ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

ছয় দফার সমর্থনে ৭ জুনের জনবিস্ফোরণ  

৭ জুনের হরতালকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফার প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি পায়, শেখ মুজিবসহ কারাবন্দি নেতৃবৃন্দদের প্রতি জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন দ্রুত বেড়ে যায়। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর নির্যাতনের মুখে আরও বেশি ঘুরে দাঁড়াতে থাকে, নতুন কর্মসূচিতে আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার অবস্থান তৈরি করে।

আজ ৭ জুন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র ছয় দফার সমর্থনে পালিত হয় প্রথম হরতাল। এই হরতালে ১১ শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। আরও অসংখ্য মানুষ আহত হন। হরতালের প্রতি শ্রমিক ও জনসাধারণের সমর্থন সেদিন ঘটতে দেখা যায়। মূলত শ্রমিকরাই ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে হরতালের সমর্থনে মিছিলসহ অংশগ্রহণ করে। পুলিশের গুলিতে সেকারণেই নিহতদের মধ্যে শ্রমিকের সংখ্যার প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। ৭ জুনের এই হত্যাকাণ্ড দেশব্যাপী যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তা ছয় দফা, শেখ মুজিবুর রহমানসহ জেলে আটক রাজবন্দিদের মুক্তির দাবি, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি পূর্ব বাংলার মানুষের সমর্থন বৃদ্ধি, ন্যাপসমর্থিত কিছু অঙ্গসংগঠন পাকিস্তানিদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার গুরত্বারোপ করে বিবৃতি প্রদান করেন। মূলত, ৭ জুন পরবর্তী সময়ে ছয় দফার প্রতি জনসমর্থন বেড়ে যায়, পাকিস্তান সরকারের দমন-নিপীড়ন ও নির্যাতন প্রদেশব্যাপী বেড়ে যায়। কিন্তু সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ ৭ জুন সূচিত শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও জনসাধারণের ঐক্যকে বিজয়লাভ পর্যন্ত এগিয়ে নেয়ার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে।

১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক দলসমূহের সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের জন্য স্বায়ত্ত্বশাসন সম্বলিত ছয় দফা দাবি আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। কিন্তু তা গৃহীত না হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দল শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সম্মেলন থেকে বের হয়ে আসেন। তবে তিনি লাহোরে ১০ তারিখ অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে তার ছয় দফা দাবিনামা পেশ করার কথা জানান।

১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা তেজগাঁও বিমানবন্দরে তিনি উক্ত ছয় দফা সাংবাদিকদের সম্মুখে দফাওয়ারি ব্যাখ্যা প্রদান করেন। এতে তিনি প্রদেশসমূহের স্বায়ত্তশাসন, ফেডারেল পদ্ধতিতে রাষ্ট্রব্যবস্থা, কেন্দ্রের হাতে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা রেখে প্রদেশসমূহের সরকারের হাতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা, দুই অঞ্চলের মধ্যে পৃথক মুদ্রাব্যবস্থা চালুসহ বেশ কিছু নতুন চিন্তার প্রকাশ ঘটান।

পরদিন পত্রপত্রিকায় ছয় দফা প্রকাশিত হলে পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ তথা শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। ছয় দফা নিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি তারিখে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ছয় দফার ওপর জেলা প্রতিনিধিগণ আলোচনা করেন। ছয় দফাকে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে সমর্থন দেয়া হয়। তবে মার্চের ১৮, ১৯, ২০ তারিখে প্রাদেশিক সম্মেলনে ছয় দফার একটি পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সম্মেলনের প্রথম দিন ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ শিরোনামে ছয় দফার একটি বিস্তারিত বিবরণ শেখ মুজিবুর রহমান পাঠ করেন। ছয় দফা সম্মেলনে দলীয় আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয়। সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নতুন নেতৃত্ব ছয় দফার পক্ষে জনসমর্থন তৈরির লক্ষ্যে প্রদেশব্যাপী সভা-সমাবেশ শুরু করে।

পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রায় প্রতিটি জনসভায় বক্তব্যদানে বাধা প্রদান, গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করে। তিনি জামিন নিয়ে বের হয়ে নতুন জনসভায় যোগদান করেন। তার প্রতি জনসমর্থনও দ্রুত বেড়ে যায়।

সর্বশেষ ৮ মে নারায়ণগঞ্জে বিশাল জনসভা শেষে ঢাকায় ফেরার পর রাতে তাকেসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়। এই গ্রেপ্তার প্রদেশব্যাপী চলতে থাকে। ২০ মে আওয়ামী লীগের এক জরুরি ওয়ার্কিং কমিটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে জরুরি আইন প্রত্যাহার, শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীর মুক্তি, সংবাদপত্রের ওপর জারি করা বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং অন্যান্য দাবির পরিপ্রেক্ষিতে… ৭ জুন প্রদেশব্যাপী ‘হরতাল’ পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ২৭ মে রাওয়ালপিন্ডিতে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি কমিটি ৭ জুন আহূত হরতালকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করে। ৩১ মে আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক কমিটি কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি কমিটির হরতাল সমর্থনের বিষয়টি পত্রিকায় বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করে।

৭ জুনের হরতালকে সফল করার জন্য ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ শ্রমিক অধ্যুষিত অঞ্চলে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে। ঢাকার তেজগাঁও, নারায়ণগঞ্জের আদমজী, টঙ্গী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ হরতাল সফল করার লক্ষ্যে শ্রমিকদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ৭ জুনের হরতালের আয়োজন দেখে সরকার ভীত হয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করতে থাকে। এর ফলে হরতালের প্রতি জনসমর্থন আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৭ জুন যত ঘনিয়ে আসছিল শাসকমহলের মধ্যে হরতাল দমনের মনোভাব তত বেশি বৃদ্ধি পায়।

অপরদিকে শ্রমিক-ছাত্র, কৃষক ও সাধারণ মানুষ হরতাল সফল করার লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। উভয়পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বাড়ছিল। ৭ জুন হরতাল সর্বত্র সাধারণ মানুষের সমর্থনে পালিত হতে থাকে। ৭ জুন ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আহূত হরতাল সংঘর্ষে রূপ ধারণ করে। যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল, দোকানপাটও খোলেনি। সংঘর্ষ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ লাভ করে। বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন স্থাপনা, যানবাহন ইত্যাদি ঘেরাও করে। পুলিশ গুলি চালিয়ে সেটি দমনের চেষ্টা করে। এতে শ্রমিকসহ ১১ সাধারণ মানুষ পুলিশের গুলিতে শহিদ হন এবং অনেকেই আহত হন। পত্রপত্রিকায় সরকারের প্রেস রিলিজ ব্যতীত হরতালের বিবরণ ও চিত্র প্রকাশিত হতে দেয়া হয়নি। তারপরও সরকারি প্রেস রিলিজের বিবরণ থেকে পাঠক এবং বোদ্ধারা সেই দিনের চিত্র বুঝে নিতে সক্ষম হন। ৭ তারিখেই পুলিশের গুলিতে নিহতদের খবর মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তৈরি হয় তীব্র উত্তেজনা। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এই প্রথম পালিত হরতালে এত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়ায় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। যদিও আওয়ামী লীগের ডাকে এই হরতাল পালিত হয়। হরতালে পুলিশের গুলি চালানো এবং ১১ জনের মৃত্যুর খবরে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতৃবৃন্দ ৮ তারিখ এক যুক্ত বিবৃতিতে সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তারা পাকিস্তানিদের দমন-নিপীড়নের প্রতিবাদ করেন এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন। বিবৃতিদানকারীরা হলেন হাজী মোহম্মদ দানেশ, মহীউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, দেওয়ান মাহবুব আলী, পীর হাবিবুর রহমান, মোজাফফর আহমদ, হাতেম আলী খান, ওসমান গনি, গোলাম মর্তুজা, নুরুল ইসলাম ও ড. এমএ ওয়াদুদ। তবে ডান ঘরানার পাকিস্তানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়নি। ৭ জুনের হরতাল সম্পর্কে কারাগারে বসে আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান লেখেন-

“ছয় দফা যে পূর্ব বাংলার জনগণের প্রাণের দাবি- পশ্চিমা উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষকশ্রেণি যে আর তার পূর্ব বাংলার নির্যাতিত গরীব জনসাধারণকে বেশিদিন শোষণ করতে পারবে না, সেকথা এবার জেলে এসেই বুঝতে পেরেছি। বিশেষ করে ৭ই জুনের যে প্রতিবাদে বাংলার গ্রামেগঞ্জে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফেটে পড়েছে, কোনো শাসকের চক্ষু রাঙানি তাদের দমাতে পারবে না। পাকিস্তানের মঙ্গলের জন্য শাসকশ্রেণির ছয় দফা মেনে নিয়ে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করা উচিত।” (কারাগারের রোজনামচা, পৃ.৭৩) ৭ জুনে হরতালের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় বেড়ে যায়। অনেককেই কারাগারে আটক রাখা হয়। এ অবস্থাতেও ১০ জুন আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা গোপন স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৬ আগস্টের মধ্যে জরুরি আইন প্রত্যাহার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দান ইত্যাদির দাবিতে প্রতিরোধ দিবস পালনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। ওয়ার্কিং কমিটির এই সিদ্ধান্ত অবহিত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান লেখেন-

“দেখেই খুশি হলাম যে আমি ও আমার সহকর্মীরা অনেকেই জেলে আটক থাকা অবস্থায়ও আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীরা শান্তিপূর্ণ গণ আন্দোলন চালাইয়া যাওয়ার সংকল্প করিয়াছে। রক্ত এরা বৃথা যাইতে দিবে না।” (ওই, পৃ. ৮৫)

