প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

যেকোনো সমাজের মতো বাঙালি সমাজেও রক্ষণশীল, প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আবহমানকাল থেকে। সব রকম সংকীর্ণতামুক্ত খুবই উদার মানুষ যেমন আমাদের সমাজে সব সময় ছিলেন, তেমনি ধর্মীয় ব্যাপারে অতি অসহিষ্ণু ও সংকীর্ণ মানুষও ছিলেন অগণিত। বাঙালি চিরকাল মধ্যপন্থায় বিশ্বাস করে এসেছে। মধ্যপথ পরমতসহিষ্ণু। উগ্র প্রতিক্রিয়াশীলতা বা ধর্মান্ধতা এবং উগ্র প্রগতিশীলতা বাঙালি সমাজ সব সময় প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

এ লেখাটির শিরোনাম বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদের একটি বইয়ের নাম থেকে নেয়া, যেখানে তিনি খেদোক্তি প্রকাশ করেছিলেন এ বলে যে, আমরা ‘প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে’ বাস করছি। বইটি ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়। পশ্চাৎপদতার এ ছায়া আজ ফুলে-ফেঁপে মহিরুহ হয়ে উঠছে। বইটির শিরোনামের উপযুক্ততা জ্বলজ্বল করছে।

এ প্রসঙ্গে যে প্রশ্নটি সামনে এসে যায়, তবে কি সমাজে প্রতিক্রিয়াশীলতা অনিবার্য পরিণতি হয়ে উঠছে? নানা উৎসব-আয়োজন, ব্যক্তিঘটনা ও অনুষঙ্গে এর রূপ কদর্যভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রভাব আজ সর্বক্ষেত্রে যা মুদ্রণে, ভিজুয়্যালে, পরিবার, অফিস ও জনপরিসরে চর্চিত হচ্ছে। কেবল ফিজিক্যাল স্পেসে নয়, এর রমরমা চাষ ভার্চুয়াল জগতেও। ভার্চুয়াল স্পেস হয়ে উঠছে বাঙালির প্রতিক্রিয়াশীলতা স্বরূপ সন্ধানের অনন্য আয়না।

এ লেখায় প্রতিক্রিয়াশীলতা চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে বাসা-বাড়ি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হবে।

ফিজিক্যাল বা ভার্চুয়াল উভয় স্পেসে ছদ্মবেশী ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। দেখা যাচ্ছে, বহিরঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া আর ভেতরে প্রতিক্রিয়াশীলতার শক্ত বুনন। সাধারণ কথাবার্তায় সহজেই এদের ধরা যায়। একটু গভীরে গেলেই লকলকে বিষাক্ত জিহ্বা দেখা যায়।

আজকের জামানায় কে প্রতিক্রিয়াশীল আর কে প্রগতিশীল তা বোঝাটা বেশ দুরূহ হয়ে পড়েছে। ধর্মবিশ্বাস, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, গায়ের রং, আঞ্চলিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিশীলতাকে ঘিরে এর কর্ষণ চলছে। প্রকাশ ও চর্চায় তা নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে।

প্রতিক্রিয়াশীলরা আধুনিকতার মর্মবাণী গ্রহণ করে না, কিন্তু আধুনিকতার বস্তুগত সব উপাদান তারা ভোগ করে। এদের জীবন আধুনিক উপকরণের বর্ণিল সাজে সজ্জিত। কিন্তু তারা আধুনিক নন। আধুনিকতার ভাবগত দিক তাদের স্পর্শ করে না।

প্রতিক্রিয়াশীলরা মূলত আত্মপ্রবঞ্চক, স্বার্থপর ও হিংস্র। তাদের প্রতিক্রিয়ার পেছনে রয়েছে ভাবগত ও বস্তুগত স্বার্থ। যেমন, অন্যের ধর্মপরিচয় নিয়ে কটাক্ষ করে নিজের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরতে চায়। এরা ভোগে শ্রেষ্ঠত্বের বিমারিতে। মনে রাখতে হবে, যে শ্রেষ্ঠ তার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের প্রয়োজন পড়ে না।

অধিকাংশ বাসাবাড়ি আজ প্রতিক্রিয়াশীলতা চর্চার অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। প্রতিটি বাসাবাড়ি হয়ে উঠছে অন্ধবিশ্বাসের বোতল, যেখানে কোনো বৈচিত্র্য নেই। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত বাসা-বাড়িগুলো আজ আধুনিক ইন্টোরিয়র ডিজাইনে ঠাসা। কাচ, প্লাইউড আর লাইটিংয়ের বাহারি বাগান। এসব বাড়ি দেখে চোখ ধাঁধায়, কিন্তু মন ভরে না। এগুলোতে নেই আত্মার খাবার। কাগজ আর প্লাস্টিক শোপিসে ভরা শুষ্ক উদ্যান। কদাচিৎ দুয়েকটি গাছ চোখে পড়ে, কাছে গেলে দেখা যায় সেগুলোও কৃত্রিম। প্রতিক্রিয়াশীল মনের বিছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত প্রকাশ ঘটছে বাসাবাড়িতে। এগুলোর বিষয়বস্তু বড়ই নিরর্থক। এখানে নেই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো উপকরণ। সাধারণত দেখা যায় নানা প্রতিক্রিয়াশীল বই-পুস্তকের সংগ্রহ। আধুনিক ও রুচিশীল ব্যক্তির পক্ষে এসব বাসাবাড়িতে দশ-পনেরো মিনিটের বেশি সময় কাটানো বেশ কঠিন। এদের ড্রয়িংরুমের আলোচনাও অত্যন্ত নিম্নমানের যা মূলত ক্ষমতা, প্রদর্শনবাদ বা বৈষয়িক বিষয়াদিকে ঘিরে আবর্তিত হয়।

প্রতিক্রিয়াশীলদের বাসাবাড়িতে রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ঘড়ি, মোবাইল আরও কতকিছু ঢুকেছে। আধুনিক এসব উপকরণকে তারা কাজে লাগায় প্রতিক্রিয়াশীলতাকে ঋদ্ধ করতে। আধুনিক জীবনের সঙ্গে এর মিথোজীবী সম্পর্কটি খুবই আগ্রহোদ্দীক। প্রতিক্রিয়াশীলরা আধুনিকতার শরীর নেবে কিন্তু মন নেবে না।

অপরদিকে, বাসাবাড়ি আধুনিকতা চর্চার অনুর্বর ক্ষেত্র। এ চর্চার জন্য যে সহায়ক উপকরণ লাগে, এখানে তা নেই বললেই চলে। আধুনিক বা প্রগতিশীল এমনি এমনি হওয়া যায় না। এটা চর্চা করতে হয়- কনটেস্ট করতে, বোঝা-পড়া লাগে, যুক্তিতর্ক ও সাহস লাগে। প্রক্রিক্রিয়াশীলতা সহজ আরাধ্য। কোনো রকম কসরৎ ছাড়াই তা অর্জন করা যায়। এটি এক প্রশ্নহীন জীবন।

প্রশ্নহীন জীবন মানেই অচলায়তন। ঘাম ঝরানো লাগে না, লাগানো না বিশ্লেষাত্মক বোঝাপড়া। কেবল লাগে অন্ধবিশ্বাস আর শরীরের জোর। এ অন্ধবিশ্বাস এক ধরনের স্থবিরতা, যা জন্ম থেকেই পাকা। একে আর নতুন করে পাকতে হয় না। বিকশিত হতে হয় না, সমৃদ্ধ হতে হয় না।

প্রতিক্রিয়াশীলরা সহজেই অন্যদের তকমা লাগাতে পছন্দ করে। তারা সূক্ষ্ম ও মোটা দুধরনের বিভক্তি রেখা টানতে পছন্দ করে। ঘৃণা উৎপাদন করে। নিজেদের মতো করে স্বস্তিদায়ক আবহ তৈরি করে। তারা যেকোনো আচারসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতায় ব্যাপক আনন্দ উপভোগ করে। তাদের কাছে ভাবগত আনন্দের কোনো মূল্য নেই। তারা স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো কিছু না বুঝে দীর্ঘসময় পড়তে, দেখতে বা শুনতে পারে। এ তাদের এ সীমাহীন সক্ষমতা।

আধুনিকতা দীর্ঘমেয়াদি ডিসকোর্স, দীঘমেয়াদি সাধনা। অনেক ঝক্কি আছে জেনেও অনেকে এর অনুবর্তী হন, জীবনজুড়ে ঝুঁকি বয়ে বেড়ান। কারণ, প্রতিক্রিয়াশীলতা কেবল অন্তরে পুষে রাখা ঘৃণা বা পশ্চাৎপদতা নয়। অনেকসময় রক্ত ঝরিয়ে এর প্রকাশ ঘটে। প্রতিক্রিয়াশীলতার চাপাতির নিচে অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। সমাজের অন্তরাত্মাতে নানা ফর্মে প্রতিক্রিয়াশীলতার রমরমা বাজার দেখা যাচ্ছে যা সত্যিই উদ্বেগজনক।

এ ফর্মগুলোর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষত ফেসবুক হয়ে উঠেছে এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুককে বিবেচনা করা হয় এক্সপ্রেশন ম্যানেজমেনট টুলস হিসেবে। যার যা আছে তা নিয়ে ফেসবুকে হাজির হচ্ছে। নিজের প্রতিকৃতি তুলে ধরছে। এ প্রকাশকে কয়েকটি বর্গভাগ করা যায়; ক. ব্যক্তিপ্রকাশ ও সেলফ ইমেজ; খ. সামাজিক প্রকাশ অর্থাৎ সামাজিক নেটওয়ার্ক বা পরিসরের ব্যাপ্তি গ. ক্ষমতাসম্পর্ক- নেতানেত্রী ও সেলিব্রেটিদের সঙ্গে ক্ষমতা নৈকট্যের ছবি; ঘ. নিজস্ব বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির সঞ্চালন। ফেসবুকহীন ব্যক্তির পরিচিতির ব্যাপ্তি সীমিত।

ফেসবুক ব্যক্তির ভার্চুয়াল আইডেন্টিটি নির্মাণ করছে। এ নির্মাণে ব্যক্তির মানসিক যতটুকু সামর্থ্য রয়েছে তা নিয়ে নেমে পড়ছে। ফেসবুক হয়ে উঠছে ব্যক্তির নিজের বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি বিচ্ছুরণের শক্তিশালী মাধ্যম এবং তা ব্যবহৃত হচ্ছে নির্বিচারভাবে। অন্যের বিশ্বাস, চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি, মতবাদ এবং বৈচিত্র্যের প্রতি কোনো ধরনের শ্রদ্ধা ছাড়াই সিংহভাগ ফেসবুক ইউজার অবলীলায় তাদের মতামত তুলে ধরছেন এবং তা ধরছেন বিষাক্তভাবে।

এদেশে মিডিয়া এডুকেশনের অবস্থাটি মোটেও সন্তোষজনক নয়। মিডিয়া একটি পাবলিক প্ল্যাটফর্ম সেখানে অভিব্যক্তি বা মতামত কীভাবে তুলে ধরতে হয় এর সঙ্গে শিক্ষা ও সচেতনতার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ফেসবুকের আইডির মালিকানা শেষ কথা হয়। এ মালিকানার সঙ্গে রয়েছে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। অন্যের বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি, মতামত, জেন্ডার ইত্যাদি ইস্যুতে একজন ফেসবুক ইউজারের সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ফেসবুককে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে হ্যান্ডেল করতে না পারলে কত ভয়াবহ ঘটনা ঘটতে পারে তার অনেক নজির এদেশ রয়েছে- যেমন কবছর আগে ঘটে যাওয়া রামু ও পাবনার ঘটনা এর মধ্যে অন্যতম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহনশীলতা, যুক্তি ও দায়িত্বশীলতার কোনো বিকল্প নেই।

