সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

কয়েকজন আমলার গোঁয়ার্তুমি আর ব্যক্তি আক্রোশের কারণে রোজিনার তিল ইস্যুকে তাল বানানো হয়েছে। সচিবালয়ে ছয় মিনিটে যেটি মিটে যেতে পারত, তা সারা বিশ্ব কাঁপিয়েছে। মূল যে ভোগান্তি, রোজিনা তা সহ্য করেছেন। আমি চাই মামলাটি চলুক। নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, রোজিনা ন্যায়বিচার পাক। তাহলে শতবর্ষী অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ব্যাপারে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সীমা সম্পর্কে আদালতের একটা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসবে।

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে ছয় ঘণ্টা সচিবালয়ের একটি কক্ষে আটকে রাখা, থানায় পাঠানো, মামলা, থানায় রাত কাটানো, জামিন নিয়ে টালবাহানায় পাঁচদিন কাশিমপুর কারাগারে কাটানোর পর মুক্তি- পুরো ঘটনায় দেশ-বিদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে অনেক আলোচনা, বিতর্ক, টক শো, লেখালেখি, আন্দোলন হয়েছে।

রোজিনার মুক্তির পর পুরো বিষয়টি থিতিয়ে এসেছে, সাংবাদিকদের আবেগও অনেকটাই প্রশমিত। এখন সময় এসেছে পুরো বিষয়টি নির্মোহ দৃষ্টিতে মূল্যায়নের, লাভক্ষতির হিসাব মেলানোর।

রোজিনা মুক্তি পেলেও সাংবাদিকরা তার মামলাটি প্রত্যাহারের দাবি করেছেন। তবে আমি এই দাবির সঙ্গে একমত নই। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না, তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে না, এমনটা আমি মনে করি না। তবে আমি মনে করি, কয়েকজন আমলার গোঁয়ার্তুমি আর ব্যক্তি আক্রোশের কারণে রোজিনার তিল ইস্যুকে তাল বানানো হয়েছে।

সচিবালয়ে ছয় মিনিটে যেটি মিটে যেতে পারত, তা সারাবিশ্ব কাঁপিয়েছে। মূল যে ভোগান্তি, রোজিনা তা সহ্য করেছেন। আমি চাই মামলাটি চলুক। নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, রোজিনা ন্যায়বিচার পাক। তাহলে শতবর্ষী অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ব্যাপারে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সীমা সম্পর্কে আদালতের একটা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসবে।

যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমে যাবে। তবে যারা বেআইনিভাবে রোজিনাকে সচিবালয়ে ছয় ঘণ্টা আটকে রাখল, তল্লাশি করল, মোবাইল কেড়ে নিল; রোজিনার পরিবারের অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা উচিত। আর যে কর্মকর্তা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নথি তার টেবিলে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখল, সরকারের উচিত খামখেয়ালির দায়ে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া।

এবার আসি লাভক্ষতির কথায়। এই ঘটনায় সরকারের কোনোই লাভ হয়নি, পুরোটাই ক্ষতি। সামান্য একটা ঘটনায় বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। রোজিনার মুক্তিতেও যার রেশ শেষ হবে না। এই একটি ঘটনাই ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত যেকোনো সূচকে বাংলাদেশের অবনমন ঘটাবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী অসহায়ের মতো স্বীকার করেছেন, গুটিকতক লোকের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে তাদের জবাবদিহি করতে হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা খুব পরিকল্পনা করে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন, এমন মনে হয় না। কিন্তু আমলাদের গোঁয়ার্তুমির কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ঘটনাটি নিয়ন্ত্রণ করতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। সরকারের লাভের খাতা পুরোটাই শূন্য।

এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে ব্যক্তি রোজিনার। ছয় দিনে কষ্ট যা হবার তা হয়ে গেছে। কিন্তু এই ঘটনা জাতীয় পর্যায় তো বটেই রোজিনা ইসলামকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেবে। আর গত কয়েকবছর ধরে দারুণ সব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন রোজিনার পক্ষে কথা বলবে। লাভ হয়েছে প্রথম আলোরও।

নানা কারণে পত্রিকাটি চাপের মুখে ছিল। রোজিনা ইস্যুতে পত্রিকাটি নতুন করে ইতিবাচকভাবে আলোচনায় এসেছে। ‘অভিজাত’ প্রথম আলো সাধারণ সাংবাদিকদের দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে কখনও পাশে না থাকলেও তাদের বিপদে সাধারণ সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ করেছে। আশা করি প্রথম আলোও বিষয়টি উপলব্ধি করবে। সাংবাদিকদের সব ন্যায্য আন্দোলন-সংগ্রামে আশা করি প্রথম আলোকে আমরা পাশে পাব।

এই যে বললাম ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ, এটাই হলো এই ঘটনায় সাংবাদিকদের প্রাপ্তি। অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের সাংবাদিকদের দ্বিধাবিভক্ত। কোনো ইস্যুতেই তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না। ফলে সরকার নানাভাবে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করতে পারে। নানা আইন চাপিয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশের অন্য সব খাতের মতো সাংবদিকরাও দুই ভাগে বিভক্ত। মোটা দাগে বিভক্তিটা হলো স্বাধীনতার পক্ষের তথা আওয়ামীপন্থি, স্বাধীনতার বিপক্ষের তথা বিএনপি-জামায়াতপন্থি। অন্য সব খাতের মতো গত এক দশকে সাংবাদিকদের মধ্যেও আওয়ামীপন্থি তথা সরকারপন্থিদের আধিপত্য। তাই সরকারের নানা অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের যতটা সোচ্চার হওয়ার কথা, ততটা হতে পারেন না।

সাংবাদিকরা সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা পায় বলে শুনি, তবে জানি না। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝে অনুদান দেন বটে, তবে সেটা দুস্থ, বেকার বা অসুস্থ সাংবাদিকদের জন্য।

রোজিনা ইসলামের গ্রেপ্তারের ঘটনা অনেকদিন পর সাংবাদিকদের নানা সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছে। এমনকি সরকারপন্থি সাংবাদিকরাও নানান হিসাব-নিকাশ ভুলে সরকারের একটি মহলের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পেরেছিলেন। এই ঐক্যটা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে আরও জোরালো ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

এই ঘটনায় সাংবাদিকদের প্রাপ্তি যেমন আছে, ঝুঁকিও আছে। রোজিনার ঘটনা বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আরও কঠিন করে দেবে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। তবে এখন থেকে সাংবাদিকদের গতিবিধি কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকবে। আমার আশঙ্কা সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারও আরও সংকুচিত হয়ে যাবে। সাংবাদিকদের দিকে বিভিন্ন অফিসের কর্তাব্যক্তিরা বাঁকা চোখে তাকাবে, এই বুঝি ফাইল চুরি করে নিয়ে গেল!

আগেই বলে রাখি, ফাইল চুরিটা অত বড় অপরাধ না হলেও কোনোভাবেই বৈধও নয়। আমার অফিসে কেউ ঢুকে অনুমতি ছাড়া কাগজপত্র ঘাটলে বা নেয়ার চেষ্টা করলে আমিও বিরক্ত হবো। তাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দোহাই দিয়ে ঢালাও ফাইল চুরির বৈধতা দেয়ারও কোনো সুযোগ নেই। তবে আগেই যেমন বলেছি, একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহের জন্য নানান চেষ্টা করবে।

আমলারা চাইবেন তথ্য গোপন করতে, সাংবাদিকরা চাইবেন তা ফাঁস করতে। গোপন ক্যামেরার ব্যবহার, সোর্স মানি দিয়ে তথ্য সংগ্রহ, সৎ আমলার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া তো আছেই; প্রয়োজনে জনস্বার্থে তথ্য চুরি করাও যেতে পারে। কিন্তু রোজিনার ঘটনার পর থেকে এই কাজগুলো আরও্র কঠিন হয়ে যাবে। আমলারা নিশ্চয়ই তাদের স্পর্শকাতর ফাইলগুলো টেবিলের ওপর ফেলে না রেখে গোপন ও নিরাপদ স্থানে রাখবেন। সিসিটিভির মনিটরিংও নিশ্চয়ই আরও কঠোর হবে।

সাংবাদিকতাটা কখনই ফুলশয্যা নয়। সৎ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের পথে পথে কাঁটা বিছানো থাকে, নানা ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকি নিয়েই সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়। ঝুঁকি যত বাড়বে, চ্যালেঞ্জও তত বাড়বে। আর চ্যালেঞ্জে জেতার আনন্দটাও বেশি। তবে ঝুঁকির চেয়ে আমি প্রাপ্তিটাকেই বড় বলে মানি। ন্যায্যতার জন্য সাংবাদিকদের ঐক্যকে শক্তি করেই চ্যালেঞ্জ জেতার পথে এগোতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

শেয়ার করুন

মন্তব্য

আফগানিস্তানে তালেবানের শক্তির উৎস পাকিস্তান 

আফগানিস্তানে তালেবানের শক্তির উৎস পাকিস্তান 

আফগানিস্তানের সঙ্গে মিলে সারা বিশ্বে যারা এখন জঙ্গিগোষ্ঠীর সবচেয়ে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বিবেচিত। আর এই দেশ দুটিই বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ ‘রপ্তানি’ করে বেড়ায়। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠনগুলোর অধিকাংশই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকেন্দ্রিক। এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আফগানযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মার্কিন জেনারেল অস্টিন মিলার ১২ জুলাই দায়িত্বভার ত্যাগ করেছেন। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আফগান মিশনের যবনিকাপাত ঘটল। অপরদিকে, মার্কিন বাহিনীর বাগরাম ঘাঁটি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পরই তালেবানরা আফগান সরকারি বাহিনী কিংবা অন্যান্য গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকা কব্জা করতে শুরু করেছে। ফলে প্রতিদিনই কোনো না কোনো জেলা তালেবানের কব্জায় চলে যাওয়ার খবর আসছে। দেশটিতে তালেবান তৎপরতা এতটাই বেড়েছে যে, ধারণা করা হচ্ছে, জঙ্গিগোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের প্রায় অর্ধেক অংশের দখল নিয়েছে। এরই মধ্যে ইরান-আফগান, আফগান-পাকিস্তান, আফগান-চীন সীমান্ত ক্রসিং ও বাণিজ্যিক রুটও তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে গোষ্ঠীটি। জাতিসংঘ বলছে, তারা যেসব জেলা দখল করেছে, সেগুলো দেশটির বিভিন্ন প্রাদেশিক রাজধানীর চারপাশে অবস্থিত। অর্থাৎ, আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হলেই প্রাদেশিক রাজধানীগুলো দখল করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে তালেবান।