বস্তুত, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও পূর্ব পাকিস্তান সরকার ধরে নিয়েছিল যে, শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে কারাগারে আটক রাখাসহ ব্যাপক নির্যাতনের মুখে ফেলা হলে শেখ মুজিবের ছয় দফা আন্দোলন কিছুদিনের মধ্যেই স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটতে থাকে ভিন্ন পরিস্থিতি। ৭ জুনের হরতালকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে ছয় দফার প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি পায়, শেখ মুজিবসহ কারাবন্দি নেতৃবৃন্দদের প্রতি জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন দ্রুত বেড়ে যায়। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর নির্যাতনের মুখে আরও বেশি ঘুরে দাঁড়াতে থাকে, নতুন কর্মসূচিতে আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার অবস্থান তৈরি করে। আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি যথার্থই ৭ জুনের পরের পরিস্থিতিকে আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব হিসেবে অভিহিত করে। শেখ মুজিবের লেখা ১২ তারিখের পর্যালোচনায় আন্দোলনের পক্ষে দল এবং জনসমর্থনের ঊর্ধ্বমুখিনতার ধারণাই স্পষ্ট হয়। এরপর পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগের আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য পাকিস্তান কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকে সম্মুখে নিয়ে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) নামক একটি জোট গঠন করে। আওয়ামী লীগের মধ্যে ভাঙন ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। অনেকে বিভ্রান্তও হয়েছিলেন, জেল জুলুমের অত্যাচার সহ্য করতে পারছিলেন না। তারা একটি আপসরফার মাধ্যমে স্বায়ত্ত্বশাসনের ভিন্ন ফরমুলা নিয়ে পিডিএমের নেতৃত্বে অগ্রসর হওয়ার দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদসহ নেতা কর্মীদের বড় অংশই ছয় দফার আন্দোলনে আপসহীন থেকে পিছিয়ে যাওয়ার প্রতি কোনোভাবেই সমর্থন দেননি। ছয় দফার আন্দোলন কঠিন চ্যালেঞ্জকে অতিক্রম করে ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, আইয়ুবের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে মানুষ ছয় দফার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়। আইয়ুব খান বাধ্য হয় সকল রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে। মুক্ত শেখ মুজিব ভূষিত হন বঙ্গবন্ধু উপাধিতে।

প্রতিবছর ৭ জুন ছয় দফা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পর্ব হিসেবে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী পালন করে থাকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ৭ জুন রক্তাক্ত দিবস ছিল, একই সঙ্গে এই রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ছয় দফাকে সফল করতে শুধু আওয়ামী লীগই নয় শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষ যে জাগরণ ঘটায় তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় জাতিকে পথ দেখায়।

লেখক: অধ্যাপক, গবেষক

আরও পড়ুন:
খন্দকার মোশতাক মুক্তিযোদ্ধা নয় পাকিস্তানের দালাল
সঞ্চয়পত্রে টিআইএন প্রত্যাহার প্রয়োজন
বাজেটে যা বলা হয়নি
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সদিচ্ছা
পঞ্চাশের বাজেটে কত মার্ক পেলেন অর্থমন্ত্রী?

শেয়ার করুন

মন্তব্য

রক্তচক্ষু উপেক্ষার আওয়ামী লীগ

রক্তচক্ষু উপেক্ষার আওয়ামী লীগ

বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসনে নিপীড়ন-অত্যাচারের শিকার হয়, সবরকম রক্তচক্ষুকে পিছে ফেলে পুনরায় ২০০৯ সালে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। পর পর তিনটি নির্বাচনে জয়লাভ করে বর্তমানে টানা ১২ বছর সফলতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করছে দলটি।

বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে যে দলটি সামনে থেকে একক নেতৃত্ব দিয়েছে সেটির নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সংগ্রামের পিদিম প্রজ্বালন করে পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে আমাদের স্বাধীনতা এনে দেয়া সংগঠনটির নাম আওয়ামী লীগ। এজন্যই আমরা বুকভরা গর্ব নিয়ে বলি বাংলাদেশের ইতিহাস মানেই আওয়ামী লীগের ইতিহাস।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে জন্ম নেয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৫ সালে দলের নাম পালটে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ করা হয়।

১৯৫২ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত টানা ১৪ বছর বঙ্গবন্ধু সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর অলঙ্কৃত করেন সভাপতির আসন। ছয় দফা থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে এদেশের গণমানুষের দল হিসেবে তারা কতটা যোগ্য।

’৭৫ পরবর্তী ঘটনাবহুল ইতিহাসের পর দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে ছিল দলটি। এরপর ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন। তার যোগ্য নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর পুনরায় সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসনে নিপীড়ন-অত্যাচারের শিকার হয়, সবরকম রক্তচক্ষুকে পিছে ফেলে পুনরায় ২০০৯ সালে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। পর পর তিনটি নির্বাচনে জয়লাভ করে বর্তমানে টানা ১২ বছর সফলতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করছে দলটি।

প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে, যা দেখে অবাক পুরো বিশ্ব। একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। বহির্বিশ্বে আজ সম্মানের পাত্র বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরবর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় এই ১২ বছরে বাংলাদেশ এগিয়েছে কমপক্ষে ৫০ বছর।

নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো উঠে আসা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল সরকার বললে অত্যুক্তি হবে না! সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পকে প্রতিহত করে সরকার পরিচালনায় জননেত্রী শেখ হাসিনার সহযোগী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে সংগ্রামে লিপ্ত আওয়ামী লীগ, সেই সংগ্রাম অবিরাম থাকুক। জনগণের আস্থার চিরন্তন প্রতীকে রূপান্তরিত দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকে জানাই অভিবাদন।

লেখক: শিক্ষার্থী, ফ্রেঞ্চ ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড কালচার বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
খন্দকার মোশতাক মুক্তিযোদ্ধা নয় পাকিস্তানের দালাল
সঞ্চয়পত্রে টিআইএন প্রত্যাহার প্রয়োজন
বাজেটে যা বলা হয়নি
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সদিচ্ছা
পঞ্চাশের বাজেটে কত মার্ক পেলেন অর্থমন্ত্রী?

শেয়ার করুন

৭২ বছরের অনিন্দ্য পথচলা

৭২ বছরের অনিন্দ্য পথচলা

জাতির মঙ্গলের জন্য যখন যা প্রয়োজন সেটিই বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার জনকল্যাণধর্মী ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে নেয়া দূরদর্শী উন্নয়ন কৌশলের নৈতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৭২ সালে গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের মাধ্যমে।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। এর ঠিক ১৯২ বছর পর বাংলার মানুষের মুক্তি আর অধিকার আদায়ের জন্য ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে আত্মপ্রকাশ ঘটে বাংলার গৌরবগাঁথা ঐতিহ্যবাহী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে’র ।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতারা দলের আত্মপ্রকাশের দিন হিসেবে ইতিহাস থেকে ২৩ জুন তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন বাঙালির পরাজয়ের সে গ্লানিকে চিরতরে ম্লান করে দেবার জন্যে। আওয়ামী লীগ নামটির সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে এক মহাপুরুষের নাম। সেই মহানায়ক হাজার বছরের অগ্নিপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ইতিহাসের স্বর্ণালি সন্ধিক্ষণে বাঙালি জাতির জন্য মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে আজও শোষিত বঞ্চিত নিপীড়িত নিষ্পেষিত শৃঙ্খলিত মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যার শিরদাঁড়া স্থাপন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পার করল। ১৯৫৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটি ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ’ থেকে হয়ে ওঠে দলমত-নির্বিশেষে সবার ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’।

১৯৫২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দিগ্বিজয়ী সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ঠিক তার পরের বছরই বঙ্গবন্ধুর উপরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় ।

১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর সদর্পে কর্মবীরের ভূমিকায় বঙ্গবন্ধু সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে দলের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আওয়ামী লীগের জন্মলাভের পর ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা ও ৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান, ৭০’র যুগান্তকারী নির্বাচন সবই হয়েছে আওয়ামী লীগের হাত ধরে। এদেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রত্যুজ্বল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অবিস্মরণীয় নাম।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের দুরভিসন্ধিমূলক ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করতে পেরে দীর্ঘ ধারাবাহিক ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পর অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ৭ মার্চ উত্তাল গণসমাবেশে ১৮ মিনিটের এক ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বাঙালিদের মাঝে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সঞ্জীবনী শক্তির সঞ্চার করেন। বজ্রনিনাদিত কণ্ঠে ও দ্রোহের স্ফুরণের সম্মেলনের সেই ভাষণ পাকিস্তানিদের অন্তরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।

পরবর্তী সময়ে বাঙালি সেই স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে, মুক্তির ঘোর অমানিশায় প্রদীপ্ত থেকে বাঙালির মহত্তম মহাযজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তবন্যার ফল হিসেবে বাংলাদেশ বিজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে ও স্বাধীনতা লাভ করে। পাকিস্তানের সূচনালগ্ন থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রতিটি নবসূর্যের আভায় বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

জাতির মঙ্গলের জন্য যখন যা প্রয়োজন সেটিই বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার জনকল্যাণধর্মী ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে নেয়া দূরদর্শী উন্নয়ন কৌশলের নৈতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৭২ সালে গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের মাধ্যমে।

‘রাষ্ট্রীয় মৌলনীতি’র অংশ হিসেবে অর্থনীতি ও সমাজে সাম্য নিশ্চিত করা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করা, খাদ্য-বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ এই সংবিধানে স্থান করে নেয়।

সময়ের প্রয়োজনে শুরুতে রাষ্ট্রীয় খাতকে প্রাধান্য দিলেও ধীরে ধীরে সমবায় ও ব্যক্তিখাতের বিকাশের জন্যে উপযুক্ত নীতি সংস্কারেও তিনি হাত দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধু সরকার গণমুখী শিক্ষার বিষয়কে শুধু সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েই থেমে থাকেননি, বরং নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ লক্ষ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেতে থাকা একটি নবীন জাতি যেন হঠাৎই বাকরুদ্ধ আর স্তব্ধ হয়ে যায় এক কালো রাতের ভয়াল নৃশংসতায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একটি সদ্যজাত জাতিকে তার পিতার লাশ বহন করতে হয়। হন্তারকরা বঙ্গবন্ধুকে নারকীয়ভাবে হত্যা করলেও তার রেখে যাওয়া জীবনাদর্শকে মুছে ফেলতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এখন লালন করে কোটি কোটি বাঙালি।

৭৫ পরবর্তী বাঙালি জাতির বুকে নেমে আসে এক কৃষ্ণবিবর। ৭৫- পরবর্তী নানা আন্দোলন সংগ্রামে যখন আওয়ামী লীগকে মুছে দেয়ার জন্য বার বার চেষ্টা করা হয়েছে তখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের রক্তের স্রোতের মাধ্যমে সেই অপচেষ্টাকে প্রতিহত করা হয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, আজকের আওয়ামী লীগ দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য নেতা কর্মীর আত্মত্যাগের ওপর। আওয়ামী লীগের চলার পথ মসৃণ হয়েছে অসংখ্য কর্মীর শরীর থেকে ঝরা রক্ত দিয়ে।

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাল ধরলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্তরের ভেতরে উদ্বেলিত বারুদ আবারও ফুঁসে ওঠে। জনমানুষের হয়ে আগের চেয়েও দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও সুসংগঠিত হয়।

স্বৈরাচার, অগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে হাজারও সংগ্রাম সাধনার পর ১৯৯৬ সালের আবারও সেই ২৩ জুনেই আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সব উন্নয়নের কর্মপ্রক্রিয়া বাস্তবায়নের রোডম্যাপ সে সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমেই সম্পাদন করা হয়।

কিন্তু বরাবরই শস্যের ভেতরে ভূত হয়ে আসে পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের দোসর ও তাদের উত্তরসূরিরা। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র জগদ্দল পাথরের মতো জাতির ঘাড়ে চেপে বসে জাতির সব অর্জনকে ভূলুন্ঠিত করবার পাঁয়তারা করেছে।

২০০১ থেকে ২০০৮ সাল ছিল নৈরাজ্য, দুঃশাসন, দুর্নীতি আর জাতির কপালে কালিমা লেপনের এক অন্ধকারতম অধ্যায়। বাঙালির ভাগ্যাকাশে নিগৃহীত এই কলঙ্কময় অধ্যায় জাতির অর্জনকে নিমেষেই জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল। দেশজুড়ে অরাজকতা ও সন্ত্রাসের কালো ছায়ায় বাংলাদেশ যেন বিপন্নপ্রায়। বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে বারংবার হত্যাচেষ্টায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঢাল হয়ে সব অপঘাতকে রুখে দিয়েছে। এ যাবৎ বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে প্রায় ১৯ বার হত্যা করবার অপচেষ্টা করা হয়। প্রতিবারই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠে প্রতিরোধ করেছে।

দেশে রাজনৈতিক সংকটের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে পুনরায় সরকার গঠন করে। ২০০৯ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের টানা এক যুগের শাসনামলে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট প্রেরণ করা হয়েছে। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য এসেছে। জঙ্গি দমনে সাফল্য সারা বিশ্বে আলোচিত।

এদেশে আওয়ামী লীগই একমাত্র দল যেটি দেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নিরবিচ্ছিন্ন ভূমিকা রেখেছে। দেশের বিভিন্ন সংকট ও দুর্যোগে অন্যদলগুলো যখন নানা নাটকীয়তায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময়ক্ষেপণ করেছে, আওয়ামী লীগ তখন তার অবস্থানে অটল থেকে জনগণকে সংগঠিত করেছে। অন্যদলগুলো যখন ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া নিয়ে অহংকারে ব্যস্ত, আওয়ামী লীগ তখন নির্মাণ করছে নতুন ইতিহাস।

লড়াই সংগ্রামে অটল অবিচল ও দ্যুতি সঞ্চারে বাঙালির লালিত স্বপ্ন সাহসের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বাঙালির স্বাধীনচেতা অগ্নিগর্ভে দ্রোহের স্ফুরণ ঘটেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাত ধরেই। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যেমন সব দৌরাত্ম্যের দোটানাকে দমন করে দুর্বার গতিতে দুর্দমনীয় হয়ে এগিয়েছে, ঠিক তেমনি সব ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙে দিয়ে জাতিকে মুক্তির আলোকবার্তা উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। যুগে যুগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই আলোর পথে অভিযাত্রা অব্যাহত থাকুক।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
খন্দকার মোশতাক মুক্তিযোদ্ধা নয় পাকিস্তানের দালাল
সঞ্চয়পত্রে টিআইএন প্রত্যাহার প্রয়োজন
বাজেটে যা বলা হয়নি
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সদিচ্ছা
পঞ্চাশের বাজেটে কত মার্ক পেলেন অর্থমন্ত্রী?

শেয়ার করুন

দুধের মাছি থেকে সাবধান থাকা দরকার

দুধের মাছি থেকে সাবধান থাকা দরকার

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে ঐতিহ্যবাহী এ দলটিতে ভিড় জমিয়েছে ভিন্ন আদর্শ এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির একটা অংশ। বিভিন্ন সময়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা, যেকোনো ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করার চেষ্টা, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টাও তাদের কুকর্মের মাধ্যমেই হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরে এসে এ ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের ব্যথিত করে, কষ্ট দেয়। এ বিষয়ে সচেতন হয়ে, দুধের মাছি এবং সুযোগসন্ধানীদের দ্রুত দল থেকে বের করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনা যেন একসূত্রে গাঁথা। ২৩ জুন, সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও সাফল্যের ৭২ বছর পেরিয়ে ৭৩ বছরে পদার্পণ করল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। গণমানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশার বাস্তবায়ন ঘটাতে বঙ্গবন্ধুতনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ফলে উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই যেন রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

এদেশে একটা সময় ছিল যখন বিদ্যুতের ব্যাপক ঘাটতি ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হতো। উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটত। পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রেখে আজ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম বাংলাদেশ। যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। প্রত্যেকটি বিভাগে করা হচ্ছে ফোর লেনের সড়ক। যে পদ্মা সেতু এবং মেট্রোরেল জনগণের স্বপ্ন ছিল, সে স্বপ্নকে সত্যি করে বাস্তব রূপদান করে দিয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শাসনকালেই মানুষের জীবন ও জীবিকার উন্নয়নসাধিত হয়েছে বহু গুণে। ২০২০-২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা বছরে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৩ টাকা।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৪৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ২০০৮ সালে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ। এ বছর ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২২ সালের আগেই এ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করছে আওয়ামী লীগ সরকার।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে দেশের সর্বস্তরের জনগণের পাশে বিপদের বন্ধু হয়ে গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

টানা একযুগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি অনন্য উদাহরণ। এ দেশের অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক শক্তির সমর্থনের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে জাতির পিতার যোগ্য কন্যা, দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি উন্নয়নশীল দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছেন।

তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হতে চলেছে। এত সব সফলতার পাশাপাশি আমাদের কিছু আক্ষেপও আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে ঐতিহ্যবাহী এ দলটিতে ভিড় জমিয়েছে ভিন্ন আদর্শ এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির একটা অংশ। বিভিন্ন সময়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা, যেকোনো ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করার চেষ্টা, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টাও তাদের কুকর্মের মাধ্যমেই হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরে এসে এ ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের ব্যথিত করে, কষ্ট দেয়।

এ বিষয়ে সচেতন হয়ে, দুধের মাছি এবং সুযোগসন্ধানীদের দ্রুত দল থেকে বের করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, দলটি এর ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে ব্যর্থ হয়ে স্থিতিশীল অবস্থা খুঁজতে গিয়ে পেন্ডুলামের মতো করে দুলতে থাকবে, যা আমরা দেখতে চাই না।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রকৃত খবরএবং তথ্যগুলো পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের আরও সতর্ক হওয়া জরুরি। আওয়ামী লীগ এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশাকে প্রাধান্য দেয়া জরুরি। অন্যথায় ঐতিহ্যবাহী এ দলটির কর্মীসংকট দেখা দিতে বেশি দিন লাগবে না। আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে এর দীর্ঘদিনের সুনাম এবং ঐতিহ্য বিনষ্ট করতে কালপ্রিট এবং হাইব্রিডদের নোংরা তৎপরতা পরিলক্ষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দমন করতে হবে।

দেশরত্ন শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে আওয়ামী লীগকে মুজিবাদর্শে বলীয়ান হয়ে জনগণের কল্যাণে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাওয়ায় মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য শতবর্ষ থেকে হাজার বছর ছুঁয়ে যাক। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু!

লেখক: শিক্ষার্থী, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
খন্দকার মোশতাক মুক্তিযোদ্ধা নয় পাকিস্তানের দালাল
সঞ্চয়পত্রে টিআইএন প্রত্যাহার প্রয়োজন
বাজেটে যা বলা হয়নি
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সদিচ্ছা
পঞ্চাশের বাজেটে কত মার্ক পেলেন অর্থমন্ত্রী?

শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগের ৭২ বছর

আওয়ামী লীগের ৭২ বছর

দীর্ঘদিনের অপপ্রচারের ফলে দেশে আসলে মৌলবাদীচেতনা দৃঢ় হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হয়েছে। গোষ্ঠীটি বলেছে, আওয়ামী লীগ ‘মুসলমানবিদ্বেষী, আওয়ামী লীগ হিন্দুদের দল, আওয়ামী লীগ ভারতের দালাল’- এ কুৎসিত মিথ্যাচার মানুষের মননে এবং মগজে ঢোকানোর এক মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলে দীর্ঘ ২১ বছর।

৭২ থেকে ৭৩ বছরে পা দিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ৷ বয়সের হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল। অবশ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনেরও বয়স কোনো গুণ নয়। তাই যদি হতো তাহলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বয়স্ক দল মুসলিম লীগ। সেটির আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই। কমিউনিস্ট পার্টিও প্রাচীনতর দল।

১৯৫৭ সালে ভাসানী প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) কত ভাগে বিভক্ত এবং কোন অংশের সমর্থক কত, তা আমাদের মতো মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। নানা উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে দলটি সাবলীলভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

১৯৭৫ সালে সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর কয়েক বছর দলটি অস্তিত্বসংকটে পড়েছিল। ১৯৭৫-৮১ এই কয়েক বছর বাদ দিলে দলটি সব সময়ই দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। অতীতে অনেকবার দলটি ক্ষমতায় যেমন ছিল, তেমন বিরোধী দলেও ছিল। বিরোধী দলে থাকার সময়ও শক্ত অবস্থানে ছিল।

যে সংগঠন বিরোধী দলে থেকে শক্ত ভূমিকা পালন করতে পারে না, সে দল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গিয়েও ভালো করতে পারে না। আওয়ামী লীগ অবশ্য ক্ষমতায় থাকার চেয়ে বিরোধী দলে থেকে উজ্জ্বল ভূমিকা পালনের রেকর্ড গড়েছে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুল হকের যৌথ নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়৷ জন্মলগ্নে এই দলের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’৷

১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়৷ স্বাধীনতার পর নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’৷ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনা৷ এরপর থেকে, গেল ৪০ বছর দলের সভাপতির দায়িত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, সময়ের হিসাবে যা আওয়ামী লীগের ইতিহাসে অর্ধেকের বেশি৷

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০০১-২০০৭ পর্যন্ত একটা বিরতি দিয়ে আবার সরকার গঠন করে দলটি৷ এরপর থেকে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আছে তারা৷ স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার রেকর্ডও এই দলটির।

কিন্তু যে আদর্শ নিয়ে দলটি পথচলা শুরু করেছিল, সেখান থেকে দলটি ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। দলটি ক্রমেই ধর্ম ও ব্যবসায়িক-নির্ভর হয়ে পড়েছে। গণতান্ত্রিক আদর্শচর্চার ক্ষেত্রেও ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

এখন আওয়ামী লীগে তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদদের চেয়ে ব্যবসায়ী ও আমলাদের প্রভাব বেড়েছে। দলে নিয়মিত কাউন্সিল হয় না। গণতন্ত্রচর্চা হয় না। জাতীয় পর্যায়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজনের ক্ষেত্রেও দলটির মধ্যে অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবর্তে নানা কারসাজির মাধ্যমে জয়ী হওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার ঝোঁক দলটির মধ্যে স্পষ্ট। শুধু তাই নয়, দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে অবৈধভাবে টাকা বানানোর ধান্দা বাড়ছে।

চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন দলের কিছু নেতা-কর্মী। বড়লোকরা প্রতিনিয়ত সুবিধা পাচ্ছে। সে তুলনায় গরিব মানুষের জন্য নীতি-কর্মসূচি নেই বললেই চলে। অথচ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল নিপীড়ন রোধ করতে, শোষণ-বঞ্চনা-ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন থেকে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আওয়ামী লীগ অনেকটাই আদর্শবিচ্যুত হয়ে গেছে। বিশেষত ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শচর্চার ক্ষেত্রে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ধর্মান্ধ, মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সারা জীবন লড়াই করে গেছেন বঙ্গবন্ধু।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হলো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’- এ স্লোগান বুকে ধারণ করেই এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। জীবন উৎসর্গ করেছিল। আজ স্বাধীনতা অর্জনের পঞ্চাশ পর পেছনে ফিরে তাকালে হতাশ হতে হয়। ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা থেকে দলটি ক্রমেই যেন দূরে সরে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম-পরিচয় এখন অনেক ক্ষেত্রেই দলটির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে অভিযোগ শোনা যায়।

অথচ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে এখনও বলা আছে: ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজতন্ত্র তথা শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হইবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি।’

কিন্তু ৭২ বছর পর আওয়ামী লীগের দিকে তাকালে মনে হয় দলটি বুঝি তার এই ঘোষিত মূলনীতি থেকে সরে এসেছে! অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের পরিবর্তে দলটি ক্রমেই ধর্মীয় চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে জনপ্রিয় করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

বরং একটু একটু করে মৌলবাদীদের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। সংবিধানে এখনও রাষ্ট্রধর্ম বহাল। সবার মধ্যে অসাম্প্রদায়িক মনমানসিকতা সৃষ্টির জন্য উদ্যোগী হওয়া, আধুনিক প্রগতিমুখী যুক্তি ও বিজ্ঞাননির্ভর চেতনা গড়ে তোলার জন্য সামাজিক জাগরণ সৃষ্টি করা, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ প্রদান ইত্যাদি কাজ করা হয়নি। বরং নানাভাবে ধর্মমুখী চেতনাকেই তালিম দেয়া হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর মধ্যেই এখন হেফাজতিচেতনা বাসা বেঁধেছে।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করেন, দীর্ঘদিনের অপপ্রচারের ফলে দেশে আসলে মৌলবাদীচেতনা দৃঢ় হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হয়েছে। গোষ্ঠীটি বলেছে, আওয়ামী লীগ ‘মুসলমানবিদ্বেষী, আওয়ামী লীগ হিন্দুদের দল, আওয়ামী লীগ ভারতের দালাল’- এ কুৎসিত মিথ্যাচার মানুষের মননে এবং মগজে ঢোকানোর এক মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলে দীর্ঘ ২১ বছর।

’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগের নেতারাও এসব ধর্মীয় অপপ্রচারে বিভ্রান্তিতে পড়েন। নিজেদের ‘মুসলমান’ প্রমাণে মরিয়া হয়ে ওঠেন কেউ কেউ। ধর্ম ও রাজনীতির ককটেলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও আসক্ত হন। বঙ্গবন্ধু যেভাবে দৃঢ়চিত্তে অকপটে ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, যেভাবে তাদের মুখোশ উন্মোচন করতেন সে পথ থেকে সরে আসে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও মনে করেন, বর্তমানে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করার মতো পরিস্থিতি আর নেই। সমাজ এখন অনেকটাই ধর্মীয় চেতনায় আচ্ছন্ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উনসত্তর, একাত্তর কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ যদি ধর্মবাদী রাজনীতিকে নাকচ করতে পারে, আজকের বাংলাদেশ কেন পারবে না?

আসলে আওয়ামী লীগের ভেতরেই মৌলবাদী গোষ্ঠী বাসা বেঁধেছে। ধর্মের প্রশ্নে দলটি ক্রমেই আপসের পথে হাঁটছে। বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করার প্রবণতা লক্ষণীয়, আবার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পদক্ষেপও আমরা দেখি, কখনও পাঠ্যপুস্তক বদল করে, ধর্মীয় শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমমর্যাদায় উন্নীত করে মৌলবাদীদের তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে ধর্মীয় শিক্ষাকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রধর্মের পক্ষে ধারাবাহিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আসলে একটু একটু করে ক্রমেই পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণাকেই যেন জাতীয়ভাবে আঁকড়ে ধরা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগও গড্ডলপ্রবাহে গা ভাসিয়েছে। অথচ বাংলাদেশকে উন্নত করতে হলে সবার আগে দেশের মানুষের মনমানসিকতার উন্নয়ন প্রয়োজন। এ জন্য দরকার মতাদর্শিক লড়াই। মানসম্পন্ন শিক্ষা। প্রয়োজন অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা, যুক্তি ও বিজ্ঞানের অুনশীলন বাড়ানো। তা না হলে ফি বছর আমাদের মাথাপিছু আয় হয়ত বাড়বে, কিন্তু এদেশে আবু ত্ব-হা, মামুনুল হক, সাঈদীদের মতাদর্শই বিস্তৃত হবে।

৭২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই লগ্নে আওয়ামী লীগকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে বিকশিত করবে, নাকি বর্তমান প্রবাহ ধরে রাখবে?

লেখক: প্রাবন্ধিক, সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
খন্দকার মোশতাক মুক্তিযোদ্ধা নয় পাকিস্তানের দালাল
সঞ্চয়পত্রে টিআইএন প্রত্যাহার প্রয়োজন
বাজেটে যা বলা হয়নি
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সদিচ্ছা
পঞ্চাশের বাজেটে কত মার্ক পেলেন অর্থমন্ত্রী?

শেয়ার করুন

স্বাধীনতার দলের নতুন চ্যালেঞ্জ

স্বাধীনতার দলের নতুন চ্যালেঞ্জ

আওয়ামী লীগ উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার দলটির জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ। আরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে- সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান রোধ। যে দলটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই দলে নানা কৌশলে সাম্প্রদায়িক শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটছে, এমন অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দলটি ২০২১ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পালন করছে। দলটি টানা ১২ বছরের বেশি ক্ষমতায়। পর পর তিনটি সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। জাতীয় সংসদ, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ- জনপ্রতিনিধিদের প্রতিটি সংস্থায় দলটির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব।

সংগত কারণেই এ দলের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কোনো সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতা কিংবা ঠিকভাবে কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে অন্যের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ তাদের নেই।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পূর্ববাংলার বঞ্চনা এবং বিশেষ করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উপেক্ষার পটভূমিতে আওয়ামী লীগের জন্ম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচি-লাহোরকে কেন্দ্র করে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তার শাসকরা পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ড) উপনিবেশ হিসেবেই গণ্য করতে শুরু করে।

তারা নতুন উদ্যমে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াতে এবং এটাকেই মুশকিল আসানের দাওয়াই হিসেবে গণ্য করতে থাকে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর উর্দুতে ডাকটিকিট প্রকাশ ও সরকারি চাকরিতে আবেদন করার যোগ্যতা হিসেবে উর্দু জানা বাধ্যতামূলক করার অপচেষ্টা শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি কর্মচারীরা ধর্মঘট করে বসবে, এটা তারা ভাবতে পারেনি।

এ ঘটনার তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পাঠ ঘুচিয়ে অচেনা শহর ঢাকায় চলে আসা তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।

বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র চাই- এ স্থির লক্ষ্য বঙ্গবন্ধু নির্ধারণ করেন সেই পঞ্চাশের দশকেই। খ্যাতিমান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সনজীদা খাতুন আমাকে (এ নিবন্ধের লেখক অজয় দাশগুপ্ত) বলেছেন, ১৯৫৬ সালে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু তাকে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি..’ গাওয়ার অনুরোধ করেন। ওই অনুষ্ঠানে পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্টজনেরা এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমাদের মনে যে ‘সোনার বাংলা’ সেটা ওদের প্রতিটি সুযোগে জানিয়ে দিতে হবে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ, প্রধান সংগঠক। ৩৩ বছর বয়সেই দলের পূর্ব পাকিস্তান কমিটির সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু বাংলার তিন প্রবাদপ্রতিম রাজনীতিবিদ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কাছে তিনি অপরিহার্য সহকর্মী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। তার বিকল্প নেই কারো কাছে।

পঞ্চাশের দশকে শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় বসবাস করতেন। কিংবা ছুটে যেতেন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দলের কাজে। এ দশকের প্রায় অর্ধেকটা কেটেছে কারাগারে। বন্দিজীবন কতদিন, সে তথ্য রয়েছে ১৯৫৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, ১৯৪৯ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি গ্রেপ্তার হন এবং একই বছরের ১৭ জুন মুক্তি পান (প্রকৃতপক্ষে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৯ এপ্রিল এবং মুক্তি পান ২৬ জুন)। এরপর গ্রেপ্তার হন ১৯ জুলাই, ১৯৪৯ (প্রকৃতপক্ষে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর) এবং মুক্তি পান ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এরপর গ্রেপ্তার হন ১৯৫৪ সালের ১৬ মে এবং মুক্তি পান একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিকশাসন জারির পর পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৪ মাস পর ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৫৯ তারিখ মুক্তি পান।

এর বাইরেও ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রথম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে হরতাল পালন করার সময় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কয়েকদিনের জন্য বন্দি ছিলেন। অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রথম ১২ বছরের মধ্যে ৪ বছরের বেশি সময় তিনি ছিলেন কারাগারে। ষাটের দশকেও বার বার তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। সবচেয়ে দীর্ঘ কারাবাস ছিল ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ সময়ের বড় অংশ কেটেছে ক্যান্টনমেন্টে। এর পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তাকে রাখা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে।

কারাগারের বাইরে থাকার সময় বঙ্গবন্ধু ঢাকাকে কেন্দ্র করে দলের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি নিয়মিত জেলা-মহকুমা সফর করেছেন। দলের দুই প্রবীণ ও জননন্দিত নেতার সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সব বিষয়ে তিনি একমত ছিলেন, সেটা বলার উপায় নেই। কখনও কখনও দ্বিমত প্রকাশ্য হয়েছে। কিন্তু দুজনের কাছেই তিনি সমান প্রিয়।

দুজনেই নানা কাজে তার ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখেন। আবার মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যেও বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য ছিল বিস্তর। সে বিরোধ নিষ্পত্তিতেও তিনি সাহায্য করেছেন।

বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দীকে রাজনৈতিক গুরু মানতেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের শুরুতেই রয়েছে- ‘কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হল। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কিভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহে আমি পেয়েছিলাম।’

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ গঠনের পর অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তান পাঠান সোহরাওয়ার্দীকে এ দলের সঙ্গে যুক্ত হতে সম্মত হওয়ার জন্য। ২৯ বছর বয়স তার। যেতে হয়েছে গোপন পথে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিধ্বস্ত ভারতের ওপর দিয়ে। সেখানের মিশন সম্পন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানে ফেরত আসার পর টানা দুই বছরের বেশি কারাগারে, মুক্তি পান ১৯৫২ সালের একুশের ফেব্রুয়ারির সফল আন্দোলনের পর।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখে আওয়ামী লীগ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিল বলেই আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের নিষ্ঠুর সামরিক শাসনামলে এ দলটিই ছিল প্রধান ও বলা যায় একক প্রতিপক্ষ। কিন্তু এই প্রতিপক্ষ যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী ও সৃজনশীল নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করে তুলবে, সেটা তারা ভাবতে পারেননি।

স্বাধীনতার জন্য বাঙালিরা এবং তাদের দল আওয়ামী লীগ কতটা প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল সেটা প্রথম স্পষ্ট হয় ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সময়ে। নিষ্ঠুর সামরিক শাসনের কবলে এ ভূখণ্ড। বাঙালিদের দমন করার জন্য বেলুচিস্তানের কসাই লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতিদিন জারি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দিয়ে সামরিক ফরমান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাসভবনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে বিকল্প প্রশাসন। ইয়াহিয়া খান-টিক্কা খানের হুকুম নয়, জনগণ পালন করেছে ৩২ নম্বরের নির্দেশ।

মহাত্মা গান্ধী শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। কিন্তু বিকল্প প্রশাসন চালু করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু একসঙ্গে দুটি কাজই করেছেন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় বিভিন্ন মহল- সব কিছু চলেছে বঙ্গবন্ধুর কথায়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই আমাদের জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। ২৫ মার্চ নিষ্ঠুর গণহত্যার তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণ করে। স্বল্প সময়ে এ সরকার লাখ লাখ তরুণকে মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে প্রশিক্ষণ প্রদান ও অস্ত্রসজ্জিত করে।

এই বাহিনী নাস্তানাবুদ করতে থাকে ‘অপরাজেয়-দুর্ধর্ষ’ দাবিদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। একইসঙ্গে এ সরকার ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থীর আশ্রয়-খাদ্য-চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে সর্বোতভাবে সহায়তা করে।

সরকার গঠনের দেড় মাস যেতে না যেতেই বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব শিল্পী-কলাকুশলী দিয়ে চালু করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করে পরিকল্পনা সেল।

মুক্তিযুদ্ধকালে কূটনৈতিক অভিযান পরিচালনাতেও বাংলাদেশ সরকার ছিল সফল। গেরিলা যুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে নাকাল করার একপর্যায়ে ভারতের সঙ্গে মিলিতভাবে গঠিত হয় মিত্র বাহিনী, যাদের প্রবল আক্রমণে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের সহযোগীরা ১৬ ডিসেম্বর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ছিল, সন্দেহ নেই। ২০২০ সালে পূরণ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ। ২০২১ সাল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আওয়ামী লীগ উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার দলটির জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে- সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান রোধ। যে দলটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই দলে নানা কৌশলে সাম্প্রদায়িক শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটছে, এমন অভিযোগ রয়েছে। দলের নানা পর্যায়ের নেতৃত্বের একটি অংশ ক্ষমতা ‘উপভোগ’ করায় যতটা তৎপর, বাংলাদেশের মৌল চেতনা ধ্বংসে সক্রিয় সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি ততটাই যেন আপসকামী।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। সম্পদ বাড়ছে দেশে এবং এর পেছনে আওয়ামী লীগের বিপুল অবদান। কিন্তু একইসঙ্গে একটি মহলের হাতে জমা হচ্ছে অঢেল সম্পদ। কী করে এই বৈষম্য কমিয়ে আনা যাবে, সে চাপ বাড়ছে দলের নেতৃত্বের ওপর।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে সরকার ও আওয়ামী লীগের সামনে আরও একটি ইস্যু- প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এমনকি দলের নানা পর্যায়ের নেতৃত্বে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের আরও বেশি দায়িত্ব প্রদান। টেকসই উন্নয়নের জন্য এটা অপরিহার্য শর্ত।

নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। কোনো স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ এভাবে বিশ্বব্যাংক বা পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। করোনা বিপর্যয় মোকাবিলা করছেন নিপুণ দক্ষতায়। বিদ্যুৎ সংকটের অবসান ঘটেছে। খাদ্যে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা প্রত্যন্ত গ্রামেও বিস্তৃত।

এ ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ উন্নত দেশের সারিতে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে হলে সম্পদ সৃষ্টির প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। উদ্যোক্তাদের দিতে হবে নানা সুবিধা। একইসঙ্গে বৈষম্য কমিয়ে আনার প্রতিও দিতে হবে সর্বোচ্চ মনোযোগ। আমাদের স্বাধীনতার মর্মচেতনাই ছিল সোনার বাংলা নির্মাণ ও দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
খন্দকার মোশতাক মুক্তিযোদ্ধা নয় পাকিস্তানের দালাল
সঞ্চয়পত্রে টিআইএন প্রত্যাহার প্রয়োজন
বাজেটে যা বলা হয়নি
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সদিচ্ছা
পঞ্চাশের বাজেটে কত মার্ক পেলেন অর্থমন্ত্রী?

শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে

আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে

জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠেছিল। জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে আসতে থাকে দলটি। ষাটের দশকজুড়ে এই ঐতিহ্যবাহী দলটি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নিজ আদর্শ সমুন্নত রেখেছিল। এই সমুদয় পর্বে আওয়ামী লীগ তার আদর্শ থেকে সরে আসেনি।

একটি রাজনৈতিক দল জনসমর্থন নিয়ে টিকে থাকে এর আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখে। মাটি ও মানুষের মধ্য থেকে গড়ে ও বেড়ে উঠলে এবং নানা যুগপর্বে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকলে, ভূমিকা রাখলে একে ঐতিহ্যিক দল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই সূত্রে আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী দল। এমন দলের জন্মকাল থেকেই আদর্শ ও দর্শন থাকে। এ ধারার রাজনৈতিক দল যতকাল এই আদর্শ ও দর্শন ধারণ করতে পারে, ততদিন রাজনীতির মাঠে এবং জনগণের আস্থায় সম্মানজনক অবস্থানে টিকে থাকে।

এই অর্থে মুসলিম লীগও একটি ঐতিহ্যবাহী দল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সূত্রে দলটির জন্ম। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে অনুন্নত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ লাভবান হবে বিবেচনার ঢাকার নবাবদের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন জানানো হয়।

অপরদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজদের কূটচাল বিবেচনা করে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করতে থাকে। ভারতীয়দের একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন সর্বভারতীয় কংগ্রেস অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেছিল। কিন্তু যখন কংগ্রেসের নেতারা মুসলমান নেতাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই বঙ্গভঙ্গের বিরোধী অবস্থানে দাঁড়ালেন, তখন পূর্ববঙ্গের মুসলমান নেতারা কংগ্রেসের ওপর আস্থা রাখতে পারলেন না।

নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে তারা সংঘবদ্ধ হলেন। বুঝতে পারলেন নিজ সম্প্রদায়ের দাবি আদায়ের জন্য মুসলমানদের রাজনৈতিক দল থাকা চাই। এই লক্ষ্যেই ঢাকায় ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হলো।

ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম লীগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের হাতে। সরকারি পক্ষের রাজনৈতিক দল হয় মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগের সমকক্ষ রাজনৈতিক দল পাকিস্তানের প্রথম পর্বে আর ছিল না। বাংলার অধিকাংশ নেতাই মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন।

একপর্যায়ে বাঙালি নেতাদের মোহভঙ্গ হয়। ভাষার প্রশ্নে যখন পাকিস্তানি শাসকদের হিংস্র মনোভাব স্পষ্ট হলো, সংঘটিত হয়ে গেল ভাষা আন্দোলন তখনই মুসলিম লীগে বেজে উঠল পতনের সুর। এই অবধারিত সত্যটি স্পষ্ট হলো। আদর্শচ্যুত হয়ে মুসলিম লীগের মতো বড় ও ঐতিহ্যবাহী দলকেও মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছিল।

ভাষা প্রশ্নে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈরী মনোভাব এবং ভাষাসূত্রে পূর্ববাংলায় সংঘটিত ভাষা আন্দোলন এ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক জীবনে প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করে। এ দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল যে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে বিশ্বাস করার কোনো ভিত্তি নেই। শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা, সরকারি নীতিতে পক্ষপাতিত্ব এবং মুসলিম লীগের রাজনীতিতে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে শোষণনীতি ইত্যাদি ক্রমেই প্রকাশ্যে চলে আসে।

সুতরাং তারা বুঝতে পেরেছিল এ দেশের জনগণের অধিকারের কথা বলার জন্য নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই চিন্তার ফসল হিসেবে ১৯৪৯ সালের জুন মাসে ঢাকায় আত্মপ্রকাশ করে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামের রাজনৈতিক সংগঠন। এই নতুন দলের সভাপতি মনোনীত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন শামসুল হক।

আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন অর্জন। এই লক্ষ্যেই তারা একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেন। এতে পাকিস্তানের আঞ্চলিক ইউনিটগুলোকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার দেয়ার প্রস্তাব রাখা হয়। গঠনতন্ত্রে বাংলার নিজস্ব পদাতিক, নৌ ও বিমানবাহিনী রাখার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মুসলিম লীগের প্রতি ইতোমধ্যেই পূর্ববাংলার মানুষের আস্থা কমে গিয়েছিল। ফলে অধিকাংশ মানুষই আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্ব মেনে নিতে থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে সময়ের দাবিতে এবং বিশেষ করে সাম্প্রদায়িকতার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে আওয়ামী মুসলিম লীগ ‘আওয়ামী লীগ’-এ রূপান্তরিত হয়।

আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। তার নেতৃত্বে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দাপটের সঙ্গে এগিয়ে যায় বাঙালি। ১৯৭০-এর নির্বাচনে অভ্রভেদী জয় পায় আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ।

তাহলে দেখা যাচ্ছে জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির আদর্শ নিয়ে বেড়ে উঠেছিল। জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে আসতে থাকে দলটি। ষাটের দশকজুড়ে এই ঐতিহ্যবাহী দলটি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নিজ আদর্শ সমুন্নত রেখেছিল। এই সমুদয় পর্বে আওয়ামী লীগ তার আদর্শ থেকে সরে আসেনি।

স্বাধীনতা-উত্তরকালেও আওয়ামী লীগ তার আদর্শ ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধু আদর্শ দুর্বল করতে দেননি। তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গণতন্ত্রের যাত্রাপথকে শক্তিশালী করে। মন্ত্রিপরিষদ-শাসিত সরকারব্যবস্থার প্রবর্তন করেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৪৭ সালে হলেও সংবিধান পাস হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। প্রায় ১০ বছর লেগে যায়।

অপরদিকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করতে পেরেছিলেন। এই সংবিধানে আওয়ামী লীগের আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীলতা জড়িয়ে ছিল সংবিধানে।

বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে গেছেন। দল ও প্রশাসনে দুর্নীতি থাকলে সব অর্জনই ধ্বংস হয়ে যায়। যতই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র থাক না কেন, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের পেছনে আকাশচুম্বী দুর্নীতির ভূমিকা কিছু মাত্রায় কম ছিল না। ‘চোরের দল’, ‘চাটার দল’ বলে বঙ্গবন্ধুকে শুধু আক্ষেপ করতে দেখেছি। সময়ের বাস্তবতায় এবং একটি শুভ ইচ্ছা সামনে রেখে সাময়িক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে সব দল নিষিদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে বাকশাল ঘোষণা করতে হয়।

যতই শুভ ইচ্ছা থাক, মানতে হবে এই ব্যবস্থা আওয়ামী লীগের অদর্শকে ধারণ করেনি। তাই শেষ পর্যন্ত একটি কঠিন দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়েছিল আওয়ামী লীগকে, দেশবাসীকেও। এখনও সমালোচনা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ।

বঙ্গবন্ধু-উত্তর আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থেকে বা সরকার গঠন করে সততা ও দলীয় আদর্শ সামনে রেখে যেভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সে পথে সব সময় হাঁটতে পারেনি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যায়। এই দুর্বলতার সুযোগে প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো আদর্শ ধারণ না করা ভুঁইফোঁড় দল বিএনপি জেঁকে বসতে পেরেছিল।

জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগ নেতাদের দুর্বলতা ও গণবিচ্ছিন্ন আচরণকে পর্যবেক্ষণ করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পেরেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র চার বছর অতিক্রান্ত না হতেই গণতান্ত্রিক ধারা বিচ্ছিন্ন সেনাছাউনি থেকে বেরিয়ে আসা একটি দল রাজনীতির মাঠে শক্ত ভিত্তি পেয়ে যায় শুধু আওয়ামী লীগ নেতাদের দলীয় আদর্শ থেকে বেরিয়ে এসে একটি বিভ্রান্ত দশায় নিপতিত হওয়ার কারণে।

শেখ হাসিনা দুর্দশাগ্রস্ত দলের হাল ধরলেও দৃঢ় পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে দলীয় আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে জামায়াতসহ অন্যান্য মৌলবাদী দলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়েছে। যে ধারা থেকে এখনও বের হওয়া সম্ভব হয়নি।

ক্ষমতার রাজনীতিতে অমন দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো সাময়িক লাভ নিয়ে আসে কিন্তু দলীয় আদর্শচ্যুতি আখেরে ক্ষতি করে দেয় দলকে। আওয়ামী লীগ তার গৌরবের সময় জনগণের দল ছিল। কিন্তু গণশক্তির ওপর শেষ পর্যন্ত ভরসা রাখতে পারেনি। তাই ক্রমে দলবৃত্তে আটকে যাচ্ছে কঠিনভাবে।

সব ক্ষেত্রে এবং সব প্রতিষ্ঠানে যখন দলীয়করণ কঠিনভাবে জায়গা করে নেয়, তখন স্বাভাবিকভাবে বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। একটি ঐতিহ্যবাহী দল এভাবেই জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকে। ক্ষমতার মদে মত্ত থাকায় কঠিন বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে চায় না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেকটা এগিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা জানেন এসব উন্ননের বাস্তবতা সব সময় সাধারণ মানুষকে স্বস্তিতে রাখতে পারে না।

মানুষ তার যাপিত জীবনে যখন প্রতিদিন দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি দেখে। সন্ত্রাসের শিকার হয়। অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ থেকে সরে আসতে দেখে। দলীয়করণের ঘেরাটোপে যখন যোগ্য, মেধাবী মানুষদের মূল্যায়ন হয় না, তখন মানুষ ১৯৪৯ সালে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগের সঙ্গে এ সময়ের আওয়ামী লীগের অনেক তফাত দেখতে পায়। এভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যদি আওয়ামী লীগের আস্থার সংকট তৈরি হয়, তবে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে এই ঐতিহ্যবাহী দলটির।