সম্প্রতি নাট্যভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী মা দিবসে তার মাকে নিয়ে ফেসবুকে যে স্ট্যাটাস দেন তার প্রতিক্রিয়ায় যে মতামতাগুলো উঠে আসে তা দেখলে প্রতিক্রিয়াশীলতার অন্তর্জগতের কদর্য চেহারা সহজেই বোঝা যায়। ছবিতে চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে মায়ের সিঁদুরপরা ছবি দেখে ফেসবুক ইউজারগণ আহত হয়। তাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। কারণ, এদের সিংহভাগ চঞ্চল চৌধুরী ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে না জেনে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিল চঞ্চল চৌধুরী মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু মায়ের সঙ্গে সিঁদুরপরা ছবি দেখে তাদের সে ধারণা ভেঙে যায়। তারা কষ্ট পান। তারা ভেতরে ভেতরে সংক্ষুব্ধ হন এবং চূড়ান্তভাবে তা প্রকাশ করেন।

এ অভিব্যক্তিগুলো পর্যালোচনা করলে সমকালীন সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। সহজেই বোঝা যায় বৈচিত্র্য থেকে কতবেশি একরৈখিক প্রবণতার দিকে সমাজটি ধাবিত হচ্ছে। এ একরৈখিকতা মাত্রায় কেবল একবর্গের মানুষ থাকবে, অন্যদের অবস্থান হবে অপ্রণিধানযোগ্য। চঞ্চল চৌধুরীকে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য আহ্বান জানাতেও অনেকে ভোলেনি।

যেকোনো সমাজের মতো বাঙালি সমাজেও রক্ষণশীল, প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আবহমানকাল থেকে। সব রকম সংকীর্ণতামুক্ত খুবই উদার মানুষ যেমন আমাদের সমাজে সব সময় ছিলেন, তেমনি ধর্মীয় ব্যাপারে অতি অসহিষ্ণু ও সংকীর্ণ মানুষও ছিলেন অগণিত। বাঙালি চিরকাল মধ্যপন্থায় বিশ্বাস করে এসেছে। মধ্যপথ পরমতসহিষ্ণু। উগ্র প্রতিক্রিয়াশীলতা বা ধর্মান্ধতা এবং উগ্র প্রগতিশীলতা বাঙালি সমাজ সব সময় প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কেন্দ্র করে যে ভার্চুয়াল জনমানস তৈরি হচ্ছে তার প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতা হয়ত একটা সময়ের আঘাত। আশা করা যায়, এ জনমানসটি একদিন বিশ্লেষণাত্মক জনমানসে রূপান্তরিত হবে। প্রতিক্রিয়াশীলতার ছায়া মাড়িয়ে প্রগতিশীলতার মসৃণপথ নির্মিত হবে। কারণ, এছাড়া অন্যকোনো বিকল্প নেই। সে আশাটুকু ধরে রাখতে চাই। কারণ, জার্মান কবি গ্যাটে বলেছেন, আশাবাদী মনোভাব হতাশার চেয়ে কল্যাণকর।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?

শেয়ার করুন

মন্তব্য

শেখ কামাল: অশেষ প্রাণশক্তির তারুণ্য

শেখ কামাল: অশেষ প্রাণশক্তির তারুণ্য

একজন তরুণের জীবন কত কর্মময়, কত প্রাণবন্ত এবং কত উজ্জ্বল হতে পারে, নিজের সংক্ষিপ্ত জীবনে তা তিনি দেখিয়ে গেছেন শেখ কামাল। ছোটবেলা থেকেই তার ছিল খেলাধুলায় প্রচণ্ড আগ্রহ। শুধু খেলাধুলা নয়, লেখাপড়া, সংগীতচর্চা, অভিনয়, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতির সব শাখাতেই তার ছিল মুনশিয়ানা ও অসামান্য সংগঠকের ভূমিকা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল তার সংক্ষিপ্ত জীবনে অপূর্ব প্রাণশক্তিতে ভরপুর থেকে এক দুরন্ত তারুণ্যে নেতৃত্ব দিয়েছেন ক্রীড়া, সংস্কৃতিসহ সব অঙ্গনে।

একজন তরুণের জীবন কত কর্মময়, কত প্রাণবন্ত এবং কত উজ্জ্বল হতে পারে, নিজের সংক্ষিপ্ত জীবনে তা তিনি দেখিয়ে গেছেন। ছোটবেলা থেকেই তার ছিল খেলাধুলায় প্রচণ্ড আগ্রহ। শুধু খেলাধুলা নয়, লেখাপড়া, সংগীতচর্চা, অভিনয়, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতির সব শাখাতেই তার ছিল মুনশিয়ানা ও অসামান্য সংগঠকের ভূমিকা। মেধাবী ছাত্র, প্রথম ডিভিশনের ফুটবল প্লেয়ার, ক্রীড়া সংগঠক, আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা এবং সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠক শেখ কামাল ছিলেন সদালাপী, সদা হাসিখুশি, প্রাণবন্ত মানুষ। তিনি গড়ে তুলেছেন ঢাকা থিয়েটার এবং আধুনিক সংগীত সংগঠন ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’।

ছাত্রলীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ও সংগঠক হিসেবে ৬ ও ১১ দফা আন্দোলন এবং উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ কামাল সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেনাবাহিনীর যে প্রথম ব্যাচটি ভারতের বেলুনিয়া থেকে কমিশন্ড লাভ করে, সেই ব্যাচের একজন শেখ কামাল।

২৫ মার্চের পর তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানীর এডিসি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এই মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন তিনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে সংগঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে দেশ গঠনে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং সেনাবাহিনী থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিরঞ্জীব ও চির উজ্জ্বল এই জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার এই জন্মদিনে আমরা সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাই জাতির এই কৃতি সন্তানের প্রতি।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মাত্র এক মাস ১২ দিন পর ৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের জন্ম। জন্মের পর পিতার সান্নিধ্য তিনি ভালোভাবে পাননি, কারণ নতুন দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এক অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মনিবেদিত থাকতেন। পিতার আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত থাকলেও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরম স্নেহ, ধৈর্য, সাহস ও একাগ্রতা দিয়ে আদর্শ শিক্ষায় সন্তানদের মানুষ করেছেন।

শেখ কামাল ঢাকার স্বনামধন্য শাহীন স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী জনাব দবির উদ্দিন আহম্মদের কন্যা দেশবরেণ্য অ্যাথলেট সুলতানার সঙ্গে উভয় পরিবারের সম্মতিতে ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই শেখ কামাল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। একই দিনে বঙ্গবন্ধুর আরেক পুত্র লেফটেন্যান্ট শেখ জামালেরও বিয়ে হয়। ফলে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ছিল তখন উত্সবমুখর।

অথচ বধূদের হাতের মেহেদির রং মুছে যাওয়ার আগেই বিয়ের মাত্র এক মাস এক দিন পর দেশি-বিদেশি চক্র এবং সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপথগামী সদস্য জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাদের নিষ্পাপ শিশুপুত্র শেখ রাসেল ও অপর দুই পুত্রসহ ১৮ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে, যার মধ্যে প্রথম শহিদ হন শেখ কামাল। পরিবারের সবার সঙ্গে নিভে যায় শেখ কামালের মাত্র ২৬ বছরের জীবনপ্রদীপ। বয়স নিছক একটা সংখ্যা, যা দিয়ে মানুষকে মাপা যায় না। কারণ ২৬ বছরের অতিক্ষুদ্র জীবন শেখ কামাল ক্রিড়া-শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে অসামান্য সব কর্ম দিয়ে সাজিয়ে গেছেন। বাংলার ইতিহাসের অন্যতম অগ্রগামী সন্তান হিসেবে তিনি নিজেকে চিনিয়ে গেছেন অসম্ভব বিনয় আর সারল্যে।

শেখ কামাল তার মাত্র ২৬ বছরের জীবনে একদিকে মেধাবী ছাত্র, প্রথম শ্রেণির ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, আবাহনী ক্রীড়া চক্রের প্রতিষ্ঠাতা, সংগীত ও অভিনয়শিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ছায়ানট ও স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা, ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী ও সংগঠক, সেনাবাহিনীর কমিশন্ড অফিসার এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী মুক্তিযোদ্ধা, অপরদিকে তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, সদালাপী ও সুকুমার মনোবৃত্তির মানুষ। জাতির পিতার সন্তান হয়েও তিনি কোনো দিন অহংকারী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন আচার-আচরণে অতি সহজ-সরল মাটির মানুষ। শেখ কামাল ছিলেন সব ক্ষেত্রে অনন্য গুণের অধিকারী। তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে সমাজ হতো গতিশীল, জীবন হতো শৈল্পিক আর বাংলাদেশ হতো ক্রীড়া, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিকভাবে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র।

একজন মানুষের মাত্র ২৬ বছরের জীবন কত কর্মময়, গতিশীল, গঠনমূলক ও প্রাণবন্ত হতে পারে, শেখ কামাল তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি অপূর্ব প্রাণশক্তিতে ভরপুর সৃষ্টিশীল তারুণ্যের প্রতীক, যিনি চির উজ্জ্বল হয়ে বেঁচে থাকবেন এদেশের মানুষের হৃদয়ে। ৫ আগস্ট বাংলার এই উজ্জ্বল সন্তানের জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধা ও নিরন্তর শুভেচ্ছা।

লেখক: সাবেক তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব

আরও পড়ুন:
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?

শেয়ার করুন

শেখ কামাল: নির্মল তারুণ্যের অগ্রদূত

শেখ কামাল: নির্মল তারুণ্যের অগ্রদূত

সংস্কৃতিকে তিনি রাজনীতির সমীকরণ ভাবতেন। তাই সংস্কৃতির রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন শেখ কামাল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন চাইলে রাজনীতির সংস্কৃতি বদলাতে হয়। রাজনীতির সংস্কৃতিকে টেকসই করার জন্য তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন অঙ্গনে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন আত্মোপলব্ধির সোপান হিসেবে।

‘গোয়েন্দা বিভাগ প্রস্তুত আছে আমাকে গ্রেফতার করবার জন্য। আমিও প্রস্তুত আছি, তবে ধরা পড়ার পূর্বে একবার বাবা-মা, ভাইবোন, ছেলেমেয়েদের সাথে দেখা করতে চাই।’...মন চলে গেছে বাড়িতে। কয়েকমাস পূর্বে বড় ছেলে কামালের জন্ম হয়েছে। ভালো করে দেখতেও পারিনি ওকে। অনুভব করতে লাগলাম যে, আমি ছেলেমেয়ের বাবা হয়েছি।’ [অসমাপ্ত আত্মজীবনী : ১৪৬ পৃষ্ঠা]। শেখ কামালের জন্মের কিছুদিন পরের ঘটনা। ওই সময় এক মাসের বেশি পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান করে দেশে ফিরছিলেন বঙ্গবন্ধু। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা অবস্থায় পাকিস্তান থেকে দিল্লি-কলকাতা হয়ে বাংলাদেশে আসার সময়কার ঘটনা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছিলেন এই কথা।

আজ ৫ আগস্ট, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই বড় ছেলে শেখ কামালের ৭৩তম জন্মদিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। অর্থাৎ ভারতবর্ষ ভাগের পর সদ্য পাকিস্তান রাষ্ট্রে শেখ কামালের জন্ম হয়। সেই অর্থে পাকিস্তান রাষ্ট্রে শোষণ-বঞ্চনা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতা আদায়ের সংগ্রামের পরিক্রমা আর শেখ কামালের বেড়ে ওঠা ছিল অনেকটাই সমান্তরাল। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সন্তান হিসেবে তিনি খুব কাছ থেকেই বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেছেন।

বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন শেখ কামাল। শাহীন স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএ (অনার্স) পাস করেন । তিনি ‘ছায়ানট’-এর সেতার বাদন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। মঞ্চ নাটক আন্দোলনের ছিলেন প্রথমসারির সংগঠক। ছিলেন নাট্যচক্রের নাট্যজন। সংস্কৃতিমনা বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’।

