বদলে যাক আমলাতন্ত্র

বদলে যাক আমলাতন্ত্র

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনপ্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণ করেন। আর আমলারা সেই নীতি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করেন। আমলারা কিন্তু জনপ্রতিনিধি নন, তাই জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। কিন্তু অনেক দিন ধরেই দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিরাও আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন ভূমিকা রাখেন না। দেশ এখন আমলাশাসিত।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আমার বিট ছিল নির্বাচন কমিশন। তখন আমি ভোরের কাগজের রিপোর্টার। শ্যামল দার (শ্যামল দত্ত, ভোরের কাগজের সম্পাদক) সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছি নতুন। একদিন কমিশনে যেতেই সংবাদের লিটন ভাই (মনির হোসেন লিটন, বর্তমানে একাত্তর টিভিতে কর্মরত) বললেন, আপনাকে মান্নান ভাই খুঁজছেন। মান্নান ভাই মানে এম এ মান্নান, আজকের পরিকল্পনামন্ত্রী; তখন তিনি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব। নির্বাচন পরিচালনায় তখন তার দারুণ ব্যস্ততা। আমি লিটন ভাইকে বললাম, আমি তো অল্প কয়েক দিন এলাম। আমাকে তো মান্নান ভাইয়ের চেনার কথা নয়। খুঁজবেন কেন? লিটন ভাই বললেন, তা জানি না, আপনাকে না চিনলেও ভোরের কাগজের রিপোর্টারকে তো চেনেন, তাকেই খুঁজছেন। মনে মনে একটু শঙ্কিতও হলাম। মাত্র নির্বাচন কমিশন বিটে এসেছি। সামনে নির্বাচন।

এই সময়ে উল্টাপাল্টা কিছু হলে মুশকিল। গেলাম মান্নান ভাইয়ের রুমে। পরিচয় দিতেই তিনি উল্লসিত কণ্ঠে বললেন, আরে আপনাকেই তো খুঁজছি। কাল আমি যে ব্রিফ করেছি, আপনার রিপোর্টে তা যথাযথভাবে উঠে এসেছে। তাই ধন্যবাদ দিতে আপনাকে খুঁজছিলাম। শুনে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সেই থেকে মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে আমার চমৎকার সম্পর্কের শুরু। মন্ত্রী হওয়ার পরও যে তিনি আমলাজীবন নিয়ে গর্ব করেন, সেই জীবনটার একটা পর্ব আমি কাছ থেকে দেখেছি। শুধু আমার সঙ্গে নয়, সাংবাদিকদের সঙ্গে ছিল তার দারুণ সম্পর্ক। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনাও ছিলেন সাবেক আমলা। সব মিলিয়ে সেবার দারুণ দক্ষতায় নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন।

এম এ মান্নান পরে এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। এখন আর তেমন যোগাযোগ নেই বটে, তবে একজন দক্ষ আমলাকে, তার কাজের স্টাইলকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। বাস্তবে আমলাদের হওয়ার কথা জনগণের সেবক। কিন্তু মানতেই হবে, বরাবরই আমলাদের সঙ্গে জনগণের একটা বিশাল ফারাক রয়ে গেছে।

এ জন্য দায় যতটা জনগণের, তারচেয়ে অনেক বেশি আমলাদের। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, তবে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই আমলারা নিজেদের চারপাশে একটা বিচ্ছিন্নতার দেয়াল তুলে দেন। জনগণ বারবার সেই দেয়ালে গিয়ে হোঁচট খায়।

দেশসেরা মেধাবীরাই বিসিএসের নানা ধাপ পেরিয়ে আমলা হন। তবে সাধারণ মানুষের কথা শুনলে মনে হয়, আমলা হওয়াটা বিশাল অপরাধ। আমলাদের সম্পর্কে সাধারণের পারসেপশন হলো- আমলা মানেই ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, গণবিরোধী। শুধু আমলা নয়, কোনো একটি পেশার মানুষকে ঢালাও গালি দেয়ার প্রবণতা তাদের মজ্জাগত।

সাংবাদিক, ডাক্তার, পুলিশ তো প্রতিদিন গালি খাচ্ছে। বাস্তবতাটা হলো, কোনো পেশার মানুষকেই ঢালাও গালি দেয়ার সুযোগ নেই। ভালো ডাক্তার যেমন আছেন, খারাপ ডাক্তারও আছেন। ভালো সাংবাদিক যেমন আছেন, খারাপ সাংবাদিকও আছেন। তেমনি অসৎ আমলা যেমন আছেন, সৎ আমলাও আছেন।

দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখলে মনে হয়, ফেসবুকের সবাই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, সততার পরাকাষ্ঠা। আর সব পেশার মানুষ খারাপ। আমলাদের সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণা, তা যদি সত্যি হতো, তাহলে দেশ এতদিনে টিকতে পারত না। পছন্দ করি আর না করি, দেশটা কিন্তু এখন আমলারাই চালায়।

আমলাতন্ত্র যুগে যুগে ছিল, আছে, থাকবে। আমলাতন্ত্র নিয়ে আমাদের আলোচনা-সমালোচনাও আমলাতন্ত্রের সমান বয়সী। তবে সম্প্রতি নানা কারণে আমলাতন্ত্র নিয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে সচিবালয়ে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে ছয় ঘণ্টা আটকে রাখা, এক উপসচিবের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারের পর আমলাতন্ত্র আরেকবার সমালোচনার শিখরে পৌঁছেছে। শুরুতে সাবেক আমলা, বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের কথা বলছিলাম। কারণ তিনি সম্প্রতি আমলাতন্ত্র নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। এম এ মান্নান বরাবরই একটু সরল ধরনের। যা মনে আসে বলে ফেলেন। সম্প্রতি একনেক বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র মন্দ নয়। আমলাতন্ত্র ভালো।

আমলাতন্ত্রের বিকল্পও তো নাই। কেউ আমলাতন্ত্রের বিকল্প বের করতে পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর বিকল্প বের করতে পারেনি। চীনারা পারেনি। ফেরাউনও পারেনি। খলিফারাও পারেনি। সেই মহান আমলাতন্ত্র আমাদের মাঝেও আছে।’ পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিজেও একসময় ছোটখাটো আমলা ছিলাম। মনেপ্রাণে এখনও বড় আমলা আছি। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কেটেছে আমলাতন্ত্রের ভেতরে। সেই মহান আমলাতন্ত্রের জন্য তাদের যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে সাভারে, সেটির আধুনিকায়ন, সংস্কার, ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, প্রশস্ত, সবকিছু করব। সেখানে ২০তলা অত্যাধুনিক ভবন হবে। তবে আশা করছি তাদের কাজের গতিও আধুনিকায়ন হবে।’

এই প্রকল্পটি নিয়েই আমার একটু বলার আছে। সাভারে লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-পিএটিসির সক্ষমতা বাড়াতে ১ হাজার ২০৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে, একনেক যা অনুমোদনও করেছে। এম এ মান্নান বলেছেন, সেটাই চরম সত্যি।

আমলাতন্ত্রের কোনো বিকল্প কেউ কখনও বের করতে পারেনি। তাই ঢালাও গালি না দিয়ে আমলাতন্ত্রকে কীভাবে জনবান্ধব করা যায় তার উপায় বের করতে হবে। সেক্ষেত্রে পিএটিসির ভূমিকাটাই সবচেয়ে বেশি। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে পিএটিসির অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে তাদের মৌলিক চিন্তায় বদল আনতে হবে। সব আমলাকেই পিএটিসির চৌকাঠ পেরিয়ে আসতে হয়। তাই সেখানে আমলাদের শেখাতে হয় মানবিকতার প্রাথমিক পাঠ।

বিসিএস দিয়েই যেন কেউ প্রশাসক বনে না যান। শেখাতে হবে তারা জনগণের শাসক নয়, সেবক। প্রায়ই পত্রিকায় খবর দেখি, মাঠপর্যায়ের কোনো ছোট আমলাকে ‘স্যার’ না বলায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের অনেক কষ্টে, মেধার অনেক পরীক্ষা দিয়ে আমলা হতে হয়, সেটা মানলাম। কিন্তু আমলা হলেই তাদের ‘স্যার’ বলতে হবে কেন। ভয় দেখিয়ে জনগণের সমীহ আদায় করা যাবে না, ভালোবেসে তাদের হৃদয় জয় করতে হবে।

৩৩৩ তে ফোন করে খাবার চাওয়ার অপরাধে এক গরিব মানুষকে ৪০০ লোকের খাবার দেয়ার শাস্তি বা ছাগল ফুলগাছ খাওয়ায় মালিকের জরিমানা করার ঘটনা আমলাতন্ত্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাই শুধু তৈরি করবে। আমলারা অবশ্যই আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হবেন। একই সঙ্গে তাদের মানবিক হতে হবে, দেশের বাস্তবতা বুঝে কাজ করতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনপ্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণ করেন। আর আমলারা সেই নীতি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করেন। আমলারা কিন্তু জনপ্রতিনিধি নন, তাই জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। কিন্তু অনেক দিন ধরেই দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিরাও আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন ভূমিকা রাখেন না। দেশ এখন আমলাশাসিত। আমলারাই নীতিনির্ধারণ করেন, তারাই তা প্রয়োগ করেন। সব মিলিয়ে একটা স্বেচ্ছাচারী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর জন্য আমি আমলাদের ততটা দোষ দিই না। এই পরিস্থিতি আমরাই তৈরি করেছি। ক্ষমতা পেলে কেউ কেউ তো তার অপব্যবহার করতেই পারে। ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ বেয়ে আসে দুর্নীতি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে এখন এগিয়ে আমলারাই। তবে সবাই তো আর তা করছেন না। কিছু আমলার বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহার, দুর্নীতির অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি শত শত মানবিক, দক্ষ, যোগ্য আমলাও আছে দেশে। তারা আছে বলেই দেশটা এখনও ঠিকঠাকমতো চলছে।

পিএটিসির কাজ হলো তেমন সৎ, দক্ষ, যোগ্য, মানবিক ও দেশপ্রেমিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা। তাতেই দেশের লাভ। এ জন্য পিএটিসির জন্য প্রয়োজনে বরাদ্দ আরও বাড়ানো হোক। তবে আবারও বলছি, সেই বরাদ্দে যেন খালি ভবন বানানো না হয়। হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের সফটওয়্যারেও পরিবর্তন আনতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন
মেকশিফট হাসপাতাল
১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন
কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বিচারকের ভুল কি ‘সরল বিশ্বাসে’ হয়?

বিচারকের ভুল কি ‘সরল বিশ্বাসে’ হয়?

একজন নারীকে পর পর তিন দফায় রিমান্ডে নেয়া যায় কি না— তা নিয়ে নানা মহলেই প্রশ্ন ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও বিষয়টির সমালোচনা শুরু হয়। পরীমনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। প্রশ্ন হলো- বিচারক এমন কাজ কেন করবেন যে, তাকে ক্ষমা চাইতে হবে? রিমান্ড কখন কাকে কোন পরিস্থিতিতে দেয়া যায়, সেটা না জেনেই কি তারা বিচারক হয়েছেন? আদালতে বসে বিচারকরা ক্ষমা চাওয়ার মতো আর কী কী করেন?

