কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন

কারামুক্তির দিনে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন

শেখ হাসিনার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া, বিএনপির চেয়ারপারসন। আমাদের দেশের রাজনীতির একটি বিশেষ ‘দুষ্টচক্র’ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ‘দুই নেত্রী’ অভিধা চালু করে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে তথা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এক পাল্লায় তুলে রাজনীতির বড় ক্ষতি করেছে। দুজনের রাজনীতির মত ও পথ এক নয়। যারা বলেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাজনীতির মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, তারা আসলে অতিসরলীকরণ দোষেদুষ্ট। পানি এবং আলকাতরার তফাৎ বুঝতে না পেরে রাজনীতিকে যারা স্বার্থ হাসিলের উপায় বলে ভেবে মানুষের মধ্যে মুখরোচক শব্দাবলি ছড়িয়ে দিয়ে অহেতুক কৌতূহল ও আশাবাদ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন, তারা রাজনীতির বড় ক্ষতি করেছেন।

‘ঝুঁকি নিতে না পারলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়’– শেখ হাসিনা।

তিনি বার বার ঝুঁকি নিয়েছেন বলেই আজ বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে। তিনি তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য সামনে রেখে ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন বলেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। আজ ১১ জুন তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিন। আজ তার কারামুক্তির দিন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের এই দিন তাকে সংসদ ভবন চত্বরে স্থাপিত বিশেষ কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল।

এর আগে ২০০৭ সালের ১৩ জুলাই তাকে সেনাসমর্থিত বিশেষ সরকার গ্রেপ্তার করে। তাকে গ্রেপ্তার করে রাজনীতিতে কালো অধ্যায়ের সূচনা করতে চেয়েছিল যারা, তারা শেষপর্যন্ত হেরেছে। তিনি জিতেছেন বলে জিতেছে বাংলাদেশ। কারাগার তাকে অবদমিত করতে পারেনি।

বরং তিনি নিজেকে আরও জনসম্পৃক্ত হওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছেন, নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করার শক্তি-সঞ্চয় করেছেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করেছেন।

কারগার পিতার মতো তার জন্যও শিক্ষাগার হয়েছে। স্বল্পকালের কারাবাস তাকে দীর্ঘকালের জন্য পায়ের নিচে শক্ত ভিত তৈরি করে দিয়েছে।

গ্রেপ্তারের আগে এক খোলা চিঠিতে শেখ হাসিনা দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন-

…‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। যে যেভাবে আছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। মাথা নত করবেন না। সত্যের জয় হবেই। আমি আছি আপনাদের সঙ্গে, আমৃত্যু থাকবো'।

তিনি তার কথা রেখেছেন। তিনি দেশের মানুষের সঙ্গে আছেন সব বাধা পায়ে দলে।

দেশের মানুষও তার কথায় সাহস পেয়েছিলেন, আস্থা রেখে তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রতিকূল পরিবেশে, ক্ষমতাসীনদের লালচোখ উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে জনমত প্রবল হয়ে ওঠায় এবং কারাগারে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তখনকার সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য আমেরিকা যান এবং চিকিৎসা শেষে ২০০৮ সালের ৬ নভেম্বর দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনা নির্বাচনি প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠন করে। এরপর আরও দুটি নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হয়। শেখ হাসিনা টানা তিন মেয়াদে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। দেশকে এগিয়ে নিয়েছেন নতুন উচ্চতায়।

শেখ হাসিনার রাজনীতিতে আসা এবং পথচলা– কোনোটাই ঝুঁকিমুক্ত নয়। ১৯৭৫ সালে তার বিদেশে অবস্থানকালে তিনি পিতা-মাতা- ভাই-ভাবীসহ স্বজনহারা হন। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে বাংলাদেশের রাজনীতিকে মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত ধারায় চালানোর অপচেষ্টা নেয়া হয়। সামরিকশাসক জিয়াউর রহমান ঘোষণা দিয়ে রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের জন্য ‘ডিফিকাল্ট' করে তোলার ব্রত নিয়ে সুবিধাবাদী এবং নীতিহীনতার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। জিয়ার রোপিত বিষবৃক্ষ ফল দিয়েছে এবং রাজনীতি এখনও সুস্থধারায় ফিরে আসতে পারছে না।

এক বিশেষ রাজনৈতিক ও দলীয় সংকটের মুহূর্তে ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় শেখ হাসিনাকে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে শেখ হাসিনা পিতার রেখে যাওয়া দল আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। কিন্তু তার পথচলা কণ্টকমুক্ত ছিল না। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তাকে শারীরিকভাবে হত্যার কমপক্ষে ১৯টি অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ২০০৭ সালে তাকে রাজনৈতিকভাবে ‘হত্যার’ চেষ্টাও সফল হয়নি বলে বাংলাদেশ এখন তার সুযোগ্য নেতৃত্বে চলছে।

২০২০ সালের ১০ জুন জাতীয় সংসদে শেখ হাসিনা বলেছেন-

‘আমি এখানে (বাংলাদেশে) বেঁচে থাকার জন্য আসিনি। জীবনটা বাংলার মানুষের জন্য বিলিয়ে দিতে এসেছি। এখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

হ্যাঁ, তিনি নির্ভয়ে তার লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যাচ্ছেন ঘরে-বাইরে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক, মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই অব্যাহত রেখেছেন অনেকটা নিঃসঙ্গ শেরপার মতো।

শেখ হাসিনার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া, বিএনপির চেয়ারপারসন। আমাদের দেশের রাজনীতির একটি বিশেষ ‘দুষ্টচক্র’ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ‘দুই নেত্রী’ অভিধা চালু করে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে তথা আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এক পাল্লায় তুলে রাজনীতির বড় ক্ষতি করেছে।

দুজনের রাজনীতির মত ও পথ এক নয়। যারা বলেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাজনীতির মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, তারা আসলে অতিসরলীকরণ দোষেদুষ্ট। পানি এবং আলকাতরার তফাৎ বুঝতে না পেরে রাজনীতিকে যারা স্বার্থ হাসিলের উপায় বলে ভেবে মানুষের মধ্যে মুখরোচক শব্দাবলি ছড়িয়ে দিয়ে অহেতুক কৌতূহল ও আশাবাদ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন, তারা রাজনীতির বড় ক্ষতি করেছেন।

হাসিনা-খালেদাকে এক জায়গায় আনার পথে যে ‘গোড়ায় গলদ’ আছে সেটা বুঝতে না পারলে, রাজনীতির মূল বিরোধগুলোর নিষ্পত্তি না করলে নতুন পথের সন্ধান পাওয়া কঠিন। শেখ হাসিনা একা এবং এককভাবে লড়াই করছেন। সাধারণ মানুষকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাছে পাওয়ার জন্য তাকে কিছু অপ্রিয় এবং সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে বলে অনেকেই মনে করেন। তিনি তা করবেন সে বিশ্বাস মানুষের আছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারসহ এমন কিছু কাজ তিনি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছেন, যা অন্য কারো পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলি টানেলসহ এমন সব নির্মাণকাজ সমাপ্তির পথে যেগুলো এক নতুন বাংলাদেশের পরিচয়বাহী। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রেকর্ড পরিমাণ রিজার্ভ, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ অনেকক্ষেত্রেই যে ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ আজ বিশ্ববাসীর নজর কাড়ছে তা সবই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দূরদর্শী ও সাহসী সিদ্ধান্তের কারণেই সম্ভব হয়েছে।

সে জন্যই এটা বলা যায় যে, শেখ হাসিনার সফলতা আসলে বাংলাদেশেরই সাফল্য। তাই তার সামনে জয়লাভের বিকল্প কিছু নেই। আজকের দিনে তাকে অভিনন্দন! তার সুস্থ দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা
বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে
ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা
বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মডেল মসজিদ ও শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা

মডেল মসজিদ ও শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা

মডেল মসজিদগুলোর সুযোগ-সুবিধা দেখলে সহজে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী একটি বিশুদ্ধ ও মানবিক জাতি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করছেন, অটিজমের শিকার মানুষদের জন্য এসব মডেল মসজিদে বিশেষ সুবিধা থাকছে। অতিথিশালা থাকছে, বিদেশি পর্যটকদের জন্য আবাসনও থাকছে। এ যে কত বড় উদারতা ও মহানুভবতা তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে ইসলামের খেদমতে সর্বপ্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জন্য তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে যান। টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার জন্য সুবিশাল প্রান্তর বরাদ্দ করেন বঙ্গবন্ধুই। আজকের বাংলাদেশের মুসলমানদের তাবলিগ জামাতের যে মূল কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ, সেটিও জাতির পিতার অবদান। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে প্রকৃত ইসলামি মূল্যবোধ থেকে সরে গিয়ে এ দেশের মাথার ওপর উগ্রবাদ জেঁকে বসে।

