বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 

বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 

নির্বাচন দিতে পাকিস্তান শাসকরা রাজি হলে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ইশতেহারে যে ২১ দফা দেয় তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পশ্চিমা শোষকগোষ্ঠীর কাছ থেকে সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তিই ছিল এর মূল বিষয়বস্তু। যেমন ২১ দফার প্রথম দফা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান; তা ছাড়াও শিক্ষার উন্নয়ন, কৃষির উন্নয়ন এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন। বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই বাংলা ভাষা ও বাঙালি সাংস্কৃতিক সত্তা জাগ্রত করতে সচেষ্ট ছিলেন। পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা- তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিফলন দেখা যায় তার উপস্থাপিত ছয় দফায়।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতো কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। অনেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামেই বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে সীমাবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বস্তুতপক্ষে, ছাত্রজীবন থেকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাসহ প্রতিটি সংগ্রামে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা কী ছিল এ বিষয়ে এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।

আমরা জানি, অল্পবয়স থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে থাকে। তবে পঞ্চাশের দশক তার রাজনৈতিক উত্থানের কাল। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দূরদর্শী এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন এক কুশলী রাজনৈতিক নেতা।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর থেকে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার জন্য গোটা দেশে ঘুরে বেড়ান। মুসলিম লীগের অপশাসনে ইতোমধ্যেই পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে একধরনের ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। মুসলিম লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অপশাসন থেকে মুক্তিলাভের কৌশল হিসেবে ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট নামের নির্বাচনি জোট গঠনের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। এই জোটটি ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে জনগণের অসন্তুষ্টি, সরকারে বাঙালির নিম্ন প্রতিনিধিত্ব, তৎকালীন শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি ও রাজনৈতিক-দমন-পীড়নের বহিঃপ্রকাশ।

এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন যুক্তফ্রন্টের স্থপতি যা মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চারটি দল নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম এবং গণতান্ত্রিক দল। জোটের মূল লক্ষ্য ছিল ১৯৫৪ সালের ৮-১২ মার্চের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভা নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে লড়াই করা।

নির্বাচনি প্রচারণায় যুক্তফ্রন্ট প্রচার করে ২১ দফার একটি ম্যানিফেস্টো। এ দফাগুলোর মধ্যে ছিল: বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, জমিদারিপ্রথাবিলোপ, পাট ব্যবসা জাতীয়করণ, সমবায়পদ্ধতিতে চাষবাস, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, বন্যা প্রতিরোধের স্থায়ী ব্যবস্থা, কৃষির আধুনিকায়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, সব কালাকানুন রহিতকরণ, সমন্বিত বেতনকাঠামো প্রবর্তন, দুর্নীতি দমন, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ, ভাষাশহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষা উন্নয়নের কেন্দ্রে রূপান্তর, ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা এবং পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ২০১৭, প্রথমা প্রকাশন)।

এসব দাবি উপস্থাপন করেন এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান। বামপন্থী দলগুলোর কর্মীদের সহায়তায় ফ্রন্টের নেতারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েও নির্বাচনের প্রচারণা চালাতে সক্ষম হন।

যুক্তফ্রন্ট যেসব বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরে সেগুলো ছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য ছাত্রদের আত্মাহুতি এবং লবণ, চাল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ক্রমবর্ধমান মূল্য। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বহু নেতা-কর্মীর ধরপাকড়ে জনসাধারণ মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধভাবাপন্ন হয়ে ওঠে (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ২০১৭, প্রথমা প্রকাশন)।

তখন শেখ মুজিবসহ বেশির ভাগ সদস্যই যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। শেখ মুজিব বলেন, দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল নেই। যুক্তফ্রন্ট করা মানে কিছু মরা লোককে বাঁচিয়ে রাখা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী এবং মওলানা ভাসানীও যুক্তফ্রন্টের ঘোর বিরোধী ছিলেন। যুক্তফ্রন্ট হবে না এ সিদ্ধান্তের পর হোসেন শহীদ পাকিস্তানে যান। তখন বঙ্গবন্ধু জেলায় জেলায় সভা করে বেড়ান। আর এদিকে ঢাকায় বসে মওলানা ভাসানী শেরেবাংলার সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সই করে ফেলেন।

যেখানে আওয়ামী লীগ এককভাবে জিততে পারত সেখানে নেজামে ইসলাম পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি ও গণতান্ত্রিক দলসহ বিভিন্ন নামের সংগঠন যুক্তফ্রন্টের নামে মনোনয়ন দাবি করতে লাগল। যারা দিনরাত খেটেছে আওয়ামী লীগের জন্য এমন লোক নমিনেশন পেল না, মাত্র তিন চার মাস আগেও মুসলিম লীগে ছিল, এ রকম লোক নমিনেশন পেয়ে যায়।

এখানে উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকে যুক্তফ্রন্ট গঠনের বিরোধী ছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যে শক্তি অর্জন করেছে, মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনে তারাই জয়লাভ করবে। কিন্তু দলের সিনিয়র নেতাদের মতামতকে সম্মান জানিয়ে তিনি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করেননি (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২)।

এদিকে নির্বাচন দিতে পাকিস্তান শাসকরা রাজি হলে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ইশতেহারে যে ২১ দফা দেয় তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পশ্চিমা শোষকগোষ্ঠীর কাছ থেকে সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তিই ছিল এর মূল বিষয়বস্তু। যেমন ২১ দফার প্রথম দফা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান; তা ছাড়াও শিক্ষার উন্নয়ন, কৃষির উন্নয়ন এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন। বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই বাংলা ভাষা ও বাঙালি সাংস্কৃতিক সত্তা জাগ্রত করতে সচেষ্ট ছিলেন। পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা- তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিফলন দেখা যায় তার উপস্থাপিত ছয় দফায়।

নির্বাচনের বিজয়লাভের পরে, যুক্তফ্রন্টের নেতা একে ফজলুল হককে ১৯৫৪ সালে ৩ এপ্রিল প্রাদেশিক গভর্নর মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে প্রথমেই দ্বন্দ্ব বাধে। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু কতটা বিশাল ছিলেন তার পরিচয় পাওয়া যায় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর মন্ত্রিসভা গঠনের সময় মন্ত্রিত্ব ভাগাভাগি করা নিয়ে জোটের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় তখন।

আওয়ামী লীগ থেকে আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রদান করা হলেও শেখ মুজিবকে মন্ত্রিত্বে নিতে অনীহা প্রকাশ করেন ফজলুল হক । বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন-

‘হক সাহেব শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেবকে বলেছিলেন আমি শেখ মুজিবকে আমার মন্ত্রিত্বে নিব না।’

তার উত্তরে শহীদ সাহেব বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের কাকে নেয়া হবে না হবে সেটাতো আমি ও ভাসানী সাহেব ঠিক করব, আপনি যখন বলেছেন নান্না মিয়াকে ছাড়া আপনার চলে না। তখন আমরাও তো বলতে পারি শেখ মুজিবকে ছাড়া আমাদের চলে না।

সে আমাদের দলের সেক্রেটারি। মুজিব তো মন্ত্রিত্বের প্রার্থী না। এ সকল কথা বললে পার্টি থেকে বলতে পারে’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২ পৃ. ২৯ )। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখন শহীদ সাহেব এবং ভাসানী সাহেবকে বলেছিলেন- ‘আমাকে নিয়ে গোলমাল করার প্রয়োজন নেই। আমি মন্ত্রী হতে চাই না। আমাকে বাদ দিলে যদি পুরো মন্ত্রিত্ব গঠন করতে রাজি হয় আপনারা তাই করুন। (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২ পৃ. ২৯ )’।

এ থেকেই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু কতটা ক্ষমতাবিমুখ ছিলেন। বয়সে তরুণ হলেও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল অনেক বেশি। আর এই কারণেই তিনি যুক্তফ্রন্টের বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনি জোট করতে যাচ্ছে সেই জোট বেশি দিন টিকবে না। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আওয়ামী লীগ তখন রাজনৈতিক দল হিসেবে যে রকম শক্তিশালী ছিল তাতে একা নির্বাচন করলেও নির্বাচনি বৈতরণী খুব সহজে পার হতে পারত। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট গঠন করার ফলে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু ত্যাগী নেতা নির্বাচনে মনোনয়ন পেলেন না, যা তাদের ওপর একধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যেটি প্রকারান্তরে দলের জন্য খারাপ হতে পারে।

এ থেকে বোঝা যায় যে, বঙ্গবন্ধু কতটা দূরদর্শীসম্পন্ন নেতা ছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কেন তিনি যুক্তফ্রন্টের বিরোধিতা করেছিলেন তা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন তিন মাস পরে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ পূর্ব পাকিস্তানের ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শাসন জারি করলেন (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ২০১৭, প্রথমা প্রকাশন)।

আমরা এটাও জানি, বঙ্গবন্ধু বেশির ভাগ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে দেশ ও জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও ক্ষমতায় যেতে পারেননি। এরপরে ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দেশে ফিরে মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এই সময়ে বাংলাদেশকে ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে সপরিবারে তাকে হত্যা করা হলে সেই স্বপ্ন বাস্তব লাভ করেনি। রাজনীতিবিদ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বিশালতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তার একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন-

‘One of the remarkable features of his political life was his transformation from an ordinary rank and file worker of a political party to an unparalleled leader of millions of people. Bangabandhu possessed outstanding organizational capacity; at the same time he was a great orator. Generally we do not find such a combination of qualities in one leader (Raunaq Jahan, The Political philosophy of Bangabandhu, Dhaka Tribune, 10 June 2019)’.

