এসডিজি অর্জনে সাফল্য

এসডিজি অর্জনে সাফল্য

২০১৫ সালে এসডিজি গৃহীত হওয়ার পর এই প্রথম এর সূচকের স্কোর আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। এর কারণ হলো কোভিড মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া। বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও কোভিড মোকাবিলায় কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যেও বাংলাদেশ অনেক সামাজিক সূচকেই ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে।

খুন, নারী নির্যাতন, গুম, কোভিডে মৃত্যু, ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম ইত্যাদি নানা নেতিবাচক খবরের ভিড়ে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো একটা খবর। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিশ্বের যে তিনটি দেশ সবচেয়ে এগিয়ে আছে, এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্কের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৫ জুন এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের এই সাফল্যের খবর অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এসডিজি অর্জনে এগিয়ে থাকা বাকি দুটি দেশ হলো আফগানিস্তান ও আইভরিকোস্ট। এর মধ্যে আফগানিস্তানের নাম থাকাটা একটা বিস্ময়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত জঙ্গিকবলিত দেশটিতে দশকের পর দশক ধরে চলছে চরম নিরাপত্তা সংকট। জঙ্গিদের আত্মঘাতী বোমা হামলা এখনও দেশটির নিয়মিত দৃশ্য। এর মধ্যেও এসডিজি অর্জনে আফগানিস্তানের সাফল্য উন্নয়ন গবেষকদের কাছে যথেষ্ট বিস্ময়ের।

যাহোক, এসডিজির ক্ষেত্রে অগ্রগতির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নির্ধারিত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

২০১৫ সালে এসডিজি গৃহীত হওয়ার পর এই প্রথম এর সূচকের স্কোর আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। এর কারণ হলো কোভিড মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া। বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও কোভিড মোকাবিলায় কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যেও বাংলাদেশ অনেক সামাজিক সূচকেই ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘ ২০১৫ সালে এসডিজি গ্রহণ করে। এটি ১৫ বছর মেয়াদি। এর উদ্দেশ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। জাতিসংঘ এর আগে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) গ্রহণ করেছিল। এরপরই এসডিজি আসে। এসডিজির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য দূর করা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত ও লিঙ্গবৈষম্য প্রতিরোধ অন্যতম।

এসডিজির এবারের সূচকে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর এ স্কোর ছিল ৬৩ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০১৫ সালে যখন এসডিজি গৃহীত হয়, তখন বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে।

এবারের তালিকায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ফিনল্যান্ড। দেশটির স্কোর ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এর পরের চার দেশ হলো সুইডেন (৮৫.৬%), ডেনমার্ক (৮৪.৯%), জার্মানি (৮২.৫%) ও বেলজিয়াম (৮২.২%)। আর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের স্কোর ৩৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর আগে আছে দক্ষিণ সুদান ও চাদ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ৭০তম স্থানে আছে ভুটান। এরপর আছে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল। এদের অবস্থান যথাক্রমে ৭৯, ৮৭ ও ৯৬তম।

সামাজিক বিভিন্ন অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে তার ভূমিকা, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের করা মন্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে চমকে দেবার মতো সাফল্য আছে বাংলাদেশের। বিশেষত শিক্ষাসুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার ও জন্মহার কমানো, গরিব মানুষের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্যসুবিধা প্রদান এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম অন্যতম।

এমডিজির সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনও বহুপথ পাড়ি দিতে হবে। এসডিজি অর্জনের এখনও প্রধান দুর্বলতা তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি বিচার-বিশ্লেষণ করার মতো প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পর্যন্ত নেই। বৈষম্য দূরীকরণ, শান্তি ও ন্যায়বিচার, জলবায়ু রক্ষায় ভূমিকা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের এখনও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। মানুষের পুষ্টি পূরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।