২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এরপর নানামুখী ষড়যন্ত্র তাকে কিছু সময়ের জন্য দেশসেবা থেকে দূরে রাখলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি পুনরায় সরকার গঠন করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। পৃথিবীর অনেক শক্তিশালী দেশের চেয়েও এখন বাংলাদেশের জিডিপি ও এসডিজির অগ্রগতি ভালো।

বিভিন্ন অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পাশাপাশি দেশরত্ন শেখ হাসিনা ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নয়নের দিকেও নজর দিয়েছেন। পিতার দেখানো পথ ধরে তিনি জাতিগত সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। আর এই জন্যই দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ইবাদতের জায়গার নির্মাণ শুধু নয়, সেটিকে মডেল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

চলমান মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশের জেলা, উপজেলা, উপকূল, মহানগর ও বিভাগীয় শহরে সরকারিভাবে ৫৬০টি মডেল মসজিদের অনুমোদন দিয়েছেন। এসব মসজিদ নির্মাণে ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মিত ৫০টি মডেল মসজিদ একযোগে উদ্বোধন করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন সম্প্রতি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পরবর্তী মডেল মসজিদগুলো উদ্বোধনের সময়ে তিনি একযোগে এত মসজিদ উদ্বোধনের নিজের রেকর্ড নিজেই আবার ভাঙবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা-সংবলিত সুবিশাল এসব মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে নারী ও পুরুষদের পৃথক ওজু ও নামাজ আদায়ের সুবিধা, লাইব্রেরি, গবেষণাকেন্দ্র, ইসলামিক বই বিক্রয় কেন্দ্র, পবিত্র কোরআন হেফজ বিভাগ, শিশু শিক্ষা, অতিথিশালা, বিদেশি পর্যটকদের আবাসন, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, হজযাত্রীদের নিবন্ধন ও অটিজম সেন্টার, প্রতিবন্ধী মুসল্লিদের টয়লেটসহ নামাজের পৃথক ব্যবস্থা, গণশিক্ষা কেন্দ্র, ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থাকবে। এ ছাড়াও ইমাম-মুয়াজ্জিনের প্রশিক্ষণ-আবাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিসের ব্যবস্থা এবং গাড়ি পার্কিং-সুবিধা রাখা হয়েছে।

মডেল মসজিদগুলোতে দ্বিনি দাওয়াত কার্যক্রম ও ইসলামি সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস, যৌতুক, নারীর প্রতি সহিংসতাসহ বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি রোধে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

সারা দেশে এসব মসজিদে প্রতিদিন ৪ লাখ ৯৪ হাজার ২০০ জন পুরুষ এবং ৩১ হাজার ৪০০ নারী একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন। একসঙ্গে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ কোরআন তেলাওয়াত করতে পারবেন, ৬ হাজার ৮০০ জন ইসলামিক বিষয়ে গবেষণা করতে পারবেন, ৫৬ হাজার মানুষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিতে পারবেন এবং প্রতিবছর এখান থেকে ১৪ হাজার কোরআনে হাফেজ হবেন।

মডেল মসজিদগুলোর সুযোগ-সুবিধা দেখলে সহজে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী একটি বিশুদ্ধ ও মানবিক জাতি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করছেন, অটিজমের শিকার মানুষদের জন্য এসব মডেল মসজিদে বিশেষ সুবিধা থাকছে। অতিথিশালা থাকছে, বিদেশি পর্যটকদের জন্য আবাসনও থাকছে। এ যে কত বড় উদারতা ও মহানুভবতা তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেবে।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রথম পর্যায়ে ৫০টি মডেল মসজিদের উদ্বোধন করা হয়েছে গত ১০ জুন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রাস ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এসব মসজিদ ভূমিকা রাখবে।”

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের গুরুত্ব খুবই অর্থবহ ও সুদূরপ্রসারী। তিনি ইসলাম ধর্মের প্রকৃত মর্মবাণী প্রতিটি মুসল্লির কাছে পৌঁছে দিতে চাচ্ছেন। আর একজন প্রকৃত মুসলমান কখনও নারীর প্রতি সহিংস হবেন না, জঙ্গিবাদে জড়াবেন না। আর এই লক্ষ্যেই তিনি ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী নিয়ে গবেষণার সুযোগ রেখেছেন এসব মসজিদে, ইমাম-মুয়াজ্জিনরা যাতে প্রকৃত ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মুসল্লিদের কাছে ইসলামের আসল বার্তা নিয়ে যেতে পারেন সেই ব্যবস্থাও রেখেছেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দর্শন ও দূরদর্শিতা ফুটে উঠেছে এসব মডেল মসজিদে। তিনি যতদিন আছেন, ততদিন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ ‘দাবায়ে’ রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের বুকে মডেল রাষ্ট্র হবে। শেখ হাসিনা দীর্ঘজীবী হোন।

লেখক: ছাত্রনেতা ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা
বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে
ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা
বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনা-ম্যাজিকে বদলে গেছে দেশের অর্থনীতি

শেখ হাসিনা-ম্যাজিকে বদলে গেছে দেশের অর্থনীতি

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন ৪২তম রপ্তানিকারক ও ৩০তম আমদানিকারক দেশ। অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, ওপরে আছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখতে এসে ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেছিলেন, ‘শুধু বলার জন্য নয়, দারিদ্র্য বিমোচনে সত্যিই আজ বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল।

কিছুদিন আগে বিদেশি এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, তোমাদের দেশে এত উন্নয়ন হচ্ছে টাকা পাও কোথায়? পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু, মেট্রোরেলসহ অনেক কিছুই তো হচ্ছে, যেটা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরাও দেখতে পাই। তোমাদের উন্নয়নের ম্যাজিক কী? বন্ধুটির প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম, আমাদের ম্যাজিকের নাম শেখ হাসিনা।

হ্যাঁ, শেখ হাসিনা-ম্যাজিকেই গত এক যুগে বদলে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, নারীর ক্ষমতায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসসহ বেশ কিছু সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্ব নেতৃত্বকে চমকে দিয়েছে।

বিপুল খাদ্য ঘাটতির দেশটি আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই শুধু অর্জন করেনি, সাহায্যনির্ভর দেশটি খাদ্য রপ্তানি করার পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী কৃষিনীতির কারণে বাংলার কৃষকরা খাদ্যপণ্য উৎপাদনে জাদু দেখিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করছে প্রধানত তিনটি খাত। কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী ভাইদের পাঠানো রেমিট্যান্স। একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এখন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ১৯৭২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করে বলেছিল, ‘সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল হবে’।

অপরদিকে ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট অর্থনীতিবিদ অ্যাডওয়ার্ড অস্টিন রবিনসন ১৯৭৩ সালে ‘ইকোনমিক প্রসপ্রেক্টাস অব বাংলাদেশ’ নামে একটি গবেষণাগ্রন্থে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় মাত্র ৭০ ডলার। এই মাথাপিছু আয়ের বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে গরিব ১০টি দেশের একটি। ভালো মানের মাথাপিছু আয় ধরা হয় ৯০০ ডলার। সেটা অর্জন করতে বাংলাদেশ যদি ২ শতাংশ হারে মাথাপিছু আয় বাড়ায়, তাহলে লাগবে ১২৫ বছর, আর ৩ শতাংশ হারে আয় বাড়লে লেগে যাবে ৯০ বছর।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করে বাংলাদেশ দ্রুততম সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, যখনই আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব দিয়েছে, তখনই বাংলাদেশের অগ্রগতির গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আর দেশরত্ন শেখ হাসিনার বিগত ১২ বছরের ধারাবাহিক নেতৃত্বের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।

অর্থনীতির এই অর্জনের সরকারের নীতিনির্ধারণী ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষির আধুনিকায়ন করা, নতুন বীজ উদ্ভাবন, স্বল্পমূল্যে সার ও বীজ বিতরণ, সব কৃষিপণ্যের ভ্যাট প্রত্যাহার করাসহ প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতে ভর্তুকি দেয় সরকার। যার কারণে কৃষি ক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

অথচ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া তো দূরের কথা, সারের দাবিতে ১৮ কৃষককে জীবন দিতে হয়েছিল। ধান উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে শাকসবজি, মাছ ও ফলফলাদি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে দেশ। বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, বাংলাদেশ সবজি, ধান ও আলু উৎপাদনে বিশ্বে যথাক্রমে ৩য়, ৪র্থ ও ৭ম। এ ছাড়াও মাছ, আম, পেয়ারা উৎপাদনে ৪র্থ, ৭ম ও ৮ম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান প্রায় ১৬.৬।