চিত্রনায়িকা পরীমনিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডে পাঠানো নিম্ন আদালতের দুই বিচারক হাইকোর্টে ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, তারা কাজটি করেছেন সরল বিশ্বাসে। দাবি করেছেন, ‘এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল’।

প্রসঙ্গত, গত ৪ আগস্ট রাতে প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে পরীমনি ও তার সহযোগী দীপুকে আটক করে র‌্যাব। পরদিন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পরীমনি ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। এর পর ৩ দফায় মোট ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় তাকে। কিন্তু বাসায় মাদক পাওয়া গেছে— এমন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় একজন নারীকে পর পর তিন দফায় রিমান্ডে নেয়া যায় কি না— তা নিয়ে নানা মহলেই প্রশ্ন ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও বিষয়টির সমালোচনা শুরু হয়।

পরীমনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। প্রশ্ন হলো- বিচারক এমন কাজ কেন করবেন যে, তাকে ক্ষমা চাইতে হবে? রিমান্ড কখন কাকে কোন পরিস্থিতিতে দেয়া যায়, সেটা না জেনেই কি তারা বিচারক হয়েছেন? আদালতে বসে বিচারকরা ক্ষমা চাওয়ার মতো আর কী কী করেন?

সরকারি কর্মচারীদের আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় অস্ত্রের নাম ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’। যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য প্রকাশ্যে কোনো নাগরিককে গুলি করে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাহলে তদন্ত রিপোর্টে উক্ত অপরাধকে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত’ কিংবা ‘আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি’ বলে উল্লেখ করে অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেয়া সম্ভব।

মূলত সব আইনের শেষাংশে এই ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বিষয়টি যুক্ত করে গণকর্মচারীদের সুরক্ষা দেয়া হয়। এমনকি নাগরিককে তথ্য দিতে বাধ্য করার বিধান ‘তথ্য অধিকার আইন’ও যদি কোনো কর্মকর্তা জেনে-বুঝে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে লঙ্ঘন করেন, তারপরও তার এই কাজকে সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ বলে প্রমাণ করা সম্ভব এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা আইনের এই ধারাবলে সুরক্ষা পেতে পারেন। যেহেতু সব আইনের খসড়া সরকারি কর্মকর্তারাই করেন, ফলে তারা আত্মরক্ষা ও সুরক্ষার জন্য একটি পথ সব সময়ই খোলা রাখেন। আইনের এই বিধানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, ‘সরল বিশ্বাস’ বলতে কী বোঝায়, তা আইনে সুস্পষ্ট নয়।

যে কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ একবার বলেছিলেন, ‘পেনাল কোড অনুযায়ী সরল বিশ্বাসে সরকারের কোনো কর্মচারী অপরাধ করলে সেটি অপরাধ নয়’। ওই সময়ে তার বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় বইলেও আসলে এটি নতুন কিছু নয়। ইকবাল মাহমুদ একটি পুরোনো কথাই নতুন করে বলেছেন। তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতি করলেও যে তিনি সরল বিশ্বাসে পার পেয়ে যাবেন— দুদক চেয়ারম্যান তা বলেননি।

বাস্তবতা হলো- যেকোনো আইন যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সেখানে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে এই যে ধারাটি থাকে, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের দায়মুক্তির সুযোগ এত বেশি থাকে যে, যেকেউ চাইলে এটির অপপ্রয়োগ করতেই পারেন।

হালের সবচেয়ে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও এই সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধের বিধান যুক্ত আছে। ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত কোনো কার্যের ফলে কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হইবার সম্ভাবনা থাকিলে, তজ্জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না।’ অর্থাৎ বায়বীয় অভিযোগে পুলিশ যদি কারো বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা নেয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয়রানির শিকার হন, তাতে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। কারণ তিনি এটা প্রমাণ করে দেবেন যে, কাজটি তিনি সরল বিশ্বাসে করেছেন।

প্রশ্ন হলো, সরল বিশ্বাসের সংজ্ঞা কী এবং এটা কে ঠিক করবেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাজটি না বুঝে করেছেন? আইনে সরল বিশ্বাসের কোনো ব্যাখ্যা নেই। এটা নির্ভর করে যিনি ঘটনাটি তদন্ত করবেন এবং যিনি বিচার করবেন, তাদের ওপর। ফলে পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্য অথবা প্রজাতন্ত্রের অন্য যেকোনো পর্যায়ের কোনো কর্মচারী যদি কোনো নাগরিককে হয়রানি করেন, বিপদে ফেলেন, ফাঁসিয়ে দিয়ে পয়সা খান অথবা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে একজন নাগরিকের জীবন বিপন্ন হয়, তারপরও ওই কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সুরক্ষা দেয়ার বিধান আইনেই রয়েছে। বাস্তবতা হলো- আমাদের সব আইন সরকারি কর্মচারী এবং আইন প্রয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে যতটা আন্তরিক, নাগরিককে সুরক্ষা দিতে ততটা নয়।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখেও এটি বলা যায় যে, জগতের সবাই ভুল করলেও বিচারক ভুল করবেন না; সবাই অন্যায় ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও বিচারকরা এর ঊর্ধ্বে থাকবেন— এটিই প্রত্যাশা। কিন্তু এই চাওয়া ও পাওয়ার মাঝখানে ব্যবধান যে বিস্তর, সেটি নানা সময়ে নানা ঘটনায় দৃশ্যমান হয়। সুতরাং বিচারকের ভুলকে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে গণ্য করার সুযোগ রয়েছে কি না— সে প্রশ্নও তোলা দরকার। কারণ তিনি বিচার করেন যুক্তি-তর্ক ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে।

অন্য যেকোনো পেশার মানুষের ভুল আর বিচারকের ভুল এক জিনিস নয়। একজন বিচারক কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসির দণ্ড দিয়ে বলতে পারেন না যে তিনি সরল বিশ্বাসে এই দণ্ড দিয়েছেন। বরং তাকে যুক্তি তর্ক ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই দণ্ড অথবা খালাস দিতে হয়।

এখানে আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সম্ভবত এ কারণেই পরীমনিকে রিমান্ড দেয়া ওই দুই বিচারকের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি হাইকোর্ট। বরং উচ্চ আদালত মনে করছেন যে, তাদের ব্যাখ্যায় হাইকোর্টকে উল্টো হেয় করা হয়ছে। ফলে তাদের কাছে আবার ব্যাখ্যা চেয়ে আদেশের জন্য ২৯ সেপ্টেম্বর দিন ঠিক করা হয়েছে। দেখা যাক, ওইদিন দুই বিচারক আবার কী ব্যাখ্যা দেন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট কী আদেশ দেন।

ঘটনাটি পরীমনির জামিন ইস্যুতে হলেও রিমান্ড নিয়ে নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ ও প্রশ্ন অনেক পুরোনো। রিমান্ডে নেয়া কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট আইন রয়েছে। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা আছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে—এমন অভিযোগও ভুরি ভুরি।

রিমান্ডে নিয়ে আসামিদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয়, তা মোটামুটি সবাই জানেন। না জানারও কোনো কারণ নেই। প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের অনেকেই রিমান্ডে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কেউ কেউ এ নিয়ে বইপত্রও লিখেছেন। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের একটি বইয়ের নাম ‘কারাগারে কেমন ছিলাম’। অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদের একটা বইয়ের নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগস্টের ঘটনা গ্রেপ্তার রিমান্ড ও কারাগারের দিনগুলি’। অধ্যাপক ড. মো আনোয়ার হোসেনের বইয়ের নাম ‘কাঠগড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : রিমান্ড ও কারাগারের দিনলিপি’। এরকম আরও অনেকেই বই লিখেছেন।

সুতরাং রিমান্ডে কী হয়, সেটি কারো অজানা নয়। দেশের অত্যন্ত সম্মানজনক মানুষ ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদেরও রিমান্ডে নিয়ে যে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়, সেটিও নতুন কোনো খবর নয়।

সন্দেহভাজন আসামি বা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেয়ার বিষয়ে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল ১৫ দফা নির্দেশনাসহ একটি যুগান্তকারী রায় দেন হাইকোর্ট, যা ২০১৬ সালে বহাল রাখেন আপিল বিভাগও। রায়ে আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ এবং রিমান্ডে নেয়ার বিষয়ে ১৬৭ ধারা সংশোধনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল; কিন্তু উল্লিখিত দুটি ধারা সংশোধন করে আপিল বিভাগের নির্দেশনা এখনও যুক্ত করা হয়নি।

ফলে পুলিশ নানা অজুহাতে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করছে; কখনও জোর করে আসামিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করছে। নির্যাতনে অনেক সময় আটক ব্যক্তির মৃত্যুও হচ্ছে। প্রশ্ন হলো- রিমান্ডে নির্যাতনের বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অমান্য করে, তাহলে সেটি আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি না?

সুতরাং চিত্রনায়িকা পরীমনির ইস্যু নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্ক নতুন মাত্রা পেল, এবার এর একটি বিহিত হোক। রিমান্ড যে চাইলেই পাওয়া যায় না; যে কাউকে রিমান্ড দেয়া যায় না; রিমান্ডে যে কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়; একজন অপরাধীকে রিমান্ডে নিলেও যে তার মানবাধিকারের বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়— সে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়া দরকার। সেসঙ্গে রিমান্ডে নিয়ে মারধর না করার শর্তে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টি সবার জানা— সেটিরও অবসান হওয়া দরকার।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন
মেকশিফট হাসপাতাল
১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন
কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

শেয়ার করুন

পরীমনি ও ইভানার জয়-পরাজয়!

পরীমনি ও ইভানার জয়-পরাজয়!