অনেক ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রতিরোধের চেষ্টা ছাড়াই আফগান সেনাবাহিনী তালেবানের হাতে আত্মসমর্পণ করছে। তালেবানরা মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সেনাদের আক্রমণ না করলেও আফগান সরকারি বাহিনী এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যে পরিণত করেছে। অপরদিকে, প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির অনুগত সেনারা অনেক জায়গায় আত্মসমর্পণ করছে এবং অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তাজিকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। এসব কারণে একদিকে যেমন গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে দেশটি, তেমনই আশপাশের বহু দেশে এর আঁচ লাগার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। হুমকিতে পড়েছে পুরো দক্ষিণ এশিয়া।

এরইমধ্যে কিছুদিন আগে প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আফগানিস্তানের চলমান সংঘাতে তালেবানকে সহযোগিতা করার অভিযোগ তুলেছেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা অনুযায়ী, তালেবানের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য গত মাসেই পাকিস্তান এবং অন্যান্য জায়গা থেকে আফগানিস্তানে ১০ হাজারের বেশি মানুষ এসেছে। প্রেসিডেন্টের পর সম্প্রতি আফগানিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হামদুল্লাহ মুহিবও একই অভিযোগ এনেছেন। তিনি তালেবানকে আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা দেয়ার জন্য পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেছেন। হামদুল্লাহ মুহিবের দাবি, ইসলামাবাদের প্রত্যক্ষ মদদে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান থেকে প্রায় ১৫ হাজার জঙ্গি আফগানিস্তানে অনুপ্রবেশ করেছে এবং আরও ১০ হাজার সশস্ত্র জঙ্গিকে আফগানিস্তানে পাঠানোর তোড়জোড় চলছে বলে তারা খবর পেয়েছেন।

এসবের পাশাপাশি, আফগানিস্তানের বর্তমান অস্থিরতার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করছে আফগান সংবাদমাধ্যম ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের একাংশ৷ তাদের মতে, পাকিস্তানের প্রচ্ছন্ন তালেবান সমর্থন মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আবহে অস্থিরতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে৷ যদিও পাকিস্তানের ওপর করা এই অভিযোগ নতুন কিছু নয়৷ দেশটির সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে সবসময়। তাছাড়া আফগানিস্তানের তালেবান ও তাদের মিত্র হাক্কানি নেটওয়ার্ককে পাকিস্তানে ‘নিভৃত আবাস’ গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে ইসলামাবাদ।

আফগান রাজনীতিক আবদুল সাত্তার হুসেইনি সম্প্রতি একটি টিভি শোতে বলেছেন, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, আমরা পাকিস্তানের হাতে আক্রান্ত। আমরা শুধু তালেবানের বিরুদ্ধে লড়ছি না, আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে এই মেকি যুদ্ধেও জড়িত৷ সাত্তার হুসেইনির মন্তব্যের কারণ হচ্ছে, পাকিস্তান থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও অস্ত্রের জোরেই তালেবানরা দ্রুত শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছিল এবং এখনও তালেবান জঙ্গিদের শক্তির প্রধান উৎস এই দেশটি।

সরকারি নীতি যা-ই হোক, তালেবানদের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র যোগাযোগ বরাবরই ছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার হামলার পর আল-কায়দাপ্রধান ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেয় আফগানিস্তানের তৎকালীন শাসক তালেবান সরকার। সেই বিন লাদেনকে ধরার জন্য আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী আক্রমণ শুরু করলেও বহু বছর পর বিন লাদেনকে পাওয়া গিয়েছিল পাকিস্তানে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভেতরের একটি অংশ জঙ্গিদের হয়ে কাজ করছে বলেই সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের জোর বিশ্বাস। বিশেষ করে বিন লাদেন পাকিস্তানের একটি সামরিক আবাসিক এলাকাতে বছরের পর বছর নিরাপদে বসবাস করার পর সেই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে।

অপরদিকে, তালেবানদেরও অবাধ যাতায়াত রয়েছে পাকিস্তানে। মোল্লা ওমরের তালেবান সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতা হারালেও বছরের পর বছর দখলে রেখেছে আফগানিস্তানের একটা বিস্তৃত এলাকা। তাছাড়া ধারণা করা হয়, আল-কায়েদার কিছু সদস্য এখন পর্যন্ত আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে লুকিয়ে আছে। পশ্চিমা বাহিনী প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই এসব জঙ্গি বাহিনীর সদস্যরা তৎপর হয়ে উঠতে পারে।

হিসাব বলছে, ভবিষ্যতে আফগানিস্তানে যে সরকারই আসুক না কেন পাকিস্তান চায় তালেবান যেন তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়। কারণ, তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। ৯০-এর দশকে আফগান গৃহযুদ্ধে তালেবানকে সমর্থন দিয়েছে পাকিস্তান। ১৯৯৬ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর যে মাত্র তিনটি দেশ তাদের বৈধ সরকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের একটি ছিল পাকিস্তান। তাছাড়া, তালেবানের নেতারা পাকিস্তানের আশ্রয় পেয়েছে সবসময়। এমনকি গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের যে শান্তিচুক্তি সম্ভব হয়, তার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল পাকিস্তানের। যুক্তরাষ্ট্র সেটা একবাক্যে স্বীকারও করেছে।

তাছাড়া আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয় কাশ্মিরেও একটি প্রভাব ফেলতে পারে। সশস্ত্র কর্মকাণ্ড বেড়ে যেতে পারে সেখানে। এর কারণ হচ্ছে, ভারত আশরাফ ঘানির নেতৃত্বাধীন বর্তমান আফগান সরকারের শক্তিশালী সমর্থক। তদুপরি, দেশটি তালেবানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেনি। আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধে সোভিয়েতের পরাজয়ের পর পরই জম্মু-কাশ্মীরে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মুজাহিদীনদের যেভাবে কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছিল, ঠিক একইভাবে এখন তালেবান জঙ্গিদেরও ব্যবহার করতে পারে।

গতবছর কাতারের রাজধানী দোহায় তালেবানদের সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাতে চীনও ভূমিকা রাখে নেপথ্যে থেকে। তারা কাবুল সরকার, তালেবান আর পাকিস্তানকে এক মঞ্চে নিয়ে আসে। এর কিছুদিন পর গত বছরের ২৬ আগস্ট পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি আফগানিস্তানে নিয়োজিত চীনের বিশেষ দূত লিউ জিয়ানকে আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ করতে সাহায্য করার জন্য ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে তালেবানদের রাজনৈতিক শাখার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের বৈঠক হয়েছে কীভাবে তালেবান এবং আফগান সরকার একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারে তার রূপরেখা নিয়ে।

তাছাড়া আফগানিস্তানের এই নব পর্যায় আরেকটি কোয়াডেরও জন্ম দিচ্ছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের জোটবদ্ধতার মতো আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে নতুন সেই কোয়াডের শরিক চীন, রাশিয়া, ইরান ও পাকিস্তান।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সখ্য রাশিয়া ও ইরানকে অনেকাংশে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে নতুন এই কোয়াড জোটকে চীন ও পাকিস্তান পরবর্তীকালে ভারতবিরোধিতায় ব্যবহার করতে পারে। কারণ, চীন নিশ্চিতভাবেই চাইবে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের পাল্টা দান হিসেবে নতুন এই কোয়াডকে সক্রিয় করে তুলতে। আর তাতে চাপ বাড়বে ভারতের। কেননা, এখানে চীনের দোসর হিসেবে পাকিস্তানও রয়েছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে মিলে সারা বিশ্বে যারা এখন জঙ্গিগোষ্ঠীর সবচেয়ে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বিবেচিত। আর এই দেশ দুটিই বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ ‘রপ্তানি’ করে বেড়ায়।

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠনগুলোর অধিকাংশই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকেন্দ্রিক। এই জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বব্যাপী জঙ্গি অর্থায়ন তদারকি করার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স- যার দায়িত্ব হচ্ছে, কারা জঙ্গিদের অর্থায়ন করছে তা নির্ধারণ করা এবং সেসব দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া।

তারা ইতোমধ্যে জঙ্গিদের অর্থ সাহায্য করার কারণে পাকিস্তানকে ধূসর তালিকাভুক্ত করেছে। পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ গণমাধ্যমে প্রকাশেই বলেছিলেন যে, জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পদ। তারা রাজনৈতিক দল ও সেনাবাহিনীর নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন পায়। নিজেদের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সাম্প্রদায়িক তালেবান গোষ্ঠীকেও কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তান এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অসহিষ্ণু করে তোলে কি না আগামীদিনে এ প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

শেয়ার করুন

সামনে দেখা যাচ্ছে, পেছনে কী

সামনে দেখা যাচ্ছে, পেছনে কী

দুই শ টাকা পকেটমার হওয়ার পর পকেটমার ধরা পড়লে তার হাড়-মাংস এক করে দেবার মতো মারধোর করার লোকের অভাব হয় না। আবার ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, দুর্নীতি করে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে এরকম লোককে সালাম দেবার মানুষের অভাব হয় না। দুক্ষেত্রেই হাত খুব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কোথাও মারতে আর কোথাও বা সালাম দিতে। পার্থক্য হয়ে যায় টাকার পরিমাণের কারণে।

সময়টা এখন এমনই। কয়েকদিন আগেই যিনি হেঁটে কিংবা রিকশায় চলাচল করতেন তাকে বিশাল ঝকঝকে গাড়ি থেকে নামতে দেখলে পরিচিতজনেরা এখন আর অবাক হন না। অথবা মেসে থাকা মানুষটাকে অভিজাত এলাকায় বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনতে দেখেও তাক লেগে যায় না কারো। অনেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কপাল! কেউ আবার অতটা কপালের ওপর নির্ভর করেন না, তারা বলেন, বেশ করিৎকর্মা ও বুদ্ধিমান। কয়েক বছরে কী রকম উন্নতি করেছে দেখেছেন? কপাল বলুক আর করিৎকর্মা বলে স্বীকৃতি দিক, যা-ই করুক না কেন এই দ্রুত সম্পদশালী হয়ে ওঠার কারণ সবাই জানে। কিন্তু বলতে চায় না। কেউ বলে না ভয়ে, আর কেউ বলে না কারণ, তার মনেও গোপন বাসনা। সেও এরকম হয়ে উঠতে চায়।

কিছু সহজ প্রশ্ন কখনও মাথা ঘুরিয়ে দেয়। উত্তর দেয়ার পরিবর্তে চিন্তা করতে হয় পরবর্তী প্রশ্নটা কী হতে পারে। যেমন, কত টাকায় এক কোটি টাকা হয়? কতদিন লাগে এক কোটি টাকা জমাতে। সম্রাট আকবরের প্রশ্নে বীরবল যে পদ্ধতিতে উত্তর দিয়েছিলেন সেই পদ্ধতি অবলম্বন করে বললে উত্তর দাঁড়াবে, যদি মাসে এক লাখ টাকা করে জমায় তাহলে ব্যাংকের লাভসহ কমপক্ষে ৮৪ মাস। কিন্তু প্রশ্ন হলো কতজন মানুষ সংসার খরচের পর মাসে এক লাখ টাকা জমাতে পারেন?

