জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য

জাতি ও জাতিরাষ্ট্রের পুনর্গঠন অপরিহার্য

প্রতিটি জাতিরাষ্ট্রই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গভেদে সমানভাবে গড়ে তোলার মাধ্যমে যে জাতি গঠন করে সেটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই মজবুত করে। অপরদিকে যে রাষ্ট্র এসব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে সেই রাষ্ট্র মানবসম্পদ তৈরির চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা না করে নানা ধরনের বৈষম্য, বিভাজন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অন্যায়-অবিচার, ঘুষ-দুর্নীতি অনিয়মকে সমাজ-রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বত্র কর্তৃত্ব করার সুযোগ করে দেয়।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও বিকাশ ঘটিয়ে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন সেটি সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কবর রচনা করেছে, একইসঙ্গে বাঙালিসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার-সংবলিত একটি জাতি-রাষ্ট্রের স্বপ্নও দেখিয়েছে।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণ ধর্ম-বর্ণ, জাতিগত পরিচয়ের বিভেদ ভুলে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অবশেষে পাকিস্তানকে পরাজিত করে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্রটি আমরা অর্জন করেছি সেটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠন এবং পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে উন্নত জীবন গঠনের ব্যবস্থা করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।

পৃথিবীতে অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের সূচনা হয়। এর আগে রাষ্ট্রব্যবস্থা চরিত্রগতভাবে কখনও জাতি-রাষ্ট্রের সনদ গ্রহণ করেনি।

তখন বেশিরভাগ রাষ্ট্রই ছিল হয় রাজতান্ত্রিক নতুবা ঔপনিবেশিক। সংগত কারণেই বোধগম্য যে, জাতিরাষ্ট্র গঠনের আগে রাষ্ট্র ভাষা-সংস্কৃতি, আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বেড়ে ওঠা জাতিগোষ্ঠীর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। সেকারণেই এই ঐক্যবদ্ধ জাতি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিপ্লব কিংবা আন্দোলন-সংগ্রাম করে নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে।

জার্মান জাতি ৩৬০টি ছোট অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। বিসমার্কের নেতৃত্বে ১৮৭০ সালে ঐক্যবদ্ধ জার্মান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। একইভাবে ইতালিও বিভক্ত ছিল কয়েকটি অঞ্চলে। অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন শাসন করেছে ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া এবং ক্যাথলিক পোপ।

১৮৭০ সালে ৫০ বছরের সশস্ত্র লড়াই-সংগ্রাম শেষে ঐক্যবদ্ধ ইতালির জন্ম হয়। রাষ্ট্রের এই ধারণাটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র বলে অভিহিত করেছে। তবে জাতি-রাষ্ট্রে একটিই জাতি থাকবে তেমন কোনো কথা নেই। বহুজাতিকে নিয়েও একটি জাতিরাষ্ট্র গঠিত হতে পারে। তবে সব জাতির সমান অধিকার রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে স্বীকার করে নেয়। আবার একই রাষ্ট্রে একটিমাত্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও আঞ্চলিক বৈষম্য থেকে মুক্ত রাখার জন্য সাংবিধানিক ফেডারেল পদ্ধতির শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতিরাষ্ট্র নিজের চরিত্রকে আধুনিক গণতান্ত্রিক মর্যাদা দিয়ে থাকে।

সুতরাং জাতি-রাষ্ট্রের উত্থান আধুনিক যুগের অন্যতম অর্জন। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা জাতি বা জাতিসমূহের স্বায়ত্তশাসন, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা-সংস্কৃতির বৈষম্য দূর করার জন্য সব ধরনের সুযোগসুবিধা সমানভাবে নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। সেকারণেই বিশ শতকে ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব রাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে তার মধ্যে অপেক্ষাকৃত উন্নত ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যেসব রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো।

বাংলাদেশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জাতিগত অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ২৩ বছর পাকিস্তানের শাসন-শোষণ ও নিপীড়নের মূল ভিত্তি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক, এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা। সেকারণেই ১৯৭১ সালে জাতি-ধর্ম, বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে আমরা মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করেছি শুধু স্বাধীনতার জন্য নয়, এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেখানে ভেদাভেদ ও বৈষম্য থাকবে না। মানুষ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচয় নিয়ে বসবাস করার অধিকার লাভ করবে। জাতি-রাষ্ট্রের এই ধারণা আমাদের ১৯৭২-এর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ যেসব নীতি, আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এর সবগুলোই ছিল মহৎ, মানবিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনে অপরিহার্য। আমাদের যাত্রার শুরুটি অবশ্যই জাতিরাষ্ট্র গঠন এবং জাতির মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে প্রাপ্ত পশ্চাৎপদতা কাটিয়ে দ্রুত শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বিকশিত, উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। সেকারণেই বঙ্গবন্ধু নতুন রাষ্ট্রের নতুন জাতি গঠনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনে হাত দিয়েছিলেন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে নীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন।