শিল্পকে বিকশিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করা। সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরই বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে বিশেষ নজর দেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষ সময় ২০০৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ৩৭৮ মেগাওয়াট, উৎপাদন কেন্দ্র ছিল ৪২টি। বর্তমান সরকারের এক যুগে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার মেগাওয়াট, উৎপাদন কেন্দ্র বেড়ে হয়েছে ১৪০টি।

সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ২০০৫-০৬ সালের ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়েছে। দেশ এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমানে বেড়ে সরবরাহ ২ হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। নতুন শিল্প-উদ্যোক্তাদের শুরু থেকে ১৫ বছরের জন্য কর মওকুফ, শিল্প স্থাপন এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কর মওকুফ করার ফলে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে।

গ্রাম থেকে উপজেলা হয়ে জেলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের নেটওয়ার্কে নিয়ে আসা হয়েছে। সড়ক, সেতু, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহরগুলো ও ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গাসহ ৪৫৩ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার বা তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে, আবার কোথাও কাজ চলমান রয়েছে। যার কারণে শহর আর গ্রামের দূরত্ব কমে গেছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়ে, দারিদ্র্য কমে এসেছে। ২০০৬ সালে অতি দারিদ্রের হার ছিল ৪০ শতাংশ। যা বর্তমানে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং হতদরিদ্রের হার ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশে ২০০৯ সালে ৫ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত। ২০১৮ সালের তথ্যমতে, চরম দারিদ্র্যসীমার মধ্যে আছে দেড় কোটির কিছু বেশি মানুষ। এই সময়ে জন্মহার কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৬ শতাংশে। ২০০৬ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ৪৫ দশমিক ৬ কোটি ডলার। বর্তমানে ৩ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ১০ ডলার। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৫৬০ মার্কিন ডলার। একযুগে যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৩ টাকা। অবাক করার বিষয় হলো, করোনা মহামারির সময়ও বিগত বছর থেকে ৯ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তান থেকে দ্বিগুণ এবং অতিসম্প্রতি ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। ভারত থেকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২৮০ ডলার বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশের একজন নাগরিক ভারতের একজন নাগরিক থেকে ২৩ হাজার ৭৫৩ টাকা বেশি আয় করেন। অথচ ২০০৭ সালেও ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের দ্বিগুণ।

বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্য, খাদ্য ও অর্থনীতি— এই তিন খাতে বিপর্যয়ে পড়তে হয়েছিল। অনেকে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি নেমে আসবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে আমাদের খাদ্য নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।

স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে কিছুটা চাপ পড়লেও খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, মহামারি সত্ত্বেও বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ার মধ্যে প্রথম অবস্থানে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে অবস্থান করেছিল বাংলাদেশ। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ।

এর ফলে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষিত হবে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের তিনটি শর্ত ছিল- মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলারে রাখা, মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ পয়েন্ট ও অর্থনীতির ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ বা নিচে আনা। এই তিনটি সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কি না- সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়।

যেকোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় পরপর তিন বছর। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ তিনটি শর্তই পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। এখন লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়া। এ লক্ষ্য পূরণের জন্য বেশ কিছু খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে সরকার। এর মধ্যে পোশাক খাতের বিশ্বব্যাপী বাজার সৃষ্টি করা, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ ও ওষুধের উপাদান, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল ও যানবাহন তৈরি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি ও কৃষিপণ্য আধুনিকীকরণসহ ৩২ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে সরকার।

রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং দারিদ্র্যের হার আরও কমে আসবে।

বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উত্থান এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত। প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘ইকোনমিস্ট’-এর ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান নবম। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।

বিখ্যাত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘গোল্ডম্যান স্যাকস’ ১১টি উদীয়মান দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ‘প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৯তম ও ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হবে। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবল’-২০২১ রিপোর্ট অনুসারে ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান হবে ২৫তম।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন ৪২তম রপ্তানিকারক ও ৩০তম আমদানিকারক দেশ। অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, ওপরে আছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখতে এসে ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেছিলেন, ‘শুধু বলার জন্য নয়, দারিদ্র্য বিমোচনে সত্যিই আজ বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল।

শেখ হাসিনার মতো সৎ-সাহসী এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই আজ বিশ্বের বুকে রোল মডেল হতে পেরেছে বাংলাদেশ। দক্ষতা, যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিকল্প কেবল শেখ হাসিনাই। বিগত এক যুগ রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে নিয়ে গেছেন মর্যাদাশীল একটি অবস্থানে। বঙ্গবন্ধুকন্যার সুযোগ্য নেতৃত্বে উন্নত সমৃদ্ধ দেশের স্বপ্ন নিয়ে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা
বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে
ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা
বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা

শেয়ার করুন

নৈতিক অবক্ষয় রোধে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন

নৈতিক অবক্ষয় রোধে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন

নানা কারণে আমাদের সমাজে মেধাবী কম না হলেও আদর্শনিষ্ঠ এবং সৎ ও নীতিপরায়ণ মেধাবী প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা কমে আসছে। কমে যাচ্ছে ব্যতিক্রমী ধারার জনস্বার্থবাদী চিন্তাবিদদের সংখ্যা। স্বভাবতই হ্রাস পাচ্ছে বা শক্তিহীন হচ্ছে অনুরূপ গুণের বৈশিষ্ট্যযুক্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো জনস্বার্থবান্ধব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন ও জাতীয় দৈনিকে নানারকম ভয়াবহ নেতিবাচক খবর দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও আঘাতের খবর এ মাধ্যমগুলো ভরা থাকে। অপরাধগুলো একটি শহরে কিংবা বিশেষ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের প্রায় সব শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে, অভিজাত এলাকা কিংবা প্রত্যন্ত জনপদে এসব ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অপরাধীদের মধ্যে কুখ্যাত সন্ত্রাসী বা মাস্তান যেমন রয়েছে, তেমনি সাধারণ জীবনযাপনকারী পারিবারিক সদস্যও রয়েছে।

বিশেষ করে পারিবারিক পর্যায়ে যে নৃশংস ও অবিশ্বাস্য ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে অপরাধীরা আসলে মানসিক রোগী। মনোরোগে আক্রান্ত লোক ছাড়া এ ধরনের নৃশংস অপরাধ কেউ করতে পারে না। নৃশংস অপরাধকে এখনও আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। আমাদের সভা-সেমিনার, ওয়ার্কশপ কিংবা গোলটেবিল আলোচনায় সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, মনোচিকিৎসক ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি বড় একটা দেখা যাচ্ছে না।

আমরা প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে এসব অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকি। সময় এসেছে, যখন আমাদের সমস্যার আরও গভীরে যেতে হবে। অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার পাশাপাশি মানসিক রোগী হিসেবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের দেখতে হবে, আমাদের দেহ-মনে এমন মারাত্মক কোনো জীবাণু বা রাসায়নিক দ্রব্য অবস্থান নিয়েছে কি না, যা আমাদের দলে দলে মানসিক রোগী করে তুলছে। সুস্থ ব্যক্তিরা যাতে এ রোগে আক্রান্ত না হয় সে জন্য আগেভাগে ব্যবস্থা নিতে হবে। কখনও ব্যক্তিপর্যায়ে, কখনও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

আজকাল নিজেদের প্রাপ্তির জন্য আমরা সবাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে কাজ করছি। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। দেশ আর সমাজকে নিয়ে কি ভাবছি আমরা? আর কত সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় প্রয়োজন আমাদেরকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য? আর কত দিন অপেক্ষা প্রয়োজন হবে নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য? এই প্রশ্ন কার কাছে রাখব?

সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে চাইব? সবাই নিজেকে নিয়েই শুধু ব্যস্ত রয়েছি, শুধু ভাবছি নিজেকে নিয়ে। সরকার ব্যস্ত রয়েছেন উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিয়ে দেশের উত্তরোত্তর কল্যাণের জন্য, আর বিরোধী দলগুলো ব্যস্ত রয়েছে তাদের ভাষায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার জন্য। তবে আমরা যারা সাধারণ জনগণ রয়েছি, তাদের কী হবে? আমাদের নিয়ে কেউ কি ব্যস্ত আছেন অথবা ভাবছেন, কিংবা ভাবার সময় কি আছে? এটা কিন্তু মোটেই দৃশ্যমান নয়।

আমরা কেমন জানি একটা বেড়াজালের মধ্যেই আছি। জাতি হিসেবে কি আমরা খুব একটা এগোতে পারছি? খুব একটা এগোচ্ছি বলে মনে হয় না, অবশ্যই কিছু ভালো অর্জন আমাদের আছে। সেগুলোও নষ্ট হয়ে যায় কাদা ছোড়াছুড়িতে, তাছাড়া সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় তো রয়েছেই, এই নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে আমাদের সব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের অর্জনকে ধরে রাখতে পারছি না।

আমাদের মেধা ও মননের সার্বক্ষণিক চর্চা অপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার পথ ছেড়ে কষ্টকর বিকল্প পথ ধরতে কার মন চায়? প্রয়োজনওবা কী এটাই মনে করেন অনেকে, আর আমাদের যেভাবে আগের অবস্থা চলে এসেছে সে অবস্থা থেকে খুব একটা বের হবার আগ্রহ আমরা প্রকাশ করি না। তাই প্রকৃত মেধাবীর সংখ্যা আমাদের সমাজে ক্রমেই কমে আসছে। সামাজিক অবক্ষয়ের পাল্লা ভারী হচ্ছে।

নানা কারণে আমাদের সমাজে মেধাবী কম না হলেও আদর্শনিষ্ঠ এবং সৎ ও নীতিপরায়ণ মেধাবী প্রতিবাদী মানুষের সংখ্যা কমে আসছে। কমে যাচ্ছে ব্যতিক্রমী ধারার জনস্বার্থবাদী চিন্তাবিদদের সংখ্যা। স্বভাবতই হ্রাস পাচ্ছে বা শক্তিহীন হচ্ছে অনুরূপ গুণের বৈশিষ্ট্যযুক্ত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো জনস্বার্থবান্ধব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

এগুলো সাংস্কৃতিক শূন্যতার অন্যতম কারণ। আর এই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণের পথ দেখাতে পারে প্রকৃত ও মূলধারার সংস্কৃতিচর্চা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়কে দূর করে জাতিকে নতুন যুগের পথ দেখাতে পারে।

আমাদের নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম আছে, আমরা কি তাদের কথা ভাবি? তারা ভবিষ্যতের হাল ধরবে, তাদেরকে সেভাবেই তৈরি করতে হবে আমাদের। প্রতিটি বাবা-মা কি তাদের সন্তানের খোঁজখবর রাখেন? সন্তানকে কীভাবে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে কি ভাবেন? সন্তানের বাবা-মা ব্যস্ত রয়েছেন জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর জন্য, দিনরাত পরিশ্রম করে আনা অর্থ কোনো কাজে লাগছে কি না সে বিষয়ে কারও চিন্তা করার সময় নেই।

সন্তান কী শিখছে, কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, সে খেয়াল রাখার মতো অবস্থায় আমরা নেই। কিন্তু কেন, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! কেন এমন হলো তা নিয়ে সরকার ও নাগরিক সমাজকে ভাবতে হবে। সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এগুলো থেকে বের হয়ে আসা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

একসময় ছিল মানি ইজ লস্ট, নাথিং ইজ লস্ট, হেলথ ইজ লস্ট, সামথিং ইজ লস্ট, হোয়েন ক্যারেক্টার ইজ লস্ট এভরিথিং ইজ লস্ট। কিন্তু এটার একটু পরিবর্তন হয়েছে এভাবে, এখন ক্যারেক্টার ইজ লস্ট নাথিং ইজ লস্ট, হেলথ ইজ লস্ট সামথিং ইজ লস্ট, হোয়েন মানি ইজ লস্ট, এভরিথিং ইজ লস্ট। এখন টাকাই সব, টাকার জন্য সব কিছুই করা সম্ভব।

আমরা শুধু টাকার পেছনে দৌড়াচ্ছি। টাকার জন্য মানসম্মান, আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত আছি! অপরদিকে সমাজ বিনির্মাণে, রাষ্ট্রের একজন আদর্শ নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারে আমাদের যে কিছু দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলো আমরা সঠিকভাবে পালন করছি কি না, কিংবা বেমালুম ভুলে যাচ্ছি কি না, সেটা ভেবে দেখার সময় এসেছে। সব কিছুতেই আমাদের ভেজালের ছড়াছড়ি। ওষুধে ভেজাল, খাবারে ভেজাল, পরীক্ষায় ভেজালসহ, সবকিছুতেই ভেজাল। এমন অবস্থা তো চলতে পারে না এবং চলতে দেয়া যায় না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আমদের সব অর্জন ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না।

একটি ওষুধ কোম্পানির মালিক যদি মনে করেন, তার ওষুধে কোনো ভেজাল দেবেন না, তাহলে অন্যেরা নিশ্চয় তার ওষুধে ভেজাল দিতে আসবেন না। একজন মালিককে ভাবতে হবে তার কোম্পানির ওষুধ খেয়ে লাখ লাখ মানুষ বাঁচবে, তার ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য চেষ্টা করা একেবারেই উচিত নয়। একজন খাবারের দোকানের মালিক যদি মনে করেন, কম লাভে তার চলবে, তাহলে তাকে খাবারে ভেজাল মেশাতে হবে না।

ব্যবসায় মুনাফা করতে হবে এটাই নিয়ম, তবে নিজের মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়। দেশের মানুষের কল্যাণ হয় না, শুধু নিজের লাভের জন্যই তা আমরা অনেক সময় করে থাকি। শুধু নিজের মুনাফা অর্জনের জন্য আমরা যেন একটি জাতিকে ধ্বংস করে না দিই, সেদিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে।

একজন ওষুধ কোম্পানির মালিক, খাবার প্রস্তুতকারী কোম্পানির মালিকের এটা মনে রাখতে হবে, তার ভেজাল মেশানোর কারণে হাজার হাজার মানুষ অসুস্থ হয়ে যেতে পারে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ভেজাল খাবার ও ভেজাল ওষুধ একটি জাতিকে ধবংস করে দিতে পারে। এ দিকগুলো মনে রেখেই কাজ করতে হবে। কিন্তু আমরা কি তা করছি? আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে পারলেই হলো। অন্যের কী হলো, দেশের কী হলো তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর সময় নেই।

নিজের কাছে যদি নৈতিকতা না থাকে তাহলে জাতি বা দেশ তার কাছ থেকে কী আশা করতে পারে? আমি আমার পবিত্র নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে দিই, তা হলে তো আর কিছু বলার থাকবে না। আমি আমার ‘বাংলাদেশকে ভালোবাসি’ এই স্লোগানে আমাদের সবাইকে এক কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে, এ জন্য নাগরিক সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

কারণ আগে জাতি হিসেবে আমাদের সকল সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় দূর করতে হবে। নৈতিক অবক্ষয়ের দিক থেকে আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে, চলুন, আমরা আবার সামনের দিকে ঘুরে দাঁড়াই, নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, আমাদের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, বাংলাদেশেকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে এক সুন্দর বাংলাদেশে পরিণত করি।

লেখক: প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা
বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে
ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা
বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা

শেয়ার করুন

এমপি, ইউএনও ও আমলাতন্ত্র

এমপি, ইউএনও ও আমলাতন্ত্র

২০১২ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চলাকালে শিকাগোর নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়েছিলাম একটি কাজে। তখন ওই অফিসের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তিকে দেখেছি একজন বয়স্ক নাগরিককে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছেন। এটুকু কাজ করতে ওই অফিসারের সময় লেগেছে বড়জোর দুই মিনিট। কিন্তু তার এই দুই মিনিটের আচরণ দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছি যে, ৯ বছর আগের সেই দৃশ্যটি এখনও চোখে ভাসছে।

প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী একটি জাতীয় দৈনিকে (দৈনিক ইত্তেফাক, ৬ জুন ২০২১) এ সময়ে আমলাদের ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে লিখতে গিয়ে এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, এখনকার মন্ত্রী, উপমন্ত্রীদের অধিকাংশই কোনো দিন মন্ত্রী হওয়ার আশা স্বপ্নেও দেখেননি। সে যোগ্যতা ও সাহসও তাদের নেই। তবু তারা মন্ত্রী হয়েছেন। আমলাদের কোনো নির্দেশ দেয়ার সাহস তাদের নেই, যোগ্যতাও তাদের নেই। তাদের অনেকেই কোনো কাজের জন্য অনুরোধ জানালে বলেন, দেখি প্রধানমন্ত্রী কী বলেন। অর্থাৎ সব ক্ষমতা এবং সব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর।

তাহলে তারা আছেন কেন—এর দুই দিন বাদেই আমলাতন্ত্র নিয়ে রসিকতার ছলে একটি নির্মম মন্তব্য করেছেন মন্ত্রিসভার জেন্টেলম্যান তথা সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র সব সময়ই থাকবে। ফেরাউনও অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক ছিলেন। তিনিও আমলাতন্ত্রের বাইরে যেতে পারেননি। আমলাতন্ত্রের বিকল্প বের করতে পারেননি। সোভিয়েতরা চেষ্টা করে বের করতে পারেননি। চীনারাও বের করতে পারেননি। এমনকি খলিফারাও বের করতে পারেননি।’