শেখ কামাল ছিলেন ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। অভিনয়শিল্পী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে ছিলেন ব্যাপক পরিচিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে ঘাতকের হাতে নিহত হওয়ার আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষার্থী ছিলেন। নিহত হওয়ার পর তার পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। ছিলেন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও। ১৯৬৯-র গণ-অভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকা পালন করেন শেখ কামাল। তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ারকোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীতে কমিশনন্ড লাভ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানির এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সংস্কৃতিকে তিনি রাজনীতির সমীকরণ ভাবতেন। তাই সংস্কৃতির রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন শেখ কামাল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন চাইলে রাজনীতির সংস্কৃতি বদলাতে হয়। রাজনীতির সংস্কৃতিকে টেকসই করার জন্য তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন অঙ্গনে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন আত্মোপলব্ধির সোপান হিসেবে। শেখ কামাল খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সংগঠিত বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মনিবেদিত ছিলেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই সর্বক্ষেত্রে তিনি তার অসামান্য মেধা ও অসাধারণ কর্মকাণ্ডের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন। লোভ-লালসা তাকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি সবসময়ই ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করে গেছেন।

বাংলাদেশের আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনের রূপকার বলা হয় শেখ কামালকে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ সমাজকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার অগ্রণী সৈনিক হিসেবে সংগঠিত করার জন্য তিনি খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় উদ্যোগী হন। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আবাহনী ক্রীড়াচক্র- যা আজকের আবাহনী ক্লাব। স্বাধীনতা-উত্তর যুব ও ক্রীড়া উন্নয়নে শেখ কামাল যে অনন্য অবদান রেখে গেছেন তার স্মরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, শেখ কামাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পুরস্কার, শেখ কামালের নামে কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণ, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আন্তর্জাতিকমানের স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং শেখ কামালের জীবনের ওপর বিভিন্ন গ্রন্থের প্রকাশ। এছাড়া শেখ কামালের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ফুটবলকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তিনি ছিলেন তার প্রজন্মের অগ্রবর্তী পথপ্রদর্শক। ছিলেন তিনি দূরদর্শী ও গভীর চিন্তাবোধের অধিকারী। শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখসমরে অংশ নিতে চেয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল ওসমানীর এডিসি নিয়োগ করা হলে, সন্মুখযুদ্ধে যেতে না পারার কষ্ট তার ছিল। তবে এডিসি হিসেবে মুক্তিবাহিনীতে গেরিলা বাহিনীর সংগঠন ও তাদের প্রশিক্ষণে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী এক স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন-

“বাবা বঙ্গবন্ধুর মতোই শেখ কামালও ছিলেন একজন অত্যন্ত সাহসী মানুষ। ২৬ মার্চ ভোরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই তিনি তার মাকে লুকিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। তার সাহসী চিন্তা-চেতনা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিচক্ষণতা তাকে যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণ সমাজের কাছে এক অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।”

রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের সন্তান হয়েও অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন শেখ কামাল। ক্ষমতার বিন্দুতে থেকেও তিনি ছিলেন নির্লোভ, নির্মোহ। তার সরলতার পরিচয় মেলে শৈশবেই। বঙ্গবন্ধুর বয়ানেই এই সারল্য ফুটে উঠেছে। একবার জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু প্রায় দেড়মাস টুঙ্গিপাড়ার গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। এ সময় শেখ কামালকে নিয়ে আবেগঘন একটি দিনের ঘটনা আত্মজীবনীর ২০৯ পৃষ্ঠায় এভাবে উল্লেখ করেছেন বঙ্গবন্ধু-

“একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। একসময় কামাল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি। আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’... কামাল আমার কাছে আসতে চাইতো না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেকদিন না দেখলে ভুলে যায়!”

শেখ কামালকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আবেগঘন উচ্চারণের আরেকটি দৃষ্টান্ত দেয়া যাক।

একবার গ্রেপ্তার অবস্থায় ফরিদপুর কারাগার থেকে জাতির পিতাকে গোপালগঞ্জে আনা হয়েছিল মামলার তারিখে। তখন গোপালগঞ্জ থানা ঘাটে গিয়ে বঙ্গবন্ধু দেখেন তাদের নৌকা। পিতা, স্ত্রী ও সন্তানরা এসেছেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- “এক বছর পরে আজ ওদের সাথে আমার দেখা। হাচিনা আমার গলা ধরল আর ছাড়তে চায় না। কামাল আমার দিকে চেয়ে আছে। আমাকে চেনেও না আর বুঝতেও পারে না। আমি কে? কামালও আমার কাছে এখন আসে। হাচু ‘আব্বা’ বলে দেখে কামালও ‘আব্বা’ বলতে শুরু করেছে।”

কারাগারের রোজনামচা বইয়ের ১৫৯ পৃষ্ঠায় শেখ কামালের প্রসঙ্গ এসেছে। ১৯৬৬ সালের ১২ জুলাই বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে গেলে কামালের পড়াশুনা নিয়ে কথা হয়। বিষয়টি বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন এভাবে-

“রেণু বলল, কামাল খুব লেখাপড়া আরম্ভ করেছে। আগামীবারে মেট্রিক পরীক্ষা দেবে। সকলকে মন দিয়ে পড়তে বলে বিদায় নিলাম।”

পরের বছর কামালের মেট্রিক পরীক্ষার সময়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন-

“৬ এপ্রিল (১৯৬৭) থেকে আমার বড় ছেলে মেট্রিক পরীক্ষা দেবে। কোনো খবর পাই নাই কেমন পরীক্ষা দিলো।’

পরে আবার লিখেন-

“কামাল এসেছিল। বলল পরীক্ষা ভালো দিয়েছে। এই খবরটার জন্য ব্যস্ত ছিলাম।”

শেখ কামাল বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেও স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি ও দেশবিরোধী চক্র জাতির পিতার পরিবার নিয়ে গোয়েবলসীয় কায়দায় বার বার মিথ্যাচার করে জনমানসে এক ভ্রান্ত প্রতিচিত্র আঁকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সময়ের পথ ধরে ইতিহাসের প্রকৃত সত্য আজ প্রতিষ্ঠিত। কালো মেঘ ক্ষণিকের জন্য বাধাগ্রস্ত করলেও যেমন সূর্যোদয় রুখতে পারে না, ঠিক তেমনি সত্য আজ তার নিজস্ব শক্তি নিয়েই সব বাধা ডিঙিয়ে উদ্ভাসিত।

শেখ কামাল অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী ছিলেন। বিরামহীনভাবে ছুটে চলা এ উদ্দীপ্ত কর্মনিষ্ঠ প্রাণের স্পন্দনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয় খুনি ঘাতক চক্র। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের জন্য প্রস্তুতিতেও ছিলেন শেখ কামাল। ১৪ আগস্ট রাত ১০টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ছিলেন জাতীয় ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে। খুনি ঘাতক চক্র শেখ কামালকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুধু এক প্রতিশ্রুতিশীল তারুণ্য বা যুব অহংকারকেই হত্যা করেনি, হত্যা করেছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের এক সম্ভাবনাময় নেতৃত্বকে। ঘাতকরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করলেও স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্দীপ্ত তারুণ্যের অগ্রদূত এবং ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎ, বহুমাত্রিক গুণে-গুণান্বিত এই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, বাঙালির চিন্তা-চেতনায় ও জাতির ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন। প্রজন্মের অহংকার শেখ কামালকে জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?

শেয়ার করুন

যে পারিবারিক শিক্ষায় কামালদের বেড়ে ওঠা

যে পারিবারিক শিক্ষায় কামালদের বেড়ে ওঠা

১৯৭২ সালে জার্মানি সফরে গিয়েছিলেন শেখ কামাল। তখন একটি দোকানে উন্নত মানের ফুটবল দেখে কিনতে চাইলেন। কিন্তু পকেটে যথেষ্ট অর্থ না থাকায় শেষ পর্যন্ত একটি নীল জার্সি নিয়ে দেশে আসেন। এ রঙের জার্সিই আবাহনীর জার্সি হয়ে যায়। অথচ তিনি তখন জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র। বহুবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় ছিলেন। নাট্যচক্রে অভিনয় করেছেন। কিন্তু আচরণ, ব্যবহারে থেকেছেন সাধারণের মতো।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের এমন অনেক ঘটনার বিবরণ রয়েছে, যা আমাদের অশ্রুসিক্ত না করে পারে না। এর মধ্যে একটি ঘটনা আমরা পাই এভাবে- প্রায় আড়াই বছর কারাযন্ত্রণা ভোগের পর তিনি ১৯৫২ সালের অমর ২১ ফেব্রয়ারির আন্দোলনের সময় অনশন ধর্মঘট পালন করেন। রাজপথের আন্দোলনের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন। তাকে মুক্তি দেয়া হয় ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে। মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় ফরিদপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি যান গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে। তখন বড় মেয়ে শেখ হাসিনার বয়স সাড়ে চার বছর এবং পুত্র শেখ কামালের আড়াই বছর। তিনি লিখেছেন, ‘একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু মাঝে মাঝে খেলা পেলে আমার কাছে আসে আর আব্বা আব্বা বলে ডাকে। এক সময় কামাল হাচিনাকে বলছে, হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে একটু আব্বা বলি। আমি আর রেণু দু’জনেই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, আমি তো তোমারও আব্বা।’ [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২০৯]

শেখ কামালের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট। ওই বছরের অক্টোবরে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাজে পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে এক মাসের বেশি কাটান। ফিরে এসেই বন্দি হন, যা স্থায়ী হয় প্রায় প্রায় আড়াই বছর। এ সময় মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সঙ্গে কারাগারে এসে পিতাকে দেখেছেন দুয়েকবার, তবে তা স্মৃতিতে থাকার কথা নয়। পিতাকে চেনার সুযোগ হয়নি পুত্রের!

বঙ্গবন্ধু কৈশোর থেকেই দেশের জন্য, দশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। প্রিয়তম স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা কেবল এটা মেনেই নেননি, সর্বতোভাবে উৎসাহ দিয়েছেন এবং সহযোগিতা করেছেন।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরের পর এই নিয়ে তিনবার বঙ্গবন্ধু জেলে এসেছেন। পাঁচ বছরের পাকিস্তানে তার জেলে কেটেছে প্রায় তিন বছর। এবারের জেলজীবনেই একবার স্বামীকে বেগম মুজিব বলেন, ‘জেলে থাক আপত্তি নাই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ।’ [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ১৯১]

১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জেল থেকে মুক্তির ঠিক দুই মাস পর তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। শুরু হয় প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে সফর। ততদিনে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের নির্দেশ গেছে সর্বত্র- ‘রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত হলে অ্যারেস্ট হিম অ্যাগেইন।’ [গোয়েন্দা প্রতিবেদন, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪৬]

ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান সফরে যান, উদ্দেশ্য রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কে সেখানে জনমত গঠন। সেখানে অবস্থানকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে চিঠি লেখেন ১৪ জুন (১৯৫২)। এ চিঠির একটি বাক্য ছিল এভাবে- ÔPlease don’t think for me. I have born to suffer.’ [গোয়েন্দা রিপোর্ট, দ্বিতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা ২৩৮]

বঙ্গবন্ধুর এই কষ্ট স্বীকার ছিল বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য, উন্নত বিশ্বের সারিতে এ জনপদ নিয়ে যাওয়ার জন্য। এ জন্য পিতা-মাতা এবং স্ত্রী-পুত্র-কন্যার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। তারাও এসব হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেসব গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তাতে আমরা পাই তৃতীয় সন্তান শেখ জামালের জন্মকালের একটি মর্মস্পর্শী বিবরণ। ১৯৫৩ সালের ১৪ মে পাকিস্তানের গোয়েন্দারা ‘অসাধারণ দক্ষতায়’ ঢাকার জিপিও থেকে ‘আটক’ করে একটি চিঠি, যাতে ৫ মে তারিখ দিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ‘স্নেহের রেণু। আজ খবর পেলাম তোমার একটি ছেলে হয়েছে। তোমাকে ধন্যবাদ। খুব ব্যস্ত, একটু পরে ট্রেনে উঠব। ইতি তোমার মুজিব।’ [গোয়েন্দা রিপোর্ট, তৃতীয় খণ্ড- পৃষ্ঠা ২৩৩]

শেখ জামালের জন্মের পর লেখা এ চিঠিটি কি প্রাপক বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছে পৌঁছেছিল? পৌঁছালে চিঠিটা চোখের জলে কতটা সিক্ত হয়েছিল? গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু ৫ মে ঢাকার ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন থেকে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ ঈশ্বরদীগামী ট্রেনে ওঠেন। পরদিন পাবনায় ছিল জনসভা।

কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর। বঙ্গবন্ধু সে সময় ছিলেন চট্টগ্রামে, আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে সম্মিলিত বিরোধীদলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহকে নিয়ে জনসভায়। রাসেলের বয়স দেড় বছর হতে না হতেই বঙ্গবন্ধু ফের কারাগারে, মুক্তি সনদ ছয় দফা প্রদানের অভিযোগে। কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে ১৯৬৭ সালের ১৫ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘‘রাসেল ওর মাকেই আব্বা ডাকছিল। রেণু বলছিল, ‘বাড়িতে আব্বা আব্বা করে কাঁদে তাই ওকে বলেছি আমাকে আব্বা বলে ডাকতে।’’ [পৃষ্ঠা ২২১]

এ তারিখেই বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, সংসার কীভাবে চলবে, জেল গেটের সাক্ষাৎকারে সে আলোচনা ওঠায় রেণু বলল, ‘‘চিন্তা তোমার করতে হবে না। সত্যই আমি কোনোদিন চিন্তা বাইরেও করতাম না, সংসারের ধার আমি খুব কমই ধারি।’’ [পৃষ্ঠা ২২২]

২৩৩ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, “বহুদিন পরে ছেলেমেয়েদের ও রেণুর সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বললাম।... আমি তো সারাজীবনই বাইরে বাইরে অথবা জেলে কাটাইয়াছি তোমাদের মা’ই সংসার চালাইয়াছে। তোমরা মানুষ হও। ছোট মেয়েটা বলল, আব্বা তোমার জেল এক বৎসর হয়ে গেল। আমি ওকে আদর করে বললাম, আরও কত বৎসর যায় ঠিক কি?”

বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের জীবন ছিল সাদামাটা, আর সব সাধারণ বাঙালি পরিবারের মতো। শেখ হাসিনার বিয়ে হয়েছে ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে একেবারেই ঘরোয়াভাবে, যখন আগরতলা মামলা দায়েরের ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত পর্যায়ে। তিনি ইডেন কলেজ ইন্টারমিডিয়েট শাখার নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। শেখ কামালের সঙ্গে আমি একসঙ্গে ছাত্র আন্দোলন করেছি। ছাত্রলীগের সব কাজে সামনের সারিতে। এ সংগঠনের ঢাকা নগর কমিটি কিংবা কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে সহজেই নির্বাচিত হতে পারতেন। ১৯৭০ কিংবা ১৯৭২ সালে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে চাইলেও কেউ আপত্তি করত না। কিন্তু এ ধরনের পদে তার আগ্রহ দেখিনি। স্বাধীনতার পর আবাহনী ক্রীড়া চক্র গড়ে তোলেন। বাংলাদেশের ফুটবলে আধুনিকতার ধারা সূচনা হয় এ টিমের হাত ধরে।

১৯৭২ সালে জার্মানি সফরে গিয়েছিলেন শেখ কামাল। তখন একটি দোকানে উন্নত মানের ফুটবল দেখে কিনতে চাইলেন। কিন্তু পকেটে যথেষ্ট অর্থ না থাকায় শেষ পর্যন্ত একটি নীল জার্সি নিয়ে দেশে আসেন। এ রঙের জার্সিই আবাহনীর জার্সি হয়ে যায়। অথচ তিনি তখন জাতির পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর পুত্র। বহুবিধ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় ছিলেন। নাট্যচক্রে অভিনয় করেছেন। কিন্তু আচরণ, ব্যবহারে থেকেছেন সাধারণের মতো।

১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি তার বিয়ে হয় বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র সুলতানা খুকির সঙ্গে। আমরা তখন একসঙ্গে জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। বিনয়ের সঙ্গে নিমন্ত্রণ জানিয়ে বলেছিলেন- আব্বা-মা আপনাদের সবাইকে বিয়েতে যেতে বলেছেন। বৌভাতে আয়োজন ছিল সিঙ্গারা ও চমচম। কয়েকদিন পর শেখ জামালের বিয়ে হয় একেবারেই ঘরোয়া পরিবেশে।

বিয়ের সময় সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল যে শাড়ি পরেছিলেন, বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে তা সবার দেখার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। আমি একবার সেখানে থাকার সময় সেখানে কয়েকজন দর্শনার্থী উপস্থিত হন। তারা রায়ের বাজারের একটি বস্তিতে থাকেন, এমনটিই মনে হয়েছিল তাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনায়। এই দলে থাকা দুটি মেয়ে একে অপরকে বলছিল- ‘দেখ দেখ, আমগো বস্তির মতো শাড়ি।’

জাতির পিতা ও বঙ্গমাতা এভাবেই সন্তানদের শিক্ষা দিয়েছেন। অথচ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ যখন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে এবং বেগম মুজিব রয়েছেন ধানমণ্ডির একটি বাসায় বন্দিজীবনে। সর্বত্র চলছে গণহত্যা। সেই ভয়ংকর সময়ে বেগম মুজিব দুই পুত্র কামাল ও জামালকে পাঠালেন মুক্তিবাহিনীতে- পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বাংলাদেশের মাটি থেকে নির্মূলের জন্য। রণাঙ্গনে তারা লড়েছিল বীরের মতো। বঙ্গবন্ধুও ফিরে আসেন মুক্ত স্বদেশে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৭৪ সালের মার্চে শেরে বাংলা নগরে নতুন গণভবন তৈরি হয়ে যায়। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ছোট বাড়ি ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গণভবনে উঠবেন, এটাই ধারণা করা হচ্ছিল। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মহিয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বলেন, সরকারি ভবনের আরাম-আয়েশে প্রতিপালিত হলে ছেলেমেয়েদের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণে অহমিকাবোধ ও উন্নাসিক ধ্যানধারণা সৃষ্টি হবে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। [সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ : এম এ ওয়াজেদ মিয়া, পৃষ্ঠা ১৭৪]

এই তো আমাদের জাতির পিতার পারিবারিক মূল্যবোধ!

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?

শেয়ার করুন

শেখ কামালকে যেমন দেখেছি

শেখ কামালকে যেমন দেখেছি

মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে এসে শেখ কামাল আবাহনী ক্রীড়া চক্র প্রতিষ্ঠা করেন। তখনি আবাহনী ফুটবল টিম বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকে। নিজে বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে হওয়া সত্ত্বেও রাজনীতিতে আগ বাড়িয়ে কখনও কিছু করতে যাননি। কারো তদবির সুপারিশ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাননি। বঙ্গবন্ধুর গোটা পরিবারই কারো তদবির ও সুপারিশে কোনো প্রকার আগ্রহ দেখাননি। তেমন অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে কেউ করেছে বলে শুনিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন পূর্ব বাংলার জনগণের কাছে ৬ দফা প্রদানের পর জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, তখন তার সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষই অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে। তার পরিবারের খোঁজখবরও মানুষের মুখে মুখে কম বেশি উচ্চারিত হতে থাকে। শেখ হাসিনা, শেখ কামালসহ তার সন্তানদের নামও মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতো। সেই সময়ে আমরা যারা গণ-অভ্যুত্থান দেখেছি কিংবা অংশ নিয়েছি, আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের নাম দূর থেকে কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুনেছি। শেখ কামালের নাম সেই সময় থেকে আমাদের মতো কিশোর-তরুণদের মুখে উচ্চারিত হতো।

’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি বন্দি অবস্থা থেকে পালিয়ে সীমান্ত পাড়ি দেন, যুদ্ধে একজন লড়াকু হিসেবে অংশ নেয়ার কথাও শোনা গেছে। যুদ্ধ শেষে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসি। ১৯৭৩ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, উঠি সলিমউল্লাহ হলে। হলে ওঠার পর জানতে পারি শেখ কামাল এই হলেরই একজন অনাবাসিক ছাত্র। তবে তিনি প্রায়ই হলে আসেন, হলের সম্মুখে ব্যাডমিন্টন খেলেন। এছাড়া ছাত্রদের সঙ্গেও মাঝেমধ্যে আড্ডা দেন। শেখ কামাল সম্পর্কে দীর্ঘদিন থেকে অনেক কিছু জানা ও শোনার পর তাকে দেখা ও পরিচিত হওয়ার বেশ আগ্রহ মনের মধ্যে ছিল। প্রথম তাকে সমাজতত্ত্ব বিভাগের করিডরে দেখতে পাই। বেশ লম্বা, চশমা পরা এবং অত্যন্ত সাধারণ শার্ট-প্যান্ট পরা হালকা পাতলা- তরুণটিকে দেখেই চিনতে ভুল হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর চেহারার সঙ্গে কিছুটা মিল খুঁজে পেলাম। তিনি বন্ধুবান্ধব নিয়ে করিডোরে কথা বলছিলেন, আড্ডা জমিয়েও সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। বেশ কিছুক্ষন তার দিকে তাকিয়ে আমার অর্থনীতি বিভাগের দিকে পা বাড়ালাম। এর কদিন পরেই একদিন তাকে সলিমউল্লাহ হলের সম্মুখে ব্যাডমিন্টন খেলতে দেখে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে তার খেলা উপভোগ করছিলাম। দারুণ খেলতেন। খেলার পর আমরা যারা দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিলাম তাদের সঙ্গে পরিচিত হলেন, খোঁজখবর নিলেন, কে কোন বিভাগে পড়ছি ইত্যাদি জানার চেষ্টা করলেন।

এর কদিন পর আবার একদিন তাকে একটি ছোট্ট জিপ গাড়ি চালিয়ে হলের সম্মুখে এসে নামতে দেখলাম। তখন আমি হলের সম্মুখে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের দেয়াল পত্রিকাগুলো দেখছিলাম। আমি নিজেও তেমন একটি দেয়াল পত্রিকা রচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। হলের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন নিজ নিজ হল শাখার উদ্যোগে এসব দেয়াল পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করত। আমি ছাত্র ইউনিয়নের একজন সমর্থক ছিলাম। সেকারণে ছাত্র ইউনিয়নের দেয়াল পত্রিকার সম্মুখে দাঁড়িয়ে পত্রিকাটি ভালো করে দেখছিলাম। কামাল ভাই কদিন আগেই আমাকে ব্যাডমিন্টন খেলার দর্শক হিসেবে দেখেছিলেন।

তিনি আমাকে দেখেই গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি আমার দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমিও হাত বাড়াতেই তিনি কাছে টেনে দিলেন, খোঁজখবর জানতে চাইলেন, দেয়াল পত্রিকাগুলো ঘুরে দেখলেন, আমাদের পত্রিকাটির প্রশংসাও করলেন। এরপর তিনি হলের ভেতরে সম্ভবত প্রভোস্ট রুমে যান। বিকেলে আবার তাকে হলের সম্মুখে খেলতে দেখেছি। তার সঙ্গে স্বল্প এই করমর্দন, কর্থাবার্তা আমাকে আজও তাড়িত করে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকবারই তাকে দেখেছি। টিএসসিতে অনুষ্ঠিত একটি নাটকে তাকে মূল চরিত্রে অভিনয় করতেও দেখেছি। তার অভিনয়দক্ষতা সবাইকে মুগ্ধ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাগ ডেতে তাকে ভীষণভাবে সাজগোজ করে নেতৃত্ব দিতে দেখেছি।

১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হওয়ার পর ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের বিভাগপর্যায়ে সংবর্ধনা দেয়ার আয়োজন করে। শিক্ষকদের হাতে ফুল তুলে দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ সুন্দর করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন নতুন এই প্রাণস্পন্দনের ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায়। দেশে গঠিত হয় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে জাতীয় ছাত্রলীগ।

ঢাকা কলেজের বিপরীতে মিরপুর রোডে জাতীয় ছাত্রলীগ অফিসে শেখ কামালকে একদিন বেশ জমিয়ে আড্ডা দিতে দেখেছিলাম। মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতার মতো তার বলা গল্প এবং আড্ডা অনেকক্ষণ উপভোগ করেছিলাম। সেটিই ছিল শেখ কামালকে আমার শেষ দেখা।