পরী যখন সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থোড়াই কেয়ার করে কাঁটা বিছানো পথে সদর্পে হাঁটেন, তখন তার জন্য সবার তো ভালোবাসা ঝরে পড়ার কথা, অথচ ঝরে না। ঝরে ইভানার জন্য, কারণ ইভানার গল্প আপনাদের চেনা, পরীরটা নয়।

‘পরীমনি দেশ ও জাতির জন্য কী করেছেন’- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত অনেকেই। তাদের অনেককে দেখছি স্কলাস্টিকা স্কুলের ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সিলর ইভানা লায়লা চৌধুরীর ‘আত্মহননের’ খবরে নড়েচড়ে উঠেছেন।

নড়াচড়া করা খারাপ নয়, এতে বরং নিত্যনতুন সামাজিক আলাপ-আলোচনা বহাল থাকে। মানুষ তথা সমাজ ঋদ্ধ হয়। তবে লক্ষ করলাম, তাদের এই নড়াচড়া ইভানার স্বামী ও শ্বশুরপক্ষীয়রা কতটা অত্যাচারী ছিলেন এবং তার বাবা-মা কতটা নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন, যা তাকে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে- সেটি নিয়ে।

দেখা গেল যারা পরীমনি ইস্যুতে হাওয়ায় ভাসছিল, পরীর নাম শুনলে যাদের বিবমিষা জাগছিল, যারা বলছিল পরী খারাপ, বেয়াদব, উদ্ধত, তিনি বঙ্গসমাজের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ আচরণ করছেন, আজ তারাই ইভানার নির্যাতনের কাহিনি বলে আহাজারি করছে।

পরীমনিকে যারা ‘ধুরো, বাংলা সিনেমার সস্তা নায়িকা। ওকে নিয়ে কীসের আলাপ!’ বলে পরীর পাতা উল্টে ফেরদৌসি কাদরীকে সামনে আনছিলেন, বোঝাতে চাচ্ছিল, ‘দেখ, অর্জন কোনটা? আসল রেখে নকলের পিছনে ছুটছ তোমরা?’- সেই তারাই এখন ইভানাকে নিয়ে আলোচনা তুলছে।

স্যরি টু সে, ইভানার প্রতি তাদের ‘সমবেদনা’র ধরন আমাকে হতাশ করছে। পাশাপাশি ঘটে যাওয়া পর পর কিছু ঘটনায় তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশের ভিন্নতা দেখে আমার এই হতাশা।

আমি বলছি না যে ইভানার মৃত্যু দুঃখজনক নয়। অবশ্যই দুঃখজনক, তবে তারা যদি কেবল চেনা চরিত্রের জন্য দুঃখবোধ করে আর চরিত্র অচেনা হলেই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় তখন বলতেই হবে তাদের অবস্থান ‘পক্ষপাতমূলক’। তারা খুব চেনা পথে হাঁটে। কারণ তারা জানে, স্বামী ও শ্বশুরপক্ষীয়ের হাতে নির্যাতিত নারীর পক্ষ নেয়া সহজ।

ইভানার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যে সম্পর্কের মধ্যে দিনের পর দিন অপমান-অবহেলা, অত্যাচার জড়িয়ে ছিল সে পরিস্থিতি তৈরিতে তিনি নিজেও ভূমিকা রেখেছেন। তিনি অত্যাচারিত হওয়াকে সজ্ঞানে মেনে নিয়েছিলেন।

নির্যাতিত হতে হতে মহৎ স্ত্রী হতে চেয়েছেন। হতে চেয়েছিলেন বাবা-মায়ের আদর্শ সন্তান, কারণ তারা বিয়ে বিচ্ছেদ কাম্য না বলে মানিয়ে নিতে বলেছিলেন। সহায়তা করেননি। একটা ভয়ংকর বিষাক্ত সম্পর্ক ইভানা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। বাবা-মা বা সমাজের দিকে তাকিয়ে এক সময়ে এই বিবেচনায় গিয়ে পৌঁছেছিলেন যে, ‘বিয়ে বিচ্ছেদ অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়।’

আহা বিয়ে! যে বিয়ে সারাক্ষণ দেয় অপমান, অবহেলা। সেজন্য প্রাণপাত করা যায়, তবু বের হয়ে আসা যায় না। শুধু ইভানা নয়, এরকম উদাহরণ ভুরি ভুরি আছে। তিক্ত দাম্পত্য তাই বলে বিচ্ছেদ! কখনও নয়। নিজেও বিচ্ছেদে যাবে না, পার্টনারকেও যেতে দেবে না।

যারা বলবে এত কি সহজ বের হয়ে আসা? এর উত্তর হলো, একদমই সহজ নয়, কিন্তু একটা চলনসই চাকরি, বাবা-মায়ের দর্শনীয় সামাজিক অবস্থান, বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে ইভানার মতো মেয়েরা যখন কোমরে জোর পান না, নীরবে মরে যান আমার তখন কষ্ট হয় না। ভীষণ রাগ হয়। জীবনের কী অপচয়! সম্ভাবনার কী অপচয়!

তাই ‘শিক্ষিত’, ‘এলিট’ লোকজন যখন মা-বাবাকে দোষী করি যে, কেন তারা নিজের মেয়ের পাশে সময়মতো দাঁড়ালেন না? মেয়েকে নরক থেকে উদ্ধার করলেন না তাহলে মেয়েটি বেঁচে যেত, ফুটফুটে শিশুগুলো মাকে পেত তখন আমার আরও রাগ হয়।

হায়! আপনারা এ কোন ধরনের এলিট, শিক্ষিত যারা ইভানার শ্বশুরবাড়িতে অবহেলিত হওয়া, নির্যাতিত হওয়াকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেন এবং আশ্রয় না দেবার জন্য বাবা-মাকে উল্টো দোষী করেন। কেন বলেন না ইভানার নিজেকে নির্যাতিত হতে দেয়া ঠিক হয়নি। ইভানার মতো মেয়ের নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়া উচিত ছিল। আপনারা কি তবে ইভানার নির্যাতিত রূপই পছন্দ করেন? আর তাই ইভানাদের নিজের সিদ্ধান্ত নিজের নিতে না পারার অক্ষমতাকে প্রশ্নই করেন না।

অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পরেও নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচার ব্যর্থতাকে বাহবা জানান, স্বামীকে, বাবা-মাকে দোষারোপ করেন। চেতন-অবচেতনে আপনাদের কি তবে ইভানার মতো আদর্শ স্ত্রী ও কন্যা হতে চাওয়া নারীই পছন্দ? কেননা এরা সমাজের প্রদর্শিত গাইডলাইনের মধ্যে থেকে ‘ক্ষমতায়িত’ হয়। আর এজন্যই পরীর অবস্থান বুঝতে আপনাদের এত সমস্যা হয়, এত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে।

পরী যখন সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থোড়াই কেয়ার করে কাঁটা বিছানো পথে সদর্পে হাঁটেন, তখন তার জন্য সবার তো ভালোবাসা ঝরে পড়ার কথা, অথচ ঝরে না। ঝরে ইভানার জন্য, কারণ ইভানার গল্প আপনাদের চেনা, পরীরটা নয়।

চেনা গল্পের বাইরে চিন্তা করতে পারেন না বলেই ইভানার পাশে দাঁড়াতে আপনাদের সময় লাগে না, কিন্তু পরী কী করেছে সেটা কয়েক মাসেও টের পান না, উল্টো বলতে থাকেন পরীর অবদান কী?

আপনারা সেসব নারীর জন্য হৃদয় উজার করে কাঁদেন যারা পড়ে পড়ে মার খায়, অত্যাচারিত হয়ে একদিন মরে যায়। অথচ যে মেয়েরা অত্যাচারিত হতে হতে জ্বলে ওঠে, নিজের অহম নিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তোলে, তাদেরকে আপনাদের মনে হয় নাটুকে। বেহায়া!

পরীমনির ছবি নিয়ে নৈতিকতার ধ্বজাধারীরা মোরাল পুলিশিং করতে মাঠে নামলে অথবা এ সমাজ কেমন নারী চায় সে বিষয়ে গাইডলাইন দিলে আপনারা খুশি হন, কারণ তারা আপনাদের মনের কথাটা বলেন। কিন্তু ‘উচ্চ বিদ্যাধারী’ না হয়েও পরী তখনও শক্তি রাখেন প্রকাশ্যে মধ্যমা প্রদর্শনের।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক

আরও পড়ুন:
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন
মেকশিফট হাসপাতাল
১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন
কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনার শান্তির উদ্যোগ

শেখ হাসিনার শান্তির উদ্যোগ

শান্তি প্রতিষ্ঠায় পিস হুইলের যে আটটি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু সে বিষয়গুলোকেই তার ভাষণের প্রতিপাদ্য হিসেবে নিয়েছেন। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের থিমটাও তার ভাষণের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছিলেন ও শান্তির ললিত বাণী শুনিয়েছিলেন, তার পথ ধরে তার কন্যাও আজ বর্তমান বিশ্ব উপযোগী শান্তির ললিত বাণী শোনাচ্ছেন। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।

দুনিয়াজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানির কমতি নেই। আজ এক দেশে তো কাল আরেক দেশে অস্ত্রবাজি চলছেই। শোষকগোষ্ঠীর নানামুখী স্বার্থের কারণে থেমে নেই এই যুদ্ধবাজি।

শান্তিনিকতেন বসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত ১৯৩৭ সালে লিখেছিলেন-

‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস,

শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস-

বিদায় নেবার আগে তাই

ডাক দিয়ে যাই

দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে

প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে॥

(প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)

দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয়। পৃথিবীর মানুষ শান্তি চায়। কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে শান্তিপ্রিয় মানুষের কণ্ঠস্বরের চেয়ে গোলাগুলি আর বোমাবাজির ডেসিবেল (শব্দের তীব্রতার পরিমাপক) বেশি। শান্তির জন্য শান্তিপ্রিয় মানুষের উদ্যোগ বেশিরভাগ সময়েই মাঠে মারা যায়। তবু দুনিয়ার মহান মানুষেরা শান্তির জন্য ছুটে বেড়ান। এই উদ্যোগ থেকেই বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘ পর্যন্ত যুদ্ধবিহীন বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮২ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দিবসটিকে ‘শান্তির আদর্শকে শক্তিশালী করার জন্য নিবেদিত’ দিন বলে ঘোষণা করে। এদিনটিতে অস্ত্র সরিয়ে রেখে বিশ্বজুড়ে সম্প্রীতির প্রতি যুদ্ধবাজদের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়। ২০০২ সাল থেকে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় মঙ্গলবারের পরিবর্তে প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস’ হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়।

শান্তির জন্য জাতিসংঘের এই দিবস ঘোষণার আগেই নতুন দেশ হিসেবে জন্মের শুরু থেকেই বাংলাদেশ শান্তির পিছনে ছুটে বেড়িয়েছে। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব সময় শান্তির অন্বেষণে ছুটেছেন। যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই শান্তির ললিত বাণী প্রচার করেছেন।

১৯৭৩ সালের ২৩ মে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি শান্তি পদক পরিয়ে দিয়ে বিশ্ব শান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশচন্দ্র বলেছিলেন- “শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।”

বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন- “লাখো শহীদের রক্তে সিক্ত স্বাধীন বাংলার পবিত্র মাটিতে প্রথম এশীয় শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য আগত শান্তির সেনানীদের জানাই স্বাগতম। উপনিবেশবাদী শাসন আর শোষণের নগ্ন হামলাকে প্রতিরোধ করে ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছি আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শান্তি আর স্বাধীনতা একাকার হয়ে মিশে গেছে। আমরা মর্মে মর্মে অনুধাবন করি বিশ্বশান্তি তথা আঞ্চলিক শান্তির অপরিহার্যতা।...