বঙ্গবন্ধুর কখনও জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে খুব বেশি ভাবেননি। তিনি ভেবেছিলেন কীভাবে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো যায়। এই দুটি ছিল তার জীবনের মূল লক্ষ্য। তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই আমরা তার রাজনৈতিক চিন্তাধারা উপলব্ধি করতে পারি। আর এই কথার সত্যতা মেলে মাত্র তিনটি বাক্যেই যেখানে বঙ্গবন্ধু তার আত্মপরিচিতি ও মূল্যবোধ অত্যন্ত পরিষ্কার করেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র প্রথমেই বঙ্গবন্ধু লিখেছেন: ‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্প্রীতির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, মে ৩, ১৯৭৩)।

যেকোনো নির্দিষ্ট ফ্রেমে বন্দি করে বঙ্গবন্ধুর বিশালতাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ২১ দফা প্রণয়নকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে না পরলেও সেই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন। দলীয় সিদ্ধান্তকে মেনেই নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। এর মাধ্যমেই তার রাজনৈতিক বিশালতার পরিচয় ফুটে ওঠে।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক, প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বজ্রপাতে আর অসহায় ভাবার সুযোগ নেই

বজ্রপাতে আর অসহায় ভাবার সুযোগ নেই

বাংলাদেশে বজ্রপাতের ওপর তেমন কোনো গবেষণা নেই। তবে ইউরোপ, জাপান ও আমেরিকায় এ বিষয়টি নিয়ে বড় গবেষণা চলছে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, অন্য যেকোনো দুর্যোগের চেয়ে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও এর ঝুঁকি কমাতে দৃশ্যমান উদ্যোগ কম। বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাথমিক পর্যায়ে সারা দেশে তালগাছের ৫০ লাখ চারা রোপণের উদ্যোগ নিলেও এটি খুব একটি কার্যকর নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশসহ পৃথিবীজুড়ে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ৪০টি বজ্রপাত হয় বলে আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। পৃথিবীর বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলের একটি বাংলাদেশ।

এই অস্বাভাবিকতার কারণ হচ্ছে, বায়ুমণ্ডলে কালো মেঘ বেড়ে যাওয়া। কালো মেঘ সৃষ্টির পেছনে বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফারের পরিমাণ বাড়াকেই দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে ৮০ লাখ বজ্রপাত সৃষ্টি হয়। উন্নত দেশগুলোতেও একসময় বজ্রপাতে অনেক মানুষের মৃত্যু হতো। কিন্তু তারা বজ্রনিরোধক খুঁটি বা পোল স্থাপন করা, মানুষকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এনেছে। তবে তার আগে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছে উন্নত দেশগুলো।

এতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলোসহ পূর্ব এশিয়ায় বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা বহুলাংশে কমেছে। যদিও বজ্রপাত সম্পর্কে অনেক কল্পকাহিনি প্রচলিত, বিজ্ঞানের কল্যাণে বজ্রপাতের কারণ পরিষ্কার হয়েছে। সহজ ভাষায় বায়ুমণ্ডলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক বৈদ্যুতিক চার্জের গঠন ও পৃথকীকরণে বজ্রপাত সংঘটিত হয়। সারা বছরের হিসাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত সংঘটিত হয় ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো হ্র্রদে। অপরদিকে আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকার অবস্থান দ্বিতীয়।

বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে এর ব্যাপকতা জনজীবনকে ভাবিয়ে তুলছে এবং ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এখন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ কিংবা ডাটাবেইজ সৃষ্টিতে কর্তৃপক্ষ তৎপর। সরকারি পর্যায়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন এনজিও, গণমাধ্যম কর্তৃক প্রদত্ত তথ্যে দেখা যায়, বিগত পাঁচ বছরে সারা দেশে বজ্রপাতে প্রায় তিন হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে এবং ২০১১ সালের পর থেকে এর প্রবণতা ক্রমাগতভাবেই বেড়ে চলছে।

যেমন, ২০১৫ সালে ৯৯ জন, ২০১৬ সালে ৩৫১ জন ও ২০১৭ সালে ২৬২ আর ২০১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৫৭ জনের মৃত্যু, ২০২১ সালের মে পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু ও চার শতাধিক আহত হওয়ার খবর রয়েছে; যা গ্রামাঞ্চলে ফসলের মাঠ, পুকুরের পাড় ও হাওরে বেশি সংঘটিত হচ্ছে। বজ্রপাতে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, বুয়েট, দুর্যোগ ফোরাম, গণমাধ্যমসহ একাধিক তথ্যমতে, বজ্রপাতে ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। এত বেশি মৃত্যুহারের জন্য মানুষের অসচেতনতাকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, বজ্রপাত সম্পর্কে দেশের প্রান্তিক ও নিরক্ষর জনসাধারণের সঠিক ধারণা না থাকার দরুন মৃত্যুহার বেশি। ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাতের সময়ও এ দেশের লোকজন খোলা জায়গায় কাজ করে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়।

দেশি-বিদেশি গবেষণা বলছে, দেশে গত কয়েক বছরে কালবৈশাখীর পাশাপাশি বজ্রপাত বেড়েছে। বজ্রপাতে মৃত্যু নিয়ে একক কোনো কারণ চিহ্নিত করতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। অনেকটাই ধারণানির্ভর তথ্যে তারা মনে করছেন, তাপমাত্রা ও বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি, জনজীবনে ধাতব পদার্থের ব্যবহারের আধিক্য, মোবাইল ফোন ব্যবহার ও এর টাওয়ারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, বনভূমি বা গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস, জলাভূমি ভরাট ও নদী শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আর এসবের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের সম্পর্ক আছে।

বিশ্বখ্যাত সায়েন্স পত্রিকার নিবন্ধে ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বজ্রপাতের আশঙ্কা ১২ শতাংশ বেড়ে যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া-সম্পর্কিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বজ্রপাত। প্রযুক্তির ব্যবহার করে বজ্রপাতে মৃত্যু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে, তবে সচেতনতা এবং সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। এখনই এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

বজ্রপাতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হিসেবে প্রথমত, দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলো শনাক্ত করতে হবে আবহাওয়া জরিপের ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে গণমাধ্যমের বদৌলতে আমরা যেসব তথ্য পাই তা থেকে দেখা যায়, দেশের ১৪টি জেলা বজ্রপাতের ঝুঁকির আওতায় রয়েছে, এর মধ্যে সুনামগঞ্জের নাম ওপরের দিকে রয়েছে।

তাই এলাকার মানুষকে এই বার্তাটি দেয়ার দায়িত্ব কার? অবশ্যই সরকারের; তবে স্থানীয়ভাবে কর্মরত সামাজিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বও কম নয়। যেহেতু মার্চ থেকে মে পর্যন্ত এই বজ্রপাতের প্রকোপ বেশি, তাই বিভিন্নভাবে প্রচার, সতর্কীকরণ, সামাজিক সভা ও মাইকিং করা যেতে পারে।

যেসব বিষয় এতে স্থান পাবে তা হলো, বজ্রপাতের সময় পাকা ভবনের নিচে আশ্রয় নেয়া, উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে থাকা, বাড়ির জানালা থেকে দূরে থাকা, ধাতব বস্তু স্পর্শ না করা, বিদ্যুৎ-চালিত যন্ত্র থেকে দূরে থাকা, গাড়ির ভেতরে না থাকা, পানি থেকে দূরে থাকা, বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে নিচু হয়ে বসা, রাবারের জুতা ব্যবহার করা, বজ্রপাতজনিত আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমির পরিমাণ হ্রাস, বড় গাছ কাটা ও বৈদ্যুতিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ার কারণে বজ্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতি দুটিই বেড়েছে। একটি দেশের আয়তনের এক-চতুর্থাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের দেশে সামাজিক বনভূমির পরিমাণ হিসাবে আনলেও তা কোনোভাবেই ২৫ শতাংশ হয় না। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বনভূমির পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সখ্য গড়ে তুলতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে বজ্রপাতে আগে বছরে ৪০০ থেকে ৪৫০ জন নিহত হতো, সেখানে এখন মারা যায় ২০ থেকে ৪০ জন। গত বছর নিহত হয়েছে মাত্র ১৬ জন।

গবেষকরা বলছেন, নগরায়ণের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি মানুষ নগরে থাকছে। বিদ্যুতের লম্বা খুঁটি মানুষের উচ্চতার অনেক ওপরে থাকায় আর খুঁটির সঙ্গে আর্থিংয়ের ব্যবস্থা বজ্রপাত থেকে মানুষের জীবনহানি রোধ করে।

ক্ষয়ক্ষতি হয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির। বড় গাছ ধ্বংস করে ফেলার কারণে আমাদের গ্রামাঞ্চল অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। গ্রামে আগের জমিদার বাড়ির ছাদে, মন্দিরের চূড়ায় কিংবা মসজিদের মিনারে যে ত্রিশূল বা চাঁদ-তারা দিয়ে আর্থিং করা থাকত, সেটাও বজ্রপাতের প্রাণহানি থেকে মানুষকে রক্ষা করত।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল (সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া), সাতক্ষীরা-যশোরের বিল অঞ্চল আর উত্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর অঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে। আর গত বছর প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষই মারা যান মাঠে অথবা জলাধারে (নদী-খাল, বিল) কাজ করার সময়। এসব অঞ্চলে মুঠোফোনের টাওয়ার লাইটেনিং এরস্টোর লাগিয়ে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানো যায়। মুঠোফোন কোম্পানিগুলো তাদের দায়িত্বের অংশ হিসেবে কাজটি করতে পারে। পল্লী বিদ্যুৎ ও সীমান্তরক্ষীদের সব স্থাপনায় কমবেশি এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। সতর্ক হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেতে পারে। দুঃখজনক সত্যটি হলো, বাংলাদেশে বজ্রপাতের ওপর তেমন কোনো গবেষণা নেই। তবে ইউরোপ, জাপান ও আমেরিকায় এ বিষয়টি নিয়ে বড় গবেষণা চলছে।

আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, অন্য যেকোনো দুর্যোগের চেয়ে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও এর ঝুঁকি কমাতে দৃশ্যমান উদ্যোগ কম। বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাথমিক পর্যায়ে সারা দেশে তালগাছের ৫০ লাখ চারা রোপণের উদ্যোগ নিলেও এটিও খুব একটি কার্যকর নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, বুয়েট, দুর্যোগ ফোরাম, গণমাধ্যমের তথ্য ও একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হিসাবমতে, গত ছয় বছরে সারা দেশে বজ্রপাতে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। বজ্রপাতের এমন প্রবণতাই বলে দিচ্ছে প্রকৃতি কতটা রুষ্ট হয়ে উঠছে। মানুষের অধিক চাহিদা আর লোভে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্টের খেসারত হিসেবে প্রকৃতির প্রতিশোধ কি বজ্রপাত? সে বিষয় নিয়ে এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে।

লেখক: গবেষক, কলাম লেখক ও সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

নারীর মর্যাদা সুরক্ষায় প্রত্যাশা

নারীর মর্যাদা সুরক্ষায় প্রত্যাশা

উঠতি বয়সী মেয়েরা দ্রুত জনপ্রিয় হতে গিয়ে অপরাধের শিকার হচ্ছে। যেমন টিকটক, লাইকির মতো ভিডিও বা লাইভ অ্যাপে দ্রুত তারকা হওয়ার ইচ্ছা থাকে কম বয়সী অনেক ছেলেমেয়ের। লাখ লাখ ফলোয়ার বা লাইকের আশায় অনেকেই এসব মাধ্যমে মগ্ন হয়ে পড়ে। আর এর সুযোগ নেয় অপরাধীরা। প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা নারীদের স্বাবলম্বী দেখতে চাচ্ছি কিন্তু তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে বেগ পেতে হচ্ছে।

পরিবারে মেয়ে মানেই ঝামেলা; মেয়ে মানেই দুশ্চিন্তা- এমন ধারণা পরিবার এবং সমাজে বহুকাল ধরেই প্রচলিত। মা, দাদি, চাচি ,ফুফু, মামিদের প্রতি একরকম নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে শুনতে বড় হয় একটি কন্যাশিশু। তার মনেও ‘মেয়েছেলে’ বা ‘মেয়েমানুষ’-এর প্রতি এবং একই সঙ্গে মেয়ে হিসেবে নিজের প্রতি হীনম্মন্যতা বোধ জন্ম নেয়। নারীর প্রতি সম্মানের একটা ‘মানদণ্ড’ তৈরি হয়ে যায়। তাছাড়া পরিবারে ছেলেসন্তানের তুলনায় কন্যা হিসেবে নিত্যদিনের বৈষম্যমূলক আচরণে একরকম ভবিতব্য বলেই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়।

ছোট থেকেই এটা করবে না, সেটা করা বারণ, কারণ তুমি মেয়ে- এ রকম বিধিনিষেধের বেড়াজালে কঠোর পরিবেশে বড় হতে হয় একটি মেয়েশিশুকে। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে তাদের জানা বা বোঝার সুযোগ খুব সীমিত। তবে পরিবার বা আশপাশের পরিবেশে থেকে সামাজিক বিভিন্ন ঘটনাবলি থেকে মেয়েশিশুদের মধ্যে মানুষ সম্পর্কে একটা সহজাত ধারণা জন্মলাভ করে।

অল্প বয়সেই সে বুঝতে পারে কে তার প্রতি স্নেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, কে তার প্রতি কু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। কে তাকে ভালোবাসে আর কে তাকে হিংসা করে। এভাবেই কোনটা ভালো বা কোনটা খারাপ সেসব বিষয়ে তার মনে একটা নিজস্ব ধারণা জন্ম নেয়। অনেক ক্ষেত্রে সেটা পরিপূর্ণ না-ও হতে পারে।

নারীকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চাইলে শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে তাদের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং ঠিকভাবে গড়ে উঠতে দিতে হবে। পরিবারের উচিত তার শিশুকে ছোট থেকেই নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা ও পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কিছু বিষয়ে শিশু বা নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেয়া। পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ভালোমন্দ বিষয়গুলো বয়সভেদে বোঝানোর দায়িত্ব পরিবারের। নয়তো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা মেয়েরা যখন হঠাৎ হাতে প্রযুক্তি পায়, স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ পায় তখন ভালোমন্দ না বুঝেই নানা ধরনের ফাঁদে পড়ে, তৈরি হয় জটিল পরিস্থিতি।

অনিরাপত্তা নারীর জীবনের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বাড়িতে, চলতি পথে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অফিসে এমনকি অনলাইনে নারীরা নানানভাবে নির্যাতিত বা প্রতারণার শিকার হয়। এখন নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অন্যতম মাধ্যম হয়েছে ইন্টারনেট দুনিয়া। অনলাইন জগৎ যেমন দূরকে হাতের মুঠোয় এনেছে, তেমনি এর মাধ্যমে অপরাধও বেড়েছে অনেক। এর ফাঁদে পড়ে কিশোরী বা উঠতি বয়সী মেয়েরা দ্রুত জনপ্রিয় হতে গিয়ে অপরাধের শিকার হচ্ছে।

যেমন টিকটক, লাইকির মতো ভিডিও বা লাইভ অ্যাপে দ্রুত তারকা হওয়ার ইচ্ছা থাকে কম বয়সী অনেক ছেলেমেয়ের। লাখ লাখ ফলোয়ার বা লাইকের আশায় অনেকেই এসব মাধ্যমে মগ্ন হয়ে পড়ে। আর এর সুযোগ নেয় অপরাধীরা। প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা নারীদের স্বাবলম্বী দেখতে চাচ্ছি কিন্তু তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে বেগ পেতে হচ্ছে।

প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে নানা প্রান্ত থেকে ধর্ষণ আর নারী নিগ্রহের খবর আসছে। ধর্ষণ, নির্যাতন বা হয়রানি, যে রকমই হোক না কেন, নারীদের প্রতি এই আচরণ সরাসরি মানবিক মর্যাদার লঙ্ঘন। যা ব্যক্তিগত আঘাত বা যন্ত্রণা সহ্য করে বেঁচে থাকতে হয়। সম্প্রতি কিছু নারী ধর্ষণ ও নিগ্রহের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অভিযুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আবার তনু হত্যার মতো ঘটনায় তাদের নিষ্ক্রিয়তা মানুষকে হতাশ করেছে।

ইউনিসেফের এক জরিপে জানা যায়, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হওয়ার মতো বিপদের মুখে রয়েছে। সেখানে ৬৩ শতাংশ ছেলে এবং ৪৮ শতাংশ মেয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এ ছাড়া বলা হয়, ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে।

কোভিড-১৯ আমাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বেকারত্ব, বিশৃঙ্খলা, নারী-শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ সব ক্ষেত্রেই একটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদিও গত বছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয় ‘কোভিড-১৯ প্রতিরোধ করি: নারী ও কিশোরীদের সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করি’।

স্থানীয় পর্যায়ে কীভাবে নারী ও কিশোরীদের অধিকতর সুরক্ষা দেয়া যায়, তা নিয়ে ভাবনা ও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে কি মনে হয় আদৌ এটা আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে ধরনের খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে নারী ও কিশোরীরা রয়েছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে পৌঁছানো এবং আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলনের (আইসিপিডি) প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ভিত্তিমূলে তিনটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো অধিকার ও পছন্দ, সমতা ও জীবনের গুণগত উন্নয়ন।

এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাতৃমৃত্যুর হার, যৌন সহিংসতা, নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহের হার কমিয়ে শূন্যে নামানো। যদিও বাস্তবে এর চিত্র অন্যরকম। করোনাকালে বাল্যবিবাহের হার বেড়ে গেছে। আর এর অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সময়ে মেয়েশিশুকে বাড়তি বোঝা মনে করে অনেক পরিবার।

এদিকে, জাতিসংঘে এ বছরে নারী দিবসের স্লোগান ছিল ‘করোনা বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করি, সমতা অর্জনে নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করি’। এই স্লোগানের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশ সরকার ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে দিবসটি পালন করে।

নারীর প্রতি সমতার চ্যালেঞ্জ এখন সবখানেই। পরিবার-সমাজ, সম্পদ-দক্ষতা, উচ্চশিক্ষা-জীবিকা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, অবস্থানগত ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশের নারীরা অনেকটাই এগিয়েছে। তবে পুরুষের তুলনায় এ সংখ্যা বেশ পিছিয়ে। নারী-পুরুষের সমান সুযোগ, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এখনও সমাজের বড় চ্যালেঞ্জ।

নারীদের শিক্ষায় অগ্রগতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সরকারের শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর হার প্রায় ৫১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকেও প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ছাত্রী। তবে উচ্চশিক্ষায় এখনও ঝরে পড়ার হার বেশি।

সমাজ বা রাষ্ট্রে দু-চার জায়গায় নারীদের ভালো অবস্থান হয়নি তা বলা যাবে না। নারীরা কিন্তু এগিয়ে আসছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যদিও নারীর উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সম-অধিকার-সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার বিভিন্ন আইন-নীতি, কৌশল প্রণয়ন করেছে এবং তা বাস্তবায়ন করছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