এই সুযোগটি ভালোভাবেই গ্রহণ করতে চাইবে ভুঁইফোঁড় দল আর মৌলবাদী গোষ্ঠী। এতে আওয়ামী লীগই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্রপ্রত্যাশী এ দেশের কোটি কোটি মানুষ।

আজ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে আমাদের অনুরোধ থাকবে এই দলের নেতারা যাতে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ান। এ দেশে শক্ত বিকল্প গণতান্ত্রিক দলের অস্তিত্ব থাকলে মানুষকে এতটা হতাশ হতে হতো না। বাস্তবতা হচ্ছে এই যে চলমান রাজনীতিতে বিকল্প নেই বলে আওয়ামী লীগকেই এ দেশের কাণ্ডারি হতে হবে।

ক্ষমতার দম্ভে থেকে সাধারণ মানুষকে আমলে না আনা একটি ঐতিহ্যবাহী দলের ‘দর্শন’ হতে পারে না। এই সত্যটি আওয়ামী লীগ নেতারা যত দ্রুত বুঝবেন, তত উপকার হবে দলের আর এ দেশের অধিকাংশ মানুষের।

আমরা প্রত্যাশা করব, ক্ষমতা আর অর্থবিত্ত নয়, আওয়ামী লীগ নেতারা শক্তভাবে দলীয় আদর্শকে সমুন্নত রাখার মধ্য দিয়ে দলীয় অবয়বে যতটা ক্লেদ জমেছে তা ধুয়েমুছে স্বচ্ছ করে দেবেন। মানুষ কিন্তু আওয়ামী লীগের কাছ থেকে এই স্বচ্ছতার রাজনীতিই দেখতে চায়।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
খন্দকার মোশতাক মুক্তিযোদ্ধা নয় পাকিস্তানের দালাল
সঞ্চয়পত্রে টিআইএন প্রত্যাহার প্রয়োজন
বাজেটে যা বলা হয়নি
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সদিচ্ছা
পঞ্চাশের বাজেটে কত মার্ক পেলেন অর্থমন্ত্রী?

শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগের প্রয়োজনীয়তা

আওয়ামী লীগের প্রয়োজনীয়তা

দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শেখ হাসিনা আদর্শ ও দৃঢ়তায় পরিচালিত করার কারণে দলের ভেতর ও বাইরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীসমূহ আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া আধুনিক কল্যাণবাদী রাষ্ট্র গঠনের নির্ভরযোগ্য দল হিসেবে বিবেচনা করছে। আওয়ামী লীগের বিকল্প এখনও পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারকবাহক কোনো দল হতে পারেনি। যতদিন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিপূর্ণভাবে সে রকম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সফল না হচ্ছে, ততদিন এই দলের ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখার আবশ্যকতা শেষ হবার নয়।

ইতিহাসে অনেক রাজনৈতিক দল স্বাধীনতা লাভের মতো ঐতিহাসিক অবদানও রেখেছে। কিন্তু এমন রাজনৈতিক দলও খুব বেশি দিন মানুষের সমর্থন নিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। মূল দল ভেঙে একাধিক রাজনৈতিক দল, শাখা-প্রশাখা হয়েছে। আমাদের এই অঞ্চলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভে দুটি রাজনৈতিক দল বেশ জনসমর্থন লাভ করে। এক কথায় দুটি দল ভারতবর্ষে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা লাভে জাতীয় কংগ্রেস এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় মুসলিম লীগ নেতৃত্ব দেয়।

ইতিহাসের অভিজ্ঞতা হলো- মুসলিম লীগ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববাংলায় অতিদ্রুত জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। ১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলার প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে দলটির যে পরাজয় ঘটে তা আর কেটে ওঠা সম্ভব হয়নি। যদিও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার মুসলিম লীগ এবং মুসলিম লীগের নব-সংস্করণে গঠিত দল নিয়ে সামরিক শাসকরাও রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু পূর্ববাংলার জনগণের মন থেকে মুসলিম লীগ ১৯৪৭-৪৮ সালেই উঠে যেতে থাকে এবং দলটি এই অঞ্চলে আর কোনোদিন দাঁড়াতে পারেনি।

পশ্চিম পাকিস্তানে এখনও বিভিন্ন ব্র্যাকেটবন্দি নামে থাকলেও মুসলিম লীগের গুরুত্ব পাকিস্তানে অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। ভারতে জাতীয় কংগ্রেস এখনও টিকে থাকলেও গত প্রায় ২৫ বছর ধরে জাতীয় কংগ্রেসের অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হতে দেখা যাচ্ছে। এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞতা বেশ ভিন্ন।

যদিও এ দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবোদ্ধা ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্ত মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯১-এর নির্বাচনে পরাজয়ের পর বেশ সদম্ভে উচ্চারণ করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ নিশ্চিতভাবেই মুসলিম লীগের ভাগ্যবরণ করতে যাচ্ছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ১৯৭৫-এর পর থেকে দাবি করে আসছিল যে, আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না, ক্ষমতায় আসতে দেয়াও হবে না। এই চেষ্টা ২১ আগস্ট তারিখে কিংবা এর আগে এবং পরে অনেকবারই করা হয়েছে, এখনও করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এসেছে, দেশ শাসন করছে, দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও পরিবর্তনে বড় ধরনের ভূমিকাও রাখছে।

এই দল পাকিস্তানকালে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম জোরদার করেছে, ছয় দফার আন্দোলনকে এক দফায় রূপান্তরিত করে স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। স্বাধীনতার পর দলটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শাসনতন্ত্র, অবকাঠামোগত ভিত্তি, জাতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা থেকে শিক্ষায় আমূল পরিবর্তনসহ মৌলিক কর্মসূচি প্রদানের মাধ্যমে অগ্রসর হয়েছিল।

দলের প্রধান, নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগীদের হত্যা, আওয়ামী লীগকে ভেঙে তছনছ করে দেয়া, সাম্প্রদায়িক দল সৃষ্টি করা, নতুন নামে মুসলিম লীগের ভাবাদর্শে রাজনৈতিক দল এবং প্রচার-প্রচারণাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাজের তলদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে কঠিন করে দেয়া হয়েছিল।

এরপরও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুনর্জীবন ঘটেছে, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং বাংলাদেশকে আওয়ামী লীগ কী ধরনের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে, কেমন আর্থসামাজিক ব্যবস্থা তৈরি করতে চাচ্ছে, সক্ষমতা রাখছে, অন্যান্য রাজনৈতিক দল এর ভিন্নতা, প্রয়োজনীয়তা, দেশে ও বিদেশে উপস্থাপন করছে, স্বীকৃতও হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে এর প্রতিষ্ঠার সময় থেকে যে রাজনৈতিক দর্শন এবং রাষ্ট্রকাঠামো তৈরির জন্য এই দলটি লড়াই সংগ্রাম, রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার মতো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, রাষ্ট্র গঠনের কাজে হাত দিয়েছে। সেটি নানা ষড়যন্ত্রের কারণে পিছিয়ে গেলেও জনগণের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে দেশে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং আওয়ামী লীগই নানা সীমাবদ্ধতা, জটিলতা, ত্রুটি-দুর্বলতা ইত্যাদির পরও ইতিহাসের কঠিন দায়িত্ব পালনে মৌলিক অবদান রাখার একমাত্র রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে অবস্থান করছে।

বিষয়টি মন গড়া নয়, অন্ধবিশ্বাসপ্রসূতও নয়। ৭২ বছরের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বেড়ে ওঠা প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার সক্ষমতা রাষ্ট্র ও জনগণকে নতুন চিন্তায় নেতৃত্ব দেয়ার যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে সেটিকে মূল্যায়ন, পুনর্মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং তুলনামূলক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণ আওয়ামী লীগের টিকে থাকার চমকপ্রদ ব্যতিক্রমধর্মী ইতিহাসটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। এর বিস্তার অনেক বড়। সেটি অসংখ্য রাজনৈতিক গ্রন্থ রচনা ও গবেষণার বিষয়। সংক্ষেপে আলোচনাটি তুলে ধরছি।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেন প্যালেসে একটি সম্মেলন শেষে নতুন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা হলো। দলটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। এর উদ্যোক্তারা হলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশ তথা মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পূর্ববাংলাবিরোধী রাজনীতির বিরোধিতাকারী যুব কর্মীরা। এরা প্রথমে যুব কর্মী শিবির নামে সংগঠিত হয়।

মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই যাদের মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল, পূর্ববাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য যারা ছিল একনিষ্ঠ, তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই ভাষাকেন্দ্রিক বিরোধ, জাতিগত নিপীড়ন, মুসলিম লীগের শাসন-শোষণ, বাঙালিবিরোধী মনোভাব ইত্যাদি দেখে ক্ষুব্ধ হচ্ছিলেন। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার প্রয়োজন অনুভব করছিলেন এবং ছোট ছোট সামাজিক সাংস্কৃতিক ছাত্র সংগঠন এবং যুব সংগঠন গড়ে তুলে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে থাকেন।

এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিলেন যারা, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শওকত আলী, শামসুল হক, কামরুদ্দীন আহমেদ, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ, মো. তোয়াহা, আতাউর রহমান খান, শামসুজ্জোহা, আবদুল আউয়াল, মুহম্মদ আলমাস প্রমুখ। কলকাতা থেকে সোহরাওয়ার্দী ঢাকায় এসে শওকত আলীকে একটি বিরোধী রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার উপদেশ দিয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়া ১৯৪৮-৪৯ সালে জোরদার হতে থাকে। ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থী খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে ভাসানী-মুজিবসমর্থিত শামসুল হক বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পর নতুন সংগঠন গড়ে তোলার বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়। তরুণ নেতা শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ মার্চ পিকেটিং করার সময় ইউ/এস ৫৪ সিআরপিসি ধারাতে কারারুদ্ধ হন।

সেই সময়ে একদিকে যুব কর্মী শিবিরে সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তুতি প্রদেশব্যাপী জোরদার হতে থাকে, অপরদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র-কর্মচারীদের আন্দোলনও বেগবান হতে থাকে। এর আগে মওলানা ভাসানী আসাম থেকে টাঙ্গাইল এবং টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আমজাদ হোসেনের বাসায় অবস্থান করছিলেন। শওকত আলীর সঙ্গে তার আলোচনা এখানেই হয়।

২৩ জুন রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রায় ২৫০-৩০০ ব্যক্তির উপস্থিতিতে জন্ম নেয় নতুন রাজনৈতিক দল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ভাইস প্রেসিডেন্ট হন আতাউর রহমান খান, আবদুস সালাম খান, আলী আহমেদ খান, আমজাদ আলী খান, সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শামসুল হক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান (তিনি তখন জেলে বন্দি) এবং কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন ইয়ার মোহাম্মদ খান।

নতুন এই দলটির অন্যতম দাবি ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আদায়, ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’, সংবিধান প্রণয়ন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, সংসদীয় সরকারব্যবস্থা, পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ ইত্যাদি। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্ত শাসনের দাবি সংগঠনের অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে গ্রহণ করে।

২৬ জুন শেখ মুজিব জেল থেকে ছাড়া পান। আওয়ামী লীগকে তিনি সাংগঠনিকভাবে প্রদেশব্যাপী গড়ে তোলার জন্য মওলানা ভাসানীসহ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় সফর করেন, সংগঠনের কমিটি গড়ে তোলেন। এরপর ভাষা আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের ওপর পাকিস্তানি শাসক মহলের কঠোর অবস্থানের ফলে মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিব, শামসুল হকসহ অনেক নেতা কারারুদ্ধ হন।

৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে কেউ কেউ মুক্তি পেলেও ভাসানীসহ অনেক নেতা কারাগারেই ছিলেন। শেখ মুজিব মুক্ত হওয়ার পর আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করার জন্য সাংগঠনিক কর্মসূচি বাড়ান। শেষ পর্যন্ত সরকার বাধ্য হয় কারারুদ্ধ নেতাদের মুক্তি দিতে। ১৯৫৩ সালের দ্বিতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী পার্টি এবং নেজামে ইসলাম মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়। এই ফ্রন্টের মূল নেতা হিসেবে শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর নাম যুক্ত হয়। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা প্রণয়নের মাধ্যমে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বিপুলভাবে জনসমাবেশ ও প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়।

১৯৫৪ সালের ৮-১২ মার্চের এই নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে। প্রাদেশিক পরিষদে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন লাভ করে। মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি, আওয়ামী লীগ এককভাবেই ১৪৩টি আসন লাভ করে। মুসলিম লীগের এই পরাজয় এবং আওয়ামী লীগের এই উত্থান পরবর্তী সময়ে ইতিহাসে মূল রাজনৈতিক গতিধারা হিসেবে দৃশ্যমান হয়।

১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগের তৃতীয় দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে সর্বসম্মতভাবে নামকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন। আওয়ামী লীগের এক-তৃতীয়াংশ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ন্যাপে যোগদান করেন। এই সময় প্রদেশে আতাউর রহমানের নেতৃত্বে প্রাদেশিক সরকার ক্ষমতায় ছিলেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্ব দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

দলের সেই কঠিন সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিত্ব ছেড়ে সাংগঠনিক দায়িত্ব যেমন পালন করেন, একই সঙ্গে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে আগে থেকেই পূর্ববাংলার স্বায়ত্ত শাসন, সংবিধান প্রণয়ন, বাংলা ভাষা, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ বিভিন্ন দাবিতে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকার ভেঙে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সামরিক শাসন জারি করে। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে আবার দলকে স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইয়ে প্রস্তুত করেন।

১৯৬৬ সালে অনুষ্ঠিত দলের সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নতুনভাবে নেতৃত্বের নির্বাচন করে। শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম দলের সহসভাপতি, তাজউদ্দীন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সম্মেলনে ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থাপিত ছয় দফা গৃহীত হয়। ছয় দফাকে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য শেখ মুজিব এবং নতুন নেতৃত্ব প্রদেশব্যাপী গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা বাড়ান।

ছয় দফার প্রতি অভূতপূর্ব জনসমর্থন লক্ষ করেই পাকিস্তান সরকার ৮ মে গভীর রাতে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে ধরপাকড় শুরু করে। দলের শত শত নেতা-কর্মী কারারুদ্ধ হন। এর প্রতিবাদস্বরূপ ৭ জুন প্রদেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয়। হরতালে ব্যাপক জনসমর্থন ঘটে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে। এতে ১১ জন নিহত হন। প্রতিক্রিয়ার বারুদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান সরকার দমন নিপীড়ন বাড়িয়ে দেয়। আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র আঁটে। পাকিস্তানের অন্য রাজনৈতিক দল ও ভাসানীসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছয় দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও আওয়ামী লীগ দমে যায়নি।

পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে বিচার করার জন্য মামলা রুজু করে। এর প্রতিক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। শেখ মুজিবসহ রাজবন্দি নেতারা কারামুক্ত হন, জনতার বিজয় সূচিত হয়, আইয়ুব খানের ষড়যন্ত্র পরাজিত হয়। শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন।

৭০-এর নির্বাচনে তিনি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ এবং জনগণের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃত হন। পাকিস্তান সরকার তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জনগণ স্বাধীনতার একদফা বাস্তবায়নে প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করার প্রেক্ষাপট তৈরি করেন। ২৫ মার্চে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জিত হয়। দীর্ঘ এই রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ সংগঠিত করে। আওয়ামী লীগের এই অবদান ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের যাত্রা শুরু হয়। গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদের আদর্শ ধারণ করে সংবিধান প্রণীত হয়, রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের নানামাত্রিক উদ্যোগ গৃহীত হতে থাকে, দেশীয় আন্তর্জাতিক নানা সংকট, সমস্যা অতিক্রম করে বাংলাদেশকে তখন চলতে হয়েছিল। তারপরও বঙ্গবন্ধু একটি কল্যাণবাদী রাষ্ট্র নির্মাণে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন। দেশের অভ্যন্তরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার লক্ষণ দেখা যায়।

বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭.৪ শতাংশ হয়। বাংলাদেশ এই ধারায় পরিচালিত হলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই উন্নয়নশীল এবং উন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করতে পারত। কিন্তু ৭৫ সালের হত্যাকাণ্ড ছিল একটি পশ্চাৎমুখী ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নেয়া হয় ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের আদর্শে।

দেশে সামরিক-আধা সামরিক শাসনব্যবস্থা চালু করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনা জটিল ও কঠিন করে দেয়া হলো। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। দলের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকার গঠনে তিনি সক্ষম হন। এই সময়ে আওয়ামী লীগে ত্যাগী মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী বিভিন্ন দলের অনেক নেতা-কর্মীর সম্মিলন ঘটে, আওয়ামী লীগে নতুন রক্তের সঞ্চালনও ঘটে।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা দলীয় আদর্শে মিশ্র অর্থনীতির সংযোজন ঘটান। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি অর্থনীতিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ধারা হিসেবে গ্রহণ করেন। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতি পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ পায়। তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় বাংলাদেশে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে বিপুল পরিবর্তন ঘটে তার ফলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করে, এ ছাড়া উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি অর্জন করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সূচকে এখন একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশের এই পরিবর্তনের বেশ কিছু সুফল মানুষ ভোগ করছে।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়ে উঠলেও দলের ভেতরে আদর্শবাদী, ত্যাগী এবং শিক্ষিত মেধাবী নেতা-কর্মীর অভাব অনস্বীকার্য। তবে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শেখ হাসিনা আদর্শ ও দৃঢ়তায় পরিচালিত করার কারণে দলের ভেতর ও বাইরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীসমূহ আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া আধুনিক কল্যাণবাদী রাষ্ট্র গঠনের নির্ভরযোগ্য দল হিসেবে বিবেচনা করছে।

আওয়ামী লীগের বিকল্প এখনও পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারকবাহক কোনো দল হতে পারেনি। যতদিন বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিপূর্ণভাবে সে রকম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সফল না হচ্ছে, ততদিন এই দলের ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখার আবশ্যকতা শেষ হবার নয়। সে জন্য দলের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত দলকে এর ইতিহাস, ঐতিহ্য, আদর্শ এবং সৃজনশীলতাকে ধারণ করতেই হবে। তাহলেই আওয়ামী লীগ শত বছরের রাজনৈতিক দল হিসেবে এর ঐতিহাসিক মর্যাদা বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসেই শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় একদিন অবশ্যই স্মরণীয় স্থান করে নেবে।

লেখক: অধ্যাপক, গবেষক

আরও পড়ুন:
খন্দকার মোশতাক মুক্তিযোদ্ধা নয় পাকিস্তানের দালাল
সঞ্চয়পত্রে টিআইএন প্রত্যাহার প্রয়োজন
বাজেটে যা বলা হয়নি
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের সদিচ্ছা
পঞ্চাশের বাজেটে কত মার্ক পেলেন অর্থমন্ত্রী?

শেয়ার করুন