বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র

বিশ্ব শান্তিরক্ষী দিবস ও শেখ হাসিনার মানবিক রাষ্ট্র

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বর্তমানে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সেনা প্রেরণকারী দেশ। পেশাগত দক্ষতা-নিরপেক্ষতা, নেতৃত্ব-মেধা, সততা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ সদস্যরা শান্তিরক্ষী মিশনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে বিশ্বের অন্যতম রোল মডেলে পরিণত হয়েছে, উজ্জ্বল করেছে দেশের ভাবমূর্তি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য সম্পর্কেও প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে।

অভ্যন্তরীণ ও বহুজাতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ অবস্থা নিরসনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের যাত্রা শুরু। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বর্তমানে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সেনা প্রেরণকারী দেশ। পেশাগত দক্ষতা-নিরপেক্ষতা, নেতৃত্ব-মেধা, সততা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারী ও পুরুষ সদস্যরা শান্তিরক্ষী মিশনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে বিশ্বের অন্যতম রোল মডেলে পরিণত হয়েছে, উজ্জ্বল করেছে দেশের ভাবমূর্তি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য সম্পর্কেও প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। জাতিসংঘসহ বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন-সংস্থা ও স্বনামধন্য নেতৃত্ব-ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনার মানবিকতা ও মানবিক বাংলাদেশের প্রশংসা করছে।

আজকের গর্বিত বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনা ও দেশের জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে একদল সামরিক-বেসামরিক ঘাতকচক্র শুধু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সবান্ধব-সপরিপারে নির্মমভাবে হত্যা করেনি, এ হত্যার মাধ্যমে সারা দেশে তারা কায়েম করেছিল ত্রাসের রাজত্ব। বাংলাদেশকে নতুন পাকিস্তান বানাতে খুন-ধর্ষণ, লুটতরাজ-অগ্নিসংযোগ, জেল-জুলুম কিছুই বাদ দেয়নি তারা।

সে সময়ে তাদের প্রধান টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। মুজিবপ্রেমী জনগণ। বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়স্বজনও ছিল তাদের টার্গেট। তারা নিষিদ্ধ করেছিল জাতির পিতা ও বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ পর্যন্ত।

দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এমনি বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে দেশে পা রেখেছিলেন।

প্রিয় মুজিব ভাইকে হারিয়ে যে কান্না কাঁদতে পারেননি এতদিন বঙ্গবন্ধুর সহকর্মীগণ, সোনার বাংলার স্বপ্ন-সারথিরা, সেদিন তারা সেই কান্না কেঁদেছিলেন মুজিবকন্যাকে পেয়ে। ডা. দীপু মনির ভাষায়-

‘...নেত্রী প্রতিকূল আবহাওয়ায় প্রকৃতির কান্নাকে ছাপিয়ে তাঁর কান্না ভেজা বক্তব্য রাখলেন। সারা বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবী যেন কাঁদছিল। অঝোর ধারায়।’…

প্রায় সাড়ে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

সেই কঠিন ও বন্ধুর পথে ঘরে ঘরে শান্তি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শেখ হাসিনা ফেরি করে বেড়িয়েছেন বাংলার পথে-প্রান্তরে, ফসলের মাঠে, কৃষক-শ্রমিক এবং মা-বোনের কাছে। তিনি অতিক্রম করেছেন অজস্র দুর্লঙ্ঘ্য বাধা, বার বার তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র। তিনি জেল খেটেছেন, বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন- স্বপ্ন দেখিয়েছেন, বাংলার দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশের ইতিহাসে প্রথম ‘বয়স্ক ভাতা’, ‘বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত মহিলা ভাতা’, ‘অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ভাতা’, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’, ‘গৃহায়ন’, ‘আদর্শ গ্রাম’, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ কর্মসূচিসহ অনেক মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি করে সেখানকার সংঘাত থামিয়েছেন। এ চুক্তির ফলে ১৯৯৮ সালে তিনি অর্জন করেছেন ইউনেস্কোর ‘হুপে-বোয়ানি শান্তি’ পুরস্কার। ২০০১ সালে আবার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তিনি রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন এবং মানবিক উন্নয়নমূলক নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নে এসেছে যুগান্তকারী সাফল্য। তার নেতৃত্বের ১২ বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে, জনগণের জীবন মান, মাথাপিছু আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এবং দেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের কাতারে উন্নীত হয়েছে।

২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হয়েছে ২২২৭ মার্কিন ডলারে। যা ভারতের চেয়ে বেশি এবং পাকিস্তানের প্রায় দ্বিগুণ।

অমর্ত্য সেনের মতে-

‘বিপুল জনপ্রিয় নেত্রী হলেও শেখ হাসিনা আসলে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র মানুষের কণ্ঠস্বর।’

নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন-

‘মানুষের প্রতি শেখ হাসিনার ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’ তার উদ্যোগে দেশের গৃহহীন পরিবারকে সরকারি খরচে ঘর নির্মাণ করে দিচ্ছে সরকার। বর্তমান করোনা দুর্যোগে ঘনবসতির বাংলাদেশকে রক্ষা করতে তার কর্মপ্রচেষ্টাও বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। গত বছর করোনার সময় বিভিন্ন প্রণোদনাসহ সুবিধাবঞ্চিত ৫০ লাখ পরিবারকে নগদ অর্থ দিয়েছে তার সরকার। বর্তমান করোনাকালেও বিভিন্ন প্রণোদনা ও নগদ অর্থ পাচ্ছে দেশের গরিব-দুখী মানুষ।

শেখ হাসিনার উদ্যোগে ২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়ে নতুন ঠিকানা পেয়েছে ৬৭ বছর মানবেতর জীবন-যাপনকারী লাখ লাখ অধিবাসী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার নেতৃত্ব-দর্শন মানবিক বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনসহ আন্তর্জাতিক অনেক বিষয়ে তার উদ্ভাবনী প্রস্তাব বিশ্বরাষ্ট্রে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। তার প্রদত্ত ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ এবং ‘শান্তির সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব জাতিসংঘের অধিবেশনে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থনে গৃহীত হয়েছে ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর।

শেখ হাসিনা অর্জন করেছেন বিশ্বের অন্যতম সৎ, দক্ষ ও সেরা প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতিসহ ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’, ‘মানবতার চ্যাম্পিয়ন’, ‘বিশ্বমানবতার নেতৃত্ব’, ‘সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক নেতা’, ‘বিশ্ব মানবতার বিবেক’, ‘বিরল মানবতাবাদী নেতা’ এবং অন্যান্য মানবিক বিশেষণ। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্জন করেছে মানবিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। সমসাময়িক বিশ্বের কোনো নেতাই শেখ হাসিনার মতো এত মানবিক টাইটেল পাননি।

মনুষ্যত্বপূর্ণ কর্ম ও লোকহিতকর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জনগণের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা ও বিকাশে নিয়োজিত রাষ্ট্রকে মানবিক রাষ্ট্র বলা যায়। সরকার শুধু রাষ্ট্রের মুখপাত্রই নয়, রাষ্ট্রের রূপকারও।

সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের নীতি-আদর্শ ও বৈশিষ্ট্যের কারণে রাষ্ট্রের ধরন বা শ্রেণি-বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হয়। প্রায় দুই যুগ ধরে এ দেশের রাজনীতির প্রভাবশালী নিয়ামক শেখ হাসিনার শাসনামলকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয়, তার শাসনামলে রাষ্ট্র ও সরকারের কার্যাবলি এবং পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের সুবিধার্থে এবং সমাজ জীবনের পূর্ণতার জন্যে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ব্যক্তিজীবনের বহুমুখী উন্নয়ন সাধনের জন্যে তার সরকার সমাজতান্ত্রিক ও অসমাজতান্ত্রিক বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

