সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি

সন্তানকে নীতি-নৈতিকতায় আবদ্ধ করা জরুরি

সন্তানকে আপনি যত বেশি স্বাধীনতা দেবেন, সে আপনার কাছ থেকে তত দূরে সরে যাবে। আপনি তার উপর যত বেশি নিয়ন্ত্রণ হারাবেন, সে তত বেশি বখে যাবে। আপনি জানবেনও না সে কাদের সঙ্গে মেশে, কী করে, কী দেখে, কী করতে চায়। তার ভেতরে ভেতরে কী পরিবর্তন হয়ে গেছে, সেটি আপনি টেরও পাবেন না। সুতরাং, সন্তানকে স্বাধীনতা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবক যদি তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে; হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান। ২০১৫-১৬ সেশনের ছাত্র সংস্কৃতি অঙ্গনেরও পরিচিত মুখ ছিলেন। মূকাভিনয় করতেন। তিনি টিএসসি-ভিত্তিক সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাইম অ্যাকশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।

তিনি গ্রামের ছেলে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার খাড়েরা গ্রামের সন্তান। ভর্তি হয়েছিলেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন মানে তিনি মেধাবী ছিলেন। নিশ্চয়ই একটি বড় স্বপ্ন সঙ্গে নিয়ে দূর মফস্বল থেকে আলোঝলমলে রাজধানীতে এসেছিলেন এই তরুণ। আমরা জানি না তিনি কী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভালো ফলাফল করে বেরিয়ে গেলে তার সামনে নিশ্চয়ই একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছিল। যেহেতু মুকাভিনয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন, ফলে এই পরিচয়টিও তার ক্যারিয়ার গড়তে হয়ত সহায়তা করত। কিন্তু কিছুই হলো না। বিকশিত হবার কালেই ঝরে গেল একটি ফুল।

ঈদের পরদিন জরুরি কাজের কথা বলে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন হাফিজুর। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে কসবা থানায় একটি জিডি করা হয়। ৮ দিন পর ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে হাফিজুরের লাশ শনাক্ত করেন তার বড় ভাই। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাই-ইথ্যালামাইড) সেবন করেছিলেন এই তরুণ। আর তারপরই বিভ্রম ঘটায় নিজের গলায় ধারাল দা দিয়ে আঘাত করেন। এতে তার মৃত্যু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে শাহবাগ থানার ওসি সাংবাদিকদের বলেছেন, ১৫ মে রাত পৌনে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে দা নিয়ে নিজের গলা নিজেই কাটতে থাকেন হাফিজুর। আর বলছিলেন ‘আমাকে মাফ করে দাও’। হাফিজুর কার কাছে মাফ চাইলেন? কেন মাফ চাইলেন? তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে? আমরা কি তাকে মাফ করতে পেরেছি?

হাফিজুরের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে গোয়েন্দারা যে তথ্য পেয়েছেন, সেটি আমাদের অনেকগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যেসব প্রশ্নের সুরাহা করা না গেলে আমরা হাফিজুরকে ক্ষমা করলেও হাফিজুরের আত্মা হয়ত আমাদের মাফ করবে না। আমরা দায়ী থাকব তার মতো অসংখ্য তরুণের কাছে। আমরা দায়ী থাকব এই সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে। আমরা দায়ী থাকব এই সময়ের কাছে।

মৃত্যুর আটদিন পরে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে হাফিজুরের পরিচয় শনাক্ত হয়। এর পর এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ খুঁজতে নেমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।

এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে হাফিজুরের অস্বাভাবিক মৃত্যুর সঙ্গে এলএসডির যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার কথা জানায় ডিবি। এর আগে নানারকম মাদকের ছোবল, বিশেষ করে ইয়াবার ভয়াবহতার কথা মানুষ জেনেছে। কিন্তু এলএসডির খবর সেভাবে জানা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএসডি এক ধরনের বিভ্রম তৈরি করে।

গণমাধ্যমের খবর বলছে, এলএসডি গ্রহণের পর বন্ধুদের একজন হাফিজুরকে বলেছিলেন, ‘মামা তুমি কাজটা ভালো করনি’। এরপর হাফিজুর কার্জন হলের মাঠ থেকে ছুটে বেরিয়ে যান। বন্ধুরা একবার সেখান থেকে ধরে এনেছিলেন।

এরপর তিনি আবার বেরিয়ে যান। কয়েকজন রিকশাচালকের পা চেপে ধরে বলেন, ‘আমাকে মাফ করে দাও’। এরপরই তিনি ডাবওয়ালার কাছ থেকে দা নিয়ে নিজের গলায় কোপ দেন। হাফিজুরের অবস্থা দেখে ভয়ে কাউকে কিছু না বলে বন্ধুরা পালিয়ে যান।

প্রশ্ন হলো, এলএসডির মতো এই ভয়াবহ মাদক কী করে দেশে ঢুকল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেহেতু এই মাদক গ্রহণ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে অনেককে গ্রেপ্তার করেছে, ফলে বোঝাই যাচ্ছে অনেক দিন ধরেই এই মাদক দেশে আসছে।

ঠিক কত তরুণ ও যুবক এরইমধ্যে এই মাদকে আসক্ত হয়েছেন, সেই তথ্য জানা খুব কঠিন। যেহেতু এই মাদক বিদেশ থেকে আসে, সুতরাং এর সঙ্গে নিশ্চয়ই বিশাল চক্র আছে এবং সেই চক্রে হয়ত প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠীও জড়িত। এই চক্রকে ধরতে না পারলে এরকম আরও অনেককে হাফিজুরের পরিণতি ভোগ করতে হবে। অনেক স্বপ্নের অপমৃত্যু হবে। অনেক বাবাকে তার সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে করবস্থানে যেতে হবে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভেতরে কী হচ্ছে, কী রকম গ্যাং ও গ্রুপ তৈরি হচ্ছে, এলএসডির মতো ভয়াবহ মাদক কী করে সেখানে থাবা বসাচ্ছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি এর দায় এড়াতে পারে? বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পড়া মুখস্থ করা এবং তারপর একটি সার্টিফিকেট প্রদানের জায়গা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে একজন তরুণের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

তার জীবনবোধ গড়ে তোলাই শিক্ষকদের প্রধান কাজ। যদি সত্যিই শিক্ষকরা তাদের সেই দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তাহলে হাফিজুরের মতো তরুণরা কি এলএসডির মতো ভয়াবহ মাদকে আসক্ত হতে পারতেন? ফলে আমরা যখন হাফিজুরের মৃত্যু নিয়ে কথা বলি, তখন এসব প্রশ্নও সামনে আনতে হবে।

তৃতীয় প্রশ্ন হলো, হাফিজুরের মতো যে মেধাবী তরুণরা মফস্বল থেকে ঢাকায় এসেছেন নিজের জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অথবা যে তরুণরা ঢাকায়ই বেড়ে উঠেছেন এবং তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, তারা কোথায় যায়, কী করে, কাদের সঙ্গে মেশে— সেই খবর কি পরিবারগুলো ঠিকমতো রাখছে বা রেখেছে? এখানে অভিভাবকরা কি তাদের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন? শুধু সন্তান জন্ম দেয়াই কি অভিভাবকের কাজ?

অস্বীকার করার উপায় নেই, সন্তানকে আপনি যত বেশি স্বাধীনতা দেবেন, সে আপনার কাছ থেকে তত দূরে সরে যাবে। আপনি তার উপর যত বেশি নিয়ন্ত্রণ হারাবেন, সে তত বেশি বখে যাবে। আপনি জানবেনও না সে কাদের সঙ্গে মেশে, কী করে, কী দেখে, কী করতে চায়। তার ভেতরে ভেতরে কী পরিবর্তন হয়ে গেছে, সেটি আপনি টেরও পাবেন না। সুতরাং, সন্তানকে স্বাধীনতা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবক যদি তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার পরিণতি ভয়াবহ হবে; হচ্ছে।

স্মরণ করা যেতে পারে, রাজধানীর বনানীতে দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় সাফাত আহমেদ নামে যে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, পুলিশের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে তিনি বলেছিলেন, ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা যে অপরাধ, তা তিনি জানেন না। তার ভাষ্য, তারা ‘মেয়ে বন্ধুদের’ সঙ্গে প্রায়ই পার্টিতে ‘এমনটা’ করে থাকে। জিজ্ঞাসাবাদে উপস্থিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা এতে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হিসেবে সাফাত উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন করত। অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তার স্বাভাবিক বলেই মনে হতো।

প্রশ্ন হলো, কী ধরনের সমাজ আমরা নির্মাণ করেছি এই তরুণদের জন্য? কী ধরনের পারিবারিক কাঠামোর ভেতরে তারা বেড়ে উঠেছে? কী ধরনের মূল্যবোধ তারা পরিবার থেকে শিখেছে? সুতরাং সাফাত যে কথা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, এই অপরাধে কেবল তার একার নয়, তার অভিভাবকদেরও কি শাস্তির আওতায় আনা উচিত নয়? যারা ধর্ষণের মতো একটা গুরুতর অপরাধকেও অপরাধ বলে তাদের সন্তানদের শেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন?

আমরা মনে করতে পারি ফরিদপুরের স্কুলছাত্র ফারদিন হুদা মুগ্ধর কথা, নতুন মোটরসাইকেল না পেয়ে যে তার বাবাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। আমরা স্মরণ করতে পারি, ভোগবিলাস আর প্রাচুর্যের ভেতরে বেড়ে ওঠা পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের মেয়ে ঐশীর কথা, যে তার বাবা মাকে হত্যা করেছিল।

রাজধানীর এজিবি কলোনির বাসিন্দা গণপূর্ত বিভাগের হিসাব সহকারী রুনা আক্তারের কথাও আমরা ভুলিনি, যিনি স্থানীয় কিছু বখাটে যারা মোটরসাইকেল নিয়ে ওই এলাকার বাইকসন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছিলেন। এরকম আরও বহু ঘটনা আছে শুধু রাজধানীতেই। এসব তারুণ্যের বখে যাওয়ার পেছনে প্রথমত রয়েছে তাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন, নৈতিক মূল্যবোধ না শেখানো এবং সন্তানের উপর নজরদারি রাখতে অভিভাবকের ব্যর্থতা।

অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে এসব তরুণের অভিভাকের অনেকেই ব্যক্তিজীবনে অসৎ। অবৈধ আয়ে সন্তানদের বড় করেছেন। সুতরাং তাদের আয়ের উৎস চিহ্নিত করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে না পারলে সামাজিক চাপে এরকম দুচারজন সাফাতের হয়ত বিচার হবে কিংবা উপযুক্ত নজরদারির অভাবে হাফিজুরের মতো অনেক তরুণ হয়ত বিকশিত হবার কালেই নিজের গলায় ডাব কাটার ধারাল দা দিয়ে নিজের গলায় কোপ দিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে; কিন্তু পৃথিবীর যে গভীরতর অসুখ—সেটি সারবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
ছয় দফায় ভিত রচিত হয়েছিল
ছয় দফা নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু
ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

