শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে এখনই ভাবা জরুরি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে এখনই ভাবা জরুরি

করোনার এই সময়ে শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়াশোনার সীমিত সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা একেবারেই বঞ্চিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। আর আমাদের দেশে এই ভার্চুয়াল পড়াশোনা দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হয় না।

গেল ১৫ মাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ছে দফায় দফায়। আবারও ছুটি বেড়েছে ৩০ জুন পর্যন্ত। এখনও বোঝা যাচ্ছে না, কবে নাগাদ প্রতিষ্ঠানের ফটক খুলবে। এই মহামারিতে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের বিক্ষিপ্ত ক্ষতি হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে অপরিমেয়। দীর্ঘ সময় স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে বেসরকারি, প্রাইভেট স্কুল এবং কলেজগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। এখানে কর্মরতরা প্রচুর আর্থিক ক্ষতির মুখে, শহর থেকে গ্রামে ছোটাছুটি করেও টিকে থাকতে পারছেন না। কেউ হয়েছেন ফলের দোকানদার, কেউ মুদি, কেউবা চায়ের দোকানদার, কেউ দিয়েছেন লন্ড্রি। কেউ আদি পেশা কৃষিতে ফিরে গেছেন।

আবার কেউবা বেঁচে আছেন অন্যের দাক্ষিণ্যে। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনে অমানিশার কালো মেঘ জমেছে, আর্থিক দৈন্যে ছোট হতে হতে মিশে যেতে বসেছে মাটির সঙ্গে। তবে অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, রাষ্ট্র কারো দায় নেয়নি, পায়নি কেউ কোনো প্রণোদনা। করোনা পুরোপুরি বিনাশ হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান আর কোনো দিনও আলোর মুখ দেখবে না বললে অত্যুক্তি হবে না।

অপরদিকে এই বন্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতির মারাত্মক দিকটির সঙ্গে চার কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনও ডুবে আছে অন্ধকারে, যা কোনো অর্থমূল্যেই শোধ হবে না।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ১৪টি দেশের একটি বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বহুমাত্রিক প্রভাবে ছিন্নভিন্ন হতে বসেছে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে একটি শিক্ষাবর্ষের পুরোটাই হারিয়ে গেছে। আরেকটি বর্ষও হারিয়ে যাওয়ার পথে। গবেষণায় এসেছে, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আর কখনোই পড়াশোনায় ফিরবে না। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের দুটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে।

একটি কারণ দীর্ঘ শিখন বিরতির ফলে পাঠ না পারা ও বোঝার পরিস্থিতি এবং অপর সম্ভাব্যটি দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিপতিত হয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজে ভিড়ে যাওয়া। বিশেষ করে মাধ্যমিকে ঝরে পড়াদের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটতে পারে। আর ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থীর মেয়েশিশুদের বিয়ে হয়ে যেতে পারে। দেশে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমের মতো বিষয়গুলো আগে থেকেই প্রকট ছিল, করোনার কারণে তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

আবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ না হওয়ায় কর্মজীবনে প্রবেশ করতে না পেরে তীব্র হতাশায় ভুগছে অনেকেই।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জনসংখ্যার বড় অংশকে গণটিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত করোনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। সেটা দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, মহামারি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে কী হবে?
কঠিন এ প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর জানা না থাকলে অবশ্যই উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার বহুমাত্রিক ক্ষতির সমাধানে আর সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। ক্ষতি যা হওয়ার তা আর কোনোক্রমেই বাড়তে দেয়া যায় না।
করোনার এই সময়ে শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়াশোনার সীমিত সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা একেবারেই বঞ্চিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। আর আমাদের দেশে এই ভার্চুয়াল পড়াশোনা দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হয় না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঘরবন্দি শিক্ষার্থীদের শুধু যে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে তা-ই নয়, পাশাপাশি শারীরিক এবং মানসিক বিকাশও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ছোট থেকে বড় প্রায় সবাই ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত হয়ে পড়ছে, আসক্ত হচ্ছে মাদকেও।

মনোযোগ হারাচ্ছে পড়াশোনায়। বিষণ্ণতা, একাকিত্ব, উদ্বেগ আর মানসিক চাপে শিক্ষার্থীরা হারিয়ে ফেলছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। এমনকি আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যা-প্রবণতার মতো মানসিক ব্যাধিও লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থনীতির চাকা চালু রাখার পাশাপাশি শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আচরণগত পরিবর্তনের কারণে মহামারি পরবর্তী জীবনেও খাপ খাইয়ে নিতে মারাত্মক অসুবিধার সৃষ্টি হবে।
শিক্ষার্থীদের সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উভয়েরই সমান দায়িত্ব এবং গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে পরিবারের কাঁধে পুরো দায়িত্ব এসে পড়ায় পরিবারগুলো এককভাবে এই গুরুদায়িত্ব পালনে হোঁচট খাচ্ছে। শিক্ষার বহুমুখী ইতিবাচক দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সামাজিকীকরণ।

একটি শিশু সামাজিকভাবে গড়ে না উঠলে সে যত বড় বিদ্বানই হোক না কেন, সংকীর্ণতার ঘেরাটোপে বন্দি থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সামাজিকীকরণের জায়গায় পরিবারগুলোও ব্যর্থ হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে অতিরিক্ত চাপে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তাকে সাথি করেই পথ চলতে হবে। সেটাই হবে নতুন স্বাভাবিক জীবন। ইতোমধ্যে অন্য খাতগুলো শুরু হয়েছে শুধু শিক্ষা খাত ছাড়া। হাটবাজার, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন সবই খুলে দেয়া হয়েছে। বিয়েসহ সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতাও বন্ধ নেই। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটছে না। ঝড় এলে উটপাখির মতো বালুতে মাথা না গুঁজে বরং ঝড়ের মোকাবিলা করাটাই যুক্তিযুক্ত।

অনির্দিষ্ট সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না রেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। করোনাকে সঙ্গে নিয়েই ঠিক করতে হবে কর্মপরিকল্পনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে একসঙ্গে না খুলে বরং ধাপে ধাপে খুলতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ নেই বা কম, সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আধুনিক সভ্যতার প্রধানতম ভিত্তি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

শেয়ার করুন

মন্তব্য