শেখ হাসিনার চিন্তা-কর্ম, নীতি-তত্ত্ব, দর্শন এবং ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে উন্নয়ন তত্ত্ব’, ‘মানবিক রাষ্ট্র’-এর ধারণা সম্পর্কে বিশ্বকে নতুন দিগন্ত দিয়েছে। বাংলার মানুষও মনে করে, দেশমান্য শেখ হাসিনা দেশের গর্ব, দেশিকোত্তম ব্যক্তি, সর্বোত্তম পথনির্দেশক, দেশহিতব্রতী মানবিক শাসক। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, শেখ হাসিনা শুধু মানবিক বিশ্বের বাতিঘর নন, ‘মানবিক রাষ্ট্র’ নামক নতুন শ্রেণির রাষ্ট্রগঠনের মডেল। যার প্রেরণামূলে কাজ করেছে শেখ হাসিনার চার দশকের লড়াই-সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার দীর্ঘ পথ। রাষ্ট্রের শ্রেণিবিভাগে আগামী বিশ্বে ‘মানবিক রাষ্ট্র’ ধারণার পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে এবং বাংলাদেশ হবে মানবিক রাষ্ট্রের মডেল। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসে এ প্রত্যাশা করি।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন:
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করোনায় তথ্যযোদ্ধা কমিউনিটি রেডিও

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বসন্তের কোকিল নয় ত্যাগীদের মূল্যায়নই জরুরি

বসন্তের কোকিল নয় ত্যাগীদের মূল্যায়নই জরুরি

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একসময় ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকও একাধিক দিনে শেষ হতো। সেসব বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্ত প্রস্তাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখত। সেই প্রস্তাব তৈরির জন্য মেধাবী রাজনীতিবিদরা ভূমিকা রাখতেন। আওয়ামী লীগ তখন গরিবের দল হলেও এর রাজনীতি ছিল বর্ণাঢ্য ও ঐতিহ্যের আলোয় আলোকিত। এখন জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বর্ণিল উৎসব হলেও সেখানে কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাব উঠে আসে না, যা দেশের রাজনৈতিক মহলকে আকৃষ্ট করে।

গৌরব-ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সাফল্যের একেকটি সিঁড়ি বেয়ে ৭২ বছর পার করল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রাচীন এই রাজনৈতিক দলের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল ২৩ জুন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, চরাই-উতরাই ও সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে আজকের এই অবস্থানে উপনীত হয়েছে আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ ৭২ বছরে দলটি অনেক ঐতিহ্য-গৌরব স্থাপনে সক্ষম হয়েছে।

পশ্চাৎপদ ও ভ্রান্ত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নেয়া পাকিস্তানের অধীনে থাকা পূর্ববাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে দলটি আত্মপ্রকাশ করে।

প্রতিষ্ঠার সময়ই দলের অসাম্প্রদায়িক নামকরণের দাবি উঠলেও তখন সমাজ বাস্তবতা ও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলটি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্র্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে।

আওয়ামী লীগ নামে বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামের ব্রত নিয়ে এ রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ।

প্রথম সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কারাগারে। প্রথম কমিটিতে তিনি কারাগারে থেকেই যুগ্ম সম্পাদক পদ পান। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার একপর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন।

১৯৬৬ সালের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা শেখ মুজিব।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলে রূপান্তরিত হয়।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তানের শাসন-নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের সব আন্দোলন একপর্যায়ে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জিত হয়। সেদিন বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ের পথ ধরে ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে দলটি অগ্রসর হয়। ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিপুল বিজয় ও স্বাধীনতার সংগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১৯৭১-এ সংগঠিত মহান মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দেয়। পাকিস্তানি শাসন আমলে এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী দীর্ঘ সময় দেশে একের পর এক আসা সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সব ধরনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী দলটি।

এই সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় আওয়ামী লীগকে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। অনেক চরাই-উৎরাই এবং ভাঙা-গড়ার মধ্যদিয়ে এগোতে হয়েছে। কখনও নেতৃত্ব শূন্যতা, কখনও দমন-পীড়ন, কখনও ভাঙনের মুখে পড়তে হয়েছে দলটিকে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের সিংহভাগ সদস্যকে হত্যা এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর নেতৃত্ব শূন্যতায় পড়ে আওয়ামী লীগ। এই শূন্যতা থেকেই দলের মধ্যে একাধিক ভাঙন, গ্রুপিং ও বহু ধারায় বিভক্তি দেখা দেয়। এরপর দলের চরম ক্রান্তিকালে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে শক্ত হাতে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্বিধা-বিভক্ত আওয়ামী লীগ আবার ঐক্যবদ্ধ হয়। প্রায় চার দশক ধরে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পরিচালিত হচ্ছে। এই সময়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। তবে ৭২ বছরের মধ্যে প্রায় ৫০ বছরই আওয়ামী লীগকে থাকতে হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে, রাজপথ, আন্দোলন-সংগ্রামে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের সাড়ে তিন বছর এবং ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পাঁচ বছর এবং বর্তমানে টানা সাড়ে ১২ বছর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে।

ক্ষমতার টানা একযুগের আওয়ামী লীগের দিকে তাকালে মনে হয় আওয়ামী লীগ দল হিসেবে গতি কি হারাচ্ছে? একসময় যে আওয়ামী লীগে ছিল জাতীয়ভাবে আলোকিত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বহর, তৃণমূলে ছিল গণমুখী-সৎ, আদর্শবাদী ও অভিজ্ঞ রাজনীতির পরীক্ষিত মুখ; সেখানে আজ চিত্রপট একেবারেই ভিন্ন। দল ও সরকারকে আলাদা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ কতটা সফলতা অর্জন করেছে তার বিষয়ে আলোচনার সময় এসেছে।

দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা সারা দেশের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও তারা ক্ষমতায় নেই। দলের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে যেমন ভূমিকা রাখতে পারছেন না, তেমন কর্মীদের জন্যও কিছু করতে পারছেন না। কর্মীরা এলে সান্ত্বনা দেয়া ছাড়া তাদের কিছু দেয়ার নেই। অনেকে ক্ষমতা দূরে থাক, সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকলেও দলের সংসদ সদস্য পদেও নেই। এটা দলের জন্য কতটা ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে এর কোনো দৃশ্যমান উদাহরণ নেই।

একটা সময় ছিল রাজনীতিতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে যারা নেতা হতেন তারাই এমপি, ক্ষমতায় গেলে তারাই মন্ত্রী হতেন। কেন্দ্র আর তৃণমূলের অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে সরকার গঠন হতো। দল ও সরকার আলাদা করার এক্সপেরিমেন্টাল ঘটনাচক্রে সরকার বা দল আদৌ লাভবান হয়েছে কি না এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

অনেকে যেমন আজন্ম আওয়ামী লীগ করেও দলীয় ক্ষমতার স্বাদ পাননি, তেমনি অনেকে হঠাৎ এসে উড়ে এসে জুড়ে বসে ষোলো-আনাই ভোগ করে ক্ষমতার স্বাদ নিচ্ছেন। অনেকের সাংগঠনিক দক্ষতা-অভিজ্ঞতা থাকলেও দলে নেই, ক্ষমতায় আছেন। সমন্বয়হীনভাবে দল ও সরকার আলাদা করার এ পরীক্ষা-নিরীক্ষা আওয়ামী লীগকে গণমুখী কর্মীবান্ধব সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির জায়গা থেকে গতি-প্রকৃতি পরিবর্তন করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একসময় ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকও একাধিক দিনে শেষ হতো। সেসব বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্ত প্রস্তাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখত।

সেই প্রস্তাব তৈরির জন্য মেধাবী রাজনীতিবিদরা ভূমিকা রাখতেন। আওয়ামী লীগ তখন গরিবের দল হলেও এর রাজনীতি ছিল বর্ণাঢ্য ও ঐতিহ্যের আলোয় আলোকিত। এখন জাতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বর্ণিল উৎসব হলেও সেখানে কোনো রাজনৈতিক প্রস্তাব উঠে আসে না, যা দেশের রাজনৈতিক মহলকে আকৃষ্ট করে।