শেয়ার করুন

মন্তব্য

স্বাধীনতার দলের নতুন চ্যালেঞ্জ

স্বাধীনতার দলের নতুন চ্যালেঞ্জ

আওয়ামী লীগ উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার দলটির জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ। আরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে- সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান রোধ। যে দলটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই দলে নানা কৌশলে সাম্প্রদায়িক শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটছে, এমন অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দলটি ২০২১ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পালন করছে। দলটি টানা ১২ বছরের বেশি ক্ষমতায়। পর পর তিনটি সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। জাতীয় সংসদ, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ- জনপ্রতিনিধিদের প্রতিটি সংস্থায় দলটির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব।

সংগত কারণেই এ দলের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কোনো সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতা কিংবা ঠিকভাবে কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে অন্যের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ তাদের নেই।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পূর্ববাংলার বঞ্চনা এবং বিশেষ করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উপেক্ষার পটভূমিতে আওয়ামী লীগের জন্ম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচি-লাহোরকে কেন্দ্র করে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তার শাসকরা পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ড) উপনিবেশ হিসেবেই গণ্য করতে শুরু করে।

তারা নতুন উদ্যমে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াতে এবং এটাকেই মুশকিল আসানের দাওয়াই হিসেবে গণ্য করতে থাকে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর উর্দুতে ডাকটিকিট প্রকাশ ও সরকারি চাকরিতে আবেদন করার যোগ্যতা হিসেবে উর্দু জানা বাধ্যতামূলক করার অপচেষ্টা শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি কর্মচারীরা ধর্মঘট করে বসবে, এটা তারা ভাবতে পারেনি।

এ ঘটনার তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পাঠ ঘুচিয়ে অচেনা শহর ঢাকায় চলে আসা তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।

বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র চাই- এ স্থির লক্ষ্য বঙ্গবন্ধু নির্ধারণ করেন সেই পঞ্চাশের দশকেই। খ্যাতিমান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সনজীদা খাতুন আমাকে (এ নিবন্ধের লেখক অজয় দাশগুপ্ত) বলেছেন, ১৯৫৬ সালে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু তাকে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি..’ গাওয়ার অনুরোধ করেন। ওই অনুষ্ঠানে পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্টজনেরা এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমাদের মনে যে ‘সোনার বাংলা’ সেটা ওদের প্রতিটি সুযোগে জানিয়ে দিতে হবে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ, প্রধান সংগঠক। ৩৩ বছর বয়সেই দলের পূর্ব পাকিস্তান কমিটির সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু বাংলার তিন প্রবাদপ্রতিম রাজনীতিবিদ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কাছে তিনি অপরিহার্য সহকর্মী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। তার বিকল্প নেই কারো কাছে।

পঞ্চাশের দশকে শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় বসবাস করতেন। কিংবা ছুটে যেতেন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দলের কাজে। এ দশকের প্রায় অর্ধেকটা কেটেছে কারাগারে। বন্দিজীবন কতদিন, সে তথ্য রয়েছে ১৯৫৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, ১৯৪৯ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি গ্রেপ্তার হন এবং একই বছরের ১৭ জুন মুক্তি পান (প্রকৃতপক্ষে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৯ এপ্রিল এবং মুক্তি পান ২৬ জুন)। এরপর গ্রেপ্তার হন ১৯ জুলাই, ১৯৪৯ (প্রকৃতপক্ষে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর) এবং মুক্তি পান ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এরপর গ্রেপ্তার হন ১৯৫৪ সালের ১৬ মে এবং মুক্তি পান একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিকশাসন জারির পর পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৪ মাস পর ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৫৯ তারিখ মুক্তি পান।

এর বাইরেও ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রথম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে হরতাল পালন করার সময় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কয়েকদিনের জন্য বন্দি ছিলেন। অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রথম ১২ বছরের মধ্যে ৪ বছরের বেশি সময় তিনি ছিলেন কারাগারে। ষাটের দশকেও বার বার তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। সবচেয়ে দীর্ঘ কারাবাস ছিল ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ সময়ের বড় অংশ কেটেছে ক্যান্টনমেন্টে। এর পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তাকে রাখা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে।

কারাগারের বাইরে থাকার সময় বঙ্গবন্ধু ঢাকাকে কেন্দ্র করে দলের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি নিয়মিত জেলা-মহকুমা সফর করেছেন। দলের দুই প্রবীণ ও জননন্দিত নেতার সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সব বিষয়ে তিনি একমত ছিলেন, সেটা বলার উপায় নেই। কখনও কখনও দ্বিমত প্রকাশ্য হয়েছে। কিন্তু দুজনের কাছেই তিনি সমান প্রিয়।

দুজনেই নানা কাজে তার ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখেন। আবার মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যেও বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য ছিল বিস্তর। সে বিরোধ নিষ্পত্তিতেও তিনি সাহায্য করেছেন।

বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দীকে রাজনৈতিক গুরু মানতেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের শুরুতেই রয়েছে- ‘কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হল। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কিভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহে আমি পেয়েছিলাম।’

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ গঠনের পর অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তান পাঠান সোহরাওয়ার্দীকে এ দলের সঙ্গে যুক্ত হতে সম্মত হওয়ার জন্য। ২৯ বছর বয়স তার। যেতে হয়েছে গোপন পথে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিধ্বস্ত ভারতের ওপর দিয়ে। সেখানের মিশন সম্পন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানে ফেরত আসার পর টানা দুই বছরের বেশি কারাগারে, মুক্তি পান ১৯৫২ সালের একুশের ফেব্রুয়ারির সফল আন্দোলনের পর।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখে আওয়ামী লীগ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিল বলেই আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের নিষ্ঠুর সামরিক শাসনামলে এ দলটিই ছিল প্রধান ও বলা যায় একক প্রতিপক্ষ। কিন্তু এই প্রতিপক্ষ যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী ও সৃজনশীল নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করে তুলবে, সেটা তারা ভাবতে পারেননি।

স্বাধীনতার জন্য বাঙালিরা এবং তাদের দল আওয়ামী লীগ কতটা প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল সেটা প্রথম স্পষ্ট হয় ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সময়ে। নিষ্ঠুর সামরিক শাসনের কবলে এ ভূখণ্ড। বাঙালিদের দমন করার জন্য বেলুচিস্তানের কসাই লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতিদিন জারি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দিয়ে সামরিক ফরমান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাসভবনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে বিকল্প প্রশাসন। ইয়াহিয়া খান-টিক্কা খানের হুকুম নয়, জনগণ পালন করেছে ৩২ নম্বরের নির্দেশ।

মহাত্মা গান্ধী শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। কিন্তু বিকল্প প্রশাসন চালু করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু একসঙ্গে দুটি কাজই করেছেন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় বিভিন্ন মহল- সব কিছু চলেছে বঙ্গবন্ধুর কথায়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই আমাদের জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। ২৫ মার্চ নিষ্ঠুর গণহত্যার তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণ করে। স্বল্প সময়ে এ সরকার লাখ লাখ তরুণকে মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে প্রশিক্ষণ প্রদান ও অস্ত্রসজ্জিত করে।

এই বাহিনী নাস্তানাবুদ করতে থাকে ‘অপরাজেয়-দুর্ধর্ষ’ দাবিদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। একইসঙ্গে এ সরকার ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থীর আশ্রয়-খাদ্য-চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে সর্বোতভাবে সহায়তা করে।

সরকার গঠনের দেড় মাস যেতে না যেতেই বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব শিল্পী-কলাকুশলী দিয়ে চালু করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করে পরিকল্পনা সেল।

মুক্তিযুদ্ধকালে কূটনৈতিক অভিযান পরিচালনাতেও বাংলাদেশ সরকার ছিল সফল। গেরিলা যুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে নাকাল করার একপর্যায়ে ভারতের সঙ্গে মিলিতভাবে গঠিত হয় মিত্র বাহিনী, যাদের প্রবল আক্রমণে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের সহযোগীরা ১৬ ডিসেম্বর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ছিল, সন্দেহ নেই। ২০২০ সালে পূরণ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ। ২০২১ সাল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আওয়ামী লীগ উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার দলটির জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে- সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান রোধ। যে দলটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই দলে নানা কৌশলে সাম্প্রদায়িক শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটছে, এমন অভিযোগ রয়েছে। দলের নানা পর্যায়ের নেতৃত্বের একটি অংশ ক্ষমতা ‘উপভোগ’ করায় যতটা তৎপর, বাংলাদেশের মৌল চেতনা ধ্বংসে সক্রিয় সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি ততটাই যেন আপসকামী।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। সম্পদ বাড়ছে দেশে এবং এর পেছনে আওয়ামী লীগের বিপুল অবদান। কিন্তু একইসঙ্গে একটি মহলের হাতে জমা হচ্ছে অঢেল সম্পদ। কী করে এই বৈষম্য কমিয়ে আনা যাবে, সে চাপ বাড়ছে দলের নেতৃত্বের ওপর।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে সরকার ও আওয়ামী লীগের সামনে আরও একটি ইস্যু- প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এমনকি দলের নানা পর্যায়ের নেতৃত্বে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের আরও বেশি দায়িত্ব প্রদান। টেকসই উন্নয়নের জন্য এটা অপরিহার্য শর্ত।

নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। কোনো স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ এভাবে বিশ্বব্যাংক বা পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। করোনা বিপর্যয় মোকাবিলা করছেন নিপুণ দক্ষতায়। বিদ্যুৎ সংকটের অবসান ঘটেছে। খাদ্যে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা প্রত্যন্ত গ্রামেও বিস্তৃত।

এ ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ উন্নত দেশের সারিতে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে হলে সম্পদ সৃষ্টির প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। উদ্যোক্তাদের দিতে হবে নানা সুবিধা। একইসঙ্গে বৈষম্য কমিয়ে আনার প্রতিও দিতে হবে সর্বোচ্চ মনোযোগ। আমাদের স্বাধীনতার মর্মচেতনাই ছিল সোনার বাংলা নির্মাণ ও দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
ছয় দফায় ভিত রচিত হয়েছিল
ছয় দফা নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু
ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে

আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে

জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠেছিল। জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে আসতে থাকে দলটি। ষাটের দশকজুড়ে এই ঐতিহ্যবাহী দলটি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নিজ আদর্শ সমুন্নত রেখেছিল। এই সমুদয় পর্বে আওয়ামী লীগ তার আদর্শ থেকে সরে আসেনি।

একটি রাজনৈতিক দল জনসমর্থন নিয়ে টিকে থাকে এর আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখে। মাটি ও মানুষের মধ্য থেকে গড়ে ও বেড়ে উঠলে এবং নানা যুগপর্বে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকলে, ভূমিকা রাখলে একে ঐতিহ্যিক দল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই সূত্রে আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল। এমন দলের জন্মকাল থেকেই আদর্শ ও দর্শন থাকে। এ ধারার রাজনৈতিক দল যতকাল এই আদর্শ ও দর্শন ধারণ করতে পারে, ততদিন রাজনীতির মাঠে এবং জনগণের আস্থায় সম্মানজনক অবস্থানে টিকে থাকে।

এই অর্থে মুসলিম লীগও একটি ঐতিহ্যবাহী দল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সূত্রে দলটির জন্ম। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে অনুন্নত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ লাভবান হবে বিবেচনার ঢাকার নবাবদের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন জানানো হয়।

অপরদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজদের কূটচাল বিবেচনা করে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করতে থাকে। ভারতীয়দের একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন সর্বভারতীয় কংগ্রেস অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছিল। কিন্তু যখন কংগ্রেসের নেতারা মুসলমান নেতাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই বঙ্গভঙ্গের বিরোধী অবস্থানে দাঁড়ালেন, তখন পূর্ববঙ্গের মুসলমান নেতারা কংগ্রেসের ওপর আস্থা রাখতে পারলেন না।

নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে তারা সংঘবদ্ধ হলেন। বুঝতে পারলেন নিজ সম্প্রদায়ের দাবি আদায়ের জন্য মুসলমানদের রাজনৈতিক দল থাকা চাই। এই লক্ষ্যেই ঢাকায় ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হলো।

ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম লীগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের হাতে। সরকারি পক্ষের রাজনৈতিক দল হয় মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগের সমকক্ষ রাজনৈতিক দল পাকিস্তানের প্রথম পর্বে আর ছিল না। বাংলার অধিকাংশ নেতাই মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন।

একপর্যায়ে বাঙালি নেতাদের মোহভঙ্গ হয়। ভাষার প্রশ্নে যখন পাকিস্তানি শাসকদের হিংস্র মনোভাব স্পষ্ট হলো, সংঘটিত হয়ে গেল ভাষা আন্দোলন তখনই মুসলিম লীগে বেজে উঠল পতনের সুর। এই অবধারিত সত্যটি স্পষ্ট হলো। আদর্শচ্যুত হয়ে মুসলিম লীগের মতো বড় ও ঐতিহ্যবাহী দলকেও মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছিল।

ভাষা প্রশ্নে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈরী মনোভাব এবং ভাষাসূত্রে পূর্ববাংলায় সংঘটিত ভাষা আন্দোলন এ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক জীবনে প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করে। এ দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে বিশ্বাস করার কোনো ভিত্তি নেই। শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা, সরকারি নীতিতে পক্ষপাতিত্ব এবং মুসলিম লীগের রাজনীতিতে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে শোষণনীতি ইত্যাদি ক্রমেই প্রকাশ্যে চলে আসে।

সুতরাং তারা বুঝতে পেরেছিল এ দেশের জনগণের অধিকারের কথা বলার জন্য নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই চিন্তার ফসল হিসেবে ১৯৪৯ সালের জুন মাসে ঢাকায় আত্মপ্রকাশ করে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামের রাজনৈতিক সংগঠন। এই নতুন দলের সভাপতি মনোনীত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন শামসুল হক।

আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন অর্জন। এই লক্ষ্যেই তারা একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেন। এতে পাকিস্তানের আঞ্চলিক ইউনিটগুলোকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার দেয়ার প্রস্তাব রাখা হয়। গঠনতন্ত্রে বাংলার নিজস্ব পদাতিক, নৌ ও বিমানবাহিনী রাখার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মুসলিম লীগের প্রতি ইতোমধ্যেই পূর্ববাংলার মানুষের আস্থা কমে গিয়েছিল। ফলে অধিকাংশ মানুষই আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্ব মেনে নিতে থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে সময়ের দাবিতে এবং বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে আওয়ামী মুসলিম লীগ ‘আওয়ামী লীগ’-এ রূপান্তরিত হয়।

আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। তার নেতৃত্বে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দাপটের সঙ্গে এগিয়ে যায় বাঙালি। ১৯৭০-এর নির্বাচনে অভ্রভেদী জয় পায় আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ।

তাহলে দেখা যাচ্ছে জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠেছিল। জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে আসতে থাকে দলটি। ষাটের দশকজুড়ে এই ঐতিহ্যবাহী দলটি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নিজ আদর্শ সমুন্নত রেখেছিল। এই সমুদয় পর্বে আওয়ামী লীগ তার আদর্শ থেকে সরে আসেনি।

স্বাধীনতা-উত্তরকালেও আওয়ামী লীগ তার আদর্শ ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধু আদর্শ দুর্বল করতে দেননি। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রের যাত্রাপথকে শক্তিশালী করে। মন্ত্রিপরিষদ-শাসিত সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন করেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৪৭ সালে হলেও সংবিধান পাস হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। প্রায় ১০ বছর লেগে যায়।

অপরদিকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করতে পেরেছিলেন। এই সংবিধানে আওয়ামী লীগের আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীলতা জড়িয়ে ছিল সংবিধানে।

বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে গেছেন। দল ও প্রশাসনে দুর্নীতি থাকলে সব অর্জনই ধ্বংস হয়ে যায়। যতই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র থাক না কেন, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের পেছনে আকাশচুম্বী দুর্নীতির ভূমিকা কিছু মাত্রায় কম ছিল না। ‘চোরের দল’, ‘চাটার দল’ বলে বঙ্গবন্ধুকে শুধু আক্ষেপ করতে দেখেছি। সময়ের বাস্তবতায় এবং একটি শুভ ইচ্ছা সামনে রেখে সাময়িক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে সব দল নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে বাকশাল ঘোষণা করতে হয়।

যতই শুভ ইচ্ছা থাক, মানতে হবে এই ব্যবস্থা আওয়ামী লীগের অদর্শকে ধারণ করেনি। তাই শেষ পর্যন্ত একটি কঠিন দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আওয়ামী লীগকে, দেশবাসীকেও। এখনও সমালোচনা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ।

বঙ্গবন্ধু-উত্তর আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থেকে বা সরকার গঠন করে সততা ও দলীয় আদর্শ সামনে রেখে যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সে পথে সব সময় হাঁটতে পারেনি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যায়। এই দুর্বলতার সুযোগে প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো আদর্শ ধারণ না করা ভুঁইফোঁড় দল বিএনপি জেঁকে বসতে পেরেছিল।

জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগ নেতাদের দুর্বলতা ও গণবিচ্ছিন্ন আচরণকে পর্যবেক্ষণ করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পেরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র চার বছর অতিক্রান্ত না হতেই গণতান্ত্রিক ধারা বিচ্ছিন্ন সেনাছাউনি থেকে বেরিয়ে আসা একটি দল রাজনীতির মাঠে শক্ত ভিত্তি পেয়ে যায় শুধু আওয়ামী লীগ নেতাদের দলীয় আদর্শ থেকে বেরিয়ে এসে একটি বিভ্রান্ত দশায় নিপতিত হওয়ার কারণে।

শেখ হাসিনা দুর্দশাগ্রস্ত দলের হাল ধরলেও দৃঢ় পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে দলীয় আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে জামায়াতসহ অন্যান্য মৌলবাদী দলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়েছে। যে ধারা থেকে এখনও বের হওয়া সম্ভব হয়নি।

ক্ষমতার রাজনীতিতে অমন দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো সাময়িক লাভ নিয়ে আসে কিন্তু দলীয় আদর্শচ্যুতি আখেরে ক্ষতি করে দেয় দলকে। আওয়ামী লীগ তার গৌরবের সময় জনগণের দল ছিল। কিন্তু গণশক্তির ওপর শেষ পর্যন্ত ভরসা রাখতে পারেনি। তাই ক্রমে দলবৃত্তে আটকে যাচ্ছে কঠিনভাবে।

সব ক্ষেত্রে এবং সব প্রতিষ্ঠানে যখন দলীয়করণ কঠিনভাবে জায়গা করে নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবে বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। একটি ঐতিহ্যবাহী দল এভাবেই জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকে। ক্ষমতার মদে মত্ত থাকায় কঠিন বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে চায় না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেকটা এগিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা জানেন এসব উন্ননের বাস্তবতা সব সময় সাধারণ মানুষকে স্বস্তিতে রাখতে পারে না।

মানুষ তার যাপিত জীবনে যখন প্রতিদিন দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি দেখে। সন্ত্রাসের শিকার হয়। অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ থেকে সরে আসতে দেখে। দলীয়করণের ঘেরাটোপে যখন যোগ্য, মেধাবী মানুষদের মূল্যায়ন হয় না, তখন মানুষ ১৯৪৯ সালে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগের সঙ্গে এ সময়ের আওয়ামী লীগের অনেক তফাত দেখতে পায়। এভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যদি আওয়ামী লীগের আস্থার সংকট তৈরি হয়, তবে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে এই ঐতিহ্যবাহী দলটির।

এই সুযোগটি ভালোভাবেই গ্রহণ করতে চাইবে ভুঁইফোঁড় দল আর মৌলবাদী গোষ্ঠী। এতে আওয়ামী লীগই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্রপ্রত্যাশী এ দেশের কোটি কোটি মানুষ।

আজ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে আমাদের অনুরোধ থাকবে এই দলের নেতারা যাতে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ান। এ দেশে শক্ত বিকল্প গণতান্ত্রিক দলের অস্তিত্ব থাকলে মানুষকে এতটা হতাশ হতে হতো না। বাস্তবতা হচ্ছে এই যে চলমান রাজনীতিতে বিকল্প নেই বলে আওয়ামী লীগকেই এ দেশের কাণ্ডারি হতে হবে।

ক্ষমতার দম্ভে থেকে সাধারণ মানুষকে আমলে না আনা একটি ঐতিহ্যবাহী দলের ‘দর্শন’ হতে পারে না। এই সত্যটি আওয়ামী লীগ নেতারা যত দ্রুত বুঝবেন, তত উপকার হবে দলের আর এ দেশের অধিকাংশ মানুষের।

আমরা প্রত্যাশা করব, ক্ষমতা আর অর্থবিত্ত নয়, আওয়ামী লীগ নেতারা শক্তভাবে দলীয় আদর্শকে সমুন্নত রাখার মধ্য দিয়ে দলীয় অবয়বে যতটা ক্লেদ জমেছে তা ধুয়েমুছে স্বচ্ছ করে দেবেন। মানুষ কিন্তু আওয়ামী লীগের কাছ থেকে এই স্বচ্ছতার রাজনীতিই দেখতে চায়।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
ছয় দফায় ভিত রচিত হয়েছিল
ছয় দফা নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু
ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগের প্রয়োজনীয়তা

আওয়ামী লীগের প্রয়োজনীয়তা

দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শেখ হাসিনা আদর্শ ও দৃঢ়তায় পরিচালিত করার কারণে দলের ভেতর ও বাইরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীসমূহ আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া আধুনিক কল্যাণবাদী রাষ্ট্র গঠনের নির্ভরযোগ্য দল হিসেবে বিবেচনা করছে। আওয়ামী লীগের বিকল্প এখনও পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারকবাহক কোনো দল হতে পারেনি। যতদিন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিপূর্ণভাবে সে রকম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সফল না হচ্ছে, ততদিন এই দলের ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখার আবশ্যকতা শেষ হবার নয়।

