বদলে যাক আমলাতন্ত্র

বদলে যাক আমলাতন্ত্র

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনপ্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণ করেন। আর আমলারা সেই নীতি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করেন। আমলারা কিন্তু জনপ্রতিনিধি নন, তাই জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। কিন্তু অনেক দিন ধরেই দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিরাও আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন ভূমিকা রাখেন না। দেশ এখন আমলাশাসিত।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আমার বিট ছিল নির্বাচন কমিশন। তখন আমি ভোরের কাগজের রিপোর্টার। শ্যামল দার (শ্যামল দত্ত, ভোরের কাগজের সম্পাদক) সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছি নতুন। একদিন কমিশনে যেতেই সংবাদের লিটন ভাই (মনির হোসেন লিটন, বর্তমানে একাত্তর টিভিতে কর্মরত) বললেন, আপনাকে মান্নান ভাই খুঁজছেন। মান্নান ভাই মানে এম এ মান্নান, আজকের পরিকল্পনামন্ত্রী; তখন তিনি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব। নির্বাচন পরিচালনায় তখন তার দারুণ ব্যস্ততা। আমি লিটন ভাইকে বললাম, আমি তো অল্প কয়েক দিন এলাম। আমাকে তো মান্নান ভাইয়ের চেনার কথা নয়। খুঁজবেন কেন? লিটন ভাই বললেন, তা জানি না, আপনাকে না চিনলেও ভোরের কাগজের রিপোর্টারকে তো চেনেন, তাকেই খুঁজছেন। মনে মনে একটু শঙ্কিতও হলাম। মাত্র নির্বাচন কমিশন বিটে এসেছি। সামনে নির্বাচন।

এই সময়ে উল্টাপাল্টা কিছু হলে মুশকিল। গেলাম মান্নান ভাইয়ের রুমে। পরিচয় দিতেই তিনি উল্লসিত কণ্ঠে বললেন, আরে আপনাকেই তো খুঁজছি। কাল আমি যে ব্রিফ করেছি, আপনার রিপোর্টে তা যথাযথভাবে উঠে এসেছে। তাই ধন্যবাদ দিতে আপনাকে খুঁজছিলাম। শুনে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সেই থেকে মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে আমার চমৎকার সম্পর্কের শুরু। মন্ত্রী হওয়ার পরও যে তিনি আমলাজীবন নিয়ে গর্ব করেন, সেই জীবনটার একটা পর্ব আমি কাছ থেকে দেখেছি। শুধু আমার সঙ্গে নয়, সাংবাদিকদের সঙ্গে ছিল তার দারুণ সম্পর্ক। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনাও ছিলেন সাবেক আমলা। সব মিলিয়ে সেবার দারুণ দক্ষতায় নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন।

এম এ মান্নান পরে এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। এখন আর তেমন যোগাযোগ নেই বটে, তবে একজন দক্ষ আমলাকে, তার কাজের স্টাইলকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। বাস্তবে আমলাদের হওয়ার কথা জনগণের সেবক। কিন্তু মানতেই হবে, বরাবরই আমলাদের সঙ্গে জনগণের একটা বিশাল ফারাক রয়ে গেছে।

এ জন্য দায় যতটা জনগণের, তারচেয়ে অনেক বেশি আমলাদের। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, তবে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই আমলারা নিজেদের চারপাশে একটা বিচ্ছিন্নতার দেয়াল তুলে দেন। জনগণ বারবার সেই দেয়ালে গিয়ে হোঁচট খায়।

দেশসেরা মেধাবীরাই বিসিএসের নানা ধাপ পেরিয়ে আমলা হন। তবে সাধারণ মানুষের কথা শুনলে মনে হয়, আমলা হওয়াটা বিশাল অপরাধ। আমলাদের সম্পর্কে সাধারণের পারসেপশন হলো- আমলা মানেই ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, গণবিরোধী। শুধু আমলা নয়, কোনো একটি পেশার মানুষকে ঢালাও গালি দেয়ার প্রবণতা তাদের মজ্জাগত।

সাংবাদিক, ডাক্তার, পুলিশ তো প্রতিদিন গালি খাচ্ছে। বাস্তবতাটা হলো, কোনো পেশার মানুষকেই ঢালাও গালি দেয়ার সুযোগ নেই। ভালো ডাক্তার যেমন আছেন, খারাপ ডাক্তারও আছেন। ভালো সাংবাদিক যেমন আছেন, খারাপ সাংবাদিকও আছেন। তেমনি অসৎ আমলা যেমন আছেন, সৎ আমলাও আছেন।

দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখলে মনে হয়, ফেসবুকের সবাই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, সততার পরাকাষ্ঠা। আর সব পেশার মানুষ খারাপ। আমলাদের সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণা, তা যদি সত্যি হতো, তাহলে দেশ এতদিনে টিকতে পারত না। পছন্দ করি আর না করি, দেশটা কিন্তু এখন আমলারাই চালায়।

আমলাতন্ত্র যুগে যুগে ছিল, আছে, থাকবে। আমলাতন্ত্র নিয়ে আমাদের আলোচনা-সমালোচনাও আমলাতন্ত্রের সমান বয়সী। তবে সম্প্রতি নানা কারণে আমলাতন্ত্র নিয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে সচিবালয়ে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে ছয় ঘণ্টা আটকে রাখা, এক উপসচিবের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারের পর আমলাতন্ত্র আরেকবার সমালোচনার শিখরে পৌঁছেছে। শুরুতে সাবেক আমলা, বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের কথা বলছিলাম। কারণ তিনি সম্প্রতি আমলাতন্ত্র নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। এম এ মান্নান বরাবরই একটু সরল ধরনের। যা মনে আসে বলে ফেলেন। সম্প্রতি একনেক বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র মন্দ নয়। আমলাতন্ত্র ভালো।

আমলাতন্ত্রের বিকল্পও তো নাই। কেউ আমলাতন্ত্রের বিকল্প বের করতে পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর বিকল্প বের করতে পারেনি। চীনারা পারেনি। ফেরাউনও পারেনি। খলিফারাও পারেনি। সেই মহান আমলাতন্ত্র আমাদের মাঝেও আছে।’ পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিজেও একসময় ছোটখাটো আমলা ছিলাম। মনেপ্রাণে এখনও বড় আমলা আছি। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কেটেছে আমলাতন্ত্রের ভেতরে। সেই মহান আমলাতন্ত্রের জন্য তাদের যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে সাভারে, সেটির আধুনিকায়ন, সংস্কার, ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, প্রশস্ত, সবকিছু করব। সেখানে ২০তলা অত্যাধুনিক ভবন হবে। তবে আশা করছি তাদের কাজের গতিও আধুনিকায়ন হবে।’

এই প্রকল্পটি নিয়েই আমার একটু বলার আছে। সাভারে লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-পিএটিসির সক্ষমতা বাড়াতে ১ হাজার ২০৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে, একনেক যা অনুমোদনও করেছে। এম এ মান্নান বলেছেন, সেটাই চরম সত্যি।

আমলাতন্ত্রের কোনো বিকল্প কেউ কখনও বের করতে পারেনি। তাই ঢালাও গালি না দিয়ে আমলাতন্ত্রকে কীভাবে জনবান্ধব করা যায় তার উপায় বের করতে হবে। সেক্ষেত্রে পিএটিসির ভূমিকাটাই সবচেয়ে বেশি। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে পিএটিসির অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে তাদের মৌলিক চিন্তায় বদল আনতে হবে। সব আমলাকেই পিএটিসির চৌকাঠ পেরিয়ে আসতে হয়। তাই সেখানে আমলাদের শেখাতে হয় মানবিকতার প্রাথমিক পাঠ।

বিসিএস দিয়েই যেন কেউ প্রশাসক বনে না যান। শেখাতে হবে তারা জনগণের শাসক নয়, সেবক। প্রায়ই পত্রিকায় খবর দেখি, মাঠপর্যায়ের কোনো ছোট আমলাকে ‘স্যার’ না বলায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের অনেক কষ্টে, মেধার অনেক পরীক্ষা দিয়ে আমলা হতে হয়, সেটা মানলাম। কিন্তু আমলা হলেই তাদের ‘স্যার’ বলতে হবে কেন। ভয় দেখিয়ে জনগণের সমীহ আদায় করা যাবে না, ভালোবেসে তাদের হৃদয় জয় করতে হবে।

৩৩৩ তে ফোন করে খাবার চাওয়ার অপরাধে এক গরিব মানুষকে ৪০০ লোকের খাবার দেয়ার শাস্তি বা ছাগল ফুলগাছ খাওয়ায় মালিকের জরিমানা করার ঘটনা আমলাতন্ত্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাই শুধু তৈরি করবে। আমলারা অবশ্যই আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হবেন। একই সঙ্গে তাদের মানবিক হতে হবে, দেশের বাস্তবতা বুঝে কাজ করতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনপ্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণ করেন। আর আমলারা সেই নীতি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করেন। আমলারা কিন্তু জনপ্রতিনিধি নন, তাই জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। কিন্তু অনেক দিন ধরেই দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিরাও আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন ভূমিকা রাখেন না। দেশ এখন আমলাশাসিত। আমলারাই নীতিনির্ধারণ করেন, তারাই তা প্রয়োগ করেন। সব মিলিয়ে একটা স্বেচ্ছাচারী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর জন্য আমি আমলাদের ততটা দোষ দিই না। এই পরিস্থিতি আমরাই তৈরি করেছি। ক্ষমতা পেলে কেউ কেউ তো তার অপব্যবহার করতেই পারে। ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ বেয়ে আসে দুর্নীতি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে এখন এগিয়ে আমলারাই। তবে সবাই তো আর তা করছেন না। কিছু আমলার বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহার, দুর্নীতির অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি শত শত মানবিক, দক্ষ, যোগ্য আমলাও আছে দেশে। তারা আছে বলেই দেশটা এখনও ঠিকঠাকমতো চলছে।

পিএটিসির কাজ হলো তেমন সৎ, দক্ষ, যোগ্য, মানবিক ও দেশপ্রেমিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা। তাতেই দেশের লাভ। এ জন্য পিএটিসির জন্য প্রয়োজনে বরাদ্দ আরও বাড়ানো হোক। তবে আবারও বলছি, সেই বরাদ্দে যেন খালি ভবন বানানো না হয়। হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের সফটওয়্যারেও পরিবর্তন আনতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন
মেকশিফট হাসপাতাল
১১ জুন একটি ঐতিহাসিক দিন
কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা

শেয়ার করুন

মন্তব্য