১৯৭৫ সালের পর সেই গভীর সংকটকালে যারা ছাত্রলীগের রাজনীতির পতাকা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উড়িয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির প্রচার চালিয়েছেন সাংগঠনিক দক্ষতা ও মেধায় দলকে উজাড় করে দিয়েছেন তারা এখন মুখ দেখাতে পারেন না।

দলও তাদের খোঁজ নেয় না। তাদের মূল্যায়ন হয় না। ওয়ান-ইলেভেনে যারা ঝুঁকি নিয়েছেন, জেল খেটেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন; যারা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ছাড়েননি তাদের খবরও এখন কেউ নেয় না।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশেই প্রবেশ করেনি, অর্থনৈতিক উন্নয়নে পৃথিবীতে রোল মডেল হয়েছে।

করোনাযুদ্ধে তার সাফল্য দেখার মতো। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শত ব্যর্থতার মধ্যেও তিনি তার নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা, মেধা ও প্রজ্ঞায় সংকট মোকাবিলা করছেন। খাবারের জন্য কাউকে কষ্ট করতে হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ আজ রাষ্ট্র পরিচালনায় আছে, কিন্তু ক্ষমতা চিরস্থায়ী থাকবে না। বিরোধী দলের কঠিন রাজনীতি মোকাবিলা করার মতো সাংগঠনিক শক্তি ও কাঠামো কি তৈরি আছে? এ নিয়ে কি কেউ ভাবছেন? সুতরাং সময় এসেছে দলের ত্যাগী এবং পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন করার।

লেখক: প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করোনায় তথ্যযোদ্ধা কমিউনিটি রেডিও

শেয়ার করুন

উপমহাদেশের রাজনীতি- আওয়ামী লীগ ও কংগ্রেস: সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য

উপমহাদেশের রাজনীতি-
আওয়ামী লীগ ও কংগ্রেস: সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য

বিশ্বে বাংলাদেশই হয়তো একমাত্র দেশ যেখানে স্বাধীনতাবিরোধীরা স্বনামে-বেনামে তৎপর এবং পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে অর্থাৎ দেশকে আবারও পাকিস্তানের আদলে পরিচালিত করতে দেশে এবং দেশের বাইরে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র আজও অব্যাহত রেখেছে। আর এ রকম ভয়ংকর পরিস্থিতি বিশ্বে একজন মাত্র ব্যক্তিই মোকাবিলা করে চলেছেন, আর তিনি হলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

উপমহাদেশের অন্যতম পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ চলার পথে ৭২ বছর পার করল। ২৩ জুন ছিল ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী; যা এ বছর করোনা সংক্রমণের কারণে বেশ অনাড়ম্বরভাবেই পালিত হয়েছে। মহাকালের বিবেচনায় ৭২ বছর হয়তো একটি রাজনৈতিক দলের জন্য তেমন কোনো সময় নয়। তবে বাস্তবতার আলোকে একেবারে কম সময়ও নয়, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দলের জন্য। কারণ, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অর্জন যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি এই দলের রয়েছে দীর্ঘ এক সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাস।

বাঙালি জাতির জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এবং স্বাধীন বাংলাদেশকে আজকের উন্নতির মহাসড়কে দাঁড় করাতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে যে পরিমাণ প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে, যে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার করতে হয়েছে, ভেতরে-বাইরে যত চক্রান্তের শিকার হতে হয়েছে এবং যে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে হয়েছে; তেমনটা বিশ্বের আর কোনো রাজনৈতিক দল করেছে কি না, আমার জানা নেই।

এত সব বৈরী পরিবেশ সফলভাবে মোকাবিলা করে এবং সব রকমের উত্থানপতন সামলে নিয়ে এই দলটি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে শুধু দুজন যোগ্য নেতৃত্বের কারণে। একজন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরেকজন তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যদিও সুদীর্ঘ চলার পথে অনেক প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ এবং গুণীমানুষ এই দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং আছেন, তাদের অবদানও কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। মূলত তারা একদিকে যেমন সার্বক্ষণিক সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করেছেন, অপরদিকে তেমনি মহান নেতার ঘোষিত কর্মসূচিগুলো পালনে অসাধারণ সফলতার স্বাক্ষরও রেখেছেন। কিন্তু মূল নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বেই দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম পেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। একইভাবে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র তকমা দেয়া বাংলাদেশকে আজকের উন্নতির রোল মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর একক কৃতিত্বও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার। এ কারণেই আওয়ামী লীগের প্রতিটা কর্মী, সদস্য এবং নেতা-নেত্রী তো বটেই, সমগ্র দেশবাসী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তারই সুযোগ্যকন্যা শেখ হাসিনার কাছে চিরকৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন এলেই উপমহাদেশের আরও একটি দীর্ঘদিনের পুরোনো রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের কথা আলোচনায় চলে আসে। কারণ, উপমহাদেশের এই দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে এত বেশি সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য লক্ষ করা যায়, যা আর কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যে নেই।

ভারতের কংগ্রেস ভারত স্বাধীন করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে। আওয়ামী লীগও নেতৃত্ব দিয়েই বাংলাদেশকে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীন করেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কংগ্রেসের চেয়ে অনেক বেশি আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ, রক্তাক্তমুখর।

আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে যে দীর্ঘ সময় কারাবাস করতে হয়েছে, তা কোনো কংগ্রেস নেতা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে করেছেন কি না, জানা নেই।

কংগ্রেস যেমন ভারতের একটি অসাম্প্রদায়িক দল, আওয়ামী লীগও বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক দল। বিভিন্ন ধর্মবর্ণ ও মতের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশেই দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং দেশের উন্নতিও নিশ্চিত করা যায়। এই মূলমন্ত্রটি কংগ্রেস যেমন উপলব্ধি করে তাদের দলের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিল, আওয়ামী লীগও তেমনটাই করেছিল।

ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের শাসনামলেই আধুনিক ভারতের প্রকাশ ঘটে। ভারতের যে উত্তরোত্তর উন্নতি এবং বিশ্বব্যাপী আধুনিক ভারতের যে স্বীকৃতি, সেটি সম্ভব হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর যোগ্য নেতৃত্বের গুণেই।

আজকের বাংলাদেশের যে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি তা-ও সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বের গুণেই। আজকের বাংলাদেশের উন্নতি সমগ্র বিশ্বে আলোচিত, প্রশংসিত এবং স্বীকৃত। মাথাপিছু আয়সহ উন্নয়নের অনেক সূচকে বাংলাদেশ এখন প্রতিবেশী দেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি তো পেয়েছেই, এখন ২০৪০ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হবার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। এত সব অভাবনীয় অর্জন সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে যার সফল নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং কংগ্রেসের মধ্যে যেমন অনেক সাদৃশ্য আছে, তেমনি বৈসাদৃশ্যও কম নয়। স্বাধীনতা লাভের মাত্র চার বছরের মধ্যে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন।

কংগ্রেসের কোনো নেতাকে এমন করুণ পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়নি। শুধু তা-ই নয়, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে চক্রান্তকারীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে দেশকে উলটো পথে অর্থাৎ পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালনা করতে শুরু করে। এমন উদ্ভট এবং স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ভারতের কংগ্রেসের ক্ষেত্রে ঘটেনি।

ভারতে কোনো দল ক্ষমতায় এসে ব্রিটিশের আদলে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করেনি। চক্রান্তকারীরা ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চালায়, নেতা-নেত্রীদের কারাগারে নিক্ষেপ করে, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করে, বিদেশে অবস্থান করায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও তাদের দেশে ফিরতে না দেয়া।

আইন করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচারের পথ যে বন্ধ করে রাখা হয় শুধু তাই নয়, তাদের বিদেশি দূতাবাসে চাকরিও দেয়া হয়। ভারতের কংগ্রেসকে নিশ্চয়ই এ রকম জঘন্য কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করতে হয়নি। এখানেই শেষ নয়, স্বাধীনতার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত স্বাধীনতাবিরোধীরা তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার প্রচেষ্টা প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে, দেশের অভ্যন্তরে এবং বহির্বিশ্বে সক্রিয়ভাবে অব্যাহত রেখেছে।