হাত পাতা মানুষ ও আমাদের দায়

হাত পাতা মানুষ ও আমাদের দায়

অনেকে হয়তো বলবেন বিচিত্র এই রাজধানী শহরে কবে হাত পাতা মানুষ ছিল না! এর জবাব হলো, ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা বেড়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। নিয়মিত ভিক্ষাবৃত্তিতে নাম লেখাচ্ছেন অসহায় মানুষ। বিশেষ করে হাত পাতা নারীর সংখ্যা বেড়েছে বেশি।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। পরিস্থিতি সামাল দিতে শক্তিশালী দেশগুলো রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। সংকটের ঢেউ সমানতালে লেগেছে বাংলাদেশেও। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে আর্থিক টানাপোড়েন সবচেয়ে বেশি।

সমাজের কিছু ঘটনাপ্রবাহ আর্থিক সংকটের চিত্র একেবারেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। একটু খেয়াল করে চললেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়। অভাব আছে। কিন্তু প্রকাশ্যে হাত পাতা সম্ভব হচ্ছে না এমন লোকজনও সরকারি জরুরি সেবায় ফোন করে রাতে চাল-ডালসহ নিত্যপণ্য নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর থেকে রাজধানী ঢাকায় বেড়েছে হাত পাতা মানুষের সংখ্যা। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত সবখানেই এখন টাকা চাওয়ার নতুন মুখ। কোথাও ১০ মিনিট দাঁড়ালে অন্তত চারজন এসে টাকা চান! কেউ সরাসরি আর্থিক সহযোগিতা চান। কেউবা মেয়ে বিয়ে, সন্তানের চিকিৎসা, ওষুধ কেনাসহ নানা সংকটের কথা বলে টাকা দাবি করেন।

অনেকে হয়তো বলবেন বিচিত্র এই রাজধানী শহরে কবে হাত পাতা মানুষ ছিল না! এর জবাব হলো, ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা বেড়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। নিয়মিত ভিক্ষাবৃত্তিতে নাম লেখাচ্ছেন অসহায় মানুষ। বিশেষ করে হাত পাতা নারীর সংখ্যা বেড়েছে বেশি।

রাজধানীর নিউ ইস্কাটন এলাকায় একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। এইচপিআরসি হাসপাতালের ঠিক বিপরীতে পদ্মা স্টুডিও ও মিকাডো রেস্টুরেন্টের সামনে প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত অবধি একজন নারী তার দুটি শিশু বাচ্চাকে নিয়ে আসেন।

ফুটপাতে ফিডার মুখে চটের ওপর শিশু দুটিকে শুইয়ে রাখেন মা। ফিডারে দুধ থাকে না। পানি। সামান্য কাপড় দিয়ে শিশু দুটির গা ঢাকা থাকে। পাশে বসে মা মানুষের কাছে হাত পাতেন। টাকার জন্য সবার কাছে আকুতি-মিনতি জানাতে থাকেন। কখনও কখনও কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বাভাবিকভাবেই দৃশ্যটি খুবই করুণ। বেদনাদায়ক। সমাজের সব বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে এই দৃশ্যটি খুবই নাড়া দেয়। এটাই স্বাভাবিক। করোনা পরিস্থিতির আগে কিন্তু এই স্থানে এমন ভিক্ষাবৃত্তি দেখা যায়নি।

শহরের অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানে সম্প্রতি এক নারীকে ফুটপাতে তার শিশুসন্তানকে নিয়ে মানুষের কাছে হাত পাততে দেখা গেছে। যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। হাত পাতা এই নারীর বক্তব্য হলো- তিনি বাড্ডা এলাকায় একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন। সম্প্রতি তাকে কর্মস্থল থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। পরিস্থিতির শিকার হয়ে স্বামী পরিত্যক্তা এই নারী বাঁচার প্রয়োজনে হাত পাততে বাধ্য হয়েছেন।

আরেকটি ঘটনার কথা বলি, রাজধানীর অনেক সিগন্যালে একদল শিশুকে মানুষের কাছে টাকা চাইতে দেখা যায়। এ রকম চিত্র আগেও দেখা গেছে। এখন যেসব কচি মুখের শিশু খালি গায়ে হাত পাতছে, এদের বেশির ভাগ নতুন মুখ। শিশুরা বলছে, সম্প্রতি তারা পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছে। সংসারের চাকা সচল রাখতেই বাবা-মায়ের পরামর্শে তারা রাস্তায় এসেছে! বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। একদিকে কোমলমতি শিশুদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি কোনোভাবেই আইনসিদ্ধ নয়, অপরদিকে এ কাজে নিয়োজিত করায় শিশুদের মনোজগতে বিরূপ প্রভাব পড়বে জীবনের শুরু থেকেই। শিক্ষার মাধ্যমে আলোর পথ সে কখনোই দেখার সুযোগ পাবে না। টাকা চেয়ে বেঁচে থাকা যায় এ বিষয়টি মনের মধ্যে আরও বেশি শেকড় ছড়াবে।

যদি এ পথ থেকে আগামী প্রজন্মের সম্ভবনাময় মুখগুলোকে ফেরানো সম্ভব না হয়, তবে এসব শিশুর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার পথ একেবারেই অনিশ্চিত। আস্তে আস্তে এ শিশুদের বিপথে পা বাড়ানোর আশঙ্কা খুবই প্রবল। এমন তো হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাদের সুন্দর পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে অনেক মেধাবী মুখ। হয়ে উঠতে পারে আলোকিত মানুষ। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে অনায়াসে।

বড় কথা হলো, এসব হাত পাতা অসহায় মানুষকে ঘরে ফেরানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামান্য উদ্যোগেই এসব অসহায় মানুষের আর্থিকভাবে পুনর্বাসন করা যায়। প্রতিটি পরিবারের সমস্যার কথা চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। তেমনি আর্থিক সংকটের কারণে যেসব এলাকা থেকে এসব ভাসমান মানুষের আসা, সেখানেই তাদের ফেরত পাঠানো যেতে পারে। নিজ এলাকায় ফিরিয়ে এ পরিবারগুলোর জীবন চলা নিশ্চিত করতে খুব বেশি টাকা খরচের প্রয়োজন হয় না।

সবার আগে থাকার জায়গাটি নিশ্চিত করতে হবে। একটি অটো বা ভ্যান, সেলাই মেশিন, দোকান বা পশু পালনের ব্যবস্থা করা গেলেই জীবনের অসহায়ত্ব কেটে যাবে সময়ের এই অসহায় মানুষদের। তবে প্রতিটি পরিবারের শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা একেবারেই নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। যেন এসব শিশুকে কোনোভাবেই আর পথে নামতে না হয়। প্রয়োজনে অসহায় ছেলে শিশুদেরও শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কমাতে পরিবারকে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।

যেসব শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তির কোনো অভিভাবক নেই, তাদের সরকারি পরিচর্যা কেন্দ্রে পাঠানো যায়। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরীর অনেক সড়ক ভিক্ষুকমুক্ত সাইনবোর্ড ঝুলছে ঠিক, কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে সাইনবোর্ডের মিল নেই। তাই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকেও এ নিয়ে ভাবতে হবে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো, কোভিড পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশে বিদেশি অতিথিদের আনাগোনা তো আছেই। নানা কারণে তারা দেশে আসছেন।

বিদেশিদের সামনে রাস্তায় হাত পাতা মানুষ মানেই- একটি দেশের জন্য কখনোই সুখকর হতে পারে না। কথা হলো- রাস্তায় নতুন এমন মানুষের সংখ্যা সর্বোচ্চ কত হতে পারে? হয়তো ১০ হাজার। আন্তর্জাতিক বিশ্বে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল রাখতে এই ১০ হাজার মানুষকে রাস্তা থেকে ঘরে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া এখন সময়ের দাবি।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, মহামারির শুরুর দিকে যে পরিমাণ সাহায্য-সহযোগিতা অসহায় মানুষ পেত, এখন তা একেবারেই কমে গেছে। অর্থাৎ ভিক্ষায় স্বাভাবিক জীবন চলাও অনিশ্চিত। এর মধ্য দিয়ে সমাজের একটি অংশ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তালিকায় নাম লেখাবে। তেমনি অপুষ্টির শিকার চেহারাগুলো সামনের দিনে হয়তো রাস্তাঘাটে আরও বেশি চোখে পড়বে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) যৌথভাবে দরিদ্র মানুষের ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব নিয়ে একটি জরিপ করেছে। গত ৪ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত টেলিফোনে এ জরিপ করা হয়। জরিপে অংশ নেন ৫ হাজার ৪৭১ জন। এতে বলা হয়েছে, গৃহকর্মীদের ৫৭ শতাংশেরই কোনো কাজ নেই।

এই গৃহকর্মীদের ৭৬ শতাংশের আয় কমেছে। ফলে নিম্ন আয়ের অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্তদের পরিবারের যে ভোগান্তি, একই ভোগান্তি হচ্ছে গৃহকর্মী ও তার পরিবারগুলোর। সরকারি পর্যায়ে অসহায় এসব মানুষের জন্য ছোটখাটো কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তারা হয়তো রাস্তায় হাত পাততে আসত না।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