আমলাতন্ত্র নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর এই মন্তব্যের পাঁচ দিনের মাথায় একজন মাঠপর্যায়ের আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান। কোনো একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে দুদকে একজন আইনপ্রণেতার এ রকম অভিযোগের ঘটনা বিরল। শুধু তা-ই নয়, অভিযোগ জানানোর পরে সাংবাদিকদের কাছে এমপি মোকাব্বির খান যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, সেটি আরও ভয়াবহ।

তিনি বলেছেন, ‘দেশ কীভাবে চলছে এইটা অনুমান করেন। আমি একজন সংসদ সদস্য হয়েও ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছি। উনিও বলেছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। কিন্তু এখনও আমার সব জায়গায় চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো আমাকে রিট করতে হবে।’

এই আইনপ্রণেতা আরও বলেন, ‘দেশে অসৎ আমলা, অসৎ ব্যবসায়ী এবং অসৎ কিছুসংখ্যক রাজনীতিবিদ এদের সমন্বয়ে যে সিন্ডিকেট হয়েছে। এইটা অত্যন্ত শক্তিশালী। এদের কাছে প্রধানমন্ত্রী জিম্মি, মন্ত্রিপরিষদ জিম্মি, সংসদ জিম্মি, এমপিরাও জিম্মি এবং সর্বোপরি জনগণ জিম্মি।’

গণমাধ্যমের খবর বলছে, এমপি মোকাব্বিরের নির্বাচনি এলাকায় একটি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের জন্য জায়গা অধিগ্রহণ ইস্যুতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নির্দেশ মানছেন না। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যের অভিযোগ, ইউএনও সরকারি নীতিমালা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন। তিনি দুর্নীতিবাজদের মদদ দিচ্ছেন।

এ ঘটনার সত্যতা কতটুকু তা সঠিক তদন্ত হলেই জানা যাবে। তবে একজন আইনপ্রণেতাকে যদি ইউএনওর মতো মাঠ প্রশাসনের কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে নানা জায়গায়, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছেও অভিযোগ জানাতে হয়, তাহলে এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, দেশে আমলাতন্ত্র কী ভয়াবহ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

দেশের আমলাতন্ত্র কতটা শক্তিশালী হয়েছে, এর প্রমাণ নানা ঘটনায় পাওয়া যায়। এর পেছনে সুস্পষ্টভাবে বেশ কিছু কারণও রয়েছে। যার একটি বড় কারণ আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী উল্লেখ করেছেন। এর বাইরে আরও অনেক কারণ রয়েছে। যার সবগুলো হয়তো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়।

সম্প্রতি আমলাদের মধ্যে, বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীদের মধ্যে ‘স্যার’ ও ‘ভাই’ সম্বোধন ইস্যুতে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং এই ঘটনাগুলো আমাদের যে মূল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে তা হলো, সংবিধানের ভাষায় যে জনগণ হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের মালিক এবং যাদের করের পয়সায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন হয়, সেই জনগণই কেন তাদের সেবক সরকারি কর্মচারীদের ‘স্যার’ সম্বোধন করবে?

বরং হওয়ার কথা তো উল্টো। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক সরকারি অফিসে কোনো সেবার জন্য গেলে সংশ্লিষ্ট অফিসারেরই উচিত তাকে স্যার বলে সম্বোধন করা এবং তিনি তার জন্য কী করতে পারেন—বিনয়ের সঙ্গে সেটি জানতে চাওয়া। এই চাওয়াটা খুব অমূলক বা অযৌক্তিক নয়।

অথচ বাস্তবতা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, সরকারি অফিসে কোনো কাজের জন্য যাওয়া মানে তাকে নিঃসন্দেহে কোনো না কোনো হয়রানির মধ্যে পড়তে হবে। হয় ঘুষ দিতে হবে, নয়তো যে কাজ এক দিনে হওয়ার কথা, সেই কাজের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের গাফিলতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে প্রতিদিন যে কত মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, এর হিসাব কে রাখে?

অথচ সভ্য রাষ্ট্রে কোনো সিনিয়র সিটিজেন সরকারি অফিসে সেবা নিতে গেলে যথেষ্ট বড় পদের কর্মকর্তাও উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানান এবং চেয়ার এগিয়ে দেন। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই প্র্যাকটিস দেখেছি এবং মেলানোর চেষ্টা করেছি, আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীরা নাগরিকদের সঙ্গে কী আচরণ করেন!

স্মরণ করতে পারি, ২০১২ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চলাকালে শিকাগোর নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়েছিলাম একটি কাজে।

তখন ওই অফিসের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তিকে দেখেছি একজন বয়স্ক নাগরিককে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছেন। এটুকু কাজ করতে ওই অফিসারের সময় লেগেছে বড়জোর দুই মিনিট। কিন্তু তার এই দুই মিনিটের আচরণ দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছি যে, ৯ বছর আগের সেই দৃশ্যটি এখনও চোখে ভাসছে।

আমাদের সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে আমরা কি এই আচরণ প্রত্যাশা করতে পারি? কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পরে তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষা বদলে যায়।

তাদের কাছে যখন তাদের বাবা-মায়ের বয়সী কোনো নাগরিকও সেবা নিতে যান, উঠে দাঁড়ানো তো দূরে থাক, তাদের সঙ্গে চাকর-বাকরের মতো আচরণ করেন। অথচ জনগণের প্রতি তাদের আচরণ কেমন হতে হবে, সেই নির্দেশনা স্বাধীনতার পরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই সেই নির্দেশনা মানেননি বা এখনও মানেন না।

অবশ্য গণহারে সব সরকারি কর্মচারী নিশ্চয়ই খারাপ নন। প্রশ্ন হলো, সেই ভালো-মন্দের অনুপাতটা কত? নিশ্চয়ই অনেক ভালো আমলা আছেন। সে রকমই একজন ভালো আমলা সম্প্রতি আমলাতন্ত্রের দুটি বৈশিষ্ট্যের কথা লিখেছেন-

১. আমলারা নিজেদের স্বার্থে মিথ্যা বলতে কখনও পিছপা হন না। ২. একজন আমলা কোনো ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেললে তারা সেটা স্বীকার করবেন না; বরং পদক্ষেপটি যে সঠিক ছিল, এটা প্রমাণের জন্য পুরো আমলাতন্ত্র একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

অনেক সময় সরকারের আচরণেও মনে হয়, তারা বুঝি গণকর্মচারীদের কাছে জিম্মি। বিশেষ করে প্রতিবছর যখন ডিসি সম্মেলন হয়, তখন সেখানে ডিসিরা যেসব দাবিদাওয়া তোলেন (এমনকি তারা বিচারিক ক্ষমতাও চান) তাতে মনে হয়, রাজনীতিবিদরা নন, বরং দেশটা আমলারাই চালান।

বাস্তবতা হয়তো সে রকমই। কিন্তু এখানে পলিটিক্যাল লিডারশিপের দায়িত্ব অনেক। তাদের শরীরী ভাষা আর আচার-আচরণে যদি প্রশাসনের লোকেরা ভয় না পায়, যদি কর্মচারীরা মনে করে যে সরকার তাদের ক্ষমতায় ভর করে টিকে আছে, তাহলে প্রশাসনের শৃঙ্খলা বজায় রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু কেন শরীরী ভাষা সে রকম হয় না—এর ব্যাখ্যা প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী দিয়েছেন।

ফলে আমরা যখন আমলাতন্ত্রের মানবিকীকরণ বা সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে মার্জিত আচরণের কথা লিখি, তখন এ প্রশ্নটিও সামনে চলে আসে যে, কেন তারা নিজেদের জনগণের সেবক না ভেবে প্রভু ভাবছে? কেন তারা প্রত্যাশা করে যে, সবাই তাদের ‘স্যার’ বলবে? কেন তারা জনগণের করের পয়সায় বেতন নিয়ে সেই জনগণকেই সেবা দেয়ার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে ঘুষ নিতে লজ্জাবোধ করে না?

কেন তারা মনে করে বা কেন তাদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে গেল যে, তারা দিনের পর দিন দুর্নীতি ও অনিয়ম করে গেলেও সেটার কোনো বিচার হবে না?