তাহলে ৩৫/ ৪০ বছর বয়সে একজন নারী বা পুরুষ কীভাবে কয়েক কোটি টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স, কয়েক কোটি টাকার বাড়ি এবং কোটি টাকার গাড়ির মালিক হয়ে যেতে পারেন? সবচেয়ে সঠিক উত্তরটা হবে, অসৎ পথে উপার্জন করে অর্থাৎ দুর্নীতি করে। দুর্নীতি কি সবাই করতে পারে? সহজ উত্তর হবে, না। কারণ, দুর্নীতি করতে ক্ষমতা লাগে। দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতা আর ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি তাই যুগলবন্দি। দুজনে দুজনার।

দেশের মানুষের জীবনে কত সমস্যা! আর কত ঘটনাই না ঘটে চলেছে প্রতিদিন। কিছু ঘটনা নিয়মিতভাবে দীর্ঘদিন ধরেই ঘটে চলছে, কিছু ঘটনা হঠাৎ করে ঘটছে। কোনো কোনো ঘটনায় শুধু চমকে ওঠা নয় আঁতকে উঠছে মানুষ। কী হচ্ছে এবং কী ঘটছে দেশে। যারা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হচ্ছেন। গ্রেপ্তারদের আত্মবিশ্বাসভরা হাসিমুখ দেখে এই প্রশ্ন ওঠা একেবারেই অস্বাভাবিক নয় যে, তাদের হাত লম্বা এবং শিকড় গভীর ছিল। দীর্ঘদিন পরে বেচারা কোনো কারণে ধরা পড়েছেন কিন্তু যারা ধরা পড়েননি তাদের সংখ্যা এবং শক্তিও হয়তো যে কম নয়, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

কয়েকদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে কয়েকটি নাম। রাজধানীর গুলশান থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন সদ্য আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্যপদ হারানো ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর। তার বাসায় অভিযান শেষে র‍্যাব জানিয়েছে, হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ, বিয়ার, বিদেশি মুদ্রা, চাকু, মোবাইল সেট, ক্যাসিনো সরঞ্জাম, এটিএম কার্ড ও হরিণের চামড়া উদ্ধার করা হয়েছে।

র‍্যাবের তদন্তে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানায় রাজধানীতে ১৫টি ফ্ল্যাটের খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে পাঁচটি ফ্ল্যাট, গুলশান ৩৬ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িতে পাঁচটি ফ্ল্যাট, গুলশান ২ নম্বরের ৮৬ নম্বর সড়কের ৭/বি নম্বর বাড়িতে আট হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, গুলশান এভিনিউ ও নিকেতনে দুটি ফ্ল্যাট, মিরপুর ১১ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট এবং কাজীপাড়ায় একটি ফ্ল্যাট।

র‍্যাবের তদন্তে আরও জানা যাচ্ছে, হেলেনা পাঁচটি গার্মেন্টের মালিক। এগুলো হলো মিরপুর ১১ নম্বরের নিউ কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট, নারায়ণগঞ্জের জয় অটো গার্মেন্টস, জেসি এমব্রয়ডারি, প্যাক কনসার্ন (যৌথ মালিকানা) ও হুমায়ারা স্টিকার। এছাড়া সাতটি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে হেলেনার সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে। সেগুলো হলো জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন, আর্চারি ফেডারেশন ক্লাব, নোটারি ডোনেশনস, টেনিস ফেডারেশন, ইনারহিল ক্লাব, জন্টা ইন্টারন্যাশনাল লেডিস ক্লাব ও ক্যারম ফেডারেশন।

এখানেই শেষ নয়, র‍্যাব কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, হেলেনা মোট ১২টি ক্লাবের সদস্য। সেগুলো হলো গুলশান ক্লাব, গুলশান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব, ঢাকা বোর্ড ক্লাব, গুলশান সোসাইটি ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গুলশান জগার সোসাইটি, ফিল্ম ক্লাব, গুলশান হেলথ ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, ঢাকা রাইফেলস ক্লাব ও ওয়ার্ল্ড ট্রাভেলার্স ক্লাব। আবার র‍্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে কখনও ছয়টি গাড়ি, কখনও আটটি গাড়ির মালিকানার কথা বলেছেন হেলেনা।

আবার পিয়াসা ও মৌ নামে আরও দুই নারীকে আটক করা হয়েছে, যারা নাকি বেশ পরিচিত মডেল বা অভিনেত্রী। আটকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করতে গিয়ে ডিবি কর্মকর্তা বলেন, তারা দুজন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে অনেক ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ছিল। সেসব ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তাদের বাসায় অভিযান চালানো হয়। দুজনের বাসায় বিদেশি মদ, ইয়াবা ও সিসা পাওয়া গেছে। মৌয়ের বাড়িতে মদের বারও ছিল।

ডিবির কর্মকর্তা আরও বলেছেন, আটক দুই মডেল হচ্ছেন রাতের রানি। তারা দিনের বেলায় ঘুমান এবং রাতে এসব কর্মকাণ্ড করেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পার্টির নামে বাসায় ডেকে এনে তাদের সঙ্গে আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ধারণ করে রাখতেন। পরে তারা সেসব ভিডিও ও ছবি পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিতেন।

আর একটি ঘটনাও নিশ্চয়ই আড়াল হয়ে যাবে না। গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে একসময়ের চিত্রনায়িকা একাকে আটক করেছে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে শনিবার (৩১ জুলাই) বিকালে তাকে রাজধানীর উলনের বাসা থেকে আটক করা হয়। থানার ওসি জানিয়েছেন, একার বাসা থেকে পাঁচ পিস ইয়াবা, ৫০ গ্রাম গাঁজা ও মদ উদ্ধার করা হয়েছে।
এর কয়েকদিন আগে একটি নামকরা স্কুলের অধ্যক্ষের একটি টেলিফোন কথোপকথন প্রচার মাধ্যমে এসেছে। কীভাবে এসব প্রচার মাধ্যমে আসে সেটা একটা প্রশ্ন। এটা কতটা অশ্লীল, অসৌজন্যমূলক, পদের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ তা আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তিনি যা বলেছেন তাতে এই ক্ষমতার ভিত্তি কোথায় তার কিছুটা উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো চিন্তা করি না। কারণ, আমি নিজেই শক্তিশালী। আমি যে দলের প্রেসিডেন্ট ছিলাম সেই দলটা এখন সরকারে। যতদিন এই দলটা আছে ততদিন আমার পাওয়ার আছে। আমি কিন্তু ... বাচ্চাদের লেংটা করে রাস্তার মধ্যে পিটাইতে পারব।’

একটা বিষয় লক্ষ করার মতো যে, কোনো অপকর্ম করে কেউ ধরা পড়লেই দেখা যায় তিনি ক্ষমতাসীন দলের কোনো না কোনো পদে আছেন বা ক্ষমতাসীন দলের বড় বড় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। ছবি তাদের একটা প্রমাণপত্রের মতো। বাসার ড্রইং রুমে বড় করে বাঁধাই করে রাখা, নিজের সঙ্গে রাখা, পোস্টার ছাপিয়ে লাগানো, রাস্তায় বড় করে বিলবোর্ড লাগানো এসব হলো ক্ষমতা দেখানোর আরেক কৌশল।
ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা সর্বত্র। কোনো কাজ পেতে, টেন্ডার পেতে, সুবিধা পেতে গিয়ে কত বড় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এটা এখন অন্যতম যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা টিভি বিজ্ঞাপন আছে না! যেখানে ধমকের সুরে একজন বলছেন , ‘তুমি জানো আমি কে? এটা ভদ্র ভাষায় বলা হয়েছে। কিন্তু, তুই আমারে চিনস? এই সংস্কৃতি চলছে সর্বত্র। দাপট দেখিয়ে প্রতিষ্ঠা পাবার মানসিকতার পেছনে মূল কারণ অবৈধ সুবিধা। সেটা সংসদ সদস্য মনোনয়ন থেকে শিক্ষক নিয়োগ, ব্যবসা থেকে বদলি, স্কুলে বাচ্চা ভর্তি করা থেকে মসজিদ কমিটির সভাপতি পর্যন্ত সর্বত্র টাকার প্রভাব।

দুই শ টাকা পকেটমার হওয়ার পর পকেটমার ধরা পড়লে তার হাড়-মাংস এক করে দেবার মতো মারধোর করার লোকের অভাব হয় না। আবার ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, দুর্নীতি করে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে এরকম লোককে সালাম দেবার মানুষের অভাব হয় না। দুক্ষেত্রেই হাত খুব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। কোথাও মারতে আর কোথাও বা সালাম দিতে। পার্থক্য হয়ে যায় টাকার পরিমাণের কারণে।

প্রথমে ভিকারুন্নিসা স্কুলের অধ্যক্ষ, তারপর একে একে হেলেনা জাহাঙ্গীর, মডেল পিয়াসা, মৌ, চিত্রনায়িকা একা, চিকিৎসক ডা. ঈশিতা। ঘটনা প্রবাহ প্রায় একই রকম, তাদের ব্যবহারও প্রায় একই ধরনের। বড় বড় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, গালাগাল করা, দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া। কারো বাসায় দেয়ালে শোভা পায় বন্যপ্রাণীর চামড়া। কারো বাসায় ড্রাগস মেলে, আবার কারো বাসায় মদ। কেউবা ভুয়া ডিগ্রি দেখিয়ে করে প্রতারণা। অর্থাৎ এরা সবাই সমাজের জন্য ক্ষতিকর, ক্ষমতাধর, ভয়ংকর মানুষ। অনেকদিন বহাল তবিয়তে ছিলেন। ভোগ করেছেন প্রচুর, অনেকের জীবনে দুর্ভোগ এনেছেন। ধরা পড়ার পর ভুক্তভোগীদের অনেকেই মুখ খুলেছেন, কেউ কেউ মুখ খোলার কথা ভাবছেন আর কেউ হয়তো কখনই মুখ খুলবেন না, তাদেরও কিছু বেরিয়ে যাওয়ার ভয়ে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ তৎপরতা চালিয়ে এদেরকে ধরেছে, প্রেস কনফারেন্স করে তাদের অপরাধের বর্ণনা দিয়েছে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক প্রচার মাধ্যমে তার রসালো প্রচার হচ্ছে। এরা নারী হওয়ার কারণে মানুষ সম্ভবত তার একঘেয়ে জীবনে কিছুটা বিনোদন পাচ্ছেন। কিন্তু যে প্রশ্ন তারা উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না তা হলো, মাঝে মাঝে এসব ঘটছে কেন? এসব নারীর যে পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক তারা কারা?