... আমি নিজে ১৯৫২ সালে পিকিং-এ অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলীয় শান্তি সম্মেলনের একজন প্রতিনিধি ছিলাম। বিশ্ব শান্তি পরিষদের ১৯৫৬ সালের স্টকহোম সম্মেলনেও আমি যোগ দিয়েছিলাম। একই সাথে এটাও আমি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই, বিশ্বশান্তি আমার জীবনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনো স্থানেই থাকুক না কেন, তাঁদের সাথে আমি রয়েছি। আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।”... (সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫৯-৬৬০, বাংলা একাডেমি, সম্পাদক: মোনায়েম সরকার।)

জাতিসংঘ শান্তির জন্য একটি দিন ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছিল ১৯৮১ সালে। তারপর ১৯৮২ সাল থেকে দিবসটি পালিত হতে শুরু করল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো এই জাতিসংঘেই অনেক আগেই শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলা ভাষায় দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘....বাংলাদেশ প্রথম হইতেই শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান ও সকলের প্রতি বন্ধুত্ব- এই নীতিমালার উপর ভিত্তি করিয়া জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করিয়াছে। কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশই কষ্টলব্ধ জাতীয় স্বাধীনতার ফল ভোগ করিতে আমাদেরকে সক্ষম করিয়া তুলিবে এবং সক্ষম করিয়া তুলিবে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা ও বেকারের বিরুদ্ধে লড়াই করিবার জন্য আমাদের সকল শক্তি ও সম্পদকে সমাবেশ ও কেন্দ্রীভূত করিতে। এই ধারণা হইতে জন্ম নিয়াছে শান্তির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি। এই জন্য সমঝোতার অগ্রগতি, উত্তেজনা প্রশমণ, অস্ত্র সীমিতকরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান নীতির সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা-বিশ্বের যেকোনো অংশে যেকোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হউক না কেন, আমরা তাহাকে স্বাগত জানাই। এই নীতির প্রতি অবিচল থাকিয়া আমরা ভারত মহাসাগরীয় এলাকা সম্পর্কে শান্তি এলাকার ধারণা, যাহা এই পরিষদ অনুমোদন করিয়াছে, তাহাকে সমর্থন করি।

আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে শান্তি, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ এলাকায় পরিণত করার প্রতিও সমর্থন জানাই।

আমরা বিশ্বাস করি যে, সমবেত উন্নয়নশীল দেশসমূহ শান্তির স্বার্থকে দৃঢ় সমর্থন করে। জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগুরু জনগণের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা তাঁহারা প্রকাশ করিয়াছেন।

মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শান্তি অত্যন্ত জরুরি এবং তাহা সমগ্র বিশ্বের নর-নারীর গভীর আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটাইবে। এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত শান্তিই দীর্ঘস্থায়ী হইতে পারে।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অঙ্গীকার প্রমাণের জন্য উপমহাদেশে আপস মীমাংসার পদ্ধতিকে আমরা জোরদার করিয়াছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের অভ্যুদয় বস্তুতপক্ষে এই উপমহাদেশে শান্তি কাঠামো এবং স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অবদান সৃষ্টি করিবে। ইহা ছাড়া আমাদের জনগণের মঙ্গলের স্বার্থেই অতীতের সংঘর্ষ ও বিরোধিতার পরিবর্তে মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।”...

(সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৮৬-৬৮৭, বাংলা একাডেমি, সম্পাদক: মোনায়েম সরকার।)

কেবল যুদ্ধ বিরতিতেই যে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না, এটা এখন সর্বজনস্বীকৃত। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অনেকগুলো উপাদান নিশ্চিত করতে হয়।

জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয় ‘পাথওয়ে টু পিস’ (সংক্ষেপে পিটিপি) নামে পিস ম্যাসেঞ্জার অর্গানাইজেশন বা শান্তির দূতিয়ালি সংগঠন। এই সংগঠনের গবেষকরা ২৫ বছরের নিরন্তর গবেষণা করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আটটি বিষয় নির্দিষ্ট করেছেন। তাদের মতে, এই আটটি বিষয়ের সঙ্গে যদি পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের সংযোগ ঘটানো যায় ও মানানো যায়, তাহলে দুনিয়াও শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠবে। যদিও দুনিয়ায় নানা জাতের, নানা চিন্তার, নানা ধর্মের, নানা পরিচয়ের, নানা বয়সের, নানা বর্ণের ও নানান লিঙ্গের মানুষ, তবু এই আটটি বিষয় প্রত্যেক সম্প্রদায় বা সোসাইটির জন্য সমান প্রযোজ্য। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘পিস হুইল’ বা শান্তির চাকা।

শান্তির চাকার আটটি বিষয় হচ্ছে- ১. সরকার, আইন, নিরাপত্তা, ২. শিক্ষা, মিডিয়া, ৩. অর্থনীতি,ব্যবসা ৪. স্বাস্থ্য সম্পর্ক ৫. বিজ্ঞান প্রযুক্তি ৬. ধর্ম, আত্মিক শিক্ষা, ৭. পরিবেশ, বাসস্থান এবং ৮. সংস্কৃতি।

প্রতিবছর আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবসের একটি থিম ঠিক করা হয়। ২০২১ সালে আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবসের থিম ঠিক করা হয়েছে- রিকভারিং বেটার ফর অ্যান একুয়াটেবল অ্যান্ড সাসটেইনেবল ওয়ার্ল্ড বা ন্যায়সংগত ও টেকসই পৃথিবীর জন্য আরও উত্তম পুনরুদ্ধার।

কোভিড-১৯ মহামারির ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে পৃথিবী। কীভাবে পৃথিবীর মানুষ আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে, সে চেষ্টা আমাদের সবার মধ্যে। আমরা সবাই মিলে সৃজনশীলতা দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করব। একটি সহনশীল পৃথিবী পুনর্নির্মাণ করব। যে পৃথিবী হবে আরও সাম্য, থাকবে ন্যায়বিচার, হবে ন্যায়নিষ্ঠ, শুদ্ধ, টেকসই এবং স্বাস্থ্যসম্মত।

এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত হিসাবে পৃথিবীর প্রায় ৬৭ কোটি মানুষ টিকা নিয়েছেন বা নেয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। কিন্তু পৃথিবীর এক শয়েরও বেশি দেশে তখন অবধি এক ডোজ টিকাও পৌঁছেনি। ওই সব টিকাহীন দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যের শিকার। তাদের কারণে পৃথিবীর সব মানুষই কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ করোনা একটি ভয়ংকর সংক্রামক রোগ। যেকোনো বৈষম্য শান্তি বিঘ্নিত করে। আর সেটাই উপলব্ধি করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য বাংলার প্রধানমন্ত্রী এখন জাতিসংঘের সদরদপ্তর নিউইয়র্কে। করোনা ভাইরাসের টিকার মেধাস্বত্ব উঠিয়ে এর ন্যায্যতাভিত্তিক বণ্টনের বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি জোর দেবেন বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা সমস্যা, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু, একীভূত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশ্ব শান্তি, নিরাপদ অভিবাসন, ফিলিস্তিন ও জোর করে বাস্তুচ্যুত করা মিয়ানমারের নাগরিকদের সংকট ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত বিষয়গুলোও তার ভাষণে গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় পিস হুইলের যে আটটি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু সে বিষয়গুলোকেই তার ভাষণের প্রতিপাদ্য হিসেবে নিয়েছেন। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের থিমটাও তার ভাষণের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছিলেন ও শান্তির ললিত বাণী শুনিয়েছিলেন, তার পথ ধরে তার কন্যাও আজ বর্তমান বিশ্ব উপযোগী শান্তির ললিত বাণী শোনাচ্ছেন। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। আশা করা যায়, শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার এই ভূমিকা ‘ব্যর্থ পরিহাস’ হবে না। এবারের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রতিপাদ্য বিষয়ও হচ্ছে ‘আশা।’ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল হবে- সে আশাও তো আমরা করতেই পারি।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন
মেকশিফট হাসপাতাল
১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন
কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

শেয়ার করুন

কাতারের অর্থ ও মধ্যস্থতায় ধরাশায়ী আরববিশ্ব

কাতারের অর্থ ও মধ্যস্থতায় ধরাশায়ী আরববিশ্ব

ইরান ও তুরস্কের উত্তেজনা প্রশমনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে। এসব অসহ্য লাগছে প্রতিবেশী সৌদি ও তার মিত্রদের। কারণ সৌদির অবস্থান তেহরান ও আঙ্কারার বিরুদ্ধে। কিন্তু উপায় নেই সৌদি জোটের। ট্রাম্প প্রশাসন যতটা মাথায় তুলেছিল সৌদি জোটকে, বাইডেন প্রশাসন তার বিপরীত। ইরান-তুরস্কের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসন ফিরলে বেকায়দায় পড়বে সৌদি। তাই কমাস আগে তুরস্কের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খাদ্যসহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে রিয়াদ। ইরান ইস্যুতে থাকছে নমনীয়।

কাতারের রাজধানী দোহায় ২০২০-এর ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় মার্কিন সমর্থিত আফগান সরকারের সঙ্গে তালেবানের শান্তি বৈঠক। দিন পাঁচেক পর আবার বৈঠক হবে বলে ঘোষণা করেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কথা ছিল গুয়ানতানামো কারাগার থেকে ৬ জন তালেবান বন্দিকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে যোগ দেবেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সচিব। কিন্তু কূটনৈতিক দোহা ১৬ সেপ্টেম্বরের আলোচনা ফলপ্রসূ করতে বৈঠকে হাজির করায় স্বয়ং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল রিচার্ড পম্পেওকে। পরে সে বৈঠক চলে টানা ৪ দিন।

মার্কিনদের পক্ষে বৈঠকের কূটনৈতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আফগানবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ। আগে তিনি ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের অধীনস্থ জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। ২০০৪ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত আফগানিস্তান এবং ২০০৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ইরাকের রাষ্ট্রদূত থাকার পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন বারাক ওবামা প্রশাসনের সঙ্গেও।

খলিলজাদকে আফগান উদ্ধার ও তালেবানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের নায়ক বলা হলেও মার্কিন জনগণ বরাবরই তার ভূমিকা সন্দেহের চোখে দেখেছে। যদিও এসবের পেছনে কাতারের সূক্ষ্ম হাত রয়েছে বলে মনে করে অনেকে। সম্প্রতি নিজেকে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে তুলে ধরলেও একটা সময় কূটনৈতিক সংকটে টালমাটাল ছিল পৃথিবীর ছোট অথচ মাথাপিছু আয়ে এক নম্বর দেশ কাতার।

আকস্মিকভাবে ২০১৭ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ইয়েমেন ও আফ্রিকার মুসলিম দেশ মিসর জোটবদ্ধ হয়ে কাতারের সঙ্গে সকল ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। শুরু হয় বিশ্বজুড়ে হইচই। নৃত্যের সঙ্গে পা মিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ।

আকাশ ও নদীপথের সম্পর্ক বন্ধের পাশাপাশি ছিন্ন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক, বন্ধ করে মিডিয়া সম্প্রচার। কাতার পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যসংকটে। এই অবস্থায় দোহার দিকে হাত বাড়ায় তেহরান ও আঙ্কারা। পরে সবকিছু স্বাভাবিক হলেও ততদিনে বিশ্ব-কূটনৈতিক ময়দানে দক্ষ খেলোয়াড় হয়ে ওঠে ছাব্বিশ লাখ জনসংখ্যার দেশটি। দূতিয়ালিতে ভূমিকা রাখে মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোর শান্তিচুক্তিতে।

আফগানিস্তানের তালেবান ইস্যু এখনও তরতাজা। প্রথমে মার্কিনরা ওমানের মাসকটে বসার আহ্বান জানায় তালেবানদের। তালেবানরা ভাবল সেখানে তাদের অনুকূল পরিবেশ এবং নিরপেক্ষ অবস্থান নেই। এমন সময় আসে দোহায় বসার আহ্বান। সেই সমঝোতার ভিত্তিতেই আফগানিস্তান ছাড়ে মার্কিনরা।