এই স্বাধীনতাবিরোধীরা প্রতিনিয়ত চক্রান্ত করে চলেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে এসব ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত এবং স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ড কঠোর হাতেই এখন পর্যন্ত সফলভাবে মোকাবিলা করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। এমন পরিস্থিতি ভারতের কংগ্রেস কেন, বিশ্বের কোনো দেশেই দেখা যাবে না।

আমাদের স্বাধীনতার পর বিশ্বে আরও অনেক দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু কোনো দেশেই স্বাধীনতাবিরোধীদের অবস্থান নেই। দেশ স্বাধীন হয়েছে, পরাজিতরা হার মেনে নিয়েছে এবং সেখানেই শেষ। কিন্তু বিশ্বে বাংলাদেশই হয়তো একমাত্র দেশ, যেখানে স্বাধীনতাবিরোধীরা স্বনামে-বেনামে তৎপর এবং পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে অর্থাৎ দেশকে আবারও পাকিস্তানের আদলে পরিচালিত করতে দেশে এবং দেশের বাইরে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র আজও অব্যাহত রেখেছে। আর এ রকম ভয়ংকর পরিস্থিতি বিশ্বে একজন মাত্র ব্যক্তিই মোকাবিলা করে চলেছেন, আর তিনি হলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের সুদীর্ঘ ৭২ বছর চলার পথে উত্থানপতন যা-ই থাকুক না কেন, প্রাপ্তির পরিমাণ আসলেই অবিস্মরণীয় এবং ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে যত দিন থাকবে বাঙালি জাতি। একটি দল দেশে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে এবং সেই সঙ্গে দেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হয়েছে সেই একই দলের অধীনে, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন পিতা এবং তারই সুযোগ্য কন্যা।

এমন দুর্লভ সাফল্যের নজির পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি আছে কি না, জানা নেই। এই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের পরবর্তী নেতৃত্ব কেমন হবে, সেটিই এখন ভাবনার বিষয়। দলের সফলতার ধারাবাহিকতা অনেকটাই নির্ভর করে সেই দলের উত্তরাধিকার পরিকল্পনার ওপর।

আমরা প্রত্যাশা করি এবং সব সময় প্রার্থনা করি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও দীর্ঘদিন দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আরও অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন। কিন্তু তারপরও একসময় তিনি অবসর নেয়ার কথা ভাববেন এবং তখন তার স্থান নেয়ার জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব এখন থেকেই প্রস্তুত করা প্রয়োজন। কেননা, যোগ্য উত্তরসূরির অভাবে অনেক সফল এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দলও অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, এমন নজির পৃথিবীতে আছে।

কংগ্রেসই মনে হয় এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ইন্দিরা গান্ধী দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হবার পর দলটি যে নেতৃত্বের সংকটে পড়ে তা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ইন্দিরা গান্ধী নিহত হবার পর তারই ছেলে রাজীব গান্ধী সহানুভূতি ভোট পেয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারলেও সঠিক নেতৃত্বের স্থানটি পূরণ করতে পারেননি। আর এই নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণে দলটি আর সর্বভারতীয় দল হিসেবে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতেই পারছে না।

এই সুযোগে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ভারতের শাসনক্ষমতায় জেঁকে বসেছে। অর্ধশতাব্দীরও অধিক সময় ধর্মনিরপেক্ষতাচর্চা করার পর সেই দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যে যেতে পারে, তা ভাবতেও অবাক লাগে।

ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের এহেন রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য কংগ্রেসের নেতৃত্বের দুর্বলতাই প্রধানত দায়ী। আমাদের দেশেও যদি কখনও আওয়ামী লীগে আবারও নেতৃত্বের দুর্বলতা দেখা দেয় এবং সেই সুযোগে যদি ভারতের মতো রাজনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি হয় তাতে অবাক হবার কিছু থাকবে না।

এখানেও আমাদের শেষ ভরসা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি যেহেতু সবকিছু খেয়াল রাখছেন এবং সব দিক যথেষ্ট দূরদৃষ্টির সঙ্গেই সামলাচ্ছেন তাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের যোগ্য উত্তরসূরির বিষয়টি তার সক্রিয় বিবেচনাধীন আছে। তিনি নিশ্চয়ই নেতৃত্বের এমন যোগ্য উত্তরসূরির সোপান তৈরি করে দেবেন যার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং শেখ হাসিনার বাস্তবায়নের পথ ধরেই দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে সমান গতিতে।

লেখক: ব্যাংকার-কলাম লেখক, টরেন্টো, কানাডা

আরও পড়ুন:
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করোনায় তথ্যযোদ্ধা কমিউনিটি রেডিও

শেয়ার করুন

রক্তচক্ষু উপেক্ষার আওয়ামী লীগ

রক্তচক্ষু উপেক্ষার আওয়ামী লীগ

বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসনে নিপীড়ন-অত্যাচারের শিকার হয়, সবরকম রক্তচক্ষুকে পিছে ফেলে পুনরায় ২০০৯ সালে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। পর পর তিনটি নির্বাচনে জয়লাভ করে বর্তমানে টানা ১২ বছর সফলতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করছে দলটি।

বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে যে দলটি সামনে থেকে একক নেতৃত্ব দিয়েছে সেটির নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সংগ্রামের পিদিম প্রজ্বালন করে পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে আমাদের স্বাধীনতা এনে দেয়া সংগঠনটির নাম আওয়ামী লীগ। এজন্যই আমরা বুকভরা গর্ব নিয়ে বলি বাংলাদেশের ইতিহাস মানেই আওয়ামী লীগের ইতিহাস।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন রোজ গার্ডেনে জন্ম নেয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৫ সালে দলের নাম পালটে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ করা হয়।

১৯৫২ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত টানা ১৪ বছর বঙ্গবন্ধু সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর অলঙ্কৃত করেন সভাপতির আসন। ছয় দফা থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে এদেশের গণমানুষের দল হিসেবে তারা কতটা যোগ্য।

’৭৫ পরবর্তী ঘটনাবহুল ইতিহাসের পর দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে ছিল দলটি। এরপর ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন। তার যোগ্য নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর পুনরায় সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসনে নিপীড়ন-অত্যাচারের শিকার হয়, সবরকম রক্তচক্ষুকে পিছে ফেলে পুনরায় ২০০৯ সালে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। পর পর তিনটি নির্বাচনে জয়লাভ করে বর্তমানে টানা ১২ বছর সফলতার সঙ্গে সরকার পরিচালনা করছে দলটি।

প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে, যা দেখে অবাক পুরো বিশ্ব। একের পর এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। বহির্বিশ্বে আজ সম্মানের পাত্র বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরবর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় এই ১২ বছরে বাংলাদেশ এগিয়েছে কমপক্ষে ৫০ বছর।

নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো উঠে আসা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল সরকার বললে অত্যুক্তি হবে না! সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পকে প্রতিহত করে সরকার পরিচালনায় জননেত্রী শেখ হাসিনার সহযোগী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে সংগ্রামে লিপ্ত আওয়ামী লীগ, সেই সংগ্রাম অবিরাম থাকুক। জনগণের আস্থার চিরন্তন প্রতীকে রূপান্তরিত দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগকে জানাই অভিবাদন।

লেখক: শিক্ষার্থী, ফ্রেঞ্চ ল্যাংগুয়েজ অ্যান্ড কালচার বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করোনায় তথ্যযোদ্ধা কমিউনিটি রেডিও

