বাজেট নিয়ে কিছু কথা

বাজেট নিয়ে কিছু কথা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে দেখেছি পাকিস্তান সরকার আধা-সামন্তবাদী, আধা-পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা ওই নীতি প্রত্যাখ্যান করি। বঙ্গবন্ধু প্রবর্তন করলেন সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যাভিসারী এক নতুন অর্থনীতি যা ছিল পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত।

বাজেটসহ আমাদের সব ভাবনা ও কর্মকাণ্ডের, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে মূল নির্ভরতার জায়গা হলো ১৯৭২-এর বঙ্গবন্ধুপ্রণীত সংবিধান। এই চিন্তা কি সংসদীয় কর্মকাণ্ডে, কি বিচার-বিভাগের ক্ষেত্রে, কি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমানভাবেই প্রযোজ্য। একটি জাতীয় বাজেট প্রণয়নের মূল দৃষ্টিভঙ্গি ওই সংবিধান থেকেই নিতে হবে- এ নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকার অবকাশ নেই।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে দেখেছি পাকিস্তান সরকার আধা-সামন্তবাদী, আধা-পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা ওই নীতি প্রত্যাখ্যান করি। বঙ্গবন্ধু প্রবর্তন করলেন সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যাভিসারী এক নতুন অর্থনীতি যা ছিল পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত।

বঙ্গবন্ধু শিল্প কারখানাগুলো ও ব্যাংক বিমা কোম্পানিগুলো জাতীয়করণ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসেন। জমির মালিকানার সর্বোচ্চ সিলিং নির্ধারণ করে দেন। লক্ষ্য ছিল, ধীরে ধীরে পুঁজিবাদকে সঙ্কুচিত করে সমাজ থেকে শোষণ দূরীভূত করা।

কিন্তু পুঁজির মালিক, জোতদার-জমিদারেরা এই ব্যবস্থা মেনে নেয়নি। মুখে কিছু বলার সাহস না করলেও গোপনে নানাবিধ ষড়যন্ত্র করতে থাকে। সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হয় ১৯৭৫-এর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

এবারে আবার বাংলাদেশে রাজনীতি অর্থনীতির চাকা বিপরীতমুখী পথে যাত্রা শুরু করল। বাংলাদেশ ফিরে গেল পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রতিক্রিয়াশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। ব্যবস্থাটি আজও বিদ্যমান। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে আমরা আজও ফিরে যেতে পারিনি।

তাই আগের ধ্যান-ধারণার পরিবর্তে ৭৫ পরবর্তী ভাবনাই হয়ে পড়েছে নিয়ন্ত্রক। শিল্প কারখানাগুলো পুনরায় ব্যক্তি মালিকানায় ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে- ফলে মালিকেরা সেগুলো না খুলে দিব্যি মেশিনপত্র, জমি প্রভৃতি তারা জলের দামে বিক্রি করে দিয়ে টাকা পয়সা ভিন্ন ব্যবসায় খাটাতে শুরু করলেন শ্রমিক ছাঁটাই হওয়ার ফলে বেকারদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটল- নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ আজও তৈরি হয়নি।

অপরদিকে বর্তমানে করোনা মহামারি বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বকে সামাজিক-অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্য্যয়ের মধ্যে ফেলেছে।

এই পরিস্থিতিতে ৩ জুন অর্থমন্ত্রী ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে আমাদের জাতীয় সংসদে পেশ করলেন। বাজেটের প্রধান প্রধান বিষয় হলো -

বাজেটের আকার ৬,০৩,৬৮১ কোটি ৮৯ হাজার কোটি টাকা, বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। বিদেশি উৎস থেকে ঋণপ্রাপ্তি ৯৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা; অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ ১ লাখ তেরো হাজার পঁয়তাল্লিশ কোটি টাকা।

কালো টাকা বিনিয়োগ করার সুযোগ অব্যাহত থাকবে বলা হয়েছে কিন্তু যারা কালো টাকা পূর্ণাঙ্গ বা আংশিকভাবে বিনিয়োগ না করে গোপনে রেখে দেবেন- তাদের ওই টাকা সাদা করার নির্দিষ্ট মেয়াদ উল্লেখ করা হয়নি।

আকারে এবারে বাজেটের বিরাট উল্লম্ফন ঘটেছে। ২০১৯-২০ সালে বাজেটের আকার ছিল ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকা, ২০২০-২১ সালের বাজেটের আকার ছিল ৫,৬৮,০০০ কোটি টাকা সে জায়গায় ২০২১-২২ সালের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৬,০৩,৬৮১ কোটি টাকা।

ঘোষিত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে তিন কোটি পর্যন্ত আয়ে কোনো সারচার্জ দিতে হবে না; ৭০ লাখ টাকার কম আয় হলে নারী উদ্যোক্তাদের কর দিতে হবে না এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে চাকরি দিলে ৫ শতাংশ কর রেয়াত দেয়া হবে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা ১২ হাজার টাকার জায়গায় ২০ হাজার টাকা, করোনায় আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের (যারা করোনা রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত) জন্য বিশেষ সম্মানী বাবদ ১০০ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রণোদনাগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য সুতরাং অভিনন্দনযোগ্য।

কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ রাখা হয়েছে তা প্রতিবারের বাজেটেই করা হয়। কিন্তু এর ইতিবাচক ফল উল্লেখযোগ্যভাবে পাওয়া যায় না বলে অর্থনীতিবিদরা মতপ্রকাশ করেছেন। বাজেটে অবশ্য সুযোগ রাখা হয়েছে কালো টাকা আবাসন খাতে, পুঁজিবাজারে, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন শিল্প স্থাপনের। এটাও ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বরং কালো টাকার মালিকাদেরকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদনশীল ও শ্রমবান্ধব খাতে বিনিয়োগে বাধ্য করা প্রয়োজন এবং বলা দরকার যে, তা না করলে তাদের টাকা ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটকে জীবন-জীবিকার বাজেট বলে অভিহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে এটি ৫০তম এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ১৩তম বাজেট।

এবারের বাজেট প্রসঙ্গে সরকার বলছে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, আয়-ব্যয়ের ব্যবধানে ঘাটতি দাড়াচ্ছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। এটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। ঘাটতি পূরণের জন্য দুটি উৎস প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। ওই উৎস দুটির একটি হলো বিদেশি এবং অন্যটি অভ্যন্তরীণ। বিদেশি ঋণের প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার ৭৩ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫ কোটি টাকা।

বাজেটের অপর বৈশিষ্ট্য হলো- কোনো রকম কর বৃদ্ধি না করা তবে করের আওতা সম্প্রসারণ করা। বস্তুত, বাংলাদেশে বিত্তশালী মানুষেরাই কর ফাঁকি দিয়ে থাকেন বেশি। অনেকক্ষেত্রে অভিযোগ শোনা যায় কর বিভাগীয় কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ বিত্তশালীদের কর ফাঁকি দেয়ার ক্ষেত্রে সহযোগীর ভূমিকা পালন করে থাকে। একদিকে কর ফাঁকি বন্ধ করা, অপরদিকে অপেক্ষকৃত কম বিত্তশালীদেরকে কম হারে সুদ ধার্য করে করদাতার সংখ্যা দ্বিগুণে পরিণত করা প্রয়োজন।

ব্যক্তিখাতে করের সীমা বহুলাংশে বাড়ানো প্রয়োজন, কারণ দ্রব্যমূল্য হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় ম্যধবিত্ত, নিম্নবিত্তদের করদান ক্ষমতা ক্রমশ কমে আসছে। তাই দ্রব্যমূল্য যৌক্তিকভাবে কমানো ও এর অযৌক্তিক বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষির প্রসারের ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় বাধা হয়েছে বাংলাদেশের সকল নদী বেদখল হয়ে সরু খালে পরিণত হওয়া এবং এর উভয়পাশে অবৈধ দখলদারদের তৈরি বিশাল স্থাপনা। একটি মহলের সঙ্গে আঁতাত করে নদীর বিশাল অংশ অবৈধ দখলদাররা নিজনামে রেকর্ডও করিয়ে নিয়েছে।

এক্ষেত্রে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী সি.এস খাতিয়ানকে ভিত্তি করে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদীগুলো গভীর ও প্রশস্তকরণের মাধ্যমে দেশে খাদ্য উৎপাদন তিনগুণ বৃদ্ধি করা যেতে পারে, মৎস্য উৎপাদন দ্বিগুণ বাড়ানো যেতে পারে এবং নৌ চলাচলের সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়ালে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনব্যয় যথেষ্ট কমতে পারে। বড় নদীগুলোর তীরে উপযুক্ত স্থানসমূহে নদীবন্দর স্থাপন করে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। ক্ষরস্রোতা নদীগুলোতে হয়ত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে শিগগিরই দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। উদ্যোগটি বিলম্বিত তবুও এর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে ভ্যাকসিন উৎপাদন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার প্রয়োগ শুরু করতে পারলে ভ্যাকসিনপ্রাপ্তির জটিলতামুক্ত হওয়াই শুধু নয়, ওই ভ্যাকসিন বিদেশে রপ্তানি সুযোগও পাওয়া যেতে পারে।

বাজেট ঘোষণাকালে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, কর্মস্থংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বক্তব্য গতানুগতিক। দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে যে ব্যাপকভাবে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রয়োজন তা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভিন্নমত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু তার পরেও বলব এ বক্তব্য গতানুগতিক। কারণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো সুনির্দিষ্ট পথ দেখানো হয়নি।

একদিকে নদীগুলো সংস্কার, অপরদিকে ব্যাপকভাবে শিল্পায়ন ও রেলপথের ব্যাপক সম্প্রসারণের মাধ্যমে একমাত্র তা করা সম্ভব হতে পারে। নদী সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতি বিকাশের যে বিপুল ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হতে পারে- তা সম্ভবত কখনো ভাবনাতেই নেয়া হয়নি। এখন যত দ্রুত সম্ভব হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে তা ব্যাপকভাবে শুরু করা প্রয়োজন।

আর একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে তেল গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করে তা আহরণ। বঙ্গোপসাগরের বিশাল এলাকাজুড়ে তেল, গ্যাসের ব্যাপক মজুদ রয়েছে বলে বহুবার কর্তাব্যক্তিদের বক্তৃতা ভাষণে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু ওই তেল গ্যাসের কূপ খননের কাজ শুরু হওয়ার খবরটুকুও জানা যাচ্ছে না। যা জানা যাচ্ছে তা উৎসাহ সৃষ্টিতে অক্ষম।

তাই অবিলম্বে তেল-গ্যাস আহরণের জন্য কূপ খনন এবং মানসম্পন্ন কয়লা দেশের কাজে ব্যবহার শুরু করে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে বিদেশনির্ভরতা-মুক্ত করতে দ্রুত সচেষ্ট হওয়ার প্রয়োজন। বাজেটে এ ব্যাপারে উপযুক্ত বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন।

লেখক: রাজনীতিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
দারিদ্র্য বিমোচনে জয়সিঁড়িতে বাংলাদেশ
হেফাজতের অর্থবিত্ত!
মহামারি মোকাবিলায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
৩ জুনের গণনির্বাচন: মেজর জিয়ার আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায়
হায় ডাকঘর, ডাক বিভাগ!