ইতিহাসে অনেক রাজনৈতিক দল স্বাধীনতা লাভের মতো ঐতিহাসিক অবদানও রেখেছে। কিন্তু এমন রাজনৈতিক দলও খুব বেশি দিন মানুষের সমর্থন নিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। মূল দল ভেঙে একাধিক রাজনৈতিক দল, শাখা-প্রশাখা হয়েছে। আমাদের এই অঞ্চলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভে দুটি রাজনৈতিক দল বেশ জনসমর্থন লাভ করে। এক কথায় দুটি দল ভারতবর্ষে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা লাভে জাতীয় কংগ্রেস এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় মুসলিম লীগ নেতৃত্ব দেয়।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা হলো- মুসলিম লীগ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববাংলায় অতিদ্রুত জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। ১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলার প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে দলটির যে পরাজয় ঘটে তা আর কেটে ওঠা সম্ভব হয়নি। যদিও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার মুসলিম লীগ এবং মুসলিম লীগের নব-সংস্করণে গঠিত দল নিয়ে সামরিক শাসকরাও রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু পূর্ববাংলার জনগণের মন থেকে মুসলিম লীগ ১৯৪৭-৪৮ সালেই উঠে যেতে থাকে এবং দলটি এই অঞ্চলে আর কোনোদিন দাঁড়াতে পারেনি।

পশ্চিম পাকিস্তানে এখনও বিভিন্ন ব্র্যাকেটবন্দি নামে থাকলেও মুসলিম লীগের গুরুত্ব পাকিস্তানে অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। ভারতে জাতীয় কংগ্রেস এখনও টিকে থাকলেও গত প্রায় ২৫ বছর ধরে জাতীয় কংগ্রেসের অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হতে দেখা যাচ্ছে। এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞতা বেশ ভিন্ন।

যদিও এ দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবোদ্ধা ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্ত মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯১-এর নির্বাচনে পরাজয়ের পর বেশ সদম্ভে উচ্চারণ করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ নিশ্চিতভাবেই মুসলিম লীগের ভাগ্যবরণ করতে যাচ্ছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ১৯৭৫-এর পর থেকে দাবি করে আসছিল যে, আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না, ক্ষমতায় আসতে দেয়াও হবে না। এই চেষ্টা ২১ আগস্ট তারিখে কিংবা এর আগে এবং পরে অনেকবারই করা হয়েছে, এখনও করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এসেছে, দেশ শাসন করছে, দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও পরিবর্তনে বড় ধরনের ভূমিকাও রাখছে।

এই দল পাকিস্তানকালে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম জোরদার করেছে, ছয় দফার আন্দোলনকে এক দফায় রূপান্তরিত করে স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। স্বাধীনতার পর দলটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শাসনতন্ত্র, অবকাঠামোগত ভিত্তি, জাতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা থেকে শিক্ষায় আমূল পরিবর্তনসহ মৌলিক কর্মসূচি প্রদানের মাধ্যমে অগ্রসর হয়েছিল।

দলের প্রধান, নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীদের হত্যা, আওয়ামী লীগকে ভেঙে তছনছ করে দেয়া, সাম্প্রদায়িক দল সৃষ্টি করা, নতুন নামে মুসলিম লীগের ভাবাদর্শে রাজনৈতিক দল এবং প্রচার-প্রচারণাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাজের তলদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে কঠিন করে দেয়া হয়েছিল।

এরপরও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুনর্জীবন ঘটেছে, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং বাংলাদেশকে আওয়ামী লীগ কী ধরনের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে, কেমন আর্থসামাজিক ব্যবস্থা তৈরি করতে চাচ্ছে, সক্ষমতা রাখছে, অন্যান্য রাজনৈতিক দল এর ভিন্নতা, প্রয়োজনীয়তা, দেশে ও বিদেশে উপস্থাপন করছে, স্বীকৃতও হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে এর প্রতিষ্ঠার সময় থেকে যে রাজনৈতিক দর্শন এবং রাষ্ট্রকাঠামো তৈরির জন্য এই দলটি লড়াই সংগ্রাম, রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার মতো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, রাষ্ট্র গঠনের কাজে হাত দিয়েছে। সেটি নানা ষড়যন্ত্রের কারণে পিছিয়ে গেলেও জনগণের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে দেশে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং আওয়ামী লীগই নানা সীমাবদ্ধতা, জটিলতা, ত্রুটি-দুর্বলতা ইত্যাদির পরও ইতিহাসের কঠিন দায়িত্ব পালনে মৌলিক অবদান রাখার একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে অবস্থান করছে।

বিষয়টি মন গড়া নয়, অন্ধবিশ্বাসপ্রসূতও নয়। ৭২ বছরের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বেড়ে ওঠা প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার সক্ষমতা রাষ্ট্র ও জনগণকে নতুন চিন্তায় নেতৃত্ব দেয়ার যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে সেটিকে মূল্যায়ন, পুনর্মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং তুলনামূলক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণ আওয়ামী লীগের টিকে থাকার চমকপ্রদ ব্যতিক্রমধর্মী ইতিহাসটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। এর বিস্তার অনেক বড়। সেটি অসংখ্য রাজনৈতিক গ্রন্থ রচনা ও গবেষণার বিষয়। সংক্ষেপে আলোচনাটি তুলে ধরছি।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেন প্যালেসে একটি সম্মেলন শেষে নতুন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা হলো। দলটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। এর উদ্যোক্তারা হলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশ তথা মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পূর্ববাংলাবিরোধী রাজনীতির বিরোধিতাকারী যুব কর্মীরা। এরা প্রথমে যুব কর্মী শিবির নামে সংগঠিত হয়।

মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই যাদের মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল, পূর্ববাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য যারা ছিল একনিষ্ঠ, তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই ভাষাকেন্দ্রিক বিরোধ, জাতিগত নিপীড়ন, মুসলিম লীগের শাসন-শোষণ, বাঙালিবিরোধী মনোভাব ইত্যাদি দেখে ক্ষুব্ধ হচ্ছিলেন। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার প্রয়োজন অনুভব করছিলেন এবং ছোট ছোট সামাজিক সাংস্কৃতিক ছাত্র সংগঠন এবং যুব সংগঠন গড়ে তুলে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে থাকেন।

এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিলেন যারা, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শওকত আলী, শামসুল হক, কামরুদ্দীন আহমেদ, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ, মো. তোয়াহা, আতাউর রহমান খান, শামসুজ্জোহা, আবদুল আউয়াল, মুহম্মদ আলমাস প্রমুখ। কলকাতা থেকে সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় এসে শওকত আলীকে একটি বিরোধী রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার উপদেশ দিয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়া ১৯৪৮-৪৯ সালে জোরদার হতে থাকে। ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থী খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে ভাসানী-মুজিবসমর্থিত শামসুল হক বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পর নতুন সংগঠন গড়ে তোলার বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়। তরুণ নেতা শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ মার্চ পিকেটিং করার সময় ইউ/এস ৫৪ সিআরপিসি ধারাতে কারারুদ্ধ হন।

সেই সময়ে একদিকে যুব কর্মী শিবিরে সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তুতি প্রদেশব্যাপী জোরদার হতে থাকে, অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র-কর্মচারীদের আন্দোলনও বেগবান হতে থাকে। এর আগে মওলানা ভাসানী আসাম থেকে টাঙ্গাইল এবং টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আমজাদ হোসেনের বাসায় অবস্থান করছিলেন। শওকত আলীর সঙ্গে তার আলোচনা এখানেই হয়।

২৩ জুন রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রায় ২৫০-৩০০ ব্যক্তির উপস্থিতিতে জন্ম নেয় নতুন রাজনৈতিক দল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ভাইস প্রেসিডেন্ট হন আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, আলী আহমেদ খান, আমজাদ আলী খান, সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শামসুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান (তিনি তখন জেলে বন্দি) এবং কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন ইয়ার মোহাম্মদ খান।

নতুন এই দলটির অন্যতম দাবি ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়, ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’, সংবিধান প্রণয়ন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, সংসদীয় সরকারব্যবস্থা, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ ইত্যাদি। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্ত শাসনের দাবি সংগঠনের অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে গ্রহণ করে।

২৬ জুন শেখ মুজিব জেল থেকে ছাড়া পান। আওয়ামী লীগকে তিনি সাংগঠনিকভাবে প্রদেশব্যাপী গড়ে তোলার জন্য মওলানা ভাসানীসহ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় সফর করেন, সংগঠনের কমিটি গড়ে তোলেন। এরপর ভাষা আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের ওপর পাকিস্তানি শাসক মহলের কঠোর অবস্থানের ফলে মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিব, শামসুল হকসহ অনেক নেতা কারারুদ্ধ হন।

৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে কেউ কেউ মুক্তি পেলেও ভাসানীসহ অনেক নেতা কারাগারেই ছিলেন। শেখ মুজিব মুক্ত হওয়ার পর আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করার জন্য সাংগঠনিক কর্মসূচি বাড়ান। শেষ পর্যন্ত সরকার বাধ্য হয় কারারুদ্ধ নেতাদের মুক্তি দিতে। ১৯৫৩ সালের দ্বিতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী পার্টি এবং নেজামে ইসলাম মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়। এই ফ্রন্টের মূল নেতা হিসেবে শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর নাম যুক্ত হয়। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা প্রণয়নের মাধ্যমে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বিপুলভাবে জনসমাবেশ ও প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়।

১৯৫৪ সালের ৮-১২ মার্চের এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে। প্রাদেশিক পরিষদে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন লাভ করে। মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি, আওয়ামী লীগ এককভাবেই ১৪৩টি আসন লাভ করে। মুসলিম লীগের এই পরাজয় এবং আওয়ামী লীগের এই উত্থান পরবর্তী সময়ে ইতিহাসে মূল রাজনৈতিক গতিধারা হিসেবে দৃশ্যমান হয়।

১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের তৃতীয় দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে সর্বসম্মতভাবে নামকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। আওয়ামী লীগের এক-তৃতীয়াংশ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ন্যাপে যোগদান করেন। এই সময় প্রদেশে আতাউর রহমানের নেতৃত্বে প্রাদেশিক সরকার ক্ষমতায় ছিলেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্ব দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

দলের সেই কঠিন সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিত্ব ছেড়ে সাংগঠনিক দায়িত্ব যেমন পালন করেন, একই সঙ্গে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে আগে থেকেই পূর্ববাংলার স্বায়ত্ত শাসন, সংবিধান প্রণয়ন, বাংলা ভাষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ বিভিন্ন দাবিতে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকার ভেঙে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সামরিক শাসন জারি করে। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে আবার দলকে স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইয়ে প্রস্তুত করেন।

১৯৬৬ সালে অনুষ্ঠিত দলের সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নতুনভাবে নেতৃত্বের নির্বাচন করে। শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম দলের সহসভাপতি, তাজউদ্দীন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সম্মেলনে ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থাপিত ছয় দফা গৃহীত হয়। ছয় দফাকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য শেখ মুজিব এবং নতুন নেতৃত্ব প্রদেশব্যাপী গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা বাড়ান।

ছয় দফার প্রতি অভূতপূর্ব জনসমর্থন লক্ষ করেই পাকিস্তান সরকার ৮ মে গভীর রাতে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে ধরপাকড় শুরু করে। দলের শত শত নেতা-কর্মী কারারুদ্ধ হন। এর প্রতিবাদস্বরূপ ৭ জুন প্রদেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয়। হরতালে ব্যাপক জনসমর্থন ঘটে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে। এতে ১১ জন নিহত হন। প্রতিক্রিয়ার বারুদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান সরকার দমন নিপীড়ন বাড়িয়ে দেয়। আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র আঁটে। পাকিস্তানের অন্য রাজনৈতিক দল ও ভাসানীসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছয় দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও আওয়ামী লীগ দমে যায়নি।

পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে বিচার করার জন্য মামলা রুজু করে। এর প্রতিক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। শেখ মুজিবসহ রাজবন্দি নেতারা কারামুক্ত হন, জনতার বিজয় সূচিত হয়, আইয়ুব খানের ষড়যন্ত্র পরাজিত হয়। শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন।

৭০-এর নির্বাচনে তিনি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ এবং জনগণের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃত হন। পাকিস্তান সরকার তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জনগণ স্বাধীনতার একদফা বাস্তবায়নে প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করার প্রেক্ষাপট তৈরি করেন। ২৫ মার্চে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জিত হয়। দীর্ঘ এই রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সংগঠিত করে। আওয়ামী লীগের এই অবদান ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের যাত্রা শুরু হয়। গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদের আদর্শ ধারণ করে সংবিধান প্রণীত হয়, রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের নানামাত্রিক উদ্যোগ গৃহীত হতে থাকে, দেশীয় আন্তর্জাতিক নানা সংকট, সমস্যা অতিক্রম করে বাংলাদেশকে তখন চলতে হয়েছিল। তারপরও বঙ্গবন্ধু একটি কল্যাণবাদী রাষ্ট্র নির্মাণে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন। দেশের অভ্যন্তরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যায়।

বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.৪ শতাংশ হয়। বাংলাদেশ এই ধারায় পরিচালিত হলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই উন্নয়নশীল এবং উন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করতে পারত। কিন্তু ৭৫ সালের হত্যাকাণ্ড ছিল একটি পশ্চাৎমুখী ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নেয়া হয় ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের আদর্শে।

দেশে সামরিক-আধা সামরিক শাসনব্যবস্থা চালু করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনা জটিল ও কঠিন করে দেয়া হলো। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। দলের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকার গঠনে তিনি সক্ষম হন। এই সময়ে আওয়ামী লীগে ত্যাগী মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী বিভিন্ন দলের অনেক নেতা-কর্মীর সম্মিলন ঘটে, আওয়ামী লীগে নতুন রক্তের সঞ্চালনও ঘটে।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা দলীয় আদর্শে মিশ্র অর্থনীতির সংযোজন ঘটান। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ধারা হিসেবে গ্রহণ করেন। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতি পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ পায়। তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় বাংলাদেশে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে বিপুল পরিবর্তন ঘটে তার ফলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করে, এ ছাড়া উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সূচকে এখন একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশের এই পরিবর্তনের বেশ কিছু সুফল মানুষ ভোগ করছে।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়ে উঠলেও দলের ভেতরে আদর্শবাদী, ত্যাগী এবং শিক্ষিত মেধাবী নেতা-কর্মীর অভাব অনস্বীকার্য। তবে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শেখ হাসিনা আদর্শ ও দৃঢ়তায় পরিচালিত করার কারণে দলের ভেতর ও বাইরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীসমূহ আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া আধুনিক কল্যাণবাদী রাষ্ট্র গঠনের নির্ভরযোগ্য দল হিসেবে বিবেচনা করছে।

আওয়ামী লীগের বিকল্প এখনও পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারকবাহক কোনো দল হতে পারেনি। যতদিন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিপূর্ণভাবে সে রকম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সফল না হচ্ছে, ততদিন এই দলের ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখার আবশ্যকতা শেষ হবার নয়। সে জন্য দলের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত দলকে এর ইতিহাস, ঐতিহ্য, আদর্শ এবং সৃজনশীলতাকে ধারণ করতেই হবে। তাহলেই আওয়ামী লীগ শত বছরের রাজনৈতিক দল হিসেবে এর ঐতিহাসিক মর্যাদা বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসেই শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় একদিন অবশ্যই স্মরণীয় স্থান করে নেবে।

লেখক: অধ্যাপক, গবেষক

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
ছয় দফায় ভিত রচিত হয়েছিল
ছয় দফা নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু
ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

শেয়ার করুন

ঐতিহাসিক তেইশে জুন: ফিরে দেখা গৌরবের ৭২ বছর

ঐতিহাসিক তেইশে জুন: ফিরে দেখা গৌরবের ৭২ বছর

পাকিস্তানি দর্শন ধর্মের রাজনীতি, সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় আসা, সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি এবং ভারত-বিদ্বেষের রাজনীতি আজও এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিইয়ে রাখা হয়েছে! এই চিত্র দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই! কী বিচিত্র এই দেশ আর দেশের রাজনীতি! ত্রিশলাখ শহিদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধের রাজনীতি পাকিস্তানি পরাজিত অপশক্তির অনুসারীদের সাম্প্রদায়িক আস্ফালন দেখতে হচ্ছে!

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় তেইশে জুন লাল অক্ষরে লেখা একটি দিন। ১৭৫৭ সালের তেইশে জুন পলাশী প্রান্তরে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলা তথা উপমহাদেশের শাসনভার দখলে নিয়েছিল ব্রিটিশ বেনিয়ারা।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির মধ্যদিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও ঔপনিবেশিক দুঃশাসন থেকে মুক্তি পায়নি বাংলার মানুষ।

ব্রিটিশ কলোনি থেকে পূর্ববাংলা আসলে প্রবেশ করেছিল পাকিস্তানি কলোনির দুঃশাসনের শৃঙ্খলে। ফলে পাকিস্তান সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই ছাত্রনেতা শেখ মুজিব, অলি আহাদসহ তৎকালীন দেশপ্রেমিক তরুণরা উপলব্ধি করলেন, যে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে মুসলিম লীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলার মানুষ পাকিস্তান-আন্দোলন করেছিল, সেই স্বপ্ন এই স্বাধীনতা দিয়ে কিছুতেই পূরণ হবে না।

কারণ পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরু থেকেই বৈষম্য আর নিপীড়ন বাংলার মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ বাঙালি হলেও পূর্ববাংলা অবহেলিত উপেক্ষিতই থাকবে। যে কারণে রাষ্ট্রের ৫৬ ভাগ মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার অন্যতম মর্যাদাও দিতে রাজি হয়নি অবাঙালি শাসকরা।

ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের তিন সপ্তাহের মধ্যে শেখ মুজিবসহ বাংলার মুক্তিকামী প্রগতিশীল যুবসমাজ ‘পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ’ প্রতিষ্ঠা করেন (৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭)। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ছয় মাস বয়সেই ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা লাভ করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ১৪ সদস্যের সাংগঠনিক কমিটির অন্যতম সংগঠক ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

যুবলীগ ও ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শোষিত-বঞ্চিত এবং মৌলিক অধিকারহারা বাংলার মানুষের পক্ষে কথা বলার যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়, তার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই ছাত্র-যুব শক্তির মিলিত সাহস আর ত্যাগের ওপরেই দাঁড়িয়ে যায় স্বাধিকার চেতনা তথা অসাম্প্রদায়িক বাঙালিত্বের বোধ।

আর সে কারণে এই দুটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার পর অর্থাৎ পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের মাত্র দেড় বছরের মধ্যে দেশের প্রধান বিরোধী দল ১৯৪৯ সালের তেইশে জুন আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে, ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের পথচলা শুরু।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে যে স্বাধীনতা আমরা হারিয়েছিলাম, কে জানত ১৯৪৯ সালের সেই একই দিনে এমন একটি রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ে উঠবে, যা বাংলার রাজনৈতিক দিগন্তে স্বাধীনতার সূর্য উন্মোচন করবে ১৯৭১ সালে!

সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি লড়াই করেছে ২৩ বছর। বায়ান্নর রক্তাক্ত ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের বাঙালির রাজনৈতিক ঐক্যে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে বিজয় ও সরকার গঠন, ৫৮তে সামরিক দুঃশাসন তথা আইয়ুববিরোধী রাজপথের আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬তে বঙ্গবন্ধুঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন, ১৯৬৮তে সর্বাত্মক গণ-আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুবি শাসনের অবসান এবং ৭০-এর সাধারণ নির্বাচন আদায়ের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছয় দফার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার পক্ষে বাঙালির ঐতিহাসিক গণরায়। সেই রায় উপেক্ষার প্রতিবাদে অসহযোগ আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, অবশেষে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন।

উল্লিখিত প্রতিটি আন্দোলনেই নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিলেন এ জাতির কর্ণধার হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে কারণেই বাংলার মানুষের মুক্তিদূত অসম সাহসী দেশপ্রেমিক বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ২৩ বছরের প্রায় ১৩ বছরই শাসকদের রোষানলে পড়ে কারাগারের পীড়ন সইতে হয়েছে।

তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়: আওয়ামী লীগের ইতিহাস ধর্মান্ধতা আর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস। রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস বাঙালির গৌরব আর মহিমা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। দরিদ্র মানুষের জন্য অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ইতিহাস।

তাই ২৩ জুন ইতিহাসের বাঁক ফেরানো এক নতুন যুগে যাত্রার গৌরবময় দিন। ১৭৫৭-এর ২৩ জুন পরাজয়ের, ৪৯'র ২৩ জুন বিজয়ের দুর্গম পথে যাত্রার আলোকবর্তিকা জ্বালানোর দিন।

কাকতালীয় হলেও স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার ২১ বছর পর তারই সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছিল, সেদিনটিও ছিল ২৩ জুন!

বঙ্গবন্ধু জীবনের সমস্ত সুখ জলাঞ্জলি দিয়ে যে শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাষ্ট্রদর্শন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ১৯৭৫ সালে তাকে হত্যার মধ্যদিয়ে সেই রাষ্ট্র দর্শনকেই হত্যা করা হয়।

ফিরিয়ে আনা হয়েছিল মৃত পাকিস্তানের সেই ‘জিন্দাবাদ’ সংস্কৃতি, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মের নামে রাজনীতি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সেই কল্যাণমুখী রাষ্ট্র দর্শন ফিরিয়ে আনার পথে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাত্রা শুরু করেছিলেন ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন। তাই সব অর্থেই তেইশে জুন রক্ত-আখরে লেখা এক ঐতিহাসিক দিন।

বাঙালির হারানো গৌরব ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জনের গৌরবময় সংগ্রামের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আওয়ামী লীগের জন্মের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সেই দিন আজ।

১৯৪৯ থেকে ২০২১। ৭২ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় নানা চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে দলটিকে। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু আর অগণতান্ত্রিক দুঃশাসনের মুখে দাঁড়িয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করা খুব সহজ যে ছিল না, তা ১৯৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানি সামরিকতন্ত্র আর আর তাদের বিমাতাসুলভ বৈষম্যনীতির শাসন ব্যবস্থার ইতিহাসের দিকে তাকালে যে কেউ সম্যক উপলব্ধি করতে পারবেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় শাসকদের বৈষম্যনীতি দেখে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল যে অংশটি স্বপ্নভঙ্গের বেদনা অনুভব করেছিলেন, তারাই মূলত ভাষা আন্দোলনসহ কেন্দ্রীয় শাসকচক্রের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। এসব আন্দোলনে জড়িতদের পাকিস্তানের শাসকচক্র ইসলাম ও তাহজিব তমদ্দুনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী বলে অভিযোগ করেছে, পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি বিনাশকারী, ভারতের দালাল বলে গাল দিয়েছে। দেশের শত্রু বলে অভিযুক্ত করেছে। মামলা-হামলায় জর্জরিত করেছে।

এরকম চরম বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই আওয়ামী লীগের মতো বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একটি অসাম্প্রদায়িক উদার রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা খুব সহজ ছিল না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং তার প্রধান কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি ২৩ বছরের শাসনামলে যেসব অভিযোগ শুনতে হয়েছে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত সেই একই অভিযোগ করা হচ্ছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে! দলের কর্ণধার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।

পাকিস্তানি দর্শন ধর্মের রাজনীতি, সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় আসা, সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি এবং ভারত-বিদ্বেষের রাজনীতি আজও এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিইয়ে রাখা হয়েছে! এই চিত্র দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই! কী বিচিত্র এই দেশ আর দেশের রাজনীতি!