এদের প্রায় সবার বাড়ি থেকেই মাদক উদ্ধার হচ্ছে কেন? বর্তমানের আলোড়ন হেলেনা বা অধুনা বিস্মৃত পাপিয়া কিংবা আরও যত নাম শুনছি বা দেখছি তারাই কি সব? এসব কি দুর্নীতির বিশাল আইসবার্গের ওপরের সামান্য অংশ? এদের পিছনে, পাশে এবং সামনে যারা ছিলেন তারা কি বহাল তবিয়তে থাকবেন? এরা ক্ষমতাসীনদের ব্যবহার করেন, নিজেরা ব্যবহৃত হন, মানুষকে কষ্ট দেন এটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মানুষের রুচির মানটা যে নেমে যাচ্ছে এবং মানুষ এসব মুখরোচক খবর নিয়েই ব্যস্ত থাকছে সেটাও কিন্তু কম কষ্টের নয়।

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

শেয়ার করুন

পাকিস্তানের কাশ্মীর বধ, নাকি উগ্রবাদের জন্ম

পাকিস্তানের কাশ্মীর বধ, 
নাকি উগ্রবাদের জন্ম

সম্প্রতি ইমরান খান বলেছেন, ‘তালিবানরা জঙ্গি নয়, সাধারণ নাগরিক’। তার এই মন্তব্যের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু চীন আফগানিস্তানে তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ইস্যু নিয়ে জঙ্গিদের শান্ত রাখতে দেশটি তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এই তালেবান গোষ্ঠী জঙ্গিদের কারণে পাকিস্তানেও বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু তারপরও ইমরান খান তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এর মূল কারণ চীন।

জম্মু ও কাশ্মীরের বিষয়টি কিছুতেই ভুলতে পারছে না পাকিস্তান। বিগত ৭৩ বছর ধরে কাশ্মীর ইস্যুতে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো এবং উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কাশ্মীরে লেলিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। কিছু ক্ষেত্রে জম্মু-কাশ্মীরে জীবিত উদ্ধার হওয়া জঙ্গিরা তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাকিস্তানের নামও নিয়েছে। কিন্তু তারপরও কাশ্মীরে যেকোনো অস্থিরতার জন্য ভারতকে দায়ী করে আসছে দেশটি।

স্বাধীন কাশ্মীর রাষ্ট্রে যুদ্ধবহর নিয়ে হামলা চালিয়ে প্রথম এই অঞ্চলের স্বাধীনতা হরণ করে পাকিস্তান। এরপর তারা তাদের দখল করা কাশ্মীর অঞ্চলের নাম দেয় ‘আজাদ কাশ্মীর’ অর্থাৎ স্বাধীন কাশ্মীর। কিন্তু পাকিস্তানের দখল করা সেই আজাদ কাশ্মীরের মানুষ আজ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছে। তাদের ন্যূনতম অধিকার আদায়ের জন্য রক্ত ঝরাচ্ছে। গত একমাসে আজাদ কাশ্মীরে বিভিন্ন আন্দোলনে তিনজনের বেশি তরুণের নিহতের খবর পাওয়া গেছে। কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী নয়, বরং পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চালিয়েছে এই হত্যাকাণ্ড। এই অঞ্চলের মানুষের ন্যূনতম অধিকার এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি পাকিস্তান।

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সংবিধানে বিশেষ ধারা ‘৩৭০’ বিলোপ করা হয়। এরপর থেকে এই অঞ্চলের উন্নয়নে মনোযোগ দেয় ভারত। কিন্তু এই ৫ আগস্টকে ঘিরে অপপ্রচারের বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে দেয়া বিশেষ মর্যাদা বাতিলের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে ওই দিনকে ‘নিপীড়ন দিবস’ হিসেবে পালন করার জন্যে জনমত গঠনে বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানের বিদেশি মিশনগুলোতে এক বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে তারা। আধুনিক ডিজিটাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে বলা হয়েছে সেখানে। দিনটি সফলভাবে পালন করতে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন রেড ফর কাশ্মীর’ নামে একটি সংগঠনও গড়ে তোলা হয়েছে। রেড ফর কাশ্মীর-এর পেছনে মূলত কাজ করছে ‘স্ট্যান্ড উইথ কাশ্মীর’ নামে একটি সংগঠন।

১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে পাকিস্তান হামলা চালানোর আগে এই ইস্যুতে ভুয়া তথ্য প্রচারের জন্য সংগঠনটি গড়ে তোলা হয়। এই সংগঠন উগ্র ওয়াহাবি মতবাদ প্রচারে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ থেকে ব্যাপক অর্থ সহায়তা পেয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কথিত নিপীড়ন দিবস পালনের জন্য বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয় মিশনগুলোর সামনে মোমবাতি প্রজ্বলন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে সেসব প্রচার করে ভাইরাল করার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। এ জন্যে একাধিক টুইটার অ্যাকাউন্ট, ফেসবুক পেজ ও একটি নতুন ই-মেইলও খুলেছে সংগঠনটি। ৫ আগস্টে ভারতবিরোধী ওই প্রচারের জন্যে ইংরেজি এবং রোমান ভাষায় অন্তত ২০টি স্লোগান পাকিস্তানি বিদেশি মিশনে পাঠিয়েছে সংস্থাগুলো। এরমধ্যে রয়েছে ‘যম-ই-ইস্তেহসাল’, সংগ্রামী কাশ্মীরীদের সঙ্গে একাত্মতা দেখানোর দিন', 'কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের সঙ্গে ও ‘কাশ্মীর হচ্ছে পাকিস্তানের ঘাড়ের শিরা’-এমন বেশ কিছু স্লোগান।

লন্ডনে ৫ আগস্টের কর্মসূচি সফল করতে কূটনৈতিক লাগেজে করে পাকিস্তানি বিদেশি মিশনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের চিরকুট, পোস্টার, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

গত ২৬ জুলাই পাকিস্তানের স্থানীয় নির্বাচনের পর দিন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের নীলম উপত্যকার শারদা এলাকায় ‘পয়েন্ট-জিরো’ রেঞ্জে আধাসামরিক বাহিনীর গুলিতে এক যুবক নিহত হয়। এ সময় পুলিশ জওয়ানসহ ২৫ জনেরও বেশি আহত হয়। এর আগে গত ২১ জুন টরেন্টো থেকে বাবার শেষকৃত্যে যোগ দিতে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে এসে হত্যার শিকার হন গোলাম আব্বাস নামে এক যুবক। তিনি ভারতীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (জম্মু ও কাশ্মীর)-এ মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে আন্ত-বিশ্বাস ও সম্প্রীতি প্রচারে কাজ করতেন।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য গত জুন মাসে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে অর্থ জোগানের ওপর নজরদারি চালানো সংগঠন ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) আবারও দেশটিকে ধূসর তালিকাতে রেখেছে।

গত ২৫ জুন প্যারিসে অবস্থিত সংস্থাটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রসংঘের ঘোষিত জঙ্গি হাফিজ সইদ, মাসুদ আজহারের মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে পাকিস্তানকে ধূসর তালিকাতেই রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

২০১৮ সালের জুনে সন্ত্রাসে আর্থিক মদদ দেয়া ও আর্থিক দুর্নীতি রোধে যে ২৭টি শর্ত পাকিস্তানকে পূরণ করতে বলা হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তইবার কুখ্যাত জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যা পাকিস্তান পূরণ করতে পারেনি।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক খবরগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানের কূটনীতিকরা শুধু সমাজবিরোধী কাজের সঙ্গেই লিপ্ত নন বরং তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ও সন্ত্রাসবাদী মনোভাবও প্রবল।

২০১৫ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তান হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব ফারিনা আশরাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়। একই বছর ঢাকায় জাল নোট ব্যবহারের দায়ে আটক করা হয় পাকিস্তান হাইকমিশনের সহকারী ভিসা কর্মকর্তা মাজহার খানকে। এছাড়া কলম্বোর পাকিস্তান হাইকমিশনের ভাইস চ্যান্সেলর আমির জুবায়ের সিদ্দিকী সন্দেহভাজন জঙ্গি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। পরে ২০২০ সালে নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের দুই কূটনীতিককে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়া ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

২০০১ সালে নেপালের কাঠমন্ডুতে পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রথম সচিব মোহাম্মদ আরশাদ সিমাকে ১৬ কেজি আরডিএক্সসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ২০১৪ সালে কলম্বোতে পাক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা কর্নেল শাহরিয়ার বাটকে হাইকমিশনের কার্যক্রমে নিয়মিত নজর রাখার অভিযোগে তাকে ওই দেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পর্যালোচনা করলে আরও দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানের দূতাবাসগুলোকে যেসব কূটনীতিকরা নিযুক্ত রয়েছেন তাদের বেশিরভাগই এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত।

২০১৮ সালের মে থেকে ওয়াশিংটনের কিছু জায়গায় পাকিস্তানি কূটনীতিকদের আনাগোনা বন্ধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে পাকিস্তানের বর্তমান প্রতিনিধি মুনির আকরামের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন তার স্ত্রী। ২০১৪ দেশটির আরও দুই কূটনীতিকের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে যুক্তরাজ্যে। এদিকে গত বছরের মে মাসে মানবপাচারের অভিযোগে জিম্বাবুয়ের হারারেতে গ্রেপ্তার হন পাকিস্তানি কূটনীতিক ওয়াকাস আহমেদ।

সম্প্রতি ইমরান খান বলেছেন, ‘তালিবানরা জঙ্গি নয়, সাধারণ নাগরিক’। তার এই মন্তব্যের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু চীন আফগানিস্তানে তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ইস্যু নিয়ে জঙ্গিদের শান্ত রাখতে দেশটি তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এই তালেবান গোষ্ঠী জঙ্গিদের কারণে পাকিস্তানেও বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু তারপরও ইমরান খান তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এর মূল কারণ চীন।

পাকিস্তানের করিডর ব্যবহার করে তালেবানরা যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তাতে পাকিস্তানের সরকার এবং ইসলামি মৌলবাদী শক্তিগুলোর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। এমনকি তালেবানদের উগ্রবাদী আচরণকে সমর্থন জুগিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে যাচ্ছে পাকিস্তানের বিভিন্ন মৌলবাদী গোষ্ঠী। আফগানিস্তানকে তালেবানদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ২০০১ ও সমসাময়িক সময়ে যেভাবে এশিয়া অঞ্চলে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসের রাজনীতির চর্চা করা হয়েছে তা আবারও পুনঃস্থাপন করতে চাচ্ছে পাকিস্তান, চীন ও তালেবান গোষ্ঠী।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরে স্বাধীনতা ও ন্যায্য অধিকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বেলুচিস্তান, সিন্ধু এবং পাকিস্তানের দখল করা কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। আর এই দাবিকে প্রতিহত করতে সামরিক বাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী এবং জঙ্গিদের ব্যবহার করছে পাকিস্তান। নিজদেশে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারা দেশটি আলোচনা করছে ভারতের কাশ্মীর নিয়ে!