ভূমিহীন-আশ্রয়হীনের আশ্রয় ও অগ্রযাত্রা

ভূমিহীন-আশ্রয়হীনের আশ্রয় ও অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশের আজকে অনেক সূচকে পরিবর্তনের যেসব স্বীকৃতি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে আমরা পাচ্ছি এর মূলে দেশকে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বস্তির জায়গায় নিয়ে আসার সরকারি দূরদর্শিতারই সাফল্য। বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার মর্যাদা লাভে যে স্বীকৃতি অর্জন করেছে এর মূলে দেশকে বিদ্যুতায়ন অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে কোনো গৃহহীন, আশ্রয়হীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষ থাকবে না- এমন ঘোষণা দেয়ার পর অনেকেই এটিকে বিশ্বাস করতে চাননি। না চাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে গৃহহীন, আশ্রয়হীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষের যে বিপুল সংখ্যা বাংলাদেশে বিরাজ করছে তা বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা আমাদের প্রয়োজন সেটি আগে ছিল না। তবে স্বপ্নচারী দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানুষকে তার লক্ষ্য ও গন্তব্য যত দূরেই হোক না কেন তা দেখাতে মোটেও পিছপা হন না।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সেই গন্তব্যের কথাই উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি তার লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাননি। তার কন্যা শেখ হাসিনা দায়িত্বগ্রহণ করার পর এই লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সেভাবেই গড়ে তুলছেন। এখন তিনি আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে সেই অসম্ভবপ্রায় কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন। কীভাবে এটি সম্ভব হচ্ছে সেই বিষয়ই তুলে ধরছি।

বাংলাদেশের পরিবর্তনের ধারায় ২০০৯ সাল থেকে এগিয়ে চলছে। শেখ হাসিনার সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনের ইশতেহারে যে রূপকল্প উপস্থাপন করেছিল সেটি ছিল অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মাত্র। কিন্তু দায়িত্বভার গ্রহণের পর সরকার জাতীয় অর্থনীতির কয়েকটি খাতের যুগান্তকারী পরিবর্তনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল। ওইসব চ্যালেঞ্জ গ্রহণব্যতীত বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক পরিবর্তন, জনগণের জীবনের মান উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আধুনিক প্রযুক্তি আত্মস্থ করার কোনো লক্ষ্যই পূরণ করার বাস্তব ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব ছিল না।

সরকার বিশ্ব অভিজ্ঞতা থেকে উন্নয়নের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার আশু করণীয় ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিয়েই যাত্রা শুরু করে। সেই মুহূর্তে ২০০৯ সালের সরকারের সম্মুখে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে অগ্রাধিকার পেয়েছিল দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা। সেই লক্ষ্যেই সরকার দেশকে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করতে ছোট, মাঝারি ও মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে হাত দেয় । এছাড়া প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানিরও ব্যবস্থা করা হয় ফলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকট কেটে যেতে থাকে, অর্থনীতির চাকা সচল ও গতিময়তা লাভ করতে থাকে।

বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা ২০০৯ সালে ছিল মাত্র ৩২০০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশের আজকে অনেক সূচকে পরিবর্তনের যেসব স্বীকৃতি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে আমরা পাচ্ছি এর মূলে দেশকে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বস্তির জায়গায় নিয়ে আসার সরকারি দূরদর্শিতারই সাফল্য।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার মর্যাদা লাভে যে স্বীকৃতি অর্জন করেছে এর মূলে দেশকে বিদ্যুতায়ন অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। উন্নয়নের এই গতিধারা সৃষ্টি করার ফলেই শেখ হাসিনার সরকার দেশে কিছু বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করার নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে। বেশিরভাগ মেগাপ্রকল্পই নিজস্ব অর্থায়নে করা হচ্ছে।

২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশের কেউই এত বিদ্যুৎ উৎপাদন, এত রেমিট্যান্স আহরণ, এত বড় মেগা প্রকল্প, এত বিশাল অঙ্কের বাজেট এবং এত দ্রুত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আশা করতে পারেনি। একই সঙ্গে গৃহহীন ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য এক খণ্ড ভূমি ও একটি পাকা বাড়ির ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব এটিও কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি।

যদিও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে নোয়াখালীতে গৃহহীনদের জন্য গুচ্ছগ্রাম স্থাপন করতে গিয়ে দেশে আশ্রয়হীন পরিবারকে আশ্রয় দেয়ার স্বপ্নের কথা তখন ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা ঘোষণা করার পাশাপাশি আশ্রয়ণ প্রকল্প নামে ভূমিহীনদের গৃহদানের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া হতদ্ররিদ্র নারী, পুরুষ ও বিধবা ভাতা চালু করার মাধ্যমে তিনি সমাজের হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষদের পাশে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা রাখার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

এই উদ্যোগ পরবর্তী সরকারগুলো ততটা গুরত্বের সঙ্গে নেয়নি। কিন্তু শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় আসার পর দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য হিসেবে সমাজের ওইসব পিছিয়ে পড়া মানুষের কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের বিষয়টি গুরত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী শিশু ও মানুষের সুযোগ-সুবিধা ধীরে ধীরে প্রবর্তন ও বাড়ানো অব্যাহত রাখেন। বিশেষভাবে তিনি গুরত্ব দেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীন ভূমিহীন ও আশ্রয়হীন মানুষদের জীবনজীবিকা ও থাকার ব্যবস্থা করার মতো মানবতাবাদী কর্মসূচি গ্রহণের ওপর। স্বাধীনতার ৫০ বছর ও মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেশে কোনো পরিবারই যেন ভূমিহীন ও গৃহহীন না থাকেন সেই লক্ষ্য পূরণের ঘোষণা তিনি প্রদান করেন। এটি তার আরেকটি মহা-মেগা প্রকল্প যা দেশ ও বিদেশে অনেকের কাছেই অকল্পনীয়, অভাবনীয় এবং বাস্তবায়নযোগ্য কি না- তা নিয়ে সন্দেহ ছিল।

কারণ বাংলাদেশে কত মানুষের ভূমি নেই, গৃহ নেই- তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু সবার মধ্যেই ধারণা আছে যে, এই দুই পর্যায়ের মানুষের সংখ্যা অগণিত। সুতরাং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পক্ষে এত মানুষের ভূমিসহ গৃহ ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা মোটের ওপর কল্পনাতীত।

কল্পনাতীত এই বিষয়টিই শেখ হাসিনা বাস্তবায়নে হাত দিয়েছেন। পৃথিবীর কোনো দেশেই এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে গৃহদানের মাধ্যমে শুধু মাথাগোঁজার ঠাঁই করে দেয়নি, দারিদ্র্য থেকে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করে আনার এমন অভিনব উদ্যোগও কেউ নিতে পারেনি। শেখ হাসিনা এই প্রকল্প সমাপ্তির মাধ্যমে যেদিন সব মানুষকে আশ্রয়দানের ফলে আত্মকর্মসংস্থানে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দেবেন সেদিনের পর থেকে বাংলাদেশে দরিদ্র শব্দটি শুধু বইয়ের পাতায় হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে, সমাজে অস্তিত্ব থাকবে না।

সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল গত জানুয়ারিতে। ৬৬ হাজার ১৮৯টি গৃহহীন এবং ভূমিহীন পরিবারকে ২ শতক জমির ওপর একটি আধা-পাকা দুই কামরা, টয়লেট, রান্নাঘর ও বারান্দা সংবলিত একটি থাকার বাড়ি প্রদানের মাধ্যমে। এতে বাদ যায়নি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যারাকের মতো ঘর স্থাপনের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ রেখে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এর ফলে ভবঘুরে এই মানুষগুলো এখন শুধু মাথাগোঁজার ঠাঁই-ই পেল না, উৎপাদনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখারও সুযোগ পেয়েছে। অপরদিকে গৃহহীন, আশ্রয়হীন পরিবারগুলোও তাদের গৃহের চারপাশে তরিতরকারি, হাঁসমুরগি, গরুছাগল ইত্যাদি লালন-পালনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ লাভ করেছে ও করতে যাচ্ছে। তাদের সন্তানরা লেখাপড়ার অনুকূল পরিবেশ লাভ করেছে। এসব গৃহহীন পরিবারের গৃহ নির্মাণে সরকার স্থানীয় প্রশাসন, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা এবং জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা গ্রহণ করেছে।

মাত্র ১ লাখ ৭১ হাজার টাকায় প্রতিটি গৃহ নির্মাণের যেই মিতব্যয়িতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তাও নজিরবিহীন। তবে কোথাও কাজের নির্মাণের মান খারাপ হওয়ার অভিযোগ ওঠায় প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি দ্রুত সমাধানের কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক্ষেত্রে যারা মানসম্মত গৃহস্থাপনে নজির স্থাপন করতে পেরেছেন তাদেরকে প্রশংসা এবং যারা ব্যর্থ হয়েছেন তাদেরকে তিরস্কারসহ শাস্তি প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে জানা গেছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ এরই মধ্যে কাজ শেষ করে এনেছে। ২০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫৩ হাজার ৪৩৪টি পরিবারের মধ্যে একই ধরনের গৃহ প্রদানের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছেন। এবারের বাসস্থানগুলোর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ টাকা করে। মালামাল ক্রয় ও পরিবহণব্যয় আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়। ফলে আশা করা যাচ্ছে এবারের বাড়িগুলো মানের ভিত্তিতে আরেকটু উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এবারের বণ্টন করা বাসস্থানগুলোর ৭ হাজার ২৮০টি ঢাকা বিভাগ, ২ হাজার ৫১২টি ময়মনসিংহ বিভাগ, ১০ হাজার ৫৬২টি চট্টগ্রাম বিভাগ, ১২ হাজার ৩৯২টি রংপুর বিভাগ, ৭ হাজার ১৭২টি রাজশাহী বিভাগ, ৩ হাজার ৯১১টি খুলনা বিভাগ, ৭ হাজার ৬২৭টি বরিশাল বিভাগ এবং ১ হাজার ৯৭৯টি সিলেট বিভাগে। এই বছর ডিসেম্বর মাসের মধ্যে আরও ১ লাখ পরিবার অনুরূপভাবে আশ্রয় ও গৃহ পেতে যাচ্ছে। সেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