শেয়ার করুন

মন্তব্য

জানাজা আর গার্ড অফ অনার এক নয়

জানাজা আর গার্ড অফ অনার এক নয়

কেন এ রকম একটি নিয়ম চালুর কথা উঠেছে, এ প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাহজাহান খান বলেছেন, ‘এই প্রশ্ন আসছে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে। কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়েছে, জানাজায় নারীরা অংশ নিতে পারেন না।’

খবরটি দেখে তথমত খেয়ে গেলাম। নারী নেতৃত্বাধীন একটি স্বাধীন দেশে এ রকম একটি প্রস্তাব নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনা হয় কীভাবে? খবর হচ্ছে: কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়ার সময় সরকারের নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি তুলেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ ব্যাপারে বিকল্প খুঁজতেও বলা হয়েছে ওই সুপারিশে।

কেন এ রকম একটি নিয়ম চালুর কথা উঠেছে, এ প্রশ্নের উত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বলেছেন, ‘এই প্রশ্ন আসছে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে। কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়েছে, জানাজায় নারীরা অংশ নিতে পারেন না।’

এ ক্ষেত্রে প্রথমেই যে প্রশ্নটা আসছে, সেটা হলো ‘গার্ড অব অনার’ কি জানাজা? একদম তা নয়। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধা মারা যাওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানায় প্রশাসন। গার্ড অব অনার দিতে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত থাকেন জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে সরকারের প্রতিনিধি হয়ে মরদেহে ফুলের শ্রদ্ধাও জানান সংশ্লিষ্ট ওই সরকারি কর্মকর্তা। এখানে জানাজার প্রশ্নটা এলো কোথা থেকে?

কেন এ রকম একটি বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে? কেন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নারীর উপস্থিতি ও পদমর্যাদা নিয়ে এই আপত্তি তোলা হচ্ছে? এর উত্তরে শাজাহান খান সাহেব গণমাধ্যমকে বলেছেন, “কোনো কোনো জায়গা থেকে বলা হয়েছে, জানাজায় নারীরা অংশ নিতে পারেন না। ‘গার্ড অফ অনার’ সাধারণত জানাজার সময় দেয়া হয় বলে এই সুপারিশ আসছে। যদি গার্ড অব অনার জানাজার আগে দেয় বা পরে দেয়, তখন জানাজা থাকে না। সেইটা একটা জিনিস। আমরা দেখেছি, সব জায়গায় জানাজার সময় গার্ড অব অনার দেয়। ওই জায়গায় ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করে এটা সুপারিশ করা হয়েছে।”

জানাজার সাথে ‘গার্ড অফ অনার’-এর সময়েরও কোনো সম্পর্ক নেই। একজন মানুষ মারা যাওয়ার পরে অনেকবার জানাজা পড়ানো হয়ে থাকে দিনের বিভিন্ন সময়ে। আর ‘গার্ড অফ অনার’ একবারই দেয়া হয়, বীরকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর জন্য। এ ক্ষেত্রে আগে বা পরে জানাজার প্রশ্নটি আসেই না। কেন তারা এ রকম এটি সুপারিশ পেশ করেছেন, সেটা তাদের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেনি।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক আঙ্গুর নাহার মন্টি তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, তার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উনি মারা যাওয়ার পর গার্ড অফ অনার দিয়েছিলেন একজন নারী ইউএনও। এতে ঐ শোকের সময়েও ওর অন্যরকমের একটা শান্তি লেগেছিল।

সম্মানিত সভাপতি সাহেবের কাছে আমরা জানতে চাই যে, কারা বা কোন কোন জায়গা থেকে এই আপত্তি তোলা হয়েছে? যারা আপত্তি তুলেছেন, তারা কি জানেন না যে জানাজা ও গার্ড অফ অনার এক জিনিস না? নাকি জেনেশুনেই নারীকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার বাহানা বের করছেন? মহিলার বিকল্প একজন পুরুষকে দিয়ে গার্ড অফ অনার দেয়ার বিষয়টি এনে তারা কি রাষ্ট্রীয় ডেকোরামের প্রতি প্রশ্ন তুলছেন না?

শুধু কি নারী ইউএনও? বাংলাদেশে অনেক নারী জেলা প্রশাসকও তো আছেন। জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একটি সরকারি পদ। এখানে নারী কিংবা পুরুষের কোনো প্রশ্ন আসে না। তবে কি সংসদীয় কমিটি এবার নারী ডিসি, এসপি, ইউএনও করার পথও রুদ্ধ করতে চাইবে? নারী যদি আর দশটা রাষ্ট্রীয় কাজ করতে পারেন, তাহলে এটা করতে বাধা কোথায়?

হঠাৎ একটি নিয়ম উত্থাপন করলেই চলে না। সংসদীয় কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক কিছুই এসব কমিটিতে আলোচিত হয়। কাজেই এখানে যা কিছু আলোচিত হবে, নিঃসন্দেহে তা চিন্তাভাবনা করেই আলোচনা করা দরকার।

বাংলাদেশের নির্বাহী প্রধান হিসেবে নারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ১৯৯১ সাল থেকে, অর্থাৎ ৩০ বছর। বাংলাদেশের সংসদে স্পিকারও একজন নারী। যে দেশ নারীর নেতৃত্বাধীনে ৩০ বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে, সে দেশে এত বছর পরে এ রকম একটি অদ্ভূত প্রশ্ন ওঠে কীভাবে? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন দেশের কতগুলো মডেল মসজিদ উদ্বোধন করেছেন। উনি সরকারপ্রধান হিসেবেই এটা করেছেন, কোনো নারী হিসেবে নয়। অন্য কোনো নারীকে এই কাজ করতে দেয়া হতো কি না, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। কাজেই নারী বলে নয়, নারী যে পদে অধিষ্ঠিত আছেন, সেটা ভেবেই কথা বলতে হবে।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে এ দেশের নারী সমাজ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। গান্ধীজির অসহযোগ, লবণ আইন, সত্যাগ্রহ, এ ছাড়া তেভাগা, নাচোল, টংক প্রথাবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই জোরালো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং এ দেশের আইন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। দেশে সকল প্রশাসনিক পদ নারীর জন্য উন্মুক্ত।

এ অবস্থায় এ ধরনের চরম জেন্ডার অসংবেদনশীল ও অমূলক প্রস্তাব কীভাবে সংসদীয় কমিটিতে ওঠে ও আলোচিত হয়, তা সত্যিই বিস্ময়কর। সরকার যেখানে সব ধরনের কাজে নিয়োজিত নারীর প্রয়োজনের দিকটাকে মূল্য দেয়, সরকার যেখানে কর্মক্ষেত্রে জেন্ডারবান্ধব পরিবেশ প্রণয়ন করতে চায়, সেখানে নারীর পদমর্যাদার অধিকার শুধু নারী বলে, দুর্বল অজুহাতে কেড়ে নিতে দেয়া হবে না। আশা করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টির প্রতি সহৃদয় দৃষ্টি দেবেন।

লেখক: সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন:
দারিদ্র্য বিমোচনে জয়সিঁড়িতে বাংলাদেশ
হেফাজতের অর্থবিত্ত!
মহামারি মোকাবিলায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
৩ জুনের গণনির্বাচন: মেজর জিয়ার আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায়
হায় ডাকঘর, ডাক বিভাগ!

শেয়ার করুন

অযোগ্য শহরে বসবাস

অযোগ্য শহরে বসবাস

প্রশাসনিক দিক থেকেই নয়, এখানকার বাসিন্দাদের মনমানসিকতা, সচেতনতা ইত্যাদি বিবেচনা করলেও ঢাকা শহর ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। এখানকার নাগরিকরা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে। রাস্তায় রং সাইডে গাড়ি চালায়। ট্রাফিক আইন মানে না। নিজে কোনো দায়িত্ব পালন না করে সবকিছুর জন্য সরকারকে দোষারোপ করে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ যেভাবে স্বার্থপরতায় মগ্ন, নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়, দেশপ্রেম না থাকা, অসচেতনতার হার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে পুরো দেশটাই অযোগ্য একটা দেশে পরিণত হবে।

বাংলা সিনেমার একটি জনপ্রিয় গান আছে ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে/আরে লাল লাল নীল নীল বাত্তি দেইখ্যা নয়ন জুড়াইছে/ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে...।’ গত শতকের আটের দশকে ‘অশিক্ষিত’ সিনেমার এই গানটি একসময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। পরিতাপের বিষয়, এই ঢাকা শহরই বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

চলতি বছরে ১৪০টি দেশ নিয়ে এই তালিকা তৈরি করেছে লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। এই তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ‘বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরগুলোর’ মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের তালিকা অনুসারে বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা।

কয়েক বছর ধরে বাসযোগ্যতার বিবেচনায় ঢাকার অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এর চেয়ে খারাপ অবস্থা সিরিয়ার দামেস্ক এবং নাইজেরিয়ার লাগোসের। স্বাস্থ্যসেবা-সংস্কৃতি, পরিবেশ-শিক্ষা ও অবকাঠামো কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রেখে এ তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।

নতুন এ জরিপ অনুসারে ২০২১ সালে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপানের ওসাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, বসবাসযোগ্য শীর্ষ ১০ শহরের মধ্যে নিউজিল্যান্ডের দুটি, জাপানের দুটি, অস্ট্রেলিয়ার চারটি ও সুইজারল্যান্ডের দুটি রয়েছে।

উল্লেখ্য, করোনার মোকাবিলায় কোন দেশ কেমন পদক্ষেপ নিয়েছে, এর প্রভাব পড়েছে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায়। করোনা মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে এবার নন্দিত হয়েছে নিউজিল্যান্ড।

ইআইইউর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে নিউজিল্যান্ড কঠোর লকডাউন আরোপ করেছিল। এর ফলে দেশটির অকল্যান্ড, ওয়েলিংটনসহ বিভিন্ন শহরের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়েছে। এসব শহরের মানুষ করোনা-পূর্ববর্তী জীবনে ফিরে যেতে পেরেছে।

যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা, যানবাহন সংকট, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, মশার উপদ্রব, ভয়াবহ যানজট, পয়োনিষ্কাশনের করুণ অবস্থা, জলাবদ্ধতা, রাস্তাঘাটের করুণ দশা, ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি প্রভৃতি সমস্যায় ঢাকা নগরী বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় ঢাকা নগরীতে জীবনযাপন যে সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ তা কারো অজানা নয়। এই ময়লা-আবর্জনার পাশাপাশি ভয়াবহ বায়ু ও শব্দদূষণের কারণে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে আমাদের প্রিয় নগরী। এখানে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের বদলে আমরা নিচ্ছি কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিষ।

সহনীয় মাত্রার চেয়ে ছয় গুণ বেশি সিসাসহ বিভিন্ন দূষিত পদার্থ মিশে আছে ঢাকার বাতাসে। দূষণে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে মানুষ। ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষণমুক্ত নয়। বিষাক্ত বর্জ্যে ভরা এসব নদী থেকেও দূষণ ছড়াচ্ছে।

একদিকে ঢাকায় বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই, অপরদিকে পুরান ঢাকায় মানুষের বাস জরাজীর্ণ ভবনে। সব মিলিয়ে ঢাকার বাসিন্দারা ভালো নেই।

পৃথিবীতে রাজপথকে দেখা হয় শহরের জীবননালি হিসেবে। মোটামুটি সচ্ছল দেশেও সেই জীবননালিকে সুন্দর, সবুজ ও গতিশীল রাখা হয়। একসময়কার কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা দিল্লির থেকেও ঢাকা সুন্দর ও স্বচ্ছন্দ ছিল। কিন্তু তা আজ কেবলই ইতিহাস।