গত দুবছরে কাশ্মীরের মানুষ পেয়েছেন নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। পর্যটন ও হর্টিকালচার (বাগান পালন) নির্ভর উন্নয়নে মিলছে সহযোগিতা। কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াতে এ দুটি ক্ষেত্রকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত সরকার। আপেল, আখরোট, চেরি, নাশপাতি এবং ফুল চাষে সরকারি সহায়তায় স্থানীয়রা তাদের রোজগার তিন চার গুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি হিমঘর নির্মাণ প্রক্রিয়াকরণ, উড়োজাহাজে ফসল দেশের অন্যত্র পরিবহনের সুবিধাও পাচ্ছে চাষীরা। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বাজার পেতেও সুবিধা হচ্ছে তাদের।

তৃণমূল স্তরে মানুষের চাহিদা মেটাতে জেলা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তহবিল সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মানুষের কল্যাণে প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছেন। কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের দ্রুত রেল যোগাযোগ স্থাপনে সরকার ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে। কোভিড মোকাবিলায় জম্মু ও শ্রীনগরে গড়ে উঠেছে দুটি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল। কেন্দ্রশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে দুটি অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স বা এইমস-এর মতো হাসপাতাল, ৭টি মেডিক্যাল কলেজ, একটি ক্যানসার হাসপাতাল, একটি হাড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং একটি শিশু হাসপাতাল হচ্ছে। স্মার্ট সিটি প্রকল্পে নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ ছাড়াও মেট্রো রেল চালানোরও পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তির উন্নয়নে গড়ে উঠছে আইটি হাব। গত সাত দশকের তুলনায় মাত্র দুবছরেই ব্যাপক উন্নয়নের স্বাদ পাচ্ছে কাশ্মীর।

জম্মু ও কাশ্মীরে উন্নয়নের পাশাপাশি দীর্ঘ বঞ্চনারও অবসান ঘটেছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৩৭০ ধারা বিলোপ করে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের নাগরিকদের মতো সমান অধিকার ভোগ করছে সেখানকার মানুষ। নয় শতাধিক আইনি সুবিধা দেশের বাকি অংশের মতোই কাশ্মীরের মানুষও এখন ভোগ করছেন। তফশিলভুক্ত জাতি ও উপজাতি, অন্যান্য পিছিয়ে পরা সম্প্রদায়ের মানুষ, শিশু, সংখ্যালঘু, বনবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন পাচ্ছেন সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষার অধিকার জম্মু ও কাশ্মীরেও প্রতিষ্ঠিত। কাশ্মীরি নারীরা ভিন রাজ্যের বাসিন্দাদের বিয়ে করলে তাদের স্বামী বা সন্তানরাও উপত্যকার স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা মানুষগুলোকে ৩৭০ ধারা বিলোপের পর মিলেছে নাগরিকত্ব।

৩৭০ ধারা বিলোপের পর ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরের মানসিক দূরত্ব আরও কমেছে। কাশ্মীরি বা মুসলিমদের কাছেও বড় হয়ে উঠেছে ভারতীয় পরিচিতি। তারা সব ক্ষেত্রে এখন নিজেদের অধিকার অর্জন করেছে। স্বাধীন নাগরিক হিসেবে সেখানে ভোটাধিকার থেকে শুরু করে সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে কতটা স্বাধীনতা উপভোগ করছে ‘আজাদ কাশ্মীর’-এর সাধারণ মানুষ?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

শেয়ার করুন

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাঙালি জাতির ক্রান্তিলগ্নে প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে জান্তার হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিচারপতি চৌধুরী কাজ করার তরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। এই সিদ্ধান্ত তার পরিবারের সদস্যবর্গ এবং তার নিজের জীবনের জন্যও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তখনও তিনি জানতেন না বাঙালি জাতির মুক্তির কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু কোথায়।

২ আগস্ট বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি রাজনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে রাতারাতি তিনি জাতীয় বীরে পরিণত হন। নিরীহ, নির্বিবাদী, নিরহংকারী, সজ্জন পণ্ডিত মানুষটি একাত্তরে মাতৃভূমির মুক্তির যুদ্ধে অমিত বিক্রম আপসহীন যোদ্ধায় পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। তাকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা যাবে না।

এই ইতিহাস সৃষ্টির অনেকখানি ভার তিনি নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। কেউ তাকে উদ্বুদ্ধ করেনি। শুধুমাত্র দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে, কর্তব্যবোধে পরিচালিত হয়ে পাকিস্তানের নৃশংস বর্বরতায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন।

১৯৮৭ সালের ২ আগস্ট তিনি লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। ৫ আগস্ট তার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছে। তার তিরোধানে বিশ্ববরেণ্য বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রনায়ক ও রাষ্ট্রপ্রধান, জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব পেরেজ দ্য কুয়েলার, রাণী এলিজাবেথ, তার প্রিন্স ফিলিপ প্রমুখ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শোকবার্তা পাঠান।

স্বৈরাচার এরশাদ তখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। বিচাপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর মরদেহ ঢাকায় আসার পর রাষ্ট্রপতি এরশাদ মরহুমের বাসায় গিয়েছিলেন। স্বৈরশাসক এরশাদকে জীবনে ওই একবারই কাছ থেকে দেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত এরশাদ মরহুমের জানাজায় অংশ নেন এবং বিমানবন্দরে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। হিথরো এয়ারপোর্টে স্বয়ং রানীর গার্ড রেজিমেন্ট একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মরদেহের প্রতি যেমন গার্ড অব অনার দেয়া হয়, তেমনিভাবে তার কফিন বিমানে তুলে দিয়েছে।

ক্ষমতার প্রতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কোনো মোহ ছিল না। ড. কামাল হোসেন লিখেছেন, ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে স্বদেশে আসার পর ১১ তারিখ বিচারপতি চৌধুরীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাসভবনে তাকে দেখা করতে বলা হলো। বিচারপতি চৌধুরী ও ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামকে নিয়ে ড. কামাল সেখানে গিয়ে দেখেন বঙ্গবন্ধুও উপস্থিত আছেন। তাজউদ্দীন সাহেব তাদেরকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘আমরা পার্লামেন্টারি কাঠামোতে আসতে চাই, তোমরা এ ব্যাপারে সাংবিধানিক উপদেশ দাও।’

সেই বাসভবনে তাঁদের রচিত প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ অর্ডার, ১৯৭২-এ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐদিনই স্বাক্ষর দিলেন।

স্বাক্ষর দেবার পরই বঙ্গবন্ধু ড. কামালকে এক কোনে ডেকে নিয়ে জাস্টিস চৌধুরী সম্পর্কে বললেন, প্রেসিডেন্ট তো উনিই হতে পারেন। বিচারপতি চৌধুরী এই প্রস্তাবের জন্য তৈরি ছিলেন না। তাকে বলা হলে তিনি নম্র স্বরে বললেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু আমাকে প্রেসিডেন্ট হতে হবে আমি কখনও তা ভাবিনি।’

কিন্তু তিনি আপত্তি করতে পারলেন না। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে তিনি খুবই শ্রদ্ধা করতেন। এখনও ভাবি, প্রেসিডেন্ট পদ তিনি চাননি। অবস্থার চাপেই তাকে প্রেসিডেন্ট হতে হয়েছিল।

২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তান সামরিক জান্তা নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ঐ রাতে শুধু ঢাকা শহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ অজস্র নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়। ২৬ মার্চ সকালে বিবিসির খবরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ডের ভাসা ভাসা খবর প্রচারিত হয়। বিবিসির খবর শুনে বিচলিত বিচারপতি চৌধুরী মানবাধিকার কমিশনের সভায় উপস্থিত হয়ে ঢাকায় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত বিবিসির খবরের কথা জানান। ঢাকায় গণহত্যার খবর শুনে বিচারপতি চৌধুরী ২৭ মার্চ শনিবার পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেন।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিশ্ব জনমত গঠনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী লন্ডনে সদরদপ্তর স্থাপন করে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে সমগ্র বিশ্ব ছুটে বেড়িয়ে সম্পন্ন করেছেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও তাদের দোসরদের প্রাণনাশের হুমকির মুখে অবিচলিত, শান্ত এই কর্মবীর সাহসের সাথে মাতৃভূমির মুক্তির লক্ষ্যে বিরামহীনভাবে কাজ করে গেছেন।

একাত্তরে যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বের শক্তিশালী কিছু দেশ পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের আপস-মীমাংসার চেষ্টা চালায়। দেশ ও জাতির ওই সংকটের সময় বিচারপতি চৌধুরীর অবিস্মরণীয় উক্তি ছিল, ‘লন্ডনের রাস্তায় আমার শবদেহ পড়ে থাকবে, তবু পাকিস্তানের সাথে আপস করে দেশে ফিরব না।’

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বর্বর সামরিক জান্তা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সশস্ত্র যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। জেনেভায় অবস্থানরত বিচারপতি চৌধুরী এবারও দেশ ও জাতির জন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করেননি। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি দস্যুদের দ্বারা বাঙালি হত্যাযজ্ঞের খবর পরের দিন সকালে বিবিসির সংবাদে তিনি অবহিত হন। কিছুক্ষণের মধ্যে মানবাধিকার কমিশনের সভায় উপস্থিত হয়ে বিচারপতি চৌধুরী বাংলার মানুষের হত্যার কথা জানান। জেনেভা থেকে অতি দ্রুত লন্ডন ফিরে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ঢাকা থেকে প্রেরিত টেলেক্স পড়ে কালরাতের খবরাখবর তিনি জানতে পারেন। ক্ষোভে, দুঃখে, যন্ত্রণায়, অপমানে বিচারপতি চৌধুরী ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান ইয়ান সাদারল্যান্ডকে বললেন, ‘এই মুহূর্ত থেকে পাকিস্তান সরকারের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক রইল না। আমি দেশ থেকে দেশান্তরে যাব আর পাকিস্তানি সৈন্যদের নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার কথা বিশ্ববাসীকে জানাব।’

বাঙালি জাতির ঐ ক্রান্তিলগ্নে এভাবে প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে জান্তার হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিচারপতি চৌধুরী কাজ করার তরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দেন।

এই সিদ্ধান্ত তার পরিবারের সদস্যবর্গ এবং তার নিজের জীবনের জন্যও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তখনও তিনি জানতেন না বাঙালি জাতির মুক্তির কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু কোথায়। বাংলাদেশ সরকার তখনও গঠিত হয়নি। প্রথম সারির নেতারা নিহত, গ্রেপ্তার নাকি আত্মগোপনে, কিছুই তার জানা ছিল না। জাতির ঐ সংকটময় মুহূর্তে বিচারপতি চৌধুরীর দেশের পক্ষে কাজ করার ওই সরব ঘোষণা শুধু ঐতিহাসিক বললেই দায়িত্ব শেষ হবে না, এটা ছিল পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। শুধুমাত্র এই একটি সিদ্ধান্তের জন্য বাঙালি জাতির ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র এক দিন পর ২৭ মার্চ শনিবার ছুটির দিনে খোদ লন্ডন শহরে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী একজন বীরের মতো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আবু সাঈদ চৌধুরীর ওই বীরোচিত ঘোষণা শুধু লন্ডন বা আমেরিকায় অবস্থানরত বাঙালিদের নয়, বাংলাদেশের জনগণসহ সমগ্র বিশ্বে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাঙালি সন্তানদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে।

ঐতিহাসিকরা একদিন লিখবেন, ‘২৬ মার্চের পর পর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুর অবস্থান, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সারা বাংলায় গণহত্যা, আওয়ামী শীর্ষ নেতাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে দেশ-বিদেশের মানুষ যখন কিছুই জানতে পারছিল না, তখন একজন বাঙালি শিক্ষাবিদ আবু সাঈদ পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণার পর ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড হিউমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এরপর তিনি কমনওয়েলথ সচিবালয় সাধারণ সম্পাদক আর্নল্ড স্মিথের সাথে দেখা করে ঢাকায় গণহত্যা বন্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য চেষ্টা করতে অনুরোধ জানান।’

১০ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড হিউমের সাথে আবু সাঈদ চৌধুরীর সাক্ষাৎ হয়। লর্ড হিউম তাকে দেখেই বলেন, ‘পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। চিন্তার কারণ নেই।’

বিচারপতি চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচানোর জন্য চেষ্টার অনুরোধ জানান। হিউম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট খবর আছে। শেখ মুজিব ভালোই আছেন।’

ঐদিনই ১০ এপ্রিল ৪টার সময় বিচারপতি চৌধুরী বিবিসিতে যান। মি. পিটারগিল তার একক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি পাকিস্তানিদের গণহত্যাসহ পাকিস্তানের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বিস্তারিত বলেন। বিবিসির দুজন সাংবাদিক সিরাজুর রহমান এবং শ্যামল লোধ বিচারপতি চৌধুরীর বক্তব্য নেন এবং প্রচার করেন। বিবিসি তখন সকাল-বিকাল বাংলাদেশের খবর বিশেষভাবে প্রচার করত। এভাবে বিচারপতি চৌধুরী ২৫ মার্চের পর থেকে লন্ডনে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে চাঙ্গা করে তোলেন।

এভাবে মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতার অবস্থান না জেনে এবং যুদ্ধকালীন সরকার গঠিত হওয়ার আগেই লন্ডনে মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে কাজ শুরু করে দিয়ে বিচারপতি চৌধুরী দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বাংলার মানুষকে উজ্জীবিত করেন। যুক্তরাজ্যে নানা দলমতে বিভক্ত বাঙালিদের তিনি ঐক্যবদ্ধ করেন। মূলত তিনি ছিলেন বহির্বিশ্বে বাঙালিদের ঐক্যের প্রতীক। ইউরোপ ও আমেরিকার বাঙালি সমাজকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার মন্ত্রে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেন। ২৩ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার বিচারপতি চৌধুরীকে বিদেশে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করে।

বিচারপতি চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। ১৯৮৫ সালে বাংলাবার্তা সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতম আঘাতের ফলে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

৭১-এর বঙ্গবন্ধু কোনো ব্যক্তি নন, বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, তার নামেই স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে। কোনো ব্যক্তির নাম যখন প্রেরণার উৎস হয়, তখন তিনি ইতিহাসে স্থায়ী মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হন।... বঙ্গবন্ধু আমাদের মধ্যে স্বাদেশিকতা, স্বাজাত্যবোধ জাগিয়েছেন, সর্বোপরি এনে দিয়েছেন স্বাধীনতা।’

আবু সাঈদ চৌধুরী আজীবন গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ পূজারী ছিলেন। আশির দশকে জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা জোরের সাথে বলেছেন। স্বৈরশাসকরা ঐ সময় বঙ্গবন্ধুর অবদান শুধু অস্বীকারই করেনি, বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার জন্য যা যা দরকার তার সবই করে। নানা ব্যস্ততার মধ্যেও বহু সভা-সমিতিতে প্রধান অতিথি, প্রধান বক্তা, সভাপতি, সম্বর্ধিত ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন ভূমিকায় যোগ দিয়ে বিচারপতি চৌধুরী তার সুললিত ভাষায় বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল অবদানের কথা জাতির সামনে তুলে ধরেন। স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যেভাবে তিনি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা, গণতন্ত্রের কথা বলেছেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

আবু সাঈদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদকীয়তে লেখে: ‘হয়তো তাঁর অপেক্ষা অনেক পণ্ডিত লোককে ভবিষ্যতে আমরা পাইব, হয়তো অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি বিজ্ঞ আইনজ্ঞ কিংবা দূরদর্শী রাজনীতিকেরও আবির্ভাব ঘটবে, এদেশে। কিন্তু একই সঙ্গে এতগুলো উজ্জ্বল গুণের অধিকারী এবং চরিত্রবান, ব্যক্তিত্বমণ্ডিত, সজ্জন, নির্লোভ আর একজন আবু সাঈদ চৌধুরীর জন্য আমাদের কতকাল অপেক্ষা করতে হবে কে জানে।’ (সোমবার, ১৭ শ্রাবণ ১৩৯৪)।

দৈনিক সংবাদ (১৮ শ্রাবণ ১৩৯৪) সম্পাদকীয়তে লেখা হয়: ‘আবু সাঈদ চৌধুরীর কর্মজীবন পর্যালোচনা করে তাকে সার্থকভাবেই দার্শনিক-রাজনীতিক হিসেবে অভিহিত করা চলে।’

দৈনিক বাংলা লেখে:, ‘বিচারপতি চৌধুরী তার কর্মে আর কৃতিত্বের মাধ্যমে অমরত্বে উপনীত হয়েছেন।’

একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এম সাদিক নামে লেখেন: ‘বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপ্নময় বরেণ্য মনীষী আবু সাঈদ চৌধুরীর তিরোধান নক্ষত্রের পতনের মতো। কিন্তু তিনি জেগে রবেন প্রতিটি বাঙালির চোখের তারায়।’ (স্মৃতিসত্তায় আবু সাঈদ চৌধুরী, পৃ. ৩৮)।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একজন নায়ক জাতীয় বীর আবু সাঈদ চৌধুরীর মৃত্যু নেই। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল তিনি অমর হয়ে থাকবেন। মৃত্যুদিবসে স্যারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক

আরও পড়ুন:
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

শেয়ার করুন

করোনায় মানসিক চাপ দূরে রাখা জরুরি

করোনায় মানসিক চাপ দূরে রাখা জরুরি

একাধিক গবেষণা বলছে, করোনায় সংক্রমিত মানুষের প্রতি পাঁচজনের একজনের মধ্যে করোনার সঙ্গে মানসিক সমস্যা যেমন- বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, সাইকোসিস ইত্যাদি দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার করোনায় আক্রান্ত নন এমন ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ উদ্বিগ্নতা, বিষণ্নতা, আতঙ্ক সৃষ্টির হার সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি করোনা থেকে সেরে উঠলেও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি থেকে যায়।

প্রায় দেড় বছর ধরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বজুড়ে আক্রান্ত হয়েছে ১৯ কোটি ৩৫ লাখ ২৯ হাজার ২৭৯ জন। মৃত্যু হয়েছে ৪১ লাখ ৫৪ হাজার ২৭৬ জনের ও সুস্থ হয়েছেন ১৭ কোটি ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ৮ জন। এ হিসাব লেখাটি প্রকাশের দিন পর‌্যন্ত বাড়বে বৈ কমবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের হিসাবের বেলায়ও এমনটা বলা যায়।

কোভিড-১৯ একটি ভাইরাসজনিত রোগ কিন্তু এ রোগটির ব্যাপ্তি এতই বেশি যে, তা শারীরিক স্বাস্থ্যের বিপন্নতাকে অতিক্রম করে মানসিক, সামাজিক আর অর্থনৈতিকভাবেও আমাদের বিপর্যস্ত করে ফেলছে।

এই সংকট ও সমস্যার সমাধান হওয়ার আশু কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কঠিন এই বাস্তবতায় কী হবে এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। করোনার কারণে চাকরিচ্যুত হয়েছেন শতকরা ৩৬ জন। তিন শতাংশ মানুষের চাকরি থাকা সত্ত্বেও তারা বেতন-ভাতা পান না ঠিকমতো। এদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত। তাহলে সংকট উত্তরণের কী উপায়?

করোনা সংক্রমণজনিত এ সংকটকালে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সার্বিক সুরক্ষা ও জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম ও জনবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। এ সকল পদক্ষেপ প্রায় স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা চলমান রাখতে কিছুটা হলেও অবদান রাখছে।

মহামারির কারণে বর্তমান বাংলাদেশের সমাজচিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। করোনার করাল থাবায় অর্থনীতির স্বাভাবিক চাকা আপন গতিতে ঘুরতে পারছে না। সচলতার পরিবর্তে প্রবল হয়ে উঠছে স্থবিরতা। অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অনিশ্চয়তার প্রহর ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দিশেহারা হয়ে অনেক মানুষ গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন ও এখনও হচ্ছেন। সেখানেও কি শান্তি আছে, বসবাসের নিশ্চয়তা আছে? কর্মসংস্থানের সুযোগ-সুবিধা কি আছে? এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না।

পেশাজীবীদের জীবিকা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। বেসরকারি অফিস প্রতিষ্ঠানে বেতন-ভাতা অনিয়মিত। কাজ করলেও বেতন-ভাতা মিলছে না। পোশাক খাতের কর্মীরা বরাবরের মতোই সংকটের মুখে। অনেক কারখানা ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়েছে বা বন্ধ হবার পথে। প্রবাসী শ্রমিকেরা প্রতিনিয়ত কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে যাচ্ছেন। কোথাও আশার আলো নেই। পেশা বদলের প্রতিযোগিতা এখন নিয়মিত বিষয়। চাকরিহারা কেউ কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন সেখানেও কি সুবিধা পাচ্ছেন?