দেশে গৃহহীন ও আশ্রয়হীনদের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু রাষ্ট্রের অর্থ নয়, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদানও সাদরে গ্রহণ করছেন। এর মধ্যে অনেকেই অনুদানের অর্থ প্রদান করছেন। বিষয়টি আরও ব্যাপক প্রচার পেলে দেশ-বিদেশে অবস্থানগত সচ্ছল ব্যক্তিরা আশ্রয়ণ প্রকল্পে অবদান রাখার জন্য এগিয়ে আসবেন বলে ধারণা করা যাচ্ছে।

দেশে প্রতিবছর নদীভাঙনের ফলে অসংখ্য মানুষ বাড়িঘর-ভিটেমাটি হারাচ্ছে। সেসব মানুষের স্থায়ী আশ্রয় এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা দরকার। একই সঙ্গে নদীভাঙনের হাত থেকে আমাদের উর্বর জমি ও মানুষের বাড়িঘর ও নানা ধরনের স্থাপনা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষায় বাঁধ নির্মাণও জরুরি।

সরকার নতুন করে জেগে ওঠা চরগুলোকে দখলদারমুক্ত রাখার জন্য সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিতে পারে। তাতে জেগে ওঠা চরগুলো মানুষের স্থায়ী আশ্রয়ণ প্রকল্পের জন্য বিবেচিত হতে পারে। এছাড়া ভূমিহীন ও আশ্রয়হীনের সংখ্যা যদি বেশি হয়, খাসজমির সংস্থান যদি না হয় তাহলে ভাসানচর অঞ্চলে থাকা কর্মসংস্থান, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে যদি আশ্রয়হীন ও কর্মহীনদের কাজে লাগানো যায় তাহলে আশ্রয়ণ প্রকল্প শুধু শেষই হবে না, আশ্রয়প্রাপ্ত মানুষ ও তাদের সন্তানরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার মতো দক্ষ জনসম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশ ২০১৭ সালে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের লক্ষ্যমাত্রায় ১৫৭টি দেশের মধ্যে ১২০তম স্থানে অবস্থান করছিল। ২০২০ সাল থেকে বৈশ্বিক করোনা মহামারির দুর্যোগ সত্ত্বেও সম্প্রতি বাংলাদেশ ১০৯তম স্থানে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ গত ১২ বছরে মাথাপিছু আয় ৫০০ ডলার থেকে ২২০০ ডলারে উন্নীত করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে বলেই এসডিজি অর্জনে যেমন সফল হচ্ছে, একইভাবে মাথাপিছু আয় ৫ শতাংশের ওপরে এবং করোনা মোকাবিলায় শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে এখন নিজস্ব শক্তিতে সর্বত্র চিকিৎসায় ঘুরে দাঁড়াতে অনেকটাই সক্ষম হচ্ছে। সেই অবস্থায় গৃহহীন, আশ্রয়হীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের শুধু বসবাসের জায়গা ও গৃহপ্রদানই নয়, কর্মক্ষম জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার যে উদ্যোগ সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা নিয়েছেন সেটিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি নিয়েছেন। এটি শেষ হলে বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনে হতদরিদ্র মানুষের অবস্থান পরিবর্তিত হয়ে অপেক্ষাকৃত সম্পদের অধিকারী কর্মক্ষম উৎপাদনশীল শক্তি হিসেবে এরা এবং তাদের উত্তরসূরি অচিরেই আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দরিদ্রপীড়িত দেশের গ্লানিকর অমর্যাদার জায়গা থেকে মুক্তির নতুন স্তরে উন্নীত হতে দেখা যাবে।

এই কাজটি একটি কল্যাণবাদী রাষ্ট্রের দর্শন। সেই দর্শন যে নেতা, তার দল ও সরকার ধারণ এবং বাস্তবায়ন করেন, তিনি, তার দল ও সরকার জনকল্যাণবাদী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রবক্তা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে এই রাষ্ট্র নির্মাণের সূচনা করেছিলেন। শেখ হাসিনা এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটাচ্ছেন। আমরা বাংলাদেশের এই বিশাল পরিবর্তনটি প্রত্যক্ষ করছি। প্রয়োজন সকল দেশপ্রেমিক মানুষের উপলব্ধি করা, এর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করা।

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ও শেখ হাসিনার ভূমিকা

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ও শেখ হাসিনার ভূমিকা

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংস হামলা চালায় সে দেশের সেনারা। গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দেয়। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় নির্যাতিত রোহিঙ্গারা। এই জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল বাংলাদেশ। দেশের সীমান্ত খুলে দিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় দেয়া হয় মিয়ানমারের নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীকে। এ দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর নিজের চোখে দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজার যান। তাদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস আজ। এবারের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- ‘একসঙ্গে আরোগ্য হব, একসঙ্গে শিখব ও একসঙ্গে দীপ্ত হব (টুগেদার উই হিল, লার্ন অ্যান্ড শাইন)।’ দুনিয়াজুড়ে দিবসটি পালনের জন্য জাতিসংঘের একটি শরণার্থী সংস্থা রয়েছে- ইউএনএইচসিআর।

২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২০০১ সালের জুনের ২০ তারিখ থেকে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দিনটি বেছে নেয়ার ঐতিহাসিক পটভূমি আছে।

১৯৫১ সালে শরণার্থীদের অবস্থান নির্ণয়বিষয়ক একটি কনভেনশনের ৫০ বছর পূর্তি হয় ২০০১ সালে। যদিও ২০০০ সাল পর্যন্ত আফ্রিকান শরণার্থী দিবস নামে একটি দিবস কয়েকটি দেশে পালিত হতো। সেটিই এখন জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্ব শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

এ প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসে যায়, শরণার্থী কারা? ১৯৫১ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী মর্যাদাবিষয়ক সম্মেলনে অনুচ্ছেদ-১-এ-তে শরণার্থীর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কাউকে জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ, সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় নিজদেশের নাগরিক অধিকার থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয় এবং রাষ্ট্র তাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলেই সে শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবে। এরপর ১৯৬৭ সালের সম্মেলনের খসড়া দলিলে শরণার্থীর এই সংজ্ঞাকে আরেকটু বিস্তৃত করা হয়।

আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সম্মেলনে যুদ্ধ ও অন্যান্য সহিংসতায় আক্রান্ত ব্যক্তির নিজ দেশ ত্যাগ করাকেও শরণার্থী হিসেবে অভিহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বিশ্বের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শরণার্থী। পৃথিবীতে এখন শরণার্থীর সংখ্যা ৮ কোটি ২০ লাখের বেশি। তার মানে বিশ্বের প্রতি ৯৫ জন নাগরিকের বিপরীতে একজন মানুষ শরণার্থী। করোনা মহামারির এই ক্রান্তিকালে মানুষের সীমিত চলাফেরার মধ্যেও গত এক বছরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ মানুষ।

এ হিসাব দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। করোনাভাইরাসের বিধিনিষেধ শিথিল হয়ে গেলে পৃথিবীজুড়ে সংঘাত আরও বেড়ে যেতে পারে। ইউএনএইচসিআর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বিশ্বের শরণার্থী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বর্তমানে বিশ্বের শরণার্থী সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এই বিশাল শরণার্থী জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই শিশু। তবে উন্নত দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় পাওয়া মানুষের সংখ্যা কম। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় শতকরা ৮৫ ভাগ শরণার্থীর আশ্রয় মিলেছে উন্নয়নশীল দেশে।

স্বদেশ হারিয়ে দুই-তৃতীয়াংশই শরণার্থী হয়েছে মাত্র পাঁচটি দেশ থেকে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিরিয়া। বিগত ১০ বছরের গৃহযুদ্ধে দেশটির ১ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ ঘরছাড়া। যা দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। বাকি চারটি দেশ হচ্ছে ভেনেজুয়েলা, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান ও মিয়ানমার। তবে এত সব নিরাশার মধ্যেও রয়েছে কিছু আশার কথা। ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদন অনুসারে জানা যায়, কিছু দেশ এই শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এ বছর ৬২ হাজার ৫০০ এবং ২০২২ সালে সোয়া লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কলম্বিয়া জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার ১০ লাখের বেশি শরণার্থীকে স্থায়ী মর্যাদা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।

শরণার্থী সংকট থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশও। বেশ কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে বেশ বিপাকেই আছি আমরা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংস হামলা চালায় সে দেশের সেনারা। গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দেয়। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় নির্যাতিত রোহিঙ্গারা।

এই জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল বাংলাদেশ। দেশের সীমান্ত খুলে দিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় দেয়া হয় মিয়ানমারের নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীকে। এ দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর নিজের চোখে দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজার যান। তাদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেন।

আগ্রহী বিদেশি সাহায্য সংস্থাগুলোকেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করার সুযোগ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই তাৎক্ষণিক মানবিক সিদ্ধান্ত পুরো বিশ্বের নজর কাড়ে এবং বিপুল প্রশংসিত হয়। তবে এখানেই থেমে থাকেননি প্রধানমন্ত্রী।

২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তিনি পাঁচ দফা প্রস্তাবও করেন। তার এই প্রস্তাবনাগুলো ছিল অনতিবিলম্বে ও চিরতরে মিয়ানমারের সহিংসতা এবং জাতিগত নিধন নিঃশর্তে বন্ধ করা, দ্রুত মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের নিজস্ব অনুসন্ধানী দল পাঠানো, জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে মিয়ানমারের ভেতর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা, রাখাইন রাজ্য থেকে জোর করে তাড়িয়ে দেয়া সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজেদের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালা নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তাবায়ন নিশ্চিত করা।