শুধু তাই নয়, নিরপেক্ষ শান্তি স্থাপনকারী হিসেবে সুদান সংকট নিরসন, লেবানন এবং ইয়েমেনেও ত্রাতার ভূমিকায় ছিল কাতার। বছরের পর বছর এসব পক্ষের বৈঠক আয়োজনে বিপুল অর্থ ও সময় খরচ করছে দোহা দপ্তর। এরপরও সমঝোতার সপক্ষে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন আরব অঞ্চলে কনিষ্ঠতম শাসক এবং কাতারের নতুন আমির শেখ তামিম বিন হামাদ বিন খলিফা আল থানি।

বর্তমানে কাতার চাইছে আমেরিকা-ইরানের মধ্যকার পরমাণু চুক্তির বিষয় আলোচনার টেবিলে এনে সমঝোতায় পৌঁছাতে। এটি সম্ভব হলে, মধ্যপ্রাচ্য আসবে এক ছাতার নিচে, আর পশ্চিমা বিশ্বের মাস্তানি নেমে যাবে অর্ধেকে। কাতার এর আগে চাচ্ছে তুরস্ক, সৌদি এবং ইরানের কূটনৈতিক ঐক্য।

ইতিমধ্যে সে প্রচেষ্টা হাতে নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন কাতার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ালেও বাইডেন চাচ্ছে কমাতে। এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি তেহরান ও ওয়াশিংটন। তবুও বসে নেই কাতার পররাষ্ট্র দপ্তর।

দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে। এসব অসহ্য লাগছে প্রতিবেশী সৌদি ও তার মিত্রদের। কারণ সৌদির অবস্থান তেহরান ও আঙ্কারার বিরুদ্ধে। কিন্তু উপায় নেই সৌদি জোটের। ট্রাম্প প্রশাসন যতটা মাথায় তুলেছিল সৌদি জোটকে, বাইডেন প্রশাসন তার বিপরীত। ইরান-তুরস্কের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসন ফিরলে বেকায়দায় পড়বে সৌদি। তাই কমাস আগে তুরস্কের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খাদ্যসহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে রিয়াদ। ইরান ইস্যুতে থাকছে নমনীয়।

মধ্যপ্রাচ্যে আর্তুগ্রুলের সৈনিকরা উসমানীয়দের সোনালি সময় ফেরাতে চাইছে তুরস্ক। অপর দিকে ইরান অপ্রতিরোধ্য। চারপাশে মার্কিন চব্বিশটি ঘাঁটি থাকার পরও আধুনিক সব অস্ত্র বানানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে ধর্মগুরু খামেনির নির্দেশে। ইব্রাহিম রাইসি সরকার সৌদির সঙ্গে বসতে রাজি হলেও আগে চাচ্ছে মার্কিনদের সঙ্গে সমঝোতা। তেহরান জানে, মার্কিন-সৌদি সম্পর্ক বেশ পুরোনো। মার্কিনদের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করতে চায় রিয়াদ। সেই রিয়াদের সঙ্গে বসলে আধিপত্য ভাগাভাগি হয়ে যেতে পারে।

পারমাণবিক শক্তির অধিকারী ইরান তা চাইবে কেন? এদিকে ইরান-তুরস্কের সঙ্গে আগে থেকে সুসম্পর্ক রয়েছে আধুনিক অস্ত্র ও অর্থে প্রভাবশালী মস্কো ও বেইজিংয়ের। তাই কাতার চাচ্ছে সম্পর্ক এবং অর্থের জোরে সবার ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করতে।

৪৪১৬ বর্গমাইলের কাতারের অর্থনৈতিক অবস্থান গত বিশ বছর ধরে মাথাপিছু আয়ের হিসাবে শীর্ষে। বিশ্বের প্রায় ৪০টির অধিক দেশে উপসাগরীয় এই ক্ষুদ্র দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে ৩৩৫ বিলিয়ন ডলার। সভরেন ওয়েলথ ফান্ড ইনস্টিটিউটের হিসাবে কাতার বিশ্বের ১৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাজপরিবারের সদস্য শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবর আল থানি জার্মানির ডয়েচ ব্যাংকে বিনিয়োগ করেন ১.৮৫ বিলিয়ন ডলার। কাতার ২০১১ সালে কিনে নেয় স্পোর্ট ইনভেস্টমেন্টস প্যারিস সেইন্ট-জারমেই (পিএসজি) ফুটবল ক্লাব। যে দলে খেলেন গ্রহের সবচেয়ে দামি ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি এবং নেইমার, এমবাপ্পেরা। বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেন জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ নামক ফুটবল ক্লাবটিতেও। তাই দুদেশের মধ্যকার খেলায় জিতে যায় কাতার।

২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দাকালে বারক্লেইসও ক্রেডিট সুইস গ্রুপে বিনিয়োগ করে কয়েক বিলিয়ন ডলার। ২০১২ সালে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে ‘পারমিরা অ্যাডভাইজর্স’ নামের একটি কোম্পানির কাছ থেকে বিলাসবহুল ইতালীয় ফ্যাশন হাউস ভ্যালেন্তিনো ফ্যাশন গ্রুপ কিনে নেয়। এর ৩ বছর পর পশ্চিম ইউরোপের জনপ্রিয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এল কোর্ট ইংলেসের ১০ শতাংশ মালিকানা কেনে। যুক্তরাজ্যে কাতারের বিনিয়োগ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অধিকাংশ বিনিয়োগ বিলাসবহুল আবাসিক এলাকাগুলোতে। ২০১৫ সালে কাতারের একটি কোম্পানি লন্ডনের ক্যানারি ইর্ফ নামের একটি এলাকাও কিনে নেয়। এ ছাড়া লন্ডনে রয়েছে কাতারের অসংখ্য বিনিয়োগ।

রাশিয়ার তেল কোম্পানিতেও কাতারের বড় ধরনের বিনিয়োগ আছে। গত বছর জুলাইয়ে রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গ বিমানবন্দরের ২৪.৯ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে জায়ান্ট তেল কোম্পানি রোজনেক্টের সঙ্গে ১১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সম্পন্ন হয়। রাশিয়ান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডে দেয় ২ বিলিয়ন ডলার। কাতারের নজর যায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। ২০১৫ সালে নিউ ইয়র্কে অফিস খোলে দেশটি। ২০২০ সালে সে দেশের তেল খাতে ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। হলিউডের সিনেমাশিল্পেও রয়েছে দোহার বিনিয়োগ।

কাতারভিত্তিক বিইন মিডিয়া গ্রুপ গত বছর ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কোম্পানি মিরাম্যাক্স কিনে নেয়। ২০১৬ সালে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে কিউআইএ চতুর্থ বৃহৎ বিনিয়োগকারীর অবস্থানে ছিল। গত বছর এম্পায়ার স্টেট রিয়েলিটি ট্রাস্ট ইনকর্পোরেশনের ১০ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় কাতার। এ ছাড়া ৮.৬ বিলিয়ন ডলারের মিশ্র মালিকানা রয়েছে ব্রুকফিল্ড প্রোপার্টি পার্টনার্সের।

কাতারের নজর ফিরে এশিয়ার দিকে। হংকং, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের সঙ্গে কাতারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রসারিত হচ্ছে। আগামী ৬ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে অফিস বানাতে চাইছে বেইজিং ও নয়াদিল্লিতে। অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের দেশটি বৈশ্বিক রাজনীতিতেও ক্রমাগত ভূমিকা রাখছে। ইসরায়েলকে উৎখাত করতে ফিলিস্তিনের হামাসকে অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দেয় দেশটি।

সৌদি জোট যেসব দাবিতে কাতারকে একঘরে করার চেষ্টা করছে- তার একটি হলো হামাসকে অর্থসহায়তা বন্ধ করা। না হয় আরবদের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইসরায়েলের বন্ধুত্ব, সমস্যায় পড়বে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক। উত্তেজনা আরও চরম আকার ধারণ করে মিসরের ইসলামপন্থি দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেয়ায়। যে দলটির তালেবান ও আল-কায়েদা সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, সুসম্পর্ক ইরানের সঙ্গেও।

কাতারের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের, তিউনিসিয়ার আন্না হাদা মুভমেন্ট ও লিবিয়ার বিভিন্ন ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলকে এবং তুরস্কের একে পার্টিসহ বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি দলের দিকে সমর্থনের অভিযোগও আছে । তাদের এমন সমর্থনে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দেশগুলো পড়ছে হুমকির মুখে।

ইরানের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসন সমঝোতায় বসলে সুবিধা হবে কাতারেরও। কারণ ইরাক সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রে ইরানের ব্যাপক প্রভাব। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীরা থাকে তেহরানের ছত্রছায়ায়। লেবানন-সিরিয়ায়ও আছে তাদের শক্ত অবস্থান। তালেবান রাষ্ট্র আফগানিস্তান ইরানের অনুকরণে গঠন করছে সরকার। পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, তুরস্কের সঙ্গে ভাই ভাই সম্পর্ক। বৈশ্বিক এই বলয় ভাঙতে গেলে ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই আমেরিকার হাতে।

কাতার কূটনীতিবিদরা জানে এমন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে আমেরিকা এবং বাকি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বোঝাপড়ার যেকোনো উদ্যোগে তাদের পরিপূর্ণ সমর্থন থাকার বার্তাই দিচ্ছে। আর এটা বাস্তবায়িত হলে ভেঙে পড়বে সৌদি জোট। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে উঠবে আমেরিকার কৌশলগত মিত্র দেশ কাতার। তাছাড়া আমেরিকা-ইরান সমঝোতায় মধ্যস্থতা করতে পারলে এশিয়ায় বাড়বে কাতারের মান-মর্যাদা।

লেখক: কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন
মেকশিফট হাসপাতাল
১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন
কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

শেয়ার করুন

বিশ্বব্যাংক ধোয়া তুলসী পাতা নয়

বিশ্বব্যাংক ধোয়া তুলসী পাতা নয়

কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করেই, ঋণের টাকা ছাড় না করেই মোড়লের মতো এই সংস্থার মাতব্বরি শুরু করে দেয়ার ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি কবছর আগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি; চুক্তিও করেছিল সরকারের সঙ্গে। কিন্তু অর্থ ছাড় না দিয়েই, প্রকল্পের কাজ শুরু না হতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে কাল্পনিক অভিযোগ করে বসে সংস্থাটি। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি- বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার। বিষয়টি কানাডার আদালত অবধি গড়ায়। দেড় বছর ধরে চলা দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেবে না বলে নিজস্ব অর্থে সেতুটি নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দুর্নীতি মানে শুধু টাকা এ হাত-ও হাত করা নয়। দুর্নীতির মানে ক্ষমতার অপব্যবহার। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তথ্য এ দিক-ও দিক করে কোনো রিপোর্ট বা প্রতিবেদন বিশ্বববাসীর কাছে তুলে ধরা কোন ধরনের দুর্নীতি- তা আমার জানা নেই। আর সেই প্রতিবেদনের কারণে যদি কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতাচ্যুত হন বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন- তাহলে সেটা দুর্নীতির মধ্যে পড়বে কি না, সে বিষয়েও আমার কোনো ধারণা নেই।