বাংলাদেশে যেন ধর্মীয় বিরোধ হানাহানি জাতির মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য তিনি সংবিধান, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার, পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে দ্রুত উপরে তুলে আনার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন।

বোঝাই যাচ্ছিল তিনি রাষ্ট্রটিকে আধুনিক শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যহীন চরিত্রদানে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তবে এমন একটি জাতিরাষ্ট্র এবং জাতি গঠনের কাজটি মোটেই সহজ ছিল না। যথেষ্ট সময় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিতর দিয়েই পাকিস্তান নামক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের গর্ভ থেকে বের করে আনা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হতো। কিন্তু ’৭৫-এর হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আদর্শ আর জাতিরাষ্ট্র গঠনে নিমগ্ন থাকেনি, বরং ৪৭-উত্তর সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের ভাবাদর্শে ফিরিয়ে নেয়া হয়।

এর পরিণতি আমাদের জন্য কত ভয়াবহ হতে যাচ্ছে তা এরই মধ্যে দেখাও যাচ্ছে। কিন্তু খুব সামান্য সংখ্যক মানুষই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যাত্রার সূচনা এবং তার পরবর্তী পালা বদলের পরিণতি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করেন বলে মনে হচ্ছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে ৫০ বছর অতিক্রম করেছে। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন গত ৫০ বছরে কতটা ঘটেছে, কোন শাসনামলে আমরা কোন কোন ক্ষেত্রে বেশি অর্জন করেছি, আবার আমাদের কোন শাসনামলে জাতি গঠনের কঠিন দায়িত্ব বিসর্জিত হয়েছে, বাংলাদেশ জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা থেকে সাম্প্রদায়িকতার ধ্যান-ধারণাকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অবারিত করে দিয়েছি- সেটি লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট বুঝা যায়।

ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের মৌলনীতির বিপর্যয় রাষ্ট্রকে কতটা হুমকির মুখে ফেলে দেয়। সেই ধারণাও আমাদের রাজনীতি এবং শাসকমহলে খুব একটা ভাবনাচিন্তা করতে দেখা যায় না। ফলে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ এখন যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে সেখান থেকে আধুনিক জাতি গঠনের কাজটি খুবই দুরূহ হয়ে উঠেছে। জাতির ধারণাটি বিভক্ত হয়ে গেছে তাই এটি গঠন প্রক্রিয়ায় ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অধিকন্তু রাষ্ট্র থেকে জাতির ধারণা হারিয়ে যেতে বসেছে। সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের প্রচারণা সমাজ-শিক্ষা, সংস্কৃতি-রাজনীতি, প্রশাসন-জীবনাচরণ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ৪ দশকের বেশি সময় বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার দর্শন দ্বারা পরিচালিত হওয়ার নীতি-কৌশল থেকে দূরে সরে গেছে। শিক্ষার নামে এখানে যার যা খুশি তাই রাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। দেশে শিশুরা কী শিখবে, কেন শিখবে, শিখে কার লাভ হবে- ব্যক্তির নাকি রাষ্ট্রের? এর কোনো তদারকি নেই। যে যার মতো করে শিক্ষার নামে নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলে চলছে।

এগুলোতে শিক্ষার্থীদের সুকুমার বৃত্তির উন্মেষ ঘটানোর প্রয়াস নেই বললেই চলে। ফলে এই শিশুরা যে ‘শিক্ষা’ নিয়ে বেড়ে উঠছে তাতে স্বদেশের অবস্থান নেই, মাতৃভাষা, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং বিশ্বজনীনতা সম্পর্কে শিক্ষা-দর্শনের ধারণাগত স্পষ্টতা নেই। অধিকন্তু বিভ্রান্তি এবং দিকভ্রান্তি তাদেরকে এমন এক বিশ্বাসের জগতে নিয়ে গেছে যেখানে বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞান মোটেও বিবেচনায় থাকে না।

ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেভাবে বিভ্রান্তিতে বেড়ে উঠছে তাতে জাতির গঠন নয়, বিভাজনই যেন দৃঢ়তা পাচ্ছে। এর ফলে সমাজে দেশপ্রেমের অভাব স্পষ্ট হচ্ছে, ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ অনেকাংশে প্রাধান্য পাচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় মান ও জ্ঞানের সংকট তীব্রতর হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ার হার বেড়েই চলছে।

ঝরে পড়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থী সংবিধানে সর্বজনীন শিক্ষার অধিকার লাভ থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা দশম অথবা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সর্বজনীন বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করতে পারিনি। অথচ আমাদের অঙ্গীকার ছিল সর্বজনীন বাধ্যতামূলক শিক্ষায় সকল শিশুকে শিক্ষিত করা। ইউরোপের জাতিরাষ্ট্রগুলো শত বছর আগেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

এমনকি জাপান প্রায় দেড়শ’ বছর আগেই তাদের নাগরিকদের সর্বজনীন শিক্ষায় শিক্ষিত করার মিশন বাস্তবায়ন শুরু করে করে। সেটি তাদের বাস্তবায়ন করতে মাত্র দুই দশক সময় নিয়েছিল। জাতির নতুন প্রজন্মকে যদি সর্বজনীনভাবে শিক্ষিত করা না যায়- তাহলে জাতীয়তা বোধ, করণীয়, অঙ্গীকার, রাষ্ট্রচেতনা, জীবনবোধ কীভাবে গঠিত হবে?

সব জাতিরাষ্ট্রই যাত্রার শুরু থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাধ্যতামূলকভাবে স্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এরপর শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করবে নাকি উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত হবে সেটি তার মেধা এবং বিবেচনার বিষয়। কিন্তু স্কুল শিক্ষা শেষে শিক্ষাসনদপ্রাপ্ত নাগরিক হিসেবে এরা সবাই রাষ্ট্রের যেকোনো জায়গায় পছন্দের পেশায় নিযুক্ত হতে কোনো বাধা নেই।

রাষ্ট্রের সঙ্গে তরুণ এই নাগরিকের সম্পর্ক এভাবেই নিবিড় হয়ে ওঠে। তরুণ নাগরিক তার রাষ্ট্রকে জীবনের জন্য কতটা প্রয়োজন সেটি আপনা থেকেই উপলব্ধি করতে পারে। এভাবেই জাতিরাষ্ট্র এবং জাতি একাত্ম হয়ে যায়। আমরা ৫০ বছরেও পারিনি আমাদের নতুন প্রজন্মের শিশুদের অন্তত উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে।

সেকারণে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেনি, পারছে না। বেকারত্ব তাদেরকে গ্রাস করেছে। আবার স্কুল থেকে ঝরে পড়া কিশোরদের অনেকেই বখাটে কিংবা দুর্বৃত্তায়নের হাতছানিতে জড়িয়ে পড়েছে। আমাদের সমাজে লাখ লাখ তরুণ স্কুল কিংবা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাজীবন পার করতে না পেরে পরিবারের বোঝা কিংবা সমাজে বখাটে অথবা সন্ত্রাসের পথ বেছে নিচ্ছে।

দীর্ঘদিন থেকে কিশোর গ্যাং শুধু শহরেই নয় গ্রামেও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে মেয়েরা লেখাপড়া কিংবা স্বাধীনভাবে চলাফেরায় এসব বখাটেদের হাতে নির্যাতিত হয়। ফলে গ্রামের অভিভাবকরা দ্রুত মেয়েদের বিয়েশাদি দিয়ে মুক্ত হতে চায়।

এভাবেই আমাদের সমাজের সম্ভাবনাময় কিশোর-কিশোরীরা জীবন গড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের এই বঞ্চিত হওয়া মানেই হচ্ছে রাষ্ট্রগঠনে যোগ্য নাগরিক তৈরিতে আমরা বছরের পর বছর ব্যর্থতা মেনে নিচ্ছি।

এভাবে আমাদের জাতি গঠন পিছিয়ে পড়ছে। রাষ্ট্র বঞ্চিত হচ্ছে আধুনিক চরিত্র লাভের সুযোগ থেকে । যতদিন রাষ্ট্র তার প্রতিটি নর ও নারীকে শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারবে ততদিন রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়নে এরা ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। সুতরাং প্রতিটি জাতিরাষ্ট্রই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গভেদে সমানভাবে গড়ে তোলার মাধ্যমে যে জাতি গঠন করে সেটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই মজবুত করে।

অপরদিকে যে রাষ্ট্র এসব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে সেই রাষ্ট্র মানবসম্পদ তৈরির চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা না করে নানা ধরনের বৈষম্য, বিভাজন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অন্যায়-অবিচার, ঘুষ-দুর্নীতি অনিয়মকে সমাজ-রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বত্র কর্তৃত্ব করার সুযোগ করে দেয়। এর শেষ পরিণতি ভয়াবহ নৈরাজ্য, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ইত্যাদি রাষ্ট্রকে পেছনের দিকে টেনে ধরে। এই রাষ্ট্রের গতিপথ সম্মুখে নয়, পেছনের দিকেই বেশি পরিচালিত হয়। আমরা কি তেমন বিভাজন থেকে খুব বেশি দূরে আছি?

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
ফেসবুকের মুখোশধারী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ
করোনায় তথ্যযোদ্ধা কমিউনিটি রেডিও
ফিলিস্তিনে রক্তস্রোত থামবে কবে?
নৃশংসতা এখন সমাজের দুষ্ট ক্ষত

শেয়ার করুন

মন্তব্য