ঢাকা বিশ্বের ঘনবসতিতম শহর, ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে বেশি, ঢাকা ভূমিকম্প-ভবনধস, অগ্নিকাণ্ড-জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের লীলাভূমি হওয়ার সঙ্গে এ শহরের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতারও যোগাযোগ আছে। ঢাকার পানির স্তর যত নেমে যাচ্ছে, ততই এই শহর পরিত্যক্ত হওয়ার দিকে গড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পদের অভাব নয়, সম্পদের ভুল ও স্বার্থতাড়িত ব্যবহারই ঢাকার দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী।

ঢাকা শহরে সবচেয়ে বড় আপদের নাম জ্যাম। রাস্তায় বের হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে বসে থাকতে হয়। এখানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা আছে, যা কখনও মিটারে চলে না। নিজেদের ইচ্ছে ও পছন্দমতো গন্তব্য ছাড়া যায় না।

অ্যাপভিত্তিক যেসব পরিবহন আছে, সেগুলো পেতেও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। এখানে হাঁটার মতো ফুটপাত নেই। ফুটপাত সব হকার ও ছোট ব্যবসায়ীদের দখলে। ফুটপাত দিয়ে সাইকেল মোটরসাইকেলও দেদার চলাচল করে। হেঁটে চলাটাও এখানে অনেক বিপজ্জনক।

গণপরিবহনে কোনো শৃঙ্খলা নেই। ভাড়া নিয়ে কোনো নিয়মনীতি নেই। যাত্রী তোলা নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকে চালকদের মধ্যে, দক্ষ চালকও নেই। রাস্তায় অনেক বেশি যানবাহন থাকার কারণে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে বার বার আলোচনা এমনকি বড় ধরনের একটি আন্দোলন হওয়ার পরও এ খাতটিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ঢাকা শহরে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মানুষ বসবাস করেন। ফলে নাগরিক সুযোগসুবিধা অপ্রতুল। অনেক এলাকায় সকাল-বিকাল গ্যাস থাকে না বললেই চলে। সেই সঙ্গে নিয়মিত পানি সরবরাহ পাওয়া যায় না।

সারা বছর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সংস্থার নামে উন্নয়ন কাজ চলে। ফলে রাস্তা কাটাকাটি-খোঁড়াখুঁড়িও নিয়মিত দৃশ্য। একেকবার একেক কর্র্তৃপক্ষ এসে রাস্তা কাটে, কখনও বিদ্যুতের জন্য কাটা হচ্ছে, কখনও গ্যাস আবার কখনও ওয়াসা। অর্থাৎ একেকজন একেক সময় রাস্তা কাটে আর মানুষজন চরম দুর্ভোগ পোহায়। কোনো সমন্বয় নেই, পরিকল্পনা নেই, নেই কোনো প্রতিকারও।

ঢাকা শহর থেকে গাছপালা বা সবুজ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। পার্ক-খেলার মাঠ, নদী-খাল বেদখল হয়ে যাচ্ছে। যা দু-চারটা পার্ক আছে তাও ব্যবহার উপযোগী নয়। স্ট্রিট লাইটগুলো ঠিকমতো জ্বলে না। পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নেই, যেগুলো আছে সেগুলো ব্যবহারোপযোগী নয়।

খেলার মাঠগুলো রাজনৈতিক দলের লোকেরা দখল করে নিচ্ছেন। এদিকে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সহায়-সম্বলহীন দরিদ্র মানুষের ঢাকামুখী স্রোত। কাজের অভাব, জলবায়ুর প্রভাব যেমন ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং কর্মসংস্থানের সন্ধানে মানুষ প্রতিনিয়তই ঢাকামুখী হচ্ছে। এই বাড়তি মানুষের চাপ সামলানোর কোনো উদ্যোগ নেই। এদের গ্রামে পুনর্বাসনেরও কোনো পরিকল্পনা নেই।

ঢাকা শহরে রাস্তাঘাট, ভবন নির্মাণ, যানজট, গণপরিবহন, এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো দেখার জন্য আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কোনো সমন্বয় নেই, নেই তাদের কোনো জবাবদিহি।

আর শুধু প্রশাসনিক দিক থেকেই নয়, এখানকার বাসিন্দাদের মনমানসিকতা, সচেতনতা ইত্যাদি বিবেচনা করলেও ঢাকা শহর ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। এখানকার নাগরিকরা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে। রাস্তায় রং সাইডে গাড়ি চালায়। ট্রাফিক আইন মানে না। নিজে কোনো দায়িত্ব পালন না করে সব কিছুর জন্য সরকারকে দোষারোপ করে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ যেভাবে স্বার্থপরতায় মগ্ন, নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয়, দেশপ্রেম না থাকা, অসচেতনতার হার যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে পুরো দেশটাই অযোগ্য একটা দেশে পরিণত হবে।

ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। কেবল মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। এর জন্য আরও অনেক কিছু করতে হবে।

ঢাকাকে অত্যাধুনিক এবং পরিবেশবান্ধব শহর হিসেবে গড়তে হলে সবার আগে ঢাকার ভেতর থেকে সচিবালয়, বিদেশি দূতাবাস, বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বিডিআর সদর দপ্তর ও ক্যান্টনমেন্টের মতো বড় স্থাপনাগুলো স্থানান্তর করে রাজধানীর বাইরে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব হাইরাইজ ভবন নির্মাণ করলে ঢাকা হবে যানজটমুক্ত একটি আধুনিক শহর। মানুষ ফিরে পাবে সুন্দর জীবনযাপনের একটি নতুন ঠিকানা।

ইকোনমিস্ট-এর এই প্রতিবেদনটিকে হেলাফেলা করে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, এই প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে, ঢাকা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী একটি নেতিবাচক ধারণাই প্রচার পেয়েছে। যে দেশে সরকারিভাবে সব সময় ‘উন্নয়নের জোয়ার বইছে’ বলে প্রচার করা হয়, সেই দেশের রাজধানীই যদি ‘বসবাসের অনুপযোগী’ তকমা পায়, তাহলে সেটা কীসের উন্নয়ন? যে উন্নয়ন নাগরিকদের জীবনের মান ও বাসযোগ্য পরিবেশ উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না, সেটা কীসের উন্নয়ন? আসলে পরিবর্তন আনতে হবে মানুষগুলোর মানসিকতায়। এই মানুষই সিঙ্গাপুর বানায়! আবার এই মানুষই ঢাকা বানায়! সুতরাং দেখতে হবে মানুষগুলো কারা এবং কেমন তাদের মানসিকতা!

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
দারিদ্র্য বিমোচনে জয়সিঁড়িতে বাংলাদেশ
হেফাজতের অর্থবিত্ত!
মহামারি মোকাবিলায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
৩ জুনের গণনির্বাচন: মেজর জিয়ার আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায়
হায় ডাকঘর, ডাক বিভাগ!

শেয়ার করুন

করোনার টিকায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিন্যাস

করোনার টিকায় নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিন্যাস

গামালিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের দাবি স্পুৎনিক-ভির কার্যকারিতা আরও বেশি। প্রায় ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অপরদিকে সম্প্রতি টিকাটির আরেকটি সংস্করণ এনেছে রাশিয়া। এক ডোজের এই টিকার নাম দেয়া হয়েছে স্পুৎনিক লাইট। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনা প্রতিরোধে এক ডোজের এই টিকা ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশ এই টিকাটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমতি এখনও দেয়নি, যেটিকেও একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

করোনাভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনার বর্তমান আপাতত কার্যকর কৌশল হচ্ছে টিকা। বর্তমানে ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে টিকার আবিষ্কার ও বাজারজাতকরণ নিয়ে প্রতিযোগী দেশগুলোর কৌশল। ভাইরাসের সংক্রমণের শুরুতে মানবিক পৃথিবী কিংবা জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বের যে আশাবাদ সামনে এসেছিল, দিন দিন তা ফিকে হয়ে আসছে। এখন সামনে এসেছে টিকা রাজনীতি।

এই নিয়ে চলছে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই। মোটা দাগে পাঁচটি দেশ এখন করোনার টিকার রাজনীতিতে সক্রিয়: চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও ভারত। এই দেশগুলো করোনার টিকাকে তাদের কূটনীতির হাতিয়ারে পরিণত করেছে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন হয়ে গেছে যে, কে টিকা পাবে কে পাবে না, তা নির্ভর করছে এই দেশগুলোর সঙ্গে কার কেমন সম্পর্ক তার ওপরে।

আমরা দেখেছি, করোনার টিকা বাজারে আসার আগে থেকেই দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভারতকেন্দ্রিক প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। এর কারণ হচ্ছে, এসব দেশে সুলভে সরবরাহের শর্তে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স নিয়েছিল ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশ তখন দারুণ দক্ষতা দেখিয়ে আগাম অর্থ দিয়ে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা কেনার চুক্তি করে বেশ কিছু টিকাও নিয়ে আসে।

অপরদিকে ভারতও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার টিকার বাজারের একচেটিয়াকরণ করে। তারা কৌশলে চীনের টিকাগুলোকে আঞ্চলিক বাজার থেকে সরিয়ে দেয়। পাকিস্তান বাদে সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশকেই ভারত বিপুল পরিমাণে টিকা উপহার দেয়।

এমনকি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এমন কিছু দেশকেও তারা উপহার হিসেবে বিপুল পরিমাণে টিকা পাঠায়। তবে সম্প্রতি দেশটিতে ভাইরাসের সংক্রমণ বহুগুণ বেড়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সিরাম ইনস্টিটিউট ভারতের স্থানীয় চাহিদা পূরণেই হিমশিম খাচ্ছে।

ফলে ভারত টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। বেশি মানুষকে টিকা দিতে রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি দেশটি এখন বিভিন্ন দেশ থেকে টিকা আমদানি করছে৷

ভারত ছাড়া বিশ্বে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি দেশ টিকা উৎপাদন করছে। এর ফলে বাকি দেশেগুলোর টিকাদান কর্মসূচি নির্ভর করছে এই গুটিসংখ্যক দেশের ওপর। এ কারণে সৃষ্ট ভারসাম্যহীন নির্ভরশীলতার কারণে ভ্যাকসিনের চাহিদা ও সরবরাহে দেখা দিয়েছে অসামঞ্জস্যতা।

অপরদিকে পেটেন্টের কারণেও চাইলেই টিকার উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। এই নিয়েও আছে রাজনীতি। ওষুধ কোম্পানিগুলো টিকার সূত্র কিনে রেখেছে। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এদের বাইরে কেউ টিকা উৎপাদন করতে পারছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া এবং চীন নিজেদের অনুকূলে থাকা পররাষ্ট্রনীতির বিনিময়ে বিভিন্ন দেশে টিকা সরবরাহ ও উৎপাদনের অনুমতি প্রদান করেছে।

প্রসঙ্গত, বিশ্বের অনেক দেশই এখন টিকা বানাতে প্রস্তুত, কিন্তু অপেক্ষা শুধু টেকনোলজি ট্রান্সফারের। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রও টিকার পেটেন্টে সাময়িক ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। তবে পেটেন্ট ও মেধাস্বত্বে ছাড় দেয়ার প্রসঙ্গ ওঠার পর থেকে এর বিরোধিতাও জোরালো হয়ে উঠেছে। ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

করোনা মহামারি এখন বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই সুবিধাকেই সক্রিয়ভাবে কাজে লাগাতে চাইছে চীন ও রাশিয়া। কেবল পররাষ্ট্র-নীতিমালা নিয়ে আপসের মাধ্যমে নয়, বরং টিকার বদলে তারা নিজেদের অনুকূলে ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনেও মনোযোগ দিয়েছে। ভারতের কথা তো আগেই বলা হয়েছে। চীন ও রাশিয়াও একইভাবে টিকাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ায় স্পুৎনিক-ভি পাঠানোর শর্তে সিরিয়ায় আটক রাশিয়ান নাগরিকের মুক্তির দাবি তুলেছিল রাশিয়া। এই টিকা রাজনীতির কল্যাণেই রাশিয়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশেও সখ্য গড়ে তুলেছে দেশটি। একইভাবে মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপিয়ান দেশগুলোকে নিজেদের ভূ-রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্যে রাশিয়া ভ্যাকসিন সরবরাহ করেছে। এদিকে নতুন করে ফাঁস হওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, টিকা কূটনীতির মাধ্যমে তাইওয়ানের বিষয়ে প্যারাগুয়ের অবস্থান পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে সফল হয়েছে চীন। এ ছাড়া টিকার চালানের পূর্বশর্ত হিসেবে ব্রাজিলের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশটির ফাইভ-জির বাজার হুয়াওয়ের জন্য উন্মুক্ত করেছে চীন।

ভারতে ডাবল মিউটেটেড ও ট্রিপল মিউটেটেড ভ্যারিয়েন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও ভাইরাসের এই ভ্যারিয়েন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেছে। এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণে মৃত্যুর ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। অপরদিকে ভারত থেকে নিকট ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত টিকার চালান পাওয়া না-ও যেতে পারে, আবার সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে টিকা না পাওয়া মানে কোভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি থেকেও টিকা না পাওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হওয়া।

এসব ইক্যুয়েশন সামনে রেখে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রাশিয়া ও চীনের করোনা টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এটিই ছিল সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

ভারত অসন্তুষ্ট হতে পারে এই কারণে পূর্বে চীনা টিকার পরীক্ষা ও সরবরাহের প্রস্তাব নাকচ করেছিল সরকার। তবে সম্প্রতি চীনের সিনোফার্ম এবং সিনোভ্যাকের উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের টিকার জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বর্তমানে একই সঙ্গে সব পক্ষকে ম্যানেজ করার নীতিতে এগোচ্ছে সরকার। কারণ, অতীত অভিজ্ঞতা সামনে রেখে ভবিষ্যতেও কেউ যদি টিকা দিতে না পারে, তখনকার পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা সামনে রেখেই কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করা হচ্ছে।

তা ছাড়া কেবল বাংলাদেশই নয়, ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানির মতো নাক উঁচু পশ্চিমের অনেক দেশই এখন চীন ও রাশিয়ার টিকা নেয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। পশ্চিমা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম প্রথম দিকে চীন ও রাশিয়ার উদ্ভাবিত করোনার টিকাকে পাত্তা না দিলেও বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। কার্যত কোনো উপায় না পেয়েই তারা পশ্চিমা দুনিয়ার বাইরের টিকা নেয়ার গরিমা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। অপরদিকে চীনও ঘোষণা করেছে, তাদের সিনোভ্যাক এবং সিনোফার্ম ভ্যাকসিন দুটি ‘বৈশ্বিক জনসাধারণের সম্পদ’।

তা ছাড়া তথ্য-উপাত্ত বলছে, এই দুই রাষ্ট্রের উদ্ভাবিত করোনার টিকাও বেশ কার্যকর। রাশিয়ার টিকা স্পুৎনিক-ভির মানবদেহে পরীক্ষার অন্তর্বর্তী ফলাফল প্রকাশ করেছে শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট। এতে দেখা গেছে, টিকাটি ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ কার্যকর।

অপরদিকে টিকাটির প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গামালিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের দাবি স্পুৎনিক-ভির কার্যকারিতা আরও বেশি। প্রায় ৯৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

অপরদিকে সম্প্রতি টিকাটির আরেকটি সংস্করণ এনেছে রাশিয়া। এক ডোজের এই টিকার নাম দেয়া হয়েছে স্পুৎনিক লাইট। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনা প্রতিরোধে এক ডোজের এই টিকা ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশ এই টিকাটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই টিকা জরুরি ব্যবহারের অনুমতি এখনও দেয়নি, যেটিকেও একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

একসময় টিকা তৈরির সক্ষমতা বাংলাদেশেরও ছিল। মহাখালীতে অবস্থিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ছয় ধরনের টিকা উৎপাদন করত এবং তা বিদেশে রপ্তানিও হতো। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শে ২০১১ সালে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে এখন আবার সময় এসেছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করে পুনরায় টিকা উৎপাদনে যাওয়ার। তা ছাড়া যদি প্রতিবছর টিকার বুস্টার হিসেবে একাধিক ডোজের প্রয়োজন পড়ে, তাহলে বিশ্বের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাই বেশি।

তাই চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে টেকনোলজি ট্রান্সফারের মাধ্যমে দেশেই টিকার উৎপাদন বিষয়ে যে আলাপ-আলোচনা চলছে, এটাকে গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদের জন্য আশার আলো হতে পারে দেশে উদ্ভাবিত টিকা বঙ্গভ্যাক্স। এই টিকাটির মানবদেহে ট্রায়ালের বিষয়ে দ্রুত পজিটিভ সিদ্ধান্তে আসা উচিত। হবে হবে করেও অনেক দিন ধরেই এটি হচ্ছে না। টিকাটি ৯৫ শতাংশ কার্যকর এবং গুরুতর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এই কাজগুলো করে ফেলা গেলে আগামী দিনে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অন্যতম টিকা উৎপাদনকারী দেশ। শুধু নিজেদের জন্য নয়, বিশ্ববাজারের জন্যও।

টিকার প্রয়োজন বহাল থাকতে পারে দীর্ঘদিন। পুরোনো ভূ-রাজনৈতিক সম্পদের দখলদারত্ব থেকে যে উপনিবেশবাদ রাজনীতির সূচনা হয়েছিল, করোনাকালে তা এখন রূপ নিয়েছে বৈশ্বিক টিকা রাজনীতিতে। এই রাজনীতির খপ্পরে পড়ে কোনো অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত যাতে না নেয়া হয়, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সচেষ্ট থাকতে হবে।

লেখক: কবি ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
দারিদ্র্য বিমোচনে জয়সিঁড়িতে বাংলাদেশ
হেফাজতের অর্থবিত্ত!
মহামারি মোকাবিলায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
৩ জুনের গণনির্বাচন: মেজর জিয়ার আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায়
হায় ডাকঘর, ডাক বিভাগ!

শেয়ার করুন

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পূর্বাপর ও বঙ্গবন্ধু

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পূর্বাপর ও বঙ্গবন্ধু

ফজলুল হক ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। নতুন মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী হলেন ফজলুল হক। বঙ্গবন্ধু এই মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্তশাসন আদায়ের ব্যাপারে চেষ্টা চালাতে থাকেন। এই মন্ত্রিসভা বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমি করার প্রস্তাব গ্রহণ করে।

পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকার রাজনৈতিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিল। তারা পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের তারিখ বার বার পিছাতে থাকে। অবশেষে ১৯৫৪ সালের মার্চে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের কথা ঘোষিত হয়। ইতিমধ্যে শাসক দল মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এ দেশের রাজনীতিবিদরা সতর্ক হয়ে যান।

নির্বাচনে মুসলিম লীগের মোকাবিলা করার জন্য সকল বিরোধী রাজনৈতিক দল মিলে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে জনগণকে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অনুপ্রাণিত করে তোলে। যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনি তৎপরতায় তরুণ শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র থাকাকালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই আন্দোলনের সূত্রে ১৯৪৬ সালে প্রথমে কলকাতা ও পরে বিহার এবং পূর্ববাংলার কয়েকটি স্থানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং আক্রান্ত মুসলমানদের রক্ষা করতে তরুণ শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ সময়ই তার রাজনৈতিক জীবনপর্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এসে দাঁড়ায়।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান অর্জিত হলে সবচেয়ে খুশি হওয়ার কথা পাকিস্তান আন্দোলনের মাঠের যোদ্ধা পূর্ববাংলার বাঙালির। শুরু থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলিম লীগ নেতাদের হাতে পাকিস্তানি শাসনক্ষমতা চলে গেলেও বাঙালি নেতারা এ নিয়ে আপত্তি তোলেননি। তারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের মুসলমান ভাই হিসেবেই মনে করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানি নেতাদের মধ্যে এই উদারতা ছিল না।

এ কারণে শাসকদের আচরণে ক্রমে বাঙালি স্বাধীনতার কটু গন্ধ অনুভব করল। ভাষা প্রশ্নে সংকট তৈরি করে ফেলল শাসকগোষ্ঠী। পাকিস্তানি নেতারা জানেন বাঙালি সংস্কৃতির একটি উজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে। এই সাংস্কৃতিক শক্তি তাদের স্বাজাত্যবোধকে শক্তিমান করে তুলবে। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর শোষণ প্রক্রিয়া বজায় রাখা সম্ভব হবে না। তাই বাঙালি প্রজন্মকে সংস্কৃতিবিচ্ছিন্ন করার জন্য সংস্কৃতির বাহন বাংলা ভাষাকে অচেনা করে দিতে চাইল। ১৯৪৮-এর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এখানেই রচিত হয়।

আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লড়াকু ছাত্রনেতা শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। যা ভীত করে তুলেছিল পাকিস্তানি শাসক চক্রকে। যে কারণে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের আগেই বঙ্গবন্ধুকে কারারুদ্ধ করা হয়। কারাগারে থেকেও বঙ্গবন্ধু নানাভাবে প্রাণসঞ্চার করেছিলেন ভাষা আন্দোলনের।

ভাষা আন্দোলন দমনে ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়ে রক্তাক্ত করার পাকিস্তানি নীতিকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলার মানুষ গ্রহণ করতে পারেনি। তাই শাসকদের রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের প্রতি বাঙালি নেতারা আস্থা রাখতে পারেননি। এদের অনেকেই ১৯৪৯-এ গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগে যুক্ত হতে থাকেন। আরও রাজনৈতিক দল গঠনেরও সম্ভাবনা তৈরি হয়।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা অর্জিত হলেও তা অনেকটা মৌখিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে থেকে যায়। তখনও পাকিস্তানের কোনো সংবিধান রচিত না হওয়ায় তা আইনত বিধিবদ্ধ হতে পারেনি। ফলে বাঙালি নেতারা আস্থা রাখতে পারেননি পাকিস্তানি শাসকদের প্রতিশ্রুতিতে।

এমন একটি অবস্থায় পাকিস্তান সরকার ১৯৫৩ সালের মাঝামাঝি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। নির্বাচনে মুসলিম লীগকে প্রতিহত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ মোর্চা গঠন করে নির্বাচন করার চিন্তা অনেকেই করছিলেন। এই প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতারা মোটামুটি একমত হয়েছিলেন দলের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র স্পষ্ট করার জন্য ‘মুসলিম’ শব্দটি উঠিয়ে দলের নাম করা হবে আওয়ামী লীগ। কাউন্সিল অধিবেশনে উত্থাপনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগ নামটিই ব্যবহৃত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুও তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এ সময়ের কথা বর্ণনাতে ‘আওয়ামী লীগ’ই বলেছেন।

শেরেবাংলা একে ফজলুল হক তখন ঢাকা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জেনারেল ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি পদত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন। বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব নেন হক সাহেবকে আওয়ামী লীগে নিয়ে আসার। ফজলুল হক বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দেন। তবে যোগদান তখনও করেননি। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লেখেন- “চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের জনসভায় হক সাহেব বলেন,‘যাঁরা চুরি করবেন তাঁরা মুসলিম লীগে থাকুন, আর যাঁরা ভালো কাজ করতে চান তাঁরা আওয়ামী লীগে যোগদান করুন।”

বঙ্গবন্ধুকে সকলের সামনে উপস্থিত করিয়ে বলেন, “মুজিব যা বলে তা আপনারা শুনুন। আমি বেশি বক্তৃতা করতে পারবো না।”

নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নেতারা দুই ধরনের মতে বিভক্ত হয়ে পড়েন। ছোট পক্ষ যুক্তফ্রন্ট গঠন করে ঐক্যবদ্ধ মোর্চায় নির্বাচন করতে চান। অন্যরা মনে করেন আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করবে। শেখ মুজিব ও মওলানা ভাসানী যুক্তফ্রন্টের পক্ষে ছিলেন না। মুসলিম লীগ থেকে যারা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন তাদের প্রতি খুব ভালো ধারণা ছিল না মওলানা ভাসানীর। হক সাহেব আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট গঠনের পক্ষে যারা তাদের কেউ কেউ হক সাহেবকে বোঝান আওয়ামী লীগে যোগ না দিয়ে আলাদা দল গঠন করে যুক্তফ্রন্টে যোগ দিলে লাভ বেশি হবে।

মওলানা ভাসানীর নির্দেশে শেখ মুজিব ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ডাকেন। এই সম্মেলনে যুক্তফ্রন্ট গঠনের পক্ষে-বিপক্ষে মতানৈক্য প্রবল হলো। যুক্তফ্রন্ট গঠনের পক্ষের মানুষই ছিলেন বেশি। বাস্তব অবস্থা দেখে বুঝলেন এমন বিভেদ প্রকাশ্যে চলে এলে মানুষ ভাববে আওয়ামী লীগের মধ্যে ঐক্য নেই। যাহোক শেষ পর্যন্ত যুক্তফ্রন্ট গঠনের পক্ষে ঐকমত্যে পৌঁছলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তফ্রন্টের অংশীদার হওয়ার জন্য এ কে ফজলুল হক কৃষক শ্রমিক দল গঠন করলেন।

শেখ মুজিব যুক্তফ্রন্টের পক্ষে গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচন করার জন্য নমিনেশন পান। অর্থশালী মুসলিম লীগের নেতা জনাব ওয়াহিদুজ্জামান শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তাকে এগিয়ে রাখে। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু প্রায় ১০ হাজার ভোট বেশি পেয়ে জয়লাভ করেন।

যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা ছিল মূলত পূর্ববাংলার জনগণের স্বায়ত্তশাসনের দাবি। যে কারণে যুক্তফ্রন্ট তার ২১ দফার প্রতি জনগণের পূর্ণ সমর্থন লাভ করে, যার প্রতিফলন নির্বাচনে লক্ষ করা যায়। ১৯৫৪ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে এবং যুক্তফ্রন্ট বিপুল সংখ্যাধিক্যে জয়ী হয়। পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদের মোট আসনসংখ্যা ছিল ৩০৯টি। আসনগুলো মুসলিম এবং অমুসলিম এ দুটি পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। মুসলিম আসন সংখ্যা ২৩৭ এবং অমুসলিম আসনসংখ্যা ছিল ৭২। মোট আসনের ২৩৬টি আসনই যুক্তফ্রন্ট পায়।

নির্বাচনের ফলাফল বের হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু ঢাকায় আসেন। রেলস্টেশনে তাকে বিশাল অভ্যর্থনা জানানো হয়। এরপর যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ এমএলএ বৈঠক করে। এবার মন্ত্রিসভা গঠনের প্রশ্ন আসে। এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে শুরু হয় মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া। ফজলুল হক ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। নতুন মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী হলেন ফজলুল হক। বঙ্গবন্ধু এই মন্ত্রিসভার সদস্য হলেন। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্তশাসন আদায়ের ব্যাপারে চেষ্টা চালাতে থাকেন। এই মন্ত্রিসভা বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমি করার প্রস্তাব গ্রহণ করে।

ফজলুল হক প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। ১৯৫৪ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি আমন্ত্রিত হয়ে কলকাতায় যান। সেখানে বক্তৃতা দেয়ার সময় উল্লেখ করেন যে, ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে দুই বাংলা অভিন্ন।’

এবার মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় নেতারা সুযোগ খুঁজে পেলেন। তারা দেখতে পেলেন এই বক্তৃতার সূত্রে ফজলুল হককে অপসারণ করা যেতে পারে। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের অজুহাতে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। প্রচার করা হয় ফজলুল হক ভারতের কাছে পূর্ব পাকিস্তান বিক্রি করে দিতে চান। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তানের নানা অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো হতে থাকে। আর সব দায় দেয়া হতে থাকে যুক্তফ্রন্ট সরকারের ওপর। অতঃপর যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে ভেঙে দেয়া হয়। অবসান হয় পূর্ববাংলার সংসদীয় গণতন্ত্রের।

পাকিস্তানের প্রাথমিক পর্বে পূর্ববাংলার শাসনক্ষমতায় স্বল্পকাল স্থায়ী বাঙালির শাসনকাঠামোয় বঙ্গবন্ধু ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন। যা পরবর্তী বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাকে বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
দারিদ্র্য বিমোচনে জয়সিঁড়িতে বাংলাদেশ
হেফাজতের অর্থবিত্ত!
মহামারি মোকাবিলায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
৩ জুনের গণনির্বাচন: মেজর জিয়ার আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায়
হায় ডাকঘর, ডাক বিভাগ!

শেয়ার করুন

কোয়াড ইস্যুকে ধামাচাপা দিতে টিকায় ছলনা চীনের

কোয়াড ইস্যুকে ধামাচাপা দিতে টিকায় ছলনা চীনের

বাংলাদেশে দৃঢ় নেতৃত্বের অধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে সংযুক্ত করে এমন এক বড় প্রকল্পে নিজেদের যুক্ত রাখতে চান, যা চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভব নয়। আর সে কারণেই চীনের আর্থিক সহায়তা প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ। নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ চীনের যে নীতির শিকারে পরিণত হয়েছে, তা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতেই চীনের কাছ থেকে দ্রব্যসামগ্রী বা প্রযুক্তিগত সহায়তা নিলেও আর্থিক কোনো সহায়তা নিতে রাজি হয়নি বাংলাদেশ।

কোয়াড ইস্যুতে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূতের ভুল(!) বাংলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক শীতল বাক্যবিনিময় হয়ে গেছে দেশটির। আর সেই সম্পর্ক উষ্ণ করতেই বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কা থেকে ৫ ডলার কম মূল্যে ১০ ডলারে সিনোফার্মের টিকা বিক্রির প্রস্তাবে রাজি হয় চীন। কিন্তু সম্প্রতি টিকার মূল্য প্রকাশিত হওয়ার পর আবারও সম্পর্কে ভাটা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে চীন-বাংলাদেশের।

শ্রীলঙ্কার বিরোধীদলীয় নেতা ড. হারসা দে সিলভা বলেছেন, বাংলাদেশের তুলনায় শ্রীরঙ্কা যে মূল্যে চীন থেকে টিকা নিচ্ছে, তাতে আমাদের ১৪ বিলিয়ন ডলার বেশি খরচ হবে। ‘আমাদের বন্ধু হিসেবে চীন পরবর্তী চালানে টিকার মূল্য কমাতে পারে না?’- এমন প্রশ্ন করেছেন তিনি টুইটারে।

তিনি আরও লিখেছেন, শ্রীলঙ্কার সরকার বলছে বাংলাদেশ ১০ ডলারে চীনের টিকা কেনেনি। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা থেকে জানানো হয়েছে, ১৯ মে ১০ ডলারে চীনের সিনোফার্মের ১৫ মিলিয়ন টিকা কেনার অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পরও শ্রীলঙ্কার বর্তমান সরকার চীনের পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা করেছে।

রাজাপাকসের সরকার দাবি করেছে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এমন কোনো চুক্তিই হয়নি, যার প্রেক্ষাপটে ঢাকা ১০ ডলারে টিকা পাবে। এ বিষয়ক চুক্তি এখনও সম্পন্ন হয়নি, বরং সম্পন্ন হওয়ার পথে রয়েছে। তারা সেটাই বলেছে যা কলম্বোর চীন অ্যাম্বাসি থেকে বলা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয় নিয়ে দারুণ ঝড় উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, শ্রীলঙ্কার বন্ধু চীন এতদিন যাবৎ যা অর্থ সহায়তা করেছে তা বেশি দামে টিকা সরবরাহের মাধ্যমে উশুল করে নিচ্ছে। এর আগে বেইজিং শ্রীলঙ্কায় নিজেদের কর্তৃত্বমূলক আচরণ বজায় রাখতে ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন সিনোফার্মের ডোজ সরবরাহ করেছে। এর মাধ্যমে দেশটির উত্তর প্রদেশে উইন্ডমিল প্রকল্প নিজেদের করে নিতে চায় চীন, যা তাদের না দেয়ার বিষয়ে অনুরোধ করে আসছে ভারত।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, চীনের সিনোফার্মের টিকার মূল্য ভারতের অ্যাস্ট্রাজেনেকার (কোভিশিল্ড) টিকার থেকে বেশি। যার প্রতিটি ডোজের মূল্য ৫ দশমিক ৫ ডলার। সেই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা সিনোফার্মের টিকার থেকে অনেক বেশি কার্যকর। মধ্যপ্রাচ্যে সিনোফার্মের টিকার তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপ পর্যন্ত ব্যবহার করতে হচ্ছে, যেখানে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দুই ডোজেই কাজ করছে। এ অবস্থায় সিনোফার্মের টিকার প্রকৃত ব্যয় কয়েক গুণ হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে। সেই সঙ্গে তাদের টিকার ওপর নির্ভর করেও থাকতে হতে পারে।

প্রাথমিকভাবে কলম্বোর চায়না অ্যাম্বাসি ঢাকার কাছে ১০ ডলারে টিকা বিক্রির বিষয়টিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে চালিয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন যে, চীন এই তথ্য প্রকাশে বিরাগভাজন হয়েছে। বাংলাদেশে এই টিকার মূল্য প্রকাশে কোনো ভুল দেখছি না আমি। কেননা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে যে, এই টিকার মূল্য তারা কাউকে জানাবে না। কিন্তু এ তথ্য প্রকাশ করেছে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জাতীয় দৈনিক। আমার কাছে যে বিষয়টি আশ্চর্যজনক মনে হচ্ছে, তা হলো কোন প্রক্রিয়ায় চীন তার ভ্যাকসিনের মূল্য নির্ধারণ করেছে!

এ বিষয়ে খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জানান, সিনোফার্মের টিকার মূল্য প্রকাশ হওয়া কিছুটা অখুশি চীন। ঢাকার ইংরেজি এক জাতীয় দৈনিকে বলা হয়, ঢাকার সঙ্গে চীনের চুক্তি অনুসারে ‘টিকার মূল্য প্রকাশ করা যাবে না’। বেসরকারি টেলিভিশনে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘এই তথ্য প্রকাশিত হওয়ায় আমরা দুঃখিত।’

তিনি বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করতে আরও স্পষ্ট করে জানান, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আর এই মূল্যে টিকা পাবে না চীনের কাছ থেকে। চীন বাংলাদেশকে এমন এক তথ্য গোপন রাখতে বলেছে, যা গোপন রাখা সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক এক দেশের পক্ষে কষ্টকর। আর সে কারণেই এই শর্তের মাধ্যমে আসলে বাংলাদেশের সঙ্গে একধরনের ছলনার আশ্রয় নিয়েছে চীন।

চীন শ্রীলঙ্কাকে ঋণ, ব্যবসায়িক সুবিধা এবং উপহার প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছে। আর বিনিময়ে দেশটির একটি বন্দরকে ৯৯ বছরের জন্য নিজেদের করে নিয়েছে। সেই সঙ্গে হাম্বানতোতা বন্দরও তারা নিজেদের করে নিয়েছে যখন শ্রীলঙ্কা তাদের ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হয়।

এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় এক বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে শ্রীলঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ার ‘শিকারি’ রাষ্ট্র চীন, যারা এই অঞ্চলের সব উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে যেই ভূ-রাজনৈতিক সংকট শ্রীলঙ্কা তাদের জন্য তৈরি করেছে তা বিশ্বের কাছে অজানা নয় এবং এ বিষয়ে বেশ সচেতনভাবেই নিজ পথ বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত (আরও অনেক দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে) কোয়াড নিয়ে দারুণ দুশ্চিন্তায় রয়েছে চীন। আর সে কারণেই তার সঙ্গে উন্নয়ন কার্যক্রমে জড়িত দেশগুলোকে কোয়াডে যোগ না দেয়ার জন্য বলছে দেশটি। এমনকি কোয়াডে যোগ দিলে চীনের সঙ্গে অপর দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি হতে পারে বলেও জানানো হচ্ছে।

চীন তার ‘পার্ল ট্রেড’ নীতি নেপাল থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। মধ্যখানে থেকে বাদ থাকছে ভারত। আর তাদের এই নীতিমালায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। কেননা এখন থেকে আরব সাগর পর্যন্ত যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু ক্ষেত্রে দ্বিমত থাকলেও দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক বেশ আন্তরিক।

চলতি বছরের ১০ মে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দেয়ার বিষয়ে সাবধান করেছেন, যা ঢাকা-সিনো সম্পর্কের অবনতির কারণ হতে পারে।

দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী উই ফ্যাঙ্গে একই মাসে ঢাকা সফরের পর এই সাবধান বাণী উচ্চারণ করেন লি জিমিং। উই ফ্যাঙ্গে তার সফরে ভিন্ন অঞ্চলের সামরিক বাহিনীকে এই অঞ্চলে প্রবেশের বিষয়ে নিরুৎসাহিত করার জন্যই আলোচনা করেছেন। এই আলোচনা তিনি শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও করেছেন।

চীনের থেকে ঋণ নিতে রাজি না হওয়ার পরও বিগত এক বছরে বাংলাদেশকে ১০ হাজার টেস্টিং কিট, ১০ হাজার সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) এবং ১ হাজার থার্মাল স্ক্যানার প্রদান করেছে চীন। বাংলাদেশ কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই উপহার গ্রহণ করলেও বেশ কৌশলে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পকে নাকচ করেছে।

বাংলাদেশে দৃঢ় নেতৃত্বের অধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে সংযুক্ত করে এমন এক বড় প্রকল্পে নিজেদের যুক্ত রাখতে চান, যা চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভব নয়। আর সে কারণেই চীনের আর্থিক সহায়তা প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ।

নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ চীনের যেই নীতির শিকারে পরিণত হয়েছে, তা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতেই চীনের কাছ থেকে দ্রব্যসামগ্রী বা প্রযুক্তিগত সহায়তা নিলেও আর্থিক কোনো সহায়তা নিতে রাজি হয়নি বাংলাদেশ। বরং বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থায়নে কাজগুলো সম্পাদন করছে। এ জন্য বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কার্যক্রম।

২০১৬ সালে বাংলাদেশে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরের সময় বেশ কিছু সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু চীন থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ সাবধান থেকেছে। সেই সঙ্গে চীনের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাতিলের পাশাপাশি চীনের বেশ কিছু ফার্মকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে, যার খবর দেশের জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

লি জিমিং তার সাবধান বাণীতে বলেছিল, ‘কোয়াডের মতো ছোট একটি সংগঠনে সদস্য বাংলাদেশের হওয়া উচিত হবে না, কেননা এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতির কারণ হতে পারে।’ কিন্তু বাংলাদেশ বর্তমানে তার শক্তি সম্পর্কে জানে এবং এ কারণেই চীনের রাষ্ট্রদূতের এমন মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, ‘সার্বভৌম একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তার নিজ দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য পররাষ্ট্রনীতি নিজেই ঠিক করবে।’ সেই সঙ্গে বাংলাদেশে থাকা বিদেশি কূটনীতিকদের ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আচরণের মধ্যে থাকা’ এবং ‘বিষয়গুলো বিবেচনা করে মন্তব্য করার’ আহ্বান জানান তিনি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হু চুনইয়াং ‘কোয়াড’ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্কশ উক্তি প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা মনে করি এটি চীনের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চীনবিরোধী মনোভাব তৈরির একটি অপচেষ্টার ফসল। সুতরাং আমরা আশা করছি, আমাদের অবস্থান বেশ স্পষ্ট সবার কাছে।’ তিনি আরও জানান, চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনোই হস্তক্ষেপ করে না। তারা অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে বিশ্বাসী।

কোয়াড বিষয়ে আমাদের থেকেও ভালো জানে ভারত, আর কোয়াড গঠনের মূল উদ্দেশ্য কী সেটাও জানে ভারত। এখানে কি শুধু চীনকে বাদ রাখা হচ্ছে, নাকি চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য এটি গঠিত হচ্ছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে এ বিষয়ে বক্তব্য দেয়া কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়। এটি মূলত কোয়াডের বিরোধিতা করা এবং এ বিষয়ে সবাইকে জানানো ও সাবধান করা।

বিপদগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে চীনের ‘ভ্যাকসিন কূটনীতি’ যেভাবে কাজ করেছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। বাংলাদেশ বাস্তবিক অবস্থা অনুসারে নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে এবং নিরপেক্ষ অবস্থানের মাধ্যমে এতদিন পরিচালিত হয়েছে, যার সুফলও ভোগ করেছে দেশটি। ঢাকা শ্রীলঙ্কাকে ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে, যা স্পষ্টতই বলছে যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং চার বছর আগেই জিডিপিতে শ্রীলঙ্কাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়েছি আমরা। ঢাকার জিডিপি বর্তমানে ৮৫ বিলিয়ন, যেখানে কলম্বোর বর্তমান জিডিপি মাত্র ৩ বিলিয়ন।

শ্রীলঙ্কা চীনের এই প্রকল্প থেকে যখন মুক্তি পাবে, ততদিনে বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়ে যাবে। কারণ ঢাকা তার পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবতার নিরিখে তৈরি করে এগিয়ে গেছে। ঢাকা জানে, কোনো দেশের মুঠোর মধ্যে না থেকেও উন্নয়ন করা সম্ভব। বরং শ্রীলঙ্কার এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
দারিদ্র্য বিমোচনে জয়সিঁড়িতে বাংলাদেশ
হেফাজতের অর্থবিত্ত!
মহামারি মোকাবিলায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
৩ জুনের গণনির্বাচন: মেজর জিয়ার আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায়
হায় ডাকঘর, ডাক বিভাগ!

শেয়ার করুন

বদলে যাক আমলাতন্ত্র

বদলে যাক আমলাতন্ত্র

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনপ্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণ করেন। আর আমলারা সেই নীতি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করেন। আমলারা কিন্তু জনপ্রতিনিধি নন, তাই জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। কিন্তু অনেক দিন ধরেই দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিরাও আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন ভূমিকা রাখেন না। দেশ এখন আমলাশাসিত।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আমার বিট ছিল নির্বাচন কমিশন। তখন আমি ভোরের কাগজের রিপোর্টার। শ্যামল দার (শ্যামল দত্ত, ভোরের কাগজের সম্পাদক) সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছি নতুন। একদিন কমিশনে যেতেই সংবাদের লিটন ভাই (মনির হোসেন লিটন, বর্তমানে একাত্তর টিভিতে কর্মরত) বললেন, আপনাকে মান্নান ভাই খুঁজছেন। মান্নান ভাই মানে এম এ মান্নান, আজকের পরিকল্পনামন্ত্রী; তখন তিনি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব। নির্বাচন পরিচালনায় তখন তার দারুণ ব্যস্ততা। আমি লিটন ভাইকে বললাম, আমি তো অল্প কয়েক দিন এলাম। আমাকে তো মান্নান ভাইয়ের চেনার কথা নয়। খুঁজবেন কেন? লিটন ভাই বললেন, তা জানি না, আপনাকে না চিনলেও ভোরের কাগজের রিপোর্টারকে তো চেনেন, তাকেই খুঁজছেন। মনে মনে একটু শঙ্কিতও হলাম। মাত্র নির্বাচন কমিশন বিটে এসেছি। সামনে নির্বাচন।

এই সময়ে উল্টাপাল্টা কিছু হলে মুশকিল। গেলাম মান্নান ভাইয়ের রুমে। পরিচয় দিতেই তিনি উল্লসিত কণ্ঠে বললেন, আরে আপনাকেই তো খুঁজছি। কাল আমি যে ব্রিফ করেছি, আপনার রিপোর্টে তা যথাযথভাবে উঠে এসেছে। তাই ধন্যবাদ দিতে আপনাকে খুঁজছিলাম। শুনে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সেই থেকে মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে আমার চমৎকার সম্পর্কের শুরু। মন্ত্রী হওয়ার পরও যে তিনি আমলাজীবন নিয়ে গর্ব করেন, সেই জীবনটার একটা পর্ব আমি কাছ থেকে দেখেছি। শুধু আমার সঙ্গে নয়, সাংবাদিকদের সঙ্গে ছিল তার দারুণ সম্পর্ক। তখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনাও ছিলেন সাবেক আমলা। সব মিলিয়ে সেবার দারুণ দক্ষতায় নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন।

এম এ মান্নান পরে এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। এখন আর তেমন যোগাযোগ নেই বটে, তবে একজন দক্ষ আমলাকে, তার কাজের স্টাইলকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। বাস্তবে আমলাদের হওয়ার কথা জনগণের সেবক। কিন্তু মানতেই হবে, বরাবরই আমলাদের সঙ্গে জনগণের একটা বিশাল ফারাক রয়ে গেছে।

এ জন্য দায় যতটা জনগণের, তারচেয়ে অনেক বেশি আমলাদের। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, তবে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই আমলারা নিজেদের চারপাশে একটা বিচ্ছিন্নতার দেয়াল তুলে দেন। জনগণ বারবার সেই দেয়ালে গিয়ে হোঁচট খায়।