কিন্তু, এই কাজটি যদি বিশ্ব আর্থিক খাতের মোড়ল সংস্থা বিশ্বব্যাংক করে থাকে তাহলে কিন্তু আমার কথা আছে। যে সংস্থাটি উঠতে-বসতে বাংলাদেশসহ তামাম দুনিয়ার মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবক দেয়, আর্থিকসহ নানা খাতের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলে; তাদের কথামতো না চললে বা কাজ না করলে কোনো দেশকে ঋণ দেয় না। নানা শর্ত মেনে কোনো প্রকল্পে ঋণ দিলেও একটু এদিক-সেদিক হলেই সেই টাকা আবার ফেরত নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলে দেয়া হয় সেই দেশের সরকারকে; অনিশ্চিত হয়ে পড়ে প্রকল্পটির ভবিষৎ। উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হন সেই দেশ বা প্রকল্প এলাকার জনগণ।

শুধু কি তাই, কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন না করেই, ঋণের টাকা ছাড় না করেই মোড়লের মতো এই সংস্থার মাতব্বরি শুরু করে দেয়ার ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি কবছর আগে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুতে ঋণ দিতে চেয়েছিল সংস্থাটি; চুক্তিও করেছিল সরকারের সঙ্গে। কিন্তু অর্থ ছাড় না দিয়েই, প্রকল্পের কাজ শুরু না হতেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে কাল্পনিক অভিযোগ করে বসে সংস্থাটি। এই প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি- বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার। বিষয়টি কানাডার আদালত অবধি গড়ায়। দেড় বছর ধরে চলা দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ২০১২ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেবে না বলে নিজস্ব অর্থে সেতুটি নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাকিটা ইতিহাস; সবারই জানা…!

এই তো আর কমাস! তারপরই স্বপ্নপূরণ। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে বাস চলবে; চলবে ট্রেন। উন্নয়নের আরেক মহাসড়কে উঠবে বাংলাদেশ। জিডিপিতে যোগ হবে এক থেকে দেড় শতাংশ। দুই অঙ্কের (১০ শতাংশ) জিডিপিতে অগ্রসর হওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে।

এরই মধ্যে থলের বিড়াল বের হতে শুরু করেছে। যে সংস্থার এত বড় কথা; কত মাতব্বরি- সেই বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধেই এখন গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। আর সেই অভিযোগটি হচ্ছে, চিলির সমাজতান্ত্রিক সরকারের বদনাম করতে অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ বা ‘ব্যবসা করার সূচক-বিষয়ক প্রতিবেদন’ তৈরি করেছিল বিশ্বব্যাংক।

ব্যবসা করার পরিবেশ কোথায় সবচেয়ে অনুকূল, এর নিরিখে ২০০৬ সাল থেকে প্রতিবছর বিশ্বের ১৯০ দেশের একটি তুলনামূলক তালিকা ও রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে বিশ্বব্যাংক। এ রিপোর্টকে ভিত্তি করেই বহু বিদেশি বিনিয়োগকারী কোন দেশে বিনিয়োগ করবে বা কোন দেশ থেকে সরে আসবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয়। গুরুত্বপূর্ণ সেই প্রতিবেদন তৈরিতেই নানা অনিয়মের কথা স্বীকার করে এই রিপোর্ট আর না করার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

গত বছরের আগস্টে প্রথম অনিয়মের বিষয়টি টের পায় সংস্থাটি। এ কারণে ওই বছরের অক্টোবরে ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ প্রকাশ করা হবে না বলে জানায় তারা। এ ছাড়া পাঁচটি প্রকাশিত রিপোর্টের তথ্যও ফরেনসিক অডিটরকে দিয়ে পরীক্ষা করানোর কথা বলা হয় সেসময়।

গত বৃহস্পতিবার এক আকস্মিক ঘোষণায় সংস্থাটি জানায়, ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট’ আর দেয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তর থেকে এই ঘোষণা দেয়া হয়। এ বিষয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতিও দেয় সংস্থাটি।

প্রতিবছর বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশগুলোর ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট তৈরি করে। ব্যবসা শুরু, বিদ্যুৎ-সংযোগ, সম্পত্তি নিবন্ধন, কর ব্যবস্থাসহ কয়েকটি নির্দেশক বা মানদণ্ডের প্রতিটির ওপর ১০০ নম্বরের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর গড় করে চূড়ান্ত স্কোর নির্ণয় করা হয়। স্কোরের ভিত্তিতে দেশগুলোর অবস্থানের তালিকা করা হয়।

২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস সূচকে চিলির অবস্থান ছিল ৩৪তম। ২০১৭ সালে এসে সেই চিলি পিছিয়ে চলে যায় ৫৫তম অবস্থানে। বিষয়টি ভালোভাবে নেননি চিলির তখনকার রাষ্ট্রপতি মিশেল বাশলে। ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এর জেরে বিশ্বব্যাংকের এ সূচক তৈরির অনিয়ম প্রথম ধরা পড়ে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে চিলি ৩৪তম অবস্থানে ছিল। ২০১৭ সালে তা পিছিয়ে ৫৫তম অবস্থানে নেমেছে। এরপর চিলির রাষ্ট্রপতি ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। চিলির কর্মকর্তারা বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা করে বলেন, সংস্থাটি দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির ক্ষেত্রে তাদের বার্ষিক ‘ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিযোগিতামূলক র‍্যাঙ্কিংয়ে অন্যায় আচরণ করেছে।

২০১৪ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট হন মিশেল বাশলে। এরপরে তার শাসনামলের পরবর্তী তিন বছরই ডুয়িং বিজনেস সূচকে চিলির অধঃপতন হয়। ২০১৫ সালে ৪১, ২০১৬ সালে ৪৮ ও ২০১৭ সালে ৫৫তম হয় চিলির অবস্থান।

চিলির প্রেসিডেন্টের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি পর্যালোচনায় নেয়া হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের সেসময়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার অসংগতির কথা জানান। তার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের একজন সাবেক পরিচালক এমনভাবে জালিয়াতি করে ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’ সূচক নির্ণয়ের পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন, যাতে চিলির ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়।

পল রোমার প্রতিবেদনের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের জন্য চিলির কাছে ক্ষমা চান। তিনি স্বীকার করেন বাশলের অধীন ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে ভুল ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এই র‌্যাঙ্কিং রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত। তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ফলে প্রতিবেদনে চিলির অবনমন হতে পারে।

সেসময় এ বিষয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে বক্তব্য দেন পল রোমার। তিনি বলেন- ‘আমি চিলি এবং অন্য যেকোনো দেশে যেখানে আমরা ভুল ধারণা দিয়েছি, তাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা চাই। আমার দায় রয়েছে। কারণ, আমরা বিষয়গুলো যথেষ্ট পরিষ্কার করিনি। বিশ্বব্যাংক অতীতের রিপোর্টগুলো সংশোধন করার পদ্ধতি শুরু করছে এবং পদ্ধতি পরিবর্তন না করে র‍্যাঙ্কিং কেমন হবে, তা পুনরায় প্রকাশ করবে।’

রোমার বলেন, সংশোধনগুলো চিলির জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, তাদের অবস্থান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্থিতিশীল ছিল। বিশ্বব্যাংকের কর্মীদের রাজনৈতিক প্রেরণার কারণে বিষয়টি কলঙ্কিত হয়েছে। কারণ, বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কাভারেজ পায়। এমন মন্তব্য করায় পল রোমারকে পদত্যাগ করতে হয়।

প্রতিবেদনের পদ্ধতিগত পরিবর্তন করা সেই সাবেক পরিচালক ছিলেন অগাস্টো লোপেজ-ক্লারোস। চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক লোপেজ-ক্লারোস সে সময় বিশ্বব্যাংকের দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়ে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় তার ওই কাজের জন্য প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।

২০১৮ সালে মার্চে দায়িত্ব থেকে সরে যান মিশেল বাশলে। সমাজতান্ত্রিক দল থেকে ক্ষমতা চলে যায় কনজারভেটিভ দলের কাছে। দায়িত্ব পান প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা।

পল রোমারের ক্ষমা চাওয়ার পর ওই সময় এক টুইটে মিশেল বাশলে লেখেন, ‘বিশ্বব্যাংকের প্রতিযোগিতামূলক র‌্যাঙ্কিং তৈরিতে যা ঘটেছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে র‌্যাঙ্কিং পরিচালনা করে, তা নির্ভরযোগ্য হওয়া উচিত। কারণ, তারা বিনিয়োগ ও দেশগুলোর উন্নয়নে প্রভাব ফেলে।’ তিনি আরও বলেন, তার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বব্যাংকের কাছে সম্পূর্ণ তদন্তের অনুরোধ জানাবে।

গত বছরের আগস্টে বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অসংগতি থাকতে পারে, কিন্তু তা এখনও চিহ্নিত হয়নি। তাই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য সংগ্রহে পদ্ধতিগত পরিবর্তন এবং অসংগতির কারণে যেসব দেশ অধিক প্রভাবিত হয়েছে, সেসব দেশের সঠিক তথ্য পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আর এ কারণে গত বছরের অক্টোবরে ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স তৈরি স্থগিত করে তারা।

আর এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়ে এই রিপোর্ট আর না করার কথা জানিয়েছে সারাবিশ্বে ‘দাদাগিরি’ ফলিয়ে আসা বিশ্বব্যাংক। তাহলে, কী দাঁড়াল বিশ্বব্যাংকও ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ নয়! তাদের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বিশ্বব্যাংকেও দুর্নীতি হয়!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন
মেকশিফট হাসপাতাল
১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন
কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

শেয়ার করুন

অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার

অনলাইন প্রযুক্তির অপব্যবহার

এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেশ-বিদেশে বসে একাত্তরের চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীরা এবং তাদের রাজনৈতিক- দোসর- সহযোগীরা এমন সব মিথ্যাচার করছে, এমন বিকৃত তথ্য দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা দেখে- শুনে বিস্মিত হতে হয়। এমনকি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টাও চালাচ্ছে তারা। অনলাইন পত্রিকার নামে অনেকে অসৎ উদ্দেশ্যে যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো খুলে বসেছে অনলাইন পোর্টাল।

একসময়ের দারিদ্র্যে জর জর টানাপোড়নের বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়নের মহাসড়কে তার মূলে শক্তি জুগিয়েছে ডিজিটাইজেশন। যদি যোগাযোগ প্রযুক্তির এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন না ঘটত তাহলে অনেক কিছুই বিলম্বিত হতো। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়েছিল যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার অন্যতম ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। প্রযুক্তির সেই অভাবিত উন্নয়ন বাংলাদেশকে সব ক্ষেত্রে গতিশীলতা দিয়েছে।

এক কথায় ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগসহ উন্নয়নের সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন গতি সঞ্চার করেছে। ব্যাংকিং এবং বিপণন ক্ষেত্রে এই গতিশীলতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কার্ডেই অধিকাংশ লেনদেন কেনাকাটা। কথায় বলে, আলোর পিঠেই অন্ধকার। এ উক্তি চিরসত্য।

এনালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তরের পর মানুষের হাতে হাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোনসেট। তার মানে পৃথিবীর তাবৎ তথ্যভাণ্ডার আর লেনদেন কয়েকটি অ্যাপসের বদৌলতে এখন এন্ড্রয়েড ফোনে। এমনকি টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রের সব কিছুই এখন মোবাইল ফোনে! এককথায় তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে প্রযুক্তি!