শেয়ার করুন

৭২ বছরের অনিন্দ্য পথচলা

৭২ বছরের অনিন্দ্য পথচলা

জাতির মঙ্গলের জন্য যখন যা প্রয়োজন সেটিই বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার জনকল্যাণধর্মী ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে নেয়া দূরদর্শী উন্নয়ন কৌশলের নৈতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৭২ সালে গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের মাধ্যমে।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। এর ঠিক ১৯২ বছর পর বাংলার মানুষের মুক্তি আর অধিকার আদায়ের জন্য ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে আত্মপ্রকাশ ঘটে বাংলার গৌরবগাঁথা ঐতিহ্যবাহী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে’র ।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতারা দলের আত্মপ্রকাশের দিন হিসেবে ইতিহাস থেকে ২৩ জুন তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন বাঙালির পরাজয়ের সে গ্লানিকে চিরতরে ম্লান করে দেবার জন্যে। আওয়ামী লীগ নামটির সঙ্গেই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে এক মহাপুরুষের নাম। সেই মহানায়ক হাজার বছরের অগ্নিপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ইতিহাসের স্বর্ণালি সন্ধিক্ষণে বাঙালি জাতির জন্য মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে আজও শোষিত বঞ্চিত নিপীড়িত নিষ্পেষিত শৃঙ্খলিত মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যার শিরদাঁড়া স্থাপন করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পার করল। ১৯৫৫ সালে ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটি ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ’ থেকে হয়ে ওঠে দলমত-নির্বিশেষে সবার ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’।

১৯৫২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দিগ্বিজয়ী সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ঠিক তার পরের বছরই বঙ্গবন্ধুর উপরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় ।

১৯৬৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর সদর্পে কর্মবীরের ভূমিকায় বঙ্গবন্ধু সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে দলের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আওয়ামী লীগের জন্মলাভের পর ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা ও ৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান, ৭০’র যুগান্তকারী নির্বাচন সবই হয়েছে আওয়ামী লীগের হাত ধরে। এদেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রত্যুজ্বল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অবিস্মরণীয় নাম।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের দুরভিসন্ধিমূলক ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করতে পেরে দীর্ঘ ধারাবাহিক ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পর অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ৭ মার্চ উত্তাল গণসমাবেশে ১৮ মিনিটের এক ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে বাঙালিদের মাঝে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সঞ্জীবনী শক্তির সঞ্চার করেন। বজ্রনিনাদিত কণ্ঠে ও দ্রোহের স্ফুরণের সম্মেলনের সেই ভাষণ পাকিস্তানিদের অন্তরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়।

পরবর্তী সময়ে বাঙালি সেই স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে, মুক্তির ঘোর অমানিশায় প্রদীপ্ত থেকে বাঙালির মহত্তম মহাযজ্ঞ মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তবন্যার ফল হিসেবে বাংলাদেশ বিজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে ও স্বাধীনতা লাভ করে। পাকিস্তানের সূচনালগ্ন থেকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রতিটি নবসূর্যের আভায় বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

জাতির মঙ্গলের জন্য যখন যা প্রয়োজন সেটিই বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার জনকল্যাণধর্মী ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে নেয়া দূরদর্শী উন্নয়ন কৌশলের নৈতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৭২ সালে গৃহীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের মাধ্যমে।

‘রাষ্ট্রীয় মৌলনীতি’র অংশ হিসেবে অর্থনীতি ও সমাজে সাম্য নিশ্চিত করা, গ্রামীণ অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করা, খাদ্য-বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ এই সংবিধানে স্থান করে নেয়।

সময়ের প্রয়োজনে শুরুতে রাষ্ট্রীয় খাতকে প্রাধান্য দিলেও ধীরে ধীরে সমবায় ও ব্যক্তিখাতের বিকাশের জন্যে উপযুক্ত নীতি সংস্কারেও তিনি হাত দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধু সরকার গণমুখী শিক্ষার বিষয়কে শুধু সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েই থেমে থাকেননি, বরং নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ লক্ষ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেতে থাকা একটি নবীন জাতি যেন হঠাৎই বাকরুদ্ধ আর স্তব্ধ হয়ে যায় এক কালো রাতের ভয়াল নৃশংসতায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একটি সদ্যজাত জাতিকে তার পিতার লাশ বহন করতে হয়। হন্তারকরা বঙ্গবন্ধুকে নারকীয়ভাবে হত্যা করলেও তার রেখে যাওয়া জীবনাদর্শকে মুছে ফেলতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এখন লালন করে কোটি কোটি বাঙালি।

৭৫ পরবর্তী বাঙালি জাতির বুকে নেমে আসে এক কৃষ্ণবিবর। ৭৫- পরবর্তী নানা আন্দোলন সংগ্রামে যখন আওয়ামী লীগকে মুছে দেয়ার জন্য বার বার চেষ্টা করা হয়েছে তখন আওয়ামী লীগ কর্মীদের রক্তের স্রোতের মাধ্যমে সেই অপচেষ্টাকে প্রতিহত করা হয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, আজকের আওয়ামী লীগ দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য নেতা কর্মীর আত্মত্যাগের ওপর। আওয়ামী লীগের চলার পথ মসৃণ হয়েছে অসংখ্য কর্মীর শরীর থেকে ঝরা রক্ত দিয়ে।

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাল ধরলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অন্তরের ভেতরে উদ্বেলিত বারুদ আবারও ফুঁসে ওঠে। জনমানুষের হয়ে আগের চেয়েও দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও সুসংগঠিত হয়।

স্বৈরাচার, অগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে হাজারও সংগ্রাম সাধনার পর ১৯৯৬ সালের আবারও সেই ২৩ জুনেই আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত সব উন্নয়নের কর্মপ্রক্রিয়া বাস্তবায়নের রোডম্যাপ সে সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমেই সম্পাদন করা হয়।

কিন্তু বরাবরই শস্যের ভেতরে ভূত হয়ে আসে পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের দোসর ও তাদের উত্তরসূরিরা। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র জগদ্দল পাথরের মতো জাতির ঘাড়ে চেপে বসে জাতির সব অর্জনকে ভূলুন্ঠিত করবার পাঁয়তারা করেছে।

২০০১ থেকে ২০০৮ সাল ছিল নৈরাজ্য, দুঃশাসন, দুর্নীতি আর জাতির কপালে কালিমা লেপনের এক অন্ধকারতম অধ্যায়। বাঙালির ভাগ্যাকাশে নিগৃহীত এই কলঙ্কময় অধ্যায় জাতির অর্জনকে নিমেষেই জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল। দেশজুড়ে অরাজকতা ও সন্ত্রাসের কালো ছায়ায় বাংলাদেশ যেন বিপন্নপ্রায়। বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে বারংবার হত্যাচেষ্টায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ঢাল হয়ে সব অপঘাতকে রুখে দিয়েছে। এ যাবৎ বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে প্রায় ১৯ বার হত্যা করবার অপচেষ্টা করা হয়। প্রতিবারই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠে প্রতিরোধ করেছে।

দেশে রাজনৈতিক সংকটের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে পুনরায় সরকার গঠন করে। ২০০৯ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের টানা এক যুগের শাসনামলে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট প্রেরণ করা হয়েছে। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য এসেছে। জঙ্গি দমনে সাফল্য সারা বিশ্বে আলোচিত।

এদেশে আওয়ামী লীগই একমাত্র দল যেটি দেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নিরবিচ্ছিন্ন ভূমিকা রেখেছে। দেশের বিভিন্ন সংকট ও দুর্যোগে অন্যদলগুলো যখন নানা নাটকীয়তায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময়ক্ষেপণ করেছে, আওয়ামী লীগ তখন তার অবস্থানে অটল থেকে জনগণকে সংগঠিত করেছে। অন্যদলগুলো যখন ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া নিয়ে অহংকারে ব্যস্ত, আওয়ামী লীগ তখন নির্মাণ করছে নতুন ইতিহাস।

লড়াই সংগ্রামে অটল অবিচল ও দ্যুতি সঞ্চারে বাঙালির লালিত স্বপ্ন সাহসের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বাঙালির স্বাধীনচেতা অগ্নিগর্ভে দ্রোহের স্ফুরণ ঘটেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাত ধরেই। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই যেমন সব দৌরাত্ম্যের দোটানাকে দমন করে দুর্বার গতিতে দুর্দমনীয় হয়ে এগিয়েছে, ঠিক তেমনি সব ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙে দিয়ে জাতিকে মুক্তির আলোকবার্তা উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। যুগে যুগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই আলোর পথে অভিযাত্রা অব্যাহত থাকুক।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করোনায় তথ্যযোদ্ধা কমিউনিটি রেডিও

শেয়ার করুন

দুধের মাছি থেকে সাবধান থাকা দরকার

দুধের মাছি থেকে সাবধান থাকা দরকার

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে ঐতিহ্যবাহী এ দলটিতে ভিড় জমিয়েছে ভিন্ন আদর্শ এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির একটা অংশ। বিভিন্ন সময়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা, যেকোনো ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করার চেষ্টা, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টাও তাদের কুকর্মের মাধ্যমেই হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরে এসে এ ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের ব্যথিত করে, কষ্ট দেয়। এ বিষয়ে সচেতন হয়ে, দুধের মাছি এবং সুযোগসন্ধানীদের দ্রুত দল থেকে বের করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনা যেন একসূত্রে গাঁথা। ২৩ জুন, সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও সাফল্যের ৭২ বছর পেরিয়ে ৭৩ বছরে পদার্পণ করল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। গণমানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশার বাস্তবায়ন ঘটাতে বঙ্গবন্ধুতনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ফলে উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই যেন রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

এদেশে একটা সময় ছিল যখন বিদ্যুতের ব্যাপক ঘাটতি ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হতো। উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটত। পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রেখে আজ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম বাংলাদেশ। যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। প্রত্যেকটি বিভাগে করা হচ্ছে ফোর লেনের সড়ক। যে পদ্মা সেতু এবং মেট্রোরেল জনগণের স্বপ্ন ছিল, সে স্বপ্নকে সত্যি করে বাস্তব রূপদান করে দিয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শাসনকালেই মানুষের জীবন ও জীবিকার উন্নয়নসাধিত হয়েছে বহু গুণে। ২০২০-২১ অর্থবছরে মাথাপিছু আয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা বছরে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৩ টাকা।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৪৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ২০০৮ সালে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ। এ বছর ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২২ সালের আগেই এ প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছানোর লক্ষ্যে কাজ করছে আওয়ামী লীগ সরকার।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে দেশের সর্বস্তরের জনগণের পাশে বিপদের বন্ধু হয়ে গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

টানা একযুগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি অনন্য উদাহরণ। এ দেশের অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক শক্তির সমর্থনের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে জাতির পিতার যোগ্য কন্যা, দেশরত্ন শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি উন্নয়নশীল দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করেছেন।

তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হতে চলেছে। এত সব সফলতার পাশাপাশি আমাদের কিছু আক্ষেপও আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে ঐতিহ্যবাহী এ দলটিতে ভিড় জমিয়েছে ভিন্ন আদর্শ এবং স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির একটা অংশ। বিভিন্ন সময়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা, যেকোনো ইস্যুতে আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করার চেষ্টা, ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টাও তাদের কুকর্মের মাধ্যমেই হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরে এসে এ ধরনের ঘটনাগুলো আমাদের ব্যথিত করে, কষ্ট দেয়।

এ বিষয়ে সচেতন হয়ে, দুধের মাছি এবং সুযোগসন্ধানীদের দ্রুত দল থেকে বের করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, দলটি এর ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে ব্যর্থ হয়ে স্থিতিশীল অবস্থা খুঁজতে গিয়ে পেন্ডুলামের মতো করে দুলতে থাকবে, যা আমরা দেখতে চাই না।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রকৃত খবরএবং তথ্যগুলো পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের আরও সতর্ক হওয়া জরুরি। আওয়ামী লীগ এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশাকে প্রাধান্য দেয়া জরুরি। অন্যথায় ঐতিহ্যবাহী এ দলটির কর্মীসংকট দেখা দিতে বেশি দিন লাগবে না। আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে এর দীর্ঘদিনের সুনাম এবং ঐতিহ্য বিনষ্ট করতে কালপ্রিট এবং হাইব্রিডদের নোংরা তৎপরতা পরিলক্ষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দমন করতে হবে।

দেশরত্ন শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে আওয়ামী লীগকে মুজিবাদর্শে বলীয়ান হয়ে জনগণের কল্যাণে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাওয়ায় মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য শতবর্ষ থেকে হাজার বছর ছুঁয়ে যাক। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু!

লেখক: শিক্ষার্থী, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করোনায় তথ্যযোদ্ধা কমিউনিটি রেডিও

শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগের ৭২ বছর

আওয়ামী লীগের ৭২ বছর

দীর্ঘদিনের অপপ্রচারের ফলে দেশে আসলে মৌলবাদীচেতনা দৃঢ় হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হয়েছে। গোষ্ঠীটি বলেছে, আওয়ামী লীগ ‘মুসলমানবিদ্বেষী, আওয়ামী লীগ হিন্দুদের দল, আওয়ামী লীগ ভারতের দালাল’- এ কুৎসিত মিথ্যাচার মানুষের মননে এবং মগজে ঢোকানোর এক মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলে দীর্ঘ ২১ বছর।

৭২ থেকে ৭৩ বছরে পা দিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ৷ বয়সের হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল। অবশ্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনেরও বয়স কোনো গুণ নয়। তাই যদি হতো তাহলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বয়স্ক দল মুসলিম লীগ। সেটির আদৌ কোনো অস্তিত্ব নেই। কমিউনিস্ট পার্টিও প্রাচীনতর দল।

১৯৫৭ সালে ভাসানী প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) কত ভাগে বিভক্ত এবং কোন অংশের সমর্থক কত, তা আমাদের মতো মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। নানা উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে দলটি সাবলীলভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

১৯৭৫ সালে সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর কয়েক বছর দলটি অস্তিত্বসংকটে পড়েছিল। ১৯৭৫-৮১ এই কয়েক বছর বাদ দিলে দলটি সব সময়ই দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। অতীতে অনেকবার দলটি ক্ষমতায় যেমন ছিল, তেমন বিরোধী দলেও ছিল। বিরোধী দলে থাকার সময়ও শক্ত অবস্থানে ছিল।

যে সংগঠন বিরোধী দলে থেকে শক্ত ভূমিকা পালন করতে পারে না, সে দল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গিয়েও ভালো করতে পারে না। আওয়ামী লীগ অবশ্য ক্ষমতায় থাকার চেয়ে বিরোধী দলে থেকে উজ্জ্বল ভূমিকা পালনের রেকর্ড গড়েছে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুল হকের যৌথ নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়৷ জন্মলগ্নে এই দলের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’৷

১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়৷ স্বাধীনতার পর নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’৷ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে দলের হাল ধরেন বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনা৷ এরপর থেকে, গেল ৪০ বছর দলের সভাপতির দায়িত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, সময়ের হিসাবে যা আওয়ামী লীগের ইতিহাসে অর্ধেকের বেশি৷

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০০১-২০০৭ পর্যন্ত একটা বিরতি দিয়ে আবার সরকার গঠন করে দলটি৷ এরপর থেকে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আছে তারা৷ স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার রেকর্ডও এই দলটির।

কিন্তু যে আদর্শ নিয়ে দলটি পথচলা শুরু করেছিল, সেখান থেকে দলটি ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। দলটি ক্রমেই ধর্ম ও ব্যবসায়িক-নির্ভর হয়ে পড়েছে। গণতান্ত্রিক আদর্শচর্চার ক্ষেত্রেও ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

এখন আওয়ামী লীগে তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদদের চেয়ে ব্যবসায়ী ও আমলাদের প্রভাব বেড়েছে। দলে নিয়মিত কাউন্সিল হয় না। গণতন্ত্রচর্চা হয় না। জাতীয় পর্যায়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজনের ক্ষেত্রেও দলটির মধ্যে অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবর্তে নানা কারসাজির মাধ্যমে জয়ী হওয়া এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার ঝোঁক দলটির মধ্যে স্পষ্ট। শুধু তাই নয়, দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে অবৈধভাবে টাকা বানানোর ধান্দা বাড়ছে।

চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন দলের কিছু নেতা-কর্মী। বড়লোকরা প্রতিনিয়ত সুবিধা পাচ্ছে। সে তুলনায় গরিব মানুষের জন্য নীতি-কর্মসূচি নেই বললেই চলে। অথচ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল নিপীড়ন রোধ করতে, শোষণ-বঞ্চনা-ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন থেকে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আওয়ামী লীগ অনেকটাই আদর্শবিচ্যুত হয়ে গেছে। বিশেষত ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শচর্চার ক্ষেত্রে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ধর্মান্ধ, মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সারা জীবন লড়াই করে গেছেন বঙ্গবন্ধু।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হলো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি’- এ স্লোগান বুকে ধারণ করেই এ দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। জীবন উৎসর্গ করেছিল। আজ স্বাধীনতা অর্জনের পঞ্চাশ পর পেছনে ফিরে তাকালে হতাশ হতে হয়। ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা থেকে দলটি ক্রমেই যেন দূরে সরে যাচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম-পরিচয় এখন অনেক ক্ষেত্রেই দলটির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে অভিযোগ শোনা যায়।

অথচ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে এখনও বলা আছে: ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা সকল ধর্মের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সমাজতন্ত্র তথা শোষণমুক্ত সমাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হইবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মূলনীতি।’

কিন্তু ৭২ বছর পর আওয়ামী লীগের দিকে তাকালে মনে হয় দলটি বুঝি তার এই ঘোষিত মূলনীতি থেকে সরে এসেছে! অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের পরিবর্তে দলটি ক্রমেই ধর্মীয় চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আধুনিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাকে জনপ্রিয় করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

বরং একটু একটু করে মৌলবাদীদের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। সংবিধানে এখনও রাষ্ট্রধর্ম বহাল। সবার মধ্যে অসাম্প্রদায়িক মনমানসিকতা সৃষ্টির জন্য উদ্যোগী হওয়া, আধুনিক প্রগতিমুখী যুক্তি ও বিজ্ঞাননির্ভর চেতনা গড়ে তোলার জন্য সামাজিক জাগরণ সৃষ্টি করা, তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ প্রদান ইত্যাদি কাজ করা হয়নি। বরং নানাভাবে ধর্মমুখী চেতনাকেই তালিম দেয়া হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর মধ্যেই এখন হেফাজতিচেতনা বাসা বেঁধেছে।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করেন, দীর্ঘদিনের অপপ্রচারের ফলে দেশে আসলে মৌলবাদীচেতনা দৃঢ় হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হয়েছে। গোষ্ঠীটি বলেছে, আওয়ামী লীগ ‘মুসলমানবিদ্বেষী, আওয়ামী লীগ হিন্দুদের দল, আওয়ামী লীগ ভারতের দালাল’- এ কুৎসিত মিথ্যাচার মানুষের মননে এবং মগজে ঢোকানোর এক মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলে দীর্ঘ ২১ বছর।

’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগের নেতারাও এসব ধর্মীয় অপপ্রচারে বিভ্রান্তিতে পড়েন। নিজেদের ‘মুসলমান’ প্রমাণে মরিয়া হয়ে ওঠেন কেউ কেউ। ধর্ম ও রাজনীতির ককটেলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও আসক্ত হন। বঙ্গবন্ধু যেভাবে দৃঢ়চিত্তে অকপটে ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, যেভাবে তাদের মুখোশ উন্মোচন করতেন সে পথ থেকে সরে আসে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও মনে করেন, বর্তমানে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল করার মতো পরিস্থিতি আর নেই। সমাজ এখন অনেকটাই ধর্মীয় চেতনায় আচ্ছন্ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, উনসত্তর, একাত্তর কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ যদি ধর্মবাদী রাজনীতিকে নাকচ করতে পারে, আজকের বাংলাদেশ কেন পারবে না?

আসলে আওয়ামী লীগের ভেতরেই মৌলবাদী গোষ্ঠী বাসা বেঁধেছে। ধর্মের প্রশ্নে দলটি ক্রমেই আপসের পথে হাঁটছে। বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করার প্রবণতা লক্ষণীয়, আবার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পদক্ষেপও আমরা দেখি, কখনও পাঠ্যপুস্তক বদল করে, ধর্মীয় শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমমর্যাদায় উন্নীত করে মৌলবাদীদের তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে ধর্মীয় শিক্ষাকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রধর্মের পক্ষে ধারাবাহিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আসলে একটু একটু করে ক্রমেই পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণাকেই যেন জাতীয়ভাবে আঁকড়ে ধরা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগও গড্ডলপ্রবাহে গা ভাসিয়েছে। অথচ বাংলাদেশকে উন্নত করতে হলে সবার আগে দেশের মানুষের মনমানসিকতার উন্নয়ন প্রয়োজন। এ জন্য দরকার মতাদর্শিক লড়াই। মানসম্পন্ন শিক্ষা। প্রয়োজন অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা, যুক্তি ও বিজ্ঞানের অুনশীলন বাড়ানো। তা না হলে ফি বছর আমাদের মাথাপিছু আয় হয়ত বাড়বে, কিন্তু এদেশে আবু ত্ব-হা, মামুনুল হক, সাঈদীদের মতাদর্শই বিস্তৃত হবে।

৭২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই লগ্নে আওয়ামী লীগকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে বিকশিত করবে, নাকি বর্তমান প্রবাহ ধরে রাখবে?

লেখক: প্রাবন্ধিক, সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করোনায় তথ্যযোদ্ধা কমিউনিটি রেডিও

শেয়ার করুন

স্বাধীনতার দলের নতুন চ্যালেঞ্জ

স্বাধীনতার দলের নতুন চ্যালেঞ্জ

আওয়ামী লীগ উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার দলটির জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ। আরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে- সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান রোধ। যে দলটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই দলে নানা কৌশলে সাম্প্রদায়িক শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটছে, এমন অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দলটি ২০২১ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পালন করছে। দলটি টানা ১২ বছরের বেশি ক্ষমতায়। পর পর তিনটি সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। জাতীয় সংসদ, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ- জনপ্রতিনিধিদের প্রতিটি সংস্থায় দলটির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব।

সংগত কারণেই এ দলের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কোনো সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতা কিংবা ঠিকভাবে কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে অন্যের ওপর দায় চাপানোর সুযোগ তাদের নেই।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পূর্ববাংলার বঞ্চনা এবং বিশেষ করে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উপেক্ষার পটভূমিতে আওয়ামী লীগের জন্ম। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচি-লাহোরকে কেন্দ্র করে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, তার শাসকরা পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ড) উপনিবেশ হিসেবেই গণ্য করতে শুরু করে।

তারা নতুন উদ্যমে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াতে এবং এটাকেই মুশকিল আসানের দাওয়াই হিসেবে গণ্য করতে থাকে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৪৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর উর্দুতে ডাকটিকিট প্রকাশ ও সরকারি চাকরিতে আবেদন করার যোগ্যতা হিসেবে উর্দু জানা বাধ্যতামূলক করার অপচেষ্টা শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি কর্মচারীরা ধর্মঘট করে বসবে, এটা তারা ভাবতে পারেনি।

এ ঘটনার তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই কলকাতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পাঠ ঘুচিয়ে অচেনা শহর ঢাকায় চলে আসা তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।

বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র চাই- এ স্থির লক্ষ্য বঙ্গবন্ধু নির্ধারণ করেন সেই পঞ্চাশের দশকেই। খ্যাতিমান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সনজীদা খাতুন আমাকে (এ নিবন্ধের লেখক অজয় দাশগুপ্ত) বলেছেন, ১৯৫৬ সালে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু তাকে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি..’ গাওয়ার অনুরোধ করেন। ওই অনুষ্ঠানে পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্টজনেরা এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমাদের মনে যে ‘সোনার বাংলা’ সেটা ওদের প্রতিটি সুযোগে জানিয়ে দিতে হবে।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ, প্রধান সংগঠক। ৩৩ বছর বয়সেই দলের পূর্ব পাকিস্তান কমিটির সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু বাংলার তিন প্রবাদপ্রতিম রাজনীতিবিদ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কাছে তিনি অপরিহার্য সহকর্মী হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। তার বিকল্প নেই কারো কাছে।

