স্বাস্থ্য-শিক্ষা নিয়ে বিষণ্ন কথা

স্বাস্থ্য-শিক্ষা নিয়ে বিষণ্ন কথা

সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। কিন্তু প্রতিবছর সরকার এই দুটি খাতে যে অর্থ বরাদ্দ করে থাকে তাতে সব মানুষের ওই দুটি মৌলিক অধিকার কার্যত থাকে অবহেলিত।

গত চার মাস করোনা সংক্রমণ দেশের সব স্তরের মানুষকে আগের তুলনায় বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। মৃত্যুর মিছিল, নিকটাত্মীয় ও বিশিষ্টজনদের অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায়। ডাক্তার-নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল, বেড, বিশেষ ধরনের নিরাপত্তামূলক পোশাক, আইসিইউ, অক্সিজেন, করোনা পরীক্ষার কিট ও ল্যাব প্রভৃতির নিদারুণ স্বল্পতা, পথেঘাটে বহু রোগীর মৃত্যু সব স্তরের নারী-পুরুষের হাজার হাজার সংক্রমণ হাজার হাজার মৃত্যু কোনো দিন দেখিনি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতির মৌলিক বিষয়গুলোও ভুলে গিয়েছি। ওই মৌলিক প্রতিশ্রুতিগুলো যথার্থভাবে বিধৃত হয়েছিল বাহাত্তরের সংবিধানে। সেখানে স্পষ্ট ছিল- খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারভুক্ত। এই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা যদি বিগত দিনগুলোতে আমরা মেনে চলতাম- তাহলে আজ আর করোনার চিকিৎসার ব্যাপারে আমাদের এমন হিমশিম খেতে হতো না।

আমাদের জনসংখ্যা ১৭ কোটি বা এর কাছাকাছি। প্রতি ২০০ নাগরিকের জন্য একটি করে বেড কেন থাকবে না? বাস্তবে আছে কত? দুই হাজার নাগরিকের জন্যও একটি বেড নেই। রোগীরা ভর্তি হতে গেলেই জবাব আসে বেড খালি নেই। ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় বেড তো খালি নেই-ই, রোগীরা (নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে) অনেকেই মেঝেতে চাদর পেতে শুয়ে আছেন।

আবার, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দৃশ্য সম্পূর্ণই ভিন্ন। অনেক বেশি ছিমছাম। সর্বত্র এসি। নির্দিষ্টসংখ্যক বেড অনুযায়ী ভর্তি। রোগীর স্বজনরা যদি বিপুল ব্যয় বহন করতে পারেন সে ক্ষেত্রেই কেবল তারা সুচিকিৎসা পেতে পারেন।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়াই দুরূহ। দিনের পর দিন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য ঘুরেও ব্যর্থ হওয়ার ফলে বাড়িতেই মৃত্যুবরণ করছে এমন উদাহরণের অভাব নেই।

আবার কায়ক্লেশে ভর্তি হতে পারলেও দেখা যায় ডাক্তার হয়তো ঠিকমতো দেখতে আসেন না, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় কেবলই অর্থের বিনিময়ে, ওষুধ কিনে দিতে হয় হাসপাতাল-সংলগ্ন দোকান থেকে। অথচ ওষুধ বাবদ প্রতিবছর সরকারের ব্যয় হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। হাসপাতালে সরকারি টাকায় কেনা ওষুধই চলে যায় পার্শ্ববর্তী দোকানগুলোয় এবং সেখান থেকে কিনে খেতে হয় রোগীকে বিনা পয়সায় তার প্রাপ্য ওই ওষুধ।

সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। কিন্তু প্রতিবছর সরকার এই দুটি খাতে যে অর্থ বরাদ্দ করে থাকে তাতে সব মানুষের ওই দুটি মৌলিক অধিকার কার্যত থাকে অবহেলিত।

শিক্ষাক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের সংখ্যা অতীতের তুলনায় বহু গুণ বেড়েছে। বেড়েছে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষকের সংখ্যাও। কিন্তু শিক্ষার মান ক্রমক্ষীয়মাণ। এই দুষ্ট ক্ষতের হাত থেকে রেহাই কত দিনে এবং কীভাবে পাওয়া যাবে কেউই তা বলতে পারেন না। কারণ, মান উন্নয়নের বিষয়টি এজেন্ডাতেই নেই। শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ হয় তা শিক্ষকের বেতন এবং অবকাঠামোতেই ব্যয় হয়। মান-সংক্রান্ত বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত।

আবার বাংলায় শিক্ষা, ইংরেজিতে শিক্ষা, আরবিতে শিক্ষার নামে শিক্ষা ক্ষেত্রে নেমে এসেছে মারাত্মক বৈষম্য। আরবি শিক্ষায় সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিবছর, অথচ ওই শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষার সমন্বয় আজও ঘটানো হয়নি। ফলে ওই শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে লাখ লাখ ছেলেমেয়ে শুধু ধর্মীয় আবেগে কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ থেকে যাচ্ছে অন্ধকারের কূপে নিক্ষিপ্ত।

ধর্মীয় বৈষম্য সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতিও বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করলে এই তিন ধরনের শিক্ষা চালু করে সংবিধানের মৌলিক দিকগুলোর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে।