ত্রিশলাখ শহিদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধের রাজনীতি পাকিস্তানি পরাজিত অপশক্তির অনুসারীদের সাম্প্রদায়িক আস্ফালন দেখতে হচ্ছে! ধর্মানুরাগ আর ধর্মান্ধতা যে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর বিষয় তারা কিছুতেই মানতে নারাজ। সে কারণে ধর্মান্ধতা দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার রাজনীতি আজও এদেশে জারি রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে যে বৈরিতার শিকার হয়েছিলেন সেই একই পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও। ১৯ বার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। বার বার অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে গেছেন।

দেশি-বিদেশি চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। ২০০৪ সালে তো বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোটের শাসনামলে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে দলটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করা হয়। প্রবাদ আছে-- রাখে আল্লাহ মারে কে! শেখ হাসিনা টিকে আছেন। আওয়ামী লীগও টিকে আছে।

আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়। কারণ এই দলটি সৃষ্টি হয়েছে বাংলার মেহনতি মানুষকে নিয়ে। কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষের জন্য কাজ করতেই দলের সৃষ্টি হয়েছে।

সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছেন। তার কন্যা মানবতার জননী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন। আওয়ামী লীগের শত্রু পুরনো শত্রু, উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি, পরাশক্তি, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, সেই ১৯৪৯ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তৎপর। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যাবে কারা সেই অপশক্তি।

সেই অপশক্তি স্বাধীন দেশের স্থাপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করেছে। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। আওয়ামী লীগের ভিতরেও অনেক শত্রু ছিল। পাকিস্তানি আমলে ছিল, এখনও আছে। অতীতেও খন্দকার মোশতাক ছিল এখনও হাইব্রিড খন্দকার মোশতাকরা আছে। বাইরের শত্রু তো চেনা যায়, ভেতরের শত্রু চেনা কষ্ট। এরা দলের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকে।

ভেতরের এবং বাইরের এই আঘাতের মধ্যদিয়েই বার বার পরীক্ষা দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাদেরকে। ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে সুবিধাবাদীরা থাকবে, নতুন কিছু নয়। কিন্তু চোখ কান খোলা রেখে এগোতে হবে। ক্ষমতার চারপাশে নানান সমস্যা থাকে।

সাম্রাজ্যবাদী আর সাম্প্রদায়িক অপশক্তির চরম বিরোধিতার মুখেই শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করিয়ছেন, দণ্ড কার্যকর করেছেন। যুদ্ধাপরাধীরা সমস্ত আস্ফালন শেষে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে, একাত্তরে গণহত্যা- ধর্ষণসহ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়ে অপরাধীরা দণ্ডিত হয়েছে। সেই দণ্ড কার্যকরও হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদীদের সহায়তায় দেশে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ছিল তাও শেখ হাসিনার সরকার কঠোর হাতে দমন করেছেন। পৃথিবীর কাছে এসব সাহসী পদক্ষেপ বাংলাদেশকে অত্যন্ত মর্যাদাবান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

সরকারে এবং দলের অভ্যন্তরে নানা সমস্যার মধ্যেও গত একযুগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তার কোনো তুলনা নেই। দরিদ্র দেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, আজ সেই সোনার বাংলা বলতে গেলে হাতের নাগালে। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ পৃথিবীর কাছে আজ এক বিস্ময়।

উন্নয়নের রোল মডেল। নেতা হিসেবে বিশ্বসভায় শেখ হাসিনা এক অনন্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সংবর্ধিত, সম্মানিত, মহিমান্বিত। এই গৌরব হতদরিদ্র দেশের মানুষের মাথাপিছু আয়ই শুধু বাড়ায়নি, মানুষ হিসেবে পৃথিবীর কাছে মাথাটা উঁচুও করে দিয়েছে।

দারিদ্র্য কমাতে সারা দেশে শেখ হাসিনার সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীই কেবল প্রসারিত করেননি, নারীর ক্ষমতায়ন সম্প্রসারিত হয়েছে, শিক্ষার হার বেড়েছে, স্বকর্ম সৃষ্টির সুযোগসহ কর্মসংস্থানের নানাপথ উন্মুক্ত হয়েছে। যোগাযোগ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। সর্বোপরি স্বপ্নের পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু আর মেট্রোরেলের মুখে প্রবেশ দেশের জন্য অভূতপূর্ব অর্জন। তথ্যপ্রযুক্তি আর অবাধ তথ্যপ্রবাহ দেশকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ওয়ান প্রেরণসহ ব্যাপক সমৃদ্ধি এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশের এসব ইতিবাচক পরিবর্তন তথা অর্জন দেশের সরকারপ্রধান তথা জননেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য যেমন মহত্তম অর্জন, তেমনই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্যও ঐতিহাসিক অর্জন। বন্যা খরা করোনার মতো মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলা করেও বাংলাদেশে যেভাবে এগোচ্ছে তাকে এককথায় বলতে গেলে বলব অসামান্য এই সাফল্যের পথযাত্রা।

তেইশে জুনের ঐতিহাসিক এই দিনে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি যারা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পথযাত্রার অনুপ্রেরণা, অগ্রণী এবং সহযাত্রী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সেই শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, আবুল হাশিম, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হকসহ পাকিস্তানি পর্বের স্মরণীয় নেতাদের। আওয়ামী লীগের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক। ৭২পেরিয়ে সাফল্যে পেরিয়ে যাক যাক শতবর্ষের বিজয়তোরণও- এই শুভকামনা।

লেখক: কবি-নাট্যকার, সিনিয়র সাংবাদিক, সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
ছয় দফায় ভিত রচিত হয়েছিল
ছয় দফা নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু
ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষতা

আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষতা

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকে বাকশাল গঠন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এদেশের মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল বিশ্ববাসীর কাছে বিস্ময়। আরও বিস্ময় ছিল দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার ইতিহাসের ঔজ্জ্বল্য।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার শাসনকালে মুদ্রিত (২০১৬ সালে) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম ভাগে রাষ্ট্রধর্ম অংশে বলা হয়েছে- ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন।’

অপরদিকে দ্বিতীয় ভাগের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অংশে লেখা আছে- ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য- (ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন,- বিলোপ করা হইবে।’ রাষ্ট্রের এই চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই সচেতন ছিলেন।

ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য ৩৮ অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয় সেসময়। যা ২০২০ সালের ‘মুজিববর্ষে’ বর্তমান সরকারের সময়ও বহাল রয়েছে। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যেকোনো ব্যক্তি সংগঠন বা সংঘ করতে পারবেন কিন্তু তা যদি নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে কিংবা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে তাহলে উক্ত সংগঠন, সংঘ বা দল সংবিধানের পরিপন্থী বলে গণ্য হবে। এটি ধর্ম নিয়ে রাজনীতিচর্চাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বিধি।

প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের সংযোগ ছিন্ন করার একটা বিধান। এজন্য ১২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্ত জুড়ে দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। তিনি কখনও বাংলাদেশকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাননি। পাকিস্তান আমলে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মের নামে যে নির্যাতন পাকসেনারা করেছিল সেই অভিজ্ঞতা থেকে বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে সাংবিধানিক কাঠামোয় উপস্থাপন করেছিলেন।

তাছাড়া কলকাতার শিক্ষাজীবনে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রতিরোধে তার ভূমিকার কথা আমরা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে পড়েছি। আর আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই দলের নীতিনির্ধারকের দায়িত্ব পেয়ে ধর্মবর্ণনির্বিশেষ মানুষের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গণ্য করার জন্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা ‘মুসলিম’ শব্দটি বর্জন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

অপরদিকে ১৯৭২ সালের ৪ অক্টোবর খসড়া সংবিধানের ওপর আলোচনার জন্য আয়োজিত সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু নির্ভীক কণ্ঠে ঘোষণা করেন- ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম-কর্ম করার স্ব-স্ব অধিকার অব্যাহত থাকবে। ...ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠিত হয় এবং জেলে থাকা অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান এ দলের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। জুলাই মাসের শেষের দিকে তিনি মুক্তিলাভ করেন। এরপর ১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই দলের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালের ২১ অক্টোবর কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব পেশ করলে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ওই কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি পুনরায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৭ সালের ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় কাগমারিতে এবং একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল সাংস্কৃতিক সম্মেলন। ৩০ মে দলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, একই ব্যক্তি এক সঙ্গে সরকার ও সংগঠনের দুটো পদে থাকতে পারবেন না। শেখ মুজিব দলকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

অপরদিকে মওলানা ভাসানী পদত্যাগ করায় ১৯৬৪ সালে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিবুর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছয় দফা উপস্থাপনের বছর ১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এর পর তিনি ছয় দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সারা পূর্ব বাংলায় গণসংযোগ সফর শুরু করেন। ১৯৭০ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পুনরায় আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচিত হন।

৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের মহিলাসহ ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন হলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

২৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় দল ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ গঠন করেন। বঙ্গবন্ধু জাতীয় দলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকে বাকশাল গঠন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এদেশের মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন। এর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল বিশ্ববাসীর কাছে বিস্ময়। আরও বিস্ময় ছিল দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার ইতিহাসের ঔজ্জ্বল্য।

একইভাবে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যার্বতনের পর দীর্ঘ ৪০ বছর দলের দায়িত্বে থেকে শেখ হাসিনা এদেশকে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ও উন্নয়নের ধারায় উন্নত রাষ্ট্রের মহিমা অর্জনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের ইতিহাস যেমন বাংলাদেশের ইতিহাস তেমনি আওয়ামী লীগের ইতিহাস বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা যুগের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতির ইতিহাস।

মূলত জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। কেবল নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সময় নয়; শেখ হাসিনা যেকোনো দলীয় সভায় বলে থাকেন, এদেশ সবার।

দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কখনই ধর্মের বিভাজনে বিশ্বাস করে না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন নিজেরাই নিজেদের অবহেলিত মনে না করেন, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে বলেছেন তিনি। এদিক থেকে বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও আওয়ামী লীগের ভেতর ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চায় বিশ্বাসী। কারণ বিষয়টি সংবিধানেও পরিষ্কারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদশ।