২৮ জুলাই আমি সোভিয়েত সরকারের বৃত্তি নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করি। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খবরটি যখন মস্কোতে বসে রেডিওতে শুনতে পাই তখন মনটা ছিল ভীষণভাবে ভারাক্রান্ত। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার খবরে গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীরা শোকাহত ছিল। যে কজন শিক্ষার্থী তখন মস্কোতে অবস্থান করছিলেন তারা সমবেত হলেন একটি কক্ষে। আমরা নবাগতরাও তাতে অংশ নেই। আমরা বয়সে তরুণ হলেও বুঝতে পেরেছিলাম যে এটি বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।

এই ষড়যন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় নয়, পাকিস্তানের এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশবিরোধীদের ধারায় পরিচালিত করার নীলনকশা। ’৭৫ পরবর্তী থেকে সেই ধারায় বেশ কয়েকটি সরকার বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে পরিচালনা করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ হারিয়েছে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের যারা পূর্ব বাংলার জনগণের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য সারাজীবন ত্যাগ স্বীকার করেছেন। শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীরা রাতের আঁধারে পরিবারের সবাইকে নির্দয় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে।

শেখ কামাল বঙ্গবন্ধু পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান, তার বড় শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার পিঠাপিঠি ১৯৪৯ সালের আজকের এই দিনে তার জন্ম। ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর পরিবার ৫০-এর দশকে এলেও পরিবারের ব্যয়ভার অনেকটাই বহন করতেন বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান। বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকার কারণে কয়েকবার তাদের ঢাকায় থাকা নিয়ে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। অনেকেই বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি ছিলেন না। পুরাতন ঢাকাতেই থেকেছিলেন তারা। সেখানেই তাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা। বঙ্গবন্ধু রাজনীতির শত ব্যস্ততার মধ্যেও সন্তানদের লেখাপড়া, বেড়ে ওঠা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নজর দেয়ার ওপর গুরত্বারোপ করতেন।

এই দায়িত্বটি বেগম ফজিলুতুন্নেছা মুজিব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করতেন। ফলে বঙ্গবন্ধুর জন্য রাজনীতিতে সময় দেয়া অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। বেগম মুজিব ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতেন। ছোটবেলা থেকে কামাল লেখাপড়ার পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি, সংগীতচর্চা এবং ক্রীড়ায় বেশ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শেখেন। খুব ভালো সেতার, গিটার ও বাঁশি বাজাতেন বলে তার সুনাম ছিল। খেলাধুলাতেও তিনি স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট সুনাম কুড়ান।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে এসে শেখ কামাল আবাহনী ক্রীড়া চক্র প্রতিষ্ঠা করেন। তখনি আবাহনী ফুটবল টিম বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকে। নিজে বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে হওয়া সত্ত্বেও রাজনীতিতে আগ বাড়িয়ে কখনও কিছু করতে যাননি। কারো তদবির সুপারিশ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাননি। বঙ্গবন্ধুর গোটা পরিবারই কারো তদবির ও সুপারিশে কোনো প্রকার আগ্রহ দেখাননি। তেমন অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে কেউ করেছে বলে শুনিনি।

শেখ কামাল ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পদ-পদবি তার ছিল না। তার চলন ও বলনে কোথাও সেই অহংকার বা আভিজাত্য ফুটে ওঠেনি। তিনি তার মতোই চলতেন, সবার সঙ্গে মিশতেন। তবে তিনি সাংস্কৃতিক নানা ক্ষেত্রে নিজেকে নীরবে ব্যস্ত রাখতেন।

খেলাধুলায় তরুণরা যেন উজ্জীবিত হয়, সেজন্যই তিনি আবাহনী ক্রীড়া চক্র স্থাপন করেছিলেন। নিজেও খেলাধুলায় যেমন অংশ নিতেন; তেমনি সংগঠন গড়ে তোলাতেও মনোযোগী হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী ক্রীড়াবিদ হিসেবে সুলতানা আহমেদ খুকি বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। সুলতানা আহমেদ খুকির সঙ্গেই তার বিয়ে হয় ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে।

বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় শেখ কামালকে কখনও ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে কেউ ভাবার মতো কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে দেখিনি। বরং তিনি লেখাপড়া শেষে হয়তো আবাহনী চক্র, নাট্যাঙ্গন কিংবা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকেই অধিকতর মনোযোগী বলে মনে করা হতো।

তার কাজকর্মের সঙ্গে এসবই দৃশ্যমান ছিল। কমবয়সী হলেও তিনি একজন ভালো সংগঠক, উদ্যোক্তা এবং নেতৃত্বদানকারী তরুণ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে রাজনীতিতে সেভাবে যুক্ত করার কোনো বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন এমনটি দাবি করা যাবে না। কারণ বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে পারিবারিক বংশধর প্রতিষ্ঠা করার কোনো কৃত্রিম উদ্যোগ নেননি। শেখ কামাল রাজনীতিতে নিজস্ব যোগ্যতা, দক্ষতা ও আগ্রহে বেড়ে উঠবেন এমনটি হয়তো তখন ভাবা হতো। শেখ কামাল তার নিজস্ব দক্ষতা, ভালো লাগা ও চিন্তার জায়গায় ভূমিকা রাখছিলেন।

তখনও তার সম্মুখে ছিল অনেক বড় ভবিষ্যৎ। সুতরাং বেঁচে থাকলে ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করত তিনি শেষ পর্যন্ত কোথায় নিজেকে যুক্ত করতেন। কিন্তু সেটি হয়নি। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরশ্রীকাতরতা একটি বড় ধরণের খারাপ প্রবণতা ছিল এবং এখনও আছে।

বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় তার বিরোধীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে স্বাভাবিক বিরোধী হিসেবে না ভেবে অনেকটাই ‘শ্রেণিশত্রুর’ দৃষ্টিতে দেখেছেন। এর প্রমাণ পাকিস্তানকালেও যেমন ছিল, বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার, মিথ্যাচার, দুর্নাম ইত্যাদি তেমন করেছে। তাকে হত্যা করে ‘শ্রেণিশত্রুর’ পৈশাচিক মনোবৃত্তিও নিবৃত্ত করেছে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যরাও এই অপপ্রচার, মিথ্যাচার ও ‘শ্রেণিশত্রুর’ পৈশাচিক মানসিকতা থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি।

শেখ কামাল স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নানা অপপ্রচারের শিকার হয়েছিলেন। তার সম্পর্কে জাসদের গণতন্ত্র, মওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’, ‘বিচিত্রা’, ‘হলিডে’ ইত্যাদি পত্রপত্রিকায় নানা ধরনের কল্পকাহিনি প্রচার করা হতো। তাকে বাংলাদেশ ব্যাংক লুটের অপবাদও দেয়া হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সরাসরি যুক্ত থাকার কথাও অপপ্রচার করা হয়। বলা হয়েছিল তার নাকি বিপুল অর্থবিত্ত রয়েছে। এই অপপ্রচারগুলো তরুণসমাজে একটি বড় অংশের মধ্যে যেমন ছিল, একইভাবে গ্রাম-গঞ্জেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়ানো হয়েছিল।

মূলত স্বাধীনতা লাভের পর তরুণদের একটি বড় অংশ রাজনীতির জটিল পাট সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না নিয়েই রোমান্টিক বিপ্লববাদের নানা জটিল তত্ত্বে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এদের কাছে তখন শ্রেণিশত্রু খতম, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি যেন ডালভাতের মতো সহজ বিষয়ে পরিণত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গঠনে বহুদূর যাওয়ার যে সুস্থ স্বাভাবিক যুক্তিবাদী, উদারনৈতিক, রাজনৈতিক জ্ঞান অর্জন অধিকতর প্রয়োজন ছিল সেটি তাদের মূল রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাই স্বভাবগতভাবে উপলব্ধি করার মতো ছিল না।

একটা চরম উত্তেজনাকর বিদ্বেষপূর্ণ পরিবেশ যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে বাস্তবতা বিবর্জিত রাজনীতি-সমালোচনা, অপপ্রচার, মিথ্যাচার ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এর পরিণতি আমাদের জাতির জীবনে কত ভয়ংকর হয়েছিল সেটি ১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে ধীরে ধীরে অনেকই উপলব্ধি করতে পেরেছেন, অনেকেই পারেননি। অতিবিপ্লবী সব দল ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে, দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও ভেঙে অন্যরকম হয়ে গেছে। তারপরও অপপ্রচার, মিথ্যাচার, বিদ্বেষ, বৈরী মনোভাব, যুক্তিহীন, ভিত্তিহীন প্রচার-প্রচারণা শুধু শেষই হয়নি বরং তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে অপশক্তিসমূহ বৃদ্ধি করতে পেরেছে।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর প্রমাণিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যেসব অপপ্রচার ও মিথ্যাচার পত্রপত্রিকা ও জনশ্রুতিতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল তার সবটাই ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ক্ষমতা দখলকারীরা কেউই সেগুলোর প্রমাণ জনগণের সামনে হাজির করতে পারেনি, করেওনি

শেখ কামাল সম্পর্কেও রটানো প্রচার ও অপপ্রচার ছিল বিদ্বেষপূর্ণ, পরশ্রীকাতরতায় ভরপুর। এখনও অনেক তরুণ-তরুণী সেসব অপপ্রচার ও মিথ্যাচারের কথা বিশ্বাস করছে। কিন্তু তাদেরও মেধা, সততা, বিদ্যাবুদ্ধি, জ্ঞানচর্চা ও বই-পুস্তক পড়ে ওইসব অপপ্রচারের রহস্য উন্মোচন করতে খুব একটা মনোযোগী হতে দেখা যায় না। আজ শেখ কামালের জন্মদিন। ১০ দিন পর ১৫ আগস্ট তার অকাল মৃত্যুদিন। এই দুই দিবসে নতুন প্রজন্মের কাজ হবে সেই সময়ের সঠিক ইতিহাসটা জানা, শেখ কামালকে ইতিহাসের সঠিক সত্য থেকে তুলে আনা, তাকে মিথ্যাচারের আবর্জনায় ঢেকে রেখে নিজেরাই পাপে নিমজ্জিত হওয়া থেকে মুক্ত হওয়া।

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?

শেয়ার করুন

উদ্দীপ্ত যৌবনের দূত শেখ কামাল

উদ্দীপ্ত যৌবনের দূত শেখ কামাল

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তার লাশ মানুষকে দেখতে না দেয়া, বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ঘৃণা করতে শেখানোর যে অপচেষ্টা, শেখ কামালও অপচেষ্টার শিকার। যে লোক পয়সার অভাবে হেঁটে বাসায় ফিরতেন, তিনি করবেন ব্যাংক ডাকাতি? ইতিহাসকে কখনও চেপে রাখা যায় না। খুনিরা প্রথমে খুন করে, তারপর সেই খুনকে জায়েজ করার জন্যে খুন হওয়া ব্যক্তির নামে অপপ্রচার চালায়। শেখ কামালের ব্যাপারেও সেটি ঘটেছে।

রাষ্ট্রপ্রধানের সন্তান হলেও তার মধ্যে ছিল না অহংকার, ছিল না বিলাসিতা। তাই বন্ধু, সতীর্থ ও সহপাঠীদের চোখে বঙ্গবন্ধুতনয় শেখ কামাল হয়ে উঠেছিলেন স্বপ্নবান ও আদর্শ তারুণ্যের এক উজ্জ্বল প্রতিকৃতি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল। ১৯৪৯ সালের আগস্টের এই দিনে তার জন্ম। বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ৭২ বছর। উত্তরাধিকার সূত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নানা মানবিক ও নেতৃত্ব গুণাবলি পেয়েছিলেন শেখ কামাল। এর সঙ্গে শাণিত হয়েছিল সংস্কৃতিবোধ ও ক্রীড়া-দর্শন। সংযুক্ত হয়েছিল দেশ ও মানুষের প্রতি অনুপম দরদ এবং দায়িত্ববোধ। খেলার মাঠ থেকে নাটকের মঞ্চ, সংগীতের ভুবন থেকে রাজনীতির ময়দান সর্বত্র ছিল তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। ছিলেন বন্ধু ও সতীর্থদের মধ্যমণি।