দেশে এখনও পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩১ শতাংশ শিশু খর্বকায়, ২২ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ওজনস্বল্পতা রয়েছে। নগরে- দারিদ্র্য ও ঘনবসতি, পার্বত্য চট্টগ্রামে- দুর্গম এলাকা, খাদ্য ঘাটতি, ফসলি জমির অভাব, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এবং পোশাক শিল্পে- নারীদের কঠোর পরিশ্রম ও অসচেতনতার কারণে পুষ্টি পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নত হয়নি।

এসডিজিতে ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নারীর মালিকানা স্থাপনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। ভূমির ওপর নারীদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে পরিবার ও জনগোষ্ঠীর খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার নিশ্চয়তা তৈরি হয়। ভূমি কেবল আয়ের উৎস নয়, এটা সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। বিষয়টা এখনও যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

নারীদের জন্য মানসম্মত কাজের পরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে। গার্মেন্টস, কৃষি, ঘর-গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মরত নারী শ্রমিকদের উপযুক্ত কাজের পরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের এমন একটি উন্নয়ন কৌশল দরকার যেখানে শ্রমিক, তার পরিবার ও ওই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি মানসম্মত মজুরি নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করে একজন শ্রমিক সম্মানের সঙ্গে তার জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।

শান্তি ও ন্যায়বিচার বা ন্যায্যতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পরেনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া, সুশাসনের ঘাটতি নারী অধিকার নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নারীর প্রতি সহিংসতাকে সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন যা অন্যান্য উন্নয়ন ও অধিকারের অন্তরায় হিসেবে মনে করা হয়। সহিংসতার ফলে নারী এবং শিশু গৃহহীন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

এর জন্য সকল স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এটা শুরু করতে হবে ঘর থেকে এবং সরকারি উচ্চপর্যায় পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে। তৃণমূল এবং জাতীয়পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ হলো নারী অধিকার, জেন্ডার সমতা, টেকসই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত।

মনে রাখা দরকার যে, এসডিজির লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হলে সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব প্রয়োজন। পদ্ধতিগতভাবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ এসডিজি অর্জনেও সফল হবে।

বাংলাদেশের যেকোনো ভালো প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি সুশাসনও দরকার। এসডিজির পরিকল্পনাগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটা একটা বড় ইস্যু। এর জন্য বিশ্ব অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

সামর্থ্য ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেতে অনেক বেশি বিনিয়োগ, শক্ত-সমর্থ উন্নয়ন সহায়তা, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ প্রয়োজন এবং উন্নত ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক শৃঙ্খলা স্থাপন ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সমুন্নত রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি সক্রিয় ও ক্রমাগত স্থিতিশীল পরিবেশ, সরকারি খাতের সুশাসন এবং সরকার ও বিচার বিভাগের দক্ষতা ও সততা শক্তিশালীকরণ, একটি দ্রুত বর্ধনশীল ও ক্রমবর্ধমান শহুরে শ্রমশক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার ও বিশ্বের দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যকরী ব্যবস্থাপনা।

সর্বোপরি, এসডিজি অর্জনে সফল হতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। উন্নত দেশ হতে হলে ২৪ বছরের মধ্যে দেশের মোট আয় তিন ট্রিলিয়নে উন্নীত করতে হবে। অর্থনীতির আকার ১০ থেকে ২০ গুণ বাড়াতে হবে। যা মোটেও সহজ কাজ নয়।

একথা ঠিক যে, কোভিড-১৯ মহামারি সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করছে। তবে আশার কথা হলো, সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কোভিড-পরবর্তী সময়ে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বেগবান হলে এসডিজি অর্জন অসম্ভব হবে না।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
মডেল মসজিদ ও শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা
শেখ হাসিনা-ম্যাজিকে বদলে গেছে দেশের অর্থনীতি
নৈতিক অবক্ষয় রোধে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন
এমপি, ইউএনও ও আমলাতন্ত্র
সরকারের প্রতিজ্ঞার বিপরীতে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব

শেয়ার করুন

মন্তব্য