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
ছয় দফায় ভিত রচিত হয়েছিল
ছয় দফা নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু
ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

শেয়ার করুন

একনজরে আওয়ামী লীগ

একনজরে আওয়ামী লীগ

’৫৫ সালে সদরঘাটের রূপমহলে তৃতীয় সম্মেলনে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ হয়। সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাবে ভাসানী এ নাম পাস করান। এ সম্মেলনেও ভাসানী-মুজিব কমিটি পুনর্বহাল থাকে। জানা যায়, মুজিব-ভাসানী আগে থেকেই মুসলিম শব্দ বাদ দেয়ার পক্ষে ছিলেন কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রথমদিকে সোহরাওয়ার্দী রাজি হচ্ছিলেন না। ’৫৫-এর আগে হিন্দু কেউ দলের সদস্যও হতে পারতেন না।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেন থেকে ১৯৭১ সালের মুজিবনগর সরকার গঠন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এবং আজ অবধি আওয়ামী লীগের পথচলার কথা সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্ট করছি।

পাকিস্তান হবার পর ১৯৪৮ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের নিয়ন্ত্রণ ছিল মওলানা আকরম খাঁ ও খাজা নাজিমুদ্দিনের হাতে। সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের অনুসারী উদারপন্থী নেতারা তখন নিজেদের অবহেলিত মনে করছিলেন।

সে সময় পুরান ঢাকার মোগলটুলীর ১৫০ নম্বর বাড়িতে কর্মী শিবির স্থাপন করে নতুন দল গঠনের আলোচনা শুরু করলেন তারা। শেখ মুজিবও তখন কলকাতা থেকে এসে এ শিবিরে যুক্ত হন।

তখন টাঙ্গাইলে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর পদত্যাগের ফলে সৃষ্ট শূন্য আসনের উপনির্বাচনে দুই দফা মুসলিম লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন ভাসানী ও শামসুল হক। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ফল অবৈধ ঘোষণা করায় তারাও এই মুসলিম লীগ কর্মীদের সঙ্গে মিলে নতুন দল গঠনের লক্ষ্যে একটি সভা আহ্বান করেন। সভা ডাকার প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হলেন মওলানা ভাসানী ও ইয়ার মোহাম্মদ খান।

অডিটরিয়াম না পাওয়ায় কাজী হুমায়ুন রশীদ কে এম দাস লেনে তার মালিকানাধীন রোজ গার্ডেনে সভা করার প্রস্তাব করেন।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বিকেলের দিকে রোজ গার্ডেনে ২৫০-৩০০ লোকের উপস্থিতি এবং আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে নতুন দল গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মওলানা ভাসানীর প্রস্তাবে দলের নামকরণ হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ আর পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে নাম হয় ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ যার সভাপতি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

ভাসানীর নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ছিল এমন-

সভাপতি : মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী

সহসভাপতি : আতাউর রহমান খান, আলী আমজাদ খান, আহম্মদ আলী খান, সাখাওয়াত হোসেন ও আব্দুস সালাম খান

সাধারণ সম্পাদক: শামসুল হক

ট্রেজারার: ইয়ার মোহাম্মদ খান।

জেলে থাকাবস্থায় শেখ মুজিব হন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। অলি আহাদের বই থেকে জানা যায়, সরকারের কড়া নজরদারির দরুন ২৩ জুনের দুয়েক দিন আগে বোরকা মতান্তরে কম্বল মুড়ি দিয়ে ভাসানীকে সম্মেলনস্থলে উপস্থিত করানো হয়। আরও জানা যায়, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেল (বর্তমান নাম অ্যাটর্নি জেনারেল) এ কে ফজলুল হকও কিছুক্ষণের জন্য সভাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। ২৪ জুন আরমানিটোলায় অনুষ্ঠিত নতুন দলের সভায় হামলা চালায় মুসলিম লীগ কর্মীরা।

’৫২ সালে শামসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেখ মুজিব হন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক।

’৫৩ সালে পুরান ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে ও ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সম্মেলনে ভাসানী-মুজিবকে নতুন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক করা হয়। সে সময় হিন্দু মুসলিম আলাদা আসনে নির্বাচনে অংশ নিত।

এ কারণেই ’৫৪ সালের নির্বাচনের সময়ে একটি সমঝোতা হয় যে অসাম্প্রদায়িকভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেবে।

’৫৪-এর নির্বাচনে ২৩৭ আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট পায় ২২৩ আসন আর এর মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় ১৪৩টি আসন। ফ্রন্টের নেতা ছিলেন তখন ভাসানী, ফজলুল হক আর সোহরাওয়ার্দী।

’৫৫ সালে সদরঘাটের রূপমহলে তৃতীয় সম্মেলনে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ হয়। সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাবে ভাসানী এ নাম পাস করান। এ সম্মেলনেও ভাসানী-মুজিব কমিটি পুনর্বহাল থাকে। জানা যায়, মুজিব-ভাসানী আগে থেকেই মুসলিম শব্দ বাদ দেয়ার পক্ষে ছিলেন কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রথমদিকে সোহরাওয়ার্দী রাজি হচ্ছিলেন না।

’৫৫-এর আগে হিন্দু কেউ দলের সদস্যও হতে পারতেন না। রূপমহল সিনেমা হলের সম্মেলনের মাধ্যমেই সব ধর্মের মানুষের জন্যে আওয়ামী লীগের দরজা উন্মুক্ত হয়।

’৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে আমেরিকার সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী মতভেদ দেখা দেয়। ভাসানী ও বাম ঘরানার অন্যরা সম্মেলন বয়কটের ঘোষণা দেন।

এমতাবস্থায় পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গণতান্ত্রিক ভোটাভুটিতে ভাসানী হেরে যাওয়ায় সেই রূপমহলেই নতুন দল ‘ন্যাপ’ গঠন করেন তিনি। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ থেকে ইয়ার মোহাম্মদ খান ন্যাপে যোগ দেন। আর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিব।

’৫৮ সালে সরকার সামরিক শাসন জারি করে সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ’৬৪ সাল পর্যন্ত টানা ছয় বছর ঘরোয়াভাবে রাজনীতি চালিয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ।

’৬৪ সালে সোহরাওয়ার্দী মারা যাবার পর, রাজনীতি উন্মুক্ত হলে ৬ বছর প্রায় একা হাতে দলের হাল ধরে রেখেছিলেন শেখ মুজিব। তাই নেতা-কর্মীরা তর্কবাগীশের পরিবর্তে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব দিলেন কিন্তু তিনি প্রথমে রাজি হননি, পরে মন্ত্রিসভার সদস্য জাস্টিস মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে প্রস্তাব করা হয়, তিনিও রাজি না হলে তর্কবাগীশ-মুজিব কমিটিই পুনর্বহাল রাখা হয়।

’৬৬ সালের সম্মেলনে তর্কবাগীশ ছয় দফার বিরোধিতা করে সরে দাঁড়ানোয় মুজিব-তাজউদ্দীন নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

’৬৮ ও ’৭০ সালের সম্মেলনেও মুজিব-তাজউদ্দীন কমিটি পুনর্বহাল রাখা হয়। আর এ কমিটির নেতৃত্বেই ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকার গঠনের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নাম ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ লেখা শুরু হয়।

’৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নতুন সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু-জিল্লুর রহমান কমিটি গঠিত হয়।

’৭৪ সালে বাকশাল গঠন করায় বঙ্গবন্ধু সরে দাঁড়ানোয় নতুন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হন এএইচএম কামারুজ্জামান-জিল্লুর রহমান।

’৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর ঘরোয়া রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী ও মোল্লা জালাল উদ্দিনকে নিয়ে নেতৃত্বের কোন্দল শুরু হওয়ায় দলীয় ঐক্য ধরে রাখতে ’৭৬ সালে জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে দলের নেতৃত্বভার দেয়া হয়।

’৭৮-এর সম্মেলনে আবদুল মালেক উকিল-আবদুর রাজ্জাক হন দলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক।

’৮১ সালে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে ও আবদুর রাজ্জাককে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।

’৮৩ সালে বাকশাল গঠন করে রাজ্জাক সরে যাওয়ায় সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

’৮৭-এর সম্মেলনে দলের নেতা হন শেখ হাসিনা-সাজেদা চৌধুরী।

’৯২ ও ৯৭-এর সম্মেলনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হন জিল্লুর রহমান।

২০০০ সালের বিশেষ কাউন্সিলে আগের কমিটি পুনর্বহাল রাখা হয়।

২০০২-এর সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক হন আব্দুল জলিল।

২০০৯ ও ২০১২-এর সম্মেলনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফ।

২০১৬ ও ২০১৯-এর সম্মেলনে শেখ হাসিনার অনিচ্ছাসত্ত্বেও তৃণমূল কাউন্সিলরসহ কেউই রাজি না হওয়ায় শেখ হাসিনা পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হন, সাধারণ সম্পাদক হন ওবায়দুল কাদের।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:

ক. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংহত করা এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা সমুন্নত রাখা।

খ. প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। জনগণের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করা।

গ. রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা।

ঘ. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।

মূলনীতি: বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজতন্ত্র তথা শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি।

রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আওয়ামী লীগের অর্জন পাকিস্তান আমলের গণতান্ত্রিক মানুষের অর্জন। এই দলের অর্জন বাংলাদেশের অর্জন। জাতির জন্য যখন যা প্রয়োজন মনে করেছে, সেটি বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ, নিজস্ব স্যাটেলাইট, জঙ্গি দমন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও অভূতপূর্ব উন্নয়নসহ দেশের প্রতিটি মহৎ, শুভ ও কল্যাণকর অর্জনে জড়িয়ে আছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

লেখক: সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
ছয় দফায় ভিত রচিত হয়েছিল
ছয় দফা নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু
ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগের কাছে প্রত্যাশা

আওয়ামী লীগের কাছে প্রত্যাশা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুক্তি লাভের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় সশস্ত্র সংগ্রাম৷ সেই সংগ্রামের পথপরিক্রমাকে বেগবান করতে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দেন৷ বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার সরাসরি নির্দেশ দেন তিনি৷

সংগ্রামকে ধারণ করে মুক্তির প্রয়াসে ঐতিহাসিক এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছায় শত বছরের নিষ্পেষিত বাঙালি জাতি৷ দিনটি ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার টিকাটুলির কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেন, ক্ষমতাসীন অগণতান্ত্রিক মুসলিম লীগকে প্রত্যাখ্যান করে জন্ম নেয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। কেক কেটে নয় বরং গণমানুষকে শোষণ থেকে মুক্তির অঙ্গীকার নিয়েই যাত্রা শুরু বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও ঐতিহাসিক এই বৃহৎ গণসংগঠন।

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পথচলা, বাংলাদেশকে স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ করা, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকেন্দ্রিক চেতনার দূরদর্শী বাস্তবায়নে যে দলটি সর্বদা অগ্রগামী ছিল তা হলো এখনকার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৭৫-এর কালো অধ্যায়ের পর এই সংগঠনকে টুকরো টুকরো করে ফেলার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েও সফল হতে পারেনি স্বার্থানেষী শাসকবর্গ৷

মানুষের ভালোবাসা ও ভালো লাগায় টিকে ছিল এই সংগঠন। এই সংগঠন দমে যায়নি, ফিরেছে পাহাড়ের মতো শক্ত হয়ে, গণমানুষের স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের স্বপ্ন নিয়ে। ধারাবাহিকতাময় সেই পথচলা আজও বহমান৷ যদিও সামনে দীর্ঘপথ!