দেশসেরা মেধাবীরাই বিসিএসের নানা ধাপ পেরিয়ে আমলা হন। তবে সাধারণ মানুষের কথা শুনলে মনে হয়, আমলা হওয়াটা বিশাল অপরাধ। আমলাদের সম্পর্কে সাধারণের পারসেপশন হলো- আমলা মানেই ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, গণবিরোধী। শুধু আমলা নয়, কোনো একটি পেশার মানুষকে ঢালাও গালি দেয়ার প্রবণতা তাদের মজ্জাগত।

সাংবাদিক, ডাক্তার, পুলিশ তো প্রতিদিন গালি খাচ্ছে। বাস্তবতাটা হলো, কোনো পেশার মানুষকেই ঢালাও গালি দেয়ার সুযোগ নেই। ভালো ডাক্তার যেমন আছেন, খারাপ ডাক্তারও আছেন। ভালো সাংবাদিক যেমন আছেন, খারাপ সাংবাদিকও আছেন। তেমনি অসৎ আমলা যেমন আছেন, সৎ আমলাও আছেন।

দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখলে মনে হয়, ফেসবুকের সবাই সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, সততার পরাকাষ্ঠা। আর সব পেশার মানুষ খারাপ। আমলাদের সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণা, তা যদি সত্যি হতো, তাহলে দেশ এতদিনে টিকতে পারত না। পছন্দ করি আর না করি, দেশটা কিন্তু এখন আমলারাই চালায়।

আমলাতন্ত্র যুগে যুগে ছিল, আছে, থাকবে। আমলাতন্ত্র নিয়ে আমাদের আলোচনা-সমালোচনাও আমলাতন্ত্রের সমান বয়সী। তবে সম্প্রতি নানা কারণে আমলাতন্ত্র নিয়ে আলোচনা বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে সচিবালয়ে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে ছয় ঘণ্টা আটকে রাখা, এক উপসচিবের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারের পর আমলাতন্ত্র আরেকবার সমালোচনার শিখরে পৌঁছেছে। শুরুতে সাবেক আমলা, বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের কথা বলছিলাম। কারণ তিনি সম্প্রতি আমলাতন্ত্র নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। এম এ মান্নান বরাবরই একটু সরল ধরনের। যা মনে আসে বলে ফেলেন। সম্প্রতি একনেক বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র মন্দ নয়। আমলাতন্ত্র ভালো।

আমলাতন্ত্রের বিকল্পও তো নাই। কেউ আমলাতন্ত্রের বিকল্প বের করতে পারেনি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর বিকল্প বের করতে পারেনি। চীনারা পারেনি। ফেরাউনও পারেনি। খলিফারাও পারেনি। সেই মহান আমলাতন্ত্র আমাদের মাঝেও আছে।’ পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিজেও একসময় ছোটখাটো আমলা ছিলাম। মনেপ্রাণে এখনও বড় আমলা আছি। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কেটেছে আমলাতন্ত্রের ভেতরে। সেই মহান আমলাতন্ত্রের জন্য তাদের যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে সাভারে, সেটির আধুনিকায়ন, সংস্কার, ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ, প্রশস্ত, সবকিছু করব। সেখানে ২০তলা অত্যাধুনিক ভবন হবে। তবে আশা করছি তাদের কাজের গতিও আধুনিকায়ন হবে।’

এই প্রকল্পটি নিয়েই আমার একটু বলার আছে। সাভারে লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-পিএটিসির সক্ষমতা বাড়াতে ১ হাজার ২০৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে, একনেক যা অনুমোদনও করেছে। এম এ মান্নান বলেছেন, সেটাই চরম সত্যি।

আমলাতন্ত্রের কোনো বিকল্প কেউ কখনও বের করতে পারেনি। তাই ঢালাও গালি না দিয়ে আমলাতন্ত্রকে কীভাবে জনবান্ধব করা যায় তার উপায় বের করতে হবে। সেক্ষেত্রে পিএটিসির ভূমিকাটাই সবচেয়ে বেশি। হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে পিএটিসির অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে তাদের মৌলিক চিন্তায় বদল আনতে হবে। সব আমলাকেই পিএটিসির চৌকাঠ পেরিয়ে আসতে হয়। তাই সেখানে আমলাদের শেখাতে হয় মানবিকতার প্রাথমিক পাঠ।

বিসিএস দিয়েই যেন কেউ প্রশাসক বনে না যান। শেখাতে হবে তারা জনগণের শাসক নয়, সেবক। প্রায়ই পত্রিকায় খবর দেখি, মাঠপর্যায়ের কোনো ছোট আমলাকে ‘স্যার’ না বলায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তাদের অনেক কষ্টে, মেধার অনেক পরীক্ষা দিয়ে আমলা হতে হয়, সেটা মানলাম। কিন্তু আমলা হলেই তাদের ‘স্যার’ বলতে হবে কেন। ভয় দেখিয়ে জনগণের সমীহ আদায় করা যাবে না, ভালোবেসে তাদের হৃদয় জয় করতে হবে।

৩৩৩ তে ফোন করে খাবার চাওয়ার অপরাধে এক গরিব মানুষকে ৪০০ লোকের খাবার দেয়ার শাস্তি বা ছাগল ফুলগাছ খাওয়ায় মালিকের জরিমানা করার ঘটনা আমলাতন্ত্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাই শুধু তৈরি করবে। আমলারা অবশ্যই আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর হবেন। একই সঙ্গে তাদের মানবিক হতে হবে, দেশের বাস্তবতা বুঝে কাজ করতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনপ্রতিনিধিরা নীতিনির্ধারণ করেন। আর আমলারা সেই নীতি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করেন। আমলারা কিন্তু জনপ্রতিনিধি নন, তাই জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। কিন্তু অনেক দিন ধরেই দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই। জনপ্রতিনিধিরাও আর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন ভূমিকা রাখেন না। দেশ এখন আমলাশাসিত। আমলারাই নীতিনির্ধারণ করেন, তারাই তা প্রয়োগ করেন। সব মিলিয়ে একটা স্বেচ্ছাচারী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

এর জন্য আমি আমলাদের ততটা দোষ দিই না। এই পরিস্থিতি আমরাই তৈরি করেছি। ক্ষমতা পেলে কেউ কেউ তো তার অপব্যবহার করতেই পারে। ক্ষমতার অপব্যবহারের পথ বেয়ে আসে দুর্নীতি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে এখন এগিয়ে আমলারাই। তবে সবাই তো আর তা করছেন না। কিছু আমলার বিরুদ্ধে ক্ষমতা অপব্যবহার, দুর্নীতির অভিযোগ যেমন আছে, তেমনি শত শত মানবিক, দক্ষ, যোগ্য আমলাও আছে দেশে। তারা আছে বলেই দেশটা এখনও ঠিকঠাকমতো চলছে।

পিএটিসির কাজ হলো তেমন সৎ, দক্ষ, যোগ্য, মানবিক ও দেশপ্রেমিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা। তাতেই দেশের লাভ। এ জন্য পিএটিসির জন্য প্রয়োজনে বরাদ্দ আরও বাড়ানো হোক। তবে আবারও বলছি, সেই বরাদ্দে যেন খালি ভবন বানানো না হয়। হার্ডওয়্যারের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের সফটওয়্যারেও পরিবর্তন আনতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
দারিদ্র্য বিমোচনে জয়সিঁড়িতে বাংলাদেশ
হেফাজতের অর্থবিত্ত!
মহামারি মোকাবিলায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
৩ জুনের গণনির্বাচন: মেজর জিয়ার আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায়
হায় ডাকঘর, ডাক বিভাগ!

শেয়ার করুন

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক সংগঠন নয় কেন

ইসলাম হেফাজতের নাম করে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের একটি অংশ ১১ বছর ধরে যেভাবে চলছে, সেটি কতটা ধর্মের পবিত্রতাকে রক্ষা করার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়, কিংবা শিক্ষকদের কারও কারও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধন, কিংবা ব্যক্তিগত সুযোগসুবিধা লাভ, বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করে সেটি এখন গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয়। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের অনেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শুধু যুক্তই নন, অনেকে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীনও আছেন।

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে কওমি মাদ্রাসা। দেশে মোট কতটি কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, কত শিক্ষক আছেন, ছাত্রসংখ্যা কত, এর পরিচালনা পরিষদ কীভাবে গঠিত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কাদের অনুমোদনে প্রতিষ্ঠিত হয়, এর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান কোনটি- এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর বাইরের কারও জানা নেই।

কওমি মাদ্রাসার অভ্যন্তরে যারা আছেন তারাও কতটা জানেন-সেটিও কারও জানা নেই। অথচ কওমি মাদ্রাসা দেশের শিক্ষাব্যবস্থারই অন্যতম একটি ধারা। আলিয়া মাদ্রাসাও একটি শিক্ষার ধারা। দেশে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম প্রধান শিক্ষার ধারা।

এগুলোর বাইরেও ভোকেশনাল, টেকনিক্যাল, কৃষি, পলিটেকনিক্যাল, বেসরকারি কেজি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কেজি স্কুলের অনুমোদনকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম খুব একটা জানা যায় না। তবে কওমি মাদ্রাসা ছাড়া অন্য সব ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজস্ব সংগঠন বা সমিতি রয়েছে। বেসরকারি কেজি স্কুল এবং কলেজের মালিকদের সমিতি রয়েছে।

বেসরকারি কেজি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের কোনো সমিতির নাম শোনা যায় না। সাধারণত সরকারি-বেসরকারি সব ধরন ও স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজস্ব পেশাগত সুযোগসুবিধা আদায় এবং বাস্তবায়নের জন্য নিজস্ব সমিতি রয়েছে। অনেক সময় একই স্তরে একাধিক সমিতিও কার্যকর থাকতে দেখা যাচ্ছে। একসময় শিক্ষক সমিতিগুলোকে নিজেদের পেশাগত সুযোগসুবিধা লাভের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করতে দেখা গেছে। সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার করে শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া আদায় করে নিয়েছে।

বর্তমানে আমরা প্রায় ৩০ হাজারের কাছাকাছি বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল, বেসরকারি কলেজ ও মাদ্রাসাকে দেখছি। এগুলো আগে সরকারি অনুদান খুব একটা পেত না। বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে কিছু অনুদান সরকার থেকে দেয়া হতো। তাতে বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বলতে যা বুঝায় তার অনেকটাই অনুপস্থিত ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রবেতন সংগ্রহ করে তা থেকে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যা দিতে পারত তাই তাদের বেতন হিসেবে ধরে নেয়া হতো। তারা কোনো জাতীয় স্কেল অনুযায়ী বেতন পেতেন না।

যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় ভালো ছিল, সেখানকার শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অপেক্ষাকৃত অন্য সমগোত্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল। বেশির ভাগ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনদানে খুব একটা সক্ষম ছিল না। অথচ শিক্ষা ও মাদ্রাসা বোর্ড থেকে এগুলোর অনুমোদন দেয়া হতো। কিন্তু শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের বিষয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এর ফলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধাবীরা শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদ যাদের নিয়োগ দিতেন তাদের বেশির ভাগই এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন ভালো কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারার কারণে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-উন্নতি ভালো ছিল সেখানে অপেক্ষাকৃত মেধাবীদের সংযুক্তি ঘটেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেও এই ধারা কিছুটা ছিল। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।

শিক্ষাবোর্ডের অনুমোদনপ্রাপ্ত বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা নিজেদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে সমিতি গঠন করতে থাকে । সমিতির নেতৃত্বে শিক্ষক কর্মচারীরা দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলন সংগ্রামও করতে থাকেন। একপর্যায়ে প্রায় সব সমিতিই আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত করাতে সক্ষম হয়। এতে শুরুর দিকে সরকার মূল বেতনের একটি অংশ প্রদান শুরু করে। এভাবেই এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতনভাতা বিভিন্ন সরকার বৃদ্ধি করতে থাকে। বেশ কয়েক বছর আগেই সরকার এমপিওভুক্ত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের শতভাগ, আংশিক বাড়িভাড়া ও চিকিৎসাভাতা জাতীয় স্কেল অনুযায়ী প্রদান করতে শুরু করেছে। এর বাইরে বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির ব্যানারে রেজিস্টার্ড-ননরেজিস্টার্ড ইত্যাদি নামে প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ আন্দোলন-সংগ্রাম করে নিজেদের জাতীয়করণ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে।

২৬ হাজারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় নতুনভাবে সরকারি বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। এর আগে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু প্রায় ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারীকরণ করেন। এর সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে ২৬,১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন এবং ১ লাখের বেশি শিক্ষক সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো সমান সুযোগ লাভ করেন।

এখনও মাঝেমধ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কিছু শিক্ষক সমিতির ব্যানারে প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ এবং বেসরকারি স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্ত করার দাবি জানিয়ে অনেককে আন্দোলন করতে দেখা যায়। এভাবে এমপিওভুক্ত ও জাতীয়করণের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার মান খুব একটা বৃদ্ধি পায় বলে মনে হয় না। অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে। কম দক্ষ, অনভিজ্ঞ ও দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি লাভ করে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছে। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা শেষবিচারে মানের সংকট থেকে এখনও বের হতে পারেনি।

এ ব্যাপারে শিক্ষকদের সংগঠনগুলো খুব একটা সোচ্চার নয়। দেশে এখন আগের মতো বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক সমিতির নামধাম ততটা শোনা যায় না। যদিও উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন সমিতির অফিস ও কার্যক্রম দৃশ্যমান আছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সমিতির কথা সকলেই অবগত আছেন। অন্যান্য স্তরেও শিক্ষকদের সংগঠন রয়েছে। কিন্তু কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকরা কোনো সমিতির পতাকাতলে আছেন কি না সেটি খুব একটা জানা যায় না। তবে ২০১০ সাল থেকে কওমি মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি সংগঠন দেশব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠে।

গত ১১ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে হেফাজতে ইসলাম ‘অরাজনৈতিক ধর্মীয় সামাজিক’ সংগঠন নামে নিজেদের পরিচয় প্রদান করলেও এর কার্যক্রম, দাবিনামা, অংশগ্রহণ ইত্যাদি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশে কোনো স্তরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্রছাত্রীরা এ ধরনের কোনো সংগঠনে অতীত বা বর্তমানে একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে-এমন কোনো নজির নেই। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম যেকোনো কর্মসূচি প্রদানে যে নজির স্থাপন করে তাতে শিক্ষক ও ছাত্রদের নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে।

২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল এবং ৫ মে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-ছাত্ররা ঢাকা অবরোধ, সরকার উৎখাত ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করে। এ বছর ২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিতে মাদ্রাসার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সরকারি স্থাপনা ধ্বংসের কাজে একসঙ্গে যেভাবে অংশগ্রহণ করেছে সেটি বাংলাদেশের অন্য কোনো স্তরের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যৌথভাবে করার মতো কল্পনা কেউ করতে পারছে না। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তা করেছে।

এটি কতটা আইনসিদ্ধ, নীতিনৈতিকতার মধ্যে পড়ে সেটিও বিবেচ্য বিষয়। ইসলাম হেফাজতের নাম করে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের একটি অংশ ১১ বছর ধরে যেভাবে চলছে, সেটি কতটা ধর্মের পবিত্রতাকে রক্ষা করার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়, কিংবা শিক্ষকদের কারও কারও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন, কিংবা ব্যক্তিগত সুযোগসুবিধা লাভ, বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করে সেটি এখন গভীরভাবে চিন্তা করার বিষয়। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে শুধু যুক্তই নন, অনেকেই দলের গুরত্বপূর্ণ পদে আসীনও আছেন।

রাজনীতি করার অধিকার বাংলাদেশে যেকোনো মানুষের আছে। কিন্তু সেটি করতে হলে দলের কাজেই নিজেকে যুক্ত রাখা নিয়মসিদ্ধ। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে যারা বিভিন্ন মাদ্রাসায় যুক্ত আছে, তাদের প্রধান কাজ শিক্ষকতা করা, শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে শিক্ষা দেয়া, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করা। কিন্তু যিনি কোনো একটি মাদ্রাসার শিক্ষকতার একটি পদ অলংকৃত করছেন, তিনি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আবার হেফাজতে ইসলাম সংগঠনেরও নেতৃত্ব কিংবা কর্মকাণ্ডে ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়ছেন যা তার মহৎ শিক্ষকতা পেশার দায়িত্ব পালনে মোটেও সহায়ক নয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এ ধরনের শিক্ষকদের ইতিবাচক প্রভাবের চাইতে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি পড়ে।

বাংলাদেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক শিক্ষকই কর্মরত আছেন, যাদের কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের সদস্য কিংবা কর্মী-সমর্থক বলে পরিচিত। তবে ওইসব শিক্ষক তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অন্য শিক্ষক কর্মচারী কিংবা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করে থাকেন এমনটি শোনা যায় না। বাস্তবেও এটি সম্ভব নয়। কিন্তু কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকরা তাদের পেশাগত কোনো সমিতি গঠন না করে হেফাজতে ইসলাম নামে যে সংগঠনটি দাঁড় করিয়েছেন এবং গত ১১ বছর যাবৎ দেশে সবচাইতে আলোচিত, সমালোচিত সংগঠন হিসেবে নিজেদের তুলে ধরেছেন সেটি মোটেও কওমি মাদ্রাসার জন্য ভালো কোনো বার্তা বয়ে আনেনি। ২০১৩ সালেও ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের অগ্নিকাণ্ড, বায়তুল মোকাররমের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের লাইব্রেরি পোড়ানো, মতিঝিলে ভাঙচুর, তাণ্ডব, শিশু-কিশোরদের দেশের আনাচকানাচ থেকে নিয়ে আসা, সরকার উৎখাতে তাদের ব্যবহার করার চেষ্টা, একইভাবে ২৬-২৮ মার্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক জায়গায় যা করা হয়েছে- তা মোটেও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাজ হতে পারে না। শিক্ষকরা নিজেরাও যেমন এ ধরনের কাজে অংশ নিতে পারেন না, শিক্ষার্থীদেরও তারা এসব কাজে ব্যবহার করতে পারেন না। এটি ধর্মীয় বা সাধারণ কোনো শিক্ষায়ই সমর্থন করে বলে মনে করার কোনো ভিত্তি নেই।

হেফাজতে ইসলামের নেতৃরা মূলতই কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক। তাদের কাছ থেকে সবাই শিক্ষার নানা দিক লাভ করার আশা করেন। কিন্তু যখন তারা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার কার্যক্রম ছেড়ে বাইরের জগতে আইনকানুন ভেঙে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের পথে পা বাড়ান, জড়িয়ে পড়েন, তখন তাদের পেশাগত সীমানা ও মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়। তারাও নিজেদের মহৎ শিক্ষকের মর্যাদার আসনে ধরে রাখতে পারেন না। এমনটির প্রমাণ এখন আমরা কিছুটা দেখতে পাচ্ছি। তবে পত্রপত্রিকায় কওমি মাদ্রাসার অভ্যন্তরের শিক্ষার্থীদের জীবনাচরণের সীমাবদ্ধতা, নানা ধরনের অন্যায়-অনিয়ম, অনাচারের খবর উঠে আসছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনায় আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ, দেশি ও বিদেশি ব্যক্তি বা সংস্থা থেকে অর্থ-অনুদান লাভ এবং তা নানাভাবে আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করা ইত্যাদি অভিযোগ এখন মিডিয়া ও মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত বিষয়।

এর ফলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের সরল বিশ্বাস অনেকটাই হোঁচট খেয়েছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে অরাজনৈতিক পরিচয়ে যে সংগঠনটি তারা গত ১১ বছর ধরে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটি বাস্তবেই একটি নিয়ন্ত্রণহীন রাজনৈতিক দলের চরিত্রের ফাঁদে আটকে পড়েছে। সংগঠনের নেতাদের মধ্যে নানা ধরনের উচ্চাভিলাষ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা থেকে কারও পদস্খলনও ঘটেছে। তাদের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির মৃত্যুর আগে হাটহাজারী মাদ্রাসায় ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে যে ধরনের বিভাজন ও হাঙ্গামা প্রদর্শিত হয়েছে তা ভাবতেও কষ্ট হয়।

তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে তার পেছনে ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিসহ নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতা; যা থেকে মুক্ত হতে পারেননি এই মাদ্রাসার অনেক নামীদামি শিক্ষকও।

এরপর তড়িঘড়ি করে সংগঠনের কমিটি গঠন, অন্যদেরকে বাইরে রাখা, এ নিয়ে পালটাপালটি অভিযোগ, আবার নতুন করে কমিটি গঠন, এর বিপরীতে নতুন কমিটি গঠন- এ এক দীর্ঘ বিতর্ক লড়াইয়ে হেফাজতের নেতৃত্ব এখন দেশে বিতর্কের এমন এক জায়গায় চলে গেছে যেখান থেকে বের হওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়।

যদি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের পেশাগত কিংবা শিক্ষার সুযোগসুবিধা সৃষ্টি করার জন্য একটি পেশাজীবী সংগঠন তথা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতি গঠন করতেন, সেটিকে অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের গঠনতন্ত্র মোতাবেক পরিচালিত করার উদ্যোগ নিতেন, তাহলে তাদের কওমি মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠানগতভাবে যেমন লাভবান হতো, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে কিংবা পড়াশোনা করে দেশ ও জাতির কাজে আত্মনিয়োগ করতে সক্ষম হতেন।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি ধারাসমূহ যেভাবে নানা সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এখন সম্মুখের দিকে অগ্রসর হওয়ার মতো একটি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে কিংবা হচ্ছে, কওমি মাদ্রাসাও সে ধরনের পেশাজীবী সংগঠনের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য স্তরে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পেত। শিক্ষাব্যবস্থার যেকোনো ধারাই শিক্ষার নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলায় পরিচালিত হতে হয়। কওমি মাদ্রাসার হেফাজতে জড়িয়ে লাভের চাইতে ক্ষতি বেশি হয়েছে। এই আত্মোপলব্ধি তাদেরকে এখন বিশেষভাবে করা উচিত। কোনটি তাদের পথ? সমিতি, নাকি ‘অরাজনীতির নামে রাজনৈতিক সংগঠন’?

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
দারিদ্র্য বিমোচনে জয়সিঁড়িতে বাংলাদেশ
হেফাজতের অর্থবিত্ত!
মহামারি মোকাবিলায় দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
৩ জুনের গণনির্বাচন: মেজর জিয়ার আরেকটি কলঙ্কিত অধ্যায়
হায় ডাকঘর, ডাক বিভাগ!

শেয়ার করুন