকা-কোলা, ফলের রসে ভুয়া করোনা পজিটিভ
ভারতে করোনা প্রতিরোধী বিশ্বের প্রথম প্লাজমিড ডিএনএ টিকা

শেয়ার করুন

‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’

‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’

শরতের শান্ত শ্যামল রৌদ্রছায়ার সঙ্গে ধানের খেতে ঢেউ খেলে যায় আবহমান বাংলার কৃষকের প্রাণ। কারণ কৃষিভিত্তিক এ দেশে শরৎই আগাম বারতা নিয়ে আসে সুদিনের সুদৃঢ় নিশ্চয়তার, বেঁচে থাকার অনিঃশেষ আশ্বাস জানিয়ে দেয়, নবান্ন সমাগত।

আষাঢ়-শ্রাবণের অঝোর বর্ষণ শেষে মেঘাচ্ছন্ন সকাল ধীরে ধীরে উজ্জ্বল, পরিপাটি হতে থাকে। পাতার ফাঁক গলে সোনালি সূর্যের কিরণ মৃত্তিকার বুকে অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে আসে শ্বেতশুভ্র শরৎ।
এবারেও শরৎ এসেছে চুপিচুপি, ঠিক গেল বছরের মতো। শ্রাবণের রেশ এখনও কাটেনি। থেমে থেমে বৃষ্টি, বর্ষাকেই মনে করিয়ে দেয় প্রবলভাবে৷ মহামারি না কি জলবায়ুর পরিবর্তন; কোন কারণে ঋতু বৈচিত্র্যের এ অঞ্চলের ঋতুরা ভিন্ন আচরণ করছে বোঝা যাচ্ছে না। অথচ শুভ্রাকাশে সাদা মেঘের সঙ্গে হালকা মৃদুমন্দ হাওয়া মিলেমিশে তৈরি হওয়া চমৎকার মনমোহন আবেশই বলে দিত শরৎ এসেছে।
ঋতু বৈচিত্র‍্যের সেই প্রকৃতি কেমন যেন পাল্টে গেছে। বছরের অল্প কিছু সময় বাদ দিলে বাকি সময়টা তীব্র গরমের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মাঝেমধ্যে বৃষ্টিও হয়। সেই বৃষ্টিতে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে ভ্যাপসা গরমে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের জাঁতাকলে পড়ে শরৎ তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে অনেকখানি, বিন্যাসে এসেছে পরিবর্তন। তাই তো শরতের এই দ্বিতীয় পক্ষেও বলতে হচ্ছে 'আবার শ্রাবণ হয়ে এলে ফিরে, মেঘ-আঁচলে নিলে ঘিরে'।
শরৎ ঠিক তেমনই এক ঋতু যা শীত-গ্রীষ্মের মেলবন্ধন তৈরি করে। শরতের শেষদিকে শীতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে সবাই। বর্ষার অনুজ্জ্বল দিনের পর শরতের হালকা সাদা মেঘের মতো আমাদের মনও যেন হালকা হতে থাকে। শরতের দিনগুলোকে তাই স্বপ্নের মতোই মনে হয়। মনের গহীনে ছড়িয়ে থাকা নানা রকমের স্বপ্ন কুড়িয়ে আমরা ভবিষ্যতের মালা গাঁথি।

শরতের আকাশ-বাতাস, নদী-ফুল, প্রকৃতি; সবকিছুই শান্ত স্নিগ্ধ মায়াময়। বিলের শাপলা, নদীতীরের কাশফুল, উঠোনের শিউলি সবই কোমল, স্নেহমাখা। যখন বিলের মন্থর বাতাসে দোল খায় শাপলা ফুলেরা, যখন টুপটাপ ঝরে পড়ে শিউলি ফুল, যখন ঢেউহীন শান্ত নদীর দুকূল ছাপিয়ে দৃশ্যমান হয় কাশবনের রুপালি নান্দনিক দৃশ্য, তখনই মনোজগতে অনুভূত হয়- শরৎ এসেছে।
শরতের স্নিগ্ধতাকে মোহময় করে তোলে এ মৌসুমের বিচিত্র ফুলেরা। নদী কিংবা জলাশয়ের ধারে ফোটে কাশ, ঘরের আঙিনায় শিউলি বা শেফালি, খাল-বিল, পুকুর-ডোবায় থাকে অসংখ্য জলজ ফুল। শেষরাতে মৃদু কুয়াশায় ঢেকে থাকা মায়াবী ফুলেরা যেন আরও রূপসী হয়ে ওঠে।

শিশিরভেজা শিউলি, বাতাসে মৃদু দোল খাওয়া কাশবনের মঞ্জরি, পদ্ম-শাপলা-শালুকে আচ্ছন্ন জলাভূমি শরতের চিরকালীন রূপ। সত্যিই বিচিত্র রূপ নিয়ে শরৎ আমাদের চেতনায় ধরা দেয়। মেঘ, আকাশ আর কাশফুলের ছায়া পড়ে নদীর নীলজলে। এমন মনোলোভা দৃশ্য শরৎ ছাড়া অন্যকোনো ঋতুতে দেখা পাওয়া ভার।
প্রকৃতির এক শুদ্ধ রূপ শরৎ। শরতের প্রকৃতি বর্ষার অবগুণ্ঠন ভেদ করে শুভ্রতার আচ্ছাদনে আবিষ্ট হয়ে অনন্য সাধারণ হয়ে ওঠে। জলহারা শুভ্র মেঘের দল নীল নির্জন নির্মল আকাশে উদ্দাম ভেসে বেড়ায়। সেই সঙ্গে কাশফুলের মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া প্রকৃতিতে শুধুই মুগ্ধতা ছড়ায়। তখনই স্নিগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে স্মৃতিতে দোলা দেয়, চঞ্চল চপলতায় নিমগ্ন হতে মন চায়।