জন্মলগ্ন থেকেই ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের অবৈধ, বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় আওয়ামী মুসলিম লীগ৷ এরপর ভাষা আন্দোলন, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে ধরাশায়ী করে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক প্রকার নতুন মোড়ের জন্ম দেয় সংগঠনটি।

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ৩০৯ আসনের বিপরীতে ২২৩টিতে জিতে সাংগঠনিক দৃঢ়তা এবং জনগণের ভালোবাসার প্রমাণ পায় দলটি। স্বভাবতই সব ধর্ম-বর্ণ বা গোত্রের মানুষের কাছে এক আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ।

ফলে, ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নামকরণ করা হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। পরবর্তী সময়ে এই অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে জোগায় নিরন্তর প্রেরণা।

ধারাবাহিক এই প্রবহমান সংগ্রামের ফলে যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়৷ স্বভাবতই গণমানুষের প্রত্যাশা ও ভালোবাসায় বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠতে থাকেন বাঙালির একজন অবিসংবাদিত নেতা৷ পরের অধ্যায়টা শুধুই তাই বঙ্গবন্ধুময় এবং আওয়ামী লীগময়৷ যার পিছনে শক্তি হিসেবে ছিল আপামর জনতার ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ, জীবন বিলিয়ে দেয়ার মতো প্রতিশ্রুতি।

বঙ্গবন্ধু দূরদর্শীতায়, নিপুণতায় ছিলেন বরাবর যোগ্য, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো রাজনৈতিক দক্ষতা ছিল তার অস্তিত্বের বড় উদাহরণ। বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নানা ঘটনা প্রবাহের পর ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ৬ দফা৷ যাকে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে অভিহিত করা হয়৷ বাঙালির বঞ্চিত ও অপ্রাপ্ত অধিকারগুলো আদায়ের লক্ষ্যে একটি সামগ্রিক পদক্ষেপ ছিল ৬ দফা।

সব অবস্থা এবং কোন কোন খাতে কী পদক্ষেপ দরকার তা উল্লেখ ছিল সুস্পষ্টভাবে।

সরকার ব্যবস্থা, মুদ্রাব্যবস্থা, কেন্দ্র সরকার ও অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্ক এমনকি অঙ্গরাজ্যেগুলোর সুদৃঢ় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্যারা মিলিশিয়া বা আধা-সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার দাবিও ছিল ছয় দফার অন্তর্ভুক্ত।

যা বাঙালিকে অধিকার আদায়ের প্রেরণা জুগিয়েছে পাশাপাশি স্বপ্ন দেখিয়েছে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেবার পথে অগ্রসর হতে। ছয় দফার ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের জন্ম হয়েছে। ছয় দফা মানতে নারাজ হওয়াতেই পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় মুখ থুবড়ে পড়তে এমনটা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।।

কেননা, ছয় দফা স্বাধীনতা সংগ্রাম বা বাঙালির মুক্তির লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুঃসাহসিক এই সিদ্ধান্ত বাঙালির জাত চেনানোর পথের বিরাট মাইলফলক। হয়তোবা ছয় দফার মতো সময়োপযোগী রচনা জাতির পিতার ভাবনায় না এলে সৃষ্টি হতো না বাংলাদেশ৷ তাই ছয় দফা বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তির ইতিহাসে এক অসামান্য তথা অনন্য দলিল। অতঃপর, আগরতলা মামলা, ১৯৭০-এর নির্বাচনে ক্ষমতা হস্তান্তর না করেও গদি রক্ষা করতে পারেনি পাকিস্তানি সরকার।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুক্তি লাভের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় সশস্ত্র সংগ্রাম৷ সেই সংগ্রামের পথপরিক্রমাকে বেগবান করতে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ দেন৷ বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার সরাসরি নির্দেশ দেন তিনি৷ ৭ মার্চে সরাসরি স্বাধীনতা না ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু দেখান তার দৃঢ়তা বা দক্ষতা কতটা সুপার ক্লাসিক্যাল

কেননা, বঙ্গবন্ধু জানতেন এতে করে পাকিস্তানি সরকার বিশ্বের বুকে তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে অভিহিত করবেন। কোনোভাবেই বঙ্গবন্ধু এটি চাননি কেননা, তিনি ভালো করেই জানতেন এ রকম হুট করে নেয়া সিদ্ধান্তে থমকে যেতে পারে বাঙালির মুক্তির যাত্রা।

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন মোড় নেয় নতুন দিকে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার কারণে গ্রেপ্তার হন৷ তার দেখানো পথে ঝাঁপ দিতে বাঙালি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি বরং লড়েছে আপন মহিমায়৷ আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে আস্থা রেখে শুরু করে দেয় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সংগ্রাম৷

মুজিবনগর সরকার এই দুইয়ের সমন্বয় সাধনের জন্য ছিল এক বিরাট স্তম্ভ।

ভারতীয় সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের তৎকালীন বাস্তবতা তুলে ধরতে তারা অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। যুবকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় মুজিবনগর সরকারের ব্যবস্থাপনায়। পরবর্তী সময়ে তারা বাংলাদেশের মাটিতে এসে যুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়েন। দল হিসেবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরাসরি সামনে থেকে নেতৃত্ব নেয়।

অনেক রক্তের বিনিময়ে অবশেষে বাংলাদেশ। তারপর অনেক উত্থান-পতন।

পৌরাণিক ফিনিক্সের মতো অপরাজিত জননেত্রী শেখ হাসিনা বদলাতে থাকেন বাংলার সার্বিক দৃশ্যপট৷ সর্বপ্রথম দেশকে কলঙ্কমুক্ত করার প্রয়াস থেকে যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করান, পিতা মুজিবের খুনিদের বিচার হয় বাংলার মাটিতে।

শিক্ষা খাতকে আগামীদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার প্রধান হাতিয়ার ধরে প্রাথমিক শিক্ষাকে করা হয় শতভাগ অবৈতনিক এবং উপবৃত্তির হার করা হয় শতভাগ।

ইউনেস্কোর মতে, বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যতজন শিক্ষার্থী রয়েছে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের জনসংখ্যা তার চেয়ে কম। যুগোপযোগী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইটি সেক্টরকে আনা হয়েছে বিশেষ প্রণোদনার আওতায়৷ আজ সবার ঘরে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং উচ্চগতির পরিষেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।

পাশাপাশি জনগণের মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল ক্ষেত্রই পাচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। শক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত জননেত্রী যে পিতা মুজিবের আদর্শিক ধারাবাহিকতা রক্তে ধারণ করেন তা প্রতিনিয়তই স্পষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশের অগ্রগতির সূচক বা বাস্তব চিত্রগুলোর মাধ্যমে।

এমনকি করোনাকালীন দুঃসময়ে ও বাংলাদেশের কোনো মানুষ খাদ্যর অভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়নি। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো সর্বদা থেকেছে মানুষের পাশে, মানবিকতা বোধে উদ্ভাসিত হয়ে। দুরাবস্থা সৃষ্টি না হওয়ার বড় কারণ খাদ্য ভাণ্ডার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চোখ ধাঁধানো। পাশাপাশি মানুষের দুর্দশা লাঘবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে নানা প্রনোদনা প্যাকেজের। ফলে মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশ সাম্প্রতিককালে ভারতে কেউ পিছনে ফেলেছে৷ মৌলিক চাহিদা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মতো পূরণ করার পাশাপাশি অবকাঠামো খাতে শেখ হাসিনা দিয়েছেন বিশেষ নজর৷

প্রবহমান পদ্মার বুকে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত সেতু প্রমাণ করে বাংলাদেশ আজ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নয় বরং আগামী দিনের এক শক্তি।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে মানা হয় দক্ষিণ এশিয়ার ইমারজিং টাইগার হিসেবে৷ যার পিছনে নিঃসন্দেহে রয়েছে শেখ হাসিনার সদূরপ্রসারী নেতৃত্ব এবং জনগণের আকুণ্ঠ সমর্থন।

দেশ, জাতির উন্নয়ন, অগ্রযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে জননেত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এটা দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করে। তবে, খুব ভালোর মাঝে একটু হলেও যেন থাকে নেতিবাচকতার ছোঁয়া। অর্থলোভী, সুযোগ সন্ধানীরা থাকে অপেক্ষায় নিজ আখের গোছানোর প্রয়োজনে।

ক্ষমতাকালীন সবচেয়ে দুরাবস্থা আওয়ামী লীগের জন্য অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। তৃণমূল থেকে শুরু করে প্রায় সবখানেই এ নেতিবাচকতা বিরাজমান। সহযোগী সংগঠনগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে এ দুরাবস্থার ছাপ। কারণ হিসেবে বলা যায়, হাজারো সুসময়ের কোকিল নিজের স্বার্থে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ বির্নিমাণের সাংগঠনিক কারিগর আওয়ামী লীগের পতাকাতলে।

এসব অনুপ্রবেশকারীরা সুকৌশলে তৈরি করছে ‘মাই ম্যান সংস্কৃতি’। সাংগঠনিক কমিটিগুলোতে অপেশাদার, সাংগঠনিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বহির্ভূত কাজে জড়িত লোকজনকে স্থান দেয়া হচ্ছে। যারা প্রতিনিয়ত অনৈতিক কাজ করে চলছে এবং প্রশ্নবিদ্ধ করছে জননেত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে।

এছাড়া, কমিটিগুলোর গতিশীলতা অনেক ক্ষেত্রে থাকছে না। নিয়মিত কমিটি তৈরি করার কথা থাকলেও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোকে দেয়া হচ্ছে পুনরায় অনুমোদন। আমাদের সৌভাগ্য যে জননেত্রী শেখ হাসিনা এসব কাজকর্ম দিনে দিনে কঠোর হাতে দমন করছেন৷ নিজদলের কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না অনৈতিকতার প্রশ্নে। যার ফলে ভিন্নধর্মী এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে এদেশের মাটিতে। যা আগে কখনও হয়নি।

বাংলাদেশ বিনির্মাণের সাংগঠনিক কারিগর, মুখ থুবড়ে পড়া দেশকে নতুন করে পথ দেখানো এক সময়োপযোগী দিকনির্দেশক বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। যখনই স্বৈরাচারের দুঃশাসনে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে এদেশ তখনই আলো দেখিয়েছে আওয়ামী লীগ।

ধারাবাহিক সংগ্রামের এ আদর্শিক যাত্রা অব্যাহত রাখুক লাখো মানুষের ভালোবাসার স্পন্দন জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগ মানেই পথ দেখানোর শক্তি। এগিয়ে যাক প্রিয় মাতৃভূমি। জন্মলগ্নে অনেক শুভেচ্ছা ও হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা।

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ষাটের অগ্নিঝরা দিনে
ছয় দফা থেকে স্বাধীনতা
ছয় দফায় ভিত রচিত হয়েছিল
ছয় দফা নিয়ে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু
ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

শেয়ার করুন