এরপর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর নিন্দা প্রস্তাব পাস করে জাতিসংঘ। তবে জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করেই বসে থাকেনি বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে থাকে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গাম্বিয়ার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) ২৩ জানুয়ারি ২০২০ সালে একটি জরুরি ‘সামরিক পদক্ষেপ’ ঘোষণা দেয়। সব মিলিয়ে গত চার বছর ধরে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সফলতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা পেয়ে আসছে।

রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে দুটি তারিখ ঘোষণা হলেও সেটা ব্যর্থ হয়। রাখাইন প্রদেশে প্রত্যাবাসন সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার ব্যর্থ হওয়ায় রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানায়। এর মধ্যেই করোনা মহামারির কবলে পড়ে যায় দুনিয়া। মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিবেশও বদলে যায়। নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সামরিক সরকার এখন ক্ষমতায়। তবু থেমে নেই বাংলাদেশ। দেশের ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে শরণার্থী রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই রোহিঙ্গাদের জন্য আরও উন্নত আবাসস্থল তৈরি করা হয়েছে ভাসানচরে। কিছু রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তরও করা হয়েছে। প্রথমদিকে কেউ কেউ এ স্থানান্তরে আপত্তি জানালেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই স্থানান্তর প্রশংসিত হয়েছে। হবেই তো।

যেখানে সুদানের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ শরণার্থীই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। খাদ্য আর বাসস্থানের মতো অতি জরুরি দুটি মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত। ওদিকে সিরিয়া, ইরাকসহ কয়েকটি দেশ থেকে ইউরোপের ২৭টি উন্নত দেশও ১০ লাখ শরণার্থীর ঢল সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। সেখানে বিপুল ঘনবসতির বাংলাদেশ ১২ লাখ শরণার্থীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান জুগিয়ে অনবরত চিকিৎসা ও শিক্ষাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। সুপরিকল্পিত ও যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া এই অসাধ্য সাধন অসম্ভব। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যেতে হচ্ছে দেশকে। তবে বাংলাদেশ কেবল রোহিঙ্গা নয়, বিশ্বের অন্যান্য শরণার্থী সমস্যার সমাধানও চায়।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

একুশ দফা-ছয় দফা ও স্বাধীনতা

একুশ দফা-ছয় দফা ও স্বাধীনতা

বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় ছিল বাঙালির আর্থসামাজিক মুক্তি। তিনি নির্বাচনি প্রচারে ২১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে থাকেন। তার লক্ষ্য ছিল- এ কর্মসূচিকে জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না-ও থাকে, তাহলেও যেন ২১ দফা কর্মসূচি কেউ অস্বীকার করতে না পারে।

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ২১ দফা একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ৭ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে পাকিস্তান আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রাখা দল মুসলিম লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। কয়েকটি দলের যুক্তফ্রন্টকে সে সময় হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট হিসেবেও অভিহিত করা হতো। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ব্রিটিশ আমলে একাধিকবার অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও এ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালে। এর আগে শেরেবাংলার মন্ত্রিসভাতেও তিনি ছিলেন।

১৯৩৮ সালে দুজনে এসেছিলেন গোপালগঞ্জে, যেখানে ১৮ বছর বয়সী মুজিবকে দেখে মুগ্ধ হন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে পূর্ববঙ্গ আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার নানা কূটকৌশল করে তার সদস্যপদ খারিজ করে দেয়। পরে আর কখনও তিনি পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হননি। কিন্তু যেকোনো নির্বাচনের প্রচারকাজে তার অংশগ্রহণ অপরিহার্য বিবেচিত হতো। তিনি জনগণকে উদ্বুদ্ধ, অনুপ্রাণিত করতে পারতেন।

যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা প্রত্যেকেই চেয়েছেন এই তিন জনপ্রিয় নেতা তাদের আসনে যেন প্রচারকাজের জন্য যান। সে সময় ৩৪ বছর বয়স্ক শেখ মুজিবকেও তারা চাইতেন নিজ নিজ এলাকায় বক্তা হিসেবে।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর থেকে মুসলিম লীগের পায়ের নিচে মাটি ছিল না। তারা হয়ে পড়ে জনধিক্কৃত দল। আওয়ামী লীগ তখন দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে। তরুণ শেখ মুজিব বারবার সভা-সমাবেশ করছেন জেলা ও মহকুমাগুলোতে।

আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের পাশাপাশি ছাত্রলীগের সংগঠন শক্তিশালী করার প্রতিও তার নজর ছিল। ভাষা আন্দোলনের কারণে ছাত্রসমাজের ওপর জনগণের আস্থা ও মর্যাদা ছিল আকাশছোঁয়া। যুক্তফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনের প্রচারে তারা বড় ভূমিকা রাখবে, এটা বোঝা যাচ্ছিল।

মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, গণতন্ত্রী পার্টি, শেরেবাংলার কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলামী ও কমিউনিস্ট পার্টি প্রভৃতি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের জনদাবি ছিল। তবে নেজামে ইসলামীর নেতারা কমিউনিস্ট পার্টিকে যুক্তফ্রন্টে নেয়া চলবে না- এ শর্ত দিলেন এবং শেরেবাংলা দৃঢ়ভাবে তাদের পক্ষে দাঁড়ালেন।

মুসলিম লীগ নির্বাচনে হেরে যাবে, জনমনে এ ধারণা ছিল। এ দলের অনেক নেতাও সেটা বুঝতেন। তারা যুক্তফ্রন্টের বিভিন্ন দলে নাম লেখাতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু আদর্শভিত্তিক ঐক্যের পক্ষে ছিলেন। কেবল মুসলিম লীগকে হারাতে হবে, এর মধ্যেই সীমিত থাকতে চাননি তিনি। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন-

‘ক্ষমতায় যাওয়া যেতে পারে, তবে জনসাধারণের জন্য কিছু করা সম্ভব হবে না, আর এ ক্ষমতা বেশি দিন থাকবেও না। যেখানে আদর্শের মিল নাই, সেখানে ঐক্যও বেশি দিন থাকে না।’ [পৃষ্ঠা ২৫০]

তিনি আরও লিখেছেন-

‘আমি চেষ্টা করতে লাগলাম যাতে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে যুক্তফ্রন্ট চলে। দুই দিন না যেতেই খেলা শুরু হল। নামও শুনি নাই এমন দলের আবির্ভাব হল।’ [পৃষ্ঠা ২৫২]

যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচি নির্ধারিত হয় ২১ দফা। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে আরও জানাচ্ছেন-

‘আবুল মনসুর আহমদ বিচক্ষণ লোক সন্দেহ নাই। তিনি ব্যাপারটি বুঝতে পারলেন এবং তাড়াতাড়ি কফিলউদ্দিন চৌধুরীর সাহায্যে একুশ দফা প্রোগ্রামে দস্তখত করিয়ে নিলেন হক সাহেবকে দিয়ে। তাতে আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন, বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা, রাজবন্দিদের মুক্তি এবং আরও কতকগুলি দাবি মেনে নেওয়া হল। আমরা যারা এ দেশের রাজনীতির সাথে জড়িত আছি তারা জানি, এই দস্তখতের কোনো অর্থ নাই অনেকের কাছে।’ [পৃষ্ঠা ২৫১]

বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবন থেকেই মহৎ কিছু লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে চার মাসের মধ্যে তিনি ছাত্রলীগ গঠন করেন। সে সময় তার বয়স ২৮ বছরও পূর্ণ হয়নি। কিন্তু বুঝতে পারেন, পাকিস্তানের ক্ষমতায় যারা বসেছে তারা পূর্ব বাংলাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখতে চাইছে। এমনকি মাতৃভাষার অধিকারও কেড়ে নিতে চায়। উর্দু চাপিয়ে দেয়া হলে চাকরি ও ব্যবসায় বাঙালিরা দারুণভাবে পিছিয়ে পড়বে।

২১ দফায় এসব দাবি স্থান পায়। কিন্তু শেরেবাংলার দল কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলামীর মতো দল কেবল ক্ষমতা চাইছিল- মুসলিম লীগের পরিবর্তে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা হলেই তারা খুশি। মন্ত্রী-এমপিরা প্রোটোকল সুবিধা পাবে, ব্যবসা করতে পারবে, লাইসেন্স-পারমিটে অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় ছিল বাঙালির আর্থসামাজিক মুক্তি। তিনি নির্বাচনি প্রচারে ২১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে থাকেন। তার লক্ষ্য ছিল- এ কর্মসূচিকে জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না-ও থাকে, তাহলেও যেন ২১ দফা কর্মসূচি কেউ অস্বীকার করতে না পারে।

তিনি লিখেছেন-

‘কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল জানেন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের জন্য জনমত সৃষ্টি করেছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে- চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মিলিটারিতে বাঙালিদের স্থান দেওয়া হচ্ছে না- এ সম্বন্ধে আওয়ালী লীগ সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে কতগুলি প্রচারপত্র ছাপিয়ে বিলি করেছে সমস্ত দেশে। সমস্ত পূর্ব বাংলায় গানের মারফতে গ্রাম্য লোক কবিরা প্রচারে নেমেছেন।’ [পৃষ্ঠা ২৫৮]

বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কা যথার্থ প্রমাণিত হয়েছিল- যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠনের মাস দুয়েকের মধ্যেই তা ভেঙে দিয়ে গভর্নরের শাসন জারি করা হয়। রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক জনগণকে প্রতিবাদের ডাক দেননি। শত শত নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। মন্ত্রীদের মধ্যে গ্রেপ্তার কেবল কনিষ্ঠতম সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে দুঃখ করে লিখেছেন-

‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনো দিন একসাথে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’ [পৃষ্ঠা ২৭৩]

পরের বছরগুলোতে তিনি স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে আরও সোচ্চার হন। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হলে নতুন করে স্বায়ত্তশাসনের ইস্যু সামনে আসে।

১৯৫৭ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মহিউদ্দিন আহমদ ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভায় স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব পাস হয়। এ আলোচনায় অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ‘পাকিস্তানে দুই অর্থনীতি’ বা টু ইকোনমি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি দলীয় সংগঠনের কাজে বেশি করে সময় দেয়ার জন্য আতাউর রহমানের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। দলের স্বার্থে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ- এমন নজির পাকিস্তানে নেই, বিশ্বেও বিরল।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়। পরের বছর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। সর্বমহলে ধারণা ছিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এটা ঠেকাতেই সামরিক শাসন জারি করা হয়।

এ ঘটনায় বঙ্গবন্ধু শিক্ষা নেন। তিনি ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের ক্ষমতার দুর্গ শহর হিসেবে পরিচিত লাহোরে বসে স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানকে এ কর্মসূচি উত্থাপনের জন্য বঙ্গবন্ধু অনুরোধ করলে তিনি বলেছিলেন, ‘মজিবর মিয়া, এ কর্মসূচি দিলে আমিও ফাঁসিতে ঝুলব, তোমাকেও লটকাবে।’

কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন অদম্য। তার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি ২১ দফার ১৯ দফায় স্বায়ত্তশাসনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থেকে মৌলিকভাবে সরে আসেন।

২১ দফায় ছিল- ঐতিহাসিক লাহোর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং মুদ্রাব্যবস্থা ছাড়া অন্য সব বিষয়ে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা। প্রতিরক্ষা বিষয়েও কেন্দ্রে যেমন থাকবে ‘নেভি হেডকোয়ার্টার্স’ এবং পূর্ববঙ্গকে অস্ত্রের ব্যাপারে স্বনির্ভর করার জন্য তেমনি পূর্ববঙ্গে হবে ‘অস্ত্র কারখানা’ প্রতিষ্ঠা। আনসারদের পুরোপুরি সৈনিকরূপে স্বীকৃতি।

ছয় দফায় বঙ্গবন্ধু অর্থ কেন্দ্রের হাত থেকে প্রদেশ বা রাজ্যের হাতে নিয়ে আসার কথা বলেন। তিনি বলেন, দুটি প্রদেশে পৃথক মুদ্রা থাকবে। অথবা এক মুদ্রা হবে, কিন্তু দুই প্রদেশে থাকবে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক। এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে মুদ্রা পাচার বন্ধ করা হবে। রাজস্ব ধার্য ও আদায়র ক্ষমতা থাকবে প্রদেশের হাতে। প্রতিটি প্রদেশ যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে তার নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যবস্থা তাদের হাতেই থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেছেন, ছয় দফা বলবৎ হলে পাকিস্তানে এমনকি শিথিল ফেডারেশনও অসম্ভব ছিল।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ছয় দফার প্রশ্নে গণভোট ঘোষণা করেন এবং জনগণ তাকে ম্যান্ডেট প্রদান করে। পাকিস্তানিরা এ ম্যান্ডেট মানতে অস্বীকার করে এবং গণহত্যা চাপিয়ে দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং জনগণ তার কথামতো ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করে’ স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে এখনই ভাবা জরুরি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে এখনই ভাবা জরুরি

করোনার এই সময়ে শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়াশোনার সীমিত সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা একেবারেই বঞ্চিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। আর আমাদের দেশে এই ভার্চুয়াল পড়াশোনা দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হয় না।

গেল ১৫ মাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ছে দফায় দফায়। আবারও ছুটি বেড়েছে ৩০ জুন পর্যন্ত। এখনও বোঝা যাচ্ছে না, কবে নাগাদ প্রতিষ্ঠানের ফটক খুলবে। এই মহামারিতে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের বিক্ষিপ্ত ক্ষতি হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে অপরিমেয়। দীর্ঘ সময় স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে বেসরকারি, প্রাইভেট স্কুল এবং কলেজগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। এখানে কর্মরতরা প্রচুর আর্থিক ক্ষতির মুখে, শহর থেকে গ্রামে ছোটাছুটি করেও টিকে থাকতে পারছেন না। কেউ হয়েছেন ফলের দোকানদার, কেউ মুদি, কেউবা চায়ের দোকানদার, কেউ দিয়েছেন লন্ড্রি। কেউ আদি পেশা কৃষিতে ফিরে গেছেন।

আবার কেউবা বেঁচে আছেন অন্যের দাক্ষিণ্যে। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনে অমানিশার কালো মেঘ জমেছে, আর্থিক দৈন্যে ছোট হতে হতে মিশে যেতে বসেছে মাটির সঙ্গে। তবে অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, রাষ্ট্র কারো দায় নেয়নি, পায়নি কেউ কোনো প্রণোদনা। করোনা পুরোপুরি বিনাশ হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান আর কোনো দিনও আলোর মুখ দেখবে না বললে অত্যুক্তি হবে না।

অপরদিকে এই বন্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতির মারাত্মক দিকটির সঙ্গে চার কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনও ডুবে আছে অন্ধকারে, যা কোনো অর্থমূল্যেই শোধ হবে না।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ১৪টি দেশের একটি বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বহুমাত্রিক প্রভাবে ছিন্নভিন্ন হতে বসেছে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে একটি শিক্ষাবর্ষের পুরোটাই হারিয়ে গেছে। আরেকটি বর্ষও হারিয়ে যাওয়ার পথে। গবেষণায় এসেছে, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আর কখনোই পড়াশোনায় ফিরবে না। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের দুটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে।

একটি কারণ দীর্ঘ শিখন বিরতির ফলে পাঠ না পারা ও বোঝার পরিস্থিতি এবং অপর সম্ভাব্যটি দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিপতিত হয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজে ভিড়ে যাওয়া। বিশেষ করে মাধ্যমিকে ঝরে পড়াদের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটতে পারে। আর ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থীর মেয়েশিশুদের বিয়ে হয়ে যেতে পারে। দেশে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমের মতো বিষয়গুলো আগে থেকেই প্রকট ছিল, করোনার কারণে তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

আবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ না হওয়ায় কর্মজীবনে প্রবেশ করতে না পেরে তীব্র হতাশায় ভুগছে অনেকেই।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জনসংখ্যার বড় অংশকে গণটিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত করোনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। সেটা দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, মহামারি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে কী হবে?
কঠিন এ প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর জানা না থাকলে অবশ্যই উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার বহুমাত্রিক ক্ষতির সমাধানে আর সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। ক্ষতি যা হওয়ার তা আর কোনোক্রমেই বাড়তে দেয়া যায় না।
করোনার এই সময়ে শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়াশোনার সীমিত সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা একেবারেই বঞ্চিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। আর আমাদের দেশে এই ভার্চুয়াল পড়াশোনা দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হয় না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঘরবন্দি শিক্ষার্থীদের শুধু যে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে তা-ই নয়, পাশাপাশি শারীরিক এবং মানসিক বিকাশও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ছোট থেকে বড় প্রায় সবাই ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত হয়ে পড়ছে, আসক্ত হচ্ছে মাদকেও।

মনোযোগ হারাচ্ছে পড়াশোনায়। বিষণ্ণতা, একাকিত্ব, উদ্বেগ আর মানসিক চাপে শিক্ষার্থীরা হারিয়ে ফেলছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। এমনকি আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যা-প্রবণতার মতো মানসিক ব্যাধিও লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থনীতির চাকা চালু রাখার পাশাপাশি শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আচরণগত পরিবর্তনের কারণে মহামারি পরবর্তী জীবনেও খাপ খাইয়ে নিতে মারাত্মক অসুবিধার সৃষ্টি হবে।
শিক্ষার্থীদের সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উভয়েরই সমান দায়িত্ব এবং গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে পরিবারের কাঁধে পুরো দায়িত্ব এসে পড়ায় পরিবারগুলো এককভাবে এই গুরুদায়িত্ব পালনে হোঁচট খাচ্ছে। শিক্ষার বহুমুখী ইতিবাচক দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সামাজিকীকরণ।

একটি শিশু সামাজিকভাবে গড়ে না উঠলে সে যত বড় বিদ্বানই হোক না কেন, সংকীর্ণতার ঘেরাটোপে বন্দি থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সামাজিকীকরণের জায়গায় পরিবারগুলোও ব্যর্থ হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে অতিরিক্ত চাপে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তাকে সাথি করেই পথ চলতে হবে। সেটাই হবে নতুন স্বাভাবিক জীবন। ইতোমধ্যে অন্য খাতগুলো শুরু হয়েছে শুধু শিক্ষা খাত ছাড়া। হাটবাজার, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন সবই খুলে দেয়া হয়েছে। বিয়েসহ সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতাও বন্ধ নেই। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটছে না। ঝড় এলে উটপাখির মতো বালুতে মাথা না গুঁজে বরং ঝড়ের মোকাবিলা করাটাই যুক্তিযুক্ত।

অনির্দিষ্ট সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না রেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। করোনাকে সঙ্গে নিয়েই ঠিক করতে হবে কর্মপরিকল্পনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে একসঙ্গে না খুলে বরং ধাপে ধাপে খুলতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ নেই বা কম, সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আধুনিক সভ্যতার প্রধানতম ভিত্তি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন