বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 

বঙ্গবন্ধু: চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট ও ২১ দফা 

নির্বাচন দিতে পাকিস্তান শাসকরা রাজি হলে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ইশতেহারে যে ২১ দফা দেয় তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পশ্চিমা শোষকগোষ্ঠীর কাছ থেকে সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তিই ছিল এর মূল বিষয়বস্তু। যেমন ২১ দফার প্রথম দফা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান; তা ছাড়াও শিক্ষার উন্নয়ন, কৃষির উন্নয়ন এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন। বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই বাংলা ভাষা ও বাঙালি সাংস্কৃতিক সত্তা জাগ্রত করতে সচেষ্ট ছিলেন। পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা- তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিফলন দেখা যায় তার উপস্থাপিত ছয় দফায়।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতো কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। অনেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামেই বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাকে সীমাবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বস্তুতপক্ষে, ছাত্রজীবন থেকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাসহ প্রতিটি সংগ্রামে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা কী ছিল এ বিষয়ে এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।

আমরা জানি, অল্পবয়স থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে থাকে। তবে পঞ্চাশের দশক তার রাজনৈতিক উত্থানের কাল। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দূরদর্শী এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন এক কুশলী রাজনৈতিক নেতা।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর থেকে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করার জন্য গোটা দেশে ঘুরে বেড়ান। মুসলিম লীগের অপশাসনে ইতোমধ্যেই পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে একধরনের ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। মুসলিম লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অপশাসন থেকে মুক্তিলাভের কৌশল হিসেবে ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট নামের নির্বাচনি জোট গঠনের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। এই জোটটি ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে জনগণের অসন্তুষ্টি, সরকারে বাঙালির নিম্ন প্রতিনিধিত্ব, তৎকালীন শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি ও রাজনৈতিক-দমন-পীড়নের বহিঃপ্রকাশ।

এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন যুক্তফ্রন্টের স্থপতি যা মূলত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চারটি দল নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম এবং গণতান্ত্রিক দল। জোটের মূল লক্ষ্য ছিল ১৯৫৪ সালের ৮-১২ মার্চের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভা নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে লড়াই করা।

নির্বাচনি প্রচারণায় যুক্তফ্রন্ট প্রচার করে ২১ দফার একটি ম্যানিফেস্টো। এ দফাগুলোর মধ্যে ছিল: বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা, জমিদারিপ্রথাবিলোপ, পাট ব্যবসা জাতীয়করণ, সমবায়পদ্ধতিতে চাষবাস, উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, বন্যা প্রতিরোধের স্থায়ী ব্যবস্থা, কৃষির আধুনিকায়ন, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, সব কালাকানুন রহিতকরণ, সমন্বিত বেতনকাঠামো প্রবর্তন, দুর্নীতি দমন, নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ, ভাষাশহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষা উন্নয়নের কেন্দ্রে রূপান্তর, ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা এবং পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ২০১৭, প্রথমা প্রকাশন)।

এসব দাবি উপস্থাপন করেন এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান। বামপন্থী দলগুলোর কর্মীদের সহায়তায় ফ্রন্টের নেতারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েও নির্বাচনের প্রচারণা চালাতে সক্ষম হন।

যুক্তফ্রন্ট যেসব বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরে সেগুলো ছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য ছাত্রদের আত্মাহুতি এবং লবণ, চাল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির ক্রমবর্ধমান মূল্য। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বহু নেতা-কর্মীর ধরপাকড়ে জনসাধারণ মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধভাবাপন্ন হয়ে ওঠে (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ২০১৭, প্রথমা প্রকাশন)।

তখন শেখ মুজিবসহ বেশির ভাগ সদস্যই যুক্তফ্রন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। শেখ মুজিব বলেন, দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দল নেই। যুক্তফ্রন্ট করা মানে কিছু মরা লোককে বাঁচিয়ে রাখা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদী এবং মওলানা ভাসানীও যুক্তফ্রন্টের ঘোর বিরোধী ছিলেন। যুক্তফ্রন্ট হবে না এ সিদ্ধান্তের পর হোসেন শহীদ পাকিস্তানে যান। তখন বঙ্গবন্ধু জেলায় জেলায় সভা করে বেড়ান। আর এদিকে ঢাকায় বসে মওলানা ভাসানী শেরেবাংলার সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সই করে ফেলেন।

যেখানে আওয়ামী লীগ এককভাবে জিততে পারত সেখানে নেজামে ইসলাম পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি ও গণতান্ত্রিক দলসহ বিভিন্ন নামের সংগঠন যুক্তফ্রন্টের নামে মনোনয়ন দাবি করতে লাগল। যারা দিনরাত খেটেছে আওয়ামী লীগের জন্য এমন লোক নমিনেশন পেল না, মাত্র তিন চার মাস আগেও মুসলিম লীগে ছিল, এ রকম লোক নমিনেশন পেয়ে যায়।

এখানে উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকে যুক্তফ্রন্ট গঠনের বিরোধী ছিলেন। কারণ, তিনি জানতেন রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যে শক্তি অর্জন করেছে, মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনে তারাই জয়লাভ করবে। কিন্তু দলের সিনিয়র নেতাদের মতামতকে সম্মান জানিয়ে তিনি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করেননি (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২)।

এদিকে নির্বাচন দিতে পাকিস্তান শাসকরা রাজি হলে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ইশতেহারে যে ২১ দফা দেয় তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পশ্চিমা শোষকগোষ্ঠীর কাছ থেকে সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তিই ছিল এর মূল বিষয়বস্তু। যেমন ২১ দফার প্রথম দফা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান; তা ছাড়াও শিক্ষার উন্নয়ন, কৃষির উন্নয়ন এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন। বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই বাংলা ভাষা ও বাঙালি সাংস্কৃতিক সত্তা জাগ্রত করতে সচেষ্ট ছিলেন। পূর্ব বাংলার পূর্ণ স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা- তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিফলন দেখা যায় তার উপস্থাপিত ছয় দফায়।

নির্বাচনের বিজয়লাভের পরে, যুক্তফ্রন্টের নেতা একে ফজলুল হককে ১৯৫৪ সালে ৩ এপ্রিল প্রাদেশিক গভর্নর মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে প্রথমেই দ্বন্দ্ব বাধে। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু কতটা বিশাল ছিলেন তার পরিচয় পাওয়া যায় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর মন্ত্রিসভা গঠনের সময় মন্ত্রিত্ব ভাগাভাগি করা নিয়ে জোটের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় তখন।

আওয়ামী লীগ থেকে আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমানের নাম প্রদান করা হলেও শেখ মুজিবকে মন্ত্রিত্বে নিতে অনীহা প্রকাশ করেন ফজলুল হক । বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন-

‘হক সাহেব শহীদ সাহেব ও ভাসানী সাহেবকে বলেছিলেন আমি শেখ মুজিবকে আমার মন্ত্রিত্বে নিব না।’

তার উত্তরে শহীদ সাহেব বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের কাকে নেয়া হবে না হবে সেটাতো আমি ও ভাসানী সাহেব ঠিক করব, আপনি যখন বলেছেন নান্না মিয়াকে ছাড়া আপনার চলে না। তখন আমরাও তো বলতে পারি শেখ মুজিবকে ছাড়া আমাদের চলে না।

সে আমাদের দলের সেক্রেটারি। মুজিব তো মন্ত্রিত্বের প্রার্থী না। এ সকল কথা বললে পার্টি থেকে বলতে পারে’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২ পৃ. ২৯ )। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখন শহীদ সাহেব এবং ভাসানী সাহেবকে বলেছিলেন- ‘আমাকে নিয়ে গোলমাল করার প্রয়োজন নেই। আমি মন্ত্রী হতে চাই না। আমাকে বাদ দিলে যদি পুরো মন্ত্রিত্ব গঠন করতে রাজি হয় আপনারা তাই করুন। (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২ পৃ. ২৯ )’।

এ থেকেই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু কতটা ক্ষমতাবিমুখ ছিলেন। বয়সে তরুণ হলেও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল অনেক বেশি। আর এই কারণেই তিনি যুক্তফ্রন্টের বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনি জোট করতে যাচ্ছে সেই জোট বেশি দিন টিকবে না। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, আওয়ামী লীগ তখন রাজনৈতিক দল হিসেবে যে রকম শক্তিশালী ছিল তাতে একা নির্বাচন করলেও নির্বাচনি বৈতরণী খুব সহজে পার হতে পারত। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট গঠন করার ফলে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু ত্যাগী নেতা নির্বাচনে মনোনয়ন পেলেন না, যা তাদের ওপর একধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যেটি প্রকারান্তরে দলের জন্য খারাপ হতে পারে।

এ থেকে বোঝা যায় যে, বঙ্গবন্ধু কতটা দূরদর্শীসম্পন্ন নেতা ছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কেন তিনি যুক্তফ্রন্টের বিরোধিতা করেছিলেন তা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন তিন মাস পরে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ পূর্ব পাকিস্তানের ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শাসন জারি করলেন (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ২০১৭, প্রথমা প্রকাশন)।

আমরা এটাও জানি, বঙ্গবন্ধু বেশির ভাগ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে দেশ ও জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েও ক্ষমতায় যেতে পারেননি। এরপরে ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দেশে ফিরে মাত্র সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এই সময়ে বাংলাদেশকে ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে সপরিবারে তাকে হত্যা করা হলে সেই স্বপ্ন বাস্তব লাভ করেনি। রাজনীতিবিদ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বিশালতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান তার একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন-

‘One of the remarkable features of his political life was his transformation from an ordinary rank and file worker of a political party to an unparalleled leader of millions of people. Bangabandhu possessed outstanding organizational capacity; at the same time he was a great orator. Generally we do not find such a combination of qualities in one leader (Raunaq Jahan, The Political philosophy of Bangabandhu, Dhaka Tribune, 10 June 2019)’.

বঙ্গবন্ধুর কখনও জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে খুব বেশি ভাবেননি। তিনি ভেবেছিলেন কীভাবে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো যায়। এই দুটি ছিল তার জীবনের মূল লক্ষ্য। তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই আমরা তার রাজনৈতিক চিন্তাধারা উপলব্ধি করতে পারি। আর এই কথার সত্যতা মেলে মাত্র তিনটি বাক্যেই যেখানে বঙ্গবন্ধু তার আত্মপরিচিতি ও মূল্যবোধ অত্যন্ত পরিষ্কার করেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র প্রথমেই বঙ্গবন্ধু লিখেছেন: ‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্প্রীতির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, মে ৩, ১৯৭৩)।

যেকোনো নির্দিষ্ট ফ্রেমে বন্দি করে বঙ্গবন্ধুর বিশালতাকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং ২১ দফা প্রণয়নকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে না পরলেও সেই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন। দলীয় সিদ্ধান্তকে মেনেই নির্বাচনে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। এর মাধ্যমেই তার রাজনৈতিক বিশালতার পরিচয় ফুটে ওঠে।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক, প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

এমপি, ইউএনও ও আমলাতন্ত্র

এমপি, ইউএনও ও আমলাতন্ত্র

২০১২ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চলাকালে শিকাগোর নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়েছিলাম একটি কাজে। তখন ওই অফিসের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তিকে দেখেছি একজন বয়স্ক নাগরিককে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছেন। এটুকু কাজ করতে ওই অফিসারের সময় লেগেছে বড়জোর দুই মিনিট। কিন্তু তার এই দুই মিনিটের আচরণ দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছি যে, ৯ বছর আগের সেই দৃশ্যটি এখনও চোখে ভাসছে।

প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী একটি জাতীয় দৈনিকে (দৈনিক ইত্তেফাক, ৬ জুন ২০২১) এ সময়ে আমলাদের ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে লিখতে গিয়ে এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, এখনকার মন্ত্রী, উপমন্ত্রীদের অধিকাংশই কোনো দিন মন্ত্রী হওয়ার আশা স্বপ্নেও দেখেননি। সে যোগ্যতা ও সাহসও তাদের নেই। তবু তারা মন্ত্রী হয়েছেন। আমলাদের কোনো নির্দেশ দেয়ার সাহস তাদের নেই, যোগ্যতাও তাদের নেই। তাদের অনেকেই কোনো কাজের জন্য অনুরোধ জানালে বলেন, দেখি প্রধানমন্ত্রী কী বলেন। অর্থাৎ সব ক্ষমতা এবং সব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর।

তাহলে তারা আছেন কেন—এর দুই দিন বাদেই আমলাতন্ত্র নিয়ে রসিকতার ছলে একটি নির্মম মন্তব্য করেছেন মন্ত্রিসভার জেন্টেলম্যান তথা সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র সব সময়ই থাকবে। ফেরাউনও অত্যন্ত শক্তিশালী শাসক ছিলেন। তিনিও আমলাতন্ত্রের বাইরে যেতে পারেননি। আমলাতন্ত্রের বিকল্প বের করতে পারেননি। সোভিয়েতরা চেষ্টা করে বের করতে পারেননি। চীনারাও বের করতে পারেননি। এমনকি খলিফারাও বের করতে পারেননি।’

আমলাতন্ত্র নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর এই মন্তব্যের পাঁচ দিনের মাথায় একজন মাঠপর্যায়ের আমলার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দিয়েছেন সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান। কোনো একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে দুদকে একজন আইনপ্রণেতার এ রকম অভিযোগের ঘটনা বিরল। শুধু তা-ই নয়, অভিযোগ জানানোর পরে সাংবাদিকদের কাছে এমপি মোকাব্বির খান যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, সেটি আরও ভয়াবহ।

তিনি বলেছেন, ‘দেশ কীভাবে চলছে এইটা অনুমান করেন। আমি একজন সংসদ সদস্য হয়েও ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছি। উনিও বলেছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। কিন্তু এখনও আমার সব জায়গায় চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত হয়তো আমাকে রিট করতে হবে।’

এই আইনপ্রণেতা আরও বলেন, ‘দেশে অসৎ আমলা, অসৎ ব্যবসায়ী এবং অসৎ কিছুসংখ্যক রাজনীতিবিদ এদের সমন্বয়ে যে সিন্ডিকেট হয়েছে। এইটা অত্যন্ত শক্তিশালী। এদের কাছে প্রধানমন্ত্রী জিম্মি, মন্ত্রিপরিষদ জিম্মি, সংসদ জিম্মি, এমপিরাও জিম্মি এবং সর্বোপরি জনগণ জিম্মি।’

গণমাধ্যমের খবর বলছে, এমপি মোকাব্বিরের নির্বাচনি এলাকায় একটি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের জন্য জায়গা অধিগ্রহণ ইস্যুতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নির্দেশ মানছেন না। এ বিষয়ে সংসদ সদস্যের অভিযোগ, ইউএনও সরকারি নীতিমালা সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন। তিনি দুর্নীতিবাজদের মদদ দিচ্ছেন।

এ ঘটনার সত্যতা কতটুকু তা সঠিক তদন্ত হলেই জানা যাবে। তবে একজন আইনপ্রণেতাকে যদি ইউএনওর মতো মাঠ প্রশাসনের কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে নানা জায়গায়, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছেও অভিযোগ জানাতে হয়, তাহলে এটি বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, দেশে আমলাতন্ত্র কী ভয়াবহ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

দেশের আমলাতন্ত্র কতটা শক্তিশালী হয়েছে, এর প্রমাণ নানা ঘটনায় পাওয়া যায়। এর পেছনে সুস্পষ্টভাবে বেশ কিছু কারণও রয়েছে। যার একটি বড় কারণ আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী উল্লেখ করেছেন। এর বাইরে আরও অনেক কারণ রয়েছে। যার সবগুলো হয়তো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়।

সম্প্রতি আমলাদের মধ্যে, বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীদের মধ্যে ‘স্যার’ ও ‘ভাই’ সম্বোধন ইস্যুতে এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা শুধু অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং এই ঘটনাগুলো আমাদের যে মূল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে তা হলো, সংবিধানের ভাষায় যে জনগণ হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের মালিক এবং যাদের করের পয়সায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন হয়, সেই জনগণই কেন তাদের সেবক সরকারি কর্মচারীদের ‘স্যার’ সম্বোধন করবে?

বরং হওয়ার কথা তো উল্টো। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক সরকারি অফিসে কোনো সেবার জন্য গেলে সংশ্লিষ্ট অফিসারেরই উচিত তাকে স্যার বলে সম্বোধন করা এবং তিনি তার জন্য কী করতে পারেন—বিনয়ের সঙ্গে সেটি জানতে চাওয়া। এই চাওয়াটা খুব অমূলক বা অযৌক্তিক নয়।

অথচ বাস্তবতা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, সরকারি অফিসে কোনো কাজের জন্য যাওয়া মানে তাকে নিঃসন্দেহে কোনো না কোনো হয়রানির মধ্যে পড়তে হবে। হয় ঘুষ দিতে হবে, নয়তো যে কাজ এক দিনে হওয়ার কথা, সেই কাজের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের গাফিলতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন থেকে প্রতিদিন যে কত মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, এর হিসাব কে রাখে?

অথচ সভ্য রাষ্ট্রে কোনো সিনিয়র সিটিজেন সরকারি অফিসে সেবা নিতে গেলে যথেষ্ট বড় পদের কর্মকর্তাও উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানান এবং চেয়ার এগিয়ে দেন। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই প্র্যাকটিস দেখেছি এবং মেলানোর চেষ্টা করেছি, আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীরা নাগরিকদের সঙ্গে কী আচরণ করেন!

স্মরণ করতে পারি, ২০১২ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন চলাকালে শিকাগোর নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে গিয়েছিলাম একটি কাজে।

তখন ওই অফিসের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তিকে দেখেছি একজন বয়স্ক নাগরিককে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিচ্ছেন। এটুকু কাজ করতে ওই অফিসারের সময় লেগেছে বড়জোর দুই মিনিট। কিন্তু তার এই দুই মিনিটের আচরণ দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছি যে, ৯ বছর আগের সেই দৃশ্যটি এখনও চোখে ভাসছে।

আমাদের সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে আমরা কি এই আচরণ প্রত্যাশা করতে পারি? কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পরে তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষা বদলে যায়।

তাদের কাছে যখন তাদের বাবা-মায়ের বয়সী কোনো নাগরিকও সেবা নিতে যান, উঠে দাঁড়ানো তো দূরে থাক, তাদের সঙ্গে চাকর-বাকরের মতো আচরণ করেন। অথচ জনগণের প্রতি তাদের আচরণ কেমন হতে হবে, সেই নির্দেশনা স্বাধীনতার পরেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্টভাবে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশই সেই নির্দেশনা মানেননি বা এখনও মানেন না।

অবশ্য গণহারে সব সরকারি কর্মচারী নিশ্চয়ই খারাপ নন। প্রশ্ন হলো, সেই ভালো-মন্দের অনুপাতটা কত? নিশ্চয়ই অনেক ভালো আমলা আছেন। সে রকমই একজন ভালো আমলা সম্প্রতি আমলাতন্ত্রের দুটি বৈশিষ্ট্যের কথা লিখেছেন-

১. আমলারা নিজেদের স্বার্থে মিথ্যা বলতে কখনও পিছপা হন না। ২. একজন আমলা কোনো ভুল পদক্ষেপ নিয়ে ফেললে তারা সেটা স্বীকার করবেন না; বরং পদক্ষেপটি যে সঠিক ছিল, এটা প্রমাণের জন্য পুরো আমলাতন্ত্র একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

অনেক সময় সরকারের আচরণেও মনে হয়, তারা বুঝি গণকর্মচারীদের কাছে জিম্মি। বিশেষ করে প্রতিবছর যখন ডিসি সম্মেলন হয়, তখন সেখানে ডিসিরা যেসব দাবিদাওয়া তোলেন (এমনকি তারা বিচারিক ক্ষমতাও চান) তাতে মনে হয়, রাজনীতিবিদরা নন, বরং দেশটা আমলারাই চালান।

বাস্তবতা হয়তো সে রকমই। কিন্তু এখানে পলিটিক্যাল লিডারশিপের দায়িত্ব অনেক। তাদের শরীরী ভাষা আর আচার-আচরণে যদি প্রশাসনের লোকেরা ভয় না পায়, যদি কর্মচারীরা মনে করে যে সরকার তাদের ক্ষমতায় ভর করে টিকে আছে, তাহলে প্রশাসনের শৃঙ্খলা বজায় রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু কেন শরীরী ভাষা সে রকম হয় না—এর ব্যাখ্যা প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী দিয়েছেন।

ফলে আমরা যখন আমলাতন্ত্রের মানবিকীকরণ বা সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে মার্জিত আচরণের কথা লিখি, তখন এ প্রশ্নটিও সামনে চলে আসে যে, কেন তারা নিজেদের জনগণের সেবক না ভেবে প্রভু ভাবছে? কেন তারা প্রত্যাশা করে যে, সবাই তাদের ‘স্যার’ বলবে? কেন তারা জনগণের করের পয়সায় বেতন নিয়ে সেই জনগণকেই সেবা দেয়ার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে ঘুষ নিতে লজ্জাবোধ করে না?

কেন তারা মনে করে বা কেন তাদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে গেল যে, তারা দিনের পর দিন দুর্নীতি ও অনিয়ম করে গেলেও সেটার কোনো বিচার হবে না?

সুতরাং পুরো প্রশাসনযন্ত্র যেভাবে শক্তিশালী হয়েছে, তাতে সিলেটের এমপি মোকাব্বির খান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মতো একজন মাঠ প্রশাসনের কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদকসহ বিভিন্ন জায়গায় যে ঘোরাঘুরি করছেন, আখেরে হয়তো কিছুই হবে না। বড়জোর তাকে অন্য কোনো উপজেলার ইউএনও হিসেবে বদলি করে দেয়া হবে। আর এমপি সাহেবও হয়তো ভাববেন, তিনি খুব জিতে গেছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

সরকারের প্রতিজ্ঞার বিপরীতে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব

সরকারের প্রতিজ্ঞার বিপরীতে সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব

বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি ম্যান্ডেট হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। এরই অংশ হিসেবে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় নারীদের পদায়ন করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নকে আশ্রয় করে বাংলাদেশ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন করেছে। বর্তমানে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশের স্বপ্নও দেখছি যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন একটি অন্যতম শর্ত।

বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেয়ার ক্ষেত্রে নারী ইউএনও চায় না মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এমন একটি সংবাদ দেখার পর ভাবছি তারা আর কোথায় কোথায় নারীদের দেখতে চায় না? কমিটির এক সভায় নারীর বিকল্প নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নারীরা সাধারণত জানাজায় অংশ নেন না এবং এ নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা হয় তাই যেখানে যেখানে নারী ইউএনও আছেন সেখানে পুরুষ প্রতিনিধি খুঁজতে বলা হয়েছে। অবাক হলাম এমন একটি প্রস্তাব সরকারের ভিতর থেকে আসতে পারে ভেবে!

বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি ম্যান্ডেট হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। এরই অংশ হিসেবে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় নারীদের পদায়ন করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নকে আশ্রয় করে বাংলাদেশ মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন করেছে।

বর্তমানে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশের স্বপ্নও দেখছি, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন একটি অন্যতম শর্ত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক প্রতিশ্রুতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন এই বাংলার নারীরা। সংসদের স্পিকার নারী, বিচারপতির আসনে নারী আছেন। আধুনিক যুগে প্লেন চালাচ্ছেন নারী, জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে আছেন নারী। বিশ্ব যখন আজকে হাঁটছে নারী-পুরুষ বৈষম্যহীন একটি বিশ্বের দিকে, তখন আমাদের বাংলাদেশকে পিছিয়ে নিতে চাইছে কারা?

কদিন আগেই বিয়ের রেজিস্টার হিসেবে নারীরা থাকতে পারবেন না বলে একটি সুপারিশ করেছিল আইন মন্ত্রণালয়, যেটি হাইকোর্টের এক রুলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। আমাদের নারীরা কোথায় নেই? খেলার মাঠ থেকে আকাশজয়, সবকিছুই হচ্ছে নারীর হাত ধরে।

যে দেশটি আজকে এগিয়ে যাচ্ছে রকেটের গতিতে, সেই দেশটির চালকের আসনে আছেন একজন নারী, যিনি বিশ্বের সফল নেতৃত্বের কাতারে নাম লিখিয়েছেন অনেক আগেই। পিছিয়ে পড়া মানুষ তো নারী নেতৃত্ব নিয়েও আপত্তি জানাচ্ছেন। তাহলে কি এই কমিটি দেশটির নেতারও পরিবর্তন চায়? মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির কাজ কী? তাদের কাজ কি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এমন নীতি তৈরি করা, নাকি পিছিয়ে পড়ার জন্য রাস্তা বানানো?

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অপরদিকে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের উত্থান। ধর্মকে আশ্রয় করা মৌলবাদী গোষ্ঠী এমনিতেই নারী শিক্ষা, নারীদের বাইরে কাজ করা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। ৯০ ভাগ মুসলমানের দোহাই দিয়ে তারা দেশটাকে কী বানাতে চায় স্পষ্ট নয়। বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ হাঁটছে অত্যন্ত সাহসিকতায়। মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্যতম একটি হাতিয়ার হচ্ছে নারীদের এগিয়ে যাওয়াকে উৎসাহিত করা।

সরকার নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে নীতিগতভাবেই। অর্থাৎ, যেসব নারী কোনো না কোনো কারণে বাইরে কাজ করতে আসতে পারছেন না, তারা যেন ঘরে বসেই অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার হতে পারেন সে জন্য নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ।

সরকারের কর্মকৌশল বলছে এক কথা আর এর অংশীদাররা চলছে উল্টোদিকে। সমাজে নানা অছিলায় চলছে নারীকে হেয় করার কাজ। নারী নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনা এখন নৈমিত্তিক। মাঠপর্যায় থেকে নারী নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে খুব কম। বিশেষ করে করোনাকালে যে পরিমাণ নারী নির্যাতন বেড়েছে, সেগুলোর দিকে নজর দেয়া কি কমিটিগুলোর কাজ নয়? বাল্যবিবাহের হার বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। নারী শিক্ষার হারের কথা নাইবা বললাম।

প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে আরও কীভাবে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়, কীভাবে নারী প্রতিনিধিদের কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত ও ক্ষমতায়ন করা যায় এ নিয়ে নীতিমালা সুপারিশ বা যাচাই কি সংসদীয় কমিটির কাজ নয়?

মূলত, সরকারের কাজগুলোর একটি চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের ভূমিকায় থাকার কথা কমিটিগুলোর। অথচ আমরা দেখলাম তারা সরকারি নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক একটি সুপারিশ করে বসল। এখন প্রশ্ন আসে, তার মানে কি শর্ষের মধ্যেই ভূত?

সরকারের ভিতরে বসে থাকা নীতিনির্ধারকদের মগজে তাহলে কী চলছে? তারাও কি চান নারী কেবল ঘরকন্যার কাজে ব্যস্ত থাকবেন? মৌলবাদের ধারক-বাহকের ভূমিকায় যদি আমাদের নীতিনির্ধারকরা আবির্ভূত হন, তাহলে আমাদের আশা-ভরসার জায়গাগুলো কেবল সংকীর্ণই হয় না, ধাক্কাও খায়। কেন বারবার হাইকোর্টকে সব বিষয়ে মতামত দিতে হবে?

নারী উন্নয়ন নীতি তো একটি মীমাংসিত বিষয়। এখানে কেন আবার নতুন করে হামলা আসছে? সংসদের নারী প্রতিনিধির কোটা বাড়ানো হয়েছে। সরাসরি নির্বাচনেও এখন নারীরা অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে নারীর অবস্থান কোথায় কীভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সেই বিষয়টিকে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর কোথাও কোনো আলোচনা দেখি না।

নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা নারী সমাজের একটি পুরোনো দাবি। আমাদের নারীরা ক্রমেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসছেন, নানা কাজে অংশ নিচ্ছেন।

অথচ, এর পরিপূরক একটি কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা নিয়ে কাজটি হচ্ছে না। অথচ উল্টো নারীর অংশগ্রহণ কমিয়ে দেয়ার সুপারিশ করছেন নীতিনির্ধারকরা। এ ধরনের মানসিকতা কেবল নারীবিদ্বেষী মানসিকতারই প্রমাণ দেয়। নারীকে সমাজে অনেক ধরনের নির্যাতন বা বৈষম্যের শিকার হতে হয়। এর মধ্যে আছে- ১. যৌন হয়রানি ২. শারীরিক নির্যাতন ৩. মানসিক নির্যাতন এবং ৪. পদের বৈষম্য।

পরিসংখ্যান বলে নারীরা শ্রমের বিনিময়ে পুরুষের সমান মজুরি পান না। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারীদের কেবল নারী বলেই নেয়া হয় না অনেক পদে। ধরেই নেয়া হয় নারীরা শারীরিক পরিশ্রম করতে হয় এমন পদের জন্য সঠিক নির্বাচন হয় না।

এতসব বৈষম্য বজায় রেখে কোনোভাবেই নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব নয়। আমাদের বাজেট নারীবান্ধব নয়। নারী উন্নয়নের কথা বলি, অথচ নারীর জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ নির্মাণে আমরা উদাসীন। সমাজ থেকে এসব বৈষম্য দূর করতে হলে দরকার নীতিমালা ও এর সঠিক বাস্তবায়ন। আর এ কাজটি করবেন আমাদের জনপ্রতিনিধিরা, যারা জনগণের রায় নিয়ে সংসদে বসে আইন বানান। অথচ এই কাজটি যারা করবেন তারাই ইদানীং দেখা যাচ্ছে নারী প্রগতির প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন।

আমাদেরকে আরও জেন্ডার সেনসেটিভিটি নিয়ে কাজ করতে হবে। সরকারের মধ্যে বসে থাকা মানুষগুলোর জেন্ডার নীতিমালার যথেষ্ট অভাব আছে। লিঙ্গ বৈষম্য একটি বিশ্বাস ও চর্চার বিষয়। সন্দেহ জাগে, আমাদের সংসদীয় কমিটির যারা এই সুপারিশটি করার মতো চিন্তা করতে পেরেছেন তাদের মগজেও নারী একটি ‘অবজেক্ট’ মাত্র। নারীকে তারা সহযাত্রী হিসেবে ভাবতে পারছেন না।

আশা করছি, এই সুপারিশটি কোনোভাবেই গৃহীত হবে না। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, তিনি যেন কমিটিগুলোতে যারা কাজ করবেন তাদের জন্য একটি জেন্ডার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখেন। অন্যথায়, সরকারের সকল সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে কেবল একটি সুপারিশেই।

লেখক: কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

পরীমনির অভিযোগ ও মানসিক বৈকল্যের চিত্র

পরীমনির অভিযোগ ও মানসিক বৈকল্যের চিত্র

বাংলাদেশেও আজ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রান্ত। রাজনীতি যখন রাজপথ থেকে নির্বাসিত, তখন ফেসবুকই আজ হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, জনমত গড়ে তোলার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই আমাদের আরও বেশি অসামাজিক করে তুলেছে। অ্যাকচুয়াল জীবনে যে চক্ষুলজ্জা, ভার্চুয়াল পৃথিবী তা কেড়ে নিয়েছে। বাস্তবে আমরা যে কথা বলতে পারি না বা মনে থাকলেও মুখে আসে না, ফেসবুকে অবলীলায় তা লিখে দিই।

জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পরীমনির অভিযোগ নিয়ে এখন তোলপাড় সারা দেশে। তার অভিযোগ সুনির্দিষ্ট। উত্তরা ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট নাসির ইউ মাহমুদ ১০ জুন মধ্যরাতে আশুলিয়ার ঢাকা বোট ক্লাবে পরীমনিকে জোর করে মদ খাওয়াতে চেয়েছেন, খেতে না চাওয়ায় তাকে মারধর করেছেন, গালাগাল করেছেন, মুখের ভেতর জোর করে মদ ঢেলে দিয়েছেন।

এ ঘটনায় বিচার না পেয়ে চার দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লেখা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার ২০ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে নাসির ইউ মাহমুদসহ ৫ জনকে। ধর্ষণ এবং হত্যাচেষ্টা মামলার বিচার কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে চাইতে হবে জানি না।

ঘটনার দিন যদি বনানী থানা পুলিশ উদ্যোগী হতো, পরীমনির অভিযোগ আমলে নিত, ঘটনাস্থলে যেত, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করত; তাহলে বোঝা যেত দেশে আইনের শাসন আছে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। কিছু হলেই কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছেই প্রতিকার চাইতে হবে? ভাইরাল না হলে বিচার হবে না, এটাই যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তাহলে কেউ আর পুলিশের কাছে যাবে না, ফেসবুকে বিচার চাইবে। ফেসবুকে জনমত গড়ে উঠুক। কিন্তু ফেসবুক যেন বিচারের মানদণ্ড না হয়।

অবশ্য এই লেখা সেই ফেসবুক নিয়েই। গোটা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও আজ ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রান্ত। রাজনীতি যখন রাজপথ থেকে নির্বাসিত, তখন ফেসবুকই আজ হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ, জনমত গড়ে তোলার প্রধান মাধ্যম। কিন্তু এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই আমাদের আরও বেশি অসামাজিক করে তুলেছে।

অ্যাকচুয়াল জীবনে যে চক্ষুলজ্জা, ভার্চুয়াল পৃথিবী তা কেড়ে নিয়েছে। বাস্তবে আমরা যে কথা বলতে পারি না বা মনে থাকলেও মুখে আসে না, ফেসবুকে অবলীলায় তা লিখে দিই। পরীমনি আক্রান্ত হওয়ার পর থানায় গিয়েছিলেন, হাসপাতালে গিয়েছিলেন, শিল্পী সমিতিতে গিয়েছিলেন, গিয়েছিলেন পরিচালক সমিতিতেও। কোথাও বিচার পাননি।

শেষ পর্যন্ত ফেসবুকের দ্বারস্থ হয়েছেন। বিচার চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। মুহূর্তেই তার সেই স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়ে যায়। সাংবাদিকরা ছুটে যান পরীমনির বাসায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠে প্রবল জনমত। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। এই জনমতের প্রবল চাপেই প্রকাশ্যে অভিযোগের ২০ ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে মূল অভিযুক্ত নাসির ইউ মাহমুদসহ ৫ জনকে।

তাৎক্ষণিকভাবে জনমত গড়ে তোলার প্রবল শক্তি যেমন ফেসবুকের আছে। আবার ফেসবুকের অনেক অন্ধকার দিকও আছে। ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, লাইকি- একেকটা অ্যাপস যেন একেকটা ফাঁদ।

ইন্টারনেটের বিশাল জগতে কত হাতছানি। রাতারাতি তারকা বনে যাওয়ার টোপ যেমন আছে, তেমনি আছে জীবন ধ্বংস করে দেয়ার ফাঁদও। বিশেষ করে নারীদের জন্য ভার্চুয়াল জগৎ মানেই যেন আতঙ্ক। ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে কত নারীর সর্বনাশ করা হয়, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

পরীমনি রোববার সন্ধ্যায় যে স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলেন, ২৪ ঘণ্টা পর তাতে ২ লাখ ৮৫ হাজার রিয়্যাক্ট, ১ লাখ ১০ হাজার মন্তব্য। রিয়্যাক্টের বেশির ভাগই অট্টহাসির। পরীমনির স্ট্যাটাসের ১ লাখ ১০ হাজার মন্তব্য ছাড়াও তার বিভিন্ন লাইভ, ফেসবুকে অন্য অনেকের স্ট্যাটাসের নিচে এ বিষয়ে আরও কয়েক লাখ মানুষের মন্তব্য আছে। সব মন্তব্য ফলো করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে সত্যি কথা বলতে গেলে, মন্তব্যের কিছু অংশ দেখে আমার মনে হয়েছে আমরা আসলে আদিম যুগে বাস করছি।

নিজেদের সভ্য দাবি করার যোগ্যতা আমাদের নেই। মানুষের মনে এত বিকৃতি, এত অশ্লীলতা থাকতে পারে, এটা কল্পনা করাও অসম্ভব। মনে না হয় থাকল, কিন্তু সেই বিকৃতি, সেই অশ্লীলতা এভাবে প্রকাশ্যে সামাজিক যোগাযোগে উগড়ে দেয়া কীভাবে সম্ভব; আমার চিন্তায় আসে না!

বিকৃত মানসিকতার এই মানুষগুলোর মধ্যে কিছু ফেক আইডি যেমন আছে, তেমনি আছে বিপুলসংখ্যক চেনা মানুষও। আমি খালি ভাবি, এই মানুষগুলো যে এভাবে নিজেদের ভেতরের নোংরামি সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে; তাদের কি বাবা-মা নেই, ভাই-বোন নেই, স্বামী/স্ত্রী-সন্তান নেই, বন্ধুবান্ধব নেই? আগে যেটা বলেছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের চোখের লজ্জার পর্দাটা সরিয়ে দিয়েছে।

পরীমনির অভিযোগ অনুযায়ী নাসির ইউ মাহমুদ তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু ফেসবুকে নাসিরের অপরাধের চেয়ে পরীমনি কেন অত রাতে সেখানে গেল সেটা নিয়ে অনেকের কৌতূহল। ঢাকা বোট ক্লাব কোনো নিষিদ্ধ স্থান নয় যে, সেখানে যাওয়া যাবে না।

আচ্ছা ধরে নিলাম, পরীমনি অত রাতে সেখানে গিয়ে খুবই খারাপ কাজ করেছেন। কিন্তু একজন নারীকে মধ্যরাতে কোথাও পেলেই আপনি তাকে ধর্ষণ করতে যাবেন।

অনেকের মন্তব্য দেখে মনে হয়েছে, নাসিরের জায়গায় তিনিও থাকলে একই কাজ করতেন। অনেকে এমনও বলছেন, পরীমনিকে ধর্ষণ করতে হবে কেন? ভাবখানা এসন সিনেমার নায়িকাদের যেন কোনো মানসম্মান নেই, চাইলেই যে কেউ যখন-তখন নায়িকাদের কাছে পেতে পারেন। অনেকে বলছেন, ধর্ষণ-টর্ষণ কিছু না, টাকাপয়সার বনিবনা হয়নি। এগুলো কিন্তু উদ্ধৃত করার যোগ্য মন্তব্য। হাজার হাজার মন্তব্য আছে, যেগুলো এখানে লেখা তো দূরের কথা পড়তেও বিবমিষা জাগে।

আমরা সভ্যতার কথা বলি, ভদ্রতার কথা বলি। গত দুদিন ফেসবুক দেখে মনে হচ্ছে, এসবই আসলে ভদ্রতার মুখোশ। আমরা আসলে এখনও সভ্য হতে পারিনি।

পরীমনি কোথায় কার সঙ্গে বেড়াতে গেছেন, কেমন পোশাক পরে সিনেমায় অভিনয় করেছেন; এসব টেনে এনে তার সঙ্গে হওয়া অন্যায়কে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এমনকি পরীমনি যখন সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন, তখনও অনেকে হাসছিলেন আর বলছিলেন, এটাও অভিনয়। পরীমনি বারবার বলছিলেন, আপনার সঙ্গে না হলে আপনি বুঝবেন না। আসলেই আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইওনি। সিনেমার নায়িকা মানেই যেন বাজারের পণ্য। আরে ভাই বাজারের পণ্যও তো আপনি অনুমতি ছাড়া ছুঁতে পারবেন না!

মানলাম, আপনাদের অভিযোগই ঠিক, পরীমনির চরিত্র ‘খারাপ’। তার অনেক পুরুষ বন্ধু। কিন্তু অনেক পুরুষ বন্ধু মানেই এই নয় যে, আপনিও তার বন্ধু। সিনেমার নায়িকা মানেই ভোগ্যপণ্য, এই ধারণাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন, মানুষকে মর্যাদা দিতে শিখুন।

শুধু পরীমনির জন্য নয়, সব মানুষের জন্য একটা নিরাপদ দেশ গড়ার আমাদের সবার চেষ্টা, আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু চারপাশে যখন এমন অসংখ্য বিকৃত মানুষ কিলবিল করছে, তখন সেই নিরাপদ সমাজটা গড়ে তোলা কঠিন। গত কদিনে ফেসবুকে অনেক মানুষ দেখেছি, যারা সেই নাসিরের মতোই।

নাসিরের সামর্থ্য আছে বলে সে পরীমনির ওপর চড়াও হয়। সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে আরও অনেক মানুষ নারীর ওপর চড়াও হতো। নিজেকে সভ্য দাবি করতে হলে আগে মানুষকে মর্যাদা দিতে শিখুন, মানুষের ব্যক্তি জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান করুন। নিজের ভেতরের অশ্লীলতাকে, নোংরা অস্তিত্বকে প্রকাশ করে সমাজকে আরও নোংরা করবেন না।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

জানাজা আর গার্ড অফ অনার এক নয়

জানাজা আর গার্ড অফ অনার এক নয়

কেন এ রকম একটি নিয়ম চালুর কথা উঠেছে, এ প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাহজাহান খান বলেছেন, ‘এই প্রশ্ন আসছে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে। কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়েছে, জানাজায় নারীরা অংশ নিতে পারেন না।’

খবরটি দেখে তথমত খেয়ে গেলাম। নারী নেতৃত্বাধীন একটি স্বাধীন দেশে এ রকম একটি প্রস্তাব নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয় কীভাবে? খবর হচ্ছে: কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার সময় সরকারের নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি তুলেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ ব্যাপারে বিকল্প খুঁজতেও বলা হয়েছে ওই সুপারিশে।

কেন এ রকম একটি নিয়ম চালুর কথা উঠেছে, এ প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বলেছেন, ‘এই প্রশ্ন আসছে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে। কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়েছে, জানাজায় নারীরা অংশ নিতে পারেন না।’

এ ক্ষেত্রে প্রথমেই যে প্রশ্নটা আসছে, সেটা হলো ‘গার্ড অব অনার’ কি জানাজা? একদম তা নয়। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা যাওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানায় প্রশাসন। গার্ড অব অনার দিতে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকেন জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে সরকারের প্রতিনিধি হয়ে মরদেহে ফুলের শ্রদ্ধাও জানান সংশ্লিষ্ট ওই সরকারি কর্মকর্তা। এখানে জানাজার প্রশ্নটা এলো কোথা থেকে?

কেন এ রকম একটি বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে? কেন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নারীর উপস্থিতি ও পদমর্যাদা নিয়ে এই আপত্তি তোলা হচ্ছে? এর উত্তরে শাজাহান খান সাহেব গণমাধ্যমকে বলেছেন, “কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়েছে, জানাজায় নারীরা অংশ নিতে পারেন না। ‘গার্ড অফ অনার’ সাধারণত জানাজার সময় দেয়া হয় বলে এই সুপারিশ আসছে। যদি গার্ড অব অনার জানাজার আগে দেয় বা পরে দেয়, তখন জানাজা থাকে না। সেইটা একটা জিনিস। আমরা দেখেছি, সব জায়গায় জানাজার সময় গার্ড অব অনার দেয়। ওই জায়গায় ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করে এটা সুপারিশ করা হয়েছে।”

জানাজার সাথে ‘গার্ড অফ অনার’-এর সময়েরও কোনো সম্পর্ক নেই। একজন মানুষ মারা যাওয়ার পরে অনেকবার জানাজা পড়ানো হয়ে থাকে দিনের বিভিন্ন সময়ে। আর ‘গার্ড অফ অনার’ একবারই দেয়া হয়, বীরকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর জন্য। এ ক্ষেত্রে আগে বা পরে জানাজার প্রশ্নটি আসেই না। কেন তারা এ রকম এটি সুপারিশ পেশ করেছেন, সেটা তাদের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেনি।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক আঙ্গুর নাহার মন্টি তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, তার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উনি মারা যাওয়ার পর গার্ড অফ অনার দিয়েছিলেন একজন নারী ইউএনও। এতে ঐ শোকের সময়েও ওর অন্যরকমের একটা শান্তি লেগেছিল।

সম্মানিত সভাপতি সাহেবের কাছে আমরা জানতে চাই যে, কারা বা কোন কোন জায়গা থেকে এই আপত্তি তোলা হয়েছে? যারা আপত্তি তুলেছেন, তারা কি জানেন না যে জানাজা ও গার্ড অফ অনার এক জিনিস না? নাকি জেনেশুনেই নারীকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার বাহানা বের করছেন? মহিলার বিকল্প একজন পুরুষকে দিয়ে গার্ড অফ অনার দেয়ার বিষয়টি এনে তারা কি রাষ্ট্রীয় ডেকোরামের প্রতি প্রশ্ন তুলছেন না?

শুধু কি নারী ইউএনও? বাংলাদেশে অনেক নারী জেলা প্রশাসকও তো আছেন। জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একটি সরকারি পদ। এখানে নারী কিংবা পুরুষের কোনো প্রশ্ন আসে না। তবে কি সংসদীয় কমিটি এবার নারী ডিসি, এসপি, ইউএনও করার পথও রুদ্ধ করতে চাইবে? নারী যদি আর দশটা রাষ্ট্রীয় কাজ করতে পারেন, তাহলে এটা করতে বাধা কোথায়?

হঠাৎ একটি নিয়ম উত্থাপন করলেই চলে না। সংসদীয় কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক কিছুই এসব কমিটিতে আলোচিত হয়। কাজেই এখানে যা কিছু আলোচিত হবে, নিঃসন্দেহে তা চিন্তাভাবনা করেই আলোচনা করা দরকার।

বাংলাদেশের নির্বাহী প্রধান হিসেবে নারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ১৯৯১ সাল থেকে, অর্থাৎ ৩০ বছর। বাংলাদেশের সংসদে স্পিকারও একজন নারী। যে দেশ নারীর নেতৃত্বাধীনে ৩০ বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে, সে দেশে এত বছর পরে এ রকম একটি অদ্ভূত প্রশ্ন ওঠে কীভাবে? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন দেশের কতগুলো মডেল মসজিদ উদ্বোধন করেছেন। উনি সরকারপ্রধান হিসেবেই এটা করেছেন, কোনো নারী হিসেবে নয়। অন্য কোনো নারীকে এই কাজ করতে দেয়া হতো কি না, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। কাজেই নারী বলে নয়, নারী যে পদে অধিষ্ঠিত আছেন, সেটা ভেবেই কথা বলতে হবে।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে এ দেশের নারী সমাজ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। গান্ধীজির অসহযোগ, লবণ আইন, সত্যাগ্রহ, এ ছাড়া তেভাগা, নাচোল, টংক প্রথাবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই জোরালো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং এ দেশের আইন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। দেশে সকল প্রশাসনিক পদ নারীর জন্য উন্মুক্ত।

এ অবস্থায় এ ধরনের চরম জেন্ডার অসংবেদনশীল ও অমূলক প্রস্তাব কীভাবে সংসদীয় কমিটিতে ওঠে ও আলোচিত হয়, তা সত্যিই বিস্ময়কর। সরকার যেখানে সব ধরনের কাজে নিয়োজিত নারীর প্রয়োজনের দিকটাকে মূল্য দেয়, সরকার যেখানে কর্মক্ষেত্রে জেন্ডারবান্ধব পরিবেশ প্রণয়ন করতে চায়, সেখানে নারীর পদমর্যাদার অধিকার শুধু নারী বলে, দুর্বল অজুহাতে কেড়ে নিতে দেয়া হবে না। আশা করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টির প্রতি সহৃদয় দৃষ্টি দেবেন।

লেখক: সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

অযোগ্য শহরে বসবাস

অযোগ্য শহরে বসবাস

প্রশাসনিক দিক থেকেই নয়, এখানকার বাসিন্দাদের মনমানসিকতা, সচেতনতা ইত্যাদি বিবেচনা করলেও ঢাকা শহর ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। এখানকার নাগরিকরা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে। রাস্তায় রং সাইডে গাড়ি চালায়। ট্রাফিক আইন মানে না। নিজে কোনো দায়িত্ব পালন না করে সবকিছুর জন্য সরকারকে দোষারোপ করে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ যেভাবে স্বার্থপরতায় মগ্ন, নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়, দেশপ্রেম না থাকা, অসচেতনতার হার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে পুরো দেশটাই অযোগ্য একটা দেশে পরিণত হবে।

বাংলা সিনেমার একটি জনপ্রিয় গান আছে ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে/আরে লাল লাল নীল নীল বাত্তি দেইখ্যা নয়ন জুড়াইছে/ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে...।’ গত শতকের আটের দশকে ‘অশিক্ষিত’ সিনেমার এই গানটি একসময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। পরিতাপের বিষয়, এই ঢাকা শহরই বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

চলতি বছরে ১৪০টি দেশ নিয়ে এই তালিকা তৈরি করেছে লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। এই তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ‘বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরগুলোর’ মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের তালিকা অনুসারে বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা।

কয়েক বছর ধরে বাসযোগ্যতার বিবেচনায় ঢাকার অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এর চেয়ে খারাপ অবস্থা সিরিয়ার দামেস্ক এবং নাইজেরিয়ার লাগোসের। স্বাস্থ্যসেবা-সংস্কৃতি, পরিবেশ-শিক্ষা ও অবকাঠামো কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রেখে এ তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।

নতুন এ জরিপ অনুসারে ২০২১ সালে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপানের ওসাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, বসবাসযোগ্য শীর্ষ ১০ শহরের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের দুটি, জাপানের দুটি, অস্ট্রেলিয়ার চারটি ও সুইজারল্যান্ডের দুটি রয়েছে।

উল্লেখ্য, করোনার মোকাবিলায় কোন দেশ কেমন পদক্ষেপ নিয়েছে, এর প্রভাব পড়েছে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায়। করোনা মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে এবার নন্দিত হয়েছে নিউজিল্যান্ড।

ইআইইউর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে নিউজিল্যান্ড কঠোর লকডাউন আরোপ করেছিল। এর ফলে দেশটির অকল্যান্ড, ওয়েলিংটনসহ বিভিন্ন শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়েছে। এসব শহরের মানুষ করোনা-পূর্ববর্তী জীবনে ফিরে যেতে পেরেছে।

যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা, যানবাহন সংকট, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মশার উপদ্রব, ভয়াবহ যানজট, পয়োনিষ্কাশনের করুণ অবস্থা, জলাবদ্ধতা, রাস্তাঘাটের করুণ দশা, ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি প্রভৃতি সমস্যায় ঢাকা নগরী বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় ঢাকা নগরীতে জীবনযাপন যে সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ তা কারো অজানা নয়। এই ময়লা-আবর্জনার পাশাপাশি ভয়াবহ বায়ু ও শব্দদূষণের কারণে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে আমাদের প্রিয় নগরী। এখানে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের বদলে আমরা নিচ্ছি কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিষ।

সহনীয় মাত্রার চেয়ে ছয় গুণ বেশি সিসাসহ বিভিন্ন দূষিত পদার্থ মিশে আছে ঢাকার বাতাসে। দূষণে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে মানুষ। ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষণমুক্ত নয়। বিষাক্ত বর্জ্যে ভরা এসব নদী থেকেও দূষণ ছড়াচ্ছে।

একদিকে ঢাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই, অপরদিকে পুরান ঢাকায় মানুষের বাস জরাজীর্ণ ভবনে। সব মিলিয়ে ঢাকার বাসিন্দারা ভালো নেই।

পৃথিবীতে রাজপথকে দেখা হয় শহরের জীবননালি হিসেবে। মোটামুটি সচ্ছল দেশেও সেই জীবননালিকে সুন্দর, সবুজ ও গতিশীল রাখা হয়। একসময়কার কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা দিল্লির থেকেও ঢাকা সুন্দর ও স্বচ্ছন্দ ছিল। কিন্তু তা আজ কেবলই ইতিহাস।

ঢাকা বিশ্বের ঘনবসতিতম শহর, ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে বেশি, ঢাকা ভূমিকম্প-ভবনধস, অগ্নিকাণ্ড-জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের লীলাভূমি হওয়ার সঙ্গে এ শহরের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতারও যোগাযোগ আছে। ঢাকার পানির স্তর যত নেমে যাচ্ছে, ততই এই শহর পরিত্যক্ত হওয়ার দিকে গড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পদের অভাব নয়, সম্পদের ভুল ও স্বার্থতাড়িত ব্যবহারই ঢাকার দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী।

ঢাকা শহরে সবচেয়ে বড় আপদের নাম জ্যাম। রাস্তায় বের হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে বসে থাকতে হয়। এখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা আছে, যা কখনও মিটারে চলে না। নিজেদের ইচ্ছে ও পছন্দমতো গন্তব্য ছাড়া যায় না।

অ্যাপভিত্তিক যেসব পরিবহন আছে, সেগুলো পেতেও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। এখানে হাঁটার মতো ফুটপাত নেই। ফুটপাত সব হকার ও ছোট ব্যবসায়ীদের দখলে। ফুটপাত দিয়ে সাইকেল মোটরসাইকেলও দেদার চলাচল করে। হেঁটে চলাটাও এখানে অনেক বিপজ্জনক।

গণপরিবহনে কোনো শৃঙ্খলা নেই। ভাড়া নিয়ে কোনো নিয়মনীতি নেই। যাত্রী তোলা নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে চালকদের মধ্যে, দক্ষ চালকও নেই। রাস্তায় অনেক বেশি যানবাহন থাকার কারণে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে বার বার আলোচনা এমনকি বড় ধরনের একটি আন্দোলন হওয়ার পরও এ খাতটিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ঢাকা শহরে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ বসবাস করেন। ফলে নাগরিক সুযোগসুবিধা অপ্রতুল। অনেক এলাকায় সকাল-বিকাল গ্যাস থাকে না বললেই চলে। সেই সঙ্গে নিয়মিত পানি সরবরাহ পাওয়া যায় না।

সারা বছর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সংস্থার নামে উন্নয়ন কাজ চলে। ফলে রাস্তা কাটাকাটি-খোঁড়াখুঁড়িও নিয়মিত দৃশ্য। একেকবার একেক কর্র্তৃপক্ষ এসে রাস্তা কাটে, কখনও বিদ্যুতের জন্য কাটা হচ্ছে, কখনও গ্যাস আবার কখনও ওয়াসা। অর্থাৎ একেকজন একেক সময় রাস্তা কাটে আর মানুষজন চরম দুর্ভোগ পোহায়। কোনো সমন্বয় নেই, পরিকল্পনা নেই, নেই কোনো প্রতিকারও।

ঢাকা শহর থেকে গাছপালা বা সবুজ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। পার্ক-খেলার মাঠ, নদী-খাল বেদখল হয়ে যাচ্ছে। যা দু-চারটা পার্ক আছে তাও ব্যবহার উপযোগী নয়। স্ট্রিট লাইটগুলো ঠিকমতো জ্বলে না। পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নেই, যেগুলো আছে সেগুলো ব্যবহারোপযোগী নয়।

খেলার মাঠগুলো রাজনৈতিক দলের লোকেরা দখল করে নিচ্ছেন। এদিকে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র মানুষের ঢাকামুখী স্রোত। কাজের অভাব, জলবায়ুর প্রভাব যেমন ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং কর্মসংস্থানের সন্ধানে মানুষ প্রতিনিয়তই ঢাকামুখী হচ্ছে। এই বাড়তি মানুষের চাপ সামলানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এদের গ্রামে পুনর্বাসনেরও কোনো পরিকল্পনা নেই।

ঢাকা শহরে রাস্তাঘাট, ভবন নির্মাণ, যানজট, গণপরিবহন, এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো দেখার জন্য আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কোনো সমন্বয় নেই, নেই তাদের কোনো জবাবদিহি।

আর শুধু প্রশাসনিক দিক থেকেই নয়, এখানকার বাসিন্দাদের মনমানসিকতা, সচেতনতা ইত্যাদি বিবেচনা করলেও ঢাকা শহর ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। এখানকার নাগরিকরা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে। রাস্তায় রং সাইডে গাড়ি চালায়। ট্রাফিক আইন মানে না। নিজে কোনো দায়িত্ব পালন না করে সব কিছুর জন্য সরকারকে দোষারোপ করে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ যেভাবে স্বার্থপরতায় মগ্ন, নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়, দেশপ্রেম না থাকা, অসচেতনতার হার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে পুরো দেশটাই অযোগ্য একটা দেশে পরিণত হবে।

ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। কেবল মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য আরও অনেক কিছু করতে হবে।

ঢাকাকে অত্যাধুনিক এবং পরিবেশবান্ধব শহর হিসেবে গড়তে হলে সবার আগে ঢাকার ভেতর থেকে সচিবালয়, বিদেশি দূতাবাস, বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বিডিআর সদর দপ্তর ও ক্যান্টনমেন্টের মতো বড় স্থাপনাগুলো স্থানান্তর করে রাজধানীর বাইরে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব হাইরাইজ ভবন নির্মাণ করলে ঢাকা হবে যানজটমুক্ত একটি আধুনিক শহর। মানুষ ফিরে পাবে সুন্দর জীবনযাপনের একটি নতুন ঠিকানা।

ইকোনমিস্ট-এর এই প্রতিবেদনটিকে হেলাফেলা করে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, এই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে, ঢাকা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী একটি নেতিবাচক ধারণাই প্রচার পেয়েছে। যে দেশে সরকারিভাবে সব সময় ‘উন্নয়নের জোয়ার বইছে’ বলে প্রচার করা হয়, সেই দেশের রাজধানীই যদি ‘বসবাসের অনুপযোগী’ তকমা পায়, তাহলে সেটা কীসের উন্নয়ন? যে উন্নয়ন নাগরিকদের জীবনের মান ও বাসযোগ্য পরিবেশ উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না, সেটা কীসের উন্নয়ন? আসলে পরিবর্তন আনতে হবে মানুষগুলোর মানসিকতায়। এই মানুষই সিঙ্গাপুর বানায়! আবার এই মানুষই ঢাকা বানায়! সুতরাং দেখতে হবে মানুষগুলো কারা এবং কেমন তাদের মানসিকতা!

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

করোনার টিকায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিন্যাস

করোনার টিকায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিন্যাস

গামালিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের দাবি স্পুৎনিক-ভির কার্যকারিতা আরও বেশি। প্রায় ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অপরদিকে সম্প্রতি টিকাটির আরেকটি সংস্করণ এনেছে রাশিয়া। এক ডোজের এই টিকার নাম দেয়া হয়েছে স্পুৎনিক লাইট। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনা প্রতিরোধে এক ডোজের এই টিকা ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশ এই টিকাটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমতি এখনও দেয়নি, যেটিকেও একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

করোনাভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনার বর্তমান আপাতত কার্যকর কৌশল হচ্ছে টিকা। বর্তমানে ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে টিকার আবিষ্কার ও বাজারজাতকরণ নিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশল। ভাইরাসের সংক্রমণের শুরুতে মানবিক পৃথিবী কিংবা জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বের যে আশাবাদ সামনে এসেছিল, দিন দিন তা ফিকে হয়ে আসছে। এখন সামনে এসেছে টিকা রাজনীতি।

এই নিয়ে চলছে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই। মোটা দাগে পাঁচটি দেশ এখন করোনার টিকার রাজনীতিতে সক্রিয়: চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও ভারত। এই দেশগুলো করোনার টিকাকে তাদের কূটনীতির হাতিয়ারে পরিণত করেছে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন হয়ে গেছে যে, কে টিকা পাবে কে পাবে না, তা নির্ভর করছে এই দেশগুলোর সঙ্গে কার কেমন সম্পর্ক তার ওপরে।

আমরা দেখেছি, করোনার টিকা বাজারে আসার আগে থেকেই দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভারতকেন্দ্রিক প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। এর কারণ হচ্ছে, এসব দেশে সুলভে সরবরাহের শর্তে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স নিয়েছিল ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশ তখন দারুণ দক্ষতা দেখিয়ে আগাম অর্থ দিয়ে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা কেনার চুক্তি করে বেশ কিছু টিকাও নিয়ে আসে।

অপরদিকে ভারতও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার টিকার বাজারের একচেটিয়াকরণ করে। তারা কৌশলে চীনের টিকাগুলোকে আঞ্চলিক বাজার থেকে সরিয়ে দেয়। পাকিস্তান বাদে সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশকেই ভারত বিপুল পরিমাণে টিকা উপহার দেয়।

এমনকি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এমন কিছু দেশকেও তারা উপহার হিসেবে বিপুল পরিমাণে টিকা পাঠায়। তবে সম্প্রতি দেশটিতে ভাইরাসের সংক্রমণ বহুগুণ বেড়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সিরাম ইনস্টিটিউট ভারতের স্থানীয় চাহিদা পূরণেই হিমশিম খাচ্ছে।

ফলে ভারত টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। বেশি মানুষকে টিকা দিতে রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি দেশটি এখন বিভিন্ন দেশ থেকে টিকা আমদানি করছে৷

ভারত ছাড়া বিশ্বে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি দেশ টিকা উৎপাদন করছে। এর ফলে বাকি দেশেগুলোর টিকাদান কর্মসূচি নির্ভর করছে এই গুটিসংখ্যক দেশের ওপর। এ কারণে সৃষ্ট ভারসাম্যহীন নির্ভরশীলতার কারণে ভ্যাকসিনের চাহিদা ও সরবরাহে দেখা দিয়েছে অসামঞ্জস্যতা।

অপরদিকে পেটেন্টের কারণেও চাইলেই টিকার উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। এই নিয়েও আছে রাজনীতি। ওষুধ কোম্পানিগুলো টিকার সূত্র কিনে রেখেছে। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এদের বাইরে কেউ টিকা উৎপাদন করতে পারছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া এবং চীন নিজেদের অনুকূলে থাকা পররাষ্ট্রনীতির বিনিময়ে বিভিন্ন দেশে টিকা সরবরাহ ও উৎপাদনের অনুমতি প্রদান করেছে।

প্রসঙ্গত, বিশ্বের অনেক দেশই এখন টিকা বানাতে প্রস্তুত, কিন্তু অপেক্ষা শুধু টেকনোলজি ট্রান্সফারের। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রও টিকার পেটেন্টে সাময়িক ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। তবে পেটেন্ট ও মেধাস্বত্বে ছাড় দেয়ার প্রসঙ্গ ওঠার পর থেকে এর বিরোধিতাও জোরালো হয়ে উঠেছে। ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

করোনা মহামারি এখন বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই সুবিধাকেই সক্রিয়ভাবে কাজে লাগাতে চাইছে চীন ও রাশিয়া। কেবল পররাষ্ট্র-নীতিমালা নিয়ে আপসের মাধ্যমে নয়, বরং টিকার বদলে তারা নিজেদের অনুকূলে ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনেও মনোযোগ দিয়েছে। ভারতের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। চীন ও রাশিয়াও একইভাবে টিকাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ায় স্পুৎনিক-ভি পাঠানোর শর্তে সিরিয়ায় আটক রাশিয়ান নাগরিকের মুক্তির দাবি তুলেছিল রাশিয়া। এই টিকা রাজনীতির কল্যাণেই রাশিয়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশেও সখ্য গড়ে তুলেছে দেশটি। একইভাবে মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপিয়ান দেশগুলোকে নিজেদের ভূ-রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্যে রাশিয়া ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছে। এদিকে নতুন করে ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, টিকা কূটনীতির মাধ্যমে তাইওয়ানের বিষয়ে প্যারাগুয়ের অবস্থান পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে সফল হয়েছে চীন। এ ছাড়া টিকার চালানের পূর্বশর্ত হিসেবে ব্রাজিলের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশটির ফাইভ-জির বাজার হুয়াওয়ের জন্য উন্মুক্ত করেছে চীন।

ভারতে ডাবল মিউটেটেড ও ট্রিপল মিউটেটেড ভ্যারিয়েন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও ভাইরাসের এই ভ্যারিয়েন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেছে। এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণে মৃত্যুর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। অপরদিকে ভারত থেকে নিকট ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত টিকার চালান পাওয়া না-ও যেতে পারে, আবার সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা না পাওয়া মানে কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি থেকেও টিকা না পাওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হওয়া।

এসব ইক্যুয়েশন সামনে রেখে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রাশিয়া ও চীনের করোনা টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটিই ছিল সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

ভারত অসন্তুষ্ট হতে পারে এই কারণে পূর্বে চীনা টিকার পরীক্ষা ও সরবরাহের প্রস্তাব নাকচ করেছিল সরকার। তবে সম্প্রতি চীনের সিনোফার্ম এবং সিনোভ্যাকের উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বর্তমানে একই সঙ্গে সব পক্ষকে ম্যানেজ করার নীতিতে এগোচ্ছে সরকার। কারণ, অতীত অভিজ্ঞতা সামনে রেখে ভবিষ্যতেও কেউ যদি টিকা দিতে না পারে, তখনকার পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা সামনে রেখেই কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করা হচ্ছে।

তা ছাড়া কেবল বাংলাদেশই নয়, ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানির মতো নাক উঁচু পশ্চিমের অনেক দেশই এখন চীন ও রাশিয়ার টিকা নেয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। পশ্চিমা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম প্রথম দিকে চীন ও রাশিয়ার উদ্ভাবিত করোনার টিকাকে পাত্তা না দিলেও বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। কার্যত কোনো উপায় না পেয়েই তারা পশ্চিমা দুনিয়ার বাইরের টিকা নেয়ার গরিমা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। অপরদিকে চীনও ঘোষণা করেছে, তাদের সিনোভ্যাক এবং সিনোফার্ম ভ্যাকসিন দুটি ‘বৈশ্বিক জনসাধারণের সম্পদ’।

তা ছাড়া তথ্য-উপাত্ত বলছে, এই দুই রাষ্ট্রের উদ্ভাবিত করোনার টিকাও বেশ কার্যকর। রাশিয়ার টিকা স্পুৎনিক-ভির মানবদেহে পরীক্ষার অন্তর্বর্তী ফলাফল প্রকাশ করেছে শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট। এতে দেখা গেছে, টিকাটি ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ কার্যকর।

অপরদিকে টিকাটির প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গামালিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের দাবি স্পুৎনিক-ভির কার্যকারিতা আরও বেশি। প্রায় ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

অপরদিকে সম্প্রতি টিকাটির আরেকটি সংস্করণ এনেছে রাশিয়া। এক ডোজের এই টিকার নাম দেয়া হয়েছে স্পুৎনিক লাইট। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনা প্রতিরোধে এক ডোজের এই টিকা ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশ এই টিকাটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমতি এখনও দেয়নি, যেটিকেও একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

একসময় টিকা তৈরির সক্ষমতা বাংলাদেশেরও ছিল। মহাখালীতে অবস্থিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ছয় ধরনের টিকা উৎপাদন করত এবং তা বিদেশে রপ্তানিও হতো। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শে ২০১১ সালে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে এখন আবার সময় এসেছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করে পুনরায় টিকা উৎপাদনে যাওয়ার। তা ছাড়া যদি প্রতিবছর টিকার বুস্টার হিসেবে একাধিক ডোজের প্রয়োজন পড়ে, তাহলে বিশ্বের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাই বেশি।

তাই চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে টেকনোলজি ট্রান্সফারের মাধ্যমে দেশেই টিকার উৎপাদন বিষয়ে যে আলাপ-আলোচনা চলছে, এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের জন্য আশার আলো হতে পারে দেশে উদ্ভাবিত টিকা বঙ্গভ্যাক্স। এই টিকাটির মানবদেহে ট্রায়ালের বিষয়ে দ্রুত পজিটিভ সিদ্ধান্তে আসা উচিত। হবে হবে করেও অনেক দিন ধরেই এটি হচ্ছে না। টিকাটি ৯৫ শতাংশ কার্যকর এবং গুরুতর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এই কাজগুলো করে ফেলা গেলে আগামী দিনে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অন্যতম টিকা উৎপাদনকারী দেশ। শুধু নিজেদের জন্য নয়, বিশ্ববাজারের জন্যও।

টিকার প্রয়োজন বহাল থাকতে পারে দীর্ঘদিন। পুরোনো ভূ-রাজনৈতিক সম্পদের দখলদারত্ব থেকে যে উপনিবেশবাদ রাজনীতির সূচনা হয়েছিল, করোনাকালে তা এখন রূপ নিয়েছে বৈশ্বিক টিকা রাজনীতিতে। এই রাজনীতির খপ্পরে পড়ে কোনো অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত যাতে না নেয়া হয়, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সচেষ্ট থাকতে হবে।

লেখক: কবি ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পূর্বাপর ও বঙ্গবন্ধু

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পূর্বাপর ও বঙ্গবন্ধু

ফজলুল হক ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। নতুন মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী হলেন ফজলুল হক। বঙ্গবন্ধু এই মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্তশাসন আদায়ের ব্যাপারে চেষ্টা চালাতে থাকেন। এই মন্ত্রিসভা বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমি করার প্রস্তাব গ্রহণ করে।

পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকার রাজনৈতিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিল। তারা পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের তারিখ বার বার পিছাতে থাকে। অবশেষে ১৯৫৪ সালের মার্চে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের কথা ঘোষিত হয়। ইতিমধ্যে শাসক দল মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এ দেশের রাজনীতিবিদরা সতর্ক হয়ে যান।

নির্বাচনে মুসলিম লীগের মোকাবিলা করার জন্য সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল মিলে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে জনগণকে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অনুপ্রাণিত করে তোলে। যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনি তৎপরতায় তরুণ শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র থাকাকালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই আন্দোলনের সূত্রে ১৯৪৬ সালে প্রথমে কলকাতা ও পরে বিহার এবং পূর্ববাংলার কয়েকটি স্থানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং আক্রান্ত মুসলমানদের রক্ষা করতে তরুণ শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ সময়ই তার রাজনৈতিক জীবনপর্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এসে দাঁড়ায়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান অর্জিত হলে সবচেয়ে খুশি হওয়ার কথা পাকিস্তান আন্দোলনের মাঠের যোদ্ধা পূর্ববাংলার বাঙালির। শুরু থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলিম লীগ নেতাদের হাতে পাকিস্তানি শাসনক্ষমতা চলে গেলেও বাঙালি নেতারা এ নিয়ে আপত্তি তোলেননি। তারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের মুসলমান ভাই হিসেবেই মনে করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানি নেতাদের মধ্যে এই উদারতা ছিল না।

এ কারণে শাসকদের আচরণে ক্রমে বাঙালি স্বাধীনতার কটু গন্ধ অনুভব করল। ভাষা প্রশ্নে সংকট তৈরি করে ফেলল শাসকগোষ্ঠী। পাকিস্তানি নেতারা জানেন বাঙালি সংস্কৃতির একটি উজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক শক্তি তাদের স্বাজাত্যবোধকে শক্তিমান করে তুলবে। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর শোষণ প্রক্রিয়া বজায় রাখা সম্ভব হবে না। তাই বাঙালি প্রজন্মকে সংস্কৃতিবিচ্ছিন্ন করার জন্য সংস্কৃতির বাহন বাংলা ভাষাকে অচেনা করে দিতে চাইল। ১৯৪৮-এর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এখানেই রচিত হয়।

আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লড়াকু ছাত্রনেতা শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। যা ভীত করে তুলেছিল পাকিস্তানি শাসক চক্রকে। যে কারণে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের আগেই বঙ্গবন্ধুকে কারারুদ্ধ করা হয়। কারাগারে থেকেও বঙ্গবন্ধু নানাভাবে প্রাণসঞ্চার করেছিলেন ভাষা আন্দোলনের।

ভাষা আন্দোলন দমনে ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়ে রক্তাক্ত করার পাকিস্তানি নীতিকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলার মানুষ গ্রহণ করতে পারেনি। তাই শাসকদের রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের প্রতি বাঙালি নেতারা আস্থা রাখতে পারেননি। এদের অনেকেই ১৯৪৯-এ গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগে যুক্ত হতে থাকেন। আরও রাজনৈতিক দল গঠনেরও সম্ভাবনা তৈরি হয়।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা অর্জিত হলেও তা অনেকটা মৌখিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে থেকে যায়। তখনও পাকিস্তানের কোনো সংবিধান রচিত না হওয়ায় তা আইনত বিধিবদ্ধ হতে পারেনি। ফলে বাঙালি নেতারা আস্থা রাখতে পারেননি পাকিস্তানি শাসকদের প্রতিশ্রুতিতে।

এমন একটি অবস্থায় পাকিস্তান সরকার ১৯৫৩ সালের মাঝামাঝি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। নির্বাচনে মুসলিম লীগকে প্রতিহত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গঠন করে নির্বাচন করার চিন্তা অনেকেই করছিলেন। এই প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতারা মোটামুটি একমত হয়েছিলেন দলের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র স্পষ্ট করার জন্য ‘মুসলিম’ শব্দটি উঠিয়ে দলের নাম করা হবে আওয়ামী লীগ। কাউন্সিল অধিবেশনে উত্থাপনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগ নামটিই ব্যবহৃত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুও তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ সময়ের কথা বর্ণনাতে ‘আওয়ামী লীগ’ই বলেছেন।

শেরেবাংলা একে ফজলুল হক তখন ঢাকা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জেনারেল ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি পদত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব নেন হক সাহেবকে আওয়ামী লীগে নিয়ে আসার। ফজলুল হক বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দেন। তবে যোগদান তখনও করেননি। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লেখেন- “চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের জনসভায় হক সাহেব বলেন,‘যাঁরা চুরি করবেন তাঁরা মুসলিম লীগে থাকুন, আর যাঁরা ভালো কাজ করতে চান তাঁরা আওয়ামী লীগে যোগদান করুন।”

বঙ্গবন্ধুকে সকলের সামনে উপস্থিত করিয়ে বলেন, “মুজিব যা বলে তা আপনারা শুনুন। আমি বেশি বক্তৃতা করতে পারবো না।”

নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতারা দুই ধরনের মতে বিভক্ত হয়ে পড়েন। ছোট পক্ষ যুক্তফ্রন্ট গঠন করে ঐক্যবদ্ধ মোর্চায় নির্বাচন করতে চান। অন্যরা মনে করেন আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করবে। শেখ মুজিব ও মওলানা ভাসানী যুক্তফ্রন্টের পক্ষে ছিলেন না। মুসলিম লীগ থেকে যারা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন তাদের প্রতি খুব ভালো ধারণা ছিল না মওলানা ভাসানীর। হক সাহেব আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট গঠনের পক্ষে যারা তাদের কেউ কেউ হক সাহেবকে বোঝান আওয়ামী লীগে যোগ না দিয়ে আলাদা দল গঠন করে যুক্তফ্রন্টে যোগ দিলে লাভ বেশি হবে।

মওলানা ভাসানীর নির্দেশে শেখ মুজিব ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ডাকেন। এই সম্মেলনে যুক্তফ্রন্ট গঠনের পক্ষে-বিপক্ষে মতানৈক্য প্রবল হলো। যুক্তফ্রন্ট গঠনের পক্ষের মানুষই ছিলেন বেশি। বাস্তব অবস্থা দেখে বুঝলেন এমন বিভেদ প্রকাশ্যে চলে এলে মানুষ ভাববে আওয়ামী লীগের মধ্যে ঐক্য নেই। যাহোক শেষ পর্যন্ত যুক্তফ্রন্ট গঠনের পক্ষে ঐকমত্যে পৌঁছলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তফ্রন্টের অংশীদার হওয়ার জন্য এ কে ফজলুল হক কৃষক শ্রমিক দল গঠন করলেন।

শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্টের পক্ষে গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচন করার জন্য নমিনেশন পান। অর্থশালী মুসলিম লীগের নেতা জনাব ওয়াহিদুজ্জামান শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তাকে এগিয়ে রাখে। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু প্রায় ১০ হাজার ভোট বেশি পেয়ে জয়লাভ করেন।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ছিল মূলত পূর্ববাংলার জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবি। যে কারণে যুক্তফ্রন্ট তার ২১ দফার প্রতি জনগণের পূর্ণ সমর্থন লাভ করে, যার প্রতিফলন নির্বাচনে লক্ষ করা যায়। ১৯৫৪ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে এবং যুক্তফ্রন্ট বিপুল সংখ্যাধিক্যে জয়ী হয়। পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদের মোট আসনসংখ্যা ছিল ৩০৯টি। আসনগুলো মুসলিম এবং অমুসলিম এ দুটি পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। মুসলিম আসন সংখ্যা ২৩৭ এবং অমুসলিম আসনসংখ্যা ছিল ৭২। মোট আসনের ২৩৬টি আসনই যুক্তফ্রন্ট পায়।

নির্বাচনের ফলাফল বের হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু ঢাকায় আসেন। রেলস্টেশনে তাকে বিশাল অভ্যর্থনা জানানো হয়। এরপর যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ এমএলএ বৈঠক করে। এবার মন্ত্রিসভা গঠনের প্রশ্ন আসে। এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে শুরু হয় মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া। ফজলুল হক ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। নতুন মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী হলেন ফজলুল হক। বঙ্গবন্ধু এই মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্তশাসন আদায়ের ব্যাপারে চেষ্টা চালাতে থাকেন। এই মন্ত্রিসভা বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমি করার প্রস্তাব গ্রহণ করে।

ফজলুল হক প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। ১৯৫৪ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি আমন্ত্রিত হয়ে কলকাতায় যান। সেখানে বক্তৃতা দেয়ার সময় উল্লেখ করেন যে, ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে দুই বাংলা অভিন্ন।’

এবার মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় নেতারা সুযোগ খুঁজে পেলেন। তারা দেখতে পেলেন এই বক্তৃতার সূত্রে ফজলুল হককে অপসারণ করা যেতে পারে। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের অজুহাতে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। প্রচার করা হয় ফজলুল হক ভারতের কাছে পূর্ব পাকিস্তান বিক্রি করে দিতে চান। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তানের নানা অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো হতে থাকে। আর সব দায় দেয়া হতে থাকে যুক্তফ্রন্ট সরকারের ওপর। অতঃপর যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে ভেঙে দেয়া হয়। অবসান হয় পূর্ববাংলার সংসদীয় গণতন্ত্রের।

পাকিস্তানের প্রাথমিক পর্বে পূর্ববাংলার শাসনক্ষমতায় স্বল্পকাল স্থায়ী বাঙালির শাসনকাঠামোয় বঙ্গবন্ধু ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন। যা পরবর্তী বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাকে বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
সাদা-কালোর রসায়ন: তৃতীয় নয়নে দেখা
ভার্চুয়াল-জগৎ ও দেশের অধঃপতিত সংস্কৃতি
সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা

শেয়ার করুন