সুতরাং পুরো প্রশাসনযন্ত্র যেভাবে শক্তিশালী হয়েছে, তাতে সিলেটের এমপি মোকাব্বির খান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মতো একজন মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদকসহ বিভিন্ন জায়গায় যে ঘোরাঘুরি করছেন, আখেরে হয়তো কিছুই হবে না। বড়জোর তাকে অন্য কোনো উপজেলার ইউএনও হিসেবে বদলি করে দেয়া হবে। আর এমপি সাহেবও হয়তো ভাববেন, তিনি খুব জিতে গেছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা
বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে
ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা
বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা

শেয়ার করুন

সরকারের প্রতিজ্ঞার বিপরীতে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব

সরকারের প্রতিজ্ঞার বিপরীতে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব

বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি ম্যান্ডেট হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। এরই অংশ হিসেবে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় নারীদের পদায়ন করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নকে আশ্রয় করে বাংলাদেশ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন করেছে। বর্তমানে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশের স্বপ্নও দেখছি যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন একটি অন্যতম শর্ত।

বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেয়ার ক্ষেত্রে নারী ইউএনও চায় না মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এমন একটি সংবাদ দেখার পর ভাবছি তারা আর কোথায় কোথায় নারীদের দেখতে চায় না? কমিটির এক সভায় নারীর বিকল্প নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নারীরা সাধারণত জানাজায় অংশ নেন না এবং এ নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা হয় তাই যেখানে যেখানে নারী ইউএনও আছেন সেখানে পুরুষ প্রতিনিধি খুঁজতে বলা হয়েছে। অবাক হলাম এমন একটি প্রস্তাব সরকারের ভিতর থেকে আসতে পারে ভেবে!

বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি ম্যান্ডেট হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। এরই অংশ হিসেবে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় নারীদের পদায়ন করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নকে আশ্রয় করে বাংলাদেশ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন করেছে।

বর্তমানে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশের স্বপ্নও দেখছি, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন একটি অন্যতম শর্ত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক প্রতিশ্রুতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন এই বাংলার নারীরা। সংসদের স্পিকার নারী, বিচারপতির আসনে নারী আছেন। আধুনিক যুগে প্লেন চালাচ্ছেন নারী, জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে আছেন নারী। বিশ্ব যখন আজকে হাঁটছে নারী-পুরুষ বৈষম্যহীন একটি বিশ্বের দিকে, তখন আমাদের বাংলাদেশকে পিছিয়ে নিতে চাইছে কারা?

কদিন আগেই বিয়ের রেজিস্টার হিসেবে নারীরা থাকতে পারবেন না বলে একটি সুপারিশ করেছিল আইন মন্ত্রণালয়, যেটি হাইকোর্টের এক রুলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। আমাদের নারীরা কোথায় নেই? খেলার মাঠ থেকে আকাশজয়, সবকিছুই হচ্ছে নারীর হাত ধরে।

যে দেশটি আজকে এগিয়ে যাচ্ছে রকেটের গতিতে, সেই দেশটির চালকের আসনে আছেন একজন নারী, যিনি বিশ্বের সফল নেতৃত্বের কাতারে নাম লিখিয়েছেন অনেক আগেই। পিছিয়ে পড়া মানুষ তো নারী নেতৃত্ব নিয়েও আপত্তি জানাচ্ছেন। তাহলে কি এই কমিটি দেশটির নেতারও পরিবর্তন চায়? মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির কাজ কী? তাদের কাজ কি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এমন নীতি তৈরি করা, নাকি পিছিয়ে পড়ার জন্য রাস্তা বানানো?

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অপরদিকে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের উত্থান। ধর্মকে আশ্রয় করা মৌলবাদী গোষ্ঠী এমনিতেই নারী শিক্ষা, নারীদের বাইরে কাজ করা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। ৯০ ভাগ মুসলমানের দোহাই দিয়ে তারা দেশটাকে কী বানাতে চায় স্পষ্ট নয়। বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ হাঁটছে অত্যন্ত সাহসিকতায়। মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্যতম একটি হাতিয়ার হচ্ছে নারীদের এগিয়ে যাওয়াকে উৎসাহিত করা।

সরকার নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে নীতিগতভাবেই। অর্থাৎ, যেসব নারী কোনো না কোনো কারণে বাইরে কাজ করতে আসতে পারছেন না, তারা যেন ঘরে বসেই অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার হতে পারেন সে জন্য নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ।

সরকারের কর্মকৌশল বলছে এক কথা আর এর অংশীদাররা চলছে উল্টোদিকে। সমাজে নানা অছিলায় চলছে নারীকে হেয় করার কাজ। নারী নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনা এখন নৈমিত্তিক। মাঠপর্যায় থেকে নারী নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে খুব কম। বিশেষ করে করোনাকালে যে পরিমাণ নারী নির্যাতন বেড়েছে, সেগুলোর দিকে নজর দেয়া কি কমিটিগুলোর কাজ নয়? বাল্যবিবাহের হার বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। নারী শিক্ষার হারের কথা নাইবা বললাম।

প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে আরও কীভাবে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়, কীভাবে নারী প্রতিনিধিদের কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত ও ক্ষমতায়ন করা যায় এ নিয়ে নীতিমালা সুপারিশ বা যাচাই কি সংসদীয় কমিটির কাজ নয়?

মূলত, সরকারের কাজগুলোর একটি চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের ভূমিকায় থাকার কথা কমিটিগুলোর। অথচ আমরা দেখলাম তারা সরকারি নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক একটি সুপারিশ করে বসল। এখন প্রশ্ন আসে, তার মানে কি শর্ষের মধ্যেই ভূত?

সরকারের ভিতরে বসে থাকা নীতিনির্ধারকদের মগজে তাহলে কী চলছে? তারাও কি চান নারী কেবল ঘরকন্যার কাজে ব্যস্ত থাকবেন? মৌলবাদের ধারক-বাহকের ভূমিকায় যদি আমাদের নীতিনির্ধারকরা আবির্ভূত হন, তাহলে আমাদের আশা-ভরসার জায়গাগুলো কেবল সংকীর্ণই হয় না, ধাক্কাও খায়। কেন বারবার হাইকোর্টকে সব বিষয়ে মতামত দিতে হবে?

নারী উন্নয়ন নীতি তো একটি মীমাংসিত বিষয়। এখানে কেন আবার নতুন করে হামলা আসছে? সংসদের নারী প্রতিনিধির কোটা বাড়ানো হয়েছে। সরাসরি নির্বাচনেও এখন নারীরা অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে নারীর অবস্থান কোথায় কীভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সেই বিষয়টিকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর কোথাও কোনো আলোচনা দেখি না।

নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা নারী সমাজের একটি পুরোনো দাবি। আমাদের নারীরা ক্রমেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসছেন, নানা কাজে অংশ নিচ্ছেন।

অথচ, এর পরিপূরক একটি কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা নিয়ে কাজটি হচ্ছে না। অথচ উল্টো নারীর অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়ার সুপারিশ করছেন নীতিনির্ধারকরা। এ ধরনের মানসিকতা কেবল নারীবিদ্বেষী মানসিকতারই প্রমাণ দেয়। নারীকে সমাজে অনেক ধরনের নির্যাতন বা বৈষম্যের শিকার হতে হয়। এর মধ্যে আছে- ১. যৌন হয়রানি ২. শারীরিক নির্যাতন ৩. মানসিক নির্যাতন এবং ৪. পদের বৈষম্য।

পরিসংখ্যান বলে নারীরা শ্রমের বিনিময়ে পুরুষের সমান মজুরি পান না। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারীদের কেবল নারী বলেই নেয়া হয় না অনেক পদে। ধরেই নেয়া হয় নারীরা শারীরিক পরিশ্রম করতে হয় এমন পদের জন্য সঠিক নির্বাচন হয় না।

এতসব বৈষম্য বজায় রেখে কোনোভাবেই নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব নয়। আমাদের বাজেট নারীবান্ধব নয়। নারী উন্নয়নের কথা বলি, অথচ নারীর জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ নির্মাণে আমরা উদাসীন। সমাজ থেকে এসব বৈষম্য দূর করতে হলে দরকার নীতিমালা ও এর সঠিক বাস্তবায়ন। আর এ কাজটি করবেন আমাদের জনপ্রতিনিধিরা, যারা জনগণের রায় নিয়ে সংসদে বসে আইন বানান। অথচ এই কাজটি যারা করবেন তারাই ইদানীং দেখা যাচ্ছে নারী প্রগতির প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন।

আমাদেরকে আরও জেন্ডার সেনসেটিভিটি নিয়ে কাজ করতে হবে। সরকারের মধ্যে বসে থাকা মানুষগুলোর জেন্ডার নীতিমালার যথেষ্ট অভাব আছে। লিঙ্গ বৈষম্য একটি বিশ্বাস ও চর্চার বিষয়। সন্দেহ জাগে, আমাদের সংসদীয় কমিটির যারা এই সুপারিশটি করার মতো চিন্তা করতে পেরেছেন তাদের মগজেও নারী একটি ‘অবজেক্ট’ মাত্র। নারীকে তারা সহযাত্রী হিসেবে ভাবতে পারছেন না।

আশা করছি, এই সুপারিশটি কোনোভাবেই গৃহীত হবে না। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, তিনি যেন কমিটিগুলোতে যারা কাজ করবেন তাদের জন্য একটি জেন্ডার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখেন। অন্যথায়, সরকারের সকল সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে কেবল একটি সুপারিশেই।