সোনা ঝরা সকাল, নির্লিপ্ত দুপুর, রুপালি বিকেল কিংবা শান্ত নির্মেঘ সন্ধ্যার পর ভরা পূর্ণিমায় উদ্ভাসিত আলোয় স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে চরাচর। অলৌকিক সৌন্দর্যে মোহময় মায়ায় প্রবল ঘোর তৈরি হয়। কবিগুরুর বন্দনাতেও সেই মুগ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। এই শরতেই প্রিয়তমাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন- “তোমায় দেখেছি শারদ প্রাতে, তোমায় দেখেছি মাধবী রাতে।”
কামিনী শেফালী টগর ছাতিম কাশফুল আর গগনশিরীষের শৈল্পিক শুভ্রতার সঙ্গে দিনভর মায়াময় আলোছায়ার খেলা আর রাতের স্নিগ্ধ মোহময় জ্যোৎস্না গায়ে মেখে রোজকার জীবনের কঠিন বাস্তবতায় হতাশা আর কষ্টের মাঝেও শুভ্রতার পরশে সজীব হয়ে ওঠে প্রাণ। বিমগ্ন হৃদয় আত্মহারা হয়ে দুঃখকে সাথি করেই এগিয়ে যেতে চায়- “দুঃখকে আজ কঠিন বলে,/ জড়িয়ে ধরতে বুকের তলে,/ উধাও হয়ে হৃদয় ছুটেছে,/ প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে।”

নদীর তীরে, বনের ধারে, মেঠোপথে, গ্রামের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, এমনকি শহরের কোলাহলেও একটুখানি জলমগ্ন স্থানে অপরূপ শোভা ছড়িয়ে বিকশিত হয় কাশফুল । বিলে-ঝিলে শাপলা-শালুক, পদ্মরা মেলে ধরে তাদের মোহময় মাধুর্য। এমন নিরুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুলকিত করেনি তেমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শরতের শান্ত স্নিগ্ধ রূপ মনে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়- “শরৎ-আলোর আঁচল টুটে,/ কিসের ঝলক নেচে উঠে,/ ঝড় এনেছ এলোচুলে,/ তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে।” শরৎকে কি ভোলা যায়?

নির্জন মাঠে নিঃশব্দে বেড়ে ওঠা সবুজ ধানের নয়নাভিরাম দৃশ্য, শুধু কৃষকের হৃদয় মন জুড়ায় না, প্রতিটি প্রাণ উন্মনা হয়, চোখে সোনালি স্বপ্ন খেলা করে, খুশির ঝিলিক বয়ে যায়।

শরতের শান্ত শ্যামল রৌদ্রছায়ার সঙ্গে ধানের খেতে ঢেউ খেলে যায় আবহমান বাংলার কৃষকের প্রাণ। কারণ কৃষিভিত্তিক এ দেশে শরৎই আগাম বারতা নিয়ে আসে সুদিনের সুদৃঢ় নিশ্চয়তার, বেঁচে থাকার অনিঃশেষ আশ্বাস জানিয়ে দেয়, নবান্ন সমাগত।

নিস্তরঙ্গ জীবনে বাংলার ঋতুরা বৈচিত্র্য আর ভালোবাসার পসরা নিয়ে আসে প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দিতে। সুখ-দুঃখের একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর জীবনে একটুখানি অনুরক্তি আসক্তি দোলা দেয়, আশা জাগায়।

স্নিগ্ধ শান্ত শুভ্র শরৎও হৃদয়কে আর্দ্র করে, অবসাদ দূর করে জাগতিক জীবনে এনে দেয় অপার্থিব মোহনীয় কাব্যময়তা। বেঁচে থাকাটা অর্থপূর্ণ মনে হয়। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব বাদ দিয়ে বিচিত্রতর উপলব্ধি নিয়ে সামনের পানে এগোতে ইচ্ছে করে-“আমার রাত পোহালো শারদ প্রাতে। বাঁশি, তোমায় দিয়ে যাব কাহার হাতে।”

হৃদয়ের গোপন গভীর থেকে আত্মতুষ্টির রিনিঝিনি দ্যোতনা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র অস্ত্বিত্বে, নতুন করে বাঁচার অনুভূতি জাগে- জীবন সত্যিই আনন্দময়।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক।

আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি দেড় কোটি মানুষ
৩০০ ক্ষুধার্তকে খাদ্য বিতরণ পুলিশের
রোগীর চাপ বাড়ছে করোনা হাসপাতালে
কোকা-কোলা, ফলের রসে ভুয়া করোনা পজিটিভ
ভারতে করোনা প্রতিরোধী বিশ্বের প্রথম প্লাজমিড ডিএনএ টিকা

শেয়ার করুন

চলমান শিক্ষাভাবনা

চলমান শিক্ষাভাবনা

একটি জাতির সংস্কৃতি তার ভাষার বাহনে চড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা হারিয়ে ফেললে প্রজন্ম সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফলে যেকোনো অশুভ শক্তি আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করতে পারবে সহজে। পাকিস্তানি শাসকচক্র এ সত্য ১৯৪৭ সালেই বুঝেছিল। তাই বাংলা ভাষার ওপরই প্রথম আঘাত করে। আমাদের পূর্বসূরিরা আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে আত্মপরিচয়কে সমুন্নত রাখতে পেরেছিল। কিন্তু চৈতন্য-বিচ্ছিন্ন আমরা নানাভাবে একে লালন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

সম্প্রতি স্কুলশিক্ষায় নতুন কারিক্যুলাম-ভাবনা উপস্থাপন করেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। এ রূপকল্প ২০২৩ থেকে কার্যকর করার কথা রয়েছে। প্রাথমিক দৃষ্টিতে রূপকল্পটি উৎসাহব্যঞ্জক। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসবে বলে আমরা মনে করি। তবে কিছু ক্ষেত্রে পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কারের অবকাশ রয়েছে। আশা করব দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মন্ত্রণালয় সেসব বিষয় বিবেচনা করবে। এখানে বড় প্রশ্ন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি নিয়ে আমরা কতটা সক্রিয় হতে পারছি এবং সে বিষয়টির ওপর কতটা দৃষ্টি দেয়া হচ্ছে।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভাষা প্রশ্নে নড়েচড়ে ওঠি। বাংলা ভাষার মর্যাদা নিয়ে কথা বলি। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে পৃথিবীর তাবৎ ভাষার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিয়ে আমাদের দায়দায়িত্বের কথাও বলি।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে মুখর-মুখরা জ্ঞানীজন টকশো মুখরিত করে। চমৎকার শব্দমালায় বক্তৃতার মঞ্চ আমোদিত হয়। পত্রিকার পাতায় নানা শিরোনামে প্রকাশিত হয় নিবন্ধ। আসলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিনগুলোর গুরুত্ব এখানেই যে, অন্তত সেই বিশেষ দিন যে চৈতন্য ধারণ করে আছে, সারা বছর তা পাথরচাপা থাকলেও বছরের বিশেষ সময়ে দৃশ্যমান হয়। এতেও যদি নতুন করে দেশের কিছুসংখ্যক মানুষ এবং নীতিনির্ধারকগণ প্রাণিত হতে পারে- তাহলেইবা মন্দ কী!

একুশ আমাদের অহঙ্কার হলেও একুশের মূল চেতনা থেকে আমরা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছি। এটি আমাদের সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষা সংকটের বড় দিক। এ সংকট তৈরি হচ্ছে প্রধানত সংস্কৃতিবোধ ও ইতিহাস চেতনা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে। যেখানে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চা জরুরি সেখানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন শিক্ষার ধারায় ইতিহাস পাঠকে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে।

ভাষা-আন্দোলনের পর প্রায় সত্তর বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যতটুকু বিকাশ ঘটার কথা ছিল তার সিকিভাগও হয়নি। কিছু ক্ষেত্র আবার অপূর্ণ স্বাজাত্যবোধের কারণে ভূতের পায়ে হেঁটে পিছিয়েও গেছে। এমন কথাও চলে আসছে যে, বিশ্বায়নের যুগে বাংলা ভাষাচর্চা অত জরুরি কেন? এখন বিশ্ব-সংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসাব- বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে পড়ে থাকা কেন? ফলে একই দেশে তিন-চার ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা অসম প্রতিযোগিতায় এগোচ্ছে। এই জগাখিচুড়ির মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি।

স্পষ্টতই চারটি শিক্ষাধারা এখন প্রচলিত। মূলধারার বাংলা মাধ্যম স্কুল এবং এর ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, আলিয়া-ধারার মাদ্রাসা এবং কওমি মাদ্রাসা। আগে বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর পাঠক্রম ও পরিচর্যাতে বাংলাচর্চায় ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের সচেতনতা যতটা ছিল, এখন আর তেমনটি নেই। এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলে এ প্লাস বা স্বর্ণখচিত এ প্লাস পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকগণ শুদ্ধ বানান ও ভাষায় বাংলাচর্চার দিকে মনোযোগ দেয়ার সময় পাচ্ছে না।

তাই দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন ভুল বানান আর দুর্বল বাক্যগঠনে উত্তরপত্র লেখে তখন বোঝা যায় সংকটটি কোথায়। আমার মতো ষাটোর্ধ্ব অনেকেই স্মরণ করতে পারবে শুদ্ধ বানান আর বাক্যে বাংলা-ইংরেজি লেখাটা স্কুলই শিখিয়ে দিত। এখন এসবের ধার ধারে না কেউ।

এক পৃষ্ঠা ইংরেজি লেখায় একটি শব্দের বানানে ‘ই’-এর বদলে ‘এ’ হয়ে গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়। এমন আকাটমূর্খ ছাত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন শিক্ষক-অভিভাবক। অপরদিকে বাংলা বানান পাঁচটা ভুল করলেও অর্ধেকটা চোখে পড়ে শিক্ষকের। বাংলা বানানে ভুল আর বাক্য গঠনে সাধু-চলিত মিশে গেলেও তা গর্হিত অপরাধ নয় জেনে শিক্ষার্থী অবিচল থাকে। এ কারণে বর্তমানে শিক্ষকতায় আসা (স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত) তরুণ শিক্ষকদের একটি বড় অংশের বাংলা ভাষা আর বানানের দুর্বলতা তাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পল্লবিত হচ্ছে।

অপরদিকে বিশ্বায়নের অপূর্ণ ব্যাখ্যায় আর চারপাশের ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার দাপটে মূলধারার বাংলা মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীরা এক ধরনের হতাশা ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে না ঘরকা না ঘাটকা দশায় পৌঁছেছে।

ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে দ্রুত। দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি শেখার তেমন অবকাশ নেই এদের পাঠক্রমে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন এ প্রজন্মের অনেকে। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, এ ধারার শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠক্রম বিন্যাসের দুর্বলতার কারণে যতটা ভালো ইংরেজি বলতে পারছে তত ভালো দখল দেখাতে পারছে না ইংরেজি ভাষা ও গ্রামারে। বিশেষ করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এদের মধ্যে দেশাত্মবোধ তৈরি হওয়াটা খুব কঠিন।

আলিয়া-ধারার মাদ্রাসাশিক্ষা বাংলা মাধ্যমের সঙ্গে অনেকটাই সম্পর্কিত। তাই বাংলা মাধ্যম শিক্ষার অনুরূপ সংকট এই অঞ্চলেও রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সংকটে আছে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ কওমি মাদ্রাসায় পড়ে। আরবি, ফারসি ও উর্দু কওমি মাদ্রাসার শিক্ষামাধ্যম। বাংলা ও ইংরেজির সঙ্গে এদের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। দেশ, জাতি ও জাতীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অনেকের ধারণাই খুব অস্পষ্ট। এরা নিজেদের এবং দেশ ও সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে।

একটি জাতির সংস্কৃতি তার ভাষার বাহনে চড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা হারিয়ে ফেললে প্রজন্ম সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফলে যেকোনো অশুভ শক্তি আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করতে পারবে সহজে। পাকিস্তানি শাসকচক্র এ সত্য ১৯৪৭ সালেই বুঝেছিল। তাই বাংলা ভাষার ওপরই প্রথম আঘাত করে। আমাদের পূর্বসূরিরা আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে আত্মপরিচয়কে সমুন্নত রাখতে পেরেছিল। কিন্তু চৈতন্য-বিচ্ছিন্ন আমরা নানাভাবে একে লালন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

এক ধরনের উগ্র আধুনিকতা ও অপূর্ণ বৈশ্বিক ভাবনা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজার অর্থনীতির বিকৃত ধারণা থেকে আমরা বাঙালি সংস্কৃতির বিকলাঙ্গ অবয়ব উপস্থাপন করছি। আমাদের চারপাশে অর্থবিত্তে আভিজাত্য খোঁজা অনেক পরিবারকেই পাওয়া যাবে যাদের বাংলা ভালো বলতে না পারা বা লিখতে না পারার মধ্যে এক ধরনের অহমিকার ছোঁয়া থাকে।

আমার শিক্ষক প্রয়াত খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিক ক্লাসে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি গল্প বলেছিলেন। ভাষা প্রশ্ন সামনে এলে এ গল্পটি নতুন করে মনে পড়ে আমার। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে স্যার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ছিলেন। সে সময়ে তাদের বাসায় এক বিহারি ভিক্ষুক আসত। ভিক্ষা চাইত তার ভাষা উর্দুতে। মুক্তিযুদ্ধের পর একদিন স্যারের দরজায় সেই বৃদ্ধ ভিখারি। যথারীতি উর্দুতেই ভিক্ষা চাচ্ছে। আমার মুক্তিযোদ্ধা স্যারের কাছে এবার বিসদৃশ লাগল। তিনি বললেন, বাংলায় ভিক্ষা না চাইলে তিনি ভিক্ষা দেবেন না। এবার অসহায় হয়ে পড়ল ভিক্ষুক। উপসংহার টানলেন স্যার। বললেন, ও বেচারা হয়ত ঢাকায় কাটিয়ে দিয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় সময়। কিন্তু জীবনযাত্রার কোনো পর্যায়েই তার বাংলা শেখার দায় পড়েনি। ভাঙা-আধাভাঙা উর্দুতে তাকে সাহায্য করেই আমরা গৌরব বোধ করেছি। অর্থাৎ আমরা আমাদের আত্মমর্যাদাবোধকেই যেন খুঁজে পাইনি।

সামাজিক জীব হিসেবে বসবাস করতে হয় বলে নিজের নেয়া শপথ নিজেকেই ভাঙতে হয়। বাঙালি পরিবারের বিয়ে ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে ইংরেজি ভাষায় দাওয়াতপত্র পেলে তেমন অনুষ্ঠানে যাব না বলে এক সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত সামাজিকতার দায়ে সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারিনি। এই প্রবণতা ইদানীং অনেক বেড়েছে। ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমলা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারও ইংরেজিতে দাওয়াতপত্র লিখে আত্মপ্রসাদ লাভ করে। আমাদের সমাজবাস্তবতায় বিয়ের অনুষ্ঠানে শিক্ষিত-স্বল্পশিক্ষিত নানা স্তরের মানুষকে দাওয়াত দিতে হয়।

এক সময় দেখতাম ডাকঘরে অশিক্ষিত মানুষের চিঠি লিখে দেয়ার জন্য পয়সার বিনিময়ে লেখক থাকত। এখন বোধহয় বিয়ের দাওয়াতপত্র পড়ে দেয়ার জন্য আরেকটি পেশা সৃষ্টি হতে পারে। বেশ কবছর আগের কথা। তখন সরদার ফজলুল করিম স্যার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন ক্লাস নিতে। স্যারকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, এক বাঙালি আরেক বাঙালিকে তার সামাজিক অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে দাওয়াত করে কেন? মৃদু হেসে স্যার বলেছিলেন, এটি এক ধরনের শ্রেণিচরিত্র। অর্থবিত্ত বা অবস্থানে সে যে একটু উঁচুতে তা প্রকাশের একটি সুযোগ খোঁজে এখানে। এ ধারার সবাই এই শ্রেণিভুক্ত হতে চায়।

প্রজন্মকে স্বাজাত্যবোধ থেকে দূরে সরাতে আমাদের টিভি চ্যানেল আর বেসরকারি রেডিও কম কসরত করছে না। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তৈরি অনেক অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ‘প্রিয় দর্শক’-এর বদলে ‘হাই ভিউয়ার্স’ বলে হাত-পা ছুড়ে মাঝেমধ্যে অদ্ভুত উচ্চারণে ইংরেজি শব্দ বলে খাওয়ার অযোগ্য এক খিচুড়ি বানাতে থাকে। এসব অনুষ্ঠানের প্রভাবও কম নয়। ক্যাম্পাস বা পথঘাটে তরুণ-তরুণীর শব্দচয়ন ও অঙ্গভঙ্গি দেখলে এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

বাংলা একাডেমি একটি প্রমিত বাংলা বানানরীতি প্রণয়ন করেছে। আবার জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তাদের বই লেখার জন্য একটি বানানরীতি ধরিয়ে দেয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে লিখতে গিয়ে আরেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আমার প্রমিত বানানরীতির কোনো কোনো বানান সংশোধন করা হয়। জানতে চাইলে বলা হয়, এটি এই পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালা। এসব অসংগতি দেখলে বোঝা যায় একুশের চেতনা আমাদের চৈতন্যোদয় ঘটাতে পারেনি এখনও। এই চেতনা অন্য ভাষাকে বৈরী জ্ঞান করা নয়- নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্মান দেয়া।

আত্মগৌরববোধ ছাড়া প্রজন্ম দেশপ্রেমিক হতে পারে না। নিজদেশ নিয়ে বড় স্বপ্ন বুনতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের শূন্যতা রয়েছে। আমরা প্রজন্মকে ঐতিহ্যসচেতন করে তুলতে পারছি না। তাই আত্মমর্যাদার জায়গাটি খুব স্পষ্ট নয় প্রজন্মের সামনে।

আরও লক্ষ করব, প্রস্তাবিত শিক্ষা-সংক্রান্ত নীতিতে বৃত্তিমূলক ও নিত্য ব্যবহারিক বিষয় যতটা গুরুত্ব পেয়েছে জ্ঞানভিত্তিক মানবিক বিষয় চর্চার অবকাশ ততটা নয়। স্কুল শিক্ষার্থী দেশপ্রেমের প্রথম পাঠ পাবে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কারিক্যুলামের ভেতর থেকে।

পৃথিবীর কোনো দেশেরই সভ্য ও মেধাবী নীতিনির্ধারকরা চায় না তাদের শিক্ষার্থীরা রোবটের মতো বেড়ে উঠুক। মানবিক গুণসম্পন্ন প্রজন্ম পেতে হলে তাকে মানবিক বিষয়গুলো চর্চা করাতে হবে। আগে বিবেচনা করতে হবে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রস্তাবিত ১০টি বইয়ের মধ্যে আলাদা বই না হয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা ধরনের বই সমাজ পাঠের অন্তর্ভুক্ত হবে, না সমাজ পাঠ থেকে বের করে ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়কে পূর্ণ পাঠের ব্যবস্থা করা হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চলের সব দেশপ্রেমিক মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে বাস্তবতার নিরিখে জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির নীতি প্রণয়ন করে তবে নতুন প্রজন্মের মনে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলা সম্ভব হবে। দেশাত্মবোধহীন জাতি কি দেশের সার্বিক উন্নয়নের দায়িত্ব নিতে পারে?

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি দেড় কোটি মানুষ
৩০০ ক্ষুধার্তকে খাদ্য বিতরণ পুলিশের
রোগীর চাপ বাড়ছে করোনা হাসপাতালে
কোকা-কোলা, ফলের রসে ভুয়া করোনা পজিটিভ
ভারতে করোনা প্রতিরোধী বিশ্বের প্রথম প্লাজমিড ডিএনএ টিকা

শেয়ার করুন

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষোদগারকারীদের চিহ্নিত করা দরকার 

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষোদগারকারীদের
চিহ্নিত করা দরকার 

আমরা ক্ষমতায় আছি, আমরা তো আপনাদের হত্যা করছি না, এমনকি হত্যার কথা বলা দূরের কথা- ওই রকম কোনো চিন্তাও করছি না, আপনাদের আত্মীয়-স্বজনদের খুঁজে বের করার কথাও বলছি না। তাহলে আপনারা আমাদের হত্যার কথা কেন বলছেন? আমরা যদি এখন আপনাদের হত্যার হুমকি দেই, বিষয়টি কেমন হবে? আওয়ামী লীগ হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কিংস পার্টি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াই জাতির পিতাকে হত্যা করে এদেশে হত্যা আর ষড়যন্ত্রের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষোদগারকারী তাজ হাশমি, সামসুল আলম, কনক সরওয়ারসহ যেসব চতুষ্পদ প্রাণী প্রতিনিয়ত বাংলাদেশবিরোধী অশ্লীল অপপ্রচার করে যাচ্ছে, তাদের আর কোনো ছাড় নয়। বিদেশে অবস্থান করার কারণে তাদের সাময়িক সময়ের জন্য আইনের আওতায় আনা না গেলেও তাদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। তারা প্রতিনিয়ত আমাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়াসহ অপপ্রচার করে যাচ্ছে, এই প্রাণীরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে ভিডিও বার্তায় হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত বাংলাদেশবিরোধী ঘৃণা আর বিষোদ্গার ছড়াচ্ছে। এক ভিডিও বার্তায় দেখলাম তাজ হাশমি নামে এক ব্যক্তি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরাসরি হত্যার হুমকি দিচ্ছে, পাশাপাশি রাষ্ট্রবিরোধী নানা অশ্লীল কথা বলছে। এটি দেখার পর কোনো সুস্থ মানুষ স্থির থাকতে পারে না।

আমরা লক্ষ করছি, বেশ কিছু দিন ধরে বিএনপি ও তাদের সমমনা কিছু রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনবরত আমাদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, তারা এই সরকারের পতন ঘটাবে, সরকার পতনের পর তারা আওয়ামী লীগের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করবে, কাউকে দেশ থেকে পালাতে দেবে না, কেউ প্রাণে বাঁচবে না- ইত্যাদি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকও এই ধরনের ইঙ্গিত দিলেন।

আমার কথা পরিষ্কার। আপনারা ক্ষমতায় এলে আমাদের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করবেন, কারণ আমরা অনেক খারাপ। আপনারা অনেকেই দেশে আছেন, আর যারা বিদেশে বসে এইগুলো বলছেন তাদের আত্মীয় স্বজনরা বাংলাদেশেই আছেন। আমরা ক্ষমতায় আছি, আমরা তো আপনাদের হত্যা করছি না, এমনকি হত্যার কথা বলা দূরের কথা- ওই রকম কোনো চিন্তাও করছি না, আপনাদের আত্মীয়-স্বজনদের খুঁজে বের করার কথাও বলছি না।

তাহলে আপনারা আমাদের হত্যার কথা কেন বলছেন? আমরা যদি এখন আপনাদের হত্যার হুমকি দেই, বিষয়টি কেমন হবে? আওয়ামী লীগ হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কিংস পার্টি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াই জাতির পিতাকে হত্যা করে এদেশে হত্যা আর ষড়যন্ত্রের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে। আপনারা তার লিগেসিই বহন করছেন।

একটা কথা বলে রাখি, আমরা আপনাদের মতো চতুষ্পদ প্রাণীদের যথোপযুক্ত শাস্তি দিতে প্রস্তুত আছি। আমাদের রাষ্ট্র এবং আমাদের নেত্রী জাতির পিতার কন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার মর্যাদা রক্ষার্থে আপনাদের মতো রাষ্ট্রবিরোধী দুষ্টচক্রকে নির্মূল করতে যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি। আমরা বাংলাদেশে আপনাদের বাড়ি-ঘর কোথায় তা জানতে পেরেছি। আপনাদের আত্মীয়স্বজন কারা তাদেরকেও আমরা চিনি। নামে-বেনামে আপনাদের অনেকেরই বাংলাদেশে বাড়ি-ঘর, সম্পত্তি এমনকি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর আপনাদের যারা উস্কে দিচ্ছে, তাদের সবার পরিচয়, তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিবরণ গোপন নয়।

পশ্চিমা দেশগুলোতে আমাদের মিশনগুলোকেও বলব, রাষ্ট্রবিরোধী এই দুষ্টচক্রটিকে আর ছাড় নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষায় এদের বিরুদ্ধে ডিপ্লোমেটিক চ্যানেলসহ অন্য সকল রুটে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

আমাদের শরীরে জাতির পিতার আদর্শের রক্ত । ৭৫-এর কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। পিতার আদর্শের একজন সৈনিক হিসেবে প্রতিনিয়ত সেই ব্যথা অনুভব করি। খুনি চক্র এবং তাদের প্রেতাত্মাদের আমরা নির্মূল করবই ইনশাল্লাহ। এই যুদ্ধে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ নতুন প্রজন্ম আমাদের সঙ্গে রয়েছে।

লেখক: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি দেড় কোটি মানুষ
৩০০ ক্ষুধার্তকে খাদ্য বিতরণ পুলিশের
রোগীর চাপ বাড়ছে করোনা হাসপাতালে
কোকা-কোলা, ফলের রসে ভুয়া করোনা পজিটিভ
ভারতে করোনা প্রতিরোধী বিশ্বের প্রথম প্লাজমিড ডিএনএ টিকা

শেয়ার করুন

বিচারকের ভুল কি ‘সরল বিশ্বাসে’ হয়?

বিচারকের ভুল কি ‘সরল বিশ্বাসে’ হয়?

একজন নারীকে পর পর তিন দফায় রিমান্ডে নেয়া যায় কি না— তা নিয়ে নানা মহলেই প্রশ্ন ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও বিষয়টির সমালোচনা শুরু হয়। পরীমনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। প্রশ্ন হলো- বিচারক এমন কাজ কেন করবেন যে, তাকে ক্ষমা চাইতে হবে? রিমান্ড কখন কাকে কোন পরিস্থিতিতে দেয়া যায়, সেটা না জেনেই কি তারা বিচারক হয়েছেন? আদালতে বসে বিচারকরা ক্ষমা চাওয়ার মতো আর কী কী করেন?

চিত্রনায়িকা পরীমনিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডে পাঠানো নিম্ন আদালতের দুই বিচারক হাইকোর্টে ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, তারা কাজটি করেছেন সরল বিশ্বাসে। দাবি করেছেন, ‘এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল’।

প্রসঙ্গত, গত ৪ আগস্ট রাতে প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে পরীমনি ও তার সহযোগী দীপুকে আটক করে র‌্যাব। পরদিন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পরীমনি ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। এর পর ৩ দফায় মোট ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় তাকে। কিন্তু বাসায় মাদক পাওয়া গেছে— এমন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় একজন নারীকে পর পর তিন দফায় রিমান্ডে নেয়া যায় কি না— তা নিয়ে নানা মহলেই প্রশ্ন ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও বিষয়টির সমালোচনা শুরু হয়।

পরীমনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। প্রশ্ন হলো- বিচারক এমন কাজ কেন করবেন যে, তাকে ক্ষমা চাইতে হবে? রিমান্ড কখন কাকে কোন পরিস্থিতিতে দেয়া যায়, সেটা না জেনেই কি তারা বিচারক হয়েছেন? আদালতে বসে বিচারকরা ক্ষমা চাওয়ার মতো আর কী কী করেন?

সরকারি কর্মচারীদের আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় অস্ত্রের নাম ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’। যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য প্রকাশ্যে কোনো নাগরিককে গুলি করে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাহলে তদন্ত রিপোর্টে উক্ত অপরাধকে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত’ কিংবা ‘আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি’ বলে উল্লেখ করে অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেয়া সম্ভব।

মূলত সব আইনের শেষাংশে এই ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বিষয়টি যুক্ত করে গণকর্মচারীদের সুরক্ষা দেয়া হয়। এমনকি নাগরিককে তথ্য দিতে বাধ্য করার বিধান ‘তথ্য অধিকার আইন’ও যদি কোনো কর্মকর্তা জেনে-বুঝে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে লঙ্ঘন করেন, তারপরও তার এই কাজকে সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ বলে প্রমাণ করা সম্ভব এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা আইনের এই ধারাবলে সুরক্ষা পেতে পারেন। যেহেতু সব আইনের খসড়া সরকারি কর্মকর্তারাই করেন, ফলে তারা আত্মরক্ষা ও সুরক্ষার জন্য একটি পথ সব সময়ই খোলা রাখেন। আইনের এই বিধানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, ‘সরল বিশ্বাস’ বলতে কী বোঝায়, তা আইনে সুস্পষ্ট নয়।

যে কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ একবার বলেছিলেন, ‘পেনাল কোড অনুযায়ী সরল বিশ্বাসে সরকারের কোনো কর্মচারী অপরাধ করলে সেটি অপরাধ নয়’। ওই সময়ে তার বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় বইলেও আসলে এটি নতুন কিছু নয়। ইকবাল মাহমুদ একটি পুরোনো কথাই নতুন করে বলেছেন। তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতি করলেও যে তিনি সরল বিশ্বাসে পার পেয়ে যাবেন— দুদক চেয়ারম্যান তা বলেননি।

বাস্তবতা হলো- যেকোনো আইন যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সেখানে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে এই যে ধারাটি থাকে, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের দায়মুক্তির সুযোগ এত বেশি থাকে যে, যেকেউ চাইলে এটির অপপ্রয়োগ করতেই পারেন।

হালের সবচেয়ে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও এই সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধের বিধান যুক্ত আছে। ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত কোনো কার্যের ফলে কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হইবার সম্ভাবনা থাকিলে, তজ্জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না।’ অর্থাৎ বায়বীয় অভিযোগে পুলিশ যদি কারো বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা নেয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয়রানির শিকার হন, তাতে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। কারণ তিনি এটা প্রমাণ করে দেবেন যে, কাজটি তিনি সরল বিশ্বাসে করেছেন।

প্রশ্ন হলো, সরল বিশ্বাসের সংজ্ঞা কী এবং এটা কে ঠিক করবেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাজটি না বুঝে করেছেন? আইনে সরল বিশ্বাসের কোনো ব্যাখ্যা নেই। এটা নির্ভর করে যিনি ঘটনাটি তদন্ত করবেন এবং যিনি বিচার করবেন, তাদের ওপর। ফলে পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্য অথবা প্রজাতন্ত্রের অন্য যেকোনো পর্যায়ের কোনো কর্মচারী যদি কোনো নাগরিককে হয়রানি করেন, বিপদে ফেলেন, ফাঁসিয়ে দিয়ে পয়সা খান অথবা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে একজন নাগরিকের জীবন বিপন্ন হয়, তারপরও ওই কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সুরক্ষা দেয়ার বিধান আইনেই রয়েছে। বাস্তবতা হলো- আমাদের সব আইন সরকারি কর্মচারী এবং আইন প্রয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে যতটা আন্তরিক, নাগরিককে সুরক্ষা দিতে ততটা নয়।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখেও এটি বলা যায় যে, জগতের সবাই ভুল করলেও বিচারক ভুল করবেন না; সবাই অন্যায় ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও বিচারকরা এর ঊর্ধ্বে থাকবেন— এটিই প্রত্যাশা। কিন্তু এই চাওয়া ও পাওয়ার মাঝখানে ব্যবধান যে বিস্তর, সেটি নানা সময়ে নানা ঘটনায় দৃশ্যমান হয়। সুতরাং বিচারকের ভুলকে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে গণ্য করার সুযোগ রয়েছে কি না— সে প্রশ্নও তোলা দরকার। কারণ তিনি বিচার করেন যুক্তি-তর্ক ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে।

অন্য যেকোনো পেশার মানুষের ভুল আর বিচারকের ভুল এক জিনিস নয়। একজন বিচারক কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসির দণ্ড দিয়ে বলতে পারেন না যে তিনি সরল বিশ্বাসে এই দণ্ড দিয়েছেন। বরং তাকে যুক্তি তর্ক ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই দণ্ড অথবা খালাস দিতে হয়।

এখানে আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সম্ভবত এ কারণেই পরীমনিকে রিমান্ড দেয়া ওই দুই বিচারকের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি হাইকোর্ট। বরং উচ্চ আদালত মনে করছেন যে, তাদের ব্যাখ্যায় হাইকোর্টকে উল্টো হেয় করা হয়ছে। ফলে তাদের কাছে আবার ব্যাখ্যা চেয়ে আদেশের জন্য ২৯ সেপ্টেম্বর দিন ঠিক করা হয়েছে। দেখা যাক, ওইদিন দুই বিচারক আবার কী ব্যাখ্যা দেন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট কী আদেশ দেন।

ঘটনাটি পরীমনির জামিন ইস্যুতে হলেও রিমান্ড নিয়ে নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ ও প্রশ্ন অনেক পুরোনো। রিমান্ডে নেয়া কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট আইন রয়েছে। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা আছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে—এমন অভিযোগও ভুরি ভুরি।

রিমান্ডে নিয়ে আসামিদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয়, তা মোটামুটি সবাই জানেন। না জানারও কোনো কারণ নেই। প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের অনেকেই রিমান্ডে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কেউ কেউ এ নিয়ে বইপত্রও লিখেছেন। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের একটি বইয়ের নাম ‘কারাগারে কেমন ছিলাম’। অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদের একটা বইয়ের নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগস্টের ঘটনা গ্রেপ্তার রিমান্ড ও কারাগারের দিনগুলি’। অধ্যাপক ড. মো আনোয়ার হোসেনের বইয়ের নাম ‘কাঠগড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : রিমান্ড ও কারাগারের দিনলিপি’। এরকম আরও অনেকেই বই লিখেছেন।

সুতরাং রিমান্ডে কী হয়, সেটি কারো অজানা নয়। দেশের অত্যন্ত সম্মানজনক মানুষ ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদেরও রিমান্ডে নিয়ে যে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়, সেটিও নতুন কোনো খবর নয়।

সন্দেহভাজন আসামি বা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেয়ার বিষয়ে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল ১৫ দফা নির্দেশনাসহ একটি যুগান্তকারী রায় দেন হাইকোর্ট, যা ২০১৬ সালে বহাল রাখেন আপিল বিভাগও। রায়ে আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ এবং রিমান্ডে নেয়ার বিষয়ে ১৬৭ ধারা সংশোধনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল; কিন্তু উল্লিখিত দুটি ধারা সংশোধন করে আপিল বিভাগের নির্দেশনা এখনও যুক্ত করা হয়নি।

ফলে পুলিশ নানা অজুহাতে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করছে; কখনও জোর করে আসামিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করছে। নির্যাতনে অনেক সময় আটক ব্যক্তির মৃত্যুও হচ্ছে। প্রশ্ন হলো- রিমান্ডে নির্যাতনের বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অমান্য করে, তাহলে সেটি আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি না?

সুতরাং চিত্রনায়িকা পরীমনির ইস্যু নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্ক নতুন মাত্রা পেল, এবার এর একটি বিহিত হোক। রিমান্ড যে চাইলেই পাওয়া যায় না; যে কাউকে রিমান্ড দেয়া যায় না; রিমান্ডে যে কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়; একজন অপরাধীকে রিমান্ডে নিলেও যে তার মানবাধিকারের বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়— সে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়া দরকার। সেসঙ্গে রিমান্ডে নিয়ে মারধর না করার শর্তে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টি সবার জানা— সেটিরও অবসান হওয়া দরকার।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি দেড় কোটি মানুষ
৩০০ ক্ষুধার্তকে খাদ্য বিতরণ পুলিশের
রোগীর চাপ বাড়ছে করোনা হাসপাতালে
কোকা-কোলা, ফলের রসে ভুয়া করোনা পজিটিভ
ভারতে করোনা প্রতিরোধী বিশ্বের প্রথম প্লাজমিড ডিএনএ টিকা

শেয়ার করুন

পরীমনি ও ইভানার জয়-পরাজয়!

পরীমনি ও ইভানার জয়-পরাজয়!

পরী যখন সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থোড়াই কেয়ার করে কাঁটা বিছানো পথে সদর্পে হাঁটেন, তখন তার জন্য সবার তো ভালোবাসা ঝরে পড়ার কথা, অথচ ঝরে না। ঝরে ইভানার জন্য, কারণ ইভানার গল্প আপনাদের চেনা, পরীরটা নয়।

‘পরীমনি দেশ ও জাতির জন্য কী করেছেন’- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত অনেকেই। তাদের অনেককে দেখছি স্কলাস্টিকা স্কুলের ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সিলর ইভানা লায়লা চৌধুরীর ‘আত্মহননের’ খবরে নড়েচড়ে উঠেছেন।

নড়াচড়া করা খারাপ নয়, এতে বরং নিত্যনতুন সামাজিক আলাপ-আলোচনা বহাল থাকে। মানুষ তথা সমাজ ঋদ্ধ হয়। তবে লক্ষ করলাম, তাদের এই নড়াচড়া ইভানার স্বামী ও শ্বশুরপক্ষীয়রা কতটা অত্যাচারী ছিলেন এবং তার বাবা-মা কতটা নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন, যা তাকে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে- সেটি নিয়ে।

দেখা গেল যারা পরীমনি ইস্যুতে হাওয়ায় ভাসছিল, পরীর নাম শুনলে যাদের বিবমিষা জাগছিল, যারা বলছিল পরী খারাপ, বেয়াদব, উদ্ধত, তিনি বঙ্গসমাজের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ আচরণ করছেন, আজ তারাই ইভানার নির্যাতনের কাহিনি বলে আহাজারি করছে।

পরীমনিকে যারা ‘ধুরো, বাংলা সিনেমার সস্তা নায়িকা। ওকে নিয়ে কীসের আলাপ!’ বলে পরীর পাতা উল্টে ফেরদৌসি কাদরীকে সামনে আনছিলেন, বোঝাতে চাচ্ছিল, ‘দেখ, অর্জন কোনটা? আসল রেখে নকলের পিছনে ছুটছ তোমরা?’- সেই তারাই এখন ইভানাকে নিয়ে আলোচনা তুলছে।

স্যরি টু সে, ইভানার প্রতি তাদের ‘সমবেদনা’র ধরন আমাকে হতাশ করছে। পাশাপাশি ঘটে যাওয়া পর পর কিছু ঘটনায় তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশের ভিন্নতা দেখে আমার এই হতাশা।

আমি বলছি না যে ইভানার মৃত্যু দুঃখজনক নয়। অবশ্যই দুঃখজনক, তবে তারা যদি কেবল চেনা চরিত্রের জন্য দুঃখবোধ করে আর চরিত্র অচেনা হলেই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় তখন বলতেই হবে তাদের অবস্থান ‘পক্ষপাতমূলক’। তারা খুব চেনা পথে হাঁটে। কারণ তারা জানে, স্বামী ও শ্বশুরপক্ষীয়ের হাতে নির্যাতিত নারীর পক্ষ নেয়া সহজ।

ইভানার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যে সম্পর্কের মধ্যে দিনের পর দিন অপমান-অবহেলা, অত্যাচার জড়িয়ে ছিল সে পরিস্থিতি তৈরিতে তিনি নিজেও ভূমিকা রেখেছেন। তিনি অত্যাচারিত হওয়াকে সজ্ঞানে মেনে নিয়েছিলেন।

নির্যাতিত হতে হতে মহৎ স্ত্রী হতে চেয়েছেন। হতে চেয়েছিলেন বাবা-মায়ের আদর্শ সন্তান, কারণ তারা বিয়ে বিচ্ছেদ কাম্য না বলে মানিয়ে নিতে বলেছিলেন। সহায়তা করেননি। একটা ভয়ংকর বিষাক্ত সম্পর্ক ইভানা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। বাবা-মা বা সমাজের দিকে তাকিয়ে এক সময়ে এই বিবেচনায় গিয়ে পৌঁছেছিলেন যে, ‘বিয়ে বিচ্ছেদ অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়।’

আহা বিয়ে! যে বিয়ে সারাক্ষণ দেয় অপমান, অবহেলা। সেজন্য প্রাণপাত করা যায়, তবু বের হয়ে আসা যায় না। শুধু ইভানা নয়, এরকম উদাহরণ ভুরি ভুরি আছে। তিক্ত দাম্পত্য তাই বলে বিচ্ছেদ! কখনও নয়। নিজেও বিচ্ছেদে যাবে না, পার্টনারকেও যেতে দেবে না।

যারা বলবে এত কি সহজ বের হয়ে আসা? এর উত্তর হলো, একদমই সহজ নয়, কিন্তু একটা চলনসই চাকরি, বাবা-মায়ের দর্শনীয় সামাজিক অবস্থান, বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে ইভানার মতো মেয়েরা যখন কোমরে জোর পান না, নীরবে মরে যান আমার তখন কষ্ট হয় না। ভীষণ রাগ হয়। জীবনের কী অপচয়! সম্ভাবনার কী অপচয়!

তাই ‘শিক্ষিত’, ‘এলিট’ লোকজন যখন মা-বাবাকে দোষী করি যে, কেন তারা নিজের মেয়ের পাশে সময়মতো দাঁড়ালেন না? মেয়েকে নরক থেকে উদ্ধার করলেন না তাহলে মেয়েটি বেঁচে যেত, ফুটফুটে শিশুগুলো মাকে পেত তখন আমার আরও রাগ হয়।

হায়! আপনারা এ কোন ধরনের এলিট, শিক্ষিত যারা ইভানার শ্বশুরবাড়িতে অবহেলিত হওয়া, নির্যাতিত হওয়াকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেন এবং আশ্রয় না দেবার জন্য বাবা-মাকে উল্টো দোষী করেন। কেন বলেন না ইভানার নিজেকে নির্যাতিত হতে দেয়া ঠিক হয়নি। ইভানার মতো মেয়ের নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়া উচিত ছিল। আপনারা কি তবে ইভানার নির্যাতিত রূপই পছন্দ করেন? আর তাই ইভানাদের নিজের সিদ্ধান্ত নিজের নিতে না পারার অক্ষমতাকে প্রশ্নই করেন না।

অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পরেও নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচার ব্যর্থতাকে বাহবা জানান, স্বামীকে, বাবা-মাকে দোষারোপ করেন। চেতন-অবচেতনে আপনাদের কি তবে ইভানার মতো আদর্শ স্ত্রী ও কন্যা হতে চাওয়া নারীই পছন্দ? কেননা এরা সমাজের প্রদর্শিত গাইডলাইনের মধ্যে থেকে ‘ক্ষমতায়িত’ হয়। আর এজন্যই পরীর অবস্থান বুঝতে আপনাদের এত সমস্যা হয়, এত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে।

পরী যখন সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থোড়াই কেয়ার করে কাঁটা বিছানো পথে সদর্পে হাঁটেন, তখন তার জন্য সবার তো ভালোবাসা ঝরে পড়ার কথা, অথচ ঝরে না। ঝরে ইভানার জন্য, কারণ ইভানার গল্প আপনাদের চেনা, পরীরটা নয়।

চেনা গল্পের বাইরে চিন্তা করতে পারেন না বলেই ইভানার পাশে দাঁড়াতে আপনাদের সময় লাগে না, কিন্তু পরী কী করেছে সেটা কয়েক মাসেও টের পান না, উল্টো বলতে থাকেন পরীর অবদান কী?

আপনারা সেসব নারীর জন্য হৃদয় উজার করে কাঁদেন যারা পড়ে পড়ে মার খায়, অত্যাচারিত হয়ে একদিন মরে যায়। অথচ যে মেয়েরা অত্যাচারিত হতে হতে জ্বলে ওঠে, নিজের অহম নিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তোলে, তাদেরকে আপনাদের মনে হয় নাটুকে। বেহায়া!

পরীমনির ছবি নিয়ে নৈতিকতার ধ্বজাধারীরা মোরাল পুলিশিং করতে মাঠে নামলে অথবা এ সমাজ কেমন নারী চায় সে বিষয়ে গাইডলাইন দিলে আপনারা খুশি হন, কারণ তারা আপনাদের মনের কথাটা বলেন। কিন্তু ‘উচ্চ বিদ্যাধারী’ না হয়েও পরী তখনও শক্তি রাখেন প্রকাশ্যে মধ্যমা প্রদর্শনের।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক

আরও পড়ুন:
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি দেড় কোটি মানুষ
৩০০ ক্ষুধার্তকে খাদ্য বিতরণ পুলিশের
রোগীর চাপ বাড়ছে করোনা হাসপাতালে
কোকা-কোলা, ফলের রসে ভুয়া করোনা পজিটিভ
ভারতে করোনা প্রতিরোধী বিশ্বের প্রথম প্লাজমিড ডিএনএ টিকা

শেয়ার করুন