জীবনযুদ্ধের এক কঠিন সময় যাচ্ছে এখন। বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায় বিভিন্ন সেক্টরে কাজে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৮২ লাখ। করোনার বিষাক্ত ছোবলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক ও আশঙ্কার, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত কর্মহীন লোকের সংখ্যা ২৬ লাখ। এই সংকট শুধু বাংলাদেশেরই নয়, গোটা বিশ্বেরই। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা আইএলওর সর্বশেষ রিপোর্টে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে তো সংকট আরও বাড়বে। আইএলও বলেছে, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী ৩৪ কোটি মানুষ কাজ হারাতে পারেন। বিপর্যস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশও।

করোনা সংকটে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই বিপদগ্রস্ত। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ আর্থিক অংশ সরকারই দেয়, তবে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী আবার সরকারি সুবিধা পান না। কিন্তু বেশি সমস্যায় আছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন না নিলে তারা শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন দিতে পারে না। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায় করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে। তাই শিক্ষক-কর্মচারীরা বিপদেই আছেন।

করোনাকালে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই মানসিক চাপের মাঝে রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ যুব ও যুব নারী বিাভন্ন প্রকার মানসিক চাপে রয়েছেন। এ ধরনের মানসিক অস্থিরতায় ভুগে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ শারীরিকভাবে নিজের ক্ষতি করছেন। মানসিক বিভিন্ন চাপের ফলে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে এমন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘আঁচল ফাউন্ডেশনে’র জরিপে এমনটি উঠে এসেছে। করোনাকালে এত বেশিসংখ্যক আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মূলত মানসিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা, আত্মহত্যার কারণ চিহ্নিত করা এবং তার সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জন্যই অনেকে কাজ করছেন।

২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট ১৪ হাজার ৪৩৬টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ৩২২টি আত্মহত্যার কেসস্টাডির প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের ৪৯ শতাংশেরই বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। আর এর ৫৭ শতাংশই নারী।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তরুণদের মধ্যে অধিকাংশই মানসিক বিষণ্নতায় ভোগেন। অধিকাংশ সময় মন খারাপ থাকা, পছন্দের কাজ থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা। অস্বাভাবিক কম বা বেশি ঘুম হওয়া, কাজে মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা করা, সবকিছুতে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা। এ সমস্যাগুলো তীব্র আকার ধারণ করলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তাদের মানসিক অস্থিরতার বিষয়ে কারো সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে না পারাই মূল কারণ।

মন খারাপ হলে বা বিষণ্ন হলে বন্ধুদের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা শেয়ার করেন। অধিকাংশই দৈনিক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করেন যা মানসিকভাবে তাদের বিপর্যস্ত করে তুলছে। অনেকেই দৈনিক ৬ ঘণ্টার বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় করেন। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য তাদের দৈনন্দিন কাজগুলোকে বাধাগ্রস্ত করেও বলে উল্লেখ করেন। এর মধ্যে ৯১ দশমিক ৪ শতাংশই কখনও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেননি।

করোনাকালে তরুণ ও যুবকরা যে মানসিক চাপজনিত সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছেন সেগুলো হচ্ছে- পড়াশোনা ও কাজে মনোযোগ হারানো, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, একাকী অনুভব করা, অনাগ্রহ সত্ত্বেও পরিবার থেকে বিয়ের চাপ, আর্থিক সমস্যা, অতিরিক্ত চিন্তা করা, মোবাইল-আসক্তি, আচরণগত সমস্যা, চাকরির অভাব, কাজের সুযোগ না পাওয়া, সেশনজট, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু ইত্যাদি তরুণ ও যুবকদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

একাধিক গবেষণা বলছে, করোনায় সংক্রমিত মানুষের প্রতি পাঁচজনের একজনের মধ্যে করোনার সঙ্গে মানসিক সমস্যা যেমন- বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, সাইকোসিস ইত্যাদি দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার করোনায় আক্রান্ত নন এমন ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ উদ্বিগ্নতা, বিষণ্নতা, আতঙ্ক সৃষ্টির হার সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি করোনা থেকে সেরে উঠলেও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি থেকে যায়।

সাধারণ সময়ের চেয়ে কোভিডকালে মানসিক সমস্যা বাংলাদেশেও বেড়েছে। করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক, চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, মরে যাবার ভয়, অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততা, চাকরি হারিয়ে বেকারত্ব, এমনকি করোনা নিয়ে ভ্রান্ত- নেতিবাচক সামাজিক বৈষম্যের কারণে বাড়ছে মানসিক সংকট। আর করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমনকি করোনাকালে বিশ্বজুড়ে বেড়ে গেছে পারিবারিক সহিংসতা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা।

সংক্রমিত হয়ে মৃত্যু, সংক্রমিত হলে চিকিৎসা নিয়ে আতঙ্ক, পরিবারের সদস্যদের সংক্রমণের ভয়, আইসোলেশনে থাকার সময় একাকিত্ব মনের ওপর চাপ বাড়ায়, পরিবার সদসস্যের মৃত্যুর আতঙ্ক, গণমাধ্যমে ভীতিকর সংবাদ, স্বাস্থ্যবিধি না মানা এসব কারণে ঘুমের সমস্যা, ঘুম না আসা, বার বার ঘুম না হওয়ার কারণে। এ কারণে মন খারাপ থাকা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অস্থিরবোধ করা, আতঙ্কিত হয়ে মৃত্যুভয়ে ভীত হওয়া।

মনে রাখা দরকার, এই সংকটময় মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়া, মানসিক চাপে পড়া বা হতাশবোধ করাই স্বাভাবিক। পুরো বিশ্ব একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখী। আতঙ্কিত হয়ে গেলে কিন্তু তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে, সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে; করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে আতঙ্ক আর মানসিক চাপ তার করোনাকে আরও জটিল করে তুলবে। তাই সকলকে মানসিক চাপ মোকাবিলায় দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হতে পারে পরিবারের সঙ্গে কোয়ালিটি সময় দেয়া, সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করা, রুটিন বিষয়গুলো, যেমন ঘুম, ঠিক সময়ে খাবার, বাড়িতে হালকা ব্যায়াম ইত্যাদি বন্ধ না করা। সুষম আর নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান, সময়মতো ঘুমানো, হালকা ব্যায়াম করা, ঘরের কাজে সবাই মিলে অংশ নেয়া এবং যেকোনো নেশা এড়িয়ে চলা।

এই সময়ে সকলকেই সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত। এক্ষেত্রে সমাজের উন্নয়নে কাজ করছে এমন সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকলকেই ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা উচিত। বর্তমানে ঘরে বসেই অনলাইনে অনেক ধরনের আয় করার সুযোগ আছে এবং সোর্স রয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের এই অলস সময়ে যুবকদেরসহ কর্মক্ষম সবার মেধাকে কাজে লাগিয়ে এই প্ল্যাটফরমগুলো সচল করা যেতে পারে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে কাজ লাগাতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

শেয়ার করুন

লুকোচুরির লকডাউন!

লুকোচুরির লকডাউন!

প্রশ্ন হলো ১৪ দিনের লকডাউনও যদি সরকার ঠিকমতো পালন না করাতে পারে তাহলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সেই ব্রেক তো আর আনা সম্ভব হলো না। তাহলে এই কদিনের অদ্ভুত এক লুকোচুরি খেলার কি দরকার ছিল?

১ আগস্ট থেকে সব গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি খুলে দেয়া হলো। তার মানে হলো দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, ৮ শ’ ফেব্রিকস ইন্ডাস্ট্রি, প্রায় সাড়ে ৪ শ’ ইয়ার্ন ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরি, প্রায় ২৫০টি ডাইং ফ্যাক্টরি, এছাড়া দুহাজারের কাছাকাছি ওয়াশিং ও অ্যাক্সেসরিজ ফ্যাক্টরি ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য অফিস ও কারখানায় কর্মরত লোক মিলিয়ে ঢাকা ও এর আশপাশে কোটির বেশি লোক ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাবে। আর কারখানাগুলো চললে এর আশপাশের খাবার দোকান, মুদি দোকান, চায়ের স্টল কোনোটাই বন্ধ করা সম্ভব হবে না। এখন থাকল বাকি ৫০ লাখ দোকান ব্যবসায়ী। এরাও মনে হয় না ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারবে!

এক তারিখ থেকে গণপরিবহন না চললে সবাই ছোট ছোট গাড়িতে গাদাগাদি করে যাতায়াত করবে, রাস্তায় লোকে লোকারণ্য থাকবে, রিকশাভ্যান, বাইকে শেয়ার রাইড কোনোকিছুই আটকানো যাবে না। ফেরির সেই গিজ গিজ করা লোকের ভিড়ের ছবিও আমরা কাল থেকে দেখব। এর মধ্যে এখন ঢাকার বাইরের বেশিরভাগ করোনা রোগীই এখন ঢাকার চারদিকের হাসপাতালে ছড়ানো। এর অর্থ দাঁড়ালো স্বাস্থ্যবিধি মানানোর কোনো পথই আর খোলা থাকল না।

আমার প্রশ্ন হলো ১৪ দিনের লকডাউনও যদি সরকার ঠিকমতো পালন না করাতে পারে তাহলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সেই ব্রেক তো আর আনা সম্ভব হলো না। তাহলে এই কদিনের অদ্ভুত এক লুকোচুরি খেলার কি দরকার ছিল? এই কদিন সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করাটা তো তাহলে কোনো কাজেই এল না।

এছাড়া নৈতিকতার দিক দিয়ে বিচার করলে শুধু গার্মেন্টসের মালিকরাই কি এদেশের নাগরিক? আর অন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, দোকান মালিক, পরিবহন মালিক, রেস্তোরাঁ মালিক এরা কি দেশের নাগরিক না? এদের জীবিকা আটকে দিয়ে, বেঁচে থাকার দায়িত্ব কি সরকার নিয়েছে?

সরকারের এই অবিমৃষ্যকারী ও হঠকারী সিদ্ধান্ত করোনায় মৃত্যুর মিছিলকে আরও প্রলম্বিতই করবে। এখন করোনার বিষয়ে সরকারের একমাত্র কাজ হবে প্রতিদিনের সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ন্ত্রণ করা ও কমিয়ে দেখানো।

ইতিহাস বলে যে, যেকোনো মহামারি বাড়তে বাড়তে একসময় চূড়ায় ওঠে আর তারপর ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। তারপর একপর্যায় একদম কমে গিয়ে মানবগোষ্ঠীর জন্য সহনীয় হয়ে আসে। মানুষ যদি মহামারির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না-ও নেয় তাহলে এরকমই হয়।

আমরাও এসব লকডাউনের ভাওতাবাজির ওপর নির্ভর না করে বিধাতা আর প্রকৃতির ওপর সব ছেড়ে দিয়ে শুধু মাস্ক পরে, জীবাণুনাশক ব্যবহার করে, হাত ধুয়ে আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের রক্ষা করি; দেখবেন সরকার একদিন বুক ফুলিয়ে বিশ্বকে বলবে অত্যন্ত সুদক্ষ হাতে বাংলাদেশ মহামারি নিয়ন্ত্রণ করেছে। আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ বলবে, করোনা নিয়ন্ত্রণে আমরা বিশ্বের রোল মডেল।

লেখক: সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

শেয়ার করুন

মুনাফার কাছে জীবন তুচ্ছ!

মুনাফার কাছে জীবন তুচ্ছ!

মালিক দেখছে উৎপাদন, অর্ডার, মুনাফা। সরকার দেখছে রপ্তানি আয়। একদিকে ৩৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়, অপরদিকে ৪০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। অর্ডার বাতিল হলে আর পাওয়া যাবে না, মুনাফা হাতছাড়া হয়ে যাবে। কিন্তু শ্রমিক তো যথেষ্টই আছে। আর শ্রমিক দেখছে তার চাকরি। এটা না থাকলে সে বাঁচবে কীভাবে? করোনার চাইতে ক্ষুধার যন্ত্রণা যে বেশি! তাই সে ঝুঁকি নিতে পরোয়া করে না। ফলে মুনাফার জন্য এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়ে গেল।

শ্রমিকের জীবন নিয়ে এক অমানবিক দৃশ্যের অবতারণা হলো আবার। ঢাকায় প্রবেশ করার প্রতিটি পথেই মানুষ আর মানুষ। লঞ্চে, ফেরিতে তিলধারণের ঠাঁই নেই। বাসে দ্বিগুণ তিনগুণ ভাড়া। মানুষ উঠে পড়েছে ট্রাক, কাভার্ডভ্যানে। আসছে রিকশাভ্যান, ইজি বাইক, সিএনজি-চালিত অটোরিশায়। কী এক অজানা আতঙ্কে মানুষ ছুটে আসছে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জের দিকে।

টাকা বেশি লাগে লাগুক, যত কষ্টই হোক তাদেরকে আসতেই হবে। কোথায় স্বাস্থ্যবিধি আর কোথায় শারীরিক দূরত্ব! জীবন বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকার তাগিদে মানুষ আসছে। কিন্তু তাদেরকে আনছে যারা তারা কেন এই সিদ্ধান্ত নিল? ব্যবসা, মুনাফা, টাকা এই শব্দগুলো যে কত শক্তিশালী তা মানুষ দেখছে এবং বুঝছে বার বার। ক্ষমতা যে আসলে টাকার ক্ষমতা, টাকাওয়ালারা সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছে ভালোভাবেই।

করোনার সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়ছে, গ্রাম এবং শহরের পার্থক্য আর নেই বললেই চলে। মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ। হাসপাতালে ঠাঁই নেই, অক্সিজেন নেই, আইসিইউ বেড খালি নেই। যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এতদিন স্বাস্থ্য খাতে সক্ষমতার বিবরণ দিতেন এখন তিনি বলছেন সংক্রমণ আরও বাড়লে করার আর কিছুই থাকবে না। কষ্টকর মৃত্যুই যেন শেষ পরিণতি। বাঁচতে হলে ঘরে থাকুন!

এ যাবৎকালের সবচেয়ে কড়া লকডাউন চলছে। রাস্তায় সামরিক বাহিনীও আছে মানুষকে ঠেকাতে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত সমস্ত ধরনের গাড়ি চলাচল বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা এল গার্মেন্টসসহ রপ্তানিমুখী কারখানা ১ আগস্ট থেকে চালু করা হবে।

ঘোষণা তো এমনি এমনি আসেনি! মালিকদের পক্ষ থেকে প্রথমে আবদার, তারপর দাবি এরপর মৃদু হুমকির মুখে চলমান কঠোর ও সর্বাত্মক লকডাউন এবং বিধিনিষেধের মধ্যেই তৈরি পোশাকসহ সব রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা রোববার খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পোশাক কারখানার মালিক তথা রপ্তানিকারকদের মুখে এখন তৃপ্তির হাসি সঙ্গে একটু গর্বের ঝিলিক। মুখের ভাষায় না হলেও ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে তাদের মনের কথা। বলেছিলাম না আমাদের কথা সরকারকে শুনতেই হবে।

রোববার সকাল ছয়টা থেকে পোশাকসহ সব রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাকে বিধিনিষেধের আওতামুক্ত ঘোষণা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ শুক্রবার বিকেলে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বৃহস্পতিবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল ব্যবসায়ী মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে যত দ্রুত সম্ভব শিল্পকারখানা খুলে দেয়ার অনুরোধ জানান। তাদের অনুরোধ ফেলতে পারেনি সরকার।

এর আগে শ্রম প্রতিমন্ত্রী আবেদন জানিয়েছিলেন, যেন মালিকরা কারখানা লে-অফ না করেন। তিনি কিন্তু বলেননি যে বেআইনি লে-অফ করলে শ্রম আইন অনুযায়ী শাস্তি পেতে হবে। বরং শ্রমিকদেরকে ভয়ের ইঙ্গিত দেখালেন। এখন সিদ্ধান্ত নাও, করোনার ভয় না কাজ হারানোর ভয় কোনটা বড়? সব জটিলতার অবসান ঘটিয়ে শেষে রপ্তানিমুখী সব শিল্পকারখানা খুলে দেয়ার ঘোষণা দিল সরকার। যাক! শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেঁচে গেলেন লে-অফ জনিত দুশ্চিন্তা থেকে আর মালিক নেতারা দেখালেন তাদের ক্ষমতা। কিন্তু শ্রমিকেরা? এই চলমান বিধিনিষেধে শ্রমিকেরা দূর দূরান্ত থেকে কীভাবে কর্মস্থলে আসবেন তার কোনো ব্যবস্থা করা হবে কি না তা বলা হয়নি।

করোনা সংক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ২৩ জুলাই থেকে জারি করা কঠোরতম বিধিনিষেধের মধ্যে গত ২৭ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক সভায় হয়। তাতে সিদ্ধান্ত হয়, চলমান বিধিনিষেধে শিল্পকারখানা খোলার জন্য ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অনুরোধ থাকলেও তা গ্রহণ করা যাচ্ছে না। তার মানে ৫ আগস্ট পর্যন্ত পোশাকসহ অন্যান্য শিল্পকারখানা বন্ধই থাকছে। কিন্তু ৩০ জুলাই সিদ্ধান্ত হলো ১ আগস্ট থেকে কারখানা খুলছে।

ঈদের ছুটি এবং ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর লকডাউনের ঘোষণায় ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ কীভাবে যে গ্রামের দিকে ছুটেছে তা যমুনা সেতুতে গাড়ির ভিড়, সদরঘাটে লঞ্চে যাত্রীর ভিড়, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মানুষ আর গাড়ির ভিড় দেখে বুঝা গেছে। এরা কারা? কেন এরা ঈদ এলে বাড়ির দিকে ছোটে? এরকম কথা বলেন অনেকেই। তারা কি ভেবেছিলেন যখন সব বন্ধ তখন এই মানুষগুলো থাকবে কীভাবে?

এই মানুষগুলো বাড়ি গিয়েছিল স্বজনের প্রতি মায়ার টানে আর খরচ বাঁচাতে। কারণ কারখানা বন্ধ এখানে থেকে কী করবে? এখন আবার হুড়মুড় করে আসছে, কারণ না এলে চাকরি থাকবে না। তাই সে আসছে তিনগুণ চারগুণ বেশি খরচ, অবর্ণনীয় কষ্ট আর সময় ব্যয় করে। কোথায় থাকবে স্বাস্থ্যবিধি আর কোথায় কী? এসব দেখে অনেকেই হয়তো বলবে- বুঝলেন, আসলে বাঙালি কথা শোনে না, নিয়ম মানে না। কিন্তু যারা ঘন ঘন নিয়ম পালটান, বাধ্য করেন শ্রমজীবী মানুষদেরকে তাদের হুকুম মানতে, তাদের কি কোনো দায় নেই?

মালিক দেখছে উৎপাদন, অর্ডার, মুনাফা। সরকার দেখছে রপ্তানি আয়। একদিকে ৩৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়, অপরদিকে ৪০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। অর্ডার বাতিল হলে আর পাওয়া যাবে না, মুনাফা হাতছাড়া হয়ে যাবে। কিন্তু শ্রমিক তো যথেষ্টই আছে। আর শ্রমিক দেখছে তার চাকরি। এটা না থাকলে সে বাঁচবে কীভাবে? করোনার চাইতে ক্ষুধার যন্ত্রণা যে বেশি! তাই সে ঝুঁকি নিতে পরোয়া করে না। ফলে মুনাফার জন্য এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়ে গেল।

হুকুম তামিল করতে এক পায়ে খাড়া হয়ে থাকা মানুষটিও যখন ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পাল্টানোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না আর সে কারণে শাস্তির মুখোমুখি হয় তখন তার একটিমাত্র জবাব থাকে, এত কিছু কেমনে সামলাই বলেন, আমিও তো মানুষ! কিন্তু চাকরি বাঁচানোর জন্যে গার্মেন্টস শ্রমিকরা বলছে, করোনা ফরনা বাদ দেন, আমরা কি মানুষ যে আমাদের করোনা হবে?

আর সরকার কিংবা মালিক! তারা তো বলেন, শ্রমিকরাই আমাদের শক্তি। তারা পরিশ্রম করে বলেই উৎপাদন হয়, রপ্তানি বাড়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ঘোষণা দিলেন ১ আগস্ট থেকে কারখানা চলবে, শ্রমিকদের আসার জন্য কোনো ব্যবস্থা কি করলেন? শ্রমিকরা এলে করোনা টেস্ট করা, সংক্রমিতদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়া, মৃত্যুবরণ করলে সরকারি কর্মচারীদের মতো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা, করোনাকালীন কাজে ঝুঁকিভাতা দেয়া, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের গাইড লাইন অনুযায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে শ্রমিকদেরকে কাজে যোগদান করতে বললে তবুও বুঝা যেত শ্রমিকদের প্রতি কিছুটা দায় পালন করেছেন। কিন্তু মালিকদের মনোভাবটা তো এরকম যে, এরা হলো সস্তা মানুষের দেশের শ্রমিক। তাদের আবার কষ্ট!

কষ্ট করার অভ্যাস আছে ওদের। ওরা ঠিকই চলে আসবে। আসলেই, আসবেই তো। না-হলে চাকরি যে থাকবে না। ত্রিপলঢাকা মালবাহী ট্রাকে করে আসছে নারী শ্রমিকেরা। একজন গরমে, অন্ধকারে হাঁসফাঁস করতে করতে বলছে, ত্রিপলটা একটু তুলে ধরুন। একটু আলো আর বাতাস আসুক! অসহায় মুখটা বের করে বাইরে তাকিয়ে থাকার এই ছবি যেন দেশের শ্রমিকের জীবনের প্রতীক। জীবনে একটু আলো আর বাতাসের জন্য আর কত অন্ধকারে থাকতে হবে শ্রমিকদের?

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন:
বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

শেয়ার করুন