লেখক: কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা
বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে
ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা
বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা

শেয়ার করুন

পরীমনির অভিযোগ ও মানসিক বৈকল্যের চিত্র

পরীমনির অভিযোগ ও মানসিক বৈকল্যের চিত্র

বাংলাদেশেও আজ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রান্ত। রাজনীতি যখন রাজপথ থেকে নির্বাসিত, তখন ফেসবুকই আজ হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, জনমত গড়ে তোলার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই আমাদের আরও বেশি অসামাজিক করে তুলেছে। অ্যাকচুয়াল জীবনে যে চক্ষুলজ্জা, ভার্চুয়াল পৃথিবী তা কেড়ে নিয়েছে। বাস্তবে আমরা যে কথা বলতে পারি না বা মনে থাকলেও মুখে আসে না, ফেসবুকে অবলীলায় তা লিখে দিই।

জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পরীমনির অভিযোগ নিয়ে এখন তোলপাড় সারা দেশে। তার অভিযোগ সুনির্দিষ্ট। উত্তরা ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসির ইউ মাহমুদ ১০ জুন মধ্যরাতে আশুলিয়ার ঢাকা বোট ক্লাবে পরীমনিকে জোর করে মদ খাওয়াতে চেয়েছেন, খেতে না চাওয়ায় তাকে মারধর করেছেন, গালাগাল করেছেন, মুখের ভেতর জোর করে মদ ঢেলে দিয়েছেন।

এ ঘটনায় বিচার না পেয়ে চার দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লেখা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ২০ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে নাসির ইউ মাহমুদসহ ৫ জনকে। ধর্ষণ এবং হত্যাচেষ্টা মামলার বিচার কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে চাইতে হবে জানি না।

ঘটনার দিন যদি বনানী থানা পুলিশ উদ্যোগী হতো, পরীমনির অভিযোগ আমলে নিত, ঘটনাস্থলে যেত, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করত; তাহলে বোঝা যেত দেশে আইনের শাসন আছে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। কিছু হলেই কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছেই প্রতিকার চাইতে হবে? ভাইরাল না হলে বিচার হবে না, এটাই যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তাহলে কেউ আর পুলিশের কাছে যাবে না, ফেসবুকে বিচার চাইবে। ফেসবুকে জনমত গড়ে উঠুক। কিন্তু ফেসবুক যেন বিচারের মানদণ্ড না হয়।

অবশ্য এই লেখা সেই ফেসবুক নিয়েই। গোটা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও আজ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রান্ত। রাজনীতি যখন রাজপথ থেকে নির্বাসিত, তখন ফেসবুকই আজ হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, জনমত গড়ে তোলার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই আমাদের আরও বেশি অসামাজিক করে তুলেছে।

অ্যাকচুয়াল জীবনে যে চক্ষুলজ্জা, ভার্চুয়াল পৃথিবী তা কেড়ে নিয়েছে। বাস্তবে আমরা যে কথা বলতে পারি না বা মনে থাকলেও মুখে আসে না, ফেসবুকে অবলীলায় তা লিখে দিই। পরীমনি আক্রান্ত হওয়ার পর থানায় গিয়েছিলেন, হাসপাতালে গিয়েছিলেন, শিল্পী সমিতিতে গিয়েছিলেন, গিয়েছিলেন পরিচালক সমিতিতেও। কোথাও বিচার পাননি।

শেষ পর্যন্ত ফেসবুকের দ্বারস্থ হয়েছেন। বিচার চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। মুহূর্তেই তার সেই স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়ে যায়। সাংবাদিকরা ছুটে যান পরীমনির বাসায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠে প্রবল জনমত। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। এই জনমতের প্রবল চাপেই প্রকাশ্যে অভিযোগের ২০ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে মূল অভিযুক্ত নাসির ইউ মাহমুদসহ ৫ জনকে।

তাৎক্ষণিকভাবে জনমত গড়ে তোলার প্রবল শক্তি যেমন ফেসবুকের আছে। আবার ফেসবুকের অনেক অন্ধকার দিকও আছে। ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, লাইকি- একেকটা অ্যাপস যেন একেকটা ফাঁদ।

ইন্টারনেটের বিশাল জগতে কত হাতছানি। রাতারাতি তারকা বনে যাওয়ার টোপ যেমন আছে, তেমনি আছে জীবন ধ্বংস করে দেয়ার ফাঁদও। বিশেষ করে নারীদের জন্য ভার্চুয়াল জগৎ মানেই যেন আতঙ্ক। ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে কত নারীর সর্বনাশ করা হয়, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

পরীমনি রোববার সন্ধ্যায় যে স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলেন, ২৪ ঘণ্টা পর তাতে ২ লাখ ৮৫ হাজার রিয়্যাক্ট, ১ লাখ ১০ হাজার মন্তব্য। রিয়্যাক্টের বেশির ভাগই অট্টহাসির। পরীমনির স্ট্যাটাসের ১ লাখ ১০ হাজার মন্তব্য ছাড়াও তার বিভিন্ন লাইভ, ফেসবুকে অন্য অনেকের স্ট্যাটাসের নিচে এ বিষয়ে আরও কয়েক লাখ মানুষের মন্তব্য আছে। সব মন্তব্য ফলো করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে সত্যি কথা বলতে গেলে, মন্তব্যের কিছু অংশ দেখে আমার মনে হয়েছে আমরা আসলে আদিম যুগে বাস করছি।

নিজেদের সভ্য দাবি করার যোগ্যতা আমাদের নেই। মানুষের মনে এত বিকৃতি, এত অশ্লীলতা থাকতে পারে, এটা কল্পনা করাও অসম্ভব। মনে না হয় থাকল, কিন্তু সেই বিকৃতি, সেই অশ্লীলতা এভাবে প্রকাশ্যে সামাজিক যোগাযোগে উগড়ে দেয়া কীভাবে সম্ভব; আমার চিন্তায় আসে না!

বিকৃত মানসিকতার এই মানুষগুলোর মধ্যে কিছু ফেক আইডি যেমন আছে, তেমনি আছে বিপুলসংখ্যক চেনা মানুষও। আমি খালি ভাবি, এই মানুষগুলো যে এভাবে নিজেদের ভেতরের নোংরামি সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে; তাদের কি বাবা-মা নেই, ভাই-বোন নেই, স্বামী/স্ত্রী-সন্তান নেই, বন্ধুবান্ধব নেই? আগে যেটা বলেছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের চোখের লজ্জার পর্দাটা সরিয়ে দিয়েছে।

পরীমনির অভিযোগ অনুযায়ী নাসির ইউ মাহমুদ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফেসবুকে নাসিরের অপরাধের চেয়ে পরীমনি কেন অত রাতে সেখানে গেল সেটা নিয়ে অনেকের কৌতূহল। ঢাকা বোট ক্লাব কোনো নিষিদ্ধ স্থান নয় যে, সেখানে যাওয়া যাবে না।

আচ্ছা ধরে নিলাম, পরীমনি অত রাতে সেখানে গিয়ে খুবই খারাপ কাজ করেছেন। কিন্তু একজন নারীকে মধ্যরাতে কোথাও পেলেই আপনি তাকে ধর্ষণ করতে যাবেন।

অনেকের মন্তব্য দেখে মনে হয়েছে, নাসিরের জায়গায় তিনিও থাকলে একই কাজ করতেন। অনেকে এমনও বলছেন, পরীমনিকে ধর্ষণ করতে হবে কেন? ভাবখানা এসন সিনেমার নায়িকাদের যেন কোনো মানসম্মান নেই, চাইলেই যে কেউ যখন-তখন নায়িকাদের কাছে পেতে পারেন। অনেকে বলছেন, ধর্ষণ-টর্ষণ কিছু না, টাকাপয়সার বনিবনা হয়নি। এগুলো কিন্তু উদ্ধৃত করার যোগ্য মন্তব্য। হাজার হাজার মন্তব্য আছে, যেগুলো এখানে লেখা তো দূরের কথা পড়তেও বিবমিষা জাগে।

আমরা সভ্যতার কথা বলি, ভদ্রতার কথা বলি। গত দুদিন ফেসবুক দেখে মনে হচ্ছে, এসবই আসলে ভদ্রতার মুখোশ। আমরা আসলে এখনও সভ্য হতে পারিনি।

পরীমনি কোথায় কার সঙ্গে বেড়াতে গেছেন, কেমন পোশাক পরে সিনেমায় অভিনয় করেছেন; এসব টেনে এনে তার সঙ্গে হওয়া অন্যায়কে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এমনকি পরীমনি যখন সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন, তখনও অনেকে হাসছিলেন আর বলছিলেন, এটাও অভিনয়। পরীমনি বারবার বলছিলেন, আপনার সঙ্গে না হলে আপনি বুঝবেন না। আসলেই আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইওনি। সিনেমার নায়িকা মানেই যেন বাজারের পণ্য। আরে ভাই বাজারের পণ্যও তো আপনি অনুমতি ছাড়া ছুঁতে পারবেন না!