পঞ্চাশের দশকে শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় বসবাস করতেন। কিংবা ছুটে যেতেন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দলের কাজে। এ দশকের প্রায় অর্ধেকটা কেটেছে কারাগারে। বন্দিজীবন কতদিন, সে তথ্য রয়েছে ১৯৫৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়, ১৯৪৯ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি গ্রেপ্তার হন এবং একই বছরের ১৭ জুন মুক্তি পান (প্রকৃতপক্ষে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৯ এপ্রিল এবং মুক্তি পান ২৬ জুন)। এরপর গ্রেপ্তার হন ১৯ জুলাই, ১৯৪৯ (প্রকৃতপক্ষে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর) এবং মুক্তি পান ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। এরপর গ্রেপ্তার হন ১৯৫৪ সালের ১৬ মে এবং মুক্তি পান একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিকশাসন জারির পর পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৪ মাস পর ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৫৯ তারিখ মুক্তি পান।

এর বাইরেও ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রথম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে হরতাল পালন করার সময় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কয়েকদিনের জন্য বন্দি ছিলেন। অর্থাৎ পাকিস্তানের প্রথম ১২ বছরের মধ্যে ৪ বছরের বেশি সময় তিনি ছিলেন কারাগারে। ষাটের দশকেও বার বার তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। সবচেয়ে দীর্ঘ কারাবাস ছিল ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ সময়ের বড় অংশ কেটেছে ক্যান্টনমেন্টে। এর পর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তাকে রাখা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে।

কারাগারের বাইরে থাকার সময় বঙ্গবন্ধু ঢাকাকে কেন্দ্র করে দলের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি নিয়মিত জেলা-মহকুমা সফর করেছেন। দলের দুই প্রবীণ ও জননন্দিত নেতার সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সব বিষয়ে তিনি একমত ছিলেন, সেটা বলার উপায় নেই। কখনও কখনও দ্বিমত প্রকাশ্য হয়েছে। কিন্তু দুজনের কাছেই তিনি সমান প্রিয়।

দুজনেই নানা কাজে তার ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখেন। আবার মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যেও বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য ছিল বিস্তর। সে বিরোধ নিষ্পত্তিতেও তিনি সাহায্য করেছেন।

বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দীকে রাজনৈতিক গুরু মানতেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের শুরুতেই রয়েছে- ‘কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হল। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কিভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহে আমি পেয়েছিলাম।’

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ গঠনের পর অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানী শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তান পাঠান সোহরাওয়ার্দীকে এ দলের সঙ্গে যুক্ত হতে সম্মত হওয়ার জন্য। ২৯ বছর বয়স তার। যেতে হয়েছে গোপন পথে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিধ্বস্ত ভারতের ওপর দিয়ে। সেখানের মিশন সম্পন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানে ফেরত আসার পর টানা দুই বছরের বেশি কারাগারে, মুক্তি পান ১৯৫২ সালের একুশের ফেব্রুয়ারির সফল আন্দোলনের পর।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখে আওয়ামী লীগ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিল বলেই আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানের নিষ্ঠুর সামরিক শাসনামলে এ দলটিই ছিল প্রধান ও বলা যায় একক প্রতিপক্ষ। কিন্তু এই প্রতিপক্ষ যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী ও সৃজনশীল নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য জনগণকে প্রস্তুত করে তুলবে, সেটা তারা ভাবতে পারেননি।

স্বাধীনতার জন্য বাঙালিরা এবং তাদের দল আওয়ামী লীগ কতটা প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল সেটা প্রথম স্পষ্ট হয় ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সময়ে। নিষ্ঠুর সামরিক শাসনের কবলে এ ভূখণ্ড। বাঙালিদের দমন করার জন্য বেলুচিস্তানের কসাই লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রতিদিন জারি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দিয়ে সামরিক ফরমান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাসভবনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়েছে বিকল্প প্রশাসন। ইয়াহিয়া খান-টিক্কা খানের হুকুম নয়, জনগণ পালন করেছে ৩২ নম্বরের নির্দেশ।

মহাত্মা গান্ধী শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। কিন্তু বিকল্প প্রশাসন চালু করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু একসঙ্গে দুটি কাজই করেছেন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় বিভিন্ন মহল- সব কিছু চলেছে বঙ্গবন্ধুর কথায়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই আমাদের জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। ২৫ মার্চ নিষ্ঠুর গণহত্যার তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই আমাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণ করে। স্বল্প সময়ে এ সরকার লাখ লাখ তরুণকে মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে প্রশিক্ষণ প্রদান ও অস্ত্রসজ্জিত করে।

এই বাহিনী নাস্তানাবুদ করতে থাকে ‘অপরাজেয়-দুর্ধর্ষ’ দাবিদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে। একইসঙ্গে এ সরকার ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থীর আশ্রয়-খাদ্য-চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে সর্বোতভাবে সহায়তা করে।

সরকার গঠনের দেড় মাস যেতে না যেতেই বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব শিল্পী-কলাকুশলী দিয়ে চালু করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করে পরিকল্পনা সেল।

মুক্তিযুদ্ধকালে কূটনৈতিক অভিযান পরিচালনাতেও বাংলাদেশ সরকার ছিল সফল। গেরিলা যুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে নাকাল করার একপর্যায়ে ভারতের সঙ্গে মিলিতভাবে গঠিত হয় মিত্র বাহিনী, যাদের প্রবল আক্রমণে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের সহযোগীরা ১৬ ডিসেম্বর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ছিল, সন্দেহ নেই। ২০২০ সালে পূরণ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ। ২০২১ সাল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। আওয়ামী লীগ উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার দলটির জন্য এটা বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে- সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান রোধ। যে দলটি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই দলে নানা কৌশলে সাম্প্রদায়িক শক্তির অনুপ্রবেশ ঘটছে, এমন অভিযোগ রয়েছে। দলের নানা পর্যায়ের নেতৃত্বের একটি অংশ ক্ষমতা ‘উপভোগ’ করায় যতটা তৎপর, বাংলাদেশের মৌল চেতনা ধ্বংসে সক্রিয় সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি ততটাই যেন আপসকামী।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। সম্পদ বাড়ছে দেশে এবং এর পেছনে আওয়ামী লীগের বিপুল অবদান। কিন্তু একইসঙ্গে একটি মহলের হাতে জমা হচ্ছে অঢেল সম্পদ। কী করে এই বৈষম্য কমিয়ে আনা যাবে, সে চাপ বাড়ছে দলের নেতৃত্বের ওপর।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে সরকার ও আওয়ামী লীগের সামনে আরও একটি ইস্যু- প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এমনকি দলের নানা পর্যায়ের নেতৃত্বে দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের আরও বেশি দায়িত্ব প্রদান। টেকসই উন্নয়নের জন্য এটা অপরিহার্য শর্ত।

নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। কোনো স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ এভাবে বিশ্বব্যাংক বা পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেনি। করোনা বিপর্যয় মোকাবিলা করছেন নিপুণ দক্ষতায়। বিদ্যুৎ সংকটের অবসান ঘটেছে। খাদ্যে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা প্রত্যন্ত গ্রামেও বিস্তৃত।

এ ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ উন্নত দেশের সারিতে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে হলে সম্পদ সৃষ্টির প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। উদ্যোক্তাদের দিতে হবে নানা সুবিধা। একইসঙ্গে বৈষম্য কমিয়ে আনার প্রতিও দিতে হবে সর্বোচ্চ মনোযোগ। আমাদের স্বাধীনতার মর্মচেতনাই ছিল সোনার বাংলা নির্মাণ ও দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
শিক্ষাক্ষেত্রে কি সৃজনশীলতা দেখা গেছে?
জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করোনায় তথ্যযোদ্ধা কমিউনিটি রেডিও

শেয়ার করুন