জাতীয় অঙ্গীকার ছিল এককেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। পৃথিবীর সব উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থার খবর নিলে আমাদের মতো বহুকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সন্ধান কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল বিষয় হলো এর সর্বজনীনতা। কিন্তু স্বাস্থ্য শিক্ষার সুযোগ সারা দেশে আজও অত্যন্ত কম। যতটুকুও বা আছে তাতে আসনসংখ্যা মারাত্মকভাবে কম হওয়ায় আগ্রহী এবং যোগ্যতাসম্পন্ন ছেলেমেয়েদের একটি বড় অংশই মেডিক্যাল শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত হয়ে থাকে। মেডিক্যাল শিক্ষাসহ সকল শিক্ষাক্ষেত্রেই গবেষণার বিষয়টি আমাদের দেশে আজও উপেক্ষিত।

চলমান করোনা সংকটের মুহূর্তে বিষয়টি সকলেরই নজর কাড়ছে। গবেষণা এবং নতুন নতুন আবিষ্কারের জন্য আমাদের বিদেশমুখীনতা সর্বগ্রাসী। নিজস্ব উদ্যোগে কেউ সেই কাজে এগিয়ে এলে সে ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার নিদারুণ অভাব। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র আবিষ্কৃত কিটসের অনুমোদন নিয়ে টালবাহানার অন্তরালে দুর্নীতিবাজ শক্তিশালী মহলের হাত সক্রিয় বলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চিকিৎসার আওতায় দেশের সব নাগরিককে যদি আমরা আনতে চাই তা হলে আমরা এ ক্ষেত্রে কিউবা ও ভিয়েতনামকে মডেল হিসেবে ধরে নিতে পারি এবং ওই দেশ দুটি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সমস্যাটির সমাধান করতে পারি।

লাতিন আমেরিকার দেশ কিউবা বিপ্লবের মাধ্যমে পরিবর্তন হলে দেশটির ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিধি-নিষেধ আরোপ করে কিউবার বিপ্লবকে অংকুরেই বিনাশের চেষ্টায় মেতে ওঠে। এমনকি বিপ্লবী জননেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রকে হত্যা বা তার ক্ষমতাচুতির লক্ষ্যে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও তাদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে ব্যর্থ হয়। অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা কিউবার বিরুদ্ধে আমেরিকা আজও জারি রেখেছে।

বিপ্লবের পর পরই ফিদেল ক্যাষ্ট্রোর নজরে পড়লো দেশটির সামগ্রিক দুরবস্থা বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে। সহায়তা চাইলেন যুদ্ধবিধস্ত লাতিন আমেরিকার ক্ষুদ্র এই দেশটির উন্নয়নের জন্য আমেরিকান সরকারের কাছে- হলেন প্রত্যাখ্যাত।

এ অবস্থায় কাষ্ট্রো সিদ্ধান্ত নিলেন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নকে বাজেটে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেশটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তুলবেন। সাধারণ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা গবেষণার ওপরও গুরুত্ব প্রদান করলেন।

গড়ে উঠলো সাধারণ স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল স্কুল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, অসংখ্য আধুনিক হাসপাতাল প্রভৃতি। সুফলও পেলেন কিউবানরা। প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা এবং সর্বাধুনিক চিকিৎসা বিনাম্যূল্যে।

এবারে আসি এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামে। এই দেশটি ২০ বছরব্যাপী হো চি মিনের নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করে স্বধীনতা অর্জন করে ১৯৭৩ সালে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়াতনামকেও তখন থেকে আজ পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালনা করছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই দেশটিও ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করেছে।

এশিয়ার একটি উদীয়মান অর্থনীতির এই দেশও নিজেকে প্রায় করোনামুক্ত রাখতে পেরেছে। দেশটির বিশাল সীমানা চীনের সঙ্গে। সেই চীনেই সবার আগে করোনা সংক্রমণ ঘটে, ঘটে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট সরকার তৎক্ষণাৎ সীমানা বন্ধ, বিমানের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটসমূহ বন্ধ এবং কঠোরভাবে দেশব্যাপী স্বাস্থ্যবিধি অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে আরোপ করার ফলে সেখানেও নগণ্যসংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হন এবং তার থেকেও অনেক কম সংখ্যক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন।

কমিউনিস্টশাসিত নেপাল এবং ভারতের কেরালা রাজ্যও অনুরূপ সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে এবং করোনা সংক্রমণ রোধে তাদের সাফল্যও প্রশংসিত। চীনও সাফল্যের সঙ্গে করোনা সংকটটির মোকাবিলা করতে পেরেছে তাদের উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও কঠোর শৃঙ্খলাবোধের কারণে।

এই দেশগুলোর সার্বিক অনুকরণ নয়, তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন।

পুঁজিবাদী দুটি দেশেরও সাফল্য আছে করোনা নিয়ন্ত্রণে এবং সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে। যেমন অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু এই দুটি দেশই উন্নত। তাই তাদের সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না।

কেরালা, নেপাল, কিউবা ও ভিয়েতনামের মতো ছোট দেশ ও রাজ্যগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পারলে বাংলাদেশ উপকৃত হবে-আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সর্বজনীন রূপও পেতে পারে।

লেখক: রাজনীতিক, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতির অর্থ যুদ্ধ শেষ নয়
জনসংখ্যার ভার ও বাসের অযোগ্য হয়ে ওঠা ঢাকা
বৈশাখী পূর্ণিমা ও বুদ্ধজাতক
নজরুল চেতনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভা নির্বাচনে নজরুল

শেয়ার করুন

মন্তব্য