যোগাযোগ ও উন্নয়ন অর্থনীতির বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে প্রযুক্তি। ওই যে বলেছি আলোর উল্টোপিঠে অন্ধকার সেই অন্ধকারে এখন আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছ। সম্ভাবনা তখনই সংকটে পরিণত হয়, যখন শুরু হয় তার অপব্যবহার। ইতিবাচক উদ্ভাবনকে নেতিবাচক কাজে ব্যবহার করলে যে কী ভয়াবহ সর্বনাশ বয়ে আনতে পারে, তার প্রমাণ তো এটম বোমা!

আমাদের অনেকেরই জানা বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন এটমকে ভেঙে যে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানো যায়, এই সত্য! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তিনি শঙ্কিত হয়েছিলেন এই ভেবে, যদি হিটলার তথা জার্মানি এই শক্তির সন্ধান পেয়ে যায় তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে!

তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে তার এই আশঙ্কার কথাই জানিয়েছিলেন। কিন্তু রুজভেল্ট সেই আণবিক শক্তি আবিষ্কারের সম্ভাবনাকে বোমায় পরিণত করে নিজেই ব্যবহার করিয়েছিলেন জাপানের বিরুদ্ধে। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা-নাগাসাকি শহর দুটি ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছিল এটম বোমা। আইনস্টাইন যা কখনও ভাবতেই পারেননি মানব সভ্যতাবিনাশী এত বড় সর্বনাশা কাজে ব্যবহৃত হবে তার উদ্ভাবন!

প্রযুক্তির শক্তিতেই বাংলাদেশ আজ বহুমাত্রিক উন্নয়নে অগ্রযাত্রায় মুখরিত। কিন্তু সেই প্রযুক্তির অপব্যবহার নানামুখী বিপর্যয়ও ডেকে আনছে। তথ্যপ্রযুক্তির ফসল সোশ্যাল মিডিয়া। সেই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত আজ নানা রকম সেবার আওতায় চলে এসেছে।

দেশের ইউনিয়নগুলো আজ সেই সেবা দিয়ে যাচ্ছে ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র থেকে। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ফরম পূরণ, পাসপোর্টের আবেদন, চাকরির আবেদনসহ বহু ধরনের সেবা আজ ঘরে বসেই পাচ্ছে মানুষ। নগদ লেন-দেনের বিকল্প ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে ই-প্লাটফরম। মার্কেটিংসহ নানা বিপণন ব্যবস্থায় নগদ লেনদেনের বিকল্প এখন কার্ড। ঘরে বসেই মিলছে সব পণ্য।

অথচ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেশ-বিদেশে বসে একাত্তরের চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীরা এবং তাদের রাজনৈতিক- দোসর- সহযোগীরা এমন সব মিথ্যাচার করছে, এমন বিকৃত তথ্য দিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, যা দেখে- শুনে বিস্মিত হতে হয়। এমনকি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টাও চালাচ্ছে তারা। অনলাইন পত্রিকার নামে অনেকে অসৎ উদ্দেশ্যে যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো খুলে বসেছে অনলাইন পোর্টাল। সম্প্রতি যার লাগাম টেনে ধরার প্রয়াস পাচ্ছে সরকার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আর যা খুশি তা অপপ্রচারের সুযোগ কখনও এক কথা হতে পারে না।

যাহোক ই-কমার্স প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ই-কমার্স-এর আওতায় বড় বড় কয়েকটি পণ্য বিপণন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে দেশে, যেখানে বিপুল পরিমাণ পণ্য কেনাবেচা হয় প্রতিদিন। ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছিল অনলাইনমার্কেট। অনলাইন ব্যবহার করে ইতোমধ্যে ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ ধামাকা, আলেশা মার্ট ইত্যাদি মেগাশপ জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। প্রযুক্তির এই সুবিধাকে এদের কেউ কেউ অপব্যবহার করে বিশাল সম্ভাবনাময় এই আধুনিক বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করল। প্রতারিত করল অসংখ্য গ্রাহককে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে প্রযুক্তির ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটি দিকেই আলো আর অন্ধকারের মতো বিপরীত বাস্তবতা। প্রয়োজন শুধু অপপ্রয়োগ রোধ করতে যথাযথ নজরদারি নিশ্চিত করা। সেটা করা না গেলে যে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে তা ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। বিশেষ করে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রতারণার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর মানুষের বিশ্বাস ধসে পড়েছে অনলাইন শপিংয়ে কেনাকাটা বিষয়ে। অথচ গত দেড় বছর ধরে করোনাকালের বাস্তবতায় জনসাধারণ বিপুলভাবে ঝুঁকছিল ই-শপিংয়ে। করোনা সংক্রমণের ভয়ে মানুষ ঘরে বসেই এই কেনাকাটার সুযোগ গ্রহণ করছিল সানন্দে। সংগত কারণেই দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছিল ই-শপিং।

গ্রাহকের দোরগোড়ায় পণ্য পৌঁছে দেয়ার এই প্লাটফরম জনপ্রিয়তা পাবে সেটাই স্বাভাবিক। পেয়েছিলও। কিন্তু গ্রাহকদের সঙ্গে একের পর এক প্রতারণার তথ্য ফাঁস হতে থাকলে এসব অনলাইন মেগা শপের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় চলে আসে এবং বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হয়। একটি সম্ভাবনাময় বিকাশমান বিপণন খাতে নেমে আসে বিশাল ধস! বিশেষ করে গত সপ্তাহে প্রতারিত গ্রাহকদের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাবের হাতে ই-ভ্যালি চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দম্পতি রাসেল ও নাসরিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর ই-শপিং ব্যবসার সম্ভাবনার ওপর চরম আঘাত নেমে আসে! মানুষের যেটুকু বিশ্বাস অবশিষ্ট ছিল, তাও নিঃশেষ হয়ে গেল।

গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে তাদের স্বামী-স্ত্রীর প্রতারণার বিশাল ফাঁদ। তারা অগ্রিম টাকা নিয়েও অসংখ্য গ্রাহককেই পণ্য বুঝিয়ে দেননি। তাদের দেনার দায় সহস্রাধিক কোটি টাকা। অথচ তাদের ব্যাংক হিসাবে আছে মাত্র লাখ টাকা! তাহলে এত টাকা কোথায় গেল?

এ প্রশ্নের উত্তর এখনও জানা যায়নি। র‌্যাব তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এখন। ইতোমধ্যে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা ভয়ংকর। তারা সচেতনভাবেই গ্রাহকদের প্রতারিত করে আসছিল।

ই-ভ্যালির এমডি এবং চেয়ারম্যান পরিকল্পনা করেছিলেন কোম্পানির দেউলিয়া ঘোষণা করে গ্রাহকদের দায় থেকে মুক্তি পেতে। তাদের আরেক পরিকল্পনা ছিল গ্রাহকসংখ্যা আরও বাড়িয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ই-ভ্যালি হস্তান্তর!

এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তাদের গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে হাজার হাজার প্রতারিত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা কী হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। ইভ্যালির মতো যেসব অনলাইন শপিং প্রতিষ্ঠান এই ধরনের লুটপাট করেছে তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব কী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের, নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের, নাকি কনজিউমার স্বার্থ যারা দেখার কথা তাদের? কার কী ভূমিকা তাও এখন খতিয়ে দেখা দরকার। এত বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যেমন খুশি তেমন চলতে দেয়া যায় কি? দিনের পর দিন তারা জনগণের অর্থ লুটপাট করে যাবে আর তা কেউ দেখবে না, তা কি হতে পারে? তার দেখভালের দায়িত্ব কি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরও বর্তায় না?

আইনের আশ্রয় নিয়ে এদের কাছ থেকে গ্রাহকদের অর্থ আদায় করা যে সম্ভব নয় তা এখন স্পষ্ট। ই-ভ্যালি বন্ধ করে দিয়ে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না। সরকার প্রশাসক বসিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে যদি পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে হয়তো একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকতে পারে। কারণ আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা মোটেও সুথকর নয়। পিকে হালদারের অর্থ প্রতিষ্ঠানের অরিয়ান্টাল ব্যাংক গ্রাহকরা এখনও অর্থ ফিরে পায়নি, বহু বছর আগে জনগণকে প্রতারণার দায়ে যুবক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু যুবকের প্রতারিত গ্রাহকরা তাদের অর্থ ফিরে পায়নি। এরকম বহু আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করে সাধারণ মানুষকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।

ই-ভ্যালির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যদি মাত্র ত্রিশ লাখ টাকা থাকে তাহলে বাকি হাজার হাজার কোটি টাকা দেশে কোথাও সরানো হয়েছে, না কি বিদেশে পাচার হয়েছে, তার সন্ধান পেতেই হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যমন্ত্রণালয় কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিত ভূমিকা নিতে হবে- যাতে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার উপায় উদ্ভাবন করা যায়।

এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, ই-কমার্সের সুস্পষ্ট পরিচালনাবিধি বা গাইডলাইন থাকা সত্ত্বেও তা মানেনি ই-ভ্যালি কর্তৃপক্ষ! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের জন্য যে ধরনের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ থাকার কথা, তা কতটা কার্যকর ছিল? এ ব্যাপারে তাদের যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকা দরকার ছিল তার কতটুকু তাদের ছিল? এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে।

এরই মধ্যে ধামাকাকে ২০০ কোটি টাকা ফেরত দিতে পাঁচদিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে ধামাকায় পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ। ১৮ সেপ্টেম্বর শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে এই আল্টিমেটাম দেন তারা। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ধামাকা শপিং ডটকম সেলার অ্যাসোসিয়েশন তাদের বকেয়া পাবে কি না তাও এক অনিশ্চিত প্রশ্ন। এ-তো গেল সেলার বা মার্চেন্টদের কথা, এর বাইরেও রয়েছে গ্রাহকদের পাওনা যারা টাকা দিয়ে পণ্য পাননি। ই-ভ্যালি ধামাকার মতো অন্যান্য ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকেও নজরদারির আওতায় আনা উচিত।

প্রতারণার ক্ষেত্রে আমাদের গণমাধ্যম এবং গ্রাহকদেরও সতর্ক থাকা দরকার ছিল। গণমাধ্যম যেভাবে তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে তাতে কোনো বাছবিচার ছিল বলে মনে হয় না। একটি প্রতিষ্ঠানকে টাকা পেলেই বিজ্ঞাপিত করা যায় না, তার সাত-পাঁচ ভেবে দেখতে হয়। আমাদের যে সমস্ত বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী তারকা ব্যক্তিরা ই-ভ্যালির হয়ে উচ্ছ্বসিত ভাষায় বিজ্ঞাপন প্রচার করেছেন, তাদেরও বিবেচনা থাকা উচিত ছিল বলে মনে করি।

ই-ভ্যালির ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সচেতনতার অভাব মারাত্মকভাবে চোখে পড়েছে। দুই লাখ টাকার একটি পণ্য কী করে আশি হাজার টাকায় দেবে, তা ভেবে দেখলে কেউ এ পথে আসার কথা ছিল না। লোভের মোহে পড়েই কেউ ভেবে দেখেননি।

যাহোক, হাজার হাজার গ্রাহকের স্বার্থ দেখার দায়িত্ব সরকারকে গ্রহণ করতেই হবে। ভোক্তা অধিকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। ই-কমার্স একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাত। কিছু দুষ্টচক্রের কারণে এই বিশাল সম্ভাবনাময় খাত ধ্বংস হয়ে যাক, এটা আমাদের কারো কাম্য হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীনসহ বিশ্বের বহু দেশ বড় বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মাধ্যমে সফলভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছে, আমাজান, আলিবাবার মতো প্রতিষ্ঠান এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ।

আমরা আশা করতে চাই, দেশের সম্ভাবনাময় এই বাণিজ্যিক খাতকে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসবেন। হাজার হাজার গ্রাহকের ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস আবার ফিরিয়ে আনবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কবি। সাবেক পরিচালক (বার্তা) বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন
মেকশিফট হাসপাতাল
১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন
কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

শেয়ার করুন

বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া

বিএনপি বাংলাদেশের বিষফোড়া

বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেটা শুধু বাংলাদেশই নয়, বিদেশি আদালতের রায়েও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কানাডার ফেডারেল আদালতে (সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন-২০১৭, এফসি ৯৪) বলা হয়েছে যে, বিএনপি প্রকৃতপক্ষে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারা হচ্ছে এমন একটি দল যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে সশস্ত্র সংগ্রাম বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জন্ম রাজনীতির কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়নি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। শাসকদের শোষণ, অত্যাচার, বঞ্চনার প্রতিবাদে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ থেকেই একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। আর বিএনপি দলটির জন্ম হয়েছে এক অরাজনৈতিক ব্যক্তির ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে। সুমহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী, আওয়ামী লীগবিরোধী কট্টরপন্থি, উগ্র সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদীদের নিয়ে একটি প্ল্যাটফরম হলো বিএনপি। রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠনের পর পাকিস্তানের দি হেরাল্ড পত্রিকায় বলা হয়, ‘বিএনপির জন্ম ছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার নীল নকশার ফলশ্রুতি।... এই দলের জন্য যে দর্শন নির্ধারণ করা হয় তা হলো: আওয়ামী লীগের দুর্বল স্থানে আঘাত করা এবং জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব জাগ্রত করা।... নিন্দিত আওয়ামী লীগার, চরম বামপন্থী ও মুসলিম লীগারদের নিয়ে দলের জনবল বাড়ানো।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রধান বেনিফিশিয়ারি হলো জিয়াউর রহমান। খন্দকার মোশতাককে সামনে রেখে জিয়াউর রহমানই যে অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন তা আজ প্রমাণিত সত্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি ছিলেন উপসেনাপ্রধান, অচিরেই ক্ষমতা দখল করে হয়ে যান সেনাপ্রধান। মার্শাল ল চালু করে রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করে বিচারের নামে রাজনীতিবিদদের বন্দি ও ভিন্নমতের শত শত মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারকে হত্যা করে ক্ষমতাকে করেন পাকাপোক্ত। একপর্যায়ে অস্ত্রের জোরে বিচারপতি সায়েমকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ দখল করে নেন। জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ সালের ৩০ মে ‘হ্যাঁ না’ ভোট ছিল গণতন্ত্রকে হত্যা করার প্রথম পদক্ষেপ। নিজের পক্ষে প্রদত্ত ভোটের ৯৮.৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার নজির গণতন্ত্রের নামে তামাশা। ভোটারবিহীন গণতন্ত্রের তিনিই প্রবর্তক।

জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথমে বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে সমন্বয়ক করে ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ বা ‘জাগদল’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করা হয়। কিন্তু জাগদল রাজনৈতিক দল হিসেবে জনগণের মধ্যে তেমন প্রভাব ফেলতে না পারায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান নিজেকে প্রধান করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করে। তখন জিয়া সেনাবাহিনীপ্রধান ছিলেন, রাজনৈতিক দল গঠন করে হয়ে গেলেন রাজনীতিবিদ। দেশের রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান আবার একটি রাজনৈতিক দলের নেতা। কী তুগলকি কাণ্ডকারখানা!

বিএনপি প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছরের পরিক্রমায় জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান দলের নেতৃত্ব দিয়েছে। তিনজনের মেয়াদ আলাদা হলেও দল পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের নীতি ও আদর্শ এক, অভিন্ন।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে বাংলাদেশের মূল চরিত্রটাকেই ধ্বংস করে দেয়। আঘাত হানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে দালাল আইন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার শুরু করেছিলেন। কিন্তু জিয়া ক্ষমতার নাটাই হাতে নিয়েই দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ১১ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেয়, যাদের মধ্যে ৭৫২ ছিল সাজাপ্রাপ্ত আসামি।

মুক্তিযুদ্ধের পর জামায়াতের রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্রের আড়ালে জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে তাদেরকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়। জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পাওয়ার ফলে বেড়ে যায় সাম্প্রদায়িকতা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডটি ছিল মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম বর্বরোচিত ঘটনা। অথচ জিয়াউর রহমান হত্যাকারীদেরকে পুরস্কৃত করে বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়েছেন এবং বিচারের পথ চিরতরে বন্ধ করতে জারি করেন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ।

জিয়াউর রহমানের দেখানো পথেই যাত্রা শুরু করে খালেদা জিয়া। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত দিবসে খালেদা জিয়া ভুয়া জন্মদিন পালন শুরু করে। বাঙালি জাতি যখন বিনম্র শ্রদ্ধায় শোক পালন করে তখন বিএনপি খালেদা জিয়ার ভুয়া জন্মদিনের কেক কেটে উৎসব করে। যা একজন বাঙালি ও বাংলাদেশি হিসেবে কেউ এমন ঘৃণ্য কাজ করতে পারে না।

খালেদা জিয়া তার প্রয়াত স্বামী জিয়াউর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জনগণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি এক ভোটারবিহীন নির্বাচন আয়োজন করেন। কোনো দল ওই সাজানো নির্বাচনে অংশ না নিলেও, কুমিল্লা-৬ আসন থেকে বঙ্গবন্ধুর খুনি ও ফ্রিডম পার্টির নেতা আবদুর রশিদকে জিতিয়ে এনে সংসদকে করেন অপবিত্র। যদিও সে সরকারের মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন। জনগণের চাপে সেদিনের সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

বিএনপি ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ’৭১-এর নরঘাতক নিজামী-মুজাহিদকে মন্ত্রী করে লাল সবুজের পতাকাকে করেছে কলঙ্কিত। ২০০২ সালে তারেক রহমান দলের সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই মূলত বিএনপিতে তারেক যুগের সুচনা হয়। তিনি হাওয়া ভবন তৈরি করে ক্ষমতার একটি আলাদা বলয় সৃষ্টি করেন। তারেক গংদের হাতে চলতে থাকে দল ও সরকার। খালেদা জিয়া দলের নামস্বর্বস্ব প্রধান থাকলেও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ থাকে তারেক রহমানের হাতে।

সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহারে বিপর্যস্ত হয় বাংলাদেশের চেহারা। রাষ্ট্রীয় মদতে দুর্নীতি, লুটপাট, কমিশন বাণিজ্য, অবাধে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে। তারেক জিয়া ও বিএনপি সরকারের অপকর্ম আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। সেসময় দুর্নীতিতে বাংলাদেশ টানা পাঁচবার হয়েছিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে তারেক রহমান এমন কোনো অপরাধ নেই যা তিনি করেননি। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চাঞ্চল্যকরভাবে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান। তারেক রহমানের নির্দেশে ও লুৎফুজ্জামান বাবরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকে অস্থিতিশীল করতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীগোষ্ঠী উলফাকে সরবরাহ করার জন্য আনা হয়েছিল।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ পুরো আওয়ামী লীগ দলটিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য তারেক রহমানের পরিকল্পনায় সম্পূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে গ্রেনেড হামলা করা হয়। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও বহু মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় মদতে দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় তো রীতিমতো তালেবানি শাসন চালু হয়েছিল। জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ- জেএমবি এবং হরকাতুল জিহাদ ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলা করে তাদের অস্তিত্বের জানান দেয়।

ক্ষমতার বাইরে থেকেও বিএনপি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বের হয়ে আসেনি। ২০১৩-১৪ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ বন্ধ করার দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মিলে সারা দেশে একটি ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে বানচাল ও ২০১৫ সালে সরকারের বর্ষপূর্তিতে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কাজ করে বিএনপি-জামায়াত। বিএনপির আন্দোলন মানেই গাড়ি পোড়ানো, পেট্রল বোমা ছোড়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সহিংস ও প্রাণঘাতী হামলা ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা।

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও তাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটকে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে বিএনপি। আর এসব কর্মকাণ্ডের কারণে বিএনপি আজ দেশের মানুষের সমর্থন হারিয়ে ডুবন্ত জাহাজে পরিণত হয়েছে।

বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেটা শুধু বাংলাদেশই নয়, বিদেশি আদালতের রায়েও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কানাডার ফেডারেল আদালতে (সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন-২০১৭, এফসি ৯৪) বলা হয়েছে যে, বিএনপি প্রকৃতপক্ষে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তারা হচ্ছে এমন একটি দল যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে সশস্ত্র সংগ্রাম বা সহিংসতার পথ বেছে নেয়। হাতবোমা, পিস্তল ও অস্ত্র ব্যবহার করে নেতৃস্থানীয় এবং জনগণের ওপর হামলা চালায়। এমনকি অগ্নিসংযোগেরর মতোও ঘটনা ঘটায় দলটি।

তারপরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক জনসমর্থন আছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এটি বিএনপির কোনো নীতি-আদর্শ, নৈতিকতার জন্য হয়েছে- তেমনটি নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিরাই মূলত কারণে অকারণে বিএনপির সমর্থক। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে যারা বিরোধিতা করেছিল, সেই গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে বিএনপি।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য বিএনপি নামক দলটি দীর্ঘ সময় এদেশের ক্ষমতায় ছিল, এখনও বিরোধী শক্তি হিসেবে আছে। বিএনপি ত্রিশ লাখ শহিদের রক্তে রঞ্জিত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে বার বার করেছে বাধাগ্রস্ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে করেছে ভূলুণ্ঠিত। বিএনপি দলটি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি বিষফোড়া। বাংলাদেশকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যে দ্রুত এই বিষফোড়াকে এড়িয়ে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন
মেকশিফট হাসপাতাল
১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন
কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

শেয়ার করুন