শেখ কামাল একাধারে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, রাজনীতিবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও সমাজচিন্তক। তার স্ত্রী সুলতানা কামালও বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ ছিলেন। বিবাহিত জীবনে প্রবেশের এক মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট গোটা পরিবারের সঙ্গে তাকেও শাহাদাতবরণ করতে হয় বাংলাদেশবিরোধী নর্দমার কীটদের হাতে। মানুষ হিসেবে শেখ কামাল ছিলেন অলরাউন্ডার। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে, কিংবা রাজনীতির মাঠে তার প্রয়োজনীয়তা যখন অনিবার্য, ঠিক তখনই রাজনীতির মাঠে। যুদ্ধের ময়দানে বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের পাশাপাশি তাকে পাওয়া গেছে খেলার মাঠে, গানের আসরে, নাটকের মঞ্চে, সেতারের সুরে, বন্ধুদের আড্ডায় ও ছাত্ররাজনীতির স্লোগানে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জাতির পিতাকে আটক করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর মা-মাটি-মাতৃভূমির সম্ভ্রম রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানীর এডিসি হিসেবে দেশকে স্বাধীন করতে তিনি রাখেন বীরত্বব্যঞ্জক ভূমিকা।

একজন ছাত্র সংগঠক হিসেবে তিনি কখনও নেতৃত্বের শীর্ষে আসতে চাননি। তিনিই ছাত্রলীগকে সংগঠিত করতেন, প্রেরণা জোগাতেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা, পরবর্তীকালে জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন দেশ গঠনের কাজে নিজেকে সমর্পণ করেছেন, তখন পিতার কাজে সহায়তা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে কাজ শুরু করেছেন তিনি। তার হাতের ছোঁয়ায় নিমেষেই বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশের ফুটবল, ক্রিকেট, হকিসহ বিভিন্ন খেলাধুলা। আবাহনী ক্রীড়া চক্রের মতো একটি ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার হাতেই। ঢাকার শাহীন স্কুলে অধ্যয়নকালে শেখ কামাল ছিলেন স্কুলের প্রতিটা খেলার পরিচিত মুখ। নিখুঁত লাইন-লেন্থের একজন ফাস্ট বোলার হিসেবেও তার সুনাম ছিল। তিনি আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন দীর্ঘদিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর তিনি ছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বাস্কেটবল টিমের অধিনায়ক। শুধু খেলাধুলা নয়- সংগীত, বিতর্ক, অভিনয়, উপস্থিত বক্তৃতা থেকে শুরু করে কোথায় ছিলেন না শেখ কামাল? ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করে তিনি বাংলা গানের নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলেন।

ফিরোজ সাঁই, ফেরদৌস ওয়াহিদদের মতো জনপ্রিয় পপসংগীত শিল্পীরা এসেছেন এই সংগঠনের মধ্য দিয়েই। বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে পপসংগীতের সূচনা হয়েছিল শেখ কামালের হাত ধরে। পাকিস্তান সরকার যখন রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছিল, তখন শেখ কামাল বিভিন্ন প্রতিবাদী সভায় নিজে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে বাংলা ও বাঙালির প্রাণের রবীন্দ্রসংগীতকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। ছায়ানটের সেতারবাদনের ছাত্র হিসেবে সেতার বাজানোতেও তিনি তালিম নিয়েছিলেন। শেখ কামাল ছিলেন বাংলাদেশের নাট্য-আন্দোলনের এক তরতরে পুরোধা যুবক। তিনি ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ যখন ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক, তখন ‘নাট্যচক্র’ নামে একটি নাটকের সংগঠন গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই নাট্য সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন শেখ কামাল। এই নাট্য সংগঠনের অভিনয়শিল্পী হয়েই নাট্যজন ফেরদৌসী মজুমদারের সঙ্গে কলকাতায় মঞ্চ নাটকে অভিনয় করতে গিয়েছিলেন তিনি।

নাটক শেষে ফেরদৌসী মজুমদার ও শেখ কামালের অটোগ্রাফ নিতে সেদিন দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এই তরুণ মানুষটি থেমে থাকেননি। তিনি সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি নিয়ে পড়াশোনার দিকে আবার ঝুঁকে পড়েন এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন শেখ কামাল। ২৬ বছরের এক টগবগে তরুণ ছিলেন শেখ কামাল। তার এই ছোট জীবন পরিধিতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল উদীয়মান জ্বলজ্বলে তারা। তারুণ্যের প্রতীক। এই ২৬ বছরের জীবনে অনেক কিছু করেছেন তিনি। কিন্তু তাকে নিয়ে হায়েনাদের চক্রান্ত থেমে থাকেনি। তার নামে ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগ এনে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে যা পরবর্তীকালে টিকে থাকতে পারেনি। কারণ, ইতিহাস কখনও মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয় না। এ প্রসঙ্গে আমাদের দেশের বিখ্যাত অভিনেত্রী ডলি জহুর বলেছিলেন, আমি খুব কষ্ট পাই, অভিশাপ দেই, যখন দেখি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে নিয়ে চিরকাল মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত, কাল্পনিক অভিযোগের কথা শুনি। অনেকে জানেন যে, এসব মিথ্যা ও বানোয়াট।

পাছে আওয়ামী লীগ সিল লেগে যায় এই জন্যে তারা এসব সত্যের বিষয়ে মুখ খোলেননি। আর এইসব ঘটনা বের করে আনার জন্যে মিডিয়ার ভূমিকাও দরকার। কারণ, এই মিথ্যাচারের মাধ্যম ও বাহন ছিল গণমাধ্যম ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ছোট বোনের বান্ধবীকে নিজের বোনের মতো করে গাইড করা, অনেক রাতে নাটকের রিহার্সাল শেষ হলে বাসায় পৌঁছে দেয়ার মতো দায়িত্ববোধ যে তরুণের আছে, তার সম্পর্কে ধারণা লাভ করা কঠিন কিছু না।

প্রেসিডেন্টের ছেলে হয়ে যার মধ্যে ছিল না অহংকার। পকেটে টাকা না থাকলে যিনি হেঁটে বাড়ি ফিরতেন। তরুণ বয়সে একজন ছেলের একটি মেয়েকে ভালো লাগতেই পারে। তাইতো ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন একজন ক্রীড়াবিদকে। ঘাতকের আঘাতে তার প্রিয় সহধর্মিণীর মৃত্যু হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তার লাশ মানুষকে দেখতে না দেয়া, বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ঘৃণা করতে শেখানোর যে অপচেষ্টা, শেখ কামালও অপচেষ্টার শিকার। যে লোক পয়সার অভাবে হেঁটে বাসায় ফিরতেন, তিনি করবেন ব্যাংক ডাকাতি? ইতিহাসকে কখনও চেপে রাখা যায় না। খুনিরা প্রথমে খুন করে, তারপর সেই খুনকে জায়েজ করার জন্যে খুন হওয়া ব্যক্তির নামে অপপ্রচার চালায়। শেখ কামালের ব্যাপারেও সেটি ঘটেছে।

শেখ কামাল একজন দক্ষ, বিচক্ষণ সংগঠক ছিলেন তাইতো যুদ্ধের ময়দানে স্বাধীন বাংলার ফুটবল ম্যানেজার তানভীর মাঝার তান্নার সঙ্গে যুদ্ধে প্রায় আলাপ হলেই উনি বলতেন, ‘তান্না, আমরা কি ফিরে যেতে পারব না? দেখে নিস, স্বাধীন হলে খেলার ছবিটাই বদলে দিব আমি’। তিনি তার কথা রেখেছিলেন। ১৯৭৪ সালে আবাহনী যখন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী আইএফএ শিল্ড ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে যায়, তখন আন্তর্জাতিক মাধ্যমেও তার মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে।

ভাইবোনদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বঙ্গমাতা বেগম মুজিব শেখ কামালকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জেলে দেখা করতে গিয়েছিলেন। এমনিতেই রাজনৈতিক কারণে পিতার সঙ্গে তার দেখা তেমন হতো না। তাইতো জেল গেটে শেখ হাসিনা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘বুবু তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা ডাকি?’ এমন একজন মানুষকে নিয়ে কত প্রোপাগান্ডাই না হয়েছে!

শেখ কামালের মিথ্যাচার নিয়ে যখন অনেকেই না জেনে কথা বলে, তখনই হাসি পায়। যে ব্যাংক ডাকাতির কথা বলা হয়, সেখানে দুষ্কৃতিকারীদের ধরতে পুলিশের সঙ্গে শেখ কামালের বন্ধু ও সিনিয়ররাও যোগ দেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ইকবাল হাসান টুকু। তার ড্রাইভার ছিলেন সেই টুকু। জাপার কাজী ফিরোজ রশিদ ছিলেন তার সিনিয়র, তিনিও ছিলেন সেই জিপে। ওই সময়ের ‘দৈনিক মর্নিং নিউজ’-এর সাংবাদিক প্রয়াত এবিএম মুসা পরদিন পত্রিকায় এর সত্যতা প্রকাশ করেন।

পৃথিবীতে ভালো মানুষকে ভালো কাজের জন্যে জীবন দিতে হয়। অনেক ধৈর্য ত্যাগ-তিতিক্ষা কষ্ট সহ্য করতে। বঙ্গবন্ধু পরিবার তার মধ্যে অন্যতম। এ দেশীয় দালাল ও বিদেশি শক্তি এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্রান্তে ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন। আজ যদি শেখ কামাল বেঁচে থাকতেন কেমন হতেন তিনি? এই প্রশ্ন মনের মধ্যে খুব জাগে। ২০২০ সালের এ আধুনিক যুগে তিনি হতেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই তরুণ-সমাজকে আরও মানসিক-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করতেন। যে তরুণ তার জীবনের ২৬ বছরে এত কর্মোদ্দীপ্ত ছিলেন, বেঁচে থাকলে হয়ত আরও কিছু করে যেতে পারতেন দেশের জন্যে। দেশের তরুণদের জন্যে। শেখ কামাল একজন ইয়ুথ আইকন। আজও, এখনও... ।

খুনিরা হয়তো তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তার অবদানকে মুছে দিতে পারেনি। কারণ, হিরো’জ নেভার ডাই...। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের ছাত্ররাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন সূচিত হতো। ক্ষণজন্মা শেখ কামালের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন, তার আদর্শকে যদি আজকের তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া যেত, তরুণদের অন্তরে যদি গেঁথে দেয়া যেত; তাহলে তরুণদের মধ্যে যে গোষ্ঠীটি আজ পথভ্রষ্ট হয়েছে, বিপথে গেছে বা ভ্রান্ত পথে হাঁটছে, তারা সত্যিই দেশপ্রেমিক নাগরিক হয়ে গড়ে উঠতো। আর দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে আজ কণ্টকাকীর্ণ যে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে, শেখ কামাল বেঁচে থাকলে হয়তো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এতটা বন্ধুর পথ তাকে পাড়ি দিতে হতো না। মাত্র ২৬ বছরের ক্ষুদ্র জীবনে শেখ কামাল যেসব অসামান্য কর্ম দিয়ে প্রিয় এ মাতৃভূমিকে সাজিয়েছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্মরণ রাখবে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা ও আন্তরিকতায়। শেখ কামালের জন্মদিনে তার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু! বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ,পরিচালক, এফবিসিসিআই

আরও পড়ুন:
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?

শেয়ার করুন

শেখ কামালকে নিয়ে জাতির জানার আছে অনেক কিছু 

শেখ কামালকে নিয়ে জাতির জানার আছে অনেক কিছু 

বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকলের নৈতিক অবস্থান এবং ক্ষমতার প্রতি মোহমুক্ত মনোভাব, এই পরিবারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মে এসেও পরিবারটি আজও উজ্জ্বল। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতাধর ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবারগুলো আস্তে আস্তে ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে। এর মূল কারণ তাদের উত্তরাধিকারীরা যোগ্যতার প্রশ্নে পূর্বসূরিদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।

বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর যোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল। শৈশবে তাকে নিয়ে কত যে মিথ্যাচার আর বিকৃত ইতিহাস শুনেছি। তারপর স্কুল জীবন থেকে তাকে জানতে শুরু করলাম। ঢাকা কলেজে এসে অনেক কিছু জানলাম এই ট্র্যাজেডি-নায়ক সম্পর্কে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শিক্ষক আর সহকর্মীদের কাছ থেকে তার গল্প শুনতে শুনতে আরও গভীরভাবে আবিষ্কার করলাম এই মেধাবী, সাহসী, দেশপ্রেমিক, স্পষ্টবাদী সংগঠককে। যিনি ছিলেন একাধারে ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠক, নাট্যকর্মী ও নাট্যসংগঠক, শিল্পকলার সকল ক্ষেত্রে যার সুনিপুণ পারদর্শিতা ছিল, ছিলেন ছাত্র সংগঠক ও ছাত্রনেতা, ছিলেন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যিনি তরুণ ও যুব সমাজকে সৃজনশীল রাজনীতি, সাংগঠনিক কার্যক্রম আর ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছিলেন; ছিলেন বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর একজন কমিশনড অফিসার। জন্মের মাসেই ঘাতকের বুলেটে নিহত হয়েছিলেন এই বীর সেনানায়ক।

শহিদ শেখ কামাল ছিলেন পঁচাত্তর পরবর্তী আওয়ামী লীগবিরোধী অপপ্রচার আর ইতিহাস বিকৃতির সবচেয়ে বড় ভিকটিম। এই দেশপ্রেমিক মেধাবী বীরকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী ও তাদের সুবিধাভোগীরা কত রকম অপপ্রচারই না করেছে! এই অপপ্রচারগুলো তারা সুপরিকল্পিতভাবে চালিয়েছিল কখনও কখনও তাদের অবৈধ শাসন আর বাংলাদেশের আদর্শবিরোধী পরিচয়কে আড়াল করার জন্য, আবার কখনও কখনও বাংলাদেশবিরোধী ওই পরিচয়কেই বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

এই অপপ্রচারের আরেকটি কারণ ছিল শেখ কামালের মেধাবী নেতৃত্বের বহুমাত্রিকতা, যা তাকে ইতিহাসে একটা উচ্চতর স্থানে নিয়ে যাবে- খুনি চক্র ও তাদের সুবিধাভোগীদের এই রকম একটি ভয়। তাদের ভয় ছিল এদেশের তরুণ প্রজন্ম এরকম একজন বহুমাত্রিক গুণাবলিসম্পন্ন দেশপ্রেমিক চৌকস তরুণ নেতার অস্তিত্ব ইতিহাসে খুঁজে পেলে তারা আওয়ামী লীগ তথা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি ঝুঁকে যেতে পারে। তাই তারা অপপ্রচার চালিয়েছিল। এই খুনি চক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা নেতৃত্ব আর ইতিহাসকে অনেক ভয় পায়। সেই ভয় থেকেই তারা প্রথমে জাতির পিতাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কারণ তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ তার মূল আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যাবে। এদেশকে অন্য কোনো দিকে ধাবিত করা যাবে না।

এই চক্রটি বুঝতে পেরেছিল, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন একটি জাতি জন্মলাভ করে, অপরদিকে তারই নেতৃত্বে এই জনপদে স্বাধীন বাংলাদেশের আদর্শ ধারণকারী একটি শক্তির উন্মেষ ঘটে। ওই আদর্শবাদী শক্তি তথা বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করার লক্ষ্যেই সেদিন ওই পিশাচরা জাতির পিতাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

তাদের পরিকল্পনায় পিতাকে হত্যার পরই তাদের স্বস্তির কারণ ছিল না। তাই বঙ্গমাতাসহ শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশু রাসেলসহ দেশে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবাইকে হত্যা করল। খুনিরা জানত, বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতিটি সদস্যের এ জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে পরিবারের কেউ যাতে নেতৃত্ব নিতে না পারে, সেই লক্ষ্যেই দেশে অবস্থানরত পরিবারের সবাইকে তারা হত্যা করেছিল। আল্লাহর অশেষ রহমতে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা ও কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা ওই সময়ে বিদেশে ছিলেন। তাই খুনি চক্র তাদেরকে হত্যা করতে পারেনি।

বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের অসাধারণ নেতৃত্বের ক্ষমতা ও বহুমুখী গুণাবলির কারণে তার মৃত্যুর পরও খুনিচক্র তাকে নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিল। সে কারণেই এই চক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা বহু বছর এই প্রতিভাবান নেতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও মিথ্যাচার করেছিল। তারা চরম মিথ্যাচার করল যে, শেখ কামাল নাকি তার বন্ধুদের নিয়ে ব্যাংক ডাকাতি করেছিল। এই জঘন্য মিথ্যাচার তারা পনেরোই আগস্টের পর থেকে করে আসছিল। এটি তাদের একটি পরিকল্পিত মিথ্যাচার। ব্যাংক ডাকাতি করে থাকলে ওই টাকা সুইস ব্যাংকে থাকার কথা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো সদস্যের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দেশ-বিদেশে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা যেসব মিথ্যাচার করেছিল, তার প্রত্যেকটিই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে এই গোষ্ঠীটিই সেনাবাহিনীকে নিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালিয়েছিল। তারা অপপ্রচার চালিয়েছিল, আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিবার সেনাবাহিনী বিরোধী– সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। অশুভ শক্তির এই অপপ্রচার বহুদিন চলেছে। অথচ মানুষ আস্তে আস্তে জানতে পেরেছে, এই সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুর হাতে তৈরি বাহিনী। তারা জানতে পেরেছে, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ দুই পুত্র সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন আর শিশু পুত্র রাসেল দুই ভাইকে অনুসরণ করে সৈনিক হতে চেয়েছিল। শিশু রাসেলের সেই স্বপ্নের কথা জাতির পিতা খুশি মনেই সাংবাদিকদের বলেছেন।

শেখ কামাল জাতির পিতা এবং রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সন্তান হলেও সব সময়ই ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থাকতে পছন্দ করতেন। তিনি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাজকর্মে যুক্ত থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। ক্ষমতার প্রতি তার কোনো মোহই ছিল না।

সেনাবাহিনীর লোভনীয় পদ ছেড়ে তিনি রাজনীতিতে থাকতে চেয়েছিলেন। আবার, রাজনীতিতে ফিরে এসেও কোনো পদ গ্রহণ না করে একজন কর্মী ও সংগঠক হিসেবেই সেখানে মনোনিবেশ করেছিলেন। তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে চাইতেন না। তার মতো চৌকস ও অসাধারণ প্রতিভাবান তরুণ নেতৃত্ব সমসাময়িক কালে বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক পরিবারে ছিল না ।

সত্তরের দশকের শুরুতে যখন সারা বিশ্বেই তরুণ প্রজন্ম ড্রাগ আর মাদকের দিকে ঝুঁকছিল, তখন শেখ কামাল তারুণ্য ও যুব সমাজকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা আর রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত করার মাধ্যমে তাদেরকে দেশ গড়ার পথে নিয়ে গিয়েছিলেন। রাষ্ট্র ও সমাজের এমন কোনো জনকল্যাণমুলক কাজ নেই, যেখানে শেখ কামালের হাতের ছোঁয়া ছিল না।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকলের নৈতিক অবস্থান এবং ক্ষমতার প্রতি মোহমুক্ত মনোভাব, এই পরিবারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ফলে বঙ্গবন্ধু পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মে এসেও পরিবারটি আজও উজ্জ্বল। বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতাধর ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবারগুলো আস্তে আস্তে ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে। এর মূল কারণ তাদের উত্তরাধিকারীরা যোগ্যতার প্রশ্নে পূর্বসূরিদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।

উপমহাদেশের গান্ধী পরিবার, ভুট্টো পরিবার অনেকটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আর বঙ্গবন্ধুর পরিবার দিনে দিনে আরও উজ্জ্বল হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আজ পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর ও সফল রাষ্ট্রনায়ক। বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় প্রজন্ম আজ শুধু বাংলাদেশেই অবদান রাখছেন না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করছেন। দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, দৌহিত্রী সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আজ বিশ্বে অটিজম বিষয়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আরেক দৌহিত্রী টিউলিপ সিদ্দীক তরুণ বয়সেই দুবার ব্রিটিশ এমপি নির্বাচিত।

আরেক দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি বাংলাদেশের উন্নয়নে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। সাধারণত বিশ্বের ক্ষমতাধর ও কিংবদন্তি রাজনীতিবিদদের পরিবারে তাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলোতে ক্ষমতার প্রকাশটা বেশি থাকে। বঙ্গবন্ধু পরিবারের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম। এই পরিবারের নতুন প্রজন্ম ক্ষমতাধারণ ও প্রকাশের পরিবর্তে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মকৌশল দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই আগ্রহী।

আজ শহিদ শেখ কামাল বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকমের হতে পারত। বড় বোন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়তা করতে পারতেন। তিনি বেঁচে থাকলে ক্রীড়া আর সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ অনেক আগেই অনন্য উচ্চতায় চলে যেত। রাজনীতিতে সৃজনশীলতার প্রবক্তা শেখ কামাল বেঁচে থাকলে রাজনীতি এতদিনে আরও বেশি সৃজনশীল ও মেধাভিত্তিক হতো। স্বাধীনতার পর অর্থাৎ সত্তর দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, বিশেষভাবে, রাজনীতিতে তরুণ ও যুব সমাজের ইতিবাচক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এই অসাধারণ মেধাবী সংগঠক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

শেখ কামালকে নিয়ে জাতীয়ভাবে অনেক বেশি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তার বহুমাত্রিক প্রতিভা, নানামুখী জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং রাষ্ট্র ও সমাজ দর্শন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একাধিক ডিসিপ্লিনে গবেষণাকর্ম হতে পারে। এই কাজটি শুরু করার আজ সময় এসেছে। ঘাতক চক্র ও তাদের সুবিধাভোগীরা শেখ কামালকে হত্যার পরও জঘন্য অপপ্রচার চালিয়েছিল তার বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ও কিংবদন্তিসম নেতৃত্বকে ইতিহাস থেকে আড়াল করার জন্য।

ইতিহাসে প্রতিটি মানুষের একটি সত্ত্বা থাকে। মানুষটি জাগতিকভাবে মৃত হলেও ইতিহাসে সেই সত্ত্বা সবসময় জীবিত থাকে। শহিদ শেখ কামালের সেই জাগ্রত সত্ত্বাকে আড়াল করার জন্যই তারা এত বছর এই মিথ্যাচার ও অপপ্রচার করে আসছিল। এই মহান তরুণ নেতাকে নিয়ে ব্যাপকভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে তার সঠিক চিত্র নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপনের সময় এসেছে।

এই কিংবদন্তিতুল্য নেতার আজ জন্মদিন। শুভ জন্মদিন ক্যাপ্টেন শেখ কামাল! আমরা আপনাকে অনেক অনেক ভালোবাসি। আপনি আমাদের কাছে স্বপ্নের নায়কের মতো। আপনি বাঙালির হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন।

লেখক: তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

আরও পড়ুন:
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?

শেয়ার করুন

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যগণ কখনোই কোনো খেদোক্তি প্রকাশ করেননি। বরং পরিবারের সদস্যরা সে-সব সগৌরবে মেনে নিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অংশে পরিণত হয়েছেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, দেশ স্বাধীনের পর কুচক্রী মহল শেখ কামালের বিরুদ্ধে মিথ্যা-বানোয়াট অপপ্রচার চালাবার চেষ্টা করেছিল। যা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বাস্তবে টেকেনি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। আজ তার ৭৩তম শুভ জন্মদিন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে শেখ কামাল দ্বিতীয় ছিলেন। তিনি শাহীন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ কর্মী ও সংগঠক হিসেবে ৬ ও ১১ দফা আন্দোলন এবং ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে শেখ কামাল সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে ’৬৯-এর অগ্নিঝরা গণ-আন্দোলনের স্মৃতি। যে আন্দোলনে শেখ কামালের প্রতিদিনের উপস্থিতি ছিল সবার জন্য তুমুল উৎসাহব্যঞ্জক। এই আন্দোলনে ঢাকা কলেজের ছাত্রদের সংগঠিত করে মিছিলসহ বটতলায় সমবেত হতেন। আমার পরম স্নেহভাজন ছিলেন শেখ কামাল।

মনে পড়ে, ’৬৯-এ পাকিস্তান সামরিক জান্তা সরকার ধর্মীয় উগ্রতার পরিচয় দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে। শেখ কামাল তখন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের সংগঠিত করেন এবং রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি খ্যাতিমান শিল্পী জাহিদুর রহিমকে দিয়ে বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানে গাওয়ানোর উদ্যোগ নেন। বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতার সন্তান তিনি, জন্ম থেকেই তার ধমনীতে নেতৃত্বগুণ আর বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনা। সংস্কৃতিবান শেখ কামালের প্রতিবাদের ভাষা ছিল রবীন্দ্র সংগীত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে যখন যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই বিশ্বকবির গান গেয়ে অহিংস প্রতিবাদের অসাধারণ উদাহরণ রেখেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করে হাতিয়ার তুলে নিয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি ছিলেন শেখ কামাল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে সংগঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার আশাবাদ ছিল, দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রের ছবিটাই পাল্টে দেবেন এবং দেশকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করবেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দেশ পুনর্গঠনে নিজের অসামান্য মেধা ও অক্লান্ত কর্মক্ষমতা নিয়ে জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে ঝাঁপিয়ে পড়েন শেখ কামাল। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। সেখান থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে শেখ কামালের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছায়ানট থেকে সেতার শিক্ষার তালিম নেন। পড়াশোনা, সংগীতচর্চা, অভিনয়, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা থেকে শুরু করে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবার চেষ্টায় সদা-সর্বদা নিয়োজিত ছিলেন শেখ কামাল। অধ্যয়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তার পদচারণায় ছিল মুখর। স্বাধীনতার পর শেখ কামাল তার বন্ধুদের সহযোগে প্রতিষ্ঠা করেন নাট্যদল ‘ঢাকা থিয়েটার’ এবং আধুনিক সংগীত সংগঠন ‘স্পন্দন শিল্পী গোষ্ঠী’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে তিনি ছিলেন সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠক এবং অভিনেতা। আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি দেশের ক্রীড়াজগতে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ‘স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী’র প্রতিষ্ঠাও তাকে অমরত্ব দান করেছে। প্রকৃতপক্ষে শেখ কামাল ছিলেন একজন ক্রীড়া ও সংস্কৃতিমনা সুকুমার মনেবৃত্তির মানুষ। তিনি কখনও ব্যবসায়িক কার্যকলাপে জড়িত হননি, অনর্থক ছোটেননি অর্থের পেছনে।

শাহীন স্কুলের ছাত্র থাকাকালে স্কুলের প্রতিটি খেলায় তিনি ছিলেন অপরিহার্য। এর মধ্যে ক্রিকেট ছিল তার প্রিয়। সেময়ের অন্যতম উদীয়মান পেসার ছিলেন তিনি। ‘আজাদ বয়েজ ক্লাব’ তখন কামালদের মতো উঠতি প্রতিভাদের আশ্রয়স্থল। এখানেই শেখ কামাল প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন দীর্ঘদিন। দেশ স্বাধীনের পর ’৭২-এ ‘আবাহনী সমাজকল্যাণ সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থার নামে সংগঠিত করেন ফুটবল দল ‘ইকবাল স্পোর্টিং’, আর ক্রিকেট, হকির দল ‘ইস্পাহানী স্পোর্টিং’। পরে এসব দলের সমবায়ে নবোদ্যমে যাত্রা শুরু করে ‘আবাহনী ক্রীড়া চক্র’।

ফুটবল, ক্রিকেট, হকি এই খেলাগুলোতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল কামালের। তার স্বপ্ন ছিল একদিন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশ হবে অপরাজেয় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রীড়াশক্তি। সত্যিই সে বেঁচে থাকলে সেটা সম্ভব ছিল। স্বপ্ন তার দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছিল বহুদূর অবধি। ফুটবলের উন্নতির জন্য ’৭৩-এ আবাহনীতে বিদেশি কোচ বিল হার্টকে নিযুক্ত করেন। যোগ্যতা, দক্ষতা আর দেশপ্রেমের অসামান্য স্ফূরণে শেখ কামাল অল্প দিনেই বদলে দিয়েছিলেন সদ্য স্বাধীন একটা দেশের ক্রীড়াক্ষেত্র। শুধু ক্রীড়াই নয়, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সব শাখাতেই ছিল তার মুন্সিয়ানা ও অসামান্য সংগঠকের ভূমিকা।

শেখ কামালের নবপরিণীতা বধূ সুলতানা খুকু ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। দেশজোড়া খ্যাতি ছিল তার। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার পরিচিতি ছিল এক প্রতিভাবান অ্যাথলেট হিসেবে। নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন। ’৭৫-এর ১৪ জুলাই যেদিন গণভবনে শেখ কামাল ও শেখ জামাল দুই ভাইয়ের বিয়ে হয় সেদিন আমি সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারিনি। কেননা ওই বছরের ১১ জুলাই আমার বড় ভাই পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) মৃত্যুবরণ করেন। আমি তখন ভোলায়।

বিয়ের দিন ভোলার পুলিশ স্টেশনে ফোন করে বঙ্গবন্ধু আমার খবর নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘জামাল-কামালের বিয়ের আসরে সবাই আছে। শুধু তুই নাই।’ কত বড় মহান নেতা যে আমার মতো ক্ষুদ্রকর্মীর কথাও সেদিন তিনি ভোলেননি। বিয়ের অল্প কিছুদিন পর ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫-এ সেনাবাহিনীর কিছু বিশ্বাসঘাতক উচ্ছৃঙ্খল সেনাসদস্যের হাতে পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও নববিবাহিতা দুই বধূ, দুই ভাই শেখ জামাল, শেখ রাসেলসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নির্মম মৃত্যুকে বরণ করতে হয়।

জাতির পিতা জীবনের যৌবনের বারোটি বছর কারান্তরালে কাটিয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে শত-দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থেকেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যগণ কখনোই কোনো খেদোক্তি প্রকাশ করেননি। বরং পরিবারের সদস্যরা সে-সব সগৌরবে মেনে নিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অংশে পরিণত হয়েছেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, দেশ স্বাধীনের পর কুচক্রী মহল শেখ কামালের বিরুদ্ধে মিথ্যা-বানোয়াট অপপ্রচার চালাবার চেষ্টা করেছিল। যা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বাস্তবে টেকেনি।

শেখ কামালের আচার-আচরণ কেমন ছিল সে-সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবুল ফজল রচিত ‘শেখ মুজিব: তাকে যেমন দেখেছি’ গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ তুলে ধরছি। নাতিদীর্ঘ এই গ্রন্থটির ৪৭-৪৮ এই দুই পৃষ্ঠাজুড়ে আছে একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখা। লেখাটির শিরোনাম ‘শেখ কামাল: স্মৃতিচারণ’।

তিনি লিখেছেন, “১৭ই মার্চ শেখ সাহেবের জন্মদিন। স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগ প্রতি বছর এ দিনটি পালন করে থাকে। ১৯৭৪-এর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার জন্য ঢাকার ছাত্রলীগ আমাকে অনুরোধ জানায়। আমি রাজি হলাম, তবে দিনে দিনে ফিরে আসতে চাই এ শর্তে। তারা সেভাবে বিমানের টিকেট পাঠিয়ে দিয়েছিল।

১৭ তারিখ ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে আমি চিন্তা করতে লাগলাম, ওরা আমাকে নিতে আসবে কিনা, এলেও আমি চিনতে পারবো কিনা। ওদের কারো সঙ্গে তো আমার দেখা নেই। ...একধারে দেখলাম একটা ছিপছিপে গোঁফওয়ালা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বেশ লম্বা বলে সহজে চোখে পড়ে। ছেলেটাকে আমি চিনতে পারলাম না। লাউঞ্জের প্রবেশপথে ছেলেটি এগিয়ে এসে বলে: ‘আপনাকে নিতে এসেছি।’ বলেই আমার হাত থেকে ব্যাগটি আমার আপত্তি অগ্রাহ্য করে নিজের হাতে নিয়ে নিল। নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম: তুমি ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে এসেছ? ‘জ্বী হ্যাঁ।’ নম্র কণ্ঠে জবাব দিলো ছেলেটি।

ওর পেছনে পেছনে হেঁটে এসে একটা গাড়িতে উঠে বসলাম। ড্রাইভারের সিটে গিয়ে বসলো ও নিজে এবং শুরু করলো ড্রাইভ করতে। তার আগে ও জেনে নিয়েছে আমি কোথায় উঠবো। গাড়িতে তৃতীয় ব্যক্তি নেই। কিছুদূর যাওয়ার পর আমার মনে হঠাৎ কৌতূহল হলো, জিজ্ঞাসা করলাম: তুমি কি করো? বললে: ‘অনার্স পরীক্ষা দিয়েছি সোশিয়োলজিতে।’ ঢাকা থেকে? ‘জ্বী হ্যাঁ।’ শেখ সাহেবের সঙ্গে ছেলেটির দৈহিক সাদৃশ্য আমার মনে ধীরে ধীরে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছিল। জিজ্ঞাসা করলাম: তোমার নাম। ‘শেখ কামাল।’ ও তুমি আমাদের শেখ সাহেবের ছেলে।”

এই ছিলেন শেখ কামাল। জাতির পিতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তার মধ্যে কোনো অহমিকাবোধ ছিল না। তিনি ছিলেন বিনয়ী ও মার্জিত। দাম্ভিকতা ছিল তার স্বভাববিরুদ্ধ। পরোপকারী, বন্ধুবৎসল ও মার্জিত শেখ কামালের বিনম্র আচরণে মুগ্ধ হতো সবাই।

পরিশেষে, কামালের শৈশবের একটি স্মৃতি উদ্ধৃত করছি। যে স্মৃতিকথাটি পাঠ করলে দু’চোখ পানিতে ভরে আসে, অশ্রু সংবরণ দুঃসাধ্য হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ শিরোনামের লেখায় এই স্মৃতি উল্লেখ করেছেন।

“১৯৪৯ সালে আমার আব্বা গ্রেফতার হন। আমি তখন খুবই ছোট্ট আর আমার ভাই কামাল কেবল জন্মগ্রহণ করেছে। আব্বা ওকে দেখারও সুযোগ পাননি। একটানা ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি বন্দি ছিলেন। সে সময় আমাদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে আমার মা দাদা-দাদির কাছেই থাকতেন। একবার একটা মামলা উপলক্ষে আব্বাকে গোপালগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়। কামাল তখন অল্প কথা বলা শিখেছে। কিন্তু আব্বাকে ও কখনও দেখেনি, চেনেও না। আমি যখন বার বার আব্বার কাছে ছুটে যাচ্ছি আব্বা-আব্বা বলে ডাকছি ও শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে। গোপালগঞ্জ থানায় একটা বড় পুকুর আছে, যার পাশে বড় খোলা মাঠ। ওই মাঠে আমরা দুই ভাইবোন খেলা করতাম ও ফড়িং ধরার জন্য ছুটে বেড়াতাম। আর মাঝে মাঝেই আব্বার কাছে ছুটে আসতাম। অনেক ফুল, পাতা কুড়িয়ে এনে থানার বারান্দায় কামালকে নিয়ে খেলতে বসেছি। ও হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘হাসু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ কামালের সেই কথা আজ যখন মনে পড়ে আমি তখন চোখের পানি রাখতে পারি না।”

ঘাতকের বুলেট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। ঘাতকেরা চেয়েছিল বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করতে। তারা জানত জাতির পিতার সন্তানেরা মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারক-বাহক। সেজন্য তারা শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল কাউকেই রেহাই দেয়নি। সেদিন জাতির পিতার দুই কন্যা বিদেশে থাকায় ঘাতকের বুলেট তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের পর ’৮১তে আমরা দলীয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার হাতে শহিদের রক্তে ভেজা দলীয় পতাকা তুলে দেই। সেই পতাকা যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে হাতে তুলে নিয়ে জাতির পিতার আদর্শ সমুন্নত রেখে তিনি আজ দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন করার যে স্বপ্ন শেখ কামাল দেখতেন সেই অসমাপ্ত কাজটিও তারই পৃষ্ঠপোষকতায় সাফল্যের সঙ্গে করে চলেছেন।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

আরও পড়ুন:
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?

শেয়ার করুন