মানলাম, আপনাদের অভিযোগই ঠিক, পরীমনির চরিত্র ‘খারাপ’। তার অনেক পুরুষ বন্ধু। কিন্তু অনেক পুরুষ বন্ধু মানেই এই নয় যে, আপনিও তার বন্ধু। সিনেমার নায়িকা মানেই ভোগ্যপণ্য, এই ধারণাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন, মানুষকে মর্যাদা দিতে শিখুন।

শুধু পরীমনির জন্য নয়, সব মানুষের জন্য একটা নিরাপদ দেশ গড়ার আমাদের সবার চেষ্টা, আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু চারপাশে যখন এমন অসংখ্য বিকৃত মানুষ কিলবিল করছে, তখন সেই নিরাপদ সমাজটা গড়ে তোলা কঠিন। গত কদিনে ফেসবুকে অনেক মানুষ দেখেছি, যারা সেই নাসিরের মতোই।

নাসিরের সামর্থ্য আছে বলে সে পরীমনির ওপর চড়াও হয়। সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে আরও অনেক মানুষ নারীর ওপর চড়াও হতো। নিজেকে সভ্য দাবি করতে হলে আগে মানুষকে মর্যাদা দিতে শিখুন, মানুষের ব্যক্তি জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান করুন। নিজের ভেতরের অশ্লীলতাকে, নোংরা অস্তিত্বকে প্রকাশ করে সমাজকে আরও নোংরা করবেন না।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা
বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে
ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা
বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা

শেয়ার করুন

জানাজা আর গার্ড অফ অনার এক নয়

জানাজা আর গার্ড অফ অনার এক নয়

কেন এ রকম একটি নিয়ম চালুর কথা উঠেছে, এ প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাহজাহান খান বলেছেন, ‘এই প্রশ্ন আসছে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে। কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়েছে, জানাজায় নারীরা অংশ নিতে পারেন না।’

খবরটি দেখে তথমত খেয়ে গেলাম। নারী নেতৃত্বাধীন একটি স্বাধীন দেশে এ রকম একটি প্রস্তাব নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয় কীভাবে? খবর হচ্ছে: কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার সময় সরকারের নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি তুলেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ ব্যাপারে বিকল্প খুঁজতেও বলা হয়েছে ওই সুপারিশে।

কেন এ রকম একটি নিয়ম চালুর কথা উঠেছে, এ প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বলেছেন, ‘এই প্রশ্ন আসছে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে। কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়েছে, জানাজায় নারীরা অংশ নিতে পারেন না।’

এ ক্ষেত্রে প্রথমেই যে প্রশ্নটা আসছে, সেটা হলো ‘গার্ড অব অনার’ কি জানাজা? একদম তা নয়। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা যাওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানায় প্রশাসন। গার্ড অব অনার দিতে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকেন জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে সরকারের প্রতিনিধি হয়ে মরদেহে ফুলের শ্রদ্ধাও জানান সংশ্লিষ্ট ওই সরকারি কর্মকর্তা। এখানে জানাজার প্রশ্নটা এলো কোথা থেকে?

কেন এ রকম একটি বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে? কেন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নারীর উপস্থিতি ও পদমর্যাদা নিয়ে এই আপত্তি তোলা হচ্ছে? এর উত্তরে শাজাহান খান সাহেব গণমাধ্যমকে বলেছেন, “কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়েছে, জানাজায় নারীরা অংশ নিতে পারেন না। ‘গার্ড অফ অনার’ সাধারণত জানাজার সময় দেয়া হয় বলে এই সুপারিশ আসছে। যদি গার্ড অব অনার জানাজার আগে দেয় বা পরে দেয়, তখন জানাজা থাকে না। সেইটা একটা জিনিস। আমরা দেখেছি, সব জায়গায় জানাজার সময় গার্ড অব অনার দেয়। ওই জায়গায় ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করে এটা সুপারিশ করা হয়েছে।”

জানাজার সাথে ‘গার্ড অফ অনার’-এর সময়েরও কোনো সম্পর্ক নেই। একজন মানুষ মারা যাওয়ার পরে অনেকবার জানাজা পড়ানো হয়ে থাকে দিনের বিভিন্ন সময়ে। আর ‘গার্ড অফ অনার’ একবারই দেয়া হয়, বীরকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর জন্য। এ ক্ষেত্রে আগে বা পরে জানাজার প্রশ্নটি আসেই না। কেন তারা এ রকম এটি সুপারিশ পেশ করেছেন, সেটা তাদের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেনি।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক আঙ্গুর নাহার মন্টি তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, তার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উনি মারা যাওয়ার পর গার্ড অফ অনার দিয়েছিলেন একজন নারী ইউএনও। এতে ঐ শোকের সময়েও ওর অন্যরকমের একটা শান্তি লেগেছিল।

সম্মানিত সভাপতি সাহেবের কাছে আমরা জানতে চাই যে, কারা বা কোন কোন জায়গা থেকে এই আপত্তি তোলা হয়েছে? যারা আপত্তি তুলেছেন, তারা কি জানেন না যে জানাজা ও গার্ড অফ অনার এক জিনিস না? নাকি জেনেশুনেই নারীকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার বাহানা বের করছেন? মহিলার বিকল্প একজন পুরুষকে দিয়ে গার্ড অফ অনার দেয়ার বিষয়টি এনে তারা কি রাষ্ট্রীয় ডেকোরামের প্রতি প্রশ্ন তুলছেন না?

শুধু কি নারী ইউএনও? বাংলাদেশে অনেক নারী জেলা প্রশাসকও তো আছেন। জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একটি সরকারি পদ। এখানে নারী কিংবা পুরুষের কোনো প্রশ্ন আসে না। তবে কি সংসদীয় কমিটি এবার নারী ডিসি, এসপি, ইউএনও করার পথও রুদ্ধ করতে চাইবে? নারী যদি আর দশটা রাষ্ট্রীয় কাজ করতে পারেন, তাহলে এটা করতে বাধা কোথায়?

হঠাৎ একটি নিয়ম উত্থাপন করলেই চলে না। সংসদীয় কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক কিছুই এসব কমিটিতে আলোচিত হয়। কাজেই এখানে যা কিছু আলোচিত হবে, নিঃসন্দেহে তা চিন্তাভাবনা করেই আলোচনা করা দরকার।

বাংলাদেশের নির্বাহী প্রধান হিসেবে নারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ১৯৯১ সাল থেকে, অর্থাৎ ৩০ বছর। বাংলাদেশের সংসদে স্পিকারও একজন নারী। যে দেশ নারীর নেতৃত্বাধীনে ৩০ বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে, সে দেশে এত বছর পরে এ রকম একটি অদ্ভূত প্রশ্ন ওঠে কীভাবে? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন দেশের কতগুলো মডেল মসজিদ উদ্বোধন করেছেন। উনি সরকারপ্রধান হিসেবেই এটা করেছেন, কোনো নারী হিসেবে নয়। অন্য কোনো নারীকে এই কাজ করতে দেয়া হতো কি না, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। কাজেই নারী বলে নয়, নারী যে পদে অধিষ্ঠিত আছেন, সেটা ভেবেই কথা বলতে হবে।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে এ দেশের নারী সমাজ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। গান্ধীজির অসহযোগ, লবণ আইন, সত্যাগ্রহ, এ ছাড়া তেভাগা, নাচোল, টংক প্রথাবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই জোরালো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং এ দেশের আইন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। দেশে সকল প্রশাসনিক পদ নারীর জন্য উন্মুক্ত।

এ অবস্থায় এ ধরনের চরম জেন্ডার অসংবেদনশীল ও অমূলক প্রস্তাব কীভাবে সংসদীয় কমিটিতে ওঠে ও আলোচিত হয়, তা সত্যিই বিস্ময়কর। সরকার যেখানে সব ধরনের কাজে নিয়োজিত নারীর প্রয়োজনের দিকটাকে মূল্য দেয়, সরকার যেখানে কর্মক্ষেত্রে জেন্ডারবান্ধব পরিবেশ প্রণয়ন করতে চায়, সেখানে নারীর পদমর্যাদার অধিকার শুধু নারী বলে, দুর্বল অজুহাতে কেড়ে নিতে দেয়া হবে না। আশা করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টির প্রতি সহৃদয় দৃষ্টি দেবেন।

লেখক: সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন:
কারামুক্তি দিবস ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা
বন্দিজীবনকে কাজে লাগিয়েছিলেন উন্নত দেশ গঠনে
ভার্চুয়াল-জগৎ: চেনা পৃথিবীকে করছে অচেনা
বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা

শেয়ার করুন